গভীর রাতে ফরিদের ঘুম ভেঙে গেল।
অনেকক্ষণ থেকে কে যেন ক্ষীণকণ্ঠে ডেকে যাচ্ছে, ‘বাবা। বাবা।’ কণ্ঠটা খুব পরিচিত। ভিকি ভয় পেলে কিংবা কোনো সমস্যায় পড়লে এভাবে অনবরত ডাকতে থাকে। ভিকি ফরিদের ছেলে। বয়স পাঁচ বছর দশ মাস।
ফরিদ কান খাড়া করে অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কোনো রকম শব্দ শুনতে পেল না আর। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। পাশে তাকিয়ে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে মুখ ঢুকিয়ে জবুথবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত অভ্যাস তার—ঘরের উষ্ণতা যাই থাকুক অথবা প্রকৃতিতে যেই ঋতুই চলুক না কেন, তাতে তার কিছু যায় আসে না। মুখ না ঢেকে সে ঘুমবে না। মাথার উপর একটা ফ্যান ঘুরবে সারা বছর। কাঠফাটা গরমেও ফ্যান ঘুরে—কনকনে শীতেও। ফ্যান ছেড়ে দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ব্লাঙ্কেটে সারা শরীর মুড়িয়ে ঘুমানো তার অভ্যাস। এবং এ নিয়ে কোনো বিতর্কও করা যাবে না। কী যে এক যন্ত্রণা!
ফরিদ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এভাবে মুখ ঢেকে ঘুমাতে তোমার কষ্ট হয় না? নিশ্বাস নাও কীভাবে—দম তো বন্ধ হয়ে যাবার কথা।’
‘কেন আমার দম বন্ধ হয়ে গেলে বুঝি তুমি খুশি হও?’
‘কী মুস্কিল—আমি কি তাই বললাম নাকি?’
‘হয়েছে হয়েছে—মনে মনে তো তাই চাও! তুমি কি ভেবেছ, আমি কিছু বুঝি না?’
‘উফ—তুমি না…’ ফরিদ আর কথা বাড়ায় না। এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। ভালো রকম সমস্যা। সহজ ভাবে সে কোনো কথার উত্তর দিতে পারে না।
মাঝে মাঝে ফরিদ দুষ্টুমি করে বলে, ‘সুন্দরী মেয়েদের ঘুমলে আরো বেশি সুন্দর লাগে। এমন সুন্দর মুখখানি ঢেকে রেখে ঘুমলে কেমন হয় বলতো?’
‘আমি সুন্দরী?’
‘অবশ্যই সুন্দরী!’
‘তাহলে তোমাদের বাসার সবাই আমার পেছনে আমাকে পেত্নী বলে কেন—আমি কি ভূত?’
ফরিদ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিলির মুখের দিকে। সে কী বলবে, কী বলা উচিত, কিছুই বুঝতে পারে না। এটা ঠিক মিলির গায়ের রঙ সেই অর্থে ফর্সা নয়। তাই বলে তাকে কিছুতেই অসুন্দর বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের গড়পড়তা মানুষ—মেয়েদের গায়ের রঙ ফর্সা না হলে তাকে সুন্দরী বলে গণ্য করে না। কোনো মেয়ে দেখতে সুন্দর হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে—তার গায়ের রঙ ফর্সা হওয়া চাই।
ফরিদের অবশ্য এ ধরনের কোনো প্রেজুডিস নেই—ছিল না কোনো কালেও। তার চোখে মিলি যথেষ্টই সুন্দরী। গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হলেও—দেখতে সে অসাধারণ। হরিণের মতো কাটাকাটা চোখ—কী মায়া লেগে আছে সেই চোখে। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুল—যাকে বলে মেঘ বরন কন্যা। অসম্ভব সুন্দর অবয়ব তার। মেদহীন একহারা, আকর্ষণীয় দেহ কাঠামো। কিন্তু সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিলির ব্যক্তিত্ব—যার প্রেমেই ফরিদ ডুবে ছিল আকণ্ঠ। তাই তো পরিবারের সবার মতামতকে উপেক্ষা করে ফরিদ মিলিকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরিদের পরিবারের কেউই এই বিয়ে মেনে নেয়নি—তা নিয়ে অবশ্য তার মাথা ব্যথাও নেই। ফরিদের সাফ কথা—গায়ের রঙ দিয়ে কী হবে, যদি মানুষটার মনটাই ভালো না হয়। মিলি অত্যন্ত ভালো মনের একটা মানুষ। শুধু স্বভাবটাই একটু পাগলাটে।
‘বাবা। বাবা।’
ফরিদের নিরবচ্ছিন্ন চিন্তায় ছেদ পড়ল। মিলির কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলেই গিয়েছিল ভিকির কথা। একটা ছোট নিশ্বাস ফেলে সে উঠে বসল বিছানায়। ছেলেটা যে কেন এত ভয় পায়?
রাত কতটা গভীর কে জানে? ভিকির কথা ভেবে ফরিদের মনটা একটু খারাপই হলো। ছেলেটা অল্প কিছুদিন হলো একা একা থাকছে তার নিজের রুমে। মিলি সুন্দর করে ভিকির বেডরুম সাজিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে নীলের ছড়াছড়ি। বিছানা-কার্পেট-ওয়াল পেপার সব কিছুতেই নীলের ছোঁয়া। রুমের একপাশে ছোটবেলা থেকে জমানো ভিকির সব খেলনা গাড়ি।
এতদিন ভিকি তার মায়ের রুমেই ঘুমতো। মিলির মাস্টার বেডরুমে কিং সাইজ বেডের প্রায় পুরোটা নিয়েই ছিল তার বিচরণ। মিলি খাটের এক কোনায় চুপচাপ পড়ে থাকে। ভিকির জন্মের পর থেকেই মায়ের বিছানাতে ছেলের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে ফরিদ ঘুমায় অন্য আরেক রুমে। ভিকি পাঁচ বছরে পড়তেই ফরিদ বলে আসছিল মিলিকে—এখন থেকে ভিকিকে ওর নিজের রুমে থাকতে দেয়া উচিত। এখনই অভ্যাস না করলে পরে সমস্যা হয়ে যাবে। ছেলে একা একা ভয় পাবে—একা থাকতে চাইবে না।
‘তোমার মতলবটা কী? ছেলেকে সরিয়ে ওর জায়গা দখল করতে চাও তুমি?’ ভ্রু কুঁচকে মিলি বলল।
‘কী আশ্চর্য—আমি কী তাই বললাম নাকি?’
‘তো কী বললে?’
‘আমি বললাম…’
‘থাক—আর বোঝাতে হবে না।’ ফরিদকে থামিয়ে দিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি যা ভাবছ তা হবে না। রাতে আমার বিছানায় তুমি ঘুমাতে পারবে না—তোমাকে আলাদাই ঘুমাতে হবে।’
‘ফর হাউ লং?’
‘যতদিন না তোমার প্রেশার কুকার হুইসেল বাজানো বন্ধ হয়।’
ফরিদ তাকিয়ে থাকে অসহায় দৃষ্টিতে। এসব কী বলে মিলি?
‘আচ্ছা তোমাকে না কতদিন বলেছি একজন ডাক্তার দেখাও। তোমার স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে—কিন্তু তুমি তো আমার কথা শুনবা না। কী আর করা।’
ফরিদ কিছু একটা বলার আগেই মিলি আবার বলল, ‘ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেই তুমি যদি মনে করে থাকো—আমার বিছানায় পার্মানেন্ট জায়গা হবে তোমার, সেটি হবে মস্ত বড় ভুল। সেটি হচ্ছে না।’
‘তাই বলে…’
‘আমি সব কিছু স্যাক্রিফাইস করতে পারি—কিন্তু আমার ঘুমের সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আর সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো ফরিদ।’ ফরিদকে আবার থামিয়ে দিয়ে বলল মিলি।
কাজেই ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেও ফরিদের কপালের কোনো হেরফের হলো না। সে বহাল তবিয়তেই তার রুমেই স্থায়ী এখনো। তবে সপ্তাহে দু’একদিন এর ব্যতিক্রম হয়। ফরিদের ভাগ্যে তখন মিলির বিছানায় ঘুমানোর সুযোগ হয়। আজকের রাতটাও ছিল তেমনি এক বিশেষ রাত।
ফরিদ ঘুমানোর চেষ্টা করছিল—অনেকক্ষণ থেকে এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসছিল না। ঠিক তখনই মিলির টেক্সট মেসেজ এলো—কি ঘুম আসছে না? এসো ঘুমের ওষুধ দিয়ে দেই। আসার সময় চেক করে এসো ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
ফরিদ খুব ভালো করেই জানে এটা কীসের ইঙ্গিত। সে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত মিলির রুমের দিকে ছুটে গেল।
মিলিকে পাতলা নাইটিতে দেবীর মত লাগে। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ এত স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান যে সে আকর্ষণকে উপেক্ষা করা একেবারেই অসাধ্য। ফরিদ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মিলি বলল, ‘ভিকির রুম চেক করে এসেছ? ও ঘুমিয়েছে তো?’
‘নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকবে নাকি?’
‘তবু যাও—দেখে আসো।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল মিলি।
এমন পরিস্থিতি কেউ এমন শীতল ব্যবহার করতে পারে ফরিদের জানা ছিল না। তার মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ হলো কিন্তু সে জানে তর্ক করে লাভ নেই—অযথা সময় নষ্ট হবে। ফরিদ কথা না বাড়িয়ে দেখতে গেল ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
মিলির মাস্টার বেডরুম আর ফরিদের রুমের মাঝখানেই ভিকির রুম। সাথে একটা বাথরুম লাগোয়া—যেটা ফরিদ আর ভিকির রুমের ঠিক মাঝে। দু’রুম থেকেই দরজা আছে। দু’পাশ থেকেই ব্যবহার করা যায়। ফরিদ দেখল ভিকি কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তবুও সে তার বিছানার পাশে গিয়ে একবার দেখল। ভিকির ভারি নিঃশ্বাসের শব্দে ফরিদ নিশ্চিত হয়ে ফিরে গেল মিলির ঘরে।
এসে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়েছে। ইতিমধ্যে তার নিশ্বাসও ভারি হয়ে এসেছে। মিলি কি ঘুমিয়ে পড়ল—এত তাড়াতাড়ি? ফরিদ কী করবে? চলে যাবে তার রুমে নাকি মিলির ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়বে। ঘুমন্ত মানুষের সাথে কি এসব করা যায়—হোক না সে তার স্ত্রী। ফরিদ দ্বিধা নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
ফরিদের মনে পড়ল একদিনের কথা। ভিকিকে ঘুম পাড়িয়ে মিলি ফরিদের রুমে এসে বলল, ‘কী ব্যস্ত?’
ফরিদ একটা জরুরি রিপোর্ট রেডি করছিল—পরদিন সকালে ওর মিটিংর জন্য। সে মাথা তুলে তাকাল।
মিলি বলল, ‘কাজ শেষ করে এসো। আমি জেগে থাকব।’
‘তুমি জেগে থাকবে?’ একটু মৃদু হেসে অবাক কণ্ঠে বলল ফরিদ।
‘হ্যাঁ থাকব।’
‘আচ্ছা যাও আসছি। ফিফটিন মিনিটস।’
হাতের কাজ শেষ না করেই ঠিক বারো মিনিটের মাথায় ফরিদ মিলির ঘরে যেয়ে দেখল—মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে। যথারীতি নিশ্বাস ভারি। মুখটা দেখা গেলেও বোঝা যেত সে ঘুমিয়েছে কিনা, কিন্তু তারও কোনো উপায় নেই।
হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-১)
তিথি কিচেনে এসে ঢুকল। তিতলির চোখে এখনো ঘুম। সে ঘুম চোখেই তার মায়ের পিছে পিছে এসে নাস্তার টেবিলে বসল।
তিথি একটা বাটিতে কিছু দুধ-সিরিয়াল ঢেলে তিতলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে।’ বলেই সে চলে গেল কাপড় বদলাতে।
সকালের নাস্তায় প্রায় প্রতিদিনই তিতলি দুধ-সিরিয়াল খায়। এতে সময় সাশ্রয় হয়। কিন্তু তারপরেও তাকে তাড়াহুড়ো করতে হয়। তিতলি তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে বাটি থেকে দুধ ফেলে দিল। গলার কাছে জামার খানিকটা ভিজে গেল। তিতলি লক্ষ্য করেছে, আম্মু যখনই বলে তাড়াতাড়ি করো, তখনই সে একটা ঝামেলা বাধিয়ে ফেলে। সে একটা পেপার টাওয়েল দিয়ে ভেজা অংশটুকু মুছে নিয়ে যেই এক চামচ সিরিয়াল মুখে নিয়েছে, ঠিক তখনই সে শুনল তার আম্মু তাকে ডাকছে।
দরজার কাছ থেকে তিথি আবার ডাকল, ‘তিতলি, তাড়াতাড়ি করো। নয়তো ক্লাসে দেরী হয়ে যাবে। ডোন’ট বি টার্ডি। আমি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছি।’ বলেই সে বের হয়ে গেল।
স্কুলের দিনে তিতলি কখনোই সকালে খাওয়া শেষ করতে পারে না। প্রায়ই তাকে খাওয়া শেষ না করেই উঠে যেতে হয়। আজও সে তাই করল। সে বাকী সিরিয়ালটুকু ট্র্যাস বিনে ফেলে দিয়ে বেসিনে বাটিটা রেখে দিল। তারপর কাঁধে ব্যাক-প্যাকটা ঝুলিয়ে বাইরে এসে দেখল তিথি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বসে আছে। সে গাড়িতে উঠে বসতেই তিথি দ্রুত রওয়ানা হয়ে গেল স্কুলের দিকে।
হাসান তার বাসার কম্পিউটার ডেস্কে বসে অফিসের কাজ করছিল। সে সকালে এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে বসেছে। সকাল ন’টায় একটা কনফারেন্স কল ছিল ক্লায়েন্টের সংগে। ৩০ মিনিটের একটা রুটিন কল। প্রতিদিন সকালে ক্লায়েন্টকে আগের দিনের আপডেট দিতে হয়। তারপর সারাদিনে আরো বেশ কয়েকবার কনফারেন্স কল থাকে–কখনো টিমের সংগে আবার কখনো সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সাথে। ব্যস্ততার জন্যে সকালে তার ঐ এক কাপ কফি ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হয়নি। হাসান মিটিং শেষ করে কিচেনে গেল কিছু একটা খাবার খাবে বলে। সে ফ্রিজ খুলে দেখল, কিন্তু খাবার মত কিছু খুঁজে পেল না। সে চিন্তিত মনে ফোন করল তিথিকে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন ধরতেই হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘কি করছ?’
‘কি করছি মানে? কাজ করছি। অফিসে এসে মানুষ কি করে?’ তিথি ভ্রূ কুঁচকে উত্তর দিল।
হাসান হেসে ফেলল।
তিথি কাজ করে একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে। তার টেবিলের সামনে একজন ক্লায়েন্ট বসে রয়েছে। একটা ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের টিকেট রিজার্ভেশনের জন্যে ক্লায়েন্টের ইনফরমেশন এন্ট্রি করছিল সে। এর মধ্যে হাসানের ফোন। তিথি ক্লায়েন্টের দিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো। ক্লায়েন্ট বসে আছে সামনে।’
‘এই ইয়ে, তিথি, বাসায় তো কোন রান্না নেই। দুপুরে খাবো কি?’
‘আমি কাজ থেকে এসে রান্না করবো। আপাতত কিছু একটা খেয়ে নাও।’
‘কিন্তু সেই কিছু একটা কি? ফ্রিজে তো কিছু নেই।’
‘নেই তো আমি কি করবো? ডীপ ফ্রিজে প্যাকেট ফুড আছে কিনা দেখো। নাহলে কিছু একটা রান্না করে নাও।’
‘রান্না? আমি কখন করবো?’
‘আশ্চর্য হাসান, সব কিছু আমাকে বলে দিতে হবে? রান্না করতে না চাইলে বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসো।’
‘ঠিক আছে, রাখি তাহলে।’
‘ওকে, বাই।’ তিথি ফোন রেখে দিয়ে সামনে বসা ক্লায়েন্টের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সরি ফর দ্য ইন্টারাপশন!’
‘ইট’স অলরাইট।’
তিথি কম্পিউটার স্ক্রিনে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফ্লাইট আইটিনেরারি প্রিন্ট করে আনল। তারপর ভাঁজ করে একটা এজেন্সির খামে ভরে ক্লায়েন্টের হাতে দিয়ে বলল, ‘ইউ আর অল সেট মিঃ ম্যাথিউ। ইফ ইউ হ্যাভ এনি কোয়েশ্চেন অর নিড টু মেক এনি চেঞ্জ, প্লিজ কল মি।’
‘আই সিউর উইল। থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘মাই প্লেজার।’
ক্লায়েন্টকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে তিথি ফোন করল হাসানকে।
হাসান ফোন ধরতেই তিথি বলল, ‘এক কাজ করো, ডীপ ফ্রিজে গত সপ্তাহের রান্না করা মাংস আছে। ওটা গরম করে খেয়ে নাও।’
‘অসুবিধা নেই। ফ্রিজে টার্কি স্লাইস আছে দেখলাম। একটা স্যান্ডুইচ বানিয়ে খেয়ে নেবো। তুমি ভেবো না।’
‘দ্যাটস গুড। আমি রাখি তাহলে। আর শোন, তুমি তো একবার কাজে ডুব দিলে জাগতিক সবকিছু ভুলে যাও। তিতলিকে আনতে ভুলে যেও না আবার।’
‘না, না ভুলবো না। এমন ভাবে বলছো যেন আমি প্রায়ই তিতলিকে আনতে ভুলে যাই।’
‘ভুলে যেতে, যদি প্রতিদিন আমি তোমাকে রিমাইন্ড না করাতাম। তোমাকে তো আমি চিনি! তোমার আর কোন কনফারেন্স কল নেই তো আজ, নাকি আছে?’
‘একটা কল আছে দু’টার সময়। কলটা শেষ করেই আমি তিতলিকে আনতে চলে যাবো। তুমি ভেবো না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি তাহলে। বাই।’
সেই কফি শপ (শেষ পর্ব)
ছুটির সকাল।
আজ সকাল থেকেই কেমন অস্থির লাগছে রাচনার। এতদিনে তার এমন কখনোই লাগে নি। প্রতিটি ছুটির সকালে ঘুম থেকে উঠে এক কাপ চা আর একটি বই নিয়ে রাচনা বসে লীনাদের বাসার পেছনের ছাউনির নীচে।
একটা সুন্দর সকাল। মৃদু মন্দ বাতাস বইছে ঝিরঝির করে। সেই বাতাসে রাচনার চুল সরে গিয়ে কপালে মুখের সামনে এসে পড়ছে। হঠাৎ চুল সরাতে গিয়ে চায়ের কাপে ধাক্কা লেগে কাপটা উলটে পড়ে গেল। কাপ ভেঙ্গে টুকরো টুকরো। রাচনা চুপ করে বসে রইল। তার এমন লাগছে কেন? কাপের ভাঙা টুকরোগুলো তুলে নিয়ে ফেলে দেয়া দরকার। কিন্তু তার ইচ্ছে হচ্ছে না। আর এক কাপ চাও বানিয়ে আনতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু তার ইচ্ছে হচ্ছে না উঠে গিয়ে আর এক কাপ চা বানিয়ে আনে। অথচ সকালে এক কাপ চা না খেলে তার সারাদিন অবশ অবশ লাগে।
অবশ লাগে লাগুক। সে যেভাবে বসে ছিল সেভাবেই রইল। বাতাসের বেগ সহসাই একটু বেড়ে গেল। কথিত আছে টেক্সাসের আবহাওয়া আর মেয়েদের মনের কোনো গ্যারান্টি নাই—যে কোনো মুহূর্তে বদলে যেতে পারে। কোনো ঘোষণা ছাড়াই বাতাসের বেগ বেড়ে গেল আরো। রাচনা আকাশের দিকে তাকাল। পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘ জমে আছে আকাশে। বৃষ্টি হবে কি না কে জানে?
রাচনা মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, বৃষ্টি যদি নামেও তবুও সে বসে থাকবে। আবেশে রাচনার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। তার মনের মধ্যে একধরণের তোলপাড় হচ্ছে, কেন হচ্ছে সে নিজেও জানে না। হঠাৎ এক পশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিল রাচনাকে—চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির মধ্যে বসে রইল সে।
বৃষ্টি থেমে গেছে সেই কখন। টেক্সাসের বৃষ্টি বলে কথা। এই আছে এই নেই। সারাদিন মেঘ আর রোদের খেলা চলেছে। মেঘ সরে গিয়ে রোদের আলোয় মোটামুটি আলোকিত ছিল সারাদিন।
দিন শেষ হতে এখনো ঢের বাকি। বিকেলের রোদ মিইয়ে যেতে শুরু করেছে।
মাহবুব সাহবের বাসার দরজায় কলিং বেলটা বেজে চলেছে অনেকক্ষণ থেকে। ডিং ডং। ডিং ডং।
লীনা তার ছাত্র-ছাত্রীদের গানের তালিম দিচ্ছিল। সপ্তাহে ছুটির দু’দিন লীনা ডালাসে বসবাসরত বাঙালি পরিবারের ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের বাংলা গান শেখায়। কলিং বেলের শব্দে সে একবার ঘুরে তাকাল। ভাবল রাচনা খুলে দেবে। মাহবুব বাসায় নেই—সে গেছে কিছু গ্রোসারি করতে। কলিং বেল বেজেই চলেছে। কেউ খুলছে না দেখে অগত্যা লীনাকে উঠতে হলো। সে বাচ্চাদেরকে প্র্যাকটিস করতে বলে চলে গেল দরজা খুলতে।
দরজা খুলে লীনার চোখ বড় হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল অর্ণব দাঁড়িয়ে আছে দরজার ওপাশে।
‘আপনি?’ লীনা প্রায় চিৎকার দিয়ে উঠল।
‘হ্যাঁ, আমি।’
‘হাউ স্ট্রেঞ্জ! এতদিন কোথায় ছিলেন?’
সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে অর্ণব জিজ্ঞেস করল, ‘রাচনা এখন কোথায় আছে, কিছু বলতে পারেন?’
‘আপনি তো অদ্ভুত মানুষ। কাউকে কিছু না বলে হুট করে নাই হয়ে গেলেন। আর এখন এসে বলছেন, রাচনা কোথায় আছে?’
‘ভাবী প্লিজ, ওকে আমার ভীষণ প্রয়োজন।’
লীনা চুপ করে রইল। ইতস্তত করে সে একবার ঘরের ভেতরের দিকে তাকাল। তারপর আবার তাকাল বাইরে। রোদ পড়ে গেছে। দিনের এই সময়টাতে রাচনা সাধারণত ওদের বাসার বাগানের পরিচর্যা করে। সে নিশ্চয়ই সেখানে আছে। লীনা বুঝতে পারছে না, সে কি রাচনাকে ডেকে দেবে না কি অর্ণবকে ভেতরে নিয়ে বসাবে।
লীনা কিছু বলছে না দেখে অর্ণব আবার বলল, ‘ভাবী প্লিজ!’
‘আসুন।‘ লীনা অর্ণবকে ভেতরে এনে বসাল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই মাহবুব সাহেব গাড়ি গ্যারাজের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকলেন। তিনি গ্রোসারীগুলো কিচেনে নিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ করেই লক্ষ করলেন অর্ণব বসে আছে লিভিং রুমে।
অর্ণবকে দেখে মাহবুব সাহেব দাঁড়ালেন এক মুহূর্ত—হাতের গ্রোসারি মেঝেতে ফেলে দিয়ে এগিয়ে গেলেন অর্ণবের কাছে—উচ্চস্বরে বললেন, ‘তুমি? এতদিন পর তুমি কোত্থেকে? কেন এসেছ?’
অর্ণব বিনয়ের সাথে বলল, ‘আমি বুঝতে পারছি, আপনারা সবাই আমার উপর রেগে আছেন। আর সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু আমার সব কথা না শুনলে আপনারা কিছুতেই বুঝতে পারবেন না, হোয়াট আই হ্যাভ বিন থ্রু!’
‘তোমার কোনো কথা শোনার প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না। তোমাদের মতো ছেলেদের আমি ভালো করেই চিনি। ইউ আর নাথিং বাট অ্যান ইররেস্পনসিবল পারসন। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল।‘ মাহবুব সাহেব অত্যন্ত রাগান্বিত কণ্ঠে বললেন।
অর্ণব চুপ করে মেঝের দিকে তাকিয়ে রইল।
‘আচ্ছা অর্ণব, রাচনার তো কোনো দোষ ছিল না, তাহলে কেন তুমি তার সঙ্গে এমন একটা কাজ করলে? কাপুরুষের মতো পালিয়ে না গিয়ে কথাটা সরাসরি জানালেই পারতে। একটা ফোন করেও তো বলা যেত?’
‘মাহবুব ভাই, বিশ্বাস করুন, রাচনার সঙ্গে যোগাযোগ করার মতো কোন উপায়ই আমার ছিল না। থাকলে আমি…’
‘তোমার কোনো কথা বিশ্বাস করার মতো কোনো কারণ আছে বলে আমি মনে করি না।’
‘আহা, এত রিয়্যাক্ট করছো কেন। মানুষের বিপদ হতে পারে না? শুনেই দেখিনা।‘ লীনা অর্ণবের ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে বলল।
লীনার কথায় মাহবুব আরো রেগে গেলেন। ‘তোমার শুনতে হয় তুমি শোনো। আই হ্যাভ নো ইন্টারেস্ট।‘ লীনা এবং অর্ণবের দিকে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে তিনি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে চলে গেলেন।
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তার অস্থিরতা বাড়তে থাকল। ইতোমধ্যেই কপালে কিঞ্চিত ঘাম দেখা দিয়েছে। সে হাতের উলটো দিক দিক দিয়ে ঘাম মুছল।
লীনা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে দেব?’
অর্ণব মাথা তুলে তাকাল কিন্তু কিছুই বলল না।
লীনা উঠে গিয়ে বরফ কুচি মিশিয়ে এক গ্লাস শীতল পানি এনে দিল অর্ণবের হাতে। অর্ণব ঢক ঢক করে সব পানিটুকু খেয়ে গ্লাসটা নামিয়ে রাখল সামনের কফি টেবিলে। তারপর একটু স্থির হয়ে বলল, ‘ভাবী, কী হয়েছিল আমি সব বলব। তার আগে একবার রাচনাকে আমি দেখতে চাই। বলবেন ও কোথায়?’
‘হাই আঙ্কেল?’
অর্ণব তাকিয়ে দেখল, সিঁড়ির নিচে তানিশা দাঁড়িয়ে আছে। তানিশাকে দেখে অর্ণব উৎফুল্ল হয়ে উঠল। দেহে প্রাণ ফিরে পেল যেন। হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে উঠল। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে উচ্চারণ করল, ‘তানিশা!’
অর্ণব উঠে দাঁড়াতেই তানিশা দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। অর্ণব তানিশাকে ধরে বলল, ‘হোয়্যার ইজ মামি?’
তানিশা বলল, ‘কাম উইথ মি।‘ তানিশা অর্ণবের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল পেছনের দরজা দিয়ে ঘরের বাইরে।
বাড়ির পেছনের বাগানে রাচনা পানি দিচ্ছিল।
ব্যাকইয়ার্ডের ছাউনির নীচে এসে দূর থেকে রাচনাকে দেখল অর্ণব । দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে রইল অপলক। তারপর অস্ফুটে ডাকল, ‘রাচনা!’
রাচনা ঘুরে তাকিয়ে দেখল অর্ণবকে। সে কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে। তারপর পানির পাইপটি হাত থেকে ফেলে দিয়ে এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল সে। একটু কাছে যেয়েই দৌড়ে গিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অর্ণবের বুকে। অর্ণবও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল রাচনাকে।
[প্রিয় পাঠক, হাত তালি দিয়ে গল্পটি এখানে শেষ করে দিলে কেমন হয়? অর্ণবকে ফিরিয়ে আনার কথা, ফিরিয়ে এনেছি, সিনেমাটিক স্টাইলে মিল হয়ে গেল—মূল গল্প বলাও শেষ। তবে কিছু পাঠকের কৌতূহল থেকেই যেত, তাহলে অর্ণব কোথায় গিয়েছিল? আসুন দেখা যাক—সেদিন কী ঘটেছিল…]
কিছু মুহূর্ত পার হয়ে গেল এভাবেই—হঠাৎ নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল রাচনা।
অর্ণব এগিয়ে গিয়ে রাচনার হাত ধরতে চাইলে সে তাকে ধরতে দিল না। বরং পাগলের মতো কাঁদতে কাঁদতে অর্ণবের জামা ধরে ঝাঁকি দিয়ে এক নাগাড়ে বলে চলল, ‘এতদিন কোথায় ছিলে তুমি? কী হয়েছিল—কী হয়েছিল আমাকে বলো। কেন তুমি আমাকে এভাবে ফেলে চলে গিয়েছিলে? তাহলে কেন বলেছিলে ভালোবাসি। ভালোই যদি বাসবে তাহলে–’
অর্ণব রাচনার হাত ধরে বলল, ‘রাচনা, আমার কথা শোন।’
‘বলো, বলো তোমার কী কথা, শুনি। জানি তো কী বলবে…’
‘না তুমি জানো না। তোমার কোন ধারণাই নেই।’
অর্ণবের কথার মধ্যে এমন কিছু ছিল যে রাচনা আর কিছু না বলে তাকিয়ে রইলে তার মুখের দিকে।
‘সেদিন রাতে, তোমার কথা ভাবতে ভাবতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গভীর রাতে আমার একটা ফোন আসে বাংলাদেশ থেকে। আমার ছোট ভাই আকাশ—এমন একটা খবর আমাকে দেয় যা শোনার মানসিক শক্তি আমার ছিল না। আমি কেন, পৃথিবীর কোন ছেলেরই সে শক্তি থাকার কথা নয়।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অর্ণব বলল সেদিনের পুরো ঘটনা।
ঘুম চোখে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে আকাশ কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘হ্যালো, ভাইয়া? আমি আকাশ। ভাইয়া, তুমি কি দেশে আসতে পারবে?’
অর্ণব বলল, ‘কেন কী হয়েছে?’
‘সর্বনাশ হয়ে গেছে ভাইয়া। আমাদের সব শেষ হয়ে গেছে। সব শেষ।’
আকাশের মুখে সব কিছু শুনে অর্ণব পাথরের মতো শক্ত হয়ে বসে রইল। তার চিন্তাশক্তি এলোমেলো হয়ে গেল। সে উদ্ভ্রান্তের মতো আচরণ করতে থাকল। সে দ্রুত কয়েকটি কাপড় একটা সুটকেসের মধ্যে ভরে নিয়ে আরো দ্রুততার সঙ্গে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
অর্ণব চলে যাওয়ার সময় তার অজান্তেই একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটল, ঘটনা না বলে দুর্ঘটনাই বলা চলে। যে ঘটনা অর্ণব ও রাচনার জীবনে এক বিষাদময়তা সৃষ্টি করল।
বিছানার উপর অর্ণবের ফোনটা যেখানে ছিল তার পাশেই সুটকেস রেখে কাপড় ভরে বের হবার সময় সুটকেসের ধাক্কায় তার ফোনটা পড়ে গেল বিছানা থেকে এবং একই সাথে তার পায়ের ধাক্কায় চলে গেল বিছানার নিচে। মেঝেতে কার্পেট থাকায় কোনো ধাতব শব্দ হলো না, হলেও তা অর্ণবের কানে পৌঁছুত কি না সন্দেহ। অর্ণবের অজান্তেই ঘটল সবকিছু—তাড়াহুড়ো আর অস্থিরতায় সে টেরই পেল না, কী ঘটে গেল।
রাচনা তাকিয়ে আছে অর্ণবের মুখের দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে।
রাচনার মুখের দিকে তাকিয়ে অর্ণব বলল, ‘আমার মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না অনেকদিন থেকেই। ঢাকায় গিয়ে একটা ভালো ডাক্তার দেখানো দরকার ছিল। তাই ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে আমার ছোট বোন রুনির ভর্তি পরীক্ষার সময় মা আর বাবাও গিয়েছিল ওর সঙ্গে ঢাকায়। ভেবেছিল রুনির পরীক্ষা শেষে মাকে ভালো একজন ডাক্তার দেখিয়ে আসবে।’
এটুকু বলে অর্ণব থেমে গেল। বাকী কথাগুলো বলতে তার গলা ধরে এল। সে থেমে থেমে বলল, ‘ফেরার সময় চালকের খামখেয়ালি আর বেপরোয়া চালানোর জন্যে ভারসাম্য হারিয়ে একটা ব্রিজের উপর থেকে ওদের বাসটি নদীতে পরে যায়। এবং অর্ধেকেরও বেশি প্যাসেঞ্জার মারা যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পরে বাবা আর মায়ের লাশ পাওয়া গেলেও, রুনিকে আর খুঁজে পাওয়া যায় নি।’
রাচনা অস্ফুটে বলল, ‘ও মাই গড!’ সে অর্ণবের হাত ধরল শক্ত করে।
‘আকাশের ফোন পাওয়ার পর থেকেই আমি কেমন জানি উদভ্রান্তের মতো হয়ে যাই। ঠাণ্ডা মাথায় কিছু ভাবতে পারছিলাম না। সঙ্গে সঙ্গে হাতের কাছে যা পেয়েছি, তাই নিয়েই আমি এয়ারপোর্ট চলে যাই।’
‘এয়ারপোর্টে পৌঁছে আমি নিউ ইয়র্কের একটি কানেকটিং ফ্লাইট পেয়ে যাই। আমি দেশে যাচ্ছি এই কথাটা তোমাকে জানানো দরকার। ফোন করতে গিয়ে দেখি আমার ফোনটা নেই। কোথায় ফেলেছি মনে করতে পারলাম না।’
‘এতগুলো দিন যোগাযোগ বিহীন থাকতে হবে তোমার সাথে—ভাবতেও পারিনি কোনোদিন। বিশ্বাস করবে কি না জানি না—প্রতিটি দিন আমার কেটেছে শুধু তোমার কথা ভেবে।’
রাচনা কিছু বলতে পারল না। অর্ণবের কথা শুনতে শুনতে তার চোখ ভিজে উঠল।
অর্ণব বলল, ‘ছোট ভাইগুলোকে সান্ত্বনা দেবার মতো কোন ভাষা আমার ছিল না। ওদেরকে কী বলবো, আমি নিজেই কেমন যেন অসুস্থ হয়ে গেলাম। আমি যাওয়ার এক সপ্তাহ পর, রুনির লাশ পাওয়া যায় একটা গ্রামে। আমরা দু’ভাই গিয়ে লাশ সনাক্ত করে নিয়ে আসি। যদিও তাকে চেনার কোনো উপায় ছিল না। বাড়ি ফিরে আমি এতটাই অসুস্থ হয়ে যাই যে কেবলই মনে হতো, তোমার সাথে বুঝি আমার আর দেখা হবে না। আমি বুঝি সুস্থ হয়ে আর তোমার কাছে ফিরে আসতে পারব না। শুধু তোমার ভালোবাসাই আমাকে ফিরিয়ে এনেছে এখানে আবার।’
দীর্ঘ সময় পার হলো নীরবতায়। ওদের দুজনের চোখই ভেজা। ভেজা চোখ মুছতে মুছতে অর্ণব বলল, ‘আই লাভ ইউ রাচনা। ইউ আর দ্য লাভ অফ মাই লাইফ।’
‘আই লাভ ইউ টু।’রাচনার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে।
দূর থেকে তানিশা তার মাকে আবার কাঁদতে দেখে এগিয়ে এসে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘Why are you crying mommy?’
রাচনা কিছু বলল না।
তানিশা বুঝতে পারল না তার মা-কেন কাঁদছে। তবে এর পেছনে যে এই মানুষটির হাত আছে, সেটুকু সে তার ক্ষুদ্র বুদ্ধিতে ঠিকই বুঝতে পারল। সে এবার অর্ণবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘Hey Mr., you made her cry again?’
অর্ণব হেসে ফেলল। তানিশার হাত ধরে বলল, ‘I’m so sorry. I won’t make her cry anymore!’
‘Promise?’
‘That’s a promise pumpkin!’
‘Hey, I’m not a pumpkin!’ হাত নেড়ে নেড়ে রাগের ভঙ্গি করে বলল তানিশা।
তানিশার কথার ভঙ্গিতে রাচনা হেসে ফেলল। কান্নার মধ্যেই হাসি। অর্ণব অবাক হয়ে দেখল রাচনার হাসিমাখা মুখখানি।
তানিশা একবার অর্ণবের দিকে তাকাল তারপর অবাক হয়ে দেখল তার মা-কে। অনেকদিন পর তার মাকে হাসতে দেখে তার ছোট মনটিও আনন্দে নেচে উঠল।
অর্ণব একহাতে তানিশাকে ধরে আরেকটি হাত বাড়িয়ে দিল রাচনার দিকে। রাচনা ধরল অর্ণবের হাত।
অর্ণব, তানিশা আর রাচনাকে কাছে টেনে নিল—পরম ভালোবাসায়।
(সমাপ্ত)
“Life isn’t always romantic. Sometimes, it’s realistic. Sometimes, things don’t work out the way you want them to.”
সেই কফি শপ (পর্ব-৯)
কিচেন কাউন্টারে বসে কফিতে চুমুক দিয়ে মাহবুব খান কথা বলছিল লীনার সঙ্গে। লীনা কিচেনের টুকটাক কাজ করছে। এমন সময় মাহবুবের ফোন বেজে উঠল। সে ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে রাচনা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ভাইয়া, বিল্ডিং ম্যানেজারের কাছে গিয়েছিলাম। উনি অর্ণবের এপার্টমেন্ট খুঁজে দেখেছে। ভেতরে নাকি সব কিছুই ঠিক আছে।’
‘আহা, কাঁদছিস কেন?’ মাহবুব সাহেব কিঞ্চিত অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে বললেন।
লীনা হাতের কাজ বন্ধ করে তাকাল মাহবুবের দিকে।
‘ভাইয়া, তিন দিন হয়ে গেল, ওর কোন খবর নেই। একটা ফোন অন্তত করতে পারত। এখন আমি কী করব?’
‘তুই কি ওর কোনো বন্ধুদের চিনিস? ওদের কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখ।’
‘না, আমি ওর কোনো বন্ধুদের চিনিনা। ভাইয়া, তুমি একটু খোঁজ নেবে?’
‘আচ্ছা, আমি দেখছি। তুই এত অস্থির হোস না।’
রাচনা কাঁদতে কাঁদতে ফোন কেটে দিল।
লীনা এগিয়ে এসে বলল, ‘তক্ষুনি বলেছিলাম, একটু ভালোমতো খোঁজ-খবর নিয়ে তারপর মতামত দাও। তোমরা দু’ভাইবোন হয়েছ একই রকম। একটা ছেলে এসে বলল, আপনার বোনকে আমি বিয়ে করতে চাই—অমনি রাজি হয়ে গেলে। ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বলে একটা কথা আছে—সেটা বোধহয় তোমাদের জানা নেই।’
‘এসব কী বলছ? অর্ণব কি কোনো ক্রিমিনাল যে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে যেতে হবে?’
‘তুমি কী করে জানো? দেখো গিয়ে, হয়তো এফবিআই’র ভয়ে পালিয়েছে। সে জন্যেই ফোন ধরছে না, যাতে ট্র্যাকড না হয়। আর তা না হলে হয়তো ডিপোর্ট করে দিয়েছে অলরেডি। হু নোজ?’
মাহবুব সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি অত্যন্ত বিরক্ত হলেন লীনার এধরণের কথায়। যদিও তিনি সেটা প্রকাশ করলেন না। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে তিনি উঠে চলে গেলেন অন্য রুমে।
লীনা ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইল সেদিকে।
…
এর মাঝে কেটে গেল বেশ কিছুদিন।
একদিন শনিবার। সেই কফি শপে রাচনা আর অর্ণব বসে কফি খাচ্ছে আর গল্প করছে। অর্ণবের কী একটা কথায় রাচনা হেসে কুটি কুটি হলো। অর্ণব বলল, ‘তুমি কি জানো হাসলে তোমাকে অন্য রকম সুন্দর লাগে। সব সময় মন খারাপ করে থাকো কেন তুমি?’
‘আমাকে এভাবে সব সময় হাসাতে পারো না? তাহলেই তো আর আমি মন খারাপ করে থাকি না।‘ রাচনা হাসতে থাকল। যেন খুব মজার একটা কথা সে বলেছে।
একজন বয়স্ক আমেরিকান ভদ্রলোক রাচনাকে একা একা হাসতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘Are you ok?’
রাচনা বাস্তবে ফিরে এলো এবং যারপর নাই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
কিছু মানুষ আছে বৃদ্ধ বয়সে তাদের একাকীত্ব কাটানোর একমাত্র জায়গা হচ্ছে, কোনো বার কিংবা কফি শপ। সেখানে তারা তাদের বয়সী কেউ থাকলে একসাথে গল্পগুজব করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কম বয়সী মেয়েদের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে। সুযোগ পেলে তাদের মেয়ের বয়সী মেয়েদেরকে ড্রিংক কিংবা কফি অফার করে। বিনিময়ে পাশে বসে দু একটি সুখ দুখের কথা বলা। তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন কোনো মেয়েকে একা সাধারণত পাওয়াই যায় না। সব সময় হয় তারা দল বেধে আসে অথবা সাথে তাদের বয়ফ্রেন্ড কিংবা অন্যকেউ থাকে।
রাচনা প্রথমে লক্ষ করে নি, কিন্তু হঠাৎ এই বুড়োর কথায় সে সম্বিত ফিরে পেল।
বুড়ো বলল, ‘You look beautiful when you laugh.’
‘Thank you.’ বলেই রাচনা মুখ লুকালো। কী কারণে যেন হঠাৎ করেই তার চোখ জ্বালা করে উঠল। কোনো রকমে বলল, ‘Excuse me.’ তারপরই দ্রুত কফি শপ থেকে বের হয়ে গেল সে।
বুড়ো লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রাচনার চলে যাওয়ার দিকে। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে একটু মৃদু হেসে নিজের মনেই বলল, ‘Women, what a strange creature of god!’
…
রাতে ঘুমানোর সময় মাহবুব সাহেব লীনাকে বললেন, ‘আমি ভাবছি রাচনা আর তানিশাকে বাসায় নিয়ে আসব। তোমার কোন অসুবিধা নেই তো?’
‘এটা কি ধরণের কথা? আমার অসুবিধা হবে কেন?’
‘ওর মনের অবস্থা বেশি ভালো না। সবার সঙ্গে থাকলে মনটা ভালো থাকবে।’
‘তোমার বোনকে তো চিনি। আমার তো মনে হয় না সে আসবে। তারপরেও তুমি বলে দেখতে পারো।’
…
সেদিন রাচনার সংগে অর্ণবকে দেখার পর থেকেই স্টিভের কী হয়েছে কে জানে। সে কয়েক দফায় রাচনার সংগে কথা বলতে চেয়েছে, দেখাও করতে চেয়েছে। রাচনা কোনো রকম প্রশ্রয় না দিয়ে স্টিভকে এড়িয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রূঢ় আচরণ করতেও কার্পণ্য করে নি। যার কারণে তার নিজের জীবন তছনছ হয়ে গেছে তার প্রতি কোনো করুণা দেখাবার মতো মানসিক অবস্থা রাচনার নেই। তবুও তানিশাকে নামিয়ে দিতে এসে স্টিভ প্রায় অনুনয় করে রাচনার সংগে কথা বলতে চাইল। তানিশাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই রাচনা বলল, ‘Sorry, I cannot invite you inside, if you need to talk, talk here.’
স্টিভ ভীষণ অবাক হলো। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘Are you dating him?’
‘Dating who?’ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল রাচনা।
‘That guy, he was with you other day.’
‘Well, that’s none of your business. Why are you even asking me this?’ রাচনা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে কথাগুলো বলল।
স্টিভ আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এদিক ওদিক তাকাল, সে আরো কিছু বলতে চায় কিন্তু সাহস পাচ্ছে না কীভাবে বলবে। তবুও ইতস্তত করে সে বলল, ‘It’s been two years I’m not in any relationship… ’ কথা শেষ না করে স্টিভ তাকিয়ে রইল রাচনার মুখের দিকে।
রাচনাও ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। স্টিভ কী বলতে চায় সে জানে। গত পাঁচ বছর ধরেই সে ইনিয়ে বিনিয়ে চেষ্টা করছে কোনো মেয়ের সংগে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে আর আগের মতো নেই। একটা সুযোগ পেলেই সে রাচনার কাছে ফিরে আসার জন্যে তৈরী। রাচনা অবশ্য কখনোই কোনো ধরণের পাত্তাই দেয় নি স্টিভের এসব কথার। এসব কথা শোনার আগ্রহ কিংবা সময় কোনোটাই তার নেই। বছর দুয়েক আগে স্টিভের সর্বশেষ গার্লফ্রেন্ড তাকে ল্যাং মেরে চলে গেছে। উইকএন্ডে তানিশাকে নিতে এসে রাচনাকে প্রায়ই সে সুযোগ পেলেই সে প্রসঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু রাচনার কাছ থেকে কোনো রকম সাড়া না পেয়ে সে আর কথা এগুতে পারেনা।
কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে স্টিভ বলল, ‘Are you serious about that guy?’
রাচনা শীতল দৃষ্টি নিয়ে তাকাল স্টিভের দিকে, ‘I think you’re crossing your limit Steve. I’m being nice to you doesn’t mean you can ask me anything you want.’
স্টিভ করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাল রাচনার দিকে। এই মেয়েটি এত নির্দয় হতে পারে এটি তার ভাবনার বাইরে। সে মরিয়া হয়ে বলল, ‘Tanisha miss me a lot. I miss her too.’
রাচনা কিছু বলল না। তার মাথায় এখন স্টিভের কোনো কথাই ঠিক মতো যাচ্ছে না। সে চুপ করে আছে।
স্টিভ আবারো বলল, ‘Tanisha is growing up now. She understands lot of thing. She loves you; you love her, and I love her too. She needs her parents, …both parents. We need to stay close for the sake of her good life.’
রাচনার মাথায় চিনচিন ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। মাইগ্রেনের পূর্ব লক্ষণ। সে ঘোলা চোখে স্টিভের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Why are you telling me all these, now?’
‘I never get a chance to talk to you.’
রাচনা জানে স্টিভ তাকে এখন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করবে। তানিশা একটু বড় হবার পর থেকেই সে চেষ্টা সে করে যাচ্ছে। তার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছে—একবার নয়, অনেকবার। কিন্তু রাচনা তার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছে। প্রয়োজনে সারা জীবন একা থাকবে, তবুও স্টিভের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
‘Are you done?’
স্টিভ হতভম্ব হয়ে অসহায়ভাবে তাকাল রাচনার মুখের দিকে।
‘I think I’m getting a migraine; will you please excuse me?’
রাচনার পক্ষে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। সে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
এরপরে আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। স্টিভ তবুও দাঁড়িয়ে থাকল। কোনো উপেক্ষা কিংবা অপমান তার গায়ে লাগছে না। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।
…
আরো বেশ কিছুদিন পরের কথা।
মাহবুব সাহেবের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে বড় একটা লন। সেখানে হরেক রকমের ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। পেছনে একটা ছাউনি দেয়া আছে। তানিশা আর রাইসা পেছনের সবুজ ঘাসের লনে খেলছে। রাচনা ওদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। তার হাতে একটা বই। বইটা পড়ার চেষ্টা করছে কয়েকদিন থেকে—কিছুতেই মন বসাতে পারছে না।
মাহবুব আর লীনা রাচনার সঙ্গে বসে অনেক কথা বলেছে। বুঝিয়েছে। যদিও সে বেশ কয়েকবার বলেছে, একা থাকতে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সে তো একাই ছিল এতদিন। তারপরেও তাদের অনেক অনুরোধের পর রাচনা এসেছে তাদের সঙ্গে।
কিন্তু মাঝে মাঝে লীনার কথায় সে আহত হয়। সেদিন যেমন কথায় কথায় লীনা বলছিল, ভাগ্যিস বিয়েটা হয় নি। তাহলে আবার আরেকটা ঝামেলার মধ্যে পড়তে হতো। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। রাচনার এসব কথা ভালো লাগেনি শুনতে কিন্তু শুধু বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে এ বাসায় আছে।
এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। রাচনা বিভিন্ন ভাবে অর্ণবের খোঁজ বের করার চেষ্টা করেছে। সমস্যা হয়েছে অর্ণবের সঙ্গে পরিচয়ের সময়টা এতই অল্প যে তার ব্যক্তিগত বিষয় বা তার অফিসের কোনো কলিগ, কিংবা কোনো বন্ধু পরিচিত কেউ আছে কিনা কিছুই জানার সুযোগ হয় নি রাচনার। অর্ণবের এপার্টমেন্ট ঘেঁটে কিছু হয়ত বের করা সম্ভব কিন্তু বিল্ডিং ম্যানেজার প্রাইভেসি রুলসের কারণের রাচনাকে কোনো রকম সহযোগিতা করতে অপারগ।
বিল্ডিং ম্যানেজার বলেছে, মাঝে মাঝে কিছু টেন্যান্ট ভাড়া বাকি রেখে এপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে যায়—এটা ঠিক। কিন্তু অর্ণবের ক্ষেত্রে তেমন হবার কথা নয়। অর্ণব ভালো জব করে, ক্রেডিট হিস্ট্রি ভালো, ভাড়াও বাকি পড়েনি কখনো—কাজেই তেমন কিছু ভাবার সুযোগ নেই। তাছাড়া এক মাসের ভাড়া এডভান্স আছে তাদের কাছে ডিপোজিট মানি হিসেবে, কাজেই তারা আরো একমাস অপেক্ষা করে দেখবে। এরমধ্যে অর্ণব ফিরে না এলে তারা এপার্টমেন্ট ভ্যাকেট করবে। তখন যদি রাচনা চায় এসে দেখতে পারে। তার আগে ওদের পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব নয়।
রাচনার পক্ষে আর তেমন কিছুই করা সম্ভব হলো না।
…
সময় যেমন কারো জন্য থেমে থাকে না—সময়ের সাথে সাথে একসময় সব কিছুই তেমনি সহনীয়ও হয়ে যায়।
সাত দিন পর্যন্ত রাচনা ছটফট করল অর্ণবের জন্যে। অফিসে গেল ঠিকই কিন্তু ঠিকমতো কাজে মন দিতে পারল না। একবার ওর বস ওকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল—সব ঠিক আছে কিনা। রাচনা বলেছে সব ঠিক আছে। এরপরে তার বস আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
ক্যালেন্ডারের পাতায় এক দিন, এক দিন করে দেখতে দেখতে তিরিশ দিন পার হয়ে গেল। রাচনার কাছে মনে হলো তিরিশ দিন নয় যেন তিরিশ মাস ধরে সে অপেক্ষা করছে। কিছু কিছু অপেক্ষার দিন যেন শেষ হতেই চায় না।
রাচনা চেয়েছিল তার জীবনে এমন কেউ একজন আসুক, যার সাথে সে বাকী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়ে দিতে পারবে। অর্ণবের সঙ্গে পরিচয়ের শেষ ক’টা দিন রাচনা তাই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে কী হয়ে গেল।
রাচনার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল।
সেই কফি শপ (পর্ব-৮)
দীর্ঘদিন পরে প্রিয় কাউকে কাছে পেলে যেমন আনন্দ হয়, বার্বি ডলের মতো দেখতে বাচ্চা মেয়েটির চোখে মুখে তেমন আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল।
বার্বি ডলকে জড়িয়ে ধরে রাচনা বলল, ‘Hello my baby doll, how’re you doing?’
‘I’m doing just fine. But you know you are late. I missed you so much.’ বার্বি ডল হাত নেড়ে নেড়ে বলল।
‘I missed you too baby.’
অর্ণব পাশে এসে দাঁড়াতেই বার্বি ডল তার মাকে ইশারায় মাথা নিচু করতে বলল। রাচনা নিচু হতেই সে কানে কানে বলল, ‘Mommy, who is he?
‘He is a very good friend of mine.’
এবার বার্বি ডল অর্ণবের দিকে মাথা উঁচু করে তাকিয়ে বলল, ‘What’s your name Mr.?’
অর্ণবের ভেতরে তোলপাড় হলেও সে নিজেকে খুব স্বাভাবিক রাখল। সে হেসে উত্তর দিল, ‘Arnab. My name is Arnab. What’s your name pumpkin?’
‘My name is Tanisha and I’m not a pumpkin!’ ডান হাতের তর্জনী উঁচু করে সে অর্ণবকে তার ভুল ধরিয়ে দিল।
অর্ণব হেসে ফেলল। সে বলল, ‘Nice to meet you Tanisha. You are so cute!’
‘I know I am! Thank you very much!’ তানিশা তাকাল রাচনার দিকে তারপর আবার অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Are you my mommy’s boyfriend?’
অর্ণব মোটেও প্রস্তুত ছিল না এমন কিছু শুনবে বলে। সে রাচনার দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে মৃদু হাসল—কিছু বলল না।
তানিশা রাচনার দিকে বড় মানুষের মতো মিট মিট করে দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘Mommy?’
রাচনা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘Ok Tanisha that’s enough now!’
‘Hi Rasna?’ কাছে থেকেই কেউ একজন রাচনার নাম ধরে ডাকল।
রাচনা ঘুরে তাকিয়ে দেখল স্টিভ এসে দাঁড়িয়েছে। রাচনা বলল, ‘Hi, Steve.’
স্টিভকে দেখে অর্ণবের চেহারায় সামান্য পরিবর্তন হলো—সে অবাক হলো এবং কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল।
স্টিভ অর্ণবের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে খানিকটা অস্বস্তিবোধ করল অর্ণব।
রাচনা পরিচয় করিয়ে দিল। ‘Arnab, this is Steve. Steve, this is Arnab.’
স্টিভ আর অর্ণব দুজন হ্যান্ডশেক করে বলল—Nice to meet you.
রাচনা তানিশাকে ধরে বলল, ‘How’s your vacation? Having fun with daddy?’
‘You know what mommy…’ তানিশা হাত নেড়ে নেড়ে আরো কত কথা বলে গেল। রাচনা হাসতে হাসতে মেয়ের কথা শুনল।
হঠাৎ করে অর্ণবের কি হলো কে জানে—সে ওদেরকে কথা বলতে দিয়ে ফিরে গেল গাড়িতে।
কিছুক্ষণ পর রাচনা তানিশাকে জড়িয়ে ধরে চুমু দিল তারপর স্টিভের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এসে উঠে বসল গাড়িতে।
অর্ণবের গাড়ি ছুটে চলেছে হাইওয়েতে। ফিরে যাচ্ছে তাদের এপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এ। রাচনা বসে আছে পাশের সীটে। গাড়িতে উঠার পর থেকে কেউ কারো সাথে কোনো কথা বলেনি। একটা অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে আছে গাড়ির ভিতরটা।
‘তুমিতো তানিশা’র কথা আমাকে কিছুই বলোনি। তোমার একটা মেয়ে আছে, অথচ সে কথাটা তুমি আমাকে বলোনি।’রাচনার দিকে না ঘুরেই অর্ণব বলল।
অর্ণবের কথায় রাচনা ঘুরে তাকাল তার দিকে। দৃঢ়তার সাথেই বলল, ‘বলতে চেয়েছি অর্ণব, তুমি শুনতে চাওনি। তারপরেও মনে হলো, তানিশার কথা তোমার জানা দরকার—তাইতো তোমাকে নিয়ে এলাম আজ।’
এস্কেলেটরে চাপ দিয়ে অর্ণব গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে দিচ্ছে আবার সাথে সাথেই কমিয়ে দিচ্ছে। কী জানি তার মনের ভেতরেও কিছু একটা হচ্ছে—যার গতিবেগ একবার বাড়ছে, একবার কমছে। অর্ণবের মুখের দিকে তাকিয়েই বলে দেয়া যায় সে আকাশ-পাতাল ভাবছে।
গাড়ির ভিতর আবারো নীরবতা নেমে এলো। গাড়ি এগিয়ে গেল অনেকটা পথ। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে অর্ণব একসময় জানতে চাইল, ‘স্টিভ এর সাথে তোমার প্রায় দেখা হয়?’
‘প্রায় না। মাঝে মাঝে—যখন স্টিভ আমার এপার্টমেন্টে আসে।’
অর্ণবের বুকের মধ্যে একটা ধাক্কা মতো লাগল। মানে কী?
অর্ণবের মুখের দিকে তাকিয়ে রাচনা বুঝতে পারল তার মনের মধ্যে কিছু একটা ঘটছে। সে সঙ্গে সঙ্গেই বলল, ‘তানিশাকে নিতে। এখন তানিশার সামার ব্রেক চলছে। ওর স্কুল বন্ধ বলেই স্টিভ ওকে নিয়ে এসেছে। ব্রেক শেষে ওকে আবার আমার কাছে দিয়ে আসবে। আর স্কুল যখন খোলা থাকে, তখন শুধু উইকএন্ডে স্টিভ সারাদিনের জন্যে তানিশাকে নিয়ে যায়।’
‘ও।’অর্ণব ছোট্ট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তাতে কতটা স্বস্তি পেল সে তা অবশ্য বোঝা গেল না।
এরপরে অর্ণব আর কিছু জানতে চাইল না। রাচনাও চুপ করে রইল। কথা আর এগুলো না। মুখে কেউ কারো সাথে কোনো কথা না বললেও মনে মনে যে হাজারো কথা বলছে, সে কথা বুঝতে হলে মনোবিজ্ঞানী হবার প্রয়োজন নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যে ওদের গাড়ি বিল্ডিং এর পার্কিং এ এসে দাঁড়াল। গাড়ি থামিয়ে বসে রইল দুজনেই—চুপচাপ। হঠাৎ করেই যেন সব কিছু কেমন হয়ে গেল। অর্ণবের মধ্যে এক ধরণের দ্বিধা চলে এসেছে, তার চেহারায় সেটা স্পষ্ট। রাচনা আর কিছু বলল না। সে অর্ণবকে ভাববার সময় দিল। অর্ণবের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে চলে গেল তার এপার্টমেন্টে।
…
রাতে ঘুমানোর আগে বিছানায় শুয়ে শুয়ে অর্ণব ভাবল—রাচনার কি তাহলে স্টিভের সাথে এখনও সম্পর্ক আছে? না না তাই বা হতে যাবে কেন? কোথাও কি কোন ভুল হচ্ছে? তানিশার কথাও তো কিছু বলেনি—সেটা কি ইচ্ছাকৃত ভাবেই এড়িয়ে গেছে? একটা দীর্ঘ সময় অর্ণব অস্থিরতায় ভুগলো। এসব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতেই এক সময়ে ঘুমিয়ে পড়ল সে।
রাত তখন তিনটারও বেশি। অর্ণব গভীর ঘুমে, হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। অর্ণব ঘুম জড়িত কণ্ঠে বলল, ‘হ্যালো।’
ওপাশ থেকে কার ফোন বোঝা গেল না—কিন্তু অর্ণবের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
…
পরেরদিন রাচনা নিজ থেকে অর্ণবকে ফোন করে নি। কিন্তু সে মনে মনে অপেক্ষায় ছিল, অর্ণবের ফোন কলের। সকাল পেরিয়ে দুপুর। দুপুর পেরিয়ে বিকেল-সন্ধ্যা। না অর্ণবের দিক থেকে কোনো সারা পাওয়া গেল না।
বিকেলের পর থেকেই রাচনার একটু একটু খারাপ লাগতে লাগল। অফিস থেকে ফেরার আগেই তাই সে নিজে থেকেই ফোন দিল অর্ণবকে। কিন্তু অর্ণবের কাছ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। একটু অপেক্ষা করে সে আরো দুবার চেষ্টা করল—অর্ণব ফোন ধরল না।
রাচনার ধারণা অর্ণব তানিশার ব্যাপারটা ঠিক মতো নিতে পারেনি। ও হয়তো কষ্ট পেয়েছে—সেটা সে পেতেই পারে। তানিশার কথা অর্ণবকে আরো আগেই হয়ত বলা যেত—কিন্তু পরিচয়ের মাত্র এ’কদিনের মধ্যেই সব কথা বলতেও সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেনি। আর তাছাড়া সময় তো শেষ হয়ে যায়নি। অর্ণব যে এত তাড়াতাড়ি এমন একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলবে—তাই বা কে জানত। আর এই পুরো ব্যাপারটা রাচনাকে এখন পীড়া দিতে থাকল। তার নিজের কাছেও খারাপ লাগতে লাগল। অর্ণবকে বিষয়টা ব্যাখ্যা করা দরকার। কিন্তু সে তো ফোনই ধরছে না।
কাজ থেকে ফিরে রাচনা সরাসরি চলে গেল অর্ণবের এপার্টমেন্টে। বেশ কিছুক্ষণ দরজায় নক করল সে—কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। বেশ কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে থেকে চিন্তিত মনে সে ফিরে গেল তার এপার্টমেন্টে।
রাতের বেলা আবার ফোন করল রাচনা। এবারো উত্তর দিল না অর্ণব। অতঃপর সে ভয়েজ মেসেজ রাখল। ‘অর্ণব আমি বুঝতে পারছি, ইউ আর শকড! তোমার যদি কিছু বলার থাকে আমাকে সরাসরি বলতে পারো। এভাবে ফোন না ধরে, দেখা না দিয়ে শুধু আমার কষ্ট বাড়িও না। প্লিজ, একবার দেখা করো, এসো কথা বলি।’
অর্ণব এভাবে তাকে এড়িয়ে যাবে এটা ঠিক মেনে নিতে পারছে না রাচনা। অর্ণবকে যতটুকু চিনেছে তার ব্যক্তিত্বে কি সেটা যায়? ওর মনে যাই থাকুক না কেন, সরাসরি বললেই তো হয়। খারাপ তার লাগতেই পারে—সে কথা বলতে সমস্যা কোথায়। এভাবে ইগ্নোর করছে কেন? রাচনা ফোন রেখে দিয়ে মন খারাপ করে শুয়ে রইল। তবুও ওর ক্ষীণ ধারণা, ঘুমনোর আগে অর্ণব তাকে ফোন করবে একবার।
এবং ভাবতে ভাবতেই রাচনার ফোন বেজে উঠল। সে ধড়মড় করে উঠে বসল। কার ফোন সেটা না দেখেই ফোনটা কানে নিয়েই সে রাগত স্বরে বলল, ‘এভাবে আমাকে কষ্ট দেবার কী মানে অর্ণব? এটা কেন তুমি করলে?’
‘Rasna, it’s me, Steve. Not sure what are you talking about. You seem very angry.’
ওপাশ থেকে স্টিভের কণ্ঠ শুনে রাচনার এই মুহূর্তে সত্যি সত্যি মাথায় রাগ চড়ে গেল। সে রীতিমতো ঝাঁঝাল কণ্ঠে ধমকের সুরে বলল, ‘Why did you call me now? Did you see the time? Don’t you have a watch?’
‘I’m sorry, I didn’t want to call you but Tanisha… she wants to talk to you.’ স্টিভ ঘাবড়ে গিয়ে কোনো রকমে বলল।
‘Why what happened to her?’
‘Wait…’ স্টিভ কথা না বাড়িয়ে তানিশার হাতে ফোন ধরিয়ে দিল।
ফোন ধরে তানিশা কাঁদো কাঁদো কণ্ঠে বলল, ‘Mommy, I wanna go back to you.’
‘কেন কী হয়েছে বেবি?’
‘I don’t know, I’m just missing you a lot.’
‘Tanisha baby, I will be very busy in next few days. Ask daddy to drop you in the weekend. Ok baby?’
তানিশা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘Ok mommy.’
‘Rasna, do you have few minutes to talk’ তানিশার হাত থেকে ফোন নিয়েই স্টিভ জানতে চাইল।
‘Now?’
‘Yes.’
‘Sorry Steve, I had a long and bad day today. Having a terrible headache, can’t really talk right now.’
‘Ok ok no problem.’
রাচনা ফোন কেটে দিয়ে বসে রইল মূর্তির মতো।
সকাল বেলা কাজে যাবার পথে রাচনা গেল যেখানে অর্ণব তার গাড়িটা পার্ক করে। গাড়ি যেখানে থাকার সেখানেই আছে। তার মানে অর্ণব যেখানেই যাক, গাড়ি নিয়ে যায়নি। হঠাৎ রাচনার মনে অন্য চিন্তা এলো। তার বুক ধড়ফড় করে উঠল। উৎকণ্ঠা আর উদ্বেগে তার হৃৎস্পন্দন বেড়ে গেল। সে কী করবে বুঝতে পারল না।
রাচনা অফিসে তার ম্যানেজারকে ফোন করে কাজে যেতে পারবে না জানিয়ে দিল। এবং সত্যি সত্যি তার মাথা ঘুরে উঠল। সে দ্রুত তার এপার্টমেন্টে ফিরে গেল। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে আবার উঠে দাঁড়াল রাচনা। এক ধরণের দিশাহীনতা এবং অস্থিরতায় পেয়ে বসল তাকে। সে বাথরুমে যেয়ে বেসিনে পানি ছেড়ে মুখে ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিল কয়েকবার। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে, ফ্রিজ থেকে পানির বোতল বের করে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি খেল। তারপর এপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে গেল সে।
রাচনা সিঁড়ি বেঁয়ে নেমে গেল নিচে। দ্রুত হেঁটে গেলে বিল্ডিং ম্যানেজারের অফিসে। রুমে ঢুকেই সে ম্যানেজারকে বলল অর্ণবের কথা। অর্ণব ফোন ধরছে না, দরজায় নক করেছে—সে দরজা খুলছে না। পার্কিং এ অর্ণবের গাড়ি আছে অথচ সে নেই—এটা কী করে সম্ভব? রাচনা বলল, ‘Can you please go and check his apartment?’
ম্যানেজার বলল, ‘Mam, I just can’t go and check his apartment as you asked. There are some rules to follow. For privacy reason—I’ll follow the proper procedure.’
রাচনা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল। তারপর বেরিয়ে গেল।
বিল্ডিং ম্যানেজারের অফিস থেকে বের হয়েই রাচনা ফোন করল তার ভাইয়াকে। অপরপ্রান্ত থেকে মাহবুব সাহেব ফোন ধরতেই কান্না চেপে রাচনা বলল, ‘ভাইয়া, অর্ণবকে পাওয়া যাচ্ছে না।’
মাহবুব খান একটু দেরি করেই অফিসে যায়। সে এক কাপ কফি নিয়ে ল্যাপটপে ইমেইল চেক করছিল ব্রেকফাস্ট টেবিলে বসেই। তিনি বললেন, ‘পাওয়া যাচ্ছে না মানে কী?’
‘হ্যাঁ ভাইয়া, দু’দিন ধরে ওর কোনো খোঁজ নেই। ফোন করছি, ধরছে না। ওর এপার্টমেন্টেও নক করেছি অনেকবার, খুলছে না।’
‘দেখ অফিসের কাজে হয়ত আউট অফ টাউন গেছে।’
‘আউট অফ টাউন গেলে ফোন ধরবে না কেন? কল ভয়েজ মেসেজে চলে যাচ্ছে।’
‘হয়ত ব্যস্ত আছে সে। এত টেনশন করছিস কেন? অপেক্ষা কর, নিশ্চয়ই চলে আসবে।’
রাচনা আর কী বলবে ভেবে পেল না। সে বুঝতে পারল ওপাশ থেকে মাহবুব ফোন কেটে দিয়েছে। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
দিনটা ভীষণ অস্থিরতায় কাটল রাচনার। কিছুই ভালো লাগছে না তার। আর কেনই বা এমন লাগছে তাও সে ঠিক বুঝতে পারছে না। মাত্র কয়েক দিনের পরিচয়, কয়েক দিনের মেলামেশা—এই ছেলেটির জন্যে তার এমন লাগছে কেন? একটা কষ্ট এমন ভাবে আকড়ে ধরে আছে যে মনে হচ্ছে গলায় কি যেন আটকে আছে।
দিনটা কোনো রকমে পার করে পরের দিন আবার বিল্ডিং ম্যানেজারের সঙ্গে দেখা করতে গেল রাচনা। রাচনা ঢুকতেই ম্যানেজার বলল, সে অর্ণবের এপার্টমেন্ট খুলে দেখে এসেছে। তার চোখে অস্বাভাবিক কোনো কিছুই পড়েনি। সব কিছুই ঠিক-ঠাক আছে। এরচেয়ে বেশি কিছু সে জানাতে পারছে না। এর বেশি সে কিছু করতেও পারবে না। একমাত্র পুলিশ যদি মিসিং রিপোর্ট নিয়ে আসে তাহলেই শুধু অন্যভাবে দেখতে পারে কেসটা। যেহেতু মিসিং রিপোর্ট নেই—তার পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব না।
রাচনা কেঁদে ফেলল।
বিল্ডিং ম্যানেজার অপ্রস্তুত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘অর্ণব তোমার কী হয়?’
রাচনা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল—সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।
সেই কফি শপ (পর্ব-৭)
সারারাত অস্থিরতায় কাটল অর্ণবের।
রাতটা প্রায় জেগে জেগেই কাটিয়ে দিল সে—দু’চোখের পাতা এক করতে পারে নি। সে জানে, রাচনাও পারে নি ঘুমাতে। এ কীসের অস্থিরতা সে জানে না—জানতে চায়ও না। তার মন শুধু জানে—সে কী চায়।
ভোরের আলো ফোঁটার আগেই সে মনে মনে অন্যরকম একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। সকালে অফিসে যেয়েও তার অস্থিরতা কমল না একটুকুও। ডেস্কে কিছু দরকারি কাজ শেষ করেই সে ফোন হাতে চলে গেল ব্রেক রুমে।
ডালাস-ফোর্ট ওয়ার্থ অঞ্চলে বেশ নামী এবং ব্যস্ত একজন সিপিএ মাহবুব খান—রাচনার বড় ভাই। তার বিজনেস ক্লায়েন্টের সংখ্যা অসংখ্য। সারাবছরই তার ব্যস্ততা লেগেই থাকে। সকালে একটা ক্লায়েন্ট মিটিং-এ যাচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। ব্লু-টুথের মাধ্যমে গাড়ির স্পিকারে ফোন অন করে তিনি বললেন, ‘হ্যালো, মাহবুব স্পিকিং।’
‘মাহবুব ভাই, আমি অর্ণব।’
‘অর্ণব?’ মাহবুব খান হঠাৎ করে অর্ণবকে চিনতে পারলেন না। কয়েক মুহূর্ত পরেই তিনি বুঝতে পারলেন এবং বললেন, ‘ও হ্যাঁ অর্ণব—কী ব্যাপার?’
‘আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল। আমি কি আপনার অফিসে একটু আসতে পারি।’
‘আমি তো এখন অফিসে নেই। একটা ক্লায়েন্ট মিটিং আছে। তুমি বরং লাঞ্চের সময় আমার অফিসে চলে এসো—তখন না হয় কথা বলা যাবে। একটু ধরো, আমি এড্রেসটা দিচ্ছি।’
মাহবুব সাহেব অর্ণবকে অফিসের এড্রেস দিয়ে ফোন কেটে দিলেন।
লাঞ্চ আওয়ার শেষ করে অর্ণব আরেকবার ফোন করল মাহবুব খানকে। ব্যস্ত মানুষ বলা তো যায় না। অফিসে যেয়ে দেখল তিনি নেই। তাই নিশ্চিত হবার জন্যেই ফোনটা করল সে। মাহবুব সাহেব জানালেন তিনি অফিসেই আছেন। অল্প সময় পড়েই অর্ণব হাজির হয়ে গেল মাহবুব খানের অফিসে। রিসেপশনিস্ট মাহবুব সাহেবের অফিস রুম দেখিয়ে দিল। অর্ণব দরজায় টোকা দিয়ে বলল, ‘মাহবুব ভাই, আসব?’
মাহবুব তাকিয়ে দেখলেন অর্ণবকে। তারপর সহাস্যে বললেন, ‘অর্ণব এসো, বসো।’
অর্ণব বসল একটা চেয়ার টেনে।
মাহবুব সাহেব লক্ষ করলেন, অর্ণবের মধ্যে একধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছে। মনে হচ্ছে কিছু নিয়ে সে চিন্তিত। তিনি বললেন, ‘কী ব্যাপার অর্ণব? এনিথিং রং? ইউ লুক টেনসড।’
একটু সময় নিয়ে অর্ণব বলল, ‘মাহবুব ভাই, রাচনার ব্যাপারে আমি কিছু কথা বলতে চাই।’
‘কেন, কী হয়েছে রাচনার?’
‘কিছু হয় নি।’
‘তাহলে?’
অর্ণব অস্বস্তিতে ভুগছে। সে বলতে চেয়েও বলতে পারছে না। মাহবুব বিষয়টা বুঝতে পেরে বলল, ‘ইউ ক্যান টেল মি এনিথিং—ডোন্ট হেজিটেট।’
‘রাচনাকে আমি বিয়ে করতে চাই।’ হুট করে অনেকটা মুখ ফসকে বলে ফেলল অর্ণব।
‘রাচনাকে তুমি বিয়ে করতে চাও?’ মাহবুব সাহেব খুবই অবাক হলেন। একটু ভেবে তিনি বললেন, ‘কিন্তু তুমি কি ওর সব কথা জানো?’
‘হ্যাঁ জানি। আমি জানি রাচনার আগে একটা বিয়ে হয়েছিল—স্টিভ নামে একটা আমেরিকান ছেলের সঙ্গে। বিয়েটা টিকে নি। কেন টিকে নি তাও জানি।’
‘তুমি বলছো তুমি ওর সব কথাই জানো?’
‘জানি এবং সব জেনে শুনেই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
‘ও। তো, তোমার সিদ্ধান্তের কথা রাচনাকে বলেছ? হোয়াট ইজ হার ওপিনিয়ন?’
‘না, এখনো বলি নি। বলব।’
‘ব্যাপারটা উল্টো হয়ে গেল না? তার সাথেই তো তোমার কথা বলা উচিৎ প্রথমে। রাচনার সঙ্গে তো তোমার পরিচয় হলোই মাত্র কিছুদিন আগে।’
‘জি।’ ইতস্তত করে বলল সে।
‘তাহলে? এতো অল্প সময়ের পরিচয়ে কাউকে বিয়ে করতে চাওয়াটা কতখানি লজিক্যাল আমি বুঝতে পারছি না।’
অর্ণব চুপ করে রইল।
‘তোমার কি মনে হয় না—আর একটু সময় নেয়া দরকার? আগে ওকে চেনো-জানো। ওর একটা অতীত আছে…’
‘আমি জানি!’ অর্ণবের কণ্ঠে স্পষ্ট বিরক্ত বোঝা গেল। সে এই অতীত বিষয়টা নিয়ে আর ঘাটাতে চায় না—ওর রুচিতে খুব বাঁধছে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাহবুব সাহেব বললেন, ‘It’s gonna be a challenging task for you, hope you realize that. I don’t know, how much you really know about her, but…’
অর্ণব মাহবুবকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল, ‘I know. You don’t have to tell me that… আর একটা ব্যাপার, আপনি হয়ত জানেন না যে, গ্রিনকার্ড কিংবা লিগ্যাল স্ট্যাটাসের কোনো প্রয়োজন আমার নেই। আমি গ্রিনকার্ড নিয়েই এদেশে এসেছি।’
‘না না আমি কিন্তু ঠিক সেটা বলতে চাই নি।’
অর্ণবের হঠাৎ কী হলো কে জানে। সে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমি আসি মাহবুব ভাই।’ বলেই সে দ্রুত বের হয়ে গেল।
মাহবুব আর কিছু বললেন না। অর্ণব চলে যাওয়ার পর তিনি বেশ খানিকটা চিন্তায় পড়ে গেলেন। অল্প সময়ের পরিচয়ে অর্ণবকে তার বেশ ভালো লেগেছে। সে যদি রাচনাকে পছন্দ করে থাকে তাতে দোষের কিছু নেই। আর রাচনাই বা কতদিন একা থাকবে। বয়স বেড়ে যাচ্ছে। স্টিভের সঙ্গে সেপারেশন হয়ে গেছে সেই কবেই। তবে রাচনা যে প্রকৃতির মেয়ে—তার মনের অবস্থা বোঝা সবচেয়ে কঠিন কাজ। সবকিছু নির্ভর করছে তার ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর। মাহবুব তার ছোট বোনকে চেনে। তিনি মনে মনে বললেন, গুড লাক অর্ণব!
…
‘আমি তোমাকে একটা জরুরি কথা বলতে চাই রাচনা।‘
কথাটা বলেই অর্ণব তাকাল তাকাল রাচনার দিকে। রাচনা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে ছিল লেকের মধ্যে ছড়িয়ে থাকা বিভিন্ন রঙের লিলি প্যাডস-এর দিকে। লাল-নীল-সাদা পদ্মফুল ফুটে আছে পুরোটা লেক জুড়ে।
কাল রাতে অর্ণব রাচনাকে বলেছিল, আজ বিকেলে তাকে লিলি প্যাডস দেখাতে নিয়ে আসবে। ডালাসের বিখ্যাত হাইল্যান্ড পার্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত অন্যতম রোমান্টিক এবং এলিগ্যান্ট একটি পার্ক—যার নাম লেকসাইড পার্ক। এই পার্কের বৈশিষ্ট্য, এখানকার লেকটিতে ফুটে থাকে শ’য়ে শ’য়ে বিভিন্ন রঙের পদ্মফুল। স্থানীয়রা বলে লিলি প্যাডস।
রাচনা ঘুরে তাকাল অর্ণবের দিকে। ‘আমাকে আবার কী জরুরি কথা?’ উত্তরের অপেক্ষা না করে সে আবার ঘুরে তাকাল লেকের পানিতে ভাসমান লিলি প্যাডস এর দিকে।
অর্ণব আবার বলল, ‘তুমি চুপ করে শুনবে। দয়া করে রাগ করবে না। এবং কথাগুলো আমার দিকে তাকিয়ে শুনবে।’
অর্ণবের কথার ধরণে রাচনা একটু অবাক হলো। সে বলল, ‘এমন কী কথা যে রাগ করার প্রশ্ন আসে?’
অর্ণব চুপ করে রইল। কীভাবে কথাটা বলবে মনে মনে তাই ভাবছে সে।
‘এমন কী কথা যে রাগ করার প্রশ্ন আসে?’ রাচনা একই কথা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘আমি তোমাকে খুব পছন্দ করি।’
‘এটা তো রাগ করার মতো কোনো কথা হলো না অর্ণব। আমিও তোমাকে পছন্দ করি।’
‘আমি সত্যি সত্যিই তোমাকে ভালোবেসে ফেলেছি রাচনা। আমার কী মনে হয় জানো?’
রাচনা কথা না বলে তাকিয়ে আছে অর্ণবের মুখের দিকে—শোনার জন্যে সে কী বলতে চায়।
‘তোমাকে পাওয়ার জন্যই বোধহয় আমি এতোগুলো বছর অপেক্ষা করেছি। তোমার ভালোবাসা পেলে এ জীবনে আমি আর কিছুই চাই না।’
‘তোমার কী হয়েছে অর্ণব? আর ইউ ওকে?’ অবাক হয়ে বলল রাচনা।
‘ইয়েস আই’ম ফাইন—আই’ম ভেরি মাচ ফাইন। এবার তোমাকে আমি একটা ভয়াবহ কথা বলব।’
‘আমার তো ধারণা সেই ভয়াবহ কথা তুমি অলরেডি বলে ফেলেছ।’
‘না, বলি নি। এখন বলব।’ একটু থেমে অর্ণব বলল, ‘রাচনা, আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই।’
হঠাৎ করেই চারিদিক নিশ্চুপ হয়ে গেল। রাচনা কিছুক্ষণ ঝিম ধরে বসে রইল। অর্ণব এসব কী বলছে—সে কিছুই বুঝতে পারছে না। রাচনা গভীর দৃষ্টি নিয়ে তাকাল অর্ণবের দিকে তারপর যথাসম্ভব ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘কিন্তু সেটা তো সম্ভব নয় অর্ণব।’
‘নয় কেন, কেন নয়?’
‘তুমি তো আমার সব কথা জানো না। তোমাকে আমার সব কথা বলা হয় নি।’
‘আর কী জানার আছে? তাছাড়া, তোমার জীবনে যা কিছু ঘটেছে, তার জন্য তো তুমি দায়ী নও। তাহলে তুমি কেন নিজের জীবনকে এভাবে বঞ্চিত করবে?’
‘অর্ণব, প্লিজ তুমি আমার সব কথা আগে শোনো…’
‘না, আমি আর কিছুই শুনতে চাই না, জানতেও চাই না।’
রাচনা বাকরুদ্ধ হয়ে বসে আছে। সে আর কিছুই বলতে পারল না। একটা দীর্ঘ নীরবতার পর অর্ণব বলল, ‘কিছু একটা বলো রাচনা। আমি তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই।’
‘বুঝতে পারছি না, কী বলব। তুমি আমার মাথা এলোমেলো করে দিয়েছ।’আর কিছু না বলে সে চুপ করে রইল।
অর্ণব তাকিয়ে আছে রাচনার মুখের দিকে।
‘তুমি কাল এসো একবার, তোমার সাথে আমি কাল কথা বলব।’ রাচনা উঠে দাঁড়াল। ‘আমি এখন যাব।’ বলেই সে দ্রুত হেঁটে চলে গেল।
…
রাতে ঘুমানোর আগে মাহবুব খানের অভ্যাস বিছানায় পা লম্বা করে এলিয়ে দিয়ে কোলের উপর একটা বালিশ রেখে তার উপর ল্যাপটপ খুলে ই-মেইল চেক করা। তিনি তাই করছিলেন। মাস্টার বেডরুমের ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে লীনা চুল আঁচড়ে নিচ্ছেন—ঘুমানোর পূর্ব প্রস্তুতি। বিছানার যে পাশটাতে মাহবুব বসে আছেন সেখান থেকে লীনার মুখটা দেখা যাচ্ছে আয়নার ভেতর দিয়ে। সে আয়নার দিকে তাকিয়ে লীনার উদ্দেশ্যে বললন, ‘আচ্ছা, রাচনাকে তো তুমি মাঝে মধ্যে বোঝাতে পারো। এভাবে একা একা আর কতদিন? বয়স তো আর থেমে থাকছে না।’
‘কত ছেলের কথাই তো ওকে বললাম। কাউকেই তার পছন্দ না। সবাই নাকি গ্রিনকার্ডের জন্যে বিয়ে করতে চায়। এটা কোনো কথা? আর গ্রিনকার্ডের জন্যে কেউ যদি ওকে বিয়ে করতে চায়ই, তাহলে সমস্যাটা কোথায়? এমন তো না যে সে ধোয়া তুলসী পাতা।’
লীনার এভাবে কথা বলার ধরণটা মাহবুবের পছন্দ হলো না। কিন্তু তিনি কিছু বললেন না।
লীনা আবারো বলল, ‘নিজের কথাটাও একটু ভেবে দেখা দরকার, নিজে যদি স্পটলেস হতো তাহলে না হয় একটা কথা ছিল। যার নিজের একটা পাস্ট আছে তার এতো অহংকার মানায় না।’
‘আমাদের সবার জীবনেই কিছু না কিছু পাস্ট আছে, থাকবে—সেটাকে বর্তমানে টেনে এনে ফিউচারের কথা ভাবা যাবে না, এমন তো কোন কথা নেই।’
‘কি বলতে চাও, সরাসরি বলো?’ লীনার নিজের জীবনেও একটা পাস্ট আছে। মাহবুবের কথাটা তাই স্পষ্টতই তার গায়ে লাগল। সে চুল আঁচড়ানো বন্ধ করে ঘুরে তাকাল মাহবুবের দিকে।
মাহবুব প্রসঙ্গ বদলে দিয়ে বললেন, ‘অর্ণব এসেছিল আমার অফিসে।’
‘কেন?’
‘ও রাচনাকে বিয়ে করতে চায়।’ খুব খুশি মনেই কথাটি বললেন মাহবুব সাহেব।
‘অর্ণব রাচনাকে বিয়ে করতে চায়? ও রাচনার সম্পর্কে সবকিছু জানে?’
‘বললো তো সব জানে এবং জেনেশুনেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’
‘সব জানে? তাহলে তো ভালই!’
লীনার ভঙ্গিটা মাহবুবের ভালো লাগল না। তিনি বললেন, ‘ওদের বিয়ে হলে তুমি খুশি হবে না?’
লীনা দু’পা এগিয়ে এলো মাহবুবের সামনে এবং অনেকটা উত্তেজিত হয়েই বলল, ‘আমার খুশি অখুশির প্রশ্ন আসছে কেন মাহবুব? যার খুশি হবার সে হলেই হলো। আমাদের কথা যদি সেদিন শুনত, তাহলে তো আর…’
মাহবুব বুঝতে পারল লীনা কী বলতে চায়। তিনি বললেন, ‘দেখো লীনা, মানুষের জীবনে অনেক ধরণের ঘটনা ঘটে। এদেশটা হচ্ছে মিক্সড কালচারের দেশ। এখানে ভিন্ন কালচারের ছেলেমেয়েদের মধ্যে বন্ধুত্ব, প্রেম- ভালবাসা, বিয়ে এখন আর নতুন কোনো বিষয় নয়। এটাকে এত বড় করে দেখার কিছু নেই।’
‘সেটাতো বলবেই।’ চোখ ঘুরিয়ে লীনা ফিরে গেল আয়নার সামনে। আয়নার ভিতর দিয়ে মাহবুবের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘রাচনার যদি কাউকে ভালো লাগে, বিয়ে সে করতেই পারে। তবে ওর উচিত হবে তাকে সবকিছু খুলে বলা।’
মাথা ঝাঁকিয়ে মাহবুব সাহেব চিন্তিত মনে ল্যাপটপে ডুবে গেলেন।
…
অর্ণবকে নিয়ে রাচনা এসেছে একটা আবাসিক এলাকার রিক্রিয়েশন সেন্টার এবং পার্কে। সেখানে অনেক বাচ্চারা খেলছে—বিভিন্ন বয়সের। কেউ স্লাইডিং করছে, কেউ দোলনায় ঝুলছে, কেউ লুকোচুরি খেলছে, কেউ বালুর মধ্যে ঘর-বাড়ি বানাচ্ছে। বাচ্চাদের সাথে তাদের বাবা-মায়েরাও খেলছে কেউ কেউ। কেউ কেউ দুর থেকে তাদের বাচ্চাদের উপর লক্ষ্য রাখছে—যেন কেউ পড়ে গেলে কিংবা সমস্যা হলে দৌড়ে গিয়ে সাহায্য করতে পারে।
পার্ক সংলগ্ন পার্কিং-এ অর্ণব গাড়ি থামাতেই রাচনা নেমে এগিয়ে গেল প্লে-গ্রাউন্ডের দিকে।
অর্ণব গাড়িতে বসে বসে ভাবছে রাচনা আজ হঠাৎ করে তাকে এখানে নিয়ে এসেছে কেন? সে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। আসার পথে একবার জিজ্ঞেস করেছিল অর্ণব, আমরা কোথায় যাচ্ছি। রাচনা বলছিল, গেলেই দেখতে পাবে। কিছুটা হেঁয়ালি ভাব ছিল রাচনার কথার মধ্যে। কোনো সারপ্রাইজও হতে পারে। এই ভেবে অর্ণব আর কিছু জানতে চায়নি—চুপচাপ গাড়িয়ে চালিয়ে চলে এসেছে। এসব ভাবতে ভাবতেই অর্ণব দেখল বার্বি ডলের মতো একটা বাচ্চা মেয়ে দৌড়ে আসছে রাচনার দিকে। অবাক হয়ে অর্ণব গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে গেল এবং দেখতে পেল বাচ্চা মেয়েটি রাচনাকে জড়িয়ে ধরে বলছে, ‘Mommy!’
অর্ণব মেয়েটির দিকে তাকিয়ে রইল ঘোর লাগা চোখে।
সেই কফি শপ (পর্ব-৬)
রাচনা আশ্চর্য রকমের শীতল কিন্তু অত্যন্ত কঠিন স্বরে জিজ্ঞেস করল, ‘What’s going on, Steve?’
স্টিভের মুখে কোন কথা নেই।
‘I can’t believe this is happening. For how long this has been going on?’
স্টিভ নিরুত্তর।
‘How long have you been cheating on me?
স্টিভ এবারো কোনো উত্তর দিল না।
এবার রাচনার কণ্ঠে আগুন ঝরে পড়ল। সে চিৎকার করে বলল, ‘Answer me Steve?’
‘Listen, Rasna… calm down, let me explain.’ স্টিভ রাচনার হাত ধরার চেষ্টা করল।
রাচনা এক পা পিছিয়ে সরে গিয়ে বলল, ‘Explain what? I’ve seen, what there’s to see. No need of any explanation. This is it…’
‘No, this is not it… you gotta listen to me Rasna…’
স্টিভ মরিয়া হয়ে রাচনার হাত ধরার চেষ্টা করল। রাচনা কিছুতেই স্টিভকে তার হাত ধরতে দিল না। এক পর্যায়ে স্টিভ জোর করে রাচনার হাত ধরল এবং সজোরে চাপ দিতে থাকল। রাচনার মাথায় আগুন উঠে গেল। সে স্টিভের হাতে একটা কামড় বসিয়ে দিল।
স্টিভ ব্যথায় ককিয়ে উঠল। এবং তৎক্ষণাৎ সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল রাচনার গালে।
রাচনা মুখে হাত দিয়ে পিছিয়ে গেল এক পা এবং অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল স্টিভের মুখের দিকে।
এক মুহূর্তের মধ্যেই স্টিভ বুঝে গেল কী ভুল সে করেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমা চাইল রাচনার কাছে। ‘Oh my God! What did I do? I’m so sorry Rasna. Please forgive me. I’m really sorry. I didn’t mean to…’
রাচনা এখনো সেই একই দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে স্টিভের দিকে।
স্টিভ নিজের কাছেই যেন বলল, ‘Oh shit.. I’m in big trouble.’
রাচনার চোখে মুখে ঘৃণা ঝরে পড়ছে। খুব ধীরে ধীরে এক পা এক পা করে পিছিয়ে গেল সে—স্টিভের দিক থেকে চোখের পলক না সরিয়েই।
স্টিভ বুঝতে পারল ঘটনা অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। সে বলল, ‘No… please don’t go. Please!!!’
দরজা খুলে বের হয়ে এলো রাচনা। স্টিভের মুখের উপর সজোরে দরজা বন্ধ করে দ্রুত নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে।
স্টিভ দ্রুত বের হয়ে এলো পিছে পিছে—দেখল রাচনা সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে নেমে যাচ্ছে। সে অনুনয় মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, ‘Rasna, please stop… don’t go. Please give me a chance!’
রাচনা ততক্ষণে নিচে নেমে গেছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে মুহূর্তের মধ্যে সে তার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে চলে গেল আবাসিক এলাকার গেট পেড়িয়ে।
স্টিভ বোকার মত তাকিয়ে রইল রাচনার গমন পথের দিকে।
…
দীর্ঘ নীরবতা।
অর্ণব তাকিয়ে আছে রাচনার মুখের দিকে। তার চাহনিতেই বলে দেয় সে জানতে চাইছে তারপর কী হলো?
রাচনা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এরপর যা হবার তাই হলো। আমরা আলাদা হয়ে গেলাম।’
একটু থেমে রাচনা আবার বলল, ‘আমার এখনো বিশ্বাস হয় না। ভেবেছিলাম আমেরিকান বর্ন একটা ছেলে—অন্তত একটা মেয়েকে কিভাবে রেসপেক্ট করতে হয় জানে। কিন্তু আমার ধারনা ভুল ছিল।’
অর্ণব আবার তাকাল উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে।
রাচনা বলল, ‘আসলে সাদা, কালো, বাদামী এগুলো কোন বিষয় নয়। এদের আউটার লুকটাই শুধু আলাদা—ভেতরে সবাই এক। একই রক্ত-মাংসের মানুষ।’
এরপরে রাচনা আর কোনো কথা বলল না। হঠাৎই যেন চুপ করে গেল।
অর্ণবও আর কিছু বলল না। আসলে এরপর আর কোনো কিছু জানতে চাওয়াটা বাড়াবাড়ি হয়ে যায়। একদিনে যথেষ্ট জানা হয়েছে। এদিকে সময় গড়িয়ে সন্ধ্যে হয়েছে অনেক আগেই।
অর্ণব বলল, ‘চলো ফেরা যাক।’
‘হুম, চলো।’
তারা ফিরে গেল তাদের নীড়ে।
…
সেদিনের পর থেকে রাচনাকে নিয়ে অর্ণব ভেবেছে। মেয়েটার জীবনে এমন একটা দুঃখজনক অধ্যায় আছে সেটা জানার পর থেকে রাচনার প্রতি একধরনের সহানুভূতি অনুভব করতে লাগল সে। অর্ণব হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল, রাচনাকে একটা সারপ্রাইজ দিয়ে তার মনটাকে ভালো করে দেয়া যায়। রাচনার সৌন্দর্য, মাধুর্য এবং সরলতা অর্ণবকে খুব টানছে। একটু একটু করে মেয়েটিকে তার ভালো লাগা শুরু হয়েছে। মেয়েটির প্রতি একটা অন্যরকম টান অনুভব করছে সে। একদিন সন্ধ্যায় সে ফোন করল রাচনাকে।
ওপাশ থেকে ফোন ধরতেই অর্ণব বলল, ‘আমি।’
‘কি ব্যাপার অর্ণব?’ রাচনা হেসে জিজ্ঞেস করল।
‘আমার এখানে একটু আসতে পারবে?’
‘এখন?’
‘হ্যাঁ।’
‘জরুরী কিছু?’
‘কেন, জরুরী কিছু না হলে বুঝি আসা যাবে না?’
‘না না, তা হবে কেন?’
‘তা হলে এসো।’
‘মাত্র তো কাজ থেকে এলাম। একটু ফ্রেশ হয়ে আসি। গিভ মি লাইক থার্টি মিনিটস।’
‘ওকে।’
ফোন রেখে দিয়ে রাচনা দ্রুত তৈরি হয়ে নিল। কিছুক্ষণ আগে গোসল করাতে চুল এখনো ভেজা। হেয়ার ড্রাইয়ার দিয়ে চুল তাড়াতাড়ি শুকিয়ে নিল যতটুকু সম্ভব। রাচনার চুল কিছুটা কোঁকড়ানো—সে চুল না বেঁধে ছেড়ে দিল ঘাড়ের দুপাশে। অনেকদিন হলো রাচনা সেই অর্থে সাজগোজ করে না বললেই চলে। আজ একটু করল। সুন্দর গোলাপী রঙের একটা লং-স্কার্টের সঙ্গে হালকা মেকআপ দিল। গলায় একটা সুন্দর হার পড়ল। কপালে যত্ন করে একটা টিপ দিল। স্কার্টের সঙ্গে মিলিয়ে হালকা গোলাপী রঙের লিপস্টিক দিল ঠোঁটে। একবার আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখল নিজেকে। এবং নিজেই খানিকটা মুগ্ধ হয়ে গেল। বাহ, বেশ সুন্দর লাগছে তো?
সবশেষে রাচনা তার প্রিয় জুসি কুটর ফারফিউম সারা শরীরে স্প্রে করে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
দরজায় টোকা দিতেই অর্ণব দরজা খুলে দিল।
রাচনা অবাক হলো—মনে হচ্ছে অর্ণব বুঝি দরজা ধরেই দাঁড়িয়ে ছিল। রাচনাকে দেখে অর্ণবের হাসি বিস্তৃত হলো। সে হাসি মুখেই বলল, ‘এসো।’
অর্ণব দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে রাচনাকে ঢুকতে দিল। রাচনা ভিতরে ঢুকেই বলল, ‘এলাম। এবার বলো কী ব্যাপার?’
ঘরে ঢুকতেই অর্ণবের বাসার ডাইনিং এরিয়ায় চোখ পড়ল রাচনার। সে লক্ষ করল হরেক রকমের আইটেম দিয়ে টেবিল সাজানো—একেবারে দেশি রান্না। টেবিলটা সুন্দর করে সাজানো। মোমবাতি জ্বলছে কয়েকটা মোমদানিতে। এক তোরা গোলাপ সাথে অন্যান্য ফুলের মিশ্রণে ফুলদানিতে ফুল সাজানো। সারা বাসায় আধো আলো আধো ছায়ায় একটা মায়াবী পরিবেশ তৈরী হয়ে আছে। ইংরেজিতে যাকে বলে রোমান্টিক ক্যান্ডেলাইট ডিনার! রাচনা অভিভূত হয়ে পড়ল। সে কিছু বলার আগেই অর্ণব তার হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘ক্যান উই হ্যাভ ডিনার টুগেদার, প্লিজ!’
রাচনা মুখে হাত দিয়ে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল, ‘Oh my God! What a pleasant surprise. I can’t believe this. It’s so romantic!’
অর্ণব খুশি হলো।
‘এসব তুমি আমার জন্যে করেছো?’
অর্ণব হাসল। তার হাসির মধ্যেই উত্তর আছে আর সেটা হলো, অবশ্যই তোমার জন্যে রাচনা!
রাচনা বলল, ‘হাউ সুইট।’
রাচনা আবার সব খাবার আইটেম গুলো পরখ করে দেখল। অর্ণব একটা চেয়ার টেনে রাচনাকে বসতে দিল। রাচনা বসতেই তার প্লেটে খাবার তুলে দিল। রাচনা যার পর নাই খুশি এবং একই সাথে যথেষ্ট অবাকও হলো। অর্ণবের এমন আতিথিয়েতায় রাচনা সত্যিই অভিভূত। সে মহা উদ্যমে খাওয়ার জন্যে বসে পড়ল।
‘তোমার ভালো লাগবে কিনা জানিনা, বাট আই ট্রাইড মাই বেস্ট।’
‘যে সুন্দর করে সাজিয়েছ, আমার তো অনেক ভালো লাগছে।’
‘আমি রান্নার কথা বলেছি।’
‘ও আচ্ছা, খেয়ে দেখি।’
রাচনা প্রতিটা আইটেম টেস্ট করে বলল, ‘রান্নাও বেশ মজা হয়েছে। তুমি দেশে থাকতে রান্না করতে?’
‘কক্ষনো না। গ্রামে থাকতে তো প্রশ্নই আসে না—আর ঢাকায় থাকতাম হলে। রান্নার সুযোগ কোথায়? এখানে বাধ্য হয়ে করি। তাছাড়া, এখানকার ফাস্ট ফুডে আমি অভ্যস্তই নই। আর প্রতিদিন রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাবার মত বিলাসিতাও আমার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই একটু আধটু রান্নার অভ্যাস করেছি।’
‘ভালো করেছো। এখানকার বাইরের খাবার খেতে আমারও ভালো লাগে না। আবার রান্না করতেও আমার ভালো লাগে না। বাট আই মাস্ট এগ্রি, তোমার রান্না খেলে যে কোন মেয়েই তোমার প্রেমে পড়ে যাবে।’
অর্ণব হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘তাই, যে কোন মেয়ে আমার প্রেমে পড়ে যাবে?’
‘আমার তো তাই ধারণা।’
‘তুমি পড়বে?’ বলে রাচনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল অর্ণব।
রাচনাও তাকাল অর্ণবের দিকে। বোঝার চেষ্টা করল অর্ণবের কথায় কতটা দুষ্টুমি আর কতটা সত্যতা মিশে আছে। চেহারা দেখে অবশ্য কিছু বোঝা গেল না। রাচনা হেসে দিয়ে বলল, ‘পড়তেও তো পারি। মানুষ হিসেবে তো তোমাকে ভালোই মনে হচ্ছে। দেখতেও খারাপ না। হান্ডসাম, কেয়ারিং, ফ্রেন্ডলি—তার উপর এখন দেখছি ভালো রান্নাও করো। দ্যাটস অলওয়েজ এ প্লাস!’
‘শুনতে কিন্তু ভালোই লাগছে।’
রাচনা শব্দ করে হেসে উঠল। এবং সে হাসতেই থাকল। এই মুহূর্তে হাসির এমন কী ঘটল তা অবশ্য বোঝা গেল না। অর্ণবের ভীষণ ভালো লাগল রাচনাকে এভাবে উচ্চস্বরে হাসতে দেখে। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল রাচনার দিকে।
রাচনা হঠাৎ লক্ষ্য করল এবং ইশারায় ভ্রূ কুঁচকে চাইল প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে।
মাথা নেড়ে অর্ণব বোঝাল না কিছু না। একটু চুপ করে থেকে সে বলল, ‘এভাবে হাসতে পারো না? তুমি কি জানো, হাসলে তোমাকে অনেক সুন্দর লাগে? সারাক্ষণ এতো গম্ভীর হয়ে থাকো কেন বলতো?’
রাচনা অবশ্য কিছু বলল না। চুপচাপ খাওয়া শেষ করল। অর্ণব তার প্লেটখানি নিয়ে বেসিনে রেখে দিল। তারপর সেখান থেকেই রাচনাকে জিজ্ঞেস করল, ‘কফি খাবে?’
‘এখন? না বাবা, এতো রাতে কফি খেলে আমি সারারাত ঘুমাতেই পারব না।’
‘একটা রাত না হয় না ঘুমলে… ভালই হবে গল্প করা যাবে।’
‘উহু—তার কোন সম্ভাবনা নেই।’
‘ঠিক আছে তুমি বসো, আমি আমার জন্য এক কাপ কফি নিয়ে আসি।’
রাচনা উঠে এসে সোফায় বসল। সেখান থেকেই অর্ণবের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা তুমি বিয়ে করনি কেন? তোমার মত একটা অলরাউন্ডার ছেলের বিয়ে হয়নি, ভাবাই যায় না।’
অর্ণব কোনো জবাব দিল না। সে তার কফি নিয়ে এসে বসল রাচনার সামনে। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘পৃথিবীতে কিছু মানুষের জন্মই হয় শুধু যুদ্ধ করার জন্য। আমি তাদেরই একজন। জীবন যুদ্ধে প্রথম সারির একজন সৈনিক বলতে পারো। আমার জীবনটা অনেকটা প্যালেস্টাইনদের মতো। জন্মের পর থেকেই যারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য শুধু যুদ্ধ করেই যাচ্ছে। স্বাধীনতা বলে ওদের কিছু নেই।’
‘এখন তো তুমি আমেরিকায়। এখানে চাইলেই তুমি তোমার মতো স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারো।’
‘না, পারিনা। চাইলেই আমরা অনেক কিছুই করতে পারিনা, রাচনা। করা উচিতও নয়।’
‘উচিৎ নয় কেন?’
অর্ণব কিছুক্ষণ ভাবল। কিন্তু রাচনার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বলল, ‘বাদ দাও আমার কথা। তুমি কেন বিয়ে করলে না? স্টিভের সাথে ডিভোর্সের পরে ছয়টি বছর কাটিয়ে দিলে—একা। ছয় বছরতো আর কম সময় না। একা একা খারাপ লাগে না?’
‘খারাপ তো লাগেই। একা জীবন কার ভালো লাগে।’
‘তাহলে?’
‘স্বার্থপর কারো সাথে নিজেকে জড়ানোর চেয়ে একা থাকাই ভালো।’
‘মানে?’
‘আমাকে একা দেখে অনেকেই আসে, কথা বলতে চায়, ভালোবাসতো চায়। ব্যস, ঐ পর্যন্তই। বেশিরভাগই আসে গ্রিনকার্ডের লোভে।’
‘আর যাদের সে লোভ নেই?’
রাচনা তাকাল অর্ণবের দিকে, কিন্তু কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল।
‘কাউকে দেখে একেবারও মনে হয়নি যাকে আবার জীবন সঙ্গি হিসেবে বেছে নেয়া যায়?’
‘মনে করার সময় পাইনি। আমিও যে তোমার মতই যুদ্ধ করে যাচ্ছি অর্ণব।’
এরপর আর কোনো কথা বলল না কেউ। অর্ণব তার কফিতে চুমুক দিয়ে ভাবছিল কিছু কথা। হঠাৎ রাচনা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অনেক রাত হয়েছে। থ্যাংকস ফর সাচ এ ওয়ান্ডারফুল সারপ্রাইজ। তোমার সাথে সময়টা বেশ ভালোই কাটল অর্ণব।’
‘আমারও।‘
‘যেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘তবে থাকো না আর একটু—কেউ তো জোর করে তাড়িয়ে দিচ্ছে না।’
‘না থাক, আজ যাই।’ বলেই রাচনা উঠে দাঁড়াল।
‘ঠিক আছে।’
রাচনাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল অর্ণব। রাচনা বিদায় নিয়ে কয়েক পা এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে অর্ণব ডাকল, ‘রাচনা।’
রাচনা ঘুরে দাঁড়াল এবং তাকাল অবাক হয়ে।
অর্ণব কিছু বলতে চাইছে। কিন্তু কিছুতেই বলতে পারছে না।
রাচনা তাকিয়েই আছে।
শেষ পর্যন্ত ইতস্তত করে বলেই ফেলল অর্ণব, ‘আই থিংক, আই’ম ইন লাভ উইথ ইউ!’
রাচনা কিছুই বলল না। তার চেহারায় কোনো পরিবর্তন হলো কিনা কিছুই বোঝা গেল না। এক মুহূর্ত অপেক্ষা করে সে বলল, ‘গুড নাইট অর্ণব।’
যথাসম্ভব দ্রুত পা ফেলে রাচনা পার হয়ে গেল লম্বা করিডোর তারপর নেমে গেল সিঁড়ি বেয়ে।
সেই কফি শপ (পর্ব-৫)
রোদ চলে গেছে।
বিকেলের ঝিরিঝিরি বাতাসে রাচনার চুল উড়ছে। সে মুখের ওপর থেকে চুলগুলি সরিয়ে হাঁটা শুরু করল। অর্ণবও উঠে দাঁড়াল। সেও হাঁটছে রাচনার পাশাপাশি। হাঁটতে হাটতেই রাচনা বলল, ‘ভাইয়া আর ভাবীর অমতে স্টিভকে আমি বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু বিয়েটা টিকল না। স্টিভের সঙ্গে আমার ব্রেকআপ হবার পর ভাইয়ার ওখানে ফিরে যাওয়াটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর কোন মুখেই বা যাব বলো?’
অর্ণব কিছুটা ইতস্তত করে বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস না করে পারছি না। জানি এটা তোমার একান্তই ব্যক্তিগত—তবুও জানতে চাইছি।’
‘তুমি তো একটার পর একটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেই যাচ্ছ।’ রাচনা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা বলো, কী জানতে চাও?’
‘ভেরি সিম্পল। স্টিভ এর সঙ্গে তোমার ব্রেকআপটা কেন হলো?’
‘এই বিষয়টা নিয়ে আমার কথা বলতে একদমই ইচ্ছে করে না। আমি আমার অতীতটা ভুলে যেতে চাই।’
‘ভুলে যেতে চাইলেই তো আর সবকিছু ভুলে যাওয়া যায় না, রাচনা। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আর যদি বন্ধু ভাবো, বুকের মধ্যে কষ্টগুলো জমিয়ে না রেখে—শেয়ার করো, দেখবে জীবনটা এত ভারী নয়—যতটা এখন মনে হচ্ছে।’
রাচনা অর্ণবের মুখের দিকে তাকাল। অর্ণবের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু বোঝার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে উঠে দাঁড়াল।
ওরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো হারবার পয়েন্টের লাইট-হাউসের কাছে। সেখানে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল রাচনা। পাশে এসে দাঁড়াল অর্ণব। রাচনার কেন যেন মনে হচ্ছে—এই ছেলেটাকে সব কিছু বলা যায়। ওর নিজের বুকটাও কেমন ভার হয়ে থাকে। এত পরিচিত মানুষ চারিপাশে তবুও স্বস্তি নিয়ে দু-একটি কথা বলার একজন মানুষও তার নেই।
শেষ বিকেলের পশ্চিমাকাশে ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা হেলে পড়েছে।
দিগন্ত রেখায় সূর্য হেলে পড়ায় আকাশে পোড়ামাটির মতো বিবর্ণ একরাশ নতুন মেঘ ভেসে উঠেছে—মনে হলো সেগুলো স্থির কিংবা দৃষ্টিসীমার অনেক দূরে বলেই ওগুলোর নড়াচড়া বোঝা যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে হলুদ থেকে লাল হয়ে যাওয়া নির্জীব ও নির্মল সূর্যটার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা দুজন।
রাচনার মনটা কেমন অশান্ত হয়ে গেল। সে একটু স্থির হয়ে আবার কথা শুরু করল—কিন্তু অনেক ধীরে ধীরে।
‘আমি তখন বাংলাদেশ থেকে সবেমাত্র এসেছি। ভাইয়ার বাসায় থেকে পড়াশুনা আর একটা পার্টটাইম জব করতাম। ক্লাস আর কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে ভাবীর সাথে তার গানের প্রোগ্রামে যেতাম।’ এটুকু বলে রাচনা তাকাল অর্ণবের মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘তুমি তো জানোই আমার ভাবী একজন প্রফেশনাল সিংগার। একদিন ভাবী তার একটা মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।’
যদিও লীনা তাকে বলেছিল শুটিং অনেক ঝামেলার—বিরক্তিকর। কিন্তু রাচনার কাছে বিরক্তিকর কিছুই মনে হলো না। তার কাছে বেশ মজার একটা ব্যাপার মনে হলো। কেমন একটা পিকনিক পিকনিক ভাব। সবাই হাতে হাতে করে শুটিং ভ্যান থেকে ক্যামেরা, স্ট্যান্ড, লাইটস, রিফ্লেক্টরস আরো কতো কী যন্ত্রপাতি নামিয়ে আনছে। সবার মধ্যেই একধরণের ব্যস্ততা।
শুধু পরিচালক, প্রযোজক আর তাদের এক বন্ধু বাদে ইউনিটের বাকী সব ক্রু-মেম্বাররাই হয় আমেরিকান না হয় অন্য কোনো দেশের। বাঙালি মাত্র ঐ তিনজন—এবং রাচনা। যদিও সে ইউনিটের কেউ নয়। গেস্ট হিসেবে এসেছে।
রাচনা খুব আগ্রহ নিয়ে শুটিং দেখছে। শুটিং হচ্ছে রকওয়ালের বিখ্যাত হারবার পয়েন্ট সংলগ্ন ফাউন্টেনের পাশে। সিডি প্লেয়ারে লীনার একটি গান বাজছে—সেই গানের সঙ্গে লীনা ঠোট মিলিয়ে গেয়ে যাচ্ছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝর্ণার পানি অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে—তারপর সেই পানি ঝিরিঝিরি বয়ে যাচ্ছে লেকের দিকে। মিশে যাচ্ছে লেক রে-হাবার্ডের পানির সাথে। পাঠক এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এই জায়গাটি রাচনার কেন এত পছন্দের।
সকাল থেকে একটা গানেরই দৃশ্য ধারণ হচ্ছে—বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে। পরিচালক ‘কাট’ বলতেই সবাই ছুটে যাচ্ছে তার কাছে পরের দৃশ্য বুঝে নেবার জন্যে। ইতিমধ্যেই লীনাকে বেশ কয়েকবার কাপড় বদলাতে হলো। প্রতিবার সে চলে যাচ্ছে নিকটস্থ একটা রেস্টুরেন্টে। সেখান থেকে কাপড় বদলে আবার পরিপাটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে ক্যামেরার সামনে। অসীম ধৈর্য নিয়ে একটার পর একটা শট দিয়ে যাচ্ছে সে।
এক পর্যায়ে লাঞ্চ ব্রেক হলো। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল প্যাকেট লাঞ্চ নিয়ে।
রাচনা চুপচাপ বসে বসে সবার কর্মকাণ্ড দেখছে। সে ভাবছে, একটা সামান্য মিউজিক ভিডিও শুটিং করতে এতো আয়োজন তাহলে একটা মুভি বানাতে না জানি কী ঘটনা ঘটে। এসব ভাবতে ভাবতেই সে হঠাৎ লক্ষ্য করল শুটিং ইউনিটের স্টিল ফটোগ্রাফার ছেলেটা দূর থেকে তার ছবি তুলছে। আমেরিকান সাদা—বয়স পঁচিশ থেকে সাতাশ। একমাথা ঝাঁকরা চুল—মুখে দাঁড়ি, সুন্দর করে ছাঁটা।
রাচনা এদিক ওদিক তাকাল। সে নিশ্চিত হবার জন্যে একবার তার পেছনে-ডানে-বামেও তাকাল—দেখল কেউ নেই। এবার সে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেটার সামনে।
‘Excuse me, are you taking my picture?’ রাচনা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘Yea, why?’ ছেলেটি উত্তর দিল।
‘You didn’t ask for my permission!’
‘I know.’ ছেলেটি তাকাল চারিদিকে। তারপর আবার বলল, ‘See this nature, this lake, this sky, all these beautiful creations of God… we don’t ask for permission to take their picture, do we?’
‘What’s that supposed to mean?’
‘Never mind. I’m sorry that I didn’t take your permission, but the truth is, I could not resist myself taking your picture. What can I say?’
ছেলেটির প্রশংসার ধরণ রাচনার ভালো লাগল। সে তেমন আর কিছু বলতে পারল না।
‘By the way, I’m Steve. Nice to meet you.’ স্টিভ হাত বাড়িয়ে দিল রাচনার দিকে।
‘I’m Rachna.’ রাচনাও হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করল।
‘Rasna? What kind of name is that?’ স্টিভ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল।
‘Bengali.’
‘So, you are from Bangladesh too?’
‘Yes.’ রাচনা আঙুল দিয়ে লীনার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘She’s my sister-in-law.’
‘I see!’
স্টিভের সঙ্গে রাচনার পরিচয় আর কথাবার্তার এ পর্যায়ে পরিচালক প্রডাকশন ইউনিটকে ডাকল পরের দৃশ্য বুঝিয়ে দেবার জন্যে।
লীনা তার পরের শটের জন্যে মেকআপ ঠিক করে নিচ্ছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি গেল রাচনা আর স্টিভের দিকে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল দুজনকে। স্টিভ তখন বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে রাচনার ছবি তোলায় ব্যস্ত। লীনা চিন্তিত মুখে নিজের পরিচর্যায় মন দিল।
অর্ণব তাকিয়ে আছে রাচনার মুখের দিকে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাচনা বলল, ‘এভাবেই স্টিভের সাথে আমার পরিচয় হলো। সে প্রায়ই আমাকে ছবি তুলতে নিয়ে যেত বিভিন্ন জায়গায়। সেই থেকে বন্ধুত্ব। তারপর বিয়ে।’
অর্ণব একবার কিছু বলতে চেয়েও বলল না। দেখল রাচনা কেমন এক ঘোরলাগা মানুষের মতো কথা বলছে। সে আবার বলল, ‘পরিচয়ের পর থেকেই ওর ভালবাসা আর কেয়ারিং আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, মাঝে মাঝে আমার মনে হতো একটা অ্যামেরিকান ছেলেকে বিয়ে করে আমি কোনো ভুল করিনি।’
রাচনা থেমে গেল। মনে হলো সে আর কী বলবে—সেই কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। অনেকক্ষণ কোনো কিছু আর বলছে না দেখে অর্ণব আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘তারপর?’
রাচনা ঘুরে তাকাল অর্ণবের দিকে। তারপর আবার তাকাল সামনে। ফিরে গেল পেছনের কথায়। সে বলল, ‘বিয়ের পর আমরা আপটাউনে একটা এপার্টমেন্ট রেন্ট করলাম। গ্রাজুয়েশন শেষ করে তখন আমি নতুন কাজে জয়েন করেছি। কাজের ব্যস্ততা আর স্টিভের প্রেমে আমি এতটাই ডুবে ছিলাম যে, বুঝতেই পারিনি আমার এবসেন্সে আমার সুন্দর সাজানো ঘরটাতে আরেকজন মানুষের নিয়মিত আসা যাওয়া হয়।’
অর্ণব তাকাল রাচনা মুখের দিকে। কোনো প্রশ্ন করল না—কিন্তু উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে থাকল তারপর কী হলো জানার জন্যে।
রাচনা বলল, ‘এরমধ্যে কাজে একদিন হঠাৎ করে প্রচণ্ড সিক ফিল করি। আমি ম্যানেজারকে বলে আমার ডাক্তারের কাছে চলে যাই।’
দুর্বল শরীর নিয়েই রাচনা ডাক্তারের অফিসে গেল। ডাক্তার তার প্রাথমিক চেকআপ শেষ করার পর কিছু টেস্ট করতে দিল। রেজাল্ট আসা পর্যন্ত রাচনার কিছু করার নেই। সে বসে আছে চুপচাপ—অপেক্ষা করছে আর মনে মনে উইশ করছে যেন ভালো কিছু হয়। তার অপেক্ষার সময় যেন কাটতেই চাচ্ছে না। সে একবার ফোন বের করে স্টিভের নাম্বারে চাপ দিতে গিয়েও দিল না। ফোন বন্ধ করে বসে রইল। এক ধরণের অস্থিরতা তাকে পেয়ে বসল।
কিছুক্ষণ পর ল্যাব থেকে টেস্ট রেজাল্ট নিয়ে এলো এক টেকনিশিয়ান। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে রাচনাকে যা বলল, সেটি সম্ভবত যে কোনো বিবাহিত নারীর জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত একটি সংবাদ—প্রতিটি বিবাহিত নারীর আরাধ্য স্বপ্ন। আর এই সংবাদটির জন্যই সে অপেক্ষা করছে—করছে কত পরিকল্পনা কত আয়োজন।
রাচনা দ্রুত ডাক্তারের অফিস থেকে বের হয়ে চলে এলো তাদের এপার্টমেন্টে। মনে মনে স্টিভকে একটা সারপ্রাইজ দেবার জন্যে সে অস্থির হয়ে থাকল সারাক্ষণ।
এপার্টমেন্টে ঢুকেই রাচনার কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে লাগল। অস্বস্তিটা কেন ঠিক বুঝতে পারল না। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল—সবকিছু কেমন যেন অগোছালো লাগছে।
লিভিং রুমের টেবিলে দেখল একটা ওয়াইনের বোতল আর দুটো ওয়াইন গ্লাস পড়ে আছে। দুটো প্লেটে আধ-খাওয়া পিজ্জা।
অস্বস্তির সঙ্গে কেমন যেন একটু একটু ভয়ও লাগছে রাচনার। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে আস্তে আস্তে তার বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল এবং ঢুকতে যেয়েই সে বুঝতে পারল ভিতরে কেউ আছে। রাচনা নিঃশব্দে দরজা ধাক্কা দিয়ে যা দেখল তাতে তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো। তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল স্থির হয়ে।
এমন একটি দৃশ্য দেখার জন্য রাচনার শরীর মন কোনটাই প্রস্তুত ছিল না।
একটা আমেরিকান ব্লন্ড গার্ল স্টিভের বাহু-বন্ধনে শুয়ে আছে রাচনার নিজের হাতে সাজানো বিছানায়—সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে।
রাচনার একবার মনে হলো সে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে। মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল। সে দ্রুত সরে গিয়ে বসে পড়ল লিভিং রুমের সোফাতে।
রাচনা নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে সজোরে কেঁদে ফেলল।
এর আগে স্টিভের সঙ্গে তার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে দু’একবার মনোমালিন্য হয়েছে। সময়ে অসময়ে সারাক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলত। এমনকি ঘুমানোর সময়ও। প্রথম দিকে রাচনা খুব একটা গুরুত্ব দিত না। ভাবত পুরনো সম্পর্ক—মাঝে মাঝে একটু কথা বললে কী আর এমন ক্ষতি। তাছাড়া স্টিভ তো আর লুকিয়ে কথা বলছে না। কিন্তু সবকিছুর তো একটা লিমিট থাকে। রাচনা আস্তে আস্তে প্রতিবাদ করা শুরু করল। কিন্তু কোনদিন সে কাঁদেনি। এই মুহূর্তে রাচনা আর নিজেকে সামলাতে পারল না—ফুলে ফুলে উঠছে তার শরীর।
একটা দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল। সমস্ত ঘরটা যেন সহসাই নিশ্চুপ হয়ে গেছে—কোথাও কোনো সারা নেই। হঠাৎ স্টিভ তার জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে বের হয়ে এলো বেডরুম থেকে। তার সঙ্গে ছায়ার মতো ব্লন্ডি গার্ল এসে দ্রুত দরজা খুলে বের হয়ে গেল।
রাচনা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। স্টিভ নার্ভাস ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে কাঁচুমাচু হয়ে। রাচনা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল স্টিভের সামনে—দুজনে মুখোমুখি।
সেই কফি শপ (পর্ব-৪)
অর্ণব বলল, ‘আসলে আমার সম্পর্কে বলার মতো কিছু নেই। আমি খুব সাধারণ মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে অনেকদিন বেকার বসে থাকার পর এক আত্মীয়ের বদৌলতে ভাগ্যগুণে একটা কাজ পেয়েছিলাম। কথা ছিলো, চাকরি পেয়ে ছোট ভাই–বোনদের লেখাপড়ার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে টিউশনি শুরু করলাম। তারপরেও কোনোভাবেই কোনো কিছুই করতে পারছিলাম না। তারপর হঠাৎ একদিন ভাগ্যবানদের খাতায় নাম উঠল। লটারি পেলাম—ডিভি লটারি।’ এটুকু বলে অর্ণব থামল।
রাচনা তাকাল অর্ণবের দিকে।
একটু থেমে অর্ণব বলল, ‘জানো, আমেরিকার ভিসা পেয়ে খুশি হবার বদলে আমার মনটা একেবারেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।’
‘রিয়েলি, কেন?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল রাচনা।
‘বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও চলে যেতে হবে, এ কথা আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবি নি। বাংলা গল্প, উপন্যাস, কবিতা থেকে দূরে থাকতে হবে, আর কখনো বইমেলায় যাওয়া হবে না, এসব কথা ভাবতেই বুকের ভেতর টনটন করছিল প্রথম দিকে। তারপর খেয়াল হলো, ফরিদপুরের একটি অনুন্নত গ্রাম থেকে আমি যখন প্রথম ঢাকায় পড়তে আসি তখনও তো একইরকম কষ্ট হয়েছিল। অনেক স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলাম পড়াশুনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াব বলে। কিন্তু তা আর হলো কই? ছোট তিনটা ভাইয়ের পড়াশুনা আর বোনের বিয়েটা পর্যন্ত আটকে গেল। তাই ভাবলাম আমেরিকায় গিয়ে যদি কিছু করতে পারি—মন্দ কী?’
‘সেটাই তোমার করা উচিত ছিল।’ রাচনা সায় দিয়ে বলল।
‘তাই তো করলাম। কিন্তু স্বপ্নের আমেরিকা বাস্তবে যে কত কঠিন এবং নিষ্ঠুর—কিছুদিনের মধ্যেই তা বুঝে গেলাম। এখানে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্যে প্রতি মুহূর্তে যে লড়াই করতে হয়—সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।’
রাচনা নিবিষ্ট মনে শুনছে অর্ণবের কথা।
‘যেসব ইমোশনাল ব্যাপার হৃদয়কে তৃপ্তি দেয়, অথচ বেঁচে থাকাকে বিপন্ন করে, এখানকার বেশিরভাগ মানুষ তা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে।’
‘বাহ—চমৎকার।’
‘কী?’
‘আমেরিকা সম্পর্কে তোমার রিয়েলাইজেশন।’
‘আমি কি ভুল বললাম?’
‘মোটেও না।’
এরপর বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। চুপচাপ বসে রইল।
নীরবতা ভেঙে অর্ণব বলল, ‘এবার তোমার কথা বলো।’
রাচনা কিছুই বলল না। তাকিয়ে রইল লেকের দিকে। সেখানে ছোট ছোট পাল তোলা নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকেই। একটা ট্যুর বোট নিয়ে দর্শনার্থীদের নিয়ে প্লাটফরম ছেড়ে বের হয়ে গেল। কেউ কেউ ওয়াটার স্কিইং করছে। সূর্য আরো কিছুটা হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। এই পড়ন্ত বিকেলে রাজ্যের অলসতা এসে আঁকড়ে ধরছে যেন তাকে। অবশেষে অলসতা কাঁটিয়ে রাচনা বলল, ‘চলো, ঝর্ণাটা দেখি। অনেকদিন আসা হয় না।’
রাচনা অর্ণবকে নিয়ে সিনেমার্ক সিনেমা হলের সামনে বড় ঝর্ণাটার পাশে এসে বসল। বাতাসে ঝর্ণার পানির ঝাপটা এসে লাগছে গায়ে-মুখে। অন্য কিছুতেই তার খেয়াল নেই। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে ঝর্ণাটির পানির ওঠা-নামা। কেমন বিভোর হয়ে আছে সে। রাচনা কি কিছু মনে করার চেষ্টা করছে? কে জানে?
এক পর্যায়ে অর্ণব বলল, ‘কি, বলবে না?’
‘কী বলব?’
‘কেন তুমি একা থাকো?’
‘আশ্চর্য, মানুষ একা থাকতে পারে না? তুমিও তো একাই থাকো অর্ণব?’
‘আমার কথা তো তোমাকে বললামই।’
‘কেন, এখানকার বাঙালি কমিউনিটির কারো কাছ থেকে কিছু শোনো নি। তারা তো সবার ঘরের খবরই রাখে।’
‘আমি এখানে এখনো নতুন। তাছাড়া অন্যদের কাছ থেকে আমি কেন শুনতে যাব। তেমন হলে নিশ্চয়ই আমি তোমার কাছে জানতে চাইতাম না।’
‘ওয়েল, মাই স্টোরি ইজ নট দ্যাট প্রিটি। তোমার ভালো লাগবে না।’
‘তবুও আমি শুনতে চাই।’
রাচনা চুপ করে রইল। কিছুটা অন্যমনস্ক। সে ফিরে গেল বেশ কয়েক বছর আগে। সেসব কথা সে এখন আর মনে করতে চায় না—তবুও বাস্তবতা তার পিছু ছাড়ে না। কারণে অকারণে সেসব কথা স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে—ফিরে আসে বারবার।
ঘটনাক্রমে একটি আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ ছেলের সঙ্গে রাচনার পরিচয় হয়েছিল। ছেলেটির নাম স্টিভ। বয়স পঁচিশ। রাচনার বয়স তখন মাত্র বাইশ। স্টিভের সাথে পরিচয়ের পর থেকে রাচনার জীবনের এক অন্যতম অধ্যায় শুরু হয়। পরিচয় থেকে প্রেম এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্ত। সেই কথা রাচনা তার ভাই-ভাবীকে জানাতে গেলে শুরু হয় মনোমালিন্য। ভাই-ভাবীর সংসারে থেকে পড়াশুনা এবং কাজ করছিল এতদিন। কাজেই তাদের মতামত জানাটা জরুরী ছিল রাচনার জন্যে।
ফ্ল্যাশব্যাক!
মাহবুব সাহেবের বাসার লিভিং রুমে বসে রয়েছে মাহবুব, লীনা আর রাচনা।
স্টিভকে বিয়ে করতে চাওয়ার ব্যাপারটা তারা কেউ মেনে নিতে পারছিল না। ঘটনার সূত্রপাত সেখান থেকেই। রাচনা যখন বলল সে স্টিভকে বিয়ে করতে চায়, তখন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল তার ভাই-ভাবী।
লীনা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, ‘পেছনের কথা কি সব ভুলে গেলে রাচনা? তোমাকে আমরা এত কষ্ট করে এদেশে এনেছিলাম স্টিভের মতো একটা ছেলেকে বিয়ে করবে বলে? আমেরিকায় কি বাঙালি ছেলের অভাব পড়েছে?’
লীনার মুখের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল রাচনা। ‘কেন, স্টিভকে বিয়ে করলে অসুবিধা কোথায়?’
‘সোসাইটিতে আমাদের একটা ইমেজ আছে। সবাই কী বলবে?’
‘কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?’
‘সমস্যা আছে—তুমি বুঝতে পারছ না।’
‘তোমরা তো শুধু তোমাদের দিকটাই দেখছ। আমার নিজের কোনো ইচ্ছা–অনিচ্ছা থাকতে পারে না? তোমরা তোমাদের ডিসিশন আমার উপর চাপাতে পারো না। আজ তোমাদের সাথে থাকছি বলেই এভাবে বলতে পারছ।’
লীনা তাকাল তার স্বামীর দিকে। ‘দেখেছ?’
মাহবুব সাহেব বললেন, ‘না, না, তা হতে যাবে কেন?’
রাচনা বলল, ‘তাই তো মনে হচ্ছে। তা না হলে… স্টিভ তো কোনো খারাপ ছেলে নয়। হি কেয়ারস এবাউট মি!’
মাহবুব রাচনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে ভুলে গেলে চলবে না কালচারাল এন্ড রিলিজিয়াস ডিফারেন্সটা একটা বড় ব্যাপার—যেটা ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে। সেটা অবশ্য এখন তুমি বুঝবে না। কারণ, একটা সময় আসে যখন সব যুক্তিই অর্থহীন মনে হয়। এটা একধরনের মোহ ছাড়া কিছুই না।’
‘বুঝবে, বুঝবে, ঐ মোহ বেশিদিন থাকবে না। এখন না বুঝলেও যখন সময় হবে, ঠিকই বুঝতে পারবে।’ এবার লীনা তার স্বামীর সাথে তাল মিলিয়ে বলল।
মাহবুব সাহেব এগিয়ে গিয়ে বসলেন রাচনার পাশে। তার অনেক আদরের ছোট বোন—রাচনা। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘তোমার জীবনের যে কোনো সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তোমার আছে। আমরা তোমার উপর জোর করে কোন ডিসিশন চাপিয়ে দিচ্ছি না—আমরা যেটা বলছি শুধু তোমার ভালোর জন্যই বলছি।’
‘ভাইয়া, আমি তোমার কথা মানছি। কিন্তু একটা বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করলেই যে আমি সুখী হবো তারই বা গ্যারান্টি কী?’
লীনা একটু কটাক্ষ করেই বলল, ‘আর আমেরিকান ছেলে বিয়ে করে সুখী হবার গ্যারান্টি বুঝি তুমি পেয়ে গেছো?’
‘তুমিও নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি ভাবী, তোমার বাবা–মাও ভালো জেনেই অন্য একটা বাঙালি ছেলের সাথেই তোমার বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখানে আসার পর যখন জানলে তার একটা স্প্যানিশ বৌ আছে, বাচ্চাও আছে—আর এই কথাটি আগে তোমাকে কেন বলা হয়নি, সেটার প্রতিবাদ করতেই তোমাকে তার ঘর ছাড়তে হলো। কাজেই ঐ বাঙালিত্বের দোহাই আমাকে দিতে এসো না।’
লীনার মুখটা সহসাই অন্ধকার হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি রাচনা এভাবে তার অতীত নিয়ে কথা বলবে।
বলবেনা বলবেনা করেও কথগুলো বলে ফেলল রাচনা। আসলে বলতে বাধ্য হলো। কারো অতীত নিয়ে কথা বলাটা কোনো ভদ্রতার রুচি বহন করে না। সেটা সে জানে। কিন্তু তাকে তার যুক্তি তো দিতে হবে—সে শুধু সেটা বোঝাতে চেয়েছে।
মাহবুব সাহেব তার স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। লীনার মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করলেন। তারপর রাচনাকে বললেন, ‘এসব পেছনের কথা টেনে আনছিস কেন এর মধ্যে?’ একই সঙ্গে তার কণ্ঠে বিরক্তি আর হতাশা প্রকাশ পেল।
‘পেছনের কথা টেনে আনছি না ভাইয়া—একটা একজাম্পল দিচ্ছি।’
লীনাও ছেড়ে দেবার মানুষ নয়। সে আবারো বলল, ‘তার মানে তুমি তোমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না?’
রাচনা সোফা থেকে উঠে লীনার মুখোমুখি দাঁড়াল। তারপর দৃঢ়ভাবে বলল, ‘এটা সিদ্ধান্ত বদলের কোন ব্যাপার নয়। আমি স্টিভকে ভালোবাসি। আই লাভ হিম অ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু ম্যারি হিম—দ্যাট’স ফাইনাল।
এ পর্যায়ে মাহবুব সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন এবং উচ্চস্বরে বললেন, ‘আই’ম টেলিং ইউ, ইউ উইল রিগ্রেট ওয়ান ডে—কিন্তু, সেদিন আর তোমার ফিরে আসার কোনো জায়গা থাকবে না।’ মাহবুব বেশ পরিষ্কারভাবেই কথাটা জানিয়ে দিলেন।
‘তবে তোমরাও শুনে রাখো, আর যাই হোক, আমি অন্তত তোমাদের ঝামেলা হয়ে ফিরে আসবো না।’
মাহবুব সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকালেন লীনার দিকে। এসব কী বলছে রাচনা!
রাচনা তীক্ষ্ণ চোখে একবার মাহবুব আর একবার লীনার মুখের দিকে তাকাল। তারপর গটগট করে বের হয়ে গেল বাসা থেকে।
মাহবুব আর লীনা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল রাচনার গমন পথের দিকে।
এ পর্যন্ত বলে রাচনা চুপ করে রইল।
অর্ণব তাকিয়ে আছে রাচনার মুখের দিকে। তার আগ্রহ আরো বেড়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তারপর?’
সেই কফি শপ (পর্ব-৩)
কফি শপের নাম হোয়াইট রক কফি।
ডালাস ডাউন-টাউন থেকে একটু দূরেই হোয়াইট রক লেকের ধারে এই কফি শপ। লেকের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কফি শপের নামও হোয়াইট রক কফি। এই কফি শপের বিশেষত্ব হলো এখানে কাস্টমাররাই তাদের গানের সরঞ্জাম নিয়ে এসে গান-বাজনা করে। স্টুডেন্টরা বসে হোমওয়ার্ক করে। প্রেমিক-প্রেমিকারা বসে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে। দোতলা কফি শপের পুরোটা জুড়েই রয়েছে স্থানীয় কফি প্রেমিকদের আনাগোনা।
অনেকক্ষণ ধরে একটা কোনার টেবিলে বসে আছে অর্ণব। কিছুক্ষণ পর পর সে ঘড়িতে সময় দেখছে আর দরজার দিকে তাকাচ্ছে। রাচনার সঙ্গে সেদিন কথা হয়েছিল—আজকে এখানে দেখা করবে। সকাল এগারোটায় আসার কথা—এখন সাড়ে এগারোটা। অর্ণব আরো তিরিশ মিনিট অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। সে উঠে গিয়ে তার জন্যে একটা কফি আর ব্লুবেরি মাফিন নিয়ে এসে আবার বসল টেবিলে। কফিতে চুমুক দিয়ে সে তার ফোন থেকে একটা কল করল রাচনাকে—কিন্তু কোনো উত্তর পেল না। অর্ণব মন খারাপ করে কফিতে চুমুক দিল।
রাতে ঘুমাতে যাবার আগে অর্ণব ফোন করল রাচনাকে।
রাচনা ফোন ধরতেই অর্ণব বলল, ‘যাক, শেষ পর্যন্ত আপনাকে পাওয়া গেল। কী ব্যাপার আজ আসতে চেয়েও এলেন না যে?’
রাচনা লজ্জিত কণ্ঠে বলল, ‘অর্ণব, আজ সারাদিন আমি ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। একটা জরুরী কাজ ছিলো, ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার কথা। আই এ্যাম রিয়েলি সরি।’
‘ইট’স ওকে।’ একটু থেমে অর্ণব বলল, ‘হাউ এবাউট টুমরো? ব্যস্ততা না থাকলে আপনাকে আমি লাঞ্চে নিয়ে যেতে চাই।’
‘লাঞ্চ তো আপনাকে আমার খাওয়ানো উচিত।’
‘তাহলে আসুন কাল একসাথে লাঞ্চ করি।’
একটু ভেবে রাচনা বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
অর্ণবকে বেশ খুশি মনে হলো। তার খুব ইচ্ছে হলো রাচনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলতে। একটু থেমে সে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কি করছেন?’
‘এখন? ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। কেন?’
‘না কিছু না।’
রাচনা হেসে দিয়ে বলল, ‘ওকে, গুড নাইট দেন।’
‘গুড নাইট।’
অর্ণবের মনটা ভালো হয়ে গেল। সে তার একটা প্রিয় কবিতা আবৃত্তি করল। অনেকদিন আবৃত্তি করা হয় না। একটা সময় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কত আড্ডা-গান-কবিতা হতো। এখানে আসার পর সেই আড্ডা সেই সময়টা অর্ণব খুব মিস করে। মাঝে মাঝে একা একা কবিতা আবৃত্তি করে ঠিকই—কিন্তু ঠিক সেই অনুভূতিটা পায় না।
ডালাসের অদূরে ছোট উপশহর রকওয়ালের বিখ্যাত লেক রে-হাবার্ড সংলগ্ন হারবার পয়েন্টের একটা মেক্সিকান রেস্টুরেন্টে অর্ণব আর রাচনা এসেছে লাঞ্চ করতে। এই হারবার পয়েন্টটি স্থানীয় বাসিন্দাদের ভীষণ প্রিয়। বাইরের শহরগুলি থেকেও ইদানীং অনেকেই আসে সময় কাঁটাতে। লেকের পাড় ঘেঁষে হিল্টন রকওয়াল হোটেল, নানা ধরণের রেস্টুরেন্ট আর শপিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। সিনেমা হল, কফি-শপ, পার্লার, বার কী নেই এখানে। আছে ফাউইনটেইন। আছে বোট রাইডের ব্যবস্থা। খোলা আকাশের নীচে লাইভ কনসার্ট—বিস্তৃত মাঠের সবুজ ঘাসে বসে সেই গান শোনা। একটি অন্যরকম ভালো লাগার জায়গা রকওয়াল সিটির এই হারবার পয়েন্ট।
এই জায়গাটি রাচনার অনেক প্রিয়। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার জীবনের একটা অংশে। যদিও অর্ণব কিছু না জেনেই রাচনাকে নিয়ে এসেছে এখানে।
বাইরে তপ্ত রোদ তাই লাঞ্চ শেষ করে ওরা বসে রইল জানালার ধারের টেবিলটিতে। খাবার সময় খুব একটা কথা কেউ বলেনি। এবার কিছু কথা বার্তা হোক। অর্ণব বলল, ‘আপনার নামটা বেশ সুন্দর। রাচনা।’
‘সেদিন না একবার বললেন?’ মৃদু হেসে রাচনা বলল।
‘যা সুন্দর তা বারে বারে বললেও ক্ষতি নেই—যা সুন্দর তা বারে বারে দেখলেও ক্ষতি নেই।’
‘তাই নাকি?’ রাচনা আবার হাসল।
‘আচ্ছা, আমি আপনাকে তুমি করে বললে কি মাইন্ড করবেন?’ অর্ণবের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘ভেবে দেখি।’
‘ভেবে দেখি মানে?’
‘ভেবে দেখি মাইন্ড করবো কি করবো না।’
অর্ণব এবার হাসতে হাসতে বলল, ‘আপনি চাইলে আমাকে তুমি করে বলতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।’
‘ভেরী স্মার্ট!’ বলেই মৃদু হেসে রাচনা তাকাল বাইরে।
‘ইংরেজি ভাষার অনেক গুলো সুবিধার মধ্যে আরেকটি সুবিধা কি জানেন?’
রাচনা ঘুরে তাকাল।
‘এখানে আপনি, তুমি এবং তুই এই জাতীয় কোন সমস্যা নেই। স্ট্রেইট ইউ! সরাসরি তুমি।’
‘ইট’স ওকে। আপনি আমাকে সরাসরি তুমিই বলেন। আমি মাইন্ড করব না।’
রোদের তাপ একটু কমে আসতেই তারা দুজনে বের হয়ে এলো রেস্টুরেন্ট থেকে। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো লেকের পাড়ে। সেখানে রেলিং এর ধাঁরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল বিস্তৃত লেকের দিকে। সূর্য খানিকটা পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। বিস্তৃত লেকের উপর সূর্যরশ্মি পড়ে মুক্তার দানার মত চিকচিক করছে। মনে হচ্ছে রুপোর লেক—লেকের পানির উপর স্বচ্ছ রুপোর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে কেউ!
রাচনাকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চারিদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখছে সে। কিছুক্ষণ পর বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সে বলল, ‘ইশ, কতদিন পর বাইরে এলাম। যা ভাল্লাগছে। জায়গাটা বেশ সুন্দর, তাইনা?’
‘খুব সুন্দর। আমিতো মনে হয় প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।’ অর্ণব মৃদু হেসে বলল।
‘তাই? এই জায়গাটার?’ রাচনা তাকাল অর্ণবের দিকে।
‘কেন, মানুষ কি শুধু মানুষের প্রেমেই পড়ে? একটা সুন্দর জায়গার প্রেমে পড়তে পারে না? আমি জায়গার প্রেমে পড়তে পারি, দেশের প্রেমে পড়তে পারি, রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়তে পারি। কি, পারি না?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই পারেন।’
অর্ণব রাচনার দিকে তাকিয়ে হাসল। রাচনা বুঝতে পারল অর্ণব কেন তাকিয়ে আছে এভাবে। সে হেসে দিয়ে বলল, ‘অবশ্যই পারো।’
লেক রে-হাভার্ডের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেল রাচনা। আসলে লেকের চেয়ে বরং লেকের তীর ঘেঁষে সব স্থাপনা, সুন্দর সুন্দর বাড়ি, মেরিনাতে শ’য়ে শ’য়ে স্পিডবোট বাধা—সব মিলিয়ে একটা মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এমন নয় যে এখানে এই প্রথম এলো সে। এর আগেও সে এখানে এসেছে। অবশ্য সে সময়ের কথা এখন আর মনে করতে চায় না রাচনা।
দুজনে চুপচাপ প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করছে। লেকের দিকে তাকিয়েই হঠাৎ রাচনা বলল, ‘আচ্ছা, আমাদের দেশেও তো কত লেক আছে—নদী আছে। সেগুলো এতো সুন্দর হয় না কেন?
‘কারণ আমরা ওদেরকে অবহেলায় ফেলে রাখি, ওদের প্রাপ্য পরিচর্যাটুকু করি না। আর তাই হয়ত মাঝে মাঝে দুকূল ভাসানো বন্যা এনে ওরা প্রতিবাদ জানায়।’
কথা বলতে বলতে একটি বেঞ্চে গিয়ে বসল রাচনা। অর্ণবও বসল তার পাশে। রাচনা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি বেশ সুন্দর করে কথা বলো অর্ণব। তুমি কি গান–কবিতাও লিখো নাকি?’
‘লিখি না—তবে দেশে থাকতে মাঝে মাঝে কবিতা আবৃত্তি করতাম।’
‘এখন করো না?’
‘সময় হয়ে ওঠেনা। তাছাড়া, কাকেই বা শোনাব?’
‘শোনানোর মত কেউ নেই?’
‘সেই অর্থে কেউ নেই—তাছাড়া এখানে এখনো পরিচিত হইনি কারো সঙ্গে, মাত্র তো এলাম। শুনেছি ডালাসে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে।’
‘আমি তোমার কবিতা শুনতে চাই। আমাকে শোনাবে?’
‘অবশ্যই শোনাব, তবে এখন নয়। অন্য কোন সময়।’
‘তাহলে তোমার কথা বলো। আমি শুনতে চাই।’
‘কি জানতে চাও?’
‘এনিথিং এবাউট ইউ।’
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর একসময় শুরু করল তার পেছনের কিছু কথা।


