-Shei-Coffe-Shop

সেই কফি শপ (পর্ব-৩)

কফি শপের নাম হোয়াইট রক কফি।
ডালাস ডাউন-টাউন থেকে একটু দূরেই হোয়াইট রক লেকের ধারে এই কফি শপ। লেকের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কফি শপের নামও হোয়াইট রক কফি। এই কফি শপের বিশেষত্ব হলো এখানে কাস্টমাররাই তাদের গানের সরঞ্জাম নিয়ে এসে গান-বাজনা করে। স্টুডেন্টরা বসে হোমওয়ার্ক করে। প্রেমিক-প্রেমিকারা বসে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে। দোতলা কফি শপের পুরোটা জুড়েই রয়েছে স্থানীয় কফি প্রেমিকদের আনাগোনা।
অনেকক্ষণ ধরে একটা কোনার টেবিলে বসে আছে অর্ণব। কিছুক্ষণ পর পর সে ঘড়িতে সময় দেখছে আর দরজার দিকে তাকাচ্ছে। রাচনার সঙ্গে সেদিন কথা হয়েছিল—আজকে এখানে দেখা করবে। সকাল এগারোটায় আসার কথা—এখন সাড়ে এগারোটা। অর্ণব আরো তিরিশ মিনিট অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল। সে উঠে গিয়ে তার জন্যে একটা কফি আর ব্লুবেরি মাফিন নিয়ে এসে আবার বসল টেবিলে। কফিতে চুমুক দিয়ে সে তার ফোন থেকে একটা কল করল রাচনাকে—কিন্তু কোনো উত্তর পেল না। অর্ণব মন খারাপ করে কফিতে চুমুক দিল।
রাতে ঘুমাতে যাবার আগে অর্ণব ফোন করল রাচনাকে।
রাচনা ফোন ধরতেই অর্ণব বলল, ‘যাক, শেষ পর্যন্ত আপনাকে পাওয়া গেল। কী ব্যাপার আজ আসতে চেয়েও এলেন না যে?’
রাচনা লজ্জিত কণ্ঠে বলল, ‘অর্ণব, আজ সারাদিন আমি ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। একটা জরুরী কাজ ছিলো, ভুলেই গিয়েছিলাম আপনার কথা। আই এ্যাম রিয়েলি সরি।’
‘ইট’স ওকে।’ একটু থেমে অর্ণব বলল, ‘হাউ এবাউট টুমরো? ব্যস্ততা না থাকলে আপনাকে আমি লাঞ্চে নিয়ে যেতে চাই।’
‘লাঞ্চ তো আপনাকে আমার খাওয়ানো উচিত।’
‘তাহলে আসুন কাল একসাথে লাঞ্চ করি।’
একটু ভেবে রাচনা বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
অর্ণবকে বেশ খুশি মনে হলো। তার খুব ইচ্ছে হলো রাচনার সঙ্গে খানিকক্ষণ কথা বলতে। একটু থেমে সে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন কি করছেন?’
‘এখন? ঘুমানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। কেন?’
‘না কিছু না।’
রাচনা হেসে দিয়ে বলল, ‘ওকে, গুড নাইট দেন।’
‘গুড নাইট।’
অর্ণবের মনটা ভালো হয়ে গেল। সে তার একটা প্রিয় কবিতা আবৃত্তি করল। অনেকদিন আবৃত্তি করা হয় না। একটা সময় ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে কত আড্ডা-গান-কবিতা হতো। এখানে আসার পর সেই আড্ডা সেই সময়টা অর্ণব খুব মিস করে। মাঝে মাঝে একা একা কবিতা আবৃত্তি করে ঠিকই—কিন্তু ঠিক সেই অনুভূতিটা পায় না।
ডালাসের অদূরে ছোট উপশহর রকওয়ালের বিখ্যাত লেক রে-হাবার্ড সংলগ্ন হারবার পয়েন্টের একটা মেক্সিকান রেস্টুরেন্টে অর্ণব আর রাচনা এসেছে লাঞ্চ করতে। এই হারবার পয়েন্টটি স্থানীয় বাসিন্দাদের ভীষণ প্রিয়। বাইরের শহরগুলি থেকেও ইদানীং অনেকেই আসে সময় কাঁটাতে। লেকের পাড় ঘেঁষে হিল্টন রকওয়াল হোটেল, নানা ধরণের রেস্টুরেন্ট আর শপিং সেন্টার গড়ে উঠেছে। সিনেমা হল, কফি-শপ, পার্লার, বার কী নেই এখানে। আছে ফাউইনটেইন। আছে বোট রাইডের ব্যবস্থা। খোলা আকাশের নীচে লাইভ কনসার্ট—বিস্তৃত মাঠের সবুজ ঘাসে বসে সেই গান শোনা। একটি অন্যরকম ভালো লাগার জায়গা রকওয়াল সিটির এই হারবার পয়েন্ট।
এই জায়গাটি রাচনার অনেক প্রিয়। অনেক স্মৃতি জড়িয়ে আছে তার জীবনের একটা অংশে। যদিও অর্ণব কিছু না জেনেই রাচনাকে নিয়ে এসেছে এখানে।
বাইরে তপ্ত রোদ তাই লাঞ্চ শেষ করে ওরা বসে রইল জানালার ধারের টেবিলটিতে। খাবার সময় খুব একটা কথা কেউ বলেনি। এবার কিছু কথা বার্তা হোক। অর্ণব বলল, ‘আপনার নামটা বেশ সুন্দর। রাচনা।’
‘সেদিন না একবার বললেন?’ মৃদু হেসে রাচনা বলল।
‘যা সুন্দর তা বারে বারে বললেও ক্ষতি নেই—যা সুন্দর তা বারে বারে দেখলেও ক্ষতি নেই।’
‘তাই নাকি?’ রাচনা আবার হাসল।
‘আচ্ছা, আমি আপনাকে তুমি করে বললে কি মাইন্ড করবেন?’ অর্ণবের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘ভেবে দেখি।’
‘ভেবে দেখি মানে?’
‘ভেবে দেখি মাইন্ড করবো কি করবো না।’
অর্ণব এবার হাসতে হাসতে বলল, ‘আপনি চাইলে আমাকে তুমি করে বলতে পারেন। আমি কিছু মনে করব না।’
‘ভেরী স্মার্ট!’ বলেই মৃদু হেসে রাচনা তাকাল বাইরে।
‘ইংরেজি ভাষার অনেক গুলো সুবিধার মধ্যে আরেকটি সুবিধা কি জানেন?’
রাচনা ঘুরে তাকাল।
‘এখানে আপনি, তুমি এবং তুই এই জাতীয় কোন সমস্যা নেই। স্ট্রেইট ইউ! সরাসরি তুমি।’
‘ইট’স ওকে। আপনি আমাকে সরাসরি তুমিই বলেন। আমি মাইন্ড করব না।’
রোদের তাপ একটু কমে আসতেই তারা দুজনে বের হয়ে এলো রেস্টুরেন্ট থেকে। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো লেকের পাড়ে। সেখানে রেলিং এর ধাঁরে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল বিস্তৃত লেকের দিকে। সূর্য খানিকটা পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। বিস্তৃত লেকের উপর সূর্যরশ্মি পড়ে মুক্তার দানার মত চিকচিক করছে। মনে হচ্ছে রুপোর লেক—লেকের পানির উপর স্বচ্ছ রুপোর চাদর বিছিয়ে দিয়েছে কেউ!
রাচনাকে খুব উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে চারিদিকটা ঘুরে ঘুরে দেখছে সে। কিছুক্ষণ পর বড় একটা নিঃশ্বাস নিয়ে সে বলল, ‘ইশ, কতদিন পর বাইরে এলাম। যা ভাল্লাগছে। জায়গাটা বেশ সুন্দর, তাইনা?’
‘খুব সুন্দর। আমিতো মনে হয় প্রেমে পড়ে যাচ্ছি।’ অর্ণব মৃদু হেসে বলল।
‘তাই? এই জায়গাটার?’ রাচনা তাকাল অর্ণবের দিকে।
‘কেন, মানুষ কি শুধু মানুষের প্রেমেই পড়ে? একটা সুন্দর জায়গার প্রেমে পড়তে পারে না? আমি জায়গার প্রেমে পড়তে পারি, দেশের প্রেমে পড়তে পারি, রবীন্দ্রনাথের প্রেমে পড়তে পারি। কি, পারি না?’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই পারেন।’
অর্ণব রাচনার দিকে তাকিয়ে হাসল। রাচনা বুঝতে পারল অর্ণব কেন তাকিয়ে আছে এভাবে। সে হেসে দিয়ে বলল, ‘অবশ্যই পারো।’
লেক রে-হাভার্ডের সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে গেল রাচনা। আসলে লেকের চেয়ে বরং লেকের তীর ঘেঁষে সব স্থাপনা, সুন্দর সুন্দর বাড়ি, মেরিনাতে শ’য়ে শ’য়ে স্পিডবোট বাধা—সব মিলিয়ে একটা মনোমুগ্ধকর পরিবেশ। এমন নয় যে এখানে এই প্রথম এলো সে। এর আগেও সে এখানে এসেছে। অবশ্য সে সময়ের কথা এখন আর মনে করতে চায় না রাচনা।
দুজনে চুপচাপ প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকন করছে। লেকের দিকে তাকিয়েই হঠাৎ রাচনা বলল, ‘আচ্ছা, আমাদের দেশেও তো কত লেক আছে—নদী আছে। সেগুলো এতো সুন্দর হয় না কেন?
‘কারণ আমরা ওদেরকে অবহেলায় ফেলে রাখি, ওদের প্রাপ্য পরিচর্যাটুকু করি না। আর তাই হয়ত মাঝে মাঝে দুকূল ভাসানো বন্যা এনে ওরা প্রতিবাদ জানায়।’
কথা বলতে বলতে একটি বেঞ্চে গিয়ে বসল রাচনা। অর্ণবও বসল তার পাশে। রাচনা অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি বেশ সুন্দর করে কথা বলো অর্ণব। তুমি কি গান–কবিতাও লিখো নাকি?’
‘লিখি না—তবে দেশে থাকতে মাঝে মাঝে কবিতা আবৃত্তি করতাম।’
‘এখন করো না?’
‘সময় হয়ে ওঠেনা। তাছাড়া, কাকেই বা শোনাব?’
‘শোনানোর মত কেউ নেই?’
‘সেই অর্থে কেউ নেই—তাছাড়া এখানে এখনো পরিচিত হইনি কারো সঙ্গে, মাত্র তো এলাম। শুনেছি ডালাসে অনেক সাংস্কৃতিক সংগঠন আছে।’
‘আমি তোমার কবিতা শুনতে চাই। আমাকে শোনাবে?’
‘অবশ্যই শোনাব, তবে এখন নয়। অন্য কোন সময়।’
‘তাহলে তোমার কথা বলো। আমি শুনতে চাই।’
‘কি জানতে চাও?’
‘এনিথিং এবাউট ইউ।’
অর্ণব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর একসময় শুরু করল তার পেছনের কিছু কথা।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *