Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-২)

পরদিন সকালে ফরিদ একটু রাগের সাথেই বলল, ‘এটা কী হলো?’
মিলি নির্বিকার ভাবে বলল, ‘কী?’
‘আমাকে আসতে বলে তুমি ঘুমিয়ে পড়লে যে?’
‘তুমি রাত কাভার করে এলে আমি কী করব? সারারাত জেগে থাকব?’
‘আমি ঠিক বারো মিনিট পরেই গিয়ে দেখি তুমি বড় বড় নিশ্বাস ছাড়ছ।’
‘তাতে কি প্রমাণ হয় আমি ঘুমিয়ে পড়েছি?’
ফরিদ অবাক হয়ে তাকাল।
‘আর ঘুমলেই বা কী? ঘুমন্ত মানুষকে বুঝি আদর করা যায় না?’
‘মানে?’
‘না কি ঘুমলে আমাকে পচা লাগে দেখতে?’
‘কী বলছ এসব?’
‘ঠিকই বলছি।’
‘তো মুখ ঢেকে রাখলে বুঝব কী করে—ঘুমলে তোমাকে কেমন লাগে?’
‘তো তোমার হাত দু’টো আছে কী জন্যে? ব্লাঙ্কেটটা সরিয়ে দেখতে—মানুষটা ঘুমিয়ে আছে না জেগে আছে। ঘুমলে তাকে সুন্দর লাগে না ভূতের মতো।’
ফরিদ আর কিছু বলল না। ইদানীং মিলিকে সে ঠিক বুঝতে পারে না। ওর সাথে কথায় পেরে ওঠা দায়।
একটু বাদে মিলিই বলল, ‘তোমাকে একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দেই। তোমার যদি সত্যিই আমাকে আদর করতে ইচ্ছে করে—আমার ঘুম কিংবা রাত, সে যত গভীরই হোক না কেন—তুমি আদর করবে। ইটস ইয়োর রাইট—গট ইট? এখন যাও অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
বাস্তবে ফিরে এলো ফরিদ। সাহস সঞ্চয় করে মিলির মুখ থেকে ব্লাঙ্কেটটা আস্তে করে সরিয়ে রাখল সে। কেমন মায়া ভরা একটা মুখ। কী সুন্দর! ফরিদ তাকিয়ে রইল অপলক। তারপর আলতো করে চুমু খেল মিলির চোখের পাতায়। তারপর চিবুকে। ঠোঁটে। আস্তে আস্তে সমস্ত শরীরে।
মিলি কেঁপে উঠল। কিন্তু তার ঘুম ভাঙল না। নিশ্বাসটা বোধ করি একটু দ্রুত হলো। ফরিদ নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না। সে মিলির ঘুমন্ত শরীর নিয়ে মেতে উঠল আদিম খেলায়।
আজকের এই বিশেষ রাতটাতে মিলিকে জড়িয়ে ধরে আরাম করে ঘুমচ্ছিল ফরিদ। আর এর মধ্যে ছেলেটা ডাকাডাকি শুরু করেছে। এজন্যেই মিলিকে বলেছিল আরো ছোটবেলা থেকেই ওকে একা একা ঘুমের অভ্যাস করতে। তাহলে এমন রাত বিরাতে ডাকাডাকি করত না। প্রথম দিকে ভয় পেত বলে, এর আগেও বেশ কয়েকবার মাঝরাতে ভিকিকে সে তার নিজের রুমে নিয়ে এসেছে ফরিদ।
মিলির ঘুম কুম্ভকর্ণের মতো। আগে ভয় পেলে ভিকি তার মাকেই ডাকত। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে এখন সে আর তার মাকে ডাকে না। সে বুঝে গেছে মাকে ডেকে লাভ নেই।
ভিকির রুম থেকে কেমন যেন একটা কুনকুন আওয়াজ আসছে। ফরিদ উঠে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার রুমের দিকে।
ফরিদ দূর থেকে দেখল—ভিকি গুটিসুটি মেরে দেয়াল ঘেঁষে বিছানার উপরে বসে আছে।
‘ভিকি, কী হয়েছে বাবা? আবার ভয় পেয়েছ?’
চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ভিকি। সে কিছু বলতে পারছে না। ইশারায় দেখাল বিছানার নিচে।
ফরিদ বুঝতে না পেরে এগিয়ে গেল কাছে। আবার বলল, ‘স্বপ্ন দেখেছ?’
ভিকি মাথা নাড়ল—না।
‘তাহলে?’
ভিকি আবারো খাটের নিচে হাত ইশারা দিয়ে দেখাল কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারল না। তার মুখের কথা যেন আঁটকে আছে। কিন্তু ভিকির চেহারা দেখে আজ ফরিদের মনে শঙ্কা দেখা দিল। কিছু একটা দেখে ভিকি ভয় পেয়েছে—কিন্তু সেটা কী? ওর চোখ মুখের আচরণ এমন কেন? ফরিদ খানিকটা দ্বিধায় পড়লেও ভিকির কথার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে বলল, ‘ভয়ের কিছু নাই। মিছিমিছি ভয় পাচ্ছ কেন? এভাবে ভয় পেলে তো চলবে না ভিকি। তুমি এখন বড় হয়েছ—তোমাকে একা ঘুমাবার অভ্যাস করতে হবে। এসো শুয়ে পড়।’
ফরিদ ভিকিকে হাত ধরে টেনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলল, ‘ঘুমাও, বাবা।’
ভিকি কিছু না বলে শুয়ে পড়ল।
ফরিদ ঘুরে দাঁড়াতেই তার টি-শার্টের এক কোনায় টান পড়ল। ভিকি ওর জামা ধরে রেখেছে। ফরিদ মাথা ঘুরাতেই ভিকি দুর্বল কণ্ঠে বলল, ‘খাটের নিচে কে যেন আছে বাবা। প্লিজ একটু দেখো—’
ফরিদ অবাক কণ্ঠে বলল, ‘খাটের নিচে কে থাকবে? কী সব আজগুবি কথা? তোমার ইউটিউব দেখা বন্ধ করতে হবে। নিশ্চয়ই হরর মুভি দেখা শুরু করেছ তাইনা?’
ভিকি কিছু বলল না। এবার সে ফরিদের হাত ধরল।
ফরিদ তাকাল ভিকির মুখের দিকে। করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটি—চোখে মুখে অনুনয়।
ভিকিকে আশ্বস্ত করা দরকার। ফরিদ দ্রুত মাথাটা কোনো রকম একটু নিচু করে খাটের নিচে তাকাল—অন্ধকারে কিছুই বোঝা গেল না। ফরিদের ধারণা ভিকির কোনো খেলনা গাড়ি রিমোটে চাপ লেগে খাটের নিচে চলে গেছে এবং মাঝে মাঝে শব্দ করছে। অধিকাংশ সময় ভিকি তার কোনো খেলনারই রিমোট সুইচ বন্ধ করে না। তেমন কিছুই হয়ত হবে। ফরিদ মাথা তুলে বলল, ‘কই কিছুই তো নেই। তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ।’
ভিকি অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদের কথা তার বিশ্বাস হলো না। সে আবারো ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘বাবা প্লিজ!’
ভিকির কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে ফরিদের মনে হলো আচ্ছা ঠিক আছে কী আছে একটু ভালোমতোই না হয় দেখি। ছেলেটার ভয় দূর করা দরকার। ফরিদ আবার মাথা নিচু করল। আর ঠিক তখনই খাটের নিচে থেকে কেমন একটা আওয়াজ হলো।
মেঝেতে উপুড় হয়ে বিছানার ঝুলে থাকা চাদর সরিয়ে কিছু সময় অন্ধকারে তাকিয়ে থাকল ফরিদ। চোখে অন্ধকার কিছুটা সয়ে আসতেই সে লক্ষ্য করল এক জোড়া চোখ তার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
ফরিদের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ভয়ের একটি শীতল স্রোত যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেল। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তার কি হ্যালুসিনেশন হলো? সে তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এটা কী করে সম্ভব। বিছানার নিচে ভয়ার্ত চোখে ফরিদের দিকে তাকিয়ে আছে—ভিকি!
ভিকি? হ্যাঁ, ভিকিই তো। অবিকল ভিকির মতো। ফরিদের হৃৎপিণ্ড বলের মতো লাফিয়ে উঠল। এখানে ভিকি এলো কীভাবে? তাহলে বিছানার উপরে কে?
কাঁপাকাঁপা গলায় ভয়ার্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে ভিকি বলল, ‘কে যেন আমার বিছানার উপর বসে আছে বাবা।’

অন্যরকম এক অনুভূতির পরশ নিয়ে মিলির ঘুম ভেঙে গেল সকাল সাড়ে ছ’টায়।
ঘুম ভেঙে মিলি রুটিন মাফিক প্রথমেই গেল ভিকির রুমে। সকালে ভিকিকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে বাথরুমে পাঠাতে হয়। স্কুলের দিনে তাকে ইউনিফর্ম পরিয়ে, নাস্তা খাইয়ে তৈরি করে দিতে হয়। আজ স্কুল নেই—তবুও সে গেল তার রুমে।
ভিকির রুমে ঢুকেই মিলি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ—ঘটনাটা কী বোঝার চেষ্টা করল। যদিও সে বুঝতে পারল না।
ভিকির বিছানার পাশে মেঝেতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে ফরিদ। মিলির মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না—ফরিদ কেন মেঝেতে শুয়ে ঘুমবে। ঘুমানোর ভঙ্গিটাও অদ্ভুত। মনে হচ্ছে খাটের নিচে মাথা ঝুঁকিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে সে।
সম্ভবত রাতে ভয় পেয়ে ভিকি ফরিদকে ডেকেছিল। ভিকির সিঙ্গেল বেডে জায়গা হয় নি তাই হয়ত সে মেঝেতেই শুয়েছিল—পরে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাছাড়া আর কী কারণ হতে পারে। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত ঠেকল মিলির কাছে।
ভিকি ঘুমিয়ে আছে তার বিছানায়—স্বাভাবিকভাবেই। ভিকিকে ডাকতে গিয়ে হঠাৎ মিলির মনে পড়ল—আজতো স্কুল নেই। পরপর পাঁচ দিন প্রত্যুষে উঠার কারণে অভ্যাসবশত স্কুল ছুটির দিনেও মাঝে মাঝে খুব সকালে ঘুম ভেঙে যায়। ভিকির দিকে তাকিয়ে মিলির কেন যেন মনে হলো রাতে হয়তো ছেলেটির ভালো ঘুম হয় নি।
সে মনে মনে ভাবল, আচ্ছা থাক—আর একটু না হয় ঘুমাক। ছুটির দিনে একটু বেশি ঘুমলে ক্ষতি নেই। ফরিদকে কি ডেকে তুলে পাঠিয়ে দেবে তার ঘরে? কিছুক্ষণ ভেবে মিলি ফরিদের কাঁধে হাত রেখে খুব সাবধানে মৃদু স্বরে ডাকল—যাতে ভিকির আবার ঘুম ভেঙে না যায়। কিন্তু ফরিদের ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সে দ্বিতীয় বার আর ডাকল না।
মিলিরও ভালো ঘুম হয় নি। সে হাবিজাবি স্বপ্ন দেখেছে। কে যেন ঘুমের মধ্যে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। তার ক্ষীণ বিশ্বাস সেই কাজটি ফরিদই করেছে। কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারছে না। ঘটনাটা স্বপ্নেই ঘটুক আর বাস্তবে—ভিন্ন এক অনুভূতিতে ছেয়ে আছে তার মন। কেমন অলস অলস লাগছে। মিলি হাই তুলল। কড়া করে এক কাপ মশলা চা খাওয়া দরকার। ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা না হলে তার চলে না।
মিলি অতি দ্রুত রান্না ঘরের দিকে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই কোথা থেকে যেন একটা শব্দ ভেসে এলো। সে স্থির হয়ে শব্দের উৎস খুঁজতে এদিক ওদিকে তাকাল। মিলিকে চমকে দিয়ে বাথরুমের ভেতর থেকে বেসিনে পানি ছাড়ার আওয়াজ ভেসে এলো। বন্ধ বাথরুমের ভেতরে পানির কল ছাড়ল কে? মিলির শরীর হিম হয়ে গেল।
ভিকি আর ফরিদের রুমের মাঝের লাগোয়া বাথরুমের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। ভিকি যেভাবে জোরে বেসিনের পানি ছেড়ে দেয়—সেভাবেই কেউ পানি ছেড়ে দিয়েছে। মিলি ঘুরে তাকিয়ে দেখল ভিকি আর ফরিদ যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে। অথচ বাথরুমে কেউ একজন আছে—অন্য কারো উপস্থিতি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কে সেই অন্য কেউ?
মিলি দুরুদুরু বক্ষে একটু এগিয়ে বাথরুমের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার বুকের ভিতরটা ভয়ে ঢিপঢিপ করে উঠল। তবুও সে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, ‘কে? কে ওখানে?’
‘ইট’স মি মামি!’
কণ্ঠ শুনে মিলি কেঁপে উঠল—এত অবিকল ভিকির গলার শব্দ। এর মানে কী? কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে মিলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’ তার গলা দিয়ে কোনো রকমে একটা শব্দ বের হলো।
‘আমি ভিকি!’
মিলি জমে বরফ হয়ে গেল। ভিকি? তাহলে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে—সে কে? সে কি ভুল শুনল। কিন্তু পানির শব্দ? এই তো এখনো হচ্ছে। ভিকি যেভাবে জোরে বেসিনের পানি ছেড়ে দেয়—ঠিক তেমনই পানি ছাড়ার শব্দ হচ্ছে। মিলির ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো অনন্তকাল ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে। কতটা সময় পার হয়েছে কে জানে। তার সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। থিরথির করে কাঁপছে তার শরীর। যে কোনো মুহূর্তে সে জ্ঞান হারাবে।
‘ভিকি?’ অস্ফুটে একবার উচ্চারণ করল মিলি। তার চারিদিকে সব কিছু অন্ধকার হয়ে এলো।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *