ছুটির দিনের সকাল।
শারমিন একটু বেলা করে ঘুম থেকে উঠল। মনে হলো আজ তো কাজ নেই। তাই ঘুমিয়ে নেই যতটা পারা যায়। অন্য অনেক দিনের মতো আজ না। আজ শনিবার। ঘুম ভাঙলেও বিছানা ছাড়তে ইচ্ছে করেনা। তবুও আলস্যে মাখা শরীরটা অনেক কষ্টে বিছানা থেকে তুলে নিল শারমিন। তার সাথে সাথে সফিকেরও ঘুম ভেঙে গেল। শারমিন মিষ্টি হেসে বলল, ‘তুমি আর একটু ঘুমাও। আমি ব্রেকফাস্ট রেডি করে ডাকব।’
সফিক হাই তুলে বলল, ‘আমিও আসি, হেল্প করব তোমাকে।’
শারমিন খুশি হয়ে গেল। ঘুম থেকে উঠেই সকালটা কেমন সুন্দর হয়ে গেল। হেসে দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে।’
রহমান সাহেবের বাসার কিচেন টেবিলে সকলে জড় হয়েছে। শারমিন দেশের মতো আলুভাজি, ডিম ওমলেট, সুজির হালুয়া আর পরাটা বানিয়েছে। আবার ব্রেড টোস্ট সাথে জ্যাম জেলিও আছে। আয়োজন দেখে সফিকের মনটা বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠল। আমেরিকায় আসার পর থেকে শান্তি মতো নাস্তাটা করা হয় না। সোম থেকে শুক্রবার সকালে তার খুব কষ্ট হয়। দু’এক স্লাইস ব্রেড, মাফিন কিংবা বেগল—এসব খেতে খেতে সে হাঁপিয়ে গেছে। শুধু ছুটির দিনের সকালে শারমিনকে বাসায় পাওয়া যায়, সে তখন অনেক ধরনের নাস্তার আয়োজন করে। মাঝে মাঝে খিচুড়িও রাঁধে। আমেরিকায় থেকে মেয়েটা এতকিছু রান্না করতে পারে এটা দেখে সফিকের বিস্ময়ের সীমা থাকে না।
সফিক দুটো পরাটা, আলুভাজি, ডিম ওমলেট তুলে নিল তার প্লেটে। দেরি না করে খাওয়া শুরু করল দ্রুত।
শারমিন সফিকের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। ‘দেখো, আবার গলায় আটকে না যায়, আস্তে খাও।’ গ্লাসে অরেঞ্জ জুস ঢেলে এগিয়ে দিল সফিকের দিকে। ‘কফি কি এখন দিবো না পরে?’
‘চা বানাও নি? চা হলে ভালো হতো। কফি তো তিতা লাগে।’
সফিকের কথার ধরনে রহমান সাহেব মৃদু হাসলেন।
শারমিন বলল, ‘তুমি যেভাবে চা খেতে চাও সেটা এখন বানানো যাবে না। গুড়ো চা নেই। টি-ব্যাগ আছে, চলবে? হট-ওয়াটারে একটা টি-ব্যাগ ছেড়ে দিলেই হবে।’
‘না থাক। কফিই খাই। তবে কফিটা পরে দাও। নাস্তাটা শেষ করি আগে।’
‘ওকে।’ শারমিন আবার হেসে ফেলল।
কিছুক্ষণের মধ্যে জেসমিন এসে বসল টেবিলে। গ্লাসে অরেঞ্জ জুস ঢেলে আস্তে করে চুমুক দিল।
সফিক মুখের খাবার শেষ করে জেসমিনের দিকে তাকাল। অরেঞ্জ জুসের গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘এই যে শালিকা, তোমার সাথে তো দেখাই হয় না। তারপর দিনকাল কেমন? নিশ্চয়ই ভালো? খুব পার্টি হচ্ছে, তাই না? হা হা হা।’
জেসমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘I told you not to call me in that stupid name. Call me Jasmine, if that is too hard for you, call me Jazz. Just Jazz. ok?’
জেসমিনের এমন প্রতিক্রিয়ায় সফিক খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে গেল। সে একবার তাকালো শারমিনের দিকে। তারপর তাকাল রহমান সাহেবের দিকে। রহমান সাহেব নির্বিকার। তিনি কফির কাপে চুমুক দিতে দিতে ডালাস মর্নিং নিউজ পেপারে চোখ বুলাতে লাগলেন।
বিব্রত সফিক প্রসঙ্গ বদলে শারমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বুঝলে শারমিন, সকালের নাস্তাটা হচ্ছে দিনের সবচাইতে প্রয়োজনীয় খাবার। ইংরেজিতে একটা কথা আছে, A healthy breakfast is the most important meal of the day. এতে শরীর ও মন ভালো থাকে। ব্রেইনও কাজ করে ভালো।’
শারমিন কিছু বলল না।
সফিক তার নাস্তা বিষয়ক বক্তৃতা চালিয়ে গেল। এবার অবশ্য কথাগুলো বলল জেসমিনকে উদ্দেশ্য করে, ‘বিশেষ করে কম বয়েসী ছেলেমেয়েরা, যারা স্কুল কলেজে যায় তাদের জন্য তো ব্রেকফাস্ট একেবারেই মাস্ট। এতে করে লেখাপড়ায় মনঃসংযোগ ঘটে, সেই সাথে সলভিং এবং ক্রিয়েটিভ স্কিলস বৃদ্ধি পায়। According to the American Dietetic Association…’
সফিকের কথা শেষ হবার আগেই জেসমিন তার বাবাকে লক্ষ করে বলল, ‘Dad, I’m moving out.’
রহমান সাহেব পত্রিকা পড়া বন্ধ করে তাকালেন জেসমিনের দিকে। শারমিন আর সফিক তাকাল একে অপরের মুখের দিকে।
‘My friend Carla is taking an apartment; she needs a roommate and I’ve decided to stay with her. I suppose that’s about it.’
বলেই জেসমিন উঠে দাঁড়াল এবং আর কিছু না বলে চলে যেতে উদ্যত হতেই রহমান সাহেব উচ্চ স্বরে বললেন, ‘Just a minute.’
‘I’m late.’ জেসমিন ঘুরে হাটা শুরু করল।
রহমান সাহেব হুংকার দিয়ে উঠলেন, ‘I said just a minute.’
রহমান সাহেব উঠে এলেন। দাঁড়ালেন জেসমিনের সামনে। তারপর উচ্চকণ্ঠেই বললেন, ‘তুমি ইচ্ছে করলেই অন্য কোথাও গিয়ে থাকতে পারো না। সে পারমিশন কেউ তোমাকে দেয় নি।’
‘I didn’t ask for a permission. I don’t need a permission. I’m old enough to make my own decision.’
‘No, you’re not old enough to do whatever you want. I’m your father and I know what is right for you, what is not. You have a college and you need to finish your study first; you understand?’
কোনো উত্তর না দিয়ে জেসমিন অন্যদিকে তাকাল।
রহমান সাহেব জেসমিনের ঘাড় ঘুরিয়ে নিজের দিকে এনে আবার বললেন, ‘Do you understand?’
‘I’ll do whatever I want.’
‘Don’t you dare to talk to me like that. কোন বাঙালি মেয়ে তার প্যারেন্টস এর সঙ্গে এভাবে কথা বলে না।’
‘I’m not a bangalee meye. তুমি আমাকে জোর করে বাঙালি বানাইতে পারো না। You just can’t force me.’
সফিক চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল সবার মুখের দিকে। এসব কী হচ্ছে?
‘আমাকে আমার মতো করে বড় হইতে দাও। Let me have my own freedom. Even a girl in Bangladesh has more freedom than I do. You don’t even know how Bangladesh has changed.’
রহমান সাহেব ভেঙে পড়লেন। হতাশ ভঙ্গিতে তাকালেন শারমিনের দিকে। তিনি আর কিছু বলতে পারলেন না।
শারমিন এগিয়ে এসে জেসমিনকে থামানোর চেষ্টা করল। ওর হাত ধরে বলল, ‘That’s enough Jasmine! Now, please stop.’
কিন্তু জেসমিন তার বাবাকে লক্ষ করে বলেই চলল, ‘You’re living in America and keeping your so called Bangladeshi poor sentiment and forcing me to live with that? You don’t care about how I want to grow up with. You only care about your god damn ill mentality Bangladeshi community and what they will say.’
রহমান সাহেব পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। সে তার দু’কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারলেন না। এই মেয়ে এসব কী বলছে তার মুখের ওপর!
উত্তেজনা চরম আকার ধারণ করল। সফিক উঠে এসে দাঁড়াল জেসমিনের সামনে। জেসমিনকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘Jesmin, I mean Jazz, এভাবে বোধহয় তোমার কথা বলাটা ঠিক হচ্ছে না। After all he is your father, you know.’ সফিক ইদানীং কথার মাঝে আমেরিকানদের মতো কাঁধ নেড়ে you know, hmm, excuse me, thank you দিয়ে কথা বলার চেষ্টা করছে।
জেসমিন সফিককে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে তাকাল তার বাবার দিকে। সে ফিরে গেল তার কথার ঝড়ে। ‘Your so called Bangalee culture, sentiment and value could not stop mommy to move away holding her boyfriend’s hand. So, don’t push me to do the same.’
এ পর্যায়ে রহমান সাহেব ভীষণ উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি তীক্ষ্ণ কণ্ঠে চিৎকার দিলেন, ‘Jasmine! How dare you?’
রহমান সাহেব হাত উঁচু করে জেসমিনের দিকে এগিয়ে যেতেই শারমিন তার বাবার হাত ধরে ফেলল, ‘বাবা, না!’
জেসমিন কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। আবার কী ঘটতে যাচ্ছিল সে বুঝে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই ঠাণ্ডা কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘I guess that’s it. I’m moving out. No one will ever stop me.’ আর এক মুহূর্ত দেরি না করে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল জেসমিন।
কয়েক মুহূর্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইলেন রহমান সাহেব। একবার তাকালেন শারমিনের দিকে আবার জেসমিনের চলে যাওয়ার দিকে। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না। অস্থির লাগছে। হাত কাঁপছে। মাথাটাও চক্কর দিয়ে উঠল। কেমন দিশেহারা মনে হচ্ছে সব কিছু। চারিদিকটা কেমন অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে। বুকের ভেতর চিনচিন ব্যথা অনুভূত হচ্ছে। ব্যথার তীব্রতা বাড়তেই রহমান সাহেব সংজ্ঞা হারিয়ে পড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সফিক ধরে ফেলল তাকে।
শারমিন চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিল, ‘Oh my god! Safiq call 9-1-1. Call the ambulance.’
মিক্সড কালচার (পর্ব-৬)
with
no comment

