marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-২০)

রাতের খাবার শেষ করে শোবার ঘরে বিছানায় আধশোয়া হয়ে টিভি দেখছিলেন রাকিবউদ্দিন সাহেব। জাহানারা পানের ডালা সাজিয়ে ঢুকলেন। পান বানিয়ে তার স্বামীর হাতে দিলেন। রাকিব সাহেব পান মুখে দিয়ে তাকালেন তার স্ত্রীর দিকে। জাহানারা কিছু বলছে না দেখে তিনি নিজেই বললেন, ‘ইমরান ছেলেটাকে তোমার কেমন মনে হয়?’
জাহানারা একটু পান মশলা মুখে দিয়ে বললেন, ‘ভালই তো।’ স্বামীর সঙ্গে তারও একটু আধটু পানের অভ্যাস হচ্ছে।
‘শুধু ভালই তো’র মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে তো চলবে না। একটু অন্যভাবে দেখতে হবে। বেগম জাহানারা, তুমি কি আমার ইঙ্গিত কিছু বুঝতে পারছ?’
জাহানারা মৃদু হেসে বললেন, ‘মনে হয় পারছি।’
রাকিবউদ্দিন বললেন, ‘ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি ওর ফ্যামিলি সম্পর্কেও খোঁজ নিয়েছি।’
‘আমি কি সোমার সাথে কথা বলব?’
‘অবশ্যই বলবে। তবে এখনই কিছু বলার দরকার নেই। সময় হোক—তাড়াহুড়ার কিছু নেই। ওকে আর একটু সময় দিতে হবে। সোমা এখন ডিপ্রেশন স্টেজে আছে। শী নীডস টাইম টু হীল।’
জাহানারা আর কিছু বললেন না।

শোবার ঘরের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সোমা। তার দ্যুতিময় শান্ত চোখে, অপলক তাকিয়ে আছে সে। গভীরভাবে দেখছে নিজেকে।
সোমা সুন্দর করে সেজেছে। পরিপাটি করে চুল আঁচড়েছে। চোখে কাজল, কপালে লাল টিপ। ঠোঁটে লিপস্টিক। নিজেকে দেখতে দেখতে সে হারিয়ে গেল ইমরানের কথায়। ইমরান বলেছিল, ‘আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, নিজেকে দেখবে, সুন্দর করে হাসবে। আয়নার মধ্যে আবিষ্কার করবে একজন নতুন সোমাকে।’
সোমা হাসল। তার সব মন খারাপের মেঘ এক নিমেষে উড়ে গেল। সে ভুলে গেল তার পেছনের কথা। ভুলে গেল রাজন নামে কোন ছেলেকে সে ভুল করে ভালবেসেছিল। ভালবেসে বিসর্জন দিয়েছিল তার অহংকারটুকু। দীর্ঘ সময় তাকিয়ে থেকে সত্যি সে দেখল একজন নতুন সোমাকে।

শাহেদের ফোন বেজে উঠল। অপরিচিত নাম্বার। শাহেদ বিরক্তি চোখে একবার দেখে লাইন কেটে দিল। ফোনটা বালিশের পাশে রেখে সে ঘুরে শুতে যাবে আর ঠিক তখনই ফোনটা আবার বেজে উঠল। ধরবে না ধরবে না করেও তিন রিং-এর মাথায় ফোন ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
শাহেদ যা ভেবেছিল তাই ঘটল। ওপাশের মানুষটি নিরুত্তর রইল। রাগে ফেটে পড়ল শাহেদ। সে হিসহিস করে বলল, ‘কথা বলছেন না কেন? সাহস থাকে তো কথা বলেন।’
হঠাৎ করেই ফোনের ভেতরে একটি মেয়ের ফুঁপিয়ে কান্নার শব্দ ভেসে এলো। সে ফোনটা চোখের সামনে একবার এনে আবার কানে নিয়ে ধরে চুপ করে রইল। এবার কান্নার শব্দ পরিষ্কার শোনা গেল। শাহেদ অস্ফুটে বলল, ‘নাতাশা!’
ওপাশ থেকে লাইনটা হুট করেই কেটে গেল। শাহেদ সাথে সাথেই সেই নাম্বারে ফোন করল। একবার না কয়েকবার। কিন্তু প্রতিবারই ফোন চলে গেল ভয়েজ মেসেজে—আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারটি ব্যস্ত আছে…।
ফোন নামিয়ে রেখে শাহেদ বসে রইল ঝিম ধরে। এভাবে কত সময় পার হয়েছে কে জানে, হঠাৎই শাহেদের ফোনে একটা টেক্সট মেসেজ এলো। একটা বাড়ির ঠিকানা। ৫ নম্বর সেক্টর, ৫/এ নম্বর রোড, ৯ নম্বর বাড়ি, উত্তরা। শাহেদ ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে রইল ঠিকানাটির দিকে। হঠাৎ চিৎকার দিয়ে উঠল শাহেদ, ‘ইউরেকা।’ সেদিন সুজন এই ঠিকানাটিই লিখেছে। সে খুব ভাল করেই লক্ষ করেছে। সে ঠিকানাটি দেখল আবার। এই ঠিকানাটি কে পাঠিয়েছে? মনে মনে তার প্রতি কৃতজ্ঞ হল শাহেদ। কিন্তু সে এই কাজটি কেন করল তার বোধগম্য হল না।

র‍্যাব-১ হেড অফিস।
র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‍্যাব-১) অফিসে যেয়ে শাহেদ আর ইমরান একটি কমপ্লেইন এন্ট্রি করল। একজন অফিসার তাদের অভিযোগটি ভালোমতো দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনারা শিওর?’
ইমরান নিশ্চিত করে বললে, ‘হ্যাঁ।’
‘নিশ্চিত হলেন কি করে?’
‘প্রথম ফোনে কণ্ঠস্বর চিনেছি। তারপর আমার এক বন্ধুকে পাত্র হিসেবে পাঠিয়ে আমরা দূর থেকে দেখেই চিনতে পেরেছি।’
‘দেখি, কোর্ট অর্ডারটি দিন।’
ইমরান আর শাহেদ মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।
‘কোর্ট অর্ডার এনেছেন?’
ইমরান আমতা আমতা করে বলল, ‘কোর্ট অর্ডার? জি না।’
‘কোর্ট অর্ডার নিয়ে আসুন। আমরা ইমিডিয়েটলি অ্যাকশন নেব।’
‘কোর্ট অর্ডার আনতে হবে?’ ইমরান অনিশ্চিত কণ্ঠে জানতে চাইল।
অফিসার বললেন, ‘জি। এ ধরণের আরও বেশ কয়েকটা কমপ্লেইন আমরা রেজিস্টার করেছি। কোর্ট অর্ডার পাওয়া মাত্রই আমরা রেইড দিয়েছিলাম বেশ কয়েকটা প্রতিষ্ঠানে। অবশ্য ধরতে পারি নি কাউকে। সব পালিয়েছে। তবে আমরা ইনফরমার লাগিয়েছি। ধরে ফেলব।’
শাহেদ আর ইমরান উঠে দাঁড়াল। অফিসার বললেন, ‘আপনাদের কেসটা আমরা দেখব। এবং দ্রুত ব্যবস্থা নেবো। গেট দ্য কোর্ট অর্ডার অ্যাজ সুন অ্যাজ পসিবল।’
অফিসারকে ধন্যবাদ দিয়ে ইমরান আর শাহেদ র‍্যাব-১ অফিস থেকে বের হয়ে গেল।

উত্তরার বাসা কাম অফিসে এজাজ আর জামান কথা বলছে। জামান ভীষণ চিন্তিত। ম্যারেজ মিডিয়া অফিসগুলোর ওপর পুলিশ আর র‍্যাব-এর নজর পড়েছে। ইদানীং ঘন ঘন রেইড দিচ্ছে। কিন্তু তারপরেও তো ব্যবসা চালিয়ে যেতে হবে। জামান চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘এজাজ, অনেক দিনতো হল, এবার গা ঝেড়ে খোলস থেকে বের হওয়া দরকার, কি বল?’
‘বুঝলাম না বস, বুঝায় বলেন।’
‘অফিসের কাজ বাসায় হয় না। প্রফেশনাল কাজের একটা ডেকোরাম আছে না?’
‘কিন্তু বস, পরিস্থিতি তো এখনো সুবিধার না। তার উপর হইছে নতুন যন্ত্রণা।’
‘নতুন যন্ত্রণা আবার কী?’
‘রাস্তায় বাইর হইলে মনে হয়, সবাই আমার দিকে তাকায় আছে। এই বুঝি ডাক দেয়। যন্ত্রণা না বলেন?’
‘যন্ত্রণা তো বটেই।’
‘সেদিন তো ধরা পড়তে পড়তে কোন রকমে বাইচা আসছি। তয় বস, আমার নাম ডাইকা গলা ছিঁড়া ফালাইলেও আমি পিছন ফিরা তাকাই না। সাথে সাথে দৌড়। যত তাড়াতাড়ি পারি কাইটা পড়ি।’
‘এখন থেকে লেবাসটা বদলে ফেলতে হবে। কালো সানগ্লাস। মাথায় হ্যাট। যতখানি ঢেকে চলা যায়। সাবধানের মার নেই।’
জামানের পরামর্শে এজাজের দুশ্চিন্তার কোন উনিশ-বিশ হল বলে মনে হল না। সে মুখ অন্ধকার করে বলল, ‘আমার মনে হয় আমরা এবার ধরা খাব। আমার মন টানতেছে না।’
‘এত চিন্তা করলে তো ব্যবসা করা যাবে না। সব ব্যবসাতেই রিস্ক আছে—নো রিস্ক, নো গেইন।’ কথাটি জামান বলল ঠিকই, কিন্তু সে নিজেও চিন্তার সাগরে ডুবে গেল।

নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
অনেকদিন পর সোমা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় মেতেছে। যদিও আগের মত উচ্ছ্বাস কিংবা হাসি-খুশি ভাবটা তার এখনো ফিরে আসে নি। কিন্তু সে ক্লাসে আসছে এবং বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায় শামিল হচ্ছে এটাও অনেক। সোমাকে ফোনে একটা এসএমএস এলো। সোমা মেসেজ দেখল—‘স্মাইল, ইট’স দ্যা সেকেন্ড বেষ্ট থিং ইউ ক্যান ডু উইথ ইয়োর লিপস!’
সোমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। সে একবার সামনের দিকে তাকাল। দূরে দৃষ্টি দিয়ে খুঁজল কাউকে। সোমার অবচেতন মন বলছে, মেসেজটি যে পাঠিয়েছে সে তাকে আড়াল থেকে লক্ষ করছে। সোমা স্মিত হেসে উঠে দাঁড়াল এবং বন্ধুদেরকে অবাক করে কাউকে কিছু না বলে হাঁটা শুরু করল। বন্ধুরা অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল সোমার চলে যাওয়ার দিকে।
আরেকটি মেসেজ এলো। হাঁটতে হাঁটতে সোমা দ্বিতীয় মেসেজটাও পড়ল—‘ডোন্ট ক্রাই ফর অ্যা ম্যান হু লেফট ইউ, দ্য নেক্সট ওয়ান মে ফল ফর ইয়োর স্মাইল।’ সোমা স্মিত হেসে আর একটু সামনে এগিয়ে গিয়েই থমকে দাঁড়াল। অবিশ্বাস্য দৃষ্টি মেলে এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইল তারপরেই চোখে মুখে উজ্জ্বল হাসি ছড়িয়ে এগিয়ে গেল সে।
আকাশ ফুড়ে যেন বেরিয়ে এলো ঝাঁকড়া চুলের ছেলেটি। চোখে কালো চশমা। চশমা খুলে এগিয়ে গেল সোমার দিকে। সোমা মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘এই যে মিস্টার, এখানে কী?’

ইমরান আর শাহেদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে র‌্যাব-১ এজাজ আর জামান প্রতারক চক্র শনাক্তে তদন্ত শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় একদিন র‌্যাব-১ এর একটি টিম ইমরান আর শাহেদকে সাথে নিয়ে উত্তরা (পশ্চিম) থানাধীন ৫ নম্বর সেক্টরের ৫/এ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাড়িতে অতর্কিতে অভিযান চালায়। র‍্যাব সদস্যরা প্রথমেই অফিসটি ঘিরে ফেলে চারদিক থেকে। অফিসে ঢুকেই শাহেদ আর ইমরান শনাক্ত করে এজাজ আর জামানকে। একজন ব্যস্ত ছিল ফোনে আর একজন প্রার্থী বাছাই নিয়ে।
শাহেদ চিৎকার দিয়ে বলল, ‘এইতো এরাই—সেই দুজন।’
ইমরানও নিশ্চিত করে বলল, ‘জি জি, এই সেই দুজন।’
একজন অফিসার দ্রুত হাতকড়া পড়িয়ে দিল এজাজ আর জামানকে। এজাজ-জামানের কয়েকজন অফিস কর্মচারীকেও ধরা হল। তারপর শুরু করল চিরুনি অভিযান। একটি ঘরথেকে ধরে আনা হল সুন্দরী জেরিনকে। র‍্যাব সদস্যরা সারা বাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজে উদ্ধার করল যেসব জিনিষ তার একটা তালিকা দেয়া যেতে পারে।
ভুয়া নিকাহ নামা, কম্পিউটার সাথে ছবি পরিবর্তন করার জন্য সফটওয়্যার, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত স্থাপনার ছবি, বিভিন্ন বয়সের সুন্দরী মেয়েদের ছবি, জন্ম নিয়ন্ত্রণ বড়ি, জন্ম নিরোধক উপাদান, টিভি-ডিভিডি প্লেয়ার, আরো হাবিজাবি অনেক কিছু।
অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই এজাজ, জামান, জেরিন সহ বাকীদেরকে র‍্যাবের পিকআপ ভ্যানে তোলা হল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। র‍্যাবের অভিযানের কথা প্রচারের জন্য কিছু মিডিয়া কর্মীকেও দেখা গেল চলে এসেছে।
টিভি রিপোর্টার লাইভ সম্প্রচার শুরু করে দিল, ‘রাজধানীতে ঘটকালির নামে প্রতারণা ব্যবসায় লিপ্ত রয়েছে কয়েকশো প্রতিষ্ঠান। এরা ঢাকা শহরের বিভিন্ন এলাকায় তাদের ম্যারেজ মিডিয়া খুলে প্রতারণার মাধ্যমে বিবাহ ইচ্ছুকদের ঠকিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। সঠিক আইনের অভাবে এসব প্রতিষ্ঠান বরাবরই থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। ইতিমধ্যেই উত্তরা থেকে এক ভুয়া পাত্রী সহ তিনজন প্রতারককে গ্রেফতার করেছে র‍্যাব সদস্যরা।’
ক্যামেরাম্যান ক্যামেরা ঘুরিয়ে এজাজ, জামান আর জেরিনের ওপর ফোকাস করল কয়েক মুহূর্তের জন্য। ক্যামেরা আবার রিপোর্টারের উপর ফোকাস করতেই সে বলে চলল, ‘এই চক্রের হাতে প্রতারিত দুই যুবক, শাহেদ আহমেদ ও ইমরান হোসেন খানের সহযোগিতায় র‍্যাব সদস্যরা এদের ধরতে সক্ষম হয়। এই তিন প্রতারক গত কয়েক বছর ধরে সহজ প্রাণ যুবকদের কাছ থেকে হাতিয়ে নিয়েছে প্রায় অর্ধ কোটি টাকা। শুধুমাত্র একজন সুন্দরী তরুণীকে পুঁজি করে কয়েকজন মিলে দেশের নামি দামি কিছু পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দিয়ে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর নাকের ডগায় এই প্রতারণা ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছে। এভাবে প্রতারিত হওয়া অনেকটা লজ্জার বলে অনেকেই আর আইনের সাহায্য নেন না। ফলে নির্বিবাদে এরা চালিয়ে যাচ্ছে তাদের ব্যবসা। জুলিয়া রহমান, স্বাধীনতা টিভি, উত্তরা-ঢাকা।’

কয়েকদিন পর। শাহেদ আর ইমরান র‍্যাব অফিসে গেল খবর নিতে। ওদের কেসটি যে অফিসার তদন্ত করছেন, তিনি বললেন, ‘আমরা এই দুই প্রতারককে রিমান্ডে দিয়েছি। ইন্টারোগেশন চলছে।’
ইমরান আগ্রহী হয়ে জানতে চাইল, ‘সোনিয়া নামে মেয়েটার কোন খবর বের করতে পেরেছেন?’
‘আমাদের কাছে নাম এসেছে সোনিয়া ওরফে তানিয়া ওরফে নাতাশা। ধারণা করছি, শী ইজ ওয়ান অফ দ্যা ইম্পরট্যান্ট মেম্বারস অফ দ্যা নেটওয়ার্ক। বিষয়টি আমরা তদন্ত করে দেখছি।’
ইমরান আর শাহেদ দৃষ্টি বিনিময় করল।
‘পুলিশ ওকে খুঁজছে। ওকে গ্রেফতার করতে পারলে এই প্রতারক চক্রের আরও তথ্য আমরা বের করতে পারব।’
ইমরান আর শাহেদ তদন্তকারী অফিসারকে ধন্যবাদ জানিয়ে বের হয়ে এলো র‍্যাবের অফিস থেকে।

সেদিন মধ্যরাত।
শাহেদের ফোনে ভৌতিক ফোন কল আসার সময় হয়েছে। প্রায় প্রতিদিন একবার কল আসছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ফোন কেটে দিচ্ছে। শাহেদ জানে এটা নাতাশা। তবে সে কেন কথা বলছে না সেটা একটা রহস্য। ভৌতিক ফোন বাজল। শাহেদ চরম বিরক্তি নিয়ে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
অপরপ্রান্ত থেকে কেউ সাড়া দিল না।
‘হ্যালো, কথা বলছেন না কেন? আপনি কী চান আমার কাছে? কেন এভাবে বিরক্ত করছেন?’
হঠাৎই অস্ফুটে কেউ বলল, ‘শাহেদ!’
এ নাতাশা না হয়ে যায়ই না। নাতাশার কণ্ঠ শাহেদের ভুল হবার কথা না, ভুল হতে পারে না। সে নিশ্চিত হয়েই বলল, ‘নাতাশা! নাতাশা তুমি? ইজ দ্যাট ইউ?’
‘হ্যাঁ।’ ভাঙা কণ্ঠে বলল নাতাশা।
শাহেদ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সে তার উত্তেজনা চেপে রাখতে পারল না। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘ওহ মাই গড! আই ক্যান’ট বিলিভ দিস। আমি জানতাম, তুমি কল করবে!’ একটু থেমে শাহেদ অভিমান আর আবেগ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, ‘কী করে পারলে তুমি, নাতাশা? হাউ কুড ইউ ডু দিস টু মি?’
‘আই’ম সরি।’
হঠাৎ করেই শাহেদ ফেটে পড়ল রাগে। ক্রোধে অন্ধ হয়ে যাবার অবস্থা হল তার। সে গজগজ করতে করতে বলল, ‘জাস্ট সরি? হাউ ডেয়ার ইউ? শোন মেয়ে, তোমার দিন শেষ! ইউ আর অ্যা ডেডগার্ল নাতাশা অর সোনিয়া অর হুএভার ইউ আর। ইউ আর ডেড। তোমার পার্টনাররা ধরা পড়েছে, তুমিও পড়বে। পুলিশ তোমাকে খুঁজছে।’
‘ওরা আমার পার্টনার নয়।’
‘ইউ লায়ার! ওরা তোমার পার্টনার নয়, তবে ওরা কারা?’
‘শাহেদ, শাহেদ প্লিজ!’ নাতাশা অনুনয় করে বলল, ‘আমার একটা কথা শোন। তোমাকে আমি সব বলব। আমার সব কথা শুনলে বুঝতে পারবে। আই’ম নাথিং মোর দ্যান অ্যা ভিক্টিম লাইক ইউ!’
‘আবার, আবার মিথ্যে কথা? আর কোন খেলা তুমি আমাকে নিয়ে খেলতে চাও? রাস্তার মেয়েদেরও একটা ধর্ম আছে, তুমি ওদের চেয়েও নীচ। ভণ্ড! প্রতারক! দে আর অ্যাটলিস্ট অনেস্ট, নট ফ্রড লাইক ইউ!’
নাতাশা ভেঙে পড়ল শাহেদের এহেন কথায়। তবুও সে মরিয়া হয়ে বলল, ‘শাহেদ, আমি বেশিক্ষণ কথা বলতে পারব না। তুমি শুধু একবার আমাকে তোমার সাথে দেখা করতে দাও। তারপর যত খুশি বাজে কথা বলতে চাও, বল। আমি কিছু মনে করব না। শুধু একবার দেখা করতে দাও, প্লিজ!’
‘তোমার কোন কথাই আমি শুনতে চাইনা। ইউ হ্যাভ কজড এনাফ ড্যামেজ ইন মাই লাইফ—নাউ গো টু হেল। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু সি ইয়োর ফেস। নেভার।’
‘শাহেদ প্লিজ!’
তারপর দীর্ঘ নীরবতা। কেউ আর কোন কথাই বলতে পারল না। ওপাশ থেকে ভেসে এলো নাতাশার চাপা কান্নার আওয়াজ। কান্নার ফাঁকে-ফাঁকে জড়ানো গলায় অনুনয় করে চলল—একটিবার তার দেখা করা খুবই জরুরী।
শাহেদ মূর্তির মত বসে রইল।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৯)

ম্যারেজ মিডিয়া অফিস বন্ধ করে এজাজ আর জামান তাদের ঠিকানা বদলে নতুনভাবে ব্যবসার ধান্ধা শুরু করেছে। তারা তাদের ভবিষ্যৎ কার্যক্রম নিয়ে কথা বলছে। জামান চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘এজাজ, তোমার ম্যাডামের কোন হদিস পেলে? ওর বোনের বাসায় গেছিলা?’
‘গেছিলাম বস, নাই। বুঝতেছি না কোথায় যে গা ঢাকা দিল? শালী তো ফোন ধরে না।’
‘ওর গ্রামের বাড়িতে খোঁজ নিতে হবে। ও ধরা পরলে কিন্তু আমাদের বিপদ হবে।’
‘আমার তো মনে হয় না বস, সে শহরেই আছে কোথাও।’
‘হুম, কিন্তু আমাদের তো আর এভাবে বসে থাকলে চলবে না।’
‘তাইলে নতুন পাত্রীর অ্যাড দিয়া দেই।’
‘নতুন পাত্রীর অ্যাড দিবা?’
‘জি বস।’
‘মডেল ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে। এই যে দেখেন।‘ একটা ফোল্ডার বের করে এজাজ মডেলের ছবি দেখাল জামানকে। মডেলের ছবি হাতে নিয়ে ভালোমতো পরখ করে সন্তুষ্ট চিত্তে ছবি ফিরিয়ে দিয়ে বলল, ‘প্রোফাইল ঠিক করছ?’
‘জি বস।’ এজাজ পড়ল, ‘বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ সিটিজেন পাত্রীর জন্য জরুরী ভিত্তিতে একজন পাত্র প্রয়োজন। পাত্রকে লন্ডন নিয়ে যাওয়া হবে।’
‘মডেলের নাম কী রাখছ?’
‘নাম ঠিক করছি জেরিন।’
‘জেরিন, বাহ সুন্দর নাম।’ বলল জামান, ‘ঠিক আছে, পেপারে অ্যাডটা দিয়ে দাও। তবে আপাতত আমরা কাজ করব বাসা থেকে। আর তুমি হবে পাত্রীর ভাই। আইডিয়াটা কেমন?’
‘আইডিয়াটা খারাপ না।’ বলেই এজাজ হাসল খুশি মনে।

সুজন বসে বসে ভাবছিল, নতুন কী ব্যবসা কিংবা কাজ করা যায়? সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, জমির দালালি সে আর করবে না। তার নিরবচ্ছিন্ন ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে তাঁর ফোন বেজে উঠল। ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে বিল্টুর কণ্ঠ শোনা গেল। সুজন বলল, ‘হ্যাঁ বিল্টু, খোঁজ বাইর করতে পারলি কিছু?’
বিল্টু বলল, ‘কিছু কিছু খোঁজ বাইর করছি, তয় পুরাপুরি লিস্ট করতে আরও কয়দিন সময় লাগবে। ফার্মগেট, শান্তিনগর, কাকরাইল, পল্টন, উত্তরার কয়টার খোঁজ পাইছি। আমি নামগুলি পড়তেছি, আপনি শুনেন—’ বিল্টু একটা কাগজ বের করে কিছু নাম পড়ে শোনাল। ‘ঘটক সাথী, সন্ধি মিডিয়া, কানেকশন, ঘটক রিয়া, ঘটক কেয়া, মিস ওয়ার্ল্ড, রয়েল মিডিয়া, ঘটক কাজি ভাই, ঘটক রত্না, নান্টু ঘটক, ঘটক ঝুমা…’ এটুকু পড়ে বিল্টু থেমে বলল, ‘বস, লম্বা লিস্ট, আরো শুনবেন?’
‘না, না আর শুনতে হবে না। এবার তুই আরেকটা কাজ কর।’
‘বলেন বস।’
‘এইগুলার সব ফোন নাম্বার আছে না?’
‘জি বস, আছে।’
‘এইবার শোন… এজাজ, জামান, মিজান কিংবা মাহবুব এই চার নামের যেকোনো একজনের হদিস পাইলে সাথে সাথে আমারে জানাবি, ঠিক আছে?’
‘ঠিক আছে, বস।’
সুজন ফোন কেটে দিয়ে পুনরায় তার ভাবনার জগতে ডুবে গেল।

ইমরানকে সুজনের বাসার ঠিকানা দিয়ে দেখা করতে বলল শাহেদ। যত দ্রুত সম্ভব। ইমরান ঠিকানা খুঁজে দরজায় নক করতেই শাহেদ দরজা খুলে দিল। শাহেদ ইমরানকে ভেতরে আসতে বলল। ইমরান কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখতে পেল সুজনকে। ইমরান বলল, ‘কী ব্যাপার শাহেদ?’
‘ব্যাপার আছে। একটু বস। একটা সারপ্রাইজ দেব। তার আগে পরিচয় করিয়ে দেই।’ সুজনের দিকে তাকিয়ে শাহেদ বলল, ‘সুজন ভাই, এই হচ্ছে ইমরান। ওর কথাতো আপনাকে বলেছি।’
ইমরান হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল সুজনের সাথে। তারপর শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী সারপ্রাইজ?’
‘গেস হোয়াট! আই ফাউন্ড দেম, অ্যাটলিস্ট ওয়ান অফ দেম। এক মিনিট। দেখতো চিনতে পার কি না?’
শাহেদ একটা নাম্বারে ফোন করল। অপরপ্রান্ত থেকে যার কণ্ঠ ভেসে এলো—তার কণ্ঠ খুবই পরিচিত ঠেকল। সে এজাজ। শাহেদ ফোন চাপা দিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ইট’স হিম।’ শাহেদ স্পিকার বাটন অন করে দিল। এবার এজাজের কণ্ঠ পরিষ্কার শুনতে পেল সবাই।
এজাজ আবার বলল, ‘হ্যালো? হ্যালো, হ্যালো কে?’
ইমরান, শাহেদ আর সুজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। সবার মধ্যে একধরণের চাঁপা উত্তেজনা কাজ করছে। সবাই তাকিয়ে আছে ফোনের স্পিকারের দিকে। এজাজ আবার বলল, ‘কী যন্ত্রণা, কথা বলে না কেন?’
শাহেদ লাইন কেটে দিল। ইমরান উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘ইটস হিম। ইট’স ডেফিনিটলি হিম। আই’ম শিওর। মোর দ্যান হান্ড্রেড পারসেন্ট।’

এজাজের দিকে তাকিয়ে জামান প্রশ্ন করল, ‘কে?’
এজাজ বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘আরে কোন হারামজাদা যেন বারে বারে ফোন করতেছে, কিন্তু কথা বলে না। হ্যালো বললে, চুপ করে থাকে।’
‘মনে হয় নতুন অ্যাডটা দেখে কল করছে। নেটওয়ার্কেরও সমস্যা হতে পারে, মে বি সিগন্যাল পাচ্ছেনা।’
‘তা-ই হবে। অনেকক্ষণ ধইরা চেষ্টা করতেছে।’
‘যাই হোক, আমাদের রেডি হয়ে থাকতে হবে। কেউ কল করলে তুমি অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিয়ে দাও। লেটস গেট ব্যাক টু বিজনেস।’
এজাজ আর জামান ঠিকানা বদলে নতুনভাবে কার্যক্রম শুরু করেছে। সেই সাথে দু’জনেই বদলে ফেলেছে তাদের বাহ্যিক রূপ। এজাজ চুল লম্বা করে অনেকটা বাউল-সাঁইদের মত করেছে। থুতনির কাছে অল্প একটু দাড়ি রেখেছে। চোখে চিকণ ফ্রেমের জিরো-পাওয়ারের চশমা। অন্যদিকে, জামান রেখেছে ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি। সাথে লম্বা মোচ। চুলের কাট আর দাড়ির স্টাইল নিমেষেই ভোল পাল্টে দিতে পারে যে কোন মানুষের। এজাজ আর জামান ভোল পাল্টে নেমে পড়েছে। চুপচাপ বসে থাকলে তো চলবে না।
উত্তরা আবাসিক এলাকায় একটা বাসা ভাড়া নিয়েছে তারা। দু’রুমের বাসা। সাথে বসার ঘর, রান্নাঘর, কমন বাথরুম আর ছোট একটা বারান্দা। বসার ঘর থেকেই তাদের অফিসের কাজ চলছে আপাতত।
লম্বা লম্বা মোচ থাকার সুবিধা অনেক! কাজ না থাকলে টেনে টেনে সময় পার করা যায়। জামান তার লম্বা মোচ টানতে টানতে সোফায় বসে থাকা মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘জেরিন?’
জেরিন, এজাজ আর জামানের নতুন টোপ। পঁচিশ বছরের অনিন্দ্যসুন্দরী। স্মার্ট। ইংরেজিতে পারদর্শী। ব্রিটিশ উচ্চারণেও কথা বলতে পারে। সে সপ্রতিভভাবে তাকাল জামানের দিকে।
‘কি তুমি রেডি তো?’ জামান জানতে চাইল।
‘জি। রেডি।’
‘ঠিকমত বলতে পারবে তো, সবকিছু?’
‘অবশ্যই পারব। কি বলেন!’ জেরিনের কণ্ঠে দৃঢ়তা স্পষ্ট।
‘গুড। আই লাইক দ্যা কনফিডেন্স।’ বলেই জামান তাকাল এজাজের দিকে। বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘গুড সিলেকশন!’
এজাজের মুখে তৃপ্তির হাসি। এজাজের হাসির মধ্যেই তার ফোন বেজে উঠল আবার। সে হ্যালো বলতেই অপরপ্রান্ত থেকে কেউ বলল, ‘হ্যালো, স্লামালিকুম। আমি পত্রিকায় অ্যাড দেখে কল করেছি। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে চাই।’
এজাজ ফোনটা সামনে এনে নাম্বার দেখে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কোথা থেকে কল করতেছেন?’
‘ঢাকা থেকে।’
‘আচ্ছা একটু ধরেন।’ এজাজ দ্রুত তার নোটবুক খুলে তারিখ দেখে বলল, ‘আগামীকাল দুপুরের পরে আসেন।’
‘ভাই ঠিকানাটা একটু দেন।’
‘আচ্ছা, লেখেন।’ এজাজ ঠিকানা বলল। ‘কী নাম আপনার?’
‘আমার নাম সুজন জোয়ার্দার।’ ঠিকানা লিখতে লিখতে সুজন বলল।
ঠিকানা লেখা শেষ করে যুদ্ধ জয়ের হাসি নিয়ে সুজন তাকাল শাহেদ আর ইমরানের দিকে।

গভীর রাত।
সোমার ঘুমের সমস্যা দিনে দিনে প্রকট হচ্ছে। কিছুতেই ঘুম আসে না। প্রায় রাত সে নির্ঘুম কাটায়। সারাদিন মাথা ধরা নিয়ে দিন কাটে তার।
সোমা বসে আছে তার ঘরের বারান্দায়। বেশিরভাগ সময় তার কাটে বারান্দায় বসে থেকে। সে একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। তার শীত শীত লাগছে একটু। সোমার ফোন বাজল। এত রাতে কে ফোন করতে পারে ভাবতে ভাবতে সে ঘরে এসে ফোন ধরল। ফোনের কোন নাম্বার উঠে নি। সে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো?’
অপরপ্রান্ত থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ ভেসে এলো। কণ্ঠস্বর চিনতে সোমার কষ্ট হল না মোটেও। সোমার অনেক পরিচিত কণ্ঠ। সোমা চুপ করে রইল। হঠাৎই তার শরীর কেঁপে উঠল। নিজেকে স্থির রাখতে কষ্ট হচ্ছে।
‘সোমা, আমি রাজন।’
সোমা খুব স্বাভাবিক ভাবে বলল, ‘বল শুনছি।’
‘তুমি কি জানো আমি এখন কোথায়?’
‘কোথায়?’
‘নিউইয়র্কে।’
‘ও।’
সোমা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে চুপ করে রইল।
‘সোমা।’
‘বল।’
‘আমি জানি, তুমি কী ভাবছ।’
‘কী ভাবছি?’
‘ভাবছ, কেন আমি এমন করলাম?’
সোমা কিছুই বলল না।
রাজন আবার বলল, ‘আমি জানি তুমি আমাকে ঘৃণা করছ। আর সেটাই স্বাভাবিক।’
আবারো নীরবতা। কিছু সময় নিয়ে রাজন বলল, ‘আজীবন লালিত স্বপ্ন পূরণের স্বার্থে তোমার সাথে বড় ধরণের একটা অন্যায় করেছি সোমা। আমি যা করেছি তার কোন ক্ষমা নেই জানি, তবুও যদি পার, আমাকে ক্ষমা করে দিও।’
‘আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি।’ সোমা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘তবে আমার কষ্ট একটাই—আমি আমার সব কিছু দিয়ে একজন ভুল মানুষকে ভালবেসেছিলাম। তুমি অন্তত নিজের কাছে সৎ থাকতে পারতে, রাজন।’
রাজন কিছু বলতে পারল না। কিছু বলার মত মনের জোর তার নেই—থাকার কথাও না।
সোমা শীতল কণ্ঠে বলল, ‘ক্যান ইউ ডু মি অ্যা ফেভার? আমার একটা কথা রাখবে, রাজন?’
রাজন আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘বল?’
‘ভবিষ্যতে আমাকে আর কখনও কল করবে না। যোগাযোগেরও চেষ্টা করবে না। প্লিজ আমার এই একটি কথা অন্তত রাখার চেষ্টা কর।’
রাজন চুপ করে রইল। সোমাও চুপ। কিছুক্ষণ শুধু দু’জনের নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো। হঠাৎ করেই ফোনটা কেটে দিয়ে মূর্তির মত বসে রইল সোমা। তারপর কান্নায় ভেঙে পড়ল। ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকল।
সোমাদের বাসার ছাদে দাঁড়িয়ে আছে সোমা আর ইমরান।
ইমরান অনেক ভেবেও সোমাকে সান্ত্বনা দেবার মত কোন ভাষা খুঁজে পেল না। সে চুপ করে সোমাকে কাঁদতে দিল কিছুক্ষণ। সোমার জীবনের এই অন্ধকার দিকটার কথা জানার পর থেকে সোমার প্রতি ওর মমতা আরো বেড়ে গেল। মেয়েটা এভাবে কষ্ট পাচ্ছে!
কান্নাটা একটু ধরে এলে সোমা বলল, ‘ঐদিন প্রথমবারের মত সত্যি সত্যিই বুঝলাম, রাজন চলে গেছে। অথচ, ওর ফোন আসার একমুহূর্ত আগে পর্যন্ত আমি কারো কথাই বিশ্বাস করি নি। অ্যান্ড দেন আই অ্যাকচুয়ালি রিয়ালাইজড ইট ওয়াজ ওভার ফর গুড!’
ইমরানের এখনও বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে। সে বলল, ‘আমি ভাবতেই পারিনা, তোমার মত একটা মেয়ের সাথে কীভাবে কেউ প্রতারণা করতে পারে?’
সোমা কিছু বলল না। শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল যতদূর দৃষ্টি যায়।
ইমরান একটু সময় নিয়ে বলল, ‘আমার কি মনে হয় জান? আমরা সবাই কোন না কোন ভাবে প্রতারিত হচ্ছি। কে জানে, এটাই হয়তো নিয়ম।’
সোমা চকিতে একবার তাকাল ইমরানের দিকে। তারপর আবার ঘুরে তাকিয়ে রইল সম্মুখ পানে।
ইমরান বলল, ‘সবার জীবনে কিছু স্বপ্ন থাকে। কারোটা পূরণ হয়, কারোটা ভেঙে যায়। তাই বলে জীবনতো থেমে থাকে না। লাইফ গোজ অন।’
সোমা শুনছে ইমরানের কথা। ইমরান বলে চলল, ‘একটা মেয়ে যখন কোন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে, সে তখন নিজের মধ্যে হারিয়ে যায়। তার সমস্ত চিন্তা ভাবনা ঐ সম্পর্কের আবর্তে ঘুরপাক খায়। দ্যাট ক্যান বি ডেঞ্জারাস সামটাইম।’
দীর্ঘ সময় চুপ করে থেকে ইমরানের কথা শুনেছে সোমা। এবার সে সাড়া দিয়ে বলল, ‘কেন?’
‘কেননা, ঐ সম্পর্কের বাইরে সে আর কিছুই ভাবতে পারে না।’ ইমরান সোমার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঐ ঘূর্ণির বলয় থেকে তোমাকে বের হয়ে আসতে হবে সোমা।’
‘কিভাবে?’ প্রশ্ন করে সোমা তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে।
‘কিভাবে…?’ ইমরান বলল, ‘একদিন ঘুম থেকে উঠে সারাদিনের জন্যে পেছনের কথা ভুলে যাবে। ভুলে যাবে যে মানুষটাকে বিশ্বাস করে মনে প্রাণে ভালবেসেছিলে, তার কথা। একটা দিন কাটিয়ে দেবে, তার কথা একবারের জন্যেও মনে করবে না। তারপরের দিন দেখবে, তুমি একজন নতুন মানুষ। দেখবে, তার কথা না ভেবেও বেঁচে থাকা সম্ভব।’
‘তারপর?’
‘তারপর আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াবে, নিজেকে দেখবে, সুন্দর করে হাসবে। আয়নার মধ্যে আবিষ্কার করবে একজন নতুন সোমাকে।’
সোমা দু’হাত ভাঁজ করে বলল, ‘আয়নার সামনে দাঁড়াব, নিজেকে দেখব, সুন্দর করে হাসব—তারপর নিজেকে আবিষ্কার করব নতুনভাবে। ইজ দ্যাট সিম্পল?’
‘ইট ইজ!’
সোমা অবাক চোখে দেখল ইমরানকে। তারপর বলল, ‘ভাবতে অবাক লাগে, আপনার মত এমন স্মার্ট ছেলেও কিভাবে ভুল করে, প্রতারিত হয়?’
‘জীবনে আমরা সবাই ভুল করি। কেউ বুঝে, কেউ না বুঝে। সবাই কোন না কোন ভাবে ঠকি। বিশ্বাস করি, আবার ঠকি। আই গেস, ইটস এ পার্ট অফ লাইফ।’
ইমরানের কথাগুলো একরাশ মুগ্ধতা ছড়িয়ে দিল সোমার মনে। সে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৮)

বায়তুল মোকাররম চত্বরে ভিড়ের মধ্যে হঠাৎ করেই দেখা গেল হায়দার হোসেনকে। পাঠক, মনে আছে হায়দার হোসেনের কথা? ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে বসে যিনি অনর্গল কথা বলে যাচ্ছিল, নায়াগ্রা ফলসের সব বরফ জমে যাওয়ার ইতিহাস বলছিল তাঁর পাশের আরেক প্রার্থীর কাছে।
ভীড় ঠেলে এগিয়ে আসছিল অতি কথক হায়দার। হঠাৎ তাঁর চোখ আঁটকে গেল পাশের একটি দোকানে। সে থমকে দাঁড়াল। ধীর পায়ে সে এগিয়ে গেল। দোকানে দাঁড়িয়ে মোবাইল ফোনের কাভার দরদাম করছে মানুষটাকে তাঁর পরিচিত মনে হল। বেশ কিছুদিন সে এই লোক আর তাঁর পার্টনারকে খুঁজছে। হায়দার আরো কাছে গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আরে, এজাজ সাহেব না?’ সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ আপনিই তো!’
এজাজ হকচকিয়ে গেল। ঘুরে তাকিয়ে দেখল হায়দারকে। সে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল কী করতে হবে। এজাজ হাসি হাসি মুখ করে বলল, ‘আরে ভাই আপনি? কী খবর, কেমন আছেন?’
‘কেমন আছি জানস না? শুয়োরের বাচ্চা—তোরে খাইছি, আইজক্যা! শালা ফ্রড। এই ধর।’
এজাজ হাত থেকে ফোনের কাভার ফেলে দিয়ে দিগ্বিদিক দৌড়ে মিশে গেল ভিড়ের মধ্যে।
হায়দার আশেপাশের সবাইকে দেখিয়ে বলল, ‘ভাই ধরেন তো। ঐ ব্যাটারে ধরেন।’
এজাজ দ্রুত রাস্তা টপকে এক দৌড়ে জিপিওর সামনের রাস্তায় একটা খালি সিএনজিতে লাফ দিয়ে উঠে পরল। পেট চেপে কোঁকাতে কোঁকাতে বলল, ‘ভাই, তাড়াতাড়ি একটা হসপিটালে যান। ইমারজেন্সি। মরে গেলাম। আহ, উহ।’
হায়দার পেছনে দৌড়ে এসেও এজাজকে ধরতে পারল না। সিএনজি চালক ঝরের গতিতে বের হয়ে গেল ভিড়ের মধ্য থেকে।
সিএনজি চালক জিপিও মোড় পার হয়ে কিছুদূর এগিয়ে যেতেই এজাজ বলল, ‘এই থামেন।’
চালক অবাক হয়ে পেছনে তাকাল। এজাজ আবার বলল, ‘থামাইতে বলতেছি কানে যায় না কথা?’
চালক গাড়ি থামাতেই এজাজ সুস্থ মানুষের মত নেমে বলল, ‘কত হইছে?’
চালকের মুখে কোন কথা নেই। সে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে এজাজের দিকে।
‘ধুর মিয়া, এই ধরেন।’ এজাজ তাঁর পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট চালকের হাতে দিয়ে দ্রুত রাস্তার উল্টো দিকে হাঁটা শুরু করল।
সিনএনজি চালক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইল এজাজের গমন পথের দিক।।

শাহেদের সব কথা খুব মনোযোগ দিয়ে শুনে সুজন বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছে না শাহেদ এই প্রতারক চক্রের হাতে নাকানি চুবানি খাচ্ছে। সে গম্ভীর হয়ে বলল, ‘তুমি তো দেখি বড় রকমের ধরা খাইছ, শাহেদ।’
শাহেদ বিচলিত কণ্ঠে বলল, ‘এখন আমি কী করব?’ সে ভেঙে পড়ল। তার চোখ ভিজে এলো।
‘ব্যবস্থা নিতেছি, তুমি চিন্তা কইর না।’ সুজন তাকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘আমার নেটওয়ার্কের কারো না কারো কাছ থেকে খবর বের করে ফেলব। দাঁড়াও এক মিনিট।’
সুজন তাঁর ফোন থেকে কাউকে ফোন করল। অপর প্রান্ত থেকে হ্যালো বলতেই সুজন বলল, ‘হ্যালো, কে বিল্টু? আমি সুজন।’
‘জি বস।’
‘বিল্টু শোন, জরুরী একটা কাজ করে দিতে হবে তোর।’
‘কাজটা কী বস?’
‘কাজটা হল, ঢাকা শহরের যত ম্যারেজ মিডিয়া এজেন্সি আছে, তার একটা লিস্ট কালকের মধ্যেই আমি চাই। পারবি না বাইর করতে?’
‘কী মিডিয়া কইলেন বস?’
‘ম্যারেজ মিডিয়া।’
‘ম্যারেজ মিডিয়াটা কী জিনিস?’
‘ম্যারেজ মিডিয়া জানস না? আরে গর্দভ, ম্যারেজ মিডিয়া হইল ঘটকালির কারখানা। সোজা বাংলায় বিয়ার দালালি করে যারা। এইবার ক্লিয়ার?’
‘জি, বস, ক্লিয়ার। আমারে একটা দিন সময় দেন।’
সুজন ফোন কেটে দিয়ে শাহেদের দিকে ফিরে হেসে দিল। ‘দেখলা তো? কাজ শুরু করে দিলাম। তুমি একেবারেই চিন্তা করবা না। এখন তুমি নিশ্চিন্তে বাসায় যাও। আমি খবর হলেই তোমারে জানাব।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ, সুজন ভাই।’
‘আরে থ্যাঙ্ক ইউ পরে দিলেও চলবে। কাজটা হোক আগে।’
কৃতজ্ঞতায় শাহেদের চোখ ভিজে এলো। এই মানুষটারে কত তাচ্ছিল্যের চোখে দেখে সবাই—অথচ, কত বড় হৃদয়ের। তবুও সুজনের ব্যবসার ধরণটা তার পছন্দ না বলেই শাহেদ একবার বলল, ‘সুজন ভাই, এত বড় মনের একজন মানুষ হয়ে আপনি কেন ক্ষুদ্র কাজ করেন? আপনার উচিৎ…’
‘শাহেদ, আমি বুঝছি তুমি কী কইতে চাও। এই কাজ আমিও আর করব না। মানুষের দীর্ঘশ্বাস খুব খারাপ জিনিষ—অভিশাপ লাগে। যাও তোমারে কথা দিলাম। এখন থেকে অন্য কাজের ধান্দা করব। দরকার হইলে, গ্রামে যাইয়া চাষাবাদ করব।’
শাহেদের চোখ আবার ভিজে এলো। সে সুজনকে জড়িয়ে ধরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল কয়েকমুহূর্ত—তারপর বের হয়ে গেল ঘর থেকে।

অনেকক্ষণ থেকে ডোরবেলটা বাজছে।
সোমা দরজা খুলে দিল। শাহেদ আর ইমরান দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসল শাহেদ। সোমা কোন প্রতিক্রিয়া কিংবা উচ্ছ্বাস দেখাল না। সে সরে দাঁড়িয়ে ওদেরকে ভেতরে ঢুকতে দিল। শাহেদ ঘরে ঢুকে বলল, ‘কিরে, তুই ক্লাসে যাসনি আজ?’ শাহেদ প্রাণপনে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করল। যেন কিছুই ঘটে নি, এমন ভাবে কথা বলার চেষ্টা করল।
‘না।’
‘কেন?’
‘তোমার শোকে ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছি।’
‘গুড। এই না হলে ছোট বোন। বাবা কোথায়রে?’
‘বারান্দায়। পেপার রিভাইজ দিচ্ছে।’
যেন সোমা খুব মজার একটা কথা বলেছে, শাহেদ হেসে দিয়ে বলল, ‘আর মা?’
‘কোথায় আবার—রান্নাঘরে।’
শাহেদ ইমরানের দিকে ঘুরে বলল, ‘ইমরান, তুমি একটু বস, আমি আসছি।’ বলেই শাহেদ ভেতরে চলে গেল।
ইমরান তবুও দাঁড়িয়ে রইল। সোমা বলল, ‘আপনি বসুন।’ বলেই সোমা ভেতরের দিকে চলে যাচ্ছিল। ইমরান বলল, ‘এক্সিউজ মি। আমাকে এক গ্লাস পানি খাওয়াতে পারবেন?’
সোমা একবার তাকাল ইমরানের দিকে। কিছু না বলে সে ভেতরে চলে গেল।
ইমরান বসে রইল চুপচাপ।

শাহেদ বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল।
শাহেদের উপস্থিতি টের পেয়ে রাকিবউদ্দিন পেপার নামিয়ে রাখলেন।
‘বাবা, আই এম সরি।’
‘এভাবে বাসা থেকে চলে গিয়ে কাজটা তুমি ভাল করনি। আই এক্সপেক্টেড ইউ টু বি লিটিল মোর রেস্পনসিবল। আমাদের বয়স হয়েছে—এ বয়সে হার্টের উপর প্রেশার পড়ে, এমন কাজ না করাই ভাল।।।
‘এমন কোন কাজ আর করব না বাবা, আই প্রমিজ।’
‘প্রমিজ করতে হবে না। তোমার মা’র সঙ্গে দেখা করেছ?’
‘না।’
‘যাও আগে তার কাছে যাও।’
‘বাবা, আই’ম সরি এগেইন।’
‘ইমরানও কি এসেছে তোমার সাথে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ঐ বুদ্ধিমান গাধাটাকে বল, দুপুরে খেয়ে যেতে।’
শাহেদ হেসে ফেলল।

সোমা রান্নাঘরে এসে ঢুকল। সে ফ্রিজ খুলে এক বোতল ঠাণ্ডা পানি বের করে গ্লাসে ঢালল। পানি নিয়ে বের হয়ে যাবার মুহূর্তে জাহানারা জানতে চাইলেন, ‘পানি নিচ্ছিস কার জন্যে?’
‘ইমরান সাহেবের জন্যে।’
‘ইমরান সাহেবটা আবার কে?’
‘ভাইয়ার বন্ধু। বুদ্ধিমান গাধা।’
‘বুদ্ধিমান গাধা মানে?’
‘মানে বাবাকে জিজ্ঞেস কর।’
জাহানারা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তোর বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে কেন? আর তুই এমন রোবটের মত কথা বলছিস কেন?’
‘এত কেন কেন কর না তো মা। তুমি বড় যন্ত্রণা কর। রোবটের মত কথা বলছি কেননা আমার অনুভূতিগুলো সব নষ্ট হয়ে গেছে আর এই বুদ্ধিমান গাধাটা হচ্ছে ভাইয়ার বন্ধু। ঐ যে সেদিন এসেছিল—সে আজকে তোমার ছেলেকে ধরে নিয়ে এসেছে।’
জাহানারা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, ‘শাহেদ এসেছে? কোথায়? আমার শাহেদ কোথায়?’
বলতে বলতেই শাহেদ রান্নাঘরে এসে ঢুকল। সোমা বলল, ‘এই যে তোমার শাহেদ এসে গেছে।’
শাহেদ তার মাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘মা।’
আনন্দে জাহানারা কেঁদে ফেললেন। তিনি শাহেদের মুখে হাত বুলিয়ে বললেন, ‘এ’কদিনেই কেমন কালো হয়ে গেছিস তুই। মুখটা কেমন শুকিয়ে গেছে।’
মায়ের আহ্লাদ দেখে সোমা মৃদু হাসল। তারপর পানি নিয়ে বেরিয়ে গেল।
শাহেদ বলল, ‘মা, আমি কালোও হই নি, শুকিয়েও যাই নি। আমি যেমন ছিলাম তেমনই আছি। এখানে আলো কম বলে তুমি আমাকে ভালোমতো দেখতে পাচ্ছ না। আজকের মেন্যু কি, মা? খুব খিদে পেয়েছে।’
‘মেন্যু নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই যা, হাত মুখ ধুয়ে নে। আমি খাবার দিচ্ছি।’
‘আমার বন্ধুও কিন্তু খাবে আমাদের সঙ্গে।’
‘তো খাবে, অসুবিধা কি?’
শাহেদ খুশি মনে তার ঘরে গেল ফ্রেশ হবার জন্য।

দুপুরে সবাই খেতে বসল একসঙ্গে।
খাওয়ার মধ্যে বেশিরভাগ কথাই হল ইমরানের সঙ্গে। খেতে খেতেই ইমরান বেশ কয়েকবার তাকাল সোমার দিকে। সোমার সঙ্গে কয়েকবার চোখাচোখিও হল। প্রতিবারই সোমা চোখ সরিয়ে নিল। ইমরান মৃদু হাসল।

মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। তবু কিছু মানুষ জেগে আছে, অন্যরা নিদ্রিত।
শাহেদের চোখে ঘুম নেই। বিছানায় শুয়েই সে খোলা জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরে। শাহেদের প্রায়ই নাতাশার কথা মনে পড়ে। মেয়েটা কোথায় গেল। এর মধ্যে বেশ কয়েকবার সে চেষ্টা করেছে—কিন্তু প্রতিবারই কল চলে গেছে ভয়েজ মেসেজে। নাতাশার কথা ভাবতে ভাবতেই শাহেদের ফোন বেজে উঠল। তিন রিং-এর মাথায় শাহেদ ফোন নিয়ে দেখল অপরিচিত নাম্বার। তবুও সে বলল, ‘হ্যালো?’
অপর প্রান্ত থেকে কোন কথা শোনা গেল না।
‘হ্যালো? কে?’
অপর প্রান্ত থেকে একটা দীর্ঘশ্বাসের মত ভেসে এলো।
‘কথা বলছেন না কেন? হ্যালো? আপনি কে?’
অপর প্রান্ত নিশ্চুপ।
‘কথা না বললে ফোন করেছেন কেন? এত রাতে এধরণের রসিকতা করার কোন মানে হয়না। যত্তসব!’
হঠাৎই ফোন কেটে গেল। শাহেদ ফোন সামনে নিয়ে এসে দেখল।

সকাল দশটা।
ইমরান দাঁড়িয়ে আছে শাহেদদের বাসার দরজায়। বেশ কিছুক্ষণ হয়ে গেল সে ডোরবেল চেপেছে। এত সকালে আরো একবার বেল বাজাবে কি না ভাবতে ভাবতেই দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে সোমা দেখল ইমরানকে। কয়েক মুহূর্তের জন্য সোমার চেহারায় একটা খুশির ঝিলিক এসেই মিলিয়ে গেল। এত সকালে ইমরানকে দেখে সোমা অবাক হল। তাঁর কৌতূহলী দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ইমরান ইতস্তত করে বলল, শাহেদ… আসতে বলেছিল… সকালে। ও কি উঠেছে?’
‘ভাইয়া তো ঘুমাচ্ছে এখনো। অনেক রাত পর্যন্ত ওর ঘরে লাইট জ্বলতে দেখেছি। হয়তো রাতে দেরিতে ঘুমিয়েছে। আপনি বসুন, আমি চা নিয়ে আসি।’
‘ব্যস্ত হতে হবে না।’
‘অসুবিধা নেই। চা বানানোই আছে। আপনি বসুন।’
সোমা ভেতরে চলে গেল। ইমরান বসে রইল চুপচাপ।
রাকিবউদ্দিন সাহেব বসার ঘরে আসলেন আজকের খবরের কাগজ এসেছে কিনা দেখার জন্য। দেখলেন ইমরান বসে আছে। ইমরান উঠে দাঁড়িয়ে সালাম দিল। সালামের উত্তর দিয়ে রাকিবউদ্দিন সাহেব বললেন, ‘তারপর ইয়াংম্যান, কালপ্রিট দু’টোর কোন খোঁজ বের করতে পারলে?’
‘এখনো পারি নি, তবে পারব। ঢাকায় যত ম্যারেজ মিডিয়া আছে, সবগুলোই আমরা খুঁজে দেখছি। বের করে ফেলব।’
‘দেশে আইনের শাসন বলতে কিছু নেই বুঝলে।’ রাকিব সাহেব হতাশ কণ্ঠে বললেন, ‘চোখের সামনে দিয়ে এত বড় বড় এক একটা প্রতারণার ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, অথচ… যাকগে, বাদ দাও এসব কথা, তুমি চা-টা কিছু খেয়েছ?’ ইমরান কিছু বলার আগেই তিনি আবারো বললেন, ‘আশ্চর্য, ছেলেটা এতক্ষণ ধরে বসে আছে… গেল কোথায় সবাই? সোমা, এই সোমা?’
‘আঙ্কেল, ব্যস্ত হতে হবে না। আমি সকালে তেমন কিছু খাই না।’
ইমরানের কথার কোন গুরুত্ব না দিয়ে রাকিবউদ্দিন সোমার নাম ধরে ডাকতে ডাকতে ভেতরে চলে গেলেন।
কিছুক্ষণ পরেই ট্রে-তে নাস্তা সাজিয়ে সোমা এসে ঢুকল বসার ঘরে। ট্রে-টা নামিয়ে রেখে ইমরানের দিকে নাস্তার প্লেট আর চায়ের কাপ এগিয়ে দিল। ইমরান চায়ে চুমুক দিল। সোমা বসে রইল চুপচাপ।
কিছু সময় নীরবে পার হল। ইমরান ইতস্তত করে বলল, ‘আপনি অনেক রাত পর্যন্ত জেগে থাকেন তাই না?’
‘কী করে জানলেন?’ সোমা অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘আপনিই তো বললেন, অনেক রাত পর্যন্ত শাহেদের রুমে লাইট জ্বলতে দেখেছেন!’
সোমা মৃদু হাসল। এত সুন্দর মুখের একটা মেয়ে, এত সুন্দর করে হাসছে, তবুও কোথায় যেন একটা বিষণ্ণতার ছায়া লুকিয়ে আছে। ইমরান বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি, ইফ ইউ ডোন্ট মাইন্ড।’
‘করুন।’
‘আপনি সবসময় ডিপ্রেসড থাকেন কেন? ইজ এনিথিং রং?’
‘নাথিং রং।’
‘ইট একচুয়ালি.. ডাজন’ট গো উইথ ইউ।’
‘এক্সকিউজ মি?’
‘তোমার চেহারায় বিষণ্ণতা মানায় না। সরি, মানে আপনার চেহারায়।’
‘তাই? কি মানায় আমার চেহারায়?’
ইমরান ঠিক কী বলবে বুঝতে পারল না। সে নীরবে তাকিয়ে রইল সোমার মুখের দিকে।
‘আমাকে তুমি করে বলায় আমি কিছু মনে করি নি। ভাইয়াকে পাঠিয়ে দিচ্ছি। আপনি আরেকটু বসুন।’
সোমা চলে গেল ভেতরে। ইমরান তাকিয়ে রইল। সোমার প্রতি মায়ায় মোড়ানো তীব্র এক টান অনুভব করল সে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৭)

শাহেদ আর ইমরান একগাদা নিউজপেপার নিয়ে বসেছে। তারা ম্যারেজ মিডিয়ার যত বিজ্ঞাপন আছে, একে একে সবগুলিতে ফোন করে দেখছে, এজাজ কিংবা জামানের কণ্ঠস্বর শোনা যায় কি না। এক পর্যায়ে শাহেদ ধৈর্যহারা হয়ে পড়ল। ‘এভাবে কল করে কি কোন লাভ হবে, ইমরান? আই’ম গেটিং ফ্রাস্ট্রেটেড। বাদ দাও।’
‘না, না বাদ দেব কেন? এত তাড়াতাড়ি রণে ভঙ্গ দিলে তো বন্ধু চলবে না। উই হ্যাভ টু ফাইন্ড দেম।’
‘আমার মনে হয়না কিছু হবে। আমরা চরম ধরা খেয়েছি। উই আর স্ক্রুড!’
‘জানি। কিন্তু আমি এত তাড়াতাড়ি হাল ছাড়ছি না।’
ইমরান হঠাৎ লক্ষ করল শাহেদের মুখ অন্ধকার। অন্য কোন ব্যাপার হতে পারে। সে কৌতূহলী দৃষ্টিতে বলল, ‘তোমার কি কোন কারণে মন খারাপ, শাহেদ? খুব ডিপ্রেসড লাগছে।’
‘এখন পর্যন্ত এমন একটা কাজও আমি করতে পারি নি ইমরান, যা কি না খুশি হবার মত যথেষ্ট কারণ হতে পারে! ডিপ্রেসড থাকাটাই তো স্বাভাবিক তাই না?’
‘হুমম।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শাহেদ বলল, ‘আমার একটা কাজ করে দেবে ইমরান?’
‘অবশ্যই। বল, কি করতে হবে?’
শাহেদ তার রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে আসার বিষয়টি বলল ইমরানকে। ‘একটা নাম্বার দিচ্ছি, সেখানে ফোন করে বলবে, আমি ভাল আছি—আমাকে নিয়ে বিশেষ চিন্তা না করতে। পারবে?’
‘না পাড়ার তো কিছু নেই। অবশ্যই পারব। দাও—নাম্বারটা দাও।’

পূর্ব নির্ধারিত সময় মোতাবেক সুজন বদরুল সাহেবের বাসায় যেয়ে হাজির হল। বদরুল সাহেব দরজা খুলতেই সুজন সময় ক্ষেপণ না করে বলল, ‘টাকা রেডি করেছেন?’
‘জি।’
‘তাহলে দিন, আমাকে আবার কোর্টে যেতে হবে। দলিল বের করা, মিউটেশন করা, হাজারো ঝামেলা।’
‘আরে বসেন একটু। চা-পানি খান। এত তাড়া কিসের?’
‘বসলে তো আঙ্কেল আমার চলবে না। হাতে অনেক কাজ। আরও দু’জায়গায় যেতে হবে। ঠিক আছে, বলেন চা দিতে।’
বদরুল সাহেব ভেতরে গিয়ে দু’কাপ চায়ের কথা বলে এলেন। বসলেন সুজনের সামনের সোফায়। একটু সময় নিয়ে ইতস্তত করে বললেন, ‘ছোট একটা সমস্যা হয়ে গেছে সুজন সাহেব।’
‘কী সমস্যা?’
‘বায়নার সব টাকাটা জোগাড় হয় নাই।’
‘মানে?’
‘না মানে, পুরো টাকাটা এখন দিতে পারছি না। তবে এখন পঞ্চাশ দিচ্ছি, বাকিটা কাল নাগাদ দিয়ে দিতে পারব।’
‘কথা তো এমন ছিল না, আপনি বলেছিলেন পুরো টাকাটা একসাথে দেবেন। এখন বলছেন, পঞ্চাশ দিচ্ছি- এর মানে কী? এভাবে তো আঙ্কেল জমি কিনতে পারবেন না।’
‘হ্যাঁ বলেছিলাম, কিন্তু…’
কাজের ছেলে দু’কাপ চা, এক গ্লাস পানি আর কিছু বিস্কিট একটা ট্রে-তে সাজিয়ে টেবিলে নামিয়ে রাখল।
সুজন চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, দেন পঞ্চাশই দেন। তবে কালকের মধ্যে বাকি টাকাটা রেডি রাখবেন। বারে বারে আসাতো অনেক খরচের ব্যাপার তাইনা?’
বদরুল সাহেব মুখ উজ্জ্বল করে বললেন, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্ক ইউ ফর ইয়োর আন্ডারস্ট্যান্ডিং। খরচ নিয়ে ভাববেন না। আমি আপনার আসা-যাওয়ার খরচ দিয়ে দেব।’
‘আপনি কি জানেন, কত ঝামেলা করে আপনাকে প্লটটা ম্যানেজ করে দিচ্ছি? আমার বন্ধুর সঙ্গে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার জোগাড় হয়েছিল প্রায়…’
‘থ্যাঙ্ক ইউ। থ্যাঙ্ক ইউ।’ বদরুল অমায়িক কণ্ঠে বললেন, ‘আমি টাকাটা নিয়ে আসি। আপনি চা খান। প্লিজ!’ বলে বদরুল সাহেব উঠে চলে গেলেন ভেতরে।
সুজন মৃদু হেসে চায়ে চুমুক দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই বদরুল একটা বাদামি রঙের কাগজের ঠোঙা নিয়ে এলো। তাঁর মধ্যে এক বান্ডিল নোট। সুজনের হাতে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এখানে পঞ্চাশ আছে। আর এই নেন-
আপনার আসা যাওয়ার খরচ। এক হাজার।’
‘থ্যাংকস!’ সুজন উঠে দাঁড়াল।
‘সুজন সাহেব, টাকাটা গুনে নিলেন না?’
‘তার কি কোন প্রয়োজন আছে? আর তাছাড়া কাল তো আমি আসছিই। কমবেশি হলে কাল বুঝে নেব।’ সুজন হাসিমুখে বের হয়ে গেল। বদরুল সাহেব তাকিয়ে রইল অবাক দৃষ্টিতে।
সুজন জানে, বদরুল সাহেবের বাসার ত্রিসীমানায় সে আর কোনদিন ফিরে আসবে না। যা হাতানো গেছে তাই সই।

ভর সন্ধ্যা।
সোমা তার ঘরের সব বাতি নিভিয়ে দিল। কোন রকমের আলোই তার সহ্য হচ্ছে না। কিন্তু ঘর পুরোপুরি অন্ধকার হল না। পাশের ঘর থেকে আলো আসছে। বারান্দায় লাইট জ্বলছে। সে আধো আলোর মধ্যেই বিছানায় শুয়ে রইল।
মিসেস জাহানারা কি মনে করে রান্নাঘর থেকে বের হয়ে সোমার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। মায়ের উপস্থিতি টের পেয়ে ডাকল, ‘মা! একটু এখানে আসবে?’
জাহানারা দাঁড়িয়ে সোমার ডাক শুনলেন দ্বিতীয়বার। সে তার ঘরে এসে দেখলেন, সোমা ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। ঘরে ঢুকেই তিনি লাইট জ্বালিয়ে দিলেন। ভ্রূ কুঁচকে জানতে চাইলেন, ‘কী রে কী হয়েছে?’
‘এখানে আস একটু, তোমার সাথে কথা বলব।’
জাহানারা মেয়ের পাশে এসে দাঁড়ালেন। কপালে আর চিবুকে হাত রেখে গায়ের তাপ অনুভব করলেন। তারপর উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘তোর কি শরীর খারাপ?’
‘না, শরীর ঠিকই আছে।’
‘বল কি বলবি?’
‘ভাইয়াকে নিয়ে এত অস্থির হবার দরকার নেই।’
জাহানারা অবাক কণ্ঠে বললেন, ‘দরকার নেই কেন?’
‘ভাইয়া ভাল আছে। আর কোথায় আছে আমি জানি। কিন্তু বাবাকে কিছু বলবে না।’
‘কেন? তাকে বললে অসুবিধা কী?’
‘অসুবিধা আছে। ভাইয়া চায় না বাবা জানুক, না জেনে একটু হার্ড টাইম পাক।’
‘হার্ড টাইম পাক মানে কী?’
‘মানে কিছু না। মানে বাবা মনে মনে একটু কষ্ট পাক। এই আর কী।’
‘কষ্ট কী আর এমনিতেই সে কম পাচ্ছে!’ একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ছেড়ে জাহানারা বললেন, ‘এখন তোর কী কথা সেটা বল। অবেলায় শুয়ে আছিস! মন খারাপ?’
‘লাইটটা অফ করে দাও, মা।’
‘লাইট অফ করতে হবে কেন?’
‘আমার যা কথা, লাইট থাকলে বলতে পারব না।’
জাহানারা সোমার কথা কিছুই বুঝতে পারলেন না। এই মেয়েটার কার্যকলাপ মাঝে মাঝে তিনি কিছুই বুঝতে পারেন না। তিনি জানেন, কথা বাড়িয়ে লাভ নেই। তিনি লাইট বন্ধ করে পাশে এসে বসলেন সোমার।
সোমা উঠে বসল। একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল, ‘আমার অনেক কষ্ট হচ্ছে, মা। রাতে ঘুমাতে পারি না। সারারাত ছটফট করি। রাতে ঘুমাতে পারিনা বলেই দিনে এত ঘুমাই।’
জাহানারা ভীত কণ্ঠে বললেন, ‘তোর কী হয়েছে?’
‘আমি বড় একটা ভুল করে ফেলেছি।’ বলতে বলতে সোমা ডুকরে কেঁদে ফেলল।
‘আমাকে বল, সোমা। কাঁদিস না। আমাকে বল।’
‘আমি বলতে পারব না।’
‘আমি তোর মা, আমাকে না বললে তুই কাকে বলবি।’
সোমার শরীর ফুলে ফুলে উঠছে। বুকে চাঁপা কষ্ট নিয়ে সে কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘আমি, আমি একজনকে ভালবেসেছিলাম। তাকে বিয়ে করতে চেয়েছিলাম।’
‘ঠিক আছে, এই নিয়ে এত ভাবনার কী আছে?’ জাহানারা মেয়েকে আশ্বস্ত করার ভঙ্গিতে বললেন, ‘তো ছেলেটাকে আসতে বল। তোর বাবার সাথে কথা বলতে বল।’
‘ছেলেটা আর নেই।’
জাহানারার বুক ধক করে উঠল। তিনি বললেন, ‘নেই মানে?’
‘ও চলে গেছে।’
‘কোথায়?’
‘আমেরিকায়।’
‘আর আসবে না?’
‘জানি না।’
সোমা ভেবেছিল সে কঠিন পাথর হয়ে থকবে। এই প্রতিজ্ঞা সে রাখতে পারল না। মাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মত কাঁদতে লাগল।
জাহানারা সোমাকে বুকের সাথে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে তার আদরের মেয়ের সব কষ্ট শুষে নিতে চাইল।

বেশ খানিকটা রাত করে শাহেদ এলো সুজনের বাসায়। সুজন দরজা খুলে দিতেই শাহেদ ঘরে ঢুকল। সুজনের বসার ঘরে আলাদা কোন টেবিল চেয়ার না থাকায় বেশিরভাগ লেখালেখির কাজ ডাইনিং টেবিলে বসেই করতে হয়। সেটাও যে বড় কোন টেবিল তাও না। দেয়ালের সাথে মিশিয়ে লাগানো ছোট একটা টেবিল আর দু’পাশে দুটো চেয়ার। সুজন সেই টেবিলে বসে খাতায় কিছু একটা লিখছে। লেখাটা শেষ করে শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কী অবস্থা শাহেদ, তোমার কাজ-টাজ কিছু হয়েছে?’
শাহেদ হ্যাঁ না কিছু বলল না।
সুজন চিন্তিত কণ্ঠে বলল, ‘তোমার ঘটনাটা কী? ধরা টরা খাইছ নাকি?’
‘ধরা খাব মানে?’
‘মানে কিছু না। তোমার চেহারা দেখে মনে হচ্ছে কিছু একটা হয়েছে। তেমন কিছু হয়ে থাকলে আমাকে বলতে পার।’
সুজনের কথার উত্তর না দিয়ে শাহেদ বলল, ‘আপনি কী করছেন?’
‘এইতো পত্রিকায় জমি বিক্রির একটা অ্যাড দিব। ওটার খসরা তৈরি করছি। দেখত, কেমন হল? আমি পড়ছি, শোন’
ঢাকার অদূরে, এই মুহূর্তে বাড়ি করার মত উপযুক্ত উঁচু জমির উপরে ৫ কাঠার একটি প্লট জরুরী ভিত্তিতে বিক্রয় হইবে। ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসার্থে জরুরী ভিত্তিতে টাকার প্রয়োজন। সত্ত্বর যোগাযোগ করুন: সুজন জোয়ারদার । মোবাইল ০১৭১-
শাহেদ কৌতূহলী কণ্ঠে জানতে চাইল, ‘জমিটা কার?’
‘আছে, আমার এক পরিচিত।’
‘কার ক্যান্সার হয়েছে?’
সুজন নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘কারো না।’
শাহেদ বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘কারো না? তাহলে লিখছেন কেন?’
‘আরে এটা হচ্ছে বিজ্ঞাপনের ভাষা, মুল আকর্ষণ বলতে পার।’ সুজন ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে বলল, ‘ক্যান্সারের কথা না বলে অন্যভাবে বলা যেত। এই যেমন ধর, আমি যদি বলতাম জমিতে ব্যাঙ্ক সংক্রান্ত সামান্য জটিলতা আছে, তাহলেও চলত। দয়া পরবশ হয়ে অথবা সামান্য জটিলতার লোভে পার্টি ইন্টারেস্টেড হবে। এদের মধ্যে থেকে কাউকে বেছে নিয়ে টোপ ফেলতে হবে।’
শাহেদ থমথমে গলায় বলল, ‘তার মানে এটা তো এক ধরণের প্রতারণা!’
‘এক এক ব্যবসার, এক এক ধরণ। এইটা তুমি বুঝবা না। এখন বল, তোমার সমস্যা কী?’
শাহেদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘আমার কোন সমস্যা নেই।’
সুজনের ব্যবসার ধরণটা শাহেদের ভাল লাগল না। ক্যান্সার রোগীর চিকিৎসার্থে জমি বিক্রয় আর ডিভোর্সি মেয়েকে বিয়ে করে কানাডা যাবার সুযোগ—এসব বিজ্ঞাপনের ভাষায় শাহেদ কোথায় যেন একটা মিল খুঁজে পেল। এসবই সরল মনের মানুষদেরকে ফাঁদে ফেলার কৌশল। শাহেদ মুখ অন্ধকার করে বসে রইল।
‘শাহেদ শোন, সেদিন তোমার চেহারা দেখেই আমি বুঝেছি তুমি বড়সড় রকমের একটা ঝামেলায় পড়েছ। আমি যে লাইনে কাজ করি, তাতে মানুষের চেহারা দেখেই বলে দিতে পারি। তুমি আমাকে বল- দেখি আমি কিছু করতে পারি কি না।’
‘কী বলব। দেশটা ছেয়ে গেছে প্রতারক আর প্রতারণায়। কে যে আসল আর কে নকল বোঝা মুস্কিল।’ কথা বলতে বলতে শাহেদ চলে গেল সুজনের সামনে থেকে—শোবার ঘরের বিছানার ওপর গা এলিয়ে তাকিয়ে রইল শূন্য দৃষ্টিতে।
সুজন অবাক দৃষ্টিতে একবার তাকাল শাহেদের দিকে, তারপর খাতায় লেখা বিজ্ঞাপনের দিকে মনোযোগ দিল।

জাহানারা উদ্বেগের সাথে রাকিবুদ্দিন সাহেবকে সোমার ব্যাপারে বললেন।
রাকিবুদ্দিন বললেন, ‘সোমার সঙ্গে কথা বলেছ?’
‘হ্যাঁ, তোমার কথাই ঠিক। ও একটা ছেলেকে ভালবেসেছিল। তাকে বিয়েও করতে চেয়েছিল।’
রাকিবউদ্দিন ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘পাস্ট টেন্সে কথা বলছ কেন? ভালবেসেছিল, বিয়ে করতে চেয়েছিল, এর মানে কী? এখন আর ভালবাসে না?’
‘না।’
‘কেন?’
‘ছেলেটা আমেরিকায় চলে গেছে, ওকে না জানিয়ে।’
‘ও।’ রাকিবুদ্দিন অদ্ভুতভাবে তাকালেন। বিষয়টি যে তিনি ঠিক মত বুঝলেন কি না বোঝা গেল না। তবে তিনি এ নিয়ে আর কিছু বললেন না। কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেলেন।

দুপুরের দিকে শাহেদদের বাসার কলিংবেল বেজে উঠল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে সোমা এসে দরজা খুলে দিয়ে দেখল, লম্বা, ঝাঁকড়া চুলের এক সুদর্শন যুবক দাঁড়িয়ে আছে। সোমা অবাক হয়ে তাকাল। সোমা কিছু বলার আগেই যুবক তার পরিচয় জানাল।
‘আমার নাম ইমরান। শাহেদের বন্ধু। আপনি নিশ্চয়ই সোমা?’
‘জি।’
‘আমি কি একটু ভিতরে আসতে পারি?’
‘আপনাকে কি ভাইয়া পাঠিয়েছে?’ সোমা পাল্টা প্রশ্ন করল।
‘জি। আমি আপনার বাবার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাই।’
‘আসুন।’
সোমা দরজা থেকে সরে দাঁড়িয়ে ইমরানকে ঢুকতে দিল। ‘আপনি বসুন, আমি বাবাকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’
ইমরানকে বসতে বলে সোমা ভেতরে চলে গেল। ইমরান মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে থাকল সোমার চলে যাওয়ার দিকে। প্রথম দর্শনেই সোমার সৌন্দর্য, নমনীয়তা এবং কোমল কণ্ঠ তাকে মুগ্ধ করল। কিন্তু চেহারাটা এত মলিন কেন? ইমরান চারিদিকে তাকিয়ে সোফাতে বসল।
কিছুক্ষণের মধ্যেই রাকিবউদ্দিন সাহেব এসে তাকালেন ইমরানের দিকে। ইমরান বসা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘স্লামালাইকুম আঙ্কেল।’
‘ওয়ালাইকুম সালাম।’ না চেনার ভঙ্গিতে তিনি বললেন, ‘তুমি…?’
‘আমার নাম ইমরান, শাহেদের বন্ধু। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম।’
‘বস।’
রাকিবুদ্দিন সাহেব বসলেন সোফাতে। ইমরানও বসল।
‘বল, কি বলতে এসেছ?’
‘আঙ্কেল, আমিও শাহেদের মত একজন ভিক্টিম। শাহেদের মত আমিও ধরা খেয়েছি। অনেকগুলো টাকা হারিয়েছি।’
‘ধরা খেয়েছ মানে কি?’
‘মানে, শাহেদ যাদের কাছ থেকে প্রতারিত হয়েছে, আমিও তাদের কাছ থেকেই প্রতারিত হয়েছি।’
রাকিবউদ্দিন ভ্রূ কুঞ্চিত করলেন। ‘তাহলে তুমিও ঐ বুদ্ধিমান গাধাদের একজন।’
‘জি?’
সোমা বসার ঘরে ফিরে আসতেই শুনতে পেল তার বাবা ইমরানকে বলছে বুদ্ধিমান গাধা। সোমা হেসে ফেলল। সোমার হাতে একটি ট্রে-তে এক গ্লাস লেবুর শরবত আর এক গ্লাস পানি। সে সামনের টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখল।
রাকিবউদ্দিন সাহেব বললেন, ‘শাহেদ কি তোমার সঙ্গেই থাকছে? গাধাটা আছে কোথায়?’
ইমরান তাকাল সোমার দিকে। সোমা মৃদু হাসল। ইমরান ঘুরে বলল, ‘কেন, সোমা তো জানে। ও বলে নি আপনাদেরকে?’
‘কই, ওতো কিছু বলেনি।’ বলেই রাকিবুদ্দিন তাকালেন সোমার দিকে। সোমা মুখ ঘুরিয়ে অন্যদিকে তাকাল।
‘শাহেদ আসলে লজ্জা আর ভয়ে বাসায় আসছে না।’
‘এখন আর লজ্জা বা ভয় পেয়ে কী হবে।’ রাকিবউদ্দিন বললেন, ‘যা হবার হয়েছে। এখন কিভাবে রিকভার হবে সেটা নিয়ে ভাবতে হবে। তুমি ওকে নিয়ে আস, যাও।’ রাকিব সাহেব ভেতরে চলে গেল।
ইমরান চলে যাবার জন্য উঠে দাঁড়াল।
‘শরবৎটা খেয়ে যান’ সোমা বলল, ‘গরমের মধ্যে এসেছেন। শরবৎটা খান—ভাল লাগবে।’
ইমরান আবার বসল। সোমা শরবতের গ্লাস এগিয়ে দিল ইমরানের হাতে। ইমরান গ্লাসে ছোট একটা চুমুক দিয়ে তাকাল সোমার দিকে। সোমা তাকিয়ে আছে তার দিকে। সোমার চোখের দিকে তাকিয়ে গ্লাসে চুমুক দিতে গিয়ে ইমরান শরবৎ ফেলে দিল খানিকটা। সোমা হেসে ফেলল।
মানুষের হাসি এত সুন্দর হয়? ইমরান আবারো মুগ্ধ হল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৬)

কোন কথাই যেমন লুকানো থাকে না। শাহেদের বাবা-মাও এক সময় জেনে গেলেন, শাহেদকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ফাঁদে ফেলা হয়েছে এবং সে প্রতারিত হয়েছে। রাকিবউদ্দিন সাহেব ভীষণভাবে মর্মাহত হলেন। তিনি জরুরিভাবে পরিবারের সবাইকে নিয়ে বসলেন। বসার ঘরে শাহেদকে রাকিব সাহেবের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়েছে। শাহেদ দাঁড়িয়ে আছে কাঁচুমাচু হয়ে। রাকিবউদ্দিন সাহেব তাকালেন শাহেদের দিকে। তারপর বললেন, ‘দেখো শাহেদ, তোমাকে আগেই বলছিলাম, যা করবে ভেবেচিন্তে করবে। বুঝে শুনে করবে। বয়স কি বাড়ছে, না কমছে দিন দিন। তোমার বুদ্ধি-শুদ্ধি আর কবে হবে?’
রাকিবউদ্দিন সাহেবের অগ্নিমূর্তি দেখে শাহেদ বিচলিত বোধ করল। তার বাবাকে সে কখনও এমন রূপে দেখে নি। কিন্তু আজকের পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন—তার চেহারাও। সোমাও মুখ কাল করে দাঁড়িয়ে আছে। রাকিব সাহেব বলে চললেন, ‘তোমাকে ট্রাস্ট করাটাই আমার ভুল হয়েছে। আমার আগেই বোঝা উচিত ছিল তোমার মত ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। ইউ আর গুড ফর নাথিং। মাঝ থেকে কতগুলো টাকা নষ্ট হল, এখন দেশের জমি যেটুকু ছিল তাও হাতছাড়া হয়ে যাবে।’
এ পর্যায়ে শব্দ করে ডুকরে কেঁদে উঠলেন মিসেস জাহানারা।
রাকিবউদ্দিন সাহেব তার স্ত্রীর দিকে ফিরে তাকালেন। বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তুমি ফ্যাচফ্যাচ করে কাঁদছো কেন? তখন তো অনেক পটিয়েছ আমাকে। সকাল বিকেল মাথা টিপে দিতে চেয়েছ। তোমাকে প্রিভিলেজ দিয়েও আমি ভুল করেছি। তোমার মোটা বুদ্ধির কল্যাণে তোমার ছেলের বুদ্ধিও হয়েছে মোটা।’
মিসেস জাহানারা অবিশ্বাস্য চোখে তাকালেন তার স্বামীর দিকে। তারপর ঘুরে তাকালেন সোমার দিকে। সোমার মুখও হা হয়ে গেছে। তার বাবার মুখ থেকে এধরণের কথা বের হয়ে আসতে পারে সেটা তার ভাবনার অতীত। মিসেস জাহানারা এমন অপবাদ নিতে পারলেন না। তিনি উচ্চস্বরে কান্না শুরু করলেন। তারপর কাঁদতে কাঁদতেই ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
সোমা তার বাবার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছিঃ! বাবা, এভাবে কথা বলছ কেন?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব ধমকের সুরে বললেন, ‘তো কীভাবে কথা বলব? তোর কাছে এখন আমার কথা শিখতে হবে?’
সোমা আহত দৃষ্টিতে তাকাল তার বাবার দিকে। সে বুঝতে পারল এখন আর কোন কথা বলে লাভ নেই। বরং অপেক্ষা করাই ভাল। যখন তার রাগ কমবে তখন বুঝিয়ে বললেই হবে। সে চুপ করে রইল।
রাকিবউদ্দিন সাহেব সোমার দিকে তাকিয়ে শাহেদকে ইঙ্গিত করে বলল, ‘ও যে কাজটা করল, এটা কোন বুদ্ধিমান ছেলের লক্ষণ হতে পারে না। সাক্ষী-প্রমাণ ছাড়া এতগুলো টাকা দিয়ে এলো। কোন এভিডেন্স নেই। লাইফ টাইম অপরচুনিটি! মাই ফুট!’
সোমা ইতস্তত করে বলল, ‘ওদের কথা না শুনে ভাইয়ার উপায় ছিল না বাবা। আচ্ছা, ধরে নিলাম, ও বোকা। তাহলে আর যে কত ছেলে প্রতারিত হল তারা সবাই কি বোকা?’
‘না কেউ বোকা না, সবাই বুদ্ধিমান। তবে গাধা, বুদ্ধিমান গাধা। লেখা পড়া শেষ করে এক একটা বুদ্ধিমান গাধা হয়েছে। দেশটা ভরে যাচ্ছে বুদ্ধিমান গাধায়।’ রাকিবউদ্দিন সাহেব রাগে গজগজ করতে লাগলেন।
এই অপমান সহ্য করা শাহেদের পক্ষে সম্ভব হল না। সে দ্রুত তার বাবার সামনে থেকে সরে গেল। সোমা একবার তাকাল তার বাবার দিকে। রাকিব সাহেবও তাকালেন। শাহেদের চলে যাওয়াটা কেমন যেন লাগল।
শাহেদ সিদ্ধান্ত নিল বাসা থেকে চলে যাবে। এ বাসায় থাকা তার পক্ষে আর সম্ভব না। সে জানে সকাল-দুপুর-রাতে, খাবার টেবিলে তাকে এই প্রবঞ্চনা সইতে হবে। প্রতি পদক্ষেপে তাকে কৈফিয়ত দিতে হবে। শাহেদ তার রুমে ঢুকে কাপড় বদলে বের হয়ে এলো।
ঘর থেকে বের হয়ে যাবার মুখে মিসেস জাহানারা উদগ্রীব হয়ে শাহেদের সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি অস্থির কণ্ঠে বললেন, ‘শাহেদ, কোথায় যাস? শোন, এতরাতে বের হোস না। যাস না বাবা।’
শাহেদ এক মুহূর্ত দাঁড়াল তারপর সজোরে দরজা খুলে বের হয়ে গেল।
জাহানারা চিৎকার করে ডাকলেন, ‘শাহেদ!’

রাত এগারটা।
শাহেদ হাঁটছে অনেকক্ষণ ধরে। সে হাঁটছে অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে। উদ্দেশ্যহীন মানুষের হাঁটা। গন্তব্যহীন যাত্ৰা। এত রাতে সে কোথায় যাবে সে নিজেও জানে না। এ ধরণের হাঁটাহাঁটি অনেকেই করে থাকে—যখন কেউ কোন হিসাবে মিলাতে ব্যর্থ হয়, তখন রাস্তায় নেমে পড়ে। তবে সব উদ্দেশ্যহীন হাটাই একটা গন্তব্যে যেয়ে শেষ হয় এক সময়। শাহেদেরও হল। সে হঠাৎ করেই আবিষ্কার করল, সে দাঁড়িয়ে আছে সুজনের বাসার সামনে। দু’কামরার একটা টিনশেড বাসায় সুজন আর তার রুমমেট ভাড়া থাকে তাদের আবাসিক এলাকার কাছেই নির্মাণাধীন একটা বিল্ডিং-এর পাশেই।
সদর দরজায় তালা ঝুলছে। সুজন বাসায় নেই। শাহেদ স্তম্ভিত হয়ে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মত। সে অসহায় বোধ করতে লাগল। সে সুজনের ফোনে একবার ফোন করল, কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া পাওয়া গেল না।
প্রায় এক ঘণ্টা পরে সুজন ফিরল। সে অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, শাহেদ বসে আছে তার দরজার সামনের সিঁড়িতে। সুজন দ্রুত এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করল, ‘শাহেদ? এত রাতে তুমি এখানে, কী ব্যাপার?’
‘মনটা একটু খারাপ, তাই ভাবলাম আপনার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলি, যদি মনটা ভাল হয়।’
‘আমার সাথে কথা বলে মন ভাল করবা। আরে এটাতো খুব সুন্দর কথা।’ সুজন বিস্ময় প্রকাশ করল।
শাহেদ উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আপনার মোবাইলে ফোন করলাম কয়েকবার, ফোন ধরলেন না—আপনার আগের নাম্বারটা নাই না কি আর?’
‘আর বইল না, একটা ঝামেলা হয়েছিল, আরেকটা নতুন ফোন নিছি।’ বলতে বলতে ঘরের তালা খুলে সুজন বলল, ‘আস ভিতরে আস।’
শাহেদ ভেতরে ঢুকে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
সুজন বলল, ‘এখন বল, তোমার বাসার সবাই কেমন আছে?’
‘আছে, মোটামুটি ভালই।’
শাহেদকে ভাল মত লক্ষ করে সুজন বলল, ‘তোমাকে তো কাহিল লাগছে খুব। ঘটনা কী?’
শাহেদ নিরুত্তর রইল।
‘আচ্ছা, ঘটনা পড়ে শোনা যাবে। তুমি একটু বস, আমি চট কইরা ঠাণ্ডা পানিতে ভালমতো একটা গোসল দিয়া আসি। তারপর না হয় তোমার সাথে কথা বলা যাবে, কি বল?’
শাহেদ মাথা নেড়ে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে।’
কথা বলতে বলতে শাহেদের সামনেই জামা খুলে, একটা লুঙ্গি পরে উদোম গায়ে সুজন ঢুকে পড়ল বাথরুমে।
শাহেদ চুপচাপ বসে রইল—গভীর ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ল সে। কিন্তু তার সব ভাবনাগুলোই কেমন যেন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
সুজন বালতি থেকে মগে করে গায়ে পানি ঢেলে গানের সুর ধরল, আমার হার কালা করলাম রে, ও আমার দেহ কালার লাইগা রে…’
শাহেদ নিবিষ্ট মনে সুজনের ভেসে আসা গান শুনতে লাগল। শাহেদ অবাক বিস্ময়ে লক্ষ করল, সুজনের গানের গলা ভাল। শুধু ভাল বললে কম বলা হবে—বেশ ভাল।

মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে।
মিসেস জাহানারার কান্না থামে নি। সে কাঁদতে কাঁদতে তাঁর স্বামীর সঙ্গে ঝগড়া করে চলেছেন। ‘ছেলেটাকে এভাবে বকাঝকা না করলে হত না। এত রাতে কোথায় গেল?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, ‘যাবে আর কোথায়, রাস্তা দিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ঠিকই ফিরে আসবে।’
জাহানারা উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘যদি না ফেরে?’
‘না ফিরলে না ফিরবে। ওতো আর কচি খোকা নয়।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘আর তাছাড়া আমি তো ওকে বাসা থেকে চলে যেতে বলি নি। বলেছি?’
‘তোমার ভয়েই তো-’ কথা শেষ না করে জাহানারা বেগম কান্নার বেগ বাড়িয়ে দিলেন।
রাকিবউদ্দিন সাহেব বিরক্তমুখে বললেন, ‘কী আশ্চর্য, তাই বলে আমি কি কিছুই বলতে পারব না? এত বড় একটা ঘটনা ঘটে গেল, অথচ আমি কিছুই বলতে পারব না!’
সোমা বাইরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে বিষণ্ণ দৃষ্টি মেলে। ভেতর থেকে তাঁর বাবা-মায়ের ঝগড়া ভেসে আসছে ক্ষণে ক্ষণে। হঠাৎ করেই এক ধরণের শূন্যতা ভর করল তাঁর শরীরে। সে মন খারাপ করে দূর আকাশের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

গভীর রাত।
আজকের রাতটা সুজনের এখানেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শাহেদ।
সুজনের ঘরে ছোট ছোট দু’টো কাঠের খাট পাতা দু’কোনায়। সুজন আর শাহেদ দু’জন দু’খাটে শুয়ে আছে। দু’জনেই চুপচাপ তাকিয়ে আছে সিলিংয়ের দিকে। নীরবতা ভেঙে সুজন বলল, ‘শাহেদ?’
‘উ।’
‘তুমি কি কিছু বলতে আসছিলা?’
‘হু।’
‘প্রেম ভালবাসা সংক্রান্ত?’
‘না।’
‘অন্য কোন ব্যাপার?’
‘হু।’
‘কি ব্যাপার?’
শাহেদ নিশ্চুপ।
‘তোমার কি কোন সমস্যা হয়েছে?’
‘না।’
সুজন ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘যন্ত্রণা হল দেখি, সব কথার উত্তর এক অক্ষরে দিচ্ছ কেন? এত সংক্ষেপে উত্তর দিলে তো কিছু বোঝা যাবে না।’
শাহেদও ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘বাদ দিন আমার কথা। আপনার কথা বলেন- কী করছেন ইদানীং?’
‘কী আর করব, ধান্ধাবাজি করছি। চাকরি-বাকরি তো হল না।’ সুজনের কণ্ঠে হতাশা ফুটে উঠল।
‘কী রকম শুনি?’ শাহেদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল।
‘জমি বেচা কেনা করি।’
‘জমি বেচা কেনা মানে?’
‘মানে একজনের জমি আর একজনের কাছে বিক্রি করি। ইংরেজিতে যাকে বলে ব্রোকার, বাংলায় বলে দালাল। মাঝখান থেকে আমি কিছু টু-পাইস কামিয়ে নেই। ব্যবসা খারাপ না।’
‘তাই। বলেন কী?’
‘দুবাইওয়ালাদের কারণে ব্যবসাটা খুব রমরমা হয়েছে বুঝলা। হঠাৎ করে কিছু মানুষের হাতে টাকা পয়সা হয়েছে, তারা টাকাটা দিয়ে কি করবে বুঝতে পারে না। তখন জমির টোপ ফেলতে হয়।’
‘টোপ ফেলতে হয় মানে?’
‘কাল চল আমার সাথে, একটা পার্টির কাছে নিয়ে যাব। নিজের চোখে দেখবা। টোপ ফেলেছিলাম সপ্তাখানেক আগে। পার্টি টোপ গিলে ফেলেছে। এখন শুধু সুতা ছাড়ছি। কাল গিয়ে বোঝার চেষ্টা করব, সুতা ছিঁড়ে যাবে না মাছ তোলা যাবে।’
‘সুজন ভাই, আপনার কথা আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। কী বলছেন, এসব। পার্টি, টোপ, সুতা ছাড়া, কী এসব?’
‘বললাম তো, সাথে চল তখন দেখবা। যাবা আমার সাথে?’
‘না সুজন ভাই, আমার অন্য কাজ আছে। আপনার সাথে নাহয় আর একদিন যাব।’
‘ঠিক আছে। তাইলে এখন বল, তোমার কথা শুনি।’
‘আমি কি আপনার এখানে দু’একটা দিন থাকতে পারি?’
‘আরে দু’একদিন কেন? তোমার যে কয়দিন ইচ্ছা থাক। এইটা কোন ব্যাপার?’ বলতে বলতে সুজন অন্যদিকে ঘুরে চোখ বন্ধ করল এবং মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর নিঃশ্বাস ভারী হয়ে এলো। সুজন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। নিশ্চিন্ত মানুষের ঘুম। এত দ্রুত কেউ ঘুমিয়ে পড়তে পারে, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা কঠিন।
শাহেদের চোখে ঘুম নেই। সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল অন্ধকারে।

লিফট থেকে নেমে রাজনের ফ্ল্যাটের সামনে এসে দাঁড়াল সোমা। ডোরবেলে চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল। কেউ খুলছে না দেখে আশে পাশে তাকিয়ে সোমা নিশ্চিত হল—এটা সেই ফ্ল্যাটই। সেদিনের সব কথাই তাঁর মনে আছে। কাজেই ভুল হবার কোন সম্ভাবনা নেই। সে আবারো ডোরবেলে চাপ দিল।
দীর্ঘ সময় পার করে একজন অপরিচিত যুবক দরজা খুলে দিল। দরজার ফাঁক গলে একজন স্বল্প বসনা মেয়ে এগিয়ে এসে দাঁড়াল যুবকের পাশে। যুবকের ঠোঁট এবং চিবুকে লিপস্টিকের দাগ। যুবক-যুবতীর রোম্যান্টিক টাইম-পাসের মধ্যে সোমা এসে পড়েছে কি না কে জানে। সোমা কিঞ্চিত ধাক্কা মত খেল। সে দ্রুত চারিদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, সে কি ভুল জায়গায় এসে পড়েছে কি না। দরজার ফাঁক গলে যতটা দেখা গেল, ভেতরের সব কিছুই সোমার পরিচিত মনে হল।
যুবকের প্রশ্নবোধক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে ইতস্তত করে সোমা বলল, ‘রাজন আছে?’
‘রাজন তো এখানে থাকে না।’
‘এটা রাজনের ফ্ল্যাট না?’
‘না, এটা লিটনের ফ্ল্যাট!’ বলেই ছেলেটি মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির হাসি দিল।
সোমা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘মানে?’
‘না না কিছু না। না, এটা রাজনের ফ্ল্যাট না।’
‘ও এখানে থাকে না?’ সোমা দ্বিধায় পরে গেল।
‘না। এটা আসলে আমাদের এক বন্ধুর বাসা। মাঝে মাঝে আমরা এসে সময় কাটাই।’ ছেলেটি তাঁর বান্ধবীর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। তারপর সোমার দিকে ঘুরে সৌজন্য রক্ষার্থে বলল, ‘আসুন, ভেতরে আসুন।’
‘না, ঠিক আছে। ভেতরে আসতে হবে না।’ সোমা ইতস্তত কণ্ঠে আবার বলল, ‘রাজন কোথায় আছে বলতে পারেন?’
উত্তর না দিয়ে যুবক পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘কিছু যদি মনে না করেন, আপনি কি সোমা?’
‘হ্যাঁ। কেন বলুন তো?’
‘রাজন কোথায় আপনি জানেন না?’
সোমা বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘না!’
‘আপনাকে কিছু বলে যায় নি?’
‘কেন, কোথায় গেছে রাজন?’ সোমার কণ্ঠে ভয় এবং শঙ্কা ফুটে উঠল পরিষ্কারভাবে।
যুবক আবার তাকাল তাঁর বান্ধবীর দিকে। তাঁরা চোখ চাওয়া-চাওয়ি করল। সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘আপনি কিছুই জানেন না?’
‘না। সত্যিই কিছু জানি না।’ সোমা ভয় পেল। ভয়ংকর কিছু শোনার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করল।
‘ও তো আমেরিকায় চলে গেছে। গত সপ্তাহে।’
অস্ফুটে বলল সোমা, ‘জি?’
‘আপনি জানেন না? আশ্চর্য!’ ছেলেটি আরো অনেক কিছুই বলল কিন্তু সোমার কানে সেসব কোন কথাই আর পৌঁছল না। হঠাৎ করে তাঁর মাথাটা ঘুরে উঠল। মনে হচ্ছে এখনি সে পড়ে যাবে। দেয়াল ধরে নিজেকে সামলে নিল। একটু স্থির হয়ে কোনরকমে নিজেকে সংযত করে বলল, ‘সরি আপনাদের ডিস্টার্ব করলাম। আসি।’
সোমা যত দ্রুত সম্ভব হেঁটে গিয়ে লিফটের বাটনে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
সোমা উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটছে। তার পা এলোমেলো। সমানে ঘামছে সে। তার চোখ ফেটে কান্না বের হয়ে আসছে। শত চেষ্টা করেও আটকে রাখতে পারছে না কান্নার অঝোর ধারা। সোমার ইচ্ছে হচ্ছে নিজেকে লুকিয়ে ফেলতে। বুকের ভেতর চাঁপা কষ্ট উথাল-পাতাল সমুদ্রের ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে। তার এমন লাগছে কেন?

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৫)

শাহেদ বলল, ‘ঠিক বুঝতে পারছি না কী করব?’
‘হাত গুটিয়ে বসে থাকলে তো কিছুই হবে না।’ ইমরান সাহস দিয়ে বলল, ‘ঐ ব্যাটাদের ধরতে হবে, চলুন।’
‘ওরা নেই। অফিসে তালা ঝুলিয়ে ভেগেছে।’ শাহেদের নির্লিপ্ত উত্তর।
‘তাহলে?’ ইমরান রীতিমত মাথায় হাত দিয়ে বলল, ‘আমি তো ভাই শেষ।’
‘শেষতো আমিও।’ বলল শাহেদ।
‘কিন্তু এভাবে এদেরকে তো ছেড়ে দেয়া যায় না।’
‘কিন্তু কীইবা করার আছে? কোথায় খুঁজব? এদিকে লজ্জায় কারো কাছে বলতেও পারছি না। নিজেকে কেমন বোকা বোকা মনে হচ্ছে। এতটা বোকামি কেউ করে? ছিঃ!’ শাহেদ নিজেকে ধিক্কার দিল।
ইমরান বলল, ‘নিজেকে এতটা ছোট ভাববেন না। ইট’স নট ইয়োর ফল্ট। আপনি এবং আমি—আমরা দু’জনেই পরিস্থিতির স্বীকার। আমাদের দোষ কোথায় বলুন?’
‘দোষ কোথায় জানি না, তবে যে শোনে সেই বলে, তুমি কি গাধা নাকি? এমন বোকামি কেউ করে?’ শাহেদ হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘সারাক্ষণ গাধা শব্দটি শুনতে শুনতে নিজেকে গাধা গোত্রীয় কেউ মনে হচ্ছে।’ একটু থেমে শাহেদ আবার বলল, ‘আচ্ছা কেউ কি ইচ্ছে করে গাধা হতে চায়, বলুন?’
‘শাহেদ, ভুলটা যদি আমি কিংবা আপনি একা করতাম তাহলে ধরে নিতাম আমরাই গাধা। গাধা হওয়া কোন মানুষেরই পছন্দ নয়, তবু মানুষ অহরহ গাধা হয়, হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা, ওরা কিন্তু আমাদের মত আরও শত ছেলের সর্বনাশ করেছে ইতোমধ্যে এবং করছে প্রতিদিন।’
শাহেদ সম্মত জানিয়ে মাথা নাড়ল।
ইমরান অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘দেশটা চলে গেছে ঠগবাজ আর প্রতারকদের দখলে। আরও কতজন কতধরণের ফাঁদে পড়ছে, ঠকছে, প্রতারিত হচ্ছে—কে জানে?’

ঢাকা শহরের একটি ঘনবসতি আবাসিক এলাকা।
একটা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল সুজন। তার পড়নে স্যুট, সাদা শার্ট, নীল স্ট্রাইপড টাই, হাতে একটা ব্রিফকেস। এই সুজনের সাথে মোড়ের চায়ের দোকানে বসে থাকা সুজনের আকাশ-পাতাল তফাৎ। তার বেশভূষায় বলে দেয়া যায় সে একজন পেশাদার লোক। সুজন একজন রিয়েল এস্টেট এজেন্ট। খাটি বাংলায় জমির দালাল।
ফ্ল্যাটের নাম্বার মিলিয়ে ডোরবেলে চাপ দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সুজন। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে দিল একজন ষাটোর্ধ ভদ্রলোক। ভদ্রলোকের নাম বদরুল হক।
‘স্লামালাইকুম।’ সুজন সালাম দিয়ে হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়াল।
‘ওয়ালাইকুলস্লাম। সালামের উত্তর দিয়ে বদরুল সাহেব বললেন, ‘আপনি, আপনাকে তো চিনলাম না?’
‘আঙ্কেল, আমার নাম সুজন জোয়ারদার। রিয়েল এস্টেট এজেন্ট। শুনলাম আপনি প্লট কিনতে চান?’
বদরুল সাহেব বিস্মিত কণ্ঠে বললেন, ‘কার কাছে শুনলেন?’
‘কার কাছে শুনলাম, সেটা তো আঙ্কেল জরুরী না। জমি কিনবেন কি না সেটাই জরুরী। যদি বলেন, না- কথা না বাড়িয়ে চলে যাব। যদি বলেন, হ্যাঁ- তাহলে বসব, আলোচনা হবে।’
সুজনের কথার ধরণে বদরুল সাহেব থতমত খেয়ে গেলেন। তিনি আমতা আমতা করে বললেন, ‘প্লট কোথায়?’
‘এখানে দাঁড়িয়ে তো সব কথা বলা যাবে না, আঙ্কেল। প্লট কোথায়, কত কাঠার, বিস্তারিত সবই জানবেন।’ সুজন তার হাতের ব্রিফকেস উঁচু করে ধরে বলল, ‘এখানে সব ইনফরমেশন আছে। যদি বসতে বলেন, তাহলে ডিটেইল আলাপ করা যাবে। সবকিছু পছন্দ হলে, দরদামে বনিবনা হলে, বায়নার টাকা দিবেন। এক সপ্তাহের মধ্যে জমি আপনার নামে রেজিস্ট্রি হয়ে যাবে।’
‘আসেন, ভিতরে আসেন।’ বদরুল সাহেব দরজা থেকে সরে দাঁড়ালেন।
সুজন গলার টাইয়ের নট আলগা করতে করতে ভেতরে ঢুকে সোফায় গিয়ে বসল।

সোমা ক্লাস শেষে একা একা বসে আছে একটা নিরিবিলি জায়গায়। বিষণ্ণতা ঘিরে আছে তাকে। তার চোখজুড়ে হতাশা। ইতোমধ্যে সে বেশ কয়েকবার রাজনের মোবাইল ফোনে কল করেছে। তবে তার ভাগ্য তাকে সহায়তা করে নি। প্রতিবারই তাকে শুনতে হয়েছে, দুঃখিত, কাঙ্ক্ষিত নাম্বারটিতে সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না। সরি, দ্য নাম্বার ইউ ডায়াল্ড ইজ আনরিচ্যাবল।
সোমার একাকীত্বের ব্যাঘাত ঘটিয়ে তার বন্ধুরা একযোগে এসে যোগ দিল তার পাশে। ইরা বলল, ‘এই যে তুই এখানে, আর আমরা তোকে খুঁজে বেড়াচ্ছি। ফোন ধরছিস না কেন?’
সোমা অবাক হয়ে বলল, ‘ফোন করেছিলি?’
‘হ্যাঁ…’ ইরা বলল, ‘তোর ঘটনাটা কী? কী হয়েছে?’
সোমা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘কিছু হয় নি।’
‘কিছু তো অবশ্যই হয়েছে।’
ইরাকে সমর্থন জানিয়ে সিন্থিয়া বলল, ‘রাজন ভাইকে দেখছি না ইদানীং। ঝগড়া টগরা করেছিস নাকি? ব্যাপারটা কী?’
সোমা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল, ‘ব্যাপারটা যে কী, আমিও ঠিক বুঝতে পারছি না। ওর মোবাইলে কল যাচ্ছে না।’
‘তাহলে তো চিন্তার কথা।’
বাপ্পীও সায় দিয়ে বলল, ‘আসলেই চিন্তার কথা। তুই রাজন ভাইয়ের বাসায় গিয়েছিস কখনো?’
সোমা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘কেন?’
‘না, মানে- উনার বাসায় গিয়ে একবার খোঁজ নিয়ে দেখলে হত না?’
‘হ্যাঁ। তাই নেব ভাবছি।’
‘যদি কোন হেল্প লাগে বলিস।’
‘বলব।’
ইরা বলল, ‘ও যার জন্যে তোকে খুঁজছি—সজল বাজীতে হেরেছে, ও আমাদের সবাইকে ফুচকা খাওয়াবে। চল।’
‘না রে, আমার ইচ্ছে করছে না। আমি বাসায় চলে যাব। তোরাই যা।’
সজল বলল, ‘আরে ধুর চল তো। আচ্ছা, তোর কি মন খারাপ করা মানায়? আর তুই এমন একটা ভাব করছিস যেন রাজন ভাই তোকে ডাম্প করে অন্য কোথাও চলে গেছে।’
সোমা শান্ত চোখে তাকাল সজলের দিকে। সে আয়ত চোখের ভেজা দৃষ্টি আর বুজে আসা গলায় থেমে থেমে বলল, ‘জানি রে। কিন্তু আমি কী করব? আমি ওর ইগ্নোর‍্যান্সটা নিতে পারছি না। এভাবে ইগ্নোর করার মানে কী? কী করেছি আমি?’
বাপ্পী বলল, ‘তুই ভাবিস না। দরকার হলে আমি আর সজল তাকে তার বাসা থেকে তুলে নিয়ে আসব। এক কাজ করি চল, কাল ক্লাস শেষে আমরা সবাই মিলে তার বাসায় হানা দেই। এখন চল তো।’
বাকীরা সমস্বরে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ চল।’
সোমাকে প্রায় জোর করেই টেনে নিয়ে চলল ওরা সবাই মিলে।

শাহেদ আর ইমরানের মধ্যে বেশ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেছে অল্প সময়ের মধ্যেই। শাহেদের সব কথা শুনে ইমরান বলল, ‘সোমাকে বেশ ইন্টারেস্টিং ক্যারেকটার বলে মনে হচ্ছে। তোমাকে অনেক হেল্প করেছে তাইনা? মেয়েটা বেশ ভাল।’
‘অবশ্যই ভাল। শুধু ভাল বললে কম বলা হবে। আই এম সো ফরচুনেট দ্যাট আই হ্যাভ অ্যা সিস্টার লাইক হার।’
‘তা তো বটেই, এমন একটা বোন থাকা তো আসলেই ভাগ্যের ব্যাপার।’ ইমরান সমর্থন করল।
তারপর হঠাৎ করেই নীরবতা নেমে এলো। বেশ কিছুক্ষণ পর শাহেদ কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘সো হোয়াট’স ইয়োর স্টোরি?’
‘মানে?’ ইমরান ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
‘মানে, আপনি কিভাবে এদের পাল্লায় পড়লেন?’
‘এই তো একই ভাবে, পত্রিকায় অ্যাড দেখে। ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করলাম, পরিচয় হল সোনিয়ার সাথে। আই মিন তোমার নাতাশার সাথে।’
‘ভালই, একই পাত্রী কারো জন্যে নাতাশা, কারো জন্যে সোনিয়া।’
‘তারপর, মিজান আর মাহবুবের কাছে টাকা দিলাম প্রায় সাড়ে তিন লাখের মত।’
‘মিজান? মাহবুব?’
‘মানে, এজাজ আর জামান। সেম পারসন, ডিফারেন্ট নেম। চরিত্র একই, শুধু নাম আলাদা।’
‘হুম। তারপর?’
‘সোনিয়ার সাথে আমার বিয়ের তারিখ ঠিক হল। বিয়ের ঠিক একদিন আগে সোনিয়া হঠাৎ করে বলল, ওর বাবা অসুস্থ। ওকে ইমিডিয়েটলি চলে যেতে হবে। একমাসের মধ্যেই ফিরে এসে আমাদের বিয়ে হবে, এই বলে ও চলে গেল। তারপরের ঘটনা তো…’
‘জানি। বলতে হবে না।’ বলতে বলতে শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
আরো বেশ কিছুক্ষণ কথা বলে শাহেদ আর ইমরান প্লান করে ফেলল।
ইমরান বলল, ‘এখন থেকে প্রতিদিন আমাদের কাজ হবে, ঢাকা শহরে যতগুলি ম্যারেজ মিডিয়া আছে সেগুলোর এড্রেস বের করে খুঁজে দেখা। ফ্রড দু’টোকে কোথাও না কোথাও ঠিকই পাওয়া যাবে।’
শাহেদ বলল, ‘আমি পত্রিকার অ্যাডগুলো থেকে ফোন নাম্বার কালেক্ট করে সব নাম্বারে কল করব। ওদের কণ্ঠস্বর আমার মুখস্থ। ধরা ওদের পরতেই হবে।’
‘ঠিক আছে, কাল আবার আমরা দেখা করব।’
‘ওকে।’
শাহেদ আর ইমরান বেড় হয়ে গেল রেস্টুরেন্ট থেকে।

রাকিবুদ্দিন সাহেবের অভ্যাস রাতের খাবার শেষে আয়েশ করে একটি পান চিবুনো। রাকিব সাহেবের পান খাওয়াটা তার স্ত্রীর পছন্দ নয়, কিন্তু তার পান খাওয়ার পেছনে হাজারো যুক্তি আছে। এই যেমন, পানের রস স্বাস্থ্যের জন্য ভাল। ভিটামিন সি আছে। হজমের সহায়ক। পানের রস হজমে সাহায্য করায় তা পেটে বদ গ্যাস তৈরিও রোধ করে। খুব কম লোকেই জানে, পানে যে অ্যান্টি মাইক্রোবিয়াল প্রপার্টি আছে। পানে প্রচুর মাত্রায় ক্লোরোফিল থাকে৷ এইজন্য পানের রস ওষুধের মত কাজ করে৷
মিসেস জাহানারার যখনই কোন প্রয়োজনীয় কথা বার্তা থাকে, সে পানের ডালা সাজিয়ে তার স্বামীর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। জাহানারা পানের ডালা নিয়ে এসে দাঁড়াল আজ। তারমানে আজ তার কোন জরুরী বিষয় আছে যা তিনি তার স্বামীর সঙ্গে আলাপ করতে চায়। সে পান বানিয়ে রাকিব সাহেবের দিকে বাড়িয়ে দিতেই তিনি বললেন,
‘আজকের আলোচনার টপিক কী?’
মিসেস জাহানারা গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘সোমার কি হয়েছে কিছু জান?’
‘কেন ওর আবার কি হয়েছে?’
‘কেন তুমি লক্ষ কর নি?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললেন, ‘না করি নি। ব্যাপারটা কী? খুলে বল।’
‘সোমা হঠাৎ করে কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। ওর সেই হাসি খুশি উচ্ছলতা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। মেয়েটা কেমন যেন মন খারাপ করে থাকে সবসময়।
‘কই আমার কাছে তো তেমন কিছু মনে হয় নি।’
‘ইদানীং প্রায়ই ক্লাস মিস করছে। সারাদিন দরজা আটকিয়ে শুয়ে থাকে।’
‘এ বয়সে মেয়েদের কতকিছুর সমস্যা হয়, আবার মিটেও যায়। এ নিয়ে এত ভাবতে হবে না। দেখ, প্রেম ট্রেম করছে কিনা।’
‘প্রেম-ট্রেম করছে মানে? ওর কি প্রেম করার বয়স হয়েছে নাকি?’
‘আকাশ থেকে পড়লে মনে হয়? সোমার চেয়ে কম বয়সে তোমার বিয়ে হয়েছিল।’
‘কী সব বাজে কথা বল?
‘মোটেই বাজে কথা বলছি না। মেয়ে বড় হয়েছে, ইউনিভার্সিটিতে যাচ্ছে। কারো সাথে সম্পর্ক হওয়া তো অসম্ভব কিছু না।’
জাহানারা আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন, ‘তেমন কিছু হলে, ও আমাকে বলত।’
‘শোনেন বেগম জাহানারা, সব মানুষেরই কিছু একান্ত কথা থাকে, সব কথা সবসময় সবাইকে বলা যায় না। এ বিষয়টা আপনাকে বুঝতে হবে।’

‘জমিটা পেয়েছেন?’
এই নিয়ে তৃতীয়বার প্রশ্নটা করলেন বদরুল সাহেব। প্রশ্নটা করে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। সুজন অনেকক্ষণ থেকে বসে আছে তার ড্রয়িং রুমে। সে ধীরে ধীরে চায়ের কাপে চুমুক দিচ্ছে—কোন তাড়াহুড়ো নেই। কিন্তু বদরুল সাহেবের তর সইছে না। এর আগে সে দু’বার জিজ্ঞেস করেছে কিন্তু সুজন তার ব্রিফকেস থেকে কি একটা কাগজ বের করে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে।
সুজন চায়ের কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘জমি তো হাতেই ছিল, কিন্তু এখন হাত ছাড়া হয়ে যায় যায় অবস্থা।’
‘হাত ছাড়া হয়ে যায় যায় মানে?’
‘আরে আপনার এখান থেকে কথা বলে গেলাম না সেদিন? গিয়ে দেখি অন্য পার্টি বাসায় এসে বসে আছে। জমির বর্ণনা শুনেই পার্টি পাঁচ লাখ বেশি অফার করল। আর করবে না-ই বা কেন? জমিতো না, একেবারে সোনার খনি। গোল্ড মাইন মিস করলেন বদরুল সাহেব, গোল্ড মাইন।’
বদরুল সাহেব বিস্ময় প্রকাশ করে বললেন, ‘বলেন কী? পাঁচ লাখ টাকা বেশি অফার করল?’
‘জি। ভাবলাম খবরটা আপনাকে দিয়ে যাই।’ সুজন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘পাঁচ লাখ আজকাল কোন টাকা?’
বদরুল সাহেব গম্ভীর কণ্ঠে বললেন, ‘এখন এই খবরে আমার লাভটা কী? আপনি আমাকে আগে জানাবেন না, আমি না হয় পাঁচ লাখ বেশীই দিতাম।’
‘আপনিতো রাজি হলেন না, উল্টো আমাকে সন্দেহ করলেন। একটা কথা বলি বদরুল সাহেব, সবাইকে এক পাল্লায় মাপা ঠিক না। সব মানুষই কিন্তু খারাপ না। যাই হোক, এখন আর এসব বলে লাভ নাই। আমি উঠি তাহলে।’
বদরুল সাহেব বুঝতে পারছেন না কী বলবেন। তিনি মুখ অন্ধকার করে ফেললেন। সুজন তার চেহারার পরিবর্তন দেখে বুঝে গেল পার্টি টোপ গিলেছে। সে বলল, ‘জানি আপনার একটু খারাপ লাগছে। তবে চিন্তা করবেন না, আমার খোঁজে আরও জমি আছে, আমি আরেকদিন এসে জানাব। যদি অনুমতি দেন তো আজ উঠি।’ বলেই সুজন চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
বদরুল সাহেব ত্রস্ত কণ্ঠে বললেন, ‘আরে বসেন না। আরেকটু কথা বার্তা বলি।’
সুজন বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘কথা বার্তা যা বলার বলে ফেলেছি। অযথা বেশি কথা বলে তো লাভ নাই।’
‘আরে বসেন আরেকটু। রোদের মধ্যে এসেছেন, আর এক কাপ চা খান।’
‘ভাই সাহেব, বসে বসে চা খেলেতো আমার চলবে না। আমার অন্য কাজ আছে।’
‘আরে এখানে তো কাজেই এসেছেন, তাই না?’
‘কাজের কাজ তো কিছু হচ্ছে না। যাই হোক টাকা আপনার, জমি কিনবেন আপনি। দরে বনলে কিনবেন, না বনলে কিনবেন না।’
‘আহা, এত টেনসড হচ্ছেন কেন? আপনি একটু বসেন আমি আসছি।’ বলেই বদরুল সাহেব ভেতরে চলে গেলেন।
সুজন তার গমন পথের দিকে তাকিয়ে অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসল।
অল্প সময় পরেই বদরুল সাহেব ফিরে এলেন। তার পেছনে একটা কাজের মেয়ে ট্রে-তে করে দু’কাপ চা আর এক গ্লাস শরবত এনে টেবিলে নামিয়ে রাখল।
বদরুল সাহেব শরবতের গ্লাস সুজনের হাতে এগিয়ে দিয়ে বললেন, ‘নেন, শরবত খান। লেবুর শরবত।’
সুজন শরবতের গ্লাস হাতে নিয়ে ছোট একটা চুমুক দিল।
বদরুল সাহেব বললেন, ‘সুজন সাহেব, সামনের সপ্তাহে কি একবার আসতে পারবেন?’
‘কেন?’
‘না মানে, ঠাণ্ডা মাথায় আর একবার ভেবে দেখতাম আর কী।’
‘এই গরমের মধ্যে মাথা ঠাণ্ডা রাখবেন কীভাবে? যত চিন্তা করবেন, মাথা তত গরম হবে।’
‘না বলছিলাম কী, আমার শ্যালকের সাথে একবার কথা বলে নেই। বুঝতেই পারছেন, যার টাকায় জমি কিনব তার মতামতটা জানা আর কী।’
‘আপনার শ্যালক যেন কোথায় থাকে?’
‘আবুধাবি।’ একটু থেমে বদরুল সাহেব বললেন, ‘আপনি প্লিজ আসেন আরেকবার। আমি আপনার আসা-যাওয়ার খরচ দিয়ে দিচ্ছি। এই নিন।’’ বদরুল সাহেব মানিব্যাগ বেড় করে দুটো একশো টাকার নোট বের করে সুজনের দিকে এগিয়ে দিলেন।
সুজন ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘এটা কী দিচ্ছেন আঙ্কেল? আমি তো আপনার কাছে ভিক্ষা করতে আসি নাই। টাকাটা আপনে রেখে দেন। আজ উঠি, স্লামালাইকুম। শুধু শুধু আপনাকে বিরক্ত করলাম!’ বিরক্ত ভঙ্গিতে সুজন উঠে দাঁড়াল।
বদরুল সাহেব সাথে সাথে ব্যস্ত হয়ে বলল, ‘আরে বসেন না আর একটু। এত ব্যস্ত হয়ে পড়লেন কেন? এক মিনিট। এক মিনিট।’
বদরুল সাহেব দ্রুত ভেতর থেকে একটা পাঁচশত টাকার নোট এনে সুজনের হাতে দিয়ে বলল, ‘এই নেন। সামনের সপ্তাহে আসেন, দেখি একটা ডিল করা যায় কিনা।’
সুজন টাকাটা আলোর দিকে ধরে একটু পরীক্ষা করে পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘আঙ্কেল, আপনি মনে হয় আমার কথা বুঝতে পারেন নাই। আমি বোধ হয় আপনাকে বুঝাতে পারি নাই যে অন্য পার্টি পাঁচ লাখ টাকা বেশি অফার করে টাকা নিয়ে বসে আছে।’
বদরুল সাহেব তৎক্ষণাৎ বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমি পাঁচ লাখ বেশীই দেব।’
‘কিন্তু সেটা তো এখন আর সম্ভব না।’
‘কেন, সম্ভব না কেন?’
‘যিনি জমিটা নিতে চান, সে আমার বন্ধুর বড় ভাই। আমেরিকায় থাকে। দেশে এসেছে কিছুদিন হল। বুঝতেই পারছেন, টেকনিক্যাল ব্যাপার। নিতে হলে আপনাকে মিনিমাম আরো এক বেশি দিতে হবে।’
বদরুল সাহেব অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন সুজনের দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘আপনি তো আমাকে মহা চিন্তায় ফেলে দিলেন। আচ্ছা, ঠিক আছে, আমি আরো এক বেশীই দেব।’
সুজন নিশ্চিত হবার জন্য বলল, ‘মানে ছ’লাখ।
‘হ্যাঁ, ছ’লাখ।’
সুজনের ইচ্ছে হল বলতে যে সেই পানি খাইলেন, তবে ঘোলা কইরা খাইলেন। হায়রে বাঙ্গালী! কিন্তু তা না বলে সে বিগলিত হাসি দিয়ে বলল, ‘আমি জানতাম আপনি রাজি হবেন, তবে সময়টা একটু বেশি নিলেন আর কী?’
‘সময় তো একটু লাগেই। এইসব কথা কি আর এক কথায় হয়। লাখ টাকার ব্যবসা এক কথায় হয় কী করে?’
‘হলে এক কথাতেই হয়, না হলে লাখ কথাতেও হয় না। আমি আগামী সপ্তাহে আসব, আপনি বায়নার টাকা রেডি রাখবেন।’
‘কোন চিন্তা করবেন না। টাকা রেডি থাকবে।’
সুজন সন্তুষ্ট চিত্তে বদরুল সাহেবের বাসা থেকে বেড় হয়ে গেল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৪)

গাঢ় সন্ধ্যা।
মিসেস জাহানারা আবার এলো শাহেদের রুমে। এমন অসময়ে ছেলেটা কেন এভাবে ঘুমাচ্ছে। তিনি বিচলিত বোধ করলেন। শাহেদের কপালে হাত দিয়ে দেখলেন, সামান্য গরম তবে জ্বর বলে মনে হল না। তিনি বসলেন তার ছেলের পাশে। ‘শাহেদ, এই শাহেদ ওঠ বাবা। সন্ধ্যার সময় ঘুমতে নেই। ওঠ।’ তিনি শাহেদের পিঠে হাত রেখে মৃদু ঝাঁকি দিলেন।
শাহেদ বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ঝাকাঝাকি কর না তো মা।’
‘তাহলে ওঠ। সন্ধ্যা হয়ে গেছে। সন্ধ্যার সময় ঘুমতে নেই।’
‘সন্ধ্যার সময় ঘুমলে কী হয়, মা?’ শাহেদ না ঘুরেই বলল।
‘কী হবে আবার? আয়ু কমে যায়।’
শাহেদ তার মায়ের দিকে ঘুরে শোল। ‘এসব থিওরি যে কোথায় পাও? যাও তো মা, বিরক্ত কর না। আমি আরও একটু ঘুমব।’
‘তোর কি শরীর খারাপ লাগছে, বাবা?’
‘না। শরীর ঠিকই আছে।’
মিসেস জাহানারা শাহেদের কপালে হাত রাখলেন। মুখ নামিয়ে মুখের একপাশ শাহেদের কপাল স্পর্শ করলেন। ছোটবেলা থেকেই শাহেদ আর সোমার গায়ের তাপমাত্রা তিনি মেপে আসছেন এভাবেই। তিনি শঙ্কিত কণ্ঠে বললেন, ‘গা তো গরম! জ্বর-জারি বাধাস নি তো আবার? সারাদিন রোদে রোদে ঘুরলে জ্বর তো আসবেই।’
‘গা ঠিকই আছে মা, তোমার হাত ঠাণ্ডা। তুমি নিশ্চয় রান্নাঘর থেকে এসেছ।’
‘যা হাত মুখ ধুয়ে আয়। চা দিচ্ছি।’
একটু চুপ করে থেকে শাহেদ বলল, ‘সোমা কোথায়?’
‘ও তো এখনও ফেরে নি।’
‘আর বাবা?’
‘সে একটু হাঁটতে বেরিয়েছে। চলে আসবে এখুনি।’
‘তা তুমিওতো বাবার সঙ্গে যেতে পারতে। তুমি সারাক্ষণ এমন একা একা থাক কেন, বল তো মা?’
‘কী যে সব বলিস না। আমি কি এখন তোর বাবার হাত ধরে রাস্তায় হাঁটতে যাব নাকি?’
‘হ্যাঁ যাবে, তাতে অসুবিধা কোথায়? তুমি তো আর অন্য কারো হাত ধরছ না!’
‘বাজে বকিস না। আয়, তাড়াতাড়ি উঠে আয়।’
মিসেস জাহানারা উঠে চলে যাচ্ছিলেন। শাহেদ ডাকল, ‘মা!’
মিসেস জাহানারা ঘুরে তাকালেন। শাহেদ উঠে বসল। জাহানারা এগিয়ে এলেন ছেলের কাছে। শাহেদ বলল,
‘আমার মনটা ভাল নেই, মা। কেন, জিজ্ঞেস করবে না। আমি আজ রাতে খাব না। ঘর থেকেও বের হব না। বাবা এলেও না। সোমাকেও পাঠাবে না।’
মিসেস জাহানারা শাহেদের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলেন চিন্তিতমুখে।

শাহেদ প্রতিদিন একবার করে ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে এসে ঘুরে যায়। তাকিয়ে দেখার চেষ্টা করে আশেপাশে। কাউকে অবশ্য দেখা যায় না। কিছুক্ষণ বসে থেকে সে চলে যায়।
শাহেদ উদ্ভ্রান্তের মত হেঁটে বেড়ায়। পার্কে যায়। রাস্তায় হাটে। তাকিয়ে থাকে পথচারীদের দিকে—অসহায় ভাবে। তার চোখ দুটি আকুলি বিকুলি খুঁজে কিছু মুখ। কোথায় হারিয়ে গেল সবাই?

সকাল ১১টা।
সোমা তার বিছানায় শুয়ে আছে। আজ সে সকালে নাস্তা করে নি। শাহেদের জন্য চা নিয়েও যায় নি। মিসেস জাহানারা মেয়ের খোঁজ নিতে এলেন। সোমার বিছানার কাছে এসে চিন্তিত মুখে বললেন, ‘কি রে ক্লাসে যাবি না আজ?’
সোমা না তাকিয়েই শীতল কণ্ঠে বলল, ‘না।’
‘কেন? শরীর খারাপ?’
‘না।’
‘তাহলে?’
‘মন খারাপ।’
‘কী? মন খারাপ?’ মিসেস জাহানারা খুবই অবাক হলেন। সোমার মন খারাপ? তার এই মেয়েটিকে কখনোই মন খারাপ করে থাকতে দেখে কেউ। যে মেয়ে অন্য সবার মন ভাল করে দেয় তার কি না মন খারাপ! তিনি বললেন, ‘বলিস কি, তোর আবার মন খারাপ কেন?’
‘কেন মা, আমার মন খারাপ হতে পারেনা?’
মিসেস জাহানারা অবাক চোখে তাকিয়ে রইলেন সোমার দিকে। ‘উঠে আয়। কিছু খেয়ে নে।’
‘তুমি যাও মা। বিরক্ত কর না।’
‘কী জানি, তোদের ব্যাপার স্যাপার কিছু বুঝি না। এসব কিসের আলামত?’ মিসেস জাহানারা তার মেয়ের আচরণে আহত হলেন। সে চিন্তিত মুখে বের হয়ে গেলেন।

রমনা পার্ক।
পার্কের একটি বেঞ্চে বসে রয়েছে। সেদিনও সে এই বেঞ্চেই বসে ছিল। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে সে ফোন করল একটা নাম্বারে। অপর প্রান্ত থেকে কোন সাড়া পেল না। সে চুপ করে উদাস ভঙ্গিতে বসে রইল।
‘ছার, চা খাবেন? চা দেই, গরম চা…’
শাহেদের নিরবিচ্ছিন্ন ধ্যান ভেঙে গেল চা বিক্রেতার ডাকে। সে তাকিয়ে দেখল সেই চা বিক্রেতা ছেলেটি। শাহেদ কিছু না বলে তাকিয়ে রইল ছেলেটির দিকে। কী ভেবে সে মাথা নেড়ে জানাল চা দিতে। ছেলেটি পরম উৎসাহ নিয়ে চা ঢেলে শাহেদের দিকে চায়ের গ্লাস এগিয়ে দিল। শাহেদ চুপচাপ চায়ে চুমুক দিল।

প্রতিদিনের রুটিন মাফিক যা করেন, আজও তাই করছেন রাকিবউদ্দিন সাহেব। বাসার বারান্দায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আজকের নিউজপেপারে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন তিনি। সকালে এক রাউন্ড পত্রিকা পড়া শেষ হয়েছে তার। আবারো পড়ছেন। পাশে পিরিচ উল্টো করে ঢেকে রাখা এক কাপ চা।
শাহেদ বারান্দায় এসে বলল, ‘বাবা, আমাকে ডেকেছ?’
‘হ্যাঁ। বস। চা খাও।’ পাশের খালি চেয়ারে শাহেদকে বসার ইঙ্গিত করলেন তিনি।
শাহেদ বসে পিরিচ সরিয়ে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে ছোট একটা চুমুক দিল।
রাকিব সাহেব পত্রিকা নামিয়ে বললেন, ‘শুনলাম, তোমার মন খারাপ। আমি কি জানতে পারি কেন?’
শাহেদ ইতস্তত করে বলল, ‘অন্য আরেকদিন বলব, বাবা।’
‘আজ বলত অসুবিধা কি?’
‘অসুবিধা নেই, তবে বলতে ইচ্ছা করছে না।’
‘সোমা বলল তুমি নাকি সারাদিন রাস্তায় রাস্তায় ঘুর। পার্কে বসে থাক? কারণটা কী?’
‘কোন কারণ নেই, বাবা। এমনি।’
রাকিব সাহেব চিন্তিত ভঙ্গিতে চায়ে চুমুক দিলেন। শাহেদও চুপচাপ। সে বুঝতে পারছে তার বাবা তাকে আবার কি বলবে। চলে যেতে পারলে ভাল হত কিন্তু সে চলে যেতেও পারছে। যেই ভয় পাচ্ছিল তাই ঘটল। রাকিবউদ্দিন সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার লাইফ টাইম অপরচুনিটি প্রোজেক্টের কার্যক্রম কি আপাতত বন্ধ?’
শাহেদ নিশ্চুপ রইল। কী বলবে সে?
রাকিবউদ্দিন সাহেব আবার বলল, ‘আমার ধারণা, তুমি বড় ধরণের একটা সমস্যায় পড়েছ। আমার ধারণা কি ঠিক?’
‘নট শিওর, বাবা। ঠিক বলতে পারছি না।’
‘ঠিক আছে, যখন শিওর হবে তখন বল।’
শাহেদ আমতা আমতা করে বলল, ‘আমার চা খাওয়া শেষ। আমি এখন আসি, বাবা।’ শাহেদ চায়ের কাপ নামিয়ে রাখল।
‘শাহেদ, সমস্যাটা তোমার একার হলেও সাফারার কিন্তু আমরা সবাই। সমস্যা যত কঠিনই হোক, তোমার উচিত হবে আমাদের সঙ্গে শেয়ার করা। ব্যাপারটা খুলে বলা। সমস্যাটা কি, সেটা জানলে সমাধানের একটা রাস্তাও নিশ্চয়ই খুঁজে বের করা যাবে।’
শাহেদ নিশ্চুপ।
‘ঘটনার গুরুত্বটা কি তুমি বুঝতে পারছ?’
‘জি পারছি।’
‘আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি যাও।’
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে উঠে চলে গেল।

নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
সোমা আজ ক্লাসে করে নি তবুও সে ক্লাস শেষের বন্ধুদের আড্ডায় যোগ দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেল। ওকে দেখে সবাই কিছুটা চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল। সোমার মন ভাল নেই। তার চেহারায় বিষণ্ণতার ছায়া স্পষ্ট।
সোমা বলল, ‘রাজন এসেছিল এদিকে? তোরা কেউ দেখেছিস ওকে?’
ইরা বলল, ‘না তো! সেদিন তুই ক্লাসে আসিস নি, রাজন ভাইও ক্যাম্পাসে আসে নি। আমরা তো ভাবলাম…’ ইরা কথা শেষ না করে ইঙ্গিতপূর্ণ দৃষ্টি বিনিময় করল সিন্থিয়ার সাথে।
বাপ্পী বলল, ‘আমরা তো ভাবলাম, দু’জনে মিলে অভিসারে গিয়েছিস!’
সোমা কিছু বলল না। তার চিন্তাযুক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে সিন্থিয়া বলল, ‘ফোন করেছিস? ফোন করে দ্যাখ।’
‘করেছি, ফোন ধরছে না। এসএমএস করেছি, নো রিপ্লাই।’
বাপ্পী বলল, ‘হুমম, কোথাও কোন সমস্যা হয়েছে। যে তোকে একদিনও না দেখে থাকতে পারে না আর সে কি না ফোনই ধরছে না। সামথিং ইজ রং।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সোমা বলল, ‘আমি আসিরে।’
সজল বলল, ‘চলে যাচ্ছিস? থাক না, আমাদের সাথে একটু আড্ডা দে—তোকে তো পাওয়াই যায় না।’
সোমা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অন্যমনস্কভাবে ঘুড়ে দাঁড়াল। সে হাঁটা শুরু করতেই বাপ্পী বলল, ‘রাজন ভাইকে বলিস আমাদের খাওয়াটা কিন্তু এখনও পাওয়া আছে।’
সোমা ঘুরে তাকিয়ে বলল, ‘দেখা হলে বলব।’
সোমা চলে যেতেই সব বন্ধুরা মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

রাতের আলো আঁধারিতে বিষণ্ণ শাহেদ বসে রয়েছে তার ছোট ব্যালকনিতে। আবাসিক এলাকার অট্টালিকার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে জোছনার আলো এসে পড়েছে। শাহেদ উদাস নয়নে তাকিয়ে আছে বাইরে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। নীরবতা ক্ষণে ক্ষণে ভিতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বের করে নিয়ে আসছে। প্রতিটা নিশ্বাস যেন কিসের অপেক্ষায় প্রহর গুনছে। কেমন জানি অস্থিরতা। কী একটার জন্য অপেক্ষা।
শাহেদের ফোন বেজে উঠল। শাহেদ ফোনের দিকে একবার তাকাল। কিন্তু সে উঠে ফোন ধরল না। কয়েকবার রিং বেজে থেমে গেল ফোন। শাহেদ আবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
ফোনটা আবার বাজল। বেজে বেজে থেমে গেল। উঠে গিয়ে শাহেদ ফোনটা হাতে নিলেই দেখতে পেত—যেই ফোনের অপেক্ষায় তার দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এটি ছিল সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন।
ঝির ঝির বাতাস বইছে। হিমেল হাওয়া। কেমন শীত শীত লাগছে শাহেদের। শাহেদ উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে হেঁটে ভেতরে গেল। অন্যমনস্কভাবে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল—নাতাশার নামের পাশে দুটো মিসকল দেখা যাচ্ছে। নাতাশা ফোন করেছিল। নাতাশার উপর তার প্রচণ্ড ক্ষোভ আবার একই সাথে অভিমান। ফোনটা বিছানায় ফেলে দিয়ে শাহেদ গা এলিয়ে দিল। কয়েক মুহূর্তে না যেতেই শাহেদের ফোন বেজে উঠল। শাহেদ ফোন স্ক্রিনে দেখল—অপরিচিত নাম্বার। শাহেদ ভাবল, হয়ত নাতাশার কল আগে ধরি নাই, তাই আরেকটা নাম্বার থেকে ফোন করেছে। শাহেদ ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো?’
‘আপনি কি শাহেদ?’ অপর প্রান্ত থেকে একটি অপরিচিত পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল।
শাহেদ ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘জি।’
অপরিচিত কণ্ঠ বলল, ‘আপনার সঙ্গে আমি কিছু কথা বলতে চাই। সামনা-সামনি বলতে পারলে ভাল হয়…’
‘আপনি কে বলছেন?’
‘পরিচয় দিলে অবশ্যই চিনবেন।’
অসহিষ্ণু কণ্ঠে শাহেদ বলল, ‘তাহলে পরিচয় দিন…’
‘ঐ যে সেদিন…’ অপরিচিত কণ্ঠ আবার বলল, ‘বসুন্ধরা শপিং মলে দেখা হল। আপনার সাথে একটা মেয়ে ছিল—সোনিয়া। মনে পড়ছে?’
শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো। মনে না পড়ার তো কোন কারণ নেই। খুব বেশিদিন আগের ঘটনা তো নয়। শাহেদ মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘আমরা কি কোথাও বসে কথা বলতে পারি?’
শাহেদ একটু ভেবে বলল, ‘বলুন, কবে কখন কোথায় বসতে চান?’
‘আমি বলছি আপনি লিখুন।’
শাহেদ টেবিল থেকে এক টুকরো ছোট কাগজে তারিখ, সময় আর ঠিকানা লিখে রাখল। অপর প্রান্ত থেকে ফোন কেটে গেল। শাহেদ ফোন হাতে ভাবতে থাকল।

ঢাকা শহরের ব্যস্ততম আবাসিক এলাকার একটি রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল শাহেদ। তার হাতে এক টুকরা কাগজ। সেখানে লেখা সাইনবোর্ডের নাম মিলিয়ে সে ভিতরে প্রবেশ করল।
ভিতরে ঢুকে সে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সে কারো সংগে দেখা করতে এসেছে। সে আরো কয়েক পা এগিয়ে গেল সামনের দিকে আর তখনই তার দৃষ্টি থেমে গেল কোনার দিকের একটি টেবিলে বসা যুবকের দিকে। যুবকের নাম ইমরান। ঝাঁকরা চুল, একহারা লম্বা গড়ন। শাহেদ এগিয়ে কাছে যেতেই ইমরান মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল তাকে। তারপর আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘শাহেদ?’
শাহেদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
‘আমি ইমরান। ইমরান হোসেন খান। ঐ যে সেদিন…’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।’
‘প্লিজ বসুন।’
শাহেদ বসতেই ইমরান বলল, ‘কী খাবেন বলুন?
‘না, কিছু খাব না।’
‘এদের বিফ সমুচাটা খুব ভাল। আমি দুটো খেয়েছি। সাথে এক কাপ চা। খেয়ে দেখুন না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, সমুচা দিতে বলুন।’
ইমরান একজন ওয়েটার ডেকে আরো চারটা সমুচা আর দু’কাপ চা দিতে বলল।
কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে শাহেদ জানতে চাইল, ‘আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?’
ইমরান একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি বের করে শাহেদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই ছবিটার পেছনে লেখা ছিল।’
শাহেদ ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল, এটি তারই ছবি এবং ছবির পেছনে ওর পুরা নাম আর ফোন নাম্বারটা লেখা। সে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন কী ব্যাপারে ডেকেছেন?’
‘সোনিয়ার ব্যাপারে…। ওর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি, ওকে কিভাবে চেনেন, কিভাবে পরিচয় হল, এইসব আর কি…’
শাহেদ বোঝার চেষ্টা করল। কিছু বলল না।
ইমরান আবার বলল, ‘বুঝতে পেরেছি, আপনি হয়তো ভাবছেন এটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আমাকে কেন বলবেন, এইতো?’
শাহেদ সরাসরি তাকাল ইমরানের মুখের দিকে। তার চেহারায় ইতস্তত ভাবটা স্পষ্ট।
ইমরান মরিয়া হয়ে বলল, ‘আই নিড ইয়োর হেল্প শাহেদ, এন্ড আই অ্যাম প্রিটি শিওর, ইউ নিড মাইন। এখন আমাদের উচিত দুজন দুজনকে সাহায্য করা।’
শাহেদ একবার তাকাল বাইরে, আবার তাকাল ইমরানের দিকে। মনে হচ্ছে সে বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। তার চোখের দৃষ্টিতে তাই বলে। শাহেদ নিজেও বুঝতে চায়, ইমরানের সম্পৃক্ততাই বা কী?
ইমরান সমুচার প্লেট সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন খান। খেতে খেতে বলুন।’
শাহেদ অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার ইতস্তত ভাবটা কাটতে কিছুটা সময় লাগছে। সে তার হাতের ফোনটি নিয়ে টেবিলের উপরে ঘুরাতে লাগল।
শাহেদ সময় নিয়ে ধীরে ধীরে সব ঘটনা খুলে বলল। ম্যারেজ মিডিয়া, এজাজ, জামান, নাতাশা, সোনিয়া—সবার কথা শুনে ইমরান বলল, ‘এখন কি করবেন?’

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৩)

‘ছার, চা খাবেন? গরম চা। দেই?’
শাহেদ ফোনটা হাতে ধরে বসে ছিল অন্যমনস্কভাবে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। নাতাশাকে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া গেল না। শাহেদকে কেন সে এড়িয়ে যাচ্ছে শাহেদের বোধগম্য হচ্ছে না। একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, শাহেদের মনে দ্বিধা-শঙ্কা তৈরি হতেই পারে, সেক্ষেত্রে বরং শাহেদেরই উচিৎ হারিয়ে যাওয়া। দূরে সরে যাওয়া নাতাশা আর তার গ্যাংদের বলয় থেকে যতদূরে যাওয়া যায়। তা না করে নাতাশাই নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। শাহেদের মেজাজ খারাপ হল, খুব। রাগে ক্ষোভে আর দুঃখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো আবার।
‘ছার, চা খাবেন? গরম চা। দেই?’
শাহেদ তাকিয়ে দেখল একটা অল্প বয়সী ছেলে—চায়ের কেতলি আর পানির বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। শাহেদ হ্যাঁ বা না কিছু না বলে আবার তার ভাবনার জগতে ফিরে গেল।
‘দেই ছার? ফেরেস গরম চা।’
শাহেদ বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘এই তোর কাছে চা চেয়েছি? ভাগ এখান থেকে।’
চা বিক্রেতা ছেলেটা আহত চোখে তাকাল শাহেদের দিকে। সারাদিনে সে বহু ধরণের মানুষের দেখা পায় এই পার্কে। সবাই যে তার চা খায় তা না, কিন্তু এভাবে তাড়িয়ে দেয় না। সেও কম যায় না। ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘না খাইলে না খাবেন, এত চ্যাত দেখান ক্যান?’
গজ গজ করতে করতে ছেলেটা চলে গেল অন্যদিকে। শাহেদ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার চলে চাওয়ার দিকে।

‘অনেকদিন থেকে তোমাকে একটা কথা বলব ভাবছিলাম।’
সোমা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল রাজনের দিকে। সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘ভাবা-ভাবির কি আছে। বলে ফেললেই তো হয়। বল।’
‘জানিনা ব্যাপারটাকে তুমি কীভাবে নেবে?’
‘কোন ব্যাপারটা?’
রাজন সোমার প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে বলল, ‘ইউ নো হাউ মাচ আই লাভ ইউ…’
‘হেঁয়ালি রাখ তো! এসব প্যাঁচান কথা আমার ভাল লাগে না। যা বলার সরাসরি বলবে।’
‘আমার বাসায় একবার নিয়ে যেতে চাই তোমাকে।’ অনেকক্ষণ ইতস্তত করে রাজন বলে ফেলল। তারপর তাকাল সোমার দিকে, উত্তরের অপেক্ষায়—
সোমা কিছু বলল না। অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। কিছু সময় পার করে সোমা বলল, ‘না। নট পসিবল।’
‘আমি কোথায় থাকি তোমার দেখতে ইচ্ছে করে না?’
‘না।’
‘না?’
‘না। দ্যাটস নট ইম্পরট্যান্ট! তুমি কোথায় থাক তা জেনে আমার কী হবে? তুমি বড়লোকের ছেলে আমি জানি। তোমার গাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে তাও জানি। কিন্তু রাজন, আমি তো সেগুলো ভেবে তোমার সাথে সম্পর্ক করি নি। তোমার সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার জন্য ইম্পরট্যান্ট আর দেখাত হচ্ছেই—অলমোস্ট এভ্রিডে!’
রাজন আর কিছু বলার মত কথা খুঁজে পেল না। মনে হচ্ছে এ জনমে সোমাকে তার একান্তভাবে আর কখনই পাওয়া হবে না।
রাজন মনে মনে আর কী কী অপশন আছে ভাবতে থাকল।

নাতাশার সাথে যোগাযোগের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কিছুদিন পর শাহেদ আবার গেল ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে। সর্বশেষ চেষ্টা করে দেখবে একবার। নিশ্চয়ই এজাজ কিংবা জামানের মাধ্যমে ফোন করালে নাতাশা ফোন ধরবে। আর তখনই সে তার সাথে কথা বলবে।
শাহেদ হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো ম্যারেজ মিডিয়া অফিসের সামনে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, কলাপ্সিবল গেটে বড় একটা তালা ঝুলছে। শাহেদ ঘড়ি দেখল—দুপুর সাড়ে বারোটা। সকাল ন’টায়ই তো এই অফিস খোলা পেয়েছে শাহেদ। আজকে কী হল? সে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল—আশে পাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে-কি ভুল জায়গায় এলো না কি? এতদিন যাওয়া-আসা এখানে, এমন ভুলত তার হবার কথা না। সে আবারো চারিদিকে একবার দেখল এবং নিশ্চিত হল।
অজানা আতংকে শাহেদের শরীরে ভয়ের শীতল স্রোত নেমে এলো। তার হার্টবিট বেড়ে গেল। সে কলাপ্সিবল গেটের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল—অন্ধকার। হঠাৎ লক্ষ করল একটা ছোট ছেলে ওকে দেখছে—দূর থেকে। শাহেদের মনে হল, এই ছেলেটিকে এই অফিসে সে দেখেছে আগে। দু’একবার চাও এনে দিয়েছে। শাহেদ হাত তুলে ডাকল, ‘এই, এই ছেলে শোন। এদিকে আস।’
ছেলেটির ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল সে এখনই দৌড়ে পালাবে। শাহেদ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওর হাত ধরে ফেলল। ‘এই, এরা কোথায়? জামান সাহেব, এজাজ সাহেব? অফিসের বাকী সবাই?’ ছেলেটির হাত ধরে রেখেই প্রশ্ন করল শাহেদ।
‘হেরা তো আইজ আসে নাই।’
‘আসে নাই কেন জান?’
‘জানি না। তয় আর আইব বইলাও মনে অয় না।’
‘কেন, আসবে না কেন?’
‘জানি না।’
শাহেদের মনে হল ছেলেটি জানে কিন্তু বলছে না। সে তার হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছে। শাহেদ হাত না ছেড়েই বলল আবার, ‘এরা কোথায় থাকে কিছু জান? মানে এদের বাসা কোথায়?’
‘জানি না।’
শাহেদ কিছুক্ষণ ভেবে কী মনে করে ছেলেটির হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি যাও।’
ছেলেটি ভয় মিশ্রিত ভঙ্গিতে কয়েক পা পিছিয়ে ঘুরে এক দৌড়ে পালিয়ে গেল। শাহেদ মাথার চুলে হাত ঢুকিয়ে চুল ছিঁড়ে ফেলার মত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মত।

সুন্দর স্নিগ্ধ বিকেল।
পড়ন্ত বিকেল বেলায় প্রকৃতি সেজেছে নিজের রূপে। আর প্রেমিকের মন রক্ষার্থে প্রেমিকা এসেছে প্রেমিকের গৃহে।
ঢাকা শহরের এক অভিজাত এলাকার সুউচ্চ অ্যাপার্টমেন্ট। লিফট দিয়ে উঠে এলো রাজন আর সোমা। রাজন উত্তেজিত। সোমা নির্লিপ্ত। ম্রিয়মাণ। সোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে ইচ্ছের বিরুদ্ধে এবং শুধুমাত্র রাজনের অনুরোধ রক্ষার্থে সে এসেছে। তার স্বভাবসুলভ হাসি কিংবা দুষ্টুমি তার চেহারা থেকে উধাও। লিফট থেকে বের হয়ে তারা এসে দাঁড়াল একটা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। দরজা খুলে রাজন বলল, ‘এস।’
সোমা ইতস্তত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। রাজন তার হাত ধরে আলতো করে টেনে রুমের ভেতরে নিয়ে এলো। সোমার পেছনে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে রুমের সবগুলো লাইট অন করে দিল রাজন। সোমা মুগ্ধ হয়ে গেল রাজনের সুন্দর পরিপাটি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের অঙ্গসজ্জা দেখে। ছবির মত করে সাজান সবকিছু। এক নজরে বসার ঘর, সোফা সেট, টিভি সেট, দেয়ালে টানানো পোট্রেট, ফ্রেমে বাধানো ছবি—সব কিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া।
সোমার দিকে তাকিয়ে রাজন বলল, ‘কেমন দেখছ?’
সোমা মৃদু হাসল। অস্ফুটে বলল, ‘সুন্দর!’ কিন্তু তার জড়তা কিছুতেই কাটছে না।
রাজন আবার বলল, ‘মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল ইয়াং লেডি। ইট’স ইয়োর হোম টু।’
সোমা কিছু না বলে চারিদিকটা একবার ঘুরে দেখল। তারপর হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল বড় জানালাটার পাশে। পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল বাইরে। অন্ধকার নেমে এসেছে। গোধূলি রঙে রাঙান বিকেলটা হঠাৎ কেমন ধূসর হয়ে যাচ্ছে।
‘কফি খাবে? বাসায় ইনস্ট্যান্ট কফি আছে।’
সোমা ফিরে তাকাল রাজনের দিকে। ‘কফি খাব না। শুধু পানি।’ বলেই সে আবার তাকাল বাইরে।
রাজন দু’কাপ কফি, এক গ্লাস পানি আর কিছু স্ন্যাকস একটা ট্রে-তে সাজিয়ে এনে রাখল সোফার সামনের কফি টেবিলে। সোমা এসে বসল সোফাতে। রাজন পানির গ্লাস এগিয়ে দিল সোমার হাতে। সোমা পানি খেয়ে নামিয়ে রাখল গ্লাস। দুজনেই কফি নিয়ে আস্তে করে চুমুক দিল। কিছুটা সময় চুপচাপ পার করে রাজন বলল, ‘টিভি দেখবে? টিভি ছেড়ে দেই?’
সোমা কিছু বলল না। সোমা এখনো সহজ হতে পারছে না।
আবারো নীরবতা। কিঞ্চিৎ অস্বস্তিকর। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাজন বলল, ‘কী ব্যাপার সোমা, একেবারে কোয়াইট হয়ে গেলে যে?’
‘এভাবে আমাকে এখানে নিয়ে আসাটা তোমার ঠিক হয় নি, রাজন। আমার ভাল লাগছে না। চল, চলে যাই।’
‘আহা, এত অস্থির হচ্ছ কেন? বস না, তোমাকে একটু দেখি—এত কাছে থেকে দেখার সুযোগ যদি আর না হয়?’
‘মানে?’
‘তোমার সাথে একান্তে কখনই কথা বলতে পারি না। সারাক্ষণ তোমার বন্ধুরা ঘিরে থাকে। এত রিকোয়েস্ট করে তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেব ভেবে নিয়ে এলাম, আর তুমি শুধু যাই যাই করছ।’
‘আচ্ছা, কী সারপ্রাইজ দেবে দাও, তবে তাড়াতাড়ি। আমাকে বাসায় ফিরতে হবে। এতক্ষণে মা চিন্তায় অস্থির হয়ে যাবে।’
রাজন ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। সোমার হাত থেকে কফির কাপটা নিয়ে রেখে দিল ট্রে-তে। আলতো করে ধরল তার হাত। সোমার হাত নিয়ে রাজন তার আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে স্পর্শ করল। সোমা কিছুই বলল না দেখে রাজন সাহসী হয়ে উঠল। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে তার উষ্ণতার হাত দিয়ে সোমার শরীরের কিছু অংশে স্পর্শ করল।
সোমা চোখ বন্ধ করে আছে। রাজন ধীরে অতি ধীরে তার ঠোঁট নামিয়ে এনে স্পর্শ করল সোমার ঠোঁট। সোমা চোখ বন্ধ করেই রইল। রাজন সরে এসে তাকিয়ে রইল সোমার চোখের দিকে। কোন রকম প্রতিক্রিয়া সে দেখতে পেল না। রাজন আবার কাছে এসে ছোঁয়াল ঠোঁট—একে দিল গভীর চুম্বন। সোমার নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো। রাজন অনুভব করল সোমার উষ্ণ নিশ্বাস। তার অভিজ্ঞতায় বুঝতে অসুবিধা হল না—সোমাকে সে তৈরী করে ফেলেছে। বাঁধা দেবার মত পরিস্থিতি সোমার নেই এখন। সে কালক্ষেপণ না করে অতি সন্তর্পণে সোমাকে পাঁজা কোলে নিয়ে গেল তার বেডরুমে।
বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রাজন জড়িয়ে ধরল সোমাকে—ভালবাসার আলিঙ্গনে। রাজন তার অবাধ্য হাত দুটো চালিয়ে দিল সোমার শরীরের স্পর্শকাতর অংশগুলোতে।
হঠাৎ করেই সোমা উঠে বসল। পরিস্থিতি অনুধাবণ করে নিজেকে সঙ্কুচিত করে ফেলল সে। রাজনকে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘প্লিজ, রাজন, এভাবে না।’
রাজন অবাক চোখে বলল, ‘না কেন?’
‘আই’ম নট রেডি ফর দিস।’
‘হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?’ রাজন ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘তাহলে এসেছ কেন?’
‘আমি ভেবেছিলাম…’
‘কী ভেবেছিলে?’ রাজনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ভয় পেয়ে গেল সোমা। সে কোন উত্তর দিতে পারল না আর।
রাজন ধাক্কা দিয়ে সোমাকে শুইয়ে দিল আবার নরম ভেলভেটের বিছানায়। চড়ে বসল সোমার নরম শরীরের ওপরে। অসহায় সোমা ছটফট করতে থাকল রাজন নামক এক অন্যরকম পুরুষের ভিন্নরকম ভালবাসার পরশে।

সারাদিন পার্কে আর রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে উদ্ভ্রান্তের মত ঘরে ফিরে এলো শাহেদ।
মানসিক চাপে ভীষণরকম বিপর্যস্ত সে। তাকে দেখলেই যে কেউ বলে দিতে পারবে, মানসিকভাবে কতটা বিধ্বস্ত সে এখন। শাহেদ ধীর পায়ে তার রুমে ঢুকে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বিছানায় এলিয়ে দিল তার শরীর। তাকিয়ে রইল ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে। তার সমস্ত শরীর-মন ঘূর্ণায়মান ফ্যানের পাখার মত ঘুরতে থাকল। সে চোখ বন্ধ করে চুপ করে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ এবং আশ্চর্যজনকভাবে মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।

সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে আসছে।
মিসেস জাহানারা চিন্তিত মুখে রান্না ঘরে একটা টুলের উপর বসে আছেন। তিনি কয়েকবার দরজার দিকে তাকালেন। এসময়ে একবার হলেও রান্নাঘরে আসে সোমা। কিন্তু সে আসছে না। ইতিপূর্বে তিনি একবার সোমার ঘরে গিয়ে দেখে এসেছেন, এখনো ফেরে নি কলেজ থেকে। মেয়েটা কেন আসছে না ভেবে অস্থির হয়ে আছেন তিনি। দিনকাল ভাল না। অল্পতেই তার টেনশন এবং প্রেশার বেড়ে যায়। তিনি আপন মনেই বললেন, ‘সোমাটা আজ আবার এত দেরী করছে কেন?’
মিসেস জাহানারা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে শাহেদের ঘরে গেলেন। শাহেদ ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। তিনি শাহেদের বিছানার কাছে এসে অবাক হয়ে লক্ষ করলেন—শাহেদ গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে। এই ভর সন্ধ্যায় কেউ ঘুমায়? তিনি চিন্তিত মুখে বের হয়ে গেলেন শাহেদের ঘর থেকে।

জানালার ফাঁক গলে রাস্তার আলো এসে পড়েছে রাজনের শোবার ঘরে।
বিছানায় শুয়ে আছে দুটি শরীর। সোমা আর রাজন। সোমা ফুলে ফুলে কাঁদছে। রাজন লক্ষ করল সোমার কান্না। সে ঘুরে সোমাকে টেনে নিল নিজের কাছে। হাত দিয়ে চোয়াল স্পর্শ করল সোমার। আদুরে গলায় বলল, ‘কাঁদছ কেন, সোমা। কী হয়েছে?’
সোমা কিছু বলতে পারল না। সে নীরবে চোখ মুছে চলল।
রাজন আবার আদর করে সোমাকে টেনে নিল তার বুকে। ‘বলবে না?’
সোমা নাক টেনে বলল, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যা আমি বিয়ের রাতে তোমাকে উপহার দিতে চেয়েছিলাম, তা তুমি আগেই নিয়ে নিলে। এটা খুবই অন্যায় হল।’
রাজন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, ‘আমার উপহার আমি নিয়েছি। কিছুদিন আগে এই যা, তাতে এত মন খারাপ করার কী আছে? আর আমি তো অন্য কেউ না, আমি সে-ই যাকে তুমি এই উপহারটা দিতে চেয়েছিলে।’
সোমা রাজনের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বসল বিছানায়। চোখ মুছে শীতল কণ্ঠে বলল, ‘রাজন, আমার কিছু কথা আছে।’
রাজন আধশোয়া অবস্থায় হাত ভেঙে হাতের ওপর মাথা রেখে বলল, ‘বল।’
‘না, ওভাবে নয়। উঠে বস।’
রাজন উঠে বসল—মুখোমুখি। ‘বল, কী বলবে?’
‘এভাবে আর কতদিন, রাজন? তুমি তো কিছুই বলছ না।’
‘কী জানতে চাও?’
‘জানতে চাই তোমার কমিটমেন্টের কথা। তোমার প্রতিশ্রুতির কথা। যা একটা মেয়ের সবচেয়ে বড় বিসর্জনকে অহংকারী করে তুলতে পারে।’
রাজন সময় নিল সোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে। ‘কি প্রতিশ্রুতি তুমি চাও বল?’ সে ব্যাখ্যা দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘তোমাকে আমি ভালবাসি এর চেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি আর কী হতে পারে, সোমা?’
সোমা স্থির এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। ‘আমি চাই আমাদের ভালবাসার পরিণতির প্রতিশ্রুতি।’
‘বুঝেছি, বিয়ের কথা বলছ?’
‘এভাবে লুকিয়ে ভালবাসা-বাসি খেলতে আমার ভয় হয়।’
‘কিসের ভয়, সোমা? বিয়ে তো আমি তোমাকেই করব। পাত্র হিসেবে আমাকে নিশ্চয়ই তোমার বাবা-মা অপছন্দ করবেন না। আফটার অল বিসিএস কোয়ালিফাইড।’
‘তাহলে আমাদের বাসায় প্রস্তাব পাঠাও। আমাদের এনগেজমেন্টটা হয়ে থাক, তারপর আমার পরীক্ষা শেষ হলে বিয়েটা সেরে ফেলব। আমাকে নিয়ে মা ভীষণ চিন্তা করে, তুমি প্লিজ এ কাজটা কর। বোঝই তো, মেয়ে বড় হলে বাবা-মায়ের চিন্তার শেষ থাকে না।’
‘ঠিক আছে প্রস্তাব পাঠাব। বোকা মেয়ে, বিয়ে হলেই তো সব আনন্দ শেষ, এমন লুকিয়ে প্রেমের মজাটা তখন আর পাওয়া যাবে না।’ বলতে বলতে রাজন সোমাকে আবার কাছে টেনে নেবার জন্য হাত বাড়াল।
সোমা বাঁধা দিয়ে বলল, ‘না, প্লিজ, আমাকে কথা দাও।’
‘আচ্ছা দিলাম, কথা দিলাম। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা প্রমিজ করতে হবে।’
‘কী সেটা?’
‘আমি তোমাকে প্রতিদিন একবার করে দেখতে চাই—এখানে।’
সোমা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাজনের মুখের দিকে। চোখে বিস্ময়!
‘এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?’
‘সেটা কী করে সম্ভব?’
‘চাইলেই সম্ভব। এই যেমন, তুমি চেয়েছিলে বলেই আজ সম্ভব হয়েছে।’
‘আমি ভেবেছিলাম অন্যকিছু, কিন্তু তুমি যে—’
সোমাকে কথা শেষ করতে দিল না রাজন। সোমার মুখে হাত চাপা দিয়ে জোর করেই টেনে নিল তার কাছে। রাজনের বাহু বন্ধনে ছটফট করতে থাকল সোমা।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১২)

যুবকের পরিচয় দেয়া যাক। তার নাম ইমরান। ইমরান হোসেন খান।
ইমরানের রিক্সা ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতেই চলছিল। হঠাৎ রিকশাচালক রিক্সার গতি কমিয়ে দিল এবং এক পর্যায়ে রিক্সা থামিয়ে নেমে পড়ল। ইমরান চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘কী ব্যাপার? রিক্সা থামালেন কেন?’
রিকশাচালক বলল, ‘ইচ্ছা কইরা তো থামাই নাই। চেইন ছিলিপ কাটছে।’
‘চেইন ছিলিপ কাটার আর সময় পেল না।’ বিরক্ত মুখে বলল ইমরান, ‘চেইন ঠিক করেন মিয়া।’
‘ঠিক করতেছি।’ রিক্সাওয়ালা চেইন ঠিক করার চেষ্টা করতে লাগল।
মেয়েদের একটা ভ্যানিটিব্যাগ হাতে নিয়ে ইমরান অস্বস্তিবোধ করতে লাগল। সে সন্তর্পণে চারিদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, কেউ তাকে বিশেষ নজরে দেখছে কি না।
হঠাৎ করেই ইমরানের দৃষ্টি গেল অদূরে—একজন পুলিশ সার্জেন্ট হেঁটে আসছে তার রিক্সার দিকে। ইমরানের মুখের রক্ত সরে গেল। সে দ্বিধায় পড়ে গেল হাতের ব্যাগটি নিয়ে। ব্যাগটি দ্রুত কোথাও লুকাতে পারলে ভাল হত কিন্তু লুকানোর মত কোন কিছু সে খুঁজে পেল না। সে রিক্সাওয়ালাকে বলল, ‘এই মিয়া, চেইন ঠিক করতে এতক্ষণ লাগে?’
‘চেইন তো ঠিক হইছেই।’
‘তাহলে দেরি করছেন কেন? চলেন।’
রিকশাচালক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কই যাইবেন কইলেন না তো।’
‘কোথাও যাব না। এমনিই ঘুরব, কোন অসুবিধা আছে?’
রিকশাচালক অবাক চোখে তাকাল। সে হ্যাঁ না কিছু না বলে আবার বসে পড়ে রিক্সার চেইন উলটা দিকে ঘুড়াতে লাগল।
পুলিশ সার্জেন্ট প্রায় চলে এসেছে। ইমরানের কপালে চিকণ ঘাম দেখা দিল। সে মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করল। ইমরান মোটামুটি বুঝে গেল সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে। সে পরিষ্কার দেখতে পেল পুলিশ সার্জেন্ট তার কাছাকাছি এসে তার হাতের ব্যাগটির দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলছে, ‘এই ব্যাগটা কি আপনার?’
ইমরান শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘জি আমার।’
‘এটাতো দেখি মেয়েদের ব্যাগ।’ সার্জেন্ট কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার হাতে মেয়েদের ব্যাগ কেন?’
ইমরান সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘পুরুষের হাতে মেয়েদের ব্যাগ থাকা কি নিষেধ?’
সার্জেন্ট কড়া দৃষ্টিতে বলল, ‘ব্যাগের মধ্যে কি আছে?’
ইমরান চুপ করে রইল।
‘কথা বলছেন না কেন? এই ব্যাগ কার, কী আছে এর ভেতর?’
ইমরান ঘাবড়ে গেল। সে আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করেও পারল না। শুধু বলল, ‘জি, মানে…’
‘ব্যাগ ছিনতাই করে রিকশা নিয়া পালাইতেছেন?’
সার্জেন্টের কথায় রিক্সাওয়ালা খুব আনন্দ পেল। সে হাসি হাসি মুখ করে তাকাল ইমরানের দিকে। চোখের সামনে ভদ্রবেশী এক ছিনতাইকারীকে দেখে তার আনন্দের সীমা রইল না। রিক্সাওয়ালার হাসি দেখে ইমরানের পিত্তি জ্বলে গেল। এই হারামজাদার কারণে এখন তাকে হেনস্তা হতে হচ্ছে। সে রিক্সাওয়ালার দিকে কটমট করে তাকাল।
‘চেহারা দেখে তো ভদ্রই মনে হয়। দেখি ব্যাগটা খুলেন।’
পুলিশ সার্জেন্টের কথায় ইমরান ঘুরে তাকাল।
ইমরান তার হাতের ভ্যানিটিব্যাগটি ধরে কী করবে বুঝতে পারছে না আর ঠিক তখনই পুলিশ সার্জেন্ট রিক্সার হুডে হাতের রুলার দিয়ে একটা বাড়ি দিয়ে হুংকার দিয়ে বলল, ‘ঐ ব্যাটা ছাগল, রিকশা থামানোর জায়গা পাস না?’
রিকশাওয়ালা বলল, ‘ছার, চেইন ছিলিপ কাটছে।’
‘চেইন ঠিক করতে কতক্ষণ লাগে? চড় দিয়া তোর রিকশা চালানো শিখায় দিব, হারামজাদা। সরা রিকশা এখান থেকে। সাইডে যাইয়া চেইন ঠিক কর, যা।’
পুলিশ সার্জেন্টের হুংকার ইমরানকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো বাস্তবে। সে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বুঝতে পারল সে যা ভাবছিল তার কিছুই আসলে ঘটে নি। ঘাম দিয়ে জ্বর সারল যেন তার। সে একটা বড় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।

ঢাকার আকাশে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
ধুলোভর্তি আকাশে সন্ধ্যা তারাটা অস্পষ্ট। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে গাঢ় ছায়া অপসৃয়মাণ।
শাহেদ তার বেডরুমে শুয়ে আছে অসময়ে। তার ঘর অন্ধকার—মুখটাও। সিলিঙের দিকে তাকিয়ে আছে সে। নিষ্পলক দৃষ্টি। অন্যমনস্ক। মাথার মধ্যে কয়েক হাজার ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। তার মনের অস্থিরতা কাটছে না কিছুতেই। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে উঠে বসল সে। বিছানার পাশ থেকে তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে নাতাশার নাম্বার বের করে ফোন করল। ওপাশ থেকে ফোনের রিংটোনের শব্দ ভেসে এলো। ফোন বাজছে কিন্তু নাতাশা ধরছে না। শাহেদ শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে সে ফোন করল আবার। না—এবারো উত্তর পাওয়া গেল না। শাহেদ চিন্তিত ভঙ্গিতে একটা টেক্সট মেসেজ লিখল—I’m sorry. Please pick up the phone, I need to talk.
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহেদের অস্থিরতাও বাড়ল সমান গতিতে। সোমা কয়েকবার ডেকে গেছে। শাহেদ রাতে কিছু খাবে না জানিয়ে দিয়েছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আজ রাতটা অনেক দীর্ঘ হবে। সে দীর্ঘ রজনী পার করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল।

ঢাকার আকাশে সূর্য উদয় হচ্ছে।
একটি নির্ঘুম রাত কাটিয়ে শাহেদ তার রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মাথাটা ধরে আছে এখনো। একটু ঘুমিয়ে নিলে নিশ্চয়ই আবার ঠিক হয়ে যাবে সব কিছু। আড়মোড়া ভেঙে সে তাকাল সামনে। আকাশছোঁয়া সারি সারি অট্টালিকার ফাঁক গলে প্রথম ভোরের এক চিলতে রোদ সবে মাত্র এসে পড়েছে। রোদেলা ভোরের মিষ্টি বাতাস এসে শাহেদের মুখে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিল।

সকাল ন’টা প্রায়।
সোমা চা নিয়ে ঢুকল শাহেদের রুমে। শাহেদ রাতের না হওয়া ঘুমটা পুষিয়ে নিতে আবার এসে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছুতেই ঘুমাতে পারছে না।
সোমা ডেকে বলল, ‘ভাইয়া তোমার চা।’
শাহেদ কিছু বলল না।
সোমা লক্ষ করল শাহেদের চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ঘুমে ঢুলুঢুলু শাহেদকে কেমন বিধ্বস্ত লাগছে। সোমা শঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘কী ব্যাপার তোমাকে এত বিধ্বস্ত লাগছে কেন? মনে হয় সারারাত ঘুমাও নি? চোখ দু’টা তো একেবারে রেড রোজ করে রেখেছ। হোয়াট’স গোয়িং অন ভাইয়া?’
‘নাথিং। এখন চা খাব না, নিয়ে যা। আর একটু ঘুমব।’ শাহেদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিল।
‘ঠিক আছে, চা ঢেকে রেখে যাচ্ছি। তুমি পরে খেয়ে নিও।’
শাহেদ হঠাৎ বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘পরে খেয়ে নিব মানে? ঠাণ্ডা চা খাব না কি? তোকে বললাম না আমি আরও একটু ঘুমব। এত কথা কেন বলছিস? যা ভাগ!’
সোমা অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল শাহেদের দিকে। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সে ধীরে পায়ে বের হয়ে গেল শাহেদের ঘর থেকে।

দুপুর বারোটা।
শাহেদ একটা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখল। সে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল মেইন গেটের সামনে। সে ডোরবেলে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল।
বেশ কিছুক্ষণ পর একজন দারোয়ান গেট খুলে জিজ্ঞেস করল, ‘কারে চান ভাইজান?’
‘ইয়ে মানে, নাতাশা ম্যাডাম আছে ভেতরে? এটাতো নাতাশাদের বাসা তাই না?’
‘কার কথা কইলেন? নাতশা? এই নামে তো এইখানে কেউ থাকে না!’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শাহেদ বলল, ‘কানাডাতে থাকে… দেশে বেড়াতে এসেছে…’ শাহেদ আবার বাসাটা এবং আশেপাশে তাকিয়ে দেখল। সে নিশ্চিত—এই বাসাটাই। এখান থেকেই সেদিন নাতাশাকে সে তুলে নিয়েছিল।
শাহেদ বলল, ‘এ বাসাটাই তো!’
‘না তো ভাইজান। আপনে মনে হয় ভুল ঠিকানায় আইসা পড়ছেন।’
‘এই বাসা তাহলে কাদের?’
‘এইটা হইল রিমন ভাইদের বাসা।’
‘রিমন?’
‘জে!’
শাহেদ মনে মনে বলল, ‘রিমন! নিশ্চয়ই ওর সেই খালাত ভাই। আর এটি সেই বাসাটাই…’ শাহেদ দারোয়ানকে বলল, ‘রিমন সাহেব বাসায় আছেন?’
‘জে আছেন।’
‘একটু ডেকে দেয়া যাবে?’
‘জে যাবে।’
‘আচ্ছা, যান আপনি তাকে একটু ডেকে দেন তাহলে।’
দারোয়ান গেট আটকিয়ে চলে গেল ভেতরে। শাহেদ চিন্তিতমুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে থাকল।
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে গেট খুলে বেরিয়ে এলো একজন যুবক। ইনিই সম্ভবত রিমন সাহেব। তার পিছে দারোয়ান। রিমন শাহেদকে এক নজর দেখে বলল, ‘আপনি আমায় ডেকেছেন?’
‘জি। আপনার সঙ্গে কি আমি একটু কথা বলতে পারি?’
‘জি বলুন। কী ব্যাপারে?’
শাহেদ ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, ‘ইয়ে মানে, নাতাশা… আই মিন আপনার কাজিন নাতাশা… কানাডা থেকে এসেছেন… উনার ব্যাপারে।’
রিমন বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘আমার কাজিন নাতাশা! আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘কেন নাতাশা আপনার কাজিন নয়? এটা কি ওদের বাসা না?’
‘কী বলছেন এসব? নাতাশা কে? এ নামের কাউকে আমি চিনি না। আমার মনে হয় আপনার কোথাও কোন ভুল হচ্ছে।’
‘আপনি বলছেন নাতাশা নামে কেউ এখানে থাকে না?’
‘না, থাকে না।’
‘এটা তাহলে ওদের বাসা নয়?’
‘একবার তো বললামই–না।’ রিমনের কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পেল।
শাহেদ দ্বিধায় পড়ে গেল। সে বোকার মত তাকাল রিমনের দিকে। বুঝতে পারছে না কী বলবে। সে নিজের মনেই বিড়বিড় করে স্বগতোক্তির মত বলল, ‘তাহলে সেদিন যে আমি ঠিক এই বাসার সামনে থেকেই ওকে নিয়ে গেলাম? তাহলে কি…’ গভীর চিন্তায় পরে গেল শাহেদ। তার দৃশ্যপটে ভেসে উঠল সেদিনের পুরো ঘটনা। এবং মুহূর্তেই সে বুঝে গেল তাকে বোকা বানিয়েছে নাতাশা। সে অস্ফুটে বলল, ‘ও মাই গড!’

দুপুর দুটা।
শাহেদ উত্তেজিত ভঙ্গিতে বসে আছে ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে। এজাজ আর জামান শুরুতে শাহেদের অগ্নিমূর্তি দেখে খানিকটা ভড়কে গেলেও নিজেদেরকে যথাসম্ভব সংযত রেখেছে। শাহেদ চোখ বড় করে বলল, ‘আপনারা তার বাসা চেনেন না?’
এজাজ শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘না, আমরা তার বাসা চিনি না। তার বাসা চিইন্যা আমরা কি করব? তার বাসা কোথায় সেইটা জানা তো জরুরী না।’
‘বাসা চিনেন না অথচ তাকে নিয়ে দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটাও বিশ্বাস করতে বলেন?’
‘দেখেন ভাইজান, আপনে অযথা চেঁচামেচি করতেছেন। অযথা চেঁচামেচি কইরা কোন লাভ নাই। চুক্তিমত আমরা সব কাজই করতেছি। দু’একদিনের মধ্যেই ভিসার ডাক পাবেন। এত মাথা গরম করতেছেন ক্যান?’
‘মাথা গরম করছি মানে? নাতাশা কোথায়?’
‘সে এখন কোথায় সেটা আমরা কী কইরা বলব? আমরা তো তার কেয়ারটেকার না।’
শাহেদ শীতল কণ্ঠে বলল, ‘ঠিক আছে, ওকে ফোন করুন।’
‘জি?’ এজাজ তাকাল জামানের দিকে।
শাহেদ আবার বলল, ‘নাতাশাকে ফোন করুন।’
জামান চোখের ইশারায় ইঙ্গিত দিল এজাজকে। এজাজ তার ফোন থেকে একটা নাম্বারে ফোন করল। অপরপ্রান্ত থেকে ফোনের রিংটোন ফিল্টার হয়ে শোনা গেল। তবে কেউ ফোন ধরল না।
এজাজ চোখ পিটপিট করে বলল, ‘রিং তো ভাইজান হয়, কিন্তু ধরতেছে না। বুঝতেছি না কি সমস্যা।’
এরপরে কেউ আর কোন কথা বলল না। সবাই চুপ। এজাজ-জামান মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে শাহেদ বলল, ‘নাতাশা যে সত্যি কানাডা থেকে এসেছে এবং কানাডার সিটিজেনশীপ আছে—কোন প্রমাণ দেখাতে পারবেন?’
এজাজ বলল, ‘কী যে বলেন ভাইজান, একটা মেয়ে আইসা বলল আমি কানাডার সিটিজেন, ‘পাত্র চাই’ আর আমরা তার কোন কিছু না জাইনাই বিয়ের পাত্র খুঁজা শুরু করব?’
‘তাহলে আমাকে দেখান।’
‘কী দেখাব?’
‘প্রমাণ! প্রমাণ দেখান।’
এজাজ আবার তাকাল জামানের দিকে। জামান এই পুরো সময়টা নীরব ছিল। শাহেদের সব প্রশ্নের উত্তর এজাজ একাই দিয়েছে। এবার সে সামনে এগিয়ে এসে ব্যাখ্যা দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘দেখেন শাহেদ সাহেব, প্রমাণ দেখান তো কোন সমস্যা নয়। নাতশা ম্যাডামের পাসপোর্টের কপি আমাদের কাছে আছে। এমনকি নায়াগ্রা ফলসের সামনে দাঁড়ানো তার ফটোও আছে। কিন্তু, সেটা কোন ফ্যাক্টর না।’
শাহেদ ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘তাহলে ফ্যাক্টরটা কী?’
জামান আবার বলল, ‘আমার কি মনে হয় জানেন? আপনি ব্যাপারটা নিয়ে বিগ ডিল করছেন।’
‘বিগ ডিল করছি মানে? কীভাবে?’ শাহেদের কণ্ঠে উষ্মা প্রকাশ পেল।
‘সামান্য ভুল বুঝাবুঝি—একটু সময় দিন, দেখবেন উনি নিজেই আপনাকে ফোন করবেন। এতটা অস্থির হবার তো কোন দরকার নেই।’
শাহেদ আর কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। জামান তাকাল এজাজের দিকে। এজাজ ইশারায় বোঝাল, সব ঠিক আছে। শাহেদ হঠাৎ করেই বলল, ‘সে আমাকে ভুল ঠিকানা দিল কেন? যে বাসা তাদের নয়, সেখান থেকে কেন আমাকে তাকে তুলে নিতে বলল?’
জামান ফিরে গেল তার স্বভাবসুলভ হাসিতে। মিষ্টি হেসে বলল, ‘উনি কেন এমন করলেন ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে এমনওতো হতে পারে তার বাসা থেকে যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে আপনার সাথে যাচ্ছে, সে কারণে উনি আপনাকে আশেপাশের কোন বাসার সামনে থেকে তুলে নিতে বলেছিলেন?’
শাহেদ তাকাল জামানের চোখের দিকে।
‘পারে না? এমনওতো হতে পারে।’
শাহেদের মুখে কোন কথা নেই। সে ভাবনায় পড়ে গেল।
জামান আবার বলল, ‘আমি যতটুকু জানি, ম্যাডামের খালা আর খালাত ভাই সারাক্ষণ উনাকে চোখে চোখে রাখে। আপনার তো জানার কথা, উনি আপনাকে নিশ্চয় বলেছেন। বলেন নাই?’
শাহেদের মনে পড়ল, সে জিজ্ঞেস করেছিল নাতাশাকে তার খালা আর খালাত ভাইকে নিয়ে কীসব ঝামেলার কথা। নাতাশা বলেছিল তার খালা তাকে তার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চায় কানাডা যাওয়ার লোভে। জামানের কথায় মনে হচ্ছে ঘটনা তাহলে ঠিকই। ওদের চোখকে ফাঁকি দিতেই নাতাশা কৌশলে অন্য বাসার সামনে থাকে তাকে তুলে নিতে বলেছিল। শাহেদের দ্বিধা তবু কাটল না।

বিকেল পাঁচটা।
রমনা পার্কের একটা পার্কে উদ্ভ্রান্তের মত বসে আছে শাহেদ। তার চারিপাশটা হঠাৎ করেই কেমন শূন্য হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় সে চুপ করে বসে থেকে পার্কের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা মানুষগুলোকে দেখছে। পার্কের চতুর্দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল, পার্কের অনেকগুলি চেয়ার আর সবুজ ঘাস জুড়ে বসে আছে ক’জোড়া কপত-কপোতী।
কী যেন ভেবে নিজের অজান্তেই একবার ফোন থেকে নাতাশার নাম্বারে চাপ দিল শাহেদ। ধীরে ধীরে ফোনটা কানে লাগিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল সে। এক রিং, দুই রিং, তিন রিং পরে শব্দ ভেসে এলো—এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, দয়া করে কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন।
শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১১)

ম্যারেজ মিডিয়া অফিস।
শাহেদকে জরুরী তলব দিয়ে ডেকে আনা হয়েছে। শাহেদ অফিসে ঢুকতেই জামান তার বিখ্যাত হাসি দিয়ে বলল, ।কংগ্রাচুলেশনস শাহেদ সাহেব। আপনার কাগজপত্র প্রসেস হয়ে গেছে।’
শাহেদ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল জামানের দিকে তারপর এজাজের দিকে।
জামান আবার বলল, ‘আশা করছি আগামী মাসেই আপনার যাবার ডেট ফাইনাল হয়ে যাবে।’
এজাজ বলল, ‘ভাইজান ডাবল মিষ্টি পাওনা রইল। মিষ্টি খাওয়াবেন কবে?’
শাহেদের হঠাৎ করেই মনটা ভাল হয়ে গেল। কিছুদিন আগে এদের সাথে খারাপ আচরণ করায় তার মনটা কিঞ্চিত খারাপ হল। নাহ, এরা কাজের লোক। কথায় এবং কাজে মিল আছে। তাছাড়া বিদেশে যাওয়া তো আর মুখের কথা না। কত ধরণের ঝামেলা থাকে। শাহেদের মুখের হাসি বিস্তৃত হল। সে বিগলিত কণ্ঠে বলল, ‘খাওয়াব, খাওয়াব। অবশ্যই খাওয়াব। যাবার আগেই একটা রিসেপশান পার্টি দেব। আপনারাতো থাকবেনই।’
জামান বলল, ‘আপনার টিকেটটা তো এখন বুকিং দিতে হয়। পরিচিত কোন ট্রাভেল এজেন্ট আছে আপনার?’
‘ট্রাভেল এজেন্ট? আমার পরিচিত?’ একটু ভেবে শাহেদ বলল, ‘না নেই। ট্রাভেল এজেন্সির আবার পরিচিত, অপরিচিত কী? একটাতে বুকিং দিলেই তো হয়।’
এজাজ এবং জামান দু’জনেই হেসে দিল। এ হাসির অর্থ এ কোন বেকুব! এজাজ বলল, ‘আরে ভাই, আপনে কোন জগতে আছেন? আপনার তো দেখি কোন আইডিয়াই নাই। এমন টিকেট ধরায়ে দিবে, বোর্ডিং নিয়ে যাইয়া দেখবেন আপনার নামে কোন টিকেটই ইস্যু হয় নাই। অথবা একই টিকেট বুকিং দিছে দুইজনের নামে।’
শাহেদ আকাশ থেকে পড়ল। সে অবাক চোখে তাকিয়ে বলল, ‘এমনও হয় নাকি?’
‘দেশটার নাম বাংলাদেশ! এই দেশে আবার কি না হয়? সবই হয়।’
এজাজের কথায় শাহেদ চিন্তায় পড়ে গেল। সে কী বলবে বুঝতে পারছে না।
জামান পরামর্শ দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘আমাদের পরিচিত এজেন্ট আছে। আপনি চাইলে আমরাই বুকিং দিয়ে দিতে পারি। এ নিয়ে আপনাকে কোন চিন্তা করতে হবে না।’
এজাজ বলল, ‘আমাদের বেশিরভাগ ক্লায়েন্টের টিকেট বুকিং আমরাই করে দেই।’
শাহেদ বলল, ‘তাহলে তো ভালই হয়। টিকেটের দাম কত হতে পারে?’
জামান একটু চিন্তা করে বলল, ‘এখন তো হাই সিজন, দাম একটু বেশী পড়বে। অবশ্য আপনার সুবিধা আছে, ওয়ান ওয়ে টিকেট। ঢাকা-টরেন্টো ওয়ান ওয়ে টিকেট পড়বে আটশো ডলারের মত। সেক্ষেত্রে…’ জামান একটা ক্যালকুলেটর নিয়ে দ্রুত হিসেব কষে বলল, ‘আটশো টাইমস আশি, উমম, চৌষট্টি হাজার। ধরেন, পঁয়ষট্টির মধ্যেই হয়ে যাবে।’
‘ঠিক আছে, আমি বরং দু’একদিনের মধ্যে এসে টিকেটের টাকাটা দিয়ে যাব। আমি আসি তাহলে।’
‘আমাদের মিষ্টি?’ এজাজ মনে করিয়ে দিল।
‘হবে হবে।’ শাহেদ খুশি মনে বের হয়ে গেল ম্যারেজ মিডিয়া অফিস থেকে।

নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
সোমা আনমনে তাকিয়ে আছে সামনের রাস্তার দিকে—গাছের ফাঁক দিয়ে।
রাজন অনেকক্ষণ থেকেই একটা কথা বলতে চাচ্ছে। কিন্তু সোমার প্রতিক্রিয়া কী হয় সে ব্যাপারে সে নিশ্চিত নয় বিধায় ইতস্তত করছে। শেষ পর্যন্ত সে বলেই ফেলল, ‘সোমা, আজ কিন্তু আমার সঙ্গে যাচ্ছ।’
সোমা ঘাড় ঘুরিয়ে বলল, ‘কোথায়?’
রাজন হেয়ালী করে বলল, ‘আমি যেখানে নিয়ে যাব, সেখানে।’
‘আহা, সেখানটা কোথায় সেটাই তো জানতে চাচ্ছি।’
‘কেন? আমাকে বিশ্বাস কর না।’
‘রাজন, এখানে বিশ্বাস, অবিশ্বাসের প্রশ্ন আসছে কেন? অবশ্যই আমি তোমাকে বিশ্বাস করি। বল, কোথায় যেতে হবে?’

দূর থেকে সোমা আর রাজনকে দেখে সিন্থিয়া বলল, ‘যাই বলিস, মেয়েদের ব্যাপারে রাজন ভাইয়ের রেপুটেশন কিন্তু ভাল না।‘
ইরা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘রেপুটেশন ভাল না মানে?’
বাপ্পী সুযোগ পেয়ে বলল, ‘ভাল না মানে ভাল না। আমি আগেও শুনেছি, আবার সেদিনও দেখলাম—নায়লার সঙ্গে ফ্লার্ট করছে।’
সজল বাপ্পীকে সমর্থন দিয়ে বলল, ‘বাপ্পী ঠিকই বলছে। সোমা কয়েকদিন ক্লাসে আসেনি আর উনি ঐ ফাঁকে ঘুরে বেড়িয়েছে নায়লার সাথে। লাঞ্চেও নিয়ে গেছে। ভাবছি ব্যাপারটা সোমাকে জানানো দরকার।’
সিন্থিয়া বলল, ‘সুযোগ পেলে তোমরাও অন্য মেয়েদের সাথে ফ্লার্ট কম কর না।’
সিন্থিয়ার সমর্থন পেয়ে ইরা বলল, ‘আমার কিন্তু রাজন ভাইকে ভালই মনে হয়। আমার মনে হয় ইউ গাইস আর জেলাস।’
বাপ্পী বলল, ‘জেলাস হতে যাব কেন। বন্ধু হিসাবে এটা আমাদের রেস্পন্সিবিলিটি। উই মাস্ট টেল সোমা!’
সিন্থিয়া বলল, ‘যদি সত্যিই তেমন কিছু হয়, সোমা নিজেই বুঝে যাবে সেটা। তোদেরকে আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে হবে না।’
এর পরে ওরা আর কেউ কিছু বলল না।

বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্স।
নাতাশাকে চলে যেতে হবে কানাডায়, তাই শাহেদ ওকে নিয়ে এসেছে কিছু কেনা কাঁটা করতে। ওরা অনেকক্ষণ হাত ধরাধরি করে ঘুরল। দু’জনকেই বেশ উৎফুল্ল দেখাচ্ছে। ঘুরতে ঘুরতে ওরা এসে দাঁড়াল গোলাকার জায়গাটাতে। উপর থেকে কিছুক্ষণ দেখল—মানুষের চলাফেরা। লিফট দিয়ে কেউ নামছে, কেউ নামছে এস্কেলেটর দিয়ে। শাহেদ
কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল নাতাশার। হাত বাড়িয়ে ধরল নাতাশার হাত। নাতাশাও তার হাতের উষ্ণতা ছড়িয়ে দিয়ে পেঁচিয়ে ধরল শাহেদের হাত। শাহেদ তাকাল নাতাশার দিকে। গভীর দৃষ্টিতে। তার ভীষণ ইচ্ছে হচ্ছে নাতাশাকে জড়িয়ে ধরতে, একান্তে কিছু সময় কাঁটাতে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিরাগপূর্ণ চোখে বলল সে, ‘You are so beautiful. My heart is racing. I can’t wait to…’
‘Wait to…? থামলে কেনো, বল?’ নাতাশা তাকাল আয়ত চোখে।
‘…see you!’ শাহেদ বলল।
নাতাশা মিষ্টি করে হাসল। ‘সেতো তুমি আমাকে দেখছই, প্রায় প্রতিদিনই।’
‘তা দেখছি, কিন্তু… আমি তোমাকে সম্পূর্ণভাবে দেখতে চাই। You know what I mean?’
‘I know dear! But…’ নাতাশা শাহেদকে আশ্বস্ত করে বলল, ‘Ok, I’ll think about it.’
শাহেদ আর কিছু বলল ন।।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নাতাশা বলল, ‘চল, আজ যাই। একটু তাড়া আছে, আমার কাজিনরা আসবে।’
শাহেদ অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘হুম।’
নাতাশা শাহেদের হাত ধরেই টেনে নিইয়ে চলল। হঠাৎ একটা শাড়ির দোকানের পাশ দিয়ে যাবার সময়, কাঁচের ভেতর দিয়ে শাড়ি পড়ানো মডেল দেখে নাতাশা একটু দাঁড়াল। তারপর ঘুরে দাঁড়াতেই শাহেদ বলল, ‘চল, তোমাকে একটা শাড়ি কিনে দেই।’
‘আরে নাহ, শাড়ি কিনতে হবে না। এমনিতেই তোমার কত খরচ হয়ে যাচ্ছে।’
‘আহা চলই না কিছু হবে না, চল।’
‘আর ইউ শিওর।’
‘আই অ্যাম শিওর।’
শাহেদ নাতাশাকে নিয়ে শাড়ির দোকানে ঢুকল।

অনেকক্ষণ থেকে লম্বা মত একটা যুবক, সুদর্শন, কোঁকড়ানো চুল, বয়স শাহেদের মতই হবে—নাতাশার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। তার চোখে মুখে বিস্ময়—সে যেন নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল শাড়ির দোকানের সামনে। আরো একটু কাছে যেয়ে সে নিশ্চিত হল। মেয়েটি তার পরিচিত। অতি চেনা। সে অস্ফুটে উচ্চারণ করল, ‘সোনিয়া!’
শাড়ির দোকানের সামনে সুদর্শন যুবক অপেক্ষা করতে থাকল।
বেশ কিছুক্ষণ পরে শাহেদ আর নাতাশা একটা শাড়ির প্যাকেট হাতে করে প্রফুল্ল চিত্তে বের হয়ে এলো। যুবক ডাকল, ‘সোনিয়া!’
ডাক শুনে নাতাশা থমকে দাঁড়াল। যুবকটি কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়াল নাতাশার সামনে। নাতাশা ভূত দেখার মত চমকে উঠল। তার মুখ থেকে রক্ত সরে গেল। সে অজান্তেই শাহেদের হাত চেপে ধরল।
যুবক আবার বলল, ‘সোনিয়া, তুমি কবে এসেছ? তোমার আব্বু কেমন আছে? আশ্চর্য, তোমাকে তো চেনাই যাচ্ছে না। কী ভয়টাই না আমি পেয়েছিলাম। ও মাই গড, আমি তো ভেবেছিলাম তোমার সাথে আর দেখাই হবে না।’ এক নাগারে কথা বলে সে শাহেদকে লক্ষ করল। নাতাশার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ছেলেটা কে? তোমার কাজিন?’
নাতাশা খুব দ্রুত নিজেকে সামলে নিল। অপরিচিত একজন মানুষের সঙ্গে কথা বলার ভঙ্গিতে বলল, ‘এক্সকিউজ মি! আই অ্যাম সরি। আমার মনে হয় আপনার কোথাও কোন ভুল হচ্ছে। আমি সোনিয়া নই। নাতাশা। এস শাহেদ, লেট’স গো।’ যুবককে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে নাতাশা শাহেদের হাত ধরে দ্রুত সে স্থান ত্যাগ করল। কিছুদূর যেয়ে শাহেদ ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল, বিস্ময়ভরা চোখে যুবকটি তাকিয়ে আছে ওদের দিকে।
শপিং মল থেকে বের হয়ে শাহেদ একটা সিএনজি ডাকল। নাতাশা আর শাহেদ উঠে বসতে যাবে আর ঠিক তখনই সেই সুদর্শন যুবক ক্ষিপ্র গতিতে কোথা থেকে এসে দাঁড়াল ওদের সামনে। যুবককে দেখে নাতাশা আঁতকে উঠল। সে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘ও মাই গড, আপনি আবার এসেছেন? দেখুন, একবার তো বলেছিই আপনি ভুল করছেন।’ নাতাশা উঠে বসল স্কুটারে। শাহেদ উঠে বসতেই নাতাশা বলল, ‘ড্রাইভার ভাই চলুন। তাড়াতাড়ি।’
ড্রাইভার স্কুটার ছেড়ে দিল। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে সে বেশি গতি বাড়াতে পারল না।
যুবকটি স্কুটারের দরজা ধরে হাঁটতে হাঁটতে বলল, ‘তুমি বললে, একমাসের মধ্যে ফিরে এসেই তুমি আমাকে…’
নাতাশা তাকে কথা শেষ করতে না দিয়েই বলল, ‘দেখুন আমি আবারো বলছি, আপনি ভুল করছেন। আমি সোনিয়া নই। ড্রাইভার ভাই প্লিজ তাড়াতাড়ি চালান।
যুবক বেশ জোর দিয়েই বলল, ‘অবশ্যই তুমি সোনিয়া। আমার ভুল হতেই পারে না। আই অ্যাম হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর—তুমি সোনিয়া।’
নাতাশা এবার কঠিন স্বরে বলল, ‘আপনি যদি এভাবে আমাদের ফলো করেন, তাহলে কিন্তু পুলিশ ডাকতে বাধ্য হব।’
‘পুলিশ ডাকবে? ডাক? দেখি তোমার কত সাহস?’ বলতে বলতে যুবক নাতাশার হাত চেপে ধরল।
নাতাশা ভয় পেয়ে চিৎকার দিয়ে বলল, ‘হাত ছাড়ুন, হাত ছাড়ুন বলছি। ড্রাইভার ভাই, আপনি যাচ্ছেন না কেন?’
রাস্তা একটু ফাঁকা পেয়েই ড্রাইভার সিএনজির এক্সিলেটরে চাপ দিল। মুহূর্তেই ছুটে চলল। যুবক তখন বাধ্য হল নাতাশার হাত ছেড়ে দিতে। সে হাত নেড়ে চিৎকার করে ডাকল, ‘সোনিয়া, সোনিয়া, তোমার ব্যাগ!’
যুবক নাতাশার হ্যান্ডব্যাগের স্ট্র্যাপের মধ্যে দিয়ে ওর হাত চেপে ধরেছিল যে কারণে সিনএনজিওয়ালা গতি বাড়িয়ে দিলে নাতাশার হাত থেকে তার ব্যাগ যুবকটির হাতে চলে আসে। যুবক নাতাশার ব্যাগ হাতে নিয়ে বোকার মত তাকিয়ে রইল।

কিছুদূর যাওয়ার পরে নাতাশা হঠাৎ বুঝতে পারল তার হ্যান্ডব্যাগটি নেই। ঘটনার আকস্মিকতায় সে চুপ করে ছিল। এখন বুঝতে পেরে সে উচ্চস্বরে বলল, ‘আমার ব্যাগ! ও মাই গড! আমার ব্যাগ তো নেই। ও আমার ব্যাগটা নিয়ে গেছে। এখন কি হবে? শাহেদ!’ বলেই সে শাহেদের দিকে ভয়ার্ত এবং করুণ চোখে তাকাল।
শাহেদ ড্রাইভারকে বলল, ‘এই মামা গাড়ি ঘুরান। ঐ হারামজাদাকে ধরতে হবে।’
ড্রাইভার নির্বিকারভাবে বলল, ‘কোন লাভ নাই ভাইজান। সামনের মোড় ছাড়া ঘুরান যাইব না। ততোক্ষণে হয়ে পগার পাড়।’
নাতাশা হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘থাক বাদ দাও। যেতে হবে না।’

রাস্তার পাশে কিছু হকার আর কিছু পথচারী তাকিয়ে আছে যুবকেরর দিকে। সে হঠাৎ করে ঘটনার গুরুত্ব অনুধাবন করে মনে মনে শঙ্কিত গেল। ওদের কেউ যদি একবার উচ্চারণ করে ‘ছিনতাইকারী, ধর’, তাহলে ওর ভবলীলা সাঙ্গ হতে বেশি সময় লাগবে না। সে আড় চোখে তাকাল চারিপাশে। অগণিত কৌতূহলী চোখ অধীর উৎসাহ নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ার অপেক্ষায়। সে মনে মনে প্রমাদ গুনল। তাকে এখুনি সরে পড়তে হবে—যত দ্রুত সম্ভব।
যুবকটি পা বাড়াতেই একজন পথচারী তার পথ আগলে দাঁড়াল। কৈফিয়ত চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘ঘটনা কী?’
যুবক ধমকের সুরে বলল, ‘ঘটনা কী সেটা দিয়ে আপনি কী করবেন? নিজের কাজ করেন, যান।’ যুবক কাল ক্ষেপণ না করে একটা খালি রিক্সা পেয়ে উঠে বসল।
রিকশাচালক বলল, ‘কই যাইবেন?’
‘এই তো সামনে।’
রিকশাওয়ালা প্যাডেলে চাপ দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই রিক্সা মোড় ঘুরে অন্য রাস্তায় এসে পড়তেই যুবক ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল পেছনে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে মনে মনে বলল, ‘আরেকটু হলেই গেছিলাম—।’

শাহেদ নাতাশার সিএনজি’র মধ্যে বরফ শীতল নীরবতা চলছে। শাহেদ মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। সে বুঝতে পারছে না, একটা অজানা অচেনা ছেলে কোন কারণ ছাড়া কেন নাতাশা বলবে সে তাকে চেনে। ছেলেটির কথার ধরণে মনে হল, শুধু চেনে তাই না, ভাল করেই চেনে।
নাতাশা শাহেদের হাত ধরে তাকিয়ে আছে বাইরে। তার মনের মধ্যে ঘূর্ণিঝড় বইছে। গভীর চিন্তায় ডুবে আছে সে।
শাহেদ কয়েকবার তাকাল নাতাশার দিকে। তার অস্বস্ত্বি কাটছে না কিছুতেই। দীর্ঘ নীরবতা কাটিয়ে সে শীতল কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘ছেলেটা কে? তুমি চেন?’
নাতাশা চুপ করে রইল।
শাহেদ আবার বলল, ‘তোমার আব্বু অসুস্থ ও জানল কী করে?’
নাতাশা বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘সেটা আমি বলব কী করে?’
নাতাশার কথার ধরণে শাহেদ অবাক হল। আর কিছু বলাটা ঠিক হবে কি না বুঝতে পারছে না। নাতাশাকে কেমন অন্যমনস্ক লাগছে। কিন্তু কিছু প্রশ্ন তার মনে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে—তার উত্তরগুলো জানা দরকার নয়ত সে স্বস্তি পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শাহেদ আবার বলল, ‘ছেলেটা জানতে চাচ্ছিল তুমি কবে এসেছ? তারমানে সে জানে যে তুমি…’
নাতাশার কপালে চিকণ ঘাম দেখা দিল। সে মনে মনে প্রস্তুতি নিল, কথা গুছিয়ে নেবার—কিন্তু সে বুঝতে পারছে না তার কোন কথা শাহেদকে আশ্বস্ত করতে পারবে কি না। তবুও সে মরিয়া হয়ে বলল, ‘ছেলেটাকে আমি চিনি।’
শাহেদ তাকাল প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে।
‘He is a crazy guy. Yes, I know him. অনেক দিন ধরেই আমাকে বিরক্ত করছে। যখন তখন বাসায় চলে আসে। থ্রেট করে-’
‘থ্রেট করে, কেন?’
‘ওকে বিয়ে করে কানাডায় নিয়ে যাবার জন্য। তাই বাসায় বলে রেখেছিলাম, ও এলে যেন বলে দেয় যে আমি ফিরে গেছি। আব্বু অসুস্থ।’
‘আর সোনিয়া?’
নাতাশার চেহারা রক্ত শূন্য হয়ে গেল। তার চোখ ছল ছল করে উঠল এবং মুহূর্তের মধ্যেই অঝরে কেঁদে ফেলল। সে কাঁদতে কাঁদতেই বলল, ‘Why are you asking so many questions Shahed? You don’t believe me?’ নাতাশা শাহেদের হাত ছেড়ে দিল। তার কান্নার বেগ বেড়ে গেল। সে ফুলে ফুলে কাঁদতে থাকল।
‘আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি, আমি আসলে কনফিউজড।’ শাহেদ বোকার মত তাকিয়ে রইল নাতাশার দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব