Opekkha

অপেক্ষা (পর্ব-১)

সায়াহ্নের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে খুব দ্রুত। চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। দমকা বাতাস বইতে শুরু করেছে। যে কোনো সময় শুরু হবে ঝমঝম বৃষ্টি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শহর শিকাগোর একটি উপশহরের লেক সংলগ্ন দোতলা, বাংলো টাইপের সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি বাড়ির ড্রাইভওয়েতে একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করল যে ব্যক্তিটি তার নাম শরীফুল আলম।
শরীফুল আলম আমেরিকায় আছে গত প্রায় বিশ বছর ধরে। পেশায় একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার। সময়ের ব্যবধানে ইতিমধ্যেই জীবন থেকে সাতচল্লিশটি বসন্ত চলে গেছে। দীর্ঘদিন একাকীত্বের জীবন কাটিয়ে সে অনুধাবন করে, তার জীবনে এখন একজন সঙ্গী দরকার। অবশেষে দেশে গিয়ে শরীফ বিয়ে করেছে চব্বিশ বছর বয়সের রুবিনাকে।
রুবিনা আমেরিকায় এসেছে মাত্র চার মাস হলো। এখনো সবকিছু নতুন তার কাছে। তবে স্মার্ট মেয়ে রুবিনা অতি দ্রুত সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে বাতাসের বেগ বাড়তে থাকল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘন ঘন। মাষ্টার বেডরুমের বিছানায় বসে রুবিনা টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। টিভিতে ঝড়ের সতর্কবাণী দিচ্ছে। পাশে শুয়ে আছে শরীফ, নির্বিকার। খবরে তার কোন আগ্রহ নেই। রুবিনা তার দিকে ঘুরে ভীত কণ্ঠে বলল, ‘আমার ভয় লাগছে।’
খোলা জানলা দিয়ে হাওয়া ঢুকে পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছিল। শরীফ উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। তারপর জানালা বন্ধ করে এসে আবার শুয়ে পড়ল। রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই। টর্নেডো, টুইস্টার এগুলো কিছুই না। সামান্য বাতাস বইছে আর তাতেই টিভিতে একেবারে সতর্কবাণীর ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। সবকিছুতেই এদের বাড়াবাড়ি।’
শরীফ রিমোটটা নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর বেডসাইড টেবিলে রাখা এলার্ম ঘড়িতে সকাল ছ’টায় এলার্ম সেট করে রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এসো ঘুমিয়ে পড়ি।’ বলেই শরীফ বেডলাইটের সুইচ বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল এবং প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল।
রুবিনার চোখে ঘুম নেই। সে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে। ডিজিটাল ঘড়িতে সময় জ্বলজ্বল করছে। রাত মাত্র দশটা।
আমেরিকায় আসার পর থেকেই রুবিনার ঘুমের সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমে ভেবেছিল রাত দিনের পার্থক্য তাই এমন হচ্ছে। কিন্তু একদিন একদিন করে চার মাস হয়ে গেল, রুবিনা ঘুমাতে পারে না। রাত যখন প্রায় শেষ হতে থাকে তখন তার অবসাদ গ্রন্থ ক্লান্ত শরীর ঘুমে আক্রান্ত হয়, আর ঠিক তখনই ঘড়ির এলার্ম বেজে উঠে। শরীফের অফিসে যাবার সময় হয়ে যায়।
রুবিনা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত এগারটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। গত প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে সে বিছানায় বসে রয়েছে। অনেকবার শরীফের দিকে তাকিয়ে দেখেছে, স্বামীর সাইনবোর্ড ধারী মানুষটি কেমন নির্লিপ্ত ভাবে ঘুমাচ্ছে। সে উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। বাইরে তাকিয়ে দেখল ঝড়ের তীব্রতা অনেকটা কমে গেছে। তবে বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। রুবিনা তাকিয়ে থাকে অকম্পিত দৃষ্টিতে সমুখপানে রাতের প্রহরজুড়ে। জীবনের মোড় কীভাবে ঘুরে যায় তা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। রুবিনাও পারেনি।
কত সময় পাড় হয়েছে সে নিজেও জানেনা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ঘড়ির দিকে। ভোর পাঁচটা। ঝরের তীব্রতা আরো খানিকটা কমে গেছে। বৃষ্টিও থেমে গেছে অনেকক্ষণ হয়। রুবিনা ধীর পায়ে শরীরটাকে প্রায় জোড় করেই টেনে নিয়ে গেল বিছানায়। নরম বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে আস্তে করে ব্লাঙ্কেটের খানিকটা টেনে নিল শরীফের গা থেকে। তারপর একসময় ক্লান্তিতে শিথিল হয়ে এলো তার শরীর। চোখ দুটি বন্ধ হয়ে এলো ঘুমে।
ঘণ্টার কাঁটা সকাল ছ’টায় স্পর্শ করতেই তীক্ষ্ণ শব্দে এলার্ম বেজে উঠে। শরীফ চোখ না খুলেই ক্ষিপ্রতার সাথে এলার্মে সুইচ বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে অলসতা কাটানোর চেষ্টা করে। তারপর বিছানা ছেড়ে হাই দিতে দিতে দ্রুত ঢুকে পড়ে মাষ্টার বেডরুমে লাগোয়া বাথরুমের ভিতর। ঢুকেই বেসিনের কল ছেড়ে দেয় সে। শব্দ করে মুখ ধোয়। শুকিয়ে যাওয়া কাশি উপরে টেনে নিলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক সেইরকম একধরনের অদ্ভুত শব্দ করে শরীফ। শেভ করার সময় রেজার দিয়ে বেসিনে খট খট করে রেজার পরিষ্কার করে। সবশেষে টয়লেটের কাজ শেষ করে ফ্ল্যাশ টেনে শরীফ বাথরুম থেকে বেড় হয়ে দেখে রুবিনা তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। এই রুটিনেই শুরু হয় প্রতিটা সকাল। আজকেও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না।
বাথরুম থেকে বের হয়ে একটু লজ্জা পেয়ে শরীফ বলল, ‘এইরে দিলাম বুঝি ঘুম ভাঙ্গিয়ে।’
‘সে তো রোজই দাও।’ বলতে বলতে ব্লাঙ্কেট সরিয়ে উঠে বসল রুবিনা।
‘তুমি আবার উঠছ কেন? তোমাকে এখন উঠতে হবে না। সকালে ঘুমটা হচ্ছে মেয়েদের বিউটি স্লিপ। শরীরটা বরং একটু পুরুক।’
রুবিনা কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বসে থাকল।
শরীফ অফিসের পোশাক পড়তে পড়তে বলল, ‘শরীরটা একটু চাঙ্গা হওয়া দরকার। দেশে থাকতে কি খাওয়া দাওয়া করতে না নাকি? ডায়েট করে তো শরীরের বারোটা বাজিয়েছ।’
রুবিনা কোন উত্তর না দিয়ে ঢুকে পড়ল বাথরুমে। কিছুক্ষণ আয়নায় দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখল। তারপর সেখান থেকেই উত্তর দেল, ‘আমার শরীরের তুমি খারাপ দেখলে কোথায়?’
‘আরে মেয়েদের শরীর একটু নাদুস-নুদুস না হলে কি ভাল লাগে? একটু হালকা মেদ থাকলে শরীরের সৌন্দর্য অন্যরকম হয়।’
রুবিনা বাথরুম থেকে বেড় হয়ে এসে আবার ব্লাঙ্কেট টেনে শুয়ে পড়ল।
শরীফ বলে চলল, ‘আজকাল বাংলাদেশের মেয়েরা না খেয়ে যে কি সব করে ডায়েট ফায়েট করে। সিস্টেমের বারোটা বাজিয়ে ফেলে। আর এদেশের মেয়েদেরকে দেখ, নিয়মিত জিমে যায়, এক্সারসাইজ করে। না খেয়ে শুকনো কাঠি হয়ে থাকে না। এতে গ্ল্যামার নষ্ট হয়ে যায়।’
রুবিনা চুপচাপ শরীফের বক্তৃতা শুনতে থাকে। শরীফ তার কাজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে কথা শেষ করে, ‘এনিওয়ে, আই বেটার গেট গোয়িং। আই নিড টু বিট দ্য ট্রাফিক।’ বলেই সে দ্রুত বেড় হয়ে গেল।
রুবিনা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শরীফের গমন পথের দিকে।
ঘুম থেকে একটু দেরী করেই উঠে রুবিনা। সকালের নাস্তা শেষে তেমন কিছু করারও থাকে না তার। বেশীর ভাগ সময় বসে থাকে লিভিং রুমে টিভি সেটের সামনে। শরীফ বলেছে টিভি দেখে ইংরেজি শিখতে। কিন্তু টিভি আর কতক্ষণই বা ভাল লাগে। চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে এক সময় টিভি বন্ধ করে দেয় সে।
প্রতিদিন দুপুরে মেইল বক্স খুলে চিঠি আনা রুবিনার প্রিয় কাজের একটি। সারাদিনে এই একটি কাজকেই তার সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। চিঠিগুলো এনে খুব আগ্রহ নিয়ে একটার পর একটা খাম সে খুলে দেখে।
দুপুর ১২টার মধ্যেই সাধারণত মেইলম্যান মেইল ডেলিভারি দিয়ে যায়। তাই লাঞ্চের আগেই রুবিনা গেল বাসার সামনের ড্রাইভওয়ে সংলগ্ন মেইল বক্স থেকে চিঠি আনতে। মেইল বক্স খুলে একগাদা এনভেলাপ বের করে দ্রুত চোখ বুলায় প্রেরকের ঠিকানার দিকে। না নেই। আজো আসেনি তার প্রত্যাশিত সেই চিঠি। মুঠো ভর্তি করে চিঠি গুলো নিয়ে সে ভিতরে আসল। সোফায় বসে আবারো একটি পর একটি ঠিকানা দেখল। তারপর হতাশ হয়ে বসে থাকল।
হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠল। ফোনের শব্দে রুবিনা সম্বিত ফিরে পায়। অলস ভঙ্গিতে সাইড টেবিলে রাখা ফোনটার দিকে তাকাল। ধরতে ইচ্ছে করছে না। ফোন বেজেই চলেছে। উঠে গিয়ে কর্ডলেস ফোনটি ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘হ্যালো?’
‘মেইল চেক করেছো?’ ফোনের ভেতর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল। কণ্ঠটি রুবিনার চেনা। তবে সেটি শরীফের কণ্ঠ নয়।
‘করেছি। প্রতিদিনই করছি। আজকেও আসেনি। চার মাস হয়ে গেল। কিছু বুঝতে পারছি না।’
‘ইমিগ্রেশন অফিসে কল দিয়ে একটা খোজ নাও না বাবা। অনলাইনেও তো চেক করতে পারো। তোমার তো দেখি কোন আগ্রহই নেই’
‘আগ্রহ নেই মানে? কি বলছো তুমি? একটি রাতও আমি ঘুমতে পারছি না টেনশনে আর তুমি কিনা বলছো আমার কোন আগ্রহ নেই? আশ্চর্য!’ রুবিনার কণ্ঠে রাগ ঝরে পড়ল।
‘আহা, এত রিয়্যাক্ট করছো কেন? এক কাজ করো না প্লীজ, কেস নাম্বারটা নিয়ে একটা ফোন করে দেখো।’
‘দেখি।’ বলেই ফোন কেটে দিল রুবিনা।
শরীফের সাথে রুবিনার কথাবার্তা তেমন একটা হয় না। সামান্য যেটুকু হয় তা ঐ রাতে খাবার টেবিলে। রুবিনার মনটা আজ অস্থির। খেতে ইচ্ছে করছে না। প্লেটে খাবার নিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করছে, মুখে দিচ্ছে না।
শরীফ সেটা লক্ষ্য করে বলল, ‘কি ব্যাপার খাচ্ছ না যে?’
‘খেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘না খেলে তো চলবে না। তোমার শরীরের যা অবস্থা!’
রুবিনা কিছুটা ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, কার্ডটা এখনো আসছে না কেন? চার মাস হয়ে গেল আমি এসেছি। তুমি না বললে এক-দেড় মাসের মধ্যেই চলে আসবে?’
‘এত অস্থির হচ্ছো কেন? চলে আসবে। আজকাল সবকিছুতেই সময় লাগে। যা কড়াকড়ি অবস্থা।’
রুবিনা কোন কথা বলল না। চুপচাপ খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকল।
শরীফ খেতে খেতেই বলল, ‘তাছাড়া তুমি তো আর জব খুঁজছো না যে কার্ড ছাড়া চলবে না। আর যদি কোন কারণে প্রয়োজন পড়েই, পাসপোর্ট দেখালেই চলবে। পাসপোর্টে এলিয়েন নাম্বার স্ট্যাম্পড করা আছে, কাজেই কোন সমস্যা হবে না।’
এরপর কথাবার্তা আর এগোয় না। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে রুবিনা উঠে গিয়ে বেসিনে প্লেট রেখে আবার ফিরে আসল। শরীফের খাওয়া তখনও শেষ হয়নি।
আবার একটি দীর্ঘ রাতের শুরু।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে, হাতের কিছু কাজ শেষ করে শরীফ বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।
রুবিনা টেবিল থেকে খাবার গুলো ফ্রিজে তুলে রেখে কিচেনে গেল। বেসিনে রাখা প্লেট ধুয়ে, রান্না ঘরটা পরিষ্কার করে সে যখন বিছানায় এলো, শরীফ তখন গভীর ঘুমে।
শরীফের কোন চাহিদা নেই। না শরীরের, না মনের। ওদের মধ্যে কোন ভালবাসার কথা হয় না। কোন ভালবাসাবাসি হয় না। এভাবেই কেটে যায় দিনগুলি। এভাবেই দুটি মানুষ বাস করছে একই ছাদের নীচে। আলাদা ভাবে।
আরেকটি দীর্ঘ রাত কাটাবার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ধীর পায়ে বিছানায় এসে ঘুমন্ত শরীফের পাশে আলতো করে শুয়ে পড়ল রুবিনা। তারপর সেই অসহ্যকর নীরবতা। নির্ঘুম রুবিনা অপলক তাকিয়ে থাকে শূন্যে, অন্ধকারে।
আরেকটা দিন চলে গেল জীবন থেকে। আরেকটা অপেক্ষার প্রহর নামছে।

পরের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-১)

গভীর রাতে ফরিদের ঘুম ভেঙে গেল।
অনেকক্ষণ থেকে কে যেন ক্ষীণকণ্ঠে ডেকে যাচ্ছে, ‘বাবা। বাবা।’ কণ্ঠটা খুব পরিচিত। ভিকি ভয় পেলে কিংবা কোনো সমস্যায় পড়লে এভাবে অনবরত ডাকতে থাকে। ভিকি ফরিদের ছেলে। বয়স পাঁচ বছর দশ মাস।
ফরিদ কান খাড়া করে অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কোনো রকম শব্দ শুনতে পেল না আর। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। পাশে তাকিয়ে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে মুখ ঢুকিয়ে জবুথবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত অভ্যাস তার—ঘরের উষ্ণতা যাই থাকুক অথবা প্রকৃতিতে যেই ঋতুই চলুক না কেন, তাতে তার কিছু যায় আসে না। মুখ না ঢেকে সে ঘুমবে না। মাথার উপর একটা ফ্যান ঘুরবে সারা বছর। কাঠফাটা গরমেও ফ্যান ঘুরে—কনকনে শীতেও। ফ্যান ছেড়ে দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ব্লাঙ্কেটে সারা শরীর মুড়িয়ে ঘুমানো তার অভ্যাস। এবং এ নিয়ে কোনো বিতর্কও করা যাবে না। কী যে এক যন্ত্রণা!
ফরিদ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এভাবে মুখ ঢেকে ঘুমাতে তোমার কষ্ট হয় না? নিশ্বাস নাও কীভাবে—দম তো বন্ধ হয়ে যাবার কথা।’
‘কেন আমার দম বন্ধ হয়ে গেলে বুঝি তুমি খুশি হও?’
‘কী মুস্কিল—আমি কি তাই বললাম নাকি?’
‘হয়েছে হয়েছে—মনে মনে তো তাই চাও! তুমি কি ভেবেছ, আমি কিছু বুঝি না?’
‘উফ—তুমি না…’ ফরিদ আর কথা বাড়ায় না। এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। ভালো রকম সমস্যা। সহজ ভাবে সে কোনো কথার উত্তর দিতে পারে না।
মাঝে মাঝে ফরিদ দুষ্টুমি করে বলে, ‘সুন্দরী মেয়েদের ঘুমলে আরো বেশি সুন্দর লাগে। এমন সুন্দর মুখখানি ঢেকে রেখে ঘুমলে কেমন হয় বলতো?’
‘আমি সুন্দরী?’
‘অবশ্যই সুন্দরী!’
‘তাহলে তোমাদের বাসার সবাই আমার পেছনে আমাকে পেত্নী বলে কেন—আমি কি ভূত?’
ফরিদ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিলির মুখের দিকে। সে কী বলবে, কী বলা উচিত, কিছুই বুঝতে পারে না। এটা ঠিক মিলির গায়ের রঙ সেই অর্থে ফর্সা নয়। তাই বলে তাকে কিছুতেই অসুন্দর বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের গড়পড়তা মানুষ—মেয়েদের গায়ের রঙ ফর্সা না হলে তাকে সুন্দরী বলে গণ্য করে না। কোনো মেয়ে দেখতে সুন্দর হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে—তার গায়ের রঙ ফর্সা হওয়া চাই।
ফরিদের অবশ্য এ ধরনের কোনো প্রেজুডিস নেই—ছিল না কোনো কালেও। তার চোখে মিলি যথেষ্টই সুন্দরী। গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হলেও—দেখতে সে অসাধারণ। হরিণের মতো কাটাকাটা চোখ—কী মায়া লেগে আছে সেই চোখে। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুল—যাকে বলে মেঘ বরন কন্যা। অসম্ভব সুন্দর অবয়ব তার। মেদহীন একহারা, আকর্ষণীয় দেহ কাঠামো। কিন্তু সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিলির ব্যক্তিত্ব—যার প্রেমেই ফরিদ ডুবে ছিল আকণ্ঠ। তাই তো পরিবারের সবার মতামতকে উপেক্ষা করে ফরিদ মিলিকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরিদের পরিবারের কেউই এই বিয়ে মেনে নেয়নি—তা নিয়ে অবশ্য তার মাথা ব্যথাও নেই। ফরিদের সাফ কথা—গায়ের রঙ দিয়ে কী হবে, যদি মানুষটার মনটাই ভালো না হয়। মিলি অত্যন্ত ভালো মনের একটা মানুষ। শুধু স্বভাবটাই একটু পাগলাটে।
‘বাবা। বাবা।’
ফরিদের নিরবচ্ছিন্ন চিন্তায় ছেদ পড়ল। মিলির কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলেই গিয়েছিল ভিকির কথা। একটা ছোট নিশ্বাস ফেলে সে উঠে বসল বিছানায়। ছেলেটা যে কেন এত ভয় পায়?
রাত কতটা গভীর কে জানে? ভিকির কথা ভেবে ফরিদের মনটা একটু খারাপই হলো। ছেলেটা অল্প কিছুদিন হলো একা একা থাকছে তার নিজের রুমে। মিলি সুন্দর করে ভিকির বেডরুম সাজিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে নীলের ছড়াছড়ি। বিছানা-কার্পেট-ওয়াল পেপার সব কিছুতেই নীলের ছোঁয়া। রুমের একপাশে ছোটবেলা থেকে জমানো ভিকির সব খেলনা গাড়ি।
এতদিন ভিকি তার মায়ের রুমেই ঘুমতো। মিলির মাস্টার বেডরুমে কিং সাইজ বেডের প্রায় পুরোটা নিয়েই ছিল তার বিচরণ। মিলি খাটের এক কোনায় চুপচাপ পড়ে থাকে। ভিকির জন্মের পর থেকেই মায়ের বিছানাতে ছেলের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে ফরিদ ঘুমায় অন্য আরেক রুমে। ভিকি পাঁচ বছরে পড়তেই ফরিদ বলে আসছিল মিলিকে—এখন থেকে ভিকিকে ওর নিজের রুমে থাকতে দেয়া উচিত। এখনই অভ্যাস না করলে পরে সমস্যা হয়ে যাবে। ছেলে একা একা ভয় পাবে—একা থাকতে চাইবে না।
‘তোমার মতলবটা কী? ছেলেকে সরিয়ে ওর জায়গা দখল করতে চাও তুমি?’ ভ্রু কুঁচকে মিলি বলল।
‘কী আশ্চর্য—আমি কী তাই বললাম নাকি?’
‘তো কী বললে?’
‘আমি বললাম…’
‘থাক—আর বোঝাতে হবে না।’ ফরিদকে থামিয়ে দিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি যা ভাবছ তা হবে না। রাতে আমার বিছানায় তুমি ঘুমাতে পারবে না—তোমাকে আলাদাই ঘুমাতে হবে।’
‘ফর হাউ লং?’
‘যতদিন না তোমার প্রেশার কুকার হুইসেল বাজানো বন্ধ হয়।’
ফরিদ তাকিয়ে থাকে অসহায় দৃষ্টিতে। এসব কী বলে মিলি?
‘আচ্ছা তোমাকে না কতদিন বলেছি একজন ডাক্তার দেখাও। তোমার স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে—কিন্তু তুমি তো আমার কথা শুনবা না। কী আর করা।’
ফরিদ কিছু একটা বলার আগেই মিলি আবার বলল, ‘ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেই তুমি যদি মনে করে থাকো—আমার বিছানায় পার্মানেন্ট জায়গা হবে তোমার, সেটি হবে মস্ত বড় ভুল। সেটি হচ্ছে না।’
‘তাই বলে…’
‘আমি সব কিছু স্যাক্রিফাইস করতে পারি—কিন্তু আমার ঘুমের সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আর সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো ফরিদ।’ ফরিদকে আবার থামিয়ে দিয়ে বলল মিলি।
কাজেই ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেও ফরিদের কপালের কোনো হেরফের হলো না। সে বহাল তবিয়তেই তার রুমেই স্থায়ী এখনো। তবে সপ্তাহে দু’একদিন এর ব্যতিক্রম হয়। ফরিদের ভাগ্যে তখন মিলির বিছানায় ঘুমানোর সুযোগ হয়। আজকের রাতটাও ছিল তেমনি এক বিশেষ রাত।
ফরিদ ঘুমানোর চেষ্টা করছিল—অনেকক্ষণ থেকে এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসছিল না। ঠিক তখনই মিলির টেক্সট মেসেজ এলো—কি ঘুম আসছে না? এসো ঘুমের ওষুধ দিয়ে দেই। আসার সময় চেক করে এসো ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
ফরিদ খুব ভালো করেই জানে এটা কীসের ইঙ্গিত। সে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত মিলির রুমের দিকে ছুটে গেল।
মিলিকে পাতলা নাইটিতে দেবীর মত লাগে। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ এত স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান যে সে আকর্ষণকে উপেক্ষা করা একেবারেই অসাধ্য। ফরিদ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মিলি বলল, ‘ভিকির রুম চেক করে এসেছ? ও ঘুমিয়েছে তো?’
‘নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকবে নাকি?’
‘তবু যাও—দেখে আসো।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল মিলি।
এমন পরিস্থিতি কেউ এমন শীতল ব্যবহার করতে পারে ফরিদের জানা ছিল না। তার মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ হলো কিন্তু সে জানে তর্ক করে লাভ নেই—অযথা সময় নষ্ট হবে। ফরিদ কথা না বাড়িয়ে দেখতে গেল ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
মিলির মাস্টার বেডরুম আর ফরিদের রুমের মাঝখানেই ভিকির রুম। সাথে একটা বাথরুম লাগোয়া—যেটা ফরিদ আর ভিকির রুমের ঠিক মাঝে। দু’রুম থেকেই দরজা আছে। দু’পাশ থেকেই ব্যবহার করা যায়। ফরিদ দেখল ভিকি কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তবুও সে তার বিছানার পাশে গিয়ে একবার দেখল। ভিকির ভারি নিঃশ্বাসের শব্দে ফরিদ নিশ্চিত হয়ে ফিরে গেল মিলির ঘরে।
এসে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়েছে। ইতিমধ্যে তার নিশ্বাসও ভারি হয়ে এসেছে। মিলি কি ঘুমিয়ে পড়ল—এত তাড়াতাড়ি? ফরিদ কী করবে? চলে যাবে তার রুমে নাকি মিলির ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়বে। ঘুমন্ত মানুষের সাথে কি এসব করা যায়—হোক না সে তার স্ত্রী। ফরিদ দ্বিধা নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
ফরিদের মনে পড়ল একদিনের কথা। ভিকিকে ঘুম পাড়িয়ে মিলি ফরিদের রুমে এসে বলল, ‘কী ব্যস্ত?’
ফরিদ একটা জরুরি রিপোর্ট রেডি করছিল—পরদিন সকালে ওর মিটিংর জন্য। সে মাথা তুলে তাকাল।
মিলি বলল, ‘কাজ শেষ করে এসো। আমি জেগে থাকব।’
‘তুমি জেগে থাকবে?’ একটু মৃদু হেসে অবাক কণ্ঠে বলল ফরিদ।
‘হ্যাঁ থাকব।’
‘আচ্ছা যাও আসছি। ফিফটিন মিনিটস।’
হাতের কাজ শেষ না করেই ঠিক বারো মিনিটের মাথায় ফরিদ মিলির ঘরে যেয়ে দেখল—মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে। যথারীতি নিশ্বাস ভারি। মুখটা দেখা গেলেও বোঝা যেত সে ঘুমিয়েছে কিনা, কিন্তু তারও কোনো উপায় নেই।

পরের পর্ব

-Shei-Coffe-Shop

সেই কফি শপ (পর্ব-১)

গভীর রাতে ফরিদের ঘুম ভেঙে গেল।
অনেকক্ষণ থেকে কে যেন ক্ষীণকণ্ঠে ডেকে যাচ্ছে, ‘বাবা। বাবা।’ কণ্ঠটা খুব পরিচিত। ভিকি ভয় পেলে কিংবা কোনো সমস্যায় পড়লে এভাবে অনবরত ডাকতে থাকে। ভিকি ফরিদের ছেলে। বয়স পাঁচ বছর দশ মাস।
ফরিদ কান খাড়া করে অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কোনো রকম শব্দ শুনতে পেল না আর। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। পাশে তাকিয়ে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে মুখ ঢুকিয়ে জবুথবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত অভ্যাস তার—ঘরের উষ্ণতা যাই থাকুক অথবা প্রকৃতিতে যেই ঋতুই চলুক না কেন, তাতে তার কিছু যায় আসে না। মুখ না ঢেকে সে ঘুমবে না। মাথার উপর একটা ফ্যান ঘুরবে সারা বছর। কাঠফাটা গরমেও ফ্যান ঘুরে—কনকনে শীতেও। ফ্যান ছেড়ে দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ব্লাঙ্কেটে সারা শরীর মুড়িয়ে ঘুমানো তার অভ্যাস। এবং এ নিয়ে কোনো বিতর্কও করা যাবে না। কী যে এক যন্ত্রণা!
ফরিদ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এভাবে মুখ ঢেকে ঘুমাতে তোমার কষ্ট হয় না? নিশ্বাস নাও কীভাবে—দম তো বন্ধ হয়ে যাবার কথা।’
‘কেন আমার দম বন্ধ হয়ে গেলে বুঝি তুমি খুশি হও?’
‘কী মুস্কিল—আমি কি তাই বললাম নাকি?’
‘হয়েছে হয়েছে—মনে মনে তো তাই চাও! তুমি কি ভেবেছ, আমি কিছু বুঝি না?’
‘উফ—তুমি না…’ ফরিদ আর কথা বাড়ায় না। এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। ভালো রকম সমস্যা। সহজ ভাবে সে কোনো কথার উত্তর দিতে পারে না।
মাঝে মাঝে ফরিদ দুষ্টুমি করে বলে, ‘সুন্দরী মেয়েদের ঘুমলে আরো বেশি সুন্দর লাগে। এমন সুন্দর মুখখানি ঢেকে রেখে ঘুমলে কেমন হয় বলতো?’
‘আমি সুন্দরী?’
‘অবশ্যই সুন্দরী!’
‘তাহলে তোমাদের বাসার সবাই আমার পেছনে আমাকে পেত্নী বলে কেন—আমি কি ভূত?’
ফরিদ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিলির মুখের দিকে। সে কী বলবে, কী বলা উচিত, কিছুই বুঝতে পারে না। এটা ঠিক মিলির গায়ের রঙ সেই অর্থে ফর্সা নয়। তাই বলে তাকে কিছুতেই অসুন্দর বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের গড়পড়তা মানুষ—মেয়েদের গায়ের রঙ ফর্সা না হলে তাকে সুন্দরী বলে গণ্য করে না। কোনো মেয়ে দেখতে সুন্দর হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে—তার গায়ের রঙ ফর্সা হওয়া চাই।
ফরিদের অবশ্য এ ধরনের কোনো প্রেজুডিস নেই—ছিল না কোনো কালেও। তার চোখে মিলি যথেষ্টই সুন্দরী। গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হলেও—দেখতে সে অসাধারণ। হরিণের মতো কাটাকাটা চোখ—কী মায়া লেগে আছে সেই চোখে। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুল—যাকে বলে মেঘ বরন কন্যা। অসম্ভব সুন্দর অবয়ব তার। মেদহীন একহারা, আকর্ষণীয় দেহ কাঠামো। কিন্তু সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিলির ব্যক্তিত্ব—যার প্রেমেই ফরিদ ডুবে ছিল আকণ্ঠ। তাই তো পরিবারের সবার মতামতকে উপেক্ষা করে ফরিদ মিলিকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরিদের পরিবারের কেউই এই বিয়ে মেনে নেয়নি—তা নিয়ে অবশ্য তার মাথা ব্যথাও নেই। ফরিদের সাফ কথা—গায়ের রঙ দিয়ে কী হবে, যদি মানুষটার মনটাই ভালো না হয়। মিলি অত্যন্ত ভালো মনের একটা মানুষ। শুধু স্বভাবটাই একটু পাগলাটে।
‘বাবা। বাবা।’
ফরিদের নিরবচ্ছিন্ন চিন্তায় ছেদ পড়ল। মিলির কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলেই গিয়েছিল ভিকির কথা। একটা ছোট নিশ্বাস ফেলে সে উঠে বসল বিছানায়। ছেলেটা যে কেন এত ভয় পায়?
রাত কতটা গভীর কে জানে? ভিকির কথা ভেবে ফরিদের মনটা একটু খারাপই হলো। ছেলেটা অল্প কিছুদিন হলো একা একা থাকছে তার নিজের রুমে। মিলি সুন্দর করে ভিকির বেডরুম সাজিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে নীলের ছড়াছড়ি। বিছানা-কার্পেট-ওয়াল পেপার সব কিছুতেই নীলের ছোঁয়া। রুমের একপাশে ছোটবেলা থেকে জমানো ভিকির সব খেলনা গাড়ি।
এতদিন ভিকি তার মায়ের রুমেই ঘুমতো। মিলির মাস্টার বেডরুমে কিং সাইজ বেডের প্রায় পুরোটা নিয়েই ছিল তার বিচরণ। মিলি খাটের এক কোনায় চুপচাপ পড়ে থাকে। ভিকির জন্মের পর থেকেই মায়ের বিছানাতে ছেলের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে ফরিদ ঘুমায় অন্য আরেক রুমে। ভিকি পাঁচ বছরে পড়তেই ফরিদ বলে আসছিল মিলিকে—এখন থেকে ভিকিকে ওর নিজের রুমে থাকতে দেয়া উচিত। এখনই অভ্যাস না করলে পরে সমস্যা হয়ে যাবে। ছেলে একা একা ভয় পাবে—একা থাকতে চাইবে না।
‘তোমার মতলবটা কী? ছেলেকে সরিয়ে ওর জায়গা দখল করতে চাও তুমি?’ ভ্রু কুঁচকে মিলি বলল।
‘কী আশ্চর্য—আমি কী তাই বললাম নাকি?’
‘তো কী বললে?’
‘আমি বললাম…’
‘থাক—আর বোঝাতে হবে না।’ ফরিদকে থামিয়ে দিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি যা ভাবছ তা হবে না। রাতে আমার বিছানায় তুমি ঘুমাতে পারবে না—তোমাকে আলাদাই ঘুমাতে হবে।’
‘ফর হাউ লং?’
‘যতদিন না তোমার প্রেশার কুকার হুইসেল বাজানো বন্ধ হয়।’
ফরিদ তাকিয়ে থাকে অসহায় দৃষ্টিতে। এসব কী বলে মিলি?
‘আচ্ছা তোমাকে না কতদিন বলেছি একজন ডাক্তার দেখাও। তোমার স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে—কিন্তু তুমি তো আমার কথা শুনবা না। কী আর করা।’
ফরিদ কিছু একটা বলার আগেই মিলি আবার বলল, ‘ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেই তুমি যদি মনে করে থাকো—আমার বিছানায় পার্মানেন্ট জায়গা হবে তোমার, সেটি হবে মস্ত বড় ভুল। সেটি হচ্ছে না।’
‘তাই বলে…’
‘আমি সব কিছু স্যাক্রিফাইস করতে পারি—কিন্তু আমার ঘুমের সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আর সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো ফরিদ।’ ফরিদকে আবার থামিয়ে দিয়ে বলল মিলি।
কাজেই ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেও ফরিদের কপালের কোনো হেরফের হলো না। সে বহাল তবিয়তেই তার রুমেই স্থায়ী এখনো। তবে সপ্তাহে দু’একদিন এর ব্যতিক্রম হয়। ফরিদের ভাগ্যে তখন মিলির বিছানায় ঘুমানোর সুযোগ হয়। আজকের রাতটাও ছিল তেমনি এক বিশেষ রাত।
ফরিদ ঘুমানোর চেষ্টা করছিল—অনেকক্ষণ থেকে এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসছিল না। ঠিক তখনই মিলির টেক্সট মেসেজ এলো—কি ঘুম আসছে না? এসো ঘুমের ওষুধ দিয়ে দেই। আসার সময় চেক করে এসো ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
ফরিদ খুব ভালো করেই জানে এটা কীসের ইঙ্গিত। সে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত মিলির রুমের দিকে ছুটে গেল।
মিলিকে পাতলা নাইটিতে দেবীর মত লাগে। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ এত স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান যে সে আকর্ষণকে উপেক্ষা করা একেবারেই অসাধ্য। ফরিদ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মিলি বলল, ‘ভিকির রুম চেক করে এসেছ? ও ঘুমিয়েছে তো?’
‘নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকবে নাকি?’
‘তবু যাও—দেখে আসো।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল মিলি।
এমন পরিস্থিতি কেউ এমন শীতল ব্যবহার করতে পারে ফরিদের জানা ছিল না। তার মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ হলো কিন্তু সে জানে তর্ক করে লাভ নেই—অযথা সময় নষ্ট হবে। ফরিদ কথা না বাড়িয়ে দেখতে গেল ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
মিলির মাস্টার বেডরুম আর ফরিদের রুমের মাঝখানেই ভিকির রুম। সাথে একটা বাথরুম লাগোয়া—যেটা ফরিদ আর ভিকির রুমের ঠিক মাঝে। দু’রুম থেকেই দরজা আছে। দু’পাশ থেকেই ব্যবহার করা যায়। ফরিদ দেখল ভিকি কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তবুও সে তার বিছানার পাশে গিয়ে একবার দেখল। ভিকির ভারি নিঃশ্বাসের শব্দে ফরিদ নিশ্চিত হয়ে ফিরে গেল মিলির ঘরে।
এসে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়েছে। ইতিমধ্যে তার নিশ্বাসও ভারি হয়ে এসেছে। মিলি কি ঘুমিয়ে পড়ল—এত তাড়াতাড়ি? ফরিদ কী করবে? চলে যাবে তার রুমে নাকি মিলির ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়বে। ঘুমন্ত মানুষের সাথে কি এসব করা যায়—হোক না সে তার স্ত্রী। ফরিদ দ্বিধা নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
ফরিদের মনে পড়ল একদিনের কথা। ভিকিকে ঘুম পাড়িয়ে মিলি ফরিদের রুমে এসে বলল, ‘কী ব্যস্ত?’
ফরিদ একটা জরুরি রিপোর্ট রেডি করছিল—পরদিন সকালে ওর মিটিংর জন্য। সে মাথা তুলে তাকাল।
মিলি বলল, ‘কাজ শেষ করে এসো। আমি জেগে থাকব।’
‘তুমি জেগে থাকবে?’ একটু মৃদু হেসে অবাক কণ্ঠে বলল ফরিদ।
‘হ্যাঁ থাকব।’
‘আচ্ছা যাও আসছি। ফিফটিন মিনিটস।’
হাতের কাজ শেষ না করেই ঠিক বারো মিনিটের মাথায় ফরিদ মিলির ঘরে যেয়ে দেখল—মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে। যথারীতি নিশ্বাস ভারি। মুখটা দেখা গেলেও বোঝা যেত সে ঘুমিয়েছে কিনা, কিন্তু তারও কোনো উপায় নেই।

পরের পর্ব

Abinashi-Shabdo-Rashi

অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-১)

[ভূমিকা: ‘অবিনাশী শব্দরাশি’ মূলত একটি কবিতার সংকলন। বারো তেরো বছর আগে ফিতার ক্যাসেটে আবৃত্তির আকারে বের হয়েছিল। আমি কবিতার মানুষ নই। তবুও কবিতাগুলি তখন ভালো লেগেছিল। এরপর ফুয়াদের কম্পোজিশনে নওরীন একটা গান করেছিল যার শিরোনাম ছিল ‘অবিনাশী শব্দরাশি’। এভাবেই নামটি এক সময় মাথায় গেঁথে যায়। নামটি সেখান থেকেই ধার করা।
নতুন গল্প শুরু করলেও শেষ করতে পারছি না। নিজের উপরেই বিরক্ত লাগছে। কী আর করা—আপাতত পুরনো গল্প দিয়েই চালিয়ে দেই। অনেকেই হয়ত গল্পটি আগে পড়েছেন তবে এই গ্রুপে প্রথম!
এবার ডালাস নয় বরং হাযির হলাম আমেরিকার সানসাইন স্টেট নামে পরিচিত রৌদ্রকরোজ্জ্বল ফ্লোরিডার গল্প নিয়ে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। সবাইকে আগাম ধন্যবাদ।]


‘এই শোন, আজ কিন্তু তুমি আমাকে বাইরে নিয়ে যাবে। কফিটা খেয়ে রেডি হয়ে নাও।’ কফির কাপটা শোভনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল নীলিমা।
ছুটির দিনে সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি করা শোভনের স্বভাব। শোভন উঠে বসে কফির কাপ হাতে নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘আমি যেতে পারবো না। আমার কাজ আছে।’
‘তোমার তো সব সময়ই কাজ থাকে।’ একটু কপট রাগ করে নীলিমা বলল, ‘ঠিক আছে না গেলে, গ্রোসারিটা অন্তত করে নিয়ে আসি চলো।’
‘বললাম তো যেতে পারবো না। আমার অন্য কাজ আছে। তুমি একাই যাও। তাছাড়া তোমার ঐ বাংলাদেশী মাছ তরকারি কিনে আনা কিংবা খাওয়া কোনোটার ইচ্ছেই আমার নেই।’
শোভনের এমন কথায় নীলিমার মনটা বিষণ্ণ হলো। কিন্তু সে কিছু বলল না।
‘কী যে রান্না করো না, সারা এপার্টমেন্ট গন্ধ হয়ে যায়। বাইরে বেরুলে সবাই এমন ভাবে তাকায় যেন মনে হয় আমরা অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছি।’ শোভন কটাক্ষ করে বলল।
নীলিমা আহত দৃষ্টিতে তাকাল শোভনের দিকে। তার মুখ লাল হয়ে গেল।
‘ওসব স্পাইস এন্ড স্মেলি ফুড রান্না না করলে কি হয় না? প্যাকেট ফুড মাইক্রোওয়েভে গরম করে খেয়ে নিলেই তো হয়। রান্নার ঝামেলা নেই, ক্লিনিং এর ঝামেলা নেই। গন্ধও ছড়ায় না। আমেরিকায় এসেছো, একটু আমেরিকান হও।’
‘দেখো শোভন, তোমার মত সবাই তো আর আমেরিকান হয়ে যায়নি যে শুধু প্যাকেট ফুড খেতে হবে। আর তাছাড়া স্পাইসি ফুড শুধু আমি একাই রান্না করি না—অন্য বাঙালিরাও করে। ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী, মেক্সিকানরাও করে। আর ক্লিনিংতো তুমি করো না—ঘর গোছানো, রান্না করা, লন্ড্রি করা কোনো কিছুতেই তুমি হেল্প করো না। তাহলে এত কথা কেন বলছো!’ নীলিমা তীব্র প্রতিবাদ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
শোভন ভ্রূ কুঁচকে তাকাল নীলিমার চলে যাওয়ার দিকে।
দরজার সামনে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল নীলিমা। শীতল কণ্ঠে বলল, ‘তুমি না যাবে না যাও, অত ফালতু কথা বলার দরকার কি।’
শোভন নীলিমার কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে কফিতে চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ পর বাইরে যাওয়ার জন্যে তৈরী হয়ে নীলিমা আবার আসল বেডরুমে। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে তার পার্সটা নিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় শোভনকে বলল, ‘ঠিক আছে আমি যাচ্ছি। টেবিলে ব্রেকফাস্ট দেয়া আছে, ইচ্ছে হলে খেয়ে নিও।’
শোভন তাকাল নীলিমার দিকে। দেখল নীলিমা গ্রোসারী করতে যাচ্ছে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ পড়ে। সে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এটা কী পড়ে যাচ্ছ?’
‘দেখতেই তো পাচ্ছ!’ নীলিমা ইচ্ছে করেই বাঁকা উত্তর দিলো।
‘তোমাকে না বলেছি এ ধরনের ড্রেস পরে বাইরে যাবে না। আমেরিকায় এসেছো, অথচ গেয়ো স্বভাবটা এখনো গেলো না। একটু স্মার্ট হবার চেষ্টা করো।’
নীলিমা শীতল দৃষ্টিতে তাকাল শোভনের দিকে। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘তো তোমার কি ধারণা যারা সালোয়ার কামিজ কিংবা শাড়ি পড়ে তারা স্মার্ট নয়? সরি, তোমার এই কথাটা মেনে নিতে পারছি না।’ একটু থেমে সে আবার বলল, ‘আচ্ছা আমার শাশুড়ি আম্মা, আই মিন তোমার মা, যখন এই দেশে আসবেন, তাকে তুমি কি পরতে বলবে শোভন, জিন্স আর টি-শার্ট?’
শোভন কোনো উত্তর দিলো না। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে কফিতে চুমুক দিলো। নীলিমা এক দৃষ্টিতে শোভনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
শোভন কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল জানালার সামনে। পর্দা সরিয়ে তাকাল নীচে। তাকিয়ে থাকল নীলিমার গাড়ি বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। নীলিমার গাড়ি আড়াল হতেই সে হাতে ফোন নিল তারপর ডায়াল করল একটা নাম্বারে।

নীলিমা আর শোভন দম্পতি বসবাস করে সূর্যের আলোয় আলোকিত শহর যুক্তরাষ্ট্রের সানশাইন স্টেট নামে খ্যাত ফ্লোরিডা রাজ্যের আলো ঝলমল মায়ামি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। আটলান্টিক মহাসাগরের সবুজাভ জলঘেরা তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি এপার্টমেন্ট। তারই একটিতে তাদের বসবাস।
নীলিমার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। পরিপাটি বিছানা। ছিমছাম আসবাবপত্র। রুচি ও ঐতিহ্য দু’য়েরই পরিচয় পাওয়া যায়। আধুনিকতার ছোঁয়া মানানসই। সবকিছুতেই শিল্পের ছোঁয়া স্পষ্ট। ঘরের দক্ষিণে উন্মুক্ত জানালা। বাতাসের ঝাপটায় মাঝে মাঝে পর্দাগুলো উড়ে উড়ে খেলা করে। জানালাটি নীলিমার খুব প্রিয়। কারণে, অকারণে খুব বেশি মন খারাপ হলে, বা সময় কাটানোর জন্য ঐ জানালাটায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। বাইরের ফুরফুরে বাতাস উদাস করে দেয় তার মনকে। ঐ জানালাটায় দাঁড়ালে দূরের সমুদ্র দেখা যায়।
গাড়ি চালাতে চালাতে আনমনা হয়ে যায় নীলিমা। শোভনের কিছু কথা কিছু ব্যবহার তাকে ভীষণ আহত করে। সে জানালার কাচ নামিয়ে দিল। একবার ভাবল গ্রোসারী বাদ দিয়ে কাছের কোন বিচে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকবে। সমুদ্রের কাছাকাছি থাকার এই একটা সুবিধা। যখন তখন চলে যাওয়া যায়।
নীলিমার খুব পছন্দের শহর মায়ামি। মায়ামি নামের মধ্যেই কেমন যেন একটা রোমান্টিক আবেশ মাখানো রয়েছে। দেশ থেকে এসেই সে এই শহরটিকে ভালোবেসে ফেলে। ছোটবেলা থেকেই সমুদ্র দেখার খুব শখ ছিল নীলিমার। ইচ্ছে ছিল কক্সবাজার যাবে। কিন্তু যাওয়া হয়নি। সব সময় ভাবত বিয়ের পর তার স্বামীকে নিয়ে প্রথমেই চলে যাবে সমুদ্র সৈকতে। লোনা পানিতে পা ভেজাবে। বেলাভূমিতে হাত ধরাধরি করে হাঁটবে। সূর্যাস্ত দেখবে। এক সঙ্গে পাশাপাশি বসে জ্যোৎস্নার আলো দেখবে।
নীলিমার ভালো লাগে শাড়ি পরতে। সমুদ্র সৈকতে বালিতে হাঁটতে। আকাশের নীল তার পছন্দের রঙ। জ্যোৎস্নার আলোতে তার মন উচাটন হয়। সে কবিতা ভালোবাসে, একা একা মাঝে আবৃত্তিও করে। ভালো বাসে বাংলা গান। প্রবাসে থেকেও সে হৃদয়ে ধারণ করে এক টুকরো বাংলাদেশ।
অন্যদিকে শোভন, পুরোপুরিই আমেরিকান জীবন ধারা। কোনো বাঙালি অনুষ্ঠানে সে যায় না। বাংলাদেশীদের সাথে মেলামেশাও করে না। তার একটা জগত আছে। সম্পূর্ণই আলাদা।
ফ্লোরিডায় প্রায় ২০ হাজারের মত বাংলাদেশীর বসবাস। মায়ামিতে আছে ৫ থেকে ৬ হাজার। মায়ামি তথা ফ্লোরিডার আবহাওয়া পুরোটাই বাংলাদেশের মত। গরম, আর্দ্রতা বাংলাদেশের মতই। আবার শীতকালে তাপমাত্রা ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যেই থাকে। শুধু আবহাওয়া নয়, গাছপালাগুলাও দেশের মতই পরিচিত।
গ্রোসারী শেষ করে, পছন্দের কিছু মাছ কিনে নিয়ে এসে রান্নার কাজটা শেষ করল নীলিমা। রান্না শেষ করেই শুরু হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান। প্রথমেই ধরল লিভিং রুমের কার্পেট। ভ‍্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে ক্লিনিং শুরু করতেই বেজে উঠল ফোন। কিন্তু ভ‍্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দে ফোন রিং এর শব্দ নীলিমার কানে পৌঁছল না। ক্লিনিং শেষ করে ভ‍্যাকুয়াম ক্লিনারের সুইচ বন্ধ করতেই ফোনের শব্দ শুনতে পেল সে।
নীলিমা এগিয়ে গিয়ে ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘তোর ব্যাপারটা কি বলতো? ইদানীং যে কল করা একেবারে ছেড়েই দিয়েছিস? কী করিস সারাদিন? কল করে ম্যাসেজ রাখলেও তো তুই কল ব্যাক করিস না। আজব।’
নীলিমা হেসে ফেলল। অপর প্রান্তের রিনরিনে কণ্ঠের মেয়েটির নাম মুনা। নীলিমা প্রিয় বান্ধবী। খুব চটপটে আর ছটফটে স্বভাবের মেয়ে মুনা। তার চোখে মুখে দুষ্টুমি খেলা করে সারাক্ষণ।
মুনা বলল, ‘হাসছিস যে?’
‘মুনা, তোর এই ব্যাপারটা না আমার খুব ভালো লাগে, তাই হাসছি।’
‘কোন ব্যাপারটা?’
‘এইযে, হাই হ্যালো না বলে হঠাৎ করে মাঝখান থেকে কথা বলা শুরু করে দিস।’
‘হ্যাঁ হয়েছে, আর বলতে হবে না। কি করছিলি?’
‘এইতো, কার্পেট ভ‍্যাকুয়াম করছিলাম। যা ধুলা জমে।’
‘তুই এত পিকি কেন রে? সারাক্ষণ শুধু ক্লিনিং আর পলিসিং, পারিসও বাবা।’
নীলিমা আবারো হাসলো। মুনা বলল, ‘এই শোন, যে জন্য তোকে ফোন করেছি—এই শনিবার বিকেলে তোদের কোন প্লান আছে?’
একটু ভেবে নিয়ে নীলিমা বলল, ‘এই শনিবার? আমারতো নেই। তবে শোভনের কথা জানিনা, ও-তো আমাকে কিছু বলে না। কেনরে?’
‘তোর জন্য একটা দারুণ খবর আছে?’
‘কি খবর?’ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘তোর প্রিয় কবি মাহমুদ সাজ্জাদ ফ্লোরিডায় আসছেন।’
‘সত্যি বলছিস? কোথায়? কখন?’
‘ইয়েস মাই ক্লিনিং লেডী, সত্যি বলছি। জামান ভাই ফোন করেছিলেন। উনারা প্রতি মাসে যে কাব্য জলসা করেন, এ মাসে কবি সাহেব স্পেশাল গেস্ট হয়ে আসছেন। নিজে কবিতা আবৃত্তি করবেন, ভক্তদের অটোগ্রাফ দেবেন। যাবি নাকি?’
‘যাবো না মানে? কি বলছিস তুই? অফকোর্স যাবো।’ নীলিমার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
‘শোভন ভাই তো যাবে বলে মনে হয় না—উনি তো আবার বাঙ্গালিদের কোনো অনুষ্ঠানে যান না। না গেলে বলিস, আ’উইল পিক ইউ আপ অন দ্য ওয়ে।’
‘আমি শোভনকে নিয়েই যাবো। যেতে না চাইলেও জোর করে নিয়ে যাবো।’
‘তাহলে তো ভালোই। কল করিস, জাস্ট ইন কেস, ইউ নিড মি।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ বন্ধু!’
‘থ্যাঙ্ক ইউ দিতে হবে না। আমাকে জানাস কিন্তু।’
‘হ্যাঁ জানাবো।’
মুনা ফোন কেটে দিল।
নীলিমা ফোন হাতে খুশী মনে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল আনমনে।
কবি মাহমুদ সাজ্জাদের নাম শুনেই নীলিমার মনটা কেমন জানি আনচান করতে থাকে। কখন হবে সেই কাব্য জলসা?
রাতে খাবার টেবিলে নীলিমা আর শোভনের মধ্যে সাধারণত প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা হয় না। শোভন যেহেতু দেশী খাবার খুব একটা পছন্দ করে না, তাই সে সাধারণত নীলিমার রান্নার তেমন কোনো প্রশংসাও করে না। খেতে কেমন হয়েছে সে ব্যাপারে তার তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। নীলিমা মাঝে মাঝে আগ্রহ নিয়ে রান্না কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করলে সে ‘হয়েছে’, ‘ভালোই’ জাতীয় উত্তর দেয়। তাই নীলিমাও খুব একটা আগ্রহ নিয়ে আর জিজ্ঞেস করে না।
শোভন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। নীলিমা কয়েকবার তাকাল তার দিকে। শোভন অবশ্য লক্ষ করল না। সে তার মত করে খেয়ে চলেছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমা আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, ‘এই শনিবার বিকেলে তোমার কি কোন প্লান আছে?’
‘কেন?’
‘বাংলাদেশ থেকে কবি মাহমুদ সাজ্জাদ আসছেন এখানকার একটা সেমিনার এ গেস্ট হয়ে।’
‘মাহমুদ সাজ্জাদ? এটা আবার কে? এই নামের কোন কবি সাহিত্যিকের নাম তো শুনি নাই।’
‘আশ্চর্য! তুমি তাঁকে চেনো না?’ নীলিমা অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল শোভনের দিকে।
‘এমন ভাবে তাকাচ্ছ যেন তাকে না চিনে আমি মস্ত বড় অপরাধ করে ফেলেছি।’
নীলিমার ইচ্ছে হলো বলে একজন বাঙালি হয়ে কবি মাহমুদ সাজ্জাদকে চিনতে না পারাটা অপরাধেরই শামিল। কিন্তু সেসব কিছু না বলে, একটু ভেবে নিয়ে নীলিমা বলল, ‘আমরা যাচ্ছি কিন্তু।’ নীলিমার কণ্ঠে একধরনের উত্তেজনা স্পষ্ট।
‘আমরা যাচ্ছি মানে? তুমি কি আমাকে নিতে চাইছো? ওসব আঁতেলদের আঁতলামি দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে বা সময় কোনোটাই আমার নেই। তোমার ইচ্ছে হয় তুমি যাও।’
শোভনের এমন করে বলায় নীলিমা একটু আহতই হলো। সে মন খারাপ করে বলল, ‘বাংলাদেশের কোন অনুষ্ঠানে তুমি যাওনা বলে আমারও যাওয়া হয় না। আর একা যেতে আমার ভাল লাগে না তা তুমি জানো।’
‘ভালো না লাগলে যেও না।’ নির্লিপ্ত উত্তর শোভনের।
‘তাই বলে কোন অনুষ্ঠানেই আমার যাওয়া হবে না?’ নীলিমার কণ্ঠ ধরে এলো। সে অভিমানী গলায় আবার বলল, ‘ঠিক আছে তোমার যেতে হবে না, আমি একাই যাবো।’ বলেই সে খাবার শেষ না করেই উঠে চলে গেলো।
শোভন তার চলে যাওয়ার দিকে একবার তাকিয়ে আবার খেতে শুরু করল।
নীলিমা কিছুতেই নিজেকে সংযত রাখতে পারছে না। বাচ্চা মেয়েদের মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না আসছে। সে এখন বাথরুমের দরজা বন্ধ করে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ কাঁদবে। নীলিমা বাথরুমে গিয়ে ঢুকল। বেসিনের কল ছেড়ে দিল। সে চায়না শোভন তার কান্নার শব্দ শুনুক। যার কাছে সামান্য আবেগের মূল্য নেই, তাকে তার কান্না শুনিয়ে নিজেকে ছোট করার কোনো মানে হয় না।

পরের পর্ব

mixed-culture

মিক্সড কালচার (পর্ব-১)

‘বাবা, তুমি কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে আসবে। এয়ারপোর্টে যেতে হবে ভুলে যেওনা আবার।’
শারমিন কফির কাপে কফি ঢেলে রহমান সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল।
রহমান সাহেব এক স্লাইস ব্রেডে জ্যাম লাগিয়ে মুখে দিয়েছিলেন, মুখের খাবার শেষ করে তিনি বললেন, ‘নারে ভুলে যাবো না। সফিকের অ‍্যারাইভাল ক’টায়?’
‘সন্ধ্যায়। সাড়ে ছ’টা।’
‘তোরা রেডি হয়ে থাকিস। আমি চলে আসব। জেসমিন যাচ্ছে তো?’
‘জানি না।’
‘ওহ।’ একটু ভেবে রহমান সাহেব বললেন, ‘আচ্ছা, জেসনকে বলেছিস? ও সাথে গেলে হেল্প করতে পারত।’
‘বলেছি। জেসন কাজ থেকে সরাসরি চলে আসবে এখানে।’
‘দ্যাটস গুড।’ বলেই রহমান সাহেব কফিতে চুমুক দিলেন।
শারমিন তাকাল তার বাবার দিকে। একটু ইতস্তত হয়ে বলল, ‘উম বাবা, আম্মুর কথা আমি কিন্তু সফিককে কিছু বলিনি। ভাবছি কাজটা ঠিক হলো কিনা?’
‘বলিসনি কেন? আমিতো ভেবেছি ও সবকিছু জানে।’
শারমিন নিরুত্তর রইল।
‘আর বললেই বা কী হতো? যে যাবার সে চলে যায়। এ নিয়ে তুই কিছু ভাবিস না। ও এসেই সব জানুক।’
রহমান সাহেব লক্ষ করলেন, বাসার কাপড় পরে রয়েছে শারমিন। সাধারণত সকালে নাস্তার টেবিলে ওরা বাবা মেয়ে দুজনে একসাথেই নাস্তা করে তারপর যে যার মতো কাজে চলে যায়। শারমিন অফিসে যাবার প্রফেশনাল ড্রেস পরেই নাস্তা রেডি করে দুজনের জন্য। রহমান সাহেব উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে বললেন, ‘তুই কাজে যাচ্ছিস না আজ?’
‘না বাবা, ডে-অফ নিয়েছি। কিছু আইটেম রান্না করতে হবে। এই উইকেন্ডে তো রান্না করার সময় পাইনি।’
রহমান সাহেব মৃদু হাসলেন।
শারমিন লজ্জা পেয়ে বলল, ‘হাসছ কেন বাবা?’
‘না এমনিই। অনেকদিন ভালো-মন্দ কিছু খাওয়া হয় না। ভালোই হলো, সফিকের উপলক্ষে একটু ভালো-মন্দ খাওয়া যাবে। তুই কিন্তু রান্নাটা ভালোই শিখেছিস।’
‘ভালো না ছাই—মায়ের মতো তো আর রাঁধতে পারি না।’
‘যতটুকু শিখেছিস—এটুকুই বা কজন পারে?’ রহমান সাহেব তার কফিতে পর পর কয়েকটা চুমুক দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেলেন।
রহমান সাহেব ডালাসে বসবাসকারী একজন বাংলাদেশি আমেরিকান। বয়স ষাটের কাছাকাছি। তার দুই মেয়ে। বড় মেয়ে শারমিন, বয়স তেইশ। ছোট মেয়ে জেসমিন, বয়স উনিশ। দুই মেয়েকে নিয়েই তার বসবাস। বিভিন্ন কারণেই তার স্ত্রীর সঙ্গে তার বনিবনা হচ্ছিল না দীর্ঘদিন থেকে। দিনে দিনে দূরত্ব বেড়েই চলছিল—একে অপরের থেকে দূরে সরে যেতে থাকে, সম্পর্কে তৈরি হয় দূরত্ব। কোনো এক দিনে কাউকে কিছু না জানিয়েই রহমান সাহেবের স্ত্রী পরিবারের সঙ্গে সব ধরনের সম্পর্ক ছিন্ন করে আলাদা হয়ে গেছে। রহমান সাহেব অনেকটাই নির্জীব স্বভাবের একজন মানুষ। সামান্য ঝগড়া কিংবা কথা কাটাকাটিও তিনি এড়িয়ে চলেন। কখনো কোনো কারণেই তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে কোনো রকমের তর্ক বিতর্কে যেতে চাইতেন না। তারপরেও যখন পরিস্থিতি এমন হতো যে তর্ক এড়ানো যাচ্ছে না, তিনি স্বেচ্ছায় পরাজয় মেনে নিয়ে তার পড়ার রুমে চলে যেতেন। তারপরেও তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে চলে গেছে। তিনি কিছুতেই মেলাতে পারেন না। জীবনের কিছু হিসেব বুঝি কখনোই মেলে না।
একটু বেলা বাড়তেই শারমিন ব্যস্ত হয়ে পড়ল রান্নার কাজে। গায়ে একটা অ্যাপ্রন জড়িয়ে সে খুব যত্ন নিয়ে রান্না করছে। এমন সময়ে উপর থেকে নেমে এলো তার ছোট বোন জেসমিন। হঠাৎ শারমিনকে রান্না ঘরে দেখে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘Hi Sis, you didn’t go to work today—what’s going on? Are you ok?’
জেসমিনের জন্ম আমেরিকাতেই। সে অল্প বিস্তর বাংলা কথা বলতে পারে তবে উচ্চারণগত সমস্যা থাকার কারণে বেশির ভাগ সময়ে সে ইংরেজিতেই কথা বলে। আমেরিকায় বেড়ে ওঠা ছেলেমেয়েদের জন্যে এটা একটা চ্যালেঞ্জই বলা চলে। কিছু কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানদের চাপ দিয়ে কিংবা বুঝিয়ে বাংলাটা শেখাতে পারলেও বেশির ভাগ মা-বাবাই ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও রণে ভঙ্গ দেয়। মা-বাবাকে কত কাঠখড় পোড়াতে হয়, বাংলায় কথা বলতে পারে কিংবা বাংলা সংস্কৃতির প্রতি যাদের একটু ঝোঁক আছে, সেসব হাতে গোনা দু’একটা বাচ্চা ছাড়া বেশির ভাগের কাছেই মা-বাবার এত সব তৎপরতা খুবই বিরক্তিকর ঠেকে। ভেতরে-ভেতরে তারা আমেরিকান সংস্কৃতিতেই সাবলীল বোধ করে।
শারমিন কাজের মধ্যেই উত্তর দিল, ‘Yes, I’m fine.’
জেসমিন চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল বেশ কিছু আইটেম রান্না হয়েছে। আরো হচ্ছে। সে কিছুটা উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘What are you cooking?’
‘এই তো ইলিশ মাছ ফ্রাই, বিফ কারি, কর্নিস চিকেন, স্পিনাচ আর ডাল। এই তুই যাচ্ছিস তো এয়ারপোর্টে?’
‘এয়ারপোর্টে কেন? Who’s coming?’
‘হু ইজ কামিং মানে? তোর দুলাভাই আসছে বাংলাদেশ থেকে। এর মধ্যেই ভুলে গেলি?’
‘Is he coming today? OMG! I totally forgot.’
‘ফরগেট তো হবেই। ফ্রেন্ডস আর পার্টি ছাড়া ফ্যামিলির অন্য কোনো কিছুতেই তো তোর ইন্টারেস্ট নেই।’
‘I’m sorry but I can’t go. I’ll be going out with Alex. Say hi to BIL.’
‘BIL?’
‘Brother-In-Law, stupid!’
জেসমিন আর কিছু না বলে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে গেল। শারমিন মাথা নেড়ে একবার তাকাল তার বোনের চলে যাওয়ার দিকে।

এয়ারপোর্ট থেকে সফিককে নিয়ে শারমিনদের ছোট দলটি যখন বাসায় ফিরে এলো তখনো সূর্য পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েনি। ডে লাইট সেভিংস এর কারণে গরমের সময় দিনের আলো থাকে রাত সাড়ে আটটা পর্যন্ত।
শারমিন, সফিক, রহমান সাহেব আর জেসন গাড়ি থেকে বের হয়ে এলো একসাথে। জেসন গাড়ি থেকে নেমেই পেছনের ট্রাঙ্ক খুলে সফিকের লাগেজগুলো বের করে আনল। জেসন শারমিনদের প্রতিবেশীর এক বাংলাদেশি পরিবারের ছেলে—শারমিনদের পরিবারের যে কোনো সমস্যায় কিংবা প্রয়োজনে ডাকলেই চলে আসে। জেসনের বয়স একুশ বছর। খানিকটা আপন ভোলা স্বভাবের ছেলেটি অনেকটা শারমিনদের পরিবারের অবিচ্ছেদ্য একটা অংশ হয়ে গেছে বলা চলে।
ঢাকা থেকে ডালাস—লম্বা জার্নি করে সফিক বেশ ক্লান্ত। কিন্তু শারমিনকে বেশ চঞ্চল দেখা গেল। দীর্ঘ দু’বছরের অপেক্ষা শেষে সফিককে শেষ পর্যন্ত নিজের কাছে নিয়ে আসতে পেরেছে—এটাই তার আনন্দের উৎস। তার সবাই মিলে ঘরের দিকে এগিয়ে যেতেই দেখা গেল জেসমিন আর অ্যালেক্স হাত ধরাধরি করে ওদের বাসা থেকে বের হয়ে আসছে। জেসমিনের পরনে পার্টি ড্রেস—কিছুটা খোলামেলা। সফিক অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখল ওদের দুজনকে। শারমিন কিছুটা অস্বস্তিবোধ করল। রহমান সাহেব রাগান্বিত দৃষ্টিতে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন। সফিক উৎসুক দৃষ্টিতে একবার জেসমিনের দিকে আর একবার অ্যালেক্সের দিকে তাকাল। তারপর তাকাল শারমিনের দিকে।
জেসমিন মুখে একটা স্মিত হাসি নিয়ে এগিয়ে গেল সফিকের দিকে। অ্যালেক্সও এগিয়ে গেল তার সাথে। জেসমিন দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘Hi BIL, কেমন আছো? Welcome to America!’
সফিক ঠিক বুঝতে পারল না কিছু। বিলটা আবার কি জিনিস? সে অপ্রস্তুতভাবে তাকাল শারমিনের দিকে। শারমিন কিছু বলার আগেই জেসমিন অয়ালেক্সকে লক্ষ করে বলল, ‘Alex, meet my brother-in-law. He just came from Bangladesh.’
অ্যালেক্স হাত সফিকের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘Nice to meet you, BIL Welcome to Dallas!’
সফিক আবারো বোকার মতো তাকাল। ওকে কেন বিল বলছে কোনোভাবেই তা বোধগম্য হচ্ছে না। এবার সে নিরুপায় হয়ে বলল, ‘Bil? Who’s Bil? I’m not Bil. My name is Safiq. Safiq Ahmed.’
সফিকের অবস্থা দেখে জেসমিন হেসে ফেলল। সে হাসতেই হাসতেই অ্যালেক্সের গাড়ির দিকে এগিয়ে গেল। অ্যালেক্সও তার পিছে পিছে যেয়ে চড়ে বসল তার গাড়িতে।
জেসমিন আর অ্যালেক্স চলে যাওয়ার পরেও সফিক ওদের গমন পথের দিকে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। শারমিন সফিকের হাত ধরে বলল, ‘চলো, ভেতরে চলো।’
সফিক উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইল, ‘ঐ সাদা ছেলেটা কে?’
‘জেসমিনের বন্ধু।’ আর কোনো কথা না বাড়িয়ে শারমিন বলল, ‘লেটস গো ইনসাইড। কামঅন জেসন।’ বলেই শারমিন সফিকের হাত ধরে বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়ল।
জেসন এই পুরো সময়টাই চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ওরা যখন কথা বলছিল, তখন সে লাগেজগুলো ঘরের মধ্যে রেখে এসে কথা শুনছিল ওদের। শারমিন আর সফিক ঘরের ভেতরে ঢুকে যেতেই সে তার গাড়ি স্টার্ট দিয়ে দ্রুত চলে গেল বাসার সামনে থেকে।

পরের পর্ব

Chinno

ছিন্ন

সেদিন আমার শরীরটা ভালো লাগছিল না।
সকাল থেকেই খুব দুর্বল লাগছিল। মনটাও খারাপ ছিল। শরীর খারাপের সাথে মন খারাপের নিশ্চয়ই কোনো যোগসূত্র আছে। পিরিয়ড শুরু হলে মেয়েদের এক ধরনের মুড সুইং হয়, অবসাদ দেখা দেয়—ব্যাপারটা সে রকমও হতে পারে। তেমন কোনো কারণ ছাড়াই মন থাকে খারাপ।
আমি আমার দশ মাস বয়সী ছেলেকে নিয়ে শুয়ে ছিলাম। আমার স্বামী বেডরুমে এসে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল বাচ্চাটার মুখের দিকে। সে নিশ্চিত হতে চায় বাচ্চাটা ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা। নিশ্চিত হতেই সে আমার হাত ধরে একটা টান দিয়ে বলল, ‘এসো।’
আমি জানি এই টানের অর্থ কী। যখন তখন তার ইচ্ছে হলেই এমন হাত ধরে সে টানাটানি করে। আমার ইচ্ছা অনিচ্ছার ধার সে কখনোই ধারে না। তার ইচ্ছেটাই আসল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও তার ইচ্ছেতেই সায় দিতে হয়। সে তার কাজ সেরে নেমে যায়, আমি পাথরের মত শক্ত হয়ে পড়ে থাকি। তাকে না করেও কোনো লাভ হয় না। তবুও আমি বললাম, ‘আজকে না।’
‘কেন? সমস্যা কী?’ বিরক্ত হয়ে সে জানতে চাইল।
‘শরীরটা ভালো লাগছে না।’
‘কী হয়েছে?’
‘কিছু হয়নি। এমনিই। ইচ্ছে করছে না।’
‘ইচ্ছে করবে না কেন? ইচ্ছে না করার কী আছে?’
‘আশ্চর্য, সব সময় কি সব কিছু ভালো লাগে?’
‘তোমার না লাগুক। আমার লাগে। আমার চাই এবং এখুনি।’ বলেই আমার দিকে অদ্ভুত চোখে একবার তাকাল।
আমি কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে বললাম, ‘বাচ্চাটা মাত্র ঘুমলো।’ বলেই আমি বিছানা ছেড়ে উঠে পড়লাম।
‘এখনি ভাল সময়। ওর ঘুম ভেঙে গেলে তো তুমি আবার একটা অজুহাত বের করবে।’
‘থাকনা বাদ দাও আজকে।’
‘তুমি কিন্তু আমার মেজাজ খারাপ করে দিচ্ছ।’
‘একবার তো বলেছি না।’
‘বাট, আমি বলেছি হ্যাঁ। আর আমার হ্যাঁ মানেই হ্যাঁ—সেটা তুমি ভালো করেই জানো।’
আমি কিছু না বলে চুপ করে রইলাম। সে আবার বলল, ‘ইউ আর বাউন্ড টু লিসেন টু মি অ্যান্ড ফুলফিল মাই ডিজায়ার—এনিটাইম আই ওয়ান্ট।’
‘নো আই’ম নট। নট অলয়েজ!’ বলেই আমি রুম থেকে বের হয়ে গেলাম।
‘হোয়াট ডিড ইউ সে?’ বলেই সে বের হয়ে এলো আমার পিছে পিছে।
‘ইউ হার্ড মি!’ আমি ঘুরে দাড়িয়ে বললাম।
‘লিসেন, আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু ফোর্স, বাট…’
‘তুমি জোর খাটাতে চাও?’
‘প্রয়োজন হলে তাই করব। সে অধিকার আমার আছে।’
‘জোর খাটানোর অধিকার আছে?’
‘হ্যাঁ আছে।’
এভাবে আরো কিছুক্ষণ কথা কাটাকাটির পর এক পর্যায়ে আমি শান্ত স্বরে বললাম, ‘আমার পিরিয়ড হয়েছে।’
‘লায়ার!’ বলেই সঙ্গে সঙ্গে আমার মুখের উপর এক দলা থুথু ছিটিয়ে দিল সে।
এবার সত্যি সত্যি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম আমি। লজ্জায় আর অপমানে আমার চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। আমি শুধু বললাম, ‘ছিঃ।’
এবং সেটাই ছিল আমার শেষ কথা। এরপর আমি আর কোনো কথা বলার সুযোগ পাইনি। তার আগেই সে সজোরে একটা চড় বসিয়ে দিল আমার গালে।
আমি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলাম তার দিকে। অপমানে আমার চোখের প্রতিটা শিরা উপশিরা থেকে ঠিকরে পড়ল ঘৃণা। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে তার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল। সে অগ্নিমূর্তি ধারণ করল এবং শুরু করল অকথ্য ভাষায় গালাগাল। তারপর এগিয়ে এলো সামনে। আমি জানি সে এবার কী করবে। আমি শিউরে উঠলাম ভয়ে। আমার শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে।
আমি বরফের মত জমে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কিছুতেই পা দুটোকে নাড়াতে পারলাম না। সে এগিয়ে এলো হাত বাড়িয়ে। হঠাৎ আমার কী হলো জানিনা–আমার চুলের মুঠি ধরার আগেই আমি তার হাত ফসকে বেরিয়ে গেলাম। কিন্তু বেশিদূর যেতে পারলাম না। সে আমাকে জাপটে ধরে ধাক্কা মেরে ফেল দিল মেঝেতে। তারপর আমার চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেল দরজার কাছে।
বাচ্চাটার ঘুম ভেঙে যাবে সেই ভয়ে আমি কোনো রকম শব্দ না করে পড়ে রইলাম। সে আমার বুকে চেপে বসল এবং তার শক্ত হাত দুটো দিয়ে আমার গলা পেঁচিয়ে ধরল। আমি বুঝতে পারলাম কী ঘটতে যাচ্ছে। আমি তাকালাম তার চোখের দিকে। দেখলাম একটা মানুষ—যে কিনা আমার গর্ভজাত সন্তানের পিতা—সে খুনের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার চোখের দিকে।
তার হাতের চাপ ক্রমশই বাড়ছে। আমি দম আটকিয়ে পড়ে আছি। অনুভব করছি—আমার চোখের সামনে থেকে আলো সরে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছে আমার জগত। চিৎকার করার মত কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই। আমার সমস্ত পেশি-ইন্দ্রিয় নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে আমি কোনো গভীর সমুদ্রে তলিয়ে যাচ্ছি। প্রাণপণে চেষ্টা করছি উপরে উঠে এক বুক নিঃশ্বাস নিতে—কিন্তু পারছি না।
হঠাৎ সমস্ত অন্ধকার ফুঁড়ে আমার ছেলেটার মুখ ভেসে উঠল। আমি কিছুক্ষণ দেখলাম—সে আমার জন্যে বিষাদে কাঁদছে। অনেক দূর থেকে ভেসে আসছে তার কান্নার শব্দ। আমি তার কান্না শুনতে পাচ্ছি—যদিও স্পষ্ট নয়। আমার শুধু একবার মনে হলো, আহা আমার বাচ্চাটা। আমি মরে গেলে ও কার কাছে বড় হবে?
আর তখনই যেন কোনো দেবদূতের আগমন ঘটল—না কি হলো জানি না, আমি অনুভব করলাম—আমার গলায় শক্ত হয়ে চেপে থাকা আঙ্গুলগুলো যেন ধীরে ধীরে শিথিল হয়ে যাচ্ছে। গলার উপর থেকে পেঁচিয়ে থাকা হাত দুটো একটু একটু করে সরে গেল। বুকের উপর বসে থাকা ভার তখনও আছে। আমি ভয়ে ভয়ে চোখ মেলে তাকালাম–দেখলাম এক জোড়া নির্লিপ্ত চোখ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। আমি আবার চোখ বন্ধ করলাম—এবং তখনই আমার বুকের উপর থেকে মস্ত বড় একটা ওজনদার বস্তু নেমে গেল। আমি নিঃসাড় পড়ে রইলাম। কিছুক্ষণ পর শুনতে পেলাম সদর দরজা খোলার শব্দ। বুঝলাম সে চলে গেল বাইরে।
আমি ধীরে ধীরে উঠে বসলাম। বুক ভরে নিঃশ্বাস নিলাম। আর তখনই আমার ছেলের কান্নার শব্দ ভেসে এলো আমার কানে। সে চিৎকার করে কাঁদছে। ছেলেটা যে অনেকক্ষণ ধরেই কাঁদছে সেটা তার কান্নার শব্দ শুনলে কারোই বুঝতে অসুবিধা হবার কথা নয়। এবং আমিও বুঝতে পারলাম–ওর কান্নার কারণেই আজ আমি আমার জীবন ফিরে পেয়েছি। ওর কান্নার শব্দই ঐ পাষণ্ড লোকটাকে বিচলিত করেছে—একটু হলেও। সে হঠাৎ তার সম্বিত ফিরে পেয়েছে–তার হাত শিথিল হয়েছে–নেমে গেছে আমার বুক থেকে। কৃতজ্ঞতায় আমার চোখ দিয়ে ছুটল অঝোর ধারা।
আমি দৌড়ে গিয়ে বুকে তুলে নিলাম আমার সোনা মানিককে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললাম দ্রুত—আমাকে পালাতে হবে। এখুনি এই মুহূর্তে।
জৈবিক কামনা নিবৃত্ত করতে না পেরে যে স্বামী তার স্ত্রীর গায়ে হাত তুলতে পারে—সে এই কাজ আরো করবে, এতে কোনো ভুল নেই। একজন মানুষের পক্ষে অন্য আরেকজন মানুষের সব ইচ্ছা সব সময় পূরণ করা সম্ভব নয়। এটুকু বিবেক বোধ যার নেই—তার সঙ্গে আর এক মুহূর্ত থাকা নয়।
স্ত্রীর প্রতি যে স্বামীর বিন্দুমাত্র সহানুভূতি নেই। যে তার ঔরসজাত সন্তানের মায়ের প্রতি সম্মান দেখাতে জানে না—তার সঙ্গে আর একদিনও নয়। এমন তো নয় যে আমি দিনের পর দিন অসুস্থ হয়ে পড়ে আছি–তার চাহিদা মেটাতে পারছি না। একদিন কি কারো খারাপ লাগতে পারে না? স্বামী-স্ত্রীর মিলন একটা পবিত্র ব্যাপার। ভালোবাসা-ভালোলাগার ব্যাপার। আনন্দের ব্যাপার। এখানে একজনের ইচ্ছা না হলে তার সঙ্গে জোরপূর্বক সম্পর্ক স্থাপন করতে হবে? একটা দিন কি নিজেকে নিবৃত্ত করা যায় না?
আমার অবচেতন মন সব সময় আমাকে সতর্ক করেছে–এমন একটা দিন হয়ত আসবে যে আমাকে সব কিছু ছিন্ন করে চলে যেতে হবে। এটা ঠিক আমরা সব সময় সচেতন মনের দ্বারা চালিত হই—সচেতন মন আমাদের সব কাজকে মনিটরিং করে যাতে কোনো ভুল না হয়। কিন্তু সবথেকে শক্তিশালী হচ্ছে অবচেতন মন। সচরাচর এর কাজ আমরা অনুভব করতে পারি না। কিন্তু আমরা যা করছি, যা কিছু দেখছি, যা কিছু বোঝার বা শেখার চেষ্টা করছি—এর সব কিছুই চালনা করে আমাদের অবচেতন মন।
ছেলেটাকে কোলে নিয়েই দ্রুত গুছিয়ে নিলাম আমার অতি প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপত্র। ছোট্ট একটা ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম অনেক আগে থেকেই। তাতে আমার পাসপোর্ট, গ্রিনকার্ড, ছেলের বার্থ সার্টিফিকেট, একটা ছোট্ট নোটবুক, যেখানে আমার প্রতিটা ঘটনার বর্ণনা–কখন, কী ঘটেছে, আমার সঙ্গে কী করেছে—সব লিখে রেখেছি। ব্যাগের মধ্যে বেশ কিছু ডলারও রাখা আছে। কাজেই আমি আর কালক্ষেপণ না করে পিছনের দরজা খুলে বের হয়ে গেলাম এক কাপড়ে।
নির্জন অন্ধকার গলি দিয়ে পাগলের মত হাঁটছি আর ভাবছি—রাতটা কোনো রকমে কোথাও কাটিয়ে দিতে পারলেই হয়। কাল সকালে ঠাণ্ডা মাথায় সব ব্যবস্থা করা যাবে। এই শহরে আমার পরিচিত অনেকেই আছে, কিন্তু আমি এখানকার কারো সাহায্য নিতে চাই না। সাহায্যের হাত হয়ত বাড়িয়ে দেবে অনেকেই কিন্তু এক কান-দু’কান করে সে খবর পৌঁছে যাবে আমার স্বামীর কাছে। তারপর এক কথা দু’কথা, আলোচনা, সালিশ, পরামর্শ শেষে ফিরে যেতে হবে সেখানেই।
অবশ্য ৯১১ এ ফোন করলেই পুলিশ এসে আমাকে তাদের গাড়িতে উঠিয়ে আমি যেখানে যেতে চাই সেখানে পৌঁছে দিত। আমার নিজের কোনো আত্মীয় বা পরিচিত কেউ না থাকলে তারা আমাকে নিয়ে যেত কোনো শেল্টার হোমে। চাইলে আমি তাকে অ‍্যারেস্ট করাতেও পারতাম। কিন্তু ওসব কোনো কিছুর মধ্যেই আমি গেলাম না।
কিছুক্ষণের মধ্যেই নির্জন গলির রাস্তা ছেড়ে বড় রাস্তায় চলে এলাম আমি। রাত তখনো গভীর হয়নি। রাস্তায় গাড়ি চলাচল করছে—মানুষজনও আছে। আমি চার রাস্তার সংযোগ স্থলের একটা ট্যাক্সি স্ট্যান্ডে গিয়ে দাঁড়ালাম এবং মুহূর্তের মধ্যে একটা ট্যাক্সিক্যাব পেয়ে গেলাম। ড্রাইভারকে বললাম, ‘প্লিজ টেক মি টু এ হোটেল অর মোটেল ক্লোজ টু দ্য এয়ারপোর্ট।’
বুদ্ধিমান ড্রাইভার যা বোঝার বুঝে নিল—গাড়িতে উঠা মাত্রই সে আমাকে নিয়ে ছুটে চলল। কয়েকবার রিয়ার ভিউ মিররে তাকিয়ে আমাকে দেখল সে। তারপর হাইওয়েতে উঠে সে মধ্যপ্রাচ্যীয় একসেন্টে জিজ্ঞেস করল, ‘ডু ইউ নিড এনি হেল্প? শুড আই কল দ্য পোলিছ?’
আমি বললাম, ‘নো। নো নিড। জাস্ট টেক মি টু এ হোটেল।’
‘ইয়েস ম্যাম। অন আওয়ার ওয়ে।’
‘থ্যাংকস।’
ট্যাক্সিতে উঠেই আমি ফোনের লোকেশন ট্র্যাকিং বন্ধ করে দিলাম। আমি কোথায় যাচ্ছি–কোথায় আছি সেটা কেউ জানুক আমি চাই না। ৩০ মিনিটের মধ্যেই ক্যাব ড্রাইভার আমাকে নিরাপদে এয়ারপোর্টের কাছে একটা হোটেলে পৌঁছে দিল।
হোটেলে চেক-ইন করেই আমি ফোন করলাম আমার সবচেয়ে কাছের বান্ধবীকে। সে থাকে অন্য একটা স্টেটের বড় একটা শহরে। ফোন ধরতেই প্রাথমিক দু‘একটি কথা শেষ করেই আমি বললাম, ‘কাল সকালেই তোর ওখানে আসছি। এসে সব বলবো। এই মুহূর্তে তুই কি আমাকে একটা হেল্প করতে পারবি?’
সে আমার কণ্ঠ শুনে কী বুঝল সেই জানে, তবে অন্য কোনো প্রশ্ন না করেই বলল, ‘বল, কী করতে হবে?’
‘আমাকে সকালের যে কোনো ফ্লাইটের একটা টিকেট কেটে দিতে পারবি?’
সে হেসে দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ পারব! এখুনি দিচ্ছি।’
‘কাটা হলে রিজার্ভেশন কোডটা টেক্সট করে দিস।’
‘আচ্ছা।’ একটু থেমে সে জানতে চাইল, ‘তুই এখন কোথায় আছিস?’
আমি সে কথার কোনো উত্তর না দিয়ে বললাম, ‘আমি নিরাপদেই আছি। তুই ভাবিস না। কাল সকালে এসে সব বলবো।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। তুই সাবধানে থাকিস আর সমস্যা হলে আমাকে কল করিস।’
‘ঠিক আছে।’
ফোন কেটে দিয়ে আমি মনে মনে ভাবলাম, প্রতিটা মানুষের জীবনেই এমন একজন বন্ধু থাকা খুব দরকার। যে আগ বাড়িয়ে কিছু জানতে চাইবে না—কিন্তু যখন যতটুকু দরকার, শুধু চাইলে হলো। সাহায্যের হাত প্রসারিত করে দাঁড়িয়ে থাকবে। সংকটের সময় পাশে থাকবে, বিপদে সাহস জোগাবে—এমন অনেক কিছু। এক বন্ধু যখন হতাশায় নিমজ্জিত কিংবা সংকটে বিপর্যস্ত, তখনই সেই একজনকে খুব বেশি দরকার।
আমি খুব সকালের ফ্লাইট ধরে চলে গেলাম বান্ধবীর শহরে। কিছুদিনের জন্যে অতিথি হয়ে রইলাম তার বাড়িতে। বেশিদিন অবশ্য থাকতে হয়নি। বান্ধবী আর তার স্বামী মিলে ওদের পরিচিত কয়েকজনের কাছে নিয়ে গেল। অল্পদিনেই আমি একটা কাজ জোগাড় করে ফেললাম। শুরু হলো আমার নতুন জীবন–লাইফ এজ এ ‘সিঙ্গেল মাদার’। সেই থেকে এক বেডরুমের ছোট্ট একটা এপার্টমেন্টে আমি আমার ছেলেকে নিয়ে আছি। সুখে আছি কি-না জানি না, তবে কোনোরকম কষ্টে নেই একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি।

তিন বছর আগে আমি আমার সুন্দর ছবির মত বাড়ি, নিজ হাতে গোছানো সংসার পেছনে ফেলে এক কাপড়ে যখন বের হয়ে এসেছিলাম—ভেবেছিলাম সেটাই ছিল আমার ‘আমেরিকার স্বপ্ন’ পূরণের শেষ দিন। আমি তখনো জানতাম না আমার ভবিষ্যৎ আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অন্ধকারের কথা চিন্তা করে আমি আমার নিজের অস্তিত্বকে বিকিয়ে দেয়নি। নিজেকে ছোটো করিনি। সব সম্পর্ক ছিন্ন করে চলে আসাটা কোনো সহজ কাজ ছিল না।
আমি অনেক বার ভেবেছি—আমি যা করেছি তা কি ঠিক ছিল? মানুষটাকে কি আর এক বার সুযোগ দেয়া যেত না? শত হলেও সে আমার সন্তানের বাবা। আমার ছেলেটা তার বাবার আদর ছাড়াই বড় হবে। তবুও আমি আমার সিদ্ধান্তে অনড় থেকেছি।
যে সব শিশু পারিবারিক সহিংসতা দেখে বড় হয়, তাদের মানসিক অবস্থাও প্রভাবান্বিত হয়। তারা সহিংসতা প্রবণ হয়। দুর্বলের উপর, বিশেষ করে নারীর উপর ক্ষমতা প্রয়োগ এবং নিয়ন্ত্রণের এক অসুস্থ প্রবণতা তৈরি হয় এই সব শিশুদের মনে।
সন্তানের চোখের সামনে, বাবার হাতে মা নির্যাতিত হচ্ছে। সন্তান দেখে যাচ্ছে। মাঝে মাঝে চোখ বন্ধ করে রাখছে—যাতে দেখতে না হয় বাবার ভয়ংকর রূপ আর মায়ের ভয়ে চুপসে যাওয়া মুখ। একজন অসহায় সন্তান কিছুই করতে পারছে না তার মায়ের জন্যে! আমার সন্তানকে সেই অসহায়ত্বের যন্ত্রণা সারা জীবন কুড়ে কুড়ে খাবে—সেটা অন্তত আমি হতে দেয়নি।
ঐ রাতের পর থেকে আমার গায়ে কেউ হাত তোলেনি। কারো চোখ রাঙানো দেখতে হয়নি। ইচ্ছার বিরুদ্ধে কেউ আমাকে কোনো কিছুর জন্যে জোর করেনি। কেউ আমার বুকে চেপে বসেনি। কারো হাতের দশটি আঙ্গুল শক্ত করে আমার গলায় চেপে ধরেনি। কেউ আমার নিঃশ্বাসও রোধ করতে পারেনি।
আমি জানি আমার মত এমন আরো অনেক মেয়েই আছে যারা প্রতিদিন এমন নির্যাতনের শিকার হয়, হচ্ছে—তাদের প্রতি আমার একটাই অনুরোধ, শোনো বোনেরা–সে, তোমার স্বামী, হবু স্বামী, বন্ধু যেই হোক না কেন, যদি তোমার গায়ে একদিন একবার হাত তোলে—জেনে রেখো, সে সেই কাজটি আরো করবে, প্রায়ই করবে, কারণে অকারণে করবে। সে যদি তোমার গায়ে একবার হাত তোলে, দ্বিতীয়বার চিন্তা না করে—দৌড়াও। প্রথম সুযোগেই। কিছু কিছু ক্ষেত্রে সত্যিই পালানোর কোনো বিকল্প নেই। যদি বাঁচতে চাও–পালাও।
ভুলেও ভেবো না যে সে ঠিক হয়ে যাবে। ঠিক হবে না। ঠিক হয় না। ঠিক হয় নাই। কোনোদিনও।
যেই প্রত্যাশা অবাস্তব তা করলে ঠকতে হবে নির্ঘাত।
যে সম্পর্কে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ নেই সে সম্পর্ক কখনোই সুস্থ হতে পারে না। ভালোবাসা একটু কম হলেও ক্ষতি নেই কিন্তু শ্রদ্ধাবোধ থাকতেই হবে। না হলে সেই সম্পর্কের মৃত্যু ঘটবেই।
—————————-————————
(একটি সত্যি ঘটনার অনুপ্রেরণায়…)
আন্তর্জাতিক নারী দিবসে পৃথিবীর সব নারীকে শুভেচ্ছা দিচ্ছেন ভালো কথা… কিন্তু আপনার নিজের ঘরে যে নারী রয়েছে তার প্রাপ্য সম্মানটুকু দিচ্ছেন তো?
গল্পটি এবারের একুশে বইমেলা ২০২০ তে প্রকাশিত আমার ছোট গল্প সংকলন ‘ধূসর বসন্ত’তে সংকলিত হয়েছে

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-১)

ক্রিং ক্রিং ক্রিং।
প্রত্যুষে হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল ফোনের শব্দে। সে বিরক্ত হয়ে বেডসাইড টেবিলে রাখা ফোনের দিকে তাকিয়ে আবার ব্লাঙ্কেট দিয়ে মাথা ঢেকে শুয়ে রইল। সে এমনিতেই রাত করে বাসায় ফেরে। তাই সকালে একটু দেরিতেই উঠে—সকালের ঘুমটা তার খুবই প্রিয়। পরিস্থিতি তেমন না হলে খুব সকালে তার ঘুম ভাঙ্গার তেমন কোনো রেকর্ড নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যে বেডসাইড টেবিলের উপরে রাখা ফোনটি আবারো বেজে উঠল।
হাসান অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ব্লাঙ্কেটের ভেতর থেকে মাথা বের করে ঘড়িতে সময় দেখল—সকাল সাতটা। সে ফোনটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ সময় আবার কে ফোন করলো। নিশ্চয়ই কোন টেলিমার্কেটিং এর লোকজন। নাহ, এদের যন্ত্রণায় দেখছি সকালে একটু আরাম করে ঘুমানোও যাবে না। যত্তসব।’
সে আবারো ব্লাঙ্কেটের মধ্যে মাথা ঢুকাল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল।
এক ঘণ্টা পর হাসানের ফোনটা আরেকবার বাজল। এবার সে মাথা তুলে ফোন হাতে নিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই বলল, ‘হ্যালো?’
ওপাশ থেকে অসম্ভব মিষ্টি একটা কণ্ঠ ভেসে আসল। রিনরিনে কণ্ঠে সে বলল, ‘হ্যালো, ক্যান আই স্পিক টু হাসান?’
হাসান ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘ইয়েস, স্পিকিং। হু ইজ দিস?’
ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। একটু চুপ করে থেকে অসহিষ্ণু কণ্ঠে হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘মে আই নো, হু ইজ কলিং?’
এবার নারী কণ্ঠ সাড়া দিল। সে বলল, ‘আমি!’
‘আমি? আমি কে?’ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল হাসান।
‘অপলা!’
‘কে?’
‘আমি অপলা।’
কয়েক মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল হাসান—কথা আঁটকে গেল তার। সে অবাক হয়ে বলল, ‘অ-অপলা? আই মিন অপলা। তুমি?’ বলতে বলতে হাসান বিছানায় উঠে বসল।
‘হ্যাঁ, আমি।’
হাসানের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ!’
‘কি খুব অবাক হয়েছ?’
‘অবাক হবো না। আমার তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।’
হাসান দ্রুত স্লিপিং গাউনটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল।
‘তোমার জন্যে আরও সারপ্রাইজ আছে।’
হাসান ফোনটা চোখের সামনে এনে একবার দেখল তারপর আবার কানে লাগিয়ে বলল, ‘আরও সারপ্রাইজ?’
‘আমি আজ বিকালের ফ্লাইটে শিকাগো আসছি।’
‘শিকাগো আসছ? কোথায়? মানে কার কাছে?’
‘কার কাছে আবার? তোমার কাছে!’
‘আমার কাছে? রিয়েলি?’ হাসান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে আবারো ফোনটা চোখের সামনে এনে দেখল তারপর কানে লাগিয়ে অপলার কথা শুনল।
অপলা বলল, ‘কেন বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘না, আই মিন হ্যাঁ। আই মিন…’ হাসান কী বলবে ভেবে পেল না।
‘এনি প্রবলেম?’ অপলা জানতে চাইল।
‘প্রবলেম ? আরে না না কিসের প্রবলেম?’
‘ওকে—তাহলে বিকেলে দেখা হচ্ছে। এখন রাখছি…’ বলেই অপলা ফোনটা কেটে দিল।
হাসান সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ওয়েট! হ্যালো। অপলা?’
অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সারা পাওয়া গেল না। হাসান ফোনটা চোখের সামনে এনে দেখে আবার কানে লাগিয়ে কয়েকবার বলল, হ্যালো। এত তাড়াতাড়ি অপলা ফোনটা কেটে দিবে সে ভাবতেই পারেনি।
হাসান হঠাৎ অনুধাবন করল অপলা আসছে—তার সঙ্গে আবার দেখা হবে। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে দু’হাত ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘ও ইয়েস।’
মুহূর্তের মধ্যেই হাসানের সবকিছু কেমন যেন বদলে গেল। সে কিচেনে ঢুকে কফি মেশিনে কফি বানাতে দিয়ে দরজা খুলে আজকের নিউজ পেপার নিয়ে এলো। তারপর, বড় এক মগ কফি নিয়ে বসল ব্যাকইয়ার্ডের ছাতার নিচে। আয়েশ করে কফিতে চুমুক দিতে দিতে পত্রিকার পাতা ওলটাতে লাগল। যদিও কোনো খবরই তার কাছে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। আসলে পত্রিকার কোনো খবরের প্রতি তার কোনো আগ্রহও নেই এই মুহূর্তে—সে সারাক্ষণ ভাবতে থাকল অপলার কথা।
তারপরেও হঠাৎ করেই সে আজকের রাশিফল পাতায় চোখ রাখল এবং কাকতালীয় ভাবে যেটুকু পড়ল তাতে তার ভাল লাগা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। রাশিফলে লেখা আছে—অনেকদিন পর আজকের সকালটা আপনার কাছে একটু অন্যরকম লাগবে। বিশেষ কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে কারো আগমন বা বা কোনো আকাঙ্ক্ষিত খবর। যার জন্য এতদিনের অপেক্ষা। যে কোনো সময় চলে আসবে আকাঙ্ক্ষার সুখবর। সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হবে। কর্মক্ষেত্রে সুবাতাস বইবে। দূর যাত্রায় সাবধানতা অবলম্বন আবশ্যক… এটুকু পড়েই হাসান তাকাল চারিদিকে।
সত্যিই আজকের সকালটা যেন একটু অন্যরকম। বাইরে মিষ্টি রোদের ঝলকানি। কেমন ফুরফুরে, আর ঝরঝরে। সকালটা তো কালও ছিল। তবে এমন ঝলমল সুনীল ছিল কি? হঠাৎ করেই শিকাগোর আকাশ ঝলমলে রোদের ঝলকানিতে চিকচিক করছে।
আজকের সকালটা অন্যরকম একটা ভাল লাগা দিয়ে শুরু হয়েছে হাসানের। সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গার পরে যে বিরক্তি শুরু হয়েছিল সেটি মিলিয়ে গেছে—অপলার ফোন পাওয়ার পর থেকেই। কেমন অদ্ভুত এক মন ভাল করা অনুভূতি হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।
এই ভাল লাগার পাশাপাশি এক ধরণের অস্থিরতা পেয়ে বসল হাসানকে। অস্থিরতাটা কমছে না কিছুতেই। কারো সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভাল হতো। সে নিউজ পেপার বন্ধ করে মোবাইল ফোন থেকে ফোন করল রুবেলকে।
শনিবারের সকাল।
শিকাগোর বিখ্যাত লেক মিশিগানের নর্থ বিচ সংলগ্ন একটা বেঞ্চে বসে রুবেল আর যূঁথী কথা বলছিল। আজ সারাদিন ঘুরাঘুরির প্ল্যান করে বের হয়েছে দুজনে। সপ্তাহে এই একটা মাত্র দিন তাদের দেখা হয়। তাও সব সময় যে হয় তা না। কাজেই সময়টাকে একে অপরের সান্নিধ্যে কাটাবার সর্বাত্মক চেষ্টা করে তাঁরারা।
রুবেলের ফোন বাজতেই সে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখল হাসানের নাম্বার। সে যূঁথীকে ইশারা দিয়ে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
ওপাশ থেকে হাসান বলল, ‘হ্যালো রুবেল? গেস হু জাস্ট কল্ড মি?’
‘হু?’ রুবেল জানতে চাইল।
‘ইট ওয়াজ অপলা।’
‘কোন অপলা?’
হাসান অবাক হয়ে বলল, ‘কোন অপলা মানে? ফাজলামো করো? তুমি বুঝি আর জানো না? ঘটনাটা শোনো…’ একটু থেমে হাসান বলল, ‘তখন সকাল আর কত হবে? এই ধরো সাতটার মতো। হঠাৎ একটা ফোনের শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি তো মহা বিরক্ত। এতো সকালে কে ফোন করল। মনে হয় টেলিমার্কেটিং—আমি তাই ফোন না ধরে ঘুমিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ আবার ফোন এলো। এবার আমি ফোন ধরলাম। ওপাশ থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠ। জিজ্ঞেস করলো, ক্যান আই স্পিক টু হাসান? আমি বললাম…’
হাসান বিরতিহীনভাবে বলে চলল। রুবেল কথার মাঝখানে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘হাসান ভাই, আপনি কি পুরা ফোনের কনভারসেশন এখন আমাকে ফোনেই শোনাবেন নাকি? আমি বরং আপনার ওখানে চলে আসি, তারপর না হয় সব কথা শোনা যাবে?’
‘আরে শোনই না, তারপর কী হলো। হ্যাঁ কোথায় যেন ছিলাম?’
উত্তেজিত কণ্ঠে হাসান আবার শুরু করল, ‘ও হ্যাঁ আমি বললাম, আপনি কে? সে বলল, আমি অপলা। আমি আসছি শিকাগোতে। আমি বললাম কোথায় আসছ, কার কাছে উঠবে। ও বলল, কার কাছে আবার? তোমার কাছে? আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। কিছু বুঝে উঠার আগেই সে বলল, এখন রাখি বলেই ফোন রেখে দিল। কোনো মানে হয় বলো?’
‘এখন কি আপনার খুব খারাপ লাগতেছে?’ দুষ্টুমির সুরে রুবেল বলল।
‘না না খারাপ লাগবে কেন? ও তো আমার এখানেই আসছে।’
‘তাইলে এখন কী করবেন?’
‘অপলার পছন্দের একটা আইটেম রান্না করবো। আই’ম গোয়িং টু মেক এ স্পেশাল ডিশ ফর হার। তারপর দুজনে মিলে ডিনার। এ ক্যাণ্ডেললাইট ডিনার ফর টু—জাস্ট ফর টু অফ আস!’
‘তারপর?’ রুবেলের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘তারপর আবার কী?’ রুবেলের দুষ্টুমি ধরতে একটু সময় লাগল হাসানের। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে সে বলল, ‘ফাজলামো হচ্ছে?’
‘আপনে কি নার্ভাস?’
‘আরে না না, নার্ভাস হতে যাবো কেন? আসলে অনেক দিন পর তো, তাই।’
‘কিন্তু আমার তো মনে হইতেছে আপনি নার্ভাস হয়ে যাইতেছেন।’
‘ইয়ে মানে, আসলে তুমি ঠিকই বলেছ। এখন যেন কেমন একটু নার্ভাস লাগছে।’
কথা বলতে বলতে হাসান ঢুকল ঘরের ভেতর। রান্না ঘরে এসে ফ্রিজ খুলে দেখল—ফ্রিজ খালি। রান্না করার মত তেমন কোনো কিছুই চোখে পড়ল না। সে রুবেলকে বলল, ‘গ্রোসারী করতে হবে। মাই ফ্রিজ ইজ এম্পটি।’ হাসান ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে দেখল—সব কিছুই কেমন অগোছালো। সে বলল, ‘এদিকে বাসাটাও একটু ক্লিন করা দরকার।’
রুবেল যূঁথীর দিকে তাকিয়ে দেখল—বিরক্ত হয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আছে সে। কিসের এত কথা? রুবেল আঙুল দিয়ে যূঁথীকে অস্থির না হবার ভঙ্গি করল। তারপর বলল, ‘হাসান ভাই, আপনি চাইলে আমি এসে হেল্প করতে পারি।’
‘না না তোমাকে আসতে হবে না। তুমি এসে আবার সব উলটা পালটা করবে। না তার দরকার নেই। আমি একাই সামলাতে পারব।’
হাসান ঘড়ি দেখল। এবং সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আমাকে এখন যেতে হচ্ছে। রাখি কেমন? পরে কথা হবে।’ কথা না বাড়িয়ে সে ফোন কেটে দিল।
হাসান ফোন কেটে দিতেই রুবেল যূঁথীর দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘যূঁথী, আমাকে এখুনি একটু যেতে হবে।’
হাসানের ফোন আসার পর থেকেই যূঁথী লক্ষ্য করছিল রুবেলকে এবং ওর কথাও সে শুনেছে। সে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘যেতে হবে মানে? কোথায়?’
‘কোথায় আবার? হাসান ভাইয়ের ওখানে।’
‘আমার তো মনে হলো উনি তোমাকে যেতে নিষেধ করলেন।’
‘আরে উনি নিষেধ করলেই হবে? আমার একটা দায়িত্ব আছে না।’
যূঁথী প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল লেকের দিকে।
রুবেল একটু ইতস্তত করে বলল, ‘ইয়ে, তুমি এক কাজ করো—তুমি বাস কিংবা ট্রেন ধরে বাসায় চলে যাও, আমি তোমাকে পরে কল করব। ওকে?’
যূঁথী এবার রাগান্বিত কণ্ঠে বলল, ‘দ্যাটস নট ফেয়ার রুবেল। আই থট উই হ্যাভ প্ল্যান—পার্কে যাব, মুভি দেখব আর এখন কিনা তুমি…’ রাগে কথা বন্ধ করে যূঁথী আবারো লেকের দিকে ঘুরে তাকাল।
রুবেল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আর কোনো কথা না বলেই চলে গেল যূঁথীকে একা ফেলে।
যূঁথী ওর চলে যাওয়ার দিকে অবিশ্বাস্যভাবে তাকিয়ে আবারো বলল, ‘দ্যাটস নট ফেয়ার।’
কাপড় বদলে হাসান পেছনের গাড়ি গ্যারাজে গিয়ে ঢুকল। তার বিএমডব্লিউ এসইউভি গাড়িটি স্টার্ট দিয়ে গ্যারাজ খুলে বের হয়ে গেল ধীরে ধীরে।
সামনে পেছনে প্রায় ১০ হাজার বর্গ ফুটের বিস্তৃত সবুজ প্লটে ৬ হাজার বর্গ ফুটের ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের দোতলা প্রাসাদোপম বাড়িটি মাত্র বছর খানেক হলো হাসান তৈরী করেছে শিকাগোর অদূরের একটি উপশহরের অভিজাত আবাসিক এলাকায়। চারিদিকে আভিজাত্যের ছায়া। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার দিয়ে ভেতরের সব কিছু ডিজাইন করা। উঁচু সিলিংএর ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু পর্দা দিয়ে গ্লাসের জানালাগুলো ঢেকে দেয়া। অন্দরের সম্পূর্ণ সজ্জায় আধুনিকতার ছোঁয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত টুরিস্ট স্পট ও স্থাপনার ছবি দিয়ে দেয়ালগুলো সাজানো হয়েছে। ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে সবকিছুর ভেতরেই নতুনত্বের ছোঁয়া—দারুণ একটা শৈল্পিক ব্যাপার সব কিছুর মধ্যেই। বাড়ির পেছনে সুইমিং পুল। বাড়ির সামনে সুন্দর করে সাজানো ফুলের বাগান। একেই হয়ত বলে স্বপ্নের বাড়ি—হাসানের স্বপ্নের বাড়ি।
আবাসিক এলাকা পার হয়ে হাইওয়েতে এসে পড়ল হাসানের বিএমডব্লিউ এসইউভি। গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে। তার মনে পড়ল সেদিনটির কথা—
(চলবে…)
(ভূমিকাতে বলতে ভুলে গেছিলাম, এই গল্পটি নিয়ে একটি নাটকও নির্মাণ করেছিলাম। নাটকের নাম ছিল ‘মোমের আলোয় অপলার স্বপ্ন’, কোনো এক ভালোবাসা দিবসে আরটিভিতে নাটকটি প্রচারিত হয়েছিল।

পরের পর্ব

a-perfect-revenge

এ পারফেক্ট রিভেঞ্জ (পার্ট-১)

একটি মনোমুগ্ধকর সন্ধ্যার শুরু। অনেকদিন থেকে এরকম একটি সন্ধ্যার অপেক্ষায় ছিল ইমরান।
সদর দরজায় কলিং বেল বেজে উঠতেই ইমরান ঘুরে তাকাল। স্মার্ট ভিডিও ডোরবেল থেকে আসা ভিডিও কলটি রিসিভ করতেই সে তার স্মার্টফোনে দেখল—দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক অনিন্দ্য সুন্দরী রমণী। চেহারায় উষ্ণতার ছাপ স্পষ্ট। চালচলনে কোথায় যেন একটা হলিউডি ভাব আছে। সুন্দরী রমণীর নাম এলিনা।
হাতের কাজ ফেলে দ্রুত এগিয়ে গেল ইমরান। দরজা খুলে দিতেই সে দেখল এলিনার ঠিক একটু পিছেই দাঁড়িয়ে আছে এক শ্বেতাঙ্গ আমেরিকান। শ্বেতাঙ্গের নাম রজার্স—এলিনার বয়ফ্রেন্ড।
দীর্ঘদিন পর ইমরানকে দেখে এলিনা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘হাই ইমরান!’
ইমরানের চেহারায় অবশ্য তেমন কোনো উচ্ছ্বাস প্রকাশ পেল না। সে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘হাই এলিনা।’
ইমরান গোয়েন্দার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে এক পলক তাকাল রজার্সের দিকে। বয়স চল্লিশের আশে পাশে হবে হয়ত। তাহলে এইই সেই—এলিনার বয়ফ্রেন্ড! দেখতে সুদর্শন, সুঠাম ও দীর্ঘদেহী—লম্বায় ছ’ফুটের কম হবে বলে মনে হয় না। বর্তমানে একটা মডেলিং এজেন্সির মাস্টার ফিটনেস ট্রেইনার এবং জিমনাস্টিক ইন্সট্রাকটর হিসেবে কর্মরত আছে। পাশাপাশি সে নিজেও একজন মডেল সেইসূত্রে হলিউডের কিছু প্রডাকশন কোম্পানির সাথেও রয়েছে কানেকশন।
ইমরান লক্ষ্য করল রজার্সের হাতে একটি রেড ওয়াইনের বোতল। রজার্স হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে ইমরানের দিকে।
‘সরি, উই আর লেট।’ এলিনা বলল।
ইমরান রজার্সের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকাল এলিনার দিকে। এলিনা হাসল সুন্দর করে।
ইমরান তার হাত ঘড়িতে সময় দেখল—সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। ‘নট অ্যাট অল। আই জাস্ট ফিনিসড মাই কুকিং—ইউ আর সার্টেনলি নট লেট।’ সে বলল।
ইমরান এলিনাকে বলেছিল সাতটার দিকে আসলেই হবে। সেখানে তাঁরা এসেছে সাড়ে-সাতটায়। আধ ঘণ্টা দেরি এমন কোনো দেরিই না। বাঙ্গালিদের দাওয়াতে কমপক্ষে এক ঘণ্টা দেরিতে পৌঁছানো হচ্ছে স্বাভাবিক ঘটনা। কেউ কেউ দেড় ঘণ্টা এমনকি দুই ঘণ্টা দেরিতে গিয়েও হাজির হয়।
এলিনা ঘরের ভিতরের দিকে ইশারা দিয়ে বলল, ‘ক্যান উই কাম ইন?’
‘ইয়া—অফ কোর্স! কাম অন ইন।’ মৃদু হেসে বলল ইমরান।
ইমরান সরে গিয়ে ওদেরকে ভিতরে ঢুকতে দিল। দরজা বন্ধ করে ঘুরে দাঁড়াতেই এলিনা বলল, ‘কেমন আছ?’
‘এই তো—চলে যাচ্ছে। তুমি?’
‘ভাল।’
এলিনা কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল ইমরানের মুখের দিকে। তারপর একটু এগিয়ে এসে হঠাৎ করেই সে জড়িয়ে ধরল ইমরানকে। এ বিগ হাগ!
ইমরান কী করবে ভেবে পেল না। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে চুপ করে রইল। কেমন জানি অস্বস্তি লাগছে। অস্বস্তি কাঁটাতেই সে বলল, ‘গুড টু সি ইউ, এলিন!’
‘গুড টু সি ইউ টু।’
তারপর যেন হঠাৎ করেই কথা হারিয়ে ফেলল দুজনেই। চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এল ওদের তিনজনকে ঘিরে। রজার্স বোকার মত তাকিয়ে রইল ওদের দুজনের দিকে। সে ঠিক বুঝতে পারছে না—তার কি কিছু বলা উচিৎ কিনা। সেও কোন কথা বলেনি পুরো সময়ে। তবে হাসিমুখে কথা শুনছিল ওদের দুজনের।
এলিনা রজার্সের অস্বস্তিবোধ বুঝতে পেরে বলল, ‘লেট মি ইনট্রোডিউস… ইমরান, মিট মাই ফিয়ান্সে রজার্স। রজার্স দিস ইজ ইমরান।’
ফিয়ান্সে! এলিনা কী তাহলে রজার্সকে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে? এতদিন সে জানত রজার্স তার বয়ফ্রেন্ড—জাস্ট লিভিং টুগেদার! এদেশে অনেকেই সেটা করে। বিয়ের আগে জানাশোনা। বিয়ের আগে জানাশোনা না থাকলে বিয়ের পরে সমস্যা হয়। বিয়ে জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি সিদ্ধান্ত। তাই বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দুজন দুজনকে ভাল করে জানা খুবই জরুরি। অনেকে আবার বিয়ে না করেও বছরের পর বছর এক ছাদের নিচে কাটিয়ে দেয়। তারপর হঠাৎ একদিন একজন আরেকজনের কাছে এসে বলে, ‘আই নিড টু টক টু ইউ।’ অপরজন তখন বুঝে যায়, বিচ্ছেদের ঘণ্টা বেজে গেছে। ‘আই নিড টু টক টু ইউ’ হচ্ছে প্রাথমিক সংকেত।
খানিকক্ষণ অবাক হয়ে চেয়ে থেকে ইমরান বলল, ‘নাইস টু মিট ইউ রজার।’
‘প্লিজড টু মিট ইয়োর একুয়ানটেন্স অলসো এন্ড থ্যাংকস ফর ইনভাইটিং আস।’ বলেই রজার্স ওয়াইনের বোতলটি ইমরানের দিকে এগিয়ে দিল।
‘ইউ আর ভেরি ওয়েলকাম! এন্ড থ্যাঙ্ক ইউ টু!’ ওয়াইন বোতলের গায়ে লাগানো লেবেলটি একনজর দেখে ইমরান সৌজন্যমূলক ধন্যবাদ জানাল রজার্সকে। ইমরান মদ্যপানে অভ্যস্ত নয়। তবে বন্ধুদের জন্যে তার সংগ্রহে খুব ভাল এবং দামী ব্র্যান্ডের ওয়াইন কিংবা হার্ড লিকার থাকে। তার কাছে ব্র্যান্ড তাই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ৷.
‘বাই দ্য ওয়ে—মাই নেম ইজ রজার্স, নট রজার। দেয়ার ইজ অ্যান ‘এস’ এট দ্য এন্ড।’
‘ওহ, ওকে। রজার্স, রজার্স।’ ইমরান দুবার রজার্সের নাম উচ্চারণ করল। তারপর একটু থেমে বলল, ‘ডিনার ইজ রেডি, প্লিজ ফলো মি।’
ইমরান ওদেরকে ডাইনিং রুমে নিয়ে এল। বড় হলওয়ে ধরে হেঁটে যাওয়ার সময় এলিনা চারিদিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখল। একবার উপর তলার দিকেও তাকাল। বসার আগে সে ইমরানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘ইরিন কোথায়? বাসায় নেই?’
‘বাসায়ই আছে। চলে আসবে যে কোনো সময়।’
ইমরান চেয়ার টেনে এলিনাকে বসতে সাহায্য করল। রজার্স বসল এলিনার সামনে—টেবিলের অন্য পাশে।
কেবিনেট থেকে তিনটি ওয়াইন গ্লাস নিয়ে ইমরান এসে দাঁড়াল এলিনা আর রজার্সের মাঝখানে। তিন গ্লাস ওয়াইন ঢেলে দুটি গ্লাস এগিয়ে দিল দুজনের দিকে। সে বসল এলিনা আর রজার্সের মাঝে—কোনার চেয়ারে। তারপর গ্লাস উঁচু করে বলল, ‘চিয়ার্স!’
এলিনা আর রজার্স একসাথে টোস্ট করল। ‘চিয়ার্স!’
সবাই যার যার গ্লাসে ছোট্ট একটা চুমুক দিয়ে গ্লাস নামিয়ে রাখল টেবিলে। কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলা দরকার। যেই বিশেষ কারণে এলিনা রজার্সের হাত ধরে চলে গেছে, সেই বিষয়টি নিয়েই নেহায়েতই কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা বলা যেতে পারে। ইমরান রজার্সের দিকে ঝুঁকে এসে বলল, ‘সো রজার্স, হোয়েন আর ইউ গেটিং হার ইনটু হলিউড…?’ এলিনার দিকে তাকিয়ে একটা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে বলল, ‘লুক অ্যাট হার—শী ইজ সো রেডি টু মুভ!’
রজার্স অস্বস্তি নিয়ে তাকাল এলিনার দিকে। ইমরান কথা শেষ করার আগেই এলিনা তার কাছে মুখ নামিয়ে এনে নিচু গলায় বলল, ‘এসব কথা থাক ইমরান—অন্য কোনো প্রসঙ্গ থাকলে বলো।’ এ প্রসঙ্গে কথা বলতে এলিনার নিজেরও আর ভাল লাগে না—ভাল লাগার অবশ্য কথাও না। যে স্বপ্ন রজার্স তাকে দেখিয়েছিল, সে স্বপ্ন আদৌ কখনো পূরণ হবে কিনা সে নিজেও জানে না।
বাংলাদেশের এক সময়ের আলোচিত মডেল ও অভিনেত্রী এলিনা—এলিনা খান নামেই সমধিক পরিচিত ছিল। মডেলিং এর পাশাপাশি অসংখ্য জনপ্রিয় টিভি নাটকে অভিনয় করেছে সে। ছোট পর্দা ছাপিয়ে বড় পর্দায়ও জুটি বেঁধেছিল ঢাকাই ছবির এক শীর্ষ নায়কের সঙ্গে। কিন্তু কী মনে করে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা সত্বেও এলিনা আমেরিকায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয়। অত্যন্ত সৌন্দর্য এবং স্বাস্থ্য সচেতন একটা মেয়ে সে। বয়স চল্লিশ ছুঁয়েছে—তবুও সৌন্দর্য যেন পিছু ছাড়ছে না তার। বরং দিন দিন আরো আকর্ষণীয়া হচ্ছে সে। চাঁপা ফুলের মতো গায়ের রং—একবার তাকালে মনে হয় আবার তাকাই। সৌন্দর্যের পাশাপাশি ঈর্ষণীয় শারীরিক গঠন এলিনার। সবসময় সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে অভ্যস্ত সে। তাই একটু অতিরিক্ত সচেতন তাকে হতেই হয়। নিয়মিত জিমে যায়। আজও সেই পুরনো এবং আকর্ষণীয়া এলিনার প্রতিনিয়তই নিজেকে ছাপিয়ে যাওয়ার পেছনে অন্যতম প্রধান রহস্য হচ্ছে শরীরচর্চার কঠোর অনুশীলন এবং পরিমিত পরিমাণে সঠিক খাদ্যগ্রহণ।
ইমরান একবার রজার্সের দিকে আড় চোখে দেখে নিয়ে এলিনাকে ইশারায় আস্বস্ত করল। তারপর প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘সো হোয়েন আর ইউ টু গেটিং ম্যারেড?’
রজার্সের কপালে এবার চিন্তার সূক্ষ্ম রেখা দেখা দিল। সে ইতস্তত করছে—কী বলবে বুঝতে পারছে না। এলিনা আবারো তাকে উদ্ধার করল। সে বলল, ‘উই আর থিঙ্কিং জানুয়ারি… বাট উই রিয়েলি ডোন্ট হ্যাভ এ ডেট সেট ইয়েট।’
ইমরান বলল, ‘আই থিঙ্ক জানুয়ারি ইজ এ ওয়ান্ডারফুল মান্থ টু গেট ম্যারেড—দ্য স্টার্ট অফ দ্য নিউ ইয়ার…’ ইমরান তাকাল রজার্সের দিকে। ‘ইউ এগ্রি উইথ মি, রজার?
রজার্স অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে আছে উপরতলার দিকে। মনে হচ্ছে তার চোখ কিছু একটা খুঁজে ফিরছে। ইমরান আবার বলল, ‘ইউ আর নট সেয়িং এনিথিং। আর ইউ নট কমফোর্টেবল?’
‘নো। ইয়েস। আই’ম জাস্ট ফাইন। আই’ম এঞ্জয়িং ইয়োর কনভারসেশন।’ ইমরানের দিকে ঘুরে রজার্স বলল।
‘আর ইউ এগ্রি উইথ মি?’
‘এগ্রি?’ রজার্স আবার খেই হারিয়ে ফেলল। তার চেহারায় দ্বিধা স্পষ্ট। সে বলল, ‘ওহ, ইয়েস, ইয়েস। আই ডু। আই ডু এগ্রি উইথ ইউ।’
এলিনা একটু অবাক হয়ে তাকাল দ্বিধাগ্রস্ত রজার্সের দিকে। তারপর ইমরানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা অস্থিরতার সাথে বলল, ‘ইরিন আসছে না কেন এখনো? আমি কি উপরে একবার যেয়ে দেখব?’
‘আই’ম হিয়্যার।’
দূর থেকে ইরিনের কণ্ঠ শোনা গেল। সবাই ঘুরে দেখল ইরিন নেমে আসছে সিঁড়ি দিয়ে। ইরিনের বয়স চৌদ্দ বছর। মায়ের রূপ পেয়েছে—দেখতে ভীষণ মিষ্টি। তবে স্বভাব হয়েছে বাবার মত। কিছুটা একরোখা এবং রুক্ষ। অল্পতেই রেগে যায়। অন্তর্মুখী স্বভাবের একটি মেয়ে ইরিন। তার চাপা স্বভাবের কারণেই সবার সঙ্গে খোলা-মেলা ভাবে মিশতেও পারে না। বেশিরভাগ সময়ে একা একাই সময় কাঁটায় সে।
ইরিন ধীর পায়ে হেঁটে এসে দাঁড়াল এলিনার পাশে। এলিনা উঠে দাঁড়িয়ে জড়িয়ে ধরল ইরিনকে। বেশ কিছুক্ষণ জোর করে চেপে ধরে রাখল। তারপর ছেড়ে দিয়ে কানে কানে বলল, ‘তুমি রজার্সকে হাই বলবে না?’
ইরিন কিছু বলল না। কোনো রকম আগ্রহও দেখাল না—সে রজার্সের দিকে শীতল দৃষ্টিতে একবার তাকাল শুধু।
রজার্স ইরিনের দিকে তাকিয়ে জোরপূর্বক একটা সৌজন্য হাসি দিল। ইরিন সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ করল না। রজার্স আস্তে করে বলল, ‘হাই ইরিন—ইউ লুক বিউটিফুল।’
ইরিন এবারও কোনো উত্তর দিল না। সে নির্লিপ্তভাবে এলিনার পাশের চেয়ারে বসে রইল চুপচাপ। ইরিনের বসার ভঙ্গিতে মনে হচ্ছে সেও একজন অতিথি।
এলিনা একটু লজ্জিত হলো—একইসাথে বিব্রত বোধ করল। ইরিনের এভাবে রজার্সকে উপেক্ষা করার ব্যাপারটাকে তার মোটেও ভাল লাগেনি। সে মাঝে মাঝেই রজার্সের দিকে তাকিয়ে তার মনোভাব বোঝার চেষ্টা করছে। রজার্সের চেহারা দেখে অবশ্য কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
রজার্সের সঙ্গে এলিনার সম্পর্কটাকে ইরিন মেনে নিতে পারেনি। সেটা ঠিক আছে—মেনে না নেয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে সামান্যতম সৌজন্যতাটুকু দেখাবে না—এটা কেমন কথা। একজন অপরিচিত মানুষকেও তো মানুষ সালাম দেয় কিংবা হ্যালো বলে। ভিতরে ভিতরে কষ্ট পেলেও এলিনা হাসি হাসি মুখ করে ইরিনের দিকে তাকিয়ে ভ্রূ উঁচু করল।
ইরিন তবুও কিছু বলল না। সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শূন্য দৃষ্টিতে খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে রইল। দেখে মনে হয় জগতের কোনো কিছুর প্রতিই তার কোনো আগ্রহ নেই। শুধু শূন্য প্লেটটির দিকে তাকিয়ে থাকাটাই হচ্ছে এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ।
ইমরান তাকাল ইরিনের দিকে। মেয়েটির মনের মধ্যে দিয়ে কিছু একটা হচ্ছে—সেটা আর কেউ না বুঝলেও সে বুঝতে পারছে ঠিকই।
ইরিন ইমরানের দিকে তাকিয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘ডিনার কি রেডি বাবা?’
‘অবশ্যই রেডি! এক মিনিট—এখুনি নিয়ে আসছি।’ বলেই সে দ্রুত কিচেনে গিয়ে ঢুকল।
ওভেনের ডালা খুলে ইমরান দেখল সবকিছু ঠিক আছে কিনা। দুহাতে মোটা কিচেন গ্লাভস পড়ে, টং এর সাহায্যে সে তার বিখ্যাত বিফ স্টেক লোফের ট্রেটি বের করে আনল। অতঃপর মেটাল টংটি ৪৫০ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার জ্বলন্ত ওভেনের ভিতরে রেখে ওভেনের ডালা লাগিয়ে দিল সে। কাজটি কী সে ভুল করে করল নাকি ইচ্ছাকৃত ভাবেই তা অবশ্য তার চেহারা দেখে বোঝা গেল না।
ইমরানের ঠোঁটের কোণে ঈষৎ একটি হাসির রেখা ফুটে উঠে নিমেষেই মিলিয়ে গেল।

পরের পর্ব

Ki-Ghotechilo-Las-Vegase

কী ঘটেছিল লাসভেগাসে (পর্ব-১)

শাহেদের মেজাজ অত্যন্ত খারাপ।
সকাল ১০টা থেকে শায়লা কে সে ফোন করছে, টেক্সট পাঠাচ্ছে অথচ শায়লা কোন উত্তর দিচ্ছে না। এখন বিকেল ৪টা। কোন সমস্যা হলো কি না বুঝতে পারছে না। শায়লার স্বভাব রাতের বেলা ফোনের রিং-টোন মিউট করে দেয়া, কিন্তু সকাল বেলা ফোনটা আনমিঊট করতে ভুলে যায়। আজকেও হয়তো তাই ঘটেছে। কিন্তু শাহেদ বুঝতে পারে না, একটা মানুষ সারাদিনে একবারের জন্যেও ফোন না চেক করে কী করে থাকতে পারে? ফোনটা একবার হাতে নিলেই তো শায়লা দেখতে পেতো শাহেদের মিসকল এবং মেসেজ।
শায়লার ফোন না ধরার সমস্যা আছে। এই বিষয়টি নিয়ে এর আগেও বেশ কয়েকবার শাহেদের ঝগড়া হয়েছে শায়লার সাথে। একবার ব্যবসায়িক খুবই দরকারি একটা কাগজ বাসায় ফেলে কাজে চলে যায় শাহেদ। কাজ থেকে কল করে শায়লাকে, কিন্তু শায়লা ফোন ধরে না। এক বার, দু বার, তিন বার এবং কাজের ফাঁকে ফাঁকে আরো বেশ কয়েকবার ফোন এবং টেক্সট পাঠায় শাহেদ। শায়লার কোন উত্তর না পেয়ে অগত্যা সে বাসায় এসে দেখে শায়লা দিব্যি রান্না ঘরে রান্নায় ব্যস্ত এবং কিচেন কাউন্টারের উপরে তার ফোন।
শাহেদকে দেখে শায়লা কিঞ্চিত অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার? তুমি এত তাড়াতাড়ি ফিরলে যে? তোমার না কী জরুরি মিটিং আছে?’
‘তুমি ফোনটা ধরলে তো আমাকে এভাবে ফিরে আসতে হতো না।’
‘তুমি ফোন করেছিলে নাকি? কই আমি শুনতে পাই নি তো!’
শাহেদ কিচেন কাউন্টার থেকে শায়লার ফোন নিয়ে দেখে, যা সন্দেহ করেছিল তাই। ফোনের রিং-টোন অফ করা। শাহেদের মেজাজ মুহূর্তেই বিগড়ে গেল। সে ফোনটা শায়লার হাতে দিয়ে বলল, ‘নিজেই দেখ।’
শাহেদ রাগে গজ গজ করতে করতে ওর দরকারি কাগজটা নিয়ে কাজে ফিরে যায়। আজকেও নিশ্চয়ই এমন ঘটনাই ঘটেছে।
শাহেদ বাসায় ফিরে দেখে শায়লা বাসায় নেই।
শাহেদ-শায়লার দুই ছেলে মেয়ে। মেয়ের নাম অর্পা, বয়স ১৩ বছর আর ছেলে অর্ক, বয়স ১০। শাহেদ দেখল দু ভাই-বোন যার যার রুমে ঘুমাচ্ছে। ভোর ৬টায় ওদেরকে ঘুম থেকে উঠতে হয় স্কুলের বাস ধরার জন্যে। তাই স্কুল থেকে ফিরেই কিছু একটা খেয়ে দু জনেই ঘুমাতে চলে যায়। সন্ধ্যা অবধি ঘুমিয়ে হোমওয়ার্ক নিয়ে বসে, চলে মধ্যরাত অবধি। শাহেদের খুব মায়া লাগল তারপরেও সে অর্পাকে ডেকে তুলে জিজ্ঞেস করল, ‘হোয়্যার ইজ ইউর মামি।’
ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই অর্পা উত্তর দিল, ‘আই ডোন্ট নো।’
‘স্কুল থেকে ফিরে মামিকে বাসায় দেখনি?’
‘নো।’
‘কোথায় গেছে কিছু জানো?’
‘আই হ্যাভ নো আইডিয়া।’ বলেই অর্পা পাশ ফিরে আবার ঘুমিয়ে পড়ল।
শাহেদ কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে অর্পার রুম থেকে বেড় হয়ে এলো।
টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের একটি ব্যস্ততম শহর ডালাস। আমেরিকার অন্যান্য বড় শহর গুলোর মত এখানেও রয়েছে কয়েক সহস্র বাঙ্গালীর বসবাস। জীবিকা নির্বাহের জন্যে বিভিন্ন ধরনের পেশার পাশাপাশি সফল ভাবে ব্যবসাও করছেন অনেকে। তাদেরই একজন আমাদের গল্পের প্রধান চরিত্র শাহেদ।
শাহেদ বৃহত্তর ডালাসের একজন প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। কমিউনিটিতেও বেশ পরিচিত। অল্পতে রেগে গেলেও একজন বড় হৃদয়ের মানুষ হিসেবে অনেক সুনাম রয়েছে তার।
বসন্তের পড়ন্ত বিকেল। ডালাসের হাইওয়ে ধরে ছুটে চলেছে শাহেদের গাড়ি। প্রায় ত্রিশ মিনিট ড্রাইভিং শেষে শাহেদের গাড়ি এসে থামল উপশহরের একটি বাড়ির সামনের ড্রাইভওয়েতে। পার্ক করেই দ্রুত বের হয়ে বড়ির সম্মুখ দরজায় এসে দাঁড়াল শাহেদ। অস্থিরভাবে কয়েকবার ডোর বেলে চাপ দিল। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবারো ডোর বেলে চাপ দিলো শাহেদ। তার চোখে মুখে বিরক্তির ছাপ সুস্পষ্ট। সিদ্ধান্ত নিল, এবার চাপ দিয়ে দাড়িয়ে থাকবে যতক্ষণ পর্যন্ত কেউ দরজা না খুলে। শাহেদ ডোর বেলের দিকে হাত বাড়াতেই দরজা খুলে গেল।
খোলা দরজার অপর প্রান্তে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে সে এক কথায় সুশ্রী এবং আকর্ষণীয়। বাংলা সাহিত্যে এমন মেয়েকেই বোধ হয় বলে সুন্দরীতমা। সুন্দরীতমার নাম নায়লা। নায়লার সবচেয়ে বড় গুন, যে কোন পরিস্থিতিতেই সে আনন্দে থাকে। তার আনন্দ সীমাহীন। তার অভিধানে দুঃখবোধ বলে কিছু নেই।
শাহেদকে দেখে একটু অবাক হবার ভান করল নায়লা, ‘দুলাভাই, আপনি?’
নায়লার হাসি হাসি মুখের দিকে ভুরু কুচকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বিরক্ত মুখেই জানতে চাইল শাহেদ, ‘দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে? থাকো কোথায়?’
‘সরি দুলাভাই, কিচেনে ছিলাম। ডিশ ক্লিন করছিলাম তো, তাই শুনতে পাইনি।’
‘ঠিক আছে, ঠিক আছে, আর কৈফিয়ত দিতে হবে না। তোমার আপুকে ডাকো।’
‘আপুকে ডাকবো মানে?’
‘কেন শায়লা আসেনি এখানে?’
‘না তো। কেন, শায়লা’পুর আসার কথা ছিল নাকি এখানে?’ নায়লা অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘আসার কথা থাকবে কেন? কিছু হলেই তো সে তোমার এখানে চলে আসে। এই হয়েছে আরেক যন্ত্রণা।’
‘আবার কী হয়েছে?’
‘হবে আবার কী? কিছুই হয়নি।’
‘আসুন ভেতরে আসুন। ভেতরে এসে কথা বলুন।’
‘আরে সকাল থেকে ফোন করছি। বাসার ফোনও ধরছে না, সেল ফোনও ধরছে না। টেক্সট পাঠালাম, নো রেসপন্স। মেসেজ রাখলাম, কোন খবর নেই। এসবের মানে কি?’
‘দুলাভাই, আপনি কি এখানে দাড়িয়েই কথা বলবেন, নাকি ভেতরে আসবেন?’
‘ভেতরে এসে কী হবে?’ বলেই শাহেদ দরজা ঠেলে, নায়লাকে পাশ কাটিয়ে ভিতরে ঢুকে পড়ল। নায়লা চোখ ঘুড়িয়ে দরজা বন্ধ করে শাহেদের পিছে পিছে বসার ঘরে এলো।
‘দুলাভাই, আপনি একটু বসুন, আমি আপনার জন্যে কফি নিয়ে আসি।’
‘না না, কফি আনতে হবে না। মেজাজ এমনিতেই অনেক গরম। এর মধ্যে আর গরম কিছু খেতে চাই না। তুমি এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি নিয়ে আসো।’
নায়লা মুচকি হেসে রান্না ঘরে চলে গেল আর তখনই কাজ থেকে ফিরে ঘরে ঢুকলো নায়লার স্বামী নাভিদ। বসার ঘরে শাহেদকে দেখে এগিয়ে গেল।
‘আরে শাহেদ ভাই, কেমন আছেন, সব খবর ভাল?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, সব খবর ভাল।’
‘শায়লা আপা কেমন আছে? বাচ্চারা সবাই ভাল?’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ সবাই ভাল।’
‘একাই এসেছেন, ওরা কেউ আসেনি?’
‘না। একাই এসেছি।’
‘ইজ এভ্রিথিং অল-রাইট শাহেদ ভাই?’
‘কী যন্ত্রণা, তুমিতো দেখি মনের সুখে একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছ? কেন, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে সামথিং ইজ রং?’ শাহেদ বিরক্তি চোখে তাকাল নাভিদের মুখের দিকে। নাভিদ থতমত খেয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে চুপ করে রইল।
নায়লা বরফ কুচি মিশিয়ে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে দিলো শাহেদের হাতে। এক চুমুকে সবটুকু পানি খেয়ে শাহেদ গ্লাসটা নায়লার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা নায়লা, তুমি বলো, আমাকে দেখে কি মনে হচ্ছে যে সামথিং ইজ রং?’
নায়লা উচ্চস্বরে হেসে উঠল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কই নাতো!’
এবার শাহেদ আবার তাকাল নাভিদের দিকে। নাভিদ অসহায় চোখে তাকাল নায়লার দিকে। নায়লা বুঝতে পেরে প্রসঙ্গ বদলে দিয়ে বলল, ‘দুলাভাই, টেবিলে খাবার দিচ্ছি, আপনি ভেতরে গিয়ে বসুন। নাভিদ, তুমিও ফ্রেশ হয়ে আসো। চলেন দুলাভাই।’
নায়লা শাহেদকে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেল। নাভিদ ওদের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা ঝাঁকিয়ে ঢুকে পড়ল বাথরুমে।
ডাইনিং টেবিলে হরেক রকমের খাবার সাজানো হয়েছে। শাহেদ অন্যমনস্ক ভাবে খেয়ে যাচ্ছে। নাভিদ এসে যোগ দিয়েছে। কারো মুখে কোন কথা নেই। সবার মনোযোগ যেন খাবারের দিকেই। নায়লা শাহেদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘দুলাভাই, রান্না কেমন হয়েছে?’
‘খারাপ না।’ মুখ না তুলেই উত্তর দিলো শাহেদ।
নায়লা বিরক্ত হয়ে জানতে চাইল, ‘খারাপ না মানে কী?’
শাহেদ মুখ তুলে তাকাল নায়লার দিকে, ‘মানে ভালই। আমার শাশুড়ির কাছ থেকে এই একটা জিনিষ তোমরা শিখেছ। তার ভাল কোন গুন তো তোমরা কেউ পাওনি, শুধু এই রান্নাটা ছাড়া।’
নাভিদ বলল, ‘শায়লা আপা এলে ভাল হতো। আড্ডাটা জমতো।’
‘শায়লার খোজেই তো এখানে এলাম। কোথায় যে গেছে কে জানে। কিছুতো বলেও যায়নি। কোন নোট রেখেও যায়নি। সারাদিন চলে গেল, বুঝতে পারছি না।’
‘আপু চলে গেছে। আর ফিরে আসবে না।’ গলার স্বর যথেষ্ট ঠাণ্ডা করে শান্ত ভাবে কথাটা এমন ভাবে বলল নায়লা যেন কিছুই ঘটেনি।
শাহেদ খাওয়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকল নায়লার দিকে। তারপর তাকাল নাভিদের দিকে। আবার নায়লার দিকে ফিরে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘তুমি কী বললে?’
নায়লা সব কিছুই জানে তবুও সে কিছু না বলে চুপ করে রইল।
শাহেদ কিছুতেই বুঝতে পারছে না, এসবের মানে কী?

পরের পর্ব

Hirodye-Aguntuk

হৃদয়ে আগন্তুক (পর্ব-১)

তিথি কিচেনে এসে ঢুকল। তিতলির চোখে এখনো ঘুম। সে ঘুম চোখেই তার মায়ের পিছে পিছে এসে নাস্তার টেবিলে বসল।
তিথি একটা বাটিতে কিছু দুধ-সিরিয়াল ঢেলে তিতলির দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি খেয়ে নাও। আমাদের দেরী হয়ে যাচ্ছে।’ বলেই সে চলে গেল কাপড় বদলাতে।
সকালের নাস্তায় প্রায় প্রতিদিনই তিতলি দুধ-সিরিয়াল খায়। এতে সময় সাশ্রয় হয়। কিন্তু তারপরেও তাকে তাড়াহুড়ো করতে হয়। তিতলি তাড়াহুড়ো করে খেতে গিয়ে বাটি থেকে দুধ ফেলে দিল। গলার কাছে জামার খানিকটা ভিজে গেল। তিতলি লক্ষ্য করেছে, আম্মু যখনই বলে তাড়াতাড়ি করো, তখনই সে একটা ঝামেলা বাধিয়ে ফেলে। সে একটা পেপার টাওয়েল দিয়ে ভেজা অংশটুকু মুছে নিয়ে যেই এক চামচ সিরিয়াল মুখে নিয়েছে, ঠিক তখনই সে শুনল তার আম্মু তাকে ডাকছে।
দরজার কাছ থেকে তিথি আবার ডাকল, ‘তিতলি, তাড়াতাড়ি করো। নয়তো ক্লাসে দেরী হয়ে যাবে। ডোন’ট বি টার্ডি। আমি গাড়ি স্টার্ট দিচ্ছি।’ বলেই সে বের হয়ে গেল।
স্কুলের দিনে তিতলি কখনোই সকালে খাওয়া শেষ করতে পারে না। প্রায়ই তাকে খাওয়া শেষ না করেই উঠে যেতে হয়। আজও সে তাই করল। সে বাকী সিরিয়ালটুকু ট্র্যাস বিনে ফেলে দিয়ে বেসিনে বাটিটা রেখে দিল। তারপর কাঁধে ব্যাক-প্যাকটা ঝুলিয়ে বাইরে এসে দেখল তিথি গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বসে আছে। সে গাড়িতে উঠে বসতেই তিথি দ্রুত রওয়ানা হয়ে গেল স্কুলের দিকে।
হাসান তার বাসার কম্পিউটার ডেস্কে বসে অফিসের কাজ করছিল। সে সকালে এক কাপ কফি বানিয়ে নিয়ে এসে বসেছে। সকাল ন’টায় একটা কনফারেন্স কল ছিল ক্লায়েন্টের সংগে। ৩০ মিনিটের একটা রুটিন কল। প্রতিদিন সকালে ক্লায়েন্টকে আগের দিনের আপডেট দিতে হয়। তারপর সারাদিনে আরো বেশ কয়েকবার কনফারেন্স কল থাকে–কখনো টিমের সংগে আবার কখনো সিনিয়র ম্যানেজমেন্টের সাথে। ব্যস্ততার জন্যে সকালে তার ঐ এক কাপ কফি ছাড়া আর কিছুই খাওয়া হয়নি। হাসান মিটিং শেষ করে কিচেনে গেল কিছু একটা খাবার খাবে বলে। সে ফ্রিজ খুলে দেখল, কিন্তু খাবার মত কিছু খুঁজে পেল না। সে চিন্তিত মনে ফোন করল তিথিকে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন ধরতেই হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘কি করছ?’
‘কি করছি মানে? কাজ করছি। অফিসে এসে মানুষ কি করে?’ তিথি ভ্রূ কুঁচকে উত্তর দিল।
হাসান হেসে ফেলল।
তিথি কাজ করে একটা ট্রাভেল এজেন্সিতে। তার টেবিলের সামনে একজন ক্লায়েন্ট বসে রয়েছে। একটা ইন্টারন্যাশনাল ফ্লাইটের টিকেট রিজার্ভেশনের জন্যে ক্লায়েন্টের ইনফরমেশন এন্ট্রি করছিল সে। এর মধ্যে হাসানের ফোন। তিথি ক্লায়েন্টের দিকে একবার তাকিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘কি বলবে তাড়াতাড়ি বলো। ক্লায়েন্ট বসে আছে সামনে।’
‘এই ইয়ে, তিথি, বাসায় তো কোন রান্না নেই। দুপুরে খাবো কি?’
‘আমি কাজ থেকে এসে রান্না করবো। আপাতত কিছু একটা খেয়ে নাও।’
‘কিন্তু সেই কিছু একটা কি? ফ্রিজে তো কিছু নেই।’
‘নেই তো আমি কি করবো? ডীপ ফ্রিজে প্যাকেট ফুড আছে কিনা দেখো। নাহলে কিছু একটা রান্না করে নাও।’
‘রান্না? আমি কখন করবো?’
‘আশ্চর্য হাসান, সব কিছু আমাকে বলে দিতে হবে? রান্না করতে না চাইলে বাইরে গিয়ে কিছু খেয়ে আসো।’
‘ঠিক আছে, রাখি তাহলে।’
‘ওকে, বাই।’ তিথি ফোন রেখে দিয়ে সামনে বসা ক্লায়েন্টের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সরি ফর দ্য ইন্টারাপশন!’
‘ইট’স অলরাইট।’
তিথি কম্পিউটার স্ক্রিনে আরেকবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফ্লাইট আইটিনেরারি প্রিন্ট করে আনল। তারপর ভাঁজ করে একটা এজেন্সির খামে ভরে ক্লায়েন্টের হাতে দিয়ে বলল, ‘ইউ আর অল সেট মিঃ ম্যাথিউ। ইফ ইউ হ্যাভ এনি কোয়েশ্চেন অর নিড টু মেক এনি চেঞ্জ, প্লিজ কল মি।’
‘আই সিউর উইল। থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘মাই প্লেজার।’
ক্লায়েন্টকে দরজা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে এসে তিথি ফোন করল হাসানকে।
হাসান ফোন ধরতেই তিথি বলল, ‘এক কাজ করো, ডীপ ফ্রিজে গত সপ্তাহের রান্না করা মাংস আছে। ওটা গরম করে খেয়ে নাও।’
‘অসুবিধা নেই। ফ্রিজে টার্কি স্লাইস আছে দেখলাম। একটা স্যান্ডুইচ বানিয়ে খেয়ে নেবো। তুমি ভেবো না।’
‘দ্যাটস গুড। আমি রাখি তাহলে। আর শোন, তুমি তো একবার কাজে ডুব দিলে জাগতিক সবকিছু ভুলে যাও। তিতলিকে আনতে ভুলে যেও না আবার।’
‘না, না ভুলবো না। এমন ভাবে বলছো যেন আমি প্রায়ই তিতলিকে আনতে ভুলে যাই।’
‘ভুলে যেতে, যদি প্রতিদিন আমি তোমাকে রিমাইন্ড না করাতাম। তোমাকে তো আমি চিনি! তোমার আর কোন কনফারেন্স কল নেই তো আজ, নাকি আছে?’
‘একটা কল আছে দু’টার সময়। কলটা শেষ করেই আমি তিতলিকে আনতে চলে যাবো। তুমি ভেবো না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। রাখি তাহলে। বাই।’

পরের পর্ব