Abinashi-Shabdo-Rashi

অবিনাশী শব্দরাশি (শেষ পর্ব)

মাহমুদ সাজ্জাদ বললেন, ‘কী খাবে বলো।’
নীলিমা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে আছে মাহমুদ সাহেবের সামনে। সে বলল, ‘কিছু খাবো না। খিদে নেই। আপনি খেয়ে নিন।’
‘তাহলে থাক, আমারো তেমন একটা খিদে নেই।’
‘না না, আপনি খেয়ে নিন, আমি বসছি।’
‘চলো, সমুদ্রের বাতাস গায়ে লাগিয়ে খিদেটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে আসি। তারপর না হয় একসঙ্গে বসে খাওয়া যাবে।’
নীলিমা কিছু বলল না। উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে গেল বাইরের দিকে। মাহমুদ সাহেব বের হয়ে এলেন তার পিছে।
আতিকুর রহমানের স্টোর থেকে ফিরে আসার সময় হোটেল গার্ডেন ইনের সামনে থেকে মাহমুদ সাহেবকে তুলে নিয়ে এসেছে নীলিমা। তার মনটা বিষণ্নতায় ভারী হয়ে আছে। তার অনেক কথা সে কবিকে বলতে চায়। কবির মুখ থেকে শুনতে চায়। কিন্তু কোনো কথাই তার বলা হচ্ছে না। এখানে আসার পর থেকেই চুপ করে আছে সে।
বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে মাহমুদ সাজ্জাদ তাকালেন নীলিমার দিকে। দেখলেন মাথা নিচু করে অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটছে মেয়েটি। ওর মধ্যেকার সেই স্বাভাবিক চঞ্চলতাটুকু নেই। তিনি একসময়ে হালকাভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, নীলিমার মন ভালো নেই আজ? সূর্যস্নাত এমন দিনে নীলিমার মন থাকবে রোদের মত ঝলমলে। সেখানে যেন মেঘের ঘনঘটা। উহু, মোটেও ভালো কথা নয়। কি হয়েছে, আমাকে বলা যায়?’
‘বললে কি হবে? মন ভালো করে দেবেন?’
‘সে গ্যারান্টি তো দিতে পারব না। তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
‘তাহলে দিন—আমার মন ভাল করে দিন। আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ।’
‘একটা কবিতা শুনবে?’
‘কবিতা শুনতে ইচ্ছে করছে না। কবিতা ছাড়া আর কিছু জানেন না?’
‘হা হা হা।’ মাহমুদ সাহেব নীলিমার কথার ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন। ‘কবিতাটাই একটু জানি, তাও ভালো মতো না। কবিতা ছাড়া আর কী শোনাই তোমাকে? উম, তাহলে… তাহলে…’
‘আমি আপনার হাতটা কিছুক্ষণ ধরে থাকতে চাই… ’ কবিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে হঠাৎ করেই বলল নীলিমা। ‘দেবেন, আপনার হাতটা ধরতে?’
নীলিমার এমন অদ্ভুত অনুরোধে মাহমুদ সাহেব আস্তে করে দাঁড়ালেন। তিনি খুব অবাক হলেন কি না তা বোঝা গেল না। কিন্তু খুব স্বাভাবিক ভাবে তিনি তার হাত দু’খানি বাড়িয়ে দিলেন নীলিমার দিকে।
নীলিমা কাঁপা কাঁপা হাতে তার প্রিয় মানুষের হাত দুটি ধরে দাঁড়িয়ে রইল।

আতিকুর রহমান খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘না না, জামান, কাজটা তুমি ঠিক করো নি। এভাবে না জেনে শুনে কারো নামে কিছু বলাটা তোমার একেবারেই উচিৎ হয় নি।’
নীলিমা চলে যাবার পর পরই আতিকুর রহমান জরুরী ভিত্তিতে ফোন করে জামানকে ডেকে নিয়ে এসেছেন তার স্টোরে। জামান বসে আছে তার অফিস রুমে মাথা নিচু করে।
আতিকুর রহমান প্রচণ্ড রকমের রেগে আছেন। তিনি আবার বললেন, ‘আমেরিকার মতো এত বড় একটা দেশে থেকেও মনটাকে বড় করতে পারলে না। আফসোস! এ কাজটা না করলেই কি হতো না। নীলিমা তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি। না কি করেছে?’
জামান মিন মিন করে বলল, ‘না করে নি।’
‘তাহলে? আর মাহমুদ ভাই-ই বা কী মনে করবেন? আমাদের সম্পর্কে ওনার ধারণাটা কী হবে বলো?’
‘আই’ম সরি আতিক ভাই।’
‘সরি আমাকে না বলে বরং যাকে বলার তাকেই বলো।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘আর সরি বললেই বা কী? এক সরিতেই কি আর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? বাঙালি কমিউনিটিতে যে কোনো কথা বাতাসের আগে ছুটে, না জানি কে কী বলা শুরু করেছে।’
‘আমার ভুল হয়েছে আতিক ভাই। আমি স্বীকার করছি—কাজটি ঠিক হয় নি। বাট আই প্রমিজ, আই উইল ফিক্স ইট। জাস্ট গিভ মি ফিউ ডেজ।’ কথা শেষ করে জামান একটু অন্যভাবে তাকাল।
আতিকুর রহমান ঠিক বুঝতে পারছে না, জামান কী ফিক্স করবে আর কীভাবেই বা করবে? সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জামানের দিকে।
জামান আবারো বলল, ‘আই’ম সরি এগেইন।’ সে উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেল।

কথা বলতে বলতে নীলিমার দু চোখ ভিজে এল। সে আস্তে করে বলল, ‘আপনি তো আমার সব কথাই শুনলেন, এখন আমি কি করব বলতে পারেন? আমার কী করা উচিৎ?’
মাহমুদ সাজ্জাদ কী বলবে ভেবে পেলেন না। নীলিমাকে সে কী বলবে? কীইবা বলা উচিৎ? তিনি কি বলবেন, শোভনকে ছেড়ে তুমি চলে যাও? যে তোমাকে ভালোবাসে না, সম্মান করে না, তোমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই যার কাছে, তার কাছে তুমি কেন থাকবে? তুমি চলে যাও। কিন্তু তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে কাউকে তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্ররোচিত করা কি ঠিক হবে? তিনি চুপ করে রইলেন।
জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে দিশেহারা হয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ। হতাশা, ব্যর্থতা, গ্লানির তিক্ত অনুভূতিগুলো যখন ঘিরে ধরে তখন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সম্বল হয় একটু আশা, একটুখানি সম্ভাবনার হাতছানি। জীবনের কঠিন সময়ে মনোবল ধরে রাখতে হৃদয়ে অনুপ্রেরণা পাওয়াটা জরুরী। একজন প্রিয় মানুষের কাছ থেকে সেই অনুপ্রেরণা কি কেউ পেতে পারে না?
‘কি আমার জন্যে কোন কথাই কি আপনার নেই? একটা ছোট্ট পরামর্শও কি আপনি দিতে পারেন না।’
কবি তবু নীরব। উদাস নয়নে তাকিয়ে রইলেন সামনের দিকে।
নীলিমা আবার বলল, ‘জানি, কিছু বলতে পারবেন না। সে সাহস আপনার নেই। আপনাদের মতো কবি লেখকদের যত সাহস শুধু ঐ কলমেই—মুখে নয়।’
মাহমুদ সাজ্জাদ মৃদু হাসলেন শুধু। কিছু বললেন না। নীলিমার কথাই কি তাহলে ঠিক? হয়ত তাই। তিনিতো চাইলেও ওকে বলতে পারছে না, যে তোমাকে আমার কত ভালো লেগেছে। তোমার জন্যে আমার খারাপ লাগছে। খারাপ লাগবে। সব কথা কি বলা যায়?
নীলিমা এক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল কবির মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘আপনি কি ভাবছেন আমি জানি। আপনাকে কিছুই বলতে হবে না। আমি জানি আমাকে কী করতে হবে।’ কথা বলতে বলতে অভিমান আর কষ্ট মিশ্রণের বাষ্পে চোখ ভরে উঠল তার।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমা বলল, ‘এনিওয়ে, আমাকে সময় দেবার জন্যে ধন্যবাদ। চলুন ফেরা যাক।’
মাহমুদ সাজ্জাদ চুপ করেই থাকলেন আরো কিছুক্ষণ। তারপর নীলিমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললেন, ‘চলো।’
কিছুটা হেঁটে কবি থেমে দাঁড়ালেন। ঘুরে তাকালেন নীলিমার দিকে। বললেন, ‘শোনো নীলিমা, বুঝতে পারছি তুমি হতাশ হয়েছো আমি কিছু না বলাতে। আমি যদি বলি, তুমি শোভনকে ছেড়ে চলে যাও, তোমার চলে যাওয়াই উচিৎ—কিন্তু সে কথা বলার অধিকার কি আমি রাখি? জীবনটা তোমার, সিদ্ধান্তটা তোমাকেই নিতে হবে। কিন্তু কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে নয়।’ তিনি থেমে থেমে বললেন, ‘তুমি যথেষ্ট স্মার্ট একটা মেয়ে। তোমার মতো একজন বুদ্ধিমতী মেয়ে কেন মেনে নেবে—যে জীবন তার প্রাপ্য নয়?’
নীলিমা চুপ করে শুনছে তার কথা।
এবার কবি ভাবলেন, মেয়েটার মন ভাল করে দেয়া দরকার। এটুকু অন্তত সে করতে পারে। তিনি সমুদ্রের দিকে একবার তাকালেন। সেদিকে তাকিয়েই বললেন, ‘নীলিমা, তুমি কি জানো, তোমার মতো মেয়েরা আছে বলেই, আজো কবিতা লেখা হয়। তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে একজন সাধারণ মানুষও কবি হয়ে যেতে পারে।’
‘থাক, আমাকে আর মন ভোলানো কথা না বললেও চলবে। আমি কোনো টিনেজ মেয়ে নই।’
নীলিমা ঘুরে হাঁটা শুরু করল। একটু হেসে কবিও তাকে অনুসরণ করল।
তারা দুজনে হেঁটে চলল। পাশাপাশি। চুপচাপ। অদ্ভুত এক নীরবতায় ছেয়ে আছে চারিদিক। সূর্য তখন ডিমের কুসুম হয়ে ঢলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। রাঙা পশ্চিমাকাশ আর সমুদ্রের পানি মাখামাখি হয়ে আছে। ক্রমেই পশ্চিমাকাশের সূর্যটা একটা লাল টকটকে থালার মতো হয়ে উঠল। চোখের পলকেই ডুব দিল ধূসর মেঘের কোলে, সন্ধেটা একরকম চুরি করেই ঝুপ করে নামল।

বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা।
দুপুরের পরে শোভন বেশ কয়েকবার ফোন করল মার্শাকে, কিন্তু মার্শা তার ফোন ধরল না। এক পর্যায়ে সে মরিয়া হয়ে গেল এবং একবার ভয়েস মেসেজ রাখল। মার্শার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে শোভন সিদ্ধান্ত নিল ওর বাসায় গিয়ে দেখবে বিষয়টা কি? এমন তো হবার কথা না। সে অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
গাড়ি চালিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে শোভন চলে এলো মার্শার এপার্টমেন্টের সামনের পার্কিং লটে। গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত চলে গেল এপার্টমেন্টের মেইন গেটে। সিকিউরিটি কোড চাপল কিন্তু গেট খুলল না। ভাবল ভুল ডিজিট চেপেছে। সে আবারো সিকিউরিটি কোড চাপল কিন্তু এবারো গেট খুলল না। প্রতিবার স্ক্রিনে দেখাচ্ছে, রং নাম্বার, ট্রাই এগেইন। কিন্তু শোভন জানে সে কোনো ভুল করছে না। পৃথিবীর অন্য অনেক কিছুতেই ভুল হতে পারে, কিন্তু এই নাম্বার তার ভুল হবার কথা না। হতেই পারে না। তবে কি মার্শা সিকিউরিটি কোড বদলে ফেলেছে? মাঝে মাঝেই কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড বদলের মতো সিকিউরিটি কোড হয়তো বদলাতে হয় কিন্তু সেটা তো তাকে জানাবে মার্শা। ভুলটা তাহলে কোথায় হচ্ছে?
শোভন আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার ফোন করল মার্শাকে। কোনো সাড়া নেই। সে চিন্তিত মনে ফিরে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল। ঠিক সে সময়ে ঐ এপার্টমেন্টের আরেক জন বাসিন্দা সিকিউরিটি কোড চেপে গেটে খুলে ঢুকে পড়তেই শোভন অতি দ্রুত তার পিছে ঢুকে পড়ল মেইন গেট বন্ধ হয়ে যাবার আগেই।
এলিভেটর থেকে বের হয়ে উল্কার মতো ছুটে হলওয়ে পার হয়ে দাঁড়াল মার্শার দরজার সামনে। কয়েকবার টোকা দিতেই মার্শা দরজা খুলে দিল। এবং দেখল শোভন দাঁড়িয়ে আছে। শোভনকে দেখে সে ভ্রূ কুচকে তাকাল এবং বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল, ‘What do you want? And how did you get in here?’
শোভন অবাক হয়ে গেল। এ কী ধরণের কথা বলছে মার্শা? সে বলল, ‘What do you mean by what do I want?’
দীর্ঘকায় এক শ্বেতাঙ্গ যুবক এসে দাঁড়াল মার্শার পেছনে। শোভন চোখ বড় করে তার দিকে তাকাল একবার এবং তার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জানতে চাইল, ‘Who is he?’
‘That’s none of your business.’ মার্শা বলল।
মার্শা এবার কৈফিয়তের সুরে বলল, ‘Why didn’t you tell me that you are married? You have a wife? I can’t believe this! You liar!’
শোভন দ্রুত ভাবতে থাকল মার্শা কী করে জানল সে কথা। কে তার সাথে যোগাযোগ করল আর কীভাবেই বা হলো। নীলিমা? নাকি অন্য কেউ? কে হতে পারে? কিন্তু এসব নিয়ে এখন ভাবার সময় নেই। তাকে দ্রুত এখন বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। এই লম্বুটাই বা কে? মার্শার এক্স বয়ফ্রেন্ড?
দীর্ঘকায় এই শ্বেতাঙ্গ যুবকের নাম এরিক। প্রায় সাড়ে ৬ ফুট লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী এরিক হচ্ছে মার্শার প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ড। শোভনের ধারণাই ঠিক।
শোভন আবার জিজ্ঞেস করল, ‘Who is he? You just can’t do this to me. Why are you doing this to me, Marsha?’
‘Why am I doing this? মার্শার কণ্ঠে হতাশা আর বিরক্তি স্পষ্ট, ‘Because you are a cheater Shovan and you know what, once is a cheater, always is a cheater!’
এবারে শোভন সত্যি সত্যিই রেগে গেল। সে তেড়ে গেল মার্শার দিকে আর ঠিক তখনই এরিক সামনে এগিয়ে এলো। সে মার্শাকে পেছনে রেখে শোভনের সামনে এসে ধমকের সুরে বলল, ‘You better knock off you bloody fool. I don’t want any trouble here.’
এ ধরণের প্রতি-আক্রমণের জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না শোভন। সে আড় চোখে তাকালো এরিকের মাংসপেশির দিকে তারপর তাকালো তার চোখের দিকে। এবং হঠাৎ করেই ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল শোভন। কেমন একটা ভয় ধরিয়ে দেবার মতো চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে এরিক।
শোভন এরিকের ঘাড়ের পাশ দিয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মার্শার দিকে।
এবার মার্শা এগিয়ে এলো সামনে। সে খানিকটা নরম স্বরে বলল, ‘Since I did not know much, I started learning about Bangladesh! I wanted to go to Bangladesh you know.’ তার কণ্ঠস্বরে আক্রমণের তেজ নেই, উলটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
হঠাৎ একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। বলে কী এই মেয়ে? শোভন অপরাধীর মত তাকালো মার্শার দিকে।
মার্শা অত্যন্ত কঠিন এবং শীতল কণ্ঠের মিশ্রণে আবারো বলল, ‘You only talked about the bad part of Bangladsh, it’s people and culture; you never talked about the sweet part of it. You don’t even know how rich your culture is! Try to learn your own culture! You’re a Bangladeshi first, and then an American. Remember it!’ কথাগুলো বলে অগ্নিদৃষ্টিতে শোভনের দিকে তাকিয়ে রইল মার্শা।
শোভন মার্শার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। সে চোখ ফিরিয়ে নিল।
মার্শার চোখ ভিজে এলো। সে তার আবেগকে সংবরণ করতে পারল না।
এই পর্যায়ে এরিক এগিয়ে এসে মার্শার ঘাড়ে একটি হাত দিয়ে ধরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। তারপর শোভনের কাছে এগিয়ে এসে ইশারায় দরজা দেখিয়ে দিল।
বিপর্যস্ত শোভন পরাজিত সৈনিকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে মার্শার ঘর থেকে বের হয়ে গেল।

শোভন কস্মিনকালেও ভাবেনি আরো একটি সারপ্রাইজ তার জন্যে অপেক্ষা করছে। সে বাসার সামনে গাড়ি থেকে নামতেই দেখল নীলিমা একটা বড় সুটকেস পাশে নিয়ে ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে তার গাড়ির পাশে। শোভন বুঝতে পারল না এটা আবার কিসের আলামত। নীলিমা হঠাৎ করে কোথায় যেতে চায়? ওর তো কোনো রিলেটিভও নেই আমেরিকার কোথাও। আর মুনার বাসায় যেতে হলে এত বড় সুটকেস কেন? সে গাড়ি থেকে নেমে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘নীলি, কোথায় যাচ্ছো তুমি? Where are you going?’
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শোভনের বুঝতে বাকি রইল না কী ঘটতে যাচ্ছে? সে দু’য়ে দু’য়ে চার মিলিয়ে নিল। কিন্তু এখনো বুঝতে পারছে না, কলকাঠিটি কে নাড়ল কোথা থেকে। সে অস্থির হয়ে বলল, ‘You can’t go like this. Oh, come on!’
‘It’s too late Shovon! অনেক দেরী হয়ে গেছে…’ নীলিমা শীতল কণ্ঠে বলল।
শোভন অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল নীলিমার দিকে। তার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা সরল না।
নীলিমা বলল, ‘Can you do me a favor, সুটকেসটা ট্রাঙ্কে একটু তুলে দিবে?’
শোভনের কানে কোন কথা ঢুকছে না। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর নীলিমা নিজেই সুটকেসটি টেনে তোলার চেষ্টা করতেই শোভন সম্বিত ফিরে পেল। সে সুটকেসটি তুলে দিল পেছনের ট্রাঙ্কে।
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ বলল নীলিমা। সে গাড়িতে উঠে বসল। স্টার্ট দিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। শোভন রোবটের মত এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে।
নীলিমা তাকাল শোভনের দিকে। তারপর বলল, ‘দু’সপ্তাহের খাবার রান্না করা আছে ফ্রিজে। জানি তোমার পছন্দ নয়, তবুও রেখে গেলাম। ভালো থেকো।’
শোভনের ভঙ্গুর চেহারা থেকে মুখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকালো নীলিমা। তারপর বলল। ‘Enjoy your life the way you always wanted. You’re a free man! Have a nice life!’
নীলিমা আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল বাসার সামনের ড্রাইভওয়ে থেকে।
শোভন শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকল নীলিমার চলে যাওয়ার দিকে। সে তাকিয়েই থাকল। কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে আছে সে নিজেও জানে না। হঠাৎ চোখ জ্বালা করতেই সে বুঝতে পারল তার চোখ ভিজে আছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, কয়েক ফোটা তপ্ত অশ্রু টপ টপ করে ঝরে পড়ল তার চোখ থেকে।
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *