mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-৭)

রহমান সাহেবের দ্বিতীয়বার হার্ট অ্যাটাকের পরে তিনি অনেকটাই নিস্তেজ হয়ে পড়েছেন। শরীরটাও ভেঙ্গে পড়েছে। তিনি তার রুম থেকে খুব একটা বের হন না। অফিস থেকেও ছুটি নিয়েছেন। যতটা সম্ভব বিশ্রামেই আছেন তিনি। হার্ট অ্যাটাকের পরে এলোমেলো করে দেয় জীবনের অনেক কিছু। আকস্মিক ছন্দপতন ঘটে জীবনে। তাৎক্ষণিক চিকিৎসার পরও নানা জটিলতা ঘটে যায় পরবর্তী কয়েক দিন থেকে কয়েক মাস পর্যন্ত। অকস্মাৎ এ বিপদ কাটিয়ে ওঠার পর আবার অনেকেই কিন্তু স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যান। হার্ট অ্যাটাকের পরে সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করলে হার্টকে দুর্বলতার হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে নিয়মিত চিকিৎসা গ্রহণ জরুরি। শারমিন আর সফিকের অক্লান্ত চেষ্টায় রহমান সাহেব ধীরে ধীরে তার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসছেন।
জেসমিন বাসাতেই থাকে। তার আর ডরমিটরিতে যাওয়া হয় নি। সেদিনের পর থেকে তার মধ্যে বেশ স্থিরতা এসেছে। যথেষ্ট নমনীয়তা লক্ষ করা যায় তার চাল-চলন, বেশ ভূষায়। কলেজ থেকে ফিরেই বাবার সঙ্গে দেখা করে, টুকটাক কথাও বলে। যদিও এক ধরনের অপরাধবোধে সে ভোগে। শারমিন বেশ কিছুদিন কথা বলে নি জেসমিনের সঙ্গে। জেসমিনের সেদিনের ব্যবহারে সে যার পর নাই বিরক্ত এবং আহত হয়েছে।
সফিক ড্রাইভিং লাইসেন্স টেস্ট দিয়ে লাইসেন্স পেয়েছে। সে ভীষণ খুশি। এখন মাঝে মাঝে সে নিজেই গাড়ি চালিয়ে গ্রোসারী কিংবা প্রয়োজনীয় কেনাকাটা করে নিয়ে আসে। প্রথমদিকে ডলার খরচ করে কিছু কিনতে গেলে মনের ভেতর খচ করে উঠত। নিজের অজান্তেই কোনো কিছুর দাম দেখা মাত্র মনে মনে ৮০ দিয়ে গুণ করে মূষরে যেত সে। শারমিন ব্যাপারটা বুঝতে পেরে ওকে বকা দিয়েছে অনেক। এখন অবশ্য এতটা খারাপ লাগে না।
শারমিন তার পরিচিত এক বড় বাঙালি ভাইয়ের গ্যাস স্টেশন কাম কনভেনিয়েন্ট স্টোরে সফিককে একটা কাজ জোগার করে দিয়েছে। কাস্টমারদের সাথে অনর্গল ভুলভাল ইংরেজি বলে ইংরেজিতে কথা বলাটা আয়ত্তে আনার চেষ্টা করছে সে। দেশ থেকে একাউন্টিং এ মাস্টার্স করে এসেছে সে। তার ইচ্ছা তার লাইনের প্রফেশনাল কোনো জব করা, কিন্তু যতদিন তেমন কোনো কাজ না হচ্ছে, পার্ট টাইম একটা অড জব করা যেতেই পারে। তাতে দোষের কিছু নেই। সবাই করে। শারমিনের পরিচিত আরেক বাঙালি ভাবীর হাজব্যান্ডের একটা সিপিএ ফার্ম আছে। সফিকের সেখানে কাজের ব্যাপারে প্রাথমিক কথাও বলে রেখেছে সে।
সফিকের অবশ্য কোনো কিছুতেই কোনো অভিযোগ নেই। খুব অল্পতেই খুশি হওয়া তার স্বভাব। কোনোদিন আমেরিকা আসবে সেটা তার কল্পনাতেও ছিল না। তবুও কীভাবে শারমিনের সাথে তার বিয়েটা হয়ে গেল। বিয়ের সময় শারমিন দেশে যেয়ে ছিল মাত্র ৩ মাস। তারও আরো আড়াই বছর পর সে ইমিগ্রেশন ভিসা পেয়ে আমেরিকা আসে।
আমেরিকায় আসার পর থেকেই এই দেশটাকে তার খুব পছন্দ হয়েছে। পছন্দ হয়েছে এই দেশের মানুষগুলিকেও। আমেরিকার সাধারণ মানুষেরা গোমড়ামুখী নয়, তারা খুব হাসিখুশি। এ বিষয়টা সফিকের সবচেয়ে বেশি পছন্দের। সম্পূর্ণ অচেনা একজন মানুষের সাথেও এরা কথা বলে এমনভাবে যেন মনে হবে কত দিনের চেনা মানুষ। স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে এটি চমৎকার একটি দেশ। সারা পৃথিবী থেকে সবদেশের মানুষ এখানে এসে জমা হয়েছে। এই দেশে কেউই আর বিদেশি নয়।
বাসায় ফিরে হাত দিয়ে ডাল-ভাত-সবজি-মাছ-মাংস মাখিয়ে মাখিয়ে মজা করে খেতে পারছে—এই নিয়ে সফিকের আনন্দের সীমা নেই। তার ধারণা ছিল আমেরিকায় তার দিন কাটবে সালাদ আর ঠাণ্ডা স্যান্ডউইচ খেয়ে। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটে নি—এখানে এখন বাংলাদেশের সব কিছুই পাওয়া যায়। সব মিলিয়ে সফিকের দিনকাল বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছে বলা যায়।

রবিবার সকাল। অনেকক্ষণ থেকে রহমান সাহেবের বাসার দরজায় কলিং বেল বাজছে। বাসায় কেউ এলে সাধারণত শারমিনই দরজা খুলে দেয়। কিন্তু শারমিন আজ বাসায় নেই। সফিককে নিয়ে গেছে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখাতে। বিখ্যাত টিভি সিরিজ ‘ডালাস’ এর শুটিং হয়েছিল সেখানে। সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ সম্পর্কে ইতিপূর্বে ‘হৃদয়ে আগন্তুক’* নামে আমার আরেকটি গল্পে বিস্তারিত বর্ণিত হয়েছে। এখানে তাই আর বিস্তারিত বর্ণনায় গেলাম না।
ডোর বেল বেজেই চলেছে। রহমান সাহেব লিভিং রুমে বসে টিভি দেখছিলেন। তিনি একবার ওপরে তাকালেন। না, কেউ নেমে আসছে না। একসময় তিনি উঠে গিয়ে দরজা খুলে দিলেন। এবং অবাক হয়ে দেখলেন জেসমিনের বয়সী একটা মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে হাসি হাসি মুখ করে। রহমান সাহেব অবাক হলেন।
‘স্লামালিকুম আঙ্কেল।’
‘ওয়ালাইকুমসালাম। তুমি কে মা? তোমাকে তো চিনলাম না।’
‘আমি সুজানা। জেসমিনের বন্ধু। আপনি অবশ্য আমাকে আগে কখনও দেখেননি। ও আমাকে আসতে বলেছিল।’
‘ও আচ্ছা।’
‘আজ একসঙ্গে আমাদের বাইরে যাবার কথা, Is she home?’
‘ও তো উইকএন্ডে অনেক দেরী করে ঘুম থেকে উঠে।’ রহমান সাহেব হাত ঘড়িতে সময় দেখলেন—সকাল প্রায় ১১টা। তিনি আবার বললেন, ‘নিশ্চয়ই এখনো ঘুমচ্ছে। তুমি এসো, ভেতরে এসে বসো।’ তিনি সরে গিয়ে সুজানাকে ভেতরে ঢুকতে দিলেন।
‘তুমি কি বাংলাদেশ থেকে নতুন এসেছো? এত সুন্দর বাংলা বলো।’
‘না আঙ্কেল, আমার জন্ম এখানেই, বড় হয়েছি এখানেই। আর বাংলা বলা শিখেছি আমার বাবা মায়ের কাছে। অবশ্য আমার গ্র্যান্ড মা’র কারণে প্র্যাকটিসটা বেশী হয়েছে।’
‘Hi, Sue?’ হঠাৎ করেই ওপর থেকে জেসমিনের কণ্ঠ শোনা গেল। সুজানা এবং রহমান সাহেব দুজনেই তাকালেন ওপরের দিকে। একটা বিড়াল কোলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জেসমিন। গায়ে রাতের কাপড়। চুল এলোমেলো। ‘Come upstairs. I’ll be ready in a minute.’
‘আঙ্কেল আপনার সাথে পরে কথা হবে।’ সুজানা উঠে দাঁড়াল।
‘ঠিক আছে মা, তুমি মাঝে মাঝে এসো। তোমার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল।’

জেসমিনের ২০ তম জন্মদিন পালন করা হচ্ছে ঘটা করে। জেসমিনের সব বন্ধুরা এসেছে, সেই সাথে তাদের পরিবার। প্রতিবেশী জেসন আর তার বাবা-মাও এসেছেন। সুজানা এসেছে তার বাবা-মাকে নিয়ে। ডালাসের বিখ্যাত বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট থেকে মজাদার সব খাবার আনা হয়েছে। শারমিন, সফিক আর জেসন মিলে সুন্দর করে সাজিয়েছে সব কিছু। সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার মধ্যেই অতিথিরা সবাই চলে এসেছেন। ছোট ছোট গ্রুপে সবাই কথা বলছেন। সবার হাতেই অ্যাপিটাইজারের প্লেট। এধরনের অনুষ্ঠানগুলোতে সাধারণত সম-সাময়িক বিষয় নিয়েই সবাই গল্পগুজব করে থাকেন।
আজকের আলোচনার প্রধান বিষয়, কমিউনিটিতে দ্বিতীয় প্রজন্মের ছেলে মেয়েদের বিয়ে নিয়ে যে সমস্যা হয়, বিশেষ করে ছেলের জন্য উপযুক্ত মেয়ে খুঁজে পাওয়া যায় না অথবা মেয়ের জন্য উপযুক্ত ছেলে খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার অনেকেই জীবন সঙ্গী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ভিন্ন ধর্মের ছেলে-মেয়েদেরকে পছন্দ করে বসে। ভিন্ন ধর্মের ছেলে ও মেয়ের মধ্যে বিয়ের ঘটনাও তাই বাড়ছে। ছেলে-মেয়েদের সুখের কথা চিন্তা করে বাবা-মায়েরা সেসব বিয়ে মেনে নিলেও মানসিকভাবে তারা ভীষণভাবে মুষরে পড়েন, কেননা তারা চান, তাদের ছেলে-মেয়েরা জীবন সঙ্গী হিসেবে বেছে নিক একটা বাঙালি ছেলে বা মেয়েকে।
অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে রহমান সাহেব সুজানার সাথে কথা বলছেন। সেদিন সুজানার সাথে কথা বলে রহমান সাহেব ভীষণ চমৎকৃত হয়েছেন। তিনি মনে মনে খুব আফসোস করেছেন, আহা তার জেসমিনও যদি এমন হতো। সুজানা চলে যেতেই মনের অজান্তেই তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলেছেন। আজ সুজানাকে আবার কাছে পেয়ে তার ভীষণ ভালো লাগছে। সুজানাকে তিনি তার পাশে বসিয়ে কথা বলছেন। এক পর্যায়ে তিনি জানতে চাইলেন, ‘বাংলা ভাষা কিংবা সংস্কৃতির প্রতি এদেশে জন্ম নেয়া ছেলেমেয়েদের মধ্যে খুব একটা আগ্রহ দেখতে পাওয়া যায় না। তোমার সাথে কথা বলে আমি খুব অবাক হয়েছি। I’m really proud of you. আচ্ছা, আমাকে বলতো, বাংলার প্রতি তোমার এমন আগ্রহ তৈরি হলো কী করে?’
‘আঙ্কেল, আমার জন্ম আমেরিকাতে হলেও বেসিক্যালি আমি বাঙালি। কেননা, এদেশে আমি যত বড়ই হই না কেন, আমেরিকানদের সাথে কমপিট করে মেইনস্ট্রীমে মিশে গেলেও আমি যে বাংলাদেশের মেয়ে এই সত্যটি আমি কখনোই ভুলে যেতে পারব না।’
রহমান সাহেব ভীষণ আপ্লুত হলেন সুজানার কথা শুনে। সফিক আর শারমিনও ওদের সামনের সোফায় বসা ছিল। সুজানার কথা হঠাৎ করে সফিকেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করল। সে আগ্রহ নিয়ে ওর কথা শুনতে থাকল।
‘আমি শত চেষ্টা করলেও একটি আমেরিকান ছেলে বা মেয়ে যেভাবে বড় হয়ে ওদের নিজস্ব কালচার নিয়ে, আইডেন্টিটি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে, সেভাবে পারব না।
সফিক জিজ্ঞেস করল, ‘তার কারণ কি হতে পারে বলে তুমি মনে করো?’
‘কারণ, আমার রক্তে মিশে আছে বাংলাদেশের কালচার অ্যান্ড ট্র্যাডিশন। এই জন্য আমি আমার বাঙালি কালচারকে নিয়েই প্রাউড ফিল করি। এটিই আমার মুল আইডেন্টিটি।’
‘কিন্তু, মূলধারার সাথে পরিপূর্ণভাবে মিশে যেতে না পারলে ভবিষ্যতে সফল হবে কিভাবে?’ সফিক আবারো প্রশ্ন রাখল।
সুজানা কিছুক্ষণ ভেবে নিল। মনে মনে সাজিয়ে নিল সে যা বলতে চায়। ‘দেখুন আমি ভবিষ্যতে ডাক্তার হতে চাই। এজন্যে ক্লাসে সব সময়ই ভালো রেজাল্ট করার চেষ্টা করি। খেলাধুলা, নাচ-গান, অভিনয়েও আমার ভীষণ আগ্রহ। আমি যেটা করতে চাই সেটাতে কোন বাধা নেই আমার। আমি ওদের অনেকের চেয়ে ভালও করছি। কিন্তু তারপরেও ওরা কিন্তু আমাকে ওদের দলের মানুষ বলে মনে করছে না। আমাকে আলাদা করেই রাখতে চাইছে। তাহলে আমি কেন ওদের কালচার নিয়ে বড় হবো? তাছাড়া আমাদের কালচারে যা আছে, ওদের তা নেই। সেদিক থেকে ওরা খুবই পুওর।’
‘বুঝিয়ে বলো তো কোনটাকে তুমি পোর বলছো?’
‘ফর এক্সাম্পল, ১৮ বছর বয়স হলেই ওরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে স্বাধীনতা পেয়ে যায়। চাইলেও বাবা মা ছেলে মেয়েদেরকে শাসন করতে পারেন না। অথচ ১৮ বছর বয়সে একটা ছেলে বা মেয়ে নিজের অভিজ্ঞতা আর বুদ্ধি দিয়ে ভালোও হতে পারে আবার খারাপও হতে পারে। সেখান থেকে কেউ ফিরিয়ে আনতে পারে না। বাবা মাও পারেন না। আর সবকিছুর পেছনে ঐ ১৮ বছরের দেয়ালটাই বাধা হয়ে থাকে।’
রহমান সাহেব একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বললেন, ‘বাহ, বেশ ভালো বলেছ তো?’
সফিকও মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘এদিকে আমাদের কালচারটা দেখো। ১৮ বছর কেনো, আমরা ৩০ বছর বয়সেও বাবা মার আদেশ পরামর্শ মেনে চলি। আর এদেশের ছেলে মেয়েরা তো খুবই সেলফিস। তারা নিজেদের নিয়ে এত বেশী ব্যস্ত থাকে যে অন্যদের সম্পর্কে জানার কোন আগ্রহই থাকে না।’ সফিক আড়চোখে তাকাল জেসমিনের দিকে। জেসমিন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।
সুজানা বলল, ‘সে দিক থেকে আমরা কিন্তু লাকি। পূর্ব পুরুষের কালচার সহ দুটি কালচারের ভেতর দিয়েই আমরা অনেক বেশি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারছি, আমাদের সে সুযোগ আছে।’
‘এক্সাক্টলি! ইউ আর রাইট!’ সফিক প্রশংসার হাসি দিয়ে সবার দিকে একবার তাকাল। তার খুব মজা লাগছে সুজানার সাথে কথা বলতে। সে আবারো জানতে চাইল, ‘আচ্ছা আমাকে বলতো, স্কুলে আমেরিকার কালচার আর ঘরে বাঙালি তার ওপরে মুসলিম রীতিনীতি—এই মিক্সড কালচার কনফ্লিক্ট তুমি কীভাবে ডিল করো?’
জেসমিন কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল, ‘প্রথম দিকে সমস্যা হতো, তবে এখন আর কোন কনফিউশন নেই। কারণ আমি বুঝতে শিখেছি, আমার বাবা-মা কিংবা অন্যান্য বাঙালি ফ্যামিলিগুলো সুদূর বাংলাদেশ থেকে এখানে এসেছেন শুধু ভাগ্যের অন্বেষণে। আমি জেনেছি স্বদেশে সামাজিক-অর্থনৈতিক অস্থিরতা, স্বাভাবিক জীবনের অনিশ্চয়তা—এসব নানা কারণেই ইমিগ্র্যান্টরা এদেশে এসেছেন ফার্স্ট জেনারেশন হয়ে। আমরা সেই সুবাদে ভিন্ন শেকড় থেকে বেড়ে উঠা আমেরিকান সিটিজেন।’
সুজানার কথা শুনতে শুনতে রহমান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। এই মেয়েটা এত সুন্দর করে কথা বলা শিখল কীভাবে। সুজানার বাবা-মাকে একটা বিশেষ ধন্যবাদ দিতে হবে।
আলোচনার মাঝখানে এবার শারমিন তার মতামত দিল। ‘এখানে বেড়ে উঠা অনেক ছেলে মেয়েরা ভয়ে কিংবা লজ্জায় বাংলা বলতে চায় না। অনেককে দেখেছি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে ইংরেজিতে লিখে বাংলা গান গায়। আসলে আমাদের সব প্যারেন্টসদের উচিত বেশী করে বাঙালি কালচারগুলো ছেলেমেয়েদের শেখানো। ছোটবেলা থেকেই বাচ্চাদেরকে বাংলা লেখা এবং পড়াটা শেখাতে পারলে সবচেয়ে ভালো হয়।’
‘ঠিক বলেছেন আপু।’ সুজানা বলল, ‘তাহলেই শুধু আমরা আমেরিকান সোসাইটিতে গর্ব করে আমাদের আইডেন্টিটি তুলে ধরতে পারবো।’
অনেকক্ষণ থেকেই সবাই বেশ আগ্রহ নিয়ে সুজানার কথা শুনছে। বাকী কথাগুলো এবার ইংরেজিতে বলল সুজানা, ‘We should know that we are American only for our bright future, but basically we are Bangalee. And we all should feel proud for this.’
অতিথিদের মধ্যে প্রশংসাসূচক শব্দ ভেসে আসতে লাগল। জেসমিন একটু অসস্ত্বিবোধ করতে লাগল। দেখা যাচ্ছে সন্ধ্যার পর থেকেই সুজানাকে নিয়েই সবাই মেতে রয়েছে অথচ এটা ওর জন্মদিনের অনুষ্ঠান। তার কি কিছুটা হিংসে হচ্ছে? হতেও পারে। এই আলোচনা এখন বন্ধ হওয়া দরকার। জেসমিন একটু উচ্চস্বরে সুজানাকে বলল, ‘Sue, let’s go to my room, I’ll show you my new collections.’ বিভিন্ন ডিজাইন এবং ব্রান্ডের জুতা কেনা জেসমিনের শখ। কয়েক শো জোড়া জুতা তার ক্লোজেটে সাজানো আছে। সে সুজানার হাত ধরে একরকম জোর করে উঠিয়ে নিয়ে চলে গেল ওপরতলায় তার রুমে।
‘বাপরে, এ মেয়েতো সাংঘাতিক। ভাবাই যায় না ওর জন্ম হয়েছে আমেরিকায়। ওর বাবা-মকে তো একটা স্পেশাল থ্যাঙ্ক ইউ জানানো দরকার। কোথায় তারা?’ সফিক উঠে গিয়ে সুজানার বাবা-মাকে খুঁজতে লাগল।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *