-Shei-Coffe-Shop

সেই কফি শপ (পর্ব-৯)

কিচেন কাউন্টারে বসে কফিতে চুমুক দিয়ে মাহবুব খান কথা বলছিল লীনার সঙ্গে। লীনা কিচেনের টুকটাক কাজ করছে। এমন সময় মাহবুবের ফোন বেজে উঠল। সে ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে রাচনা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘ভাইয়া, বিল্ডিং ম্যানেজারের কাছে গিয়েছিলাম। উনি অর্ণবের এপার্টমেন্ট খুঁজে দেখেছে। ভেতরে নাকি সব কিছুই ঠিক আছে।’
‘আহা, কাঁদছিস কেন?’ মাহবুব সাহেব কিঞ্চিত অসহিষ্ণু ভঙ্গিতে বললেন।
লীনা হাতের কাজ বন্ধ করে তাকাল মাহবুবের দিকে।
‘ভাইয়া, তিন দিন হয়ে গেল, ওর কোন খবর নেই। একটা ফোন অন্তত করতে পারত। এখন আমি কী করব?’
‘তুই কি ওর কোনো বন্ধুদের চিনিস? ওদের কাউকে জিজ্ঞেস করে দেখ।’
‘না, আমি ওর কোনো বন্ধুদের চিনিনা। ভাইয়া, তুমি একটু খোঁজ নেবে?’
‘আচ্ছা, আমি দেখছি। তুই এত অস্থির হোস না।’
রাচনা কাঁদতে কাঁদতে ফোন কেটে দিল।
লীনা এগিয়ে এসে বলল, ‘তক্ষুনি বলেছিলাম, একটু ভালোমতো খোঁজ-খবর নিয়ে তারপর মতামত দাও। তোমরা দু’ভাইবোন হয়েছ একই রকম। একটা ছেলে এসে বলল, আপনার বোনকে আমি বিয়ে করতে চাই—অমনি রাজি হয়ে গেলে। ব্যাকগ্রাউন্ড চেক বলে একটা কথা আছে—সেটা বোধহয় তোমাদের জানা নেই।’
‘এসব কী বলছ? অর্ণব কি কোনো ক্রিমিনাল যে ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করতে যেতে হবে?’
‘তুমি কী করে জানো? দেখো গিয়ে, হয়তো এফবিআই’র ভয়ে পালিয়েছে। সে জন্যেই ফোন ধরছে না, যাতে ট্র্যাকড না হয়। আর তা না হলে হয়তো ডিপোর্ট করে দিয়েছে অলরেডি। হু নোজ?’
মাহবুব সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। তিনি অত্যন্ত বিরক্ত হলেন লীনার এধরণের কথায়। যদিও তিনি সেটা প্রকাশ করলেন না। কফিতে একটা চুমুক দিয়ে তিনি উঠে চলে গেলেন অন্য রুমে।
লীনা ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইল সেদিকে।

এর মাঝে কেটে গেল বেশ কিছুদিন।
একদিন শনিবার। সেই কফি শপে রাচনা আর অর্ণব বসে কফি খাচ্ছে আর গল্প করছে। অর্ণবের কী একটা কথায় রাচনা হেসে কুটি কুটি হলো। অর্ণব বলল, ‘তুমি কি জানো হাসলে তোমাকে অন্য রকম সুন্দর লাগে। সব সময় মন খারাপ করে থাকো কেন তুমি?’
‘আমাকে এভাবে সব সময় হাসাতে পারো না? তাহলেই তো আর আমি মন খারাপ করে থাকি না।‘ রাচনা হাসতে থাকল। যেন খুব মজার একটা কথা সে বলেছে।
একজন বয়স্ক আমেরিকান ভদ্রলোক রাচনাকে একা একা হাসতে দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘Are you ok?’
রাচনা বাস্তবে ফিরে এলো এবং যারপর নাই অস্বস্তিতে পড়ে গেল।
কিছু মানুষ আছে বৃদ্ধ বয়সে তাদের একাকীত্ব কাটানোর একমাত্র জায়গা হচ্ছে, কোনো বার কিংবা কফি শপ। সেখানে তারা তাদের বয়সী কেউ থাকলে একসাথে গল্পগুজব করে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তারা কম বয়সী মেয়েদের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে থাকে। সুযোগ পেলে তাদের মেয়ের বয়সী মেয়েদেরকে ড্রিংক কিংবা কফি অফার করে। বিনিময়ে পাশে বসে দু একটি সুখ দুখের কথা বলা। তার বেশি কিছু নয়। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এমন কোনো মেয়েকে একা সাধারণত পাওয়াই যায় না। সব সময় হয় তারা দল বেধে আসে অথবা সাথে তাদের বয়ফ্রেন্ড কিংবা অন্যকেউ থাকে।
রাচনা প্রথমে লক্ষ করে নি, কিন্তু হঠাৎ এই বুড়োর কথায় সে সম্বিত ফিরে পেল।
বুড়ো বলল, ‘You look beautiful when you laugh.’
‘Thank you.’ বলেই রাচনা মুখ লুকালো। কী কারণে যেন হঠাৎ করেই তার চোখ জ্বালা করে উঠল। কোনো রকমে বলল, ‘Excuse me.’ তারপরই দ্রুত কফি শপ থেকে বের হয়ে গেল সে।
বুড়ো লোকটি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল রাচনার চলে যাওয়ার দিকে। তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে একটু মৃদু হেসে নিজের মনেই বলল, ‘Women, what a strange creature of god!’

রাতে ঘুমানোর সময় মাহবুব সাহেব লীনাকে বললেন, ‘আমি ভাবছি রাচনা আর তানিশাকে বাসায় নিয়ে আসব। তোমার কোন অসুবিধা নেই তো?’
‘এটা কি ধরণের কথা? আমার অসুবিধা হবে কেন?’
‘ওর মনের অবস্থা বেশি ভালো না। সবার সঙ্গে থাকলে মনটা ভালো থাকবে।’
‘তোমার বোনকে তো চিনি। আমার তো মনে হয় না সে আসবে। তারপরেও তুমি বলে দেখতে পারো।’

সেদিন রাচনার সংগে অর্ণবকে দেখার পর থেকেই স্টিভের কী হয়েছে কে জানে। সে কয়েক দফায় রাচনার সংগে কথা বলতে চেয়েছে, দেখাও করতে চেয়েছে। রাচনা কোনো রকম প্রশ্রয় না দিয়ে স্টিভকে এড়িয়ে গেছে। মাঝে মাঝে রূঢ় আচরণ করতেও কার্পণ্য করে নি। যার কারণে তার নিজের জীবন তছনছ হয়ে গেছে তার প্রতি কোনো করুণা দেখাবার মতো মানসিক অবস্থা রাচনার নেই। তবুও তানিশাকে নামিয়ে দিতে এসে স্টিভ প্রায় অনুনয় করে রাচনার সংগে কথা বলতে চাইল। তানিশাকে ভেতরে পাঠিয়ে দিয়ে দরজার সামনে দাঁড়িয়েই রাচনা বলল, ‘Sorry, I cannot invite you inside, if you need to talk, talk here.’
স্টিভ ভীষণ অবাক হলো। অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘Are you dating him?’
‘Dating who?’ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল রাচনা।
‘That guy, he was with you other day.’
‘Well, that’s none of your business. Why are you even asking me this?’ রাচনা অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে কথাগুলো বলল।
স্টিভ আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। এদিক ওদিক তাকাল, সে আরো কিছু বলতে চায় কিন্তু সাহস পাচ্ছে না কীভাবে বলবে। তবুও ইতস্তত করে সে বলল, ‘It’s been two years I’m not in any relationship… ’ কথা শেষ না করে স্টিভ তাকিয়ে রইল রাচনার মুখের দিকে।
রাচনাও ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। স্টিভ কী বলতে চায় সে জানে। গত পাঁচ বছর ধরেই সে ইনিয়ে বিনিয়ে চেষ্টা করছে কোনো মেয়ের সংগে তার কোনো সম্পর্ক নেই। সে আর আগের মতো নেই। একটা সুযোগ পেলেই সে রাচনার কাছে ফিরে আসার জন্যে তৈরী। রাচনা অবশ্য কখনোই কোনো ধরণের পাত্তাই দেয় নি স্টিভের এসব কথার। এসব কথা শোনার আগ্রহ কিংবা সময় কোনোটাই তার নেই। বছর দুয়েক আগে স্টিভের সর্বশেষ গার্লফ্রেন্ড তাকে ল্যাং মেরে চলে গেছে। উইকএন্ডে তানিশাকে নিতে এসে রাচনাকে প্রায়ই সে সুযোগ পেলেই সে প্রসঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করে। কিন্তু রাচনার কাছ থেকে কোনো রকম সাড়া না পেয়ে সে আর কথা এগুতে পারেনা।
কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে স্টিভ বলল, ‘Are you serious about that guy?’
রাচনা শীতল দৃষ্টি নিয়ে তাকাল স্টিভের দিকে, ‘I think you’re crossing your limit Steve. I’m being nice to you doesn’t mean you can ask me anything you want.’
স্টিভ করুণ দৃষ্টি নিয়ে তাকাল রাচনার দিকে। এই মেয়েটি এত নির্দয় হতে পারে এটি তার ভাবনার বাইরে। সে মরিয়া হয়ে বলল, ‘Tanisha miss me a lot. I miss her too.’
রাচনা কিছু বলল না। তার মাথায় এখন স্টিভের কোনো কথাই ঠিক মতো যাচ্ছে না। সে চুপ করে আছে।
স্টিভ আবারো বলল, ‘Tanisha is growing up now. She understands lot of thing. She loves you; you love her, and I love her too. She needs her parents, …both parents. We need to stay close for the sake of her good life.’
রাচনার মাথায় চিনচিন ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। মাইগ্রেনের পূর্ব লক্ষণ। সে ঘোলা চোখে স্টিভের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Why are you telling me all these, now?’
‘I never get a chance to talk to you.’
রাচনা জানে স্টিভ তাকে এখন ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করার চেষ্টা করবে। তানিশা একটু বড় হবার পর থেকেই সে চেষ্টা সে করে যাচ্ছে। তার ভুলের জন্য ক্ষমা চেয়েছে—একবার নয়, অনেকবার। কিন্তু রাচনা তার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছে। প্রয়োজনে সারা জীবন একা থাকবে, তবুও স্টিভের কাছে ফিরে যাওয়ার প্রশ্নই আসে না।
‘Are you done?’
স্টিভ হতভম্ব হয়ে অসহায়ভাবে তাকাল রাচনার মুখের দিকে।
‘I think I’m getting a migraine; will you please excuse me?’
রাচনার পক্ষে আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হলো না। সে ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
এরপরে আর দাঁড়িয়ে থাকা যায় না। স্টিভ তবুও দাঁড়িয়ে থাকল। কোনো উপেক্ষা কিংবা অপমান তার গায়ে লাগছে না। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।

আরো বেশ কিছুদিন পরের কথা।
মাহবুব সাহেবের বাড়ির ব্যাকইয়ার্ডে বড় একটা লন। সেখানে হরেক রকমের ফুলের গাছ লাগানো হয়েছে। পেছনে একটা ছাউনি দেয়া আছে। তানিশা আর রাইসা পেছনের সবুজ ঘাসের লনে খেলছে। রাচনা ওদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে মাঝে মাঝে। তার হাতে একটা বই। বইটা পড়ার চেষ্টা করছে কয়েকদিন থেকে—কিছুতেই মন বসাতে পারছে না।
মাহবুব আর লীনা রাচনার সঙ্গে বসে অনেক কথা বলেছে। বুঝিয়েছে। যদিও সে বেশ কয়েকবার বলেছে, একা থাকতে তার কোনো সমস্যা হচ্ছে না। সে তো একাই ছিল এতদিন। তারপরেও তাদের অনেক অনুরোধের পর রাচনা এসেছে তাদের সঙ্গে।
কিন্তু মাঝে মাঝে লীনার কথায় সে আহত হয়। সেদিন যেমন কথায় কথায় লীনা বলছিল, ভাগ্যিস বিয়েটা হয় নি। তাহলে আবার আরেকটা ঝামেলার মধ্যে পড়তে হতো। আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যেই করেন। রাচনার এসব কথা ভালো লাগেনি শুনতে কিন্তু শুধু বড় ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে সে এ বাসায় আছে।
এভাবেই দিন কেটে যাচ্ছিল। রাচনা বিভিন্ন ভাবে অর্ণবের খোঁজ বের করার চেষ্টা করেছে। সমস্যা হয়েছে অর্ণবের সঙ্গে পরিচয়ের সময়টা এতই অল্প যে তার ব্যক্তিগত বিষয় বা তার অফিসের কোনো কলিগ, কিংবা কোনো বন্ধু পরিচিত কেউ আছে কিনা কিছুই জানার সুযোগ হয় নি রাচনার। অর্ণবের এপার্টমেন্ট ঘেঁটে কিছু হয়ত বের করা সম্ভব কিন্তু বিল্ডিং ম্যানেজার প্রাইভেসি রুলসের কারণের রাচনাকে কোনো রকম সহযোগিতা করতে অপারগ।
বিল্ডিং ম্যানেজার বলেছে, মাঝে মাঝে কিছু টেন্যান্ট ভাড়া বাকি রেখে এপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে যায়—এটা ঠিক। কিন্তু অর্ণবের ক্ষেত্রে তেমন হবার কথা নয়। অর্ণব ভালো জব করে, ক্রেডিট হিস্ট্রি ভালো, ভাড়াও বাকি পড়েনি কখনো—কাজেই তেমন কিছু ভাবার সুযোগ নেই। তাছাড়া এক মাসের ভাড়া এডভান্স আছে তাদের কাছে ডিপোজিট মানি হিসেবে, কাজেই তারা আরো একমাস অপেক্ষা করে দেখবে। এরমধ্যে অর্ণব ফিরে না এলে তারা এপার্টমেন্ট ভ্যাকেট করবে। তখন যদি রাচনা চায় এসে দেখতে পারে। তার আগে ওদের পক্ষে আর কিছুই করা সম্ভব নয়।
রাচনার পক্ষে আর তেমন কিছুই করা সম্ভব হলো না।

সময় যেমন কারো জন্য থেমে থাকে না—সময়ের সাথে সাথে একসময় সব কিছুই তেমনি সহনীয়ও হয়ে যায়।
সাত দিন পর্যন্ত রাচনা ছটফট করল অর্ণবের জন্যে। অফিসে গেল ঠিকই কিন্তু ঠিকমতো কাজে মন দিতে পারল না। একবার ওর বস ওকে ডেকে নিয়ে জিজ্ঞেস করল—সব ঠিক আছে কিনা। রাচনা বলেছে সব ঠিক আছে। এরপরে তার বস আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
ক্যালেন্ডারের পাতায় এক দিন, এক দিন করে দেখতে দেখতে তিরিশ দিন পার হয়ে গেল। রাচনার কাছে মনে হলো তিরিশ দিন নয় যেন তিরিশ মাস ধরে সে অপেক্ষা করছে। কিছু কিছু অপেক্ষার দিন যেন শেষ হতেই চায় না।
রাচনা চেয়েছিল তার জীবনে এমন কেউ একজন আসুক, যার সাথে সে বাকী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কাটিয়ে দিতে পারবে। অর্ণবের সঙ্গে পরিচয়ের শেষ ক’টা দিন রাচনা তাই নতুন করে ভাবতে শুরু করেছিল। কিন্তু হঠাৎ কোথা থেকে কী হয়ে গেল।
রাচনার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *