উত্তর আমেরিকায় বাঙালিদের সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।
আটলান্টিকের পারের এই বাঙালিদের বিনোদনের যেন কোনো শেষ নেই। গান, নাচ, নাটক, কবিতা আবৃত্তি, কাব্য জলসা, বাউল সন্ধ্যা, পুঁথিপাঠ, গুরুগম্ভীর সেমিনার, বইমেলা, পথমেলা—সবই হচ্ছে এখানে। বসন্ত উৎসব, বৈশাখ উদযাপন, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস—সব দিবসই পালিত হয় এখানে। আর সে কারণেই বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল ব্যবধানে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি রাজ্যের ছোট বড় অনেক শহরেও বাঙালির বোধ আর মননে এই বাংলা আর বাংলাদেশ অনেক আদর, ভালোবাসায় নিত্যই আদৃত হয়ে আসছে। এই ‘বাংলাদেশ’ নামক ছোট্ট শব্দটি বাঙালি তাঁর ধমনীতে অনেক আদর আর ভালোবাসায় ঠাঁই দিয়েছে বলেই এই প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির একটা উর্বর ভূমি তৈরি হয়েছে। শক্ত হয়েছে বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতির শিকড়।
গল্পে ফেরা যাক। শনিবার বিকেলে মায়ামির একটি সেমিনার হলে ‘কাব্য জলসা’ উপলক্ষে স্থানীয় বেশ কিছু বাঙালিদের সমাগম হয়েছে। সবাই যার যার আসন নিয়ে বসেছে। দর্শক সারিতে মুনা এবং তার স্বামী সাগর বসে আছে। মুনা কিছুক্ষণ পর পর দরজার দিকে তাকাচ্ছে। নীলিমা এখনো এসে পৌঁছেনি। আসার আগে সে নীলিমাকে ফোন করেছিল—নীলিমা তাকে জানিয়েছে শোভন যেতে রাজী হয়েছে এবং তাকে সাথে নিয়েই সে অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ওদের খবর নেই।
কাব্য জলসার প্রধান সমন্বয়ক, ফ্লোরিডার জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জনাব আতিকুর রহমান উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে অনুষ্ঠান শুরু করলেন। আতিকুর রহমান ফ্লোরিডায় আছেন দীর্ঘদিন থেকে। একাধারে একজন আবৃত্তি শিল্পী, অভিনেতা, সংগঠক–অন্যদিকে একজন সফল ব্যবসায়ী। শুরুতে তিনি কবি শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ থেকে কয়েকটি লাইন পাঠ করে শোনালেন। তারপর একে একে স্থানীয় সাহিত্য প্রেমীরা আলোচনা করলেন এবং আবৃত্তি শিল্পীরাও কবিতা আবৃত্তি করলেন।
মুনা আবার ঘুরে তাকাল দরজার দিকে। ঠিক তখনই নীলিমা আর শোভন ঢুকলো। নীলিমা সুন্দর করে সেজেছে। নীল রঙের তাঁতের শাড়ি, কপালে টিপ, মাথায় কোঁকড়ানো চুলে বেলি ফুলের মালা দিয়ে বেণী করা। মায়ামি শহরে বেলি ফুল সে কোথায় পেল কে জানে। নীলিমা শোভনের হাতটা ধরার চেষ্টা করলো কিন্তু শোভন হাত ছাড়িয়ে নিল।
মুনা দূর থেকে ওদেরকে দেখে হাত উঁচু করলো। তারা দুজন গিয়ে বসলো মুনার পাশের আসনে।
অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে উপস্থাপক আমন্ত্রণ জানালেন কাব্য জলসার বিশেষ অতিথি, বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি শ্রদ্ধেয় জনাব মাহমুদ সাজ্জাদকে।
অতিথিদের করতালির মধ্যে কবি মঞ্চে উঠলেন। উপস্থাপককে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি তার কথা শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি প্রথমেই আয়োজক এবং কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে এই কাব্য জলসায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আজকে আমার সত্যি খুব ভাল লাগছে এটা দেখে এবং জেনে যে বাংলাদেশের বাইরে এসেও আপনারা বাংলা কবিতা, গান ও সাহিত্যকে এভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও এর পরিচর্যা করছেন। এটা অনেক আনন্দের ব্যাপার। অনেক আশার ব্যাপার আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্যে, যারা এখানে বেড়ে উঠছে। এই যে শেকড়ের সন্ধান আপনারা তাদেরকে দিচ্ছেন, ‘সুন্দরতম ভূমি বাংলাদেশ’কে বিশদভাবে জানাতে এগিয়ে আসছেন, আমি তার জন্যে বিশেষভাবে সাধুবাদ জানাই। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।’
আবার করতালি হলো। করতালি থেমে গেলে তিনি বললেন, ‘আমি মূলত কবি, আবৃত্তিকার নই। আমার কাজ লেখা, আবৃত্তি নয়। এটা মনে রাখলে আমার কবিতা পাঠ করা সহজ হবে।’
অতিথিদের মধ্যে সামান্য হাসির শব্দ শোনা গেল।
কবি আবার বললেন, ‘আজ আমি আমার নিজের কোনো কবিতা নয় বরং আমি আমার প্রিয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কবিতা আপনাদেরকে শোনাবো।’ বলেই কবি আবৃত্তি শুরু করলেন।
‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষ পান করে মরে যাবো।
বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-
এ আমারই সাড়ে-তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষ পান করে মরে যাবো।’
নীলিমা মুগ্ধ নয়নে অপলক তাকিয়ে আছে কবির দিকে। কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁদের সাথে কোনো দিনও সামনাসামনি দেখা হয়নি কিন্তু তাঁদের কাছে কুঁজো হয়ে নতজানু হতে ইচ্ছে হয়। যাঁদের কখনো কখনো গুরু হিসেবে মনেপ্রাণে মেনে নিতে ইচ্ছে জাগে। সেই মানুষের সামনে বসে তার নিজের কণ্ঠে আবৃত্তি শুনতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার। শ্রদ্ধেয় মাহমুদ সাজ্জাদ নীলিমার কাছে তেমনি একজন মানুষ।
আবৃত্তি করতে করতেই দর্শক সারিতে বসা নীলিমার চোখে কবি সাহেবের দৃষ্টি এসে থমকে গেল মুহূর্তের জন্যে। সে একটু থেমে আবার আবৃত্তি শুরু করলেন। এবং বার কয়েক তাকালেন নীলিমার মুগ্ধ দৃষ্টির দিকে। প্রতিবার দৃষ্টি বিনিময় হতেই নীলিমা মিষ্টি করে একটা হাসি উপহার দিল।
কাব্য জলসা শেষ হতেই উপস্থিত দর্শক আর ভক্তরা ঘিরে ধরল কবি মাহমুদ সাজ্জাদকে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ নিচ্ছে অটোগ্রাফ।
নীলিমা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভক্ত এবং শুভানুধ্যায়ীদের ভিড় একটু কমে আসতেই কবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর নরম সুরে বলল, ‘আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেবেন প্লীজ?’
মাহমুদ সাজ্জাদ মুখ তুলে তাকাতেই দেখল সেই মেয়েটি হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।
‘আমি আপনার একজন ভক্ত।’ নীলিমা বলল কবির সহাস্য মুখের দিকে তাকিয়ে।
‘অবশ্যই। দিন।’ বলেই মাহমুদ সাহেব হাত বাড়ালেন।
নীলিমার হাতে একটি বই ছিল। সে বইটা এগিয়ে দিল। কবি মাহমুদ সাজ্জাদের নির্বাচিত কবিতার সংকলন, ‘অবিনাশী শব্দরাশি।’
বইটি হাতে নিয়ে মাহমুদ সাহেব বেশ অবাক হলেন। তিনি বললেন, ‘আরে এই বই আপনি কোথায় পেলেন?’
‘দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম।’ নীলিমা উত্তর দিল।
‘আপনি কতদিন হলো এসেছেন?’ কবির প্রশ্ন।
‘দু বছর।’
‘হুম।’
‘আপনার কবিতা আমার খুবই ভালো লাগে।’
মাহমুদ সাজ্জাদ বইটির মলাট উল্টিয়ে বললেন, ‘আপনি খুব সুন্দর।’
নীলিমার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হলো। তার প্রিয় মানুষের মুখে তার সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে আপ্লুত হলো সে। আস্তে করে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘কি নাম আপনার?’
‘নীলিমা।’
‘বাহ, বেশ সুন্দর নাম! নীলিমায় নীল।’ বলেই তিনি একটি কবিতার কয়েকটি লাইন আওড়ালেন।
“শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল
তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে
তব সুর বাজে মোর গানে;
কবির অন্তরে তুমি কবি,
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।”
তারপর থেমে বললেন, ‘বলতে পারবেন কার কবিতা?’
‘বলাকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ নীলিমা একটু হেসে উত্তর দিলো।
কবি সাহেব বিস্মিত হলেন নিঃসন্দেহে এবং পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন নীলিমার দিকে। একটু হেসে দিয়ে হাতের বইটিতে লিখলেন, ‘নীলিমা, আপনি খুব সুন্দর। আমি অভিভূত। অনেক শুভেচ্ছা।’ তারপর বইটি ফিরিয়ে দিলেন।
নীলিমা খুশিতে আত্মহারা। সে বলল, ‘আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন।’
‘এক মিনিট, আমি ক্যামেরাটা নিয়ে আসছি।’ বলেই নীলিমা দৌড়ে চলে গেল শোভনের খোঁজে।
(পাঠক, বুঝতেই পারছেন—তখন স্মার্ট ফোনের প্রচলন সেভাবে শুরু হয়নি। নাহলে নীলিমা হয়তো কবির সঙ্গে একখানা সেলফি তুলে ফেলত এতক্ষণে। 😊)
নীলিমা চলে যেতেই কর্মকর্তাদের একজনকে দেখা গেল মাহমুদ সাহেবের কাছে এসে তাকে কিছু বলতে। সম্ভবত রাতে কারো বাসায় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে এবং সেখানে যেতে হবে—এসব বলতে। এর মধ্যেই আরো কিছু ভক্ত চলে এসেছে। তারা এবার কবির সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলো।
নীলিমা ফিরে এসে দেখল, তার প্রিয় কবির চারিদিকে অনেক লোক। সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে গেল যেখানে মুনা, সাগর আর শোভন দাঁড়িয়ে অন্যদের সাথে চা-সিঙ্গারা খাচ্ছে আর চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
কথা বলার ফাঁকেই মাহমুদ সাহেব লক্ষ করলেন নীলিমা এসে আবার চলে গেল।
নীলিমা ওদের কাছে যেতেই মুনা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে অটোগ্রাফ নিয়েছিস?’
‘হুম।’
শোভন বলল, ‘দেখিতো কি লিখেছেন?’ বলেই হাত বাড়িয়ে বইটি নিতে চাইল।
‘কেনো তোমাকে দেখাবো কেনো?’ দুষ্টুমি করে উত্তর দিলো নীলিমা।
‘কথা বলেছিস?’ মুনা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘বলতে আর পারলাম কই?’
‘তাহলে এতক্ষণ কি করলি। আমার তো মনে হলো সে কি যেন বলছিল তোকে।’ বলেই মুনা তাকাল সাগর আর শোভনের দিকে, ওদের সমর্থন নেবার জন্যে।
‘কবিতা।’
‘তোকে একা কবিতা শোনালো?’
‘প্রসঙ্গক্রমে চলে এলো তাই।’
‘মানে?’
‘মানে কিছু না।’
‘ছবি তুলেছিস?’
‘নারে, তুলতে পারিনি।’
‘চল, ছবি তুলে আসি।’
নীলিমা আর মুনা ঘুরে দাড়িয়েই চমকে গেল। কবি সাহেব ওদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
মাহমুদ সাহেব নীলিমাকে লক্ষ করে বললেন, ‘এই যে আপনি এখানে। ছবি না তুলে ফিরে এলেন যে, তুলতে চান না?’
‘অবশ্যই চাই। তার আগে পরিচয় করিয়ে দেই… ও হচ্ছে শোভন, আমার হাজব্যান্ড। ও মুনা, ফ্লোরিডায় আমার একমাত্র বান্ধবী, আর ইনি হচ্ছেন…’
নীলিমার মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে মুনা বলল, ‘সাগর, আমার একমাত্র হাজব্যান্ড।’
মুনার কথা বলার ঢং এ সবাই একসাথে হেসে উঠল। এরপর তারা সবাই মিলে কবির সঙ্গে ছবি তুলল।
এর মধ্যেই মুনা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কোথায় উঠেছেন? কারো বাসায় না হোটেলে?’
‘হোটেলে।’
‘থাকবেন কিছুদিন, নাকি কালই চলে যাচ্ছেন?’
‘এ সপ্তাহটা আছি। আমার এক বন্ধু থাকে অরল্যান্ডোতে, এরমাঝে ওর ওখানে একবার যেতে হবে।’
‘তাহলে তো আপনার সাথে কথা হতে পারে?’ মুনা আবার বলল।
‘হ্যাঁ, তাতো পারেই।’
এরপর মুনা নীলিমার দিকে একবার তাকিয়ে মাহমুদ সাহেবকে বলল, ‘আপনার ফোন নাম্বারটা কি পেতে পারি, অবশ্য আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে।’
‘না না, আপত্তি থাকবে কেন? আপনারা ফোন করলে ভালই লাগবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমার নিজেরতো ফোন নেই। আর হোটেলের নাম্বারটাও আমার কাছে নেই।’ একটু ভেবে নিয়ে তিনি আবার বললেন, ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, আমাকে বরং আপনাদের ফোন নাম্বারটা দিয়ে দিন, আমিই না হয় ফোন করব।’
মুনা তাড়াতাড়ি একটা কাগজে নীলিমা আর তার নাম্বার লিখে কবির হাতে দিলো। সেটা দেখে সাগর আর শোভন চোখ ঘুরিয়ে একটু মুচকি হাসল। এরমধ্যে আরেক কর্মকর্তা এসে মাহমুদ সাহেবকে নিয়ে গেলেন। কবি বিদায় নিয়ে চলে যেতেই ওরা সবাই সেমিনার হল থেকে বের হয়ে এলো।
নীলিমা চুপচাপ হাঁটছে করিডোর দিয়ে। মুনাও হাঁটছে নীলিমার পাশে পাশে। নীলিমার অন্য পাশে শোভন আর মুনার পাশে সাগর। মুনাকে খুবই খুশি মনে হচ্ছে। বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে নীলিমাকে বলল সে, ‘বলতো কবি সাহেব আগে কাকে ফোন করবেন? তোকে না আমাকে?’
‘তোর কি মনে হয়, উনি ফোন করবেন?’ নীলিমা অনিশ্চিতভাবে বলল।
শোভন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই, আরে উনার কি সে সময় হবে নাকি? এ বাসা ও বাসা দাওয়াত খেতে খেতেই তো সময় চলে যাবে। তারপর সাইট সিয়িং, ফিশিং আরো কত কি। লেখালেখিও নিশ্চয়ই করবেন। হু নোজ!’
সাগর চোখ টিপে যোগ করল, ‘ফ্লোরিডায় এসেছেন–নর্থ বীচ কিংবা সাউথ বীচে যাবেন না? ওখানেই না কবিতার সব উপকরণ।’
‘সাগর?’ মুনা কটাক্ষ করলো সাগরকে।
নীলিমা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ছিঃ সাগর ভাই, এভাবে বলছেন কেন?’
‘ছিঃ সাগর, এভাবে বলছ কেন?’ নীলিমার কণ্ঠ অনুকরণ করে বলল শোভন।
নীলিমার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেলো মুহূর্তেই। প্রিয় কবিকে নিয়ে এমন ফাজলামো তার একেবারেই পছন্দ নয়। সে রেগে বলল, ‘এনাফ! লেটস গো হোম।’ বলেই নীলিমা দ্রুত এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে।
মুনা একবার সাগর আর একবার শোভনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমরা না!’ বলেই সে সাগরকে বলল, ‘চলো।’
এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। মুনা আর সাগর অন্যদিকে চলে গেলো।
শোভন দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়ি খুলে দিলো। নীলিমা উঠে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিলো সে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
আলো ঝলমল মায়ামির রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে ওদের গাড়ি। নীলিমা চুপচাপ তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। সে ভীষণ আহত হয়েছে সাগর আর শোভনের অশোভনীয় আচরণে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কোনো কারণ ছাড়াই কিছু মানুষ আছে যারা কবি-সাহিত্যিক কিংবা গুণীজনদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে জানে না নাকি ইচ্ছে করেই দেখায় না। কে জানে।
নীলিমা মন খারাপ করে বসে রইল। গাড়ি চালাতে চালাতে শোভন দু’একবার তাকাল নীলিমার দিকে, কিন্তু কিছু বলল না।
নীলিমার মন খারাপের আরেকটি কারণ হলো কবি মাহমুদ সাজ্জাদের কাছে একটা ব্যক্তিগত ফোন নেই এই বিষয়টি তাকে অবাক করেছে। সে ভেবেছিল কবির নাম্বারটা নিয়ে এলে তার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারত। ওর যে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার ছিল। বাসায় ফিরে কাপড় বদলাতে বদলাতে নিজের মনেই সে বলল, ‘এত বড় একজন কবি, উনার নিজের একটা সেল ফোন থাকতে পারে না? আশ্চর্য!’
শোভন কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। সে তাকাল নীলিমার দিকে। একটু মুচকি হেসে বলল, ‘আরে, উনিতো আর এখানে থাকেন না যে তার একটা সেল ফোন থাকতে হবে। তাছাড়া উনি এসেছেন মাত্র কয়েকদিনের জন্যে। এ ক’দিনের জন্যে একটা সেল ফোনের ব্যবস্থা কে করে দেবে বলো?’
‘কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যেসব শিল্পীরা আসেন তাদের তো দেখি সবারই সাথে ফোন থাকে। গানের শিল্পী, নাটকের শিল্পী, সিনেমার নায়ক-নায়িকা সব শিল্পীদেরই তো দেখলাম পারসোনাল ফোন নিয়ে সারাক্ষণ কথা বলছে।’
‘আরে ওদের কথা আলাদা। ওরাতো স্টার। কবি সাহিত্যিকেরা তো আর স্টার নয়। তারা জাস্ট কবি সাহিত্যিক।’
নীলিমা অবাক হয়ে গেলো, কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি এমন তুচ্ছ মানসিকতার কথা ভেবে। এর আগেও আতিক ভাইর কাছে এ ব্যাপারে ও শুনেছে সেসব কথা। আতিকুর রহমান ফ্লোরিডার স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংগঠক, নিজেও অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি করেন, নীলিমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। নীলিমার সঙ্গে মাঝে মাঝে সাহিত্য নিয়ে কথা হয়। সেদিন কথায় কথায় নীলিমাকে বলছিলেন আক্ষেপ করে। প্রতি বছর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশী সংগঠনগুলির একত্রে ‘ফোবানা’ নামে যে মহাসম্মেলন হয় সেখানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি কিছু কবি-সাহিত্যিক, আবৃত্তি শিল্পীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো গানের শিল্পীদের যেভাবে মূল্যায়ন করা কিংবা গুরুত্ব দেয়া হয় তেমনটা কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এমনকি তাদেরকে নিয়ে যে কাব্য-জলসা কিংবা সাহিত্য-চর্চার অনুষ্ঠান করা হয়, সেখানেও দর্শকদের উপস্থিতি থাকে শূন্যের কোঠায়। সবাই অপেক্ষায় থাকে কখন বড় বড় শিল্পীরা গান করবেন, মঞ্চ মাতাবেন। ফোবানা’র মূল আকর্ষণই থাকে দেশ থেকে আসা সেই সব গানের শিল্পীরা। কবি-সাহিত্যিকরা থাকেন অবহেলিত, উপেক্ষিত।
নীলিমা প্রসাধনী তুলে, রাতের শোয়ার কাপড় পড়ে বিছানায় এসে দেখলো শোভন চোখ বন্ধ করে আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সে আলতো করে একটা হাত রাখলো শোভনের গায়ের উপর।
মাঝে মাঝে শোভনের বুকের সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে নীলিমার–আদর পেতে ইচ্ছে করে ভীষণ। একটা সময় ছিল, শোভনের কাছে গেলেই সে বুঝতে পারতো। আদর ভালোবাসা দিতে কোন কার্পণ্য ছিল না। এখন তাকে চাইলেও পাওয়া যায় না। ইচ্ছে করছে, ধাক্কা দিয়ে শোভনকে জাগিয়ে দিতে। আবার ভাবল, কী লাভ। সাড়া তো দিবেই না। উপরন্তু, এমন বিরক্তি প্রকাশ করবে, তা নীলিমার জন্য হবে আরো অপমানকর। এসব ব্যাপারে তো কোন জোর চলে না!
নীলিমা যা ভেবেছিল তাই হলো। শোভন বিরক্ত হয়ে নীলিমার হাতখানি সরিয়ে দিয়ে পাশ ফিরে শুলো।
অভিমানে নীলিমার চোখ ভিজে এলো। সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিলিং এর দিকে।
শোভনের এমন উপেক্ষা আর অবহেলা ভীষণ কষ্ট দেয় তাকে। তারপরেও সে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে একই ছাদের নীচে। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কিইবা করার আছে মানিয়ে নেয়া ছাড়া। আর যাবেই বা কোথায় সে। কিন্তু এমন জীবন তো সে কখনই আশা করেনি। প্রায় দু বছর হয়ে গেল নীলিমা এসেছে এই দেশে। প্রথম প্রথম ওদের দিনগুলি বেশ আনন্দে কেটে যেত। কাজ থেকে ফিরে শোভন তাকে যথেষ্ট সময় দিত। মাঝে মাঝে খুনসুটি করতো। সমুদ্রের পাড়ে হেঁটে বেড়াত। সেই শোভন কেমন যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে নীলিমার কাছ থেকে। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে। প্রায়ই রাত করে। ছুটির দিনগুলিতেও চলে যায় বাইরে। নীলিমার দিনগুলি কাটে একাই। সে ভীষণ একা। মাঝে মাঝে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন সে একাই চলে যায় সমুদ্র পাড়ে। বুক ভরে বাতাস নেয়। তারপর ফিরে আসে তার ছোট্ট এপার্টমেন্টে।
শোভনের এমন পরিবর্তনের কি কারণ আছে সেটা সে এখনো জানে না। কাছের দু’এক জন মানুষের কাছ থেকে কিছু কান কথা তার কানে এসেছে কিন্তু সেসব নিয়ে শোভনের সাথে কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডায় সে যায় নি। সময়ের উপর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করছে নীলিমা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল নীলিমা। পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে রইল দূর সমুদ্রের দিকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল কবি মাহমুদ সাজ্জাদের কথা। কানে ভেসে এলো তার আবৃত্তি করা কবিতার পঙক্তি, ‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো, আমি বিষ পান করে মরে যাবো…’
ধীরে ধীরে নীলিমার বিষণ্ণতা কেটে গেল। মনে পড়ল কবির সাথে তার পরিচয় আর কথোপকথনের কথা। নীলিমা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে কবির কথা। কবি বললেন, ‘আপনি খুব সুন্দর, কি নাম আপনার?’ এটুকু ভাবতেই নীলিমার মন ভাল হয়ে গেল। সে ঘুরে একবার ঘুমন্ত শোভনের দিকে তাকাল। তারপর আবার ফিরে তাকিয়ে রইল দূর সমুদ্রের দিকে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের পানি চিক চিক করছে।
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-২)
with
no comment

