সিমি,
প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, তোমাকে কলব্যাক করতে পারি নি বলে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! গভীর রাতে আমার ফোনটা একবার বেজে উঠল। আমার এখানে তখন ভোররাত ৩:১১! ফোনটা কি তুমি করেছিলে?
তোমার জীবনের গল্প শুনে আমি কিন্তু আর মন খারাপ করে নেই এখন। তবে বেশ কিছুদিন তোমাকে নিয়ে অনেক ভেবেছি তা অস্বীকার করব না। আমারও মনে হয়, জীবনকে জীবনের নিয়মেই চলতে দেয়া উচিৎ। পেছনের কথা ভেবে থেমে থাকলে তো চলবে না। মানুষের জীবনে দুঃখ যেমন থাকে, সুখের স্মৃতিও তো থাকে। জীবনে দুঃখ–কষ্ট, বেদনা–ব্যর্থতা আসবেই। এসব নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
তুমি তো খুব সুন্দর করে বললে সিমি; সত্যিই তো সৃষ্টিকর্তাই হচ্ছে চিফ স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং কারো সাধ্য নেই সেই স্ক্রিপ্ট পরিবর্তন করার। আর হ্যাঁ, সৃষ্টিকর্তার ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস এবং আস্থা দুইই আছে।
আমার হৃদয়ের নিলয় থেকে অলিন্দে তোমার জন্যে বেশ খানিকটা জায়গা খালি করেছি। রিজার্ভেশন পাক্কা। তুমি ডিজার্ভ করো তাই অটো রিজার্ভ হয়েছে। তবে , বিনিময়ে ছোট একটা জিনিষ চাইব।
তোমার একটা মিষ্টি হাসি
যদি পাই,
বর্ত্যে যাই,
কিছু আর নাহি চাই।
তোমার সঙ্গে যখন দেখা হবে, এই উপহারটি আমায় দিও। তাতেই আমি খুশি হবো—অনেক।
ভালো থেকো মেয়ে। আমাদের কিন্তু কথা বলার কথা। অপেক্ষায় আছি—
ফাহিম।
………
আজ ফাহিমের মনটা ভীষণ ফুরফুরা। সিমির সাথে তার ফোনে কথা হয়েছে। মেয়েটির কণ্ঠস্বর, কথা বলার ঢং, উচ্চারণ, সারাক্ষণ হেসে হেসে কথা বলা, দুষ্টুমি—সব কিছু মিলিয়ে অন্যরকম একটা ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হলো ফাহিম। আবার একটু কষ্টও হলো, এই ভেবে যে এমন স্বতঃস্ফূর্ত, হাসিখুশি মেয়েটির জীবনে কেন এমন একাকীত্ব!
সিমির সঙ্গে কথা বলার পর ফাহিমের আরো একটা উপলব্ধি হলো। তার মনে হলো মেয়েটির চরিত্রের মধ্যে একধরণের রহস্যময়তা আছে। ঘুমতে যাবার আগে ফাহিমের ইচ্ছে হলো কয়েক লাইন মেইল লিখে পাঠানোর। সে লিখল—
রহস্যময়ী মেয়ে,
I love when you laugh, I like when you laugh. Wish you can laugh like that forever.
সত্যিই তুমি এত সুন্দর করে হাসতে পারো, আমি তো তোমার হাসির প্রেমেই পড়ে গেছি। দুষ্টুমিও বেশ ভালোই জানো দেখছি। যদিও আমি ভালো কথা বলতে পারি না, সুন্দর করে তো নয়ই। অথচ তোমার সঙ্গে কী সাবলীল আর সহজভাবেই না কথা বলে গেলাম। ননস্টপ। এ কি আমি? নিজেই ভীষণ অবাক হয়েছি। অথচ, আমি কথা বলতে পারি না, হাসাতে জানি না, মন ভালো করে দেবার কোনো ক্ষমতা আমার নেই—আরো কত কী শুনি নিজের সম্পর্কে। জানি না, তোমার কাছে কী মনে হয়েছে, অথবা কী ভেবেছ আমার সম্পর্কে—আমি কিন্তু বেশ এনজয় করেছি তোমার সঙ্গ। মনেই হয় নি, একে অপরের কাছ থেকে ১২,৭২২ কিলোমিটার দূরত্বে আমাদের অবস্থান ছিল।
এই প্রথম ফোনে আমাদের কথা হলো অথচ মনে হয়েছে তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের চেনা কেউ। প্রতিদিনই আমাদের দেখা হয়, কথাও হয়। কত আপন। আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন, খুঁজি তারে আমি আপনায়…
কেন জানি না, গত বেশ কয়েক দিন ধরে, আমি প্রতি মুহূর্তে কেবল তোমার কথাই ভাবছি। আমি তোমাকে দেখতে পাই, চোখ খোলা থাকুক বা বন্ধ। আমার অদেখা তোমার মুখটি সারাক্ষণ চোখের সামনে ঘুরে।
এটুকু লিখে ফাহিম ভাবতে লাগল। হঠাৎই আর কোনো কথা খুঁজে পেল না সে। অনেকক্ষণ ধরে আতিপাতি করে কথা খুঁজে না পেয়ে তার পছন্দের একটা গানের কিছু লাইন লিখল—জনপ্রিয় আমেরিকান গায়ক রয় অরবিসনের ‘রহস্য মেয়ে।’
In the night of love
Words tangled in her hair
Words soon to disappear
A love so sharp it cut
Like a switchblade to my heart
Words tearing me apart
She tears again my bleeding heart
I want to run, she’s pulling me apart
Fallen angel cries
Then I just melt away
She’s a mystery girl
…
কাজ থেকে ফিরে ফাহিমের মেইল পড়ল সিমি। মনে মনে হাসল। একটু ভাবল এবং উত্তর লিখল প্রায় সাথে সাথেই।
এই ফাহিম,
তুমি কি প্রেমে পড়ে গেলে নাকি? কিন্তু তোমার তো প্রেমে পড়া বারণ। একেবারেই না না। এখন কী হবে তবে? সামনে সমূহ বিপদ তোমার।
আমার ধারণা তুমি প্রেমে পড়েছ, আবার—এমন একটি মেয়ের, যে রহস্য ভালোবাসে, হঠাৎ করেই সে তোমার জীবনে এসেছে রংধনুর সাত রঙে রাঙ্গিয়ে, সূর্যের সব আলো ছড়িয়ে। যদিও সেই রঙ কিংবা আলোর কোনোই প্রয়োজন নেই তোমার জীবনে। আমি কি ঠিক বলেছি?
তোমার বউ যদি জানতে পারে, তোমার কিন্তু খবর আছে বন্ধু। ধরা পড়ে গেলে আমাকে দোষ দিতে পারবে না কিছু। আমি কিন্তু আগেই সাবধান করে দিচ্ছি। 😛
তুমি কয়েক লাইন কবিতা লিখেছ না কি গান, কিছুই বুঝি নি। ব্যাখ্যা করবে? কে এই মিস্ট্রি গার্ল? প্রিটি প্রিটি প্লিজ।
আমি অবশ্যই হাসবো, সত্যিকার উচ্চ শব্দে হাসা যাকে বলে। তুমি যখন দেশে আসবে, দেখবে আমার হাসি। আমি কেমন হাসতে পারি নিজ চোখেই দেখো। তখন কিন্তু শব্দদূষণের জন্য আমাকে দায়ী করতে পারবে না।
আমি আর কিছু লিখতে চাইছি না। আমার অংশটুকু কাল লিখব। সে পর্যন্ত ভালো থেকো।
লটস অফ লাভ।
অ্যা মিস্ট্রি গার্ল।
…
সিমি,
তোমার বুঝি তাই ধারণা যে আমি তোমার প্রেমে পড়েছি? এত দ্রুত? তোমার সঙ্গে আমার এই মেইল চালাচালির সম্পর্ককে কি প্রেম বলা ঠিক হবে?
না বন্ধু, আমাকে নিয়ে ভয় পেও না। সেই অর্থে যাকে প্রেম-ভালোবাসা বলে, তেমন প্রেমে পড়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই—অন্তত আমার পক্ষ থেকে। যদিও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, রহস্যময়ী মেয়েটি আমার মনোঃদৃষ্টি আকর্ষণ করেছে খুব ভালোভাবেই। হঠাৎ দেখা দেয়া রঙধনুর মতোই।
মানুষের জীবনটাও কিন্তু রংধনুর রংয়ের মতোই। হঠাৎ করে সুখ দেখা দেয়, কিছু সময় সে সুখ স্থায়ী হয়। আবার চলেও যায়।
ভালোবাসা, এই এক ছোট শব্দে আছে হাজার অনুভূতির মিশ্রণ। ভালোবাসাকে কতভাবেই তো সংজ্ঞায়িত করা যায়। পৃথিবীতে সহস্র ধরণের ভালোবাসা আছে। আমি যদি তোমাকে ভালোবাসিও, তোমার মতো একজন বন্ধু তেমন ভালোবাসা পেতেই পারে। একজন মানুষের বুকে অনেক এবং অনেকের প্রতিই ভালোবাসা থাকতে পারে। থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না।
তোমার প্রেমে যেন না পড়ে যাই, তারজন্যে আমাকে আগেভাগেই সতর্ক করে দেবার জন্য ধন্যবাদ তোমাকে। যদিও, আমাকে সতর্ক করে দেবার অনেক আগে থেকেই আমি জানি—আমার সীমাবদ্ধতার কথা। কাজেই বেশি টেনশন নিও না। বন্ধু যেখন ভেবেছি, সম্পর্কটা সেখানেই লক করা থাকবে—অন্তত আমার কাছ থেকে। তোমাকে ঝামেলায় ফেলবার কোনো অভিসন্ধিই আমার নেই। আমার কোনো আচরণে তুমি যদি অস্বস্তিবোধ করো জানিয়ে দিও। মানুষ বলে কথা। আচরণের তারতম্য হতে পারে।
জনপ্রিয় আমেরিকান গায়ক রয় অরবিসনের ‘রহস্য মেয়ে’ শিরোনামের একটা গানের কিছু লাইন লিখেছিলাম তোমার জন্য। ব্যাখ্যা তো দিতে পারব না। আমি কবিও নই—লেখকও নই। তবে গানটির আরো কয়েকটি লাইন লিখে দিচ্ছি, আমার ধারণা এটুকু বুঝতে কোনো অসুবিধাই হবে না—ব্যাখ্যারও প্রয়োজন পড়বে না।
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
…
ফাহিম,
তুমি দেখি প্রেমে পড়া বারণ সংক্রান্ত কথাগুলোকে সিরিয়াসলি নিয়েছ। আই ওয়াজ জাস্ট জোকিং বাবা—ট্রায়িং টু পুল ইয়োর লেগস। তোমার সীমাবদ্ধতার কথা কি আর আমি জানি না? তার ওপরে আমি নিজেও তো আমার সীমাবদ্ধতার কথা জানি। আর তুমি না বললেও আমি খুব ভালো করেই জানি যে তুমি তোমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসো। আমিও ভালোবাসি আমার স্বামীকে। যদিও সে আর আমার কাছে নেই।
আমি তোমার সঙ্গে দুষ্টুমি করেছি মাত্র ফাহিম, প্লিজ আমাকে ভুল বুঝো না। আমি এমনই। আর হ্যাঁ, আমিও তোমাকে অনেক পছন্দ করি।
তুমি কিন্তু বললে না, কেন তুমি আমাকে মিস্ট্রি গার্ল বলেছ… প্লিজ টেল মি না
…
এই ছোট মেইলটা পাঠিয়ে দিয়ে সিমির হঠাৎ মনে হলো, একটা প্রশ্ন ছিল, করা হয় নি। সে আবার লিখল—
তোমাকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি, আচ্ছা তার মানে এই কি যে আমি যদি না হাসি, তুমি আমাকে ভালোবাসবে না?
ওকে বাই।
তোমার রহস্য মেয়ে
পুনশ্চ: ফাহিম, আমি তোমার কাছ থেকে মায়া, দয়া, অনুকম্পা, সহানুভূতি কিছুই চাই না। যেমন আছে আমাদের চিঠির সম্পর্ক তেমনি স্নিগ্ধ ভালোবাসার আলোয় উজ্জ্বল থাকুক-এটুকুই আমার কাম্য।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৯)
(গত পর্বের সিমির চিঠির বাকী অংশ…)
কুড়িতে পড়তে না পড়তেই, আমি একজন নিখুঁত মানুষের প্রেমে পড়ে যাই। দুই বছর প্রেম করে আমরা গাঁটছড়া বাঁধি। আমাদের বিয়ের গল্পটা সত্যিই সিরিয়াস কিছু। তোমাকে পরে বলব এক সময়।
একটা দুর্ঘটনার পর থেকে আমার শাশুড়ি বিছানায় পড়ে ছিল প্রায় ৬ মাসেরও বেশি। পুরো বাড়ি এবং সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে আমার কাঁধে। আমার বয়স তখন মাত্র বাইশ বছর। বিয়ের দুই বছর যেতে না যেতেই রানার পাকস্থলীতে একটা সমস্যা দেখা দেয়। বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার পর জানা গেল, মানুষটার জন্মই হয়েছে একটা কিডনি নিয়ে এবং সেটাও ঠিকমতো কাজ করছে না, এক অর্থে বিকল। এ কথা জানার পর, হঠাৎই কেউ যেন আমার চোখ দুটো কালো পর্দায় মুড়ে দিলো। সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে এলো চারিদিকে। যেদিকে তাকাই, শুধুই অন্ধকার। সবকিছুই কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো। তবুও আমি আশা ছাড়ি নি এক মুহূর্তের জন্য। বিশ্বাস করো ফাহিম, আমার মুখ থেকে একবারের জন্যেও হাসি মুছে যায় নি। সত্যি কথা বলতে কী, রানাকে যখন ভর্তি করালাম চেন্নাই’র ভেলর হাসপাতালে, কিডনি বায়োপ্সি করার জন্য—আমার মুখের ঐ হাসিটুকুই ছিল তার জন্য উপহার স্বরূপ।
তারপরে কতদিন চলে গেছে, কত স্মৃতি নিয়ে। আমাদের বিবাহিত জীবনটা ছিল অন্যরকম—এক কথায় ঈর্ষণীয়। কোনো পার্টিতে গেলে সবাই আমাদের দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকাত। আমি রানার দিকে তাকাতাম, নিজে নিজেই গর্বিত হতাম। অহংকারী হতাম। ভাবতাম, আমার হাত ধরে থাকা এই মানুষটি আমার স্বামী। আমার খুব ভালো লাগত। অনেক ভালোবাসতাম সেই অনুভূতি।
পাঁচ বছর পর, রানার কিডনি যখন আর নিতে পারছিল না, তখন ডায়ালাইসিস শুরু করতে হলো। রক্ত পরিশোধনের একটি আধুনিকতম প্রক্রিয়া হচ্ছে ডায়ালাইসিস। কিডনি যখন অতিমাত্রায় বিকল হয়ে পড়ে, তখন এটি করতে হয়। যখন ডায়ালাইসিস করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন রোগীর চিকিৎসার জন্য কিডনি সংস্থাপন ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় থাকে না। এ অবস্থায় রোগীকে বাঁচানোর জন্য ডায়ালাইসিস করতে হয়। কাজেই একবার ডায়ালাইসিস শুরু করলে পরবর্তী সময়ে সেটি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন ডায়ালাইসিস না করা মানে অকালে মৃত্যুর প্রহর গোনা।
শুরু হলো আমার দুঃস্বপ্নের দিন। সেদিনগুলির কথা আমি আর মনে করতে চাই না। আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক আর কষ্টের সময়। তার আগে আমি বুঝতেই পারি নি, ঐ মানুষটাকে আমি কত ভালোবাসতাম। বুঝতে পারি নি, ঐ মানুষটা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। অথচ তাকে একটু ভালো রাখবার জন্য কিছুই করতে পারছিলাম না আমি। এতটা অসহায়ত্ব আমি আমার জীবদ্দশায় আর কখনোই অনুভব করি নি। আহ, সেই কষ্টের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কষ্ট মানুষকে কাঁদায় না, নীরব করে রাখে। আমিও নীরবে পাথর হয়ে গেলাম অনেকটাই।
আমি আমার জীবনকে বাজী রাখলাম, যে কোনোভাবেই হোক, আমি রানাকে সুস্থ করে তুলবোই কিন্তু বুঝতে পারি নি, সৃষ্টিকর্তা বাজী ধরা পছন্দ করেন না। তিনি চান নি, রানা আমার জীবনে থাকুক এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো ক্ষমতাই আমাদের নেই।
আমার পুরো জীবন যেন উত্তাল সমুদ্রে ডুবে যাওয়া এক কাগজের নৌকা। আমার স্বপ্ন ছিল সমূদ্রের মতো বিশাল, আর বাস্তবতা ছিল কাগজের নৌকার মতো ঠুনকো। আমি তাকে হারালাম। আমার হাজারো চেষ্টা ব্যর্থ করে সে চলে গেল।
শেষ বিকেলের পশ্চিমাকাশে ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা যখন হেলে পড়ে, ধীরে ধীরে হলুদ থেকে লাল হয়ে যাওয়া নির্জীব ও নির্মল সূর্যটা বিদায় নেবার পূর্বে শেষ বারের মতো মেঘের মধ্য থেকে মাথা বের করে তার কুসুম বর্ণ রূপ দেখাবার জন্য আরেকবার উকি দেয়—তারপর আচমকাই দিগন্তে ডুবে যায়। এখন আমি দিগন্তরেখায় এক অস্তগামী সূর্য ছাড়া আর কিছুই নই। আমার জীবনটা ধীরে ধীরে দিগন্তরেখার নীচে ডুবে যাচ্ছে অস্তগামী সূর্যের মতোই।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, বেলা যে ফুরিয়ে যায়
কখন যেন হঠাৎ করেই চলে যেতে হবে
সময়ের হাতে বুঝি সময় আর বেশি নাই!
আজ আমাকে লেখায় পেয়ে বসেছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি এই মেইলটি অনেক বড় হয়ে গেছে। কী জানি এমন দীর্ঘ লেখা পড়তে পড়তে তোমার চোখ জ্বালা করবে কিনা। যদি বোর ফিল করো তার জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তোমাকে বোর করার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই।
আমার ঘুম পাচ্ছে। তোমার সঙ্গে কালকেই চ্যাট করতে চাই। দেখা দেবে তো?
আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ। তুমি আমাকে সুন্দর করে একটা চিঠি দেবে। যে চিঠি পড়ে আমার মন ভালো হয়ে যাবে।
ভালো থেকো হে প্রিয়। ভালোবাসায় থেকো—ভালোবাসায় রেখো! সবসময়।
সিমি।
It’s not what’s happening to you now or what has happened to you in your past that determines who you become. Rather, it’s your decisions about what to focus on, what things mean to you, and what you’re going to do about them that will determine your ultimate destiny. –Anthony Robbins
…………।
প্রিয় সিমি,
তোমার মেইলটি পড়ার পরে আমি একরকম অসাড় হয়ে গেছি। আই লস্ট মাই সেনসিটিভিটি। মনে হচ্ছে কেউ যেন একটা ধারালো বস্তু আমার হার্টে ঠুকে দিয়েছে। আমি ভীষণ মর্মাহত হয়েছি। গভীর অন্তর্বেদনায় ভুগছি। তোমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সবকিছুর জন্যেই সমবেদনা বা সহমর্মিতা প্রকাশ করা ছাড়া আর কীইবা করতে পারি! এর চেয়ে বেশি কিছু লিখতেও যে পারছি না। জীবনে এই প্রথম কারো চিঠির উত্তরে কী লিখব তা ভেবে দিশেহারা হচ্ছি।
কিছু কিছু সময়ে শুধু লিখে বা ফোনে সত্যিকারের আন্তরিকতা বোঝানো যায় না। খুব কাছে এসে মাথাটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে সমবেদনা জানাতে পারলে মনে হতো কিছুটা কষ্টের ভাগ নিতে পেরেছি। কিন্তু চাইলেই তো আর সেটা সম্ভব না।
মাঝে মাঝে ভেবে অবাক হই, সৃষ্টিকর্তা কেন এত নিষ্ঠুর হয়! কেন এত কষ্ট দেয়। এভাবেই কেন?
আমার ব্যস্ততার কারণে আমি আজকেও একটা দীর্ঘ মেইল লিখতে পারব না জানি। ভীষণ দুঃখিত। তবে আমি চেষ্টা করব লিখতে না পারলেও অন্তত ফোনে তোমার সঙ্গে কথা বলতে। অ্যান্ড দ্যাটস অ্যা প্রমিজ। কথা বলবো কী, আমার তো এখনই ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে তোমার কাছে। ইচ্ছে হয়, শক্ত করে জড়িয়ে ধরি তোমাকে। শুষে নেই তোমার সব কষ্ট!
আমি খুবই ব্যস্ত থাকব কিছুদিন। তবে যত ব্যস্তই থাকি না কেন, আমার মনটা কিন্তু পড়ে থাকবে তোমার কাছেই। তোমার পাশে। ইনভিজিবল হয়ে।
তোমার অনাগত দিনগুলিতে আমাকে পাশে পাবে সবসময়। সে আমি যত দূরেই থাকি না কেন?
তোমাকে তো বলা হয় নি, আমার হার্টটা কিন্তু বেশ বড়। আই মিন লিটারেলি, বিগ। আই হ্যাভ বিন ডায়াগনোজড অ্যাজ কার্ডিয়াক এনলার্জমেন্ট। কাজেই আমার হৃদয়ের কোনো এক কোণে তোমার জন্য একটু জায়গা নিশ্চয়ই হবে।
তোমার হাসি দেখতে ইচ্ছে করে। খুব। কবে দেখব?
যখনই মন খারাপ হবে জানিও, আমি কল দেবো। তোমার যদি কথা বলতে ইচ্ছে হয়, তাহলেও জানিও।
এখন যাই। ভালো থেকো।
অনেক অনেক ভালোবাসা।
ফাহিম।
…………
যথারীতি ঘুম থেকে উঠেই অফিসের যাবার আগে সিমি মেইল চেক করতে বসল। ফাহিমের কোনো মেইল নেই। ফাহিমকে অনলাইনেও দেখা গেল না। একটু মন খারাপ করে সে অফিসে গেল। কাজের ফাঁকে কয়েক দফায় মেইল চেক করল, না নেই।
কাজ থেকে ফিরে সিমি গোসল সেরে, কী মনে করে একটা তাতের শাড়ি পড়ল। সিমি কখনো তেমন একটা সাজগোজ করে না। রাতের খাবার শেষ করে মেইল খুলে বসল সে। ফাহিমের কোনো উত্তর নেই। আবারো হাওয়া হয়ে গেছে মানুষটা। কিছুটা আনমনা হয়ে বসে থেকে আবারো একটা মেইল লিখতে বসল আর ঠিক তখনই ফাহিমের ইমেইল এলো।
সিমি দ্রুত কয়েকবার মেইলটি পড়ল তারপর ধীরেসুস্থে একটা উত্তর লিখল।
সাবজেক্ট লাইনে লিখল, ‘না জানি কেনরে এত দিন পর জাগিয়া উঠিল প্রাণ।’
ফাহিম প্রিয় বন্ধু আমার,
কেন যেন মনে হচ্ছে আমার দীর্ঘ চিঠি পড়ে তোমার মন খারাপের মতো কিছু একটা হয়েছে। আমার কারণে তোমার মন খারাপ হোক, সেটি আমার কাম্য নয়। তুমি জানতে চেয়েছিলে বলেই আমি আমার জীবনের কিছু কথা তোমায় বলেছি। বিশেষ করে আমার দুঃখের স্মৃতিগুলো তোমার সাথে ভাগ করে নিয়েছি। আমার অনেক সুখের স্মৃতিও আছে, যা আমার মাথাকে সোজা এবং উঁচু রাখতে সাহায্য করে। আমি আমার সারা জীবন সেই স্মৃতিগুলো রোমন্থন করেই বেঁচে থাকতে পারব। আমি সত্যিই ভীষণ আনন্দিত, তোমার মতো একজন বন্ধু আছে আমার। আমাকে নিয়ে তোমার ভাবনা আমাকে আপ্লুত করে। আমার ইচ্ছে, আমাদের এই বন্ধুত্ব অটুট থাকুক সারাজীবন। থাকবে ইনশাল্লাহ।
আমার কি মনে হয় জানো ফাহিম, আল্লাহ কখনোই নির্দয় হয় না। আমি জানি না তুমি কতটা আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী তবে আমার শতভাগ বিশ্বাস রয়েছে তার ওপর। এবং আমি এও বিশ্বাস করি, তিনি যাই করেন না কেন, তার পেছনে একটা কারণ থাকে। তিনি যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আমি আমার ভাগ্যের জন্য আল্লাহকে কখনোই অনুযুক্ত করি না। কী জানি, হয়তো তার কোনো বেটার প্লান আছে আমাকে নিয়ে। তার চেয়ে বড় স্ক্রিপ্ট রাইটার তো আর কেউ নেই। আমার কী সাধ্য, সেই স্ক্রিপ্ট আমি এডিট করি?
আশাকরি তুমি তোমার ফ্যামিলির সাথে সময়টা ভালোই কাটাচ্ছ। তোমার মা কি তোমার সাথে শিকাগোতেই থাকেন? আর তোমার বাবা? তোমার ফ্যামিলি লাইফ সম্পর্কে জানিও। এবং তোমার স্ত্রীর কথাও। দেখেতো মনে হচ্ছে সে খুবই ফ্রেন্ডলি পারসন। আমি জানি না, তোমাকে আগে কখনো বলেছি কিনা, তোমার বৌ কিন্তু ফাটাফাটি সুন্দরী। তোমরা ছেলেরা যাকে বলো হট, সে কিন্তু সেই কিসিমের হট। আর তোমার মেয়ে? তার কথাও জানিও।
তুমি আমাকে নিয়ে এত ভাবো, বিষয়টা ভাবতেও ভালো লাগে। নিজেকে এখন আর একা মনে হয় না। আমি কোনো কিছু নিয়েই আর উতলা হই না। আবগেতাড়িত হয়ে কষ্টও পাই না। দিন শেষে এটা ভেবে ভালো লাগে যে, দূরে হলেও কেউ একজন আছে যার ওপর আমি ভরসা করতে পারি। তোমার ওপর, কেন জানি না, অজানিতেই ভরসা জন্মে গেছে। এই ভরসা আমাকে একটু হলেও কিছু অতিরিক্ত শক্তি জোগায়, সাহস দেয়। জীবনকে এগিয়ে নিতে এই অতিরিক্ত সাহস আর শক্তিটুকুর ভীষণই প্রয়োজন। অনেক ধন্যবাদ ফাহিম। তোমার কাছে অনেক ঋণী হয়ে যাচ্ছি। জানি না এসব ঋণ কী করে শোধ দেব। যদি দেখা হয় কোনোদিন, কী নেবে জানিয়ে দিও আগে ভাগেই।
তোমার হার্টের সমস্যার কথা জেনে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়েছি। আল্লাহর কাছে অনেক প্রার্থনা করছি, তিনি যেন সব সময় তোমাকে সুস্থ রাখেন। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বলতে পারি, হৃদযন্ত্রের যে কোনো সমস্যাকে হালকাভাবে দেখো না। আবারো বলছি। এটা অনেকটা আমাদের মনের মতোই। যে কোনো মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। রানারও এনলার্জড হার্ট ছিল। যদিও এটা তার জীবনে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে নি তবে তার শেষ নিঃশ্বাস নেবার আগে তার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরিভাবে।
তোমার নিজের ব্যস্ত জীবন এবং তোমার পরিবারের বাইরে আমার জন্য একটু জায়গা আছে এটা জেনে ভীষণ সুখী হলাম। এরজন্য আলাদাভাবে তোমাকে কোনো ধন্যবাদ দিতে চাই না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তোমার জীবনে অলিখিত কিংবা অদৃশ্য একটা অধিকার ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে আমার। সেকথা থাক, হার্টের চিকিৎসা ঠিকঠাক মতো করাও। প্লিজ এটাকে নিয়ে হেলাফেলা করো না। তোমার কিছু হয়ে গেলে সে খবর শোনার মতো মানসিক শক্তি আমার হবে না। আই ক্যান্ট অ্যাফোর্ড টু হিয়ার দ্য নিউজ অফ ইউ সাফারিং ফ্রম এনিথিং! তুমি কি তা বোঝ?
তুমি অবশ্যই আমার হাসি দেখবে। তবে কখন তার সঠিক সময় হয়তো বলতে পারব না এই মুহূর্তে, তবে দেখবে অবশ্যই। তুমি যখন ঢাকা আসবে তখনই দেখবে। অথবা আমি যদি শিকাগোতে যাই। যেতেও তো পারি—কিছু কি বলা যায়?
আজ আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। আমি জানি তুমিও আমার মতো দীর্ঘ মেইল পড়তে পছন্দ করো। কি ঠিক বলি নি?
আমি অনলাইনে থাকব কিছুক্ষণ। তোমাকে খুঁজব কিছুক্ষণ। তোমাকে পেলে কথা বলব কিছুক্ষণ। না পেলে মন খারাপ করে থাকব কিছুক্ষণ।
ভালোবাসা তবুও অনেক।
সিমি।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৮)
হ্যালো ফাহিম,
তুমি কি আমার আগের মেইল দুটো পেয়েছিলে? পরপর দুটো মেইল পাঠিয়েছি তোমাকে। দুদিন হয়ে গেল, কোনো উত্তর এলো না। একটু অবাকই হলাম। তুমি ঠিক আছ?
তোমাকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছিলাম। আমাকে কোনো টেক্সটও পাঠাও নি। আমি বলেছিলাম তুমি চ্যাট করতে না পারলে আমাকে টেক্সট করে জানিও। আমি তাহলে আর লগইন করব না। তুমি কিছু জানাও নি, তবুও আমি গত দুদিন অফিসে যাওয়ার আগে তুমি অনলাইনে আছ কিনা দেখার জন্য লগইন করেছি। তুমি ছিলে না। একটা মেসেজও রাখো নি আমার জন্য। ইশ কী নিষ্ঠুর একটা মানুষ তুমি।
তোমার মেইলের অপেক্ষায়, মন খারাপ করে বসে আছি আমি।
হোপ অল ইজ ওয়েল। লাভ ইউ।
সিমি।
…
পরের দিনও কোনো মেইল এলো না। সিমি অফিস থেকে ফিরে আবারো দু’লাইন লিখে পাঠাল ফাহিমের ঠিকানায়।
হোয়াট ফাহিম? নো মেইল ফর মি? মি স্যাড ☹
এটা খুবই অন্যায়। ভীষণ। তুমি জানো একজন মানুষ তোমার মেইলের অপেক্ষায় থাকে। অথচ তার কথা তোমার মনেই পড়ছে না। এটা কোনো কথা? আরে বাবা, দুটো লাইন লিখে তো পাঠাতে পারো। নাহয় টেক্সট মেসেজ দাও। অথবা ইয়াহুতে।
এভাবে চুপ করে থাকলে আমার বুঝি কষ্ট হয় না? কী হয়েছে তোমার? আমি কি এমন কিছু লিখেছি কিংবা আমার কোনো কথায় কি তুমি আহত হয়েছ? কিছু একটা তো বলো।
এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে তোমার সাথে জীবনেও কোনো সম্পর্ক রাখব না। মাইন্ড ইট। আমি মেইল চাই। বড়, অনেক বড় মেইল। ভুল করেও ভুলে যেন যাওয়া না হয়। ওকে?
তোমার বিহনে আমার মন কেমন কেমন করে, তুমি কি তা বোঝ?
আমার মন কেমন করে—কে জানে, কে জানে, কে জানে কাহার তরে!
আশাকরি, বড় কোনো ঝামেলায় তুমি পড় নি।
ভালো থেকো।
সিমি।
…
আরো একদিন গেল। অফিসে বেশ কয়েকবার মেইল চেক করে দেখেছে—কোনো মেইল নেই ফাহিমের। সেদিন ফাহিমের ফোন নাম্বারটা চেয়ে নেয়া উচিৎ ছিল। অন্তত ফোন করে জানা যেত? সিমির মনে হঠাৎ করে আরো একটা আশঙ্কা দেখা দিল। আসলে ফাহিমের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। সিমি জানতে চায় নি তার পরিবারের কথা। আমেরিকাতে সে নিশ্চয়ই একা থাকে না। তার হয়তো একটা ফ্যামিলি আছে। স্ত্রী আছে। ছেলে-মেয়ে আছে। সেটাই স্বাভাবিক। চল্লিশ বছরের একজন পুরুষ নিশ্চয়ই একা নেই।
অবশেষে ফাহিমের মেইল পেল সিমি। ছোট একটা মেইল তবুও সিমির আনন্দের সীমা রইল না। পরপর চারদিন ফাহিমের মেইল না পেয়ে ভীষণ রকমের মুষড়ে পড়েছিল সে। কী যেন নাই নাই অনুভূতি হচ্ছিল তার। আজ ভালো লাগছে। ফাহিম লিখেছে—
সিমি,
আমি আছি, যাই নি কোথাও। তোমার সব মেইলগুলিই পেয়েছি। অফিস থেকে হঠাৎ করেই একটা ক্লায়েন্ট সাইটে যেতে হয়েছিল। ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। পারসোনাল মেইল চেক করার কোনো সুযোগই ছিল না। চারদিন পরে তোমার মেইলের উত্তর লিখতে বসলাম। তবে তোমার সবগুলো মেইলের উত্তর হয়তো দেয়া হবে না একসাথে। শুধু তোমাকে অশ্বত্ব করার জন্য এটুকুই লেখা আপাতত। আজ চ্যাট করতে পারব। আজ তোমার ওখানে শুক্রবার। তোমার নিশ্চয়ই ডে অফ। বাসায়ই তো থাকবে। চাইলে ফোনে কথাও হতে পারে। কথা বলতে চাও?
ফাহিম।
…
সিমি অফিস থেকে এসে মেইলের উত্তর লিখল।
ফাহিম,
উফ হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কী টেনশনেই না পড়েছিলাম। যাক তুমি সুস্থ আছ এটাই বড় কথা। তুমি জানো আমি কতটা অপেক্ষা করে থাকি তোমার মেইলের। তোমার মেইল পাওয়ার চেয়ে ভালো কিছু আর কী হতে পারে? কিন্তু তারচেয়েও বড় কিছু হবে যদি তোমার সাথে সত্যিই কথা বলতে পারি।
অবশ্যই কথা বলতে চাই। আমি ভীষণ খুশি হবো। ইনফ্যাক্ট আমি ইগারলি অপেক্ষা করছি কখন তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবো। আমি যতটা না এক্সাইটেড, একই সাথে ঠিক ততটাই নার্ভাস হয়ে আছি। অথচ কেন তা বুঝতে পারছি না। এ যেন নতুন করে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আমার জীবনে। ভাবতেই পারছি না—সত্যিই অবশেষে আমাদের কথা হবে।
সে পর্যন্ত ভালো থাকি—তুমিও থেকো।
সিমি।
…
সিমি অপেক্ষা করল, কিন্তু ফাহিমের কোনো সারা পাওয়া গেল না। না ফোন কল, না টেক্সট মেসেজ, না ইমেইল। সে ভীষণরকমের আশাহত হয়ে পড়ল। ফাহিম বলেছিল ফোনে কথা বলবে আজ। কতটা আগ্রহ নিয়ে বসেছিল সে। অথচ… কী হয় ছেলেটার? হুট করেই নাই হয়ে যায়?
ফাহিমকে সে খুব মিস করছে, কিন্তু কেন? যাকে এখনো সামনা সামনি দেখেনি, কখনো ফোনেও কথা হয় নি। শুধুই কয়েকটি মেইলের আদান-প্রদান আর তাতেই তার এমন অবস্থা? তবে ফাহিম কি তাকে মিস করে না? সিমি বুঝতে পারে নি, কখন থেকে, কী করে সে ফাহিমকে এতটা একান্ত কাছের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে।
সিমির খুব মন খারাপ হলে তার রানার কথা মনে পড়ে। রানা সামনে চলে আসতেই তার পেছনের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। পেছনের কথা ভাবতে ভাবতেই একটা দীর্ঘ ইমেইল লেখা শুরু করল সিমি। অনেকটা ডায়েরী লেখার মতো।
সাবজেক্ট লাইনে লিখল, আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
ফাহিম প্রিয় বন্ধু আমার,
একটা সময় ছিল, যখন আমি সারাদিন লিখতে পারতাম। কতকিছু লিখতাম। আমার দিন কেটে যেত টাইপ করতে করতে। অথচ সেই আমি এখন আর লিখতে পারি না। যখনই আমি কিছু লিখতে শুরু করি, আমার রানার কথা মনে পড়ে। আমার সব লেখাগুলোর প্রথম সমালোচক ছিল সে। সে ছিল আমার শিক্ষক, আমার মেন্টর। আজকের এই আমাকে, যদি তুমি বলো আমি স্মার্ট, তবে সেই স্মার্টনেস আমার মধ্যে এনে দিয়েছে রানা। আমি ইংরেজিতে বরাবরই ছিলাম ভীষণ কাঁচা—রানাই আমাকে ইংরেজি উচ্চারণ শিখিয়েছে। শিখিয়েছে বাচনভঙ্গি, শব্দ চয়ন। কথা বলার সময় আত্মবিশ্বাস, মাথা উঁচু করে কথা বলা—সব কিছুই তার কৃতিত্ব। আমি সব সময় একটু লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। মানুষের সামনে কথা বলতে লজ্জা পেতাম। হাতাশাবাদী মানুষ বলতে যা বোঝায় আমি ছিলাম তেমনই একজন। কিন্তু রানাই আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে আশাবাদী হতে হয়। লক্ষে না পৌঁছানো পর্যন্ত লেগে থাকতে হয়। সে একবার আমার ডায়েরীতে লিখেছিল, “life at times seems to me like a losing battle, but I never gave up the fight.” সত্যিকার অর্থেই সে ছিল একজন সাহসী যোদ্ধা। বেঁচে থাকার প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত সে যুদ্ধ করে গেছে—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
আমাদের দিনগুলো ছিল অনেক কষ্টের। এখন যখন সেসব দিনের কথা মনে পড়ে, আমার চোখ ভিজে আসে। আহারে কী দিন গেছে আমাদের! রানার চিকিৎসার জন্য আমাদের হাতে কোনো টাকা ছিল না।
আমরা অনেক স্ট্রাগল করেছি। রানার চিকিৎসার ব্যয় বহন করার জন্য, এক পর্যায়ে একে একে আমাদের গাড়ি, হাই-ফাই মিউজিক সেট, টিভি, ভিসিআর এমন কি বিয়ের গয়নাগুলোও বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু আমরা কিছুতেই হাল ছেড়ে দেই নি। কীভাবে আমি ভুলে যাবো সেই দিনগুলি?
আই ফিল প্রাউড টু বি হিজ ওয়াইফ। যদি পুনর্জন্ম বলে কিছু থাকে তবে আমি আল্লাহর কাছে একটিই জিনিষই চাইব, তিনি যেন সেই জীবনেও রানাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেন। একজন স্বামী হিসেবে, সে ছিল মহান। একজন বন্ধু হিসেবে—অতুলনীয়। একজন সমালোচক হিসেবে—অপরিসীম। একজন শিক্ষক হিসেবে—অসাধারণ।
রানা নেই। কোনোদিন ফিরেও আসবে না আর। কিন্তু এই সহজ অথচ নিষ্ঠুর সত্যিটাকে আমি মেনে নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন। প্রতি মুহূর্ত। আর মেনে না নিয়েই বা কী করব? এটাই আমার জীবন—আমার নিয়তি। যে কষ্ট সে পেয়েছে তা ছিল অসহনীয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে বেঁচে নেই, এটা একদিকে ভালোই হয়েছে। সহ্যসীমার বাইরের এই কষ্ট থেকে সে মুক্তি পেয়েছে।
রানার কথা বলার জন্য এই মেইলটি আমি লিখতে চাই নি। তার কথা এনেছি শুধু বোঝানোর জন্য, কত শক্ত এবং সাহসিকতা নিয়ে সে এক একটা পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। আমি কখনো তাকে নিরাশ হতে দেখি নি। হতাশা শব্দটি তার অভিধানে ছিল না। শত অসুস্থতার মধ্যেও যখনই সে একটু ভালো বোধ করত, সে খুনসুটিতে মেতে উঠত। জোকস বলত। হাসত সবার দিকে তাকিয়ে। সে ছিল একজন সুখী মানুষ। আমি ছিলাম তার অনুসারী।
আমার কি মনে জানো ফাহিম, ‘সুখ’ বিষয়টা হচ্ছে এমন, যে তুমি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও যে তুমি সুখী হবে কি হবে না। জীবনে যা ঘটে গেছে, সেই সত্যিটাকে তুমি মেনে নাও আর না নাও, তোমার ভবিষ্যৎ কিন্তু তার ওপর নির্ভর করে না। এভাবেই আমি আমার মনকে গুছিয়ে নেই।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দিনের শুরুতেই আমি সিদ্ধান্ত নেই। আমার দুটো অপশন: চাইলে আমি সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে জীবনের সমস্যাগুলো গণনা করতে পারি অথবা আমার একাকীত্ব নিয়ে হা হুতাশ করতে পারি। অথবা বিছানা থেকে নেমে সুন্দর সকালের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞবোধ করতে পারি এইজন্যে যে তিনি আমাকে আরেকটি সকাল দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন এই ভেবে।
প্রতিটা দিনই কিন্তু একটা উপহার। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আমার চোখ খোলা, আমি ফোকাস করব নতুন এই দিনটির প্রতি এবং আমার যত সুখের স্মৃতি জমা হয়েছে সেখানে।
মানুষের বয়স আর জীবন হচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো। তুমি যা জমা রাখবে, একসময় তাই তুলতে পারবে। আমি তাই চেষ্টা করি, জীবনের যত সুখ, আনন্দ, ভালোলাগার স্মৃতি, মুহূর্তগুলো এই অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে।
তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ আমার এই মেমরি ব্যাংকের অংশীদার হয়ে কিছু সুখ, কিছু আনন্দ জমা রাখার জন্য। আমি প্রতিদিন কিছু না কিছু জমা রেখে চলেছি।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৭)
জানি আমার বিরহে তুমি কাতর নও—হবার তো তেমন কোনো কারণও নেই। তবুও কিউরিয়াস মাইন্ড ওয়ান্টস টু নো—কার কথা ভেবে ভেবে গানটি গাইছিলে তুমি? লিখেছ, নিঃসঙ্গ নিজেকে সঙ্গ দেবার জন্য, তাই কি?
‘সময় যেন কাটে না’ সামিনা চৌধুরীর এই গানটি আমি জিঙ্গেল হিসেবে প্রথম দেখেছি টিভিতে (অপি করিম মডেল ছিল), সম্পূর্ণ গানটি শোনার সুযোগ হয় নি। গানের লাইনগুলি যখন পড়ছিলাম, আমার চোখে অপির মুখাবয়বটিই ভাসছিল। কিন্তু অপির জায়গায় আমি তোমার ছবিটি দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু কিছুতেই তোমাকে কল্পনায় মেলাতে পারছিলাম না। আচ্ছা, তুমি কি কোনো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে?
ইশ কবে যে তোমাকে দেখতে পাবো? তোমার একটা ছবি কি আমাকে পাঠাতে পারো? না কি তোমাকে দেখার জন্যে বাংলাদেশেই যেতে হবে আমাকে?
আচ্ছা তুমি তো আমার ছবি দেখেছ, তাই না? কিছু তো বললে না।
আমার কেন যেন মনে হয়, আমাকে যত বেশি জানবে হঠাৎ করেই তুমি মন বদলে ফেলবে এক সময়।
তুমি ঠিকই বলেছ, চিঠি কিন্তু কথা বলার চেয়েও ভালো মাধ্যম। তুমি চাইলেই তোমার সব কথা কোনো সংশয় ছাড়াই বলতে পারো। তাহলে আমাদের এই ইলেকট্রনিক চিঠির আদান-প্রদান চলতে থাকুক, কী বলো?
আমার সঙ্গে কথা বলতে তুমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করো জেনে আশ্বস্ত হলাম। একটা ব্যাপারে আমি তোমাকে নিশ্চিত করতে চাই আর তা হলো, আমার কাছ থেকে তুমি কখনো আঘাত পাবে না। তোমার মতো আমিও বিশ্বাস করি, আমরা একে অপরের ভালো বন্ধু হতে পারব।
তুমি হয়তো এখন গভীর ঘুমে। আমার দিনের শেষ প্রায়। এখনই বাসায় যাবো। তার আগেই ভাবলাম তোমার জন্য একটা মেইল পাঠিয়ে দেই। আমি জানি, কেউ একজন আমার চিঠির অপেক্ষায় থাকে সারাক্ষণ।
তোমাকে বোর করতে চাচ্ছি না। তোমার দিনের শুরুটা অন্য রকম হওয়ার বদলে বিরক্তিকর হতে পারে এই চিঠি পড়ে। মাঝে মাঝে খুব আফসোস হয়, ইশ আমি যদি কবি লেখকদের মতো সুন্দর করে লিখতে পারতাম!
আপাতত এটুকুই। ভালো থেকো।
ফাহিম।
পুনশ্চ: ফাহিম আমার অনেক পছন্দের নাম। আমার নামটি বদলে না দেবার জন্যে অশেষ কৃতজ্ঞতা।
…
ফাহিম, প্রিয়তম বন্ধু আমার—
লক্ষ করলাম, তোমার আগের মেইলটিতে তুমি কোনো সম্বোধন করো নি আমায়! কেন? এর আগে লিখেছো প্রিয় সিমি। আমি কি তাহলে অপ্রিয় হয়ে গেলাম? তাহলে অপ্রিয় সিমিই লিখতে!
তুমি হাসছ আমি জানি।
তোমার চিঠি পেতে আমার খুব ভালো লাগে, এটা আর নতুন কিছু নয়। নতুন করে যেটা যোগ করতে চাচ্ছি আর তা হলো তোমার লেখা আমার শুধু ভালোই লাগে তা নয়, আমি এখন তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকি তোমার মেইলের। আজ আমার নতুন কাজের দ্বিতীয় দিন। আমি অলরেডি দশ মিনিট লেট। এখনো বের হতে পারি নি। কিন্তু তোমার মেইল এসেছে কিনা সেটা চেক না করে আমি বের হতেই পারলাম না। এবার বোঝা গেছে ব্যাপারটা?
তুমি ঠিকই বলেছ, সময় যেন কাটে না, গানটি একটেলের একটি বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনটি দেখার আগে আমিও গানটি শুনি নি। গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই কোনো একটা টিভি চ্যানেলে দেখলাম সামিনা চৌধুরী গানটি গাচ্ছে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই ভীষণ ভালো লেগে যায় আমার। বিশেষ করে গানের কথাগুলো। ঠিক যেন আমারই কথা—আমার কথা ভেবেই লেখা হয়েছে।
তুমি আমাকে দেখতে চেয়েছ। খুব শীঘ্রই আমার কিছু ছবি পাঠিয়ে দেবো তোমাকে। এখানকার নেটের যা অবস্থা এই মুহূর্তে ছবি আপলোড করতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে, সেক্ষেত্রে অফিসে যেতে অনেকই দেরী হয়ে যাবে। অফিসের দ্বিতীয় দিনেই দেরীতে যাওয়া মোটেই সমীচীন হবে না।
বরং তুমি তোমার কিছু ছবি পাঠিয়ে দাও আমার জন্য। যদিও আমি ইয়াহুতে তোমার একটা ছবি দেখেছি, সেটা তোমার মুখের একটা সাইড ভিউ শুধু এবং আকারে খুবই ছোট। দেখেতো মনে হচ্ছে তুমি বেশ হ্যান্ডসাম। তবে গায়ের রঙটা কিঞ্চিৎ কালোই হবে হয়তো। আমাদের দেশে যাকে বলে শ্যামলা। তোমরা কী বলো—ব্রাউন? যাইহোক ব্ল্যাক অর ব্রাউন কোনো জরুরী বিষয় নয়। ফ্রেন্ডশিপ ইজ নট অ্যাবাউট লুক, ইটস অল অ্যাবাউট মেন্টালিটি। তাই নয় কি?
আজ তোমাকে অনলাইনে পাবো ভেবেছিলাম। মনে হচ্ছে তুমি ব্যস্ত আছো। সমস্যা নেই, কালকে নাহয় চ্যাট করবো। আমার সকালে, তোমার সন্ধ্যায়—অবশ্যই যদি তুমি ফ্রি থাকো।
দেখেছ, আমাকে কথায় পেয়ে বসেছে। আজকে অফিসে নির্ঘাত দেরী হবে। আমি যাই। তুমি অপেক্ষায় থাকবে তাই তাড়াহুড়ো করে লিখলাম।
তোমার মেইলের আকার যেমনই হোক তাতে কিছু যায় আসে না। এক লাইনের না এক হাজার লাইনের তা মুখ্য নয়। অবশ্য আমি কিন্তু বড় মেইল লিখতে এবং পড়তে পছন্দ করি। আমার ধারণা তুমি ইতোমধ্যেই তা জেনে গেছ।
আবারো লিখব, কাজ থেকে ফিরেই। সুন্দর থেকো। হ্যাভ অ্যা ওয়ান্ডারফুল স্লিপ এন্ড সুইট ড্রিম।
ভালোবাসা জেনো।
অপ্রিয় সিমি।
পুনশ্চ: তুমি ভালো লিখতে পারো না, এ কথাটা মোটেও ঠিক না ফাহিম। তোমার কথার মায়ায় এই আমি কেমন করে আঁটকে যাচ্ছি, একটু একটু করে, দেখেছ? এমন করে এর আগে কোনো ছেলে আমাকে লিখে নি কখনও। কোনো কাব্য নয় বরং তোমার এই সাধারণ সাদামাটা সহজ কথাই আমাকে নেশা ধরিয়ে দেয়। আমি চাই না, আমার এ নেশা কেটে যাক সহসাই।
…
ঘুমতে যাবার আগে সিমি আরো একটা দীর্ঘ মেইল লিখল ফাহিমকে। রাত ১২টা পেরিয়ে ১৪ মিনিট।
প্রিয় ফাহিম,
আমি ঐদিন সন্ধ্যায় বিশেষ কারো জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম না। কিছু এলোমেলো ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। আমার সেই ভাবনার মাঝে তুমিও খানিকটা জায়গা করে নিয়েছিলে। খানিকটা নয়, বেশ খানিকটা। আমি যদি বলি আমি আসলে অপেক্ষা করছিলাম আমার নতুন বন্ধুর চিঠির, ভাবছিলাম তারই কথা।
নাহ, আমি কোনো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম না। আমি আর আগের মতো সেই রোম্যান্টিক সিমি নেই। আর তুমি যদি শো-বিজের কোনো তারকার সাথে আমাকে কম্পেয়ার করো বা মিলিয়ে দেখতে চাও—হে প্রিয় বন্ধু আমার, তুমি শুধু হতাশই হবে। কাজেই এখনই সতর্ক হয়ে যাও। পরে কিন্তু আমাকে ব্লেম করতে পারবে না।
টিপিক্যাল বাঙালি মেয়েদের মতোই আমি খুবই সাদামাটা সাধারণ একটা মেয়ে। আমার চেহারার মধ্যে কোনো চমক নেই। তারপরেও, তুমি চাইলে অবশ্যই আমার ছবি তোমাকে পাঠাব। অবশ্য তার আগে ফটো অ্যালবাম থেকে কিছু ছবি নিয়ে স্ক্যান করাতে হবে। আমিও কিন্তু তোমার ছবি দেখার অপেক্ষায় আছি। তোমার ইয়াহু আইডিতে যে থাম্বনেইল ছবিটি আছে, সেটি খুবই ছোট যা থেকে তুমি আসলে দেখতে ঠিক কেমন তা উদ্ধার করা কঠিন। আমার আগের মেইলে কী লিখেছি তা মোটেও ঠিক নয়।
সত্যি কথা যদি বলি, আমার আসলে খুবই ইচ্ছে হচ্ছে তোমাকে দেখতে। সশরীরে। সামনা-সামনি। তুমি এত দূরে থাকো কেন বলতো? আচ্ছা তুমি শেষ কবে দেশে এসেছিলে?
চিঠির মাধ্যমে একে অপরকে বেশ ভালোভাবেই জানা যায়। তবে চ্যাটিং এর কিন্তু একটা আলাদা প্রাণ আছে। একজন জীবন্ত মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলার মতোই অনেকটা। তারপরেও চিঠিই কিন্তু পারে দুজন মানুষকে দুজনার খুব কাছে টেনে নিতে।
আচ্ছা শোনো, দীর্ঘ চিঠি লিখে মানুষকে বিরক্ত করতে আমার কিন্তু বেশ লাগে। আমার ধারণা, তুমি ইতোমধ্যেই নিশ্চয়ই তার কিছুটা নমুনা দেখতে পেয়েছ।
তোমার সঙ্গে স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও চ্যাট করে খুব ভালো লাগল। মনে হচ্ছিল তোমাকে আমি অনেকদিন থেকেই চিনি। সিরিয়াসলি বলছি। হ্যাঁ এ কথা ঠিক, আমি তোমাকে চিনি না, এবং আমি তোমার সম্পর্কে বেশিকিছু জানতে চাই না, চিনতেও না। আমি ঠিক তোমার সম্পর্কে ততটুকুই জানতে চাই, যতটুকু তুমি জানাতে চাও। কেউ তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বা অনেক কিছু কাউকে জানাতে চাইতে নাই পারে—এটা তার অধিকার। সেই অধিকার খর্ব করার আমি কে?
তোমার ইতিহাসটা কী আমি জানি না, জানতে চাইও না, শুধু এটুকুই বলব, পেছনের কোনো জটিলতা (যদি থাকে) নিয়ে সাফার করার কোনো মানে হয় না। যা ঘটে গেছে, গেছে। সামনের জীবনটা অন্য রকম হোক—সে চেষ্টাই করা উচিৎ। জীবনটা হওয়া উচিৎ হেমন্তের বিকেলের মতো—শরীর জুড়িয়ে যাবার মতো যথেষ্ট ঠাণ্ডা আবার যথেষ্ট গরম যাতে ঠাণ্ডাটা শরীরে বসে না যায়।
আমার ধারণা, তুমি এখন অফিসে। আজ রাতে আমাদের চ্যাট হবে? মানে তোমার সন্ধ্যা আর আমার ভোর। যদি কথা হয়, শুধু তাহলেই আমি লগইন করব, নাহলে অফিসের যাওয়ার আগে সময় নষ্ট করতে চাই না। এমনিতেই ঢাকার ট্রাফিক জ্যামের অবস্থা ভয়াবহ। অফিসে যেতে একঘণ্টার ওপরে লেগে যায়। নতুন কাজে বারে বারে দেরীতে যাওয়া কোনো ভালো কথা না।
তোমাকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছি কিন্তু, যদি মাইন্ড চেঞ্জ করো, আমাকে টেক্স করে জানিয়ে দিও। আবারো বলছি, তুমি চ্যাট করতে না পারলে আমি লগইন করব না। মনে থাকে যেন!
আমার কথা ভেবে তুমি যে দ্রুত আমার মেইলের উত্তর দাও, এটা জেনে আমি ভীষণ আহ্লাদিত। এতটা গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য কি আমি? আমার প্রতি তোমার এই স্পেশাল অ্যাটেনশন দেয়ার জন্যে কী করে ধন্যবাদ দিব জানি না, তবে এই স্পেশাল অ্যাটেনশন আমি পেতে চাই, একই ভাবে—দীর্ঘদিন!
তুমি কয়েকবার জানতে চেয়েছ, নতুন কাজে আমার প্রথম দিনটি কেমন কেটেছে। ভালো না। একেবারেই। আমার সহকর্মীরা সবাই খুবই ভালো, কেয়ারিং অ্যান্ড হেল্পফুল। অফিসটাও খুব সুন্দর, পরিপাটি করে সাজানো। যেখানে যেটা থাকার সেখানেই সেটা আছে। ঢাকার আবহাওয়াও ছিল আশানুরূপ সুন্দর। নাতিশীতোষ্ণ। সবকিছুই যেমন থাকার কথা তেমনই ছিল। ভালো না লাগার কোনোই কারণ নেই তবুও আমার দিনটি ভালো কাটে নি তার একমাত্র কারণ ছিল—সারাদিনে আমার করার কিছুই ছিল না। হয়তো প্রথম দিন বলেই, কিন্তু তবুও আমি বোর হয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুটা ফ্রাস্টেটেডও। আজকের চিত্রটাও একইরকম ছিল। ধারণা করছি, আগামীকাল থেকে হয়তো কিছু কাজ হাতে পাবো, সময়টাও ব্যস্ততার মধ্যে কাটবে।
তোমাকে কি বলেছিলাম আমি দীর্ঘ চিঠি পছন্দ করি? আমি কখনওই বোর হই না। কাজেই, আমাকে যখন লিখবে, দড়ি টেনে ধরবে না, যতক্ষণ ইচ্ছে লিখে যাবে। তোমাকে তো আর পৃষ্ঠা গুনতে হবে না। মেইলিং কস্ট বেড়ে যাবার কোনো ভয়ও নেই। কাজেই লিখবে।
তোমার সম্পর্কে জানিও, যতটুকু জানাতে চাও। আমার অবশ্যই ভালো লাগবে আমি জানি।
ভালোবাসা অফুরান: ফ্রম মি সিমি।
…
পরিশিষ্ট: সিমি মেইলের নিচে *মায়া এঞ্জেলো’র বিখ্যাত কবিতা ‘ফেনোমেনাল ওম্যান’ এর কিছু লাইন লিখে দিয়েছে। কিন্তু কেন দিয়েছে সেই রহস্য উন্মোচন সহসাই করতে পারল না ফাহিম। কবিতাটির সঙ্গে সিমির চরিত্রের কি কোনো মিল আছে? সিমিও কি মায়া এঞ্জেলোর কবিতার মতোই একজন বিস্ময়-রমণী? হয়তো বা। ফাহিমের কাছে অবশ্য পৃথিবীর তাবৎ মেয়েদের বিস্ময়-রমণী মনে হয়। সিমি তো পৃথিবীর বাইরের কেউ নয়।
Phenomenal Woman – Poem by Maya Angelou
Pretty women wonder where my secret lies.
I’m not cute or built to suit a fashion model’s size
But when I start to tell them,
They think I’m telling lies.
I say,
It’s in the reach of my arms,
The span of my hips,
The stride of my step,
The curl of my lips.
I’m a woman
Phenomenally.
Phenomenal woman,
That’s me.
প্রিয়দর্শিনীরা ভেবে পায় না আমার রূপের রহস্য কী!
সুদর্শনা নই আমি কিংবা ফ্যাশন মডেলের মাপে মাপে নয় আমার দেহের গঠন
কিন্তু আমি যখন ওদের বলতে শুরু করি,
ওরা ভাবে, বানিয়ে বলছি,
আমি বলি, রহস্য লুকিয়ে আছে
বাহুদ্বয়ের প্রসারণ ক্ষমতায়,
নিতম্বের বিস্তারে,
ধাপের দৈর্ঘ্যে,
ঠোঁটের বঙ্কিমতায়।
আমি নারী
বাহ্যত।
ধারণাসম্মত রমণী,
সেটাই আমি।
*মায়া এঞ্জেলো ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, নৃত্যশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেত্রী। ১৯৯৩ সালের ২০ শে জানুয়ারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অভিষেক অনুষ্ঠানে অ্যাঞ্জেলো তাঁর “অন দ্যা পালস অফ মর্নিং” কবিতাটি আবৃতি করেছিলেন। গায়িকা হিসেবে তার অনেক সাফল্য থাকলেও সঙ্গীতের জন্য তিনি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হননি। কিন্তু তার নিজের লেখা কবিতা ‘পালস অফ মর্নিং’ আবৃত্তির জন্য লাভ করেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। এর আগে ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘দ্য গিফট আউটরাইট’ কবিতার জন্য কবি রবার্ট ফ্রস্ট এই বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। সে হিসেবে রবার্ট ফ্রস্টের পর মায়া এঞ্জেলো একমাত্র কবি যিনি এই পুরস্কারে ভূষিত হন।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৬)
সিমির আগের মেইলটা পেয়ে ফাহিমের মনটা ফুরফুরা ছিল। তার মনের সমস্ত আশঙ্কা মুহূর্তেই কেটে গেছে। সে ফুরফুরে মেজাজ থাকতে থাকতেই আর দেরী না করে উত্তর লিখতে বসে গেল।
সিমি প্রিয় বন্ধু আমার,
তোমার মেইল পেয়ে আমার যে কী ভালো লেগেছে, তখনকার সে অনুভূতি বলে বুঝানো যাবে না। বুকের উপর থেকে যেন বড্ড ভারী একটা পাথর নেমে গেল।
তুমি মেয়েটা সত্যিই অন্যরকম। তোমার মধ্যে কোনো ন্যাকামি নেই। তারচেয়েও বড় কথা কোনোরকম সংকোচ বা দ্বিধাও নেই। এ কদিনে তোমাকে যতটুকু চিনেছি তাতে এটুকু নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
এ কথা ঠিক, অনেককে দীর্ঘদিন কাছ থেকে জেনেও জানা হয়ে ওঠে না আবার কারো কারো সঙ্গে স্বল্পকটি চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে এমন একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে তা অতি নিবিড়। সম্পর্কের নানা রকম যেমন হয়। জানার ধরণও হয় তেমনি।
তুমি যখন বললে আমার মেইলগুলো তোমাকে শক্তি দেয় কোনো ভাবে, আমি জেনে তৃপ্ত হয়েছি। ভীষণ। তোমাকে নিয়মিত লেখার আগ্রহটা পাকাপোক্ত হলো। অবশ্যই যতদিন তুমি চাইবে, আমি লিখব।
আমার একটা ইয়াহু মেসেঞ্জার আইডি আছে। একটা অনলাইন ম্যাগাজিনে ইন্টারভিউ দেবার জন্য খুলেছিলাম। খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। এবার মনে হচ্ছে এটার একটা সুষ্ঠু ব্যবহার হবে।
আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে যদি এই মেইল তুমি পড়, তাহলে আমাকে তোমার বাডি লিস্টে অ্যাড করে নিও। তাহলেই এখনই হয়ত তোমার সাথে মেসেঞ্জারে কথা হতে পারে। নাহলে অন্য যে কোনো সময়ে।
আজ এ পর্যন্তই।
ভালো থেকো। খুবই ভালো থেকো সব সময়। তুমি ভালো না থাকলে আমার যে ভালো থাকা হয় না।
ফাহিম।
লাঞ্চব্রেক থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরেই সিমিকে মেইলটি পাঠিয়ে দিল ফাহিম।
আজ সারাদিন অনেকগুলো মিটিং ছিল—একটা নতুন প্রজেক্ট শুরু হচ্ছে। মোটামুটি ব্যস্ততায় দিন শেষ করে অফিস থেকে বের হবার ঠিক আগের মুহূর্তে ফাহিম তার পারসোনাল মেইলে লগইন করল এবং যথারীতি দেখতে পেল সিমির মেইল এসে বসে আছে। মুহূর্তেই ফাহিমের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সুপ্রিয় ফাহিম,
তোমার মেইলটা পেয়েই উত্তর দিতে বসে গেলাম। একটু তাড়াহুড়োও করছি। আজ একটু আর্লি ঘুমিয়ে পড়তে চাই। কাল সকালে আমার নতুন কাজের জয়েনিং। আমি ভেবে অবাক হচ্ছি, আমার অখণ্ড সময়গুলো কত দ্রুত শেষ হয়ে গেল। কী আর করা!
এখন বলো কেমন আছো তুমি?
আচ্ছা তোমার কি আর কোনো নাম আছে? তোমাকে ফাহিম নামে ডাকতে আমার কোনো সমস্যা অবশ্য নেই, তবে যখনই তোমার নাম ধরে ডাকি, সবসময় শুধুই মনে হয় কেউ আমাকে বলছে ‘জি ভাবী!’ আমার খালাত দেবরের নাম ফাহিম! 😛
আমি তোমাকে দেখতে পেলাম তুমি অনলাইনে আছো, হাই দিলাম, তুমি সারা দিলে না। মনে হয় মেসেঞ্জার অন রেখে চলে গেছো। অসুবিধা নেই, আমি তোমাকে এই ছোট মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছি। তুমি সুযোগ পেলেই উত্তর দেবে। আজকের মতো এটুকুই।
ফাহিম বন্ধু আমার, তোমার মতো সরল, স্বাভাবিক, সুরুচিপূর্ণ মানসিকতার একজন মানুষকে বন্ধু হিসেবে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। সত্যিই বলছি।
নিজের যত্ন নিও। ভালো থেকো তুমিও। খুবই ভালো থেকো সবসময়। তুমি ভালো না থাকলে আমারও যে ভালো থাকা হয় না। তোমার লাইন চুরি করে লিখে দিলাম। এত সুন্দর কথা কোথায় পাও তুমি?
সিমি।
…
সিমি,
আমার যে কী হয়েছে! যখনই আমি মেইল চেক করি, প্রথমেই খুঁজি তোমার নাম। কিন্তু সমস্যা হলো, যখনই দেখি তোমার নাম নেই, আমি ভীষণ অস্থিরতায় কাতর হয়ে পড়ি। হতাশা গ্রাস করে আমাকে। মনে হয় তুমি বোধহয় আর লিখবে না আমাকে। মনে হয়, তুমি হয়তো মন বদলে ফেলেছ। তারপর মেইল খুলে যখনই তোমার নাম দেখি—কী যে হয় আমার! হাতে যত কাজই থাকুক, সাথে সাথেই মেইল খুলে পড়তে বসে যাই। আমার মনের সব আশঙ্কা দূর হয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ।
দুঃখিত আমার অফিস কম্পিউটারে পারসোনাল চ্যাটিং ব্লক করা। সিকিউরিটির কারণেই হয়তো। কাজেই অফিস থেকে তোমার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ইমেইল। মেসেঞ্জারে চ্যাট করতে হলে বাসায় যেয়ে করতে হবে।
কাল রাতে তোমার সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য চ্যাট হলো—উফ, কী যে ভালো লাগল! মনে হচ্ছিল আমাদের বুঝি সামনা সামনিই কথা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তোমাকে আমি কতদিন থেকে চিনি। তুমি আমার খুব কাছের কেউ।
তুমি কি জানো কী ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে তুমি?
সরি, আমার তো আর কোনো নাম নেই। তবে তুমি চাইলে তোমার পছন্দের একটা নাম তুমি আমায় দিতে পারো। সেটা আমার জন্য একটা বিশেষ কিছু হবে।
আমি জানি এখন তুমি গভীর ঘুমে। ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাবার আগেই যদি তুমি মেইল চেক করো, আশাকরি তোমার ভালো লাগবে।
তোমার নতুন চাকরীর জন্য অভিনন্দন এবং অনেক অনেক শুভ কামনা। খুব শীঘ্রই তোমার সাথে কথা হবে আশাকরি।
ফাহিম (যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমায় অন্য কোনো নাম না দিচ্ছ—ততক্ষণ এই নামেই চলুক)।
…
ফাহিম, কেমন আছো? আমি নিশ্চিত তুমি এখন ঘুমাচ্ছ। আমি অফিসে তাই বেশি কিছু লিখতে পারছি না। তবে রাতে বাসায় ফিরেই লম্বা মেইল লিখব। শুধু জেনো, তোমার মেইলটি সত্যিই আমার দিনটাকে অন্যরকম করে দিয়েছে। ভীষণ ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি। ভালো থেকো বন্ধু। সিমি।
…
সিমি, আমি জেগেই ছিলাম—তোমার মেইলের অপেক্ষায়। এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যেতে পারব। তবে নতুন করে অপেক্ষায় থাকব তোমার পরের মেইলটির জন্যে। আশাকরি, তোমার নতুন কাজের সবকিছু ঠিকঠাক যাচ্ছে। বাকী দিনটা ভালো কাটুক। অনেক শুভ কামনা। ফাহিম।
…
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পর হঠাৎ করেই একাকীত্ব পেয়ে বসল সিমিকে। বাসার বারান্দায় অস্থিরভাবে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। তারপর তাকিয়ে রইল আনমনে দূর পানে। নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ মানুষ মনে হলো তার। নিঃসঙ্গতা মানুষকে মাঝে মাঝে পেয়ে বসে। এটা কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না। সিমি দেখেছে নিঃসঙ্গতা মানুষকে শুধু অসুখীই করে না, মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দেয়।
মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। কেউ সবার মাঝে থেকেও একা। কেউ সবার থেকে দূরে থেকেও একা। কেউ বা হাজার প্রাপ্তির ভিড়ে একা। দিন শেষে আমরা সবাই একা, তবে কেন এই একাকিত্ব বোধ বা নিঃসঙ্গতা?
নিঃসঙ্গতা মানেই কি একা হয়ে যাওয়া নাকি এটি মনের এমন একটি উপলব্ধি যা আমাদের মনকে বাইরের সমস্ত যোগাযোগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়? সিমি এলোমেলো ভাবনার জালে জড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
একটা দীর্ঘ সময় পার করে সিমি আগামীকালের অফিসের জন্য সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে চিঠি লিখতে বসল ফাহিমকে।
“সময় যেন কাটে না
বড় একা একা লাগে
এই মুখর জনারণ্যে
বিরহী বাতাস বহে
শুধু তোমার জন্যে।”
তুমি কি এই গানটি শুনেছ আগে? সামিনা চৌধুরী গেয়েছেন। অফিস থেকে ফিরে, সন্ধ্যা থেকেই এই গানটি আমি গুনগুন করে গাচ্ছিলাম। আবার ভেবে বসো না তোমার কথা ভেবে কিংবা তোমার বিরহে এই গান গাওয়া। 😛 আমার নিঃসঙ্গ আমিকে সঙ্গ দিচ্ছিলাম বলতে পারো।
তুমি কি জানো, আমিও তোমার মেইলের জন্য কেমন করে অপেক্ষা করি। দিস ইজ ক্রেজি বাট ট্রু। যখনই মেইলবক্স খুলি, আমি জানি, তোমার এক লাইনের একটা মেসেজ হলেও সেখানে অপেক্ষা করছে আমার জন্যে। তোমার দীর্ঘ মেইলটি পড়ে আমার দিনটি সত্যিই অন্যরকম ভালোলাগায় পূর্ণ ছিল। অফিসে কিছুক্ষণ পর পরই মেইল চেক করেছি, দেখলাম ইয়াহুতেও অনলাইনে আছো, কিন্তু সাহস পাই নি তোমাকে একটা হ্যালো পর্যন্ত বলার। তুমি নিশ্চয়ই কিছু মনে করো নি। কথা তো হবেই। অফিসের নিয়মকানুনটা আগে একটু ভালো করে জেনে নেই।
আচ্ছা তুমি এমন কেন বলো তো? মেইল পাঠাতে একটু দেরী হলেই বুঝি ধরে নিতে হবে আমি মন বদলে ফেলেছি? এটা কোনো কথা? আচ্ছা আমি কি কোনো টিনেজ মেয়ে যে হুটহাট আমার মন বদলে যাবে? মেইল লিখতে পারি আর না পারি, তুমি যে আমার ভাবনায় থাকো এটা কি কম?
আমি নিজেও জানি না, আমার অফিস থেকে ইয়াহুতে চ্যাট করতে পারব কিনা। না পারলেও ক্ষতি নেই। আমার কি মনে হয় জানো। এই মেসেঞ্জারে চ্যাটিং ব্যাপারটা ক্ষণস্থায়ী, একটা সময় হারিয়েও যায়। কিন্তু একটা ইমেইলের গুরুত্ব কিন্তু অনেক। একটা হাতে লেখা চিঠির মতোই। দেখো একটা চিঠিতে আমরা কত কথা লিখতে পারি, শেয়ার করতে পারি মনের ভাব। চ্যাটিং এর সময় অনেক হেজিটেশন কাজ করে, কথা বলতে হয় মেপে অথবা ভেবে এবং দ্রুত। ইচ্ছে হলেই অনেক কিছু বলা যায় না। কিন্তু যখন চিঠি লিখতে বসি, কতকিছু লিখতে পারি। আমার কিন্তু মেইল অপশনটাই বেটার মনে হয়। আমি জানি তুমিও আমার সঙ্গে একমত হবে।
গতকাল একটু সময়ের জন্যে তোমার সঙ্গে চ্যাট করে আমারও ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি চিন্তাই করি নি, এভাবে তোমাকে পেয়ে যাবো। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো ছিল ব্যাপারটি। তুমি সত্যিই অমায়িক একটা মানুষ। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি আমি। যদিও এখনো তোমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা হয় নি আমার, তবুও মনে হয় তোমার সাথে আমার বন্ধুত্বটা বেশ অনেকদূরই গড়াবে।
তোমাকেও আমার ভীষণ ভালো লাগে ফাহিম।
তোমাকে ডাকার মতো কোনো ছোট নাম না থাকলে সমস্যা নেই। ফাহিম নামটা কিন্তু খারাপ না। আমি তোমাকে এই নামেই ডাকব।
তোমার মেইল এখন আমার জন্যে ডেইলি ডোজ অফ মেডিসিন এর মতো। খুব কাজ করে। আমার টেনশন, ডিপ্রেশন এমনকি নার্ভাসনেসও কেটে যায় আমি যখন তোমার চিঠি পড়ি। তোমার চিঠি আমার নিঃসঙ্গতার সঙ্গ। তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
তুমি চাইলেই আমাকে ভালো রাখতে পারো। না চাইলে না। কাজেই, লক্ষ রেখো মেডিসিনের ডোজ যেন মিস হয় না কিছুতেই।
অনেক ভালোবাসা।
সিমি।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৫)
সিমির মেইল পড়ার পরে একধরণের মিশ্র অনুভূতি হলো ফাহিমের। মেয়েটি তো দেখি খুব সহজ করেই উত্তর লিখেছে। যদিও ফাহিম বয়সের ব্যাপারটা নিয়ে নিজেই অস্বস্তিবোধ করছিল। সিমি কি তাহলে হতাশ হয়েছে? হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বয়স লুকিয়ে কি কোনো সম্পর্ক করা ঠিক? আর সম্পর্কের কথাই বা ভাবছে কেন সে। ইমেইলের মাধ্যমে পরিচয় আর তার সূত্র ধরে কিছুদিন মেইল আদান-প্রদান হয়েছে, এর বেশি কিছু তো নয়। এখানে কি কোনো সম্পর্ক তৈরি হয়েছে? এটাকে কি কোনো সম্পর্ক বলা যায়? বন্ধুত্ব? আর বন্ধুত্ব যদি হয়ই, তাতে বয়সের ব্যবধান কতটা গুরুত্ব বহন করে। পুরো বিষয়টা অবশ্য নির্ভর করছে সিমির ওপর। তবুও নিজেকে পরিষ্কার রাখতেই অনেক ভেবে ফাহিম একটা মেইল লিখল।
সিমি,
আমার কেন যেন মনে হচ্ছিল আমার বয়স জানার পরে তুমি হতাশ হবে। অবশ্য আমি চাইলেই বয়স লুকিয়ে তোমার বয়সের কাছাকাছি একটা সংখ্যা বলে দিতে পারতাম, কিন্তু তাতে কি ব্যাপারটা ভালো হতো? মিথ্যে বলার মতো কোনো কারণ আমি খুঁজে পাই নি তাই যা সত্যি তাই বলেছি। লুকানোর তো কিছু নেই।
আমি জানি, তোমার বয়সী একটা মেয়ের সঙ্গে আমার মতো একজন বয়স্ক মানুষের বন্ধুত্ব ব্যাপারটা ঠিক যায় না। তাই তুমি যদি চাও তাহলে আমাদের যোগাযোগ কিংবা মেইল আদান-প্রদান এখানেই বন্ধ হতে পারে। আমি কিছুই মনে করব না।
মুনার সঙ্গে আমার বয়সের পার্থক্য দশ বছরের মতোই। কিন্তু আমরা বেশ ভালো বন্ধু এবং আমাদের বন্ধুত্ব এখনো অটুট। শিকাগোর বাঙালি কমিউনিটির একটা অনুষ্ঠান আয়োজন করতে যেয়ে তার সাথে আমার পরিচয় তারপর বন্ধুত্ব, সেই ৯৭ সাল থেকে। বেশ দীর্ঘ সময়ই বলা যায়। আমাদেরও ঝগড়া হয়, ভুল বোঝাবুঝি হয়। কিন্তু মুনা তার যে কোনো আনন্দ বা কষ্টের কথা আমাকে বলে, সম্ভবত প্রথমেই। ব্র্যাড নামে আমেরিকান এক শ্বেতাঙ্গ ছেলের সাথে সম্প্রতি তার সম্পর্ক হয়েছে—ব্রাডের সাথে তার সম্পর্কের খুঁটিনাটি পারলে প্রতিদিনই আমাকে কিছু জানায়। এমন নয় যে আমি ছাড়া মুনার আর কোনো বন্ধু নেই। আমার কাছে তার বিশ্বাসের একটা জায়গা আছে, তাই হয়ত সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। নির্দ্বিধায় বলতে পারে সব কিছু।
এসব কথা বলার অর্থ কিন্তু এই নয় যে আমাকেও তোমার বিশ্বাস করতে হবে এবং তোমার সব কথা বলতে হবে। তবে যদি বিশ্বাস করোই, তোমার আস্থার জায়গাটা অটুট থাকবে।
জানি না এসব কথা আমি কেন তোমাকে বলছি। আমার একধরণের গিলটি ফিলিং হচ্ছিল। সম্ভবত সেই অনুশোচনা কাটাতেই এত কথার অবতারণা।
বন্ধুত্ব হলো মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক—আত্মার শক্তিশালী বন্ধন। এখানে বয়সের ব্যবধান কোনো বাধা নয়। আমার কাছে বন্ধুত্ব মানে বয়সের সাথে বয়সের মিল নয়, বরং মনের সাথে মনের।
ভালো থেকো।
ফাহিম।
মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে নিজেকে বেশ হালকা লাগছিল ফাহিমের। অসম বয়সী বন্ধুত্ব যে কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়, সে সম্পর্কে নাতি দীর্ঘ বক্তব্য দিয়ে বিষয়টির যৌক্তিকতা বোঝাতে যে পেরেছে এতেই সে খুশি।
পরের দিন মোটামুটি উৎকণ্ঠা নিয়ে কাটলো ফাহিমের সময়। প্রায় প্রতি ঘণ্টায় একবার করে মেইল চেক করল সে। কিন্তু সিমির কোনো মেইলের দেখা পাওয়া গেল না।
পরের দিনও না, তারপরের দিনেও না। ফাহিমের উৎকণ্ঠা বেড়ে গেল। সিমি যদি ওর সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে না চায়, তাতে তো কোনো সমস্যা নেই। সেই অধিকার তার আছে। কিন্তু সেটা জানালে তো ক্ষতি নেই। এটুকু সৌজন্যাতাটুকু অন্তত সে দেখাতে পারত। কিন্তু ফাহিমের অবচেতন মন বলছে, সিমি শেষবারের মতো হলেও একটা মেইল তাকে পাঠাবে। তাই সে প্রতিদিনই সুযোগ পেলেই মেইলবক্স খুলে দেখতে থাকল।
সিমি কি তাহলে সত্যিই রাগ হলো কিংবা হতাশ? না হলে কোনো উত্তর নেই কেন? এতদিন তো মেইল পেয়েই উত্তর দিয়েছে! যে সম্পর্কের দানাই বাঁধল না ঠিকমতো এখনো, তা কি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যাবে?
আরো একদিন পর সিমির ইমেইল এলো। ফাহিমের উত্তেজনা বেড়ে গেল। তারপরেও যথা সম্ভব স্থির হয়ে সে মেইল খুলে পড়া শুরু করল।
হেই হেই হেই, ডোন্ট গেট আপসেট, ম্যান। তুমি আমার সম বয়সী নও, তাতে কী হয়েছে। তোমার যদি আমাকে বন্ধু হিসেবে মেনে নিতে সমস্যা না হয়, তাহলে আমার কেন হবে? তাছাড়া বয়স আসলেই কোনো বাঁধা নয়, হওয়া উচিৎও নয়। তুমি যেমন বললে, আমিও ঠিক তাইই মনে করি।
কি খুব টেনশনে ছিলে বুঝি—আমি যোগাযোগ বন্ধ করে দিবো এই ভয়ে? আরে ধুর। সেসব কিছুই না। পারিবারিক কিছু ঝামেলা ছিল, মূলত শ্বশুর বাড়ির লোকজনের সঙ্গেই, জমিজমা সংক্রান্ত। যাই হোক, তোমাকে এভাবে অপেক্ষায় রাখাটা ঠিক হয় নি। কয়েকটি লাইন অন্তত লিখে পাঠিয়ে দিতে পারতাম। তারপর মনে হলো, তোমাকে একটু টেনশনে রাখা যাক। ভীষণ দুঃখিত। এক্সট্রিমলি সরি।
দেখতে চেয়েছিলাম, আমার বিরহে কতটা কাতর হও তুমি! একটু কি মন কেমন কেমন করেছে?
আমি যখন রানার প্রেমে পড়ি, আমার বয়স তখন বিশ বছর আর রানার একত্রিশ। হ্যাঁ, আমার চেয়ে এগারো বছরের বড় ছিল সে। দেখতেই পাচ্ছ, বয়স কিন্তু কোনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি প্রেমে পড়বার কিংবা ভালোবাসবার এবং বিয়ে করবার জন্য, তাহলে শুধুই বন্ধুত্বের জন্য কেনই বা সেটা বাঁধা হবে? আমার চেয়ে বয়সে অনেক বড় অনেক বন্ধুই আমার আছে। এমন কি আমার বাবার বয়সীও। 😛 তোমার বয়স নিয়ে আমি একেবারেই চিন্তিত নই, আপসেটও নই। কাজেই মাথা থেকে ঐ উদ্ভট চিন্তা বের করে দাও।
যাইহোক, আমি যখন কাউকে বন্ধু ভাবি, তখন কে বয়সে বড় আর কে ছোট সেগুলো আমার মাথায় থাকে না। আমি তাকে বন্ধুর মতোই ট্রিট করি। হাসি-ঠাট্টা খুনসুটি করি, দুষ্টুমি করি, এমন কী ধমকও দেই। আগেই জানিয়ে রাখলাম। পরে আবার বলতে পারবে না মেয়েটি এমন কেন? আমি এমনই।
তুমি কিন্তু আমাকে তোমার জন্ম তারিখটি জানাও নি। বন্ধুর জন্মদিনে তাকে শুভেচ্ছা জানাতে হবে না? তবে তুমি যদি জানাতে না চাও—তাহলে ভিন্ন কথা।
তুমি আমাকে ইনিয়ে বিনিয়ে অসম বয়সের বন্ধুত্বের বিষয়ে অনেক কথা বলার চেষ্টা করেছ। জানিয়েছ তোমার গিলটি ফিলিং এর কথা। কিন্তু আমি বুঝতে পারি নি, কেন এমন অনুভূতি তোমার হলো। দেখো, তোমাকে না জেনে না চিনেই আমি কিন্তু আমার জীবনের কত কথা বলে দিলাম অকপটে, নিশ্চিন্তে। না বললেও পারতাম, তবুও বলেছি। আমি রানার প্রসঙ্গে কিছু না বললে, আমাদের কথা হয়ত সেখানেই থেমে যেত। কিন্তু আমি বলেছি। মাঝে মাঝে জীবনের কিছু কিছু কথা কাউকে না কাউকে তো বলতেই হয়। আর তাই তো, কাছের কেউ, পরিচিত এমন কী অপরিচিত অনেকের সঙ্গেও পথে ঘাটে, চলতি পথে জীবনের বিশেষ কোনো গল্প আমরা শেয়ার করি। করি না?
আমি তোমার মেইলের অপেক্ষায় থাকব। তোমার প্রতিটা লেখা আমাকে শক্তি দেয়, কীভাবে জানি না, তবে দেয়। মনে হয় কেউ অন্তত একজন আছে যে আমাকে নিয়ে ভাবছে। কাজের ফাঁকে। অবসরে। কারো ভাবনায় থাকাটাও কিন্তু আশীর্বাদ। আমরা কি সবাইকে নিয়ে ভাবি?
আচ্ছা তোমার কি কোনো মেসেঞ্জার প্রোগ্রাম আছে, লাইক ইয়াহু কিংবা এমএসএন? যদি থাকে তাহলে আমরা মাঝে মাঝে অনলাইনে চ্যাট করতে পারি। তাহলে মেইলের অপেক্ষায় না থেকে খুব সহজেই কথা বলা যাবে। ভালোভাবে একে অপরকে চেনাও হবে। জানাও যাবে। অবশ্যই যদি তুমি চাও—তবেই।
আশাকরি তুমি আমাকে খুব তাড়াতাড়িই লিখবে—আরো অনেক কথা অনেক।
অনেক ভালো থেকো। অপেক্ষায় রইলাম।
সিমি।
সিমির মেইলটা পেয়ে কী এক ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে রইল ফাহিমের মন। মেয়েটার প্রতি সীমাহীন কৃতজ্ঞতায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল সে।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৪)
সিমির দীর্ঘ চিঠিটি বেশ কয়েকবার পড়ল ফাহিম। চিঠি পড়তে পড়তেই মেয়েটির প্রতি কেমন যেন একটা টান অনুভব করতে লাগল সে। এটা কিসের টান? বন্ধুত্বের? অন্যান্য সম্পর্কের তুলনায় বন্ধুত্বের টান অনেক বেশি। যা হাজার হাজার মাইল দূরে থেকেও অনুভব করা যায়। অফিস থেকে বের হয়ে যাবার ঠিক পূর্ব মুহূর্তে ফাহিম দ্রুত একটা মেইল লিখে ফেলল।
হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ, সিমি!
জেনে খুশি হলাম, আমাকে তোমার বন্ধু বিবেচনা করেছ। আমার সম্পর্কে বলতে বলেছ, কিন্তু কী বলব? আমার সম্পর্কে বলার মতো তেমন কোনো কথা নেই তবুও সহজ হতো যদি নির্দিষ্ট করে কিছু জানতে চাইতে।
এটুকু লিখে ফাহিম কথা হারিয়ে ফেলল। আর কী লিখবে? হঠাৎ মনে পড়ল মুনার কথা। সেদিন মুনার সাথে ফোনে কথা হচ্ছিল, তখন সে সিমির সাথে তার কাকতালীয় ভাবে পরিচয়ের ঘটনাটি খুলে বলল। মুনার কথাই তাহলে কিছু লেখা যাক। ফাহিম লিখল—
সেদিন মুনার সাথে কথা হলো। বললাম তোমার কথা। সে তো ভীষণ অবাক। সে ভেবেই পাচ্ছে না, তোমার সাথে আমার পরিচয়টা হলো কী করে! আমি তাকে সব খুলে বললাম। তোমার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করল মুনা। বলল, তুমি অনেক ভালো এবং বুদ্ধিমতী একটা মেয়ে। আমি অবশ্য বলেছি সে কথা আমি জেনে গেছি ইতোমধ্যেই। মুনা অবশ্য বাঁকা হেসে বলেছে—তাই? আমিও হেসেছি। তোমার কী মনে হয়, তোমাকে কি একটু হলেও চিনেছি আমি?
আজ এটুকুই। হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ।
ফাহিম।
মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে ফাহিম বাসার দিকে রওয়ানা দিল।
…
ফাহিম একটু দেরীতেই ঘুমাতে যায়। মাঝে মাঝেই মাঝরাত পেরিয়ে যায়। রাত সাড়ে বারোটার দিকে কী মনে করে সে তার বাসার কম্পিউটারে লগইন করল এবং মুহূর্তেই তার চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। এত দ্রুত সিমির মেইল আসবে সে ভাবতেও পারে নি। সিমি লিখেছে—
বন্ধু আমার,
হ্যাপি ফ্রেন্ডশিপ টু ইউ টু।
আমি জানি না মুনা ঠিক কী বলেছে তোমাকে আমার সম্পর্কে, কিন্তু মনে হচ্ছে সে একটু বেশিই বলেছে। একে অপরকে জানার মতো যথেষ্ট সময় কিন্তু আমরা পাই নি। তাই ঠিক কী কারণে সে আমাকে ভালো কিংবা বুদ্ধিমতী বলেছে, আমি বুঝতে পারছি না। তবুও তোমার কাছে আমার সম্পর্কে উচ্চ ধারণা দেবার জন্য তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়। আমার হয়ে তুমি জানিয়ে দিও।
এখন যেহেতু আমরা নিজেরাই বন্ধু হয়ে গেলাম, তুমি নিজেই ধীরে ধীরে বুঝে যাবে আমি কেমন—তখন নিজেই জাজ করতে পারবে, আমি ভালো আর বুদ্ধিমান না বোকা।
তোমার সম্পর্কে কিছুই বলো নি। আমি শুধু জানতে চেয়েছিলাম, এই যেমন তুমি কে, কোথায় থাকো, কী করো, দেখতে কেমন, বয়স কত, পড়াশুনা কতদূর ইত্যাদি ইত্যাদি। তোমার সম্পর্কে অল্প কিছু কথা আর তোমার পরিচয়। অন্য কাউকে নিজের সম্পর্কে বলতে গেলে যা বলো, ব্যাস সেটুকুই।
আশাকরি আমার মেইলের উত্তর পেয়ে যাবো তাড়াতাড়ি। অপেক্ষায় রইলাম।
অনেক শুভ কামনা।
সিমি।
…
ফাহিমের দৈনন্দিন কাজের মধ্যে সিমির মেইলের জন্য অপেক্ষা করা আর তার উত্তর দেয়া একটি অন্যতম প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়াল। এই অপেক্ষার অনুভূতি অন্যরকম। হঠাৎ এই ইলেকট্রনিক চিঠির প্রতি একধরণের ভালো লাগা শুরু হয়ে গেছে তার। এ যাবৎকালে এক অফিসের ইমেইল ছাড়া নিয়মমাফিক কখনো কারো মেইলের উত্তর দিতে হয় নি। তবে একান্ত ব্যক্তিগত আর মনের ভাব প্রকাশ করার জন্য এই মাধ্যমটির প্রতি সে কৃতজ্ঞতা অনুভব করল।
ফাহিমের মনে আছে, কলেজে থাকতে একবার বাসের সিটের পেছনে লেখা একটা মেয়ের ঠিকানা পেয়েছিল। মেয়েটির বাড়ির ছিল জয়পুরহাটে। সে কী মনে করে সেই ঠিকানায় একটি চিঠি পাঠিয়ে দিল। সে চিঠির কথা সে ভুলেও গেল। প্রায় মাস খানেক পরে হঠাৎ সেই মেয়েটির কাছ থেকে উত্তর পেয়ে ফাহিমের যে কী আনন্দ হয়েছিল, সে কথা বলে হয়তো সে বোঝাতে পারবে না। মেয়েটির সাথে তার বন্ধুত্ব টিকে ছিল বহু বছর। পরে সে উচ্চ শিক্ষার্থে রাশিয়া চলে যায়। এরপর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন।
চিঠি লিখে বন্ধু হওয়া বা পত্র মিতালির শখটি এখন আর নেই। তখন একটা পত্রিকায়, যারা পত্র মিতালি করতে চায় তাদের ঠিকানা ছাপানো হতো। সেটা দেখেই চিঠি পাঠিয়ে বন্ধুত্ব করা হতো। আহা কী মধুর ছিল সেই দিনগুলি।
আর এখন মিনিটে মিনিটে মেসেজ, ফোন, হোয়াটসঅ্যাপ—কী নেই এই সভ্য সমাজে। সবকিছু সহজলভ্য, ডেটিং, ফিল্ডিং, কেনাকাটা, রাত জেগে ভিডিও কল, চাইনিজ রেস্টুরেন্ট, এই দিবস, সেই দিবস।
ভাবনার ডালি সরিয়ে সিমির মেইলের উত্তর লিখতে বসল ফাহিম।
প্রিয় সিমি,
১৯৯৪ সনে ফেব্রুয়ারি মাসের এক হিমশীতল দিনে আমি আমেরিকার শিকাগো শহরে আসি। প্রথম দিন থেকেই এই শহরটির প্রেমে পড়ে যাই। আমি যখন প্লেন থেকে নেমে আমার গন্তব্যে যাচ্ছিলাম, তখন চারিদিকে ঝিরিঝিরি তুষারপাত হচ্ছিল। পেঁজা তুলোর মতো। আমার মনে আছে, আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখক হুমায়ূন আহমেদের একটি গল্পে পড়েছিলাম ফার্গো শহরের তুষারপাতের কথা। আজ বাইরে খুব তুষারপাত হচ্ছে। রাস্তাঘাট ঢেকে গেছে সাদা বরফে। সে যে কী অপূর্ব দৃশ্য… দীর্ঘদিন আমার মাথার মধ্যে সেই দৃশ্য গেঁথে ছিল। সেদিন শিকাগো শহরের সেই তুষারের সৌন্দর্য দেখে আমিও বিমোহিত হয়েছিলাম। সেই অনুভূতির কথা কখনোই ভোলার নয়।
এবার পড়াশুনায় আসা যাক। দেশ থেকে গ্রাজুয়েশন করে এসেছিলাম, তাই শিকাগোর একটা স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি থেকে মাস্টার্স শেষ করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় নি। এই মুহূর্তে একটা বড় কোম্পানিতে সফটওয়্যার প্রজেক্ট ম্যানেজার হিসেবে কাজ করছি।
আমার বয়স জানতে চেয়েছ। তারুণ্য ও যৌবনকে অনেকখানি পেছনে ফেলে এসেছি আমি। এক মাস পরেই চল্লিশের ঘরে পড়ব। সময় এতো দ্রুত পার হয়ে যায় যে, মাঝে মাঝেই খেই হারিয়ে ফেলতে হয়। অনিচ্ছা সত্ত্বেও মেনে নিতে হয় সময়ের গতিকে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই বয়স বিশ ও তিরিশের কোঠা পেরিয়ে চল্লিশের ঘরে চলে আসে। চল্লিশ বছর—একেবারেই কম নয় কিন্তু!
আমার তৃতীয় ইন্দ্রিয় বলছে, আমি কম করে হলেও তোমার থেকে দশ বছরের বড় হবো। আমি কি ঠিক?
এবার তোমার পালা। অপেক্ষায় রইলাম
ফাহিম।
পুনশ্চ: আমার কিন্তু মনে হয় না যে মুনা তোমার সম্পর্কে বাড়িয়ে কিছু বলেছে।
সেন্ড বাটনে চাপ দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল ফাহিম। কেমন যেন একটু অস্বস্ত্বি বোধ করল। সে হঠাৎ করেই সেন্ড ফোল্ডারে যেয়ে তার পাঠানো মেইলটি আরেকবার পড়ল। প্রায় প্রতিবারই সে এই কাজটি করে থাকে। অথচ কাজটি করা উচিৎ মেইল পাঠানোর আগে। একবার পাঠানো হয়ে গেলে তো আর কিছু করার থাকে না। তার অবচেতন মনের অস্বস্ত্বির বিষয়টি তখনই চোখে পড়ল। আর সেটি হচ্ছে বয়স। তার বয়স চল্লিশ সে কথা জানিয়ে সে সূক্ষ্মভাবে একটা ব্যাখ্যা দেবার চেষ্টা করেছে। এটা সে কেন করছে? সিমি যদি অন্যরকম কিছু একটা ভেবে বসে তাহলে বিষয়টা কেমন হবে? ফাহিমের অস্বস্তিবোধ আরো বেড়ে গেল।
সেদিন দুপুরেই সিমির উত্তর এলো।
হ্যালো ফাহিম,
তোমার মেইল পেয়ে আমি হাসতে হাসতে শেষ। তোমার তৃতীয় ইন্দ্রিয় সঠিক আন্দাজটিই করেছে—ইউ আর কোয়াইট ওল্ড, ম্যান! এতদিন আমি কল্পনায় যাকে দেখেছি সেই মানুষটি আমার থেকে দশ বছরের বড় হবে ভাবিনি কখনো। আমি ভেবেছিলাম তুমি যেহেতু মুনার বন্ধু, তুমি হয়তো আমাদের বয়সীই কেউ হবে। কী একটা ঝামেলা হয়ে গেল বলো তো। আর এদিক থেকে আমি সমানে তুমি তুমি করে বলে যাচ্ছি। আই অ্যাম সো সরি। প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড।
অবশ্য তুমি চাইলে আমি আপনিতে ফিরে যেতে পারি। যদিও আমি তুমি বলতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করছি।
আমার সম্পর্কে তেমন কিছু বলার নেই। এক সময় আমি ইন্টেরিয়র ডিজাইনার হিসেবে কাজ করতাম। আমাদের ছোট একটা ব্যবসাও ছিল ইন্টেরিয়র ডিজাইনিং ফার্ম, যেটা আমি আর রানা একসাথেই চালাতাম। এখন যেহেতু রানা নেই আর আমি একা, ব্যবসাটা আমি আর চালাতে চাচ্ছি না। আমি একটা চাকরী খুঁজছিলাম। ইনফ্যাক্ট, আমি একটা চাকরী পেয়েও গেছি—একটা আইএসপি কোম্পানিতে। ইনশাল্লাহ আগামী মাস থেকেই শুরু করবো।
আগামী মাসেই যেহেতু তুমি চল্লিশে পড়ছ, তোমার জন্ম তারিখটা জানিও।
অশেষ ধন্যবাদ তোমার মেইলটির জন্য। এবং অবশ্যই দ্রুত উত্তর দেবার জন্য। তোমার চিঠিগুলো আমার একাকীত্বে কিছুটা হলেও সঙ্গ দিচ্ছে, এটাই বা কম কী?
ভালো থেকো।
সিমি।
পুনশ্চ: এখন থেকে আমি কি তোমাকে ফাহিম বলব নাকি শেষে একটা ‘ভাই’ জুড়ে দেব—ফাহিম ভাই!?
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৩)
রাতে ঘুমানোর আগে ফাহিম মেইলের উত্তর লিখতে বসল। অনেক ভেবে নিয়ে সে লিখল—
‘প্রিয়তমা সিমি,
এটা ঠিক, আমরা একে অপরকে চিনি না। তুমি আমাকে চেনো না, একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কয়েকটি মেইল আদান-প্রদান হয়েছে, শুধু এটুকু পরিচয়ের সূত্র ধরেই কারো সঙ্গে তার একান্ত অনুভূতির কথা ভাগ করে নেয়া হয়ত যায় না—তবুও তুমি বলেছ। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তোমার কষ্ট আমাকে স্পর্শ করেছে। রাত দশটার দিকে ঘুমাতে যাবার আগে তোমার মেইলটি আমি আবারো পড়লাম এবং সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর লিখতে বসলাম। কিন্তু কী যে হলো, কেন যেন কিছুই লিখতে পারলাম না। রাত বারোটা নাগাদ বিছানায় গিয়ে এপাশ-ওপাশ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। ঘুম এলো না। এখন বাজে রাত দু’টোর মতো। তোমার জন্যে কয়েকটি লাইন না লিখে যেন কিছুতেই ঘুম আসছে না। মনে হচ্ছে কিছু একটা মিসিং। অবশেষে বুঝলাম, তোমার জন্য অন্তত একটি লাইন হলেও আমাকে লিখতে হবে।
আমার শুধু তোমাকে একটা কথাই বলার আছে। আমরা যতই একজন আরেকজনকে চিনি আর না চিনি কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে, তুমি আমার অনেকদিনের চেনা—কাছের একজন মানুষ। দূরের কেউ নও। তুমি মুনারও বন্ধু। আর মুনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব দশ বছরের ওপরে। আমাকে অবিশ্বাস করার কোনোই কারণ নেই। এবং চাইলে ভরসা রাখতেও পারো—নিশ্চিন্তে। অভয় দিয়ে বলছি।
তোমার মনের ভেতরে যত কষ্ট জমে আছে, তা দ্রুত বের হয়ে যাক। আমার প্রতি আস্থা রাখতে পারো। অযাচিতভাবে কাউকে বিরক্ত করার মানুষ আমি নই। ভালো থেকো। শুভেচ্ছা।
ফাহিম।’
রাত দু’টায় মেইল পাঠিয়ে ফাহিম যখন ঘুমাতে গেল, নিজেকে বেশ হালকা লাগছিল তার।
সকালে অফিসে যেয়ে প্রাত্যহিক টিম মিটিং শেষ করে ফাহিম তার বসের সঙ্গে দেখা করতে গেল একটা প্রজেক্টের আপডেট দিতে। ফাহিমের বস জ্যানিস প্যাসিলিও, ষাটোর্ধ আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ প্রৌঢ়া। ফাহিমকে সাথে নিয়ে জ্যানিস চলে গেল স্মোকিং এর জন্য নির্ধারিত অফিস বিল্ডিং এর বাইরের জায়গাটাতে। কিছুদিন আগে তার প্রথম ধাপের ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়েছে, তারপরেও এই মহিলা সিগারেট ছাড়তে পারছেন না। কী আছে এই সিগারেটে যা ছাড়তে এত অনীহা? সিগারেটে ৬৫ রকমের বেশি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থ থাকে। নিকোটিন ছাড়াও তিন হাজারেরও বেশি রকম রাসায়নিক পদার্থ ঢুকে যায় ধূমপায়ীর শরীরে। এমন কোন রোগ নেই যার কারণের মধ্যে ধূমপান নেই। আর এই ধূমপানের কারণে সবচেয়ে ভয়াবহ রোগটিই হলো ক্যান্সার।
জ্যানিস বিভিন্ন কথা বলছে কিন্তু ফাহিমের কানে যেন কিছুই ঢুকছে না।
‘কোনো সমস্যা?’ ব্যাপারটা লক্ষ করে জ্যানিস জানতে চাইল।
‘না না কোনো সমস্যা না। তুমি কেমন আছ?’ ফাহিম সপ্রতিভ ভঙ্গিতে জানতে চাইল।
জ্যানিস সিগারেটে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আমি ভালো আছি। কিন্তু তোমার কী হয়েছে? মনটা তো এখানে নেই। আমাকে বলতে পারো যদি পারসোনাল ইস্যু না হয়ে থাকে।’
ফাহিম কী বলবে ভেবে পেল না। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত সে তার পারসোনাল মেইলগুলো খুলে দেখার সুযোগ পায় নি। অফিসের ইমেইল দেখে আর উত্তর দিতেই সময় চলে যায় অনেক। তারপর টিম মিটিং, এখন বসের সাথে কথা বলতে এসেছে এখানে। ভেতরে ভেতরে যে সে অস্থির হয়ে আছে এবং তার বসের চোখে সেই অস্থিরতা ধরাও পড়ে গেছে। সে দ্রুত উত্তর দিল, ‘না না তেমন কিছু না।’ বলেই সে দ্রুত প্রজেক্টের আপডেট দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
জ্যানিস ওকে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কিছু পরামর্শ দিল। কথা শেষ করে চলে যেতে উদ্যত হতেই জ্যানিস ডাকল, ‘ফাহিম!’
জ্যানিসের ডাক শুনে ফাহিম ঘুরে তাকাল।
জ্যানিস বলল, ‘আমি কিছুদিনের জন্যে ছুটি নিচ্ছি—কেমো শুরু হবে। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত যে কোনো দরকারে তুমি মার্গারেটের কাছে যাবে, ওর সঙ্গে কথা বলবে। সব রিপোর্ট তাকেই দেবে। শী উইল বি ইয়োর বস ইন মাই অ্যাবসেন্স।’
ফাহিম মাথা নেড়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে তার নিজের রুমে গিয়ে বসল। ঘড়ি দেখল, সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। মাথাটা ধরে আছে মনে হচ্ছে। ফাহিম ব্রেকরুমে গেল কফি আনতে। সকালে অফিসে এসে অনেকের মতোই ফাহিম ব্রেকরুম থেকে এক কাপ কফি নিয়ে ঢুকে তার রুমে। আজকে কফি নেবার সময় হয় নি। সে কফি বানিয়ে নিয়ে এসে বসল তার অফিস কম্পিউটারের সামনে।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে পারসোনাল ইমেইলে লগইন করা মাত্রই চোখে পড়ল সিমির মেইল। সকাল ৮টায় এসেছে। তারমানে বাংলাদেশে তখন রাত ৮টা। ফাহিম অবাক হয়ে লক্ষ করল আকারে বেশ বড়ই আজকের মেইলটা। এতদিন যেসব মেইল আদান-প্রদান হয়েছে সেগুলোর তুলনায় যথেষ্ট বড়। সে আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করল।
‘প্রিয় ফাহিম,
তোমার মেইল পেয়ে আমি অনেকক্ষণ একা একা হেসেছি, কেন জানো? তুমি যা করেছ আমিও ঠিক তাইই করেছি। অস্বস্ত্বিবোধ করছি তবুও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমিও তোমার মেইলের অপেক্ষা করছিলাম। এবং সেটা পেয়েই আমি উত্তর লিখতে শুরু করেছি। তোমার মতোই—যদিও তখনো জানি না, কী লিখব।
আর কিছু লেখার আগে প্রথমেই তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই—তোমার সমবেদনা আর সাহস দিয়ে আমাকে লেখার জন্য। আমি কৃতজ্ঞ। আমি ভীষণ খুশি এই ভেবে যে এখন থেকে তোমার মতো একজন সুন্দর হৃদয়ের মানুষকে আমার বন্ধু হিসেবে পাশে পাবো।
তোমাকে ভয় পাবো কেন? আসলে আমি খুব সহজে কাউকে বন্ধু বানাতে পারি না। এমন নয় যে আমি খুঁতখুঁতে। আমি ঠিক পারি না। পারি না সবার সাথে তাল মেলাতে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তোমার সাথে আমার যাবে। আমরা হয়ত একে অপরের ভালো বন্ধু হতে পারবো।
তোমার বন্ধু মুনা আর তার প্রেমিক প্রবর অনির্বাণ কদাচিৎ আমাদের বাসায় আসত। তোমাকে কি বলেছি অনির্বাণ ছিল রানার বন্ধু? সেই সুবাদে মুনাকে আমি চিনতাম। শুনেছি ওদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে। যদিও কারণটা আমার অজানা। ব্রেকআপ হয়ে যাবার পর থেকে মুনার সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ নেই। শুধু জানি ও শিকাগোতে ফিরে গেছে এবং সেখানেই আছে কিন্তু কেমন আছে, কী করছে কিছুই জানি না। তোমার সাথে দেখা হলে আমার কথা বলো—আমার শুভেচ্ছা দিও।
আমার জীবনে প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধু অথবা গার্জিয়ান বলতে একজনই ছিল আর সে হচ্ছে রানা, মানে আমার স্বামী। রানাই ছিল আমার সব—সব কিছু। বিয়ের আগে প্রায় তিন বছর প্রেম করেছি আমরা। আমাদের বিবাহিত জীবনটাও ছিল অত্যন্ত সুখের এবং চমকপ্রদ। বেশ সুখেই কাটছিল সময়। কিন্তু হঠাৎ করেই ওর চলে যাবার সময় হয়ে গেল। ওর এভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে—খুব। মানিয়ে নিতেও পারছি না। রানা নেই—এই সত্যিটাকে বিশ্বাস করে নিতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছে। আমি জানি না, কতদিন লাগবে আমার এই সত্যিটাকে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক হতে।
যাইহোক, তোমার মতো একজন বন্ধু যখন পেয়েই গেলাম—মনে হচ্ছে আমাকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। অনাগত দিনগুলিতে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে জানি না, শুধু এই জানি, রানাই আমার জীবনের সব এবং আমার বাকী জীবনেও তাকে ভুলে যাওয়া হবে না।
আমার মনে হচ্ছে আজকে আমাকে কথায় পেয়ে বসেছে। কত বড় একটা চিঠি লিখে ফেলেছি ইতোমধ্যেই। তুমি বোর হবে জেনেও লিখলাম এত কথা। তুমি তো বলেইছো, আমার সব অনুভূতির কথা তোমাকে জানাতে। এখন বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। তবুও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি—যদি আমার এই চিঠি তোমাকে কিছুমাত্র বিরক্তের উদ্রেক করে থাকে।
তোমার সাহস জাগানিয়া অসম্ভব সুন্দর চিঠিটির জন্য আরেকবার ধন্যবাদ। আমার খুব ভালো লেগেছে।
আমি অপেক্ষা করবো—তোমার পরের মেইলটির জন্য। তোমার নিজের সম্পর্কেও কিছু জানিও। অন্তত বুঝতে যেন পারি আমার নতুন এই বন্ধুটি কেমন মানুষ!
আজ তবে এই টুকু থাক। বাকী কথা পরে হবে…
শুভেচ্ছা আর শুভ কামনা,
সিমি।’
এ এমন পরিচয় (পর্ব-২)
সাতদিন পর আমেরিকায় ঈদ। ঈদের দিনেও ফাহিম অফিসে গেল। এখানে ঈদের দিন একটা সাধারণ দিনের মতোই। দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকে অফিস বসেই কাছের বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিত অনেককেই ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মেসেজ পাঠাল ফাহিম। হঠাৎই কী মনে করে সে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা ইমেইল পাঠাল সিমিকে। দুপুর তখন সাড়ে বারোটা, শিকাগোর সময়।
পরেরদিন সকালে সিমির উত্তর এলো। সে লিখেছে, ‘ঈদ মোবারক ফাহিম। মহান আল্লাহতায়ালা তোমার আর তোমার পরিবারের উপর শান্তি বর্ষণ করুন। আমার ধারণা গতকাল তোমাদের ঈদ হয়ে গেছে। আশাকরি ঈদের দিনটি আনন্দেই কেটেছে। আগামীকাল আমাদের ঈদ। অনেক শুভেচ্ছা রইল। সিমি।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ। গতকাল আমরা ঈদ পালন করেছি। যদিও দিনের অর্ধেকের বেশি সময় অফিসেই ছিলাম। অফিস শেষে সন্ধ্যাটা কাটিয়েছি আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুদের সান্নিধ্যে। তোমাদের ঈদ কি আজকে?’ ফাহিম লিখে পাঠাল।
‘হ্যাঁ, আজ আমাদের ঈদ হচ্ছে। সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। অনেক আনন্দ করছে সবাই। যদিও আমার জন্যে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি।’ এটুকু পড়ে ফাহিম একটু ভাবল। ‘সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি’ এ কথার মানে কী? সে সিমির ইমেইল থেকে বাকী লেখাটুকু পড়ল। ‘আজকের দিনটি বেশ সুন্দর। চারিদিকে রোদের ঝিকিমিকি—একটু গরম অবশ্য পড়েছে, তবে অসহনীয় নয়। যাইহোক, ওয়েদার রিপোর্ট দিয়ে তোমাকে বোর করতে চাচ্ছি না। আশাকরি তুমি ভালো আছ। তাড়াতাড়ি উত্তর দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ। ঈদ মোবারক।’
এরপরে কয়েকদিন আর কোনো ইমেইল লেখা-লেখি হলো না। ফাহিম এরমধ্যে কয়েকবার ভেবেছে—আর একবার কিছু লিখবে কিনা। কাজের ব্যস্ততায় আর কোনো মেসেজ পাঠানো হয় নি ফাহিমের। হঠাৎ করেই সে একদিন এক লাইনের একটা ইমেইল পাঠাল। ‘কাজের ব্যস্ততায় উত্তর দিতে দেরী হলো—দুঃখিত। আশাকরি তোমার ঈদের দিনটি অনেক আনন্দে কেটেছে। শুভেচ্ছা। ফাহিম।’
একটু ভেবে ফাহিম সেন্ড বাটনে চাপ দিল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, ব্যাপারটা হালকা হয়ে গেল। কাজের ব্যস্ততায় উত্তর দিতে দেরী হলো, এটা কী কথা? ভাবটা এমন যেন ওই প্রান্তে তার ইমেইলের অপেক্ষায় একজন অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু এখন আর ভেবে কী হবে। যা হবার তা হয়ে গেছে। ফাহিম অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।
ঠিক দশ মিনিটের মধ্যেই সিমির উত্তর এলো। সে ছোট্ট করে লিখেছে, ‘আমার ঈদ মোটেই আনন্দে কাটে নি। শুভেচ্ছা পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ।’
ফাহিম বেশ অবাক হলো। সে মনে করতে পারল, আগের ইমেইলে সিমি লিখেছিল সবার সঙ্গে ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। তাহলে এখন এটা কী লিখল সে। দু’দিন আগের ইমেইল খুলে সেসেজটি আবার পড়ল ফাহিম—এবং নিশ্চিত হলো। হ্যাঁ সিমি লিখেছিল, ‘সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। অনেক আনন্দ করছে সবাই। যদিও আমার জন্যে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি।’ ফাহিম বেশ কয়েকবার পড়ল মেসেজটি। কিন্তু শেষের লাইনটির অর্থ ঠিকমতো বুঝতে পারল না।
একটু ভেবে ফাহিম উত্তরে লিখল, ‘জেনে খারাপ লাগল। কিন্তু ঈদের দিনে তো তোমাকে বেশ প্রফুল্লই মনে হচ্ছিল। তুমি লিখেছিলে, সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই দিনটি কাটছে। সবাই আনন্দে করছে। তাহলে কি তুমি যেভাবে চেয়েছিলে—সেভাবে কিছুই হয় নি?’ এটুকু লিখে ফাহিম চুপচাপ বসে রইল। মেসেজটি পাঠানোর আগে আরো কিছুক্ষণ ভাবল। এরপর আর একটি লাইন যোগ করল। ‘বিষয়টি ব্যক্তিগত হলে কিছুই লিখতে হবে না। এমনিই জানতে চাইলাম–তুমি না চাইলে কিছুই জানাতে হবে না। ভালো থেকো।’
দু’দিন কেটে গেল। সিমির কোনো উত্তর এলো না। ফাহিম বেশ আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করল। তার আগ্রহের কারণটা বোঝা গেল না। কিন্তু তবু সে অপেক্ষা করল—এবং মাঝে মাঝেই ইমেইল খুলে দেখল। তারও একদিন পর সিমির উত্তর এলো। ২৫ মিনিটের ব্যবধানে সিমি দুটো ইমেইল পাঠিয়েছে।
প্রথম মেইলে সে লিখেছে, ‘আসলে সবকিছু ঠিকই ছিল। দিনটিও ছিল সুন্দর। সবাই আনন্দ করছিল—শুধু সবার মাঝে থেকেও নিজেকে একা লাগছিল—ভীষণ একা। আমি জানি না কেন তোমাকে এসব লিখছি। বিষয়টি এমন ব্যক্তিগত নয় যে তোমাকে বলা যাবে না। আসলে মাত্র দু’মাস আগে আমি রানাকে হারিয়েছি। রানা আমার স্বামী। তাকে ছাড়া এটিই ছিল আমার প্রথম ঈদ। স্বাভাবিকভাবেই আমি তাকে মিস করছিলাম। তার অভাবটা কষ্ট দিচ্ছিল খুব—ভীষণ অনুভব করছিলাম। এই আর কী। আমি জানি আমাকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হবে একদিন। একসময় হয়তো সব কিছুই মেনে নিতে হবে। যাইহোক, আমি বোধহয় তোমাকে অনেক বিরক্ত করছি এসব বলে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ভালো থেকো। সিমি।’
কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ থেকে ফাহিম দ্বিতীয় মেইলটিও পড়ল। সিমি লিখেছে, ‘আমার আগের ইমেইলটির জন্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত এবং লজ্জিত। এভাবে আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলাটা ঠিক হয় নি। তুমি নিশ্চয়ই ভাববে অপরিচিত একজন মানুষকে এত কিছু বলার দরকার কী? তোমাকে বিরক্ত করার জন্যে আবারো দুঃখিত এবং ক্ষমা প্রার্থী।’
দেরী না করে ফাহিম তখনই লিখল, ‘সিমি, আমি তোমার স্বামী হারানোর কথা শুনে যারপর নাই দুঃখিত হয়েছি। এটা অবশ্যই হৃদয়বিদারক একটি বিষয় এবং আমি সমব্যথী। আল্লাহ তোমাকে এই কষ্টের সময়টা পার করতে সাহায্য করবেন নিশ্চয়ই। তিনি তোমাকে এই শোক কাঁটিয়ে উঠবার শক্তি দিক। তুমি কোনোভাবেই আমাকে বিরক্ত করছ না বরং আমি তোমার ইমেইলের অপেক্ষাতেই ছিলাম। নিঃসঙ্কোচে তোমার যা ইচ্ছে লিখতে পারো। তোমাকে দুঃখিত কিংবা লজ্জিত হতে হবে না।’
এটুকু লিখে ফাহিম চুপচাপ বসে রইল। আর কি কিছু লেখা উচিৎ? সে একটু ভাবল। তার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, সিমির স্বামীর আসলে কী হয়েছিল। জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কিনা সে বুঝতে পারছে না। আবার ভাবল, একটা প্রশ্ন করলে সে নিশ্চয়ই উত্তর দিবে—দেরীতে হলেও। কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার আরেকটা সুযোগ তৈরী হবে। সিমির সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগছে ফাহিমের। সে লিখল, ‘তোমার স্বামীর কী হয়েছিল জানতে পারি? বলতে না চাইলেও সমস্যা নেই।’ এ পর্যায়ে সে থামল। একটু ভেবে আরো এক লাইন যোগ করল, ‘নিজেকে শক্ত রেখো। আল্লাহ তোমার সহায় হোন। ফাহিম।’
‘প্রিয় ফাহিম,’ সিমি লিখল, ‘আমি তোমার সম্পর্কে কিছুই জানি না। তুমি কে, কোথায় থাকো, কী করো—কিছু না। কিন্তু দেখো, আমি নির্দ্বিধায় তোমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের কাহিনীটি বলে যাচ্ছি। অবাক হচ্ছি—কেন? এমন নয় যে আমি আমার কষ্ট বা ব্যথা কারো সঙ্গে ভাগ করে নেবার জন্যে মারা যাচ্ছি। অথচ, কী অবলীলায় আমি বলে যাচ্ছি। আচ্ছা যাইহোক, তুমি জানতে চেয়েছ, তাই বলছি।
গত আট বছর ধরে রানা কিডনি সমস্যায় ভুগছিল। ওর জন্মই হয়েছিল মাত্র একটি কিডনি নিয়ে এবং সেই একমাত্র কিডনিটি গত চার বছর যাবত ঠিকমতো কাজ করছিল না—অকেজো হয়েই ছিল। ২০০৩ সন থেকে তার ডায়ালাইসিস শুরু হয় যা চলছিল তার রেনাল ফেইলিওরের শেষ ধাপ পর্যন্ত। তার শরীরের সব জরুরী অরগ্যানগুলোতেও সমস্যা হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত তার হৃদযন্ত্রও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ১৭ আগস্ট ২০০৬।
সমবেদনা জানানোর জন্য অশেষ ধন্যবাদ। দ্রুত উত্তর দেবার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইল। সিমি।’
ফাহিম মেইল পড়ে স্তব্ধ হয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। সে কিছুতেই ভাবতে পারছে না, এমন একটা অবস্থার মুখোমুখি মেয়েটিকে হতে হয়েছে। আরো অবাক হলো এই ভেবে যে, মাত্র আড়াই মাস আগে সিমির হাজবেন্ডের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টের ১৭ তারিখে সে মারা গেছে আর আজ অক্টোবর ২৯। ভাবতে ভাবতেই ফাহিমের মন ভারী হয়ে এলো। সিমিকে সহানুভূতি জানিয়ে একটা মেইল পাঠানো দরকার। কিন্তু সে কিছু ভাবতে পারল না। সারাদিন একধরণের বিষণ্ণতায় বুঁদ হয়ে থাকল। অফিসের কাজে মন বসাতে পারল না। একটু তাড়াতাড়িই অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরল ফাহিম।
ম্যারেজ মিডিয়া (শেষ পর্ব)
একপর্যায়ে শাহেদের মন দ্রবীভূত হল। নাতাশার কান্নায় সিক্ত হল তার মন। শাহেদ সিদ্ধান্ত নিল দেখা করার।
…
দেখা হল তাদের। সেই রেস্টুরেন্টে মিলিত হল শাহেদ আর নাতাশা। একটা বিশেষ দিনে তারা এখানে এসেছিল। কিছু অনন্য মুহূর্ত কাটিয়েছিল শাহেদ, নাতাশার সান্নিধ্যে। কিছু কিছু বিশেষ মুহূর্ত আছে যেগুলো সত্যিই একটু আলাদা। সেই অনুভূতির কোন তুলনা হয় না। অন্যরকম।
প্রথম দেখায় নাতাশাকে চিনতে শাহেদের কষ্ট হল। মাথায় সিল্কের স্কার্ফ, চোখে কালো চশমা, গায়ে একটা ওভারকোটের মত কিছু। নাতাশাই শাহেদের সামনে এলো। চোখ থেকে চশমা সরাতেই শাহেদ চিনতে পারল তাকে। কেমন মলিন হয়ে আছে মুখখানি। শান্ত গভীর বিষাদের ছায়া ভরা ঐ মলিন মুখখানির দিকেই শাহেদ তাকিয়ে রইল পলকহীন চোখে।
কিছু সময় পার করে একটা কর্নার টেবিলে বসল ওরা। দীর্ঘসময় চুপ করে থেকে নাতাশা বলল তার জীবনের কিছু না জানা কথা। শাহেদ মন দিয়ে শুনল সব কথা।
থেমে থেমে নাতাশা বলল, ‘ছোটবেলা থেকেই বান্ধবীরা সবসময় বলতো তুই দেখতে সিনেমার নায়িকাদের মত। সেই থেকে শখ ছিল বড় হয়ে মডেল কিংবা একট্রেস হব।’
শাহেদ মনে মনে ভাবল, আসলেই তো তাই—নাতাশার মধ্যে মডেল কিংবা নায়িকা হবার মত সব যোগ্যতাই তো ছিল। সুযোগ পেলে হয়ত সে ভালই করতে পারত।
‘মফস্বল শহর থেকে পড়াশুনা শেষ করে ঢাকায় এসে আমার এক খালাত বোনের বাসায় উঠলাম। বেশ কিছুদিন মডেলিং এজেন্সিতে ঘুরাঘুরিও করলাম। চেষ্টা করলাম অনেক, কিন্তু কাজ পেলাম না। আমি ভীষণভাবে মূষরে পড়লাম। আমাকে কাজ পাইয়ে দেবার জন্য এজেন্সিগুলো তাদের বসদের ভ্রমণসঙ্গী হিসেবে কখনো কক্সবাজার কখনো ব্যাংকক যাবার প্রস্তাব দিতে থাকল—যা আমার পক্ষে কখনই মেনে নেয়া সম্ভব ছিল না। এরই মধ্যে হঠাৎ একদিন একটা পত্রিকায় দেখলাম মডেল খুঁজছে। একটা সর্বশেষ চেষ্টা হিসেবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। আমাকে সাক্ষাতের জন্য ডাকা হল।’
এটুকু বলে নাতাশা চুপ করে রইল। শূন্যদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কাঁচের জানালা ভেদ করে যতদূর দৃষ্টি যায়।
…
ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিস।
এক বছর আগের কথা। এজাজ আর জামানের সামনে জড়সড় হয়ে বসে আছে একটি মেয়ে। জামানের হাতে মেয়েটির সিভি এবং কিছু ছবি। সেগুলো একবার ভাল মত দেখে জামান তাকাল মেয়েটির দিকে।
‘কী নাম আপনার?’
‘জোবাইদা গুলশানারা। ডাকনাম পলি।’
জামান তাকাল এজাজের দিকে।
এজাজ বলল, ‘এই জাতীয় নামে তো চলবে না। নাম বদলাইতে হবে।’
জামান বলল, ‘ঠিক আছে, নাম নিয়ে এখন ভাবতে হবেনা। ওটা পড়ে বদলান যাবে।’ জামান মেয়েটির দিকে ঘুরে বলল, ‘পড়াশুনা কতদূর?
‘বিএ অনার্স।’
‘ম্যারিড অর আনম্যারিড?’
‘আনম্যারিড।’
‘গুড! একটু দেখি দাঁড়ান তো?’
মেয়েটি উঠে দাঁড়াল।
জামান বলল, ‘একটু ঘুরেন। ডান দিকে, হ্যাঁ। ঠিক আছে। এবার একটু বাম দিকে ঘুরেন। হ্যাঁ, বিইইইউটিফুল। এবার একটু দূর থেকে হেঁটে আসেন।’
মেয়েটি কয়েক পা দূরে গিয়ে হেঁটে আসল।
‘এবার আপনি বসতে পারেন।’
মেয়েটি বসল। জামান তার ছবিগুলো আরেকবার দেখে বলল, ‘প্রোফাইল তো বেশ ভাল। মনে হয় আপনাকে দিয়ে হবে।’ বলেই এজাজের দিকে তাকাল। এজাজ মাথা নেড়ে সমর্থন দিল।
জামান বলল, ‘ইংরেজিতে কথা বলতে পারবেন তো?’
‘অভ্যাস নেই, তবে চেষ্টা করলে পারব। ইউটিউব দেখে শিখে নিব।’ মেয়েটি চটপট উত্তর দিল।
‘গুড। আই লাইক দ্য কনফিডেন্স। শুনুন মিস—’ জামান তাকাল এজাজের দিকে, ‘উনার নাম কী রাখছ?’
এজাজ বলল, ‘নাতাশা।’
জামান মেয়েটির দিকে ঘুরে বলল, ‘এখন থেকে আপনার নাম নাতাশা। শুনুন মিস নাতাশা, আমরা যে প্রজেক্ট করছি, সেটা একটু ভিন্ন ধরণের। আপনাকে ট্রেইন্ড করা হবে। ফটোসেশন, গ্রুমিং এবং মেকওভার করা হবে। তারপর আপনি অ্যাসাইনমেন্ট পাবেন। যদি ভাল করেন, আপনাকে আমরা মোটা অংকের বেতন দিব। আর প্রতিটা অ্যাসাইনমেন্টের কমিশন তো থাকবেই।’
মেয়েটির মুখ উজ্জ্বল হয়ে গেল। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘অ্যাসাইনমেন্টটা কী?’
‘সেটা এজাজ আপনাকে বুঝিয়ে বলবে।’
…
দীর্ঘ নীরবতা। যেভাবে তাকিয়ে ছিল, সেভাবেই তাকিয়ে রইল নাতাশা। মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘পরিচয় হল, এজাজ আর জামান ভাইয়ের সাথে। আর এভাবেই আমি জড়িয়ে গেলাম এই চক্রের সাথে।’
শাহেদ অবিশ্বাস্য কণ্ঠে বলল, ‘জেনে শুনে এধরণের একটা কাজ বেছে নিলে তুমি?’
‘কী করব? উপায় ছিল না। অন্য কাজের চেষ্টা করেছি, পাই নি। তাছাড়া, খালাত বোনের সংসারে চেপে বসে কয়দিন থাকা যায়? আমার জন্যে দুলাভাইয়ের কাছ থেকে অনেক কথা শুনতে হত আপাকে। তাছাড়া…’
‘তাছাড়া?’
‘দুলাভাই সুযোগ পেলেই আমার শরীরে হাত দেয়ার চেষ্টা করত। আমার সৌন্দর্যের প্রশংসা করত। ইনিয়ে বিনিয়ে বাইরে ঘুরতে নিয়ে যেতে চাইত। বোনকে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে, রাতে আমার রুমেও আসতে চাইত। আমার বোনের কথা ভেবেই, ঐ বাসায় আর আমার পক্ষে থাকা সম্ভব ছিল না। কিন্তু থাকার জন্য একটা জায়গা তো দরকার আর তার জন্য চাই টাকা।’
‘তাহলে গ্রামে ফিরে যেতে? এখানে থাকার দরকার কী ছিল?’
‘গিয়েছিলাম।’ বলল নাতাশা, ‘আবার ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছি।’
‘কেন?’
‘বিপদ যখন আসে তখন চারিদিক দিয়েই আসে। আমার বাবা শ্বাসকষ্টে ভুগছিলেন দীর্ঘদিন থেকে। হঠাৎ নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বাবা মারা যায়। সংসার আর ছোট দু’ভাই বোনের লেখা পড়ার খরচ চালানোর মত সামর্থ্য আমার মায়ের ছিল না। অগত্যা আমাকে কাজটি করতে হয়েছে।’
শাহেদ কী বলবে ভেবে পেল না।
‘প্লিজ তুমি আমাকে ভুল বুঝ না, শাহেদ। পরিস্থিতি মানুষকে এর চেয়েও খারাপ কাজ করতে বাধ্য করে। বল করে না?’
‘কিন্তু তোমার এসব কথা আমি বিশ্বাস করব কেন? গিভ মি অ্যা গুড রিজন।’
নাতাশা চুপ করে রইল। চোখ ছলছল করে উঠল তার। সে ভেজা চোখে তাকাল শাহেদের চোখের দিকে।
‘বিসাইডস বিইং অ্যা গুড লায়ার, হোয়াট এলস ইউ হ্যাভ? প্রুভ মি?’
নাতাশা তাকাল আহত দৃষ্টিতে। বুঝতে পারল তার বলা কথার সুরেই শাহেদ বলল কথাটি। সে কী বলবে।
শাহেদ কিছুতেই সন্দেহ মুক্ত হতে পারছে না। সে থমথমে গলায় বলল, ‘আমি সত্যি সত্যি কনফিউজড নাতাশা! তোমার কোন কথাটা সত্যি আর কোন কথাটা মিথ্যা, আমি বুঝব কী করে?’
‘শাহেদ, প্লিজ!’ অস্ফুটে বলল নাতাশা।
‘আই’ম সরি।’ শাহেদ উঠে দাঁড়াল। সে চলে যেতে উদ্যত হতেই নাতাশা ওর হাতটা ধরল। তাকাল অনুনয়ের দৃষ্টিতে। সে দৃষ্টিতে প্রেম, সে দৃষ্টিতে ভালবাসার ছোঁয়া। সব কিছু উপেক্ষা করা যায় কিন্তু ভালোবাসার দৃষ্টি উপেক্ষা করা যায় না। মানুষ ভুল করেই, কিন্তু সে ভুলগুলোকে বড় করে না দেখে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখাও ভালোবাসার আরেক নাম। শাহেদ কী করবে? শাহেদ কি পারবে নাতাশার হাত ছাড়িয়ে চলে যেতে?
শাহেদ আস্তে করে নাতাশার হাতটি ছাড়িয়ে নিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল নাতাশার দৃষ্টির আড়ালে।
নাতাশা ভেঙে পড়ল অঝর কান্নায়। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শাহেদের চলে যাওয়ার দিকে।
…
নাতাশা টেবিলে দু’হাত ভাঁজ করে চুপ করে বসে আছে।
দীর্ঘ সময় পার হয়েছে। হঠাৎ তার কাঁধে কারো মৃদু হাতের স্পর্শ পেয়ে চকিতে ঘুরে তাকাল নাতাশা। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। শাহেদ দাঁড়িয়ে মিটিমিটি হাসছে।
শাহেদ বলল, ‘বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে। এদিকে খিদেও পেয়েছে ভীষণ। সকালে নাস্তা করি নি। তোমার কি অবস্থা? এক সাথে লাঞ্চটা করা যেতে পারে, কী বল?’
নাতাশার বুক হু হু করে উঠল। চোখ ভিজে উঠল আবার। ধাক্কাটা কিছুতেই সইতে পারল না সে। তার ইচ্ছে হল গলা ফাটিয়ে কাঁদে। কিন্তু সব কান্না সব সময় কাঁদা যায় না। তবুও জলের ধারায় চোখ ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে তার। কান্না লুকাতে নাতাশা বাইরে তাকাল। অঝোরে ঝরছে বৃষ্টি, অথচ সে কিছুই লক্ষ করে নি।
শাহেদ টেবিল থেকে একটা নরম টিস্যু এগিয়ে দিল নাতাশার দিকে। নাতাশা কান্না চোখেই হেসে ফেলল।
…
জোৎস্না-স্নাত শরতের সন্ধ্যা। এরই মধ্যে আকাশের বিশাল শরীরে ফুটে উঠছে স্বচ্ছ চাঁদ।
কোথাও কালো মেঘের আঁচড় নেই, ঘন হয়ে দলা বেঁধে জমাট নেই—সাদা শাড়ি পড়ে কোন এক শুভ্র কিশোরী যেনো তাথৈ তাথৈ নেচে বেড়াচ্ছে ঘুঙুর পায়ে। সারা শরীর নীল।
আকাশের নীলের সাথে মিলিয়েই যেন একটি সাদা আর আসমানির মিশ্রণের সুতি শাড়ি পড়েছে সোমা। শিউলি ফুলের নকশা, হাতের কারুকাজ করা শাড়িতে কাশফুলের শুভ্রতা। দু’পাশের চুল শিউলি ফুলের মালা দিয়ে বেনী করা। হাতে নীল কাঁচের চুড়ি। কপালে নীল টিপ।
অধিকতর বিস্ময়ে ইমরানের মুখ হা হয়ে গেল। এমন রূপে সোমাকে দেখে তার ঘোর কাটছে না।
ইমরানের হা করা মুখের দিকে তাকিয়ে সোমা বলল, ‘কী দেখছেন, অমন হা করে?’
সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ইমরান ঘোর লাগা কণ্ঠেই বলল, ‘তোমাকে। ইজ দ্যাট ইউ? রিয়েলি? আনবিলিভেবল!’
‘খুব খারাপ লাগছে?’
‘না। একটুও না, ভারী মানিয়েছে। অসম্ভব সুন্দর লাগছে তোমাকে। ভয়ংকর সুন্দর।’
‘ভয়ংকর? ভয়ংকর কেন?’
‘তোমার রূপে একধরণের রহস্য আছে, সোমা—যে বুঝতে পারবে না তার নির্ঘাত মৃত্যু।’
‘আপনি পারবেন তো?’
‘মনে হয় পারব। তুমি যদি একেবারে অন্যরকম হয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াও, আমি তোমাকে ঠিকই চিনতে পারব।’ ইমরানের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘অন্যরকম মানে?’
‘এই ধরো, সিল্ক কিংবা সূতি শাড়ি না পড়ে, তুমি যদি একটা ভেবেলিন শাড়ি পড়ে আমার সামনে এসে দাঁড়াও…’
কথা থামিয়ে সোমা বলল, ‘ভেবেলিন শাড়ি আবার কী?’
ইমরান দুষ্টুমির হাসি মুখে রেখেই বলল, ‘ভেবেলিন শাড়ি হচ্ছে, তুমি মনে মনে ভেবে নিলে যে তুমি একটা শাড়ি পরেছ, কিন্তু আসলে কিছুই পড় নি।’
সোমা কপট রাগ করল তারপর হেসে দিল। প্রাণ খুলে হাসতে থাকল সে। হাসতে হাসতেই বলল, ‘অসভ্যতা হচ্ছে কিন্তু!’
‘তা একটু হচ্ছে।’ ইমরানও হাসল।
সোমা হেসেই যাচ্ছে। ইমরান বুঝতে পারছে না—এত হাসির কথা সে কী বলেছে? সোমার হাসির রহস্য উদঘাটন করাটা তেমন জরুরী না। হাসতে থাকুক। এমন মন খুলে প্রাণ খুলে মেয়েটি শেষ কবে হেসেছে কে জানে?
সোমার খুশিতে শামিল হয়ে ইমরান বলল, ‘আজ খুব ভাল লাগছে, সোমা।’
‘কেন?’
‘অনেকদিন পর তোমাকে হাসতে দেখলাম।’
‘আর কখনই কাঁদব না। আমার মনের সমস্ত বরফ গলে গেছে।’
সোমা শূন্যে দু’হাত ছড়িয়ে কয়েকবার চক্কর দিল। তারপর বলল, ‘আচ্ছা, এখন কী কাল?’
ইমরান বলল, ‘শরতের শুরু।’
‘কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে বসন্ত। চারিদিকে বসন্ত। আমার মনেও বসন্তের রঙ লেগেছে। বলুন, আমি কেন কাঁদব? আমিও এখন গলা ছেড়ে গাইব, ‘বসন্ত ছুঁয়েছে আমাকে।’
সোমার সাথে ইমরানও সুর মেলাল, ‘ঘুমন্ত মন তাই জেগেছে, এখন যে প্রয়োজন তোমাকে, নিঃসঙ্গ এই হৃদয়ে!’
গানের সুর ভাঁজতে ভাঁজতে সোমা তার হাত দুটি বাড়িয়ে দিল ইমরানের দিকে। ইমরান পরম যত্ন নিয়ে ধরল সোমার হাত।
আকাশে রূপার থালার মত একটা চাঁদ উঠেছে। এই রূপালী রাত্রিতে একজোড়া মানব-মানবী ছায়াসঙ্গী হয়ে জোছনায় ভিজে একাকার হতে থাকল।
(সমাপ্ত)
লেখকের কথা: ২০১০ সনে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ঠিকানা পত্রিকায় এক কলামের একটা খবর ছাপা হয়। প্রবাসী পাত্রী বিয়ে করে বিদেশ গমনের সুযোগ এবং ভুয়া ম্যারেজ মিডিয়া খপ্পরে পড়ে শত শত যুবক সর্বস্বান্ত। খবরটি পড়ে আমি বিষয়টি নিয়ে ভাবতে থাকি। তখন ইন্টারনেটের খবর এখনকার মত এতটা তথ্যবহুল ছিল না। তারমধ্যেও যতটুকু পেয়েছি সেগুলোই নোট করে রেখেছি। তথ্য আবিষ্কার করতে যেয়ে ভুয়া ম্যারেজ মিডিয়ার পাশাপাশি আরো জানতে পারলাম—কীভাবে জমির দালালি করে একের জমি অন্যের কাছে বিক্রি করে ভুয়া দলিল করে ঠকানো হচ্ছে সরল মানুষদের। আর প্রেমের প্রতারণা—সে তো সার্বজনীন। প্রতিদিনই প্রেম হচ্ছে, ভেঙেও যাচ্ছে। তো এই তিন ধরণের প্রতারণাকে সমন্বয় করে শুরুতে টেলিভিশনের জন্য একটি এক খণ্ডের নাটক লিখেছিলাম। নাটকের স্ক্রিপ্ট পড়ে আমার অত্যন্ত প্রিয়ভাজন, অগ্রজ অভিনেতা এবং পরিচালক শহীদুজ্জামান সেলিম বললেন, এই গল্প থেকে ধারাবাহিক নাটক লিখতে। তারই অনুরোধ এবং অনুপ্রেরণায় লিখে ফেললাম ১৩ পর্বের ধারাবাহিক। যা পরবর্তীতে এটিএন বাংলায় সম্প্রচারিত হয়েছিল। এবার আমার ফেসবুক পাঠকদের জন্য আরো বর্ধিত কলেবরে লিখলাম ২১ পর্বের ধারাবাহিক।


