Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-৮)

হ্যালো ফাহিম,
তুমি কি আমার আগের মেইল দুটো পেয়েছিলে? পরপর দুটো মেইল পাঠিয়েছি তোমাকে। দুদিন হয়ে গেল, কোনো উত্তর এলো না। একটু অবাকই হলাম। তুমি ঠিক আছ?
তোমাকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছিলাম। আমাকে কোনো টেক্সটও পাঠাও নি। আমি বলেছিলাম তুমি চ্যাট করতে না পারলে আমাকে টেক্সট করে জানিও। আমি তাহলে আর লগইন করব না। তুমি কিছু জানাও নি, তবুও আমি গত দুদিন অফিসে যাওয়ার আগে তুমি অনলাইনে আছ কিনা দেখার জন্য লগইন করেছি। তুমি ছিলে না। একটা মেসেজও রাখো নি আমার জন্য। ইশ কী নিষ্ঠুর একটা মানুষ তুমি।
তোমার মেইলের অপেক্ষায়, মন খারাপ করে বসে আছি আমি।
হোপ অল ইজ ওয়েল। লাভ ইউ।
সিমি।

পরের দিনও কোনো মেইল এলো না। সিমি অফিস থেকে ফিরে আবারো দু’লাইন লিখে পাঠাল ফাহিমের ঠিকানায়।
হোয়াট ফাহিম? নো মেইল ফর মি? মি স্যাড ☹
এটা খুবই অন্যায়। ভীষণ। তুমি জানো একজন মানুষ তোমার মেইলের অপেক্ষায় থাকে। অথচ তার কথা তোমার মনেই পড়ছে না। এটা কোনো কথা? আরে বাবা, দুটো লাইন লিখে তো পাঠাতে পারো। নাহয় টেক্সট মেসেজ দাও। অথবা ইয়াহুতে।
এভাবে চুপ করে থাকলে আমার বুঝি কষ্ট হয় না? কী হয়েছে তোমার? আমি কি এমন কিছু লিখেছি কিংবা আমার কোনো কথায় কি তুমি আহত হয়েছ? কিছু একটা তো বলো।
এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে তোমার সাথে জীবনেও কোনো সম্পর্ক রাখব না। মাইন্ড ইট। আমি মেইল চাই। বড়, অনেক বড় মেইল। ভুল করেও ভুলে যেন যাওয়া না হয়। ওকে?
তোমার বিহনে আমার মন কেমন কেমন করে, তুমি কি তা বোঝ?
আমার মন কেমন করে—কে জানে, কে জানে, কে জানে কাহার তরে!
আশাকরি, বড় কোনো ঝামেলায় তুমি পড় নি।
ভালো থেকো।
সিমি।

আরো একদিন গেল। অফিসে বেশ কয়েকবার মেইল চেক করে দেখেছে—কোনো মেইল নেই ফাহিমের। সেদিন ফাহিমের ফোন নাম্বারটা চেয়ে নেয়া উচিৎ ছিল। অন্তত ফোন করে জানা যেত? সিমির মনে হঠাৎ করে আরো একটা আশঙ্কা দেখা দিল। আসলে ফাহিমের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। সিমি জানতে চায় নি তার পরিবারের কথা। আমেরিকাতে সে নিশ্চয়ই একা থাকে না। তার হয়তো একটা ফ্যামিলি আছে। স্ত্রী আছে। ছেলে-মেয়ে আছে। সেটাই স্বাভাবিক। চল্লিশ বছরের একজন পুরুষ নিশ্চয়ই একা নেই।
অবশেষে ফাহিমের মেইল পেল সিমি। ছোট একটা মেইল তবুও সিমির আনন্দের সীমা রইল না। পরপর চারদিন ফাহিমের মেইল না পেয়ে ভীষণ রকমের মুষড়ে পড়েছিল সে। কী যেন নাই নাই অনুভূতি হচ্ছিল তার। আজ ভালো লাগছে। ফাহিম লিখেছে—
সিমি,
আমি আছি, যাই নি কোথাও। তোমার সব মেইলগুলিই পেয়েছি। অফিস থেকে হঠাৎ করেই একটা ক্লায়েন্ট সাইটে যেতে হয়েছিল। ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। পারসোনাল মেইল চেক করার কোনো সুযোগই ছিল না। চারদিন পরে তোমার মেইলের উত্তর লিখতে বসলাম। তবে তোমার সবগুলো মেইলের উত্তর হয়তো দেয়া হবে না একসাথে। শুধু তোমাকে অশ্বত্ব করার জন্য এটুকুই লেখা আপাতত। আজ চ্যাট করতে পারব। আজ তোমার ওখানে শুক্রবার। তোমার নিশ্চয়ই ডে অফ। বাসায়ই তো থাকবে। চাইলে ফোনে কথাও হতে পারে। কথা বলতে চাও?
ফাহিম।

সিমি অফিস থেকে এসে মেইলের উত্তর লিখল।
ফাহিম,
উফ হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কী টেনশনেই না পড়েছিলাম। যাক তুমি সুস্থ আছ এটাই বড় কথা। তুমি জানো আমি কতটা অপেক্ষা করে থাকি তোমার মেইলের। তোমার মেইল পাওয়ার চেয়ে ভালো কিছু আর কী হতে পারে? কিন্তু তারচেয়েও বড় কিছু হবে যদি তোমার সাথে সত্যিই কথা বলতে পারি।
অবশ্যই কথা বলতে চাই। আমি ভীষণ খুশি হবো। ইনফ্যাক্ট আমি ইগারলি অপেক্ষা করছি কখন তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবো। আমি যতটা না এক্সাইটেড, একই সাথে ঠিক ততটাই নার্ভাস হয়ে আছি। অথচ কেন তা বুঝতে পারছি না। এ যেন নতুন করে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আমার জীবনে। ভাবতেই পারছি না—সত্যিই অবশেষে আমাদের কথা হবে।
সে পর্যন্ত ভালো থাকি—তুমিও থেকো।
সিমি।

সিমি অপেক্ষা করল, কিন্তু ফাহিমের কোনো সারা পাওয়া গেল না। না ফোন কল, না টেক্সট মেসেজ, না ইমেইল। সে ভীষণরকমের আশাহত হয়ে পড়ল। ফাহিম বলেছিল ফোনে কথা বলবে আজ। কতটা আগ্রহ নিয়ে বসেছিল সে। অথচ… কী হয় ছেলেটার? হুট করেই নাই হয়ে যায়?
ফাহিমকে সে খুব মিস করছে, কিন্তু কেন? যাকে এখনো সামনা সামনি দেখেনি, কখনো ফোনেও কথা হয় নি। শুধুই কয়েকটি মেইলের আদান-প্রদান আর তাতেই তার এমন অবস্থা? তবে ফাহিম কি তাকে মিস করে না? সিমি বুঝতে পারে নি, কখন থেকে, কী করে সে ফাহিমকে এতটা একান্ত কাছের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে।
সিমির খুব মন খারাপ হলে তার রানার কথা মনে পড়ে। রানা সামনে চলে আসতেই তার পেছনের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। পেছনের কথা ভাবতে ভাবতেই একটা দীর্ঘ ইমেইল লেখা শুরু করল সিমি। অনেকটা ডায়েরী লেখার মতো।
সাবজেক্ট লাইনে লিখল, আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
ফাহিম প্রিয় বন্ধু আমার,
একটা সময় ছিল, যখন আমি সারাদিন লিখতে পারতাম। কতকিছু লিখতাম। আমার দিন কেটে যেত টাইপ করতে করতে। অথচ সেই আমি এখন আর লিখতে পারি না। যখনই আমি কিছু লিখতে শুরু করি, আমার রানার কথা মনে পড়ে। আমার সব লেখাগুলোর প্রথম সমালোচক ছিল সে। সে ছিল আমার শিক্ষক, আমার মেন্টর। আজকের এই আমাকে, যদি তুমি বলো আমি স্মার্ট, তবে সেই স্মার্টনেস আমার মধ্যে এনে দিয়েছে রানা। আমি ইংরেজিতে বরাবরই ছিলাম ভীষণ কাঁচা—রানাই আমাকে ইংরেজি উচ্চারণ শিখিয়েছে। শিখিয়েছে বাচনভঙ্গি, শব্দ চয়ন। কথা বলার সময় আত্মবিশ্বাস, মাথা উঁচু করে কথা বলা—সব কিছুই তার কৃতিত্ব। আমি সব সময় একটু লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। মানুষের সামনে কথা বলতে লজ্জা পেতাম। হাতাশাবাদী মানুষ বলতে যা বোঝায় আমি ছিলাম তেমনই একজন। কিন্তু রানাই আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে আশাবাদী হতে হয়। লক্ষে না পৌঁছানো পর্যন্ত লেগে থাকতে হয়। সে একবার আমার ডায়েরীতে লিখেছিল, “life at times seems to me like a losing battle, but I never gave up the fight.” সত্যিকার অর্থেই সে ছিল একজন সাহসী যোদ্ধা। বেঁচে থাকার প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত সে যুদ্ধ করে গেছে—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
আমাদের দিনগুলো ছিল অনেক কষ্টের। এখন যখন সেসব দিনের কথা মনে পড়ে, আমার চোখ ভিজে আসে। আহারে কী দিন গেছে আমাদের! রানার চিকিৎসার জন্য আমাদের হাতে কোনো টাকা ছিল না।
আমরা অনেক স্ট্রাগল করেছি। রানার চিকিৎসার ব্যয় বহন করার জন্য, এক পর্যায়ে একে একে আমাদের গাড়ি, হাই-ফাই মিউজিক সেট, টিভি, ভিসিআর এমন কি বিয়ের গয়নাগুলোও বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু আমরা কিছুতেই হাল ছেড়ে দেই নি। কীভাবে আমি ভুলে যাবো সেই দিনগুলি?
আই ফিল প্রাউড টু বি হিজ ওয়াইফ। যদি পুনর্জন্ম বলে কিছু থাকে তবে আমি আল্লাহর কাছে একটিই জিনিষই চাইব, তিনি যেন সেই জীবনেও রানাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেন। একজন স্বামী হিসেবে, সে ছিল মহান। একজন বন্ধু হিসেবে—অতুলনীয়। একজন সমালোচক হিসেবে—অপরিসীম। একজন শিক্ষক হিসেবে—অসাধারণ।
রানা নেই। কোনোদিন ফিরেও আসবে না আর। কিন্তু এই সহজ অথচ নিষ্ঠুর সত্যিটাকে আমি মেনে নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন। প্রতি মুহূর্ত। আর মেনে না নিয়েই বা কী করব? এটাই আমার জীবন—আমার নিয়তি। যে কষ্ট সে পেয়েছে তা ছিল অসহনীয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে বেঁচে নেই, এটা একদিকে ভালোই হয়েছে। সহ্যসীমার বাইরের এই কষ্ট থেকে সে মুক্তি পেয়েছে।
রানার কথা বলার জন্য এই মেইলটি আমি লিখতে চাই নি। তার কথা এনেছি শুধু বোঝানোর জন্য, কত শক্ত এবং সাহসিকতা নিয়ে সে এক একটা পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। আমি কখনো তাকে নিরাশ হতে দেখি নি। হতাশা শব্দটি তার অভিধানে ছিল না। শত অসুস্থতার মধ্যেও যখনই সে একটু ভালো বোধ করত, সে খুনসুটিতে মেতে উঠত। জোকস বলত। হাসত সবার দিকে তাকিয়ে। সে ছিল একজন সুখী মানুষ। আমি ছিলাম তার অনুসারী।
আমার কি মনে জানো ফাহিম, ‘সুখ’ বিষয়টা হচ্ছে এমন, যে তুমি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও যে তুমি সুখী হবে কি হবে না। জীবনে যা ঘটে গেছে, সেই সত্যিটাকে তুমি মেনে নাও আর না নাও, তোমার ভবিষ্যৎ কিন্তু তার ওপর নির্ভর করে না। এভাবেই আমি আমার মনকে গুছিয়ে নেই।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দিনের শুরুতেই আমি সিদ্ধান্ত নেই। আমার দুটো অপশন: চাইলে আমি সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে জীবনের সমস্যাগুলো গণনা করতে পারি অথবা আমার একাকীত্ব নিয়ে হা হুতাশ করতে পারি। অথবা বিছানা থেকে নেমে সুন্দর সকালের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞবোধ করতে পারি এইজন্যে যে তিনি আমাকে আরেকটি সকাল দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন এই ভেবে।
প্রতিটা দিনই কিন্তু একটা উপহার। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আমার চোখ খোলা, আমি ফোকাস করব নতুন এই দিনটির প্রতি এবং আমার যত সুখের স্মৃতি জমা হয়েছে সেখানে।
মানুষের বয়স আর জীবন হচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো। তুমি যা জমা রাখবে, একসময় তাই তুলতে পারবে। আমি তাই চেষ্টা করি, জীবনের যত সুখ, আনন্দ, ভালোলাগার স্মৃতি, মুহূর্তগুলো এই অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে।
তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ আমার এই মেমরি ব্যাংকের অংশীদার হয়ে কিছু সুখ, কিছু আনন্দ জমা রাখার জন্য। আমি প্রতিদিন কিছু না কিছু জমা রেখে চলেছি।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *