mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-৩)

দীর্ঘসময় পার করে মেয়েটি এবার ছেলেটির বাহুবন্ধন থেকে নিজেকে মুক্ত করে এলোমেলো পায়ে হেটে এলো এই বাড়িটির সদর দরজার দিকে। মেয়েটি দরজার কাছাকাছি আসতেই সফিকের চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল যখন সে বুঝতে পারল ছায়া মানব-মানবী দুজন আর কেউ নয়—জেসমিন আর তার বন্ধু অ্যালেক্স! সফিক সরে যেতে চাইল কিন্তু পারল না। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
রহমান সাহেব দোতলার করিডোরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি দেখলেন জেসমিন ওপরে উঠে আসছে সন্তর্পণে। একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে তিনি ফিরে গেলেন তার রুমে। স্থির হয়ে বসলেন তার রিভলভিং চেয়ারে। প্রতি সপ্তাহের শুক্র আর শনিবার রাত তার জন্য অসহ্য রকমের একটি রাত হয়ে দেখা দেয়। তিনি সারারাত প্রায় জেগেই কাটান জেসমিনের ফিরে আসা পর্যন্ত। জেসমিন ফিরে এসে তার রুমে না ঢোকা পর্যন্ত পায়চারী করতে থাকেন। তারপর অবসাদগ্রস্ত শরীরটা এলিয়ে দেন বিছানায়। রাত জেগে থাকার শরীর তার নয়। এর আগে একবার একটা স্ট্রোক করেছে, সেটা ঐ জেসমিনের কারণেই। তবুও মেয়েটার চিন্তায় তার ঘুম আসে না। নির্ঘুম তাকিয়ে থাকেন যতক্ষণ মেয়েটা বাসায় ফিরে না আসে।
জেসমিন বিড়ালের মতো পা টিপে টিপে উঠে এলো ওপরে। রহমান সাহেবের রুম পার হয়ে যেতে হয় তার রুমে। ওপরে উঠে এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াল সে—তার বাবার রুমের খোলা দরজার সামনে। কী মনে করে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ভেতরে। রহমান সাহেবের চোখের দিকে চোখ পড়ে গেল তার। জবুথবু বসে রয়েছেন উদাসভাবে মানুষটি। তার নির্লিপ্ত দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না জেসমিন। চোখাচোখি হতেই দৃষ্টি সরিয়ে নিয়ে দ্রুত চলে গেল তার রুমে।

মায়াবী এক বিকেলে ডালাসের বিখ্যাত হোয়াইট রক লেকের ধারে সফিককে নিয়ে বেড়াতে এলো শারমিন। দুজন হাত ধরাধরি করে হাঁটছে লেকের পাড় ঘেঁসে। কিছুক্ষণ হেটে তারা এসে দাঁড়াল কাঠের তৈরি একটা পাটাতনের উপরে। সফিক মুগ্ধ হয়ে দেখছে চারিদিক। কী সুন্দর প্রকৃতি। পাটাতনের ওপর থেকে কিছু বাচ্চা ছেলে-মেয়ে নিচের পানিতে ভেসে বেড়ানো একঝাক হাসের দিকে রুটি আর বিস্কিটের টুকরা ফেলে দিচ্ছে। পানিতে খাবার পাওয়া মাত্রই হাসেরা ঝাঁপিয়ে পড়ছে। তাই দেখে বাচ্চাগুলোর খুশি আর ধরে না। তারা তুমুল আনন্দে রুটির টুকরা ফেলে যাচ্ছে। সফিক একদৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল সেদিকে। শারমিনও কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল তারপর সফিককে নিয়ে বসল লেকের পাড় সংলগ্ন একটা বেঞ্চে। ফ্লাস্ক থেকে ফোম কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল সফিকের দিকে। সে নিজেও এক কাপ নিল। সফিক চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘বাহ, চা-টা তো মজার হয়েছে।’
সফিক এখন সবকিছুই ভালো লাগার স্টেজে আছে। যা দেখছে, ভালো লাগছে। যা খাচ্ছে, ভালো লাগছে। সব কিছুর মধ্যেই এক ধরনের তৃপ্তি খুঁজে পাচ্ছে সে। আমেরিকায় প্রথম প্রথম আসার পরে সবারই এরকম হয়। তারপর এক সময় রূঢ় বাস্তবতার সমীকরণ মেলাতে মেলাতে সব আনন্দ ফিকে হতে শুরু করে।
সফিকের সবকিছু ভালোলাগার বিষয়টা শারমিনও লক্ষ করেছে। এই চা-টা হুট করেই ভালো লাগার কথা না। তবুও সফিক বলল, চা-টা মজা হয়েছে। শারমিন মুচকি হেসে বলল, ‘তাই?’
‘হ্যাঁ। তবে, একটু অবশ্য ঝাল ঝাল লাগছে।’
‘ঝাল লাগছে কারণ এটা হলো স্পাইস টি। মশলা চা। তাই একটু ঝাল লাগছে এবং সেটাই এই চায়ের স্পেশালটি। কয়েকটা ছিপ নিলেই দেখবে ভালো লাগছে।’
সফিক চায়ের কাপে আবার চুমুক দিয়ে বলল, ‘খারাপ লাগছে না তো!’
শারমিন এক ঝলক সফিকের মুখের দিকে তাকাল। একটু হেসে নিজের কাপে ছোট করে চুমুক দিয়ে তাকাল লেকের দিকে। এরপর খানিকক্ষণ নীরবতা। চুপচাপ চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে চলল দুজনে—আনমনে।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সফিক অসহিষ্ণু কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘আম্মা চলে গেছেন—আর এমন একটা খবর তুমি আমাকে জানাও নি। তোমরা এতো সহজে সব কিছু মেনে নিতে পারো?’
সফিকের হঠাৎ করে এমন প্রশ্নের জবাবে শারমিন প্রথমে কিছু বলল না—যেভাবে ছিল সেভাবেই তাকিয়ে রইল লেকের দিকে। কিন্তু ভেতরে ভেতরে নিজেকে তৈরি করে নিল। সে জানে সফিক কোনো না কোনো সময় ঠিকই জানতে চাইবে। তাছাড়া জানার সে অধিকারও তার আছে। শারমিন নিজে থেকেই বলত কিন্তু বুঝতে পারছিল না কীভাবে বলবে। ভালোই হলো সে নিজেই জানতে চেয়েছে।
সফিক চায়ের কাপে পরপর দুবার চুমুক দিয়ে কাপ নামিয়ে রাখল। তারপর জিহ্বা দিয়ে বিরক্তিসূচক একটা শব্দ করে উত্তরের অপেক্ষায় তাকিয়ে রইল শারমিনের মুখের দিকে।
খানিকটা ইতস্তত হয়ে শারমিন বলল, ‘মেনে না নিয়ে কী করার আছে বলো? বাবার সঙ্গে মায়ের বনিবনা হচ্ছিল না অনেকদিন থেকেই। বছরের পর বছর দু’জন মানুষ একই ছাদের নিচে থাকছে অথচ কেউ কারো সাথে কথা বলছে না। একে অপরকে সহ্য করতে পারছে না। শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাহীন কোন সম্পর্ক কি বেশীদিন টিকে বলো?’
সফিক হ্যাঁ বা না কিছু বলল না। চুপ করে রইল।
‘তাছাড়া, তেলে আর পানিতে কখনো মিশে না…’ এটুকু বলে শারমিন চুপ করে রইল।
সফিক বলল, ‘তেলে আর পানিতে মিশে না এ কথাটা ঠিক না। মিশে, তবে অনেক ঝাকাঝাকি করতে হবে।’
‘তা হয়তো হয়, তবে বাবা বেশি ঝাকাঝাকি পছন্দ করেন না।’
আবার কিছুক্ষণের নীরবতা। সফিক চায়ের কাপটা একবার মুখের কাছে নিয়ে আবার নামিয়ে রাখল। কাপ খালি। শারমিন ফ্লাস্ক থেকে আরেকটু চা ঢেলে দিল সফিকের কাপে।
‘উনি এখন কোথায়?’
শারমিন ভ্রূ কুঁচকে মাথা তুলে তাকাল।
‘মানে আম্মা এখন কোথায়?’
‘তা জেনে তুমি কী করবে সফিক? হাতে পায়ে ধরে ফিরিয়ে আনবে?’ শারমিন বিরক্ত কণ্ঠে জবাব দিল এবং পরক্ষণেই বুঝতে পারল, এভাবে জবাব দেয়াটা তার ঠিক হয় নি।
‘না না তা কেনো হবে? এমনি জানতে চাচ্ছিলাম আর কি। After all, my own Mother-In-Law.’
শারমিন ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে তাকাল সামনের দিকে। নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘আছে হয়ত কোথাও। কোথায় আছে সেটা জানার এখন আর আমাদের কোন ইন্টারেস্ট নেই।’
সফিক আর কোনো কথা বাড়াল না। চিন্তিত ভঙ্গিতে বাচ্চাদের হাসের রুটি খাওয়ানো দেখতে থাকল।
রহমান সাহেব তার পড়ার ঘরে একটা বই খুলে বসে রয়েছেন। শুক্রবার রাত। ডিনার শেষ করে তার বই পড়ার অভ্যাস। বিশেষ করে শুক্রবার আর শনিবার রাতে তার এই রুটিন। তাকে রাত জেগে থাকতে হয়। তার ছোট মেয়ে জেসমিন সপ্তাহের এই দু’রাত দেরি করে ফিরে। জেসমিনের বয়স এখন উনিশ। আঠারো হয়ে গেলেই এখানে সবাই প্রাপ্ত-বয়স্ক। তারা তখন স্বাধীন। নিজেদের মতো চলাফেরা করার পূর্ণ স্বাধীনতা পেয়ে যায়। তাদের তখন কিছু বলা যায় না। বাবা মায়েরা উৎকণ্ঠিত হওয়া ছাড়া আর তেমন কিছু করতে পারে না। রহমান সাহেব উৎকণ্ঠা নিয়েই রাত কাঁটাতে থাকেন।
শারমিন এক গ্লাস পানি আর কিছু ওষুধ হাতে করে নিয়ে এসে ঢুকল রহমান সাহেবের ঘরে। শারমিন ঢুকতেই রহমান সাহেব বই নামিয়ে রেখে মেয়ের হাত থেকে ওষুধগুলো নিয়ে খেয়ে নিলেন।
‘বাবা, রাত অনেক হয়েছে, ঘুমাতে যাবে না?’ রহমান সাহেবের হাত থেকে পানির গ্লাসটা ফিরিয়ে নিয়ে শারমিন বলল।’
‘যাবো। ইন্টারেস্টিং একটা আর্টিক্যাল পড়ছিলাম। এটা শেষ করেই যাবো। এত তাড়া কিসের? কাল তো শনিবার, কাজে তো আর যেতে হবে না।’
‘কাজে যেতে হবে না বলেই কি রাত জেগে থাকতে হবে নাকি?’
রহমান সাহেব কোনো জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলেন, ‘সফিক কী করছে?’
‘কী আর করবে। সারাদিন তো ঐ একটাই কাজ—ইংরেজি শেখা। এখন খুব মনোযোগ দিয়ে মুভি দেখছে। ওর ধারণা মুভি দেখলেই ইংরেজি শেখাটা সহজ হবে। এই বাসার দুটো জিনিষ তার খুব পছন্দ। তোমার এই লাইব্রেরীটা আর আমার এন্টারটেইনমেন্ট রুমটা।’
‘তাই নাকি?’
‘হুম।’
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতা। রহমান সাহেব জানেন শারমিন এখন কী বলবে। এই একই কথা প্রতি শুক্রবার আর শনিবার রাতেই ওষুধ খাওয়াতে এসে একবার করে বলে।
শারমিন বলল, ‘জেসমিন এখন যথেষ্ট বড় হয়েছে। কেন শুধু শুধু দুচিন্তা করছো বাবা? তাছাড়া আজ শুক্রবার, ওকি আর এতো তাড়াতাড়ি ফিরবে? তুমি অযথা রাত জেগে শরীর খারাপ করো না।’
‘হ্যাঁ, মা জানি। তুই যা—আমি আর একটু পরেই শুয়ে পড়বো।’
শারমিন আর কথা না বাড়িয়ে বের হয়ে এলো। রহমান সাহেব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তাকিয়ে রইলেন শারমিনের চলে যাওয়ার দিকে।
বরাবরের মতোই ভোর রাতে পার্টি শেষ করে বাসায় ফিরে এলো জেসমিন। পা টিপে টিপে ওপরে উঠে দ্রুত ঢুকে পড়ল তার রুমে।
শেষ রাতের দিকে রহমান সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। কিছুক্ষণ চুপচাপ শুয়ে থেকে তিনি বিছানায় উঠে বসলেন। পাশের টেবিল রাখা পানির গ্লাস থেকে ঢক ঢক করে পানি খেয়ে বসে রইলেন স্থির হয়ে। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেলেন জেসমিনের রুমের দিকে। তাকিয়ে দেখলেন জেসমিন গায়ের কাপড় না বদলিয়েই ঘুমিয়ে আছে কাচু মাচু হয়ে। কেমন অঘোরে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি। ওর কি শীত লাগছে? রহমান সাহেব ধীর পায়ে জেসমিনের বিছানার কাছে এলেন। পায়ের কাছ থেকে ব্লাঙ্কেটটি টেনে আলতো করে ওর গায়ের ওপর তুলে দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। মাথায় একবার হাত রাখলেন মেয়েটির। তারপর যেভাবে এসেছিলেন তেমনি ধীর পায়ে বের হয়ে গেলেন।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-২)

রাতে খাবার টেবিলে বসে সফিকের ভ্রমণ সংক্রান্ত দু’একটি কথা বলে চুপচাপ খেয়ে উঠে পড়লেন রহমান সাহেব। তিনি এমনিতেই কম কথার মানুষ। প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা বার্তা খুব একটা বলেন না। টুকটাক যা কথা হয়, তা ঐ বড় মেয়ে শারমিনের সঙ্গেই।
সফিক রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে খেতে খেতেই জিজ্ঞেস করল, ‘আব্বা, আপনার শরীরটা কি এখন একটু ভালো?’
‘শরীর ভালই আছে। তবে মনের অবস্থা ভালো না। আমি ভীষণ ক্লান্ত। এখানে আর ভালো লাগে না। অনেক বছর তো হলো।’
রহমান সাহেবের দিকে তাকিয়ে শারমিন বলল, ‘তোমার শরীর ভাল নেই বাবা। একবার একটা স্ট্রোক করেছে। কতবার বললাম, কিছুদিন রেস্ট নিয়ে তারপর কাজে ফিরো। তা না…’
‘চাইলেই কি আর রেস্ট নেয়া যায়রে মা। দেশটা যে আমেরিকা। কাজ নেই তো, ভাত নেই। কাজের বিনিময়ে খাদ্য। ফুড ফর ওয়ার্ক। হা হা হা।’
শারমিন কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘কেনো, আমার কাজে বুঝি ভাত আসবে না?’
রহমান সাহেব হাসলেন, কোনো উত্তর দিলেন না।
সফিক বলল, ‘না না, এ শরীরে আপনার আর কষ্ট করে কাজে যেতে হবে না। এখন তো আমি চলেই এসেছি। সব দায়িত্ব আমার। আপনি কিচ্ছু ভাববেন না।’
রহমান সাহেব মৃদু হেসে বললেন, ‘আচ্ছা, সে দেখা যাবেক্ষণ। সবে তো মাত্র এলে। সবকিছু আগে দেখো। দেশটাকে আগে জানো।’
সফিক বিজ্ঞের মতো আবার বলল, ‘আমেরিকা সম্পর্কে আর কি জানবো? এ দেশ সম্পর্কে এখন রাস্তার টোকাইরাও ভাল জানে। বাংলাদেশের প্রেসিডেন্টের নাম হয়তো অনেকে জানে না, কিন্তু ট্রাম্পের নাম ঠিকই জানে। হা হা হা…’
এরপর আর তেমন কোনো কথা হলো না। সফিক কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাল। একবার তাকাল রান্নাঘরের দিকে তারপর তাকাল ওপর তলার দিকে। তারমধ্যে কিঞ্চিত অস্থিরতা লক্ষ করা গেল। কিছু একটা ব্যাপার তাকে ভাবাচ্ছে। অনেকক্ষণ হলো সে এসেছে, কিন্তু এখন পর্যন্ত তার শাশুড়ির সঙ্গে তার দেখা হয় নি। সে কি বাসায় নেই, বাইরে অফিসে না অন্য কোনো কাজে তাও ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। সেও মুখ ফোটে জিজ্ঞেস করে নি। অবশেষে সে জিজ্ঞেস করেই বসল, ‘ইয়ে, আম্মা কোথায়? তাকে দেখছি না। শরীর-টরীর খারাপ নাকি?
সফিকের এমন হঠাৎ প্রশ্নে রহমান সাহেব অপ্রস্তুতভাবে তাকালেন শারমিনের দিকে। শারমিনও ঠাণ্ডা দৃষ্টিতে তাকাল তার বাবার দিকে। তারপর সফিকের দিকে ঘুরে বলল, ‘রান্না কেমন হয়েছে? এই প্রথম তুমি আমার রান্না খাচ্ছো। কিছু বললে না যে?’ শারমিন কথা ঘুরিয়ে নেবার চেষ্টা করছে সেটা স্পষ্ট বোঝা গেলেও সফিক আর কিছু বলল না। সে উত্তর দিল, ‘রান্না অতি চমৎকার হয়েছে। কিন্তু কেমন যেন একটা গন্ধ সবকিছুতেই।’
‘গন্ধ লাগছে?’
‘না মানে কেমন অন্যরকম যেন। ঠিক স্বাদ পাচ্ছি না।’
‘অস্বাভাবিক কিছু না। ধুলা-বালি, ঘাম আর নর্দমার গন্ধ থেকে এসে এখানকার গন্ধ তো একটু অন্যরকম লাগবেই। কয়েকদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
‘তা যা বলেছ। হা হা হা।’ সফিক বোকার মতো হেসে সায় দিল।

প্রায় মধ্য রাত।
শারমিনের রুমে মৃদু আলো জ্বলছে। সফিককে নিয়ে শারমিন তার রুমে এসে ঢুকল। বিছানার পাশের টেবিলে হরেক রকম নাম-না-জানা ফুলের মিশ্রণে তৈরি বেশ বড় একটি ফুলের তোড়া ফুলদানিতে সাজানো। সুন্দর পরিপাটি বিছানার ওপরে ছড়িয়ে আছে কিছু গোলাপের পাপড়ি। ঘরময় ফুলের মিষ্টি গন্ধে ম ম করছে। নাসারন্ধ্রে ঘ্রাণটা পৌঁছুতেই কেমন যেন পুরো শরীরে শিহরণ খেলে গেলো সফিকের। পরিবেশটা কেমন স্বর্গীয় অনুভূতিতে অন্য এক রঙ ধারণ করেছে–সেই রঙের নেই কোনো নাম, কল্পনাতেই যার অস্তিত্ব। স্যাক্সোফোনের একটা রোমান্টিক সুর ভাসছে মৃদু তালে। সফিক অবাক বিস্ময়ে পুরো বিষয়টা লক্ষ করে শারমিনের দিকে ঘুরে বলল, ‘তুমি তো দেখি বাসর ঘর বানিয়ে রেখেছো?’
শারমিন মৃদু হেসে বলল, ‘বিয়ের পর তোমার সাথে দেশে থেকেছি মাত্র তিন সপ্তাহ। তারপর দু’বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা। আজকের রাত তাই আমার কাছে বাসর রাতের মতোই।’
‘তা যা বলেছ। সত্যি আমেরিকার এই ভিসা দেয়ার সিস্টেমটা খুবই খারাপ। শরীর এবং মনের উপর ভীষণ চাপ পড়ে। বিয়ের পরে স্বামী স্ত্রীকে কেনো এতদিন অপেক্ষা করতে হবে?’
‘ঠিক বলেছ। সিস্টেমটা খুবই খারাপ।’
সফিক কিছু বলতে যাচ্ছিল তার আগেই শারমিন তাকে ধাক্কা দিয়ে বিছানায় ফেলে দিয়ে তার ওপরে চড়ে বসল। ঘটনার আকস্মিকতায় সফিক হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই সে তার দু’হাত প্রসারিত করে বুকে টেনে নিল তার প্রাণ প্রিয় স্ত্রীকে। সফিক আর শারমিন, দুটি মানুষ এই প্রথম অনুভব করল, জীবনে কত গান আছে, কত ফুল আছে, কত রূপ আছে, কত গন্ধ আছে। শারমিনের মুখে মিষ্টি হাসি। কোনো রকম ভূমিকা না করে সফিকের কাছে নিজেকে সমর্পণ করল সে। মুহূর্তে ডুবে গেল একে অন্যের মাঝে—এক অতল গহ্বরের শূন্যতার ভেতর।
ডালাসের উত্তরে অ্যাডিসন* নামক শহরের একটি আপস্কেল রেস্টুরেন্টে উদ্দাম মিউজিকের সাথে তালে তাল মিলিয়ে নেচে বেড়াচ্ছে উচ্ছল বেশ কিছু তরুণ তরুণী। সেই দলে জেসমিনকেও দেখা যাচ্ছে সাথে অ্যালেক্স সহ আরো বেশ কিছু আমেরিকান এবং মেক্সিকান বন্ধু।
*অ্যাডিসনকে বলা হয়ে থাকে ‘দি রেস্টুরেন্ট ক্যাপিটাল অফ টেক্সাস’, এখানে দুইশত’র উপরে রেস্টুরেন্ট আছে। মাত্র ৫ বর্গ মাইল জায়গা নিয়ে ছোট্ট এই শহরটিতে প্রায় ১৬,০০০ মানুষের বসবাস। তবে নাইট লাইফ এবং বিভিন্ন ধরনের রেস্টুরেন্টের কারণেই এই মিউনিসিপালিটি শহরের চাহিদা ডালাসবাসীদের কাছে অনন্য। তাছাড়া রয়েছে পার্ক এবং রিক্রিয়েশন সেন্টার। ‘ফোর্থ অফ জুলাই’তে আমেরিকার স্বাধীনতা দিবসের প্রাক্কালে এই শহরের যে ফায়ারওয়ার্কস হয় তা দেখার জন্য দূর-দূরান্ত থেকেও পর্যটকরা এসে থাকে।
আমরা ফিরে যাই গল্পে। জেসমিন কিছুক্ষণ পর পর উচ্চ স্বরে হেসে উঠছে। কয়েকজন ছেলে চেষ্টা করছে নাচের তালে তালে জেসমিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হবার কিন্তু অ্যালেক্স তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে লক্ষ রাখছে সেদিকে। এক পর্যায়ে সে জেসমিনের একটা হাত ধরে অন্য হাতে তার কোমর জড়িয়ে ধরে নিজের দিকে টেনে নিয়ে মিউজিকের সাথে তাল মিলিয়ে নেচে চলল।
সফিকের চোখে ঘুম নেই। এদিকে প্রায় ভোর হতে চলেছে। অনেক চেষ্টা করেও ঘুমাতে পারছে না। রাতের খাবার পর পরেই ঘুমিয়ে পরেছিল একবার—অনেক চেষ্টা করেও বসে থাকতে পারছিল না। এখন তার খেসারত দিচ্ছে। তার দু’চোখে ঘুমের রেশ মাত্র নেই। শারমিন ঘুমাচ্ছে তার পাশে। একবার ইচ্ছে হলো ওর ঘুম ভাঙিয়ে দিতে—পর মুহূর্তেই ভাবল থাক। সে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল মেয়েটির মুখের দিকে। অনেকক্ষণ স্পষ্ট চোখে তাকে দেখল, তার আকর্ষণীয় শরীর, রূপ, ভঙ্গিমা, যাবতীয় একাকার হয়ে সফিকের মাথা এলোমেলো করে দিল। সে এক হাত শারমিনের শরীরের ওপর দিয়ে টেনে আনল নিজের কাছে।
অস্বস্তিতে শারমিনের ঘুম ভেঙ্গে গেল। সে চোখ খুলে দেখল সফিক তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখে দুষ্ট হাসি। শারমিন ঘাড় ঘুরিয়ে সাইড টেবিলে রাখা এলার্ম ঘড়িতে সময় দেখল—৪টা বেজে ২০মিনিট। ঘুরে তাকাল সফিকের দিকে। প্রশ্ন বোধক চিহ্ন দিয়ে ভ্রূ নাচাল। সফিক হাসল, কিন্তু কিছু বলল না।
শারমিন ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘ঘুম আসছে না, না? দিন রাতের পার্থক্য। কিন্তু আমাকে তো ঘুমাতে হবে, সকালেই কাজ।’
‘এতদিন পরে আমি এলাম, আরেকটা দিন ছুটি নিতে পারলে না?’
‘পারতাম, তবে ইচ্ছে করে নেই নি। তুমি তো আর চলে যাচ্ছো না। বছরে ছুটি পাই মাত্র দশ দিন। বাবার স্ট্রোকের সময় চার দিন ইউজ করেছি। আজ একদিন, পাঁচদিন। বাকী পাঁচদিন রেখেছি তোমাকে নিয়ে ফ্লোরিডা যাবো বলে।’
‘মাই গড, একেবারে গুনে গুনে ছুটির ব্যবহার?’
‘এটা বাংলাদেশ নয় মিস্টার, আমেরিকা। We don’t have that kind of luxury here. উপায় কী বলো?
সফিক কী বলবে ভেবে পেল না। তাকিয়েই রইল শারমিনের মুখের দিকে।
শারমিন আবার বলল, ‘তুমি এক কাজ করো। লিভিং রুমে গিয়ে টিভি দেখো। ঘুম পেলে চলে এসো। দেখো, আবার কিন্তু আমার ঘুম ভাঙ্গানোর চেষ্টা করো না।’
‘সে গ্যারান্টি অবশ্য দিতে পারছি না।’ সফিকের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
শারমিন চোখ ঘুরিয়ে তাকাল সফিকের দিকে।
সফিক হেসে ফেলল, ‘না না ভাঙ্গাবো না। তুমি নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারো।’ বলেই রুম থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো সে।
‘শোন, নিচের টেবিলে খাবার রাখা আছে। খিদে পেলে খেয়ে নিও। গুড নাইট।’
‘গুড নাইট।’
লিভিং রুমের সোফায় বসে সফিক টিভি ছেড়ে দিল। কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না কী দেখবে? কোন চ্যানেলে কী দেখাবে তাও তো তার জানা নেই। সে একটার পর একটা চ্যানেল বদলাতে থাকল। কিছুক্ষণ চ্যানেল বদলিয়ে সে স্থির হলো মুভি চ্যানেলে। একটা লাভ মেকিং সিন হচ্ছে। সম্পূর্ণ নগ্ন শরীরে নারী-পুরুষের রতিক্রিয়া চলছে। সফিক স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল টিভি পর্দায়। কোথায় যেন একটা শব্দ হলো। সে দ্রুত চ্যানেলটি বদলিয়ে তাকাল এদিক-ওদিক। না কেউ নেই। সে আবার ফিরে এলো আগের চ্যানেলে। দৃশ্যটি নেই। সে আরো এক চ্যানেল পেছনে গেল, না নেই। আরো কয়েকবার চ্যানেল সামনে পেছনে করে ক্ষান্ত দিল।
টিভি দেখতে দেখতে হঠাৎ কেমন খিদে পেল সফিকের। রাতের খাবারের পর শারমিন তাকে কিচেনের কোথায় কী আছে দেখিয়ে দিয়েছে। সে উঠে গিয়ে কিচেন থেকে বিস্কিটের টিন নিয়ে এলো। কয়েকটি বিস্কিট খেয়ে এক গ্লাস পানি খেল সে। সময় কাটছে না একেবারেই। কিছু সময় পার করে সে এদিক ওদিক তাকাল। হঠাৎ লক্ষ করল লিভিং রুমের বড় জানালা দিয়ে গাড়ির আলো এসে পড়েছে। উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল সফিক। সামনের পার্কিং লটে একটা গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল এবং মুহূর্তেই থমকে গেল।
অন্ধকারে আবছা মত দুটি ছায়া যেন একে অপরের শরীরের সঙ্গে লেপ্টে আছে। কেমন পরিচিত লাগছে ছায়া দুটিকে।
সফিক স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না—এ সে কী দেখছে?

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Chinno

ছিন্ন

সেদিন আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না।
সকাল থেকেই খুব দুর্বল লাগছিল। মনটাও খারাপ ছিল। শরীর খারাপের সাথে মন খারাপের নিশ্চয়ই কোনো যোগসূত্র আছে। পিরিয়ড শুরু হলে মেয়েদের এক ধরনের মুড সুইং হয়, অবসাদ দেখা দেয়—ব্যাপারটা সে রকমও হতে পারে। তেমন কোনো কারণ ছাড়াই মন থাকে খারাপ।
আমি আমার দশ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে শুয়ে ছিলাম। আমার স্বামী বেডরুমে এসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল বাচ্চাটার মুখের দিকে। সে নিশ্চিত হতে চায় বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা। নিশ্চিত হতেই সে আমার হাত ধরে একটা টান দিয়ে বলল, ‘এসো।’
আমি জানি এই টানের অর্থ কী। যখন তখন তার ইচ্ছে হলেই এমন হাত ধরে সে টানাটানি করে। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার ধার সে কখনোই ধারে না। তার ইচ্ছেটাই আসল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার ইচ্ছেতেই সায় দিতে হয়। সে তার কাজ সেরে নেমে যায়, আমি পাথরের মত শক্ত হয়ে পড়ে থাকি। তাকে না করেও কোনো লাভ হয় না। তবুও আমি বললাম, ‘আজকে না।’
‘কেন? সমস্যা কী?’ বিরক্ত হয়ে সে জানতে চাইল।
‘শরীরটা ভালো লাগছে না।’
‘কী হয়েছে?’
‘কিছু হয়নি। এমনিই। ইচ্ছে করছে না।’
‘ইচ্ছে করবে না কেন? ইচ্ছে না করার কী আছে?’
‘আশ্চর্য, সব সময় কি সব কিছু ভালো লাগে?’
‘তোমার না লাগুক। আমার লাগে। আমার চাই এবং এখুনি।’ বলেই আমার দিকে অদ্ভুত চোখে একবার তাকাল।
আমি কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বললাম, ‘বাচ্চাটা মাত্র ঘুমলো।’ বলেই আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম।
‘এখনি ভাল সময়। ওর ঘুম ভেঙে গেলে তো তুমি আবার একটা অজুহাত বের করবে।’
‘থাকনা বাদ দাও আজকে।’
‘তুমি কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছ।’
‘একবার তো বলেছি না।’
‘বাট, আমি বলেছি হ্যাঁ। আর আমার হ্যাঁ মানেই হ্যাঁ—সেটা তুমি ভালো করেই জানো।’
আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। সে আবার বলল, ‘ইউ আর বাউন্ড টু লিসেন টু মি অ্যান্ড ফুলফিল মাই ডিজায়ার—এনিটাইম আই ওয়ান্ট।’
‘নো আই’ম নট। নট অলয়েজ!’ বলেই আমি রুম থেকে বের হয়ে গেলাম।
‘হোয়াট ডিড ইউ সে?’ বলেই সে বের হয়ে এলো আমার পিছে পিছে।
‘ইউ হার্ড মি!’ আমি ঘুরে দাড়িয়ে বললাম।
‘লিসেন, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ফোর্স, বাট…’
‘তুমি জোর খাটাতে চাও?’
‘প্রয়োজন হলে তাই করব। সে অধিকার আমার আছে।’
‘জোর খাটানোর অধিকার আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’
এভাবে আরো কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর এক পর্যায়ে আমি শান্ত স্বরে বললাম, ‘আমার পিরিয়ড হয়েছে।’
‘লায়ার!’ বলেই সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখের উপর এক দলা থুথু ছিটিয়ে দিল সে।
এবার সত্যি সত্যি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম আমি। লজ্জায় আর অপমানে আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। আমি শুধু বললাম, ‘ছিঃ।’
এবং সেটাই ছিল আমার শেষ কথা। এরপর আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ পাইনি। তার আগেই সে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল আমার গালে।
আমি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। অপমানে আমার চোখের প্রতিটা শিরা উপশিরা থেকে ঠিকরে পড়ল ঘৃণা। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। সে অগ্নিমূর্তি ধারণ করল এবং শুরু করল অকথ্য ভাষায় গালাগাল। তারপর এগিয়ে এলো সামনে। আমি জানি সে এবার কী করবে। আমি শিউরে উঠলাম ভয়ে। আমার শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে।
আমি বরফের মত জমে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুতেই পা দুটোকে নাড়াতে পারলাম না। সে এগিয়ে এলো হাত বাড়িয়ে। হঠাৎ আমার কী হলো জানিনা–আমার চুলের মুঠি ধরার আগেই আমি তার হাত ফসকে বেরিয়ে গেলাম। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলাম না। সে আমাকে জাপটে ধরে ধাক্কা মেরে ফেল দিল মেঝেতে। তারপর আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল দরজার কাছে।
বাচ্চাটার ঘুম ভেঙে যাবে সেই ভয়ে আমি কোনো রকম শব্দ না করে পড়ে রইলাম। সে আমার বুকে চেপে বসল এবং তার শক্ত হাত দুটো দিয়ে আমার গলা পেঁচিয়ে ধরল। আমি বুঝতে পারলাম কী ঘটতে যাচ্ছে। আমি তাকালাম তার চোখের দিকে। দেখলাম একটা মানুষ—যে কিনা আমার গর্ভজাত সন্তানের পিতা—সে খুনের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে।
তার হাতের চাপ ক্রমশই বাড়ছে। আমি দম আটকিয়ে পড়ে আছি। অনুভব করছি—আমার চোখের সামনে থেকে আলো সরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে আমার জগত। চিৎকার করার মত কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। আমার সমস্ত পেশি-ইন্দ্রিয় নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি কোনো গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছি। প্রাণপণে চেষ্টা করছি উপরে উঠে এক বুক নিঃশ্বাস নিতে—কিন্তু পারছি না।
হঠাৎ সমস্ত অন্ধকার ফুঁড়ে আমার ছেলেটার মুখ ভেসে উঠল। আমি কিছুক্ষণ দেখলাম—সে আমার জন্যে বিষাদে কাঁদছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে তার কান্নার শব্দ। আমি তার কান্না শুনতে পাচ্ছি—যদিও স্পষ্ট নয়। আমার শুধু একবার মনে হলো, আহা আমার বাচ্চাটা। আমি মরে গেলে ও কার কাছে বড় হবে?
আর তখনই যেন কোনো দেবদূতের আগমন ঘটল—না কি হলো জানি না, আমি অনুভব করলাম—আমার গলায় শক্ত হয়ে চেপে থাকা আঙ্গুলগুলো যেন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। গলার উপর থেকে পেঁচিয়ে থাকা হাত দুটো একটু একটু করে সরে গেল। বুকের উপর বসে থাকা ভার তখনও আছে। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকালাম–দেখলাম এক জোড়া নির্লিপ্ত চোখ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি আবার চোখ বন্ধ করলাম—এবং তখনই আমার বুকের উপর থেকে মস্ত বড় একটা ওজনদার বস্তু নেমে গেল। আমি নিঃসাড় পড়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম সদর দরজা খোলার শব্দ। বুঝলাম সে চলে গেল বাইরে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। আর তখনই আমার ছেলের কান্নার শব্দ ভেসে এলো আমার কানে। সে চিৎকার করে কাঁদছে। ছেলেটা যে অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদছে সেটা তার কান্নার শব্দ শুনলে কারোই বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। এবং আমিও বুঝতে পারলাম–ওর কান্নার কারণেই আজ আমি আমার জীবন ফিরে পেয়েছি। ওর কান্নার শব্দই ঐ পাষণ্ড লোকটাকে বিচলিত করেছে—একটু হলেও। সে হঠাৎ তার সম্বিত ফিরে পেয়েছে–তার হাত শিথিল হয়েছে–নেমে গেছে আমার বুক থেকে। কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ দিয়ে ছুটল অঝোর ধারা।
আমি দৌড়ে গিয়ে বুকে তুলে নিলাম আমার সোনা মানিককে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম দ্রুত—আমাকে পালাতে হবে। এখুনি এই মুহূর্তে।
জৈবিক কামনা নিবৃত্ত করতে না পেরে যে স্বামী তার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারে—সে এই কাজ আরো করবে, এতে কোনো ভুল নেই। একজন মানুষের পক্ষে অন্য আরেকজন মানুষের সব ইচ্ছা সব সময় পূরণ করা সম্ভব নয়। এটুকু বিবেক বোধ যার নেই—তার সঙ্গে আর এক মুহূর্ত থাকা নয়।
স্ত্রীর প্রতি যে স্বামীর বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। যে তার ঔরসজাত সন্তানের মায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে জানে না—তার সঙ্গে আর একদিনও নয়। এমন তো নয় যে আমি দিনের পর দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি–তার চাহিদা মেটাতে পারছি না। একদিন কি কারো খারাপ লাগতে পারে না? স্বামী-স্ত্রীর মিলন একটা পবিত্র ব্যাপার। ভালোবাসা-ভালোলাগার ব্যাপার। আনন্দের ব্যাপার। এখানে একজনের ইচ্ছা না হলে তার সঙ্গে জোরপূর্বক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে? একটা দিন কি নিজেকে নিবৃত্ত করা যায় না?
আমার অবচেতন মন সব সময় আমাকে সতর্ক করেছে–এমন একটা দিন হয়ত আসবে যে আমাকে সব কিছু ছিন্ন করে চলে যেতে হবে। এটা ঠিক আমরা সব সময় সচেতন মনের দ্বারা চালিত হই—সচেতন মন আমাদের সব কাজকে মনিটরিং করে যাতে কোনো ভুল না হয়। কিন্তু সবথেকে শক্তিশালী হচ্ছে অবচেতন মন। সচরাচর এর কাজ আমরা অনুভব করতে পারি না। কিন্তু আমরা যা করছি, যা কিছু দেখছি, যা কিছু বোঝার বা শেখার চেষ্টা করছি—এর সব কিছুই চালনা করে আমাদের অবচেতন মন।
ছেলেটাকে কোলে নিয়েই দ্রুত গুছিয়ে নিলাম আমার অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র। ছোট্ট একটা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম অনেক আগে থেকেই। তাতে আমার পাসপোর্ট, গ্রিনকার্ড, ছেলের বার্থ সার্টিফিকেট, একটা ছোট্ট নোটবুক, যেখানে আমার প্রতিটা ঘটনার বর্ণনা–কখন, কী ঘটেছে, আমার সঙ্গে কী করেছে—সব লিখে রেখেছি। ব্যাগের মধ্যে বেশ কিছু ডলারও রাখা আছে। কাজেই আমি আর কালক্ষেপণ না করে পিছনের দরজা খুলে বের হয়ে গেলাম এক কাপড়ে।
নির্জন অন্ধকার গলি দিয়ে পাগলের মত হাঁটছি আর ভাবছি—রাতটা কোনো রকমে কোথাও কাটিয়ে দিতে পারলেই হয়। কাল সকালে ঠাণ্ডা মাথায় সব ব্যবস্থা করা যাবে। এই শহরে আমার পরিচিত অনেকেই আছে, কিন্তু আমি এখানকার কারো সাহায্য নিতে চাই না। সাহায্যের হাত হয়ত বাড়িয়ে দেবে অনেকেই কিন্তু এক কান-দু’কান করে সে খবর পৌঁছে যাবে আমার স্বামীর কাছে। তারপর এক কথা দু’কথা, আলোচনা, সালিশ, পরামর্শ শেষে ফিরে যেতে হবে সেখানেই।
অবশ্য ৯১১ এ ফোন করলেই পুলিশ এসে আমাকে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে আমি যেখানে যেতে চাই সেখানে পৌঁছে দিত। আমার নিজের কোনো আত্মীয় বা পরিচিত কেউ না থাকলে তারা আমাকে নিয়ে যেত কোনো শেল্টার হোমে। চাইলে আমি তাকে অ‍্যারেস্ট করাতেও পারতাম। কিন্তু ওসব কোনো কিছুর মধ্যেই আমি গেলাম না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্জন গলির রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় চলে এলাম আমি। রাত তখনো গভীর হয়নি। রাস্তায় গাড়ি চলাচল করছে—মানুষজনও আছে। আমি চার রাস্তার সংযোগ স্থলের একটা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং মুহূর্তের মধ্যে একটা ট্যাক্সিক্যাব পেয়ে গেলাম। ড্রাইভারকে বললাম, ‘প্লিজ টেক মি টু এ হোটেল অর মোটেল ক্লোজ টু দ্য এয়ারপোর্ট।’
বুদ্ধিমান ড্রাইভার যা বোঝার বুঝে নিল—গাড়িতে উঠা মাত্রই সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। কয়েকবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে আমাকে দেখল সে। তারপর হাইওয়েতে উঠে সে মধ্যপ্রাচ্যীয় একসেন্টে জিজ্ঞেস করল, ‘ডু ইউ নিড এনি হেল্প? শুড আই কল দ্য পোলিছ?’
আমি বললাম, ‘নো। নো নিড। জাস্ট টেক মি টু এ হোটেল।’
‘ইয়েস ম্যাম। অন আওয়ার ওয়ে।’
‘থ্যাংকস।’
ট্যাক্সিতে উঠেই আমি ফোনের লোকেশন ট্র্যাকিং বন্ধ করে দিলাম। আমি কোথায় যাচ্ছি–কোথায় আছি সেটা কেউ জানুক আমি চাই না। ৩০ মিনিটের মধ্যেই ক্যাব ড্রাইভার আমাকে নিরাপদে এয়ারপোর্টের কাছে একটা হোটেলে পৌঁছে দিল।
হোটেলে চেক-ইন করেই আমি ফোন করলাম আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবীকে। সে থাকে অন্য একটা স্টেটের বড় একটা শহরে। ফোন ধরতেই প্রাথমিক দু‘একটি কথা শেষ করেই আমি বললাম, ‘কাল সকালেই তোর ওখানে আসছি। এসে সব বলবো। এই মুহূর্তে তুই কি আমাকে একটা হেল্প করতে পারবি?’
সে আমার কণ্ঠ শুনে কী বুঝল সেই জানে, তবে অন্য কোনো প্রশ্ন না করেই বলল, ‘বল, কী করতে হবে?’
‘আমাকে সকালের যে কোনো ফ্লাইটের একটা টিকেট কেটে দিতে পারবি?’
সে হেসে দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ পারব! এখুনি দিচ্ছি।’
‘কাটা হলে রিজার্ভেশন কোডটা টেক্সট করে দিস।’
‘আচ্ছা।’ একটু থেমে সে জানতে চাইল, ‘তুই এখন কোথায় আছিস?’
আমি সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বললাম, ‘আমি নিরাপদেই আছি। তুই ভাবিস না। কাল সকালে এসে সব বলবো।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। তুই সাবধানে থাকিস আর সমস্যা হলে আমাকে কল করিস।’
‘ঠিক আছে।’
ফোন কেটে দিয়ে আমি মনে মনে ভাবলাম, প্রতিটা মানুষের জীবনেই এমন একজন বন্ধু থাকা খুব দরকার। যে আগ বাড়িয়ে কিছু জানতে চাইবে না—কিন্তু যখন যতটুকু দরকার, শুধু চাইলে হলো। সাহায্যের হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকবে। সংকটের সময় পাশে থাকবে, বিপদে সাহস জোগাবে—এমন অনেক কিছু। এক বন্ধু যখন হতাশায় নিমজ্জিত কিংবা সংকটে বিপর্যস্ত, তখনই সেই একজনকে খুব বেশি দরকার।
আমি খুব সকালের ফ্লাইট ধরে চলে গেলাম বান্ধবীর শহরে। কিছুদিনের জন্যে অতিথি হয়ে রইলাম তার বাড়িতে। বেশিদিন অবশ্য থাকতে হয়নি। বান্ধবী আর তার স্বামী মিলে ওদের পরিচিত কয়েকজনের কাছে নিয়ে গেল। অল্পদিনেই আমি একটা কাজ জোগাড় করে ফেললাম। শুরু হলো আমার নতুন জীবন–লাইফ এজ এ ‘সিঙ্গেল মাদার’। সেই থেকে এক বেডরুমের ছোট্ট একটা এপার্টমেন্টে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে আছি। সুখে আছি কি-না জানি না, তবে কোনোরকম কষ্টে নেই একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।

তিন বছর আগে আমি আমার সুন্দর ছবির মত বাড়ি, নিজ হাতে গোছানো সংসার পেছনে ফেলে এক কাপড়ে যখন বের হয়ে এসেছিলাম—ভেবেছিলাম সেটাই ছিল আমার ‘আমেরিকার স্বপ্ন’ পূরণের শেষ দিন। আমি তখনো জানতাম না আমার ভবিষ্যৎ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারের কথা চিন্তা করে আমি আমার নিজের অস্তিত্বকে বিকিয়ে দেয়নি। নিজেকে ছোটো করিনি। সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে আসাটা কোনো সহজ কাজ ছিল না।
আমি অনেক বার ভেবেছি—আমি যা করেছি তা কি ঠিক ছিল? মানুষটাকে কি আর এক বার সুযোগ দেয়া যেত না? শত হলেও সে আমার সন্তানের বাবা। আমার ছেলেটা তার বাবার আদর ছাড়াই বড় হবে। তবুও আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছি।
যে সব শিশু পারিবারিক সহিংসতা দেখে বড় হয়, তাদের মানসিক অবস্থাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা সহিংসতা প্রবণ হয়। দুর্বলের উপর, বিশেষ করে নারীর উপর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণের এক অসুস্থ প্রবণতা তৈরি হয় এই সব শিশুদের মনে।
সন্তানের চোখের সামনে, বাবার হাতে মা নির্যাতিত হচ্ছে। সন্তান দেখে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে রাখছে—যাতে দেখতে না হয় বাবার ভয়ংকর রূপ আর মায়ের ভয়ে চুপসে যাওয়া মুখ। একজন অসহায় সন্তান কিছুই করতে পারছে না তার মায়ের জন্যে! আমার সন্তানকে সেই অসহায়ত্বের যন্ত্রণা সারা জীবন কুড়ে কুড়ে খাবে—সেটা অন্তত আমি হতে দেয়নি।
ঐ রাতের পর থেকে আমার গায়ে কেউ হাত তোলেনি। কারো চোখ রাঙানো দেখতে হয়নি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ আমাকে কোনো কিছুর জন্যে জোর করেনি। কেউ আমার বুকে চেপে বসেনি। কারো হাতের দশটি আঙ্গুল শক্ত করে আমার গলায় চেপে ধরেনি। কেউ আমার নিঃশ্বাসও রোধ করতে পারেনি।
আমি জানি আমার মত এমন আরো অনেক মেয়েই আছে যারা প্রতিদিন এমন নির্যাতনের শিকার হয়, হচ্ছে—তাদের প্রতি আমার একটাই অনুরোধ, শোনো বোনেরা–সে, তোমার স্বামী, হবু স্বামী, বন্ধু যেই হোক না কেন, যদি তোমার গায়ে একদিন একবার হাত তোলে—জেনে রেখো, সে সেই কাজটি আরো করবে, প্রায়ই করবে, কারণে অকারণে করবে। সে যদি তোমার গায়ে একবার হাত তোলে, দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে—দৌড়াও। প্রথম সুযোগেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই পালানোর কোনো বিকল্প নেই। যদি বাঁচতে চাও–পালাও।
ভুলেও ভেবো না যে সে ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হবে না। ঠিক হয় না। ঠিক হয় নাই। কোনোদিনও।
যেই প্রত্যাশা অবাস্তব তা করলে ঠকতে হবে নির্ঘাত।
যে সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নেই সে সম্পর্ক কখনোই সুস্থ হতে পারে না। ভালোবাসা একটু কম হলেও ক্ষতি নেই কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ থাকতেই হবে। না হলে সেই সম্পর্কের মৃত্যু ঘটবেই।
—————————-————————
(একটি সত্যি ঘটনার অনুপ্রেরণায়…)
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পৃথিবীর সব নারীকে শুভেচ্ছা দিচ্ছেন ভালো কথা… কিন্তু আপনার নিজের ঘরে যে নারী রয়েছে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিচ্ছেন তো?
গল্পটি এবারের একুশে বইমেলা ২০২০ তে প্রকাশিত আমার ছোট গল্প সংকলন ‘ধূসর বসন্ত’তে সংকলিত হয়েছে

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (শেষ পর্ব)

অনেকক্ষণ আগেই সূর্য ডুবে গিয়েছে। শান্ত নীল সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশটা মেঘে ভরে আছে। মেঘ জমেছে হাসানের মনেও।
শিকাগো ডাউন-টাউনের সারিসারি অট্টালিকা পেছনে ফেলে লেক মিশিগানের তীর ঘেঁষে লেক শোর ড্রাইভ দিয়ে এগিয়ে চলেছে হাসানের বিএমডব্লিউ।
কিছুক্ষণ আগে সে অপলাকে নামিয়ে দিয়ে এসেছে শিকাগো রিভার সংলগ্ন ডাউনটাউনে অবস্থিত বিখ্যাত হোটেল হায়াত রিজেন্সিতে। বিদায় নেবার সময়ও হাসান ভাবতে পারছিল না—অপলা আবার এভাবে দূরে চলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হয় মাঝে মাঝে—সে যত কঠিন আর নির্মম হোক না কেন।
হাসান একবার বলেছিল অপলাকে কনফারেন্স শেষ করে আর কয়েকটা দিন থেকে যেতে। কিন্তু অপলা কোনো উত্তর দেয়নি—চুপ করে থেকেছে। মৌনতা সব সময় সম্মতির লক্ষণ নয়। মৌনতা কখনো কখনো অপরাগতারও লক্ষণ। হাসান বুঝে গেল অপলার নীরবতার অর্থ। তাই ব্যর্থ মনোরথ হয়েই ফিরে যাচ্ছে সে—ভগ্ন হৃদয়ে।
বাসায় ফিরে হাসান দেখল রুবেল দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে হাসান কিছু বলল না। রুবেল এগিয়ে এসে গাড়িতে উঁকি দিল। দেখল, অপলা নেই। সে মাথা ঝাঁকিয়ে জানতে চাইল, ‘ভাবী কই?’
হাসান বোকার মতো তাকিয়ে রইল রুবেলের দিকে। সে কোনো উত্তর দিল না।
রুবেল বলল, ‘ওই মিয়া, ভাবীরে কই রাইখা আসলেন?’
‘ডাউন-টাউন—হায়াত রিজেন্সীতে।’ থমথমে গলায় বলল হাসান।
‘ঐখানে কি?’
‘ওর কনভেনশন আছে কাল-পরশু দুইদিন।’
‘তাইলে আপনি ফিরে আসলেন ক্যান—তার সাথে থাকতেন? আরে ফাইভ স্টার হোটেলে থাইকা রোমাঞ্চ করার চান্সটা মিস করলেন মিয়া। ধুর, আপনারে দিয়া কোনো কাম হইব না।’
হাসানের হঠাৎ মনে হলো, তাই তো, রুবেল তো ঠিকই বলেছে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, অপলাকে বললে সে কি রাজী হতো?
হাসান বলল, ‘আরে না। তাই হয় নাকি। ওর হয়তো অফিস কলিগদের সাথে মিটিং থাকতে পারে। তাছাড়া এসব কনভেনশনে গ্রুপ ডিনার থাকে—আমি থাকলে শুধু ঝামেলাই হতো।’
‘আচ্ছা বাদ দেন। জিনিসটা কাজে লাগাইছিলেন?’
‘কোন জিনিসটা—কিসের কথা বলছ?’ ভ্রূ কুঁচকে হাসান জানতে চাইল।
‘আরে কালকে আপনেরে দিয়ে গেলাম না—প্যাকেট? দুই একটা কাজে লাগাইছেন?’ রুবেল অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসছে।
হাসান কী বলবে ভেবে পেল না। অন্য কোনো সময় হলে রুবেলের উপর বিরক্ত হতো সে। কিন্তু কিছু বলল না। হাসানের কথা বলার মুড নেই—আবার রুবেলকে চলে যেতেও বলছে না।
‘হাসান ভাই, ঐ কনভেনশন না কনফারেন্স—ঐটা শেষ হইলে ভাবীর জন্যে একটা বারবিকিউ পার্টি দিতে হবে বুচ্ছেন। যূঁথীরেও আসতে বলব। ভাবীর সাথে পরিচয়টা হইল—তখন তার কথা বলার একটা সঙ্গী হবে। ঠিক আছে না?’
‘কিন্তু অপলা তো আসছে না। কনফারেন্স শেষ করেই ফিরে যাবে।’
‘মানে? বুঝলাম না—ফিরে যাবে মানে?’ রুবেল এমন ভাবে তাকাল হাসানের দিকে—যেন হাসান হিব্রু কিংবা অন্য কোনো দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে। সে মাথা চুলকে কিছু একটা বলতে যাবে আর ঠিক তখনই যূঁথীর ফোন এলো। রুবেল ফোন ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘যূঁথী, তোমারে একটু পরে কল দিতেছি। একটা ঝামেলার মধ্যে আছি।’
‘তুমি এখন কোথায়?’ ফোনের ভেতরে দিয়ে যূঁথীর কণ্ঠ শোনা গেল।
‘কোথায় আবার—হাসান ভাইর এখানে। তোমাকে না বললাম—একটা ঝামেলা মধ্যে আছি।’
‘কিসের ঝামেলা?’
‘আছে, তুমি বুঝবা না। আর সব কথা তোমার শুনতে হবে?’
‘হ্যাঁ হবে।’
‘আমি এখন রাখি—পরে কথা হবে।’
‘এই তুমি ফোন রাখবা না। তুমি এখুনি আসো—তোমার সাথে আমার কথা আছে।’
রুবেল ফোন চাপা দিয়ে তাকাল হাসানের দিকে। হাসান তাকে ইশারায় চলে যেতে বলল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘ঠিক আছে, আসতেছি—বেশিক্ষণ কিন্তু থাকতে পারব না।’
রুবেল চলে যেতেই হাসান ঘরে ঢুকে বসে রইল চুপচাপ। ক্ষণে ক্ষণেই অপলার কথা মনে হচ্ছে তার। দীর্ঘ সময় পার করে হাসান প্রস্তুতি নিল এক দীর্ঘ রাতের প্রতীক্ষায়। মাঝে মাঝে কোনো কোনো রাত খুব দীর্ঘ মনে হয়। আজ এমনই একটা রাত এবং সে জানে আজ রাতটি তার অস্থিরতায় কাটবে। এতদিন পর অপলা ফিরে এসেছিল, এসে আবার চলেও গেল। দুটো দিন বেশ কেটেছে তার—অপলার সান্নিধ্যে।
রাতে ঘুমানোর আগে অপলা ফোন করল হাসানকে।
হাসানের ক্ষীণ আশা ছিল, অপলা হয়ত একবারের জন্যে হলেও তাকে ফোন করবে। ফোনটা তাই বিছানায় নিয়েই সে ঘুমাতে গেল। অপলার ফোন পেয়ে হাসান উঠে বসল। হাসানের সঙ্গে সময়টা তার ভাল কেটেছে এবং হাসান তাকে সময় দিয়েছে এজন্য সে কৃতজ্ঞ—শুধু এটুকু বলার জন্যেই অপলার ফোন করা। খুব সকালে কনফারেন্সের রেজিস্ট্রেশন আর ব্রেকফাস্ট মিটিং—তাই বেশি কথা বলার সুযোগও হলো না অপলার। সে গুড নাইট বলে ফোন কেটে দিল।
স্বাভাবিক ভাবেই রাতে ভাল ঘুম হলো না হাসানের। এবং কয়েকবার ঘুম ভেঙেও গেল। অনেকটা নির্ঘুম রাত কাঁটিয়ে শেষ রাতের দিকে সে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।
খুব সকালে হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল আচমকা।
অনেকক্ষণ থেকেই তার ফোন বেজে চলেছে। সে ফোনটা নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে অপলা বলল, ‘কতক্ষণ থেকে ডোর বেল বাজাচ্ছি—নক করছি, দরজাটা খোলো।’
‘মানে কি?’ হাসান বলল অবাক হয়ে।
‘মানে হচ্ছে আমি তোমার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি—দরজাটা খুলো। খুলেই দেখো।’
‘কী? এক মিনিট, আমি আসছি।’ হাসান দ্রুত সিঁড়ি বেঁয়ে নেমে দরজা খুলতেই তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
এটা যে স্বপ্ন ছিল সেটা বুঝতে কিছু সময় লাগল হাসানের। সে সাইড টেবিল থেকে পানির বোতল নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে অন্ধকারের মধ্যে তাকিয়ে রইল শূন্যে।র

অনেকক্ষণ ধরে দরজায় ঠকঠক আওয়াজ করছে কেউ।
এক রাতেই হাসানের হেলুসিনেশনের মতো কিছু হয়ে গেল। কোথাও কোনো শব্দ হলেই তার মনে হচেছ—এই বুঝি অপলা ফিরে এসেছে। ক্লিয়ার সাইন অফ অডিটরি হেলুসিনেশন।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল—সকাল আটটাও বাজেনি। কাল রাত থেকেই মনটা ভীষণ বিক্ষিপ্ত ছিল হাসানের। স্বপ্নের কথা ভেবেও খানিকটা মন খারাপের মতো হলো।
রাতে একেবারেই ঘুম হয়নি তাই এখন এতো সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় মেজাজ খারাপ হলো খুব। তার ধারণা এটা রুবেলের কাজ। সাত সকালে এসে হাজির হয়েছে। এই ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না। এত বিরক্ত করতে পারে। এর আক্কেল জ্ঞান যে আর কবে হবে কে জানে।
এবার ডোর বেলের আওয়াজ শোনা গেল। কে আসল এই ভাবতে ভাবতে হাসান নেমে এলো ওপর থেকে। আচ্ছা, সত্যি সত্যি অপলা এলো নাকি? হতেও তো পারে। কে জানে সে হয়ত মাইন্ড চেঞ্জ করেছে—বলা তো যায় না। মানুষের মন বলে কথা। নাহ, তাই বা কী করে হবে—এতক্ষণে ওর কনফারেন্স শুরু হয়ে যাবার কথা। এটা রুবেল না হয়েই যায় না। আজকে এই ছেলের খবর আছে। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে সে। দিস নিড টু বি স্টপড!
অত্যন্ত বিরক্ত চেহারা নিয়ে দরজা খুলে ভুত দেখার মতো চমকে উঠল হাসান। সত্যি সত্যি অপলা দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। কালো ট্রাউজার, কালো ব্লেজার আর অফ হোয়াইট রঙের টপস পড়ে দাঁড়ানো মেয়েটিকে অপলার মতই লাগছে। হাসান দু’হাতে চোখ কচলে দেখল এবং নিশ্চিত হলো যখন অপলা বলল, ‘কি, সাত সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম?’
হাসানের ঘোর কাটতে সময় লাগল। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে এখনো তাকিয়ে আছে অপলার দিকে।
‘কি ব্যাপার, ভেতরে ঢুকতে দেবে নাকি দাঁড়িয়েই থাকব এখানে?’
হাসান সরে দাঁড়াতেই অপলা ভেতরে ঢুকে পড়ল। হাসান কোনো কথা না বলে অপলার লাগেজ নিয়ে পেছনে পেছনে ঢুকল।
অপলা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সেদিন যা যা বললে তা কি ঠিক?’
হাসানের মুখের হাসি বিস্তৃত হলো। সে বলল, ‘তোমার এখনও সন্দেহ আছে?’
অপলা মাথা নেড়ে জানাল, না।
‘তোমাকে আমার ভীষণ প্রয়োজন, অপলা। এবার যখন পেয়েছি আর হারাতে চাইনা।’
‘আমিও না।’
‘তোমার কনফারেন্স?’ অপলার প্রফেশনাল আউটফিটের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল হাসান।
‘ম্যানেজ করে এসেছি।’
‘তোমাকে ফিরে যেতে হবে না?’
‘না।’
সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে অপলা তার টিম ম্যানেজারকে বলেছে, কাজটা সে আর করতে চায় না। কারণটা পারসোনাল এবং ফ্যামিলি রিলেটেড তাই ডিটেইল বলা যাচ্ছে না বলে সে দুঃখিত। ম্যানেজার বলল, কনফারেন্সটা শেষ করে যাও। ও বলল, কাজটাই তো ছেড়ে দিচ্ছি। শুধু শুধু কনফারেন্সে থেকে আর কী হবে? অপলা দেরি না করে রুম চেক-আউট করে একটা ক্যাব নিয়ে চলে এসেছে হাসানের বাসায়।
হাসানের অবাক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে অপলা আবার বলল, ‘কাজটা আমি ছেড়ে দিয়েছি।’
‘সিরিয়াসলি!’
‘হ্যাঁ।’
‘সো, দিস ইজ ফর রিয়েল? আই মিন উই আর ফ্যামিলি এগেইন?’
‘কোনো সন্দেহ আছে?’
‘এখন আর নেই।’ বলেই হাসান হাসল। তার মুখটা প্রশস্ত করে দুই ঠোঁটে লেপ্টে এক নিদারুণ ভঙ্গিমায় হাসতে থাকল সে—সম্ভবত পৃথিবীর প্রশস্ত হাসি।
রাতের ডিনার শেষ করে পেছনের ছাওনির নীচে বসে আছে হাসান আর অপলা—হাতে গ্রিন টি।
আজকের সন্ধ্যা-রাতটা অন্যরকম। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর আকাশে একটি বিরল চাঁদ উকি দিয়েছে। ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে উঠছে। আকাশে কিছুটা কুয়াশা থাকায় সন্ধ্যার পরপরই চাঁদটি দেখা যায়নি।
দুজনের কেউ কোনো কথা বলছে না—শুধুই অনুভব করছে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। শুধু কিছু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
অনেকক্ষণ থেকেই হাসান উসখুস করছিল—অপলাকে একটা কথা বলতে চায়। নীরবতা ভেঙ্গে সে বলল, ‘অপলা, তুমি কি জানো আমি কতটা খুশি হয়েছি।’
‘জানি।’ একটু থেমে অপলা বলল, ‘তুমি কি জানতে আমি ফিরে আসব?’
‘একবার মনে হয়েছিল। আবার মনে হয়েছিল নাও আসতে পারো।’
‘তার মানে আমি ফিরে না এলেও তুমি কিছু বলতে না?’
হাসান কোনো উত্তর দিতে পারল না।
‘শোনো হাসান, নিজের অধিকারটা নিজেকেই আদায় করে নিতে হয়। মাঝে মাঝে চেয়ে নিতে হয়। তুমি কি ভেবেছ, না চাইতেই সব কিছু পেয়ে যাবে? সব কিছু কি এতো সহজ?’
হাসান চুপ করে রইল।
অপলা আবার বলল, ‘তুমি আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলে—কিন্তু তুমি আমাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ দেখাও নি কোনোদিন—কোনো উদ্যোগও নাও নি, কেন?’
হাসান মিন মিন করে বলল, ‘তুমি যদি না আসতে চাও…’
অপলা হাসানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘না আসতে তো চাইতেই পারি, তাই বলে তুমি বলবে না? নাকি বললে তোমার ইগো তে লাগত—নিজেকে ছোট মনে হতো?’
হাসান উত্তর দিল না।
‘কেন, তুমি জোর করতে পারতে না?’
‘তুমি তো জানই আমি কোন কিছু নিয়ে জোর করাটা পছন্দ করিনা।’
‘জানি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে জোর খাটাতে হয়। নাহলে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হতে হয় জীবনে। ভালবাসার জোর—ভালবাসা দিয়ে ভালবাসা আদায় করতে হয়, এটা কি তুমি বোঝ?’
‘বুঝি তো।’
‘তাহলে?’
অপলার হঠাৎ মনে হলো—ধ্যাত, এই মানুষটার সাথে রাগ করে লাভ নেই। আজকের এই মুহূর্তটাকে কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না। সে প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘আচ্ছা, রুবেলের ব্যাপারটা কি বলতো? ও আসলেই তোমাকে খুব পছন্দ করে তাই না?’
‘কেন রুবেল কি করেছে আবার?’
‘কি আর করবে? তুমি যা পারো নি—সেটা সে করেছে।’
‘মানে কি?’
অপলা কিছু বলল না। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
হাসান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে সে বলল, ‘রুবেল আর যূঁথী কাল রাতে হোটেলে গিয়েছিল—আমার সঙ্গে দেখা করতে।’
‘কি?’
‘ঠিকই শুনেছ।’
‘কিন্তু কেন?’
‘তোমার হয়ে ওকালতি করতে। আমার বিরহে তুমি পাগল হয়ে আছো সেটা বলতে। আমার ফোন পেয়ে তুমি কেমন অস্থির হয়েছিলে সেটা জানাতে।’
‘তাই বুঝি?’ হাসান লজ্জা পেয়ে হাসল। সে অবাক হয়ে ভাবছে। রুবেলের প্রতি ভেতরে ভেতরে কৃতজ্ঞ বোধ করল। রুবেল যা করেছে তা ছিল তার ভাবনার বাইরে।
অপলা আর কিছু বলল না। মিটি মিটি হাসল শুধু।
এমন সময় অপলার ফোন এলো। ওরিগন থেকে তার বান্ধবী শিল্পীর ফোন। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দিতেই হাসান জানতে চাইল, ‘কার ফোন ছিল?’
‘শিল্পীর। আমি এখন ফিরে যাচ্ছি না শুনে রাইসা অনেক কান্না কাটি করছে।’ একটু চুপ থেকে অপলা বলল, ‘মেয়েটা আমাকে ভীষণ মিস করবে।’
হাসান বলল, ‘তুমি রাইসাকে মিস করবে না?’
‘অবশ্যই করব বাট আই হ্যাভ এ বেটার আইডিয়া।’
‘রিয়েলি? হোয়াট’স দ্যাট?’
‘হাউ’বাউট উই হ্যাভ আওয়ার অউন রাইসা? তুমি আমাকে আমার নিজের একটি রাইসা এনে দিতে পারো না?’
‘কেনো পারব না?’
‘তাহলে আর দেরী কেন?’ অপলার ঠোটে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি খেলা করল।
হাসান হাত বাড়িয়ে দিল—অপলা ধরল সে হাত। তাঁরা দুজন দুজনের কোমর জড়িয়ে ধরে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর।
একটি রৌদ্রকরোজ্জ্বল শুভ্র সকাল আর রূপালী দুপুর পেরিয়ে হাতছানি দিচ্ছে এক কুয়াশাচ্ছন্ন মায়াবী রাত—আজকের পুরো সময়টা কেবলই ভালবাসার ক্ষণ। আজকের রাতটা হবে অন্যরকম। আজকের রাত শুধুই ভালবাসার রাত—ভালবাসাবাসির রাত।
হাসান আর অপলা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তেই যেন আকাশ ফুঁরে বের হয়ে এলো রুবেল। সে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাক এতদিনে দুইজনের অপেক্ষার পালা শেষ হইছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌! এবার ডাইরেক্ট একশন!’ বলেই সে নিশ্চিন্ত মনে তার ভক্সওয়াগন স্টার্ট দিয়ে ভটভট করে চলে গেল হাসানের বাসার পেছনের গলির ভেতর থেকে।
রুবেল গাড়িতে উঠেই উচ্চ কণ্ঠে গেয়ে উঠল, ‘আজ পাশা খেলব রে শ্যাম… ও শ্যামরে তোমার সনে… একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম…’
কিছুক্ষণের মধ্যেই রুবেলের গাড়ি হাসানদের আবাসিক এলাকা ছেড়ে হারিয়ে গেল হাইওয়েতে।
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৬)

অপলার ফোন বাজতেই হাসান চমকে উঠল। একটু ইতস্তত করে সে তাকাল অপলার দিকে।
অপলা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল হাসানের মুখ ঠিক তার মুখের সামনে। বেরসিক ফোনটি বেজেই চলেছে।
‘এক্সকিউজ মি’ বলে ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল অপলা। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফোন কানে লাগিয়ে বলল, ‘Hello?’
ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলল। কিছুক্ষণ শুনে অপলা বলল, ‘Oh, I miss you too.’ ওপাশের মানুষটি আবার কিছু বলল। অপলা উত্তর দিল, ‘Okay, I’ll be back in couple of days.’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘I love you too!’
এ পর্যায়ে হাসান তাকাল অপলার দিকে—চিন্তিত ভঙ্গিতে। অপলার মুখে ‘আই লাভ ইউ টু’ শুনে তার মাথায় নতুন চিন্তা শুরু হলো। কার ফোন—কে হতে পারে, যাকে অপলা বলতে পারে আই লাভ ইউ টু?
অপলা কথা শেষ করে ফোন কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে উপলব্ধি করল—এসময়ে ফোনটা না এলে কী হতো!
হঠাৎ করেই একটা অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে গেল ঘরটাতে। হাসান তাকিয়ে আছে অন্যদিকে।
অপলা তাকাল হাসানের দিকে। হাসানের চেহারায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দিলেও অপলা তা ধরতে পারল না।
অপলা একটু ধাতস্থ হয়ে প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করল, ‘সো হোয়াট’স আওয়ার প্ল্যান ফর টুমরো?’
‘কাল সারাদিন তোমাকে নিয়ে ঘুরব। বাইরে লাঞ্চ করব, বোট রাইডেও যেতে পারি। তুমিতো মিলেনিয়াম পার্ক দেখনি। নামেই পার্ক, কিন্তু কোন বাগান নেই। হা হা হা…।’ হাসান স্বাভাবিক হয়ে এলো।
‘সাউন্ডস গ্রেট!’ একটু থেমে অপলা হাসানের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর একসময় বলল, ‘সময়টা বেশ কাটছিল তাই না?’
‘তাহলে, আরেকটু বসো না।’
অপলা চুপ করে রইল। সে স্থির করতে পারছে না—কী করবে। এক মন চাইছে, আরেকটু থেকে যেতে–কী এমন ক্ষতি। আরেক মন বলছে, এত তাড়াহুড়ো কিসের।
হাসান ইতস্তত করে বলল, ‘তোমাকে এভাবে কাছে পেয়ে আমার যে কী ভাল লাগছে। আমার যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে সারাজীবনের জন্যে তোমাকে কাছে রেখে দিতাম। কোথাও হারিয়ে যেতে দিতাম না।’
‘তাহলে চেষ্টা করছ না কেন?’ একটা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে অপলা কয়েক পা হেঁটে দরজার কাছে গেল। ঘুরে তাকাল হাসানের দিকে। তারপর বলল, ‘গুড নাইট হাসান।’
হাসান একটা অপ্রস্তুত হাসি হেসে হাত নেড়ে বলল, ‘গুড নাইট অপলা।’
একটু থেমে অপলা চলে গেল ওপরে—তার রুমে।
হাসান তাকিয়ে রইল অপলার চলে যাওয়ার দিকে। এবং হঠাৎ করেই প্রচণ্ড মন খারাপ হলো তার। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সারাটা রাত যদি কথা বলা যেত অপলার সাথে। অপলা বলেছিল, কত কথা জমে আছে। তাহলে? হাসানেরও তো কত কথা বলার ছিল। কিছুই তো বলা হলো না। বিষাদে ছেয়ে গেল তার মনটা।
অপলা ড্রেস বদলে স্লিপিং গাউন গায়ে জড়িয়ে নিল। প্রসাধনী তুলে ধীরে ধীরে গা এলিয়ে দিল বিছানায়। দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ শুয়ে এপাশ ওপাশ করল সে। তার মনে হাজারো প্রশ্ন দেখা দিল। হাসানের এমন পরিবর্তন তাকে অবাক করেছে। হাসানের ব্যবহার এবং কেয়ারিং তাকে অভিভূত করল। হাসান কি তাহলে সত্যি সত্যি তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বিশ্বাসই হচ্ছে না, অপলার জন্য এতটা ভালবাসা সে লালন করে আছে। যেই মানুষটা টাকা আর কাজ ছাড়া অন্য কিছুই বুঝত না, অপলার দিকে ভাল করে তাকাবার একটু সময় যার হতো না, আজ সেই কিনা… অপলা মনে মনে ভীষণ অবাক হলো।
অপলার রেখে যাওয়া সবকিছু হাসান এই বাসাটাতে এনে গুছিয়ে রেখেছে। বিশাল বড় বেডরুম, বাথরুম সব কিছু কাস্টম ডিজাইন করে বানিয়েছে—তার জন্যে। ভাবতে অন্যরকম লাগছে।
হাসানের জন্যে এখন খুব মায়া হচ্ছে তার। আহা বেচারা, কেমন অসহায় হয়ে গেছে। অপলা এখন কী করবে? ফিরে আসবে? তার কি ফিরে আসা উচিত?
অন্যদিকে হাসান তার রুমে বসে বসে ভাবছে, অপলা কি তাহলে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে? নাকি দেখতে এসেছে হাসান এখনো একা আছি কিনা। অপলাকে কী করে বুঝাবে যে, সে তার হৃদয়ের কত বড় একটা অংশ হয়ে আছে। অপলার চলে যাওয়া হাসানকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। সে এখন এক নতুন মানুষ।
হাসানের খুব ইচ্ছে হচ্ছে অপলাকে জড়িয়ে ধরে সারারাত শুয়ে থাকতে। সে কি যাবে তার কাছে? কিন্তু অপলা যদি আবার অন্য কিছু ভাবে? হাসানের মনে আছে, অপলা কিছু নিয়ে রাগ করলে কিছুতেই তার শরীর ছুঁতে দিত না। সে বলত, তোমার ভালবাসা তো শুধু শরীরেই। আমার মন ভাল না হওয়া পর্যন্ত আমাকে ছোঁবে না তুমি।
রাত গভীর হয়ে এলো। দুজন মানুষ একটা দ্বিধার দেয়ালের দু’পাশে অস্থির হয়ে ছটফট করছে। এভাবেই দুজন একান্ত কাছের মানুষ, একে অপরের আরো কাছে এসেও অস্বস্তিকর দীর্ঘ একটি রাত পার করে দিল শুধু সংকোচ আর দ্বিধার কারণে।
পরের দিন রোববার। শিকাগোর দিনটা শুরু হলো রৌদ্রকরোজ্জল সকাল দিয়ে। সকাল পেরিয়ে দুপুর হবে হবে করছে। সকালে তাদের দুজনেরই ঘুম ভেঙেছে একটু দেরীতে। আগের দিনের পরিকল্পনা মোতাবেক আজ তাদের শিকাগো ডাউন-টাউনে যাওয়ার কথা।
হাসান একটা নীল রঙের জিনস প্যান্ট আর সাদা পোলো টি-শার্ট, মাথায় বেসবল ক্যাপ, চোখে রে-ব্যান সানগ্লাস পড়ে বের হয়ে তার বিএমডব্লিউ এসইউভি স্টার্ট দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে অপলা এসে উঠে বসল হাসানের গাড়িতে। কাকতালীয় ভাবে অপলা পড়েছে সাদা রঙের স্কার্ট, নীল টপস, তার চোখে প্রাডা ব্রান্ডের সান-গ্লাস। দুজনকেই অপূর্ব লাগছে।
হাসান গাড়ি ছেড়ে দিতেই কোথা থেকে রুবেল এসে হাজির। হাসানদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা বিস্তৃত হাসি দিয়ে বলল, ‘কাজ তাহলে ঠিকঠাক মতই আগাইতেছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌!’
লেক মিশিগানের তীর ঘেঁষে পথচারীর আর পর্যটকদের হাঁটা চলা চলছে। হাসান আর অপলা পর্যটকদের মতোই ঘুরে বেড়াল কিছুক্ষণ। নীল রঙা লেকের ব্যাকগ্রাউন্ডে তাদের দুজনকে পাশাপাশি মনে হচ্ছে হিন্দি সিনেমার নায়ক নায়িকা কোনো গানের দৃশ্যে অভিনয় করছে।
লেকের পাড়ে আসার আগে হাসান অপলাকে নিয়ে গেল শিকাগোর বিখ্যাত মিলেনিয়াম পার্কে। সেখানে বিভিন্ন আর্ট-গ্যালারির মধ্যে বাংলাদেশের একটি কাজ দেখাল। অপলা অবাক হয়ে দেখল। এবং যারপর নাই অভিভূত হলো। সেখান থেকে দুজনে মিলে বিখ্যাত বাকিংহাম ফাউণ্টেনের কাছে গেল। এই জায়গাটি অপলার খুব প্রিয়। ঝর্ণার পাশে কিছুসময় থেকে তাঁরা গেল নেভি-পিয়ারে। সেখানে লেকের ধারের একটি রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ করল। ইতিমধ্যেই দুপুর গড়িয়েছে।
লাঞ্চ শেষ করে হাসান আর অপলা এসে বসল লেকের পাড়ের একটি বেঞ্চে।
পড়ন্ত বিকেল। ঝিরিঝিরি বাতাস ভেসে আসছে লেক থেকে। ওরা দুজন তাকিয়ে আছে সামনে। একটা ট্যুর বোট ভেঁপু বাজিয়ে চলে যাচ্ছে ওদের সামনে দিয়ে। ডেক থেকে সবাই হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে পারের মানুষগুলোকে। পার থেকে থেকেও সবাই হাত নেড়ে উত্তর দিচ্ছে।
অপলার দিকে ঘুরে হঠাৎ করেই হাসান বলল, ‘অপলা, তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল।’
‘বলো।’ অপলা অবাক হয়ে হাসানের দিকে তাকাল।
হাসান ইতস্তত করে বলল, ‘আমরা দু’বছরের কিছু বেশি সময় ধরে আলাদা। ইট’স এ বিগ গ্যাপ। এসময়ের মধ্যে তোমার কিংবা আমার অন্য যে কাউকে ভাল লাগতে পারে—কারো সাথে সম্পর্কও হয়ে যেতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না।
অপলা হেসে দিয়ে বলল, ‘এতো ভূমিকা দেবার দরকার নেই হাসান। সরাসরি বলে ফেলো, যা বলতে চাও।’
‘আমার ধারণা, তুমি কাউকে ভালোবাসো। কারো সাথে তোমার সম্পর্ক হয়েছে।’
অপলা তড়িৎ হাসানের কনফিউশনের ব্যাপারটা ধরে ফেলল। সে দুষ্টুমি করে মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার ধারণা ভুল নয়।’
হাসানের চেহারায় খানিকটা অনিশ্চয়তার ছায়া দেখা দিল। সে বলল, ‘But I have to tell you how I feel for you.’
অপলা হাসানের হাঁটুর ওপরে হাত রেখে বলল, ‘I know now how you feel about me.’ একটু থেমে সে আবার বলল, ‘তোমার হয়ত মনে হচ্ছে, আমাকে কিছু বলার এটাই তোমার শেষ সুযোগ, আমি আবার চলে যাবার আগে।’
‘হ্যাঁ তাই।’ বলেই একটু হাসল হাসান—শুষ্ক হাসি। ‘এই সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনা। তোমার সাথে আর যদি দেখা না হয়, যদি তোমাকে আমার কথা গুলো বলা না হয়, যে তোমাকে আমি…’
‘কত ভালবাসি?’
হাসান চুপ।
‘First of all, I don’t have a boyfriend—আর কারো সাথেও আমার কোনো সম্পর্কও হয়নি।’
‘না? তাহলে কাল রাতে তুমি যে ফোনে বললে, I love you, too?’ হাসান ইতস্তত করে বলল।
‘আমি রাইসার সঙ্গে কথা বলছিলাম।’ অপলা আবারো মিটিমিটি হাসছে।
‘রাইসা?’
‘হ্যাঁ। আমার বান্ধবীর মেয়ে। চার বছর বয়স।’
‘দেখো দেখি কী কাণ্ড, আর আমি কিনা ভাবলাম—’ হাসান নিজের ভুল বুঝতে পেরে বিব্রত বোধ করল।
‘আমার বান্ধবী শিল্পী, যার সাথে আমি থাকি—ওর চার বছরের মেয়ে। রাইসাই আমার একমাত্র ভালবাসা। সম্পর্ক যদি কারো সাথে হয়ে থাকে তা ঐ ছোট্ট মেয়েটির সাথে। অমন একটি মেয়েতো আমারও থাকতে পারত!’ এটুকু বলতে বলতে অপলার গলা ধরে এলো। সে তাকিয়ে থাকল লেকের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে। তার চোখ খানিকটা ভিজে গেল।
অপলার কাঁধে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল হাসান।
নীরবতায় কেটে গেল আরো কিছুটা সময়।
অপলা নিজেকে স্থির করে বলল, ‘হাসান, আজ রাতে আমাকে চলে যেতে হবে।’
‘চলে যেতে হবে মানে? কোথায় চলে যাবে?’
‘তোমাকে তো বলা হয়নি, আমি আসলে এসেছিলাম আমার কোম্পানির এনুয়াল কনফারেন্সে। কাল পরশু দু’দিন মিটিং হোটেল হায়াত রিজেন্সিতে। পরদিন সকালেই আমার ফ্লাইট।’
হাসান বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না, অপলা কী বলছে এসব। ওতো ধরেই নিয়েছিল অপলা আবার ফিরে এসেছে তার কাছে। তারমানে অপলা শুধু দেখা করতে এসেছে—সম্ভবত নিজের চোখে দেখে গেল সে কেমন আছে। হাসান তাকিয়ে রইল অপলার মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে।
‘যখন জানলাম, শিকাগোতে কনফারেন্স, খুব ইচ্ছে হলো দুটো দিন আগে এসে তোমাকে একটু দেখে যাই। তোমার সঙ্গে একটু সময় কাটাই। তোমাকে মাঝে মাঝে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে।’
হাসান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অপলার চোখের দিকে। কী মায়া নিয়ে কথাগুলো বলল অপলা। হাসান নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে অপলার হাত চেপে ধরল।
‘কেন তোমাকে ফিরে যেতে হবে? না, অপলা। না, আমি তোমাকে আর যেতে দেব না। For god sake, look at me. I’m a different person now!’
‘আমি জানি।’
‘এটা ঠিক একটা সময় আমি টাকার পিছনে হন্যে হয়ে ঘুরেছি। তখন মনে হতো জীবনে টাকাই সব। তুমি চলে যাবার আগের দিন পর্যন্ত মনে হয়েছিল, জীবনে টাকার চেয়ে ইম্পরট্যান্ট কোন কিছু নেই। Now I know, money can only solve money problem. Nothing else. Money cannot buy happiness. Money can give freedom not life. I don’t want money any more. I want to have a life!’
হাসানের মুখে এমন কথা শুনে অপলা বেশ অবাক হলো। মনে হলো অপলার বলে যাওয়া কথাগুলোই আবার বলল হাসান। অপলা একসময় এই কথাগুলোই হাসানকে বলত।
অপলার হাত ঝাঁকি দিয়ে হাসান আবারো বলল, ‘প্লিজ, তুমি চলে যেও না। চলো, আমরা আবার নতুন করে জীবন শুরু করি।’
অপলা কোনো জবাব দিল না। সে চুপ করে রইল।
হাসান অপলার হাত ধরে অপেক্ষা করছে—তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে অপলা বলল, ‘চলো ফেরা যাক। আমার হোটেল চেক-ইনের সময় পার হয়ে যাচ্ছে।’

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৫)

‘Oh shit!’ ৩৫০ ডিগ্রী তাপমাত্রার ওভেনের ভেতর হাত ঢুকিয়ে গরমে ছ্যাঁকা খেয়ে মুখ ফসকে বলে ফেলল হাসান।
ওপাশ থেকে অপলা বলল, ‘কী হলো? Is something wrong?’
অপলার কথা হাসানের কানে গেল না। সে তখনো তাকিয়ে আছে রুবেলের দিকে—অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে। এই ছেলেটার কী কোনো কমনসেন্স নাই?
‘Are you alright?’ অপলা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘Yeah, I’m fine.’ কথা বলতে বলতে রুবেলকে হাতের ইশারায় চলে যেতে বলল হাসান। কিন্তু নাছোড়বান্দা রুবেল বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বোঝাল—চালিয়ে যান।
হাসান খুবই বিরক্ত হলো। সে রুবেলকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে হাতে গ্লাভস পরে এলুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়ানো গরম ট্রে-টা বের করে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে রাখল। ধীরে ধীরে কাভারটা খুলে বলল, ‘Here you go. Surprise!’
‘Lasagna! My favorite dish! Looks really good.’ অপলা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেই তাকাল হাসানের দিকে। ‘মনে রাখার জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
‘My pleasure.’ হাসান ট্রে থেকে বড় এক পিস লাজানিয়া তুলে দিল অপলার প্লেটে।
অপলার দেরি সহ্য হলো না। সে কাটা-চামচ আর ছুঁড়ি নিয়ে কাটাকাটি শুরু করে দিল। তারপর মুখে দিয়ে একটু খেয়ে তাকাল হাসানের দিকে।
হাসান নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, ‘অনেকদিন পর তোমার প্রিয় আইটেমটা করলাম। খেতে পারবে কিনা জানিনা। ভাল না লাগলে বলো—আমরা বাইরে গিয়ে খেয়ে নেব।’
‘Umm, perfect! ভাল হয়েছে, হাসান।’
‘সত্যি বলছ?’
‘হুম। সত্যি।’
অপলা খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে। হাসান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অপলার দিকে। অপলার সেদিকে কোনো লক্ষ্য নেই। সে খেয়েই চলেছে। মাঝে মাঝে আবার এক সিপ শ্যাম্পেনও মুখে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে তাকাল হাসানের দিকে—দেখল, সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অপলা একটু লজ্জা পেয়ে গেল।
হাসান হেসে দিয়ে বলল, ‘খুব ভাল্লাগছে তোমাকে দেখে।’
‘তাই? আর আমার খাওয়া দেখে কী মনে হচ্ছে—কতদিন না খেয়ে আছি?’
‘আরে না না তা হতে যাবে কেন?’
শ্যাম্পেনে একটা চুমুক দিয়ে অপলা জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর, তুমি কেমন আছো?’
‘এইতো, আছি।’ হাসান মৃদু হেসে বলল।
‘এনি গার্লফ্রেন্ড?’ প্রশ্নটা করে অপলা তাকিয়ে রইল হাসানের দিকে।
‘গার্লফ্রেন্ড? আরে নাহ…’ হাসান অবাক হয়ে বলল।
‘না কেন?’
‘আসলে মেয়েদের ব্যাপারে আমার ভাগ্যটা খুবই খারাপ। অবশ্য সেভাবে চেষ্টা করেও দেখা হয়নি।’
‘তাহলে বিয়ে করছ না কেন? নাকি করবে না বলে ডিসিশন নিয়েছ?’
হাসান ঠিক বুঝতে পারল না, অপলা কেন এধরণের কথা বলছে। সেটা কী কথা পিঠে কথা নাকি ও সত্যি সত্যিই জানতে চায়। হাসান হাসি হাসি মুখ করে বলল, ‘আরে ধুর, এই বয়সে কে আর আমাকে বিয়ে করবে?’
‘কী আর এমন বয়স হয়েছে তোমার? You’re still young, good looking, besides being an established businessman.’ এবার দুষ্টুমি করে যোগ করল অপলা, ‘টাকা পয়সা নিশ্চয়ই ভালই বানিয়েছ! সেই সাথে, বিশালাকার বাড়ি, লেটেস্ট মডেলের গাড়ি, কী নেই তোমার। তোমার জন্যে মেয়ের অভাব? একবার দেশে গিয়েই দেখ না, মেয়ের সঙ্গে মায়েরাও লাইনে দাড়িয়ে যাবে।’
অপলার কথার ভঙ্গিতে উচ্চস্বরে হেসে ফেলল হাসান। ‘তুমি দেখি অনেক মজার কথা বলতে শিখেছ অপলা? তুমি বদলেও গেছ অনেক।’
‘তাই? কী রকম?’
‘এই যেমন, তুমি আগে চুপচাপ থাকতে—কথা বলতে কম। হাসতে না একেবারেই। আর এখন, কেমন যেন একটা চটপটে ভাব এসেছে তোমার মধ্যে। বেশ সাবলীল।’
‘কথা আমি আগেও বলতাম। তবে নিজের সাথে—মনে মনে কত কথা বলতাম। তোমাকে পেতাম না, তাই কথাও হতো না। কথা বলার জন্যে একজন সঙ্গী তো চাই, তাইনা?’
মুহূর্তের মধ্যে হাসানের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
হাসানের এই পরিবর্তনটা অপলার চোখ এড়াল না। একটু থেমে সে বলল, ‘তাছাড়া, দু’বছরতো আর কম সময় না, হাসান। একজন মানুষের বদলে যাবার জন্যে যথেষ্ট।’
এরপরে আর কেউ কোনো কথা বলল না। চুপচাপ খেয়ে চলল দুজনে—শুধু চামচের টুংটাং শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই শোনা গেল না।
হাসান লক্ষ্য করল অপলার প্লেট খালি হয়ে এসেছে। সে আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘আরেকটু তুলে দেই?’
‘Oh no! I’m full.’
‘ঠিক আছে, তুমি লিভিং রুমে গিয়ে বসো, আমি এগুলো ক্লিন করে আসছি।’
‘এখন ক্লিন করতে হবে না। তুমি এসো অনেক কথা জমে আছে।’ বলেই অপলা উঠে দাঁড়াল। একহাতে শ্যাম্পেন গ্লাস ধরে অন্য হাত বাড়িয়ে দিল হাসানের দিকে।
হাসান হেসে দিয়ে ধরল অপলার হাত। অপলা তাকে প্রায় টেনেই নিয়ে গেল লিভিং রুমে। তারপর বসল সোফাতে। প্রচণ্ড ভাললাগায় বুঁদ হয়ে রইল হাসান—অনেকদিন পর যেন জীবন ফিরে পেয়েছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, ঠিক এই মুহূর্ত থেকে অপলা যা যা বলবে সে তাই তাই করবে। এখন থেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন সেই—সে যেভাবে নেভিগেট করবে, সেভাবেই চলবে।
অপলারও ভাল লাগছে। অনেকদিন পর হাসানের কাছে এসে তার সঙ্গ সে উপভোগ করছে। সে চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ। এক ধরণের নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে—তবে ভাললাগার রেশটুকু ছড়িয়ে আছে চারিদিকে।
নীরবতা ভাঙ্গার জন্যেই হাসান বলল, ‘মুভি দেখবে? একটা মুভি ছেড়ে দেই?’
হাসানের লিভিং রুমের দেয়াল জুড়ে সিনেমা দেখার পর্দা লাগানো। উপরে প্রজেক্টর থেকে মুভি দেখতে বেশ ভালই লাগে। কিন্তু মুভি দেখার কোনো আগ্রহ অপলার মধ্যে দেখা গেল না। সে বরং উল্টো বলল, ‘আমি এক হাজার মাইল ফ্লাই করে এসেছি কি এখানে বসে মুভি দেখার জন্যে?’
হাসান হেসে ফেলল। আর কী বলা যায় সে ভেবে পেল না। হঠাৎ তার মনে হলে। অপলাকে একটা ধন্যবাদ তো দিতে পারে—তার এত প্রশংসা করল। হাসান বলল, ‘বাই দ্য ওয়ে, থ্যাঙ্কস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট!’
‘কমপ্লিমেন্ট!’ ভ্রূ কুঁচকে অপলা তাকাল হাসানের দিকে।
‘ঐ যে বললে, আমি এখনও ইয়ং, গুড লুকিং…’ হাসানের মুখে লজ্জার হাসি।
‘শুধু তাই নয়, ইয়্যু আর সো সুইট, ইউ নো দ্যাট রাইট?’
হাসানের মুখের হাসি বিস্তৃত হলো। সে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ!’
অপলা হঠাৎ করেই হাসানের একটি হাত তার হাতের মধ্যে এনে কিছুক্ষণ ধরে রাখল। তারপর বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
‘করো।’
‘এখন তো তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আর ইউ হ্যাপি নাউ?’
হাসান চুপ করে রইল। সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল অপলার সেই কথা গুলো। অপলা বলেছিল, একদিন তোমার অনেক টাকা হবে। স্বপ্নের বাড়ি হবে, গাড়ি হবে ঠিকই, কিন্তু যার বা যাদের কথা ভেবে এগুলো করছ, তারা হয়ত কেউ থাকবে না তোমার পাশে।
অপলা আবারো জানতে চাইল, ‘কি বললে না?
হাসান অস্ফুটে বলল, ‘কী?’
‘তুমি কি এখন সুখী?’
হাসান সুখী কিনা তার উত্তর না দিয়ে সে বলল, ‘আমি ভীষণ একা, অপলা। আমার ভীষণ কষ্ট।’
‘একা থাকছ কেন? একজন সঙ্গী জোগাড় করে নাও।’
‘আমি আসলে অপেক্ষায় ছিলাম—এখনো আছি।’
‘কিসের অপেক্ষা?’
‘তোমার ফিরে আসার।’ একটু থেমে হাঁসান আবার বলল, ‘ভেবেছিলাম, তুমি ফিরে আসবে। যখন তোমার চিঠি পেলাম, তখন ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম। খুবই কষ্ট হয়েছিল।’
অপলা চুপ করে রইল। কী বলবে ভেবে পেল না। চারিদিকে নীরবতা—দুজনেই যেন নিবিড় ভাবনায় আচ্ছন্ন।
হঠাৎ করেই দরজায় টোকা পড়ল। ঠক ঠক ঠক। ছেদ পড়ল নিবিড় ভাবনায়।
হাসান দরজার দিকে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল। দরজায় টোকা বেজেই চলেছে। হাসান অপলার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এক মিনিট, আমি দেখছি।’
দরজা খুলে হাসানের মাথায় রক্ত উঠে গেল। সবগুলো দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছে রুবেল। হাসান নিজেকে চেষ্টা করেও স্থির রাখতে পারল না। ‘তুমি এখনো ঘুর ঘুর করছ কেন?’ হাসান তার গলার স্বর যথেষ্ট নিচু করে চাপা কিন্তু রাগান্বিত কণ্ঠে বলল।
‘হাসান ভাই, সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা তার খোঁজ নিতে আসলাম।’
‘সবকিছু ঠিক আছে। তুমি এখন যাও।’
‘আপনেতো মনে হয় এখনো আসল কথাটাই বলতে পারেন নাই। আসল কাজ তো দূরে থাক।’
‘আর কিছু বলবে? নাহলে খোদা হাফেজ।’
‘না বলেছিলাম কি, সারাক্ষণ তো আমার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করেন—আই রিয়েলি লাভ হার, আই ক্যান’ট লিভ উইদাউট হার। আমার সব কিছুই সে, দরকার হলে আমার সারাজীবন অপেক্ষা করব। এইসব কথা কি তাকে বলছেন নাকি এখনো ভাবতেছেন?’
হাসান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল রুবেলের হাসি হাসি মুখের দিকে—কয়েক মুহূর্ত। ‘গুড নাইট রুবেল।’ বলেই সে দরজা বন্ধ করে দিল।
হাসান ফিরে যেতেই অপলা জিজ্ঞেস করল, ‘কে এসেছিল?’
‘রুবেল। ওর কথাতো তোমাকে বলাই হয়নি। হি ইজ অ্যান ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। আমাকে খুবই পছন্দ করে—লাইক হিজ বিগ ব্রাদার। কিন্তু মাঝে মাঝে একটু বেশি…’
এটুকু বলে হাসান থেমে গেল। অপলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো?
‘বেশি কী?’
‘না কিছু না। তুমি বুঝবে না। আচ্ছা বাদ দাও ওর কথা।’
রুবেলের ব্যাপারে অপলা আর কোনো আগ্রহ দেখাল না। কিন্তু সে তার আগের প্রশ্নের উত্তর এখনো পায় নি, তাই হাসানকে আবার মনে করিয়ে দিল। ‘তুমি কিন্তু এখনো বলনি।’
‘কি জানতে চেয়েছিলে?’
‘আর ইউ হ্যাপি?’
‘তার কী কোন কারণ আছে?’ একটু চুপ করে থেকে হাসান বলল।
‘অবশ্যই আছে। তুমি যা চেয়েছিলে, তার সব কিছুইতো পেয়েছো। ইউ শুড বি হ্যাপি।’
‘হতাম যদি আমার পাশে তোমাকে পেতাম—সবসময়।’
‘কিন্তু তুমিতো আমাকে চাও নি।’
অসহায় চোখে হাসান তাকাল অপলার দিকে। সে কিছুই বলতে পারল না। তবে তার চোখের ভাষা পড়তে পারলে অপলা নিশ্চয়ই বুঝতে পারত তার মনের কথা। মুখের ভাষা মনের কথা বলে কিনা কে জানে, তবে সত্য-মিথ্যে যাই বলুক তা কানে শোনা যায়, তবে কতটা সত্য তা যাচাই করা মুশকিল। এই সমস্যার কারণেই মানুষের চোখের ভাষা বোঝা দরকার। চোখের ভাষা ভাল ভাবে রপ্ত করতে পারলে মনের কথা বোঝা যেতে পারে।
মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়—চাইলেও সঠিক কাজটি করা হয়ে উঠে না কখনোই। সময়ের সাথে মানুষ বদলায়। জীবনে কিছু কিছু প্রশ্ন থাকে যার উত্তর কখনও মেলে না, কিছু কিছু ভুল থাকে যা শোধরানো যায় না, আর কিছু কিছু কষ্ট থাকে যা কাউকে বলা যায় না।
হাসান বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘বাদ দাও, আমার কথা। তোমার কথা বলো।’
‘আমার কী কথা শুনতে চাও?’
‘এনি রিলেশনশিপ?’
‘আমিতো তোমাকে ছেড়ে কারো সঙ্গে রিলেশনশিপ করার জন্যে যাইনি, হাসান।’ এটুকু বলে অপলা অল্প সময় চুপ করে রইল। তারপর থেমে থেমে বলল, ‘কোনো ছেলের সঙ্গে যে একেবারেই মিশি নি তা কিন্তু নয়। কাজের সুবাদে অনেকের সাথেই পরিচয় হয়েছে—তবে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। শুধু জানার জন্যে মেশা। তবে যতটুকু জেনেছি এবং বুঝতে পেরেছি, তাতে বলাই যায়—আসলে সব ছেলেরাই একই রকম। দে জাস্ট ওয়ান্ট টু প্লে।’
‘জেনারাইলাইজড হয়ে গেল না? সব ছেলেরা কি একই রকম?’
‘বেশিরভাগ ছেলেরাই। তুমি অবশ্য ওদের কারো মতই নও। তুমি অনেক আলাদা।’
হাসান উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল অপলার দিকে।
অপলা হাসতে হাসতে বলল, ‘You’re too nice.’
‘You think so?’
‘I know so!’
মনে হচ্ছে শ্যাম্পেনের মাত্রা একটু বেশি হয়ে গেছে। যদিও দুজনেই কথা বলছে অসম্ভব মার্জিত ভাবে এবং এখন পর্যন্ত যত কথা হয়েছে কিছুতেই অন্যরকম কিছু মনে হয়নি। তবে দুজনের সান্নিধ্য দুজনেই উপভোগ করছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
হাসান হঠাৎ করেই বলল, ‘Do you still love me?’
অপলা তাকিয়ে রইল নেশার দৃষ্টিতে হাসানের দিকে। তার চাহনিই বলে দেয় হাসানের প্রতি তার অনুরাগের কথা।
অনেকক্ষণ থেকেই তারা দুজন দুজনের হাত ধরে কথা বলছিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে হাতের ছোঁয়ায় একে অপরের উষ্ণতার আদান-প্রদান করছে। শ্যাম্পেনের প্রভাবেই হোক আর ভাললাগা থেকেই হোক, তারা দুজন অজান্তেই একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এলো। অপলার চোখ বন্ধ হয়ে এলো আবেশে। হাসান তার ঠোঁট নামিয়ে নিয়ে এলো অপলার ঠোঁটের খুব কাছে। অপলা চোখ বন্ধ করে আছে। অসম্ভব নীরবতায় থমকে গেল কিছু মুহূর্ত। হঠাৎ–
অপলার মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল ঝনঝন করে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৪)

‘ম্যাম, ইয়োর লাগেজ?’
অপলা ক্যাবের কাছে ফিরে যেতেই ড্রাইভার অপলার লাগেজ বের করে সামনে এগিয়ে দিল।
‘ও মাই গড! আই’ম সো সরি। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’ বলেই অপলা পার্স খুলে ক্যাবিকে কিছু এক্সট্রা টিপস দিয়ে দিল। ক্যাবি খুশি মনে চলে যেতেই সে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
হাসানের বাড়ির সামনে এসে অপলা এতটাই আবেগাপ্লুত হয়েছিল যে সে ভুলেই গিয়েছিল তার লাগেজের কথা। অপলা মনে মনে ক্যাব ড্রাইভারকে আবার একটা ধন্যবাদ দিল।
রুবেলকে বিদায় করে দিয়ে হাসান লিভিং রুমটা একটু পরিপাটি করে নিচ্ছিল—শেষ মুহূর্তের পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া যাকে বলে আর ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় নক হলো।
খুবই মৃদু শব্দে। হাসান একটু ভাবল—রুবেল কি এখনো যায় নি তাহলে? এবার ডোর বেল বাজল। সে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘আশ্চর্য, ছেলেটা পারেও বিরক্ত করতে…’ বলে সে দরজা খুলতে গেল।
হাসান দেখল সত্যিই সত্যিই অপলা দাঁড়িয়ে আছে—দরজার সামনে। একটু থতমত খেয়ে সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল অপলার মুখের দিকে। অপলার মুখে একটা স্মিত হাসি। হাসান চুপ করে আছে—অপলাও। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। কিংবা বলতে পারল না।
কিছু সময় পার করে অপলা নীরবতা ভেঙ্গে বলল, ‘হাই, হাসান! ইটস বিন অ্যা হোয়াইল!’
হাসান সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, অনেকদিনই তো। দু’বছরতো আর কম সময় নয়! দেখতে দেখতে বছর কেটে যায়।’
হাসানের দৃষ্টি সরাসরি নিবদ্ধ অপলার ওপর—সে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে বলল, ‘অপলা, ইউ লুক গ্রেট। অনেক সুন্দর হয়েছ তুমি—ভেরী প্রিটি!’
অপলা হেসে দিয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। ইউ লুক ভিনটেজ—এন্ড গ্রেট টু!’
অপলার প্রশংসায় হাসানের হাসি প্রসারিত হলো। সে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘এসো, ভেতরে এসো।’
অপলা ভেতরে ঢুকে ব্যাগটা রেখে কয়েক পা এগিয়ে গেল সামনে। চারিদিকে একনজর চোখ বুলিয়ে ঘুরে দাঁড়াল হাসানের দিকে। হাসান হঠাৎ বুঝতে পারল তার হাতের ব্রাউন প্যাকেটের দিকে অপলা তাকিয়ে আছে। সে অপ্রস্তুত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাত পেছনে নিয়ে গেল।
অপলা বলল, ‘আর ইউ ওকে?’
‘ইয়েস, ইয়েস আই’ম ফাইন।’ হাসান বোকার মত হেসে বলল।
অপলা মিটি মিটি হাসি দিয়ে বলল, ‘তো এই তোমার সেই ড্রিম হাউজ! যার জন্যে তুমি…’
হাসানের মুখে অপরাধীর হাসি। সে বলল, ‘শুধু আমার একার নয়, তোমারও…’
‘হুম, ওকে। তাহলে চলো, আমাকে ঘুরিয়ে দেখাও।’ অপলা চোখ ঘুরিয়ে তাকাল হাসানের দিকে।
‘অবশ্যই দেখাব। তার আগে তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর না হয় দেখাব সব। তুমিতো নিশ্চয়ই এখনি চলে যাচ্ছ না। চলো আমি তোমাকে তোমার রুম দেখিয়ে দিচ্ছি।’
‘বেশ, চলো।’
হাসান অপলার ক্যারিং লাগেজটা সিঁড়ি বেঁয়ে ওপরে নিয়ে গেল। অপলা উঠে এলো পিছে পিছে। বেশ পরিপাটি করে সাজানো বড় একটা ঘরে অপলাকে নিয়ে এসে কোথায় কী আছে দেখিয়ে দিল হাসান। বিশাল একটা বাথরুম—বাথটাব, সাথে ওয়াকিং ক্লোজেট। ক্লোজেট ভর্তি অপলার রেখে যাওয়া কাপড়-চোপড়।
অপলা সারা ঘর একবার দেখে নিয়ে এসে দাঁড়াল হাসানের সামনে।
‘ইউ মাস্ট বি টায়ার্ড।’ অপলা সামনে এসে দাঁড়াতেই হাসান জিজ্ঞেস করল।
অপলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হুম, একটু!’
‘তাহলে রেস্ট নাও।’
‘রেস্ট নিতে হবে না—আমি একটু ফ্রেশ হয়েই আসছি।’
‘ঠিক আছে তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি দেখছি, ডিনারের কী অবস্থা।’ বলেই হাসান দ্রুত বের হয়ে গেল।
প্রথমেই বাথটাবে পানি ছেড়ে দিল অপলা। তারপর গরম আর ঠাণ্ডা পানির তাপমাত্রা ঠিক করে কিছুটা লিকুইড সাবান ঢেলে দিল পানির মধ্যে। সাথে সাথে বাথটাব সাবানের ফেনায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। অপলা কাপড় ছেড়ে বাথটাবে গা এলিয়ে দিল। তার শরীর থেকে ভ্রমণের ক্লান্তি দূর হয়ে যেতে থাকল—আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে এলো তার।
হাসান ডাইনিং রুমে এসে দেখল সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। সে ডাইনিং টেবিলের দু’পাশে দুজনের জন্যে প্লেট, ছুঁড়ি, কাঁটা চামচ, ন্যাপকিন সুন্দর করে সাজাল। একটা শ্যাম্পেনের বোতল ন্যাপকিন দিয়ে পেঁচিয়ে টেবিলের পাশে শ্যাম্পেন স্ট্যান্ডের উপর রাখল। ডাইনিং টেবিলের ঠিক মাঝ বরাবর ঝুলে থাকা ঝালর বাতিটি জ্বালিয়ে আলো কমিয়ে দিল। তারপর অনেকগুলো ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে একবার তাকিয়ে দেখল—পরিবেশটা রোমান্টিক হলো কিনা। তার চোখে-মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত চলে গেল তার রুমে ডিনারের জন্যে ফরমাল ড্রেস পরার জন্যে।
বিছানার উপর কয়েকটি লং ড্রেস ছড়িয়ে অপলা তাকিয়ে আছে—সে ঠিক করতে পারছে না কোন ড্রেসটা পড়বে। যদিও তার পছন্দের পোশাক শাড়ি কিন্তু সে আজ হাসানের পছন্দের একটা আউটফিট পরবে বলে মনস্থির করল। কিছুক্ষণ ভেবে সে তার প্রিয় জর্জিও আরমানির নীল রঙের গাউনটিই তুলে নিয়ে গায়ে চড়াল। নিজেকে পরিপাটি করল সময় নিয়ে। সুন্দর করে সাজল। অনেকটা প্রথম ডেট নাইটের মতোই অনুভূতি হচ্ছে তার। স্লিভলেস লং ড্রেসের সঙ্গে একটি জিরকন ডায়মন্ডের নেকলস পড়ল। হাতে ব্রেসলেট। ড্রেসের সঙ্গে মিলিয়ে হাতের ব্যাগ। দেখে মনে হবে যেন কোনো বিশেষ পার্টিতে যাচ্ছে সে। বেডরুমের লম্বা আয়নায় একবার নিজেকে তাকিয়ে দেখল অপলা—ক্লাসিক ও সেক্সি লুকের মিশ্রণে তাকে দেখতে লাগছে গ্রীক দেবীদের মতো। আয়নায় কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো সে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে এদিক ওদিক তাকাল। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল হাসান দাঁড়িয়ে আছে ডাইনিং টেবিলের পাশে। অপলা জোরে বলল, ‘সো হোয়াটস ফর ডিনার?’
হাসান কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়াল। মাথা তুলে দেখল অপলাকে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল—বিস্ময়ে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ সে। অপলাকে দেখতে লাগছে অস্কার অনুষ্ঠানে ঝাঁ চকচকে লাল গালিচার উপর দিয়ে হেঁটে আসা হলিউড সেলেব্রিটিদের মতো। তার রূপ যেন উপচে পড়ছে। হাসান একটা ছোট্ট নিঃশাস ফেলে অস্ফুটে বলল, ‘ওয়াও!’ তারপর এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘লেট’স চেক ইট আউট।’
সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়িয়ে অপলা নেমে এলো নিচে। হাসান মুগ্ধ নয়নে বলল, ‘ইউ লুক বিউটিফুল। মনে হচ্ছে অস্কারে যাচ্ছ এওয়ার্ড নিতে।’
‘তাই?’ বলেই একটু হাসল অপলা। সেই হাসির আড়ালে সামান্য বিষাদ। তাতে কিছু স্মৃতি, কিছু বিস্মৃত সুখ, কিছু আড়াল করে রাখা কষ্ট। কিছু লুকিয়ে রাখা সময়। সব যেন ক্ষণিকের জন্যে ভেসে উঠল একসাথে।
হাসান হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য ইতস্তত করে হাসানের বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরল অপলা।
হাসান তাকে এস্কর্ট করে নিয়ে এলো ডাইনিং টেবিলে।
অপলা দেখল সুন্দর করে সাজানো ডাইনিং টেবিল—দুজনের জন্যে। মনে হচ্ছে কোনো পাঁচ তারকা হোটেলের ফাইন ডাইনিং রেস্টুরেন্ট।
হাসান চেয়ার সরিয়ে অপলাকে বসতে সাহায্য করল। অপলা বসতেই সে প্রফেশনাল ওয়েটারদের মতো ন্যাপকিনটির ভাঁজ খুলে অপলার হাতে দিল। তারপর ফ্রেঞ্চ উচ্চারণে বলল, ‘Would that be “dinner for two” mam?’
অপলা মজা পেল। সে হেসে দিয়ে বলল, ‘Yes! Thank you.’
‘Okay then, may I offer you a glass of champagne?’ একই রকম ফ্রেঞ্চ উচ্চারণে বলল হাসান।
‘Yes you may.’ অপলা আবারো হাসল।
হাসান অনভ্যস্ত হাতে শ্যাম্পেন বোতলের কর্ক খুলতে চেষ্টা করল পেশাদার ওয়েটারদের মত একটা ভাব নিয়ে। কিন্তু অনভ্যস্ত হাতে কর্ক খোলা মাত্রই অতিরিক্ত বুদবুদ তৈরী হয়ে বোতল থেকে উপচে পড়ল শ্যাম্পেন। অপলা হেসে ফেলল।
হাসান অপ্রস্তুত ভাবে হাসল। সে খুব ধীরে একটা গ্লাসে কিছুটা শ্যাম্পেন ঢেলে এগিয়ে দিল অপলার হাতে। তারপর নিজের জন্যে একটা গ্লাসে ঢেলে নিয়ে বসল তার নির্দিষ্ট চেয়ারে। শ্যাম্পেন গ্লাস উঁচু করে ধরে হাসান বলল, ‘চিয়ার্স!’
অপলা তার গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে হাসানের গ্লাসে আলতো করে একটা ছোঁয়া দিয়ে বলল, ‘চিয়ার্স!’
একটা হালকা চুমুক দিয়ে শ্যাম্পেন গ্লাস নামিয়ে রাখল অপলা। তাকাল হাসানের দিকে।
হাসানকে কিছুটা নার্ভাস মনে হলো, কেন কে জানে। সে শব্দ করে কয়েক সিপ শ্যাম্পেন গলায় ঢেলে দিল।
অপলা মৃদু হেসে বলল, ‘Thirsty?’
হাসান খানিকটা অপ্রস্তুতভাবে বলল, ‘একটুতো বটেই।’
‘আমিও।’ হেসে বলল অপলা। এবং বড় করে এক সিপ শ্যাম্পেন মুখে নিল।
হাসান খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো। অপলা প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে এমন একটা ভাব নিয়ে বলল, ‘কোথায় তোমার ডিনার? আনো দেখি, আর সহ্য হচ্ছে না। অনেক খিদে পেয়েছে।’
‘এখুনি আনছি।’ বলেই হাসান ঘুরে পাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Waiter, we’d like to have our dinner now.’ ভাবটা এমন যে সেখানে একজন ওয়েটার দাঁড়িয়ে আছে।
হাসানের কাণ্ড দেখে হেসে ফেলল অপলা। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘And tell him to get me a huge dish, completely full.’
‘Will do, mam.’ বলেই হাসান উঠে চলে গেল ভেতরে। কিচেন থেকে ডিশটা বের করতে যাবে ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল, কিচেনের জানালার ওপাশে রুবেল দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। হাসানের সাথে চোখাচোখি হতেই সবগুলো দাঁত বের করে দিল সে। রুবেলের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে হাসান অন্যমনস্কভাবে গরম ওভেনে হাত ঢুকিয়ে দিল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৩)

হাসান দেখল বত্রিশ পাটি দন্ত বিকশিত করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—রুবেল।
হাসানের সমস্ত উচ্ছ্বাস উবে গেল নিমিষেই—চূড়ান্ত রকমের মেজাজ খারাপ হলো তার। নিজেকে কোনো রকমে সামলে নিল সে। মুখ কালো করে বলল, ‘ও তুমি। আমিতো ভাবলাম… আচ্ছা, তোমাকে না বললাম আসার দরকার নেই। অপলা যে কোন মুহূর্তে চলে আসবে। তুমি এখন যাও।’
রুবেল বলল, ‘হাসান ভাই, আমি এইখানে আসার একটু আগেই তো দেখলাম কে যেন আপনার বাসার সামনে থেকে চইলা গেল। মনে হয় অনেকক্ষণ দাড়ায় ছিল।’
রুবেলের কথা হাসান ঠিক বুঝতে পারল না। সে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
রুবেল আবার বলল, ‘আপনে তো মিয়া সারাদিন লাগায়ে দিলেন। দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে? ছিলেন কোথায়?’
হাসান কিছু বলার আগেই রুবেল আবার বলল, ‘তারপর কি আয়োজন করতেছেন? এতদিন পর আপনার… হে হে হে’ বলতে বলতে হাসানকে পাশ কাঁটিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।
হাসান ঘুরে বলল, ‘তুমি কি সত্যি সত্যি কাউকে চলে যেতে দেখেছ?’
‘রিল্যাক্স ম্যান, আই ওয়াজ জাস্ট প্লেয়িং উইথ ইউ!’
‘ধুর মিয়া, দিয়েছিলে তো হার্টের মধ্যে একটা পেরেক ঢুকিয়ে। সব সময় ফাজলামো করা ঠিক না।’ কপালের ঘাম মুছে হাসান বলল, ‘তো কোন মতলবে এখানে হাজির হয়েছ বলো, বিসাইডস টরচারিং মি?’
‘হাসান ভাই, আপনারতো ব্যবসা আর টাকা বানানোর চিন্তা ছাড়া আর কোন ধান্দা নাই—সময়ও নাই। তাই ভাবলাম, আপনার জন্যে কয়েকটা জিনিস নিয়া আসি।’ রুবেল দুষ্টুমির হাসি দিয়ে পকেট থেকে একটা ব্রাউন প্যাকেট বের হাসানের দিকে এগিয়ে দিল।
‘কী জিনিস?’ রুবেলের হাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল হাসান।
‘আরে বুঝলেন না? আরে ঐ জিনিস! ইউ নো হোয়াট আই মিন…’
‘নো আই ডোন্ট নো হোয়াট ইউ মিন… তাছাড়া আমার কিছুই লাগবে না। তুমি এখন যাওতো ভাই। পরে এসো।’
‘হাসান ভাই, আপনি বয়সে আমার বড় হইলে কী হবে—এই ব্যাপারে আপনার চেয়ে আমার অভিজ্ঞতা একটু বেশীই আছে। রাইখা দেন কাজে লাগবে। গরীবের একটা কথা, বাসী বানায়ে লাভ কী?’
‘শোন রুবেল, তুমি বেশী কথা বলো। বেশী কথা বলা মানুষ আমার মাঝে মাঝে পছন্দ—তবে সব সময় না। যন্ত্রণা করবে না। এখন যাও, পরে এসো।’
রুবেল নাছোড়বান্দা। সে আবারো প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বিপদের সঙ্গী। সব সময় দু’একটা হাতের কাছে রাখতে হয়। কখন কাজে লাগে বলা যায় না।’ বলেই সে প্যাকেট খুলে বের করতে উদ্যত হতেই হাসান থামিয়ে দিল।
‘থাক খুলতে হবে না। এমনিই দাও, দিয়ে বিদেয় হও। তুমিতো দেখছি নাছোড়বান্দা।’ হাসান প্যাকেটটা রুবেলের হাত থেকে নিয়ে প্রায় জোর করেই ওকে বিদায় জানাল।
রুবেল দরজা পর্যন্ত যেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘হাসান ভাই…’
হাসান বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আবার কী? রুবেল, দয়া করে তুমি এখন যাও। অপলা যে কোনো মুহূর্তে চলে আসবে। প্লিজ তুমি যাও—আমি পরে সব তোমাকে বলব। ওকে?’
‘যা যা ঘটবে সব?’
হাসান চোখ বড় করে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ যা যা ঘটবে সব।’
‘ঠিক আছে যাইতেছি। বাট আই উইল বি ব্যাক সুন।’ বলেই দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।
হাসান যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সে দরজাটা আটকাতে যাবে, রুবেল দরজা ধরে বলল, ‘আপনি এতো নার্ভাস হয়ে আছেন কেন?’
‘উফ!’ বলেই রুবেলের মুখের উপর সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল হাসান।
শিকাগোর হাইওয়ে ধরে অপলার ক্যাব ছুটে চলেছে। উদাস দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে বাইরে—স্মৃতির সব কটি জানালা খুলে। এতদিন পর আবার মনে পড়ে যাচ্ছে পেছনের কথাগুলো একটি একটি করে—বিক্ষিপ্ত ভাবে। চোখ বন্ধ করে অনুভব করল নিজের মনের কত অব্যক্ত অনুভূতির কথা। জীবনের ক্যানভাসে এমন কিছু স্মৃতির ছবি আঁকা হয়ে যায়, যা ভোলা যায় না কখনোই।

হাসানের ফিরতে বেশ দেরি হলো।
সে ঘরে ঢুকে দেখল অপলা উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে আছে। হাসান আলতো করে অপলার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?’
অপলা কিছুই বলল না। নিঃশব্দে পড়ে আছে সে। ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না।
হাসান ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘সরি, আজো একটু দেরী হয়ে গেল।’
অপলা এবারো কিছু বলল না।
‘আই’ম রিয়েলি সরি।’
অপলা যেভাবে ছিল সেভাবেই পড়ে রইল। তারপর ঠাণ্ডা কিন্তু কঠিন স্বরে বলল, ‘আমার টিকিটের ব্যবস্থা করো। আমি বাংলাদেশে যাব।’
‘আর মাত্র কয়েকটা মাস। বিজনেসটা একটু গুছিয়ে নেই, তারপর দেখো আর দেরী হবে না।’
‘সে কথা গত তিন বছর ধরেই শুনছি।’ একটু থেমে অপলা অভিমানী কণ্ঠে বলল, ‘তুমি কি একবারও আমার কথা ভাবো?’ তার গলা ধরে এলো। সে ধীরে ধীরে বলল, ‘বিয়ের পরে তুমি আমাকে কতটুকু সময় দিয়েছ বলো? দেশে গিয়ে বিয়ে করে রেখে এলে। কি অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে এক একটি দিন আমাকে কাটাতে হয়েছে!’
‘এখনতো তুমি চলেই এসেছ।’
অপলা উঠে বসল। ঘুরে মুখোমুখি হলো হাসানের। গলার স্বর উঁচু না করেই বলল, ‘হ্যাঁ, চলে এসেছি, কিন্তু কার কাছে? যার জন্যে এতো অপেক্ষা, তার কাছে এসেও যদি তাকে না পাই, তাহলে এ আসার কী মানে?’
হাসান চুপ করে রইল।
‘আমাকে যদি সময় নাই দেবে তাহলে বিয়ে করে এনেছিলে কেন? শুধু রান্না, ঘর গোছানো, লণ্ড্রী করা আর মাঝে মাঝে তোমার শরীরের ক্ষুধা মেটানোর জন্যে? আমিতো একটা মানুষ, হাসান। এই ঘরটার মধ্যে একা একা আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।’
হাসান কী বলবে ভেবে পেল না।
কথা বলতে বলতে অপলা চলে গেল ওদের ছোট্ট কিচেন কাম ডানিং রুমটাতে। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে মাইক্রোওয়েভে গরম করতে করতে সে গজগজ করছে। হাসান তার পেছনে এসে বসল ডাইনিং টেবিলে। অপলা প্লেটে ভাত তুলে এগিয়ে দিল হাসানের দিকে।
হাসান লক্ষ্য করল, এত রাগ ক্ষোভ আর অভিমান নিয়েও অপলা তার জন্য খাবার গরম করে দিচ্ছে ঠিকই—প্লেটেও তুলে দিচ্ছে।
‘জেলখানায় মানুষও এর চেয়ে বেশী ভাল থাকে। অন্তত কথা বলার সঙ্গী পায়। এখানে আমার কে আছে যার সঙ্গে কথা বলে দু’দণ্ড সময় কাটাব?’ অভিমানী কণ্ঠে অপলা বলল।
‘আহা তোমাকে না বললাম, এখানে কত বাঙালি ভাবী আছে—তাদের কারো সঙ্গে পরিচয় করো। বন্ধু বানাও। কথা বলো। সময় কেটে যাবে।’
‘পরিচয়টা হবে কীভাবে? ঘরে বসে থেকে? বাঙালিদের কোন অনুষ্ঠানে তুমি আমাকে নিয়ে যাও, না সে সময় তোমার আছে? তাছাড়া কোন বাঙালি ভাবীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে অন্য আরেক ভাবীর সমালোচনা করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমার চাই তোমার সময়, অন্য কারো নয়।’
‘তাহলে টিভি দেখো। তোমার জন্যেই তো সব হিন্দি আর বাংলা চ্যানেলগুলো নিলাম।’
অপলা আহত চোখে তাকাল হাসানের দিকে। এসব বিনোদনে সাময়িক সময় কাটে—কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান নয়। হাসান এই কথাটা কেন বুঝতে পারছে না।
হাসান এবার বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা, তুমি কি চাওনা আমাদের একটা সুন্দর বাড়ি হোক, ভাল গাড়ি থাক। দেখো, তাকিয়ে দেখো আমরা কোথায় থাকি। দু’কামরার ছোট্ট একটা এপার্টমেন্ট। যেখানে একটা গেস্ট আসলে থাকতে দেবার জন্যে আলাদা একটা রুম নেই। এক চিলতে রুমের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে সব কিছু ভরা। ডাইনিং টেবিলটা বসাতে হয় কিচেনের মধ্যে। তোমার ইচ্ছে হয় না, আমাদের একটা স্বপ্নের বাড়ি হোক। এগুলো আমি কার জন্যে করছি, অপলা? তোমার জন্যে, আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্যে। সুন্দর একটা ভবিষ্যতের জন্যে।’
‘এখানে আসার পর থেকেই তোমার কাছে একটা বাচ্চা চেয়েছি। সেখানেও তোমার আপত্তি। ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি, বলে এড়িয়ে গেছো। আর ভবিষ্যতের কথা বলছ? হাহ, আমার তো বর্তমানই নেই, আর ভবিষ্যৎ!’
হাসান মুখ নিচু করে ফেলল। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।
‘তুমি শুধু তোমার স্বপ্নের কথাই ভাবছো, হাসান। অন্য কারো নয়। একদিন তোমার অনেক টাকা হবে। স্বপ্নের বাড়ি হবে, গাড়ি হবে ঠিকই—কিন্তু যার বা যাদের কথা ভেবে এগুলো করছ, তারা হয়ত কেউ থাকবে না তোমার পাশে। একদিন কাজ থেকে ফিরে এসে দেখবে আমি নেই।’
হাসান মুখে হাত দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে শুনছে অপলার কথা।
‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট মানি, হাসান। আই ডোন্ট নিড মানি। আই নিড এ লাইফ!’
হাসান বুঝতে পারছে না কী বলবে। অপলাকে কখনোই এতটা উতলা হতে দেখেনি সে এর আগে। হাসানের হঠাৎ একটু একটু খারাপ লাগতে লাগল। আহারে, বিকেল থেকে মেয়েটা সেজে গুজে বসে ছিল—বিয়ে বার্ষিকীর দিনটিতে ওকে তার প্রিয় রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবার কথা ছিল। সেটা বড় কথা নয়—অপেক্ষায় থেকে মেয়েটা অভিমানের পাহাড় জমিয়ে ফেলেছে। রাতে বাইরে খাবে বলে সে হয়ত কিছু রান্নাও করেনি। তাই পুরনো যা ছিল তাই গরম করে সামনে দিয়েছে।
অপলা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল বেডরুমে। এবং কাপড় বদলে শুয়ে পড়ল। তার এখন আর কান্না পাচ্ছে না। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবার পর যখন সে বুঝতে পেরেছে—হাসানের আসতে আজকেও দেরি হবে, তখন থেকেই ক্ষণে ক্ষণে সে কেঁদেছে অনেক।

পেছনের কথাগুলো ভেবে চোখ ভিজে এলো অপলার। সে চোখ মুছে তাকাল বাইরে আর ঠিক তখনই তার ক্যাব হাইওয়ে থেকে বের হয়ে ছবির মত দেখতে একটি আবাসিক এলাকায় ঢুকল। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাব ড্রাইভার ঠিকানা মিলিয়ে হাসানের প্রাসদোপম বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। অপলা ফিরে এলো বাস্তবে।
ক্যাব থেকে নেমে অপলা তাকাল বাড়িটার দিকে। তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। দাঁড়াল সদর দরজার সামনে।
হঠাৎ অপলার কী হলো কে জানে। ডোর বেলে চাপ দিতে গিয়েও থেমে গেল সে। একবার রাস্তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখল ক্যাব ড্রাইভার তাকিয়ে আছে তার দিকে । কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে ফিরে গেল ক্যাবের কাছে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-২)

হাসানের এখনো মনে আছে—যেদিন অপলা শিকাগো শহরের একটা ঘিঞ্জি এলাকার তাদের দু’বেড রুমের ছোট্ট এপার্টমেন্টটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাকে ফেলে।
প্রতিদিনের মত সেদিনও কাজ থেকে একটু দেরি করেই বাসায় ফিরল হাসান। দরজা খুলে ঘরে ঢুকে সে ডাকল, ‘অপলা।’
কিন্তু কোনো সাড়া দিল না অপলা। সে বেডরুমে যেয়ে দেখল অপলা নেই।
হাসান আবার ডাকল। এবারো নীরব। এবার সে সব রুম গুলো দেখল—নেই। বাথরুম, কিচেন, পেছনের বারান্দা—কোথাও নেই অপলা।
হাসানের দেরি হলে অনেক সময় টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে অপলা। হাসান লিভিং রুমে এসে দেখল—এখানেও নেই। গেল কোথায় এত রাতে? সে চিন্তিত মনে সোফায় বসে পড়ল।
অভ্যাসবশত টেলিভিশনের রিমোট নিয়ে চালু করতে যেয়েই সে লক্ষ্য করল টেলিভিশনের পর্দার উপরে একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ টেপ দিয়ে লাগানো। হাসান উঠে গিয়ে কাগজটি নিয়ে এসে আবার বসল সোফায়। ভাঁজ খুলে সে দেখল একটা চিঠি। অপলার হাতের লেখা। গোটা গোটা অক্ষরে অপলা লিখেছে–
‘হাসান,
নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত আমি চলে যাচ্ছি।
প্রতিদিন একদিন একদিন করে তোমার সাথে আমার দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আমি আর পারছিলাম না—এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে আমার মেন্টাল ব্রেকডাউন হতো। তাতে তোমার ঝামেলা আরো বাড়ত বই কমত না। না পারতে ফেলতে—না পারতে রাখতে।’
হাসান চিঠি পড়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর আবার পড়া শুরু করল—
‘হাসান, একজন পুরুষ মানুষের জীবনে টাকা এবং নারী দুটোরই প্রয়োজন আছে—অন্তত তাই বলেই জানতাম। কিন্তু তুমি তার ব্যতিক্রম। তোমার দরকার শুধু টাকা। আমাকে তো তোমার প্রয়োজন নেই। আমাকে তুমি হয়ত মিস করবে না—মিস করার মতো কোনো ঘটনাই তো ঘটেনি। আমাদের সাড়ে-পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে পাঁচটা দিনও তুমি আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে দাওনি। আমারা দু’জন দু’জনকে কতটুকুই বা চিনতে পেরেছি।’
এ পর্যায়ে হাসান আবার থামল। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বাকী লেখাটুকু পড়ে শেষ করল।
‘তোমার কাছে তো আমি বেশি কিছু চাইনি হাসান। একটু সময়—আর একটা বাচ্চা। তার কোনোটিই যখন দিতে পারবে না তবে কেন আর থাকা বলো? কিসের প্রয়োজনে? আমার কিছু একটা তো চাই। যেদিন জানব তোমার জীবনে আমার প্রয়োজন আছে—আমি ফিরে আসব। তবে আমার জন্যে তোমার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ভাল থেকো। নিজের যত্ন নিও।
ইতি—তোমার অপলা।’

রান্না ঘরে চারিদিকে দুনিয়ার জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ওয়ালমার্টে গিয়ে সামনে যা পেয়েছে তাই শপিং কার্টে তুলেছে হাসান। এখন সব কিছু ছড়িয়ে বসে আছে।
কিচেন কাউন্টারে ছড়ানো জিনিষগুলোর দিকে বোকার মত তাকিয়ে আছে সে। বুঝতে পারছে না কী দিয়ে কী করবে? তার কপালে কিঞ্চিত ঘাম দেখা দিল। সে মনে মনে ভাবল—রান্নার আইডিয়াটা বাদ দিলে কেমন হয়। তারচেয়ে বরং কোনো একটা ফাইন ডাইনিং রেস্টুরেন্টে দুজনের জন্যে রিজার্ভেশন দিয়ে দেয়াটাই উত্তম। অপলার একটা পছন্দের রেস্টুরেন্ট আছে—ওদেরকে কল করে রিজার্ভেশনটা দিয়ে দিলেই হবে।
‘উম… নাহ, অপলার একটা পছন্দের আইটেম, এটা আমাকে করতেই হবে। ওকে বরং সারপ্রাইজ দেয়া যাবে।’ হাসান মনে মনে বলল।
এতদিন পর অপলা আসছে। তাকে ইমপ্রেস করতেই হবে আর সেটা তার নিজের হাতে তৈরী অপলার ফেভারিট ডিস। কিন্তু রেসিপিটা কিছুতেই মনে করতে পারছে না সে। অতঃপর রেসিপি বইটা খুলে কয়েকবার পড়ে পূর্ণ উদ্যমে নেমে পড়ল কাজে। রান্না করার এপ্রোনটা গায়ে জড়িয়ে একটার পর একটা আইটেম এলুমিনিয়ামের ট্রে-তে সাজিয়ে ফেলল। প্রয়োজনীয় মশলা, সস আর চিজ ছড়িয়ে দিয়ে ফয়েল পেপার দিয়ে ঢেকে ওভেনে ঢুকিয়ে টাইমার সেট করে দিল। তারপর ফুড নেটওয়ার্ক চ্যানেলের সেফদের মত কপালের ঘাম মুছে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল, ‘যাক বাবা, শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক মতো সব কিছু দেয়া হয়েছে। এবার জিনিসটা ঠিক মতো হলেই হয়।’
হাসান খুশিমনে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে দ্রুত গোসলটা সেরে নিল।
হাসান ঘড়ি দেখল। প্রায় পঁচিশ মিনিট হয়ে গেছে। সে কিচেনে ঢুকে ওভেন খুলে দেখল সবকিছু ঠিক আছে কিনা। ‘মনে তো হচ্ছে সব কিছু ঠিক মতোই হয়েছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়–আল্লাহ্‌ ভরসা।’ বলেই সে আবারো টাইমার সেট করে দিয়ে লিভিং রুমে এসে বসল। এখন শুধু অপেক্ষা।

দুপুর পেরিয়ে বিকেল ছুঁই ছুঁই করছে।
অপলার প্লেন ল্যান্ড করল শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। একটা ছোট্ট ক্যারিং লাগেজ আর হ্যান্ডব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে এলো অপলা। বাদামি রঙের স্কার্টের সাথে কালো রঙের টপস পরিহিতা অপলাকে লাগছে অপ্সরীর মত। চোখে তার প্রিয় প্রাডা ব্র্যান্ডের সানগ্লাস। ঘাড়ের দুপাশে বাঁকা হয়ে চুল ছড়িয়ে আছে। অন্যরকম একটা ব্যক্তিত্বের দ্যুতি ছড়িয়ে আছে তার চোখে-মুখে।
এদিক ওদিক তাকিয়ে সে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল আউট-বাউন্ড প্যাসেঞ্জার তুলে নেবার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা ইয়েলো ক্যাব এসে থামল তার পাশে।
ক্যাব ড্রাইভার অপলার লাগেজটি ট্রাঙ্কে তুলে দিতেই সে উঠে বসল পেছনের সীটে। তারপর ঠিকানাটা দিয়ে দিল ড্রাইভারকে। গন্তব্য হাসানের বাড়ি।
এয়ারপোর্ট থেকে হাসানের বাসা একঘণ্টার ড্রাইভ। অপলা পেছনের জানালাটা খুলে দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরে। বাতাসে চুল উড়ে এসে পড়ছে তার মুখের উপর। চুল সরিয়ে দিয়ে সে আবার তাকাল বাইরে। শিকাগো ডাউন-টাউন পার হয়ে যখন লেক মিশিগানের তীর ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছিল ক্যাবটি—লেকের দিকে তাকিয়ে অপলা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার তখন মনে পড়ে গেল কিছু পেছনের কথা—কিছু স্মৃতি।

অপলা সুন্দর করে সেজেছে।
চুমকি দেয়া গোলাপি রঙের একটা ডিজাইনার শাড়ি। সুন্দর করে পরিপাটি চুল বাঁধা। কপালে টিপ—হাতে বালা। সে অনেকক্ষণ থেকে সামনের জানালা খুলে তাকিয়ে আছে বাইরে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেয়াল ঘড়ি দেখল—বিকেল পাঁচটা বেজে পঁচিশ মিনিট। সে আবারো তাকাল বাইরে।
ঘড়ির টিক্‌ টক্‌ শব্দ! এক একটা সেকেন্ড চলে যাচ্ছে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। অপলা জানালার ধার থেকে ভেতরে এসে দেখল ঘড়িতে ৬টা বাজে। সে অসহিষ্ণু হয়ে ফোন করল—কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরল না। সে কিছুক্ষণ টিভি ছেড়ে দিয়ে রিমোট নিয়ে চ্যানেল বদলাতে থাকল। তার অস্থির লাগছে। ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বাজতেই সে আবার ফোন করল।
ওপাশ থেকে এবার ফোন ধরতেই অপলা চাপা ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘তোমার কি আজকেও দেরী হবে? বছরের এই একটা বিশেষ দিনেও কী তুমি একটু আগে আসতে পারতে না? একটা দিন কী আলাদা হতে পারে না, হাসান?’
হাসান বলল, ‘অপলা, একটা ভীষণ জরুরী কাজে আটকা পড়ে গেছি। তুমি রেডি হয়ে থাকো। আমি আসছি।
‘রেডি তো আমি সেই বিকেল থেকে হয়ে বসে আছি। তোমাকে কতবার বললাম, আজকের দিনটাতে অন্তত একটু তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করো।’
হাসান কোনো উত্তর দিল না।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি তোমার কাজ করো। কাজ শেষ হলেই ফিরো।’ বলেই অপলা ফোন কেটে দিল।
ফোন কেটে দিয়ে চুপ করে বসে রইল অপলা। মুহূর্তেই তার দু’চোখ ভিজে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল—নিজেকে একবার দেখল আয়নায়। এতো সুন্দর করে সে সেজেছিল। আজকে ওদের বিয়ে বার্ষিকী। কিছু কিছু দিন মনের খাতায় লেখা হয়ে যায় আজীবনের জন্য। ঠিক তেমন একটা দিন—বিয়ের দিনটা। বিবাহিত দম্পতিদের ক্যালেন্ডারের পাতায় জ্বলজ্বল করে এই দিন।
হাসান যখন কাজে যায় তখন একবার মনে করিয়ে দিল অপলা। ‘মনে আছে তো না? আজকে কিন্তু একদম দেরি করা চলবে না।’
‘খুব মনে আছে। আমি যথা সময়েই চলে আসব—ডু নট ওরি।’
ডু নট ওরি বলেও সে ঠিকই ভুলে গেছে আজকের এই বিশেষ দিনটির কথা। হাসান বলেছিল কাজ থেকে ফিরেই তারা দু’জন ডিনার করতে যাবে। শিকাগোর বিখ্যাত জন হ্যানকক টাওয়ারের ৯৫ তলায় হাসানের প্রিয় রেস্টুরেন্ট ‘সিগনেচার রুম’-এ রিজার্ভেশন দিয়ে রেখেছে সে। দুপুরে একবার ফোন করে হাসানকে মনে করিয়ে দিল অপলা। হাসান তখনো বলল যে সে আজকে তাড়াতাড়িই ফিরবে—অথচ তার ফেরার কোন নাম নেই।
অভিমানে জমে থাকা পানি টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে অপলার চোখ থেকে। সে একে একে খুলে ফেলল তার সব প্রসাধনী। কপালের টিপ খুলে লাগিয়ে রাখল আয়নার কাঁচে। গলার হার, হাতের চুড়ি খুলে রেখে দিল ড্রেসিং টেবিলের কাউন্টারে। তারপর চুল ছেড়ে দিয়ে মন খারাপ করে শুয়ে রইল বিছানায়।

হাসান রান্নাঘরের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ময়লাগুলো পরিষ্কার করা শুরু করল।
একটা আইটেম রান্না করতে গিয়ে সে ভাল পরিমাণ ময়লা ছড়িয়েছে। অপলা যে কোনো সময় চলে আসতে পারে। সে দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করছে আর ঠিক তখনই ডোর বেল বেজে উঠল।
হাসান একবার বাইরের দিকে তাকাল এবং অবাক হয়ে নিজের মনে প্রশ্ন করল, ‘এখন আবার কে এলো? অপলা? কিন্তু ওতো বলল বিকেলের ফ্লাইটে আসবে। এখন ক’টা বাজে?’
হাসান দ্রুত নিজেকে একটু পরিপাটি করে নিয়ে ছুটল দরজা খুলে দেবার জন্যে। সে উচ্চ কণ্ঠে বলল, ‘হোল্ড অন, আই উইল বি দেয়ার ইন অ্যা সেকেন্ড!’
হাসান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলগুলি ঠিক করে নিল। এটা অবশ্য তার একটা অভ্যাস—মাঝে মাঝেই চুলে হাত দিয়ে দেখে নেয় পরিপাটি আছে কিনা। দরজা খোলার মুহূর্তে সে একবার অনেকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি জানতাম তুমি একদিন ঠিকই ফিরে আসবে। ওয়েলকাম—ওয়েলকাম ব্যাক!’
দরজা খুলে চোখ বড় হয়ে গেল হাসানের—সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (শেষ পর্ব)

দূর থেকে এলিনা আর ইরিন দেখল একটি এ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ইমরানের বাসার সামনের পার্কিং লটে। তাঁরা দুজনেই উৎকণ্ঠা আর শঙ্কা নিয়ে একবার তাকাল একে অপরের দিকে। তারপর দ্রুত এগিয়ে গেল সামনে। বাসার কাছাকাছি আসতেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলো তাদের সামনে। পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও ওদেরকে ভিতরে যেতে না দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। টেনশনে ওদের দম বের হয়ে যাবার জোগাড় হলো।
এলিনা শঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘What’s wrong officer?’
অফিসার কোনো উত্তর দেবার আগেই কমলা রঙের ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন প্যারামেডিক একটা স্ট্রেচার বের করে এনে ঢুকাল এ্যাম্বুলেন্সে। স্ট্রেচারে শুয়ে আছে রজার্স—জীবিত না মৃত তা বোঝা গেল না। এলিনা বিচলিত বোধ করল।
একটু পরেই বেরিয়ে এলো ইমরান।
এলিনা আর ইরিন তাকাল ইমরানের দিকে। তাকে দেখেও কিছু বোঝা গেল না—ঘটনা আসলে কী ঘটেছে।
ইমরানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এলিনা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল ইরিনের দিকে। ‘তুই তোর বাবাকে সবকিছু বলে দিয়েছিলি তাই না?’
‘না মা—আমি কিছুই বলি নাই। Trust me—I didn’t say a single word.’
এলিনার ক্ষীণ সন্দেহ হলো যে ইরিন তার কাছ থেকে বিষয়টি লুকিয়েছে। তার ধারণা, ইমরান আর ইরিন আগে থেকেই কিছু একটা প্ল্যান করেছিল। এলিনার প্রচণ্ড রাগ হলো। হঠাৎ করেই রজার্সের জন্যে তার খারাপ লাগা শুরু হলো অথচ কয়েক মিনিট আগেও সে নিজেই রজার্সকে নিজের হাতে খুন করবে বলে উত্তেজিত হয়ে বাসায় ফিরে এসেছে। কী আশ্চর্য!
সাইরেন বাজিয়ে এ্যাম্বুলেন্সটি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে গেল ইমরানের দিকে। একটা কাগজ আর কলম বের করে দিল তার হাতে—একটি সাধারণ পুলিশ রিপোর্ট। ইমরান একবার দেখে নিয়ে সাইন করে ফিরিয়ে দিল অফিসারের হাতে। আবার কিছু কথা হলো তাদের মধ্যে। পুলিশ অফিসার বিদায় নিয়ে চলে যেতেই ইমরান এগিয়ে গেল ইরিনের দিকে।
ইরিন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে। ‘You alright baba?’
‘Yea, I’m just fine.’ ইমরান তার মেয়েকে আশ্বস্ত করে বলল।
‘What happened?’ ইরিন জিজ্ঞেস করল আবার।
ইমরান কিছু বলল না। এলিনা এগিয়ে এলো সামনে। সে এতক্ষণ কনফিউজড হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না—আসলে কী ঘটেছে। সে ইমরানকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে আমাকে বলবে?’
ইমরান কোনো উত্তর দিল না।
এলিনা তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল আবার, ‘কথা বলছ না কেন ইমরান?’ সে যথেষ্ট চিন্তিত। আবার বলল সে, ‘What did you do to him?’
উত্তর না দিয়ে ইমরান তাকিয়ে দেখল আশে পাশের বাসা থেকে বেশ কিছু প্রতিবেশী কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। ইমরানের বাসার পাশের বাসাতেই থাকে এক সাউথ ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি—সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ঘটনা কী? ইমরান তাকে বোঝাল—তার গেস্টের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। চিন্তার কিছু নেই। কথা না বাড়িয়ে তাকে গুড নাইট জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ইরিন এসে ধরল তার হাত।
‘Let’s go inside.’ ইরিনকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল ইমরান। এলিনার দিকে একবারের জন্যে তাকালও না।
এলিনা কী করবে বুঝতে পারল না। কেমন অসহায় লাগছে তার। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল একা একা। তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ সামনের বাড়িটার দিকে। একসময় এটি ছিল তার নিজের বাড়ি—অনেক পছন্দের। নিজ হাতে সাজিয়ে ছিল সব কিছু। আজ এখানে সে অতিথি। ভাবতেই কেমন অস্বস্তি হতে লাগল তার। এলিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে তাকাল রাস্তার দিকে। রাত কত হয়েছে কে জানে। সে কি একা একা ড্রাইভ করে ফিরে যাবে? কিন্তু কোথায় যাবে সে? সব কিছু জানার পরে রজার্সের ঐ অভিশপ্ত বাসায় তো তার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল এলিনা ।
হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তার হাত ধরল। ঘুরে তাকিয়ে দেখল ইরিন। ইরিন তার মায়ের হাত ধরে তাকে নিয়ে গেল ভিতরে।

৪৮ ঘণ্টা পরে রজার্সের জ্ঞান ফিরেছে। সার্জারি করে রজার্সের জেনিটালস রিপেয়ার করার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু সফল হয়নি সার্জনরা। বিকল যন্ত্র নিয়েই তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। বেঁচে আছে এটাই ভাগ্য।
এক সপ্তাহ পরে এলিনা একবার দেখা করে এসেছে রজার্সের সঙ্গে। এলিনাকে যেতেই হতো। রজার্সের সঙ্গে তার কিছু বোঝাপড়া ছিল।
এলিনা দেখল হাসপাতালের বিছানায় বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত রজার্স তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে। সে এসে দাঁড়াল তার বিছানার পাশে। পৃথিবীর সমস্ত ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে এলিনা তাকাল রজার্সের চোখের দিকে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল, ‘You’re lucky that Imran did not kill you but I would have killed you. I have no sympathy for a rapist; you deserved the pain and suffering.’
রজার্স নিশ্চুপ। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল দেয়ালের দিকে।
‘You scarred my girl for life. You took her life away. Now you pay for the consequences. Enjoy the rest of your life.’
এলিনা ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রজার্সের দিকে। রজার্স দেয়ালের দিকেই তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে এলিনা বের হয়ে গেল রুম থেকে।

অনেকক্ষণ থেকেই লিভিং রুমে বসে আছে এলিনা। ইমরান ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল এনে দিয়েছে তাকে। পানি খেয়ে এলিনা চুপচাপ বসে রয়েছে। মাঝেমাঝে ইমরানের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু তার মনের অবস্থা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
ইমরান ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে। সে জানে এলিনা কিছু বলতেই এসেছে। কিন্তু এখনো কিছুই বলছে না অথবা বলতে পারছে না। সে নিজেও অপেক্ষায় আছে এলিনাকে কিছু কথা শোনাবার জন্যে। এলিনা শুরু করলেই সেও শুনিয়ে দেবে। তার প্রস্তুতি নেয়াই আছে।
দীর্ঘ সময় পার করে এলিনা বলল, ‘এভাবে ওকে ইনজুর্ড না করে পুলিশে দিলেই তো হতো? যা করার তারাই করত।’
‘পুলিশে দিলে কী হতো? তুমি জানো না—এ দেশে রেপিস্টের জেল হয় না। জেল হয় হোমলেস পিপলের—চুরি করে ধরা পড়ার অপরাধে। তাছাড়া এখানকার সিস্টেম ঐ সাদা চামড়ার কথাই বিশ্বাস করবে—তোমার আমার কথা না। উল্টো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার মেয়েটাকেই ফাঁসিয়ে দিত।’
এলিনা চুপ করে রইল।
‘নাকি তোমার কষ্ট হচ্ছে?’ ইমরান খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল।
‘কী বলছ তুমি?’
এবার উঠে দাঁড়িয়ে রিয়্যাক্ট করল ইমরান—উচ্চকণ্ঠে সে বলল, ‘Don’t you understand, that man raped my child? He’s a pervert, an evil pervert. That bastard hurt my daughter physically, mentally, and and took her childhood. My daughter, she is innocent. I could not take it, her suffering every day.’ বলতে বলতেই ইমরান অঝোরে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলে চলল, ‘কী দোষ ছিল ইরিনের? তিলে তিলে প্রতিদিন যে কষ্ট সে পাচ্ছিল—সেই কষ্ট মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি যা করার ভেবে চিন্তেই করেছি। জেল জরিমানা যাই হোক—সে নিয়ে আমি ভাবিনা। আমার কষ্ট শুধু একটাই—আমি আমার মেয়েকে রক্ষা করতে পারি নাই। আমি একজন ব্যর্থ বাবা!’
এলিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইমরানের মুখের দিকে। ভীষণ অবাক হলো—ইমরানকে এর আগে এভাবে কোনোদিন কাঁদতে দেখেনি সে। কোনো বাবা যখন তার সন্তানের জন্য কাঁদে—সে কান্নায় কোনো খাঁদ থাকে না। ইরিনের জন্যে আপ্লুত হয়ে যেভাবে কাঁদছে ইমরান—দেখে খুব মায়া লাগল। ইমরানকে স্থির হবার সময় দিয়ে চুপচাপ বসে রইল এলিনা।
ইমরানের ক্রোধ একটু কমে আসতেই এলিনা বলল, ‘একটা কথা বলবে?’
ইমরান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
‘তুমি জানলে কী করে? ইরিন তো তোমাকে কিছু বলেনি।’
‘না।’ ইমরান মাথা নাড়ল।
‘তাহলে?’
কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না ইমরান। চুপ করে বসে রইল। তারপর উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে। বাইরে তাকিয়ে থাকল যতদূর দৃষ্টি যায়। তার মনে পড়ল সেই রাতটির কথা—মাত্র কয়েকদিন আগের কথা।
সেদিন রাতে রজার্সের পাঠানো ভিডিও ক্লিপ দেখে আর রজার্সের হুমকি শুনে ইরিন যখন তার বাবাকে ফোনে বলেছিল তার ভয় লাগছে, ইমরান তখনই সব ফেলে দ্রুত ফিরে এসেছিল বাসায়। ঘরে ঢুকে দেরি না করে সে ছুটে গেল ইরিনের বেডরুমে। দূর থেকে দেখল, ইরিন ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ল্যাপটপটা ওর বুকের উপরে।
বিছানার কাছে এসে তার বুকের উপর থেকে আস্তে করে ল্যাপটপটা সরিয়ে ইরিনের গায়ের উপর ব্লাঙ্কেট তুলে দিল ইমরান। তারপর ল্যাপটপটা নিয়ে রাখল রিডিং ডেস্কের উপর। রাখার সময় স্ক্রিনে ইমরানের হাতের স্পর্শ লেগে হঠাৎ করেই ঘুমন্ত ল্যাপটপটা যেন জেগে উঠল—এবং স্থির হয়ে থাকা সেই ভিডিওটা চালু হয়ে গেল—যেটা দেখেই ইরিন সংজ্ঞা হারিয়েছিল।
ইমরান একটু অবাক হলো। সে ভাবল, এই বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেক কিছুতেই কিউরিয়াস হয়—ইরিন কি কোনো পর্ন সাইটে ঢুকেছিল—কে জানে। একটু চিন্তিত মনে সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে তার মনে একটা খটকা বাঁধল। মনে হচ্ছে কিছু একটা সে দেখেছে—অস্বাভাবিক কিছু। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কি ভুল দেখল? অবশ্যই ভুল। তবুও নিশ্চিত হবার জন্য সে স্ক্রিনটা আবার খুলে মাউস প্যাডে আঙুল দিয়ে কয়েকবার নাড়ল আর তখনই ভিডিওটা চালু হয়ে গেল আবার।
বরফের মতো জমে গেল ইমরান। বুকের ভেতরটা কে যেন মুচড়ে দিল মুহূর্তে। একি দেখল সে। এতবড় ধাক্কা সে তার জীবনে এর আগে কখনো খেয়েছে বলে মনে পড়ে না। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। কিছুতেই নড়তে পারছে না। সেকি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে তাও বুঝতে পারছে না।
বাস্তবে ফিরে আসতে ইমরানের বেশ খানিকটা সময় লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে একবার তাকাল ঘুমন্ত ইরিনের দিকে। এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল তার বিছানার কাছে। বিছানায় পড়ে থাকা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে খুঁজে খুঁজে ইরিনের ফোন থেকে সব টেক্সট মেসেজগুলো পড়ল। ধীরে ধীরে তার মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আপনা-আপনিই মুঠি বন্ধ হয়ে গেল তার। প্রতিহিংসায় চোখদুটো জ্বলে উঠল।
ইরিনের মাথায় হাত রেখে তার বিছানার পাশে বসে রইল পাথরের মত। একজন ভগ্নহৃদয়ের পরাজিত মানুষের প্রতিচ্ছবি যেন ইমরান।
বাস্তবে ফিরে এলো ইমরান। তার চোখ আবার ভিজে উঠেছে।
ইমরান বলল, ‘এটা আমার ব্যর্থতা। আমি আমার মেয়েকে প্রটেক্ট করতে পারিনি। এ দায় আমার—যা করার আমাকেই করতে হতো। প্রতিশোধ আমাকে নিতেই হতো।’
এলিনা ইমোশনাল হয়ে পড়ল।
‘কিন্তু তোমাকে আমি কোনোদিনই ক্ষমা করব না এলিনা।’
এলিনা চমকে তাকাল ইমরানের দিকে। কেমন কষ্ট আর ঘৃণা মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমরান।
‘আমার মেয়ের জীবনে এত বড় একটা ক্ষতি কোনোদিনই হতো না—যদি তুমি ওর কাছে থাকতে। এই সব কিছুর জন্যেই তুমি দায়ী। You’re responsible for this mess… and I’ll never ever forgive you.’
এলিনা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I deal with the blame and shame on a daily basis. লজ্জায় চলতে পারিনা, ঘুমাতে পারিনা। আমার দিন শুরু হয় এই ব্যথা নিয়ে। শেষও হয় এই ব্যথা নিয়ে। তুমি কী বুঝতে পারছ—আমি কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি? How long, how long do I have to deal with it?’
‘In rest of your life!’ বলেই উঠে চলে গেল ইমরান। তার আর কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না।
এলিনা নীরবে কেঁদে চলল।

ইমরানের ল’ইয়ার জানিয়েছে—হাসপাতালের বিছানায় বসেই রজার্স স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করেছে। স্বীকার না করে অবশ্য তার উপায়ও ছিল না। তার করা ভিডিও, পাঠানো টেক্সট মেসেজ এবং ইমেইলে ছবি—সবই তার বিরুদ্ধে আলামত হিসেবে কাজ করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ইরিনকে আইসক্রিমের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে তারপর ধর্ষণ করার বিষয়টি।
নিচের অংশটুকু রজার্সের জবানবন্দি থেকে নেয়া—!
ইরিনকে সংজ্ঞাহীন করে বেডরুমে নিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর–রজার্স ঘড়ি দেখল।
এলিনার শিফট শেষ হতে কম করে হলেও আরো তিন ঘণ্টা বাকি। তারপর বাসায় ফিরতে আরো পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট। সে ইরিনের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত ছুটে গেল তার নিজের রুমে। কালবিলম্ব না করে ফিরে এলো একটা ছোট হ্যান্ডিক্যাম আর ট্রাইপড নিয়ে। ক্যামেরাটি সেট করে ইরিনের শরীরের উপরে ফোকাস স্থির করল সে। স্টার্ট বাটনে চাপ দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ইরিনের কাছে। অতঃপর অতি সন্তর্পণে ইরিনের শরীর থেকে একটা একটা করে কাপড় খুলে ফেলল সে। মোবাইল ফোন দিয়ে প্রথমেই দ্রুত কিছু স্থির ছবি তুলে নিল মেয়েটির নগ্ন শরীরের। সময় ক্ষেপণ না করে ছোট মেয়েটিকে অচেতন অবস্থায় ইচ্ছেমত ধর্ষণ করল রজার্স। চরিতার্থ করলো তার বিকৃত কাম লালসার। ইরিনের নগ্ন শরীরটাকে জানোয়ারের মতো ব্যবহার করল সে। একটা ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে একটা মায়াবী হরিণ ছেড়ে দিলে যেমনটা হয় ঠিক ঐরকম অবস্থা হলো ছোট মেয়েটির। সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেও তার শরীর মোচড় দিয়ে উঠল। কী পাষণ্ডটা!
ইরিনের জ্ঞান ফেরার আগেই রজার্স দ্রুত হ্যান্ডিক্যাম, ট্রাইপড সব লুকিয়ে ফেলল ক্লোজেটের ভিতরে। অতঃপর স্টিকি নোটে একটা মেসেজ লিখে ইরিনের হাতের মধ্যে গুজে দিয়ে আরো দ্রুততার সাথে সে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।

শহরের একটি বিখ্যাত ক্রিমিনাল ল ফার্ম ইরিন এবং ইমরানের কেসটির দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ল’ইয়ার ইমরানকে নিশ্চিত করেছে রজার্সের সর্বোচ্চ সাজার ব্যাপারে। রজার্সের নাম এবং ছবি একজন সেক্স অফেন্ডার হিসেবে ইতিমধ্যেই ডাটাবেজে রেজিস্টার করা হয়েছে—ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে আমেরিকার সর্বত্র। প্রকৃতির কী পরিহাস—এক সময় ইরিনকে সে ভয় দেখিয়েছিল ইন্টারনেটে তার ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেবে বলে আর এখন তার নিজের ছবিই একজন দাগী ধর্ষক হিসেবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেটে। যতদিন বেঁচে থাকবে, একজন ধর্ষকের পরিচয় নিয়েই তাকে থাকতে হবে।
এদিকে ইমরানের কেসটিও তাঁরা সাজিয়েছে বিচক্ষণতার সাথে। মদ্যপ অবস্থায় রজার্স ইমরানকে আঘাত করতে চাইলে ইমরান ‘সেলফ ডিফেন্স’ করেছে এবং রজার্সকে প্রতিঘাত করেছে। তাছাড়া তার মাইনর চাইল্ডকে রেপ এবং ব্লাকমেইল করার ভিডিও এবং ইমেইল দেখার পর থেকেই সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল তাই রজার্সের উপর তার আক্রোশ তৈরি হয়—বেড়ে যায় প্রতিহিংসা। সে চাইলে তাকে খুনও করতে পারত—কিন্তু তা না করে রজার্সকে শুধু আহত করেছে। ইমরানের সাজা দীর্ঘ মেয়াদী যাতে না হয় সে ব্যাপারে তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এলিনাও সাক্ষ্য দিয়েছে রজার্স মদ্যপ অবস্থায় তাকে প্রায়ই মারধর করত। ব্যস—রজার্স মোটামুটি ভালোভাবেই ফেঁসে গিয়েছে। এলিনা যখন বলছিল কথাগুলি—ইমরান সত্যিই অবাক হয়েছিল।

ইমরানের বাসার সামনে একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দুজন পুলিশ অফিসার সাথে ইমরানের ল’ইয়ারকেও দেখা যাচ্ছে। ইমরানকে নিতে এসেছে। একজন পুলিশ ওয়াকিটকিতে কথা বলছে। আরেকজন ইমরানের ল’ইয়ারের সঙ্গে কথা বলছে।
ইরিন আর এলিনাকে জানানো হয়েছে—ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কাজেই এ নিয়ে খুব একটা চিন্তা করার দরকার নেই। ইমরানের পরামর্শেই তার ল’ইয়ার ইরিন আর এলিনাকে বলেছে। কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটা সমস্যা আছে—বুঝতে পারছে না কেউ।
ইরিন আর এলিনাও এসে দাঁড়িয়েছে পার্কিং লটে। ইরিন ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। সে চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না।
ইমরানকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, ‘I love you baba. I always have. Always will.’
‘I know sweetheart! You’re my dearest daughter.’ একটু থেমে ইমরান বলল, ‘I want to tell you that, you are an incredibly loving daughter. You’re a brave girl and your mother is a strongest person I know. You and your mother will get through this together!’
‘I’ll take care of myself. I’ll be fine. Do not worry about me.’ বলেই ইরিন আবার জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে।
‘I will be back soon. Goodbye Erin.’
‘Goodbye baba’ ইমরানের হাতে একটা চুমু দিয়ে ইরিন তাকে ছেড়ে দিল।
ইমরান একবার তাকাল এলিনার দিকে। সে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান কিছুই বলল না এলিনাকে। গাড়িতে উঠার ঠিক আগের মুহূর্তে সে ফিরে গেল এলিনার কাছে। ‘Take care of your child and yourself!’
ইমরান পুলিশের গাড়িতে উঠে বসল।
এলিনা আর ইরিন দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো। অনিশ্চিত চোখে তাকিয়ে রইল চলে যাওয়া গাড়ির দিকে।
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব