বাথরুমে পানি পড়ার শব্দ হঠাৎ করেই থেমে গেল। সুনসান নীরবতায় ছেয়ে গেল চারিপাশ। মিলির শরীরের ওজন যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল কয়েকগুণ। সে কিছুতেই শরীর নাড়াতে পারছে না। তবুও ভারী পায়ে ধীরে ধীরে হেঁটে তার বিছানায় ফিরে গেল সে। প্রচণ্ড পানির পিপাসা পেল। কিন্তু বিছানা ছেড়ে যাবার মতো শক্তি অবশিষ্ট রইল না তার।
মিলির বেশ শীত লাগছে—রীতিমত কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল তার। সে দ্রুত ব্লাঙ্কেটের মধ্যে ঢুকে মুখ ঢেকে ফেলল। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে গেল তার শরীর। সে কি অজ্ঞান হয়ে গেল না ঘুমিয়ে পড়ল—তা বোঝার কোনো উপায় রইল না।
…
‘মামি, মামি।’ ক্ষীণভাবে একটি শিশুর ডাক মিলির কানে ভেসে এলো—মনে হলো বহু দূর থেকে একটি বাচ্চা ছেলে তার মাকে ডাকছে। তার মামি-মামি ডাকের সঙ্গে ভেসে এলো বাথটাবে পানি ছাড়ার শব্দ। ধীরে ধীরে পানির শব্দ বাড়ছে আর মামি ডাকের শব্দ ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে পানির শব্দের আড়ালে। এক সময় বাথটাবে ছেড়ে দেয়া পানির শব্দ সমুদ্র গর্জনের মতো শোনা যেতে লাগল। মিলির চোখের সামনে ভেসে উঠল ছেলেটি—সমুদ্র সৈকতে বসে বালি দিয়ে খেলছে আর ঢেউ আসার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দৌড় দিচ্ছে। হঠাৎ বড় একটা ঢেউয়ের ধাক্কায় চোখের নিমিষে ছেলেটা পড়ে গেল পানিতে। বাচ্চা একটা ছেলে, অনেক চেষ্টা করেও তার সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারল না—ভেসে গেল ফিরতি পানির টানে। মিলি উঠে দাঁড়াল—হাত বাড়িয়ে দৌড় দিল ছেলেটিকে ধরার জন্য।
ছেলেটির মামি-মামি ডাক আর শোনা যাচ্ছে না। মিলি দৌড়ে গিয়ে ঢুকল বাথরুমে। সাথে সাথেই স্থির হয়ে গেল তার শরীর। নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারল না। বাথটাব ভরে আছে পানিতে। সেই পানিতে উপুড় হয়ে ফুটফুটে একটি বাচ্চা ছেলে ভাসছে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে মিলি এক ঝটকায় তুলে নিল ছেলেটিকে। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গেছে। মিলির বুক ফেটে কান্না এলো–পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে থাকল সে। একসময় তার চিৎকার প্রলাপের মতো শোনা যেতে থাকল। মিলি ক্রমাগত বলতে থাকল, বাবু, আমার শোনা, কথা বল, কথা বল শোনা। ছেলেটির মুখ দিয়ে একটু পানি বের হলো শুধু, কোনো শব্দ বের হলো না। তার নিথর দেহ কোলে নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বসে রইল মিলি।
একটি এম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে মিলিদের বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। সাইরেনের তীব্র শব্দে মিলির ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। একটু ধাতস্থ হতেই সে বুঝতে পারল—এটি ছিল সেই স্বপ্ন, যেই স্বপ্নটি তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কতদিন থেকে!
জানালা গলে সকালের হলদে আর মিঠে রোদ ঢুকেছে মিলির বেডরুমে। পর্দা দিয়ে জানালা ঢেকে রাখতে পছন্দ করে না মিলি। তাই সকাল হতে না হতেই তার বাসা রোদের আলোতে হীরার মতো চকচক করে।
মিলির মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল সে। একটু পরেই আড়মোড়া ভেঙে একটা হাই তুলে নেমে পড়ল বিছানা থেকে।
রান্নাঘর থেকে তুমুল শব্দ ভেসে আসছে। ভিকি আর ফরিদ কথা বলছে। ভিকির কথাই শোনা যাচ্ছে বেশি—সে বেশ শব্দ করেই কথা বলছে। বাবা-ছেলে কী যে এত কথা বলে!
ফরিদ ভিকির জন্যে সকালের নাস্তা বানিয়েছে—ওল্ড ফ্যাশানড প্যানকেক সাথে হুইপড বাটার আর ম্যাপল সিরাপ। ভিকি কথা বলছে আর মজা করে খাচ্ছে। কথা বলতে বলতে ফরিদ দু’কাপ মশলা চা বানিয়ে ফেলল। চায়ে মশলা মেশানোই থাকে—শুধু দুধ-পানি মিশিয়ে জ্বাল করে পরিমাণ মতো চায়ের গুড়া ছেড়ে দিলেই হলো। মিলির খুব পছন্দ এই মশলা চা। এখন ফরিদের নিজেরও অনেক ভালো লাগে। মাঝে মধ্যে মিলির ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে, সে নিজেই চা-টা বানিয়ে ফেলে।
ফরিদ ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভিকির কথার উত্তর দিচ্ছে। ছুটির দিনে ফরিদ ভিকিকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়—বেশিরভাগই পার্ক কিংবা বাচ্চাদের খেলার জায়গা। এই সামারের লম্বা ছুটিতে ভিকিকে সকার ক্যাম্পে দেবার পরিকল্পনা ফরিদের। কিন্তু মিলি চায় ভিকি পিয়ানো বাজানো শিখুক।
‘গুড মর্নিং।’
ফরিদ আর ভিকি একসাথে ঘুরে তাকিয়ে দেখল মিলি দাঁড়িয়ে আছে। রান্নাঘরে ঢুকেই সে বাবা আর ছেলের কথোপকথন শুনছিল নিঃশব্দে।
ফরিদ বলল, ‘গুড মর্নিং।’
ভিকি কিছু বলল না দেখে মিলি আবার বলল, ‘গুড মর্নিং, ভিকি।’
ভিকি অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘গুড মর্নিং মাম্মি।’
ভিকির হাতে আইফোন। প্যানকেক খাওয়া বন্ধ করে সে গেম খেলছে ফোনে। মিলি খুবই বিরক্ত হলো। সে বলল, ‘ভিকি, ফোন রাখো। আগে খাওয়া শেষ করো, পরে খেলবে। দাও, ফোনটা দাও তো।’
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভিকি ফোন নামিয়ে রাখল টেবিলে। এক টুকরা প্যানকেক মুখে দিয়ে তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে।
মিলি সেটা লক্ষ্য করে বলল, ‘ছেলেটা একেবারে এডিক্টেড হয়ে যাচ্ছে—ফোন ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝে না।’
ভিকি মুখ গোমড়া করে বসে রইল। এজন্যেই ভিকি বাবাকে বেশি পছন্দ করে—ফোন নিয়ে বাবা তাকে কখনো কিছু বলে না।
ফরিদ কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল মিলির দিকে। সে একটা চুমুক দিয়ে বলল ‘বাপ-বেটা মিলে কী কথা হচ্ছিল শুনি?’
‘আজকে আমরা কোথায় যাবো সেই প্ল্যান করছিলাম।’ ফরিদ বলল।
‘প্ল্যান করছিলে ভালো—তাই বলে এত চিৎকার করতে হবে কেন? আমি তো ভাবলাম কী যেন হয়েছে। ছুটির দিনের সকালটা শুরু হয় তোমাদের দু’জনের চিৎকার চেঁচামেচিতে। একটু আস্তে কথা বলতে পারো না?’
ভিকি চোখ বড় করে ঘুরিয়ে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ একটু মুচকি হাসল। মিলি অবশ্য সেটা লক্ষ্য করল না। সে আবার বলল, ‘ছুটির দিনে সকালে একটু আরাম করে ঘুমাব—তারও উপায় নেই!’
প্রতি উইকএন্ডেই এই একই কথা শুনে শুনে ওরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কাজেই মিলির কথায় ফরিদ কিংবা ভিকি—দু’জনের কারো মধ্যেই তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিল না।
‘তোমার চা-টা বোধ হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। দাও গরম করে দেই।’ মিলির দিকে তাকিয়ে বলল ফরিদ।
‘সমস্যা নেই—আমি গরম করে নিচ্ছি।’
মিলি তার চায়ের কাপটা মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে এক মিনিট গরম করতে দিয়ে এক স্লাইস মাল্টিগ্রেইন ব্রেড টোস্টারে ঢুকিয়ে দিল।
মিলিদের রান্নাঘরের চারপাশটা বেশ সুন্দর খোলামেলা। জানালা দিয়ে অনেকখানি আকাশ দেখা যায়। প্রতিদিন সকালে এক কাপ চা নিয়ে বাইরের সুন্দর দৃশ্য দেখা মিলির অভ্যাস। সে তার ব্রেডে পিনাট বাটার লাগিয়ে চেয়ার টেনে বসল জানালার পাশে। এক কামড় ব্রেড আর এক চুমুক গরম চা—সাথে নির্মল আলোয় ছেয়ে যাওয়া প্রকৃতি। জানালা দিয়ে বাইরেটা আজ সবুজ মায়াময়। অন্যদিনে মিলির মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়—কিন্তু আজ তাকে এক ধরনের অস্বস্তি আঁকড়ে ধরে আছে।
মিলি চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। একবারও ফরিদ কিংবা ভিকির দিকে তাকাল না। সকালের এই সময়টুকু তার একান্তই নিজের। সে নিজের মতো করেই কাঁটাতে চায়।
জানালা দিয়ে এক ফালি সোনালী রোদ মিলির মুখের উপরে এসে পড়েছে। ঝট করে ফরিদের চোখ আটকে গেল সেখানে। ফরিদ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল মিলির দিকে। এত সুন্দর কী করে হয় কেউ? কী সরল—কী মায়াবী। কাঁধের পাশ দিয়ে লম্বা চুল ছড়িয়ে আছে তার কোমর অবধি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রহস্যময় দুটি চোখে মিলি আনমনে তাকিয়ে আছে বাইরে।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মিলির পাশে এসে দাঁড়াল ফরিদ। মিলি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখল তাকে, তারপর আবারো তাকাল বাইরে।
ফরিদও তাকাল মিলির সাথে, সেদিকে তাকিয়েই আস্তে করে ডাকল, ‘মিলি!’
‘উম।’
‘কিছু ভাবছ?’
মিলি কোনো উত্তর দিল না।
‘তোমার শরীর কি খারাপ?’
মিলি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘না।’ তারপর চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।
‘কাল রাতে আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।’ বলবে না বলবে না করেও ফরিদ বলে ফেলল কথাটা।
‘তাই—কী ঘটনা?’
‘উইয়ার্ড একটা ব্যাপার, বুঝলা। রাতে ভিকির ডাকাডাকিতে ওর রুমে গেলাম। দেখি জড়সড় হয়ে বিছানার উপরে বসে আছে সে। জানতে চাইলাম কী হয়েছে? ও বলল, কে যেন ওর বিছানার নিচে। আমি ওর ভয় ভাঙানোর জন্য নিচু হয়ে তাকালাম খাটের নিচে—তাকিয়ে আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।’ এটুকু বলে ফরিদ থেমে গেল।
মিলি তাকাল উৎসুক দৃষ্টিতে ফরিদের দিকে।
ফরিদ আবার বলল, ‘অন্ধকারে প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। অন্ধকার একটু সয়ে এলেই দেখি ভিকি চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।’
‘তুমি দেখলে ভিকি বিছানার নিচ থেকে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে?’
‘হ্যাঁ। তারপর বলল, ওর বিছানার উপর কেউ বসে আছে।’
মিলি চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকাল ফরিদের দিকে।
‘আজব না?’ ফরিদ বলল।
‘তারপর?’
ফরিদ চুপ করে রইল। সে আর কিছু মনে করতে পারছে না। সত্যিই কিছুই মনে পড়ছে না তার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘জানো আমার না আর কিছুই মনে পড়ছে না—ব্যাপারটা কী স্বপ্নে দেখলাম না সত্যিই ঘটল বুঝতে পারছি না। উইয়ার্ড!’
একটু ভেবে নিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি ফ্লোরে ঘুমিয়ে ছিলে কেন?’
‘ফ্লোরে ঘুমিয়ে ছিলাম মানে? কোথায়?’
‘ভিকির রুমে।’
‘কী বলো?’
মিলি কোনো উত্তর দিল না।
‘কই, কিছু মনে পড়ছে না তো!’ ফরিদ কপাল কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করল।
‘ঘুম ভাঙার পর কী দেখলে তুমি?’
‘ঘুম ভাঙার পর দেখি ভিকি আমার পাশে ঘুমিয়ে আছে—অথচ আমি মনে করতে পারছি না, আমি কখন ওকে আমার রুমে নিয়ে এসেছি।’
‘ঘুম ভেঙে দেখলে তুমি তোমার বিছানায় শুয়ে আছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভিকি তোমার পাশে?’
‘হ্যাঁ। কেন?’
মিলি আর কিছু বলল না। এই মুহূর্তে তার মাথায় কিছু প্রশ্ন চক্রাকারে ঘুরছে। তার মনে হচ্ছে, সামথিং ইজ রং—সামথিং ইজ ভেরি রং। এক ধরনের অস্থিরতা আঁকড়ে ধরল তাকে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘এত ঘনঘন ভয় পায় কেন ছেলেটা?’
একথা ঠিক, ভিকি সব কিছুতেই ভয় পায়। অন্ধকারে ভয় পায়। একা বাথরুমে যেতেও ভয় পায়। এত বড় বাড়ি। এতটুকুন একটা ছেলে, ছয় বছর এখনো হয় নি। ভয় তো একটু পেতেই পারে। ফরিদ মিলির কথার কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলল, ‘আমি ভাবছি বাসাটা বদলে ফেললে কেমন হয়। অন্য কোথাও মুভ করি চলো।’
‘বাসা বদলে ফেললেই কি স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে যাবে? কিংবা মনের ভয়? মনের ভয় তো যেখানেই যাবে সেখানেই সঙ্গী হয়ে যাবে।’
ফরিদ মনে মনে ভাবল, ‘আসলেই তো তাই। এভাবে তো ভেবে দেখা হয় নি।’ সে আর কিছু না বলে তাকিয়ে রইল বাইরে।
মিলিও চুপ করে আছে। সে একবার ঘুরে তাকাল ভিকির দিকে—ভিকি নিবিষ্ট মনে গেম খেলছে ফোনে। বাইরের সোনালি রোদের ঝলকানি বাড়ছে। মিলি উসখুস করছে কিছু একটা বলার জন্য। তার চোখ-মুখে এক ধরনের অস্থিরতা ফুটে উঠল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সে বলল, ‘সেই স্বপ্নটা আমি আবারো দেখেছি। আর…’
কথা শেষ না করে মিলি থেমে গেল। ফরিদ অবাক হয়ে তাকাল মিলির দিকে। নিজের অজান্তে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। মিলির স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা ফরিদ জানে। কিন্তু কথা শেষ না করে মিলি থেমে গেল কেন? ফরিদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মিলির দিকে।
অন্য কেউ (পর্ব-৩)
with
no comment

