শহীদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সোমার এমন কঠিনরূপ সে কখনো দেখেনি—দেখার অবশ্য কথাও না। সে ফরিদের দিকে তাকাল অসহায় দৃষ্টিতে। ফরিদ অবাক হয়ে চেয়ে আছে সোমার মুখের দিকে।
সোমা বলল, ‘ফরিদ ভাই, আপনি আমার দেশে যাবার ব্যবস্থা করেন।’
ফরিদ সুযোগ পেয়ে এবার মধ্যস্থতা করার জন্যে বলল, ‘আচ্ছা দাঁড়াও দাঁড়াও—এত অস্থির হচ্ছো কেন? তার আগে একটু শুনে নেই কী ঝামেলা হয়েছিল। নিশ্চয়ই এমন কিছু একটা হয়েছিল—একটা জেনুইন কারণেই হয়ত সে আসতে পারেনি।’ ফরিদ শহীদের দিকে ঘুরে বলল, ‘কী হয়েছে বলো তো ভাই?’ তারপর সে সোমাকে বলল, ‘সোমা তুমি বসো। এসো শোনা যাক—ঘটনাটা কি?’
সোমা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে হেঁটে গিয়ে বসল শহীদের পাশের সোফাতে। ভাবতে অবাক লাগছে, এই মানুষটার জন্যেই সে কত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছে অথচ এখন তাকে কেমন দূরের মানুষ মনে হচ্ছে।
ফরিদ শহীদকে বলল, ‘এবার বলো। কী এমন হয়েছিল যে তুমি এয়ারপোর্টে নিজের স্ত্রীকে আনতে যাওনি?’
শহীদ একটু নড়েচড়ে বসল। একটু ভূমিকা দিয়ে সে কথা বলা শুরু করল, ‘ফরিদ ভাই, আপনার সাথে আজকে আমার প্রথম পরিচয়। আমি দু’বছর আগে শিকাগোতে এসেছি—আগে ছিলাম নিউ ইয়র্কে। এটা ঠিক এখানে আমার তেমন কোনো বন্ধু বান্ধব নেই। যারা আছে—তারা কেউ এখানে থাকে না। অন্য জায়গায় চলে গেছে। সোমার সঙ্গে আমার বিয়েও হয়েছে দু’বছর।’
‘হ্যাঁ সোমা বলেছে।’ ফরিদ বলল।
‘আপনি তো জানেনই এখানে জীবন কত কঠিন। আগে একা ছিলাম, যা ইনকাম হতো–চলে যেত। কিন্তু বিয়ে করার পরে বুঝতে পারলাম, সংসার বড় হবে। টাকা-পয়সা রোজগার করতে হবে বেশি করে। সেই চিন্তা করেই আমি প্রায়ই ডাবল শিফট ক্যাব চালাচ্ছিলাম দীর্ঘদিন। আমার মেইন উদ্দেশ্য ছিল, সোমা আসার পরে আমার যেন কমপক্ষে এক সপ্তাহ কাজ করতে না হয়। ওকে নিয়ে ভ্যাকেশনে যাবো।’
ফরিদ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘দ্যাটস গ্রেট।’
‘মাঝে মাঝে একটু ব্রেক নিয়ে, গত তিনদিন আমি একটানা ক্যাব চালিয়েছি।’
ফরিদ বলল, ‘বলো কী?’
‘জি ফরিদ ভাই। আমার মধ্যে এক ধরনের এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিল।’
ফরিদ একটু মুচকি হাসল। সোমা নির্বিকার।
শহীদ আবার বলল, ‘তো গতকাল সারারাত গাড়ি চালিয়ে ভোরে যখন বাসায় ফিরছিলাম—ভেবেছিলাম বাসায় গিয়ে ছোট্ট একটা ঘুম দিয়ে আটটার দিকে এয়ারপোর্টে চলে যাব। কিন্তু…’
‘কিন্তু?’
শহীদ এবার পুরো ঘটনাটার বর্ণনা করল। ঘটনাটা এই রকম…
রাতের শিফটে কাজ শেষ করে ভোর পাঁচটার দিকে শহীদ ফিরে আসছিল বাসার দিকে। বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তায় ঢুকতেই একজন প্যাসেঞ্জার হাত তুলে শহীদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। শহীদ জানালা নামিয়ে দেখল প্রায় ছ’ফুটের মত লম্বা একজন কালো যুবক—মাথায় কালো টুপি, গায়ে লম্বা জ্যাকেট, এক হাত পকেটের ভিতর। শীতের ভোর— ঘন কুয়াশার কারণে চারিদিক তখনো অন্ধকার। রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা। আশে পাশে কেউ নেই। শহীদ বলল, ‘সরি ম্যান—আই’ম নট ফর হায়ার।’
‘হেই ম্যান, আই’ভ অ্যান ইমার্জেন্সি। আই নিড অ্যা রাইড।’ যুবকের চোখে মুখে আকুতি ফুটে উঠল।
‘আই’ম সরি। আই ক্যান্ট। আই নিড টু গো হোম। আই ড্রোভ লাস্ট টুয়েলভ আওয়ার্স—আই’ম রিয়েলি টায়ার্ড।’
‘কাম অন ম্যান—আই উইল পে ইউ গুড। দিস ইজ ইমার্জেন্সি। মাই মাম ইজ সিক—আই নিড টু টেক হার টু হসপিটাল। লেট মি গেট ইন।’
ছেলেটির মায়ের কথা শুনে শহীদ একটু ভাবল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ছেলেটি দরজা খুলে উঠে বসল গাড়ির পিছনের সীটে। ‘লেট’স গো।’ দরজা বন্ধ করে ছেলেটি বলল।
হাল ছেড়ে দিয়ে শহীদ জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার আর ইউ গোয়িং? গিভ মি দ্য এড্রেস।’
সে কিছুই বলল না। শহীদ ইতস্তত করে গাড়ি ঘুরিয়ে বড় রাস্তার দিকে ছুটে চলল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। বড় রাস্তায় উঠার আগেই একটা নির্জন মতো জায়গায় হঠাৎ করেই শহীদের ঘাড়ের উপর পিস্তল ঠেকিয়ে যুবক কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘স্টপ দ্য কার। স্টপ দ্য কার। গিভ মি ইয়োর মানি।’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শহীদ বলল, ‘হেই ম্যান, লিসেন। ইউ ক্যান্ট ডু দিস টু মি। আই’ম ট্রায়িং টু হেল্প ইয়ু।’
‘ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম—গিভ মি দ্যা ওয়ালেট। ওপেন ইয়োর ওয়াচ। গিভ ইট টু মি। ইয়োর ফোন ঠু।’
শহীদের অনেক কষ্টার্জিত ডলার। ডাবল শিফট কাজ করে, না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, সকাল-সন্ধ্যা-রাত একটানা কাজ করছে সে শুধু অতিরিক্ত কিছু রোজগার করার জন্যে। আর সেই টাকা এত সহজেই একজন নিয়ে যাবে তা কী করে হয়। শহীদ কিছুতেই দিতে চাইল না। কিন্তু পিস্তলের মুখে নিজেকে বড়ই অসহায় মনে হলো। ক্যাব ড্রাইভিং লাইসেন্স নেবার ট্রেনিং এর সময় সে শিখেছিল—যদি ছিনতাইকারীর কবলে পড়—চোখ বন্ধ করে যা আছে সব দিয়ে দাও। দ্বিতীয় চিন্তা করার অবকাশ নেই। অলওয়েজ রিমেমবার, লাইফ ইজ মোর ইম্পরট্যান্ট দ্যান এনিথিং। ডোন্ট রিস্ক ইয়োর লাইফ ফর ম্যাটেরিয়াল থিংস।
শহীদ অবশ্য বেশিক্ষণ চিন্তা করার অবকাশ পেল না। তার দেরী হচ্ছে দেখে পিস্তলধারী শহীদের মাথার পিছনে পিস্তলের বাট দিয়ে সজোরে আঘাত করল। মুহূর্তেই চোখে অন্ধকার দেখল সে। এরপরে আর কোনো শব্দ না করে ভীত সন্ত্রস্ত শহীদ একে একে সবকিছু দিয়ে দিল যুবকের হাতে। কিন্তু তারপরেও শেষ রক্ষা হলো না। ছিনতাইকারী যুবক শহীদের মাথার পিছনে পুনরায় আঘাত করল সজোরে এবং মুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল সে।
তারপরে তার আর কিছুই মনে নেই। তার যখন সংজ্ঞা ফিরে এলো তখন নিজেকে আবিষ্কার করল গাড়ির পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায়। মুখ টেপ দিয়ে আটকানো। ঠাণ্ডায় তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আছে। তবুও সে কোনো রকমে মাথাটা উঁচু করে দেখল—দিনের আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা দিনের কোন সময় সে কিছুই বুঝতে পারল না। শহর থেকে অনেক দূরে একটা কান্ট্রি রোডের পাশে তার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এতদূরেই বা তার গাড়ি কে নিয়ে আসল সেটাও জানা গেল না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে উঠে বসতে চাইল কিন্তু পারল না। ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবারো জ্ঞান হারালো।
শহীদের যখন দ্বিতীয়বার জ্ঞান ফিরল—তখন সে শুয়ে আছে শিকাগো সাউথ সাইডের একটি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বেডে। গরম ব্লাঙ্কেট দিয়ে তার সারা শরীর মুড়িয়ে রাখা। দীর্ঘ সময় তীব্র শীতের মধ্যে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় আর অস্বাভাবিকভাবে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় তার হাইপোথার্মিয়ার মতো হয়ে যায়।
যেসব দেশে বরফ পড়াটা স্বাভাবিক, সেসব দেশে হাইপোথার্মিয়ায় মৃত্যুর ব্যাপারটাও মানুষের কাছে পরিচিত। হাইপোথার্মিয়া শুরু হয়ে গেলে অবধারিতভাবেই মানুষটির শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। অনেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। দিকভ্রান্ত হয়—হোঁচট খেতে থাকে এবং গতি ধীর হয়ে যায়। একটা পর্যায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন আশঙ্কাজনক মাত্রায় কমে আসে—মানুষ জ্ঞান হারায় এবং মারা যায়।
শহীদের শরীরের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিক হয়ে এলো, সে যখন স্বাভাবিক কথা বলতে পারছে তখন দায়িত্বরত ডাক্তার হাইপোথার্মিয়ার বিষয়টি তাকে ব্যাখ্যা করল। শহীদ বাসায় যেতে চাইলে ডাক্তার বলল, রাতটা তাকে অবজার্ভ করে সকালে রিলিজ দিয়ে দেবে—তার আগে নয়।
ঘটনা এ পর্যন্তই।
সব শুনে ফরিদ বলল, ‘ও মাই গড!’ বলেই সে তাকাল সোমার দিকে। সোমা চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে শহীদের দিকে।
শহীদ বলল, ‘সারাটা রাত আমার যে কী যন্ত্রণা হয়েছে—সোমার চিন্তায় শুধু ছটফট করেছি।’ বলেই শহীদ তাকাল সোমার দিকে।
সোমা তাকিয়ে থাকতে পারল না। সে চোখ ঘুরিয়ে নিল।
ফরিদ বলল, ‘তো তুমি পুলিশে যোগাযোগ করো নাই কেন?’
‘আমি যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, তখন দেখলাম আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি। পুলিশই আমাকে উদ্ধার করে হসপিটালে নিয়ে যায়। পুলিশ একটা রিপোর্ট করেছে—বলেছে সুস্থ হয়ে ওদের সাথে কথা বলতে। সাথে ফোন না থাকাতে কারো সঙ্গেই আর যোগাযোগ করতে পারি নাই।’
এরপরে আর কেউ কোনো কথা বলল না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ফরিদ জানতে চাইল, ‘হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছ কখন?’
‘আজ সকালে। সেখান থেকে সরাসরি বাসায় ফিরেই দেখলাম ইকবাল ভাই আর বাদশা দাঁড়িয়ে আছে বাসার সামনে। তাদের কাছেই জানলাম সোমা আপনার এখানে…’
শহীদ আবার তাকাল সোমার দিকে। সোমা শাড়ির আঁচলে চোখ চেপে ধরে আছে।
ফরিদ বলল, ‘তুমি এখন কেমন বোধ করছ?’
‘ভালো—তবে মাথার এই পেছনটায় ব্যথা আছে এখনো। ফোলাটা একটু কমেছে অবশ্য।’
‘চা-কফি কিছু খাবে? ব্রেকফাস্ট করেছো?’
শহীদ মাথা নেড়ে বলল, ‘না ফরিদ ভাই। আপনি এমনিতেই অনেক করেছেন…’
‘আরে এটা তো একজন বাঙালী হিসেবে আমার দায়িত্ব। আমি আমার দায়িত্বটুকুই পালন করেছি। আর তুমি এই শিকাগোতে এসেছে অথচ আমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই… এই শহরে এমন কোনো বাঙালী নেই যে পারসোনালি আমাকে চিনে না।’
‘আমি আপনার নাম শুনেছি ফরিদ ভাই… কিন্তু যোগাযোগটা করা হয়নি।’
ফরিদ এবার সোমাকে বলল, ‘এবার তো বুঝতে পেরেছ সোমা, কী হয়েছে? থ্যাঙ্কস গড যে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়নি।’
সোমা চুপ করে রইল। তার ভেতরটা উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। একটা মানুষের উপর এত বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে আর তার উপর সে রাগ করে ছিল!
শহীদ সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘চলো সোমা।’
ফরিদ বলল, ‘যাও সোমা তৈরী হয়ে এসো। এখন তোমার রাগ কমেছে তো?’
সোমা মৃদু হাসল। ফরিদ আবার বলল, ‘যাও যাও।’
সোমা উঠে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে কাপড় বদলে তার ছোট্ট সুটকেসটা নিয়ে নীচে নেমে এলো।
ফরিদের বাসার সামনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সোমা আর ফরিদ।
শহীদ তার জীপ চেরকিতে সোমার লাগেজ দুটি তুলে দিয়ে এসে দাঁড়াল সোমার পাশে। সোমার কী হয়েছে কে জানে। হঠাৎ করেই চোখ ভরে যাচ্ছে পানিতে। গত ২৪ ঘণ্টায় চোখের পানি এত ঝরেছে—তারপরেও এখন সে আবার কাঁদছে।
ফরিদ অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সোমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে বলল, ‘সোমা, আবার কাঁদছ? এবার কী হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেয়েছ এই আনন্দে নাকি অন্য কিছু?’
সোমা চোখ মুছল। দীর্ঘক্ষণ সে কোনো কথা বলেনি। এবার মৃদু স্বরে বলল, ‘দোয়া করবেন আমাদের জন্যে।’ বলেই হাত ব্যাগ থেকে সেই রুমালখানি বের করে ফরিদকে দিয়ে বলল, ‘আপনার রুমাল।’
ফরিদ হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘দেখো সোমা, কাল রাতে তুমি আমাকে রান্না করে খাইয়েছ। তোমাকে তো আর বাবুর্চি খরচ দিতে পারব না—ধরে নাও এই রুমালটিই আমার গিফট। আমি খুব খুশী হবো তুমি যদি রাখো।’
সোমা মৃদু হেসে রুমালটি হাত ব্যাগে রেখে দিল।
শহীদ বলল, ‘আসি ফরিদ ভাই।’
‘এসো। ভালো থেকো। সাবধানে যেও। আর যখন যা লাগবে আমাকে জানাবে। আর শোন, এবার কিছু বাংলাদেশি বন্ধু-বান্ধব বানাও। তা নাহলে তো তোমাকে খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল। ’
শহীদ হেসে বলল, ‘জি ফরিদ ভাই—অবশ্যই।’ তারপর সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সোমা চলো যাই।’
সোমা আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল—তারপর হঠাৎ করেই নিচু হয়ে ফরিদকে দু’হাতে সালাম করল। ফরিদ কিছু বলার আগেই সোমা উঠে দাঁড়িয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘ভালো থাকবেন। শরীরের যত্ন নিবেন আর সময়মত খাওয়া-দাওয়া করবেন। ওষুধ খেতে ভুলে যাবেন না।’
ফরিদ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারল না। তার ইচ্ছে হলো মেয়েটির মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে।
সোমার চোখ আবার ভিজে উঠেছে। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে এখন আর তার কিছুই করার নেই। চোখের পানি আটকানো যাবে না—সে চোখ মুছতে মুছতে দ্রুত গাড়িতে যেয়ে উঠল। একবারের জন্যেও আর ফিরে তাকাল না। ফরিদ ভাই আবার তার এই ভেজা চোখ দেখুক সে তা কিছুতেই চায় না।
ফরিদ বুঝতে পারল মেয়েটির খুব কষ্ট হচ্ছে। কেন কে জানে? ফরিদের নিজের কাছেও একটু খারাপ লাগছে। একটু নয়—বেশ ভালো পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু কেন? এই কেনর কোনো উত্তর ফরিদের জানা নেই। মাত্র একদিনের পরিচয়ে মেয়েটিকে মনে হচ্ছে প্রিয়জন কেউ।
মানুষের সম্পর্ক কত রকমের হতে পারে। কি জটিলতা এই সম্পর্কের। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এক অদ্ভুত মায়ার সম্পর্ক তৈরী হয়েছে সোমা আর ফরিদের মধ্যে যার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
কিছু সম্পর্কের পরিচয় শুধুই মায়া। এই সম্পর্কগুলোর না আছে কোন স্থায়ী বন্ধন, না আছে পিছুটান। তবুও সম্পর্কগুলো এক অদ্ভুত সুতায় বাঁধা পড়ে। বাস্তব জীবনে সম্পর্কগুলো অনেক বেশি জটিল এবং রহস্যে ঘেরা।
শহীদ গাড়ি ছেড়ে দিল। দূর থেকে ফরিদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
ফরিদ হাত উঁচু করে নাড়ল। শহীদের গাড়ি বাঁক নিয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া পর্যন্ত সে দাঁড়িয়ে রইল। (সমাপ্ত)
পরিশিষ্ট: যাবার সময় ফরিদের হাতে এক টুকরো সাদা কাগজ দিয়ে যায় সোমা। ফরিদ অবাক হয়েছিল—কিন্তু কিছু বলেনি তখন। ওরা চলে যাবার পর ফরিদ ভাঁজ খুলে দেখল, গোটা গোটা অক্ষরে কয়েকটি লাইন লেখা।
আপনাকে বলেছিলাম আমার একজন প্রিয় মানুষের কথা। আপনি জানতে চেয়েছিলেন, কে সে? ছোটো বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম যদি কোনো দিন তার সাথে দেখা হয়, তার হাত ধরে বলব—আপনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ। কথাটা তাকে বলা হয়নি। তার সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি। অথচ আমার দেখা হলো আপনার সাথে। আমার মনে হলো গত ২৪ ঘণ্টা আমি আমার প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্যেই কাটিয়ে গেলাম। আপনার কথা আমার মনে থাকবে। শুধু হাত ধরে বলা হলো না—আপনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ ফরিদ ভাই।

