মাহমুদ সাজ্জাদ বললেন, ‘কী খাবে বলো।’
নীলিমা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে আছে মাহমুদ সাহেবের সামনে। সে বলল, ‘কিছু খাবো না। খিদে নেই। আপনি খেয়ে নিন।’
‘তাহলে থাক, আমারো তেমন একটা খিদে নেই।’
‘না না, আপনি খেয়ে নিন, আমি বসছি।’
‘চলো, সমুদ্রের বাতাস গায়ে লাগিয়ে খিদেটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে আসি। তারপর না হয় একসঙ্গে বসে খাওয়া যাবে।’
নীলিমা কিছু বলল না। উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে গেল বাইরের দিকে। মাহমুদ সাহেব বের হয়ে এলেন তার পিছে।
আতিকুর রহমানের স্টোর থেকে ফিরে আসার সময় হোটেল গার্ডেন ইনের সামনে থেকে মাহমুদ সাহেবকে তুলে নিয়ে এসেছে নীলিমা। তার মনটা বিষণ্নতায় ভারী হয়ে আছে। তার অনেক কথা সে কবিকে বলতে চায়। কবির মুখ থেকে শুনতে চায়। কিন্তু কোনো কথাই তার বলা হচ্ছে না। এখানে আসার পর থেকেই চুপ করে আছে সে।
বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে মাহমুদ সাজ্জাদ তাকালেন নীলিমার দিকে। দেখলেন মাথা নিচু করে অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটছে মেয়েটি। ওর মধ্যেকার সেই স্বাভাবিক চঞ্চলতাটুকু নেই। তিনি একসময়ে হালকাভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, নীলিমার মন ভালো নেই আজ? সূর্যস্নাত এমন দিনে নীলিমার মন থাকবে রোদের মত ঝলমলে। সেখানে যেন মেঘের ঘনঘটা। উহু, মোটেও ভালো কথা নয়। কি হয়েছে, আমাকে বলা যায়?’
‘বললে কি হবে? মন ভালো করে দেবেন?’
‘সে গ্যারান্টি তো দিতে পারব না। তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
‘তাহলে দিন—আমার মন ভাল করে দিন। আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ।’
‘একটা কবিতা শুনবে?’
‘কবিতা শুনতে ইচ্ছে করছে না। কবিতা ছাড়া আর কিছু জানেন না?’
‘হা হা হা।’ মাহমুদ সাহেব নীলিমার কথার ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন। ‘কবিতাটাই একটু জানি, তাও ভালো মতো না। কবিতা ছাড়া আর কী শোনাই তোমাকে? উম, তাহলে… তাহলে…’
‘আমি আপনার হাতটা কিছুক্ষণ ধরে থাকতে চাই… ’ কবিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে হঠাৎ করেই বলল নীলিমা। ‘দেবেন, আপনার হাতটা ধরতে?’
নীলিমার এমন অদ্ভুত অনুরোধে মাহমুদ সাহেব আস্তে করে দাঁড়ালেন। তিনি খুব অবাক হলেন কি না তা বোঝা গেল না। কিন্তু খুব স্বাভাবিক ভাবে তিনি তার হাত দু’খানি বাড়িয়ে দিলেন নীলিমার দিকে।
নীলিমা কাঁপা কাঁপা হাতে তার প্রিয় মানুষের হাত দুটি ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
…
আতিকুর রহমান খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘না না, জামান, কাজটা তুমি ঠিক করো নি। এভাবে না জেনে শুনে কারো নামে কিছু বলাটা তোমার একেবারেই উচিৎ হয় নি।’
নীলিমা চলে যাবার পর পরই আতিকুর রহমান জরুরী ভিত্তিতে ফোন করে জামানকে ডেকে নিয়ে এসেছেন তার স্টোরে। জামান বসে আছে তার অফিস রুমে মাথা নিচু করে।
আতিকুর রহমান প্রচণ্ড রকমের রেগে আছেন। তিনি আবার বললেন, ‘আমেরিকার মতো এত বড় একটা দেশে থেকেও মনটাকে বড় করতে পারলে না। আফসোস! এ কাজটা না করলেই কি হতো না। নীলিমা তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি। না কি করেছে?’
জামান মিন মিন করে বলল, ‘না করে নি।’
‘তাহলে? আর মাহমুদ ভাই-ই বা কী মনে করবেন? আমাদের সম্পর্কে ওনার ধারণাটা কী হবে বলো?’
‘আই’ম সরি আতিক ভাই।’
‘সরি আমাকে না বলে বরং যাকে বলার তাকেই বলো।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘আর সরি বললেই বা কী? এক সরিতেই কি আর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? বাঙালি কমিউনিটিতে যে কোনো কথা বাতাসের আগে ছুটে, না জানি কে কী বলা শুরু করেছে।’
‘আমার ভুল হয়েছে আতিক ভাই। আমি স্বীকার করছি—কাজটি ঠিক হয় নি। বাট আই প্রমিজ, আই উইল ফিক্স ইট। জাস্ট গিভ মি ফিউ ডেজ।’ কথা শেষ করে জামান একটু অন্যভাবে তাকাল।
আতিকুর রহমান ঠিক বুঝতে পারছে না, জামান কী ফিক্স করবে আর কীভাবেই বা করবে? সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জামানের দিকে।
জামান আবারো বলল, ‘আই’ম সরি এগেইন।’ সে উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেল।
…
কথা বলতে বলতে নীলিমার দু চোখ ভিজে এল। সে আস্তে করে বলল, ‘আপনি তো আমার সব কথাই শুনলেন, এখন আমি কি করব বলতে পারেন? আমার কী করা উচিৎ?’
মাহমুদ সাজ্জাদ কী বলবে ভেবে পেলেন না। নীলিমাকে সে কী বলবে? কীইবা বলা উচিৎ? তিনি কি বলবেন, শোভনকে ছেড়ে তুমি চলে যাও? যে তোমাকে ভালোবাসে না, সম্মান করে না, তোমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই যার কাছে, তার কাছে তুমি কেন থাকবে? তুমি চলে যাও। কিন্তু তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে কাউকে তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্ররোচিত করা কি ঠিক হবে? তিনি চুপ করে রইলেন।
জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে দিশেহারা হয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ। হতাশা, ব্যর্থতা, গ্লানির তিক্ত অনুভূতিগুলো যখন ঘিরে ধরে তখন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সম্বল হয় একটু আশা, একটুখানি সম্ভাবনার হাতছানি। জীবনের কঠিন সময়ে মনোবল ধরে রাখতে হৃদয়ে অনুপ্রেরণা পাওয়াটা জরুরী। একজন প্রিয় মানুষের কাছ থেকে সেই অনুপ্রেরণা কি কেউ পেতে পারে না?
‘কি আমার জন্যে কোন কথাই কি আপনার নেই? একটা ছোট্ট পরামর্শও কি আপনি দিতে পারেন না।’
কবি তবু নীরব। উদাস নয়নে তাকিয়ে রইলেন সামনের দিকে।
নীলিমা আবার বলল, ‘জানি, কিছু বলতে পারবেন না। সে সাহস আপনার নেই। আপনাদের মতো কবি লেখকদের যত সাহস শুধু ঐ কলমেই—মুখে নয়।’
মাহমুদ সাজ্জাদ মৃদু হাসলেন শুধু। কিছু বললেন না। নীলিমার কথাই কি তাহলে ঠিক? হয়ত তাই। তিনিতো চাইলেও ওকে বলতে পারছে না, যে তোমাকে আমার কত ভালো লেগেছে। তোমার জন্যে আমার খারাপ লাগছে। খারাপ লাগবে। সব কথা কি বলা যায়?
নীলিমা এক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল কবির মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘আপনি কি ভাবছেন আমি জানি। আপনাকে কিছুই বলতে হবে না। আমি জানি আমাকে কী করতে হবে।’ কথা বলতে বলতে অভিমান আর কষ্ট মিশ্রণের বাষ্পে চোখ ভরে উঠল তার।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমা বলল, ‘এনিওয়ে, আমাকে সময় দেবার জন্যে ধন্যবাদ। চলুন ফেরা যাক।’
মাহমুদ সাজ্জাদ চুপ করেই থাকলেন আরো কিছুক্ষণ। তারপর নীলিমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললেন, ‘চলো।’
কিছুটা হেঁটে কবি থেমে দাঁড়ালেন। ঘুরে তাকালেন নীলিমার দিকে। বললেন, ‘শোনো নীলিমা, বুঝতে পারছি তুমি হতাশ হয়েছো আমি কিছু না বলাতে। আমি যদি বলি, তুমি শোভনকে ছেড়ে চলে যাও, তোমার চলে যাওয়াই উচিৎ—কিন্তু সে কথা বলার অধিকার কি আমি রাখি? জীবনটা তোমার, সিদ্ধান্তটা তোমাকেই নিতে হবে। কিন্তু কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে নয়।’ তিনি থেমে থেমে বললেন, ‘তুমি যথেষ্ট স্মার্ট একটা মেয়ে। তোমার মতো একজন বুদ্ধিমতী মেয়ে কেন মেনে নেবে—যে জীবন তার প্রাপ্য নয়?’
নীলিমা চুপ করে শুনছে তার কথা।
এবার কবি ভাবলেন, মেয়েটার মন ভাল করে দেয়া দরকার। এটুকু অন্তত সে করতে পারে। তিনি সমুদ্রের দিকে একবার তাকালেন। সেদিকে তাকিয়েই বললেন, ‘নীলিমা, তুমি কি জানো, তোমার মতো মেয়েরা আছে বলেই, আজো কবিতা লেখা হয়। তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে একজন সাধারণ মানুষও কবি হয়ে যেতে পারে।’
‘থাক, আমাকে আর মন ভোলানো কথা না বললেও চলবে। আমি কোনো টিনেজ মেয়ে নই।’
নীলিমা ঘুরে হাঁটা শুরু করল। একটু হেসে কবিও তাকে অনুসরণ করল।
তারা দুজনে হেঁটে চলল। পাশাপাশি। চুপচাপ। অদ্ভুত এক নীরবতায় ছেয়ে আছে চারিদিক। সূর্য তখন ডিমের কুসুম হয়ে ঢলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। রাঙা পশ্চিমাকাশ আর সমুদ্রের পানি মাখামাখি হয়ে আছে। ক্রমেই পশ্চিমাকাশের সূর্যটা একটা লাল টকটকে থালার মতো হয়ে উঠল। চোখের পলকেই ডুব দিল ধূসর মেঘের কোলে, সন্ধেটা একরকম চুরি করেই ঝুপ করে নামল।
…
বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা।
দুপুরের পরে শোভন বেশ কয়েকবার ফোন করল মার্শাকে, কিন্তু মার্শা তার ফোন ধরল না। এক পর্যায়ে সে মরিয়া হয়ে গেল এবং একবার ভয়েস মেসেজ রাখল। মার্শার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে শোভন সিদ্ধান্ত নিল ওর বাসায় গিয়ে দেখবে বিষয়টা কি? এমন তো হবার কথা না। সে অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
গাড়ি চালিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে শোভন চলে এলো মার্শার এপার্টমেন্টের সামনের পার্কিং লটে। গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত চলে গেল এপার্টমেন্টের মেইন গেটে। সিকিউরিটি কোড চাপল কিন্তু গেট খুলল না। ভাবল ভুল ডিজিট চেপেছে। সে আবারো সিকিউরিটি কোড চাপল কিন্তু এবারো গেট খুলল না। প্রতিবার স্ক্রিনে দেখাচ্ছে, রং নাম্বার, ট্রাই এগেইন। কিন্তু শোভন জানে সে কোনো ভুল করছে না। পৃথিবীর অন্য অনেক কিছুতেই ভুল হতে পারে, কিন্তু এই নাম্বার তার ভুল হবার কথা না। হতেই পারে না। তবে কি মার্শা সিকিউরিটি কোড বদলে ফেলেছে? মাঝে মাঝেই কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড বদলের মতো সিকিউরিটি কোড হয়তো বদলাতে হয় কিন্তু সেটা তো তাকে জানাবে মার্শা। ভুলটা তাহলে কোথায় হচ্ছে?
শোভন আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার ফোন করল মার্শাকে। কোনো সাড়া নেই। সে চিন্তিত মনে ফিরে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল। ঠিক সে সময়ে ঐ এপার্টমেন্টের আরেক জন বাসিন্দা সিকিউরিটি কোড চেপে গেটে খুলে ঢুকে পড়তেই শোভন অতি দ্রুত তার পিছে ঢুকে পড়ল মেইন গেট বন্ধ হয়ে যাবার আগেই।
এলিভেটর থেকে বের হয়ে উল্কার মতো ছুটে হলওয়ে পার হয়ে দাঁড়াল মার্শার দরজার সামনে। কয়েকবার টোকা দিতেই মার্শা দরজা খুলে দিল। এবং দেখল শোভন দাঁড়িয়ে আছে। শোভনকে দেখে সে ভ্রূ কুচকে তাকাল এবং বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল, ‘What do you want? And how did you get in here?’
শোভন অবাক হয়ে গেল। এ কী ধরণের কথা বলছে মার্শা? সে বলল, ‘What do you mean by what do I want?’
দীর্ঘকায় এক শ্বেতাঙ্গ যুবক এসে দাঁড়াল মার্শার পেছনে। শোভন চোখ বড় করে তার দিকে তাকাল একবার এবং তার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জানতে চাইল, ‘Who is he?’
‘That’s none of your business.’ মার্শা বলল।
মার্শা এবার কৈফিয়তের সুরে বলল, ‘Why didn’t you tell me that you are married? You have a wife? I can’t believe this! You liar!’
শোভন দ্রুত ভাবতে থাকল মার্শা কী করে জানল সে কথা। কে তার সাথে যোগাযোগ করল আর কীভাবেই বা হলো। নীলিমা? নাকি অন্য কেউ? কে হতে পারে? কিন্তু এসব নিয়ে এখন ভাবার সময় নেই। তাকে দ্রুত এখন বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। এই লম্বুটাই বা কে? মার্শার এক্স বয়ফ্রেন্ড?
দীর্ঘকায় এই শ্বেতাঙ্গ যুবকের নাম এরিক। প্রায় সাড়ে ৬ ফুট লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী এরিক হচ্ছে মার্শার প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ড। শোভনের ধারণাই ঠিক।
শোভন আবার জিজ্ঞেস করল, ‘Who is he? You just can’t do this to me. Why are you doing this to me, Marsha?’
‘Why am I doing this? মার্শার কণ্ঠে হতাশা আর বিরক্তি স্পষ্ট, ‘Because you are a cheater Shovan and you know what, once is a cheater, always is a cheater!’
এবারে শোভন সত্যি সত্যিই রেগে গেল। সে তেড়ে গেল মার্শার দিকে আর ঠিক তখনই এরিক সামনে এগিয়ে এলো। সে মার্শাকে পেছনে রেখে শোভনের সামনে এসে ধমকের সুরে বলল, ‘You better knock off you bloody fool. I don’t want any trouble here.’
এ ধরণের প্রতি-আক্রমণের জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না শোভন। সে আড় চোখে তাকালো এরিকের মাংসপেশির দিকে তারপর তাকালো তার চোখের দিকে। এবং হঠাৎ করেই ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল শোভন। কেমন একটা ভয় ধরিয়ে দেবার মতো চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে এরিক।
শোভন এরিকের ঘাড়ের পাশ দিয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মার্শার দিকে।
এবার মার্শা এগিয়ে এলো সামনে। সে খানিকটা নরম স্বরে বলল, ‘Since I did not know much, I started learning about Bangladesh! I wanted to go to Bangladesh you know.’ তার কণ্ঠস্বরে আক্রমণের তেজ নেই, উলটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
হঠাৎ একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। বলে কী এই মেয়ে? শোভন অপরাধীর মত তাকালো মার্শার দিকে।
মার্শা অত্যন্ত কঠিন এবং শীতল কণ্ঠের মিশ্রণে আবারো বলল, ‘You only talked about the bad part of Bangladsh, it’s people and culture; you never talked about the sweet part of it. You don’t even know how rich your culture is! Try to learn your own culture! You’re a Bangladeshi first, and then an American. Remember it!’ কথাগুলো বলে অগ্নিদৃষ্টিতে শোভনের দিকে তাকিয়ে রইল মার্শা।
শোভন মার্শার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। সে চোখ ফিরিয়ে নিল।
মার্শার চোখ ভিজে এলো। সে তার আবেগকে সংবরণ করতে পারল না।
এই পর্যায়ে এরিক এগিয়ে এসে মার্শার ঘাড়ে একটি হাত দিয়ে ধরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। তারপর শোভনের কাছে এগিয়ে এসে ইশারায় দরজা দেখিয়ে দিল।
বিপর্যস্ত শোভন পরাজিত সৈনিকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে মার্শার ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
…
শোভন কস্মিনকালেও ভাবেনি আরো একটি সারপ্রাইজ তার জন্যে অপেক্ষা করছে। সে বাসার সামনে গাড়ি থেকে নামতেই দেখল নীলিমা একটা বড় সুটকেস পাশে নিয়ে ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে তার গাড়ির পাশে। শোভন বুঝতে পারল না এটা আবার কিসের আলামত। নীলিমা হঠাৎ করে কোথায় যেতে চায়? ওর তো কোনো রিলেটিভও নেই আমেরিকার কোথাও। আর মুনার বাসায় যেতে হলে এত বড় সুটকেস কেন? সে গাড়ি থেকে নেমে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘নীলি, কোথায় যাচ্ছো তুমি? Where are you going?’
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শোভনের বুঝতে বাকি রইল না কী ঘটতে যাচ্ছে? সে দু’য়ে দু’য়ে চার মিলিয়ে নিল। কিন্তু এখনো বুঝতে পারছে না, কলকাঠিটি কে নাড়ল কোথা থেকে। সে অস্থির হয়ে বলল, ‘You can’t go like this. Oh, come on!’
‘It’s too late Shovon! অনেক দেরী হয়ে গেছে…’ নীলিমা শীতল কণ্ঠে বলল।
শোভন অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল নীলিমার দিকে। তার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা সরল না।
নীলিমা বলল, ‘Can you do me a favor, সুটকেসটা ট্রাঙ্কে একটু তুলে দিবে?’
শোভনের কানে কোন কথা ঢুকছে না। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর নীলিমা নিজেই সুটকেসটি টেনে তোলার চেষ্টা করতেই শোভন সম্বিত ফিরে পেল। সে সুটকেসটি তুলে দিল পেছনের ট্রাঙ্কে।
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ বলল নীলিমা। সে গাড়িতে উঠে বসল। স্টার্ট দিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। শোভন রোবটের মত এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে।
নীলিমা তাকাল শোভনের দিকে। তারপর বলল, ‘দু’সপ্তাহের খাবার রান্না করা আছে ফ্রিজে। জানি তোমার পছন্দ নয়, তবুও রেখে গেলাম। ভালো থেকো।’
শোভনের ভঙ্গুর চেহারা থেকে মুখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকালো নীলিমা। তারপর বলল। ‘Enjoy your life the way you always wanted. You’re a free man! Have a nice life!’
নীলিমা আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল বাসার সামনের ড্রাইভওয়ে থেকে।
শোভন শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকল নীলিমার চলে যাওয়ার দিকে। সে তাকিয়েই থাকল। কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে আছে সে নিজেও জানে না। হঠাৎ চোখ জ্বালা করতেই সে বুঝতে পারল তার চোখ ভিজে আছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, কয়েক ফোটা তপ্ত অশ্রু টপ টপ করে ঝরে পড়ল তার চোখ থেকে।
(সমাপ্ত)
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-৫)
পরেরদিন বিকেলে মুনা এলো নীলিমার সঙ্গে দেখা করতে। দরজা খুলে দিতেই মুনা ভিতরে ঢুকল এবং সাথে সাথেই বলল, ‘কিরে এরই মধ্যে দেখি সিএনএন-এর হেডলাইনে চলে এসেছিস। তলে তলে এতদূর?’
‘দ্যাখ মুনা, সবসময় ভণিতা করবি না। ব্যাপারটা কী সেটা বল?’ ভ্রূ কুঁচকে নীলিমা বলল।
‘খবরের জন্ম দিয়েছিস আর নিজেই জানিস না?’
‘আহা, বাবা বল না, ব্যাপারটা কী?’
‘তোকে নাকি কবি সাহেবের হোটেল রুম থেকে বের হতে দেখেছে কেউ কেউ এবং খুবই আপত্তিকর অবস্থায়?’
‘কেউ কেউ এবং খুবই আপত্তিকর অবস্থায়!’ হতবাক হয়ে নীলিমা নিজেকেই বলল। তারপর মুনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হুম, ইন্টারেস্টিং। এ তো দেখছি তিলকে তাল নয়, রীতিমত কুমড়ো বানিয়ে ফেলেছে।’
‘শোভন ভাইয়ের কানে কথাটা গেলে উনিতো যুদ্ধ বাঁধিয়ে ফেলবেন। এখন কী করবি?’
‘আমি শোভনকে নিয়ে ভাবছি না। ভাবছি যাকে জড়িয়ে কথাটা রটানো হলো, উনি কী ভাববেন?’
নীলিমা জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ চুপ করে। এই মুহূর্তে তার মনের ভিতরে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে মেলাতে পারছে না—এভাবেও কথা ছড়াতে পারে। তার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হলো এই কমিউনিটির মানুষজনের উপরে। সেই সাথে অভিমানও হলো। মুনার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘কথাটা যেহেতু এভাবে রটেছে, তাহলে ব্যাপারটাকে জাস্টিফায়েড করা উচিৎ কি বলিস?’
নীলিমার কথা মুনা কিছুই বুঝতে পারল না। সে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকল নীলিমার মুখের দিকে।
মুনার প্রশ্নবোধক চোখের দিকে তাকিয়ে নীলিমা বলল, ‘ভাবছি সত্যি সত্যি আপত্তিকর কিছু একটা করলে কেমন হয়।’
‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড?’ মুনা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাল। সে বুঝতে পারছে না নীলিমা কী বলছে এসব?
‘চোখ কান খোলা রাখ। দেখ, সিএনএন হেডলাইনে আর কি কি নিউজ আসে। তুই আর কিছু বলবি?’
‘আমার কথায় রাগ করিস না। I’m your best friend, Neeli. I do care for you.’
‘I know dear. Don’t worry, I’ll handle it.’ নীলিমা হঠাৎ করেই খুব ইমোশনাল হয়ে পড়ল। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না। উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকল বাইরে।
মুনার খুব খারাপ লাগতে লাগল। সে চায়নি বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে কিন্তু নীলিমাকে সাবধান করার জন্যেই সে এসেছিল। নীলিমা ওর একমাত্র ভালো বন্ধু এখানে। তাকে নিয়ে মানুষ কথা বলে বেড়াবে তা কি করে হয়। নীলিমাকে ওর চেয়ে ভালো আর কেউ চিনে বলে মনে হয় না। এমনকি শোভনও নয়। মুনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল। তারপর কোনো কিছু আর না বলে প্রায় নিঃশব্দেই চলে গেল সে। পেছন থেকে দরজা বন্ধ হবার শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাল নীলিমা। ততক্ষণে মুনা চলে গেছে।
…
অফিসে ভীষণ ব্যস্ততায় কাটছে শোভনের সময়। লাঞ্চের পরেই তার বস ক্যাথলিনের সঙ্গে মিটিং ছিল। প্রায় একঘণ্টার মিটিং শেষ করে তার ডেস্কে ফিরে এলো সে। এবং এসেই তার মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল ৫টা মিসকল। কেউ একজন তাকে ৫বার ফোন করেছে!
ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই শোভনের অফিস ফোন বেজে উঠল। সে ফোন তুলে কলার আইডি দেখে বলল, ‘Hi sweetie!’
অপর প্রান্ত থেকে রিনরিনে কণ্ঠে কেউ একজন বলল, ‘Aren’t you supposed to see me today?’
‘I’ve been really busy today, but I’ll be coming in an hour, ok haan?’
‘One hour?’
‘Ok, 30 minutes, how’bout that?’
‘Ok!’
শোভন ফোন কেটে দিয়ে কিছু একটা ভাবল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করল নীলিমাকে।
নীলিমা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল জানালার পাশে। তার মনটা ভারী হয়ে আছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা ধরল সে।
ওপাশ থেকে শোভন বলল, ‘এই শোনো, আমার ফিরতে একটু দেরী হবে। অফিসের কাজে ভীষণ ব্যস্ত আজকে। কাজের শেষে আবার যেতে হবে এক ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করতে। বেশি রাত হলে তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমার জন্যে বসে থেকো না।’
নীলিমা চুপ করে শুনল। শোভন আবার বলল, ‘কী যে করো না, বাংলাদেশের মায়েদের মতো না খেয়ে বসে থাকা। এসব কী বাজে অভ্যাস। এটা আমেরিকা—এখানে কেউ কারো জন্যে না খেয়ে বসে থাকে না। তোমার যখন খিদে পাবে খেয়ে নিবে। ব্যাস।’
নীলিমা কিছুই বলল না। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে চুপ করে রইল।
শোভন বলল হ্যালো। কোনো সাড়া না পেয়ে ফোন রেখে দিলো সে।
নীলিমা অনেকক্ষণ ফোন হাতে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে শোভন দেরী করে ফেরার যে অজুহাত দিলো সেটা মিথ্যা। শোভনের যে কাজ সেখানে অফিসের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা করতে হয় না। ইদানীং সে প্রায় এই অজুহাতটি দেয়। নীলিমার স্বভাবের বাইরে বলেই সে এ বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলে না।
হঠাৎ করেই নীলিমা খুব অসহায় বোধ করতে লাগল। তার মায়ের কথা মনে পড়ল। ইচ্ছে হচ্ছে তার মা-কে জড়িয়ে ধরে বলে, এই দেখো মা আমি কেমন আছি—কত সুখে আছি? বলেছিলে না, তুই অনেক সুখে থাকবি? স্বপ্নের আমেরিকায় আমি কেমন সুখে আছি একবার দেখে যাও মা। ভাবতে ভাবতেই নীলিমার চোখ ভিজে উঠল।
দীর্ঘ সময় পাড় হলো। কিন্তু মনের অস্থিরতাটা কিছুতেই কাটছে না নীলিমার। এই মুহূর্তে তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে তার প্রিয় কবির সংগে কিছুক্ষণ কথা বলতে। তার সাথে কথা বললে কি অস্থিরতাটা একটু কমবে? নীলিমা তার হাতের ফোনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কী ভেবে ফোন করল হোটেল গার্ডেন ইনে।
ফ্রন্ট ডেস্কের রিসেপশনিস্ট ফোন ধরতেই নীলিমা বলল, ‘Can I get transferred to room 724 please?’
‘Just a moment please.’ বলেই রিসেপশনিস্ট লাইন বদলি করে দিল ৭২৪ নাম্বার রুমে।
কয়েকবার রিং বাঁজার পর মাহমুদ সাহেব ফোন ধরলেন।
‘আপনার কি অনেক ব্যস্ততা আজকে? কোথাও যাচ্ছেন?’ অপরপ্রান্তে মাহমুদ সাহেব ফোন ধরা মাত্রই অস্থির হয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘কেন বলতো?’
‘আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল।’
‘দেখা করতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে চলে এসো। আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।’
‘আমি না আসা পর্যন্ত আপনি কোত্থাও যাবেন না।’
মাহমুদ সাজ্জাদ হেসে ফেললেন। মেয়েটি এমন ভাবে অধিকার নিয়ে কথা বলে যে মায়াই লাগে। তিনি বললেন, ‘তুমি না আসা পর্যন্ত আমি কোত্থাও যাবো না।’
ফোন রেখে দিয়ে নীলিমা বাথরুমের বেসিনে ঠাণ্ডা পানির ট্যাপ ছেড়ে দিল। বেশ কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিল মুখে। তারপর ঝটপট তৈরী হয়ে বের হয়ে গেল বাসা থেকে।
গাড়ি চালাতে চালাতে নীলিমা ঠিক করল আতিক ভাইর সঙ্গে দেখা করে যাবে। সে আজ একবার ফোন করেছিলেন, বলল জরুরী কথা আছে সময় করে কলব্যাক করতে। তাকে কলব্যাক করা হয়নি। যেতে পথেই তার কনভিনিয়েন্ট স্টোরটা পড়বে। বরং সামনাসামনিই শোনা যাক কী কথা। দশ মিনিটের মাথায় নীলিমা পৌঁছে গেল আতিকুর রহমানের গ্যাস স্টেশন কাম কনভিনিয়েন্ট স্টোরের সামনে। গাড়ি পার্ক করে ভিতরে ঢুকতেই নীলিমা দেখল আতিক সাহেব কথা বলছেন একজন কাস্টমারের সঙ্গে। কথা শেষ হতেই নীলিমা এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আতিক ভাই, স্লামালাইকুম।’
মাথা না তুলেই তিনি সালামের উত্তর দিলেন, ‘ওয়ালাইকুমস্লাম।’ তারপর তাকিয়ে দেখলেন নীলিমা দাঁড়িয়ে সামনে। তিনি হেসে দিয়ে বললেন, ‘আরে নীলিমা, এসো।’
‘কি ব্যাপার জরুরী তলব?’
‘বলছি। জাস্ট এ মিনিট। চলো, অফিস রুমে বসে কথা বলি। কফি খাবে?’
‘আজকে না। আরেকদিন খাবো। আজ একটু তাড়া আছে।’
‘ঠিক আছে। এসো।’
আতিকুর রহমান তার অফিস রুমে গিয়ে ঢুকলেন। নীলিমা হেঁটে এলো পিছনে। আতিক সাহেব বললেন, ‘বসো।’
নীলিমা বসতেই তিনি বললেন, ‘তারপর বলো, কেমন আছো?’
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। বসে রইল চুপ করে। আতিকুর রহমান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে নীরবতা ভাঙলেন। তিনি বললেন, ‘এসব কী শুনছি নীলিমা?’
নীলিমা মাথা তুলে তাকাল আতিকুর রহমানের দিকে। তারপর অসহিষ্ণু ভাবে বলল, ‘তাহলে এ জন্যেই ডেকেছেন? আমি বুঝতে পারছিনা হোয়াই দিস হ্যাজ বিকাম সাচ অ্যা বিগ ডিল? আচ্ছা আতিক ভাই, আপনি তো মাঝে মাঝে আমার বাসায় যান আমার খোঁজখবর নেবার জন্যে। শোভন হয়তো বাসায়ও থাকে না অনেক সময়—তারমানে কি আপনার সাথে আমার সম্পর্ক? কেউ কারো সাথে দেখা করলে, খোঁজখবর নিলেই কি কিছু হয়ে যায়? ব্যাপারটা কি এতই সহজ?’
আতিকুর রহমান থতমত খেয়ে তাকিয়ে রইলেন নীলিমার মুখের দিকে। তিনি বুঝতে পারেন নি নীলিমা এভাবে রিয়্যাক্ট করবে। তার চোখে-মুখে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নীলিমা আবারো বলল, ‘আমি ভাবতে পারছিনা মানুষের মন এতো নোংরা হয় কী করে? আবার এরাই কিনা করছে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা। সুস্থ সংস্কৃতি—হাহ! পরচর্চা করে যাদের এত আনন্দ, তারা কাব্য জলসা না করে পরনিন্দা জলসা করলেই তো পারে। দর্শকের অভাব হবে না, হল ভরে যাবে দর্শকে।’
‘এত উত্তেজিত হলে তো চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা করে আমাকে ব্যাপারটা খুলে বলো।’
দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকল নীলিমা। তারপর ধীরে ধীরে সব ঘটনা খুলে বলল।
…
শোভন অনেকক্ষণ থেকে বসে বসে ভাবছে কী করে কাজ থেকে কয়েক ঘণ্টা আগে বের হওয়া যায়। ইতোমধ্যেই সে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন রকমের কারণ দেখিয়ে কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে। আজকে কী বলবে সে ভেবে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে গেল তার ম্যানেজারের রুমে।
ক্যাথলিন ফোনে কথা বলছিল। হাত ইশারায় শোভনকে বসতে বলল। কথা শেষ করে ক্যাথি শোভনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘What’s up?’
‘My wife is sick. She’s not feeling good. I’m taking rest of the day off.’ চেহারার মধ্যে যথাসম্ভব করুণ একটা ভাব ফুটিয়ে কথাগুলো বলল শোভন।
শোভনের এভাবে প্রায়ই হুট-হাট করে চলে যাওয়াটা ক্যাথির পছন্দ না। তাছাড়া ওর কাজের গতিও আগের মতো নেই। কেন যেন সময় মতো কোনো এসাইনমেন্ট শেষ করতে পারছে না। ক্যাথি এর আগে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, সমস্যাটা কী? কিন্তু শোভন কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে পারেনি। শুধু বলেছে এরপর থেকে অফিসের কাজে আরো মনোযোগী হবে সে। কিন্তু তেমন অগ্রগতি ক্যাথির চোখে পড়ছে না। ক্যাথি কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলল, ‘Don’t you already owe me a bunch of hours?
‘Yes, I know. Don’t worry Kathy, I’ll make my time up.’
স্ত্রীর অসুস্থতার অজুহাতে কোনো স্বামী মিথ্যে বলবে, কোনো বসই হয়তো সেটা ভাববে না। শোভন সে সুযোগটাই নিল। ক্যাথি বলল, ‘Ok, go home. Make sure you take good care of her.’
‘Of course, I will.’ শোভন বের হয়ে এলো ক্যাথির রুম থেকে। রুমের বাইরে এসে বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
…
সেদিন হোটেলের লবিতে নীলিমা এবং কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে জামানের দেখা হয়েছিল সে বিষয়টি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলল নীলিমা আতিকুর রহমানকে। সব কথা শুনে তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, ব্যাপারটা আমি দেখছি। তুমি এ নিয়ে একটুও ভাববে না।’
নীলিমার শঙ্কা তবু কাটল না। সে বলল, ‘শোভন ব্যাপারটা জানলে কী যে করবে… জানেনই তো ওর মেজাজ কেমন?’
‘আমি ভেবে অবাক হই, শোভনকে এখনো তুমি যেভাবে কেয়ার করো, প্রিভিলেজ দাও, অথচ সে যদি একবারও তোমার কথা ভাবতো। একটা ট্যালেন্টেড মেয়ে কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।’ আতিকুর রহমান আফসোস করে বললেন।
নীলিমা কিছু বলল না। আতিক সাহেব আবার বললেন, ‘একটা কথা তোমাকে বলা দরকার। জানিনা কথাটা তুমি কীভাবে নেবে।’
‘আতিক ভাই, আমি জানি আপনি কী বলতে চান—তবুও শুনি, বলুন।’
একটু ইতস্তত করে আতিকুর রহমান বললেন, ‘একটা কিউবান মেয়ে কি যেন নাম, মার্সা। হ্যাঁ ঐ মেয়েটির সঙ্গে শোভনের সম্পর্কের ব্যাপারটা কমিউনিটির অনেকেই বলাবলি করে, শুনতে খারাপ লাগে। ওদের দুজনকে নাকি একসাথে ঘুরতেও দেখেছে অনেকে। কিছু মনে করো না, তোমাকে পছন্দ করি বলেই বলছি। তুমি ওকে একটু বোঝাও।’
‘সে চেষ্টা কি আর করিনি। But, he does not find me attractive anymore! আমার প্রয়োজন হয়ত ফুরিয়ে গেছে ওর কাছে। অবশ্য প্রয়োজন ছিলই বা কবে? আমিতো গেঁয়ো। গায়ে দেশের গন্ধ। এতদিনেও আমেরিকান হতে পারিনি। আসলে সাদা চামড়ার মোহে ও এখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। অন্ধ হয়ে গেছে।’
আতিকুর রহমান আর কিছু বললেন না। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে তারও ভালো লাগছে না। সে অস্বস্তি নিয়ে অন্য দিকে তাকালেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমা বলল, ‘আমি এখন আসি আতিক ভাই।’
আতিকুর রহমান ঘুরে তাকাল।
নীলিমা উঠে দাঁড়াল এবং আতিকুর রহমান কিছু বলার আগেই দ্রুত বের হয়ে গেল তার ষ্টোর থেকে।
…
শোভন অফিস থেকে বের হয়েই সোজা চলে গেল মার্সার এপার্টমেন্টে। মায়ামি ডাউনটাউনের ওর অফিস থেকে মাত্র বিশ মিনিট দূরেই একটা স্টুডিও এপার্টমেন্টে একা থাকে মার্সা। মার্সার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মায়ামি শহরেই। ওর বাবা-মা কিউবান অভিবাসী—মায়ামিতে এসেছেন প্রায় ২৫ বছর আগে।
২২ বছর বয়সী মার্সা কলেজ ড্রপ আউট। নিজের পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের মতো থাকছে। কাজ করে মায়ামি বিচ সংলগ্ন একটা রেস্টুরেন্টে ওয়েট্রেস হিসেবে। সাত-আট মাস আগে মার্সার সঙ্গে পরিচয় ঘটে শোভনের। একদিন দুপুরে অফিস কলিগদের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে এসে দেখা হয় মার্সার সঙ্গে। রেস্টুরেন্ট ওয়েট্রেস মার্সা শোভনদের টেবিলে অর্ডার সার্ভ করতে এসে পানির গ্লাস ফেলে দেয়। মুহূর্তেই মার্সার চেহারা বদলে যায়। সে তাৎক্ষণিক ক্ষমা প্রার্থনা করে। লজ্জা আর ক্ষমার মিশ্রণের এক চিলতে হাসি দিয়ে মার্সা দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নেয়। এরপর থেকে শোভন প্রায়ই এই রেস্টুরেন্টে খেতে আসত মার্সার সঙ্গে যাতে দেখা হয়। বিষয়টি মার্সার দৃষ্টি এড়ায় না। ঐ সময়ে মার্শার বয়-ফ্রেন্ডের সঙ্গে ব্রেক-আপ সেইসাথে চলছিল টাকা-পয়সার টানাটানি। চতুর শোভন বুঝতে পেরে সেই সুযোগটাই কাজে লাগায়। নিজেকে সিঙ্গেল হিসেবে পরিচয় দিয়ে মার্শার সাথে সম্পর্ক তৈরী করে। সেই সম্পর্ক ধাপে ধাপে এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়া সহজ সাধ্য নয়।
শোভনের কাছে মার্শার এপার্টমেন্টের সিকিউরিটি কোড আছে। সে কোড টিপে ঢুকে পড়ল মেইন গেট দিয়ে। এলিভেটর দিয়ে উপরে উঠে হলওয়ে দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে চলে এলো মার্শার রুমের সামনে। দরজায় টোকা দিতেই হাসি হাসি মুখ করে দরজা খুলে দিল মার্শা।
শোভন ভিতরে ঢুকেই মার্শাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘Marsha, my sweet heart!’ বলেই তার ঠোঁটে গভীর চুম্বন দিলো।
মার্শা শোভনকে ছাড়িয়ে নিয়ে কপট রাগ করে বলল, ‘What made you so late, I’ve been waiting for… since who knows how long, since morning.’
‘I know honey. Been busy at work, you know?’
‘You must be thirsty; can I get you something to drink? How bout a cold beer or gin and tonic?’
‘I’m thirsty and hungry. Bring me a super cold beer and a super hot Marsha. I’m heading to bedroom.’ চোখ টিপে কিছু একটা ইঙ্গিত দিয়ে শোভন বেডরুমে দিকে হেঁটে গেল।
মার্শা হেসে দিয়ে চলে গেল কিচেনে। ফ্রিজ থেকে একটা বরফ শীতল বিয়ারের ক্যান নিয়ে ঢুকল বেডরুমে।
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-৪)
পৃথিবীর বিখ্যাত মায়ামি বিচ সম্পর্কে কিছু কথা বলা যেতে পারে।
মায়ামি বিচ হচ্ছে দক্ষিণ ফ্লোরিডার একটি দ্বীপ শহর। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের সবুজাভ জলঘেরা তীরই মায়ামি বিচ। দুটো শহরকে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করেছে একদিকে মায়ামি নদীর ওপর তৈরি হওয়া কলিন্স ব্রিজ আর অন্য দিকে ক্যানেলের ওপরে তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান ক্রিকব্রিজ। বিশাল জলাশয়ের দু’পাশে গড়ে উঠেছে অপূর্ব সুন্দর শহর, যেন সাজানো গোছানো ভিডিও গেমের কোনো শহর। একের পর এক উঁচু দালান, তাদের দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেও যেন কোনো ছন্দ আছে। স্বচ্ছ কাচে ঘেরা দালানগুলো, তার প্রতিচ্ছবি পানিতে পড়ে এক মুগ্ধতা তৈরি করে। আর ক্যানেল মানেই কোনো এলোপাথাড়ি কিছু নয়। দু’পাশে শান বাঁধানো ঘাট। ঝিরিঝিরি পানির নীরবে বয়ে চলার ঝলক যেন কোনো রমণীর গলার হার। মাঝে মাঝে সাদা প্রাইভেট বোট, রিভার ক্রুজগুলো সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
পর্যটকদের জন্য রয়েছে বিচের দুটো অংশ। উত্তর এবং দক্ষিণ মায়ামি বিচ। দক্ষিণ বিচটাই মূলত বিখ্যাত এবং আকর্ষণীয়। এখানে যেমন জমে ওঠে বিলাসী পর্যটকদের আনাগোনা, তেমন পৃথিবীর সব বিখ্যাত সেলিব্রেটিদের অবসর যাপন থেকে শুরু করে চলে মনোহর সিনেমা জগতের নির্মাণকাজ।
এবার মূল গল্পে ফেরা যাক।
অফিস থেকে শোভন ফোন করল বাসায়। কয়েকবার রিং বাজল। কোন সাড়া না পেয়ে সে ফোন করল নীলিমার মোবাইল ফোনে।
মুগ্ধতায় ঘেরা ফ্লোরিডার বিখ্যাত মায়ামি বিচের তীর ঘেঁষে দাঁড়ানো একটা মনোরম রেস্টুরেন্টের ব্যালকনিতে মুখোমুখি বসে আছে নীলিমা আর মাহমুদ সাজ্জাদ। দুজনেই খাবারের মেনুতে চোখ বুলাচ্ছে। এমন সময় নীলিমার ফোন বেজে উঠল। সে ফোনটা কাছে নিয়ে দেখল শোভনের নাম। উত্তর না দিয়ে ফোন বন্ধ করে রেখে দিল নীলিমা।
মাহমুদ সাহেব উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলেন, ‘কার ফোন ছিল?’
‘শোভনের।’
‘ফোন ধরলে না যে?’
‘ধরে কি বলবো, আমি কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে সমুদ্রের পাড়ে মনোরম একটি রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ করছি?’
‘ওকে তুমি বলে আসনি?’
‘আপনার কি ধারণা, আমি ওকে বললাম—আমি আজ কবি সাহেবের সঙ্গে তার হোটেলে দেখা করতে যাবো, আর ও সানন্দে রাজী হয়ে গেল?’
‘না তুমি বলেছিলে কিনা, ও আসতে চেয়েছিল, শেষ মুহূর্তে মাইন্ড চেঞ্জ করেছে… তাই, ভাবলাম সে হয়তো জানে। আমার অবশ্য বোঝায় ভুলও হতে পারে।’
নীলিমা সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকল। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ব্যালকনিটার ঠিক নিচেই। ভর দুপুরে কি জোয়ার আসে? তাহলে ঢেউগুলো এত বড় কেন? নীলিমার নিজের মধ্যেও এমন উথাল-পাথাল ঢেউ আসে যায় সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত, সেই অশান্ত মনের ঢেউ কেউ কি কখনো দেখে? আকাশের বিশালতা আর সাগরের শত ঢেউ সবাই দেখে—শুধু মানুষের ভিতরের কষ্টের নীল ঢেউটা কেউ দেখেনা।
মাহমুদ সাহেব নীলিমার দিকে কয়েকবার তাকালেন। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকায় তার মনের অবস্থা কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অদূরে দাঁড়ানো ওয়েটারকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিলেন।
নীলিমার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাহমুদ সাহেব তাকালেন সমুদ্র সৈকতে। চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন চারিদিকটা। ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। একবার পানিতে যায়, ঢেউ আসলে দৌড়ে পাড়ে চলে আসে। আবার কেউ কেউ বালি দিয়ে উঁচু করে ঢিবির মত কিছু একটা বানাচ্ছে। কেউ বানাচ্ছে ক্যাসল হাউজ। কিছুক্ষণ পর পর ঢেউ এসে সেগুলো ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাগুলো প্রবল উৎসাহে আবার বালির ঢিবি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সার্ফাররা সার্ফিং করছে। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে খেলছে বিচ ভলিবল।
একটা লম্বা কাপড়ের বিজ্ঞাপন লেজের সঙ্গে বেধে নিয়ে আকাশে চক্কর দিচ্ছে একটা ছোট্ট প্লেন। কিছুক্ষণ পর পর সে ফিরে আসছে পর্যটক এবং সমুদ্র বিলাসী মানুষগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে।
একটা যুবতী মেয়ে কাঁধে ব্যাগপ্যাক ঝুলিয়ে নিবিষ্ট মনে একটার পর একটা ছবি তুলে যাচ্ছে। একটা করে ঢেউ আসে, ঢেউয়ের সঙ্গে যা উঠে আসছে—স্টার ফিশ, জেলি ফিশ, শামুক-ঝিনুক, সামুদ্রিক লতা-পাতা সব কিছুই ক্যামেরা বন্দি করছে সে। হয়ত কোনো রিসার্চ পেপার তৈরী করতে হবে সে জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে কে জানে।
সৈকতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যাই বোধ হয় বেশী। বেশিরভাগ মেয়েরাই শরীর উন্মুক্ত করে বালির মধ্যে শুয়ে রয়েছে। মাত্র দু’চিলতে কাপড় ছাড়া তাদের শরীরে আর কিছুই নেই। প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে রৌদ্রস্নান করছে। কেউ নানা রঙের ছাতার নিচে বসে বই পড়ছে। সমুদ্রের গর্জন, মানুষের হৈ-চৈ কোনো কিছুই তাদের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না।
এসব দেখতে দেখতে কবি মাহমুদ সাজ্জাদের একটা উপলব্ধি হলো—কি অদ্ভুত সম্মোহনী ক্ষমতা এই সমুদ্রের। এর সৈকত, বালি আর পানি মানুষকে টেনে রাখে বহুক্ষণ৷
দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। রোদের তেজ নেই। সমুদ্রের বাতাসে শাড়ির আচল আর চুল উড়িয়ে নীলিমা হাঁটছে সৈকতের তীর ঘেঁষে তার প্রিয় কবির পাশে পাশে। আকাশে মেঘ করেছিল—মেঘটা কেটে গেছে। সেই সাথে কেটে গেছে তার মনের মেঘ। এই মুহূর্তে তার জীবনের একটা অন্যরকম ভালোলাগার সময় কাটাচ্ছে তার প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হাটার পর নীরবতা ভাঙল নীলিমা। সে ঘাড় ঘুরিয়ে কবির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ভাবছেন?’
‘উম, তেমন কিছু না।’
‘আজ ক’ তারিখ জানেন?’ নীলিমা বলল।
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে মাহমুদ সাহেব বললেন, ‘৩ তারিখ। ৩রা জুন।’
‘৩রা জুন কবিতাটাও আমার খুব প্রিয়। একটু শোনাবেন?’
মাহমুদ সাহেব আবৃত্তি শুরু করলেন।
‘ওগো সুন্দরী, মনে আছে কাল ৩রা জুন?’
সেকি ভুলে গেছো, তুমিতো দেখছি সাংঘাতিক…’
নীলিমা হেসে দিয়ে পরের দু’লাইন জুড়ে দিল।
‘তুমি যা বলছো স্বীকার করছি, ইয়েস স্যার
বিয়ে আমাদের হয়নি এবং হবেও না…’
কবি: ‘তাতে কি হয়েছে? মনে মনেই তুমি পার্বতী
৩রা জুনের বিকেল থেকেই, সেটাতো ঠিক?’
নীলিমা: ৩রা জুনেই প্রথম উঠল ঘূর্ণিঝড়…
কবি: ৩রা জুনেই প্রথম প্রবল বৃষ্টিপাত…
নীলিমা: আকাশে আতর ছুঁড়ল, প্রথম কদম ফুল…
কবি: একটি রুমালে তোমার হাত ও আমার হাত।
মাহমুদ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘আরে তুমিতো ভাল আবৃত্তি করো।’
‘বাড়িয়ে বলার কোন প্রয়োজন নেই। এটাকে ভাল আবৃত্তি বলে না।’ নীলিমা লজ্জা পেয়ে বলল।
‘তাহলে কী বলে?’
নীলিমা হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ঘুরে বলল, ‘চলুন ফেরা যাক।’
…
জামান অনেকক্ষণ থেকে হোটেল গার্ডেন ইনের লবিতে বসে অপেক্ষা করছে মাহমুদ সাহেবের জন্যে। কিন্তু তিনি কখন ফিরবেন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে নির্দিষ্ট করে কিছুই জানাতে পারল না। মাহমুদ সাহেবের কাছে কোনো মোবাইল ফোন না থাকায় কিছু জানাও সম্ভব হচ্ছে না—তিনি কোথায় গেছেন কার সাথে গেছেন। অথচ জামানের সঙ্গে সকালেই কথা হয়েছে সে সন্ধ্যায় এসে তাকে নিয়ে যাবে রাতের ডিনার করাতে। দেশ থেকে যখন কোনো শিল্পী অথবা কবি-সাহিত্যিক আসেন তারা সাধারণত স্থানীয় সংগঠকদের কিংবা অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কাউকে না জানিয়ে অন্য কারো সঙ্গে কোথাও যান না। জামান একটু চিন্তায়ই পড়ে গেল—তাহলে তিনি গেলেন কোথায়?
হোটেল গার্ডেন ইনের সামনে গাড়ি পার্ক করল নীলিমা। মাহমুদ সাহেব বের হয়ে বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাইলে নীলিমা বলল, ‘একটু দাঁড়ান, আমিও আসছি।’ সে মনে মনে ভাবল, এতটুকু ভদ্রতা করা যেতেই পারে। অন্তত হোটেলের মেইন গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসাটা সমীচীন হবে। নীলিমা হেঁটে এগিয়ে গেল মাহমুদ সাহেবের সঙ্গে হোটেল লবি পর্যন্ত। এবং সেখানে যেয়েই দেখতে পেল জামান দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ বড় করে জামান দেখল মাহমুদ সাহেবের পাশে হেঁটে আসা নীলিমাকে। তার মাথায় ঢুকছে না, ব্যাপারটা কী হতে পারে। নীলিমার সঙ্গে মাহমুদ সাহেবের সংযোগ কিভাবে হলো। কিংবা সম্পর্কটাই বা-কী? সে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল।
নীলিমা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে জামানকে দেখেই তাকাল মাহমুদ সাহেবের দিকে। তিনি চোখের ইশারায় অভয় দিলেন নীলিমাকে। নীলিমা ইতস্তত করে বলল, ‘আমি বরং এখন যাই।’
‘চলো, তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’
‘না না তার দরকার হবে না।’
‘ঠিক আছে তাহলে, পরে কথা হবে। ড্রাইভ সেফ।’
নীলিমা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চলে গেল তার গাড়ির কাছে। কয়েক মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবল কিছু। তাকাল হোটেল লবির দিকে। কাউকে দেখতে পেল না। সে বিলম্ব না করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বের হয়ে গেল হোটেল পার্কিং থেকে।
নীলিমা চলে যেতেই মাহমুদ সাহেব এগিয়ে গেলেন জামানের সামনে। কিছুটা অবাক হবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আরে জামান সাহেব, আপনি কতক্ষণ?’
‘এইতো মিনিট বিশেক হবে।’ হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জামান বলল।
‘আজ রাতে আবার কোথায়?’
‘আতিক ভাইয়ের বাসায় বারবিকিউ ডিনার।’
‘যেতেই হবে?’
জামান কী বলবে বুঝতে পারল না। সে বোকার মত হেসে বলল, ‘সবাই অপেক্ষা করছে।’
‘সবার সঙ্গেই তো দেখা হয়েছে কয়েকবার।’ একটু চুপ করে থেকে মাহমুদ সাহেব আবার বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
মাহমুদ সাহেব হেঁটে গিয়ে এলিভেটরে উঠলেন। এলিভেটরের দরজা বন্ধ হতেই জামান তার হাতের ফোন নিয়ে ফোন করল কমিউনিটির নেতা গোছের কাউকে। অপরপ্রান্ত থেকে ভদ্রলোক ফোন ধরতেই জামান বলল, ‘কে কবির ভাই, গরম খবর আছে।’
‘আরে জামান? খুব এক্সাইটেড মনে হচ্ছে। বলো কী খবর?’ কবির ভাই বললেন।
‘আরে শোনেন কী হয়েছে। আমি আসছি মাহমুদ ভাইকে নিতে তার হোটেলে, ডিনারে নিয়ে যাবো বলে। যা দেখলাম, আমারতো চোখ ছানাবড়া। না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।’
‘বুঝলাম না। মানে কী?’
‘মানে তো ফোনে বুঝানো যাবে না। রাত্রে আসতেছি বাসায়। ঘুমায়েন না।’
‘মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং কিছু। আমি জেগেই থাকব, তুমি এসো কিন্তু।’
লাইন কেটে দিয়ে ফোন হাতে কিছুক্ষণ বসে রইল জামান। একধরনের অস্থিরতা এসে ভর করেছে তার ওপর। সে এবার ফোন করল মুনার স্বামী সাগরকে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন ধরতেই জামান বলল, ‘কে সাগর? আচ্ছা, শোভন ছেলেটার ওয়াইফ নীলিমা, মুনার ফ্রেন্ড তাইনা?’
‘হ্যাঁ। কেন জামান ভাই?’ সাগর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘আছে, ইন্টারেস্টিং একটা ঘটনা আছে… তুমি কিন্তু মুনাকে কিছু বলতে পারবা না, প্রমিজ?’
‘আচ্ছা, ঘটনাটা কী বলেন শুনি?’
জামান ঘটনার বর্ণনা দেয়ার আগে মনে মনে গুছিয়ে নিল কী বলবে আর ঠিক তখনই দেখা গেল এলিভেটর থেকে মাহমুদ সাহেব বের হয়ে আসছেন। জামান ফিস ফিস করে বলল, ‘শোন, আমি তোমাকে পরে কল দিবো। একটু রাত হইতে পারে। ঘুমায়ো না। আরে শহর গরম করা খবর আছে।’
সাগর আর কিছু বলার আগেই জামান ফোন কেটে দিল।
মাহমুদ সাহেব কাছে আসতেই জামান বলল, ‘রেডি?’
‘হ্যাঁ রেডি। চলুন।’
তারা হোটেল থেকে বের হয়ে গেল।
…
শোভন একটু রাতে করেই বাসায় ফিরল।
নীলিমা বিছানায় শুয়ে ছিল। সে উঠে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে বিছানা থেকে নেমে কিচেনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। শোভন বলল, ‘আমি খেয়ে এসেছি।’
নীলিমা একটু দাঁড়াল। কিছু না বলে কিচেনে গেল সে। ডাইনিং টেবিল থেকে তার নিজের জন্যে কিছু খাবার প্লেটে নিয়ে মাইক্রোওভেনে গরম করতে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। প্রতি রাতেই নীলিমা শোভনের জন্যে অপেক্ষা করে অন্তত রাতের খাবারটা যাতে একসাথে খেতে পারে। ওর একা খেতে ভালো লাগে না। কিন্তু দেখা যায় প্রায় রাতেই শোভন বাইরে থেকে খেয়ে আসে।
প্লেট নিয়ে সে টেবিলে বসে চুপচাপ খাচ্ছিল। কাপড় বদলে শোভন এসে একটা চেয়ার টেনে বসল নীলিমার সামনে। নীলিমা ভাবল ও বোধহয় মত বদলে খেতে এসেছে। শোভনের সামনে প্লেট এগিয়ে দিতেই শোভন বলল, ‘একবার তো বলেছি খেয়ে এসেছি।’
নীলিমা আর কিছু বলল না। মনে হচ্ছে কোনো কারণে শোভনের মেজাজ বিগড়ে আছে। তার মেজাজ যদিও ইদানীং প্রায়ই খারাপ থাকে। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও ঝামেলা করে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শোভন জিজ্ঞেস করল, ‘ফোন ধরো নি কেনো তখন?
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ খেতে থাকল। শোভন আবারো বলল, ‘বাসার ফোনও ধরলে না, সেল ফোনও ধরলে না, ছিলে কোথায় তুমি?’
নীলিমা এবারো কিছু বলল না।
‘কথা বলছো না কেন?’ শোভন ধমকের স্বরে বলল।
‘একটু বিচের ধারে গিয়েছিলাম।’
‘কেন?’
‘এমনিই। বাসায় একা ভাল লাগছিল না তাই।’
‘তাহলে ফোন ধরে সেটা আমাকে জানালেই হতো। ফোন ছিল না সাথে?’
‘ছিল।’
‘তাহলে ধরো নি কেন?’
‘ধরতে ইচ্ছে করে নি।’
‘নাকি অন্য কোন অসুবিধা ছিল।’
নীলিমা বুঝতে পারছে না শোভন কী বলতে চাইছে। সে ভিতরে ভিতরে একটু শঙ্কিত হলো। তবে কি জামান ভাই কিছু বলেছে শোভনকে? একমাত্র সেই নীলিমাকে দেখেছিল কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে হোটেলের লবিতে। তাই যদি হয় তবে শোভন ওর রাতের ঘুম হারাম করে দেবে। নীলিমা মনে মনে তৈরী হয়ে নিল।
‘কথা বলছ না কেন? বলো?’ শোভন এবার বেশ কঠিন স্বরেই জানতে চাইল।
নীলিমা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আজকে হার্ডবল প্লে করতে হবে। সে খাওয়া বন্ধ করে হঠাৎ করেই উত্তর দিল, ‘সব কথা তোমাকে বলতে হবে? তুমি বলো? তুমি কি করো, কখন কোথায় যাও, অফিস থেকে ফিরতে কেন দেরী হয়, আমাকে বলো? তাহলে আমার সব কথা তোমাকে বলতে হবে কেন?’
শোভন থতমত খেয়ে গেল। নীলিমার এমন আক্রমণাত্মক উত্তরের জন্যে সে একবারেই প্রস্তুত ছিল না। সম্পূর্ণ অচেনা কণ্ঠ। শোভন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নীলিমার দিকে, তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সেই অগ্নি চক্ষুকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে নীলিমা তার খাওয়া শেষ করে উঠে চলে গেল অন্য রুমে।
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-৩)
ডিনার শেষে মাহমুদ সাহেবকে স্থানীয় সংগঠকদের একজন তার হোটেলে পৌঁছে দিয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। তাকে বেশ ক্লান্ত লাগছে। ঢাকা থেকে মায়ামির লম্বা প্লেন জার্নিতে এমনিতেই বেশ ধকল গেছে। তার উপর জেটল্যাগ এখনো কাটেনি। তিনি রুমে ঢুকেই হ্যান্ডপার্সটি বিছানার পাশের টেবিলে রেখে দিলেন। তারপর কাপড় বদলানোর সময় পাঞ্জাবীর পকেট থেকে কিছু কাগজ বের করে টেবিলের উপর রাখলেন। অনেকগুলো বিজনেস কার্ড, ভক্তদের দেয়া ফোন নাম্বারের ছোট ছোট কাগজের টুকরাগুলো ছড়িয়ে রাখলেন। হঠাৎ করেই চোখে পড়ল একটা কাগজ যেখানে মুনা আর নীলিমার ফোন নাম্বার লেখা। সে কাগজটি তুলে ধরলেন একবার চোখের সামনে। তারপর রেখে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে এসে বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
প্রত্যুষে নীলিমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। পর্দার ফাঁক গলে ভোরের সূর্যের আলো এসে নীলিমার চোখ ছুঁয়ে দিল। অভ্যাস মতো ঘুম চোখ রগড়ানোর জন্যে হাত তুলে চোখের কাছে নিতেই, নীলিমা তার ভেজা গালটা অনুভব করল। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে এলোমেলো ভাবতেই মনে পড়ল কাল রাতের কথা। আর সেটা মনে পড়তেই ভোরের সতেজ মনটা মরে সেখানে জায়গা নিলো এক রাজ্যের বিষণ্ণতা। তখন খেয়াল করল সে, সারাটা রাত ঠিক করে শোয়নি পর্যন্ত সে, এককোণে পড়ে আকাশ পাতাল ভাবছিল। কাঁদছিল না, চোখ দিয়ে আপনাতেই জল গড়াচ্ছিল। কখন যে তারমধ্যেই চোখ লেগে গিয়েছিল টের পায়নি সে।
নীলিমা আপ্রাণ চায় শুয়ে পড়া মাত্রই তার দুচোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসুক। মুক্তি মিলুক কুঁড়ে কুঁড়ে খাওয়া এই ভাবনার বেড়াজাল থেকে। কিন্তু চাইলেই ভাবনা থেকে মানুষের মুক্তি মেলে? যে কথা কাউকে বলা যায় না, সে কথার তো মনই আধার। ঘুরে ফিরে সে ভাবনা নিজেকেই কুঁড়ে খায়।
প্রতিদিনের রুটিন মাফিক সকালে উঠেই শোভনের জন্যে কফি আর সাথে হালকা নাস্তা তৈরী করে বসে থাকে নীলিমা। শোভন তৈরী হয়ে এসে নাস্তার প্লেট থেকে তড়িঘড়ি করে কিছু একটা মুখে দিয়ে কফির মগ নিয়ে কাজে চলে গেছে। নীলিমার কফি খাওয়ার অভ্যাস নেই। তার পছন্দ চা। সে দেশের মতই চা বানিয়ে নিয়ে বসে রইল চুপচাপ।
সকালে একটু দেরী করেই ঘুম ভাঙ্গল মাহমুদ সাজ্জাদের। শেষ রাতের দিকে তার একবার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে সে উঠে পড়েছিল। কাগজ কলম নিয়ে একটি কবিতার কয়েকটি লাইন লিখে রেখেছে। রুমের ভিতর কিছুক্ষণ পায়চারী করে ভোরের দিকে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।
ফোনের শব্দে মাহমুদ সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই অন্য প্রান্ত থেকে জামানের কণ্ঠ শোনা গেল। জামান বলল, ‘মাহমুদ ভাই, উঠেছেন? রেডি হয়ে যান, আমি আপনাকে ঠিক এগারোটায় পিক করবো। মনে আছে তো আপনাকে নিয়ে আজ ডীপ সি ফিশিং-এ যাচ্ছি? তারপর বিকেলে ফিরে এসে বোট রাইড। অনেক এলিগেটর দেখতে পাবেন।’
‘আজ শরীরটা বেশী ভাল না।’ বললেন মাহমুদ সাহেব, ‘আজ থাক, কাল পরশু না হয় যাই?’
জামান একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘তাহলে দুপুরে এসে আমি আপনাকে লাঞ্চে নিয়ে যাবো। ঠিক আছে, আপনি রেস্ট নিন।’
‘না না আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি রুম সার্ভিসে অর্ডার করে কিছু খেয়ে নেবো। আপনি বরং অন্যদেরকে বলে দেবেন, আমি আজ বের হবো না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি না হয় বিকেলের দিকে একবার খোঁজ নেবো।’
‘ধন্যবাদ।’ বলেই মাহমুদ সাহেব ফোন রেখে দিলেন।
ফোন রেখে দিয়ে বেড সাইড টেবিলে রাখা কাগজের টুকরোগুলো থেকে মাহমুদ সাহেব একটা কাগজ হাতে নিলেন। সেখানে দুটো ফোন নাম্বার লেখা আছে। একটা মুনার আর একটা নীলিমার। সে কলম দিয়ে নীলিমার নাম্বারটাকে বৃত্তাকারে দাগ দিলেন। তারপর ফোনটা নিয়ে কাগজে লেখা নাম্বার দেখে একটা একটা নাম্বার চেপে ঠিক শেষ নাম্বারটাতে এসে থেমে গেলেন। কী ভেবে শেষ নাম্বারটা না চেপে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
সকাল থেকেই নীলিমা ক্ষণে ক্ষণে ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। অন্য কোনো কাজের মধ্যেও সে সজাগ রাখছে নিজেকে। কোনো এক বিচিত্র কারণে তার মনে হচ্ছে, তার কাছে একটা ফোন আসবে। কেউ একজন তাকে ফোন করবে। সে অপেক্ষা করছে। সব কাজের ফাঁকে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনের জন্যে অপেক্ষা করতে তার খারাপ লাগছে না।
সময় গড়িয়ে দুপুর। নীলিমা রান্নার আয়োজন করতে কিচেনে গেল আর তখনই হঠাৎ বাসার ফোন বেজে উঠল। এর আগে সকালে একবার একটা ফোন এসেছিল। সে আগ্রহ নিয়ে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে এক মহিলার কণ্ঠ শোনা গেল। ‘May I speak to Mr. or Ms. Amed, please?’ সে জানতে চাইল।
‘Speaking…’ নীলিমা বলল। যদিও তার শঙ্কা হলো এটা হয়ত কোনো সেলস কল হতে পারে। সকাল থেকেই এমন অনেক উদ্ভট ফোন আসা শুরু হয়। তবুও সে ভদ্রতা করে জানতে চাইল, ‘what is this call about?’
‘Ms. Amed, we have very exciting news for you. You are pre-approved for a home equity loan with the lowest interest rate of…’
‘Sorry, we’re not interested at this time. Thank you.’ মহিলার কথা শেষ হবার আগেই লাইন কেটে দিল নীলিমা। তার বুঝতে বাকী রইল না যে এটা সত্যি একটা সেলস কল। কোনো এক মর্টগেজ কোম্পানি টাকা ধার দিতে চায় কম ইন্টারেস্ট রেটে নতুন বাড়ি কেনার জন্যে অথবা পুরনো বাড়ি মেরামত করার জন্যে। মাঝে মাঝে এভাবে কথা শেষ না করে ফোন কেটে দিতে ওর খারাপ লাগে কিন্তু না দিয়েও উপায় থাকে না। এদের হাত থেকে সহজে নিস্তার পাওয়া যায় না। একটার পর একটা অফার দিতেই থাকে।
ফোন কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল নীলিমা। তারপর কিচেনে ফিরে রান্নার কাজ শুরু করতেই ফোনটা আবার বেজে উঠল। এটা কি সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন না কি আবারো সেলস কল। নীলিমা দ্বিধা নিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, ‘হ্যালো?’
‘বল তো কে ফোন করেছিল আমাকে?’ অপর প্রান্ত থেকে মুনার স্বভাবসুলভ কণ্ঠ ভেসে এলো।
‘কে?’ কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘কে আবার? কবি সাহেব!’
‘রিয়েলি? কি বললেন?’ কিছুটা নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানতে চাইল নীলিমা।
মুনা হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি তোর চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি—মুখটা অন্ধকার করে ফেলেছিস। আই’ম জাস্ট কিডিংরে বাবা। আমাকে উনি ফোন করেন নি। তোকে নিশ্চয়ই করেছেন। এই তোর সাথে কি নিয়ে কথা হলো, বল না?’
‘আমাকে উনি ফোন করেন নি।’ একটু থেমে নীলিমা বলল, ‘তুই কি আমার নাম্বারটা ঠিকমত লিখেছিলি?’
‘কি বলছিস তুই, আমি তোর নাম্বারটা ঠিকমত লিখে দেই নি? এর মানে কি নীলি! তুই আমাকে এই ভাবছিস?’ মুনা রাগ করেই কথা গুলো বলল। ‘Ok then call him up, if you don’t trust me. Hotel Garden Inn, Room #724.’
‘তুই জানলি কিভাবে?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘That’s not important.’ মুনার কণ্ঠে উষ্মা প্রকাশ পেল। সে বলল, ‘মেসেজটা তোকে দেবার জন্যেই ফোন করেছিলাম। I better hang up now.’
‘মুনা শোন, প্লীজ ডোন্ট হ্যাং আপ… আমি কিছু মীন করে বলিনি।’
অপর প্রান্ত থেকে মুনার কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। সে ফোন রেখে দিয়েছে। নীলিমার মনটা খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে মুনা ওকে আবার ভুল না বোঝে। ফোন রেখে কিচেনে চলে গেল নীলিমা। হঠাৎ তার মনে হলে সে কেনই বা অপেক্ষা করছে। আর তারই বা কি দায় পড়েছে নীলিমাকে ফোন করার। এমন জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিকদের হাজারো ভক্ত তাদেরকে ফোন নাম্বার দেয়, তাই বলে সবার সাথেই কি আর কথা হয়?
এর মধ্যে এক দিন কেটে গেছে। মাহমুদ সাজ্জাদকে নিয়ে ফ্লোরিডার বেশ কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়েছে জামান আর আতিকুর রহমান। গতকাল রাতে ছিল ডিনার রিসেপশন, ফ্লোরিডার স্বনামধন্য বাঙালি ব্যবসায়ী নৌশাদ চৌধুরীর বাসায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং কর্মী যারা নিরলসভাবে এই প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা করে যাচ্ছেন। মাহমুদ সাহেব তাদের সবার সাথে মত বিনিময় করেছেন। কথা বলেছেন। তাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন। এবং এই ধারাটা যেন অব্যাহত থাকে সেদিকে দৃষ্টি দিতে বলেছেন।
বাংলা সাহিত্যে ভাষার প্রয়োগ, আঞ্চলিক ভাষা, প্রবাসের নতুন প্রজন্মের ভাষা, বাংলাদেশের এফএম ব্যান্ডগুলোর আর জে’দের ভাষার অপব্যবহার—বিকৃত উচ্চারণ, সাহিত্যর নানা বিবর্তন, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সকলে মতামত তুলে ধরেন। সবার সঙ্গে প্রাণবন্ত একটা সন্ধ্যা কাটান কবি মাহমুদ সাজ্জাদ।
আজ সকাল থেকে সেদিনের অসমাপ্ত কবিতাখানি আবার লেখার চেষ্টা করছেন কবি। কোনো এক বিচিত্র কারণে তার লেখা আসছে না। বেশ কয়েকবার কাগজ কাটাকুটি করে ট্র্যাস বিনে ফেলে দিয়েছেন। এখন জানালার পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে আছেন বাইরে। হঠাৎ তার ভাবনায় ছেদ পড়ল দরজায় টোকার শব্দে। কিছুক্ষণ আগেই তিনি রুম সার্ভিসে অর্ডার করেছেন। এত তাড়াতাড়ি রুম সার্ভিস চলে এলো? তিনি কিছুটা অবাক হয়েই দরজা খুলে দিলেন এবং ততোধিক অবাক হয়ে দেখলেন হাসি হাসি মুখ করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
মাহমুদ সাহেব নির্লিপ্ত নয়নে তাকালেন। হালকা সবুজ সুতোর কাজ করা তাঁতের শাড়িতে অপূর্ব লাগছে মেয়েটিকে। আঁচলটা ছেড়ে দেওয়া। কপালে কালো টিপ। দু’হাতে সবুজ আর নীল রংয়ের মিশ্রণে কাঁচের চুড়ির রিনিক ঝিনিক। চুলগুলো খোলাই ছিল। মেয়েটির এলোচুল থেকে মিষ্টি এক সুঘ্রাণ আবিষ্ট করল কবিকে।
মেয়েটিকে দেখে কবি সাহেবের তেমন কোনো ভাবান্তর হলো না। তিনি যে খুব একটা অবাক হয়েছেন তাও মনে হচ্ছে না। দরজায় দাঁড়ানো মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে খুব পরিচিত এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, ‘এসো, ভিতরে এসো।’
মেয়েটি ভিতরে ঢুকল। তিনি ঘুরে তাকালেন মেয়েটির দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘কেমন আছো তুমি?’
‘ভালো।’ রুমের ভিতরে সামনে দিকে এগিয়ে গেল মেয়েটি। চারিদিকটা একটু চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর খুব স্বচ্ছন্দে বলল, ‘আপনি কি সব মেয়েদেরই তুমি করে বলেন না কি? বয়সে ছোট হলেই কি তুমি বলা যায়?’
‘সব মেয়েদেরকে নয়, যাদেরকে বলা যাবে বলে আমার মনে হয়, শুধু তাদেরকেই বলি। অবশ্য তোমার আপত্তি থাকলে বলবো না।’
‘আপত্তি নেই।’
‘বেশ।’
‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না যে আমাকে দেখে আপনি খুব অবাক হয়েছেন।’
‘কারণটা সহজ, তুমি আসবে সেটা আমি জানতাম।’
‘আপনি জানতেন?’ মেয়েটি অবাক হবার ভঙ্গি করে বলল। ‘আমি তো ভেবেছিলাম আপনি শুধু কবিতাই লিখেন—ভবিষ্যৎও যে দেখতে পান তা তো জানতাম না?’
‘সব সময় দেখতে পাই না, মাঝে মাঝে আমার ইনটুইশন কাজ করে।’
‘তাহলে লবিতে কেন অপেক্ষা করলেন না?’
‘সেটা খুব একটা বিজ্ঞান সম্মত হত না। তাছাড়া, মনের সব খেয়ালকে বেশি প্রশ্রয় দেয়াও ঠিক নয়।’
‘কিসে আপনার মনে হলো যে আমি আসব?’
‘তা জানি না। ঐযে বললাম, ইনটুইশন। সকাল থেকেই মনে হচ্ছিল আজ তোমরা দুজনে আসতে পারো। তুমি একা আসবে সেটা বুঝিনি।’
‘ও আসতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাইন্ড চেঞ্জ করেছে।’ ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি নিয়ে মেয়েটি বলল।
মাহমুদ সাহেব মৃদু হাসলেন। প্রশ্রয়ের হাসি।
মেয়েটির মনে হলো—তিনি সম্ভবত ওর কথা বিশ্বাস করেননি। প্রসঙ্গ বদলে ও বলল, ‘আমি আসায় আপনি খুশী হয়েছেন?’
‘প্রত্যাশায় প্রাপ্তি এলে, খুশী না হওয়ার কোনো কারণ তো থাকতে পারে না।’
‘আই সি!’ একটা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে মেয়েটি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে।
ফ্লোরিডার নীল আকাশে ঝলমল করছে সোনালী রোদ। মেয়েটি তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। নীল রঙের প্রতি তার দুর্বলতা অস্বাভাবিক রকমের। বাইরে রোদ-ঝলমল নীল আকাশ আর তার চেয়েও বেশি নীল সমুদ্র দু’বেলা হাতছানি দিয়ে ডাকলে কি আর ঘরে বসে থাকা যায়? তাই তো মাঝে মাঝেই সে ছুটে যায় এই নীলের কাছাকাছি। তার ধারণা এই নীলের বাড়াবাড়ির জায়গাটাই হলো ফ্লোরিডা।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কবির দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নির্জন তপস্যায় ব্যাঘাত ঘটালাম না-তো আবার?’
‘আমি অতি সাধারণ একজন মানুষ। আমার আবার তপস্যা কী? তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে লেখার জন্যে কিছুটা তপস্যার মতো করতে হয় বৈকি।’
‘অতি সাধারণ হওয়াটা তো অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার—সবাই সাধারণ হতে পারে না। অসাধারণ হওয়াটাই বরং সহজ। যে কেউ হতে পারে।’
‘বাহ! চমৎকার।’ কবি চমৎকৃত হলেন এবং তার মুগ্ধতা প্রকাশে কোনো রকম কার্পণ্য করলেন না। তিনি বললেন, ‘তুমি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলো!’
‘সত্যি বলছেন?’
‘হুম!’
‘সত্যি না ছাই।’
মেয়েটির কথার ধরনে মাহমুদ সাহেব হেসে ফেললেন।
‘কোথাও যাননি যে? কেউ নিতে আসেনি আজ?’
‘আসতে চেয়েছিল, না করে দিয়েছি। এখন তুমি এলে। রুম সার্ভিসে অর্ডার দিয়েছি—কিছু খেয়ে তারপর তোমার সাথে না হয় বাইরে ঘুরতে যাবো।’
‘অর্ডার ক্যান্সেল করে দিন। আজ আমি আপনাকে আমার প্রিয় একটা জায়গায় লাঞ্চ করাতে নিয়ে যাবো। আপনি তৈরী হয়ে নিন।’
কিছুক্ষণ ভেবে মাহমুদ সাহেব সম্মতি দিয়ে বললেন, ‘বেশ চলো তাহলে যাওয়া যাক।’
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-২)
উত্তর আমেরিকায় বাঙালিদের সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।
আটলান্টিকের পারের এই বাঙালিদের বিনোদনের যেন কোনো শেষ নেই। গান, নাচ, নাটক, কবিতা আবৃত্তি, কাব্য জলসা, বাউল সন্ধ্যা, পুঁথিপাঠ, গুরুগম্ভীর সেমিনার, বইমেলা, পথমেলা—সবই হচ্ছে এখানে। বসন্ত উৎসব, বৈশাখ উদযাপন, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস—সব দিবসই পালিত হয় এখানে। আর সে কারণেই বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল ব্যবধানে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি রাজ্যের ছোট বড় অনেক শহরেও বাঙালির বোধ আর মননে এই বাংলা আর বাংলাদেশ অনেক আদর, ভালোবাসায় নিত্যই আদৃত হয়ে আসছে। এই ‘বাংলাদেশ’ নামক ছোট্ট শব্দটি বাঙালি তাঁর ধমনীতে অনেক আদর আর ভালোবাসায় ঠাঁই দিয়েছে বলেই এই প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির একটা উর্বর ভূমি তৈরি হয়েছে। শক্ত হয়েছে বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতির শিকড়।
গল্পে ফেরা যাক। শনিবার বিকেলে মায়ামির একটি সেমিনার হলে ‘কাব্য জলসা’ উপলক্ষে স্থানীয় বেশ কিছু বাঙালিদের সমাগম হয়েছে। সবাই যার যার আসন নিয়ে বসেছে। দর্শক সারিতে মুনা এবং তার স্বামী সাগর বসে আছে। মুনা কিছুক্ষণ পর পর দরজার দিকে তাকাচ্ছে। নীলিমা এখনো এসে পৌঁছেনি। আসার আগে সে নীলিমাকে ফোন করেছিল—নীলিমা তাকে জানিয়েছে শোভন যেতে রাজী হয়েছে এবং তাকে সাথে নিয়েই সে অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ওদের খবর নেই।
কাব্য জলসার প্রধান সমন্বয়ক, ফ্লোরিডার জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জনাব আতিকুর রহমান উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে অনুষ্ঠান শুরু করলেন। আতিকুর রহমান ফ্লোরিডায় আছেন দীর্ঘদিন থেকে। একাধারে একজন আবৃত্তি শিল্পী, অভিনেতা, সংগঠক–অন্যদিকে একজন সফল ব্যবসায়ী। শুরুতে তিনি কবি শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ থেকে কয়েকটি লাইন পাঠ করে শোনালেন। তারপর একে একে স্থানীয় সাহিত্য প্রেমীরা আলোচনা করলেন এবং আবৃত্তি শিল্পীরাও কবিতা আবৃত্তি করলেন।
মুনা আবার ঘুরে তাকাল দরজার দিকে। ঠিক তখনই নীলিমা আর শোভন ঢুকলো। নীলিমা সুন্দর করে সেজেছে। নীল রঙের তাঁতের শাড়ি, কপালে টিপ, মাথায় কোঁকড়ানো চুলে বেলি ফুলের মালা দিয়ে বেণী করা। মায়ামি শহরে বেলি ফুল সে কোথায় পেল কে জানে। নীলিমা শোভনের হাতটা ধরার চেষ্টা করলো কিন্তু শোভন হাত ছাড়িয়ে নিল।
মুনা দূর থেকে ওদেরকে দেখে হাত উঁচু করলো। তারা দুজন গিয়ে বসলো মুনার পাশের আসনে।
অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে উপস্থাপক আমন্ত্রণ জানালেন কাব্য জলসার বিশেষ অতিথি, বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি শ্রদ্ধেয় জনাব মাহমুদ সাজ্জাদকে।
অতিথিদের করতালির মধ্যে কবি মঞ্চে উঠলেন। উপস্থাপককে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি তার কথা শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি প্রথমেই আয়োজক এবং কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে এই কাব্য জলসায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আজকে আমার সত্যি খুব ভাল লাগছে এটা দেখে এবং জেনে যে বাংলাদেশের বাইরে এসেও আপনারা বাংলা কবিতা, গান ও সাহিত্যকে এভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও এর পরিচর্যা করছেন। এটা অনেক আনন্দের ব্যাপার। অনেক আশার ব্যাপার আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্যে, যারা এখানে বেড়ে উঠছে। এই যে শেকড়ের সন্ধান আপনারা তাদেরকে দিচ্ছেন, ‘সুন্দরতম ভূমি বাংলাদেশ’কে বিশদভাবে জানাতে এগিয়ে আসছেন, আমি তার জন্যে বিশেষভাবে সাধুবাদ জানাই। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।’
আবার করতালি হলো। করতালি থেমে গেলে তিনি বললেন, ‘আমি মূলত কবি, আবৃত্তিকার নই। আমার কাজ লেখা, আবৃত্তি নয়। এটা মনে রাখলে আমার কবিতা পাঠ করা সহজ হবে।’
অতিথিদের মধ্যে সামান্য হাসির শব্দ শোনা গেল।
কবি আবার বললেন, ‘আজ আমি আমার নিজের কোনো কবিতা নয় বরং আমি আমার প্রিয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কবিতা আপনাদেরকে শোনাবো।’ বলেই কবি আবৃত্তি শুরু করলেন।
‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষ পান করে মরে যাবো।
বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-
এ আমারই সাড়ে-তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষ পান করে মরে যাবো।’
নীলিমা মুগ্ধ নয়নে অপলক তাকিয়ে আছে কবির দিকে। কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁদের সাথে কোনো দিনও সামনাসামনি দেখা হয়নি কিন্তু তাঁদের কাছে কুঁজো হয়ে নতজানু হতে ইচ্ছে হয়। যাঁদের কখনো কখনো গুরু হিসেবে মনেপ্রাণে মেনে নিতে ইচ্ছে জাগে। সেই মানুষের সামনে বসে তার নিজের কণ্ঠে আবৃত্তি শুনতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার। শ্রদ্ধেয় মাহমুদ সাজ্জাদ নীলিমার কাছে তেমনি একজন মানুষ।
আবৃত্তি করতে করতেই দর্শক সারিতে বসা নীলিমার চোখে কবি সাহেবের দৃষ্টি এসে থমকে গেল মুহূর্তের জন্যে। সে একটু থেমে আবার আবৃত্তি শুরু করলেন। এবং বার কয়েক তাকালেন নীলিমার মুগ্ধ দৃষ্টির দিকে। প্রতিবার দৃষ্টি বিনিময় হতেই নীলিমা মিষ্টি করে একটা হাসি উপহার দিল।
কাব্য জলসা শেষ হতেই উপস্থিত দর্শক আর ভক্তরা ঘিরে ধরল কবি মাহমুদ সাজ্জাদকে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ নিচ্ছে অটোগ্রাফ।
নীলিমা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভক্ত এবং শুভানুধ্যায়ীদের ভিড় একটু কমে আসতেই কবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর নরম সুরে বলল, ‘আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেবেন প্লীজ?’
মাহমুদ সাজ্জাদ মুখ তুলে তাকাতেই দেখল সেই মেয়েটি হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।
‘আমি আপনার একজন ভক্ত।’ নীলিমা বলল কবির সহাস্য মুখের দিকে তাকিয়ে।
‘অবশ্যই। দিন।’ বলেই মাহমুদ সাহেব হাত বাড়ালেন।
নীলিমার হাতে একটি বই ছিল। সে বইটা এগিয়ে দিল। কবি মাহমুদ সাজ্জাদের নির্বাচিত কবিতার সংকলন, ‘অবিনাশী শব্দরাশি।’
বইটি হাতে নিয়ে মাহমুদ সাহেব বেশ অবাক হলেন। তিনি বললেন, ‘আরে এই বই আপনি কোথায় পেলেন?’
‘দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম।’ নীলিমা উত্তর দিল।
‘আপনি কতদিন হলো এসেছেন?’ কবির প্রশ্ন।
‘দু বছর।’
‘হুম।’
‘আপনার কবিতা আমার খুবই ভালো লাগে।’
মাহমুদ সাজ্জাদ বইটির মলাট উল্টিয়ে বললেন, ‘আপনি খুব সুন্দর।’
নীলিমার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হলো। তার প্রিয় মানুষের মুখে তার সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে আপ্লুত হলো সে। আস্তে করে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘কি নাম আপনার?’
‘নীলিমা।’
‘বাহ, বেশ সুন্দর নাম! নীলিমায় নীল।’ বলেই তিনি একটি কবিতার কয়েকটি লাইন আওড়ালেন।
“শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল
তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে
তব সুর বাজে মোর গানে;
কবির অন্তরে তুমি কবি,
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।”
তারপর থেমে বললেন, ‘বলতে পারবেন কার কবিতা?’
‘বলাকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ নীলিমা একটু হেসে উত্তর দিলো।
কবি সাহেব বিস্মিত হলেন নিঃসন্দেহে এবং পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন নীলিমার দিকে। একটু হেসে দিয়ে হাতের বইটিতে লিখলেন, ‘নীলিমা, আপনি খুব সুন্দর। আমি অভিভূত। অনেক শুভেচ্ছা।’ তারপর বইটি ফিরিয়ে দিলেন।
নীলিমা খুশিতে আত্মহারা। সে বলল, ‘আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন।’
‘এক মিনিট, আমি ক্যামেরাটা নিয়ে আসছি।’ বলেই নীলিমা দৌড়ে চলে গেল শোভনের খোঁজে।
(পাঠক, বুঝতেই পারছেন—তখন স্মার্ট ফোনের প্রচলন সেভাবে শুরু হয়নি। নাহলে নীলিমা হয়তো কবির সঙ্গে একখানা সেলফি তুলে ফেলত এতক্ষণে। 😊)
নীলিমা চলে যেতেই কর্মকর্তাদের একজনকে দেখা গেল মাহমুদ সাহেবের কাছে এসে তাকে কিছু বলতে। সম্ভবত রাতে কারো বাসায় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে এবং সেখানে যেতে হবে—এসব বলতে। এর মধ্যেই আরো কিছু ভক্ত চলে এসেছে। তারা এবার কবির সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলো।
নীলিমা ফিরে এসে দেখল, তার প্রিয় কবির চারিদিকে অনেক লোক। সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে গেল যেখানে মুনা, সাগর আর শোভন দাঁড়িয়ে অন্যদের সাথে চা-সিঙ্গারা খাচ্ছে আর চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
কথা বলার ফাঁকেই মাহমুদ সাহেব লক্ষ করলেন নীলিমা এসে আবার চলে গেল।
নীলিমা ওদের কাছে যেতেই মুনা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে অটোগ্রাফ নিয়েছিস?’
‘হুম।’
শোভন বলল, ‘দেখিতো কি লিখেছেন?’ বলেই হাত বাড়িয়ে বইটি নিতে চাইল।
‘কেনো তোমাকে দেখাবো কেনো?’ দুষ্টুমি করে উত্তর দিলো নীলিমা।
‘কথা বলেছিস?’ মুনা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘বলতে আর পারলাম কই?’
‘তাহলে এতক্ষণ কি করলি। আমার তো মনে হলো সে কি যেন বলছিল তোকে।’ বলেই মুনা তাকাল সাগর আর শোভনের দিকে, ওদের সমর্থন নেবার জন্যে।
‘কবিতা।’
‘তোকে একা কবিতা শোনালো?’
‘প্রসঙ্গক্রমে চলে এলো তাই।’
‘মানে?’
‘মানে কিছু না।’
‘ছবি তুলেছিস?’
‘নারে, তুলতে পারিনি।’
‘চল, ছবি তুলে আসি।’
নীলিমা আর মুনা ঘুরে দাড়িয়েই চমকে গেল। কবি সাহেব ওদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
মাহমুদ সাহেব নীলিমাকে লক্ষ করে বললেন, ‘এই যে আপনি এখানে। ছবি না তুলে ফিরে এলেন যে, তুলতে চান না?’
‘অবশ্যই চাই। তার আগে পরিচয় করিয়ে দেই… ও হচ্ছে শোভন, আমার হাজব্যান্ড। ও মুনা, ফ্লোরিডায় আমার একমাত্র বান্ধবী, আর ইনি হচ্ছেন…’
নীলিমার মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে মুনা বলল, ‘সাগর, আমার একমাত্র হাজব্যান্ড।’
মুনার কথা বলার ঢং এ সবাই একসাথে হেসে উঠল। এরপর তারা সবাই মিলে কবির সঙ্গে ছবি তুলল।
এর মধ্যেই মুনা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কোথায় উঠেছেন? কারো বাসায় না হোটেলে?’
‘হোটেলে।’
‘থাকবেন কিছুদিন, নাকি কালই চলে যাচ্ছেন?’
‘এ সপ্তাহটা আছি। আমার এক বন্ধু থাকে অরল্যান্ডোতে, এরমাঝে ওর ওখানে একবার যেতে হবে।’
‘তাহলে তো আপনার সাথে কথা হতে পারে?’ মুনা আবার বলল।
‘হ্যাঁ, তাতো পারেই।’
এরপর মুনা নীলিমার দিকে একবার তাকিয়ে মাহমুদ সাহেবকে বলল, ‘আপনার ফোন নাম্বারটা কি পেতে পারি, অবশ্য আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে।’
‘না না, আপত্তি থাকবে কেন? আপনারা ফোন করলে ভালই লাগবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমার নিজেরতো ফোন নেই। আর হোটেলের নাম্বারটাও আমার কাছে নেই।’ একটু ভেবে নিয়ে তিনি আবার বললেন, ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, আমাকে বরং আপনাদের ফোন নাম্বারটা দিয়ে দিন, আমিই না হয় ফোন করব।’
মুনা তাড়াতাড়ি একটা কাগজে নীলিমা আর তার নাম্বার লিখে কবির হাতে দিলো। সেটা দেখে সাগর আর শোভন চোখ ঘুরিয়ে একটু মুচকি হাসল। এরমধ্যে আরেক কর্মকর্তা এসে মাহমুদ সাহেবকে নিয়ে গেলেন। কবি বিদায় নিয়ে চলে যেতেই ওরা সবাই সেমিনার হল থেকে বের হয়ে এলো।
নীলিমা চুপচাপ হাঁটছে করিডোর দিয়ে। মুনাও হাঁটছে নীলিমার পাশে পাশে। নীলিমার অন্য পাশে শোভন আর মুনার পাশে সাগর। মুনাকে খুবই খুশি মনে হচ্ছে। বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে নীলিমাকে বলল সে, ‘বলতো কবি সাহেব আগে কাকে ফোন করবেন? তোকে না আমাকে?’
‘তোর কি মনে হয়, উনি ফোন করবেন?’ নীলিমা অনিশ্চিতভাবে বলল।
শোভন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই, আরে উনার কি সে সময় হবে নাকি? এ বাসা ও বাসা দাওয়াত খেতে খেতেই তো সময় চলে যাবে। তারপর সাইট সিয়িং, ফিশিং আরো কত কি। লেখালেখিও নিশ্চয়ই করবেন। হু নোজ!’
সাগর চোখ টিপে যোগ করল, ‘ফ্লোরিডায় এসেছেন–নর্থ বীচ কিংবা সাউথ বীচে যাবেন না? ওখানেই না কবিতার সব উপকরণ।’
‘সাগর?’ মুনা কটাক্ষ করলো সাগরকে।
নীলিমা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ছিঃ সাগর ভাই, এভাবে বলছেন কেন?’
‘ছিঃ সাগর, এভাবে বলছ কেন?’ নীলিমার কণ্ঠ অনুকরণ করে বলল শোভন।
নীলিমার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেলো মুহূর্তেই। প্রিয় কবিকে নিয়ে এমন ফাজলামো তার একেবারেই পছন্দ নয়। সে রেগে বলল, ‘এনাফ! লেটস গো হোম।’ বলেই নীলিমা দ্রুত এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে।
মুনা একবার সাগর আর একবার শোভনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমরা না!’ বলেই সে সাগরকে বলল, ‘চলো।’
এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। মুনা আর সাগর অন্যদিকে চলে গেলো।
শোভন দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়ি খুলে দিলো। নীলিমা উঠে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিলো সে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
আলো ঝলমল মায়ামির রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে ওদের গাড়ি। নীলিমা চুপচাপ তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। সে ভীষণ আহত হয়েছে সাগর আর শোভনের অশোভনীয় আচরণে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কোনো কারণ ছাড়াই কিছু মানুষ আছে যারা কবি-সাহিত্যিক কিংবা গুণীজনদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে জানে না নাকি ইচ্ছে করেই দেখায় না। কে জানে।
নীলিমা মন খারাপ করে বসে রইল। গাড়ি চালাতে চালাতে শোভন দু’একবার তাকাল নীলিমার দিকে, কিন্তু কিছু বলল না।
নীলিমার মন খারাপের আরেকটি কারণ হলো কবি মাহমুদ সাজ্জাদের কাছে একটা ব্যক্তিগত ফোন নেই এই বিষয়টি তাকে অবাক করেছে। সে ভেবেছিল কবির নাম্বারটা নিয়ে এলে তার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারত। ওর যে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার ছিল। বাসায় ফিরে কাপড় বদলাতে বদলাতে নিজের মনেই সে বলল, ‘এত বড় একজন কবি, উনার নিজের একটা সেল ফোন থাকতে পারে না? আশ্চর্য!’
শোভন কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। সে তাকাল নীলিমার দিকে। একটু মুচকি হেসে বলল, ‘আরে, উনিতো আর এখানে থাকেন না যে তার একটা সেল ফোন থাকতে হবে। তাছাড়া উনি এসেছেন মাত্র কয়েকদিনের জন্যে। এ ক’দিনের জন্যে একটা সেল ফোনের ব্যবস্থা কে করে দেবে বলো?’
‘কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যেসব শিল্পীরা আসেন তাদের তো দেখি সবারই সাথে ফোন থাকে। গানের শিল্পী, নাটকের শিল্পী, সিনেমার নায়ক-নায়িকা সব শিল্পীদেরই তো দেখলাম পারসোনাল ফোন নিয়ে সারাক্ষণ কথা বলছে।’
‘আরে ওদের কথা আলাদা। ওরাতো স্টার। কবি সাহিত্যিকেরা তো আর স্টার নয়। তারা জাস্ট কবি সাহিত্যিক।’
নীলিমা অবাক হয়ে গেলো, কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি এমন তুচ্ছ মানসিকতার কথা ভেবে। এর আগেও আতিক ভাইর কাছে এ ব্যাপারে ও শুনেছে সেসব কথা। আতিকুর রহমান ফ্লোরিডার স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংগঠক, নিজেও অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি করেন, নীলিমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। নীলিমার সঙ্গে মাঝে মাঝে সাহিত্য নিয়ে কথা হয়। সেদিন কথায় কথায় নীলিমাকে বলছিলেন আক্ষেপ করে। প্রতি বছর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশী সংগঠনগুলির একত্রে ‘ফোবানা’ নামে যে মহাসম্মেলন হয় সেখানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি কিছু কবি-সাহিত্যিক, আবৃত্তি শিল্পীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো গানের শিল্পীদের যেভাবে মূল্যায়ন করা কিংবা গুরুত্ব দেয়া হয় তেমনটা কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এমনকি তাদেরকে নিয়ে যে কাব্য-জলসা কিংবা সাহিত্য-চর্চার অনুষ্ঠান করা হয়, সেখানেও দর্শকদের উপস্থিতি থাকে শূন্যের কোঠায়। সবাই অপেক্ষায় থাকে কখন বড় বড় শিল্পীরা গান করবেন, মঞ্চ মাতাবেন। ফোবানা’র মূল আকর্ষণই থাকে দেশ থেকে আসা সেই সব গানের শিল্পীরা। কবি-সাহিত্যিকরা থাকেন অবহেলিত, উপেক্ষিত।
নীলিমা প্রসাধনী তুলে, রাতের শোয়ার কাপড় পড়ে বিছানায় এসে দেখলো শোভন চোখ বন্ধ করে আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সে আলতো করে একটা হাত রাখলো শোভনের গায়ের উপর।
মাঝে মাঝে শোভনের বুকের সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে নীলিমার–আদর পেতে ইচ্ছে করে ভীষণ। একটা সময় ছিল, শোভনের কাছে গেলেই সে বুঝতে পারতো। আদর ভালোবাসা দিতে কোন কার্পণ্য ছিল না। এখন তাকে চাইলেও পাওয়া যায় না। ইচ্ছে করছে, ধাক্কা দিয়ে শোভনকে জাগিয়ে দিতে। আবার ভাবল, কী লাভ। সাড়া তো দিবেই না। উপরন্তু, এমন বিরক্তি প্রকাশ করবে, তা নীলিমার জন্য হবে আরো অপমানকর। এসব ব্যাপারে তো কোন জোর চলে না!
নীলিমা যা ভেবেছিল তাই হলো। শোভন বিরক্ত হয়ে নীলিমার হাতখানি সরিয়ে দিয়ে পাশ ফিরে শুলো।
অভিমানে নীলিমার চোখ ভিজে এলো। সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিলিং এর দিকে।
শোভনের এমন উপেক্ষা আর অবহেলা ভীষণ কষ্ট দেয় তাকে। তারপরেও সে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে একই ছাদের নীচে। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কিইবা করার আছে মানিয়ে নেয়া ছাড়া। আর যাবেই বা কোথায় সে। কিন্তু এমন জীবন তো সে কখনই আশা করেনি। প্রায় দু বছর হয়ে গেল নীলিমা এসেছে এই দেশে। প্রথম প্রথম ওদের দিনগুলি বেশ আনন্দে কেটে যেত। কাজ থেকে ফিরে শোভন তাকে যথেষ্ট সময় দিত। মাঝে মাঝে খুনসুটি করতো। সমুদ্রের পাড়ে হেঁটে বেড়াত। সেই শোভন কেমন যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে নীলিমার কাছ থেকে। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে। প্রায়ই রাত করে। ছুটির দিনগুলিতেও চলে যায় বাইরে। নীলিমার দিনগুলি কাটে একাই। সে ভীষণ একা। মাঝে মাঝে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন সে একাই চলে যায় সমুদ্র পাড়ে। বুক ভরে বাতাস নেয়। তারপর ফিরে আসে তার ছোট্ট এপার্টমেন্টে।
শোভনের এমন পরিবর্তনের কি কারণ আছে সেটা সে এখনো জানে না। কাছের দু’এক জন মানুষের কাছ থেকে কিছু কান কথা তার কানে এসেছে কিন্তু সেসব নিয়ে শোভনের সাথে কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডায় সে যায় নি। সময়ের উপর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করছে নীলিমা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল নীলিমা। পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে রইল দূর সমুদ্রের দিকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল কবি মাহমুদ সাজ্জাদের কথা। কানে ভেসে এলো তার আবৃত্তি করা কবিতার পঙক্তি, ‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো, আমি বিষ পান করে মরে যাবো…’
ধীরে ধীরে নীলিমার বিষণ্ণতা কেটে গেল। মনে পড়ল কবির সাথে তার পরিচয় আর কথোপকথনের কথা। নীলিমা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে কবির কথা। কবি বললেন, ‘আপনি খুব সুন্দর, কি নাম আপনার?’ এটুকু ভাবতেই নীলিমার মন ভাল হয়ে গেল। সে ঘুরে একবার ঘুমন্ত শোভনের দিকে তাকাল। তারপর আবার ফিরে তাকিয়ে রইল দূর সমুদ্রের দিকে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের পানি চিক চিক করছে।
মিক্সড কালচার (শেষ পর্ব)
ডালাসের অদূরে রিচার্ডসন নামক শহরে অবস্থিত টেক্সাসের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের ডালাস ক্যাম্পাস। সংক্ষেপে ইউটি ডালাস কিংবা ইউটিডি। ইউটি ডালাসের STEM (Science, Technology, Engineering and Math) প্রোগ্রাম আমেরিকার সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং প্রোগ্রামগুলির মধ্যে একটি। আর এ কারণেই ইউটি ডালাস বিশ্বজুড়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য—বিশেষ করে যারা উচ্চতর ডিগ্রী নিতে চান।
ক্লাস শেষ করে ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল জেসমিন আর সুজানা। পরের ক্লাস শুরু হতে আরো ৪৫ মিনিট বাকী। একটু কফি খেলে কেমন হয়? জেসমিনের পছন্দ স্টারবাকস কফি। ওদের একটা কফি শপ আছে ক্যাফেটেরিয়ার অভ্যন্তরে। ওখানে হেঁটে যেতে হবে। হাতে যেহেতু সময় আছে, তাই ক্যাফেটেরিয়াতেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা হলো দুজনার মধ্যে। কথোপকথনের বেশিরভাগ সময়েই জেসমিন তার বাবার প্রসঙ্গে কথা বলল।
‘I don’t understand why dad is so concerned about me. I’m already 20! Look at the American parents—they are not too concerned when their children reach 18!’
‘You know Jazz, we are lucky that our parents still wants to guide us even when we’re 18.’ সুজানা তার স্বভাবসুলভ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করল। ‘বাংলাদেশি প্যারেন্টসরা তাদের ছেলেমেয়েদের যেভাবে আদেশ–উপদেশ দেন তা আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যে খুবই প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম কি বোঝ তা?’ জেসমিনের অবাক করা চেহারার দিকে তাকিয়ে সুজানা জানতে চাইল।
‘I know, new generation. I agree, but my dad overreacts all the time. He does not want to understand me.’
‘Sometimes our parents don’t understand us, or sometimes we don’t understand them, that’s ok. আমরা এদেশে জন্ম নিয়েছি বলেই এটা হতে পারে।’
‘Are you saying it’s a communication gap then?’
‘Of course, it is. আমাদের প্যারেন্টসদের সঙ্গে এই গ্যাপ দূর করতে হলে আমাদেরকে বাংলাদেশের কালচার সম্পর্কে বেশী করে জানতে হবে। ‘
‘Our parents also should know and learn more about American culture, their history, racism, Spanish and other immigrants. Don’t you think?’
সুজানা মাথা নেড়ে সায় জানাল।
জেসমিন আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সে চুপ করে গেল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল অদূরে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুজানাও তাকাল। জেসমিন দ্রুত এগিয়ে গেল যেদিকে তাকিয়ে ছিল সেদিকে। কিছুদূর এগিয়েই সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে থমকে দাঁড়াল। জায়গাটি তুলনামূলকভাবে নির্জন, সেখানে একটি মেয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে কথা বলছে অ্যালেক্স । কথার ফাঁকে ফাঁকে তারা চুম্বন করছে একে অপরকে। জেসমিন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে দাঁড়াল অ্যালেক্সের সামনে। ‘অ্যালেক্স!’
জেসমিনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠের ডাকে অ্যালেক্স ঘুরে দাঁড়াল। ওর অগ্নিমূর্তি দেখে কিছুটা ভরকে গেল সে।
‘What do you think you are doing, you son of a bitch?’
অ্যালেক্স চুপ করে রইল। সাথের মেয়েটির কোমর থেকে হাত ছুটে গেছে তার।
‘How long have you been cheating on me, Alex?’
‘Cheating on you? You are not even my girlfriend, ok? You are fooling around! And I’m just playing with you. What do you expect?’ জেসমিনকে অপমানের চূড়ান্ত করে কথাগুলো বলল অ্যালেক্স। নতুন বান্ধবীর সামনে তাকে অপমান করার প্রতিশোধ নিতে পেরে একটু স্বস্তি বোধ করল সে।
‘Playing with me? How dare you. Then why did you…’ জেসমিন নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল অ্যালেক্সের গালে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলেও অ্যালেক্স সাথে সাথেই জেসমিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল নিচে।
জেসমিন রাগে দুঃখে কেঁদে ফেলল। সে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অ্যালেক্সের ওপর। এলোপাথারি কিল ঘুসি চালাতে থাকল।
সুজানা দেরি না করে জেসমিনকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরে এলো একটু দূরে। ফোন বের করে অ্যালেক্সের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Ok, I’m going to call the police’
পরিস্থিতি খারাপ হবার আগেই অ্যালেক্স তার বান্ধবীকে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল চোখের আড়ালে।
‘Let’s go Jasmine. Forget it. আজ আর ক্লাসে মন বসবে না। চলো আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি।’ সুজানা জেসমিনকে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল পার্কিং লটে যেখানে পার্ক করা আছে ওদের গাড়ি।
…
বাসায় ফিরে প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে বিছানায় শুয়ে রইল জেসমিন। তার হাতের এবং পায়ের কয়েক জায়গায় ক্ষত হয়েছে। সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল।
কাজ থেকে একটু তাড়াতাড়ি বসায় ফিরে এলো শারমিন। এসেই জেসমিনের রুমে যেয়ে দেখল সে মন খারাপ করে শুয়ে আছে। আজ কলেজে যা ঘটেছে সে ব্যাপারে শারমিনকে সব জানিয়েছে সুজানা।
শারমিন একটা আইচ প্যাক নিয়ে ব্যথার জায়গাগুলোতে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে ধরল। জেসমিন ফুলে ফুলে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I made a terrible mistake. I was wrong all along. I’m sorry. I’m very sorry.’
‘I told you so many times. You didn’t care.’ শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল।
‘I know sis. I know now. Please forgive me.’
‘It’s ok.’
…
রাতের খাবার শেষ করে একটা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিলেন রহমান সাহেব। খুট করে একটা শব্দে তিনি ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন দাঁড়িয়ে আছে তার রুমে। তিনি অবাক হলেন। জেসমিন তো সাধারণত তার ঘরে আসে না। জেসমিন এগিয়ে এসে রহমান সাহেবের হাত ধরে দাঁড়াল।
‘কিছু বলবি মা?’
‘Dad, I’m sorry, I hurt you. I don’t want to hurt you anymore.’ জেসমিন ইংরেজির সাথে ভাঙা ভাঙা বাংলা মিশিয়ে বলল, ‘আমার ভুল হয়েছে। আমি আর ভুল করতে চাই না।’
‘আচ্ছা, সে তো খুবই ভালো কথা।’
‘I’ll finish my college first then I’ll go to Bangladesh. আমি একটা বাংলাদেশি ছেলেকে বিয়ে করতে চাই।’
রহমান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে জেসমিনকে বুকে টেনে নিলেন।
জেসমিনকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে শারমিন আর সফিক দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন আনন্দঘন মুহূর্তে তারা দুজনে ঘরে ঢুকল হাসি মুখে। জেসমিন শারমিনকে দেখিয়ে বলল, ‘Look at her, how happy she is with dulabhai. I want to be like her. And I want to make you happy too.’
জেসমিনের সহজ সরল কথার ভঙ্গিতে সবাই হেসে ফেলল। রহমান সাহেব আবার বুকে টেনে নিলেন তার আদরের ছোট মেয়েকে।
…
রহমান সাহেবের বাসার লিভিং রুমে তুমুল আড্ডা জমে উঠেছে। সফিক, শারমিন, জেসমিন, সুজানা, জেসন আর রহমান সাহেব স্বয়ং খোশ গল্পে মেতে উঠেছেন। কিছুদিন থেকেই রহমান সাহেবের মনটা অত্যন্ত প্রফুল্ল। তাই শরীরটাও সতেজ লাগছে। তিনি শারমিনকে বলেছিলেন এই উইকএন্ডে লাঞ্চে একটু ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া হোক। শারমিন সেভাবেই আয়োজন করেছে সবকিছু। জেসন আর সুজানাও শামিল হয়েছে আজ দুপুরের নিমন্ত্রণে। আড্ডা জমে উঠেছে তুমুল। সফিকই বেশি গল্প করছে। হঠাৎ সুজানার ফোন এলো। সে এক্সকিউজ মি বলে ফোনটা ধরল। সুজানার মায়ের ফোন।
‘হ্যাঁ আম্মু? তুমি কোথায়? আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি ওখানেই থাকো, আমি আসছি।’ ফোন কেটে দিয়ে সুজানা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সরি, আমাকে যেতে হবে। আম্মু অপেক্ষা করছেন। আমি আজ আসি।’
‘তুমি আবার এসো, মা। চলো, তোমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’ রহমান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
‘না না আঙ্কেল অসুবিধা নেই। আপনি বসুন। আমি অবশ্যই আবার আসব।’
সুজানা জেসমিন আর শারমিনকে হাগ দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সুজানা বের হয়ে যেতেই জেসনও দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। জেসনের এভাবে কিছু না বলে হুট করে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টা শারমিন কিংবা জেসমিন কেউই ঠিক বুঝতে পারল না। তারা দুজন দুজনের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
সফিক বলল, ‘কী ব্যাপার, তোমরা হাসছ কেন?’
‘না কিছু না।’ দু’বোন আবার একসাথে হেসে ফেলল।
…
সুজানা একটু এগিয়ে যেতেই শুনতে পেল জেসনের কণ্ঠ। ‘Excuse me!’
সুজানা ঘুরে দাঁড়াল।
জেসন বলল, ‘I was just wondering if you need a ride or something.’
‘Thank you, Jason. রাইড লাগবে না। তবে তুমি যদি আমার সাথে আসতে চাও, আসতে পারো। You can meet my mom.’
‘অবশ্যই আসতে চাই।’
তারা হাঁটতে হাঁটতে সুজানার গাড়ির কাছে গেল।
জেসন বলল, ‘By the way, I’m very impressed about your thought process of mixed culture. তুমি তো অনেক ভালো বাংলা জানো—আমাকে বাংলা শেখাবে?’
‘অবশ্যই শেখাবো। তবে এক শর্তে।’ সুজানার মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘কী শর্ত?’
‘আমাকে সালসা শেখাবে?’
জেসন অবাক হয়ে তাকাল সুজানার দিকে। সে ঠিক বুঝতে পারল না, সুজানা কী করে জানে যে সে একজন ড্যান্স ইন্সট্রাকটর। ছোট বেলা থেকেই ল্যাটিন আমেরিকান নাচের প্রতি জেসনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়—বিশেষ করে সালসা, ফ্লেমিঙ্কো, সাম্বা, ট্যাংগো, ম্যাম্বো, মেরেঙ্গে, চা-চা, বাচাতা আরো কত ধরনের নাচ! সে নিজে থেকেই বিভিন্ন ধারার ল্যাটিন নাচ শিখে, পরে ট্রেনিং শেষ করে একটা ড্যান্স ক্লাবে ইন্সট্রাকটর হিসেবে পার্ট টাইম জব করে।
‘তুমি কী করে জানো যে আমি ড্যান্স জানি?’
‘আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও, তারপর বলছি। কী শেখাবে?’
‘অবশ্যই শেখাবো। তবে একটা শর্তে।’ এবার জেসন হাসি হাসি মুখ করে বলল।
‘কী শর্ত?’
‘আমাকে বিয়ে করবে? Will you marry me?’
‘এত তাড়াতাড়ি বিয়ের প্রস্তাব? তুমি তো আমাকে চেনোই না ঠিকমতো।’ মিষ্টি করে হেসে বলল সুজানা।
‘Whatever I know, that’s good enough for me!’
‘কিন্তু আমার জন্য সেটা এনাফ নাও হতে পারে তাই না?’
‘I agree!’ একটু ভেবে জেসন উত্তর দিল।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল দুজনেই। কেউ কোনো কথা খুঁজে পেল না। জেসন কিছুটা হতাশ হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
‘দ্যাট’স ইট, আর কোনো কথা নেই?’ সুজানা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল।
জেসন কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।
‘ঠিক আছে, আমি আসি। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।’
জেসন সরে দাঁড়াল। হঠাৎ করেই তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
সুজানা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তাকাল জেসনের দিকে। ‘আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করবে না?’ সুজানার চেহারায় আবার সেই দুষ্টুমির হাসি। ‘উঠে এসো গাড়িতে। লেট’স গো।’
জেসন উঠে বসল সুজানার গাড়িতে। পাশের সিটে বসে তাকাল সুজানার দিকে। মেয়েটির হাসিটা এত মিষ্টি কেন? কী সুন্দর হাসি। জেসন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এই মেয়েটিকেই তার পাশে সারা জীবন চাই।
সুজানা গাড়ি ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল আবাসিক এলাকার বাঁকে।
(আর চলবে না… দি এন্ড!)
করোনা বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত এই অস্থির সময়ে কারো মানসিক অবস্থারই ঠিক নেই। তারমধ্যেও সময় বের করে যারা গল্পটি পড়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত সাথেই ছিলেন, তাদের সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে নতুন কোনো গল্প নিয়ে। সে পর্যন্ত সবাই ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন।
মিক্সড কালচার (পর্ব-৭)
রহমান সাহেবের দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের পরে তিনি অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন। শরীরটাও ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি তার রুম থেকে খুব একটা বের হন না। অফিস থেকেও ছুটি নিয়েছেন। যতটা সম্ভব বিশ্রামেই আছেন তিনি। হার্ট অ্যাটাকের পরে এলোমেলো করে দেয় জীবনের অনেক কিছু। আকস্মিক ছন্দপতন ঘটে জীবনে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পরও নানা জটিলতা ঘটে যায় পরবর্তী কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। অকস্মাৎ এ বিপদ কাটিয়ে ওঠার পর আবার অনেকেই কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। হার্ট অ্যাটাকের পরে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে হার্টকে দুর্বলতার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি। শারমিন আর সফিকের অক্লান্ত চেষ্টায় রহমান সাহেব ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন।
জেসমিন বাসাতেই থাকে। তার আর ডরমিটরিতে যাওয়া হয় নি। সেদিনের পর থেকে তার মধ্যে বেশ স্থিরতা এসেছে। যথেষ্ট নমনীয়তা লক্ষ করা যায় তার চাল-চলন, বেশ ভূষায়। কলেজ থেকে ফিরেই বাবার সঙ্গে দেখা করে, টুকটাক কথাও বলে। যদিও এক ধরনের অপরাধবোধে সে ভোগে। শারমিন বেশ কিছুদিন কথা বলে নি জেসমিনের সঙ্গে। জেসমিনের সেদিনের ব্যবহারে সে যার পর নাই বিরক্ত এবং আহত হয়েছে।
সফিক ড্রাইভিং লাইসেন্স টেস্ট দিয়ে লাইসেন্স পেয়েছে। সে ভীষণ খুশি। এখন মাঝে মাঝে সে নিজেই গাড়ি চালিয়ে গ্রোসারী কিংবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে নিয়ে আসে। প্রথমদিকে ডলার খরচ করে কিছু কিনতে গেলে মনের ভেতর খচ করে উঠত। নিজের অজান্তেই কোনো কিছুর দাম দেখা মাত্র মনে মনে ৮০ দিয়ে গুণ করে মূষরে যেত সে। শারমিন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওকে বকা দিয়েছে অনেক। এখন অবশ্য এতটা খারাপ লাগে না।
শারমিন তার পরিচিত এক বড় বাঙালি ভাইয়ের গ্যাস স্টেশন কাম কনভেনিয়েন্ট স্টোরে সফিককে একটা কাজ জোগার করে দিয়েছে। কাস্টমারদের সাথে অনর্গল ভুলভাল ইংরেজি বলে ইংরেজিতে কথা বলাটা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে সে। দেশ থেকে একাউন্টিং এ মাস্টার্স করে এসেছে সে। তার ইচ্ছা তার লাইনের প্রফেশনাল কোনো জব করা, কিন্তু যতদিন তেমন কোনো কাজ না হচ্ছে, পার্ট টাইম একটা অড জব করা যেতেই পারে। তাতে দোষের কিছু নেই। সবাই করে। শারমিনের পরিচিত আরেক বাঙালি ভাবীর হাজব্যান্ডের একটা সিপিএ ফার্ম আছে। সফিকের সেখানে কাজের ব্যাপারে প্রাথমিক কথাও বলে রেখেছে সে।
সফিকের অবশ্য কোনো কিছুতেই কোনো অভিযোগ নেই। খুব অল্পতেই খুশি হওয়া তার স্বভাব। কোনোদিন আমেরিকা আসবে সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না। তবুও কীভাবে শারমিনের সাথে তার বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের সময় শারমিন দেশে যেয়ে ছিল মাত্র ৩ মাস। তারও আরো আড়াই বছর পর সে ইমিগ্রেশন ভিসা পেয়ে আমেরিকা আসে।
আমেরিকায় আসার পর থেকেই এই দেশটাকে তার খুব পছন্দ হয়েছে। পছন্দ হয়েছে এই দেশের মানুষগুলিকেও। আমেরিকার সাধারণ মানুষেরা গোমড়ামুখী নয়, তারা খুব হাসিখুশি। এ বিষয়টা সফিকের সবচেয়ে বেশি পছন্দের। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের সাথেও এরা কথা বলে এমনভাবে যেন মনে হবে কত দিনের চেনা মানুষ। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে এটি চমৎকার একটি দেশ। সারা পৃথিবী থেকে সবদেশের মানুষ এখানে এসে জমা হয়েছে। এই দেশে কেউই আর বিদেশি নয়।
বাসায় ফিরে হাত দিয়ে ডাল-ভাত-সবজি-মাছ-মাংস মাখিয়ে মাখিয়ে মজা করে খেতে পারছে—এই নিয়ে সফিকের আনন্দের সীমা নেই। তার ধারণা ছিল আমেরিকায় তার দিন কাটবে সালাদ আর ঠাণ্ডা স্যান্ডউইচ খেয়ে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি—এখানে এখন বাংলাদেশের সব কিছুই পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে সফিকের দিনকাল বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে বলা যায়।
…
রবিবার সকাল। অনেকক্ষণ থেকে রহমান সাহেবের বাসার দরজায় কলিং বেল বাজছে। বাসায় কেউ এলে সাধারণত শারমিনই দরজা খুলে দেয়। কিন্তু শারমিন আজ বাসায় নেই। সফিককে নিয়ে গেছে সাউথফোর্ক র্যাঞ্চ দেখাতে। বিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘ডালাস’ এর শুটিং হয়েছিল সেখানে। সাউথফোর্ক র্যাঞ্চ সম্পর্কে ইতিপূর্বে ‘হৃদয়ে আগন্তুক’* নামে আমার আরেকটি গল্পে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। এখানে তাই আর বিস্তারিত বর্ণনায় গেলাম না।
ডোর বেল বেজেই চলেছে। রহমান সাহেব লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছিলেন। তিনি একবার ওপরে তাকালেন। না, কেউ নেমে আসছে না। একসময় তিনি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। এবং অবাক হয়ে দেখলেন জেসমিনের বয়সী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাসি হাসি মুখ করে। রহমান সাহেব অবাক হলেন।
‘স্লামালিকুম আঙ্কেল।’
‘ওয়ালাইকুমসালাম। তুমি কে মা? তোমাকে তো চিনলাম না।’
‘আমি সুজানা। জেসমিনের বন্ধু। আপনি অবশ্য আমাকে আগে কখনও দেখেননি। ও আমাকে আসতে বলেছিল।’
‘ও আচ্ছা।’
‘আজ একসঙ্গে আমাদের বাইরে যাবার কথা, Is she home?’
‘ও তো উইকএন্ডে অনেক দেরী করে ঘুম থেকে উঠে।’ রহমান সাহেব হাত ঘড়িতে সময় দেখলেন—সকাল প্রায় ১১টা। তিনি আবার বললেন, ‘নিশ্চয়ই এখনো ঘুমচ্ছে। তুমি এসো, ভেতরে এসে বসো।’ তিনি সরে গিয়ে সুজানাকে ভেতরে ঢুকতে দিলেন।
‘তুমি কি বাংলাদেশ থেকে নতুন এসেছো? এত সুন্দর বাংলা বলো।’
‘না আঙ্কেল, আমার জন্ম এখানেই, বড় হয়েছি এখানেই। আর বাংলা বলা শিখেছি আমার বাবা মায়ের কাছে। অবশ্য আমার গ্র্যান্ড মা’র কারণে প্র্যাকটিসটা বেশী হয়েছে।’
‘Hi, Sue?’ হঠাৎ করেই ওপর থেকে জেসমিনের কণ্ঠ শোনা গেল। সুজানা এবং রহমান সাহেব দুজনেই তাকালেন ওপরের দিকে। একটা বিড়াল কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেসমিন। গায়ে রাতের কাপড়। চুল এলোমেলো। ‘Come upstairs. I’ll be ready in a minute.’
‘আঙ্কেল আপনার সাথে পরে কথা হবে।’ সুজানা উঠে দাঁড়াল।
‘ঠিক আছে মা, তুমি মাঝে মাঝে এসো। তোমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।’
…
জেসমিনের ২০ তম জন্মদিন পালন করা হচ্ছে ঘটা করে। জেসমিনের সব বন্ধুরা এসেছে, সেই সাথে তাদের পরিবার। প্রতিবেশী জেসন আর তার বাবা-মাও এসেছেন। সুজানা এসেছে তার বাবা-মাকে নিয়ে। ডালাসের বিখ্যাত বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট থেকে মজাদার সব খাবার আনা হয়েছে। শারমিন, সফিক আর জেসন মিলে সুন্দর করে সাজিয়েছে সব কিছু। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যেই অতিথিরা সবাই চলে এসেছেন। ছোট ছোট গ্রুপে সবাই কথা বলছেন। সবার হাতেই অ্যাপিটাইজারের প্লেট। এধরনের অনুষ্ঠানগুলোতে সাধারণত সম-সাময়িক বিষয় নিয়েই সবাই গল্পগুজব করে থাকেন।
আজকের আলোচনার প্রধান বিষয়, কমিউনিটিতে দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের বিয়ে নিয়ে যে সমস্যা হয়, বিশেষ করে ছেলের জন্য উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না অথবা মেয়ের জন্য উপযুক্ত ছেলে খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার অনেকেই জীবন সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধর্মের ছেলে-মেয়েদেরকে পছন্দ করে বসে। ভিন্ন ধর্মের ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বিয়ের ঘটনাও তাই বাড়ছে। ছেলে-মেয়েদের সুখের কথা চিন্তা করে বাবা-মায়েরা সেসব বিয়ে মেনে নিলেও মানসিকভাবে তারা ভীষণভাবে মুষরে পড়েন, কেননা তারা চান, তাদের ছেলে-মেয়েরা জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিক একটা বাঙালি ছেলে বা মেয়েকে।
অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে রহমান সাহেব সুজানার সাথে কথা বলছেন। সেদিন সুজানার সাথে কথা বলে রহমান সাহেব ভীষণ চমৎকৃত হয়েছেন। তিনি মনে মনে খুব আফসোস করেছেন, আহা তার জেসমিনও যদি এমন হতো। সুজানা চলে যেতেই মনের অজান্তেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। আজ সুজানাকে আবার কাছে পেয়ে তার ভীষণ ভালো লাগছে। সুজানাকে তিনি তার পাশে বসিয়ে কথা বলছেন। এক পর্যায়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘বাংলা ভাষা কিংবা সংস্কৃতির প্রতি এদেশে জন্ম নেয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় না। তোমার সাথে কথা বলে আমি খুব অবাক হয়েছি। I’m really proud of you. আচ্ছা, আমাকে বলতো, বাংলার প্রতি তোমার এমন আগ্রহ তৈরি হলো কী করে?’
‘আঙ্কেল, আমার জন্ম আমেরিকাতে হলেও বেসিক্যালি আমি বাঙালি। কেননা, এদেশে আমি যত বড়ই হই না কেন, আমেরিকানদের সাথে কমপিট করে মেইনস্ট্রীমে মিশে গেলেও আমি যে বাংলাদেশের মেয়ে এই সত্যটি আমি কখনোই ভুলে যেতে পারব না।’
রহমান সাহেব ভীষণ আপ্লুত হলেন সুজানার কথা শুনে। সফিক আর শারমিনও ওদের সামনের সোফায় বসা ছিল। সুজানার কথা হঠাৎ করে সফিকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সে আগ্রহ নিয়ে ওর কথা শুনতে থাকল।
‘আমি শত চেষ্টা করলেও একটি আমেরিকান ছেলে বা মেয়ে যেভাবে বড় হয়ে ওদের নিজস্ব কালচার নিয়ে, আইডেন্টিটি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেভাবে পারব না।
সফিক জিজ্ঞেস করল, ‘তার কারণ কি হতে পারে বলে তুমি মনে করো?’
‘কারণ, আমার রক্তে মিশে আছে বাংলাদেশের কালচার অ্যান্ড ট্র্যাডিশন। এই জন্য আমি আমার বাঙালি কালচারকে নিয়েই প্রাউড ফিল করি। এটিই আমার মুল আইডেন্টিটি।’
‘কিন্তু, মূলধারার সাথে পরিপূর্ণভাবে মিশে যেতে না পারলে ভবিষ্যতে সফল হবে কিভাবে?’ সফিক আবারো প্রশ্ন রাখল।
সুজানা কিছুক্ষণ ভেবে নিল। মনে মনে সাজিয়ে নিল সে যা বলতে চায়। ‘দেখুন আমি ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চাই। এজন্যে ক্লাসে সব সময়ই ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা করি। খেলাধুলা, নাচ-গান, অভিনয়েও আমার ভীষণ আগ্রহ। আমি যেটা করতে চাই সেটাতে কোন বাধা নেই আমার। আমি ওদের অনেকের চেয়ে ভালও করছি। কিন্তু তারপরেও ওরা কিন্তু আমাকে ওদের দলের মানুষ বলে মনে করছে না। আমাকে আলাদা করেই রাখতে চাইছে। তাহলে আমি কেন ওদের কালচার নিয়ে বড় হবো? তাছাড়া আমাদের কালচারে যা আছে, ওদের তা নেই। সেদিক থেকে ওরা খুবই পুওর।’
‘বুঝিয়ে বলো তো কোনটাকে তুমি পোর বলছো?’
‘ফর এক্সাম্পল, ১৮ বছর বয়স হলেই ওরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে যায়। চাইলেও বাবা মা ছেলে মেয়েদেরকে শাসন করতে পারেন না। অথচ ১৮ বছর বয়সে একটা ছেলে বা মেয়ে নিজের অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি দিয়ে ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। সেখান থেকে কেউ ফিরিয়ে আনতে পারে না। বাবা মাও পারেন না। আর সবকিছুর পেছনে ঐ ১৮ বছরের দেয়ালটাই বাধা হয়ে থাকে।’
রহমান সাহেব একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন, ‘বাহ, বেশ ভালো বলেছ তো?’
সফিকও মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এদিকে আমাদের কালচারটা দেখো। ১৮ বছর কেনো, আমরা ৩০ বছর বয়সেও বাবা মার আদেশ পরামর্শ মেনে চলি। আর এদেশের ছেলে মেয়েরা তো খুবই সেলফিস। তারা নিজেদের নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত থাকে যে অন্যদের সম্পর্কে জানার কোন আগ্রহই থাকে না।’ সফিক আড়চোখে তাকাল জেসমিনের দিকে। জেসমিন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
সুজানা বলল, ‘সে দিক থেকে আমরা কিন্তু লাকি। পূর্ব পুরুষের কালচার সহ দুটি কালচারের ভেতর দিয়েই আমরা অনেক বেশি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছি, আমাদের সে সুযোগ আছে।’
‘এক্সাক্টলি! ইউ আর রাইট!’ সফিক প্রশংসার হাসি দিয়ে সবার দিকে একবার তাকাল। তার খুব মজা লাগছে সুজানার সাথে কথা বলতে। সে আবারো জানতে চাইল, ‘আচ্ছা আমাকে বলতো, স্কুলে আমেরিকার কালচার আর ঘরে বাঙালি তার ওপরে মুসলিম রীতিনীতি—এই মিক্সড কালচার কনফ্লিক্ট তুমি কীভাবে ডিল করো?’
জেসমিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, ‘প্রথম দিকে সমস্যা হতো, তবে এখন আর কোন কনফিউশন নেই। কারণ আমি বুঝতে শিখেছি, আমার বাবা-মা কিংবা অন্যান্য বাঙালি ফ্যামিলিগুলো সুদূর বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছেন শুধু ভাগ্যের অন্বেষণে। আমি জেনেছি স্বদেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা, স্বাভাবিক জীবনের অনিশ্চয়তা—এসব নানা কারণেই ইমিগ্র্যান্টরা এদেশে এসেছেন ফার্স্ট জেনারেশন হয়ে। আমরা সেই সুবাদে ভিন্ন শেকড় থেকে বেড়ে উঠা আমেরিকান সিটিজেন।’
সুজানার কথা শুনতে শুনতে রহমান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। এই মেয়েটা এত সুন্দর করে কথা বলা শিখল কীভাবে। সুজানার বাবা-মাকে একটা বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হবে।
আলোচনার মাঝখানে এবার শারমিন তার মতামত দিল। ‘এখানে বেড়ে উঠা অনেক ছেলে মেয়েরা ভয়ে কিংবা লজ্জায় বাংলা বলতে চায় না। অনেককে দেখেছি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে লিখে বাংলা গান গায়। আসলে আমাদের সব প্যারেন্টসদের উচিত বেশী করে বাঙালি কালচারগুলো ছেলেমেয়েদের শেখানো। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে বাংলা লেখা এবং পড়াটা শেখাতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।’
‘ঠিক বলেছেন আপু।’ সুজানা বলল, ‘তাহলেই শুধু আমরা আমেরিকান সোসাইটিতে গর্ব করে আমাদের আইডেন্টিটি তুলে ধরতে পারবো।’
অনেকক্ষণ থেকেই সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে সুজানার কথা শুনছে। বাকী কথাগুলো এবার ইংরেজিতে বলল সুজানা, ‘We should know that we are American only for our bright future, but basically we are Bangalee. And we all should feel proud for this.’
অতিথিদের মধ্যে প্রশংসাসূচক শব্দ ভেসে আসতে লাগল। জেসমিন একটু অসস্ত্বিবোধ করতে লাগল। দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার পর থেকেই সুজানাকে নিয়েই সবাই মেতে রয়েছে অথচ এটা ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠান। তার কি কিছুটা হিংসে হচ্ছে? হতেও পারে। এই আলোচনা এখন বন্ধ হওয়া দরকার। জেসমিন একটু উচ্চস্বরে সুজানাকে বলল, ‘Sue, let’s go to my room, I’ll show you my new collections.’ বিভিন্ন ডিজাইন এবং ব্রান্ডের জুতা কেনা জেসমিনের শখ। কয়েক শো জোড়া জুতা তার ক্লোজেটে সাজানো আছে। সে সুজানার হাত ধরে একরকম জোর করে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল ওপরতলায় তার রুমে।
‘বাপরে, এ মেয়েতো সাংঘাতিক। ভাবাই যায় না ওর জন্ম হয়েছে আমেরিকায়। ওর বাবা-মকে তো একটা স্পেশাল থ্যাঙ্ক ইউ জানানো দরকার। কোথায় তারা?’ সফিক উঠে গিয়ে সুজানার বাবা-মাকে খুঁজতে লাগল।
মিক্সড কালচার (পর্ব-৬)
ছুটির দিনের সকাল।
শারমিন একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠল। মনে হলো আজ তো কাজ নেই। তাই ঘুমিয়ে নেই যতটা পারা যায়। অন্য অনেক দিনের মতো আজ না। আজ শনিবার। ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করেনা। তবুও আলস্যে মাখা শরীরটা অনেক কষ্টে বিছানা থেকে তুলে নিল শারমিন। তার সাথে সাথে সফিকেরও ঘুম ভেঙে গেল। শারমিন মিষ্টি হেসে বলল, ‘তুমি আর একটু ঘুমাও। আমি ব্রেকফাস্ট রেডি করে ডাকব।’
সফিক হাই তুলে বলল, ‘আমিও আসি, হেল্প করব তোমাকে।’
শারমিন খুশি হয়ে গেল। ঘুম থেকে উঠেই সকালটা কেমন সুন্দর হয়ে গেল। হেসে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে।’
রহমান সাহেবের বাসার কিচেন টেবিলে সকলে জড় হয়েছে। শারমিন দেশের মতো আলুভাজি, ডিম ওমলেট, সুজির হালুয়া আর পরাটা বানিয়েছে। আবার ব্রেড টোস্ট সাথে জ্যাম জেলিও আছে। আয়োজন দেখে সফিকের মনটা বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আমেরিকায় আসার পর থেকে শান্তি মতো নাস্তাটা করা হয় না। সোম থেকে শুক্রবার সকালে তার খুব কষ্ট হয়। দু’এক স্লাইস ব্রেড, মাফিন কিংবা বেগল—এসব খেতে খেতে সে হাঁপিয়ে গেছে। শুধু ছুটির দিনের সকালে শারমিনকে বাসায় পাওয়া যায়, সে তখন অনেক ধরনের নাস্তার আয়োজন করে। মাঝে মাঝে খিচুড়িও রাঁধে। আমেরিকায় থেকে মেয়েটা এতকিছু রান্না করতে পারে এটা দেখে সফিকের বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
সফিক দুটো পরাটা, আলুভাজি, ডিম ওমলেট তুলে নিল তার প্লেটে। দেরি না করে খাওয়া শুরু করল দ্রুত।
শারমিন সফিকের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ‘দেখো, আবার গলায় আটকে না যায়, আস্তে খাও।’ গ্লাসে অরেঞ্জ জুস ঢেলে এগিয়ে দিল সফিকের দিকে। ‘কফি কি এখন দিবো না পরে?’
‘চা বানাও নি? চা হলে ভালো হতো। কফি তো তিতা লাগে।’
সফিকের কথার ধরনে রহমান সাহেব মৃদু হাসলেন।
শারমিন বলল, ‘তুমি যেভাবে চা খেতে চাও সেটা এখন বানানো যাবে না। গুড়ো চা নেই। টি-ব্যাগ আছে, চলবে? হট-ওয়াটারে একটা টি-ব্যাগ ছেড়ে দিলেই হবে।’
‘না থাক। কফিই খাই। তবে কফিটা পরে দাও। নাস্তাটা শেষ করি আগে।’
‘ওকে।’ শারমিন আবার হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে জেসমিন এসে বসল টেবিলে। গ্লাসে অরেঞ্জ জুস ঢেলে আস্তে করে চুমুক দিল।
সফিক মুখের খাবার শেষ করে জেসমিনের দিকে তাকাল। অরেঞ্জ জুসের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘এই যে শালিকা, তোমার সাথে তো দেখাই হয় না। তারপর দিনকাল কেমন? নিশ্চয়ই ভালো? খুব পার্টি হচ্ছে, তাই না? হা হা হা।’
জেসমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘I told you not to call me in that stupid name. Call me Jasmine, if that is too hard for you, call me Jazz. Just Jazz. ok?’
জেসমিনের এমন প্রতিক্রিয়ায় সফিক খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে একবার তাকালো শারমিনের দিকে। তারপর তাকাল রহমান সাহেবের দিকে। রহমান সাহেব নির্বিকার। তিনি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ডালাস মর্নিং নিউজ পেপারে চোখ বুলাতে লাগলেন।
বিব্রত সফিক প্রসঙ্গ বদলে শারমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলে শারমিন, সকালের নাস্তাটা হচ্ছে দিনের সবচাইতে প্রয়োজনীয় খাবার। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, A healthy breakfast is the most important meal of the day. এতে শরীর ও মন ভালো থাকে। ব্রেইনও কাজ করে ভালো।’
শারমিন কিছু বলল না।
সফিক তার নাস্তা বিষয়ক বক্তৃতা চালিয়ে গেল। এবার অবশ্য কথাগুলো বলল জেসমিনকে উদ্দেশ্য করে, ‘বিশেষ করে কম বয়েসী ছেলেমেয়েরা, যারা স্কুল কলেজে যায় তাদের জন্য তো ব্রেকফাস্ট একেবারেই মাস্ট। এতে করে লেখাপড়ায় মনঃসংযোগ ঘটে, সেই সাথে সলভিং এবং ক্রিয়েটিভ স্কিলস বৃদ্ধি পায়। According to the American Dietetic Association…’
সফিকের কথা শেষ হবার আগেই জেসমিন তার বাবাকে লক্ষ করে বলল, ‘Dad, I’m moving out.’
রহমান সাহেব পত্রিকা পড়া বন্ধ করে তাকালেন জেসমিনের দিকে। শারমিন আর সফিক তাকাল একে অপরের মুখের দিকে।
‘My friend Carla is taking an apartment; she needs a roommate and I’ve decided to stay with her. I suppose that’s about it.’
বলেই জেসমিন উঠে দাঁড়াল এবং আর কিছু না বলে চলে যেতে উদ্যত হতেই রহমান সাহেব উচ্চ স্বরে বললেন, ‘Just a minute.’
‘I’m late.’ জেসমিন ঘুরে হাটা শুরু করল।
রহমান সাহেব হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘I said just a minute.’
রহমান সাহেব উঠে এলেন। দাঁড়ালেন জেসমিনের সামনে। তারপর উচ্চকণ্ঠেই বললেন, ‘তুমি ইচ্ছে করলেই অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে পারো না। সে পারমিশন কেউ তোমাকে দেয় নি।’
‘I didn’t ask for a permission. I don’t need a permission. I’m old enough to make my own decision.’
‘No, you’re not old enough to do whatever you want. I’m your father and I know what is right for you, what is not. You have a college and you need to finish your study first; you understand?’
কোনো উত্তর না দিয়ে জেসমিন অন্যদিকে তাকাল।
রহমান সাহেব জেসমিনের ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের দিকে এনে আবার বললেন, ‘Do you understand?’
‘I’ll do whatever I want.’
‘Don’t you dare to talk to me like that. কোন বাঙালি মেয়ে তার প্যারেন্টস এর সঙ্গে এভাবে কথা বলে না।’
‘I’m not a bangalee meye. তুমি আমাকে জোর করে বাঙালি বানাইতে পারো না। You just can’t force me.’
সফিক চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল সবার মুখের দিকে। এসব কী হচ্ছে?
‘আমাকে আমার মতো করে বড় হইতে দাও। Let me have my own freedom. Even a girl in Bangladesh has more freedom than I do. You don’t even know how Bangladesh has changed.’
রহমান সাহেব ভেঙে পড়লেন। হতাশ ভঙ্গিতে তাকালেন শারমিনের দিকে। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।
শারমিন এগিয়ে এসে জেসমিনকে থামানোর চেষ্টা করল। ওর হাত ধরে বলল, ‘That’s enough Jasmine! Now, please stop.’
কিন্তু জেসমিন তার বাবাকে লক্ষ করে বলেই চলল, ‘You’re living in America and keeping your so called Bangladeshi poor sentiment and forcing me to live with that? You don’t care about how I want to grow up with. You only care about your god damn ill mentality Bangladeshi community and what they will say.’
রহমান সাহেব পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সে তার দু’কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। এই মেয়ে এসব কী বলছে তার মুখের ওপর!
উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করল। সফিক উঠে এসে দাঁড়াল জেসমিনের সামনে। জেসমিনকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘Jesmin, I mean Jazz, এভাবে বোধহয় তোমার কথা বলাটা ঠিক হচ্ছে না। After all he is your father, you know.’ সফিক ইদানীং কথার মাঝে আমেরিকানদের মতো কাঁধ নেড়ে you know, hmm, excuse me, thank you দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে।
জেসমিন সফিককে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে তাকাল তার বাবার দিকে। সে ফিরে গেল তার কথার ঝড়ে। ‘Your so called Bangalee culture, sentiment and value could not stop mommy to move away holding her boyfriend’s hand. So, don’t push me to do the same.’
এ পর্যায়ে রহমান সাহেব ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার দিলেন, ‘Jasmine! How dare you?’
রহমান সাহেব হাত উঁচু করে জেসমিনের দিকে এগিয়ে যেতেই শারমিন তার বাবার হাত ধরে ফেলল, ‘বাবা, না!’
জেসমিন কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। আবার কী ঘটতে যাচ্ছিল সে বুঝে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাণ্ডা কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘I guess that’s it. I’m moving out. No one will ever stop me.’ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল জেসমিন।
কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন রহমান সাহেব। একবার তাকালেন শারমিনের দিকে আবার জেসমিনের চলে যাওয়ার দিকে। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না। অস্থির লাগছে। হাত কাঁপছে। মাথাটাও চক্কর দিয়ে উঠল। কেমন দিশেহারা মনে হচ্ছে সব কিছু। চারিদিকটা কেমন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর চিনচিন ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। ব্যথার তীব্রতা বাড়তেই রহমান সাহেব সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সফিক ধরে ফেলল তাকে।
শারমিন চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল, ‘Oh my god! Safiq call 9-1-1. Call the ambulance.’
মিক্সড কালচার (পর্ব-৫)
সব শুনে সফিক চুপ করে রইল। সে আর তেমন কিছুই বলতে পারল না। আর কীইবা বলবে। তার যা জানার ছিল জেনে গেছে। সে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল শারমিনের মুখের দিকে। শারমিন আস্তে করে বলল শুধু, ‘তারপরে আরও অনেকগুলো ইন্সিডেন্ট ঘটেছে। আমাদের সাথে প্রায়ই সেসব নিয়ে সমস্যা হতো। এখনো হচ্ছে।’
শারমিন একে একে আরো কয়েকদিনের ঘটনা বলে গেল।
একদিন—শারমিন লিভিং রুমের সোফাতে বসে অপেক্ষা করছিল জেসমিনের জন্য। সে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ১২টা বেজে ২৫ মিনিট। আরো কিছুক্ষণ পর জেসমিনের গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই দেখল শারমিন বসে আছে লিভিং রুমে। সব সময়ের মতোই ওপরে উঠে যাওয়ার মুখে শারমিন উঠে দাঁড়িয়ে ওর সামনে গেল। জেসমিন বুঝতে পারল বড় বোনের জবাবদিহিতার সামনে এবার তাকে দাঁড়াতে হবে। শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, You are late again. তুই জানিস বাবার শরীর ভালো না। And you’re keep causing him to suffer. Why Jazz? কেনো এমন করছিস?’
‘Do you have to interrogate me every time I get home?’ জেসমিনের কণ্ঠেও বিরক্ত প্রকাশ পেল।
‘No, I don’t have to, if you back home on time.’ শারমিন আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। এখন রাত ১২টা বেজে ৪০ মিনিট। সে জিজ্ঞেস করল, ‘So why are you late?’
‘I had dinner with a friend.’
‘And then?’
‘Nothing.’
‘তোর কি মনে হয় আমি ব্রেষ্ট ফিডিং বেবি? আমি কিছুই বুঝি না? You will be in big trouble one day, I’m telling you.’
জেসমিন সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে হেঁটে গেল ডাইনিং টেবিলের কাছে। গ্লাসে পানি ঢেলে পানি খেতে খেতে লক্ষ করল টেবিলে অনেক রকমের খাবার সাজানো রয়েছে। তখন মনে পড়ল আজ রাতে ওর ডিনার করার কথা ছিল সবার সাথে। রহমান সাহেব অপেক্ষায় থাকেন, প্রতি রাতে তার মেয়ে দুটিকে নিয়ে এক সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন। বেশির ভাগ সময়ই অবশ্য জেসমিনকে পাওয়া যায় না। আবার বাসায় থাকলেও সে তার মতো কোনো প্যাকেট ফুড ফ্রিজ থেকে বের করে মাইক্রোওয়েভে গরম করে খেয়ে নেয়। টেবিলে থাকলেও সে তার মতো কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারপর উঠে চলে যায়। দু’একটি যা কথা হয় ঐ শারমিনের সঙ্গেই।
টেবিলে এত খাবার দেখে জেসমিন বলল, ‘Wow! Looks good.’
‘তোর ডিনার করার কথা ছিল আমাদের সাথে। বাবা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছেন।’
‘That’s ok, sis. I’ll have it tomorrow or some other day.’
‘You are going out of control. You are crossing your limit you know that?’
‘Don’t start acting like dad. I’m sick of it.’ বলতে বলতে জেসমিন সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
শারমিন তাকিয়ে রইল অসহায় দৃষ্টিতে। কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কী করলে জেসমিনকে বশে আনা যাবে। মেয়েটা দিন দিন এমন হয়ে যাচ্ছে কেন?
আরেকদিনের ঘটনা। এক শনিবারের দুপুর। রহমান সাহেব তার দু’মেয়েকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন। তার মনটা বেশ ভালো। সে সব সময় চায় মেয়ে দুটি তার আশে পাশেই থাকুক। ওরা পাশে থাকলে তার খুব ভালো লাগে।
সবাই চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। জেসমিন অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছে কিছু একটা বলার জন্য, কিন্তু তার বাবা কী বলবেন সেই চিন্তায় সে কিছুটা দ্বিধান্বিত। কথাটা কি সে বলবে না কি বলবে না। অবশেষে কোনো রকম ভণিতা না করে সে বলে ফেলল, ‘I’ll sleep over at my friends’ house tonight. I need some help with the homework. So, don’t wait for me.’
রহমান সাহেব খাওয়া বন্ধ করে একবার তাকালেন জেসমিনের দিকে। তারপর তাকালেন শারমিনের দিকে। শারমিন জানে জেসমিনের সব কথা এখন আর বিশ্বাস করা যায় না। অথচ আমেরিকায় ছেলেমেয়েরা সাধারণত মিথ্যে বলে না। যা বলার সরাসরি বলে। এমন হতে পারে, বাবাকে ভয় পেয়ে সে ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে। সে বিরক্ত চোখে তাকাল জেসমিনের দিকে।
রহমান সাহেব শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘রাতে অন্য কারো বাসায় থাকাটা আমার পছন্দ নয়। রাত যতই হোক বাসায় ফিরবে, তাছাড়া প্রতি উইকএন্ডেই তোমাকে কেনো বাইরে যেতে হবে জেসমিন? You are not a boy!’
‘I can’t go out just because I’m not a boy? That’s discrimination!’ জেসমিন প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল।
‘জেসমিন, তোমাকে আগেও বলেছি, আবারো বলছি। তোমার চলাফেরা আচরণ দিনকে দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি চাই না তোমার বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হোক, সমস্যায় পড়ো।’
‘Dad, I told you, don’t worry about me. I’m not a little kid anymore. I’m quite grown up.’
‘Not quite enough to make your own decision. I’ll have to restrict your privilege, if you keep doing it and not listen to me.’
‘Why do I have to always listen to you? Just because you are my dad? Can’t I have my own choice? Why? Why can’t I have my freedom? Am I not adult enough to make my own decision?’
‘তোমার ফ্রিডম তুমি নিজেই নষ্ট করেছ। ফ্রিডম মানে এই নয় যে তোমার যা খুশি তাই করবে। যখন খুশি বাসায় ফিরবে, যখন খুশি বেরিয়ে যাবে। সব ফ্যামিলিতেই কিছু কিছু নিয়ম থাকে। যতক্ষণ তুমি এ বাড়িতে থাকছ, এ বাড়ির কিছু নিয়ম তোমাকে মেনে চলতে হবে। No exception.’
‘Ok, then I’ll have to move out with a friend or maybe I’ll find a room at the dorm and I will live on my own.’
‘কি বললে? What did you say?’
‘You heard me.’
‘এত বড় বাড়ি থাকতে তুমি ডর্মে গিয়ে থাকবে?’
‘Only if you force me to.’ বলেই জেসমিন টেবিল থেকে উঠে চলে গেল।
রহমান সাহেব খাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলেন। শারমিন অসহায় চোখে তাকাল জেসমিনের চলে যাওয়ার দিকে। তারপর উঠে এসে দাঁড়াল তার বাবার পাশে।
এসব কথা শুনে সফিকের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কথা বলতে বলতে শারমিন বেশ ইমোশনাল হয়ে পড়ল। সফিক ওর কাঁধে হাত রাখল। শারমিন একটু ধাতস্থ হতেই এক সময় সফিক বলল, ‘আসলে কি জানো? ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের প্রচুর সমস্যা হয়। বিশেষ করে আমেরিকায়। ওদের লাইফটা অন্য আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো হয় না। এজন্যেই বাবা-মায়ের একত্রে থাকাটা খুবই জরুরী।’ একটু থেমে সফিক আবার বলল, ‘জেসমিনের ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। কিছু একটা করা দরকার। কিন্তু কী করা যায় তাই ভাবছি?’
প্রতিদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে রহমান সাহেবের বাগানে পানি দেয়াটা অভ্যাস। শারমিনদের বাসার পেছনে বিস্তর জায়গায় হরেক রকমের শাক-সবজি, ফল আর ফুলের বাগান। এগুলোর পরিচর্যা রহমান সাহেব আর শারমিনই করে থাকে। আসলে বাগান করার শখ ছিল রহমান সাহেবের স্ত্রী নাসরীন জাহানের। তার আগ্রহ এবং ইচ্ছেতেই বাড়ির পেছনের এই বাগানটি তৈরী হয়েছিল। বাগান ভর্তি ফলফুলের সমাহার দেখে এখন হয়ত বোঝা যাবে না যে, এগুলোর পেছনে একজন মানুষের কতটা শ্রম আর মমতা থাকতে পারে। নাসরীন জাহান প্রতিদিন সকাল আর বিকেলবেলাতে বাগানে কাজ করতেন। গাছ রোপণ করা, আগাছা পরিষ্কার করা, গাছে পানি দেওয়া, মাটি বদলানো, সার দেওয়া, কীটনাশক ছিটানো—সব কিছুই নিজের হাতে করেছেন। প্রতি বছর বসন্তের শুরুতেই ফুলের চারা, মাটি আর ঘাস কিনে নিয়ে এসে নিজ হাতেই সব কিছু করতেন নাসরীন জাহান। রহমান সাহেব তার স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় বাগানে কাটাতেন। অভ্যাসটা রয়ে গেছে এখনো। তাছাড়া, বাগানে এলেই তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। বাগান পরিচর্যা করতে করতে নাসরীন প্রায়ই বলত, ‘গাছ শুধু লাগালেই হয় না, যত্ন করতে হয়, গাছের সাথে কথা বলতে হয়, তবেই না ফুলে-ফলে-পল্লবে ভরে ওঠে উদ্ভিদগুলো! তখন খুব ভালোভাবেই বোঝা যায় যে, গাছেরও প্রাণ আছে৷ বাগানের কাজের জন্য কে কতটা সময় দেয় বা ভালোবাসে তা যে কোনো বাগান দেখলেই নিঃসন্দেহে বোঝা যায়৷ তাছাড়া, বাগানের কাজ বা সবুজ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে মানুষের স্ট্রেস লেভেলও অনেক কমে যায়।’
সফিক দূর থেকে দেখল রহমান সাহেব বাগানে পানি দিচ্ছেন। সে এগিয়ে গেল তার কাছে। রহমান সাহেব ঘুরে তাকালেন। পানি দিতে দিতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ড্রাইভিং শেখা কেমন হচ্ছে? টেস্ট দেবার জন্য রেডি?’
‘আর কয়েকদিন প্র্যাকটিস করলেই হয়ে যাবে। আমি অবশ্য রেডি কিন্তু শারমিন বলছে আর একটু প্রাকটিস করা দরকার।’
‘প্যারালাল পার্কিং শিখেছ ঠিকমতো?’
‘জি। ঐ প্যারালাল পার্কিং-এই একটু ঝামেলা হচ্ছে।’
‘হুমম।’
এটুকু কথাবার্তার পরে আর কোনো কথা হয় না। রহমান সাহেব একটু সামনে এগিয়ে অন্য গাছে পানি দিতে থাকেন। সফিক এগিয়ে দাঁড়াল তার কাছাকাছি। কিন্তু কিছু বলল না। রহমান সাহেব একবার ঘুরে দেখলেন ওকে, চেহারা দেখে বুঝে নিলেন, সফিক হয়তো কিছু বলতে চায়। তিনি বললেন, ‘কিছু বলবে?’
সফিক কোনো রকম ভণিতা না করেই বলল, ‘না মানে, আমি ভাবছিলাম, জেসমিনকে একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিলে কেমন হয়?’
রহমান সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। যেভাবে পানি দিচ্ছিলেন সেভাবেই পানি দিতে থাকলেন।
সফিক একটু সময় নিয়ে বলল, ‘খুঁজলে নিশ্চয়ই উপযুক্ত বাঙালি ছেলে এখানে পাওয়া যাবে। আমেরিকার সিটিজেনশীপ আছে এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করার ছেলের তো অভাব হবার কথা না।’
‘ওর কি বিয়ের বয়স হয়েছে? তাছাড়া গ্রাজুয়েশন করতে হবে, ক্যারিয়ারের ব্যাপার আছে।’
‘তাতো ঠিকই।’
‘আর যে বিয়ে করবে তার ইচ্ছেও তো থাকতে হবে।’
‘তাতো ঠিকই।’
‘ছেলে মেয়েরা বড় হলে বাবা মায়ের কথা কিংবা ইচ্ছা অনিচ্ছার বোধহয় আর কোন মূল্য থাকে না। তাদের জগৎ আলাদা হয়ে যায়।’ রহমান সাহেবের কণ্ঠে হতাশা ফুটে উঠল। তিনি গাছে পানি দেয়া বন্ধ করে দিলেন। তার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়েছে।
সফিক বলল, ‘কেনো, থাকবে না কেনো? শারমিন তো আপনার কথা মতো দেশে গিয়েই বিয়ে করেছে। তাহলে জেসমিন করবে না কেনো?’
‘শারমিনের কথা আলাদা। বাংলাদেশে জন্ম, ছোটবেলা থেকে এদেশেই বড় হয়েছে ও। কিন্তু তারপরেও দেখো, ও কিন্তু বাংলাদেশি কালচার কিংবা ট্র্যাডিশনকে বিসর্জন দেয়নি। আবার আমেরিকান কালচারকেও দূরে সরিয়ে রাখেনি। দুটো কালচারের সমন্বয়ে ও বড় হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা ওর কারণে কখনোই আমাদেরকে কোনো কষ্ট পেতে হয় নি। কিন্তু হাতের পাঁচ আঙ্গুলতো আর সমান হয় না তাই না?’
‘তাতো ঠিকই।’
শারমিনকে নিয়ে রহমান সাহেবের সত্যিকার অর্থেই কোনো কষ্ট নেই। ওকে কখনো কিছুই বলতে হয় নি। কি কারণে কে জানে, শারমিন খুব ছোট বেলা থেকেই বাঙালি সংস্কৃতিটাকে বেশ ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে। বাংলাদেশিদের প্রতিটা অনুষ্ঠানেই সে যায়। সক্রিয়ভাবে অংশও নেয়। বসন্ত, বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস সহ সব দিবসগুলোতেই সে সুন্দর করে শাড়ি পড়ে সেজেগুজে যায়। দেখতে কী ভালো লাগে। ভাবতে ভাবতে রহমান সাহেবের চোখ ভিজে আসে।
সফিক আরো কিছু বলতে চায়। সে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। ইতস্তত কণ্ঠে বলল, ‘আমি কি একবার জেসমিনের সঙ্গে কথা বলে দেখব?’
রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন সফিকের দিকে। মৃদু হেসে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, ‘তুমি আর কী বলবে? এদেশে বর্ণড ছেলেমেয়েদের কথার ভঙ্গীই আলাদা। ওর এটিচুড তোমার ভালো নাও লাগতে পারে।’
‘সে নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমি অত সহজে কিছু মনে করি না।’
রহমান সাহেব আর কিছু বললেন না। সফিক কি দাঁড়িয়ে থাকবে না চলে যাবে বুঝতে পারল না।
‘কী ব্যাপার, তোমরা এতক্ষণ কী কথা বলো? ডিনার দেয়া হয়েছে, ভেতরে এসো।’
হঠাৎ শারমিনের ডাকে তারা দুজনেই ঘুরে তাকাল। সফিক অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। এখনো তো সন্ধ্যাই হয় নি, বিকেলের রোদ কেবল মাত্র ফিকে হতে শুরু করেছে, এখনই ডিনার? কিন্তু ঘড়ির সময় দেখে সে আঁতকে উঠল। প্রায় আটটা বাজে। সময় অনুযায়ী তো এখন রাত। আজব দেশ তো!
মিক্সড কালচার (পর্ব-৪)
সোমবার থেকে শুক্রবার, সপ্তাহের এই পাঁচদিন শারমিনকে অফিসে যেতে হয়। শুধু শনি আর রবি এই দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি। শনিবার সকালটা রান্না, লন্ড্রি করা, ঘর গোছানো ইত্যাদি কাজেই চলে যায়। শনিবার বিকেল আর রবিবারে যতটুকু সম্ভব সফিককে নিয়ে সে ঘুরতে যায় বাইরে। সফিক বেচারা একা একা গৃহবন্দির মতো অবস্থা। শুধু টিভি দেখে আর কত সময় কাটে। রহমান সাহেবও কাজ থেকে ফিরে তার স্টাডি রুমেই থাকেন বেশিরভাগ সময় আর জেসমিন কখন বাসায় থাকে কখন থাকে না, সেটা বোঝার কোনোই উপায় নেই। একই বাসার মধ্যে এতোগুলো মানুষ থাকছে অথচ কেমন যেন ডিসকানেক্টেড—কারো সঙ্গে কারো কোনো সংযোগ নেই। এই কী আমেরিকার জীবন? এই জীবনের জন্য বাংলাদেশে থেকে সফিক এতো হা-হুতাশ করেছে? শুধু সফিক কেন, বাংলাদেশের প্রতিটা প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষই হা-হুতাশ করে। যেন জীবনে বেঁচে থাকতে একবার আমেরিকা যেতে না পারলে জীবনের বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই। বেশিরভাগ প্রবাসী কিংবা অভিবাসী তাদের প্রবাস জীবন নিয়ে সুখী নয়, নানান মানসিক সমস্যায় ভোগে এবং জীবনের একটা বিশাল এবং লম্বা সময় পর্যন্ত নানান বর্ণ বৈষম্যে এবং চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। বাইরে থেকে প্রবাস জীবন যতটাই রঙিন দেখা যাক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে—কেবলই ধূসর! এসব ভাবতে ভাবতে সফিকের মনটা বিষণ্ণতায় ভরে ওঠে।
শারমিন বুঝতে পারে সফিকের মনের অবস্থা। তাই তো কাজ থেকে ফিরেই কোথাও যেতে হলে সফিককে সে সাথে করে নিয়ে যায়। ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়। নিয়ে যায় কোথাও না কোথাও। তারই ধারাবাহিকতায় সফিককে নিয়ে শারমিন আজকে এসেছে ডালাসের বিখ্যাত বোটানিক গার্ডেনে। এখানে চারিদিকে সবুজের সমারোহ। নাম না জানা হরেক রকমের ফুলের বাগান। বাগানের ভিতর শত শত ফুলের বিছানা। মাঝে দিয়ে পর্যটক এবং ফুলপ্রেমীদের জন্য হাঁটার পথ। পথের দু’পাশে সারি বাঁধা টিউলিপ বাগান। তারমাঝে নানা প্রজাতির রংবেরংয়ের শত শত টিউলিপ সারি সারি ফুটে রয়েছে। কোনোটি টকটকে লাল, কোনোটি কমলা, আবার কোনো বাগান বেগুনি, ফিরোজা, মেরুন, হলুদ কিংবা সাদা টিউলিপের। পথের পাশে যেন নানা প্রিন্টের গালিচা বিছানো। এক এক সারি এক এক রঙের টিউলিপে সাজানো, বিশাল মাঠ জুড়ে টিউলিপ অপরূপ সৌন্দর্য বিলিয়েই চলেছে। এত সুন্দরভাবে বাগানের চারদিকটা সাজানো হয়েছে, সত্যিই অকল্পনীয়। বাতাসে ফুটন্ত ফুলের সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছে চারিদিকে।
শারমিনের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুগ্ধ নয়নে ঘুরে ঘুরে দেখছে সফিক। সফিকের কিছু ছবিও তুলে দিল শারমিন। দেশে সবাইকে পাঠাবে। বেলা একটু পড়ে আসতেই শারমিন আর সফিক বসল গার্ডেনের সবুজ ঘাসের মধ্যে। কার্পেটের মতো মোলায়েম ঘাসের মধ্যে বসে থাকতে বেশ লাগছে সফিকের। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাঁটিয়ে বিভিন্ন কথার ফাঁকে একবার জেসমিনকে নিয়েও কিছু কথা হলো। জেসমিনের প্রসঙ্গ আসতেই সফিক খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আচ্ছা তোমরা জেসমিনকে কিছু বলো না কেন? ওতো দেখি খুব উড়নচণ্ডী হয়েছে।’
‘উড়নচণ্ডী মানে?’
‘অবাধ্য, উচ্ছৃঙ্খল! এই যে প্রায় প্রতিদিন রাতে বন্ধুদের সাথে বাইরে যাচ্ছে। অনেক রাত করে বাসায় ফিরছে। নিজের ইচ্ছে মতো চলছে। তোমাদের কারো কোনো কথা শুনে না—মানেও না। ও যে এই ফ্যামিলির একজন মানুষ সেটাই তো মনে হয় না। কেমন ছাড়া ছাড়া একটা ব্যাপার লক্ষ করছি সব সময়।’
শারমিন একটু সময় চুপ করে থেকে বলল, ‘জেসমিনের ১৮ বছর পার হয়েছে। ওকে শাসন করার অধিকার আর আমাদের নেই। আর শাসন করলেই বা ও শুনবে কেনো বলো? দেশটা যে আমেরিকা!’ শারমিনের কণ্ঠে এক ধরনের হতাশা আর অসহায়ত্ব ফুটে উঠল।
’দেশটা আমেরিকা হয়েছে তো কী হয়েছে? আর ১৮ বছর হয়েছে বলেই কী যা খুশি তাই করবে নাকি? আমরা এ বয়সটা পার হয়ে আসি নি?’
শারমিন চুপ করে রইল।
‘সেদিন আবার দেখলাম একটা নিগ্রো ছেলের সাথে। ওই নিগ্রোটাও কি ওর ফ্রেন্ড নাকি?’
সফিকের কথার ধরণে শারমিন হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই সে বলল, ‘সফিক, এখানে কালোদের নিগ্রো কিংবা নিগার বলাটা শোভনীয় নয়—ভীষণ অফেনসিভ। মারাত্মক অপরাধ। অনেকটা গালির পর্যায়ে পরে। ভুলেও আর কখনো বলবে না—বলবে আফ্রিকান আমেরিকান কিংবা ব্ল্যাক। শুধুই কালো।’ পশ্চিমে কালো অভিবাসীদের নিগ্রো কিংবা নিগার না বলে ‘আফ্রিকান আমেরিকান’ বলে সম্বোধন করা হয়। ঠিক তেমনি সমকামীদের ‘ফ্যাগ’ বা ‘হোমো’ না বলে ‘গে’ বা ‘লেসবিয়ান’ বলে। শারমিন সুন্দর করে বিষয়টি বুঝিয়ে বলল সফিককে।
সফিক অবাক চোখে তাকাল শারমিনের দিকে। শারমিনের কথা সে কি কিছু বুঝল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। সে বলল, ‘তবে যাই বলো না কেনো, এভাবে ছেলে বন্ধুদের সাথে অবাধ মেলা মেশাটা ওর কিন্তু একেবারেই ঠিক হচ্ছে না। একটা বাঙালি মেয়ে হয়ে…’
সফিকের কথা শেষ হবার আগেই শারমিন বলল, ‘ও তো বাঙালি মেয়ে নয় সফিক। জেসমিন বাঙালি বাবার আমেরিকান মেয়ে। বাঙালি ঘরে জন্ম হলেই তাকে বাঙালি হতে হবে, এ থিওরি তো এ দেশে চলে না।’
শারমিনের কথা সফিককে সন্তুষ্ট করতে পারল না। কিন্তু সে আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। বুঝতে পারল না কী বলবে।
শারমিন আবার বলল, ‘তাছাড়া ওকে কিছু বলা হয় না তা তো নয়। বলতে গিয়েই তো বাবার একবার স্ট্রোক করল।’
সফিক অবাক হয়ে তাকাল। দেশ থেকেই সে শুনে আসছিল তার শ্বশুরের একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। এখানে আসার পর শারমিনও মাঝে মাঝে বলেছে। কিন্তু তার আসল কারণ কখনোই তাকে বলা হয় নি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সফিক আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছিল আমাকে বলবে?’
শারমিনের এখনো মনে আছে সেদিনটার কথা। একদিন রহমান সাহেব তার দোতলার স্টাডি রুম থেকে হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন আর অ্যালেক্সকে। তারা সম্ভবত ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এসেছে। অ্যালেক্সের একটা হলুদ রঙের জিপ আছে, সেটাতে করে জেসমিনকে সে বেশিরভাগ সময় নামিয়ে দিয়ে যায়। উইকএন্ডের আউটিং-এও সে নিয়ে যায়। তো ঐদিন পড়ন্ত বিকেলে রহমান সাহেব দেখলেন গাড়ি থেকে নেমে অ্যালেক্স জেসমিনের কোমর ধরে আলিংগন করছে। দূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে মনে হতেই পারে তারা একে অপরকে গভীরভাবে চুম্বন করছে। এটা দেখে রহমান সাহেবের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। উত্তেজিত হয়ে নেমে এলেন ওপর থেকে। দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘Hey you, get off your hands of her. What do you think you are doing? How dare you touch my daughter?’ বলতে বলতে তিনি এগিয়ে গেলেন জেসমিন আর অ্যালেক্সের দিকে। কাছাকাছি গিয়ে রাগান্বিত ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘জেসমিন ভেতরে যাও।’
জেসমিনের মধ্যে ভেতরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সে আরো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রহমান সাহেব উচ্চস্বরে বললেন, ‘I said go inside. Now.’ এবার তিনি এগিয়ে গেলেন অ্যালেক্সের আরো কাছে। তার মুখের উপর আঙ্গুল তুলে বললেন, ‘Get out of my face, right now. Out. You never ever come to my house. And I don’t want to see your face, ever again.’
বিব্রত অ্যালেক্স অপ্রস্তুতভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। এমন অপমান সে হয়তো তার এই বিশ একুশ বছরের জীবনে কখনোই হয় নি। পুরো বিষয়টি নিয়ে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল সে এবং ভয়ও পেল বেশ। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তার গাড়িতে উঠে বসল অ্যালেক্স।
জেসমিন ঘুরে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আহত কণ্ঠে বলল, ‘No dad, no. You can’t do that to him. What’s wrong with you?’
অ্যালেক্স গাড়ি স্টার্ট দিতেই জেসমিন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। অনুনয়ের স্বরে বলল, ‘Alex, I’m sorry. Please don’t listen to him. Don’t go like this.’
কিন্তু জেসমিনের কথায় কর্ণপাত না করে অ্যালেক্স দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে গেল বাসার সামনে থেকে।
জেসমিন আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অ্যালেক্সের চলে যাওয়ার দিকে কয়েক মুহূর্ত। তারপর হঠাৎই ঘুরে দাঁড়াল রহমান সাহেবের মুখের দিকে। উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘Dad, he is my friend. You can’t talk to him like that. You just can’t walk up and assault someone.
জেসমিনের কথার ভঙ্গিতে রহমান সাহেব বেশ অবাক হলেন। এতটা সাহস আর স্পর্ধা এ মেয়ে পেল কোথায়? জেসমিন গলার স্বর নিচু না করেই আবার বলল, ‘You have no right of doing this. How dare you?’
এ পর্যায়ে রহমান সাহেব নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলেন না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে অধিকতর উচ্চস্বরে বললেন, ‘And how dare you’re talking to me like that?’ বলেই এক পা এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলেন জেসমিনের গালে।
ঘটনার আকস্মিকতায় জেসমিন তথমত খেয়ে গেল। চোখ বড় করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার উনিশ বছরের জীবনে এই প্রথম তার গায়ে কেউ হাত তুলল। জেসমিন হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। মুহূর্তেই তার চোখ ভরে গেল অভিমানের কান্নায়। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার বাবার মুখের দিকে।
রহমান সাহেব সহসাই বুঝতে পারলেন তিনি কী করেছেন। তার এত আদরের ছোট মেয়ে, যাকে কোলে পিঠে করে এত বড় করেছে আর সেই কিনা আজ তার গায়ে এভাবে হাত তুলল। তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন। তার হাতটা কেমন কেঁপে উঠছে।
জেসমিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে ঢুকে গেল ঘরের মধ্যে।
হঠাৎই রহমান সাহেবের চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। বুকের বাম পাশে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে লাগল। চাপ চাপ ব্যথা। এই ব্যথা এতটাই তীব্র যে, মনে হলো হাতির পা বুকে চাপ দিলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনি। তার শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে গেল এবং এক পর্যায়ে তিনি পার্কিং লটের ফ্লোরে পড়ে গেলেন।


