-Shei-Coffe-Shop

সেই কফি শপ (পর্ব-৪)

অর্ণব বলল, ‘আসলে আমার সম্পর্কে বলার মতো কিছু নেই। আমি খুব সাধারণ মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে অনেকদিন বেকার বসে থাকার পর এক আত্মীয়ের বদৌলতে ভাগ্যগুণে একটা কাজ পেয়েছিলাম। কথা ছিলো, চাকরি পেয়ে ছোট ভাই–বোনদের লেখাপড়ার দায়িত্ব আমাকেই নিতে হবে। কাজের ফাঁকে ফাঁকে টিউশনি শুরু করলাম। তারপরেও কোনোভাবেই কোনো কিছুই করতে পারছিলাম না। তারপর হঠাৎ একদিন ভাগ্যবানদের খাতায় নাম উঠল। লটারি পেলাম—ডিভি লটারি।’ এটুকু বলে অর্ণব থামল।
রাচনা তাকাল অর্ণবের দিকে।
একটু থেমে অর্ণব বলল, ‘জানো, আমেরিকার ভিসা পেয়ে খুশি হবার বদলে আমার মনটা একেবারেই খারাপ হয়ে গিয়েছিল।’
‘রিয়েলি, কেন?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল রাচনা।
‘বাংলাদেশ ছেড়ে কোথাও চলে যেতে হবে, এ কথা আমি কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবি নি। বাংলা গল্প, উপন্যাস, কবিতা থেকে দূরে থাকতে হবে, আর কখনো বইমেলায় যাওয়া হবে না, এসব কথা ভাবতেই বুকের ভেতর টনটন করছিল প্রথম দিকে। তারপর খেয়াল হলো, ফরিদপুরের একটি অনুন্নত গ্রাম থেকে আমি যখন প্রথম ঢাকায় পড়তে আসি তখনও তো একইরকম কষ্ট হয়েছিল। অনেক স্বপ্ন নিয়ে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসেছিলাম পড়াশুনা শেষ করে নিজের পায়ে দাঁড়াব বলে। কিন্তু তা আর হলো কই? ছোট তিনটা ভাইয়ের পড়াশুনা আর বোনের বিয়েটা পর্যন্ত আটকে গেল। তাই ভাবলাম আমেরিকায় গিয়ে যদি কিছু করতে পারি—মন্দ কী?’
‘সেটাই তোমার করা উচিত ছিল।’ রাচনা সায় দিয়ে বলল।
‘তাই তো করলাম। কিন্তু স্বপ্নের আমেরিকা বাস্তবে যে কত কঠিন এবং নিষ্ঠুর—কিছুদিনের মধ্যেই তা বুঝে গেলাম। এখানে নিজের অস্তিত্ব বজায় রাখার জন্যে প্রতি মুহূর্তে যে লড়াই করতে হয়—সে সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিল না।’
রাচনা নিবিষ্ট মনে শুনছে অর্ণবের কথা।
‘যেসব ইমোশনাল ব্যাপার হৃদয়কে তৃপ্তি দেয়, অথচ বেঁচে থাকাকে বিপন্ন করে, এখানকার বেশিরভাগ মানুষ তা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখে।’
‘বাহ—চমৎকার।’
‘কী?’
‘আমেরিকা সম্পর্কে তোমার রিয়েলাইজেশন।’
‘আমি কি ভুল বললাম?’
‘মোটেও না।’
এরপর বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। চুপচাপ বসে রইল।
নীরবতা ভেঙে অর্ণব বলল, ‘এবার তোমার কথা বলো।’
রাচনা কিছুই বলল না। তাকিয়ে রইল লেকের দিকে। সেখানে ছোট ছোট পাল তোলা নৌকা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে অনেকেই। একটা ট্যুর বোট নিয়ে দর্শনার্থীদের নিয়ে প্লাটফরম ছেড়ে বের হয়ে গেল। কেউ কেউ ওয়াটার স্কিইং করছে। সূর্য আরো কিছুটা হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। এই পড়ন্ত বিকেলে রাজ্যের অলসতা এসে আঁকড়ে ধরছে যেন তাকে। অবশেষে অলসতা কাঁটিয়ে রাচনা বলল, ‘চলো, ঝর্ণাটা দেখি। অনেকদিন আসা হয় না।’
রাচনা অর্ণবকে নিয়ে সিনেমার্ক সিনেমা হলের সামনে বড় ঝর্ণাটার পাশে এসে বসল। বাতাসে ঝর্ণার পানির ঝাপটা এসে লাগছে গায়ে-মুখে। অন্য কিছুতেই তার খেয়াল নেই। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে ঝর্ণাটির পানির ওঠা-নামা। কেমন বিভোর হয়ে আছে সে। রাচনা কি কিছু মনে করার চেষ্টা করছে? কে জানে?
এক পর্যায়ে অর্ণব বলল, ‘কি, বলবে না?’
‘কী বলব?’
‘কেন তুমি একা থাকো?’
‘আশ্চর্য, মানুষ একা থাকতে পারে না? তুমিও তো একাই থাকো অর্ণব?’
‘আমার কথা তো তোমাকে বললামই।’
‘কেন, এখানকার বাঙালি কমিউনিটির কারো কাছ থেকে কিছু শোনো নি। তারা তো সবার ঘরের খবরই রাখে।’
‘আমি এখানে এখনো নতুন। তাছাড়া অন্যদের কাছ থেকে আমি কেন শুনতে যাব। তেমন হলে নিশ্চয়ই আমি তোমার কাছে জানতে চাইতাম না।’
‘ওয়েল, মাই স্টোরি ইজ নট দ্যাট প্রিটি। তোমার ভালো লাগবে না।’
‘তবুও আমি শুনতে চাই।’
রাচনা চুপ করে রইল। কিছুটা অন্যমনস্ক। সে ফিরে গেল বেশ কয়েক বছর আগে। সেসব কথা সে এখন আর মনে করতে চায় না—তবুও বাস্তবতা তার পিছু ছাড়ে না। কারণে অকারণে সেসব কথা স্মৃতি হয়ে ফিরে আসে—ফিরে আসে বারবার।
ঘটনাক্রমে একটি আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ ছেলের সঙ্গে রাচনার পরিচয় হয়েছিল। ছেলেটির নাম স্টিভ। বয়স পঁচিশ। রাচনার বয়স তখন মাত্র বাইশ। স্টিভের সাথে পরিচয়ের পর থেকে রাচনার জীবনের এক অন্যতম অধ্যায় শুরু হয়। পরিচয় থেকে প্রেম এবং বিয়ে করার সিদ্ধান্ত। সেই কথা রাচনা তার ভাই-ভাবীকে জানাতে গেলে শুরু হয় মনোমালিন্য। ভাই-ভাবীর সংসারে থেকে পড়াশুনা এবং কাজ করছিল এতদিন। কাজেই তাদের মতামত জানাটা জরুরী ছিল রাচনার জন্যে।
ফ্ল্যাশব্যাক!
মাহবুব সাহেবের বাসার লিভিং রুমে বসে রয়েছে মাহবুব, লীনা আর রাচনা।
স্টিভকে বিয়ে করতে চাওয়ার ব্যাপারটা তারা কেউ মেনে নিতে পারছিল না। ঘটনার সূত্রপাত সেখান থেকেই। রাচনা যখন বলল সে স্টিভকে বিয়ে করতে চায়, তখন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল তার ভাই-ভাবী।
লীনা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, ‘পেছনের কথা কি সব ভুলে গেলে রাচনা? তোমাকে আমরা এত কষ্ট করে এদেশে এনেছিলাম স্টিভের মতো একটা ছেলেকে বিয়ে করবে বলে? আমেরিকায় কি বাঙালি ছেলের অভাব পড়েছে?’
লীনার মুখের দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাল রাচনা। ‘কেন, স্টিভকে বিয়ে করলে অসুবিধা কোথায়?’
‘সোসাইটিতে আমাদের একটা ইমেজ আছে। সবাই কী বলবে?’
‘কিন্তু সমস্যাটা কোথায়?’
‘সমস্যা আছে—তুমি বুঝতে পারছ না।’
‘তোমরা তো শুধু তোমাদের দিকটাই দেখছ। আমার নিজের কোনো ইচ্ছা–অনিচ্ছা থাকতে পারে না? তোমরা তোমাদের ডিসিশন আমার উপর চাপাতে পারো না। আজ তোমাদের সাথে থাকছি বলেই এভাবে বলতে পারছ।’
লীনা তাকাল তার স্বামীর দিকে। ‘দেখেছ?’
মাহবুব সাহেব বললেন, ‘না, না, তা হতে যাবে কেন?’
রাচনা বলল, ‘তাই তো মনে হচ্ছে। তা না হলে… স্টিভ তো কোনো খারাপ ছেলে নয়। হি কেয়ারস এবাউট মি!’
মাহবুব রাচনাকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন। ‘আচ্ছা ঠিক আছে, তা না হয় বুঝলাম। কিন্তু তোমাকে ভুলে গেলে চলবে না কালচারাল এন্ড রিলিজিয়াস ডিফারেন্সটা একটা বড় ব্যাপার—যেটা ভবিষ্যতে সমস্যার কারণ হতে পারে। সেটা অবশ্য এখন তুমি বুঝবে না। কারণ, একটা সময় আসে যখন সব যুক্তিই অর্থহীন মনে হয়। এটা একধরনের মোহ ছাড়া কিছুই না।’
‘বুঝবে, বুঝবে, ঐ মোহ বেশিদিন থাকবে না। এখন না বুঝলেও যখন সময় হবে, ঠিকই বুঝতে পারবে।’ এবার লীনা তার স্বামীর সাথে তাল মিলিয়ে বলল।
মাহবুব সাহেব এগিয়ে গিয়ে বসলেন রাচনার পাশে। তার অনেক আদরের ছোট বোন—রাচনা। ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে তিনি বললেন, ‘তোমার জীবনের যে কোনো সিদ্ধান্ত নেবার অধিকার তোমার আছে। আমরা তোমার উপর জোর করে কোন ডিসিশন চাপিয়ে দিচ্ছি না—আমরা যেটা বলছি শুধু তোমার ভালোর জন্যই বলছি।’
‘ভাইয়া, আমি তোমার কথা মানছি। কিন্তু একটা বাঙালি ছেলেকে বিয়ে করলেই যে আমি সুখী হবো তারই বা গ্যারান্টি কী?’
লীনা একটু কটাক্ষ করেই বলল, ‘আর আমেরিকান ছেলে বিয়ে করে সুখী হবার গ্যারান্টি বুঝি তুমি পেয়ে গেছো?’
‘তুমিও নিশ্চয়ই ভুলে যাওনি ভাবী, তোমার বাবা–মাও ভালো জেনেই অন্য একটা বাঙালি ছেলের সাথেই তোমার বিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু এখানে আসার পর যখন জানলে তার একটা স্প্যানিশ বৌ আছে, বাচ্চাও আছে—আর এই কথাটি আগে তোমাকে কেন বলা হয়নি, সেটার প্রতিবাদ করতেই তোমাকে তার ঘর ছাড়তে হলো। কাজেই ঐ বাঙালিত্বের দোহাই আমাকে দিতে এসো না।’
লীনার মুখটা সহসাই অন্ধকার হয়ে গেল। সে ভাবতেই পারেনি রাচনা এভাবে তার অতীত নিয়ে কথা বলবে।
বলবেনা বলবেনা করেও কথগুলো বলে ফেলল রাচনা। আসলে বলতে বাধ্য হলো। কারো অতীত নিয়ে কথা বলাটা কোনো ভদ্রতার রুচি বহন করে না। সেটা সে জানে। কিন্তু তাকে তার যুক্তি তো দিতে হবে—সে শুধু সেটা বোঝাতে চেয়েছে।
মাহবুব সাহেব তার স্ত্রীর দিকে একবার তাকালেন। লীনার মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করলেন। তারপর রাচনাকে বললেন, ‘এসব পেছনের কথা টেনে আনছিস কেন এর মধ্যে?’ একই সঙ্গে তার কণ্ঠে বিরক্তি আর হতাশা প্রকাশ পেল।
‘পেছনের কথা টেনে আনছি না ভাইয়া—একটা একজাম্পল দিচ্ছি।’
লীনাও ছেড়ে দেবার মানুষ নয়। সে আবারো বলল, ‘তার মানে তুমি তোমার সিদ্ধান্ত বদলাবে না?’
রাচনা সোফা থেকে উঠে লীনার মুখোমুখি দাঁড়াল। তারপর দৃঢ়ভাবে বলল, ‘এটা সিদ্ধান্ত বদলের কোন ব্যাপার নয়। আমি স্টিভকে ভালোবাসি। আই লাভ হিম অ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু ম্যারি হিম—দ্যাট’স ফাইনাল।
এ পর্যায়ে মাহবুব সাহেব উঠে দাঁড়ালেন। তিনি ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন এবং উচ্চস্বরে বললেন, ‘আই’ম টেলিং ইউ, ইউ উইল রিগ্রেট ওয়ান ডে—কিন্তু, সেদিন আর তোমার ফিরে আসার কোনো জায়গা থাকবে না।’ মাহবুব বেশ পরিষ্কারভাবেই কথাটা জানিয়ে দিলেন।
‘তবে তোমরাও শুনে রাখো, আর যাই হোক, আমি অন্তত তোমাদের ঝামেলা হয়ে ফিরে আসবো না।’
মাহবুব সাহেব হতভম্ব হয়ে তাকালেন লীনার দিকে। এসব কী বলছে রাচনা!
রাচনা তীক্ষ্ণ চোখে একবার মাহবুব আর একবার লীনার মুখের দিকে তাকাল। তারপর গটগট করে বের হয়ে গেল বাসা থেকে।
মাহবুব আর লীনা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল রাচনার গমন পথের দিকে।
এ পর্যন্ত বলে রাচনা চুপ করে রইল।
অর্ণব তাকিয়ে আছে রাচনার মুখের দিকে। তার আগ্রহ আরো বেড়ে গেছে। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘তারপর?’

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *