Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-২)

এয়ারপোর্ট থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা বাস স্টপেজের যাত্রী ছাউনিতে বসে আছে সোমা।
নিয়মিত বিরতি দিয়ে একটার পর একটা বাস আসে, কিছুক্ষণের জন্যে থামে যাত্রী নামা-উঠার জন্যে তারপর আবার চলে যায়। এক একবার বাস থামে আর সোমা উঠে দাঁড়ায় কারো কাছে কোনো সাহায্য পাওয়া যায় কিনা এই আশায়। যাত্রী ছাউনির ভিতর হিটিং সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও ঠাণ্ডায় প্রায় জমে যাবার মত অবস্থা হলো তার।
সোমা হঠাৎ লক্ষ্য করল একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হেঁটে আসছেন। তার বেশভূষা দেখে মনে হলো লোকটি ভারতীয় হতে পারে। লম্বা আলখাল্লার মত একটা ওভারকোট গায়ে চড়ানো। মাথায় কানটুপি, গলায় মাফলার, হাতে হাত মোজা। এর মধ্যে কিভাবে সে কথা বলছে এটাই একটা রহস্য।
ভদ্রলোক কাছাকাছি আসতেই সোমা দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ একটা মেয়ে এভাবে সামনে এসে পড়ল কোথা থেকে তা বোঝার আগেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘এক্সকিউজ মি। ক্যান আই ইউজ ইয়োর ফোন?’
লোকটি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে একবার মেয়েটির দিকে তাকালেন এবং বুঝতে পারলেন মেয়েটি সম্ভবত বিপদে পড়েছে। কেমন অসহায় লাগছে তাকে। ভদ্রলোক যার সঙ্গে কথা বলছিলেন তাকে ‘টক টু ইয়্যু লেটার’ বলে লাইনটা কেটে দিলেন। তারপর মেয়েটির হাতে ফোন এগিয়ে দিলেন।
সোমার চোখ চিকচিক করে উঠল খুশীতে। সে ফোন হাতে ছাউনির ভিতরে ঢুকে সুটকেসের উপরে লাগানো কাগজ থেকে ফোন নাম্বার দেখে একটা একটা করে বোতামে চাপ দিতে থাকল।
লোকটি একটু এগিয়ে এসে দেখলেন কাগজে বড় বড় অক্ষরে লেখা—নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার। নাম দেখে তার মনে হলো মেয়েটি হয়ত বাংলাদেশি। তিনি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?’
সোমা ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হাউ ডু ইউ নো?’
‘কি করে বুঝলাম?’ হেসে দিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললেন তিনি।
‘জি।’
সোমার অবাক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক সুটকেসে লাগানো বড় বড় অক্ষরে লেখা কাগজটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আপনার সুটকেসের উপরে সবকিছু লেখা আছে। সোমা ইসলাম। কেয়ার অফ-শহীদুল ইসলাম। নাম-ঠিকানা-ফোন নাম্বার। আমরা বাঙ্গালীরা এই কাজটি সবসময় করে থাকি।’
‘আপনি বাংলাদেশি?’ সোমার চোখ আবারো চকচক করে উঠল খুশীতে।
মেয়েটির উচ্ছ্বাস দেখে ভদ্রলোক হেসে ফেললেন। ‘হ্যাঁ বাংলাদেশি। আমার নাম ফরিদ। ফরিদ আহমেদ।’ তিনি আশ্বস্ত করলেন মেয়েটিকে।
‘আল্লাহর কাছে হাজার শুকুর। এইসময়ে একজন বাঙ্গালী ভাইয়ের দেখা পেলাম।’ সোমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমি না খুব বিপদে পড়ছি।’
ফরিদ লক্ষ্য করল মেয়েটির গলায় আঞ্চলিকতার টান স্পষ্ট। তবে কোন অঞ্চলের তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটি কোন অঞ্চলের সেটা অবশ্য মুখ্য কোনো বিষয়ও না—মেয়েটি বাংলাদেশের সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। সে জিজ্ঞেস করল, ‘এয়ারপোর্ট থেকে বের হলেন? দেশ থেকে এসেছেন, না? প্রথমবার?’
‘জি।’
‘কোথায় যাবেন? ট্যাক্সি ডেকে দিব?’
‘এই এড্রেসে যার নাম লিখা, উনার আমাকে রিসিভ করার কথা ছিল। একে একে সবাই চলে গেল। গাড়ি নিয়ে, ট্যাক্সি নিয়ে। আমার জন্যে কেউ এলো না। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর ভাবলাম একটা ফোন করি—তাই ফোনের খোঁজে এখানে চলে এলাম। এখন কি করব আমি? কিভাবে যাব?’ সোমার কণ্ঠে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল।
‘আরে এয়ারপোর্টের ভেতরেই তো ফোন ছিল।’
‘আমি তো চিনি না।’
‘ও।’
‘তাই মানুষের পিছনে পিছনে এখানে চলে আসছি।’
মৃদু হেসে ফরিদ বলল, ‘কিন্তু যিনি আপনাকে রিসিভ করতে আসবেন, তিনি এসে যদি দেখেন আপনার যেখানে থাকার কথা সেখানে আপনি নেই, বাইরে চলে এসেছেন—তখন কি হবে?’
‘সে জন্যেই তো ফোন করতে চাচ্ছি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, দেখি ফোনটা আমার কাছে দিন।’ বলেই সে লাগেজের উপর লেখা নাম্বার দেখে রিং করল। বেশ কয়েকবার ফোন রিং হলো কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কেউ ফোন ধরল না। ফরিদ বলল, ‘কেউ তো ফোন ধরছে না।’
সোমা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল, ‘এখন? এখন কি হবে?’
‘আচ্ছা দেখি আমি আরেকবার চেষ্টা করি।’ ফরিদ আবার চেষ্টা করল এবং যথারীতি অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া পেল না। সে বলল, ‘উমম ফোন ধরছে না। নো রেসপন্স।’
‘তাহলে এখন আমি কি করব—কোথায় যাব আমি?’ এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল সোমা।
ফরিদ বলল, ‘আহা কাঁদবেন না। কান্নাকাটি করে কোনো লাভ হবে না। এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।’ সে তার কোটের পকেট হাতরে একটা রুমাল বের করে সোমার হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নিন, চোখটা মুছুন। এসব কথা পরেও চিন্তা করা যাবে। আসুন—ভেতরে বসুন। রিল্যাক্স করুন।’
সোমার কান্না তাতে অবশ্য থামল না। সে কেঁদেই চলল।
ফরিদ আবার বলল, ‘একটা ব্যবস্থা হবেই। আপনি অস্থির হবেন না। আমি দেখছি কী করা যায়।’ ফরিদ একরকম জোর করেই সোমাকে নিয়ে যাত্রী ছাওনীর ভেতরে নিয়ে বসালেন। তিনি নিজেও বসলেন সোমার পাশে। তারপর বললেন, ‘আমার কি মনে হয় জানেন? আমার মনে হয় শহীদ সাহেব চলে আসবেন।’
সোমা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘আপনি কি করে ওর নাম জানলেন?’
ফরিদ আবার লাগেজের গায়ে লাগানো কাগজটি দেখিয়ে বলল, ‘ঐ যে সবই তো লেখা আছে ওখানে।’
সোমা কিছু বলল না। ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনি কতক্ষণ এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন।’
‘তিন ঘণ্টা।’ সোমা বলল।
‘তিন ঘণ্টা?’ ফরিদ আঁতকে উঠে বলল।
‘জি।’
‘তাহলে আপনার পা-টা তো এতক্ষণে ফুলে যাবার কথা।’
‘পা তো প্লেনেই ফুলে গেছে।’
‘ওহো।’ একটু থেমে ফরিদ বলল, ‘তাহলে এক কাজ করি—চলুন কোথাও বসে একটু কফি-টফি খাই। এবং ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখি কী করা যায়। ঠিক আছে?’
সোমা চুপ করে রইল—সে হ্যাঁ না কিছু বলল না। সে কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা অনিশ্চিত ভাবে তাকাল ফরিদ সাহেবের দিকে।
ফরিদ সাহস দিয়ে বলল, ‘আপনার ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। আপনি নিশ্চিন্তে আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। এই শিকাগো শহরে সমস্ত বাংলাদেশি আমাকে চিনে—ট্রাস্ট মি! চলুন। আমার গাড়িটা একটু দূরে পার্ক করা আছে। এগুলো দিন আমার কাছে—চলুন।’
সোমা ইতস্তত করে উঠে দাঁড়াল।
ফরিদ সোমার বড় লাগেজটা নিয়ে বের হয়ে যাবার মুহূর্তে হঠাৎ থেমে গেল। সে সোমার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করল যে মেয়েটির গায়ে একটি পাতলা জ্যাকেট ছাড়া আর কোনো গরম কাপড় নেই। সে বেশ শঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার তো ঠাণ্ডা লাগার কথা। ঠাণ্ডা লাগছে না?’
‘না।’
‘বলেন কি?’ ফরিদ অবাক হয়ে বলল, ‘ভয় এবং উত্তেজনায় আপনি ঠাণ্ডাটা বুঝতে পারছেন না। একটু পরেই বুঝতে পারবেন—একেবারে নার্ভে গিয়ে লাগবে।’
সোমা বুজতে পারছে না—তার আসলেই ঠাণ্ডা লাগছে না। অথবা ঠাণ্ডা হয়ত ঠিকই লাগছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে না। কেমন যেন অসাড় হয়ে আছে তার শরীর। তার মনের উপর দিয়ে ছোটখাটো একটা ঝড় বয়ে গেছে। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে ইতিপূর্বে সে আর কখনোই পড়ে নাই। এয়ারপোর্ট থেকে সে কোনোদিন বের হতে পারবে এই আশা সে প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল। ভাগ্যিস এই মানুষটির সাথে তার দেখা হয়েছিল।
‘আপনার সঙ্গে আর কোনো শীতের কাপড় নেই?’
ফরিদের কথায় তার সম্বিত ফিরে এলো। সোমা বলল, ‘আছে। সুটকেসে একটা উলের সোয়েটার আছে।’
‘শিকাগোর ঠাণ্ডা সম্পর্কে দেখি আপনার কোনো ধারণাই নেই। আপনাকে কেউ কিছু বলে নাই আগে?’
‘ও বলেছিল।’
‘ও-টা কে?’
সোমা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আমার হাজবেন্ড।’
‘শহীদ সাহেব? তা কি বলেছিল?’
‘বলেছিল কষ্ট করে শীতের কাপড় আনতে হবে না। সে আমার জন্যে গরম কাপড় কিনে রেখেছে—এয়ারপোর্টে নিয়ে আসবে।’
ফরিদ একটু মুচকি হাসল। সে লক্ষ্য করল, মেয়েটির হাতে কোনো হাত মোজা না থাকায় হাত দুটি ঠাণ্ডায় নীল হয়ে আছে। সে বলল, ‘আপনি এক কাজ করুন—আপত্তি না থাকলে এই মাফলারটি গলায় জড়িয়ে নিন।’ বলেই ফরিদ তার গলা থেকে মাফলার খুলে নিয়ে সোমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
সোমা ইতস্তত করে মাফলারটি নিল। ফরিদ বড় লাগেজটি নিয়ে ছাওনী থেকে বের হতেই সোমা ডাকল, ‘ফরিদ ভাই?’
ফরিদ দাঁড়াল। সোমা ইতস্তত করে বলল, ‘থাক, আমি যাবো না। আপনি চলে যান। আমি এখানেই থাকি।’
ফরিদ অবাক হলো—হঠাৎ করেই মন বদলে ফেলেছে মেয়েটি। কিন্তু কেন? সে বলল, ‘ঠিক আছে। থাকুন। কিন্তু কেন জানতে পারি?’ বিরক্ত কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল।
‘ও হয়ত আসতে পারে।’
এবার ফরিদ রেগে গেল। সে বলল, ‘আরে বাবা, ও আসবেটা কোথায়?’ ফরিদ অত্যধিক বিরক্ত হয়ে আবারো বলল, ‘এখানে তো আসবে না। তুমি তো এয়ারপোর্ট থেকে চলে এসেছ অনেকদূরে—একটা বাস স্ট্যান্ডের কাছে। তোমার যেখানে থাকার কথা ছিল—তুমি তো সেখানে নেই। শহীদ এসে তোমাকে কোথায় খুঁজবে?’ ফরিদের কণ্ঠে স্পষ্ট উষ্মা প্রকাশ পেল।
সোমা কী বলবে বুঝতে পারছে না। সে বোকার মত তাকিয়ে রইল ফরিদের মুখের দিকে। সে লক্ষ্য করল, রেগে গিয়ে লোকটি তাকে তুমি তুমি করে বলছে।
ফরিদ আগের মতই রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘তুমি এখানে কতক্ষণ বসে থাকবে? কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি ঠাণ্ডায় জমে যাবে। এতক্ষণ যে তুমি টিকে আছো, তাতেই আমি অবাক হচ্ছি। শিকাগোর ঠাণ্ডা সম্পর্কে কি কোনো ধারণা আছে তোমার? নাই। থাকলে এমন বোকার মত কথা বলতে না।’
সোমা আবার কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘তাহলে, আমি এখন কি করব?’
ফরিদ ধমকে উঠে বলল, ‘আহা আবার কাঁদছ কেন? প্লীজ কান্না থামাও।’
সোমা কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে—কিন্তু থামাতে পারছে না। ফরিদ এবার লক্ষ্য করল মেয়েটির শরীর কাঁপছে। এ কাঁপন কান্নার নয়—শীতের।
ফরিদ বুঝতে পারল যে সে আসলে রেগে গেছে। এভাবে রেগে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হয়নি। মেয়েটারই বা কি দোষ—সে কি আর জানত যে তাকে এই পরিস্থিতিতে পরতে হবে। ফরিদ এবার নরম স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘বললাম তো—আপনার কোনো সমস্যা হবে না। আপনার কাছে তো ঠিকানা আছেই। আমিই আপনাকে পৌঁছে দেব। তার আগে চলুন, কোথাও গিয়ে একটু বসি। শহীদ সাহেবকে আবার ফোন করি। ব্যবস্থা একটা হবেই—ট্রাস্ট মি। বলুন এবার কি করতে চান।’
সোমা চোখ মুছল এবং বেশ খুশী মনেই বলল, ‘ঠিক আছে চলেন।’
‘যাবেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘চলুন।’
ফরিদ আর দেরী না করে সোমার লাগেজটা নিয়ে হাঁটা শুরু করল। সোমা পাশে পাশে হেঁটে চলল। হাঁটতে হাঁটতেই ফরিদ বলল, ‘গাড়িতে উঠার আগে বুদ্ধিমানের মত দুটো কাজ করতে হবে। আসুন আমার সঙ্গে। আসুন।’
সোমা অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, কত অল্প সময়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষকে আর দূরের কেউ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে খুব কাছেরই কেউ—আপনজন। বাংলাদেশে হলে অনুভূতিটা কি এমন হতো নাকি দেশের বাইরে বলে এমন লাগছে। কে জানে?
সোমার মত একজন অচেনা মানুষের সঙ্গে ফরিদের এমন চেনা ভঙ্গিতে কথা বলার বিষয়টি তার ভালো লেগেছে। শুরুতে যেই অস্বস্তিবোধ ছিল, সেটা কেটে গেছে—ভয়ও লাগছে না। সে নির্দ্বিধায় অজানা-অচেনা একজন মানুষের সাথে রওনা হলো।
গাড়িতে উঠে সোমা বলল, ‘ফরিদ ভাই, আমাকে তুমি করেই বলেন। আপনি-তুমি মিশিয়ে ফেলছেন—ভালো লাগছে না।’
‘মিশিয়ে ফেলছি নাকি? হা হা হা।’
শিকাগোর হাইওয়ে ধরে ফরিদের গাড়ি ছুটে চলেছে প্রচণ্ড বেগে। পাশের সীটে চুপচাপ বসে আছে সোমা। প্রচণ্ড অনিশ্চয়তার যে মেঘ তাকে ঘিরে ছিল তা কেটে যেতে শুরু করেছে। সোমার মনে হচ্ছে এই মানুষটিকে বিশ্বাস করা যায়—হয়ত নির্ভর করাও যায়। যদিও মানুষটা সম্পর্কে তার এখনো কোনো ধারণা নেই। তবুও একধরনের স্বস্তিবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখল।
গাড়িতে উঠেই ফরিদ গাড়ির হিটিং সিস্টেম চালু করে দিয়েছে। সোমা এক ধরণের আরামদায়ক উষ্ণতা অনুভব করছে। প্রশান্তিতে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। চারিদিকে কী সুন্দর। হাইওয়ের দু’ধারের জায়গাটা বরফের আচ্ছাদনে ঢেকে আছে। মধ্যদিনের সূর্যের আলোতে সেই বরফ চিকচিক করছে। সোমার খুব ইচ্ছে করছে চোখ জুড়িয়ে সেই সৌন্দর্য দেখতে—কিন্তু আয়েসে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কিছুতেই সে তার চোখ খুলে রাখতে পারছে না।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Valobashar-Chayasongi

ভালোবাসার ছায়াসঙ্গী (পর্ব-২)

মীরার বয়স ছাব্বিশ। খুব সাধারণ একটি মেয়ে–তথাকথিত চোখ ধাঁধানো সুন্দরী বলতে যা বোঝায় সে মোটেও তা নয়। তবে তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে—যা খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এবং সেভাবেই একদিন আবীরের চোখেও পড়েছিল মীরা।
আবীরের সঙ্গে মীরার প্রথম দেখা হয়েছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেটের ছোট শহর অস্টিনে। তাঁরা দুজন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে পড়ছিল টেক্সাস তথা আমেরিকার বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে। দুজনেরই ওই প্রথম দূরাবাস—একলা থাকা। একই প্রোগ্রাম আর একই রিসার্চ ফিল্ড হওয়ার সুবাদে দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই ওরা দুজন থাকত একসঙ্গেই। দুজন তরুণ-তরুণীর একসঙ্গে থাকা বড় চমৎকার ব্যাপার। কিছু কথা, একটু হাসি, খুনসুটি, ভাগাভাগি করে খাওয়া আর সুখ দুঃখে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলা। ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট আর গ্রুপ স্টাডি করতে করতে দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে সখ্যতা—সৃষ্টি হয় একে অপরের জন্য অনন্ত অসীম ভালোবাসার। সেই সম্পর্কে ভালোবাসার আবীর ছড়িয়ে দুজন দুজনার আরো কাছে চলে আসে। একসময় বুঝতে পারে একে অপরকে ছাড়া তাদের জীবন অর্থহীন। জীবনের বাকিটা পথ দুজন দুজনার হাত ধরে চলবে বলে অঙ্গীকার করে ওরা। তাই গ্রাজুয়েশন শেষ করেই গাঁটছড়া বেঁধে নেয় দুজন। আবীর আর মীরা বিয়ে করে অস্টিনেই। মাস দুয়েক বাদে চাকরি নিয়ে দুজনেই চলে আসে ডালাসে।
আন্ডার-গ্রাজুয়েট কোর্স চলাকালীন সময়ে আবীর আর মীরা ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পেয়ে যায় আমেরিকার এক বিখ্যাত ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির ডালাস হেড কোয়ার্টারে। সেই সুবাদে গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগেই ফুল টাইম জব অফারও পেয়ে যায় একই কোম্পানিতে।
সম্পর্কের শুরুতে যদিও মীরা প্রেম-ভালোবাসা জাতীয় বিষয়ে ছিল বড় উদাসীন। তার কাছে আবীর খুব একজন ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর আবীর ছিল পেন্ডুলামের মতো দোদুল্যমান, তার কখনো কখনো মনে হতো মীরা ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার। আবার কখনো কখনো মীরাকে মনে হতো অচেনা কেউ।
তবুও আবীরের আদর, যত্ন আর ভালোবাসা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল মীরাকে। ভালোই কাটছিল ওদের দিনকাল। তারপর কী থেকে কী হয়ে গেল। সেদিনটির কথা মনে হলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায় মীরার। নিজেকে অপরাধী মনে হয়—কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না সে নিজেকে।
এক বিকেলের এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বদলে দিল মীরার পৃথিবী।

সেদিন বিকেলে…
একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আবীরের সাথে খানিকটা ঝগড়া হয়ে গেল মীরার।
ঐদিন মীরা কাজে যায়নি—শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে। সে আবীরকে ফোন করে বলে দিল, বাসায় রান্না নেই—অফিস থেকে ফেরার পথে তার জন্যে একটা চিকেন স্যান্ডউইচ নিয়ে আসতে। আর আবীর তার পছন্দের যা চায় তাই। মীরা সাধারণত প্লেইন স্যান্ডউইচ খায়—নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ, নো ড্রেসিংস অ্যাট অল। শুধু লেটুস পাতা, টমেটো আর পিকল। আবীরকে সেকথা দুবার মনে করিয়ে দিল মীরা।
আবীর ঘরে ঢুকা মাত্রই মীরা স্যান্ডউইচের প্যাকেট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবং মুহূর্তেই তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। রাগে গজগজ করতে করতে বলল, ‘আবীর, তুমি আমার একটা কথাও ঠিকমতো শোনো না। তোমাকে কতবার বললাম, নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ। আই ডোন্ট লাইক এনি ড্রেসিংস ইন মাই স্যান্ডউইচ। লুক হোয়াট ডিড ইউ ব্রিং…’ মীরা খোলা স্যান্ডউইচটি আবীরের দিকে মেলে ধরল।
আবীর তার ডাবল বার্গারে একটি কামড় দিয়েছে মাত্র—সে মুখের খাবার শেষ করে বলল, ‘আশ্চর্য, বেটারা দেখি সব কিছুই দিয়ে দিয়েছে। কোনো মানে হয়?’
‘আমার তো মনে হয় তুমি বলতেই ভুলে গেছ।’
‘ট্রাস্ট মি। আমি বলছি এগুলো না দিতে—আর আমিতো জানিই তুমি প্লেইন স্যান্ডউইচ লাইক করো। নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ—আমার মুখস্থ। জানি।’
‘বলেই যদি থাকো, তাহলে দিলো কেন?’
‘কেন দিলো সেটা আমি এখন কী করে বলবো? আমি তো আর জানতাম না, বেটারা এই কাজ করবে, নাহলে তো চেক করেই আনতাম।’
মীরা আর কিছু না বলে ঝিম ধরে বসে রইল।
আবীর শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘আচ্ছা এক কাজ করো, উপর থেকে চিজটা ফেলে দাও আর নাইফ দিয়ে মেওনেজ আর কেচাপ সরিয়ে ফেলো। একদিন না হয় একটু কষ্ট করে খাও জান্টু।’
‘তুমি খাও।’ বলেই মীরা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
আবীর খানিকটা বিরক্ত হয়েই বলল, ‘আমি বুঝলাম না, সামান্য একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে এত বিগ ডিল করার কী আছে? একটা দিন কি ব্যতিক্রম করা যায় না? নাহয় খেলেই একদিন চিজ, মেওনেজ, আর কে-চাপ দিয়ে—তাতে সমস্যা কী? এমন তো না যে তুমি কোনো দিনই খাওনি ওসব কিংবা ওগুলোতে তোমার অ্যালার্জি।’ গলা নিচু করে আবার বলল, ‘তোমার ডিকশনারিতে আবার ব্যতিক্রম বলে কোনো শব্দ নেই।’
মীরা একবার তাকাল আবীরের দিকে কিন্তু কোনো কথা বলল না—চুপচাপ শুয়ে রইল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বরং আমার বার্গারটা খাও…’ বলেই আবীর বুঝতে পারল, আরেকটা ভুল হয়ে গেছে। তার বার্গারের মধ্যে দুনিয়ায় হাবিজাবি দেয়া—ডাবল চিজ, মেওনেজ, কেচাপ, মাস্টার্ড কোনো কিছু বাদ নেই। সে সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে আবার বলল, ‘আমি না হয় কালকে আবার নিয়ে আসবো। এবং অবশ্যই চেক করে আনবো—তুমি দেখো, এমন ভুল আর আমার জীবনেও হবে না।’
মীরা তাতেও কোনো সাড়া দিল না।
আবীর জানে মীরা একবার গো ধরলে সেটা থেকে সহজে বের হতে পারে না। আর তখনই সে বুঝতে পারল মীরার শরীর খারাপের রহস্য। ওর মেজাজ খারাপের ধরন দেখেই সে অনুমান করল—পিরিয়ড চলছে মীরার। শুধুমাত্র পিরিয়ড চলাকালীন সময়েই ওর মাথার ঠিক থাকে না। মিন্সট্রুয়াল ক্রাম্পসের ব্যথা সহ্য করতে পারে না সে। তখন তার মেজাজ গরমের পারদ উঠানামা করে। রেগে যায় অল্পতেই। ঠিকমতো খেতেও পারে না। সারাদিন হয়ত কিছুই খাওয়া হয়নি মেয়েটির। খিদেয় তাই মেজাজ চড়ে গেছে। লক্ষণ তো তেমনই।
মীরার জন্যে আবীরের এখন একটু খারাপ লাগতে লাগল। মেয়েটা না খেয়ে আছে আর সে কিনা বার্গার খাচ্ছে মজা করে—একা একা। আবীর খাওয়া বন্ধ করে মীরার পাশে গিয়ে বসল। পিঠে হাত রেখে আস্তে করে বলল, ‘চলো আমরা দুজনে মিলে রেস্টুরেন্টে গিয়ে নতুন আর একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করে নিয়ে আসি—চাইলে ওখানে বসেও খেতে পারি।’
মীরা ঘুরে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে রইল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবীর বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে—তোমার যেতে হবে না। মনে হয় তোমার শরীর খারাপ। আমিই যাচ্ছি। নো ওরিস—আই উইল বি ব্যাক ইন ফিফটিন মিনিটস।’
আধ খাওয়া বার্গারটা রেখে ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেল আবীর।

পনেরো মিনিটের কথা বলে সেই যে আবীরের গেছে, এখন প্রায় তিরিশ মিনিট হয়ে গেল, অথচ তার ফিরে আসার কোনো খবর নেই। এদিকে খিদেয় মীরার চোখে অন্ধকার দেখার মতো অবস্থা হলো। উঠে গিয়ে যে সে কিছু একটা খেয়ে নেবে—তাও ইচ্ছে করছে না।
দিনের এসময়ে ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টগুলো খুব ব্যস্ত থাকে। কাজ থেকে ফেরার পথে সবাই খাবার তুলে নিয়ে বাসায় ফেরে। হয়তো তাই দেরি হচ্ছে। মীরা আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘড়ি দেখল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট হয়ে গেল। এমনিতেই মেজাজ খারাপ তার উপরে এত দেরি—মীরা ফোন করল আবীরকে এবং যা ভেবেছিল তাই। আবীর ফোন ধরল না—এক রিঙেই ফোন চলে গেল ভয়েজমেইলে। তারমানে আবীর আসলে রাগ করেই চলে গেছে ঘর থেকে। রাগ অবশ্য করারই কথা। ওর নিজেরও তো খিদে পেয়েছিল—কাজ থেকে এসেই সে খিদেয় অস্থির থাকে। তখন হাতের কাছে যা পায় তাই খেতে থাকে।
মীরা উঠে এসে ওয়াটার ডিস্পেন্সার থেকে গ্লাসে পানি ভরে টেবিলে বসল আর তখনই লক্ষ্য করল, আবীর খাওয়া শেষ না করেই চলে গেছে। আহা বেচারা। হঠাৎ করেই মীরার খুব মন খারাপ হলো। নিজের উপরে এখন রাগ হচ্ছে। এত তুচ্ছ ব্যাপারে এভাবে রিয়্যাক্ট না করলেই হতো। একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে।
মীরার মাথাটা চিনচিন করতে লাগল। আবীরের ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন? প্রায় একঘণ্টা হতে চলল—যেখানে পনের-বিশ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। মীরার রাগ উধাও হয়ে গেল মুহূর্তেই—সেখানে জড় হলো এক অজানা আশঙ্কা। তার ভয় ভয় করতে লাগল—কোনো বিপদ হলো না তো? মীরা ফোনটা নিয়ে আবার কল করল আবীরকে। এবার অপর-প্রান্ত থেকে কেউ একজন ফোন ধরল—তবে সে আবীর নয়। হ্যালো বলতেই মীরা জিজ্ঞেস করল, ‘হু ইজ দিস?’
‘আই’ম এ প্যারামেডিক।’
‘এ হোয়াট?’
‘প্যারামেডিক! উই প্রভাইড ইমার্জেন্সি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস…’
মীরা বুঝতে পারল না—একজন প্যারামেডিকের কাছে আবীরের ফোন গেল কী করে। সে জানতে চাইল, ‘হোয়ার ইজ আবীর? মাই হাজব্যান্ড?’
‘দ্য পারসন ইউ কলড, ক্যাননট টক রাইট নাও। হি জাস্ট হ্যাড এ ফ্যাটাল কার এক্সিডেন্ট। উই’র টেকিং হিম টু ইমার্জেন্সি।’
মীরার মাথায় কিছুই ঢুকল না—এসব কী বলছে? নিশ্চয়ই কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। সে আবারো বলল, ‘আই’ম হিজ ওয়াইফ—কুড ইউ প্লিজ টেল মি, হোয়াট হ্যাপেন্ড।’
প্যারামেডিক্স এরপর যা বলল সে কথা শোনার জন্য কোনো মানসিক প্রস্তুতি মীরার ছিল না। স্বপ্নেও ভাবেনি এমন কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে এখুনি বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে সে।

আবীর গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে।
বাসা থেকে বের হয়ে হাইওয়েতে উঠতেই একটা দ্রুতগতির এইটিন হুইলার ট্রেলারের ব্লাইন্ড স্পটে পড়ে যায় তার গাড়ি। পাশ কাটাতে গিয়ে আঠারো চাকার দৈত্যকার লরিটি আবীরের গাড়িকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। আবীরের গাড়ি কার্যত উড়ে গিয়ে ছিটকে পড়েছে সার্ভিস রোডে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে তার। শরীর হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত।
মীরা যখন হাসপাতালে পৌঁছল, ততক্ষণে আবীরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অপারেশন থিয়েটারে। দীর্ঘ চার ঘণ্টা অপারেশন শেষে আবীরকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো আইসিইউতে। একজন নার্স এসে মীরাকে বলল, বাসায় চলে যেতে। চব্বিশ ঘণ্টা পার না হলে কিছুই বোঝা যাবে না।
নির্বাক নিথর মীরা বসে রইল হাসপাতালের লবিতে, সারারাত—নির্ঘুম।

চব্বিশ ঘণ্টা পার হলো কিন্তু আবীরের জ্ঞান ফিরে এলো না। আটচল্লিশ ঘণ্টা পার হলো, আবীর তখনো সংজ্ঞাহীন। তিনদিন পরেও যখন আবীরের জ্ঞান ফিরল না, তখন একজন দায়িত্বরত ডাক্তার মীরাকে ডেকে নিয়ে গেল তার অফিসে। কোনো ভণিতা না করেই বলল, পেসেন্টের ব্রেনে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সে আর সাড়া দিচ্ছে না। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু শতভাগ আশাবাদী কিনা সেকথা বলতে পারছি না। প্রে টু অলমাইটি।
মীরার চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। তার কানে কোনো কথাই ঠিক মতো ঢুকল বলে মনে হয় না। সে উদ্ভ্রান্তের মতন তাকিয়ে রইল ডাক্তারের মুখের দিকে। ডাক্তার বুঝতে পারল মীরার মনের অবস্থা। একজন নার্স ডেকে মীরার কাছে বসিয়ে ডিউটিতে চলে গেল সে।

আবীর কোমায় চলে গেল। দশদিনের দিন আবীরের লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হলো। মীরা আবীরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েকদিন থেকেই কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল আবীরকে। তার শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সাড়া দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে—অকেজো হয়ে গেছে পুরোপুরি। আর কোন আশা নেই, ডাক্তারের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণায় বাধ্য হয়ে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়ার অনুমতি দিল মীরা। খুলে ফেলা হলো আবীরের সাথে পৃথিবীর সবশেষ সংযোগগুলো। চারিদিকে নেমে এলো রাজ্যের বিষণ্ণতা।

আবীরের ফিউনেরাল শেষ করে শোকার্ত, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মীরা যখন বাসায় ফিরল তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে আকাশ ভারী হয়ে আছে। ভারী হয়ে আছে মীরার শরীর-মন। ঘরে ঢুকেই সে গা এলিয়ে দিল বিছানায় এবং মুহূর্তেই তলিয়ে গেল অতল ঘুমে।
গভীর রাতে মীরার ঘুম ভেঙ্গে গেল। নীরব নিস্তব্ধ আঁধার চারিদিকে। ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ল আবীরের কথা। নিজের অন্ধকার রুমে, বিছানায় শুয়ে মীরার নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগল। তার চোখে আবীরের সঙ্গে কাটানো সব মুহূর্তগুলোর ছবি ভেসে ওঠল অন্তহীন ঢেউয়ের মতো। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তরল আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
মীরা কিছুতেই ভাবতে পারে না, ক্ষণে ক্ষণে সেই পাগল ছেলেটির মীরা মীরা চিৎকার আর শোনা যাবে না। ছুটির দিনে হাতে দু’কাপ চা নিয়ে টুক টুক করে দরজায় টোকা দিয়ে আর কেউ বলবে না একা একা চা খেতে ভালো লাগে না মীরা। তাকে যত্ন করে চা বানিয়ে খাওয়ানোর মতো আর কেউ রইল না। তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও চিন্তায় নীল হওয়ার মানুষটি আর তার পাশে নেই।
আজ মীরা সত্যিকারের একা হয়ে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হলেই মানুষ উপলব্ধি করে বাতাস নামের কিছু একটা আছে। আবীরের বিদায়ে মীরা বুঝতে পারল আবীর কী ছিল তার জীবনে। আশ্চর্য! মীরা কখনো এমনভাবে ভাবেইনি—কখনো বুঝতেই পারেনি তার চারপাশে আবীর কী গভীর মমতায় ভালোবাসার জাল ছড়িয়ে গেছে।
লেকের ধারে বাড়ির খুব শখ ছিল মীরার। আবীর মীরাকে বলেনি তেমনই এক লেকের ধারে নতুন বাড়ি কেনার কথা। মীরাও আবীরকে বলেনি সে মা হতে চেয়েছিল—এখনই। দুজন, দুজনের অজান্তেই পরিকল্পনা করছিল একে অন্যকে চমকে দেওয়ার। অথচ বিধাতার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন—এ কেমন চমক বিধাতা তার জন্যে রেখে দিয়েছিল। আবীরের মৃত্যু সব স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়ে গেল।
এত অভিমান করে কেউ চলে যায়? একবার ‘স্যরি’ বলার সুযোগটা পর্যন্ত দিল না। মীরার চোখ ভরে গেল পানিতে।
‘কাঁদছ কেন মীরা?’ ফিসফিস করে মীরার কানের কাছে মুখ নামিয়ে খুব নরম স্বরে কেউ বলল।
মীরা চমকে তাকাল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কে কথা বলল? একেবারে আবীরের কণ্ঠ। আবীর? হ্যাঁ, আবীরই তো। হঠাৎ একটি হাত জড়িয়ে ধরল মীরার শরীর। মীরা ঠিক বুঝতে পারল এটা আবীরের হাত। মীরা চুপ করে রইল।
আবীর যত্ন করে মীরার চোখের পানি মুছে দিল। আদর করে হাত বুলিয়ে দিল চুলের মধ্যে। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘এভাবে কাঁদতে নেই বুড়ি।’
মীরার কান্নার বেগ আরো বেড়ে গেল। তার চোখ বেয়ে অশ্রুর বন্যা বেয়ে চলল। আবীরের কণ্ঠ, তার স্পর্শ, আদর মীরাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।

জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, কিন্তু মনটা মাঝে মাঝে থেমে যায়, প্রিয় মানুষটার জন্যে। মীরার জীবনের একাকীত্ব তীব্র হয়ে দেখা দেয় মাঝে মাঝে। খুব খুব একা একা লাগে তার। সময় যেন কাটতেই চায় না। অফিসের ব্যস্ততায় দিনগুলো কেটে যায় ঠিকই কিন্তু এক একটি রাত মনে হয়ে দীর্ঘতম রাত।
উইক-এন্ডে মীরা মাঝে মাঝে একাই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। একা একা হাঁটছে হঠাৎ মনে হলো, তার পাশে কেউ আছে। মীরা যেখানেই যাচ্ছে, তার সাথে সাথেই সেও সেখানে যাচ্ছে। এই ‘কেউ’ টার কোনো আওয়াজ শুনতে পায় না মীরা। স্পর্শও নয়—গন্ধও নয়। কিন্তু কেউ একজন আছে। যেন একটা নিঝুম নিস্তব্ধ ছোট আয়তন, তার আশেপাশে নিঃশব্দ তরঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছে। জানান দিচ্ছে—আমি আছি। তোমার সাথেই আছি। তুমি একা নও মীরা।
(সমাপ্ত)