-Shei-Coffe-Shop

সেই কফি শপ (পর্ব-৫)

রোদ চলে গেছে।
বিকেলের ঝিরিঝিরি বাতাসে রাচনার চুল উড়ছে। সে মুখের ওপর থেকে চুলগুলি সরিয়ে হাঁটা শুরু করল। অর্ণবও উঠে দাঁড়াল। সেও হাঁটছে রাচনার পাশাপাশি। হাঁটতে হাটতেই রাচনা বলল, ‘ভাইয়া আর ভাবীর অমতে স্টিভকে আমি বিয়ে করেছিলাম। কিন্তু বিয়েটা টিকল না। স্টিভের সঙ্গে আমার ব্রেকআপ হবার পর ভাইয়ার ওখানে ফিরে যাওয়াটা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর কোন মুখেই বা যাব বলো?’
অর্ণব কিছুটা ইতস্তত করে বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস না করে পারছি না। জানি এটা তোমার একান্তই ব্যক্তিগত—তবুও জানতে চাইছি।’
‘তুমি তো একটার পর একটা আমার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করেই যাচ্ছ।’ রাচনা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা বলো, কী জানতে চাও?’
‘ভেরি সিম্পল। স্টিভ এর সঙ্গে তোমার ব্রেকআপটা কেন হলো?’
‘এই বিষয়টা নিয়ে আমার কথা বলতে একদমই ইচ্ছে করে না। আমি আমার অতীতটা ভুলে যেতে চাই।’
‘ভুলে যেতে চাইলেই তো আর সবকিছু ভুলে যাওয়া যায় না, রাচনা। তুমি আমাকে বিশ্বাস করতে পারো। আর যদি বন্ধু ভাবো, বুকের মধ্যে কষ্টগুলো জমিয়ে না রেখে—শেয়ার করো, দেখবে জীবনটা এত ভারী নয়—যতটা এখন মনে হচ্ছে।’
রাচনা অর্ণবের মুখের দিকে তাকাল। অর্ণবের হাসি হাসি মুখের দিকে তাকিয়ে সে কিছু বোঝার চেষ্টা করল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে উঠে দাঁড়াল।
ওরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো হারবার পয়েন্টের লাইট-হাউসের কাছে। সেখানে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল রাচনা। পাশে এসে দাঁড়াল অর্ণব। রাচনার কেন যেন মনে হচ্ছে—এই ছেলেটাকে সব কিছু বলা যায়। ওর নিজের বুকটাও কেমন ভার হয়ে থাকে। এত পরিচিত মানুষ চারিপাশে তবুও স্বস্তি নিয়ে দু-একটি কথা বলার একজন মানুষও তার নেই।
শেষ বিকেলের পশ্চিমাকাশে ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা হেলে পড়েছে।
দিগন্ত রেখায় সূর্য হেলে পড়ায় আকাশে পোড়ামাটির মতো বিবর্ণ একরাশ নতুন মেঘ ভেসে উঠেছে—মনে হলো সেগুলো স্থির কিংবা দৃষ্টিসীমার অনেক দূরে বলেই ওগুলোর নড়াচড়া বোঝা যাচ্ছে না। ধীরে ধীরে হলুদ থেকে লাল হয়ে যাওয়া নির্জীব ও নির্মল সূর্যটার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা দুজন।
রাচনার মনটা কেমন অশান্ত হয়ে গেল। সে একটু স্থির হয়ে আবার কথা শুরু করল—কিন্তু অনেক ধীরে ধীরে।
‘আমি তখন বাংলাদেশ থেকে সবেমাত্র এসেছি। ভাইয়ার বাসায় থেকে পড়াশুনা আর একটা পার্টটাইম জব করতাম। ক্লাস আর কাজের ফাঁকে মাঝে মাঝে ভাবীর সাথে তার গানের প্রোগ্রামে যেতাম।’ এটুকু বলে রাচনা তাকাল অর্ণবের মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘তুমি তো জানোই আমার ভাবী একজন প্রফেশনাল সিংগার। একদিন ভাবী তার একটা মিউজিক ভিডিওর শুটিংয়ে আমাকে নিয়ে গিয়েছিল।’
যদিও লীনা তাকে বলেছিল শুটিং অনেক ঝামেলার—বিরক্তিকর। কিন্তু রাচনার কাছে বিরক্তিকর কিছুই মনে হলো না। তার কাছে বেশ মজার একটা ব্যাপার মনে হলো। কেমন একটা পিকনিক পিকনিক ভাব। সবাই হাতে হাতে করে শুটিং ভ্যান থেকে ক্যামেরা, স্ট্যান্ড, লাইটস, রিফ্লেক্টরস আরো কতো কী যন্ত্রপাতি নামিয়ে আনছে। সবার মধ্যেই একধরণের ব্যস্ততা।
শুধু পরিচালক, প্রযোজক আর তাদের এক বন্ধু বাদে ইউনিটের বাকী সব ক্রু-মেম্বাররাই হয় আমেরিকান না হয় অন্য কোনো দেশের। বাঙালি মাত্র ঐ তিনজন—এবং রাচনা। যদিও সে ইউনিটের কেউ নয়। গেস্ট হিসেবে এসেছে।
রাচনা খুব আগ্রহ নিয়ে শুটিং দেখছে। শুটিং হচ্ছে রকওয়ালের বিখ্যাত হারবার পয়েন্ট সংলগ্ন ফাউন্টেনের পাশে। সিডি প্লেয়ারে লীনার একটি গান বাজছে—সেই গানের সঙ্গে লীনা ঠোট মিলিয়ে গেয়ে যাচ্ছে। ব্যাকগ্রাউন্ডে ঝর্ণার পানি অনেক উপরে উঠে যাচ্ছে—তারপর সেই পানি ঝিরিঝিরি বয়ে যাচ্ছে লেকের দিকে। মিশে যাচ্ছে লেক রে-হাবার্ডের পানির সাথে। পাঠক এবার নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন, এই জায়গাটি রাচনার কেন এত পছন্দের।
সকাল থেকে একটা গানেরই দৃশ্য ধারণ হচ্ছে—বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে। পরিচালক ‘কাট’ বলতেই সবাই ছুটে যাচ্ছে তার কাছে পরের দৃশ্য বুঝে নেবার জন্যে। ইতিমধ্যেই লীনাকে বেশ কয়েকবার কাপড় বদলাতে হলো। প্রতিবার সে চলে যাচ্ছে নিকটস্থ একটা রেস্টুরেন্টে। সেখান থেকে কাপড় বদলে আবার পরিপাটি হয়ে দাঁড়াচ্ছে ক্যামেরার সামনে। অসীম ধৈর্য নিয়ে একটার পর একটা শট দিয়ে যাচ্ছে সে।
এক পর্যায়ে লাঞ্চ ব্রেক হলো। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ল প্যাকেট লাঞ্চ নিয়ে।
রাচনা চুপচাপ বসে বসে সবার কর্মকাণ্ড দেখছে। সে ভাবছে, একটা সামান্য মিউজিক ভিডিও শুটিং করতে এতো আয়োজন তাহলে একটা মুভি বানাতে না জানি কী ঘটনা ঘটে। এসব ভাবতে ভাবতেই সে হঠাৎ লক্ষ্য করল শুটিং ইউনিটের স্টিল ফটোগ্রাফার ছেলেটা দূর থেকে তার ছবি তুলছে। আমেরিকান সাদা—বয়স পঁচিশ থেকে সাতাশ। একমাথা ঝাঁকরা চুল—মুখে দাঁড়ি, সুন্দর করে ছাঁটা।
রাচনা এদিক ওদিক তাকাল। সে নিশ্চিত হবার জন্যে একবার তার পেছনে-ডানে-বামেও তাকাল—দেখল কেউ নেই। এবার সে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল ছেলেটার সামনে।
‘Excuse me, are you taking my picture?’ রাচনা বিরক্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘Yea, why?’ ছেলেটি উত্তর দিল।
‘You didn’t ask for my permission!’
‘I know.’ ছেলেটি তাকাল চারিদিকে। তারপর আবার বলল, ‘See this nature, this lake, this sky, all these beautiful creations of God… we don’t ask for permission to take their picture, do we?’
‘What’s that supposed to mean?’
‘Never mind. I’m sorry that I didn’t take your permission, but the truth is, I could not resist myself taking your picture. What can I say?’
ছেলেটির প্রশংসার ধরণ রাচনার ভালো লাগল। সে তেমন আর কিছু বলতে পারল না।
‘By the way, I’m Steve. Nice to meet you.’ স্টিভ হাত বাড়িয়ে দিল রাচনার দিকে।
‘I’m Rachna.’ রাচনাও হাত বাড়িয়ে দিয়ে হ্যান্ডশেক করল।
‘Rasna? What kind of name is that?’ স্টিভ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল।
‘Bengali.’
‘So, you are from Bangladesh too?’
‘Yes.’ রাচনা আঙুল দিয়ে লীনার দিকে দেখিয়ে বলল, ‘She’s my sister-in-law.’
‘I see!’
স্টিভের সঙ্গে রাচনার পরিচয় আর কথাবার্তার এ পর্যায়ে পরিচালক প্রডাকশন ইউনিটকে ডাকল পরের দৃশ্য বুঝিয়ে দেবার জন্যে।
লীনা তার পরের শটের জন্যে মেকআপ ঠিক করে নিচ্ছিল। হঠাৎ তার দৃষ্টি গেল রাচনা আর স্টিভের দিকে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল দুজনকে। স্টিভ তখন বিভিন্ন এঙ্গেল থেকে রাচনার ছবি তোলায় ব্যস্ত। লীনা চিন্তিত মুখে নিজের পরিচর্যায় মন দিল।
অর্ণব তাকিয়ে আছে রাচনার মুখের দিকে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাচনা বলল, ‘এভাবেই স্টিভের সাথে আমার পরিচয় হলো। সে প্রায়ই আমাকে ছবি তুলতে নিয়ে যেত বিভিন্ন জায়গায়। সেই থেকে বন্ধুত্ব। তারপর বিয়ে।’
অর্ণব একবার কিছু বলতে চেয়েও বলল না। দেখল রাচনা কেমন এক ঘোরলাগা মানুষের মতো কথা বলছে। সে আবার বলল, ‘পরিচয়ের পর থেকেই ওর ভালবাসা আর কেয়ারিং আমাকে এতটাই মুগ্ধ করেছিল যে, মাঝে মাঝে আমার মনে হতো একটা অ্যামেরিকান ছেলেকে বিয়ে করে আমি কোনো ভুল করিনি।’
রাচনা থেমে গেল। মনে হলো সে আর কী বলবে—সেই কথাগুলো গুছিয়ে নিচ্ছে। অনেকক্ষণ কোনো কিছু আর বলছে না দেখে অর্ণব আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘তারপর?’
রাচনা ঘুরে তাকাল অর্ণবের দিকে। তারপর আবার তাকাল সামনে। ফিরে গেল পেছনের কথায়। সে বলল, ‘বিয়ের পর আমরা আপটাউনে একটা এপার্টমেন্ট রেন্ট করলাম। গ্রাজুয়েশন শেষ করে তখন আমি নতুন কাজে জয়েন করেছি। কাজের ব্যস্ততা আর স্টিভের প্রেমে আমি এতটাই ডুবে ছিলাম যে, বুঝতেই পারিনি আমার এবসেন্সে আমার সুন্দর সাজানো ঘরটাতে আরেকজন মানুষের নিয়মিত আসা যাওয়া হয়।’
অর্ণব তাকাল রাচনা মুখের দিকে। কোনো প্রশ্ন করল না—কিন্তু উদগ্রীব হয়ে অপেক্ষা করতে থাকল তারপর কী হলো জানার জন্যে।
রাচনা বলল, ‘এরমধ্যে কাজে একদিন হঠাৎ করে প্রচণ্ড সিক ফিল করি। আমি ম্যানেজারকে বলে আমার ডাক্তারের কাছে চলে যাই।’
দুর্বল শরীর নিয়েই রাচনা ডাক্তারের অফিসে গেল। ডাক্তার তার প্রাথমিক চেকআপ শেষ করার পর কিছু টেস্ট করতে দিল। রেজাল্ট আসা পর্যন্ত রাচনার কিছু করার নেই। সে বসে আছে চুপচাপ—অপেক্ষা করছে আর মনে মনে উইশ করছে যেন ভালো কিছু হয়। তার অপেক্ষার সময় যেন কাটতেই চাচ্ছে না। সে একবার ফোন বের করে স্টিভের নাম্বারে চাপ দিতে গিয়েও দিল না। ফোন বন্ধ করে বসে রইল। এক ধরণের অস্থিরতা তাকে পেয়ে বসল।
কিছুক্ষণ পর ল্যাব থেকে টেস্ট রেজাল্ট নিয়ে এলো এক টেকনিশিয়ান। ডাক্তার রিপোর্ট দেখে রাচনাকে যা বলল, সেটি সম্ভবত যে কোনো বিবাহিত নারীর জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত একটি সংবাদ—প্রতিটি বিবাহিত নারীর আরাধ্য স্বপ্ন। আর এই সংবাদটির জন্যই সে অপেক্ষা করছে—করছে কত পরিকল্পনা কত আয়োজন।
রাচনা দ্রুত ডাক্তারের অফিস থেকে বের হয়ে চলে এলো তাদের এপার্টমেন্টে। মনে মনে স্টিভকে একটা সারপ্রাইজ দেবার জন্যে সে অস্থির হয়ে থাকল সারাক্ষণ।
এপার্টমেন্টে ঢুকেই রাচনার কেমন যেন অস্বস্তি লাগতে লাগল। অস্বস্তিটা কেন ঠিক বুঝতে পারল না। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল—সবকিছু কেমন যেন অগোছালো লাগছে।
লিভিং রুমের টেবিলে দেখল একটা ওয়াইনের বোতল আর দুটো ওয়াইন গ্লাস পড়ে আছে। দুটো প্লেটে আধ-খাওয়া পিজ্জা।
অস্বস্তির সঙ্গে কেমন যেন একটু একটু ভয়ও লাগছে রাচনার। সে এদিক ওদিক তাকিয়ে আস্তে আস্তে তার বেডরুমের দিকে এগিয়ে গেল এবং ঢুকতে যেয়েই সে বুঝতে পারল ভিতরে কেউ আছে। রাচনা নিঃশব্দে দরজা ধাক্কা দিয়ে যা দেখল তাতে তার হৃৎস্পন্দন বন্ধ হয়ে যাবার উপক্রম হলো। তার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল স্থির হয়ে।
এমন একটি দৃশ্য দেখার জন্য রাচনার শরীর মন কোনটাই প্রস্তুত ছিল না।
একটা আমেরিকান ব্লন্ড গার্ল স্টিভের বাহু-বন্ধনে শুয়ে আছে রাচনার নিজের হাতে সাজানো বিছানায়—সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে।
রাচনার একবার মনে হলো সে জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবে। মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করে উঠল। সে দ্রুত সরে গিয়ে বসে পড়ল লিভিং রুমের সোফাতে।
রাচনা নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে সজোরে কেঁদে ফেলল।
এর আগে স্টিভের সঙ্গে তার প্রাক্তন গার্লফ্রেন্ডকে নিয়ে দু’একবার মনোমালিন্য হয়েছে। সময়ে অসময়ে সারাক্ষণ তার সঙ্গে কথা বলত। এমনকি ঘুমানোর সময়ও। প্রথম দিকে রাচনা খুব একটা গুরুত্ব দিত না। ভাবত পুরনো সম্পর্ক—মাঝে মাঝে একটু কথা বললে কী আর এমন ক্ষতি। তাছাড়া স্টিভ তো আর লুকিয়ে কথা বলছে না। কিন্তু সবকিছুর তো একটা লিমিট থাকে। রাচনা আস্তে আস্তে প্রতিবাদ করা শুরু করল। কিন্তু কোনদিন সে কাঁদেনি। এই মুহূর্তে রাচনা আর নিজেকে সামলাতে পারল না—ফুলে ফুলে উঠছে তার শরীর।
একটা দীর্ঘ সময় পার হয়ে গেল। সমস্ত ঘরটা যেন সহসাই নিশ্চুপ হয়ে গেছে—কোথাও কোনো সারা নেই। হঠাৎ স্টিভ তার জামার বোতাম লাগাতে লাগাতে বের হয়ে এলো বেডরুম থেকে। তার সঙ্গে ছায়ার মতো ব্লন্ডি গার্ল এসে দ্রুত দরজা খুলে বের হয়ে গেল।
রাচনা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। স্টিভ নার্ভাস ভঙ্গীতে দাঁড়িয়ে আছে কাঁচুমাচু হয়ে। রাচনা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল স্টিভের সামনে—দুজনে মুখোমুখি।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *