-Shei-Coffe-Shop

সেই কফি শপ (পর্ব-২)

রাচনা বলল, ‘যাচ্ছি আমার ভাইয়ের বাসায়।’
‘আপনার ভাই এখানেই থাকেন?’ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল অর্ণব।
‘জি।’
অর্ণবের একবার জানতে ইচ্ছে হলো যে ভাইয়ের বাসা থাকতে একা থাকছেন কেন? কিন্তু পর মুহূর্তেই ভাবল—ব্যাপারটা পারসোনাল হয়ে যাবে। কী দরকার এত কিছু জেনে? একজন বিপদে পড়ে একটা রাইড চেয়েছে—এটা এমন কোনো ব্যাপার না। তাছাড়া নিজের দেশের মানুষ বলে কথা।
রাচনার বড় ভাই মাহবুব হোসেন খান থাকেন ডালাস থেকে প্রায় তিরিশ মাইল দূরে ফ্রিসকো নামে একটা নতুন উপ শহরে। সেখানে যেতে যেতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেল। মাহবুব সাহেবের বিশাল বাড়ির সামনের পার্কিং লটে অর্ণব গাড়ি পার্ক করল। রাচনা নেমে এসে সদর দরজায় কলিং বেল চেপে দাঁড়িয়ে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন মাহবুব খান এবং বেশ খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাচনা, তুই? কী ব্যাপার? কোনো সমস্যা?’
রাচনা হুটহাট করে কখনোই আসে না। মাঝে মাঝে উইকএণ্ডে আসে, সারাদিন থাকে। তারপর আবার সন্ধ্যায় ফিরে যায় তার নিজের এপার্টমেন্টে। সেই আসা-যাওয়া যে নিয়মিত তাও নয়। তাই এই ভর সন্ধ্যায় ছোট বোনকে দেখে মাহবুব সাহেব একটু অবাকই হলেন।
রাচনা বলল, ‘চাবি হারিয়ে ফেলেছি ভাইয়া। আমার স্পেয়ার কী’টা নিতে এলাম।’ রাচনার ঘরের এবং গাড়ির একসেট চাবি এ বাসায় রাখা আছে। রাচনার নিজস্ব একটা রুমও আছে এ বাসায়।
মাহবুব সাহেব বললেন, ‘চাবি হারিয়েছিস? কোথায়, কীভাবে?’
‘মনে করতে পারছিনা। তুমি কি এখানেই দাঁড়িয়ে কথা বলবে নাকি ভিতরে ঢুকতে দেবে? সাথে গেস্ট আছে।’ অর্ণবকে দেখিয়ে রাচনা বলল।
‘ও হ্যাঁ। আয় আয়—ভেতরে আয়।’
মাহবুব সাহেব সরে গিয়ে ওদেরকে ভিতরে ঢুকতে দিলেন। ঘরে ঢুকেই রাচনা পরিচয় করিয়ে দিল অর্ণবকে।
‘ভাইয়া, ইনি হচ্ছেন অর্ণব, আমাদের বিল্ডিং-এই থাকেন। আমাকে রাইড দিলেন।’
‘আমি মাহবুব খান, রাচনা’র বড় ভাই।’ বলেই তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন অর্ণবের দিকে।
অর্ণব হ্যান্ডসেক করে বলল, ‘নাইস টু মিট ইউ।’
‘প্লিজ, হ্যাভ এ সিট।’
‘থ্যাংকস!’
রাচনা তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাবী কোথায়?’
‘উপরে—রাইসাকে হোমওয়ার্ক করাচ্ছে।’ খান দম্পতির তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে রাইসা সবচেয়ে ছোট। থার্ড গ্রেডে যায়। আমেরিকায় বেশিরভাগ মায়েদের কাজের মধ্যে একটি হচ্ছে বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক নিয়ে বসা।
‘আচ্ছা, আমি যাই দেখা করে আসি।’ বলেই রাচনা অর্ণবকে বলল, ‘আপনি ভাইয়ার সাথে কথা বলুন, আমি আসছি।’
রাচনা চলে যেতেই মাহবুব সাহেব অর্ণবকে বললেন, ‘থ্যাংকস ফর গিভিং হার দ্য রাইড। সো নাইস অফ ইউ।’
‘না, না এতো থ্যাংকস দিতে হবে না।’ অর্ণব বিনয়ের সঙ্গে বলল।
‘আপনাকে দেখিনি বোধ হয় আগে। নতুন এসেছেন?’
‘নতুনই বলা চলে, মাত্র পাঁচ মাস হলো ডালাসে এসেছি। আগে মিনেসোটায় ছিলাম।’
‘মিনেসোটা—সেতো অনেক ঠাণ্ডার জায়গা।’
‘হ্যাঁ উইন্টারে খুব বেশি ঠাণ্ডা। বলতে পারেন অনেকটা ঠাণ্ডার ভয়েই এখানে এসেছি। তাছাড়া জব মার্কেটও বেশ ভালো এখানে।’
মাহবুব সাহেব এবার একটু ভালো মতো লক্ষ্য করে দেখলেন অর্ণবকে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘একাই থাকেন নাকি ফ্যামিলি আছে?’
‘একাই থাকি।’
কথার মধ্যেই উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো লীনা, মাহবুবের স্ত্রী। লীনা খান নামে ডালাস সহ উত্তর আমেরিকার সঙ্গীতাঙ্গণে এক নামে সবাই চেনে। খুব ভালো গান করে—গানের কণ্ঠ প্রফেশনাল লেভেলের। বেশ কয়েকটা গানের সিডিও বের হয়েছে।
লীনা সামনে আসতেই মাহবুব সাহেব বললেন ‘এই শোনো, এই হচ্ছে অর্ণব। রাচনাদের বিল্ডিং এ থাকে।’
লীনা মৃদু হেসে বলল, ‘ও তাই না, ভালো আছেন?’
‘জি ভালো।’
‘রাতে খেয়ে যাবেন। আমি ডিনারের ব্যবস্থা করছি।’
‘না, না, আজ থাক। আরেকদিন না হয় খাওয়া যাবে।’
‘সেকি আপনি এত কষ্ট করে এখানে এসেছেন।’
‘তাতে কী, এটা কোন ব্যাপার না।’
‘তাহলে আরেকদিন আসবেন কিন্তু।’
‘জি জি অবশ্যই আসব।’
এর মধ্যে রাচনা এসে দাঁড়াল। অর্ণব জিজ্ঞেস করল, ‘চাবি পেয়েছেন?’
‘জি।‘
‘তাহলে চলুন।‘
‘লেট’স গো।’
বিদায় নিয়ে অর্ণব আর রাচনা বের হয়ে গাড়িতে উঠল। আবাসিক এলাকার ছোট রাস্তা গুলো পার হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ওদের গাড়ি হাইওয়েতে গিয়ে পরল।
নর্থ সেন্ট্রাল এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলল অর্ণবের গাড়ি। অর্ণব একবার তাকাল রাচনার দিকে। রাচনা চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পার করে অর্ণব বলল, ‘আপনার ভাইয়া আর ভাবীকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। নাইস কাপল।’
‘হুমম।’
‘কি ভাবছেন?’
‘কিছু না।’
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। বলবেনা বলবেনা করেও অর্ণব বলেই ফেলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
ঘার ঘুরিয়ে রাচনা তাকাল অর্ণবের দিকে। তারপর বলল, ‘করুন।’
‘আপনার ভাইয়ার এতো বড় বাড়ি থাকতে আপনি একা থাকেন কেন?’
রাচনা উত্তর না দিয়ে আবার তাকিয়ে রইল সামনে। অর্ণব অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ বলল, ‘জানি ব্যাপারটা একান্তই ব্যক্তিগত, বলতে না চাইলে অসুবিধা নেই।’
ঘার না ঘুরিয়েই রাচনা বলল, ‘তাহলে জানতে চাইলেন কেন?’
‘এমনি! জাস্ট কিউরিয়াস…’
এবার ঘার ঘুরিয়ে সুন্দর করে হেসে দিয়ে রাচনা বলল, ‘আরেকদিন দেখা হলে বলবো।’
‘আর যদি দেখা না হয়?’
‘কেন হবে না? হবে। একবার যখন আলাপ হলো, তখন হবেই।’
‘এতো জোড় দিয়ে যখন বলছেন, ধরেই নিচ্ছি আমাদের আরেকদিন দেখা হতে পারে।’
‘হ্যাঁ, পারে।’
‘কোথায়?’
‘আপনি বলুন।’
একটু ভেবে অর্ণব বলল, ‘সেই কফি শপে।’
‘কোন কফি শপে?’
‘যেখানে আপনাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম।’
‘সেটার কথাইতো জানতে চাইছি। কোথায় সেটা?’
অর্ণব তাকাল রাচনার দিকে। কিছু না বলে একটু মুচকি হাসল শুধু।

অর্ণবের মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা।
ডালাসের বিখ্যাত হোয়াইট রক লেকের পার সংলগ্ন একটা কফি শপে এসে ঢুকল অর্ণব। কয়েক পা এগুতেই সে শুনতে পেল বাংলায় কথা বলছে কেউ। আশে পাশে তাকিয়ে তার চোখ আটকে গেল একটা টেবিলে বসা দুজন মেয়ের দিকে—আর একটু এগুতেই সে দেখল রাচনাকে। সাথে তার বান্ধবী সম্ভবত। দুজনেই কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর কথা বলছে। আবার হাসছে। তবে খুব বেশি জোরে হাসছে তাও না। কিন্তু বাংলায় কথা বলছে বলেই হয়ত অর্ণবের কানে পৌঁছেছে ওদের কথা। সে একটু মৃদু হেসে কফির লাইনে গিয়ে দাঁড়াল। এবং কিছুক্ষণ পরপরই মেয়ে দুটির দিকে তাকাল। কফি নিয়ে ফেরার সময় একবার ইচ্ছে হলো দাঁড়িয়ে বলে হ্যালো, আমিও বাংলাদেশি। আপনাদের বাংলায় কথা বলতে দেখে এলাম। কিন্তু অর্ণব কিছুই বলল না। রাচনার দিকে আরেকবার তাকাল সে। এবং মুগ্ধ হয়ে গেল।
রাচনার বয়স এখন সাতাশ। রূপসী মেয়েদের যা যা থাকতে হয়—সবই তার মধ্যে আছে। গায়ের রং ফর্সা আর উজ্জ্বল শ্যামলার মাঝামাঝি। কিছুটা হলুদাভ। কাঁটা কাঁটা চোখ। লম্বায় গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের তুলনায় একটু বেশিই। মুগ্ধ হবার মতই তার সৌন্দর্য।
চোখ না ফিরিয়ে হাঁটতে গিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে কফি পড়ে গেল অর্ণবের হাত থেকে। সরি বলে সে দ্রুত সরে গেল সেখান থেকে—পাছে রাচনা কিংবা তার বান্ধবীর চোখে পরে যায় সেই ভয়ে। যদিও রাচনা কিংবা তার বান্ধবীর চোখে এসবের কিছুই পড়ল না। তারা জানলও না একটা বাঙালি ছেলে তাদেরকে দেখে হোঁচট খেয়ে দ্রুত সরে গেছে।
রাচনার মুখখানি তাই অর্ণবের ভালো মতোই মনে আছে। কিন্তু ঐদিনের পরে রাচনাকে অর্ণব আর কখনো কোথাও দেখেনি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তারা থাকছে একই বিল্ডিং-এ। এটাকে কি কাকতালীয় বলা যায়?
অর্ণবের গাড়ি চলে এলো তার এপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর নির্দিষ্ট পার্কিং ছাউনিতে। পার্ক করে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিল অর্ণব। তারপর দুজনেই চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ।
হঠাৎ রাচনা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অর্ণবের দিকে। অর্ণব হেসে দিয়ে বলল, ‘কি ধন্যবাদ দিতে চান?’
‘সেটা তো আপনার প্রাপ্য।’
‘ভাগ্যিস আপনি চাবি হারিয়েছিলেন।’
রাচনা কী বুঝল কে জানে। সে লক্ষ্য করেছে, দেখা হবার পর থেকেই অর্ণব মাঝে মাঝেই হেয়ালী করে কথা বলছে। মাঝে মাঝে দুষ্টুমিও করছে। সে গাড়ির জানালা নামিয়ে একটু বাইরে তাকাল। গ্রীষ্মের রাত। বাইরে ফুরফুরে বাতাস বইছে। সারাদিনের গরমের শেষে সন্ধ্যার পর থেকে ডালাসের তাপমাত্রা কিছু কমতে থাকে। আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বাইরে তাকিয়েই রাচনা বলল, ‘আমার কেন জানি গাড়ি থেকে নামতে ইচ্ছে করছে না।’ বলেই সে তাকাল অর্ণবের দিকে এবং জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন। যতক্ষণ খুশি। আপনি চাইলে আপনাকে নিয়ে আমি সারা রাত ঘুরতেও পারি।’
রাচনা মৃদু হাসল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘ভালো কথা, আপনি একবারও আমার নাম জানতে চাননি, কেন জানতে পারি?
‘কারণ আপনার নামটা আমি জানি। খুব সুন্দর নাম আপনার—রাচনা। একটু ডিফারেন্ট!’
‘থ্যাংকস। এন্ড থ্যাংকস ফর এভ্রিথিং ইউ ডিড ফর মি।’
‘ইউ আর ভেরী ওয়েলকাম।’
‘গুড নাইট অর্ণব।’
‘গুড নাইট।’
রাচনা গাড়ি থেকে বের হয়ে লম্বা পায়ে হেঁটে তার এপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে গেল। অর্ণব তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। রাচনা এভাবে হঠাৎ করেই গুড নাইট বলে চলে যাবে—সেটা সে ভাবতেই পারেনি। রাচনা নিজেই তো বলল তার যেতে ইচ্ছে করছে না। আশ্চর্য মেয়ে তো!
অর্ণব আরো কিছুক্ষণ বসে রইল গাড়িতে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *