দীর্ঘসময় পার করে মেয়েটি এবার ছেলেটির বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে এলোমেলো পায়ে হেটে এলো এই বাড়িটির সদর দরজার দিকে। মেয়েটি দরজার কাছাকাছি আসতেই সফিকের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল যখন সে বুঝতে পারল ছায়া মানব-মানবী দুজন আর কেউ নয়—জেসমিন আর তার বন্ধু অ্যালেক্স! সফিক সরে যেতে চাইল কিন্তু পারল না। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রহমান সাহেব দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দেখলেন জেসমিন ওপরে উঠে আসছে সন্তর্পণে। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি ফিরে গেলেন তার রুমে। স্থির হয়ে বসলেন তার রিভলভিং চেয়ারে। প্রতি সপ্তাহের শুক্র আর শনিবার রাত তার জন্য অসহ্য রকমের একটি রাত হয়ে দেখা দেয়। তিনি সারারাত প্রায় জেগেই কাটান জেসমিনের ফিরে আসা পর্যন্ত। জেসমিন ফিরে এসে তার রুমে না ঢোকা পর্যন্ত পায়চারী করতে থাকেন। তারপর অবসাদগ্রস্ত শরীরটা এলিয়ে দেন বিছানায়। রাত জেগে থাকার শরীর তার নয়। এর আগে একবার একটা স্ট্রোক করেছে, সেটা ঐ জেসমিনের কারণেই। তবুও মেয়েটার চিন্তায় তার ঘুম আসে না। নির্ঘুম তাকিয়ে থাকেন যতক্ষণ মেয়েটা বাসায় ফিরে না আসে।
জেসমিন বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে উঠে এলো ওপরে। রহমান সাহেবের রুম পার হয়ে যেতে হয় তার রুমে। ওপরে উঠে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল সে—তার বাবার রুমের খোলা দরজার সামনে। কী মনে করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ভেতরে। রহমান সাহেবের চোখের দিকে চোখ পড়ে গেল তার। জবুথবু বসে রয়েছেন উদাসভাবে মানুষটি। তার নির্লিপ্ত দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না জেসমিন। চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে দ্রুত চলে গেল তার রুমে।
…
মায়াবী এক বিকেলে ডালাসের বিখ্যাত হোয়াইট রক লেকের ধারে সফিককে নিয়ে বেড়াতে এলো শারমিন। দুজন হাত ধরাধরি করে হাঁটছে লেকের পাড় ঘেঁসে। কিছুক্ষণ হেটে তারা এসে দাঁড়াল কাঠের তৈরি একটা পাটাতনের উপরে। সফিক মুগ্ধ হয়ে দেখছে চারিদিক। কী সুন্দর প্রকৃতি। পাটাতনের ওপর থেকে কিছু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে নিচের পানিতে ভেসে বেড়ানো একঝাক হাসের দিকে রুটি আর বিস্কিটের টুকরা ফেলে দিচ্ছে। পানিতে খাবার পাওয়া মাত্রই হাসেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাই দেখে বাচ্চাগুলোর খুশি আর ধরে না। তারা তুমুল আনন্দে রুটির টুকরা ফেলে যাচ্ছে। সফিক একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল সেদিকে। শারমিনও কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল তারপর সফিককে নিয়ে বসল লেকের পাড় সংলগ্ন একটা বেঞ্চে। ফ্লাস্ক থেকে ফোম কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল সফিকের দিকে। সে নিজেও এক কাপ নিল। সফিক চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বাহ, চা-টা তো মজার হয়েছে।’
সফিক এখন সবকিছুই ভালো লাগার স্টেজে আছে। যা দেখছে, ভালো লাগছে। যা খাচ্ছে, ভালো লাগছে। সব কিছুর মধ্যেই এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে সে। আমেরিকায় প্রথম প্রথম আসার পরে সবারই এরকম হয়। তারপর এক সময় রূঢ় বাস্তবতার সমীকরণ মেলাতে মেলাতে সব আনন্দ ফিকে হতে শুরু করে।
সফিকের সবকিছু ভালোলাগার বিষয়টা শারমিনও লক্ষ করেছে। এই চা-টা হুট করেই ভালো লাগার কথা না। তবুও সফিক বলল, চা-টা মজা হয়েছে। শারমিন মুচকি হেসে বলল, ‘তাই?’
‘হ্যাঁ। তবে, একটু অবশ্য ঝাল ঝাল লাগছে।’
‘ঝাল লাগছে কারণ এটা হলো স্পাইস টি। মশলা চা। তাই একটু ঝাল লাগছে এবং সেটাই এই চায়ের স্পেশালটি। কয়েকটা ছিপ নিলেই দেখবে ভালো লাগছে।’
সফিক চায়ের কাপে আবার চুমুক দিয়ে বলল, ‘খারাপ লাগছে না তো!’
শারমিন এক ঝলক সফিকের মুখের দিকে তাকাল। একটু হেসে নিজের কাপে ছোট করে চুমুক দিয়ে তাকাল লেকের দিকে। এরপর খানিকক্ষণ নীরবতা। চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চলল দুজনে—আনমনে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সফিক অসহিষ্ণু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা চলে গেছেন—আর এমন একটা খবর তুমি আমাকে জানাও নি। তোমরা এতো সহজে সব কিছু মেনে নিতে পারো?’
সফিকের হঠাৎ করে এমন প্রশ্নের জবাবে শারমিন প্রথমে কিছু বলল না—যেভাবে ছিল সেভাবেই তাকিয়ে রইল লেকের দিকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজেকে তৈরি করে নিল। সে জানে সফিক কোনো না কোনো সময় ঠিকই জানতে চাইবে। তাছাড়া জানার সে অধিকারও তার আছে। শারমিন নিজে থেকেই বলত কিন্তু বুঝতে পারছিল না কীভাবে বলবে। ভালোই হলো সে নিজেই জানতে চেয়েছে।
সফিক চায়ের কাপে পরপর দুবার চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখল। তারপর জিহ্বা দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে রইল শারমিনের মুখের দিকে।
খানিকটা ইতস্তত হয়ে শারমিন বলল, ‘মেনে না নিয়ে কী করার আছে বলো? বাবার সঙ্গে মায়ের বনিবনা হচ্ছিল না অনেকদিন থেকেই। বছরের পর বছর দু’জন মানুষ একই ছাদের নিচে থাকছে অথচ কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। একে অপরকে সহ্য করতে পারছে না। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাহীন কোন সম্পর্ক কি বেশীদিন টিকে বলো?’
সফিক হ্যাঁ বা না কিছু বলল না। চুপ করে রইল।
‘তাছাড়া, তেলে আর পানিতে কখনো মিশে না…’ এটুকু বলে শারমিন চুপ করে রইল।
সফিক বলল, ‘তেলে আর পানিতে মিশে না এ কথাটা ঠিক না। মিশে, তবে অনেক ঝাকাঝাকি করতে হবে।’
‘তা হয়তো হয়, তবে বাবা বেশি ঝাকাঝাকি পছন্দ করেন না।’
আবার কিছুক্ষণের নীরবতা। সফিক চায়ের কাপটা একবার মুখের কাছে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখল। কাপ খালি। শারমিন ফ্লাস্ক থেকে আরেকটু চা ঢেলে দিল সফিকের কাপে।
‘উনি এখন কোথায়?’
শারমিন ভ্রূ কুঁচকে মাথা তুলে তাকাল।
‘মানে আম্মা এখন কোথায়?’
‘তা জেনে তুমি কী করবে সফিক? হাতে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনবে?’ শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে জবাব দিল এবং পরক্ষণেই বুঝতে পারল, এভাবে জবাব দেয়াটা তার ঠিক হয় নি।
‘না না তা কেনো হবে? এমনি জানতে চাচ্ছিলাম আর কি। After all, my own Mother-In-Law.’
শারমিন ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে তাকাল সামনের দিকে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘আছে হয়ত কোথাও। কোথায় আছে সেটা জানার এখন আর আমাদের কোন ইন্টারেস্ট নেই।’
সফিক আর কোনো কথা বাড়াল না। চিন্তিত ভঙ্গিতে বাচ্চাদের হাসের রুটি খাওয়ানো দেখতে থাকল।
রহমান সাহেব তার পড়ার ঘরে একটা বই খুলে বসে রয়েছেন। শুক্রবার রাত। ডিনার শেষ করে তার বই পড়ার অভ্যাস। বিশেষ করে শুক্রবার আর শনিবার রাতে তার এই রুটিন। তাকে রাত জেগে থাকতে হয়। তার ছোট মেয়ে জেসমিন সপ্তাহের এই দু’রাত দেরি করে ফিরে। জেসমিনের বয়স এখন উনিশ। আঠারো হয়ে গেলেই এখানে সবাই প্রাপ্ত-বয়স্ক। তারা তখন স্বাধীন। নিজেদের মতো চলাফেরা করার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে যায়। তাদের তখন কিছু বলা যায় না। বাবা মায়েরা উৎকণ্ঠিত হওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু করতে পারে না। রহমান সাহেব উৎকণ্ঠা নিয়েই রাত কাঁটাতে থাকেন।
শারমিন এক গ্লাস পানি আর কিছু ওষুধ হাতে করে নিয়ে এসে ঢুকল রহমান সাহেবের ঘরে। শারমিন ঢুকতেই রহমান সাহেব বই নামিয়ে রেখে মেয়ের হাত থেকে ওষুধগুলো নিয়ে খেয়ে নিলেন।
‘বাবা, রাত অনেক হয়েছে, ঘুমাতে যাবে না?’ রহমান সাহেবের হাত থেকে পানির গ্লাসটা ফিরিয়ে নিয়ে শারমিন বলল।’
‘যাবো। ইন্টারেস্টিং একটা আর্টিক্যাল পড়ছিলাম। এটা শেষ করেই যাবো। এত তাড়া কিসের? কাল তো শনিবার, কাজে তো আর যেতে হবে না।’
‘কাজে যেতে হবে না বলেই কি রাত জেগে থাকতে হবে নাকি?’
রহমান সাহেব কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘সফিক কী করছে?’
‘কী আর করবে। সারাদিন তো ঐ একটাই কাজ—ইংরেজি শেখা। এখন খুব মনোযোগ দিয়ে মুভি দেখছে। ওর ধারণা মুভি দেখলেই ইংরেজি শেখাটা সহজ হবে। এই বাসার দুটো জিনিষ তার খুব পছন্দ। তোমার এই লাইব্রেরীটা আর আমার এন্টারটেইনমেন্ট রুমটা।’
‘তাই নাকি?’
‘হুম।’
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। রহমান সাহেব জানেন শারমিন এখন কী বলবে। এই একই কথা প্রতি শুক্রবার আর শনিবার রাতেই ওষুধ খাওয়াতে এসে একবার করে বলে।
শারমিন বলল, ‘জেসমিন এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। কেন শুধু শুধু দুচিন্তা করছো বাবা? তাছাড়া আজ শুক্রবার, ওকি আর এতো তাড়াতাড়ি ফিরবে? তুমি অযথা রাত জেগে শরীর খারাপ করো না।’
‘হ্যাঁ, মা জানি। তুই যা—আমি আর একটু পরেই শুয়ে পড়বো।’
শারমিন আর কথা না বাড়িয়ে বের হয়ে এলো। রহমান সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইলেন শারমিনের চলে যাওয়ার দিকে।
বরাবরের মতোই ভোর রাতে পার্টি শেষ করে বাসায় ফিরে এলো জেসমিন। পা টিপে টিপে ওপরে উঠে দ্রুত ঢুকে পড়ল তার রুমে।
শেষ রাতের দিকে রহমান সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে তিনি বিছানায় উঠে বসলেন। পাশের টেবিল রাখা পানির গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে পানি খেয়ে বসে রইলেন স্থির হয়ে। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন জেসমিনের রুমের দিকে। তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন গায়ের কাপড় না বদলিয়েই ঘুমিয়ে আছে কাচু মাচু হয়ে। কেমন অঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি। ওর কি শীত লাগছে? রহমান সাহেব ধীর পায়ে জেসমিনের বিছানার কাছে এলেন। পায়ের কাছ থেকে ব্লাঙ্কেটটি টেনে আলতো করে ওর গায়ের ওপর তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মাথায় একবার হাত রাখলেন মেয়েটির। তারপর যেভাবে এসেছিলেন তেমনি ধীর পায়ে বের হয়ে গেলেন।
মিক্সড কালচার (পর্ব-৩)
with
no comment

