সিমির মেইল পড়ার পরে একধরণের মিশ্র অনুভূতি হলো ফাহিমের। মেয়েটি তো দেখি খুব সহজ করেই উত্তর লিখেছে। যদিও ফাহিম বয়সের ব্যাপারটা নিয়ে নিজেই অস্বস্তিবোধ করছিল। সিমি কি তাহলে হতাশ হয়েছে? হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বয়স লুকিয়ে কি কোনো সম্পর্ক করা ঠিক? আর সম্পর্কের কথাই বা ভাবছে কেন সে। ইমেইলের মাধ্যমে পরিচয় আর তার সূত্র ধরে কিছুদিন মেইল আদান-প্রদান হয়েছে, এর বেশি কিছু তো নয়। এখানে কি কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? এটাকে কি কোনো সম্পর্ক বলা যায়? বন্ধুত্ব? আর বন্ধুত্ব যদি হয়ই, তাতে বয়সের ব্যবধান কতটা গুরুত্ব বহন করে। পুরো বিষয়টা অবশ্য নির্ভর করছে সিমির ওপর। তবুও নিজেকে পরিষ্কার রাখতেই অনেক ভেবে ফাহিম একটা মেইল লিখল।
সিমি,
আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল আমার বয়স জানার পরে তুমি হতাশ হবে। অবশ্য আমি চাইলেই বয়স লুকিয়ে তোমার বয়সের কাছাকাছি একটা সংখ্যা বলে দিতে পারতাম, কিন্তু তাতে কি ব্যাপারটা ভালো হতো? মিথ্যে বলার মতো কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই নি তাই যা সত্যি তাই বলেছি। লুকানোর তো কিছু নেই।
আমি জানি, তোমার বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে আমার মতো একজন বয়স্ক মানুষের বন্ধুত্ব ব্যাপারটা ঠিক যায় না। তাই তুমি যদি চাও তাহলে আমাদের যোগাযোগ কিংবা মেইল আদান-প্রদান এখানেই বন্ধ হতে পারে। আমি কিছুই মনে করব না।
মুনার সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য দশ বছরের মতোই। কিন্তু আমরা বেশ ভালো বন্ধু এবং আমাদের বন্ধুত্ব এখনো অটুট। শিকাগোর বাঙালি কমিউনিটির একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যেয়ে তার সাথে আমার পরিচয় তারপর বন্ধুত্ব, সেই ৯৭ সাল থেকে। বেশ দীর্ঘ সময়ই বলা যায়। আমাদেরও ঝগড়া হয়, ভুল বোঝাবুঝি হয়। কিন্তু মুনা তার যে কোনো আনন্দ বা কষ্টের কথা আমাকে বলে, সম্ভবত প্রথমেই। ব্র্যাড নামে আমেরিকান এক শ্বেতাঙ্গ ছেলের সাথে সম্প্রতি তার সম্পর্ক হয়েছে—ব্রাডের সাথে তার সম্পর্কের খুঁটিনাটি পারলে প্রতিদিনই আমাকে কিছু জানায়। এমন নয় যে আমি ছাড়া মুনার আর কোনো বন্ধু নেই। আমার কাছে তার বিশ্বাসের একটা জায়গা আছে, তাই হয়ত সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। নির্দ্বিধায় বলতে পারে সব কিছু।
এসব কথা বলার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আমাকেও তোমার বিশ্বাস করতে হবে এবং তোমার সব কথা বলতে হবে। তবে যদি বিশ্বাস করোই, তোমার আস্থার জায়গাটা অটুট থাকবে।
জানি না এসব কথা আমি কেন তোমাকে বলছি। আমার একধরণের গিলটি ফিলিং হচ্ছিল। সম্ভবত সেই অনুশোচনা কাটাতেই এত কথার অবতারণা।
বন্ধুত্ব হলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক—আত্মার শক্তিশালী বন্ধন। এখানে বয়সের ব্যবধান কোনো বাধা নয়। আমার কাছে বন্ধুত্ব মানে বয়সের সাথে বয়সের মিল নয়, বরং মনের সাথে মনের।
ভালো থেকো।
ফাহিম।
মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে নিজেকে বেশ হালকা লাগছিল ফাহিমের। অসম বয়সী বন্ধুত্ব যে কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, সে সম্পর্কে নাতি দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে বিষয়টির যৌক্তিকতা বোঝাতে যে পেরেছে এতেই সে খুশি।
পরের দিন মোটামুটি উৎকণ্ঠা নিয়ে কাটলো ফাহিমের সময়। প্রায় প্রতি ঘণ্টায় একবার করে মেইল চেক করল সে। কিন্তু সিমির কোনো মেইলের দেখা পাওয়া গেল না।
পরের দিনও না, তারপরের দিনেও না। ফাহিমের উৎকণ্ঠা বেড়ে গেল। সিমি যদি ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে না চায়, তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। সেই অধিকার তার আছে। কিন্তু সেটা জানালে তো ক্ষতি নেই। এটুকু সৌজন্যাতাটুকু অন্তত সে দেখাতে পারত। কিন্তু ফাহিমের অবচেতন মন বলছে, সিমি শেষবারের মতো হলেও একটা মেইল তাকে পাঠাবে। তাই সে প্রতিদিনই সুযোগ পেলেই মেইলবক্স খুলে দেখতে থাকল।
সিমি কি তাহলে সত্যিই রাগ হলো কিংবা হতাশ? না হলে কোনো উত্তর নেই কেন? এতদিন তো মেইল পেয়েই উত্তর দিয়েছে! যে সম্পর্কের দানাই বাঁধল না ঠিকমতো এখনো, তা কি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে?
আরো একদিন পর সিমির ইমেইল এলো। ফাহিমের উত্তেজনা বেড়ে গেল। তারপরেও যথা সম্ভব স্থির হয়ে সে মেইল খুলে পড়া শুরু করল।
হেই হেই হেই, ডোন্ট গেট আপসেট, ম্যান। তুমি আমার সম বয়সী নও, তাতে কী হয়েছে। তোমার যদি আমাকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিতে সমস্যা না হয়, তাহলে আমার কেন হবে? তাছাড়া বয়স আসলেই কোনো বাঁধা নয়, হওয়া উচিৎও নয়। তুমি যেমন বললে, আমিও ঠিক তাইই মনে করি।
কি খুব টেনশনে ছিলে বুঝি—আমি যোগাযোগ বন্ধ করে দিবো এই ভয়ে? আরে ধুর। সেসব কিছুই না। পারিবারিক কিছু ঝামেলা ছিল, মূলত শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সঙ্গেই, জমিজমা সংক্রান্ত। যাই হোক, তোমাকে এভাবে অপেক্ষায় রাখাটা ঠিক হয় নি। কয়েকটি লাইন অন্তত লিখে পাঠিয়ে দিতে পারতাম। তারপর মনে হলো, তোমাকে একটু টেনশনে রাখা যাক। ভীষণ দুঃখিত। এক্সট্রিমলি সরি।
দেখতে চেয়েছিলাম, আমার বিরহে কতটা কাতর হও তুমি! একটু কি মন কেমন কেমন করেছে?
আমি যখন রানার প্রেমে পড়ি, আমার বয়স তখন বিশ বছর আর রানার একত্রিশ। হ্যাঁ, আমার চেয়ে এগারো বছরের বড় ছিল সে। দেখতেই পাচ্ছ, বয়স কিন্তু কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি প্রেমে পড়বার কিংবা ভালোবাসবার এবং বিয়ে করবার জন্য, তাহলে শুধুই বন্ধুত্বের জন্য কেনই বা সেটা বাঁধা হবে? আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় অনেক বন্ধুই আমার আছে। এমন কি আমার বাবার বয়সীও। 😛 তোমার বয়স নিয়ে আমি একেবারেই চিন্তিত নই, আপসেটও নই। কাজেই মাথা থেকে ঐ উদ্ভট চিন্তা বের করে দাও।
যাইহোক, আমি যখন কাউকে বন্ধু ভাবি, তখন কে বয়সে বড় আর কে ছোট সেগুলো আমার মাথায় থাকে না। আমি তাকে বন্ধুর মতোই ট্রিট করি। হাসি-ঠাট্টা খুনসুটি করি, দুষ্টুমি করি, এমন কী ধমকও দেই। আগেই জানিয়ে রাখলাম। পরে আবার বলতে পারবে না মেয়েটি এমন কেন? আমি এমনই।
তুমি কিন্তু আমাকে তোমার জন্ম তারিখটি জানাও নি। বন্ধুর জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে হবে না? তবে তুমি যদি জানাতে না চাও—তাহলে ভিন্ন কথা।
তুমি আমাকে ইনিয়ে বিনিয়ে অসম বয়সের বন্ধুত্বের বিষয়ে অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছ। জানিয়েছ তোমার গিলটি ফিলিং এর কথা। কিন্তু আমি বুঝতে পারি নি, কেন এমন অনুভূতি তোমার হলো। দেখো, তোমাকে না জেনে না চিনেই আমি কিন্তু আমার জীবনের কত কথা বলে দিলাম অকপটে, নিশ্চিন্তে। না বললেও পারতাম, তবুও বলেছি। আমি রানার প্রসঙ্গে কিছু না বললে, আমাদের কথা হয়ত সেখানেই থেমে যেত। কিন্তু আমি বলেছি। মাঝে মাঝে জীবনের কিছু কিছু কথা কাউকে না কাউকে তো বলতেই হয়। আর তাই তো, কাছের কেউ, পরিচিত এমন কী অপরিচিত অনেকের সঙ্গেও পথে ঘাটে, চলতি পথে জীবনের বিশেষ কোনো গল্প আমরা শেয়ার করি। করি না?
আমি তোমার মেইলের অপেক্ষায় থাকব। তোমার প্রতিটা লেখা আমাকে শক্তি দেয়, কীভাবে জানি না, তবে দেয়। মনে হয় কেউ অন্তত একজন আছে যে আমাকে নিয়ে ভাবছে। কাজের ফাঁকে। অবসরে। কারো ভাবনায় থাকাটাও কিন্তু আশীর্বাদ। আমরা কি সবাইকে নিয়ে ভাবি?
আচ্ছা তোমার কি কোনো মেসেঞ্জার প্রোগ্রাম আছে, লাইক ইয়াহু কিংবা এমএসএন? যদি থাকে তাহলে আমরা মাঝে মাঝে অনলাইনে চ্যাট করতে পারি। তাহলে মেইলের অপেক্ষায় না থেকে খুব সহজেই কথা বলা যাবে। ভালোভাবে একে অপরকে চেনাও হবে। জানাও যাবে। অবশ্যই যদি তুমি চাও—তবেই।
আশাকরি তুমি আমাকে খুব তাড়াতাড়িই লিখবে—আরো অনেক কথা অনেক।
অনেক ভালো থেকো। অপেক্ষায় রইলাম।
সিমি।
সিমির মেইলটা পেয়ে কী এক ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে রইল ফাহিমের মন। মেয়েটার প্রতি সীমাহীন কৃতজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল সে।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৪)
সিমির দীর্ঘ চিঠিটি বেশ কয়েকবার পড়ল ফাহিম। চিঠি পড়তে পড়তেই মেয়েটির প্রতি কেমন যেন একটা টান অনুভব করতে লাগল সে। এটা কিসের টান? বন্ধুত্বের? অন্যান্য সম্পর্কের তুলনায় বন্ধুত্বের টান অনেক বেশি। যা হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও অনুভব করা যায়। অফিস থেকে বের হয়ে যাবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ফাহিম দ্রুত একটা মেইল লিখে ফেলল।
হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ, সিমি!
জেনে খুশি হলাম, আমাকে তোমার বন্ধু বিবেচনা করেছ। আমার সম্পর্কে বলতে বলেছ, কিন্তু কী বলব? আমার সম্পর্কে বলার মতো তেমন কোনো কথা নেই তবুও সহজ হতো যদি নির্দিষ্ট করে কিছু জানতে চাইতে।
এটুকু লিখে ফাহিম কথা হারিয়ে ফেলল। আর কী লিখবে? হঠাৎ মনে পড়ল মুনার কথা। সেদিন মুনার সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল, তখন সে সিমির সাথে তার কাকতালীয় ভাবে পরিচয়ের ঘটনাটি খুলে বলল। মুনার কথাই তাহলে কিছু লেখা যাক। ফাহিম লিখল—
সেদিন মুনার সাথে কথা হলো। বললাম তোমার কথা। সে তো ভীষণ অবাক। সে ভেবেই পাচ্ছে না, তোমার সাথে আমার পরিচয়টা হলো কী করে! আমি তাকে সব খুলে বললাম। তোমার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল মুনা। বলল, তুমি অনেক ভালো এবং বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে। আমি অবশ্য বলেছি সে কথা আমি জেনে গেছি ইতোমধ্যেই। মুনা অবশ্য বাঁকা হেসে বলেছে—তাই? আমিও হেসেছি। তোমার কী মনে হয়, তোমাকে কি একটু হলেও চিনেছি আমি?
আজ এটুকুই। হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ।
ফাহিম।
মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে ফাহিম বাসার দিকে রওয়ানা দিল।
…
ফাহিম একটু দেরীতেই ঘুমাতে যায়। মাঝে মাঝেই মাঝরাত পেরিয়ে যায়। রাত সাড়ে বারোটার দিকে কী মনে করে সে তার বাসার কম্পিউটারে লগইন করল এবং মুহূর্তেই তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এত দ্রুত সিমির মেইল আসবে সে ভাবতেও পারে নি। সিমি লিখেছে—
বন্ধু আমার,
হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ টু ইউ টু।
আমি জানি না মুনা ঠিক কী বলেছে তোমাকে আমার সম্পর্কে, কিন্তু মনে হচ্ছে সে একটু বেশিই বলেছে। একে অপরকে জানার মতো যথেষ্ট সময় কিন্তু আমরা পাই নি। তাই ঠিক কী কারণে সে আমাকে ভালো কিংবা বুদ্ধিমতী বলেছে, আমি বুঝতে পারছি না। তবুও তোমার কাছে আমার সম্পর্কে উচ্চ ধারণা দেবার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। আমার হয়ে তুমি জানিয়ে দিও।
এখন যেহেতু আমরা নিজেরাই বন্ধু হয়ে গেলাম, তুমি নিজেই ধীরে ধীরে বুঝে যাবে আমি কেমন—তখন নিজেই জাজ করতে পারবে, আমি ভালো আর বুদ্ধিমান না বোকা।
তোমার সম্পর্কে কিছুই বলো নি। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, এই যেমন তুমি কে, কোথায় থাকো, কী করো, দেখতে কেমন, বয়স কত, পড়াশুনা কতদূর ইত্যাদি ইত্যাদি। তোমার সম্পর্কে অল্প কিছু কথা আর তোমার পরিচয়। অন্য কাউকে নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে যা বলো, ব্যাস সেটুকুই।
আশাকরি আমার মেইলের উত্তর পেয়ে যাবো তাড়াতাড়ি। অপেক্ষায় রইলাম।
অনেক শুভ কামনা।
সিমি।
…
ফাহিমের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে সিমির মেইলের জন্য অপেক্ষা করা আর তার উত্তর দেয়া একটি অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল। এই অপেক্ষার অনুভূতি অন্যরকম। হঠাৎ এই ইলেকট্রনিক চিঠির প্রতি একধরণের ভালো লাগা শুরু হয়ে গেছে তার। এ যাবৎকালে এক অফিসের ইমেইল ছাড়া নিয়মমাফিক কখনো কারো মেইলের উত্তর দিতে হয় নি। তবে একান্ত ব্যক্তিগত আর মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য এই মাধ্যমটির প্রতি সে কৃতজ্ঞতা অনুভব করল।
ফাহিমের মনে আছে, কলেজে থাকতে একবার বাসের সিটের পেছনে লেখা একটা মেয়ের ঠিকানা পেয়েছিল। মেয়েটির বাড়ির ছিল জয়পুরহাটে। সে কী মনে করে সেই ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠিয়ে দিল। সে চিঠির কথা সে ভুলেও গেল। প্রায় মাস খানেক পরে হঠাৎ সেই মেয়েটির কাছ থেকে উত্তর পেয়ে ফাহিমের যে কী আনন্দ হয়েছিল, সে কথা বলে হয়তো সে বোঝাতে পারবে না। মেয়েটির সাথে তার বন্ধুত্ব টিকে ছিল বহু বছর। পরে সে উচ্চ শিক্ষার্থে রাশিয়া চলে যায়। এরপর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
চিঠি লিখে বন্ধু হওয়া বা পত্র মিতালির শখটি এখন আর নেই। তখন একটা পত্রিকায়, যারা পত্র মিতালি করতে চায় তাদের ঠিকানা ছাপানো হতো। সেটা দেখেই চিঠি পাঠিয়ে বন্ধুত্ব করা হতো। আহা কী মধুর ছিল সেই দিনগুলি।
আর এখন মিনিটে মিনিটে মেসেজ, ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ—কী নেই এই সভ্য সমাজে। সবকিছু সহজলভ্য, ডেটিং, ফিল্ডিং, কেনাকাটা, রাত জেগে ভিডিও কল, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, এই দিবস, সেই দিবস।
ভাবনার ডালি সরিয়ে সিমির মেইলের উত্তর লিখতে বসল ফাহিম।
প্রিয় সিমি,
১৯৯৪ সনে ফেব্রুয়ারি মাসের এক হিমশীতল দিনে আমি আমেরিকার শিকাগো শহরে আসি। প্রথম দিন থেকেই এই শহরটির প্রেমে পড়ে যাই। আমি যখন প্লেন থেকে নেমে আমার গন্তব্যে যাচ্ছিলাম, তখন চারিদিকে ঝিরিঝিরি তুষারপাত হচ্ছিল। পেঁজা তুলোর মতো। আমার মনে আছে, আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্পে পড়েছিলাম ফার্গো শহরের তুষারপাতের কথা। আজ বাইরে খুব তুষারপাত হচ্ছে। রাস্তাঘাট ঢেকে গেছে সাদা বরফে। সে যে কী অপূর্ব দৃশ্য… দীর্ঘদিন আমার মাথার মধ্যে সেই দৃশ্য গেঁথে ছিল। সেদিন শিকাগো শহরের সেই তুষারের সৌন্দর্য দেখে আমিও বিমোহিত হয়েছিলাম। সেই অনুভূতির কথা কখনোই ভোলার নয়।
এবার পড়াশুনায় আসা যাক। দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন করে এসেছিলাম, তাই শিকাগোর একটা স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি। এই মুহূর্তে একটা বড় কোম্পানিতে সফটওয়্যার প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি।
আমার বয়স জানতে চেয়েছ। তারুণ্য ও যৌবনকে অনেকখানি পেছনে ফেলে এসেছি আমি। এক মাস পরেই চল্লিশের ঘরে পড়ব। সময় এতো দ্রুত পার হয়ে যায় যে, মাঝে মাঝেই খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিতে হয় সময়ের গতিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বয়স বিশ ও তিরিশের কোঠা পেরিয়ে চল্লিশের ঘরে চলে আসে। চল্লিশ বছর—একেবারেই কম নয় কিন্তু!
আমার তৃতীয় ইন্দ্রিয় বলছে, আমি কম করে হলেও তোমার থেকে দশ বছরের বড় হবো। আমি কি ঠিক?
এবার তোমার পালা। অপেক্ষায় রইলাম
ফাহিম।
পুনশ্চ: আমার কিন্তু মনে হয় না যে মুনা তোমার সম্পর্কে বাড়িয়ে কিছু বলেছে।
সেন্ড বাটনে চাপ দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ফাহিম। কেমন যেন একটু অস্বস্ত্বি বোধ করল। সে হঠাৎ করেই সেন্ড ফোল্ডারে যেয়ে তার পাঠানো মেইলটি আরেকবার পড়ল। প্রায় প্রতিবারই সে এই কাজটি করে থাকে। অথচ কাজটি করা উচিৎ মেইল পাঠানোর আগে। একবার পাঠানো হয়ে গেলে তো আর কিছু করার থাকে না। তার অবচেতন মনের অস্বস্ত্বির বিষয়টি তখনই চোখে পড়ল। আর সেটি হচ্ছে বয়স। তার বয়স চল্লিশ সে কথা জানিয়ে সে সূক্ষ্মভাবে একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছে। এটা সে কেন করছে? সিমি যদি অন্যরকম কিছু একটা ভেবে বসে তাহলে বিষয়টা কেমন হবে? ফাহিমের অস্বস্তিবোধ আরো বেড়ে গেল।
সেদিন দুপুরেই সিমির উত্তর এলো।
হ্যালো ফাহিম,
তোমার মেইল পেয়ে আমি হাসতে হাসতে শেষ। তোমার তৃতীয় ইন্দ্রিয় সঠিক আন্দাজটিই করেছে—ইউ আর কোয়াইট ওল্ড, ম্যান! এতদিন আমি কল্পনায় যাকে দেখেছি সেই মানুষটি আমার থেকে দশ বছরের বড় হবে ভাবিনি কখনো। আমি ভেবেছিলাম তুমি যেহেতু মুনার বন্ধু, তুমি হয়তো আমাদের বয়সীই কেউ হবে। কী একটা ঝামেলা হয়ে গেল বলো তো। আর এদিক থেকে আমি সমানে তুমি তুমি করে বলে যাচ্ছি। আই অ্যাম সো সরি। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।
অবশ্য তুমি চাইলে আমি আপনিতে ফিরে যেতে পারি। যদিও আমি তুমি বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।
আমার সম্পর্কে তেমন কিছু বলার নেই। এক সময় আমি ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে কাজ করতাম। আমাদের ছোট একটা ব্যবসাও ছিল ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং ফার্ম, যেটা আমি আর রানা একসাথেই চালাতাম। এখন যেহেতু রানা নেই আর আমি একা, ব্যবসাটা আমি আর চালাতে চাচ্ছি না। আমি একটা চাকরী খুঁজছিলাম। ইনফ্যাক্ট, আমি একটা চাকরী পেয়েও গেছি—একটা আইএসপি কোম্পানিতে। ইনশাল্লাহ আগামী মাস থেকেই শুরু করবো।
আগামী মাসেই যেহেতু তুমি চল্লিশে পড়ছ, তোমার জন্ম তারিখটা জানিও।
অশেষ ধন্যবাদ তোমার মেইলটির জন্য। এবং অবশ্যই দ্রুত উত্তর দেবার জন্য। তোমার চিঠিগুলো আমার একাকীত্বে কিছুটা হলেও সঙ্গ দিচ্ছে, এটাই বা কম কী?
ভালো থেকো।
সিমি।
পুনশ্চ: এখন থেকে আমি কি তোমাকে ফাহিম বলব নাকি শেষে একটা ‘ভাই’ জুড়ে দেব—ফাহিম ভাই!?
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (শেষ পর্ব)
শহীদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। সোমার এমন কঠিনরূপ সে কখনো দেখেনি—দেখার অবশ্য কথাও না। সে ফরিদের দিকে তাকাল অসহায় দৃষ্টিতে। ফরিদ অবাক হয়ে চেয়ে আছে সোমার মুখের দিকে।
সোমা বলল, ‘ফরিদ ভাই, আপনি আমার দেশে যাবার ব্যবস্থা করেন।’
ফরিদ সুযোগ পেয়ে এবার মধ্যস্থতা করার জন্যে বলল, ‘আচ্ছা দাঁড়াও দাঁড়াও—এত অস্থির হচ্ছো কেন? তার আগে একটু শুনে নেই কী ঝামেলা হয়েছিল। নিশ্চয়ই এমন কিছু একটা হয়েছিল—একটা জেনুইন কারণেই হয়ত সে আসতে পারেনি।’ ফরিদ শহীদের দিকে ঘুরে বলল, ‘কী হয়েছে বলো তো ভাই?’ তারপর সে সোমাকে বলল, ‘সোমা তুমি বসো। এসো শোনা যাক—ঘটনাটা কি?’
সোমা কিছুক্ষণ ইতস্তত করে হেঁটে গিয়ে বসল শহীদের পাশের সোফাতে। ভাবতে অবাক লাগছে, এই মানুষটার জন্যেই সে কত হাজার মাইল পাড়ি দিয়ে ছুটে এসেছে অথচ এখন তাকে কেমন দূরের মানুষ মনে হচ্ছে।
ফরিদ শহীদকে বলল, ‘এবার বলো। কী এমন হয়েছিল যে তুমি এয়ারপোর্টে নিজের স্ত্রীকে আনতে যাওনি?’
শহীদ একটু নড়েচড়ে বসল। একটু ভূমিকা দিয়ে সে কথা বলা শুরু করল, ‘ফরিদ ভাই, আপনার সাথে আজকে আমার প্রথম পরিচয়। আমি দু’বছর আগে শিকাগোতে এসেছি—আগে ছিলাম নিউ ইয়র্কে। এটা ঠিক এখানে আমার তেমন কোনো বন্ধু বান্ধব নেই। যারা আছে—তারা কেউ এখানে থাকে না। অন্য জায়গায় চলে গেছে। সোমার সঙ্গে আমার বিয়েও হয়েছে দু’বছর।’
‘হ্যাঁ সোমা বলেছে।’ ফরিদ বলল।
‘আপনি তো জানেনই এখানে জীবন কত কঠিন। আগে একা ছিলাম, যা ইনকাম হতো–চলে যেত। কিন্তু বিয়ে করার পরে বুঝতে পারলাম, সংসার বড় হবে। টাকা-পয়সা রোজগার করতে হবে বেশি করে। সেই চিন্তা করেই আমি প্রায়ই ডাবল শিফট ক্যাব চালাচ্ছিলাম দীর্ঘদিন। আমার মেইন উদ্দেশ্য ছিল, সোমা আসার পরে আমার যেন কমপক্ষে এক সপ্তাহ কাজ করতে না হয়। ওকে নিয়ে ভ্যাকেশনে যাবো।’
ফরিদ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘দ্যাটস গ্রেট।’
‘মাঝে মাঝে একটু ব্রেক নিয়ে, গত তিনদিন আমি একটানা ক্যাব চালিয়েছি।’
ফরিদ বলল, ‘বলো কী?’
‘জি ফরিদ ভাই। আমার মধ্যে এক ধরনের এক্সাইটমেন্ট কাজ করছিল।’
ফরিদ একটু মুচকি হাসল। সোমা নির্বিকার।
শহীদ আবার বলল, ‘তো গতকাল সারারাত গাড়ি চালিয়ে ভোরে যখন বাসায় ফিরছিলাম—ভেবেছিলাম বাসায় গিয়ে ছোট্ট একটা ঘুম দিয়ে আটটার দিকে এয়ারপোর্টে চলে যাব। কিন্তু…’
‘কিন্তু?’
শহীদ এবার পুরো ঘটনাটার বর্ণনা করল। ঘটনাটা এই রকম…
রাতের শিফটে কাজ শেষ করে ভোর পাঁচটার দিকে শহীদ ফিরে আসছিল বাসার দিকে। বড় রাস্তা থেকে ছোট রাস্তায় ঢুকতেই একজন প্যাসেঞ্জার হাত তুলে শহীদের গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। শহীদ জানালা নামিয়ে দেখল প্রায় ছ’ফুটের মত লম্বা একজন কালো যুবক—মাথায় কালো টুপি, গায়ে লম্বা জ্যাকেট, এক হাত পকেটের ভিতর। শীতের ভোর— ঘন কুয়াশার কারণে চারিদিক তখনো অন্ধকার। রাস্তা সম্পূর্ণ ফাঁকা। আশে পাশে কেউ নেই। শহীদ বলল, ‘সরি ম্যান—আই’ম নট ফর হায়ার।’
‘হেই ম্যান, আই’ভ অ্যান ইমার্জেন্সি। আই নিড অ্যা রাইড।’ যুবকের চোখে মুখে আকুতি ফুটে উঠল।
‘আই’ম সরি। আই ক্যান্ট। আই নিড টু গো হোম। আই ড্রোভ লাস্ট টুয়েলভ আওয়ার্স—আই’ম রিয়েলি টায়ার্ড।’
‘কাম অন ম্যান—আই উইল পে ইউ গুড। দিস ইজ ইমার্জেন্সি। মাই মাম ইজ সিক—আই নিড টু টেক হার টু হসপিটাল। লেট মি গেট ইন।’
ছেলেটির মায়ের কথা শুনে শহীদ একটু ভাবল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই ছেলেটি দরজা খুলে উঠে বসল গাড়ির পিছনের সীটে। ‘লেট’স গো।’ দরজা বন্ধ করে ছেলেটি বলল।
হাল ছেড়ে দিয়ে শহীদ জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার আর ইউ গোয়িং? গিভ মি দ্য এড্রেস।’
সে কিছুই বলল না। শহীদ ইতস্তত করে গাড়ি ঘুরিয়ে বড় রাস্তার দিকে ছুটে চলল। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারল না। বড় রাস্তায় উঠার আগেই একটা নির্জন মতো জায়গায় হঠাৎ করেই শহীদের ঘাড়ের উপর পিস্তল ঠেকিয়ে যুবক কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘স্টপ দ্য কার। স্টপ দ্য কার। গিভ মি ইয়োর মানি।’
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে শহীদ বলল, ‘হেই ম্যান, লিসেন। ইউ ক্যান্ট ডু দিস টু মি। আই’ম ট্রায়িং টু হেল্প ইয়ু।’
‘ডোন্ট ওয়েস্ট মাই টাইম—গিভ মি দ্যা ওয়ালেট। ওপেন ইয়োর ওয়াচ। গিভ ইট টু মি। ইয়োর ফোন ঠু।’
শহীদের অনেক কষ্টার্জিত ডলার। ডাবল শিফট কাজ করে, না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, সকাল-সন্ধ্যা-রাত একটানা কাজ করছে সে শুধু অতিরিক্ত কিছু রোজগার করার জন্যে। আর সেই টাকা এত সহজেই একজন নিয়ে যাবে তা কী করে হয়। শহীদ কিছুতেই দিতে চাইল না। কিন্তু পিস্তলের মুখে নিজেকে বড়ই অসহায় মনে হলো। ক্যাব ড্রাইভিং লাইসেন্স নেবার ট্রেনিং এর সময় সে শিখেছিল—যদি ছিনতাইকারীর কবলে পড়—চোখ বন্ধ করে যা আছে সব দিয়ে দাও। দ্বিতীয় চিন্তা করার অবকাশ নেই। অলওয়েজ রিমেমবার, লাইফ ইজ মোর ইম্পরট্যান্ট দ্যান এনিথিং। ডোন্ট রিস্ক ইয়োর লাইফ ফর ম্যাটেরিয়াল থিংস।
শহীদ অবশ্য বেশিক্ষণ চিন্তা করার অবকাশ পেল না। তার দেরী হচ্ছে দেখে পিস্তলধারী শহীদের মাথার পিছনে পিস্তলের বাট দিয়ে সজোরে আঘাত করল। মুহূর্তেই চোখে অন্ধকার দেখল সে। এরপরে আর কোনো শব্দ না করে ভীত সন্ত্রস্ত শহীদ একে একে সবকিছু দিয়ে দিল যুবকের হাতে। কিন্তু তারপরেও শেষ রক্ষা হলো না। ছিনতাইকারী যুবক শহীদের মাথার পিছনে পুনরায় আঘাত করল সজোরে এবং মুহূর্তেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে গেল সে।
তারপরে তার আর কিছুই মনে নেই। তার যখন সংজ্ঞা ফিরে এলো তখন নিজেকে আবিষ্কার করল গাড়ির পিছনে হাত বাঁধা অবস্থায়। মুখ টেপ দিয়ে আটকানো। ঠাণ্ডায় তার সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আছে। তবুও সে কোনো রকমে মাথাটা উঁচু করে দেখল—দিনের আলো দেখা যাচ্ছে। কিন্তু সেটা দিনের কোন সময় সে কিছুই বুঝতে পারল না। শহর থেকে অনেক দূরে একটা কান্ট্রি রোডের পাশে তার গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। এতদূরেই বা তার গাড়ি কে নিয়ে আসল সেটাও জানা গেল না। শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে সে উঠে বসতে চাইল কিন্তু পারল না। ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই সে আবারো জ্ঞান হারালো।
শহীদের যখন দ্বিতীয়বার জ্ঞান ফিরল—তখন সে শুয়ে আছে শিকাগো সাউথ সাইডের একটি হাসপাতালের ইমার্জেন্সি বেডে। গরম ব্লাঙ্কেট দিয়ে তার সারা শরীর মুড়িয়ে রাখা। দীর্ঘ সময় তীব্র শীতের মধ্যে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় পড়ে থাকায় আর অস্বাভাবিকভাবে শরীরের তাপমাত্রা কমে যাওয়ায় তার হাইপোথার্মিয়ার মতো হয়ে যায়।
যেসব দেশে বরফ পড়াটা স্বাভাবিক, সেসব দেশে হাইপোথার্মিয়ায় মৃত্যুর ব্যাপারটাও মানুষের কাছে পরিচিত। হাইপোথার্মিয়া শুরু হয়ে গেলে অবধারিতভাবেই মানুষটির শরীরে কাঁপুনি শুরু হয়ে যায়। অনেকে স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। দিকভ্রান্ত হয়—হোঁচট খেতে থাকে এবং গতি ধীর হয়ে যায়। একটা পর্যায়ে শ্বাস-প্রশ্বাস এবং হৃৎস্পন্দন আশঙ্কাজনক মাত্রায় কমে আসে—মানুষ জ্ঞান হারায় এবং মারা যায়।
শহীদের শরীরের তাপমাত্রা যখন স্বাভাবিক হয়ে এলো, সে যখন স্বাভাবিক কথা বলতে পারছে তখন দায়িত্বরত ডাক্তার হাইপোথার্মিয়ার বিষয়টি তাকে ব্যাখ্যা করল। শহীদ বাসায় যেতে চাইলে ডাক্তার বলল, রাতটা তাকে অবজার্ভ করে সকালে রিলিজ দিয়ে দেবে—তার আগে নয়।
ঘটনা এ পর্যন্তই।
সব শুনে ফরিদ বলল, ‘ও মাই গড!’ বলেই সে তাকাল সোমার দিকে। সোমা চোখ বড় করে তাকিয়ে আছে শহীদের দিকে।
শহীদ বলল, ‘সারাটা রাত আমার যে কী যন্ত্রণা হয়েছে—সোমার চিন্তায় শুধু ছটফট করেছি।’ বলেই শহীদ তাকাল সোমার দিকে।
সোমা তাকিয়ে থাকতে পারল না। সে চোখ ঘুরিয়ে নিল।
ফরিদ বলল, ‘তো তুমি পুলিশে যোগাযোগ করো নাই কেন?’
‘আমি যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম, তখন দেখলাম আমি হসপিটালের বেডে শুয়ে আছি। পুলিশই আমাকে উদ্ধার করে হসপিটালে নিয়ে যায়। পুলিশ একটা রিপোর্ট করেছে—বলেছে সুস্থ হয়ে ওদের সাথে কথা বলতে। সাথে ফোন না থাকাতে কারো সঙ্গেই আর যোগাযোগ করতে পারি নাই।’
এরপরে আর কেউ কোনো কথা বলল না। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর ফরিদ জানতে চাইল, ‘হসপিটাল থেকে ছাড়া পেয়েছ কখন?’
‘আজ সকালে। সেখান থেকে সরাসরি বাসায় ফিরেই দেখলাম ইকবাল ভাই আর বাদশা দাঁড়িয়ে আছে বাসার সামনে। তাদের কাছেই জানলাম সোমা আপনার এখানে…’
শহীদ আবার তাকাল সোমার দিকে। সোমা শাড়ির আঁচলে চোখ চেপে ধরে আছে।
ফরিদ বলল, ‘তুমি এখন কেমন বোধ করছ?’
‘ভালো—তবে মাথার এই পেছনটায় ব্যথা আছে এখনো। ফোলাটা একটু কমেছে অবশ্য।’
‘চা-কফি কিছু খাবে? ব্রেকফাস্ট করেছো?’
শহীদ মাথা নেড়ে বলল, ‘না ফরিদ ভাই। আপনি এমনিতেই অনেক করেছেন…’
‘আরে এটা তো একজন বাঙালী হিসেবে আমার দায়িত্ব। আমি আমার দায়িত্বটুকুই পালন করেছি। আর তুমি এই শিকাগোতে এসেছে অথচ আমার সঙ্গে যোগাযোগ নেই… এই শহরে এমন কোনো বাঙালী নেই যে পারসোনালি আমাকে চিনে না।’
‘আমি আপনার নাম শুনেছি ফরিদ ভাই… কিন্তু যোগাযোগটা করা হয়নি।’
ফরিদ এবার সোমাকে বলল, ‘এবার তো বুঝতে পেরেছ সোমা, কী হয়েছে? থ্যাঙ্কস গড যে বড় কোনো দুর্ঘটনা ঘটে যায়নি।’
সোমা চুপ করে রইল। তার ভেতরটা উলট-পালট হয়ে যাচ্ছে। একটা মানুষের উপর এত বড় একটা ঝড় বয়ে গেছে আর তার উপর সে রাগ করে ছিল!
শহীদ সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘চলো সোমা।’
ফরিদ বলল, ‘যাও সোমা তৈরী হয়ে এসো। এখন তোমার রাগ কমেছে তো?’
সোমা মৃদু হাসল। ফরিদ আবার বলল, ‘যাও যাও।’
সোমা উঠে চলে গেল এবং কিছুক্ষণের মধ্যে কাপড় বদলে তার ছোট্ট সুটকেসটা নিয়ে নীচে নেমে এলো।
ফরিদের বাসার সামনের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে সোমা আর ফরিদ।
শহীদ তার জীপ চেরকিতে সোমার লাগেজ দুটি তুলে দিয়ে এসে দাঁড়াল সোমার পাশে। সোমার কী হয়েছে কে জানে। হঠাৎ করেই চোখ ভরে যাচ্ছে পানিতে। গত ২৪ ঘণ্টায় চোখের পানি এত ঝরেছে—তারপরেও এখন সে আবার কাঁদছে।
ফরিদ অবাক হয়ে লক্ষ্য করল সোমার চোখ ভিজে যাচ্ছে। সে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার জন্যে বলল, ‘সোমা, আবার কাঁদছ? এবার কী হারিয়ে যাওয়া মানুষকে ফিরে পেয়েছ এই আনন্দে নাকি অন্য কিছু?’
সোমা চোখ মুছল। দীর্ঘক্ষণ সে কোনো কথা বলেনি। এবার মৃদু স্বরে বলল, ‘দোয়া করবেন আমাদের জন্যে।’ বলেই হাত ব্যাগ থেকে সেই রুমালখানি বের করে ফরিদকে দিয়ে বলল, ‘আপনার রুমাল।’
ফরিদ হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘দেখো সোমা, কাল রাতে তুমি আমাকে রান্না করে খাইয়েছ। তোমাকে তো আর বাবুর্চি খরচ দিতে পারব না—ধরে নাও এই রুমালটিই আমার গিফট। আমি খুব খুশী হবো তুমি যদি রাখো।’
সোমা মৃদু হেসে রুমালটি হাত ব্যাগে রেখে দিল।
শহীদ বলল, ‘আসি ফরিদ ভাই।’
‘এসো। ভালো থেকো। সাবধানে যেও। আর যখন যা লাগবে আমাকে জানাবে। আর শোন, এবার কিছু বাংলাদেশি বন্ধু-বান্ধব বানাও। তা নাহলে তো তোমাকে খুঁজে পাওয়াই মুস্কিল। ’
শহীদ হেসে বলল, ‘জি ফরিদ ভাই—অবশ্যই।’ তারপর সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সোমা চলো যাই।’
সোমা আরো কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল—তারপর হঠাৎ করেই নিচু হয়ে ফরিদকে দু’হাতে সালাম করল। ফরিদ কিছু বলার আগেই সোমা উঠে দাঁড়িয়ে বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে বলল, ‘ভালো থাকবেন। শরীরের যত্ন নিবেন আর সময়মত খাওয়া-দাওয়া করবেন। ওষুধ খেতে ভুলে যাবেন না।’
ফরিদ বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। কিছু একটা বলতে চেয়েও বলতে পারল না। তার ইচ্ছে হলো মেয়েটির মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দিতে।
সোমার চোখ আবার ভিজে উঠেছে। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। সে বুঝতে পারছে এখন আর তার কিছুই করার নেই। চোখের পানি আটকানো যাবে না—সে চোখ মুছতে মুছতে দ্রুত গাড়িতে যেয়ে উঠল। একবারের জন্যেও আর ফিরে তাকাল না। ফরিদ ভাই আবার তার এই ভেজা চোখ দেখুক সে তা কিছুতেই চায় না।
ফরিদ বুঝতে পারল মেয়েটির খুব কষ্ট হচ্ছে। কেন কে জানে? ফরিদের নিজের কাছেও একটু খারাপ লাগছে। একটু নয়—বেশ ভালো পরিমাণ কষ্ট হচ্ছে তার। কিন্তু কেন? এই কেনর কোনো উত্তর ফরিদের জানা নেই। মাত্র একদিনের পরিচয়ে মেয়েটিকে মনে হচ্ছে প্রিয়জন কেউ।
মানুষের সম্পর্ক কত রকমের হতে পারে। কি জটিলতা এই সম্পর্কের। মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে এক অদ্ভুত মায়ার সম্পর্ক তৈরী হয়েছে সোমা আর ফরিদের মধ্যে যার রেশ থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
কিছু সম্পর্কের পরিচয় শুধুই মায়া। এই সম্পর্কগুলোর না আছে কোন স্থায়ী বন্ধন, না আছে পিছুটান। তবুও সম্পর্কগুলো এক অদ্ভুত সুতায় বাঁধা পড়ে। বাস্তব জীবনে সম্পর্কগুলো অনেক বেশি জটিল এবং রহস্যে ঘেরা।
শহীদ গাড়ি ছেড়ে দিল। দূর থেকে ফরিদের দিকে তাকিয়ে হাত নেড়ে বিদায় জানাল।
ফরিদ হাত উঁচু করে নাড়ল। শহীদের গাড়ি বাঁক নিয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়া পর্যন্ত সে দাঁড়িয়ে রইল। (সমাপ্ত)
পরিশিষ্ট: যাবার সময় ফরিদের হাতে এক টুকরো সাদা কাগজ দিয়ে যায় সোমা। ফরিদ অবাক হয়েছিল—কিন্তু কিছু বলেনি তখন। ওরা চলে যাবার পর ফরিদ ভাঁজ খুলে দেখল, গোটা গোটা অক্ষরে কয়েকটি লাইন লেখা।
আপনাকে বলেছিলাম আমার একজন প্রিয় মানুষের কথা। আপনি জানতে চেয়েছিলেন, কে সে? ছোটো বেলা থেকেই স্বপ্ন দেখতাম যদি কোনো দিন তার সাথে দেখা হয়, তার হাত ধরে বলব—আপনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ। কথাটা তাকে বলা হয়নি। তার সাথে কোনোদিন দেখা হয়নি। অথচ আমার দেখা হলো আপনার সাথে। আমার মনে হলো গত ২৪ ঘণ্টা আমি আমার প্রিয় মানুষটির সান্নিধ্যেই কাটিয়ে গেলাম। আপনার কথা আমার মনে থাকবে। শুধু হাত ধরে বলা হলো না—আপনি আমার অনেক পছন্দের মানুষ ফরিদ ভাই।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৯)
‘হ্যালো, এটা ফরিদ ভাইর বাসা না?’
ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। কিন্তু কণ্ঠটি সোমার পরিচিত নয়। সে বলল, ‘জি।’
‘আপনি কে?’
‘আমি সোমা।’
‘সোমা… ও বুচ্ছি বুচ্ছি বুচ্ছি। ভালো আছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ ভালো।’
‘ফরিদ ভাই বাসায় নাই?’
‘জি জি আছেন। আপনি একটু ধরুন।’ সোমা ফরিদকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ইকবাল বলল, ‘সবগুলি হসপিটালের ইমারজেন্সিতে খোঁজ নিসি বস, শহীদুল ইসলাম নামে কোনো পেসেন্টের ইনফরমেশন নাই। আর কই যামু বস?’
‘দেখো ইকবাল, তুমি কোথায় যাবা তোমার ব্যাপার। আমি চাই, তুমি রাতের মধ্যেই শহীদের খোঁজ বের করবা—কোথায় যাবা, কার কাছে যাবা আমি কিছু জানিনা। আল্লাহর ওয়াস্তে যেভাবেই হোক তুমি ছেলেটার একটা ট্রেস বের করবা।’
‘আচ্ছা বস—আপনি টেনশন নিয়েন না। আমি দেখতেছি।’
ফরিদ ফোন কেটে দিয়ে বলল, ‘ধুর।’
সোমা মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি কেমন মলিন হয়ে গেছে। ফরিদ সোমার কাছে গিয়ে বসল। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘সোমা, সব মানুষের জীবনেই একটা গল্প থাকে—আমারো আছে। শুনবে?’
সোমা বলল, ‘শোনান।’
‘তখন তোমাকে আমি মিথ্যে বলেছি।’
সোমা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল ফরিদের দিকে?
‘আমার একটা বিয়ে হয়েছিল—দেশে। তখন আমি বেকার। সদ্য পাশ করে বেরিয়েছি। মেয়েটিকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। আমার পরিচিত ছিল। মেয়েটি সুশ্রী এবং শিক্ষিত। খুব ভালোবাসতাম—খুব। কিন্তু আমাদের বেশিদিন একসাথে থাকা হয়নি।’
‘কেন?’
‘ভাগ্য বদলানোর জন্যে আমি আমেরিকায় চলে আসি—একা।’
সোমা তাকিয়ে আছে ফরিদের মুখের দিকে।
একটু গুছিয়ে নিয়ে ফরিদ বলল, ‘এদেশে আসার অনেকদিন পর—যেহেতু আমার কাগজপত্র তৈরী হচ্ছিল না, আমিও দেশে যেতে পারছিলাম না—তার সঙ্গে দেখাও হচ্ছিল না। তার ভিসাও হচ্ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল টেলিফোন। আমরা টেলিফোনে অনেক কথা বলতাম। তখন তো এমন ফোন কার্ড ছিল না। যা টাকা বানাতাম তার সবটাই খরচ হয়ে যেত ফোনের বিল দিতেই।’ এটুকু বলে ফরিদ থামল।
সোমা জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’
‘তারপর? তারপর যখন আর কোনো উপায়ই বের করতে পারলাম না তখন একটা শেষ চেষ্টা করলাম। ঢাকায় আমার খুব কাছের এক বন্ধু ছিল। খুবই পাওয়ারফুল। বড় লোকের ছেলে—অনেক টাকা পয়সা। তাকে বললাম—দোস্ত, আমার বৌটাকে তোর বৌ সাজিয়ে এদেশে নিয়ে আয় এবং আমার বৌ আমার কাছে দিয়ে যা।’
‘কি বলেন? তাও কি সম্ভব নাকি?’
‘কি করব—আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওকে ছাড়া সারাটা জীবন কাঁটিয়ে দিব নাকি—সেটা কি সম্ভব?’
‘তারপর?’
‘অনেক অনুরোধের পরে আমার বন্ধু রাজি হলো। সত্যি সত্যি ওরা স্বামী-স্ত্রী সেজে ভিসার জন্যে দাঁড়াল এবং ভিসা পেয়েও গেল।’
‘ওয়াও। তারপর?’
‘তারপর ওরা দু’জন একসময় এক সঙ্গে এদেশে চলেও এলো। কিন্তু—’
‘কিন্তু?’
‘আমার বৌ আর আমার কাছে ফিরে এলো না। সে আমার বন্ধুর সঙ্গে চলে গেল অন্য একটা স্টেটে এবং সেখানেই সেটেলড হলো। শুনেছি তারা খুবই ভালো আছে।’
‘কি বলেন?’
‘সত্যি বলছি। সুতরাং, অতীতের দিকে তাকিয়ে তুমি যদি সামনের দিকে চলতে চাও—তাহলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে। সামনে তাকাও—সামনে। জীবনটা অনেক সুন্দর হবে।’
সোমা অবাক হয়ে ভাবছে তার সামনে বসে থাকা মানুষটার কথা। মানুষের জীবনে আসলেই কত ঘটনা ঘটে। একজনকে কাছে থেকে না দেখলে, তার সম্পর্কে না জানলে—কিছু জানা হয় না। দূর থেকে বোঝাও যায় না। ইশ, মানুষের জীবনটা এমন কেন?
সোমা বলল, ‘আপনি আবার বিয়ে করেন নি কেন?’
‘ঐ যে বললাম, কোনো মেয়ে আমাকে পছন্দ করেনি তাই।’
‘আপনার কাউকে ভালো লাগেনি?’
ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর যখন কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ফরিদ বলল, ‘এটা নিশ্চয়ই বাদশা। আমি ধরছি।’
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে চিৎকার দিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে কথা বলল একজন মেয়ে—স্লামালিকুম।
ফরিদ বলল, ‘জি, ওয়ালাইকুম সালাম।’
‘আমি সোমার বোন বলছি।’ বলেই সে কান্না শুরু করল।
ফরিদ চুপ করে রইল। রুমা বলল, ‘বুঝতেই তো পারছেন আমাদের মনের অবস্থা। মেয়েটা একা এই প্রথম আমেরিকা গেছে। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত। প্লীজ আপনি ওকে একটু হেল্প করেন।’
‘আচ্ছা শুনুন, আপনাকে একটা কথা বলি। আমার নাম ফরিদ আহমেদ। আমি এই শিকাগো শহরে অনেক বছর ধরে আছি। আপনার ছোট বোন সোমা—সে এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে এবং সে খুব ভালো আছে। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আর আমার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ থাকে—আপনি যদি চান, আমার নাম, ঠিকানা, ড্রাইভার্স লাইসেন্স, সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার—সবকিছু আপনাকে দিতে পারি।’
‘না না তার কোনো কিছুরই দরকার হবে না। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত—আপনি শুধু ওকে একটু দেখে রেখেন।’
‘অবশ্যই দেখে রাখব। আপনি এত উতলা হবেন না। এমনিতেই সোমা খাচ্ছে না—সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে। এর মধ্যে আপনি এভাবে কাঁদলে ওতো ভেঙে পড়বে।’
কাঁদতে কাঁদতেই রুমা বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা কাঁদব না।’
‘ইটস আ ম্যাটার অফ টাইম। আমি কথা দিচ্ছি যে করেই হোক কাল সকালের মধ্যে শহীদুল ইসলামকে খুঁজে বের করব আমরা। আপনি কোন টেনশন করবেন না।’ এবার ফরিদ কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল, ‘আপনি এক কাজ করুন—সোমার সঙ্গে একটু কথা বলুন। ওকে একটু বোঝান—সান্ত্বনা দিন। মেয়েটা সারাক্ষণ কাঁদছে। আর শুনুন, আপনি আবার কাঁদবেন না যেন, তাহলে ও আরো নার্ভাস হয়ে যাবে। আমি সোমাকে দিচ্ছি… নিন কথা বলুন।’ বলেই সে ফোনটা দিল সোমাকে।
সোমা ফোন হাতে নিয়েই কেঁদে ফেলল। ‘হ্যালো আপা, তোরা আমাকে কোথায় পাঠালি?’ এই একটি কথা বলেই তার কান্নার বেগ বেড়ে গেল—অঝোরে কাঁদতে থাকল। আর কোনো কথাই বলতে পারল না।
রুমা বলল, ‘সোমা, তুই কিছু চিন্তা করিস না। ফরিদ ভাই বলেছেন, সে যে করেই হোক শহীদকে খুঁজে বের করে দিবে… তুই কাঁদিস না বোন। একটু ধৈর্য্য ধর—সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এরপর চলল দু’বোনের কিছুক্ষণ নীরব কান্না—তারপর এক সময় ফোন রেখে দিল সোমা।
ফরিদ হাত ঘড়ি দেখে বলল, ‘এখন রাত বাজে প্রায় দশটা। শীতের দিনে এটা অনেক রাত। দেখো, তুমি প্লেন থেকে নামার পর এখন পর্যন্ত কিছুই খাওনি। প্লেনে কি খেয়েছো আমি জানি না। তোমাকে লাঞ্চ করাতে নিয়ে গেলাম, তুমি কিছুই খেলে না। তোমার জন্যে রান্না করেছি—একসঙ্গে খাবো বলে আমিও বসে রয়েছি।’
‘আমার খিদে নেই—খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি খেয়ে নিন।’
‘না খেলে তো তোমার ব্রেইন কাজ করবে না—মাইগ্রেন অ্যাটাক করবে। যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারবে না। তাছাড়া না খেয়ে থাকলে তোমার সমস্যার কোনো সমাধান তো হবে না।’
‘আমি খাবো না।’ বলে উঠে চলে গেল সোমা।
ফরিদ তাকিয়ে রইল চিন্তিত মুখে।
রাতে এক ফোঁটা ঘুম হলো না সোমার। সমস্ত দিনের উত্তেজনা আর ক্লান্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে আগামী দিনের দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা।
প্রচণ্ড শীত পড়েছে। ঘরের মধ্যে হিটিং সিস্টেম চালু আছে। থার্মোস্ট্যাট অটো সেট-আপ করা থাকে। তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মানের নিচে নেমে গেলে একা একাই হিটিং সিস্টেম চালু হয়ে যায়। তখন এক ধরনের আওয়াজ বের হয়। শুরুতে একটু ভয় লাগলেও এখন আর কোনো রকম ভয় লাগছে না সোমার।
রাতের তুষারপাতে সারা শহর ঢেকে গেছে। এখনো ঝরছে ঝিরঝিরি। সোমা জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে। হালকা মেঘের মত ভেসে আসা তুষারগুলো আছড়ে পরছে জানালার কাঁচের গায়ে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যায়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেশাগ্রস্তের মতো হলো সোমার। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে।
ক্ষণে ক্ষণে শহীদের কথা মনে হচ্ছে। কেন শহীদ তাকে আনতে গেল না? মানুষটা ভালো আছে তো? কোনো বিপদ হয়নি তো? মানুষের বিপদের কথা কিছু কি বলা যায়? সোমার মাথা ভার হয়ে এলো। সে আর কিছু ভাবতে পারছে না। চোখ খুলেও থাকতে পারছে না—এক সময় তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
একটি সুন্দর সকালের শুরু। আকাশে নীলের ছড়াছড়ি। ঝকঝকে রোদ দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করেই টেম্পারেচার বেড়ে গিয়ে চারিদিকের বরফ গলা শুরু হয়েছে। গ্লুমি ভাবটা কেটে গেছে—সবার মধ্যেই এক ধরনের প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
ঝলমলে রৌদ্রস্নাত এই সকালে একটা সাদা রঙের জীপ চেরকি ফরিদের টাউন-হোম সংলগ্ন পার্কিং-এ এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে এলো ঝাঁকড়া চুলের এক যুবক। বয়স ত্রিশের কোঠায়। কমও হতে পারে। কলিং বেলে কয়েকবার চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ফরিদ নিচে নেমে দরজা খুলে দেখল একজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। ‘আপনি?’ ফরিদ জিজ্ঞেস করল।
অপরিচিত লোকটি সালাম দিয়ে বলল, ‘জি আমার নাম শহীদ। শহীদুল ইসলাম।’
‘আরে মিয়া কোথায় ছিলেন আপনি!’ ফরিদ প্রায় চিৎকার দিয়ে বলল, আপনার সমস্যা কি? বাসার ঠিকানা কোথায় পেলেন?’
‘ইকবাল ভাই, বাদশা—ওদের কাছ থেকে।’
‘ও আচ্ছা আচ্ছা। ওদের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল না?’
‘জি ভাই। আমি যখন বাসায় ফিরে আসি—উনারা আমার বাসার সামনে গাড়িতে বসা ছিল। তাদের কাছ থেকেই সবকিছু জেনেছি। শুনলাম, সোমা আপনার এখানে…’
‘তো আপনি ছিলেন কোথায়?’
‘একটা সমস্যা হয়েছিল। সোমা কি এখানে আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’ শহীদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো মত একবার দেখে নিয়ে খানিকটা রুক্ষ স্বরে বলল, ‘আসুন।’ বলেই সে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকল। শহীদ উঠে এলো তার পিছে পিছে।
ফরিদকে মনে হলো যেন হঠাৎ করেই কিছুটা ক্ষেপে গেল। কারণটা ঠিক বোঝা গেল না।
লিভিং রুমে এসে শহীদকে সোফা দেখিয়ে বলল, ‘এসো। বসো।’
শহীদ বসল না—দাঁড়িয়ে রইল কাঁচুমাচু হয়ে।
ফরিদ বলল, ‘তোমার ঘটনাটা কি আমাকে বলো তো। দেশ থেকে তোমার স্ত্রী এসেছে—তাকে তোমার রিসিভ করতে যাওয়ার কথা। আর তুমি উধাও?’
শহীদ বলল, ‘না আসলে আমার সত্যিকারের একটা সমস্যা হয়েছিল। এটা না বললে বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা—আপনি যা করলেন…’
‘আরে ভাই আমার কথা বাদ দাও। আমি তো শিকাগোতেই থাকি আর আমি তো কোনো বিপদে পড়িনি। একটা মেয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছে—সে এখানকার কাউকে চিনেনা, কিচ্ছু জানে না। শুধু তোমার নামটা জানে, তোমাদের দেখা পর্যন্ত হয়নি, বিয়ে করেছো টেলিফোনে—তুমি এটা কি করেছ বলো তো?’
‘ফরিদ ভাই, সত্যি আমি এমন একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম যে সেটা বলে বোঝাতে পারব না।’
‘কি এমন বিপদে পড়েছিলে… তোমার বাসার সামনে কাগজে লিখে এসেছি, ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি। এয়ারপোর্টেও ফোন নাম্বার রেখে এসেছিলাম।’
‘জি দেখেছি–তাই তো সরাসরি চলে এলাম।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে বসো।’
তারা দুজনেই বসল। শহীদ একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘সোমা কোথায়?’
‘সোমা আছে উপরে। সারারাত নিশ্চয়ই ঘুমায়নি—সকালে ঘুমিয়েছে কিনা বলতে পারছি না। আচ্ছা আমি ডাকছি।’
ফরিদ কয়েক পা এগিয়ে সিঁড়ির কাছে যেয়ে উপরে তাকিয়ে ডাকল, ‘সোমা? এই সোমা, একটু নীচে এসো তো ভাই।’
ফরিদ ফিরে এসে আবার বসল শহীদের পাশে। এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘কি যে টেনশনে ফেলেছিলে আমাদেরকে—উফ।’
‘আসলেই অনেক ঝামেলা গেছে আপনাদের উপর দিয়ে।’
‘তারপরে এখানে তোমার কোনো বন্ধু নেই, তোমার কোন রুমমেট নেই, এত বড় একটা কমিউনিটি কিন্তু কোনো বাঙালী লোক তোমাকে চেনে না—তুমি কারো সঙ্গে মিশো না নাকি?’
শহীদ চুপ করে রইল।
‘আমেরিকায় থাকো অথচ একটা ইমারজেন্সি কন্টাক্টও তোমার নেই—এটা কোনো কথা?’
ফরিদের কথা শেষ হবার আগেই শহীদ লক্ষ্য করল সোমা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। সোমাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। ফরিদও দাঁড়িয়ে পড়ল।
সোমা শহীদের দিকে তাকালো কিন্তু তার মধ্যে কোনো ধরনের এক্সাইটমেন্ট দেখা গেল না। কোনো রকম উত্তেজনা নেই—ভাবাবেগ নেই। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে।
শহীদ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সোমার দিকে তারপর কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বলল, ‘চলো।’
‘কোথায়?’ শীতল কণ্ঠে সোমা জানতে চাইল।
‘কোথায় মানে? বাসায় চলো।’
‘কেন?’
সোমার এমন প্রশ্নে ভড়কে গেল শহীদ। সে একবার পাশে দাঁড়ানো ফরিদের মুখের দিকে তাকাল আবার তাকাল সোমার মুখের দিকে। তারপর বোকার মত হেসে দিয়ে বলল, ‘বাসায় যাবে না?’
একই রকম শীতল কণ্ঠে সোমা প্রশ্ন করল, ‘তুমি আমাকে এয়ারপোর্টে নিতে আসোনি কেন?’
শহীদ আবার তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ কি বলবে ভেবেও বলল না।
শহীদ বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল, ‘একটা ঝামেলা হয়েছিল সোমা। একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম—সমস্যা হয়েছিল যা তোমাকে…।’
‘কি সমস্যা?’ কথা শেষ করতে না দিয়েই সোমা জানতে চাইল।
‘আগে বাসায় চলো, সবই বলব তোমাকে।’
‘আমি তো তোমার সঙ্গে যাবো না।’ সোমার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই বদলে গেল যেন। কঠিন স্বরে বলল সে, ‘তোমার মত একজন ইরেস্পন্সিবল মানুষের সঙ্গে তো আমি কোত্থাও যাব না।’
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৮)
‘হ্যালো, এটা ফরিদ ভাইর বাসা না?’
ওপাশ থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। কিন্তু কণ্ঠটি সোমার পরিচিত নয়। সে বলল, ‘জি।’
‘আপনি কে?’
‘আমি সোমা।’
‘সোমা… ও বুচ্ছি বুচ্ছি বুচ্ছি। ভালো আছেন আপনি?’
‘হ্যাঁ ভালো।’
‘ফরিদ ভাই বাসায় নাই?’
‘জি জি আছেন। আপনি একটু ধরুন।’ সোমা ফরিদকে ফোনটা এগিয়ে দিল।
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে ইকবাল বলল, ‘সবগুলি হসপিটালের ইমারজেন্সিতে খোঁজ নিসি বস, শহীদুল ইসলাম নামে কোনো পেসেন্টের ইনফরমেশন নাই। আর কই যামু বস?’
‘দেখো ইকবাল, তুমি কোথায় যাবা তোমার ব্যাপার। আমি চাই, তুমি রাতের মধ্যেই শহীদের খোঁজ বের করবা—কোথায় যাবা, কার কাছে যাবা আমি কিছু জানিনা। আল্লাহর ওয়াস্তে যেভাবেই হোক তুমি ছেলেটার একটা ট্রেস বের করবা।’
‘আচ্ছা বস—আপনি টেনশন নিয়েন না। আমি দেখতেছি।’
ফরিদ ফোন কেটে দিয়ে বলল, ‘ধুর।’
সোমা মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। মুহূর্তের মধ্যেই মেয়েটির হাস্যোজ্জ্বল মুখখানি কেমন মলিন হয়ে গেছে। ফরিদ সোমার কাছে গিয়ে বসল। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘সোমা, সব মানুষের জীবনেই একটা গল্প থাকে—আমারো আছে। শুনবে?’
সোমা বলল, ‘শোনান।’
‘তখন তোমাকে আমি মিথ্যে বলেছি।’
সোমা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল ফরিদের দিকে?
‘আমার একটা বিয়ে হয়েছিল—দেশে। তখন আমি বেকার। সদ্য পাশ করে বেরিয়েছি। মেয়েটিকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম। আমার পরিচিত ছিল। মেয়েটি সুশ্রী এবং শিক্ষিত। খুব ভালোবাসতাম—খুব। কিন্তু আমাদের বেশিদিন একসাথে থাকা হয়নি।’
‘কেন?’
‘ভাগ্য বদলানোর জন্যে আমি আমেরিকায় চলে আসি—একা।’
সোমা তাকিয়ে আছে ফরিদের মুখের দিকে।
একটু গুছিয়ে নিয়ে ফরিদ বলল, ‘এদেশে আসার অনেকদিন পর—যেহেতু আমার কাগজপত্র তৈরী হচ্ছিল না, আমিও দেশে যেতে পারছিলাম না—তার সঙ্গে দেখাও হচ্ছিল না। তার ভিসাও হচ্ছিল না। যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল টেলিফোন। আমরা টেলিফোনে অনেক কথা বলতাম। তখন তো এমন ফোন কার্ড ছিল না। যা টাকা বানাতাম তার সবটাই খরচ হয়ে যেত ফোনের বিল দিতেই।’ এটুকু বলে ফরিদ থামল।
সোমা জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর?’
‘তারপর? তারপর যখন আর কোনো উপায়ই বের করতে পারলাম না তখন একটা শেষ চেষ্টা করলাম। ঢাকায় আমার খুব কাছের এক বন্ধু ছিল। খুবই পাওয়ারফুল। বড় লোকের ছেলে—অনেক টাকা পয়সা। তাকে বললাম—দোস্ত, আমার বৌটাকে তোর বৌ সাজিয়ে এদেশে নিয়ে আয় এবং আমার বৌ আমার কাছে দিয়ে যা।’
‘কি বলেন? তাও কি সম্ভব নাকি?’
‘কি করব—আর কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছিলাম না। ওকে ছাড়া সারাটা জীবন কাঁটিয়ে দিব নাকি—সেটা কি সম্ভব?’
‘তারপর?’
‘অনেক অনুরোধের পরে আমার বন্ধু রাজি হলো। সত্যি সত্যি ওরা স্বামী-স্ত্রী সেজে ভিসার জন্যে দাঁড়াল এবং ভিসা পেয়েও গেল।’
‘ওয়াও। তারপর?’
‘তারপর ওরা দু’জন একসময় এক সঙ্গে এদেশে চলেও এলো। কিন্তু—’
‘কিন্তু?’
‘আমার বৌ আর আমার কাছে ফিরে এলো না। সে আমার বন্ধুর সঙ্গে চলে গেল অন্য একটা স্টেটে এবং সেখানেই সেটেলড হলো। শুনেছি তারা খুবই ভালো আছে।’
‘কি বলেন?’
‘সত্যি বলছি। সুতরাং, অতীতের দিকে তাকিয়ে তুমি যদি সামনের দিকে চলতে চাও—তাহলে হোঁচট খেয়ে পড়ে যাবে। সামনে তাকাও—সামনে। জীবনটা অনেক সুন্দর হবে।’
সোমা অবাক হয়ে ভাবছে তার সামনে বসে থাকা মানুষটার কথা। মানুষের জীবনে আসলেই কত ঘটনা ঘটে। একজনকে কাছে থেকে না দেখলে, তার সম্পর্কে না জানলে—কিছু জানা হয় না। দূর থেকে বোঝাও যায় না। ইশ, মানুষের জীবনটা এমন কেন?
সোমা বলল, ‘আপনি আবার বিয়ে করেন নি কেন?’
‘ঐ যে বললাম, কোনো মেয়ে আমাকে পছন্দ করেনি তাই।’
‘আপনার কাউকে ভালো লাগেনি?’
ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর যখন কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই ফোন বেজে উঠল। ফরিদ বলল, ‘এটা নিশ্চয়ই বাদশা। আমি ধরছি।’
ফরিদ ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে চিৎকার দিয়ে কান্না জড়িত কণ্ঠে কথা বলল একজন মেয়ে—স্লামালিকুম।
ফরিদ বলল, ‘জি, ওয়ালাইকুম সালাম।’
‘আমি সোমার বোন বলছি।’ বলেই সে কান্না শুরু করল।
ফরিদ চুপ করে রইল। রুমা বলল, ‘বুঝতেই তো পারছেন আমাদের মনের অবস্থা। মেয়েটা একা এই প্রথম আমেরিকা গেছে। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত। প্লীজ আপনি ওকে একটু হেল্প করেন।’
‘আচ্ছা শুনুন, আপনাকে একটা কথা বলি। আমার নাম ফরিদ আহমেদ। আমি এই শিকাগো শহরে অনেক বছর ধরে আছি। আপনার ছোট বোন সোমা—সে এই মুহূর্তে আমার কাছে আছে এবং সে খুব ভালো আছে। আপনি কোনো চিন্তা করবেন না। আর আমার ব্যাপারে যদি কোনো সন্দেহ থাকে—আপনি যদি চান, আমার নাম, ঠিকানা, ড্রাইভার্স লাইসেন্স, সোশ্যাল সিকিউরিটি নাম্বার—সবকিছু আপনাকে দিতে পারি।’
‘না না তার কোনো কিছুরই দরকার হবে না। আপনি আমাদের বড় ভাইয়ের মত—আপনি শুধু ওকে একটু দেখে রেখেন।’
‘অবশ্যই দেখে রাখব। আপনি এত উতলা হবেন না। এমনিতেই সোমা খাচ্ছে না—সারাক্ষণ কান্নাকাটি করছে। এর মধ্যে আপনি এভাবে কাঁদলে ওতো ভেঙে পড়বে।’
কাঁদতে কাঁদতেই রুমা বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা কাঁদব না।’
‘ইটস আ ম্যাটার অফ টাইম। আমি কথা দিচ্ছি যে করেই হোক কাল সকালের মধ্যে শহীদুল ইসলামকে খুঁজে বের করব আমরা। আপনি কোন টেনশন করবেন না।’ এবার ফরিদ কণ্ঠস্বর নিচু করে বলল, ‘আপনি এক কাজ করুন—সোমার সঙ্গে একটু কথা বলুন। ওকে একটু বোঝান—সান্ত্বনা দিন। মেয়েটা সারাক্ষণ কাঁদছে। আর শুনুন, আপনি আবার কাঁদবেন না যেন, তাহলে ও আরো নার্ভাস হয়ে যাবে। আমি সোমাকে দিচ্ছি… নিন কথা বলুন।’ বলেই সে ফোনটা দিল সোমাকে।
সোমা ফোন হাতে নিয়েই কেঁদে ফেলল। ‘হ্যালো আপা, তোরা আমাকে কোথায় পাঠালি?’ এই একটি কথা বলেই তার কান্নার বেগ বেড়ে গেল—অঝোরে কাঁদতে থাকল। আর কোনো কথাই বলতে পারল না।
রুমা বলল, ‘সোমা, তুই কিছু চিন্তা করিস না। ফরিদ ভাই বলেছেন, সে যে করেই হোক শহীদকে খুঁজে বের করে দিবে… তুই কাঁদিস না বোন। একটু ধৈর্য্য ধর—সব ঠিক হয়ে যাবে।’
এরপর চলল দু’বোনের কিছুক্ষণ নীরব কান্না—তারপর এক সময় ফোন রেখে দিল সোমা।
ফরিদ হাত ঘড়ি দেখে বলল, ‘এখন রাত বাজে প্রায় দশটা। শীতের দিনে এটা অনেক রাত। দেখো, তুমি প্লেন থেকে নামার পর এখন পর্যন্ত কিছুই খাওনি। প্লেনে কি খেয়েছো আমি জানি না। তোমাকে লাঞ্চ করাতে নিয়ে গেলাম, তুমি কিছুই খেলে না। তোমার জন্যে রান্না করেছি—একসঙ্গে খাবো বলে আমিও বসে রয়েছি।’
‘আমার খিদে নেই—খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি খেয়ে নিন।’
‘না খেলে তো তোমার ব্রেইন কাজ করবে না—মাইগ্রেন অ্যাটাক করবে। যন্ত্রণায় ঘুমাতে পারবে না। তাছাড়া না খেয়ে থাকলে তোমার সমস্যার কোনো সমাধান তো হবে না।’
‘আমি খাবো না।’ বলে উঠে চলে গেল সোমা।
ফরিদ তাকিয়ে রইল চিন্তিত মুখে।
রাতে এক ফোঁটা ঘুম হলো না সোমার। সমস্ত দিনের উত্তেজনা আর ক্লান্তির সঙ্গে যোগ হয়েছে আগামী দিনের দুশ্চিন্তা আর অনিশ্চয়তা।
প্রচণ্ড শীত পড়েছে। ঘরের মধ্যে হিটিং সিস্টেম চালু আছে। থার্মোস্ট্যাট অটো সেট-আপ করা থাকে। তাপমাত্রা নির্দিষ্ট মানের নিচে নেমে গেলে একা একাই হিটিং সিস্টেম চালু হয়ে যায়। তখন এক ধরনের আওয়াজ বের হয়। শুরুতে একটু ভয় লাগলেও এখন আর কোনো রকম ভয় লাগছে না সোমার।
রাতের তুষারপাতে সারা শহর ঢেকে গেছে। এখনো ঝরছে ঝিরঝিরি। সোমা জানালার পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে। হালকা মেঘের মত ভেসে আসা তুষারগুলো আছড়ে পরছে জানালার কাঁচের গায়ে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলে নেশা ধরে যায়। তাকিয়ে থাকতে থাকতে নেশাগ্রস্তের মতো হলো সোমার। তার চোখ দুটো স্থির হয়ে আছে।
ক্ষণে ক্ষণে শহীদের কথা মনে হচ্ছে। কেন শহীদ তাকে আনতে গেল না? মানুষটা ভালো আছে তো? কোনো বিপদ হয়নি তো? মানুষের বিপদের কথা কিছু কি বলা যায়? সোমার মাথা ভার হয়ে এলো। সে আর কিছু ভাবতে পারছে না। চোখ খুলেও থাকতে পারছে না—এক সময় তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো।
একটি সুন্দর সকালের শুরু। আকাশে নীলের ছড়াছড়ি। ঝকঝকে রোদ দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ করেই টেম্পারেচার বেড়ে গিয়ে চারিদিকের বরফ গলা শুরু হয়েছে। গ্লুমি ভাবটা কেটে গেছে—সবার মধ্যেই এক ধরনের প্রাণের সঞ্চার হয়েছে।
ঝলমলে রৌদ্রস্নাত এই সকালে একটা সাদা রঙের জীপ চেরকি ফরিদের টাউন-হোম সংলগ্ন পার্কিং-এ এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নেমে এলো ঝাঁকড়া চুলের এক যুবক। বয়স ত্রিশের কোঠায়। কমও হতে পারে। কলিং বেলে কয়েকবার চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ফরিদ নিচে নেমে দরজা খুলে দেখল একজন অপরিচিত লোক দাঁড়িয়ে আছে। ‘আপনি?’ ফরিদ জিজ্ঞেস করল।
অপরিচিত লোকটি সালাম দিয়ে বলল, ‘জি আমার নাম শহীদ। শহীদুল ইসলাম।’
‘আরে মিয়া কোথায় ছিলেন আপনি!’ ফরিদ প্রায় চিৎকার দিয়ে বলল, আপনার সমস্যা কি? বাসার ঠিকানা কোথায় পেলেন?’
‘ইকবাল ভাই, বাদশা—ওদের কাছ থেকে।’
‘ও আচ্ছা আচ্ছা। ওদের সাথে যোগাযোগ হয়েছিল না?’
‘জি ভাই। আমি যখন বাসায় ফিরে আসি—উনারা আমার বাসার সামনে গাড়িতে বসা ছিল। তাদের কাছ থেকেই সবকিছু জেনেছি। শুনলাম, সোমা আপনার এখানে…’
‘তো আপনি ছিলেন কোথায়?’
‘একটা সমস্যা হয়েছিল। সোমা কি এখানে আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’ শহীদের পা থেকে মাথা পর্যন্ত ভালো মত একবার দেখে নিয়ে খানিকটা রুক্ষ স্বরে বলল, ‘আসুন।’ বলেই সে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠতে থাকল। শহীদ উঠে এলো তার পিছে পিছে।
ফরিদকে মনে হলো যেন হঠাৎ করেই কিছুটা ক্ষেপে গেল। কারণটা ঠিক বোঝা গেল না।
লিভিং রুমে এসে শহীদকে সোফা দেখিয়ে বলল, ‘এসো। বসো।’
শহীদ বসল না—দাঁড়িয়ে রইল কাঁচুমাচু হয়ে।
ফরিদ বলল, ‘তোমার ঘটনাটা কি আমাকে বলো তো। দেশ থেকে তোমার স্ত্রী এসেছে—তাকে তোমার রিসিভ করতে যাওয়ার কথা। আর তুমি উধাও?’
শহীদ বলল, ‘না আসলে আমার সত্যিকারের একটা সমস্যা হয়েছিল। এটা না বললে বুঝতে পারবেন না। কিন্তু তারচেয়ে বড় কথা—আপনি যা করলেন…’
‘আরে ভাই আমার কথা বাদ দাও। আমি তো শিকাগোতেই থাকি আর আমি তো কোনো বিপদে পড়িনি। একটা মেয়ে বাংলাদেশ থেকে এসেছে—সে এখানকার কাউকে চিনেনা, কিচ্ছু জানে না। শুধু তোমার নামটা জানে, তোমাদের দেখা পর্যন্ত হয়নি, বিয়ে করেছো টেলিফোনে—তুমি এটা কি করেছ বলো তো?’
‘ফরিদ ভাই, সত্যি আমি এমন একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম যে সেটা বলে বোঝাতে পারব না।’
‘কি এমন বিপদে পড়েছিলে… তোমার বাসার সামনে কাগজে লিখে এসেছি, ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি। এয়ারপোর্টেও ফোন নাম্বার রেখে এসেছিলাম।’
‘জি দেখেছি–তাই তো সরাসরি চলে এলাম।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে বসো।’
তারা দুজনেই বসল। শহীদ একটু ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘সোমা কোথায়?’
‘সোমা আছে উপরে। সারারাত নিশ্চয়ই ঘুমায়নি—সকালে ঘুমিয়েছে কিনা বলতে পারছি না। আচ্ছা আমি ডাকছি।’
ফরিদ কয়েক পা এগিয়ে সিঁড়ির কাছে যেয়ে উপরে তাকিয়ে ডাকল, ‘সোমা? এই সোমা, একটু নীচে এসো তো ভাই।’
ফরিদ ফিরে এসে আবার বসল শহীদের পাশে। এবার একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘কি যে টেনশনে ফেলেছিলে আমাদেরকে—উফ।’
‘আসলেই অনেক ঝামেলা গেছে আপনাদের উপর দিয়ে।’
‘তারপরে এখানে তোমার কোনো বন্ধু নেই, তোমার কোন রুমমেট নেই, এত বড় একটা কমিউনিটি কিন্তু কোনো বাঙালী লোক তোমাকে চেনে না—তুমি কারো সঙ্গে মিশো না নাকি?’
শহীদ চুপ করে রইল।
‘আমেরিকায় থাকো অথচ একটা ইমারজেন্সি কন্টাক্টও তোমার নেই—এটা কোনো কথা?’
ফরিদের কথা শেষ হবার আগেই শহীদ লক্ষ্য করল সোমা এসে দাঁড়িয়েছে সামনে। সোমাকে দেখে সে উঠে দাঁড়াল। ফরিদও দাঁড়িয়ে পড়ল।
সোমা শহীদের দিকে তাকালো কিন্তু তার মধ্যে কোনো ধরনের এক্সাইটমেন্ট দেখা গেল না। কোনো রকম উত্তেজনা নেই—ভাবাবেগ নেই। নির্লিপ্ত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে সে।
শহীদ কিছুক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল সোমার দিকে তারপর কোনো রকমে সাহস সঞ্চয় করে বলল, ‘চলো।’
‘কোথায়?’ শীতল কণ্ঠে সোমা জানতে চাইল।
‘কোথায় মানে? বাসায় চলো।’
‘কেন?’
সোমার এমন প্রশ্নে ভড়কে গেল শহীদ। সে একবার পাশে দাঁড়ানো ফরিদের মুখের দিকে তাকাল আবার তাকাল সোমার মুখের দিকে। তারপর বোকার মত হেসে দিয়ে বলল, ‘বাসায় যাবে না?’
একই রকম শীতল কণ্ঠে সোমা প্রশ্ন করল, ‘তুমি আমাকে এয়ারপোর্টে নিতে আসোনি কেন?’
শহীদ আবার তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ কি বলবে ভেবেও বলল না।
শহীদ বুঝিয়ে বলার চেষ্টা করল, ‘একটা ঝামেলা হয়েছিল সোমা। একটা বিপদের মধ্যে পড়েছিলাম—সমস্যা হয়েছিল যা তোমাকে…।’
‘কি সমস্যা?’ কথা শেষ করতে না দিয়েই সোমা জানতে চাইল।
‘আগে বাসায় চলো, সবই বলব তোমাকে।’
‘আমি তো তোমার সঙ্গে যাবো না।’ সোমার কণ্ঠস্বর হঠাৎ করেই বদলে গেল যেন। কঠিন স্বরে বলল সে, ‘তোমার মত একজন ইরেস্পন্সিবল মানুষের সঙ্গে তো আমি কোত্থাও যাব না।’
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৭)
সোমা নেমে এসে দেখল চিন্তিত মুখে টেবিলের এক কোনায় বসে আছে ফরিদ। সোমা বলল, ‘আমি আপনাকে অনেক ঝামেলার মধ্যে ফেলে দিয়েছি তাই না?’
‘না না ঝামেলা হতে যাবে কেন? এসব কি বলছ তুমি? আমি তো তোমাকে নিয়ে ভাবছি না—ভাবছি শহীদকে নিয়ে। ছেলেটার কোনো বিপদ হলো কিনা?’
সোমা চুপ করে রইল।
ফরিদ প্রসঙ্গ বদলে দেবার জন্যে বলল, ‘শেষ পর্যন্ত মাংসটা কিন্তু দারুণ হয়েছে। কি সুন্দর গন্ধ বেরিয়েছে দেখেছ? চলো এবার খেয়ে নেয়া যাক। খেয়ে-দেয়ে ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করি আমাদের পরবর্তী করণীয় কী?’
সোমা কিছু না বলে চুপ করে রইল। তার মনের মধ্যে আরেকটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। সে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, শেল্টার হোম কি? তখন বলছিলেন…’
ফরিদ খানিকক্ষণ চুপ করে থাকল। একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘এক ধরনের আশ্রম। সাধারণত যখন কোনো মেয়ে অন্যের দ্বারা হয়—শারীরিক এবং মানসিক দু’ভাবেই হতে পারে কিংবা প্রাণনাশের হুমকি থাকে—এমন পরিস্থিতিতে সেই মেয়েটির যদি আত্মীয়-পরিজনের কাছ থেকে পর্যাপ্ত সাহায্য-সহযোগিতা না মেলে, তাহলে সে শেল্টার হোমের আশ্রয়ে থাকতে পারে।’
সোমা চুপ করে শুনল। ফরিদ আরো একটু ব্যাখ্যা করল, ‘মূলত, যাদের মাথার ওপরে ছাদ নেই, তাদের জন্য বড় বড় শহরে সাবসিডাইজড্ গভর্নমেন্ট হাউজিং আছে এবং সারা দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সরকারি ও বেসরকারি শেল্টার হোম যেখানে গৃহহীনদের থাকা-খাওয়ার সুব্যবস্থা থাকে বারোমাস। বিশেষ করে ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের কারণে যে সব মেয়েরা ঘর ছাড়তে বাধ্য হয়—তাদের ইমিডিয়েটলি একটা থাকার ব্যবস্থা হয় এখানে।’
‘আমাকে কোনো শেল্টার হোমে রেখে আসা যায় না?’
সোমার এমন আচমকা প্রশ্নে ফরিদ হকচকিয়ে গেল। তার কেন যেন একবার মনে হচ্ছিল সোমা এমন কিছুই হয়ত ভাবছে। সে তাৎক্ষণিক উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ তা তো যায়ই। কিন্তু তাতে তো এই ক্রাইসিসের কোনো সমাধান হচ্ছে না। এই মুহূর্তে আমাদের প্রধান ক্রাইসিস হচ্ছে শহীদকে খুঁজে বের করা।’
‘কিন্তু তাকে তো পাওয়া যাচ্ছে না।’
‘আজকে পাওয়া যায়নি তো কি হয়েছে। কালকে নিশ্চয়ই যাবে। সে হয়ত কোথাও আটকা পড়ে আছে—আমরা জানি না। হয়ত দেখা যাবে কাল সকালে ঠিকই হাজির হয়েছে।’
‘আর যদি না হয়?’
‘সেক্ষেত্রে প্রথমেই যে কাজটা আমরা করব সেটি হচ্ছে—লোকাল পুলিশ স্টেশনে গিয়ে একটা রিপোর্ট করব। তারপর সেই রিপোর্ট নিয়ে চলে যাবো ইয়েলো ক্যাবের অফিসে—ওদের কাছে নিশ্চয়ই তথ্য থাকবে। সে সর্বশেষ কখন প্যাসেঞ্জার তুলেছে সেটা জানলেই অর্ধেক কাজ হয়ে যাবে।’
‘এখন যাওয়া যায় না?’
ফরিদ হাত ঘড়িতে সময় দেখে নিয়ে বলল, ‘এখন তো অফিস বন্ধ।’
সোমা আর কিছু বলল না। সে এখনো দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে। ফরিদ বলল, ‘এবার কি আমরা খেতে পারি?’
সোমা টেবিলে এসে বসল। ফরিদ আনন্দচিত্তে খাবারগুলো টেবিলে এনে রাখল। ভেবেছিল সোমাই হয়ত সাহায্য করবে কিন্তু তার মধ্যে কোনো আগ্রহ দেখা গেল না—সে বসে রইল চুপচাপ। ওর মনের অবস্থা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
ফরিদের সামনে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কোনো ভাবে রাতটা পার করা। এবং যে করেই হোক সোমার মনটাকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখা। কাজটা কঠিন তবুও চেষ্টা করতে হবে। রাতে একা এই বাসায় সে থাকতে চাইবে কি না সেটাও একটা সংশয়। এই আবহাওয়ায় ওকে পাঠাবেই বা কোথায়? যতক্ষণ পর্যন্ত সোমা ঘুমাতে না চায়—ততক্ষণ বিভিন্ন প্রসঙ্গে ওর সঙ্গে কথা বলে যেতে হবে।
‘এত বড় বাড়িতে আপনি একা থাকেন?’ ফরিদের চিন্তায় ছেদ পড়ল সোমার প্রশ্নে।
ফরিদ একটু হেসে দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘কেন?’
‘একা থাকি!’
‘আপনি বিয়ে করেন নি?’
ফরিদ আবারো হাসল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘না।’
‘কেন?’
‘কোনো মেয়ে আমাকে পছন্দ করেনি তাই।’
‘কেন?’
‘তা তো বলতে পারবো না। কি জানি, হয়ত আমি দেখতে অতটা সুশ্রী নই।’
কথাটা শুনে সোমার একজনের কথা মনে পড়ল। সেও দেখতে অতটা সুশ্রী নয় কিন্তু কী তার ব্যক্তিত্ব! আর ঠিক তখনই সোমার মনে পড়ল—মানুষটা দেখতে কার মত। তার সেই পছন্দের মানুষটার সাথে প্রচণ্ড মিল। একেবারে ট্রু কপি! তার মত কথা বলা, মিষ্টি করে হাসা, অধিকার নিয়ে ধমক দেয়া—কেয়ার করা সব-সব তার মত। সোমার মনটা হঠাৎ করেই বেশ ভালো হয়ে গেল। তার বেশ মজা লাগছে—কেন লাগছে তা অবশ্য সে নিজেও ঠিক জানে না।
সোমা হেসে দিয়ে বলল, ‘কি বলেন? আপনি দেখতে অনেক সুন্দর।’
ফরিদ মৃদু হেসে বলল, ‘আমার মায়ের পরে তুমিই প্রথম বললে আমি দেখতে সুন্দর।’
সোমা আবার বলল, ‘আপনি অনেক সুন্দর করে কথা বলেন। আর সবচেয়ে বড় কথা—আপনি অনেক কেয়ারিং।’ তারপর হঠাৎ করেই অনেকটা মুখ-ফসকে বলে ফেলল সোমা, ‘আমার একজন প্রিয় মানুষের সাথে আপনার অনেক মিল।’
‘তাই? কে সে?’
‘অন্য সময় বলব।’
ফরিদকে বেশ খুশি মনে হলো। এটা নয় যে সোমা তাকে সুন্দর বলেছে সে জন্যে। অন্তত মেয়েটার চিন্তাটাকে ডাইভার্ট করা গেছে ফরিদ এতেই সন্তুষ্ট। সোমা নিজে থেকেই কথা বলছে এটাও একটা ভালো লক্ষণ।
সোমা চারিদিকে তাকিয়ে বলল, ‘বাড়িটা তো অনেক বড়। সুন্দর করে সাজিয়েছেন। একা থাকতে আপনার খারাপ লাগে না?’
ফরিদ প্রথমে কিছু বলল না। সোমা তাকিয়ে আছে দেখে সে বলল, ‘একেবারেই যে লাগে না তা নয়—মাঝে মাঝে তো একটু ডিপ্রেস লাগেই। একা থাকতে কারই বা ভালো লাগে বলো? নিঃসঙ্গ মানুষের অনেক ধরনের কষ্ট থাকে। তবে কাজের ব্যস্ততা থাকে—সময় কেটে যায়।’
সোমা এবার একটু ইতস্তত করে বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
‘করো।’
‘জানি প্রশ্নটা করতে নেই, তবুও জানতে ইচ্ছে করছে।’
‘বলো কি জানতে চাও?’
‘আপনি কী করেন?’
‘ও এই কথা?’ ফরিদ হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি ব্যবসা করি। রিয়েল-এস্টেটের ব্যবসা। বাড়ি কিনি, বাড়ি বিক্রি করি। আবার নতুন যারা বাড়ি কিনতে চায়—তাদেরকে বাড়ি খুঁজে দেই। এখানে রিয়েল এস্টেট এজেন্ট বলে। বাংলায় যাকে বলে দালাল—হা হা হা।’
‘আপনি কত বছর এখানে?’
‘অনেকদিন। প্রায় ২০ বছর।’
‘এখানে পড়াশুনা করেছেন?’
‘না, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে ফিলসফিতে মাস্টার্স করেছি।’
সোমা চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল ফরিদের দিকে।
ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা ফিলসফির কথা যখন উঠলই তখন তোমাকে একটা গল্প বলি।’ ফরিদের ইচ্ছে হলো, যতক্ষণ সম্ভব কথা বার্তা চালিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এতক্ষণে সোমার স্বভাব সম্পর্কে ফরিদের মোটামুটি একটা ধারণা হয়ে গেছে। মেয়েটি আবার যে কোনো সময় কান্নাকাটি শুরু করে দিতে পারে। সেই সুযোগ তাকে দেয়াটা ঠিক হবে না। মেয়েটি কতক্ষণ আগ্রহ নিয়ে তার কথা শোনে সেটাই চিন্তার বিষয়।
‘বলেন? কী চিন্তা করছেন?’
সোমার কথায় ফরিদের চিন্তাচ্ছেদ হলো। সে গল্প বলা শুরু করল, ‘সক্রেটিসের নাম নিশ্চয়ই শুনেছ। সক্রেটিস কে তার এক শিষ্য এসে বলল, গুরুজি আমি বিয়ে করতে চাই। শুনে সক্রেটিস বলল, ভালো—বিয়ে করো। মেয়ে যদি ভালো হয় তবে তুমি সুখী হবে আর যদি ভালো না হয় তবে তুমি দার্শনিক হয়ে যাবে। আমার মত হা হা হা।’
সোমাও হেসে ফেলল। হাসি থামতেই ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি পড়াশোনা করেছ কোথায়?’
‘ফরিদপুরে। অনার্স পাশ করেছি।’
‘কোন সাবজেক্টে?’
‘ইকনোমিকস।’
‘মাস্টার্স করলে না কেন?’
সোমা মন খারাপ করে ফেলল। মন খারাপ করেই সে বলল, ‘ভেবেছিলাম এখানে এসে করবো।’
ফরিদ শঙ্কিত হলো—সোমা আবার কেঁদে না ফেলে। এখন নিশ্চয়ই ওর স্বামীর কথা মনে পড়বে। সে হয়ত ওকে বলেছিল, দেশে আর পড়াশুনা করতে হবে না। আমেরিকা এসেই মাস্টার্স করো। কে জানে।
সোমা বারে বারে অন্যমনস্ক হয়ে যাচ্ছে। লক্ষণ ভালো নয়। ঝড়ের পূর্বাভাস। শুরু হওয়ার পূর্বেই গতিপথ বদলে দিতে হবে। ফরিদ দ্রুত জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা এখন বাংলাদেশে শুনেছি অনার্স কোর্স অনেক বড় হয়েছে—কত বছরের কোর্স এখন?’
‘চার বছর।’
‘হুম। আমাদের সময় তিন বছর ছিল।’
‘আমার কিছু ভালো লাগছে না।’ সোমা অস্থির হয়ে বলল, ‘আমি আবার দেশে কথা বলতে চাই। আমাকে একটু লাইন দিয়ে দিন।’ বলেই সে কেঁদে ফেলল।
ফরিদ যেই ভয় পেয়েছিল তাই ঘটতে যাচ্ছে মনে হয়। সামনে আরো কি বিপদ আছে কে জানে। সে দ্রুত বলল, ‘সমস্যা নেই। লাইন দিয়ে দিচ্ছি এখুনি। একটু ওয়েট করো।’
ফরিদ ফোন কার্ড নিয়ে এসে লাইন দিয়ে সোমার হাতে ফোনটা দিল।
রুমা ফোন ধরতেই সোমা কেঁদে দিয়ে বলল, ‘হ্যালো, হ্যালো আপা… আপা, আমি না তখন তোকে সত্যি কথা বলি নাই। হ্যাঁ। ঐ শহীদ তো আমাকে নিতে আসে নাই এয়ারপোর্টে।’
‘কি বলছিস এসব? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না।’
‘এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে আমি তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করছি—কিন্তু শহীদ যায় নাই আমাকে আনতে।’
রুমা চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে দিল। সোমা বলল, ‘একে একে সবাই চলে গেল। কতজনের কাছে হেল্প চাইলাম—কিন্তু কেউ হেল্প করল না। আমার কথা তো কেউ বুঝে না। আমি পরে অনেকের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে বাইরে চলে আসি। পরে একজন বাঙালী ভদ্রলোকের সাথে দেখা—উনার ফোন নিয়ে শহীদরে কতবার কল করলাম, কিন্তু শহীদ ফোন ধরল না। পরে উনিই আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসছেন।’
‘তাইলে তুই এখন কোথায়?’
‘আমি ফরিদ ভাইয়ের বাসায়। উনার নাম ফরিদ আহমেদ। উনি খুবই ভালো মানুষ—আমাকে অনেক হেল্প করছে। উনার সঙ্গে দেখা না হলে যে আমার কি হতো? আমি তো ঠাণ্ডায় জমে মরে পড়ে থাকতাম।’
‘হায় হায়—এত কিছু ঘটে গেছে আর আমরা কিছুই জানি না? তুই এখন কি করবি?’
‘কিছুই জানি না—কি করব। আচ্ছা, আমি রাখি—আমি পরে আবার কল দিব।’
সোমার কথার মধ্যে ফরিদ বেশ কয়েকবার কথা বলতে চাচ্ছিল। এবার সোমাকে থামিয়ে দিয়ে সে বলল, ‘তুমি এক কাজ কর, আমার ফোন নাম্বারটা তোমার বোনকে দিয়ে দাও।’
সোমা ফরিদের নাম্বার রুমাকে দিয়ে বলল, ঐ নাম্বারে ফোন দিয়ে খোঁজ নিতে। সোমা ফোন রেখে দিয়ে আরো কিছুক্ষণ কাঁদল। ফরিদ তাকে কাঁদতে দিল।
একটু সময় নিয়ে ফরিদ বলল, ‘সোমা তুমি তোমার কান্নাটা একটু থামাও—একটু স্থির হয়ে বসো। কান্নাটা থামালে তোমাকে একটা অদ্ভুত কথা বলব।’
কিছুক্ষণ পর সোমা চোখ মুছে তাকাল ফরিদের মুখের দিকে।
ফরিদ বলল, ‘দেখো আজকে এই যে তুমি কাঁদছ… যখন তুমি শহীদকে পেয়ে যাবে, সুন্দর সুখের একটা সংসার শুরু করবে—তখন কিন্তু আজকের দিনটার কথা মনে করে তুমি হাসবে।’
সোমা কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘আমার কি মনে হয় জানেন?’
‘কি?’
‘শহীদ আসলে ইচ্ছে করেই আমাকে নিতে আসে নাই। ও আমার ব্যাপারে কনফিউজড ছিল। আরেকটা মেয়ের সঙ্গে ওর এফেয়ার ছিল—অনেকদিনের পরিচয়। সেই মেয়েটাকেই ও বিয়ে করতে চাইছিল। কিন্তু মেয়েটার বাবা-মা রাজী হয় নাই—ও ক্যাব চালায় বলে। শহীদ হয়ত এখনো ঐ মেয়েটাকে ভুলতে পারে নাই। তাই ও আমাকে নিতে আসে নাই।’ বলেই সোমা আবার কাঁদতে থাকল।
ফরিদ মাথা নেড়ে বলল, ‘আমার কিন্তু তা মনে হয় না। তাই যদি হবে—সেটা তো তোমাকে আগেই বলে দিত তাই না। তোমাকে এতদূর নিয়ে আসার তো কোনো দরকার ছিল না।’
শাড়ির আঁচল দিয়ে চোখ মুছে সোমা আবার বলল, ‘আসলে মানুষ মাঝে মাঝে কনফিউজড থাকে। জানেন কি হয়েছে, আমার এক বান্ধবী ছিল। ওর একটা ছেলের সঙ্গে প্রেম ছিল। কিন্তু ওর বাবা-মা ওর বিয়ে ঠিক করে আরেকটা ছেলের সাথে। বিয়ের রাতে সে তার হাজবেন্ডকে বলল-ডোন্ট টাচ মি। আমার ভালোবাসার মানুষ আছে। আমি আপনাকে কখনোই ভালোবাসতে পারব না। তারপর ওর হাজবেন্ডকে ডিভোর্স দিয়ে বয়ফ্রেন্ডকে বিয়ে করে। বলেন, এর কোনো মানে হয়? ও তো আগেই বলতে পারত। শুধু শুধু ছেলেটাকে কষ্ট দেয়া।’
‘রাইট শুধু শুধু কষ্ট দেয়া…’ ফরিদ আরো কিছু বলতে চাচ্ছিল, এর মধ্যে ফোন বেজে উঠল।
ফরিদ সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সোমা ফোনটা ধরো তো। মনে হচ্ছে এটা শহীদের ফোন—ধরো।’
সোমার চেহারা বদলে গেল। মুখে একটা প্রশান্তির হাসি নিয়ে ফোনটা ধরে বলল, ‘হ্যালো?’
মেয়েটা এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৬)
সোমা আবারো বলল, ‘কে? কে ওখানে?’
কেউ জবাব দিল না। সোমা দরজার কাছে এগিয়ে গেল। দরজা না খুলেই সে আবার ডাকল। তার গলার স্বর কাঁপছে। সে ভীত কিন্তু উচ্চস্বরে ডাকল, ‘ফরিদ ভাই?’
দরজা বন্ধ থাকায় সোমার কথা নিচে সামান্যই পৌঁছল। সোমা এবার দরজায় শব্দ করে ডাকল-ফরিদ ভাই।
লিভিং রুম থেকে ফোনে কথা শেষ করে ফরিদ চলে এসেছে রান্নাঘরে। হঠাৎ ক্ষীণ স্বরে ফরিদ তার নাম শুনতে পেল। সোমা সম্ভবত তাকে ডাকছে। ফরিদ উপরে উঠে দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে ডাকল, ‘সোমা।’
সোমা কাঁপা কণ্ঠে বলল, ‘ফরিদ ভাই?’
‘হ্যাঁ আমি, কি হয়েছে? ভয় পেয়েছ নাকি? দরজাটা খুলো।’
‘আপনি কি কিছুক্ষণ আগে দরজায় নক করেছিলেন?’
‘আমি একবার এসেছিলাম তোমাকে ডাকতে। তুমি হয়তো ঘুমচ্ছ তাই আর ডাকিনি। কেন বলো তো?’
‘আমি স্পষ্ট শুনেছি—দরজায় কেউ নক করেছে। ঠক ঠক শব্দ হয়েছে।’
‘আচ্ছা আচ্ছা দেখছি ব্যাপারটা কি। দরজাটা খুলো—নাহলে তো কিছু বুঝতে পারছি না।’
সোমার ভয় কাটল না। তবুও সে আস্তে করে দরজা খুলে দেখল হাসি হাসি মুখ করে ফরিদ দাঁড়িয়ে আছে। ফরিদের হাসিমাখা মুখখানি দেখে তার ভয় অনেকখানি কেটে গেল।
সোমার মুখের দিকে তাকিয়েই ফরিদ বুঝতে পারল, কিছু একটা সমস্যা হয়েছে। ফরিদ বলল, ‘আমার ধারণা, অতিরিক্ত টেনশন আর টায়ার্ডনেসের কারণে তোমার ব্রেইন ঠিকমত কাজ করছে না।’ ফরিদ লক্ষ্য করল সোমা সেই একই পোশাক পরে আছে। তারমানে তার গোসল হয়নি এখনো। সে বলল, ‘তুমি শাওয়ারটা সেরে নিচে আসো।’
ফরিদ চলে যেতেই সোমা ধীরে ধীরে বাথরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দিল। এবং দীর্ঘ সময় ঝরনার নীচে দাঁড়িয়ে থাকল। হালকা গরম পানির প্রবাহ তার শরীর বেয়ে নেমে যাচ্ছে। এক ধরনের আরামদায়ক অনুভূতি হচ্ছে। আরামে সে চোখ বন্ধ করে ফেলল।
দীর্ঘ ক্লান্তি আর অবসাদগ্রস্ত শরীরটায় একটু একটু করে প্রাণ ফিরে এসেছে। এখন বেশ প্রফুল্ল লাগছে। গোসল শেষ করে নীচে নেমে এলো সোমা। এদিক ওদিক তাকিয়ে শব্দের উৎস খুঁজে এগিয়ে গেল। যে মানুষটির সঙ্গে এই বাসায় সে চলে এসেছে তাকে দেখল রান্না ঘরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা করছে। সোমা রান্না ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কি করছেন?’
ফরিদ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল সোমাকে। বাসন্তী আর লালের মিশ্রণের সুন্দর একটা তাঁতের শাড়ি পরেছে সে। ভেজা চুল ছড়িয়ে আছে কাঁধের দু’পাশে। ভারী সুন্দর লাগছে মেয়েটিকে। ফরিদ মুগ্ধ নয়নে চেয়ে রইল সোমার মুখের দিকে। কি নিষ্পাপ চেহারা। শান্ত—মায়াবী।
ফরিদ বলল, ‘এই তো রান্নার আয়োজন করছি।’
‘রান্না কেন?’
‘রাতে খেতে হবে না? বাসায় খাস মেহমান—তাও আবার নিজের দেশ থেকে এসেছে। তাকে আপ্যায়ন করতে হবে না?’
‘রাতে কি আমি এখানেই থাকছি নাকি?’ উৎকণ্ঠা নিয়ে জিজ্ঞেস করল সোমা।
‘তা তো জানিনা। তবে রাতে যে তুমি এখানেই খাচ্ছ, দ্যাটস ফর শিওর।’
‘রেস্টুরেন্ট থেকে না একগাদা খাবার নিয়ে এলেন?’
‘আরে রেস্টুরেন্টের খাবার রেস্টুরেন্টেই ভালো লাগে। বাসায় খাওয়া যায় নাকি? একবার ফ্রিজে রাখলে আর মজা লাগে না। ফ্রেশনেস নষ্ট হয়ে যায়।’
সোমা মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘কি রান্না করছেন?’
‘গরম ভাত। ডাল আর গরুর মাংস। ডাল আর ভাত হয়ে গেছে। কিন্তু মাংস নিয়ে একটু ঝামেলার মধ্যে আছি—কিছুতেই সিদ্ধ হচ্ছে না। মনে হয়ে বুড়ো মাংস নিয়ে এসেছি।’
সোমা এবার শব্দ করে হেসে ফেলল।
বাহ, হাসলে মেয়েটিকে আরো সুন্দর লাগছে। এখন পর্যন্ত মেয়েটির কোনো হাসি দেখা যায়নি। সোমাকে হাসতে দেখে ভালো লাগছে ফরিদের। মেয়েটি স্বাভাবিক হচ্ছে। এটা ভালো লক্ষণ। ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুম হয়েছে একটু?’
‘বুঝতে পারছি না। মনে হয় হয়েছে।’
‘জেট ল্যাগ। এত বড় লম্বা জার্নির পর এমন হয়। কিছুক্ষণ পর পর ঘুম আসে। আর একটু ঘুমলেই মনে হয় অনেক ঘুম হয়েছে।’
‘ভীষণ টায়ার্ড লাগছিল। তাই গোসল করে নিলাম।’
‘খুব ভাল করেছ।’ একটু থেমে ফরিদ আবার বলল, ‘তোমাকে ভীষণ সুন্দর লাগছে সোমা।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ!’
‘তোমার নিশ্চয়ই এখন খিদে পেয়েছে। তখন তো কিছুই খেলে না।’
‘হ্যাঁ খিদে পেয়েছে। মনে হচ্ছে এক গামলা ভাত খেয়ে ফেলি।’
‘মাংসটা সিদ্ধ হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কাঁচা মাংসই খেতে হবে। ঝামেলাই হলো।’
‘দেখি দিন আমাকে দিন—আমি দেখছি।’ সোমা এগিয়ে গেল।
‘আরে নাহ—তুমি পারবে না। এগুলো আমেরিকান স্টাইলে রান্না—খেতে পারবে কিনা তাই নিয়েই আমি সন্দিহান।’
‘সমস্যা নেই। আমি বাংলাদেশি স্টাইলে রাঁধব। আপনি যান ফ্রেশ হয়ে আসুন। তারপর একসাথে খেতে বসব।’
ফরিদ তার গায়ের অ্যাপ্রনটা খুলে সোমাকে পরিয়ে দিল। এখন তারমধ্যে কোনো রকম জড়তা নেই। যাওয়ার আগে ফরিদ বলল, ‘সোমা, আমি আরো কয়েক জায়গায় ফোন করেছি। শিকাগোর বাংলাদেশি এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টের সাথেও আমার কথা হয়েছে। সমস্যা হচ্ছে—এখানে কেউ তাকে চিনতে পারছে না। শহীদ বোধ হয় বাঙালীদের কোনো অনুষ্ঠান গুলিতে কখনো যায়-টায় না। এত বড় একটা কমিউনিটিতে কেউ তাকে চিনবে না—এটা অবিশ্বাস্য। আমি আরেকজন বাঙালী ক্যাব ড্রাইভারকেও বলেছি—তাকে খুঁজে বের করবোই। কোথায় আর যাবে। তুমি একদম চিন্তা করো না।’
‘কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দিব—বুঝতে পারছি না।’
‘আরে কী বলো—ধন্যবাদ দিতে হবে না। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কেউ কারো জন্যে কিছু করতে পারাটাও একটা ভাগ্যের ব্যাপার। সবার কিন্তু সেই ভাগ্য হয় না।’ বলেই ফরিদ চলে গেল।
সোমা লক্ষ্য করল, শহীদের জন্যে তার আর আগের মত কষ্ট লাগছে না। কিন্তু কেন? সে ফরিদকে ধন্যবাদ দিল ঠিকই কিন্তু সেটা কেমন যেন মেকি মনে হলো। নাকি অন্য কিছু?
এই মধ্যবয়স্ক মানুষটিকে এখন অন্যরকম লাগছে সোমার। মনে হচ্ছে কাছের কেউ—অনেক আপনজন। সোমা লক্ষ্য করেছে, ফরিদ মাঝে মাঝেই তাকে তুমি তুমি করে বলছে আবার মাঝে মাঝে আপনি। শুধু তাই নয়, সে ঐ ছেলেগুলি—বাদশা এবং ইকবালকে একবার তুই আবার তুমি করে বলছে। সোমার বাবাও অনেকটা এরকম ছিলেন—সিচুয়েশন এবং মুডের উপরে তার ছেলেমেয়েদের সাথে তুই আর তুমির মিশ্রণে কথা বলতেন তিনি।
ফরিদ ফিরে এসে দেখল সোমার রান্না প্রায় হয়ে এসেছে। মাংসের চেহারা এবং রঙের আমূল পরিবর্তন দেখে ফরিদ অবাক হয়ে গেল। ফরিদ কাউন্টারের উপর বসে জিজ্ঞেস করল, ‘বাহ দেখতে তো বেশ সুন্দর হয়েছে। তুমি রান্না শিখেছো কার কাছে?’
‘আমার মায়ের কাছ থেকে।’ সোমা মাংস নাড়তে নাড়তেই বলল। ‘আপনি?’ সোমা জানতে চাইল।
‘একা একাই শিখেছি। এদেশে সবাই একসময় রান্না শিখে যায়। উপায় তো নেই—হার্ড লাইফ।’ ফরিদের কথা শেষ হবার সঙ্গে সঙ্গেই বাসার ফোন বেজে উঠল। ফরিদ রান্না ঘরের দেয়ালে ঝুলানো ফোন তুলে নিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
‘বস, আমি বাদশা।’
‘হ্যাঁ বলো।’
‘বস ঐ পোলার কোনো খোঁজ বাইর করতে পারলাম না। এত জায়গায় গেলাম—কেউ হালারে চিনে না। আমার তো মনে হয় বস এখন পুলিশে একটা ফোন করা দরকার—এতো ঝামেলা…’
বাদশা কথা শেষ করার আগেই ফরিদ তাকে ধমকে উঠে বলল, ‘ধুর মিয়া, পুলিশে ফোন করা যায়, সেটা কি আমি জানিনা মনে করেছ?’
‘আমি চিন্তা করছিলাম বস, আপনার কাজ নষ্ট হইতেছে। এর মধ্যে একটা ঝামেলা আপনার কান্ধে আইসা জুটছে। কাম-কাইজ ফালায় রাইখা আপনেই বা কতক্ষণ দেখবেন। তাই ভাবছিলাম পুলিশরে জানাইলে তারাই একটা শেল্টার হোমে মেয়েটারে থাকার ব্যবস্থা করে দিত।’
ফরিদ রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? এসব কি বলছিস তুই? আমরা এতগুলো মানুষ থাকতে মেয়েটাকে শেল্টার হোমে যেতে হবে?’ এটুকু বলেই ফরিদ লক্ষ্য করল সোমা রান্না বন্ধ করে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তার চেহারায় একটা দুশ্চিন্তার ছাপ স্পষ্ট দেখা দিল। ফরিদ এবার ফোনটা নিয়ে পাশের রুমে গিয়ে চাপা স্বরে বলল, ‘একটু বোঝার চেষ্টা কর—বাংলাদেশ থেকে একটা মেয়ে এসেছে। সে একটা বিপদে পড়েছে—তাকে সাহায্য করাটা আমাদের নৈতিক কর্তব্য। এটা আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা যদি এই মুহূর্তে তার পাশে না দাড়াই, তাকে সাহায্য না করি তা হলে কে করবে?’
‘আপনে বুঝতে পারতেছেন না বস—বাসার মধ্যে একা একটা মেয়েকে নিয়ে গেছেন, এদিকে আবার কান কথা শুরু না হয়ে যায়। আপনার একটা রেপুটেশন আছে বস। তাই বলছিলাম ঝামেলার কি দরকার…’
‘কান কথা মানে? কিসের কান কথা? কান কথা কে ছড়াবে? আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না—এ ধরনের কথা কেনই বা আসবে?’ ফরিদের ভীষণ রাগ হলো, তবুও সে যথাসম্ভব মাথা ঠাণ্ডা রাখার চেষ্টা করল। সে গলার স্বর নিচু করে বলল, ‘তোকে যা করতে বলেছি তাই কর। বাকীটা আমি দেখছি।’ বলেই ফরিদ ফোন কেটে দিল।
ফরিদ ফিরে এসে দেখল রান্না ঘরে সোমা নেই। বুঝতে পারল সোমা আহত হয়েছে। তার সামনে এইভাবে কথা বলায় তার মন খারাপ হবারই কথা। নিশ্চয়ই অস্বস্তিতে পড়েছে মেয়েটা। ফরিদ সিদ্ধান্ত নিল মেয়েটিকে একটু সময় দেয়া দরকার। এদিকে তার খিদেও পেয়েছে অনেক। সোমার খাওয়া দরকার সবার আগে—সারাদিনে সে কিছুই খায়নি। ফরিদ ধীর পায়ে উপরে উঠে সোমার ঘরের দরজায় গিয়ে নরম স্বরে ডাকল, ‘সোমা।’
সোমা কোনো উত্তর দিল না।
ফরিদ আবার ডাকল। কোনো উত্তর না পেয়ে ফরিদ বলল, ‘সোমা আমি জানি তুমি কষ্ট পেয়েছ। তোমার সামনে এভাবে কথাগুলো বলা ঠিক হয়নি। তুমি কি একটু নীচে আসবে ভাই, আমি বিষয়টা বুঝিয়ে বলছি।’
সোমা কিছু বলল না। ফরিদ এবার সর্বশেষ অস্ত্র প্রয়োগ করল। সে বলল, ‘দেখো আমি সারাদিন কিছু খাইনি। আমার কিছু মেডিসিন খেতে হয় যা খালি পেটে খাওয়া যায় না। আমাকে এখন খেতে হবে। মুশকিল হচ্ছে তোমাকে ছাড়া খেতে পারছি না।’ এটুকু বলে ফরিদ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল দরজার ওপাশে।
কিছুক্ষণ পরে দরজা খুলে বাইরে এসে দাঁড়াল সোমা। ফরিদকে বলল, ‘এত নাটক করতে হবে না। আপনি যান আমি আসছি।’
সোমার কথার বলার ভঙ্গীতে ফরিদ হেসে ফেলল। সে হাসতে হাসতেই নীচে নেমে গেল।
নীচে নামতে নামতেই ইকবালের ফোন এলো। ফরিদ হ্যালো বলতেই সে বলল, ‘এইটা হান্ড্রেড পার্সেন্ট ফ্রড কেস, বস। আমার তো মনে হয় ঐ হালার অন্য কোথাও সম্পর্ক আছে। এই রকম ঘটনা কিন্তু বস আগেও ঘটছে। আই’ম শিওর ঐ ব্যাটার আরেকটা বউ আছে—হয় কাইল্যা না হয় মেক্সিকান। গ্রিনকার্ড বানাইয়া আবার বিয়া করছে দেশ থিকে… এইটা ফ্রড কেস না হয়েই যায় না…’
‘দেখো ইকবাল, কারো সম্পর্কে না জেনে কিছু বলা ঠিক না। এসব ফালতু চিন্তা বাদ দিয়ে আগে দেখো, ছেলেটাকে খুঁজে পাও কিনা?’ রেগে গেলে ফরিদ তুমি করে বলে। ইকবাল, বাদশা, রন্টু এমন বেশ কিছু যুবকের সঙ্গে ফরিদের বেশ ভালো সম্পর্ক রয়েছে। ফরিদ তাদের সবাইকে কোনো না কোনো ভাবে সাহায্য করেছে—শিকাগোতে প্রতিষ্ঠিত হবার ব্যাপারে। তাদের সবাই ফরিদকে বড় ভাইয়ের মত মানে। সে সবার বস।
‘খুঁজতেছি তো বস—শিকাগোর কোনো জায়গা বাদ নাই। কিন্তু তারে তো কেউ চিনেনা।’
‘কেউই চিনবে না এটা হতেই পারে না।’
কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইকবাল বলল, ‘বস, মাইয়াটারে রাত্রে কই রাখবেন তাইলে?’
ফরিদ একটু চুপ করে রইল। সে কি উত্তর দেবে? বাইরে তুষারপাত হচ্ছে। রাতও হয়েছে অনেক। এই অবস্থায় সোমাকে কার বাসায় পাঠাবে? সবচেয়ে বড় কথা, যার বাসায়ই পাঠানো হোক না কেন, শুরু হবে একটার পর একটা অযাচিত প্রশ্ন। মেয়েটাকে কোথায় পেলেন, আপনার কে হয়, আপনি আগে থেকে চিনতেন কিনা, আপনার কাছেই বা কেন এলো? এই লোকের চরিত্র খারাপ সবাই জানে—বউ তো আর এমনি এমনিই যায় নাই? সোমা নিশ্চয়ই বিব্রত হবে। এমনিতেই যথেষ্ট ধকল যাচ্ছে—এরপর আরো বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ফেলাটা মোটেও ঠিক হবে না।
ফরিদ বলল, ‘ব্যবস্থা করছি। এটা নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে—তোকে যা বললাম, তুই তাই কর।’ বলেই লাইন কেটে দিল ফরিদ।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৫)
বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেল সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাতের শুরু হয়েছে শিকাগো শহরে।
ফরিদের গাড়ি তার ডুপ্লেক্স টাউন-হোমের পার্কিং এ এসে থামল। সোমার লাগেজগুলো বের করে ফরিদ সোমাকে সিঁড়ি দেখিয়ে দিল।
সোমা দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মত। সে বুঝতে পারছে না কি করবে। একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একা একা তার বাসায় যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে কি না। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজের সব কাজ ফেলে রেখে এই মানুষটা তার জন্যে যা করেছে সেখানে তার বিশ্বাস যোগ্যতা নিয়ে ভিন্ন কিছু চিন্তা করাটা হবে নিতান্তই অন্যায়। সোমা সব দ্বিধা ছেড়ে ফেলে ফরিদের পেছনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। ফরিদ দরজা খুলে সোমাকে লিভিং রুমে এনে বসাল।
সোমা আড়ষ্ট হয়ে বসল। সে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। অন্য কাউকে চোখে পড়ল না।
ফরিদ বলল, ‘রিল্যাক্স।’ ফরিদ তার গায়ের ওভারকোট, হাত মোজা খুলতে খুলতে বলল, ‘তুমি কোনো চিন্তা করো না। শিকাগো শহরটা অনেক বড় হলেও, এখানে বাঙালীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। আমরা তোমার স্বামীকে খুঁজে বের করবোই। ঠিক আছে?’
সোমা চুপ করে রইল। ফরিদ আবার বলল, ‘আমি একটা ফোনকার্ড এনে দিচ্ছি এবং কিভাবে দেশে ফোন করতে হবে বলে দিচ্ছি। তুমি নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারবে।’ বলেই সে তার ডুপ্লেক্স বাসার উপরের তলায় উঠে গেল।
সোমা আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। তার শরীর ঝাঁকি দিয়ে কান্না পাচ্ছে। কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। তার সামনে এখন কি অপেক্ষা করছে একমাত্র আল্লাহই জানে—সে কিছুই ভাবতে পারছে না।
ফরিদ ফোনকার্ড নিয়ে এসে দেখল সোমা আবারো কাঁদছে। সান্ত্বনা দিয়ে সে বলল, ‘আহা, তুমি এতো কাঁদছ কেন? কাঁদতে কাঁদতেই তো তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে। তোমাকে তো বলেছি ভয়ের কিছু নেই। আমি যতক্ষণ আছি—কোনো সমস্যা হবেনা। এই যে নাও ফোনকার্ড। তুমি ফোনটা করো। আমি গাড়ি থেকে খাবারগুলো নিয়ে আসছি।’ ফরিদ ফোনকার্ড আর কর্ডলেস ফোনটা সোমার হাতে দিয়ে নীচে নেমে গেল।
সোমা ফোনকার্ড হাতে নিয়ে উল্টে পালটে দেখল কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারল না কিভাবে এটার ব্যবহার করতে হবে। সে কার্ড হাতে চুপ করে বসে রইল।
ফরিদ খাবারগুলো রান্না ঘরের ফ্রিজে রেখে ফিরে এসে দেখল সোমা কার্ড হাতে বসে রয়েছে। সে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হলো ফোন করেছ?’
সোমা না-সূচক মাথা নাড়ল।
‘কেন?’
‘আমি তো জানিনা কার্ড দিয়ে কিভাবে ফোন করতে হয়।’
‘দেখি কার্ডটা দাও।’ ফরিদ কার্ড হাতে নিয়ে বলল, ‘ফোনকার্ড দিয়ে বাংলাদেশে ফোন করা খুবই সহজ। আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। প্রথমে এই টোল ফ্রি নাম্বার ডায়াল করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। তারপর এই যে, এই পিন নাম্বারটা দিয়ে বাংলাদেশের নাম্বারটা চাপলেই হয়ে যাবে। এই যে নাও—রিং হচ্ছে। ইউ হ্যাভ টুয়েন্টি এইট মিনিটস।’ ফরিদ ফোনটা দিল সোমার হাতে।
সোমা ফোন কানে ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে সোমার বড় বোন রুমার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ শোনা গেল।
সোমা বলল, ‘হ্যালো আপা, আমি সোমা।’
‘হ্যালো? হ্যালো?’ ওপাশে রুমা চিৎকার করছে।
‘আপা আমি সোমা। আমেরিকা থেকে…’
‘সোমা! কখন পৌঁছেছিস? ঠিকমত পৌঁছেছিস?’
সোমা একটু থেমে বলল, ‘হ্যাঁ আমি ঠিকমত পৌঁছেছি।’
‘আরে ফোন করতে এত দেরী হলো কেন? আগে ফোন করিস নাই কেন? এদিকে আমরা কি টেনশনেই না ছিলাম…’
‘লন্ডনে ফ্লাইট ডিলে ছিল।’
‘কোথায়?’
‘লন্ডনে। কেন, শহীদ কল করে জানায় নাই?’
‘না তো। শহীদ ফোন করে নাই তো। শহীদ ফোন করবে কেন? তুই করিস নাই কেন? আচ্ছা শহীদ কই? দে তো ওকে…’
সোমা চুপ করে রইল।
‘শহীদকে দে।’ রুমা আবার চাইল।
‘আপা, আমি আবার পরে কল করব। এখন রাখি—পরে কথা বলব নে।’
‘তুই ভালো আছিস তো?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ভালো আছি। চিন্তা করো না। আচ্ছা এখন তাহলে রাখি?’
‘শহীদ কোথায় বললি না তো। ও ভালো আছে?’
সোমা কোন উত্তর দিল না। ফোনের ভেতর থেকে রুমার কণ্ঠ শোনা গেল, হ্যালো হ্যালো? সোমা খট করে ফোন কেটে দিল।
ফরিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সোমার মুখের দিকে। একটা ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারছে না—সোমা শহীদের ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল কেন? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘তুমি মিথ্যে বললে কেন?’
সোমা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘সত্যি বললে কি হতো? সব সময় কি সত্যি বলা যায়? আর তাছাড়া আমার আপার টেনশনটা এমনিতেই বেশি—দেখা যাবে সবার ঘুম হারাম করে দিয়েছে।’
‘না না না কাজটা তুমি ঠিক করো নি। একটা মিথ্যে ঢাকতে অনেক মিথ্যে বলতে হয়। মিথ্যে বলাটা…’ কথা শেষ হবার আগেই ফোন বেজে উঠল। ফরিদ কথা থামিয়ে দ্রুত ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
‘শহীদ নামে কোন ক্যাব ড্রাইভারকে কেউ চিনে না বস।’ ইকবালের কণ্ঠ শোনা গেল ফোনের ভিতর দিয়ে। ‘বাদশাও চিনে না। আমি আরো খোঁজ লাগাইছি বস—আপনি চিন্তা কইরেন না।’
‘ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর—একটু সিরিয়াসলি নে। কেমন একটা ঝামেলার মধ্যে পড়েছি বুঝতে পারছিস?’
ফরিদের এই কথায় সোমার মুখ কালো হয়ে গেল। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
‘বস, আমি জাইকা’তে আবার আসলাম। এইখানে পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান যত ক্যাব’য়ালা আছে কেউ তারে চিনে না। আচ্ছা বস, তার আর কোনো নাম আছে নাকি?’
ফরিদ ফোন চেপে ধরে সোমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, ওর আর কোনো নাম আছে? ডাকনাম?’
সোমা মাথা নেড়ে জানাল, নেই।
‘না আর কোনো নাম নেই।’ ফোনে ফরিদ আবার বলল, ‘ঐ শহীদই নাম, শহীদুল ইসলাম—তুমি খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করো।’
‘আচ্ছা বস, ব্যবস্থা করতেছি। আপনি টেনশন নিয়েন না।’
ফরিদ ফোন রেখে দিয়ে সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঐ শহীদ বোধ হয় খুব একটা কারো সঙ্গে মেশে না। কেউ তো ওকে চেনে না। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগছে। ওর কি কোনো বন্ধু-বান্ধব অথবা পুরনো রুমমেট—জানো কিছু?’
সোমা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘রুমমেট তো বোধহয় ছিল না। ও তো একাই থাকত। তবে বাবু নামে একটা ছেলের কথা মাঝে মাঝে বলত।’
‘বাবু? বাবু নামে শিকাগোতে কে আছে? আচ্ছা দেখছি।’ বলতে বলতেই সোমার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করে ফরিদ বলল, ‘তুমি লম্বা জার্নি করে এসেছে। আমার মনে হয় তোমার একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার। একটু রেস্টও দরকার।’
সোমা নিজেই ভাবছিল তার ফ্রেশ হওয়া দরকার। দু’দিনের জার্নি, ধকল সব মিলিয়ে সে খুব ক্লান্ত। এক কাপড়েও সে কখনো এত সময় থাকেনি। গা-টা যেন কেমন ঘিনঘিন করছে। মাথাটাও ধরে আছে। বমি বমি ভাব হচ্ছে। ওর মনে হচ্ছে যে কোনো সময় পড়ে যেতে পারে। সে বলল, ‘হ্যাঁ একটু ফ্রেশ হতে পারলে ভালো লাগত। খুব টায়ার্ড লাগছে।’
‘টায়ার্ড তো লাগারই কথা। এখন তো তোমার গভীর ঘুমের সময়। তুমি এক কাজ করো, একটা শাওয়ার নিয়ে নাও—দেখবে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে।’
সোমা মাথা নেড়ে সায় দিল।
ফরিদ উপর তলায় ঘর দেখিয়ে বলল, ‘তুমি উপরের ডান দিকের রুমটাতে যাও—ওটাতে এটাচড বাথ আছে… আচ্ছা, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি—এসো আমার সাথে।’
সোমার ছোট ব্যাগটা নিয়ে ফরিদ সিঁড়ি ভেঙে উপর তলায় গিয়ে সোমার জন্যে ঘর দেখিয়ে দিল। বাথরুমে কিভাবে গরম পানি আর ঠাণ্ডা পানি মিশিয়ে ব্যবহার করতে হয় দেখিয়ে দিল। সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে নীচে নামার সময় বলল, ‘একটা হট শাওয়ার নিয়ে কিছুক্ষণ ন্যাপ নিয়ে নাও—দেখবে ভালো লাগছে। ভয়ের কিছু নেই—বী ইয়োরসেলফ!’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ফরিদ ভাই!’
‘ইউ ওয়েলকাম।’
ফরিদ নীচে নেমে গেলে সোমা দরজা আটকিয়ে চারিদিকে একবার দেখে নিয়ে বিছানায় গা-টা এলিয়ে দিল এবং মুহূর্তের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখল সোমা।
কলেজ থেকে ফিরে সোমা শুয়ে আছে। হুট করে রুমা এসে ওকে ডেকে তুলল, ‘এই সোমা ওঠ। জরুরী কথা আছে।’
ঘুম জড়ানো কণ্ঠে সোমা বলল, ‘কি হয়েছে?’
‘তোর শহীদের কথা মনে আছে?’
‘কোন শহীদ?’
‘আরে আমার দেবর শহীদ—আমেরিকায় থাকে।’
‘হ্যাঁ—কি হয়েছে তার?’
‘কিছু হয় নাই। শহীদ বিয়ে করবে। মেয়ে খুঁজছে।’
‘তো?’
‘আমি বলেছি তোর কথা।’
সোমা বড় একটা হাই তুলে উঠে বসতে বসতে বলল, ‘আমার কথা মানে?’
‘শোন, আমার শ্বশুর বাড়িতে কথা বলেছি। তারা তো এক পায়ে রাজী। শহীদ তোর সাথে কথা বলতে চায়। তুই আজ রাতে আমাদের বাসায় চল। শহীদ রাতে কল দিবে—তোর সাথে কথা বলতে চায়।’
‘আমার সাথে কথা বলতে চায় মানে কি?’
‘এত মানে বলতে পারব না। সেটা কথা হলেই বুঝতে পারবি। তুই রেডি হয়ে নে—চল আমার সাথে।’
‘আপা হেঁয়ালি করিস না তো!’
সোমাকে কোন রকম পাত্তা না দিয়ে রুমা প্রায় জোর করে সোমাকে নিয়ে চলে গেল তার নিজের বাসায়।
সন্ধ্যা মাত্র ৭টা। শহীদ ঘুম থেকে উঠে শিকাগো সময় সকাল ৯টায় রুমাদের বাসার ফোনে কল দিবে—তখন ফরিদপুরে সময় হবে রাত ৯টা।
‘তুই এখানে বসে পড়াশুনা কর। আমি চাই, শহীদের ফোন এলে তুইই প্রথমে ধরবি—দারুণ সারপ্রাইজ হবে।’ রুমাদের ড্রইং রুমের একটা টেবিলে রাখা ল্যান্ডফোনের পাশে সোমাকে বসিয়ে রেখে রুমা চলে গেল রাতের খাবার তৈরী করতে।
তখন থেকেই অত্যন্ত অস্বস্তিকর সময় কাটছে সোমার। কিন্তু একটা পর্যায়ে সেও তার ঘড়ি দেখা শুরু করল। ৯টা বাজতে আর কত দেরী। সোমা পড়ায় মন দেয়ার চেষ্টা করল—কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারল না। তার অস্থিরতা বেড়ে গেল। সোমার নিজের কাছে বিরক্ত লাগছে—সে ভেবে পেল না, তার কেন এত অস্থির লাগছে।
সোমা পড়ায় ডুব দিল। একটা পর্যায়ে ফোনের কথা প্রায় ভুলেই গেল সে। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! রুমাদের বসার ঘরের ফোন বেজে উঠল—ক্রিং ক্রিং।
ক্রিং ক্রিং… অনেকক্ষণ থেকে একটা ফোন বেজে চলেছে। অনেক দূর থেকে ফোনের শব্দ ভেসে আসছে। ফোনের শব্দে সোমার ঘুম ভাঙল। সে চোখ মেলে তাকাল। সে কতক্ষণ ঘুমিয়েছে? এই মুহূর্তে সে কোথায় আছে সেটাও মনে করতে পারল না। চোখে রাজ্যের ঘুম—কিছুতেই চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। এখন কি রাত না দিন? রাত হলে কত রাত?
লিভিং রুমের কফি টেবিলের উপর থেকে কর্ডলেস ফোনটা নিয়ে ফরিদ বলল, ‘হ্যালো?’
‘বস আমি ইকবাল।’
‘হ্যাঁ ইকবাল বল।’
‘বস আমি ইয়েলো ক্যাব অফিসে। ওরা কোনো ইনফরমেশন দিতে চায় না। জিগায় তুমি কে? আমি কইলাম, আমি তার ফ্রেন্ড। কিন্তু কাজ হইল না বস। ওরা পুলিশ রিপোর্ট ছাড়া কোনো ইনফরমেশন দিবে না।’
‘ও।’ ফরিদ আর কিছু না বলে চিন্তিত মুখে ফোন রেখে দিল।
লিভিং রুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে ফরিদ কিছুক্ষণ ভাবল। এলোমেলো ভাবনা। অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে। অন্যমনস্কভাবেই একবার তাকাল উপরের দিকে। অজান্তেই বেরিয়ে এলো একটা দীর্ঘশ্বাস।
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে বসল সোমা। এবং হঠাৎই তার মনে পড়ল সারাদিনের সব ঘটনা।
আরো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল সোমা। এবং অবাক হয়ে দেখল—চারিদিক সাদা বরফের আবরণে ঢেকে আছে। রুপোর মতো ঝলমল করছে সারিবদ্ধ বাড়ির ছাদগুলি।
ফরিদ ভাই বলছিল রাতে স্নো পড়বে। সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মত তুষার—এখনো ঝরছে ঝিরিঝিরি। নিয়নের আলো আর চাঁদের আলোর মিশ্রণে চিকচিক করছে চারিদিক—এ এক অপূর্ব দৃশ্য। সোমার কল্পনাতে এমন দৃশ্যের কথা কখনো আসেনি। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বাইরে।
রাতের নিস্তব্ধতায় মগ্ন হয়ে আছে সোমা। নিস্তব্ধতা যখন চারিদিকে গ্রাস করে আছে হঠাৎ তখন দরজায় শব্দ হলো—ঠক ঠক। সম্বিত ফিরে পেয়ে ভয়ার্ত চোখে দরজার দিকে তাকাল সে। এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা দুরু দুরু কেঁপে উঠল তার। হৃৎপিণ্ডের দপ দপ শব্দ শোনা যাচ্ছে পরিষ্কার। সোমা কাঁপা স্বরে বলল, ‘কে? ফরিদ ভাই?’
কেউ কোনো সাড়া দিল না—দরজার ওপাশ থেকে।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৪)
ফরিদ ফোন বের করে ডায়াল করল ইকবাল নামে খুব পরিচিত এক ছেলেকে। অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই ফরিদ বলল, ‘হ্যাঁ ইকবাল?’
‘জি ফরিদ ভাই।’
‘আচ্ছা শোন, শহীদ নামে শিকাগোতে ক্যাব চালায় এমন কাউকে চিনিস?’
‘ক্যান কি হইছে বস?’
‘না মানে আমি তো এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম সেলিমকে ড্রপ করতে। ফেরার পথে দেখি একটা বাংলাদেশি মেয়ে—বিয়ে হয়েছে শহীদ নামে এক ছেলের সঙ্গে—মেয়েটা বসে বসে কাঁদছে। ওর হাজবেন্ড এয়ারপোর্টে ওকে আনতে যায়নি। আমি মেয়েটাকে নিয়ে আসছি শহীদের বাসায়। কিন্তু সে বাসায় নেই। এখন বুঝতে পারছি না কি করব।’
‘আপনি ঐখানে গেলেন ক্যামনে?’
‘লাগেজের উপরের ঠিকানা লেখা ছিল। ঐ ঠিকানা দেখেই এসেছি।’
‘ফ্রড কেস নাকি বস?’
‘না না তা হতে যাবে কেন? তুই এক কাজ কর, তুই একটু খোঁজ নিয়ে দ্যাখ তো—কেউ শহীদ নামে কাউকে চিনে কিনা।’
‘আচ্ছা আমি দেখতেছি। আপনে ঐ পোলার ফোন নাম্বারটা আমারে দেন।’
‘আচ্ছা আমি টেক্সট করে পাঠাচ্ছি। তুই ব্যাপারটা একটু সিরিয়াসলি দ্যাখ, ওকে?’
‘ওকে বস।’
ফোন কেটে দিয়ে ফরিদ দেখল সোমা কাঁচুমাচু হয়ে বসে অঝোরে কাঁদছে।
দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। শীতের সময়ে এই শহরে বিকেল চারটা বাজতে না বাজতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ফরিদ চারিদিকে একবার তাকাল তারপর ফিরে গেল সোমার কাছে। বসল তার পাশে।
সোমার কান্নার গতি বেড়ে গেল—রীতিমত শব্দ করে কাঁদছে মেয়েটি। ঠাণ্ডায় তার নাক দিয়েও পানি ঝরছে। একেই বলে নাকের পানি—চোখের পানি এক হয়ে যাওয়া। সে রুমাল দিয়ে মুছে তাকাল ফরিদের দিকে।
একটু সময় নিয়ে ফরিদ বলল, ‘আমি বলছিলাম কি—আমার বেশ খিদে লেগে গেছে। তারপর আবার ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার। চলো, কিছু খেয়ে নেই।’
‘না। আমি যাবো না। এটা যদি শহীদের বাসা হয়ে থাকে তাহলে সে নিশ্চয়ই এখানে আসবে। আমি এখানে বসে থাকি—আপনি যান।’ জেদি গলায় বলল সোমা।
‘না না সেটা তো ঠিকই আছে। শহীদের বাসা—শহীদ তো এখানে আসবেই। আমি বলছিলাম কি, আমি না হয় আমার ফোন নাম্বারটা লিখে ওর দরজায় ঝুলিয়ে রেখে যাই। ও ফিরে এলে আমাকে কল করলেই আমরা চলে এলাম। তাছাড়া এই ঠাণ্ডায় এভাবে বসে থাকাটা ঠিক হবে না। তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে।’
সোমা চুপ করে রইল।
ফরিদ আবার বলল, ‘এক কাজ করি চলো। এখানে ডেভন নামে একটা জায়গা আছে—ডেভন এভিনিউ। সেখানে বাংলাদেশি, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি অনেক রেস্টুরেন্ট আছে। চাই কি দু’একজন দেশী মানুষের সাথে দেখাও হয়ে যেতে পারে। তোমার ভালো লাগবে। সেই সাথে আমরা খেয়েও নিলাম।’
সোমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘না আমি যাবো না। এখানেই বসে থাকব। আপনি চলে যান।’
ফরিদ আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে উঠে চলে গেল। সে একবারের জন্যেও পিছনে ঘুরে তাকালো না। দরজা খুলে ফরিদ যখন গাড়িতে উঠতে যাবে তখন সে শুনতে পেল সোমার ডাক—ফরিদ ভাই!
ফরিদ ঘুরে তাকাল। সোমা বলল, ‘আমিও যাবো আপনার সাথে।’
‘চলো।’ ফরিদ এমন ভাবে চলো বলল যার মানে হতে পারে তোমার ইচ্ছা—গেলে যাবে না গেলে নাই। আমার কি? এই মেয়ে কখন আবার মত বদলে ফেলে কে জানে।
‘আমার হ্যান্ডবাগে বোর্ডিং কার্ড আছে। ওখানে চিঠি লিখে রেখে যাই।’ সোমা দ্রুত কয়েক লাইন লিখে ফরিদকে বলল, ‘আপনার ফোন নাম্বারটা লিখে দেন।’
ফরিদ তার নাম্বার লিখে দিল। সোমা তার বোর্ডিং কার্ডটি দরজায় ঝুলিয়ে রেখে ফরিদের পিছে পিছে গাড়িতে গিয়ে উঠল।
ফরিদের গাড়ি ছুটে চলেছে। গন্তব্য ডেভন এভিনিউ।***
লেকশোর ড্রাইভ ধরে লেক মিশিগানের মনোরম সৌন্দর্য দেখতে দেখতে গাড়ি ছুটে চলেছে ডেভনের দিকে। সম্পূর্ণ লেকটি সাদা বরফের চাদরে ঢেকে আছে। লেকের উপর দিয়ে ডানা মেলে শীতের পাখি নীড়ে ফিরে যাচ্ছে—সে এক অপূর্ব দৃশ্য।
ডেভনে এসে গাড়ি পার্ক করে সোমাকে নিয়ে ফরিদ ঢুকল একটা রেস্টুরেন্টে। তাকে জানালার ধারের একটা টেবিলে বসিয়ে রেখে ফরিদ গেল খাবার অর্ডার দিতে।
ইতিমধ্যে সোমা আরেক দফা কান্না শুরু করে দিয়েছে। শব্দ চেপে কান্নার চেষ্টা করছে বলে তার শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালের ভিতর দিয়ে বাইরে থেকে কয়েকজন মানুষ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে সোমাকে। কিন্তু তার কান্নার কারণটা কি কেউ বুঝতে পারছে না।
ফরিদ ফিরে এসে সোমাকে বলল, ‘দেখুন আপনি কাঁদবেন না। একটু ধৈর্য্য ধরুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
সোমা কান্না থামাল।
‘এখন কি খাবেন সেটা বলুন।’
‘আমি কিছু খাবো না।’
‘সেকি। কিছু তো একটা খেতে হবে। না খেলে চলবে কী করে? এদের বিরিয়ানিটা খুব ভালো—দিতে বলি?’
‘আপনি যা খাবেন তাতেই হবে।’
ফরিদ উঠে গিয়ে আগের খাবারের সঙ্গে একটা বিরিয়ানি যোগ করতে বলল। সে ফিরে এসে বসল। সোমা কাঁচের দেয়ালের বাইরে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে। ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, তোমাকে একটা পারসোনাল প্রশ্ন করি?’
‘করেন।’
‘তোমাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন?’
‘বছর দুয়েক।’
‘দুই বছর?’
সোমা মাথা নাড়ল।
‘বলো কি? সে তো অনেক সময়।’
‘তা তোমাদের বিয়ে নিশ্চয়ই বাংলাদেশে হয়েছে না?’
‘না। ফোনে।’
‘অ্যাঁ?’ ফরিদ বেশ অবাক হলো।
‘ফোনে।’ সোমা আবার বলল।
‘ও। টেলিফোনে বিয়ে!’ টেলিফোনের বিয়ের ব্যাপারটা ফরিদ শুনে এসেছে অনেক—কিন্তু সত্যি সত্যিই ফোনে বিয়ে হয় কিংবা হতে পারে সেই সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। সে উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, ‘তো তুমি এতো দেরী করলে যে? ওর কি কাগজ-পত্র রেডি ছিল না নাকি…’
‘না না ওর কাগজ-পত্র আছে। আমিই ভিসা পাইনি।’
‘ও।’ ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কি পূর্ব পরিচিত?’
‘না।’
‘আত্মীয়?’
‘আমার বোনের দেবর। অনেক আগেই আমেরিকা চলে আসে। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। তখন আমার সাথে দেখা হয়েছিল। কথা-টথা তেমন ছিল না।’
‘কিন্তু বিয়ের পরে টেলিফোনে নিশ্চয়ই অনেক কথা হতো?’ ফরিদের মুখে দুষ্টমির হাসি।
‘হতো। কিন্তু আমাদের তো ফোন ছিল না। ও সব সময় বলত ফোন নিতে—আর এখন তো মোবাইল।’
‘মোবাইল আসার পরে নিশ্চয়ই আর কোনো সমস্যা হয়নি—সারাক্ষণই কথা বলতে।’
‘না না সারাক্ষণ কথা বলি কেমন করে? ও তো ক্যাব চালায়। গাড়ি চালাতে চালাতে কি কথা বলা যায় নাকি?’
‘বলা যাবে না কেন? গাড়ি চালাতে চালাতেও কথা বলা যায়—অনেকেই বলে।’
‘তাই?’
‘তবে গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইলে কথা না বলাই উচিৎ। এক্সিডেন্ট হতে কতক্ষণ।’
সোমা আর কিছু বলল না। ফরিদও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। এসব অর্থহীন কথা-বার্তা আর কতক্ষণ বলা যায়। মেয়েটির মনটাকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখার জন্যে যতক্ষণ সম্ভব কথা চালিয়ে যাওয়া।
ফরিদ একবার কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে দেখল খাবার রেডি হয়েছে কিনা। সে সোমাকে আবার বলল, ‘শহীদ নিশ্চয়ই তোমাকে খুব ভালোবাসে?’
সোমা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘দেখাই হলো না। আর ভালোবাসা।’
ভালো যন্ত্রণা হলো দেখছি। এই মেয়ে দেখি সব কথাতেই কেঁদে ফেলে। অপ্রস্তুত ফরিদ কী বলবে ভেবে পেল না।
সোমা বলল, ‘বাসে। বাসে নিশ্চয়ই।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘চলেন ওর বাসায় যাই। এতক্ষণে নিশ্চয়ই চলে আসছে।’
‘এখনই যাবে? মাত্রই তো এলাম। এত অল্প সময়ের মধ্যে কি ফিরে এসেছে? আর আসলে তো আমাদেরকে কল করতোই।’
‘জানিনা। চলেন আমরা যাই।’ সোমা গোঁ ধরে বসে রইল। সে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাচ্ছে না।
ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কাঁদতে হবে না। উমম, তাহলে এক কাজ করি—খাবারগুলো টু-গো করে নিয়ে নেই।’
সোমা কিছু বলল না। ফরিদ আবার বলল, ‘তুমি কিছু চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। ট্রাস্ট মি।’ বলেই সে উঠে চলে গেল কাউন্টারে। খাবার নিয়ে এসে তারা আবার চলল শহীদের বাসার উদ্দেশ্যে।
গাড়ি থেকে নেমে সোমা দৌড়ে চলে গেল দরজার সামনে। কলিং বেলে চাপ দিল বেশ কয়েকবার—কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। ফরিদ এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। উঁকিঝুঁকি দিল জানালার পাশ দিয়ে। দরজায় কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করল—ভিতর থেকে কোনো শব্দ ভেসে আসে কিনা। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘কেউ তো আসেনি বোধহয়। কোনো শব্দ পাচ্ছি না।’
সোমা কাঁদ কাঁদ স্বরে বলল, ‘ওমা, আমার তাহলে এখন কি হবে?’
কিছুক্ষণ ভেবে ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা, তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? ব্যবস্থা একটা হবেই। আমাদের এখানে অনেক বাঙালী ফ্যামিলি আছে—তোমার থাকার ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে।’
‘আমি বাংলাদেশে কথা বলতে চাই। আপনি আমাকে দেশে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন।’
‘এক মিনিট।’ বলেই ফরিদ ফোন করল বাদশা নামে শিকাগো বাঙালী কমিউনিটির তার পরিচিত আর এক ছেলেকে। সেও ক্যাব চালায়। ফরিদের ধারণা, বাদশা একটা খোঁজ বের করতে পারবে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন তুলতেই ফরিদ বলল, ‘ঐ শহীদ নামের ছেলেটার কোনো খবর পেলি?’
ওপাশ থেকে বাদশা কি বলল সোমা তার কিছুই শুনতে পেল না। ফরিদ কিছুক্ষণ চুপচাপ শুনল তার কথা। তারপর বলল, ‘তুই ইকবালের সাথে যোগাযোগ করে আমাকে তাড়াতাড়ি জানা। দরকার হলে সব হসপিটালগুলোতে খোঁজ নে। জাইকাতে গিয়েছিলি?’
সোমা এসে দাঁড়াল ফরিদের পাশে। এবার ফোনের ভিতর দিয়ে ভেসে আসা কথা শুনতে পেল সে। ওপাশের লোকটি বলছে, ‘গেছিলাম বস—লাস্ট দুইদিনে শহীদ নামে কেউ যায় নাই ঐখানে। লোকাল থানায় একটা রিপোর্ট করলে কেমন হয়? আপনি বললে আমি একটা রিপোর্ট করে আসি।’
ফরিদ এখনো জানে না শহীদের ভিসা স্ট্যাটাস কি। তার কি সিটিজেনশীপ কিংবা গ্রিন কার্ড আছে? যদিও সোমা বলেছে তার কাগজ-পত্র আছে। তবুও তার সম্পর্কে ফরিদ এখনো ডিটেইল কিছুই জানে না—তাই এ মুহূর্তে থানা-পুলিশ এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। ফরিদ রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘আরে পুলিশ কল করে একটা মিসিং রিপোর্ট করা যায় সেটা কি আমি জানি না নাকি? দরকার হলে আমি নিজেই যাবো।’
‘ওকে বস ওকে।’ বাদশা আর কোনো কথা বাড়াল না।
‘তুই এক কাজ কর, শহীদের ডিটেইল আমি তোকে টেক্সট করে দিচ্ছি—তুই একটু ইয়েলো ক্যাব অফিসে যেয়ে দেখ কোনো হদিস বের করতে পারিস কিনা।’
‘পাঠান বস—আমি এখুনি যাইতেছি।’
ফরিদ ফোন কেটে দিতেই সোমা উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইল, ‘জাইকা কি?’
ফরিদ ঠিক বুঝতে পারল না। সে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকাল সোমার দিকে। সোমা আবার বলল, ‘আপনি বলছিলেন, জাইকাতে খোঁজ নিয়েছে কিনা।’
‘জাইকা—ও হ্যাঁ।’ ফরিদ হেসে দিয়ে বলল, ‘ওটা ক্যাব চালকদের পছন্দের একটা রেস্টুরেন্ট। খুব সস্তায় খাবার পাওয়া যায়। চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকে। শিকাগো শহরে এমন কোনো ক্যাব চালক নেই যে জাইকাতে খায়নি।’
সোমা চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল ফরিদের মুখের দিকে। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। মানুষটা তাহলে কোথায় গেল? অন্য কোনো বিপদ হয়নি তো? সোমার মনটা হু হু করে কেঁদে উঠল।
ফরিদ বলল, ‘চলো তাহলে যাওয়া যাক।’
সোমার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করতে যে কোথায় যাবো? কিন্তু সে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। সে তার সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে। তার আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও সে মূর্তির মত ফরিদের পিছে পিছে হেঁটে গাড়িতে উঠল।
(চলবে…)
**বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশিয়ান অধ্যুষিত এই ডেভন এভিনিউ সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমার ‘একজন আজমল হোসেন’ গল্পে লিখেছিলাম। গল্পটি যারা পড়েছেন তারা হয়তো জানেন— আমেরিকাকে যদি সত্যিই বলতে হয় যে এটা ইমিগ্র্যান্টদের দেশ, তাহলে ডেভন এভিনিউকে বলতে হবে এটাই আসল আমেরিকা। শিকাগো শহরের উত্তর দিকে পূর্বে-পশ্চিমে লম্বা এই রাস্তায় একসঙ্গে বসবাস করছে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের একটা বিরাট অংশ। পাশাপাশি সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক থেকে আসা অ্যসিরিয়ান খৃষ্টানরা, রাশিয়া থেকে আসা ইহুদিরাও থাকে এখানে। তাদের সাথে আরো রয়েছে আধুনিক ক্রিস্টিয়ানিটির নানা গোষ্ঠী। কালো-ধলো-বাদামী মিলে একাকার। শুধু তাই না, যেন আমেরিকার বহুত্ববোধকে স্বীকৃতি দিতেই এই ডেভন এভিনিউর একাংশের নাম রাখা হয়েছে গান্ধী মার্গ। একটু দূরে গেলেই চোখে পড়বে সাইনবোর্ড মুহাম্মদ আলী জিন্না ওয়ে কিংবা অনারারি শেখ মুজিব ওয়ে।
*১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে শিকাগো সিটি কাউন্সিলে পাশ হওয়া বিলের মাধ্যমে ডেভন এভিনিউর একটি অংশকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ‘শেখ মুজিব ওয়ে’ ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে শিকাগোর বাঙালীরা বাংলাদেশের পতাকা, বেলুন-ফেস্টুন, ফ্লোট, বাঁশি বাজিয়ে একটা র্যালী করে এগিয়ে যায়। সেই র্যালীর শুরুটা হয় এই ‘শেখ মুজিব ওয়ে’ থেকে।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৩)
ফরিদের গাড়ি এসে থামল একটা ডানকিন ডোনাটস-এর সামনে।
সে তাকিয়ে দেখল সোমা চোখ বন্ধ করে সীটের উপর কাঁধ এলিয়ে জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে। মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ফরিদ ওকে ডাকবে কিনা একবার ভাবল। তারপর চুপচাপ বসে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ পর সোমা চোখ মেলে তাকাল এবং সোজা হয়ে বসল। সে অবাক হয়ে চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখল তারপর তাকাল ফরিদের দিকে।
ফরিদ বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলে বোধ হয়।’
সোমা বলল, ‘আমরা কোথায়?’
‘একটা ডোনাট শপের সামনে। কফি খেতে এলাম—এদের কফিটা ভালো।’
‘ও।’ বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সোমা তারপর গাড়ি থেকে নেমে ফরিদের পিছে পিছে ঢুকল ডোনাট শপের ভিতরে।
ফরিদ সোমাকে একটা কোণার টেবিলে বসিয়ে রেখে কফি আনতে গেল। দু’টো কফি নিয়ে এসে সে দেখল সোমা রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে।
ফরিদ সোমার দিকে গরম কফি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘কফিতে চকলেট দেয়া আছে। এত বড় জার্নির পর এই চকলেট-কফিটা কাজে লাগবে—টায়ার্ডনেস কেটে যাবে।’
সোমা কিছু বলল না। চুপচাপ কফির কাপটা দু’হাতে চেপে ধরে গরম কফির উষ্ণতা নিয়ে নিজেকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করল। তারপর আস্তে করে একটা চুমুক দিল।
ফরিদ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘তোমার দেশ কোথায়?’
‘ফরিদপুর।’
‘ফরিদপুর শহরে?’
‘জি।’
‘আচ্ছা। ভাইবোন ক’জন তোমরা?’
‘তিন ভাই-বোন। দুই বোন, এক ভাই।’
‘তুমি বড় সবার?’
‘আমি মেঝ। আমার ছোট ভাই…’
‘বোন বড়?’
‘জি।’
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। ফরিদ চাইছে মেয়েটিকে বিভিন্ন কথা বলে ভুলিয়ে রাখতে। ফরিদ লক্ষ্য করেছে, সোমা ক্ষণে ক্ষণেই কাঁদছে আর কিছুক্ষণ পরপর হাতের রুমালটা দিয়ে চোখের জল মুছছে। এই মুহূর্তে ওকে ব্যস্ত রাখাটা দরকার। সে প্রসঙ্গক্রমে বলল, ‘সোমা, তুমি শিকাগোতে এসেছ—শিকাগোতে বাংলাদেশিদের গৌরব করার মত বড় একটা ব্যাপার আছে।’
সোমা চোখ মুছে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ বলল, ‘এখানে সিয়ার্স টাওয়ার নামে ১১০ তলা উঁচু একটা বিল্ডিং আছে, যেটা একসময় পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে বিখ্যাত ছিল। সেই সিয়ার্স টাওয়ারের আর্কিটেক্ট হচ্ছেন আমাদের একজন বাংলাদেশি। তুমি কি তার নাম শুনেছ?’
‘শুনেছি।’ সোমা শহীদের কাছে শুনেছে সিয়ার্স টাওয়ারের কথা। সোমা এলে শহীদ তাকে যেসব জায়গা দেখাতে নিয়ে যাবে সিয়ার্স টাওয়ার সেই লিস্টের মধ্যে আছে। সে জানে তার নাম। সে বলল, ‘এফ আর খান।’
‘হ্যাঁ, ফজলুর রহমান খান—সংক্ষেপে এফ আর খান। আর ঐ টাওয়ার সংলগ্ন একটা রাস্তার নাম এফ আর খান ওয়ে’***
‘তাই?’
‘হ্যাঁ।’ ফরিদের মুখে গর্বের হাসি দেখা দিল। শিকাগোতে তার পরিচিত কেউ এলেই সে তাকে নিয়ে যায় সিয়ার্স টাওয়ার দেখাতে। তার খুব গর্ব হয় এই ভেবে যে এই শহরের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ এই ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন তার দেশেরই একজন। যিনি ‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর আইনস্টাইন হিসেবে বিশ্বখ্যাত। যাকে বলা হয় ‘টিউব্যুলার ডিজাইন’ এর জনক। কখনো দেখা হয়নি—তবু মনে হয়, কি এক আত্মার বাঁধনে যেন সবাই জড়িয়ে আছে ঐ মানুষটার সাথে। মানুষটা বেঁচে থাকলে ফরিদ নিশ্চিত তার সঙ্গে দেখা করে একটা স্যালুট দিত।
শিকাগো শহরের সব বাঙালীদেরই বোধহয় এমন হয়। সে যে প্রান্তেই যায় না কেন ‘সিয়ার্স টাওয়ার’ যেন ছায়ার মত অনুসরণ করে—অভয় দিয়ে যায় অবিরত। বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় এ শহর সৃষ্টিতে তাদেরও অবদান আছে। এ মহান বাঙ্গালি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনমত তৈরি এবং তহবিল গঠনের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে তৈরী হয় শিকাগো ভিত্তিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইমারজেন্সি ওয়েলফেয়ার আপীল’। উল্লেখ্য, এফ আর খানের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং তাঁর প্রতি সম্মাননা দেখাতে গিয়ে ১৯৯৮ সালে শিকাগো সিটি কাউন্সিল সিয়ার্স টাওয়ারের সামনের রাস্তার নামকরণ করে ‘এফ আর খান ওয়ে’।
ফরিদ আবার বলল, ‘শিকাগো শহরে আমার প্রিয় জায়গাগুলোর একটি এই রাস্তাটি—আমি যখনই এই রাস্তায় গিয়ে ‘এফ আর খান’ এর নাম দেখি, তাকিয়ে থাকি কয়েক মিনিট। মনে হয় পথচারীদের কাছে গিয়ে বলি, তোমরা কি এই লোকটাকে চেনো? এর বাড়ী কোথায় জানো?’
সোমা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফরিদের মুখের দিকে। হঠাৎ করেই যেন মানুষটা বদলে গেছে। একেবারেই অন্যরকম লাগছে। প্রবাসে একজন বাঙালীর সাফল্যে আরেকজন কেমন বুক ফুলিয়ে কথা বলছে। দেশকে নিয়ে ভাবছে—অন্যরকম ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠল সোমার।
‘আরো ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার আছে।’ ফরিদ বলেই চলেছে, ‘এখানে ডেভন এভিনিউ নামে একটা জায়গা আছে—যেখানে সাউথ এশিয়ানদের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-দোকানপাট-রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেও একটা সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘শেখ মুজিব ওয়ে’—দারুণ না?’
‘অবশ্যই।’
‘তোমার তো খুশী হবার কথা। আফটার-অল তোমরা ফরিদপুরের মানুষ!’
উত্তর না দিয়ে কথার মধ্যে হঠাৎই সোমা কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘আমি যে এখানে কেন আসতে গেলাম। আল্লাহ কেন যে আমাকে এমন বিপদের মধ্যে ফেলল।’
ফরিদ অপ্রস্তুত হয়ে তাকাল সোমার মুখের দিকে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না হাসতে হাসতেই একটা মেয়ে কি করে এভাবে কাঁদতে পারে। সে চশমার ফাঁক দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সোমা চোখ মুছে একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, ‘জানেন ওর সাথে না লন্ডন এয়ারপোর্ট থেকেও আমার কথা হয়েছে। আমি একজন বাঙালীর কাছ থেকে ফোন নিয়ে কথা বলেছিলাম। ও বলছিল—ও ঠিক সময়ে হাজির থাকবে। ও যে কেন আসল না…’ বলতে বলতে সোমার কান্নার জোর আরো বেড়ে গেল।
ফরিদ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘দেখো সোমা, শহীদ সাহেব কেন আসল না তা নিয়ে পরেও ভাবা যাবে। আর সে যদি কোনো কারণে দেরীতেও আসে—এয়ারপোর্টে একটু খোঁজ নিলেই সে জেনে যাবে যে তুমি এসেছ। আমরা এয়ারওয়েজ অফিসে বলে এসেছি যে বাংলাদেশ থেকে সোমা ইসলাম নামে যিনি এসেছেন তিনি আমার সঙ্গে আছেন। আমি আমার ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি। কাজেই শাহীদ সাহেব ফোন করলেই জেনে যাবেন যে তুমি কোথায় আছ। তাই তো?’
সোমা কান্না থামিয়ে মাথা নাড়ল।
এরপর কথা বন্ধ করে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ কফিতে চুমুক দিতে থাকল। ফরিদ বলল, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা তুমি ওয়েট করেছ। তুমি নিশ্চয়ই টায়ার্ড।’
সোমা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
‘এখন তোমার কাজ হচ্ছে একটু খাওয়া-দাওয়া করা এবং ফ্রেশ হওয়া।’
‘না না আমার একদম খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি আরেকবার ওকে ফোন দিন না।’
‘ফোন তো বেশ কয়েকবার করলাম—ধরে না তো। দাড়াও দেখছি…’ বলতে বলতে ফরিদ আবার ডায়াল করল। বরাবরের মতোই রিং হলো কিন্তু ধরল না কেউ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফরিদ বলল, ‘ধরছে না। সরাসরি ভয়েজ মেইলে চলে যাচ্ছে—এনসারিং মেশিন।’
‘তাহলে চলেন, ওর বাসায় চলে যাই। ঠিকানা তো আছেই।’
ফরিদ চুপ করে রইল। সোমা সাথে সাথেই বলল, ‘ঠিক আছে আপনার যেতে হবে না। আপনি আমাকে একটা ক্যাব ডেকে দেন—আমি একাই চলে যাব।’
‘ঠিক যেতে পারবে?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘অবশ্য ভয়ের কিছু নেই—চিন্তারও কিছু নেই। সমস্যা হবার কথা না। ঠিকানা বলে দিলে ঠিক জায়গা মত পৌঁছে দেবে।’ একটু থেমে ফরিদ বলল, ‘কিন্তু যেয়ে যদি দেখো শহীদ সাহেব বাড়িতে নেই, তখন কি করবে?’
‘না না তা কেন হবে?’
‘তা হবে না কিন্তু ধরো যদি হয়ে যায়। গিয়ে দেখলে শহীদ নেই—দরজা খুলছে না। তখন কি করবে তুমি?’ থেমে থেমে কথাগুলি বলে সোমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ফরিদ।
‘তাহলে আপনিও চলেন না আমার সঙ্গে।’ সোমার কণ্ঠে আকুতি ফুটে উঠল। সে আবার বলল, ‘আপনার এখন কি কাজ?’
‘কাজ তো কিছু না কিছু আছেই। কাজ ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? ধরো, ফুটপাতে যে মানুষটি ঘুমায়, সেই জায়গাটা খুঁজে বের করাটা তার জন্যে কিন্তু একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ তাই না?’
সোমা মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন আপনার কি কাজ? খুব জরুরী?’
‘হ্যাঁ খুব জরুরী।’
সোমার মন খারাপ হয়ে গেল। হয়ত এখুনি কেঁদে ফেলবে আবার। তবুও সে জানতে চাইল, ‘কি কাজ?’
ফরিদ মুচকি হেসে বলল, ‘এখন আমার প্রথম কাজ হচ্ছে—সোমা নামে যে মেয়েটি এই মুহূর্তে আমার সামনে বসে আছে তাকে শহীদ সাহেবের বাসায় পৌঁছে দেয়া।’
মুহূর্তেই সোমার চেহারা বদলে গেল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার মনটা ভরে উঠল। পৃথিবীতে এত ভালো মানুষ আছে ভাবতেই ভালো লাগছে।
ফরিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘চলো তাহলে।’
সোমাকে নিয়ে ফরিদের গাড়ি এসে থামল ছোট্ট একটা একতলা বাড়ির সামনে। ফরিদ গাড়ি থেকে নেমে ঠিকানা মিলিয়ে দেখল ঠিক জায়গায়ই এসেছে। নিশ্চিত হবার জন্যে সে আরো একটু সামনে গিয়ে ভালো করে দেখে নিল। তারপর দূর থেকে বলল, ‘হ্যাঁ এটাই।’
সোমা দ্রুত নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল বাড়িটার প্রধান দরজার দিকে। ফরিদ লাগেজ নিয়ে এসে দাঁড়াল সোমার পাশে। তারপর কলিং বেল চাপল। একবার। দুবার। তিনবার।
কেউ দরজা খুলল না। ফরিদ বলল, ‘বাসায় তো মনে হচ্ছে কেউ নেই।’
সোমার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
ফরিদ ফোন বের করে রি-ডায়াল করল শহীদের নাম্বারে। ফোনের শব্দ ভেসে এলো ঘরের ভিতর থেকে। তারা দুজনেই তাকাল ভিতরের দিকে। ফোন বেজেই চলেছে। ফরিদ বলল, ‘ভিতরে তো রিং হচ্ছে—কেউ তো ধরছে না।’
সোমা বলল, ‘এখন কি হবে?’
ফরিদ ঠিক বুঝতে পারছে না কী বলবে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সোমা বলল, ‘আপনি চলে যান। আমি এখানে বসে থাকি।’
মেয়েটির কণ্ঠ কেমন অন্যরকম শোনাল। অদ্ভুত কঠিন। ফরিদ অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, ‘তুমি একা একা থাকবে এখানে?’
‘হ্যাঁ আমি এখানে বসে থাকব।’
‘তুমি এখানে বসে থাকবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ কোল্ড ইট ইজ। তুমি তো ঠাণ্ডায় জমে বরফ হয়ে যাবে।’ ফরিদ রীতিমত ধমকে উঠল।
তবুও সোমা সিঁড়ির উপর বসে পড়ল।
ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। থাকো। বসে থাকো। বসে বসে অপেক্ষা করো—দেখো তোমার পতিদেব কখন আসে তোমাকে উদ্ধার করতে।’ বলেই সে গটগট করে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। গাড়ির কাছে যেয়ে সে একবার ঘুরে তাকাল সোমার দিকে।
সোমা শক্ত হয়ে বসে আছে। মনের ভিতর অনিশ্চয়তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার।


