-Shei-Coffe-Shop

সেই কফি শপ (পর্ব-২)

রাচনা বলল, ‘যাচ্ছি আমার ভাইয়ের বাসায়।’
‘আপনার ভাই এখানেই থাকেন?’ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল অর্ণব।
‘জি।’
অর্ণবের একবার জানতে ইচ্ছে হলো যে ভাইয়ের বাসা থাকতে একা থাকছেন কেন? কিন্তু পর মুহূর্তেই ভাবল—ব্যাপারটা পারসোনাল হয়ে যাবে। কী দরকার এত কিছু জেনে? একজন বিপদে পড়ে একটা রাইড চেয়েছে—এটা এমন কোনো ব্যাপার না। তাছাড়া নিজের দেশের মানুষ বলে কথা।
রাচনার বড় ভাই মাহবুব হোসেন খান থাকেন ডালাস থেকে প্রায় তিরিশ মাইল দূরে ফ্রিসকো নামে একটা নতুন উপ শহরে। সেখানে যেতে যেতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে গেল। মাহবুব সাহেবের বিশাল বাড়ির সামনের পার্কিং লটে অর্ণব গাড়ি পার্ক করল। রাচনা নেমে এসে সদর দরজায় কলিং বেল চেপে দাঁড়িয়ে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ পর দরজা খুললেন মাহবুব খান এবং বেশ খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘রাচনা, তুই? কী ব্যাপার? কোনো সমস্যা?’
রাচনা হুটহাট করে কখনোই আসে না। মাঝে মাঝে উইকএণ্ডে আসে, সারাদিন থাকে। তারপর আবার সন্ধ্যায় ফিরে যায় তার নিজের এপার্টমেন্টে। সেই আসা-যাওয়া যে নিয়মিত তাও নয়। তাই এই ভর সন্ধ্যায় ছোট বোনকে দেখে মাহবুব সাহেব একটু অবাকই হলেন।
রাচনা বলল, ‘চাবি হারিয়ে ফেলেছি ভাইয়া। আমার স্পেয়ার কী’টা নিতে এলাম।’ রাচনার ঘরের এবং গাড়ির একসেট চাবি এ বাসায় রাখা আছে। রাচনার নিজস্ব একটা রুমও আছে এ বাসায়।
মাহবুব সাহেব বললেন, ‘চাবি হারিয়েছিস? কোথায়, কীভাবে?’
‘মনে করতে পারছিনা। তুমি কি এখানেই দাঁড়িয়ে কথা বলবে নাকি ভিতরে ঢুকতে দেবে? সাথে গেস্ট আছে।’ অর্ণবকে দেখিয়ে রাচনা বলল।
‘ও হ্যাঁ। আয় আয়—ভেতরে আয়।’
মাহবুব সাহেব সরে গিয়ে ওদেরকে ভিতরে ঢুকতে দিলেন। ঘরে ঢুকেই রাচনা পরিচয় করিয়ে দিল অর্ণবকে।
‘ভাইয়া, ইনি হচ্ছেন অর্ণব, আমাদের বিল্ডিং-এই থাকেন। আমাকে রাইড দিলেন।’
‘আমি মাহবুব খান, রাচনা’র বড় ভাই।’ বলেই তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন অর্ণবের দিকে।
অর্ণব হ্যান্ডসেক করে বলল, ‘নাইস টু মিট ইউ।’
‘প্লিজ, হ্যাভ এ সিট।’
‘থ্যাংকস!’
রাচনা তার ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভাবী কোথায়?’
‘উপরে—রাইসাকে হোমওয়ার্ক করাচ্ছে।’ খান দম্পতির তিন ছেলে-মেয়ের মধ্যে রাইসা সবচেয়ে ছোট। থার্ড গ্রেডে যায়। আমেরিকায় বেশিরভাগ মায়েদের কাজের মধ্যে একটি হচ্ছে বাচ্চাদের হোমওয়ার্ক নিয়ে বসা।
‘আচ্ছা, আমি যাই দেখা করে আসি।’ বলেই রাচনা অর্ণবকে বলল, ‘আপনি ভাইয়ার সাথে কথা বলুন, আমি আসছি।’
রাচনা চলে যেতেই মাহবুব সাহেব অর্ণবকে বললেন, ‘থ্যাংকস ফর গিভিং হার দ্য রাইড। সো নাইস অফ ইউ।’
‘না, না এতো থ্যাংকস দিতে হবে না।’ অর্ণব বিনয়ের সঙ্গে বলল।
‘আপনাকে দেখিনি বোধ হয় আগে। নতুন এসেছেন?’
‘নতুনই বলা চলে, মাত্র পাঁচ মাস হলো ডালাসে এসেছি। আগে মিনেসোটায় ছিলাম।’
‘মিনেসোটা—সেতো অনেক ঠাণ্ডার জায়গা।’
‘হ্যাঁ উইন্টারে খুব বেশি ঠাণ্ডা। বলতে পারেন অনেকটা ঠাণ্ডার ভয়েই এখানে এসেছি। তাছাড়া জব মার্কেটও বেশ ভালো এখানে।’
মাহবুব সাহেব এবার একটু ভালো মতো লক্ষ্য করে দেখলেন অর্ণবকে। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘একাই থাকেন নাকি ফ্যামিলি আছে?’
‘একাই থাকি।’
কথার মধ্যেই উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এলো লীনা, মাহবুবের স্ত্রী। লীনা খান নামে ডালাস সহ উত্তর আমেরিকার সঙ্গীতাঙ্গণে এক নামে সবাই চেনে। খুব ভালো গান করে—গানের কণ্ঠ প্রফেশনাল লেভেলের। বেশ কয়েকটা গানের সিডিও বের হয়েছে।
লীনা সামনে আসতেই মাহবুব সাহেব বললেন ‘এই শোনো, এই হচ্ছে অর্ণব। রাচনাদের বিল্ডিং এ থাকে।’
লীনা মৃদু হেসে বলল, ‘ও তাই না, ভালো আছেন?’
‘জি ভালো।’
‘রাতে খেয়ে যাবেন। আমি ডিনারের ব্যবস্থা করছি।’
‘না, না, আজ থাক। আরেকদিন না হয় খাওয়া যাবে।’
‘সেকি আপনি এত কষ্ট করে এখানে এসেছেন।’
‘তাতে কী, এটা কোন ব্যাপার না।’
‘তাহলে আরেকদিন আসবেন কিন্তু।’
‘জি জি অবশ্যই আসব।’
এর মধ্যে রাচনা এসে দাঁড়াল। অর্ণব জিজ্ঞেস করল, ‘চাবি পেয়েছেন?’
‘জি।‘
‘তাহলে চলুন।‘
‘লেট’স গো।’
বিদায় নিয়ে অর্ণব আর রাচনা বের হয়ে গাড়িতে উঠল। আবাসিক এলাকার ছোট রাস্তা গুলো পার হয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে ওদের গাড়ি হাইওয়েতে গিয়ে পরল।
নর্থ সেন্ট্রাল এক্সপ্রেসওয়ে দিয়ে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলল অর্ণবের গাড়ি। অর্ণব একবার তাকাল রাচনার দিকে। রাচনা চুপচাপ বসে আছে। কিছুক্ষণ পার করে অর্ণব বলল, ‘আপনার ভাইয়া আর ভাবীকে আমার বেশ পছন্দ হয়েছে। নাইস কাপল।’
‘হুমম।’
‘কি ভাবছেন?’
‘কিছু না।’
আবার কিছুক্ষণ নীরবতা। বলবেনা বলবেনা করেও অর্ণব বলেই ফেলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
ঘার ঘুরিয়ে রাচনা তাকাল অর্ণবের দিকে। তারপর বলল, ‘করুন।’
‘আপনার ভাইয়ার এতো বড় বাড়ি থাকতে আপনি একা থাকেন কেন?’
রাচনা উত্তর না দিয়ে আবার তাকিয়ে রইল সামনে। অর্ণব অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে তৎক্ষণাৎ বলল, ‘জানি ব্যাপারটা একান্তই ব্যক্তিগত, বলতে না চাইলে অসুবিধা নেই।’
ঘার না ঘুরিয়েই রাচনা বলল, ‘তাহলে জানতে চাইলেন কেন?’
‘এমনি! জাস্ট কিউরিয়াস…’
এবার ঘার ঘুরিয়ে সুন্দর করে হেসে দিয়ে রাচনা বলল, ‘আরেকদিন দেখা হলে বলবো।’
‘আর যদি দেখা না হয়?’
‘কেন হবে না? হবে। একবার যখন আলাপ হলো, তখন হবেই।’
‘এতো জোড় দিয়ে যখন বলছেন, ধরেই নিচ্ছি আমাদের আরেকদিন দেখা হতে পারে।’
‘হ্যাঁ, পারে।’
‘কোথায়?’
‘আপনি বলুন।’
একটু ভেবে অর্ণব বলল, ‘সেই কফি শপে।’
‘কোন কফি শপে?’
‘যেখানে আপনাকে আমি প্রথম দেখেছিলাম।’
‘সেটার কথাইতো জানতে চাইছি। কোথায় সেটা?’
অর্ণব তাকাল রাচনার দিকে। কিছু না বলে একটু মুচকি হাসল শুধু।

অর্ণবের মনে পড়ে গেল সেদিনের কথা।
ডালাসের বিখ্যাত হোয়াইট রক লেকের পার সংলগ্ন একটা কফি শপে এসে ঢুকল অর্ণব। কয়েক পা এগুতেই সে শুনতে পেল বাংলায় কথা বলছে কেউ। আশে পাশে তাকিয়ে তার চোখ আটকে গেল একটা টেবিলে বসা দুজন মেয়ের দিকে—আর একটু এগুতেই সে দেখল রাচনাকে। সাথে তার বান্ধবী সম্ভবত। দুজনেই কফিতে চুমুক দিচ্ছে আর কথা বলছে। আবার হাসছে। তবে খুব বেশি জোরে হাসছে তাও না। কিন্তু বাংলায় কথা বলছে বলেই হয়ত অর্ণবের কানে পৌঁছেছে ওদের কথা। সে একটু মৃদু হেসে কফির লাইনে গিয়ে দাঁড়াল। এবং কিছুক্ষণ পরপরই মেয়ে দুটির দিকে তাকাল। কফি নিয়ে ফেরার সময় একবার ইচ্ছে হলো দাঁড়িয়ে বলে হ্যালো, আমিও বাংলাদেশি। আপনাদের বাংলায় কথা বলতে দেখে এলাম। কিন্তু অর্ণব কিছুই বলল না। রাচনার দিকে আরেকবার তাকাল সে। এবং মুগ্ধ হয়ে গেল।
রাচনার বয়স এখন সাতাশ। রূপসী মেয়েদের যা যা থাকতে হয়—সবই তার মধ্যে আছে। গায়ের রং ফর্সা আর উজ্জ্বল শ্যামলার মাঝামাঝি। কিছুটা হলুদাভ। কাঁটা কাঁটা চোখ। লম্বায় গড়পড়তা বাঙালি মেয়েদের তুলনায় একটু বেশিই। মুগ্ধ হবার মতই তার সৌন্দর্য।
চোখ না ফিরিয়ে হাঁটতে গিয়ে উল্টো দিক থেকে আসা একজনের সঙ্গে ধাক্কা লেগে কফি পড়ে গেল অর্ণবের হাত থেকে। সরি বলে সে দ্রুত সরে গেল সেখান থেকে—পাছে রাচনা কিংবা তার বান্ধবীর চোখে পরে যায় সেই ভয়ে। যদিও রাচনা কিংবা তার বান্ধবীর চোখে এসবের কিছুই পড়ল না। তারা জানলও না একটা বাঙালি ছেলে তাদেরকে দেখে হোঁচট খেয়ে দ্রুত সরে গেছে।
রাচনার মুখখানি তাই অর্ণবের ভালো মতোই মনে আছে। কিন্তু ঐদিনের পরে রাচনাকে অর্ণব আর কখনো কোথাও দেখেনি। আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তারা থাকছে একই বিল্ডিং-এ। এটাকে কি কাকতালীয় বলা যায়?
অর্ণবের গাড়ি চলে এলো তার এপার্টমেন্ট বিল্ডিং-এর নির্দিষ্ট পার্কিং ছাউনিতে। পার্ক করে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিল অর্ণব। তারপর দুজনেই চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ।
হঠাৎ রাচনা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল অর্ণবের দিকে। অর্ণব হেসে দিয়ে বলল, ‘কি ধন্যবাদ দিতে চান?’
‘সেটা তো আপনার প্রাপ্য।’
‘ভাগ্যিস আপনি চাবি হারিয়েছিলেন।’
রাচনা কী বুঝল কে জানে। সে লক্ষ্য করেছে, দেখা হবার পর থেকেই অর্ণব মাঝে মাঝেই হেয়ালী করে কথা বলছে। মাঝে মাঝে দুষ্টুমিও করছে। সে গাড়ির জানালা নামিয়ে একটু বাইরে তাকাল। গ্রীষ্মের রাত। বাইরে ফুরফুরে বাতাস বইছে। সারাদিনের গরমের শেষে সন্ধ্যার পর থেকে ডালাসের তাপমাত্রা কিছু কমতে থাকে। আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর বাইরে তাকিয়েই রাচনা বলল, ‘আমার কেন জানি গাড়ি থেকে নামতে ইচ্ছে করছে না।’ বলেই সে তাকাল অর্ণবের দিকে এবং জিজ্ঞেস করল, ‘আমি কি আরো কিছুক্ষণ বসে থাকতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন। যতক্ষণ খুশি। আপনি চাইলে আপনাকে নিয়ে আমি সারা রাত ঘুরতেও পারি।’
রাচনা মৃদু হাসল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘ভালো কথা, আপনি একবারও আমার নাম জানতে চাননি, কেন জানতে পারি?
‘কারণ আপনার নামটা আমি জানি। খুব সুন্দর নাম আপনার—রাচনা। একটু ডিফারেন্ট!’
‘থ্যাংকস। এন্ড থ্যাংকস ফর এভ্রিথিং ইউ ডিড ফর মি।’
‘ইউ আর ভেরী ওয়েলকাম।’
‘গুড নাইট অর্ণব।’
‘গুড নাইট।’
রাচনা গাড়ি থেকে বের হয়ে লম্বা পায়ে হেঁটে তার এপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে গেল। অর্ণব তাকিয়ে রইল তার চলে যাওয়ার দিকে। রাচনা এভাবে হঠাৎ করেই গুড নাইট বলে চলে যাবে—সেটা সে ভাবতেই পারেনি। রাচনা নিজেই তো বলল তার যেতে ইচ্ছে করছে না। আশ্চর্য মেয়ে তো!
অর্ণব আরো কিছুক্ষণ বসে রইল গাড়িতে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (শেষ পর্ব)

শেষ রাতের দিকে হঠাৎ করেই হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। অস্বস্তি নিয়ে চোখ মেলে তাকাল। পাশ ফিরে দেখল তিথি বিছানায় নেই। সে উঠে বসে তাকাল চারিদিকে। উঠে গিয়ে লাগোয়া বাথরুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখল, সেখানেও নেই। হাসান জানে তিথির একটা মন খারাপের জায়গা আছে। পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল—যা ভেবেছিল তাই। তিথি ব্যাক-ইয়ার্ডের সিঁড়িতে বসে আছে। কাকতালীয় ভাবে ঠিক ঐ একই জায়গায় বসে ছিল রূপা। রূপার কথা মনে হতেই হাসান ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।

আকাশ হঠাৎ করে গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। সে পরের এক্সিট দিয়ে বের হয়ে থামল একটা ফাঁকা মাঠের সামনে। বেগুনি-নীলে মেশা ব্লুবনেটস ফুলে ছেয়ে আছে সারা মাঠ। টেক্সাসের জাতীয় ফুল ব্লুবনেট। শহুরে টিপটপ গোলাপ বাগানের থেকে একদম আলাদা এই বনফুল। কাউ বয় বা কাউ গার্লের মতোই গ্রাম্য, সাধারণ কিন্তু সুন্দর।
আকাশ গাড়ির জানালা নামিয়ে দিল। ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে বাইরে। জানালা খোলা মাত্রই এক পশলা ঠাণ্ডা বাতাস এসে লাগল রূপার মুখে। রূপা চোখ বন্ধ করে ছিল। হঠাৎ বাতাসের স্পর্শে সে চোখ মেলে তাকিয়ে একবার দেখল চারিপাশটা তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার আকাশ, এখানে থামলে কেন? এনিথিং রং?’
আকাশ তাকিয়ে আছে সামনে যতদূর দৃষ্টি যায়। দিগন্ত রেখায় লাল সূর্যের আভা দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য উঁকি দেবে। বিস্তৃত খোলা মাঠে বিছানো ব্লুবনেটসের উপর দিয়ে যখন সূর্য হাসবে তখন সে রূপাকে বলবে তার মনের কিছু না বলা কথা। রূপার সঙ্গে আবার কোনদিন দেখা হতে পারে সেটা সে স্বপ্নেও কোনদিন ভাবে নি। কিন্তু প্রকৃতির রহস্য বোঝা বড়ই কঠিন। এটা প্রকৃতির রহস্য নয়ত কী? আকাশের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রকৃতির ইচ্ছেতেই রূপার সাথে তার এভাবে আবার দেখা হয়েছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, রূপাকে তার না বলা কথা গুলো বলতেই হবে। কিন্তু রূপার যা মনের অবস্থা এখন সেখানে তাকে আবার একটা দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলতেও সে চাচ্ছে না। আকাশ রূপার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল সূর্য উঠার অপেক্ষায়।

হাসান প্রায় নিঃশব্দে পেছনের দরজা খুলে এসে দাঁড়াল তিথির পাশে। তিথি মাথা ঘুরিয়ে দেখল হাসানকে। কিন্তু কোনো কথা না বলে আবার তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। হাসান বসল তিথির পাশে। কেউ কারো সঙ্গে কথা না বলে দুজনেই তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। এ যেন একদৃষ্টে শূন্যে তাকিয়ে থাকার খেলা। কে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে। একটা লম্বা সময় পার করে হাসান বলল, ‘সারারাত ঘুমাওনি তাই না?’
তিথি কোনো উত্তর দিল না। অস্বস্তিকর নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর হাসান আবার বলল, ‘তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, তিথি!’

আকাশ গাড়ি থেকে নেমে বাইরে এসে দাঁড়াল। রূপাও এসে দাঁড়াল তার পাশে। চারিদিকে একবার তাকিয়ে অসম্ভব রকম ভাল লাগায় ভরে গেল তার মন। নীল-বেগুনীর মিশ্রণে বিছানো ব্লুবনেটসের চাদরের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলো কি বলতে চাও?’

হাসান একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে থেমে থেমে বলল, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত এবং লজ্জিত। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আমার আচরণে তুমি কনফিউজড হয়েছ। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার মনে কোন লুকান অভিপ্রায় ছিল না। আমি যা করেছি, তার কোন ব্যাখ্যা হয়ত আমি দিতে পারব না। কিন্তু আমি স্বীকার করছি—আমার ভুল হয়েছে।’
তিথি হাসানের দিকে ফিরেও তাকাল না। যেভাবে ছিল সেভাবেই তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।

রূপা তাকিয়ে আছে আকাশের মুখের দিকে। আকাশ ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি একজন হতভাগ্য মানুষ। জীবনে কিছুই পাওয়া হলো না। সারাজীবন কেমন যেন মরীচিকার পেছনে দৌড়ে, জীবনটাকেই মাটি করলাম শুধু। যা পাওয়ার জন্য এই ট্র্যাকে দৌড় শুরু করেছিলাম একদিন—তা কি আমার কোনদিনই পাওয়া হবে না, রূপা?’
‘আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না, আকাশ।’ রূপা তাকিয়ে রইল আকাশের মুখের দিকে।

হাসান আবার বলল, ‘প্রত্যেক মানুষের জীবনেই একটা সময় আসে, যখন সে তার পারিপার্শ্বিকতা এবং বাস্তবতা ভুলে গিয়ে নিজের ইমোশনকে বেশী প্রশ্রয় দিয়ে বসে। অবশ্য একসময় সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং অনুশোচনাও করে।’

আকাশ আবার বলল, ‘মাঝে মাঝে ভীষণ অবাক হতাম আবার ভালও লাগত! মানুষে মানুষে এতো ভালবাসা কখনো দেখিনি আমি।’
‘কার কথা বলছো তুমি?’ রূপা অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘পার্থর মত একটা বোহেমিয়ান অগোছালো ছেলেকে তোমার মতো দীপ্তিময়ী একটা মেয়ে সারাক্ষণ আগলে রাখত। দেখে অবাক হতাম। তোমার কাছে এলেই সে খুঁজে পেত তার আপন নীড়ের ঠিকানা।’

হাসান বলল, ‘আমি জানি না, আমার কি হয়েছিল তিথি। কেন জানি না, আমিও হঠাৎই আমার বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমার ইমোশনকে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ঠকাইনি।’

আকাশ বলল, ‘আমি জানি না, আমি কেন তোমাকে বলতে পারিনি তখন। কেন জানি না আমিও পার্থর মত পালিয়ে গিয়েছিলাম, হয়ত তোমাকে আমার পাওয়া হবে না কোনদিনই, হয়ত সেই ভয়েই… কিন্তু এমন একটা নীড়ের ঠিকানা আমার বড় প্রয়োজন এখন।’

হাসান বলল, ‘আমি জানি তুমি অনেক শক্ত মনের মানুষ, সহনশীল, বুদ্ধিমতী। তবুও তোমার মনে যদি কিছুমাত্র সন্দেহ থেকে থাকে…’ বলেই হাসান তার একটি হাত তিথির কাঁধের উপর দিল, তারপর আবার বলল, ‘এই নতুন সূর্য উঠা ভোরের আলোতে আমি তোমাকে ছুঁয়ে বলতে পারি তিথি, রূপা আর আমার মাঝে কিছুই ঘটেনি।’

রূপা তাকিয়ে আছে অনেকদূরে।
আকাশ বলল, ‘যে কথাটা তোমাকে এক জীবনে বলতে পারিনি, তা বলার উপযুক্ত সময় হয়ত এখন না। পাছে তোমার মনে হতে পারে আমি তোমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছি।’
‘এখন আর কোন কিছুতেই আমি কিছু মনে করি না, আকাশ। তোমার সাথে এভাবে দেখা না হলে, আমি হয়ত তিথির ওখানেই আরো দুটো দিন থেকে তারপর আমার গন্তব্যে চলে যেতাম। কাজেই…’
‘আমি জানি জীবনে অনেক কষ্ট তুমি পেয়েছো। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতে তুমি হয়ত এখন অন্যরকম হয়ে গেছ। তবুও—এই নতুন সূর্য উঠা ভোরের আলোতে আমি তোমার কাছে একটা অনুরোধ করতে চাই, তুমি রাখবে?
রূপা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কি অনুরোধ?’
‘আমি যদি তোমাকে আর ফিরে যেতে না দেই, তুমি থাকবে এখানে? এই দেশে? আমার সাথে—নীল সমুদ্রের পাড়ে?’ একটু থেমে আকাশ যোগ করল, ‘একের পর এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। সামনে বিশাল সমুদ্র। নীল আকাশ জুড়ে জ্যোৎস্নার লুটোপুটি খেলা। চোখ বন্ধ করতেই কানে সমুদ্রের গর্জন। দেখবে না তুমি?’
রূপা প্রথমেই কিছু বলতে পারল না। চুপ করে থাকল। তার মনের মধ্যে কীসের যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। কিছুক্ষণ ভেবে সে ঘুরে দাঁড়াল আকাশের দিকে। তারপর হেসে দিয়ে বলল, ‘উত্তরটা কি তোমার এখনই চাই?’
রূপার হাসিতে এমন কী ছিল কে জানে, আকাশ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। সে জানে এই হাসির গভীরতায় কি লুকিয়ে আছে। এই হাসি একটি বিশ্বাসের হাসি। এই হাসির অর্থ হলো আমি আছি তোমার সাথে।
আকাশ হাত বাড়িয়ে দিল রূপার দিকে। কোন দ্বিধা না করেই রূপা ধরল তার হাত। তারা দুজন-দুজনের হাত ধরে তাকিয়ে রইল সামনে। ব্লুবনেটসের চাদরে ছাওয়া বিস্তৃত খোলা মাঠের উপর দিয়ে দিগন্ত রেখায় তখন নতুন সূর্য হাসছে।

হাসান অনেকক্ষণ আর কিছু বলল না। তার যা বলার ছিল বলা হয়েছে। এখন তিথি কি বলে সেটা জানার জন্যে সে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
তিথি হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল। সে কাঁধ থেকে হাসানের হাত সরিয়ে দিল আস্তে করে। তারপর যেভাবে সামনে তাকিয়ে ছিল সেভাবেই বলল, ‘তোমার কথা শেষ হয়েছে?’
হাসান চুপ করে থাকল। সে আর কিছু বলছে না দেখে তিথি আবার বলল, ‘এবার তাহলে আমার কিছু কথা তুমি শোনো।’
হাসান অবাক হয়ে তাকাল।
তিথি বলল, ‘আই নিড এ ব্রেক। তিতলিকে নিয়ে আমি কিছুদিন আলাদা থাকতে চাই।’
হাসান ভাবতেই পারেনি তিথি এমন কিছু বলবে। তার এই রূপও সে আগে কখনো দেখেনি। সে কিছুটা ভড়কে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’
‘কারণ, তোমার সঙ্গে এক ঘরে এক বিছানায় আমার ঘুমতে কষ্ট হচ্ছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আই ফিল সাফোকেটেড—আই নিড টু ব্রিদ।’
হাসান পাংশু মুখে তাকিয়ে রইল। সে কিছু খুঁজে পেল না কি বলবে।
তিথি আবার বলল, ‘তুমি জানতে চাইলে, সারারাত ঘুমাই নি, তাই না? ইয়েস, দ্যাটস রাইট—আমি সারারাত ঘুমাই নি। নট এ সিঙ্গেল মিনিট। চেষ্টা করেও পারিনি। তুমি আমার ঘুম নষ্ট করে দিয়েছ!’
হাসান চুপ করে থাকল।
তিথি তার সমস্ত রাগ-ক্ষোভ, অপমান-অভিমান একসাথে উগড়ে দিচ্ছে একের পর এক। সে বলে চলল, ‘যে নোংরা কথা গুলো তুমি আমাকে বলেছ, যে ক্ষত তুমি সৃষ্টি করেছ—ভেবেছ একবার ‘সরি’ বলাতেই সব মুছে যাবে?’
হাসান কোনো উত্তর না দিয়ে পেছনের রাস্তার দিকে তাকাল।
‘বিশ্বাস হলো কাচের মত—একবার ভেঙ্গে গেলে যতই জোড়া লাগানো হোক না কেন দাগ ঠিকই থেকে যায়! আমার কষ্ট টা কি জানো?’ বলেই তিথি সরাসরি তাকাল হাসানের চোখের দিকে। হাসান অস্বস্তি বোধ করলেও চোখ সরাল না। তিথি আবার বলল, ‘আই’ম নট আপসেট দ্যাট ইউ হার্ট মাই ফিলিংস—আই’ম আপসেট দ্যাট ফ্রম নাউ অন আই ক্যান্ট বিলিভ ইয়্যু! ইয়্যু ব্রোক মাই ট্রাষ্ট—বাট আই উন্ট লেট ইউ ব্রেক মি!’
হাসান হঠাৎ করে বাতাস চলে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেল। সে আর কিছুই ভাবতে পারছে না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উঠে দাঁড়াল তিথি। তারপর ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য কয়েক পা বাড়াতেই-
হাসান বলল, ‘ক্যান আই গেট এ লাস্ট চান্স?’
তিথি ঘুরে তাকাল। একবার গভীর দৃষ্টি নিয়ে দেখল হাসানকে। তিথি আগে থেকেই জানত, হাসান তাকে এসব কথা বলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। হাসান হয়ত যা বলেছে সব কথাই তার মন থেকেই বলেছে। হয়ত সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। সত্যি হোক আর মিথ্যা, তিথি সেগুলো নিয়ে আর ভাবতে চায় না। সে নিজের সঙ্গে অনেক বোঝাপড়া করেই সিদ্ধান্ত যা নেবার নিয়েছে। সে কিছুতেই তার সিদ্ধান্ত এক কথায় বদলে দিতে পারে না। তিথি আবার ঘুরে দাঁড়াল। এবার এক পা বাড়াতেই হাসান বলল-
‘গিভ মি ওয়ান লাস্ট চান্স—প্লিজ!’ হাসানের কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ল।
তিথি দাঁড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ করে তার কী হলো—সে বুঝতে পারছে না সে কী করবে? তার কি উচিত হাসানকে একবার সুযোগ দেয়া? তার চিন্তা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
হাসানের মন বলছে তিথি তাকে ক্ষমা করে দিবে। সে অপেক্ষায় থাকল, এই বুঝি তিথি তার সেই মায়া ভরা হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে হাসানের হাত ধরে বলবে, চলো সূর্য উঠা দেখি। হাসান হাত বাড়িয়ে দাড়িয়ে রইল—তিথির হাত ধরার অপেক্ষায়।
সারি সারি বাড়ির পেছনে বিস্তৃত খোলা লেকের পানির উপর দিয়ে দিগন্ত রেখায় তখন নতুন সূর্য হাসছে।
তিথি এখন কী করবে?

ব্লুবনেটসের তীর ঘেঁষে কান্ট্রি রোড দিয়ে আকাশের গাড়ি ছুটে চলেছে গন্তব্যে। এখনো যেতে হবে অনেকটা পথ। আকাশের চোখে কোনো ক্লান্তি নেই—নেই কোনো হতাশা, অস্থিরতা। এ যেন এক অন্য আকাশ। সে শীষ বাজিয়ে গাইতে থাকল জন ডেনভারের বিখ্যাত গান, ‘কান্ট্রি রোড টেক মি হোম!’

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৮)

হাসান ভেবেছিল তিথিকে কিছুই বলবে না। তিথি এই মুহূর্তে সামনে না এলে হয়ত কিছু বলতও না। কিন্তু সে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না। তাকে বলতেই হলো, ‘রূপার সামনে এভাবে রিয়্যাক্ট না করলেই কি হতো না, তিথি? ও তো এমনিতেই চলে যেত! এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেবার তো কোন প্রয়োজন ছিল না।’
রূপা চলে যাবার পর থেকেই তিথি কাঁদছিল। সেই কান্নার রেশ ধরেই সে ফুলে ফুলে বলল, ‘আমি কাউকে অপমান করে তাড়িয়ে দেইনি, চলে যেতেও বলিনি।’
‘কিন্তু বাকীও তো রাখনি কিছু। তোমার কাছ থেকে অন্তত আমি এরকম আচরণ আশা করিনি।’
‘তাহলে কি আশা করেছিলে। চোখের সামনে সবকিছু দেখার পরেও চুপ করে থাকলেই তুমি খুশি হতে?’
‘আমি ভাবতে পারছি না। ব্যাপারটাকে এভাবে কমপ্লিকেটেড করে ফেলবে তুমি। কি লাভ হলো তোমার?’
‘আমার জায়গায় তুমি হলে কি করতে? তো তোমার কোনো ছেলে বন্ধুর সঙ্গে তুমি যদি আমাকে এভাবে দেখতে—হাউ উড ইউ ফিল? তুমি মেনে নিতে?’
হাসান সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকল। কিছুক্ষণ পর আবার বলল সে, ‘তোমার যা বলার আমাকে একা বলতে পারতে। মেয়েটা কী ভাবল? নিজেকে এতো ছোট না করলে কি হতো না?’
‘ছোট হলে আমি হয়েছি, তুমি তো হওনি, তোমার এতো লাগছে কেন? আর রূপার ভাবনাটাই তোমার কাছে এখন বড় হয়ে গেল? আমি কী ভাবছি বা ভাবতে পারি, তাতে তোমার কিছু এসে যায় না? নাকি তুমি কেয়ার করো না?’
‘কেন কেয়ার করব না? অবশ্যই করি।’
‘তাহলে?’
‘তাহলে আর কি? বলেছি তো ভুলটা আসলে আমারই হয়েছে…’ বলেই হাসান চলে যেতে উদ্যত হতেই তিথি বলল-
‘অবশ্যই তোমার ভুল। তোমার কারণেই আজ রূপা আর আমি দুজন দুজনের কাছে ছোট হয়ে গেলাম।’
‘হ্যাঁ আমার ভুল হয়েছে—আমি রূপাকে সময় দিয়েছি, তাকে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি। কিন্তু সেটা তো আমার করার কথা ছিল না। ছিল তোমার অথবা আমাদের একসাথে। তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড দেশ থেকে এসেছে অথচ তুমি দু’টো দিন ছুটি নিতে পারনি। আমার কাছে ফেভার চেয়েছ অথচ আবার আমাকেই ব্লেম করছ।’
‘হ্যাঁ ফেভার চেয়েছিলাম কারণ আমার কাজে অনেক প্রেশার ছিল। আর ফেভার চেয়েছি বলেই কি তুমি…’
‘কি? কি করেছি আমি? তুমি এমন ভাবে রিয়্যাক্ট করছ, যেন মনে হচ্ছে আমাকে আর রূপাকে একসাথে…’
হাসান পুরো কথাটা শেষ না করলেও তিথির বুঝতে অসুবিধা হলো না সে কী বলতে চেয়েছিল। তিথি অবিশ্বাস্য চোখে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
হাসান আবার বলল, ‘আরে বাবা, ব্যাক-ইয়ার্ডে সে আমার হাত ধরেছিল, শুধু এটুকু বলার জন্যে যে হাউ গ্রেটফুল শী ইজ—আমাদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ। দ্যাটস অল।’
কিছুক্ষণ আর কেউ কিছু বলল না। ‘কেউ কী আমার কষ্টটা বুঝবে?’ হঠাৎ তিথি হাসানকে নয়—নিজেকেই যেন বলল কথাটা।
এবার হাসান একটু নরম স্বরে বলল, ‘আই ফিল ইয়োর পেইন তিথি, আই রিয়েলি ডু। আই কজড ইউ পেইন অ্যান্ড আই’ম রিয়েলি সরি ফর দ্যাট।’
তিথি আর কিছু বলল না। নীরবে কাঁদতে থাকল।
হাসান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সরে গেল তিথির সামনে থেকে।
তিথি কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। কান্নার দমকে বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে।
তিতলি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। বড়দের কথার মধ্যে আসতে হয় না, তাই সে কাছে আসেনি। মাকে কাঁদতে এই প্রথম দেখছে না তিতলি। বাবার সঙ্গে ঝগড়া হলে আগেও কেঁদেছে। কিন্তু এইভাবে ফুলে ফুলে নিঃশব্দে কান্নাটা অন্যরকম। তিতলির বুকের ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল।
হাসান সরে যেতেই তিতলি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘মামি, এভ্রিথিং উইল বি অলরাইট। সব ঠিক হয়ে যাবে।’

বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর আকাশ পাশে তাকিয়ে দেখল রূপা মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। সে নিশ্চিত, কিছু একটা হয়েছে কিন্তু সেটা কী জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কিনা সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু রূপার মলিন মুখটা দেখে তার খুব খারাপ লাগছে। হয়তো দুপুরে কিছু খায় নি। কে জানে? আকাশ রূপাকে জিজ্ঞেস করল, ‘দুপুরে খেয়েছ কিছু?’
রূপা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল, ‘না।’
‘সকালে?’
রূপা আবারো মাথা নাড়ল, ‘না।’ তারপরে বলল, ‘চা খেয়েছি।’
‘শুধু চা? সারাদিন আর কিছু খাওনি?’ বলেই আকাশ গাড়ি থামাল হাইওয়ের পাশে একটা ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে। রূপা যেতে চাইল না। কিন্তু আকাশ নাছোড়বান্দা। রূপাকে নিয়েই সে ঢুকল রেস্টুরেন্টে।

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। তিতলি আজ একা একা তার হোমওয়ার্ক শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছে। মামির গায়ের গন্ধ ছাড়া তার ঘুম আসেনা কিন্তু আজ তার মামির মন খারাপ। তাই সে তাকে আর না ডেকে একা কিছুক্ষণ চেষ্টা করে ঘুমিয়ে পড়েছে।

রূপা চুপ করে বসে আছে। আকাশ রূপার সামনে একটা ঢাউস সাইজের বার্গার এনে দিয়ে বলল, ‘নাও খাও!’
রূপা এত মন খারাপের মধ্যেও আকাশের কথা বলা আর ভাবভঙ্গি দেখে একটু হেসে দিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ আর ক্রেজী।’
আকাশ হেসে ফেলল। বলল, ‘ইউ আর রাইট।’ আকাশের কথার ভাবেই বলে দেয়—যার অর্থ দাঁড়ায়, তোমার জন্যেই আমার সব পাগলামি। তুমি যতক্ষণ পাশে আছ, আমি পাগলামি করেই যাব।

রাত বাড়ার সাথে সাথে হাসান উপলব্ধি করল, তিথির সাথে এভাবে কথা বলাটা তার ঠিক হয়নি। তার তো কোনো দোষ নেই। তিথি যা করেছে সেটা যে কোনো মেয়েই করবে। এমনকি হাসান নিজেও রিয়্যাক্ট করত। যতই ভাবছে তিথির জন্যে হাসানের মনটা ততই খারাপ হতে থাকল।
হাসান গেল তাদের রুমে। তিথি শুয়ে আছে চুপচাপ—বাঁকা হয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। হাসান আস্তে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হাত রাখল তিথির পিঠে। তিথি একটু কেঁপে উঠল। কিন্তু সে ফিরে তাকাল না। শক্ত হয়ে পড়ে রইল।
হাসান বলল, ‘সারাদিন কিছু খাও নি। চলো খাবে।’
তিথি নীরব।
হাসান আবারো বলল, ‘রাগ করেছো ঠিক আছে কিন্তু খাবে না কেন? উঠে এসো, খাওয়ার সঙ্গে রাগ করতে নেই।’
তিথি তবুও কিছু বলল না।
হাসান বলল, ‘আমিও কিন্তু সারাদিন কিছু খাই নি। তুমি না খেলে আমিও খাবো না।’ বলেই হাসান তাকে জোর করে টেনে তোলার চেষ্টা করল।
তিথি ঝটকা দিয়ে হাসানের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এ সব মেয়েলি ঢং আমার সঙ্গে দেখাতে এসো না। তুমি এখান থেকে যাও।’
‘একবার তো সরি বলেছি—আবারো বলছি। আই’ম সরি।’
‘শুধু সরি বললেই সব ঠিক হয়ে যায়?’ তিথি গায়ের উপর চাদর টেনে নিয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকল।
হাসান বুঝতে পারছে না কি করলে তিথির রাগ কমবে। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বের হয়ে গেল।

আকাশের গাড়ি ইন্টারস্টেট হাইওয়ে-৩৫ ধরে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। রাতের রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। এতো রাতে মাঝে মাঝে দু’একটি ১৮ চাকার ট্রাক ছাড়া সাধারণ গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। দু’দিকে মাঠের পর মাঠ খালি পরে আছে। কালো রাস্তা আচলের মত লম্বা করে বিছানো। হঠাৎ করেই একটি ১৮ চাকার ট্রাক পাশের লেনে চলে এসে ছুটছে সমান গতিতে। আকাশের হাতের স্টিয়ারিং সামান্য কেঁপে উঠল। সে তার গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে ট্রাকটাকে চলে যেতে দিল। একবার তাকাল রূপার দিকে। রূপা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে—শূন্য দৃষ্টিতে।

তিথির চোখে ঘুম নেই। ক্লান্তি আর অবসাদগ্রস্ত শরীরটা নিয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। এপাশ ওপাশ করেছে অনেক, তবু ঘুম আসেনি। হাসানের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাতে তার অস্বস্তি লাগছে। সে হাসানের ঘুমিয়ে পরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে উঠে পড়ল।
তিথির বড় অভিমান হলো রূপার উপরে। সে যাই বলুক—তাই বলে এভাবে চলে যেতে হবে? একবার তার সাথে কথা বলে গেলে কী হতো? আকাশের সাথে যদি দেখা না হতো, তাহলে? তিথির নিজের উপরেও ভীষণ রাগ হলো। কিন্তু সেই বা কী করবে?
রূপা যদি কোনোদিন যোগাযোগ না করে তাহলে ওর সাথে আর কখনোই কথা হবে না। তিথির মনে ক্ষীণ আশা—হয়ত রূপা ওকে একবার ফোন দেবে। ফোনটা দেখা দরকার। সে দ্রুত গেল লিভিং রুমে। কিন্তু সেখানে ফোন নেই। তিথির সন্দেহ হলো—রূপা নিশ্চয়ই আকাশকে ফোন করেছিল, না হলে আকাশ জানবে কী করে যে রূপা চলে যেতে চায়? ভাবতে ভাবতেই সে গেল রূপার রুমে। দেখল ফোনটা নাইটষ্ট্যান্ডে। সে ফোন হাতে নিতেই দেখল একটা ভাঁজ করা কাগজ। তিথি কাগজটা খুলে দেখল রূপার লেখা কথা গুলো। সে একবার পড়ল। আবার পড়ল। পড়তে পড়তেই তার চোখ ভিজে উঠল।
তিথি কলার আইডি চেক করল। না কোন ফোন আসেনি। সে সেন্ট বাটনে চাপ দিয়ে দেখল একটা নাম্বার। সময় মিলিয়ে তিথি নিশ্চিত হলো এটা আকাশেরই নাম্বার। সে একবার ভাবল তারপর রি-ডায়াল বাটনে চাপ দিয়ে ফোনটা কানের কাছে ধরে চুপ করে রইল।
আকাশের ফোন বেজে উঠল। এতো রাতে কে ফোন করল? আকাশ গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে তার ফোনটা নিল। সে একবার ফোনের দিকে তাকাল। নাম্বারটা পরিচিত লাগছে। আকাশ জানে এই নাম্বার থেকে আগেও তার কাছে কল এসেছে। সে ফোনটা নিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
তিথি বলল, ‘আমি তিথি। রূপা কি আছে আপনার সঙ্গে?’
আকাশ পাশে দিকে তাকিয়ে দেখল রূপা সীটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সে বলল, ‘জি আছে।’
‘একটু দেয়া যাবে?’
আকাশ আস্তে করে ডেকে তুলল রূপাকে। তারপর ফোনটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘তোমার ফোন।’
রূপা একটু অবাক হয়ে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
রূপার গলা শুনে তিথি ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। তারপর বলল, ‘তুই এভাবে চলে যেতে পারলি?’
রূপা চুপ করে রইল।
তিথি বলল, ‘একবার বলে গেলে কী হতো? আমি কি তোকে আটকে রাখতাম?’
রূপা কী বলবে? অভিমানে তার বুকটা ভার হয়ে আছে। সে কিছুই বলতে পারছে না।
‘কিছু বলছিস না কেন?’
রূপা বলল, ‘কী বলবো?’
তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘কিছুই বলবি না।’
‘আই’ম সরি।’
‘আমি তোকে সরি বলতে বলেছি?’
‘বাট আই’ম রিয়েলি সরি। আমার জন্যেই তো…’
আকাশ তাকালো রূপার দিকে। সে এখনো জানে না আসলে কী ঘটেছে। রূপাকে নিয়ে আসার সময় একবার জিজ্ঞেস করেছিল, কি হয়েছে—কোনো সমস্যা? রূপা এড়িয়ে গেছে। আকাশও আর কিছু জিজ্ঞেস করে নি। কিন্তু তার স্বল্প বুদ্ধিতে অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছে তিথি আর রূপার মধ্যে যদি কিছু হয়ে থাকে সেটা হাসানকে নিয়েই। সেদিন মুভি থিয়েটারে হাসানের সঙ্গে রূপাকে দেখেও তার কাছে একটু খটকা লেগেছিল। আকাশ সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার কান খাড়া হয়ে আছে প্রথম থেকেই তিথি আর রূপার ফোন কথনের দিকে।
‘আমি আগামী উইকএন্ডে অস্টিন যাচ্ছি—দু’দিন তোকে নিয়ে ঘুরব। শপিং করব। মুভি দেখব। তুই অস্টিন পৌঁছে আমাকে ফোন দিবি।’
মুভির কথা আসতেই রূপার মনে পড়ল, হাসান বলেছিল তিথিকে নিয়ে কখনো মুভি দেখতে যেতে পারেনি। তাহলে কি হাসান ভাই মিথ্যে বলেছে? কী জানি? রূপা এখন আর কিছু ভাবতে চায় না। সে কোনো কথা বলল না।
তিথিও চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘আমি কি করব বল, আমি তো আর ইচ্ছে করে…’ কথা শেষ না করে তিথি থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে রাখি। ভাল থাকিস।’
ফোন কেটে দিয়ে তিথি রূপার বিছনাতেই শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়েই দেখল মস্ত বড় একটা চাঁদ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই ডাকে সারা দিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল তিথি।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৭)

তিথি কঠিন স্বরে বলল, ‘এসব কি হচ্ছে, হাসান?’
হাসান সামনে এগিয়ে এসে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে? শরীর খারাপ?’
‘না শরীর খারাপ না। শরীর ঠিকই আছে।’
‘তাহলে?’
‘কি তাহলে? কেন আমি এসে ডিস্টার্ব করলাম?’
‘এসব কি বলছো রূপা?’
‘রূপা?’
‘সরি, আই মিন তিথি!’
‘মাথার মধ্যে বেশ ভাল ভাবেই ঢুকেছে তাহলে?’
‘কীই বলছো তুমি?’
‘কী বলছি, বুঝতে পারছ না?’
‘না বুঝতে পারছি না।’
‘ভেতরে এসো, তোমার সাথে আমার কথা আছে।’ বলেই তিথি রূপার দিকে একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
হাসান একবার তাকাল রূপার দিকে। দুজনেই এতটাই বিব্রত বোধ করছে যে কেউ কারো দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারল না।
প্রচণ্ড অপমানে রূপার কেঁদে ফেলার মত অবস্থা হলো। সে মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল। দেখল তিথি বসে রয়েছে অন্যদিকে তাকিয়ে। রূপা লিভিং রুমের টেবিল থেকে কর্ডলেস ফোনটা নিয়ে তার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
হাসান ভেতরে ঢুকতেই তিথি উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘কি বুঝতে পারছ না বলো। আবার বলো না যে আমি যা ভাবছি তা ঠিক না।’
‘হ্যাঁ তাই।’
‘আমার নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে বলো? এখন যা দেখলাম আর দু’দিন ধরে যা দেখছি সে গুলো?’
হাসান বলল, ‘তিথি, প্লিজ আমার কথা শোন, আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলব।’
‘ঠিক এই কথাটাই যে বলবে—তাও আমি জানতাম। কি বোঝাবে তুমি? তুমি ভেবেছ আমি কিছু বুঝি না? আমি তো তিতলি না, তিথি। আই এক্সাটলি নো হোয়াটস গোয়িং অন। ডোন ইভেন ট্রাই টু ফুল মি!’ বলেই তিথি সোফায় বসে অঝরে কান্না শুরু করল।
হাসান বুঝতে পারছে না কি করবে। সে অসহায়ের মত বসে রইল অন্য সোফাতে।
রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বসে রইল রূপা। অপমান আর অভিমানে তার চোখ ভিজে গেছে। কিছুতেই সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটা কাগজে লেখা নাম্বার দেখে ডায়াল করল।
আকাশের এক দুঃসম্পর্কের চাচা থাকেন ডালাসে। তার কিছু বন্ধুও আছে। তবে এখানে এলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তার চাচার বাসাতেই থাকে সে। আজকে তার ফিরে যাবার কথা ছিল। কিন্তু সে যায়নি। আকাশের খুব ইচ্ছা হলো রূপার সঙ্গে আরেকটিবার দেখা করে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো রূপার কোনো ফোন নেই—আর তাড়াহুড়োয় ওদের কারো ফোন নাম্বার নেয়া হয়নি। কাল রাতে রূপাকে নামাতে হয়েছে বলে বাসার ঠিকানাটা ওর মনে আছে। ইচ্ছে করলে সে চলে যেতে পারবে অনায়াসে। কিন্তু যদি বাসায় না থাকে। তাই সে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ভেবে পেল না। কিন্তু ওর মন বলছে রূপা একবার হলেও একটা ফোন করবে। রূপার কাছে ওর নাম্বার আছে। কাল রাতে রেস্টুরেন্টে ডিনার করার সময় একটা কাগজে লিখে রূপার হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘যখন ইচ্ছে ফোন করো। রিমেম্বার, আই অ্যাম অনলি এ ফোন কল অ্যাওয়ে। কল দিলেই চলে আসব সে আমি যত দুরেই থাকিনা কেন। আমি তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকব।’
রূপা হাসতে হাসতে বলেছে, ‘বাব্বা-এত প্রেম কোথায় ছিল এতদিন?’
আকাশের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ওর মন বলছে এটা রূপার ফোন। সে ফোন ধরেই বলল, ‘রূপা!’
রূপা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। ফোনের ওপাশ থেকে আকাশ তার ভারী নিঃশ্বাসটা বুঝতে পারল। সে আবার বলল, ‘রূপা, তুমি?’
‘হ্যাঁ।’ ভারী কণ্ঠে রূপা বলল, ‘তুমি কি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে?’
‘হ্যাঁ পারব। কখন আসতে হবে বলো?’
‘এখুনি।’
‘নো প্রব্লেম। আই অ্যাম অন মাই ওয়ে।’
আকাশের সংগে কথা শেষ করে রূপা দ্রুত তার সুটকেসটা গুছিয়ে নিল। কিছু ব্যবহারের কাপড় ছিল বাথরুমে সেইসাথে প্রসাধনীর যা যা ছিল সব ভরে ফেলল। তারপর সাইড টেবিল থেকে একটা কাগজ বের করে তিথির জন্যে একটা ছোট্ট মেসেজ লিখল। মেসেজ না বলে চিঠিও বলা যেতে পারে।
তিথি,
আমি চলে যাচ্ছি। আরো দুটো দিন থাকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু পরিস্থিতি যেভাবে জটিল হচ্ছে তাতে সংকট আরো বেড়ে যেতে পারে। জেনে শুনে সংকট বাড়ানোর কী দরকার।
আমি যেদিন প্রথম আমেরিকায় ট্রেনিং-এর চিঠি পেলাম—সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম সেটা আমেরিকায় আসার জন্যে না—শুধু তোর সাথে দেখা হবে এই ভেবে। দুর্ভাগ্য আমার তোর সাথে দেখা হলো কিন্তু তার পরিণতি যে এমন হবে তা আমার কল্পনার অতীত ছিল। আফসোস থেকে গেল যে তোর সাথে দু’দণ্ড সময় কাটাতে পারলাম না—যদিও এতে তোর কোন হাত ছিল না। আমেরিকার জীবনটাই যে এমন, হয়ত না এলে কিছুই বুঝতে পারতাম না।
যাওয়ার আগে দুটি কথা বলা দরকার।
হাসান ভাইকে তোর চেয়ে পৃথিবীর আর কেউ ভাল চিনে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। তারপরেও একজন মেয়ে হয়েই বলছি—আমার ধারণা, বিয়ের আগে অথবা পরে, তুই ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের একাকী সান্নিধ্যে সে যায়নি। মানুষটা খুবই সরল এবং কিছুটা বোকাও। সে ভণিতা করতে জানেনা। না, তার হয়ে সাফাই গাইছি না। আমি শুধু আমার উপলব্ধির কথাটা তোকে বললাম। তুই তাকে ভুল বুঝিস না। এটুকুই শুধু আমার অনুরোধ থাকবে তোর কাছে।
আবার কোনদিন দেখা হবে কিনা জানিনা। পারলে ক্ষমা করিস। তিতলির জন্য আদর।
ভাল থাকিস।
ইতি, তোর রূপা।
লেখা শেষ করে রূপা বড় একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর চিঠিটা ভাঁজ করে নাইটস্ট্যান্ডের উপরে রেখে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকল।
তিথি আরো কিছুক্ষণ কেঁদে কেটে তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।
তিথিকে না ডেকে হাসান গেল তিতলিকে আনতে। গাড়িতে উঠেই তিতলি বুঝতে পারল তার বাবার মুড খারাপ। সাধারণত হাসান খুব হেসে হেসে জিজ্ঞেস করে, তোমার স্কুল কেমন গেল আজকে? এনিথিং ইন্টারেস্টিং টু শেয়ার? তখন তিতলি গরগর করে সব কথা বলা শুরু করে। বাসায় তেমন কোনো কথা না বললেও গাড়িতে উঠলেই তিতলি নন-স্টপ কথা বলে। সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইউ ওকে বাবা?’
‘ইয়েস, আই’ম ফাইন।’ হাসান তিতলির দিকে না তাকিয়েই অন্যমনস্ক ভাবে বলল।
‘ইউ সিমস আনমাইন্ডফুল।’
হাসান কোনো কথা না বলে সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে থাকল। তিতলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার ইজ রূপা আন্টি?
‘শী’জ অ্যাট হোম।’
‘আই থট শী’জ উইথ ইয়্যু!’
‘এত প্রশ্ন করছ কেন তিতলি? বললাম না সে বাসায়? তোমার আম্মুও বাসায়।’
হঠাৎ করে হাসানের রেগে যাওয়ায় তিতলি ঘাবড়ে গেল। সে বুঝতে পারল না তার বাবার কি হয়েছে। তবে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে সেটা বুঝতে তার কষ্ট হলো না। সেদিনও সে দেখেছে তার আম্মুকে বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে। কিছু একটা হচ্ছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে না সেটা কী। মনে হয় বড়দের ব্যাপার তাই সে আর কোনো কথা না বলে চুপ রইল।
হাসান বাসায় ফিরে ড্রাইভওয়েতে গাড়ি পার্ক করতেই তিতলি বলল, ‘আই’ম সরি, বাবা।’ বলেই সে দৌড়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। হাসান চুপচাপ বসে রইল গাড়িতে।
আমি এখুনি আসছি বলে আকাশ এলো চার ঘণ্টা পর। ওর দেরী হচ্ছে দেখে এক ঘণ্টা পর রূপা আরেকবার ফোন করল তাকে। কিন্তু সে ফোন ধরল না। ইতিমধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। এই সময়টুকু পার করতে রূপাকে যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিতে হলো। রূপা ভেবে পেল না, তার সাথেই কেন সব সময় এমন হয়। সে ঘন ঘন ঘড়ি দেখল। কয়েকবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। এবং আশ্চর্যজনক ভাবে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।
রূপার ঘুম ভাঙ্গল তিতলির ডাকে। সে কতক্ষণ ঘুমিয়েছে মনে করতে পারল না। সে উঠে দরজা খুলে দিতেই তিতল বলল, ‘তোমার বন্ধু এসেছে।’ তিতলির মুখে পরিষ্কার বাংলা শুনে রূপার বেশ ভাল লাগল। হঠাৎ করে মনে হলো, তিথির মেয়েটা বেশ সুন্দর হয়েছে। ওর খুব ইচ্ছে হলো ওকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু তার আগেই তিতলি দৌড়ে চলে গেল।
রূপা চোখ-মুখে পানি দিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে তার সুটকেসটা নিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলো। এসেই দেখল আকাশ বসে আছে হাসি হাসি মুখ করে। হাসানের সঙ্গে কথা বলছিল হয়তো। হাসানকেও দেখল, কিন্তু বেশ গম্ভীর। বোঝাই যাচ্ছে দুপুরের বিষয়টা তাকে নিশ্চয়ই যন্ত্রণা দিচ্ছে। সে সামনে এগিয়ে এসে আকাশকে বলল, ‘এতক্ষণে এলে?’
আকাশ হাসতে হাসতেই বলল, ‘আর বলো না, একটা ঝামেলা হয়েছিল। পরে বলছি সবকিছু।’
‘ঠিক আছে চলো।’
হাসান চমকে তাকাল। এবং বুঝতে পারল রূপা চলে যাচ্ছে—একেবারে। সে কী বলবে বুঝতে পারল না।
আকাশ ওর সুটকেসটা নিয়ে বের হয়ে গেল। রূপা বলল, ‘হাসান ভাই, আমি চলে যাচ্ছি। অনেক কষ্ট দিয়ে গেলাম।’
হাসান কিছু বলল না। অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
তিতলি কাছেই দাঁড়ান ছিল—রূপা তিতলিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। তিতলি বুঝতে পারছে না রূপা আন্টি কাঁদছে কেনো। সেও রূপাকে জড়িয়ে ধরে থাকল কিছুক্ষণ।
হাসানের বলতে ইচ্ছে করছে অনেক কিছুই কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। রূপা এভাবে হুট করে চলে যেতে চাইবে সেটা ছিল তার ধারণার বাইরে। রূপার এভাবে চলে যাওয়াটা শোভনীয় হচ্ছে না—কিন্তু তাকে থাকতেও বলতে পারছে না। নিজেকে হঠাৎ করেই খুব ছোট মনে হলো। তবুও হাসান একবার বলল, ‘তিথিকে বলে যাবে না।’
রূপা কিছু বলল না। তিতলিকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শুধু। তারপর ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বের হয়ে গিয়ে আকাশের গাড়িতে উঠল।
আকাশ একবার তাকাল রূপার দিকে তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বের হয়ে গেল ড্রাইভওয়ে থেকে।
হাসান ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাড়িয়েই দেখল তিথি অঝরে কাঁদছে।
(চলবে…)

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৬)

হাসান তার অফিস রুমে বসে কাজ করছে। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে দরজার দিকে। এখন প্রায় মাঝ দুপুর। অথচ রূপা একবারের জন্যেও বের হয়নি। সে কি এখনো ঘুমোচ্ছে। হাসান একবার ভাবল ডেকে তুলবে কিনা। তারপর ভাবল, থাক—যখন ওঠার উঠুক।
রূপা দুপুর পর্যন্ত তার রুমের ভিতরেই থাকল। যদিও তার ঘুম ভেঙ্গেছে অনেক আগেই। কিন্তু দুপুরের পরে তার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হলো। সম্ভবত এতক্ষণ না খেয়ে থাকার জন্যে। সে রুম থেকে বের হয়ে কিচেনে ঢুকল তারপর নিজে থেকেই এক কাপ চা বানিয়ে ব্যাক-ইয়ার্ডে গিয়ে দাঁড়াল।
তিথিদের বাসার ব্যাকইয়ার্ডের একটা অংশ ঢালু হয়ে নীচে নেমে গেছে। নীচে নামার জন্যে আবার কয়েক ধাপের ইটের সিঁড়ি দেয়া আছে। রূপা প্রথম সিঁড়িটার উপরে বসে দূরের বাড়ি গুলির উপর দিয়ে লেকের দিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ পর হাসান এসে দাঁড়াল রূপার পাশে। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার শরীর ঠিক তো?’
রুপা বলল, ‘হ্যাঁ। কেন হাসান ভাই?’
‘না মানে এত দেরী করে বের হলে তাই ভাবলাম…’
‘এমনিই একটু মাথা ব্যথা করছিল।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রূপা আবার বলল, ‘আপনাদের বাসার ব্যাক-ইয়ার্ডটা খুব সুন্দর। এখানে বসে থাকতে বেশ লাগছে।’
‘হুমম।’
রূপা অবাক হলো। সাধারণত কেউ কোনো কিছুর প্রশংসা করলে উত্তরে ধন্যবাদ জানানো একটা সাধারণ ভদ্রতা। কিন্তু হাসান কিছুই বলল না।
হাসান আর কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রূপার মনে হলো হাসান কিছু হয়ত বলতে চায় কিন্তু বলছে না। সে বলল, ‘কাল আকাশের সঙ্গে এভাবে চলে যাওয়ায় আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?’
‘রাগ করবো কেন? তোমার উপর রাগ করার অধিকার কি আমার আছে?’
‘মানে?’
‘মানে তো সহজ রূপা, কারো উপর রাগ করতে হলে রাগ করার অধিকার তো থাকতে হবে, তাই না? তোমার উপর রাগ করার কোন অধিকার নিশ্চয়ই আমার তৈরী হয় নি!’
‘হলে করতেন?’
হাসান সে কথার কোন উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসান বলল, ‘আকাশের সঙ্গে তোমার কি কথা হলো?’
‘এক যুগ পরে দেখা হলে যে ধরণের কথা হয়, তেমনই। না চাইতেও পেছনের অনেক কথাই বলতে হলো। আমি কেন বিয়ে করি নি, পার্থকে এখনো ভুলতে পেরেছি কী না, ইত্যাদি।’
‘ও তোমাকে ভালবাসতো তাই না?’
‘কে?’
‘আকাশ!’
‘একথা আপনার মনে হলো কেন?’
‘কাল ওর চোখে যে আনন্দ আমি দেখেছি—তাতে করে নিশ্চিত বলে দেয়া যায় যে, সে তোমাকে খুবই পছন্দ করতো।’
‘হয়ত করত। আমরা খুব ভাল বন্ধু ছিলাম।’
‘হয়ত বলছ কেন? তুমি জানতে না?’
‘জেনেছিলাম—হঠাৎ করে ওর হারিয়ে যাবার অনেক পরে এবং সেটা পার্থর কাছ থেকেই।’
‘আকাশ বিয়ে করে নি?’
‘করেছিল, একটা মেক্সিকান মেয়েকে। কিন্তু বিয়েটা বেশিদিন টিকেনি। এখন সিঙ্গেল।’
‘ও!’
হাসানকে দেখে মনে হচ্ছে তাকে একধরনের অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে একবার রূপার পাশে গিয়ে বসল। তারপর আবার উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ির দু ধাপ নীচে নেমে ঘুরে দাঁড়াল রূপার দিকে। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘রূপা তোমাকে আমার কিছু কথা বলা দরকার।’
রূপা থমকে গেল। তারপর আস্তে করে তাকাল হাসানের চোখের দিকে—একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে।
‘আমি জানি না আমি যা বলতে চাই, ঠিকমত বোঝাতে পারব কিনা। তবু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই।’
হাসানের ভূমিকা রূপাকে দ্বিধায় ফেলে দিল। সে চুপ করে মুল কথা শোনার অপেক্ষায় রইল।
একটা দীর্ঘ বিরতি দিয়ে হাসান বলল, ‘তুমি একটা চমৎকার মেয়ে। যে কোনো ছেলেরই তোমার সঙ্গ ভাল লাগবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা বলতে দ্বিধা নেই তোমাকে আমারো ভাল লেগেছে—আমার কিছু অসংলগ্ন আচরণে তোমার কাছে মনে হতে পারে—আমি হয়ত তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি। ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’
এটুকু বলে হাসান একবার রাস্তার দিকে তাকাল। তারপর আবার শুরু করল, ‘আমারো সব সময় ইচ্ছে করে তিথিকে নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়াতে। সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখতে। কিন্তু অফিস, সংসার আর তিতলি’র বাইরে ওর জগতে আর কিছুই নেই—আর কিছুই ভাবতে পারে না। আমরা একসাথে শেষ কবে ঘুরতে গিয়েছি মনে নেই। কতবার ওকে নিয়ে মুভি দেখতে চেয়েছি—কখনই হয়ে উঠেনি।’
থেমে থেমে হাসান বলে চলল, ‘সাধারণত হাজব্যান্ডরা ব্যস্ত থাকে—স্ত্রীদের সময় দিতে পারে না, অথচ আমাদের হয়েছে উলটো। তাই তোমাকে নিয়ে যখন ঘুরতে বেরিয়েছি—আমার কাছে অন্যরকম মনে হয়েছে। অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করেছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও তিথির অভাব আমি বুঝতে পারিনি। আই অ্যাম সরি বাট আই মাস্ট কনফেস!’
রূপা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়—হাসান আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছে।
হাসান আবার বলল, ‘তুমি হয়ত ভাবছ, এসব কথা আমি কেন বলছি? এগুলো কিন্তু কোনো অজুহাত নয়। নিজেকে স্বচ্ছ প্রমাণ করার কোনো চেষ্টাও নয়। তুমি স্মার্ট মেয়ে, আমি জানি তুমি জানো আমি কি বলতে চাচ্ছি। আমার কোন ব্যবহারে তুমি যদি কষ্ট পেয়ে থাকো, তার জন্যে আমি দুঃখিত। আই অ্যাম ট্রুলি সরি।’
রূপা কি বলবে ভেবে পেল না। সে চুপ করেই রইল।
‘তিথি অত্যন্ত ভাল মনের একটা মেয়ে। অসম্ভব কেয়ারিং-পুরো সংসার, তিতলির স্কুল-হোমওয়ার্ক সব কিছু ও একাই সামাল দেয়। মাসের একটা লম্বা সময় আমাকে বাইরে থাকতে হয়—সে একা মেয়েকে নিয়ে থাকে। একা হাতেই সব কিছু আগলে রেখেছে। ওর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার কিছু ভুলের কারণে ও কষ্ট পাচ্ছে—’
হাসান আর কিছু বলল না। সে চুপ করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
হাসানের কথায় রূপার মনটা একটু খারাপ হলো। এবার সে হাসানকে নিশ্চিত করার জন্য বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি হাসান ভাই। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। বরং আমারই উচিত আপনাকে ধন্যবাদ জানানো—আমাকে সময় দেবার জন্যে। আমারো অনেক ভাল লেগেছে। সত্যিকার অর্থেই আমি ভাবতে পারিনি আমার সময়টা এত ভাল কাটবে। আপনারা দুজনেই আমার জন্যে যা করলেন—তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ।’
রূপা উঠে দাঁড়িয়ে হাসানের পাশে দাঁড়াল। তারপর হাসানের হাত ধরে আশ্বস্ত করার জন্যে একটা ঝাঁকি দিয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ হাসান ভাই—থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভ্রিথিং।’
তিথি দেখল রূপা হাসানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
গত কয়েকদিনের বিক্ষিপ্ত ঘটনা, সব কিছু মিলিয়ে আজ সকাল থেকেই তিথির মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। অফিসে যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু কিছু দরকারি কাজ যে গুলো তিথিকেই করতে হতো তাই অনিচ্ছা সত্বেও সে অফিসে গেল। রূপাকে সময় দেয়া হচ্ছে না, এই ব্যাপারটা নিয়েও তার মন খারাপ। তাই ভাবল আজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে দুই বান্ধবী মিলে জম্পেশ আড্ডা দিবে। রূপাকে নিয়ে হাসানের বাড়াবাড়িটাও ওকে ভাবাচ্ছে। মনটা খচ-খচ করছে। কিন্তু হাসান তো এমন তরল চরিত্রের মানুষ ছিল না কখনই—সে তাকে চিনে। তারপরেও মানুষের মন বলে কথা।
তিতলিকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে পৌঁছেই দ্রুত হাতের কাজ গুলো সেরে ফেলার চেষ্টা করল তিথি। কয়েকটা ক্লায়েন্টের ফোন কল ছিল—সে গুলো করল। কয়েকটি ইমেইল রিপ্লাই করল। দুটো টিকেট চেঞ্জের রিকোয়েস্ট ছিল, সেগুলো করে ক্লায়েন্টকে নতুন কনফার্মেশন ইমেইল করতে করতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। তিথি ওর অফিস ম্যানেজারকে বলে লাঞ্চ ব্রেকে বাসায় ফিরে এলো।
ঘরে ঢুকে তিথি দেখল বাসায় কেউ নেই। হাসান নেই ওর অফিস রুমে। রূপার রুমও খালি। তিথি ভাবল হাসান হয়তো রূপাকে নিয়ে লাঞ্চ করতে বাইরে গেছে কেননা ফ্রিজে দু’দিনের পুরনো খাবার ছাড়া তেমন কিছুই নেই। খাবারের কথা মনে হতেই সে কিচেনে গেল। ফ্রিজ থেকে পুরনো খাবার বের করে গরম করার জন্যে মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে কিচেনের জানালা দিয়ে ব্যাক-ইয়ার্ডে তাকাল এবং সঙ্গে সঙ্গে রক্ত শূন্য হয়ে গেল তার মুখ। তিথি সরে এসে ঘরের পেছনের কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবার দেখল রূপা আর হাসানকে—হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। তিথি কাল বিলম্ব না করে বের হয়ে এলো তারপর তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকল, ‘হাসান!’
হাসান আর রূপা দুজনেই চমকে ঘুরে তাকাল। দেখল তিথি দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিয়ে দুজনেই অপ্রস্তুত ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৫)

আকাশ রূপাকে নিয়ে এসেছে অদূরেই হোয়াইট রক লেকের ধারে একটা কফি শপে। লেকের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কফি শপের নামও হোয়াইট রক কফি। এই কফি শপের বিশেষত্ব হলো এখানে কাস্টমরাই তাদের গানের সরঞ্জাম নিয়ে এসে গান-বাজনা করে। স্টুডেন্টরা বসে হোমওয়ার্ক করে। প্রেমিক-প্রেমিকারা বসে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে। দোতলা কফি শপের পুরোটা জুড়েই রয়েছে স্থানীয় কফি প্রেমিকদের আনাগোনা।
আকাশ নিজের জন্যে ক্যাফে লাটে আর রূপার জন্যে ক্যাপাচিনো অর্ডার দিল। রূপাকে এভাবে কাছে পেয়ে ভাল লাগার সাগরে ভাসছে আকাশ। সে সারাক্ষণ রূপার একটি হাত ধরে রেখেছে। গাড়ি চালানোর সময়ও ছাড়েনি। রূপার মধ্যে এই মুহূর্তে কোনো রকম অস্বস্তি বোধ নেই। বিদেশের মাটিতে দেখা হয়েছে বলেই হোক আর ইউনিভার্সিটির স্মৃতির কারণেই হোক—আকাশকে পেয়ে রূপা যেন নিজের কাছের কাউকেই ফিরে পেয়েছে।
আকাশ রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তারপর বলো, কেমন আছো?’
‘ভাল।’
‘জাস্ট ভাল?’
‘হ্যাঁ, ভালই তো।’ রূপা হেসে ফেলল।
‘কবে এসেছ আমেরিকায়?’
‘লাস্ট সানডে-তে। অফিস থেকে একটা ট্রেনিং-এ পাঠিয়েছে। অস্টিনে।
‘তাই? দ্যাটস গ্রেট।’
‘ট্রেনিং-এ যাবার আগে ভাবলাম তিথির সঙ্গে একটু সময় কাটিয়ে যাই। তাই ডালাসে আসা।’
‘তিথি?’
‘ওই যে আমার বান্ধবী। ওর হাজব্যান্ডই তো হাসান ভাই!’
‘কিন্তু সময়তো দেখি বান্ধবী নয়, কাটাচ্ছিলে বান্ধবীর হাজব্যান্ডের সঙ্গে। হা, হা, হা…’
মুহূর্তেই রূপার চেহারা কালো হয়ে গেল।
রূপাকে সহজ করার জন্যে সঙ্গে সঙ্গেই আকাশ বলল, ‘নেভার মাইন্ড, আই ওয়াজ জাস্ট কিডিং।’
রূপা কিছু বলল না। কফিতে চুমুক দেবার অজুহাতে আকাশের হাত থেকে ওর হাতটি ছাড়িয়ে নিয়ে ঢাউস সাইজের ক্যাপাচিনোর কাপটি দু’ হাতে পেঁচিয়ে ধরে ছোট্ট একটা চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আকাশ বলল, ‘মাইন্ড করলে? প্লীজ মাইন্ড করো না। অনেকদিন পর তোমাকে কাছে পেয়ে তোমার সঙ্গে সেই আগের মত একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে হলো। সরি…’
রূপা আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজেকে সহজ করার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘মাইন্ড করিনি।’
রূপা আশ্বস্ত করায় আকাশ আবার উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সে বলল, ‘মনে আছে রূপা, ক্যাম্পাসে তুমি ছিলে আমাদের ব্যাঙ্ক। কিছু খেতে ইচ্ছে করলেই তোমাকে খুঁজে বের করতাম। আমাদের পকেটে তো কখনোই তেমন টাকা-পয়সা থাকত না। হা হা হা।’
রূপা হেসে ফেলল।
‘তারপর আমাদের সাথে যোগ দিল পার্থ। কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো। এসেই ভাগ বসাল। এক সময় সবটুকু রূপার মালিক বনে গেল সে। আমরা অবশ্য জেলাস হতাম কিন্তু যখন দেখতাম তুমিই আগলে রেখেছ তাকে—তখন আমাদের আর কিছুই করার থাকল না। তুমি ছিলে আমাদের সবার, হুট করে হয়ে গেলে পার্থর একার, কেমন লাগে বলো?’
রূপা আকাশের কথার ধরনে আবারো হেসে ফেলল। সে বলল, ‘বাদ দাও ওর কথা। তোমার কথা বলো শুনি—পরীক্ষা শেষ করে সেই যে হারিয়ে গেলে… কেউ তোমার কোন ট্রেস করতে পারেনি। আমেরিকায় কবে এলে?’
‘ওই যে বললে হারিয়ে গেলাম। তখনই চলে এসেছিলাম।’
‘তো কি করছো, এখানে?’
‘একটা ইউনিভার্সিটিতে পরাই। টেক্সাস এএন্ডএম-এর করপাস ক্রিস্টি ক্যাম্পাসে। ডালাস থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার ড্রাইভ।’
‘করপাস ক্রিস্টি কি কোনো জায়গার নাম?’
‘হ্যাঁ। ভীষণ সুন্দর একটা জায়গা। টেক্সাসের দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগরের একটি শহর আর বে-এরিয়ার একটা আইল্যান্ডের মধ্যে আমাদের ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর নৈসর্গিক লীলাভূমি করপাস ক্রিস্টি ভ্রমণ পিয়াসু মানুষের চারণভূমি বলা চলে। অবসর সময়ে এই আইল্যান্ডে ছুটে আসে অনেক পর্যটক।’
‘ওয়াও! শুনেই তো লোভ হচ্ছে। আর তুমি যেভাবে বর্ণনা দিচ্ছ—বাব্বা!’
‘তুমি যাবে?’
‘অস্টিন থেকে কতদূর?’
‘মাত্র তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। ডালাস থেকে অস্টিন হয়েই করপাস ক্রিস্টি যেতে হয়।’
রূপা হঠাৎ করেই কি যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘ডালাসে কি মাঝে মাঝেই আসো নাকি?’
‘হ্যাঁ, তাতো আসিই। এখানে অনেক বাঙালি আছে। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আছে, দোকান আছে যেখানে বাংলাদেশি আইটেম, মাছ-মাংস সবই পাওয়া যায়। যখনই আসি, এসব দোকান থেকে ইচ্ছে মত দেশী জিনিষপত্র কিনে নিয়ে যাই। আমি যেখানে থাকি সেখানে তো আর এসব কিছু পাওয়া যায় না। করারও তেমন কিছু নেই।’
‘তাহলে সময় কাটাও কিভাবে?’
‘সপ্তাহে তিন-চারদিন ক্লাস থাকে। সেগুলোর প্রিপারেশন নিতে হয়। অবসরে ঘুরে বেড়াই। শখের ফটোগ্রাফি করি।’
‘ফটোগ্রাফি? বাহ! তোমার প্রিয় সাবজেক্ট কি?’
‘প্রকৃতির ছবি তুলতেই বেশি পছন্দ করি। প্রকৃতি আমাকে খুব টানে। প্রকৃতি খালি চোখে যতটা সুন্দর দেখায় তার চেয়ে একটু বেশি সুন্দর লাগে ক্যামেরার লেন্স এ।’
‘প্রকৃতির মাঝেই যার বসবাস—প্রকৃতি তাকে টানবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমার কাছে প্রকৃতি খালি চোখেই সুন্দর! কি জানি আমি তো আর ক্যামেরার লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করিনি কখনো।’
আকাশ হেসে বলল, ‘বাদ দাও। দ্যাখো তো, তখন থেকে আমি কেবল নিজের কথাই বলে যাচ্ছি। অথচ তোমার কথা শুনব বলে তোমাকে নিয়ে এলাম। বলো, তোমার কথা বলো।’
রূপা কিছু না বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘চলনা, একটু হাঁটি। জায়গাটা মনে হচ্ছে বেশ সুন্দর।’
‘ঠিক আছে, চলো।’
আকাশ আর রূপা দুজনে কফি শপ থেকে বের হয়ে হাটতে শুরু করল।
হাসান বাসায় ফিরে এসে ব্যাকইয়ার্ডে গিয়ে বসেছে। তার মনটা ভীষণ বিক্ষিপ্ত—সে উদাস নয়নে দূরে কোথাও তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। বিষণ্ণতা যখন কাউকে পেয়ে বসে, তার মনটা কেমন যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়, কিছুই ভাল লাগে না—কিংবা ভাল লাগার অনুভূতি গুলোই কেমন যেন ভোঁতা হয়ে যায়।
তিতলির স্কুল আজকে হাফ-ডে (আর্লি রিলিজ) ছিল বিধায় লাঞ্চ ব্রেকে তিথি অফিস থেকে বের হয়ে এসে তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে আবার অফিসে ফিরে গিয়েছিল। তিতলির স্কুল থেকে তিথির অফিসের দূরত্ব মাত্র পনের থেকে বিশ মিনিটের মত। হাসান যখন সপ্তাহে তিন-চার দিন ক্লায়েন্ট সাইটে গিয়ে কাজ করে, তিথি তখন তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে আবার অফিসে ফিরে যায়। তিতলি তিথির অফিসে বসেই হোম-ওয়ার্ক করে তিথির কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত। মাঝে মাঝে সোফার উপর ঘুমিয়েও পড়ে ক্লান্ত হয়ে। ছোট মানুষ সেই সকাল ছয়টায় উঠতে হয়।
শেষ বিকেলে তিথি আর তিতলি বাসায় ফিরে এলো। তিতলি তার রুমে চলে গেল। তিথি দেখল হাসান ব্যাক-ইয়ার্ডে বসে রয়েছে একা। সে পেছনের দরজা খুলে ব্যাক-ইয়ার্ডের পাটাতনে এলো। রূপা নেই দেখে ভাবল হয়ত রূপা ওর রুমে রেস্ট নিচ্ছে। তবুও হাসানের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘রূপা কোথায়?’
‘ওর এক বন্ধুর সাথে গেছে।’ হাসান উত্তর দিল।
তিথি খানিকটা অবাক হয়ে বলল, ‘বন্ধুর সাথে গেছে মানে? কার সাথে? কোথায়?’
‘হ্যাঁ, আকাশ নামে ওর এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল… অনেক বছর পর দেখা তাই… কোথায় গেছে তা তো বলতে পারবো না।’
তিথি দ্রুত চিন্তা করে দেখল আকাশ নামে সে কাউকে চিনে কিনা। নাহ, চিনে না। সে বলল, ‘আকাশ! আকাশের সঙ্গে দেখা হলো কোথায়?’
‘ও, না মানে, আমি রূপাকে একটা মুভি দেখাতে নিয়ে গেছিলাম। সেখানেই দেখা।’
‘মুভি দেখতে গেছিলে? কই আমাকে তো কিছু বলো নি?’
‘না মানে, বলার মত সিচুয়েশন ছিল না।’
‘বলার মত সিচুয়েশন ছিল না মানে কি হাসান? মুভি দেখতে যাবে, এটা বলার জন্য আবার সিচুয়েশন লাগে নাকি?’
হাসান একটু রেগে গিয়ে বলল, ‘তুমি এমন রিয়্যাক্ট করছো কেন তিথি? রিয়্যাক্ট করার মতো কিছু তো হয়নি।’
তিথি চুপ করে থাকল। হাসানও আর কোনো কিছু বলল না। বেশ খানিকক্ষণ পরে তিথি একটু ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘আকাশ কোথায় থাকে?’
‘জানি না।’
‘কেন, তোমার সঙ্গে কথা হয়নি?’
‘তেমন ভাবে না। নাইস টু মিট ইউ পর্যন্ত… কোথায় থাকে, কি করে জানা হয় নি।’
‘কখন ফিরবে তা কি কিছু জানো?’
‘আকাশ বলেছে রাতে নামিয়ে দিয়ে যাবে।’
‘ফোন নাম্বার দিয়েছে?’
‘না।’
‘তারমানে রূপা কল না দিলে কিছুই জানার উপায় নেই।’ বলেই তিথি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল হাসানের চোখের দিকে।
হাসান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল অন্যদিকে। তিথি আর কোনো কিছু না বলে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল।
আকাশ আর রূপা অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ হাঁটছিল। আকাশ হঠাৎ থেমে ঘুরে দাঁড়াল রূপার দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কি বলবে না?’
‘কি বলবো? এখন আর কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। এসব কষ্টের কথা কি সব সময় বলা যায়?’
‘অবশ্যই বলা যায়। আমি আগের মতই এখনো তোমার বন্ধু আছি রূপা। আমাকে কোন কিছু বলতে তোমার দ্বিধা থাকা উচিত নয়। প্লীজ বলো। আমি শুনবো।’
রূপা তবুও কিছু বলল না। সে তাকিয়ে সামনের বড় রাস্তা দিয়ে গাড়ির চলাচল দেখতে থাকল।
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে অনেক আগেই।
হাসান লিভিং-রুমে বসে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসানের চোখের দিকে তাকালে যে কেউ বলে দিতে পারবে যে সে আসলে কিছুই দেখছে না, শুধু তাকিয়েই আছে। হাসান ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। মাঝে মাঝে ফোনের দিকে তাকাচ্ছে এবং একটি কান সজাগ রেখেছে দরজায় কলিং বেলের শব্দ শোনার জন্য।
তিথি এসে দাঁড়াল হাসানের সামনে। হাসান তাকালো তিথির দিকে। তিথি বলল, ‘খাবে না? খেতে আসো।’
হাসান একটু ইতস্তত করে বলল, ‘রূপা তো এখনো এলো না। ফোন করে এড্রেস নেবে বলেছিল, ফোনও করলো না। ফিরবে কিনা বুঝতে পারছি না।’
তিথি একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘না ফিরলে না ফিরবে। তুমি এত অস্থির হচ্ছো কেন? সেই সন্ধ্যা থেকে দেখছি তুমি অন্যমনস্ক। ক্ষণে ক্ষণে ঘড়ি দেখছো আর দরজার দিকে তাকাচ্ছো। তুমি যে অস্থির সেটা কিন্তু বোঝা যাচ্ছে।’
‘অস্থির হবো না? একটা মেয়ে হুট করে একটা অচেনা মানুষের সঙ্গে চলে গেল। এতো রাত হয়ে গেল, অথচ-’
‘এমন কোন রাত হয় নি যে তোমাকে এতটা চিন্তিত হতে হবে। তাছাড়া মানুষটাকে তুমি চেনো না, কিন্তু যে গেছে সে তো চেনে।’
‘হ্যাঁ, তা হয় তো চেনে।’
‘এসো খেতে এসো।’ তিথি আবার বলল।
কিন্তু হাসান কোনো উত্তর না দিয়ে টেলিভিশনের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল। তিথি বুঝতে পারল, হাসান রূপার জন্যে অপেক্ষা করতে চাইছে। সে একটু খোঁচা দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি খেয়ে নিচ্ছি। তুমি বরং রূপার জন্য ওয়েট করো। তবে আমার ধারণা, ও ডিনার করেই আসবে।’
‘আর একটা কথা, রূপার কাছে বাসার এড্রেস আছে। দেশ থেকে আসার আগেই ওকে দিয়েছিলাম। সেটা ওর হ্যান্ড-ব্যাগে নিশ্চয়ই থাকবে। তুমি টেনশন একটু কম করো।’ বলেই তিথি চলে গেল কিচেনে রাতের খাবার খেতে।
আকাশ রূপাকে নিয়ে এসেছে ওর পছন্দের একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে। তাদের বীফ শাহী বিরিয়ানি আকাশের খুব পছন্দের। খেতে খেতে আকাশ রূপাকে বলল, ‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, পার্থকে তুমি এখনও ভালবাসো।’
‘হয়তো বাসি!’
‘যে ছেলেটি এতদিন প্রেম করে তোমাকে বিয়ে করলো না, তাকে তুমি এখনো ভালোবাসো?’
‘ভালবাসার সঙ্গে বিয়ের কি সম্পর্ক আছে? বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য ভালবাসার প্রয়োজন, কিন্তু ভালবাসলেই বিয়ে করতে হবে এমন তো কোন কথা নেই। তবে হ্যাঁ, আমরা অনেকেই ভালবেসেই বিয়ে করি। আবার সেই ভালবাসা বিয়ের পরে উড়েও যায়।’
‘এই থিওরিটা কি পার্থকে ভালবাসার আগে থেকে তুমি বিশ্বাস করতে?’
‘হ্যাঁ করতাম। সম্পর্কের প্রথম থেকেই একটা বিষয় আমরা পরিষ্কার করে নিয়েছিলাম, ফ্যামিলির কাউকে অখুশি করে আমরা বিয়ে করবো না। তার জন্যে যতদিন অপেক্ষা করতে হয় করবো।’
‘তাহলে তুমি ওর জন্য কষ্ট পাচ্ছ কেন?’
‘কি মুশকিল, একটা মানুষকে ভালবাসতাম, তাকে দেখতে পাচ্ছি না, কাছে পাচ্ছি না, তার জন্য কষ্ট হবে না? এটা নিশ্চয়ই পার্থরও আছে।’
‘তুমি কিভাবে জানো?’
‘আমি ওকে চিনি না?’
‘তাই যদি হবে, তাহলে সে তোমাকে ছেড়ে যাবে কেন?’
‘নিশ্চয়ই কোন কারণ ছিল। যে কারণে হয়তো ওর মনে হয়েছে, বিয়ে হলে আমরা সুখী হবো না। আর সুখী যদি নাই হই, তাহলে ভালবাসার মৃত্যুর জন্যে তো বিয়ে করাটা ঠিক হতো না, তাই না?’
‘তোমার ভালবাসা কি তাহলে এখনো টিকে আছে?’
‘হ্যাঁ, আছে।’
‘ওর জন্যে তোমার ঘৃণা হয় না?’
‘না, ঘৃণা হয় না। মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়। ভীষণ রাগ।’
‘আশ্চর্য মানুষ তুমি। তুমি বিয়ে করছো না কেন?’
‘করবো—করবো নিশ্চয়ই।’
রূপা যখন ফিরে এলো তখন প্রায় মধ্য রাত। হঠাৎ রূপার মনে পড়েছে বাংলাদেশ থেকে আসার আগেই তিথিদের বাসার ঠিকানা সে লিখে রেখেছিল। তার হাত ব্যাগ থেকে সে ঠিকানা বের করে আকাশকে দিলে আকাশ তাকে নামিয়ে দিয়ে গেল।
তিথি অনেক আগেই ঘুমাতে চলে গেছে। হাসান এখনো জেগে রয়েছে। অপেক্ষা করছে রূপার জন্যে। আরো কিছুক্ষণ পর ডোর বেল বেজে উঠল। হাসান উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখল রূপা দাঁড়িয়ে আছে।
রূপা একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, ‘সরি, দেরী হয়ে গেলো।’
হাসান কিছু বলল না। সে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। রূপা ভিতরে ঢুকে বলল, ‘আপনি এখনো ঘুমননি?’
‘না।’
রূপা আর কিছু না বলে ওর রুমের দিকে চলে যাচ্ছিল, হাসান বলল, ‘তুমি খাবে না?’
‘ডিনার করে এসেছি। আকাশ না খাইয়ে ছাড়লো না।’
‘ও।’
রূপার কেন যেন মনে হলো হাসান না খেয়ে ওর জন্যে অপেক্ষা করেছে। সে একটু চুপ থেকে বলল, ‘আপনি খাননি?’
হাসান কোনো উত্তর দিল না। রূপা আবার বলল, ‘সরি, হাসান ভাই।’
হাসান কিছুই বলল না। সে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।
রূপা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তার রুমে ঢুকে আস্তে করে দরজা বন্ধ করে দিল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৪)

হাসান ঘড়ি দেখল। মাত্র দুটা বাজে। হাতে এখনো কিছুটা সময় আছে ভেবে সে রূপাকে নিয়ে গেল ফাউন্টেন প্লাজার ওয়াটার গার্ডেনে। ফাউন্টেনের পানির নৃত্য দেখে রূপা বাচ্চা মেয়েদের মত চিৎকার দিয়ে উঠল। সে পানির মধ্যে দিয়েই দৌড়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগল। রূপার উচ্ছ্বাস দেখে হাসানের খুব ভাল লাগল। আবার শঙ্কাও হলো ভিজে যাবে বলে। তাই সে সাবধান করে বলল, ‘রূপা, ভিজে যাবে কিন্তু!’
‘অসুবিধা নেই। পানিতে ভিজতে আমার খুব ভাল লাগে।’
‘কিন্তু ভিজা কাপড়ে বাসায় ফিরবে কি করে? ঠাণ্ডা লেগে যাবে না?’
‘পানিতে ভিজলে আমার কখনোই ঠাণ্ডা লাগে না। আহ, যা ভাল লাগছে আজ!’
রূপা লক্ষ্য করল হাসান একটু আনমনা হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ইতিমধ্যে রূপার সারা শরীর ভিজে একাকার হয়ে গেছে। সে হাসানের দিকে এগিয়ে এসে পরনে লং স্কার্ট চিপরে কিছু পানি বের করল। মাথার ভেজা চুল ঝাড়ল। তারপর হাতের তালু দিয়ে মুখ থেকে পানি সরিয়ে হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই হাসান ভাই, আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন?’
‘তুমি তো দেখি বেশ পাগল আছো! পানিতে ভিজতে তোমার এত ভাল লাগে?’
‘ভীষণ! ভীষণ ভাল লাগে। বৃষ্টিতে ভিজতে আরো বেশি ভাল লাগে। আচ্ছা, এখানে বৃষ্টি হয় না?’
‘হবে না কেন? অবশ্যই হয়। এপ্রিলে অনেক বৃষ্টি হয় এখানে।’
ভেজা কাপড় গায়ের সঙ্গে লেপটে গিয়ে রূপার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে আছে। মেঘের মত চুল লেপটে রয়েছে পিঠে, সেগুলোর ডগা দিয়ে চুইয়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু পানি। কী অপরূপ লাগছে দেখতে। হাসান মদির চোখে রূপার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। রূপার ভেজা শরীরটা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। নিজেকে সংযত রাখার কোনো চেষ্টাই করল না হাসান। সে হাত বাড়িয়ে ঘাড় স্পর্শ করল রূপার। তারপর নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘তুমি তাকাও তো দেখি আমার দিকে! তোমাকে ভাল করে দেখি একবার!’
‘ভাল করে দেখবেন? আমি পাগল না আপনি পাগল?’ বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল রূপা।
‘তাহলে দু’জনেই।’
‘মোটেই না—আপনার সঙ্গে পাগল হবার কোন ইচ্ছেই আমার নেই।’
‘ভাগ্যিস তুমি এসেছিলে! নাহলে কখনোই জানা হতো না…’
‘কি?’
‘তুমি কত সুন্দর!’
‘আর তিথি?’ রূপার চোখে-মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘তিথিও সুন্দর।’
‘শুধু সুন্দর না, অনেক সুন্দর। আমাদের কলেজের কত ছেলে যে ওর জন্যে পাগল ছিল তা যদি আপনি জানতেন!’
হাসান কিছু বলার আগেই রূপা কাঁধ থেকে হাসানের হাত দুটি নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘যাই, আরেকটু ভিজি।’ বলেই সে ছুটে চলে গেল ঝরনার দিকে।
তিথি আবার ফোন করল হাসানকে। এবারও হাসানের ফোন বন্ধ পেল। তিথি এবার বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ভয়েজ মেসেজ রাখল সে—‘হাসান, কি ব্যাপার ফোনও ধরছ না, কল ব্যাকও করছ না। তুমিতো চিন্তায় ফেলে দিলে। বুঝতে পারছি না কিছু, কি হচ্ছে।’ তিথি ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সময় দেখে আবার বলল, ‘এখন ২টা ৪০ বাজে। তিতলিকে তুমি তুলতে পারবে কিনা তাও জানিনা। এনিওয়ে, আমি তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি। হোপ এভ্রিথিং ইজ অলরাইট উইথ ইউ!’
তিথি তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে বাসায় ফিরে গাড়ি থেকে নামতেই হাসানের গাড়ি এসে থামল সামনের ড্রাইভওয়েতে। তিথি আর তিতলি দাঁড়িয়ে রইল। হাসান আর রূপা বের হয়ে এলো গাড়ি থেকে। তিথি লক্ষ্য করল রূপার শরীর ভেজা। কিন্তু রূপাকে কিছু না বলে সে গিয়ে দাঁড়াল হাসানের সামনে। তারপর কৈফিয়ত চাওয়ার ভঙ্গিতে জানতে চাইল, ‘তোমার ব্যাপারটা কি হাসান? এতবার ফোন করলাম, একবারও ফোন ধরলে না!’
হাসান কিছুটা বিব্রত হয়ে বলল, ‘বিশ্বাস করো তিথি, রিংটোন একদমই শুনতে পাই নি। মনে হচ্ছে ফোনটা সত্যিই এবার বদলাতে হবে। মাঝে মাঝেই এটার ভলিউম অটোমেটিকলি সাইলেন্সে চলে যায়।’
‘সেটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে কেন?’
‘না মানে, তুমি যদি ভাবো, আমি ইচ্ছে করে ফোন ধরিনি।’
‘আশ্চর্য, আমি কেন সেটা ভাববো? আর তুমি ইচ্ছে করেই বা ফোন ধরবে না কেন? এসব কি ধরণের কথা বলছো হাসান? যাই হোক, একটা কল ব্যাক অন্তত করতে পারতে! তিতলিকে তুমি আনতে পারবে কি পারবে না, আমাকে জানাবে না?
‘আমিই তো যেতাম, দেখলাম ফোনে মেসেজ রেখেছো যে তুমি ওকে নিয়ে আসবে। তাই আর…’
এবার তিথি একটু আহত স্বরে বলল, ‘মেসেজ চেক করেছো, তবুও একটা কল দাও নি, সত্যি অবাক হচ্ছি।’
হাসান কোনো উত্তর দিল না। তিথি রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই তো দেখি ভিজে কাঠ হয়ে গেছিস। ভিজলি কিভাবে?’
রূপা কিছু বলার আগেই তিথি হাসানের দিকে ফিরে বলল, ‘তোমরা যেখানে গিয়েছিলে, সেখানে কি বৃষ্টি হয়েছিল নাকি?’
‘না না বৃষ্টি হবে কেন? ফেরার পথে একটু ফাউন্টেন প্লাজার ওয়াটার গার্ডেনে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। রূপা যে এতো ছেলেমানুষ জানতাম না। ও তো না ভিজে আসবেই না। হা হা হা, সত্যিই ছেলেমানুষ।’
‘রূপা ছেলেমানুষ, আর তুমি?’
তিথি কটাক্ষ করল হাসানকে। হাসান আবারো বিব্রত হলো। সে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি অবশ্য নিষেধ করেছিলাম।’
‘তিতলি এসো, লেটস গো ইনসাইড।’ বলেই তিথি তিতলিকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল।
হাসান আর রূপা অপ্রস্তুতভাবে একে অপরের দিকে একবার তাকাল তারপর তারাও বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ল।
রাতে খাবার টেবিলে তিথি খুব স্বাভাবিক আচরণ করল। রূপা যদিও বা একটু অস্বস্তি বোধ করছিল কিন্তু তিথি এত কথা বলল যে দিনের বিষয়টা সে ভুলেই গেল। দুই বান্ধবী অনেক রাত জেগে গল্প করল। ঘুমতে যাবার আগে তিথিই বলল, ‘কালকে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখতে যাবার প্লান ঠিক আছে তো?’
রূপা বলল, ‘নারে কোথাও যেতে চাচ্ছি না। উইকএন্ডে তুই যখন ফ্রি থাকবি তখন দেখব।’
‘আরে নাহ, উইকএন্ডের জন্যে বসে থাকতে হবে না। উইকএন্ডে আমি অন্য প্লান করেছি তোকে নিয়ে। তুই বরং সময়টা কাজে লাগা। আর হাসান তো বাসায়ই আছে। ডালাসে এসে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখবি না, তাই হয় নাকি?’
(সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। আশির দশকের বিখ্যাত টেলিভিশন সিরিজ ‘ডালাস’ এর শুটিং হয়েছিল এই র‍্যাঞ্চে। আমেরিকার যে কয়েকটি শহরের নাম বাঙালি সবার আগে জেনেছে, তার মধ্যে ডালাস একটি। এবং তার অন্যতম কারণ এই টিভি সিরিজ বিশ্বের আরো প্রায় ৯৬টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও দেখানো হতো।
‘ডালাস’ সিরিজের ঘটনাবলি যে সাউথফোর্ককে ঘিরে আবর্তিত, সেই জায়গার অস্তিত্ব সত্যিই আছে মূল ডালাস শহরের সামান্য বাইরে। Southfork Ranch লেখা মূল ফটক, যেমনটি সিরিজে দেখা যেতো, ছাড়াও ভেতরে আছে ইউয়িং-দের বাড়ি ও চারপাশের বিশাল চত্বর। ভেতরে গেলে দেখা যায়, টিভিতে দেখা ঘরদুয়ার ও আসবাব, সুইমিং পুল, বাথরুম, আস্তাবল ইত্যাদি সবই আছে। গাইডের বিবরণ শুনে জানা যাবে, সিরিজের কিছু কিছু শুটিং এখানেও হয়েছিলো। তবে বেশিরভাগই হলিউডে হয়েছে, সেখানেও হুবহু এই রকমের সব বাড়িঘর তৈরি করা আছে। আরো জানা যাবে, সিরিজের কাজ শুরু করার আগে এটি ব্যবহারের অনুমতির জন্যে মূল মালিকের কাছে আসে হলিউডের প্রোডাকশন কোম্পানি। মালিক প্রথমে রাজি হননি। কিছুদিন পরে হলিউডিরা আবার আসে, এবার অবশ্য তারা চেকবইটি সঙ্গে আনতে ভুল করেননি।
সিরিজের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে সাউথফোর্কও তীর্থস্থানের মর্যাদা পেয়ে যায়। দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকলে দর্শনীর প্রথা চালু হয়। প্রথা আজও আছে। ডালাস সিরিজ বন্ধ হয়ে গেছে বহু বছর আগে, পুরনো এপিসোডগুলো আমেরিকার কোনো কোনো চ্যানেলে অবশ্য মাঝে মাঝে দেখানো হয়। কিন্তু দর্শক আজও ভুলেনি ববি-প্যাম বা জে আর-স্যু অ্যালেনকে। এখনো প্রতিদিন এ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে দল বেঁধে বাসভর্তি মানুষ আসে এই তীর্থদর্শনে। এ দেশীয়দের পাশাপাশি বিদেশী ভ্রমণকারীও কম নেই।
বাংলাদেশ থেকে বা আমেরিকার অন্য কোনো শহর থেকে আসা আত্মীয়-পরিজন বা বন্ধুদের কেউ ডালাসে এলে তাদেরকে সাউথফোর্ক দেখাতে নিয়ে যাওয়াটা স্থানীয় বাঙ্গালিদের জন্যে খানিকটা বাধ্যতামূলক হয়ে আছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, বিশেষ একটি বয়সী বাঙালির স্মৃতিতে ডালাস সিরিজটি এখনো জাগ্রত। দ্বিতীয় কারণ, জেএফকে’র আততায়ীর গুলিতে নিহত হবার স্থানটি ছাড়া পরিচিত আর কিছুই দেখানোর নেই!)
আমরা আবার ফিরে আসি রূপার রুমে। তিথি যখন বলল সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখতে যাবার কথা—রূপা কি বলবে ভেবে পেল না। তিথি বের হয়ে যাবার আগে রূপাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘খবরদার, তুই কিন্তু আমার উপর রাগ করতে পারবি না। আমি আসলে হাসানের উপর একটু বিরক্ত হয়েছিলাম। তাই একটু রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি।’
‘রাগ করিনি। তুই যা ঘুমতে যা। তোর তো সেই সকালে উঠতে হয়।’
তিথি চলে গেল ওর রুমে। রূপা দরজা ভেজিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে রূপা কিছুটা ক্লান্ত ঠিকই কিন্তু ওর সহসা ঘুম এলো না। কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে সে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল বাইরে—অন্ধকারে।
গতকাল হাসানের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করায় আজ সারাদিন মোটেও ভাল সময় কাটছে না তিথির। দুপুর পর্যন্ত সে অস্থিরতায় কাঁটাল—বিশেষ করে রূপার সামনে এভাবে কথা বলাটা ঠিক হয়নি। রূপাই বা কি মনে করেছে? ও যতই বলুক রাগ করেনি। কিন্তু মনটা তো ঠিকই খারাপ হয়েছে। যদিও রাতে সে রূপাকে বলেছে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ ঘুরে আসতে হাসানকে নিয়ে।
সাউথফোর্ক থেকে ফেরার পথে হাসান রূপাকে নিয়ে গেল মুভি দেখাতে। বিশাল তেল সাম্রাজ্যের মালিক ইউয়িং পরিবারে প্রাসাদ দেখে রূপাকে খুব একটা আহ্লাদিত মনে হলো না। কোনো এক অজানা কারণে সে অন্যমনস্ক। সাউথফোর্ক ঘুরে দেখার সময়ও সে খুব একটা কথা বলেনি। আগ্রহ নিয়ে কোনো কোনো কিছু জানতে চায়নি। হাসান বিষয়টা লক্ষ্য করে ভাবল রূপাকে একটু চিয়ার-আপ করা দরকার। সে ভাবনা থেকেই মুভি দেখতে যাওয়া। রূপাকে বলাতে সেও কোনো আপত্তি করেনি।
মুভি দেখা শেষ করে হাসান আর রূপা মুভি থিয়েটার থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। হাসান বলল, ‘তুমি একটু দাড়াও এখানে, আমি গাড়িটা নিয়ে আসি।’
রূপা বলল, ‘আমিও আসি আপনার সঙ্গে।’
‘না, না তোমাকে এতদূর যেতে হবে না।’ বলেই হাসান পার্কিং জোনের দিকে হেঁটে চলে গেল।
রূপা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন সিনেমার পোষ্টার দেখতে লাগল। রূপা লক্ষ্য করল একজন ভারতীয় চেহারার ত্রিশোর্ধ পুরুষ অনেকক্ষণ যাবৎ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সে কি রূপাকে চেনে? রূপা ঠিক বুঝতে পারছে না। হঠাৎ লোকটি এগিয়ে এলো রূপার সামনে এবং কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এক্সিউজ মি। ইউ লুকস ভেরি ফ্যামিলিয়ার। আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?’
রূপা উত্তর দিল, ‘ইয়েস।’
লোকটি এবার মোটামুটি নিশ্চিত ভঙ্গিতে পরিষ্কার বাংলায় বলল, ‘আমি মনে হয় আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি নিশ্চয়ই রূপা, কি ঠিক বলেছি?’
রূপা অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি?’ রূপা ইতস্তত করে বলল।
‘আমি আকাশ। দেখতো চিনতে পারো কি না?’ আকাশ আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলো।
রূপা আকাশের দিকে ভাল করে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘আকাশ, মানে আমাদের ডিপার্টমেন্টের সেই আকাশ?’
‘হ্যাঁ। আমি সেই…’
আকাশ হঠাৎ করেই বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সে কিভাবে তার আনন্দ প্রকাশ করবে বুঝতে পারছে না। সে খুশিতে রূপার একটি হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘তুমি সত্যি রূপা? আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না তুমি আমেরিকাতে।’
‘তা তোমার এই অবস্থা কেন?
‘কি অবস্থা?’
‘এত মোটা হয়েছ কেন? এক মাথা ঝাঁকরা চুল ছিল, সে গুলো গেল কোথায়?’ রূপা আকাশের দিকে তাকিয়ে দুষ্ট হাসি দিয়ে বলল।
আকাশ হেসে দিয়ে বলল, ‘এতদিন পর দেখা হলো, এই একটি প্রশ্ন তুমি খুঁজে পেলে?
‘একটা কোথায় দু’টো প্রশ্ন করেছি।’
‘হা হা হা, তার আগে বলো, তুমি কেমন আছো? কবে এসেছো, কোথায় থাকো, পার্থ কেমন আছে? কোথায় সে? এনি কিডস?’ গড়গড় করে এক গাদা প্রশ্ন ছুড়ে দিল আকাশ।
আকাশের কথা বলার ভঙ্গিতে রূপাও হেসে ফেলল। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘থামো থামো। একসাথে এতো প্রশ্নের উত্তর তো একবারে দিতে পারব না।’
আকাশ একটু ভেবে বলল, ‘তাহলে, চলো কোথাও গিয়ে বসি। তারপর সব শোনা যাবে। তুমি কারো সঙ্গে এসেছ এখানে নাকি একাই?’ আকাশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘উম, এক মিনিট—দাঁড়াও, বলছি সবকিছু।’ রূপা তাকালো বাইরে, তারপর আকাশের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এসো আমার সাথে।’
ইতোমধ্যে হাসান গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। হাসানকে দেখেই রূপা বের হয়ে এলো। পেছনে এলো আকাশ।
হাসান দেখল একজন অপরিচিত মানুষ রূপার পাশে দাঁড়ানো। হাসান গাড়ি থেকে বের হয়ে আসতেই রূপা আকাশকে বলল, ‘তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেই। ইনি হচ্ছেন হাসান ভাই, আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীর হাজব্যান্ড। আমি ওনাদের বাসাতেই উঠেছি।’ তারপর হাসানের দিকে ফিরে বলল, ‘হাসান ভাই, ও হচ্ছে আকাশ। ভার্সিটিতে আমরা এক ডিপার্টমেন্টে ছিলাম। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। আশ্চর্য তাই না?’
হাসান বলল, ‘আশ্চর্য তো বটেই। পৃথিবীটাও যে কত ছোট আবারো প্রমাণ হলো।’ বলতে বলতেই হাসান আর আকাশ দুজনেই হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল।
আকাশ বলল, ‘নাইস টু মিট ইউ হাসান ভাই।’
‘নাইস টু মিট ইউ টু!’
রূপা বলল, ‘হাসান ভাই, আমি একটু আকাশের সঙ্গে যেতে চাই। আপনার কোন অসুবিধা নেই তো?’
‘না, না আমার অসুবিধা কি?’ হাসান কিছু না ভেবেই বলল।
‘হাসান ভাই, ভাববেন না—আমি রাতের আগেই রূপাকে আপনাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাবো। আসার আগে ফোন করে এড্রেসটা নিয়ে নেব।’ আকাশ হাসানকে আশ্বস্ত করল তারপর রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার কাছে নাম্বার আছে না?’
‘হ্যাঁ, আছে।’
‘তাহলে চলো?’
‘চলো।’ বলেই রূপা হাসানের দিকে ঘুরে বলল, ‘হাসান ভাই, আসি। দেখা হবে রাতে।’
হাসান বলল, ‘বাই। হ্যাভ ফান।’
আকাশ রূপার হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়ে চলল তার গাড়ির দিকে।
হাসান অবাক হয়ে ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থেকে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। এক ধরনের শূন্যতায় ছেয়ে গেল তার মন। কেন, কে জানে। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বাসার দিকে ছুটে চলল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৩)

তিথির সামনে একজন ক্লায়েন্ট বসে আছে। সকাল থেকেই সে ব্যস্ত। অনেকক্ষণ থেকে ভাবছে হাসানকে একটা ফোন করা দরকার। তাকে বলতে হবে–ঘুম ভাঙ্গলে রূপাকে যেন ঠিকঠাক মত চা-কফি কিংবা নাস্তার ব্যবস্থা করে দেয়। তিথির নিজেরও খুব কফি খেতে ইচ্ছে করছে। অথচ কলিং বেল টিপে কাউকে ডেকে যে এক কাপ কফি চাইবে তারও উপায় নেই। দেশটার নাম আমেরিকা। এখানে যার যার কাজ তাকেই করতে হয়। তার নিজের জন্যে এক কাপ কফি এখনো সে বানাতে পারেনি। ব্রেক রুমে যাবারও সময় পাচ্ছে না।
হাসান তার কনফারেন্স কল শেষ করে ল্যাপটপে একটা রিপোর্ট তৈরী করছিল। হঠাৎ সে শুনতে পেল, ‘গুড মর্নিং!’
হাসান ঘার ঘুরিয়ে দেখল রূপা দাঁড়িয়ে আছে। রূপা নাইটি ছেড়ে একটা হালকা তাঁতের শাড়ি পড়েছে। আকাশি রঙের শাড়িতে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে রূপাকে। হাসান বলল, ‘গুড মর্নিং! তারপর মিস রূপা, আমেরিকায় তোমার প্রথম রাত কেমন কাটল? ঘুম হয়েছে ঠিক মতো?
রূপা বলল, ‘শেষের দিকে হয়েছে একটু। পুরা রাত অবশ্য জেগেই ছিলাম।’
‘জেটল্যাগ। দু’একদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
রূপা চারিদিকটা একটু দেখে নিয়ে বলল, ‘আপনি অফিসে যান নি?’
‘এই তো আমার অফিস। আমার কাজের এই একটা সুবিধা, ইচ্ছে হলে বাসা থেকেই কাজ করতে পারি।’
‘আপনার কাজটা কি জানতে পারি? আই মিন কি করেন আপনি?’
হাসান হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি কী করি সেটা ব্যাখ্যা করা একটু কঠিন। তবে সবাই জানে আমি একজন কন্সালট্যান্ট।’
রূপার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করতে কিসের কন্সালটিং করেন আপনি। অবশ্য তা না জিজ্ঞেস করে সে বলল, ‘ও আচ্ছা।’
‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবশ্য আমাকে ক্লায়েন্ট সাইটে গিয়েই কাজ করতে হয়। তবে প্রয়োজনে বাসা থেকেও অফিস করতে পারি। তিথি আগেই বলে রেখেছিল তাই এই সপ্তাহটা বাসায়ই আছি। সেটা একদিক থেকে ভালই হয়েছে–তোমাকে ডালাস সিটিটা একটু ঘুরিয়ে দেখাতে পারবো। তোমার সাথে অনেক গল্পও করা যাবে।’ এক নাগারে কাজের ফিরিস্তি দিয়ে হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি খাবে বলো।’
‘আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি সকালে তেমন কিছু খাইনা। শুধু চা হলেই চলবে। আমি নিজেই বানিয়ে নিতে পারবো। কোথায় কি আছে, শুধু দেখিয়ে দিলেই হবে।’
‘অসুবিধা নেই, আমেরিকায় তোমার প্রথম সকালের চা-টা না হয় আমার হাতেই খেলে।’
হাসান উঠে কিচেনে গেল। কাউন্টার থেকে একটা কাপ নিয়ে পানি ভরে মাইক্রোওয়েভে দিয়ে ২ মিনিট গরম করল। তারপর ২টা টি-ব্যাগ ছেড়ে দিয়ে রূপাকে জিজ্ঞেস করল, ‘চিনি?’
‘এক চামচ।’
হাসান চিনি মিশিয়ে চা-টা রূপার দিকে এগিয়ে দিতেই বাসার ফোন বেজে উঠল। হাসান ফোন নিয়ে কলার আইডিতে দেখল তিথির অফিস নাম্বার। সে ফোন ধরতেই তিথি বলল, ‘কি করছো?’
‘এই তো রূপার জন্য চা বানাচ্ছিলাম।’
‘রূপা ঘুম থেকে উঠেছে?’
‘হ্যাঁ, উঠেছে।’
‘প্রোগ্রাম ঠিক আছে তো সব? কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ওকে?’
‘ভাবছি ডাউন-টাউনে গিয়ে কয়েকটা মিউজিয়াম দেখাবো প্রথমে, তারপর হয়তো জাপানিজ গার্ডেনে যাবো।’
‘জাপানিজ গার্ডেন? ইস, আমি মিস করবো!’ তিথি আক্ষেপ করে বলল।
‘তাহলে থাক, উইকএন্ডে যাবো যেদিন তুমি থাকবে।’
‘না, না, সময় হলে আজই যাও। তোমার কি মনে হয়, তিনটার আগে ফিরতে পারবে? তিতলিকে আনতে হবে তো।’
‘তিনটার আগেই ফিরব।’
‘ঠিক আছে, রূপাকে দাও।’
হাসান ফোন নিয়ে এসে দেখল রূপা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে দুরের লেকটার দিকে তাকিয়ে আছে। হাসান রূপাকে ফোন দিয়ে বলল, ‘তিত্থির ফোন।’
রূপা ফোন নিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
‘কিরে, ঘুম ঠিকমতো হয়েছে?’
‘হ্যাঁ, হয়েছে।’
‘দেশে কথা বলেছিলি?’
‘হ্যাঁ, বলেছি। বলেছি সবকিছু ঠিক আছে, কোন অসুবিধা হয়নি। এই তিথি, তুই কখন আসবি?’
‘এই তো কাজ শেষ হলেই। আসতে আসতে ৬টা বেজে যাবে।’
‘একটু তাড়াতাড়ি আয় না।’
‘দেখি, চেষ্টা করবো। একটু হাসানকে দে।’
রূপা ফোন এগিয়ে দিল হাসানের হাতে। হাসান বলল, ‘হ্যাঁ, বলো।’
‘শোন, রূপাকে কিন্তু ভাল মত ট্রিট করবে। বাইরে লাঞ্চ খাওয়াতে ভুলো না। আর একদম কিপ্টেমী করবে না।’
‘ছি ছি এসব কি বলছো!’
‘বলছি, কারণ টাকা-পয়সা খরচের ব্যাপারে তোমার আবার একটু ইয়ে আছে কিনা তাই।’
‘ইয়ে আছে মানে? এই, ইয়ে আছে মানে কি?’
‘মানে কিছু না। আমি রাখছি।’
তিথি হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিল।
হাসান কাজ থেকে আগেই ছুটি নিয়ে রেখেছিল। কাজেই দেরী না করে সে রূপাকে নিয়ে বের হয়ে পরল শহর দেখাতে। রূপাকে ডালাসের বেশ কিছু ল্যান্ডমার্ক ঘুরিয়ে দেখালো। ওরা অবশ্য গাড়ি থেকেই সব জায়গা গুলো দেখল। যদিও রূপাকে নামতে বলেছিল হাসান, কিন্তু রূপা নামতে চায় নি। সময় কম বলে রূপা বলল, কোথাও নামতে হবে না। তারচেয়ে বরং আমাকে জায়গা গুলোতে নিয়ে চলুন। গাড়ি থেকে দেখলেই হবে।’
হাসান প্রথমেই রূপাকে নিয়ে গেল প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যেখানে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন সেখানে। সেখান থেকে একে একে রি-ইউনিয়ন টাওয়ার, ডেলে প্লাজা, পেরো মিউজিয়াম, আর্টস মিউজিয়াম, নাসের স্কাল্পচার সেন্টার, পাইওনীয়ার প্লাজার ক্যাটেল ড্রাইভ, ওয়ার্ল্ড এ্যাকুইরিয়াম, প্রেসবাইটারিয়ান চার্চ–কোন জায়গাই বাদ পড়ল না।
ঘুরাঘুরির ফাঁকে ফাঁকে ওদের মধ্যে অনেক কথা হলো। হাসান জানতে পারল রূপার জীবনের বেশ কিছু না জানা কথা। দুপুরের লাঞ্চ সেরে হাসান রূপাকে নিয়ে গেল ডাউন-টাউন সংলগ্ন ক্লাইড ওয়ারেন পার্কে। গাড়ি থামিয়ে ওরা নেমে পড়ল। তারপর বসল একটা ছায়া ঘেরা বেঞ্চে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পূর্বের কথার রেশ ধরে হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘একটা ব্যাপার আমার কাছে এখনো পরিষ্কার না। পার্থ তোমাকে এভাবে ফেলে চলে গেল কেন? তোমাদের মাঝে কি আন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছিল না?’
পার্থের সঙ্গের রূপার সম্পর্ক ছিল অনেকদিনের। বিয়ে করার তারিখ পর্যন্ত ঠিক হয়েছিল তারপর হঠাৎ করেই পার্থ রূপার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে রূপা বলল, ‘তাতো বলতে পারবো না। ও কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল তা যদি জানতে পারতাম, অন্তত নিজেকে কিছু একটা হলেও সান্ত্বনা দিতে পারতাম।’
হাসান আসলে বুঝতে পারছে না আর কি বলা যায় কিন্তু তার আরো জানতে ইচ্ছে করছে। কথা চালিয়ে যাবার জন্য সে বলল, ‘নিশ্চয়ই অনেক খারাপ সময় গেছে তোমার!’
‘পার্থ আমাকে ছেড়ে চলে যাবার পর আমার পৃথিবীটা একবারে শূন্য হয়ে পড়ে। আমরা তো আসলে আলাদা করে দু’টি মানুষ ছিলাম না। দুজন মিলে এক হয়ে গেছিলাম। ও চলে যাবার পর আমি এতোটাই ভেঙ্গে পড়ি যে এক সময় অসুস্থ হয়ে যাই। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়।’
‘সেটা তো খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু একটা পর্যায়ে সবকিছু তো মেনে নিতেই হয়।’
‘সে চেষ্টা কি আমি করিনি? কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার চারপাশের মানুষগুলো অনেক বাজে বাজে কথা বলতে শুরু করলো। পার্থকে ভালবেসে আমি যেন একটা মহা অন্যায় করে ফেলেছি। সবাই আমাকে অন্য চোখে দেখতে লাগলো। ভাবখানা এমন যেন আমি খারাপ টাইপের একটা মেয়ে।’
একটু থেমে রূপা আবার শুরু করল, ‘কাউকে ভালবাসলেই কি তার সাথে শরীরের সম্পর্ক হয়ে যায়? সেক্স ছাড়া কি সম্পর্ক হতে পারে না?’
রূপার গলা ভারী হয়ে এলো। সে চুপ করে থাকল। কিছুক্ষণ পর হাসান বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, অবশ্য তুমি যদি কিছু মনে না করো।’
রূপা হেসে দিয়ে বলল, ‘কিছু মনে করলে কি এত কথা আপনার সাথে শেয়ার করতাম। বলুন কি জানতে চান?’
‘তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করলে না কেন? বিয়ে হয়ে গেলে কিন্তু এত কিছুর ভিতর দিয়ে তোমাকে যেতে হতো না।’
‘বাসা থেকে একবার বিয়ে দেয়ার চেষ্টাও শুরু করেছিল। সেটা হয়েছিল আরো ভয়ংকর—অনেক অপমানের। আমার ফ্যামিলিকে অনেক আজে বাজে কথা শুনতে হয়েছে। আমার আগে একটা সম্পর্ক ছিল, আরো অনেক নোংরা কথা। আগে একটা সম্পর্ক থাকলেই কি কেউ নষ্ট হয়ে যায়?’
‘না, না তা হবে কেন?’
‘আচ্ছা, আপনি বলুন, মেয়েরা কি এতোই তুচ্ছ যে একটা মানুষকে ভালবাসলে সে নষ্ট হয়ে যাবে? তাই যদি হয়, তবে সেটা শুধু মেয়েদের বেলায় কেন? ছেলেদের বেলায় নয় কেন? কেন এমন বৈষম্য বলতে পারেন?’
হাসান কোনো উত্তর দিতে পারল না। রূপা আবার বলল, ‘প্রায়ই ভাবতাম, যদি কোথাও পালিয়ে যেতে পারতাম? একবার কোথাও যেতে পারলে দেশে আর ফিরে যেতাম না।’
‘তোমার সে ভাবনা কি এখনো বহাল আছে?’
‘মানে?’
‘মানে তুমি তো এখন মার্কিন মুল্লুকে চলে এসেছো। চাইলেই থেকে যেতে পারো।’
‘থেকে যেতে পারলে তো ভালই হতো।’
‘বাঁধাটা কোথায়?’
রূপা ঠিক বুঝতে পারল না কি বলবে। সে হাসানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তিথি ঘড়ি দেখল প্রায় দু’টা বাজে। সে ভাবল হাসানকে একবার ফোন করে দেখি সে সময় মত যাচ্ছে কিনা তিতলিকে আনতে। ওর যে ভুলো মন। তিথি হাসানের মোবাইল ফোনে কল দিল, কিন্তু কোন সাড়া পেল না। সে আবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই ভয়েজ মেসেজে চলে যাচ্ছে। তিথি কিছুটা দুষ্টুমি আর কিছুটা চিন্তার মিশ্রণে ভয়েজ মেসেজ রাখল–‘কি ব্যাপার সারাদিন কোন খবর নেই যে? আমার বান্ধবীকে নিয়ে কি হারিয়ে গেলে নাকি? ফোন করছি–ধরছো না। ঘটনা কি হ্যাঁ? এনিওয়ে, কল মি হোয়েন ইউ গেট এ চান্স।’
তিথি চিন্তিত মনে ফোন রেখে দিল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-২)

ডালাস সময় সকাল সাড়ে ১১ টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ল্যান্ড করল ডিফডব্লিউ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। এরাইভাল লাউঞ্জে তিথি, হাসান আর তিতলি অপেক্ষা করছে রূপার জন্যে। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে রূপার বের হয়ে আসতে আরো প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। তিথি দূর থেকে রূপাকে দেখেই একটা বাচ্চা মেয়ের মত হাত নেড়ে ডাকল। রূপা বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো। কাছে আসতেই তিথি ওকে জড়িয়ে ধরল। তিতলি এগিয়ে এসে রূপার হাতে একটা ফুলের তোড়া দিয়ে বলল, ‘ওয়েলকাম টু ডালাস!’
রূপা তিতলিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইয়্যু!’ তারপর তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোর মেয়ে এত বড় হয়ে গেছে? কত হলো বয়স?’
‘নয় বছর!’
‘নাইন এন্ড এ হাফ ইয়ার্স!’ তিতলি তার মা-কে শুধরে দিয়ে বলল।
রূপা হেসে ফেলল।
‘কেমন আছো রূপা? তোমার জার্নি কেমন হলো?’
রূপা তাকিয়ে দেখল হাসানকে। মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘ভাল আছি হাসান ভাই। জার্নি বেশ ভালই হয়েছে।’
‘কোনো সমস্যা হয়নি তো?’
‘না কোনো সমস্যা হয়নি।’
‘বেশ তাহলে চলো যাওয়া যাক।’
রূপার হাত থেকে বড় লাগেজটা নিয়ে নিল হাসান। তারপর সবাই মিলে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেল।
গাড়িতে লাগেজ ঢুকিয়ে হাসান যখন ড্রাইভিং সীটে বসতে যাবে, তিথি তখন হাসানকে বলল, ‘চাবিটা দাও, আমি চালাচ্ছি। তুমি তিতলিকে নিয়ে পেছনে বসো। রূপা তুই সামনে বস।’
হাসান হেসে দিয়ে তিতলিকে নিয়ে পেছনের সীটে বসল। রূপা একটু অবাক হয়ে সামনে গিয়ে বসল। তিথি গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে হাইওয়েতে পড়ল।
ডালাসের আকাশে তখন ঝকঝকে রোদ। সূর্য মাথার উপরে। মেঘও তেমন নেই। টেক্সাসের তাপ সহজেই অনুমেয়। যদিও গরম এখনো সেভাবে জেকে বসেনি। সবার মধ্যেই খুশি খুশি ভাব।
ইন্টারস্টেট হাইওয়ে-৬৩৫ ধরে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে তিথির মিনি-ভ্যান। রূপা অবাক হয়ে দেখছে চারিদিকটা। বিশেষ করে ৬ লেনের হাইওয়ে, উঁচু উঁচু ফ্লাইওভার, একটি থেকে আরেকটি রাস্তার সংযোগ, বিকল্প রাস্তা, হাইওয়ের সংগে সার্ভিস রোড–এসব দেখে সে মোটামুটি ভাবে নিশ্চিত হলো যে যুক্তরাষ্ট্রের মহাসড়কগুলা সর্বাধুনিক, নিরাপদ ও যাত্রী সেবায় এগিয়ে রয়েছে অনেক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উন্নত সড়ক-মহাসড়কের বিকল্প নেই। যাত্রী পরিসেবা তো বটেই, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অবিরাম ও নিরাপদ হাইওয়ে নির্মাণে বিশ্বের প্রতিটি দেশই মনোযোগী। দেশে দেশে হাইওয়ে বা মহাসড়কের দিকে তাকালে দেখা যাবে সেগুলো মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও নির্মাণকৌশলে নির্মিত হচ্ছে। বিশ্বের কোনো দেশেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে স্থবির থাকে না প্রধান মহাসড়কগুলো—একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত বাংলাদেশ।
দেশের কথা মনে হতেই রূপার মনে হলে ঢাকায় একটা ফোন করে বলে দিতে হবে যে সে ঠিকমত পৌঁছেছে। রূপা তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেশে একটা কল করা দরকার।’
‘এখনই করবি না বাসায় যেয়ে করবি?’
‘বাসায় যেতে আর কতক্ষণ লাগবে?’
‘দশ মিনিট-এইতো প্রায় এসে গেছি।’
‘ঠিক আছে তাহলে বাসায় যেয়েই করব।’
ডালাস ডাউন-টাউন পার হয়ে তিথির মিনি-ভ্যান সোজা ছুটে চলল গন্তব্যে।
রূপার আসার উপলক্ষে গতকাল রাতেই তিথি অনেক গুলো আইটেম রান্না করে রেখেছিল। যদিও রূপা অনেক ক্লান্ত ছিল তবুও সে বেশ মজা করেই খেল সবকিছু। দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রামে চলে গেল রূপা।
বিকেল গড়াতেই শুরু হলো চা-য়ের আড্ডা ব্যাকইয়ার্ডে বসে। তিথি আর রূপাই বেশী কথা বলছে। হাসান চায়ের কাপে চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে দুই বান্ধবীর কথা শুনছে। তিতলি তার হুলা-হুপ নিয়ে একা একা খেলছে পাশেই।
তিথিদের বাসার পেছনেই বড় একটা লেক। লেকের ওপারে রোদ সরে যাচ্ছে–তাপও অনেকটা কমে এসেছে। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে–স্বস্তির ছোঁয়া নিয়ে।
কোনো কোনো বিকেল খুব সুন্দর হয়। সূর্যের হলদে আলো পিছলে পড়ে সবুজ পাতা থেকে। আজকের বিকেলটাও তেমনি মনে হচ্ছে রূপার কাছে। রূপা তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোদের সংসার দেখে খুব ভাল লাগছে রে। দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ সুখেই আছিস।’
‘তাই? দূর থেকে কাশবন ঘনই দেখা যায় বন্ধু।’
হাসান 88 করে বলল, ‘এ কথার মানে কি তিথি? তারমানে কি, তুমি সুখে নেই?’
তিথি হাসানের কথার অবশ্য কোনো উত্তর দিল না। রূপা হেসে দিয়ে বলল, ‘কিরে, কিছু বল?’
‘সুখে আছি কিনা জানি না, তবে নিজের মত করে স্বাধীন ভাবে চলতে পারছি। এই তো কত!’
‘এখানে থেকে অন্তত এইটুকু বলতে পারছিস যে তুই স্বাধীন ভাবে চলতে পারছিস। এই স্বাধীনতা টুকুই বা ক’টা মেয়ের আছে আমাদের দেশে বল?’
‘সেভাবে দেখলে মনে হয়, এদেশে এসে ভালই করেছি। আমি যে একটা মানুষ, তার স্বাদটুকু অন্তত পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করছি। মানুষের জীবন যে কত বড় আর সুন্দর তা এদেশে না এলে বুঝতেই পারতাম না।’
হাসান হাসি হাসি মুখ করে তিথির কথা বেশ আগ্রহ নিয়েই শুনছে। রূপাও তাকিয়ে থাকল ওর মুখের দিকে।
তিথি রূপার দিকে তাকিয়ে আবারো বলল, ‘তুই দ্যাখ, এখানে কেউ কাউকে নিয়ে মাথা ঘামায় না। ব্যক্তিগত বিশেষ কিছুর ওপর ওদের নজর আটকায় না। কেউ কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলে না। অযাচিত সন্দেহ করে না। স্বাধীনতা মানে যে কি, তা বাংলাদেশের মেয়েরা হয়তো কোনোদিনই বুঝতে পারবে না।’
তিথির সঙ্গে রূপাও যোগ করল। এ যেন তার মনের কথাই সব। সে বলল, ‘আমাদের দেশের মানুষগুলোর মন-মানসিকতা এতো ছোট যে কি বলবো! ক্রমশ তাদের বিবেক-বিবেচনা, চিন্তা-চেতনা দিনদিন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে মেলামেশা করলেই ধরে নেয় ওদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে… আচ্ছা, একটা ছেলে আর মেয়েতে কি স্রেফ বন্ধুত্বের সম্পর্ক হতে পারে না?’
এবার হাসান রূপার দিকে তাকাল। বোঝাই যাচ্ছে সে বেশ উপভোগ করছে ওদের দুজনের কথোপকথন।
রূপার ক্ষোভের পেছনে একটা কারণ আছে সেটা তিথি জানে। তাই সে চুপ থেকে ওকে বলতে দিল।
রূপা আবার বলল, ‘একটা মেয়েকে একা দেখলেই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে শিস দেবে। অরুচিকর কথা বলবে। আবার একটা ছেলের সঙ্গে দেখলেও…’ বলতে গিয়ে রূপার গলা কেমন ভারী হয়ে গেল। সে থেমে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। একটা চাপা ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘একজন স্বাভাবিক চিন্তার মানুষ অন্যের সম্পর্ক নিয়ে কেন এত মাথা ঘামাতে হবে? তাদের কি আর কোনো কাজ নেই?’
তিথি রূপার কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘ঠিকই বলেছিস, অন্যের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর মত এমন বিরল প্রজাতির দেশ বোধ হয় পৃথিবীতে একটাই আছে। আমি ভেবে পাই না, গোটা একটা জাতি এমন ভাবে গড়ে উঠেছে কিভাবে? অদ্ভুত–ভীষণ অদ্ভুত, এদের ফিলসফিও অদ্ভুত। এরা অন্যের সুখ সইতে পারে না–ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে। নিজের স্বার্থে সামান্য আঘাত লাগলে এদের ভিতরে লুকানো কুৎসিত কদাকার রূপ বেরিয়ে আসে।’
এবার হাসান তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখো, আমার মনে হয় ব্যাপারটাকে এভাবে জেনারালাইজড করাটা ঠিক হচ্ছে না। এটা ঠিক আমাদের দেশের কিছু মানুষের মধ্যে এই সহজাত স্বভাবটা আছে। পৃথিবীর সব দেশেই কিন্তু এই একই চিত্র তুমি দেখতে পাবে। এটা যে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা তা কিন্তু না–ইট’স এ প্রব্লেম ফর হোল ইউনিভার্স!’
তিথি আর রূপা দুজনের কেউ আর কিছু বলল না। পরিবেশটা একটু ভারী হয়ে যাচ্ছে দেখে এবার হাসান মজা করে বলল, ‘আচ্ছা, তোমরা দেখছি প্রথম অধিবেশনেই দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে লেগে পড়লে! এমন সুন্দর একটা বিকেল নষ্ট করছো সব ভারী ভারী কথা বলে। তারচেয়ে বরং চলো, রূপাকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসি।’
‘তোমার কাছে এসব ভারী কথা মনে হচ্ছে?’ তিথি একটু রেগেই বলল হাসানকে।
‘আরে বাবা এসব কথা তো বাইরে গিয়েও বলা যাবে।’
‘আচ্ছা চলো।’
ওরা সবাই মিলে বের হয়ে গেল।
তিথিদের বাসার থেকে মাত্র দশ-পনের মিনিটের দূরত্বে ছোট্ট শহর রকওয়াল। রকওয়ালের বিখ্যাত লেক রে-হাবার্ডের উপরে তৈরী হয়েছে একটি হারবার পয়েন্ট। ইদানীং পর্যটকদের অনেক আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লেকের পাড় ঘেঁষে অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্ট আর দোকানপাট গড়ে উঠেছে। সিনেমা হল, কফি-শপ, বার কি নেই এখানে। খোলা আকাশের নীচে লাইভ কনসার্ট হয়। বিস্তৃত মাঠের সবুজ ঘাসে বসে সবাই গান শোনে। এই জায়গাটি তিথি আর হাসানের অনেক প্রিয়। ওদের বাসায় কোনো অতিথি এলে, তাকে প্রথম সুযোগেই নিয়ে আসা হয় এই লেকের ধারে।
হাসান সবাইকে নিয়ে এলো হারবার পয়েন্ট-এ। লেকের পাড় দিয়ে অনেকক্ষণ ধরেই হাঁটছে তিথি, রূপা, হাসান আর তিতলি। তিতলি অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যায়। বাচ্চা মানুষ। সে হাটা থামিয়ে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে তিথি দেখল তিতলি বসে রয়েছে। সে ফিরে এসে বসল মেয়ের পাশে।
হাসান আর রূপা কথা বলছিল। কথা বলতে বলতেই ওরা এগিয়ে গেল।
তিথি হঠাৎ করে লক্ষ্য করল, হাসান আর রূপা হাটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা দুরে চলে গেছে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলায় এতটাই মগ্ন যে ওদের দুজনের কেউ একবারের জন্যেও পেছনে ফিরে তাকাল না। হাটতে হাঁটতে একসময় হারবার পয়েন্ট সংলগ্ন লাইট হাউসের নীচে গিয়ে দাঁড়াল হাসান আর রূপা।
শেষ বিকেলের পশ্চিমাকাশে ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা তখন হেলে পড়েছে। ধীরে ধীরে হলুদ থেকে লাল হয়ে যাওয়া নির্জীব ও নির্মল সূর্যটার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা দুজন।
সূর্য পশ্চিমাকাশে আজকের মতো বিদায় নেবার পূর্বে শেষ বারের মতো মেঘের মধ্য থেকে মাথা বের করে তার কুসুম বর্ণ রূপ দেখাবার জন্য আরেকবার উকি দিলো। তারপর আচমকাই যেন দিগন্তে ডুবে গেল।
প্রতিদিনকার মতই খুব সকালে উঠে তিথি তিতলিকে নিয়ে বের হয়ে গেছে। তিতলিকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে সে চলে গেছে কর্মস্থলে। হাসানের একটা কনফারেন্স কল ছিল সকাল সাড়ে সাতটায়–সেও উঠে পড়েছে। হাসান এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে তার অফিস রুমে ঢুকার আগে লিভিং রুমে গেল কিন্তু কর্ডলেস ফোনটা কোথাও খুঁজে পেল না। সে কপাল কুঁচকে নিজেকে জিজ্ঞেস করল, ‘ফোনটা গেল কোথায়?’ তখনি তার মনে পড়ল রাতে ঘুমানোর আগে রূপা ফোনটা নিয়েছিল দেশে কথা বলবে বলে। রূপা যেই রুমটাতে আছে সেদিকে একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে তার রুমের দিকে এগিয়ে গেল হাসান।
দরজার কাছে গিয়ে সে আস্তে করে ডাকল—রূপা! কিন্তু রূপা কোনো সাড়া দিল না। সে দরজায় দু’বার টোকা দিল, তাতেও কোনো সাড়া পেল না। একটু ইতস্তত করে আস্তে দরজা সরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল হাসান এবং দেখল ফোনটা খাটের পাশের নাইটস্ট্যান্ডে পড়ে আছে।
রূপা গভীর ঘুমে–ওর ঘুম যেন ভেঙ্গে না যায় তাই খুব সন্তর্পণে বিড়ালের মত পা ফেলে কোন রকম শব্দ না করে ফোনটা নিয়ে ফিরে আসার সময় হাসানের চোখ পড়ল রূপার ঘুমন্ত মুখের উপর। জানালার পর্দার ফাঁক গলে এক চিলতে রোদ রূপার শরীরের উপর দিয়ে চলে গেছে। এবার তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল বাঁকা হয়ে শুয়ে থাকা রূপার শরীরের উপর। পায়ের উপর থেকে তার নাইটির কিছু অংশ সরে গিয়ে ফর্সা পা বেরিয়ে আছে। হাসানের পায়ে যেন কেউ পেরেক ঠুকে দিল। অনেক চেষ্টা করেও সে নিজের পা দুটোকে নাড়াতে পারছে না।
হাসান মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব