বেশ অনেকক্ষণ হয়ে গেল সন্ধ্যা ঘনিয়ে রাতের শুরু হয়েছে শিকাগো শহরে।
ফরিদের গাড়ি তার ডুপ্লেক্স টাউন-হোমের পার্কিং এ এসে থামল। সোমার লাগেজগুলো বের করে ফরিদ সোমাকে সিঁড়ি দেখিয়ে দিল।
সোমা দাঁড়িয়ে আছে মূর্তির মত। সে বুঝতে পারছে না কি করবে। একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে একা একা তার বাসায় যাওয়াটা ঠিক হচ্ছে কি না। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত নিজের সব কাজ ফেলে রেখে এই মানুষটা তার জন্যে যা করেছে সেখানে তার বিশ্বাস যোগ্যতা নিয়ে ভিন্ন কিছু চিন্তা করাটা হবে নিতান্তই অন্যায়। সোমা সব দ্বিধা ছেড়ে ফেলে ফরিদের পেছনে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে গেল। ফরিদ দরজা খুলে সোমাকে লিভিং রুমে এনে বসাল।
সোমা আড়ষ্ট হয়ে বসল। সে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। অন্য কাউকে চোখে পড়ল না।
ফরিদ বলল, ‘রিল্যাক্স।’ ফরিদ তার গায়ের ওভারকোট, হাত মোজা খুলতে খুলতে বলল, ‘তুমি কোনো চিন্তা করো না। শিকাগো শহরটা অনেক বড় হলেও, এখানে বাঙালীর সংখ্যা খুব বেশি নয়। আমরা তোমার স্বামীকে খুঁজে বের করবোই। ঠিক আছে?’
সোমা চুপ করে রইল। ফরিদ আবার বলল, ‘আমি একটা ফোনকার্ড এনে দিচ্ছি এবং কিভাবে দেশে ফোন করতে হবে বলে দিচ্ছি। তুমি নিশ্চিন্তে কথা বলতে পারবে।’ বলেই সে তার ডুপ্লেক্স বাসার উপরের তলায় উঠে গেল।
সোমা আবার ডুকরে কেঁদে উঠল। তার শরীর ঝাঁকি দিয়ে কান্না পাচ্ছে। কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। তার সামনে এখন কি অপেক্ষা করছে একমাত্র আল্লাহই জানে—সে কিছুই ভাবতে পারছে না।
ফরিদ ফোনকার্ড নিয়ে এসে দেখল সোমা আবারো কাঁদছে। সান্ত্বনা দিয়ে সে বলল, ‘আহা, তুমি এতো কাঁদছ কেন? কাঁদতে কাঁদতেই তো তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে। তোমাকে তো বলেছি ভয়ের কিছু নেই। আমি যতক্ষণ আছি—কোনো সমস্যা হবেনা। এই যে নাও ফোনকার্ড। তুমি ফোনটা করো। আমি গাড়ি থেকে খাবারগুলো নিয়ে আসছি।’ ফরিদ ফোনকার্ড আর কর্ডলেস ফোনটা সোমার হাতে দিয়ে নীচে নেমে গেল।
সোমা ফোনকার্ড হাতে নিয়ে উল্টে পালটে দেখল কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারল না কিভাবে এটার ব্যবহার করতে হবে। সে কার্ড হাতে চুপ করে বসে রইল।
ফরিদ খাবারগুলো রান্না ঘরের ফ্রিজে রেখে ফিরে এসে দেখল সোমা কার্ড হাতে বসে রয়েছে। সে জিজ্ঞেস করল, ‘কি হলো ফোন করেছ?’
সোমা না-সূচক মাথা নাড়ল।
‘কেন?’
‘আমি তো জানিনা কার্ড দিয়ে কিভাবে ফোন করতে হয়।’
‘দেখি কার্ডটা দাও।’ ফরিদ কার্ড হাতে নিয়ে বলল, ‘ফোনকার্ড দিয়ে বাংলাদেশে ফোন করা খুবই সহজ। আমি শিখিয়ে দিচ্ছি। প্রথমে এই টোল ফ্রি নাম্বার ডায়াল করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে। তারপর এই যে, এই পিন নাম্বারটা দিয়ে বাংলাদেশের নাম্বারটা চাপলেই হয়ে যাবে। এই যে নাও—রিং হচ্ছে। ইউ হ্যাভ টুয়েন্টি এইট মিনিটস।’ ফরিদ ফোনটা দিল সোমার হাতে।
সোমা ফোন কানে ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে সোমার বড় বোন রুমার ঘুম জড়ানো কণ্ঠ শোনা গেল।
সোমা বলল, ‘হ্যালো আপা, আমি সোমা।’
‘হ্যালো? হ্যালো?’ ওপাশে রুমা চিৎকার করছে।
‘আপা আমি সোমা। আমেরিকা থেকে…’
‘সোমা! কখন পৌঁছেছিস? ঠিকমত পৌঁছেছিস?’
সোমা একটু থেমে বলল, ‘হ্যাঁ আমি ঠিকমত পৌঁছেছি।’
‘আরে ফোন করতে এত দেরী হলো কেন? আগে ফোন করিস নাই কেন? এদিকে আমরা কি টেনশনেই না ছিলাম…’
‘লন্ডনে ফ্লাইট ডিলে ছিল।’
‘কোথায়?’
‘লন্ডনে। কেন, শহীদ কল করে জানায় নাই?’
‘না তো। শহীদ ফোন করে নাই তো। শহীদ ফোন করবে কেন? তুই করিস নাই কেন? আচ্ছা শহীদ কই? দে তো ওকে…’
সোমা চুপ করে রইল।
‘শহীদকে দে।’ রুমা আবার চাইল।
‘আপা, আমি আবার পরে কল করব। এখন রাখি—পরে কথা বলব নে।’
‘তুই ভালো আছিস তো?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ আমি ভালো আছি। চিন্তা করো না। আচ্ছা এখন তাহলে রাখি?’
‘শহীদ কোথায় বললি না তো। ও ভালো আছে?’
সোমা কোন উত্তর দিল না। ফোনের ভেতর থেকে রুমার কণ্ঠ শোনা গেল, হ্যালো হ্যালো? সোমা খট করে ফোন কেটে দিল।
ফরিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে সোমার মুখের দিকে। একটা ব্যাপার ঠিক বুঝতে পারছে না—সোমা শহীদের ব্যাপারটা এড়িয়ে গেল কেন? কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘তুমি মিথ্যে বললে কেন?’
সোমা বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘সত্যি বললে কি হতো? সব সময় কি সত্যি বলা যায়? আর তাছাড়া আমার আপার টেনশনটা এমনিতেই বেশি—দেখা যাবে সবার ঘুম হারাম করে দিয়েছে।’
‘না না না কাজটা তুমি ঠিক করো নি। একটা মিথ্যে ঢাকতে অনেক মিথ্যে বলতে হয়। মিথ্যে বলাটা…’ কথা শেষ হবার আগেই ফোন বেজে উঠল। ফরিদ কথা থামিয়ে দ্রুত ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
‘শহীদ নামে কোন ক্যাব ড্রাইভারকে কেউ চিনে না বস।’ ইকবালের কণ্ঠ শোনা গেল ফোনের ভিতর দিয়ে। ‘বাদশাও চিনে না। আমি আরো খোঁজ লাগাইছি বস—আপনি চিন্তা কইরেন না।’
‘ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা কর—একটু সিরিয়াসলি নে। কেমন একটা ঝামেলার মধ্যে পড়েছি বুঝতে পারছিস?’
ফরিদের এই কথায় সোমার মুখ কালো হয়ে গেল। সে অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল।
‘বস, আমি জাইকা’তে আবার আসলাম। এইখানে পাকিস্তানি, ইন্ডিয়ান যত ক্যাব’য়ালা আছে কেউ তারে চিনে না। আচ্ছা বস, তার আর কোনো নাম আছে নাকি?’
ফরিদ ফোন চেপে ধরে সোমাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, ওর আর কোনো নাম আছে? ডাকনাম?’
সোমা মাথা নেড়ে জানাল, নেই।
‘না আর কোনো নাম নেই।’ ফোনে ফরিদ আবার বলল, ‘ঐ শহীদই নাম, শহীদুল ইসলাম—তুমি খুঁজে বের করার ব্যবস্থা করো।’
‘আচ্ছা বস, ব্যবস্থা করতেছি। আপনি টেনশন নিয়েন না।’
ফরিদ ফোন রেখে দিয়ে সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঐ শহীদ বোধ হয় খুব একটা কারো সঙ্গে মেশে না। কেউ তো ওকে চেনে না। ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগছে। ওর কি কোনো বন্ধু-বান্ধব অথবা পুরনো রুমমেট—জানো কিছু?’
সোমা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘রুমমেট তো বোধহয় ছিল না। ও তো একাই থাকত। তবে বাবু নামে একটা ছেলের কথা মাঝে মাঝে বলত।’
‘বাবু? বাবু নামে শিকাগোতে কে আছে? আচ্ছা দেখছি।’ বলতে বলতেই সোমার দিকে ভালো করে লক্ষ্য করে ফরিদ বলল, ‘তুমি লম্বা জার্নি করে এসেছে। আমার মনে হয় তোমার একটু ফ্রেশ হওয়া দরকার। একটু রেস্টও দরকার।’
সোমা নিজেই ভাবছিল তার ফ্রেশ হওয়া দরকার। দু’দিনের জার্নি, ধকল সব মিলিয়ে সে খুব ক্লান্ত। এক কাপড়েও সে কখনো এত সময় থাকেনি। গা-টা যেন কেমন ঘিনঘিন করছে। মাথাটাও ধরে আছে। বমি বমি ভাব হচ্ছে। ওর মনে হচ্ছে যে কোনো সময় পড়ে যেতে পারে। সে বলল, ‘হ্যাঁ একটু ফ্রেশ হতে পারলে ভালো লাগত। খুব টায়ার্ড লাগছে।’
‘টায়ার্ড তো লাগারই কথা। এখন তো তোমার গভীর ঘুমের সময়। তুমি এক কাজ করো, একটা শাওয়ার নিয়ে নাও—দেখবে সব ক্লান্তি দূর হয়ে গেছে।’
সোমা মাথা নেড়ে সায় দিল।
ফরিদ উপর তলায় ঘর দেখিয়ে বলল, ‘তুমি উপরের ডান দিকের রুমটাতে যাও—ওটাতে এটাচড বাথ আছে… আচ্ছা, আমি দেখিয়ে দিচ্ছি—এসো আমার সাথে।’
সোমার ছোট ব্যাগটা নিয়ে ফরিদ সিঁড়ি ভেঙে উপর তলায় গিয়ে সোমার জন্যে ঘর দেখিয়ে দিল। বাথরুমে কিভাবে গরম পানি আর ঠাণ্ডা পানি মিশিয়ে ব্যবহার করতে হয় দেখিয়ে দিল। সবকিছু বুঝিয়ে দিয়ে নীচে নামার সময় বলল, ‘একটা হট শাওয়ার নিয়ে কিছুক্ষণ ন্যাপ নিয়ে নাও—দেখবে ভালো লাগছে। ভয়ের কিছু নেই—বী ইয়োরসেলফ!’
‘থ্যাঙ্ক ইউ ফরিদ ভাই!’
‘ইউ ওয়েলকাম।’
ফরিদ নীচে নেমে গেলে সোমা দরজা আটকিয়ে চারিদিকে একবার দেখে নিয়ে বিছানায় গা-টা এলিয়ে দিল এবং মুহূর্তের মধ্যেই সে ঘুমিয়ে পড়ল।
ঘুমের মধ্যেই স্বপ্ন দেখল সোমা।
কলেজ থেকে ফিরে সোমা শুয়ে আছে। হুট করে রুমা এসে ওকে ডেকে তুলল, ‘এই সোমা ওঠ। জরুরী কথা আছে।’
ঘুম জড়ানো কণ্ঠে সোমা বলল, ‘কি হয়েছে?’
‘তোর শহীদের কথা মনে আছে?’
‘কোন শহীদ?’
‘আরে আমার দেবর শহীদ—আমেরিকায় থাকে।’
‘হ্যাঁ—কি হয়েছে তার?’
‘কিছু হয় নাই। শহীদ বিয়ে করবে। মেয়ে খুঁজছে।’
‘তো?’
‘আমি বলেছি তোর কথা।’
সোমা বড় একটা হাই তুলে উঠে বসতে বসতে বলল, ‘আমার কথা মানে?’
‘শোন, আমার শ্বশুর বাড়িতে কথা বলেছি। তারা তো এক পায়ে রাজী। শহীদ তোর সাথে কথা বলতে চায়। তুই আজ রাতে আমাদের বাসায় চল। শহীদ রাতে কল দিবে—তোর সাথে কথা বলতে চায়।’
‘আমার সাথে কথা বলতে চায় মানে কি?’
‘এত মানে বলতে পারব না। সেটা কথা হলেই বুঝতে পারবি। তুই রেডি হয়ে নে—চল আমার সাথে।’
‘আপা হেঁয়ালি করিস না তো!’
সোমাকে কোন রকম পাত্তা না দিয়ে রুমা প্রায় জোর করে সোমাকে নিয়ে চলে গেল তার নিজের বাসায়।
সন্ধ্যা মাত্র ৭টা। শহীদ ঘুম থেকে উঠে শিকাগো সময় সকাল ৯টায় রুমাদের বাসার ফোনে কল দিবে—তখন ফরিদপুরে সময় হবে রাত ৯টা।
‘তুই এখানে বসে পড়াশুনা কর। আমি চাই, শহীদের ফোন এলে তুইই প্রথমে ধরবি—দারুণ সারপ্রাইজ হবে।’ রুমাদের ড্রইং রুমের একটা টেবিলে রাখা ল্যান্ডফোনের পাশে সোমাকে বসিয়ে রেখে রুমা চলে গেল রাতের খাবার তৈরী করতে।
তখন থেকেই অত্যন্ত অস্বস্তিকর সময় কাটছে সোমার। কিন্তু একটা পর্যায়ে সেও তার ঘড়ি দেখা শুরু করল। ৯টা বাজতে আর কত দেরী। সোমা পড়ায় মন দেয়ার চেষ্টা করল—কিন্তু কিছুতেই মন বসাতে পারল না। তার অস্থিরতা বেড়ে গেল। সোমার নিজের কাছে বিরক্ত লাগছে—সে ভেবে পেল না, তার কেন এত অস্থির লাগছে।
সোমা পড়ায় ডুব দিল। একটা পর্যায়ে ফোনের কথা প্রায় ভুলেই গেল সে। অবশেষে এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ! রুমাদের বসার ঘরের ফোন বেজে উঠল—ক্রিং ক্রিং।
ক্রিং ক্রিং… অনেকক্ষণ থেকে একটা ফোন বেজে চলেছে। অনেক দূর থেকে ফোনের শব্দ ভেসে আসছে। ফোনের শব্দে সোমার ঘুম ভাঙল। সে চোখ মেলে তাকাল। সে কতক্ষণ ঘুমিয়েছে? এই মুহূর্তে সে কোথায় আছে সেটাও মনে করতে পারল না। চোখে রাজ্যের ঘুম—কিছুতেই চোখ মেলে তাকাতে ইচ্ছে করছে না। এখন কি রাত না দিন? রাত হলে কত রাত?
লিভিং রুমের কফি টেবিলের উপর থেকে কর্ডলেস ফোনটা নিয়ে ফরিদ বলল, ‘হ্যালো?’
‘বস আমি ইকবাল।’
‘হ্যাঁ ইকবাল বল।’
‘বস আমি ইয়েলো ক্যাব অফিসে। ওরা কোনো ইনফরমেশন দিতে চায় না। জিগায় তুমি কে? আমি কইলাম, আমি তার ফ্রেন্ড। কিন্তু কাজ হইল না বস। ওরা পুলিশ রিপোর্ট ছাড়া কোনো ইনফরমেশন দিবে না।’
‘ও।’ ফরিদ আর কিছু না বলে চিন্তিত মুখে ফোন রেখে দিল।
লিভিং রুমের মেঝেতে দাঁড়িয়ে ফরিদ কিছুক্ষণ ভাবল। এলোমেলো ভাবনা। অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে। অন্যমনস্কভাবেই একবার তাকাল উপরের দিকে। অজান্তেই বেরিয়ে এলো একটা দীর্ঘশ্বাস।
ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে বসল সোমা। এবং হঠাৎই তার মনে পড়ল সারাদিনের সব ঘটনা।
আরো কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরে তাকাল সোমা। এবং অবাক হয়ে দেখল—চারিদিক সাদা বরফের আবরণে ঢেকে আছে। রুপোর মতো ঝলমল করছে সারিবদ্ধ বাড়ির ছাদগুলি।
ফরিদ ভাই বলছিল রাতে স্নো পড়বে। সাদা সাদা পেঁজা তুলোর মত তুষার—এখনো ঝরছে ঝিরিঝিরি। নিয়নের আলো আর চাঁদের আলোর মিশ্রণে চিকচিক করছে চারিদিক—এ এক অপূর্ব দৃশ্য। সোমার কল্পনাতে এমন দৃশ্যের কথা কখনো আসেনি। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল বাইরে।
রাতের নিস্তব্ধতায় মগ্ন হয়ে আছে সোমা। নিস্তব্ধতা যখন চারিদিকে গ্রাস করে আছে হঠাৎ তখন দরজায় শব্দ হলো—ঠক ঠক। সম্বিত ফিরে পেয়ে ভয়ার্ত চোখে দরজার দিকে তাকাল সে। এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা দুরু দুরু কেঁপে উঠল তার। হৃৎপিণ্ডের দপ দপ শব্দ শোনা যাচ্ছে পরিষ্কার। সোমা কাঁপা স্বরে বলল, ‘কে? ফরিদ ভাই?’
কেউ কোনো সাড়া দিল না—দরজার ওপাশ থেকে।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৪)
ফরিদ ফোন বের করে ডায়াল করল ইকবাল নামে খুব পরিচিত এক ছেলেকে। অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই ফরিদ বলল, ‘হ্যাঁ ইকবাল?’
‘জি ফরিদ ভাই।’
‘আচ্ছা শোন, শহীদ নামে শিকাগোতে ক্যাব চালায় এমন কাউকে চিনিস?’
‘ক্যান কি হইছে বস?’
‘না মানে আমি তো এয়ারপোর্টে গিয়েছিলাম সেলিমকে ড্রপ করতে। ফেরার পথে দেখি একটা বাংলাদেশি মেয়ে—বিয়ে হয়েছে শহীদ নামে এক ছেলের সঙ্গে—মেয়েটা বসে বসে কাঁদছে। ওর হাজবেন্ড এয়ারপোর্টে ওকে আনতে যায়নি। আমি মেয়েটাকে নিয়ে আসছি শহীদের বাসায়। কিন্তু সে বাসায় নেই। এখন বুঝতে পারছি না কি করব।’
‘আপনি ঐখানে গেলেন ক্যামনে?’
‘লাগেজের উপরের ঠিকানা লেখা ছিল। ঐ ঠিকানা দেখেই এসেছি।’
‘ফ্রড কেস নাকি বস?’
‘না না তা হতে যাবে কেন? তুই এক কাজ কর, তুই একটু খোঁজ নিয়ে দ্যাখ তো—কেউ শহীদ নামে কাউকে চিনে কিনা।’
‘আচ্ছা আমি দেখতেছি। আপনে ঐ পোলার ফোন নাম্বারটা আমারে দেন।’
‘আচ্ছা আমি টেক্সট করে পাঠাচ্ছি। তুই ব্যাপারটা একটু সিরিয়াসলি দ্যাখ, ওকে?’
‘ওকে বস।’
ফোন কেটে দিয়ে ফরিদ দেখল সোমা কাঁচুমাচু হয়ে বসে অঝোরে কাঁদছে।
দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। শীতের সময়ে এই শহরে বিকেল চারটা বাজতে না বাজতেই সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। ফরিদ চারিদিকে একবার তাকাল তারপর ফিরে গেল সোমার কাছে। বসল তার পাশে।
সোমার কান্নার গতি বেড়ে গেল—রীতিমত শব্দ করে কাঁদছে মেয়েটি। ঠাণ্ডায় তার নাক দিয়েও পানি ঝরছে। একেই বলে নাকের পানি—চোখের পানি এক হয়ে যাওয়া। সে রুমাল দিয়ে মুছে তাকাল ফরিদের দিকে।
একটু সময় নিয়ে ফরিদ বলল, ‘আমি বলছিলাম কি—আমার বেশ খিদে লেগে গেছে। তারপর আবার ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার। চলো, কিছু খেয়ে নেই।’
‘না। আমি যাবো না। এটা যদি শহীদের বাসা হয়ে থাকে তাহলে সে নিশ্চয়ই এখানে আসবে। আমি এখানে বসে থাকি—আপনি যান।’ জেদি গলায় বলল সোমা।
‘না না সেটা তো ঠিকই আছে। শহীদের বাসা—শহীদ তো এখানে আসবেই। আমি বলছিলাম কি, আমি না হয় আমার ফোন নাম্বারটা লিখে ওর দরজায় ঝুলিয়ে রেখে যাই। ও ফিরে এলে আমাকে কল করলেই আমরা চলে এলাম। তাছাড়া এই ঠাণ্ডায় এভাবে বসে থাকাটা ঠিক হবে না। তুমি অসুস্থ হয়ে যাবে।’
সোমা চুপ করে রইল।
ফরিদ আবার বলল, ‘এক কাজ করি চলো। এখানে ডেভন নামে একটা জায়গা আছে—ডেভন এভিনিউ। সেখানে বাংলাদেশি, ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানি অনেক রেস্টুরেন্ট আছে। চাই কি দু’একজন দেশী মানুষের সাথে দেখাও হয়ে যেতে পারে। তোমার ভালো লাগবে। সেই সাথে আমরা খেয়েও নিলাম।’
সোমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘না আমি যাবো না। এখানেই বসে থাকব। আপনি চলে যান।’
ফরিদ আর কোনো বাক্য ব্যয় না করে উঠে চলে গেল। সে একবারের জন্যেও পিছনে ঘুরে তাকালো না। দরজা খুলে ফরিদ যখন গাড়িতে উঠতে যাবে তখন সে শুনতে পেল সোমার ডাক—ফরিদ ভাই!
ফরিদ ঘুরে তাকাল। সোমা বলল, ‘আমিও যাবো আপনার সাথে।’
‘চলো।’ ফরিদ এমন ভাবে চলো বলল যার মানে হতে পারে তোমার ইচ্ছা—গেলে যাবে না গেলে নাই। আমার কি? এই মেয়ে কখন আবার মত বদলে ফেলে কে জানে।
‘আমার হ্যান্ডবাগে বোর্ডিং কার্ড আছে। ওখানে চিঠি লিখে রেখে যাই।’ সোমা দ্রুত কয়েক লাইন লিখে ফরিদকে বলল, ‘আপনার ফোন নাম্বারটা লিখে দেন।’
ফরিদ তার নাম্বার লিখে দিল। সোমা তার বোর্ডিং কার্ডটি দরজায় ঝুলিয়ে রেখে ফরিদের পিছে পিছে গাড়িতে গিয়ে উঠল।
ফরিদের গাড়ি ছুটে চলেছে। গন্তব্য ডেভন এভিনিউ।***
লেকশোর ড্রাইভ ধরে লেক মিশিগানের মনোরম সৌন্দর্য দেখতে দেখতে গাড়ি ছুটে চলেছে ডেভনের দিকে। সম্পূর্ণ লেকটি সাদা বরফের চাদরে ঢেকে আছে। লেকের উপর দিয়ে ডানা মেলে শীতের পাখি নীড়ে ফিরে যাচ্ছে—সে এক অপূর্ব দৃশ্য।
ডেভনে এসে গাড়ি পার্ক করে সোমাকে নিয়ে ফরিদ ঢুকল একটা রেস্টুরেন্টে। তাকে জানালার ধারের একটা টেবিলে বসিয়ে রেখে ফরিদ গেল খাবার অর্ডার দিতে।
ইতিমধ্যে সোমা আরেক দফা কান্না শুরু করে দিয়েছে। শব্দ চেপে কান্নার চেষ্টা করছে বলে তার শরীরটা কেঁপে কেঁপে উঠছে। স্বচ্ছ কাঁচের দেয়ালের ভিতর দিয়ে বাইরে থেকে কয়েকজন মানুষ অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে সোমাকে। কিন্তু তার কান্নার কারণটা কি কেউ বুঝতে পারছে না।
ফরিদ ফিরে এসে সোমাকে বলল, ‘দেখুন আপনি কাঁদবেন না। একটু ধৈর্য্য ধরুন, সব ঠিক হয়ে যাবে।’
সোমা কান্না থামাল।
‘এখন কি খাবেন সেটা বলুন।’
‘আমি কিছু খাবো না।’
‘সেকি। কিছু তো একটা খেতে হবে। না খেলে চলবে কী করে? এদের বিরিয়ানিটা খুব ভালো—দিতে বলি?’
‘আপনি যা খাবেন তাতেই হবে।’
ফরিদ উঠে গিয়ে আগের খাবারের সঙ্গে একটা বিরিয়ানি যোগ করতে বলল। সে ফিরে এসে বসল। সোমা কাঁচের দেয়ালের বাইরে তাকিয়ে চুপচাপ বসে আছে। ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, তোমাকে একটা পারসোনাল প্রশ্ন করি?’
‘করেন।’
‘তোমাদের বিয়ে হয়েছে কতদিন?’
‘বছর দুয়েক।’
‘দুই বছর?’
সোমা মাথা নাড়ল।
‘বলো কি? সে তো অনেক সময়।’
‘তা তোমাদের বিয়ে নিশ্চয়ই বাংলাদেশে হয়েছে না?’
‘না। ফোনে।’
‘অ্যাঁ?’ ফরিদ বেশ অবাক হলো।
‘ফোনে।’ সোমা আবার বলল।
‘ও। টেলিফোনে বিয়ে!’ টেলিফোনের বিয়ের ব্যাপারটা ফরিদ শুনে এসেছে অনেক—কিন্তু সত্যি সত্যিই ফোনে বিয়ে হয় কিংবা হতে পারে সেই সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না। সে উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, ‘তো তুমি এতো দেরী করলে যে? ওর কি কাগজ-পত্র রেডি ছিল না নাকি…’
‘না না ওর কাগজ-পত্র আছে। আমিই ভিসা পাইনি।’
‘ও।’ ফরিদ কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তোমরা কি পূর্ব পরিচিত?’
‘না।’
‘আত্মীয়?’
‘আমার বোনের দেবর। অনেক আগেই আমেরিকা চলে আসে। তখন আমি ক্লাস এইটে পড়ি। তখন আমার সাথে দেখা হয়েছিল। কথা-টথা তেমন ছিল না।’
‘কিন্তু বিয়ের পরে টেলিফোনে নিশ্চয়ই অনেক কথা হতো?’ ফরিদের মুখে দুষ্টমির হাসি।
‘হতো। কিন্তু আমাদের তো ফোন ছিল না। ও সব সময় বলত ফোন নিতে—আর এখন তো মোবাইল।’
‘মোবাইল আসার পরে নিশ্চয়ই আর কোনো সমস্যা হয়নি—সারাক্ষণই কথা বলতে।’
‘না না সারাক্ষণ কথা বলি কেমন করে? ও তো ক্যাব চালায়। গাড়ি চালাতে চালাতে কি কথা বলা যায় নাকি?’
‘বলা যাবে না কেন? গাড়ি চালাতে চালাতেও কথা বলা যায়—অনেকেই বলে।’
‘তাই?’
‘তবে গাড়ি চালাতে চালাতে মোবাইলে কথা না বলাই উচিৎ। এক্সিডেন্ট হতে কতক্ষণ।’
সোমা আর কিছু বলল না। ফরিদও আর কিছু জিজ্ঞেস করল না। এসব অর্থহীন কথা-বার্তা আর কতক্ষণ বলা যায়। মেয়েটির মনটাকে অন্যদিকে ব্যস্ত রাখার জন্যে যতক্ষণ সম্ভব কথা চালিয়ে যাওয়া।
ফরিদ একবার কাউন্টারের দিকে তাকিয়ে দেখল খাবার রেডি হয়েছে কিনা। সে সোমাকে আবার বলল, ‘শহীদ নিশ্চয়ই তোমাকে খুব ভালোবাসে?’
সোমা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘দেখাই হলো না। আর ভালোবাসা।’
ভালো যন্ত্রণা হলো দেখছি। এই মেয়ে দেখি সব কথাতেই কেঁদে ফেলে। অপ্রস্তুত ফরিদ কী বলবে ভেবে পেল না।
সোমা বলল, ‘বাসে। বাসে নিশ্চয়ই।’ একটু থেমে আবার বলল, ‘চলেন ওর বাসায় যাই। এতক্ষণে নিশ্চয়ই চলে আসছে।’
‘এখনই যাবে? মাত্রই তো এলাম। এত অল্প সময়ের মধ্যে কি ফিরে এসেছে? আর আসলে তো আমাদেরকে কল করতোই।’
‘জানিনা। চলেন আমরা যাই।’ সোমা গোঁ ধরে বসে রইল। সে আর এক মুহূর্তও থাকতে চাচ্ছে না।
ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে। কাঁদতে হবে না। উমম, তাহলে এক কাজ করি—খাবারগুলো টু-গো করে নিয়ে নেই।’
সোমা কিছু বলল না। ফরিদ আবার বলল, ‘তুমি কিছু চিন্তা করো না। সব ঠিক হয়ে যাবে। ট্রাস্ট মি।’ বলেই সে উঠে চলে গেল কাউন্টারে। খাবার নিয়ে এসে তারা আবার চলল শহীদের বাসার উদ্দেশ্যে।
গাড়ি থেকে নেমে সোমা দৌড়ে চলে গেল দরজার সামনে। কলিং বেলে চাপ দিল বেশ কয়েকবার—কিন্তু কেউ দরজা খুলল না। ফরিদ এসে দাঁড়াল দরজার সামনে। উঁকিঝুঁকি দিল জানালার পাশ দিয়ে। দরজায় কান লাগিয়ে শোনার চেষ্টা করল—ভিতর থেকে কোনো শব্দ ভেসে আসে কিনা। কোনো সাড়াশব্দ নেই। সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘কেউ তো আসেনি বোধহয়। কোনো শব্দ পাচ্ছি না।’
সোমা কাঁদ কাঁদ স্বরে বলল, ‘ওমা, আমার তাহলে এখন কি হবে?’
কিছুক্ষণ ভেবে ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা, তুমি এত ভয় পাচ্ছ কেন? ব্যবস্থা একটা হবেই। আমাদের এখানে অনেক বাঙালী ফ্যামিলি আছে—তোমার থাকার ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে।’
‘আমি বাংলাদেশে কথা বলতে চাই। আপনি আমাকে দেশে কথা বলার ব্যবস্থা করে দেন।’
‘এক মিনিট।’ বলেই ফরিদ ফোন করল বাদশা নামে শিকাগো বাঙালী কমিউনিটির তার পরিচিত আর এক ছেলেকে। সেও ক্যাব চালায়। ফরিদের ধারণা, বাদশা একটা খোঁজ বের করতে পারবে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন তুলতেই ফরিদ বলল, ‘ঐ শহীদ নামের ছেলেটার কোনো খবর পেলি?’
ওপাশ থেকে বাদশা কি বলল সোমা তার কিছুই শুনতে পেল না। ফরিদ কিছুক্ষণ চুপচাপ শুনল তার কথা। তারপর বলল, ‘তুই ইকবালের সাথে যোগাযোগ করে আমাকে তাড়াতাড়ি জানা। দরকার হলে সব হসপিটালগুলোতে খোঁজ নে। জাইকাতে গিয়েছিলি?’
সোমা এসে দাঁড়াল ফরিদের পাশে। এবার ফোনের ভিতর দিয়ে ভেসে আসা কথা শুনতে পেল সে। ওপাশের লোকটি বলছে, ‘গেছিলাম বস—লাস্ট দুইদিনে শহীদ নামে কেউ যায় নাই ঐখানে। লোকাল থানায় একটা রিপোর্ট করলে কেমন হয়? আপনি বললে আমি একটা রিপোর্ট করে আসি।’
ফরিদ এখনো জানে না শহীদের ভিসা স্ট্যাটাস কি। তার কি সিটিজেনশীপ কিংবা গ্রিন কার্ড আছে? যদিও সোমা বলেছে তার কাগজ-পত্র আছে। তবুও তার সম্পর্কে ফরিদ এখনো ডিটেইল কিছুই জানে না—তাই এ মুহূর্তে থানা-পুলিশ এড়িয়ে যাওয়াই ভাল। ফরিদ রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘আরে পুলিশ কল করে একটা মিসিং রিপোর্ট করা যায় সেটা কি আমি জানি না নাকি? দরকার হলে আমি নিজেই যাবো।’
‘ওকে বস ওকে।’ বাদশা আর কোনো কথা বাড়াল না।
‘তুই এক কাজ কর, শহীদের ডিটেইল আমি তোকে টেক্সট করে দিচ্ছি—তুই একটু ইয়েলো ক্যাব অফিসে যেয়ে দেখ কোনো হদিস বের করতে পারিস কিনা।’
‘পাঠান বস—আমি এখুনি যাইতেছি।’
ফরিদ ফোন কেটে দিতেই সোমা উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইল, ‘জাইকা কি?’
ফরিদ ঠিক বুঝতে পারল না। সে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকাল সোমার দিকে। সোমা আবার বলল, ‘আপনি বলছিলেন, জাইকাতে খোঁজ নিয়েছে কিনা।’
‘জাইকা—ও হ্যাঁ।’ ফরিদ হেসে দিয়ে বলল, ‘ওটা ক্যাব চালকদের পছন্দের একটা রেস্টুরেন্ট। খুব সস্তায় খাবার পাওয়া যায়। চব্বিশ ঘণ্টাই খোলা থাকে। শিকাগো শহরে এমন কোনো ক্যাব চালক নেই যে জাইকাতে খায়নি।’
সোমা চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল ফরিদের মুখের দিকে। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না। মানুষটা তাহলে কোথায় গেল? অন্য কোনো বিপদ হয়নি তো? সোমার মনটা হু হু করে কেঁদে উঠল।
ফরিদ বলল, ‘চলো তাহলে যাওয়া যাক।’
সোমার ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করতে যে কোথায় যাবো? কিন্তু সে কিছুই জিজ্ঞেস করল না। সে তার সমস্ত শক্তি যেন হারিয়ে ফেলেছে। তার আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করছে না। তবুও সে মূর্তির মত ফরিদের পিছে পিছে হেঁটে গাড়িতে উঠল।
(চলবে…)
**বাংলাদেশি এবং দক্ষিণ এশিয়ান অধ্যুষিত এই ডেভন এভিনিউ সম্পর্কে ইতিপূর্বে আমার ‘একজন আজমল হোসেন’ গল্পে লিখেছিলাম। গল্পটি যারা পড়েছেন তারা হয়তো জানেন— আমেরিকাকে যদি সত্যিই বলতে হয় যে এটা ইমিগ্র্যান্টদের দেশ, তাহলে ডেভন এভিনিউকে বলতে হবে এটাই আসল আমেরিকা। শিকাগো শহরের উত্তর দিকে পূর্বে-পশ্চিমে লম্বা এই রাস্তায় একসঙ্গে বসবাস করছে ভারতীয়, বাংলাদেশি ও পাকিস্তানিদের একটা বিরাট অংশ। পাশাপাশি সিরিয়া, ইরাক, তুরস্ক থেকে আসা অ্যসিরিয়ান খৃষ্টানরা, রাশিয়া থেকে আসা ইহুদিরাও থাকে এখানে। তাদের সাথে আরো রয়েছে আধুনিক ক্রিস্টিয়ানিটির নানা গোষ্ঠী। কালো-ধলো-বাদামী মিলে একাকার। শুধু তাই না, যেন আমেরিকার বহুত্ববোধকে স্বীকৃতি দিতেই এই ডেভন এভিনিউর একাংশের নাম রাখা হয়েছে গান্ধী মার্গ। একটু দূরে গেলেই চোখে পড়বে সাইনবোর্ড মুহাম্মদ আলী জিন্না ওয়ে কিংবা অনারারি শেখ মুজিব ওয়ে।
*১৯৯৭ সালের অক্টোবর মাসে শিকাগো সিটি কাউন্সিলে পাশ হওয়া বিলের মাধ্যমে ডেভন এভিনিউর একটি অংশকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে ‘শেখ মুজিব ওয়ে’ ঘোষণা করা হয়। প্রতি বছর বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষ্যে শিকাগোর বাঙালীরা বাংলাদেশের পতাকা, বেলুন-ফেস্টুন, ফ্লোট, বাঁশি বাজিয়ে একটা র্যালী করে এগিয়ে যায়। সেই র্যালীর শুরুটা হয় এই ‘শেখ মুজিব ওয়ে’ থেকে।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-৩)
ফরিদের গাড়ি এসে থামল একটা ডানকিন ডোনাটস-এর সামনে।
সে তাকিয়ে দেখল সোমা চোখ বন্ধ করে সীটের উপর কাঁধ এলিয়ে জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে। মেয়েটি ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। ফরিদ ওকে ডাকবে কিনা একবার ভাবল। তারপর চুপচাপ বসে রইল।
বেশ কিছুক্ষণ পর সোমা চোখ মেলে তাকাল এবং সোজা হয়ে বসল। সে অবাক হয়ে চারদিকে একবার তাকিয়ে দেখল তারপর তাকাল ফরিদের দিকে।
ফরিদ বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছিলে বোধ হয়।’
সোমা বলল, ‘আমরা কোথায়?’
‘একটা ডোনাট শপের সামনে। কফি খেতে এলাম—এদের কফিটা ভালো।’
‘ও।’ বলে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল সোমা তারপর গাড়ি থেকে নেমে ফরিদের পিছে পিছে ঢুকল ডোনাট শপের ভিতরে।
ফরিদ সোমাকে একটা কোণার টেবিলে বসিয়ে রেখে কফি আনতে গেল। দু’টো কফি নিয়ে এসে সে দেখল সোমা রুমাল দিয়ে চোখ মুছছে।
ফরিদ সোমার দিকে গরম কফি এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘কফিতে চকলেট দেয়া আছে। এত বড় জার্নির পর এই চকলেট-কফিটা কাজে লাগবে—টায়ার্ডনেস কেটে যাবে।’
সোমা কিছু বলল না। চুপচাপ কফির কাপটা দু’হাতে চেপে ধরে গরম কফির উষ্ণতা নিয়ে নিজেকে উষ্ণ রাখার চেষ্টা করল। তারপর আস্তে করে একটা চুমুক দিল।
ফরিদ কফিতে চুমুক দিয়ে বলল, ‘তোমার দেশ কোথায়?’
‘ফরিদপুর।’
‘ফরিদপুর শহরে?’
‘জি।’
‘আচ্ছা। ভাইবোন ক’জন তোমরা?’
‘তিন ভাই-বোন। দুই বোন, এক ভাই।’
‘তুমি বড় সবার?’
‘আমি মেঝ। আমার ছোট ভাই…’
‘বোন বড়?’
‘জি।’
এরপর কিছুক্ষণ নীরবতায় কাটল। ফরিদ চাইছে মেয়েটিকে বিভিন্ন কথা বলে ভুলিয়ে রাখতে। ফরিদ লক্ষ্য করেছে, সোমা ক্ষণে ক্ষণেই কাঁদছে আর কিছুক্ষণ পরপর হাতের রুমালটা দিয়ে চোখের জল মুছছে। এই মুহূর্তে ওকে ব্যস্ত রাখাটা দরকার। সে প্রসঙ্গক্রমে বলল, ‘সোমা, তুমি শিকাগোতে এসেছ—শিকাগোতে বাংলাদেশিদের গৌরব করার মত বড় একটা ব্যাপার আছে।’
সোমা চোখ মুছে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ বলল, ‘এখানে সিয়ার্স টাওয়ার নামে ১১০ তলা উঁচু একটা বিল্ডিং আছে, যেটা একসময় পৃথিবীর সর্বোচ্চ ভবন হিসেবে বিখ্যাত ছিল। সেই সিয়ার্স টাওয়ারের আর্কিটেক্ট হচ্ছেন আমাদের একজন বাংলাদেশি। তুমি কি তার নাম শুনেছ?’
‘শুনেছি।’ সোমা শহীদের কাছে শুনেছে সিয়ার্স টাওয়ারের কথা। সোমা এলে শহীদ তাকে যেসব জায়গা দেখাতে নিয়ে যাবে সিয়ার্স টাওয়ার সেই লিস্টের মধ্যে আছে। সে জানে তার নাম। সে বলল, ‘এফ আর খান।’
‘হ্যাঁ, ফজলুর রহমান খান—সংক্ষেপে এফ আর খান। আর ঐ টাওয়ার সংলগ্ন একটা রাস্তার নাম এফ আর খান ওয়ে’***
‘তাই?’
‘হ্যাঁ।’ ফরিদের মুখে গর্বের হাসি দেখা দিল। শিকাগোতে তার পরিচিত কেউ এলেই সে তাকে নিয়ে যায় সিয়ার্স টাওয়ার দেখাতে। তার খুব গর্ব হয় এই ভেবে যে এই শহরের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা সুউচ্চ এই ভবনটির স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন তার দেশেরই একজন। যিনি ‘স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’ এর আইনস্টাইন হিসেবে বিশ্বখ্যাত। যাকে বলা হয় ‘টিউব্যুলার ডিজাইন’ এর জনক। কখনো দেখা হয়নি—তবু মনে হয়, কি এক আত্মার বাঁধনে যেন সবাই জড়িয়ে আছে ঐ মানুষটার সাথে। মানুষটা বেঁচে থাকলে ফরিদ নিশ্চিত তার সঙ্গে দেখা করে একটা স্যালুট দিত।
শিকাগো শহরের সব বাঙালীদেরই বোধহয় এমন হয়। সে যে প্রান্তেই যায় না কেন ‘সিয়ার্স টাওয়ার’ যেন ছায়ার মত অনুসরণ করে—অভয় দিয়ে যায় অবিরত। বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় এ শহর সৃষ্টিতে তাদেরও অবদান আছে। এ মহান বাঙ্গালি ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় জনমত তৈরি এবং তহবিল গঠনের জন্য ব্যাপক ভূমিকা পালন করেন। তাঁর নেতৃত্বে তৈরী হয় শিকাগো ভিত্তিক সংগঠন ‘বাংলাদেশ ইমারজেন্সি ওয়েলফেয়ার আপীল’। উল্লেখ্য, এফ আর খানের কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং তাঁর প্রতি সম্মাননা দেখাতে গিয়ে ১৯৯৮ সালে শিকাগো সিটি কাউন্সিল সিয়ার্স টাওয়ারের সামনের রাস্তার নামকরণ করে ‘এফ আর খান ওয়ে’।
ফরিদ আবার বলল, ‘শিকাগো শহরে আমার প্রিয় জায়গাগুলোর একটি এই রাস্তাটি—আমি যখনই এই রাস্তায় গিয়ে ‘এফ আর খান’ এর নাম দেখি, তাকিয়ে থাকি কয়েক মিনিট। মনে হয় পথচারীদের কাছে গিয়ে বলি, তোমরা কি এই লোকটাকে চেনো? এর বাড়ী কোথায় জানো?’
সোমা অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফরিদের মুখের দিকে। হঠাৎ করেই যেন মানুষটা বদলে গেছে। একেবারেই অন্যরকম লাগছে। প্রবাসে একজন বাঙালীর সাফল্যে আরেকজন কেমন বুক ফুলিয়ে কথা বলছে। দেশকে নিয়ে ভাবছে—অন্যরকম ভালোলাগায় মনটা ভরে উঠল সোমার।
‘আরো ইন্টারেস্টিং একটা ব্যাপার আছে।’ ফরিদ বলেই চলেছে, ‘এখানে ডেভন এভিনিউ নামে একটা জায়গা আছে—যেখানে সাউথ এশিয়ানদের অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-দোকানপাট-রেস্টুরেন্ট আছে, সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামেও একটা সড়কের নামকরণ করা হয়েছে ‘শেখ মুজিব ওয়ে’—দারুণ না?’
‘অবশ্যই।’
‘তোমার তো খুশী হবার কথা। আফটার-অল তোমরা ফরিদপুরের মানুষ!’
উত্তর না দিয়ে কথার মধ্যে হঠাৎই সোমা কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘আমি যে এখানে কেন আসতে গেলাম। আল্লাহ কেন যে আমাকে এমন বিপদের মধ্যে ফেলল।’
ফরিদ অপ্রস্তুত হয়ে তাকাল সোমার মুখের দিকে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না হাসতে হাসতেই একটা মেয়ে কি করে এভাবে কাঁদতে পারে। সে চশমার ফাঁক দিয়ে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
সোমা চোখ মুছে একটু ধাতস্থ হয়ে বলল, ‘জানেন ওর সাথে না লন্ডন এয়ারপোর্ট থেকেও আমার কথা হয়েছে। আমি একজন বাঙালীর কাছ থেকে ফোন নিয়ে কথা বলেছিলাম। ও বলছিল—ও ঠিক সময়ে হাজির থাকবে। ও যে কেন আসল না…’ বলতে বলতে সোমার কান্নার জোর আরো বেড়ে গেল।
ফরিদ তাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, ‘দেখো সোমা, শহীদ সাহেব কেন আসল না তা নিয়ে পরেও ভাবা যাবে। আর সে যদি কোনো কারণে দেরীতেও আসে—এয়ারপোর্টে একটু খোঁজ নিলেই সে জেনে যাবে যে তুমি এসেছ। আমরা এয়ারওয়েজ অফিসে বলে এসেছি যে বাংলাদেশ থেকে সোমা ইসলাম নামে যিনি এসেছেন তিনি আমার সঙ্গে আছেন। আমি আমার ফোন নাম্বার দিয়ে এসেছি। কাজেই শাহীদ সাহেব ফোন করলেই জেনে যাবেন যে তুমি কোথায় আছ। তাই তো?’
সোমা কান্না থামিয়ে মাথা নাড়ল।
এরপর কথা বন্ধ করে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপচাপ কফিতে চুমুক দিতে থাকল। ফরিদ বলল, ‘ঘণ্টার পর ঘণ্টা তুমি ওয়েট করেছ। তুমি নিশ্চয়ই টায়ার্ড।’
সোমা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।
‘এখন তোমার কাজ হচ্ছে একটু খাওয়া-দাওয়া করা এবং ফ্রেশ হওয়া।’
‘না না আমার একদম খেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি আরেকবার ওকে ফোন দিন না।’
‘ফোন তো বেশ কয়েকবার করলাম—ধরে না তো। দাড়াও দেখছি…’ বলতে বলতে ফরিদ আবার ডায়াল করল। বরাবরের মতোই রিং হলো কিন্তু ধরল না কেউ। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ফরিদ বলল, ‘ধরছে না। সরাসরি ভয়েজ মেইলে চলে যাচ্ছে—এনসারিং মেশিন।’
‘তাহলে চলেন, ওর বাসায় চলে যাই। ঠিকানা তো আছেই।’
ফরিদ চুপ করে রইল। সোমা সাথে সাথেই বলল, ‘ঠিক আছে আপনার যেতে হবে না। আপনি আমাকে একটা ক্যাব ডেকে দেন—আমি একাই চলে যাব।’
‘ঠিক যেতে পারবে?’
‘বুঝতে পারছি না।’
‘অবশ্য ভয়ের কিছু নেই—চিন্তারও কিছু নেই। সমস্যা হবার কথা না। ঠিকানা বলে দিলে ঠিক জায়গা মত পৌঁছে দেবে।’ একটু থেমে ফরিদ বলল, ‘কিন্তু যেয়ে যদি দেখো শহীদ সাহেব বাড়িতে নেই, তখন কি করবে?’
‘না না তা কেন হবে?’
‘তা হবে না কিন্তু ধরো যদি হয়ে যায়। গিয়ে দেখলে শহীদ নেই—দরজা খুলছে না। তখন কি করবে তুমি?’ থেমে থেমে কথাগুলি বলে সোমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল ফরিদ।
‘তাহলে আপনিও চলেন না আমার সঙ্গে।’ সোমার কণ্ঠে আকুতি ফুটে উঠল। সে আবার বলল, ‘আপনার এখন কি কাজ?’
‘কাজ তো কিছু না কিছু আছেই। কাজ ছাড়া কি মানুষ বাঁচে? ধরো, ফুটপাতে যে মানুষটি ঘুমায়, সেই জায়গাটা খুঁজে বের করাটা তার জন্যে কিন্তু একটা ইম্পরট্যান্ট কাজ তাই না?’
সোমা মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘এখন আপনার কি কাজ? খুব জরুরী?’
‘হ্যাঁ খুব জরুরী।’
সোমার মন খারাপ হয়ে গেল। হয়ত এখুনি কেঁদে ফেলবে আবার। তবুও সে জানতে চাইল, ‘কি কাজ?’
ফরিদ মুচকি হেসে বলল, ‘এখন আমার প্রথম কাজ হচ্ছে—সোমা নামে যে মেয়েটি এই মুহূর্তে আমার সামনে বসে আছে তাকে শহীদ সাহেবের বাসায় পৌঁছে দেয়া।’
মুহূর্তেই সোমার চেহারা বদলে গেল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় তার মনটা ভরে উঠল। পৃথিবীতে এত ভালো মানুষ আছে ভাবতেই ভালো লাগছে।
ফরিদ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেয়েটির মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘চলো তাহলে।’
সোমাকে নিয়ে ফরিদের গাড়ি এসে থামল ছোট্ট একটা একতলা বাড়ির সামনে। ফরিদ গাড়ি থেকে নেমে ঠিকানা মিলিয়ে দেখল ঠিক জায়গায়ই এসেছে। নিশ্চিত হবার জন্যে সে আরো একটু সামনে গিয়ে ভালো করে দেখে নিল। তারপর দূর থেকে বলল, ‘হ্যাঁ এটাই।’
সোমা দ্রুত নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল বাড়িটার প্রধান দরজার দিকে। ফরিদ লাগেজ নিয়ে এসে দাঁড়াল সোমার পাশে। তারপর কলিং বেল চাপল। একবার। দুবার। তিনবার।
কেউ দরজা খুলল না। ফরিদ বলল, ‘বাসায় তো মনে হচ্ছে কেউ নেই।’
সোমার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
ফরিদ ফোন বের করে রি-ডায়াল করল শহীদের নাম্বারে। ফোনের শব্দ ভেসে এলো ঘরের ভিতর থেকে। তারা দুজনেই তাকাল ভিতরের দিকে। ফোন বেজেই চলেছে। ফরিদ বলল, ‘ভিতরে তো রিং হচ্ছে—কেউ তো ধরছে না।’
সোমা বলল, ‘এখন কি হবে?’
ফরিদ ঠিক বুঝতে পারছে না কী বলবে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সোমা বলল, ‘আপনি চলে যান। আমি এখানে বসে থাকি।’
মেয়েটির কণ্ঠ কেমন অন্যরকম শোনাল। অদ্ভুত কঠিন। ফরিদ অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, ‘তুমি একা একা থাকবে এখানে?’
‘হ্যাঁ আমি এখানে বসে থাকব।’
‘তুমি এখানে বসে থাকবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড? ডু ইউ হ্যাভ এনি আইডিয়া হাউ কোল্ড ইট ইজ। তুমি তো ঠাণ্ডায় জমে বরফ হয়ে যাবে।’ ফরিদ রীতিমত ধমকে উঠল।
তবুও সোমা সিঁড়ির উপর বসে পড়ল।
ফরিদ বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে। থাকো। বসে থাকো। বসে বসে অপেক্ষা করো—দেখো তোমার পতিদেব কখন আসে তোমাকে উদ্ধার করতে।’ বলেই সে গটগট করে গাড়ির দিকে হেঁটে গেল। গাড়ির কাছে যেয়ে সে একবার ঘুরে তাকাল সোমার দিকে।
সোমা শক্ত হয়ে বসে আছে। মনের ভিতর অনিশ্চয়তার ঝড় বয়ে যাচ্ছে তার।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-২)
এয়ারপোর্ট থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা বাস স্টপেজের যাত্রী ছাউনিতে বসে আছে সোমা।
নিয়মিত বিরতি দিয়ে একটার পর একটা বাস আসে, কিছুক্ষণের জন্যে থামে যাত্রী নামা-উঠার জন্যে তারপর আবার চলে যায়। এক একবার বাস থামে আর সোমা উঠে দাঁড়ায় কারো কাছে কোনো সাহায্য পাওয়া যায় কিনা এই আশায়। যাত্রী ছাউনির ভিতর হিটিং সিস্টেম থাকা সত্ত্বেও ঠাণ্ডায় প্রায় জমে যাবার মত অবস্থা হলো তার।
সোমা হঠাৎ লক্ষ্য করল একজন মাঝ বয়সী ভদ্রলোক মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে হেঁটে আসছেন। তার বেশভূষা দেখে মনে হলো লোকটি ভারতীয় হতে পারে। লম্বা আলখাল্লার মত একটা ওভারকোট গায়ে চড়ানো। মাথায় কানটুপি, গলায় মাফলার, হাতে হাত মোজা। এর মধ্যে কিভাবে সে কথা বলছে এটাই একটা রহস্য।
ভদ্রলোক কাছাকাছি আসতেই সোমা দ্রুত তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। হঠাৎ একটা মেয়ে এভাবে সামনে এসে পড়ল কোথা থেকে তা বোঝার আগেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করল, ‘এক্সকিউজ মি। ক্যান আই ইউজ ইয়োর ফোন?’
লোকটি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে একবার মেয়েটির দিকে তাকালেন এবং বুঝতে পারলেন মেয়েটি সম্ভবত বিপদে পড়েছে। কেমন অসহায় লাগছে তাকে। ভদ্রলোক যার সঙ্গে কথা বলছিলেন তাকে ‘টক টু ইয়্যু লেটার’ বলে লাইনটা কেটে দিলেন। তারপর মেয়েটির হাতে ফোন এগিয়ে দিলেন।
সোমার চোখ চিকচিক করে উঠল খুশীতে। সে ফোন হাতে ছাউনির ভিতরে ঢুকে সুটকেসের উপরে লাগানো কাগজ থেকে ফোন নাম্বার দেখে একটা একটা করে বোতামে চাপ দিতে থাকল।
লোকটি একটু এগিয়ে এসে দেখলেন কাগজে বড় বড় অক্ষরে লেখা—নাম, ঠিকানা, ফোন নাম্বার। নাম দেখে তার মনে হলো মেয়েটি হয়ত বাংলাদেশি। তিনি উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আর ইউ ফ্রম বাংলাদেশ?’
সোমা ঘাড় ঘুরিয়ে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘হাউ ডু ইউ নো?’
‘কি করে বুঝলাম?’ হেসে দিয়ে পরিষ্কার বাংলায় বললেন তিনি।
‘জি।’
সোমার অবাক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ভদ্রলোক সুটকেসে লাগানো বড় বড় অক্ষরে লেখা কাগজটির দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ‘আপনার সুটকেসের উপরে সবকিছু লেখা আছে। সোমা ইসলাম। কেয়ার অফ-শহীদুল ইসলাম। নাম-ঠিকানা-ফোন নাম্বার। আমরা বাঙ্গালীরা এই কাজটি সবসময় করে থাকি।’
‘আপনি বাংলাদেশি?’ সোমার চোখ আবারো চকচক করে উঠল খুশীতে।
মেয়েটির উচ্ছ্বাস দেখে ভদ্রলোক হেসে ফেললেন। ‘হ্যাঁ বাংলাদেশি। আমার নাম ফরিদ। ফরিদ আহমেদ।’ তিনি আশ্বস্ত করলেন মেয়েটিকে।
‘আল্লাহর কাছে হাজার শুকুর। এইসময়ে একজন বাঙ্গালী ভাইয়ের দেখা পেলাম।’ সোমা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘আমি না খুব বিপদে পড়ছি।’
ফরিদ লক্ষ্য করল মেয়েটির গলায় আঞ্চলিকতার টান স্পষ্ট। তবে কোন অঞ্চলের তা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না। মেয়েটি কোন অঞ্চলের সেটা অবশ্য মুখ্য কোনো বিষয়ও না—মেয়েটি বাংলাদেশের সেটাই সবচেয়ে বড় কথা। সে জিজ্ঞেস করল, ‘এয়ারপোর্ট থেকে বের হলেন? দেশ থেকে এসেছেন, না? প্রথমবার?’
‘জি।’
‘কোথায় যাবেন? ট্যাক্সি ডেকে দিব?’
‘এই এড্রেসে যার নাম লিখা, উনার আমাকে রিসিভ করার কথা ছিল। একে একে সবাই চলে গেল। গাড়ি নিয়ে, ট্যাক্সি নিয়ে। আমার জন্যে কেউ এলো না। আমি অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকলাম। তারপর ভাবলাম একটা ফোন করি—তাই ফোনের খোঁজে এখানে চলে এলাম। এখন কি করব আমি? কিভাবে যাব?’ সোমার কণ্ঠে স্পষ্ট উৎকণ্ঠা প্রকাশ পেল।
‘আরে এয়ারপোর্টের ভেতরেই তো ফোন ছিল।’
‘আমি তো চিনি না।’
‘ও।’
‘তাই মানুষের পিছনে পিছনে এখানে চলে আসছি।’
মৃদু হেসে ফরিদ বলল, ‘কিন্তু যিনি আপনাকে রিসিভ করতে আসবেন, তিনি এসে যদি দেখেন আপনার যেখানে থাকার কথা সেখানে আপনি নেই, বাইরে চলে এসেছেন—তখন কি হবে?’
‘সে জন্যেই তো ফোন করতে চাচ্ছি।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, দেখি ফোনটা আমার কাছে দিন।’ বলেই সে লাগেজের উপর লেখা নাম্বার দেখে রিং করল। বেশ কয়েকবার ফোন রিং হলো কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কেউ ফোন ধরল না। ফরিদ বলল, ‘কেউ তো ফোন ধরছে না।’
সোমা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলল, ‘এখন? এখন কি হবে?’
‘আচ্ছা দেখি আমি আরেকবার চেষ্টা করি।’ ফরিদ আবার চেষ্টা করল এবং যথারীতি অপর প্রান্ত থেকে কোনো সাড়া পেল না। সে বলল, ‘উমম ফোন ধরছে না। নো রেসপন্স।’
‘তাহলে এখন আমি কি করব—কোথায় যাব আমি?’ এবার কান্নায় ভেঙে পড়ল সোমা।
ফরিদ বলল, ‘আহা কাঁদবেন না। কান্নাকাটি করে কোনো লাভ হবে না। এখন মাথা ঠাণ্ডা রাখতে হবে।’ সে তার কোটের পকেট হাতরে একটা রুমাল বের করে সোমার হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নিন, চোখটা মুছুন। এসব কথা পরেও চিন্তা করা যাবে। আসুন—ভেতরে বসুন। রিল্যাক্স করুন।’
সোমার কান্না তাতে অবশ্য থামল না। সে কেঁদেই চলল।
ফরিদ আবার বলল, ‘একটা ব্যবস্থা হবেই। আপনি অস্থির হবেন না। আমি দেখছি কী করা যায়।’ ফরিদ একরকম জোর করেই সোমাকে নিয়ে যাত্রী ছাওনীর ভেতরে নিয়ে বসালেন। তিনি নিজেও বসলেন সোমার পাশে। তারপর বললেন, ‘আমার কি মনে হয় জানেন? আমার মনে হয় শহীদ সাহেব চলে আসবেন।’
সোমা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘আপনি কি করে ওর নাম জানলেন?’
ফরিদ আবার লাগেজের গায়ে লাগানো কাগজটি দেখিয়ে বলল, ‘ঐ যে সবই তো লেখা আছে ওখানে।’
সোমা কিছু বলল না। ফরিদ জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, আপনি কতক্ষণ এয়ারপোর্টে দাঁড়িয়ে ছিলেন।’
‘তিন ঘণ্টা।’ সোমা বলল।
‘তিন ঘণ্টা?’ ফরিদ আঁতকে উঠে বলল।
‘জি।’
‘তাহলে আপনার পা-টা তো এতক্ষণে ফুলে যাবার কথা।’
‘পা তো প্লেনেই ফুলে গেছে।’
‘ওহো।’ একটু থেমে ফরিদ বলল, ‘তাহলে এক কাজ করি—চলুন কোথাও বসে একটু কফি-টফি খাই। এবং ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখি কী করা যায়। ঠিক আছে?’
সোমা চুপ করে রইল—সে হ্যাঁ না কিছু বলল না। সে কিছুটা দ্বিধা, কিছুটা অনিশ্চিত ভাবে তাকাল ফরিদ সাহেবের দিকে।
ফরিদ সাহস দিয়ে বলল, ‘আপনার ভয় পাবার কোনো কারণ নেই। আপনি নিশ্চিন্তে আমাকে বিশ্বাস করতে পারেন। এই শিকাগো শহরে সমস্ত বাংলাদেশি আমাকে চিনে—ট্রাস্ট মি! চলুন। আমার গাড়িটা একটু দূরে পার্ক করা আছে। এগুলো দিন আমার কাছে—চলুন।’
সোমা ইতস্তত করে উঠে দাঁড়াল।
ফরিদ সোমার বড় লাগেজটা নিয়ে বের হয়ে যাবার মুহূর্তে হঠাৎ থেমে গেল। সে সোমার দিকে তাকিয়ে লক্ষ্য করল যে মেয়েটির গায়ে একটি পাতলা জ্যাকেট ছাড়া আর কোনো গরম কাপড় নেই। সে বেশ শঙ্কিত হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার তো ঠাণ্ডা লাগার কথা। ঠাণ্ডা লাগছে না?’
‘না।’
‘বলেন কি?’ ফরিদ অবাক হয়ে বলল, ‘ভয় এবং উত্তেজনায় আপনি ঠাণ্ডাটা বুঝতে পারছেন না। একটু পরেই বুঝতে পারবেন—একেবারে নার্ভে গিয়ে লাগবে।’
সোমা বুজতে পারছে না—তার আসলেই ঠাণ্ডা লাগছে না। অথবা ঠাণ্ডা হয়ত ঠিকই লাগছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে না। কেমন যেন অসাড় হয়ে আছে তার শরীর। তার মনের উপর দিয়ে ছোটখাটো একটা ঝড় বয়ে গেছে। এমন অনিশ্চয়তার মধ্যে ইতিপূর্বে সে আর কখনোই পড়ে নাই। এয়ারপোর্ট থেকে সে কোনোদিন বের হতে পারবে এই আশা সে প্রায় ছেড়েই দিয়েছিল। তার বুক ফেটে কান্না আসছিল। ভাগ্যিস এই মানুষটির সাথে তার দেখা হয়েছিল।
‘আপনার সঙ্গে আর কোনো শীতের কাপড় নেই?’
ফরিদের কথায় তার সম্বিত ফিরে এলো। সোমা বলল, ‘আছে। সুটকেসে একটা উলের সোয়েটার আছে।’
‘শিকাগোর ঠাণ্ডা সম্পর্কে দেখি আপনার কোনো ধারণাই নেই। আপনাকে কেউ কিছু বলে নাই আগে?’
‘ও বলেছিল।’
‘ও-টা কে?’
সোমা একটু লজ্জা পেয়ে বলল, ‘আমার হাজবেন্ড।’
‘শহীদ সাহেব? তা কি বলেছিল?’
‘বলেছিল কষ্ট করে শীতের কাপড় আনতে হবে না। সে আমার জন্যে গরম কাপড় কিনে রেখেছে—এয়ারপোর্টে নিয়ে আসবে।’
ফরিদ একটু মুচকি হাসল। সে লক্ষ্য করল, মেয়েটির হাতে কোনো হাত মোজা না থাকায় হাত দুটি ঠাণ্ডায় নীল হয়ে আছে। সে বলল, ‘আপনি এক কাজ করুন—আপত্তি না থাকলে এই মাফলারটি গলায় জড়িয়ে নিন।’ বলেই ফরিদ তার গলা থেকে মাফলার খুলে নিয়ে সোমার দিকে বাড়িয়ে দিল।
সোমা ইতস্তত করে মাফলারটি নিল। ফরিদ বড় লাগেজটি নিয়ে ছাওনী থেকে বের হতেই সোমা ডাকল, ‘ফরিদ ভাই?’
ফরিদ দাঁড়াল। সোমা ইতস্তত করে বলল, ‘থাক, আমি যাবো না। আপনি চলে যান। আমি এখানেই থাকি।’
ফরিদ অবাক হলো—হঠাৎ করেই মন বদলে ফেলেছে মেয়েটি। কিন্তু কেন? সে বলল, ‘ঠিক আছে। থাকুন। কিন্তু কেন জানতে পারি?’ বিরক্ত কণ্ঠে সে জিজ্ঞেস করল।
‘ও হয়ত আসতে পারে।’
এবার ফরিদ রেগে গেল। সে বলল, ‘আরে বাবা, ও আসবেটা কোথায়?’ ফরিদ অত্যধিক বিরক্ত হয়ে আবারো বলল, ‘এখানে তো আসবে না। তুমি তো এয়ারপোর্ট থেকে চলে এসেছ অনেকদূরে—একটা বাস স্ট্যান্ডের কাছে। তোমার যেখানে থাকার কথা ছিল—তুমি তো সেখানে নেই। শহীদ এসে তোমাকে কোথায় খুঁজবে?’ ফরিদের কণ্ঠে স্পষ্ট উষ্মা প্রকাশ পেল।
সোমা কী বলবে বুঝতে পারছে না। সে বোকার মত তাকিয়ে রইল ফরিদের মুখের দিকে। সে লক্ষ্য করল, রেগে গিয়ে লোকটি তাকে তুমি তুমি করে বলছে।
ফরিদ আগের মতই রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘তুমি এখানে কতক্ষণ বসে থাকবে? কিছুক্ষণের মধ্যেই তুমি ঠাণ্ডায় জমে যাবে। এতক্ষণ যে তুমি টিকে আছো, তাতেই আমি অবাক হচ্ছি। শিকাগোর ঠাণ্ডা সম্পর্কে কি কোনো ধারণা আছে তোমার? নাই। থাকলে এমন বোকার মত কথা বলতে না।’
সোমা আবার কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘তাহলে, আমি এখন কি করব?’
ফরিদ ধমকে উঠে বলল, ‘আহা আবার কাঁদছ কেন? প্লীজ কান্না থামাও।’
সোমা কান্না থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে—কিন্তু থামাতে পারছে না। ফরিদ এবার লক্ষ্য করল মেয়েটির শরীর কাঁপছে। এ কাঁপন কান্নার নয়—শীতের।
ফরিদ বুঝতে পারল যে সে আসলে রেগে গেছে। এভাবে রেগে যাওয়াটা বোধহয় ঠিক হয়নি। মেয়েটারই বা কি দোষ—সে কি আর জানত যে তাকে এই পরিস্থিতিতে পরতে হবে। ফরিদ এবার নরম স্বরে বোঝানোর চেষ্টা করল, ‘বললাম তো—আপনার কোনো সমস্যা হবে না। আপনার কাছে তো ঠিকানা আছেই। আমিই আপনাকে পৌঁছে দেব। তার আগে চলুন, কোথাও গিয়ে একটু বসি। শহীদ সাহেবকে আবার ফোন করি। ব্যবস্থা একটা হবেই—ট্রাস্ট মি। বলুন এবার কি করতে চান।’
সোমা চোখ মুছল এবং বেশ খুশী মনেই বলল, ‘ঠিক আছে চলেন।’
‘যাবেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘চলুন।’
ফরিদ আর দেরী না করে সোমার লাগেজটা নিয়ে হাঁটা শুরু করল। সোমা পাশে পাশে হেঁটে চলল। হাঁটতে হাঁটতেই ফরিদ বলল, ‘গাড়িতে উঠার আগে বুদ্ধিমানের মত দুটো কাজ করতে হবে। আসুন আমার সঙ্গে। আসুন।’
সোমা অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, কত অল্প সময়ে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষকে আর দূরের কেউ মনে হচ্ছে না। মনে হচ্ছে খুব কাছেরই কেউ—আপনজন। বাংলাদেশে হলে অনুভূতিটা কি এমন হতো নাকি দেশের বাইরে বলে এমন লাগছে। কে জানে?
সোমার মত একজন অচেনা মানুষের সঙ্গে ফরিদের এমন চেনা ভঙ্গিতে কথা বলার বিষয়টি তার ভালো লেগেছে। শুরুতে যেই অস্বস্তিবোধ ছিল, সেটা কেটে গেছে—ভয়ও লাগছে না। সে নির্দ্বিধায় অজানা-অচেনা একজন মানুষের সাথে রওনা হলো।
গাড়িতে উঠে সোমা বলল, ‘ফরিদ ভাই, আমাকে তুমি করেই বলেন। আপনি-তুমি মিশিয়ে ফেলছেন—ভালো লাগছে না।’
‘মিশিয়ে ফেলছি নাকি? হা হা হা।’
শিকাগোর হাইওয়ে ধরে ফরিদের গাড়ি ছুটে চলেছে প্রচণ্ড বেগে। পাশের সীটে চুপচাপ বসে আছে সোমা। প্রচণ্ড অনিশ্চয়তার যে মেঘ তাকে ঘিরে ছিল তা কেটে যেতে শুরু করেছে। সোমার মনে হচ্ছে এই মানুষটিকে বিশ্বাস করা যায়—হয়ত নির্ভর করাও যায়। যদিও মানুষটা সম্পর্কে তার এখনো কোনো ধারণা নেই। তবুও একধরনের স্বস্তিবোধ তাকে আচ্ছন্ন করে রাখল।
গাড়িতে উঠেই ফরিদ গাড়ির হিটিং সিস্টেম চালু করে দিয়েছে। সোমা এক ধরণের আরামদায়ক উষ্ণতা অনুভব করছে। প্রশান্তিতে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। চারিদিকে কী সুন্দর। হাইওয়ের দু’ধারের জায়গাটা বরফের আচ্ছাদনে ঢেকে আছে। মধ্যদিনের সূর্যের আলোতে সেই বরফ চিকচিক করছে। সোমার খুব ইচ্ছে করছে চোখ জুড়িয়ে সেই সৌন্দর্য দেখতে—কিন্তু আয়েসে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। কিছুতেই সে তার চোখ খুলে রাখতে পারছে না।
ভালোবাসার ছায়াসঙ্গী (পর্ব-২)
মীরার বয়স ছাব্বিশ। খুব সাধারণ একটি মেয়ে–তথাকথিত চোখ ধাঁধানো সুন্দরী বলতে যা বোঝায় সে মোটেও তা নয়। তবে তার ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন একটা কিছু আছে—যা খুব সহজেই দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এবং সেভাবেই একদিন আবীরের চোখেও পড়েছিল মীরা।
আবীরের সঙ্গে মীরার প্রথম দেখা হয়েছিল আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস স্টেটের ছোট শহর অস্টিনে। তাঁরা দুজন গ্রাজুয়েট স্টুডেন্ট হিসেবে পড়ছিল টেক্সাস তথা আমেরিকার বিখ্যাত ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাস অ্যাট অস্টিনে, ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেমে। দুজনেরই ওই প্রথম দূরাবাস—একলা থাকা। একই প্রোগ্রাম আর একই রিসার্চ ফিল্ড হওয়ার সুবাদে দিনের প্রায় পুরোটা সময়ই ওরা দুজন থাকত একসঙ্গেই। দুজন তরুণ-তরুণীর একসঙ্গে থাকা বড় চমৎকার ব্যাপার। কিছু কথা, একটু হাসি, খুনসুটি, ভাগাভাগি করে খাওয়া আর সুখ দুঃখে হাত ধরাধরি করে এগিয়ে চলা। ক্লাস অ্যাসাইনমেন্ট আর গ্রুপ স্টাডি করতে করতে দুজনের মধ্যে গড়ে উঠে সখ্যতা—সৃষ্টি হয় একে অপরের জন্য অনন্ত অসীম ভালোবাসার। সেই সম্পর্কে ভালোবাসার আবীর ছড়িয়ে দুজন দুজনার আরো কাছে চলে আসে। একসময় বুঝতে পারে একে অপরকে ছাড়া তাদের জীবন অর্থহীন। জীবনের বাকিটা পথ দুজন দুজনার হাত ধরে চলবে বলে অঙ্গীকার করে ওরা। তাই গ্রাজুয়েশন শেষ করেই গাঁটছড়া বেঁধে নেয় দুজন। আবীর আর মীরা বিয়ে করে অস্টিনেই। মাস দুয়েক বাদে চাকরি নিয়ে দুজনেই চলে আসে ডালাসে।
আন্ডার-গ্রাজুয়েট কোর্স চলাকালীন সময়ে আবীর আর মীরা ইন্টার্নশিপ করার সুযোগ পেয়ে যায় আমেরিকার এক বিখ্যাত ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির ডালাস হেড কোয়ার্টারে। সেই সুবাদে গ্রাজুয়েশন শেষ করার আগেই ফুল টাইম জব অফারও পেয়ে যায় একই কোম্পানিতে।
সম্পর্কের শুরুতে যদিও মীরা প্রেম-ভালোবাসা জাতীয় বিষয়ে ছিল বড় উদাসীন। তার কাছে আবীর খুব একজন ভালো বন্ধু ছাড়া আর কিছু ছিল না। আর আবীর ছিল পেন্ডুলামের মতো দোদুল্যমান, তার কখনো কখনো মনে হতো মীরা ছাড়া পৃথিবী অন্ধকার। আবার কখনো কখনো মীরাকে মনে হতো অচেনা কেউ।
তবুও আবীরের আদর, যত্ন আর ভালোবাসা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছিল মীরাকে। ভালোই কাটছিল ওদের দিনকাল। তারপর কী থেকে কী হয়ে গেল। সেদিনটির কথা মনে হলেই সব কিছু এলোমেলো হয়ে যায় মীরার। নিজেকে অপরাধী মনে হয়—কিছুতেই ক্ষমা করতে পারে না সে নিজেকে।
এক বিকেলের এক অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্ঘটনা বদলে দিল মীরার পৃথিবী।
…
সেদিন বিকেলে…
একটি তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে আবীরের সাথে খানিকটা ঝগড়া হয়ে গেল মীরার।
ঐদিন মীরা কাজে যায়নি—শরীরটা ভালো লাগছিল না বলে। সে আবীরকে ফোন করে বলে দিল, বাসায় রান্না নেই—অফিস থেকে ফেরার পথে তার জন্যে একটা চিকেন স্যান্ডউইচ নিয়ে আসতে। আর আবীর তার পছন্দের যা চায় তাই। মীরা সাধারণত প্লেইন স্যান্ডউইচ খায়—নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ, নো ড্রেসিংস অ্যাট অল। শুধু লেটুস পাতা, টমেটো আর পিকল। আবীরকে সেকথা দুবার মনে করিয়ে দিল মীরা।
আবীর ঘরে ঢুকা মাত্রই মীরা স্যান্ডউইচের প্যাকেট নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। এবং মুহূর্তেই তার মেজাজ সপ্তমে চড়ে গেল। রাগে গজগজ করতে করতে বলল, ‘আবীর, তুমি আমার একটা কথাও ঠিকমতো শোনো না। তোমাকে কতবার বললাম, নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ। আই ডোন্ট লাইক এনি ড্রেসিংস ইন মাই স্যান্ডউইচ। লুক হোয়াট ডিড ইউ ব্রিং…’ মীরা খোলা স্যান্ডউইচটি আবীরের দিকে মেলে ধরল।
আবীর তার ডাবল বার্গারে একটি কামড় দিয়েছে মাত্র—সে মুখের খাবার শেষ করে বলল, ‘আশ্চর্য, বেটারা দেখি সব কিছুই দিয়ে দিয়েছে। কোনো মানে হয়?’
‘আমার তো মনে হয় তুমি বলতেই ভুলে গেছ।’
‘ট্রাস্ট মি। আমি বলছি এগুলো না দিতে—আর আমিতো জানিই তুমি প্লেইন স্যান্ডউইচ লাইক করো। নো চিজ, নো মেওনেজ, নো কেচাপ—আমার মুখস্থ। জানি।’
‘বলেই যদি থাকো, তাহলে দিলো কেন?’
‘কেন দিলো সেটা আমি এখন কী করে বলবো? আমি তো আর জানতাম না, বেটারা এই কাজ করবে, নাহলে তো চেক করেই আনতাম।’
মীরা আর কিছু না বলে ঝিম ধরে বসে রইল।
আবীর শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘আচ্ছা এক কাজ করো, উপর থেকে চিজটা ফেলে দাও আর নাইফ দিয়ে মেওনেজ আর কেচাপ সরিয়ে ফেলো। একদিন না হয় একটু কষ্ট করে খাও জান্টু।’
‘তুমি খাও।’ বলেই মীরা বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল।
আবীর খানিকটা বিরক্ত হয়েই বলল, ‘আমি বুঝলাম না, সামান্য একটা স্যান্ডউইচ নিয়ে এত বিগ ডিল করার কী আছে? একটা দিন কি ব্যতিক্রম করা যায় না? নাহয় খেলেই একদিন চিজ, মেওনেজ, আর কে-চাপ দিয়ে—তাতে সমস্যা কী? এমন তো না যে তুমি কোনো দিনই খাওনি ওসব কিংবা ওগুলোতে তোমার অ্যালার্জি।’ গলা নিচু করে আবার বলল, ‘তোমার ডিকশনারিতে আবার ব্যতিক্রম বলে কোনো শব্দ নেই।’
মীরা একবার তাকাল আবীরের দিকে কিন্তু কোনো কথা বলল না—চুপচাপ শুয়ে রইল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি বরং আমার বার্গারটা খাও…’ বলেই আবীর বুঝতে পারল, আরেকটা ভুল হয়ে গেছে। তার বার্গারের মধ্যে দুনিয়ায় হাবিজাবি দেয়া—ডাবল চিজ, মেওনেজ, কেচাপ, মাস্টার্ড কোনো কিছু বাদ নেই। সে সঙ্গে সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে আবার বলল, ‘আমি না হয় কালকে আবার নিয়ে আসবো। এবং অবশ্যই চেক করে আনবো—তুমি দেখো, এমন ভুল আর আমার জীবনেও হবে না।’
মীরা তাতেও কোনো সাড়া দিল না।
আবীর জানে মীরা একবার গো ধরলে সেটা থেকে সহজে বের হতে পারে না। আর তখনই সে বুঝতে পারল মীরার শরীর খারাপের রহস্য। ওর মেজাজ খারাপের ধরন দেখেই সে অনুমান করল—পিরিয়ড চলছে মীরার। শুধুমাত্র পিরিয়ড চলাকালীন সময়েই ওর মাথার ঠিক থাকে না। মিন্সট্রুয়াল ক্রাম্পসের ব্যথা সহ্য করতে পারে না সে। তখন তার মেজাজ গরমের পারদ উঠানামা করে। রেগে যায় অল্পতেই। ঠিকমতো খেতেও পারে না। সারাদিন হয়ত কিছুই খাওয়া হয়নি মেয়েটির। খিদেয় তাই মেজাজ চড়ে গেছে। লক্ষণ তো তেমনই।
মীরার জন্যে আবীরের এখন একটু খারাপ লাগতে লাগল। মেয়েটা না খেয়ে আছে আর সে কিনা বার্গার খাচ্ছে মজা করে—একা একা। আবীর খাওয়া বন্ধ করে মীরার পাশে গিয়ে বসল। পিঠে হাত রেখে আস্তে করে বলল, ‘চলো আমরা দুজনে মিলে রেস্টুরেন্টে গিয়ে নতুন আর একটা স্যান্ডউইচ অর্ডার করে নিয়ে আসি—চাইলে ওখানে বসেও খেতে পারি।’
মীরা ঘুরে অন্যদিকে মুখ করে শুয়ে রইল।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবীর বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে—তোমার যেতে হবে না। মনে হয় তোমার শরীর খারাপ। আমিই যাচ্ছি। নো ওরিস—আই উইল বি ব্যাক ইন ফিফটিন মিনিটস।’
আধ খাওয়া বার্গারটা রেখে ঝড়ের গতিতে বের হয়ে গেল আবীর।
…
পনেরো মিনিটের কথা বলে সেই যে আবীরের গেছে, এখন প্রায় তিরিশ মিনিট হয়ে গেল, অথচ তার ফিরে আসার কোনো খবর নেই। এদিকে খিদেয় মীরার চোখে অন্ধকার দেখার মতো অবস্থা হলো। উঠে গিয়ে যে সে কিছু একটা খেয়ে নেবে—তাও ইচ্ছে করছে না।
দিনের এসময়ে ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টগুলো খুব ব্যস্ত থাকে। কাজ থেকে ফেরার পথে সবাই খাবার তুলে নিয়ে বাসায় ফেরে। হয়তো তাই দেরি হচ্ছে। মীরা আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে ঘড়ি দেখল। প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট হয়ে গেল। এমনিতেই মেজাজ খারাপ তার উপরে এত দেরি—মীরা ফোন করল আবীরকে এবং যা ভেবেছিল তাই। আবীর ফোন ধরল না—এক রিঙেই ফোন চলে গেল ভয়েজমেইলে। তারমানে আবীর আসলে রাগ করেই চলে গেছে ঘর থেকে। রাগ অবশ্য করারই কথা। ওর নিজেরও তো খিদে পেয়েছিল—কাজ থেকে এসেই সে খিদেয় অস্থির থাকে। তখন হাতের কাছে যা পায় তাই খেতে থাকে।
মীরা উঠে এসে ওয়াটার ডিস্পেন্সার থেকে গ্লাসে পানি ভরে টেবিলে বসল আর তখনই লক্ষ্য করল, আবীর খাওয়া শেষ না করেই চলে গেছে। আহা বেচারা। হঠাৎ করেই মীরার খুব মন খারাপ হলো। নিজের উপরে এখন রাগ হচ্ছে। এত তুচ্ছ ব্যাপারে এভাবে রিয়্যাক্ট না করলেই হতো। একটু বাড়াবাড়িই হয়ে গেছে।
মীরার মাথাটা চিনচিন করতে লাগল। আবীরের ফিরতে দেরি হচ্ছে কেন? প্রায় একঘণ্টা হতে চলল—যেখানে পনের-বিশ মিনিটের বেশি লাগার কথা নয়। মীরার রাগ উধাও হয়ে গেল মুহূর্তেই—সেখানে জড় হলো এক অজানা আশঙ্কা। তার ভয় ভয় করতে লাগল—কোনো বিপদ হলো না তো? মীরা ফোনটা নিয়ে আবার কল করল আবীরকে। এবার অপর-প্রান্ত থেকে কেউ একজন ফোন ধরল—তবে সে আবীর নয়। হ্যালো বলতেই মীরা জিজ্ঞেস করল, ‘হু ইজ দিস?’
‘আই’ম এ প্যারামেডিক।’
‘এ হোয়াট?’
‘প্যারামেডিক! উই প্রভাইড ইমার্জেন্সি এ্যাম্বুলেন্স সার্ভিস…’
মীরা বুঝতে পারল না—একজন প্যারামেডিকের কাছে আবীরের ফোন গেল কী করে। সে জানতে চাইল, ‘হোয়ার ইজ আবীর? মাই হাজব্যান্ড?’
‘দ্য পারসন ইউ কলড, ক্যাননট টক রাইট নাও। হি জাস্ট হ্যাড এ ফ্যাটাল কার এক্সিডেন্ট। উই’র টেকিং হিম টু ইমার্জেন্সি।’
মীরার মাথায় কিছুই ঢুকল না—এসব কী বলছে? নিশ্চয়ই কোথাও কোনো ভুল হচ্ছে। সে আবারো বলল, ‘আই’ম হিজ ওয়াইফ—কুড ইউ প্লিজ টেল মি, হোয়াট হ্যাপেন্ড।’
প্যারামেডিক্স এরপর যা বলল সে কথা শোনার জন্য কোনো মানসিক প্রস্তুতি মীরার ছিল না। স্বপ্নেও ভাবেনি এমন কিছু একটা ঘটে যেতে পারে। তার মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠল। মনে হচ্ছে এখুনি বুঝি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে সে।
…
আবীর গাড়ি এক্সিডেন্ট করেছে।
বাসা থেকে বের হয়ে হাইওয়েতে উঠতেই একটা দ্রুতগতির এইটিন হুইলার ট্রেলারের ব্লাইন্ড স্পটে পড়ে যায় তার গাড়ি। পাশ কাটাতে গিয়ে আঠারো চাকার দৈত্যকার লরিটি আবীরের গাড়িকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে চলে গেছে। আবীরের গাড়ি কার্যত উড়ে গিয়ে ছিটকে পড়েছে সার্ভিস রোডে। মাথায় প্রচণ্ড আঘাত লেগেছে তার। শরীর হয়েছে ক্ষত-বিক্ষত।
মীরা যখন হাসপাতালে পৌঁছল, ততক্ষণে আবীরকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অপারেশন থিয়েটারে। দীর্ঘ চার ঘণ্টা অপারেশন শেষে আবীরকে লাইফ সাপোর্ট দিয়ে নিয়ে যাওয়া হলো আইসিইউতে। একজন নার্স এসে মীরাকে বলল, বাসায় চলে যেতে। চব্বিশ ঘণ্টা পার না হলে কিছুই বোঝা যাবে না।
নির্বাক নিথর মীরা বসে রইল হাসপাতালের লবিতে, সারারাত—নির্ঘুম।
…
চব্বিশ ঘণ্টা পার হলো কিন্তু আবীরের জ্ঞান ফিরে এলো না। আটচল্লিশ ঘণ্টা পার হলো, আবীর তখনো সংজ্ঞাহীন। তিনদিন পরেও যখন আবীরের জ্ঞান ফিরল না, তখন একজন দায়িত্বরত ডাক্তার মীরাকে ডেকে নিয়ে গেল তার অফিসে। কোনো ভণিতা না করেই বলল, পেসেন্টের ব্রেনে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। সে আর সাড়া দিচ্ছে না। তবে আমরা আমাদের সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছি। কিন্তু শতভাগ আশাবাদী কিনা সেকথা বলতে পারছি না। প্রে টু অলমাইটি।
মীরার চারিদিক অন্ধকার হয়ে গেল। তার কানে কোনো কথাই ঠিক মতো ঢুকল বলে মনে হয় না। সে উদ্ভ্রান্তের মতন তাকিয়ে রইল ডাক্তারের মুখের দিকে। ডাক্তার বুঝতে পারল মীরার মনের অবস্থা। একজন নার্স ডেকে মীরার কাছে বসিয়ে ডিউটিতে চলে গেল সে।
…
আবীর কোমায় চলে গেল। দশদিনের দিন আবীরের লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়া হলো। মীরা আবীরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইল। কয়েকদিন থেকেই কৃত্রিমভাবে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল আবীরকে। তার শরীরের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো সাড়া দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে—অকেজো হয়ে গেছে পুরোপুরি। আর কোন আশা নেই, ডাক্তারের এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘোষণায় বাধ্য হয়ে লাইফ সাপোর্ট খুলে দেয়ার অনুমতি দিল মীরা। খুলে ফেলা হলো আবীরের সাথে পৃথিবীর সবশেষ সংযোগগুলো। চারিদিকে নেমে এলো রাজ্যের বিষণ্ণতা।
…
আবীরের ফিউনেরাল শেষ করে শোকার্ত, ক্লান্ত, বিধ্বস্ত মীরা যখন বাসায় ফিরল তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত শুরু হয়েছে। সন্ধ্যার পর থেকে আকাশ ভারী হয়ে আছে। ভারী হয়ে আছে মীরার শরীর-মন। ঘরে ঢুকেই সে গা এলিয়ে দিল বিছানায় এবং মুহূর্তেই তলিয়ে গেল অতল ঘুমে।
গভীর রাতে মীরার ঘুম ভেঙ্গে গেল। নীরব নিস্তব্ধ আঁধার চারিদিকে। ঘুম ভাঙতেই মনে পড়ল আবীরের কথা। নিজের অন্ধকার রুমে, বিছানায় শুয়ে মীরার নিজেকে বড় নিঃস্ব লাগল। তার চোখে আবীরের সঙ্গে কাটানো সব মুহূর্তগুলোর ছবি ভেসে ওঠল অন্তহীন ঢেউয়ের মতো। স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তরল আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
মীরা কিছুতেই ভাবতে পারে না, ক্ষণে ক্ষণে সেই পাগল ছেলেটির মীরা মীরা চিৎকার আর শোনা যাবে না। ছুটির দিনে হাতে দু’কাপ চা নিয়ে টুক টুক করে দরজায় টোকা দিয়ে আর কেউ বলবে না একা একা চা খেতে ভালো লাগে না মীরা। তাকে যত্ন করে চা বানিয়ে খাওয়ানোর মতো আর কেউ রইল না। তার ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়েও চিন্তায় নীল হওয়ার মানুষটি আর তার পাশে নেই।
আজ মীরা সত্যিকারের একা হয়ে গেল। শ্বাস নিতে কষ্ট হলেই মানুষ উপলব্ধি করে বাতাস নামের কিছু একটা আছে। আবীরের বিদায়ে মীরা বুঝতে পারল আবীর কী ছিল তার জীবনে। আশ্চর্য! মীরা কখনো এমনভাবে ভাবেইনি—কখনো বুঝতেই পারেনি তার চারপাশে আবীর কী গভীর মমতায় ভালোবাসার জাল ছড়িয়ে গেছে।
লেকের ধারে বাড়ির খুব শখ ছিল মীরার। আবীর মীরাকে বলেনি তেমনই এক লেকের ধারে নতুন বাড়ি কেনার কথা। মীরাও আবীরকে বলেনি সে মা হতে চেয়েছিল—এখনই। দুজন, দুজনের অজান্তেই পরিকল্পনা করছিল একে অন্যকে চমকে দেওয়ার। অথচ বিধাতার পরিকল্পনা ছিল ভিন্ন—এ কেমন চমক বিধাতা তার জন্যে রেখে দিয়েছিল। আবীরের মৃত্যু সব স্বপ্নকে তছনছ করে দিয়ে গেল।
এত অভিমান করে কেউ চলে যায়? একবার ‘স্যরি’ বলার সুযোগটা পর্যন্ত দিল না। মীরার চোখ ভরে গেল পানিতে।
‘কাঁদছ কেন মীরা?’ ফিসফিস করে মীরার কানের কাছে মুখ নামিয়ে খুব নরম স্বরে কেউ বলল।
মীরা চমকে তাকাল। অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। কে কথা বলল? একেবারে আবীরের কণ্ঠ। আবীর? হ্যাঁ, আবীরই তো। হঠাৎ একটি হাত জড়িয়ে ধরল মীরার শরীর। মীরা ঠিক বুঝতে পারল এটা আবীরের হাত। মীরা চুপ করে রইল।
আবীর যত্ন করে মীরার চোখের পানি মুছে দিল। আদর করে হাত বুলিয়ে দিল চুলের মধ্যে। তারপর মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘এভাবে কাঁদতে নেই বুড়ি।’
মীরার কান্নার বেগ আরো বেড়ে গেল। তার চোখ বেয়ে অশ্রুর বন্যা বেয়ে চলল। আবীরের কণ্ঠ, তার স্পর্শ, আদর মীরাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। তার চোখের পাতা ভারী হয়ে এলো।
…
জীবন কারো জন্য থেমে থাকে না, কিন্তু মনটা মাঝে মাঝে থেমে যায়, প্রিয় মানুষটার জন্যে। মীরার জীবনের একাকীত্ব তীব্র হয়ে দেখা দেয় মাঝে মাঝে। খুব খুব একা একা লাগে তার। সময় যেন কাটতেই চায় না। অফিসের ব্যস্ততায় দিনগুলো কেটে যায় ঠিকই কিন্তু এক একটি রাত মনে হয়ে দীর্ঘতম রাত।
উইক-এন্ডে মীরা মাঝে মাঝে একাই ঘুরতে বেরিয়ে পড়ে। একা একা হাঁটছে হঠাৎ মনে হলো, তার পাশে কেউ আছে। মীরা যেখানেই যাচ্ছে, তার সাথে সাথেই সেও সেখানে যাচ্ছে। এই ‘কেউ’ টার কোনো আওয়াজ শুনতে পায় না মীরা। স্পর্শও নয়—গন্ধও নয়। কিন্তু কেউ একজন আছে। যেন একটা নিঝুম নিস্তব্ধ ছোট আয়তন, তার আশেপাশে নিঃশব্দ তরঙ্গ ছড়িয়ে যাচ্ছে। জানান দিচ্ছে—আমি আছি। তোমার সাথেই আছি। তুমি একা নও মীরা।
(সমাপ্ত)


