মীরার বয়স ছাব্বিশ। খুব সাধারণ একটি মেয়ে–তথাকথিত চোখ ধাঁধানো সুন্দরী বলতে যা বোঝায় সে মোটেও তা নয়। তবে তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে—যা খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এবং সেভাবেই একদিন আবীরের চোখেও পড়েছিল মীরা।
আবীরের সঙ্গে মীরার প্রথম দেখা হয়েছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেটের ছোট শহর অস্টিনে। তাঁরা দুজন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে পড়ছিল টেক্সাস তথা আমেরিকার বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে। দুজনেরই ওই প্রথম দূরাবাস—একলা থাকা। একই প্রোগ্রাম আর একই রিসার্চ ফিল্ড হওয়ার সুবাদে দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই ওরা দুজন থাকত একসঙ্গেই। দুজন তরুণ-তরুণীর একসঙ্গে থাকা বড় চমৎকার ব্যাপার। কিছু কথা, একটু হাসি, খুনসুটি, ভাগাভাগি করে খাওয়া আর সুখ দুঃখে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলা। ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট আর গ্রুপ স্টাডি করতে করতে দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে সখ্যতা—সৃষ্টি হয় একে অপরের জন্য অনন্ত অসীম ভালোবাসার। সেই সম্পর্কে ভালোবাসার আবীর ছড়িয়ে দুজন দুজনার আরো কাছে চলে আসে। একসময় বুঝতে পারে একে অপরকে ছাড়া তাদের জীবন অর্থহীন। জীবনের বাকিটা পথ দুজন দুজনার হাত ধরে চলবে বলে অঙ্গীকার করে ওরা। তাই গ্রাজুয়েশন শেষ করেই গাঁটছড়া বেঁধে নেয় দুজন। আবীর আর মীরা বিয়ে করে অস্টিনেই। মাস দুয়েক বাদে চাকরি নিয়ে দুজনেই চলে আসে ডালাসে।
আন্ডার-গ্রাজুয়েট কোর্স চলাকালীন সময়ে আবীর আর মীরা ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পেয়ে যায় আমেরিকার এক বিখ্যাত ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির ডালাস হেড কোয়ার্টারে। সেই সুবাদে গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগেই ফুল টাইম জব অফারও পেয়ে যায় একই কোম্পানিতে।
সম্পর্কের শুরুতে যদিও মীরা প্রেম-ভালোবাসা জাতীয় বিষয়ে ছিল বড় উদাসীন। তার কাছে আবীর খুব একজন ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর আবীর ছিল পেন্ডুলামের মতো দোদুল্যমান, তার কখনো কখনো মনে হতো মীরা ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার। আবার কখনো কখনো মীরাকে মনে হতো অচেনা কেউ।
তবুও আবীরের আদর, যত্ন আর ভালোবাসা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল মীরাকে। ভালোই কাটছিল ওদের দিনকাল। তারপর কী থেকে কী হয়ে গেল। সেদিনটির কথা মনে হলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায় মীরার। নিজেকে অপরাধী মনে হয়—কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না সে নিজেকে।
এক বিকেলের এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বদলে দিল মীরার পৃথিবী।
…
সেদিন বিকেলে…
একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আবীরের সাথে খানিকটা ঝগড়া হয়ে গেল মীরার।
ঐদিন মীরা কাজে যায়নি—শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে। সে আবীরকে ফোন করে বলে দিল, বাসায় রান্না নেই—অফিস থেকে ফেরার পথে তার জন্যে একটা চিকেন স্যান্ডউইচ নিয়ে আসতে। আর আবীর তার পছন্দের যা চায় তাই। মীরা সাধারণত প্লেইন স্যান্ডউইচ খায়—নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ, নো ড্রেসিংস অ্যাট অল। শুধু লেটুস পাতা, টমেটো আর পিকল। আবীরকে সেকথা দুবার মনে করিয়ে দিল মীরা।
আবীর ঘরে ঢুকা মাত্রই মীরা স্যান্ডউইচের প্যাকেট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবং মুহূর্তেই তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। রাগে গজগজ করতে করতে বলল, ‘আবীর, তুমি আমার একটা কথাও ঠিকমতো শোনো না। তোমাকে কতবার বললাম, নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ। আই ডোন্ট লাইক এনি ড্রেসিংস ইন মাই স্যান্ডউইচ। লুক হোয়াট ডিড ইউ ব্রিং…’ মীরা খোলা স্যান্ডউইচটি আবীরের দিকে মেলে ধরল।
আবীর তার ডাবল বার্গারে একটি কামড় দিয়েছে মাত্র—সে মুখের খাবার শেষ করে বলল, ‘আশ্চর্য, বেটারা দেখি সব কিছুই দিয়ে দিয়েছে। কোনো মানে হয়?’
‘আমার তো মনে হয় তুমি বলতেই ভুলে গেছ।’
‘ট্রাস্ট মি। আমি বলছি এগুলো না দিতে—আর আমিতো জানিই তুমি প্লেইন স্যান্ডউইচ লাইক করো। নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ—আমার মুখস্থ। জানি।’
‘বলেই যদি থাকো, তাহলে দিলো কেন?’
‘কেন দিলো সেটা আমি এখন কী করে বলবো? আমি তো আর জানতাম না, বেটারা এই কাজ করবে, নাহলে তো চেক করেই আনতাম।’
মীরা আর কিছু না বলে ঝিম ধরে বসে রইল।
আবীর শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘আচ্ছা এক কাজ করো, উপর থেকে চিজটা ফেলে দাও আর নাইফ দিয়ে মেওনেজ আর কেচাপ সরিয়ে ফেলো। একদিন না হয় একটু কষ্ট করে খাও জান্টু।’
‘তুমি খাও।’ বলেই মীরা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
আবীর খানিকটা বিরক্ত হয়েই বলল, ‘আমি বুঝলাম না, সামান্য একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে এত বিগ ডিল করার কী আছে? একটা দিন কি ব্যতিক্রম করা যায় না? নাহয় খেলেই একদিন চিজ, মেওনেজ, আর কে-চাপ দিয়ে—তাতে সমস্যা কী? এমন তো না যে তুমি কোনো দিনই খাওনি ওসব কিংবা ওগুলোতে তোমার অ্যালার্জি।’ গলা নিচু করে আবার বলল, ‘তোমার ডিকশনারিতে আবার ব্যতিক্রম বলে কোনো শব্দ নেই।’
মীরা একবার তাকাল আবীরের দিকে কিন্তু কোনো কথা বলল না—চুপচাপ শুয়ে রইল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বরং আমার বার্গারটা খাও…’ বলেই আবীর বুঝতে পারল, আরেকটা ভুল হয়ে গেছে। তার বার্গারের মধ্যে দুনিয়ায় হাবিজাবি দেয়া—ডাবল চিজ, মেওনেজ, কেচাপ, মাস্টার্ড কোনো কিছু বাদ নেই। সে সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে আবার বলল, ‘আমি না হয় কালকে আবার নিয়ে আসবো। এবং অবশ্যই চেক করে আনবো—তুমি দেখো, এমন ভুল আর আমার জীবনেও হবে না।’
মীরা তাতেও কোনো সাড়া দিল না।
আবীর জানে মীরা একবার গো ধরলে সেটা থেকে সহজে বের হতে পারে না। আর তখনই সে বুঝতে পারল মীরার শরীর খারাপের রহস্য। ওর মেজাজ খারাপের ধরন দেখেই সে অনুমান করল—পিরিয়ড চলছে মীরার। শুধুমাত্র পিরিয়ড চলাকালীন সময়েই ওর মাথার ঠিক থাকে না। মিন্সট্রুয়াল ক্রাম্পসের ব্যথা সহ্য করতে পারে না সে। তখন তার মেজাজ গরমের পারদ উঠানামা করে। রেগে যায় অল্পতেই। ঠিকমতো খেতেও পারে না। সারাদিন হয়ত কিছুই খাওয়া হয়নি মেয়েটির। খিদেয় তাই মেজাজ চড়ে গেছে। লক্ষণ তো তেমনই।
মীরার জন্যে আবীরের এখন একটু খারাপ লাগতে লাগল। মেয়েটা না খেয়ে আছে আর সে কিনা বার্গার খাচ্ছে মজা করে—একা একা। আবীর খাওয়া বন্ধ করে মীরার পাশে গিয়ে বসল। পিঠে হাত রেখে আস্তে করে বলল, ‘চলো আমরা দুজনে মিলে রেস্টুরেন্টে গিয়ে নতুন আর একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করে নিয়ে আসি—চাইলে ওখানে বসেও খেতে পারি।’
মীরা ঘুরে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে রইল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবীর বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে—তোমার যেতে হবে না। মনে হয় তোমার শরীর খারাপ। আমিই যাচ্ছি। নো ওরিস—আই উইল বি ব্যাক ইন ফিফটিন মিনিটস।’
আধ খাওয়া বার্গারটা রেখে ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেল আবীর।
…
পনেরো মিনিটের কথা বলে সেই যে আবীরের গেছে, এখন প্রায় তিরিশ মিনিট হয়ে গেল, অথচ তার ফিরে আসার কোনো খবর নেই। এদিকে খিদেয় মীরার চোখে অন্ধকার দেখার মতো অবস্থা হলো। উঠে গিয়ে যে সে কিছু একটা খেয়ে নেবে—তাও ইচ্ছে করছে না।
দিনের এসময়ে ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টগুলো খুব ব্যস্ত থাকে। কাজ থেকে ফেরার পথে সবাই খাবার তুলে নিয়ে বাসায় ফেরে। হয়তো তাই দেরি হচ্ছে। মীরা আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘড়ি দেখল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট হয়ে গেল। এমনিতেই মেজাজ খারাপ তার উপরে এত দেরি—মীরা ফোন করল আবীরকে এবং যা ভেবেছিল তাই। আবীর ফোন ধরল না—এক রিঙেই ফোন চলে গেল ভয়েজমেইলে। তারমানে আবীর আসলে রাগ করেই চলে গেছে ঘর থেকে। রাগ অবশ্য করারই কথা। ওর নিজেরও তো খিদে পেয়েছিল—কাজ থেকে এসেই সে খিদেয় অস্থির থাকে। তখন হাতের কাছে যা পায় তাই খেতে থাকে।
মীরা উঠে এসে ওয়াটার ডিস্পেন্সার থেকে গ্লাসে পানি ভরে টেবিলে বসল আর তখনই লক্ষ্য করল, আবীর খাওয়া শেষ না করেই চলে গেছে। আহা বেচারা। হঠাৎ করেই মীরার খুব মন খারাপ হলো। নিজের উপরে এখন রাগ হচ্ছে। এত তুচ্ছ ব্যাপারে এভাবে রিয়্যাক্ট না করলেই হতো। একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে।
মীরার মাথাটা চিনচিন করতে লাগল। আবীরের ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন? প্রায় একঘণ্টা হতে চলল—যেখানে পনের-বিশ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। মীরার রাগ উধাও হয়ে গেল মুহূর্তেই—সেখানে জড় হলো এক অজানা আশঙ্কা। তার ভয় ভয় করতে লাগল—কোনো বিপদ হলো না তো? মীরা ফোনটা নিয়ে আবার কল করল আবীরকে। এবার অপর-প্রান্ত থেকে কেউ একজন ফোন ধরল—তবে সে আবীর নয়। হ্যালো বলতেই মীরা জিজ্ঞেস করল, ‘হু ইজ দিস?’
‘আই’ম এ প্যারামেডিক।’
‘এ হোয়াট?’
‘প্যারামেডিক! উই প্রভাইড ইমার্জেন্সি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস…’
মীরা বুঝতে পারল না—একজন প্যারামেডিকের কাছে আবীরের ফোন গেল কী করে। সে জানতে চাইল, ‘হোয়ার ইজ আবীর? মাই হাজব্যান্ড?’
‘দ্য পারসন ইউ কলড, ক্যাননট টক রাইট নাও। হি জাস্ট হ্যাড এ ফ্যাটাল কার এক্সিডেন্ট। উই’র টেকিং হিম টু ইমার্জেন্সি।’
মীরার মাথায় কিছুই ঢুকল না—এসব কী বলছে? নিশ্চয়ই কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। সে আবারো বলল, ‘আই’ম হিজ ওয়াইফ—কুড ইউ প্লিজ টেল মি, হোয়াট হ্যাপেন্ড।’
প্যারামেডিক্স এরপর যা বলল সে কথা শোনার জন্য কোনো মানসিক প্রস্তুতি মীরার ছিল না। স্বপ্নেও ভাবেনি এমন কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে এখুনি বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে সে।
…
আবীর গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে।
বাসা থেকে বের হয়ে হাইওয়েতে উঠতেই একটা দ্রুতগতির এইটিন হুইলার ট্রেলারের ব্লাইন্ড স্পটে পড়ে যায় তার গাড়ি। পাশ কাটাতে গিয়ে আঠারো চাকার দৈত্যকার লরিটি আবীরের গাড়িকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। আবীরের গাড়ি কার্যত উড়ে গিয়ে ছিটকে পড়েছে সার্ভিস রোডে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে তার। শরীর হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত।
মীরা যখন হাসপাতালে পৌঁছল, ততক্ষণে আবীরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অপারেশন থিয়েটারে। দীর্ঘ চার ঘণ্টা অপারেশন শেষে আবীরকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো আইসিইউতে। একজন নার্স এসে মীরাকে বলল, বাসায় চলে যেতে। চব্বিশ ঘণ্টা পার না হলে কিছুই বোঝা যাবে না।
নির্বাক নিথর মীরা বসে রইল হাসপাতালের লবিতে, সারারাত—নির্ঘুম।
…
চব্বিশ ঘণ্টা পার হলো কিন্তু আবীরের জ্ঞান ফিরে এলো না। আটচল্লিশ ঘণ্টা পার হলো, আবীর তখনো সংজ্ঞাহীন। তিনদিন পরেও যখন আবীরের জ্ঞান ফিরল না, তখন একজন দায়িত্বরত ডাক্তার মীরাকে ডেকে নিয়ে গেল তার অফিসে। কোনো ভণিতা না করেই বলল, পেসেন্টের ব্রেনে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সে আর সাড়া দিচ্ছে না। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু শতভাগ আশাবাদী কিনা সেকথা বলতে পারছি না। প্রে টু অলমাইটি।
মীরার চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। তার কানে কোনো কথাই ঠিক মতো ঢুকল বলে মনে হয় না। সে উদ্ভ্রান্তের মতন তাকিয়ে রইল ডাক্তারের মুখের দিকে। ডাক্তার বুঝতে পারল মীরার মনের অবস্থা। একজন নার্স ডেকে মীরার কাছে বসিয়ে ডিউটিতে চলে গেল সে।
…
আবীর কোমায় চলে গেল। দশদিনের দিন আবীরের লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হলো। মীরা আবীরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েকদিন থেকেই কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল আবীরকে। তার শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সাড়া দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে—অকেজো হয়ে গেছে পুরোপুরি। আর কোন আশা নেই, ডাক্তারের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণায় বাধ্য হয়ে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়ার অনুমতি দিল মীরা। খুলে ফেলা হলো আবীরের সাথে পৃথিবীর সবশেষ সংযোগগুলো। চারিদিকে নেমে এলো রাজ্যের বিষণ্ণতা।
…
আবীরের ফিউনেরাল শেষ করে শোকার্ত, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মীরা যখন বাসায় ফিরল তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে আকাশ ভারী হয়ে আছে। ভারী হয়ে আছে মীরার শরীর-মন। ঘরে ঢুকেই সে গা এলিয়ে দিল বিছানায় এবং মুহূর্তেই তলিয়ে গেল অতল ঘুমে।
গভীর রাতে মীরার ঘুম ভেঙ্গে গেল। নীরব নিস্তব্ধ আঁধার চারিদিকে। ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ল আবীরের কথা। নিজের অন্ধকার রুমে, বিছানায় শুয়ে মীরার নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগল। তার চোখে আবীরের সঙ্গে কাটানো সব মুহূর্তগুলোর ছবি ভেসে ওঠল অন্তহীন ঢেউয়ের মতো। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তরল আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
মীরা কিছুতেই ভাবতে পারে না, ক্ষণে ক্ষণে সেই পাগল ছেলেটির মীরা মীরা চিৎকার আর শোনা যাবে না। ছুটির দিনে হাতে দু’কাপ চা নিয়ে টুক টুক করে দরজায় টোকা দিয়ে আর কেউ বলবে না একা একা চা খেতে ভালো লাগে না মীরা। তাকে যত্ন করে চা বানিয়ে খাওয়ানোর মতো আর কেউ রইল না। তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও চিন্তায় নীল হওয়ার মানুষটি আর তার পাশে নেই।
আজ মীরা সত্যিকারের একা হয়ে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হলেই মানুষ উপলব্ধি করে বাতাস নামের কিছু একটা আছে। আবীরের বিদায়ে মীরা বুঝতে পারল আবীর কী ছিল তার জীবনে। আশ্চর্য! মীরা কখনো এমনভাবে ভাবেইনি—কখনো বুঝতেই পারেনি তার চারপাশে আবীর কী গভীর মমতায় ভালোবাসার জাল ছড়িয়ে গেছে।
লেকের ধারে বাড়ির খুব শখ ছিল মীরার। আবীর মীরাকে বলেনি তেমনই এক লেকের ধারে নতুন বাড়ি কেনার কথা। মীরাও আবীরকে বলেনি সে মা হতে চেয়েছিল—এখনই। দুজন, দুজনের অজান্তেই পরিকল্পনা করছিল একে অন্যকে চমকে দেওয়ার। অথচ বিধাতার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন—এ কেমন চমক বিধাতা তার জন্যে রেখে দিয়েছিল। আবীরের মৃত্যু সব স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়ে গেল।
এত অভিমান করে কেউ চলে যায়? একবার ‘স্যরি’ বলার সুযোগটা পর্যন্ত দিল না। মীরার চোখ ভরে গেল পানিতে।
‘কাঁদছ কেন মীরা?’ ফিসফিস করে মীরার কানের কাছে মুখ নামিয়ে খুব নরম স্বরে কেউ বলল।
মীরা চমকে তাকাল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কে কথা বলল? একেবারে আবীরের কণ্ঠ। আবীর? হ্যাঁ, আবীরই তো। হঠাৎ একটি হাত জড়িয়ে ধরল মীরার শরীর। মীরা ঠিক বুঝতে পারল এটা আবীরের হাত। মীরা চুপ করে রইল।
আবীর যত্ন করে মীরার চোখের পানি মুছে দিল। আদর করে হাত বুলিয়ে দিল চুলের মধ্যে। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘এভাবে কাঁদতে নেই বুড়ি।’
মীরার কান্নার বেগ আরো বেড়ে গেল। তার চোখ বেয়ে অশ্রুর বন্যা বেয়ে চলল। আবীরের কণ্ঠ, তার স্পর্শ, আদর মীরাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।
…
জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, কিন্তু মনটা মাঝে মাঝে থেমে যায়, প্রিয় মানুষটার জন্যে। মীরার জীবনের একাকীত্ব তীব্র হয়ে দেখা দেয় মাঝে মাঝে। খুব খুব একা একা লাগে তার। সময় যেন কাটতেই চায় না। অফিসের ব্যস্ততায় দিনগুলো কেটে যায় ঠিকই কিন্তু এক একটি রাত মনে হয়ে দীর্ঘতম রাত।
উইক-এন্ডে মীরা মাঝে মাঝে একাই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। একা একা হাঁটছে হঠাৎ মনে হলো, তার পাশে কেউ আছে। মীরা যেখানেই যাচ্ছে, তার সাথে সাথেই সেও সেখানে যাচ্ছে। এই ‘কেউ’ টার কোনো আওয়াজ শুনতে পায় না মীরা। স্পর্শও নয়—গন্ধও নয়। কিন্তু কেউ একজন আছে। যেন একটা নিঝুম নিস্তব্ধ ছোট আয়তন, তার আশেপাশে নিঃশব্দ তরঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছে। জানান দিচ্ছে—আমি আছি। তোমার সাথেই আছি। তুমি একা নও মীরা।
(সমাপ্ত)
ভালোবাসার ছায়াসঙ্গী (পর্ব-২)
with
no comment

