ডালাসের অদূরে রিচার্ডসন নামক শহরে অবস্থিত টেক্সাসের বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসের ডালাস ক্যাম্পাস। সংক্ষেপে ইউটি ডালাস কিংবা ইউটিডি। ইউটি ডালাসের STEM (Science, Technology, Engineering and Math) প্রোগ্রাম আমেরিকার সর্বোচ্চ র্যাঙ্কিং প্রোগ্রামগুলির মধ্যে একটি। আর এ কারণেই ইউটি ডালাস বিশ্বজুড়ে তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য একটি জনপ্রিয় গন্তব্য—বিশেষ করে যারা উচ্চতর ডিগ্রী নিতে চান।
ক্লাস শেষ করে ডিপার্টমেন্টের করিডোরে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল জেসমিন আর সুজানা। পরের ক্লাস শুরু হতে আরো ৪৫ মিনিট বাকী। একটু কফি খেলে কেমন হয়? জেসমিনের পছন্দ স্টারবাকস কফি। ওদের একটা কফি শপ আছে ক্যাফেটেরিয়ার অভ্যন্তরে। ওখানে হেঁটে যেতে হবে। হাতে যেহেতু সময় আছে, তাই ক্যাফেটেরিয়াতেই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। হাঁটতে হাঁটতে অনেক কথা হলো দুজনার মধ্যে। কথোপকথনের বেশিরভাগ সময়েই জেসমিন তার বাবার প্রসঙ্গে কথা বলল।
‘I don’t understand why dad is so concerned about me. I’m already 20! Look at the American parents—they are not too concerned when their children reach 18!’
‘You know Jazz, we are lucky that our parents still wants to guide us even when we’re 18.’ সুজানা তার স্বভাবসুলভ যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করল। ‘বাংলাদেশি প্যারেন্টসরা তাদের ছেলেমেয়েদের যেভাবে আদেশ–উপদেশ দেন তা আমাদের মতো নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ার জন্যে খুবই প্রয়োজন। নতুন প্রজন্ম কি বোঝ তা?’ জেসমিনের অবাক করা চেহারার দিকে তাকিয়ে সুজানা জানতে চাইল।
‘I know, new generation. I agree, but my dad overreacts all the time. He does not want to understand me.’
‘Sometimes our parents don’t understand us, or sometimes we don’t understand them, that’s ok. আমরা এদেশে জন্ম নিয়েছি বলেই এটা হতে পারে।’
‘Are you saying it’s a communication gap then?’
‘Of course, it is. আমাদের প্যারেন্টসদের সঙ্গে এই গ্যাপ দূর করতে হলে আমাদেরকে বাংলাদেশের কালচার সম্পর্কে বেশী করে জানতে হবে। ‘
‘Our parents also should know and learn more about American culture, their history, racism, Spanish and other immigrants. Don’t you think?’
সুজানা মাথা নেড়ে সায় জানাল।
জেসমিন আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই সে চুপ করে গেল। সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল অদূরে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সুজানাও তাকাল। জেসমিন দ্রুত এগিয়ে গেল যেদিকে তাকিয়ে ছিল সেদিকে। কিছুদূর এগিয়েই সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে থমকে দাঁড়াল। জায়গাটি তুলনামূলকভাবে নির্জন, সেখানে একটি মেয়ের কোমর জড়িয়ে ধরে কথা বলছে অ্যালেক্স । কথার ফাঁকে ফাঁকে তারা চুম্বন করছে একে অপরকে। জেসমিন আর নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। অগ্নিমূর্তি ধারণ করে দাঁড়াল অ্যালেক্সের সামনে। ‘অ্যালেক্স!’
জেসমিনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠের ডাকে অ্যালেক্স ঘুরে দাঁড়াল। ওর অগ্নিমূর্তি দেখে কিছুটা ভরকে গেল সে।
‘What do you think you are doing, you son of a bitch?’
অ্যালেক্স চুপ করে রইল। সাথের মেয়েটির কোমর থেকে হাত ছুটে গেছে তার।
‘How long have you been cheating on me, Alex?’
‘Cheating on you? You are not even my girlfriend, ok? You are fooling around! And I’m just playing with you. What do you expect?’ জেসমিনকে অপমানের চূড়ান্ত করে কথাগুলো বলল অ্যালেক্স। নতুন বান্ধবীর সামনে তাকে অপমান করার প্রতিশোধ নিতে পেরে একটু স্বস্তি বোধ করল সে।
‘Playing with me? How dare you. Then why did you…’ জেসমিন নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। এগিয়ে গিয়ে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল অ্যালেক্সের গালে। ঘটনার আকস্মিকতায় হকচকিয়ে গেলেও অ্যালেক্স সাথে সাথেই জেসমিনকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিল নিচে।
জেসমিন রাগে দুঃখে কেঁদে ফেলল। সে উঠে দাঁড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল অ্যালেক্সের ওপর। এলোপাথারি কিল ঘুসি চালাতে থাকল।
সুজানা দেরি না করে জেসমিনকে ছাড়িয়ে নিয়ে সরে এলো একটু দূরে। ফোন বের করে অ্যালেক্সের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Ok, I’m going to call the police’
পরিস্থিতি খারাপ হবার আগেই অ্যালেক্স তার বান্ধবীকে নিয়ে দৌড়ে চলে গেল চোখের আড়ালে।
‘Let’s go Jasmine. Forget it. আজ আর ক্লাসে মন বসবে না। চলো আমি তোমাকে বাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি।’ সুজানা জেসমিনকে ধরে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল পার্কিং লটে যেখানে পার্ক করা আছে ওদের গাড়ি।
…
বাসায় ফিরে প্রচণ্ড মন খারাপ নিয়ে বিছানায় শুয়ে রইল জেসমিন। তার হাতের এবং পায়ের কয়েক জায়গায় ক্ষত হয়েছে। সে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ল।
কাজ থেকে একটু তাড়াতাড়ি বসায় ফিরে এলো শারমিন। এসেই জেসমিনের রুমে যেয়ে দেখল সে মন খারাপ করে শুয়ে আছে। আজ কলেজে যা ঘটেছে সে ব্যাপারে শারমিনকে সব জানিয়েছে সুজানা।
শারমিন একটা আইচ প্যাক নিয়ে ব্যথার জায়গাগুলোতে আস্তে আস্তে চাপ দিয়ে ধরল। জেসমিন ফুলে ফুলে কাঁদছে। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I made a terrible mistake. I was wrong all along. I’m sorry. I’m very sorry.’
‘I told you so many times. You didn’t care.’ শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে বলল।
‘I know sis. I know now. Please forgive me.’
‘It’s ok.’
…
রাতের খাবার শেষ করে একটা ম্যাগাজিনে চোখ বুলাচ্ছিলেন রহমান সাহেব। খুট করে একটা শব্দে তিনি ঘুরে তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন দাঁড়িয়ে আছে তার রুমে। তিনি অবাক হলেন। জেসমিন তো সাধারণত তার ঘরে আসে না। জেসমিন এগিয়ে এসে রহমান সাহেবের হাত ধরে দাঁড়াল।
‘কিছু বলবি মা?’
‘Dad, I’m sorry, I hurt you. I don’t want to hurt you anymore.’ জেসমিন ইংরেজির সাথে ভাঙা ভাঙা বাংলা মিশিয়ে বলল, ‘আমার ভুল হয়েছে। আমি আর ভুল করতে চাই না।’
‘আচ্ছা, সে তো খুবই ভালো কথা।’
‘I’ll finish my college first then I’ll go to Bangladesh. আমি একটা বাংলাদেশি ছেলেকে বিয়ে করতে চাই।’
রহমান সাহেবের চোখ ভিজে এলো। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে জেসমিনকে বুকে টেনে নিলেন।
জেসমিনকে ভেতরে ঢুকিয়ে দিয়ে শারমিন আর সফিক দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। এমন আনন্দঘন মুহূর্তে তারা দুজনে ঘরে ঢুকল হাসি মুখে। জেসমিন শারমিনকে দেখিয়ে বলল, ‘Look at her, how happy she is with dulabhai. I want to be like her. And I want to make you happy too.’
জেসমিনের সহজ সরল কথার ভঙ্গিতে সবাই হেসে ফেলল। রহমান সাহেব আবার বুকে টেনে নিলেন তার আদরের ছোট মেয়েকে।
…
রহমান সাহেবের বাসার লিভিং রুমে তুমুল আড্ডা জমে উঠেছে। সফিক, শারমিন, জেসমিন, সুজানা, জেসন আর রহমান সাহেব স্বয়ং খোশ গল্পে মেতে উঠেছেন। কিছুদিন থেকেই রহমান সাহেবের মনটা অত্যন্ত প্রফুল্ল। তাই শরীরটাও সতেজ লাগছে। তিনি শারমিনকে বলেছিলেন এই উইকএন্ডে লাঞ্চে একটু ভালোমন্দ খাওয়া-দাওয়া হোক। শারমিন সেভাবেই আয়োজন করেছে সবকিছু। জেসন আর সুজানাও শামিল হয়েছে আজ দুপুরের নিমন্ত্রণে। আড্ডা জমে উঠেছে তুমুল। সফিকই বেশি গল্প করছে। হঠাৎ সুজানার ফোন এলো। সে এক্সকিউজ মি বলে ফোনটা ধরল। সুজানার মায়ের ফোন।
‘হ্যাঁ আম্মু? তুমি কোথায়? আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি ওখানেই থাকো, আমি আসছি।’ ফোন কেটে দিয়ে সুজানা সবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সরি, আমাকে যেতে হবে। আম্মু অপেক্ষা করছেন। আমি আজ আসি।’
‘তুমি আবার এসো, মা। চলো, তোমাকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসি।’ রহমান সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।
‘না না আঙ্কেল অসুবিধা নেই। আপনি বসুন। আমি অবশ্যই আবার আসব।’
সুজানা জেসমিন আর শারমিনকে হাগ দিয়ে বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।
সুজানা বের হয়ে যেতেই জেসনও দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল। জেসনের এভাবে কিছু না বলে হুট করে বের হয়ে যাওয়ার বিষয়টা শারমিন কিংবা জেসমিন কেউই ঠিক বুঝতে পারল না। তারা দুজন দুজনের দিকে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
সফিক বলল, ‘কী ব্যাপার, তোমরা হাসছ কেন?’
‘না কিছু না।’ দু’বোন আবার একসাথে হেসে ফেলল।
…
সুজানা একটু এগিয়ে যেতেই শুনতে পেল জেসনের কণ্ঠ। ‘Excuse me!’
সুজানা ঘুরে দাঁড়াল।
জেসন বলল, ‘I was just wondering if you need a ride or something.’
‘Thank you, Jason. রাইড লাগবে না। তবে তুমি যদি আমার সাথে আসতে চাও, আসতে পারো। You can meet my mom.’
‘অবশ্যই আসতে চাই।’
তারা হাঁটতে হাঁটতে সুজানার গাড়ির কাছে গেল।
জেসন বলল, ‘By the way, I’m very impressed about your thought process of mixed culture. তুমি তো অনেক ভালো বাংলা জানো—আমাকে বাংলা শেখাবে?’
‘অবশ্যই শেখাবো। তবে এক শর্তে।’ সুজানার মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘কী শর্ত?’
‘আমাকে সালসা শেখাবে?’
জেসন অবাক হয়ে তাকাল সুজানার দিকে। সে ঠিক বুঝতে পারল না, সুজানা কী করে জানে যে সে একজন ড্যান্স ইন্সট্রাকটর। ছোট বেলা থেকেই ল্যাটিন আমেরিকান নাচের প্রতি জেসনের আগ্রহ সৃষ্টি হয়—বিশেষ করে সালসা, ফ্লেমিঙ্কো, সাম্বা, ট্যাংগো, ম্যাম্বো, মেরেঙ্গে, চা-চা, বাচাতা আরো কত ধরনের নাচ! সে নিজে থেকেই বিভিন্ন ধারার ল্যাটিন নাচ শিখে, পরে ট্রেনিং শেষ করে একটা ড্যান্স ক্লাবে ইন্সট্রাকটর হিসেবে পার্ট টাইম জব করে।
‘তুমি কী করে জানো যে আমি ড্যান্স জানি?’
‘আগে আমার প্রশ্নের উত্তর দাও, তারপর বলছি। কী শেখাবে?’
‘অবশ্যই শেখাবো। তবে একটা শর্তে।’ এবার জেসন হাসি হাসি মুখ করে বলল।
‘কী শর্ত?’
‘আমাকে বিয়ে করবে? Will you marry me?’
‘এত তাড়াতাড়ি বিয়ের প্রস্তাব? তুমি তো আমাকে চেনোই না ঠিকমতো।’ মিষ্টি করে হেসে বলল সুজানা।
‘Whatever I know, that’s good enough for me!’
‘কিন্তু আমার জন্য সেটা এনাফ নাও হতে পারে তাই না?’
‘I agree!’ একটু ভেবে জেসন উত্তর দিল।
তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল দুজনেই। কেউ কোনো কথা খুঁজে পেল না। জেসন কিছুটা হতাশ হয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল।
‘দ্যাট’স ইট, আর কোনো কথা নেই?’ সুজানা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল।
জেসন কী বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারল না।
‘ঠিক আছে, আমি আসি। দেরি হয়ে যাচ্ছে আমার।’
জেসন সরে দাঁড়াল। হঠাৎ করেই তার মনটা ভীষণ খারাপ হয়ে গেল।
সুজানা গাড়ি স্টার্ট দিয়ে তাকাল জেসনের দিকে। ‘আমার মায়ের সঙ্গে দেখা করবে না?’ সুজানার চেহারায় আবার সেই দুষ্টুমির হাসি। ‘উঠে এসো গাড়িতে। লেট’স গো।’
জেসন উঠে বসল সুজানার গাড়িতে। পাশের সিটে বসে তাকাল সুজানার দিকে। মেয়েটির হাসিটা এত মিষ্টি কেন? কী সুন্দর হাসি। জেসন একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, এই মেয়েটিকেই তার পাশে সারা জীবন চাই।
সুজানা গাড়ি ছেড়ে দিল। ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সামনে। কিছুক্ষণের মধ্যেই অদৃশ্য হয়ে গেল আবাসিক এলাকার বাঁকে।
(আর চলবে না… দি এন্ড!)
করোনা বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত এই অস্থির সময়ে কারো মানসিক অবস্থারই ঠিক নেই। তারমধ্যেও সময় বের করে যারা গল্পটি পড়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত সাথেই ছিলেন, তাদের সবার প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ। বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে নতুন কোনো গল্প নিয়ে। সে পর্যন্ত সবাই ঘরে থাকুন, ভালো থাকুন, নিরাপদে থাকুন।
মিক্সড কালচার (শেষ পর্ব)
with
no comment

