সাতদিন পর আমেরিকায় ঈদ। ঈদের দিনেও ফাহিম অফিসে গেল। এখানে ঈদের দিন একটা সাধারণ দিনের মতোই। দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকে অফিস বসেই কাছের বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিত অনেককেই ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মেসেজ পাঠাল ফাহিম। হঠাৎই কী মনে করে সে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা ইমেইল পাঠাল সিমিকে। দুপুর তখন সাড়ে বারোটা, শিকাগোর সময়।
পরেরদিন সকালে সিমির উত্তর এলো। সে লিখেছে, ‘ঈদ মোবারক ফাহিম। মহান আল্লাহতায়ালা তোমার আর তোমার পরিবারের উপর শান্তি বর্ষণ করুন। আমার ধারণা গতকাল তোমাদের ঈদ হয়ে গেছে। আশাকরি ঈদের দিনটি আনন্দেই কেটেছে। আগামীকাল আমাদের ঈদ। অনেক শুভেচ্ছা রইল। সিমি।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ। গতকাল আমরা ঈদ পালন করেছি। যদিও দিনের অর্ধেকের বেশি সময় অফিসেই ছিলাম। অফিস শেষে সন্ধ্যাটা কাটিয়েছি আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুদের সান্নিধ্যে। তোমাদের ঈদ কি আজকে?’ ফাহিম লিখে পাঠাল।
‘হ্যাঁ, আজ আমাদের ঈদ হচ্ছে। সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। অনেক আনন্দ করছে সবাই। যদিও আমার জন্যে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি।’ এটুকু পড়ে ফাহিম একটু ভাবল। ‘সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি’ এ কথার মানে কী? সে সিমির ইমেইল থেকে বাকী লেখাটুকু পড়ল। ‘আজকের দিনটি বেশ সুন্দর। চারিদিকে রোদের ঝিকিমিকি—একটু গরম অবশ্য পড়েছে, তবে অসহনীয় নয়। যাইহোক, ওয়েদার রিপোর্ট দিয়ে তোমাকে বোর করতে চাচ্ছি না। আশাকরি তুমি ভালো আছ। তাড়াতাড়ি উত্তর দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ। ঈদ মোবারক।’
এরপরে কয়েকদিন আর কোনো ইমেইল লেখা-লেখি হলো না। ফাহিম এরমধ্যে কয়েকবার ভেবেছে—আর একবার কিছু লিখবে কিনা। কাজের ব্যস্ততায় আর কোনো মেসেজ পাঠানো হয় নি ফাহিমের। হঠাৎ করেই সে একদিন এক লাইনের একটা ইমেইল পাঠাল। ‘কাজের ব্যস্ততায় উত্তর দিতে দেরী হলো—দুঃখিত। আশাকরি তোমার ঈদের দিনটি অনেক আনন্দে কেটেছে। শুভেচ্ছা। ফাহিম।’
একটু ভেবে ফাহিম সেন্ড বাটনে চাপ দিল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, ব্যাপারটা হালকা হয়ে গেল। কাজের ব্যস্ততায় উত্তর দিতে দেরী হলো, এটা কী কথা? ভাবটা এমন যেন ওই প্রান্তে তার ইমেইলের অপেক্ষায় একজন অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু এখন আর ভেবে কী হবে। যা হবার তা হয়ে গেছে। ফাহিম অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।
ঠিক দশ মিনিটের মধ্যেই সিমির উত্তর এলো। সে ছোট্ট করে লিখেছে, ‘আমার ঈদ মোটেই আনন্দে কাটে নি। শুভেচ্ছা পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ।’
ফাহিম বেশ অবাক হলো। সে মনে করতে পারল, আগের ইমেইলে সিমি লিখেছিল সবার সঙ্গে ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। তাহলে এখন এটা কী লিখল সে। দু’দিন আগের ইমেইল খুলে সেসেজটি আবার পড়ল ফাহিম—এবং নিশ্চিত হলো। হ্যাঁ সিমি লিখেছিল, ‘সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। অনেক আনন্দ করছে সবাই। যদিও আমার জন্যে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি।’ ফাহিম বেশ কয়েকবার পড়ল মেসেজটি। কিন্তু শেষের লাইনটির অর্থ ঠিকমতো বুঝতে পারল না।
একটু ভেবে ফাহিম উত্তরে লিখল, ‘জেনে খারাপ লাগল। কিন্তু ঈদের দিনে তো তোমাকে বেশ প্রফুল্লই মনে হচ্ছিল। তুমি লিখেছিলে, সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই দিনটি কাটছে। সবাই আনন্দে করছে। তাহলে কি তুমি যেভাবে চেয়েছিলে—সেভাবে কিছুই হয় নি?’ এটুকু লিখে ফাহিম চুপচাপ বসে রইল। মেসেজটি পাঠানোর আগে আরো কিছুক্ষণ ভাবল। এরপর আর একটি লাইন যোগ করল। ‘বিষয়টি ব্যক্তিগত হলে কিছুই লিখতে হবে না। এমনিই জানতে চাইলাম–তুমি না চাইলে কিছুই জানাতে হবে না। ভালো থেকো।’
দু’দিন কেটে গেল। সিমির কোনো উত্তর এলো না। ফাহিম বেশ আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করল। তার আগ্রহের কারণটা বোঝা গেল না। কিন্তু তবু সে অপেক্ষা করল—এবং মাঝে মাঝেই ইমেইল খুলে দেখল। তারও একদিন পর সিমির উত্তর এলো। ২৫ মিনিটের ব্যবধানে সিমি দুটো ইমেইল পাঠিয়েছে।
প্রথম মেইলে সে লিখেছে, ‘আসলে সবকিছু ঠিকই ছিল। দিনটিও ছিল সুন্দর। সবাই আনন্দ করছিল—শুধু সবার মাঝে থেকেও নিজেকে একা লাগছিল—ভীষণ একা। আমি জানি না কেন তোমাকে এসব লিখছি। বিষয়টি এমন ব্যক্তিগত নয় যে তোমাকে বলা যাবে না। আসলে মাত্র দু’মাস আগে আমি রানাকে হারিয়েছি। রানা আমার স্বামী। তাকে ছাড়া এটিই ছিল আমার প্রথম ঈদ। স্বাভাবিকভাবেই আমি তাকে মিস করছিলাম। তার অভাবটা কষ্ট দিচ্ছিল খুব—ভীষণ অনুভব করছিলাম। এই আর কী। আমি জানি আমাকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হবে একদিন। একসময় হয়তো সব কিছুই মেনে নিতে হবে। যাইহোক, আমি বোধহয় তোমাকে অনেক বিরক্ত করছি এসব বলে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ভালো থেকো। সিমি।’
কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ থেকে ফাহিম দ্বিতীয় মেইলটিও পড়ল। সিমি লিখেছে, ‘আমার আগের ইমেইলটির জন্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত এবং লজ্জিত। এভাবে আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলাটা ঠিক হয় নি। তুমি নিশ্চয়ই ভাববে অপরিচিত একজন মানুষকে এত কিছু বলার দরকার কী? তোমাকে বিরক্ত করার জন্যে আবারো দুঃখিত এবং ক্ষমা প্রার্থী।’
দেরী না করে ফাহিম তখনই লিখল, ‘সিমি, আমি তোমার স্বামী হারানোর কথা শুনে যারপর নাই দুঃখিত হয়েছি। এটা অবশ্যই হৃদয়বিদারক একটি বিষয় এবং আমি সমব্যথী। আল্লাহ তোমাকে এই কষ্টের সময়টা পার করতে সাহায্য করবেন নিশ্চয়ই। তিনি তোমাকে এই শোক কাঁটিয়ে উঠবার শক্তি দিক। তুমি কোনোভাবেই আমাকে বিরক্ত করছ না বরং আমি তোমার ইমেইলের অপেক্ষাতেই ছিলাম। নিঃসঙ্কোচে তোমার যা ইচ্ছে লিখতে পারো। তোমাকে দুঃখিত কিংবা লজ্জিত হতে হবে না।’
এটুকু লিখে ফাহিম চুপচাপ বসে রইল। আর কি কিছু লেখা উচিৎ? সে একটু ভাবল। তার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, সিমির স্বামীর আসলে কী হয়েছিল। জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কিনা সে বুঝতে পারছে না। আবার ভাবল, একটা প্রশ্ন করলে সে নিশ্চয়ই উত্তর দিবে—দেরীতে হলেও। কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার আরেকটা সুযোগ তৈরী হবে। সিমির সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগছে ফাহিমের। সে লিখল, ‘তোমার স্বামীর কী হয়েছিল জানতে পারি? বলতে না চাইলেও সমস্যা নেই।’ এ পর্যায়ে সে থামল। একটু ভেবে আরো এক লাইন যোগ করল, ‘নিজেকে শক্ত রেখো। আল্লাহ তোমার সহায় হোন। ফাহিম।’
‘প্রিয় ফাহিম,’ সিমি লিখল, ‘আমি তোমার সম্পর্কে কিছুই জানি না। তুমি কে, কোথায় থাকো, কী করো—কিছু না। কিন্তু দেখো, আমি নির্দ্বিধায় তোমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের কাহিনীটি বলে যাচ্ছি। অবাক হচ্ছি—কেন? এমন নয় যে আমি আমার কষ্ট বা ব্যথা কারো সঙ্গে ভাগ করে নেবার জন্যে মারা যাচ্ছি। অথচ, কী অবলীলায় আমি বলে যাচ্ছি। আচ্ছা যাইহোক, তুমি জানতে চেয়েছ, তাই বলছি।
গত আট বছর ধরে রানা কিডনি সমস্যায় ভুগছিল। ওর জন্মই হয়েছিল মাত্র একটি কিডনি নিয়ে এবং সেই একমাত্র কিডনিটি গত চার বছর যাবত ঠিকমতো কাজ করছিল না—অকেজো হয়েই ছিল। ২০০৩ সন থেকে তার ডায়ালাইসিস শুরু হয় যা চলছিল তার রেনাল ফেইলিওরের শেষ ধাপ পর্যন্ত। তার শরীরের সব জরুরী অরগ্যানগুলোতেও সমস্যা হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত তার হৃদযন্ত্রও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ১৭ আগস্ট ২০০৬।
সমবেদনা জানানোর জন্য অশেষ ধন্যবাদ। দ্রুত উত্তর দেবার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইল। সিমি।’
ফাহিম মেইল পড়ে স্তব্ধ হয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। সে কিছুতেই ভাবতে পারছে না, এমন একটা অবস্থার মুখোমুখি মেয়েটিকে হতে হয়েছে। আরো অবাক হলো এই ভেবে যে, মাত্র আড়াই মাস আগে সিমির হাজবেন্ডের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টের ১৭ তারিখে সে মারা গেছে আর আজ অক্টোবর ২৯। ভাবতে ভাবতেই ফাহিমের মন ভারী হয়ে এলো। সিমিকে সহানুভূতি জানিয়ে একটা মেইল পাঠানো দরকার। কিন্তু সে কিছু ভাবতে পারল না। সারাদিন একধরণের বিষণ্ণতায় বুঁদ হয়ে থাকল। অফিসের কাজে মন বসাতে পারল না। একটু তাড়াতাড়িই অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরল ফাহিম।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-২)
with
no comment

