Moddhorater-Jarti

মধ্যরাতের যাত্রী (শেষ পর্ব)

বাকী পথটুকু কোনো ঝামেলা ছাড়াই পার হওয়া গেল। ঝড়ের গতি এবং বৃষ্টি দুটোই কমে গিয়েছিল তবে থেমে যায় নি একেবারে। গাড়ির গতি কিছুটা কম হলেও বেশি সময় লাগল না ওদের গন্তব্য পৌছতে। লিসার অ্যাপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে ঢুঁকে একটা ফাঁকা পার্কিং এ গাড়ি থামাল ফাহিম। পাশে তাকিয়ে দেখল লিসা চোখ বন্ধ করে আছে। গাড়িতে বেশ খানিকক্ষণ বকবক করে শেষের দিকে সম্ভবত ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। ঘড়িতে সময় দেখল ফাহিম, ভোর সারে ৩টার মত বাজে। আড়মোড়া ভেঙে কিছুক্ষণ বসে রইল সে। ঘাড়ের পেছনে অসার হয়ে আছে। বৃষ্টির কারণে সামনের দিকে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না, তাই ঝুঁকে গাড়ি চালাতে হয়েছে প্রায় সারাটা রাস্তা। অবসাদ লাগছে খুব। মাথাটাও ধরে আছে। এত বড় দীর্ঘ পথ আবার ফিরে যেতে হবে ভাবতেই বুক শুকিয়ে আসছে। কিন্তু কী আর করা, একটু কষ্ট হবে তবে ফিরে গিয়ে একটা লম্বা ঘুম দিয়ে নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।
আরো খানিকটা সময় পার করে ফাহিম আলত করে ডাকল, ‘লিসা?’
‘উম!’ চোখ না খুলেই একটা শব্দ করল লিসা।
‘আমরা এসে গেছি।’
‘কোথায়?’
‘গন্তব্যে।’
লিসা চুপ করে আছে। চোখ বন্ধ।
ফাহিম আবার বলল, ‘নামবে না?’
‘না।’
‘আমাকে তো ফিরে যেতে হবে।’
‘না।’
‘মানে কি?’
‘কিছু না।’
‘হেয়ালী কর না।’
‘হেয়ালী করছি না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, আমাকে বিদায় দিয়ে দাও। আমাকে তো ফিরতে হবে—লং ওয়ে টু গো।’
‘তুমি এখন কোথাও যাচ্ছ না।’
‘কোথাও যাচ্ছি না মানে?’
‘মানে তুমি আমার সঙ্গে যাচ্ছ।’
‘কোথায়?’
‘আমার অ্যাপার্টমেন্টে।’
ফাহিম চুপ করে রইল। এই মেয়ে এসব কী বলছে? সে ভাবল হয়তো ওর কাছে ক্যাশ টাকা নেই, টিপস দিতে পারবে না, তাই সাথে যেতে বলছে। সে বলল, ‘তুমি তো অলরেডি ভাড়া দিয়েছ। আর তুমি আমাকে যে এক্সট্রা টাকা দিতে চেয়েছিলে, তা দিতে হবে না।’
‘দিতে হবে না কেন?’
‘আমি এক্সট্রা টাকার জন্য তোমাকে রাইড দেই নি।’
‘তাহলে কেন দিয়েছ?’
‘কেন দিয়েছি তা তো ব্যাখ্যা করতে পারব না। তবে তোমাকে দেখে মনে হয়েছিল তুমি সত্যিই বিপদে পরেছ, তাই তোমাকে সাহায্য করতে চেয়েছি। কারো বিপদে সাহায্য করতে পারার ভাগ্যও তো সবার হয় না।’
এবার চোখ খুলে তাকাল লিসা। সোজা হয়ে বসল। তাকাল ফাহিমের দিকে। সুন্দর করে একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘বাকী রাতটা তুমি আমার এখানে থেকে যাও। তুমি অনেক টায়ার্ড। আমি চাই না, রাস্তায় তুমি ঘুমিয়ে পড় এবং এক্সিডেন্ট কর।’
‘সমস্যা নেই—আমি গাড়িতেই কিছুক্ষণ ন্যাপ নিয়ে নিব। আমার অভ্যাস আছে।’
‘না।’
‘কী না?’
‘তুমি আমার সঙ্গে যাবে। আমার লিভিং রুমে সোফাবেড আছে—সেখানে একটা ঘুম দিয়ে সকালে আমার হাতে এক কাপ কফি খেয়ে তারপর চলে যেও।’
‘আরে নাহ।’
‘আরে হ্যাঁ।’
ফাহিম হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘সো নাইস অফ ইউ লিসা। আই অ্যাপ্রিসিয়েট ইয়োর কনসার্ণ, কিন্তু…’
‘কিন্তু কী?’
‘আমার মনে হয় এটা ঠিক হবে না।’
‘কেন ঠিক হবে না?’
ফাহিম কোনো উত্তর দিল না।
‘ওকে নো প্রবলেম, আমিও নামছি না গাড়ি থেকে।’
‘মানে কী?’
‘ভেরী সিম্পল। কয়েক ঘণ্টা রেস্ট না নিয়ে তোমাকে আমি যেতে দিচ্ছি না। একে তো ওয়েদার খারাপ। আসার সময় তুমি বারে বারে হাই তুলছিলে। যাবার সময় তুমি থাকবে একা—তোমার পাশে বসে বকবক করে কেউ তোমাকে জাগিয়ে রাখবে না। ঘুমিয়ে পড়বে এবং নির্ঘাত হাইওয়ে থেকে পাশের খাদে ছিটকে পড়বে। আমি অন্তত তা হতে দিচ্ছি না।’
‘এক্সিডেন্ট যদি করিও—তোমার দায়টা কোথায়? তুমি এত উতলা হচ্ছ কেন?’
‘কারণ আমি তোমাকে জোর করে নিয়ে এসেছি—তোমার মৃত্যুর ভার সারাজীবন আমাকে বয়ে বেড়াতে হবে। আই ক্যাননট লেট ইট হ্যাপেন।’
ফাহিম মুগ্ধ হয়ে এই অচেনা মেয়েটির কথা শুনল। এবং খানিকটা কৃতজ্ঞতাও বোধ করল। এই বয়সের মেয়েদের আসলেই বোঝা মুস্কিল। এদের মাথায় কখন যে কী এসে ভর করে কে জানে।
লিসা তাকিয়ে আছে ফাহিমের মুখের দিকে। ‘কী হল?’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল।
ফাহিম অবাক হয়ে দেখছে মেয়েটিকে। এ কী ধরণের পাগলামি? ফাহিমের মাথায় শত চিন্তা। সে ঠিক বুঝতে পারছে না ওর কী করা উচিৎ। এই বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে তার অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়া আবার রাত থাকা কতটা যুক্তিসঙ্গত? আবার কোনো ঝামেলায় পড়ে না যায়। মেয়েটি একা থাকে না রুমমেট আছে, তাও তো সে জানে না।
‘তোমার বাসায় আর কে আছে?’ উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে ফাহিম জানতে চাইল।
‘কেউ নেই—আমি একাই থাকি। কেন?’
‘না মানে…’
‘না মানে কী?’
‘ব্যাপারটা শোভনীয় নয়।’
‘শোভনীয় নয় কেন? তোমাকে তো আমার বিছানায় আমন্ত্রণ জানাচ্ছি না—’
‘না না আমি সেসব কিছু বলতে চাই নি।’
‘তা হলে কী বলতে চেয়েছ?’
ফাহিম চুপ করে রইল। হঠাৎ করেই বাতাসের শো শো আওয়াজ বেড়ে গেল আবার। বৃষ্টির তেজও বেড়ে যাবে মনে হয়। ফাহিমের মাথায় রাজ্যের চিন্তা শুরু হয়ে গেল। লিসা নামের এই আধ পাগল মেয়েটার যন্ত্রণা থেকে কীভাবে দ্রুত রক্ষা পাওয়া যায় তাই নিয়ে ভাবতে থাকল।
‘কী হল?’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি তোমার সাথে তবে বেশিক্ষণ থাকব না। তুমি আমাকে এখনই এক কাপ কফি বানিয়ে খাওয়াবে। কফি খেয়েই আমি চলে আসব। ডিল?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে লিসা বলল, ‘ডিল।’
বৃষ্টির তেজ খানিকটা কমে এলেই গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের ভেতর ঢুকে পড়ল লিসা আর ফাহিম। কিছুদূর এগিয়েই লিসার রুম। ভেতরে ঢুকে লাইট জ্বালিয়ে লিসা বলল, ‘মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল।’
ফাহিম চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখল। এক বেডরুমের একটা অ্যাপার্টমেন্ট। ছোট একটা লিভিংরুম—সেখানে একটা সোফা আর একটা কফি টেবিল। বাড়তি কোনো আসবাবপত্র নেই। রুমটাও বেশ ছোটই। ফাহিম ইতস্তত করে দাঁড়িয়ে রইল।
লিসা বলল, ‘ওয়াশরুমটা ঐদিকে—তুমি ফ্রেশ হয়ে এস, আমি আসছি।’ বলতে বলতে লিসা তার কিচেনে গিয়ে ঢুকল।
প্রচণ্ড ক্লান্তি এসে ভর করেছে ফাহিমের শরীরের। মুখে একটু পানির ঝাপটা দিলে হয়ত ক্লান্তিবোধটুকু কম হবে। ক্লান্তিভাব না কাটা পর্যন্ত গাড়ি চালানো বেশ কঠিন হয়ে পড়বে। কিন্তু শরীর টেনে নিয়ে কিছুতেই যেতে ইচ্ছে করছে না ওয়াশরুম পর্যন্ত। কয়েক পা এগিয়ে সোফাতেই বসে পড়ল সে।
বেশ কিছুক্ষণ পরে দু’কাপ ধোঁয়া ওঠা কফি আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে এসে লিসা দেখল ফাহিম কাঁচুমাচু হয়ে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে আছে।
হাতের ট্রে কফি টেবিলে রেখে লিসা তার বেডরুম থেকে একটা ব্লাঙ্কেট এনে ফাহিমের গায়ের উপরে দিয়ে দিল। ঘুমের মধ্যে একটু নড়েচড়ে উঠতেই ব্লাঙ্কেট খানিকটা সরে গেল ফাহিমের শরীর থেকে। লিসা ব্লাঙ্কেটটি ঠিক করতে গিয়ে ভয়াবহ এক অনুভূতি হল ওর। ঘুমের মধ্যেই লিসার দুহাতের মাঝে মুখগুজে দিল ফাহিম। হঠাৎ করেই লিসা কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। সে নির্বাক বসে থাকল পায়ের উপর হাতের মধ্যে ফাহিমের মুখ নিয়ে।
প্রচণ্ড মাথা ব্যথা নিয়ে ফাহিমের ঘুম ভাঙল। এবং অবাক হয়ে লক্ষ করল, সে শুয়ে রয়েছে একটি অপরিচিত বিছানায়। এক সেকেন্ডের জন্য মনে হল কোথায় আছে সে? পরক্ষণেই মনে পড়ল লিসার বাসায় এসেছে সে রাতে। একটু ধাতস্থ হতেই উঠে বসল ফাহিম।
‘কি সাহেবের ঘুম ভাঙল?’
ফাহিম ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল, বেডরুমের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে লিসা। সে ভ্রূ কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এখানে কীভাবে এলাম?’
লিসা আবারও হাসল। রহস্যময়ী হাসি।
‘এসবের মানে কী লিসা? আমি তোমার বেডরুমে কেন?’
‘তোমার কি ধারণা, আমি তোমাকে কোলে করে নিয়ে এসে শুইয়ে দিয়েছি আমার বিছানায়? লজিক কি বলে, এটা সম্ভব?’
চিন্তার সাগরে ডুবে গেল ফাহিম। গত রাতের কথা তেমনিভাবে কিছুই মনে করতে পারছে না সে। ক্যাসেট প্লেয়ার রিওয়াইন্ড করার মত মেমোরি রিওয়াইন্ড করে সর্বশেষ অবস্থান মনে করল—লিসার সোফাতে বসে সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কিন্তু সেই সোফা থেকে লিসার বেডরুমের বিছানাতে সে কী করে এল? লিসা এভাবে রহস্যপূর্ণ হাসি হাসছে কেন? এর মানে কী?
‘উঠে এস। কফি ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে।’
ফাহিম তাকাল লিসার দিকে। সে বিছানা থেকে নেমে ধীর পায়ে হেঁটে গিয়ে ঢুকল ওয়াশরুমে। নিজেকে কেমন বোকা বোকা লাগছে। মুখে পানির ছিটে দিয়ে চোখ বুজতেই হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝটকায় যেন কাল রাতটা ফিরে এল। সম্পূর্ণ না, ভাঙা ভাঙা টুকরো। সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছিল সে। কতক্ষণ পর সে জানেনা, কেউ একজন তার পা’দুটো তুলে দিয়েছিল সোফাতে। ঘুমের মধ্যেই হাত চেপে ধরেছিল তার।
ভাঙা টুকরোগুলো সব নিমেষেই জোড়া লেগে সামনে চলে এল। ফাহিম হাত ছাড়িয়ে নিতে চাইলেও পারেনি, লিসা দু’হাত দিয়ে ওর গলা জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। ফিসফিস করে বলে, ‘আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধর প্লিজ।’
‘ইউ আর ড্রাঙ্ক লিসা।’
‘বিকজ, আই’ম আপসেট। আমার মনটা ভাল করে দাও।’ মাতাল কণ্ঠে লিসা বলল। তার চোখে আকুলতা স্পষ্ট। বলতে বলতেই সোফা থেকে পড়ে যাবার উপক্রম হল তার।
ফাহিম তাকে ধরে ফেলল, ‘হয়েছে অনেক, এখন চল তোমাকে শুইয়ে দেই—ঘুমোবে।’
দুহাতে লিসাকে তুলে দাড় করাতেই লিসা ফাহিমকে সাপ্টে জড়িয়ে ধরল। বেডরুমে এনে বিছানায় শুইয়ে দিতে গেলেও ওকে ছাড়ল না। ফাহিম হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল। লিসা তাকে অক্টোপাসের মত জড়িয়ে ধরে রাখল। ফাহিম কিছু না বলে তাকিয়ে থাকল। লিসা ওর ঠোটে জোর করে চুমু খেল।
বিদ্যুৎ চমকের মত সোজা হয়ে দাঁড়াল ফাহিম। মুখ হাত মুছে লিভিং রুমের সোফায় গিয়ে বসল। আর তখনই লক্ষ করল দুটো ওয়াইনের গ্লাস আর অর্ধেক খালি বোতল সাইড টেবিলে পরে আছে। ফাহিমের আর বুঝতে বাকি রইল না—কিন্তু তবুও কিছুটা অস্পষ্টতা রয়েই গেল।
লিসা কিচেন থেকে দু’কাপ কফি আর কিছু প্যাস্ট্রি নিয়ে এসে বসল ফাহিমের পাশে। কফির কাপ এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখ তো ঠিক আছে কি না।’
ফাহিম কফির কাপে আস্তে করে চুমুক দিল। সে কিছুই বলছে না দেখে লিসা বলল, ‘চিনি ঠিক আছে?’
ফাহিম মাথা নাড়ল।
দুজনে চুপচাপ কফির কাপে চুমুক দিয়ে চলল। এক পর্যায়ে ফাহিম বলল, ‘আমাকে যেতে হবে।’
‘জানি।’
আবারও নীরবতা। কিছু একটা বলতে চেয়েও না বলে উঠে দাঁড়াল ফাহিম। তাকাল লিসার দিকে, ভাবলেশহীন দৃষ্টি। মুখে কিছু না বললেও মাথার ভেতর চলছে হাজারো প্রশ্ন। কিছু একটা জট পাকিয়ে আছে—জট না খোলা পর্যন্ত অস্থিরতা কমছে না। ফাহিম ইতস্তত করে বলল, ‘তুমি কি বলবে, রাতে ঠিক কী ঘটেছিল?’
‘বলতে পারি এক শর্তে।’ লিসার ঠোটের কোণে হাসি। এত রহস্য করতে পারে মেয়েটা!
‘কী শর্ত?’ ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইল ফাহিম।
‘আজকের দিনটা যদি থেকে যাও—সব বলব।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফাহিম বলল, ‘থাক, কিছু বলতে হবে না।’ বলেই দরজার দিকে পা বাড়াল সে।
‘আরে সত্যিই চলে যাচ্ছ নাকি? একটু দাঁড়াও–শোনো।’
ফাহিম দাঁড়াল।
লিসা এগিয়ে দাঁড়াল ফাহিমের সামনে। ‘তুমি যা ভাবছ, তেমন কিছুই ঘটে নি।’ আবারো রহস্যময়ী হাসি তার মুখে।
ফাহিমের অস্বস্তি তবুও কাটল না।
কোনো রকম ভণিতা ছাড়াই ফাহিমকে জড়িয়ে ধরল লিসা। তারপর আস্তে করে বলল, ‘আই উইল নেভার ফরগেট অ্যাবাউট দিস নাইট। থ্যাংকস ফর এভ্রিথিং।’
লিসার গভীর আলিঙ্গন থেকে নিজেকে আস্তে করে ছাড়িয়ে নিল ফাহিম। দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।
লিসা এল তার পিছে—দাঁড়িয়ে রইল অদূরে।
ফাহিম গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। একবার তাকাল লিসার দিকে। কেমন মায়া কাড়া চোখে তাকিয়ে আছে মেয়েটি। সে কি কেঁদে ফেলবে না কি? কি বিচিত্র মানুষের মন। মাত্র একটি রাতের কয়েকটি ঘণ্টার পরিচয় অথচ মনে হচ্ছে কতদিনের চেনা। ফাহিম চোখ সরিয়ে নিতেই বুঝতে পারল মেয়েটি এগিয়ে আসছে তার গাড়ির কাছে। এভাবে বসে থাকাটা আর সমীচীন হবে না। ফাহিম হঠাৎই গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত বের হয়ে গেল। রিয়ার ভিউ মিররে এক ঝলক দেখা গেল লিসাকে, হাত নেড়ে বিদায় জানাচ্ছে।
স্নিগ্ধ সূর্য উকি দিয়েছে আকাশে অনেক আগেই। প্রকৃতির চারপাশে উঠে গেছে আলো। সুন্দর ঝলমলে একটি সকাল। এমন রোদেলা সকাল বহুদিন দেখেনি ফাহিম। কাল রাতে যে ঝড় বয়ে গেছে এই প্রকৃতিতে তার কোনো ছিটেফোঁটা চিহ্ন পর্যন্ত নেই। বিশ্বপ্রকৃতি আশ্চর্যরকম শান্ত। প্রকৃতির রূপ এত তাড়াতাড়ি বদলে যেতে পারে তার জানা ছিল না। মানুষের মনও কি তেমন, বদলে যায় প্রকৃতির মতই—সময়ে অসময়ে? প্রকৃতির এই রূপের সঙ্গে মানুষের মনের যথেষ্ট মিল আছে। প্রকৃতির বদলায় রং, মানুষের বদলায় মন।
ভাবতেই ভাবতেই আবাসিক এলাকার রাস্তা ছেড়ে হাইওয়েতে উঠে পড়ল ফাহিমের গাড়ি। জানালার কাঁচ নামিয়ে দিল সে। ঝিরিঝিরি হিমেল হাওয়ায় অন্যরকম একটা অনুভূতির ছোঁয়া যেন আচ্ছন্ন করে ফেলল তাকে।
(সমাপ্ত)
পরিশিষ্ট – নির্বাচিত.কম এর বর্ষা উৎসবের জন্য পাঠানো মূল গল্পটির শেষ এখানেই হয়েছিল। দুজন অচেনা অদেখা মানুষের হঠাৎ পরিচয় এবং ঘটে যাওয়া কিছু রহস্যময় ঘটনার সমাপ্তি এভাবেই হয়েছিল। কিন্তু কিছু পাঠকের প্রতিক্রিয়ায় বুঝতে পারলাম তারা কেউ সন্তুষ্ট নয়। কোনো এক বিচিত্র কারণে আমার পাঠকেরা হ্যাপি এন্ডিং না হলে কিঞ্চিৎ মনঃক্ষুণ্ণ হন। তাদের অনুরোধ রক্ষা করতে প্রায়ই আমাকে শেষ পর্বের পরের পর্ব লিখতে হয়—হ্যাপি এন্ডিং সহ। এই গল্পেও তার ব্যতিক্রম হয় নি। হ্যাপি এন্ডিং লেখা হয়েছে। পড়তে চাইলে চোখ রাখুন আগামীকাল এই সময়ে।

বোনাস পর্ব

আগের পর্ব

Moddhorater-Jarti

মধ্যরাতের যাত্রী (পর্ব-২)

লিসার মনে হল যেন অনন্ত কাল ধরে, গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড জুড়ে ঝড়ের তাণ্ডব চলছে। যেন উন্মাদের চিৎকার তার কান জুড়ে ছড়াচ্ছে, আর অন্ধকারের শক্তিরা তার চারপাশের শূন্যতায় পাক খাচ্ছে আর চীৎকার করছে। অনন্ত সময় কেটে যাওয়ার পর, ধীরে ধীরে সে টের পেল, যে গোলমালটা কমে আসছে। তার কানের ভেতরের গর্জনটা আস্তে আস্তে পাতলা হয়ে এল। অন্ধকারের মধ্যে গোঁত্তা খাওয়া বন্য শক্তিগুলোর তেজ কমে এল। ধীরে ধীরে হুলস্থূলটা শান্ত হয়ে এল। লিসার ঘোর পুরোপুরি কেটে গেল। ফাহিমের কণ্ঠস্বরে এমন কিছু ছিল যে সে ভড়কে গিয়ে চুপ করে রইল।
ফাহিম আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল আর ঠিক তখনই আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে তুমুল শব্দে আবার বজ্রপাত হল। বাজটি যেন পড়ল ওদের গাড়ির ঠিক উপরেই। বিদ্যুতের তীব্র ঝলকানি আর গগনবিদারী আওয়াজে লিসা ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে উঠল। সে চকিতে পেছন থেকে সামনের প্যাসেঞ্জার সীটে গিয়ে বসে পড়ল।
লিসা ভয়ার্ত চোখে চারিদিকে তাকিয়ে দেখল। অন্ধকারে কিছুই বোঝা যাচ্ছে না কোথায় আছে? সে অনিশ্চিত কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘আমরা এখন কোথায়?’
ফাহিম নেভিগেটর জুম করে দেখল কিন্তু ঠিক বুঝতে পারল না—এখন তারা ঠিক কোথায়। সে বলল, ‘এখন ঠিক কোথায় আছি বলতে পারব না, তবে পঞ্চাশ মাইলের মত এসেছি। আরো ৬৫ মাইল যেতে হবে। এখন এখানে কতক্ষণ বসে থাকতে হবে কে জানে!’ ফাহিমের কণ্ঠে বিরক্ত এবং হতাশা ফুটে উঠল।
‘সরি তোমাকে এভাবে জোর করে নিয়ে আসাটা ঠিক হয় নি। কিন্তু আমি কী করব বলো?’
‘তো কী এমন জরুরী কাজ ছিল যে আজ রাতেই তোমাকে ফিরতে হল?’
লিসা নিশ্চুপ।
‘কথা বলছ না কেন?’ ধমকে উঠে জিজ্ঞেস করল ফাহিম।
লিসা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। এবং কাঁদতেই থাকল।
‘কাঁদছ কেন? কান্নার কী হল?’
মেয়েটির কান্না বেড়ে গেল আরো।
‘কী মুস্কিল—হোয়াই ইউ আর ক্রায়িং?’
কোনো উত্তর নেই।
‘হ্যোয়ার ইজ ইয়োর বয়ফ্রেন্ড?’
‘আই ডোন্ট নো।’
‘টেল মি হোয়াট হ্যাপেন্ড?’
‘হি লেফট মি। আর একটা মেয়ের সাথে চলে গেছে।’
‘কোথায় চলে গেছে?’
‘আই ডোন্ট নো।’
ফাহিম হতাশ হয়ে তাকিয়ে রইল সামনে।
‘আমি, ব্র্যাডলি আর ষ্টেসি—সাথে আরো কয়েকজন ফ্রেন্ড একসাথে বসেছিলাম।’
‘ব্র্যাডলি আর ষ্টেসি?’
‘ব্র্যাড আমার বয়ফ্রেন্ড। ষ্টেসি হচ্ছে সেই মেয়েটি, যার সঙ্গে ব্র্যাড ভেগেছে।’
‘ভেগেছে মানে কী? কীভাবে, কোথায় গেছে?’
‘একবার তো বলেছি—আই ডোন্ট নো।’
ফাহিম আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। বাইরে বৃষ্টি ঝরছে অবিরাম—বৃষ্টি থামা তো দূরের কথা, কমারও কোনো লক্ষণ নেই। ফাহিমের নিজের বোকামির জন্য, নিজের উপর প্রচণ্ড রকমের বিরক্ত হতে থাকল।
‘আমরা তিনজন একই টেবিলে বসে ড্রিংক করছিলাম। হঠাৎ ব্র্যাড আর ষ্টেসি স্মোক করার জন্য বাইরে চলে যায়। আমি স্মোক করি না, তাই আমি যাই নি ওদের সাথে।’ এটুকু বলে চুপ করে রইল লিসা।
ফাহিম ঘুরে তাকাল লিসার দিকে—প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে।
‘ওরা আর ফিরে আসে নি। দশ মিনিট পরে আমি বাইরে স্মোকিং জোনে গেলাম—দেখলাম ওরা কেউ নেই। সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করলাম, ফোন ধরল না। টেক্সটেরও রিপ্লাই দিল না। আমি প্রায় দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করলাম, কিন্তু ওরা আর ফিরে এল না।’
ফাহিম যা বোঝার বুঝে নিল। তার মাথায় এখন একটাই চিন্তা, কী করে মেয়েটিকে দ্রুত পৌঁছে দিয়ে ফিরে যাবে তার অ্যাপার্টমেন্টে। তার নিজেরও অনেক ক্লান্ত লাগছে। মাথাটা টনটন করছে—মাইগ্রেনের লক্ষণ। সে ঘড়ি দেখল, রাত ১টা বেজে ১৫ মিনিট। আরো প্রায় দেড় ঘণ্টা ড্রাইভ করতে হবে গন্তব্য পৌছতে। তারমানে ফিরতে ফিরতে ভোর ৫টা বেজে যাবে। কিন্তু ঝড়-বৃষ্টি, বাতাসের গতি কোনোটাই কমছে না। সে গাড়ির সীট পেছনে হেলিয়ে তার শরীরটা এলিয়ে দিল।
আবার নীরবতা নেমে এল দুই অপেক্ষমাণের চারিদিকের অন্ধকারে।
‘তুমি কি কখনো প্রেম করেছ?’ দীর্ঘ বিরতি দিয়ে লিসা প্রশ্ন ছুড়ে দিল।
ফাহিমের নীরব ভাবনায় ছেদ পড়ল লিসার এমন প্রশ্নে। সে মাথা ঘুরিয়ে একবার দেখল লিসাকে—সীটের ওপর দু’পা তুলে দিয়ে দু’হাত ভাঁজ করে জবুথবু বসে রয়েছে মেয়েটি। দুটি আয়ত চোখে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ফাহিম বলল, ‘কেন বলত?’
‘এমনিই—জানতে ইচ্ছে করল। তাছাড়া এভাবে কতক্ষণ চুপ করে থাকব। গত এক ঘণ্টায় তুমি আমার সঙ্গে একটি কথাও বল নি।’
‘তুমি ঘুমচ্ছিলে, তাই ডিস্টার্ব করি নি।’
‘ডাকলেই পারতে।’
‘নিয়ম নেই।’
‘কিসের নিয়ম নেই।’
‘ঘুমন্ত প্যাসেঞ্জারকে ডেকে তোলার। গন্তব্যে পৌঁছে গেলে অবশ্য ভিন্ন কথা।’
‘আমি তো চোখ বন্ধ করে ছিলাম শুধু।’
‘হা হা হা, তাই?’ ফাহিম হেসে দিয়ে বলল, ‘তাহলে তুমি বললে না কেন? তোমাদের বয়সী মেয়েরা তো সারাক্ষণ কথা বলে।’
‘আমার কি কথা বলার মত মেন্টাল সিচুয়েশন ছিল?’
‘তা অবশ্য একটা কথা।’ একটু চুপ করে থেকে ফাহিম আবার বলল, ‘এখন মন ভাল হয়েছে?’
‘ভাল হয় নি।’
‘তাহলে?’
‘চুপ করে থাকলে মন আরো খারাপ হচ্ছে। আজ সন্ধ্যায় আমার সঙ্গে যা ঘটে গেছে—সে কথা আমি মনে করতে চাচ্ছি না।’
‘মনে না করাই ভাল।’
‘আচ্ছা সব ছেলেরাই কি এমন?’
‘কেমন?’
‘সুযোগ পেলেই প্রেমিকার হাত ছেড়ে অন্য একটা মেয়ের সাথে পালিয়ে যায়?’
ফাহিম এ কথার কোনো উত্তর দিল না।
‘আমার তো মনে হয় পৃথিবীর সব ছেলেরাই খারাপ।’
‘এভাবে বলাটা বোধ হয় ঠিক নয়।’ ফাহিম ঘুরে তাকাল মেয়েটির দিকে। কিছুটা রুঢ় কণ্ঠে বলল, ‘দোষটা কি ছেলেদের একার? আজ তোমার বয়ফ্রেন্ড তোমাকে ছেড়ে চলে না গেলে, এ কথা কি তুমি বলতে? তাছাড়া, সম্পর্ক গড়ে তোলার আগে যাচাই করে নিতে তুমি ভুল করেছ। দায় তো তোমারও আছে, নেই?’
লিসা চুপ করে রইল।
‘আমি কি একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতে পারি?’ ফাহিম কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকাল।
‘পারো। অবশ্য আমি জানি প্রশ্নটা কী?’
‘তাহলে উত্তরটা দাও।’ একটু অবাক হয়ে ফাহিম বলল।
‘ইয়েস, উই হ্যাড সেক্স। হি টুক অ্যাওয়ে মাই ভার্জিনিটি।’
‘হা হা হা। হি টুক অ্যাওয়ে ইয়োর ভার্জিনিটি! রিয়েলি?’
‘হাসির কী হল? আমি কি ভুল কিছু বললাম?’
‘অবশ্যই ভুল বলছ। তুমি ছেলেটাকে একা দোষ দিচ্ছ কেন? তোমার দায় নেই? সে কি তোমাকে রেপ করেছে? তোমার প্রশ্রয় ছিল না?’
‘তুমি রেগে যাচ্ছ কেন?’
‘রেগে যাচ্ছি—বোকার মত কথা বলছ, তাই। তাছাড়া এটা আমার প্রশ্ন ছিল না। তোমার জীবনে আর কোনো ব্যক্তিগত কথা নেই?’
এবার মেয়েটি লজ্জা পেল, নিজের বোকামির জন্য। আগ বাড়িয়ে কেন যে এত কথা বলতে গেল। সে মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল।
অস্বস্তিকর একটা নীরবতা নেমে এল আবার। কিছু সময় পার করে, ফাহিম হাত বাড়িয়ে প্যাসেঞ্জার সীটের পাশ থেকে ব্রাউন ব্যাগের ভেতর থেকে কয়েকটি গ্রানোলা স্ন্যাক-বার আর পানির বোতল বের করল। লিসার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নাও। খিদে পেলে খেতে পারো।’
‘খিদে নেই।’
‘তোমার কি ধারণা আমি ধুতুরার বিষ মিশিয়ে দিয়েছি এটাতে?’
‘হোয়াট?’ কিছু না বুঝে প্রশ্ন নিয়ে তাকাল লিসা।
ফাহিম দ্বিতীয়বার না সেধে নিজে একটি স্ন্যাক-বার খুলে খাওয়া শুরু করল। মচমচে স্ন্যাক-বার খাওয়ার শব্দে লিসা আবার তাকাল ফাহিমের দিকে। ফাহিম মৃদু হেসে একটি বার এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘দেখলেই তো এটাতে কোনো কিছু মেশানো নেই। খেতে পারো। তাছাড়া আমি মানুষ খারাপ না। তোমার কোনো ক্ষতি যে আমি করব না, তা নিশ্চয়ই এতক্ষণে বুঝতে পেরেছ।’
কথা না বলে ফাহিমের বাড়ানো স্ন্যাকটি আলতো করে হাতে নিয়ে চুপ করে বসে রইল লিসা।
আবার অপেক্ষা। ক্ষণে ক্ষণে বিদ্যুতের ঝলকানি, বাতাসের ঝাপটা আর বড় বড় ফোটার অবিরাম বৃষ্টি মিলে মিশে এক অদ্ভুত পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে অপেক্ষমাণ একজোড়া মানব-মানবী।
88 ভিউ মিররে বহু দূর থেকে ভেসে একটা আলোর বিন্দু হঠাৎ করেই দেখতে পেল ফাহিম। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে রইল। আলোক বিন্দু ধীরে ধীরে বড় হয়ে এক সময় বেশ বড় হয়ে গেল এবং আরো বড় হতেই ফাহিম বুঝতে পারল একটা গাড়ি মাত্রই তাদেরকে পাশ কাঁটিয়ে চলে গেল। পিছে পিছে আরো একটি গাড়ি চলে যেতেই ফাহিম ভাল করে পর্যবেক্ষণ করে বুঝতে পারল, ঝড়ের তাণ্ডব বেশ কমে এসেছে। জানালার কাঁচ কিছুটা নামিয়ে দেখল, বৃষ্টিও আগের চেয়ে কম। সে খুশি খুশি চেহারা নিয়ে তাকাল লিসার দিকে—দেখল চুপচাপ ফোনে টেক্সট মেসেজ পড়ছে সে। ফাহিম বলল, ‘চল, সেকেন্ড ইনিংস শুরু করা যাক।’
লিসা অবাক হয়ে তাকাল।
‘দেখ নাই, দুটো গাড়ি আমাদের পাশ কাঁটিয়ে চলে গেল? ঐ দেখ…’ ফাহিম সামনের দিকে তর্জনী তাক করে দেখাল। এখনও একটা গাড়ির পেছনের লাল আলো দেখা যাচ্ছে—অল্প কিন্তু যথেষ্ট পরিষ্কার।
‘আর কতক্ষণ লাগতে পারে পৌছতে?’
‘সেটা তো এখনই বলা যাবে না। সামনের ওয়েদার কেমন কে জানে? তবে নেভিগেটরের সময় অনুযায়ী আমরা আরো ১ ঘণ্টা ১৫ মিনিটের মধ্যেই পৌঁছে যাব।’
‘আমাকে বাথরুমে যেতে হবে।’ লিসা কোনো দ্বিধা ছাড়াই বলল।
‘বাথরুমে কেন?’
‘বোকার মত প্রশ্ন তুমিও কর, দেখলে? বাথরুমে কেন যায় মানুষ?’
‘আচ্ছা, দেখি সামনের কোনো গ্যাস স্টেশন পেলেই এক্সিট নিয়ে নিব।’
‘অতক্ষণ তো দেরি করতে পারব না।’
ফাহিমের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলার আগেই, অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল লিসা গাড়ির দরজা সামান্য খুলে কেমন কায়দা করে বসে দিব্যি তার প্রাকৃতিক কাজটি সেরে নিচ্ছে। এবং কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে নিজেকে পরিপাটি করে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গাড়ি স্টার্ট দাও।’
ফাহিম রাগ করতে যেয়েও রাগ করল না। সে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘আই ক্যান্ট বিলিভ, ইউ রিয়েলি ডিড দ্যাট।’
‘হোয়াট?’ কাঁধ দুলিয়ে দুষ্টুমির হাসি হেসে লিসা বলল, ‘কোনো মেয়েকে পী করতে দেখনি কোনোদিন?’
ফাহিম অবিশ্বাস্যদৃষ্টিতে মাথা ঝাঁকিয়ে গাড়ি সার্ট দিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। সামনের কাঁচ ডিফ্রষ্ট হতেই উইন্ডশীল্ড উইপার চালু করে দিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ি নিয়ে উঠে পড়ল হাইওয়েতে।
ফাহিমকে খুব সাবধানে গাড়ি চালাতে হচ্ছে। বাতাসের বেগ আর বৃষ্টির তেজ কিছুটা কমে এলেও, নির্বিঘ্নে গাড়ি চালানোর জন্য যথেষ্ট নয়। এক দীর্ঘ নীরবতা পার করে লিসা হঠাৎ ঘুরে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা দাও নি।’
‘কী প্রশ্ন?’ ফাহিম খানিকটা অবাক হয়ে জনতে চাইল।
‘তুমি কি কখনো প্রেম করেছ?’
‘হ্যাঁ করেছি।’
‘তোমার কাছে ভালবাসার সংজ্ঞা কী?’
ফাহিম তাকাল লিসার দিকে। লিসা উত্তরের অপেক্ষায়।
‘ভালবাসা এমন একটা জিনিস যার কোন সংজ্ঞা হয় না। এটি শুধু মাত্র অনুভূতির মাধ্যমে বুঝতে হয়। অন্য কোন উপায়ে প্রেম বা ভালবাসা বোঝা অসম্ভব। কারণ এটার অর্থ পরমভাব। আর যা কিছু সংজ্ঞার মাধ্যমে উত্তর দেওয়া সম্ভব, তা পরম হতে পারেনা।’
লিসার চোখে মুখে মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল। সে আর কিছু বলতে পারল না।
‘তো ভালবাসা বলতে তুমি কি বোঝ—তোমার সংজ্ঞাটি কি শুনি?’ এবার ফাহিম জানতে চাইল।
একটু চুপ করে থেকে লিসা বলল, ‘এক সময় আমারও মনে হত, ভালবাসা হচ্ছে অনুভূতির একটা ব্যাপার। এটি ব্যাখ্যার কোনো বিষয় না—অনুভব করার বিষয়। তবে এখন মনে হচ্ছে…’ থেমে গেল লিসা।
‘কী?’
‘নাহ—কিছু না।’ ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল লিসা।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Opekkha

অপেক্ষা (বোনাস পর্ব)

মাঝ রাতে অকস্মাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল শরীফের। কোনো কারণ ছাড়াই সে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। কেন যেন অস্থির লাগছে। তার পানি পিপাসা লেগেছে। সে পাশের টেবিলে রাখা পানির বোতল থেকে পানি খেয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল। সে মনে করতে পারল না সে কী কোনো স্বপ্ন দেখেছে? তাহলে এমন লাগছে কেন?
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সে আবার যখন শুয়ে পড়তে যাবে তখন হঠাৎ কি মনে করে পাশের টেবিল থেকে তার মোবাইল ফোনটা হাতে নিল। শরীফ একবার ঘুমাতে গেলে কখনোই ফোন খুলে দেখে না। রাত-বিরাতে কেউ যে তাকে ফোন করে তাও না—তবু সে ফোন বন্ধ করে ঘুমায়।
ফোনটা হাতে নিতেই স্ক্রিনের লাইট জ্বলে উঠল। সে দেখল একটা টেক্সট মেসেজ। শরীফের মনে হলো তার জীবনে এত সুন্দর মেসেজ সে আর কোনদিনই দেখেনি। খুশীতে তার চোখ ছল ছল করে উঠল। সে মেসেজটা আবার দেখল। রুবিনা লিখেছে, প্লিজ কল মি!
শরীফ ঘড়ি দেখল। রাত তিনটা বেজে তের মিনিট। এত রাতে কি ফোন করা ঠিক হবে? কিন্তু, রুবিনা নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে—না হলে ফোন করতেই বা বলবে কেন? রুবিনা ওকে ছেড়ে চলে গেছে দু’সপ্তাহ হয়ে গেল। এর মাঝে কখনোই সে শরীফকে ফোন করতে বলেনি। রুবিনা নিজে থেকেই দু’একবার ফোন করেছে—ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলেছে, যেন তাকে সে তাড়াতাড়ি ডিভোর্স দিয়ে দেয়। রুবিনার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকারও কোনো দরকার নেই। শরীফ অবশ্য কিছুই বলেনি তাকে। কোনো অনুনয় বিনয় বা অনুরোধ কিছুই করেনি।
শরীফ টেক্সট মেসেজের সময় দেখল। রুবিনা মেসেজটি পাঠিয়েছে রাত বারোটা বেজে বিশ মিনিটে। তার মানে মাত্র তিন ঘণ্টা আগে। এত রাতেই বা সে কোথায়? অনেক ভেবে শরীফ সিদ্ধান্ত নিল—ফোন করবে রুবিনাকে। কিন্তু যদি সে ঘুমিয়ে থাকে? যেখানেই থাকুক এত রাতে নিশ্চয়ই সে জেগে নেই। ফোন করে ঘুম নষ্ট না করে বরং টেক্সট মেসেজে রিপ্লাই দিয়ে দেখলে কেমন হয়? ও যদি জেগে থাকে কিংবা সত্যিই কোনো বিপদে পরে তাহলে নিশ্চয়ই সে উত্তর দিবে। শরীফ রিপ্লাই বাটনে চাপ দিয়ে লিখল, ‘আর ইউ আপ?’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শরীফের ফোনে উত্তর এলো, ‘ইয়েস।’
শরীফ ফোনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এবং ঠিক সে সময় আরো একটি মেসেজ এলো। রুবিনা লিখেছে, ‘ক্যান উই টক?’
রুবিনা কথা বলতে চাইছে। কিন্তু সে বলেনি এখনি না অন্য যে কোনো এক সময়। বলেছে, ক্যান উই টক? বলেনি, ক্যান উই টক নাও? শরীফ কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল। তার কি এখনি কল করা উচিৎ এই এত রাতে নাকি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। সে আবার ঘড়ি দেখল, রাত তিনটা সতের। শরীফ চুপ করে বসে রইল।
শরীফের চিন্তার ব্যাঘাত ঘটিয়ে হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। রুবিনার ফোন। শরীফ ফোন ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, ‘হ্যালো!’
রুবিনা কোনো কথা বলল না। চুপ করে রইল। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে—ভারী নিঃশ্বাস।
শরীফ আবার বলল, ‘রুবি!’
রুবিনা এবারো নিশ্চুপ। সে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড অভিমান আর অপমানে তার বুক ভারী হয়ে আছে। তার চোখ ভিজে যাচ্ছে।
‘তুমি কোথায়? কী হয়েছে?’ উৎকণ্ঠা নিয়ে শরীফ জানতে চাইল।
‘এয়ারপোর্টে।’ ভাঙা কণ্ঠে বলল রুবিনা।
‘কোন এয়ারপোর্টে?’
‘লাগোর্ডিয়া।’
‘এত রাতে? কোথায় যাচ্ছ?’
‘জানিনা।’
‘মানে কী?’ শরীফ ঠিক বুঝতে পারল না। সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি ঠিক আছো তো? ইজ এভ্রিথিং অলরাইট?’
‘নো।’ আস্তে করে ভারী কণ্ঠে কোনো রকমে ছোট এক শব্দে উত্তর দিল রুবিনা।
‘কী হয়েছে? আমাকে বলা যাবে?’
রুবিনা চুপ করে গেল আবার। নীরবতা কাঁটিয়ে একসময় সে অস্ফুটে বলল, ‘আমি চলে এসেছি।’
শরীফ বুঝতে পারল না কী বলবে। তার কি খুশি হওয়া উচিৎ? ক্ষীণভাবে একটা সূক্ষ্ম জয়ের আনন্দ কি সে অনুভব করছে? শরীফের সব সময়ে মনে হয়েছে, রুবিনা একদিন ফিরে আসবে। এমন একটা ফোন কল তার আসবে—বলবে, আমি চলে এসেছি। যদি সত্যিই তাই হয়, তখন সে কী করবে? গ্রহন করবে রুবিনা কে? সম্পর্কটা কি আগের মতো আর হবে? রুবিনার যা ব্যক্তিত্ব, তাতে মনে হয় না সে কখনও নিজ থেকে বলবে, আমার ভুল হয়েছিল। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। শরীফ যথাসম্ভব তার উত্তেজনাকে সংযত রেখে বলল, ‘চলে এসেছি মানে কী? কী হয়েছে তোমার?’
সে কথার উত্তর না দিয়ে হু হু করে কেঁদে ফেলল রুবিনা। দু’হাতে মুখ চেপে কাঁদতে লাগল। কেন কাঁদছে সে নিজেও জানেনা। অনেক চেষ্টা করেও সে তার কান্নার বাঁধ সংবরণ করতে পারল না। রাত বাড়ার সাথে সাথে সিটি নেভার স্লিপস—নিউ ইয়র্কের ব্যস্ততম এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা কমে এসেছে অনেকটাই। আর মাত্র ঘণ্টা খানিক পরেই শুরু হয়ে যাবে এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা। শেষ রাতের এই থমথমে আওয়াজের সাথে রুবিনার কান্নার আওয়াজ মিশে গেল।
শরীফ আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। ওকে কাঁদতে দিল। কিছু সময় পরে রুবিনার কান্নার বেগ কমে এলো। একটু সময় নিয়ে শরীফ বলল, ‘আমাকে কি বলবে, কী হয়েছে?’
‘তুমি শুনে কী করবে শরীফ?’ হঠাৎ ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলে উঠল রুবিনা। ‘তোমার মতো একজন নির্জীব, অনুভূতিহীন মানুষের পক্ষে কি কিছু করা সম্ভব?’
শরীফ কোনো কথা খুঁজে পেল না। কী বলবে? রুবিনা ইচ্ছে করেই তাকে একটা খোঁচা দিয়েছে—শরীফ অপ্রস্তুত হয়ে বসে রইল।
অপরপ্রান্তে রুবিনা কেঁদেই চলেছে। সবকিছু সহ্য করা যায় কিন্তু একটা মেয়ের কান্না সহ্য করা যায় না। শরীফের কেমন যেন মায়া লাগতে লাগল মেয়েটির জন্য। যদিও সে জানে রুবিনা একটা ভুল করেছে, বেশ বড় ধরণের ভুল—তাই বলে কি সারাজীবন তাকে সাফার করতে হবে? শরীফের বিশ্বাস রুবিনা একদিন তার ভুল বুঝতে পারবে। এমন একটা ফোনের অপেক্ষায় কি সে থাকেনি? সত্যি বলতে কী—সে অপেক্ষাতেই ছিল। তাহলে কি রুবিনা সত্যি সত্যিই তার ভুল বুঝতে পেরেছে? সে জন্যেই কি সে চলে এসেছে? নাকি অন্য কিছু? কোনো বিপদও তো হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রুবিনা কিছুই বলছে না।
‘আমি অনলাইনে টিকেট কেটে দিচ্ছি—তুমি নেক্সট ফ্লাইট ধরে চলে এসো।’ রুবিনাকে আশ্বস্ত করে বলল শরীফ।
‘না।’
‘না, কেনো?’
‘সেটা তুমি ভালো করেই জানো। আমার পক্ষে তো আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।’
‘তুমি না বললে তুমি চলে এসেছে? তাহলে কোথায় যাবে, কী করবে তুমি?’
‘জানি না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শরীফ বলল, ‘তুমি ফিরে এসো রুবি। আমরা আবার নতুন করে শুরু করি সব কিছু।’
‘করুণা?’
‘মোটেই না।’ একটু থেমে শরীফ আবার বলল, ‘দায়িত্ব। ভালোবাসা।’
এরপর রুবিনা কোনো কিছু আর বলতে পারল না। অঝরে কাঁদতে থাকল।
নিঃশব্দের কান্না কিন্তু কান্নার গভীরতা বুঝতে শরীফের কষ্ট হলো না। তার ইচ্ছে হলো এখুনি গিয়ে রুবিনা যেখানে আছে সেখান থেকে তাকে নিয়ে আসতে। রুবিনার নিঃশব্দ কান্নার শব্দ তার কর্ণ কুহরে প্রবেশ করে এখন হৃদয় ক্ষরণ শুরু করে দিয়েছে। সে কালক্ষেপণ না করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—তাকে যেতে হবে এবং এখুনি। শরীফ বলল, ‘তুমি যেখানে আছো—সেখানেই থাকো। কোথাও যাবে না। আমি আসছি।’
‘তোমাকে আসতে হবে না।’
‘শোনো রুবি, আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি আসছি না। তুমি না চাইলে আসবে না—কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তোমার একটা ব্যবস্থা তো হওয়া দরকার। নিউ ইয়র্কে কি তোমার পরিচিত কেউ আছে? তুমি কি সব কিছু চেন? নতুন একটা জায়গায় সেটেল হতেও সময় লাগে। আমি শুধু তোমার একটা ব্যবস্থা করে দিয়েই আবার চলে আসব।’
‘আমি একটা খারাপ মেয়ে—আমার জন্য কেন তুমি কষ্ট করবে?’
‘ভালো-খারাপ বিবেচনার সময় এখন না রুবি। আর তুমি ভালো না খারাপ সে বিচার করারও আমি কেউ নই। তুমি যা করেছ, সেটা তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষের জন্য করেছ। এটা নিয়ে আমার জন্য কোনো আক্ষেপ নেই। তবে হ্যাঁ ব্যাপারটার একটা সমাধান অন্য ভাবেও করা যেত। কিন্তু আমরা কি সব সময় সঠিক কাজটি করি? ভুল করি বলেই আমরা মানুষ—নাহলে অন্য কেউ হতাম।’
রুবিনা মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলল। সে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। শরীফ বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করল এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। তাঁর নিজেরও একটা ব্রেক দরকার। রুবিনা দেশ থেকে আসার পর ওকে নিয়েও কোথাও যাওয়া হয়নি। সেই অর্থে মেয়েটিকে সময়ও দেয়া হয়নি। সে-ই বা ওকে কতটুকু চিনেছে। শরীফের মনের মধ্যে এক ধরণের খচখচানি শুরু হলো। সে দ্রুত একটা ব্যাগ গুছিয়ে নিল। কিছু কাপড়, সেভিং কীটস, টুথ পেস্ট-ব্রাশ, মেডিসিন, ল্যাপটপ, ফোন চার্জার আর টুকিটাকি কিছু জিনিস ব্যাগে ভরে নিয়ে বের হয়ে পড়ল। গন্তব্য এয়ারপোর্ট।
ভোরের আলো তখনো ফোটেনি ভালভাবে। আধো আলো আধো অন্ধকার। পূবের আকাশে কমলা আভা। শিকাগোর রাস্তা একদমই ফাঁকা। অল্প কিছু গাড়ি চলাচল করছে। এয়ারপোর্টে পৌঁছতে বেশি দেরি হলো না শরীফের। এয়ারপোর্টে পৌঁছে নিউ ইয়র্কের ফ্লাইট কাউন্টারে দিয়ে দাঁড়াল সে। খোঁজ নিয়ে দেখল কোনো স্ট্যান্ডবাই টিকেট পাওয়া যাবে কিনা। শরীফের ভাগ্য সহায় হলো। শেষ মুহূর্তে একটা ক্যানসেলেশনের কারণে সে শিকাগো-নিউ ইয়র্কের প্রথম ফ্লাইটের একটা সীট পেয়ে গেল।
সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে শরীফের ফ্লাইট নিউ ইয়র্কের লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। দুরুদুরু বক্ষে সে বের হয়ে এলো প্লেন থেকে। সে জানে রুবিনা এয়ারপোর্ট লাউঞ্জের কোথাও বসে আছে—কিন্তু এত বড় এয়ারপোর্টে অবস্থান না জেনে খুঁজে বের করা কিছুতেই সম্ভব হবে না। শরীফ ফোন করল রুবিনাকে। রুবিনা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে হ্যালো বলতেই শরীফ উত্তেজিত হয়ে বলল, কোথায় তুমি? রুবিনা চারিদিকে তাকিয়ে তার অবস্থান জানাল শরীফকে। রুবিনা কোথায় আছে সেটা জেনে নিয়ে শরীফ এগিয়ে গেল।
সাউথওয়েষ্ট এয়ারলাইন্সের লাউঞ্জে এসে একবার চারিদিকে দেখেই দূর থেকে শরীফ দেখতে পেল রুবিনাকে—লাউঞ্জের একটি কর্নারে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেমন জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে মেয়েটি। জানালার কাঁচ ভেদ করে আসা রোদের আলোতে আরো মায়াবী দেখাচ্ছে তার ছিপছিপে শরীরটাকে। দেখেই ভীষণ মায়া লাগল তার। শরীফ রুবিনাকে দেখতে পেলেও প্যাসেঞ্জারদের ভীরে রুবিনা শরীফকে দেখতে পেল না। শরীফ খুব দ্রুতই পৌঁছে গেল রুবিনার কাছে।
শরীফ রুবিনার পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই রুবিনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বুঝতে পারল কিছু। সে তড়িৎ গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েই দেখল শরীফকে। দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার চোখের সামনে—মুখে এক প্রশস্ত নির্ভরতার হাসি। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে বলল, ‘দেখলে, ঠিকই চলে এসেছি।’
রুবিনার চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। পারিপার্শ্বিকতা সব ভুলে আবেগে সে জড়িয়ে ধরল শরীফকে। আহা বেচারি, কেমন ফুলে ফুলে কাঁদছে।
শরীফও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল রুবিনাকে। ওর মতো আবেগহীন মানুষের কাছ থেকে এরকম উষ্ণ আলিঙ্গন ভাবাই যায় না।
রুবিনার গাল বেয়ে নেমে এলো উষ্ণ চোখের জল। তির তির করে কেঁপে উঠতে লাগল তার সমস্ত হৃদয়। শরীফের আলিঙ্গনে সে নিজেকে আবিষ্কার করল সম্পূর্ণ এক অন্য রুবিনাকে।
অপ্রাপ্ত ভালোবাসার দুজন মানুষ আওয়াজহীন ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে রইল।
(সমাপ্ত)

পরিশিষ্ট: এই পর্বটি অনুরোধের ঢেঁকি গেলা জাতীয় লেখা। দুবছর আগে যখন মূল গল্পটি ক্যানভাস এবং পেন্সিলে পোষ্ট করেছিলাম, তখন এই পর্বের কোনো অস্তিত্বই ছিল না এবং কখনো লিখতে হবে সেটাও ভাবি নি। তবে গল্পের ওপেন এন্ডিং এর বিষয়টি অনেকে সহজে নিতে পারেন নি—তারা চেয়েছিলেন হ্যাপি এন্ডিং। কিছুদিন আগে অন্যপ্রকাশে গল্পটি পূণঃপ্রকাশ করার পরে সেই একই ধরণের মন্তব্য এবং অনুরোধ আসতে থাকে। এই পর্যায়ে এসে পাঠকদের ইচ্ছাটাকেই প্রাধান্য দিতে চাইলাম।
কিছু কিছু গল্প থাকে, লেখক তাঁর নিজের খুশি মতন লিখে যায়। বাস্তবে আসলে কী ঘটে সে তাঁর ধাঁর ধাঁরে না। মূল গল্পে রুবিনা, সোহেলের বাসা থেকে বের হয়ে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় হারিয়ে যায়। সেখানেই আমাদের গল্পটি শেষ হয়েছিল। তারপর রুবিনা কী করল? আসলে আদৌ কি সে এয়ারপোর্টে গিয়ে বসে ছিল? সে কি সত্যি সত্যিই শরীফকে মেসেজ পাঠিয়েছিল? শরীফ কি সত্যি সত্যিই এসেছিল রুবিনার কাছে? বাস্তবে এসব কিছু ঘটেছে কি না আমরা জানি না, তবে এভাবে ভাবতে ভালো লেগেছে বিধায় এই পর্বটি এভাবে লেখা হয়েছে। লেখকের স্বাধীনতা বলে কথা।
যারা চেয়েছিলেন শরীফ আর রুবিনার মিল হোক, এই পর্বটি তাদের জন্য। বাকীদের জন্য আগের শেষটাই শেষ।
সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা।

আগের পর্ব

Opekkha

অপেক্ষা (শেষ পর্ব)

আহমেদ মামা নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’র পুরনো কয়েকটা সংখ্যা সাথে করে নিয়ে এসেছেন। তিনি পত্রিকা থেকে গ্রীনকার্ড সংক্রান্ত কিছু খবর বের করে শরীফকে দেখিয়ে বললেন, ‘স্বামীর স্পন্সর নিয়ে আমেরিকায় এসে গ্রীনকার্ড হাতে পেয়ে স্ত্রীর চলে যাবার ব্যাপারে এখানে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এখান থেকে একটির কিছু অংশ আমি তোমাকে পড়ে শোনাচ্ছি। ইন্টারেস্টিং ইনফরমেশন। আই থিংক, ইউ উইল ফাইন্ড ইয়োর আনসার।’
মামা পড়া শুরু করলেন–
‘দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে দেশে গিয়ে একেবারেই অপরিচিত কাউকে বিয়ে করা, বয়সে অনেক কম মেয়েকে বিয়ে করা, ছেলের চেয়ে মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি হওয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসার আগে স্বামীর জীবন-যাপন সম্পর্কে যে ধরনের ধারনা থাকে বাস্তবে তার মিল খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদি অনেক কারণে ইমিগ্রান্ট হয়ে আমেরিকায় আসার পর পরই স্ত্রীর চোখ-কান খুলে যায় কিংবা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা পুরুষের জন্যে হৃদয়টা আকুলি বিকুলি করে।’
মামা একটা বিরতি নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিলেন। শরীফ কিছুটা বিরক্ত আবার কিছুটা আগ্রহ নিয়েই মামার পড়া শুনতে থাকল। মামা আবার শুরু করলেন, ‘আবার উল্টোটাও ঘটেছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেও যায়নি, কিংবা কালচার সম্পর্কে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেনি—এমন নিউলি ম্যারেড হঠাৎ করে আমেরিকান কালচারে এসে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। আমেরিকানদের মত হতে চায়। এ কারণেও স্বামীর সাথে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। স্বামীর বন্ধুর প্রতি দৃষ্টি পড়ে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্যে দেশে গিয়ে হুট করে বিয়ে করা কিংবা টেলিফোনে বিয়ে করার মনোভাব পরিবর্তন করা উচিত।’
আরেক দফা পড়া থামিয়ে মামা কফির কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে শরীফের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কিছু বুঝলে?’
শরীফ বোঝার চেষ্টা করল। অন্তত দুটো কারণে রুবিনা ওকে ছেড়ে চলে যেয়ে থাকতে পারে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে অন্যমনস্ক ভাবে সে নিজের মনেই জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এখন কি করব?’
মামা যেন ওর মনের কথা বুঝতে পেরেই বলল, ‘অপেক্ষা।’
‘জি?’
‘এখন তোমার অপেক্ষা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।’
শরীফ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকাল মামার দিকে।
মামা ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘রুবিনা যদি ফিরে আসে, তাহলে সে আর কোনোদিনও তোমাকে ছেড়ে যাবে না। হান্ড্রেড পার্সেন্ট। আর যদি ফিরে না আসে, তবে তোমাকে তোমার ভাগ্যকেই মেনে নিতে হবে।’
এরপরে মামা আরো অনেক কথা বললেন। যুক্তি দিয়ে বোঝালেন। আহমেদ মামা অনেক ভালো যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন। অভিজ্ঞতারও একটা ব্যাপার আছে। উনি যুক্তি দিয়ে একপর্যায়ে শরীফকে প্রায় বুঝিয়ে ফেলেছিলেন যে রুবিনাকে ওর ডিভোর্স করাই উচিত।
‘আমার কথা গুলো ভেবে দেখো।’ যাবার সময় শরীফকে মনে করিয়ে দিলেন।
‘জি মামা, ভেবে দেখব। অবশ্যই ভেবে দেখবে। আপনার একটা কথাও ফেলে দেবার মত না।’
মামা খুশী হয়ে বললেন, ‘এনি হেল্প, জাস্ট লেট মি নো। ডোন্ট হেজিটেট টু কল মি।’
‘আমি অবশ্যই কল করব। আপনি ভাববেন না।’
মামাকে বিদায় দিয়ে ফিরে এসে শরীফ আবার ব্যাকইয়ার্ডের ছাতার নিচে এসে বসল। হঠাৎ লক্ষ্য করল পত্রিকাগুলো মামা নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন। নিশ্চয়ই এগুলো ফেরত নিতে উনি আরেকবার আসবেন। হয়ত ইচ্ছে করেই ফেলে গেছেন। ভাবতে ভাবতেই শরীফ একটি পত্রিকা খুলে মামার পড়ে শোনানো প্রতিবেদনগুলো খুঁজে খুঁজে আবার পড়ল।
রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শরীফ অনেক কিছুই ভাবল। রুবিনাকে একবার ফোনও করল। রুবিনা অবশ্য ফোন ধরে নাই।
নিজের সংগে অনেক বোঝা পড়া করেও শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারল না সে। একবার ভাবল, ঠিক আছে আমি অপেক্ষাই করব। দেখি সে ফিরে আসে কিনা। আবার পরক্ষণেই ভাবল, যে চলে গেছে তাকে নিয়ে আর ভেবে কি লাভ।
শরীফ আপন মনেই ভেবে চলল, ‘আমি জানি তুমি ভালো থাকতে পারবে না। আমি যদি তোমাকে ক্ষমা করেও দেই, আমার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস তোমাকে কখনোই ক্ষমা করবে না রুবিনা। এটা কোনো অভিশাপ না, এটাই প্রকৃতির হিসাব। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারে না। তুমিও পারবে না।’
তারপরেই সে ভাবল, ‘রুবিনা তো আমাকে ভালোবাসে না। ওর ভালোবাসার মানুষ আছে। কে জানে এখন হয়ত সে তার ভালোবাসার মানুষটির বাহু বন্ধনেই ঘুমিয়ে আছে। তবে কেন শুধু শুধু অপেক্ষা? শুধু শুধু তার কথা ভেবে নিজেকে কেন কষ্ট দেয়া। ওহ গড, গিভ মি সাম ষ্ট্রেংথ!’
শরীফ আর কিছুই ভাবতে পারে না। তার কষ্টগুলো নীরবে গুমরে কাঁদে।

সোহেল আজ দিনের শিফটে ক্যাব চালাচ্ছে। দুপুরের দিকে সে একজন প্যাসেঞ্জার নিয়ে লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্ট অভিমুখে যাচ্ছিল, তখন রুবিনার ফোন এলো। সে ফোন ধরতেই রুবিনা বলল, ‘এই শোন, আমার রান্না প্রায় শেষ। তুমি কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে এসো। একসাথে খাবো। আজ তুমি আমাকে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখাতে নিয়ে যাবে বলেছিলে। মনে আছে?’
‘হ্যাঁ মনে আছে। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব।’
‘কতক্ষণ লাগবে?’
‘এই তো সব মিলিয়ে ঘণ্টা খানেক।’
‘ফেরার পথে আবার কোনো প্যাসেঞ্জার তুলো না কিন্তু।’
সোহেল হেসে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্টে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে সোহেল তার ক্যাবের উইণ্ডশিল্ডে ‘নট ফর হায়ার’ সাইনটি লাগিয়ে দিল। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে সে যখন বাসার দিকে ফিরে আসছিল ঠিক তখনই আরেকটা ক্যাব সোহেলের এপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল। ক্যাব থেকে নেমে আসল একজন হিস্প্যানিক শ্বেতাংগিনী। ছোট্ট একটা ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে সে ঢুকে পড়ল এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর সদর দরজা দিয়ে।
সোহেলের আসতে যেহেতু ঘণ্টা খানেক দেরী আছে, এই ফাঁকে রুবিনা গোসলটা সেরে নিল যাতে সে তৈরী হয়ে থাকতে পারে। কাপড় বদলে বাইরে যাবার জন্যে তৈরী হয়ে রুবিনা যখন বেডরুম থেকে বের হয়ে আসবে ঠিক তখনই সে শুনতে পেল দরজা খোলার শব্দ। সে অবাক হয়ে ভাবল সোহেল এত তাড়াতাড়ি চলে এলো? এখনও তো আধ ঘণ্টাও হয়নি। সে খুশি মনে রুমের বাইরে এসে দেখল সুন্দর মুখের একটি অপরিচিত মেয়ে লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে আছে।
‘কে আপনি? এখানে কিভাবে এলেন?’ কিছুটা থতমত খেয়ে রুবিনা জিজ্ঞেস করল।
‘Excuse me!’ অপরিচিত মেয়ে না বোঝার দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে।
রুবিনা বুঝতে পারল যার সংগে সে কথা বলছে সে হয়ত বাংলা বুঝে না। সে বাঙালি নয়। চেহারা এবং বেশভূষায় আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের মতই দেখতে। তাই সে এবার ইংরেজিতে জানতে চাইল, ‘Who are you? How did you get in here?’
‘I’m Gabie. Gabriela.’
‘So, Gabie- let me ask you again, how did you get in here?’
‘With my key!’
‘With your key? You’ve a key of this apartment?’
‘It’s my apartment.’
‘What?’
‘I live here. I share this apartment.’
‘What are you talking about?’
রুবিনা আর কোন কথা বলতে পারল না। আকাশ পাতাল চিন্তা তার মাথায় ভেঙ্গে পড়ল। কিছুতেই সে মেলাতে পারছে না। কি হচ্ছে এসব?
‘You didn’t tell me your name. Who are you?’
গ্যাব্রিয়েলার প্রশ্ন শুনে রুবিনা তার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
‘I’m nobody!’
এক ধরনের অস্বাভাবিক চিন্তা রুবিনাকে গ্রাস করল। আকাশ-পাতাল ভাবছে সে। গ্যাব্রিয়েলার সাথে কিসের সম্পর্ক সোহেলের। সম্পর্ক যাই হোক, সোহেল কেন তাকে কিছুই জানায়নি। গ্যাব্রিয়েলা বলছে সে এপার্টমেন্ট শেয়ার করে, এ কথার মানে কি?
রুবিনা তো তার কোন কথা কখনোই লুকায়নি। তাহলে সোহেল কেন বলল না?
এরপর একটা দীর্ঘ সময় কেটে গেল এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতায়।
ইতোমধ্যেই সোহেল ফিরে এলো। সে রুমে ঢুকেই দেখল, গ্যাব্রিয়েলা দাঁড়িয়ে আছে।
রুবিনা সোহেলের দিকে তাকাল অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে।
গ্যাব্রিয়েলা ছুটে এসে সোহেলকে জড়িয়ে ধরে গভীরভাবে চুম্বন দিল। ‘I missed you honey. I missed you so much!’
উচ্ছ্বসিত গ্যাব্রিয়েলা রুবিনার উপস্থিতিকে পাত্তা না দিয়ে আবারো সোহেল কে কয়েকবার চুমু দিল।
সোহেল অপ্রস্তুত ভাবে গ্যাব্রিয়েলাকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে।
রুবিনা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে বুঝতেও পারল না কিছু। তার হৃদপিণ্ডের কম্পন বেড়ে গেল। মুহূর্তেই দুনিয়াটা যেন তার অন্ধকারে ঢেকে গেল।
কিচ্ছুক্ষণ চিন্তা করার পর রুবিনা সিদ্ধান্ত নিল যা করার তাকে এখনই করতে হবে। সে দ্রুত বেডরুমের ভেতরে ঢুকে গেল।
সোহেল রুবিনার পিছে পিছে যেতে চাইলে গ্যাব্রিয়েলা তাকে জড়িয়ে ধরেই জিজ্ঞেস করল, ‘Is that your cousin sister you told me about? She seems upset. Where’s her husband?’
সোহেল কিছু বলার আগেই রুবিনা তার সুটকেস নিয়ে বের হয়ে আসল।
সোহেল অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘Where are you going?’
রুবিনা সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে এপার্টমেন্টের দরজা খুলে বের হয়ে গেল।
সমস্ত ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে কিছু বুঝে উঠার আগেই সোহেল দেখল রুবিনা নেই। সে দৌড়ে নিচে নেমে গেল রুবিনাকে থামানোর জন্যে।
রুবিনা নিচে নেমেই দেখল একটা ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত গ্যাব্রিয়েলা যে ক্যাব নিয়ে এসেছিল–চালক তাকে নামিয়ে দিয়ে পরের প্যাসেঞ্জার ধরার জন্যে অপেক্ষা করছিল।
রুবিনা এগিয়ে যেতেই সোহেল তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল, ‘রুবিনা, প্লিজ গিভ মি এ চান্স টু এক্সপ্লেইন।’
‘এক্সপ্লেইন? কি এক্সপ্লেইন করবে তুমি সোহেল? তোমাকে আর কিছুই এক্সপ্লেইন করতে হবে না।’
‘এটা খুবই স্বাভাবিক। তুমি বুঝতে ভুল করছ।’
‘আমি আর কিছুই বুঝতে চাই না। আমার যা দেখার দেখেছি, যা বোঝার বুঝেছি, এবং যা শোনার শুনেছি। নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করতে পারব না।’
সোহেল রুবিনার হাত ধরার চেষ্টা করল।
রুবিনা তাকে কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘ইয়্যু আর এ লায়ার। আমার ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।’ তারপর হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, সোহেল!’ বলেই রুবিনা দ্রুত অপেক্ষারত ক্যাবে চড়ে বসল।
রুবিনার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে সোহেল আর কিছুই বলতে পারল না। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
ক্যাব চালক ঠিকানা চাইলে রুবিনা কিছু বলতে পারল না। তার দুচোখ ছল ছল করছে। নিউইয়র্কের ক্যাব চালকরা এমন দৃশ্যের সাথে খুবই পরিচিত। চালক কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বড় রাস্তার দিকে। তারপর হারিয়ে গেল ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত রাস্তার ভীরে।
হঠাৎ করেই আকাশে মেঘ করেছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। নিজের দু’চোখে হালকা জ্বালা অনুভব করছে রুবিনা। বাঁধ ভাঙ্গা এক বুক কষ্ট যেন বের হয়ে আসতে চাইছে তার বুকের ভিতর থেকে। চিৎকার করে সেই জ্বালা মিটাতে ইচ্ছে করছে। দু’চোখ বেয়ে নেমে আসল নোনা জলের ধারা।
নিউ ইয়র্কের আকাশে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আজ জমাট বাঁধা সব কষ্ট যেন আকাশের কান্না হয়ে ঝরে পরছে। অঝোর ধারায়, নোনাজলের ধারা হারিয়ে যাচ্ছে জলে জলে মিতালি করে। সেই সাথে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে রুবিনার অন্তরে লুকিয়ে থাকা সকল নোংরা-আবর্জনা।
কিছু স্বপ্ন হারিয়ে যায়, এভাবেই!
কিছু অপেক্ষার অনন্ত প্রহর কখনই শেষ হয় না।
(শেষ হলো অপেক্ষা’র গল্প)
(আপনাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার জন্যে। আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্য আমাকে অনুপ্রাণিত করে সব সময়। সামনে আবার কোনো গল্প নিয়ে দেখা হবে অচিরেই। সবার জন্যে শুভেচ্ছা। অনেক অনেক ধন্যবাদ। আবারো কৃতজ্ঞতা!)
(গল্পটি একুশের বইমেলা ২০২০এ অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তৃতীয় পক্ষ’তে সংকলিত হয়েছে! এখন রকমারি আর দারাজ এও পাওয়া যাচ্ছে!)

বোনাস পর্ব

আগের পর্ব

Opekkha

অপেক্ষা (পর্ব-৪)

‘আজ আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
ঘর থেকে বের হয়ে রুবিনা জিজ্ঞেস করল সোহেলকে।
‘প্রথমেই যাবো গ্রাউন্ড জিরোতে। সেখান থেকে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। তারপর নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরী। রাতে জ্যাকসন হাইটসের কোনো বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে দেশী খাবার, তারপর বাসা।’
‘তারপর?’ রুবিনার হাসিতে দুষ্টুমি।
‘তারপর…’ সোহেল আর কিছু না বলে একটা অর্থপূর্ণ হাসি ফিরিয়ে দিল রুবিনার দিকে।
একদিনে যতটুকু সম্ভব রুবিনাকে নিউইয়র্ক শহরটা ঘুরিয়ে দেখাল সোহেল।
‘কি আশ্চর্য। কি ভয়ঙ্কর! ওয়াও! ইশ, এখানে না এলে কত কিছু অদেখাই থেকে যেত।’ সারাক্ষণই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল সে। যা দেখে তাতেই মুগ্ধ হয় রুবিনা।
ম্যানহাটনে এসে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল সোহেল। নিজের মনেই আক্ষেপ করতে থাকে। ‘মাঝে মাঝে ভাবি, এদেশে না এলেই বোধ হয় ভাল হতো। দেশে থেকে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু করতে পারতাম। দেশে আমার সব বন্ধুরাই আজ দাঁড়িয়ে গেছে।’
‘তুমিই না অস্থির হয়ে গেলে? আর কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখতে, চাকরী নিশ্চয়ই একটা পেয়ে যেতে।’
‘সত্যিই, তোমার জীবনটাও তাহলে এমন প্যাঁচের মধ্যে পড়ত না। আর আমারও এ অবস্থা হতো না। হাজার হাজার ডলারের লোনে প্রায় ডুবে গেছি আমি। কত টাকা খরচ করেছি। একটা সবুজ কাগজের অভাবে কিছুই করতে পারলাম না।’ সোহেলের কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ল।
রুবিনা এগিয়ে এসে সোহেলের হাত ধরল। তারপর গাঢ় স্বরে বলল, ‘এখন আর এসব কথা ভেবে কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কি? এতদিন হয়নি তো কি হয়েছে, এখন হবে। তুমিই তো বললে, কত মানুষ দশ বছর এমনকি বিশ বছরও অপেক্ষা করে একটা গ্রীনকার্ডের জন্যে।’
সোহেল সামান্য হাসল। রুবিনা তাকে সাহস দিয়ে বলল, ‘আমরা একটা নতুন জীবন শুরু করব সোহেল। আমি জানি আমাকে সবাই খারাপ বলবে। বলুক। আমি আমার ভালবাসার মানুষের সাথে জীবন কাটাতে চাই। তারজন্যে যে কোনো অপবাদ আমি মেনে নেব। জীবনটা আমার, আমি আমার মত করে বাঁচতে চাই। আর সেই অধিকার নিশ্চয়ই আমার আছে?’ বলতে বলতে রুবিনার কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।
সোহেল নীরবে রুবিনার কথা শুনতে থাকে। রুবিনা আবার বলল, ‘আমিই বা কি করব। দুজন মানুষের সাথে যদি কোনো কেমিষ্ট্রিই না কাজ করে, তাদের একসাথে থাকার কি মানে? যার সাথে শরীর-মন কোনো কিছুরই মিল নেই, তার সাথে সারাটা জীবন কাটানোর কথা আমি ভাবতেও পারি না। কোন মানুষ এভাবে তার সারাটা জীবন কাটাতে পারে না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রুবিনা আবারও বলল, ‘মানুষের জীবনে একটা ভুল সিদ্ধান্তে অকালে নষ্ট হয় তার জীবন। ঠিক তার বললে ভুল হবে, সাথে জড়িয়ে থাকে আরও কয়েকটি জীবন। কষ্ট পেতে হয় সারাটা জীবন।’
দিনের আলো কমে আসছে। ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে নিউইয়র্কের আকাশে।
অনেকক্ষণ থেকেই দুরের স্ট্যাচু অফ লিবার্টির দিকে মোহাবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে আছে রুবিনা।
রুবিনার খুব কাছে এসে দাঁড়াল সোহেল। আজ সকাল থেকেই সে ভাবছিল রুবিনাকে একটা কথা বলা দরকার। অনেকবার বলতে চেয়েও বলা হয়নি। এখন না বললে দেরী হয়ে যাবে। অথচ বলা হচ্ছে না। কিছুটা দ্বিধা কাঁটিয়ে সোহেল রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুবি, তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল।’
রুবিনা চোখ না ফিরিয়েই বলল, ‘আমি ওখানে যেতে চাই, আজকেই।’ রুবিনা সোহেলের কোনো কথা শুনেছে বলে মনে হলো না।
‘লাস্ট ফেরীটা তো ছেড়ে চলে গেছে। দিনের আলোয়ে না গেলে ভাল লাগবে না। আমরা বরং আরেকদিন যাবো।’
রুবিনা কিছু বলল না। সোহেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, ‘রুবি, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। ইটস ইম্পরট্যান্ট।’
‘বাসায় যেয়ে শুনব।’ বলেই রুবিনা আফসোসের সুরে বলল, ’ইশ, কেন যে আগে বললাম না। লাস্ট ফেরীটা কখন ছেড়ে গেছে?’
‘বিকেল পাঁচটায় সম্ভবত।’
‘ও।’
এরপর সোহেল আর কোন কথা বলতে পারল না।
রুবিনা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল লিবার্টি আইল্যান্ডের দিকে।
ফেরার পথে সোহেল রুবিনাকে নিয়ে গেল বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটসে। জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ থেকে ৭৪ স্ট্রীটে অবস্থিত বাংলাদেশী দোকানগুলি নিউইয়র্ককে বাংলাদেশীদের কাছে একটা বিশেষ মহিমা দিয়েছে। ৭৪ স্ট্রীটে ঢুকলে দেখা যাবে যে অদৃশ্য স্টারগেইট জাতীয় কোন গেইট পার হয়ে আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে হঠাৎ ঢাকার ফার্মগেটে পৌঁছে গেছে। লোকেরা জটলা করে বাংলায় আড্ডা দিচ্ছে। রাস্তা ঘাট বাংলাদেশের মতই সঙ্কীর্ণ আর নোংরা। দোকান পাট বাংলায় নামকরণ করা। এমনকি একটা রাস্তার নাম দেয়া হয়েছে বাঙ্গালীর নামে। আমেরিকার ব্যস্ততম শহরে হঠাৎ বাংলাদেশ। রুবিনা কৌতূহলী দৃষ্টিতে চারিদিকে দেখল আর অবাক হলো।
একটা দেশী রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে ওরা রাতের খাবার অর্ডার দিল। রুবিনা অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, দেশের যাবতীয় খাবারের আয়োজন এখানে আছে। একেবারেই বাংলাদেশী কায়দায়। অনেকদিন পর খুব মজা করে দেশের খাবার খেতে পেরে তার মনটা প্রফুল্ল হয়ে গেল। সে ক্ষণে ক্ষণে বলল, দারুণ। দারুণ। খাওয়া শেষ করে বের হয়ে সোহেল একটা পানের দোকান থেকে দুটো মিষ্টি পান কিনে রুবিনার হাতে দিল। রুবিনা হাসতে হাসতে একটা পান মুখে নিয়ে বলল, ওয়াও! অসম্ভব সুন্দর একটা দিনের শেষ করে যখন ওরা বাসায় ফিরল তখন অনেক রাত।
শরীফ অফিসে বসে আছে, অন্যমনস্ক ভাবে। কাজে মন দিতে পারছে না। কিছুই ভাল লাগছে না তার। অবশেষে হাতের কিছু কাজ গুছিয়ে বাসায় চলে আসল। মনটার সাথে ধীরে ধীরে শরীরটাও কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে।
শরীফ অনুভব করল–মনের সাথে শরীরের অদ্ভুত এক সম্পর্ক রয়েছে। মন ভাল অবস্থায় শরীর খারাপ থাকলেও তা ভাল হতে সময় লাগে না। আবার মন খারাপ থাকলে শরীর ভাল থাকলেও তা খারাপ হতে সময় লাগে না। মনই সব, শরীর কিছু নয়।
ঘরে ঢুকে শরীফের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা সবকিছু কি সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখত। সোফায় হেলান দিয়ে শরীফ ভাবতে থাকে রুবিনার কথা। পেছনের কথা ভাবতে ভাবতে তার একদিনের কথা মনে পড়ল। খাবার টেবিলে রুবিনা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, একটা কথা তোমার কাছে অনেকবার জানতে চেয়েছি। তুমি এড়িয়ে গেছ। আই’ম জাস্ট কিউরিয়াস।’
‘কি কথা?’ হাসতে হাসতে শরীফ চোখ তুলে তাকাল রুবিনার দিকে।
‘তুমি সময় থাকতে বিয়ে করলে না কেন? আই মিন একজন পুরুষ সাধারণত যে বয়সে বিয়ে করে। বিয়েরও তো একটা বয়স আছে, তাই না?’
শরীফ কোনো কিছু না বলে চুপচাপ খেতে থাকে।
‘বুঝেছি, বলবে না।’
‘কি বলব? প্রয়োজন হয়নি, তাই।’
‘নাকি প্রয়োজনটা মিটে যেতে অন্য কোনো উপায়ে।’
‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’ শরীফের হাসিটা নিমিষে মিলিয়ে গেল।
‘নাথিং।’ বলে চুপ করে গেল রুবিনা। তারপর আবার বলল, ‘অবশ্য প্রয়োজনের বাইরে কোন কাজটাই বা তুমি করো?’
শরীফ কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলে কিছু বলল না। কিন্তু রুবিনা বলে চলল, ‘প্রয়োজন মনে করনি বলে গত বিশ বছরের মধ্যে একবারও দেশে যাবার সময় বের করতে পারোনি। দেশে যাওয়া মানেই তো একগাদা অর্থের অপচয়। যথেষ্ট উপার্জন তোমার, টাকা পয়সার অভাব নেই, সিটিজেনশীপও আছে। তাহলে?’
শরীফ বুঝতে পারল না কি বলবে, কি বলা উচিত। আর রুবিনাই বা হঠাৎ করে এধরনের কথা জিজ্ঞেস করছে কেন? মেয়েটা কেমন ফুঁসে ফুঁসে কথা বলছে। ওর এমন রাগের ভঙ্গি সে আগে কখনও দেখেনি। চিৎকার করছে না, কিন্তু রাগটা ঠিকই বোঝা যাচ্ছে।
‘তা হঠাৎ তোমার বিয়ের প্রয়োজন পড়ল কেন? বয়স হয়ে যাচ্ছে, দেখাশোনার জন্যে একজন মানুষ তো চাই, তাইনা?’
শরীফ না বোঝার দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে। রুবিনা বলল, ‘তবু ভাল, সাদা চামড়ায় যত রুচিই থাক না কেন, বিয়ে করতে হবে একশত ভাগ খাটি বাঙ্গালী। তাই বিশ বছর পর দেশে গিয়ে নিজের অর্ধেক বয়সের একটা মেয়েকে বিয়ে করে আনলে। অথচ, মেয়েটার কথা একবারও ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করলে না।’
ফোনের শব্দে শরীফের ভাবনায় ছেদ পড়ল। ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না। কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তবুও কি মনে করে সে ফোনটা ধরল। রুবিনা হতে পারে। নাকি অফিসের কেউ? সে দ্বিধা হাতে ফোন নিয়ে বলল, ‘হ্যালো?’
‘কেমন আছ শরীফ?’ ফোনের ওপাশে আহমেদ মামার কণ্ঠ শোনা গেল।
‘জি মামা, আছি। বুঝতেই তো পারছেন।’
আহমেদ মামা শিকাগোর কমন মামা। বাঙ্গালী কমিউনিটির মধ্যে সবচেয়ে পুরনোদের একজন। তিরিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে উনি আছেন এই শহরে। কমিউনিটির সকলে তাই তাকে মুরুব্বী হিসেবে সম্মান করে। তিনিও বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন। জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, ঈদ পূনর্মিলনী, বনভোজন, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস—সব দিবসেই তাকে দেখা যায়। শহরে অবাঞ্ছনীয় কিছু ঘটলেই মামার কর্ণ গোচরে সবার আগেই সেটা চলে যায়। তিনি তখন নিজ দায়িত্বে সেটার একটা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকেন।
মামা বললেন, ‘শোনো, আমার খোঁজে একজন ভাল ল’ইয়ার আছে। বেটা জিউইস, কিন্তু আমার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক। তুমি চাইলে আমি কথা বলে দেখতে পারি।’
‘না না মামা, আমি এমুহূর্তে এসব কিছুই ভাবছি না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি এই উইকএন্ডে তোমার বাসায় আসব। কিছু কথা বলা দরকার। কমিউনিটির ব্যাপার তো বুঝতেই পারো। লোকজন বলাবলি করছে।’
শরীফ বুঝতে পারল না লোকজন বলাবলি করছে কিসের ভিত্তিতে। রুবিনা তো সত্যি সত্যিই বেড়াতে যেতে পারে। তা সে নিউইয়র্কেই যাক আর ডালাসেই যাক। সেটা নিয়ে মানুষের এত মাথা ব্যথা কেন? আর এই খবরটাই বা এত তাড়াতাড়ি কানাকানি হয়ে গেল কি করে? সে কিছুতেই মেলাতে পারল না ব্যাপারটা।
রুবিনার এভাবে চলে যাওয়াটা যতটা না ওকে ব্যথিত করেছে, তার চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে এখানকার বাঙ্গালী কমিউনিটি। ইতিমধ্যে তার স্বল্প পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে সে জানতে পারল, রুবিনা যে তার প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে গেছে এই ব্যাপারটা এখন সবাই জানে। আশ্চর্য!
অনেক বছর ধরে শিকাগোতে থাকলেও শরীফের পরিচিত তেমন কেউ নেই এখানে। সোসাইটির কোন কার্যক্রম বা অনুষ্ঠানেও সে খুব একটা যায় না। তবে রুবিনা দেশ থেকে আসার পর বেশ কিছু ইভেন্টে সে গিয়েছে তাকে নিয়ে। দু’চারজন বাঙ্গালী ভাবীদের সাথে হয়ত পরিচয় হয়েছে রুবিনার। কিন্তু সে নিশ্চয়ই কাউকে কিছু বলেনি। তারপরেও কিভাবে যে ব্যাপারটার হাত-পা গজিয়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিল শরীফ কিছুতেই বুঝতে পারল না। সেদিনও আহমেদ মামা ওকে ফোন করে এসব কথাই জানতে চেয়েছেন। আজ আবার ফোন করলেন।
শনিবার সকালে মামা এসে হাজির।
বসন্তের সকাল। চার ঋতুর দেশ আমেরিকার প্রকৃতিতে এখন বসন্ত চলছে। শীতের শেষে গরমের আগে আসে গরমের মতই ক্ষণিকের বসন্ত। ফুরফুরে একটা হাওয়া বইছে চারিদিকে। নানা রঙের পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদের কিরণ উঁকি দিচ্ছে। রোদ ঝলমলে একটা দিনের শুরু।
শরীফ দরজা খুলে দিতেই মামা ভিতরে ঢুকে চলে গেলেন ব্যাকইয়ার্ডে। ছাতার নিচে চেয়ার থেকে কুশনটা ঝেড়ে নিয়ে বসলেন আয়েস করে। তার হাতে কিছু পুরনো বাংলা পত্রিকা। সেগুলোর একটা ভাজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলেন।
শরীফ কিচেন থেকে দু কাপ কফি নিয়ে এসে বসল মামার পাশে। মামা তার কফিতে একটা চুমুক দিয়ে কথা শুরু করলেন, ‘আচ্ছা, ব্যাপারটা আমাকে খুলে বলতো? পুরো ঘটনাটা বলবে। কিছুই বাদ দেবে না, দেখি, তোমাকে কোনোভাবে হেল্প করতে পারি কিনা।’
শরীফ কিছু না বলে অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে থাকে ওক গাছের ঝাঁকের মধ্যে দিয়ে পিছনের লেকের দিকে।
মামা অবশ্য শরীফের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বলে চললেন ‘আরে আমরা আছি কেন তাহলে? এক কমিউনিটিতে থাকব আর কেউ কাউকে হেল্প করব না, তা কি হয় নাকি? এটি আমাকে দিয়ে হবে না। এদেশে আমাদের আর আছেই বা কে বলো? একে অপরের বিপদে যদি এগিয়ে না আসি, তাহলে চলবে কি করে? তুমি একেবারেই ভাববে না। বলো।’
মামা তাকিয়ে রইলেন শরীফের মুখের দিকে।
শরীফের সব কথাই মামা জানেন। তবুও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘আপনি তো মোটামুটি সবই জানেন। দীর্ঘদিন পর দেশে গিয়ে পারিবারিক পছন্দে বিয়ে করি। স্ত্রী উচ্চ শিক্ষিত, দেখতেও মোটামুটি সুন্দরী বলে বিয়েতে আপত্তি করিনি। বরং খুশীই হয়েছিলাম।’
আহমেদ মামা এখানে আপত্তি করলেন। তিনি বললেন, ‘তোমার বউ মোটামুটি নয়, যথেষ্ট সুন্দরী। আর তুমি আপত্তি করবে কেন? তুমি যেই বয়সে বিয়ে করেছ, রুবিনার মত একটা মেয়ে তোমাকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছিল সেটাই তো যথেষ্ট।’
শরীফ মনে মনে বলল, ‘আরে এ তো দেখি বেশি কথা বলে। আপনি তো এসেছেন কথা শুনতে, বলতে নয়!’ কিন্তু সে মামার কথায় সহমত জানিয়ে বলল, ‘জি মামা, বয়সের ঐ গ্যাপটাই যা একটু বেশী। কিন্তু ওকে আমি খুবই পছন্দ করি। অনেক ভালোওবাসি।’
‘সে কথা কি তোমার বউ জানে?’
‘জানবে না কেন? না জানার কি আছে?’
‘আছে, না জানার অনেক কিছুই আছে। তাকে সেটা জানাতে হবে। বোঝাতে হবে। না হলে সে জানব কি করে?’
শরীফ না বোঝার দৃষ্টি নিয়ে মামার দিকে তাকিয়ে রইল। মামা বললেন, ‘বাদ দাও। আচ্ছা বলত, রুবিনা কি তোমাকে ভালবাসে?’
শরীফ চুপ করে রইল। এ প্রশ্নের কোনো উত্তর তার কাছে নেই। সে নিজেও জানে না রুবিনা তাকে ভালবাসে কিনা।
‘শোন শরীফ, তোমাকে একটা কথা বলি। তিরিশ বছরের বেশী হলো এদেশে এসেছি। চোখের সামনে অনেক কিছু দেখেছি। মনে কিছু করো না। আমার ধারনা রুবিনার অন্য কারো সাথে এফেয়ার হয়েছে। তা না হলে এভাবে চলে যাবার তো কোনো কারণ থাকতে পারে না।’
শরীফ আপত্তি জানিয়ে বলল, ‘কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব। মাত্র চার মাস হলো রুবিনা আমেরিকায় এসেছে। তাছাড়া, কারো সাথে তো ওর জানাশোনাও হয়নি এখনও।’
‘জানাশোনা হয়ত আগেই ছিল। তুমি জানতে না।’
শরীফ অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মামার দিকে। তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে থাকল দুরের লেকের দিকে, যত দূর দৃষ্টি যায়। ভাবনাগুলো আবার এলোমেলো হয়ে গেল।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Opekkha

অপেক্ষা (পর্ব-৩)

একটু ধাতস্থ হয়ে শরীফ ফোন করল সাউথওয়েষ্ট এইয়ারলাইন্সের কাস্টমার সার্ভিসে। সেখানে খোঁজ নিয়ে যা জানতে পারল তাতে তার মাথা আরও এলোমেলো হয়ে গেল। গতকালের ওই নির্দিষ্ট ফ্লাইটে রুবিনা আলম নামে কোনো যাত্রী ডালাসে যায়নি। এয়ারলাইন্সের সিকিউরিটি এবং প্রাইভেসি রুলসের কারণে কাস্টমার সার্ভিস থেকে এর চেয়ে বেশী আর কিছু সে জানতে পারল না। রুবিনা তাহলে গেল কোথায়?
রুবিনার খালা খাবার আয়োজন করছিলেন হঠাৎ বাসার ফোন বেজে উঠল। সে ফোনটা ধরতেই রুবিনার কণ্ঠ শুনতে পেলেন। তিনি উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইলেন, ‘রুবিনা! কেমন আছিস মা? তুই কোথায়?’
‘আমি ভাল। তোমরা কেমন আছো? খালুর শরীর কেমন?’
‘কেমন আর থাকব। তোর চিন্তায় তো আমাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এমনিতেই আমার ব্লাডপ্রেসার হাই। তোর না আসার কথা এখানে?’
‘কথা তেমনি ছিল খালা। একটা ঝামেলা হয়েছে। পরে সব বলব। আমাকে নিয়ে তোমরা কোন চিন্তা করো না। আমি ভাল আছি।’
‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এমনিতেই আমার প্রেশারের সমস্যা। তুই তোর খালুর সাথে কথা বল। আমি ডেকে দিচ্ছি।’
‘খালুকে ডাকতে হবে না। আমি এখন কথা বলতে পারব না খালা। সময় হলে তোমরা সবই জানতে পারবে। আমি রাখছি।’
‘না না রাখিস না। একটু ধর… এই শুনছ?’ বলেই সে উঁচু গলায় ডাকল রুবিনার খালুকে।
রুবিনার খালু এগিয়ে এসে ফোন হাতে নিয়ে দেখলেন অপর প্রান্তে কোনো রিং টোন নেই। সে চিন্তিত মুখে রুবিনার খালার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লাইনটা বোধ হয় কেটে দিছে।’
রুবিনার হারিয়ে যাওয়ার শোকে শরীফ যখন চিন্তিত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত—রুবিনা তখন নিউইয়র্কের একটা এপার্টমেন্টের লিভিং রুমের সোফায় বসে ডিভিডিতে হিন্দি সিনেমা দেখছে। ঐদিন শরীফ যদি এয়ারপোর্টের ভিতরে যেত তাহলে সে দেখতে পেত—রুবিনা আসলে ডালাসে নয়, সাউথওয়েষ্ট এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটের বোর্ডিং নিচ্ছে।
কিচেন কাউন্টার থেকে দু’কাপ ইনস্ট্যান্ট কফি আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে রুবিনার পাশে এসে বসল সোহেল।
সোহেলের সংগে রুবিনার যোগাযোগ ছিল প্রথম থেকেই। সোহেলই নিউইয়র্কের টিকেট কেটে ইলেকট্রনিক কোড নাম্বারটি রুবিনাকে দিয়ে ছিল।
সোহেল বাংলাদেশ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে কিছুদিন চাকরী খুঁজেছে। তারপর আরও কিছুদিন বেকার ঘুরাঘুরি করে সে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রায় চারশত মাইল দুরের একটি ছোট্ট শহর বাফেলোতে মাস্টার্স করার জন্যে চলে আসে দুই বছর আগে। ভেবেছিল হায়ার ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে ভাল একটা চাকরী পেয়ে যাবে সহজেই। রুবিনাকে বিয়ে করে সুখের সংসার করাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু মাস্টার্সটা আর করা হয়ে উঠেনি তার। দেশ থেকে নিয়ে আসা কিছু টাকা আর প্রথম ছয় মাস একটি গ্যাস ষ্টেশনে রাতের শিফটে কাজ করে যা রোজগার করেছিল তা দিয়ে দুটি সেমিস্টার ফি দিতে পারলেও বেশিদূর আর এগুতে পারেনি। সেমিস্টার গ্যাপ পড়ায় স্টুডেন্ট স্ট্যাটাস হারাতে হয়। অতঃপর হতাশ হয়ে চলে এসেছে ব্যস্ত নগরী নিউইয়র্কে। এখানে তার ভালই কাটছে দিনকাল। ক্যাব চালিয়ে রোজগারও খারাপ না। কিন্তু তারপরেও হতাশা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। একটাই আফসোস, ইস, একটা গ্রীনকার্ড যদি থাকত!
রুবিনার হাতে কফির কাপ দিয়ে সোহেল আক্ষেপ করে বলল, ‘বুঝলা রুবি, এই দেশে শালা সবকিছুই তাড়াতাড়ি হয়। মোটামুটি বিদ্যুৎ গতিতে বলতে পারো। হয় না শুধু ঐ কাগজটাই।’
সোহেল রুবিনাকে রুবি বলে ডাকে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে সোহেল বলতে থাকে, ‘বছর লেগে যায়। যুগ পার হয়। কেন হচ্ছে না, কবে হবে তাও জানার উপায় নাই। ফোন করলে কেউ ধরে না। ঘণ্টা পার হয়, সেখানে একজন লোক থাকার কথা। এটা তার চাকরী, কিন্তু কেউ নেই। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মেশিনে রেকর্ড বাজতে থাকে। যাতে একসময় ধৈর্য হারিয়ে তুমি ফোন রেখে দাও। আর কেউ যদি হঠাৎ ফোনটা ধরে, তার কাছেও কোন উত্তর নেই। আমেরিকার ফেডারেল এমপ্লয়ীজরা অনেকটা আমাদের দেশের সরকারী কর্মচারীর মতই।’
‘তো এতদিনেও তোমার একটা গ্রীনকার্ড হলো না?’ রুবিনার সরল প্রশ্ন।
‘পাগল। মানুষ দশ-বারো এমন কি বিশ বছর অপেক্ষা করেও কিছু করতে পারে না, আরতো আমি…।’
‘থাক। এখন আর তোমাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্সটা নিয়ে নেব। সোনার হরিণ তো এখন আমার হাতের মুঠোয়…’ উচ্ছ্বসিত রুবিনা সোহেলকে আশ্বস্ত করল।
‘তার আগে তুমি তোমার হাজব্যান্ডকে একটা ফোন করো। তাকে এভাবে টেনশনে রাখাটা তোমার মোটেই ঠিক হচ্ছে না।’
‘করব। আজ রাতেই ফোন করব।’
শরীফ কিছুতেই বুঝতে পারছে না রুবিনা কেন এমন করল? তাহলে কি সে সুখী নয়? তাই কি সারাক্ষণ তার মুখটা বিষণ্ণতায় ভরা থাকে? শরীফের অস্থিরতা বেড়ে গেল।

সন্ধ্যা থেকে সে ঘরময় পায়চারী করল। কিছুই ভাল লাগছে না। অস্থিরতা আর অজানা আশংকায় বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কিছুক্ষণ কাটল স্তব্ধতার মধ্যে। শরীফের চিন্তাচ্ছেদ হলো ফোনের শব্দে। সে দ্রুত ফোনটা ধরেই বলল, ‘হ্যালো।’
‘আমি।’ ফোনের ওপাশে রুবিনার শান্ত কণ্ঠ শোনা গেল।
‘রুবিনা! তুমি কোথায়?’ উত্তেজিত হয়ে শরীফ জানতে চাইল।
রুবিনা উত্তর দেবার আগেই শরীফ আবার বলল, ‘এসবের মানে কী? তুমি খালার বাসায় বেড়াতে যাবার কথা বলে চলে গেলে, অথচ সেখানে তুমি যাওনি। তাহলে তুমি কোথায় গেছ?’ শরীফ উত্তেজনায় কাঁপতে থাকল।
‘কোথায় গেছি সেটা তো কোন ইম্পরট্যান্ট বিষয় নয়।’
‘কী বলছ এসব? তাহলে ইম্পরট্যান্ট বিষয়টা কী রুবিনা?’ শরীফের উত্তেজনা আরও একধাপ বেড়ে গেল।
‘উত্তেজিত হচ্ছ কেন? শান্ত হও, আমি বলছি সবকিছু।’
শরীফ আর কিছু না বলে চুপ করে রইল।
রুবিনা বলল, ‘প্লীজ রিয়্যাক্ট করো না। একটা কথা বলছি বোঝার চেষ্টা করো।’ একটু চুপ করে থেকে আবার বলল সে, ‘দেখো, আমরা দুজন দু’প্রান্তের মানুষ। তোমার চিন্তাধারা একরকম, আমার একরকম। তুমি মানুষটা নিঃসঙ্গ আমি জানি। আর নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য তোমার চাই শুধুই একজন সঙ্গী, জাস্ট এ কোম্পানি। বাট আই নিড মোর দ্যান দ্যাট।’
‘সেটা কী আমাকে বলো। তাছাড়া, কী নেই আমার আর কী দেইনি আমি তোমাকে?’
‘আমার যা চাই তা তোমার কাছে নেই এবং তুমি তা দিতেও পারবে না।’
‘তাহলে এতদিন কেন বলনি?’
‘বলেছি। অনেকবার বলেছি। তুমি বোঝার চেষ্টা করনি। অথবা বুঝেও কেয়ার করনি। মনে করে দেখো।’
শরীফের মনে আছে দেশে যাবার পর, রুবিনার সংগে বিয়ের কথা যখন ঠিক হচ্ছিল তখনই রুবিনা তার সংগে দেখা করে বলেছিল এ বিয়েতে সে রাজী নয়। শুধু বাবা-মাকে কষ্ট দিতে পারবে না বলে না করতে পারছে না। তাই সবচেয়ে ভাল হয় শরীফ যদি রুবিনাকে বিয়ে না করে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করে। রুবিনা এও বলেছিল সে একজনকে ভালবাসে এবং তাকেই বিয়ে করতে চায়। তার জন্যে যতদিন অপেক্ষা করতে হয় করবে। কিন্তু শরীফ রুবিনার সে সব কথার কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল বিয়ের পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া একবার আমেরিকা নিয়ে গেলে পেছনের কোনো কথা তখন আর মনে থাকবে না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শরীফ জানতে চাইল, ‘তাহলে দেশ থেকে এসেছিলে কেন? না এলেই পারতে।’
‘আমিতো আসতে চাইনি। তুমিই ইনসিস্ট করেছিলে।’
‘হ্যাঁ আমিই করেছিলাম। ভুলটা আমারই। আমার বোঝার ভুল হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম…’
শরীফের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রুবিনা বলল, ‘কি ভেবেছিলে, আমেরিকায় গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে?’
শরীফ কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আরো আগেই তো চলে যেতে পারতে। এত নাটকের কী দরকার ছিল? কিসের অপেক্ষায় ছিলে তুমি?’
‘কিসের অপেক্ষায় ছিলাম তা এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।’
‘আমার ভাবতে ঘৃণা হচ্ছে, ছিঃ! তুমি শেষ পর্যন্ত…। আচ্ছা, মানুষ কী ভাববে বলত? নিজেকে ছোট করতে তোমার খারাপ লাগছে না?’
‘মানুষের কাজই হচ্ছে অন্যের ব্যাপারে মাথা ঘামানো। মানুষ নিজে যেমনই হোক সবসময় অন্যকে নিয়ে বলতে ভালোবাসে। মানুষ কী ভাববে, লোকে কী বলবে—এসব নিয়ে ভাবলে তো আমার চলবে না। আর তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথাও নেই। শরীফ শোনো, তুমি আজ অনেক উত্তেজিত। মাথা গরম করে কোনো কিছুর সমাধান হবে না। আমি বরং এখন রাখি। এ ব্যাপারে পরে কথা বলব।’ রুবিনা শরীফকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লাইনটা কেটে দিল।
সোহেলের এপার্টমেন্টে মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যেই সময় কাটছে রুবিনার। রান্না করছে, ঘর গোছাচ্ছে। সব খানেই একটা প্রাণের ছোঁয়া। সোহেলের ছোট্ট এক বেডরুমের এপার্টমেন্ট এ ক’দিনেই বেশ সুন্দর পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে ফেলেছে সে।
সোহেল রাতের শিফটে ক্যাব চালায় আর দিনের বেশীর ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাঁটায়। তবে রুবিনা আসাতে তার রুটিনের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন সে দুপুরের আগেই ঘুম থেকে উঠে পরে রুবিনার হাতের মজাদার রান্না খাবে বলে।
দুপুরে খাবার টেবিলে বসে রুবিনা আক্ষেপ করে বলল, ‘তবে যাই বলো সোহেল, তোমার মাস্টার্স ডিগ্রী শেষ না করাটা কিন্তু আমি মোটেও মেনে নিতে পারছি না। কত ঝামেলা করে এদেশে এলে, অথচ…’
‘কীভাবে করব বলো? টিউশন ফি জোগাড় করব, না ক্লাস করব? সারারাত কাজ করার পর দিনের বেলা ক্লাসে যেয়ে চোখে অন্ধকার দেখতাম। প্রচণ্ড মাইগ্রেন হতো। তারপরেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বেশিদিন টিকতে পারিনি। এভাবে তো আর পড়াশুনা হয় না। এটা শুধু আমার একার সমস্যা না। আমার মত আরও অনেকেরই এই অবস্থা।’
সোহেল মন খারাপ করে তার আফসোসের কথা বলতে থাকল, ‘একটা সেমিস্টার মিস করলেই আউট অফ স্ট্যাটাস। সেখানে আমি একটার পর একটা সেমিস্টার মিস করেছি, কোনো ক্লাসই নিতে পারিনি। তোমাকে তো সবকিছুই জানিয়েছি।’
‘জানতাম বলেই তো, শরীফের সংগে শেষ পর্যন্ত বিয়েতে রাজী হয়েছিলাম। অবশ্য তুমি না বললে আমি কখনোই রাজী হতাম না। মরে গেলেও না।’
‘ভাগ্যিস রাজী হয়েছিলে।’
‘শুধু তোমার জন্যে কত বড় মিথ্যের আশ্রয় আমাকে নিতে হলো, ভেবে দেখেছ? এটাতো একধরনের প্রতারণা তাই না?’
‘এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন ওয়ার এন্ড লাভ।’
‘কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগছে মানুষটার জন্যে। ওর তো কোনো দোষ নেই।’
‘তবে কার দোষ?’
‘জানিনা।’
হঠাৎই চুপ হয়ে যায় রুবিনা। সোহেলও আর কিছু বলতে পারে না। একটি অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে গেল ঘরের ভিতর।
এর মধ্যে শরীফ আরও বেশ কয়েকবার চেষ্টা করল রুবিনার সংগে যোগাযোগ করার। রুবিনা কলার আইডি দেখে ফোন ধরেনি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শরীফ একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন করল রুবিনাকে।
ফোন ধরার পর রুবিনা যখন বুঝতে পারল এটা শরীফের কল তখন সে বলেছে, ‘এখন কথা বলতে পারব না। তোমাকে রাতে কল দিব।’ বলেই লাইনটা কেটে দিয়েছে সে। এর পর থেকে আর কারো কোনো ফোনই ধরে নি রুবিনা।
সোহেলে রাতের শিফটে কাজে চলে যাবার পর শরীফকে ফোন করল রুবিনা।
‘একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না কিছুতেই। তুমি হঠাৎ করেই এমন একটা ডিসিশন কেন নিলে?’ কথা না পেঁচিয়ে শরীফ সরাসরি জিজ্ঞেস করল রুবিনাকে।
‘ডিসিশন তো আমি হঠাৎ করে নেয়নি, শরীফ। আমি আগে থেকেই জানতাম আমি এমনই কিছু একটা করব। কিছুদিন আগে বা পরে। মনে করে দেখো, আমেরিকায় আসার আগেও আমি বলেছিলাম—আমি যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারবে না।’
‘তারপরেও, এভাবে চলে যাওয়াটা কি তোমার ঠিক হয়েছে বলো? আমাকে খুলে বললে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে জোড় করে আটকে রাখতাম না। প্রয়োজনে আমরা মিউচুয়ালি সেপারেশন নিতাম।’
‘এখন তো জানলে! এখন তাহলে ডিভোর্স লেটারটা পাঠিয়ে দাও।’
এ কথা শুনে সহসাই শরীফ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সে তার রাগ চেপে রাখার কোনো রকম চেষ্টা না করেই বলল, ‘ডিভোর্স! ডিভোর্স তো আমি তোমাকে দিব না। তুমি চাইলে আমার এগেইনস্টে এলিগেশন এনে কোর্টে গিয়ে কেস করো। ডিভোর্স নিয়ে নাও। কিন্তু আমি তোমাকে ডিভোর্স দিব না।’
‘আমাকে তো তোমার ঘৃণা করা উচিত।’ রুবিনা নিজেকে শান্ত রেখেই বলল।
‘তুমি যা করলে, এটার জন্যে তোমাকে একদিন রিগ্রেট করতে হবে রুবিনা। রিমেমবার ইট!’
‘সেটাই যদি হয় আমার ডেসটিনেশন, তাহলে করব। কপালের উপর তো কারো হাত নেই।’
‘ইউ শুড বী গ্রেটফুল টু মি!’ শরীফ ইচ্ছে করেই রুবিনাকে কথাটা মনে করিয়ে দিল।
‘অফকোর্স আই’ম গ্রেটফুল টু ইউ, শরীফ। তুমি আমাকে এদেশে এনেছো। তোমার জন্যে আমার গ্রীনকার্ড হয়েছে। আমার স্বপ্ন পূরণ হতে এখন আর কোন বাঁধা নেই। আমি অবশ্যই কৃতজ্ঞ। আমাকে তোমার অকৃতজ্ঞ মনে হতে পারে। কিন্তু আমি যা করেছি আমাদের দুজনের ভালোর জন্যেই করেছি। তোমার সংগে থাকলে তোমাকে ঠকানোই হতো শুধু। তুমি ভাল মানুষ—তোমাকে ঠকানোটা হতো অন্যায়। তাই চলে এসেছি।’ রুবিনা উত্তেজিত হয়ে একনাগাড়ে কথা গুলো বলে চুপ করে গেল।
এরপর দীর্ঘ নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলল না। একসময় নীরবতা ভেঙ্গে শরীফ বলল, ‘ঠিক আছে রাখি তাহলে।’ রাখি বললেও শরীফ ফোন ছাড়ল না—ধরে থাকল। রুবিনাও চুপ করে থাকল। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। এভাবে আরও কিছুক্ষণ চলল চুপচাপ নিঃশ্বাসের আদান-প্রদান। তারপর একসময় ফোন রেখে দিল শরীফ।
অপরপ্রান্তে ফোন হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল রুবিনা।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Opekkha

অপেক্ষা (পর্ব-২)

শরীফের এই পরিবর্তন অবশ্য একদিনেই হয়নি। সে প্রথম দিকে স্বাভাবিক নিয়মেই স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক মিলনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু রুবিনার কাছ থেকে সাড়া মেলেনি। যদিও শরীফ তাকে কাছে ডাকলে সে বাধাঁও দেয়নি কখনও। নির্জীব জড় পদার্থের মত পড়ে থেকেছে শুধু।
শরীফ জানতে চেয়েছে, ‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করে সুখী হওনি?’
শরীফের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর রুবিনা দিতে পারেনি। শুধু চুপ করে থেকেছে। এরপর থেকে শরীফও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। প্রাকৃতিক রিপুর তাড়নায় সে যে কখনো তাড়িত হয়নি তা নয়, তবে তার ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না বলেই সে নিজেকে সংযত রেখেছে। রুবিনার সাথে শারীরিক সম্পর্ক তৈরী করার চেষ্টা করেনি আর। ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। সে সেই সময়ের অপেক্ষায় আছে।
প্রতিদিনের মতো আজকেও রুবিনা দুপুরে মেইল বক্স থেকে একগাদা মেইল বের করে দেখতে থাকে একটির পর একটি। বেশীর ভাগই বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন আর সেল কুপন। অপ্রয়োজনীয় জাঙ্ক মেইলে ভর্তি হয়ে থাকে মেইল বক্স। রুবিনা মাঝে মাঝে ভাবে, দেশে হলে এত কাগজ অন্তত কেজি হিসেবেও বিক্রি করা যেত।
রুবিনা মেইল নিয়ে এসে লিভিং রুমে বসল। তারপর আরও একবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। না নেই। আজকেও আসেনি। চিঠিটা কি তাহলে হারিয়ে গেল? নিশ্চয়ই কোথাও কোন গোলমাল হয়েছে।
রুবিনা ফাইল কেবিনেট থেকে আইএনএস-এর কনফার্মেশন লেটারটি নিয়ে নাম্বার দেখে ফোন করল। কয়েকবার রিং হবার পর অপরপ্রান্ত থেকে মেশিনে রেকর্ডকৃত শব্দ শুনতে পেল, ‘প্লীজ এন্টার ইয়োর থার্টিন ডিজিট রিসিপ্ট নাম্বার।’
রুবিনা ফোনের বাটনে কেস নাম্বার দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল। কিছুক্ষণ পর সে শুনতে পেল তার রেসিডেন্ট এলিয়েন কার্ড ইতিমধ্যেই ফাইলে থাকা তার ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। রুবিনা লম্বা একটা দম নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারমত খুশী এ মুহূর্তে আর কেউ নেই। তার চেহারায় খুশির ঝিলিক দেখা দিল। সে দেরী না করে ফোন করল একজনকে।
প্রায় সাথে সাথেই অপর প্রান্ত থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠে ভেসে আসল, ‘কি, কোন খবর হলো?’
উচ্ছ্বসিত রুবিনার উত্তর, ‘ইয়েস স্যার। দ্যা গোল্ডেন ডিয়ার ইজ অন ইটস ওয়ে… চলে আসবে দু’একদিনের মধ্যেই।’
‘ফাইনালি! থ্যাংকস গড!’ অপরপ্রান্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফোনের ভিতরেও বোঝা গেল, স্পষ্ট।
রুবিনার অপেক্ষার দিন শেষ হলো। মেইল বক্সে আজ অল্প কয়েকটি চিঠি। এর মধ্যে অতি আকাঙ্ক্ষিত এনভেলপটি চিনতে তার মোটেও অসুবিধা হলো না। দেরী না করে প্রায় সাথে সাথেই খুলে দেখল একটি লেটার সাইজ কাগজে তার ছবি সম্বলিত একটি ছোট্ট আয়তাকৃতি অতি উন্নত মানের সাদা রঙের প্লাস্টিক কার্ড। এটাই তাহলে সেই সোনার হরিণ? সে উলটে পালটে দেখল। পেলব হাতে স্পর্শ করে মনে মনে ভাবল, নাম গ্রীনকার্ড অথচ রঙ সবুজ না হয়ে সাদা? এর কারণ কি? শরীফকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
রুবিনা এক দৌড়ে ঢুকে পড়ল বাসার ভিতরে। প্রথমেই ফোন করল শরীফকে তার অফিসে। খবরটা এখুনি জানানো দরকার। শরীফ ফোন ধরতেই রুবিনা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘এসেছে!’
‘কি এসেছে?’ শরীফ অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘সেই চিঠিটা। যার জন্যে এতদিন ধরে অপেক্ষা করছি।’
‘আহা হেঁয়ালি করো না তো।’
‘আশ্চর্য, তুমি বুঝতে পারছো না? আমার গ্রীনকার্ড এসেছে।’
‘রিয়েলি? দ্যাটস গ্রেট নিউজ। তাহলে তো সেলিব্রেট করতে হয়। আজ রাতে চলো আমরা একটা ফাইন ডাইনিং এ ডিনার করি। তুমি রেডি হয়ে থেকো।’
কথা না বাড়িয়ে শরীফ ফোন রেখে দিলো। মানুষটা কি প্রয়োজনের বাইরে একটা কথাও বলতে পারে না! রুবিনা অবাক হয়। এমন একটা খুশির খবরে সে একটা কথা বলেই রেখে দিল? কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে রুবিনা আবার ফোন করল একটি বিশেষ নাম্বারে।
ডিনার শেষে বাসায় ফিরে নিয়ম মাফিক অন্য কাজ গুলো সেরে শরীফ বিছানায় শুয়ে টিভি ছেড়ে দিল।
নিয়মের ব্যতিক্রম করল রুবিনা। সে সাধারণত ঘরের কাজ শেষ না করে ঘুমাতে যায় না। কিন্তু আজ কোনো কিছু না করেই তাড়াতাড়ি ছুটে গেল বিছানায়।
শরীফ পাশ ফিরে শুয়ে আছে। রুবিনা বিছানায় উঠে বসল। আস্তে করে শরীফের গায়ে হাত রেখে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছ?’
‘অলমোষ্ট। কিছু বলবে?’
‘ভাবছি, একবার ডালাসে যাবো। খালা-খালুকে একবার দেখে আসি। উনারা অনেকদিন থেকেই বলছেন।’
শরীফ মাথা ঘুড়িয়ে রুবিনার দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘তা যাও না। অসুবিধা কি? কবে যেতে চাও?’
রুবিনা খুশি চেপে রেখে বলল, ‘সম্ভব হলে এই উইকএন্ডেই।’
‘এই উইকএন্ডে না গিয়ে পরের উইকএন্ডে যাও। তাহলে আমিও যেতে পারব তোমার সাথে।’
‘তোমার না কাজে অনেক চাপ? কি সব ঝামেলা যাচ্ছে! তুমি বরং পরে যেয়ে আমাকে নিয়ে এসো।’
‘একা যেতে ভয় লাগবে না?’
‘ভয় লাগবে কেন? বাংলাদেশ থেকে তো একাই এলাম। আর শিকাগো থেকে ডালাস একা যেতে পারব না?’
শরীফ কৌতূহলী দৃষ্টিতে রুবিনার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, যাও।’
সকাল অফিসে যাওয়ার সময় শরীফ ফ্রিজ খুলে ভি-এইট জুসের একটা ক্যান বের করে একটা ঝাঁকি দিয়ে ঢক ঢক করে বেশ খানিকটা জুস গলায় চালান করে দিল। তারপর কফি মেকার থেকে কফি ঢেলে একটা চুমুক দিতেই রুবিনা সুটকেস নিয়ে নীচে নেমে এলো তাড়াতাড়ি। তার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা স্পষ্ট। নীল জিন্স আর সাদা টি-শার্টে ওকে বেশ অন্যরকম লাগছে। ঘরে সাধারণত দেশ থেকে নিয়ে আসা সালোয়ার-কামিজ আর মাঝে মাঝে সুতি শাড়ি পরে রুবিনা। হঠাৎ তাই জিন্স-টিশার্ট পরিহিতা রুবিনার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল শরীফ।
‘কি দেখছ অমন হাঁ করে?’ কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইল রুবিনা।
‘ইয়্যু লুক ফ্যাবুলাস! বুঝতে পারছি না, কোন ড্রেসে তোমাকে সবচেয়ে বেশি মানায়?’
‘ভাল লাগছে?’
‘খুউব!’
রুবিনা কি বলবে ভেবে পেল না। অন্তত একটা ধন্যবাদ দেয়া যেতেই পারে। তাই সে বলল, ‘থ্যাংকস!’
শরিফুল হেসে দিয়ে বলল, ‘নাস্তা করে নাও। হাতে এখনও সময় আছে। এত তাড়া কিসের?’
‘তোমার অফিসে দেরী হয়ে যাবে না?’ বলতে বলতে ফ্রিজ খুলে এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস খেয়ে নিল রুবিনা।
‘একদিন দেরী হলে কিছু হবে না।’
কথা বলতে বলতে কিচেন কাউন্টারে রাখা ব্রেড টোস্টারে একটা বেগল টোষ্ট করে তাতে অনেক খানি ক্রিম চিজ লাগিয়ে রুবিনার হাতে দিল শরীফ, ‘নাও, এটা খাও।’
‘আমি তো এত সকালে কিছু খেতে পারি না।’
‘ঠিক আছে, তাহলে সাথে নিয়ে নাও। পরে খেও।’
একটা র‍্যাপিং পেপারে বেগলটা মুড়িয়ে রুবিনার হাতে দিয়ে বলল, ‘প্লেনে একগ্লাস পানি অথবা জুস ছাড়া আর কিছুই খেতে দেয় না। আজকাল এয়ারলাইন্স গুলো অনেক চিপ হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও অন্তত এক প্যাকেট বাদাম দিত, এখন তাও দেয় না।’
ঘর থেকে বের হয়ে আসল তারা দুজন। শরীফ রুবিনার সুটকেস গাড়ীর ট্র্যাঙ্কে তুলে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। রুবিনা পাশের সিটে উঠে এসে বসা মাত্রই শরীফ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে গেল।
রাস্তায় তেমন কোনো কথাই হলো না ওদের দুজনের মধ্যে। শরীফের বাসা থেকে এয়ারপোর্ট প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ড্রাইভ। লেক মিশিগানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রুবিনা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জানালা দিয়ে। অবলোকন করতে থাকে শিকাগোর মনোরম দৃশ্যাবলী।
দেশ থেকে আসার পরের উইকএন্ডেই শরীফ ওকে নিয়ে এসেছিল শিকাগো ডাউনটাউন দেখাতে। বাংলাদেশের গর্ব এফ আর খানের ডিজাইনকৃত সিয়ার্স টাওয়ার আর জন হ্যানকক টাওয়ার দেখে মুগ্ধ হয়েছিল রুবিনা। সেই সাথে নেভী পিয়ার, বাকিংহ্যাম ফাউনটেইন, সায়েন্স মিউজিয়াম, এডলার প্লানেটারিয়াম সবই ঘুরিয়ে দেখিয়েছে ওকে। রুবিনা অবাক হয়ে দেখেছে আর ভেবেছে সব কিছুর ব্যাপকতা নিয়ে। এদেশটা কত বড়? ডাউনটাউন আর লেক মিশিগানের মাঝ দিয়ে ওদের গাড়ি লেক শোর ড্রাইভ দিয়ে এগিয়ে যাবার সময় রুবিনা বার বার অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
শিকাগো মিডওয়ে এয়ারপোর্টের ডিপারচার কার্ব সাইডে শরীফের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে এলো রুবিনা। ট্রাঙ্ক থেকে সুটকেস নামিয়ে শরীফ এসে দাঁড়াল রুবিনার পাশে। তারপর বলল, ‘প্লেন থেকে নেমেই কিন্তু তুমি আমাকে ফোন করবে।’
‘করব।’
হঠাৎ করেই শরীফ রুবিনাকে বুকে টেনে নিল। রুবিনার চোখ ছলছল করে উঠল। বুকের মধ্যে কেমন যেন লাগছে। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকাল শরীফের মুখের দিকে।
‘কিছু বলবে?’ শরীফ জানতে চাইল।
‘না কিছু না।’
‘ঠিক আছে। যাও তাহলে। চেক-ইনে অনেক ঝামেলা করে। হাতে সময় নিয়ে যাওয়াই ভাল।’
রুবিনার গলা ধরে এলো। সে বাষ্পরুদ্ব কণ্ঠে বলল, ‘তুমি ভাল থেকো। ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করো আর শরীরের যত্ন নিও।’
‘তুমি এমন ভাবে বলছ যেন তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না সহসা। আরে মাত্র তো এক সপ্তাহের ব্যাপার।’ বলতে বলতেই শরীফ রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল একজন ট্রাফিক পুলিশ এগিয়ে আসছে ওর গাড়ির দিকে।
‘এইরে পুলিশ বুঝি এখনই টিকেট দিয়ে দিবে। এখানে আর দাঁড়ানো যাবে না। গাড়ি সরাতে হবে।’
‘আচ্ছা, তুমি যাও। আমিও যাচ্ছি।’
‘না, তুমি আগে যাও।’
রুবিনা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত টার্মিনালের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দুপুরের পর থেকেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে বেশ কয়েকবার ফোনের দিকে তাকাল শরীফ। রুবিনার একটা কলের অপেক্ষায় আছে সে। এতক্ষণ তো লাগার কথা না। মাত্র দুই ঘণ্টার ফ্লাইট। সকাল এগারটার মধ্যেই তো পৌঁছে যাবার কথা। এখন সাড়ে বারোটা।
শরীফ আবার কাজের ব্যস্ততায় ডুবে গেল, ঠিক তখনই তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। সে তাকিয়ে দেখল রুবিনার ফোন। অবশেষে তার মুখে হাসি দেখা দিল। সে ফোন ধরেই বলল, ‘পৌঁছে গেছ?’
‘হ্যাঁ।’ ফোনের ওপাশ থেকে রুবিনার কণ্ঠ শোনা যায়।
‘হাউ ওয়াজ দ্য ফ্লাইট?’
‘ভাল না।’
‘কেন?’
‘বাম্পিং। ওয়েদার খারাপ ছিল।’
‘ভয় পেয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
কথা বলার মাঝেই শরীফের অফিস ফোন বেজে উঠে। সে ফোনটা অন-হোল্ডে রেখে রুবিনাকে বলল, ‘এই শোন, আমি এখন রাখছি। একটু পরে আবার কল দিচ্ছি। নাহলে রাতে কথা হবে।’
‘তোমাকে এত অস্থির হতে হবে না। সময় মত আমিই কল দিব।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ একটু চুপ করে থেকে শরীফ বলল, ‘রুবিনা!’
‘বলো।’
‘আই উইল মিস ইউ।’
রুবিনা চুপ করে থাকে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া শরীফ আর কিছুই শুনতে পেল না। শরীফ ফোন কেটে দিয়ে অফিসের ফোন ধরল।
রাতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর শরীফ রুবিনাকে ফোন করল। কিন্তু কোনো উত্তর পেল না। রুবিনার মোবাইল ফোন বন্ধ। ফোনে কি চার্জ নেই? আচ্ছা, চার্জার নিতে ভুলে যায়নি তো? শরীফ বুঝতে পারল না রুবিনা ফোন কেন ধরছে না। সে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই কল ভয়েজ মেসেজে চলে গেল। হয়তো টায়ার্ড সে জন্যে ঘুমিয়ে পরেছে অথবা কাজিনদের সাথে গল্প করছে। কতদিন পর দেখা। তারপরেও একটা ভয়েজ মেসেজ দিয়ে রাখল শরীফ। তারপর কিছুটা চিন্তিত মনেই ঘুমতে গেল।
সকালে অফিসে গিয়ে শরীফ ব্যস্ত হয়ে পড়ল কাজে। ব্যস্ততার মধ্যেও সে কয়েকবার ফোন করল রুবিনার মোবাইল ফোনে। কিন্তু প্রতিবারই কল চলে গেল ভয়েস মেসেজে। শরীফ অবাক হয়ে ভাবল, ‘আশ্চর্য, ফোন ধরছে না কেন?’
শরীফ আরেকবার ফোন করল এবং যথারীতি কল চলে ভয়েস মেসেজে। শরীফ আবারও একটা মেসেজ রাখল, ‘কি ব্যাপার রুবিনা, ফোন ধরছ না কেন? ইজ এভ্রিথিং অলরাইট? রাতে ফোন ধরলে না, সকালেও না। কোনো খবর নেই। খালার বাসায় গিয়ে দেখি একেবারে ভুলেই গেলে? এখানে কেউ একজন যে চিন্তায় অস্থির সেদিকে খেয়াল আছে? এনিওয়ে, কল মি। মিসিং ইয়্যু!’
রাতে বিভিন্ন কাগজ পত্র ঘাটাঘাটি করে শরীফ রুবিনার খালার বাসার নাম্বার খুঁজে পেল। দেরী না করে সে সাথে সাথে ফোন দিল সেই নাম্বারে। অপরপ্রান্তে রুবিনার খালা ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’
‘স্লামালিকুম। খালা আমি শরীফ। কেমন আছেন?’
আগ্রহ ভরা কণ্ঠে খালা বললেন, ‘ভাল আছি বাবা। তোমরা কেমন আছ? রুবিনা কেমন আছে? ওতো অনেকদিন কল-ঠল করে না।’
শরীফ বুঝতে পারছে না খালা কি বলছেন! অনিশ্চিত ভাবে সে শুনে গেল তার কথা। তিনি আরো বললেন, ‘মাঝে মাঝে কথা বললে ভাল লাগে। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কথা বলার একজন মানুষ পাইনা। সবাই ব্যস্ত। রুবিনা প্রথম দিকে প্রায়ই কল দিত। অনেকদিন হল সেও কল করে না। ওর শরীর ভাল তো?’
শরীফের শিরদাঁড়া বেয়ে একটি শীতল স্রোত নেমে গেল নিচের দিকে। সে ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘খালা কি বলছেন এসব? আমিতো আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। রুবিনা তো গতকালই আপনাদের ওখানে গেল। এয়ারপোর্টে পৌঁছে সে আমাকে ফোনও করেছে।’
‘কই আমরা তো কিছুই জানি না। তুমি এসব কি বলছ, আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। একটু ধরো তো বাবা। এই শুনছ, এদিকে আসো। শরীফ ফোন করেছে…’ খালা চিৎকার করে তার স্বামীকে ডাকল।
শরীফের মুখ থেকে অস্ফুটে শুধু একটা শব্দই বের হলো, ‘ও মাই গড!’ তারপর তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল বিছানায়।
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে রুবিনার খালুর কথা শোনা গেল, ‘শরীফ, কি হয়েছে বাবা? শরীফ। ঘটানাটা কি আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদেরকে বলো, কি হয়েছে? শরীফ। হ্যালো? হ্যালো?’
শরীফ বুঝতে পারছে না সে এখন কি করবে, কি বলবে। মাথাটা কেমন যেন এলো মেলো ঠেকছে। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (শেষ পর্ব)

আজকে পেশেন্টের ভিড় খুব একটা নেই ড. জোনসের অফিসে তবুও বেশ দেরি করেই ডাক পড়ল ফরিদের। ফরিদ ভিতরে ঢুকতেই ড. জোনস প্রাথমিক কুশলাদি সেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রথম কবে আপনার মনে হলো আপনার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ?’
মিলি মানসিকভাবে অসুস্থ! কথাটা শুনতে ফরিদের মোটেও ভালো লাগল না। মিলির মধ্যে সামান্য অস্বাভাবিকতা আছে এটা ঠিক কিন্তু তাই বলে ওকে কি অসুস্থ বলা যাবে? কিন্তু যে অস্বাভাবিকতা ওর মধ্যে আছে কিংবা ঢুকে পড়েছে, তার একটা চিকিৎসা হওয়া দরকার, সেটা ফরিদ বিশ্বাস করে।
ফরিদ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। কিন্তু একদিনের ঘটনা সে কিছুতেই ভুলতে পারবে না। তার মনে পড়ে গেল সেদিনটির কথা।
গভীর রাতে একদিন হঠাৎ ঘুম ভেঙে ফরিদ দেখল, মিলি বিছানায় নেই। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। ফোনের পর্দায় সময় দেখল রাত দুটা বেজে তেইশ মিনিট। নিশ্চয়ই বাথরুমে গেছে, এতরাতে আর যাবেই বা কোথায়। ফরিদ অন্যদিকে ঘুরে ঘুমানোর চেষ্টা করল আবার।
মিলি সাধারণত একবার ঘুমিয়ে পড়লে সকালের আগে ঘুম থেকে উঠে না। বাথরুমে যেতে হবে সেই ভয়ে রাতে সে বেশি পানিও খায় না। প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেল মিলির ফিরে আসার নাম নেই। বাথরুমে যদি যেয়েও থাকে, এতক্ষণ সেখানে সে কী করছে? ছোট বড় যেই কাজই হোক, এত সময় তো লাগার কথা না।
ফরিদ ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নেমে পড়ল সে। লক্ষ করল বাথরুমের দরজার ফাঁক গলে আলো দেখা যাচ্ছে। সে এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে টোকা দিল দরজায়। মিলি কোনো উত্তর দিল না। কমোডে বসে আবার ঘুমিয়ে পড়ল নাকি। ফরিদ দরজার নব ঘুরাতেই খুলে গেল খানিকটা। আস্তে করে দরজা সরিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দেখল, কিন্তু মিলিকে দেখা গেল না। সে আর একটু ঢুকে মাথা ঘোরাতেই তার চোখ চলে গেল বাথটাবের দিকে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার সমস্ত শরীরটা প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে শক্ত হয়ে গেল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। ফরিদ দেখল, বাথটাব পূর্ণ হয়ে আছে পানিতে—সেই পানিতে উপুড় হয়ে ভাসছে মিলির শরীর—সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। মিলি এভাবে কতক্ষণ ধরে মাথা ডুবিয়ে আছে কে জানে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে দ্রুত মিলির শরীরটা ঘুরিয়ে টেনে তুলল ফরিদ। মাথাটা উঁচু করে ধরতেই বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ মেলে তাকাল মিলি।
ফরিদ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মিলি, কী হয়েছে তোমার? তুমি এভাবে…’
ফরিদের কথা শেষ হবার আগেই মিলি বলল, ‘কিছু হয় নি তো! কী হবে আবার?’
চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল ফরিদ। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
‘ভয় পেয়েছ?’ মিলি আবার তাকাল ফরিদের দিকে।
ফরিদের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, মিলি এভাবে পানি ভর্তি বাথটাবের মধ্যে মাথা ডুবিয়ে ছিল কেন—এসবের মানে কী?
মিলির চেহারায় একটা অপ্রকৃতিস্থ ভাব ফুটে উঠেছে। সে ঘোরলাগা মানুষের কণ্ঠে বলল, ‘একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম। টাওয়েলটা দাও তো, শীত লাগছে।’
ফরিদের ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করতে, কীসের এক্সপেরিমেন্ট? ঠিক তক্ষুণি লক্ষ করল মিলির শরীর কাঁপছে থরথর করে। ফরিদ দ্রুত একটা তোয়ালে দিয়ে মিলিকে পেঁচিয়ে ধরে বিছানায় নিয়ে এলো। ব্লাঙ্কেট দিয়ে শরীর ঢেকে জড়িয়ে ধরে রাখল। ধীরে ধীরে উষ্ণতা ফিরে এলো মিলির দেহে। কিছুক্ষণের মধ্যে কাঁপুনির মাত্রাও কমে এলো এবং এক পর্যায়ে সে ঘুমিয়েও পড়ল।
ফরিদ জেগে রইল বাকি রাত। ঘুমন্ত মিলির পাশে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল সে।
সব শুনে ড. জোনস গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ একমনে কী যেন ভাবলেন তিনি। নোটপ্যাডে কিছু লিখলেন আবার কেটেও দিলেন। কিছু একটা মেলানোর চেষ্টা করছেন। তিনি ফরিদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের বাচ্চাটি মারা যাবার কতদিন পরের ঘটনা এটি?’
‘দেড় কি দুমাস পর, সঠিক মনে নেই।’
‘আর কোনো অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা এমন কিছু কী সে করে যা দেখে মনে হতে পারে সে অসুস্থ?’
‘না। তবে মাঝে মাঝে ও খুব আনমনে তাকিয়ে থাকে একদিকে।’
‘এনিথিং এলস?’
একটু ভেবে নিয়ে ফরিদ বলল, ‘বাথটাবে শুয়ে থাকে।’
‘পানি ছেড়ে?’
‘হ্যাঁ।’
ড. জোনসের একবার মনে হলো এটা পোস্ট-পারটাম ডিপ্রেশনের কেস। সন্তান জন্ম দেয়ার পরপরই অনেক মা সন্তান জন্মদান পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু পরিবারের নিকটজনেরা অনেকক্ষেত্রেই এই বিষণ্নতাকে চিহ্নিত করতে পারে না। ফলে ঘটে দুঃখজনক পরিণতি।
ড. জোনসের লিলিয়ান নামের এক পেসেন্টের কথা মনে পড়ে গেল। সন্তান জন্মদানের পর ইনসমনিয়াতে আক্রান্ত হয় লিলিয়ান এবং সব মিলিয়ে তাল সামলাতে হিমশিম খেতে থাকে। এই পরিস্থিতিই ধীরে ধীরে মনোরোগ হিসেবে দেখা দেয় এবং ড. জোনসের পরামর্শক্রমে ওষুধ সেবনও শুরু করে সে। তারপরেও একদিন লিলিয়ানের স্বামী বাড়ি ফিরে দেখে তাদের সাত মাসের শিশুটি পানিতে ডুবে মারা গেছে। আর তার স্ত্রীকে পাওয়া যায় শহরের সন্নিকটে একটি লেকের ধারে। পরবর্তীতে জানা যায়, নিজের সন্তানকে পানিতে ডুবিয়ে মারার পর লিলিয়ান নিজেও ডুবে মরতে গিয়েছিল এবং সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে।
নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার আগে অন্তত আশি ভাগ নারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় এবং মাথা ব্যথা, ঘুমহীনতা ও অনিয়মিত পিরিয়ডের ব্যাপারে পরামর্শ নেয়।
মিলির অস্বাভাবিকতাকে হালকাভাবে নেবার কোনো সুযোগ নেই। খতিয়ে দেখতে হবে সেও কোনো রকম ডিপ্রেশনে ভুগছে কি না। শিশুটি মারা যাবার পর থেকেই মিলি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তীব্র অপরাধবোধের কারণে বাথরুমে গেলেই তাঁর মনে হয় শিশুটি তার অবহেলার কারণে মারা গেছে। মিলিকে সুস্থ করতে হলে যেভাবেই হোক ওর মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে যে বিষয়টি ছিল নেহায়েত দুর্ঘটনা।

ফরিদের সঙ্গে কথা শেষ করে ড. জোনস মিলিকে ডাকলেন।
‘আপনার ঘুম কেমন হয়?’ মিলির সঙ্গে কথা বলার সময় ড. জোনস জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমার ঘুমে কোনো সমস্যা নেই। ঘুম ভালই হয়।’ মিলির সাবলীল উত্তর।
‘আপনার স্বামী বলছিল আপনি ঘুমের মধ্যে বাথরুমের মধ্যে গিয়ে বসে থাকেন।’
‘ঘুমের মধ্যে যাই না তো! আমি তো জেগেই থাকি।’
‘আপনি মাঝে মাঝেই এটা করেন?’
‘জি।’
‘কেন?’
‘এমনিই—কোনো কারণ নেই।’
‘বিনা কারণে কি কেউ কিছু করে মিস মিলি?’
‘আমি তো নিজের ইচ্ছেয় করি না।’
‘তবে?’
‘অন্য কেউ একজন আমাকে দিয়ে করায়।’
‘কে সে?’
‘তা তো বলতে পারব না।’
‘মিস মিলি—বিষয়টা আমার জানা দরকার!’
মিলি কোনো উত্তর দিল না। সে উঠে গিয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইল অন্যদিকে।
ড. জোনস আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তার যা বোঝার তিনি বুঝে ফেলেছেন। মিলির ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন বলেই তার ধারণা।

মিলির যেটা হয়েছে—মেডিক্যাল টার্মে তাকে বলে অডিটরি হ্যালুসিনেশন। মানসিকভাবে আঘাত প্রাপ্ত অনেকের এরকম হয়। অনেকটা সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের মতো। খুব সম্ভব মেয়েটি সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছে। এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে—যাকে বলে নিউরোসিস। তবে এখনই চিকিৎসা না করালে সাইকোসিস পর্যায়ে চলে যাবে। সে পর্যায়ে গেলে ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটতে থাকবে। তাই ব্যবস্থা যা করার এখনই করতে হবে।
ড. জোনস মিলিকে তার নির্বাহী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি সাইকিয়াট্রিক ক্লিনিকে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিলেন ফরিদকে। কিছু ক্লিনিক্যাল টেস্ট অ‍্যান্ড ট্রায়ালের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চান তিনি।
ফরিদ উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, ‘কতদিন লাগতে পারে বলে আপনার ধারণা?’
‘ফরিদ সাহেব, মানসিক রোগ তো কোনো জীবাণুঘটিত রোগ না যে এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিলাম—আট ঘণ্টা পর পর একটি করে ক্যাপসুল সাত দিন খেল—ভালো হয়ে গেল। শরীরের রোগ-ব্যাধি ওষুধ দিয়ে সারানো যায়, কিন্তু মনের ব্যাধির তেমন কোনো ওষুধ নেই। কঠিন মানসিক ব্যাধি সারতে সময় লাগে। অনেক সময় সারেও না। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। মনের রোগ তাড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে।’
ফরিদ মাথা নেড়ে চুপ করে রইল।
ড. জোনস আবার বললেন, ‘আপনার স্ত্রীর মাথায় অনেক এলোমেলো ব্যাপার আছে—যা আপনি কিংবা ভিকি কেউই বুঝতে পারছেন না। আপাত: দেখতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও মিস মিলি কিন্তু মোটেও স্বাভাবিক নয়। আমার ধারণা মিলি তার মনের অসুখটা লুকিয়ে রাখতে চাইছে। শরীরে যেমন ক্ষত থাকলে মানুষ তা লুকিয়ে রাখতে চায়—মনের ক্ষতও তাই। মনের অসুখও বিষাক্ত ঘায়ের মতো—কেউ দেখাতে চায় না। মিস মিলি এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগছে। আমাদের কাজ হবে তাকে সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করা। কাজটা সহজ নয়—তবে চেষ্টা করলে সফল হবার সম্ভাবনা আছে বৈ কি।’
এক নাগারে থেমে থেমে কথাগুলো বলে ড. জোনস থামলেন। ফরিদ তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল সে।
একটু বিরতি দিয়ে ড. জোনস আবার বললেন, ‘অসুখের মূল কারণটি বুঝতে পারলেই অসুখ সেরে যায়।’
ফরিদ কী বলবে কিছু ভেবে পেল না। তবে বুঝতে পারল, মিলির চিকিৎসা সম্ভব। ড. জোনসের কথাগুলো তার মনে ধরেছে। সে আশার আলো দেখতে পেল। বেশ খুশি মনেই মিলিকে নিয়ে ফরিদ ড. জোনসের অফিস থেকে বের হয়ে এলো সে।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মিলিকে ড. জোনসের ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে দিল ফরিদ।

মিলির সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে বেশিদিন সময় লাগল না।
একমাসের অল্প কিছু বেশি সময় ধরে মিলির চিকিৎসা চলল ড. জোনসের ক্লিনিকে তার বিশেষ তত্বাবধানে। বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং থেরাপির মাধ্যমে মিলিকে সুস্থ করে তুললেন তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।
ক্লিনিক থেকে যেদিন রিলিজ পেল মিলি, সেদিন সে এক অন্যরকম মিলি।
ফরিদ আর ভিকি মিলিকে নিয়ে যখন বাসায় ফিরল তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে চারিদিকে।
বাসায় ফিরে মিলিকে শোবার ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল ফরিদ।
মিলি বলল, ‘তুমি একটা কাজ করো—তুমি ভিকিকে নিয়ে তোমার রুমে চলে যাও। তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে না, কেউ সহসা ঘুমবে। আমি একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।’
ফরিদ বলল, ‘আমি তোমার পাশে বসে থাকব। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাচ্ছি না। তুমি হাতটা দাও তো—আমি তোমার হাতটা একটু ধরি।’
মিলি হাত বাড়িয়ে দিল। ফরিদ আলতো করে মিলির হাতখানি ধরল।
ভিকি দৌড়ে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ইটস ফ্যামিলি টাইম। ক্যান উই অল স্লিপ টুগেদার লাইক বিফোর—প্লিজ মামি!’
মিলি হেসে দিয়ে বলল, ‘আয় পাগলা, আজ আমরা আগের মতো সবাই এক সঙ্গেই ঘুমাব।’
ভিকির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ফরিদের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলল, ‘বাট বাবা, ইউ ক্যাননট স্নোর ওকে?’
ফরিদ হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কই, আমি কি স্নোর করি নাকি? আই ডোন্ট ডু দ্যাট এনিমোর!’
‘ইয়েস ইউ ডু।’ ভিকি দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘রিমেম্বার লাস্ট টাইম, আই ভিডিও টেপড ইয়োর স্নোরিং। ইউ ওয়ানা সি?’
ফরিদ আর মিলি একসঙ্গে হেসে দিল। মিলি বলল, ‘ফরিদ, একটা গল্প বলো। গল্প বলে আমার মনটা ভালো করে দাও।’
ইতিমধ্যেই ভিকি বাবা-মায়ের মাঝখানে তার জায়গা করে নিয়ে গুটিসুটি শুয়ে গল্প শোনার জন্যে তৈরি হয়ে গেল।
ফরিদ তার গল্প বলা শুরু করল…
মিলি চোখ বন্ধ করে আছে। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে গল্প শুনছে ভিকি।
কী আনন্দময় সময়! আহারে!
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-৪)

ফরিদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিলির মুখের দিকে।
‘চলো আমরা একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাই।’ ফরিদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল মিলি।
ফরিদের চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হলো।
‘আমার ধারণা আমাদের সবকথা শোনার পর নিশ্চয়ই একটা ভালো পরামর্শ পাওয়া যাবে।’ আগ্রহ নিয়ে কথাগুলো বলল মিলি।
মিলিকে একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার। অনেকদিন থেকেই ফরিদ বিষয়টা নিয়ে ভাবছিল। কিন্তু নিজ থেকে ওকে সে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। যদি রিয়‍্যাক্ট করে বসে। আজ মিলি নিজেই বলছে সে কথা—ফরিদ বেশ অবাক হলো। সে খুশি মনে বলল, ‘ভিকিকেও সাথে নিলে কেমন হয়?’
‘ভিকি?’ ভ্রু কুঁচকে বলল মিলি, ‘ওকে কেন?’
‘দেখো না কেমন সব কিছুতেই ভয় পায় ছেলেটা? একা ঘুমাতে ভয় পায়। একা একা ইভেন বাথরুমে যেতেও ভয় পায়।’
‘অতটুকুন বাচ্চা—ও তো ভয় পাবেই। এটাই তো স্বাভাবিক। আর তোমারও কোনো সমস্যা আছে বলে আমার মনে হয় না। যা সমস্যা আমার—চিকিৎসা আমার দরকার। আমি নিজেও সেটা জানি। তুমি বরং ভালো একজন সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ নাও। আমি দেখা করতে চাই।’ অস্থিরকণ্ঠে কথাগুলো বলে মিলি চায়ে চুমুক দিল।
মিলির মুখ থেকে এ কথা শোনার পর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অবস্থা হলো ফরিদের। মিলি এত সহজেই রাজি হয়ে যাবে—এটা ছিল তার কল্পনার অতীত। দেরি না করে ফরিদ ডিরেক্টরি ঘেঁটে শহরের নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ বের করে ফেলল খুব সহজেই।

প্রফেসর ড. ডরথি জোনস, একজন ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট—মনোরোগ চিকিৎসার অন্যতম সেরা চিকিৎসক। তিনি একজন সজ্জন রোগী সেবী। এ পর্যন্ত হাজারো রোগী তার চিকিৎসায় সুস্থ জীবন যাপন করছে। একমাসের আগে ড. জোনসের অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ফরিদের ভাগ্য ভালো সে এক সপ্তাহের মধ্যেই অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে গেল।
সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগ একটি জটিল চিকিৎসা। ড. ডরথি জোনস হলেন এক্ষেত্রে একজন পাইওনিয়ার। তিনি পর্যাপ্ত সময় নিয়ে রোগী দেখেন। সুন্দর সুললিত কোমল ভাষায় সবার সঙ্গে কথা বলেন। নিবিড়ভাবে সকলের যত্ন নেন।
অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট অনুসারে একদিন মিলিকে সাথে করে ড. জোনসের অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলো ফরিদ। পেপারওয়ার্ক শেষ করার কিছুক্ষণ পরেই মিলির ডাক পড়ল। মিলিকে সাথে নিয়ে ডাক্তারের রুমে ঢুকল সে। তাদেরকে ভিতরে ঢুকতে দেখে ড. জোনস বললেন, ‘আমি পেশেন্টের সঙ্গে একা কথা বলতে চাই প্রথমে।’
ফরিদ মিলির হাতে একটু মৃদু চাপ দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করে বের হয়ে গেল।
মিলি দাঁড়িয়ে রইল একা একা।
ড. জোনস বললেন, ‘প্লিজ হ্যাভ এ সিট।’
কোনো জড়তা ছাড়াই মিলি বসল এবং খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলে গেল।
ড. জোনস খুব আন্তরিকভাবে বললেন, ‘কফি খাবেন?’
‘হ্যাঁ, খেতে পারি।’
কফি মেকার থেকে একটি পেপার কাপে কফি ঢেলে মিলিকে দিলেন ড. জোনস। নিজের জন্যেও এককাপ নিলেন। তারপর বললেন, ‘কফি খেতে খেতে কথা বলা যাক, কী বলেন মিস মিলি?’
মিলি মৃদু হেসে বলল, ‘অলরাইট।’ কফিতে একটা চুমুক দিয়ে মিলি কথা শুরু করল। একে একে সব ঘটনাই বলে গেল সে এবং আশ্চর্যজনকভাবে সবকথা বেশ গুছিয়েই বলল মিলি। ভিকির ঘনঘন ভয় পাওয়া, গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনা—সবকিছু খুলে বলল সে। বাথরুমে পানির শব্দ, ভিকির কণ্ঠ শুনতে পাওয়া—কোনো কিছুই বাদ গেল না।
মিলির কাছ থেকে সবকথা খুব মনোযোগ দিয়ে বেশ সময় নিয়ে শুনলেন ড. জোনস। তারপর চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ—আরেক কাপ কফি নিয়ে কফিতে চুপচাপ চুমুক দিতে থাকলেন। তার সামনে কেউ একজন বসে আছে, সে কথাও যেন তিনি ভুলে গেছেন।
ড. জোনস কিছুই বলছেন না দেখে মিলি অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। মিলির অস্থিরতা হঠাৎ তার নজরে এলো। তিনি মিলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেসটা আমি দেখছি। ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যান্ড পেপারওয়ার্কগুলো রিভিউ করে আমি জানাব।’
ড. জোনসের কথা মিলিকে খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারল না। সে অস্থির হয়ে বলল, ‘আপনি কি আমাদের বাসায় একবার আসবেন?’
‘তার কি কোনো দরকার আছে?’ ভ্রু কুঁচকে বললেন ড. জোনস।
‘আপনার মনে হয় নেই?’
‘না নেই।’
‘নাকি যেতে চাচ্ছেন না।’
‘দেখুন মিস মিলি আমি তো আপনাকে বিনে পয়সায় সার্ভিস দিচ্ছি না। আর আমার কন্সালটিং ফি সম্পর্কে নিশ্চয়ই আপনার ধারণা আছে।’
‘জি আছে। প্রয়োজনে আপনার ফি আমরা অ‍্যাডভান্স পে করব।’ মিলির কথাগুলো বেশ কঠিন শোনাল। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে নিঃশ্বাস ফেলছে ঘনঘন।
ড. জোনস অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মিলির দিকে এবং তারপর কী ভেবে বললেন, ‘ঠিক আছে, ফ্রন্ট ডেস্কে ঠিকানা রেখে যান। আমার এসিস্ট্যান্ট আপনাকে ফোনে কনফার্ম করবে।’
‘অনেক ধন্যবাদ।’
কথা না বাড়িয়ে মিলি উঠে দাঁড়াল। সে একবারও পেছনে না ফিরে ড. জোনসের অফিস থেকে বের হয়ে এলো।

মিলি চলে যাওয়ার পর আরো বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন ড. জোনস। মিলি হঠাৎ করে এমন উত্তেজিত হয়ে গেল কেন? মেয়েটি সম্ভবত হ্যালুসিনেশনে ভুগছে—বারবার একই স্বপ্ন দেখছে। কারণটা খুঁজে বের করতে হবে। একই স্বপ্ন বারবার দেখার পেছনে একটা রহস্য নিশ্চয়ই আছে। কী সেই রহস্য? মিলি অনেক কিছুই বলেছে তবুও তার ধারণা সে কিছু একটা বিষয় চেপে গেছে। সে বিষয়টা কী? ড. জোনস মিলির বাসায় যেয়ে একবার দেখতে চান। তিনি তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে তক্ষুনি বলে দিলেন মিলির বাসা ভিজিটের ব্যবস্থা করার জন্য।

পরের উইকএন্ডেই ড. জোনস মিলিদের বাসায় এসে হাজির হলেন।
ঘুরে ঘুরে বাসার সব ঘরগুলো তিনি দেখলেন। ফরিদের রুমের লাগোয়া বাথরুম দেখলেন এবং ভিকির রুমে ঢুকে তীক্ষ্ণ চোখে চারিদিকে তাকালেন। প্রথমেই তিনি আবিষ্কার করলেন—ভিকির বিছানা আর দেয়ালের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা। বিছানার নিচে, দেয়াল ঘেঁসে অনেকগুলো বালিশ ফেলে রাখা হয়েছে। তার মানে ঘুমের মধ্যে ভিকি নিচে পড়ে গেলে যেন ব্যথা না পায় তাই এই ব্যবস্থা। হয়ত এর আগে ভিকি ঘুমের মধ্যে গড়িয়ে বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেছে। এটা অসম্ভব নয়—ভয় পেয়ে ভিকি যখন ফরিদকে ডেকে বলেছে নিচে কেউ আছে, ফরিদ ঝুঁকে দেখার সময়ই ভিকি দেয়ালের দিকে সেঁটে গিয়ে বিছানা থেকে নিচে পড়ে যায়। ভিকিকে একবার বিছানার ওপরে আর পরক্ষণেই আবার মেঝেতে দেখতে পায় ফরিদ। এবং ভয় পেয়ে মুর্ছা যায়।
এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো ব্যাখ্যা তার মাথায় এলো না। যদিও তার মধ্যে খানিকটা সংশয় থেকেই গেল। সময় আসুক ভেবে দেখা যাবে।
ড. জোনস মিলিকে নিয়ে তাদের বেডরুমে এলেন। সেখানে ঢুকেই চারিদিকে এক নজর দেখলেন। তিনি লক্ষ করলেন বিছানার পাশের টেবিলে ছোট একটা বাচ্চা ছেলের ছবি ফ্রেমবন্দী করা। বয়স এক থেকে দেড় বছর হবে হয়ত। সমুদ্র সৈকতে মিলি বসে রয়েছে আর তার একটু সামনেই বালু নিয়ে খেলছে ছেলেটি। ড. জোনস ছবিটি একবার হাতে নিয়ে দেখে আবার নামিয়ে রাখলেন।
‘আপনাদের বিয়ে হয়েছে কত বছর?’ প্রশ্ন করে মিলির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ড. জোনস।
‘আট বছর।’
‘একটাই ছেলে?’
উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল মিলি। ড. জোনস তার দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে।
মিলি মৃদু স্বরে বলল, ‘জি।’
‘ভেবে উত্তর দিতে হলো?’
‘আমাদের আরেকটি ছেলে ছিল।’ বলেই বেডসাইড টেবিলে রাখা ছবিটির দিকে তাকাল মিলি। ড. জোনস তা লক্ষ করলেন।
‘ছিল?’
মিলি নিশ্চুপ।
‘এখন নেই?’
‘না।’
ড. জোনস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মিলির দিকে। কিছু একটা আঁচ করতে পারলেন তিনি—সময় দিলেন মিলিকে স্বাভাবিক হবার।
‘ও মারা গেছে।’ মিলি বলল।
‘কীভাবে?’
‘বাথটাবে। গোসলের সময়।’
‘তার মানে খুব ছোট অবস্থায়। কত বয়স হয়েছিল ছেলেটার?’
‘দেড় বছর।’
‘আপনি কাছে ছিলেন না?’
‘ছিলাম।’
‘তাহলে?’
মিলি চুপ করে রইল।
‘অন্যমনস্ক ছিলেন?’
মিলি চুপ।
‘বাথটাবের পানি বন্ধ করতে ভুলে গেছিলেন?’
মিলি চুপ।
‘বলতে না চাইলে অসুবিধা নেই।’ অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললেন ড. জোনস। ‘ঘটনা যাই ঘটুক, যেভাবেই ঘটুক—সত্যটা জানা প্রয়োজন।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘রিমেমবার, আই’ম হেয়ার টু হেল্প ইউ অ্যান্ড আই নিড টু নো দ্য ট্রুথ।’
কিছু না বলে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল মিলি। ড. জোনসের চোখের দিকে তাকাতে তার সাহস হচ্ছে না। তার ধারণা, চোখে চোখ পড়লেই ড. জোনস সব কিছু বুঝে যাবেন।
‘আমার ধারণা বাথটাবে পানি ছেড়ে দিয়ে আপনি জরুরি কোনো কারণে বাথরুমের বাইরে চলে যান। এবং একসময় ভুলে যান ছেলেকে পানিতে বসিয়ে রেখে গেছেন।’
হঠাৎ করে ড. জোনসের এমন কথায় চমকে উঠল মিলি। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল ড. জোনসের দিকে।
ড. জোনস কিঞ্চিত উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি আবার বললেন, ‘একটা পর্যায়ে যখন মনে পড়েছে, তখন দৌড়ে এসে দেখেন শিশুটি পানিতে তলিয়ে গেছে! অ্যাম আই রাইট মিস মিলি?’ অনেকটা কাঠগড়ায় উকিলদের মতো জেরা করার ভঙ্গিতে বললেন ড. জোনস।
মিলি নিরুত্তর। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল উদাস দৃষ্টিতে।
‘আপনি আমার অফিসে আসুন আরেকদিন। আপনার স্বামীকেও নিয়ে আসবেন।’
ড. জোনস বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার মুহূর্তে উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলেন, ‘বাই দ্য ওয়ে, আপনার স্বামী আর ছেলে কোথায়? ওদেরকে দেখলাম না।’
মিলি তাকাল ড. জোনসের দিকে। ‘উইকএন্ডে ফরিদ ভিকিকে নিয়ে সকার খেলতে যায়।’ উত্তর দিল মিলি।
‘ও আচ্ছা। হ্যাভ এ গুড ডে মিস মিলি—এঞ্জয় ইয়োর রেস্ট অফ দ্য উইকএন্ডস।’ ড. জোনস হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেল মিলিদের বাসা থেকে।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-৩)

বাথরুমে পানি পড়ার শব্দ হঠাৎ করেই থেমে গেল। সুনসান নীরবতায় ছেয়ে গেল চারিপাশ। মিলির শরীরের ওজন যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল কয়েকগুণ। সে কিছুতেই শরীর নাড়াতে পারছে না। তবুও ভারী পায়ে ধীরে ধীরে হেঁটে তার বিছানায় ফিরে গেল সে। প্রচণ্ড পানির পিপাসা পেল। কিন্তু বিছানা ছেড়ে যাবার মতো শক্তি অবশিষ্ট রইল না তার।
মিলির বেশ শীত লাগছে—রীতিমত কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল তার। সে দ্রুত ব্লাঙ্কেটের মধ্যে ঢুকে মুখ ঢেকে ফেলল। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে গেল তার শরীর। সে কি অজ্ঞান হয়ে গেল না ঘুমিয়ে পড়ল—তা বোঝার কোনো উপায় রইল না।

‘মামি, মামি।’ ক্ষীণভাবে একটি শিশুর ডাক মিলির কানে ভেসে এলো—মনে হলো বহু দূর থেকে একটি বাচ্চা ছেলে তার মাকে ডাকছে। তার মামি-মামি ডাকের সঙ্গে ভেসে এলো বাথটাবে পানি ছাড়ার শব্দ। ধীরে ধীরে পানির শব্দ বাড়ছে আর মামি ডাকের শব্দ ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে পানির শব্দের আড়ালে। এক সময় বাথটাবে ছেড়ে দেয়া পানির শব্দ সমুদ্র গর্জনের মতো শোনা যেতে লাগল। মিলির চোখের সামনে ভেসে উঠল ছেলেটি—সমুদ্র সৈকতে বসে বালি দিয়ে খেলছে আর ঢেউ আসার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দৌড় দিচ্ছে। হঠাৎ বড় একটা ঢেউয়ের ধাক্কায় চোখের নিমিষে ছেলেটা পড়ে গেল পানিতে। বাচ্চা একটা ছেলে, অনেক চেষ্টা করেও তার সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারল না—ভেসে গেল ফিরতি পানির টানে। মিলি উঠে দাঁড়াল—হাত বাড়িয়ে দৌড় দিল ছেলেটিকে ধরার জন্য।
ছেলেটির মামি-মামি ডাক আর শোনা যাচ্ছে না। মিলি দৌড়ে গিয়ে ঢুকল বাথরুমে। সাথে সাথেই স্থির হয়ে গেল তার শরীর। নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারল না। বাথটাব ভরে আছে পানিতে। সেই পানিতে উপুড় হয়ে ফুটফুটে একটি বাচ্চা ছেলে ভাসছে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে মিলি এক ঝটকায় তুলে নিল ছেলেটিকে। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গেছে। মিলির বুক ফেটে কান্না এলো–পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে থাকল সে। একসময় তার চিৎকার প্রলাপের মতো শোনা যেতে থাকল। মিলি ক্রমাগত বলতে থাকল, বাবু, আমার শোনা, কথা বল, কথা বল শোনা। ছেলেটির মুখ দিয়ে একটু পানি বের হলো শুধু, কোনো শব্দ বের হলো না। তার নিথর দেহ কোলে নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বসে রইল মিলি।
একটি এম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে মিলিদের বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। সাইরেনের তীব্র শব্দে মিলির ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। একটু ধাতস্থ হতেই সে বুঝতে পারল—এটি ছিল সেই স্বপ্ন, যেই স্বপ্নটি তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কতদিন থেকে!
জানালা গলে সকালের হলদে আর মিঠে রোদ ঢুকেছে মিলির বেডরুমে। পর্দা দিয়ে জানালা ঢেকে রাখতে পছন্দ করে না মিলি। তাই সকাল হতে না হতেই তার বাসা রোদের আলোতে হীরার মতো চকচক করে।
মিলির মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল সে। একটু পরেই আড়মোড়া ভেঙে একটা হাই তুলে নেমে পড়ল বিছানা থেকে।
রান্নাঘর থেকে তুমুল শব্দ ভেসে আসছে। ভিকি আর ফরিদ কথা বলছে। ভিকির কথাই শোনা যাচ্ছে বেশি—সে বেশ শব্দ করেই কথা বলছে। বাবা-ছেলে কী যে এত কথা বলে!
ফরিদ ভিকির জন্যে সকালের নাস্তা বানিয়েছে—ওল্ড ফ্যাশানড প্যানকেক সাথে হুইপড বাটার আর ম্যাপল সিরাপ। ভিকি কথা বলছে আর মজা করে খাচ্ছে। কথা বলতে বলতে ফরিদ দু’কাপ মশলা চা বানিয়ে ফেলল। চায়ে মশলা মেশানোই থাকে—শুধু দুধ-পানি মিশিয়ে জ্বাল করে পরিমাণ মতো চায়ের গুড়া ছেড়ে দিলেই হলো। মিলির খুব পছন্দ এই মশলা চা। এখন ফরিদের নিজেরও অনেক ভালো লাগে। মাঝে মধ্যে মিলির ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে, সে নিজেই চা-টা বানিয়ে ফেলে।
ফরিদ ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভিকির কথার উত্তর দিচ্ছে। ছুটির দিনে ফরিদ ভিকিকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়—বেশিরভাগই পার্ক কিংবা বাচ্চাদের খেলার জায়গা। এই সামারের লম্বা ছুটিতে ভিকিকে সকার ক্যাম্পে দেবার পরিকল্পনা ফরিদের। কিন্তু মিলি চায় ভিকি পিয়ানো বাজানো শিখুক।
‘গুড মর্নিং।’
ফরিদ আর ভিকি একসাথে ঘুরে তাকিয়ে দেখল মিলি দাঁড়িয়ে আছে। রান্নাঘরে ঢুকেই সে বাবা আর ছেলের কথোপকথন শুনছিল নিঃশব্দে।
ফরিদ বলল, ‘গুড মর্নিং।’
ভিকি কিছু বলল না দেখে মিলি আবার বলল, ‘গুড মর্নিং, ভিকি।’
ভিকি অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘গুড মর্নিং মাম্মি।’
ভিকির হাতে আইফোন। প্যানকেক খাওয়া বন্ধ করে সে গেম খেলছে ফোনে। মিলি খুবই বিরক্ত হলো। সে বলল, ‘ভিকি, ফোন রাখো। আগে খাওয়া শেষ করো, পরে খেলবে। দাও, ফোনটা দাও তো।’
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভিকি ফোন নামিয়ে রাখল টেবিলে। এক টুকরা প্যানকেক মুখে দিয়ে তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে।
মিলি সেটা লক্ষ্য করে বলল, ‘ছেলেটা একেবারে এডিক্টেড হয়ে যাচ্ছে—ফোন ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝে না।’
ভিকি মুখ গোমড়া করে বসে রইল। এজন্যেই ভিকি বাবাকে বেশি পছন্দ করে—ফোন নিয়ে বাবা তাকে কখনো কিছু বলে না।
ফরিদ কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল মিলির দিকে। সে একটা চুমুক দিয়ে বলল ‘বাপ-বেটা মিলে কী কথা হচ্ছিল শুনি?’
‘আজকে আমরা কোথায় যাবো সেই প্ল‍্যান করছিলাম।’ ফরিদ বলল।
‘প্ল‍্যান করছিলে ভালো—তাই বলে এত চিৎকার করতে হবে কেন? আমি তো ভাবলাম কী যেন হয়েছে। ছুটির দিনের সকালটা শুরু হয় তোমাদের দু’জনের চিৎকার চেঁচামেচিতে। একটু আস্তে কথা বলতে পারো না?’
ভিকি চোখ বড় করে ঘুরিয়ে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ একটু মুচকি হাসল। মিলি অবশ্য সেটা লক্ষ্য করল না। সে আবার বলল, ‘ছুটির দিনে সকালে একটু আরাম করে ঘুমাব—তারও উপায় নেই!’
প্রতি উইকএন্ডেই এই একই কথা শুনে শুনে ওরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কাজেই মিলির কথায় ফরিদ কিংবা ভিকি—দু’জনের কারো মধ্যেই তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিল না।
‘তোমার চা-টা বোধ হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। দাও গরম করে দেই।’ মিলির দিকে তাকিয়ে বলল ফরিদ।
‘সমস্যা নেই—আমি গরম করে নিচ্ছি।’
মিলি তার চায়ের কাপটা মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে এক মিনিট গরম করতে দিয়ে এক স্লাইস মাল্টিগ্রেইন ব্রেড টোস্টারে ঢুকিয়ে দিল।
মিলিদের রান্নাঘরের চারপাশটা বেশ সুন্দর খোলামেলা। জানালা দিয়ে অনেকখানি আকাশ দেখা যায়। প্রতিদিন সকালে এক কাপ চা নিয়ে বাইরের সুন্দর দৃশ্য দেখা মিলির অভ্যাস। সে তার ব্রেডে পিনাট বাটার লাগিয়ে চেয়ার টেনে বসল জানালার পাশে। এক কামড় ব্রেড আর এক চুমুক গরম চা—সাথে নির্মল আলোয় ছেয়ে যাওয়া প্রকৃতি। জানালা দিয়ে বাইরেটা আজ সবুজ মায়াময়। অন্যদিনে মিলির মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়—কিন্তু আজ তাকে এক ধরনের অস্বস্তি আঁকড়ে ধরে আছে।
মিলি চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। একবারও ফরিদ কিংবা ভিকির দিকে তাকাল না। সকালের এই সময়টুকু তার একান্তই নিজের। সে নিজের মতো করেই কাঁটাতে চায়।
জানালা দিয়ে এক ফালি সোনালী রোদ মিলির মুখের উপরে এসে পড়েছে। ঝট করে ফরিদের চোখ আটকে গেল সেখানে। ফরিদ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল মিলির দিকে। এত সুন্দর কী করে হয় কেউ? কী সরল—কী মায়াবী। কাঁধের পাশ দিয়ে লম্বা চুল ছড়িয়ে আছে তার কোমর অবধি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রহস্যময় দুটি চোখে মিলি আনমনে তাকিয়ে আছে বাইরে।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মিলির পাশে এসে দাঁড়াল ফরিদ। মিলি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখল তাকে, তারপর আবারো তাকাল বাইরে।
ফরিদও তাকাল মিলির সাথে, সেদিকে তাকিয়েই আস্তে করে ডাকল, ‘মিলি!’
‘উম।’
‘কিছু ভাবছ?’
মিলি কোনো উত্তর দিল না।
‘তোমার শরীর কি খারাপ?’
মিলি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘না।’ তারপর চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।
‘কাল রাতে আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।’ বলবে না বলবে না করেও ফরিদ বলে ফেলল কথাটা।
‘তাই—কী ঘটনা?’
‘উইয়ার্ড একটা ব্যাপার, বুঝলা। রাতে ভিকির ডাকাডাকিতে ওর রুমে গেলাম। দেখি জড়সড় হয়ে বিছানার উপরে বসে আছে সে। জানতে চাইলাম কী হয়েছে? ও বলল, কে যেন ওর বিছানার নিচে। আমি ওর ভয় ভাঙানোর জন্য নিচু হয়ে তাকালাম খাটের নিচে—তাকিয়ে আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।’ এটুকু বলে ফরিদ থেমে গেল।
মিলি তাকাল উৎসুক দৃষ্টিতে ফরিদের দিকে।
ফরিদ আবার বলল, ‘অন্ধকারে প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। অন্ধকার একটু সয়ে এলেই দেখি ভিকি চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।’
‘তুমি দেখলে ভিকি বিছানার নিচ থেকে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে?’
‘হ্যাঁ। তারপর বলল, ওর বিছানার উপর কেউ বসে আছে।’
মিলি চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকাল ফরিদের দিকে।
‘আজব না?’ ফরিদ বলল।
‘তারপর?’
ফরিদ চুপ করে রইল। সে আর কিছু মনে করতে পারছে না। সত্যিই কিছুই মনে পড়ছে না তার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘জানো আমার না আর কিছুই মনে পড়ছে না—ব্যাপারটা কী স্বপ্নে দেখলাম না সত্যিই ঘটল বুঝতে পারছি না। উইয়ার্ড!’
একটু ভেবে নিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি ফ্লোরে ঘুমিয়ে ছিলে কেন?’
‘ফ্লোরে ঘুমিয়ে ছিলাম মানে? কোথায়?’
‘ভিকির রুমে।’
‘কী বলো?’
মিলি কোনো উত্তর দিল না।
‘কই, কিছু মনে পড়ছে না তো!’ ফরিদ কপাল কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করল।
‘ঘুম ভাঙার পর কী দেখলে তুমি?’
‘ঘুম ভাঙার পর দেখি ভিকি আমার পাশে ঘুমিয়ে আছে—অথচ আমি মনে করতে পারছি না, আমি কখন ওকে আমার রুমে নিয়ে এসেছি।’
‘ঘুম ভেঙে দেখলে তুমি তোমার বিছানায় শুয়ে আছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভিকি তোমার পাশে?’
‘হ্যাঁ। কেন?’
মিলি আর কিছু বলল না। এই মুহূর্তে তার মাথায় কিছু প্রশ্ন চক্রাকারে ঘুরছে। তার মনে হচ্ছে, সামথিং ইজ রং—সামথিং ইজ ভেরি রং। এক ধরনের অস্থিরতা আঁকড়ে ধরল তাকে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘এত ঘনঘন ভয় পায় কেন ছেলেটা?’
একথা ঠিক, ভিকি সব কিছুতেই ভয় পায়। অন্ধকারে ভয় পায়। একা বাথরুমে যেতেও ভয় পায়। এত বড় বাড়ি। এতটুকুন একটা ছেলে, ছয় বছর এখনো হয় নি। ভয় তো একটু পেতেই পারে। ফরিদ মিলির কথার কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলল, ‘আমি ভাবছি বাসাটা বদলে ফেললে কেমন হয়। অন্য কোথাও মুভ করি চলো।’
‘বাসা বদলে ফেললেই কি স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে যাবে? কিংবা মনের ভয়? মনের ভয় তো যেখানেই যাবে সেখানেই সঙ্গী হয়ে যাবে।’
ফরিদ মনে মনে ভাবল, ‘আসলেই তো তাই। এভাবে তো ভেবে দেখা হয় নি।’ সে আর কিছু না বলে তাকিয়ে রইল বাইরে।
মিলিও চুপ করে আছে। সে একবার ঘুরে তাকাল ভিকির দিকে—ভিকি নিবিষ্ট মনে গেম খেলছে ফোনে। বাইরের সোনালি রোদের ঝলকানি বাড়ছে। মিলি উসখুস করছে কিছু একটা বলার জন্য। তার চোখ-মুখে এক ধরনের অস্থিরতা ফুটে উঠল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সে বলল, ‘সেই স্বপ্নটা আমি আবারো দেখেছি। আর…’
কথা শেষ না করে মিলি থেমে গেল। ফরিদ অবাক হয়ে তাকাল মিলির দিকে। নিজের অজান্তে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। মিলির স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা ফরিদ জানে। কিন্তু কথা শেষ না করে মিলি থেমে গেল কেন? ফরিদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মিলির দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব