দুবাই ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট।
এমিরেটস এয়ারলাইন্সের লাউঞ্জে বসে নিবিষ্ট মনে ল্যাপটপের মনিটরে তাকিয়ে আছে ফাহিম। অনেক ঝামেলা করে সে ইন্টারনেট কানেকশন পেয়েছে। শিকাগো থেকে লন্ডন হয়ে ১৫ ঘণ্টার দীর্ঘ ফ্লাইট শেষ করে ঘণ্টা দুয়েক আগে তার প্লেন ল্যান্ড করেছে এখানে। চার ঘণ্টা লে-ওভার। তারপর পাঁচ ঘণ্টার ফ্লাইট টু ঢাকা।
গত দু-তিন দিন টানা তুষারপাতে প্রায় দেড়ফুট বরফ জমে ছিল শিকাগো শহরের সর্বত্র। ফাহিমের নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল হয়ে যায় অবধারিতভাবেই। কিন্তু হঠাৎ করেই তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় একদিনেই সব বরফ গলে পানি, আসলে কাদা পানি হয়ে গেল। প্রচণ্ড শীত কিংবা তুষারপাতের একদিন পরেই এই হঠাৎ তাপমাত্রা উষ্ণায়নকে এরা বলে ইন্ডিয়ান সামার। কেন এমন অদ্ভুত নামকরণ তা অবশ্য ফাহিমের জানা নেই। তবে ধারণা করা যায়, ইন্ডিয়ার উষ্ণ আবহাওয়ার কারণেই হতে পারে এমন নামকরণ।
এভাবে একদিনের মধ্যেই দৃশ্যপট বদলে যাবে সেকথা আবহাওয়াবিদরাও বলতে পারে নি। এই কনে কনে শীত, একদিন না যেতেই সব কিছু স্বাভাবিক। নাগরিক জীবন ফিরে এলো স্বাভাবিকতায়। ফাহিম মনে মনে সৃষ্টিকর্তার এই খেয়ালখুশির বিষয়টার প্রতি ভীষণ কৃতজ্ঞতা অনুভব করল। তিনি চাইলে সব কিছুই সম্ভব। ফাহিমের ফ্লাইট অনির্দিষ্ট কালের জন্য ক্যান্সেল হয়ে গিয়েছিল, আবহাওয়ার পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত। এখন যেহেতু বরফ গলে গেছে, রাস্তাঘাট, রানওয়েও থেকে বরফের স্তূপ সরিয়ে পরিষ্কারও করা হয়েছে—প্লেন চলাচলে এখন আর কোনো অসুবিধা নেই। ফাহিমের ট্রাভেল এজেন্ট ওর টিকেট রিকনফার্ম করে দেয়াতে ফাহিমের ফ্লাই করতে আর কোনো সমস্যা হলো না।
লাউঞ্জে বসে ফাহিম প্রথমেই তার ইমেইল খুলে বসল। সিমির দুটো ইমেইল এসেছে। মেইল দুটো পড়তে পড়তে মেয়েটির প্রতি এক ধরণের মায়া বেড়ে গেল ফাহিমের। কেমন মন কাড়া কথাগুলো। সিমির একাকীত্বের কথা ভেবেও ওর খারাপ লাগতে লাগল। বরফের স্তূপ পরিষ্কার, ফ্লাইট বাতিল হবার টেনশন, এক মাসের জন্যে বাসার যাবতীয় কাজ, বিল পেমেন্ট সব কিছু মিলিয়ে একটা ঝড়ের তাণ্ডব গিয়েছে ওর নিজের ওপর দিয়ে। ও বেশ কয়েকবার ভেবেছে সিমিকে পরিস্থিতির একটা আপডেট জানানো দরকার, কিন্তু এই লিখি এই লিখি করে আর লেখা হয়ে ওঠে নি। ফাহিম লক্ষ করল, তুষারপাতের বর্ণনা দিয়ে তার লেখা শেষ ইমেইলটিও রয়ে গেছে ড্রাফট ফোল্ডারে।
ফাহিম দ্রুত তার সর্বশেষ অবস্থান, পরিস্থিতি, অ্যারাইভ্যাল টাইম আর বাংলাদেশে সে যে ফোনটি ব্যবহার করবে, সেই নাম্বারটি জানিয়ে সিমিকে একটা মেইল পাঠিয়ে দিল।
প্লেনে ফাহিম কখনও ঘুমাতে পারে না। সে সময় পার করে ইন-ফ্লাইট সিনেমা দেখে দেখে। দীর্ঘ ভ্রমণের ক্লান্তিতে এখন অবসাদ লাগছে তার। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। ফাহিম ল্যাপটপ বন্ধ করে ঘড়ি দেখল। বোর্ডিং হতে এখনো তিরিশ মিনিট বাকী। সে ডিউটি ফ্রি শপ থেকে কিছু গিফট কিনল। কিছুক্ষণ এলোমেলো ঘুরে বেড়াল। তারপর ঝুলন্ত মনিটরে ঢাকা গামী ফ্লাইটের নাম্বার দেখে নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ডিপারচার গেটের দিকে।
…
সিমি সাধারণত শাড়ি পরে কাজে যায় না। আজ সে শাড়ি পরল। সুন্দর করে সেজেছে সে।
কাজের শেষে ফাহিমের সঙ্গে দেখা হবে। ফাহিমকে সে ঠিকানা দিয়ে রেখেছে। তাঁর অফিসের গেটে ফাহিম আসবে সেখান থেকে তাঁরা দুজনে কোথাও যাবে।
সিমি হালকা নীল রঙের একটা শাড়ি পরেছে। ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, অফিসের অনেকেই ওর দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে। সিমির মেদহীন ছিপছিপে শরীরে নীল শাড়ি, নীল টিপ, নীল নেইল পলিস আর মেজেন্টা রঙের লিপস্টিক দেয়া পুরু ঠোট—কেউ কি পারবে পাশ কাঁটিয়ে চলে যেতে একবার না তাকিয়ে? আর ওর কাঁটা কাঁটা মুখটা দেখে যে কেউ বলবে, একটু দাঁড়িয়ে হাসিটাও দেখে যাই।
সিমি ঘড়ি দেখল। আজ যেন ঘড়ির কাঁটা থমকে আছে। প্রহর যেন কাটছেই না। চারটা পঞ্চাশে সে উঠে দাঁড়াল। ওয়াশরুমে যেয়ে নিজেকে আর একবার দেখে নিলো আয়নায়।
পাঁচটা বাজতেই সিমি নেমে এলো ওপর থেকে। হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল অফিসের গেটের সামনে। বার কয়েক ঘড়িতে সময় দেখল। একটু নার্ভাস লাগছে তাঁর। গত দুমাস ধরে একজন মানুষের সাথে এত কথা, এত আলাপ—সেই এত পরিচিত একজন, তাঁর সাথে দেখা হবে, তাতে নার্ভাস হবার কী আছে? সিমি মাথা থেকে যতই বের করে দিতে চাইছে, ততই সে অস্বস্তিবোধ করছে। সে আবার ঘড়ি দেখল।
আরো বেশ কিছুক্ষণ পরে ফাহিম এলো একটা ইয়ালো ক্যাব নিয়ে। ক্যাব থেকে নেমেই সে তাকাল চারিদিকে। সিমি তাকে জানিয়েছিল, সে নীল শাড়ি পরে আসবে। ফাহিম হঠাৎই লক্ষ করল নীল শাড়ি পরা একটি মেয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই ফাহিম হেসে বলল, ‘কেমন আছ?’
‘ভালো। তুমি?’ সিমির ঠোটের কোণে মৃদু হাসি।
‘অনেক ভালো।’ স্বভাবসুলভ বক্র হাসি দিয়ে বলল ফাহিম।
‘হাউ ওয়াজ ইয়োর ট্রিপ? কোনো কষ্ট হয় নি তো?’
‘হুম হয়েছিল। কিন্তু এখন আর কোনো কষ্ট নেই।’ আবারো বক্র হাসি।
‘তাই?’
‘হ্যাঁ। তোমাকে দেখার পর সব কষ্ট চলে গেছে। বাই দ্য ওয়ে, ইউ আর লুকিং সো প্রিটি!’ ফাহিম ঘুরিয়ে প্রশংসা করল সিমির।
সিমি ভেবেছিল ভাবুক টাইপের আনরোমান্টিক এই মানুষটার চোখে সিমির এত কষ্ট করে সেজে আসাটা ধরা পড়বে না। সেটা ভেবে কিঞ্চিৎ লজ্জা পেল সিমি। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘ইউ লুক হ্যান্ডসাম টু।’
‘থ্যাংকস।’ তারপর হেসে দিয়ে বলল ফাহিম, ‘আচ্ছা আমরা এত ফরমাল কথা বলছি কেন? মনে হচ্ছে অপরিচিত কেউ—প্রথম দেখা হলে যেমন হয়।’
সিমিও হঠাৎ বুঝতে পারল ব্যাপারটা, কেমন একটা জড়তা ওদের কথায়। সে হেসে দিয়ে বলল, ‘প্রথম দেখাই তো!’
‘হ্যাঁ তা অবশ্য ঠিক। তবে ফোনে, চ্যাট রুমে আর মেইলে বরং আমরা বেশি স্পনটেনিয়াস, তাই না?’
‘হুম।’ সিমি মাথা নেড়ে মেনে নিল। ‘তোমার মা কেমন আছেন?’ জিজ্ঞেস করল সে।
‘আমাকে দেখে অনেকটাই সুস্থ হয়ে গেছেন তিনি। আমি তো ভেবেছিলাম আমাকে চিনবেনই না। ভয়ে ভয়ে আমি জানতে চাইলাম, মা বলো তো আমি কে? মা আমার মাথাটা তার বুকে টেনে নিয়ে বললেন, আমার ফাহিম!’ বলতে বলতে ফাহিমের চোখ কেমন সিক্ত হয়ে এলো।
সিমি অবাক চোখে দেখল ফাহিমকে। তারপর আলতো করে তার হাতটি বাড়িয়ে ধরল ফাহিমের হাত। মৃদু চাপ দিয়ে আশ্বস্ত করল তাকে। ভাবটা এমন যে, এখন তুমি এসেছ, সব ঠিক হয়ে যাবে।
ফাহিমের অসম্ভব ভালো লাগল ব্যাপারটি। তাঁর মনে হলো, এই যে এতটুকু ছোঁয়া—অথচ কী তার শক্তি। ভালোবাসা কি নিছক একটি ছক ভাঙ্গা সম্পর্কের বাইরে শুধুই বন্ধুত্ব আর ভালোলাগা হয়েই থেকে যাবে নাকি কেউ বুঝবে তার মনের কথা!
ফাহিম বলল, ‘আমরা কি এখানে দাঁড়িয়েই কথা বলব, নাকি কোথাও যাব?’
‘কোথায় যেতে চাও?’ ফাহিমের হাত ধরেই তাঁর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল সিমি।
‘তোমার শহরে এসেছি, তুমি যেখানে নিয়ে যাবে—সেখানেই যাব। আমি তোমারে সঁপেছি হাত, ওগো স্বদেশিনী…’ বলেই হেসে ফেলল ফাহিম।
সিমি হাসতে হাসতে বলল, ‘শহরটা বুঝি আমার একার, তোমার নয়?’
‘অবশ্যই আমারো।’
সিমি একটা রিক্সা ডেকে ফাহিমকে নিয়ে ঝটপট উঠে পড়ল। একটা মিষ্টি হালকা গন্ধ ভেসে এলো। ফাহিম কিছুটা আড়ষ্ট হয়ে বসল। সিমি খুব সহজ ভঙ্গিতে বলল, ‘এমন শক্ত হয়ে আছ কেন? রিল্যাক্স হয়ে বসো। আচ্ছা, তোমার কি ভয় লাগছে?’
ফাহিম বিব্রত কণ্ঠে বলল, ‘আরে কী বলো, ভয় লাগবে কেন? তোমার কি ধারণা আমি রিক্সায় কোনোদিন চড়ি নি?’
‘রিক্সায় চরেছ, কিন্তু আমার পাশে তো বসো নি।’ সিমির ঠোটে দুষ্টুমির হাসি।
ফাহিম কিছু একটা বলতে যেয়েও বলল না।
সিমি চোখ নাড়িয়ে তাকাল ফাহিমের দিকে শুধু। কিন্তু কিছু আর বলল না। খুব সহজভাবে ফাহিমের হাতটা ধরল আবার। ফাহিম নিজেকে যতটা সম্ভব সহজ রাখার চেষ্টা করল। অল্প সময়ের মধ্যে ওদের রিক্সা ভ্রমণ শেষ হয়ে গেল। সিমির অফিসের খুব কাছেই, ওর পরিচিত একটা রেস্টুরেন্টের সামনে এসে নেমে পড়ল ওরা দুজন।
রেস্টুরেন্টে ঢুকে একটা কোণার টেবিলে বসে সিমি জানতে চাইল, ‘তোমার প্ল্যান কী?’
‘আপাতত তোমার যা প্ল্যান আমারো তাই প্ল্যান।’ ফাহিম মেনু চেক করতে করতে বলল।
‘আচ্ছা ঠিক আছে। প্ল্যান তাহলে আমিই রেডি করে ফেলব। এখন বলো কী খাবে?’
‘তুমি যা খাবে, আমিও তাই খাবো।’
‘মানে কী?’ সিমি ভ্রূ কুঁচকে তাকাল।
‘একবার তো বলেছিই—আই অ্যাম ইন ইয়োর হ্যান্ড। তুমি যা চাইবে, যেভাবে চাইবে তাই হবে।’
‘যা চাইব, যেভাবে চাইব তাই হবে?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভেবে বলছ?’
‘হ্যাঁ।’
সিমি দুষ্টুমির হাসি দিল। হাসতে হাসতে ওয়েটারকে ডেকে ওর পছন্দের কিছু খাবার অর্ডার করল।
খাবার পরিবেশন করার আগেই ফাহিম একটা ছোট গিফট ব্যাগ বের করে এগিয়ে দিল সিমির দিকে। সিমি অবাক হয়ে বলল, ‘এটা কী?’
‘তেমন কিছু না।’
‘খুলে দেখব?’
‘হ্যাঁ দেখতে পারো।’
সিমি গিফট প্যাক খুলল। একটা Juicy Couture ক্লাসিক কালেকশন পারফিউম, বিভিন্ন শেডের এক সেট ম্যাক লিপস্টিক, এক প্যাকেট ডার্ক চকোলেট, এক সেট পিপার স্প্রে আর অনেকগুলো বিভিন্ন ব্রান্ডের পারফিউমের ছোট ছোট শিশির স্যাম্পল। সিমি উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘ওয়াও, গ্রেট! থ্যাংক ইউ ফাহিম। থ্যাংক ইউ সো মাচ।’
‘তোমার পছন্দ হয়েছে?’
‘হবে না?’ বলেই সিমি প্রতিটা আইটেম নেড়েচেড়ে দেখল আর ক্ষণে ক্ষণে তাকাল ফাহিমের দিকে, হৃদয় উষ্ণ করা দৃষ্টিতে।
সিমির উচ্ছ্বাস দেখে ভীষণ ভালো লাগল ফাহিমের।
‘আচ্ছা তুমি পিপার স্প্রে এনেছ কেন?’ অবাক দৃষ্টিতে বলল সিমি।
‘তুমি একদিন বলেছিলে, কাজ থেকে বের হতে দেরী হলে একা একা বাসায় ফিরতে ভয় লাগে। তাই তোমার সেইফটির কথা ভেবেই এটা আনলাম। প্রয়োজনে ব্যবহার করবে। আত্মরক্ষার জন্যে এটা খুবই কার্যকরী অস্ত্র বলতে পারো।’
প্রশংসাসূচক কণ্ঠে বলল সিমি, ‘ইউ আর সাচ অ্যা থটফুল পারসন, ফাহিম। আই মাস্ট সে।’
‘থ্যাংক ইউ।’
খাওয়া দাওয়া সেরে ওরা যখন রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে এলো তখন ঢাকা শহরের চারিদিকে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আকাশের এক কোণ লালচে হয়ে আছে। শীতের শুরু। সন্ধ্যা নামতেই হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে রাজধানী শহর।
অনেকক্ষণ অপেক্ষা করেও ওরা কোনো রিক্সা কিংবা সিএনজি পেল না। অগত্যা হাঁটা শুরু করল, মেইন রাস্তার মোড় পর্যন্ত হেঁটে যেতে হবে। অনেকটা পথ। তাতে অবশ্য কোনো সমস্যা হলো না। এই সময়ে পাশাপাশি হাঁটার থেকে তো আর ভালো কোনো মুহূর্ত হতে পারে না।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৬)
with
no comment

