Meyeti-Ekhon-Kothay-Jabe

মেয়েটি এখন কোথায় যাবে (পর্ব-১)

নাম তার বাতাসের শহর। স্থানীয়রা বলে উইন্ডি সিটি। শহরটির নাম—শিকাগো।
ইলিনয় অঙ্গরাজ্যে অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৃতীয় বৃহত্তম এই শহরটি সৌম্য আর আভিজাত্যের মিশেলে একটি অন্যতম শহর। শিল্প সাহিত্যে অনন্য। ব্লুজ এবং জ্যাজ মিউজিকের জন্যে বিখ্যাত। এককথায় মাল্টি-কালচারাল মেট্রোপলিটন সিটি বলতে যা বোঝায়—শিকাগো তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
লেক মিশিগানের তীরে গড়ে উঠা শিকাগোর ডাউন-টাউন দেখে অনায়াসে এর নাম দেয়া যায় অট্টালিকার শহর। এখানে অগণিত সারি সারি সুউচ্চ ভবন কিন্তু কনক্রিটের জঞ্জাল বলা যাবে না মোটেও। দেখবার মত সুন্দর, চোখ ধাঁধানো সব উঁচু স্থাপনাগুলো একটার পর একটা যেন পাল্লা দিয়ে ঘোষণা করছে নিজেদের আধিপত্যের কথা। হঠাৎ করে মনে হয়, শহরে যেন উঁচু ভবনগুলোর বাহারী মেলা বসেছে।
এই শহরে দু’টি এয়ারপোর্ট। ও’হেয়ার এবং মিডওয়ে—দুটোই ইন্টারন্যাশনাল। এর মধ্যে ও’হেয়ার পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্যস্ততম। এই ব্যস্ততম এয়ারপোর্টে কোনো এক সকালে বাংলাদেশ থেকে একটি মেয়ে এসে পৌঁছল—আমাদের গল্পের ঘটনা এই মেয়েটিকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে।
মেয়েটি প্লেন থেকে বের হয়ে মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখল শিকাগো ও’হেয়ার এয়ারপোর্টের চাকচিক্য—চোখ ধাঁধিয়ে যাওয়ার মত। কী এলাহি ব্যাপার! এয়ারপোর্টের মত একটা ব্যাপার এত বিশাল হতে পারে—সে সম্পর্কে তার কোনো ধারণাই ছিল না।
মেয়েটি চারিদিকে তাকিয়ে দেখল—আঁতিপাঁতি করে খুঁজল একটি মুখ। প্লেন থেকে বের হয়েই যে মুখটি দেখবে বলে সে ধারণা করেছিল তার দেখা মিলল না। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সে তার ভারী লাগেজ দুটো নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল। আবার তাকালো চারিদিকে—নাহ, সে কোথাও নেই। মেয়েটি এখন কি করবে কিছু বুঝতে পারছে না।
ব্যাগেজসহ এয়ারপোর্টের সামনের রাস্তায় নেমে এলো মেয়েটি—যে স্থানে সাধারণত বহির্গামী যাত্রীদের নামিয়ে দেয়া হয়। প্রচণ্ড বাতাস আর কনকনে শীত। মুহূর্তের মধ্যেই শরীর হিম হয়ে গেল তার। দাঁতে দাঁত লেগে ঠক ঠক আওয়াজ হতে লাগল। একটা প্রিন্টের সালওয়ার-কামিজ, উপরে নীল রঙের একটা হাল্কা জ্যাকেট শুধু। এতে শিকাগোর শীত মানার প্রশ্নই উঠে না। শিকাগোর শীত মানে ভয়াবহ ব্যাপার। শীত সহ্য করতে না পেরে কাঁপতে কাঁপতে সে পুনরায় টার্মিনালের ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর স্বচ্ছ কাঁচের মধ্যে দিয়ে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল বাইরে।
সকাল ন’টায় প্লেন ল্যান্ড করেছে। ইমিগ্রেশনের ঝামেলা শেষ করতে লেগেছে প্রায় দেড় ঘণ্টার মত। এরপর কেটে গেছে আরো ত্রিশ মিনিট। এখন বাজে সকাল এগারোটার মতো। মানুষটা এখনো এলো না আর কেনই বা আসছে না তার কিছুই সে বুঝতে পারছে না। মেয়েটি দুশ্চিন্তায় কাহিল হয়ে পড়ল। একে তো এত দীর্ঘ ফ্লাইট আর এখন প্রায় তিরিশ ঘণ্টা ভ্রমণ শেষে যার কাছে এলো—তারই দেখা নেই। সে জড়সড় হয়ে বসে রয়েছে আর ক্ষণে ক্ষণে বাইরে তাকাচ্ছে।
এভাবে বসে থেকেই বা কী লাভ। বেশ কিছুক্ষণ পর সে সাহস করে আবার বের হয়ে এলো। অন্তত কাউকে না কাউকে জিজ্ঞেস করলে কিছু নিশ্চয়ই বুঝতে পারা যাবে। স্যুট-টাই পড়া একজন সাদা আমেরিকান ভদ্রলোককে দেখে মেয়েটি এগিয়ে গেল। ‘এক্সকিউজ মি।’ ভদ্রলোক দাঁড়াতেই মেয়েটি থেমে থেমে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল, ‘আই এম ফ্রম বাংলাদেশ। মাই হাজবেন্ড ডিড নট কাম টু রিসিভ মি। আই নিড হেল্প…’
মেয়েটি কথা শেষ করার আগেই ভদ্রলোক হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সরি, আই’ভ টু ক্যাচ মাই ফ্লাইট। আই’ম রানিং লেট।’ বলেই দ্রুত পাশ কাঁটিয়ে চলে গেলেন তিনি।
‘আই নিড হেল্প। প্লীজ হেল্প মি!’ মেয়েটি আবারো বলল।
ভদ্রলোক একবার পেছনে ফিরে তাকিয়ে দেখলেন মেয়েটিকে তারপর যেভাবে হাঁটছিলেন সেভাবেই দ্রুত হেঁটে চলে গেলেন।
মেয়েটি মন খারাপ করে চারিদিকে তাকালো। এই বুঝি সে আসে। কিন্তু না—সে এলো না।
একজন লম্বা মত যুবককে দেখে মেয়েটি তার দিকে হেঁটে গেল। তারপর একই ভঙ্গীতে বলল, ‘আই এম ফ্রম বাংলাদেশ। মাই হাজবেন্ড ডিড নট কাম টু রিসিভ মি। আই এম লস্ট। আই নিড হেল্প…’
মেয়েটিকে দূর থেকে দেখে লম্বা যুবক সম্ভবত আগেই বুঝতে পেরেছিল কিছু। ‘সরি ক্যান্ট হেল্প… রানিং লেট… গটা গো।’ বলেই লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে গেল লম্বা যুবকটি।
এরপর মেয়েটি আরো কয়েকজনকে একইভাবে জিজ্ঞেস করল কিন্তু কেউ তাকে তেমন কোনো সাহায্য করতে পারল না। একজন শুধু আগ্রহ নিয়ে তার কথাগুলো শুনল তারপর মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘আই ডোন্ট আন্ডারস্ট্যান্ড হোয়াট ইউ আর সেয়িং… ক্যান ইউ রিপিট দ্যাট?’
মেয়েটি আবার বলল। লোকটি আবারো মাথা ঝাঁকাল—সে বুঝতে পারছে না। এক পর্যায়ে খানিকটা হতাশ হয়েই সে চলে গেল।
তার কথা কি তাহলে কেউ বুঝতে পারছে না? মেয়েটি অত্যধিক হতাশ হয়ে অসহায় ভাবে দাঁড়িয়ে রইল।
মেয়েটির বড় বোনের কথা মনে পড়ল। ঢাকা এয়ারপোর্টে তার বোন তাকে বিজ্ঞের মত বলেছিল, ‘শোন, একেবারেই ভয় পাবি না। আমেরিকায় ভয়ের কোনো ব্যাপারই নাই। সবাই খুব হেল্পফুল। কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করলেই তোর হাত ধরে সে কাজটি করে দিবে। শুধু বলবি—হেল্প মি প্লীজ। ব্যস, দেখবি মন্ত্রের মত কাজ হয়ে গেছে। একবার কি হয়েছে শোন—শহীদ যেবার প্রথম আমেরিকায় গেল তখন সে কিছুই চিনত না। তো সোশ্যাল সিকিউরিটি অফিসে যাবার জন্যে সাবওয়ে ট্রেন থেকে নেমে দিকহারা হয়ে পড়ে। তখন এক থুত্থুড়ি বুড়ি ওর হাত ধরে অফিস পর্যন্ত পৌঁছে দিল। অনেক কথাও বলল। নতুন আসছে বলে অনেক উপদেশ দিল। জিজ্ঞেস করল, দেশ কোথায়? শহীদ বলল, বাংলাদেশ। বুড়ি বলল, ওয়াও বাংলাদেশ? এমন ভাবে বলল যেন বাংলাদেশ তার শ্বশুর বাড়ি। বুঝলি কিছু?’
আপা এমনভাবে কথা গুলো বলছিল যেন আমেরিকার সবকিছু তার নখদর্পণে। ভাবটা এমন যেন কতবার আমেরিকা সে ঘুরে গেছে। অথচ তার ভ্রমণ ঐ ফরিদপুর—ঢাকা—ফরিদপুর পর্যন্তই। মেয়েটির বাড়ি ফরিদপুর শহরে—সেখানেই তার বেড়ে ওঠা। পড়াশুনাও সেখানেই।
আমেরিকার মানুষজনকে যতটা বন্ধু ভাবাপন্ন আর সাহায্যকারী মনে করেছিল মেয়েটি—ধীরে ধীরে তার সেই ধারণা পাল্টে গেল। সত্যি কথা হলো, এখানে সবাই ব্যস্ত—সবাই ছুটছে। হাজার হাজার মানুষ। অথচ একদণ্ড দাঁড়াবার সময় যেন কারুরই নেই।
এই পর্যায়ে মেয়েটি সিদ্ধান্ত নিল পুলিশের সাহায্য চাইবে। বড় বোন বলে দিয়েছে, এয়ারপোর্টে কোনো সমস্যা হলে সরাসরি পুলিশের সাহায্য চাইবি। আমেরিকার পুলিশ হলো বন্ধু—আমাদের দেশের মত না। আর কথা শুরু করবি ‘এক্সকিউজ মি’ বলে আর শেষ করবি ‘থ্যাঙ্ক ইউ’ দিয়ে। মেয়েটি আশে পাশে তাকাল, কিন্তু পুলিশের পোশাক পড়া তেমন কাউকে চোখে পড়ল না। অবশেষে সে দেখতে পেল একজনকে, বেশ খানিকটা দূরে। মেয়েটি হেঁটে হেঁটে তার কাছে গিয়ে কিছুটা ভড়কে গেল। দৈর্ঘ্যে-প্রস্থে প্রায় সমান কৃষ্ণবর্ণের বিশালদেহী একজন মানুষ—সে যে একজন পুলিশ সেটা তার পোশাক আর কোমরে ঝুলান পিস্তল না দেখলে বোঝাই যেত না। এই শরীরে সে কিভাবে ক্রিমিনাল তাড়া করে কে জানে। মেয়েটি ঘাড় উঁচিয়ে সাহস করে বলল, ‘এক্সকিউজ মি, আই নিড হেল্প।’
কৃষ্ণবর্ণের বিশালদেহী সিকিউরিটি অফিসার মেয়েটিকে সরু চোখে একবার দেখল তারপর গম্ভীর মুখে বলল, ‘হাউ ক্যান আই হেল্প ইউ?’
‘আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ। মাই হাজবেন্ড ডিড নট কাম টু রিসিভ মি। আই অ্যাম লস্ট। আই নিড হেল্প…’ মেয়েটি পুনরায় একই কথা ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে বলল।
‘কল হিম—ডোন্ট ইউ হ্যাভ হিজ ফোন নাম্বার? হ্যোয়ার আর ইউ গোয়িং?’
অফিসারের কণ্ঠস্বরে ধমক না বিরক্তি ঠিক বোঝা গেল না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিতে এরা সাধারণত একটু নরম সুরে কথা বলে—অভয় দেয়। কিন্তু এই অফিসারের কণ্ঠ যেন একটু রুক্ষ—একটু না বেশ রুক্ষ। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে লাগেজের উপরে সেঁটে দেয়া একটা সাদা কাগজে লেখা ফোন নাম্বার দেখাল।
অফিসার কিছুটা অবাক হয়ে বলল, ‘ইট’স হিজ নাম্বার?’
‘ইয়েস ইয়েস।’
‘ডিড ইয়্যু কল?’
‘আই ডোন্ট নো…’
অফিসার বুঝতে পারল না মেয়েটি ঠিক কি বোঝাতে চাইছে। সম্ভবত ঘাবড়ে গেছে। সে বলল, ‘লেট মি কল।’ বলেই সে নাম্বার দেখে ফোন করল। কিন্তু কোনো সাড়া পেল না। সে লাইন কেটে দিয়ে আবার ফোন করল, এবারো কোনো সাড়া পেল না। অফিসার বলল, ‘আর ইয়্যু শিওর দিস ইজ দ্য রাইট নাম্বার? নো ওয়ান ইজ এন্সারিং…’
মেয়েটি চুপ করে রইল। সে বুঝতে পারছে না—ভুলটা কোথায় হচ্ছে? ফোন ধরবে না কেন? সে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল।
অফিসার এবার জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়াটস ইয়োর নেম, ম্যাম?’
‘মাই নেম ইজ সোমা ইসলাম।’
অফিসার লক্ষ্য করল লাগেজের গায়ে লেখা আছে, সোমা ইসলাম কেয়ার অফ শহীদুল ইসলাম। সে জিজ্ঞেস করল, ‘হু ইজ শাহীডুল ইজলাম?’
‘মাই হাজবেন্ড।’
‘ও-আই সি! সো হি ডিডন্ট শো আপ! ইজ দিস দ্য এড্রেস ইয়্যু’আর গোয়িং টু?’ লাগেজের উপর লেখা ঠিকানা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল অফিসার।
‘ইয়েস।’
‘ডু ইউ হ্যাভ হিজ পিকচার?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মেয়েটি বলল, ‘নো।’
অফিসার কি যেন ভাবল। তারপর পরামর্শ দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ম্যাম, লুক ওভার দেয়ার…’ অফিসার রাস্তার ওপারে দাঁড়ানো সারি সারি ট্যাক্সি ক্যাবের দিকে আঙ্গুল দিয়ে দেখাল। ‘ইউ ক্যান টেক অ্যা ক্যাব অ্যান্ড গো হোম।’
কিছুক্ষণ চিন্তা করে সোমা নামের মেয়েটি এবার সাহস করে টার্মিনালের বাইরে চলে এলো। কিছুদূর এগিয়ে গেল সামনের দিকে। তার চোখে মুখে ভয় স্পষ্ট। ভয়ে কিছুটা কেঁদেও ফেলল সে। আরো কিছুদূর এগিয়ে উল্টো দিকের রাস্তায় দেখতে পেল লাইন দিয়ে অপেক্ষারত হলুদ রঙের ট্যাক্সি ক্যাবগুলো। সোমা ভাবল, শহীদও তো ট্যাক্সি চালায়। এদের কাউকে জিজ্ঞেস করলে কি কাজ হবে? কেউ কি চিনবে? নাকি একটা ট্যাক্সি নিয়ে চলে যাবে শহীদের বাসায়? তার কাছে বেশ কিছু ডলার আছে—ভাড়া নিয়ে সমস্যা হবে না। পরক্ষণেই চিন্তা করল, একা একা না জেনে কোথায় যাবে সে? যদি ট্যাক্সিওয়ালা তাকে ঠিকমত পৌঁছে না দেয়? এমনও তো হতে পারে যে গিয়ে দেখল শহীদ বাসায় নেই—তখন? আর সেটার সম্ভাবনাই বেশি। তখন তো সমস্যা আরো হবে। তারচেয়ে বরং আর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করাই ভালো।
কিন্তু আর কতক্ষণই বা অপেক্ষা করবে সে। অস্থির অস্থির লাগছে। বুকের মধ্যে দলা পাকিয়ে কান্না উঠে আসছে। শুধুই মনে পড়ছে দেশের কথা।

পরের পর্ব

Valobashar-Chayasongi

ভালোবাসার ছায়সঙ্গী (পর্ব-১)

রাত প্রায় বারোটা। কিন্তু মীরার চোখে কোনো ঘুম নেই। বারোটা এমন কোনো রাত নয়—তবুও তার টেনশন বেড়ে গেল। এখুনি না ঘুমলে সকালে উঠতে দেরি হয়ে যাবে। কাল সকালেই একটা জরুরি মিটিং আছে তার।
ইদানীং মীরার ঘুমের সমস্যা হয়েছে। বেশ বড় রকমের সমস্যা। বিশেষ করে যেদিন কাজে বেশি চাপ থাকে কিংবা কোনো কারণে শরীরে অতিরিক্ত ক্লান্তি আসে, সেদিন রাতে সহজে তার ঘুম আসে না। অথচ হওয়া উচিত উল্টো। মানুষ ক্লান্ত কিংবা অবসাদ হলেই বরং তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ে।
আজ কাজে অনেক চাপ ছিল মীরার। কাল সকালে গুরুত্বপূর্ণ একটা মিটিং আছে কোম্পানির ফাইন্যান্স ডিরেক্টর আর কয়েকজন সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সঙ্গে। আমেরিকার একটা স্বনামধন্য ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানিতে প্রজেক্ট কন্সাল্ট্যান্ট হিসেবে কাজ করে মীরা। ডালাস ডাউন-টাউনের ৫০ তলার বহুতল ভবন থ্যাঙ্কসগিভিং টাওয়ারের ৩৩ তলায় তার অফিস। যে কোনো ফাইন্যান্সিয়াল কোম্পানির একজন প্রজেক্ট ম্যানেজারের দায়িত্ব অনেক। কাজটাও বেশ জটিল। মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করতে হয়। হিসেবের একটু গড়মিল হলেই পত্রপাঠ বিদায়। কিন্তু মাঝে মাঝে মাথা ঠাণ্ডা রেখে কাজ করাটা অসম্ভব হয়ে পড়ে। তখন সে কাঁচের জানালা দিয়ে ডালাস ডাউন-টাউনের উঁচু নিচু অট্টালিকার বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকে।
কাল মীরার ক্যারিয়ারের একটা গুরুত্বপূর্ণ দিন। এক দশমিক তিন মিলিয়ন ডলারের একটি প্রজেক্ট প্ল্যান তাকে প্রেজেন্ট করতে হবে—ডিরেক্টরদের সামনে। প্রতিটা খাতে কোথায় কী খরচ হবে—তার চুলচেরা হিসেব এবং বিশ্লেষণ দেখাতে হবে—কোনো রকম ফাঁক থাকা চলবে না। তার প্রেজেন্টেশনের উপরেই নির্ভর করছে প্রজেক্টটা অ্যাপ্রুভ হবে কি না। তাই অতিরিক্ত সময় তাকে কাজ করতে হলো আজকে। লাইন বাই লাইন আইটেমসহ স্প্রেডশিট আর পাওয়ার-পয়েন্ট স্লাইড তৈরি করে তার সাথে নোটগুলো মিলিয়ে নিয়ে অফিস থেকে যখন সে বের হয়ে এলো তখন রাত প্রায় সাড়ে নটা। মীরার খুব ইচ্ছে ছিল পুরো প্রেজেন্টেশনটা একবার রিহার্সাল দেবে, যাতে সময়টাও মিলিয়ে নেয়া যায়। কিন্তু শেষপর্যন্ত শরীর বাধ সাধল। মাথাটাও আর কাজ করছে না। সারাদিনে এতো ধকল গেছে যে শেষের দিকে এসে একেবারে মাথাটা ধরে গেল। সারাদিনে তেমন কিছু খাওয়াও হয়নি। শুধু ভেন্ডিং মেশিন থেকে ব্ল্যাক কফি খেয়েছে কয়েকবার।
এর মধ্যে মীরার বস কাজের অগ্রগতি আর প্রস্তুতি কেমন জানার জন্য কয়েকবার এসে ঘুরে গেছেন। বসের এমন ঘন ঘন খোঁজ নেয়াটা মীরার পছন্দ নয়। মীরাই বা কী করবে? কোনো এক বিচিত্র কারণে অফিসের সবাই তাকে খুবই পছন্দ করে। মীরার সৌন্দর্য আর ব্যক্তিত্বের মধ্যে এমন কিছু একটা আছে যা তার আশেপাশের সবাইকেই আকর্ষণ করে আর তাইতো অফিসের বিগ বস থেকে শুরু করে সিনিয়র-জুনিয়র কলিগ পর্যন্ত সবাই সুযোগ পেলেই কারণে-অকারণে তার আশেপাশে ঘুর ঘুর করে। আলাপ করার চেষ্টা করে। অপরদিকে মীরা খুবই স্বল্পভাষী একটি মেয়ে। অকারণে কথা বলা তার একেবারেই অপছন্দ। তবুও মাঝে মাঝে অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে কথা বলতে এবং শুনতে হয়। আজকেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
কথা আর কাজের চাপে বিকেল থেকেই মাথাটা ধরে আসছিল মীরার। শেষ পর্যন্ত মাথা ধরা নিয়েই বাসায় ফিরল সে। অফিস থেকে মাত্র বিশ মিনিট দূরেই আপ-টাউনে একটা এপার্টমেন্টে একাই থাকে সে। বিকেলের দিকে প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিল। কিন্তু ঘরে ঢুকেই তার খিদেটা কেমন মিইয়ে গেল। একবার ফ্রিজ খুলে দেখল খাবার কী আছে। কিন্তু একনজর দেখেই ফ্রিজ বন্ধ করে দিল সে।
কিছুক্ষণ পর কাপড় ছেড়ে শাওয়ারে ঢুকে পড়ল মীরা। দীর্ঘ সময় নিয়ে গোসল করল। শরীর থেকে অবসাদের ছায়া একটু একটু করে কমে যাচ্ছে। গোসল সেরে বের হবার সাথে সাথেই প্রচণ্ড খিদে পেল তার। রাতে এমনিতেই সে তেমন কিছু খায় না। পিনাট বাটার আর স্ট্রবেরি জ্যাম দিয়ে এক স্লাইস মাল্টি-গ্রেইন ব্রেড আর এক কাপ গ্রিন-টি বানিয়ে লিভিং রুমে এসে বসল মীরা। টিভি ছেড়ে দিয়ে কিছুক্ষণ চ্যানেল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে খাওয়া শেষ করল। চায়ে শেষ চুমুক দিতেই তার মনে পড়ল সকালে প্রেজেন্টেশনের কথা। সাথে সাথেই মীরার টেনশন বেড়ে গেল। আর দেরি না করে সে ছুটে গেল বিছানায়।
প্রায় এক ঘণ্টা হলো মীরা বিছানায় এসেছে কিন্তু তার দু চোখের পাতা এক হচ্ছে না। ঘুমানোর চেষ্টা যত করছে, চোখ যেন তত খুলে খুলে যাচ্ছে। তবুও সে এক প্রকার জোর করেই চোখ বন্ধ করে রাখল এবং চোখের পাতা চেপে ঘুমানোর জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে গেল। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। উল্টো চোখে কেমন একটা চাপের সৃষ্টি হলো। এমন কেন হচ্ছে সে ঠিক বুঝতে পারছে না। ভালো যন্ত্রণা।
মীরা হাত বাড়িয়ে সেলফোনে সময় দেখল। রাত বারোটা বেজে ষোল মিনিট। আরো কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে সে উঠে বসল বিছানায়।
টেবিল ল্যাম্পটা জ্বালিয়ে উঠে চলে গেল বাথরুমে। বেসিনে ঠাণ্ডা পানি ছেড়ে দিয়ে বেশ কয়েকবার চোখে মুখে পানির ঝাপটা দিল। শীতল পানির স্পর্শে মাথার দপদপানিটা একটু কমল। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছে একবার তাকাল আয়নার দিকে। অমনি ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সে। রক্ত সরে গেল তার মুখ থেকে। সমস্ত শরীর যেন জমে পাথরের মতো আড়ষ্ট ও ভারী হয়ে গেল। মূর্তির মতো ক্ষণকাল একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকল। আতঙ্কে তার বুকের রক্ত হিম হয়ে যাবার অবস্থা হলো। আতঙ্কের প্রধান কারণ—সে অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, আয়নার ভেতর থেকে তার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে একজন সুদর্শন যুবক।
আয়নার ভেতর মানুষটাকে দেখা যাচ্ছে। তার মুখে স্বভাবসুলভ দুষ্টুমির হাসি। এই হাসি মীরার পরিচিত। ভীষণ পরিচিত। মীরা তীক্ষ্ণ চোখে আবার তাকাল আয়নার দিকে। যুবকের পুরো শরীরটাই দেখা যাচ্ছে। পরনে নীল জিন্স, তার উপরে ফুল হাতা সাদা টি-শার্ট। মাথায় নীল রঙের বেসবল হ্যাট, চোখে নীল ফ্রেমের চশমা। পায়েও নীল রঙের জুতা।
নীল আবীরেরও খুব প্রিয় রঙ ছিল। আর রঙ মিলিয়ে কাপড় পরাটা ছিল তার শখ। ক্লোজেটের দেয়ালে কম করে হলেও বিভিন্ন রঙের গোটা পঞ্চাশেক হ্যাট ঝুলানো থাকত তার। বিভিন্ন রঙের ফ্রেমের চশমা ছিল কম করে হলেও গোটা বিশেক। আবীরের পরনে সেদিন ঠিক এই পোশাকটাই ছিল।
‘মীরা, এত টেনশন করছো কেন? কাল সকালে তোমার প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশন ভালো হবে—আমি বলছি। এখন যাও ঘুমিয়ে পড়।’
কে কথা বলল? আবীর? হ্যাঁ, আবীরই তো। অবিকল তার কণ্ঠ। কোনো কারণে মীরার টেনশন হলেই আবীর ঠিক এভাবেই কথা বলত—সাহস দিত।
মীরা ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। কিন্তু কাউকে দেখতে পেল না। তার বুক ঢিপ ঢিপ করছে। হৃৎপিণ্ড লাফাচ্ছে। তীব্র একটা ভয় তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। থরথর করে তার হাত পা কাঁপছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। মনে হচ্ছে এখুনি বোধহয় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যাবে। তার এমন লাগছে কেন? মীরা বেসিনের কাউন্টার ধরে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করল।
তুমি জানো না, তুমি টেনশন করলে আমার ভালো লাগে না? কাজে তো চ্যালেঞ্জ থাকবেই—তাই বলে এত বিচলিত হলে চলবে? মনে সাহস রাখো—ইউ উইল বি জাস্ট ফাইন!’
মীরা চোখ তুলে তাকাল আয়নার দিকে—তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে রইল। নীল রঙের মানুষটি সাহস দেয়া ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। মুখে স্মিত হাসি।
মীরা আবার ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাল। নীল রঙের মানুষটাকে আর দেখা যাচ্ছে না। এসবের মানে কী? মীরার কি হ্যালুসিনেশন হচ্ছে? পাগল টাগল হয়ে যাচ্ছে না তো? এসব কীসের লক্ষণ? অতিরিক্ত কাজের চাপে মনে হয় মাথাটা জ্যাম হয়ে আছে—ঠিকমতো মাথা কাজ করছে না। বিছানায় ফিরে যাবার শক্তি পর্যন্ত নেই। মীরা দাঁড়িয়ে রইল আরো কিছুক্ষণ। একটু স্বাভাবিক হয়ে ফিরে এলো বিছানায়। বসে রইল খাটের কিনারে। বেডসাইড টেবিলে রাখা বোতল থেকে কয়েক ঢোক পানি খেল। কোথাও কোনো শব্দ নেই। সুনসান নীরবতায় চারিদিকে ছেয়ে আছে।
মীরা হাত বাড়িয়ে টেবিল ল্যাম্পের সুইচ বন্ধ করে শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই চোখের পেশি দুর্বল হয়ে এলো তার এবং ঘুম জড়িয়ে এলো চোখে। আর ঠিক তখনই আচমকা একটি হাত এসে জড়িয়ে ধরল তাকে। হাতটি একটি পুরুষের হাত।
মীরা নিঃশ্বাস বন্ধ করে পাথরের মতো স্থির হয়ে পড়ে রইল। তার কপালে চিকন ঘাম দেখা দিল। সে কী করবে বুঝে উঠতে পারল না। সে একটু একটু চাপ অনুভব করছে। তাকে খুব অন্তরঙ্গভাবে কাছে টেনে নিতে চাইছে কেউ। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। মানুষটির গায়ের গন্ধও পাচ্ছে সে—গন্ধটা তার পরিচিত। কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব?
মীরা এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। টেবিল ল্যাম্পের সুইচ অন করে তাকাল বিছানার দিকে। তার বিছানায় কেউ নেই। পুরো বিছানা ফাঁকা। সে ঘরের সবগুলো বাতি জ্বালিয়ে দিলো। চারিদিকে তাকিয়ে দেখল ভালোমতো—কেউ নেই। তাহলে তাকে জড়িয়ে ধরল কে? কাছে টেনে নিতে চাইল মানুষটা কে? তার শরীরের গন্ধ এলো কোত্থেকে? এসব কী? মীরার মাথা এলোমেলো হয়ে গেল।

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৮)

দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের সময় একজন ভ্রমণকারী যখন বিভিন্ন টাইম জোন দ্রুত অতিক্রম করে, তার শরীর যে সময় যে অঞ্চলের উপরে যায়, সেইমতো কাজ করতে থাকে। একজন ভ্রমণকারী কতদূর ভ্রমণ করল তার উপর নির্ভর করে কত সময়ে শরীর নতুন অঞ্চলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। সেই সময়টাতে ভ্রমণকারী বিভিন্ন টাইম জোনের দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে ক্লান্তিতে ভোগে, মাথা ঝিমঝিম করে ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। একধরণের অস্বস্তিকর অনুভূতির এই উপসর্গকে বলে জেটল্যাগ।
বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সময়ের পার্থক্য কোথাও ১০ ঘণ্টা, কোথাও ১১ ঘণ্টা, কোথাও ১২ ঘণ্টা। শিকাগো শহরটি আমেরিকার মধ্যাঞ্চলে অবস্থান করায় বাংলাদেশের সঙ্গে সময়ের পার্থক্য ঠিক ১২ ঘণ্টা। ডেলাইট সেভিংস এর সময় পার্থক্য হয় ১১ ঘণ্টা।
আজ চারদিন হয়ে গেল, কিন্তু ফাহিমের জেটল্যাগের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটে নি। প্রতিদিন ভোর তিনটা চারটা অবধি সে জেগে থাকে, ঘুমলেও ঘুম ভেঙে যায়। তারপর চুপচাপ শুয়ে থেকে ভাবনার জগতে ডুবে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না তার। ভোরের দিকে চোখ ভেঙে আসে আবার একটু পরেই ছোট বোন লীনার ডাকাডাকিতে নাস্তার টেবিলে যেয়ে বসতে হয়। সকালে নাস্তার টেবিল সাজানো হয় হাতে বানানো পরাটা, আটার রুটি, শিম দিয়ে আলু ভাজি অথবা টাটকা সবজির নিরামিষ সাথে ডিম ভাজি, মুরগীর মাংস আর সুজির হালুয়া দিয়ে। বিদেশে বিভূঁইয়ে এসব খাবার চাইলেও পাওয়া যায় না। দেশে এলে ফাহিম তাই সকালের নাস্তাটা খুব আনন্দ নিয়ে খায়।
নাস্তা সেরে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা নিয়ে ফাহিম লিখতে বসল সিমিকে। গত দুই দিন সিমির সঙ্গে দেখা হয় নি। দেখা না হবার অবশ্য কারণ আছে। ফাহিম ওর মা, ছোট বোন, আর বোনের স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য এসেছে ওদের গ্রামের বাড়িতে। ও জানে ফিরে যাওয়ার সময় এলে তাড়াহুড়োতে আর হয়তো আসাই হবে না।
সিমির সঙ্গে ফোনে আর এমএসএর মাধ্যমে কথা হচ্ছে তবুও সিমির কড়া নির্দেশ, সময় বের করে মেইল লিখতে হবে। গতকাল থেকে ফাহিমের মাথায় কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীতের একটা লাইনই শুধু ঘুরছিল। সে কী মনে করে মেইলের সাবজেক্টে সেই লাইনটি লিখল: আমার বেলা যে যায় সাঁজ বেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে…
প্রিয়তমা সিমি,
বলেছ, দেখা হোক বা না হোক, মেইল লেখা যেন বন্ধ না করি। কথা যেহেতু দিয়েছি, কিছু একটা তো লিখতেই হয়। তাই লিখছি। যদিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, কী লিখব?
গতকাল প্রায় সারা রাতটাই আমি জেগে ছিলাম। ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এপাশ ওপাশ করেছি। ঘুমের নিষ্ফল চেষ্টা। আমি কম ঘুমাই ঠিকই তাই বলে একেবারেই নির্ঘুম কাটবে সেটা ভাবি নি। আমি সেই অর্থে ইনসোমনিয়াক নই। তবুও এমন হলো। জেটল্যাগের প্রভাব হয়ত কাটে নি পুরোপুরি। সেটাও একটা কারণ হতে পারে। কারণ যাই হোক, এই দীর্ঘ রাত আমি বিভিন্ন রকমের ভাবনায় ডুবে ছিলাম। কিন্তু তার মধ্যে বিজ্ঞাপন বিরতির মতো প্রতিটি ভাবনার মাঝেই নিয়মিত বিরতি দিয়ে দেখা দিয়েছ তুমি। তোমার কথাই ভেবেছি খণ্ড খণ্ডভাবে। এক পর্যায়ে নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করলাম—কেন আমার মগজে চিন্তা চেতনায় শুধুই তুমি। এ আমি কী করছি? কী হচ্ছে এসব, কেনোইবা হচ্ছে। নিজেকে ঝাঁকি দিয়ে বললাম, ওয়েক আপ ফাহিম! এসব কী? তুমি অবাস্তব স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছ। ওয়েক আপ!
হঠাৎ করেই আমি অনুধাবন করলাম, সত্যিই তো তাই। আমাকে বাস্তবে ফিরে আসতে হবে। অনেকভাবে আমি স্থির হলাম। আমি এখন জানি—আমি ঠিক কী চাই। আমাকে কী করতে হবে।
সব সম্পর্কেরই কিছু স্তর থাকে। তার একটি হচ্ছে প্রবল আকর্ষণের স্তর। প্রথম দর্শনেই প্রেম বলো বা বন্ধুত্বের চৌকাঠ পেরিয়ে প্রেমের উঁকিঝুঁকিই বলো—এই স্তরে আকর্ষণের টান থাকে প্রচণ্ড তীব্র। এ সময়টা শুধুই হরমোনের তীব্রতা আর ওঠাপড়ার সময়! তুমি কি বুঝতে পারো?
আমাদের নির্মল বন্ধুত্বের ওপরে আর কোনো সত্যি নেই। এর চেয়ে জরুরীও কিছু নেই। আমি অবশ্যই চাইব আমাদের এই সম্পর্ক চাপ ও চিন্তামুক্ত রাখতে। আমি তোমার কাছে এমন কিছুই চাইব না, যা তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আমি এমন কিছুর জন্য অস্থিরও হতে চাই না। যা আমার প্রাপ্য নয়, তা পাওয়ার অধিকারও আমার নেই।
আমি জানি না, এসব কথা আমি কেন লিখছি তোমাকে? শুধু তোমাকে জানাতে চাই, আমি তো এমন না। তুমি যাকে এখন দেখছ, সে মোটেও আমি নই।
নিজেকে ভালো রেখো। নিজের মধ্যেই থেকো। হাল ছেড়ো না। আমি এবং আমার শুভ কামনা সমসময়ই থাকবে তোমার জন্য।
অফুরান ভালোবাসা।
—ফাহিম

অফিসে বসেই ফাহিমের মেইল পেল সিমি এবং কোনো এক ফাঁকে দ্রুত উত্তরও লিখল সে।
ফাহিম,
সুন্দর একটা মেইল পাঠানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ।
আমি ঠিক তোমার মেইলের উত্তর লিখতে বসি নি। শুধু তোমাকে জানাতে চাচ্ছি যে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি এটা জেনে যে তুমি আমার সেদিনের ব্যবহারে কিছু মনে করো নি। আমার ইমোশনকে কোনো প্রশ্রয় তুমি দাও নি। একদিকে ভালোই করেছ। আমি সত্যিই খুশি হয়েছি এটা জেনে যে তুমি আমার বন্ধু হিসেবেই থাকতে চাও। সেটিই আসলে আমার সবচেয়ে বেশি দরকার। এই মুহূর্তে তোমার মতো একজন ভালো বন্ধুর বড়ই অভাব।
অনেক কিছু লেখার আছে কিন্তু অফিসে বসে দীর্ঘ ইমেইল লেখা যাবে না। আমি বাসায় ফিরে তোমার মেইলের উত্তর লিখব, ততক্ষণ পর্যন্ত…
অনেক অনেক ভালোবাসা তোমার জন্য।
বর্ষা aka সিমি

রাতে হাতের সব কাজ সেরে সিমি লিখতে বসল।
ফাহিম, প্রিয় বন্ধু আমার—
তুমি কি জানো, কেন আমি তোমাকে এত পছন্দ করি? কারণ, তোমার মধ্যে একধরণের শক্তি আছে, অথবা সম্মোহনী, যা চুম্বকের মতো অন্যকে আকৃষ্ট করে। আমি ঠিক বলতে পারব না, সে শক্তিটা আসলে কী! আমি এও বলতে পারব না কতটা শক্তিশালী সেই ক্ষমতা, অথবা সেই শক্তি আমার ওপর কীভাবে কাজ করেছে, কিন্তু স্বীকার করতে ভয় নেই যে আমি তোমার প্রতি ভীষণ রকমের আকৃষ্ট হয়েছি। এটা সম্পূর্ণই ভিন্ন ধরণের একটা অনুভূতি। এই অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। শুধু জানি, আমার ভীষণ ভালো লাগছে। তোমার পাশে কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকাতেও শান্তি।
প্রেমে তো তুমি পড় নি, পড়েছি আমি। আমি সত্যিই প্রেমে পড়েছি। সামনে সমূহ বিপদ আমার। একটু একটু লোভ হচ্ছে, সাধ জাগছে। অভুক্ত আমি কত কিছু পেতে চাই। জানি, কিছু চাওয়া অপূর্ণই থেকে যায়। সব চাওয়া পাওয়া হয় না। কখনোই। তবুও মনের ওপরে তো জোর চলে না। মনকে তার নিজস্ব গতিতেই চলতে দেয়া উচিৎ।
নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছ কেন তুমি? তুমি এমন কিছুই করো নি। তোমার আগ্রহ কিংবা অস্থিরতা যা দেখা যাচ্ছে, তা আর কিছুই নয়—আমার প্রতি তোমার ভালো লাগার অনুভূতি বা উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ বলতে পারো। এটা নিয়ে মন্দ লাগা কিংবা নিজেকে অন্যকিছু ভাবার তো দরকার দেখি না। এটাই কি স্বাভাবিক নয়?
সেদিন আমার অনুভূতিকে তুমি প্রশ্রয় দিয়েছ খানিকটা। আমি তোমার অনুভূতিকে। একই দোষে আমিও দোষী—ব্যস, কাটাকাটি। আমি কিছুই মনে করি নি। সত্যি বলছি।
তবে এটা ঠিক, তোমাকে ঘোর ভেঙে বাস্তবে ফিরে আসতে হবে, এই জন্যে যে, তুমি পৃথিবীর একজন অনিন্দ্য সুন্দরী চমৎকার নারীর সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ। আর এদিকে আমি একজন স্বামীহীনা বিধবা নারী। শুনতে যত খারাপই লাগুক, সত্যকে তো আর অস্বীকার করা যাবে না।
তুমি ভীষণ কোমল হৃদয়ের একজন মানুষ, ফাহিম। যে কোনো মানুষের কষ্টেই তুমি সমব্যথী হও। তোমার নাচারটাই এমন। আর যেহেতু তুমি আমাকে পছন্দ করো (একটু বেশিই—থ্যাংক ইউ ফর দ্যাট!), সেখানে আমার কষ্ট তোমাকেও যে কষ্ট দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তারমানে আমার কষ্ট, অসহায়ত্ব, একাকীত্ব এসবই আমার প্রতি তোমার একধরণের ভালোলাগার সৃষ্টি করেছে। আমার প্রতি যে টানটা তুমি অনুভব করো, সেটা একধরণের মায়া। এটা তো খারাপ কিছু না, ফাহিম। সত্যি বলতে কী, আমার ভাবতে ভালো লাগছে যে, পৃথিবীতে এখনো এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই।
রানা যখন চলে গেল, আমার মনে হয়েছিল আমিও খুব তাড়াতাড়ি চলে যাব। রানাকে হারানোর ক্ষতি আমি সহ্য করতে পারব না। অথচ দেখো, আমি শুধু যে সহ্যই করেছি তা কিন্তু নয়, আমার এই একাকীত্বকে আমি মেনে নিয়েছি, খানিকটা উপভোগও করছি। এটা অস্বাভাবিক নয় কি?
ফাহিম, মাই ফ্রেন্ড, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই কোনো কিছুর জন্য বাঁধা হয়ে থাকে না। থেমেও থাকে না।
আমার মা যখন মারা গেলেন, আমার বাবা এতটাই মূষরে পড়েছিলেন যে দেবদাসের মতো দাড়ি-টাড়ি রেখে একাকার। অথচ, কিছুদিন যেতে না যেতেই, তার কাউকে ভালো লাগা শুরু হয় এবং এক সময় তাকে বিয়েও করে। এটাই জীবন। সাসপেন্স আর অনিশ্চয়তায় ভরপুর জীবনের নাটক। মাঝে মাঝে ভীষণ একঘেয়েমি ও বিরক্তিকরও বটে।
জেনে খুশি হলাম যে তুমি অন্তত আমাদের বন্ধুত্বের মাজেজাটা বুঝতে পেরেছ। এটা আমার জন্য বড়ই স্বস্তিকর। যেমনটা বলেছিলাম, আমার সত্যিকার অর্থেই ভালো কোনো বন্ধু নেই। কাজেই, কোনো অবস্থাতেই তোমাকে আমি হারাতে চাই না। তুমি আমার কষ্ট শুষে নিতে চাও, আমাকে একটু স্বস্তি দিতে চাও, ভালোলাগা দিতে চাও, ভালোবাসায় রাখতে চাও—এটা ভেবেই আমি কতটা ভালো থাকি, কী করে বুঝাই। তোমাকে নিয়ে এটুকু ভাবতেই গর্বে আমার বুক ভরে যায়। আই রিয়েলি অ্যাম প্রাউড অফ ইউ, ফাহিম!
আমি কি একটা অনুরোধ করতে পারি। প্লিজ কোনো অবস্থাতেই নিজেকে বদলে ফেলো না। তুমি না চাইলেও হয়ত আর পারবে না, তবুও বলছি। থাকো না এভাবেই, আমার একজন ভালো বন্ধু হয়ে। তুমি জানো না, তুমি কী, কী তোমার প্রাপ্য আর কতটাই উপযুক্ত একজন মানুষ তুমি। কাজেই কী পেলে আর কী পেলে না, সেটা ভুলে যাও। শুধু জেনো, তুমি সৃষ্টিকর্তার এক অসাধারণ সৃষ্টি—নিজেকে কখনোই ছোট করে দেখো না। নিজের ভেতরেই থেকো। বাকীটা পরিস্থিতি আর প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দাও।
এখন যে ‘তুমি’ কে আমি দেখছি, সে তুমি নও। ভিন্ন কেউ। তবে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম, এখন যাকে দেখছি সেই ‘তুমি’ কেই যদি আরো আগে দেখতে পেতাম। আশাকরি বিষয়টা তুমি ধরতে পারবে। এর চেয়ে বেশি কিছু খুলে বলতে পারব না। বুঝলে ভালো—না বুঝলে নাই।
রানার কাছ থেকে আমি শিখেছি, রণে ভঙ্গ না দিয়ে কীভাবে যুদ্ধ করে যেতে হয়। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন? গত দশ বছর যেসকল বাঁধা আর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, কম তো শিখি নি। এসব নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না, শুধু তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, টসে হারলেই আফসোস, আহারে কয়েনের অপর পাশটা আমার ছিল।
তুমিও আশাহত হয়ো না। আমার শুভ কামনা তোমার জন্য সবসময়ের জন্য থাকবে একই রকম। আমিও তোমাকে অনেক পছন্দ করি ফাহিম। শুধু কি তাই, আমি তোমাকে ভালোওবাসি অনেক। কিন্তু আমার কীইবা করার আছে। আমি তোমার মতো অস্থির নই। আমি নিজেকে ঝাঁকি দিয়ে বলি না, ওয়েক আপ সিমি! এসব কী?
প্লিজ ফাহিম, নিজেকে বদলে ফেলো না। প্লিজ!
ভালোবাসা।
তোমার বর্ষা।

আগের পর্ব

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৭)

ফাহিম বলেছিল, সিমি যেভাবে পরিকল্পনা করবে সেভাবেই সে সময় বের করবে। কিন্তু বাস্তবে সেভাবে সময় মেলানোটা ঠিক হয়ে ওঠে নি ফাহিমের। গত দুদিন সে তার মায়ের সঙ্গেই থেকেছে। কোথাও বের হয় নি।
তবে আজ শুক্রবার বন্ধের দিন বিধায় সিমি মোটামুটি লম্বা একটা পরিকল্পনা করে ফেলল। ফাহিম সেদিন কথায় কথায় জানিয়েছিল, দেশে এলে আর কোথাও তার যাওয়া হোক না হোক, তিনটি জায়গায় সে যায়। এক শহীদ মিনার, দুই জাতীয় স্মৃতিসৌধ আর তিন ওদের গ্রামের বাড়ি।
পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ফাহিমকে নিয়ে আজ স্মৃতিসৌধ দেখতে যাবে সিমি। সারাদিন ওখানেই থাকবে। সেখান থেকে ফেরার পথে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে কিছুক্ষণ থাকার ইচ্ছে ফাহিমের। সেখানেও যে তার স্মৃতি রয়েছে অনেক। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যরে ভরপুর বিশ্ববিদ্যালয়টির ক্যাম্পাস প্রথম দেখাতেই ফাহিমকে মুগ্ধ করেছিল। পুরো ক্যাম্পাসটাকেই প্রকৃতি এক নিবিড় আলিঙ্গনে জড়িয়ে রেখেছে যেন। প্রকৃতিকে এত কাছে থেকে দেখা, হৃদয় শীতল করা বিশুদ্ধ বাতাস, সব মিলিয়ে অন্য রকম একটা অনুভূতি কাজ করত তখন।
এয়ারপোর্ট রোডের পাশে ঢাকা রিজেন্সি হোটেলের সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল ফাহিম। সিমিই বলেছিল ফাহিমকে ওখানে আসতে। সকাল দশটার কিছু আগেই ফাহিম এখানে চলে এসেছে। একটা রিক্সা নিয়ে সিমি যখন সেখানে পৌঁছল তখন সাড়ে দশটা বেজে গেছে। ফাহিমকে দেখে সুন্দর করে হাসল সিমি। ফাহিমও হাসল তার স্বভাব-সুলভ ঠোট বাঁকানো হাসি। সিমি নেমে দাঁড়াতেই ফাহিম এগিয়ে গেল।
সিমি আজ নীল জিন্সের সঙ্গে সাদা রঙের ফতুয়ার মতো কিছু একটা পরেছে। চোখে সানগ্লাস। তার কাঁধে একটা কাপড়ের ব্যাগ। এ পোষাকে তাকে অন্যরকম লাগছে। সেদিনের শাড়ি পরা সিমি আর আজকের জিন্স পরা সিমি—একই মানুষ অথচ অন্যরকম। কিছু কিছু মানুষ আছে সব কিছুতেই মানিয়ে যায়। সিমি তাদেরই একজন।
সিমির কাঁধের ব্যাগটি নিতে চাইল ফাহিম। সে বাঁধা দিল না। ফাহিমের কাছে ব্যাগটা একটু ভারী মনে হলো। ফাহিম সারাদিনের জন্য একটা ট্যাক্সি ভাড়া করেছে। ওরা উঠে বসতেই ড্রাইভার ট্যাক্সি ঘুরিয়ে এয়ারপোর্ট রোডে পড়ল।
বন্ধের দিন থাকায় রাস্তায় জ্যাম তুলনামূলকভাবে কম। মোটামুটি অল্প সময়েই ওরা পৌঁছে গেল গন্তব্যে। এখানে যতবার এসেছে ততবারই বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেছে ফাহিমের মন। তবুও দেশে এলেই বিদেশীদের মতোই জাতীয় স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন করতে যায় ফাহিম। দীর্ঘ সময় বসে থাকে সেখানে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ফাহিমের বাবাকে ‘একটু বাইরে আসেন’ বলে রাজাকার বাহিনী ধরে নিয়ে যায়। আর কখনোই সে ফিরে আসে নি। বাবার সঙ্গে ফাহিমের কোনো স্মৃতি নেই। এখানে এলে ফাহিমের মনে হয় তার বাবার কাছে এসেছে।
ফাহিম সাভারের এই স্মৃতিসৌধে যখনই এসেছে, কোনো এক বিচিত্র কারণে, ওর তখন নিউ ইয়র্কে স্থাপিত স্ট্যাচু অফ লিবার্টির কথা মনে পড়েছে। ফাহিম যখন প্রথম স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখতে যায়, মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে ছিল সে। ছোটবেলা থেকে আমেরিকার স্বাধীনতা বুঝাতে এই মূর্তিটির ছবি দেখে আসছে। পৃথিবীতে স্বাধীনতার এরচেয়ে ভালো প্রতীক কী আর আছে!
সেই মূর্তিটা ফ্রান্সের জনগণ দিয়েছিল আমেরিকার জনগণকে—বিশ্ব বন্ধুত্বের প্রতিক হিসেবে। এবং সেটা বর্তমান সময়ের রাজনৈতিক মুক্তি ও গণতন্ত্রের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য প্রতিক।
বাংলাদেশের স্বাধীনতারও গৌরবময় প্রতিক এই জাতীয় স্মৃতিসৌধ। যা কিনা বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে নিহত মুক্তিযোদ্ধা ও নিহত বেসামরিক বাঙালি ও অবাঙ্গালিদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে নিবেদিত একটি স্মারক স্থাপনা। বিশিষ্ট স্থপতি সৈয়দ মাইনুল হোসেন করেছেন এই অনন্য সাধারণ নকশাটি। বিদেশি রাষ্ট্রনায়কগণ সরকারিভাবে বাংলাদেশ সফরে আগমন করলে এই স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা নিবেদন রাষ্ট্রাচারের অন্তর্ভুক্ত।
অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর-জাতীয় স্মৃতিসৌধ চত্বরে ছায়া ঘেরা বিস্তীর্ণ এলাকায় বেশ কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে ফাহিমের একটু খিদে পেয়ে গেল। ইতোমধ্যে সময় গড়িয়ে দুপুর হয়েছে। বেলা বাজে প্রায় দেড়টা। সিমির দিকে তাকিয়ে ফাহিম বলল, ‘আমার না খিদে পেয়েছে। কিছু একটা খেতে পারলে ভালো হতো। যদিও বাইরে খাওয়াটা আমার জন্য একটু রিস্কি। এখানে একটা পর্যটনের রেস্টুরেন্ট ছিল না? ওটাতে যাওয়া যেতে পারে, কি বলো?’
সিমি মুচকি হেসে বলল, ‘সেটা নিয়ে আপাতত ভাবতে হবে না। চলো ঐ ছায়াটায় গিয়ে বসি। আর ব্যাগটা আমাকে দাও।’ বলেই সিমি ব্যাগটা নিলো ফাহিমের কাঁধ থেকে। সুন্দর একটা জায়গা বেছে নিয়ে বসল ওরা দুজন।
সিমি ওর ব্যাগ থেকে প্লাস্টিকের একটা বাটি বের করে বলল, ‘তোমার জন্য একটু নুডুলস বানিয়ে এনেছিলাম। তুমি কি নুডুলস পছন্দ করো?’
ব্যাগটা ভারী লাগার পেছনের রহস্য কিছুটা বোঝা গেল। যদিও নুডুলস ফাহিমের খুব প্রিয় কোনো খাবার নয়। কারো বাসায় গেলে নুডুলস খেতে দিলে দু এক চামচের বেশি সে তার প্লেটে কখনোই তুলে নেয় না। ফাহিমের ধারণা নুডুলস সবাই ঠিক মতো বানাতেও পারে না। কারোটা বেশি সিদ্ধ হয়ে কাঁদা কাঁদা হয়ে যায়, কারোটা হয় আঠাল। তবে সিমির বানানো এই নুডুলসটা দেখেই ফাহিমের পছন্দ হলো। সে বলল, ‘সব নুডুলস পছন্দ করি না। নুডুলস করার একটা আর্ট আছে। দেখা যাক তোমার নুডুলস পাশ করে কি না।’
সিমি দুটো ছোট প্লেট, কাঁটা চামচ বের করে একটা প্লেটে নুডুলস তুলে দিল ফাহিমকে। ফাহিম এক চামচ খেয়ে চোখ বন্ধ করে স্বাদটা বোঝার চেষ্টা করল। এতটা সে আশা করে নি। অনেক সময় প্রিয় মানুষ যাই করে সেটাই ভালো লাগে। কিন্তু নুডুলসের বেলায় সেটা হবার সম্ভাবনা কম। ফাহিম চোখ খুলে বলল, ‘তুমি পাশ করেছ। শুধু পাশ নয়, লেটার মার্কস সহ পাশ। আজ থেকে আমার নুডুলসের স্ট্যান্ডার্ড বেড়ে গেল—প্রিয়দর্শিনী সেফ সিমির তৈরী আজকের এই নুডুলসই হলো নতুন স্ট্যান্ডার্ড।’
ফাহিমের কথার ধরণে সিমি খুব মজা পেল। সে শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘বেশি হয়ে যাচ্ছে না? না কি বাটার দিচ্ছ?’
‘একেবারেই না। সত্যি বলছি, খুব ভালো হয়েছে। আমি সাধারণত নুডুলস খাই না। তবে, তোমার বানানো এই নুডুলসটা সত্যিই অসাধারণ হয়েছে।’ বলতে বলতে ফাহিমে গপাগপ আরো কয়েক চামচ মুখে দিলো।
সিমি অবাক চোখে ফাহিমের খাওয়া দেখছে আর মিটি মিটি হাসছে। ফাহিমের ভাবসাব দেখে মনে হচ্ছে, নুডুলসের মতো এমন সুস্বাদু খাবার পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই এবং সেই খাবারটি জীবনে এই প্রথম সে খাচ্ছে।
ফাহিম চামচ দিয়ে সরিয়ে নুডুলসে কী কী উপকরণ আছে তা একবার দেখে নিলো। সিমি বাংলাদেশের মোটা নুডুলসটা নিয়েছে। তার ভেতর দিয়েছে আলু সেদ্ধ, মটরশুঁটি, গাজর, ফুলকপি, ডিম, মাংসের টুকরো আর শুকনো মরিচ। ওপরে টমেটো কেচাপ। তাতেই স্বাদ বেড়ে গেছে বহুগুণে।
‘তুমি ঘুমাও নি রাতে?’ বলল ফাহিম।
‘কেন?’
‘এত কিছু কখন করলে?’
‘সকালেই। একটু আর্লি উঠে গেলাম। আর তাছাড়া আমি ছুটির দিনেও বিছানায় বেশিক্ষণ থাকতে পারি না। অফিসের যাওয়ার নিয়মে উঠে পড়ি।’
‘আমাকে রেসিপিটা দিও তো।’
‘রেসিপি লাগবে না। তোমার যখন খেতে মন চাইবে বলবে, আমি বানিয়ে নিয়ে আসব।’ মিষ্টি হেসে বলল সিমি।
‘আর আমি যখন শিকাগো ফিরে যাবো, তখন?’
‘তখন কুরিয়ারে পাঠিয়ে দিবো।’ বলেই বাচ্চা মানুষের মতো হেসে উঠল সিমি।
ফাহিমও হাসল। হাসতে হাসতে বলল, ‘আশ্চর্য, তুমি খাচ্ছ না কেন? আমি তো একাই শেষ করে ফেলছি।’
‘চান্সই তো পাচ্ছি না।’ সিমি আবারো হাসল।
ফাহিম মুগ্ধ হয়ে তাকাল। মেয়েটা এত সুন্দর করে হাসতে পারে। ফাহিম তার প্লেটে আর একটু নুডুলস তুলে নিয়ে এগিয়ে ধরল সিমির দিকে। সিমি একটু অবাক হলো, সেই সাথে মুগ্ধও। সে তার চামচ দিয়ে একটু নুডুলস মুখে দিল।
একই প্লেট থেকে দুজনে মিলে নুডুলস খাচ্ছে। নরম রোদ আর গাছের প্রশস্ত ছায়ায় বসে এক প্লেটে নুডুলস খাওয়ার চেয়ে সুখের জীবন আর কী আছে?

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৬)

দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।
এমিরেটস এয়ারলাইন্সের লাউঞ্জে বসে নিবিষ্ট মনে ল্যাপটপের মনিটরে তাকিয়ে আছে ফাহিম। অনেক ঝামেলা করে সে ইন্টারনেট কানেকশন পেয়েছে। শিকাগো থেকে লন্ডন হয়ে ১৫ ঘণ্টার দীর্ঘ ফ্লাইট শেষ করে ঘণ্টা দুয়েক আগে তার প্লেন ল্যান্ড করেছে এখানে। চার ঘণ্টা লে-ওভার। তারপর পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইট টু ঢাকা।
গত দু-তিন দিন টানা তুষারপাতে প্রায় দেড়ফুট বরফ জমে ছিল শিকাগো শহরের সর্বত্র। ফাহিমের নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায় অবধারিতভাবেই। কিন্তু হঠাৎ করেই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় একদিনেই সব বরফ গলে পানি, আসলে কাদা পানি হয়ে গেল। প্রচণ্ড শীত কিংবা তুষারপাতের একদিন পরেই এই হঠাৎ তাপমাত্রা উষ্ণায়নকে এরা বলে ইন্ডিয়ান সামার। কেন এমন অদ্ভুত নামকরণ তা অবশ্য ফাহিমের জানা নেই। তবে ধারণা করা যায়, ইন্ডিয়ার উষ্ণ আবহাওয়ার কারণেই হতে পারে এমন নামকরণ।
এভাবে একদিনের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যাবে সেকথা আবহাওয়াবিদরাও বলতে পারে নি। এই কনে কনে শীত, একদিন না যেতেই সব কিছু স্বাভাবিক। নাগরিক জীবন ফিরে এলো স্বাভাবিকতায়। ফাহিম মনে মনে সৃষ্টিকর্তার এই খেয়ালখুশির বিষয়টার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞতা অনুভব করল। তিনি চাইলে সব কিছুই সম্ভব। ফাহিমের ফ্লাইট অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিল, আবহাওয়ার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত। এখন যেহেতু বরফ গলে গেছে, রাস্তাঘাট, রানওয়েও থেকে বরফের স্তূপ সরিয়ে পরিষ্কারও করা হয়েছে—প্লেন চলাচলে এখন আর কোনো অসুবিধা নেই। ফাহিমের ট্রাভেল এজেন্ট ওর টিকেট রিকনফার্ম করে দেয়াতে ফাহিমের ফ্লাই করতে আর কোনো সমস্যা হলো না।
লাউঞ্জে বসে ফাহিম প্রথমেই তার ইমেইল খুলে বসল। সিমির দুটো ইমেইল এসেছে। মেইল দুটো পড়তে পড়তে মেয়েটির প্রতি এক ধরণের মায়া বেড়ে গেল ফাহিমের। কেমন মন কাড়া কথাগুলো। সিমির একাকীত্বের কথা ভেবেও ওর খারাপ লাগতে লাগল। বরফের স্তূপ পরিষ্কার, ফ্লাইট বাতিল হবার টেনশন, এক মাসের জন্যে বাসার যাবতীয় কাজ, বিল পেমেন্ট সব কিছু মিলিয়ে একটা ঝড়ের তাণ্ডব গিয়েছে ওর নিজের ওপর দিয়ে। ও বেশ কয়েকবার ভেবেছে সিমিকে পরিস্থিতির একটা আপডেট জানানো দরকার, কিন্তু এই লিখি এই লিখি করে আর লেখা হয়ে ওঠে নি। ফাহিম লক্ষ করল, তুষারপাতের বর্ণনা দিয়ে তার লেখা শেষ ইমেইলটিও রয়ে গেছে ড্রাফট ফোল্ডারে।
ফাহিম দ্রুত তার সর্বশেষ অবস্থান, পরিস্থিতি, অ্যারাইভ্যাল টাইম আর বাংলাদেশে সে যে ফোনটি ব্যবহার করবে, সেই নাম্বারটি জানিয়ে সিমিকে একটা মেইল পাঠিয়ে দিল।
প্লেনে ফাহিম কখনও ঘুমাতে পারে না। সে সময় পার করে ইন-ফ্লাইট সিনেমা দেখে দেখে। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে এখন অবসাদ লাগছে তার। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। ফাহিম ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘড়ি দেখল। বোর্ডিং হতে এখনো তিরিশ মিনিট বাকী। সে ডিউটি ফ্রি শপ থেকে কিছু গিফট কিনল। কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরে বেড়াল। তারপর ঝুলন্ত মনিটরে ঢাকা গামী ফ্লাইটের নাম্বার দেখে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ডিপারচার গেটের দিকে।

সিমি সাধারণত শাড়ি পরে কাজে যায় না। আজ সে শাড়ি পরল। সুন্দর করে সেজেছে সে।
কাজের শেষে ফাহিমের সঙ্গে দেখা হবে। ফাহিমকে সে ঠিকানা দিয়ে রেখেছে। তাঁর অফিসের গেটে ফাহিম আসবে সেখান থেকে তাঁরা দুজনে কোথাও যাবে।
সিমি হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছে। ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, অফিসের অনেকেই ওর দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সিমির মেদহীন ছিপছিপে শরীরে নীল শাড়ি, নীল টিপ, নীল নেইল পলিস আর মেজেন্টা রঙের লিপস্টিক দেয়া পুরু ঠোট—কেউ কি পারবে পাশ কাঁটিয়ে চলে যেতে একবার না তাকিয়ে? আর ওর কাঁটা কাঁটা মুখটা দেখে যে কেউ বলবে, একটু দাঁড়িয়ে হাসিটাও দেখে যাই।
সিমি ঘড়ি দেখল। আজ যেন ঘড়ির কাঁটা থমকে আছে। প্রহর যেন কাটছেই না। চারটা পঞ্চাশে সে উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুমে যেয়ে নিজেকে আর একবার দেখে নিলো আয়নায়।
পাঁচটা বাজতেই সিমি নেমে এলো ওপর থেকে। হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল অফিসের গেটের সামনে। বার কয়েক ঘড়িতে সময় দেখল। একটু নার্ভাস লাগছে তাঁর। গত দুমাস ধরে একজন মানুষের সাথে এত কথা, এত আলাপ—সেই এত পরিচিত একজন, তাঁর সাথে দেখা হবে, তাতে নার্ভাস হবার কী আছে? সিমি মাথা থেকে যতই বের করে দিতে চাইছে, ততই সে অস্বস্তিবোধ করছে। সে আবার ঘড়ি দেখল।
আরো বেশ কিছুক্ষণ পরে ফাহিম এলো একটা ইয়ালো ক্যাব নিয়ে। ক্যাব থেকে নেমেই সে তাকাল চারিদিকে। সিমি তাকে জানিয়েছিল, সে নীল শাড়ি পরে আসবে। ফাহিম হঠাৎই লক্ষ করল নীল শাড়ি পরা একটি মেয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই ফাহিম হেসে বলল, ‘কেমন আছ?’
‘ভালো। তুমি?’ সিমির ঠোটের কোণে মৃদু হাসি।
‘অনেক ভালো।’ স্বভাবসুলভ বক্র হাসি দিয়ে বলল ফাহিম।
‘হাউ ওয়াজ ইয়োর ট্রিপ? কোনো কষ্ট হয় নি তো?’
‘হুম হয়েছিল। কিন্তু এখন আর কোনো কষ্ট নেই।’ আবারো বক্র হাসি।
‘তাই?’
‘হ্যাঁ। তোমাকে দেখার পর সব কষ্ট চলে গেছে। বাই দ্য ওয়ে, ইউ আর লুকিং সো প্রিটি!’ ফাহিম ঘুরিয়ে প্রশংসা করল সিমির।
সিমি ভেবেছিল ভাবুক টাইপের আনরোমান্টিক এই মানুষটার চোখে সিমির এত কষ্ট করে সেজে আসাটা ধরা পড়বে না। সেটা ভেবে কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল সিমি। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘ইউ লুক হ্যান্ডসাম টু।’
‘থ্যাংকস।’ তারপর হেসে দিয়ে বলল ফাহিম, ‘আচ্ছা আমরা এত ফরমাল কথা বলছি কেন? মনে হচ্ছে অপরিচিত কেউ—প্রথম দেখা হলে যেমন হয়।’
সিমিও হঠাৎ বুঝতে পারল ব্যাপারটা, কেমন একটা জড়তা ওদের কথায়। সে হেসে দিয়ে বলল, ‘প্রথম দেখাই তো!’
‘হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক। তবে ফোনে, চ্যাট রুমে আর মেইলে বরং আমরা বেশি স্পনটেনিয়াস, তাই না?’
‘হুম।’ সিমি মাথা নেড়ে মেনে নিল। ‘তোমার মা কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘আমাকে দেখে অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছেন তিনি। আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে চিনবেনই না। ভয়ে ভয়ে আমি জানতে চাইলাম, মা বলো তো আমি কে? মা আমার মাথাটা তার বুকে টেনে নিয়ে বললেন, আমার ফাহিম!’ বলতে বলতে ফাহিমের চোখ কেমন সিক্ত হয়ে এলো।
সিমি অবাক চোখে দেখল ফাহিমকে। তারপর আলতো করে তার হাতটি বাড়িয়ে ধরল ফাহিমের হাত। মৃদু চাপ দিয়ে আশ্বস্ত করল তাকে। ভাবটা এমন যে, এখন তুমি এসেছ, সব ঠিক হয়ে যাবে।
ফাহিমের অসম্ভব ভালো লাগল ব্যাপারটি। তাঁর মনে হলো, এই যে এতটুকু ছোঁয়া—অথচ কী তার শক্তি। ভালোবাসা কি নিছক একটি ছক ভাঙ্গা সম্পর্কের বাইরে শুধুই বন্ধুত্ব আর ভালোলাগা হয়েই থেকে যাবে নাকি কেউ বুঝবে তার মনের কথা!
ফাহিম বলল, ‘আমরা কি এখানে দাঁড়িয়েই কথা বলব, নাকি কোথাও যাব?’
‘কোথায় যেতে চাও?’ ফাহিমের হাত ধরেই তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল সিমি।
‘তোমার শহরে এসেছি, তুমি যেখানে নিয়ে যাবে—সেখানেই যাব। আমি তোমারে সঁপেছি হাত, ওগো স্বদেশিনী…’ বলেই হেসে ফেলল ফাহিম।
সিমি হাসতে হাসতে বলল, ‘শহরটা বুঝি আমার একার, তোমার নয়?’
‘অবশ্যই আমারো।’
সিমি একটা রিক্সা ডেকে ফাহিমকে নিয়ে ঝটপট উঠে পড়ল। একটা মিষ্টি হালকা গন্ধ ভেসে এলো। ফাহিম কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বসল। সিমি খুব সহজ ভঙ্গিতে বলল, ‘এমন শক্ত হয়ে আছ কেন? রিল্যাক্স হয়ে বসো। আচ্ছা, তোমার কি ভয় লাগছে?’
ফাহিম বিব্রত কণ্ঠে বলল, ‘আরে কী বলো, ভয় লাগবে কেন? তোমার কি ধারণা আমি রিক্সায় কোনোদিন চড়ি নি?’
‘রিক্সায় চরেছ, কিন্তু আমার পাশে তো বসো নি।’ সিমির ঠোটে দুষ্টুমির হাসি।
ফাহিম কিছু একটা বলতে যেয়েও বলল না।
সিমি চোখ নাড়িয়ে তাকাল ফাহিমের দিকে শুধু। কিন্তু কিছু আর বলল না। খুব সহজভাবে ফাহিমের হাতটা ধরল আবার। ফাহিম নিজেকে যতটা সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করল। অল্প সময়ের মধ্যে ওদের রিক্সা ভ্রমণ শেষ হয়ে গেল। সিমির অফিসের খুব কাছেই, ওর পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে নেমে পড়ল ওরা দুজন।
রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটা কোণার টেবিলে বসে সিমি জানতে চাইল, ‘তোমার প্ল্যান কী?’
‘আপাতত তোমার যা প্ল্যান আমারো তাই প্ল্যান।’ ফাহিম মেনু চেক করতে করতে বলল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে। প্ল্যান তাহলে আমিই রেডি করে ফেলব। এখন বলো কী খাবে?’
‘তুমি যা খাবে, আমিও তাই খাবো।’
‘মানে কী?’ সিমি ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
‘একবার তো বলেছিই—আই অ্যাম ইন ইয়োর হ্যান্ড। তুমি যা চাইবে, যেভাবে চাইবে তাই হবে।’
‘যা চাইব, যেভাবে চাইব তাই হবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভেবে বলছ?’
‘হ্যাঁ।’
সিমি দুষ্টুমির হাসি দিল। হাসতে হাসতে ওয়েটারকে ডেকে ওর পছন্দের কিছু খাবার অর্ডার করল।
খাবার পরিবেশন করার আগেই ফাহিম একটা ছোট গিফট ব্যাগ বের করে এগিয়ে দিল সিমির দিকে। সিমি অবাক হয়ে বলল, ‘এটা কী?’
‘তেমন কিছু না।’
‘খুলে দেখব?’
‘হ্যাঁ দেখতে পারো।’
সিমি গিফট প্যাক খুলল। একটা Juicy Couture ক্লাসিক কালেকশন পারফিউম, বিভিন্ন শেডের এক সেট ম্যাক লিপস্টিক, এক প্যাকেট ডার্ক চকোলেট, এক সেট পিপার স্প্রে আর অনেকগুলো বিভিন্ন ব্রান্ডের পারফিউমের ছোট ছোট শিশির স্যাম্পল। সিমি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘ওয়াও, গ্রেট! থ্যাংক ইউ ফাহিম। থ্যাংক ইউ সো মাচ।’
‘তোমার পছন্দ হয়েছে?’
‘হবে না?’ বলেই সিমি প্রতিটা আইটেম নেড়েচেড়ে দেখল আর ক্ষণে ক্ষণে তাকাল ফাহিমের দিকে, হৃদয় উষ্ণ করা দৃষ্টিতে।
সিমির উচ্ছ্বাস দেখে ভীষণ ভালো লাগল ফাহিমের।
‘আচ্ছা তুমি পিপার স্প্রে এনেছ কেন?’ অবাক দৃষ্টিতে বলল সিমি।
‘তুমি একদিন বলেছিলে, কাজ থেকে বের হতে দেরী হলে একা একা বাসায় ফিরতে ভয় লাগে। তাই তোমার সেইফটির কথা ভেবেই এটা আনলাম। প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। আত্মরক্ষার জন্যে এটা খুবই কার্যকরী অস্ত্র বলতে পারো।’
প্রশংসাসূচক কণ্ঠে বলল সিমি, ‘ইউ আর সাচ অ্যা থটফুল পারসন, ফাহিম। আই মাস্ট সে।’
‘থ্যাংক ইউ।’
খাওয়া দাওয়া সেরে ওরা যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে এলো তখন ঢাকা শহরের চারিদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশের এক কোণ লালচে হয়ে আছে। শীতের শুরু। সন্ধ্যা নামতেই হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে রাজধানী শহর।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ওরা কোনো রিক্সা কিংবা সিএনজি পেল না। অগত্যা হাঁটা শুরু করল, মেইন রাস্তার মোড় পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। অনেকটা পথ। তাতে অবশ্য কোনো সমস্যা হলো না। এই সময়ে পাশাপাশি হাঁটার থেকে তো আর ভালো কোনো মুহূর্ত হতে পারে না।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৫)

ফাহিম,
এভাবে টেনশনে রাখার কী মানে? দুদিন কোনো খবর নেই! একটি মেইল পাঠিয়েছ, তার পুরোটা জুড়েই তোমার প্রথম প্রেমের গল্প। সরি পেন-ফ্রেন্ডশিপের গল্প। আমি কি জয়ার কথা শুনতে চেয়েছিলাম? তবে তোমার পেন-ফ্রেন্ডশিপের ঘটনা আর বর্ণনা অসাধারণ লেগেছে।
না, তোমার মতো পেন-ফ্রেন্ডশিপের অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে আমিও যে চিঠি একেবারেই লিখি নি তা কিন্তু নয়। স্কুল জীবনে দুএকটা প্রেমের চিঠি আমিও পেয়েছি। লিখেছিও। অবশ্যই সেই অনুভূতি অন্যরকম এবং আমার ধারণা সেই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। অস্বীকার করবো না, খাম খুলে হস্তাক্ষরে লেখা একটা চিঠি যে কতটা আনন্দের তা সত্যিই এ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারবে না।
তবুও আমার কাছে মনে হয়, হাতে লেখা কাগজের চিঠি আর ইমেইলের ভেতরে বেসিক পার্থক্যটা কিন্তু খুব বেশি নেই। ধরো, তোমার যদি চিঠি কাগজেই পেতে ইচ্ছে করে, তাহলে ইমেইল প্রিন্ট আউট করে নিলেই তো হয়? হাতের লেখার স্টাইল ভাল লাগলে হাতের লেখার মত ফন্ট আছে, আর যদি বলো হাতের স্পর্শের কথা, তাহলে ইমেইল টাইপ করতে গিয়ে কীবোর্ডে হাতের স্পর্শের কথা ভাবতে পারো, যেহেতু দু’টো স্পর্শই কাল্পনিক!
আমার কী মনে হয় জানো? সমস্যাটা আসলে কাগজের চিঠি কিংবা ইলেক্ট্রনিক চিঠি নিয়ে নয়—সমস্যাটা হলো চিঠির বিষয়বস্তু ও লেখার ধরণ। আগে তোমাকে যে ভাষায় কেউ একজন চিঠি লিখত এখন সে হয়তো সে ভাষায় লিখে না। পুরোটাই অনুভূতির ব্যাপার। আমার যেমন তোমার ই-চিঠি পেতে এবং দিতে একই রকম অনুভূতি কাজ করে। একই রকম মুগ্ধতা। ভালোলাগা সব। তবে হ্যাঁ, বাংলিশ আর শর্টহ্যান্ডে লেখা যে কোনো মেসেজই আমি অপছন্দ করি।
দেখো, এই ই-চিঠি চালাচালির মধ্য দিয়ে আমরা দুজনের কত কাছাকাছি চলে এসেছি। দূরে থেকেও অনেক কাছে। কখন যে তোমাকে এত কাছের মানুষ মনে করতে শুরু করেছি, তা নিজেই বুঝতে পারি নি। বুঝতে পারছি না কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা। আর সামনেই বা কী অপেক্ষা করছে তাও জানি না। সব সম্পর্ক কি আর হিসেব কষে হয়?
এটুকু লিখে সিমি কিছুক্ষণ ভাবল। সিমি তার অনেকগুলো ছবি পাঠিয়েছিল ফাহিমকে। ছবিগুলো দেখে উচ্ছ্বসিত কোনো মন্তব্য করে নি ফাহিম। সৌজন্যমূলক প্রশংসাও না। তবে কি ছবি দেখে নিরাশ হয়েছে সে? অনেকদিন থেকেই সিমি ভাবছিল কথাটা ফাহিমকে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু করেনি। কারণ, সিমি এও জানে, ফাহিমের কাছে কারো বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে মনের সৌন্দর্যটাই বেশি মুখ্য। তবুও সে লিখল—
আচ্ছা আমি দেখতে কেমন বললে নাতো? আমি দেখতে কেমন সেটা আমি জানি। জানতে চাইছিলাম, তোমার চোখে আমি, কেমন? আমার ছবি দেখে কী মনে হয়েছে? ভয়ে আছি, আমাকে দেখার পর যদি তোমার ভালো না লাগে, যদি আর আমার সাথে যোগাযোগ করতে না চাও, আমাকে লিখতে ইচ্ছে না করে? যোগাযোগ রাখতে না চাইলে রাখবে না। ভালো না লাগলে লিখবে না। সে স্বাধীনতা তোমার আছে। তবে আমি তোমার লেখা ভীষণ মিস করবো। তোমাকেও।
ছবি দেখে একজন মানুষকে যত না বোঝা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি বোঝা যায় তার লেখা থেকে, তার কথা থেকে। তুমি মানুষটা কেমন সে তো তোমার ছবি না দেখার অনেক আগে থেকেই বুঝেছি।
তোমার কথা দিনে রাতে মনে পড়ে—অনেকবার। স্বপ্নও দেখি। ইনফ্যাক্ট গত রাতেই তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি। তুমি আমার এত কাছে ছিলে যে চাইলেই তোমাকে ছুঁয়ে দিতে পারতাম। আচ্ছা তুমি কি কখনো স্বপ্ন দেখো? দেখেছ আমাকে? দেখলে কী দেখেছ? বলবে আমাকে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।
আজকে আমাকে কথাতে পেয়েছে। আমার এসব কথার কোনো গুরুত্ব দিতে যেও না আবার। মাঝে মাঝে এলোমেলো ভাবনায় কত কথা বলতে ইচ্ছে করে।
তুমি আমার বন্ধু হয়েই থেকো। আজীবন। আমি এতেই খুশি। আমাদের সম্পর্কের অন্য কোনো পরিণতি সম্ভব নয়। এ যেমন তুমিও জানো—আমিও জানি। এতদিন ধরে তোমার লেখা পড়ে এবং লেখার মধ্যে তোমাকে খুবই অন্তরঙ্গভাবে জেনে আমার মনে হয়েছে, মেয়েদেরকে তুমি ভালোই বোঝো। তাদের মনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তোমার অনুভূতির অদৃশ্য পরশ এড়িয়ে যায় না। মেয়েদেরকে এমন করে বোঝার পুরুষের সংখ্যা খুব বেশি দেখা যায় না।
তোমার ফ্লাইট কখন? ডিপারচার—অ্যারাইভাল কিছুই জানাও নি। এয়ারপোর্টে কে যাচ্ছে তোমাকে আনতে? ইশ আমি যদি যেতে পারতাম!
এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই তুমি দেখতে, ছোট খাটো একটি মেয়ে, নীল রঙের শাড়ি পড়ে একটি ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে নার্ভাসভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছে। তুমি দুটো ঢাউস সাইজের লাগেজ ট্রলিতে করে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আসতেই মেয়েটি জানতে চাইল, কেমন আছ ফাহিম? আসতে কোনো অসুবিধা হয় নি তো?
তুমি বললে, হুম হয়েছিল। কিন্তু এখন তোমাকে দেখে সব কিছু কেটে গেছে।
তোমার স্বপ্নের শহর, প্রিয়জনদের রেখে আসতে কষ্ট হয় নি? বলেই অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসল মেয়েটি।
একটু তো হয়েছেই। তবে এখন আর কষ্ট নেই। তুমি তো রয়েছ আমার সামনে। আর আমার ফেলে যাওয়া প্রাণের শহর, ঢাকা।
মেয়েটি লাজুক হাসি দিয়ে বলল, তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, বিশ্বাসই হচ্ছে না।
তুমি মেয়েটির হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে বললে, ফুলগুলো আমার হাতে দাও তাহলেই বিশ্বাস হবে।
মেয়েটি আবারো লজ্জা পেয়ে গেল। সে এতটাই নার্ভাস আর বোকা কখনোই বোধ করে নি। ফুলগুলো দিতেও ভুলে গেছে। সে ছোট করে বলল, সরি, ফুলগুলো তোমার জন্য।
তুমি তখন হাত বাড়িয়ে মেয়েটির হাত ধরে বললে, জানি।
মেয়েটি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটির হাতের স্পর্শে শিহরিত হয়।
কী রোম্যান্টিক একটা ব্যাপার হতো বলো তো! অথচ তুমি আমাকে একবারের জন্যেও বললে না, এয়ারপোর্টে যেতে।
জানি না তুমি এখন কোথায়? আমার মন বলছে, তুমি এখন ৩৪০০০ ফুট ওপরে। সম্ভবত আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছ। আর এদিকে আমি প্রহর গুনে গুনে হয়রান। তোমার সঙ্গে দেখা হবে, এই ভাবনাতেই আমার প্রতিটি মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে।
কিছু কিছু প্রতীক্ষার প্রহর এত দীর্ঘ হয় কেন?
~সিমি

রাতে ঘুমনোর আগে সিমি মেইল চেক করল আবার। নাহ, ফাহিমের কোনো খবর নেই। কোনো মেইল নেই। ইয়াহু চ্যাট রুম, এমএসএন মেসেঞ্জার, কোথাও নেই। তাহলে কি কোনো সমস্যা হলো? কত ধরণের সমস্যাই তো হতে পারে, তাই বলে একবার জানাবে না? কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবনায় ডুবে থেকে ঘুমতে গেল সিমি। অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও তার ঘুম এলো না। সে উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে। জানালাটা খোলাই ছিল। বাইরে শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস বইছে—হিমেল বাতাস। শীতের আগমনী বার্তা। আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে ফিরে গিয়ে বসল তার ল্যাপটপের সামনে। ফাহিমের জন্য কিছু লিখল আবার—
এই যে দূরের মানুষ, আপনার কোনোও খবর নেই কেন? ভালো আছেন তো? কেউ যে আপনার অপেক্ষায় আছে সে খেয়াল আছে?
এটুকু লিখে সিমি মিটি মিটি হাসল। কেননা, ফাহিমও এমন ভাববাচ্যে একবার একটা মেইল লিখেছিল তাকে। কথাগুলো মনে পড়ে হাসি পাচ্ছে ওর। কথার কী ঢং। ‘কেউ কি জানে, কারো একটা মেইলের জন্য কেউ একজন কত অপেক্ষায় থাকে? কারো সময় হলে যেন ইমেইল করে। কেউ যেন ভালো থাকে। খুব ভালো। কারো মেইলের অপেক্ষায় কেউ।’ উফ!
সিমি আবার লিখল—
বড্ড হাওয়ার রাত আজ। বাইরে শীতের ঠাণ্ডা মিষ্টি বাতাসে জানালার পর্দা বারবার সিন্দাবাদ নাবিকের জাহাজের পালের মতো ফুলে ফুলে উঠছে। এত মিষ্টি বাতাসেও ঘুম আসছিল না। তাই তোমাকে লিখতে বসলাম। কিছুক্ষণ আগেই তোমাকে একটা মেইল পাঠিয়েছি। আবারো লিখছি। কেন লিখছি জানি না।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশের অনন্ত নক্ষত্ররা জ্বলজ্বল চোখে জানালার ভেতর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা কি শুক্লপক্ষ চলছে? এসব হিসেব রাখি না কতদিন। আকাশে নক্ষত্রের ফুলকি ফুটে আছে। নক্ষত্রের রাতগুলোতে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষের কথা খুব মনে পড়ে।
বিকেলে অফিস থেকে যখন ফিরেছে, ভীষণ একা লাগছিল সিমির। মাঝে মাঝে একাকীত্ব জেঁকে বসে। তার ঘরের লাগোয়া এক চিলতে বারান্দায় বসে তখন সে তার প্রিয় কিছু গান শুনে। বিষণ্ণ বিকেলে এই গানের ছোঁয়া সিমিকে আরো বেশি ভাবিয়ে তোলে। সূর্য তখন ডুবি ডুবি করছে। ঢাকা শহরের লাইটগুলো কেবল জ্বলতে শুরু করেছে। আকাশ কেমন যেন রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আছে। সিমি ঘরে গিয়ে এককাপ চা বানিয়ে আনল। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সে হারিয়ে গেল তার আপন জগতে। গানের কথাও এমন—আমি তো তোমার কথাই ভাবছি, তোমার কথাই ভাবছি। গান শুনতে শুনতে সিমি উদাস হয়ে যায়। তার অবচেতন মনে ঘুরে ফিরে আসে ফাহিমের চিন্তা। সিমির মন বলছে, যে কোনো কারণেই হোক ফাহিম ওকে জানাতে পারে নি অথবা ইচ্ছে করে জানায় নি। তবে সে যে বাংলাদেশের পথে, সে ব্যাপারে তার বিশ্বাস শতভাগ অটুট।
ফাহিম বাংলাদেশে আসছে এটা যে সিমির জন্য কত খুশির সেটা কী করে বোঝাবে সে। কিছু কিছু আনন্দের প্রকাশ করার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে তা কবিতার ভাষায় লিখে রাখা যায়। সিমির ইচ্ছে হলো কয়েকটি লাইন লিখে রাখতে। সে লিখল—
আকাশের ডাক
উপেক্ষা করবার
আছে কি বাষ্পের ক্ষমতা?
ভোরের টানে
উড়ে যায়
গহীন রাতের তীব্রতা।
তুমি
আমার ভোরের আকাশ।
বারান্দার গদি লাগানো চেয়ারটাতে বিড়ালের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে সিমি। হাতগুলো বুকের ভেতর নিয়ে জড়সড় হয়ে আছে সে। শীত শীত লাগছে, কিন্তু উঠে গিয়ে চাদর আনতে ইচ্ছে করছে না। এসময় ভীষণ মনে পড়ছে একজনের কথা। সে থাকলে এখন ওর গায়ে আলতো করে একটি চাদর জড়িয়ে দিতে পারতো। মানুষটা কেমন স্বার্থপরের মতো এই কঠিন পৃথিবীতে ওকে একা রেখে চলে গেছে। চাইলেও সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা যাবে না তাকে। সিমি উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে গোধূলির রঙে রাঙানো আকাশপানে। সেখান থেকে মানুষটা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে সিমি। কেমন একটা ঘোর লাগা দৃষ্টি। চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে চায়—পেতে চায় কাছে। আরো কাছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না সে। ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। ভিজে আসে তার আয়ত দুচোখ।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৪)

সিমি,
তোমার দুটি মেইল একই সঙ্গে পেলাম। খুব ভালো লাগল। আমার মনটা যখন খুবই খারাপ হয়েছিল, তখনই তোমার মেইল পেলাম এবং সত্যি বলছি, হুট করেই মনটা ভালো হয়ে গেল।
আমার লেখা পেতে তোমার ভালো লাগে এটা জেনে ভীষণ আপ্লুত হই। এটা তো আর নতুন কিছু নয়। তুমিও যে কত ভালো লিখো তা হয়তো তুমি নিজেও জানো না। আমিও তোমার লেখা পাবার অপেক্ষায় থাকি। এটাও তো আর নতুন কিছু নয়।
একসময় অনেক চিঠি লিখতাম। তখন চিঠি লিখতেও ভালো লাগত, পেতেও। কী যে ভালো লাগত এক একটা চিঠি পেলে। আমার কাছে কি মনে হয় জানো, চিঠির মতো এমন অমূল্য উপহার খুব কমই হয়। অথচ এই চিঠি লেখাটাই উঠে গেল পুরোপুরিভাবে। আমরা তবুও ইমেইলে বেশ লেখালেখি করে যাচ্ছি অথচ এখন এই ইলেক্ট্রনিক চিঠির জায়গাও দখল করে নিচ্ছে টেক্সট মেসেজ আর মেসেঞ্জার। চিঠির মাঝে একে অপরের কাছে যতটা উন্মোচিত করা যায়, ততটা বোধহয় সামনাসামনিও হয় না। মুখে যে কথা বলা যায় না, চিঠিতে সেকথা অনায়াসে লিখে দেয়া যায়।
তোমাকে বলেছিলাম কিনা জানি না। কলেজে পড়াকালীন সময়ে, দূরপাল্লার বাসের সীটের পেছনে লেখা ঠিকানা দেখে আমি একটা মেয়েকে চিঠি লিখেছিলাম—কৌতূহল বশত:। জয়পুরহাটের মেয়ে—নাম জয়া। ভেবেছিলাম ভুয়া এড্রেস লিখে রেখেছে কেউ। তবুও আমি অপেক্ষায় ছিলাম এবং সত্যি সত্যিই একদিন আমার চিঠির উত্তর এলো মেয়েটির কাছ থেকে। সেদিনের সেই অনুভূতি প্রকাশ করা কিছুতেই সম্ভব না। তখনকার সময়ে একজন অপরিচিত মেয়ের কাছ থেকে চিঠি পাওয়া ছিল অপ্রত্যাশিত। তবে বিষয়টা যে কী পরিমাণ আনন্দের হতে পারে, এ যুগের ছেলে মেয়েরা তা বোধকরি বুঝবে না। সেই চিঠিটি আমি অনেকদিন রেখে দিয়েছিলাম। কয়েকটি চিঠি চালাচালির পর আমাদের মধ্যে নিবিড় বন্ধুত্ব তৈরি হলো। যদিও জয়াকে আমার কখনো দেখা হয় নি। তবে আমার জীবনে যা কিছু ভালো লাগার বিষয় আছে, জয়ার সাথে পেন-ফ্রেন্ডশিপ ছিল তারমধ্যে অন্যতম।
তখন ইন্টারনেটের এত আধিপত্য ছিল না বলেই হয়ত বিশ্বজুড়ে পত্রমিতালি বা পেন ফ্রেন্ডশিপ নামক এই শখ ছিল দারুণ জনপ্রিয়। দেশ-বিদেশের বন্ধুরা একে অপরকে চিঠির সঙ্গে পাঠাত সেই দেশের ভিউকার্ড, স্ট্যাম্পসহ নানা স্মারক উপহার। ইন্টারনেটের এই যুগে যেখানে ইলেকট্রনিক মেইল করে সব জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে এক ক্লিকে বন্ধু বানিয়ে ফেলা যায়, সেখানে কষ্ট করে হাতে-কলমে চিঠি লিখে বন্ধু বানানোর কথা হয়ত ভাবাই যায় না। তবে, হাতে লেখা চিঠির গুরুত্বই অন্যরকম। কলমের কালিতে গুটি গুটি হরফে যে বন্ধুত্বের অনুভূতির কথা লেখা যায়, তা কখনো ই-মেইলের যান্ত্রিকতায় ফুটে ওঠে না।
শেষ পর্যন্ত জয়ার সাথে আমার বন্ধুত্বের কী হলো নিশ্চয়ই তোমার জানতে ইচ্ছে করছে? বলছি। তখন রাশিয়াতে বাংলাদেশের ছেলেমেয়েদের পড়তে যাবার একটা হিড়িক পড়েছিল। এখন যেমন উচ্চশিক্ষার জন্য সবাই আমেরিকা-কানাডাকে বেছে নেয়। সেই স্রোতে জয়াও একদিন হুট করেই চলে যায় রাশিয়াতে। সেখান থেকেও সে লিখত মাঝে মাঝে। তারপর আস্তে আস্তে দৃশ্যপট থেকে অদৃশ্য হয়ে যায় সে। এখন যে সে কোথায় আছে জানি না। তার একটা ছবি পর্যন্ত আমার কাছে নেই। তবুও তার কথা মাঝে মাঝেই মনে পড়ে।
তুমিও কি এভাবে একদিন না বলেই হারিয়ে যাবে? ব্যাপারটা কিন্তু ভীষণ কষ্টের হবে। দোহাই, এই কাজটি করো না কিন্তু। যেখানে যে পরিস্থিতিতেই থাকো না কেন, যোগাযোগটা যেন থাকে। একেবারেই যেন বিচ্ছিন্ন না হয়ে যাই আমরা।
দেখো তো কী লিখতে কী লিখছি। জানি না তুমি বিরক্ত হচ্ছো কিনা। হলেও এখন আর কিছু করার নেই।
অফিসের কাজে ভীষণ ব্যস্ত সময় পার করছি। সেই সাথে যতই দিন ঘনিয়ে আসছে আমার উত্তেজনার পারদ ততই ঊর্ধ্বগামী হচ্ছে। কেন তার কারণ নিশ্চয়ই ব্যাখ্যা করতে হবে না।
তুমি বলেছ, দেশে যাচ্ছি আমাদের দেখা হবে সেই ভেবে যেন তোমাকে লেখা বন্ধ করে না দেই। আমি হয়তো সেটা চাইলেও পারব না। তুমিও কি পারবে আমাকে না লিখে থাকতে? তোমাকে মেইল লেখা এবং পাঠানো এখন একটা অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। শুধু যে ভালো লাগা থেকেই করছি তা না, অভ্যাসেই হচ্ছে কাজটি। কাজেই আমি নিশ্চিত, মেইল তুমি পাবে—সেটি দুই লাইনের হলেও। শুধু চিঠি লিখে কাউকে মুগ্ধ করতে পারাটাও তো ভীষণ আনন্দের ব্যাপার। আমিই বা সে আনন্দ থেকে বঞ্চিত হতে চাইব কেন?
ভালো থেকো। আর তো মাত্র দু’দিন! অপেক্ষায় আমিও।
—ফাহিম
মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে ফাহিম ঘুমতে যাবে আর ঠিক সেই মুহূর্তে সে এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। তার স্টাডি রুমের টেবিলের ঠিক সামনেই রয়েছে এক কাঁচের জানালা। সেই জানালার প্লাস্টিকের ব্লাইন্ড অর্ধেকটা ওঠানোই থাকে সবসময়। জানালা দিয়ে ফাহিম মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল বাইরে। আকাশ ভেঙে সাদা সাদা মেঘগুলো তুলোর মতো ঝরে পড়ছে।

ঘুম থেকে উঠে ফাহিম আবিষ্কার করল প্রায় দুই ফুট বরফের চাদরে ঢেকে আছে বাসার সামনের ড্রাইভওয়ে। গাড়িটাও ডুবে গেছে। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে একবার ভাবল, আজকে আর ঝামেলা করে অফিসে গিয়ে কাজ নেই। দেশে যাবার আগে আজকেই তার শেষ দিন ছিল অফিসের। আগামীকাল সন্ধ্যায় ফ্লাইট। তার হাতে সময়ও বেশি নেই। সে সিদ্ধান্ত নিল, দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। এরমধ্যে তাপমাত্রা বেড়ে গিয়ে বরফ গলে গেলে রাস্তা গাড়ি চলাচলের উপযোগী হবে। নাহলে চরম দুর্দশায় পড়তে হবে।
ফাহিম কিচেনে ঢুকে কফি বানিয়ে ঢুকল তার স্টাডি রুমে। গরম কফিতে চুমুক দিয়ে সে ল্যাপটপ খুলে বসল। হঠাৎ করেই ইচ্ছে হলো সিমিকে আর একটা মেইল লিখলে কেমন হয়? যেই ভাবা সেই কাজ, সে লিখতে বসল।
প্রিয় সিমি,
কাল রাতে হঠাৎ করেই এক চোট স্নো-স্টর্ম হয়ে গেছে এখানে। তোমাকে একটা মেইল পাঠিয়ে যখনই ঘুমতে যাবো, ঠিক তখনই লক্ষ করলাম বাইরে অঝোরে ঝরছে তুষার। তখনও বুঝি নি, এই তুষার ঝড়বে সারারাত ধরেই।
সাধারণত ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ব্যাপক তুষারপাত হয় এখানে। তবে এবার নভেম্বরেই পুরু বরফের স্তর পড়ে গিয়েছে। এ বছরের প্রথম তুষারপাত। ইতোমধ্যেই সাদা বরফের চাদরে ঢেকে গেছে রাস্তাঘাট। চারিদিকে যেন এক শ্বেত, শুভ্র সৌন্দর্য। এ যেন এক অন্য জগৎ। যতদূর চোখ যায় শুধুই শুভ্রতা। সারি সারি বাড়ি, রাস্তার দুধারে গাড়ি, সবকিছু সেই শুভ্রতায় ঢেকে গেছে। সেই জগতে কোনো কালো নেই।
আমি শিকাগোতে যেদিন প্রথম পা রাখলাম, সেদিনও তুষারপাত হচ্ছিল। বাংলাদেশ বিমানে ঢাকা—লন্ডন—নিউ ইয়র্ক তারপর ডোমেস্টিক প্লেনে নিউ ইয়র্ক থেকে শিকাগো যখন পৌঁছলাম তখন রাত প্রায় ১০টা। এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় যাবার পথে দেখেছিলাম ঝিরিঝিরি তুষারপাত। দেশে যখন ছিলাম, তখন মনে হতো প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ দান বৃষ্টি আর জোছনা। ওই রাতের অপার্থিব সৌন্দর্য আমার তালিকায় তুষারকে যোগ করেছিল।
ঘুম থেকে ওঠে যখন ঘরের বাইরে এলাম, সেই শুভ্রতায় প্রথম পা ফেললাম—কী আনন্দ, কী উত্তেজনা। সৌন্দর্য যে মনের হাহাকারও কমিয়ে দিতে পারে, সেটা বুঝেছিলাম সেদিন।
আমাদের সংস্কৃতিতে বর্ষার প্রথম বৃষ্টিতে ভেজার একটা ব্যাপার আছে। আমেরিকানরাও তাদের বছরের প্রথম তুষারপাত ব্যাপারটা উৎসবের মতো পালন করে। অন্যান্য দিন তুষারপাতে কাজকর্মের কোন সমস্যা না থাকলেও, এদিন প্রথম দিন যেন তাদের বাসায় বসে থাকতে হয়। রেস্টুরেন্টে ডেলিভারি অর্ডার দিয়ে ফায়ারপ্লেসে আগুন জ্বালিয়ে সবাই মিলে মুভি দেখার আয়োজন। কারো কারো হাতে থাকে ওয়াইনের গ্লাস অথবা ব্রান্ডি। সবার মধ্যে একটা পিকনিক ভাব চলে আসে।
বাচ্চাদের দল রাস্তায় নেমে একজন আরেকজনের দিকে বল বানিয়ে ছুড়ে মারে। কেউ বানায় স্নো-ম্যান। আর যেসব জায়গা একটু ঢালু সেখানে স্লাইড বানিয়ে ধুপ করে পড়ে কেউ। তারপর শুরু হয় হাসাহাসি আর বরফ ছোড়াছুড়ি। প্রথম তুষারপাতের পরের সময়টা পরিবারের আনন্দের সময়। প্রকৃতি কতভাবেই না আনন্দ ছড়িয়ে রাখে এ পৃথিবীতে।
একটানা তুষারপাতের বর্ণনা লিখে এপর্যায়ে ফাহিম বিরতি নিলো। সে কফিতে চুমুক দিয়ে বুঝতে পারল কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। তারমানে সে কফিতে চুমুক দিতেও ভুলে ছিল এতক্ষণ। তাকে লেখায় পেয়ে বসেছে, নতুন আর এক কাপ কফি বানিয়ে আনার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহবোধ করল না। কিছুক্ষণ ভেবে সে আবার লিখল—
ও তোমাকে তো বলা হয় নি, বাংলাদেশ এম্বাসী ওয়াশিংটন, ডিসিতে পাসপোর্ট পাঠিয়েছিলাম ‘নো ভিসা রিকোয়ার্ড’ স্ট্যাম্পের জন্য। গতকাল পাসপোর্ট হাতে পেয়েছি। এখন আর আমার দেশে যেতে ভিসা জনিত কোনো সমস্যায় পরতে হবে না। দুবছর আগে যখন দেশে গিয়েছিলাম, ঢাকা এয়ারপোর্টে এরাইভাল ভিসা পেতে আমাকে যে কত সমস্যায় পড়তে হয়েছিল। পঞ্চাশ ডলার ব্যাংক ড্রাফট করতে হবে, সেই কাজটি যিনি করেন তিনি ঘুমচ্ছিলেন। তাকে ডেকে তোলা হলো। পঞ্চাশ ডলার ভিসা ফি কিন্তু তিনি আমার কাছ থেকে দুইশত ডলার নিলেন। আমাকে কোনো রিসিট দিলেন না। রিসিট চাইতেই বললেন আমরা রিসিট দেই না। প্রায় দুই ঘণ্টা লেগে গেল শুধু ব্যাংক ড্রাফট করতে। তারপর দীর্ঘ লাইন শেষে যখন বের হয়ে এলাম, মনে হলো, আমি ভুল করে সম্ভবত পৃথিবীর অন্য কোনো গ্রহে চলে এসেছি। কিন্তু এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে যখন বুক ভরে শ্বাস নিলাম, তখন সব কষ্ট ভুলে গেলাম। হাজারো সমস্যায় জর্জরিত এই দেশটাকেই তখন বড় বেশি মায়াবী মনে হলো আমার।
হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল ফাহিম। যেভাবে তুষারপাত হচ্ছে, ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়ে যায় কিনা কে জানে। গতবারের তুষার ঝড়ে প্রায় দেড় হাজার ফ্লাইট ক্যান্সেল হয়েছিল। বন্ধ ছিল ট্রেন চলাচলও। তার অবচেতন মন বলছে, এই তুষারপাত সহজে বন্ধ হবে না। সে উঠে গিয়ে নতুন এক কাপ কফি বানাল। তারপর বসার ঘরে টিভি সেটের সামনে গিয়ে ওয়েদার চ্যানেল অন করে চিন্তিত ভঙ্গিতে বসে রইল।
এত আগ্রহ করে সিমির জন্য দ্বিতীয় যেই মেইলটি এতক্ষণ ধরে সে লিখল, সেটা বেমালুম ভুলে গেল পাঠাতে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৩)

গভীর রাতে হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ফাহিমের।
এমনিতেই সে রাত করে ঘুমতে যায়। খুব যে বেশিক্ষণ ঘুমিয়েছে তাও না। এত রাতে কে ফোন করল তাকে। কী কারণে হঠাৎ করেই সিমির কথা মনে হলো তার। কিন্তু সন্ধ্যায়ইতো ওর সঙ্গে চ্যাটরুমে কথা হয়েছে। এসময়ে ওর ফোন আসার কোনোই কারণ নেই।
এত রাতে একমাত্র বাংলাদেশ থেকেই ফোন আসে এবং তা অবশ্যই কোনো খারাপ খবর নিয়ে। ফাহিম লক্ষ করেছে দেশ থেকে কোনো ফোন এলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তার সবগুলিই হয় দুঃসংবাদ। পৃথিবীর যাবতীয় দুঃসংবাদ যেন তৈরী হয়েছে বাংলাদেশের মানুষের জন্য।
ফোনটা আবারো বাজল। ঘুম চোখে ফোন ধরে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ক্ষীণ কণ্ঠে ভেসে এলো, ‘ভাইয়া, ঘুমিয়ে পড়েছ?’ ফাহিমের ছোট বোন লীনা, ফোন করেছে দেশ থেকে। তার কণ্ঠে উৎকণ্ঠা স্পষ্ট।
ফাহিম বলল, ‘এত রাতে ফোন করেছিস, কী ব্যাপার?’
‘তোমার অফিসের কাজের চাপ কি খুব বেশি?’
ফাহিম ফোন স্ক্রিনে সময় দেখল। তারপর বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘রাত দু’টার সময় ফোন করে অফিসের কথা জিজ্ঞেস করছিস, এসবের মানে কী লীনা?’
‘তুমি কি কিছুদিনের জন্য দেশে আসতে পারবে?’ ফাহিমের কথার উত্তর না দিয়ে বলল লীনা।
‘কেন, কী হয়েছে?’ উঠে বসল ফাহিম।
‘মায়ের শরীরটা খারাপ।’
ফাহিম জানে ওর মায়ের শরীরটা ভালো যাচ্ছে না অনেকদিন হলো। রাতে ঘুমায় না বললেই চলে। সারারাত জেগে থাকে। মাথা ব্যথায় কাতরায়। ইদানিং কাউকে ঠিক মতো চিনতেও পারে না। ফাহিম অবশ্য ছোটবেলা থেকেই দেখে এসেছে ওর মায়ের ঘুমের সমস্যা। তিনি প্রচুর কথা বলেন। কাউকে সামনে না পেলে একা একাই কথা বলেন। ফাহিম দেশে গেলে মায়ের সঙ্গেই থাকে। মায়ের কোলে মাথা রেখে রাজ্যের গল্প শুনতে শুনতে ফাহিম ঘুমিয়ে যায় কিন্তু মায়ের কথা শেষ হয় না। তিনি কথা বলেই চলেন।
খুব ছোটবেলায় বাবাকে হারিয়েছে ফাহিম। তাঁর বুকের ওপর শুয়ে থাকা ছাড়া আর কোনো স্মৃতি ওর মনে নেই। ওরা দুই ভাইবোন একরকম মায়ের আঁচলের নিচেই বড় হয়েছে বলা যায়। ফাহিম আমেরিকায় চলে আসার পর থেকে ছোট বোন লীনার কাছেই থাকে ওদের মা। হঠাৎ মায়ের এমন কী হলো যে গভীর রাতে লীনা ফোন করেছে? খারাপ কিছু ঘটে নি তো? ফাহিম শঙ্কিত কন্ঠে বলল, ‘মায়ের কী হয়েছে?’
‘ব্রেন টিউমার।’ বলেই লীনা ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাদতেই বলল, ‘তোমার বন্ধুর বড় ভাই, নিউরোসার্জন প্রফেসর দীন মোহাম্মদ দেখেছেন। অনেক ধরণের টেস্ট করেছেন। মায়ের ব্রেন টিস্যু শুকিয়ে যাচ্ছে। টিউমার রিমুভ করা যাবে না। অনেক রিস্কি অপারেশন। উনি বললেন, এভাবেই থাকতে, যে ক’দিন বাঁচেন…’ লীনা কথা শেষ করতে পারে না।
ফাহিম বুঝতে পারল, ওর মায়ের মানসিক অবস্থার পরিবর্তন এবং আচরণে অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়ার মূল কারণ তাহলে এটাই। সে চুপ করে বসে রইল দীর্ঘ সময়। মায়ের মুখটা ভেসে উঠল চোখের সামনে। প্রায় বারো বছর হলো ফাহিম আমেরিকায় অভিবাসী হয়েছে। এই দীর্ঘ প্রবাস জীবনে সে তার মাকে কাছে আনতে পেরেছে মাত্র দুবার। তিনি বেশিদিন থাকতে চাইতেন না—খাঁচায় বন্দী পাখির মতো ছটফট করতেন, দেশে ফিরে যাবার জন্য।
ফাহিমের মায়ের কিছু অদ্ভুত ঘটনা আছে। সেসব কথা মনে হলে ফাহিম একা একাই হাসে। যেমন, যে কোনো জায়গায় কোনো বিদেশীর সঙ্গে দেখা হলেই তিনি হাত তুলে বলতেন, আসসালামুয়ালাইকুম। উত্তরে তারাও মাথা দুলিয়ে হেসে বলতেন, হ্যালো। মাঝে মাঝে তিনি বাংলায় কথা বলা শুরু করে দিতেন—তাঁর ছেলের নাম কী, কোথায় থাকে, কী করে ইত্যাদি। উত্তরে তারা মাথা দুলিয়ে হাসতেন—ভাবটা এমন যেন তাঁর সব কথাই তারা বুঝেছে। সেটা দেখে ফাহিমের মাও হাসতেন। তাঁর মন কাড়ানিয়া সেই সরল হাসি কি তবে আর কোনোদিন দেখা হবে না? এ কথা ভাবতেই শরীর কেঁপে ওঠে ফাহিমের।
‘ভাইয়া?’
লীনার ডাকে ফাহিম সম্বিৎ ফিরে পেল। অস্ফুটে বলল, ‘উম।’
‘দু’বছর হয়ে গেল তুমি দেশে আসো না। মাকে এসে দেখে যাও একবার—নাহলে পরে আফসোস করবে।’
‘হুম। আসব।’ উদাস কণ্ঠে বলল ফাহিম।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে তুমি ঘুমাও। আমি রাখছি।’
‘ভেঙে পড়িস না। আমি আসছি।’
লীনা ফোন কেটে দিল। ফাহিম জানে লীনা ভেঙে পড়ার মেয়ে না। খুব শক্ত মেয়ে। প্রকৃতিই ওকে ওভাবে বড় করেছে। তেমনি ওর বুকে ভালোবাসা দিতেও কার্পণ্য করে নি। মায়ের সঙ্গে দ্বিতীয় মাঝি হয়ে সংসারের হালটা প্রায় একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছে সে।
বাকী রাত ফাহিমের নির্ঘুম কাটল।

ঘুম ভরা চোখ আর মাইগ্রেনের ব্যথা নিয়ে সকালে অফিসে গেল ফাহিম। এক মগ ব্ল্যাক কফি খেয়ে টিম মিটিং শেষ করে দেখা করল ওর বস জ্যানিস প্যাসিলিও’র সঙ্গে। জানাল ওর মায়ের অসুস্থতার কথা। বাংলাদেশ থেকে অনলাইনে প্রজেক্টের কাজ যতটুকু সম্ভব করবে সে—অবশ্যই যদি পরিস্থিতি অনুকূলে থাকে। সব শুনে জ্যানিস একমাসের ছুটির ব্যবস্থা করে দিল। জ্যানিসকে ধন্যবাদ দিয়ে সেদিনই স্থানীয় ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে দেশে যাবার টিকেট কনফার্ম করে ফেলল ফাহিম।
কয়েকটা দিন প্রচণ্ড ব্যস্ততায় কাটল ফাহিমের। একটা হাই-প্রোফাইল সফটওয়্যার ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের পুরো দায়িত্বটাই তার কাঁধে। ওর টিমে আছে আরো ছয়জন। ফাহিম টিম লিড। প্রজেক্ট ম্যানেজার না থাকায় প্রজেক্ট ডেলিভারির দায়িত্ব তার। সে সবার সংগে কয়েকদফা মিটিং করে কিছু দায়িত্ব ভাগ করে দিল টিমের সিনিয়র মেম্বারদের মধ্যে। বাংলাদেশে বসে প্রয়োজনে সে কাজ করবে, তাই ল্যাপটপ, অফিসের নেটওয়ার্ক ও ডাটা সেন্টারের সাথে ভিপিএন কানেকশন সহ যাবতীয় সেটআপ রেডি করে ফেলল। বাংলাদেশে ইন্টারনেট সার্ভিসের যা অবস্থা তাতে ঠিকঠাক মতো কাজ করতে পারবে কিনা কে জানে।

সিমিকে খবরটা দেয়া হয় নি এখনো। কাজের ব্যস্ততায় সে সুযোগই পাচ্ছিল না। হুট করে এভাবে দেশে যাওয়া হচ্ছে, এটা জেনে সিমি নিশ্চয়ই অনেক অবাক হবে। সিমিকে না জানিয়ে দেশে গিয়ে একটা সারপ্রাইজ দিলে কেমন হয়? তা হয়তো ফাহিমের পক্ষে সম্ভব হবে না। সারপ্রাইজ দেয়া এবং কোনো কিছু সিক্রেট রাখার ব্যাপারে সে একেবারেই অপরিপক্ব।
রাতে সিমির জন্য সে ইমেইল লিখল।
‘কেউ কি চায়, আজ বিকেলে আমার সাথে এক কাপ কফি খেতে? তাহলে নীল রঙের একটা শাড়ি পড়ে সে যেন তৈরী থাকে।’
সিমি প্রিয়তমেষু, একদিন ঘুম ভেঙে যদি দেখো এমন একটা মেসেজ এসেছে তোমার ফোনে—কেমন হবে ব্যাপারটা বলতো?
বুঝতে পারছি, বেশি হেঁয়ালি হয়ে যাচ্ছে। সহজ করেই বলে ফেলি।
দুটি খবর দিয়ে শুরু করি। একটি ভালোলাগার আর একটি মন খারাপের। কোনটা আগে শুনবে? আচ্ছা ভালোলাগাটাই আগে বলি। আমি দেশে যাচ্ছি। আর মন খারাপের খবরটি হচ্ছে, আমার মা অসুস্থ। তার ব্রেনে টিউমার ধরা পড়েছে। দু’বছরের বেশি হয়ে গেছে মাকে দেখি না। মনটা তাই অস্থির হয়ে আছে। বিক্ষিপ্তও অনেক।
একটা বিষয় তোমাকে বলতে চাচ্ছি—জানি না, তুমি কী ভাববে তবুও বলছি। দেশে যাচ্ছি আমার মায়ের শরীর খারাপের খবর জেনে। আমার মনটা খুবই খারাপ। অথচ আমি যতটুকু না মনকষ্টে আছি মায়ের কথা ভেবে তারচেয়ে বেশি খুশি এই ভেবে যে তোমার সাথে আমার দেখা হবে! এটা কি অন্যায়?
আমি ভণিতা করতে পারি না। চাইও না। তাই সত্যিটাই তোমাকে বললাম।
যদি সব কিছু ঠিক থাকে—তবে দেখা হচ্ছে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই। ততদিন অবশ্যই ভালো থাকবে।
–ফাহিম।

ফাহিম,
তোমার মেইল পেয়ে কতটা খুশি হয়েছি বুঝাবো কী করে?
আবার ভালোলাগার পাশাপাশি মনটা বিষাদে ভরে গেল। দুটো খবরই কেন তোমাকে একসাথেই দিতে হলো?
তোমার মায়ের অসুস্থতার কথা শুনে খুব খারাপ লাগছে। তোমাকে কী করে সান্ত্বনা দেবো বুঝতে পারছি না। তোমার দুঃখ নিরসনের জন্য কিছু করতে পারলে ভালো লাগত। মনকে শক্ত করো।
তোমার সঙ্গে সত্যিই এত তাড়াতাড়ি দেখা হবার সুযোগ হবে এটা ভেবে আমি কিন্তু একেবারেই অবাক হচ্ছি না। আমার মন বলছিল তোমার সাথে সহসাই আমার দেখা হবে। আবার হতে পারে, এটাও তাঁরই পরিকল্পনা! তিনি যে আমার জন্য এত বড় একটা চমক সৃষ্টি করবেন কে জানত? এমন চমৎকার সময় আমার জীবনে এভাবে কখনও আসে নি। কিছু কিছু সুখ প্রকাশ করার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার এখনকার অনুভূতির কথা তাই অপ্রকাশিতই থেকে যাবে।
এটুকু লিখে সিমি চুপ হয়ে যায়। আর কী লিখবে, লেখা উচিৎ, তাঁর ভাবনায় আর কিছু আসে না। ফাহিমের বাংলাদেশে আসার খবরে কেমন জানি হয়ে যায় সে। কিছুটা ভালোলাগা, কিছুটা ভয়, কিছুটা আনন্দ, কিছুটা অনিশ্চয়তা—সবকিছু মিলিয়ে কেমন জানি একটা সময়। একবার ইচ্ছে হচ্ছে, কোথাও চলে যেতে, আরেকবার ইচ্ছে করছে চুপ করে ঘরের ভেতরেই বসে থাকে। এমন দুই মেরুর মিশ্র অনুভূতি ওর ভেতর কখনোও কাজ করে নি আগে। সিমি লেখা শেষ করল।
তুমি ভালো না থাকলে আমার ভারী খারাপ লাগে। আমার কথা ভেবে হলেও ভালো থেকো।
তুমি এলে তোমার সাথে মা-কে দেখতে যাবো। নেবে আমাকে?
আর একটা কথা, ভেবো না, আমাদের দেখা হবে বলে আর মেইল লিখবে না। তোমার লেখা চাই, ছোট্ট করে হলেও। দু’লাইন হলেও। তোমার লেখা আমায় মুগ্ধ করে।
~তোমার লেখা-মুগ্ধ আমি।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১২)

অফিস থেকে ফিরে রাতে মেইল চেক করল ফাহিম। সিমির কোনো মেইল নেই। কী মনে করে সে ইয়াহু চ্যাট রুমে লগইন করল এবং দেখল, বেশ কয়েকটা এসএমএস লিখে রেখেছে সিমি। ফাহিম খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ল।
আমি তোমার মেইল পেয়েছি কিন্তু রিপ্লাই দিতে পারি নি—আমি খুবই দুঃখিত ফাহিম। আসলে কিছু লিখতে ইচ্ছে করছিল না। তোমার মেইল পড়ার পরে আমি অনেক ভেবেছি। সাথে সাথেই ভাবছিলাম কিছু লিখব কিন্তু কেন যেন আর ইচ্ছে করল না উত্তর লিখতে। জানি না আমার কী হয়েছে। মনে হচ্ছে আমি একটা গভীর জঙ্গলে হারিয়ে গেছি। বের হওয়ার কোনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই। আমি যেন আর নিজের মধ্যে নেই। না, এসবের কোনো কিছুর সাথেই তুমি নেই। ইটস জাস্ট ওয়ান অফ দোজ ডে’জ। তেমনই একটা দিন।
তুমি কিন্তু আবার ভেবো না তোমার মেইল পেয়ে আমি আপসেট হয়েছি। আর আপসেট হবোই বা কেন? তুমি বিবাহিত, পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরী একজন রূপসী তোমার বউ—একথা তো আমি জানিই। আমি বরং খুশি হয়েছি—দেরিতে হলেও তার কথা লিখেছ নিজ থেকে। তুমি স্বস্তিবোধ করছ—আমিও।
তবে এই মুহূর্তে আমার কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। প্লিজ কিছু মনে করো না।
আমাকে ২/৩ দিন সময় দাও। অ্যান্ড ফর গডস সেক—আমাকে নিয়ে ভেবো না। বিভ্রান্ত হয়ো না। আমি ঠিক আছি। তুমি যেখানে আছো, সেখানেই থাকবে, আমার প্রাণের বন্ধু, সত্যিকার অর্থেই অসম্ভব একজন ভালো বন্ধু হয়ে।
আমার একটু সময় চাই—কিছু নির্মম সত্যকে ধারণ করবার জন্য। এ সময়টুকু আমার দরকার। প্লিজ।
আর আমাকে ছেড়ে যেও না কোথাও। তোমার রহস্যময়ী সিমি যে কোনো মুহূর্তে রহস্যের বেড়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। কাজেই, থেকো আশে পাশেই।
আল্লাহ হাফেজ।

সিমির মেসেজগুলো পড়ে ভীষণ দ্বিধায় পড়ে গেল ফাহিম। হঠাৎ কী এমন হলো যে তার কোনো কিছুই লিখতে ইচ্ছে করল না। ২/৩ দিন সময় চেয়েছে সিমি। তার মানে এ’কদিন সে যোগাযোগ করবে না। ফাহিমের কোনো কথায় কি সে কষ্ট পেয়েছে? কী জানি হতেও পারে। ফাহিম অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।
আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে ফাহিম তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে যা কিছু লিখেছে তা শোনার জন্য হয়ত প্রস্তুত ছিল না সে। কিন্তু তাইই বা হবে কেন? অবশ্য অনেক সময় সত্যি জেনেও আমরা বাস্তবতাটা ঠিক মেনে নিতে পারি না—মেনে নিতে কষ্ট হয়। মানুষের মন বিচিত্র জিনিস। সমস্ত নক্ষত্র পূঞ্জে যে জটিলতা ও রহস্য আছে, তার থেকেও রহস্যময় মানুষের মন। সিমির মনের মধ্যে কী কাজ করছে একমাত্র সেই জানে।
আরো একদিন পরে হঠাৎ করেই ফাহিম আবিষ্কার করল সিমিকে—চ্যাট রুমে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে দেখতে চাইল, সিমি ওকে হাই হ্যালো কিছু বলে কিনা। কিন্তু না সে কিছুই বলল না। ফাহিম আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কিছু না বলে চ্যাট রুম থেকে চলে গেল, কিছুটা হতাশ হয়ে।
মাঝে দুদিন কেটে গেল। ফাহিমের কী যেন নেই, কী যেন নেই টাইপের অনুভূতি হতে লাগল। সেদিন সকালে অফিসে এসেই সে ছোট্ট একটা মেইল লিখল সিমিকে।
এই যে রহস্যময়ী মেয়ে,
আপনার কোনো খোঁজ নেই কেন? ভালো আছেন তো?
কেউ কি জানে, কারো একটা মেইলের জন্য কেউ একজন কত অপেক্ষায় থাকে?
কারো সময় হলে যেন ইমেইল করে।
কেউ যেন ভালো থাকে। খুব ভালো।
কারো মেইলের অপেক্ষায় কেউ।
মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে ফাহিম সকালের টিম মিটিং এ চলে গেল। মিটিং এ কিছুতেই মন বসল না তার। সিমির কথা আজ খুব মনে পড়ছে। কিন্তু এমন চুপ করে গেল কেন মেয়েটা? ফাহিমের একটু অভিমানের মতো হলো। ছেলেরা কি অভিমান করে? হঠাৎ ফাহিম অভিমানের ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল কিছুক্ষণ। অভিমান ভীষণ অন্যরকম একটা জিনিস। সবার উপর অভিমান করা যায় না, শুধু ভালবাসার মানুষগুলোর উপরই অভিমান হয়, তাহলে সিমির প্রতি তাঁর এমন অনুভূতি হচ্ছে কেন?
সিমির তো এখন অফিস থেকে ফিরে আসার কথা। সে কী করছে এখন? ফাহিমের মেইলটি কি সে দেখেছে?
মিটিং শেষ করে এসে ফাহিম চ্যাট রুমে ঢুঁ মারার জন্য এলো কিন্তু তার দেখা মিলল না। তবু সে লিখল, ‘হাই, সিমি, কেমন আছ তুমি? মিসিং ইউ।’
এটুকু লিখে কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবল সে। তারপর লগ অফ করে কাজে ফিরে গেল।
দিন শেষে বাসায় ফিরে যাবার আগে ফাহিম আরেকবার চ্যাট রুমে এলো এবং দেখতে পেল সিমির রিপ্লাই। মাত্র দু’লাইনের একটা মেসেজ। সে লিখেছে—
‘আমি ভালো আছি। খুব ভালো আছি। সত্যি যদি বলতে হয়, তাহলে বলব, এর চেয়ে বেশি ভালো আসলে থাকা যায় না। নিজেকে মনে হচ্ছে একজন প্রিন্সেস!’
ব্যস এটুকুই। আর কিছু না।
ফাহিম আবারো দ্বিধায় পড়ে গেল। দুদিন আগেই না সিমি লিখল সে খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে আর আজকে নিজেকে প্রিন্সেসের মতো লাগছে। এর চেয়ে বেশি ভালো থাকায় যায় না। ওয়াও—হোয়াট অ্যা কন্ট্রাডিকশন! কেমন বৈপরীত্য এবং দ্বন্দ্ব, সম্পূর্ণ অনিশ্চিত—একেবারেই যেন শিকাগোর ওয়েদার! প্রতি মিনিটেই বদলে যায়—কারণে অকারণে। আবহাওয়াবিদদের দেয়া পূর্বাভাস কখনোই ঠিক হয় না এই শহরে। তাদের আর কী দোষ?
সিমির সঙ্গে তাঁর প্রাণের এই শহরের অনেক মিল। সবকিছুই কেমন রহস্যে ঘেরা।

এরমধ্যে সিমির একটি রেকর্ড করে পাঠানো গান পেল ফাহিম। সম্পূর্ণ গান নয়, গানের কয়েকটি লাইন। সেই সাথে সে লিখেছে—
তোমার জন্য একটা গান পাঠালাম ফাহিম। জানি না, তোমার ভালো লাগবে কি না, তবুও ইচ্ছে হলো পাঠাতে। শুনে দেখো।
ভালোবাসা জেনো।
~সিমি।
তাহলে কি সিমির মনের মেঘ কিছুটা কমতে শুরু করেছে? হয়ত তাই। নাহলে হুট করে একটা গান পাঠানোর কথা না। ফাহিম গানটি শুনল। এবং যারপর নাই মুগ্ধ হলো। সত্যিই সুন্দর গায় সিমি। হয়ত ছোটবেলায় গান শিখেছে, একসময় চর্চা ছিল বোঝা যায়। কণ্ঠের কারুকাজ বেশ ভালো—মানুষের মনের মধ্যে পৌঁছে যাবার মতোই। ফাহিম আবারো মুগ্ধ হলো।
সুযোগ পেয়ে সে দ্রুত ছোট করে উত্তর লিখল।
সিমি,
তুমি যে কত ভালো গান করো, তা কি তুমি জানো? আমি জানি না, তুমি গানের চর্চাটা চালিয়ে যাও কিনা, তবে চর্চাটা রাখলে ভালো করবে। ছোটবেলায় গান শিখতে কিনা জিজ্ঞেস করি নি, তবে তোমার দু তিনটি গান শুনেই আমি বলে দিতে পারি, ইউ হ্যাভ অ্যা স্ট্রং বেজ।
তোমার আরো গান শোনার অপেক্ষায় রইলাম।
–আমি।

ইতোমধ্যে শিকাগোর আবহাওয়া বদলে গেল আরো কয়েকবার। লেক মিশিগানের পানিও গড়াল অনেক। অবশেষে সিমি একটা নাতিদীর্ঘ মেইল লিখল ফাহিমকে।
ফাহিম, প্রাণের বন্ধু আমার—
কেমন আছো তুমি?
যখন এই লেখাটি আমি লিখছি তোমার জন্য, তখন তোমার ঘুমিয়ে থাকার কথা। তুমি হয়তো ঘুমচ্ছো। আমার এখানে এখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। অত্যন্ত দুঃখিত, তোমাকে এভাবে অপেক্ষা করিয়ে রাখার জন্য।
জানি অপেক্ষায় ছিলে। খুব কষ্ট হয়েছে বুঝি? আচ্ছা কথা দিচ্ছি, কেউ যদি খুব বেশি দুঃখিত হয়ে থাকে, তবে কখনও দেখা হলে তাকে সুখিত করে দেয়ার চেষ্টা করা হবে। চলবে?
তোমাকে দেখে কিন্তু কখনও মনে হয় না, যে তোমারও মন খারাপ হতে পারে! আমি প্রায়ই ভাবি, একজন মানুষ সবসময় এমন হাসিখুশি থাকে কী করে? তোমাকে আমার হিংসেই হয়!
কথা দিয়েছিলাম, তাই ফিরে এলাম আমার নতুন মেইল নিয়ে—পাওনা মিটিয়ে দিতে। চিঠির বিনিময়ে চিঠি।
কিন্তু কী লিখি তোমায় বলো তো? মাথাটা সত্যিই কেমন যেন শূন্য হয়ে আছে। অথচ তোমাকে কত কিছু বলার ছিল, বলার আছে, বলতে চাই। কিন্তু কোথায় শুরু করি? এমন ভাষা কি আছে যা দিয়ে এই তিরিশ বছরের জমানো ব্যথা বন্দী করা যায় চিঠির পাতায়? এমন শব্দ কি আছে যা দিয়ে হতভাগ্য এক হৃদয়ের স্পন্দন আঁকা যায়?
জানো ফাহিম, একটা সময় ছিল যখন চাইলেই আমি লিখতে পারতাম—বিরতিহীন। এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত ছিলাম তখন যে আমাকে কখনো ভাবতেও হতো না কী লিখব, কী নিয়ে লিখব? কিন্তু সে সময়গুলি এখন শুধুই এক অতীত ইতিহাস।
তবুও চেষ্টা করি কিছু লিখতে। আমার ফেলে আসা সময় থেকে। কথাগুলো কিছুটা ফিলসফিক্যাল, কেন জানি মেমরি ব্যাংক থেকে এগুলোই সামনে আসছে।
আমার মা কখনোই কোনো আগন্তুকের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করতেন না। আমার বাবা আমাদেরকে উৎসাহিত করতেন মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে—এমনি কী তারা অপরিচিত হলেও। তারা দুজনেই চাইতেন, আমাদের অনেক বন্ধু হোক, তাঁদের মনোভাব বুঝি এবং পৃথিবীটাকে জানি। মানুষের সঙ্গে মিশলেই চেনা যাবে মানুষ।
আমার মা সবসময় বলতেন, সত্যিকারের বন্ধুরা তোমার জীবন থেকে চলে গেলেও তোমার হৃদয় থেকে কখনোই যাবে না। কাজেই বন্ধু বানাবে। বন্ধু হচ্ছে আল্লাহর আশীর্বাদ। একজন বন্ধু তোমার জীবনে অনেক সুখের সময় এনে দিতে পারে। কাজেই কথা বলবে, তাকে যদি তুমি নাও চেনো। পৃথিবীটাকে নতুন দৃষ্টি দিয়ে দেখার সুযোগ পাবে প্রতিদিন।
আমার মায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল আমার। আমার এই তিরিশ বছরের জীবনে চলার পথে আমি অনেক বন্ধু বানিয়েছি—অনেক বন্ধু পেয়েছি, বন্ধু হয়েছি। আমি জানি, একমাত্র একজন বন্ধুকেই আমি পাবো যখন আমার দরকার পড়বে কারো কাঁধে মাথা রেখে যেন একটু কাঁদতে পারি।
আমি ছোট বেলায় খুব অল্পতেই মন খারাপ করে ফেলতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বুঝতে শিখলাম, তখনই আমার মায়ের কথা মনে পড়ত। আমার জীবনে তাঁর প্রভাব—তাঁর ভূমিকা। আমার জীবনের সর্বশেষ্ঠ উপহার হচ্ছে আমার মা। বেঁচে থাকতে যিনি সব সময় আমার চোখের পানি মুছে দিতেন। মহান আল্লাহ’র কাছে আমি কৃতজ্ঞ সেজন্য।
আমার মনে হয় অনেক কথাই লিখে ফেলেছি আজকে। তবুও যা বলতে চেয়েছিলাম তার কিছুই বলা হয় নি। তুমি হয়ত ভ্রূ কুঁচকে ভাবছ, এসব কী?
দৈবক্রমে তোমার সাথে আমার পরিচয়, তাও আবার ইমেলের মাধ্যমে, কিন্তু সেদিন যদি একজন অপরিচিত মানুষের মেইল মনে করে ডিলিট করে দিতাম, তা হয়ত ট্র‍্যাশ কিংবা রিসাইকেল বিনেই পড়ে থাকত এতদিন অথচ দ্যাখো, তুমি এখন জায়গা করে নিয়েছ সিমির স্পেশাল সিক্রেট লকারে। এখন আমি জানি, আমার একজন কেউ আছে যার কাঁধে মাথা রেখে আমি কাঁদতে পারব!
ভাবতেই পারছি না, অবশেষে তোমার সাথে দেখা হবে আমার। ২২ তারিখ কবে আসবে? আমি তো আর অপেক্ষা করতে পারছি না ফাহিম! আমার ধৈর্য এত কম কেন?
অনেক ভালোবাসা আর শুভ কামনা রইল।
~সিমি

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১১)

সিমিকে উত্তর দেবার আগে, শেষ মেইলের পুনশ্চ-তে লেখা সিমির কথাগুলো ফাহিম বেশ কয়েকবার পড়ল। সিমি কেন বলল যে সে ফাহিমের কাছে কোনো মায়া, দয়া, অনুকম্পা, কিংবা সহানুভূতি এসব কিছুই চায় না। শুধু চিঠির এই সম্পর্কটাই থাকুক, ভালোবাসায় সমৃদ্ধ হয়ে। ফাহিমের কোনো কথায় কি সে ভুল বুঝেছে? ফাহিমও তো এমনই চায়।
সিমির মনটা কি তাহলে খারাপ? ফাহিম চাইল এমন কিছু কথা লিখবে যা পড়ে সিমির মনটা ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু অনেক ভেবেও সিমির জন্য কোনো কিছুই লিখতে পারল না সে। হঠাৎ মনে হলো, একটা কবিতা লিখলে কেমন হয়? কলেজ জীবনে মাঝে মাঝেই সে কবিতা লেখার চেষ্টা করেছে। সেসব পাগলামি করার বয়স কি আর এখন আছে? তখন যেকোনোও মেয়েকে দেখলে কবিতা লেখায় রাত পার হয়ে যেতো। সেই কবিতা অবশ্য আর কাউকেই দেয়া হতো না।
সিমির জন্য ফাহিমের মন কেমন কেমন করে। মেয়েটাকে কেন জানি অন্যরকম মনে হয়। খুবই বিশ্বাসের একটা মানুষ, যার কাছে নির্দ্বিধায় সব কথা বলা যায়। এত মায়াময় একটা মেয়ে। সেই মেয়েটিকে কী লিখবে তাই ভাবছিল ফাহিম। আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে লিখল—
I’m not a poet
capable of writing lovely sonnets.
I’m not a musician
able to compose magnificent symphonies
or a sculptor who could create
a monument
that would endure forever.
I’m just one man…
এই কবিতা পড়ে তোমার মন ভালো হবে কিনা জানি না। তবুও একটু চেষ্টা করে দেখা। তোমার মনের ওপর এর খানিকটা রেশ থেকে গেলেই আমার ভালো লাগবে।
ভালো থেকো। খুব ভালো।

কবিতাটি পেয়ে অসম্ভব এক ভালোলাগায় ভরে গেল সিমির সমস্ত মন। হারিয়ে গেল কথামালার ভেতরে। এমন সাধারণ অথচ কত আন্তরিক। সে কালক্ষেপণ না করেই লিখতে বসে গেল।
ফাহিম, প্রিয় বন্ধু আমার—
তোমার কবিতাটা ভালো লেগেছে। ভীষণ। তোমার লেখার মতোই। তোমার লেখা আমি যত মনোযোগ দিয়ে পড়ি, তেমন করে অন্য কারো লেখা আমি কখনও পড়ি নি। মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা, মানুষ কি তার লেখার ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় বেশি, নাকি কথার ভেতর দিয়ে? নাকি দু’টোই।
তোমার প্রতিটা লেখাই আমি সেভ করে রাখছি। ইমেইল হওয়াতে অবশ্য একটা সুবিধে হয়েছে—লেখা হারিয়ে যাওয়ার কোনো ফুসরৎ নেই। ফোনের বাটন চেপে না পাবার বেদনা নেই। কণ্ঠ না শুনেও লেখা দেখে কল্পনায় তোমাকে দেখতে পাচ্ছি—বেশ। কিন্তু এই দেখাটা কি সত্যি হতে পারে না?
তুমি কবে আসবে দেশে? কবে দেখা হবে? কথা বলব সামনা সামনি বসে?
আচ্ছা, তোমার কি নদী ভালো লাগে, নাকি নদীর ওপর পালতোলা নৌকা?
নীল আকাশ, নাকি আকাশের ওপর মেঘ?
বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, নাকি মাঠের ওপর বৃষ্টি?
চাঁদ ভালো লাগে, নাকি জোছনা রাত?
গহীন রাত নাকি সেই রাতে ঝি ঝি পোকার ডাক?
পড়ন্ত বিকেল নাকি সেই বিকেলের চটুল হাওয়া?
খোলা চুল নাকি চুলের ঘ্রাণ?
উত্তরের প্রতীক্ষায় থাকব। অফুরান শুভেচ্ছা তোমার জন্য।
সিমি লেখাটি শেষ করে একটা কবিতা লিখে দিল নিচে।
‘Call me’ by Robert J. Lavery.
If one day you feel like crying…
Call me.
I don’t promise that I will make you laugh,
But I can cry with you.
If one day you want to run away–
Don’t be afraid to call me.
I don’t promise to ask you to stop,
But I can run with you.
If one day you don’t want to listen to anyone…
Call me.
I promise to be there for you.
And I promise to remain quiet.
But if one day you call…
And there is no answer…
Come fast to see me.
Perhaps I need you.
ভালো থেকো সুন্দর মনের মানুষ।
~সিমি।

তখন শিকাগোতে সকাল আট’টার একটু বেশি।
সিমি হয়তো ঘুমাচ্ছে। কাল রাতে অনেকক্ষণ কথা হয়েছে তার সাথে—রাত জেগেছে। সিমি বলেছিল সকালে ফোন করে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিতে। আজ তো ওর কাজ নেই। থাক না, ঘুমাক না আর একটু।
হঠাৎ করেই ফাহিমের মাথায় একটা খেয়াল চেপে বসল। সিমি ওকে যে কবিতাটা পাঠিয়েছে—সেটির বাংলা অনুবাদ ওকে পাঠালে কেমন হয়? আরো ভালো হয় কবিতাটির আবৃত্তি রেকর্ড করে পাঠাতে পারলে। সিমি যেমন ওকে মাঝে মাঝে ওর গাওয়া গানের কয়েকটি লাইন রেকর্ড করে পাঠায়। সিমির গানের গলাও সুন্দর। কিন্তু ফাহিম তো আবৃত্তিকার নয়, তবুও তার কেন এমন ইচ্ছে হলো কে জানে। মনের কিছু ইচ্ছাকে তাৎক্ষনিক ভাবে প্রাধান্য দেয়া যেতেই পারে—ফাহিম আবৃত্তি করল।
যদি কোনো দিন
অঝোরে কাঁদতে চাও তুমি,
তবে আমায় ডেকো।
আমি কথা দিচ্ছি না
তোমায় হাসিয়ে দেবো,
তবে, তোমার সাথে কাঁদতে তো পারবো।
যদি একদিন দূরে কোথাও
চলে যেতে চাও তুমি,
আমায় ডাকতে ভয় পেও না।
আমি কথা দিচ্ছি না
তোমায় বাঁধা দেবো।
তবে তোমার সাথে যেতে তো পারবো।
যদি একদিন কারো
কথাই শুনতে ইচ্ছে না করে,
তবে আমায় ডেকো।
আমি কথা দিচ্ছি,
নীরবে তোমার কথা শুনবো।
কিন্তু কখনও একদিন
তোমার ডাকে যদি না আসি,
তবে তুমি আমায় দেখতে যেয়ো।
হয়তো সেদিন খুব দরকার
তোমাকেই আমার।
কবিতাটির সঙ্গে ফাহিম আরো লিখল—
সিমি, তোমার পাঠানো কবিতাটির বাংলা ভার্শন পাঠালাম রেকর্ড করে। আমি আবৃত্তি শিল্পী নই তবুও একবার চেষ্টা করলাম। এক কাপ চা হাতে, সকালের মিষ্টি রোদ খানিকটা গায়ে মেখে শুনে দেখো একবার। ভালো না লাগলে ডিলিট করে দিও।
প্রিয় মানুষটির জন্যে ছন্দে আনন্দে সকালের শুভেচ্ছা।
আঁধারের পর সূর্যের আলো,
দিনটা তোমার কাটুক ভালো।
–ফাহিম।

সিমি ঘুম থেকে উঠে ফাহিমের কবিতা পেয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে গেল।
আজ অফিস নেই। সারাদিন তেমন কিছু করারও নেই। তবে সে জানে আজ ফাহিমের একটা মেইল আসবে। মেইল না আসা পর্যন্ত সে কবিতাটিই শুনতে থাকল। সিমি চট করে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসল বারান্দায়। গাছের ফাঁক দিয়ে সকালের রোদের অনেকখানিই এসে পড়েছে। সিমি রোদে গা ভিজিয়ে, গরম চা’য়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুনল কবিতাখানি আবার। বেশ কয়েকবার শুনে তার মনে হলো—বাহ, বেশ তো!
সিমির মনটা এতোটাই ভালো হয়ে যাবে বা যেতে পারে তা সে কল্পনাও করে নি কখনও। কেমন একটা সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে। ইচ্ছে করছে পাখির মতো আকাশে উড়তে, অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে। সে ফাহিমের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে কবিতাটি আওড়ালো শব্দ করে।
দুপুরের দিকে ফাহিমের ইমেইল পেল সিমি। ফাহিম লিখেছে—
সিমি, প্রিয়তমা বন্ধু আমার—
অনেকদিন থেকেই একটা ব্যাপার নিয়ে খুব অস্বস্তি বোধ করছি। ভাবলাম, আজকে তোমাকে জানাই।
আমি ভীষণ অবাক হয়েছি, তুমি আমার স্ত্রীর কথা বিভিন্ন প্রসঙ্গে এনেছ কিন্তু আর একবারও জানতে চাও নি তার ব্যাপারে। আমি কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছি—সেটা নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পেরেছ। তুমি হয়তো ভেবেছ, আমার নীরবতার কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে আর তাই তুমিও নীরবতায় আছে। হয়তো অপেক্ষায় ছিলে কিংবা আছো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তোমার মনে কৌতূহল যে জন্মেছে সেটা কিন্তু আমি বুঝেছি। কাজটা আমি ইচ্ছে করেই করেছি। আমি দেখতে চাইছিলাম—কতটা ধৈর্য তুমি ধরতে পারো। একধরণের পরীক্ষা বলতে পারো।
তবে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তুমি একজন অসাধারণ ধৈর্যশীল মেয়ে। অন্য কোনো মেয়ে হলে তার কৌতূহল তীব্র হতো—অনেক। তুমি ব্যতিক্রম। তোমার ধৈর্য আর নির্লিপ্ততা আমাকে অভিভূত করেছে।
তবে একেবারেই যে কৌতূহলী ছিলে না, তাই বা বলি কী করে। তুমিই তো তাকে ইন্টারনেট থেকে খুঁজে বের করে বলেছিলে, তোমার বউ কিন্তু হট। তুমি মিথ্যে বলো নি, সে সত্যিকার অর্থেই সুন্দরী—শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও। এবং তার সুন্দরের প্রশংসা সে পেয়ে আসছে তার টিনেজ বয়স থেকে। ছোট বেলা থেকেই সে একটু লাজুক ও নরম প্রকৃতির। কথাও বলে কম, যাকে বলে মিতভাষী। সে যখন টিনেজ পার হয়ে কুড়িতে পড়ল তখন আমিই তাকে ইনসিস্ট করেছিলাম মডেলিং ক্যারিয়ার করতে। তোমার মনে আছে কিনা জানি না, তখন আনন্দ বিচিত্রা নামে একটা ম্যাগাজিন ছিল, বেশ জনপ্রিয়। সেখানে ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতা হতো। অনেকটা আমার চাপে, একরকম ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এবং প্রথম দশজনের মধ্যে টিকেও যায় সে। কিন্তু ফাইনাল রাউন্ডের আগেই তাকে চলে আসতে হয় আমেরিকায় ইমিগ্রেশন নিয়ে, তার ভাইবোনদের সাথে।
তার সাথে আমার পরিচয়, প্রেম আর বিয়ের ঘটনা নিয়ে লিখলে একটা প্রেমের উপাখ্যান সৃষ্টি হবে বলেই আমার বিশ্বাস। তবে বন্ধু যখন হয়েছ, তার সম্পর্কে প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু জানবে কথা প্রসঙ্গে। অবশ্যই যদি তুমি জানতে চাও।
সুন্দরী স্ত্রীদের স্বামীরা সুযোগ পেলেই তাঁদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে থাকে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, এ কেমন আদিখ্যেতা। স্ত্রীর কথা বলতে যেয়ে শুধু তার সৌন্দর্যের প্রশংসাই করে যাচ্ছি। যে সুন্দর তাকে সুন্দর বলায় কোনো অপরাধ নেই।
তবে সবকিছু ছাড়িয়ে তার প্রেমে আমি পড়েছিলাম শুধুমাত্র তার ব্যক্তিত্ব আর জ্ঞানের সৌন্দর্যে। মানুষের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার ব্যক্তিত্বে। সৌন্দর্য দৃষ্টি কাড়ে কিন্তু ব্যক্তিত্ব কাড়ে মন। সেটা যে শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তা কিন্তু নয়। ব্যক্তিত্বহীন কিংবা মনের পরিচর্যা করে না এমন মানুষ আমার দৃষ্টিতে একটু কমই সুন্দর।
যাইহোক, সৌন্দর্য নিয়ে এমন বিশেষজ্ঞের মতামত কিংবা বক্তৃতা দেবার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। কেন দিলাম তাও জানি না। আপাতত এই চ্যাপ্টার ক্লোজ।
শেষ করছি একটা গল্প দিয়ে। এই গল্প নিয়েও পরে হয়তো আমাদের কথা হবে। ভালো থেকো সিমি। তুমি ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকি। অনেক ভালোবাসা।

মেয়েটি একটি চিঠি লিখল, ‘আমি আসছি, বিয়ে করব! বিয়ে করার মতো টাকা আছে তোমার কাছে?’
ছেলেটি সবেমাত্র গ্রাজুয়েশন শেষ করে একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছে, বেতন খুবই কম। এক বছরও হয় নি চাকরি। এরমধ্য বিয়ে করার মতো টাকা! চেক বই’র হিসেব মিলিয়ে তার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
মেয়েটি আরো লিখেছে, ‘আমার ভাই-বোনরা কেউ রাজী না। শুধু ছোট বোন ছাড়া। মা-ও রাজী না। তবে আমার জিদের কাছে হার মেনে আশা ছাড়া দিয়ে বলেছে, তোমার কপাল যদি তুমি পোড়াতে চাও আমাদের আর কী করার আছে। ঐ ছেলেকে যদি বিয়ে করো তবে তোমার নিজ দায়িত্বে একা একা-ই করতে হবে। আমরা কেউ তোমার সাথে থাকব না।’
মেয়েটি স্বপ্নের আমেরিকার নিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা না ভেবে একা একাই শুরু করল এক অনিশ্চিত যাত্রা। দেশে ফিরল। ছেলেটির সাথে দেখা করল। তারা সিদ্ধান্ত নিলো বিয়ে করবে। বিয়ে হলো, কাজী অফিসে।
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মেয়েটি বুঝে গেল ভুল একটা হয়ে গেছে। ছোট খাট ভুল না। বেশ বড়। মনে পড়ল মায়ের কথা। কিন্তু ফিরে যাবার আর তো পথ খোলা নেই। ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেছে!
মেয়েটি এখন কী করবে?
–ফাহিম।

পরের পর্ব

আগের পর্ব