Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৬)

হাসান তার অফিস রুমে বসে কাজ করছে। সে কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝে তাকাচ্ছে দরজার দিকে। এখন প্রায় মাঝ দুপুর। অথচ রূপা একবারের জন্যেও বের হয়নি। সে কি এখনো ঘুমোচ্ছে। হাসান একবার ভাবল ডেকে তুলবে কিনা। তারপর ভাবল, থাক—যখন ওঠার উঠুক।
রূপা দুপুর পর্যন্ত তার রুমের ভিতরেই থাকল। যদিও তার ঘুম ভেঙ্গেছে অনেক আগেই। কিন্তু দুপুরের পরে তার প্রচণ্ড মাথা ব্যথা শুরু হলো। সম্ভবত এতক্ষণ না খেয়ে থাকার জন্যে। সে রুম থেকে বের হয়ে কিচেনে ঢুকল তারপর নিজে থেকেই এক কাপ চা বানিয়ে ব্যাক-ইয়ার্ডে গিয়ে দাঁড়াল।
তিথিদের বাসার ব্যাকইয়ার্ডের একটা অংশ ঢালু হয়ে নীচে নেমে গেছে। নীচে নামার জন্যে আবার কয়েক ধাপের ইটের সিঁড়ি দেয়া আছে। রূপা প্রথম সিঁড়িটার উপরে বসে দূরের বাড়ি গুলির উপর দিয়ে লেকের দিকে তাকিয়ে চায়ে চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ পর হাসান এসে দাঁড়াল রূপার পাশে। জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার শরীর ঠিক তো?’
রুপা বলল, ‘হ্যাঁ। কেন হাসান ভাই?’
‘না মানে এত দেরী করে বের হলে তাই ভাবলাম…’
‘এমনিই একটু মাথা ব্যথা করছিল।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রূপা আবার বলল, ‘আপনাদের বাসার ব্যাক-ইয়ার্ডটা খুব সুন্দর। এখানে বসে থাকতে বেশ লাগছে।’
‘হুমম।’
রূপা অবাক হলো। সাধারণত কেউ কোনো কিছুর প্রশংসা করলে উত্তরে ধন্যবাদ জানানো একটা সাধারণ ভদ্রতা। কিন্তু হাসান কিছুই বলল না।
হাসান আর কোনো কথা না বলে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। রূপার মনে হলো হাসান কিছু হয়ত বলতে চায় কিন্তু বলছে না। সে বলল, ‘কাল আকাশের সঙ্গে এভাবে চলে যাওয়ায় আপনি কি আমার উপর রাগ করেছেন?’
‘রাগ করবো কেন? তোমার উপর রাগ করার অধিকার কি আমার আছে?’
‘মানে?’
‘মানে তো সহজ রূপা, কারো উপর রাগ করতে হলে রাগ করার অধিকার তো থাকতে হবে, তাই না? তোমার উপর রাগ করার কোন অধিকার নিশ্চয়ই আমার তৈরী হয় নি!’
‘হলে করতেন?’
হাসান সে কথার কোন উত্তর দিল না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে হাসান বলল, ‘আকাশের সঙ্গে তোমার কি কথা হলো?’
‘এক যুগ পরে দেখা হলে যে ধরণের কথা হয়, তেমনই। না চাইতেও পেছনের অনেক কথাই বলতে হলো। আমি কেন বিয়ে করি নি, পার্থকে এখনো ভুলতে পেরেছি কী না, ইত্যাদি।’
‘ও তোমাকে ভালবাসতো তাই না?’
‘কে?’
‘আকাশ!’
‘একথা আপনার মনে হলো কেন?’
‘কাল ওর চোখে যে আনন্দ আমি দেখেছি—তাতে করে নিশ্চিত বলে দেয়া যায় যে, সে তোমাকে খুবই পছন্দ করতো।’
‘হয়ত করত। আমরা খুব ভাল বন্ধু ছিলাম।’
‘হয়ত বলছ কেন? তুমি জানতে না?’
‘জেনেছিলাম—হঠাৎ করে ওর হারিয়ে যাবার অনেক পরে এবং সেটা পার্থর কাছ থেকেই।’
‘আকাশ বিয়ে করে নি?’
‘করেছিল, একটা মেক্সিকান মেয়েকে। কিন্তু বিয়েটা বেশিদিন টিকেনি। এখন সিঙ্গেল।’
‘ও!’
হাসানকে দেখে মনে হচ্ছে তাকে একধরনের অস্থিরতা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সে একবার রূপার পাশে গিয়ে বসল। তারপর আবার উঠে দাঁড়াল। সিঁড়ির দু ধাপ নীচে নেমে ঘুরে দাঁড়াল রূপার দিকে। একটু ইতস্তত করে বলল, ‘রূপা তোমাকে আমার কিছু কথা বলা দরকার।’
রূপা থমকে গেল। তারপর আস্তে করে তাকাল হাসানের চোখের দিকে—একটা প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে।
‘আমি জানি না আমি যা বলতে চাই, ঠিকমত বোঝাতে পারব কিনা। তবু চেষ্টা করে দেখতে তো ক্ষতি নেই।’
হাসানের ভূমিকা রূপাকে দ্বিধায় ফেলে দিল। সে চুপ করে মুল কথা শোনার অপেক্ষায় রইল।
একটা দীর্ঘ বিরতি দিয়ে হাসান বলল, ‘তুমি একটা চমৎকার মেয়ে। যে কোনো ছেলেরই তোমার সঙ্গ ভাল লাগবে এতে কোনো সন্দেহ নেই। এটা বলতে দ্বিধা নেই তোমাকে আমারো ভাল লেগেছে—আমার কিছু অসংলগ্ন আচরণে তোমার কাছে মনে হতে পারে—আমি হয়ত তোমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়েছি। ব্যাপারটার একটা ব্যাখ্যা প্রয়োজন।’
এটুকু বলে হাসান একবার রাস্তার দিকে তাকাল। তারপর আবার শুরু করল, ‘আমারো সব সময় ইচ্ছে করে তিথিকে নিয়ে এভাবে ঘুরে বেড়াতে। সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখতে। কিন্তু অফিস, সংসার আর তিতলি’র বাইরে ওর জগতে আর কিছুই নেই—আর কিছুই ভাবতে পারে না। আমরা একসাথে শেষ কবে ঘুরতে গিয়েছি মনে নেই। কতবার ওকে নিয়ে মুভি দেখতে চেয়েছি—কখনই হয়ে উঠেনি।’
থেমে থেমে হাসান বলে চলল, ‘সাধারণত হাজব্যান্ডরা ব্যস্ত থাকে—স্ত্রীদের সময় দিতে পারে না, অথচ আমাদের হয়েছে উলটো। তাই তোমাকে নিয়ে যখন ঘুরতে বেরিয়েছি—আমার কাছে অন্যরকম মনে হয়েছে। অন্যরকম একটা ভালোলাগা কাজ করেছে। ক্ষণিকের জন্য হলেও তিথির অভাব আমি বুঝতে পারিনি। আই অ্যাম সরি বাট আই মাস্ট কনফেস!’
রূপা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়—হাসান আসলে কি বোঝাতে চাচ্ছে।
হাসান আবার বলল, ‘তুমি হয়ত ভাবছ, এসব কথা আমি কেন বলছি? এগুলো কিন্তু কোনো অজুহাত নয়। নিজেকে স্বচ্ছ প্রমাণ করার কোনো চেষ্টাও নয়। তুমি স্মার্ট মেয়ে, আমি জানি তুমি জানো আমি কি বলতে চাচ্ছি। আমার কোন ব্যবহারে তুমি যদি কষ্ট পেয়ে থাকো, তার জন্যে আমি দুঃখিত। আই অ্যাম ট্রুলি সরি।’
রূপা কি বলবে ভেবে পেল না। সে চুপ করেই রইল।
‘তিথি অত্যন্ত ভাল মনের একটা মেয়ে। অসম্ভব কেয়ারিং-পুরো সংসার, তিতলির স্কুল-হোমওয়ার্ক সব কিছু ও একাই সামাল দেয়। মাসের একটা লম্বা সময় আমাকে বাইরে থাকতে হয়—সে একা মেয়েকে নিয়ে থাকে। একা হাতেই সব কিছু আগলে রেখেছে। ওর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই। আমার কিছু ভুলের কারণে ও কষ্ট পাচ্ছে—’
হাসান আর কিছু বলল না। সে চুপ করে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রইল।
হাসানের কথায় রূপার মনটা একটু খারাপ হলো। এবার সে হাসানকে নিশ্চিত করার জন্য বলল, ‘আমি বুঝতে পেরেছি হাসান ভাই। আমাকে নিয়ে ভাবতে হবে না। বরং আমারই উচিত আপনাকে ধন্যবাদ জানানো—আমাকে সময় দেবার জন্যে। আমারো অনেক ভাল লেগেছে। সত্যিকার অর্থেই আমি ভাবতে পারিনি আমার সময়টা এত ভাল কাটবে। আপনারা দুজনেই আমার জন্যে যা করলেন—তার জন্যে আমি কৃতজ্ঞ।’
রূপা উঠে দাঁড়িয়ে হাসানের পাশে দাঁড়াল। তারপর হাসানের হাত ধরে আশ্বস্ত করার জন্যে একটা ঝাঁকি দিয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ হাসান ভাই—থ্যাঙ্ক ইউ ফর এভ্রিথিং।’
তিথি দেখল রূপা হাসানের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে।
গত কয়েকদিনের বিক্ষিপ্ত ঘটনা, সব কিছু মিলিয়ে আজ সকাল থেকেই তিথির মনটা ভীষণ খারাপ ছিল। অফিসে যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু কিছু দরকারি কাজ যে গুলো তিথিকেই করতে হতো তাই অনিচ্ছা সত্বেও সে অফিসে গেল। রূপাকে সময় দেয়া হচ্ছে না, এই ব্যাপারটা নিয়েও তার মন খারাপ। তাই ভাবল আজ তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে দুই বান্ধবী মিলে জম্পেশ আড্ডা দিবে। রূপাকে নিয়ে হাসানের বাড়াবাড়িটাও ওকে ভাবাচ্ছে। মনটা খচ-খচ করছে। কিন্তু হাসান তো এমন তরল চরিত্রের মানুষ ছিল না কখনই—সে তাকে চিনে। তারপরেও মানুষের মন বলে কথা।
তিতলিকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে অফিসে পৌঁছেই দ্রুত হাতের কাজ গুলো সেরে ফেলার চেষ্টা করল তিথি। কয়েকটা ক্লায়েন্টের ফোন কল ছিল—সে গুলো করল। কয়েকটি ইমেইল রিপ্লাই করল। দুটো টিকেট চেঞ্জের রিকোয়েস্ট ছিল, সেগুলো করে ক্লায়েন্টকে নতুন কনফার্মেশন ইমেইল করতে করতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল। তিথি ওর অফিস ম্যানেজারকে বলে লাঞ্চ ব্রেকে বাসায় ফিরে এলো।
ঘরে ঢুকে তিথি দেখল বাসায় কেউ নেই। হাসান নেই ওর অফিস রুমে। রূপার রুমও খালি। তিথি ভাবল হাসান হয়তো রূপাকে নিয়ে লাঞ্চ করতে বাইরে গেছে কেননা ফ্রিজে দু’দিনের পুরনো খাবার ছাড়া তেমন কিছুই নেই। খাবারের কথা মনে হতেই সে কিচেনে গেল। ফ্রিজ থেকে পুরনো খাবার বের করে গরম করার জন্যে মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে কিচেনের জানালা দিয়ে ব্যাক-ইয়ার্ডে তাকাল এবং সঙ্গে সঙ্গে রক্ত শূন্য হয়ে গেল তার মুখ। তিথি সরে এসে ঘরের পেছনের কাঁচের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আবার দেখল রূপা আর হাসানকে—হাত ধরাধরি করে দাঁড়িয়ে আছে। তিথি কাল বিলম্ব না করে বের হয়ে এলো তারপর তীক্ষ্ণ স্বরে ডাকল, ‘হাসান!’
হাসান আর রূপা দুজনেই চমকে ঘুরে তাকাল। দেখল তিথি দাঁড়িয়ে আছে। সঙ্গে সঙ্গে হাত ছেড়ে দিয়ে দুজনেই অপ্রস্তুত ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৫)

আকাশ রূপাকে নিয়ে এসেছে অদূরেই হোয়াইট রক লেকের ধারে একটা কফি শপে। লেকের নামের সঙ্গে মিলিয়ে কফি শপের নামও হোয়াইট রক কফি। এই কফি শপের বিশেষত্ব হলো এখানে কাস্টমরাই তাদের গানের সরঞ্জাম নিয়ে এসে গান-বাজনা করে। স্টুডেন্টরা বসে হোমওয়ার্ক করে। প্রেমিক-প্রেমিকারা বসে নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করে। দোতলা কফি শপের পুরোটা জুড়েই রয়েছে স্থানীয় কফি প্রেমিকদের আনাগোনা।
আকাশ নিজের জন্যে ক্যাফে লাটে আর রূপার জন্যে ক্যাপাচিনো অর্ডার দিল। রূপাকে এভাবে কাছে পেয়ে ভাল লাগার সাগরে ভাসছে আকাশ। সে সারাক্ষণ রূপার একটি হাত ধরে রেখেছে। গাড়ি চালানোর সময়ও ছাড়েনি। রূপার মধ্যে এই মুহূর্তে কোনো রকম অস্বস্তি বোধ নেই। বিদেশের মাটিতে দেখা হয়েছে বলেই হোক আর ইউনিভার্সিটির স্মৃতির কারণেই হোক—আকাশকে পেয়ে রূপা যেন নিজের কাছের কাউকেই ফিরে পেয়েছে।
আকাশ রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তারপর বলো, কেমন আছো?’
‘ভাল।’
‘জাস্ট ভাল?’
‘হ্যাঁ, ভালই তো।’ রূপা হেসে ফেলল।
‘কবে এসেছ আমেরিকায়?’
‘লাস্ট সানডে-তে। অফিস থেকে একটা ট্রেনিং-এ পাঠিয়েছে। অস্টিনে।
‘তাই? দ্যাটস গ্রেট।’
‘ট্রেনিং-এ যাবার আগে ভাবলাম তিথির সঙ্গে একটু সময় কাটিয়ে যাই। তাই ডালাসে আসা।’
‘তিথি?’
‘ওই যে আমার বান্ধবী। ওর হাজব্যান্ডই তো হাসান ভাই!’
‘কিন্তু সময়তো দেখি বান্ধবী নয়, কাটাচ্ছিলে বান্ধবীর হাজব্যান্ডের সঙ্গে। হা, হা, হা…’
মুহূর্তেই রূপার চেহারা কালো হয়ে গেল।
রূপাকে সহজ করার জন্যে সঙ্গে সঙ্গেই আকাশ বলল, ‘নেভার মাইন্ড, আই ওয়াজ জাস্ট কিডিং।’
রূপা কিছু বলল না। কফিতে চুমুক দেবার অজুহাতে আকাশের হাত থেকে ওর হাতটি ছাড়িয়ে নিয়ে ঢাউস সাইজের ক্যাপাচিনোর কাপটি দু’ হাতে পেঁচিয়ে ধরে ছোট্ট একটা চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে আকাশ বলল, ‘মাইন্ড করলে? প্লীজ মাইন্ড করো না। অনেকদিন পর তোমাকে কাছে পেয়ে তোমার সঙ্গে সেই আগের মত একটু দুষ্টুমি করতে ইচ্ছে হলো। সরি…’
রূপা আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নিজেকে সহজ করার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘মাইন্ড করিনি।’
রূপা আশ্বস্ত করায় আকাশ আবার উৎফুল্ল হয়ে উঠল। সে বলল, ‘মনে আছে রূপা, ক্যাম্পাসে তুমি ছিলে আমাদের ব্যাঙ্ক। কিছু খেতে ইচ্ছে করলেই তোমাকে খুঁজে বের করতাম। আমাদের পকেটে তো কখনোই তেমন টাকা-পয়সা থাকত না। হা হা হা।’
রূপা হেসে ফেলল।
‘তারপর আমাদের সাথে যোগ দিল পার্থ। কোথা থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসার মতো। এসেই ভাগ বসাল। এক সময় সবটুকু রূপার মালিক বনে গেল সে। আমরা অবশ্য জেলাস হতাম কিন্তু যখন দেখতাম তুমিই আগলে রেখেছ তাকে—তখন আমাদের আর কিছুই করার থাকল না। তুমি ছিলে আমাদের সবার, হুট করে হয়ে গেলে পার্থর একার, কেমন লাগে বলো?’
রূপা আকাশের কথার ধরনে আবারো হেসে ফেলল। সে বলল, ‘বাদ দাও ওর কথা। তোমার কথা বলো শুনি—পরীক্ষা শেষ করে সেই যে হারিয়ে গেলে… কেউ তোমার কোন ট্রেস করতে পারেনি। আমেরিকায় কবে এলে?’
‘ওই যে বললে হারিয়ে গেলাম। তখনই চলে এসেছিলাম।’
‘তো কি করছো, এখানে?’
‘একটা ইউনিভার্সিটিতে পরাই। টেক্সাস এএন্ডএম-এর করপাস ক্রিস্টি ক্যাম্পাসে। ডালাস থেকে প্রায় ছয় ঘণ্টার ড্রাইভ।’
‘করপাস ক্রিস্টি কি কোনো জায়গার নাম?’
‘হ্যাঁ। ভীষণ সুন্দর একটা জায়গা। টেক্সাসের দক্ষিণে মেক্সিকো উপসাগরের একটি শহর আর বে-এরিয়ার একটা আইল্যান্ডের মধ্যে আমাদের ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর নৈসর্গিক লীলাভূমি করপাস ক্রিস্টি ভ্রমণ পিয়াসু মানুষের চারণভূমি বলা চলে। অবসর সময়ে এই আইল্যান্ডে ছুটে আসে অনেক পর্যটক।’
‘ওয়াও! শুনেই তো লোভ হচ্ছে। আর তুমি যেভাবে বর্ণনা দিচ্ছ—বাব্বা!’
‘তুমি যাবে?’
‘অস্টিন থেকে কতদূর?’
‘মাত্র তিন ঘণ্টার ড্রাইভ। ডালাস থেকে অস্টিন হয়েই করপাস ক্রিস্টি যেতে হয়।’
রূপা হঠাৎ করেই কি যেন ভাবল। তারপর বলল, ‘ডালাসে কি মাঝে মাঝেই আসো নাকি?’
‘হ্যাঁ, তাতো আসিই। এখানে অনেক বাঙালি আছে। বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট আছে, দোকান আছে যেখানে বাংলাদেশি আইটেম, মাছ-মাংস সবই পাওয়া যায়। যখনই আসি, এসব দোকান থেকে ইচ্ছে মত দেশী জিনিষপত্র কিনে নিয়ে যাই। আমি যেখানে থাকি সেখানে তো আর এসব কিছু পাওয়া যায় না। করারও তেমন কিছু নেই।’
‘তাহলে সময় কাটাও কিভাবে?’
‘সপ্তাহে তিন-চারদিন ক্লাস থাকে। সেগুলোর প্রিপারেশন নিতে হয়। অবসরে ঘুরে বেড়াই। শখের ফটোগ্রাফি করি।’
‘ফটোগ্রাফি? বাহ! তোমার প্রিয় সাবজেক্ট কি?’
‘প্রকৃতির ছবি তুলতেই বেশি পছন্দ করি। প্রকৃতি আমাকে খুব টানে। প্রকৃতি খালি চোখে যতটা সুন্দর দেখায় তার চেয়ে একটু বেশি সুন্দর লাগে ক্যামেরার লেন্স এ।’
‘প্রকৃতির মাঝেই যার বসবাস—প্রকৃতি তাকে টানবে এটাই স্বাভাবিক। তবে আমার কাছে প্রকৃতি খালি চোখেই সুন্দর! কি জানি আমি তো আর ক্যামেরার লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করিনি কখনো।’
আকাশ হেসে বলল, ‘বাদ দাও। দ্যাখো তো, তখন থেকে আমি কেবল নিজের কথাই বলে যাচ্ছি। অথচ তোমার কথা শুনব বলে তোমাকে নিয়ে এলাম। বলো, তোমার কথা বলো।’
রূপা কিছু না বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বাইরে তাকিয়ে বলল, ‘চলনা, একটু হাঁটি। জায়গাটা মনে হচ্ছে বেশ সুন্দর।’
‘ঠিক আছে, চলো।’
আকাশ আর রূপা দুজনে কফি শপ থেকে বের হয়ে হাটতে শুরু করল।
হাসান বাসায় ফিরে এসে ব্যাকইয়ার্ডে গিয়ে বসেছে। তার মনটা ভীষণ বিক্ষিপ্ত—সে উদাস নয়নে দূরে কোথাও তাকিয়ে কী যেন ভাবছে। বিষণ্ণতা যখন কাউকে পেয়ে বসে, তার মনটা কেমন যেন মেঘাচ্ছন্ন হয়ে যায়, কিছুই ভাল লাগে না—কিংবা ভাল লাগার অনুভূতি গুলোই কেমন যেন ভোঁতা হয়ে যায়।
তিতলির স্কুল আজকে হাফ-ডে (আর্লি রিলিজ) ছিল বিধায় লাঞ্চ ব্রেকে তিথি অফিস থেকে বের হয়ে এসে তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে আবার অফিসে ফিরে গিয়েছিল। তিতলির স্কুল থেকে তিথির অফিসের দূরত্ব মাত্র পনের থেকে বিশ মিনিটের মত। হাসান যখন সপ্তাহে তিন-চার দিন ক্লায়েন্ট সাইটে গিয়ে কাজ করে, তিথি তখন তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে আবার অফিসে ফিরে যায়। তিতলি তিথির অফিসে বসেই হোম-ওয়ার্ক করে তিথির কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত। মাঝে মাঝে সোফার উপর ঘুমিয়েও পড়ে ক্লান্ত হয়ে। ছোট মানুষ সেই সকাল ছয়টায় উঠতে হয়।
শেষ বিকেলে তিথি আর তিতলি বাসায় ফিরে এলো। তিতলি তার রুমে চলে গেল। তিথি দেখল হাসান ব্যাক-ইয়ার্ডে বসে রয়েছে একা। সে পেছনের দরজা খুলে ব্যাক-ইয়ার্ডের পাটাতনে এলো। রূপা নেই দেখে ভাবল হয়ত রূপা ওর রুমে রেস্ট নিচ্ছে। তবুও হাসানের দিকে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, ‘রূপা কোথায়?’
‘ওর এক বন্ধুর সাথে গেছে।’ হাসান উত্তর দিল।
তিথি খানিকটা অবাক হয়ে বলল, ‘বন্ধুর সাথে গেছে মানে? কার সাথে? কোথায়?’
‘হ্যাঁ, আকাশ নামে ওর এক বন্ধুর সাথে দেখা হয়ে গেল… অনেক বছর পর দেখা তাই… কোথায় গেছে তা তো বলতে পারবো না।’
তিথি দ্রুত চিন্তা করে দেখল আকাশ নামে সে কাউকে চিনে কিনা। নাহ, চিনে না। সে বলল, ‘আকাশ! আকাশের সঙ্গে দেখা হলো কোথায়?’
‘ও, না মানে, আমি রূপাকে একটা মুভি দেখাতে নিয়ে গেছিলাম। সেখানেই দেখা।’
‘মুভি দেখতে গেছিলে? কই আমাকে তো কিছু বলো নি?’
‘না মানে, বলার মত সিচুয়েশন ছিল না।’
‘বলার মত সিচুয়েশন ছিল না মানে কি হাসান? মুভি দেখতে যাবে, এটা বলার জন্য আবার সিচুয়েশন লাগে নাকি?’
হাসান একটু রেগে গিয়ে বলল, ‘তুমি এমন রিয়্যাক্ট করছো কেন তিথি? রিয়্যাক্ট করার মতো কিছু তো হয়নি।’
তিথি চুপ করে থাকল। হাসানও আর কোনো কিছু বলল না। বেশ খানিকক্ষণ পরে তিথি একটু ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘আকাশ কোথায় থাকে?’
‘জানি না।’
‘কেন, তোমার সঙ্গে কথা হয়নি?’
‘তেমন ভাবে না। নাইস টু মিট ইউ পর্যন্ত… কোথায় থাকে, কি করে জানা হয় নি।’
‘কখন ফিরবে তা কি কিছু জানো?’
‘আকাশ বলেছে রাতে নামিয়ে দিয়ে যাবে।’
‘ফোন নাম্বার দিয়েছে?’
‘না।’
‘তারমানে রূপা কল না দিলে কিছুই জানার উপায় নেই।’ বলেই তিথি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল হাসানের চোখের দিকে।
হাসান মাথা ঘুরিয়ে তাকাল অন্যদিকে। তিথি আর কোনো কিছু না বলে ঘরের ভিতর ঢুকে গেল।
আকাশ আর রূপা অনেকক্ষণ ধরে চুপচাপ হাঁটছিল। আকাশ হঠাৎ থেমে ঘুরে দাঁড়াল রূপার দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘কি বলবে না?’
‘কি বলবো? এখন আর কাউকে কিছু বলতে ইচ্ছা করে না। এসব কষ্টের কথা কি সব সময় বলা যায়?’
‘অবশ্যই বলা যায়। আমি আগের মতই এখনো তোমার বন্ধু আছি রূপা। আমাকে কোন কিছু বলতে তোমার দ্বিধা থাকা উচিত নয়। প্লীজ বলো। আমি শুনবো।’
রূপা তবুও কিছু বলল না। সে তাকিয়ে সামনের বড় রাস্তা দিয়ে গাড়ির চলাচল দেখতে থাকল।
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেছে অনেক আগেই।
হাসান লিভিং-রুমে বসে টেলিভিশনের দিকে তাকিয়ে আছে। হাসানের চোখের দিকে তাকালে যে কেউ বলে দিতে পারবে যে সে আসলে কিছুই দেখছে না, শুধু তাকিয়েই আছে। হাসান ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। মাঝে মাঝে ফোনের দিকে তাকাচ্ছে এবং একটি কান সজাগ রেখেছে দরজায় কলিং বেলের শব্দ শোনার জন্য।
তিথি এসে দাঁড়াল হাসানের সামনে। হাসান তাকালো তিথির দিকে। তিথি বলল, ‘খাবে না? খেতে আসো।’
হাসান একটু ইতস্তত করে বলল, ‘রূপা তো এখনো এলো না। ফোন করে এড্রেস নেবে বলেছিল, ফোনও করলো না। ফিরবে কিনা বুঝতে পারছি না।’
তিথি একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘না ফিরলে না ফিরবে। তুমি এত অস্থির হচ্ছো কেন? সেই সন্ধ্যা থেকে দেখছি তুমি অন্যমনস্ক। ক্ষণে ক্ষণে ঘড়ি দেখছো আর দরজার দিকে তাকাচ্ছো। তুমি যে অস্থির সেটা কিন্তু বোঝা যাচ্ছে।’
‘অস্থির হবো না? একটা মেয়ে হুট করে একটা অচেনা মানুষের সঙ্গে চলে গেল। এতো রাত হয়ে গেল, অথচ-’
‘এমন কোন রাত হয় নি যে তোমাকে এতটা চিন্তিত হতে হবে। তাছাড়া মানুষটাকে তুমি চেনো না, কিন্তু যে গেছে সে তো চেনে।’
‘হ্যাঁ, তা হয় তো চেনে।’
‘এসো খেতে এসো।’ তিথি আবার বলল।
কিন্তু হাসান কোনো উত্তর না দিয়ে টেলিভিশনের দিকে অতিরিক্ত মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে রইল। তিথি বুঝতে পারল, হাসান রূপার জন্যে অপেক্ষা করতে চাইছে। সে একটু খোঁচা দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি খেয়ে নিচ্ছি। তুমি বরং রূপার জন্য ওয়েট করো। তবে আমার ধারণা, ও ডিনার করেই আসবে।’
‘আর একটা কথা, রূপার কাছে বাসার এড্রেস আছে। দেশ থেকে আসার আগেই ওকে দিয়েছিলাম। সেটা ওর হ্যান্ড-ব্যাগে নিশ্চয়ই থাকবে। তুমি টেনশন একটু কম করো।’ বলেই তিথি চলে গেল কিচেনে রাতের খাবার খেতে।
আকাশ রূপাকে নিয়ে এসেছে ওর পছন্দের একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে। তাদের বীফ শাহী বিরিয়ানি আকাশের খুব পছন্দের। খেতে খেতে আকাশ রূপাকে বলল, ‘তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে, পার্থকে তুমি এখনও ভালবাসো।’
‘হয়তো বাসি!’
‘যে ছেলেটি এতদিন প্রেম করে তোমাকে বিয়ে করলো না, তাকে তুমি এখনো ভালোবাসো?’
‘ভালবাসার সঙ্গে বিয়ের কি সম্পর্ক আছে? বিয়ে টিকিয়ে রাখার জন্য ভালবাসার প্রয়োজন, কিন্তু ভালবাসলেই বিয়ে করতে হবে এমন তো কোন কথা নেই। তবে হ্যাঁ, আমরা অনেকেই ভালবেসেই বিয়ে করি। আবার সেই ভালবাসা বিয়ের পরে উড়েও যায়।’
‘এই থিওরিটা কি পার্থকে ভালবাসার আগে থেকে তুমি বিশ্বাস করতে?’
‘হ্যাঁ করতাম। সম্পর্কের প্রথম থেকেই একটা বিষয় আমরা পরিষ্কার করে নিয়েছিলাম, ফ্যামিলির কাউকে অখুশি করে আমরা বিয়ে করবো না। তার জন্যে যতদিন অপেক্ষা করতে হয় করবো।’
‘তাহলে তুমি ওর জন্য কষ্ট পাচ্ছ কেন?’
‘কি মুশকিল, একটা মানুষকে ভালবাসতাম, তাকে দেখতে পাচ্ছি না, কাছে পাচ্ছি না, তার জন্য কষ্ট হবে না? এটা নিশ্চয়ই পার্থরও আছে।’
‘তুমি কিভাবে জানো?’
‘আমি ওকে চিনি না?’
‘তাই যদি হবে, তাহলে সে তোমাকে ছেড়ে যাবে কেন?’
‘নিশ্চয়ই কোন কারণ ছিল। যে কারণে হয়তো ওর মনে হয়েছে, বিয়ে হলে আমরা সুখী হবো না। আর সুখী যদি নাই হই, তাহলে ভালবাসার মৃত্যুর জন্যে তো বিয়ে করাটা ঠিক হতো না, তাই না?’
‘তোমার ভালবাসা কি তাহলে এখনো টিকে আছে?’
‘হ্যাঁ, আছে।’
‘ওর জন্যে তোমার ঘৃণা হয় না?’
‘না, ঘৃণা হয় না। মাঝে মাঝে খুব রাগ হয়। ভীষণ রাগ।’
‘আশ্চর্য মানুষ তুমি। তুমি বিয়ে করছো না কেন?’
‘করবো—করবো নিশ্চয়ই।’
রূপা যখন ফিরে এলো তখন প্রায় মধ্য রাত। হঠাৎ রূপার মনে পড়েছে বাংলাদেশ থেকে আসার আগেই তিথিদের বাসার ঠিকানা সে লিখে রেখেছিল। তার হাত ব্যাগ থেকে সে ঠিকানা বের করে আকাশকে দিলে আকাশ তাকে নামিয়ে দিয়ে গেল।
তিথি অনেক আগেই ঘুমাতে চলে গেছে। হাসান এখনো জেগে রয়েছে। অপেক্ষা করছে রূপার জন্যে। আরো কিছুক্ষণ পর ডোর বেল বেজে উঠল। হাসান উঠে গিয়ে দরজা খুলে দেখল রূপা দাঁড়িয়ে আছে।
রূপা একটু লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, ‘সরি, দেরী হয়ে গেলো।’
হাসান কিছু বলল না। সে দরজা থেকে সরে দাঁড়াল। রূপা ভিতরে ঢুকে বলল, ‘আপনি এখনো ঘুমননি?’
‘না।’
রূপা আর কিছু না বলে ওর রুমের দিকে চলে যাচ্ছিল, হাসান বলল, ‘তুমি খাবে না?’
‘ডিনার করে এসেছি। আকাশ না খাইয়ে ছাড়লো না।’
‘ও।’
রূপার কেন যেন মনে হলো হাসান না খেয়ে ওর জন্যে অপেক্ষা করেছে। সে একটু চুপ থেকে বলল, ‘আপনি খাননি?’
হাসান কোনো উত্তর দিল না। রূপা আবার বলল, ‘সরি, হাসান ভাই।’
হাসান কিছুই বলল না। সে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে নিজের রুমে চলে গেল।
রূপা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে তার রুমে ঢুকে আস্তে করে দরজা বন্ধ করে দিল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৪)

হাসান ঘড়ি দেখল। মাত্র দুটা বাজে। হাতে এখনো কিছুটা সময় আছে ভেবে সে রূপাকে নিয়ে গেল ফাউন্টেন প্লাজার ওয়াটার গার্ডেনে। ফাউন্টেনের পানির নৃত্য দেখে রূপা বাচ্চা মেয়েদের মত চিৎকার দিয়ে উঠল। সে পানির মধ্যে দিয়েই দৌড়ে এপাশ ওপাশ করতে লাগল। রূপার উচ্ছ্বাস দেখে হাসানের খুব ভাল লাগল। আবার শঙ্কাও হলো ভিজে যাবে বলে। তাই সে সাবধান করে বলল, ‘রূপা, ভিজে যাবে কিন্তু!’
‘অসুবিধা নেই। পানিতে ভিজতে আমার খুব ভাল লাগে।’
‘কিন্তু ভিজা কাপড়ে বাসায় ফিরবে কি করে? ঠাণ্ডা লেগে যাবে না?’
‘পানিতে ভিজলে আমার কখনোই ঠাণ্ডা লাগে না। আহ, যা ভাল লাগছে আজ!’
রূপা লক্ষ্য করল হাসান একটু আনমনা হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ইতিমধ্যে রূপার সারা শরীর ভিজে একাকার হয়ে গেছে। সে হাসানের দিকে এগিয়ে এসে পরনে লং স্কার্ট চিপরে কিছু পানি বের করল। মাথার ভেজা চুল ঝাড়ল। তারপর হাতের তালু দিয়ে মুখ থেকে পানি সরিয়ে হাসানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই হাসান ভাই, আপনি এত গম্ভীর হয়ে আছেন কেন?’
‘তুমি তো দেখি বেশ পাগল আছো! পানিতে ভিজতে তোমার এত ভাল লাগে?’
‘ভীষণ! ভীষণ ভাল লাগে। বৃষ্টিতে ভিজতে আরো বেশি ভাল লাগে। আচ্ছা, এখানে বৃষ্টি হয় না?’
‘হবে না কেন? অবশ্যই হয়। এপ্রিলে অনেক বৃষ্টি হয় এখানে।’
ভেজা কাপড় গায়ের সঙ্গে লেপটে গিয়ে রূপার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ স্পষ্ট হয়ে আছে। মেঘের মত চুল লেপটে রয়েছে পিঠে, সেগুলোর ডগা দিয়ে চুইয়ে পড়ছে বিন্দু বিন্দু পানি। কী অপরূপ লাগছে দেখতে। হাসান মদির চোখে রূপার দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অনেকক্ষণ। রূপার ভেজা শরীরটা ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে খুব। নিজেকে সংযত রাখার কোনো চেষ্টাই করল না হাসান। সে হাত বাড়িয়ে ঘাড় স্পর্শ করল রূপার। তারপর নিজের দিকে ঘুরিয়ে বলল, ‘তুমি তাকাও তো দেখি আমার দিকে! তোমাকে ভাল করে দেখি একবার!’
‘ভাল করে দেখবেন? আমি পাগল না আপনি পাগল?’ বলেই খিলখিল করে হেসে উঠল রূপা।
‘তাহলে দু’জনেই।’
‘মোটেই না—আপনার সঙ্গে পাগল হবার কোন ইচ্ছেই আমার নেই।’
‘ভাগ্যিস তুমি এসেছিলে! নাহলে কখনোই জানা হতো না…’
‘কি?’
‘তুমি কত সুন্দর!’
‘আর তিথি?’ রূপার চোখে-মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘তিথিও সুন্দর।’
‘শুধু সুন্দর না, অনেক সুন্দর। আমাদের কলেজের কত ছেলে যে ওর জন্যে পাগল ছিল তা যদি আপনি জানতেন!’
হাসান কিছু বলার আগেই রূপা কাঁধ থেকে হাসানের হাত দুটি নামিয়ে দিয়ে বলল, ‘যাই, আরেকটু ভিজি।’ বলেই সে ছুটে চলে গেল ঝরনার দিকে।
তিথি আবার ফোন করল হাসানকে। এবারও হাসানের ফোন বন্ধ পেল। তিথি এবার বেশ চিন্তায় পড়ে গেল। এক ধরনের অনিশ্চয়তা আর কিছুটা বিরক্তি নিয়ে ভয়েজ মেসেজ রাখল সে—‘হাসান, কি ব্যাপার ফোনও ধরছ না, কল ব্যাকও করছ না। তুমিতো চিন্তায় ফেলে দিলে। বুঝতে পারছি না কিছু, কি হচ্ছে।’ তিথি ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে সময় দেখে আবার বলল, ‘এখন ২টা ৪০ বাজে। তিতলিকে তুমি তুলতে পারবে কিনা তাও জানিনা। এনিওয়ে, আমি তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে বাসায় যাচ্ছি। হোপ এভ্রিথিং ইজ অলরাইট উইথ ইউ!’
তিথি তিতলিকে স্কুল থেকে তুলে নিয়ে বাসায় ফিরে গাড়ি থেকে নামতেই হাসানের গাড়ি এসে থামল সামনের ড্রাইভওয়েতে। তিথি আর তিতলি দাঁড়িয়ে রইল। হাসান আর রূপা বের হয়ে এলো গাড়ি থেকে। তিথি লক্ষ্য করল রূপার শরীর ভেজা। কিন্তু রূপাকে কিছু না বলে সে গিয়ে দাঁড়াল হাসানের সামনে। তারপর কৈফিয়ত চাওয়ার ভঙ্গিতে জানতে চাইল, ‘তোমার ব্যাপারটা কি হাসান? এতবার ফোন করলাম, একবারও ফোন ধরলে না!’
হাসান কিছুটা বিব্রত হয়ে বলল, ‘বিশ্বাস করো তিথি, রিংটোন একদমই শুনতে পাই নি। মনে হচ্ছে ফোনটা সত্যিই এবার বদলাতে হবে। মাঝে মাঝেই এটার ভলিউম অটোমেটিকলি সাইলেন্সে চলে যায়।’
‘সেটা না হয় বুঝলাম। কিন্তু এখানে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে কেন?’
‘না মানে, তুমি যদি ভাবো, আমি ইচ্ছে করে ফোন ধরিনি।’
‘আশ্চর্য, আমি কেন সেটা ভাববো? আর তুমি ইচ্ছে করেই বা ফোন ধরবে না কেন? এসব কি ধরণের কথা বলছো হাসান? যাই হোক, একটা কল ব্যাক অন্তত করতে পারতে! তিতলিকে তুমি আনতে পারবে কি পারবে না, আমাকে জানাবে না?
‘আমিই তো যেতাম, দেখলাম ফোনে মেসেজ রেখেছো যে তুমি ওকে নিয়ে আসবে। তাই আর…’
এবার তিথি একটু আহত স্বরে বলল, ‘মেসেজ চেক করেছো, তবুও একটা কল দাও নি, সত্যি অবাক হচ্ছি।’
হাসান কোনো উত্তর দিল না। তিথি রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুই তো দেখি ভিজে কাঠ হয়ে গেছিস। ভিজলি কিভাবে?’
রূপা কিছু বলার আগেই তিথি হাসানের দিকে ফিরে বলল, ‘তোমরা যেখানে গিয়েছিলে, সেখানে কি বৃষ্টি হয়েছিল নাকি?’
‘না না বৃষ্টি হবে কেন? ফেরার পথে একটু ফাউন্টেন প্লাজার ওয়াটার গার্ডেনে দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। রূপা যে এতো ছেলেমানুষ জানতাম না। ও তো না ভিজে আসবেই না। হা হা হা, সত্যিই ছেলেমানুষ।’
‘রূপা ছেলেমানুষ, আর তুমি?’
তিথি কটাক্ষ করল হাসানকে। হাসান আবারো বিব্রত হলো। সে লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি অবশ্য নিষেধ করেছিলাম।’
‘তিতলি এসো, লেটস গো ইনসাইড।’ বলেই তিথি তিতলিকে নিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে গেল।
হাসান আর রূপা অপ্রস্তুতভাবে একে অপরের দিকে একবার তাকাল তারপর তারাও বাড়ির ভিতর ঢুকে পড়ল।
রাতে খাবার টেবিলে তিথি খুব স্বাভাবিক আচরণ করল। রূপা যদিও বা একটু অস্বস্তি বোধ করছিল কিন্তু তিথি এত কথা বলল যে দিনের বিষয়টা সে ভুলেই গেল। দুই বান্ধবী অনেক রাত জেগে গল্প করল। ঘুমতে যাবার আগে তিথিই বলল, ‘কালকে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখতে যাবার প্লান ঠিক আছে তো?’
রূপা বলল, ‘নারে কোথাও যেতে চাচ্ছি না। উইকএন্ডে তুই যখন ফ্রি থাকবি তখন দেখব।’
‘আরে নাহ, উইকএন্ডের জন্যে বসে থাকতে হবে না। উইকএন্ডে আমি অন্য প্লান করেছি তোকে নিয়ে। তুই বরং সময়টা কাজে লাগা। আর হাসান তো বাসায়ই আছে। ডালাসে এসে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখবি না, তাই হয় নাকি?’
(সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ নিয়ে কিছু কথা বলা যেতে পারে। আশির দশকের বিখ্যাত টেলিভিশন সিরিজ ‘ডালাস’ এর শুটিং হয়েছিল এই র‍্যাঞ্চে। আমেরিকার যে কয়েকটি শহরের নাম বাঙালি সবার আগে জেনেছে, তার মধ্যে ডালাস একটি। এবং তার অন্যতম কারণ এই টিভি সিরিজ বিশ্বের আরো প্রায় ৯৬টি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশেও দেখানো হতো।
‘ডালাস’ সিরিজের ঘটনাবলি যে সাউথফোর্ককে ঘিরে আবর্তিত, সেই জায়গার অস্তিত্ব সত্যিই আছে মূল ডালাস শহরের সামান্য বাইরে। Southfork Ranch লেখা মূল ফটক, যেমনটি সিরিজে দেখা যেতো, ছাড়াও ভেতরে আছে ইউয়িং-দের বাড়ি ও চারপাশের বিশাল চত্বর। ভেতরে গেলে দেখা যায়, টিভিতে দেখা ঘরদুয়ার ও আসবাব, সুইমিং পুল, বাথরুম, আস্তাবল ইত্যাদি সবই আছে। গাইডের বিবরণ শুনে জানা যাবে, সিরিজের কিছু কিছু শুটিং এখানেও হয়েছিলো। তবে বেশিরভাগই হলিউডে হয়েছে, সেখানেও হুবহু এই রকমের সব বাড়িঘর তৈরি করা আছে। আরো জানা যাবে, সিরিজের কাজ শুরু করার আগে এটি ব্যবহারের অনুমতির জন্যে মূল মালিকের কাছে আসে হলিউডের প্রোডাকশন কোম্পানি। মালিক প্রথমে রাজি হননি। কিছুদিন পরে হলিউডিরা আবার আসে, এবার অবশ্য তারা চেকবইটি সঙ্গে আনতে ভুল করেননি।
সিরিজের জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে সাউথফোর্কও তীর্থস্থানের মর্যাদা পেয়ে যায়। দর্শনার্থীদের ভিড় বাড়তে থাকলে দর্শনীর প্রথা চালু হয়। প্রথা আজও আছে। ডালাস সিরিজ বন্ধ হয়ে গেছে বহু বছর আগে, পুরনো এপিসোডগুলো আমেরিকার কোনো কোনো চ্যানেলে অবশ্য মাঝে মাঝে দেখানো হয়। কিন্তু দর্শক আজও ভুলেনি ববি-প্যাম বা জে আর-স্যু অ্যালেনকে। এখনো প্রতিদিন এ দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে দল বেঁধে বাসভর্তি মানুষ আসে এই তীর্থদর্শনে। এ দেশীয়দের পাশাপাশি বিদেশী ভ্রমণকারীও কম নেই।
বাংলাদেশ থেকে বা আমেরিকার অন্য কোনো শহর থেকে আসা আত্মীয়-পরিজন বা বন্ধুদের কেউ ডালাসে এলে তাদেরকে সাউথফোর্ক দেখাতে নিয়ে যাওয়াটা স্থানীয় বাঙ্গালিদের জন্যে খানিকটা বাধ্যতামূলক হয়ে আছে মূলত দুটি কারণে। প্রথমত, বিশেষ একটি বয়সী বাঙালির স্মৃতিতে ডালাস সিরিজটি এখনো জাগ্রত। দ্বিতীয় কারণ, জেএফকে’র আততায়ীর গুলিতে নিহত হবার স্থানটি ছাড়া পরিচিত আর কিছুই দেখানোর নেই!)
আমরা আবার ফিরে আসি রূপার রুমে। তিথি যখন বলল সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ দেখতে যাবার কথা—রূপা কি বলবে ভেবে পেল না। তিথি বের হয়ে যাবার আগে রূপাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘খবরদার, তুই কিন্তু আমার উপর রাগ করতে পারবি না। আমি আসলে হাসানের উপর একটু বিরক্ত হয়েছিলাম। তাই একটু রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি।’
‘রাগ করিনি। তুই যা ঘুমতে যা। তোর তো সেই সকালে উঠতে হয়।’
তিথি চলে গেল ওর রুমে। রূপা দরজা ভেজিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল। সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে রূপা কিছুটা ক্লান্ত ঠিকই কিন্তু ওর সহসা ঘুম এলো না। কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে সে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে যতদূর দৃষ্টি যায় নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল বাইরে—অন্ধকারে।
গতকাল হাসানের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করায় আজ সারাদিন মোটেও ভাল সময় কাটছে না তিথির। দুপুর পর্যন্ত সে অস্থিরতায় কাঁটাল—বিশেষ করে রূপার সামনে এভাবে কথা বলাটা ঠিক হয়নি। রূপাই বা কি মনে করেছে? ও যতই বলুক রাগ করেনি। কিন্তু মনটা তো ঠিকই খারাপ হয়েছে। যদিও রাতে সে রূপাকে বলেছে সাউথফোর্ক র‍্যাঞ্চ ঘুরে আসতে হাসানকে নিয়ে।
সাউথফোর্ক থেকে ফেরার পথে হাসান রূপাকে নিয়ে গেল মুভি দেখাতে। বিশাল তেল সাম্রাজ্যের মালিক ইউয়িং পরিবারে প্রাসাদ দেখে রূপাকে খুব একটা আহ্লাদিত মনে হলো না। কোনো এক অজানা কারণে সে অন্যমনস্ক। সাউথফোর্ক ঘুরে দেখার সময়ও সে খুব একটা কথা বলেনি। আগ্রহ নিয়ে কোনো কোনো কিছু জানতে চায়নি। হাসান বিষয়টা লক্ষ্য করে ভাবল রূপাকে একটু চিয়ার-আপ করা দরকার। সে ভাবনা থেকেই মুভি দেখতে যাওয়া। রূপাকে বলাতে সেও কোনো আপত্তি করেনি।
মুভি দেখা শেষ করে হাসান আর রূপা মুভি থিয়েটার থেকে বের হয়ে বাইরে এসে দাঁড়াল। হাসান বলল, ‘তুমি একটু দাড়াও এখানে, আমি গাড়িটা নিয়ে আসি।’
রূপা বলল, ‘আমিও আসি আপনার সঙ্গে।’
‘না, না তোমাকে এতদূর যেতে হবে না।’ বলেই হাসান পার্কিং জোনের দিকে হেঁটে চলে গেল।
রূপা ঘুরে ঘুরে বিভিন্ন সিনেমার পোষ্টার দেখতে লাগল। রূপা লক্ষ্য করল একজন ভারতীয় চেহারার ত্রিশোর্ধ পুরুষ অনেকক্ষণ যাবৎ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ওর দিকে। সে কি রূপাকে চেনে? রূপা ঠিক বুঝতে পারছে না। হঠাৎ লোকটি এগিয়ে এলো রূপার সামনে এবং কিছুটা দ্বিধা নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এক্সিউজ মি। ইউ লুকস ভেরি ফ্যামিলিয়ার। আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?’
রূপা উত্তর দিল, ‘ইয়েস।’
লোকটি এবার মোটামুটি নিশ্চিত ভঙ্গিতে পরিষ্কার বাংলায় বলল, ‘আমি মনে হয় আপনাকে চিনতে পেরেছি। আপনি নিশ্চয়ই রূপা, কি ঠিক বলেছি?’
রূপা অবাক হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ। কিন্তু আপনি?’ রূপা ইতস্তত করে বলল।
‘আমি আকাশ। দেখতো চিনতে পারো কি না?’ আকাশ আপনি থেকে তুমিতে নেমে এলো।
রূপা আকাশের দিকে ভাল করে তাকিয়ে চেনার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘আকাশ, মানে আমাদের ডিপার্টমেন্টের সেই আকাশ?’
‘হ্যাঁ। আমি সেই…’
আকাশ হঠাৎ করেই বেশ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সে কিভাবে তার আনন্দ প্রকাশ করবে বুঝতে পারছে না। সে খুশিতে রূপার একটি হাত শক্ত করে ধরে বলল, ‘তুমি সত্যি রূপা? আমি তো বিশ্বাসই করতে পারছি না তুমি আমেরিকাতে।’
‘তা তোমার এই অবস্থা কেন?
‘কি অবস্থা?’
‘এত মোটা হয়েছ কেন? এক মাথা ঝাঁকরা চুল ছিল, সে গুলো গেল কোথায়?’ রূপা আকাশের দিকে তাকিয়ে দুষ্ট হাসি দিয়ে বলল।
আকাশ হেসে দিয়ে বলল, ‘এতদিন পর দেখা হলো, এই একটি প্রশ্ন তুমি খুঁজে পেলে?
‘একটা কোথায় দু’টো প্রশ্ন করেছি।’
‘হা হা হা, তার আগে বলো, তুমি কেমন আছো? কবে এসেছো, কোথায় থাকো, পার্থ কেমন আছে? কোথায় সে? এনি কিডস?’ গড়গড় করে এক গাদা প্রশ্ন ছুড়ে দিল আকাশ।
আকাশের কথা বলার ভঙ্গিতে রূপাও হেসে ফেলল। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘থামো থামো। একসাথে এতো প্রশ্নের উত্তর তো একবারে দিতে পারব না।’
আকাশ একটু ভেবে বলল, ‘তাহলে, চলো কোথাও গিয়ে বসি। তারপর সব শোনা যাবে। তুমি কারো সঙ্গে এসেছ এখানে নাকি একাই?’ আকাশ আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘উম, এক মিনিট—দাঁড়াও, বলছি সবকিছু।’ রূপা তাকালো বাইরে, তারপর আকাশের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এসো আমার সাথে।’
ইতোমধ্যে হাসান গাড়ি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। হাসানকে দেখেই রূপা বের হয়ে এলো। পেছনে এলো আকাশ।
হাসান দেখল একজন অপরিচিত মানুষ রূপার পাশে দাঁড়ানো। হাসান গাড়ি থেকে বের হয়ে আসতেই রূপা আকাশকে বলল, ‘তোমাকে পরিচয় করিয়ে দেই। ইনি হচ্ছেন হাসান ভাই, আমার সবচেয়ে প্রিয় বান্ধবীর হাজব্যান্ড। আমি ওনাদের বাসাতেই উঠেছি।’ তারপর হাসানের দিকে ফিরে বলল, ‘হাসান ভাই, ও হচ্ছে আকাশ। ভার্সিটিতে আমরা এক ডিপার্টমেন্টে ছিলাম। হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। আশ্চর্য তাই না?’
হাসান বলল, ‘আশ্চর্য তো বটেই। পৃথিবীটাও যে কত ছোট আবারো প্রমাণ হলো।’ বলতে বলতেই হাসান আর আকাশ দুজনেই হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল।
আকাশ বলল, ‘নাইস টু মিট ইউ হাসান ভাই।’
‘নাইস টু মিট ইউ টু!’
রূপা বলল, ‘হাসান ভাই, আমি একটু আকাশের সঙ্গে যেতে চাই। আপনার কোন অসুবিধা নেই তো?’
‘না, না আমার অসুবিধা কি?’ হাসান কিছু না ভেবেই বলল।
‘হাসান ভাই, ভাববেন না—আমি রাতের আগেই রূপাকে আপনাদের বাসায় নামিয়ে দিয়ে যাবো। আসার আগে ফোন করে এড্রেসটা নিয়ে নেব।’ আকাশ হাসানকে আশ্বস্ত করল তারপর রূপার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার কাছে নাম্বার আছে না?’
‘হ্যাঁ, আছে।’
‘তাহলে চলো?’
‘চলো।’ বলেই রূপা হাসানের দিকে ঘুরে বলল, ‘হাসান ভাই, আসি। দেখা হবে রাতে।’
হাসান বলল, ‘বাই। হ্যাভ ফান।’
আকাশ রূপার হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়ে চলল তার গাড়ির দিকে।
হাসান অবাক হয়ে ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে থেকে ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। এক ধরনের শূন্যতায় ছেয়ে গেল তার মন। কেন, কে জানে। সে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে গাড়িতে স্টার্ট দিয়ে বাসার দিকে ছুটে চলল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৩)

তিথির সামনে একজন ক্লায়েন্ট বসে আছে। সকাল থেকেই সে ব্যস্ত। অনেকক্ষণ থেকে ভাবছে হাসানকে একটা ফোন করা দরকার। তাকে বলতে হবে–ঘুম ভাঙ্গলে রূপাকে যেন ঠিকঠাক মত চা-কফি কিংবা নাস্তার ব্যবস্থা করে দেয়। তিথির নিজেরও খুব কফি খেতে ইচ্ছে করছে। অথচ কলিং বেল টিপে কাউকে ডেকে যে এক কাপ কফি চাইবে তারও উপায় নেই। দেশটার নাম আমেরিকা। এখানে যার যার কাজ তাকেই করতে হয়। তার নিজের জন্যে এক কাপ কফি এখনো সে বানাতে পারেনি। ব্রেক রুমে যাবারও সময় পাচ্ছে না।
হাসান তার কনফারেন্স কল শেষ করে ল্যাপটপে একটা রিপোর্ট তৈরী করছিল। হঠাৎ সে শুনতে পেল, ‘গুড মর্নিং!’
হাসান ঘার ঘুরিয়ে দেখল রূপা দাঁড়িয়ে আছে। রূপা নাইটি ছেড়ে একটা হালকা তাঁতের শাড়ি পড়েছে। আকাশি রঙের শাড়িতে বেশ স্নিগ্ধ লাগছে রূপাকে। হাসান বলল, ‘গুড মর্নিং! তারপর মিস রূপা, আমেরিকায় তোমার প্রথম রাত কেমন কাটল? ঘুম হয়েছে ঠিক মতো?
রূপা বলল, ‘শেষের দিকে হয়েছে একটু। পুরা রাত অবশ্য জেগেই ছিলাম।’
‘জেটল্যাগ। দু’একদিন গেলেই ঠিক হয়ে যাবে।’
রূপা চারিদিকটা একটু দেখে নিয়ে বলল, ‘আপনি অফিসে যান নি?’
‘এই তো আমার অফিস। আমার কাজের এই একটা সুবিধা, ইচ্ছে হলে বাসা থেকেই কাজ করতে পারি।’
‘আপনার কাজটা কি জানতে পারি? আই মিন কি করেন আপনি?’
হাসান হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি কী করি সেটা ব্যাখ্যা করা একটু কঠিন। তবে সবাই জানে আমি একজন কন্সালট্যান্ট।’
রূপার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করতে কিসের কন্সালটিং করেন আপনি। অবশ্য তা না জিজ্ঞেস করে সে বলল, ‘ও আচ্ছা।’
‘বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অবশ্য আমাকে ক্লায়েন্ট সাইটে গিয়েই কাজ করতে হয়। তবে প্রয়োজনে বাসা থেকেও অফিস করতে পারি। তিথি আগেই বলে রেখেছিল তাই এই সপ্তাহটা বাসায়ই আছি। সেটা একদিক থেকে ভালই হয়েছে–তোমাকে ডালাস সিটিটা একটু ঘুরিয়ে দেখাতে পারবো। তোমার সাথে অনেক গল্পও করা যাবে।’ এক নাগারে কাজের ফিরিস্তি দিয়ে হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি কি খাবে বলো।’
‘আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি সকালে তেমন কিছু খাইনা। শুধু চা হলেই চলবে। আমি নিজেই বানিয়ে নিতে পারবো। কোথায় কি আছে, শুধু দেখিয়ে দিলেই হবে।’
‘অসুবিধা নেই, আমেরিকায় তোমার প্রথম সকালের চা-টা না হয় আমার হাতেই খেলে।’
হাসান উঠে কিচেনে গেল। কাউন্টার থেকে একটা কাপ নিয়ে পানি ভরে মাইক্রোওয়েভে দিয়ে ২ মিনিট গরম করল। তারপর ২টা টি-ব্যাগ ছেড়ে দিয়ে রূপাকে জিজ্ঞেস করল, ‘চিনি?’
‘এক চামচ।’
হাসান চিনি মিশিয়ে চা-টা রূপার দিকে এগিয়ে দিতেই বাসার ফোন বেজে উঠল। হাসান ফোন নিয়ে কলার আইডিতে দেখল তিথির অফিস নাম্বার। সে ফোন ধরতেই তিথি বলল, ‘কি করছো?’
‘এই তো রূপার জন্য চা বানাচ্ছিলাম।’
‘রূপা ঘুম থেকে উঠেছে?’
‘হ্যাঁ, উঠেছে।’
‘প্রোগ্রাম ঠিক আছে তো সব? কোথায় নিয়ে যাচ্ছো ওকে?’
‘ভাবছি ডাউন-টাউনে গিয়ে কয়েকটা মিউজিয়াম দেখাবো প্রথমে, তারপর হয়তো জাপানিজ গার্ডেনে যাবো।’
‘জাপানিজ গার্ডেন? ইস, আমি মিস করবো!’ তিথি আক্ষেপ করে বলল।
‘তাহলে থাক, উইকএন্ডে যাবো যেদিন তুমি থাকবে।’
‘না, না, সময় হলে আজই যাও। তোমার কি মনে হয়, তিনটার আগে ফিরতে পারবে? তিতলিকে আনতে হবে তো।’
‘তিনটার আগেই ফিরব।’
‘ঠিক আছে, রূপাকে দাও।’
হাসান ফোন নিয়ে এসে দেখল রূপা চায়ের কাপ হাতে নিয়ে জানালা দিয়ে দুরের লেকটার দিকে তাকিয়ে আছে। হাসান রূপাকে ফোন দিয়ে বলল, ‘তিত্থির ফোন।’
রূপা ফোন নিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
‘কিরে, ঘুম ঠিকমতো হয়েছে?’
‘হ্যাঁ, হয়েছে।’
‘দেশে কথা বলেছিলি?’
‘হ্যাঁ, বলেছি। বলেছি সবকিছু ঠিক আছে, কোন অসুবিধা হয়নি। এই তিথি, তুই কখন আসবি?’
‘এই তো কাজ শেষ হলেই। আসতে আসতে ৬টা বেজে যাবে।’
‘একটু তাড়াতাড়ি আয় না।’
‘দেখি, চেষ্টা করবো। একটু হাসানকে দে।’
রূপা ফোন এগিয়ে দিল হাসানের হাতে। হাসান বলল, ‘হ্যাঁ, বলো।’
‘শোন, রূপাকে কিন্তু ভাল মত ট্রিট করবে। বাইরে লাঞ্চ খাওয়াতে ভুলো না। আর একদম কিপ্টেমী করবে না।’
‘ছি ছি এসব কি বলছো!’
‘বলছি, কারণ টাকা-পয়সা খরচের ব্যাপারে তোমার আবার একটু ইয়ে আছে কিনা তাই।’
‘ইয়ে আছে মানে? এই, ইয়ে আছে মানে কি?’
‘মানে কিছু না। আমি রাখছি।’
তিথি হাসতে হাসতে ফোন কেটে দিল।
হাসান কাজ থেকে আগেই ছুটি নিয়ে রেখেছিল। কাজেই দেরী না করে সে রূপাকে নিয়ে বের হয়ে পরল শহর দেখাতে। রূপাকে ডালাসের বেশ কিছু ল্যান্ডমার্ক ঘুরিয়ে দেখালো। ওরা অবশ্য গাড়ি থেকেই সব জায়গা গুলো দেখল। যদিও রূপাকে নামতে বলেছিল হাসান, কিন্তু রূপা নামতে চায় নি। সময় কম বলে রূপা বলল, কোথাও নামতে হবে না। তারচেয়ে বরং আমাকে জায়গা গুলোতে নিয়ে চলুন। গাড়ি থেকে দেখলেই হবে।’
হাসান প্রথমেই রূপাকে নিয়ে গেল প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি যেখানে আততায়ীর গুলিতে নিহত হয়েছিলেন সেখানে। সেখান থেকে একে একে রি-ইউনিয়ন টাওয়ার, ডেলে প্লাজা, পেরো মিউজিয়াম, আর্টস মিউজিয়াম, নাসের স্কাল্পচার সেন্টার, পাইওনীয়ার প্লাজার ক্যাটেল ড্রাইভ, ওয়ার্ল্ড এ্যাকুইরিয়াম, প্রেসবাইটারিয়ান চার্চ–কোন জায়গাই বাদ পড়ল না।
ঘুরাঘুরির ফাঁকে ফাঁকে ওদের মধ্যে অনেক কথা হলো। হাসান জানতে পারল রূপার জীবনের বেশ কিছু না জানা কথা। দুপুরের লাঞ্চ সেরে হাসান রূপাকে নিয়ে গেল ডাউন-টাউন সংলগ্ন ক্লাইড ওয়ারেন পার্কে। গাড়ি থামিয়ে ওরা নেমে পড়ল। তারপর বসল একটা ছায়া ঘেরা বেঞ্চে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে পূর্বের কথার রেশ ধরে হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘একটা ব্যাপার আমার কাছে এখনো পরিষ্কার না। পার্থ তোমাকে এভাবে ফেলে চলে গেল কেন? তোমাদের মাঝে কি আন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছিল না?’
পার্থের সঙ্গের রূপার সম্পর্ক ছিল অনেকদিনের। বিয়ে করার তারিখ পর্যন্ত ঠিক হয়েছিল তারপর হঠাৎ করেই পার্থ রূপার সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে রূপা বলল, ‘তাতো বলতে পারবো না। ও কেন আমাকে ছেড়ে চলে গেল তা যদি জানতে পারতাম, অন্তত নিজেকে কিছু একটা হলেও সান্ত্বনা দিতে পারতাম।’
হাসান আসলে বুঝতে পারছে না আর কি বলা যায় কিন্তু তার আরো জানতে ইচ্ছে করছে। কথা চালিয়ে যাবার জন্য সে বলল, ‘নিশ্চয়ই অনেক খারাপ সময় গেছে তোমার!’
‘পার্থ আমাকে ছেড়ে চলে যাবার পর আমার পৃথিবীটা একবারে শূন্য হয়ে পড়ে। আমরা তো আসলে আলাদা করে দু’টি মানুষ ছিলাম না। দুজন মিলে এক হয়ে গেছিলাম। ও চলে যাবার পর আমি এতোটাই ভেঙ্গে পড়ি যে এক সময় অসুস্থ হয়ে যাই। সবকিছু কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যায়।’
‘সেটা তো খুবই স্বাভাবিক, কিন্তু একটা পর্যায়ে সবকিছু তো মেনে নিতেই হয়।’
‘সে চেষ্টা কি আমি করিনি? কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই আমার চারপাশের মানুষগুলো অনেক বাজে বাজে কথা বলতে শুরু করলো। পার্থকে ভালবেসে আমি যেন একটা মহা অন্যায় করে ফেলেছি। সবাই আমাকে অন্য চোখে দেখতে লাগলো। ভাবখানা এমন যেন আমি খারাপ টাইপের একটা মেয়ে।’
একটু থেমে রূপা আবার শুরু করল, ‘কাউকে ভালবাসলেই কি তার সাথে শরীরের সম্পর্ক হয়ে যায়? সেক্স ছাড়া কি সম্পর্ক হতে পারে না?’
রূপার গলা ভারী হয়ে এলো। সে চুপ করে থাকল। কিছুক্ষণ পর হাসান বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করতে চাই, অবশ্য তুমি যদি কিছু মনে না করো।’
রূপা হেসে দিয়ে বলল, ‘কিছু মনে করলে কি এত কথা আপনার সাথে শেয়ার করতাম। বলুন কি জানতে চান?’
‘তুমি অন্য কাউকে বিয়ে করলে না কেন? বিয়ে হয়ে গেলে কিন্তু এত কিছুর ভিতর দিয়ে তোমাকে যেতে হতো না।’
‘বাসা থেকে একবার বিয়ে দেয়ার চেষ্টাও শুরু করেছিল। সেটা হয়েছিল আরো ভয়ংকর—অনেক অপমানের। আমার ফ্যামিলিকে অনেক আজে বাজে কথা শুনতে হয়েছে। আমার আগে একটা সম্পর্ক ছিল, আরো অনেক নোংরা কথা। আগে একটা সম্পর্ক থাকলেই কি কেউ নষ্ট হয়ে যায়?’
‘না, না তা হবে কেন?’
‘আচ্ছা, আপনি বলুন, মেয়েরা কি এতোই তুচ্ছ যে একটা মানুষকে ভালবাসলে সে নষ্ট হয়ে যাবে? তাই যদি হয়, তবে সেটা শুধু মেয়েদের বেলায় কেন? ছেলেদের বেলায় নয় কেন? কেন এমন বৈষম্য বলতে পারেন?’
হাসান কোনো উত্তর দিতে পারল না। রূপা আবার বলল, ‘প্রায়ই ভাবতাম, যদি কোথাও পালিয়ে যেতে পারতাম? একবার কোথাও যেতে পারলে দেশে আর ফিরে যেতাম না।’
‘তোমার সে ভাবনা কি এখনো বহাল আছে?’
‘মানে?’
‘মানে তুমি তো এখন মার্কিন মুল্লুকে চলে এসেছো। চাইলেই থেকে যেতে পারো।’
‘থেকে যেতে পারলে তো ভালই হতো।’
‘বাঁধাটা কোথায়?’
রূপা ঠিক বুঝতে পারল না কি বলবে। সে হাসানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
তিথি ঘড়ি দেখল প্রায় দু’টা বাজে। সে ভাবল হাসানকে একবার ফোন করে দেখি সে সময় মত যাচ্ছে কিনা তিতলিকে আনতে। ওর যে ভুলো মন। তিথি হাসানের মোবাইল ফোনে কল দিল, কিন্তু কোন সাড়া পেল না। সে আবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই ভয়েজ মেসেজে চলে যাচ্ছে। তিথি কিছুটা দুষ্টুমি আর কিছুটা চিন্তার মিশ্রণে ভয়েজ মেসেজ রাখল–‘কি ব্যাপার সারাদিন কোন খবর নেই যে? আমার বান্ধবীকে নিয়ে কি হারিয়ে গেলে নাকি? ফোন করছি–ধরছো না। ঘটনা কি হ্যাঁ? এনিওয়ে, কল মি হোয়েন ইউ গেট এ চান্স।’
তিথি চিন্তিত মনে ফোন রেখে দিল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-২)

ডালাস সময় সকাল সাড়ে ১১ টায় এমিরেটস এয়ারলাইন্সের ফ্লাইট ল্যান্ড করল ডিফডব্লিউ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। এরাইভাল লাউঞ্জে তিথি, হাসান আর তিতলি অপেক্ষা করছে রূপার জন্যে। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করে রূপার বের হয়ে আসতে আরো প্রায় এক ঘণ্টা লেগে গেল। তিথি দূর থেকে রূপাকে দেখেই একটা বাচ্চা মেয়ের মত হাত নেড়ে ডাকল। রূপা বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে এলো। কাছে আসতেই তিথি ওকে জড়িয়ে ধরল। তিতলি এগিয়ে এসে রূপার হাতে একটা ফুলের তোড়া দিয়ে বলল, ‘ওয়েলকাম টু ডালাস!’
রূপা তিতলিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইয়্যু!’ তারপর তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোর মেয়ে এত বড় হয়ে গেছে? কত হলো বয়স?’
‘নয় বছর!’
‘নাইন এন্ড এ হাফ ইয়ার্স!’ তিতলি তার মা-কে শুধরে দিয়ে বলল।
রূপা হেসে ফেলল।
‘কেমন আছো রূপা? তোমার জার্নি কেমন হলো?’
রূপা তাকিয়ে দেখল হাসানকে। মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘ভাল আছি হাসান ভাই। জার্নি বেশ ভালই হয়েছে।’
‘কোনো সমস্যা হয়নি তো?’
‘না কোনো সমস্যা হয়নি।’
‘বেশ তাহলে চলো যাওয়া যাক।’
রূপার হাত থেকে বড় লাগেজটা নিয়ে নিল হাসান। তারপর সবাই মিলে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেল।
গাড়িতে লাগেজ ঢুকিয়ে হাসান যখন ড্রাইভিং সীটে বসতে যাবে, তিথি তখন হাসানকে বলল, ‘চাবিটা দাও, আমি চালাচ্ছি। তুমি তিতলিকে নিয়ে পেছনে বসো। রূপা তুই সামনে বস।’
হাসান হেসে দিয়ে তিতলিকে নিয়ে পেছনের সীটে বসল। রূপা একটু অবাক হয়ে সামনে গিয়ে বসল। তিথি গাড়ি স্টার্ট দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে হাইওয়েতে পড়ল।
ডালাসের আকাশে তখন ঝকঝকে রোদ। সূর্য মাথার উপরে। মেঘও তেমন নেই। টেক্সাসের তাপ সহজেই অনুমেয়। যদিও গরম এখনো সেভাবে জেকে বসেনি। সবার মধ্যেই খুশি খুশি ভাব।
ইন্টারস্টেট হাইওয়ে-৬৩৫ ধরে দ্রুত গতিতে এগিয়ে চলেছে তিথির মিনি-ভ্যান। রূপা অবাক হয়ে দেখছে চারিদিকটা। বিশেষ করে ৬ লেনের হাইওয়ে, উঁচু উঁচু ফ্লাইওভার, একটি থেকে আরেকটি রাস্তার সংযোগ, বিকল্প রাস্তা, হাইওয়ের সংগে সার্ভিস রোড–এসব দেখে সে মোটামুটি ভাবে নিশ্চিত হলো যে যুক্তরাষ্ট্রের মহাসড়কগুলা সর্বাধুনিক, নিরাপদ ও যাত্রী সেবায় এগিয়ে রয়েছে অনেক তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
যোগাযোগ ব্যবস্থা একটি দেশের অর্থনীতির প্রতিচ্ছবি। দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য উন্নত সড়ক-মহাসড়কের বিকল্প নেই। যাত্রী পরিসেবা তো বটেই, ব্যবসায়িক প্রয়োজনে অবিরাম ও নিরাপদ হাইওয়ে নির্মাণে বিশ্বের প্রতিটি দেশই মনোযোগী। দেশে দেশে হাইওয়ে বা মহাসড়কের দিকে তাকালে দেখা যাবে সেগুলো মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী, সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ও নির্মাণকৌশলে নির্মিত হচ্ছে। বিশ্বের কোনো দেশেই ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে স্থবির থাকে না প্রধান মহাসড়কগুলো—একমাত্র ব্যতিক্রম সম্ভবত বাংলাদেশ।
দেশের কথা মনে হতেই রূপার মনে হলে ঢাকায় একটা ফোন করে বলে দিতে হবে যে সে ঠিকমত পৌঁছেছে। রূপা তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেশে একটা কল করা দরকার।’
‘এখনই করবি না বাসায় যেয়ে করবি?’
‘বাসায় যেতে আর কতক্ষণ লাগবে?’
‘দশ মিনিট-এইতো প্রায় এসে গেছি।’
‘ঠিক আছে তাহলে বাসায় যেয়েই করব।’
ডালাস ডাউন-টাউন পার হয়ে তিথির মিনি-ভ্যান সোজা ছুটে চলল গন্তব্যে।
রূপার আসার উপলক্ষে গতকাল রাতেই তিথি অনেক গুলো আইটেম রান্না করে রেখেছিল। যদিও রূপা অনেক ক্লান্ত ছিল তবুও সে বেশ মজা করেই খেল সবকিছু। দুপুরে খাওয়ার পর বিশ্রামে চলে গেল রূপা।
বিকেল গড়াতেই শুরু হলো চা-য়ের আড্ডা ব্যাকইয়ার্ডে বসে। তিথি আর রূপাই বেশী কথা বলছে। হাসান চায়ের কাপে চুমুকের ফাঁকে ফাঁকে দুই বান্ধবীর কথা শুনছে। তিতলি তার হুলা-হুপ নিয়ে একা একা খেলছে পাশেই।
তিথিদের বাসার পেছনেই বড় একটা লেক। লেকের ওপারে রোদ সরে যাচ্ছে–তাপও অনেকটা কমে এসেছে। ঝিরিঝিরি বাতাস বইছে–স্বস্তির ছোঁয়া নিয়ে।
কোনো কোনো বিকেল খুব সুন্দর হয়। সূর্যের হলদে আলো পিছলে পড়ে সবুজ পাতা থেকে। আজকের বিকেলটাও তেমনি মনে হচ্ছে রূপার কাছে। রূপা তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোদের সংসার দেখে খুব ভাল লাগছে রে। দেখে তো মনে হচ্ছে বেশ সুখেই আছিস।’
‘তাই? দূর থেকে কাশবন ঘনই দেখা যায় বন্ধু।’
হাসান 88 করে বলল, ‘এ কথার মানে কি তিথি? তারমানে কি, তুমি সুখে নেই?’
তিথি হাসানের কথার অবশ্য কোনো উত্তর দিল না। রূপা হেসে দিয়ে বলল, ‘কিরে, কিছু বল?’
‘সুখে আছি কিনা জানি না, তবে নিজের মত করে স্বাধীন ভাবে চলতে পারছি। এই তো কত!’
‘এখানে থেকে অন্তত এইটুকু বলতে পারছিস যে তুই স্বাধীন ভাবে চলতে পারছিস। এই স্বাধীনতা টুকুই বা ক’টা মেয়ের আছে আমাদের দেশে বল?’
‘সেভাবে দেখলে মনে হয়, এদেশে এসে ভালই করেছি। আমি যে একটা মানুষ, তার স্বাদটুকু অন্তত পরিপূর্ণভাবে উপভোগ করছি। মানুষের জীবন যে কত বড় আর সুন্দর তা এদেশে না এলে বুঝতেই পারতাম না।’
হাসান হাসি হাসি মুখ করে তিথির কথা বেশ আগ্রহ নিয়েই শুনছে। রূপাও তাকিয়ে থাকল ওর মুখের দিকে।
তিথি রূপার দিকে তাকিয়ে আবারো বলল, ‘তুই দ্যাখ, এখানে কেউ কাউকে নিয়ে মাথা ঘামায় না। ব্যক্তিগত বিশেষ কিছুর ওপর ওদের নজর আটকায় না। কেউ কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলে না। অযাচিত সন্দেহ করে না। স্বাধীনতা মানে যে কি, তা বাংলাদেশের মেয়েরা হয়তো কোনোদিনই বুঝতে পারবে না।’
তিথির সঙ্গে রূপাও যোগ করল। এ যেন তার মনের কথাই সব। সে বলল, ‘আমাদের দেশের মানুষগুলোর মন-মানসিকতা এতো ছোট যে কি বলবো! ক্রমশ তাদের বিবেক-বিবেচনা, চিন্তা-চেতনা দিনদিন সংকুচিত হয়ে পড়েছে। একটা ছেলে আর একটা মেয়ে মেলামেশা করলেই ধরে নেয় ওদের মধ্যে কিছু একটা হয়েছে… আচ্ছা, একটা ছেলে আর মেয়েতে কি স্রেফ বন্ধুত্বের সম্পর্ক হতে পারে না?’
এবার হাসান রূপার দিকে তাকাল। বোঝাই যাচ্ছে সে বেশ উপভোগ করছে ওদের দুজনের কথোপকথন।
রূপার ক্ষোভের পেছনে একটা কারণ আছে সেটা তিথি জানে। তাই সে চুপ থেকে ওকে বলতে দিল।
রূপা আবার বলল, ‘একটা মেয়েকে একা দেখলেই রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে শিস দেবে। অরুচিকর কথা বলবে। আবার একটা ছেলের সঙ্গে দেখলেও…’ বলতে গিয়ে রূপার গলা কেমন ভারী হয়ে গেল। সে থেমে গিয়ে মাথা ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল। একটা চাপা ক্ষোভ স্পষ্ট হয়ে উঠল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘একজন স্বাভাবিক চিন্তার মানুষ অন্যের সম্পর্ক নিয়ে কেন এত মাথা ঘামাতে হবে? তাদের কি আর কোনো কাজ নেই?’
তিথি রূপার কথায় সায় দিয়ে বলল, ‘ঠিকই বলেছিস, অন্যের ব্যাপারে মাথা ঘামানোর মত এমন বিরল প্রজাতির দেশ বোধ হয় পৃথিবীতে একটাই আছে। আমি ভেবে পাই না, গোটা একটা জাতি এমন ভাবে গড়ে উঠেছে কিভাবে? অদ্ভুত–ভীষণ অদ্ভুত, এদের ফিলসফিও অদ্ভুত। এরা অন্যের সুখ সইতে পারে না–ঈর্ষাকাতর হয়ে পড়ে। নিজের স্বার্থে সামান্য আঘাত লাগলে এদের ভিতরে লুকানো কুৎসিত কদাকার রূপ বেরিয়ে আসে।’
এবার হাসান তিথির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখো, আমার মনে হয় ব্যাপারটাকে এভাবে জেনারালাইজড করাটা ঠিক হচ্ছে না। এটা ঠিক আমাদের দেশের কিছু মানুষের মধ্যে এই সহজাত স্বভাবটা আছে। পৃথিবীর সব দেশেই কিন্তু এই একই চিত্র তুমি দেখতে পাবে। এটা যে শুধু বাংলাদেশের সমস্যা তা কিন্তু না–ইট’স এ প্রব্লেম ফর হোল ইউনিভার্স!’
তিথি আর রূপা দুজনের কেউ আর কিছু বলল না। পরিবেশটা একটু ভারী হয়ে যাচ্ছে দেখে এবার হাসান মজা করে বলল, ‘আচ্ছা, তোমরা দেখছি প্রথম অধিবেশনেই দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে লেগে পড়লে! এমন সুন্দর একটা বিকেল নষ্ট করছো সব ভারী ভারী কথা বলে। তারচেয়ে বরং চলো, রূপাকে নিয়ে কোথাও থেকে ঘুরে আসি।’
‘তোমার কাছে এসব ভারী কথা মনে হচ্ছে?’ তিথি একটু রেগেই বলল হাসানকে।
‘আরে বাবা এসব কথা তো বাইরে গিয়েও বলা যাবে।’
‘আচ্ছা চলো।’
ওরা সবাই মিলে বের হয়ে গেল।
তিথিদের বাসার থেকে মাত্র দশ-পনের মিনিটের দূরত্বে ছোট্ট শহর রকওয়াল। রকওয়ালের বিখ্যাত লেক রে-হাবার্ডের উপরে তৈরী হয়েছে একটি হারবার পয়েন্ট। ইদানীং পর্যটকদের অনেক আনাগোনা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। লেকের পাড় ঘেঁষে অনেক হোটেল-রেস্টুরেন্ট আর দোকানপাট গড়ে উঠেছে। সিনেমা হল, কফি-শপ, বার কি নেই এখানে। খোলা আকাশের নীচে লাইভ কনসার্ট হয়। বিস্তৃত মাঠের সবুজ ঘাসে বসে সবাই গান শোনে। এই জায়গাটি তিথি আর হাসানের অনেক প্রিয়। ওদের বাসায় কোনো অতিথি এলে, তাকে প্রথম সুযোগেই নিয়ে আসা হয় এই লেকের ধারে।
হাসান সবাইকে নিয়ে এলো হারবার পয়েন্ট-এ। লেকের পাড় দিয়ে অনেকক্ষণ ধরেই হাঁটছে তিথি, রূপা, হাসান আর তিতলি। তিতলি অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যায়। বাচ্চা মানুষ। সে হাটা থামিয়ে একটা বেঞ্চে বসে পড়ল। কিছুদূর এগিয়ে গিয়ে তিথি দেখল তিতলি বসে রয়েছে। সে ফিরে এসে বসল মেয়ের পাশে।
হাসান আর রূপা কথা বলছিল। কথা বলতে বলতেই ওরা এগিয়ে গেল।
তিথি হঠাৎ করে লক্ষ্য করল, হাসান আর রূপা হাটতে হাঁটতে বেশ অনেকটা দুরে চলে গেছে। তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলায় এতটাই মগ্ন যে ওদের দুজনের কেউ একবারের জন্যেও পেছনে ফিরে তাকাল না। হাটতে হাঁটতে একসময় হারবার পয়েন্ট সংলগ্ন লাইট হাউসের নীচে গিয়ে দাঁড়াল হাসান আর রূপা।
শেষ বিকেলের পশ্চিমাকাশে ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা তখন হেলে পড়েছে। ধীরে ধীরে হলুদ থেকে লাল হয়ে যাওয়া নির্জীব ও নির্মল সূর্যটার দিকে তাকিয়ে আছে ওরা দুজন।
সূর্য পশ্চিমাকাশে আজকের মতো বিদায় নেবার পূর্বে শেষ বারের মতো মেঘের মধ্য থেকে মাথা বের করে তার কুসুম বর্ণ রূপ দেখাবার জন্য আরেকবার উকি দিলো। তারপর আচমকাই যেন দিগন্তে ডুবে গেল।
প্রতিদিনকার মতই খুব সকালে উঠে তিথি তিতলিকে নিয়ে বের হয়ে গেছে। তিতলিকে স্কুলে নামিয়ে দিয়ে সে চলে গেছে কর্মস্থলে। হাসানের একটা কনফারেন্স কল ছিল সকাল সাড়ে সাতটায়–সেও উঠে পড়েছে। হাসান এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে তার অফিস রুমে ঢুকার আগে লিভিং রুমে গেল কিন্তু কর্ডলেস ফোনটা কোথাও খুঁজে পেল না। সে কপাল কুঁচকে নিজেকে জিজ্ঞেস করল, ‘ফোনটা গেল কোথায়?’ তখনি তার মনে পড়ল রাতে ঘুমানোর আগে রূপা ফোনটা নিয়েছিল দেশে কথা বলবে বলে। রূপা যেই রুমটাতে আছে সেদিকে একবার তাকিয়ে ধীর পায়ে তার রুমের দিকে এগিয়ে গেল হাসান।
দরজার কাছে গিয়ে সে আস্তে করে ডাকল—রূপা! কিন্তু রূপা কোনো সাড়া দিল না। সে দরজায় দু’বার টোকা দিল, তাতেও কোনো সাড়া পেল না। একটু ইতস্তত করে আস্তে দরজা সরিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল হাসান এবং দেখল ফোনটা খাটের পাশের নাইটস্ট্যান্ডে পড়ে আছে।
রূপা গভীর ঘুমে–ওর ঘুম যেন ভেঙ্গে না যায় তাই খুব সন্তর্পণে বিড়ালের মত পা ফেলে কোন রকম শব্দ না করে ফোনটা নিয়ে ফিরে আসার সময় হাসানের চোখ পড়ল রূপার ঘুমন্ত মুখের উপর। জানালার পর্দার ফাঁক গলে এক চিলতে রোদ রূপার শরীরের উপর দিয়ে চলে গেছে। এবার তার দৃষ্টি গিয়ে পড়ল বাঁকা হয়ে শুয়ে থাকা রূপার শরীরের উপর। পায়ের উপর থেকে তার নাইটির কিছু অংশ সরে গিয়ে ফর্সা পা বেরিয়ে আছে। হাসানের পায়ে যেন কেউ পেরেক ঠুকে দিল। অনেক চেষ্টা করেও সে নিজের পা দুটোকে নাড়াতে পারছে না।
হাসান মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (শেষ পর্ব)

শহীদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সোমার এমন কঠিনরূপ সে কখনো দেখেনি—দেখার অবশ্য কথাও না। সে ফরিদের দিকে তাকাল অসহায় দৃষ্টিতে। ফরিদ অবাক হয়ে চেয়ে আছে সোমার মুখের দিকে।
সোমা বলল, ‘ফরিদ ভাই, আপনি আমার দেশে যাবার ব্যবস্থা করেন।’
ফরিদ সুযোগ পেয়ে এবার মধ্যস্থতা করার জন্যে বলল, ‘আচ্ছা দাঁড়াও দাঁড়াও—এত অস্থির হচ্ছো কেন? তার আগে একটু শুনে নেই কী ঝামেলা হয়েছিল। নিশ্চয়ই এমন কিছু একটা হয়েছিল—একটা জেনুইন কারণেই হয়ত সে আসতে পারেনি।’ ফরিদ শহীদের দিকে ঘুরে বলল, ‘কী হয়েছে বলো তো ভাই?’ তারপর সে সোমাকে বলল, ‘সোমা তুমি বসো। এসো শোনা যাক—ঘটনাটা কি?’
সোমা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে হেঁটে গিয়ে বসল শহীদের পাশের সোফাতে। ভাবতে অবাক লাগছে, এই মানুষটার জন্যেই সে কত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছে অথচ এখন তাকে কেমন দূরের মানুষ মনে হচ্ছে।
ফরিদ শহীদকে বলল, ‘এবার বলো। কী এমন হয়েছিল যে তুমি এয়ারপোর্টে নিজের স্ত্রীকে আনতে যাওনি?’
শহীদ একটু নড়েচড়ে বসল। একটু ভূমিকা দিয়ে সে কথা বলা শুরু করল, ‘ফরিদ ভাই, আপনার সাথে আজকে আমার প্রথম পরিচয়। আমি দু’বছর আগে শিকাগোতে এসেছি—আগে ছিলাম নিউ ইয়র্কে। এটা ঠিক এখানে আমার তেমন কোনো বন্ধু বান্ধব নেই। যারা আছে—তারা কেউ এখানে থাকে না। অন্য জায়গায় চলে গেছে। সোমার সঙ্গে আমার বিয়েও হয়েছে দু’বছর।’
‘হ্যাঁ সোমা বলেছে।’ ফরিদ বলল।
‘আপনি তো জানেনই এখানে জীবন কত কঠিন। আগে একা ছিলাম, যা ইনকাম হতো–চলে যেত। কিন্তু বিয়ে করার পরে বুঝতে পারলাম, সংসার বড় হবে। টাকা-পয়সা রোজগার করতে হবে বেশি করে। সেই চিন্তা করেই আমি প্রায়ই ডাবল শিফট ক্যাব চালাচ্ছিলাম দীর্ঘদিন। আমার মেইন উদ্দেশ্য ছিল, সোমা আসার পরে আমার যেন কমপক্ষে এক সপ্তাহ কাজ করতে না হয়। ওকে নিয়ে ভ্যাকেশনে যাবো।’
ফরিদ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘দ্যাটস গ্রেট।’
‘মাঝে মাঝে একটু ব্রেক নিয়ে, গত তিনদিন আমি একটানা ক্যাব চালিয়েছি।’
ফরিদ বলল, ‘বলো কী?’
‘জি ফরিদ ভাই। আমার মধ্যে এক ধরনের এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিল।’
ফরিদ একটু মুচকি হাসল। সোমা নির্বিকার।
শহীদ আবার বলল, ‘তো গতকাল সারারাত গাড়ি চালিয়ে ভোরে যখন বাসায় ফিরছিলাম—ভেবেছিলাম বাসায় গিয়ে ছোট্ট একটা ঘুম দিয়ে আটটার দিকে এয়ারপোর্টে চলে যাব। কিন্তু…’
‘কিন্তু?’
শহীদ এবার পুরো ঘটনাটার বর্ণনা করল। ঘটনাটা এই রকম…
রাতের শিফটে কাজ শেষ করে ভোর পাঁচটার দিকে শহীদ ফিরে আসছিল বাসার দিকে। বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তায় ঢুকতেই একজন প্যাসেঞ্জার হাত তুলে শহীদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। শহীদ জানালা নামিয়ে দেখল প্রায় ছ’ফুটের মত লম্বা একজন কালো যুবক—মাথায় কালো টুপি, গায়ে লম্বা জ্যাকেট, এক হাত পকেটের ভিতর। শীতের ভোর— ঘন কুয়াশার কারণে চারিদিক তখনো অন্ধকার। রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা। আশে পাশে কেউ নেই। শহীদ বলল, ‘সরি ম্যান—আই’ম নট ফর হায়ার।’
‘হেই ম্যান, আই’ভ অ্যান ইমার্জেন্সি। আই নিড অ্যা রাইড।’ যুবকের চোখে মুখে আকুতি ফুটে উঠল।
‘আই’ম সরি। আই ক্যান্ট। আই নিড টু গো হোম। আই ড্রোভ লাস্ট টুয়েলভ আওয়ার্স—আই’ম রিয়েলি টায়ার্ড।’
‘কাম অন ম্যান—আই উইল পে ইউ গুড। দিস ইজ ইমার্জেন্সি। মাই মাম ইজ সিক—আই নিড টু টেক হার টু হসপিটাল। লেট মি গেট ইন।’
ছেলেটির মায়ের কথা শুনে শহীদ একটু ভাবল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ছেলেটি দরজা খুলে উঠে বসল গাড়ির পিছনের সীটে। ‘লেট’স গো।’ দরজা বন্ধ করে ছেলেটি বলল।
হাল ছেড়ে দিয়ে শহীদ জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার আর ইউ গোয়িং? গিভ মি দ্য এড্রেস।’
সে কিছুই বলল না। শহীদ ইতস্তত করে গাড়ি ঘুরিয়ে বড় রাস্তার দিকে ছুটে চলল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। বড় রাস্তায় উঠার আগেই একটা নির্জন মতো জায়গায় হঠাৎ করেই শহীদের ঘাড়ের উপর পিস্তল ঠেকিয়ে যুবক কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘স্টপ দ্য কার। স্টপ দ্য কার। গিভ মি ইয়োর মানি।’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শহীদ বলল, ‘হেই ম্যান, লিসেন। ইউ ক্যান্ট ডু দিস টু মি। আই’ম ট্রায়িং টু হেল্প ইয়ু।’
‘ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম—গিভ মি দ্যা ওয়ালেট। ওপেন ইয়োর ওয়াচ। গিভ ইট টু মি। ইয়োর ফোন ঠু।’
শহীদের অনেক কষ্টার্জিত ডলার। ডাবল শিফট কাজ করে, না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, সকাল-সন্ধ্যা-রাত একটানা কাজ করছে সে শুধু অতিরিক্ত কিছু রোজগার করার জন্যে। আর সেই টাকা এত সহজেই একজন নিয়ে যাবে তা কী করে হয়। শহীদ কিছুতেই দিতে চাইল না। কিন্তু পিস্তলের মুখে নিজেকে বড়ই অসহায় মনে হলো। ক্যাব ড্রাইভিং লাইসেন্স নেবার ট্রেনিং এর সময় সে শিখেছিল—যদি ছিনতাইকারীর কবলে পড়—চোখ বন্ধ করে যা আছে সব দিয়ে দাও। দ্বিতীয় চিন্তা করার অবকাশ নেই। অলওয়েজ রিমেমবার, লাইফ ইজ মোর ইম্পরট্যান্ট দ্যান এনিথিং। ডোন্ট রিস্ক ইয়োর লাইফ ফর ম্যাটেরিয়াল থিংস।
শহীদ অবশ্য বেশিক্ষণ চিন্তা করার অবকাশ পেল না। তার দেরী হচ্ছে দেখে পিস্তলধারী শহীদের মাথার পিছনে পিস্তলের বাট দিয়ে সজোরে আঘাত করল। মুহূর্তেই চোখে অন্ধকার দেখল সে। এরপরে আর কোনো শব্দ না করে ভীত সন্ত্রস্ত শহীদ একে একে সবকিছু দিয়ে দিল যুবকের হাতে। কিন্তু তারপরেও শেষ রক্ষা হলো না। ছিনতাইকারী যুবক শহীদের মাথার পিছনে পুনরায় আঘাত করল সজোরে এবং মুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল সে।
তারপরে তার আর কিছুই মনে নেই। তার যখন সংজ্ঞা ফিরে এলো তখন নিজেকে আবিষ্কার করল গাড়ির পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায়। মুখ টেপ দিয়ে আটকানো। ঠাণ্ডায় তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আছে। তবুও সে কোনো রকমে মাথাটা উঁচু করে দেখল—দিনের আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা দিনের কোন সময় সে কিছুই বুঝতে পারল না। শহর থেকে অনেক দূরে একটা কান্ট্রি রোডের পাশে তার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এতদূরেই বা তার গাড়ি কে নিয়ে আসল সেটাও জানা গেল না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে উঠে বসতে চাইল কিন্তু পারল না। ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবারো জ্ঞান হারালো।
শহীদের যখন দ্বিতীয়বার জ্ঞান ফিরল—তখন সে শুয়ে আছে শিকাগো সাউথ সাইডের একটি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বেডে। গরম ব্লাঙ্কেট দিয়ে তার সারা শরীর মুড়িয়ে রাখা। দীর্ঘ সময় তীব্র শীতের মধ্যে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় আর অস্বাভাবিকভাবে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় তার হাইপোথার্মিয়ার মতো হয়ে যায়।
যেসব দেশে বরফ পড়াটা স্বাভাবিক, সেসব দেশে হাইপোথার্মিয়ায় মৃত্যুর ব্যাপারটাও মানুষের কাছে পরিচিত। হাইপোথার্মিয়া শুরু হয়ে গেলে অবধারিতভাবেই মানুষটির শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। অনেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। দিকভ্রান্ত হয়—হোঁচট খেতে থাকে এবং গতি ধীর হয়ে যায়। একটা পর্যায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন আশঙ্কাজনক মাত্রায় কমে আসে—মানুষ জ্ঞান হারায় এবং মারা যায়।
শহীদের শরীরের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিক হয়ে এলো, সে যখন স্বাভাবিক কথা বলতে পারছে তখন দায়িত্বরত ডাক্তার হাইপোথার্মিয়ার বিষয়টি তাকে ব্যাখ্যা করল। শহীদ বাসায় যেতে চাইলে ডাক্তার বলল, রাতটা তাকে অবজার্ভ করে সকালে রিলিজ দিয়ে দেবে—তার আগে নয়।
ঘটনা এ পর্যন্তই।
সব শুনে ফরিদ বলল, ‘ও মাই গড!’ বলেই সে তাকাল সোমার দিকে। সোমা চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে শহীদের দিকে।
শহীদ বলল, ‘সারাটা রাত আমার যে কী যন্ত্রণা হয়েছে—সোমার চিন্তায় শুধু ছটফট করেছি।’ বলেই শহীদ তাকাল সোমার দিকে।
সোমা তাকিয়ে থাকতে পারল না। সে চোখ ঘুরিয়ে নিল।
ফরিদ বলল, ‘তো তুমি পুলিশে যোগাযোগ করো নাই কেন?’
‘আমি যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, তখন দেখলাম আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি। পুলিশই আমাকে উদ্ধার করে হসপিটালে নিয়ে যায়। পুলিশ একটা রিপোর্ট করেছে—বলেছে সুস্থ হয়ে ওদের সাথে কথা বলতে। সাথে ফোন না থাকাতে কারো সঙ্গেই আর যোগাযোগ করতে পারি নাই।’
এরপরে আর কেউ কোনো কথা বলল না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ফরিদ জানতে চাইল, ‘হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছ কখন?’
‘আজ সকালে। সেখান থেকে সরাসরি বাসায় ফিরেই দেখলাম ইকবাল ভাই আর বাদশা দাঁড়িয়ে আছে বাসার সামনে। তাদের কাছেই জানলাম সোমা আপনার এখানে…’
শহীদ আবার তাকাল সোমার দিকে। সোমা শাড়ির আঁচলে চোখ চেপে ধরে আছে।
ফরিদ বলল, ‘তুমি এখন কেমন বোধ করছ?’
‘ভালো—তবে মাথার এই পেছনটায় ব্যথা আছে এখনো। ফোলাটা একটু কমেছে অবশ্য।’
‘চা-কফি কিছু খাবে? ব্রেকফাস্ট করেছো?’
শহীদ মাথা নেড়ে বলল, ‘না ফরিদ ভাই। আপনি এমনিতেই অনেক করেছেন…’
‘আরে এটা তো একজন বাঙালী হিসেবে আমার দায়িত্ব। আমি আমার দায়িত্বটুকুই পালন করেছি। আর তুমি এই শিকাগোতে এসেছে অথচ আমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই… এই শহরে এমন কোনো বাঙালী নেই যে পারসোনালি আমাকে চিনে না।’
‘আমি আপনার নাম শুনেছি ফরিদ ভাই… কিন্তু যোগাযোগটা করা হয়নি।’
ফরিদ এবার সোমাকে বলল, ‘এবার তো বুঝতে পেরেছ সোমা, কী হয়েছে? থ্যাঙ্কস গড যে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়নি।’
সোমা চুপ করে রইল। তার ভেতরটা উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। একটা মানুষের উপর এত বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে আর তার উপর সে রাগ করে ছিল!
শহীদ সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘চলো সোমা।’
ফরিদ বলল, ‘যাও সোমা তৈরী হয়ে এসো। এখন তোমার রাগ কমেছে তো?’
সোমা মৃদু হাসল। ফরিদ আবার বলল, ‘যাও যাও।’
সোমা উঠে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে কাপড় বদলে তার ছোট্ট সুটকেসটা নিয়ে নীচে নেমে এলো।
ফরিদের বাসার সামনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সোমা আর ফরিদ।
শহীদ তার জীপ চেরকিতে সোমার লাগেজ দুটি তুলে দিয়ে এসে দাঁড়াল সোমার পাশে। সোমার কী হয়েছে কে জানে। হঠাৎ করেই চোখ ভরে যাচ্ছে পানিতে। গত ২৪ ঘণ্টায় চোখের পানি এত ঝরেছে—তারপরেও এখন সে আবার কাঁদছে।
ফরিদ অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সোমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে বলল, ‘সোমা, আবার কাঁদছ? এবার কী হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেয়েছ এই আনন্দে নাকি অন্য কিছু?’
সোমা চোখ মুছল। দীর্ঘক্ষণ সে কোনো কথা বলেনি। এবার মৃদু স্বরে বলল, ‘দোয়া করবেন আমাদের জন্যে।’ বলেই হাত ব্যাগ থেকে সেই রুমালখানি বের করে ফরিদকে দিয়ে বলল, ‘আপনার রুমাল।’
ফরিদ হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘দেখো সোমা, কাল রাতে তুমি আমাকে রান্না করে খাইয়েছ। তোমাকে তো আর বাবুর্চি খরচ দিতে পারব না—ধরে নাও এই রুমালটিই আমার গিফট। আমি খুব খুশী হবো তুমি যদি রাখো।’
সোমা মৃদু হেসে রুমালটি হাত ব্যাগে রেখে দিল।
শহীদ বলল, ‘আসি ফরিদ ভাই।’
‘এসো। ভালো থেকো। সাবধানে যেও। আর যখন যা লাগবে আমাকে জানাবে। আর শোন, এবার কিছু বাংলাদেশি বন্ধু-বান্ধব বানাও। তা নাহলে তো তোমাকে খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল। ’
শহীদ হেসে বলল, ‘জি ফরিদ ভাই—অবশ্যই।’ তারপর সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সোমা চলো যাই।’
সোমা আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল—তারপর হঠাৎ করেই নিচু হয়ে ফরিদকে দু’হাতে সালাম করল। ফরিদ কিছু বলার আগেই সোমা উঠে দাঁড়িয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘ভালো থাকবেন। শরীরের যত্ন নিবেন আর সময়মত খাওয়া-দাওয়া করবেন। ওষুধ খেতে ভুলে যাবেন না।’
ফরিদ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারল না। তার ইচ্ছে হলো মেয়েটির মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে।
সোমার চোখ আবার ভিজে উঠেছে। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে এখন আর তার কিছুই করার নেই। চোখের পানি আটকানো যাবে না—সে চোখ মুছতে মুছতে দ্রুত গাড়িতে যেয়ে উঠল। একবারের জন্যেও আর ফিরে তাকাল না। ফরিদ ভাই আবার তার এই ভেজা চোখ দেখুক সে তা কিছুতেই চায় না।
ফরিদ বুঝতে পারল মেয়েটির খুব কষ্ট হচ্ছে। কেন কে জানে? ফরিদের নিজের কাছেও একটু খারাপ লাগছে। একটু নয়—বেশ ভালো পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু কেন? এই কেনর কোনো উত্তর ফরিদের জানা নেই। মাত্র একদিনের পরিচয়ে মেয়েটিকে মনে হচ্ছে প্রিয়জন কেউ।
মানুষের সম্পর্ক কত রকমের হতে পারে। কি জটিলতা এই সম্পর্কের। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এক অদ্ভুত মায়ার সম্পর্ক তৈরী হয়েছে সোমা আর ফরিদের মধ্যে যার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
কিছু সম্পর্কের পরিচয় শুধুই মায়া। এই সম্পর্কগুলোর না আছে কোন স্থায়ী বন্ধন, না আছে পিছুটান। তবুও সম্পর্কগুলো এক অদ্ভুত সুতায় বাঁধা পড়ে। বাস্তব জীবনে সম্পর্কগুলো অনেক বেশি জটিল এবং রহস্যে ঘেরা।
শহীদ গাড়ি ছেড়ে দিল। দূর থেকে ফরিদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
ফরিদ হাত উঁচু করে নাড়ল। শহীদের গাড়ি বাঁক নিয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া পর্যন্ত সে দাঁড়িয়ে রইল। (সমাপ্ত)

পরিশিষ্ট: যাবার সময় ফরিদের হাতে এক টুকরো সাদা কাগজ দিয়ে যায় সোমা। ফরিদ অবাক হয়েছিল—কিন্তু কিছু বলেনি তখন। ওরা চলে যাবার পর ফরিদ ভাঁজ খুলে দেখল, গোটা গোটা অক্ষরে কয়েকটি লাইন লেখা।
আপনাকে বলেছিলাম আমার একজন প্রিয় মানুষের কথা। আপনি জানতে চেয়েছিলেন, কে সে? ছোটো বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম যদি কোনো দিন তার সাথে দেখা হয়, তার হাত ধরে বলব—আপনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ। কথাটা তাকে বলা হয়নি। তার সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি। অথচ আমার দেখা হলো আপনার সাথে। আমার মনে হলো গত ২৪ ঘণ্টা আমি আমার প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্যেই কাটিয়ে গেলাম। আপনার কথা আমার মনে থাকবে। শুধু হাত ধরে বলা হলো না—আপনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ ফরিদ ভাই।

আগের পর্ব

Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৯)

‘হ্যালো, এটা ফরিদ ভাইর বাসা না?’
ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। কিন্তু কণ্ঠটি সোমার পরিচিত নয়। সে বলল, ‘জি।’
‘আপনি কে?’
‘আমি সোমা।’
‘সোমা… ও বুচ্ছি বুচ্ছি বুচ্ছি। ভালো আছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ ভালো।’
‘ফরিদ ভাই বাসায় নাই?’
‘জি জি আছেন। আপনি একটু ধরুন।’ সোমা ফরিদকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ইকবাল বলল, ‘সবগুলি হসপিটালের ইমারজেন্সিতে খোঁজ নিসি বস, শহীদুল ইসলাম নামে কোনো পেসেন্টের ইনফরমেশন নাই। আর কই যামু বস?’
‘দেখো ইকবাল, তুমি কোথায় যাবা তোমার ব্যাপার। আমি চাই, তুমি রাতের মধ্যেই শহীদের খোঁজ বের করবা—কোথায় যাবা, কার কাছে যাবা আমি কিছু জানিনা। আল্লাহর ওয়াস্তে যেভাবেই হোক তুমি ছেলেটার একটা ট্রেস বের করবা।’
‘আচ্ছা বস—আপনি টেনশন নিয়েন না। আমি দেখতেছি।’
ফরিদ ফোন কেটে দিয়ে বলল, ‘ধুর।’
সোমা মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি কেমন মলিন হয়ে গেছে। ফরিদ সোমার কাছে গিয়ে বসল। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘সোমা, সব মানুষের জীবনেই একটা গল্প থাকে—আমারো আছে। শুনবে?’
সোমা বলল, ‘শোনান।’
‘তখন তোমাকে আমি মিথ্যে বলেছি।’
সোমা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল ফরিদের দিকে?
‘আমার একটা বিয়ে হয়েছিল—দেশে। তখন আমি বেকার। সদ্য পাশ করে বেরিয়েছি। মেয়েটিকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। আমার পরিচিত ছিল। মেয়েটি সুশ্রী এবং শিক্ষিত। খুব ভালোবাসতাম—খুব। কিন্তু আমাদের বেশিদিন একসাথে থাকা হয়নি।’
‘কেন?’
‘ভাগ্য বদলানোর জন্যে আমি আমেরিকায় চলে আসি—একা।’
সোমা তাকিয়ে আছে ফরিদের মুখের দিকে।
একটু গুছিয়ে নিয়ে ফরিদ বলল, ‘এদেশে আসার অনেকদিন পর—যেহেতু আমার কাগজপত্র তৈরী হচ্ছিল না, আমিও দেশে যেতে পারছিলাম না—তার সঙ্গে দেখাও হচ্ছিল না। তার ভিসাও হচ্ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল টেলিফোন। আমরা টেলিফোনে অনেক কথা বলতাম। তখন তো এমন ফোন কার্ড ছিল না। যা টাকা বানাতাম তার সবটাই খরচ হয়ে যেত ফোনের বিল দিতেই।’ এটুকু বলে ফরিদ থামল।
সোমা জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’
‘তারপর? তারপর যখন আর কোনো উপায়ই বের করতে পারলাম না তখন একটা শেষ চেষ্টা করলাম। ঢাকায় আমার খুব কাছের এক বন্ধু ছিল। খুবই পাওয়ারফুল। বড় লোকের ছেলে—অনেক টাকা পয়সা। তাকে বললাম—দোস্ত, আমার বৌটাকে তোর বৌ সাজিয়ে এদেশে নিয়ে আয় এবং আমার বৌ আমার কাছে দিয়ে যা।’
‘কি বলেন? তাও কি সম্ভব নাকি?’
‘কি করব—আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওকে ছাড়া সারাটা জীবন কাঁটিয়ে দিব নাকি—সেটা কি সম্ভব?’
‘তারপর?’
‘অনেক অনুরোধের পরে আমার বন্ধু রাজি হলো। সত্যি সত্যি ওরা স্বামী-স্ত্রী সেজে ভিসার জন্যে দাঁড়াল এবং ভিসা পেয়েও গেল।’
‘ওয়াও। তারপর?’
‘তারপর ওরা দু’জন একসময় এক সঙ্গে এদেশে চলেও এলো। কিন্তু—’
‘কিন্তু?’
‘আমার বৌ আর আমার কাছে ফিরে এলো না। সে আমার বন্ধুর সঙ্গে চলে গেল অন্য একটা স্টেটে এবং সেখানেই সেটেলড হলো। শুনেছি তারা খুবই ভালো আছে।’
‘কি বলেন?’
‘সত্যি বলছি। সুতরাং, অতীতের দিকে তাকিয়ে তুমি যদি সামনের দিকে চলতে চাও—তাহলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে। সামনে তাকাও—সামনে। জীবনটা অনেক সুন্দর হবে।’
সোমা অবাক হয়ে ভাবছে তার সামনে বসে থাকা মানুষটার কথা। মানুষের জীবনে আসলেই কত ঘটনা ঘটে। একজনকে কাছে থেকে না দেখলে, তার সম্পর্কে না জানলে—কিছু জানা হয় না। দূর থেকে বোঝাও যায় না। ইশ, মানুষের জীবনটা এমন কেন?
সোমা বলল, ‘আপনি আবার বিয়ে করেন নি কেন?’
‘ঐ যে বললাম, কোনো মেয়ে আমাকে পছন্দ করেনি তাই।’
‘আপনার কাউকে ভালো লাগেনি?’
ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর যখন কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ফরিদ বলল, ‘এটা নিশ্চয়ই বাদশা। আমি ধরছি।’
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে চিৎকার দিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে কথা বলল একজন মেয়ে—স্লামালিকুম।
ফরিদ বলল, ‘জি, ওয়ালাইকুম সালাম।’
‘আমি সোমার বোন বলছি।’ বলেই সে কান্না শুরু করল।
ফরিদ চুপ করে রইল। রুমা বলল, ‘বুঝতেই তো পারছেন আমাদের মনের অবস্থা। মেয়েটা একা এই প্রথম আমেরিকা গেছে। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত। প্লীজ আপনি ওকে একটু হেল্প করেন।’
‘আচ্ছা শুনুন, আপনাকে একটা কথা বলি। আমার নাম ফরিদ আহমেদ। আমি এই শিকাগো শহরে অনেক বছর ধরে আছি। আপনার ছোট বোন সোমা—সে এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে এবং সে খুব ভালো আছে। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আর আমার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ থাকে—আপনি যদি চান, আমার নাম, ঠিকানা, ড্রাইভার্স লাইসেন্স, সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার—সবকিছু আপনাকে দিতে পারি।’
‘না না তার কোনো কিছুরই দরকার হবে না। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত—আপনি শুধু ওকে একটু দেখে রেখেন।’
‘অবশ্যই দেখে রাখব। আপনি এত উতলা হবেন না। এমনিতেই সোমা খাচ্ছে না—সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে। এর মধ্যে আপনি এভাবে কাঁদলে ওতো ভেঙে পড়বে।’
কাঁদতে কাঁদতেই রুমা বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা কাঁদব না।’
‘ইটস আ ম্যাটার অফ টাইম। আমি কথা দিচ্ছি যে করেই হোক কাল সকালের মধ্যে শহীদুল ইসলামকে খুঁজে বের করব আমরা। আপনি কোন টেনশন করবেন না।’ এবার ফরিদ কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল, ‘আপনি এক কাজ করুন—সোমার সঙ্গে একটু কথা বলুন। ওকে একটু বোঝান—সান্ত্বনা দিন। মেয়েটা সারাক্ষণ কাঁদছে। আর শুনুন, আপনি আবার কাঁদবেন না যেন, তাহলে ও আরো নার্ভাস হয়ে যাবে। আমি সোমাকে দিচ্ছি… নিন কথা বলুন।’ বলেই সে ফোনটা দিল সোমাকে।
সোমা ফোন হাতে নিয়েই কেঁদে ফেলল। ‘হ্যালো আপা, তোরা আমাকে কোথায় পাঠালি?’ এই একটি কথা বলেই তার কান্নার বেগ বেড়ে গেল—অঝোরে কাঁদতে থাকল। আর কোনো কথাই বলতে পারল না।
রুমা বলল, ‘সোমা, তুই কিছু চিন্তা করিস না। ফরিদ ভাই বলেছেন, সে যে করেই হোক শহীদকে খুঁজে বের করে দিবে… তুই কাঁদিস না বোন। একটু ধৈর্য্য ধর—সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এরপর চলল দু’বোনের কিছুক্ষণ নীরব কান্না—তারপর এক সময় ফোন রেখে দিল সোমা।
ফরিদ হাত ঘড়ি দেখে বলল, ‘এখন রাত বাজে প্রায় দশটা। শীতের দিনে এটা অনেক রাত। দেখো, তুমি প্লেন থেকে নামার পর এখন পর্যন্ত কিছুই খাওনি। প্লেনে কি খেয়েছো আমি জানি না। তোমাকে লাঞ্চ করাতে নিয়ে গেলাম, তুমি কিছুই খেলে না। তোমার জন্যে রান্না করেছি—একসঙ্গে খাবো বলে আমিও বসে রয়েছি।’
‘আমার খিদে নেই—খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি খেয়ে নিন।’
‘না খেলে তো তোমার ব্রেইন কাজ করবে না—মাইগ্রেন অ্যাটাক করবে। যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারবে না। তাছাড়া না খেয়ে থাকলে তোমার সমস্যার কোনো সমাধান তো হবে না।’
‘আমি খাবো না।’ বলে উঠে চলে গেল সোমা।
ফরিদ তাকিয়ে রইল চিন্তিত মুখে।
রাতে এক ফোঁটা ঘুম হলো না সোমার। সমস্ত দিনের উত্তেজনা আর ক্লান্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে আগামী দিনের দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা।
প্রচণ্ড শীত পড়েছে। ঘরের মধ্যে হিটিং সিস্টেম চালু আছে। থার্মোস্ট্যাট অটো সেট-আপ করা থাকে। তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মানের নিচে নেমে গেলে একা একাই হিটিং সিস্টেম চালু হয়ে যায়। তখন এক ধরনের আওয়াজ বের হয়। শুরুতে একটু ভয় লাগলেও এখন আর কোনো রকম ভয় লাগছে না সোমার।
রাতের তুষারপাতে সারা শহর ঢেকে গেছে। এখনো ঝরছে ঝিরঝিরি। সোমা জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে। হালকা মেঘের মত ভেসে আসা তুষারগুলো আছড়ে পরছে জানালার কাঁচের গায়ে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যায়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেশাগ্রস্তের মতো হলো সোমার। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে।
ক্ষণে ক্ষণে শহীদের কথা মনে হচ্ছে। কেন শহীদ তাকে আনতে গেল না? মানুষটা ভালো আছে তো? কোনো বিপদ হয়নি তো? মানুষের বিপদের কথা কিছু কি বলা যায়? সোমার মাথা ভার হয়ে এলো। সে আর কিছু ভাবতে পারছে না। চোখ খুলেও থাকতে পারছে না—এক সময় তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
একটি সুন্দর সকালের শুরু। আকাশে নীলের ছড়াছড়ি। ঝকঝকে রোদ দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করেই টেম্পারেচার বেড়ে গিয়ে চারিদিকের বরফ গলা শুরু হয়েছে। গ্লুমি ভাবটা কেটে গেছে—সবার মধ্যেই এক ধরনের প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
ঝলমলে রৌদ্রস্নাত এই সকালে একটা সাদা রঙের জীপ চেরকি ফরিদের টাউন-হোম সংলগ্ন পার্কিং-এ এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে এলো ঝাঁকড়া চুলের এক যুবক। বয়স ত্রিশের কোঠায়। কমও হতে পারে। কলিং বেলে কয়েকবার চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ফরিদ নিচে নেমে দরজা খুলে দেখল একজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। ‘আপনি?’ ফরিদ জিজ্ঞেস করল।
অপরিচিত লোকটি সালাম দিয়ে বলল, ‘জি আমার নাম শহীদ। শহীদুল ইসলাম।’
‘আরে মিয়া কোথায় ছিলেন আপনি!’ ফরিদ প্রায় চিৎকার দিয়ে বলল, আপনার সমস্যা কি? বাসার ঠিকানা কোথায় পেলেন?’
‘ইকবাল ভাই, বাদশা—ওদের কাছ থেকে।’
‘ও আচ্ছা আচ্ছা। ওদের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল না?’
‘জি ভাই। আমি যখন বাসায় ফিরে আসি—উনারা আমার বাসার সামনে গাড়িতে বসা ছিল। তাদের কাছ থেকেই সবকিছু জেনেছি। শুনলাম, সোমা আপনার এখানে…’
‘তো আপনি ছিলেন কোথায়?’
‘একটা সমস্যা হয়েছিল। সোমা কি এখানে আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’ শহীদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো মত একবার দেখে নিয়ে খানিকটা রুক্ষ স্বরে বলল, ‘আসুন।’ বলেই সে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকল। শহীদ উঠে এলো তার পিছে পিছে।
ফরিদকে মনে হলো যেন হঠাৎ করেই কিছুটা ক্ষেপে গেল। কারণটা ঠিক বোঝা গেল না।
লিভিং রুমে এসে শহীদকে সোফা দেখিয়ে বলল, ‘এসো। বসো।’
শহীদ বসল না—দাঁড়িয়ে রইল কাঁচুমাচু হয়ে।
ফরিদ বলল, ‘তোমার ঘটনাটা কি আমাকে বলো তো। দেশ থেকে তোমার স্ত্রী এসেছে—তাকে তোমার রিসিভ করতে যাওয়ার কথা। আর তুমি উধাও?’
শহীদ বলল, ‘না আসলে আমার সত্যিকারের একটা সমস্যা হয়েছিল। এটা না বললে বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা—আপনি যা করলেন…’
‘আরে ভাই আমার কথা বাদ দাও। আমি তো শিকাগোতেই থাকি আর আমি তো কোনো বিপদে পড়িনি। একটা মেয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছে—সে এখানকার কাউকে চিনেনা, কিচ্ছু জানে না। শুধু তোমার নামটা জানে, তোমাদের দেখা পর্যন্ত হয়নি, বিয়ে করেছো টেলিফোনে—তুমি এটা কি করেছ বলো তো?’
‘ফরিদ ভাই, সত্যি আমি এমন একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম যে সেটা বলে বোঝাতে পারব না।’
‘কি এমন বিপদে পড়েছিলে… তোমার বাসার সামনে কাগজে লিখে এসেছি, ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি। এয়ারপোর্টেও ফোন নাম্বার রেখে এসেছিলাম।’
‘জি দেখেছি–তাই তো সরাসরি চলে এলাম।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে বসো।’
তারা দুজনেই বসল। শহীদ একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘সোমা কোথায়?’
‘সোমা আছে উপরে। সারারাত নিশ্চয়ই ঘুমায়নি—সকালে ঘুমিয়েছে কিনা বলতে পারছি না। আচ্ছা আমি ডাকছি।’
ফরিদ কয়েক পা এগিয়ে সিঁড়ির কাছে যেয়ে উপরে তাকিয়ে ডাকল, ‘সোমা? এই সোমা, একটু নীচে এসো তো ভাই।’
ফরিদ ফিরে এসে আবার বসল শহীদের পাশে। এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘কি যে টেনশনে ফেলেছিলে আমাদেরকে—উফ।’
‘আসলেই অনেক ঝামেলা গেছে আপনাদের উপর দিয়ে।’
‘তারপরে এখানে তোমার কোনো বন্ধু নেই, তোমার কোন রুমমেট নেই, এত বড় একটা কমিউনিটি কিন্তু কোনো বাঙালী লোক তোমাকে চেনে না—তুমি কারো সঙ্গে মিশো না নাকি?’
শহীদ চুপ করে রইল।
‘আমেরিকায় থাকো অথচ একটা ইমারজেন্সি কন্টাক্টও তোমার নেই—এটা কোনো কথা?’
ফরিদের কথা শেষ হবার আগেই শহীদ লক্ষ্য করল সোমা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। সোমাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। ফরিদও দাঁড়িয়ে পড়ল।
সোমা শহীদের দিকে তাকালো কিন্তু তার মধ্যে কোনো ধরনের এক্সাইটমেন্ট দেখা গেল না। কোনো রকম উত্তেজনা নেই—ভাবাবেগ নেই। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে।
শহীদ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সোমার দিকে তারপর কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বলল, ‘চলো।’
‘কোথায়?’ শীতল কণ্ঠে সোমা জানতে চাইল।
‘কোথায় মানে? বাসায় চলো।’
‘কেন?’
সোমার এমন প্রশ্নে ভড়কে গেল শহীদ। সে একবার পাশে দাঁড়ানো ফরিদের মুখের দিকে তাকাল আবার তাকাল সোমার মুখের দিকে। তারপর বোকার মত হেসে দিয়ে বলল, ‘বাসায় যাবে না?’
একই রকম শীতল কণ্ঠে সোমা প্রশ্ন করল, ‘তুমি আমাকে এয়ারপোর্টে নিতে আসোনি কেন?’
শহীদ আবার তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ কি বলবে ভেবেও বলল না।
শহীদ বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল, ‘একটা ঝামেলা হয়েছিল সোমা। একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম—সমস্যা হয়েছিল যা তোমাকে…।’
‘কি সমস্যা?’ কথা শেষ করতে না দিয়েই সোমা জানতে চাইল।
‘আগে বাসায় চলো, সবই বলব তোমাকে।’
‘আমি তো তোমার সঙ্গে যাবো না।’ সোমার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই বদলে গেল যেন। কঠিন স্বরে বলল সে, ‘তোমার মত একজন ইরেস্পন্সিবল মানুষের সঙ্গে তো আমি কোত্থাও যাব না।’

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৮)

‘হ্যালো, এটা ফরিদ ভাইর বাসা না?’
ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। কিন্তু কণ্ঠটি সোমার পরিচিত নয়। সে বলল, ‘জি।’
‘আপনি কে?’
‘আমি সোমা।’
‘সোমা… ও বুচ্ছি বুচ্ছি বুচ্ছি। ভালো আছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ ভালো।’
‘ফরিদ ভাই বাসায় নাই?’
‘জি জি আছেন। আপনি একটু ধরুন।’ সোমা ফরিদকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ইকবাল বলল, ‘সবগুলি হসপিটালের ইমারজেন্সিতে খোঁজ নিসি বস, শহীদুল ইসলাম নামে কোনো পেসেন্টের ইনফরমেশন নাই। আর কই যামু বস?’
‘দেখো ইকবাল, তুমি কোথায় যাবা তোমার ব্যাপার। আমি চাই, তুমি রাতের মধ্যেই শহীদের খোঁজ বের করবা—কোথায় যাবা, কার কাছে যাবা আমি কিছু জানিনা। আল্লাহর ওয়াস্তে যেভাবেই হোক তুমি ছেলেটার একটা ট্রেস বের করবা।’
‘আচ্ছা বস—আপনি টেনশন নিয়েন না। আমি দেখতেছি।’
ফরিদ ফোন কেটে দিয়ে বলল, ‘ধুর।’
সোমা মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি কেমন মলিন হয়ে গেছে। ফরিদ সোমার কাছে গিয়ে বসল। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘সোমা, সব মানুষের জীবনেই একটা গল্প থাকে—আমারো আছে। শুনবে?’
সোমা বলল, ‘শোনান।’
‘তখন তোমাকে আমি মিথ্যে বলেছি।’
সোমা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল ফরিদের দিকে?
‘আমার একটা বিয়ে হয়েছিল—দেশে। তখন আমি বেকার। সদ্য পাশ করে বেরিয়েছি। মেয়েটিকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। আমার পরিচিত ছিল। মেয়েটি সুশ্রী এবং শিক্ষিত। খুব ভালোবাসতাম—খুব। কিন্তু আমাদের বেশিদিন একসাথে থাকা হয়নি।’
‘কেন?’
‘ভাগ্য বদলানোর জন্যে আমি আমেরিকায় চলে আসি—একা।’
সোমা তাকিয়ে আছে ফরিদের মুখের দিকে।
একটু গুছিয়ে নিয়ে ফরিদ বলল, ‘এদেশে আসার অনেকদিন পর—যেহেতু আমার কাগজপত্র তৈরী হচ্ছিল না, আমিও দেশে যেতে পারছিলাম না—তার সঙ্গে দেখাও হচ্ছিল না। তার ভিসাও হচ্ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল টেলিফোন। আমরা টেলিফোনে অনেক কথা বলতাম। তখন তো এমন ফোন কার্ড ছিল না। যা টাকা বানাতাম তার সবটাই খরচ হয়ে যেত ফোনের বিল দিতেই।’ এটুকু বলে ফরিদ থামল।
সোমা জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’
‘তারপর? তারপর যখন আর কোনো উপায়ই বের করতে পারলাম না তখন একটা শেষ চেষ্টা করলাম। ঢাকায় আমার খুব কাছের এক বন্ধু ছিল। খুবই পাওয়ারফুল। বড় লোকের ছেলে—অনেক টাকা পয়সা। তাকে বললাম—দোস্ত, আমার বৌটাকে তোর বৌ সাজিয়ে এদেশে নিয়ে আয় এবং আমার বৌ আমার কাছে দিয়ে যা।’
‘কি বলেন? তাও কি সম্ভব নাকি?’
‘কি করব—আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওকে ছাড়া সারাটা জীবন কাঁটিয়ে দিব নাকি—সেটা কি সম্ভব?’
‘তারপর?’
‘অনেক অনুরোধের পরে আমার বন্ধু রাজি হলো। সত্যি সত্যি ওরা স্বামী-স্ত্রী সেজে ভিসার জন্যে দাঁড়াল এবং ভিসা পেয়েও গেল।’
‘ওয়াও। তারপর?’
‘তারপর ওরা দু’জন একসময় এক সঙ্গে এদেশে চলেও এলো। কিন্তু—’
‘কিন্তু?’
‘আমার বৌ আর আমার কাছে ফিরে এলো না। সে আমার বন্ধুর সঙ্গে চলে গেল অন্য একটা স্টেটে এবং সেখানেই সেটেলড হলো। শুনেছি তারা খুবই ভালো আছে।’
‘কি বলেন?’
‘সত্যি বলছি। সুতরাং, অতীতের দিকে তাকিয়ে তুমি যদি সামনের দিকে চলতে চাও—তাহলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে। সামনে তাকাও—সামনে। জীবনটা অনেক সুন্দর হবে।’
সোমা অবাক হয়ে ভাবছে তার সামনে বসে থাকা মানুষটার কথা। মানুষের জীবনে আসলেই কত ঘটনা ঘটে। একজনকে কাছে থেকে না দেখলে, তার সম্পর্কে না জানলে—কিছু জানা হয় না। দূর থেকে বোঝাও যায় না। ইশ, মানুষের জীবনটা এমন কেন?
সোমা বলল, ‘আপনি আবার বিয়ে করেন নি কেন?’
‘ঐ যে বললাম, কোনো মেয়ে আমাকে পছন্দ করেনি তাই।’
‘আপনার কাউকে ভালো লাগেনি?’
ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর যখন কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ফরিদ বলল, ‘এটা নিশ্চয়ই বাদশা। আমি ধরছি।’
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে চিৎকার দিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে কথা বলল একজন মেয়ে—স্লামালিকুম।
ফরিদ বলল, ‘জি, ওয়ালাইকুম সালাম।’
‘আমি সোমার বোন বলছি।’ বলেই সে কান্না শুরু করল।
ফরিদ চুপ করে রইল। রুমা বলল, ‘বুঝতেই তো পারছেন আমাদের মনের অবস্থা। মেয়েটা একা এই প্রথম আমেরিকা গেছে। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত। প্লীজ আপনি ওকে একটু হেল্প করেন।’
‘আচ্ছা শুনুন, আপনাকে একটা কথা বলি। আমার নাম ফরিদ আহমেদ। আমি এই শিকাগো শহরে অনেক বছর ধরে আছি। আপনার ছোট বোন সোমা—সে এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে এবং সে খুব ভালো আছে। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আর আমার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ থাকে—আপনি যদি চান, আমার নাম, ঠিকানা, ড্রাইভার্স লাইসেন্স, সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার—সবকিছু আপনাকে দিতে পারি।’
‘না না তার কোনো কিছুরই দরকার হবে না। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত—আপনি শুধু ওকে একটু দেখে রেখেন।’
‘অবশ্যই দেখে রাখব। আপনি এত উতলা হবেন না। এমনিতেই সোমা খাচ্ছে না—সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে। এর মধ্যে আপনি এভাবে কাঁদলে ওতো ভেঙে পড়বে।’
কাঁদতে কাঁদতেই রুমা বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা কাঁদব না।’
‘ইটস আ ম্যাটার অফ টাইম। আমি কথা দিচ্ছি যে করেই হোক কাল সকালের মধ্যে শহীদুল ইসলামকে খুঁজে বের করব আমরা। আপনি কোন টেনশন করবেন না।’ এবার ফরিদ কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল, ‘আপনি এক কাজ করুন—সোমার সঙ্গে একটু কথা বলুন। ওকে একটু বোঝান—সান্ত্বনা দিন। মেয়েটা সারাক্ষণ কাঁদছে। আর শুনুন, আপনি আবার কাঁদবেন না যেন, তাহলে ও আরো নার্ভাস হয়ে যাবে। আমি সোমাকে দিচ্ছি… নিন কথা বলুন।’ বলেই সে ফোনটা দিল সোমাকে।
সোমা ফোন হাতে নিয়েই কেঁদে ফেলল। ‘হ্যালো আপা, তোরা আমাকে কোথায় পাঠালি?’ এই একটি কথা বলেই তার কান্নার বেগ বেড়ে গেল—অঝোরে কাঁদতে থাকল। আর কোনো কথাই বলতে পারল না।
রুমা বলল, ‘সোমা, তুই কিছু চিন্তা করিস না। ফরিদ ভাই বলেছেন, সে যে করেই হোক শহীদকে খুঁজে বের করে দিবে… তুই কাঁদিস না বোন। একটু ধৈর্য্য ধর—সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এরপর চলল দু’বোনের কিছুক্ষণ নীরব কান্না—তারপর এক সময় ফোন রেখে দিল সোমা।
ফরিদ হাত ঘড়ি দেখে বলল, ‘এখন রাত বাজে প্রায় দশটা। শীতের দিনে এটা অনেক রাত। দেখো, তুমি প্লেন থেকে নামার পর এখন পর্যন্ত কিছুই খাওনি। প্লেনে কি খেয়েছো আমি জানি না। তোমাকে লাঞ্চ করাতে নিয়ে গেলাম, তুমি কিছুই খেলে না। তোমার জন্যে রান্না করেছি—একসঙ্গে খাবো বলে আমিও বসে রয়েছি।’
‘আমার খিদে নেই—খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি খেয়ে নিন।’
‘না খেলে তো তোমার ব্রেইন কাজ করবে না—মাইগ্রেন অ্যাটাক করবে। যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারবে না। তাছাড়া না খেয়ে থাকলে তোমার সমস্যার কোনো সমাধান তো হবে না।’
‘আমি খাবো না।’ বলে উঠে চলে গেল সোমা।
ফরিদ তাকিয়ে রইল চিন্তিত মুখে।
রাতে এক ফোঁটা ঘুম হলো না সোমার। সমস্ত দিনের উত্তেজনা আর ক্লান্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে আগামী দিনের দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা।
প্রচণ্ড শীত পড়েছে। ঘরের মধ্যে হিটিং সিস্টেম চালু আছে। থার্মোস্ট্যাট অটো সেট-আপ করা থাকে। তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মানের নিচে নেমে গেলে একা একাই হিটিং সিস্টেম চালু হয়ে যায়। তখন এক ধরনের আওয়াজ বের হয়। শুরুতে একটু ভয় লাগলেও এখন আর কোনো রকম ভয় লাগছে না সোমার।
রাতের তুষারপাতে সারা শহর ঢেকে গেছে। এখনো ঝরছে ঝিরঝিরি। সোমা জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে। হালকা মেঘের মত ভেসে আসা তুষারগুলো আছড়ে পরছে জানালার কাঁচের গায়ে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যায়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেশাগ্রস্তের মতো হলো সোমার। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে।
ক্ষণে ক্ষণে শহীদের কথা মনে হচ্ছে। কেন শহীদ তাকে আনতে গেল না? মানুষটা ভালো আছে তো? কোনো বিপদ হয়নি তো? মানুষের বিপদের কথা কিছু কি বলা যায়? সোমার মাথা ভার হয়ে এলো। সে আর কিছু ভাবতে পারছে না। চোখ খুলেও থাকতে পারছে না—এক সময় তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
একটি সুন্দর সকালের শুরু। আকাশে নীলের ছড়াছড়ি। ঝকঝকে রোদ দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করেই টেম্পারেচার বেড়ে গিয়ে চারিদিকের বরফ গলা শুরু হয়েছে। গ্লুমি ভাবটা কেটে গেছে—সবার মধ্যেই এক ধরনের প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
ঝলমলে রৌদ্রস্নাত এই সকালে একটা সাদা রঙের জীপ চেরকি ফরিদের টাউন-হোম সংলগ্ন পার্কিং-এ এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে এলো ঝাঁকড়া চুলের এক যুবক। বয়স ত্রিশের কোঠায়। কমও হতে পারে। কলিং বেলে কয়েকবার চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ফরিদ নিচে নেমে দরজা খুলে দেখল একজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। ‘আপনি?’ ফরিদ জিজ্ঞেস করল।
অপরিচিত লোকটি সালাম দিয়ে বলল, ‘জি আমার নাম শহীদ। শহীদুল ইসলাম।’
‘আরে মিয়া কোথায় ছিলেন আপনি!’ ফরিদ প্রায় চিৎকার দিয়ে বলল, আপনার সমস্যা কি? বাসার ঠিকানা কোথায় পেলেন?’
‘ইকবাল ভাই, বাদশা—ওদের কাছ থেকে।’
‘ও আচ্ছা আচ্ছা। ওদের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল না?’
‘জি ভাই। আমি যখন বাসায় ফিরে আসি—উনারা আমার বাসার সামনে গাড়িতে বসা ছিল। তাদের কাছ থেকেই সবকিছু জেনেছি। শুনলাম, সোমা আপনার এখানে…’
‘তো আপনি ছিলেন কোথায়?’
‘একটা সমস্যা হয়েছিল। সোমা কি এখানে আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’ শহীদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো মত একবার দেখে নিয়ে খানিকটা রুক্ষ স্বরে বলল, ‘আসুন।’ বলেই সে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকল। শহীদ উঠে এলো তার পিছে পিছে।
ফরিদকে মনে হলো যেন হঠাৎ করেই কিছুটা ক্ষেপে গেল। কারণটা ঠিক বোঝা গেল না।
লিভিং রুমে এসে শহীদকে সোফা দেখিয়ে বলল, ‘এসো। বসো।’
শহীদ বসল না—দাঁড়িয়ে রইল কাঁচুমাচু হয়ে।
ফরিদ বলল, ‘তোমার ঘটনাটা কি আমাকে বলো তো। দেশ থেকে তোমার স্ত্রী এসেছে—তাকে তোমার রিসিভ করতে যাওয়ার কথা। আর তুমি উধাও?’
শহীদ বলল, ‘না আসলে আমার সত্যিকারের একটা সমস্যা হয়েছিল। এটা না বললে বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা—আপনি যা করলেন…’
‘আরে ভাই আমার কথা বাদ দাও। আমি তো শিকাগোতেই থাকি আর আমি তো কোনো বিপদে পড়িনি। একটা মেয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছে—সে এখানকার কাউকে চিনেনা, কিচ্ছু জানে না। শুধু তোমার নামটা জানে, তোমাদের দেখা পর্যন্ত হয়নি, বিয়ে করেছো টেলিফোনে—তুমি এটা কি করেছ বলো তো?’
‘ফরিদ ভাই, সত্যি আমি এমন একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম যে সেটা বলে বোঝাতে পারব না।’
‘কি এমন বিপদে পড়েছিলে… তোমার বাসার সামনে কাগজে লিখে এসেছি, ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি। এয়ারপোর্টেও ফোন নাম্বার রেখে এসেছিলাম।’
‘জি দেখেছি–তাই তো সরাসরি চলে এলাম।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে বসো।’
তারা দুজনেই বসল। শহীদ একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘সোমা কোথায়?’
‘সোমা আছে উপরে। সারারাত নিশ্চয়ই ঘুমায়নি—সকালে ঘুমিয়েছে কিনা বলতে পারছি না। আচ্ছা আমি ডাকছি।’
ফরিদ কয়েক পা এগিয়ে সিঁড়ির কাছে যেয়ে উপরে তাকিয়ে ডাকল, ‘সোমা? এই সোমা, একটু নীচে এসো তো ভাই।’
ফরিদ ফিরে এসে আবার বসল শহীদের পাশে। এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘কি যে টেনশনে ফেলেছিলে আমাদেরকে—উফ।’
‘আসলেই অনেক ঝামেলা গেছে আপনাদের উপর দিয়ে।’
‘তারপরে এখানে তোমার কোনো বন্ধু নেই, তোমার কোন রুমমেট নেই, এত বড় একটা কমিউনিটি কিন্তু কোনো বাঙালী লোক তোমাকে চেনে না—তুমি কারো সঙ্গে মিশো না নাকি?’
শহীদ চুপ করে রইল।
‘আমেরিকায় থাকো অথচ একটা ইমারজেন্সি কন্টাক্টও তোমার নেই—এটা কোনো কথা?’
ফরিদের কথা শেষ হবার আগেই শহীদ লক্ষ্য করল সোমা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। সোমাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। ফরিদও দাঁড়িয়ে পড়ল।
সোমা শহীদের দিকে তাকালো কিন্তু তার মধ্যে কোনো ধরনের এক্সাইটমেন্ট দেখা গেল না। কোনো রকম উত্তেজনা নেই—ভাবাবেগ নেই। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে।
শহীদ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সোমার দিকে তারপর কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বলল, ‘চলো।’
‘কোথায়?’ শীতল কণ্ঠে সোমা জানতে চাইল।
‘কোথায় মানে? বাসায় চলো।’
‘কেন?’
সোমার এমন প্রশ্নে ভড়কে গেল শহীদ। সে একবার পাশে দাঁড়ানো ফরিদের মুখের দিকে তাকাল আবার তাকাল সোমার মুখের দিকে। তারপর বোকার মত হেসে দিয়ে বলল, ‘বাসায় যাবে না?’
একই রকম শীতল কণ্ঠে সোমা প্রশ্ন করল, ‘তুমি আমাকে এয়ারপোর্টে নিতে আসোনি কেন?’
শহীদ আবার তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ কি বলবে ভেবেও বলল না।
শহীদ বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল, ‘একটা ঝামেলা হয়েছিল সোমা। একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম—সমস্যা হয়েছিল যা তোমাকে…।’
‘কি সমস্যা?’ কথা শেষ করতে না দিয়েই সোমা জানতে চাইল।
‘আগে বাসায় চলো, সবই বলব তোমাকে।’
‘আমি তো তোমার সঙ্গে যাবো না।’ সোমার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই বদলে গেল যেন। কঠিন স্বরে বলল সে, ‘তোমার মত একজন ইরেস্পন্সিবল মানুষের সঙ্গে তো আমি কোত্থাও যাব না।’

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৭)

সোমা নেমে এসে দেখল চিন্তিত মুখে টেবিলের এক কোনায় বসে আছে ফরিদ। সোমা বলল, ‘আমি আপনাকে অনেক ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিয়েছি তাই না?’
‘না না ঝামেলা হতে যাবে কেন? এসব কি বলছ তুমি? আমি তো তোমাকে নিয়ে ভাবছি না—ভাবছি শহীদকে নিয়ে। ছেলেটার কোনো বিপদ হলো কিনা?’
সোমা চুপ করে রইল।
ফরিদ প্রসঙ্গ বদলে দেবার জন্যে বলল, ‘শেষ পর্যন্ত মাংসটা কিন্তু দারুণ হয়েছে। কি সুন্দর গন্ধ বেরিয়েছে দেখেছ? চলো এবার খেয়ে নেয়া যাক। খেয়ে-দেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করি আমাদের পরবর্তী করণীয় কী?’
সোমা কিছু না বলে চুপ করে রইল। তার মনের মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, শেল্টার হোম কি? তখন বলছিলেন…’
ফরিদ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকল। একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘এক ধরনের আশ্রম। সাধারণত যখন কোনো মেয়ে অন্যের দ্বারা হয়—শারীরিক এবং মানসিক দু’ভাবেই হতে পারে কিংবা প্রাণনাশের হুমকি থাকে—এমন পরিস্থিতিতে সেই মেয়েটির যদি আত্মীয়-পরিজনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য-সহযোগিতা না মেলে, তাহলে সে শেল্টার হোমের আশ্রয়ে থাকতে পারে।’
সোমা চুপ করে শুনল। ফরিদ আরো একটু ব্যাখ্যা করল, ‘মূলত, যাদের মাথার ওপরে ছাদ নেই, তাদের জন্য বড় বড় শহরে সাবসিডাইজড্ গভর্নমেন্ট হাউজিং আছে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সরকারি ও বেসরকারি শেল্টার হোম যেখানে গৃহহীনদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা থাকে বারোমাস। বিশেষ করে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কারণে যে সব মেয়েরা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়—তাদের ইমিডিয়েটলি একটা থাকার ব্যবস্থা হয় এখানে।’
‘আমাকে কোনো শেল্টার হোমে রেখে আসা যায় না?’
সোমার এমন আচমকা প্রশ্নে ফরিদ হকচকিয়ে গেল। তার কেন যেন একবার মনে হচ্ছিল সোমা এমন কিছুই হয়ত ভাবছে। সে তাৎক্ষণিক উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ তা তো যায়ই। কিন্তু তাতে তো এই ক্রাইসিসের কোনো সমাধান হচ্ছে না। এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান ক্রাইসিস হচ্ছে শহীদকে খুঁজে বের করা।’
‘কিন্তু তাকে তো পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘আজকে পাওয়া যায়নি তো কি হয়েছে। কালকে নিশ্চয়ই যাবে। সে হয়ত কোথাও আটকা পড়ে আছে—আমরা জানি না। হয়ত দেখা যাবে কাল সকালে ঠিকই হাজির হয়েছে।’
‘আর যদি না হয়?’
‘সেক্ষেত্রে প্রথমেই যে কাজটা আমরা করব সেটি হচ্ছে—লোকাল পুলিশ স্টেশনে গিয়ে একটা রিপোর্ট করব। তারপর সেই রিপোর্ট নিয়ে চলে যাবো ইয়েলো ক্যাবের অফিসে—ওদের কাছে নিশ্চয়ই তথ্য থাকবে। সে সর্বশেষ কখন প্যাসেঞ্জার তুলেছে সেটা জানলেই অর্ধেক কাজ হয়ে যাবে।’
‘এখন যাওয়া যায় না?’
ফরিদ হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলল, ‘এখন তো অফিস বন্ধ।’
সোমা আর কিছু বলল না। সে এখনো দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। ফরিদ বলল, ‘এবার কি আমরা খেতে পারি?’
সোমা টেবিলে এসে বসল। ফরিদ আনন্দচিত্তে খাবারগুলো টেবিলে এনে রাখল। ভেবেছিল সোমাই হয়ত সাহায্য করবে কিন্তু তার মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা গেল না—সে বসে রইল চুপচাপ। ওর মনের অবস্থা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
ফরিদের সামনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কোনো ভাবে রাতটা পার করা। এবং যে করেই হোক সোমার মনটাকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখা। কাজটা কঠিন তবুও চেষ্টা করতে হবে। রাতে একা এই বাসায় সে থাকতে চাইবে কি না সেটাও একটা সংশয়। এই আবহাওয়ায় ওকে পাঠাবেই বা কোথায়? যতক্ষণ পর্যন্ত সোমা ঘুমাতে না চায়—ততক্ষণ বিভিন্ন প্রসঙ্গে ওর সঙ্গে কথা বলে যেতে হবে।
‘এত বড় বাড়িতে আপনি একা থাকেন?’ ফরিদের চিন্তায় ছেদ পড়ল সোমার প্রশ্নে।
ফরিদ একটু হেসে দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
‘একা থাকি!’
‘আপনি বিয়ে করেন নি?’
ফরিদ আবারো হাসল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘না।’
‘কেন?’
‘কোনো মেয়ে আমাকে পছন্দ করেনি তাই।’
‘কেন?’
‘তা তো বলতে পারবো না। কি জানি, হয়ত আমি দেখতে অতটা সুশ্রী নই।’
কথাটা শুনে সোমার একজনের কথা মনে পড়ল। সেও দেখতে অতটা সুশ্রী নয় কিন্তু কী তার ব্যক্তিত্ব! আর ঠিক তখনই সোমার মনে পড়ল—মানুষটা দেখতে কার মত। তার সেই পছন্দের মানুষটার সাথে প্রচণ্ড মিল। একেবারে ট্রু কপি! তার মত কথা বলা, মিষ্টি করে হাসা, অধিকার নিয়ে ধমক দেয়া—কেয়ার করা সব-সব তার মত। সোমার মনটা হঠাৎ করেই বেশ ভালো হয়ে গেল। তার বেশ মজা লাগছে—কেন লাগছে তা অবশ্য সে নিজেও ঠিক জানে না।
সোমা হেসে দিয়ে বলল, ‘কি বলেন? আপনি দেখতে অনেক সুন্দর।’
ফরিদ মৃদু হেসে বলল, ‘আমার মায়ের পরে তুমিই প্রথম বললে আমি দেখতে সুন্দর।’
সোমা আবার বলল, ‘আপনি অনেক সুন্দর করে কথা বলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা—আপনি অনেক কেয়ারিং।’ তারপর হঠাৎ করেই অনেকটা মুখ-ফসকে বলে ফেলল সোমা, ‘আমার একজন প্রিয় মানুষের সাথে আপনার অনেক মিল।’
‘তাই? কে সে?’
‘অন্য সময় বলব।’
ফরিদকে বেশ খুশি মনে হলো। এটা নয় যে সোমা তাকে সুন্দর বলেছে সে জন্যে। অন্তত মেয়েটার চিন্তাটাকে ডাইভার্ট করা গেছে ফরিদ এতেই সন্তুষ্ট। সোমা নিজে থেকেই কথা বলছে এটাও একটা ভালো লক্ষণ।
সোমা চারিদিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাড়িটা তো অনেক বড়। সুন্দর করে সাজিয়েছেন। একা থাকতে আপনার খারাপ লাগে না?’
ফরিদ প্রথমে কিছু বলল না। সোমা তাকিয়ে আছে দেখে সে বলল, ‘একেবারেই যে লাগে না তা নয়—মাঝে মাঝে তো একটু ডিপ্রেস লাগেই। একা থাকতে কারই বা ভালো লাগে বলো? নিঃসঙ্গ মানুষের অনেক ধরনের কষ্ট থাকে। তবে কাজের ব্যস্ততা থাকে—সময় কেটে যায়।’
সোমা এবার একটু ইতস্তত করে বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
‘করো।’
‘জানি প্রশ্নটা করতে নেই, তবুও জানতে ইচ্ছে করছে।’
‘বলো কি জানতে চাও?’
‘আপনি কী করেন?’
‘ও এই কথা?’ ফরিদ হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি ব্যবসা করি। রিয়েল-এস্টেটের ব্যবসা। বাড়ি কিনি, বাড়ি বিক্রি করি। আবার নতুন যারা বাড়ি কিনতে চায়—তাদেরকে বাড়ি খুঁজে দেই। এখানে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট বলে। বাংলায় যাকে বলে দালাল—হা হা হা।’
‘আপনি কত বছর এখানে?’
‘অনেকদিন। প্রায় ২০ বছর।’
‘এখানে পড়াশুনা করেছেন?’
‘না, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিলসফিতে মাস্টার্স করেছি।’
সোমা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল ফরিদের দিকে।
ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা ফিলসফির কথা যখন উঠলই তখন তোমাকে একটা গল্প বলি।’ ফরিদের ইচ্ছে হলো, যতক্ষণ সম্ভব কথা বার্তা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এতক্ষণে সোমার স্বভাব সম্পর্কে ফরিদের মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গেছে। মেয়েটি আবার যে কোনো সময় কান্নাকাটি শুরু করে দিতে পারে। সেই সুযোগ তাকে দেয়াটা ঠিক হবে না। মেয়েটি কতক্ষণ আগ্রহ নিয়ে তার কথা শোনে সেটাই চিন্তার বিষয়।
‘বলেন? কী চিন্তা করছেন?’
সোমার কথায় ফরিদের চিন্তাচ্ছেদ হলো। সে গল্প বলা শুরু করল, ‘সক্রেটিসের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। সক্রেটিস কে তার এক শিষ্য এসে বলল, গুরুজি আমি বিয়ে করতে চাই। শুনে সক্রেটিস বলল, ভালো—বিয়ে করো। মেয়ে যদি ভালো হয় তবে তুমি সুখী হবে আর যদি ভালো না হয় তবে তুমি দার্শনিক হয়ে যাবে। আমার মত হা হা হা।’
সোমাও হেসে ফেলল। হাসি থামতেই ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি পড়াশোনা করেছ কোথায়?’
‘ফরিদপুরে। অনার্স পাশ করেছি।’
‘কোন সাবজেক্টে?’
‘ইকনোমিকস।’
‘মাস্টার্স করলে না কেন?’
সোমা মন খারাপ করে ফেলল। মন খারাপ করেই সে বলল, ‘ভেবেছিলাম এখানে এসে করবো।’
ফরিদ শঙ্কিত হলো—সোমা আবার কেঁদে না ফেলে। এখন নিশ্চয়ই ওর স্বামীর কথা মনে পড়বে। সে হয়ত ওকে বলেছিল, দেশে আর পড়াশুনা করতে হবে না। আমেরিকা এসেই মাস্টার্স করো। কে জানে।
সোমা বারে বারে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। লক্ষণ ভালো নয়। ঝড়ের পূর্বাভাস। শুরু হওয়ার পূর্বেই গতিপথ বদলে দিতে হবে। ফরিদ দ্রুত জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা এখন বাংলাদেশে শুনেছি অনার্স কোর্স অনেক বড় হয়েছে—কত বছরের কোর্স এখন?’
‘চার বছর।’
‘হুম। আমাদের সময় তিন বছর ছিল।’
‘আমার কিছু ভালো লাগছে না।’ সোমা অস্থির হয়ে বলল, ‘আমি আবার দেশে কথা বলতে চাই। আমাকে একটু লাইন দিয়ে দিন।’ বলেই সে কেঁদে ফেলল।
ফরিদ যেই ভয় পেয়েছিল তাই ঘটতে যাচ্ছে মনে হয়। সামনে আরো কি বিপদ আছে কে জানে। সে দ্রুত বলল, ‘সমস্যা নেই। লাইন দিয়ে দিচ্ছি এখুনি। একটু ওয়েট করো।’
ফরিদ ফোন কার্ড নিয়ে এসে লাইন দিয়ে সোমার হাতে ফোনটা দিল।
রুমা ফোন ধরতেই সোমা কেঁদে দিয়ে বলল, ‘হ্যালো, হ্যালো আপা… আপা, আমি না তখন তোকে সত্যি কথা বলি নাই। হ্যাঁ। ঐ শহীদ তো আমাকে নিতে আসে নাই এয়ারপোর্টে।’
‘কি বলছিস এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আমি তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করছি—কিন্তু শহীদ যায় নাই আমাকে আনতে।’
রুমা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সোমা বলল, ‘একে একে সবাই চলে গেল। কতজনের কাছে হেল্প চাইলাম—কিন্তু কেউ হেল্প করল না। আমার কথা তো কেউ বুঝে না। আমি পরে অনেকের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে চলে আসি। পরে একজন বাঙালী ভদ্রলোকের সাথে দেখা—উনার ফোন নিয়ে শহীদরে কতবার কল করলাম, কিন্তু শহীদ ফোন ধরল না। পরে উনিই আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসছেন।’
‘তাইলে তুই এখন কোথায়?’
‘আমি ফরিদ ভাইয়ের বাসায়। উনার নাম ফরিদ আহমেদ। উনি খুবই ভালো মানুষ—আমাকে অনেক হেল্প করছে। উনার সঙ্গে দেখা না হলে যে আমার কি হতো? আমি তো ঠাণ্ডায় জমে মরে পড়ে থাকতাম।’
‘হায় হায়—এত কিছু ঘটে গেছে আর আমরা কিছুই জানি না? তুই এখন কি করবি?’
‘কিছুই জানি না—কি করব। আচ্ছা, আমি রাখি—আমি পরে আবার কল দিব।’
সোমার কথার মধ্যে ফরিদ বেশ কয়েকবার কথা বলতে চাচ্ছিল। এবার সোমাকে থামিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘তুমি এক কাজ কর, আমার ফোন নাম্বারটা তোমার বোনকে দিয়ে দাও।’
সোমা ফরিদের নাম্বার রুমাকে দিয়ে বলল, ঐ নাম্বারে ফোন দিয়ে খোঁজ নিতে। সোমা ফোন রেখে দিয়ে আরো কিছুক্ষণ কাঁদল। ফরিদ তাকে কাঁদতে দিল।
একটু সময় নিয়ে ফরিদ বলল, ‘সোমা তুমি তোমার কান্নাটা একটু থামাও—একটু স্থির হয়ে বসো। কান্নাটা থামালে তোমাকে একটা অদ্ভুত কথা বলব।’
কিছুক্ষণ পর সোমা চোখ মুছে তাকাল ফরিদের মুখের দিকে।
ফরিদ বলল, ‘দেখো আজকে এই যে তুমি কাঁদছ… যখন তুমি শহীদকে পেয়ে যাবে, সুন্দর সুখের একটা সংসার শুরু করবে—তখন কিন্তু আজকের দিনটার কথা মনে করে তুমি হাসবে।’
সোমা কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘আমার কি মনে হয় জানেন?’
‘কি?’
‘শহীদ আসলে ইচ্ছে করেই আমাকে নিতে আসে নাই। ও আমার ব্যাপারে কনফিউজড ছিল। আরেকটা মেয়ের সঙ্গে ওর এফেয়ার ছিল—অনেকদিনের পরিচয়। সেই মেয়েটাকেই ও বিয়ে করতে চাইছিল। কিন্তু মেয়েটার বাবা-মা রাজী হয় নাই—ও ক্যাব চালায় বলে। শহীদ হয়ত এখনো ঐ মেয়েটাকে ভুলতে পারে নাই। তাই ও আমাকে নিতে আসে নাই।’ বলেই সোমা আবার কাঁদতে থাকল।
ফরিদ মাথা নেড়ে বলল, ‘আমার কিন্তু তা মনে হয় না। তাই যদি হবে—সেটা তো তোমাকে আগেই বলে দিত তাই না। তোমাকে এতদূর নিয়ে আসার তো কোনো দরকার ছিল না।’
শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সোমা আবার বলল, ‘আসলে মানুষ মাঝে মাঝে কনফিউজড থাকে। জানেন কি হয়েছে, আমার এক বান্ধবী ছিল। ওর একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম ছিল। কিন্তু ওর বাবা-মা ওর বিয়ে ঠিক করে আরেকটা ছেলের সাথে। বিয়ের রাতে সে তার হাজবেন্ডকে বলল-ডোন্ট টাচ মি। আমার ভালোবাসার মানুষ আছে। আমি আপনাকে কখনোই ভালোবাসতে পারব না। তারপর ওর হাজবেন্ডকে ডিভোর্স দিয়ে বয়ফ্রেন্ডকে বিয়ে করে। বলেন, এর কোনো মানে হয়? ও তো আগেই বলতে পারত। শুধু শুধু ছেলেটাকে কষ্ট দেয়া।’
‘রাইট শুধু শুধু কষ্ট দেয়া…’ ফরিদ আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল, এর মধ্যে ফোন বেজে উঠল।
ফরিদ সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সোমা ফোনটা ধরো তো। মনে হচ্ছে এটা শহীদের ফোন—ধরো।’
সোমার চেহারা বদলে গেল। মুখে একটা প্রশান্তির হাসি নিয়ে ফোনটা ধরে বলল, ‘হ্যালো?’

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটা এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৬)

সোমা আবারো বলল, ‘কে? কে ওখানে?’
কেউ জবাব দিল না। সোমা দরজার কাছে এগিয়ে গেল। দরজা না খুলেই সে আবার ডাকল। তার গলার স্বর কাঁপছে। সে ভীত কিন্তু উচ্চস্বরে ডাকল, ‘ফরিদ ভাই?’
দরজা বন্ধ থাকায় সোমার কথা নিচে সামান্যই পৌঁছল। সোমা এবার দরজায় শব্দ করে ডাকল-ফরিদ ভাই।
লিভিং রুম থেকে ফোনে কথা শেষ করে ফরিদ চলে এসেছে রান্নাঘরে। হঠাৎ ক্ষীণ স্বরে ফরিদ তার নাম শুনতে পেল। সোমা সম্ভবত তাকে ডাকছে। ফরিদ উপরে উঠে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে ডাকল, ‘সোমা।’
সোমা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘ফরিদ ভাই?’
‘হ্যাঁ আমি, কি হয়েছে? ভয় পেয়েছ নাকি? দরজাটা খুলো।’
‘আপনি কি কিছুক্ষণ আগে দরজায় নক করেছিলেন?’
‘আমি একবার এসেছিলাম তোমাকে ডাকতে। তুমি হয়তো ঘুমচ্ছ তাই আর ডাকিনি। কেন বলো তো?’
‘আমি স্পষ্ট শুনেছি—দরজায় কেউ নক করেছে। ঠক ঠক শব্দ হয়েছে।’
‘আচ্ছা আচ্ছা দেখছি ব্যাপারটা কি। দরজাটা খুলো—নাহলে তো কিছু বুঝতে পারছি না।’
সোমার ভয় কাটল না। তবুও সে আস্তে করে দরজা খুলে দেখল হাসি হাসি মুখ করে ফরিদ দাঁড়িয়ে আছে। ফরিদের হাসিমাখা মুখখানি দেখে তার ভয় অনেকখানি কেটে গেল।
সোমার মুখের দিকে তাকিয়েই ফরিদ বুঝতে পারল, কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। ফরিদ বলল, ‘আমার ধারণা, অতিরিক্ত টেনশন আর টায়ার্ডনেসের কারণে তোমার ব্রেইন ঠিকমত কাজ করছে না।’ ফরিদ লক্ষ্য করল সোমা সেই একই পোশাক পরে আছে। তারমানে তার গোসল হয়নি এখনো। সে বলল, ‘তুমি শাওয়ারটা সেরে নিচে আসো।’
ফরিদ চলে যেতেই সোমা ধীরে ধীরে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দিল। এবং দীর্ঘ সময় ঝরনার নীচে দাঁড়িয়ে থাকল। হালকা গরম পানির প্রবাহ তার শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে। এক ধরনের আরামদায়ক অনুভূতি হচ্ছে। আরামে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
দীর্ঘ ক্লান্তি আর অবসাদগ্রস্ত শরীরটায় একটু একটু করে প্রাণ ফিরে এসেছে। এখন বেশ প্রফুল্ল লাগছে। গোসল শেষ করে নীচে নেমে এলো সোমা। এদিক ওদিক তাকিয়ে শব্দের উৎস খুঁজে এগিয়ে গেল। যে মানুষটির সঙ্গে এই বাসায় সে চলে এসেছে তাকে দেখল রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছে। সোমা রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি করছেন?’
ফরিদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সোমাকে। বাসন্তী আর লালের মিশ্রণের সুন্দর একটা তাঁতের শাড়ি পরেছে সে। ভেজা চুল ছড়িয়ে আছে কাঁধের দু’পাশে। ভারী সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে। ফরিদ মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইল সোমার মুখের দিকে। কি নিষ্পাপ চেহারা। শান্ত—মায়াবী।
ফরিদ বলল, ‘এই তো রান্নার আয়োজন করছি।’
‘রান্না কেন?’
‘রাতে খেতে হবে না? বাসায় খাস মেহমান—তাও আবার নিজের দেশ থেকে এসেছে। তাকে আপ্যায়ন করতে হবে না?’
‘রাতে কি আমি এখানেই থাকছি নাকি?’ উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল সোমা।
‘তা তো জানিনা। তবে রাতে যে তুমি এখানেই খাচ্ছ, দ্যাটস ফর শিওর।’
‘রেস্টুরেন্ট থেকে না একগাদা খাবার নিয়ে এলেন?’
‘আরে রেস্টুরেন্টের খাবার রেস্টুরেন্টেই ভালো লাগে। বাসায় খাওয়া যায় নাকি? একবার ফ্রিজে রাখলে আর মজা লাগে না। ফ্রেশনেস নষ্ট হয়ে যায়।’
সোমা মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘কি রান্না করছেন?’
‘গরম ভাত। ডাল আর গরুর মাংস। ডাল আর ভাত হয়ে গেছে। কিন্তু মাংস নিয়ে একটু ঝামেলার মধ্যে আছি—কিছুতেই সিদ্ধ হচ্ছে না। মনে হয়ে বুড়ো মাংস নিয়ে এসেছি।’
সোমা এবার শব্দ করে হেসে ফেলল।
বাহ, হাসলে মেয়েটিকে আরো সুন্দর লাগছে। এখন পর্যন্ত মেয়েটির কোনো হাসি দেখা যায়নি। সোমাকে হাসতে দেখে ভালো লাগছে ফরিদের। মেয়েটি স্বাভাবিক হচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ। ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুম হয়েছে একটু?’
‘বুঝতে পারছি না। মনে হয় হয়েছে।’
‘জেট ল্যাগ। এত বড় লম্বা জার্নির পর এমন হয়। কিছুক্ষণ পর পর ঘুম আসে। আর একটু ঘুমলেই মনে হয় অনেক ঘুম হয়েছে।’
‘ভীষণ টায়ার্ড লাগছিল। তাই গোসল করে নিলাম।’
‘খুব ভাল করেছ।’ একটু থেমে ফরিদ আবার বলল, ‘তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে সোমা।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ!’
‘তোমার নিশ্চয়ই এখন খিদে পেয়েছে। তখন তো কিছুই খেলে না।’
‘হ্যাঁ খিদে পেয়েছে। মনে হচ্ছে এক গামলা ভাত খেয়ে ফেলি।’
‘মাংসটা সিদ্ধ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কাঁচা মাংসই খেতে হবে। ঝামেলাই হলো।’
‘দেখি দিন আমাকে দিন—আমি দেখছি।’ সোমা এগিয়ে গেল।
‘আরে নাহ—তুমি পারবে না। এগুলো আমেরিকান স্টাইলে রান্না—খেতে পারবে কিনা তাই নিয়েই আমি সন্দিহান।’
‘সমস্যা নেই। আমি বাংলাদেশি স্টাইলে রাঁধব। আপনি যান ফ্রেশ হয়ে আসুন। তারপর একসাথে খেতে বসব।’
ফরিদ তার গায়ের অ্যাপ্রনটা খুলে সোমাকে পরিয়ে দিল। এখন তারমধ্যে কোনো রকম জড়তা নেই। যাওয়ার আগে ফরিদ বলল, ‘সোমা, আমি আরো কয়েক জায়গায় ফোন করেছি। শিকাগোর বাংলাদেশি এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টের সাথেও আমার কথা হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে—এখানে কেউ তাকে চিনতে পারছে না। শহীদ বোধ হয় বাঙালীদের কোনো অনুষ্ঠান গুলিতে কখনো যায়-টায় না। এত বড় একটা কমিউনিটিতে কেউ তাকে চিনবে না—এটা অবিশ্বাস্য। আমি আরেকজন বাঙালী ক্যাব ড্রাইভারকেও বলেছি—তাকে খুঁজে বের করবোই। কোথায় আর যাবে। তুমি একদম চিন্তা করো না।’
‘কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দিব—বুঝতে পারছি না।’
‘আরে কী বলো—ধন্যবাদ দিতে হবে না। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কেউ কারো জন্যে কিছু করতে পারাটাও একটা ভাগ্যের ব্যাপার। সবার কিন্তু সেই ভাগ্য হয় না।’ বলেই ফরিদ চলে গেল।
সোমা লক্ষ্য করল, শহীদের জন্যে তার আর আগের মত কষ্ট লাগছে না। কিন্তু কেন? সে ফরিদকে ধন্যবাদ দিল ঠিকই কিন্তু সেটা কেমন যেন মেকি মনে হলো। নাকি অন্য কিছু?
এই মধ্যবয়স্ক মানুষটিকে এখন অন্যরকম লাগছে সোমার। মনে হচ্ছে কাছের কেউ—অনেক আপনজন। সোমা লক্ষ্য করেছে, ফরিদ মাঝে মাঝেই তাকে তুমি তুমি করে বলছে আবার মাঝে মাঝে আপনি। শুধু তাই নয়, সে ঐ ছেলেগুলি—বাদশা এবং ইকবালকে একবার তুই আবার তুমি করে বলছে। সোমার বাবাও অনেকটা এরকম ছিলেন—সিচুয়েশন এবং মুডের উপরে তার ছেলেমেয়েদের সাথে তুই আর তুমির মিশ্রণে কথা বলতেন তিনি।
ফরিদ ফিরে এসে দেখল সোমার রান্না প্রায় হয়ে এসেছে। মাংসের চেহারা এবং রঙের আমূল পরিবর্তন দেখে ফরিদ অবাক হয়ে গেল। ফরিদ কাউন্টারের উপর বসে জিজ্ঞেস করল, ‘বাহ দেখতে তো বেশ সুন্দর হয়েছে। তুমি রান্না শিখেছো কার কাছে?’
‘আমার মায়ের কাছ থেকে।’ সোমা মাংস নাড়তে নাড়তেই বলল। ‘আপনি?’ সোমা জানতে চাইল।
‘একা একাই শিখেছি। এদেশে সবাই একসময় রান্না শিখে যায়। উপায় তো নেই—হার্ড লাইফ।’ ফরিদের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বাসার ফোন বেজে উঠল। ফরিদ রান্না ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ফোন তুলে নিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
‘বস, আমি বাদশা।’
‘হ্যাঁ বলো।’
‘বস ঐ পোলার কোনো খোঁজ বাইর করতে পারলাম না। এত জায়গায় গেলাম—কেউ হালারে চিনে না। আমার তো মনে হয় বস এখন পুলিশে একটা ফোন করা দরকার—এতো ঝামেলা…’
বাদশা কথা শেষ করার আগেই ফরিদ তাকে ধমকে উঠে বলল, ‘ধুর মিয়া, পুলিশে ফোন করা যায়, সেটা কি আমি জানিনা মনে করেছ?’
‘আমি চিন্তা করছিলাম বস, আপনার কাজ নষ্ট হইতেছে। এর মধ্যে একটা ঝামেলা আপনার কান্ধে আইসা জুটছে। কাম-কাইজ ফালায় রাইখা আপনেই বা কতক্ষণ দেখবেন। তাই ভাবছিলাম পুলিশরে জানাইলে তারাই একটা শেল্টার হোমে মেয়েটারে থাকার ব্যবস্থা করে দিত।’
ফরিদ রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? এসব কি বলছিস তুই? আমরা এতগুলো মানুষ থাকতে মেয়েটাকে শেল্টার হোমে যেতে হবে?’ এটুকু বলেই ফরিদ লক্ষ্য করল সোমা রান্না বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চেহারায় একটা দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখা দিল। ফরিদ এবার ফোনটা নিয়ে পাশের রুমে গিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘একটু বোঝার চেষ্টা কর—বাংলাদেশ থেকে একটা মেয়ে এসেছে। সে একটা বিপদে পড়েছে—তাকে সাহায্য করাটা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা যদি এই মুহূর্তে তার পাশে না দাড়াই, তাকে সাহায্য না করি তা হলে কে করবে?’
‘আপনে বুঝতে পারতেছেন না বস—বাসার মধ্যে একা একটা মেয়েকে নিয়ে গেছেন, এদিকে আবার কান কথা শুরু না হয়ে যায়। আপনার একটা রেপুটেশন আছে বস। তাই বলছিলাম ঝামেলার কি দরকার…’
‘কান কথা মানে? কিসের কান কথা? কান কথা কে ছড়াবে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না—এ ধরনের কথা কেনই বা আসবে?’ ফরিদের ভীষণ রাগ হলো, তবুও সে যথাসম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করল। সে গলার স্বর নিচু করে বলল, ‘তোকে যা করতে বলেছি তাই কর। বাকীটা আমি দেখছি।’ বলেই ফরিদ ফোন কেটে দিল।
ফরিদ ফিরে এসে দেখল রান্না ঘরে সোমা নেই। বুঝতে পারল সোমা আহত হয়েছে। তার সামনে এইভাবে কথা বলায় তার মন খারাপ হবারই কথা। নিশ্চয়ই অস্বস্তিতে পড়েছে মেয়েটা। ফরিদ সিদ্ধান্ত নিল মেয়েটিকে একটু সময় দেয়া দরকার। এদিকে তার খিদেও পেয়েছে অনেক। সোমার খাওয়া দরকার সবার আগে—সারাদিনে সে কিছুই খায়নি। ফরিদ ধীর পায়ে উপরে উঠে সোমার ঘরের দরজায় গিয়ে নরম স্বরে ডাকল, ‘সোমা।’
সোমা কোনো উত্তর দিল না।
ফরিদ আবার ডাকল। কোনো উত্তর না পেয়ে ফরিদ বলল, ‘সোমা আমি জানি তুমি কষ্ট পেয়েছ। তোমার সামনে এভাবে কথাগুলো বলা ঠিক হয়নি। তুমি কি একটু নীচে আসবে ভাই, আমি বিষয়টা বুঝিয়ে বলছি।’
সোমা কিছু বলল না। ফরিদ এবার সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করল। সে বলল, ‘দেখো আমি সারাদিন কিছু খাইনি। আমার কিছু মেডিসিন খেতে হয় যা খালি পেটে খাওয়া যায় না। আমাকে এখন খেতে হবে। মুশকিল হচ্ছে তোমাকে ছাড়া খেতে পারছি না।’ এটুকু বলে ফরিদ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল দরজার ওপাশে।
কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল সোমা। ফরিদকে বলল, ‘এত নাটক করতে হবে না। আপনি যান আমি আসছি।’
সোমার কথার বলার ভঙ্গীতে ফরিদ হেসে ফেলল। সে হাসতে হাসতেই নীচে নেমে গেল।
নীচে নামতে নামতেই ইকবালের ফোন এলো। ফরিদ হ্যালো বলতেই সে বলল, ‘এইটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফ্রড কেস, বস। আমার তো মনে হয় ঐ হালার অন্য কোথাও সম্পর্ক আছে। এই রকম ঘটনা কিন্তু বস আগেও ঘটছে। আই’ম শিওর ঐ ব্যাটার আরেকটা বউ আছে—হয় কাইল্যা না হয় মেক্সিকান। গ্রিনকার্ড বানাইয়া আবার বিয়া করছে দেশ থিকে… এইটা ফ্রড কেস না হয়েই যায় না…’
‘দেখো ইকবাল, কারো সম্পর্কে না জেনে কিছু বলা ঠিক না। এসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে আগে দেখো, ছেলেটাকে খুঁজে পাও কিনা?’ রেগে গেলে ফরিদ তুমি করে বলে। ইকবাল, বাদশা, রন্টু এমন বেশ কিছু যুবকের সঙ্গে ফরিদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফরিদ তাদের সবাইকে কোনো না কোনো ভাবে সাহায্য করেছে—শিকাগোতে প্রতিষ্ঠিত হবার ব্যাপারে। তাদের সবাই ফরিদকে বড় ভাইয়ের মত মানে। সে সবার বস।
‘খুঁজতেছি তো বস—শিকাগোর কোনো জায়গা বাদ নাই। কিন্তু তারে তো কেউ চিনেনা।’
‘কেউই চিনবে না এটা হতেই পারে না।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইকবাল বলল, ‘বস, মাইয়াটারে রাত্রে কই রাখবেন তাইলে?’
ফরিদ একটু চুপ করে রইল। সে কি উত্তর দেবে? বাইরে তুষারপাত হচ্ছে। রাতও হয়েছে অনেক। এই অবস্থায় সোমাকে কার বাসায় পাঠাবে? সবচেয়ে বড় কথা, যার বাসায়ই পাঠানো হোক না কেন, শুরু হবে একটার পর একটা অযাচিত প্রশ্ন। মেয়েটাকে কোথায় পেলেন, আপনার কে হয়, আপনি আগে থেকে চিনতেন কিনা, আপনার কাছেই বা কেন এলো? এই লোকের চরিত্র খারাপ সবাই জানে—বউ তো আর এমনি এমনিই যায় নাই? সোমা নিশ্চয়ই বিব্রত হবে। এমনিতেই যথেষ্ট ধকল যাচ্ছে—এরপর আরো বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলাটা মোটেও ঠিক হবে না।
ফরিদ বলল, ‘ব্যবস্থা করছি। এটা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে—তোকে যা বললাম, তুই তাই কর।’ বলেই লাইন কেটে দিল ফরিদ।

পরের পর্ব

আগের পর্ব