a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-১)

একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যার শুরু। অনেকদিন থেকে এরকম একটি সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছিল ইমরান।
সদর দরজায় কলিং বেল বেজে উঠতেই ইমরান ঘুরে তাকাল। স্মার্ট ভিডিও ডোরবেল থেকে আসা ভিডিও কলটি রিসিভ করতেই সে তার স্মার্টফোনে দেখল—দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিন্দ্য সুন্দরী রমণী। চেহারায় উষ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। চালচলনে কোথায় যেন একটা হলিউডি ভাব আছে। সুন্দরী রমণীর নাম এলিনা।
হাতের কাজ ফেলে দ্রুত এগিয়ে গেল ইমরান। দরজা খুলে দিতেই সে দেখল এলিনার ঠিক একটু পিছেই দাঁড়িয়ে আছে এক শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। শ্বেতাঙ্গের নাম রজার্স—এলিনার বয়ফ্রেন্ড।
দীর্ঘদিন পর ইমরানকে দেখে এলিনা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘হাই ইমরান!’
ইমরানের চেহারায় অবশ্য তেমন কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল না। সে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘হাই এলিনা।’
ইমরান গোয়েন্দার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক পলক তাকাল রজার্সের দিকে। বয়স চল্লিশের আশে পাশে হবে হয়ত। তাহলে এইই সেই—এলিনার বয়ফ্রেন্ড! দেখতে সুদর্শন, সুঠাম ও দীর্ঘদেহী—লম্বায় ছ’ফুটের কম হবে বলে মনে হয় না। বর্তমানে একটা মডেলিং এজেন্সির মাস্টার ফিটনেস ট্রেইনার এবং জিমনাস্টিক ইন্সট্রাকটর হিসেবে কর্মরত আছে। পাশাপাশি সে নিজেও একজন মডেল সেইসূত্রে হলিউডের কিছু প্রডাকশন কোম্পানির সাথেও রয়েছে কানেকশন।
ইমরান লক্ষ্য করল রজার্সের হাতে একটি রেড ওয়াইনের বোতল। রজার্স হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে ইমরানের দিকে।
‘সরি, উই আর লেট।’ এলিনা বলল।
ইমরান রজার্সের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল এলিনার দিকে। এলিনা হাসল সুন্দর করে।
ইমরান তার হাত ঘড়িতে সময় দেখল—সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। ‘নট অ্যাট অল। আই জাস্ট ফিনিসড মাই কুকিং—ইউ আর সার্টেনলি নট লেট।’ সে বলল।
ইমরান এলিনাকে বলেছিল সাতটার দিকে আসলেই হবে। সেখানে তাঁরা এসেছে সাড়ে-সাতটায়। আধ ঘণ্টা দেরি এমন কোনো দেরিই না। বাঙ্গালিদের দাওয়াতে কমপক্ষে এক ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছানো হচ্ছে স্বাভাবিক ঘটনা। কেউ কেউ দেড় ঘণ্টা এমনকি দুই ঘণ্টা দেরিতে গিয়েও হাজির হয়।
এলিনা ঘরের ভিতরের দিকে ইশারা দিয়ে বলল, ‘ক্যান উই কাম ইন?’
‘ইয়া—অফ কোর্স! কাম অন ইন।’ মৃদু হেসে বলল ইমরান।
ইমরান সরে গিয়ে ওদেরকে ভিতরে ঢুকতে দিল। দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াতেই এলিনা বলল, ‘কেমন আছ?’
‘এই তো—চলে যাচ্ছে। তুমি?’
‘ভাল।’
এলিনা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে। তারপর একটু এগিয়ে এসে হঠাৎ করেই সে জড়িয়ে ধরল ইমরানকে। এ বিগ হাগ!
ইমরান কী করবে ভেবে পেল না। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চুপ করে রইল। কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে। অস্বস্তি কাঁটাতেই সে বলল, ‘গুড টু সি ইউ, এলিন!’
‘গুড টু সি ইউ টু।’
তারপর যেন হঠাৎ করেই কথা হারিয়ে ফেলল দুজনেই। চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল ওদের তিনজনকে ঘিরে। রজার্স বোকার মত তাকিয়ে রইল ওদের দুজনের দিকে। সে ঠিক বুঝতে পারছে না—তার কি কিছু বলা উচিৎ কিনা। সেও কোন কথা বলেনি পুরো সময়ে। তবে হাসিমুখে কথা শুনছিল ওদের দুজনের।
এলিনা রজার্সের অস্বস্তিবোধ বুঝতে পেরে বলল, ‘লেট মি ইনট্রোডিউস… ইমরান, মিট মাই ফিয়ান্সে রজার্স। রজার্স দিস ইজ ইমরান।’
ফিয়ান্সে! এলিনা কী তাহলে রজার্সকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে? এতদিন সে জানত রজার্স তার বয়ফ্রেন্ড—জাস্ট লিভিং টুগেদার! এদেশে অনেকেই সেটা করে। বিয়ের আগে জানাশোনা। বিয়ের আগে জানাশোনা না থাকলে বিয়ের পরে সমস্যা হয়। বিয়ে জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। তাই বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুজন দুজনকে ভাল করে জানা খুবই জরুরি। অনেকে আবার বিয়ে না করেও বছরের পর বছর এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দেয়। তারপর হঠাৎ একদিন একজন আরেকজনের কাছে এসে বলে, ‘আই নিড টু টক টু ইউ।’ অপরজন তখন বুঝে যায়, বিচ্ছেদের ঘণ্টা বেজে গেছে। ‘আই নিড টু টক টু ইউ’ হচ্ছে প্রাথমিক সংকেত।
খানিকক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে থেকে ইমরান বলল, ‘নাইস টু মিট ইউ রজার।’
‘প্লিজড টু মিট ইয়োর একুয়ানটেন্স অলসো এন্ড থ্যাংকস ফর ইনভাইটিং আস।’ বলেই রজার্স ওয়াইনের বোতলটি ইমরানের দিকে এগিয়ে দিল।
‘ইউ আর ভেরি ওয়েলকাম! এন্ড থ্যাঙ্ক ইউ টু!’ ওয়াইন বোতলের গায়ে লাগানো লেবেলটি একনজর দেখে ইমরান সৌজন্যমূলক ধন্যবাদ জানাল রজার্সকে। ইমরান মদ্যপানে অভ্যস্ত নয়। তবে বন্ধুদের জন্যে তার সংগ্রহে খুব ভাল এবং দামী ব্র্যান্ডের ওয়াইন কিংবা হার্ড লিকার থাকে। তার কাছে ব্র্যান্ড তাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷.
‘বাই দ্য ওয়ে—মাই নেম ইজ রজার্স, নট রজার। দেয়ার ইজ অ্যান ‘এস’ এট দ্য এন্ড।’
‘ওহ, ওকে। রজার্স, রজার্স।’ ইমরান দুবার রজার্সের নাম উচ্চারণ করল। তারপর একটু থেমে বলল, ‘ডিনার ইজ রেডি, প্লিজ ফলো মি।’
ইমরান ওদেরকে ডাইনিং রুমে নিয়ে এল। বড় হলওয়ে ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় এলিনা চারিদিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল। একবার উপর তলার দিকেও তাকাল। বসার আগে সে ইমরানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ইরিন কোথায়? বাসায় নেই?’
‘বাসায়ই আছে। চলে আসবে যে কোনো সময়।’
ইমরান চেয়ার টেনে এলিনাকে বসতে সাহায্য করল। রজার্স বসল এলিনার সামনে—টেবিলের অন্য পাশে।
কেবিনেট থেকে তিনটি ওয়াইন গ্লাস নিয়ে ইমরান এসে দাঁড়াল এলিনা আর রজার্সের মাঝখানে। তিন গ্লাস ওয়াইন ঢেলে দুটি গ্লাস এগিয়ে দিল দুজনের দিকে। সে বসল এলিনা আর রজার্সের মাঝে—কোনার চেয়ারে। তারপর গ্লাস উঁচু করে বলল, ‘চিয়ার্স!’
এলিনা আর রজার্স একসাথে টোস্ট করল। ‘চিয়ার্স!’
সবাই যার যার গ্লাসে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে গ্লাস নামিয়ে রাখল টেবিলে। কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলা দরকার। যেই বিশেষ কারণে এলিনা রজার্সের হাত ধরে চলে গেছে, সেই বিষয়টি নিয়েই নেহায়েতই কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলা যেতে পারে। ইমরান রজার্সের দিকে ঝুঁকে এসে বলল, ‘সো রজার্স, হোয়েন আর ইউ গেটিং হার ইনটু হলিউড…?’ এলিনার দিকে তাকিয়ে একটা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, ‘লুক অ্যাট হার—শী ইজ সো রেডি টু মুভ!’
রজার্স অস্বস্তি নিয়ে তাকাল এলিনার দিকে। ইমরান কথা শেষ করার আগেই এলিনা তার কাছে মুখ নামিয়ে এনে নিচু গলায় বলল, ‘এসব কথা থাক ইমরান—অন্য কোনো প্রসঙ্গ থাকলে বলো।’ এ প্রসঙ্গে কথা বলতে এলিনার নিজেরও আর ভাল লাগে না—ভাল লাগার অবশ্য কথাও না। যে স্বপ্ন রজার্স তাকে দেখিয়েছিল, সে স্বপ্ন আদৌ কখনো পূরণ হবে কিনা সে নিজেও জানে না।
বাংলাদেশের এক সময়ের আলোচিত মডেল ও অভিনেত্রী এলিনা—এলিনা খান নামেই সমধিক পরিচিত ছিল। মডেলিং এর পাশাপাশি অসংখ্য জনপ্রিয় টিভি নাটকে অভিনয় করেছে সে। ছোট পর্দা ছাপিয়ে বড় পর্দায়ও জুটি বেঁধেছিল ঢাকাই ছবির এক শীর্ষ নায়কের সঙ্গে। কিন্তু কী মনে করে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সত্বেও এলিনা আমেরিকায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। অত্যন্ত সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্য সচেতন একটা মেয়ে সে। বয়স চল্লিশ ছুঁয়েছে—তবুও সৌন্দর্য যেন পিছু ছাড়ছে না তার। বরং দিন দিন আরো আকর্ষণীয়া হচ্ছে সে। চাঁপা ফুলের মতো গায়ের রং—একবার তাকালে মনে হয় আবার তাকাই। সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঈর্ষণীয় শারীরিক গঠন এলিনার। সবসময় সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে অভ্যস্ত সে। তাই একটু অতিরিক্ত সচেতন তাকে হতেই হয়। নিয়মিত জিমে যায়। আজও সেই পুরনো এবং আকর্ষণীয়া এলিনার প্রতিনিয়তই নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান রহস্য হচ্ছে শরীরচর্চার কঠোর অনুশীলন এবং পরিমিত পরিমাণে সঠিক খাদ্যগ্রহণ।
ইমরান একবার রজার্সের দিকে আড় চোখে দেখে নিয়ে এলিনাকে ইশারায় আস্বস্ত করল। তারপর প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘সো হোয়েন আর ইউ টু গেটিং ম্যারেড?’
রজার্সের কপালে এবার চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা দেখা দিল। সে ইতস্তত করছে—কী বলবে বুঝতে পারছে না। এলিনা আবারো তাকে উদ্ধার করল। সে বলল, ‘উই আর থিঙ্কিং জানুয়ারি… বাট উই রিয়েলি ডোন্ট হ্যাভ এ ডেট সেট ইয়েট।’
ইমরান বলল, ‘আই থিঙ্ক জানুয়ারি ইজ এ ওয়ান্ডারফুল মান্থ টু গেট ম্যারেড—দ্য স্টার্ট অফ দ্য নিউ ইয়ার…’ ইমরান তাকাল রজার্সের দিকে। ‘ইউ এগ্রি উইথ মি, রজার?
রজার্স অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে আছে উপরতলার দিকে। মনে হচ্ছে তার চোখ কিছু একটা খুঁজে ফিরছে। ইমরান আবার বলল, ‘ইউ আর নট সেয়িং এনিথিং। আর ইউ নট কমফোর্টেবল?’
‘নো। ইয়েস। আই’ম জাস্ট ফাইন। আই’ম এঞ্জয়িং ইয়োর কনভারসেশন।’ ইমরানের দিকে ঘুরে রজার্স বলল।
‘আর ইউ এগ্রি উইথ মি?’
‘এগ্রি?’ রজার্স আবার খেই হারিয়ে ফেলল। তার চেহারায় দ্বিধা স্পষ্ট। সে বলল, ‘ওহ, ইয়েস, ইয়েস। আই ডু। আই ডু এগ্রি উইথ ইউ।’
এলিনা একটু অবাক হয়ে তাকাল দ্বিধাগ্রস্ত রজার্সের দিকে। তারপর ইমরানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অস্থিরতার সাথে বলল, ‘ইরিন আসছে না কেন এখনো? আমি কি উপরে একবার যেয়ে দেখব?’
‘আই’ম হিয়্যার।’
দূর থেকে ইরিনের কণ্ঠ শোনা গেল। সবাই ঘুরে দেখল ইরিন নেমে আসছে সিঁড়ি দিয়ে। ইরিনের বয়স চৌদ্দ বছর। মায়ের রূপ পেয়েছে—দেখতে ভীষণ মিষ্টি। তবে স্বভাব হয়েছে বাবার মত। কিছুটা একরোখা এবং রুক্ষ। অল্পতেই রেগে যায়। অন্তর্মুখী স্বভাবের একটি মেয়ে ইরিন। তার চাপা স্বভাবের কারণেই সবার সঙ্গে খোলা-মেলা ভাবে মিশতেও পারে না। বেশিরভাগ সময়ে একা একাই সময় কাঁটায় সে।
ইরিন ধীর পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল এলিনার পাশে। এলিনা উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরল ইরিনকে। বেশ কিছুক্ষণ জোর করে চেপে ধরে রাখল। তারপর ছেড়ে দিয়ে কানে কানে বলল, ‘তুমি রজার্সকে হাই বলবে না?’
ইরিন কিছু বলল না। কোনো রকম আগ্রহও দেখাল না—সে রজার্সের দিকে শীতল দৃষ্টিতে একবার তাকাল শুধু।
রজার্স ইরিনের দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক একটা সৌজন্য হাসি দিল। ইরিন সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। রজার্স আস্তে করে বলল, ‘হাই ইরিন—ইউ লুক বিউটিফুল।’
ইরিন এবারও কোনো উত্তর দিল না। সে নির্লিপ্তভাবে এলিনার পাশের চেয়ারে বসে রইল চুপচাপ। ইরিনের বসার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে সেও একজন অতিথি।
এলিনা একটু লজ্জিত হলো—একইসাথে বিব্রত বোধ করল। ইরিনের এভাবে রজার্সকে উপেক্ষা করার ব্যাপারটাকে তার মোটেও ভাল লাগেনি। সে মাঝে মাঝেই রজার্সের দিকে তাকিয়ে তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে। রজার্সের চেহারা দেখে অবশ্য কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
রজার্সের সঙ্গে এলিনার সম্পর্কটাকে ইরিন মেনে নিতে পারেনি। সেটা ঠিক আছে—মেনে না নেয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে সামান্যতম সৌজন্যতাটুকু দেখাবে না—এটা কেমন কথা। একজন অপরিচিত মানুষকেও তো মানুষ সালাম দেয় কিংবা হ্যালো বলে। ভিতরে ভিতরে কষ্ট পেলেও এলিনা হাসি হাসি মুখ করে ইরিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রূ উঁচু করল।
ইরিন তবুও কিছু বলল না। সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শূন্য দৃষ্টিতে খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। দেখে মনে হয় জগতের কোনো কিছুর প্রতিই তার কোনো আগ্রহ নেই। শুধু শূন্য প্লেটটির দিকে তাকিয়ে থাকাটাই হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
ইমরান তাকাল ইরিনের দিকে। মেয়েটির মনের মধ্যে দিয়ে কিছু একটা হচ্ছে—সেটা আর কেউ না বুঝলেও সে বুঝতে পারছে ঠিকই।
ইরিন ইমরানের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘ডিনার কি রেডি বাবা?’
‘অবশ্যই রেডি! এক মিনিট—এখুনি নিয়ে আসছি।’ বলেই সে দ্রুত কিচেনে গিয়ে ঢুকল।
ওভেনের ডালা খুলে ইমরান দেখল সবকিছু ঠিক আছে কিনা। দুহাতে মোটা কিচেন গ্লাভস পড়ে, টং এর সাহায্যে সে তার বিখ্যাত বিফ স্টেক লোফের ট্রেটি বের করে আনল। অতঃপর মেটাল টংটি ৪৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার জ্বলন্ত ওভেনের ভিতরে রেখে ওভেনের ডালা লাগিয়ে দিল সে। কাজটি কী সে ভুল করে করল নাকি ইচ্ছাকৃত ভাবেই তা অবশ্য তার চেহারা দেখে বোঝা গেল না।
ইমরানের ঠোঁটের কোণে ঈষৎ একটি হাসির রেখা ফুটে উঠে নিমেষেই মিলিয়ে গেল।

পরের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (শেষ পর্ব)

দূর থেকে এলিনা আর ইরিন দেখল একটি এ্যাম্বুলেন্স আর পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে ইমরানের বাসার সামনের পার্কিং লটে। তাঁরা দুজনেই উৎকণ্ঠা আর শঙ্কা নিয়ে একবার তাকাল একে অপরের দিকে। তারপর দ্রুত এগিয়ে গেল সামনে। বাসার কাছাকাছি আসতেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে এলো তাদের সামনে। পরিচয় দেয়া সত্ত্বেও ওদেরকে ভিতরে যেতে না দিয়ে দাঁড় করিয়ে রাখল কিছুক্ষণ। টেনশনে ওদের দম বের হয়ে যাবার জোগাড় হলো।
এলিনা শঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘What’s wrong officer?’
অফিসার কোনো উত্তর দেবার আগেই কমলা রঙের ইউনিফর্ম পরা কয়েকজন প্যারামেডিক একটা স্ট্রেচার বের করে এনে ঢুকাল এ্যাম্বুলেন্সে। স্ট্রেচারে শুয়ে আছে রজার্স—জীবিত না মৃত তা বোঝা গেল না। এলিনা বিচলিত বোধ করল।
একটু পরেই বেরিয়ে এলো ইমরান।
এলিনা আর ইরিন তাকাল ইমরানের দিকে। তাকে দেখেও কিছু বোঝা গেল না—ঘটনা আসলে কী ঘটেছে।
ইমরানের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে এলিনা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে তাকাল ইরিনের দিকে। ‘তুই তোর বাবাকে সবকিছু বলে দিয়েছিলি তাই না?’
‘না মা—আমি কিছুই বলি নাই। Trust me—I didn’t say a single word.’
এলিনার ক্ষীণ সন্দেহ হলো যে ইরিন তার কাছ থেকে বিষয়টি লুকিয়েছে। তার ধারণা, ইমরান আর ইরিন আগে থেকেই কিছু একটা প্ল্যান করেছিল। এলিনার প্রচণ্ড রাগ হলো। হঠাৎ করেই রজার্সের জন্যে তার খারাপ লাগা শুরু হলো অথচ কয়েক মিনিট আগেও সে নিজেই রজার্সকে নিজের হাতে খুন করবে বলে উত্তেজিত হয়ে বাসায় ফিরে এসেছে। কী আশ্চর্য!
সাইরেন বাজিয়ে এ্যাম্বুলেন্সটি চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গেই একজন পুলিশ অফিসার এগিয়ে গেল ইমরানের দিকে। একটা কাগজ আর কলম বের করে দিল তার হাতে—একটি সাধারণ পুলিশ রিপোর্ট। ইমরান একবার দেখে নিয়ে সাইন করে ফিরিয়ে দিল অফিসারের হাতে। আবার কিছু কথা হলো তাদের মধ্যে। পুলিশ অফিসার বিদায় নিয়ে চলে যেতেই ইমরান এগিয়ে গেল ইরিনের দিকে।
ইরিন দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে। ‘You alright baba?’
‘Yea, I’m just fine.’ ইমরান তার মেয়েকে আশ্বস্ত করে বলল।
‘What happened?’ ইরিন জিজ্ঞেস করল আবার।
ইমরান কিছু বলল না। এলিনা এগিয়ে এলো সামনে। সে এতক্ষণ কনফিউজড হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। সে কিছুই বুঝতে পারছে না—আসলে কী ঘটেছে। সে ইমরানকে জিজ্ঞেস করল, ‘কী হয়েছে আমাকে বলবে?’
ইমরান কোনো উত্তর দিল না।
এলিনা তার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল আবার, ‘কথা বলছ না কেন ইমরান?’ সে যথেষ্ট চিন্তিত। আবার বলল সে, ‘What did you do to him?’
উত্তর না দিয়ে ইমরান তাকিয়ে দেখল আশে পাশের বাসা থেকে বেশ কিছু প্রতিবেশী কৌতূহলী চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। ইমরানের বাসার পাশের বাসাতেই থাকে এক সাউথ ইন্ডিয়ান ফ্যামিলি—সে এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল ঘটনা কী? ইমরান তাকে বোঝাল—তার গেস্টের হার্ট অ্যাটাক হয়েছে। চিন্তার কিছু নেই। কথা না বাড়িয়ে তাকে গুড নাইট জানিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই ইরিন এসে ধরল তার হাত।
‘Let’s go inside.’ ইরিনকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল ইমরান। এলিনার দিকে একবারের জন্যে তাকালও না।
এলিনা কী করবে বুঝতে পারল না। কেমন অসহায় লাগছে তার। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল একা একা। তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ সামনের বাড়িটার দিকে। একসময় এটি ছিল তার নিজের বাড়ি—অনেক পছন্দের। নিজ হাতে সাজিয়ে ছিল সব কিছু। আজ এখানে সে অতিথি। ভাবতেই কেমন অস্বস্তি হতে লাগল তার। এলিনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ঘুরে তাকাল রাস্তার দিকে। রাত কত হয়েছে কে জানে। সে কি একা একা ড্রাইভ করে ফিরে যাবে? কিন্তু কোথায় যাবে সে? সব কিছু জানার পরে রজার্সের ঐ অভিশপ্ত বাসায় তো তার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব না। গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল এলিনা ।
হঠাৎ পিছন থেকে কেউ তার হাত ধরল। ঘুরে তাকিয়ে দেখল ইরিন। ইরিন তার মায়ের হাত ধরে তাকে নিয়ে গেল ভিতরে।

৪৮ ঘণ্টা পরে রজার্সের জ্ঞান ফিরেছে। সার্জারি করে রজার্সের জেনিটালস রিপেয়ার করার চেষ্টা করা হয়েছে কিন্তু সফল হয়নি সার্জনরা। বিকল যন্ত্র নিয়েই তাকে বাকি জীবন কাটাতে হবে। বেঁচে আছে এটাই ভাগ্য।
এক সপ্তাহ পরে এলিনা একবার দেখা করে এসেছে রজার্সের সঙ্গে। এলিনাকে যেতেই হতো। রজার্সের সঙ্গে তার কিছু বোঝাপড়া ছিল।
এলিনা দেখল হাসপাতালের বিছানায় বিধ্বস্ত বিপর্যস্ত রজার্স তাকিয়ে আছে শূন্য দৃষ্টিতে। সে এসে দাঁড়াল তার বিছানার পাশে। পৃথিবীর সমস্ত ঘৃণা আর অবিশ্বাস নিয়ে এলিনা তাকাল রজার্সের চোখের দিকে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে সে বলল, ‘You’re lucky that Imran did not kill you but I would have killed you. I have no sympathy for a rapist; you deserved the pain and suffering.’
রজার্স নিশ্চুপ। সে মুখ ঘুরিয়ে নিল দেয়ালের দিকে।
‘You scarred my girl for life. You took her life away. Now you pay for the consequences. Enjoy the rest of your life.’
এলিনা ঘৃণার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল রজার্সের দিকে। রজার্স দেয়ালের দিকেই তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ নীরব থেকে এলিনা বের হয়ে গেল রুম থেকে।

অনেকক্ষণ থেকেই লিভিং রুমে বসে আছে এলিনা। ইমরান ফ্রিজ থেকে ঠাণ্ডা পানির বোতল এনে দিয়েছে তাকে। পানি খেয়ে এলিনা চুপচাপ বসে রয়েছে। মাঝেমাঝে ইমরানের দিকে তাকাচ্ছে কিন্তু তার মনের অবস্থা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।
ইমরান ভাবলেশহীন ভাবে বসে আছে। সে জানে এলিনা কিছু বলতেই এসেছে। কিন্তু এখনো কিছুই বলছে না অথবা বলতে পারছে না। সে নিজেও অপেক্ষায় আছে এলিনাকে কিছু কথা শোনাবার জন্যে। এলিনা শুরু করলেই সেও শুনিয়ে দেবে। তার প্রস্তুতি নেয়াই আছে।
দীর্ঘ সময় পার করে এলিনা বলল, ‘এভাবে ওকে ইনজুর্ড না করে পুলিশে দিলেই তো হতো? যা করার তারাই করত।’
‘পুলিশে দিলে কী হতো? তুমি জানো না—এ দেশে রেপিস্টের জেল হয় না। জেল হয় হোমলেস পিপলের—চুরি করে ধরা পড়ার অপরাধে। তাছাড়া এখানকার সিস্টেম ঐ সাদা চামড়ার কথাই বিশ্বাস করবে—তোমার আমার কথা না। উল্টো মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার মেয়েটাকেই ফাঁসিয়ে দিত।’
এলিনা চুপ করে রইল।
‘নাকি তোমার কষ্ট হচ্ছে?’ ইমরান খোঁচা দিয়ে কথাটা বলল।
‘কী বলছ তুমি?’
এবার উঠে দাঁড়িয়ে রিয়্যাক্ট করল ইমরান—উচ্চকণ্ঠে সে বলল, ‘Don’t you understand, that man raped my child? He’s a pervert, an evil pervert. That bastard hurt my daughter physically, mentally, and and took her childhood. My daughter, she is innocent. I could not take it, her suffering every day.’ বলতে বলতেই ইমরান অঝোরে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলে চলল, ‘কী দোষ ছিল ইরিনের? তিলে তিলে প্রতিদিন যে কষ্ট সে পাচ্ছিল—সেই কষ্ট মেনে নেয়া আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। আমি যা করার ভেবে চিন্তেই করেছি। জেল জরিমানা যাই হোক—সে নিয়ে আমি ভাবিনা। আমার কষ্ট শুধু একটাই—আমি আমার মেয়েকে রক্ষা করতে পারি নাই। আমি একজন ব্যর্থ বাবা!’
এলিনা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে ইমরানের মুখের দিকে। ভীষণ অবাক হলো—ইমরানকে এর আগে এভাবে কোনোদিন কাঁদতে দেখেনি সে। কোনো বাবা যখন তার সন্তানের জন্য কাঁদে—সে কান্নায় কোনো খাঁদ থাকে না। ইরিনের জন্যে আপ্লুত হয়ে যেভাবে কাঁদছে ইমরান—দেখে খুব মায়া লাগল। ইমরানকে স্থির হবার সময় দিয়ে চুপচাপ বসে রইল এলিনা।
ইমরানের ক্রোধ একটু কমে আসতেই এলিনা বলল, ‘একটা কথা বলবে?’
ইমরান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
‘তুমি জানলে কী করে? ইরিন তো তোমাকে কিছু বলেনি।’
‘না।’ ইমরান মাথা নাড়ল।
‘তাহলে?’
কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না ইমরান। চুপ করে বসে রইল। তারপর উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে। বাইরে তাকিয়ে থাকল যতদূর দৃষ্টি যায়। তার মনে পড়ল সেই রাতটির কথা—মাত্র কয়েকদিন আগের কথা।
সেদিন রাতে রজার্সের পাঠানো ভিডিও ক্লিপ দেখে আর রজার্সের হুমকি শুনে ইরিন যখন তার বাবাকে ফোনে বলেছিল তার ভয় লাগছে, ইমরান তখনই সব ফেলে দ্রুত ফিরে এসেছিল বাসায়। ঘরে ঢুকে দেরি না করে সে ছুটে গেল ইরিনের বেডরুমে। দূর থেকে দেখল, ইরিন ঘুমাচ্ছে। কিন্তু ল্যাপটপটা ওর বুকের উপরে।
বিছানার কাছে এসে তার বুকের উপর থেকে আস্তে করে ল্যাপটপটা সরিয়ে ইরিনের গায়ের উপর ব্লাঙ্কেট তুলে দিল ইমরান। তারপর ল্যাপটপটা নিয়ে রাখল রিডিং ডেস্কের উপর। রাখার সময় স্ক্রিনে ইমরানের হাতের স্পর্শ লেগে হঠাৎ করেই ঘুমন্ত ল্যাপটপটা যেন জেগে উঠল—এবং স্থির হয়ে থাকা সেই ভিডিওটা চালু হয়ে গেল—যেটা দেখেই ইরিন সংজ্ঞা হারিয়েছিল।
ইমরান একটু অবাক হলো। সে ভাবল, এই বয়সে ছেলেমেয়েরা অনেক কিছুতেই কিউরিয়াস হয়—ইরিন কি কোনো পর্ন সাইটে ঢুকেছিল—কে জানে। একটু চিন্তিত মনে সে ল্যাপটপটা বন্ধ করে দিল। কয়েক সেকেন্ডের জন্যে তার মনে একটা খটকা বাঁধল। মনে হচ্ছে কিছু একটা সে দেখেছে—অস্বাভাবিক কিছু। সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কি ভুল দেখল? অবশ্যই ভুল। তবুও নিশ্চিত হবার জন্য সে স্ক্রিনটা আবার খুলে মাউস প্যাডে আঙুল দিয়ে কয়েকবার নাড়ল আর তখনই ভিডিওটা চালু হয়ে গেল আবার।
বরফের মতো জমে গেল ইমরান। বুকের ভেতরটা কে যেন মুচড়ে দিল মুহূর্তে। একি দেখল সে। এতবড় ধাক্কা সে তার জীবনে এর আগে কখনো খেয়েছে বলে মনে পড়ে না। সমস্ত শরীর অবশ হয়ে আসছে। কিছুতেই নড়তে পারছে না। সেকি কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে তাও বুঝতে পারছে না।
বাস্তবে ফিরে আসতে ইমরানের বেশ খানিকটা সময় লাগল। ঘাড় ঘুরিয়ে সে একবার তাকাল ঘুমন্ত ইরিনের দিকে। এক পা এক পা করে এগিয়ে গেল তার বিছানার কাছে। বিছানায় পড়ে থাকা মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে খুঁজে খুঁজে ইরিনের ফোন থেকে সব টেক্সট মেসেজগুলো পড়ল। ধীরে ধীরে তার মুখের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। আপনা-আপনিই মুঠি বন্ধ হয়ে গেল তার। প্রতিহিংসায় চোখদুটো জ্বলে উঠল।
ইরিনের মাথায় হাত রেখে তার বিছানার পাশে বসে রইল পাথরের মত। একজন ভগ্নহৃদয়ের পরাজিত মানুষের প্রতিচ্ছবি যেন ইমরান।
বাস্তবে ফিরে এলো ইমরান। তার চোখ আবার ভিজে উঠেছে।
ইমরান বলল, ‘এটা আমার ব্যর্থতা। আমি আমার মেয়েকে প্রটেক্ট করতে পারিনি। এ দায় আমার—যা করার আমাকেই করতে হতো। প্রতিশোধ আমাকে নিতেই হতো।’
এলিনা ইমোশনাল হয়ে পড়ল।
‘কিন্তু তোমাকে আমি কোনোদিনই ক্ষমা করব না এলিনা।’
এলিনা চমকে তাকাল ইমরানের দিকে। কেমন কষ্ট আর ঘৃণা মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ইমরান।
‘আমার মেয়ের জীবনে এত বড় একটা ক্ষতি কোনোদিনই হতো না—যদি তুমি ওর কাছে থাকতে। এই সব কিছুর জন্যেই তুমি দায়ী। You’re responsible for this mess… and I’ll never ever forgive you.’
এলিনা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I deal with the blame and shame on a daily basis. লজ্জায় চলতে পারিনা, ঘুমাতে পারিনা। আমার দিন শুরু হয় এই ব্যথা নিয়ে। শেষও হয় এই ব্যথা নিয়ে। তুমি কী বুঝতে পারছ—আমি কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি? How long, how long do I have to deal with it?’
‘In rest of your life!’ বলেই উঠে চলে গেল ইমরান। তার আর কিছুই বলতে ইচ্ছে করছে না।
এলিনা নীরবে কেঁদে চলল।

ইমরানের ল’ইয়ার জানিয়েছে—হাসপাতালের বিছানায় বসেই রজার্স স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করেছে। স্বীকার না করে অবশ্য তার উপায়ও ছিল না। তার করা ভিডিও, পাঠানো টেক্সট মেসেজ এবং ইমেইলে ছবি—সবই তার বিরুদ্ধে আলামত হিসেবে কাজ করেছে। সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ইরিনকে আইসক্রিমের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে অজ্ঞান করে তারপর ধর্ষণ করার বিষয়টি।
নিচের অংশটুকু রজার্সের জবানবন্দি থেকে নেয়া—!
ইরিনকে সংজ্ঞাহীন করে বেডরুমে নিয়ে যাবার কিছুক্ষণ পর–রজার্স ঘড়ি দেখল।
এলিনার শিফট শেষ হতে কম করে হলেও আরো তিন ঘণ্টা বাকি। তারপর বাসায় ফিরতে আরো পঁয়ত্রিশ-চল্লিশ মিনিট। সে ইরিনের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে দ্রুত ছুটে গেল তার নিজের রুমে। কালবিলম্ব না করে ফিরে এলো একটা ছোট হ্যান্ডিক্যাম আর ট্রাইপড নিয়ে। ক্যামেরাটি সেট করে ইরিনের শরীরের উপরে ফোকাস স্থির করল সে। স্টার্ট বাটনে চাপ দিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ইরিনের কাছে। অতঃপর অতি সন্তর্পণে ইরিনের শরীর থেকে একটা একটা করে কাপড় খুলে ফেলল সে। মোবাইল ফোন দিয়ে প্রথমেই দ্রুত কিছু স্থির ছবি তুলে নিল মেয়েটির নগ্ন শরীরের। সময় ক্ষেপণ না করে ছোট মেয়েটিকে অচেতন অবস্থায় ইচ্ছেমত ধর্ষণ করল রজার্স। চরিতার্থ করলো তার বিকৃত কাম লালসার। ইরিনের নগ্ন শরীরটাকে জানোয়ারের মতো ব্যবহার করল সে। একটা ক্ষুধার্ত বাঘের সামনে একটা মায়াবী হরিণ ছেড়ে দিলে যেমনটা হয় ঠিক ঐরকম অবস্থা হলো ছোট মেয়েটির। সংজ্ঞাহীন অবস্থাতেও তার শরীর মোচড় দিয়ে উঠল। কী পাষণ্ডটা!
ইরিনের জ্ঞান ফেরার আগেই রজার্স দ্রুত হ্যান্ডিক্যাম, ট্রাইপড সব লুকিয়ে ফেলল ক্লোজেটের ভিতরে। অতঃপর স্টিকি নোটে একটা মেসেজ লিখে ইরিনের হাতের মধ্যে গুজে দিয়ে আরো দ্রুততার সাথে সে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।

শহরের একটি বিখ্যাত ক্রিমিনাল ল ফার্ম ইরিন এবং ইমরানের কেসটির দায়িত্ব নিয়েছে। তাদের সবচেয়ে অভিজ্ঞ ল’ইয়ার ইমরানকে নিশ্চিত করেছে রজার্সের সর্বোচ্চ সাজার ব্যাপারে। রজার্সের নাম এবং ছবি একজন সেক্স অফেন্ডার হিসেবে ইতিমধ্যেই ডাটাবেজে রেজিস্টার করা হয়েছে—ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে আমেরিকার সর্বত্র। প্রকৃতির কী পরিহাস—এক সময় ইরিনকে সে ভয় দেখিয়েছিল ইন্টারনেটে তার ছবি-ভিডিও ছড়িয়ে দেবে বলে আর এখন তার নিজের ছবিই একজন দাগী ধর্ষক হিসেবে ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে ইন্টারনেটে। যতদিন বেঁচে থাকবে, একজন ধর্ষকের পরিচয় নিয়েই তাকে থাকতে হবে।
এদিকে ইমরানের কেসটিও তাঁরা সাজিয়েছে বিচক্ষণতার সাথে। মদ্যপ অবস্থায় রজার্স ইমরানকে আঘাত করতে চাইলে ইমরান ‘সেলফ ডিফেন্স’ করেছে এবং রজার্সকে প্রতিঘাত করেছে। তাছাড়া তার মাইনর চাইল্ডকে রেপ এবং ব্লাকমেইল করার ভিডিও এবং ইমেইল দেখার পর থেকেই সে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিল তাই রজার্সের উপর তার আক্রোশ তৈরি হয়—বেড়ে যায় প্রতিহিংসা। সে চাইলে তাকে খুনও করতে পারত—কিন্তু তা না করে রজার্সকে শুধু আহত করেছে। ইমরানের সাজা দীর্ঘ মেয়াদী যাতে না হয় সে ব্যাপারে তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাবে।
এলিনাও সাক্ষ্য দিয়েছে রজার্স মদ্যপ অবস্থায় তাকে প্রায়ই মারধর করত। ব্যস—রজার্স মোটামুটি ভালোভাবেই ফেঁসে গিয়েছে। এলিনা যখন বলছিল কথাগুলি—ইমরান সত্যিই অবাক হয়েছিল।

ইমরানের বাসার সামনে একটা পুলিশের গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। দুজন পুলিশ অফিসার সাথে ইমরানের ল’ইয়ারকেও দেখা যাচ্ছে। ইমরানকে নিতে এসেছে। একজন পুলিশ ওয়াকিটকিতে কথা বলছে। আরেকজন ইমরানের ল’ইয়ারের সঙ্গে কথা বলছে।
ইরিন আর এলিনাকে জানানো হয়েছে—ইমরানকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। কাজেই এ নিয়ে খুব একটা চিন্তা করার দরকার নেই। ইমরানের পরামর্শেই তার ল’ইয়ার ইরিন আর এলিনাকে বলেছে। কিন্তু কোথায় যেন কিছু একটা সমস্যা আছে—বুঝতে পারছে না কেউ।
ইরিন আর এলিনাও এসে দাঁড়িয়েছে পার্কিং লটে। ইরিন ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে তার বাবার দিকে। সে চেষ্টা করছে কিন্তু কিছুতেই নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না।
ইমরানকে জড়িয়ে ধরে সে বলল, ‘I love you baba. I always have. Always will.’
‘I know sweetheart! You’re my dearest daughter.’ একটু থেমে ইমরান বলল, ‘I want to tell you that, you are an incredibly loving daughter. You’re a brave girl and your mother is a strongest person I know. You and your mother will get through this together!’
‘I’ll take care of myself. I’ll be fine. Do not worry about me.’ বলেই ইরিন আবার জড়িয়ে ধরল তার বাবাকে।
‘I will be back soon. Goodbye Erin.’
‘Goodbye baba’ ইমরানের হাতে একটা চুমু দিয়ে ইরিন তাকে ছেড়ে দিল।
ইমরান একবার তাকাল এলিনার দিকে। সে ঠোঁট কামড়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইমরান কিছুই বলল না এলিনাকে। গাড়িতে উঠার ঠিক আগের মুহূর্তে সে ফিরে গেল এলিনার কাছে। ‘Take care of your child and yourself!’
ইমরান পুলিশের গাড়িতে উঠে বসল।
এলিনা আর ইরিন দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মতো। অনিশ্চিত চোখে তাকিয়ে রইল চলে যাওয়া গাড়ির দিকে।
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-৬)

এলিনা মূর্তির মত দাঁড়িয়ে আছে। নিজের কানকে বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। ইরিন যা বলছে তা যদি সত্যি হয়ে থাকে—ওহ মাই গড! সে কিছুতেই ভাবতে পারছেনা তার নিজের মেয়ে—নাড়ি ছেঁড়া ধন—আর তার সাথেই কিনা এসব ঘটেছে। মনে পড়ল সেই দিনটির কথা—যেদিন সেইন্ট মেরি হসপিটালে ইরিনের জন্ম হলো। অনেক কষ্ট হয়েছিল এলিনার। বাচ্চা প্রসবের দেরি দেখে ইমরান ডাক্তারকে সার্জারির কথা কয়েকবার বলেছে কিন্তু ডাক্তারের স্পষ্ট জবাব, সার্জারির দরকার হলে আমরা করব কিন্তু এখনো এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়নি যে সার্জারি করতে হবে। আমরা নরমাল ডেলিভারির চেষ্টা করছি। বেচারা ইমরান, না পারছে ডাক্তার কে বোঝাতে, না পারছে এলিনার কষ্ট সহ্য করতে।
ঘণ্টার পর ঘণ্টা পেরিয়ে গেল কিন্তু নরমাল ডেলিভারির কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। এদিকে এম্নিওটিক ফ্লুইড শুকিয়ে জীবন মরণ দশা হলো দুজনেরই। অবশেষে প্রায় ষোল ঘণ্টা যুদ্ধ আর যমে দূতে টানাটানির পর ভূমিষ্ঠ হলো এক ফুটফুটে পরীর বাচ্চা। তারপর একটানা সাতদিন পরীর বাচ্চাটাকে ইনকিবিউটরে রাখতে হলো বিলিরুবিন বেড়ে যাওয়ার কারণে।
কত কষ্ট আর যত্ন করে তিলে তিলে বড় করা তার আদরের মেয়ে ইরিন আর তাকেই কিনা এমন নরক যন্ত্রণার মধ্যে দিয়ে যেতে হচ্ছে। এলিনার সবকিছু কেমন এলোমেলো হয়ে গেল। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না। ইচ্ছে হচ্ছে এখুনি ছুটে গিয়ে ঐ সান অফ অ্যা বিচকে খুন করে ফেলতে।
দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে ইরিনের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে এলিনা বলল, ‘এসব কথা তুমি আমাকে আগে বলনি কেন?’
‘আগে বললে তুমি কী করতে? কিছু করতে পারতা?’
‘কী করতে পারতাম কী পারতাম না সেটা তো পরের কথা। But you should have told me at least—তোমার অবশ্যই উচিত ছিল আমাকে সব কিছু খুলে বলা। I’m not only your mother Erin, I’m also your friend. You used to tell me every little thing, you remember?’
‘I used to, but you’re not my friend anymore… you left me! আমি বলি নাই তোমাকে—বাট বলতে চাইছিলাম—দেন মনে হইছে তুমি আমাকে বিলিভ করবা না—তাই বলি নাই। plus, I’m not important in your life anymore—you’ve someone more important in your life now! Who cares about me?’
এলিনা অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল ইরিনের মুখের দিকে। তাহলে কি সে সত্যিই অনেক দূরে সরে গেছে তার একমাত্র মেয়ের জীবন থেকে? নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো তার।
‘তাছাড়া এসব কথা জানাজানি হলে আমাকেই সবাই খারাপ ভাবত। My friends would have bullied me…’ একটু থেমে ইরিন আবার বলল, ‘You also insulted me mom. You yelled at me that; I was a trash. Did you forget everything? ভুলে গেছ?’
এলিনা কোনো উত্তর দিতে পারল না। অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইরিনের মুখের দিকে। আসলেই তো রজার্সের সাথে সম্পর্কের কারণে সে এই বাচ্চা মেয়েটির সাথে কত দুর্ব্যবহার করেছে। বিচ্ছিরি ভাষায় গালাগাল করেছে। স্বার্থের কারণেই বোধহয় মানুষ এমন অন্ধ হয়ে যায়। এলিনা কি তাহলে হেরে গেল? ইরিনের ঘৃণা ভরা অগ্নিদৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকা সম্ভব হলো না—সে দৃষ্টি সরিয়ে নিল ইরিনের মুখের উপর থেকে।

ইমরানের বাসার বেশির ভাগ বাতি বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। আলো আঁধারের একটা পরিবেশ বিরাজ করছে ঘরটার মধ্যে। অনেকক্ষণ থেকে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে। জানালার পর্দা গলে বাইরে থেকে আলোর ছটায় দেখা গেল রজার্সকে—একটা চেয়ারে বসা। শক্ত করে তাকে চেয়ারের হাতলের সঙ্গে বেঁধে রাখা হয়েছে। মাথাটা ঝুঁকে আছে সামনের দিকে। তার চোয়ালে বড় একটা ক্ষত চিহ্ন। নাকের ফুটা দিয়ে রক্ত ঝরছে। নাকটা বেশ খানিকটা থেঁতলে গেছে। ঠোঁট কেটেও রক্ত ঝরেছে অনেক। একটা কালো রঙের গ্যাফার টেপ দিয়ে রজার্সের মুখ আটকানো—যাতে কোনো শব্দ করতে না পারে সে। বিপর্যস্ত রজার্স বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে আছে সামনে দাঁড়ানো মানুষটির দিকে। মানুষটি আর কেউ নয়—ইমরান। তার হাতে একটা বেসবল ব্যাট।
এলিনা আর ইরিন বাইরে হাঁটতে চলে যাবার পর থেকেই ইমরান কৌশলে রজার্সকে একটার পর একটা ড্রিঙ্কস দিয়ে মোটামুটি মাতাল বানিয়ে ফেলে। তারপর হুট করেই চেয়ারের সঙ্গে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফেলে তাকে। বাধা দেবার মতো শক্তি তেমন ছিল না। ঘটনার আকস্মিকতায় থতমত খেয়ে যায় সে। অতঃপর আত্মসমর্পণ।
রজার্সের দিকে কিছুক্ষণ ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শীতল কণ্ঠে ইমরান বলল, ‘Do you realize what I’m going to do to you?’
রজার্স কিছু বলার চেষ্টা করল কিন্তু টেপ দিয়ে মুখ আটকানো থাকায় কোনো শব্দ বের হলো না। ইমরান তার মুখ থেকে হ্যাঁচকা টানে সেঁটে থাকা টেপটি তুলে ফেলল।
‘What’s going on Imran? What are you doing?’ একটা লম্বা নিঃশ্বাস ফেলে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল রজার্স।
‘Exactly what you deserve!’
‘This is what you do to your guest?’
‘You don’t deserve a fair trial my friend—after what you did to my family.’ চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বলল ইমরান। তারপর হঠাৎ করেই হাতের ব্যাটটি দিয়ে সজোরে আঘাত করল রজার্সের ঊরুসন্ধির ঠিক মধ্যস্থলে।
চেয়ার উল্টে পড়ে গেল রজার্স। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল তার মুখ। ‘Oh my God! You crazy bastard! What the hell is wrong with you?’ হাঁপাতে হাঁপাতে কোনো রকমে বলল সে।
হাঁটু গেঁড়ে রজার্সের সামনে বসল ইমরান। মুখ নামিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, ‘I’ve waited a long time for this, Rogers!’
‘I should have known that you weren’t inviting for a social dinner.’ রজার্সের কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। ইমরান তাকে ধরে চেয়ার সোজা করে বসিয়ে দিল।
‘Well what do you expect?’ ইমরান বলল হাতের ব্যাটটি নাড়াতে নাড়াতে।
‘I expect some respect—only if you know how to…’
‘Respect?’ সিনেমার ভিলেনদের মত অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ইমরান। হঠাৎ করে হাসি থামিয়ে বেসবল ব্যাটটি রজার্সের চিবুকে ঠেকাল সে।
ইমরানের দিকে তাকিয়ে রজার্সের হৃৎপিণ্ডে কাঁপন ধরে গেল—ভয়ের শীতল স্রোত শিরশির করে নেমে গেল তার শিরদাঁড়া দিয়ে। ইমরানের চোখে স্পষ্ট খুন দেখতে পেল সে। রজার্স অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘You wanna kill me?’
‘No no no, I cannot kill you. You’re my wife’s boyfriend after all and you’re my guest too, right?’
‘Man, are you psycho or what? I’m telling you Imran—you will regret for this!’
‘Really? Psycho? Me? Oh, I’m no psycho. What I’m doing is purely logical. Revenge. The real psycho is somebody who rapes his girlfriend’s daughter!’ হিশহিশ করে কথাগুলো বলে রজার্সের দিকে হিংস্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ইমরান।
রজার্সের চোয়াল ঝুলে পড়ল। হাঁ করে তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না—ইমরান কী বলল? সে ভাবছিল—এলিনার সাথে তার সম্পর্কের কারণেই তাকে টর্চার করছে ইমরান। কিন্তু—। তার মানে ইমরান আগে থেকেই সবকিছুই জানত। এলিনা? সেও কি জানে? সবটাই কি তাহলে পূর্ব পরিকল্পনা? ইরিনকে নিয়ে এলিনা তাহলে বাইরে চলে যাবে কেন? আর এতক্ষণ হয়ে গেল—এলিনা ফিরছেই বা না কেন? রজার্সের মাথা এলোমেলো হয়ে গেল। তার ব্রেইন কাজ করছে না—চিন্তা শক্তি লোপ পেল পুরোপুরি। চোখেও ঝাপসা দেখছে একটু একটু। এতগুলো ড্রিঙ্কস করাটা তার মোটেই ঠিক হয়নি। নাহলে রজার্সের মতো এমন তাগড়া জোয়ান জিম ইন্সট্রাকটরের সঙ্গে ইমরানের মত এভারেজ হাইটের সাধারণ একজন মানুষের পক্ষে পেরে উঠার কথা ছিল না। রজার্সের আগেই বোঝা উচিৎ ছিল। তার মত একজন স্মার্ট মানুষের পক্ষে এমন ভুল হয়ে গেল—মনে মনে নিজেকে ধিক্কার দিল সে। চালে মস্ত বড় একটা ভুল করে ফেলেছে সে।
‘Tell me Rogers—who’s real psycho?’ ইমরানের কথায় চিন্তায় ছেদ পড়ল তার।
‘No. This can’t be true. Who told you that? Can you tell me? Can you prove?’
‘You need proof?’
‘Yeah. Prove me.’ সাহস নিয়ে বলল রজার্স।
ইমরান কিছু না বলে তার ফোনটা বের করে রজার্সের চোখের সামনে ধরল একবার। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই রজার্সের চেহারা পাংশু বর্ণ ধারণ করল। মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হলো না।
ইমরান তার হাতের ব্যাটটি উঁচু করে ধরে রজার্সের মুখের সামনে নিয়ে নাড়াতে থাকল। পরাজিত ভঙ্গিতে রজার্স ভয়ার্ত চোখে তাকিয়ে রইল ব্যাটটির দিকে। যে কোনো মুহূর্তে নেমে আসবে তার চোয়ালে। সে প্রমাদ গুনল।

এলিনার চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে—অনবরত। চোখ মুছতে মুছতে সে বলল, ‘How about your dad? তাকেও কিছু বলনি?’
ইরিন ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘No! Are you out of your mind? He would have had a heart attack. তোমার কি মনে হয়, বাবা জানলে ওকে বাসায় ইনভাইট করত? কক্ষনো না। He would have simply killed him.’
এলিনা কিছু বলল না। সে গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল কিছু সময়ের জন্যে। তারপর চোখ খুলে তাকাল ইরিনের দিকে। ইরিন তার মায়ের চেহারার দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে গেল। কেমন অস্থিরতায় ভুগছে সে। হঠাৎ করেই এলিনা উঠে দাঁড়িয়ে বাতাসে হাত ছুঁড়ে বলল, ‘Let’s go.’ বলেই সে ইরিনের হাত ধরল।
ইরিন লক্ষ্য করল, এলিনা কেমন পাগলের মতো এলোমেলো আচরণ করছে। এলিনা বলল, ‘I will kill that bastard myself—in my own hand!’ বলেই ইরিনের হাত ধরে প্রায় টেনে নিয়েই ছুটে চলল এলিনা—গন্তব্য ইরিনদের বাসা।

দু’পা ভাঁজ করে রজার্সের সামনের মেঝেতে ধ্যানে বসা ভঙ্গিতে বসে আছে ইমরান। তাকিয়ে আছে রজার্সের চোখের দিকে।
রজার্সের শরীর বেয়ে ভয়ের শীতল স্রোত বয়ে গেল। ইমরানের দৃষ্টিতে এমন কিছু আছে যে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না—চোখ ফিরিয়ে নিল।
ইমরান বলল, ‘It’s time Rogers. Are you ready?’
‘Go to hell.’
‘Oh I’ve been in the hell. Every time you were in me, it was a living hell.’
‘It was not my fault. She was high on drugs and… she asked for it.’
একথা শুনে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করল ইমরান। তার চোখ ঠিকরে আগুন ঝরতে থাকল। হাতের ব্যাটটি নিয়ে রজার্সের চোয়ালের নিচে চাপ দিয়ে ধরে সে বলল, ‘She asked for it?! How the hell does a fourteen-year-old asks to be raped?!’ বলেই ব্যাটের মাথা দিয়ে সজোরে আঘাত করল রজার্সের মুখে।
রজার্সের মুখ থেকে রক্ত ঝরে পড়ল। কয়েকটা ফোঁটা রক্ত গড়িয়ে পড়ল মেঝেতে। সে একদলা থুথু ফেলল—একটা দাঁত খুলে পড়ল থুথুর সাথে।
রজার্স কোনো রকমে বলল, ‘If you’re going to kill me, just do it already.’
রজার্সের মুখের অভিব্যক্তি দেখে ইমরান অবাক হয়ে তাকাল। অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, ‘Oh my God. I can’t believe it…’
রজার্স তাকাল ইমরানের দিকে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে।
‘You. Your face. No sign of regret in there. You don’t regret doing it. You raped your girlfriend’s daughter and you don’t feel anything about it. Like it was a normal thing.’
রজার্সের চেহারায় কোনো পরিবর্তন হলো না। সে ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
‘Do you really love Elina?’
ইমরানের হঠাৎ করা প্রশ্নে অবাক হয়ে বলল রজার্স, ‘Why you’re asking me same question again. I answered you before.’
‘Answer me again. Do you love Elina?’ শীতল কণ্ঠে ইমরান বলল।
‘Yes I do.’
‘You wanna marry her?’
‘What nonsense. I told you once.’
‘Tell me again.’
‘Yes. Yes, I wanna marry her. And I’m going to marry her.’
‘Once you marry her, Erin would be your daughter, right?!’
রজার্স কিছু না বলে তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে।
একটু বিরতি নিয়ে ইমরান আবার বলল, ‘Tell me Rogers, if you ever had a daughter, would you do to her what you did to your soon to be daughter??’
রজার্স তাকিয়ে রইল ইমরানের দিকে। সে কিছু বলল না।
‘Answer me.’
ইমরানের ধমকে একটু নড়ে উঠে বলল রজার্স, ‘No because I would actually love her. She wouldn’t be some spoiled tramp’
কথা শেষ করার আগেই ব্যাটের আঘাতে রজার্সের মুখ ঘুরে গেল। ইমরান অগ্নিমূর্তি ধারণ করে বলল, ‘You son of a bitch!’
ঠোঁট কেটে আরেক দফা রক্ত বের হলো ফিনকি দিয়ে। চেষ্টা করেও মুখ সরাতে পারল না রজার্স।
ইমরান রজার্সের মুখের কাছে এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে রক্ত ছুঁয়ে দেখল। হাতের আঙ্গুলে রক্ত পিষে বলল, ‘You said I’m gonna regret leaving you alive. Perhaps. But now you will regret me leaving you alive.’
‘Why—you don’t wanna kill me?’
‘Nope, I don’t wanna kill you. I will do something far worse. You’ll never be able to do such thing ever again in your life what you did to my daughter.’
‘Worse than killing me? Really? What’s that?’ ঢুলু ঢুলু চোখে কোনো রকমে বলল রজার্স।
‘No rush my friend. Just wait…’
ইমরান একটা ক্রূর হাসি দিয়ে চলে গেল কিচেনে। দুহাতে গ্লাভস ঢুকিয়ে ওভেন খুলে দেখল স্টেইনলেস স্টিলের বারবিকিউ করার গ্রিলিং টংটি এখনো জ্বলছে। জ্বলন্ত টংটি বের করে নিয়ে সে ফিরে এলো লিভিংরুমে। দাঁড়াল রজার্সের সামনে। এক মুহূর্ত তাকাল রজার্সের চোখের দিকে।
রজার্স ভয়ার্ত চোখে দেখল ইমরানের অগ্নিদৃষ্টি—হাতে জ্বলন্ত টং। কিছু বুঝে উঠার আগেই ৪৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইট টেম্পারেচারে পোড়ানো জ্বলন্ত টং দিয়ে রজার্সের জেনিটাল চেপে ধরল ইমরান—ধরেই রইল। বাড়তে থাকল চাপ—ধীরে ধীরে।
ব্যথায় আর্তনাদ করে উঠল রজার্স। চোখে ঘোর অন্ধকার দেখল সে। দাঁতে দাঁত চেপে রইল সে।
ইমরান চার্জ করল আবার। আরেকবার। শেষ বার হাতের কব্জি ঘুরিয়ে থেঁতলে দিল রজার্সের পুরুষাঙ্গটি।
কোঁত করে একটা শব্দ বেরিয়ে এলো রজার্সের মুখ থেকে। চিৎকার দিয়ে চেয়ার থেকে মেঝেতে উল্টে পড়ে গেল সে। একধরণের গোঙানির মতো শব্দ করতে থাকল শুধু। মনে হচ্ছে কেউ তার মুখ চেপে ধরে নিঃশ্বাস বের করে দিতে চাইছে।
ইমরান নিচু হয়ে রজার্সের পাশে বসল আবার। তার বিস্ফারিত চোখের দিকে তাকিয়ে ইমরান বলল, ‘You ruined two lives and now, it’s your turn to payback. Goodbye Rogers. Have a great sleep!’
রজার্স কিছু বলতে পারল না। ধীরে ধীরে তার চোখ বন্ধ হয়ে এলো। ইমরান তার শরীর মনের আক্রোশ নিভিয়ে ঘৃণা ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রজার্সের চোখের দিকে। চোখ বন্ধ হয়ে যেতেই দৃষ্টি ঘুরিয়ে সে একবার দেখল—রজার্সের রক্তাক্ত ও থেঁতলানো শরীরের বিশেষ অঙ্গ থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে। পোড়া গন্ধ বের হয়ে এল সাথে সাথেই।
রজার্স জ্ঞান হারাতেই ইমরান উঠে চলে গেল। খুব ধীরে এক শট কানাডিয়ান ক্রাউন রয়েল ঢালল গ্লাসে। একবারে গলায় ঢেলে দিয়ে মাথা ঝাঁকাল। কিছু সময় স্থির হয়ে বসে রইল সে। তারপর হঠাৎ করেই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল ইমরান। হাসতে হাসতেই কল করল ৯১১ নাম্বারে। এম্বুলেন্স আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে থাকল সে।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-৫)

একটা দীর্ঘ সময় পার করে জ্ঞান ফিরে এলো ইরিনের। চরম এক অস্বস্তিবোধ নিয়ে সে চোখ খুলে তাকাল। একবার দেখল চারপাশটা তারপর নিজেকে আবিষ্কার করল সম্পূর্ণ অনাবৃত অবস্থায়—বিছানায়। লিভিং রুমের সোফাতে সে বসা ছিল, সেখান থেকে বেডরুমের বিছানায় কখন কিভাবে এলো—ইরিন বোঝার চেষ্টা করল। সোফাতে বসা অবস্থায় তার মাথাটা ঝিম ঝিম করছিল… তারপর মনে পড়ল রজার্সের কথা—আইসক্রিম! আর বেশি সময় অপেক্ষা করতে হলো না ইরিনের—সে বুঝে গেল আসলে কী ঘটেছে। সে জানে এলিনার ইনসমনিয়া আছে। আইসক্রিমের উপরে ভেসে থাকা পাউডার আর কিছুই না—নিশ্চয়ই ঘুমের ওষুধ ছিল। যে কারণে তার মুখে আইসক্রিম তেতো লেগেছিল। তাকে অজ্ঞান করে তাহলে… ওহ গড, ওহ গড!
এটুকু ভাবতেই ধরমর করে দ্রুত বিছানায় উঠে বসল ইরিন। মাথাটা আবার ঘুরে উঠতে চাইল একবার। নিজেকে স্থির করে নিয়ে সে দ্রুত তার কাপড় পড়ে নিল। এবং সঙ্গে সঙ্গেই সে আবিষ্কার করল একটা টুকরা কাগজ তার হাতের সঙ্গে লেগে রয়েছে। চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে দেখল সে—রজার্সের কোনো অস্তিত্ব বোঝা গেল না। সে হাতের কাগজটি খুলে দেখল একটা মেসেজ।
‘You fell in sleep. When you wake up—if you remember anything, just erase that from your memory. If you try to tell this to anybody, I will make your life miserable and you’ll regret it for rest of your life!’
ইরিনের শরীরে কাঁপুনি দেখা দিল। কুঁকড়ে গেল তার শরীর। তেষ্টায় বুক ফেটে যাচ্ছে। জিভ তালু সব শুকিয়ে গেছে। মনে হচ্ছে এখনই বমি হয়ে যাবে। সে দ্রুত বাথরুমে গিয়ে ঢুকল।
বাথরুমের আয়নায় নিজেকে দেখে চমকে উঠল ইরিন। শরীরে এগুলো কিসের দাগ? এসব দাগ তো আগে ছিল না। হঠাৎ প্রচণ্ড ব্যথা অনুভব করল শরীরের নিচের অংশে। কোমরটা ভেঙ্গে যাচ্ছে—পা দুটো অবশ হয়ে আসছে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে খুব। ইরিন কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে সে চিৎকার করল। এমন কিছু একটা ঘটে যেতে পারে সে কোনোদিনই ভাবেনি। এমন কিছু তো সে চায়ও নি। তাহলে এমন কেন হলো?
ইরিনের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে এলো আবার। ঝর ঝর করে কেঁদে ফেলল মেয়েটি। চোখ ভরে গেল কান্নার পানিতে।
কিছু সময় পার করে নিজেকে গুছিয়ে নেবার চেষ্টা করল সে। বেসিনের পানি ছেড়ে দিয়ে চোখে মুখে পানি ছিটিয়ে নিল। বাথরুম থেকে বের হবার আগে তার চোখ চলে গেল আয়নায়, নিজেকে দেখল আরেকবার—কেমন অচেনা লাগছে নিজেকে।
এলিনাকে একবার ফোন করল সে—কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। ইরিন আর এক মুহূর্ত দেরি না করে লিভিংরুম থেকে তার হাত ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে গেল অভিশপ্ত বাড়িটি থেকে।

গত এক ঘণ্টা ধরে শাওয়ারের নিচে দাঁড়িয়ে আছে ইরিন। পানির ধোঁয়ায় শাওয়ারের কাঁচের দেয়াল ঢেকে গেছে। ইরিন তার শরীর থেকে সব নোংরা ধুয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই পরিষ্কার হচ্ছে না। সমস্ত শরীর সাবান মেখে স্ক্রাব দিয়ে কতবার ঘষেছে তার ঠিক নেই—তবুও মনে হচ্ছে শরীর থেকে নোংরা যাচ্ছে না। চিৎকার করে কাঁদছে মেয়েটি। তার চোখের পানি আর শাওয়ারের পানি মিশে একাকার হয়ে গেল।
ঐদিনের পর থেকে ইরিন একেবারেই চুপ হয়ে গেল। কিছুদিন স্কুলেও গেল না। ইমরান বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছে তার কী হয়েছে। শরীর খারাপ বলে এড়িয়ে গেছে। এলিনা বলেছিল, পিরিয়ডের সময় অনেক পেইন হয় ইরিনের। ব্যথায় মেয়েটি কাৎরাতে থাকে—একেবারেই ব্যথা সহ্য করতে পারে না। ইরিনের হয়ত পিরিয়ড চলছে, তাই সে আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করেনি। সে একবার শুধু বলেছে, দুটো মাইডল খেয়ে ঘুমিয়ে পড়। ইমরান দেখেছে মিন্সট্রুয়াল ক্রাম্পিং এর জন্যে দুটো করে মাইডল ট্যাবলেট এলিনা খাইয়ে দিত ইরিনকে।
এলিনা কয়েকবার ফোন করেছে—কিন্তু ইরিন কথা বলেনি। তার বন্ধুরা যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে—সে কারো সঙ্গেই কোনো কথা না বলে নিজেকে গৃহবন্দী করে রাখল সম্পূর্ণভাবে।
এভাবেই কেটে গেল কিছুদিন।
ইতিমধ্যেই ইরিনের ফোনে বেশ কিছু টেক্সট মেসেজ এলো। হঠাৎ একদিন বেশ কিছু মেসেজ এসেছে রজার্সের—ইরিনকে সাবধান করে দেয়া মেসেজ। ইরিন একটা খুলে দেখল। রজার্স লিখেছে, ‘Why are you not replying me? If you do not listen to me, I will tell everyone that you sell your body for money to buy drugs!’
‘What?’ নিজের অজান্তেই চমকে উঠল ইরিন। এসব কী বলছে পিশাচটি?
পরের মেসেজে একটি ছবি—খুলতেই দেখল একটি মেয়ে সম্পূর্ণ নগ্ন হয়ে ঘুমিয়ে আছে। জুম করতেই ইরিনের শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে এলো বরফঠাণ্ডা জলের স্রোত। ভয়ের একটা শীতল শিহরণ তার ভেতরে পাক দিয়ে উঠতে লাগল। মনে হলো ওর পাকস্থলীটা কেউ যেন খামচে ধরল। চোখ বড় বড় করে ছবিটির দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল ইরিন। মেয়েটিকে দেখতে অবিকল তার মত লাগছে কেন? কয়েক সেকেন্ডের জন্য ইরিন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল।
ইরিন হিস্টিরিয়ার রোগীর মত আচরণ করতে লাগল। সে দ্রুত রজার্সের পাঠানো পরের মেসেজটিও পড়ল। ‘I’ve some more surprises like these. If you do what I ask you to do, I promise, I will delete all the pictures… will delete all the surprises too.’
‘Surprise? What surprise? What is he talking about?’ ইরিন আর চাপ নিতে পারছে না। তার ভয় হলো, বিষয়টি যদি সত্যিই জানাজানি হয়ে যায় তাহলে খুবই লজ্জার হবে। সে কিছু ভাবতে পারছে না। সে রজার্সের পরের মেসেজটি খুলে দেখল। ‘If you don’t want trouble—you follow my instruction and do what I want you to do… out and clear.’
কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল ইরিন। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে তার। বিষণ্ণতা ঘিরে ধরল তাকে। অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ল তার সমস্ত শরীর। ক্ষণে ক্ষণে মনে পড়ছে তার মাকে। ইচ্ছে হচ্ছে মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে। এখন তার মা কাছে থাকলে এসব কিছুই হতো না। আবার পরক্ষণেই প্রচণ্ড অভিমান হলো তার। সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, এ জীবনে সে তার মাকে আর কোনোদিনই ক্ষমা করবে না। যে নিজের স্বার্থের জন্য ছোট একটা মেয়েকে এভাবে ফেলে যেতে পারে—এমন মায়ের কথা সে কেনই বা ভাববে।

রাতে ঘুমানোর আগে ইমরান রুটিন মাফিক একবার এসে ঘুরে গেল ইরিনের রুম থেকে। সে দেখল ইরিন বিছানায় মাথা নিচু করে বসে আছে। ইমরান দরজায় নক করতেই ইরিন মাথা তুলে তাকাল। ইমরান জিজ্ঞেস করল, ‘ঘুমাওনি এখনো?’
ইরিন কোনো উত্তর দিল না। সে যেভাবে ছিল সেভাবেই চুপ করে বসে রইল। ইমরান কাছে এগিয়ে এসে ইরিনের কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘এভাবে বসে আছ কেন? মন খারাপ?’
ইরিন হঠাৎ করেই কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই সে বলল, ‘I miss mommy so much. I need her.’
ইমরান কী বলবে ভেবে পেল না। সে ইরিনের মাথায় হাত রাখল।
‘Why did you let her go? Why couldn’t you keep her? Was it too difficult?’ ইরিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদল কিছুক্ষণ। ইমরান তার মেয়েকে কাঁদতে দিল—কিছু বলল না।
একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ইমরান বোঝানোর চেষ্টা করল। ‘ইরিন, তুমি এখন বড় হয়েছ। তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে, even two good souls cannot stay together forever. Sometimes, no matter how hard they try, their relationships just don’t work. Things happen, they get separated.’ একটু থেমে ইমরান আবার বলল, ‘When people divorce, it’s always such a tragedy. At the same time, if people stay together it can be even worse!’
মানব সম্পর্কের জটিলতা বোঝার মতো গ্রে ম্যাটার ইরিনের ক্ষুদ্র মস্তিষ্কে এখনো তেমন হয় নি—সে আনমনে বলল, ‘Yea, I guess it’s complicated.’
‘Yes, it is.’ ইমরান আবার বলল, ‘কিছু সময় আছে—কাদা ছুঁড়াছুঁড়ি, মারামারি কিংবা কেউ কারো কোনো ক্ষতি না করে আলাদা হয়ে যাওয়াই কি ভাল না? Sometimes it’s better to light a candle than curse the darkness!’
এসব কথায় ইরিনের কষ্টের কোনো হেরফের হলো না। সে মাথাটা এলিয়ে দিল বাবার কোলে।
ইরিনের মাথার চুলে কিছুক্ষণ আদর করে দিয়ে ইমরান বলল, ‘অনেক রাত হয়েছে ঘুমিয়ে পড়—ট্রাই টু গেট সাম স্লিপ।’ ইরিনের কপালে আলত করে একটা চুমু দিয়ে ইমরান কয়েক পা দরজার দিকে এগিয়ে যেতেই ইরিন ডাকল, ‘বাবা!’
ইমরান ঘুরে দাঁড়াল। ইরিন তাকিয়ে আছে তার দিকে—সে কি কিছু বলতে চায়? কিন্তু কিছু না বলে চুপ করে রইল ইরিন। ইরিনের মনের ঝড় ইমরান বুঝতে পারল না। পারার কথাও না। ইমরান অবাক হয়ে বলল, ‘কী মা—কিছু বলবে?’
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকার পর ইরিন বলল, ‘I’m sorry for the other day.’
‘I’m sorry too.’
‘Goodnight baba.’
‘Goodnight sweetheart.’
ইরিনের রুমের দরজা ভিজিয়ে ধীর পায়ে ইমরান চলে গেল তার রুমে।

আরো কিছুদিন কেটে গেল। ইরিন ভুলে যাবার চেষ্টা করছে—প্রাণপণে—সেই বিভীষিকাময় দিনটির কথা। যদিও ক্ষণে ক্ষণেই তার শরীর কেঁপে উঠল দিনটির কথা মনে হতেই।
ক্লাস হোমওয়ার্কে পিছিয়ে যাচ্ছিল সে—কয়েক সপ্তাহ হলো শরীরের অসুস্থতার কথা বলে বন্ধুদের সঙ্গ পরিত্যাগ করে স্কুল হোমওয়ার্ক গুলো শেষ করার চেষ্টা করছে ইরিন। একদিন সন্ধ্যায় পরার টেবিলে বসে ইরিন হোমওয়ার্ক করছিল। তার হাতে একটা চকোলেট ক্যান্ডি বার। সে মাঝে মাঝে একটা কামড় দিচ্ছে আর হোমওয়ার্ক দেখছে। হঠাৎ তার সেল ফোন বেজে উঠল। সে অন্যমনস্ক ভাবে নাম্বার না দেখেই ফোনটা কানে তুলে নিয়ে বলল, ‘Hello!’
‘Hello Erin…’ অপর প্রান্ত থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। শীতল—কর্কশ।
‘Who’s this?’
‘You cannot recognize me? Wow, I’m surprised!’
মুহূর্তেই রক্ত শূন্য হয়ে গেলে ইরিনের মুখ। তার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না—ওপাশে কে কথা বলছে। জমে বরফ হয়ে রইল সে।
‘I’m glad you’ve been quiet as I asked you to be. Good girl!’
‘What do you want?’ যথেষ্ট বিরক্তি নিয়ে ঝাঁঝাল কণ্ঠে সে জানতে চাইল।
‘I want to see you again baby girl!’
সঙ্গে সঙ্গেই ইরিন লাইন কেটে দিল। ভীত চোখে তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে।
কয়েক মুহূর্তে পরেই ইরিনের ফোন বেজে উঠল আবার। সে লাইন কেটে দিল। একটা ছোট বিরতি দিয়ে আবার বাজল ফোন। এবং বেজেই চলল। ইরিন দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোন ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘What else you want from me?’
‘Erin, is everything alright? What are you talking about?’ ওপাশ থেকে ইমরান উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।
ইরিন চুপ করে রইল। তার মাথা খারাপের মত হয়ে গেল। ধাতস্থ হতে একটু সময় লাগল তার। সে ভেবেছিল রজার্স।
‘Is everything alright?’ ইমরান আবার জিজ্ঞেস করল।
ইরিন যখন বুঝতে পারল ফোনের ওপাশে মানুষটি তার বাবা—সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বলল, ‘তুমি কখন আসবা?’
‘কেন কী হয়েছে মা?
‘I’m scared.’
‘Anything wrong?’
ভয়ার্ত এবং কান্না জড়িত কণ্ঠে ইরিন বলল, ‘Yes, something is very wrong but I can’t tell you now. Please come home soon.’ তার কণ্ঠে ভয় স্পষ্ট।
‘Are you crying?’
ইরিন কোনো উত্তর দিল না। কিন্তু তার কান্নার শব্দ ঠিকই বোঝা গেল। ইমরান আবার ডাকল, ‘ইরিন?’
ইরিন কিছু বলতে পারল না। কান্নার দমকে শরীরটা ফুলে ফুলে উঠছে ওর।
‘I’m on my way…’ ফোনটা কেটে দিয়ে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ না করে গাড়ি স্টার্ট দিল ইমরান। তারপর দ্রুত গতিতে ছুটে চলল বাড়ির দিকে।
ইমরানের সঙ্গে কথা বলে উঠে দাঁড়াতেই ইরিনের সেল ফোন আবার বেজে উঠল। ফোনের শব্দে সে চমকে উঠল। এবার সে ফোনের নাম্বার দেখল—অপরিচিত। সে লাল বোতামে চাপ দিয়ে ফোন কেটে দিল। একটা বিরতি দিয়ে ফোন আবার বাজল—
ইরিন ফোন হাতে নিল। সে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘Hello?’
অপর প্রান্ত থেকে সেই কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। ‘Check your email right now!’
‘Why? Why? What is in there?’ ইরিন চিৎকার করে বলল।
‘Surprise!’
ইরিন বুঝতে পারছে না সে কী করবে। অনেকক্ষণ দ্বিধায় থেকে ভয়ে ভয়ে তার ল্যাপটপ থেকে কাঁপা হাতে ইমেইল খুলল এবং সঙ্গে সঙ্গেই দেখতে পেল একটা ভিডিও ক্লিপ। নিচে লেখা, ‘Play this video and see what surprise is waiting for you!’
ইরিনের হার্ট বিট বেড়ে গেল। সে ভয়ে ভয়ে ক্লিক করতেই ভিডিওটি চালু হয়ে গেল। মনে মনে ঠিক যে আশঙ্কা করছিল—শেষ পর্যন্ত সেটিই ঘটতে যাচ্ছে। সে নিজের দু চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। সে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘What the hell is this Rogers?’
রজার্স শীতল কণ্ঠে বলল, ‘Now hear me out clearly. You will comply to everything that I say, and I, in return, will not put you down or any of your close loved ones.’
ইরিন চুপ করে রইল—তার মুখে কোনো কথা আসছে না।
‘If you do not listen to me, I will post the footage to the teenage porn site. I will make it public. Your friends will find out, your dad will find out, your mom will find out… and everyone will know you did it for money to buy drugs!’ একটা ক্রূর হাসি দিয়ে কথাগুলো বলল রজার্স।
ইরিন কিছু ভাবতে পারছে না। তার মাথা দপদপ করছে। কী করবে সে। বিধ্বস্ত ও বিপর্যস্ত মেয়েটি অসহায় কণ্ঠে বলল, ‘Can you please just tell me what you want?’
‘Just do what I ask you to do.’
‘What the hell do you want me to do?’
‘I’m texting you an address. You will meet me there tomorrow after school. I’ve a client—he’s very interested to meet with you.’
এসব কথার মানে কী? রাগে ক্ষোভে ইরিনের নিজের চুল ছিঁড়ে ফেলতে ইচ্ছে হলো। সে আর একটিও কথা না বলে ফোন কেটে দিল। দুহাতে তার চুল মুঠি করে চেপে ধরল। কিছুতেই বুঝতে পারছে না—কেন এসব হচ্ছে তার সঙ্গে। সে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘I swear, Rogers, I will tell my dad everything what you’ve done to me and he will tear you in pieces!’
নিজেকে শান্ত করার প্রাণপণ চেষ্টা করল ইরিন। কিছু সময় পার করে একটু স্থির হতেই নিজের অজান্তেই আরেকবার ভিডিও ক্লিপটি পলে করল ইরিন—কয়েক সেকেন্ড দেখেই জ্ঞান হারাল মেয়েটি।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-৪)

দু মাস আগের ঘটনা।
ইরিনের কয়েকজন বন্ধু ইরিনকে এলিনার বাসার সামনে নামিয়ে দিয়ে চলে গেছে। ইরিন টেক্সট করে জানালেই তাঁরা এসে আবার তাকে নিয়ে যাবে। এক বিশেষ প্রয়োজনে ইরিন এসেছে তার মায়ের সঙ্গে দেখা করতে।
ডোরবেল বাজতেই রজার্স দরজা খুলে দিয়ে দেখল ইরিনকে। সে কিছু বলার আগেই ইরিন দ্রুত ঘরের ভিতর ঢুকে পড়ল। দরজা বন্ধ করে রজার্স ইরিনের কাছে এসে অবাক হয়ে তাকাল। ইরিন রজার্সকে উপেক্ষা করে ঢুকে পড়ল বাথরুমে। কোনো রকমে কমোডের ঢাকনা খুলে হড় হড় করে বমি করে দিল। বমি করার শব্দে রজার্স কিঞ্চিত শঙ্কিত বোধ করল। সে বাথরুমের দরজার দিকে উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল ইরিন বের হওয়া পর্যন্ত।
বেশ কিছুক্ষণ পর ইরিন বের হয়ে এসে লিভিং রুমের সোফাতে বসে পড়ল। তার চেহারা দেখে যে কারো ধারণা হবে সে অসুস্থ। কেমন মাদকাসক্তদের মতো অস্থিরতায় ভুগছে সে।
ইরিনের উল্টো দিকের সোফাতে বসে রজার্স সন্দেহজনক চোখে তার দিকে তাকিয়ে জানতে চাইল, ‘Everything alright? You look terrible. Are you ok?’
‘Yea I’m fine.’ রজার্সের উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন ভেসে আসতেই ইরিন কোনোক্রমে নিজেকে সামলে নিয়ে আড়ষ্ট গলায় উত্তর দিল। ‘Where’s mom?’ জানতে চাইল সে।
‘At work.’
‘Work? Isn’t she supposed to be home today?’
‘She got a call from work. She’s covering a shift.’ একটু থেমে রজার্স আবার বলল, ‘Is there anything I can do for you?’
ইরিন হাতের উল্টো দিক দিয়ে তার নাক মুছল। নাকের ভিতর এক ধরনের জ্বালা পোড়া অনুভূতি হচ্ছে তার। সে হাতের উল্টো দিক দিয়ে আবার একটু ঘষল। তার অস্থিরতা বেড়ে গেল। আবার শীত শীতও লাগছে। নিজেকে উষ্ণ রাখার জন্যে দুহাত ভাঁজ করে বুকের উপর রাখল।
রজার্স তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখল ইরিনকে। তার চেহারা এবং আচরণে অস্বাভাবিকতা লক্ষণীয়।
ইরিন একটু চুপ করে থেকে ভয়ে ভয়ে খুব দ্রুত বলল, ‘I need some money.’
‘You need some money! Okay, why do you need money for?’
ইরিন কিছু বলল না। তবে তার আচরণে অস্বাভাবিকতা স্পষ্ট হয়ে উঠল।
রজার্স গভীরভাবে ইরিনকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করল। ইরিনের এলোমেলো আচরণ যথেষ্ট সন্দেহের সৃষ্টি করল তার মনে। ইরিনের চোখের দিকে তাকিয়ে সে উৎসুক কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘Are you doing drugs?’
ইরিন শীতল দৃষ্টি নিয়ে মুখ তুলে তাকাল রজার্সের দিকে। ‘No I’m not.’ দৃঢ়তার সাথেই জবাব দিল সে।
ইরিনের উত্তরে রজার্স খুব একটা আশ্বস্ত হলো বলে মনে হলো না। সে আবার বলল, ‘Did you ask your dad?’
ইরিন প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকাল রজার্সের দিকে। রজার্স বলল, ‘…for the money?’
ইরিন কোনো উত্তর না দিয়ে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তার চোখে মুখে হতাশা আর বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট।

সকালে খাবার টেবিলে নাস্তা করার সময় ইমরান দেখল ইরিন চুপচাপ বসে আছে। একটু অন্যমনস্ক দেখাচ্ছে তাকে। বাবা-মেয়ের খুব একটা কথাবার্তা কখনোই হয় না। ইরিনের সব কথা হয় তার মায়ের সঙ্গে। মা-ই তার বন্ধু। এলিনা চলে যাবার পর থেকে ইরিনের তাই কথা বলা হয় না। ইমরানের সাথে প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা হতো না—এখনো হয় না। ইমরানও বাসায় ফিরে রাত করে। অনেকটা যার যার তার তার অবস্থা। ইমরান আর ইরিন দুজনেই প্রায় একই সঙ্গে ঘুম থেকে উঠে। দুজনে একসঙ্গে নাস্তা করে। তারপর যে যার মত চলে যায়। ইমরান তার কর্মস্থলে আর ইরিন স্কুলে।
ইমরান দু স্লাইস ব্রেডের উপরে বাটার আর জ্যাম লাগিয়ে এগিয়ে দিল ইরিনের দিকে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে বলল সে, ‘তোমার স্কুল কেমন যাচ্ছে ইরিন?’
‘এইতো যাচ্ছে—নাথিং স্পেশাল।’
ইমরান লক্ষ্য করেছে ইদানীং ইরিন বেশ চুপচাপ থাকে। অথচ মেয়েটি কখনোই এরকম ছিল না। বেশ চটপটে স্বভাবের মেয়েটি হঠাৎ করেই কেমন হয়ে গেছে। ইরিনেরই বা কী দোষ? কথা বলার জন্যে একটা মানুষ তো চাই। আগে ওরা তিনজন—ইরিন, এলিনা আর ইমরান যখন কোথাও বের হতো, গাড়িতে উঠেই ইরিন বকবক শুরু করতো। এলিনা চলে যাবার পর থেকেই তার সমস্ত উচ্ছ্বাস নিমিষেই কোথায় হারিয়ে গেছে। হঠাৎ করেই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে সে। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারেনি। ইরিনের কাছে এখনো অনেক কিছুই স্পষ্ট নয়—তার বাবা মায়ের বিচ্ছেদটা কেন হলো? সবকিছুই তো ঠিক ছিল।
মেয়েটির দিকে তাকিয়ে ইমরানের মনে অজানা আশংকা দোলা দিল। ইরিনের কোন সমস্যা হয়নি তো? হয়েছে নিশ্চয়। কিন্তু কী?
‘নাথিং স্পেশাল বলছ যে? ক্যান ইউ বি স্পেসিফিক?’ খানিকটা অবাক হয়ে ইমরান জিজ্ঞেস করল।
‘আই ডোন্ট নো বাবা। আই হ্যাভ নো ফ্রেন্ডস এনিমোর। আই হ্যাভ নো বডি টু টক টু—ফিলিং লোনলি।’
ইমরান ভাবল সত্যিই তো। মেয়েটা তো একাই হয়ে গেছে। খুব মায়া হলো তার মেয়েটির জন্য। বাবা হিসেবে সে নিজেই বা কতটুকু দায়িত্ব পালন করতে পারছে? এলিনা চলে যাবার পরপর এক ধরণের একাকীত্ব তাকে গ্রাস করে—মাঝে মাঝেই তার খুব অসহ্য লাগত। তাই অফিসের কাজের পরে সেই একাকীত্ব কাটাতে সে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে চলে যায়—আড্ডা দিয়ে বাসায় ফিরতে বেশ দেরি করে ফেলে। বেশিরভাগ সময় ইরিন ঘুমিয়ে পড়ে। মেয়েটিকে তাই খুব একটা সময় দেয়া হয় না তার। ইরিন নিজেও প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা বলে না। যতক্ষণ বাসায় থাকে তার রুমের মধ্যেই থাকে।
একটু চুপ করে থেকে ইরিন হঠাৎ করেই খুব দ্রুততার সাথে বলল, ‘Dad, I need some money!’
চিন্তাচ্ছেদ হতেই ইমরান মাথা তুলে তাকাল ইরিনের দিকে। প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে রইল। ইরিন আবার বলল, ‘আমার কিছু টাকা দরকার।’
‘কেন?’ ইমরান অবাক হয়ে জানতে চাইল। মাসের শুরুতেই ইরিনকে লাঞ্চ মানি দিয়ে দেয় ইমরান। মাসের মাত্র দ্বিতীয় সপ্তাহ চলছে—যদি অন্য কোনো কারণে টাকা লাগে সেটা জানা দরকার। ইমরান আবার জানতে চাইল, ‘টাকা কেন দরকার?’
ইদানীং অল্পতেই রেগে যায় ইরিন। একমাত্র মেয়ে ছোটবেলা থেকে আদরে আর প্রশ্রয়ে বেড়ে ওঠায় না শুনতে অভ্যস্ত নয় সে। ইরিন অত্যন্ত বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘I just need it. I am a grown up girl and I have some needs.’ সিরিয়াস মুহূর্তগুলোতে ইরিন তার বাবা মাকে ড্যাড এবং মাম বলে ডাকে—নাহলে বাবা-মাই বলে।
ইমরান তাৎক্ষণিক ভেবেই জিজ্ঞেস করল, ‘Ok, how much do you need?’
‘১০০ হলেই চলবে।’
‘১০০ ডলার? এত টাকা দিয়ে কী করবে?’
‘It’s not a huge amount of money!’
‘Yes it is. At least for some people. Ok, tell me. তোমাকে তো লাঞ্চ মানি দেয়া হয়েছে অলরেডি—টাকাটা কেন লাগবে সেটা বলতে কি সমস্যা আছে?’
‘I have needs dad!’
‘তাতো বুঝলাম। কিন্তু নিডসটা কী, সেটা অন্তত বলো।’
‘আমার নিডস থাকতে পারে না? Ok, never mind. I don’t need your money.’ কিছুটা অভিমান মিশ্রিত কণ্ঠে রুক্ষতার সাথে বলল ইরিন।
ইমরান অবাক হয়ে তাকাল ইরিনের চোখের দিকে। ইরিনও কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকল কিছুক্ষণ তারপর হঠাৎ করেই উঠে চলে গেল।
ইমরান বলল, ‘Erin Stop!!’
ততক্ষণে দরজা খুলে বের হয়ে গেছে ইরিন। মেয়েটির এমন ব্যবহার ইমরানকে আহত করল। বেশ ভাবিয়েও তুলল। স্কুল থেকেও একবার ওর টিচার রিপোর্ট করেছে—কিছুদিন পর পর সবার সাথে তার ঝগড়া বিবাদ হয়। সামান্যতেই গণ্ডগোল লেগে যায়। আশেপাশের সবার সাথেও তার সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যেতে শুরু করেছে। ইরিন নিজেই সেটা বলল আজকে। গভীর চিন্তায় আচ্ছন্ন হয়ে বসে রইল ইমরান।

ইরিনকে গভীর ভাবে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করল রজার্স। সে মোটামুটি নিশ্চিত ইরিন দুষ্ট পাল্লায় পড়েছে। আমেরিকায় এটা একটা কমন ঘটনা। বাবা-মায়ের বিচ্ছেদ ছোট ছোট বাচ্চাগুলোর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। পরিসংখ্যান থাকুক আর না থাকুক, এটা বলা যায় যে, স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ হলে তার সব চেয়ে বড় প্রভাব গিয়ে পরে তাদের সন্তানদের ওপর। ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের। টিনেজ ছেলে-মেয়েরা ড্রাগে আসক্ত হয়ে পড়ে অনেকক্ষেত্রে। কারো কারো ক্ষেত্রে ঘটনা ঘটে আরো ভয়াবহ।
একটু সময় নিয়ে রজার্স সহানুভূতির সুরে বলল, ‘We were all young once, you know. You can trust and tell me anything you want. You look pale. Washed out. Believe me, you look like you’re doing drugs!’
‘I told you–I’m not doing drugs. How many times I’ve to say that?’ রজার্সের কথার তীব্র প্রতিবাদ করল ইরিন।
‘Let me see your eyes. It looks dialated’ বলেই ইরিনের চোখের দিকে হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল রজার্স।
ইরিন এক ঝটকায় রজার্সের হাত সরিয়ে দিয়ে বলল, ‘What the hell is wrong with you?’
‘Alright, alright. Take it easy. I’m sorry. You look pale, I’ve noticed it for a while. I just want to check to see if you’re anaemic?’
‘What are you—a doctor? I told you I’m fine.’
‘Well, you don’t look like you are. How do you feel? Do you feel nausea? Headaches?’
ইরিন উত্তর দিল না। কিন্তু তার অস্থিরতা অনেক বেড়ে গেল। সে উঠে দাঁড়িয়ে অস্থির ভাবে পায়চারী শুরু করল। একবার বসে আবার উঠে দাঁড়ায়—কিছুতেই অস্থিরতা যাচ্ছে না। এই মুহূর্তে রজার্সকে তার অসহ্য মনে হচ্ছে। সে হঠাৎ করেই রজার্সের সামনে দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলল, ‘Yeah, I’ve got a headache. Earache too. Would you please stop questening me?’ বলেই সে দু হাতে তার কান চেপে ধরল।
রজার্স কিছুটা থতমত খেয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল ইরিনের দিকে।
একটু দম নিয়ে অত্যন্ত কঠিন স্বরে ইরিন আবার বলল, ‘You’re not my dad—so please, stop interrogating me!’
এক ধরণের অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো অল্প সময়ের জন্য। ইরিনের অস্থিরতা প্রকট আকার ধারণ করল। বাসায় এসে এলিনাকে না পাওয়ায় তার প্রচণ্ড রাগ উঠেছে। এলিনাকে সে বলেছিল তার প্রয়োজন হলেই সে আসবে। এলিনার বন্ধের দিনগুলো ইরিন জানে। তাই সে আজকেই এসেছে। এলিনাকে কাজে যেতে হবে—ইরিনকে সেটা জানালেই হতো। তাকে জানানোর কোনো প্রয়োজন মনে করে নি সে। তারমানে এলিনার কাছে ইরিনের আর কোনো গুরুত্বই নেই।
ইরিন একা একা বলে চলল, ‘She doesn’t care about me any more. She only cares about herself. Selfish woman!’
এক নাগারে কিছুক্ষণ কথা বলে ইরিন খুব বিরক্ত হয়ে সোফার এক কোণায় আবার বসে পড়ল। সে তার দু’পা সোফায় তুলে ভাঁজ করে বসে শরীরটাকে সামনে-পিছনে নিয়ে দুলতে থাকল।
ইরিন একটু শান্ত হতেই রজার্স উঠে দাঁড়াল। ‘You must be thirsty. Let me get you something to drink. How about some icecream?’
ইরিন হ্যাঁ-না কিছুই বলল না। রজার্স চলে গেল কিচেনের দিকে।
কিচেনে ঢুকে রেফ্রিজারেটর খুলে আইসক্রিমের বাক্স বের করে আনল। কেবিনেট থেকে ছোট একটা বাটি এনে দু’স্কুপ আইসক্রিম তুলে রাখল বাটিতে। একবার দূর থেকে তাকিয়ে দেখল ইরিনকে—সে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে রইল রজার্স। কী যেন ভাবল। তারপর এগিয়ে গেল মেডিসিন কেবিনেটের দিকে।
ইরিন চোখ বন্ধ করে আছে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যে ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সে দ্রুত তার হাত ব্যাগ থেকে একটা ছোট কালো রঙের বাক্স বের করে খুলে দেখল—কিছু নেই ভিতরে। সে বাক্সটি হাত ব্যাগের ভিতরে রেখে দিয়ে শরীর সামনে-পিছনে করে আগের মতোই দুলতে থাকল। প্রচণ্ড পানি পিপাসা পেল তার।
ঠিক সে সময়েই রজার্স ফিরে এল আইসক্রিম নিয়ে। সে ইরিনের হাতে বাটিটি তুলে দিল। ইরিন আইসক্রিমের বাটি থেকে গপাগপ কয়েক চামচ আইসক্রিম মুখে দিয়ে আয়েশ করে খেল। এবং হঠাৎ সে মুখ বিকৃত করে ফেলল। আইসক্রিমের স্বাদ কেমন যেন তেতো লাগছে। এমন তেতো আর বিস্বাদের আইসক্রিম আগে কখনো খায়নি সে। ইরিন বাটির দিকে তাকিয়ে চামচ দিয়ে নেড়ে চেড়ে দেখল সাদা সাদা পাউডারের মতো কিছু একটা আইসক্রিমের উপর ভাসছে। ইরিনের সন্দেহ হলো। রজার্সের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘What’s this? It tastes strange. It doesn’t taste right.’ সে আবার বলল, ‘What is this Rogers?’
রজার্স আমতা আমতা করে বলল, ‘It’s probably an icecream additive. No worries—just move them on the side.’
ইরিন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে রজার্সের দিকে শুধু তাকাল একবার তারপরই ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে পড়ল। হঠাৎ করেই তার সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে এল। তার হাত থেকে আইসক্রিমের বাটিটি পড়ে গেল মেঝেতে। এবং অল্প সময়ের মধ্যেই সোফাতে ঢলে পড়ল ইরিনের শরীর।
রজার্স চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। ইরিন যেভাবে পড়ে গেছে সেভাবেই পড়ে রইল। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর ইরিনের নিস্তেজ শরীরটাকে আলতো করে তুলে নিল রজার্স। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল বেডরুমের দিকে।
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ইরিনকে বিছানায় শুইয়ে দিল রজার্স। সে নিশ্চিত—সহসা সংজ্ঞা ফিরে আসবে না ইরিনের।
ঘুমন্ত একটা পরীর মতো লাগছে ইরিনকে। কী নিষ্পাপ চেহারা মেয়েটির। রজার্স অপলক তাকিয়ে রইল ঘুমন্ত পরীর দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-৩)

আমেরিকার প্রতিটি আবাসিক এলাকায় কম করে হলেও একটি করে বাচ্চাদের খেলার পার্ক থাকে। কোথাও আবার থাকে রিক্রিয়েশন সেন্টার। বিভিন্ন রকমের খেলাধুলার ব্যবস্থা থাকে সেখানে। থাকে বিভিন্ন বয়সের বাচ্চাদের উপযোগী খেলার সরঞ্জাম—স্লাইডস, বেবি সুইংস, ক্লাইম্বার, মাঙ্কি বার, টিউব স্লাইড, ওয়াটার স্লাইড, জাম্পিং বাউন্সার, ট্রাম্পোলিন, হাইড এন্ড সিক সহ আরো অনেক কিছুই। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত পার্কগুলো প্রায় পূর্ণ থাকে বিভিন্ন বয়সের মানুষের পদচারণায়। বাচ্চাগুলো খেলাধুলা করে—ধুলোবালিতে গড়াগড়ি খায় আর বাবা-মায়েরা ছাউনির নিচে বেঞ্চে বসে ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাচ্চারা কেউ ব্যথা না পাওয়া পর্যন্ত ফোন থেকে কেউ মাথা তুলে তাকায় না। বাচ্চাগুলো কে কোথায় কী খেলছে সেদিকেও লক্ষ্য থাকে না অনেকের। সন্ধ্যা মিলিয়ে যেতেই কিছু কিছু পার্কে আবার ফ্লাড লাইট জ্বলে উঠে। বিশেষ করে যে সব পার্কের সংগেই থাকে সকার কিংবা বেসবল খেলার মাঠ অথবা জগিং এন্ড রানিং ট্র্যাক।
ইরিনকে নিয়ে কত বিকেল-সন্ধ্যা কাটিয়েছে এলিনা এই পার্কটিতে। ওদের বাসা থেকে হেটেই আসা যায়। সন্ধ্যা মিলিয়ে যেতেই গরমের তাপ কমে এসেছে। চারিদিকে মৃদু মন্দ বাতাস বইছে। এমন বাতাসে হাঁটতে ওদের বেশ ভালই লাগছে। তাই হাঁটতে হাঁটতে দূরের এই পার্কটিতেই চলে এসেছে এলিনা আর ইরিন।
অনেকক্ষণ থেকে পার্কের একটি বেঞ্চে মাথা নিচু করে বসে রয়েছে ইরিন। এলিনাও বসে আছে তার পাশে। ইরিনের কাঁধে হাত রেখে সে বলল, ‘ইয়োর ড্যাড এন্ড আই—ডু উই মিন এনিথিং টু ইউ?’
‘অফ কোর্স ইউ ডু। ইউ আর দ্য অনলি টু পিপল ইন মাই লাইফ—যারা আমাকে কেয়ার করে, লাভ করে।’
এবার এলিনা ইরিনের চিবুক উঁচু করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ডু ইউ কেয়ার এবাউট আস? আমাদের জন্য কি তোমার কোনো মায়া হয়? আমাদেরকে ফিল করো? আমাকে—তোমার বাবাকে?’
ইরিন ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। এলিনা আবার তার কাঁধে হাত রেখে বলল, ‘হোয়াই ক্যান’ট ইউ অ্যাক্ট লাইক ইউ কেয়ার এবাউট আস। আই হেট টু সি ওয়েস্ট ইয়োর লাইফ! ডোন্ট ইউ হ্যাভ ড্রিমস—সামথিং ইউ ক্যান লিভ ফর?’
ইরিন মাথা না তুলেই বলল, ‘দ্য ট্রুথ ইজ—আই ডোন্ট। আই লিভ ফর টুডে—আই ডোন্ট থিংক এবাউট টুমরো।’ একটু চুপ করে থেকে সে আবার বলল, ‘বাট আই লাইক টু হ্যাভ অ্যা ড্রিম।’
‘লুক এট মি—মাই লাইফ হ্যাজ নেভার বিন ইজি—ফ্রম ডে ওয়ান। বাট আই হ্যাভ নেভার গিভেন আপ বিকজ আই হ্যাভ অল দিজ ড্রিমস দ্যাট কিপ মি গোয়িং। আই লিভ ফর মাই ড্রিমস এন্ড আই উড ডাই ফর দেম।’ তারপর নিচু গলায় যেন নিজের কাছেই বলল, ‘আমার স্বপ্নই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে।’
ইরিন অবাক হয়ে তাকাল এলিনার দিকে। তার খুব কষ্ট হলো এই মুখটার দিকে তাকাতে। তার মায়ের সেই স্বপ্ন আদৌ কোনোদিন পূরণ হবে কিনা সে ব্যাপারে ইরিনের যথেষ্ট ধারণা নেই। কিন্তু সে কিছুতেই বুঝতে পারে না—তার জন্যে তার মাকে বাসা ছেড়ে আরেকজনের সাথে চলে যেতে হবে কেন? বাবার সাহায্য কি যথেষ্ট ছিল না—নাকি এর পেছনে আরো কোনো কারণ আছে? যদি থাকে কী সেই কারণ? বলবে না বলবে না ভেবেও ইরিন জিজ্ঞেস করল, ‘ইউ স্টিল ড্রিম ফর হলিউড?’
হঠাৎ করেই ইরিনের এমন প্রশ্নে অপ্রস্তুত হয়ে গেল এলিনা। কোনো উত্তর না দিয়ে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল সে চুপ করে। তার চোখের কোনটা চিকচিক করে উঠল।
‘হোয়াই ডিড ইউ হ্যাভ টু গো মাম? কেন—কেন চলে গেছ?’
এলিনার চোখ থেকে টপটপ করে কয়েকফোটা পানি গড়িয়ে পড়ল। ‘এর কোনো সহজ উত্তর আমার কাছে নেই ইরিন। আই রিয়েলি ডোন্ট।’ একটু থেমে চোখ মুছল এলিনা। তারপর আস্তে করে বলল, ‘আই’ম বিগিনিং টু ওয়ান্ডার মাইসেল্ফ—মে বি বিকজ আই নিডেড সামওয়ান টু শেয়ার মাই লাইফ উইথ…’ এলিনার কথায় মনে হলো সম্ভবত সে নিজেও নিশ্চিত নয়, সে কী বোঝাতে চাইছে।
‘সো বাবা ওয়াজ নট গুড এনাফ ফর ইউ টু শেয়ার ইয়োর লাইফ উইথ?’
ইরিনের জেরার মুখে এলিনা অসহায় বোধ করতে লাগল। এবার শেষ অস্ত্র প্রয়োগ—মানুষের জীবনের জটিলতা বোঝার বয়স তোমার হয় নি জাতীয় কিছু একটা বলে ওকে থামানোর চেষ্টা করল। সে তার কণ্ঠে জোর ফিরিয়ে এনে বলল, ‘আই টোল্ড ইউ—ইটস কমপ্লিকেটেড। তুমি বুঝবে না। হয়ত একদিন বুঝতে পারবে—কিন্তু এখন না।’
ইরিন কিছু একটা বলতে যেয়েও বলল না। সে চুপ করে রইল। অথচ তার মনে কত কথা—কত প্রশ্ন। সে এখনো জানে না কিংবা বুঝে না, কেন তার মা-বাবার সেপারেশন হয়েছে। কেন তার মা এভাবে তাদেরকে ফেলে এক আমেরিকানের হাত ধরে চলে গেল। তার ছোট মনে আরো এমন কত প্রশ্ন আনাগোনা করে—কিন্তু কে দেবে তার এসব প্রশ্নের উত্তর।
এলিনা ছোট্ট একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, ‘লুক ইরিন, ইয়োর ড্যাড ইজ অ্যা গুড ম্যান। বাট উই হ্যাভ সো মাচ ডিফারেন্সেস। উই জাস্ট ডোন্ট কমপ্লিমেন্ট ইচ আদার। ইউ আর অ্যা গ্রোন আপ গার্ল নাউ—ইউ মাস্ট আন্ডারস্ট্যান্ড…’
‘…ইভেন টু গুড সোলস ক্যাননট স্টে টুগেদার ফরএভার।’ এলিনার মুখের কথা কেঁড়ে নিয়ে ইরিন বাকী কথাটুকু শেষ করল—বিষয়টা এমন যেন ইরিন খুব ভাল করেই জানে এলিনা এখন কী বলবে। ‘সামটাইমস, নো ম্যাটার হাউ হার্ড দে ট্রাই, দেয়ার রিলেশনশিপ জাস্ট ডোন্ট ওয়ার্ক। থিংস হ্যাপেন, দে গেট সেপারেটেড।’ একথাগুলোই এলিনা ইরিনকে একবার বলেছিল যখন সে প্রথমবার ইরিনকে বলেছিল—সে তার বাবার সঙ্গে আর থাকছে না—ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সেদিন থেকেই সেই কথাগুলো ইরিনের মস্তিষ্কে গেঁথে রয়েছে। এসব কথা বোঝার মতো বয়স কিংবা ক্ষমতা হয়ত তখন তার ছিল না। কিন্তু এখন অনেক কিছুই বোঝে সে।
এলিনা কী বলবে ভেবে পেল না। সে ইরিনের মুখের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। মনে মনে ভাবল—তার মেয়েটা সত্যি সত্যিই বড় হয়ে গেছে।

রজার্স হঠাৎ লক্ষ্য করল ইমরানের চেহারার মধ্যে এক ধরণের অস্বাভাবিকতা। তার কেমন একটু অস্বস্তি হতে লাগল। কিছুটা ভয়ও। সে খানিকটা শঙ্কিত হয়েই ডাকল, ‘ইমরান!’
ইমরানের দৃষ্টিভঙ্গির তেমন কোনো পরিবর্তন হলো না।
ইমরানের হিমশীতল দৃষ্টির দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে রজার্সের খুব অস্বস্তি হতে লাগল। অস্বস্তি কাঁটাতে সে আবারো বলল, ‘ইমরান—হোয়াটস রং?’
ইমরান সহসাই চেহারার পরিবর্তন করে ফেলল। হাসি হাসি মুখ করে সে বলল, ‘হাউ’জ দ্য ড্রিঙ্ক?’
রজার্স একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর মিন মিন করে বলল, ‘ইট’স গুড। রিয়েলি গুড।’
আবার একটা অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল। গ্রীষ্মের সন্ধ্যা—তাপমাত্রা বেশ খানিকটা কমে এলেও সেন্ট্রাল এসির দুটো ইউনিটই চলছে সারাক্ষণ—অতিরিক্ত নীরবতায় শুধু এসির হাম শব্দ ছাড়া আর কোনো কিছু শোনা যাচ্ছে না।
হঠাৎ নীরবতা ভেঙ্গে ইমরান বলল, ‘ফিলিং বোর্ড—উড ইউ লাইক টু প্লে অ্যা গেম?’
‘হোয়াট গেম?’ রজার্স ঠিক বুঝতে পারল না ইমরান কী খেলার কথা বলছে।
‘ট্রুথ অর ডেয়ার!’
রজার্সের বুঝতে এবং দ্বিধা কাটতে একটু সময় লাগল। কিছু সময় ভেবে নিয়ে সে বলল, ‘ট্রুথ…’
‘ডু ইউ লাভ এলিনা?’ প্রশ্নটা ছুঁড়ে দিয়ে রজার্সের চোখের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইল ইমরান।
রজার্স অবাক হলো। মনে মনে ভাবল এটা আবার কেমন প্রশ্ন। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে বলল, ‘অফ কোর্স আই ডু।’
‘ইউ ওয়ানা মেরি হার রাইট?’
‘ইয়েস। অফ কোর্স।’ একটু হেসে বেশ জোর দিয়েই সে বলল।
‘ওয়ান্স ইউ মেরি হার, ইরিন উড বি ইয়োর ডটার, রাইট?’
‘স্টেপ ডটার।’ রজার্স ভ্রূ কুঁচকে বলল।
‘ইয়েস স্টেপ ডটার। উড ইউ একসেপ্ট হার—এজ ইয়োর ডটার?’
‘জেসাস! হোয়াট কাইন্ড অফ কোশ্চেন ইজ দ্যাট?’
‘ট্রুথ অর ডেয়ার!’
রজার্সের কপালে চিকণ ঘাম দেখা দিল। তার মনে ভয়ের কুডাক দিল। পরিষ্কার বুঝতে না পারলেও তার মনে হচ্ছে—কিছু একটা ঘটছে যার কোনো ক্লু সে পাচ্ছে না। ইমরানের চাহনির মধ্যে কিছু একটা আছে। আজকেই তার সাথে প্রথম পরিচয় তাই ইমরানের ক্ষণে ক্ষণে বদলে যাওয়া হাসির রহস্য সে ধরতে পারছে না। কিন্তু তার অবচেতন মন বলছে—কিছু একটা ঘটবে। সে একবার ঘড়ি দেখল। এলিনা আসছে না কেন এখনো?
‘ট্রুথ অর ডেয়ার?’ ইমরান আবারো শীতল দৃষ্টি নিক্ষেপ করল।
রজার্স বুঝতে পারছে, ইমরানের ফেলে রাখা কোনো ফাঁদে সে আটকা পড়েছে অথবা পড়তে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে সুতো ছাড়ছে সে। এখনো হয়তো ধরতে পারছে না—একবার ঠিক মত গেঁথে গেলেই হলো। রজার্স মনে মনে ভাবল—তাকে সাবধান হতে হবে। প্রয়োজনে সে আর কোনো কথার উত্তর দেবে না। সে ঝিম ধরে বসে রইল।
‘ইউ আর অ্যা লায়ার, রজার্স। ইউ ডোন্ট হ্যাভ গাটস টু টেল দ্য ট্রুথ। ইউ এইন্ট গোনা ম্যারি এলিনা, রাইট?’
রজার্স ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে। তার মাথা ঘুরছে। এতগুলো ড্রিঙ্ক করা মোটেই উচিৎ হয় নি। মাথা কাজ করছে না। সবকিছু কেমন এলোমেলো ঠেকছে।
‘হ্যাভ এনাদার ড্রিঙ্ক মাই ফ্রেন্ড—নাইট ইজ স্টিল ইয়াং!’ হুইস্কির বোতল থেকে এক শট হুইস্কি রজার্সের গ্লাসে ঢেলে দিয়ে ইমরান মিটমিট করে হাসল।
রজার্স আবারো দ্বিধায় পড়ে গেল। কিছুতেই বুঝতে পারল না—এ হাসির অর্থ কি?

এলিনা বলল, ‘তুমি রজার্সকে পছন্দ করনা আমি জানি। আমি এক্সপেক্টও করিনা যে তুমি তাকে পছন্দ করবে বাট এট লিস্ট, বি লিটল মোর কার্টেয়াস টু হিম—দ্যাটস অল আই’ম আস্কিং।’
‘হাউ ক্যান আই বি মোর কার্টেয়াস? দ্যাট’স নট পসিবল মাম। আই ক্যান্ট বি অ্যা হিপোক্রাইট। দ্যাটস সিমপ্লি নট পসিবল।’ ইরিনের কণ্ঠস্বরে ফুটে উঠল কাঠিন্য।
‘হোয়াই নট?’
‘ইউ ডোন্ট ওয়ান্ট টু নো মাম। ইউ ওন্ট বি এবল টু হ্যান্ডেল দ্যাট। সো ডোন্ট আস্ক—জানার দরকার নাই।’
এলিনার চোখে মুখে অশুভ ছায়া দেখা দিল। সে কাঁপা গলায় বলল, ‘কী—কী বলছো তুমি?’
ইরিন তার মায়ের মুখের দিকে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রইল দূরের খোলা মাঠের দিকে। মাঠকে সবুজ সতেজ রাখার জন্যে স্প্রিঙ্কুলার সিস্টেম থেকে পানি ছড়িয়ে পড়ছে—ফ্লাড লাইটের আলোতে সে পানি চিকচিক করছে। এক দৃষ্টিতে সেদিকেই তাকিয়ে রইল ইরিন।
ইরিনের দিকে তাকিয়ে একটা অশুভ আশঙ্কা জেগে উঠল এলিনার মনে। সে উঠে গিয়ে দাঁড়াল ইরিনের পাশে—দুহাতে ধরে ইরিনকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে ভয়ে ভয়ে বলল, ‘কী হয়েছে ইরিন? আমাকে বলা যায় না? আমি তোর মা!’
ইরিন চুপ করে রইল।
এলিনা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল। ‘কী এমন কথা আমাকে বলতে পারিস নি আগে?’
‘আমি বলতে চাইছি—অনেক বলতে চাইছি। আই ওয়ান্টেড টু টক উইথ ইউ ব্যাডলি। বাট ইউ ডিডন্ট হ্যাভ এনি টাইম ফর মি। আই ওয়াজ গোয়িং থ্রু হেল। অল অফ মাই ফ্রেন্ডস রিজেকটেড মি। আই হ্যাভ নোবডি টু টক টু… এন্ড আই নিডেড সাম এক্সট্রা মানি, ডেসপারেটলি।’
‘তোমাকে তো হাত খরচের টাকা দেয়াই হয়—হোয়াই ডিড ইউ নিড এক্সট্রা মানি ফর?’
‘আই’ম অ্যা গ্রোন আপ গার্ল মাম। আই হ্যাভ নিডস। ইউ শুড নো দ্য ডিম্যান্ড অফ অ্যা গার্ল অফ মাই এজ। ডোন্ট ইউ?’
‘জানব না কেন? তোমার মতো এই বয়সটা একসময় আমারও ছিল। বাট আওয়ার ডিম্যান্ড ওয়াজ লিমিটেড—তোমাদের মতো মডার্ন টিনেজদের মত এত ডিম্যান্ড আমাদের কখনোই ছিল না। এখনকার বাচ্চারা বাবা-মাকে সাতপাঁচ বুঝিয়ে যা খুশি তাই করে।’
এলিনার কথায় ইরিন খুবই বিরক্ত হলো। সে ভ্রূ কুঁচকে তাকাল তার মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দেখলা?’
এলিনা বুঝতে পারল এভাবে বলাটা ঠিক হয় নি। সে কথার সুর বদলে বলল, ‘টাকা লাগবে তো বাবাকে বললেই পারতে। তাকে বলো নাই কেন?’
‘বলছিলাম বাট হি ডিডন্ট কেয়ার। সো আই ওয়েন্ট টু ইয়োর এপার্টমেন্ট ওয়ান ডে—কিন্তু তুমি বাসায় ছিলা না।
‘কই আমি তো কিছুই জানি না? রজার্স বাসায় ছিল না?’
ইরিন সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে যেভাবে তাকিয়ে ছিল সেভাবেই দূরের মাঠের দিকে তাকিয়ে রইল। মাঠের পানি চিকচিক করছে—ইরিনের চোখের পানিও।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-২)

ডিনার টেবিলে হরেক রকমের খাবার শোভা পাচ্ছে। সবই অবশ্য আমেরিকানদের খাবার। মিক্সড গ্রিন সালাদ, ম্যাসড পটেটো, লুজ কর্ন, অ্যাসপ্যারাগাস এবং মিক্সড ভেজিটেবল। সঙ্গে সাইড হিসেবে আরো আছে পেঁয়াজ ও রসুন দিয়ে ভাজা মাশরুম। প্লেট, গ্লাস, কাঁটা চামচ, ছুরি—সুন্দর করে সাজানো। রজার্স যেহেতু প্রথম বারের মত ইমরানের আতিথেয়তা নিচ্ছে—তার কথা ভেবেই এমন আয়োজন।
স্টেকের ট্রেটি টেবিলের অন্য প্রান্তে রেখে ধারাল ছুরি দিয়ে একটা একটা স্লাইস কেটে সবার প্লেটে তুলে দিল ইমরান—তার তৈরী করা স্পেশাল গার্লিক বাটার স্টেক। সবার প্লেটে দেয়া হয়ে গেলে সে পেশাদার শেফদের মতো বলল, ‘লেডিস এন্ড জেন্টলম্যান প্লিজ এনজয় ইয়োর ডিনার।’
এলিনা সালাদের বাটি থেকে একটু সালাদ নিজের প্লেটে তুলে নিয়ে রজার্সের দিকে এগিয়ে দিল। রজার্স তার স্টেক থেকে এক টুকরা মাংস কেটে নিয়ে মুখে পুরে একটু খেয়ে ইমরানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দিস ইজ এক্সেলেন্ট!’ আমেরিকানরা এই ভদ্রতাটুকু করে থাকে। খেতে অখাদ্য হলেও বলবে, ওয়াও এমন রান্না আমি আগে কখনো খাইনি—দারুন হয়েছে।
‘ইউ এপ্রুভ?’ ইমরান জানতে চাইল।
‘আই ডু।’
‘ওহ, থ্যাঙ্ক ইউ।’
এরপরে আর কেউ কোনো কথা না বলে যার যার প্লেটে মনোযোগ দিল। কাঁটা ছুরি আর কাঁটা চামচের কাটাকাটির মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ যেন নেই কোথাও।
এলিনা একবার তাকাল ইরিনের দিকে। ইরিন চুপচাপ। তাকে খুবই অন্যমনস্ক লাগছে। ঠিকমতো খাচ্ছে বলেও মনে হলো না। কোনো এক বিচিত্র কারণে তাকে কিছুটা অস্থির মনে হচ্ছে। কোনো কিছুর উপরে সে বিরক্ত—কিন্তু কেন?
রজার্স বেশ কয়েকবার তাকাল ইরিনের দিকে। ইরিন ভুল করেও তার দিকে তাকাল না।
ইমরান লক্ষ্য করল—ইরিন তেমন কিছুই খাচ্ছে না। অথচ ইমরানের স্টেক প্রিপারেশন ইরিন এবং এলিনা দুজনেরই অনেক পছন্দ। ইমরান প্রায় উইকএন্ডেই ওদের জন্যে স্টেক বানিয়ে দিত। ওরা দুজন গল্প করতে করতে খুব মজা করে খেত। আর প্রশংসা করত ইমরানের স্টেক রেসিপির—তারও ভীষণ মজা লাগত বিষয়টা। কত সুন্দর কাটছিল ওদের দিনগুলি। হঠাৎ কেমন এলোমেলো হয়ে গেল সবকিছু। ইমরান এখনো হিসাব মেলাতে পারে না।
‘এক্সকিউজ মি।’ খাবার শেষ না করেই ইরিন হঠাৎ তার প্লেট নিয়ে উঠে চলে গেল কিচেনে।
ইতিমধ্যেই এলিনার খাওয়া প্রায় শেষ হয়ে এসেছিল। একটু সময় পার করে সেও গিয়ে দাঁড়াল ইরিনের পাশে।
বেসিনে প্লেট রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই ইরিন মুখোমুখি হলো এলিনার। সে ডাইনিং টেবিলের দিকে আঙুল দেখিয়ে নিচু গলায় চাঁপা ক্ষোভের সাথে বলল, ‘ওকে আনছ কেন?’
‘মানে কী?’ এলিনা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল ইরিনের মুখের দিকে?
‘হোয়াই ডিড ইউ ব্রিং হিম হিয়ার?’ ইরিন আবার বলল।
এলিনার মুখ হা হয়ে গেল। সে নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না। ইরিন কী বলছে এসব? সে চোখ বড় করে আহত স্বরে বলল, ‘কী? কী বলছো তুমি? হোয়াট আর ইউ টকিং এবাউট?’
‘ইউ নো হোয়াট আই’ম টকিং এবাউট। কেন আনছ? ওকে? তোমার বয়ফ্রেন্ডকে?’
লজ্জায় লাল হয়ে গেল এলিনার মুখ। নিজেকে স্থির রাখতে ভাল সমস্যা হচ্ছে তার। তবুও নিজেকে যথা সম্ভব স্বাভাবিক রেখে লজ্জিত এবং বিব্রত কণ্ঠে সে বলল, ‘আমি আনতে চাইনি। তোমার বাবা বলল তাই নিয়ে এলাম। ইয়োর ড্যাড ইনসিসটেড।’ শেষের কথাটি বেশ জোরের সাথেই বলল এলিনা।
‘বাবা বলছে?’ ইরিন বেশ অবাক হল—খানিকটা দ্বিধায় পড়ে গেল সে। ইমরান তাকে বলেছিল উইকএন্ডে তোমার আম্মু আসবে। কোথাও কোনো প্লান রেখো না। আমরা একসাথে ডিনার করব। তোমাদের ফেভারিট বিফ স্টেক প্রিপেয়ার করব ভাবছি। ইমরানের কথায় ইরিন মনে মনে খুশিই হয়েছিল। যদিও তার মায়ের প্রতি আগের সেই তীব্র ভালবাসার টানটা এখন আর অনুভব করে না সে।
ইরিন কিচেন তোয়ালে দিয়ে হাত মুছতে মুছতে বলল, ‘আই নিড টু টক টু ইউ। তুমি কি আমার রুমে একটু আসতে পারবা?’
এলিনা বুঝতে পারল না—ইরিনের কী এমন কথা থাকতে পারে? তারপরেই ভাবল—ইরিনের সাথে তার সম্পর্কটা যত না মা-মেয়ের তার চেয়েও বেশি বন্ধুত্বের। মেয়েটি নিশ্চয়ই তাকে অনেক মিস করে। কত কথাই তো বলার থাকতে পারে। একটা মেয়ের শিশুকাল শুরুই হয় মায়ের প্রতি নির্ভরতা দিয়ে। সৃষ্টি হয় আনুগত্য আর তীব্র ভালবাসার। এই কিছুদিন আগেও এলিনাই ইরিনকে স্কুলে আনা-নেয়া করত। স্কুল থেকে ফেরার সময় গাড়িতে উঠেই ইরিন শুরু করত বকবকানি। এলিনা হাসত আর তার কথা শুনত। সেই মেয়েটি কেমন নির্জীব হয়ে গেছে। হয়ত বয়ঃসন্ধির কারণে তার আচরণে কিছু অস্বাভাবিকতা এসেছে। একটা অবাধ্য—স্বেচ্ছাচারী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে ইদানীং। কেমন একটা স্বাধীনচেতা ভাব চলে এসেছে। মেয়েটি হঠাৎ করেই যেন বড় হয়ে গেছে। মা-মেয়ের মধুর সম্পর্কটা আগের মতো আর নেই—সম্পর্কে ফাটল ধরেছে। রজার্সের কারণেই কি মা-মেয়ের সেই মধুর সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করেছে নাকি আরো অন্য কোনো কারণ আছে?
এলিনা একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘বরং চলো, আমরা বাইরে থেকে একটু হেঁটে আসি। হাঁটতে হাঁটতে কথা বলা যাবে। এই নেইবারহুডে কতদিন হাঁটা হয় না!’
ইরিন আসলে চাইছিল বাইরেই যেতে। কিছু একটা কারণে ইরিনের এই মুহূর্তে এই ঘরটার মধ্যে এক সেকেন্ডও থাকতে ইচ্ছে করছে না। এলিনা কী করে তার মনের ইচ্ছেটা বুঝে ফেলল কে জানে। সে খানিকটা অবাক হয়েই তাকাল এলিনার চোখের দিকে তারপর বলল, ‘ঠিক আছে চলো।’
‘রজার্স, আই’ম গোয়িং আউট ফর এ ওয়াক উইথ ইরিন। মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল বাট ডু নট ড্রিং টু মাচ। ইউ হ্যাভ টু ড্রাইভ ব্যাক, রিমেমবার।’ ইরিনকে নিয়ে বের হয়ে যাবার সময় দূর থেকে রজার্সের উদ্দেশ্যে বলল এলিনা।
‘আই উইল বি ফাইন হানি। এনজয় ইয়োর ওয়াক।’ রজার্স উত্তর দিল।
ইমরান দুটো প্লেট নিয়ে এসে কিচেনের দিকে যাচ্ছিল। এলিনা একটু এগিয়ে এসে রজার্সকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘ওকে কিন্তু বেশি ড্রিঙ্ক করতে দিও না। নাহলে আবার আমাকে ড্রাইভ করতে হবে। তুমি তো জানই রাতে আমি একদমই ড্রাইভ করতে পছন্দ করি না।’
ইমরানকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই এলিনা ইরিনকে নিয়ে বের হয়ে গেল বাসা থেকে। ইমরান ওদের চলে যাওয়ার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
ইরিনকে নিয়ে এলিনা বাইরে চলে যাওয়ায় ইমরান মনে মনে বেশ খুশিই হল। নাহলে প্ল্যান-বি এপ্লাই করতে হতো। সে কাজটি খুব একটা সহজ হত না। এখন সে নিশ্চিত।
রজার্সের সঙ্গে তার কিছু বোঝাপড়া আছে—আর সেটা সে একাই করতে চায়।

ডিনার শেষে ইমরানের লিভিং রুম সংলগ্ন ছোট্ট লিকার বারের উঁচু কাউন্টারের টুলের উপরে বসে আছে রজার্স। একটি ওল্ড-ফ্যাশন গ্লাসে বার্বোন হুইস্কির সঙ্গে অ্যারোমাটিক বিটার মিশিয়ে একটি ড্রিঙ্ক বানিয়ে তার সামনে এগিয়ে দিল ইমরান। সামান্য ক্লাব-সোডা মিশিয়ে ভাসানো হয়েছে কমলালেবুর একটি চাকতি, তাতে রুপালি বুদ্বুদ উঠছে প্রচুর। রজার্স ড্রিঙ্কে একটা চুমুক দিয়ে চুপ করে বসে রইল। ইমরান শীতল দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল রজার্সের দিকে।

ইমরানের বাংলো টাইপের দোতলা বাড়িটির আশে পাশে একই মডেলের আরো অনেকগুলো বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সারিবদ্ধ ভাবে। দুপাশের সারি সারি বাড়িগুলো সামনে দিয়ে সুন্দর পায়ে হাঁটার রাস্তা। এলিনা আর ইরিন ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছে। কিছুদূর এগিয়ে যেয়ে এলিনা ইরিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কি শরীর খারাপ?’
‘নো। আই’ম ফাইন।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে এলিনা আবার বলল, ‘তোমাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না—তুমি ভাল আছো।’
‘আমি ভাল আছি মাম।’
‘ভাল থাকার তো কথা না। নিশ্চয়ই শরীর খারাপ করেছে। এমনিতেই তোমার এলার্জির সমস্যা। নিজে এখনো একা খেতে পারো না। সব জেনে শুনে তুমি তোমার বাবার কাছেই পড়ে আছ। আর তোমার বাবাও—যতই দিন যাচ্ছে, ততই দেখি মানুষটা মূর্খ হচ্ছে।’
‘তুমি শুধু শুধু বাবাকে ব্লেইম করো কেন?’
এলিনার সঙ্গে ইরিন সব সময় বাংলায় কথা বলার চেষ্টা করে। বাসায় বাবা-মায়ের সঙ্গে বাংলায় কথা বলতে বলতে এখন বেশ স্বাচ্ছন্দেই কথা বলতে পারে সে। উচ্চারণে সামান্য সমস্যা থাকলেও আমেরিকায় জন্ম নেয়া অন্যান্য বাচ্চাদের তুলনায় ইরিনের বাংলা যথেষ্ট পরিষ্কার। অনেক সময় স্কুলের বন্ধুদের সামনে কোনো সিক্রেট বা এমন কোনো ঘটনা বন্ধুদের সামনে বললে তাঁরা বুঝে যাবে—তখন সে তার মায়ের সঙ্গে বাংলায় কথা বলে।
এলিনা বলল, ‘শুধু শুধু ব্লেইম করি না—যা সত্যি তাই বলি। তাছাড়া, তোমাকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে তোমার শরীর ভাল নেই। খাওয়া দাওয়াতো কিছুই করো না।’
‘দ্যাটস নট ট্রু। হোয়েন আই’ম হাংগ্রি—আই ইট। কম খাই—কিন্তু খাই।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ কত কী খাও—সেটা কি আর আমি জানি না।’
ইরিন আর কিছু না বলে চুপ করে রইল।
‘আমাদের সেটেলমেন্টটা হয়ে গেলেই আমি তোমাকে আমার কাষ্টডিতে নিয়ে আসব। রজার্স একটু ব্যাড টেম্পার্ড মানুষ এটা ঠিক কিন্তু তোমার বাবার মতো অবিবেচক নয়। এজ এ প্যারেন্ট, হি উইল বি মাচ বেটার চয়েস।’
ইরিন হাঁটা থামিয়ে দিল। হঠাৎ করে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় এলিনা একটু অবাক হলো। সেও দাঁড়িয়ে পরল। ইরিন শীতল চোখে তাকাল এলিনার দিকে। ‘আমি বাবার সংগেই ভাল আছি। ডোন্ট ওরি এবাউট মি।’ বলেই সে হাঁটা শুরু করল আবার।
এলিনা পিছন থেকে বলল, ‘তুমি মোটেই ভাল নেই। আমি তোমাকে নিয়ে অনেক কনসার্নড। আমার কানে কিছু কথাও এসেছে। আই’ম রিয়েলি ওরিড এবাউট ইউ ইরিন।’
ইরিন আবার দাঁড়িয়ে পড়ল। এলিনা তার কাছে আসতেই সে বলল, ‘কী শুনছ তুমি?’
‘ইউ নো দ্যাট বেটার—যা শুনেছি তাতে যে কোনো প্যারেন্টদেরই কনসার্নড হবার কথা।’
‘দেন কাম ব্যাক এন্ড টেক কেয়ার অফ মি। তুমি ফিরে আসো—তখন দেখবা আমি ভাল হয়ে গেছি।’
‘দ্যাট’স নট পসিবল—এখনতো আর সম্ভব না।’
‘হোয়াই নট?’
‘সেটা তোমাকে এখন বোঝানো যাবে না। যখন বড় হবে তখন বুঝবে।’
‘কেন? আমি বড় হই নাই? ইউ থিংক আই’ম নট ওল্ড এনাফ ইয়েট? ইউ হ্যাভ লেফট হোম ফর ওয়ান ইয়ার এন্ড ওয়ান ইয়ার ইজ অ্যা লং টাইম মাম। ইউ হ্যাভ নো আইডিয়া হোয়াট আই হ্যাভ বীন থ্রু এন্ড হাউ মাচ আই হ্যাভ চেঞ্জড।’
এলিনা অবাক হয়ে ইরিনের দিকে তাকিয়ে রইল।

লিকার বারে বসে রজার্স ড্রিঙ্ক করেই চলেছে। একটা শেষ হতে না হতেই ইমরানও একটার পর একটা হার্ড লিকার পরিবেশন করে যাচ্ছে তাকে। অনেকক্ষণ থেকেই রজার্স চুপচাপ গ্লাসে চুমুক দিয়ে যাচ্ছে। একপর্যায়ে নীরবতা ভেঙ্গে ইমরান বলল, ‘সো হাউ লং ইউ হ্যাভ বীন ইন মডেলিং বিজনেস রজার্স?’
‘ওহ, দিজ উড বি মাই ফার্স্ট জব এজ এ ট্রেইনার। বাট আই ইউজড টু বি এ মডেল ফর সেভারেল ইয়ার্স। আই হ্যাভ গুড হলিউড কানেকশন টু…’
‘আই সি। দ্যাট’স হাউ ইউ মিট দ্য মডেল গার্লস এন্ড…’ কথা শেষ না করে ইমরান থেমে গেল।
‘এন্ড?’ প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে ইমরানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল রজার্স।
ইমরান কিছু না বলে আর একটি হুইস্কির গ্লাস এগিয়ে দিল রজার্সের দিকে।
রজার্স বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ একটু থেমে গ্লাসে একটা চুমুক দিয়ে সে বলল, ‘আই নো ইউ আর ম্যাড এট মি। বাট ট্রাস্ট মি—এনিবডি উড হ্যাভ টেকেন হার—শী ইজ ট্যালেন্টেড বিসাইডস বিং বিউটিফুল এন্ড শী শুড এক্সপ্লোর হারসেল্ফ। আই’ম জাস্ট গাইডিং হার। শী নিডেড সামওয়ান লাইক মি ইন হার লাইফ।’
রজার্স ঘোরের মধ্যে আছে। ইতিমধ্যেই সে চূড়ান্ত রকমের মাতাল হয়ে পড়েছে। যদিও সে যথেষ্ট স্থির এখনো। হুইস্কির গ্লাসে আর একটা চুমুক দিয়ে সে যেন ইচ্ছাকৃত ভাবেই ইমরানকে আঘাত করে বলল, ‘নট অনলি ফর হার ক্যারিয়ার—শী অলসো নিড মি ফর এনাদার রিজন টু। ইউ নো হোয়াট আই মিন?’ বলেই সে খ্যাঁক খ্যাক করে বিচ্ছিরি ভাবে হাসল—গায়ে জ্বালা ধরা হাসি।
ইমরান শীতল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রজার্সের দিকে। ধীরে ধীরে তার চেহারা বদলে অন্যরকম হয়ে গেল। কেমন যেন অচেনা। চোখের দৃষ্টি স্থির কিন্তু জ্বলন্ত। ক্ষুধার্ত বাঘের মত—হিংস্র।

পরের পর্ব

আগের পর্ব