এলিনা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ইরিন যা বলছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে—ওহ মাই গড! সে কিছুতেই ভাবতে পারছেনা তার নিজের মেয়ে—নাড়ি ছেঁড়া ধন—আর তার সাথেই কিনা এসব ঘটেছে। মনে পড়ল সেই দিনটির কথা—যেদিন সেইন্ট মেরি হসপিটালে ইরিনের জন্ম হলো। অনেক কষ্ট হয়েছিল এলিনার। বাচ্চা প্রসবের দেরি দেখে ইমরান ডাক্তারকে সার্জারির কথা কয়েকবার বলেছে কিন্তু ডাক্তারের স্পষ্ট জবাব, সার্জারির দরকার হলে আমরা করব কিন্তু এখনো এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে সার্জারি করতে হবে। আমরা নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করছি। বেচারা ইমরান, না পারছে ডাক্তার কে বোঝাতে, না পারছে এলিনার কষ্ট সহ্য করতে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেল কিন্তু নরমাল ডেলিভারির কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এদিকে এম্নিওটিক ফ্লুইড শুকিয়ে জীবন মরণ দশা হলো দুজনেরই। অবশেষে প্রায় ষোল ঘণ্টা যুদ্ধ আর যমে দূতে টানাটানির পর ভূমিষ্ঠ হলো এক ফুটফুটে পরীর বাচ্চা। তারপর একটানা সাতদিন পরীর বাচ্চাটাকে ইনকিবিউটরে রাখতে হলো বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার কারণে।
কত কষ্ট আর যত্ন করে তিলে তিলে বড় করা তার আদরের মেয়ে ইরিন আর তাকেই কিনা এমন নরক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। এলিনার সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। ইচ্ছে হচ্ছে এখুনি ছুটে গিয়ে ঐ সান অফ অ্যা বিচকে খুন করে ফেলতে।
দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে ইরিনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এলিনা বলল, ‘এসব কথা তুমি আমাকে আগে বলনি কেন?’
‘আগে বললে তুমি কী করতে? কিছু করতে পারতা?’
‘কী করতে পারতাম কী পারতাম না সেটা তো পরের কথা। But you should have told me at least—তোমার অবশ্যই উচিত ছিল আমাকে সব কিছু খুলে বলা। I’m not only your mother Erin, I’m also your friend. You used to tell me every little thing, you remember?’
‘I used to, but you’re not my friend anymore… you left me! আমি বলি নাই তোমাকে—বাট বলতে চাইছিলাম—দেন মনে হইছে তুমি আমাকে বিলিভ করবা না—তাই বলি নাই। plus, I’m not important in your life anymore—you’ve someone more important in your life now! Who cares about me?’
এলিনা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল ইরিনের মুখের দিকে। তাহলে কি সে সত্যিই অনেক দূরে সরে গেছে তার একমাত্র মেয়ের জীবন থেকে? নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো তার।
‘তাছাড়া এসব কথা জানাজানি হলে আমাকেই সবাই খারাপ ভাবত। My friends would have bullied me…’ একটু থেমে ইরিন আবার বলল, ‘You also insulted me mom. You yelled at me that; I was a trash. Did you forget everything? ভুলে গেছ?’
এলিনা কোনো উত্তর দিতে পারল না। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইরিনের মুখের দিকে। আসলেই তো রজার্সের সাথে সম্পর্কের কারণে সে এই বাচ্চা মেয়েটির সাথে কত দুর্ব্যবহার করেছে। বিচ্ছিরি ভাষায় গালাগাল করেছে। স্বার্থের কারণেই বোধহয় মানুষ এমন অন্ধ হয়ে যায়। এলিনা কি তাহলে হেরে গেল? ইরিনের ঘৃণা ভরা অগ্নিদৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা সম্ভব হলো না—সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল ইরিনের মুখের উপর থেকে।
…
ইমরানের বাসার বেশির ভাগ বাতি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আলো আঁধারের একটা পরিবেশ বিরাজ করছে ঘরটার মধ্যে। অনেকক্ষণ থেকে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জানালার পর্দা গলে বাইরে থেকে আলোর ছটায় দেখা গেল রজার্সকে—একটা চেয়ারে বসা। শক্ত করে তাকে চেয়ারের হাতলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাথাটা ঝুঁকে আছে সামনের দিকে। তার চোয়ালে বড় একটা ক্ষত চিহ্ন। নাকের ফুটা দিয়ে রক্ত ঝরছে। নাকটা বেশ খানিকটা থেঁতলে গেছে। ঠোঁট কেটেও রক্ত ঝরেছে অনেক। একটা কালো রঙের গ্যাফার টেপ দিয়ে রজার্সের মুখ আটকানো—যাতে কোনো শব্দ করতে না পারে সে। বিপর্যস্ত রজার্স বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে। মানুষটি আর কেউ নয়—ইমরান। তার হাতে একটা বেসবল ব্যাট।
এলিনা আর ইরিন বাইরে হাঁটতে চলে যাবার পর থেকেই ইমরান কৌশলে রজার্সকে একটার পর একটা ড্রিঙ্কস দিয়ে মোটামুটি মাতাল বানিয়ে ফেলে। তারপর হুট করেই চেয়ারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে তাকে। বাধা দেবার মতো শক্তি তেমন ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে যায় সে। অতঃপর আত্মসমর্পণ।
রজার্সের দিকে কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শীতল কণ্ঠে ইমরান বলল, ‘Do you realize what I’m going to do to you?’
রজার্স কিছু বলার চেষ্টা করল কিন্তু টেপ দিয়ে মুখ আটকানো থাকায় কোনো শব্দ বের হলো না। ইমরান তার মুখ থেকে হ্যাঁচকা টানে সেঁটে থাকা টেপটি তুলে ফেলল।
‘What’s going on Imran? What are you doing?’ একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রজার্স।
‘Exactly what you deserve!’
‘This is what you do to your guest?’
‘You don’t deserve a fair trial my friend—after what you did to my family.’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল ইমরান। তারপর হঠাৎ করেই হাতের ব্যাটটি দিয়ে সজোরে আঘাত করল রজার্সের ঊরুসন্ধির ঠিক মধ্যস্থলে।
চেয়ার উল্টে পড়ে গেল রজার্স। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল তার মুখ। ‘Oh my God! You crazy bastard! What the hell is wrong with you?’ হাঁপাতে হাঁপাতে কোনো রকমে বলল সে।
হাঁটু গেঁড়ে রজার্সের সামনে বসল ইমরান। মুখ নামিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘I’ve waited a long time for this, Rogers!’
‘I should have known that you weren’t inviting for a social dinner.’ রজার্সের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। ইমরান তাকে ধরে চেয়ার সোজা করে বসিয়ে দিল।
‘Well what do you expect?’ ইমরান বলল হাতের ব্যাটটি নাড়াতে নাড়াতে।
‘I expect some respect—only if you know how to…’
‘Respect?’ সিনেমার ভিলেনদের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ইমরান। হঠাৎ করে হাসি থামিয়ে বেসবল ব্যাটটি রজার্সের চিবুকে ঠেকাল সে।
ইমরানের দিকে তাকিয়ে রজার্সের হৃৎপিণ্ডে কাঁপন ধরে গেল—ভয়ের শীতল স্রোত শিরশির করে নেমে গেল তার শিরদাঁড়া দিয়ে। ইমরানের চোখে স্পষ্ট খুন দেখতে পেল সে। রজার্স অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘You wanna kill me?’
‘No no no, I cannot kill you. You’re my wife’s boyfriend after all and you’re my guest too, right?’
‘Man, are you psycho or what? I’m telling you Imran—you will regret for this!’
‘Really? Psycho? Me? Oh, I’m no psycho. What I’m doing is purely logical. Revenge. The real psycho is somebody who rapes his girlfriend’s daughter!’ হিশহিশ করে কথাগুলো বলে রজার্সের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইমরান।
রজার্সের চোয়াল ঝুলে পড়ল। হাঁ করে তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না—ইমরান কী বলল? সে ভাবছিল—এলিনার সাথে তার সম্পর্কের কারণেই তাকে টর্চার করছে ইমরান। কিন্তু—। তার মানে ইমরান আগে থেকেই সবকিছুই জানত। এলিনা? সেও কি জানে? সবটাই কি তাহলে পূর্ব পরিকল্পনা? ইরিনকে নিয়ে এলিনা তাহলে বাইরে চলে যাবে কেন? আর এতক্ষণ হয়ে গেল—এলিনা ফিরছেই বা না কেন? রজার্সের মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। তার ব্রেইন কাজ করছে না—চিন্তা শক্তি লোপ পেল পুরোপুরি। চোখেও ঝাপসা দেখছে একটু একটু। এতগুলো ড্রিঙ্কস করাটা তার মোটেই ঠিক হয়নি। নাহলে রজার্সের মতো এমন তাগড়া জোয়ান জিম ইন্সট্রাকটরের সঙ্গে ইমরানের মত এভারেজ হাইটের সাধারণ একজন মানুষের পক্ষে পেরে উঠার কথা ছিল না। রজার্সের আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। তার মত একজন স্মার্ট মানুষের পক্ষে এমন ভুল হয়ে গেল—মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিল সে। চালে মস্ত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে সে।
‘Tell me Rogers—who’s real psycho?’ ইমরানের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ল তার।
‘No. This can’t be true. Who told you that? Can you tell me? Can you prove?’
‘You need proof?’
‘Yeah. Prove me.’ সাহস নিয়ে বলল রজার্স।
ইমরান কিছু না বলে তার ফোনটা বের করে রজার্সের চোখের সামনে ধরল একবার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রজার্সের চেহারা পাংশু বর্ণ ধারণ করল। মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হলো না।
ইমরান তার হাতের ব্যাটটি উঁচু করে ধরে রজার্সের মুখের সামনে নিয়ে নাড়াতে থাকল। পরাজিত ভঙ্গিতে রজার্স ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল ব্যাটটির দিকে। যে কোনো মুহূর্তে নেমে আসবে তার চোয়ালে। সে প্রমাদ গুনল।
…
এলিনার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে—অনবরত। চোখ মুছতে মুছতে সে বলল, ‘How about your dad? তাকেও কিছু বলনি?’
ইরিন ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘No! Are you out of your mind? He would have had a heart attack. তোমার কি মনে হয়, বাবা জানলে ওকে বাসায় ইনভাইট করত? কক্ষনো না। He would have simply killed him.’
এলিনা কিছু বলল না। সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল কিছু সময়ের জন্যে। তারপর চোখ খুলে তাকাল ইরিনের দিকে। ইরিন তার মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। কেমন অস্থিরতায় ভুগছে সে। হঠাৎ করেই এলিনা উঠে দাঁড়িয়ে বাতাসে হাত ছুঁড়ে বলল, ‘Let’s go.’ বলেই সে ইরিনের হাত ধরল।
ইরিন লক্ষ্য করল, এলিনা কেমন পাগলের মতো এলোমেলো আচরণ করছে। এলিনা বলল, ‘I will kill that bastard myself—in my own hand!’ বলেই ইরিনের হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়েই ছুটে চলল এলিনা—গন্তব্য ইরিনদের বাসা।
…
দু’পা ভাঁজ করে রজার্সের সামনের মেঝেতে ধ্যানে বসা ভঙ্গিতে বসে আছে ইমরান। তাকিয়ে আছে রজার্সের চোখের দিকে।
রজার্সের শরীর বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল। ইমরানের দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে যে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না—চোখ ফিরিয়ে নিল।
ইমরান বলল, ‘It’s time Rogers. Are you ready?’
‘Go to hell.’
‘Oh I’ve been in the hell. Every time you were in me, it was a living hell.’
‘It was not my fault. She was high on drugs and… she asked for it.’
একথা শুনে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল ইমরান। তার চোখ ঠিকরে আগুন ঝরতে থাকল। হাতের ব্যাটটি নিয়ে রজার্সের চোয়ালের নিচে চাপ দিয়ে ধরে সে বলল, ‘She asked for it?! How the hell does a fourteen-year-old asks to be raped?!’ বলেই ব্যাটের মাথা দিয়ে সজোরে আঘাত করল রজার্সের মুখে।
রজার্সের মুখ থেকে রক্ত ঝরে পড়ল। কয়েকটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। সে একদলা থুথু ফেলল—একটা দাঁত খুলে পড়ল থুথুর সাথে।
রজার্স কোনো রকমে বলল, ‘If you’re going to kill me, just do it already.’
রজার্সের মুখের অভিব্যক্তি দেখে ইমরান অবাক হয়ে তাকাল। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, ‘Oh my God. I can’t believe it…’
রজার্স তাকাল ইমরানের দিকে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে।
‘You. Your face. No sign of regret in there. You don’t regret doing it. You raped your girlfriend’s daughter and you don’t feel anything about it. Like it was a normal thing.’
রজার্সের চেহারায় কোনো পরিবর্তন হলো না। সে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
‘Do you really love Elina?’
ইমরানের হঠাৎ করা প্রশ্নে অবাক হয়ে বলল রজার্স, ‘Why you’re asking me same question again. I answered you before.’
‘Answer me again. Do you love Elina?’ শীতল কণ্ঠে ইমরান বলল।
‘Yes I do.’
‘You wanna marry her?’
‘What nonsense. I told you once.’
‘Tell me again.’
‘Yes. Yes, I wanna marry her. And I’m going to marry her.’
‘Once you marry her, Erin would be your daughter, right?!’
রজার্স কিছু না বলে তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে।
একটু বিরতি নিয়ে ইমরান আবার বলল, ‘Tell me Rogers, if you ever had a daughter, would you do to her what you did to your soon to be daughter??’
রজার্স তাকিয়ে রইল ইমরানের দিকে। সে কিছু বলল না।
‘Answer me.’
ইমরানের ধমকে একটু নড়ে উঠে বলল রজার্স, ‘No because I would actually love her. She wouldn’t be some spoiled tramp’
কথা শেষ করার আগেই ব্যাটের আঘাতে রজার্সের মুখ ঘুরে গেল। ইমরান অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বলল, ‘You son of a bitch!’
ঠোঁট কেটে আরেক দফা রক্ত বের হলো ফিনকি দিয়ে। চেষ্টা করেও মুখ সরাতে পারল না রজার্স।
ইমরান রজার্সের মুখের কাছে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে রক্ত ছুঁয়ে দেখল। হাতের আঙ্গুলে রক্ত পিষে বলল, ‘You said I’m gonna regret leaving you alive. Perhaps. But now you will regret me leaving you alive.’
‘Why—you don’t wanna kill me?’
‘Nope, I don’t wanna kill you. I will do something far worse. You’ll never be able to do such thing ever again in your life what you did to my daughter.’
‘Worse than killing me? Really? What’s that?’ ঢুলু ঢুলু চোখে কোনো রকমে বলল রজার্স।
‘No rush my friend. Just wait…’
ইমরান একটা ক্রূর হাসি দিয়ে চলে গেল কিচেনে। দুহাতে গ্লাভস ঢুকিয়ে ওভেন খুলে দেখল স্টেইনলেস স্টিলের বারবিকিউ করার গ্রিলিং টংটি এখনো জ্বলছে। জ্বলন্ত টংটি বের করে নিয়ে সে ফিরে এলো লিভিংরুমে। দাঁড়াল রজার্সের সামনে। এক মুহূর্ত তাকাল রজার্সের চোখের দিকে।
রজার্স ভয়ার্ত চোখে দেখল ইমরানের অগ্নিদৃষ্টি—হাতে জ্বলন্ত টং। কিছু বুঝে উঠার আগেই ৪৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইট টেম্পারেচারে পোড়ানো জ্বলন্ত টং দিয়ে রজার্সের জেনিটাল চেপে ধরল ইমরান—ধরেই রইল। বাড়তে থাকল চাপ—ধীরে ধীরে।
ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল রজার্স। চোখে ঘোর অন্ধকার দেখল সে। দাঁতে দাঁত চেপে রইল সে।
ইমরান চার্জ করল আবার। আরেকবার। শেষ বার হাতের কব্জি ঘুরিয়ে থেঁতলে দিল রজার্সের পুরুষাঙ্গটি।
কোঁত করে একটা শব্দ বেরিয়ে এলো রজার্সের মুখ থেকে। চিৎকার দিয়ে চেয়ার থেকে মেঝেতে উল্টে পড়ে গেল সে। একধরণের গোঙানির মতো শব্দ করতে থাকল শুধু। মনে হচ্ছে কেউ তার মুখ চেপে ধরে নিঃশ্বাস বের করে দিতে চাইছে।
ইমরান নিচু হয়ে রজার্সের পাশে বসল আবার। তার বিস্ফারিত চোখের দিকে তাকিয়ে ইমরান বলল, ‘You ruined two lives and now, it’s your turn to payback. Goodbye Rogers. Have a great sleep!’
রজার্স কিছু বলতে পারল না। ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। ইমরান তার শরীর মনের আক্রোশ নিভিয়ে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রজার্সের চোখের দিকে। চোখ বন্ধ হয়ে যেতেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে সে একবার দেখল—রজার্সের রক্তাক্ত ও থেঁতলানো শরীরের বিশেষ অঙ্গ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। পোড়া গন্ধ বের হয়ে এল সাথে সাথেই।
রজার্স জ্ঞান হারাতেই ইমরান উঠে চলে গেল। খুব ধীরে এক শট কানাডিয়ান ক্রাউন রয়েল ঢালল গ্লাসে। একবারে গলায় ঢেলে দিয়ে মাথা ঝাঁকাল। কিছু সময় স্থির হয়ে বসে রইল সে। তারপর হঠাৎ করেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ইমরান। হাসতে হাসতেই কল করল ৯১১ নাম্বারে। এম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকল সে।
এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-৫)
একটা দীর্ঘ সময় পার করে জ্ঞান ফিরে এলো ইরিনের। চরম এক অস্বস্তিবোধ নিয়ে সে চোখ খুলে তাকাল। একবার দেখল চারপাশটা তারপর নিজেকে আবিষ্কার করল সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায়—বিছানায়। লিভিং রুমের সোফাতে সে বসা ছিল, সেখান থেকে বেডরুমের বিছানায় কখন কিভাবে এলো—ইরিন বোঝার চেষ্টা করল। সোফাতে বসা অবস্থায় তার মাথাটা ঝিম ঝিম করছিল… তারপর মনে পড়ল রজার্সের কথা—আইসক্রিম! আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না ইরিনের—সে বুঝে গেল আসলে কী ঘটেছে। সে জানে এলিনার ইনসমনিয়া আছে। আইসক্রিমের উপরে ভেসে থাকা পাউডার আর কিছুই না—নিশ্চয়ই ঘুমের ওষুধ ছিল। যে কারণে তার মুখে আইসক্রিম তেতো লেগেছিল। তাকে অজ্ঞান করে তাহলে… ওহ গড, ওহ গড!
এটুকু ভাবতেই ধরমর করে দ্রুত বিছানায় উঠে বসল ইরিন। মাথাটা আবার ঘুরে উঠতে চাইল একবার। নিজেকে স্থির করে নিয়ে সে দ্রুত তার কাপড় পড়ে নিল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই সে আবিষ্কার করল একটা টুকরা কাগজ তার হাতের সঙ্গে লেগে রয়েছে। চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল সে—রজার্সের কোনো অস্তিত্ব বোঝা গেল না। সে হাতের কাগজটি খুলে দেখল একটা মেসেজ।
‘You fell in sleep. When you wake up—if you remember anything, just erase that from your memory. If you try to tell this to anybody, I will make your life miserable and you’ll regret it for rest of your life!’
ইরিনের শরীরে কাঁপুনি দেখা দিল। কুঁকড়ে গেল তার শরীর। তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। জিভ তালু সব শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এখনই বমি হয়ে যাবে। সে দ্রুত বাথরুমে গিয়ে ঢুকল।
বাথরুমের আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে উঠল ইরিন। শরীরে এগুলো কিসের দাগ? এসব দাগ তো আগে ছিল না। হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল শরীরের নিচের অংশে। কোমরটা ভেঙ্গে যাচ্ছে—পা দুটো অবশ হয়ে আসছে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে খুব। ইরিন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে চিৎকার করল। এমন কিছু একটা ঘটে যেতে পারে সে কোনোদিনই ভাবেনি। এমন কিছু তো সে চায়ও নি। তাহলে এমন কেন হলো?
ইরিনের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো আবার। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল মেয়েটি। চোখ ভরে গেল কান্নার পানিতে।
কিছু সময় পার করে নিজেকে গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করল সে। বেসিনের পানি ছেড়ে দিয়ে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নিল। বাথরুম থেকে বের হবার আগে তার চোখ চলে গেল আয়নায়, নিজেকে দেখল আরেকবার—কেমন অচেনা লাগছে নিজেকে।
এলিনাকে একবার ফোন করল সে—কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। ইরিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে লিভিংরুম থেকে তার হাত ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেল অভিশপ্ত বাড়িটি থেকে।
…
গত এক ঘণ্টা ধরে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আছে ইরিন। পানির ধোঁয়ায় শাওয়ারের কাঁচের দেয়াল ঢেকে গেছে। ইরিন তার শরীর থেকে সব নোংরা ধুয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না। সমস্ত শরীর সাবান মেখে স্ক্রাব দিয়ে কতবার ঘষেছে তার ঠিক নেই—তবুও মনে হচ্ছে শরীর থেকে নোংরা যাচ্ছে না। চিৎকার করে কাঁদছে মেয়েটি। তার চোখের পানি আর শাওয়ারের পানি মিশে একাকার হয়ে গেল।
ঐদিনের পর থেকে ইরিন একেবারেই চুপ হয়ে গেল। কিছুদিন স্কুলেও গেল না। ইমরান বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছে তার কী হয়েছে। শরীর খারাপ বলে এড়িয়ে গেছে। এলিনা বলেছিল, পিরিয়ডের সময় অনেক পেইন হয় ইরিনের। ব্যথায় মেয়েটি কাৎরাতে থাকে—একেবারেই ব্যথা সহ্য করতে পারে না। ইরিনের হয়ত পিরিয়ড চলছে, তাই সে আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করেনি। সে একবার শুধু বলেছে, দুটো মাইডল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। ইমরান দেখেছে মিন্সট্রুয়াল ক্রাম্পিং এর জন্যে দুটো করে মাইডল ট্যাবলেট এলিনা খাইয়ে দিত ইরিনকে।
এলিনা কয়েকবার ফোন করেছে—কিন্তু ইরিন কথা বলেনি। তার বন্ধুরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে—সে কারো সঙ্গেই কোনো কথা না বলে নিজেকে গৃহবন্দী করে রাখল সম্পূর্ণভাবে।
এভাবেই কেটে গেল কিছুদিন।
ইতিমধ্যেই ইরিনের ফোনে বেশ কিছু টেক্সট মেসেজ এলো। হঠাৎ একদিন বেশ কিছু মেসেজ এসেছে রজার্সের—ইরিনকে সাবধান করে দেয়া মেসেজ। ইরিন একটা খুলে দেখল। রজার্স লিখেছে, ‘Why are you not replying me? If you do not listen to me, I will tell everyone that you sell your body for money to buy drugs!’
‘What?’ নিজের অজান্তেই চমকে উঠল ইরিন। এসব কী বলছে পিশাচটি?
পরের মেসেজে একটি ছবি—খুলতেই দেখল একটি মেয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ঘুমিয়ে আছে। জুম করতেই ইরিনের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো বরফঠাণ্ডা জলের স্রোত। ভয়ের একটা শীতল শিহরণ তার ভেতরে পাক দিয়ে উঠতে লাগল। মনে হলো ওর পাকস্থলীটা কেউ যেন খামচে ধরল। চোখ বড় বড় করে ছবিটির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল ইরিন। মেয়েটিকে দেখতে অবিকল তার মত লাগছে কেন? কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইরিন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
ইরিন হিস্টিরিয়ার রোগীর মত আচরণ করতে লাগল। সে দ্রুত রজার্সের পাঠানো পরের মেসেজটিও পড়ল। ‘I’ve some more surprises like these. If you do what I ask you to do, I promise, I will delete all the pictures… will delete all the surprises too.’
‘Surprise? What surprise? What is he talking about?’ ইরিন আর চাপ নিতে পারছে না। তার ভয় হলো, বিষয়টি যদি সত্যিই জানাজানি হয়ে যায় তাহলে খুবই লজ্জার হবে। সে কিছু ভাবতে পারছে না। সে রজার্সের পরের মেসেজটি খুলে দেখল। ‘If you don’t want trouble—you follow my instruction and do what I want you to do… out and clear.’
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল ইরিন। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে তার। বিষণ্ণতা ঘিরে ধরল তাকে। অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ল তার সমস্ত শরীর। ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ছে তার মাকে। ইচ্ছে হচ্ছে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে। এখন তার মা কাছে থাকলে এসব কিছুই হতো না। আবার পরক্ষণেই প্রচণ্ড অভিমান হলো তার। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, এ জীবনে সে তার মাকে আর কোনোদিনই ক্ষমা করবে না। যে নিজের স্বার্থের জন্য ছোট একটা মেয়েকে এভাবে ফেলে যেতে পারে—এমন মায়ের কথা সে কেনই বা ভাববে।
…
রাতে ঘুমানোর আগে ইমরান রুটিন মাফিক একবার এসে ঘুরে গেল ইরিনের রুম থেকে। সে দেখল ইরিন বিছানায় মাথা নিচু করে বসে আছে। ইমরান দরজায় নক করতেই ইরিন মাথা তুলে তাকাল। ইমরান জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুমাওনি এখনো?’
ইরিন কোনো উত্তর দিল না। সে যেভাবে ছিল সেভাবেই চুপ করে বসে রইল। ইমরান কাছে এগিয়ে এসে ইরিনের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘এভাবে বসে আছ কেন? মন খারাপ?’
ইরিন হঠাৎ করেই কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I miss mommy so much. I need her.’
ইমরান কী বলবে ভেবে পেল না। সে ইরিনের মাথায় হাত রাখল।
‘Why did you let her go? Why couldn’t you keep her? Was it too difficult?’ ইরিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল কিছুক্ষণ। ইমরান তার মেয়েকে কাঁদতে দিল—কিছু বলল না।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ইমরান বোঝানোর চেষ্টা করল। ‘ইরিন, তুমি এখন বড় হয়েছ। তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে, even two good souls cannot stay together forever. Sometimes, no matter how hard they try, their relationships just don’t work. Things happen, they get separated.’ একটু থেমে ইমরান আবার বলল, ‘When people divorce, it’s always such a tragedy. At the same time, if people stay together it can be even worse!’
মানব সম্পর্কের জটিলতা বোঝার মতো গ্রে ম্যাটার ইরিনের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এখনো তেমন হয় নি—সে আনমনে বলল, ‘Yea, I guess it’s complicated.’
‘Yes, it is.’ ইমরান আবার বলল, ‘কিছু সময় আছে—কাদা ছুঁড়াছুঁড়ি, মারামারি কিংবা কেউ কারো কোনো ক্ষতি না করে আলাদা হয়ে যাওয়াই কি ভাল না? Sometimes it’s better to light a candle than curse the darkness!’
এসব কথায় ইরিনের কষ্টের কোনো হেরফের হলো না। সে মাথাটা এলিয়ে দিল বাবার কোলে।
ইরিনের মাথার চুলে কিছুক্ষণ আদর করে দিয়ে ইমরান বলল, ‘অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়—ট্রাই টু গেট সাম স্লিপ।’ ইরিনের কপালে আলত করে একটা চুমু দিয়ে ইমরান কয়েক পা দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই ইরিন ডাকল, ‘বাবা!’
ইমরান ঘুরে দাঁড়াল। ইরিন তাকিয়ে আছে তার দিকে—সে কি কিছু বলতে চায়? কিন্তু কিছু না বলে চুপ করে রইল ইরিন। ইরিনের মনের ঝড় ইমরান বুঝতে পারল না। পারার কথাও না। ইমরান অবাক হয়ে বলল, ‘কী মা—কিছু বলবে?’
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ইরিন বলল, ‘I’m sorry for the other day.’
‘I’m sorry too.’
‘Goodnight baba.’
‘Goodnight sweetheart.’
ইরিনের রুমের দরজা ভিজিয়ে ধীর পায়ে ইমরান চলে গেল তার রুমে।
…
আরো কিছুদিন কেটে গেল। ইরিন ভুলে যাবার চেষ্টা করছে—প্রাণপণে—সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা। যদিও ক্ষণে ক্ষণেই তার শরীর কেঁপে উঠল দিনটির কথা মনে হতেই।
ক্লাস হোমওয়ার্কে পিছিয়ে যাচ্ছিল সে—কয়েক সপ্তাহ হলো শরীরের অসুস্থতার কথা বলে বন্ধুদের সঙ্গ পরিত্যাগ করে স্কুল হোমওয়ার্ক গুলো শেষ করার চেষ্টা করছে ইরিন। একদিন সন্ধ্যায় পরার টেবিলে বসে ইরিন হোমওয়ার্ক করছিল। তার হাতে একটা চকোলেট ক্যান্ডি বার। সে মাঝে মাঝে একটা কামড় দিচ্ছে আর হোমওয়ার্ক দেখছে। হঠাৎ তার সেল ফোন বেজে উঠল। সে অন্যমনস্ক ভাবে নাম্বার না দেখেই ফোনটা কানে তুলে নিয়ে বলল, ‘Hello!’
‘Hello Erin…’ অপর প্রান্ত থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। শীতল—কর্কশ।
‘Who’s this?’
‘You cannot recognize me? Wow, I’m surprised!’
মুহূর্তেই রক্ত শূন্য হয়ে গেলে ইরিনের মুখ। তার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না—ওপাশে কে কথা বলছে। জমে বরফ হয়ে রইল সে।
‘I’m glad you’ve been quiet as I asked you to be. Good girl!’
‘What do you want?’ যথেষ্ট বিরক্তি নিয়ে ঝাঁঝাল কণ্ঠে সে জানতে চাইল।
‘I want to see you again baby girl!’
সঙ্গে সঙ্গেই ইরিন লাইন কেটে দিল। ভীত চোখে তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে।
কয়েক মুহূর্তে পরেই ইরিনের ফোন বেজে উঠল আবার। সে লাইন কেটে দিল। একটা ছোট বিরতি দিয়ে আবার বাজল ফোন। এবং বেজেই চলল। ইরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘What else you want from me?’
‘Erin, is everything alright? What are you talking about?’ ওপাশ থেকে ইমরান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
ইরিন চুপ করে রইল। তার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল। ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল তার। সে ভেবেছিল রজার্স।
‘Is everything alright?’ ইমরান আবার জিজ্ঞেস করল।
ইরিন যখন বুঝতে পারল ফোনের ওপাশে মানুষটি তার বাবা—সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘তুমি কখন আসবা?’
‘কেন কী হয়েছে মা?
‘I’m scared.’
‘Anything wrong?’
ভয়ার্ত এবং কান্না জড়িত কণ্ঠে ইরিন বলল, ‘Yes, something is very wrong but I can’t tell you now. Please come home soon.’ তার কণ্ঠে ভয় স্পষ্ট।
‘Are you crying?’
ইরিন কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তার কান্নার শব্দ ঠিকই বোঝা গেল। ইমরান আবার ডাকল, ‘ইরিন?’
ইরিন কিছু বলতে পারল না। কান্নার দমকে শরীরটা ফুলে ফুলে উঠছে ওর।
‘I’m on my way…’ ফোনটা কেটে দিয়ে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে গাড়ি স্টার্ট দিল ইমরান। তারপর দ্রুত গতিতে ছুটে চলল বাড়ির দিকে।
ইমরানের সঙ্গে কথা বলে উঠে দাঁড়াতেই ইরিনের সেল ফোন আবার বেজে উঠল। ফোনের শব্দে সে চমকে উঠল। এবার সে ফোনের নাম্বার দেখল—অপরিচিত। সে লাল বোতামে চাপ দিয়ে ফোন কেটে দিল। একটা বিরতি দিয়ে ফোন আবার বাজল—
ইরিন ফোন হাতে নিল। সে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘Hello?’
অপর প্রান্ত থেকে সেই কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ‘Check your email right now!’
‘Why? Why? What is in there?’ ইরিন চিৎকার করে বলল।
‘Surprise!’
ইরিন বুঝতে পারছে না সে কী করবে। অনেকক্ষণ দ্বিধায় থেকে ভয়ে ভয়ে তার ল্যাপটপ থেকে কাঁপা হাতে ইমেইল খুলল এবং সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পেল একটা ভিডিও ক্লিপ। নিচে লেখা, ‘Play this video and see what surprise is waiting for you!’
ইরিনের হার্ট বিট বেড়ে গেল। সে ভয়ে ভয়ে ক্লিক করতেই ভিডিওটি চালু হয়ে গেল। মনে মনে ঠিক যে আশঙ্কা করছিল—শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটতে যাচ্ছে। সে নিজের দু চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘What the hell is this Rogers?’
রজার্স শীতল কণ্ঠে বলল, ‘Now hear me out clearly. You will comply to everything that I say, and I, in return, will not put you down or any of your close loved ones.’
ইরিন চুপ করে রইল—তার মুখে কোনো কথা আসছে না।
‘If you do not listen to me, I will post the footage to the teenage porn site. I will make it public. Your friends will find out, your dad will find out, your mom will find out… and everyone will know you did it for money to buy drugs!’ একটা ক্রূর হাসি দিয়ে কথাগুলো বলল রজার্স।
ইরিন কিছু ভাবতে পারছে না। তার মাথা দপদপ করছে। কী করবে সে। বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত মেয়েটি অসহায় কণ্ঠে বলল, ‘Can you please just tell me what you want?’
‘Just do what I ask you to do.’
‘What the hell do you want me to do?’
‘I’m texting you an address. You will meet me there tomorrow after school. I’ve a client—he’s very interested to meet with you.’
এসব কথার মানে কী? রাগে ক্ষোভে ইরিনের নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো। সে আর একটিও কথা না বলে ফোন কেটে দিল। দুহাতে তার চুল মুঠি করে চেপে ধরল। কিছুতেই বুঝতে পারছে না—কেন এসব হচ্ছে তার সঙ্গে। সে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘I swear, Rogers, I will tell my dad everything what you’ve done to me and he will tear you in pieces!’
নিজেকে শান্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা করল ইরিন। কিছু সময় পার করে একটু স্থির হতেই নিজের অজান্তেই আরেকবার ভিডিও ক্লিপটি পলে করল ইরিন—কয়েক সেকেন্ড দেখেই জ্ঞান হারাল মেয়েটি।
এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-৪)
দু মাস আগের ঘটনা।
ইরিনের কয়েকজন বন্ধু ইরিনকে এলিনার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ইরিন টেক্সট করে জানালেই তাঁরা এসে আবার তাকে নিয়ে যাবে। এক বিশেষ প্রয়োজনে ইরিন এসেছে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে।
ডোরবেল বাজতেই রজার্স দরজা খুলে দিয়ে দেখল ইরিনকে। সে কিছু বলার আগেই ইরিন দ্রুত ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করে রজার্স ইরিনের কাছে এসে অবাক হয়ে তাকাল। ইরিন রজার্সকে উপেক্ষা করে ঢুকে পড়ল বাথরুমে। কোনো রকমে কমোডের ঢাকনা খুলে হড় হড় করে বমি করে দিল। বমি করার শব্দে রজার্স কিঞ্চিত শঙ্কিত বোধ করল। সে বাথরুমের দরজার দিকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল ইরিন বের হওয়া পর্যন্ত।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইরিন বের হয়ে এসে লিভিং রুমের সোফাতে বসে পড়ল। তার চেহারা দেখে যে কারো ধারণা হবে সে অসুস্থ। কেমন মাদকাসক্তদের মতো অস্থিরতায় ভুগছে সে।
ইরিনের উল্টো দিকের সোফাতে বসে রজার্স সন্দেহজনক চোখে তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘Everything alright? You look terrible. Are you ok?’
‘Yea I’m fine.’ রজার্সের উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন ভেসে আসতেই ইরিন কোনোক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে আড়ষ্ট গলায় উত্তর দিল। ‘Where’s mom?’ জানতে চাইল সে।
‘At work.’
‘Work? Isn’t she supposed to be home today?’
‘She got a call from work. She’s covering a shift.’ একটু থেমে রজার্স আবার বলল, ‘Is there anything I can do for you?’
ইরিন হাতের উল্টো দিক দিয়ে তার নাক মুছল। নাকের ভিতর এক ধরনের জ্বালা পোড়া অনুভূতি হচ্ছে তার। সে হাতের উল্টো দিক দিয়ে আবার একটু ঘষল। তার অস্থিরতা বেড়ে গেল। আবার শীত শীতও লাগছে। নিজেকে উষ্ণ রাখার জন্যে দুহাত ভাঁজ করে বুকের উপর রাখল।
রজার্স তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখল ইরিনকে। তার চেহারা এবং আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষণীয়।
ইরিন একটু চুপ করে থেকে ভয়ে ভয়ে খুব দ্রুত বলল, ‘I need some money.’
‘You need some money! Okay, why do you need money for?’
ইরিন কিছু বলল না। তবে তার আচরণে অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রজার্স গভীরভাবে ইরিনকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। ইরিনের এলোমেলো আচরণ যথেষ্ট সন্দেহের সৃষ্টি করল তার মনে। ইরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘Are you doing drugs?’
ইরিন শীতল দৃষ্টি নিয়ে মুখ তুলে তাকাল রজার্সের দিকে। ‘No I’m not.’ দৃঢ়তার সাথেই জবাব দিল সে।
ইরিনের উত্তরে রজার্স খুব একটা আশ্বস্ত হলো বলে মনে হলো না। সে আবার বলল, ‘Did you ask your dad?’
ইরিন প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকাল রজার্সের দিকে। রজার্স বলল, ‘…for the money?’
ইরিন কোনো উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখে মুখে হতাশা আর বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।
…
সকালে খাবার টেবিলে নাস্তা করার সময় ইমরান দেখল ইরিন চুপচাপ বসে আছে। একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে তাকে। বাবা-মেয়ের খুব একটা কথাবার্তা কখনোই হয় না। ইরিনের সব কথা হয় তার মায়ের সঙ্গে। মা-ই তার বন্ধু। এলিনা চলে যাবার পর থেকে ইরিনের তাই কথা বলা হয় না। ইমরানের সাথে প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা হতো না—এখনো হয় না। ইমরানও বাসায় ফিরে রাত করে। অনেকটা যার যার তার তার অবস্থা। ইমরান আর ইরিন দুজনেই প্রায় একই সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে। দুজনে একসঙ্গে নাস্তা করে। তারপর যে যার মত চলে যায়। ইমরান তার কর্মস্থলে আর ইরিন স্কুলে।
ইমরান দু স্লাইস ব্রেডের উপরে বাটার আর জ্যাম লাগিয়ে এগিয়ে দিল ইরিনের দিকে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল সে, ‘তোমার স্কুল কেমন যাচ্ছে ইরিন?’
‘এইতো যাচ্ছে—নাথিং স্পেশাল।’
ইমরান লক্ষ্য করেছে ইদানীং ইরিন বেশ চুপচাপ থাকে। অথচ মেয়েটি কখনোই এরকম ছিল না। বেশ চটপটে স্বভাবের মেয়েটি হঠাৎ করেই কেমন হয়ে গেছে। ইরিনেরই বা কী দোষ? কথা বলার জন্যে একটা মানুষ তো চাই। আগে ওরা তিনজন—ইরিন, এলিনা আর ইমরান যখন কোথাও বের হতো, গাড়িতে উঠেই ইরিন বকবক শুরু করতো। এলিনা চলে যাবার পর থেকেই তার সমস্ত উচ্ছ্বাস নিমিষেই কোথায় হারিয়ে গেছে। হঠাৎ করেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। ইরিনের কাছে এখনো অনেক কিছুই স্পষ্ট নয়—তার বাবা মায়ের বিচ্ছেদটা কেন হলো? সবকিছুই তো ঠিক ছিল।
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ইমরানের মনে অজানা আশংকা দোলা দিল। ইরিনের কোন সমস্যা হয়নি তো? হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু কী?
‘নাথিং স্পেশাল বলছ যে? ক্যান ইউ বি স্পেসিফিক?’ খানিকটা অবাক হয়ে ইমরান জিজ্ঞেস করল।
‘আই ডোন্ট নো বাবা। আই হ্যাভ নো ফ্রেন্ডস এনিমোর। আই হ্যাভ নো বডি টু টক টু—ফিলিং লোনলি।’
ইমরান ভাবল সত্যিই তো। মেয়েটা তো একাই হয়ে গেছে। খুব মায়া হলো তার মেয়েটির জন্য। বাবা হিসেবে সে নিজেই বা কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পারছে? এলিনা চলে যাবার পরপর এক ধরণের একাকীত্ব তাকে গ্রাস করে—মাঝে মাঝেই তার খুব অসহ্য লাগত। তাই অফিসের কাজের পরে সেই একাকীত্ব কাটাতে সে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে চলে যায়—আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতে বেশ দেরি করে ফেলে। বেশিরভাগ সময় ইরিন ঘুমিয়ে পড়ে। মেয়েটিকে তাই খুব একটা সময় দেয়া হয় না তার। ইরিন নিজেও প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা বলে না। যতক্ষণ বাসায় থাকে তার রুমের মধ্যেই থাকে।
একটু চুপ করে থেকে ইরিন হঠাৎ করেই খুব দ্রুততার সাথে বলল, ‘Dad, I need some money!’
চিন্তাচ্ছেদ হতেই ইমরান মাথা তুলে তাকাল ইরিনের দিকে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে রইল। ইরিন আবার বলল, ‘আমার কিছু টাকা দরকার।’
‘কেন?’ ইমরান অবাক হয়ে জানতে চাইল। মাসের শুরুতেই ইরিনকে লাঞ্চ মানি দিয়ে দেয় ইমরান। মাসের মাত্র দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে—যদি অন্য কোনো কারণে টাকা লাগে সেটা জানা দরকার। ইমরান আবার জানতে চাইল, ‘টাকা কেন দরকার?’
ইদানীং অল্পতেই রেগে যায় ইরিন। একমাত্র মেয়ে ছোটবেলা থেকে আদরে আর প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠায় না শুনতে অভ্যস্ত নয় সে। ইরিন অত্যন্ত বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘I just need it. I am a grown up girl and I have some needs.’ সিরিয়াস মুহূর্তগুলোতে ইরিন তার বাবা মাকে ড্যাড এবং মাম বলে ডাকে—নাহলে বাবা-মাই বলে।
ইমরান তাৎক্ষণিক ভেবেই জিজ্ঞেস করল, ‘Ok, how much do you need?’
‘১০০ হলেই চলবে।’
‘১০০ ডলার? এত টাকা দিয়ে কী করবে?’
‘It’s not a huge amount of money!’
‘Yes it is. At least for some people. Ok, tell me. তোমাকে তো লাঞ্চ মানি দেয়া হয়েছে অলরেডি—টাকাটা কেন লাগবে সেটা বলতে কি সমস্যা আছে?’
‘I have needs dad!’
‘তাতো বুঝলাম। কিন্তু নিডসটা কী, সেটা অন্তত বলো।’
‘আমার নিডস থাকতে পারে না? Ok, never mind. I don’t need your money.’ কিছুটা অভিমান মিশ্রিত কণ্ঠে রুক্ষতার সাথে বলল ইরিন।
ইমরান অবাক হয়ে তাকাল ইরিনের চোখের দিকে। ইরিনও কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ তারপর হঠাৎ করেই উঠে চলে গেল।
ইমরান বলল, ‘Erin Stop!!’
ততক্ষণে দরজা খুলে বের হয়ে গেছে ইরিন। মেয়েটির এমন ব্যবহার ইমরানকে আহত করল। বেশ ভাবিয়েও তুলল। স্কুল থেকেও একবার ওর টিচার রিপোর্ট করেছে—কিছুদিন পর পর সবার সাথে তার ঝগড়া বিবাদ হয়। সামান্যতেই গণ্ডগোল লেগে যায়। আশেপাশের সবার সাথেও তার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করেছে। ইরিন নিজেই সেটা বলল আজকে। গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে বসে রইল ইমরান।
…
ইরিনকে গভীর ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করল রজার্স। সে মোটামুটি নিশ্চিত ইরিন দুষ্ট পাল্লায় পড়েছে। আমেরিকায় এটা একটা কমন ঘটনা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিসংখ্যান থাকুক আর না থাকুক, এটা বলা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে তার সব চেয়ে বড় প্রভাব গিয়ে পরে তাদের সন্তানদের ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের। টিনেজ ছেলে-মেয়েরা ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়ে অনেকক্ষেত্রে। কারো কারো ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটে আরো ভয়াবহ।
একটু সময় নিয়ে রজার্স সহানুভূতির সুরে বলল, ‘We were all young once, you know. You can trust and tell me anything you want. You look pale. Washed out. Believe me, you look like you’re doing drugs!’
‘I told you–I’m not doing drugs. How many times I’ve to say that?’ রজার্সের কথার তীব্র প্রতিবাদ করল ইরিন।
‘Let me see your eyes. It looks dialated’ বলেই ইরিনের চোখের দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল রজার্স।
ইরিন এক ঝটকায় রজার্সের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘What the hell is wrong with you?’
‘Alright, alright. Take it easy. I’m sorry. You look pale, I’ve noticed it for a while. I just want to check to see if you’re anaemic?’
‘What are you—a doctor? I told you I’m fine.’
‘Well, you don’t look like you are. How do you feel? Do you feel nausea? Headaches?’
ইরিন উত্তর দিল না। কিন্তু তার অস্থিরতা অনেক বেড়ে গেল। সে উঠে দাঁড়িয়ে অস্থির ভাবে পায়চারী শুরু করল। একবার বসে আবার উঠে দাঁড়ায়—কিছুতেই অস্থিরতা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে রজার্সকে তার অসহ্য মনে হচ্ছে। সে হঠাৎ করেই রজার্সের সামনে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ‘Yeah, I’ve got a headache. Earache too. Would you please stop questening me?’ বলেই সে দু হাতে তার কান চেপে ধরল।
রজার্স কিছুটা থতমত খেয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ইরিনের দিকে।
একটু দম নিয়ে অত্যন্ত কঠিন স্বরে ইরিন আবার বলল, ‘You’re not my dad—so please, stop interrogating me!’
এক ধরণের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো অল্প সময়ের জন্য। ইরিনের অস্থিরতা প্রকট আকার ধারণ করল। বাসায় এসে এলিনাকে না পাওয়ায় তার প্রচণ্ড রাগ উঠেছে। এলিনাকে সে বলেছিল তার প্রয়োজন হলেই সে আসবে। এলিনার বন্ধের দিনগুলো ইরিন জানে। তাই সে আজকেই এসেছে। এলিনাকে কাজে যেতে হবে—ইরিনকে সেটা জানালেই হতো। তাকে জানানোর কোনো প্রয়োজন মনে করে নি সে। তারমানে এলিনার কাছে ইরিনের আর কোনো গুরুত্বই নেই।
ইরিন একা একা বলে চলল, ‘She doesn’t care about me any more. She only cares about herself. Selfish woman!’
এক নাগারে কিছুক্ষণ কথা বলে ইরিন খুব বিরক্ত হয়ে সোফার এক কোণায় আবার বসে পড়ল। সে তার দু’পা সোফায় তুলে ভাঁজ করে বসে শরীরটাকে সামনে-পিছনে নিয়ে দুলতে থাকল।
ইরিন একটু শান্ত হতেই রজার্স উঠে দাঁড়াল। ‘You must be thirsty. Let me get you something to drink. How about some icecream?’
ইরিন হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। রজার্স চলে গেল কিচেনের দিকে।
কিচেনে ঢুকে রেফ্রিজারেটর খুলে আইসক্রিমের বাক্স বের করে আনল। কেবিনেট থেকে ছোট একটা বাটি এনে দু’স্কুপ আইসক্রিম তুলে রাখল বাটিতে। একবার দূর থেকে তাকিয়ে দেখল ইরিনকে—সে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল রজার্স। কী যেন ভাবল। তারপর এগিয়ে গেল মেডিসিন কেবিনেটের দিকে।
ইরিন চোখ বন্ধ করে আছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে দ্রুত তার হাত ব্যাগ থেকে একটা ছোট কালো রঙের বাক্স বের করে খুলে দেখল—কিছু নেই ভিতরে। সে বাক্সটি হাত ব্যাগের ভিতরে রেখে দিয়ে শরীর সামনে-পিছনে করে আগের মতোই দুলতে থাকল। প্রচণ্ড পানি পিপাসা পেল তার।
ঠিক সে সময়েই রজার্স ফিরে এল আইসক্রিম নিয়ে। সে ইরিনের হাতে বাটিটি তুলে দিল। ইরিন আইসক্রিমের বাটি থেকে গপাগপ কয়েক চামচ আইসক্রিম মুখে দিয়ে আয়েশ করে খেল। এবং হঠাৎ সে মুখ বিকৃত করে ফেলল। আইসক্রিমের স্বাদ কেমন যেন তেতো লাগছে। এমন তেতো আর বিস্বাদের আইসক্রিম আগে কখনো খায়নি সে। ইরিন বাটির দিকে তাকিয়ে চামচ দিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখল সাদা সাদা পাউডারের মতো কিছু একটা আইসক্রিমের উপর ভাসছে। ইরিনের সন্দেহ হলো। রজার্সের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘What’s this? It tastes strange. It doesn’t taste right.’ সে আবার বলল, ‘What is this Rogers?’
রজার্স আমতা আমতা করে বলল, ‘It’s probably an icecream additive. No worries—just move them on the side.’
ইরিন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে রজার্সের দিকে শুধু তাকাল একবার তারপরই ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। হঠাৎ করেই তার সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে এল। তার হাত থেকে আইসক্রিমের বাটিটি পড়ে গেল মেঝেতে। এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সোফাতে ঢলে পড়ল ইরিনের শরীর।
রজার্স চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ইরিন যেভাবে পড়ে গেছে সেভাবেই পড়ে রইল। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ইরিনের নিস্তেজ শরীরটাকে আলতো করে তুলে নিল রজার্স। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বেডরুমের দিকে।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইরিনকে বিছানায় শুইয়ে দিল রজার্স। সে নিশ্চিত—সহসা সংজ্ঞা ফিরে আসবে না ইরিনের।
ঘুমন্ত একটা পরীর মতো লাগছে ইরিনকে। কী নিষ্পাপ চেহারা মেয়েটির। রজার্স অপলক তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত পরীর দিকে।
এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-৩)
আমেরিকার প্রতিটি আবাসিক এলাকায় কম করে হলেও একটি করে বাচ্চাদের খেলার পার্ক থাকে। কোথাও আবার থাকে রিক্রিয়েশন সেন্টার। বিভিন্ন রকমের খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকে সেখানে। থাকে বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের উপযোগী খেলার সরঞ্জাম—স্লাইডস, বেবি সুইংস, ক্লাইম্বার, মাঙ্কি বার, টিউব স্লাইড, ওয়াটার স্লাইড, জাম্পিং বাউন্সার, ট্রাম্পোলিন, হাইড এন্ড সিক সহ আরো অনেক কিছুই। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পার্কগুলো প্রায় পূর্ণ থাকে বিভিন্ন বয়সের মানুষের পদচারণায়। বাচ্চাগুলো খেলাধুলা করে—ধুলোবালিতে গড়াগড়ি খায় আর বাবা-মায়েরা ছাউনির নিচে বেঞ্চে বসে ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাচ্চারা কেউ ব্যথা না পাওয়া পর্যন্ত ফোন থেকে কেউ মাথা তুলে তাকায় না। বাচ্চাগুলো কে কোথায় কী খেলছে সেদিকেও লক্ষ্য থাকে না অনেকের। সন্ধ্যা মিলিয়ে যেতেই কিছু কিছু পার্কে আবার ফ্লাড লাইট জ্বলে উঠে। বিশেষ করে যে সব পার্কের সংগেই থাকে সকার কিংবা বেসবল খেলার মাঠ অথবা জগিং এন্ড রানিং ট্র্যাক।
ইরিনকে নিয়ে কত বিকেল-সন্ধ্যা কাটিয়েছে এলিনা এই পার্কটিতে। ওদের বাসা থেকে হেটেই আসা যায়। সন্ধ্যা মিলিয়ে যেতেই গরমের তাপ কমে এসেছে। চারিদিকে মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। এমন বাতাসে হাঁটতে ওদের বেশ ভালই লাগছে। তাই হাঁটতে হাঁটতে দূরের এই পার্কটিতেই চলে এসেছে এলিনা আর ইরিন।
অনেকক্ষণ থেকে পার্কের একটি বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে ইরিন। এলিনাও বসে আছে তার পাশে। ইরিনের কাঁধে হাত রেখে সে বলল, ‘ইয়োর ড্যাড এন্ড আই—ডু উই মিন এনিথিং টু ইউ?’
‘অফ কোর্স ইউ ডু। ইউ আর দ্য অনলি টু পিপল ইন মাই লাইফ—যারা আমাকে কেয়ার করে, লাভ করে।’
এবার এলিনা ইরিনের চিবুক উঁচু করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডু ইউ কেয়ার এবাউট আস? আমাদের জন্য কি তোমার কোনো মায়া হয়? আমাদেরকে ফিল করো? আমাকে—তোমার বাবাকে?’
ইরিন ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। এলিনা আবার তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘হোয়াই ক্যান’ট ইউ অ্যাক্ট লাইক ইউ কেয়ার এবাউট আস। আই হেট টু সি ওয়েস্ট ইয়োর লাইফ! ডোন্ট ইউ হ্যাভ ড্রিমস—সামথিং ইউ ক্যান লিভ ফর?’
ইরিন মাথা না তুলেই বলল, ‘দ্য ট্রুথ ইজ—আই ডোন্ট। আই লিভ ফর টুডে—আই ডোন্ট থিংক এবাউট টুমরো।’ একটু চুপ করে থেকে সে আবার বলল, ‘বাট আই লাইক টু হ্যাভ অ্যা ড্রিম।’
‘লুক এট মি—মাই লাইফ হ্যাজ নেভার বিন ইজি—ফ্রম ডে ওয়ান। বাট আই হ্যাভ নেভার গিভেন আপ বিকজ আই হ্যাভ অল দিজ ড্রিমস দ্যাট কিপ মি গোয়িং। আই লিভ ফর মাই ড্রিমস এন্ড আই উড ডাই ফর দেম।’ তারপর নিচু গলায় যেন নিজের কাছেই বলল, ‘আমার স্বপ্নই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
ইরিন অবাক হয়ে তাকাল এলিনার দিকে। তার খুব কষ্ট হলো এই মুখটার দিকে তাকাতে। তার মায়ের সেই স্বপ্ন আদৌ কোনোদিন পূরণ হবে কিনা সে ব্যাপারে ইরিনের যথেষ্ট ধারণা নেই। কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারে না—তার জন্যে তার মাকে বাসা ছেড়ে আরেকজনের সাথে চলে যেতে হবে কেন? বাবার সাহায্য কি যথেষ্ট ছিল না—নাকি এর পেছনে আরো কোনো কারণ আছে? যদি থাকে কী সেই কারণ? বলবে না বলবে না ভেবেও ইরিন জিজ্ঞেস করল, ‘ইউ স্টিল ড্রিম ফর হলিউড?’
হঠাৎ করেই ইরিনের এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে গেল এলিনা। কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল সে চুপ করে। তার চোখের কোনটা চিকচিক করে উঠল।
‘হোয়াই ডিড ইউ হ্যাভ টু গো মাম? কেন—কেন চলে গেছ?’
এলিনার চোখ থেকে টপটপ করে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। ‘এর কোনো সহজ উত্তর আমার কাছে নেই ইরিন। আই রিয়েলি ডোন্ট।’ একটু থেমে চোখ মুছল এলিনা। তারপর আস্তে করে বলল, ‘আই’ম বিগিনিং টু ওয়ান্ডার মাইসেল্ফ—মে বি বিকজ আই নিডেড সামওয়ান টু শেয়ার মাই লাইফ উইথ…’ এলিনার কথায় মনে হলো সম্ভবত সে নিজেও নিশ্চিত নয়, সে কী বোঝাতে চাইছে।
‘সো বাবা ওয়াজ নট গুড এনাফ ফর ইউ টু শেয়ার ইয়োর লাইফ উইথ?’
ইরিনের জেরার মুখে এলিনা অসহায় বোধ করতে লাগল। এবার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ—মানুষের জীবনের জটিলতা বোঝার বয়স তোমার হয় নি জাতীয় কিছু একটা বলে ওকে থামানোর চেষ্টা করল। সে তার কণ্ঠে জোর ফিরিয়ে এনে বলল, ‘আই টোল্ড ইউ—ইটস কমপ্লিকেটেড। তুমি বুঝবে না। হয়ত একদিন বুঝতে পারবে—কিন্তু এখন না।’
ইরিন কিছু একটা বলতে যেয়েও বলল না। সে চুপ করে রইল। অথচ তার মনে কত কথা—কত প্রশ্ন। সে এখনো জানে না কিংবা বুঝে না, কেন তার মা-বাবার সেপারেশন হয়েছে। কেন তার মা এভাবে তাদেরকে ফেলে এক আমেরিকানের হাত ধরে চলে গেল। তার ছোট মনে আরো এমন কত প্রশ্ন আনাগোনা করে—কিন্তু কে দেবে তার এসব প্রশ্নের উত্তর।
এলিনা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘লুক ইরিন, ইয়োর ড্যাড ইজ অ্যা গুড ম্যান। বাট উই হ্যাভ সো মাচ ডিফারেন্সেস। উই জাস্ট ডোন্ট কমপ্লিমেন্ট ইচ আদার। ইউ আর অ্যা গ্রোন আপ গার্ল নাউ—ইউ মাস্ট আন্ডারস্ট্যান্ড…’
‘…ইভেন টু গুড সোলস ক্যাননট স্টে টুগেদার ফরএভার।’ এলিনার মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে ইরিন বাকী কথাটুকু শেষ করল—বিষয়টা এমন যেন ইরিন খুব ভাল করেই জানে এলিনা এখন কী বলবে। ‘সামটাইমস, নো ম্যাটার হাউ হার্ড দে ট্রাই, দেয়ার রিলেশনশিপ জাস্ট ডোন্ট ওয়ার্ক। থিংস হ্যাপেন, দে গেট সেপারেটেড।’ একথাগুলোই এলিনা ইরিনকে একবার বলেছিল যখন সে প্রথমবার ইরিনকে বলেছিল—সে তার বাবার সঙ্গে আর থাকছে না—ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সেদিন থেকেই সেই কথাগুলো ইরিনের মস্তিষ্কে গেঁথে রয়েছে। এসব কথা বোঝার মতো বয়স কিংবা ক্ষমতা হয়ত তখন তার ছিল না। কিন্তু এখন অনেক কিছুই বোঝে সে।
এলিনা কী বলবে ভেবে পেল না। সে ইরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। মনে মনে ভাবল—তার মেয়েটা সত্যি সত্যিই বড় হয়ে গেছে।
…
রজার্স হঠাৎ লক্ষ্য করল ইমরানের চেহারার মধ্যে এক ধরণের অস্বাভাবিকতা। তার কেমন একটু অস্বস্তি হতে লাগল। কিছুটা ভয়ও। সে খানিকটা শঙ্কিত হয়েই ডাকল, ‘ইমরান!’
ইমরানের দৃষ্টিভঙ্গির তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না।
ইমরানের হিমশীতল দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে রজার্সের খুব অস্বস্তি হতে লাগল। অস্বস্তি কাঁটাতে সে আবারো বলল, ‘ইমরান—হোয়াটস রং?’
ইমরান সহসাই চেহারার পরিবর্তন করে ফেলল। হাসি হাসি মুখ করে সে বলল, ‘হাউ’জ দ্য ড্রিঙ্ক?’
রজার্স একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর মিন মিন করে বলল, ‘ইট’স গুড। রিয়েলি গুড।’
আবার একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। গ্রীষ্মের সন্ধ্যা—তাপমাত্রা বেশ খানিকটা কমে এলেও সেন্ট্রাল এসির দুটো ইউনিটই চলছে সারাক্ষণ—অতিরিক্ত নীরবতায় শুধু এসির হাম শব্দ ছাড়া আর কোনো কিছু শোনা যাচ্ছে না।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে ইমরান বলল, ‘ফিলিং বোর্ড—উড ইউ লাইক টু প্লে অ্যা গেম?’
‘হোয়াট গেম?’ রজার্স ঠিক বুঝতে পারল না ইমরান কী খেলার কথা বলছে।
‘ট্রুথ অর ডেয়ার!’
রজার্সের বুঝতে এবং দ্বিধা কাটতে একটু সময় লাগল। কিছু সময় ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘ট্রুথ…’
‘ডু ইউ লাভ এলিনা?’ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে রজার্সের চোখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল ইমরান।
রজার্স অবাক হলো। মনে মনে ভাবল এটা আবার কেমন প্রশ্ন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বলল, ‘অফ কোর্স আই ডু।’
‘ইউ ওয়ানা মেরি হার রাইট?’
‘ইয়েস। অফ কোর্স।’ একটু হেসে বেশ জোর দিয়েই সে বলল।
‘ওয়ান্স ইউ মেরি হার, ইরিন উড বি ইয়োর ডটার, রাইট?’
‘স্টেপ ডটার।’ রজার্স ভ্রূ কুঁচকে বলল।
‘ইয়েস স্টেপ ডটার। উড ইউ একসেপ্ট হার—এজ ইয়োর ডটার?’
‘জেসাস! হোয়াট কাইন্ড অফ কোশ্চেন ইজ দ্যাট?’
‘ট্রুথ অর ডেয়ার!’
রজার্সের কপালে চিকণ ঘাম দেখা দিল। তার মনে ভয়ের কুডাক দিল। পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও তার মনে হচ্ছে—কিছু একটা ঘটছে যার কোনো ক্লু সে পাচ্ছে না। ইমরানের চাহনির মধ্যে কিছু একটা আছে। আজকেই তার সাথে প্রথম পরিচয় তাই ইমরানের ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া হাসির রহস্য সে ধরতে পারছে না। কিন্তু তার অবচেতন মন বলছে—কিছু একটা ঘটবে। সে একবার ঘড়ি দেখল। এলিনা আসছে না কেন এখনো?
‘ট্রুথ অর ডেয়ার?’ ইমরান আবারো শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
রজার্স বুঝতে পারছে, ইমরানের ফেলে রাখা কোনো ফাঁদে সে আটকা পড়েছে অথবা পড়তে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সুতো ছাড়ছে সে। এখনো হয়তো ধরতে পারছে না—একবার ঠিক মত গেঁথে গেলেই হলো। রজার্স মনে মনে ভাবল—তাকে সাবধান হতে হবে। প্রয়োজনে সে আর কোনো কথার উত্তর দেবে না। সে ঝিম ধরে বসে রইল।
‘ইউ আর অ্যা লায়ার, রজার্স। ইউ ডোন্ট হ্যাভ গাটস টু টেল দ্য ট্রুথ। ইউ এইন্ট গোনা ম্যারি এলিনা, রাইট?’
রজার্স ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে। তার মাথা ঘুরছে। এতগুলো ড্রিঙ্ক করা মোটেই উচিৎ হয় নি। মাথা কাজ করছে না। সবকিছু কেমন এলোমেলো ঠেকছে।
‘হ্যাভ এনাদার ড্রিঙ্ক মাই ফ্রেন্ড—নাইট ইজ স্টিল ইয়াং!’ হুইস্কির বোতল থেকে এক শট হুইস্কি রজার্সের গ্লাসে ঢেলে দিয়ে ইমরান মিটমিট করে হাসল।
রজার্স আবারো দ্বিধায় পড়ে গেল। কিছুতেই বুঝতে পারল না—এ হাসির অর্থ কি?
…
এলিনা বলল, ‘তুমি রজার্সকে পছন্দ করনা আমি জানি। আমি এক্সপেক্টও করিনা যে তুমি তাকে পছন্দ করবে বাট এট লিস্ট, বি লিটল মোর কার্টেয়াস টু হিম—দ্যাটস অল আই’ম আস্কিং।’
‘হাউ ক্যান আই বি মোর কার্টেয়াস? দ্যাট’স নট পসিবল মাম। আই ক্যান্ট বি অ্যা হিপোক্রাইট। দ্যাটস সিমপ্লি নট পসিবল।’ ইরিনের কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল কাঠিন্য।
‘হোয়াই নট?’
‘ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট টু নো মাম। ইউ ওন্ট বি এবল টু হ্যান্ডেল দ্যাট। সো ডোন্ট আস্ক—জানার দরকার নাই।’
এলিনার চোখে মুখে অশুভ ছায়া দেখা দিল। সে কাঁপা গলায় বলল, ‘কী—কী বলছো তুমি?’
ইরিন তার মায়ের মুখের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল দূরের খোলা মাঠের দিকে। মাঠকে সবুজ সতেজ রাখার জন্যে স্প্রিঙ্কুলার সিস্টেম থেকে পানি ছড়িয়ে পড়ছে—ফ্লাড লাইটের আলোতে সে পানি চিকচিক করছে। এক দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে রইল ইরিন।
ইরিনের দিকে তাকিয়ে একটা অশুভ আশঙ্কা জেগে উঠল এলিনার মনে। সে উঠে গিয়ে দাঁড়াল ইরিনের পাশে—দুহাতে ধরে ইরিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘কী হয়েছে ইরিন? আমাকে বলা যায় না? আমি তোর মা!’
ইরিন চুপ করে রইল।
এলিনা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ‘কী এমন কথা আমাকে বলতে পারিস নি আগে?’
‘আমি বলতে চাইছি—অনেক বলতে চাইছি। আই ওয়ান্টেড টু টক উইথ ইউ ব্যাডলি। বাট ইউ ডিডন্ট হ্যাভ এনি টাইম ফর মি। আই ওয়াজ গোয়িং থ্রু হেল। অল অফ মাই ফ্রেন্ডস রিজেকটেড মি। আই হ্যাভ নোবডি টু টক টু… এন্ড আই নিডেড সাম এক্সট্রা মানি, ডেসপারেটলি।’
‘তোমাকে তো হাত খরচের টাকা দেয়াই হয়—হোয়াই ডিড ইউ নিড এক্সট্রা মানি ফর?’
‘আই’ম অ্যা গ্রোন আপ গার্ল মাম। আই হ্যাভ নিডস। ইউ শুড নো দ্য ডিম্যান্ড অফ অ্যা গার্ল অফ মাই এজ। ডোন্ট ইউ?’
‘জানব না কেন? তোমার মতো এই বয়সটা একসময় আমারও ছিল। বাট আওয়ার ডিম্যান্ড ওয়াজ লিমিটেড—তোমাদের মতো মডার্ন টিনেজদের মত এত ডিম্যান্ড আমাদের কখনোই ছিল না। এখনকার বাচ্চারা বাবা-মাকে সাতপাঁচ বুঝিয়ে যা খুশি তাই করে।’
এলিনার কথায় ইরিন খুবই বিরক্ত হলো। সে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল তার মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখলা?’
এলিনা বুঝতে পারল এভাবে বলাটা ঠিক হয় নি। সে কথার সুর বদলে বলল, ‘টাকা লাগবে তো বাবাকে বললেই পারতে। তাকে বলো নাই কেন?’
‘বলছিলাম বাট হি ডিডন্ট কেয়ার। সো আই ওয়েন্ট টু ইয়োর এপার্টমেন্ট ওয়ান ডে—কিন্তু তুমি বাসায় ছিলা না।
‘কই আমি তো কিছুই জানি না? রজার্স বাসায় ছিল না?’
ইরিন সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে যেভাবে তাকিয়ে ছিল সেভাবেই দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল। মাঠের পানি চিকচিক করছে—ইরিনের চোখের পানিও।
এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-২)
ডিনার টেবিলে হরেক রকমের খাবার শোভা পাচ্ছে। সবই অবশ্য আমেরিকানদের খাবার। মিক্সড গ্রিন সালাদ, ম্যাসড পটেটো, লুজ কর্ন, অ্যাসপ্যারাগাস এবং মিক্সড ভেজিটেবল। সঙ্গে সাইড হিসেবে আরো আছে পেঁয়াজ ও রসুন দিয়ে ভাজা মাশরুম। প্লেট, গ্লাস, কাঁটা চামচ, ছুরি—সুন্দর করে সাজানো। রজার্স যেহেতু প্রথম বারের মত ইমরানের আতিথেয়তা নিচ্ছে—তার কথা ভেবেই এমন আয়োজন।
স্টেকের ট্রেটি টেবিলের অন্য প্রান্তে রেখে ধারাল ছুরি দিয়ে একটা একটা স্লাইস কেটে সবার প্লেটে তুলে দিল ইমরান—তার তৈরী করা স্পেশাল গার্লিক বাটার স্টেক। সবার প্লেটে দেয়া হয়ে গেলে সে পেশাদার শেফদের মতো বলল, ‘লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান প্লিজ এনজয় ইয়োর ডিনার।’
এলিনা সালাদের বাটি থেকে একটু সালাদ নিজের প্লেটে তুলে নিয়ে রজার্সের দিকে এগিয়ে দিল। রজার্স তার স্টেক থেকে এক টুকরা মাংস কেটে নিয়ে মুখে পুরে একটু খেয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দিস ইজ এক্সেলেন্ট!’ আমেরিকানরা এই ভদ্রতাটুকু করে থাকে। খেতে অখাদ্য হলেও বলবে, ওয়াও এমন রান্না আমি আগে কখনো খাইনি—দারুন হয়েছে।
‘ইউ এপ্রুভ?’ ইমরান জানতে চাইল।
‘আই ডু।’
‘ওহ, থ্যাঙ্ক ইউ।’
এরপরে আর কেউ কোনো কথা না বলে যার যার প্লেটে মনোযোগ দিল। কাঁটা ছুরি আর কাঁটা চামচের কাটাকাটির মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ যেন নেই কোথাও।
এলিনা একবার তাকাল ইরিনের দিকে। ইরিন চুপচাপ। তাকে খুবই অন্যমনস্ক লাগছে। ঠিকমতো খাচ্ছে বলেও মনে হলো না। কোনো এক বিচিত্র কারণে তাকে কিছুটা অস্থির মনে হচ্ছে। কোনো কিছুর উপরে সে বিরক্ত—কিন্তু কেন?
রজার্স বেশ কয়েকবার তাকাল ইরিনের দিকে। ইরিন ভুল করেও তার দিকে তাকাল না।
ইমরান লক্ষ্য করল—ইরিন তেমন কিছুই খাচ্ছে না। অথচ ইমরানের স্টেক প্রিপারেশন ইরিন এবং এলিনা দুজনেরই অনেক পছন্দ। ইমরান প্রায় উইকএন্ডেই ওদের জন্যে স্টেক বানিয়ে দিত। ওরা দুজন গল্প করতে করতে খুব মজা করে খেত। আর প্রশংসা করত ইমরানের স্টেক রেসিপির—তারও ভীষণ মজা লাগত বিষয়টা। কত সুন্দর কাটছিল ওদের দিনগুলি। হঠাৎ কেমন এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু। ইমরান এখনো হিসাব মেলাতে পারে না।
‘এক্সকিউজ মি।’ খাবার শেষ না করেই ইরিন হঠাৎ তার প্লেট নিয়ে উঠে চলে গেল কিচেনে।
ইতিমধ্যেই এলিনার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। একটু সময় পার করে সেও গিয়ে দাঁড়াল ইরিনের পাশে।
বেসিনে প্লেট রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই ইরিন মুখোমুখি হলো এলিনার। সে ডাইনিং টেবিলের দিকে আঙুল দেখিয়ে নিচু গলায় চাঁপা ক্ষোভের সাথে বলল, ‘ওকে আনছ কেন?’
‘মানে কী?’ এলিনা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল ইরিনের মুখের দিকে?
‘হোয়াই ডিড ইউ ব্রিং হিম হিয়ার?’ ইরিন আবার বলল।
এলিনার মুখ হা হয়ে গেল। সে নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ইরিন কী বলছে এসব? সে চোখ বড় করে আহত স্বরে বলল, ‘কী? কী বলছো তুমি? হোয়াট আর ইউ টকিং এবাউট?’
‘ইউ নো হোয়াট আই’ম টকিং এবাউট। কেন আনছ? ওকে? তোমার বয়ফ্রেন্ডকে?’
লজ্জায় লাল হয়ে গেল এলিনার মুখ। নিজেকে স্থির রাখতে ভাল সমস্যা হচ্ছে তার। তবুও নিজেকে যথা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে লজ্জিত এবং বিব্রত কণ্ঠে সে বলল, ‘আমি আনতে চাইনি। তোমার বাবা বলল তাই নিয়ে এলাম। ইয়োর ড্যাড ইনসিসটেড।’ শেষের কথাটি বেশ জোরের সাথেই বলল এলিনা।
‘বাবা বলছে?’ ইরিন বেশ অবাক হল—খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেল সে। ইমরান তাকে বলেছিল উইকএন্ডে তোমার আম্মু আসবে। কোথাও কোনো প্লান রেখো না। আমরা একসাথে ডিনার করব। তোমাদের ফেভারিট বিফ স্টেক প্রিপেয়ার করব ভাবছি। ইমরানের কথায় ইরিন মনে মনে খুশিই হয়েছিল। যদিও তার মায়ের প্রতি আগের সেই তীব্র ভালবাসার টানটা এখন আর অনুভব করে না সে।
ইরিন কিচেন তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল, ‘আই নিড টু টক টু ইউ। তুমি কি আমার রুমে একটু আসতে পারবা?’
এলিনা বুঝতে পারল না—ইরিনের কী এমন কথা থাকতে পারে? তারপরেই ভাবল—ইরিনের সাথে তার সম্পর্কটা যত না মা-মেয়ের তার চেয়েও বেশি বন্ধুত্বের। মেয়েটি নিশ্চয়ই তাকে অনেক মিস করে। কত কথাই তো বলার থাকতে পারে। একটা মেয়ের শিশুকাল শুরুই হয় মায়ের প্রতি নির্ভরতা দিয়ে। সৃষ্টি হয় আনুগত্য আর তীব্র ভালবাসার। এই কিছুদিন আগেও এলিনাই ইরিনকে স্কুলে আনা-নেয়া করত। স্কুল থেকে ফেরার সময় গাড়িতে উঠেই ইরিন শুরু করত বকবকানি। এলিনা হাসত আর তার কথা শুনত। সেই মেয়েটি কেমন নির্জীব হয়ে গেছে। হয়ত বয়ঃসন্ধির কারণে তার আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা এসেছে। একটা অবাধ্য—স্বেচ্ছাচারী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইদানীং। কেমন একটা স্বাধীনচেতা ভাব চলে এসেছে। মেয়েটি হঠাৎ করেই যেন বড় হয়ে গেছে। মা-মেয়ের মধুর সম্পর্কটা আগের মতো আর নেই—সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। রজার্সের কারণেই কি মা-মেয়ের সেই মধুর সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করেছে নাকি আরো অন্য কোনো কারণ আছে?
এলিনা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘বরং চলো, আমরা বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাবে। এই নেইবারহুডে কতদিন হাঁটা হয় না!’
ইরিন আসলে চাইছিল বাইরেই যেতে। কিছু একটা কারণে ইরিনের এই মুহূর্তে এই ঘরটার মধ্যে এক সেকেন্ডও থাকতে ইচ্ছে করছে না। এলিনা কী করে তার মনের ইচ্ছেটা বুঝে ফেলল কে জানে। সে খানিকটা অবাক হয়েই তাকাল এলিনার চোখের দিকে তারপর বলল, ‘ঠিক আছে চলো।’
‘রজার্স, আই’ম গোয়িং আউট ফর এ ওয়াক উইথ ইরিন। মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল বাট ডু নট ড্রিং টু মাচ। ইউ হ্যাভ টু ড্রাইভ ব্যাক, রিমেমবার।’ ইরিনকে নিয়ে বের হয়ে যাবার সময় দূর থেকে রজার্সের উদ্দেশ্যে বলল এলিনা।
‘আই উইল বি ফাইন হানি। এনজয় ইয়োর ওয়াক।’ রজার্স উত্তর দিল।
ইমরান দুটো প্লেট নিয়ে এসে কিচেনের দিকে যাচ্ছিল। এলিনা একটু এগিয়ে এসে রজার্সকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘ওকে কিন্তু বেশি ড্রিঙ্ক করতে দিও না। নাহলে আবার আমাকে ড্রাইভ করতে হবে। তুমি তো জানই রাতে আমি একদমই ড্রাইভ করতে পছন্দ করি না।’
ইমরানকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এলিনা ইরিনকে নিয়ে বের হয়ে গেল বাসা থেকে। ইমরান ওদের চলে যাওয়ার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
ইরিনকে নিয়ে এলিনা বাইরে চলে যাওয়ায় ইমরান মনে মনে বেশ খুশিই হল। নাহলে প্ল্যান-বি এপ্লাই করতে হতো। সে কাজটি খুব একটা সহজ হত না। এখন সে নিশ্চিত।
রজার্সের সঙ্গে তার কিছু বোঝাপড়া আছে—আর সেটা সে একাই করতে চায়।
…
ডিনার শেষে ইমরানের লিভিং রুম সংলগ্ন ছোট্ট লিকার বারের উঁচু কাউন্টারের টুলের উপরে বসে আছে রজার্স। একটি ওল্ড-ফ্যাশন গ্লাসে বার্বোন হুইস্কির সঙ্গে অ্যারোমাটিক বিটার মিশিয়ে একটি ড্রিঙ্ক বানিয়ে তার সামনে এগিয়ে দিল ইমরান। সামান্য ক্লাব-সোডা মিশিয়ে ভাসানো হয়েছে কমলালেবুর একটি চাকতি, তাতে রুপালি বুদ্বুদ উঠছে প্রচুর। রজার্স ড্রিঙ্কে একটা চুমুক দিয়ে চুপ করে বসে রইল। ইমরান শীতল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল রজার্সের দিকে।
…
ইমরানের বাংলো টাইপের দোতলা বাড়িটির আশে পাশে একই মডেলের আরো অনেকগুলো বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধ ভাবে। দুপাশের সারি সারি বাড়িগুলো সামনে দিয়ে সুন্দর পায়ে হাঁটার রাস্তা। এলিনা আর ইরিন ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। কিছুদূর এগিয়ে যেয়ে এলিনা ইরিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কি শরীর খারাপ?’
‘নো। আই’ম ফাইন।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এলিনা আবার বলল, ‘তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না—তুমি ভাল আছো।’
‘আমি ভাল আছি মাম।’
‘ভাল থাকার তো কথা না। নিশ্চয়ই শরীর খারাপ করেছে। এমনিতেই তোমার এলার্জির সমস্যা। নিজে এখনো একা খেতে পারো না। সব জেনে শুনে তুমি তোমার বাবার কাছেই পড়ে আছ। আর তোমার বাবাও—যতই দিন যাচ্ছে, ততই দেখি মানুষটা মূর্খ হচ্ছে।’
‘তুমি শুধু শুধু বাবাকে ব্লেইম করো কেন?’
এলিনার সঙ্গে ইরিন সব সময় বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করে। বাসায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে বলতে এখন বেশ স্বাচ্ছন্দেই কথা বলতে পারে সে। উচ্চারণে সামান্য সমস্যা থাকলেও আমেরিকায় জন্ম নেয়া অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় ইরিনের বাংলা যথেষ্ট পরিষ্কার। অনেক সময় স্কুলের বন্ধুদের সামনে কোনো সিক্রেট বা এমন কোনো ঘটনা বন্ধুদের সামনে বললে তাঁরা বুঝে যাবে—তখন সে তার মায়ের সঙ্গে বাংলায় কথা বলে।
এলিনা বলল, ‘শুধু শুধু ব্লেইম করি না—যা সত্যি তাই বলি। তাছাড়া, তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তোমার শরীর ভাল নেই। খাওয়া দাওয়াতো কিছুই করো না।’
‘দ্যাটস নট ট্রু। হোয়েন আই’ম হাংগ্রি—আই ইট। কম খাই—কিন্তু খাই।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ কত কী খাও—সেটা কি আর আমি জানি না।’
ইরিন আর কিছু না বলে চুপ করে রইল।
‘আমাদের সেটেলমেন্টটা হয়ে গেলেই আমি তোমাকে আমার কাষ্টডিতে নিয়ে আসব। রজার্স একটু ব্যাড টেম্পার্ড মানুষ এটা ঠিক কিন্তু তোমার বাবার মতো অবিবেচক নয়। এজ এ প্যারেন্ট, হি উইল বি মাচ বেটার চয়েস।’
ইরিন হাঁটা থামিয়ে দিল। হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় এলিনা একটু অবাক হলো। সেও দাঁড়িয়ে পরল। ইরিন শীতল চোখে তাকাল এলিনার দিকে। ‘আমি বাবার সংগেই ভাল আছি। ডোন্ট ওরি এবাউট মি।’ বলেই সে হাঁটা শুরু করল আবার।
এলিনা পিছন থেকে বলল, ‘তুমি মোটেই ভাল নেই। আমি তোমাকে নিয়ে অনেক কনসার্নড। আমার কানে কিছু কথাও এসেছে। আই’ম রিয়েলি ওরিড এবাউট ইউ ইরিন।’
ইরিন আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। এলিনা তার কাছে আসতেই সে বলল, ‘কী শুনছ তুমি?’
‘ইউ নো দ্যাট বেটার—যা শুনেছি তাতে যে কোনো প্যারেন্টদেরই কনসার্নড হবার কথা।’
‘দেন কাম ব্যাক এন্ড টেক কেয়ার অফ মি। তুমি ফিরে আসো—তখন দেখবা আমি ভাল হয়ে গেছি।’
‘দ্যাট’স নট পসিবল—এখনতো আর সম্ভব না।’
‘হোয়াই নট?’
‘সেটা তোমাকে এখন বোঝানো যাবে না। যখন বড় হবে তখন বুঝবে।’
‘কেন? আমি বড় হই নাই? ইউ থিংক আই’ম নট ওল্ড এনাফ ইয়েট? ইউ হ্যাভ লেফট হোম ফর ওয়ান ইয়ার এন্ড ওয়ান ইয়ার ইজ অ্যা লং টাইম মাম। ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হোয়াট আই হ্যাভ বীন থ্রু এন্ড হাউ মাচ আই হ্যাভ চেঞ্জড।’
এলিনা অবাক হয়ে ইরিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
…
লিকার বারে বসে রজার্স ড্রিঙ্ক করেই চলেছে। একটা শেষ হতে না হতেই ইমরানও একটার পর একটা হার্ড লিকার পরিবেশন করে যাচ্ছে তাকে। অনেকক্ষণ থেকেই রজার্স চুপচাপ গ্লাসে চুমুক দিয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে নীরবতা ভেঙ্গে ইমরান বলল, ‘সো হাউ লং ইউ হ্যাভ বীন ইন মডেলিং বিজনেস রজার্স?’
‘ওহ, দিজ উড বি মাই ফার্স্ট জব এজ এ ট্রেইনার। বাট আই ইউজড টু বি এ মডেল ফর সেভারেল ইয়ার্স। আই হ্যাভ গুড হলিউড কানেকশন টু…’
‘আই সি। দ্যাট’স হাউ ইউ মিট দ্য মডেল গার্লস এন্ড…’ কথা শেষ না করে ইমরান থেমে গেল।
‘এন্ড?’ প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল রজার্স।
ইমরান কিছু না বলে আর একটি হুইস্কির গ্লাস এগিয়ে দিল রজার্সের দিকে।
রজার্স বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ একটু থেমে গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে সে বলল, ‘আই নো ইউ আর ম্যাড এট মি। বাট ট্রাস্ট মি—এনিবডি উড হ্যাভ টেকেন হার—শী ইজ ট্যালেন্টেড বিসাইডস বিং বিউটিফুল এন্ড শী শুড এক্সপ্লোর হারসেল্ফ। আই’ম জাস্ট গাইডিং হার। শী নিডেড সামওয়ান লাইক মি ইন হার লাইফ।’
রজার্স ঘোরের মধ্যে আছে। ইতিমধ্যেই সে চূড়ান্ত রকমের মাতাল হয়ে পড়েছে। যদিও সে যথেষ্ট স্থির এখনো। হুইস্কির গ্লাসে আর একটা চুমুক দিয়ে সে যেন ইচ্ছাকৃত ভাবেই ইমরানকে আঘাত করে বলল, ‘নট অনলি ফর হার ক্যারিয়ার—শী অলসো নিড মি ফর এনাদার রিজন টু। ইউ নো হোয়াট আই মিন?’ বলেই সে খ্যাঁক খ্যাক করে বিচ্ছিরি ভাবে হাসল—গায়ে জ্বালা ধরা হাসি।
ইমরান শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রজার্সের দিকে। ধীরে ধীরে তার চেহারা বদলে অন্যরকম হয়ে গেল। কেমন যেন অচেনা। চোখের দৃষ্টি স্থির কিন্তু জ্বলন্ত। ক্ষুধার্ত বাঘের মত—হিংস্র।
কী ঘটেছিল লাসভেগাসে (পর্ব-২)
শাহেদ খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছে নায়লার দিকে।
নায়লা নির্বিকার।
কিছুক্ষণ পর সে তাকাল নাভিদের দিকে। আবার নায়লার দিকে ফিরে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি কি বললে?’
নায়লা গলার স্বরে কোন পরিবর্তন না এনে একই রকম ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘আপনি তো সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। ফ্যামিলির জন্যে আপনার সময় কোথায়? তাই সে ডিসিশন নিয়েছে সাথে আর থাকবে না।’
‘আমার সাথে থাকবে না মানে? আমার সাথে থাকবে না তো কার সাথে থাকবে?’ হঠাৎ করে শাহেদের কণ্ঠে রাগ ঝরে পড়ল।
‘কার সাথে থাকবে সেটা আমি কী করে বলব?’ নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রেখেই নায়লা শাহেদের প্রশ্নের উত্তর দিল।
‘তাহলে আমার সাথে যে আর থাকবে না, সেটা কী করে জানলে?’
‘আমাকে বলেছে।’
‘কবে বলেছে?’
‘দিন-তারিখ তো মনে করে রাখি নাই দুলাভাই।’
‘আর কী বলেছে শুনি?’
‘থাক, সেগুলো শুনলে আপনার ভাল লাগবে না।’
‘তবুও শুনি। বলো।’
‘আর বলেছে আপনার শরীর থেকে নাকি কিসের গন্ধ বের হয়। সে লাইক করে না। অবশ্য এরকম অনেকেই আছে, গন্ধ সহ্য করতে পারে না।’
এমন ধরণের কথা শুনে শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে নায়লার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর নাভিদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার গায়ে গন্ধ?’
নাভিদ চেয়ার ছেড়ে উঠে শাহেদের পাশে গিয়ে ওর শরীরের গন্ধ নেবার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘কই না তো!’
শাহেদ এবার নায়লাকে ডেকে বলল, ‘এই তুমি এদিকে আসো।’
‘থাক দুলাভাই বাদ দেন।’
‘বাদ দিব কেন। তুমি নিজেই পরীক্ষা করে দেখো—আসো।’
অনিচ্ছা স্বত্বেও নায়লা উঠে এসে শাহেদের পাশে দাঁড়াল।
‘করো, পরীক্ষা করো।’
নায়লা শাহেদের ঘারের কাছে নাক নামিয়ে গন্ধ নেবার চেষ্টা করল।
‘কি, গন্ধ পেলে?’
‘আমার কাছে তো লাগছে না।’
‘তাহলে?’
‘আসলে আপুর নাকটা না একটু বেশি সেন্সিসিটিভ। আম্মার মতো।’
‘আর ইউ সিরিয়াস? সত্যি করে বলতো, শায়লা বলেছে যে আমার গায়ে গন্ধ?’
‘তাহলে কি আমি বানিয়ে বলছি?’ বলতে বলতে নায়লা ফিরে গিয়ে বসল ওর চেয়ারে।
‘শায়লা এখন কোথায়?’ নায়লার দিকে তাকিয়ে শাহেদ সরাসরি জানতে চাইল।
নায়লা খাওয়া শুরু করেছিল। খেতে খেতেই উত্তর দিল, ‘মাশুক ভাইয়ের সাথে লাস ভেগাস গেছে।’
নাভিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কার সাথে লাস ভেগাস গেছে?’
‘মাশুক ভাইয়ের সাথে।’ হঠাৎ করেই নায়লার রাগ গিয়ে পড়ল এখন নাভিদের উপর। ‘নাভিদ, তুমি বোধ হয় ইদানীং কানে একটু কম শুনছো। ইউ শুড কনসাল্ট এন ইএনটি স্পেশালিষ্ট।’
বিষয়টা নাভিদের কাছে স্পষ্ট নয়। সে আবারো প্রশ্ন করল, ‘না সেটা ঠিক আছে, কিন্তু মাশুক ভাইয়ের সাথে যাবে কেন?’
‘কেন যাবে তার আমি কী জানি? আমাকে কেন জেরা করছ?’
নাভিদ আর কথা না বাড়িয়ে তাকাল শাহেদের দিকে।
শাহেদ চিন্তিত মুখে প্লেট নিয়ে উঠে পড়ল। বেসিনের সিঙ্কে প্লেট রেখে হাত ধুয়ে সে ফিরে এসে বসে থাকল চুপচাপ। হঠাৎ করেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল শাহেদ। কোন কিছুই সে মেলাতে পারছে না।
নায়লা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। তারপর প্রসঙ্গটা বদলে দেবার জন্যে শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, একটা পান খাবেন? আপনার পছন্দের মসলা দেয়া পান এনেছে নাভিদ।’
শাহেদ কোনো উত্তর দিলো না। যেভাবে বসেছিল সেভাবেই বসে রইল। নায়লার দিকে তাকালও না। তার মানসিক অবস্থা বোঝার কোন উপায় নেই।
নায়লা নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘দুলাভাই, আপনার মন কি বেশি খারাপ হয়েছে?’
শাহেদ এবারো কোন উত্তর দিল না।
নাভিদ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘এখন কী করবেন শাহেদ ভাই?’
শাহেদ একদৃষ্টিতে নাভিদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল নায়লার দিকে। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিল, ‘খুন করব।’
নায়লার চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। যেন খুব মজার একটা বিষয় ঘটবে, এমন ভাব নিয়ে সে শাহেদের দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে খুন করবেন দুলাভাই?’
‘সেটা সময় হলেই বুঝতে পারবে। তবে আমি নিজের হাতে কাজটা করব না। আই উইল হায়ার এ প্রফেশনাল হিটম্যান। ভাড়াটে খুনি দিয়ে আমি তাকে পরপারে পাঠিয়ে দেবো।’
নাভিদের আগ্রহের সীমা রইল না। সে শাহেদের দিকে একটু ঝুঁকে এসে জানতে চাইল, ‘আপনার সন্ধানে কি ভাড়াটে খুনি আছে শাহেদ ভাই?’
‘না নাই। তবে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না।’
‘আমার সন্ধানে আছে। আপনি চাইলে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’
‘তোমার সন্ধানে আছে মানে? তুমি চেনো?’ নায়লা অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে তাকাল নাভিদের দিকে।
নাভিদ নায়লার দিকে ঘুরে আমতা আমতা করে বলল, ‘না মানে, আমি সরাসরি কাউকে চিনি না। তবে আমার এক কলিগ আছে, তার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে ভাল কানেকশন আছে। বললেই সে ব্যবস্থা করে দেবে।’ এবার শাহেদের দিকে ঘুরে আগ্রহ নিয়ে সে বলল, ‘শাহেদ ভাই, হেল্প লাগলে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। ব্যবস্থা করে দেবো।
রাগে শাহেদের মুখ লাল হয়ে গেল। কিছু না বলে সে চুপচাপ বসে থাকল।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে নাভিদ চেষ্টা করল পরিবেশটাকে হালকা করার জন্যে। সে নায়লার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই শাহেদ ভাইকে পান এনে দিলে না? যাও পান এনে দাও। আমাকেও একটা দিও।’
‘আমি যাই।’ হঠাৎ করেই শাহেদ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল।
‘কেন দুলাভাই, পান খাবেন না? পানটা খেয়ে যান?’
শাহেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে নাভিদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘তোমার জামাইকে খাওয়াও।’ বলেই দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।
নায়লা আর নাভিদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই নাভিদ অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, শায়লা আপা কি সত্যি সত্যি লাস ভেগাস গেছে নাকি?’
‘সেটা তোমার জানার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ নায়লা নাভিদকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেবিলের খাবারগুলো নিয়ে কিচেনের দিকে চলে গেল।
…
রাত প্রায় ১২টা।
শাহেদ ঘুমানোর আগে গেল ছেলে মেয়েদের খবর নিতে। অর্ক ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু অর্পা এখনও টিভি দেখছে। শাহেদ জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার অর্পা? তুমি ঘুমাওনি এখনো?’
‘আই ক্যান্ট স্লিপ উইদাউট মামি।’
‘বাট ইউ নীড টু ট্রাই স্লিপিং এলোন সামটাইমস, ইউ নো।’
‘ইয়া আই নো এন্ড আই’ম ট্রায়িং।’
শাহেদ আর কিছু না বলে ফিরে আসতে যাবে ঠিক তখন অর্পা ডাকল, ‘বাবা!’
‘উম।’ শাহেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘কী মা?’
‘অর্ক ডিডন’ট ইট এনিথিং। হি ওয়াজ ভেরী হাংগ্রি… আই গেভ হিম ফুড বাট হি রিফিউজড।’
‘কেন?’
‘হি ক্যান’ট ইট উইদাউট মামি’স হ্যান্ড। মামি স্পয়লড হিম।’
‘এত বড় ছেলে এখনো মায়ের হাতে খায়? কি সর্বনাশ, আমি এসব কিছুই জানিনা?’
‘ইয়া, ইউ ডোন্ট নো আ লট অফ থিংস বাবা।’
‘হুম, তাইতো দেখছি। আমি আসলেই অনেক কিছুই জানিনা। কী থেকে কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
গভীর চিন্তায় পরে যায় শাহেদ। মনে মনে ভাবল, ‘এতো ভাল যন্ত্রণা হলো। একজন মায়ের হাতে ছাড়া খেতে পারে না, আরেকজন মায়ের কাছে ছাড়া ঘুমাতে পারে না। এখন উপায়?’
শাহেদ চিন্তিত মনে ধীর পায়ে চলে গেল তার রুমে।
পরেরদিন সকালে শাহেদ আবার গেল নায়লাদের বাসায়। শাহেদকে চা-নাস্তা দিয়ে অনেকক্ষণ হলো ভিতরে চলে গেছে নায়লা—প্রাত্যহিক কিছু কাজ সারার জন্যে। শাহেদ চুপচাপ বসে আছে। রাজ্যের ভাবনা তার মাথায়।
নায়লা মাঝে মাঝে ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে দেখল, শাহেদ তার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
নায়লা তার হাতের কাজগুলো শেষ করে অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে দেখল শাহেদ ঠিক একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে বসে আছে। চা-নাস্তা যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই পড়ে আছে টেবিলে। শাহেদ ছুঁয়েও দেখেনি।
নায়লা বসার ঘরের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, প্রায় পনের মিনিট হলো আপনি এভাবে ঝিম ধরে বসে আছেন। চা-টাও তো খাননি। সমস্যা কী?’
শাহেদ তাকাল নায়লার দিকে, ভাবলেশহীন চাহনি নিয়ে।
‘কী বলবেন বলেন।’
‘শায়লা একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। একটা না, আসলে কয়েকটা—বেশ কয়েকটা।’
‘তাই? কী লিখেছে?’
শাহেদ তার মোবাইল ফোন থেকে মেসেজ বের করে এগিয়ে দিল নায়লার দিকে। বলল, ‘পড়ে দেখো।’
নায়লা শাহেদের হাত থেকে ফোন নিয়ে মেসেজগুলি দেখল।
শাহেদ বলল, ‘পড়ো।’
‘জোরে পড়ব?’
‘পড়ো। জোরেই পড়ো, দেখো কি লিখেছে তোমার লাভিং সিস্টার!’
নায়লা পড়া শুরু করল।
ইমিগ্রেশন ডিপোর্টেশন এবং অপেক্ষার গল্প (পর্ব-২)
পাঠক, আসুন এবার আমরা পরিচিত হই ছেলেটি, তার বোন, আর বাবা এবং সর্বোপরি মায়ের সঙ্গে।
ছেলেটির নাম আদনান। বয়স এগারো বছর। তার জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মহানগরী নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকাতে বসবাসরত এক বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারে। তার বাবা, শোয়েব খান—একজন স্থায়ী অভিবাসী, পেশায় ট্যাক্সিচালক। তার মা শিরিন খান, আমেরিকায় এসেছিলেন ভিজিট ভিসা নিয়ে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন অবৈধ অভিবাসী। কাজ করেন একটা হার্ডওয়ার স্টোরে ক্যাশিয়ার হিসেবে। ৫ম গ্রেডের ছাত্র আদনান একটি পাবলিক স্কুলে যায়। অঙ্ক তার প্রিয় বিষয়। ড্রাগন বল জি তার প্রিয় ভিডিও গেম।
পরিচয়ের পালা শেষ। আসুন আমরা মূল গল্পে ফিরে যাই।
এক পড়ন্ত বিকেলে হাডসন নদীর তীরে বসে ওপারে ম্যানহাটনের স্কাইলাইনের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায় শোয়েব। আমেরিকার কঠিন জীবনের জাঁতাকলে কাজ করতে করতে যখন হাঁপিয়ে ওঠে—তখন মাঝে মাঝে শিরিনকে নিয়ে এসে এই নদীর তীরে বসে আনমনে তাকিয়ে থাকে সে।
শিরিনও চুপ করে থাকে। শোয়েবের সান্নিধ্য তাঁর অনেক ভালো লাগে। এই দেশটিতে শোয়েবই একমাত্র আপনজন তাঁর।
এক পর্যায়ে শিরিনের উদাস দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠে শোয়েব, ‘শিরিন, চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি। এভাবে আর কতদিন—একা একা আর ভালো লাগে না।’
শিরিন অবাক হয়ে তাকায় শোয়েবের মুখের দিকে। সে কী বলবে? তারও তো একা থাকতে ভালো লাগে না। কিন্তু যখনই পেছনের দিকে তাকায় সে—অনিশ্চয়তা জেঁকে ধরে তাকে। সে কী করবে?
ঠিক কত বছর আগে শিরিন এসেছিল এই স্বপ্নের ভূখণ্ড আমেরিকাতে তাঁর সঠিক সময় জানা না গেলেও, তাঁর স্বপ্নও ছিল অন্য সবার মতো অভিন্ন। সবার মত সেও স্বপ্ন দেখেছিল—একদিন তারও একটা গ্রিনকার্ড হবে। ভেবেছিল এসে যখন এসেই পড়েছি—ব্যবস্থা একটা নিশ্চয়ই হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যবস্থাই আসলে হয় না। এক সময় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কোনো উপায়ান্তর না দেখে স্থানীয় এক বাঙালি আইনজীবীর সহায়তায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে সে। কিন্তু পর্যাপ্ত এবং গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট এবং এভিডেন্স না থাকায় তার আবেদন গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। অন্য হাজারো ইমিগ্রান্টদের মতো ডিপোর্টেশন এড়াতে গা ঢাকা দেয় শিরিন। তারপর সেলস গার্লের কাজ জুটিয়ে নেয় একটা পরিচিত দোকানে। একসময় পরিচয় ঘটে গ্রিনকার্ডধারী শোয়েবের সাথে। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা। ট্যাক্সি চালিয়ে ক্লান্ত শোয়েব সুযোগ পেলেই চলে যায় শিরিনের কাজের জায়গায়। শিরিনের সাথে সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে যায় শোয়েব।
‘তুমি তো সব জানোই শোয়েব। একটা অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাইছ কেন?’ বলে শিরিন।
‘জড়াতে চাইছি কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর ছাড়া তুমিতো কোনো অপরাধ করোনি।’
‘এদেশে অবৈধভাবে থাকাটাই তো বড় অপরাধ।’ এটুকু বলে আবার আনমনে তাকিয়ে থাকে হাডসন নদীর পানির দিকে। শোয়েবও আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শিরিন আবার বলে, ‘এদেশের আইন সম্পর্কে তুমি ভালো করেই জানো—একবার ডিপোর্টেশনের অর্ডার হয়ে গেলে বিয়ে করেও কোনো লাভ নেই। আর তুমি সিটিজেন হলেও একটা কথা ছিল—তাতেও কিছু হতো বলে আমার মনে হয় না।’
‘এত ভাবছ কেন? যদি সত্যিই কিছু ঘটে যায়, সেটা তখন দেখা যাবে। কিন্তু এভাবে একা একা আমি তোমাকে কষ্ট করতে দেব না। আমি তোমার জীবনের ভাগীদার হতে চাই।’
‘আচ্ছা আমি ভেবে দেখি।’
‘ভাবা-ভাবির কিছু নেই। আমেরিকাতে তোমার মতো হাজার হাজার ইমিগ্রান্ট আছে—যাদের বৈধ কাগজ পত্র নেই। তারা থাকতে পারলে তুমি পারবে না কেন?’
শিরিন কিছু বলতে পারে না। আবারো অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
‘যা হবার হবে—আই ওয়ান্ট টু ম্যারি ইউ অ্যান্ড দ্যাটস ফাইনাল।’
এভাবেই দুজনে দুজনকে ভালো লাগা থেকে প্রেম—অতঃপর সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার শোয়েব আর শিরিন। বিয়ে করে শুরু করে সংসার। সময়টা তাদের ভালোভাবেই কেটে যায়। জন্ম হয় দুই সন্তানের। হেসে খেলে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে যায়। এগারো বছরের ছেলে আদনান আর মেয়ে দুই বছর বয়সী রাফিয়া।
বিয়ের পরপরই শিরিন আবেদন করেন বৈধ হবার জন্যে। কিন্তু আমেরিকার ইমিগ্রেশন আইনে একবার কেউ ডিপোর্টেশনের অর্ডার পেলে তা বাতিল করা খুবই দুরূহ। আর ধরা পড়লে আমেরিকা ছাড়তেই হবে এবং সেটাই ঘটেছে শিরিনের ভাগ্যে। ঘটনা হয়ত এতদূর গড়াতো না। কিন্তু ৯/১১ এর ঘটনা বদলে দিয়েছে সব কিছু। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার করছে হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসীকে। শিরিনকেও ধরা হলো এমনি একটা অভিযানে।
গত বসন্তের কোনো এক ভোরে—রাতের আঁধার তখনও পুরোপুরি কাটেনি, আদনান আর রাফিয়া তখনও ঘুমিয়ে। মুহূর্তে উলট পালট হয়ে যায় তাদের আমেরিকার স্বপ্নের জীবন। ইমিগ্রেশন পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে হাতকড়া পরিয়ে তাদের মা শিরিনকে নিয়ে যায় নিউ জার্সির এক ডিটেনশন সেন্টারে। কারণ আর কিছু না—সেই পুরনো ডিপোর্টেশন অর্ডার। সেখানেই তাকে থাকতে হবে শিরিনকে যতদিন না তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। আমেরিকায় একবার কোনো অভিবাসীকে ডিপোর্ট জরা হলে দশ বছরের আগে তাঁর পক্ষে আমেরিকায় এন্ট্রি করা সম্ভব হয় না।
শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছোট ছোট দুটো ছেলে-মেয়ে মাকে ছাড়া থাকবেই বা কী করে? একা কাজ আর বাসার কাজ সামলে ছেলেমেয়ে দুটোকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না শোয়েব। সে আবার ল’ইয়ার ধরল। অনেক চেষ্টা তদবির করল। ছোট বাচ্চা দুটির দোহাই দিল—কিন্তু আইনের মন গলাতে পারল না। তাদের একটাই কথা, যে অবৈধ সে অবৈধ। সে ভালো হলেও—খারাপ হলেও। এখানে মানবিকতা দেখানো সুযোগ নেই।
নিয়মানুসারে শিরিনকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। শিরিনের চলে যাওয়া যখন নিশ্চিত, উপায়ান্তর না পেয়ে শোয়েব বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়—আদনান আর রাফিয়াকে শিরিনের সঙ্গে দেশে পাঠিয়ে দেবে। সে তখন ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টকে অনুরোধ করল—তাদের বাচ্চা দুটোকে তাদের মায়ের সঙ্গে দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁর অনুরোধ রক্ষা করল। তারাই সব ব্যবস্থা করে দিল যাতে একই ফ্লাইটে মা এবং সন্তানেরা বাংলাদেশে যেতে পারে। এবং সেভাবেই সব কিছু ঠিক করা হয়।
এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তারপরেই ঘটে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বেদনাদায়ক ঘটনা।
ইমিগ্রেশন থেকে সিদ্ধান্ত হলো কুয়েত এয়ারওয়েজের একটা ফ্লাইটে মায়ের সাথে বাচ্চারাও যাবে। ডিটেনশন সেন্টার থেকে শিরিনকে নেয়া হলো সোজা এয়ারপোর্টে। ইতোমধ্যেই আদনান আর রাফিয়া বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে উঠে পড়েছে বিমানে। যেহেতু পূর্বেই কাগজ-পত্রে নির্দেশনা ছিল তাই আদনান আর রাফিয়ার ইমিগ্রেশন আর বোর্ডিং করতে কোনো ঝামেলা হলো না।
কিন্তু ঝামেলা হলো অন্যখানে। কুয়েত এয়ারওয়েজ ভিসার জটিলতার কারণে শিরিনকে বোর্ডিং করাতে রাজি হলো না। শিরিনের দায়িত্ব ছিল যেই ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে সে শিরিনের পাসপোর্টে লে-ওভারের জন্যে ট্রানজিট ভিসা লাগাতে ভুলে যাওয়ায় এই বিপত্তি দেখা দিল। শিরিনকে আবার ফেরত পাঠানো হলো ডিটেনশন সেন্টারে।
এদিকে বাচ্চারা যথারীতি পরিকল্পনা অনুসারে বিমানে উঠে পড়েছে। সময় গড়িয়ে যায়। কিন্তু মায়ের দেখা আর মেলে না। বিমানে বসে তারা অপেক্ষা করতে থাকে তাদের মায়ের জন্যে।
সব কিছু ঘটে গেল শোয়েবের অজান্তেই। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ করল না।
আদনানের ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেল। সে কী করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমান আকাশে উড়াল দিল। ছোট মানুষ—ভয়েই হোক আর বুঝেই হোক কান্নাকাটি না করে ভেবেছে পরে খোঁজ নিবে। ওর বদ্ধমূল ধারণা ছিল ওর মা এই বিমানেই আছে—সম্ভবত অন্য কোথাও তাকে বসিয়েছে, যেহেতু তাকে ডিপোর্ট করা হয়েছে। হয়ত তার জন্য ভিন্ন নিয়ম। যদিও তার কাছে পরিষ্কার নয় যে তাদের মায়ের অপরাধটা কী এবং কেনই বা তাকে চলে যেতে হচ্ছে। আদনানের নিজের মধ্যেও এক ধরনের হীনমন্যতা গ্রাস করল। সে কান্নাকাটি না করে কীভাবে মায়ের সন্ধান বের করা যায় সে চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল।
কাঁদতে কাঁদতে এবং ক্লান্তিতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ল রাফিয়া। শুধু আদনানের চোখে ঘুম নেই। হঠাৎ করেই সে যেন পূর্ণ বয়স্ক এক মানুষ হয়ে গেল সে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, যে করেই হোক কুয়েতে নেমেই তাঁর বাবার সাথে কথা বলবে। সে নিশ্চয়ই মায়ের কী ঘটেছে বলতে পারবে।
ইতিমধ্যেই এয়ার হোস্টেস বিমানের সব যাত্রীর তালিকা থেকে খুঁজে খুঁজে দেখল অন্য কেউ বাংলাদেশে যাচ্ছে কিনা এবং একজনকে পেয়েও গেল। তাকে সব কথা জানানোর পর সে আগ্রহ নিয়ে আদনান আর রাফিয়ার সঙ্গে বাকিটা পথ ওদের সাথেই থাকল।
কুয়েত এয়ারপোর্টে অবতরণের পর বাংলাদেশি ভদ্রলোক আদনানের কাছ থেকে ওর বাবার ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করল শোয়েবকে। অপরপ্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই, আদনান কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাবা, হোয়াট হ্যাপেন্ড টু মামি? শি ইজ নট উইথ আস। শি ডিড নট বোর্ড ইন দিস প্লেন। উই আর গোয়িং এলোন। হোয়্যার ইজ মামি?’
শোয়েব কিছু বুঝে উঠতে পারল না। আদনান কী বলছে? সে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলছ, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।’
আদনান আবার তাকে পুরো বিষয়টা খুলে বলল। সব শুনে এবং বুঝতে পেরে শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জানতে চাইল, ‘হাউ ইজ রাফিয়া ডুইং? ইজ শি ওকে?’
‘নো শি ইজ নট—শি ইজ ক্রায়িং অল দ্য টাইম। শি ইজ জাস্ট এ লিটল গার্ল। শি ইজ কিপ অন ক্রায়িং অ্যান্ড শি ডিড নট ইট এনিথিং। আই ডোন্ট নো হোয়াট টু ডু।’ বলেই আদনান আবার কাঁদতে থাকল।
শোয়েব মূর্তির মতে বসে রইল ফোন হাতে। সে কথা বলতে ভুলে গেল। আদনান আবার বলল, ‘প্লিজ টক টু রাফিয়া।’ আদনান রাফিয়ার হাতে ফোন দিল।
ফোন হাতে নিয়ে রাফিয়া অবাক করা কাণ্ড ঘটাল। কোনো ধরনের কান্নাকাটি না করে বাসা থেকে সে তাঁর বাবা যখন বাইরে থাকে তখন যেভাবে কথা বলে ফোনে ঠিক সেভাবেই কথা বলল।
‘কেমন আছ আম্মু?’
‘গুড।’
‘শোনো আম্মু, ইয়োর মামি একচুয়ালি মিসড দ্য ফ্লাইট, দ্যাটস হোয়াই শি কুডন’ট গো উইথ ইউ। বাট শি ইজ গোয়িং ইন দ্য নেক্সট ফ্লাইট। হোয়েন ইউ এরাইভড—শি উইল বি দেয়ার। ডোন্ট ক্রাই, ওকে আম্মু?’ মেয়েকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে সে ভেবে পেল না। বাধ্য হয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিল।
‘ওকে।’ রাফিয়া বলল।
ভদ্রলোক অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছিল। তাঁর ফোনে ইন্টারন্যাশনাল রোমিং চার্জ উঠছে কিনা কিংবা সে চিন্তায় চিন্তিত কিনা ঠিক বোঝা গেল না। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতা অনুভব করে সে বিষয়টি মেনে নিল। মানুষের বিপদ বলে কথা। আর এমন ছোট ছোট দুটি বাচ্চা—এভাবে বিপদে পড়েছে। সে ফোন কেটে দেবার আগে শোয়েবের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল। এটুকু ভদ্রতা তো তাকে করতেই হবে। সে বলল, ‘ভাই আপনি একেবারেই ভাববেন না। আপনার বাচ্চাদেরকে আমি সহি সালামতে পৌঁছে দেব। আমার ফোন নাম্বারটা দিচ্ছি আপনাকে। আপনি দেশে জানিয়ে দিন। যারা ওদেরকে নিতে আসবে, আমার ফোনে কল দিলেই হবে। আপনি বরং ওদিকটা সামলান।’
‘আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দিব ভেবে পাচ্ছি না। আল্লাহ সত্যিই মহান। আপনি না থাকলে আমার বাচ্চা দুটোর কী হতো আমি ভাবতেই পারছি না। আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনার ভালো করবেন।’
‘ঠিক আছে ভাই রাখছি। আপনি টেনশন করবেন না। আমি ঢাকায় ল্যান্ড করা মাত্রই আপনাকে ফোন করে জানিয়ে দিব।’ আর কথা না বাড়িয়ে ভদ্রলোক লাইন কেটে দিলেন।
তাদের সাথে শিরিন নেই। একথা শোনার পর শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সাথে। অবাক করা বিষয় হলো, সেখান থেকে তাকে জানানো হলো, এ ব্যাপারে তাদের কিছুই করার নেই। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল অথচ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ শোয়েবকে সে কথা জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করে নাই। এর চেয়ে অমানবিক ঘটনা আর কী হতে পারে!
এর পরে কেটে গেল আরো দশ দিন। জীবনে প্রথমবারের মতো মা-বাবা ছাড়া সম্পূর্ণ কিছু অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কাটল আদনান আর রাফিয়ার। পরিবেশ খাবার, বাংলা বলতে এবং বুঝতে না পারা—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় জীবন কাটল বাচ্চা দুটোর।
দশ দিন পর শিরিনকে পাঠানো হলো বাংলাদেশে।
মাকে কাছে পেয়ে আদনান আর রাফিয়া যেন জীবন ফিরে পেল। মাকে কাছে পেয়েছে ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশে তো ওদের ভালো লাগে না। আমেরিকায় জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা ছেলে মেয়েদের জন্য সেটা একটা সমস্যাই তো। তবুও মন্দের ভালো অন্তত তাদের মাকে তারা কাছে পেয়েছে। খারাপ লাগলেও মেনে নিচ্ছে।
কাজ থেকে ফিরে শোয়েব প্রায় প্রতিদিনই একবার করে ফোন দেয় দেশে। কথা বলে স্ত্রী-ছেলে আর মেয়ের সাথে। আদনানের সঙ্গে কথার সময় হলে আদনান কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি আমেরিকায় ফিরে যেতে চাই। আই ওয়ান্ট টু গো ব্যাক বাবা। ’
শোয়েব চুপ করে থাকে। সে কী বলবে? দীর্ঘ সময় পার করে সে আস্তে করে বলে, ‘আমিওতো চাই বাবা। আমিও তো চাই।’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে শোয়েবের। সে আর কিছু বলতে পারে না।
একবার ডিপোর্টেশন অর্ডার পেলে দশ বছরের মধ্যে আর আমেরিকার ভিসার জন্যে আবেদন করা যায় না। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা। শোয়েব, শিরিন, আদনান আর রাফিয়া—সবাই অপেক্ষা করছে। একদিন হয়তো সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তখন ওরা সবাই আবার একসঙ্গে হবে।
নিশ্চয়ই একদিন সব অপেক্ষার অবসান হবে। আমরাও অপেক্ষায় থাকি সেদিনটির।
(সমাপ্ত)
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন
হৃদয়ে আগন্তুক (শেষ পর্ব)
শেষ রাতের দিকে হঠাৎ করেই হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল। অস্বস্তি নিয়ে চোখ মেলে তাকাল। পাশ ফিরে দেখল তিথি বিছানায় নেই। সে উঠে বসে তাকাল চারিদিকে। উঠে গিয়ে লাগোয়া বাথরুমের দরজা ধাক্কা দিয়ে দেখল, সেখানেও নেই। হাসান জানে তিথির একটা মন খারাপের জায়গা আছে। পেছনের জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখল—যা ভেবেছিল তাই। তিথি ব্যাক-ইয়ার্ডের সিঁড়িতে বসে আছে। কাকতালীয় ভাবে ঠিক ঐ একই জায়গায় বসে ছিল রূপা। রূপার কথা মনে হতেই হাসান ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলল।
…
আকাশ হঠাৎ করে গাড়ির গতি কমিয়ে দিল। সে পরের এক্সিট দিয়ে বের হয়ে থামল একটা ফাঁকা মাঠের সামনে। বেগুনি-নীলে মেশা ব্লুবনেটস ফুলে ছেয়ে আছে সারা মাঠ। টেক্সাসের জাতীয় ফুল ব্লুবনেট। শহুরে টিপটপ গোলাপ বাগানের থেকে একদম আলাদা এই বনফুল। কাউ বয় বা কাউ গার্লের মতোই গ্রাম্য, সাধারণ কিন্তু সুন্দর।
আকাশ গাড়ির জানালা নামিয়ে দিল। ঝিরিঝিরি ঠাণ্ডা বাতাস বইছে বাইরে। জানালা খোলা মাত্রই এক পশলা ঠাণ্ডা বাতাস এসে লাগল রূপার মুখে। রূপা চোখ বন্ধ করে ছিল। হঠাৎ বাতাসের স্পর্শে সে চোখ মেলে তাকিয়ে একবার দেখল চারিপাশটা তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কি ব্যাপার আকাশ, এখানে থামলে কেন? এনিথিং রং?’
আকাশ তাকিয়ে আছে সামনে যতদূর দৃষ্টি যায়। দিগন্ত রেখায় লাল সূর্যের আভা দেখা যাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সূর্য উঁকি দেবে। বিস্তৃত খোলা মাঠে বিছানো ব্লুবনেটসের উপর দিয়ে যখন সূর্য হাসবে তখন সে রূপাকে বলবে তার মনের কিছু না বলা কথা। রূপার সঙ্গে আবার কোনদিন দেখা হতে পারে সেটা সে স্বপ্নেও কোনদিন ভাবে নি। কিন্তু প্রকৃতির রহস্য বোঝা বড়ই কঠিন। এটা প্রকৃতির রহস্য নয়ত কী? আকাশের দৃঢ় বিশ্বাস, প্রকৃতির ইচ্ছেতেই রূপার সাথে তার এভাবে আবার দেখা হয়েছে। সে সিদ্ধান্ত নিয়ে নিল, রূপাকে তার না বলা কথা গুলো বলতেই হবে। কিন্তু রূপার যা মনের অবস্থা এখন সেখানে তাকে আবার একটা দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলতেও সে চাচ্ছে না। আকাশ রূপার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে চুপচাপ তাকিয়ে রইল সূর্য উঠার অপেক্ষায়।
…
হাসান প্রায় নিঃশব্দে পেছনের দরজা খুলে এসে দাঁড়াল তিথির পাশে। তিথি মাথা ঘুরিয়ে দেখল হাসানকে। কিন্তু কোনো কথা না বলে আবার তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। হাসান বসল তিথির পাশে। কেউ কারো সঙ্গে কথা না বলে দুজনেই তাকিয়ে রইল সামনের দিকে। এ যেন একদৃষ্টে শূন্যে তাকিয়ে থাকার খেলা। কে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে। একটা লম্বা সময় পার করে হাসান বলল, ‘সারারাত ঘুমাওনি তাই না?’
তিথি কোনো উত্তর দিল না। অস্বস্তিকর নীরবতা।
কিছুক্ষণ পর হাসান আবার বলল, ‘তোমাকে একটা কথা বলতে চাই, তিথি!’
…
আকাশ গাড়ি থেকে নেমে বাইরে এসে দাঁড়াল। রূপাও এসে দাঁড়াল তার পাশে। চারিদিকে একবার তাকিয়ে অসম্ভব রকম ভাল লাগায় ভরে গেল তার মন। নীল-বেগুনীর মিশ্রণে বিছানো ব্লুবনেটসের চাদরের দিকে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ। তারপর আকাশের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বলো কি বলতে চাও?’
…
হাসান একটা গভীর নিঃশ্বাস নিয়ে থেমে থেমে বলল, ‘আমি সত্যিই দুঃখিত এবং লজ্জিত। আমি তোমাকে কষ্ট দিয়েছি। আমার আচরণে তুমি কনফিউজড হয়েছ। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমার মনে কোন লুকান অভিপ্রায় ছিল না। আমি যা করেছি, তার কোন ব্যাখ্যা হয়ত আমি দিতে পারব না। কিন্তু আমি স্বীকার করছি—আমার ভুল হয়েছে।’
তিথি হাসানের দিকে ফিরেও তাকাল না। যেভাবে ছিল সেভাবেই তাকিয়ে রইল সামনের দিকে।
…
রূপা তাকিয়ে আছে আকাশের মুখের দিকে। আকাশ ধীরে ধীরে বলল, ‘আমি একজন হতভাগ্য মানুষ। জীবনে কিছুই পাওয়া হলো না। সারাজীবন কেমন যেন মরীচিকার পেছনে দৌড়ে, জীবনটাকেই মাটি করলাম শুধু। যা পাওয়ার জন্য এই ট্র্যাকে দৌড় শুরু করেছিলাম একদিন—তা কি আমার কোনদিনই পাওয়া হবে না, রূপা?’
‘আমি তোমার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না, আকাশ।’ রূপা তাকিয়ে রইল আকাশের মুখের দিকে।
…
হাসান আবার বলল, ‘প্রত্যেক মানুষের জীবনেই একটা সময় আসে, যখন সে তার পারিপার্শ্বিকতা এবং বাস্তবতা ভুলে গিয়ে নিজের ইমোশনকে বেশী প্রশ্রয় দিয়ে বসে। অবশ্য একসময় সে তার ভুল বুঝতে পারে এবং অনুশোচনাও করে।’
…
আকাশ আবার বলল, ‘মাঝে মাঝে ভীষণ অবাক হতাম আবার ভালও লাগত! মানুষে মানুষে এতো ভালবাসা কখনো দেখিনি আমি।’
‘কার কথা বলছো তুমি?’ রূপা অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘পার্থর মত একটা বোহেমিয়ান অগোছালো ছেলেকে তোমার মতো দীপ্তিময়ী একটা মেয়ে সারাক্ষণ আগলে রাখত। দেখে অবাক হতাম। তোমার কাছে এলেই সে খুঁজে পেত তার আপন নীড়ের ঠিকানা।’
…
হাসান বলল, ‘আমি জানি না, আমার কি হয়েছিল তিথি। কেন জানি না, আমিও হঠাৎই আমার বাস্তবতাকে ভুলে গিয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও আমার ইমোশনকে প্রশ্রয় দিয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমি তোমাকে ঠকাইনি।’
…
আকাশ বলল, ‘আমি জানি না, আমি কেন তোমাকে বলতে পারিনি তখন। কেন জানি না আমিও পার্থর মত পালিয়ে গিয়েছিলাম, হয়ত তোমাকে আমার পাওয়া হবে না কোনদিনই, হয়ত সেই ভয়েই… কিন্তু এমন একটা নীড়ের ঠিকানা আমার বড় প্রয়োজন এখন।’
…
হাসান বলল, ‘আমি জানি তুমি অনেক শক্ত মনের মানুষ, সহনশীল, বুদ্ধিমতী। তবুও তোমার মনে যদি কিছুমাত্র সন্দেহ থেকে থাকে…’ বলেই হাসান তার একটি হাত তিথির কাঁধের উপর দিল, তারপর আবার বলল, ‘এই নতুন সূর্য উঠা ভোরের আলোতে আমি তোমাকে ছুঁয়ে বলতে পারি তিথি, রূপা আর আমার মাঝে কিছুই ঘটেনি।’
…
রূপা তাকিয়ে আছে অনেকদূরে।
আকাশ বলল, ‘যে কথাটা তোমাকে এক জীবনে বলতে পারিনি, তা বলার উপযুক্ত সময় হয়ত এখন না। পাছে তোমার মনে হতে পারে আমি তোমার অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছি।’
‘এখন আর কোন কিছুতেই আমি কিছু মনে করি না, আকাশ। তোমার সাথে এভাবে দেখা না হলে, আমি হয়ত তিথির ওখানেই আরো দুটো দিন থেকে তারপর আমার গন্তব্যে চলে যেতাম। কাজেই…’
‘আমি জানি জীবনে অনেক কষ্ট তুমি পেয়েছো। অনেক ঘাত-প্রতিঘাতে তুমি হয়ত এখন অন্যরকম হয়ে গেছ। তবুও—এই নতুন সূর্য উঠা ভোরের আলোতে আমি তোমার কাছে একটা অনুরোধ করতে চাই, তুমি রাখবে?
রূপা অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘কি অনুরোধ?’
‘আমি যদি তোমাকে আর ফিরে যেতে না দেই, তুমি থাকবে এখানে? এই দেশে? আমার সাথে—নীল সমুদ্রের পাড়ে?’ একটু থেমে আকাশ যোগ করল, ‘একের পর এক বিশাল ঢেউ আছড়ে পড়ছে তীরে। সামনে বিশাল সমুদ্র। নীল আকাশ জুড়ে জ্যোৎস্নার লুটোপুটি খেলা। চোখ বন্ধ করতেই কানে সমুদ্রের গর্জন। দেখবে না তুমি?’
রূপা প্রথমেই কিছু বলতে পারল না। চুপ করে থাকল। তার মনের মধ্যে কীসের যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। কিছুক্ষণ ভেবে সে ঘুরে দাঁড়াল আকাশের দিকে। তারপর হেসে দিয়ে বলল, ‘উত্তরটা কি তোমার এখনই চাই?’
রূপার হাসিতে এমন কী ছিল কে জানে, আকাশ অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে। সে জানে এই হাসির গভীরতায় কি লুকিয়ে আছে। এই হাসি একটি বিশ্বাসের হাসি। এই হাসির অর্থ হলো আমি আছি তোমার সাথে।
আকাশ হাত বাড়িয়ে দিল রূপার দিকে। কোন দ্বিধা না করেই রূপা ধরল তার হাত। তারা দুজন-দুজনের হাত ধরে তাকিয়ে রইল সামনে। ব্লুবনেটসের চাদরে ছাওয়া বিস্তৃত খোলা মাঠের উপর দিয়ে দিগন্ত রেখায় তখন নতুন সূর্য হাসছে।
…
হাসান অনেকক্ষণ আর কিছু বলল না। তার যা বলার ছিল বলা হয়েছে। এখন তিথি কি বলে সেটা জানার জন্যে সে তাকিয়ে রইল তার মুখের দিকে।
তিথি হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল। সে কাঁধ থেকে হাসানের হাত সরিয়ে দিল আস্তে করে। তারপর যেভাবে সামনে তাকিয়ে ছিল সেভাবেই বলল, ‘তোমার কথা শেষ হয়েছে?’
হাসান চুপ করে থাকল। সে আর কিছু বলছে না দেখে তিথি আবার বলল, ‘এবার তাহলে আমার কিছু কথা তুমি শোনো।’
হাসান অবাক হয়ে তাকাল।
তিথি বলল, ‘আই নিড এ ব্রেক। তিতলিকে নিয়ে আমি কিছুদিন আলাদা থাকতে চাই।’
হাসান ভাবতেই পারেনি তিথি এমন কিছু বলবে। তার এই রূপও সে আগে কখনো দেখেনি। সে কিছুটা ভড়কে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন?’
‘কারণ, তোমার সঙ্গে এক ঘরে এক বিছানায় আমার ঘুমতে কষ্ট হচ্ছে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। আই ফিল সাফোকেটেড—আই নিড টু ব্রিদ।’
হাসান পাংশু মুখে তাকিয়ে রইল। সে কিছু খুঁজে পেল না কি বলবে।
তিথি আবার বলল, ‘তুমি জানতে চাইলে, সারারাত ঘুমাই নি, তাই না? ইয়েস, দ্যাটস রাইট—আমি সারারাত ঘুমাই নি। নট এ সিঙ্গেল মিনিট। চেষ্টা করেও পারিনি। তুমি আমার ঘুম নষ্ট করে দিয়েছ!’
হাসান চুপ করে থাকল।
তিথি তার সমস্ত রাগ-ক্ষোভ, অপমান-অভিমান একসাথে উগড়ে দিচ্ছে একের পর এক। সে বলে চলল, ‘যে নোংরা কথা গুলো তুমি আমাকে বলেছ, যে ক্ষত তুমি সৃষ্টি করেছ—ভেবেছ একবার ‘সরি’ বলাতেই সব মুছে যাবে?’
হাসান কোনো উত্তর না দিয়ে পেছনের রাস্তার দিকে তাকাল।
‘বিশ্বাস হলো কাচের মত—একবার ভেঙ্গে গেলে যতই জোড়া লাগানো হোক না কেন দাগ ঠিকই থেকে যায়! আমার কষ্ট টা কি জানো?’ বলেই তিথি সরাসরি তাকাল হাসানের চোখের দিকে। হাসান অস্বস্তি বোধ করলেও চোখ সরাল না। তিথি আবার বলল, ‘আই’ম নট আপসেট দ্যাট ইউ হার্ট মাই ফিলিংস—আই’ম আপসেট দ্যাট ফ্রম নাউ অন আই ক্যান্ট বিলিভ ইয়্যু! ইয়্যু ব্রোক মাই ট্রাষ্ট—বাট আই উন্ট লেট ইউ ব্রেক মি!’
হাসান হঠাৎ করে বাতাস চলে যাওয়া বেলুনের মত চুপসে গেল। সে আর কিছুই ভাবতে পারছে না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে উঠে দাঁড়াল তিথি। তারপর ঘুরে চলে যাওয়ার জন্য কয়েক পা বাড়াতেই-
হাসান বলল, ‘ক্যান আই গেট এ লাস্ট চান্স?’
তিথি ঘুরে তাকাল। একবার গভীর দৃষ্টি নিয়ে দেখল হাসানকে। তিথি আগে থেকেই জানত, হাসান তাকে এসব কথা বলে প্রভাবিত করার চেষ্টা করবে। হাসান হয়ত যা বলেছে সব কথাই তার মন থেকেই বলেছে। হয়ত সে তার ভুল বুঝতে পেরেছে। সত্যি হোক আর মিথ্যা, তিথি সেগুলো নিয়ে আর ভাবতে চায় না। সে নিজের সঙ্গে অনেক বোঝাপড়া করেই সিদ্ধান্ত যা নেবার নিয়েছে। সে কিছুতেই তার সিদ্ধান্ত এক কথায় বদলে দিতে পারে না। তিথি আবার ঘুরে দাঁড়াল। এবার এক পা বাড়াতেই হাসান বলল-
‘গিভ মি ওয়ান লাস্ট চান্স—প্লিজ!’ হাসানের কণ্ঠে অনুনয় ঝরে পড়ল।
তিথি দাঁড়িয়ে পড়ল। হঠাৎ করে তার কী হলো—সে বুঝতে পারছে না সে কী করবে? তার কি উচিত হাসানকে একবার সুযোগ দেয়া? তার চিন্তা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
হাসানের মন বলছে তিথি তাকে ক্ষমা করে দিবে। সে অপেক্ষায় থাকল, এই বুঝি তিথি তার সেই মায়া ভরা হাসি দিয়ে এগিয়ে এসে হাসানের হাত ধরে বলবে, চলো সূর্য উঠা দেখি। হাসান হাত বাড়িয়ে দাড়িয়ে রইল—তিথির হাত ধরার অপেক্ষায়।
সারি সারি বাড়ির পেছনে বিস্তৃত খোলা লেকের পানির উপর দিয়ে দিগন্ত রেখায় তখন নতুন সূর্য হাসছে।
তিথি এখন কী করবে?
…
ব্লুবনেটসের তীর ঘেঁষে কান্ট্রি রোড দিয়ে আকাশের গাড়ি ছুটে চলেছে গন্তব্যে। এখনো যেতে হবে অনেকটা পথ। আকাশের চোখে কোনো ক্লান্তি নেই—নেই কোনো হতাশা, অস্থিরতা। এ যেন এক অন্য আকাশ। সে শীষ বাজিয়ে গাইতে থাকল জন ডেনভারের বিখ্যাত গান, ‘কান্ট্রি রোড টেক মি হোম!’
হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৮)
হাসান ভেবেছিল তিথিকে কিছুই বলবে না। তিথি এই মুহূর্তে সামনে না এলে হয়ত কিছু বলতও না। কিন্তু সে নিজেকে আর সংযত রাখতে পারল না। তাকে বলতেই হলো, ‘রূপার সামনে এভাবে রিয়্যাক্ট না করলেই কি হতো না, তিথি? ও তো এমনিতেই চলে যেত! এভাবে অপমান করে তাড়িয়ে দেবার তো কোন প্রয়োজন ছিল না।’
রূপা চলে যাবার পর থেকেই তিথি কাঁদছিল। সেই কান্নার রেশ ধরেই সে ফুলে ফুলে বলল, ‘আমি কাউকে অপমান করে তাড়িয়ে দেইনি, চলে যেতেও বলিনি।’
‘কিন্তু বাকীও তো রাখনি কিছু। তোমার কাছ থেকে অন্তত আমি এরকম আচরণ আশা করিনি।’
‘তাহলে কি আশা করেছিলে। চোখের সামনে সবকিছু দেখার পরেও চুপ করে থাকলেই তুমি খুশি হতে?’
‘আমি ভাবতে পারছি না। ব্যাপারটাকে এভাবে কমপ্লিকেটেড করে ফেলবে তুমি। কি লাভ হলো তোমার?’
‘আমার জায়গায় তুমি হলে কি করতে? তো তোমার কোনো ছেলে বন্ধুর সঙ্গে তুমি যদি আমাকে এভাবে দেখতে—হাউ উড ইউ ফিল? তুমি মেনে নিতে?’
হাসান সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে চুপ করে থাকল। কিছুক্ষণ পর আবার বলল সে, ‘তোমার যা বলার আমাকে একা বলতে পারতে। মেয়েটা কী ভাবল? নিজেকে এতো ছোট না করলে কি হতো না?’
‘ছোট হলে আমি হয়েছি, তুমি তো হওনি, তোমার এতো লাগছে কেন? আর রূপার ভাবনাটাই তোমার কাছে এখন বড় হয়ে গেল? আমি কী ভাবছি বা ভাবতে পারি, তাতে তোমার কিছু এসে যায় না? নাকি তুমি কেয়ার করো না?’
‘কেন কেয়ার করব না? অবশ্যই করি।’
‘তাহলে?’
‘তাহলে আর কি? বলেছি তো ভুলটা আসলে আমারই হয়েছে…’ বলেই হাসান চলে যেতে উদ্যত হতেই তিথি বলল-
‘অবশ্যই তোমার ভুল। তোমার কারণেই আজ রূপা আর আমি দুজন দুজনের কাছে ছোট হয়ে গেলাম।’
‘হ্যাঁ আমার ভুল হয়েছে—আমি রূপাকে সময় দিয়েছি, তাকে নিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি। কিন্তু সেটা তো আমার করার কথা ছিল না। ছিল তোমার অথবা আমাদের একসাথে। তোমার বেস্ট ফ্রেন্ড দেশ থেকে এসেছে অথচ তুমি দু’টো দিন ছুটি নিতে পারনি। আমার কাছে ফেভার চেয়েছ অথচ আবার আমাকেই ব্লেম করছ।’
‘হ্যাঁ ফেভার চেয়েছিলাম কারণ আমার কাজে অনেক প্রেশার ছিল। আর ফেভার চেয়েছি বলেই কি তুমি…’
‘কি? কি করেছি আমি? তুমি এমন ভাবে রিয়্যাক্ট করছ, যেন মনে হচ্ছে আমাকে আর রূপাকে একসাথে…’
হাসান পুরো কথাটা শেষ না করলেও তিথির বুঝতে অসুবিধা হলো না সে কী বলতে চেয়েছিল। তিথি অবিশ্বাস্য চোখে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
হাসান আবার বলল, ‘আরে বাবা, ব্যাক-ইয়ার্ডে সে আমার হাত ধরেছিল, শুধু এটুকু বলার জন্যে যে হাউ গ্রেটফুল শী ইজ—আমাদের প্রতি সে কৃতজ্ঞ। দ্যাটস অল।’
কিছুক্ষণ আর কেউ কিছু বলল না। ‘কেউ কী আমার কষ্টটা বুঝবে?’ হঠাৎ তিথি হাসানকে নয়—নিজেকেই যেন বলল কথাটা।
এবার হাসান একটু নরম স্বরে বলল, ‘আই ফিল ইয়োর পেইন তিথি, আই রিয়েলি ডু। আই কজড ইউ পেইন অ্যান্ড আই’ম রিয়েলি সরি ফর দ্যাট।’
তিথি আর কিছু বলল না। নীরবে কাঁদতে থাকল।
হাসান কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে সরে গেল তিথির সামনে থেকে।
তিথি কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। কান্নার দমকে বুকটা ফুলে ফুলে উঠছে।
তিতলি দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখছিল। বড়দের কথার মধ্যে আসতে হয় না, তাই সে কাছে আসেনি। মাকে কাঁদতে এই প্রথম দেখছে না তিতলি। বাবার সঙ্গে ঝগড়া হলে আগেও কেঁদেছে। কিন্তু এইভাবে ফুলে ফুলে নিঃশব্দে কান্নাটা অন্যরকম। তিতলির বুকের ভিতরটা কেমন যেন মুচড়ে উঠল।
হাসান সরে যেতেই তিতলি গুটি পায়ে এগিয়ে এসে মাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর আস্তে করে বলল, ‘মামি, এভ্রিথিং উইল বি অলরাইট। সব ঠিক হয়ে যাবে।’
…
বেশ কিছু দূর যাওয়ার পর আকাশ পাশে তাকিয়ে দেখল রূপা মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। সে নিশ্চিত, কিছু একটা হয়েছে কিন্তু সেটা কী জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কিনা সে বুঝতে পারছে না। কিন্তু রূপার মলিন মুখটা দেখে তার খুব খারাপ লাগছে। হয়তো দুপুরে কিছু খায় নি। কে জানে? আকাশ রূপাকে জিজ্ঞেস করল, ‘দুপুরে খেয়েছ কিছু?’
রূপা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মাথা নাড়ল, ‘না।’
‘সকালে?’
রূপা আবারো মাথা নাড়ল, ‘না।’ তারপরে বলল, ‘চা খেয়েছি।’
‘শুধু চা? সারাদিন আর কিছু খাওনি?’ বলেই আকাশ গাড়ি থামাল হাইওয়ের পাশে একটা ফাস্টফুড রেস্টুরেন্টে। রূপা যেতে চাইল না। কিন্তু আকাশ নাছোড়বান্দা। রূপাকে নিয়েই সে ঢুকল রেস্টুরেন্টে।
…
সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। তিতলি আজ একা একা তার হোমওয়ার্ক শেষ করে রাতের খাবার খেয়ে শুয়ে পড়েছে। মামির গায়ের গন্ধ ছাড়া তার ঘুম আসেনা কিন্তু আজ তার মামির মন খারাপ। তাই সে তাকে আর না ডেকে একা কিছুক্ষণ চেষ্টা করে ঘুমিয়ে পড়েছে।
…
রূপা চুপ করে বসে আছে। আকাশ রূপার সামনে একটা ঢাউস সাইজের বার্গার এনে দিয়ে বলল, ‘নাও খাও!’
রূপা এত মন খারাপের মধ্যেও আকাশের কথা বলা আর ভাবভঙ্গি দেখে একটু হেসে দিল। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ আর ক্রেজী।’
আকাশ হেসে ফেলল। বলল, ‘ইউ আর রাইট।’ আকাশের কথার ভাবেই বলে দেয়—যার অর্থ দাঁড়ায়, তোমার জন্যেই আমার সব পাগলামি। তুমি যতক্ষণ পাশে আছ, আমি পাগলামি করেই যাব।
…
রাত বাড়ার সাথে সাথে হাসান উপলব্ধি করল, তিথির সাথে এভাবে কথা বলাটা তার ঠিক হয়নি। তার তো কোনো দোষ নেই। তিথি যা করেছে সেটা যে কোনো মেয়েই করবে। এমনকি হাসান নিজেও রিয়্যাক্ট করত। যতই ভাবছে তিথির জন্যে হাসানের মনটা ততই খারাপ হতে থাকল।
হাসান গেল তাদের রুমে। তিথি শুয়ে আছে চুপচাপ—বাঁকা হয়ে দেয়ালের দিকে মুখ করে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে কি না বোঝা যাচ্ছে না। হাসান আস্তে তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর হাত রাখল তিথির পিঠে। তিথি একটু কেঁপে উঠল। কিন্তু সে ফিরে তাকাল না। শক্ত হয়ে পড়ে রইল।
হাসান বলল, ‘সারাদিন কিছু খাও নি। চলো খাবে।’
তিথি নীরব।
হাসান আবারো বলল, ‘রাগ করেছো ঠিক আছে কিন্তু খাবে না কেন? উঠে এসো, খাওয়ার সঙ্গে রাগ করতে নেই।’
তিথি তবুও কিছু বলল না।
হাসান বলল, ‘আমিও কিন্তু সারাদিন কিছু খাই নি। তুমি না খেলে আমিও খাবো না।’ বলেই হাসান তাকে জোর করে টেনে তোলার চেষ্টা করল।
তিথি ঝটকা দিয়ে হাসানের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে বলল, ‘এ সব মেয়েলি ঢং আমার সঙ্গে দেখাতে এসো না। তুমি এখান থেকে যাও।’
‘একবার তো সরি বলেছি—আবারো বলছি। আই’ম সরি।’
‘শুধু সরি বললেই সব ঠিক হয়ে যায়?’ তিথি গায়ের উপর চাদর টেনে নিয়ে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে থাকল।
হাসান বুঝতে পারছে না কি করলে তিথির রাগ কমবে। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে বের হয়ে গেল।
…
আকাশের গাড়ি ইন্টারস্টেট হাইওয়ে-৩৫ ধরে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে। রাতের রাস্তায় গাড়ির সংখ্যা তুলনামূলক ভাবে অনেক কম। এতো রাতে মাঝে মাঝে দু’একটি ১৮ চাকার ট্রাক ছাড়া সাধারণ গাড়ি দেখা যাচ্ছে না। দু’দিকে মাঠের পর মাঠ খালি পরে আছে। কালো রাস্তা আচলের মত লম্বা করে বিছানো। হঠাৎ করেই একটি ১৮ চাকার ট্রাক পাশের লেনে চলে এসে ছুটছে সমান গতিতে। আকাশের হাতের স্টিয়ারিং সামান্য কেঁপে উঠল। সে তার গাড়ির গতি কমিয়ে দিয়ে ট্রাকটাকে চলে যেতে দিল। একবার তাকাল রূপার দিকে। রূপা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে—শূন্য দৃষ্টিতে।
…
তিথির চোখে ঘুম নেই। ক্লান্তি আর অবসাদগ্রস্ত শরীরটা নিয়ে শুয়ে ছিল বিছানায়। এপাশ ওপাশ করেছে অনেক, তবু ঘুম আসেনি। হাসানের সঙ্গে এক বিছানায় ঘুমাতে তার অস্বস্তি লাগছে। সে হাসানের ঘুমিয়ে পরা পর্যন্ত অপেক্ষা করে উঠে পড়ল।
তিথির বড় অভিমান হলো রূপার উপরে। সে যাই বলুক—তাই বলে এভাবে চলে যেতে হবে? একবার তার সাথে কথা বলে গেলে কী হতো? আকাশের সাথে যদি দেখা না হতো, তাহলে? তিথির নিজের উপরেও ভীষণ রাগ হলো। কিন্তু সেই বা কী করবে?
রূপা যদি কোনোদিন যোগাযোগ না করে তাহলে ওর সাথে আর কখনোই কথা হবে না। তিথির মনে ক্ষীণ আশা—হয়ত রূপা ওকে একবার ফোন দেবে। ফোনটা দেখা দরকার। সে দ্রুত গেল লিভিং রুমে। কিন্তু সেখানে ফোন নেই। তিথির সন্দেহ হলো—রূপা নিশ্চয়ই আকাশকে ফোন করেছিল, না হলে আকাশ জানবে কী করে যে রূপা চলে যেতে চায়? ভাবতে ভাবতেই সে গেল রূপার রুমে। দেখল ফোনটা নাইটষ্ট্যান্ডে। সে ফোন হাতে নিতেই দেখল একটা ভাঁজ করা কাগজ। তিথি কাগজটা খুলে দেখল রূপার লেখা কথা গুলো। সে একবার পড়ল। আবার পড়ল। পড়তে পড়তেই তার চোখ ভিজে উঠল।
তিথি কলার আইডি চেক করল। না কোন ফোন আসেনি। সে সেন্ট বাটনে চাপ দিয়ে দেখল একটা নাম্বার। সময় মিলিয়ে তিথি নিশ্চিত হলো এটা আকাশেরই নাম্বার। সে একবার ভাবল তারপর রি-ডায়াল বাটনে চাপ দিয়ে ফোনটা কানের কাছে ধরে চুপ করে রইল।
আকাশের ফোন বেজে উঠল। এতো রাতে কে ফোন করল? আকাশ গাড়ির ড্যাশবোর্ড থেকে তার ফোনটা নিল। সে একবার ফোনের দিকে তাকাল। নাম্বারটা পরিচিত লাগছে। আকাশ জানে এই নাম্বার থেকে আগেও তার কাছে কল এসেছে। সে ফোনটা নিয়ে বলল, ‘হ্যালো।’
তিথি বলল, ‘আমি তিথি। রূপা কি আছে আপনার সঙ্গে?’
আকাশ পাশে দিকে তাকিয়ে দেখল রূপা সীটে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছে। সে বলল, ‘জি আছে।’
‘একটু দেয়া যাবে?’
আকাশ আস্তে করে ডেকে তুলল রূপাকে। তারপর ফোনটা তার হাতে দিয়ে বলল, ‘তোমার ফোন।’
রূপা একটু অবাক হয়ে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
রূপার গলা শুনে তিথি ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। তারপর বলল, ‘তুই এভাবে চলে যেতে পারলি?’
রূপা চুপ করে রইল।
তিথি বলল, ‘একবার বলে গেলে কী হতো? আমি কি তোকে আটকে রাখতাম?’
রূপা কী বলবে? অভিমানে তার বুকটা ভার হয়ে আছে। সে কিছুই বলতে পারছে না।
‘কিছু বলছিস না কেন?’
রূপা বলল, ‘কী বলবো?’
তিথি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘কিছুই বলবি না।’
‘আই’ম সরি।’
‘আমি তোকে সরি বলতে বলেছি?’
‘বাট আই’ম রিয়েলি সরি। আমার জন্যেই তো…’
আকাশ তাকালো রূপার দিকে। সে এখনো জানে না আসলে কী ঘটেছে। রূপাকে নিয়ে আসার সময় একবার জিজ্ঞেস করেছিল, কি হয়েছে—কোনো সমস্যা? রূপা এড়িয়ে গেছে। আকাশও আর কিছু জিজ্ঞেস করে নি। কিন্তু তার স্বল্প বুদ্ধিতে অন্তত এটুকু বুঝতে পেরেছে তিথি আর রূপার মধ্যে যদি কিছু হয়ে থাকে সেটা হাসানকে নিয়েই। সেদিন মুভি থিয়েটারে হাসানের সঙ্গে রূপাকে দেখেও তার কাছে একটু খটকা লেগেছিল। আকাশ সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ঠিকই কিন্তু তার কান খাড়া হয়ে আছে প্রথম থেকেই তিথি আর রূপার ফোন কথনের দিকে।
‘আমি আগামী উইকএন্ডে অস্টিন যাচ্ছি—দু’দিন তোকে নিয়ে ঘুরব। শপিং করব। মুভি দেখব। তুই অস্টিন পৌঁছে আমাকে ফোন দিবি।’
মুভির কথা আসতেই রূপার মনে পড়ল, হাসান বলেছিল তিথিকে নিয়ে কখনো মুভি দেখতে যেতে পারেনি। তাহলে কি হাসান ভাই মিথ্যে বলেছে? কী জানি? রূপা এখন আর কিছু ভাবতে চায় না। সে কোনো কথা বলল না।
তিথিও চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, ‘আমি কি করব বল, আমি তো আর ইচ্ছে করে…’ কথা শেষ না করে তিথি থেমে গেল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘ঠিক আছে রাখি। ভাল থাকিস।’
ফোন কেটে দিয়ে তিথি রূপার বিছনাতেই শুয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়েই দেখল মস্ত বড় একটা চাঁদ যেন হাতছানি দিয়ে ডাকছে। সেই ডাকে সারা দিয়ে ধীর পায়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল তিথি।
হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-৭)
তিথি কঠিন স্বরে বলল, ‘এসব কি হচ্ছে, হাসান?’
হাসান সামনে এগিয়ে এসে আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলে যে? শরীর খারাপ?’
‘না শরীর খারাপ না। শরীর ঠিকই আছে।’
‘তাহলে?’
‘কি তাহলে? কেন আমি এসে ডিস্টার্ব করলাম?’
‘এসব কি বলছো রূপা?’
‘রূপা?’
‘সরি, আই মিন তিথি!’
‘মাথার মধ্যে বেশ ভাল ভাবেই ঢুকেছে তাহলে?’
‘কীই বলছো তুমি?’
‘কী বলছি, বুঝতে পারছ না?’
‘না বুঝতে পারছি না।’
‘ভেতরে এসো, তোমার সাথে আমার কথা আছে।’ বলেই তিথি রূপার দিকে একটা অবিশ্বাসের দৃষ্টি দিয়ে ঘরে ঢুকে গেল।
হাসান একবার তাকাল রূপার দিকে। দুজনেই এতটাই বিব্রত বোধ করছে যে কেউ কারো দিকে মুখ তুলে তাকাতে পারল না।
প্রচণ্ড অপমানে রূপার কেঁদে ফেলার মত অবস্থা হলো। সে মাথা নিচু করে ঘরে ঢুকল। দেখল তিথি বসে রয়েছে অন্যদিকে তাকিয়ে। রূপা লিভিং রুমের টেবিল থেকে কর্ডলেস ফোনটা নিয়ে তার রুমে গিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
হাসান ভেতরে ঢুকতেই তিথি উঠে দাঁড়াল। তারপর বলল, ‘কি বুঝতে পারছ না বলো। আবার বলো না যে আমি যা ভাবছি তা ঠিক না।’
‘হ্যাঁ তাই।’
‘আমার নিজের চোখকে অবিশ্বাস করতে বলো? এখন যা দেখলাম আর দু’দিন ধরে যা দেখছি সে গুলো?’
হাসান বলল, ‘তিথি, প্লিজ আমার কথা শোন, আমি তোমাকে বুঝিয়ে বলব।’
‘ঠিক এই কথাটাই যে বলবে—তাও আমি জানতাম। কি বোঝাবে তুমি? তুমি ভেবেছ আমি কিছু বুঝি না? আমি তো তিতলি না, তিথি। আই এক্সাটলি নো হোয়াটস গোয়িং অন। ডোন ইভেন ট্রাই টু ফুল মি!’ বলেই তিথি সোফায় বসে অঝরে কান্না শুরু করল।
হাসান বুঝতে পারছে না কি করবে। সে অসহায়ের মত বসে রইল অন্য সোফাতে।
রুমের দরজা বন্ধ করে দিয়ে চুপচাপ বসে রইল রূপা। অপমান আর অভিমানে তার চোখ ভিজে গেছে। কিছুতেই সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে তার হ্যান্ড ব্যাগ থেকে একটা কাগজে লেখা নাম্বার দেখে ডায়াল করল।
আকাশের এক দুঃসম্পর্কের চাচা থাকেন ডালাসে। তার কিছু বন্ধুও আছে। তবে এখানে এলে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে তার চাচার বাসাতেই থাকে সে। আজকে তার ফিরে যাবার কথা ছিল। কিন্তু সে যায়নি। আকাশের খুব ইচ্ছা হলো রূপার সঙ্গে আরেকটিবার দেখা করে যায়। কিন্তু সমস্যা হলো রূপার কোনো ফোন নেই—আর তাড়াহুড়োয় ওদের কারো ফোন নাম্বার নেয়া হয়নি। কাল রাতে রূপাকে নামাতে হয়েছে বলে বাসার ঠিকানাটা ওর মনে আছে। ইচ্ছে করলে সে চলে যেতে পারবে অনায়াসে। কিন্তু যদি বাসায় না থাকে। তাই সে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় ভেবে পেল না। কিন্তু ওর মন বলছে রূপা একবার হলেও একটা ফোন করবে। রূপার কাছে ওর নাম্বার আছে। কাল রাতে রেস্টুরেন্টে ডিনার করার সময় একটা কাগজে লিখে রূপার হাতে দিয়ে বলেছিল, ‘যখন ইচ্ছে ফোন করো। রিমেম্বার, আই অ্যাম অনলি এ ফোন কল অ্যাওয়ে। কল দিলেই চলে আসব সে আমি যত দুরেই থাকিনা কেন। আমি তোমার ফোনের অপেক্ষায় থাকব।’
রূপা হাসতে হাসতে বলেছে, ‘বাব্বা-এত প্রেম কোথায় ছিল এতদিন?’
আকাশের মোবাইল ফোন বেজে উঠল। ওর মন বলছে এটা রূপার ফোন। সে ফোন ধরেই বলল, ‘রূপা!’
রূপা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। ফোনের ওপাশ থেকে আকাশ তার ভারী নিঃশ্বাসটা বুঝতে পারল। সে আবার বলল, ‘রূপা, তুমি?’
‘হ্যাঁ।’ ভারী কণ্ঠে রূপা বলল, ‘তুমি কি আমাকে নিয়ে যেতে পারবে?’
‘হ্যাঁ পারব। কখন আসতে হবে বলো?’
‘এখুনি।’
‘নো প্রব্লেম। আই অ্যাম অন মাই ওয়ে।’
আকাশের সংগে কথা শেষ করে রূপা দ্রুত তার সুটকেসটা গুছিয়ে নিল। কিছু ব্যবহারের কাপড় ছিল বাথরুমে সেইসাথে প্রসাধনীর যা যা ছিল সব ভরে ফেলল। তারপর সাইড টেবিল থেকে একটা কাগজ বের করে তিথির জন্যে একটা ছোট্ট মেসেজ লিখল। মেসেজ না বলে চিঠিও বলা যেতে পারে।
তিথি,
আমি চলে যাচ্ছি। আরো দুটো দিন থাকার ইচ্ছে ছিল কিন্তু পরিস্থিতি যেভাবে জটিল হচ্ছে তাতে সংকট আরো বেড়ে যেতে পারে। জেনে শুনে সংকট বাড়ানোর কী দরকার।
আমি যেদিন প্রথম আমেরিকায় ট্রেনিং-এর চিঠি পেলাম—সেদিন খুব খুশি হয়েছিলাম সেটা আমেরিকায় আসার জন্যে না—শুধু তোর সাথে দেখা হবে এই ভেবে। দুর্ভাগ্য আমার তোর সাথে দেখা হলো কিন্তু তার পরিণতি যে এমন হবে তা আমার কল্পনার অতীত ছিল। আফসোস থেকে গেল যে তোর সাথে দু’দণ্ড সময় কাটাতে পারলাম না—যদিও এতে তোর কোন হাত ছিল না। আমেরিকার জীবনটাই যে এমন, হয়ত না এলে কিছুই বুঝতে পারতাম না।
যাওয়ার আগে দুটি কথা বলা দরকার।
হাসান ভাইকে তোর চেয়ে পৃথিবীর আর কেউ ভাল চিনে সেটা আমি বিশ্বাস করি না। তারপরেও একজন মেয়ে হয়েই বলছি—আমার ধারণা, বিয়ের আগে অথবা পরে, তুই ছাড়া অন্য কোনো মেয়ের একাকী সান্নিধ্যে সে যায়নি। মানুষটা খুবই সরল এবং কিছুটা বোকাও। সে ভণিতা করতে জানেনা। না, তার হয়ে সাফাই গাইছি না। আমি শুধু আমার উপলব্ধির কথাটা তোকে বললাম। তুই তাকে ভুল বুঝিস না। এটুকুই শুধু আমার অনুরোধ থাকবে তোর কাছে।
আবার কোনদিন দেখা হবে কিনা জানিনা। পারলে ক্ষমা করিস। তিতলির জন্য আদর।
ভাল থাকিস।
ইতি, তোর রূপা।
লেখা শেষ করে রূপা বড় একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। তারপর চিঠিটা ভাঁজ করে নাইটস্ট্যান্ডের উপরে রেখে দিয়ে চুপচাপ বসে থাকল।
তিথি আরো কিছুক্ষণ কেঁদে কেটে তার রুমে গিয়ে শুয়ে পড়েছে।
তিথিকে না ডেকে হাসান গেল তিতলিকে আনতে। গাড়িতে উঠেই তিতলি বুঝতে পারল তার বাবার মুড খারাপ। সাধারণত হাসান খুব হেসে হেসে জিজ্ঞেস করে, তোমার স্কুল কেমন গেল আজকে? এনিথিং ইন্টারেস্টিং টু শেয়ার? তখন তিতলি গরগর করে সব কথা বলা শুরু করে। বাসায় তেমন কোনো কথা না বললেও গাড়িতে উঠলেই তিতলি নন-স্টপ কথা বলে। সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, ‘ইউ ওকে বাবা?’
‘ইয়েস, আই’ম ফাইন।’ হাসান তিতলির দিকে না তাকিয়েই অন্যমনস্ক ভাবে বলল।
‘ইউ সিমস আনমাইন্ডফুল।’
হাসান কোনো কথা না বলে সামনের দিকে তাকিয়ে গাড়ি চালাতে থাকল। তিতলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার ইজ রূপা আন্টি?
‘শী’জ অ্যাট হোম।’
‘আই থট শী’জ উইথ ইয়্যু!’
‘এত প্রশ্ন করছ কেন তিতলি? বললাম না সে বাসায়? তোমার আম্মুও বাসায়।’
হঠাৎ করে হাসানের রেগে যাওয়ায় তিতলি ঘাবড়ে গেল। সে বুঝতে পারল না তার বাবার কি হয়েছে। তবে কিছু একটা সমস্যা হয়েছে সেটা বুঝতে তার কষ্ট হলো না। সেদিনও সে দেখেছে তার আম্মুকে বাবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করতে। কিছু একটা হচ্ছে কিন্তু সে বুঝতে পারছে না সেটা কী। মনে হয় বড়দের ব্যাপার তাই সে আর কোনো কথা না বলে চুপ রইল।
হাসান বাসায় ফিরে ড্রাইভওয়েতে গাড়ি পার্ক করতেই তিতলি বলল, ‘আই’ম সরি, বাবা।’ বলেই সে দৌড়ে ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। হাসান চুপচাপ বসে রইল গাড়িতে।
আমি এখুনি আসছি বলে আকাশ এলো চার ঘণ্টা পর। ওর দেরী হচ্ছে দেখে এক ঘণ্টা পর রূপা আরেকবার ফোন করল তাকে। কিন্তু সে ফোন ধরল না। ইতিমধ্যে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা হয়েছে। এই সময়টুকু পার করতে রূপাকে যথেষ্ট ধৈর্যের পরিচয় দিতে হলো। রূপা ভেবে পেল না, তার সাথেই কেন সব সময় এমন হয়। সে ঘন ঘন ঘড়ি দেখল। কয়েকবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল। এবং আশ্চর্যজনক ভাবে এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল।
রূপার ঘুম ভাঙ্গল তিতলির ডাকে। সে কতক্ষণ ঘুমিয়েছে মনে করতে পারল না। সে উঠে দরজা খুলে দিতেই তিতল বলল, ‘তোমার বন্ধু এসেছে।’ তিতলির মুখে পরিষ্কার বাংলা শুনে রূপার বেশ ভাল লাগল। হঠাৎ করে মনে হলো, তিথির মেয়েটা বেশ সুন্দর হয়েছে। ওর খুব ইচ্ছে হলো ওকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু তার আগেই তিতলি দৌড়ে চলে গেল।
রূপা চোখ-মুখে পানি দিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে তার সুটকেসটা নিয়ে দ্রুত বের হয়ে এলো। এসেই দেখল আকাশ বসে আছে হাসি হাসি মুখ করে। হাসানের সঙ্গে কথা বলছিল হয়তো। হাসানকেও দেখল, কিন্তু বেশ গম্ভীর। বোঝাই যাচ্ছে দুপুরের বিষয়টা তাকে নিশ্চয়ই যন্ত্রণা দিচ্ছে। সে সামনে এগিয়ে এসে আকাশকে বলল, ‘এতক্ষণে এলে?’
আকাশ হাসতে হাসতেই বলল, ‘আর বলো না, একটা ঝামেলা হয়েছিল। পরে বলছি সবকিছু।’
‘ঠিক আছে চলো।’
হাসান চমকে তাকাল। এবং বুঝতে পারল রূপা চলে যাচ্ছে—একেবারে। সে কী বলবে বুঝতে পারল না।
আকাশ ওর সুটকেসটা নিয়ে বের হয়ে গেল। রূপা বলল, ‘হাসান ভাই, আমি চলে যাচ্ছি। অনেক কষ্ট দিয়ে গেলাম।’
হাসান কিছু বলল না। অবাক চোখে তাকিয়ে রইল।
তিতলি কাছেই দাঁড়ান ছিল—রূপা তিতলিকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে ফেলল। তিতলি বুঝতে পারছে না রূপা আন্টি কাঁদছে কেনো। সেও রূপাকে জড়িয়ে ধরে থাকল কিছুক্ষণ।
হাসানের বলতে ইচ্ছে করছে অনেক কিছুই কিন্তু সে কিছুই বলতে পারল না। রূপা এভাবে হুট করে চলে যেতে চাইবে সেটা ছিল তার ধারণার বাইরে। রূপার এভাবে চলে যাওয়াটা শোভনীয় হচ্ছে না—কিন্তু তাকে থাকতেও বলতে পারছে না। নিজেকে হঠাৎ করেই খুব ছোট মনে হলো। তবুও হাসান একবার বলল, ‘তিথিকে বলে যাবে না।’
রূপা কিছু বলল না। তিতলিকে একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরল শুধু। তারপর ওর কপালে একটা চুমু দিয়ে বের হয়ে গিয়ে আকাশের গাড়িতে উঠল।
আকাশ একবার তাকাল রূপার দিকে তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বের হয়ে গেল ড্রাইভওয়ে থেকে।
হাসান ওদের চলে যাওয়া পথের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাড়িয়েই দেখল তিথি অঝরে কাঁদছে।
(চলবে…)




