immigration-deportation

ইমিগ্রেশন ডিপোর্টেশন এবং অপেক্ষার গল্প (পর্ব-১)

‘এক্সিউজ মি! তুমি কি বলতে পারবে আমার আম্মু কোথায় বসেছে?’
এয়ার হোস্টেস অবাক হয়ে তাকাল প্রশ্নকারীর দিকে। অল্প বয়সী একটা ছেলে—দৃষ্টিতে উৎকণ্ঠা। চোখে মুখে শঙ্কা আর দুশ্চিন্তার ছায়া সুস্পষ্ট।
মধ্য আকাশে কুয়েত এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট সবেমাত্র সোজা হয়ে চলতে শুরু করেছে। বিমান তার নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে যাবার পরপরই বিমানের ক্যাপ্টেন ইতোমধ্যে সিটবেল্ট বাঁধার সংকেত নিভিয়ে দিয়েছেন। মাত্র কিছুক্ষণ হলো বিমানটি নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে কুয়েতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। কেবিন ক্রুরা উঠে দাঁড়িয়েছে। তারা একটি ট্রেতে করে উষ্ণ ভেজা টিস্যু পেপার বিতরণ করছে যাত্রীদের মাঝে—হাত মুখ মুছে নেবার জন্যে। খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি চলছে—কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবারের ট্রলি নিয়ে বের হয়ে পড়বে। যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন সিট বেল্ট খুলে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কেউ কেউ চাদর গায়ে পেঁচিয়ে আরাম করে বসেছে। কেউ কেউ সামনের ছোট টিভি স্ক্রিনে সিনেমা ছেড়ে দিয়েছে।
বিমানে উঠার পর থেকেই ছেলেটি অস্থির হয়ে চারিদিকে খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও দেখতে পায়নি তাকে। ভেবেছিল প্লেনে ছাড়ার আগে হয়ত সবাই একসাথে হবে ওরা—কিন্তু হয়নি। তাই প্লেন সোজা হতেই সে হেল্প লাইটটি জ্বালিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন কেবিন ক্রু দূর থেকে লক্ষ্য করে ছেলেটির কাছে এগিয়ে আসতেই সে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল তার মায়ের কথা।
এয়ার হোস্টেস খানিকটা দ্বিধা নিয়ে তাকাল ছেলেটির মুখের দিকে। আনুমানিক দশ কিংবা এগার বছর বয়স হবে তার। এয়ার হোস্টেস ছেলেটির সিটের পজিশন দেখল। লক্ষ্য করল তার পাশের সিটে ছোট একটি মেয়ে বসে আছে। সম্ভবত ওর ছোট বোন। মেয়েটির চোখ ফোলা। দীর্ঘ সময় ধরে বিরতিহীন কান্নার কারণে চোখ ফুলে আছে। এয়ার হোস্টেস দেখল জানালার সিটে একজন ভদ্রলোক বসা। বেশভূষায় মনে হলো কুয়েতি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের নাগরিক। তার মানে ছেলেটির মা কিংবা বাবা কেউ ওদের সঙ্গে নেই। এয়ার হোস্টেস কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, তোমার আম্মুর কোথায় বসার কথা? তোমাদের সঙ্গে না?’
‘আমরা তো তাই ভেবেছিলাম, কিন্তু সে তো আমাদের সঙ্গে বসেনি।’
এয়ার হোস্টেস ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, ‘তাহলে কোথায় বসল? তোমারা একসঙ্গে বোর্ডিং করোনি?’
‘না।’
‘সে কি আলাদা বোর্ডিং করেছে?’
‘আমি ঠিক জানি না।’
এবার এয়ার হোস্টেস পুরা মাত্রায় বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে জানতে চাইল, ‘তোমার আব্বু? তিনি কোথায় বসেছেন?’
‘আব্বু তো নিউ ইয়র্কে—আসে নি আমাদের সাথে।’
‘তিনি যাচ্ছেন না?’
‘না।’
‘কিন্তু তোমার আম্মু যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘মেয়েটি কি তোমার বোন?’ পাশের ছোট মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সে বলল।
‘হ্যাঁ। আমার ছোট বোন।’
একটু ভেবে এয়ার হোস্টেস বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি দেখছি কিছু জানতে পারি কিনা। আচ্ছা তোমার মায়ের নাম কী?’
‘শিরিন খান।’
‘শিরিন খান!’ এয়ার হোস্টেস নামটা উচ্চারণ করল একবার তারপর বলল, ‘আমি ফিরে আসছি একটু পরেই—তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো।’
ছেলেটির সিট নাম্বার আরেকবার দেখে নিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে সে হেঁটে চলে গেল ককপিটের দিকে।
ছোট মেয়েটি তার ভাইয়ের হাত ধরে কেঁদে উঠল আবার। ছেলেটি তার বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্না থামানোর চেষ্টা করল—কিন্তু কিছুতেই মেয়েটির কান্না থামছে না। তার নিজেরও অনেক কান্না পাচ্ছে—কিন্তু তাকে এখন কাঁদলে চলবে না। শক্ত হতে হবে। পরিস্থিতি যাইহোক, তাকে মোকাবেলা করতে হবে। সে বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে বসে রইল।
বেশ কিছু সময় পার করে এয়ার হোস্টেস ফিরে এলো। সাথে একজন ফ্লাইট অফিসার। কিন্তু যে সংবাদ তাঁরা নিয়ে এলো তা মোটেও সুখকর হলো না। এয়ার হোস্টেস বলল, ‘হানি, শিরিন খান নামে কোনো প্যাসেঞ্জার এই প্লেনে নেই। এই নামের কেউ যাচ্ছেন না।’
মুহূর্তে ছেলেটির মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। কান্নায় ভেঙে পড়ল বাচ্চা মেয়েটি। ছেলেটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘তাহলে? সে তাহলে কোথায় গেল? কী হয়েছে আম্মুর?’
‘আমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কোনো তথ্য নেই। আমরা চেষ্টা করছি খোঁজ বের করার।’
ছেলেটি তার বোনকে জড়িয়ে ধরল আবার।
‘তুমি কি শিওর—এই প্লেনেই তার বুকিং ছিল?’
ছেলেটি নিশ্চিত নয়। সে নিরুত্তর দাঁড়িয়ে রইল। তার বাবা বলেছিল, তোমাদের আম্মুর সঙ্গেই তোমরা একসাথেই যাবে। সেভাবেই সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। এয়ারপোর্টেই আম্মুর সঙ্গে দেখা হবে।
ছেলেটি চুপ করে আছে দেখে এয়ার হোস্টেস আবার জানতে চাইল, ‘তিনি কি তোমাদের সাথে এয়ারপোর্টে এসেছিলেন?’
‘না।’
এয়ার হোস্টেস আর কিছু জিজ্ঞেস না করে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল ফ্লাইট অফিসারের দিকে। সে কিছু বুঝতে পারছে না ঘটনা কী হতে পারে। ফ্লাইট অফিসার এতক্ষণ ছেলেটি আর তার বোনের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল সে—ছোট ছোট দুটি বাচ্চা—এদের তো একা একা ফ্লাই করার কথা না। নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় এরা এসেছে। সেটা কী? ফ্লাইট অফিসার মাথা ঝুঁকিয়ে সামনে এসে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা এয়ারপোর্টে কার সঙ্গে এসেছো? কেউ হেল্প করেছে?’
‘আমার আব্বু।’
‘তোমার আম্মু কোথায় ছিল তখন?’
কিছু না বলে ছেলেটি চুপ করে রইল আবার।
ফ্লাইট অফিসার আবার বললেন, ‘তোমার আম্মুর কি অন্য কারো সাথে আসার কথা ছিল? অন্য কোথাও থেকে?’
ছেলেটি এবারও নিরুত্তর রইল। সে ঠিক বুঝতে পারছে না কী বলবে এবং কীভাবে বুঝিয়ে বলবে।
ফ্লাইট অফিসার কিঞ্চিত অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘তুমি কি শিওর এই ফ্লাইটেই তোমাদের সঙ্গেই তার যাওয়ার কথা ছিল?’
‘ওরা আব্বুকে তাই বলেছিল—যে আম্মু আমাদের সঙ্গেই যাবে। কিন্তু আমরা বোর্ডিংয়ের সময় তাকে দেখিনি। ভেবেছিলাম প্লেনে এসে দেখা হবে।’
‘এক মিনিট। ওরা মানে? ওরা কারা—কাদের কথা বলছো?’
‘ইমিগ্রেশন পিপল।’ ছেলেটি আস্তে করে এমনভাবে বলল যেন আশেপাশের কেউ শুনতে না পায়। যেন কেউ শুনলে সে লজ্জায় পড়ে যাবে। ইতিমধ্যেই ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেছে।
‘ওহ গড!’ বলেই ফ্লাইট অফিসার তাকালেন এয়ার হোস্টেসের দিকে। তার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না—ঘটনা আসলে কী ঘটেছে বা ঘটে থাকতে পারে। তিনি মোটামুটি নিশ্চিত—শুধু বুঝতে পারছেন না, ভদ্রমহিলা বিমানে উঠেনি কেন?
তিনি ছোট ছোট ভাই-বোন দুটির দিকে তাকিয়ে ভালো মত লক্ষ্য করলেন। এদেরকে এখন কী বলে সান্ত্বনা দেবে সেটাই তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি নরম সুরে বললেন, ‘তোমরা যাচ্ছ কোথায়? কোন দেশে?’
‘বাংলাদেশে।’
ফ্লাইট অফিসার চিন্তায় পড়ে গেলেন। এত অনেক লম্বা ফ্লাইট। তিনি মনে মনে হিসেব করে ফেললেন—নিউ ইয়র্ক থেকে কুয়েত ১২ ঘণ্টা—মাঝে ট্রানজিটে থাকতে হবে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা তারপর শেষ পর্যায়ে কুয়েত থেকে ঢাকা আরো ৫ ঘণ্টা। তার মানে সব মিলিয়ে কম করে হলেও ২১-২২ ঘণ্টা। এতটা সময় বাচ্চা মেয়েটি কী করে পার করবে সেটিই এক চিন্তার বিষয়। হয়ত আরো কান্নাকাটি করবে। তিনি ছেলেটিকে এবার বুঝিয়ে বললেন, ‘তোমাদেরকে একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আমরা যখন কুয়েতে নামব—তখন খোঁজ নিয়ে জানার চেষ্টা করব। আমরা নিউ ইয়র্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করব। তখন নিশ্চয়ই জানতে পারব। আমি বুঝতে পারছি, তোমাদের মন খারাপ। কিন্তু এই মুহূর্তে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’ এরপর একটু থেমে তিনি এয়ার হোস্টেসকে বললেন, ‘ওদের দিকে লক্ষ্য রেখো। ওদের যা দরকার—তাই যেন পায়। কোনো সমস্যা যেন না হয়। আমি আবার এসে খোঁজ নিয়ে যাবো।’ বলেই তিনি চলে গেলেন ককপিটের দিকে।
এয়ার হোস্টেস বলল, ‘আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার পরিবেশন করব। তোমাদের কি অন্য কিছু লাগবে এখন?’
‘না, আমার কিছু লাগবে না।’ ছেলেটি বলল। সে মন খারাপ করে বসে রইল।
এবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল সে, ‘তোমার কিছু লাগবে সোনামণি?’
‘আমি আম্মুকে চাই। আমি আম্মুর কাছে যেতে চাই। আমার আম্মুকে এনে দাও।’ কেঁদে কেঁদে বলল মেয়েটি। এবং কাঁদতেই থাকল।
এয়ার হোস্টেস পড়ে গেল মহা চিন্তায়। কিন্তু এখানে, এই মাটি থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার ফিট উপরে সে তার আম্মুকে কোথায় পাবে?

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কৌতূহলী মন নিশ্চয়ই জানতে চাইছে ছেলেটির মায়ের কী হলো। সে কোথায়? কেনই বা ওদের সঙ্গে যাচ্ছে না বা যেতে পারল না। এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সহ ছেলেটি, তার বোন, আর বাবা এবং সর্বপোরি মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব আগামী পর্বে।
সে পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

পরের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

Ki-Ghotechilo-Las-Vegase

কী ঘটেছিল লাসভেগাসে (পর্ব-১)

শাহেদের মেজাজ অত্যন্ত খারাপ।
সকাল ১০টা থেকে শায়লা কে সে ফোন করছে, টেক্সট পাঠাচ্ছে অথচ শায়লা কোন উত্তর দিচ্ছে না। এখন বিকেল ৪টা। কোন সমস্যা হলো কি না বুঝতে পারছে না। শায়লার স্বভাব রাতের বেলা ফোনের রিং-টোন মিউট করে দেয়া, কিন্তু সকাল বেলা ফোনটা আনমিঊট করতে ভুলে যায়। আজকেও হয়তো তাই ঘটেছে। কিন্তু শাহেদ বুঝতে পারে না, একটা মানুষ সারাদিনে একবারের জন্যেও ফোন না চেক করে কী করে থাকতে পারে? ফোনটা একবার হাতে নিলেই তো শায়লা দেখতে পেতো শাহেদের মিসকল এবং মেসেজ।
শায়লার ফোন না ধরার সমস্যা আছে। এই বিষয়টি নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার শাহেদের ঝগড়া হয়েছে শায়লার সাথে। একবার ব্যবসায়িক খুবই দরকারি একটা কাগজ বাসায় ফেলে কাজে চলে যায় শাহেদ। কাজ থেকে কল করে শায়লাকে, কিন্তু শায়লা ফোন ধরে না। এক বার, দু বার, তিন বার এবং কাজের ফাঁকে ফাঁকে আরো বেশ কয়েকবার ফোন এবং টেক্সট পাঠায় শাহেদ। শায়লার কোন উত্তর না পেয়ে অগত্যা সে বাসায় এসে দেখে শায়লা দিব্যি রান্না ঘরে রান্নায় ব্যস্ত এবং কিচেন কাউন্টারের উপরে তার ফোন।
শাহেদকে দেখে শায়লা কিঞ্চিত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার? তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরলে যে? তোমার না কী জরুরি মিটিং আছে?’
‘তুমি ফোনটা ধরলে তো আমাকে এভাবে ফিরে আসতে হতো না।’
‘তুমি ফোন করেছিলে নাকি? কই আমি শুনতে পাই নি তো!’
শাহেদ কিচেন কাউন্টার থেকে শায়লার ফোন নিয়ে দেখে, যা সন্দেহ করেছিল তাই। ফোনের রিং-টোন অফ করা। শাহেদের মেজাজ মুহূর্তেই বিগড়ে গেল। সে ফোনটা শায়লার হাতে দিয়ে বলল, ‘নিজেই দেখ।’
শাহেদ রাগে গজ গজ করতে করতে ওর দরকারি কাগজটা নিয়ে কাজে ফিরে যায়। আজকেও নিশ্চয়ই এমন ঘটনাই ঘটেছে।
শাহেদ বাসায় ফিরে দেখে শায়লা বাসায় নেই।
শাহেদ-শায়লার দুই ছেলে মেয়ে। মেয়ের নাম অর্পা, বয়স ১৩ বছর আর ছেলে অর্ক, বয়স ১০। শাহেদ দেখল দু ভাই-বোন যার যার রুমে ঘুমাচ্ছে। ভোর ৬টায় ওদেরকে ঘুম থেকে উঠতে হয় স্কুলের বাস ধরার জন্যে। তাই স্কুল থেকে ফিরেই কিছু একটা খেয়ে দু জনেই ঘুমাতে চলে যায়। সন্ধ্যা অবধি ঘুমিয়ে হোমওয়ার্ক নিয়ে বসে, চলে মধ্যরাত অবধি। শাহেদের খুব মায়া লাগল তারপরেও সে অর্পাকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার ইজ ইউর মামি।’
ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই অর্পা উত্তর দিল, ‘আই ডোন্ট নো।’
‘স্কুল থেকে ফিরে মামিকে বাসায় দেখনি?’
‘নো।’
‘কোথায় গেছে কিছু জানো?’
‘আই হ্যাভ নো আইডিয়া।’ বলেই অর্পা পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে অর্পার রুম থেকে বেড় হয়ে এলো।
টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি ব্যস্ততম শহর ডালাস। আমেরিকার অন্যান্য বড় শহর গুলোর মত এখানেও রয়েছে কয়েক সহস্র বাঙ্গালীর বসবাস। জীবিকা নির্বাহের জন্যে বিভিন্ন ধরনের পেশার পাশাপাশি সফল ভাবে ব্যবসাও করছেন অনেকে। তাদেরই একজন আমাদের গল্পের প্রধান চরিত্র শাহেদ।
শাহেদ বৃহত্তর ডালাসের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কমিউনিটিতেও বেশ পরিচিত। অল্পতে রেগে গেলেও একজন বড় হৃদয়ের মানুষ হিসেবে অনেক সুনাম রয়েছে তার।
বসন্তের পড়ন্ত বিকেল। ডালাসের হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে শাহেদের গাড়ি। প্রায় ত্রিশ মিনিট ড্রাইভিং শেষে শাহেদের গাড়ি এসে থামল উপশহরের একটি বাড়ির সামনের ড্রাইভওয়েতে। পার্ক করেই দ্রুত বের হয়ে বড়ির সম্মুখ দরজায় এসে দাঁড়াল শাহেদ। অস্থিরভাবে কয়েকবার ডোর বেলে চাপ দিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবারো ডোর বেলে চাপ দিলো শাহেদ। তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। সিদ্ধান্ত নিল, এবার চাপ দিয়ে দাড়িয়ে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ দরজা না খুলে। শাহেদ ডোর বেলের দিকে হাত বাড়াতেই দরজা খুলে গেল।
খোলা দরজার অপর প্রান্তে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে সে এক কথায় সুশ্রী এবং আকর্ষণীয়। বাংলা সাহিত্যে এমন মেয়েকেই বোধ হয় বলে সুন্দরীতমা। সুন্দরীতমার নাম নায়লা। নায়লার সবচেয়ে বড় গুন, যে কোন পরিস্থিতিতেই সে আনন্দে থাকে। তার আনন্দ সীমাহীন। তার অভিধানে দুঃখবোধ বলে কিছু নেই।
শাহেদকে দেখে একটু অবাক হবার ভান করল নায়লা, ‘দুলাভাই, আপনি?’
নায়লার হাসি হাসি মুখের দিকে ভুরু কুচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিরক্ত মুখেই জানতে চাইল শাহেদ, ‘দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে? থাকো কোথায়?’
‘সরি দুলাভাই, কিচেনে ছিলাম। ডিশ ক্লিন করছিলাম তো, তাই শুনতে পাইনি।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। তোমার আপুকে ডাকো।’
‘আপুকে ডাকবো মানে?’
‘কেন শায়লা আসেনি এখানে?’
‘না তো। কেন, শায়লা’পুর আসার কথা ছিল নাকি এখানে?’ নায়লা অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘আসার কথা থাকবে কেন? কিছু হলেই তো সে তোমার এখানে চলে আসে। এই হয়েছে আরেক যন্ত্রণা।’
‘আবার কী হয়েছে?’
‘হবে আবার কী? কিছুই হয়নি।’
‘আসুন ভেতরে আসুন। ভেতরে এসে কথা বলুন।’
‘আরে সকাল থেকে ফোন করছি। বাসার ফোনও ধরছে না, সেল ফোনও ধরছে না। টেক্সট পাঠালাম, নো রেসপন্স। মেসেজ রাখলাম, কোন খবর নেই। এসবের মানে কি?’
‘দুলাভাই, আপনি কি এখানে দাড়িয়েই কথা বলবেন, নাকি ভেতরে আসবেন?’
‘ভেতরে এসে কী হবে?’ বলেই শাহেদ দরজা ঠেলে, নায়লাকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। নায়লা চোখ ঘুড়িয়ে দরজা বন্ধ করে শাহেদের পিছে পিছে বসার ঘরে এলো।
‘দুলাভাই, আপনি একটু বসুন, আমি আপনার জন্যে কফি নিয়ে আসি।’
‘না না, কফি আনতে হবে না। মেজাজ এমনিতেই অনেক গরম। এর মধ্যে আর গরম কিছু খেতে চাই না। তুমি এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসো।’
নায়লা মুচকি হেসে রান্না ঘরে চলে গেল আর তখনই কাজ থেকে ফিরে ঘরে ঢুকলো নায়লার স্বামী নাভিদ। বসার ঘরে শাহেদকে দেখে এগিয়ে গেল।
‘আরে শাহেদ ভাই, কেমন আছেন, সব খবর ভাল?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সব খবর ভাল।’
‘শায়লা আপা কেমন আছে? বাচ্চারা সবাই ভাল?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ সবাই ভাল।’
‘একাই এসেছেন, ওরা কেউ আসেনি?’
‘না। একাই এসেছি।’
‘ইজ এভ্রিথিং অল-রাইট শাহেদ ভাই?’
‘কী যন্ত্রণা, তুমিতো দেখি মনের সুখে একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছ? কেন, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে সামথিং ইজ রং?’ শাহেদ বিরক্তি চোখে তাকাল নাভিদের মুখের দিকে। নাভিদ থতমত খেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ করে রইল।
নায়লা বরফ কুচি মিশিয়ে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে দিলো শাহেদের হাতে। এক চুমুকে সবটুকু পানি খেয়ে শাহেদ গ্লাসটা নায়লার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা নায়লা, তুমি বলো, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে যে সামথিং ইজ রং?’
নায়লা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কই নাতো!’
এবার শাহেদ আবার তাকাল নাভিদের দিকে। নাভিদ অসহায় চোখে তাকাল নায়লার দিকে। নায়লা বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ বদলে দিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, টেবিলে খাবার দিচ্ছি, আপনি ভেতরে গিয়ে বসুন। নাভিদ, তুমিও ফ্রেশ হয়ে আসো। চলেন দুলাভাই।’
নায়লা শাহেদকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। নাভিদ ওদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা ঝাঁকিয়ে ঢুকে পড়ল বাথরুমে।
ডাইনিং টেবিলে হরেক রকমের খাবার সাজানো হয়েছে। শাহেদ অন্যমনস্ক ভাবে খেয়ে যাচ্ছে। নাভিদ এসে যোগ দিয়েছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। সবার মনোযোগ যেন খাবারের দিকেই। নায়লা শাহেদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘দুলাভাই, রান্না কেমন হয়েছে?’
‘খারাপ না।’ মুখ না তুলেই উত্তর দিলো শাহেদ।
নায়লা বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল, ‘খারাপ না মানে কী?’
শাহেদ মুখ তুলে তাকাল নায়লার দিকে, ‘মানে ভালই। আমার শাশুড়ির কাছ থেকে এই একটা জিনিষ তোমরা শিখেছ। তার ভাল কোন গুন তো তোমরা কেউ পাওনি, শুধু এই রান্নাটা ছাড়া।’
নাভিদ বলল, ‘শায়লা আপা এলে ভাল হতো। আড্ডাটা জমতো।’
‘শায়লার খোজেই তো এখানে এলাম। কোথায় যে গেছে কে জানে। কিছুতো বলেও যায়নি। কোন নোট রেখেও যায়নি। সারাদিন চলে গেল, বুঝতে পারছি না।’
‘আপু চলে গেছে। আর ফিরে আসবে না।’ গলার স্বর যথেষ্ট ঠাণ্ডা করে শান্ত ভাবে কথাটা এমন ভাবে বলল নায়লা যেন কিছুই ঘটেনি।
শাহেদ খাওয়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল নায়লার দিকে। তারপর তাকাল নাভিদের দিকে। আবার নায়লার দিকে ফিরে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি কী বললে?’
নায়লা সব কিছুই জানে তবুও সে কিছু না বলে চুপ করে রইল।
শাহেদ কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এসবের মানে কী?

পরের পর্ব

Ki-Ghotechilo-Las-Vegase

কী ঘটেছিল লাসভেগাসে (পর্ব-২)

শাহেদ খাওয়া বন্ধ করে তাকিয়ে আছে নায়লার দিকে।
নায়লা নির্বিকার।
কিছুক্ষণ পর সে তাকাল নাভিদের দিকে। আবার নায়লার দিকে ফিরে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি কি বললে?’
নায়লা গলার স্বরে কোন পরিবর্তন না এনে একই রকম ঠাণ্ডা স্বরে বলল, ‘আপনি তো সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। ফ্যামিলির জন্যে আপনার সময় কোথায়? তাই সে ডিসিশন নিয়েছে সাথে আর থাকবে না।’
‘আমার সাথে থাকবে না মানে? আমার সাথে থাকবে না তো কার সাথে থাকবে?’ হঠাৎ করে শাহেদের কণ্ঠে রাগ ঝরে পড়ল।
‘কার সাথে থাকবে সেটা আমি কী করে বলব?’ নিজেকে যথাসম্ভব সংযত রেখেই নায়লা শাহেদের প্রশ্নের উত্তর দিল।
‘তাহলে আমার সাথে যে আর থাকবে না, সেটা কী করে জানলে?’
‘আমাকে বলেছে।’
‘কবে বলেছে?’
‘দিন-তারিখ তো মনে করে রাখি নাই দুলাভাই।’
‘আর কী বলেছে শুনি?’
‘থাক, সেগুলো শুনলে আপনার ভাল লাগবে না।’
‘তবুও শুনি। বলো।’
‘আর বলেছে আপনার শরীর থেকে নাকি কিসের গন্ধ বের হয়। সে লাইক করে না। অবশ্য এরকম অনেকেই আছে, গন্ধ সহ্য করতে পারে না।’
এমন ধরণের কথা শুনে শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে নায়লার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল। তারপর নাভিদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার গায়ে গন্ধ?’
নাভিদ চেয়ার ছেড়ে উঠে শাহেদের পাশে গিয়ে ওর শরীরের গন্ধ নেবার চেষ্টা করল। তারপর বলল, ‘কই না তো!’
শাহেদ এবার নায়লাকে ডেকে বলল, ‘এই তুমি এদিকে আসো।’
‘থাক দুলাভাই বাদ দেন।’
‘বাদ দিব কেন। তুমি নিজেই পরীক্ষা করে দেখো—আসো।’
অনিচ্ছা স্বত্বেও নায়লা উঠে এসে শাহেদের পাশে দাঁড়াল।
‘করো, পরীক্ষা করো।’
নায়লা শাহেদের ঘারের কাছে নাক নামিয়ে গন্ধ নেবার চেষ্টা করল।
‘কি, গন্ধ পেলে?’
‘আমার কাছে তো লাগছে না।’
‘তাহলে?’
‘আসলে আপুর নাকটা না একটু বেশি সেন্সিসিটিভ। আম্মার মতো।’
‘আর ইউ সিরিয়াস? সত্যি করে বলতো, শায়লা বলেছে যে আমার গায়ে গন্ধ?’
‘তাহলে কি আমি বানিয়ে বলছি?’ বলতে বলতে নায়লা ফিরে গিয়ে বসল ওর চেয়ারে।
‘শায়লা এখন কোথায়?’ নায়লার দিকে তাকিয়ে শাহেদ সরাসরি জানতে চাইল।
নায়লা খাওয়া শুরু করেছিল। খেতে খেতেই উত্তর দিল, ‘মাশুক ভাইয়ের সাথে লাস ভেগাস গেছে।’
নাভিদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কার সাথে লাস ভেগাস গেছে?’
‘মাশুক ভাইয়ের সাথে।’ হঠাৎ করেই নায়লার রাগ গিয়ে পড়ল এখন নাভিদের উপর। ‘নাভিদ, তুমি বোধ হয় ইদানীং কানে একটু কম শুনছো। ইউ শুড কনসাল্ট এন ইএনটি স্পেশালিষ্ট।’
বিষয়টা নাভিদের কাছে স্পষ্ট নয়। সে আবারো প্রশ্ন করল, ‘না সেটা ঠিক আছে, কিন্তু মাশুক ভাইয়ের সাথে যাবে কেন?’
‘কেন যাবে তার আমি কী জানি? আমাকে কেন জেরা করছ?’
নাভিদ আর কথা না বাড়িয়ে তাকাল শাহেদের দিকে।
শাহেদ চিন্তিত মুখে প্লেট নিয়ে উঠে পড়ল। বেসিনের সিঙ্কে প্লেট রেখে হাত ধুয়ে সে ফিরে এসে বসে থাকল চুপচাপ। হঠাৎ করেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল শাহেদ। কোন কিছুই সে মেলাতে পারছে না।
নায়লা পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল। তারপর প্রসঙ্গটা বদলে দেবার জন্যে শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, একটা পান খাবেন? আপনার পছন্দের মসলা দেয়া পান এনেছে নাভিদ।’
শাহেদ কোনো উত্তর দিলো না। যেভাবে বসেছিল সেভাবেই বসে রইল। নায়লার দিকে তাকালও না। তার মানসিক অবস্থা বোঝার কোন উপায় নেই।
নায়লা নরম সুরে জিজ্ঞেস করল, ‘দুলাভাই, আপনার মন কি বেশি খারাপ হয়েছে?’
শাহেদ এবারো কোন উত্তর দিল না।
নাভিদ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল, ‘এখন কী করবেন শাহেদ ভাই?’
শাহেদ একদৃষ্টিতে নাভিদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিল নায়লার দিকে। তারপর ঠাণ্ডা মাথায় উত্তর দিল, ‘খুন করব।’
নায়লার চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। যেন খুব মজার একটা বিষয় ঘটবে, এমন ভাব নিয়ে সে শাহেদের দিকে ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে খুন করবেন দুলাভাই?’
‘সেটা সময় হলেই বুঝতে পারবে। তবে আমি নিজের হাতে কাজটা করব না। আই উইল হায়ার এ প্রফেশনাল হিটম্যান। ভাড়াটে খুনি দিয়ে আমি তাকে পরপারে পাঠিয়ে দেবো।’
নাভিদের আগ্রহের সীমা রইল না। সে শাহেদের দিকে একটু ঝুঁকে এসে জানতে চাইল, ‘আপনার সন্ধানে কি ভাড়াটে খুনি আছে শাহেদ ভাই?’
‘না নাই। তবে খুঁজে পেতে সমস্যা হবে না।’
‘আমার সন্ধানে আছে। আপনি চাইলে যোগাযোগের ব্যবস্থা করে দিতে পারি।’
‘তোমার সন্ধানে আছে মানে? তুমি চেনো?’ নায়লা অগ্নি দৃষ্টি নিয়ে তাকাল নাভিদের দিকে।
নাভিদ নায়লার দিকে ঘুরে আমতা আমতা করে বলল, ‘না মানে, আমি সরাসরি কাউকে চিনি না। তবে আমার এক কলিগ আছে, তার আন্ডারওয়ার্ল্ডের সাথে ভাল কানেকশন আছে। বললেই সে ব্যবস্থা করে দেবে।’ এবার শাহেদের দিকে ঘুরে আগ্রহ নিয়ে সে বলল, ‘শাহেদ ভাই, হেল্প লাগলে নির্দ্বিধায় বলতে পারেন। ব্যবস্থা করে দেবো।
রাগে শাহেদের মুখ লাল হয়ে গেল। কিছু না বলে সে চুপচাপ বসে থাকল।
ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে নাভিদ চেষ্টা করল পরিবেশটাকে হালকা করার জন্যে। সে নায়লার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এই শাহেদ ভাইকে পান এনে দিলে না? যাও পান এনে দাও। আমাকেও একটা দিও।’
‘আমি যাই।’ হঠাৎ করেই শাহেদ উঠে দাঁড়িয়ে দরজার দিকে হাঁটা শুরু করল।
‘কেন দুলাভাই, পান খাবেন না? পানটা খেয়ে যান?’
শাহেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে নাভিদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘তোমার জামাইকে খাওয়াও।’ বলেই দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।
নায়লা আর নাভিদ একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই নাভিদ অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, শায়লা আপা কি সত্যি সত্যি লাস ভেগাস গেছে নাকি?’
‘সেটা তোমার জানার কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করি না।’ নায়লা নাভিদকে আর কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে টেবিলের খাবারগুলো নিয়ে কিচেনের দিকে চলে গেল।

রাত প্রায় ১২টা।
শাহেদ ঘুমানোর আগে গেল ছেলে মেয়েদের খবর নিতে। অর্ক ঘুমিয়ে পড়েছে কিন্তু অর্পা এখনও টিভি দেখছে। শাহেদ জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার অর্পা? তুমি ঘুমাওনি এখনো?’
‘আই ক্যান্ট স্লিপ উইদাউট মামি।’
‘বাট ইউ নীড টু ট্রাই স্লিপিং এলোন সামটাইমস, ইউ নো।’
‘ইয়া আই নো এন্ড আই’ম ট্রায়িং।’
শাহেদ আর কিছু না বলে ফিরে আসতে যাবে ঠিক তখন অর্পা ডাকল, ‘বাবা!’
‘উম।’ শাহেদ ঘুরে দাঁড়িয়ে জানতে চাইল, ‘কী মা?’
‘অর্ক ডিডন’ট ইট এনিথিং। হি ওয়াজ ভেরী হাংগ্রি… আই গেভ হিম ফুড বাট হি রিফিউজড।’
‘কেন?’
‘হি ক্যান’ট ইট উইদাউট মামি’স হ্যান্ড। মামি স্পয়লড হিম।’
‘এত বড় ছেলে এখনো মায়ের হাতে খায়? কি সর্বনাশ, আমি এসব কিছুই জানিনা?’
‘ইয়া, ইউ ডোন্ট নো আ লট অফ থিংস বাবা।’
‘হুম, তাইতো দেখছি। আমি আসলেই অনেক কিছুই জানিনা। কী থেকে কী হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছি না।’
গভীর চিন্তায় পরে যায় শাহেদ। মনে মনে ভাবল, ‘এতো ভাল যন্ত্রণা হলো। একজন মায়ের হাতে ছাড়া খেতে পারে না, আরেকজন মায়ের কাছে ছাড়া ঘুমাতে পারে না। এখন উপায়?’
শাহেদ চিন্তিত মনে ধীর পায়ে চলে গেল তার রুমে।
পরেরদিন সকালে শাহেদ আবার গেল নায়লাদের বাসায়। শাহেদকে চা-নাস্তা দিয়ে অনেকক্ষণ হলো ভিতরে চলে গেছে নায়লা—প্রাত্যহিক কিছু কাজ সারার জন্যে। শাহেদ চুপচাপ বসে আছে। রাজ্যের ভাবনা তার মাথায়।
নায়লা মাঝে মাঝে ভেতর থেকে উঁকি দিয়ে দেখল, শাহেদ তার মোবাইল ফোনের স্ক্রিনে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
নায়লা তার হাতের কাজগুলো শেষ করে অনেকক্ষণ পর ফিরে এসে দেখল শাহেদ ঠিক একই জায়গায় একই ভঙ্গিতে বসে আছে। চা-নাস্তা যেভাবে রেখে গিয়েছিল সেভাবেই পড়ে আছে টেবিলে। শাহেদ ছুঁয়েও দেখেনি।
নায়লা বসার ঘরের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে সময়টা দেখে নিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, প্রায় পনের মিনিট হলো আপনি এভাবে ঝিম ধরে বসে আছেন। চা-টাও তো খাননি। সমস্যা কী?’
শাহেদ তাকাল নায়লার দিকে, ভাবলেশহীন চাহনি নিয়ে।
‘কী বলবেন বলেন।’
‘শায়লা একটা মেসেজ পাঠিয়েছে। একটা না, আসলে কয়েকটা—বেশ কয়েকটা।’
‘তাই? কী লিখেছে?’
শাহেদ তার মোবাইল ফোন থেকে মেসেজ বের করে এগিয়ে দিল নায়লার দিকে। বলল, ‘পড়ে দেখো।’
নায়লা শাহেদের হাত থেকে ফোন নিয়ে মেসেজগুলি দেখল।
শাহেদ বলল, ‘পড়ো।’
‘জোরে পড়ব?’
‘পড়ো। জোরেই পড়ো, দেখো কি লিখেছে তোমার লাভিং সিস্টার!’
নায়লা পড়া শুরু করল।

আগের পর্ব

immigration-deportation

ইমিগ্রেশন ডিপোর্টেশন এবং অপেক্ষার গল্প (পর্ব-২)

পাঠক, আসুন এবার আমরা পরিচিত হই ছেলেটি, তার বোন, আর বাবা এবং সর্বোপরি মায়ের সঙ্গে।
ছেলেটির নাম আদনান। বয়স এগারো বছর। তার জন্ম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম মহানগরী নিউ ইয়র্কের জ্যামাইকাতে বসবাসরত এক বাংলাদেশি অভিবাসী পরিবারে। তার বাবা, শোয়েব খান—একজন স্থায়ী অভিবাসী, পেশায় ট্যাক্সিচালক। তার মা শিরিন খান, আমেরিকায় এসেছিলেন ভিজিট ভিসা নিয়ে। ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন অবৈধ অভিবাসী। কাজ করেন একটা হার্ডওয়ার স্টোরে ক‍্যাশিয়ার হিসেবে। ৫ম গ্রেডের ছাত্র আদনান একটি পাবলিক স্কুলে যায়। অঙ্ক তার প্রিয় বিষয়। ড্রাগন বল জি তার প্রিয় ভিডিও গেম।
পরিচয়ের পালা শেষ। আসুন আমরা মূল গল্পে ফিরে যাই।
এক পড়ন্ত বিকেলে হাডসন নদীর তীরে বসে ওপারে ম্যানহাটনের স্কাইলাইনের দিকে তাকিয়ে অন্যমনস্ক হয়ে যায় শোয়েব। আমেরিকার কঠিন জীবনের জাঁতাকলে কাজ করতে করতে যখন হাঁপিয়ে ওঠে—তখন মাঝে মাঝে শিরিনকে নিয়ে এসে এই নদীর তীরে বসে আনমনে তাকিয়ে থাকে সে।
শিরিনও চুপ করে থাকে। শোয়েবের সান্নিধ্য তাঁর অনেক ভালো লাগে। এই দেশটিতে শোয়েবই একমাত্র আপনজন তাঁর।
এক পর্যায়ে শিরিনের উদাস দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থেকে বলে উঠে শোয়েব, ‘শিরিন, চলো আমরা বিয়ে করে ফেলি। এভাবে আর কতদিন—একা একা আর ভালো লাগে না।’
শিরিন অবাক হয়ে তাকায় শোয়েবের মুখের দিকে। সে কী বলবে? তারও তো একা থাকতে ভালো লাগে না। কিন্তু যখনই পেছনের দিকে তাকায় সে—অনিশ্চয়তা জেঁকে ধরে তাকে। সে কী করবে?
ঠিক কত বছর আগে শিরিন এসেছিল এই স্বপ্নের ভূখণ্ড আমেরিকাতে তাঁর সঠিক সময় জানা না গেলেও, তাঁর স্বপ্নও ছিল অন্য সবার মতো অভিন্ন। সবার মত সেও স্বপ্ন দেখেছিল—একদিন তারও একটা গ্রিনকার্ড হবে। ভেবেছিল এসে যখন এসেই পড়েছি—ব্যবস্থা একটা নিশ্চয়ই হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবে কোনো ব্যবস্থাই আসলে হয় না। এক সময় ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। কোনো উপায়ান্তর না দেখে স্থানীয় এক বাঙালি আইনজীবীর সহায়তায় রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করে সে। কিন্তু পর্যাপ্ত এবং গ্রহণযোগ্য ডকুমেন্ট এবং এভিডেন্স না থাকায় তার আবেদন গ্রহণ করেনি কর্তৃপক্ষ। অন্য হাজারো ইমিগ্রান্টদের মতো ডিপোর্টেশন এড়াতে গা ঢাকা দেয় শিরিন। তারপর সেলস গার্লের কাজ জুটিয়ে নেয় একটা পরিচিত দোকানে। একসময় পরিচয় ঘটে গ্রিনকার্ডধারী শোয়েবের সাথে। পরিচয় থেকে ঘনিষ্ঠতা। ট্যাক্সি চালিয়ে ক্লান্ত শোয়েব সুযোগ পেলেই চলে যায় শিরিনের কাজের জায়গায়। শিরিনের সাথে সুখ দুঃখের কথা বলতে বলতে আনমনা হয়ে যায় শোয়েব।
‘তুমি তো সব জানোই শোয়েব। একটা অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে নিজেকে জড়াতে চাইছ কেন?’ বলে শিরিন।
‘জড়াতে চাইছি কারণ আমি তোমাকে ভালোবাসি। আর ছাড়া তুমিতো কোনো অপরাধ করোনি।’
‘এদেশে অবৈধভাবে থাকাটাই তো বড় অপরাধ।’ এটুকু বলে আবার আনমনে তাকিয়ে থাকে হাডসন নদীর পানির দিকে। শোয়েবও আর কোনো কথা খুঁজে পায় না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শিরিন আবার বলে, ‘এদেশের আইন সম্পর্কে তুমি ভালো করেই জানো—একবার ডিপোর্টেশনের অর্ডার হয়ে গেলে বিয়ে করেও কোনো লাভ নেই। আর তুমি সিটিজেন হলেও একটা কথা ছিল—তাতেও কিছু হতো বলে আমার মনে হয় না।’
‘এত ভাবছ কেন? যদি সত্যিই কিছু ঘটে যায়, সেটা তখন দেখা যাবে। কিন্তু এভাবে একা একা আমি তোমাকে কষ্ট করতে দেব না। আমি তোমার জীবনের ভাগীদার হতে চাই।’
‘আচ্ছা আমি ভেবে দেখি।’
‘ভাবা-ভাবির কিছু নেই। আমেরিকাতে তোমার মতো হাজার হাজার ইমিগ্রান্ট আছে—যাদের বৈধ কাগজ পত্র নেই। তারা থাকতে পারলে তুমি পারবে না কেন?’
শিরিন কিছু বলতে পারে না। আবারো অন্যমনস্ক হয়ে যায়।
‘যা হবার হবে—আই ওয়ান্ট টু ম্যারি ইউ অ্যান্ড দ্যাটস ফাইনাল।’
এভাবেই দুজনে দুজনকে ভালো লাগা থেকে প্রেম—অতঃপর সিদ্ধান্ত নেয় বিয়ে করার শোয়েব আর শিরিন। বিয়ে করে শুরু করে সংসার। সময়টা তাদের ভালোভাবেই কেটে যায়। জন্ম হয় দুই সন্তানের। হেসে খেলে ভালোই চলছিল তাদের সংসার। দেখতে দেখতে বছর গড়িয়ে যায়। এগারো বছরের ছেলে আদনান আর মেয়ে দুই বছর বয়সী রাফিয়া।
বিয়ের পরপরই শিরিন আবেদন করেন বৈধ হবার জন্যে। কিন্তু আমেরিকার ইমিগ্রেশন আইনে একবার কেউ ডিপোর্টেশনের অর্ডার পেলে তা বাতিল করা খুবই দুরূহ। আর ধরা পড়লে আমেরিকা ছাড়তেই হবে এবং সেটাই ঘটেছে শিরিনের ভাগ্যে। ঘটনা হয়ত এতদূর গড়াতো না। কিন্তু ৯/১১ এর ঘটনা বদলে দিয়েছে সব কিছু। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি বিশেষ অভিযানে গ্রেফতার করছে হাজার হাজার অবৈধ অভিবাসীকে। শিরিনকেও ধরা হলো এমনি একটা অভিযানে।
গত বসন্তের কোনো এক ভোরে—রাতের আঁধার তখনও পুরোপুরি কাটেনি, আদনান আর রাফিয়া তখনও ঘুমিয়ে। মুহূর্তে উলট পালট হয়ে যায় তাদের আমেরিকার স্বপ্নের জীবন। ইমিগ্রেশন পুলিশ বাড়ি ঘেরাও করে হাতকড়া পরিয়ে তাদের মা শিরিনকে নিয়ে যায় নিউ জার্সির এক ডিটেনশন সেন্টারে। কারণ আর কিছু না—সেই পুরনো ডিপোর্টেশন অর্ডার। সেখানেই তাকে থাকতে হবে শিরিনকে যতদিন না তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়। আমেরিকায় একবার কোনো অভিবাসীকে ডিপোর্ট জরা হলে দশ বছরের আগে তাঁর পক্ষে আমেরিকায় এন্ট্রি করা সম্ভব হয় না।
শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ছোট ছোট দুটো ছেলে-মেয়ে মাকে ছাড়া থাকবেই বা কী করে? একা কাজ আর বাসার কাজ সামলে ছেলেমেয়ে দুটোকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না শোয়েব। সে আবার ল’ইয়ার ধরল। অনেক চেষ্টা তদবির করল। ছোট বাচ্চা দুটির দোহাই দিল—কিন্তু আইনের মন গলাতে পারল না। তাদের একটাই কথা, যে অবৈধ সে অবৈধ। সে ভালো হলেও—খারাপ হলেও। এখানে মানবিকতা দেখানো সুযোগ নেই।
নিয়মানুসারে শিরিনকে বাংলাদেশে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। শিরিনের চলে যাওয়া যখন নিশ্চিত, উপায়ান্তর না পেয়ে শোয়েব বাধ্য হয়ে সিদ্ধান্ত নেয়—আদনান আর রাফিয়াকে শিরিনের সঙ্গে দেশে পাঠিয়ে দেবে। সে তখন ইমিগ্রেশন ডিপার্টমেন্টকে অনুরোধ করল—তাদের বাচ্চা দুটোকে তাদের মায়ের সঙ্গে দেশে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাঁর অনুরোধ রক্ষা করল। তারাই সব ব্যবস্থা করে দিল যাতে একই ফ্লাইটে মা এবং সন্তানেরা বাংলাদেশে যেতে পারে। এবং সেভাবেই সব কিছু ঠিক করা হয়।
এ পর্যন্ত সবকিছু ঠিকঠাকই ছিল। তারপরেই ঘটে গেল অনাকাঙ্ক্ষিত এবং বেদনাদায়ক ঘটনা।
ইমিগ্রেশন থেকে সিদ্ধান্ত হলো কুয়েত এয়ারওয়েজের একটা ফ্লাইটে মায়ের সাথে বাচ্চারাও যাবে। ডিটেনশন সেন্টার থেকে শিরিনকে নেয়া হলো সোজা এয়ারপোর্টে। ইতোমধ্যেই আদনান আর রাফিয়া বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষে উঠে পড়েছে বিমানে। যেহেতু পূর্বেই কাগজ-পত্রে নির্দেশনা ছিল তাই আদনান আর রাফিয়ার ইমিগ্রেশন আর বোর্ডিং করতে কোনো ঝামেলা হলো না।
কিন্তু ঝামেলা হলো অন্যখানে। কুয়েত এয়ারওয়েজ ভিসার জটিলতার কারণে শিরিনকে বোর্ডিং করাতে রাজি হলো না। শিরিনের দায়িত্ব ছিল যেই ইমিগ্রেশন অফিসারের হাতে সে শিরিনের পাসপোর্টে লে-ওভারের জন্যে ট্রানজিট ভিসা লাগাতে ভুলে যাওয়ায় এই বিপত্তি দেখা দিল। শিরিনকে আবার ফেরত পাঠানো হলো ডিটেনশন সেন্টারে।
এদিকে বাচ্চারা যথারীতি পরিকল্পনা অনুসারে বিমানে উঠে পড়েছে। সময় গড়িয়ে যায়। কিন্তু মায়ের দেখা আর মেলে না। বিমানে বসে তারা অপেক্ষা করতে থাকে তাদের মায়ের জন্যে।
সব কিছু ঘটে গেল শোয়েবের অজান্তেই। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ তাকে কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ করল না।
আদনানের ক্ষুদ্র মস্তিষ্ক এলোমেলো হয়ে গেল। সে কী করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিমান আকাশে উড়াল দিল। ছোট মানুষ—ভয়েই হোক আর বুঝেই হোক কান্নাকাটি না করে ভেবেছে পরে খোঁজ নিবে। ওর বদ্ধমূল ধারণা ছিল ওর মা এই বিমানেই আছে—সম্ভবত অন্য কোথাও তাকে বসিয়েছে, যেহেতু তাকে ডিপোর্ট করা হয়েছে। হয়ত তার জন্য ভিন্ন নিয়ম। যদিও তার কাছে পরিষ্কার নয় যে তাদের মায়ের অপরাধটা কী এবং কেনই বা তাকে চলে যেতে হচ্ছে। আদনানের নিজের মধ্যেও এক ধরনের হীনমন্যতা গ্রাস করল। সে কান্নাকাটি না করে কীভাবে মায়ের সন্ধান বের করা যায় সে চিন্তায় মগ্ন হয়ে রইল।
কাঁদতে কাঁদতে এবং ক্লান্তিতে এক পর্যায়ে ঘুমিয়ে পড়ল রাফিয়া। শুধু আদনানের চোখে ঘুম নেই। হঠাৎ করেই সে যেন পূর্ণ বয়স্ক এক মানুষ হয়ে গেল সে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, যে করেই হোক কুয়েতে নেমেই তাঁর বাবার সাথে কথা বলবে। সে নিশ্চয়ই মায়ের কী ঘটেছে বলতে পারবে।
ইতিমধ্যেই এয়ার হোস্টেস বিমানের সব যাত্রীর তালিকা থেকে খুঁজে খুঁজে দেখল অন্য কেউ বাংলাদেশে যাচ্ছে কিনা এবং একজনকে পেয়েও গেল। তাকে সব কথা জানানোর পর সে আগ্রহ নিয়ে আদনান আর রাফিয়ার সঙ্গে বাকিটা পথ ওদের সাথেই থাকল।
কুয়েত এয়ারপোর্টে অবতরণের পর বাংলাদেশি ভদ্রলোক আদনানের কাছ থেকে ওর বাবার ফোন নাম্বার নিয়ে ফোন করল শোয়েবকে। অপরপ্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই, আদনান কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘বাবা, হোয়াট হ্যাপেন্ড টু মামি? শি ইজ নট উইথ আস। শি ডিড নট বোর্ড ইন দিস প্লেন। উই আর গোয়িং এলোন। হোয়্যার ইজ মামি?’
শোয়েব কিছু বুঝে উঠতে পারল না। আদনান কী বলছে? সে জিজ্ঞেস করল, ‘কী বলছ, আমি তো কিছু বুঝতে পারছি না।’
আদনান আবার তাকে পুরো বিষয়টা খুলে বলল। সব শুনে এবং বুঝতে পেরে শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জানতে চাইল, ‘হাউ ইজ রাফিয়া ডুইং? ইজ শি ওকে?’
‘নো শি ইজ নট—শি ইজ ক্রায়িং অল দ্য টাইম। শি ইজ জাস্ট এ লিটল গার্ল। শি ইজ কিপ অন ক্রায়িং অ্যান্ড শি ডিড নট ইট এনিথিং। আই ডোন্ট নো হোয়াট টু ডু।’ বলেই আদনান আবার কাঁদতে থাকল।
শোয়েব মূর্তির মতে বসে রইল ফোন হাতে। সে কথা বলতে ভুলে গেল। আদনান আবার বলল, ‘প্লিজ টক টু রাফিয়া।’ আদনান রাফিয়ার হাতে ফোন দিল।
ফোন হাতে নিয়ে রাফিয়া অবাক করা কাণ্ড ঘটাল। কোনো ধরনের কান্নাকাটি না করে বাসা থেকে সে তাঁর বাবা যখন বাইরে থাকে তখন যেভাবে কথা বলে ফোনে ঠিক সেভাবেই কথা বলল।
‘কেমন আছ আম্মু?’
‘গুড।’
‘শোনো আম্মু, ইয়োর মামি একচুয়ালি মিসড দ্য ফ্লাইট, দ্যাটস হোয়াই শি কুডন’ট গো উইথ ইউ। বাট শি ইজ গোয়িং ইন দ্য নেক্সট ফ্লাইট। হোয়েন ইউ এরাইভড—শি উইল বি দেয়ার। ডোন্ট ক্রাই, ওকে আম্মু?’ মেয়েকে কী বলে সান্ত্বনা দেবে সে ভেবে পেল না। বাধ্য হয়ে মিথ্যার আশ্রয় নিল।
‘ওকে।’ রাফিয়া বলল।
ভদ্রলোক অনেকক্ষণ থেকে উসখুস করছিল। তাঁর ফোনে ইন্টারন্যাশনাল রোমিং চার্জ উঠছে কিনা কিংবা সে চিন্তায় চিন্তিত কিনা ঠিক বোঝা গেল না। কিন্তু পরিস্থিতির জটিলতা অনুভব করে সে বিষয়টি মেনে নিল। মানুষের বিপদ বলে কথা। আর এমন ছোট ছোট দুটি বাচ্চা—এভাবে বিপদে পড়েছে। সে ফোন কেটে দেবার আগে শোয়েবের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলল। এটুকু ভদ্রতা তো তাকে করতেই হবে। সে বলল, ‘ভাই আপনি একেবারেই ভাববেন না। আপনার বাচ্চাদেরকে আমি সহি সালামতে পৌঁছে দেব। আমার ফোন নাম্বারটা দিচ্ছি আপনাকে। আপনি দেশে জানিয়ে দিন। যারা ওদেরকে নিতে আসবে, আমার ফোনে কল দিলেই হবে। আপনি বরং ওদিকটা সামলান।’
‘আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দিব ভেবে পাচ্ছি না। আল্লাহ সত্যিই মহান। আপনি না থাকলে আমার বাচ্চা দুটোর কী হতো আমি ভাবতেই পারছি না। আল্লাহ নিশ্চয়ই আপনার ভালো করবেন।’
‘ঠিক আছে ভাই রাখছি। আপনি টেনশন করবেন না। আমি ঢাকায় ল্যান্ড করা মাত্রই আপনাকে ফোন করে জানিয়ে দিব।’ আর কথা না বাড়িয়ে ভদ্রলোক লাইন কেটে দিলেন।
তাদের সাথে শিরিন নেই। একথা শোনার পর শোয়েবের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। সে সঙ্গে সঙ্গে যোগাযোগ করল ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের সাথে। অবাক করা বিষয় হলো, সেখান থেকে তাকে জানানো হলো, এ ব্যাপারে তাদের কিছুই করার নেই। এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল অথচ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ শোয়েবকে সে কথা জানানোর প্রয়োজন পর্যন্ত বোধ করে নাই। এর চেয়ে অমানবিক ঘটনা আর কী হতে পারে!
এর পরে কেটে গেল আরো দশ দিন। জীবনে প্রথমবারের মতো মা-বাবা ছাড়া সম্পূর্ণ কিছু অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কাটল আদনান আর রাফিয়ার। পরিবেশ খাবার, বাংলা বলতে এবং বুঝতে না পারা—সব মিলিয়ে এক বিভীষিকাময় জীবন কাটল বাচ্চা দুটোর।
দশ দিন পর শিরিনকে পাঠানো হলো বাংলাদেশে।
মাকে কাছে পেয়ে আদনান আর রাফিয়া যেন জীবন ফিরে পেল। মাকে কাছে পেয়েছে ঠিকই কিন্তু বাংলাদেশে তো ওদের ভালো লাগে না। আমেরিকায় জন্ম নিয়ে বেড়ে ওঠা ছেলে মেয়েদের জন্য সেটা একটা সমস্যাই তো। তবুও মন্দের ভালো অন্তত তাদের মাকে তারা কাছে পেয়েছে। খারাপ লাগলেও মেনে নিচ্ছে।
কাজ থেকে ফিরে শোয়েব প্রায় প্রতিদিনই একবার করে ফোন দেয় দেশে। কথা বলে স্ত্রী-ছেলে আর মেয়ের সাথে। আদনানের সঙ্গে কথার সময় হলে আদনান কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘আমি আমেরিকায় ফিরে যেতে চাই। আই ওয়ান্ট টু গো ব্যাক বাবা। ’
শোয়েব চুপ করে থাকে। সে কী বলবে? দীর্ঘ সময় পার করে সে আস্তে করে বলে, ‘আমিওতো চাই বাবা। আমিও তো চাই।’ বলতে বলতে গলা ধরে আসে শোয়েবের। সে আর কিছু বলতে পারে না।
একবার ডিপোর্টেশন অর্ডার পেলে দশ বছরের মধ্যে আর আমেরিকার ভিসার জন্যে আবেদন করা যায় না। এখন শুধুই অপেক্ষার পালা। শোয়েব, শিরিন, আদনান আর রাফিয়া—সবাই অপেক্ষা করছে। একদিন হয়তো সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। তখন ওরা সবাই আবার একসঙ্গে হবে।
নিশ্চয়ই একদিন সব অপেক্ষার অবসান হবে। আমরাও অপেক্ষায় থাকি সেদিনটির।
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন