mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-১)

‘বাবা, তুমি কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে আসবে। এয়ারপোর্টে যেতে হবে ভুলে যেওনা আবার।’
শারমিন কফির কাপে কফি ঢেলে রহমান সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
রহমান সাহেব এক স্লাইস ব্রেডে জ্যাম লাগিয়ে মুখে দিয়েছিলেন, মুখের খাবার শেষ করে তিনি বললেন, ‘নারে ভুলে যাবো না। সফিকের অ‍্যারাইভাল ক’টায়?’
‘সন্ধ্যায়। সাড়ে ছ’টা।’
‘তোরা রেডি হয়ে থাকিস। আমি চলে আসব। জেসমিন যাচ্ছে তো?’
‘জানি না।’
‘ওহ।’ একটু ভেবে রহমান সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা, জেসনকে বলেছিস? ও সাথে গেলে হেল্প করতে পারত।’
‘বলেছি। জেসন কাজ থেকে সরাসরি চলে আসবে এখানে।’
‘দ্যাটস গুড।’ বলেই রহমান সাহেব কফিতে চুমুক দিলেন।
শারমিন তাকাল তার বাবার দিকে। একটু ইতস্তত হয়ে বলল, ‘উম বাবা, আম্মুর কথা আমি কিন্তু সফিককে কিছু বলিনি। ভাবছি কাজটা ঠিক হলো কিনা?’
‘বলিসনি কেন? আমিতো ভেবেছি ও সবকিছু জানে।’
শারমিন নিরুত্তর রইল।
‘আর বললেই বা কী হতো? যে যাবার সে চলে যায়। এ নিয়ে তুই কিছু ভাবিস না। ও এসেই সব জানুক।’
রহমান সাহেব লক্ষ করলেন, বাসার কাপড় পরে রয়েছে শারমিন। সাধারণত সকালে নাস্তার টেবিলে ওরা বাবা মেয়ে দুজনে একসাথেই নাস্তা করে তারপর যে যার মতো কাজে চলে যায়। শারমিন অফিসে যাবার প্রফেশনাল ড্রেস পরেই নাস্তা রেডি করে দুজনের জন্য। রহমান সাহেব উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে বললেন, ‘তুই কাজে যাচ্ছিস না আজ?’
‘না বাবা, ডে-অফ নিয়েছি। কিছু আইটেম রান্না করতে হবে। এই উইকেন্ডে তো রান্না করার সময় পাইনি।’
রহমান সাহেব মৃদু হাসলেন।
শারমিন লজ্জা পেয়ে বলল, ‘হাসছ কেন বাবা?’
‘না এমনিই। অনেকদিন ভালো-মন্দ কিছু খাওয়া হয় না। ভালোই হলো, সফিকের উপলক্ষে একটু ভালো-মন্দ খাওয়া যাবে। তুই কিন্তু রান্নাটা ভালোই শিখেছিস।’
‘ভালো না ছাই—মায়ের মতো তো আর রাঁধতে পারি না।’
‘যতটুকু শিখেছিস—এটুকুই বা কজন পারে?’ রহমান সাহেব তার কফিতে পর পর কয়েকটা চুমুক দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
রহমান সাহেব ডালাসে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশি আমেরিকান। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে শারমিন, বয়স তেইশ। ছোট মেয়ে জেসমিন, বয়স উনিশ। দুই মেয়েকে নিয়েই তার বসবাস। বিভিন্ন কারণেই তার স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না দীর্ঘদিন থেকে। দিনে দিনে দূরত্ব বেড়েই চলছিল—একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, সম্পর্কে তৈরি হয় দূরত্ব। কোনো এক দিনে কাউকে কিছু না জানিয়েই রহমান সাহেবের স্ত্রী পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে আলাদা হয়ে গেছে। রহমান সাহেব অনেকটাই নির্জীব স্বভাবের একজন মানুষ। সামান্য ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটিও তিনি এড়িয়ে চলেন। কখনো কোনো কারণেই তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো রকমের তর্ক বিতর্কে যেতে চাইতেন না। তারপরেও যখন পরিস্থিতি এমন হতো যে তর্ক এড়ানো যাচ্ছে না, তিনি স্বেচ্ছায় পরাজয় মেনে নিয়ে তার পড়ার রুমে চলে যেতেন। তারপরেও তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তিনি কিছুতেই মেলাতে পারেন না। জীবনের কিছু হিসেব বুঝি কখনোই মেলে না।
একটু বেলা বাড়তেই শারমিন ব্যস্ত হয়ে পড়ল রান্নার কাজে। গায়ে একটা অ্যাপ্রন জড়িয়ে সে খুব যত্ন নিয়ে রান্না করছে। এমন সময়ে উপর থেকে নেমে এলো তার ছোট বোন জেসমিন। হঠাৎ শারমিনকে রান্না ঘরে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘Hi Sis, you didn’t go to work today—what’s going on? Are you ok?’
জেসমিনের জন্ম আমেরিকাতেই। সে অল্প বিস্তর বাংলা কথা বলতে পারে তবে উচ্চারণগত সমস্যা থাকার কারণে বেশির ভাগ সময়ে সে ইংরেজিতেই কথা বলে। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের জন্যে এটা একটা চ্যালেঞ্জই বলা চলে। কিছু কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানদের চাপ দিয়ে কিংবা বুঝিয়ে বাংলাটা শেখাতে পারলেও বেশির ভাগ মা-বাবাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রণে ভঙ্গ দেয়। মা-বাবাকে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়, বাংলায় কথা বলতে পারে কিংবা বাংলা সংস্কৃতির প্রতি যাদের একটু ঝোঁক আছে, সেসব হাতে গোনা দু’একটা বাচ্চা ছাড়া বেশির ভাগের কাছেই মা-বাবার এত সব তৎপরতা খুবই বিরক্তিকর ঠেকে। ভেতরে-ভেতরে তারা আমেরিকান সংস্কৃতিতেই সাবলীল বোধ করে।
শারমিন কাজের মধ্যেই উত্তর দিল, ‘Yes, I’m fine.’
জেসমিন চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল বেশ কিছু আইটেম রান্না হয়েছে। আরো হচ্ছে। সে কিছুটা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘What are you cooking?’
‘এই তো ইলিশ মাছ ফ্রাই, বিফ কারি, কর্নিস চিকেন, স্পিনাচ আর ডাল। এই তুই যাচ্ছিস তো এয়ারপোর্টে?’
‘এয়ারপোর্টে কেন? Who’s coming?’
‘হু ইজ কামিং মানে? তোর দুলাভাই আসছে বাংলাদেশ থেকে। এর মধ্যেই ভুলে গেলি?’
‘Is he coming today? OMG! I totally forgot.’
‘ফরগেট তো হবেই। ফ্রেন্ডস আর পার্টি ছাড়া ফ্যামিলির অন্য কোনো কিছুতেই তো তোর ইন্টারেস্ট নেই।’
‘I’m sorry but I can’t go. I’ll be going out with Alex. Say hi to BIL.’
‘BIL?’
‘Brother-In-Law, stupid!’
জেসমিন আর কিছু না বলে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে গেল। শারমিন মাথা নেড়ে একবার তাকাল তার বোনের চলে যাওয়ার দিকে।

এয়ারপোর্ট থেকে সফিককে নিয়ে শারমিনদের ছোট দলটি যখন বাসায় ফিরে এলো তখনো সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েনি। ডে লাইট সেভিংস এর কারণে গরমের সময় দিনের আলো থাকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত।
শারমিন, সফিক, রহমান সাহেব আর জেসন গাড়ি থেকে বের হয়ে এলো একসাথে। জেসন গাড়ি থেকে নেমেই পেছনের ট্রাঙ্ক খুলে সফিকের লাগেজগুলো বের করে আনল। জেসন শারমিনদের প্রতিবেশীর এক বাংলাদেশি পরিবারের ছেলে—শারমিনদের পরিবারের যে কোনো সমস্যায় কিংবা প্রয়োজনে ডাকলেই চলে আসে। জেসনের বয়স একুশ বছর। খানিকটা আপন ভোলা স্বভাবের ছেলেটি অনেকটা শারমিনদের পরিবারের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ হয়ে গেছে বলা চলে।
ঢাকা থেকে ডালাস—লম্বা জার্নি করে সফিক বেশ ক্লান্ত। কিন্তু শারমিনকে বেশ চঞ্চল দেখা গেল। দীর্ঘ দু’বছরের অপেক্ষা শেষে সফিককে শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে নিয়ে আসতে পেরেছে—এটাই তার আনন্দের উৎস। তার সবাই মিলে ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল জেসমিন আর অ্যালেক্স হাত ধরাধরি করে ওদের বাসা থেকে বের হয়ে আসছে। জেসমিনের পরনে পার্টি ড্রেস—কিছুটা খোলামেলা। সফিক অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল ওদের দুজনকে। শারমিন কিছুটা অস্বস্তিবোধ করল। রহমান সাহেব রাগান্বিত দৃষ্টিতে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। সফিক উৎসুক দৃষ্টিতে একবার জেসমিনের দিকে আর একবার অ্যালেক্সের দিকে তাকাল। তারপর তাকাল শারমিনের দিকে।
জেসমিন মুখে একটা স্মিত হাসি নিয়ে এগিয়ে গেল সফিকের দিকে। অ্যালেক্সও এগিয়ে গেল তার সাথে। জেসমিন দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘Hi BIL, কেমন আছো? Welcome to America!’
সফিক ঠিক বুঝতে পারল না কিছু। বিলটা আবার কি জিনিস? সে অপ্রস্তুতভাবে তাকাল শারমিনের দিকে। শারমিন কিছু বলার আগেই জেসমিন অয়ালেক্সকে লক্ষ করে বলল, ‘Alex, meet my brother-in-law. He just came from Bangladesh.’
অ্যালেক্স হাত সফিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘Nice to meet you, BIL Welcome to Dallas!’
সফিক আবারো বোকার মতো তাকাল। ওকে কেন বিল বলছে কোনোভাবেই তা বোধগম্য হচ্ছে না। এবার সে নিরুপায় হয়ে বলল, ‘Bil? Who’s Bil? I’m not Bil. My name is Safiq. Safiq Ahmed.’
সফিকের অবস্থা দেখে জেসমিন হেসে ফেলল। সে হাসতেই হাসতেই অ্যালেক্সের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। অ্যালেক্সও তার পিছে পিছে যেয়ে চড়ে বসল তার গাড়িতে।
জেসমিন আর অ্যালেক্স চলে যাওয়ার পরেও সফিক ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। শারমিন সফিকের হাত ধরে বলল, ‘চলো, ভেতরে চলো।’
সফিক উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইল, ‘ঐ সাদা ছেলেটা কে?’
‘জেসমিনের বন্ধু।’ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শারমিন বলল, ‘লেটস গো ইনসাইড। কামঅন জেসন।’ বলেই শারমিন সফিকের হাত ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
জেসন এই পুরো সময়টাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা যখন কথা বলছিল, তখন সে লাগেজগুলো ঘরের মধ্যে রেখে এসে কথা শুনছিল ওদের। শারমিন আর সফিক ঘরের ভেতরে ঢুকে যেতেই সে তার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দ্রুত চলে গেল বাসার সামনে থেকে।

পরের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (শেষ পর্ব)

ডালাসের অদূরে রিচার্ডসন নামক শহরে অবস্থিত টেক্সাসের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের ডালাস ক্যাম্পাস। সংক্ষেপে ইউটি ডালাস কিংবা ইউটিডি। ইউটি ডালাসের STEM (Science, Technology, Engineering and Math) প্রোগ্রাম আমেরিকার সর্বোচ্চ‌ র‍্যাঙ্কিং প্রোগ্রামগুলির মধ্যে একটি। আর এ কারণেই ইউটি ডালাস বিশ্বজুড়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য—বিশেষ করে যারা উচ্চতর ডিগ্রী নিতে চান।
ক্লাস শেষ করে ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল জেসমিন আর সুজানা। পরের ক্লাস শুরু হতে আরো ৪৫ মিনিট বাকী। একটু কফি খেলে কেমন হয়? জেসমিনের পছন্দ স্টারবাকস কফি। ওদের একটা কফি শপ আছে ক্যাফেটেরিয়ার অভ্যন্তরে। ওখানে হেঁটে যেতে হবে। হাতে যেহেতু সময় আছে, তাই ক্যাফেটেরিয়াতেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা হলো দুজনার মধ্যে। কথোপকথনের বেশিরভাগ সময়েই জেসমিন তার বাবার প্রসঙ্গে কথা বলল।
‘I don’t understand why dad is so concerned about me. I’m already 20! Look at the American parents—they are not too concerned when their children reach 18!’
‘You know Jazz, we are lucky that our parents still wants to guide us even when we’re 18.’ সুজানা তার স্বভাবসুলভ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করল। ‘বাংলাদেশি প্যারেন্টসরা তাদের ছেলেমেয়েদের যেভাবে আদেশ–উপদেশ দেন তা আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যে খুবই প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম কি বোঝ তা?’ জেসমিনের অবাক করা চেহারার দিকে তাকিয়ে সুজানা জানতে চাইল।
‘I know, new generation. I agree, but my dad overreacts all the time. He does not want to understand me.’
‘Sometimes our parents don’t understand us, or sometimes we don’t understand them, that’s ok. আমরা এদেশে জন্ম নিয়েছি বলেই এটা হতে পারে।’
‘Are you saying it’s a communication gap then?’
‘Of course, it is. আমাদের প্যারেন্টসদের সঙ্গে এই গ্যাপ দূর করতে হলে আমাদেরকে বাংলাদেশের কালচার সম্পর্কে বেশী করে জানতে হবে। ‘
‘Our parents also should know and learn more about American culture, their history, racism, Spanish and other immigrants. Don’t you think?’
সুজানা মাথা নেড়ে সায় জানাল।
জেসমিন আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সে চুপ করে গেল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল অদূরে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুজানাও তাকাল। জেসমিন দ্রুত এগিয়ে গেল যেদিকে তাকিয়ে ছিল সেদিকে। কিছুদূর এগিয়েই সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে থমকে দাঁড়াল। জায়গাটি তুলনামূলকভাবে নির্জন, সেখানে একটি মেয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে কথা বলছে অ্যালেক্স । কথার ফাঁকে ফাঁকে তারা চুম্বন করছে একে অপরকে। জেসমিন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে দাঁড়াল অ্যালেক্সের সামনে। ‘অ্যালেক্স!’
জেসমিনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠের ডাকে অ্যালেক্স ঘুরে দাঁড়াল। ওর অগ্নিমূর্তি দেখে কিছুটা ভরকে গেল সে।
‘What do you think you are doing, you son of a bitch?’
অ্যালেক্স চুপ করে রইল। সাথের মেয়েটির কোমর থেকে হাত ছুটে গেছে তার।
‘How long have you been cheating on me, Alex?’
‘Cheating on you? You are not even my girlfriend, ok? You are fooling around! And I’m just playing with you. What do you expect?’ জেসমিনকে অপমানের চূড়ান্ত করে কথাগুলো বলল অ্যালেক্স। নতুন বান্ধবীর সামনে তাকে অপমান করার প্রতিশোধ নিতে পেরে একটু স্বস্তি বোধ করল সে।
‘Playing with me? How dare you. Then why did you…’ জেসমিন নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল অ্যালেক্সের গালে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলেও অ্যালেক্স সাথে সাথেই জেসমিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল নিচে।
জেসমিন রাগে দুঃখে কেঁদে ফেলল। সে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অ্যালেক্সের ওপর। এলোপাথারি কিল ঘুসি চালাতে থাকল।
সুজানা দেরি না করে জেসমিনকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরে এলো একটু দূরে। ফোন বের করে অ্যালেক্সের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Ok, I’m going to call the police’
পরিস্থিতি খারাপ হবার আগেই অ্যালেক্স তার বান্ধবীকে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল চোখের আড়ালে।
‘Let’s go Jasmine. Forget it. আজ আর ক্লাসে মন বসবে না। চলো আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি।’ সুজানা জেসমিনকে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল পার্কিং লটে যেখানে পার্ক করা আছে ওদের গাড়ি।

বাসায় ফিরে প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে বিছানায় শুয়ে রইল জেসমিন। তার হাতের এবং পায়ের কয়েক জায়গায় ক্ষত হয়েছে। সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল।
কাজ থেকে একটু তাড়াতাড়ি বসায় ফিরে এলো শারমিন। এসেই জেসমিনের রুমে যেয়ে দেখল সে মন খারাপ করে শুয়ে আছে। আজ কলেজে যা ঘটেছে সে ব্যাপারে শারমিনকে সব জানিয়েছে সুজানা।
শারমিন একটা আইচ প্যাক নিয়ে ব্যথার জায়গাগুলোতে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে ধরল। জেসমিন ফুলে ফুলে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I made a terrible mistake. I was wrong all along. I’m sorry. I’m very sorry.’
‘I told you so many times. You didn’t care.’ শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল।
‘I know sis. I know now. Please forgive me.’
‘It’s ok.’

রাতের খাবার শেষ করে একটা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিলেন রহমান সাহেব। খুট করে একটা শব্দে তিনি ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন দাঁড়িয়ে আছে তার রুমে। তিনি অবাক হলেন। জেসমিন তো সাধারণত তার ঘরে আসে না। জেসমিন এগিয়ে এসে রহমান সাহেবের হাত ধরে দাঁড়াল।
‘কিছু বলবি মা?’
‘Dad, I’m sorry, I hurt you. I don’t want to hurt you anymore.’ জেসমিন ইংরেজির সাথে ভাঙা ভাঙা বাংলা মিশিয়ে বলল, ‘আমার ভুল হয়েছে। আমি আর ভুল করতে চাই না।’
‘আচ্ছা, সে তো খুবই ভালো কথা।’
‘I’ll finish my college first then I’ll go to Bangladesh. আমি একটা বাংলাদেশি ছেলেকে বিয়ে করতে চাই।’
রহমান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে জেসমিনকে বুকে টেনে নিলেন।
জেসমিনকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে শারমিন আর সফিক দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন আনন্দঘন মুহূর্তে তারা দুজনে ঘরে ঢুকল হাসি মুখে। জেসমিন শারমিনকে দেখিয়ে বলল, ‘Look at her, how happy she is with dulabhai. I want to be like her. And I want to make you happy too.’
জেসমিনের সহজ সরল কথার ভঙ্গিতে সবাই হেসে ফেলল। রহমান সাহেব আবার বুকে টেনে নিলেন তার আদরের ছোট মেয়েকে।

রহমান সাহেবের বাসার লিভিং রুমে তুমুল আড্ডা জমে উঠেছে। সফিক, শারমিন, জেসমিন, সুজানা, জেসন আর রহমান সাহেব স্বয়ং খোশ গল্পে মেতে উঠেছেন। কিছুদিন থেকেই রহমান সাহেবের মনটা অত্যন্ত প্রফুল্ল। তাই শরীরটাও সতেজ লাগছে। তিনি শারমিনকে বলেছিলেন এই উইকএন্ডে লাঞ্চে একটু ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া হোক। শারমিন সেভাবেই আয়োজন করেছে সবকিছু। জেসন আর সুজানাও শামিল হয়েছে আজ দুপুরের নিমন্ত্রণে। আড্ডা জমে উঠেছে তুমুল। সফিকই বেশি গল্প করছে। হঠাৎ সুজানার ফোন এলো। সে এক্সকিউজ মি বলে ফোনটা ধরল। সুজানার মায়ের ফোন।
‘হ্যাঁ আম্মু? তুমি কোথায়? আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি ওখানেই থাকো, আমি আসছি।’ ফোন কেটে দিয়ে সুজানা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সরি, আমাকে যেতে হবে। আম্মু অপেক্ষা করছেন। আমি আজ আসি।’
‘তুমি আবার এসো, মা। চলো, তোমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’ রহমান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
‘না না আঙ্কেল অসুবিধা নেই। আপনি বসুন। আমি অবশ্যই আবার আসব।’
সুজানা জেসমিন আর শারমিনকে হাগ দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সুজানা বের হয়ে যেতেই জেসনও দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। জেসনের এভাবে কিছু না বলে হুট করে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টা শারমিন কিংবা জেসমিন কেউই ঠিক বুঝতে পারল না। তারা দুজন দুজনের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
সফিক বলল, ‘কী ব্যাপার, তোমরা হাসছ কেন?’
‘না কিছু না।’ দু’বোন আবার একসাথে হেসে ফেলল।

সুজানা একটু এগিয়ে যেতেই শুনতে পেল জেসনের কণ্ঠ। ‘Excuse me!’
সুজানা ঘুরে দাঁড়াল।
জেসন বলল, ‘I was just wondering if you need a ride or something.’
‘Thank you, Jason. রাইড লাগবে না। তবে তুমি যদি আমার সাথে আসতে চাও, আসতে পারো। You can meet my mom.’
‘অবশ্যই আসতে চাই।’
তারা হাঁটতে হাঁটতে সুজানার গাড়ির কাছে গেল।
জেসন বলল, ‘By the way, I’m very impressed about your thought process of mixed culture. তুমি তো অনেক ভালো বাংলা জানো—আমাকে বাংলা শেখাবে?’
‘অবশ্যই শেখাবো। তবে এক শর্তে।’ সুজানার মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘কী শর্ত?’
‘আমাকে সালসা শেখাবে?’
জেসন অবাক হয়ে তাকাল সুজানার দিকে। সে ঠিক বুঝতে পারল না, সুজানা কী করে জানে যে সে একজন ড্যান্স ইন্সট্রাকটর। ছোট বেলা থেকেই ল্যাটিন আমেরিকান নাচের প্রতি জেসনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়—বিশেষ করে সালসা, ফ্লেমিঙ্কো, সাম্বা, ট্যাংগো, ম্যাম্বো, মেরেঙ্গে, চা-চা, বাচাতা আরো কত ধরনের নাচ! সে নিজে থেকেই বিভিন্ন ধারার ল্যাটিন নাচ শিখে, পরে ট্রেনিং শেষ করে একটা ড্যান্স ক্লাবে ইন্সট্রাকটর হিসেবে পার্ট টাইম জব করে।
‘তুমি কী করে জানো যে আমি ড্যান্স জানি?’
‘আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও, তারপর বলছি। কী শেখাবে?’
‘অবশ্যই শেখাবো। তবে একটা শর্তে।’ এবার জেসন হাসি হাসি মুখ করে বলল।
‘কী শর্ত?’
‘আমাকে বিয়ে করবে? Will you marry me?’
‘এত তাড়াতাড়ি বিয়ের প্রস্তাব? তুমি তো আমাকে চেনোই না ঠিকমতো।’ মিষ্টি করে হেসে বলল সুজানা।
‘Whatever I know, that’s good enough for me!’
‘কিন্তু আমার জন্য সেটা এনাফ নাও হতে পারে তাই না?’
‘I agree!’ একটু ভেবে জেসন উত্তর দিল।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল দুজনেই। কেউ কোনো কথা খুঁজে পেল না। জেসন কিছুটা হতাশ হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
‘দ্যাট’স ইট, আর কোনো কথা নেই?’ সুজানা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল।
জেসন কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।
‘ঠিক আছে, আমি আসি। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।’
জেসন সরে দাঁড়াল। হঠাৎ করেই তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
সুজানা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তাকাল জেসনের দিকে। ‘আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করবে না?’ সুজানার চেহারায় আবার সেই দুষ্টুমির হাসি। ‘উঠে এসো গাড়িতে। লেট’স গো।’
জেসন উঠে বসল সুজানার গাড়িতে। পাশের সিটে বসে তাকাল সুজানার দিকে। মেয়েটির হাসিটা এত মিষ্টি কেন? কী সুন্দর হাসি। জেসন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এই মেয়েটিকেই তার পাশে সারা জীবন চাই।
সুজানা গাড়ি ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল আবাসিক এলাকার বাঁকে।
(আর চলবে না… দি এন্ড!)
করোনা বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত এই অস্থির সময়ে কারো মানসিক অবস্থারই ঠিক নেই। তারমধ্যেও সময় বের করে যারা গল্পটি পড়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত সাথেই ছিলেন, তাদের সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে নতুন কোনো গল্প নিয়ে। সে পর্যন্ত সবাই ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন।

আগের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-৭)

রহমান সাহেবের দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের পরে তিনি অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন। শরীরটাও ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি তার রুম থেকে খুব একটা বের হন না। অফিস থেকেও ছুটি নিয়েছেন। যতটা সম্ভব বিশ্রামেই আছেন তিনি। হার্ট অ্যাটাকের পরে এলোমেলো করে দেয় জীবনের অনেক কিছু। আকস্মিক ছন্দপতন ঘটে জীবনে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পরও নানা জটিলতা ঘটে যায় পরবর্তী কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। অকস্মাৎ এ বিপদ কাটিয়ে ওঠার পর আবার অনেকেই কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। হার্ট অ্যাটাকের পরে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে হার্টকে দুর্বলতার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি। শারমিন আর সফিকের অক্লান্ত চেষ্টায় রহমান সাহেব ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন।
জেসমিন বাসাতেই থাকে। তার আর ডরমিটরিতে যাওয়া হয় নি। সেদিনের পর থেকে তার মধ্যে বেশ স্থিরতা এসেছে। যথেষ্ট নমনীয়তা লক্ষ করা যায় তার চাল-চলন, বেশ ভূষায়। কলেজ থেকে ফিরেই বাবার সঙ্গে দেখা করে, টুকটাক কথাও বলে। যদিও এক ধরনের অপরাধবোধে সে ভোগে। শারমিন বেশ কিছুদিন কথা বলে নি জেসমিনের সঙ্গে। জেসমিনের সেদিনের ব্যবহারে সে যার পর নাই বিরক্ত এবং আহত হয়েছে।
সফিক ড্রাইভিং লাইসেন্স টেস্ট দিয়ে লাইসেন্স পেয়েছে। সে ভীষণ খুশি। এখন মাঝে মাঝে সে নিজেই গাড়ি চালিয়ে গ্রোসারী কিংবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে নিয়ে আসে। প্রথমদিকে ডলার খরচ করে কিছু কিনতে গেলে মনের ভেতর খচ করে উঠত। নিজের অজান্তেই কোনো কিছুর দাম দেখা মাত্র মনে মনে ৮০ দিয়ে গুণ করে মূষরে যেত সে। শারমিন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওকে বকা দিয়েছে অনেক। এখন অবশ্য এতটা খারাপ লাগে না।
শারমিন তার পরিচিত এক বড় বাঙালি ভাইয়ের গ্যাস স্টেশন কাম কনভেনিয়েন্ট স্টোরে সফিককে একটা কাজ জোগার করে দিয়েছে। কাস্টমারদের সাথে অনর্গল ভুলভাল ইংরেজি বলে ইংরেজিতে কথা বলাটা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে সে। দেশ থেকে একাউন্টিং এ মাস্টার্স করে এসেছে সে। তার ইচ্ছা তার লাইনের প্রফেশনাল কোনো জব করা, কিন্তু যতদিন তেমন কোনো কাজ না হচ্ছে, পার্ট টাইম একটা অড জব করা যেতেই পারে। তাতে দোষের কিছু নেই। সবাই করে। শারমিনের পরিচিত আরেক বাঙালি ভাবীর হাজব্যান্ডের একটা সিপিএ ফার্ম আছে। সফিকের সেখানে কাজের ব্যাপারে প্রাথমিক কথাও বলে রেখেছে সে।
সফিকের অবশ্য কোনো কিছুতেই কোনো অভিযোগ নেই। খুব অল্পতেই খুশি হওয়া তার স্বভাব। কোনোদিন আমেরিকা আসবে সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না। তবুও কীভাবে শারমিনের সাথে তার বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের সময় শারমিন দেশে যেয়ে ছিল মাত্র ৩ মাস। তারও আরো আড়াই বছর পর সে ইমিগ্রেশন ভিসা পেয়ে আমেরিকা আসে।
আমেরিকায় আসার পর থেকেই এই দেশটাকে তার খুব পছন্দ হয়েছে। পছন্দ হয়েছে এই দেশের মানুষগুলিকেও। আমেরিকার সাধারণ মানুষেরা গোমড়ামুখী নয়, তারা খুব হাসিখুশি। এ বিষয়টা সফিকের সবচেয়ে বেশি পছন্দের। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের সাথেও এরা কথা বলে এমনভাবে যেন মনে হবে কত দিনের চেনা মানুষ। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে এটি চমৎকার একটি দেশ। সারা পৃথিবী থেকে সবদেশের মানুষ এখানে এসে জমা হয়েছে। এই দেশে কেউই আর বিদেশি নয়।
বাসায় ফিরে হাত দিয়ে ডাল-ভাত-সবজি-মাছ-মাংস মাখিয়ে মাখিয়ে মজা করে খেতে পারছে—এই নিয়ে সফিকের আনন্দের সীমা নেই। তার ধারণা ছিল আমেরিকায় তার দিন কাটবে সালাদ আর ঠাণ্ডা স্যান্ডউইচ খেয়ে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি—এখানে এখন বাংলাদেশের সব কিছুই পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে সফিকের দিনকাল বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে বলা যায়।

রবিবার সকাল। অনেকক্ষণ থেকে রহমান সাহেবের বাসার দরজায় কলিং বেল বাজছে। বাসায় কেউ এলে সাধারণত শারমিনই দরজা খুলে দেয়। কিন্তু শারমিন আজ বাসায় নেই। সফিককে নিয়ে গেছে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখাতে। বিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘ডালাস’ এর শুটিং হয়েছিল সেখানে। সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ সম্পর্কে ইতিপূর্বে ‘হৃদয়ে আগন্তুক’* নামে আমার আরেকটি গল্পে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। এখানে তাই আর বিস্তারিত বর্ণনায় গেলাম না।
ডোর বেল বেজেই চলেছে। রহমান সাহেব লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছিলেন। তিনি একবার ওপরে তাকালেন। না, কেউ নেমে আসছে না। একসময় তিনি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। এবং অবাক হয়ে দেখলেন জেসমিনের বয়সী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাসি হাসি মুখ করে। রহমান সাহেব অবাক হলেন।
‘স্লামালিকুম আঙ্কেল।’
‘ওয়ালাইকুমসালাম। তুমি কে মা? তোমাকে তো চিনলাম না।’
‘আমি সুজানা। জেসমিনের বন্ধু। আপনি অবশ্য আমাকে আগে কখনও দেখেননি। ও আমাকে আসতে বলেছিল।’
‘ও আচ্ছা।’
‘আজ একসঙ্গে আমাদের বাইরে যাবার কথা, Is she home?’
‘ও তো উইকএন্ডে অনেক দেরী করে ঘুম থেকে উঠে।’ রহমান সাহেব হাত ঘড়িতে সময় দেখলেন—সকাল প্রায় ১১টা। তিনি আবার বললেন, ‘নিশ্চয়ই এখনো ঘুমচ্ছে। তুমি এসো, ভেতরে এসে বসো।’ তিনি সরে গিয়ে সুজানাকে ভেতরে ঢুকতে দিলেন।
‘তুমি কি বাংলাদেশ থেকে নতুন এসেছো? এত সুন্দর বাংলা বলো।’
‘না আঙ্কেল, আমার জন্ম এখানেই, বড় হয়েছি এখানেই। আর বাংলা বলা শিখেছি আমার বাবা মায়ের কাছে। অবশ্য আমার গ্র্যান্ড মা’র কারণে প্র্যাকটিসটা বেশী হয়েছে।’
‘Hi, Sue?’ হঠাৎ করেই ওপর থেকে জেসমিনের কণ্ঠ শোনা গেল। সুজানা এবং রহমান সাহেব দুজনেই তাকালেন ওপরের দিকে। একটা বিড়াল কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেসমিন। গায়ে রাতের কাপড়। চুল এলোমেলো। ‘Come upstairs. I’ll be ready in a minute.’
‘আঙ্কেল আপনার সাথে পরে কথা হবে।’ সুজানা উঠে দাঁড়াল।
‘ঠিক আছে মা, তুমি মাঝে মাঝে এসো। তোমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।’

জেসমিনের ২০ তম জন্মদিন পালন করা হচ্ছে ঘটা করে। জেসমিনের সব বন্ধুরা এসেছে, সেই সাথে তাদের পরিবার। প্রতিবেশী জেসন আর তার বাবা-মাও এসেছেন। সুজানা এসেছে তার বাবা-মাকে নিয়ে। ডালাসের বিখ্যাত বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট থেকে মজাদার সব খাবার আনা হয়েছে। শারমিন, সফিক আর জেসন মিলে সুন্দর করে সাজিয়েছে সব কিছু। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যেই অতিথিরা সবাই চলে এসেছেন। ছোট ছোট গ্রুপে সবাই কথা বলছেন। সবার হাতেই অ্যাপিটাইজারের প্লেট। এধরনের অনুষ্ঠানগুলোতে সাধারণত সম-সাময়িক বিষয় নিয়েই সবাই গল্পগুজব করে থাকেন।
আজকের আলোচনার প্রধান বিষয়, কমিউনিটিতে দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের বিয়ে নিয়ে যে সমস্যা হয়, বিশেষ করে ছেলের জন্য উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না অথবা মেয়ের জন্য উপযুক্ত ছেলে খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার অনেকেই জীবন সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধর্মের ছেলে-মেয়েদেরকে পছন্দ করে বসে। ভিন্ন ধর্মের ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বিয়ের ঘটনাও তাই বাড়ছে। ছেলে-মেয়েদের সুখের কথা চিন্তা করে বাবা-মায়েরা সেসব বিয়ে মেনে নিলেও মানসিকভাবে তারা ভীষণভাবে মুষরে পড়েন, কেননা তারা চান, তাদের ছেলে-মেয়েরা জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিক একটা বাঙালি ছেলে বা মেয়েকে।
অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে রহমান সাহেব সুজানার সাথে কথা বলছেন। সেদিন সুজানার সাথে কথা বলে রহমান সাহেব ভীষণ চমৎকৃত হয়েছেন। তিনি মনে মনে খুব আফসোস করেছেন, আহা তার জেসমিনও যদি এমন হতো। সুজানা চলে যেতেই মনের অজান্তেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। আজ সুজানাকে আবার কাছে পেয়ে তার ভীষণ ভালো লাগছে। সুজানাকে তিনি তার পাশে বসিয়ে কথা বলছেন। এক পর্যায়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘বাংলা ভাষা কিংবা সংস্কৃতির প্রতি এদেশে জন্ম নেয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় না। তোমার সাথে কথা বলে আমি খুব অবাক হয়েছি। I’m really proud of you. আচ্ছা, আমাকে বলতো, বাংলার প্রতি তোমার এমন আগ্রহ তৈরি হলো কী করে?’
‘আঙ্কেল, আমার জন্ম আমেরিকাতে হলেও বেসিক্যালি আমি বাঙালি। কেননা, এদেশে আমি যত বড়ই হই না কেন, আমেরিকানদের সাথে কমপিট করে মেইনস্ট্রীমে মিশে গেলেও আমি যে বাংলাদেশের মেয়ে এই সত্যটি আমি কখনোই ভুলে যেতে পারব না।’
রহমান সাহেব ভীষণ আপ্লুত হলেন সুজানার কথা শুনে। সফিক আর শারমিনও ওদের সামনের সোফায় বসা ছিল। সুজানার কথা হঠাৎ করে সফিকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সে আগ্রহ নিয়ে ওর কথা শুনতে থাকল।
‘আমি শত চেষ্টা করলেও একটি আমেরিকান ছেলে বা মেয়ে যেভাবে বড় হয়ে ওদের নিজস্ব কালচার নিয়ে, আইডেন্টিটি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেভাবে পারব না।
সফিক জিজ্ঞেস করল, ‘তার কারণ কি হতে পারে বলে তুমি মনে করো?’
‘কারণ, আমার রক্তে মিশে আছে বাংলাদেশের কালচার অ্যান্ড ট্র্যাডিশন। এই জন্য আমি আমার বাঙালি কালচারকে নিয়েই প্রাউড ফিল করি। এটিই আমার মুল আইডেন্টিটি।’
‘কিন্তু, মূলধারার সাথে পরিপূর্ণভাবে মিশে যেতে না পারলে ভবিষ্যতে সফল হবে কিভাবে?’ সফিক আবারো প্রশ্ন রাখল।
সুজানা কিছুক্ষণ ভেবে নিল। মনে মনে সাজিয়ে নিল সে যা বলতে চায়। ‘দেখুন আমি ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চাই। এজন্যে ক্লাসে সব সময়ই ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা করি। খেলাধুলা, নাচ-গান, অভিনয়েও আমার ভীষণ আগ্রহ। আমি যেটা করতে চাই সেটাতে কোন বাধা নেই আমার। আমি ওদের অনেকের চেয়ে ভালও করছি। কিন্তু তারপরেও ওরা কিন্তু আমাকে ওদের দলের মানুষ বলে মনে করছে না। আমাকে আলাদা করেই রাখতে চাইছে। তাহলে আমি কেন ওদের কালচার নিয়ে বড় হবো? তাছাড়া আমাদের কালচারে যা আছে, ওদের তা নেই। সেদিক থেকে ওরা খুবই পুওর।’
‘বুঝিয়ে বলো তো কোনটাকে তুমি পোর বলছো?’
‘ফর এক্সাম্পল, ১৮ বছর বয়স হলেই ওরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে যায়। চাইলেও বাবা মা ছেলে মেয়েদেরকে শাসন করতে পারেন না। অথচ ১৮ বছর বয়সে একটা ছেলে বা মেয়ে নিজের অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি দিয়ে ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। সেখান থেকে কেউ ফিরিয়ে আনতে পারে না। বাবা মাও পারেন না। আর সবকিছুর পেছনে ঐ ১৮ বছরের দেয়ালটাই বাধা হয়ে থাকে।’
রহমান সাহেব একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন, ‘বাহ, বেশ ভালো বলেছ তো?’
সফিকও মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এদিকে আমাদের কালচারটা দেখো। ১৮ বছর কেনো, আমরা ৩০ বছর বয়সেও বাবা মার আদেশ পরামর্শ মেনে চলি। আর এদেশের ছেলে মেয়েরা তো খুবই সেলফিস। তারা নিজেদের নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত থাকে যে অন্যদের সম্পর্কে জানার কোন আগ্রহই থাকে না।’ সফিক আড়চোখে তাকাল জেসমিনের দিকে। জেসমিন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
সুজানা বলল, ‘সে দিক থেকে আমরা কিন্তু লাকি। পূর্ব পুরুষের কালচার সহ দুটি কালচারের ভেতর দিয়েই আমরা অনেক বেশি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছি, আমাদের সে সুযোগ আছে।’
‘এক্সাক্টলি! ইউ আর রাইট!’ সফিক প্রশংসার হাসি দিয়ে সবার দিকে একবার তাকাল। তার খুব মজা লাগছে সুজানার সাথে কথা বলতে। সে আবারো জানতে চাইল, ‘আচ্ছা আমাকে বলতো, স্কুলে আমেরিকার কালচার আর ঘরে বাঙালি তার ওপরে মুসলিম রীতিনীতি—এই মিক্সড কালচার কনফ্লিক্ট তুমি কীভাবে ডিল করো?’
জেসমিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, ‘প্রথম দিকে সমস্যা হতো, তবে এখন আর কোন কনফিউশন নেই। কারণ আমি বুঝতে শিখেছি, আমার বাবা-মা কিংবা অন্যান্য বাঙালি ফ্যামিলিগুলো সুদূর বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছেন শুধু ভাগ্যের অন্বেষণে। আমি জেনেছি স্বদেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা, স্বাভাবিক জীবনের অনিশ্চয়তা—এসব নানা কারণেই ইমিগ্র্যান্টরা এদেশে এসেছেন ফার্স্ট জেনারেশন হয়ে। আমরা সেই সুবাদে ভিন্ন শেকড় থেকে বেড়ে উঠা আমেরিকান সিটিজেন।’
সুজানার কথা শুনতে শুনতে রহমান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। এই মেয়েটা এত সুন্দর করে কথা বলা শিখল কীভাবে। সুজানার বাবা-মাকে একটা বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হবে।
আলোচনার মাঝখানে এবার শারমিন তার মতামত দিল। ‘এখানে বেড়ে উঠা অনেক ছেলে মেয়েরা ভয়ে কিংবা লজ্জায় বাংলা বলতে চায় না। অনেককে দেখেছি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে লিখে বাংলা গান গায়। আসলে আমাদের সব প্যারেন্টসদের উচিত বেশী করে বাঙালি কালচারগুলো ছেলেমেয়েদের শেখানো। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে বাংলা লেখা এবং পড়াটা শেখাতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।’
‘ঠিক বলেছেন আপু।’ সুজানা বলল, ‘তাহলেই শুধু আমরা আমেরিকান সোসাইটিতে গর্ব করে আমাদের আইডেন্টিটি তুলে ধরতে পারবো।’
অনেকক্ষণ থেকেই সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে সুজানার কথা শুনছে। বাকী কথাগুলো এবার ইংরেজিতে বলল সুজানা, ‘We should know that we are American only for our bright future, but basically we are Bangalee. And we all should feel proud for this.’
অতিথিদের মধ্যে প্রশংসাসূচক শব্দ ভেসে আসতে লাগল। জেসমিন একটু অসস্ত্বিবোধ করতে লাগল। দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার পর থেকেই সুজানাকে নিয়েই সবাই মেতে রয়েছে অথচ এটা ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠান। তার কি কিছুটা হিংসে হচ্ছে? হতেও পারে। এই আলোচনা এখন বন্ধ হওয়া দরকার। জেসমিন একটু উচ্চস্বরে সুজানাকে বলল, ‘Sue, let’s go to my room, I’ll show you my new collections.’ বিভিন্ন ডিজাইন এবং ব্রান্ডের জুতা কেনা জেসমিনের শখ। কয়েক শো জোড়া জুতা তার ক্লোজেটে সাজানো আছে। সে সুজানার হাত ধরে একরকম জোর করে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল ওপরতলায় তার রুমে।
‘বাপরে, এ মেয়েতো সাংঘাতিক। ভাবাই যায় না ওর জন্ম হয়েছে আমেরিকায়। ওর বাবা-মকে তো একটা স্পেশাল থ্যাঙ্ক ইউ জানানো দরকার। কোথায় তারা?’ সফিক উঠে গিয়ে সুজানার বাবা-মাকে খুঁজতে লাগল।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-৬)

ছুটির দিনের সকাল।
শারমিন একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠল। মনে হলো আজ তো কাজ নেই। তাই ঘুমিয়ে নেই যতটা পারা যায়। অন্য অনেক দিনের মতো আজ না। আজ শনিবার। ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করেনা। তবুও আলস্যে মাখা শরীরটা অনেক কষ্টে বিছানা থেকে তুলে নিল শারমিন। তার সাথে সাথে সফিকেরও ঘুম ভেঙে গেল। শারমিন মিষ্টি হেসে বলল, ‘তুমি আর একটু ঘুমাও। আমি ব্রেকফাস্ট রেডি করে ডাকব।’
সফিক হাই তুলে বলল, ‘আমিও আসি, হেল্প করব তোমাকে।’
শারমিন খুশি হয়ে গেল। ঘুম থেকে উঠেই সকালটা কেমন সুন্দর হয়ে গেল। হেসে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে।’
রহমান সাহেবের বাসার কিচেন টেবিলে সকলে জড় হয়েছে। শারমিন দেশের মতো আলুভাজি, ডিম ওমলেট, সুজির হালুয়া আর পরাটা বানিয়েছে। আবার ব্রেড টোস্ট সাথে জ্যাম জেলিও আছে। আয়োজন দেখে সফিকের মনটা বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আমেরিকায় আসার পর থেকে শান্তি মতো নাস্তাটা করা হয় না। সোম থেকে শুক্রবার সকালে তার খুব কষ্ট হয়। দু’এক স্লাইস ব্রেড, মাফিন কিংবা বেগল—এসব খেতে খেতে সে হাঁপিয়ে গেছে। শুধু ছুটির দিনের সকালে শারমিনকে বাসায় পাওয়া যায়, সে তখন অনেক ধরনের নাস্তার আয়োজন করে। মাঝে মাঝে খিচুড়িও রাঁধে। আমেরিকায় থেকে মেয়েটা এতকিছু রান্না করতে পারে এটা দেখে সফিকের বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
সফিক দুটো পরাটা, আলুভাজি, ডিম ওমলেট তুলে নিল তার প্লেটে। দেরি না করে খাওয়া শুরু করল দ্রুত।
শারমিন সফিকের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ‘দেখো, আবার গলায় আটকে না যায়, আস্তে খাও।’ গ্লাসে অরেঞ্জ জুস ঢেলে এগিয়ে দিল সফিকের দিকে। ‘কফি কি এখন দিবো না পরে?’
‘চা বানাও নি? চা হলে ভালো হতো। কফি তো তিতা লাগে।’
সফিকের কথার ধরনে রহমান সাহেব মৃদু হাসলেন।
শারমিন বলল, ‘তুমি যেভাবে চা খেতে চাও সেটা এখন বানানো যাবে না। গুড়ো চা নেই। টি-ব্যাগ আছে, চলবে? হট-ওয়াটারে একটা টি-ব্যাগ ছেড়ে দিলেই হবে।’
‘না থাক। কফিই খাই। তবে কফিটা পরে দাও। নাস্তাটা শেষ করি আগে।’
‘ওকে।’ শারমিন আবার হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে জেসমিন এসে বসল টেবিলে। গ্লাসে অরেঞ্জ জুস ঢেলে আস্তে করে চুমুক দিল।
সফিক মুখের খাবার শেষ করে জেসমিনের দিকে তাকাল। অরেঞ্জ জুসের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘এই যে শালিকা, তোমার সাথে তো দেখাই হয় না। তারপর দিনকাল কেমন? নিশ্চয়ই ভালো? খুব পার্টি হচ্ছে, তাই না? হা হা হা।’
জেসমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘I told you not to call me in that stupid name. Call me Jasmine, if that is too hard for you, call me Jazz. Just Jazz. ok?’
জেসমিনের এমন প্রতিক্রিয়ায় সফিক খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে একবার তাকালো শারমিনের দিকে। তারপর তাকাল রহমান সাহেবের দিকে। রহমান সাহেব নির্বিকার। তিনি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ডালাস মর্নিং নিউজ পেপারে চোখ বুলাতে লাগলেন।
বিব্রত সফিক প্রসঙ্গ বদলে শারমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলে শারমিন, সকালের নাস্তাটা হচ্ছে দিনের সবচাইতে প্রয়োজনীয় খাবার। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, A healthy breakfast is the most important meal of the day. এতে শরীর ও মন ভালো থাকে। ব্রেইনও কাজ করে ভালো।’
শারমিন কিছু বলল না।
সফিক তার নাস্তা বিষয়ক বক্তৃতা চালিয়ে গেল। এবার অবশ্য কথাগুলো বলল জেসমিনকে উদ্দেশ্য করে, ‘বিশেষ করে কম বয়েসী ছেলেমেয়েরা, যারা স্কুল কলেজে যায় তাদের জন্য তো ব্রেকফাস্ট একেবারেই মাস্ট। এতে করে লেখাপড়ায় মনঃসংযোগ ঘটে, সেই সাথে সলভিং এবং ক্রিয়েটিভ স্কিলস বৃদ্ধি পায়। According to the American Dietetic Association…’
সফিকের কথা শেষ হবার আগেই জেসমিন তার বাবাকে লক্ষ করে বলল, ‘Dad, I’m moving out.’
রহমান সাহেব পত্রিকা পড়া বন্ধ করে তাকালেন জেসমিনের দিকে। শারমিন আর সফিক তাকাল একে অপরের মুখের দিকে।
‘My friend Carla is taking an apartment; she needs a roommate and I’ve decided to stay with her. I suppose that’s about it.’
বলেই জেসমিন উঠে দাঁড়াল এবং আর কিছু না বলে চলে যেতে উদ্যত হতেই রহমান সাহেব উচ্চ স্বরে বললেন, ‘Just a minute.’
‘I’m late.’ জেসমিন ঘুরে হাটা শুরু করল।
রহমান সাহেব হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘I said just a minute.’
রহমান সাহেব উঠে এলেন। দাঁড়ালেন জেসমিনের সামনে। তারপর উচ্চকণ্ঠেই বললেন, ‘তুমি ইচ্ছে করলেই অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে পারো না। সে পারমিশন কেউ তোমাকে দেয় নি।’
‘I didn’t ask for a permission. I don’t need a permission. I’m old enough to make my own decision.’
‘No, you’re not old enough to do whatever you want. I’m your father and I know what is right for you, what is not. You have a college and you need to finish your study first; you understand?’
কোনো উত্তর না দিয়ে জেসমিন অন্যদিকে তাকাল।
রহমান সাহেব জেসমিনের ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের দিকে এনে আবার বললেন, ‘Do you understand?’
‘I’ll do whatever I want.’
‘Don’t you dare to talk to me like that. কোন বাঙালি মেয়ে তার প্যারেন্টস এর সঙ্গে এভাবে কথা বলে না।’
‘I’m not a bangalee meye. তুমি আমাকে জোর করে বাঙালি বানাইতে পারো না। You just can’t force me.’
সফিক চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল সবার মুখের দিকে। এসব কী হচ্ছে?
‘আমাকে আমার মতো করে বড় হইতে দাও। Let me have my own freedom. Even a girl in Bangladesh has more freedom than I do. You don’t even know how Bangladesh has changed.’
রহমান সাহেব ভেঙে পড়লেন। হতাশ ভঙ্গিতে তাকালেন শারমিনের দিকে। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।
শারমিন এগিয়ে এসে জেসমিনকে থামানোর চেষ্টা করল। ওর হাত ধরে বলল, ‘That’s enough Jasmine! Now, please stop.’
কিন্তু জেসমিন তার বাবাকে লক্ষ করে বলেই চলল, ‘You’re living in America and keeping your so called Bangladeshi poor sentiment and forcing me to live with that? You don’t care about how I want to grow up with. You only care about your god damn ill mentality Bangladeshi community and what they will say.’
রহমান সাহেব পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সে তার দু’কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। এই মেয়ে এসব কী বলছে তার মুখের ওপর!
উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করল। সফিক উঠে এসে দাঁড়াল জেসমিনের সামনে। জেসমিনকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘Jesmin, I mean Jazz, এভাবে বোধহয় তোমার কথা বলাটা ঠিক হচ্ছে না। After all he is your father, you know.’ সফিক ইদানীং কথার মাঝে আমেরিকানদের মতো কাঁধ নেড়ে you know, hmm, excuse me, thank you দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে।
জেসমিন সফিককে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে তাকাল তার বাবার দিকে। সে ফিরে গেল তার কথার ঝড়ে। ‘Your so called Bangalee culture, sentiment and value could not stop mommy to move away holding her boyfriend’s hand. So, don’t push me to do the same.’
এ পর্যায়ে রহমান সাহেব ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার দিলেন, ‘Jasmine! How dare you?’
রহমান সাহেব হাত উঁচু করে জেসমিনের দিকে এগিয়ে যেতেই শারমিন তার বাবার হাত ধরে ফেলল, ‘বাবা, না!’
জেসমিন কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। আবার কী ঘটতে যাচ্ছিল সে বুঝে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাণ্ডা কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘I guess that’s it. I’m moving out. No one will ever stop me.’ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল জেসমিন।
কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন রহমান সাহেব। একবার তাকালেন শারমিনের দিকে আবার জেসমিনের চলে যাওয়ার দিকে। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না। অস্থির লাগছে। হাত কাঁপছে। মাথাটাও চক্কর দিয়ে উঠল। কেমন দিশেহারা মনে হচ্ছে সব কিছু। চারিদিকটা কেমন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর চিনচিন ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। ব্যথার তীব্রতা বাড়তেই রহমান সাহেব সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সফিক ধরে ফেলল তাকে।
শারমিন চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল, ‘Oh my god! Safiq call 9-1-1. Call the ambulance.’

পরের পর্ব

আগের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-৫)

সব শুনে সফিক চুপ করে রইল। সে আর তেমন কিছুই বলতে পারল না। আর কীইবা বলবে। তার যা জানার ছিল জেনে গেছে। সে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল শারমিনের মুখের দিকে। শারমিন আস্তে করে বলল শুধু, ‘তারপরে আরও অনেকগুলো ইন্সিডেন্ট ঘটেছে। আমাদের সাথে প্রায়ই সেসব নিয়ে সমস্যা হতো। এখনো হচ্ছে।’
শারমিন একে একে আরো কয়েকদিনের ঘটনা বলে গেল।
একদিন—শারমিন লিভিং রুমের সোফাতে বসে অপেক্ষা করছিল জেসমিনের জন্য। সে দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত ১২টা বেজে ২৫ মিনিট। আরো কিছুক্ষণ পর জেসমিনের গাড়ির আওয়াজ পাওয়া গেল। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেই দেখল শারমিন বসে আছে লিভিং রুমে। সব সময়ের মতোই ওপরে উঠে যাওয়ার মুখে শারমিন উঠে দাঁড়িয়ে ওর সামনে গেল। জেসমিন বুঝতে পারল বড় বোনের জবাবদিহিতার সামনে এবার তাকে দাঁড়াতে হবে। শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, You are late again. তুই জানিস বাবার শরীর ভালো না। And you’re keep causing him to suffer. Why Jazz? কেনো এমন করছিস?’
‘Do you have to interrogate me every time I get home?’ জেসমিনের কণ্ঠেও বিরক্ত প্রকাশ পেল।
‘No, I don’t have to, if you back home on time.’ শারমিন আবার ঘড়ির দিকে তাকাল। এখন রাত ১২টা বেজে ৪০ মিনিট। সে জিজ্ঞেস করল, ‘So why are you late?’
‘I had dinner with a friend.’
‘And then?’
‘Nothing.’
‘তোর কি মনে হয় আমি ব্রেষ্ট ফিডিং বেবি? আমি কিছুই বুঝি না? You will be in big trouble one day, I’m telling you.’
জেসমিন সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে হেঁটে গেল ডাইনিং টেবিলের কাছে। গ্লাসে পানি ঢেলে পানি খেতে খেতে লক্ষ করল টেবিলে অনেক রকমের খাবার সাজানো রয়েছে। তখন মনে পড়ল আজ রাতে ওর ডিনার করার কথা ছিল সবার সাথে। রহমান সাহেব অপেক্ষায় থাকেন, প্রতি রাতে তার মেয়ে দুটিকে নিয়ে এক সঙ্গে রাতের খাবার খাবেন। বেশির ভাগ সময়ই অবশ্য জেসমিনকে পাওয়া যায় না। আবার বাসায় থাকলেও সে তার মতো কোনো প্যাকেট ফুড ফ্রিজ থেকে বের করে মাইক্রোওয়েভে গরম করে খেয়ে নেয়। টেবিলে থাকলেও সে তার মতো কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকে তারপর উঠে চলে যায়। দু’একটি যা কথা হয় ঐ শারমিনের সঙ্গেই।
টেবিলে এত খাবার দেখে জেসমিন বলল, ‘Wow! Looks good.’
‘তোর ডিনার করার কথা ছিল আমাদের সাথে। বাবা অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেছেন।’
‘That’s ok, sis. I’ll have it tomorrow or some other day.’
‘You are going out of control. You are crossing your limit you know that?’
‘Don’t start acting like dad. I’m sick of it.’ বলতে বলতে জেসমিন সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠে তার রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
শারমিন তাকিয়ে রইল অসহায় দৃষ্টিতে। কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কী করলে জেসমিনকে বশে আনা যাবে। মেয়েটা দিন দিন এমন হয়ে যাচ্ছে কেন?
আরেকদিনের ঘটনা। এক শনিবারের দুপুর। রহমান সাহেব তার দু’মেয়েকে নিয়ে দুপুরের খাবার খেতে বসেছেন। তার মনটা বেশ ভালো। সে সব সময় চায় মেয়ে দুটি তার আশে পাশেই থাকুক। ওরা পাশে থাকলে তার খুব ভালো লাগে।
সবাই চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। জেসমিন অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছে কিছু একটা বলার জন্য, কিন্তু তার বাবা কী বলবেন সেই চিন্তায় সে কিছুটা দ্বিধান্বিত। কথাটা কি সে বলবে না কি বলবে না। অবশেষে কোনো রকম ভণিতা না করে সে বলে ফেলল, ‘I’ll sleep over at my friends’ house tonight. I need some help with the homework. So, don’t wait for me.’
রহমান সাহেব খাওয়া বন্ধ করে একবার তাকালেন জেসমিনের দিকে। তারপর তাকালেন শারমিনের দিকে। শারমিন জানে জেসমিনের সব কথা এখন আর বিশ্বাস করা যায় না। অথচ আমেরিকায় ছেলেমেয়েরা সাধারণত মিথ্যে বলে না। যা বলার সরাসরি বলে। এমন হতে পারে, বাবাকে ভয় পেয়ে সে ছল-চাতুরীর আশ্রয় নিচ্ছে। সে বিরক্ত চোখে তাকাল জেসমিনের দিকে।
রহমান সাহেব শীতল কণ্ঠে বললেন, ‘রাতে অন্য কারো বাসায় থাকাটা আমার পছন্দ নয়। রাত যতই হোক বাসায় ফিরবে, তাছাড়া প্রতি উইকএন্ডেই তোমাকে কেনো বাইরে যেতে হবে জেসমিন? You are not a boy!’
‘I can’t go out just because I’m not a boy? That’s discrimination!’ জেসমিন প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল।
‘জেসমিন, তোমাকে আগেও বলেছি, আবারো বলছি। তোমার চলাফেরা আচরণ দিনকে দিন সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। আমি চাই না তোমার বড় ধরনের কোনো ক্ষতি হোক, সমস্যায় পড়ো।’
‘Dad, I told you, don’t worry about me. I’m not a little kid anymore. I’m quite grown up.’
‘Not quite enough to make your own decision. I’ll have to restrict your privilege, if you keep doing it and not listen to me.’
‘Why do I have to always listen to you? Just because you are my dad? Can’t I have my own choice? Why? Why can’t I have my freedom? Am I not adult enough to make my own decision?’
‘তোমার ফ্রিডম তুমি নিজেই নষ্ট করেছ। ফ্রিডম মানে এই নয় যে তোমার যা খুশি তাই করবে। যখন খুশি বাসায় ফিরবে, যখন খুশি বেরিয়ে যাবে। সব ফ্যামিলিতেই কিছু কিছু নিয়ম থাকে। যতক্ষণ তুমি এ বাড়িতে থাকছ, এ বাড়ির কিছু নিয়ম তোমাকে মেনে চলতে হবে। No exception.’
‘Ok, then I’ll have to move out with a friend or maybe I’ll find a room at the dorm and I will live on my own.’
‘কি বললে? What did you say?’
‘You heard me.’
‘এত বড় বাড়ি থাকতে তুমি ডর্মে গিয়ে থাকবে?’
‘Only if you force me to.’ বলেই জেসমিন টেবিল থেকে উঠে চলে গেল।
রহমান সাহেব খাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলেন। শারমিন অসহায় চোখে তাকাল জেসমিনের চলে যাওয়ার দিকে। তারপর উঠে এসে দাঁড়াল তার বাবার পাশে।
এসব কথা শুনে সফিকের মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। কথা বলতে বলতে শারমিন বেশ ইমোশনাল হয়ে পড়ল। সফিক ওর কাঁধে হাত রাখল। শারমিন একটু ধাতস্থ হতেই এক সময় সফিক বলল, ‘আসলে কি জানো? ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলেমেয়েদের প্রচুর সমস্যা হয়। বিশেষ করে আমেরিকায়। ওদের লাইফটা অন্য আর দশটা ছেলেমেয়ের মতো হয় না। এজন্যেই বাবা-মায়ের একত্রে থাকাটা খুবই জরুরী।’ একটু থেমে সফিক আবার বলল, ‘জেসমিনের ব্যাপারটা আমাকে ভাবিয়ে তুলেছে। কিছু একটা করা দরকার। কিন্তু কী করা যায় তাই ভাবছি?’
প্রতিদিন বিকেলে অফিস থেকে ফিরে রহমান সাহেবের বাগানে পানি দেয়াটা অভ্যাস। শারমিনদের বাসার পেছনে বিস্তর জায়গায় হরেক রকমের শাক-সবজি, ফল আর ফুলের বাগান। এগুলোর পরিচর্যা রহমান সাহেব আর শারমিনই করে থাকে। আসলে বাগান করার শখ ছিল রহমান সাহেবের স্ত্রী নাসরীন জাহানের। তার আগ্রহ এবং ইচ্ছেতেই বাড়ির পেছনের এই বাগানটি তৈরী হয়েছিল। বাগান ভর্তি ফলফুলের সমাহার দেখে এখন হয়ত বোঝা যাবে না যে, এগুলোর পেছনে একজন মানুষের কতটা শ্রম আর মমতা থাকতে পারে। নাসরীন জাহান প্রতিদিন সকাল আর বিকেলবেলাতে বাগানে কাজ করতেন। গাছ রোপণ করা, আগাছা পরিষ্কার করা, গাছে পানি দেওয়া, মাটি বদলানো, সার দেওয়া, কীটনাশক ছিটানো—সব কিছুই নিজের হাতে করেছেন। প্রতি বছর বসন্তের শুরুতেই ফুলের চারা, মাটি আর ঘাস কিনে নিয়ে এসে নিজ হাতেই সব কিছু করতেন নাসরীন জাহান। রহমান সাহেব তার স্ত্রীর সঙ্গে দীর্ঘ সময় বাগানে কাটাতেন। অভ্যাসটা রয়ে গেছে এখনো। তাছাড়া, বাগানে এলেই তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ে। বাগান পরিচর্যা করতে করতে নাসরীন প্রায়ই বলত, ‘গাছ শুধু লাগালেই হয় না, যত্ন করতে হয়, গাছের সাথে কথা বলতে হয়, তবেই না ফুলে-ফলে-পল্লবে ভরে ওঠে উদ্ভিদগুলো! তখন খুব ভালোভাবেই বোঝা যায় যে, গাছেরও প্রাণ আছে৷ বাগানের কাজের জন্য কে কতটা সময় দেয় বা ভালোবাসে তা যে কোনো বাগান দেখলেই নিঃসন্দেহে বোঝা যায়৷ তাছাড়া, বাগানের কাজ বা সবুজ প্রকৃতির কাছাকাছি থাকলে মানুষের স্ট্রেস লেভেলও অনেক কমে যায়।’
সফিক দূর থেকে দেখল রহমান সাহেব বাগানে পানি দিচ্ছেন। সে এগিয়ে গেল তার কাছে। রহমান সাহেব ঘুরে তাকালেন। পানি দিতে দিতেই জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার ড্রাইভিং শেখা কেমন হচ্ছে? টেস্ট দেবার জন্য রেডি?’
‘আর কয়েকদিন প্র্যাকটিস করলেই হয়ে যাবে। আমি অবশ্য রেডি কিন্তু শারমিন বলছে আর একটু প্রাকটিস করা দরকার।’
‘প্যারালাল পার্কিং শিখেছ ঠিকমতো?’
‘জি। ঐ প্যারালাল পার্কিং-এই একটু ঝামেলা হচ্ছে।’
‘হুমম।’
এটুকু কথাবার্তার পরে আর কোনো কথা হয় না। রহমান সাহেব একটু সামনে এগিয়ে অন্য গাছে পানি দিতে থাকেন। সফিক এগিয়ে দাঁড়াল তার কাছাকাছি। কিন্তু কিছু বলল না। রহমান সাহেব একবার ঘুরে দেখলেন ওকে, চেহারা দেখে বুঝে নিলেন, সফিক হয়তো কিছু বলতে চায়। তিনি বললেন, ‘কিছু বলবে?’
সফিক কোনো রকম ভণিতা না করেই বলল, ‘না মানে, আমি ভাবছিলাম, জেসমিনকে একটা ভালো ছেলে দেখে বিয়ে দিয়ে দিলে কেমন হয়?’
রহমান সাহেব কোনো উত্তর দিলেন না। যেভাবে পানি দিচ্ছিলেন সেভাবেই পানি দিতে থাকলেন।
সফিক একটু সময় নিয়ে বলল, ‘খুঁজলে নিশ্চয়ই উপযুক্ত বাঙালি ছেলে এখানে পাওয়া যাবে। আমেরিকার সিটিজেনশীপ আছে এমন একটা মেয়েকে বিয়ে করার ছেলের তো অভাব হবার কথা না।’
‘ওর কি বিয়ের বয়স হয়েছে? তাছাড়া গ্রাজুয়েশন করতে হবে, ক্যারিয়ারের ব্যাপার আছে।’
‘তাতো ঠিকই।’
‘আর যে বিয়ে করবে তার ইচ্ছেও তো থাকতে হবে।’
‘তাতো ঠিকই।’
‘ছেলে মেয়েরা বড় হলে বাবা মায়ের কথা কিংবা ইচ্ছা অনিচ্ছার বোধহয় আর কোন মূল্য থাকে না। তাদের জগৎ আলাদা হয়ে যায়।’ রহমান সাহেবের কণ্ঠে হতাশা ফুটে উঠল। তিনি গাছে পানি দেয়া বন্ধ করে দিলেন। তার মনটা বিক্ষিপ্ত হয়েছে।
সফিক বলল, ‘কেনো, থাকবে না কেনো? শারমিন তো আপনার কথা মতো দেশে গিয়েই বিয়ে করেছে। তাহলে জেসমিন করবে না কেনো?’
‘শারমিনের কথা আলাদা। বাংলাদেশে জন্ম, ছোটবেলা থেকে এদেশেই বড় হয়েছে ও। কিন্তু তারপরেও দেখো, ও কিন্তু বাংলাদেশি কালচার কিংবা ট্র্যাডিশনকে বিসর্জন দেয়নি। আবার আমেরিকান কালচারকেও দূরে সরিয়ে রাখেনি। দুটো কালচারের সমন্বয়ে ও বড় হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা ওর কারণে কখনোই আমাদেরকে কোনো কষ্ট পেতে হয় নি। কিন্তু হাতের পাঁচ আঙ্গুলতো আর সমান হয় না তাই না?’
‘তাতো ঠিকই।’
শারমিনকে নিয়ে রহমান সাহেবের সত্যিকার অর্থেই কোনো কষ্ট নেই। ওকে কখনো কিছুই বলতে হয় নি। কি কারণে কে জানে, শারমিন খুব ছোট বেলা থেকেই বাঙালি সংস্কৃতিটাকে বেশ ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে। বাংলাদেশিদের প্রতিটা অনুষ্ঠানেই সে যায়। সক্রিয়ভাবে অংশও নেয়। বসন্ত, বৈশাখ, একুশে ফেব্রুয়ারি, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস সহ সব দিবসগুলোতেই সে সুন্দর করে শাড়ি পড়ে সেজেগুজে যায়। দেখতে কী ভালো লাগে। ভাবতে ভাবতে রহমান সাহেবের চোখ ভিজে আসে।
সফিক আরো কিছু বলতে চায়। সে আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল। ইতস্তত কণ্ঠে বলল, ‘আমি কি একবার জেসমিনের সঙ্গে কথা বলে দেখব?’
রহমান সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন সফিকের দিকে। মৃদু হেসে তাচ্ছিল্যের সুরে বললেন, ‘তুমি আর কী বলবে? এদেশে বর্ণড ছেলেমেয়েদের কথার ভঙ্গীই আলাদা। ওর এটিচুড তোমার ভালো নাও লাগতে পারে।’
‘সে নিয়ে আপনি ভাববেন না। আমি অত সহজে কিছু মনে করি না।’
রহমান সাহেব আর কিছু বললেন না। সফিক কি দাঁড়িয়ে থাকবে না চলে যাবে বুঝতে পারল না।
‘কী ব্যাপার, তোমরা এতক্ষণ কী কথা বলো? ডিনার দেয়া হয়েছে, ভেতরে এসো।’
হঠাৎ শারমিনের ডাকে তারা দুজনেই ঘুরে তাকাল। সফিক অবাক হয়ে আকাশের দিকে তাকাল। এখনো তো সন্ধ্যাই হয় নি, বিকেলের রোদ কেবল মাত্র ফিকে হতে শুরু করেছে, এখনই ডিনার? কিন্তু ঘড়ির সময় দেখে সে আঁতকে উঠল। প্রায় আটটা বাজে। সময় অনুযায়ী তো এখন রাত। আজব দেশ তো!

পরের পর্ব

আগের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-৪)

সোমবার থেকে শুক্রবার, সপ্তাহের এই পাঁচদিন শারমিনকে অফিসে যেতে হয়। শুধু শনি আর রবি এই দু’দিন সাপ্তাহিক ছুটি। শনিবার সকালটা রান্না, লন্ড্রি করা, ঘর গোছানো ইত্যাদি কাজেই চলে যায়। শনিবার বিকেল আর রবিবারে যতটুকু সম্ভব সফিককে নিয়ে সে ঘুরতে যায় বাইরে। সফিক বেচারা একা একা গৃহবন্দির মতো অবস্থা। শুধু টিভি দেখে আর কত সময় কাটে। রহমান সাহেবও কাজ থেকে ফিরে তার স্টাডি রুমেই থাকেন বেশিরভাগ সময় আর জেসমিন কখন বাসায় থাকে কখন থাকে না, সেটা বোঝার কোনোই উপায় নেই। একই বাসার মধ্যে এতোগুলো মানুষ থাকছে অথচ কেমন যেন ডিসকানেক্টেড—কারো সঙ্গে কারো কোনো সংযোগ নেই। এই কী আমেরিকার জীবন? এই জীবনের জন্য বাংলাদেশে থেকে সফিক এতো হা-হুতাশ করেছে? শুধু সফিক কেন, বাংলাদেশের প্রতিটা প্রাপ্ত বয়স্ক মানুষই হা-হুতাশ করে। যেন জীবনে বেঁচে থাকতে একবার আমেরিকা যেতে না পারলে জীবনের বেঁচে থাকার কোনো মানে নেই। বেশিরভাগ প্রবাসী কিংবা অভিবাসী তাদের প্রবাস জীবন নিয়ে সুখী নয়, নানান মানসিক সমস্যায় ভোগে এবং জীবনের একটা বিশাল এবং লম্বা সময় পর্যন্ত নানান বর্ণ বৈষম্যে এবং চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। বাইরে থেকে প্রবাস জীবন যতটাই রঙিন দেখা যাক না কেন, বাস্তবতা হচ্ছে—কেবলই ধূসর! এসব ভাবতে ভাবতে সফিকের মনটা বিষণ্ণতায় ভরে ওঠে।
শারমিন বুঝতে পারে সফিকের মনের অবস্থা। তাই তো কাজ থেকে ফিরেই কোথাও যেতে হলে সফিককে সে সাথে করে নিয়ে যায়। ছুটির দিনে ঘুরতে বের হয়। নিয়ে যায় কোথাও না কোথাও। তারই ধারাবাহিকতায় সফিককে নিয়ে শারমিন আজকে এসেছে ডালাসের বিখ্যাত বোটানিক গার্ডেনে। এখানে চারিদিকে সবুজের সমারোহ। নাম না জানা হরেক রকমের ফুলের বাগান। বাগানের ভিতর শত শত ফুলের বিছানা। মাঝে দিয়ে পর্যটক এবং ফুলপ্রেমীদের জন্য হাঁটার পথ। পথের দু’পাশে সারি বাঁধা টিউলিপ বাগান। তারমাঝে নানা প্রজাতির রংবেরংয়ের শত শত টিউলিপ সারি সারি ফুটে রয়েছে। কোনোটি টকটকে লাল, কোনোটি কমলা, আবার কোনো বাগান বেগুনি, ফিরোজা, মেরুন, হলুদ কিংবা সাদা টিউলিপের। পথের পাশে যেন নানা প্রিন্টের গালিচা বিছানো। এক এক সারি এক এক রঙের টিউলিপে সাজানো, বিশাল মাঠ জুড়ে টিউলিপ অপরূপ সৌন্দর্য বিলিয়েই চলেছে। এত সুন্দরভাবে বাগানের চারদিকটা সাজানো হয়েছে, সত্যিই অকল্পনীয়। বাতাসে ফুটন্ত ফুলের সুবাস ছড়িয়ে যাচ্ছে চারিদিকে।
শারমিনের হাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে মুগ্ধ নয়নে ঘুরে ঘুরে দেখছে সফিক। সফিকের কিছু ছবিও তুলে দিল শারমিন। দেশে সবাইকে পাঠাবে। বেলা একটু পড়ে আসতেই শারমিন আর সফিক বসল গার্ডেনের সবুজ ঘাসের মধ্যে। কার্পেটের মতো মোলায়েম ঘাসের মধ্যে বসে থাকতে বেশ লাগছে সফিকের। বেশ কিছুক্ষণ সময় কাঁটিয়ে বিভিন্ন কথার ফাঁকে একবার জেসমিনকে নিয়েও কিছু কথা হলো। জেসমিনের প্রসঙ্গ আসতেই সফিক খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আচ্ছা তোমরা জেসমিনকে কিছু বলো না কেন? ওতো দেখি খুব উড়নচণ্ডী হয়েছে।’
‘উড়নচণ্ডী মানে?’
‘অবাধ্য, উচ্ছৃঙ্খল! এই যে প্রায় প্রতিদিন রাতে বন্ধুদের সাথে বাইরে যাচ্ছে। অনেক রাত করে বাসায় ফিরছে। নিজের ইচ্ছে মতো চলছে। তোমাদের কারো কোনো কথা শুনে না—মানেও না। ও যে এই ফ্যামিলির একজন মানুষ সেটাই তো মনে হয় না। কেমন ছাড়া ছাড়া একটা ব্যাপার লক্ষ করছি সব সময়।’
শারমিন একটু সময় চুপ করে থেকে বলল, ‘জেসমিনের ১৮ বছর পার হয়েছে। ওকে শাসন করার অধিকার আর আমাদের নেই। আর শাসন করলেই বা ও শুনবে কেনো বলো? দেশটা যে আমেরিকা!’ শারমিনের কণ্ঠে এক ধরনের হতাশা আর অসহায়ত্ব ফুটে উঠল।
’দেশটা আমেরিকা হয়েছে তো কী হয়েছে? আর ১৮ বছর হয়েছে বলেই কী যা খুশি তাই করবে নাকি? আমরা এ বয়সটা পার হয়ে আসি নি?’
শারমিন চুপ করে রইল।
‘সেদিন আবার দেখলাম একটা নিগ্রো ছেলের সাথে। ওই নিগ্রোটাও কি ওর ফ্রেন্ড নাকি?’
সফিকের কথার ধরণে শারমিন হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই সে বলল, ‘সফিক, এখানে কালোদের নিগ্রো কিংবা নিগার বলাটা শোভনীয় নয়—ভীষণ অফেনসিভ। মারাত্মক অপরাধ। অনেকটা গালির পর্যায়ে পরে। ভুলেও আর কখনো বলবে না—বলবে আফ্রিকান আমেরিকান কিংবা ব্ল্যাক। শুধুই কালো।’ পশ্চিমে কালো অভিবাসীদের নিগ্রো কিংবা নিগার না বলে ‘আফ্রিকান আমেরিকান’ বলে সম্বোধন করা হয়। ঠিক তেমনি সমকামীদের ‘ফ্যাগ’ বা ‘হোমো’ না বলে ‘গে’ বা ‘লেসবিয়ান’ বলে। শারমিন সুন্দর করে বিষয়টি বুঝিয়ে বলল সফিককে।
সফিক অবাক চোখে তাকাল শারমিনের দিকে। শারমিনের কথা সে কি কিছু বুঝল কিনা ঠিক বোঝা গেল না। সে বলল, ‘তবে যাই বলো না কেনো, এভাবে ছেলে বন্ধুদের সাথে অবাধ মেলা মেশাটা ওর কিন্তু একেবারেই ঠিক হচ্ছে না। একটা বাঙালি মেয়ে হয়ে…’
সফিকের কথা শেষ হবার আগেই শারমিন বলল, ‘ও তো বাঙালি মেয়ে নয় সফিক। জেসমিন বাঙালি বাবার আমেরিকান মেয়ে। বাঙালি ঘরে জন্ম হলেই তাকে বাঙালি হতে হবে, এ থিওরি তো এ দেশে চলে না।’
শারমিনের কথা সফিককে সন্তুষ্ট করতে পারল না। কিন্তু সে আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। বুঝতে পারল না কী বলবে।
শারমিন আবার বলল, ‘তাছাড়া ওকে কিছু বলা হয় না তা তো নয়। বলতে গিয়েই তো বাবার একবার স্ট্রোক করল।’
সফিক অবাক হয়ে তাকাল। দেশ থেকেই সে শুনে আসছিল তার শ্বশুরের একবার হার্ট অ্যাটাক হয়েছিল। এখানে আসার পর শারমিনও মাঝে মাঝে বলেছে। কিন্তু তার আসল কারণ কখনোই তাকে বলা হয় নি। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সফিক আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘কী হয়েছিল আমাকে বলবে?’
শারমিনের এখনো মনে আছে সেদিনটার কথা। একদিন রহমান সাহেব তার দোতলার স্টাডি রুম থেকে হঠাৎ বাইরে তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন আর অ্যালেক্সকে। তারা সম্ভবত ইউনিভার্সিটি থেকে ফিরে এসেছে। অ্যালেক্সের একটা হলুদ রঙের জিপ আছে, সেটাতে করে জেসমিনকে সে বেশিরভাগ সময় নামিয়ে দিয়ে যায়। উইকএন্ডের আউটিং-এও সে নিয়ে যায়। তো ঐদিন পড়ন্ত বিকেলে রহমান সাহেব দেখলেন গাড়ি থেকে নেমে অ্যালেক্স জেসমিনের কোমর ধরে আলিংগন করছে। দূর থেকে ঠিক বোঝা যাচ্ছে না, তবে মনে হতেই পারে তারা একে অপরকে গভীরভাবে চুম্বন করছে। এটা দেখে রহমান সাহেবের মাথা চক্কর দিয়ে উঠল। তিনি নিজেকে স্থির রাখতে পারলেন না। উত্তেজিত হয়ে নেমে এলেন ওপর থেকে। দরজা খুলে চিৎকার দিয়ে বললেন, ‘Hey you, get off your hands of her. What do you think you are doing? How dare you touch my daughter?’ বলতে বলতে তিনি এগিয়ে গেলেন জেসমিন আর অ্যালেক্সের দিকে। কাছাকাছি গিয়ে রাগান্বিত ও ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বললেন, ‘জেসমিন ভেতরে যাও।’
জেসমিনের মধ্যে ভেতরে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সে আরো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রহমান সাহেব উচ্চস্বরে বললেন, ‘I said go inside. Now.’ এবার তিনি এগিয়ে গেলেন অ্যালেক্সের আরো কাছে। তার মুখের উপর আঙ্গুল তুলে বললেন, ‘Get out of my face, right now. Out. You never ever come to my house. And I don’t want to see your face, ever again.’
বিব্রত অ্যালেক্স অপ্রস্তুতভাবে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। সে কী করবে ঠিক বুঝতে পারছে না। এমন অপমান সে হয়তো তার এই বিশ একুশ বছরের জীবনে কখনোই হয় নি। পুরো বিষয়টি নিয়ে ভীষণ লজ্জায় পড়ে গেল সে এবং ভয়ও পেল বেশ। আর এক মুহূর্ত দেরি না করে তার গাড়িতে উঠে বসল অ্যালেক্স।
জেসমিন ঘুরে তার বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে আহত কণ্ঠে বলল, ‘No dad, no. You can’t do that to him. What’s wrong with you?’
অ্যালেক্স গাড়ি স্টার্ট দিতেই জেসমিন তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। অনুনয়ের স্বরে বলল, ‘Alex, I’m sorry. Please don’t listen to him. Don’t go like this.’
কিন্তু জেসমিনের কথায় কর্ণপাত না করে অ্যালেক্স দ্রুত গাড়ি নিয়ে চলে গেল বাসার সামনে থেকে।
জেসমিন আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অ্যালেক্সের চলে যাওয়ার দিকে কয়েক মুহূর্ত। তারপর হঠাৎই ঘুরে দাঁড়াল রহমান সাহেবের মুখের দিকে। উত্তেজিত কণ্ঠে চিৎকার করে উঠল, ‘Dad, he is my friend. You can’t talk to him like that. You just can’t walk up and assault someone.
জেসমিনের কথার ভঙ্গিতে রহমান সাহেব বেশ অবাক হলেন। এতটা সাহস আর স্পর্ধা এ মেয়ে পেল কোথায়? জেসমিন গলার স্বর নিচু না করেই আবার বলল, ‘You have no right of doing this. How dare you?’
এ পর্যায়ে রহমান সাহেব নিজেকে আর সংযত রাখতে পারলেন না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে অধিকতর উচ্চস্বরে বললেন, ‘And how dare you’re talking to me like that?’ বলেই এক পা এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিলেন জেসমিনের গালে।
ঘটনার আকস্মিকতায় জেসমিন তথমত খেয়ে গেল। চোখ বড় করে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল। তার উনিশ বছরের জীবনে এই প্রথম তার গায়ে কেউ হাত তুলল। জেসমিন হাত দিয়ে তার মুখ চেপে ধরল। মুহূর্তেই তার চোখ ভরে গেল অভিমানের কান্নায়। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার বাবার মুখের দিকে।
রহমান সাহেব সহসাই বুঝতে পারলেন তিনি কী করেছেন। তার এত আদরের ছোট মেয়ে, যাকে কোলে পিঠে করে এত বড় করেছে আর সেই কিনা আজ তার গায়ে এভাবে হাত তুলল। তিনি চোখ নামিয়ে ফেললেন। তার হাতটা কেমন কেঁপে উঠছে।
জেসমিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দৌড়ে ঢুকে গেল ঘরের মধ্যে।
হঠাৎই রহমান সাহেবের চারিদিক অন্ধকার হয়ে এল। বুকের বাম পাশে তীব্র ব্যথা অনুভূত হতে লাগল। চাপ চাপ ব্যথা। এই ব্যথা এতটাই তীব্র যে, মনে হলো হাতির পা বুকে চাপ দিলে যেমনটা হয় ঠিক তেমনি। তার শ্বাস কষ্ট শুরু হয়ে গেল এবং এক পর্যায়ে তিনি পার্কিং লটের ফ্লোরে পড়ে গেলেন।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-৩)

দীর্ঘসময় পার করে মেয়েটি এবার ছেলেটির বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে এলোমেলো পায়ে হেটে এলো এই বাড়িটির সদর দরজার দিকে। মেয়েটি দরজার কাছাকাছি আসতেই সফিকের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল যখন সে বুঝতে পারল ছায়া মানব-মানবী দুজন আর কেউ নয়—জেসমিন আর তার বন্ধু অ্যালেক্স! সফিক সরে যেতে চাইল কিন্তু পারল না। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রহমান সাহেব দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দেখলেন জেসমিন ওপরে উঠে আসছে সন্তর্পণে। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি ফিরে গেলেন তার রুমে। স্থির হয়ে বসলেন তার রিভলভিং চেয়ারে। প্রতি সপ্তাহের শুক্র আর শনিবার রাত তার জন্য অসহ্য রকমের একটি রাত হয়ে দেখা দেয়। তিনি সারারাত প্রায় জেগেই কাটান জেসমিনের ফিরে আসা পর্যন্ত। জেসমিন ফিরে এসে তার রুমে না ঢোকা পর্যন্ত পায়চারী করতে থাকেন। তারপর অবসাদগ্রস্ত শরীরটা এলিয়ে দেন বিছানায়। রাত জেগে থাকার শরীর তার নয়। এর আগে একবার একটা স্ট্রোক করেছে, সেটা ঐ জেসমিনের কারণেই। তবুও মেয়েটার চিন্তায় তার ঘুম আসে না। নির্ঘুম তাকিয়ে থাকেন যতক্ষণ মেয়েটা বাসায় ফিরে না আসে।
জেসমিন বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে উঠে এলো ওপরে। রহমান সাহেবের রুম পার হয়ে যেতে হয় তার রুমে। ওপরে উঠে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল সে—তার বাবার রুমের খোলা দরজার সামনে। কী মনে করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ভেতরে। রহমান সাহেবের চোখের দিকে চোখ পড়ে গেল তার। জবুথবু বসে রয়েছেন উদাসভাবে মানুষটি। তার নির্লিপ্ত দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না জেসমিন। চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে দ্রুত চলে গেল তার রুমে।

মায়াবী এক বিকেলে ডালাসের বিখ্যাত হোয়াইট রক লেকের ধারে সফিককে নিয়ে বেড়াতে এলো শারমিন। দুজন হাত ধরাধরি করে হাঁটছে লেকের পাড় ঘেঁসে। কিছুক্ষণ হেটে তারা এসে দাঁড়াল কাঠের তৈরি একটা পাটাতনের উপরে। সফিক মুগ্ধ হয়ে দেখছে চারিদিক। কী সুন্দর প্রকৃতি। পাটাতনের ওপর থেকে কিছু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে নিচের পানিতে ভেসে বেড়ানো একঝাক হাসের দিকে রুটি আর বিস্কিটের টুকরা ফেলে দিচ্ছে। পানিতে খাবার পাওয়া মাত্রই হাসেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাই দেখে বাচ্চাগুলোর খুশি আর ধরে না। তারা তুমুল আনন্দে রুটির টুকরা ফেলে যাচ্ছে। সফিক একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল সেদিকে। শারমিনও কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল তারপর সফিককে নিয়ে বসল লেকের পাড় সংলগ্ন একটা বেঞ্চে। ফ্লাস্ক থেকে ফোম কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল সফিকের দিকে। সে নিজেও এক কাপ নিল। সফিক চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বাহ, চা-টা তো মজার হয়েছে।’
সফিক এখন সবকিছুই ভালো লাগার স্টেজে আছে। যা দেখছে, ভালো লাগছে। যা খাচ্ছে, ভালো লাগছে। সব কিছুর মধ্যেই এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে সে। আমেরিকায় প্রথম প্রথম আসার পরে সবারই এরকম হয়। তারপর এক সময় রূঢ় বাস্তবতার সমীকরণ মেলাতে মেলাতে সব আনন্দ ফিকে হতে শুরু করে।
সফিকের সবকিছু ভালোলাগার বিষয়টা শারমিনও লক্ষ করেছে। এই চা-টা হুট করেই ভালো লাগার কথা না। তবুও সফিক বলল, চা-টা মজা হয়েছে। শারমিন মুচকি হেসে বলল, ‘তাই?’
‘হ্যাঁ। তবে, একটু অবশ্য ঝাল ঝাল লাগছে।’
‘ঝাল লাগছে কারণ এটা হলো স্পাইস টি। মশলা চা। তাই একটু ঝাল লাগছে এবং সেটাই এই চায়ের স্পেশালটি। কয়েকটা ছিপ নিলেই দেখবে ভালো লাগছে।’
সফিক চায়ের কাপে আবার চুমুক দিয়ে বলল, ‘খারাপ লাগছে না তো!’
শারমিন এক ঝলক সফিকের মুখের দিকে তাকাল। একটু হেসে নিজের কাপে ছোট করে চুমুক দিয়ে তাকাল লেকের দিকে। এরপর খানিকক্ষণ নীরবতা। চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চলল দুজনে—আনমনে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সফিক অসহিষ্ণু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা চলে গেছেন—আর এমন একটা খবর তুমি আমাকে জানাও নি। তোমরা এতো সহজে সব কিছু মেনে নিতে পারো?’
সফিকের হঠাৎ করে এমন প্রশ্নের জবাবে শারমিন প্রথমে কিছু বলল না—যেভাবে ছিল সেভাবেই তাকিয়ে রইল লেকের দিকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজেকে তৈরি করে নিল। সে জানে সফিক কোনো না কোনো সময় ঠিকই জানতে চাইবে। তাছাড়া জানার সে অধিকারও তার আছে। শারমিন নিজে থেকেই বলত কিন্তু বুঝতে পারছিল না কীভাবে বলবে। ভালোই হলো সে নিজেই জানতে চেয়েছে।
সফিক চায়ের কাপে পরপর দুবার চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখল। তারপর জিহ্বা দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে রইল শারমিনের মুখের দিকে।
খানিকটা ইতস্তত হয়ে শারমিন বলল, ‘মেনে না নিয়ে কী করার আছে বলো? বাবার সঙ্গে মায়ের বনিবনা হচ্ছিল না অনেকদিন থেকেই। বছরের পর বছর দু’জন মানুষ একই ছাদের নিচে থাকছে অথচ কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। একে অপরকে সহ্য করতে পারছে না। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাহীন কোন সম্পর্ক কি বেশীদিন টিকে বলো?’
সফিক হ্যাঁ বা না কিছু বলল না। চুপ করে রইল।
‘তাছাড়া, তেলে আর পানিতে কখনো মিশে না…’ এটুকু বলে শারমিন চুপ করে রইল।
সফিক বলল, ‘তেলে আর পানিতে মিশে না এ কথাটা ঠিক না। মিশে, তবে অনেক ঝাকাঝাকি করতে হবে।’
‘তা হয়তো হয়, তবে বাবা বেশি ঝাকাঝাকি পছন্দ করেন না।’
আবার কিছুক্ষণের নীরবতা। সফিক চায়ের কাপটা একবার মুখের কাছে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখল। কাপ খালি। শারমিন ফ্লাস্ক থেকে আরেকটু চা ঢেলে দিল সফিকের কাপে।
‘উনি এখন কোথায়?’
শারমিন ভ্রূ কুঁচকে মাথা তুলে তাকাল।
‘মানে আম্মা এখন কোথায়?’
‘তা জেনে তুমি কী করবে সফিক? হাতে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনবে?’ শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে জবাব দিল এবং পরক্ষণেই বুঝতে পারল, এভাবে জবাব দেয়াটা তার ঠিক হয় নি।
‘না না তা কেনো হবে? এমনি জানতে চাচ্ছিলাম আর কি। After all, my own Mother-In-Law.’
শারমিন ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে তাকাল সামনের দিকে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘আছে হয়ত কোথাও। কোথায় আছে সেটা জানার এখন আর আমাদের কোন ইন্টারেস্ট নেই।’
সফিক আর কোনো কথা বাড়াল না। চিন্তিত ভঙ্গিতে বাচ্চাদের হাসের রুটি খাওয়ানো দেখতে থাকল।
রহমান সাহেব তার পড়ার ঘরে একটা বই খুলে বসে রয়েছেন। শুক্রবার রাত। ডিনার শেষ করে তার বই পড়ার অভ্যাস। বিশেষ করে শুক্রবার আর শনিবার রাতে তার এই রুটিন। তাকে রাত জেগে থাকতে হয়। তার ছোট মেয়ে জেসমিন সপ্তাহের এই দু’রাত দেরি করে ফিরে। জেসমিনের বয়স এখন উনিশ। আঠারো হয়ে গেলেই এখানে সবাই প্রাপ্ত-বয়স্ক। তারা তখন স্বাধীন। নিজেদের মতো চলাফেরা করার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে যায়। তাদের তখন কিছু বলা যায় না। বাবা মায়েরা উৎকণ্ঠিত হওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু করতে পারে না। রহমান সাহেব উৎকণ্ঠা নিয়েই রাত কাঁটাতে থাকেন।
শারমিন এক গ্লাস পানি আর কিছু ওষুধ হাতে করে নিয়ে এসে ঢুকল রহমান সাহেবের ঘরে। শারমিন ঢুকতেই রহমান সাহেব বই নামিয়ে রেখে মেয়ের হাত থেকে ওষুধগুলো নিয়ে খেয়ে নিলেন।
‘বাবা, রাত অনেক হয়েছে, ঘুমাতে যাবে না?’ রহমান সাহেবের হাত থেকে পানির গ্লাসটা ফিরিয়ে নিয়ে শারমিন বলল।’
‘যাবো। ইন্টারেস্টিং একটা আর্টিক্যাল পড়ছিলাম। এটা শেষ করেই যাবো। এত তাড়া কিসের? কাল তো শনিবার, কাজে তো আর যেতে হবে না।’
‘কাজে যেতে হবে না বলেই কি রাত জেগে থাকতে হবে নাকি?’
রহমান সাহেব কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘সফিক কী করছে?’
‘কী আর করবে। সারাদিন তো ঐ একটাই কাজ—ইংরেজি শেখা। এখন খুব মনোযোগ দিয়ে মুভি দেখছে। ওর ধারণা মুভি দেখলেই ইংরেজি শেখাটা সহজ হবে। এই বাসার দুটো জিনিষ তার খুব পছন্দ। তোমার এই লাইব্রেরীটা আর আমার এন্টারটেইনমেন্ট রুমটা।’
‘তাই নাকি?’
‘হুম।’
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। রহমান সাহেব জানেন শারমিন এখন কী বলবে। এই একই কথা প্রতি শুক্রবার আর শনিবার রাতেই ওষুধ খাওয়াতে এসে একবার করে বলে।
শারমিন বলল, ‘জেসমিন এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। কেন শুধু শুধু দুচিন্তা করছো বাবা? তাছাড়া আজ শুক্রবার, ওকি আর এতো তাড়াতাড়ি ফিরবে? তুমি অযথা রাত জেগে শরীর খারাপ করো না।’
‘হ্যাঁ, মা জানি। তুই যা—আমি আর একটু পরেই শুয়ে পড়বো।’
শারমিন আর কথা না বাড়িয়ে বের হয়ে এলো। রহমান সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইলেন শারমিনের চলে যাওয়ার দিকে।
বরাবরের মতোই ভোর রাতে পার্টি শেষ করে বাসায় ফিরে এলো জেসমিন। পা টিপে টিপে ওপরে উঠে দ্রুত ঢুকে পড়ল তার রুমে।
শেষ রাতের দিকে রহমান সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে তিনি বিছানায় উঠে বসলেন। পাশের টেবিল রাখা পানির গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে পানি খেয়ে বসে রইলেন স্থির হয়ে। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন জেসমিনের রুমের দিকে। তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন গায়ের কাপড় না বদলিয়েই ঘুমিয়ে আছে কাচু মাচু হয়ে। কেমন অঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি। ওর কি শীত লাগছে? রহমান সাহেব ধীর পায়ে জেসমিনের বিছানার কাছে এলেন। পায়ের কাছ থেকে ব্লাঙ্কেটটি টেনে আলতো করে ওর গায়ের ওপর তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মাথায় একবার হাত রাখলেন মেয়েটির। তারপর যেভাবে এসেছিলেন তেমনি ধীর পায়ে বের হয়ে গেলেন।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-২)

রাতে খাবার টেবিলে বসে সফিকের ভ্রমণ সংক্রান্ত দু’একটি কথা বলে চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়লেন রহমান সাহেব। তিনি এমনিতেই কম কথার মানুষ। প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা বার্তা খুব একটা বলেন না। টুকটাক যা কথা হয়, তা ঐ বড় মেয়ে শারমিনের সঙ্গেই।
সফিক রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করল, ‘আব্বা, আপনার শরীরটা কি এখন একটু ভালো?’
‘শরীর ভালই আছে। তবে মনের অবস্থা ভালো না। আমি ভীষণ ক্লান্ত। এখানে আর ভালো লাগে না। অনেক বছর তো হলো।’
রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে শারমিন বলল, ‘তোমার শরীর ভাল নেই বাবা। একবার একটা স্ট্রোক করেছে। কতবার বললাম, কিছুদিন রেস্ট নিয়ে তারপর কাজে ফিরো। তা না…’
‘চাইলেই কি আর রেস্ট নেয়া যায়রে মা। দেশটা যে আমেরিকা। কাজ নেই তো, ভাত নেই। কাজের বিনিময়ে খাদ্য। ফুড ফর ওয়ার্ক। হা হা হা।’
শারমিন কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘কেনো, আমার কাজে বুঝি ভাত আসবে না?’
রহমান সাহেব হাসলেন, কোনো উত্তর দিলেন না।
সফিক বলল, ‘না না, এ শরীরে আপনার আর কষ্ট করে কাজে যেতে হবে না। এখন তো আমি চলেই এসেছি। সব দায়িত্ব আমার। আপনি কিচ্ছু ভাববেন না।’
রহমান সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবেক্ষণ। সবে তো মাত্র এলে। সবকিছু আগে দেখো। দেশটাকে আগে জানো।’
সফিক বিজ্ঞের মতো আবার বলল, ‘আমেরিকা সম্পর্কে আর কি জানবো? এ দেশ সম্পর্কে এখন রাস্তার টোকাইরাও ভাল জানে। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের নাম হয়তো অনেকে জানে না, কিন্তু ট্রাম্পের নাম ঠিকই জানে। হা হা হা…’
এরপর আর তেমন কোনো কথা হলো না। সফিক কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাল। একবার তাকাল রান্নাঘরের দিকে তারপর তাকাল ওপর তলার দিকে। তারমধ্যে কিঞ্চিত অস্থিরতা লক্ষ করা গেল। কিছু একটা ব্যাপার তাকে ভাবাচ্ছে। অনেকক্ষণ হলো সে এসেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার শাশুড়ির সঙ্গে তার দেখা হয় নি। সে কি বাসায় নেই, বাইরে অফিসে না অন্য কোনো কাজে তাও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সেও মুখ ফোটে জিজ্ঞেস করে নি। অবশেষে সে জিজ্ঞেস করেই বসল, ‘ইয়ে, আম্মা কোথায়? তাকে দেখছি না। শরীর-টরীর খারাপ নাকি?
সফিকের এমন হঠাৎ প্রশ্নে রহমান সাহেব অপ্রস্তুতভাবে তাকালেন শারমিনের দিকে। শারমিনও ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাল তার বাবার দিকে। তারপর সফিকের দিকে ঘুরে বলল, ‘রান্না কেমন হয়েছে? এই প্রথম তুমি আমার রান্না খাচ্ছো। কিছু বললে না যে?’ শারমিন কথা ঘুরিয়ে নেবার চেষ্টা করছে সেটা স্পষ্ট বোঝা গেলেও সফিক আর কিছু বলল না। সে উত্তর দিল, ‘রান্না অতি চমৎকার হয়েছে। কিন্তু কেমন যেন একটা গন্ধ সবকিছুতেই।’
‘গন্ধ লাগছে?’
‘না মানে কেমন অন্যরকম যেন। ঠিক স্বাদ পাচ্ছি না।’
‘অস্বাভাবিক কিছু না। ধুলা-বালি, ঘাম আর নর্দমার গন্ধ থেকে এসে এখানকার গন্ধ তো একটু অন্যরকম লাগবেই। কয়েকদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
‘তা যা বলেছ। হা হা হা।’ সফিক বোকার মতো হেসে সায় দিল।

প্রায় মধ্য রাত।
শারমিনের রুমে মৃদু আলো জ্বলছে। সফিককে নিয়ে শারমিন তার রুমে এসে ঢুকল। বিছানার পাশের টেবিলে হরেক রকম নাম-না-জানা ফুলের মিশ্রণে তৈরি বেশ বড় একটি ফুলের তোড়া ফুলদানিতে সাজানো। সুন্দর পরিপাটি বিছানার ওপরে ছড়িয়ে আছে কিছু গোলাপের পাপড়ি। ঘরময় ফুলের মিষ্টি গন্ধে ম ম করছে। নাসারন্ধ্রে ঘ্রাণটা পৌঁছুতেই কেমন যেন পুরো শরীরে শিহরণ খেলে গেলো সফিকের। পরিবেশটা কেমন স্বর্গীয় অনুভূতিতে অন্য এক রঙ ধারণ করেছে–সেই রঙের নেই কোনো নাম, কল্পনাতেই যার অস্তিত্ব। স্যাক্সোফোনের একটা রোমান্টিক সুর ভাসছে মৃদু তালে। সফিক অবাক বিস্ময়ে পুরো বিষয়টা লক্ষ করে শারমিনের দিকে ঘুরে বলল, ‘তুমি তো দেখি বাসর ঘর বানিয়ে রেখেছো?’
শারমিন মৃদু হেসে বলল, ‘বিয়ের পর তোমার সাথে দেশে থেকেছি মাত্র তিন সপ্তাহ। তারপর দু’বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। আজকের রাত তাই আমার কাছে বাসর রাতের মতোই।’
‘তা যা বলেছ। সত্যি আমেরিকার এই ভিসা দেয়ার সিস্টেমটা খুবই খারাপ। শরীর এবং মনের উপর ভীষণ চাপ পড়ে। বিয়ের পরে স্বামী স্ত্রীকে কেনো এতদিন অপেক্ষা করতে হবে?’
‘ঠিক বলেছ। সিস্টেমটা খুবই খারাপ।’
সফিক কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই শারমিন তাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার ওপরে চড়ে বসল। ঘটনার আকস্মিকতায় সফিক হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই সে তার দু’হাত প্রসারিত করে বুকে টেনে নিল তার প্রাণ প্রিয় স্ত্রীকে। সফিক আর শারমিন, দুটি মানুষ এই প্রথম অনুভব করল, জীবনে কত গান আছে, কত ফুল আছে, কত রূপ আছে, কত গন্ধ আছে। শারমিনের মুখে মিষ্টি হাসি। কোনো রকম ভূমিকা না করে সফিকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করল সে। মুহূর্তে ডুবে গেল একে অন্যের মাঝে—এক অতল গহ্বরের শূন্যতার ভেতর।
ডালাসের উত্তরে অ্যাডিসন* নামক শহরের একটি আপস্কেল রেস্টুরেন্টে উদ্দাম মিউজিকের সাথে তালে তাল মিলিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে উচ্ছল বেশ কিছু তরুণ তরুণী। সেই দলে জেসমিনকেও দেখা যাচ্ছে সাথে অ্যালেক্স সহ আরো বেশ কিছু আমেরিকান এবং মেক্সিকান বন্ধু।
*অ্যাডিসনকে বলা হয়ে থাকে ‘দি রেস্টুরেন্ট ক্যাপিটাল অফ টেক্সাস’, এখানে দুইশত’র উপরে রেস্টুরেন্ট আছে। মাত্র ৫ বর্গ মাইল জায়গা নিয়ে ছোট্ট এই শহরটিতে প্রায় ১৬,০০০ মানুষের বসবাস। তবে নাইট লাইফ এবং বিভিন্ন ধরনের রেস্টুরেন্টের কারণেই এই মিউনিসিপালিটি শহরের চাহিদা ডালাসবাসীদের কাছে অনন্য। তাছাড়া রয়েছে পার্ক এবং রিক্রিয়েশন সেন্টার। ‘ফোর্থ অফ জুলাই’তে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এই শহরের যে ফায়ারওয়ার্কস হয় তা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও পর্যটকরা এসে থাকে।
আমরা ফিরে যাই গল্পে। জেসমিন কিছুক্ষণ পর পর উচ্চ স্বরে হেসে উঠছে। কয়েকজন ছেলে চেষ্টা করছে নাচের তালে তালে জেসমিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার কিন্তু অ্যালেক্স তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ রাখছে সেদিকে। এক পর্যায়ে সে জেসমিনের একটা হাত ধরে অন্য হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে মিউজিকের সাথে তাল মিলিয়ে নেচে চলল।
সফিকের চোখে ঘুম নেই। এদিকে প্রায় ভোর হতে চলেছে। অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছে না। রাতের খাবার পর পরেই ঘুমিয়ে পরেছিল একবার—অনেক চেষ্টা করেও বসে থাকতে পারছিল না। এখন তার খেসারত দিচ্ছে। তার দু’চোখে ঘুমের রেশ মাত্র নেই। শারমিন ঘুমাচ্ছে তার পাশে। একবার ইচ্ছে হলো ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিতে—পর মুহূর্তেই ভাবল থাক। সে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল মেয়েটির মুখের দিকে। অনেকক্ষণ স্পষ্ট চোখে তাকে দেখল, তার আকর্ষণীয় শরীর, রূপ, ভঙ্গিমা, যাবতীয় একাকার হয়ে সফিকের মাথা এলোমেলো করে দিল। সে এক হাত শারমিনের শরীরের ওপর দিয়ে টেনে আনল নিজের কাছে।
অস্বস্তিতে শারমিনের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে চোখ খুলে দেখল সফিক তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখে দুষ্ট হাসি। শারমিন ঘাড় ঘুরিয়ে সাইড টেবিলে রাখা এলার্ম ঘড়িতে সময় দেখল—৪টা বেজে ২০মিনিট। ঘুরে তাকাল সফিকের দিকে। প্রশ্ন বোধক চিহ্ন দিয়ে ভ্রূ নাচাল। সফিক হাসল, কিন্তু কিছু বলল না।
শারমিন ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘ঘুম আসছে না, না? দিন রাতের পার্থক্য। কিন্তু আমাকে তো ঘুমাতে হবে, সকালেই কাজ।’
‘এতদিন পরে আমি এলাম, আরেকটা দিন ছুটি নিতে পারলে না?’
‘পারতাম, তবে ইচ্ছে করে নেই নি। তুমি তো আর চলে যাচ্ছো না। বছরে ছুটি পাই মাত্র দশ দিন। বাবার স্ট্রোকের সময় চার দিন ইউজ করেছি। আজ একদিন, পাঁচদিন। বাকী পাঁচদিন রেখেছি তোমাকে নিয়ে ফ্লোরিডা যাবো বলে।’
‘মাই গড, একেবারে গুনে গুনে ছুটির ব্যবহার?’
‘এটা বাংলাদেশ নয় মিস্টার, আমেরিকা। We don’t have that kind of luxury here. উপায় কী বলো?
সফিক কী বলবে ভেবে পেল না। তাকিয়েই রইল শারমিনের মুখের দিকে।
শারমিন আবার বলল, ‘তুমি এক কাজ করো। লিভিং রুমে গিয়ে টিভি দেখো। ঘুম পেলে চলে এসো। দেখো, আবার কিন্তু আমার ঘুম ভাঙ্গানোর চেষ্টা করো না।’
‘সে গ্যারান্টি অবশ্য দিতে পারছি না।’ সফিকের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
শারমিন চোখ ঘুরিয়ে তাকাল সফিকের দিকে।
সফিক হেসে ফেলল, ‘না না ভাঙ্গাবো না। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারো।’ বলেই রুম থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো সে।
‘শোন, নিচের টেবিলে খাবার রাখা আছে। খিদে পেলে খেয়ে নিও। গুড নাইট।’
‘গুড নাইট।’
লিভিং রুমের সোফায় বসে সফিক টিভি ছেড়ে দিল। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না কী দেখবে? কোন চ্যানেলে কী দেখাবে তাও তো তার জানা নেই। সে একটার পর একটা চ্যানেল বদলাতে থাকল। কিছুক্ষণ চ্যানেল বদলিয়ে সে স্থির হলো মুভি চ্যানেলে। একটা লাভ মেকিং সিন হচ্ছে। সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরে নারী-পুরুষের রতিক্রিয়া চলছে। সফিক স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল টিভি পর্দায়। কোথায় যেন একটা শব্দ হলো। সে দ্রুত চ্যানেলটি বদলিয়ে তাকাল এদিক-ওদিক। না কেউ নেই। সে আবার ফিরে এলো আগের চ্যানেলে। দৃশ্যটি নেই। সে আরো এক চ্যানেল পেছনে গেল, না নেই। আরো কয়েকবার চ্যানেল সামনে পেছনে করে ক্ষান্ত দিল।
টিভি দেখতে দেখতে হঠাৎ কেমন খিদে পেল সফিকের। রাতের খাবারের পর শারমিন তাকে কিচেনের কোথায় কী আছে দেখিয়ে দিয়েছে। সে উঠে গিয়ে কিচেন থেকে বিস্কিটের টিন নিয়ে এলো। কয়েকটি বিস্কিট খেয়ে এক গ্লাস পানি খেল সে। সময় কাটছে না একেবারেই। কিছু সময় পার করে সে এদিক ওদিক তাকাল। হঠাৎ লক্ষ করল লিভিং রুমের বড় জানালা দিয়ে গাড়ির আলো এসে পড়েছে। উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল সফিক। সামনের পার্কিং লটে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল এবং মুহূর্তেই থমকে গেল।
অন্ধকারে আবছা মত দুটি ছায়া যেন একে অপরের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। কেমন পরিচিত লাগছে ছায়া দুটিকে।
সফিক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না—এ সে কী দেখছে?

পরের পর্ব

আগের পর্ব