immigration-deportation

ইমিগ্রেশন ডিপোর্টেশন এবং অপেক্ষার গল্প (পর্ব-১)

‘এক্সিউজ মি! তুমি কি বলতে পারবে আমার আম্মু কোথায় বসেছে?’
এয়ার হোস্টেস অবাক হয়ে তাকাল প্রশ্নকারীর দিকে। অল্প বয়সী একটা ছেলে—দৃষ্টিতে উৎকণ্ঠা। চোখে মুখে শঙ্কা আর দুশ্চিন্তার ছায়া সুস্পষ্ট।
মধ্য আকাশে কুয়েত এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট সবেমাত্র সোজা হয়ে চলতে শুরু করেছে। বিমান তার নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে যাবার পরপরই বিমানের ক্যাপ্টেন ইতোমধ্যে সিটবেল্ট বাঁধার সংকেত নিভিয়ে দিয়েছেন। মাত্র কিছুক্ষণ হলো বিমানটি নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে কুয়েতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। কেবিন ক্রুরা উঠে দাঁড়িয়েছে। তারা একটি ট্রেতে করে উষ্ণ ভেজা টিস্যু পেপার বিতরণ করছে যাত্রীদের মাঝে—হাত মুখ মুছে নেবার জন্যে। খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি চলছে—কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবারের ট্রলি নিয়ে বের হয়ে পড়বে। যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন সিট বেল্ট খুলে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কেউ কেউ চাদর গায়ে পেঁচিয়ে আরাম করে বসেছে। কেউ কেউ সামনের ছোট টিভি স্ক্রিনে সিনেমা ছেড়ে দিয়েছে।
বিমানে উঠার পর থেকেই ছেলেটি অস্থির হয়ে চারিদিকে খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও দেখতে পায়নি তাকে। ভেবেছিল প্লেনে ছাড়ার আগে হয়ত সবাই একসাথে হবে ওরা—কিন্তু হয়নি। তাই প্লেন সোজা হতেই সে হেল্প লাইটটি জ্বালিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন কেবিন ক্রু দূর থেকে লক্ষ্য করে ছেলেটির কাছে এগিয়ে আসতেই সে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল তার মায়ের কথা।
এয়ার হোস্টেস খানিকটা দ্বিধা নিয়ে তাকাল ছেলেটির মুখের দিকে। আনুমানিক দশ কিংবা এগার বছর বয়স হবে তার। এয়ার হোস্টেস ছেলেটির সিটের পজিশন দেখল। লক্ষ্য করল তার পাশের সিটে ছোট একটি মেয়ে বসে আছে। সম্ভবত ওর ছোট বোন। মেয়েটির চোখ ফোলা। দীর্ঘ সময় ধরে বিরতিহীন কান্নার কারণে চোখ ফুলে আছে। এয়ার হোস্টেস দেখল জানালার সিটে একজন ভদ্রলোক বসা। বেশভূষায় মনে হলো কুয়েতি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের নাগরিক। তার মানে ছেলেটির মা কিংবা বাবা কেউ ওদের সঙ্গে নেই। এয়ার হোস্টেস কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, তোমার আম্মুর কোথায় বসার কথা? তোমাদের সঙ্গে না?’
‘আমরা তো তাই ভেবেছিলাম, কিন্তু সে তো আমাদের সঙ্গে বসেনি।’
এয়ার হোস্টেস ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, ‘তাহলে কোথায় বসল? তোমারা একসঙ্গে বোর্ডিং করোনি?’
‘না।’
‘সে কি আলাদা বোর্ডিং করেছে?’
‘আমি ঠিক জানি না।’
এবার এয়ার হোস্টেস পুরা মাত্রায় বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে জানতে চাইল, ‘তোমার আব্বু? তিনি কোথায় বসেছেন?’
‘আব্বু তো নিউ ইয়র্কে—আসে নি আমাদের সাথে।’
‘তিনি যাচ্ছেন না?’
‘না।’
‘কিন্তু তোমার আম্মু যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘মেয়েটি কি তোমার বোন?’ পাশের ছোট মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সে বলল।
‘হ্যাঁ। আমার ছোট বোন।’
একটু ভেবে এয়ার হোস্টেস বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি দেখছি কিছু জানতে পারি কিনা। আচ্ছা তোমার মায়ের নাম কী?’
‘শিরিন খান।’
‘শিরিন খান!’ এয়ার হোস্টেস নামটা উচ্চারণ করল একবার তারপর বলল, ‘আমি ফিরে আসছি একটু পরেই—তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো।’
ছেলেটির সিট নাম্বার আরেকবার দেখে নিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে সে হেঁটে চলে গেল ককপিটের দিকে।
ছোট মেয়েটি তার ভাইয়ের হাত ধরে কেঁদে উঠল আবার। ছেলেটি তার বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্না থামানোর চেষ্টা করল—কিন্তু কিছুতেই মেয়েটির কান্না থামছে না। তার নিজেরও অনেক কান্না পাচ্ছে—কিন্তু তাকে এখন কাঁদলে চলবে না। শক্ত হতে হবে। পরিস্থিতি যাইহোক, তাকে মোকাবেলা করতে হবে। সে বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে বসে রইল।
বেশ কিছু সময় পার করে এয়ার হোস্টেস ফিরে এলো। সাথে একজন ফ্লাইট অফিসার। কিন্তু যে সংবাদ তাঁরা নিয়ে এলো তা মোটেও সুখকর হলো না। এয়ার হোস্টেস বলল, ‘হানি, শিরিন খান নামে কোনো প্যাসেঞ্জার এই প্লেনে নেই। এই নামের কেউ যাচ্ছেন না।’
মুহূর্তে ছেলেটির মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। কান্নায় ভেঙে পড়ল বাচ্চা মেয়েটি। ছেলেটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘তাহলে? সে তাহলে কোথায় গেল? কী হয়েছে আম্মুর?’
‘আমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কোনো তথ্য নেই। আমরা চেষ্টা করছি খোঁজ বের করার।’
ছেলেটি তার বোনকে জড়িয়ে ধরল আবার।
‘তুমি কি শিওর—এই প্লেনেই তার বুকিং ছিল?’
ছেলেটি নিশ্চিত নয়। সে নিরুত্তর দাঁড়িয়ে রইল। তার বাবা বলেছিল, তোমাদের আম্মুর সঙ্গেই তোমরা একসাথেই যাবে। সেভাবেই সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। এয়ারপোর্টেই আম্মুর সঙ্গে দেখা হবে।
ছেলেটি চুপ করে আছে দেখে এয়ার হোস্টেস আবার জানতে চাইল, ‘তিনি কি তোমাদের সাথে এয়ারপোর্টে এসেছিলেন?’
‘না।’
এয়ার হোস্টেস আর কিছু জিজ্ঞেস না করে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল ফ্লাইট অফিসারের দিকে। সে কিছু বুঝতে পারছে না ঘটনা কী হতে পারে। ফ্লাইট অফিসার এতক্ষণ ছেলেটি আর তার বোনের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল সে—ছোট ছোট দুটি বাচ্চা—এদের তো একা একা ফ্লাই করার কথা না। নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় এরা এসেছে। সেটা কী? ফ্লাইট অফিসার মাথা ঝুঁকিয়ে সামনে এসে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা এয়ারপোর্টে কার সঙ্গে এসেছো? কেউ হেল্প করেছে?’
‘আমার আব্বু।’
‘তোমার আম্মু কোথায় ছিল তখন?’
কিছু না বলে ছেলেটি চুপ করে রইল আবার।
ফ্লাইট অফিসার আবার বললেন, ‘তোমার আম্মুর কি অন্য কারো সাথে আসার কথা ছিল? অন্য কোথাও থেকে?’
ছেলেটি এবারও নিরুত্তর রইল। সে ঠিক বুঝতে পারছে না কী বলবে এবং কীভাবে বুঝিয়ে বলবে।
ফ্লাইট অফিসার কিঞ্চিত অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘তুমি কি শিওর এই ফ্লাইটেই তোমাদের সঙ্গেই তার যাওয়ার কথা ছিল?’
‘ওরা আব্বুকে তাই বলেছিল—যে আম্মু আমাদের সঙ্গেই যাবে। কিন্তু আমরা বোর্ডিংয়ের সময় তাকে দেখিনি। ভেবেছিলাম প্লেনে এসে দেখা হবে।’
‘এক মিনিট। ওরা মানে? ওরা কারা—কাদের কথা বলছো?’
‘ইমিগ্রেশন পিপল।’ ছেলেটি আস্তে করে এমনভাবে বলল যেন আশেপাশের কেউ শুনতে না পায়। যেন কেউ শুনলে সে লজ্জায় পড়ে যাবে। ইতিমধ্যেই ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেছে।
‘ওহ গড!’ বলেই ফ্লাইট অফিসার তাকালেন এয়ার হোস্টেসের দিকে। তার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না—ঘটনা আসলে কী ঘটেছে বা ঘটে থাকতে পারে। তিনি মোটামুটি নিশ্চিত—শুধু বুঝতে পারছেন না, ভদ্রমহিলা বিমানে উঠেনি কেন?
তিনি ছোট ছোট ভাই-বোন দুটির দিকে তাকিয়ে ভালো মত লক্ষ্য করলেন। এদেরকে এখন কী বলে সান্ত্বনা দেবে সেটাই তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি নরম সুরে বললেন, ‘তোমরা যাচ্ছ কোথায়? কোন দেশে?’
‘বাংলাদেশে।’
ফ্লাইট অফিসার চিন্তায় পড়ে গেলেন। এত অনেক লম্বা ফ্লাইট। তিনি মনে মনে হিসেব করে ফেললেন—নিউ ইয়র্ক থেকে কুয়েত ১২ ঘণ্টা—মাঝে ট্রানজিটে থাকতে হবে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা তারপর শেষ পর্যায়ে কুয়েত থেকে ঢাকা আরো ৫ ঘণ্টা। তার মানে সব মিলিয়ে কম করে হলেও ২১-২২ ঘণ্টা। এতটা সময় বাচ্চা মেয়েটি কী করে পার করবে সেটিই এক চিন্তার বিষয়। হয়ত আরো কান্নাকাটি করবে। তিনি ছেলেটিকে এবার বুঝিয়ে বললেন, ‘তোমাদেরকে একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আমরা যখন কুয়েতে নামব—তখন খোঁজ নিয়ে জানার চেষ্টা করব। আমরা নিউ ইয়র্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করব। তখন নিশ্চয়ই জানতে পারব। আমি বুঝতে পারছি, তোমাদের মন খারাপ। কিন্তু এই মুহূর্তে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’ এরপর একটু থেমে তিনি এয়ার হোস্টেসকে বললেন, ‘ওদের দিকে লক্ষ্য রেখো। ওদের যা দরকার—তাই যেন পায়। কোনো সমস্যা যেন না হয়। আমি আবার এসে খোঁজ নিয়ে যাবো।’ বলেই তিনি চলে গেলেন ককপিটের দিকে।
এয়ার হোস্টেস বলল, ‘আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার পরিবেশন করব। তোমাদের কি অন্য কিছু লাগবে এখন?’
‘না, আমার কিছু লাগবে না।’ ছেলেটি বলল। সে মন খারাপ করে বসে রইল।
এবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল সে, ‘তোমার কিছু লাগবে সোনামণি?’
‘আমি আম্মুকে চাই। আমি আম্মুর কাছে যেতে চাই। আমার আম্মুকে এনে দাও।’ কেঁদে কেঁদে বলল মেয়েটি। এবং কাঁদতেই থাকল।
এয়ার হোস্টেস পড়ে গেল মহা চিন্তায়। কিন্তু এখানে, এই মাটি থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার ফিট উপরে সে তার আম্মুকে কোথায় পাবে?

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কৌতূহলী মন নিশ্চয়ই জানতে চাইছে ছেলেটির মায়ের কী হলো। সে কোথায়? কেনই বা ওদের সঙ্গে যাচ্ছে না বা যেতে পারল না। এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সহ ছেলেটি, তার বোন, আর বাবা এবং সর্বপোরি মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব আগামী পর্বে।
সে পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

পরের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *