Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৫)

ফাহিম,
এভাবে টেনশনে রাখার কী মানে? দুদিন কোনো খবর নেই! একটি মেইল পাঠিয়েছ, তার পুরোটা জুড়েই তোমার প্রথম প্রেমের গল্প। সরি পেন-ফ্রেন্ডশিপের গল্প। আমি কি জয়ার কথা শুনতে চেয়েছিলাম? তবে তোমার পেন-ফ্রেন্ডশিপের ঘটনা আর বর্ণনা অসাধারণ লেগেছে।
না, তোমার মতো পেন-ফ্রেন্ডশিপের অভিজ্ঞতা আমার নেই। তবে আমিও যে চিঠি একেবারেই লিখি নি তা কিন্তু নয়। স্কুল জীবনে দুএকটা প্রেমের চিঠি আমিও পেয়েছি। লিখেছিও। অবশ্যই সেই অনুভূতি অন্যরকম এবং আমার ধারণা সেই অভিজ্ঞতা আমাদের অনেকেরই আছে। অস্বীকার করবো না, খাম খুলে হস্তাক্ষরে লেখা একটা চিঠি যে কতটা আনন্দের তা সত্যিই এ প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা বুঝতে পারবে না।
তবুও আমার কাছে মনে হয়, হাতে লেখা কাগজের চিঠি আর ইমেইলের ভেতরে বেসিক পার্থক্যটা কিন্তু খুব বেশি নেই। ধরো, তোমার যদি চিঠি কাগজেই পেতে ইচ্ছে করে, তাহলে ইমেইল প্রিন্ট আউট করে নিলেই তো হয়? হাতের লেখার স্টাইল ভাল লাগলে হাতের লেখার মত ফন্ট আছে, আর যদি বলো হাতের স্পর্শের কথা, তাহলে ইমেইল টাইপ করতে গিয়ে কীবোর্ডে হাতের স্পর্শের কথা ভাবতে পারো, যেহেতু দু’টো স্পর্শই কাল্পনিক!
আমার কী মনে হয় জানো? সমস্যাটা আসলে কাগজের চিঠি কিংবা ইলেক্ট্রনিক চিঠি নিয়ে নয়—সমস্যাটা হলো চিঠির বিষয়বস্তু ও লেখার ধরণ। আগে তোমাকে যে ভাষায় কেউ একজন চিঠি লিখত এখন সে হয়তো সে ভাষায় লিখে না। পুরোটাই অনুভূতির ব্যাপার। আমার যেমন তোমার ই-চিঠি পেতে এবং দিতে একই রকম অনুভূতি কাজ করে। একই রকম মুগ্ধতা। ভালোলাগা সব। তবে হ্যাঁ, বাংলিশ আর শর্টহ্যান্ডে লেখা যে কোনো মেসেজই আমি অপছন্দ করি।
দেখো, এই ই-চিঠি চালাচালির মধ্য দিয়ে আমরা দুজনের কত কাছাকাছি চলে এসেছি। দূরে থেকেও অনেক কাছে। কখন যে তোমাকে এত কাছের মানুষ মনে করতে শুরু করেছি, তা নিজেই বুঝতে পারি নি। বুঝতে পারছি না কাজটা ঠিক হচ্ছে কিনা। আর সামনেই বা কী অপেক্ষা করছে তাও জানি না। সব সম্পর্ক কি আর হিসেব কষে হয়?
এটুকু লিখে সিমি কিছুক্ষণ ভাবল। সিমি তার অনেকগুলো ছবি পাঠিয়েছিল ফাহিমকে। ছবিগুলো দেখে উচ্ছ্বসিত কোনো মন্তব্য করে নি ফাহিম। সৌজন্যমূলক প্রশংসাও না। তবে কি ছবি দেখে নিরাশ হয়েছে সে? অনেকদিন থেকেই সিমি ভাবছিল কথাটা ফাহিমকে জিজ্ঞেস করবে। কিন্তু করেনি। কারণ, সিমি এও জানে, ফাহিমের কাছে কারো বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে মনের সৌন্দর্যটাই বেশি মুখ্য। তবুও সে লিখল—
আচ্ছা আমি দেখতে কেমন বললে নাতো? আমি দেখতে কেমন সেটা আমি জানি। জানতে চাইছিলাম, তোমার চোখে আমি, কেমন? আমার ছবি দেখে কী মনে হয়েছে? ভয়ে আছি, আমাকে দেখার পর যদি তোমার ভালো না লাগে, যদি আর আমার সাথে যোগাযোগ করতে না চাও, আমাকে লিখতে ইচ্ছে না করে? যোগাযোগ রাখতে না চাইলে রাখবে না। ভালো না লাগলে লিখবে না। সে স্বাধীনতা তোমার আছে। তবে আমি তোমার লেখা ভীষণ মিস করবো। তোমাকেও।
ছবি দেখে একজন মানুষকে যত না বোঝা যায় তার চেয়ে অনেক বেশি বোঝা যায় তার লেখা থেকে, তার কথা থেকে। তুমি মানুষটা কেমন সে তো তোমার ছবি না দেখার অনেক আগে থেকেই বুঝেছি।
তোমার কথা দিনে রাতে মনে পড়ে—অনেকবার। স্বপ্নও দেখি। ইনফ্যাক্ট গত রাতেই তোমাকে স্বপ্ন দেখেছি। তুমি আমার এত কাছে ছিলে যে চাইলেই তোমাকে ছুঁয়ে দিতে পারতাম। আচ্ছা তুমি কি কখনো স্বপ্ন দেখো? দেখেছ আমাকে? দেখলে কী দেখেছ? বলবে আমাকে? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে।
আজকে আমাকে কথাতে পেয়েছে। আমার এসব কথার কোনো গুরুত্ব দিতে যেও না আবার। মাঝে মাঝে এলোমেলো ভাবনায় কত কথা বলতে ইচ্ছে করে।
তুমি আমার বন্ধু হয়েই থেকো। আজীবন। আমি এতেই খুশি। আমাদের সম্পর্কের অন্য কোনো পরিণতি সম্ভব নয়। এ যেমন তুমিও জানো—আমিও জানি। এতদিন ধরে তোমার লেখা পড়ে এবং লেখার মধ্যে তোমাকে খুবই অন্তরঙ্গভাবে জেনে আমার মনে হয়েছে, মেয়েদেরকে তুমি ভালোই বোঝো। তাদের মনের সূক্ষ্ম বিষয়গুলো তোমার অনুভূতির অদৃশ্য পরশ এড়িয়ে যায় না। মেয়েদেরকে এমন করে বোঝার পুরুষের সংখ্যা খুব বেশি দেখা যায় না।
তোমার ফ্লাইট কখন? ডিপারচার—অ্যারাইভাল কিছুই জানাও নি। এয়ারপোর্টে কে যাচ্ছে তোমাকে আনতে? ইশ আমি যদি যেতে পারতাম!
এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়েই তুমি দেখতে, ছোট খাটো একটি মেয়ে, নীল রঙের শাড়ি পড়ে একটি ফুলের তোড়া হাতে নিয়ে নার্ভাসভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মিটি মিটি হাসছে। তুমি দুটো ঢাউস সাইজের লাগেজ ট্রলিতে করে ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আসতেই মেয়েটি জানতে চাইল, কেমন আছ ফাহিম? আসতে কোনো অসুবিধা হয় নি তো?
তুমি বললে, হুম হয়েছিল। কিন্তু এখন তোমাকে দেখে সব কিছু কেটে গেছে।
তোমার স্বপ্নের শহর, প্রিয়জনদের রেখে আসতে কষ্ট হয় নি? বলেই অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসল মেয়েটি।
একটু তো হয়েছেই। তবে এখন আর কষ্ট নেই। তুমি তো রয়েছ আমার সামনে। আর আমার ফেলে যাওয়া প্রাণের শহর, ঢাকা।
মেয়েটি লাজুক হাসি দিয়ে বলল, তুমি আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ, বিশ্বাসই হচ্ছে না।
তুমি মেয়েটির হাত থেকে ফুলের তোড়াটা নিয়ে বললে, ফুলগুলো আমার হাতে দাও তাহলেই বিশ্বাস হবে।
মেয়েটি আবারো লজ্জা পেয়ে গেল। সে এতটাই নার্ভাস আর বোকা কখনোই বোধ করে নি। ফুলগুলো দিতেও ভুলে গেছে। সে ছোট করে বলল, সরি, ফুলগুলো তোমার জন্য।
তুমি তখন হাত বাড়িয়ে মেয়েটির হাত ধরে বললে, জানি।
মেয়েটি অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। ছেলেটির হাতের স্পর্শে শিহরিত হয়।
কী রোম্যান্টিক একটা ব্যাপার হতো বলো তো! অথচ তুমি আমাকে একবারের জন্যেও বললে না, এয়ারপোর্টে যেতে।
জানি না তুমি এখন কোথায়? আমার মন বলছে, তুমি এখন ৩৪০০০ ফুট ওপরে। সম্ভবত আটলান্টিক পাড়ি দিচ্ছ। আর এদিকে আমি প্রহর গুনে গুনে হয়রান। তোমার সঙ্গে দেখা হবে, এই ভাবনাতেই আমার প্রতিটি মুহূর্ত কেটে যাচ্ছে।
কিছু কিছু প্রতীক্ষার প্রহর এত দীর্ঘ হয় কেন?
~সিমি

রাতে ঘুমনোর আগে সিমি মেইল চেক করল আবার। নাহ, ফাহিমের কোনো খবর নেই। কোনো মেইল নেই। ইয়াহু চ্যাট রুম, এমএসএন মেসেঞ্জার, কোথাও নেই। তাহলে কি কোনো সমস্যা হলো? কত ধরণের সমস্যাই তো হতে পারে, তাই বলে একবার জানাবে না? কিছুক্ষণ এলোমেলো ভাবনায় ডুবে থেকে ঘুমতে গেল সিমি। অনেকক্ষণ এপাশ-ওপাশ করেও তার ঘুম এলো না। সে উঠে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে। জানালাটা খোলাই ছিল। বাইরে শোঁ শোঁ শব্দে বাতাস বইছে—হিমেল বাতাস। শীতের আগমনী বার্তা। আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে ফিরে গিয়ে বসল তার ল্যাপটপের সামনে। ফাহিমের জন্য কিছু লিখল আবার—
এই যে দূরের মানুষ, আপনার কোনোও খবর নেই কেন? ভালো আছেন তো? কেউ যে আপনার অপেক্ষায় আছে সে খেয়াল আছে?
এটুকু লিখে সিমি মিটি মিটি হাসল। কেননা, ফাহিমও এমন ভাববাচ্যে একবার একটা মেইল লিখেছিল তাকে। কথাগুলো মনে পড়ে হাসি পাচ্ছে ওর। কথার কী ঢং। ‘কেউ কি জানে, কারো একটা মেইলের জন্য কেউ একজন কত অপেক্ষায় থাকে? কারো সময় হলে যেন ইমেইল করে। কেউ যেন ভালো থাকে। খুব ভালো। কারো মেইলের অপেক্ষায় কেউ।’ উফ!
সিমি আবার লিখল—
বড্ড হাওয়ার রাত আজ। বাইরে শীতের ঠাণ্ডা মিষ্টি বাতাসে জানালার পর্দা বারবার সিন্দাবাদ নাবিকের জাহাজের পালের মতো ফুলে ফুলে উঠছে। এত মিষ্টি বাতাসেও ঘুম আসছিল না। তাই তোমাকে লিখতে বসলাম। কিছুক্ষণ আগেই তোমাকে একটা মেইল পাঠিয়েছি। আবারো লিখছি। কেন লিখছি জানি না।
জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখি আকাশের অনন্ত নক্ষত্ররা জ্বলজ্বল চোখে জানালার ভেতর দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে। এটা কি শুক্লপক্ষ চলছে? এসব হিসেব রাখি না কতদিন। আকাশে নক্ষত্রের ফুলকি ফুটে আছে। নক্ষত্রের রাতগুলোতে হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষের কথা খুব মনে পড়ে।
বিকেলে অফিস থেকে যখন ফিরেছে, ভীষণ একা লাগছিল সিমির। মাঝে মাঝে একাকীত্ব জেঁকে বসে। তার ঘরের লাগোয়া এক চিলতে বারান্দায় বসে তখন সে তার প্রিয় কিছু গান শুনে। বিষণ্ণ বিকেলে এই গানের ছোঁয়া সিমিকে আরো বেশি ভাবিয়ে তোলে। সূর্য তখন ডুবি ডুবি করছে। ঢাকা শহরের লাইটগুলো কেবল জ্বলতে শুরু করেছে। আকাশ কেমন যেন রক্তিম বর্ণ ধারণ করে আছে। সিমি ঘরে গিয়ে এককাপ চা বানিয়ে আনল। গরম চায়ে চুমুক দিয়ে সে হারিয়ে গেল তার আপন জগতে। গানের কথাও এমন—আমি তো তোমার কথাই ভাবছি, তোমার কথাই ভাবছি। গান শুনতে শুনতে সিমি উদাস হয়ে যায়। তার অবচেতন মনে ঘুরে ফিরে আসে ফাহিমের চিন্তা। সিমির মন বলছে, যে কোনো কারণেই হোক ফাহিম ওকে জানাতে পারে নি অথবা ইচ্ছে করে জানায় নি। তবে সে যে বাংলাদেশের পথে, সে ব্যাপারে তার বিশ্বাস শতভাগ অটুট।
ফাহিম বাংলাদেশে আসছে এটা যে সিমির জন্য কত খুশির সেটা কী করে বোঝাবে সে। কিছু কিছু আনন্দের প্রকাশ করার মতো ভাষা খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে তা কবিতার ভাষায় লিখে রাখা যায়। সিমির ইচ্ছে হলো কয়েকটি লাইন লিখে রাখতে। সে লিখল—
আকাশের ডাক
উপেক্ষা করবার
আছে কি বাষ্পের ক্ষমতা?
ভোরের টানে
উড়ে যায়
গহীন রাতের তীব্রতা।
তুমি
আমার ভোরের আকাশ।
বারান্দার গদি লাগানো চেয়ারটাতে বিড়ালের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে শুয়ে থাকে সিমি। হাতগুলো বুকের ভেতর নিয়ে জড়সড় হয়ে আছে সে। শীত শীত লাগছে, কিন্তু উঠে গিয়ে চাদর আনতে ইচ্ছে করছে না। এসময় ভীষণ মনে পড়ছে একজনের কথা। সে থাকলে এখন ওর গায়ে আলতো করে একটি চাদর জড়িয়ে দিতে পারতো। মানুষটা কেমন স্বার্থপরের মতো এই কঠিন পৃথিবীতে ওকে একা রেখে চলে গেছে। চাইলেও সেখান থেকে ফিরিয়ে আনা যাবে না তাকে। সিমি উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকে গোধূলির রঙে রাঙানো আকাশপানে। সেখান থেকে মানুষটা তার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে। কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকে সিমি। কেমন একটা ঘোর লাগা দৃষ্টি। চোখ বন্ধ করে অনুভব করতে চায়—পেতে চায় কাছে। আরো কাছে। বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারে না সে। ঝাপসা হয়ে আসে দৃষ্টি। ভিজে আসে তার আয়ত দুচোখ।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *