marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১০)

নাতাশা কাঁদছে। ফুলে ফুলে কাঁদছে মেয়েটা। পাশেই বসে আছে শাহেদ।
শাহেদ বুঝতে পারছে না কী করবে।
‘তুমি কি করে ভাবলে যে তোমার সঙ্গে আমি এমন কিছু করতে পারি?’ কাঁদতে কাঁদতে বলে চলল নাতাশা। ‘এতগুলো ছেলের মধ্যে আমি তোমাকেই বেছে নিয়েছি, কারণ সত্যি সত্যিই তোমাকে আমার পছন্দ হয়েছে। আমি ভাবতে পারছি না—’ নাতাশা কথা শেষ করতে পারল না। কাঁদতে থাকল অনবরত।
অস্বস্তির মধ্যে পড়ে গেল শাহেদ। সে সহসা কোন কথা খুঁজে পেল না। শাহেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অভিমানের গলায় বলল, ‘তাহলে তুমিই বা কী করে ভাবতে পারলে যে আমি মাইন্ড চেঞ্জ করব?’ শাহেদের কণ্ঠ ধরে এলো। সে থমথমে গলায় বলল, ‘you know I’m in love with you Natasha! সিচুয়েশন যাই হোক না কেন, বিয়ে আমি তোমাকেই করব। প্রয়োজন হলে এখনই, এই মুহূর্তে।’
নাতাশা মুখ তুলে তাকাল।
‘এবার কান্নাটা থামাও প্লিজ।’
নাতাশা চোখের পানি মুছে নিল। তার মুখে হাসির রেখা ফুটে উঠল। ‘জাস্ট অ্যা মিনিট’ বলে সে উঠে দাঁড়াল। হেঁটে যেয়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে একটা প্যাকেট বের করে এনে দিল শাহেদের হাতে।
শাহেদ অবাক হয়ে বলল, ‘এটা কী?’
নাতাশা রহস্যমাখা হাসি দিয়ে বলল, ‘খুলে দেখ কী।’
শাহেদ প্যাকেট খুলে দেখল এক সেট পাঞ্জাবী আর পাজামা। ‘পাঞ্জাবী?’ জিজ্ঞাসু চোখে তাকাল শাহেদ।
‘হ্যাঁ পাঞ্জাবী। এটা পড়ে রেডি হয়ে নাও। কাজী সাহেব চলে আসবেন যে কোন সময়।’
‘মানে?’ শাহেদের মাথায় কিছু ঢুকছে না।
‘মানে অতি সহজ। আমি জানতাম তুমি রাজি হবে। তাই সব ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছিলাম।’
শাহেদ বুঝতে পারছে না কী বলবে। সে বোকার মত তাকাল নাতাশার চোখের দিকে।
নাতাশা বলল, ‘আমি অন্যদিকে তাকাচ্ছি। তুমি ঝটপট বদলে ফেল।’
এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। ওপাশ থেকে কেউ একজন বলল, ‘ম্যাডাম, কাজী সাহেব চলে আসছেন। আপনারা রেডি হইলে বইলেন।’
নাতাশা শাহেদের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল।
নাতাশার চাহনিতে কী ছিল কে জানে—শাহেদের হিপ্নোটাইজের মত কিছু হয়ে গেল। তার মনে হল সে দিবা স্বপ্ন দেখছে। অথবা কোন বই কিংবা মুভিতে নিজেকে হারিয়ে ফেলেছে। তার মস্তিষ্কের সচেতন অংশকে সাময়িকভাবে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নাতাশা তার বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলোকে কেন্দ্রীভূত করে তাকে নির্দেশনা দিচ্ছে। সে রোবটের মত নাতাশার ইশারায় কাপড় বদলে ফেলল। নাতাশা দুষ্টুমির হাসি মুখে ঘুরে তাকাল অন্যদিকে।

এজাজ, জামান এবং ম্যারেজ মিডিয়া অফিসের জনাকয়েক কর্মচারীর উপস্থিতিতে শাহেদ আর নাতাশার বিয়ে সম্পন্ন করালেন কাজী সাহেব। এজাজ, জামান এবং একজন কর্মচারী সাক্ষী হল। শাহেদ এবং নাতাশা নিকাহ্ রেজিস্টার বইতে সাইন করল। অফিসের একজন কর্মচারী সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করল। খুবই ক্ষুদ্র আয়োজনে শাহেদ-নাতাশার বিয়ে হয় গেল। পুরো বিষয়টা এত তাড়াতাড়ি ঘটে গেল যে শাহেদের কাছে মনে হল যেন সে একটা স্বপ্ন দেখছে। ঘটনার আকস্মিকতায় বাক্যহারা হয়ে সে চুপচাপ বসে রইল সোফার এক কোনায়।

আজকের বিকেলটা একটু অন্যরকম লাগছে।
আসলে বিকেল থেকে সন্ধ্যা। শাহেদ এবং নাতাশার জন্য আজ একটা বিশেষ দিন। তারা দুজন সময়টা তাদের নিজের মত কাটাতে বের হয়েছে অনেকক্ষণ আগেই। দুজনে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে এসেছে একটা রেস্টুরেন্টে—সন্ধ্যাটা উদযাপন করতে। শাহেদ ক্ষণে ক্ষণে নাতাশার দিকে তাকাচ্ছে আর মিটি মিটি হাসছে। নাতাশা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার, সেই তখন থেকেই দেখছি, তুমি হাসছ!’
শাহেদ বলল, ‘কেমন যেন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছে সবকিছু। বিশ্বাসই হচ্ছে না…’
নাতাশা হাত বাড়িয়ে দিল শাহেদের দিকে। আলতো করে তার হাতটি ধরে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘আমি জানি তুমি মন খারাপ করেছ, বিয়ে হল অথচ এখনো দূরে দূরে। কিন্তু কী করব বল? তোমাকে তো সব বলেছিই।’
শাহেদ চুপ করে রইল।
‘এই মুহূর্তে কাগজ রেডি করাটাই বেশি জরুরী। মন খারাপ কর না। আমাকে যদি চলে যেতেই হয়, তুমি তো আসছই কানাডায়, অল্প কিছুদিনের ব্যাপার। আমাদের বাসর না হয় তখনই হবে?’
‘তাহলে তোমার আমার বিয়েটা কি শুধুই কাগজের জন্যে?’
‘আপাতত তাই। অন্তত যতদিন তুমি কানাডায় না আসছ, ততদিন আমি শুধুই তোমার কাগজের বউ।’
‘কাগজের বউ!’ শাহেদ অস্ফুটে উচ্চারণ করল, ‘শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়!’
নাতাশা তাকাল। ‘মানে কী? কার কথা বলছ?’
‘না কিছু না। তুমি বুঝবে না।’
‘না বললে কী করে বুঝব?’
‘কাগজের বউ—শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটি উপন্যাসের নাম।’
‘তাই?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি পড়েছ?’
‘একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি তার বিবাহিত বউকে ছেড়ে দিতে চায়। এখন ডিভোর্সের গ্রাউন্ড শক্ত করার জন্য তারই এক কাছের বন্ধুকে লেলিয়ে দেয় বউয়ের পেছনে পরকীয়ার জন্য। এই হল ঘটনা।’
‘তারপর?’
‘এখন বউর সঙ্গে যখন বন্ধুর সত্যি সত্যি প্রেম হয়ে গেল, তখন তার মতিভ্রম কেটে গেল। সে আবার তার বউকে ফিরে পেতে চাইল।’
‘ইন্টারেস্টিং।’
শাহেদ হঠাৎ করেই চুপ করে গেল। হুট করেই বিয়ের মত একটা ঘটনা ঘটে গেল অথচ তেমন কিছুই মনে হচ্ছে না। নাতাশা এখন তার বিয়ে করা বউ—অথচ কোথায় যেন একটা শূন্যস্থান, সংকোচ। তাকে কিছুতেই নিজের আপন কেউ মনে হচ্ছে না। শাহেদের ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেল।

সোমা তাদের বাসা থেকে হেঁটে এসে দাঁড়াল মোড়ের রাস্তায়। সে হাত ঘড়িতে সময় দেখল। দুই রাস্তার অদূরে তাকিয়ে দেখল কোন রিক্সা আছে কি না। নেই। সে অপেক্ষা করতে থাকল।
‘এই যে, এই মেয়ে শোন, এদিকে।’
সোমা ঘুরে দেখল সুজন ভাই বসে আছে মোড়ের চায়ের দোকানে। সুজন হাত নেড়ে ডাকল আবার।
সোমা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল সুজনের সামনে। হেসে বলল, ‘সুজন ভাই। আপনি দেখা হলেই শুধু এই মেয়ে বলে ডাকেন কেন? আমার নাম বলতে অসুবিধা কি?’
সুজন বলল, ‘না কোন অসুবিধা নাই। কিসের অসুবিধা?’
‘তাহলে কী?’
সুজন উত্তর না দিয়ে বলল, ‘তুমি ভাল আছ?’
‘জি, ভাল।’
‘রৌদ্রের মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে যাও কোথায়?’
‘ইউনিভার্সিটি। কী করব, রিক্সা তো পাচ্ছি না।’
‘রিক্সার ব্যবস্থা হবে। তুমি দাঁড়াও, এক কাপ চা খাও।’
‘আর ইউ ক্রেজি? আমি এখন এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আপনার সাথে চা খাব?’
‘দাঁড়ায় খাবা ক্যান। বইসা খাবা। আস বস এইখানে।’ বলে সুজন তার পাশের বেঞ্চের খালি জায়গাটা হাত দিয়ে একটু মুছে দিল।
‘না সুজন ভাই, এখন বসতে পারব না।’
‘কেন বসলে অসুবিধা কি?’
সোমা বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘কোন অসুবিধা নাই। আমি বাসা থেকে চা-নাস্তা খেয়েই বের হয়েছি। এখন আর চা খাব না, ঠিক আছে?’
সুজন কিছু বলল না।
‘থ্যাংকস এনিওয়ে।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে, না খাইলে আর কী করা।’
সুজনের মন খারাপ হল কি না বোঝা গেল না।
কিন্তু সোমার একটু খারাপ লাগল। সে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল, ‘আচ্ছা সুজন ভাই, আপনি কি সবাইকেই এভাবে ডেকে ডেকে চা খাওয়ান?’
সোমার প্রশ্নে সুজন খুবই অবাক হল। সে বিস্মিত কণ্ঠে বলল, ‘সবাইকে কেন খাওয়াতে যাব। আমার কি চায়ের গোডাউন আছে না কি? তোমারা আমার আপনজন।’
সোমা হাসল। সে আবার তাকাল রাস্তার দিকে। কোন রিক্সা দেখা গেল না।
একটু থেমে সুজন বলল, ‘আচ্ছা সোমা, এই যে এত কষ্ট করে পড়াশুনা করতেছ, কী লাভ? চাকরী তো পাবা না।’
সোমা অবাক চোখে বলল, ‘আপনি কী করে জানেন, চাকরি পাব না? আপনি কি ফরচুন টেলার? আর, চাকরি পাব না বলে, পড়াশুনা করব না? এটা কী ধরণের কথা, সুজন ভাই?’
‘না মানে, সেদিন অনেকদিন পর শাহেদের সাথে দেখা—পড়াশুনা শেষ করে বেকার ঘুরে বেড়াচ্ছে। দেখতে খারাপ লাগে।’
সোমা বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘আপনিও তো বেকার বসে আছেন।’
সোমার কথায় প্রচণ্ড বিরক্ত হল সুজন। ‘আমি বেকার বসে আছি কে বলল তোমাকে?’
‘আপনি কাজ করেন?’
‘অবশ্যই করি।’
‘কী কাজ?’
‘সেটাতো তোমাকে বলা যাবে না। আর বললেও তুমি বুঝবে না।’
‘আমার বুঝে দরকার নাই। আপনি কি আমাকে একটা রিক্সা ডেকে দিবেন?’
‘অবশ্যই দিব। তুমি এই ছায়ার মধ্যে একটু দাঁড়াও, আমি রিক্সা নিয়ে আসতেছি।’
সুজন তড়িৎ গতিতে ছুটে চলে গেল বড় রাস্তায়। সোমা হেসে ফেলল সুজনের ব্যস্ত ভঙ্গিতে বের হওয়া দেখে। সে তাকিয়ে রইল সুজনের গমন পথের দিকে।

নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
সোমার ক্লাসমেট ইরা, সিন্থিয়া সাথে সজল আর বাপ্পী সহ আরো কয়েকজন ক্লাস শেষ করে করিডোরে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছিল। দূর থেকে সোমা আর রাজনকে দেখে বাপ্পী প্রতিবাদী কণ্ঠে বলল, ‘দিস ইজ নট ফেয়ার, ম্যান। সোমা আমাদের ক্লাসের মেয়ে আর প্রেম করবে অন্য একজন সিনিয়রের সাথে, এটা কেমন কথা?’
সজল বলল, ‘আমরা তো আর বন্যার জলে ভেসে আসি নাই। আমাদের একটু চান্স কিন্তু দিলেই পারত।’
ইরা ভ্রুকুটি করে বলল, ‘তোরা নিজেদের দিকে একটু দ্যাখ। আর দ্যাখ রাজন ভাইকে। হাউ হ্যান্ডসাম হি ইজ! সোমা ইজ রিয়েলি লাকি।’
সিন্থিয়া মৃদু হাসল।
ইরা আবার বলল, ‘সোমার সাথে কিছু না হলে, আমি শিওর প্রেম নিবেদন করতাম রাজন ভাইকে।’
‘তাই তো করবি, আমাদের তো চোখে পড়ে না!’ সজল কণ্ঠে কপট রাগ।
ইরা সজলের কথাকে কোন রকম পাত্তা না দিয়ে তাকাল সিন্থিয়ার দিকে। দুজনেই হেসে ফেলল। সিন্থিয়া হাসতে হাসতেই বলল, ‘তুই এখনো ট্রাই করে দেখতে পারিস ইরা। রাজন ভাই পটে যেতেও পারে। শুনেছি উনি সুইং মুডে থাকে।’
ইরা ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘কী যে বলিস না?’
বাপ্পী বলল, ‘আচ্ছা তোরা কী শুরু করলি। এক কাজ করি চল, ওদেরকে একটা সিল দেয়ার ব্যবস্থা করি। অনেকদিন তো হল, আজ রাজন ভাইকে বলব, আমাদের খাওয়াতে হবে।’
সজল বলল, ‘That sounds like a plan. Let’s do that!’
ওদের কথা শেষ হতে না হতেই রাজন এসে যোগ দিল ওদের দলে।

ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে মুখ অন্ধকার করে বসে আছে শাহেদ। নিজেকে সংযত রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার। দীর্ঘ সময় পাড় করে অত্যন্ত বিরক্ত এবং উত্তেজিত কণ্ঠে বলল সে, ‘আপনারা আগে বললেন যে একমাসের মধ্যে ভিসার ব্যবস্থা করে দেবেন। আর এখন বলছেন ছয় মাসের নিচে হবে না। এর মানে কী? তাছাড়া, আমার কেসটা তো আর অবৈধ না। বৈধ। লিগ্যাল ম্যারেজ।’
শাহেদ তার বাকী কাগজপত্র রেডি হয়েছে কি না এবং কতদিন লাগবে সে ব্যাপারে জানতে এসেছে। অনেকক্ষণ থেকেই এজাজ এবং জামান সাত-পাঁচ বোঝানোর চেষ্টা করছে শাহেদকে। কিন্তু তাদের চেষ্টা সফল হচ্ছে বলে মনে হল না।
জামান মাথা ঠাণ্ডা রেখে হাসি হাসি মুখ করে বলল, ‘নরমাল প্রসেসে ছয় মাসের মতই লাগে। তবে অন্য রাস্তায় গেলে একমাসের মধ্যেই সব কিছু রেডি করা সম্ভব। আপনাকে তো বলেছিই।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শাহেদ শীতল কণ্ঠে বলল, ‘অন্য রাস্তা কী?’
জামান মাথা সামনে এনে গোপন কথা বলার ভঙ্গিতে বলল, ‘অ্যাম্বাসিতে আমাদের পরিচিত লোক আছে। এসব বিজনেস করতে গেলে আসল মানুষদের সাথে পরিচয় থাকাটা খুবই জরুরী। আপনার ভিসা একমাসের মধ্যেই করে দেয়া যাবে।’
‘তাহলে করে দিন।’
জামান তাকাল এজাজের দিকে। এবার এজাজ সামনে ঝুঁকে এসে বলল, ‘আসলে হইছে কি ভাইজান, খালি মুখে তো কেউ কিছু করতে চায় না। বুঝলেন না? এসব কাজে একটু খরচ টরচ করতে হয়…।’
জামান সহমত প্রকাশ করে বলল, ‘তাকে একটু খুশি করে দিতে পারলেই কাজ হয়ে যাবে। এই ধরেন, সোনারগাঁও কিংবা র‍্যাডিসনে একদিন ডিনার আর তার ওয়াইফের জন্যে কিছু গিফট, ব্যাস…।’
‘উনি আবার ক্যাশে কাজ করেন না। তাই কাইন্ডস দিতে হয়…।’ এজাজ সাথে সাথেই যোগ করে দিল।
শাহেদ অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে সোজাসুজি তাকিয়ে রইল এজাজের দিকে, স্থির দৃষ্টিতে। এজাজ অন্যদিকে মুখ ঘুড়িয়ে নিল। শাহেদের শীতল চোখের দিকে সে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকতে পারল না।
অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। জামান ভেতরের দিকে তাকিয়ে একজন কর্মচারীকে বলল, ‘এই এদিকে শাহেদ স্যারের জন্য একটা চা পাঠাও। সাথে কয়েক পিছ কেক।’
শাহেদ কোন প্রতিক্রিয়া দেখাল না। অন্যমনস্কভাবে তাকিয়ে রইল—সে বাক্য হারা হয়ে গেল।
কিছু সময় পাড় করে এজাজ মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘ভাইজান তো কিছু বলতেছেন না।’
‘উম?’ রোবটের মত মাথা ঘুড়িয়ে বলল শাহেদ, ‘সোনারগাঁও-এ খাওয়াতে কত লাগবে?’
এজাজ আর জামান নিজেদের মধ্যে চোখ চাওয়া চাওয়ি করল। তাদের মুখে প্রসন্ন হাসি দেখা গেল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৯)

নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
রাজন হেঁটে হেঁটে যাচ্ছিল তাদের নির্দিষ্ট জায়গায় যেখানে সে সোমার সঙ্গে দেখা করে। হঠাৎ সে শুনতে পেল তার নাম ধরে কেউ ডাকছে। ঘুরে দেখল সোমার ক্লাসের দুজন ছাত্রী—ইরা এবং সিন্থিয়া। ওদের সাথে আগেও অনেকবার দেখা হয়েছে। ইরা হাত নেড়ে আবার ডাকল, ‘রাজন ভাই!’
রাজন ওদের কাছে এগিয়ে গেল। কাছাকাছি যেতেই ইরা বলল, ‘কী রাজন ভাই, পাস টাস করে তো দেখি আমাদের ভুলেই গেলেন? কোন খবর নেই।’
রাজন হাসতে হাসতে বলল, ‘আরে কী বল, ভুলব কেন? আসিতো, প্রায় প্রতিদিনই তো আসি। তোমাদের জন্যেই তো ক্যাম্পাসের মায়া এখনো ছাড়তে পারি নাই।’
ইরা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘আমাদের জন্যে, না কার জন্যে সেটা আমরা জানি।’
‘কার জন্যে?’ রাজনও দুষ্টুমির হাসি দিল।
‘কেউ একজন স্পেশাল। আপনি ঘুরলেই দেখতে পাবেন’ ইরা রাজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলল।
রাজন ঘুরে দেখল সোমা এগিয়ে আসছে ওদের দিকে।
সোমা কাছে এসে দাঁড়াল। সিন্থিয়া বলল, ‘কি রে সোমা, তোকে যে দেখলাম না কয়েকদিন, ঠিক আছিস তো?’
‘হ্যাঁ ঠিক আছি। তোরা কেমন আছিস?’
‘ভালো আছি রে।’
সোমা আর রাজন ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেল ওদের নির্দিষ্ট জায়গায়। ওরা হাঁটল কিছুক্ষণ চুপচাপ। কিছু সময় পার করে রাজন অস্থির কণ্ঠে বলল, ‘কী হয়েছিল বলত? ক্লাসে আসনি, একটা ফোন পর্যন্ত নেই। প্রতিদিন দুবার তিনবার করে এসে অপেক্ষা করেছি। যদি তোমার দেখা পাই।’
সোমা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘এতটার দরকার ছিল না।’
‘মানে?’
‘শুধু শুধু কষ্ট করেছ।’
‘কী হয়েছে তোমার, সোমা?’ বিস্ময় প্রকাশ করল রাজন।
‘কী হবে? কিছুই না।’
রাজন জোর করে বলল, ‘বল, কী হয়েছে?’
‘বললাম তো কিছু না।’
‘তাহলে এ’কদিন ফোন দাও নি কেন? ফোন করলেও ফোন ধর নি।’
সোমা অন্যদিকে তাকিয়ে বলল, ‘ঢাকায় ছিলাম না।’
‘ঢাকায় ছিলে না মানে, কোথায় গিয়েছিলে?’
‘গ্রামের বাড়ি।’
‘গ্রামের বাড়ি কেন?’
‘দরকার ছিল।’
‘কী দরকার?’
সোমা রেগে গেল। সে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘কি আশ্চর্য, এত কথা জিজ্ঞেস করছ কেন? মানুষের প্রয়োজন থাকতে পারেনা?’
রাজন অবাক হয়ে বলল, ‘রেগে যাচ্ছ কেন?’
‘রেগে যাচ্ছি, কেননা তখন থেকে তুমি কি, কোথায়, কেন, একটার পর একটা প্রশ্ন করেই যাচ্ছ।’
রাজন লজ্জা পেয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে হাসল। সোমাও আর কিছু বলল না। দীর্ঘ নীরবতা।
সোমা বুঝতে পারল, তার প্রতিক্রিয়াটা একটু বেশি হয়ে গেছে। সে নিজেকে সামলে নিয়ে নীরবতা ভেঙে বলল, ‘সরি, আমি বোধহয় একটু বেশি রিয়্যাক্ট করে ফেলেছি। আসলে আমার মনটা ভাল ছিল না।’
‘কেন?’ বলেই রাজন বলল, ‘সরি…’
সোমা বলল, ‘হঠাৎ করে বেশ কিছু টাকার প্রয়োজন পড়ল, তাই দেশের বেশ কিছু জমি বিক্রি করে দিতে হল।
‘ও মাই গড!’ রাজন বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তো সে কথাটা আমাকে জানালেই পারতে?’
‘জানালে কী করতে?’
রাজন নিশ্চুপ। সে অবাক হয়ে তাকাল সোমার দিকে। কিছু একটা গড়বড় হয়েছে। কী সেটা। সোমা কখনই এমন সুরে কথা বলে না। ওকে কিছু একটা বিরক্ত করছে।
সোমা কিছু না বলে অদূরে তাকিয়ে রইল শূন্য দৃষ্টিতে।
রাজন বুঝতে পারছে না, কী করবে। সে কী আজ চলে যাবে? না কি আর কিছুক্ষণ থেকে দেখবে। সে এদিক ওদিক তাকাল। এদিকে একটা পিচ্চি ছেলে চা নিয়ে আসে। এক কাপ চা খেলে মন্দ হত না। তারচেয়ে বড় কথা, সোমাকে চিয়ার আপ করা দরকার। ওকে কি বলে দেখবে আজ আর ক্লাস করা দরকার নেই? চল, একটু ঘুরে আসি। রাজনের বাসাও বেশি দূরে নয়। সোমাকে কতদিন নিয়ে যেতে চেয়েছে, সোমা রাজী হয় নি। একসাথে ভিসিআরে মুভি-ঠুবি দেখলে মন ভাল হয়ে যেতে পারে। সে তাকাল সোমার দিকে।

শাহেদ আর নাতাশা একটা মনোরম জায়গায় বসে রয়েছে। অনেকক্ষণ কেউ কোন কথা বলে নি। একটু সময় নিয়ে শাহেদ বলল, ‘তুমি তো আমাকে বল নি যে তোমার কি সব ঝামেলা যাচ্ছে?’
নাতাশা যেন জানতই শাহেদের কাছ থেকে এমন একটি প্রশ্ন আসবে। তার উত্তর তৈরিই ছিল। সে ঝটপট উত্তর দিল, ‘আর বল না। আমার বড় খালা তার ছেলের সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার জন্যে উঠে পড়ে লেগেছে। কি যে এক যন্ত্রণা হয়েছে…’
শাহেদ বলল, ‘তোমার খালা কি ঢাকাতেই থাকেন?’
‘শুধু ঢাকাতেই নয়, উনি থাকেন আমাদের বাসাতেই এবং সদলবলে।’
‘তোমাদের বাসায়? মানে?’ শাহেদ অবাক হল।
‘আসলে তোমাকে বলা হয় নি, আমরা কানাডায় সেটেলড হবার পর দেখাশোনার নাম করে আমার বড় খালা আমাদের বাসায় এসে উঠে। সেই থেকে উনারা এখানেই থাকছেন। তাই তো সবকিছু লুকিয়ে করতে হচ্ছে।’
‘লুকিয়ে করতে হচ্ছে কেন?’
‘অনেক ব্যাপার আছে। তুমি বুঝবে না।’
‘ও আচ্ছা।’
‘কি ও আচ্ছা?’
‘না কিছু না।’
‘খালা হার্ট ফেল করবেন, যদি জানেন যে আমি অন্য ছেলেকে… যাই হোক, এই মুহূর্তে আমাদের বিয়েটা খুব সিক্রেটলি সেরে ফেলতে হবে। তোমার ভিসা এবং টিকেট কনফার্ম হয়ে যাবার পর, তুমি যদি চাও ছোট একটা রিসিপশনের ব্যবস্থা তখন করতে পার। What do you say?’
শাহেদ মাথা নেড়ে সায় দিল। একটু ভেবে বলল, ‘আমার মনে হয় সেটাই ভাল হবে।’

কয়েকদিন পরের ঘটনা।
খুব সকালে ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল শাহেদের। সে ঘুমের মধ্যে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’ শাহেদ কিছুক্ষণ চুপচাপ শুনল। কথা শুনতে শুনতে সে উঠে বসল। তার চেহারায় একধরণের পরিবর্তন হল। সে বলল,
‘কখন আসতে হবে?’ আবার চুপ। একটু চুপ করে থেকে সে আবার বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে আমি আসছি, ঘণ্টাখানেকের মধ্যে।’
অপরপ্রান্ত থেকে লাইন কেটে গেল। শাহেদ চিন্তিত মুখে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। আড়মোড়া ভেঙে ঢুকে পড়ল বাথরুমে। বাথরুম থেকে বের হয়ে দ্রুত কাপড় পড়ে বের হয়ে গেল বাসা থেকে।
শাহেদ দ্রুত হেঁটে এসে দাঁড়াল আবাসিক এলাকার একটা মোড়ে। সে হাত নেড়ে একটি রিক্সা ডাকল। রিকশাওয়ালা যাবে না বলে চলে গেল অন্য দিকে। শাহেদ আর একটু এগিয়ে যেতেই শুনতে পেল কেউ একজন তার নাম ধরে ডাকছে, ‘এই যে শাহেদ, এদিকে আস।’
শাহেদ এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল সুজন ভাই, মোড়ের চায়ের দোকানে বসে আয়েসে চা পান করছে। সুজন এই এলাকার বাসিন্দা। বয়স মধ্য তিরিশের কোঁটায়। যদিও বয়সের তুলনায় তাকে একটু বেশিই বয়স্ক দেখায়। বয়স্ক দেখানোর মূল কারণ, সুজনের মাথার সম্মুখ এবং মধ্য অঞ্চলে কোন চুল অবশিষ্ট নেই। মাথার চারিপাশে যেকয়টি অবশিষ্ট চুল আছে তাদেরকে নিয়ে তার চিন্তার সীমা নেই। মাথার বাম অঞ্চল থেকে কয়েক গোছা চুল লম্বা করে মাথার অপর প্রান্তে নিয়ে প্রাণপণে ঢেকে রাখার চেষ্টা করে যায় সে। এ কাজে তেমন সফল হয় না, তবুও তার পকেটে ছোট একটি চিরুনি সব সময় থাকে।
শাহেদ এগিয়ে কাছে গেল। সুজন চায়ের কাপে লাঠি বিস্কিট ভিজিয়ে শব্দ করে খাচ্ছে। শাহেদ সালাম দিয়ে বলল, ‘স্লামালাইকুম, সুজন ভাই, কেমন আছেন?’
‘ওয়ালাইকুমস্লাম।’ সুজন চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ ভাল। তারপর, তোমার খবর কী? এক মহল্লায় থাকি অথচ দেখা সাক্ষাত নাই। চাকরি-বাকরীর কী অবস্থা?’
‘কোন অবস্থা নেই। চেষ্টা করে যাচ্ছি।’
‘কর। চেষ্টা কর। হাল ছেড়ো না বন্ধু… চা খাবা?’
শাহেদ কিছু বলল না। অন্যমনস্কভাবে ঘড়ি দেখল।
সুজন আবার বলল, ‘আরে কী এত চিন্তা কর! বস, চা খাও।’ দোকানের ছেলেটাকে বলল, ‘এই পিচ্চি, এখানে আর এক কাপ চা দে।’
শাহেদ মাথা নেড়ে বলল, ‘না, সুজন ভাই। চা খাব না।’
‘আরে খাও এক কাপ।’
‘না থাক, আজ না।’
‘তাইলে লাচ্ছি খাও। গরমের মধ্যে লাচ্ছি ভাল লাগবে।’ দোকানের ছেলেটাকে বলল, ‘এই পিচ্চি, চা লাগবে না। এক গ্লাস ঠাণ্ডা লাচ্ছি দে।’
‘বাদ দেন। আরেকদিন খাব। আজ যাই।’
‘যাবা? আচ্ছা যাও।’
শাহেদ আর দেরি না করে দ্রুত বের হয়ে গেল চায়ের স্টল থেকে। সুজন তাকিয়ে রইল ওর চলে যাওয়ার দিকে।

ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকল শাহেদ। সে জামানকে দেখল ফোনে কথা বলছে। জামানের সামনে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ব্যাপার জামান ভাই, একেবারে জরুরী তলব?’
জামান তার সবগুলো দন্ত বিকশিত করে বলল, ‘ভেতরে যান।’ সে আঙ্গুল দিয়ে একটা রুমের দিকে দেখিয়ে দিল।
শাহেদ কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘কে?’
‘গিয়েই দেখেন না।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল। ধীর পায়ে এগিয়ে গেল নির্দিষ্ট রুমটার দিকে।
শাহেদ রুমের ভেতরে ঢুকে অবাক হয়ে দেখল—নাতাশা একটা লাল শাড়ি পড়ে বসে আছে সোফাতে। এই প্রথম নাতাশাকে শাড়ি পড়া দেখল শাহেদ। কি অসম্ভব সুন্দর যে লাগছে তাকে। লাল শাড়ির সঙ্গে লাল ব্লাউজ, লাল টিপ। সর্বাঙ্গেই যেন লালচে আগুনের ছোঁয়া। শাহেদ অপলক চোখে তাকিয়ে থাকল তার দিকে।
নাতাশার চেহারায় বিষাদের ছায়া—শাহেদ অবশ্য তা লক্ষ করল না। সে হেসে বলল, ‘আরে, এত দেখি একেবারে বউ সেজে বসে আছ? কী ঘটনা?’
নাতাশা কিছু বলল না। শাহেদ এবার লক্ষ করল, নাতাশাকে কেমন অন্যমনস্ক লাগছে। একটু সময় নিয়ে নাতাশা বলল, ‘বস, তোমার সাথে কথা আছে।’
শাহেদ বসল না। ‘এনিথিং রং? কী হয়েছে?’ উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল সে।
নাতাশা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘শাহেদ, আব্বুর শরীর খারাপ। সম্ভবত স্ট্রোক। হসপিটালে আছে তিন দিন ধরে, অথচ আমি কিছুই জানিনা।’
‘ও মাই গড! কী বল, কখন জেনেছ?’
‘কাল রাতে। আম্মু ফোন করেছিল-’
‘উনি এখন কেমন আছেন?’
‘আই ডোন্ট নো।’ নাতাশা অনিশ্চিত কণ্ঠে বলল, ‘আম্মু ডিটেইল কিছু বলে নি, সম্ভবত আমি কান্নাকাটি করব এই ভেবে। শুধু বলেছে পারলে তাড়াতাড়ি চলে আয়-’
শাহেদ শূন্য দৃষ্টিতে তাকাল। কী বলছে এসব নাতাশা? শাহেদের কপালে চিন্তার রেখা ফুটে উঠল। নাতাশাকে যদি এখন এই অবস্থায় চলে যেতে হয়—তাহলে শাহেদের কী হবে?
নাতাশা অস্থির কণ্ঠে বলল, আমার কিছু ভাল লাগছে না শাহেদ। আমি কী করব কিছু বুঝতে পারছি না-’
শাহেদ এগিয়ে গিয়ে বসল নাতাশার পাশে। মায়াজড়ানো কণ্ঠে বলল, ‘আমিও বুঝতে পারছি না।’
কিছুক্ষণ নীরবে বসে রইল দুজন।
নাতাশা বলল, ‘আব্বুর কিছু একটা হয়ে গেলে… আমি ভাবতে পারছি না।’ বলতে বলতে চোখ ভিজে এল তার। শাহেদের দিকে ঘুরে আকুল কণ্ঠে বলল, ‘আমাকে যে কোন মুহূর্তে চলে যেতে হতে পারে, শাহেদ।’
শাহেদ তাকাল। কিছু ভাবতে পারছে না সে।
‘সারারাত আমি ঘুমাতে পারি নি।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নাতাশা বলল, ‘আমি অনেক ভেবে একটা সিদ্ধান্তে এসেছি।’
‘কী সিদ্ধান্ত?’ শাহেদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল।
নাতাশা আলত করে শাহেদের হাত ধরল। আবেগতাড়িতে কণ্ঠে বলল, ‘তোমাকে আমার অনেক পছন্দ হয়েছে শাহেদ, আমি তোমাকেই বিয়ে করতে চাই।’
শাহেদের শরীরে বিদ্যুৎ খেলে গেল। এমন মধুর কথা সে তার জীবনে আর কোনদিন শুনেছে কি না কে জানে। সে সহাস্যে বলল, ‘আমিও চাই।’
‘তাহলে চল বিয়েটা করে ফেলি।’
নাতাশার কথা শুনে মনে হচ্ছে ও বোধহয় এখনই বিয়ে করার জন্য তৈরি হয়ে আছে। শাহেদ বলল, ‘কবে?’
‘আজ। এখনি। তুমি যদি চাও, আমাদের বিয়েটা আজ এবং এখনই হবে। আর তুমি যদি না চাও, or if you change your mind, সেক্ষেত্রে-’
শাহেদ ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘সেক্ষেত্রে?’
একটু ভেবে নিয়ে নাতাশা বলল, ‘I don’t know! দেখ, আমার পক্ষে তো চাইলেই যখন তখন দেশে আসা সম্ভব নয়, তাই না? সেক্ষেত্রে হয়ত আমি অন্য কাউকে বিয়ে করে রেখে যাব। তারপর তার ভিসা হয়ে গেলে সে চলে যাবে কানাডায়। Now it’s your call Shahed—আমি তোমার উপরে ছেড়ে দিচ্ছি।’
শাহেদ বুঝতে পারছে না কী বলবে। অন্যদিকে নাতাশার কথাগুলোকে ফেলে দেয়া যাচ্ছে না। ওকে যদি চলে যেতে হয়, কাউকে তো ওকে বেছে নিতেই হবে। তবুও শাহেদের মনে আশঙ্কা উঁকি দিল। ম্যারেজ মিডিয়ার এজাজ আর জামানের একটার পর একটা অজুহাত সামনে এনে টাকা চাওয়ার ব্যাপারটা ওকে ভাবিয়ে তুলেছে। যদিও কোনটার ভেতরেই সে অযৌক্তিক কিছু সে খুঁজে পায় নি। টাকা তো লাগবেই। মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকা খরচ করতেও কার্পণ্য করে না। আবার নাতাশার সাথে ঘনিষ্ঠতা হবার পর থেকে একটার পর একটা অপ্রত্যাশিত ঘটনা ঘটে যাচ্ছে। সব কী কাকতালীয় না কি পুরো বিষয়টাই একটা ছকে আঁকা! সে কি কোন চক্রের গোলকধাঁধার মধ্যে পড়ে গেছে? শাহেদের ভাবনা এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে।
নাতাশা উত্তরের অপেক্ষায়।
শাহেদ হঠাৎ করেই হতাশা আর ক্ষোভ মিশ্রিত কণ্ঠে বলল, ‘Are you playing with me?’
নাতাশা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল শাহেদের দিকে। আহত কণ্ঠে বলল, ‘কী বলছ তুমি এসব?’
‘ঠিকই বলছি। তোমরা তিনজনে মিলে আমাকে ট্র্যাপে ফেলেছ। আমার আরো আগেই বোঝা উচিৎ ছিল।’
শাহেদের অপ্রত্যাশিত প্রতিক্রিয়ায় হকচকিয়ে গেল নাতাশা। সে কী বলবে বুঝতে পারল না। আচমকা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৮)

নাতাশা লক্ষ করল শাহেদ কোন কথা বলছে না—একেবারেই চুপ করে আছে। আজ কি তার মনটা কোন কারণে খারাপ? কিছু একটা বলতে চাচ্ছে, কিন্তু বলতে যেয়েও বলছে না।
নাতাশা নীরবতা ভেঙে বলল, ‘কী ব্যাপার শাহেদ, কথা বলছ না যে? তুমি ভীষণ অন্যমনস্ক। তোমার মন ভাল নেই? আমাকে বলবে কেন?’
শাহেদ তাকাল শূন্য দৃষ্টিতে। কিছু বলল না।
নাতাশা আবার বলল, ‘Is something wrong? আমার সঙ্গ ভাল লাগছে না?’
শাহেদ বলল, ‘না- না তা হবে কেন? কী বলছ? তোমার সঙ্গ ভাল লাগবে না কেন?’
‘তাহলে?’
একটু চুপ করে থেকে শাহেদ বলল, ‘তোমাকে চলে যেতে হবে তাড়াতাড়ি, তাইনা?
নাতাশা বলল, ‘কোথায়, কানাডায়?’
শাহেদ মাথা নাড়ল।
‘তাতো যেতে হবেই। কেন?’
‘কত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলে?’ শাহেদ জানতে চাইল।
‘মাত্র দেড় মাসের ছুটি পেয়েছি। তাও তো প্রায় শেষ হয়ে আসছে।’
‘এক্সটেনশন করতে পারবে না?’
নাতাশা একটু ভেবে বলল, ‘করা যাবে না তা নয়। ইমার্জেন্সি হলে তো বাড়ানো যেতেই পারে। কেন বল তো?
‘আমার যে একটু সময় লাগবে।’ শাহেদের কণ্ঠে আকুতি।
নাতাশা কিছু বলল না।
‘হঠাৎ করে বেশ কিছু টাকার জোগাড় করতে হচ্ছে। বুঝতেই তো পারছ।’
‘না বোঝার তো কিছু নেই, অবশ্যই বুঝতে পারছি। আই উইশ, আমি তোমাকে এই সময় হেল্প করতে পারতাম…’
‘না না তোমাকে এ নিয়ে ভাবতে হবে না। ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। তুমি আমাকে এত বড় একটা সুযোগ দিচ্ছ, এটাই তো কত!’
‘সাম হাউ টাকাটা যদি ম্যানেজ করতে পার, ইভেন লোন করেও যদি হয়… একবার কানাডায় গেলে দু’তিন মাসের মধ্যেই তুমি সব টাকা শোধ করে দিতে পারবে।’
নাতাশার কথা শুনে শাহেদ কিছুটা আশ্বস্ত হল। তার চেহারায় প্রশান্তির ছায়া নেমে আসল।

শাহেদ রান্নাঘরে এসে উঁকি দিল।
সোমা আর জাহানারা বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত। সোমা টুকটাক সাহায্য করছে তার মাকে। সাহায্যের চেয়ে কথাই বলছে বেশি। জাহানারা খুব আগ্রহ নিয়ে তার মেয়ের কথা শুনছে।
‘মা মেয়ে কী এত কথা হচ্ছে শুনি?’ শাহেদ রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল।
শাহেদকে দেখে জাহানারা হেসে দিয়ে বললেন, ‘তুই নাকি কোন বিদেশী মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছিস? মেয়েটার নাকি একবার বিয়ে হয়েছিল? বয়সেও নাকি তোর চেয়ে বড় হবে?’ কৌতুহল দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন জাহানারা।
শাহেদ হেসে বলল, ‘কী সমস্যা, এত নাকি নাকি করছ কেন? তিনটা প্রশ্ন করলে, তিনটাই নাকি দিয়ে।’
সোমা হেসে ফেলল। শাহেদ কপট রাগে তাকাল সোমার দিকে। সোমা মনে হচ্ছে কোন কিছুই বাদ রাখেনি তার মাকে জানাতে। শাহেদ আবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সিএনএন থেকে তো দেখি সব খবর ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছ?’
সোমা ভেংচি কাটল শাহেদের দিকে তাকিয়ে।
শাহেদ বলল, মেয়েটা বিদেশী নয়, বাংলাদেশী। থাকে বিদেশে। মা তোমার সঙ্গে আমার জরুরী কিছু কথা আছে।’ শাহেদ এবার সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘এই যে ক্রিস্টিনা আমানপোর দয়া করে আপনি কি এখান থেকে একটু যাবেন?’
সোমা বলল, ‘যাব কেন? যা বলার তোমাকে আমার সামনেই বলতে হবে। আমি এত বড় একটা স্যাক্রিফাইস করলাম—আমার বিয়ের ফান্ডের টাকা তোমাকে দিলাম আর আমাকেই কিনা বলছ চলে যেতে? হাউ রুড? আই অ্যাম অ্যা পার্ট অফ দিস প্রজেক্ট ভাইয়া, তুমি আমাকে চলে যেতে বলতে পার না।’
‘ঠিক আছে, তোকে যেতে হবে না।’
জাহানারা বললেন, ‘বল কী বলবি।’
একটু ভেবে শাহেদ বলল, ‘দেশে থেকে তো কিছু হচ্ছে না, আর কিছু হবে বলেও মনে হয় না। ঐ মেয়েটাকে বিয়ে করে আমি বিদেশ যেতে চাই।’
‘কিন্তু মেয়েটা সম্পর্কে ভালোমতো জানতে হবে না?’ জাহানারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, ‘ওর বাবা-মাকে আসতে বল কথা বলি।’
‘ওর বাবা-মাকে আমি কোথায় পাব? ওরা থাকে কানাডায়। আর বিয়ে তো আমি ওর বাবা-মাকে করব না। যাকে করব তার সম্পর্কে আমি যতটুকু জেনেছি, তাতে আমি স্যাটিসফায়েড। নাতাশা খুবই ভাল মেয়ে।’
জাহানারা বললেন, ‘ভাল মেয়েই যদি হবে তবে তার ডিভোর্স হল কেন?’
শাহেদ মুখ কালো করে ফেলল।
সোমা শাহেদের পক্ষ নিল। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার ছোট বোন, মানে আমার ছোট খালা–তারও তো একবার ডিভোর্স হয়েছিল মা, সে কি খারাপ মেয়ে?’
জাহানারা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তুই কথার মধ্যে কথা বলছিস কেন?’
‘আই অ্যাম অ্যা পার্ট অফ দিস প্রজেক্ট মাম! আমাকে তো কথা বলতেই হবে!’
জাহানারা চূড়ান্ত বিরক্ত হলেন। তিনি ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘মাম? আমার সঙ্গে ইংরেজি বলবি না।’
শাহেদ বলল, ‘কী শুরু করলে তোমরা? আর এটা কী ধরণের কথা মা? একবার বিয়ে হলেই কেউ খারাপ হয়ে যায় না। আমি ওর সব কথাই জেনেছি মা, খুবই ভাল মেয়ে। ট্রাষ্ট মি!’
সোমা বিদ্রূপাত্মক হাসির রেখা চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘বাংলা বল ভাইয়া।’
শাহেদ ওর মায়ের কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। মায়ের ঘাড়ে হাত রেখে আবদারের সুরে বলল, ‘মা শোন, আমার আরও বেশ কিছু টাকা লাগবে। কিছু একটা ব্যবস্থা কর। দরকার হলে বড় মামার কাছ থেকে লোন করে এনে দাও।’
জাহানারা মাথা নেড়ে বললেন, ‘না না, সেটা সম্ভব নয়। আমি কোন লোন-ঠোন চাইতে পারব না।’
‘কেন পারবে না?’
‘এত কিছু তো বলতে পারব না। পারব না, ব্যাস।’
শাহেদের মন খারাপ হল। সে কী করবে বা কী করবে বুঝতে পারল না।
সোমা বলল, ‘আই হ্যাভ অ্যান আইডিয়া।’
জাহানারা কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘তোকে আর আইডিয়া কপচাতে হবে না। তুই যা আমার সামনে থেকে।’
শাহেদ অনুনয় করে বলল, ‘আহা মা, শুনিই না ওর আইডিয়াটা কী?’
জাহানারা চুপ করে রইলেন। শাহেদ সোমাকে ইশারা করল।
সোমা বলল, ‘আমাদের গ্রামের বাড়ির অনেক জমি পড়ে আছে ছোট চাচার দখলে। জমিগুলো ফেরত পাবার কোন আশা নেই। ফসলেরও কোন ভাগ আমরা পাইনা। ওখান থেকে কিছু জমি বিক্রি করে দিলেই হয়। চাচা কিছু বললে তোমরা বলবে শাহেদ বিদেশ যাবে, টাকা দরকার।’
শাহেদ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘এক্সেলেন্ট! এক্সেলেন্ট আইডিয়া। ইউ আর অ্যা ব্রিলিয়ান্ট সিস্টার। মা তুমি আজ রাতেই বাবার সঙ্গে কথা বলবে। হাতে একদমই সময় নেই। প্লিজ!’ শাহেদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
জাহানারা বেগম হ্যাঁ না কিছু বললেন না।
সোমা বলল, ‘ভাইয়া তুমি চিন্তা করনা। আব্বুকে আমি বোঝাব। ধরে নাও কাজটা হয়ে গেছে। ডান!’
ওর মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শাহেদ দ্রুত রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেল।

রাত বেশি হয় নি।
জাহানারা শোবার ঘরে ঢুকে দেখলেন রাকিবউদ্দিন সাহেব বিছানায় শুয়ে আছেন। তিনি কপালের দু’পাশে চেপে ধরে আছেন। তার কি মাথা ব্যথা হচ্ছে না কিছু নিয়ে চিন্তা করছেন বোঝা গেল না। জাহানারা স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘এই তোমার কি শরীর খারাপ? মাথা ব্যথা করছে? মাথা টিপে দিব?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, মাথা টিপতে হবে না, যা বলতে চাও সরাসরি বলে ফেল। ভূমিকার দরকার নেই।’
একটু আমতা আমতা করে জাহানারা বললেন, ‘শাহেদের ব্যাপারে একটা আলাপ ছিল…’
‘আলাপ জমবে না। এ ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।’
জাহানারা অবাক হয়ে বললেন, ‘মানে? আমি কী বলতে চাইছি, তুমি না শুনেই…’
‘শুনেছি, সোমা সব বলেছে আমায়।’
জাহানারা খুব আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘এমন একটা সুযোগ, তোমার কি মনে হয় না আমাদের সায় দেয়া উচিৎ?’
শীতল কণ্ঠে রাকিবউদ্দিন সাহেব বললেন, ‘তোমার মনে হলে তুমি দাও। কিন্তু গ্রামের কোন জমি আমি বিক্রি করব না।’
সোমা এসে দাঁড়াল শোবার ঘরের দরজায়। মাথা ঢুকিয়ে বলল, ‘বাবা, আসব?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব উঠে বসলেন। বললেন, ‘আয়, তবে কোন লাভ হবে না। তোকে যা বলার বলে দিয়েছি।’
সোমা তার বাবার কাছে এসে মোলায়েম সুরে বলল, ‘ওয়ান লাস্ট থট দিয়ে দেখবে নাকি? আই হ্যাভ অ্যানাদার আইডিয়া… বলব?’
‘আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড।’ রাকিবউদ্দিন সাহেব কোন রকম আগ্রহ দেখালেন না।
‘আহা শোনই না।’ সোমা বলল, ‘আমি বলছিলাম কী, জমি বিক্রি করার দরকার নেই। তুমি ছোট চাচাকে বলবে জমিগুলো বন্ধক রেখে টাকা দিতে, ভাইয়া দু’তিন মাসের মধ্যেই টাকা পাঠিয়ে দিবে, তুমি জমিগুলো তখন আবার ছাড়িয়ে নেবে। ইটস দ্যাট সিম্পল।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব তাকালেন সোমার দিকে। তারপর তাকালেন তার স্ত্রীর দিকে।
জাহানারার চেহারায় ব্যাকুলতা ফুটে উঠল।

ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিস।
শাহেদ টাকা নিয়ে এসেছে। এজাজ সব টাকা একবার গণনা শেষ করে তাকাল শাহেদের দিকে।
শাহেদ বলল, ‘এজাজ ভাই, সব ঠিক আছে তো? ঠিকমত গুনেছেন?’
এজাজ বলল, ‘কী যে বলেন ভাইজান। জেন্টেলম্যান্স ডিলিং, না গুনলেও অসুবিধা ছিল না, আপনে বারে বারে বলেন দেইখাই গুনাগুনির ঝামেলায় যাই, হে হে হে।’
শাহেদ এবার জামানের দিকে ঘুরে বলল, ‘জামান ভাই, কাগজপত্র কতদূর, প্রসেসিং হচ্ছে তো তাইনা?’
‘সবকিছুই ঠিকমত হচ্ছে।’ জামান মাথা ঝুঁকিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘তবে সবচেয়ে জরুরী কাজটা এখন সেরে ফেলা দরকার।’
শাহেদ তাকাল উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে।
‘আপনাদের বিয়েটা রেজিস্ট্রি করতে হবে এবং ইমিডিয়েটলি নোটারি করে অ্যাম্বাসিতে জমা দিতে হবে।’
শাহেদ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘বিয়েটা কোথায় হবে?’
‘সেটা আপনারা দুজন মিলে যে ডিসিশন নিবেন সেভাবেই হবে। তবে এই মুহূর্তে ব্যাপারটা যত সিক্রেট থাকে তত ভাল। তাছাড়া-’
‘তাছাড়া?’
‘নাতাশা ম্যাডামের পারসোনাল কিছু ঝামেলা আছে…’
শাহেদ বিচলিত হল। সে শঙ্কিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কিসের ঝামেলা? কই আমিতো কিছু জানিনা?’
‘আপনি বরং তার সাথেই কথা বলেন।’
‘ঠিক আছে আমি আসি।’
শাহেদ রাজ্যের চিন্তা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে চলে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই এজাজ ডাকল, ‘ভাইজান-’
শাহেদ তাকাল এজাজের দিকে।
এজাজ বলল, ‘একটু বসেন। আর এক কাপ চা খান।’
শাহেদ বসল না। দাঁড়িয়েই বলল, ‘না না আর চা খাব না। বলেন কী বলবেন?’
এজাজ কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল, ‘বিয়ের রেজিস্ট্রি এবং নোটারি করতে কিছু খরচ হবে তাতো বুঝতেই পারতেছেন। হাজার বিশেক টাকা সাথে রাইখেন। এর বেশি হয়তো লাগবে না। আর লাগলে তো একটা ব্যবস্থা হবেই-’
শাহেদের মুখ শুকিয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্যভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল এজাজের দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৭)

নিজেকে স্বাভাবিক চেহারায় ফিরিয়ে আনতে নাতাশার বেশি সময় লাগল না।
মুহূর্তেই সে তার মুখে একটা দুষ্টুমির হাসি ফুটিয়ে তুলল। তারপর কোল্ড ড্রিঙ্কসে ছোট একটা চুমুক দিয়ে মিষ্টি কণ্ঠে বলল, ‘আমার কাজিনদের কাছ থেকে শিখেছি। এখানে রিকশাওয়ালা, ফুচকাওয়ালা, ঝালমুড়িওয়ালা সবাইকে দেখি মনের আনন্দে মামা বলে ডাকে। অনেক নাটকেও দেখেছি।’
শাহেদ শব্দ করে হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘তাই বলো।’
‘শুনেছি, এখানে বেষ্ট ফ্রেন্ডকেও নাকি মামা সম্বোধন করে। ইজ দ্যাট ট্রু?’
শাহেদ আবারো হেসে বলল, ‘ইয়া, দ্যাটস ট্রু।’
‘আর প্রেমিক-প্রেমিকারা? তারা কিছু বলে না?’
‘তা তো বলতে পারব না।’
‘কেন প্রেম কর নি কখনো?’
শাহেদ চুপ করে রইল।
নাতাশা প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘সেই তখন থেকে আমি একাই কথা বলে যাচ্ছি। এতক্ষণ তো শুধু আমার কথাই শুনলে। এখন তোমার কথা কিছু বল, শুনি।’
শাহেদ একটু সময় নিয়ে বলল, ‘বলার মত আমার তেমন কোন কথা নেই নাতাশা। কি বলব?’
‘তোমার ফ্যামিলি সম্পর্কে বল। তাদের সম্পর্কে তো কিছুই বললে না। ক’ভাইবোন তোমরা? ফ্যামিলিতে আর কে কে আছে?’
‘বাবা, মা, ছোট একটা বোন আর আমি, এই নিয়ে আমাদের সংসার। মোটামুটি সুখী পরিবার বলতে পার।’
নাতাশা বলল, ‘দেখি তোমার হাতটা এদিকে দাও তো।’
শাহেদ অবাক হয়ে বলল, ‘কেন?’
‘আহা দিতে বলছি দাও।’
শাহেদ হাত বাড়িয়ে দিল। নাতাশা ছোট করে একটা চিমটি কাটল শাহেদের হাতে।
‘আউচ! এটা কী হল?’
‘চিমটি দিলাম।’ নাতাশার মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘চিমটি দিলাম মানে? এটার রহস্য কী?’
‘এটার রহস্য জান না? রহস্য হচ্ছে—তোমরাও দু’ভাইবোন, আমরাও দু’ভাইবোন। মিলে গেল, তাই চিমটি।’
‘আর বাবা-মা?’
নাতাশা ছোট একটা নিঃশ্বাস ফেলল। কাঁচের জানালা দিয়ে তাকাল বাইরে। একটু সময় নিয়ে বলল, ‘এক সময় আমাদের সংসারটাও সুখের ছিল, তবে এখন আর নেই।’
‘এখন আর নেই কেন?’
‘সে অনেক কথা। এসব কথা বলতে ইচ্ছা করছে না এখন। তুমিতো যাচ্ছই কিছুদিন পর, তখনই সব দেখতে পাবে।’
শাহেদ আর কিছু বলল না। নাতাশাও নিশ্চুপ। দু’জনে দু’জনের ভাবনা নিয়ে চুপচাপ বসে রইল।
ইতোমধ্যে ওয়েটার খাবার পরিবেশন করে গেল। নাতাশা তাকাল শাহেদের দিকে। শাহেদ নাতাশার প্লেটে খাবার তুলে দিল। ওরা দুজন খেতে খেতে কথা শুরু করল আবার।
নাতাশা বলল, ‘তোমার ছোটবোনের কথা বলেছিলে—কী নাম ওর?’
‘সোমা।’
‘রিয়েলি?’ নাতাশা চোখ নাচিয়ে বলল, ‘সোমা আমার খুব প্রিয় একটা নাম। বিয়ে হয়ে গেছে, না কি পড়ছে?’
‘নর্থ-সাউথ ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ করছে। বিয়ে এখনো হয় নি। মা অবশ্য ছেলে খুঁজছেন…’
‘চিন্তা কর না। কিছুদিনের মধ্যে কানাডায় সেটেলড হয়ে তুমিই সোমার বিয়ের ব্যবস্থা করতে পারবে। মাকে আর চিন্তা করতে হবে না।’
শাহেদ ভীষণভাবে আপ্লুত হল। নাতাশার মুখে ‘মাকে আর চিন্তা করতে হবে না’ শুনে মনে হচ্ছে ওদের বুঝি সত্যি সত্যিই বিয়ে হয়ে গেছে। শাহেদের মা-অ এখন নাতাশার মা। মা-ই তো। কৃতজ্ঞতায় শাহেদের মন ভরে গেল। নাতাশাকে নিয়ে তার মনে আর কোন সংশয় রইল না।

এদিকে নাতাশা আর শাহেদ যখন ঢাকা শহরে ঘুরে বেড়াচ্ছে কপোত-কপোতীর মত, ওদিকে ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে এজাজ এবং জামান তাদের নতুন নতুন পাত্র দেখা এবং পাত্রের ইন্টারভিউ নেবার আয়োজন চালিয়ে যাচ্ছে।
পঁচিশ থেকে ত্রিশ বছরের কিছু যুবক, বুক ভরা সীমাহীন স্বপ্ন নিয়ে ম্যারেজ মিডিয়া অফিসের ওয়েটিং রুমে বসে রয়েছে।
এজাজের সামনে বসে আছে জনৈক প্রার্থী। সে কৌতূহলী হয়ে বলল, ‘শুনেছি কানাডায় নাকি অনেক শীত?’
এজাজ বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘সেইটা তো আমি বলতে পারব না। আমি তো আর ঐ দেশে থাকি না।’
‘আপনার কি মনে হয়, কিছু শীতের কাপড় নিয়ে যাওয়া ভাল, তাইনা? ওখানে নিশ্চয় অনেক দাম হবে।’
এই পর্যায়ে জামান ঘুরে তাকাল যুবকের দিকে। সে রুক্ষ স্বরে বলল, ‘আপনার নাম?’
‘হায়দার হোসেন।’
‘আপনার ফর্ম ফিল আপ করছেন?’
‘জি।’
‘রেজিস্ট্রেশন ফি? বায়োডাটা—জমা দিয়েছেন?’
‘জি জি। সব কিছুই দিয়েছি।’
জামান অপেক্ষারত অন্যান্য প্রার্থীদের বসার জায়গা দেখিয়ে বলল, ‘দেখেন হায়দার সাহেব, আমরা এখন অনেক ব্যস্ত আছি। পেছনে তাকিয়ে দেখেন, আরো কতজন ক্যান্ডিডেট বসে আছে। আপনার এসব খেজুরে আলাপের সময় আমাদের হাতে নাই। আপনি এক কাজ করেন, আপাতত ঐখানে গিয়ে বসেন। আপনার ইন্টারভিউ ডেট ঠিক হলে আপনাকে আমরা জানাব।’
হায়দার হোসেন জামানের কথায় কিছুই মনে করল না। বরং হাসি মুখেই উঠে চলে গেল। সে চলে যেতেই জামান বিরক্ত হয়ে এজাজের দিকে ঘুরে বলল, ‘এত ভাল যন্ত্রণা শুরু হল দেখি!’
পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে, মান-অপমান তাদের গায়ে লাগে না। হায়দার হোসেন সেই গোত্রেরই একজন। সে দমে যাবার পাত্র নয়। বেশিক্ষণ চুপ করে থাকার মানুষও সে নয়। সে ওয়েটিং এরিয়াতে বসেই তার পাশের যুবকের সঙ্গে আলাপ জুড়ে দিল। প্রাথমিক পরিচয় পর্ব শেষ করে সে বিজ্ঞের মত বলল, ‘আপনি কি জানেন, ১৯১১ সনে নায়াগ্রা ফলসের সব পানি জমে বরফ হয়ে গেছিল?’
পাশের যুবক অবাক হয়ে বলল, ‘তাই নাকি? জানিনা তো? ইন্টারেস্টিং!’
‘আমার কাছে ছবি আছে। এ ভেরী রেয়ার ফটো। আপনি চাইলে আপনাকে পাঠাতে পারি। আপনার ইমেইল অ্যাড্রেসটা দেন, ফরওয়ার্ড করে দেব।’
হায়দার হোসেন তার নোটবুক বের করে যুবকের ইমেইল অ্যাড্রেস লিখে নিল।

শাহেদ বিছানায় শুয়ে আছে।
নাতাশার সঙ্গে সুন্দর কিছু সময় কাটিয়ে তার মন এখন ফুরফুরে। এক সপ্তাহ আগেও তার জীবনটা ডুবে ছিল হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। ঘরবন্দী জীবনটা তার কাছে অসহ্য যন্ত্রণার হয়ে উঠছিল। নাতাশা যেন তার জীবনে আলাদিনের যাদুর চেরাগ হয়ে এসেছে।
নাতাশা তাকে একটা ছবি দিয়েছে। ছবিটি তার হাতে। নায়াগ্রা জল্প্রপাতের সামনে দাঁড়ান নাতাশা, চুল উড়ছে। পেছনে বিশাল বিস্ময়কর জলপ্রপাত। ছবিটির দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে নাতাশার রূপ আর প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ডুবে গেল শাহেদ। মনের অজান্তেই সে গুনগুন করে উঠল—
‘আমি আকাশে পাতিয়া কান
শুনেছি শুনেছি তোমারি গান
আমি তোমারে সঁপেছি প্রাণ
ওগো বিদেশিনী…’
শাহেদের নির্জন তপস্যার ব্যাঘাত ঘটাতেই যেন হঠাৎ করেই সোমার আবির্ভাব ঘটল। সে এসে দাঁড়াল শাহেদের রুমের দরজায়। কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে হালকা গলায় কাশি দিল।
সোমার উপস্থিতি টের পেয়ে নাতাশার ছবিটি দ্রুত বালিশের নিচে লুকিয়ে ফেলল শাহেদ।
সোমা কিছু বুঝল কি না, তা বোঝা গেল না। সে কাছে এসে বলল, ‘ভাইয়া, তোমার জন্যে একটা ভাল খবর আছে। উঠে বস, বলছি।’
শাহেদ উঠে বসল।
সোমা বলল, ‘বাবা আর মাকে আমি কনভিন্স করেছি। আমার বিয়ের ফান্ড থেকে তোমার জন্যে আরও ৫০ হাজার টাকা দেয়া হবে। অবশ্যই লোন হিসেবে এবং একটা শর্তে।’
‘শর্ত? শর্ত আবার কিসের?’
‘তোমার পরিকল্পনাটা কি, এ ব্যাপারে আমাকে বিষদ বিবরণ দিতে হবে।’
‘কী যে সব বলিস? বিষদ বিবরণ আবার কী?’
‘টাকাটা কোথায় ইনভেস্ট হচ্ছে, রিটার্ন অফ ইনভেস্টমেন্ট কী, ইত্যাদি—সব আমাকে বলতে হবে। পেটের মধ্যে কোন কথা রাখতে পারবে না। এবার বল—what is your master plan?’
‘মানে?’
‘মানে হচ্ছে টাকা দিয়ে তুমি কী করছ অথবা কী করবে?’
শাহেদ বালিশের নিচ থেকে নাতাশার ছবিটি বের করে শান্ত ভাবে বলল, ‘বিয়ে করব।’
‘কী করবে?’
‘বিয়ে।’ ছবিটা সোমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘এই মেয়েটাকে।’
সোমা ছবি হাতে নিয়ে একবার শাহেদের দিকে আর একবার ছবিটার দিকে তাকাল।
শাহেদ বলল, ‘ভেবে দেখলাম—আমি বিয়ে না করলে তো তোর কোন গতি হবে না। তোর কথা ভেবেই…’ কথা বলতে বলতে শাহেদ লক্ষ করল সোমা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে ছবিটার দিকে। ওর চাহনিই বলে দিচ্ছে নাতাশাকে সোমার পছন্দ হয়েছে।
‘মেয়েটা কেমন?’ প্রশ্ন করল শাহেদ।
সোমা অস্ফুটে বলল, ‘Gorgeous! Stunning beauty! Who is she?’
‘A bride from Canada!!’
সোমা একে একে দুই, দুয়ে দুয়ে চার মিলিয়ে বলল, ‘ও আচ্ছা, এই তাহলে তোমার সেই লাইফ টাইম অপরচুনিটি?’
শাহেদ বলল, ‘হ্যাঁ। কানাডার সিটিজেন। দেশে এসেছে বিয়ে করে হাজব্যান্ডকে কানাডা নিয়ে যাবে।’
‘তা এই কানাডিয়ান ব্রাইডের সঙ্গে তোমার পরিচয়টা হল কি করে? ইন্টারনেটে নিশ্চয়?’
‘আরে না, ইন্টারনেটে হতে যাবে কেন? নিউজপেপারে অ্যাড দেখে যোগাযোগ করলাম, ইন্টারভিউ দিলাম। ব্যাস!’
‘ব্যাস?’
‘চাকরীটা পেয়ে গেলাম। আই মিন, সিলেকশনটা পেয়ে গেলাম।’
‘ভুয়া! পত্রিকার এ সমস্ত দু’নম্বরি অ্যাড দেখে তুমি ধরা খেয়েছ। তোমার বুদ্ধি সুদ্ধি আর কবে হবে ভাইয়া?’ সোমা বিস্ময় প্রকাশ করল।
‘শোন সোমা, তোদের এই হচ্ছে একটা সমস্যা। সব কিছুতেই সন্দেহ করিস। যা জানিস না, তা নিয়ে কথা বলতে আসিস না।’
সোমা ছবিটা হাতে নেড়ে চেড়ে আবারো কিছুক্ষণ তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে দেখল। ‘বয়সে তো তোমার চেয়ে বড় হবে মনে হচ্ছে।’ সোমার কণ্ঠে সংশয়।
‘দু’তিন বছরের বড় হবে হয়ত, তাতে কিছু যায় আসে না। বয়স কোন ব্যাপার না। আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহম্মদ (সা:)…’
‘বুঝেছি। থাক আর বয়ান দিতে হবে না। আব্বু চেক লিখে দিয়েছে। কাল সকালে ব্যাঙ্ক থেকে টাকাটা তুলে নিয়ে এস।’
সোমা চলে যাচ্ছিল, শাহেদ ডাকল ওকে। সোমা ঘুরে দাঁড়াল।
শাহেদ কৃতজ্ঞচিত্তে গভীর কণ্ঠে বলল, ‘Soma, thank you. Thanks for being so supportive. You’re a great sister!’
সোমা দাঁড়িয়ে রইল। একটু চুপ করে থেকে থেমে থেমে বলল, ‘ভাইয়া তোমার উপর আমাদের অনেক বিশ্বাস। আমি জানি তুমি কোন ভুল করবে না। তবু ভয় হয়, আব্বুর অনেক কষ্টের জমানো টাকা। যাই কর, ভেবে চিন্তে কর।’
সোমা কথা শেষ করতে পারল না। বলতে বলতে তার চোখ ভিজে এল। সে দ্রুত বের হয়ে গেল শাহেদের রুম থেকে।

ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিস।
শাহেদ তার ব্যাগ থেকে একটা কাগজের প্যাকেট বের করে এজাজের হাতে দিল। এজাজ বিগলিত হাসি দিয়ে প্যাকেট থেকে কয়েকটি টাকার বান্ডিল বের করে গণনা শুরু করল।
শাহেদ চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখল। অফিস মোটামুটি ফাঁকা। অন্যান্য প্রার্থীদের কাউকে চোখে পড়ল না। ওয়েটিং এরিয়াতে কেউ নেই। অভ্যর্থনা ডেস্কে দুজন অফিস স্টাফকে দেখতে পেল শুধু।
জামান ভেতর থেকে এসে শাহেদের সাথে হ্যান্ডশেক করে বসল তার চেয়ারে। এজাজ টাকা গণনা শেষ করে বলল, ‘নেন, আর কোন টেনশনের কারবার নাই। এইবার আসল কাজ সাইরা ফেলা দরকার।’
শাহেদ প্রশ্ন করল, ‘আসল কাজ মানে?’
এজাজ মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘সেইটাও বুঝলেন না? নাতাশা ম্যাডামের সাথে আপনার বিয়ে। কাগজপত্র রেডি করতে হবে না? কানাডার ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, আপনার পাসপোর্ট।’
জামান তার বিখ্যাত কাস্টমার সার্ভিস হাসি মুখে লাগিয়ে বলল, ‘শাহেদ সাহেব, আপনার কাগজপত্র তৈরি হচ্ছে। আমাদের বিশ্বাস ছিল আপনি ডিপোজিট মানি নিয়ে আসবেন, তাই দেরী না করে আমরা পেপার প্রসেসিং অলরেডি শুরু করে দিয়েছি।‘
শাহেদের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ভেতরে ভেতরে উত্তেজিত হয়ে পড়ল। উত্তেজিত কণ্ঠেই সে বলল, ‘Thank you. Thank you so much.’
জামান বলল, ‘শাহেদ সাহেব, এখন মন দিয়ে কিছু কথা শুনুন। আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম পেপার প্রসেসিং-এ কিছু খরচ আছে।’
শাহেদ শীতল দৃষ্টিতে তাকাল জামানের দিকে। হঠাৎ করেই তার সমস্ত উত্তেজনা নিমিষেই উবে গিয়ে অন্ধকার নেমে এল তার চেহারায়।
‘আপনাকে যে আরো কিছু টাকা জোগাড় করতে হবে।’
‘কত টাকা?’
‘ওয়ার্ক পারমিট করতে লাগবে পঞ্চাশ হাজার আর আপনার পাসপোর্ট করতে লাগবে হাজার দশেক। পাসপোর্টটা আগে করা থাকলে অবশ্য এই টাকাটা লাগত না।‘
‘পাসপোর্ট করতে দশ হাজার লাগবে?’
এবার এজাজ ঝুঁকে এসে বলল, ‘জরুরী পাসপোর্ট, দালাল ধইরা করতে হবে। দুই দিনের মধ্যে পাসপোর্ট হাতে দিয়া যাবে। আমাদের নিজেদের লোক বলতে পারেন। দুইনম্বরী না। আমরা দুইনম্বরী কারবার করি না।’
জামান বলল, ‘অবশ্য আপনি নিজে যদি দু’দিনের মধ্যে পাসপোর্ট করে আনতে পারেন, তাহলেও হবে। আপনি চেষ্টা করে দেখতে পারেন। পরিচিত কেউ আছে?’
‘আমার? মানে পাসপোর্ট অফিসে? না না আমার কেউ পরিচিত নেই।’
চিন্তিত ভঙ্গিতে জামান বলল, ‘তাহলে তো ঝামেলা হয়ে যাবে।’
‘ঠিক আছে অসুবিধা নেই। পাসপোর্টটা আপনারাই করে দিন। আমি পাসপোর্টের টাকাটা কাল এসে দিয়ে যাব।’
এজাজ সাথে সাথে বলল, ‘তিন কপি ফটো লাগবে ভাইজান। ফটো না থাকলে বলেন, আমাদের পরিচিত স্টুডিও আছে। হাতে হাতে ফটো দিয়ে দিবে।’
‘না না তার আর প্রয়োজন পড়বে না। ফটো আছে।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল। আর কোন কথা না বলে সে দরজার দিকে পা বাড়াল।
‘বেশি সময় নিয়েন না। বাকি টাকার ব্যবস্থাটাও একটু তাড়াতাড়ি কইরেন। ম্যাডামের সময় কিন্তু শেষ হইয়া আসতেছে।’ এজাজ মনে করিয়ে দিল।
শাহেদ ঘুরে দাঁড়াল। এজাজের দিকে কঠিন দৃষ্টি নিক্ষেপ করল। টেবিলের সামনে এগিয়ে এসে দৃঢ়তার সাথে হিস হিস করে বলল, ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট দিয়েছি। This deal should be locked. বাকি টাকার ব্যবস্থা করতে কয়েকদিন সময় লাগবে।’ বলেই সে ধীরে ধীরে বের হয়ে গেল ম্যারেজ মিডিয়া অফিস থেকে।
এজাজ আর জামান অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল শাহেদের গমন পথের দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৬)

সকাল ৯টা।
শাহেদ তার পছন্দের ব্লু লিভাইস জিন্স এর সাথে হোয়াইট পোলো টি-শার্ট চাপিয়ে দাঁড়াল আয়নার সামনে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল নিজেকে। একবার মুখে হাত বুলিয়ে দেখল, শেভ করা হয়েছে কি না ঠিকমত। মনে হল কোন সমস্যা নাই। সে সন্তুষ্ট চিত্তে তার পছন্দের পারফিউম বাতাসে স্প্রে করে তার শরীরটা এগিয়ে দিল। স্প্রে করা মিষ্ট তার শরীরে এসে লাগল।
সোমা এলো শাহেদের জন্য এক কাপ চা নিয়ে। শাহেদ দেরিতে নাস্তা করে, তাই সকালের চা’টা সোমা তার রুমেই দিয়ে যায়। দূর থেকে শাহেদের পারফিউম স্প্রে করার দৃশ্য দেখে ফিক করে হেসে ফেলল সোমা। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কি ব্যাপার ভাইয়া, সকাল সকাল হেভি মাঞ্জা মেরে কোথায় যাচ্ছ? দেখে তো মনে হচ্ছে ডেটিং! না কি ইন্টারভিউ?’
শাহেদ আয়নায় নিজেকে আবার দেখে দৃপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘আরে না, ইন্টারভিউ দেবার দিন শেষ। No more interviews.’
‘তাহলে?’
‘অত কথা তো এখন বলতে পারব না। একবার তো বলেছি সময় হলে সবই জানতে পারবি। চা দিতে এসেছিস, চা দিয়ে বিদায় হ।’
‘হাউ রুড! এভাবে কথা বলছ কেন?’
সোমার হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে শাহেদ দ্রুত কয়েকবার চুমুক দিয়ে কাপ ফিরিয়ে দিল। সোমা বিস্মিত হয়ে কাপ হাতে দাঁড়িয়ে রইল। শাহেদ তার হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠে বলল, ‘Oh my God, I’m getting late.’
শাহেদ আয়নায় আরেকবার নিজেকে দেখে সন্তুষ্ট মনে ঘুরে দাঁড়াল। সোমা লক্ষ করল শাহেদ কম করে হলেও তিনবার আয়নায় নিজেকে দেখল। সে মুচকি হাসল।
শাহেদ রুম থেকে বের হয়ে যাওয়ার মুহূর্তে থমকে দাঁড়াল দরজার সামনে। তারপর সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘Soma, I need a big favor. তুই ছাড়া কাজটা আর কেউ করতে পারবে না।’
সোমা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘I know. কাজটা কি সেটা আমি জানি ভাইয়া, তোমাকে আর বলতে হবে না।’
‘You’re the best sister ever!’
‘থাক আর বাটার দিতে হবে না। যেখানে যাচ্ছিলে যাও।’
শাহেদ খুশি মনে বের হয়ে গেল।

ঢাকা শহরের ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে শাহেদের রিক্সা একটি আবাসিক এলাকায় প্রবেশ করল। তার হাতে ঠিকানা লেখা একটি কাগজ। শাহেদ রিকশাওয়ালাকে বলল একটু ধীরে চালাতে। রিক্সা চলছে ধীর গতিতে। সে নাম্বার মিলিয়ে দেখতে থাকল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সুন্দর একটি বাড়ির সামনে এসে রিক্সা থামাতে বলল শাহেদ।
দূর থেকে শাহেদকে দেখল নাতাশা। সে হাত নাড়ল।
শাহেদ অবাক হয়ে দেখল নাতাশাকে। সুন্দর একটি সুতি সালোয়ার-কামিজ পড়েছে সে। যত্ন করে চোখে কাজল দিয়েছে। ঠোঁটে গাঢ় লিপস্টিক। চুলে সোনালি রঙের আভা। কোন বিদেশিনীকে দেশি পোশাক এবং সাজে যেমন অন্যরকম সুন্দর দেখায়—নাতাশাকে ঠিক তেমনি দেখাচ্ছে।
রাজ্য জয়ের হাসি মুখে নিয়ে রিক্সা থেকে নেমে দাঁড়াল শাহেদ।
নাতাশা দ্রুত এগিয়ে গেল। সে হাত নেড়ে বলল, ‘আরে- আরে নামছ কেন? নামতে হবে না, এই রিক্সা নিয়েই চল।’
নাতাশা রিক্সায় উঠে বসল। শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘উঠে এস, কুইক।’
শাহেদ অল্প সময়ের জন্য কিছু বুঝে উঠতে পারল না। নাতাশার মধ্যে কেমন যেন অস্থিরতা লক্ষ করল সে। একবার চারিদিকে তাকাল শাহেদ।
নাতাশা চোখের ইশারায় তাড়া দিল। শাহেদ একটু ইতস্তত করে উঠে বসল নাতাশার পাশে।
রিক্সা চলতে শুরু করল। এবার রিকশাওয়ালাকে তাড়া দিয়ে নাতাশা বলল, ‘এই মামা, একটু তাড়াতাড়ি চালান।’
রিকশাওয়ালা খুব মজা পেল। সে পঙ্খিরাজের মত শো শো করে রিক্সা চালিয়ে আবাসিক এলাকার গলির রাস্তা ছেড়ে প্রধান সড়কে গিয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ যাওয়ার পরেই শাহেদ উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, ‘কী ব্যাপার নাতাশা? Anything wrong?’
নাতাশা সহজ ভঙ্গিতে বলল, ‘Nothing wrong. Why?’
‘না মানে, এই যে কেমন যেন পালিয়ে আসার মত করে চলে এলে।’
‘আর বল না। পেপারে অ্যাড দেবার পর থেকে বাসায় থাকাই মুস্কিল হয়েছে। গেটের বাইরে যে একটু দাঁড়াব তারও উপায় নেই। এমন ভাবে সবাই তাকায় যে মনে হয় আমি যেন ভিন দেশী কেউ—না পালিয়ে উপায় কি বল?’
‘তুমিতো ভিন দেশীই।’
‘এখন তো দেখছি অ্যাড দেয়াটাই ভুল হয়েছিল।’
‘ভাগ্যিস দিয়েছিলে, তা না হলে তো তোমার সাথে আমার দেখাই হত না।’
‘দেখা না হলে কী এমন ক্ষতি হত?’
‘তোমার হয়ত হত না, তবে আমার হত। অনেক বড় একটা ক্ষতি হয়ে যেত।’
ঘুরে তাকিয়ে বলল নাতাশা, ‘তাই? কী রকম? শুনি একটু।’
শাহেদ নিশ্চুপ। সহসাই কিছু বলতে পারল না সে। সে সময় নিল।
নাতাশা তাকিয়ে থাকল।
শাহেদ গভীর কণ্ঠে বলল, ‘I think I’m in love with you, Natasha!’
‘Love in first sight?’ বলেই নাতাশা খিলখিল করে হাসল।
‘That’s right. Love in first sight!’ শাহেদও মৃদু হাসল।
‘Man, you will be in big trouble! তুমিতো বিপদে পড়বে, শাহেদ!’
‘কেন বলছ এ কথা?’
‘পরিচয় হতে না হতেই ধুম করে কারো প্রেমে পড়া কোন কাজের কথা না।’
‘কিন্তু প্রেমে তো মানুষ ধুম করেই পড়ে। ভেবে চিন্তে পরিকল্পনা করে কি প্রেম হয়?’
নাতাশা আর কিছু বলল না। আলত করে একটি হাত বাড়িয়ে দিল শাহেদের দিকে।
রিক্সা ছুটে চলল পঙ্খিরাজের গতিতে।

দুপুর ছুঁইছুঁই করছে।
রাকিবউদ্দিন সাহেব পত্রিকা নিয়ে বসেছেন বাসার সামনের বারান্দায়। তার হাতে দৈনিক পত্রিকা। তিনি প্রথম পাতা থেকে শেষ পাতা উল্টেপাল্টে দেখছেন। খবরের কাগজ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস, বিশেষ করে উপ-সম্পাদকীয়গুলো মনোযোগ দিয়ে পড়েন তিনি। তাছাড়া ছুটির দিনে এই সময়ে পত্রিকা নিয়ে সময় কাঁটাতে তার ভাল লাগে। একধরণের অলসতা ভর করে। এই অলস সময়টুকু তিনি উপভোগ করেন। এসময়টা তার একান্ত নিজের। পত্রিকা পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি সামনে তাকান। সামনের রাস্তায় রিক্সার টুং-টাং আওয়াজ, ফেরিওয়ালাদের আওয়াজ—মাছ, মুরগি, সবজি বিক্রেতাদের ডাক শুনতেও তার ভাল লাগে।
রাকিবউদ্দিন সাহেব মাঝে মাঝেই ভাবেন, ঢাকার অলিতে-গলিতে ফেরিওয়ালার ডাক আর রাস্তার আওয়াজ একেবারেই অন্যরকম। পৃথিবীর অন্য কোন শহরে আছে কি না কে জানে? যদিও এখন আগের মত এদের হাঁকডাক আর শোনা যায় না। সময়ের সাথে বদলে যাচ্ছে ফেরিওয়ালার ডাক, জীবন জীবিকাও।
সোমা তার বাবার জন্য এক কাপ চা নিয়ে এসে দাঁড়াল বারান্দায়।
‘বাবা তোমার চা।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব পত্রিকা নামিয়ে দেখলেন সোমাকে। অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, ‘সকালেই না একবার চা দিলি? আবার চা কেন?’
‘বন্ধের দিনে চা এক কাপ বেশি খেলে কিছু হবে না। নাও।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব চশমা খুলে সোমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘উদ্দেশ্যটা কি? কিছু বলতে চাস মনে হয়। শাহেদের ব্যাপারে সুপারিশ করতে এসেছিস?’
সোমা মিষ্টি করে হেসে বলল, ‘You are a very smart dad! And sweet!’
রাকিবউদ্দিন সাহেব হেসে ফেললেন। ঈষৎ উদ্বেগ ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘কিন্তু ও তো কিছু বলছে না। কী করছে কিছু তো বুঝতে পারছি না। তুই কি কিছু জানিস?’
‘ভেবো না, আমি আজ রাতেই সব কিছু জেনে নেব। তুমি শুধু ভাইয়ার টাকার ব্যবস্থাটা করে দাও।’ সোমা তার বাবাকে আশ্বস্ত করল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাকিবউদ্দিন সাহেব বললেন, ‘হুম। আচ্ছা যা আমি দেখছি কি করা যায়।’
সোমা গেল না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল।
রাকিব সাহেব বললেন, ‘আর কিছু বলবি?’
‘হ্যাঁ।’
‘বল।’
‘ভাইয়ার সঙ্গে তুমি সবসময় এমন ব্যবহার কর, এটা কিন্তু ঠিক না। তুমি কি জান, ভাইয়া এটা নিয়ে কত মন খারাপ করে থাকে? বেকার ছেলেরা একটু সেনসিটিভ বেশি হয়। তাছাড়া এমন তো নয় যে ও কোন কাজের চেষ্টা করছে না।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব চুপ করে রইলেন।
‘ভাইয়ার সঙ্গে তুমি আর এরকম করবে না।’
‘আচ্ছা, যা আর করব না। কিন্তু ছেলেটা যে কেন এমন হল। এত সহজ সরল হলে কি আর আজকাল চলে।’
‘আমার ধারণা, এই স্বভাবটা ও তোমার কাছ থেকেই পেয়েছে।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন, ‘আমার কাছ থেকে?’
‘হ্যাঁ। পৃথিবীর সব মানুষকে বিশ্বাস করা আর বিশ্বাস করে ঠকা, এ ব্যাপারে তোমাদের দুজনের অদ্ভুত মিল।’
‘মানুষ হচ্ছে, আল্লাহতালার সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ জীব হচ্ছে এই মানুষ। মানুষকে তো বিশ্বাস করতেই হবে?’
‘যাই হোক, এ নিয়ে আমি তোমার সাথে তর্ক করতে চাইনা।’
‘আচ্ছা তোকে আর তর্ক করতে হবে না। দেখত তোর মা কোথায়?’
‘কোথায় আবার রান্নাঘরে! ওটাই তো তার স্থায়ী ঠিকানা। কিছু করার থাক বা না থাক দিনটা কাটাতে হবে রান্নাঘরেই।
সোমার কথার ধরণে রাকিবউদ্দিন সাহেব ভীষণ মজা পেলেন। তিনি উচ্চ স্বরে হেসে ফেললেন।
সোমা বারান্দা থেকে বের হয়ে এলো। যেতে যেতে গানের সুর ভাজল, ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই। মানুষ নামের মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই। এই মানুষের ভিড়ে আমার সেই মানুষ নাই।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব মুগ্ধ নয়নে ঘুরে তাকালেন সোমার চলে যাওয়ার দিকে। মেয়েটার গানের গলা এত ভাল, তিনি আগে কখনো লক্ষ করেন নি ব্যাপারটা। তিনি চট করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন, শাহেদের ভাল কিছু হয়ে গেলে, সেদিন রাতেই একটা গানের আড্ডার আয়োজন করবেন।
সোমা রান্নাঘরে এলো। জাহানারা বেগম দুপুরের রান্না শেষ করে সব কিছু ধুয়ে মুছে রাখছিলেন। সোমা ভ্রু কুঁচকে বলল, ‘মা, সারাদিন রান্নাঘরে এত কী কর বলতো? কাজ না থাকলেও দেখি তুমি এখানেই বসে থাক।’
জাহানারা বিপন্ন কণ্ঠে বললেন, ‘যাব টা কোথায়? আমার আর কোথাও যাবার জায়গা আছে?’
‘এত বড় একটা বাড়ীতে তোমার আর কোথাও যাবার জায়গা নেই?’ সোমা এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল মায়ের পাশে। মায়ের শাড়ির আচল ধরে মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার রিটায়ার্ড হাজব্যান্ড সারাদিন একা একা বসে থাকে। তুমি তার সঙ্গে একটু সময় কাটাতে পার না?’
জাহানারা কঠিন চোখে তাকালেন সোমার দিকে। অত্যন্ত বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘বেয়াদবের মত কথা বলিস না তো?’
‘আচ্ছা, এই ক্লিনিং- এর কাজটা তো ফুলির মা-ই করতে পারে।’ সোমা বলল, ‘ওকে বসিয়ে বসিয়ে বেতন দিচ্ছ কেন?’
‘কী বলতে এসেছিস, বলে বিদায় হ। বেশি ঘ্যানর ঘ্যানর করিস না।’
‘ভাইয়ার ব্যাপারে একটা জরুরী কথা আছে। আই হ্যাভ অ্যান একসেলেন্ট আইডিয়া। তোমাদের দু’জনের সঙ্গেই ডিসকাস করতে চাই। একটু আসবে?’
বিস্মিত কণ্ঠে বললেন জাহানারা, ‘তোর মাথায় যে কত আইডিয়া আছে? ‘আচ্ছা যা আমি আসছি।’

শাহেদ আর নাতাশা অনেকক্ষণ ঘুরে বেড়াল রিক্সায়। টং দোকানে দাঁড়িয়ে চা-ও খেল।
রিক্সায় ঘুরতে ঘুরতে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুজন দুজনের কাছাকাছি চলে এলো। প্রথম দিকে শাহেদের জড়তা থাকলেও, সেটা বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় নি। নাতাশাই তার হাতটা বাড়িয়ে দিল প্রথমে। শাহেদ আলত করে ধরল তার হাত—একটা অদ্ভুত ভালোলাগা যেন তাকে ছুঁয়ে গেল। নাতাশা কথা বলে গেল আনমনে। শাহেদ মুগ্ধ হয়ে নাতাশার আনমনে বলা কথাগুলি শুনল। কথা যেন শেষই হয় না।
রিকশাওয়ালা মাঝে মাঝে ওদের দিকে ঘুরে তাকায়। হাসে। এমন দৃশ্য নতুন নয় তার জন্যে। সে মনের আনন্দে প্যাডেল ঘুরাতে থাকে।
দুপুর পার করে শাহেদ আর নাতাশা এসে ঢুকল একটা রেস্টুরেন্টে। কর্নারের একটা টেবিল বেঁছে নিয়ে বসল তারা। ওয়েটার এসে কোল্ড ড্রিংকস আর পানি দিয়ে গেল টেবিলে। মেনু দেখতে দেখতে শাহেদ হঠাৎ করেই বলল, ‘এখানে রিকশাওয়ালাদের মামা বলে ডাকে, সেটা তুমি জানলে কী করে?’
নাতাশার গা বেয়ে শীতল স্রোত বয়ে গেল। সে কোল্ড ড্রিংকসে চুমুক দিতে যাচ্ছিল। সে মুখ থেকে স্ট্র সরিয়ে শীতল দৃষ্টিতে তাকাল শাহেদের দিকে। প্রাণপণে মুখে হাসি ধরে রাখার চেষ্টা করল নাতাশা। কিন্তু তার সহাস্য মুখটি হঠাৎ করেই মলিন হয়ে গেল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৫)

ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে বসে আছে অনেকক্ষণ থেকে শাহেদ। কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না জামান কিংবা এজাজের সঙ্গে। দুজনেই ব্যস্ত—টাকা গণনা আর অ্যাপ্লিকেশন দেখা নিয়ে। আরো বেশ কয়েকজন নতুন প্রার্থীকেও দেখা যাচ্ছে অপেক্ষা করছে। শাহেদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু তার মাথায় আসছে না—আরো নতুন প্রার্থীর কাছে থেকে টাকা কেন নেয়া হচ্ছে। নাতাশার কথায় তো মনে হল, শাহেদকে সে পছন্দ করেছে! তাহলে? শাহেদ চিন্তিত মুখে বসে রইল।
জামানের সামনে বসা যুবক সরে যেতেই শাহেদ উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গিয়ে জামানকে লক্ষ করে বলল, ‘আপনারা কি আরও ক্যান্ডিডেট দেখবেন নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম—’
শাহেদকে কথা শেষ করতে না দিয়ে এজাজ বলল, ‘জাস্ট ব্যাকআপ। ব্যাকআপ হিসেবে আরও কিছু ক্যান্ডিডেট লিস্ট কইরা রাখতেছি। বলা তো যায় না, তাই না?’
শাহেদ বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘বুঝলাম না। ব্যাকআপ মানে কী?’
‘বুঝায়ে বলতেছি। ব্যাকআপ মানে—এই ধরেন আপনে যদি কোন কারণে টাকার জোগাড় করতে না পারেন, অথবা মাইন্ড চেঞ্জ কইরা ফালান, তখন আমরা কী করব?’
শাহেদ দ্রুত বলল, ‘না- না মাইন্ড চেঞ্জ করব কেন? মাইন্ড চেঞ্জ করার প্রশ্নই আসে না। তাহলে তো আর আসতামই না?’
‘আপনের তো আরও তিনদিন আগে আসার কথা ছিল। কি, ছিল না বলেন?’
শাহেদ ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘তাইলে আপনেই বলেন, আমাদের দোষটা কোথায়?’
শাহেদ ইতস্তত করে বলল, ‘ইয়ে মানে, এতগুলো টাকা জোগাড় করতে একটু সময় লেগে গেল। বুঝতেই তো পারছেন।’
জামান এতক্ষণ এজাজ আর শাহেদের কথা শুনছিল। এবার সে মাথা সামনে এনে বলল, ‘শুনেন শাহেদ সাহেব, কিছু মনে করবেন না। এর আগে দু’বার আমাদের এধরণের সমস্যা হয়েছিল।’
‘কী রকম?’
‘বসুন বলছি।’
শাহেদ বসল। জামান আবার সামনে ঝুঁকে বলল, ‘আমাদের দু’জন ক্লায়েন্ট- একজন আমেরিকান সিটিজেন, একজন ব্রিটিশ—তারা পাত্র পছন্দ করল। পাত্র মহা আনন্দে চলে গেল, কিন্তু আর ফিরে আসল না।’
শাহেদ অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলল, ‘বলেন কী? ফিরে আসবে না কেন? এমন সুযোগ কেউ হাত ছাড়া করে?’
জামান তার বিখ্যাত হাসি মুখে এনে বলল, ‘জি! একবার ভেবে দেখেন!’
এবার এজাজ শাহেদের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, সাধেই কি আর ব্যাকআপের চিন্তা করতেছি ভাইজান? অভিজ্ঞতা, বুঝলেন অভিজ্ঞতা। আমরা যা করি সব কিছুর পিছনেই একটা ভ্যালিড রিজন থাকে। ভ্যালিড রিজন ছাড়া আমরা কোন কাজ করিনা।’ বলেই সে জামানের দিকে তাকাল।
জামান তাকে সমর্থন করে বলল, ‘তবে এর একটা অলটারনেটিভ অবশ্য আছে। আপনি যদি জেনুইনলি সিরিয়াস হন, তাহলে আপনাকে বলতে পারি।’
শাহেদ রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘আপনাদের কাছে কি আমাকে যথেষ্ট সিরিয়াস মনে হচ্ছে না?’
‘জি হচ্ছে, কেন হবে না?’
‘বলুন আমাকে কী করতে হবে?’
‘সিকিউরিটি ডিপোজিট দিয়ে আপনি এই ডিলটা ক্লোজ করে ফেলতে পারেন। সেক্ষেত্রে নাতাশা ম্যাডামও আর অন্য কোন পাত্র দেখবেন না, পছন্দ কিংবা বিয়ে করা তো দুরের কথা।’
শাহেদের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। সে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট? কত?’
‘এ ধরণের সিচুয়েশনে আমরা লাখ খানেক নিয়ে থাকি। তবে আপনি পঞ্চাশ হাজার দিলেই চলবে। আফটার অল ম্যাডামের পছন্দের লোক আপনি!’
শাহেদের মাথায় কিছু ঢুকছে না। এসব কথা তাকে আগে কেন বলা হয় নি? এখন আবার এতগুলো টাকা সে জোগাড় করবে কীভাবে? শাহেদ চুপ করে রইল।
এবার এজাজ ব্যাখ্যা করে বলল, ‘আপনে যে ক্যানাডা যাবেন, মত বদলাবেন না এবং নিশি ম্যাডাম সরি নাতাশা ম্যাডামও অন্য কোন পাত্র দেখবেন না—এইটা হইল তার নিশ্চয়তা।’
শাহেদ শূন্য দৃষ্টিতে একবার এজাজ আর একবার জামানের দিকে তাকাল। সে ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।

শাহেদ ডাইনিং টেবিলে মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। আরো কিছু টাকা লাগবে, একথাটা বলার সাহস তার নেই। কিন্তু টাকাটা ছাড়া এত বড় একটা সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যাবে সেটাও সে মেনে নিতে পারবে না। শাহেদ কয়েকবার তার বাবার দিকে তাকাল। আবার টাকা চাইলে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা ভেবেই শাহেদের মুখ আরো অন্ধকার হয়ে গেল।
রাকিবউদ্দিন সাহেব হঠাৎ করেই তাকালেন শাহেদের দিকে। শাহেদ চোখ নামিয়ে নিল সাথে সাথেই।
‘শাহেদ, কিছু বলবে?’ রাকিব সাহেব খাওয়া থামিয়ে বললেন।
‘জি? জি না, কিছু না।’
সোমা শাহেদের অবস্থা দেখে বলল, ‘ভাইয়া, ভয় পাচ্ছ কেন? বলে ফেল? তোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে, তুমি কিছু বলতে চাও। You have something in mind.’
শাহেদ চুপ করে রইল।
‘তা তোমার লাইফ টাইম অপরচুনিটি প্রোজেক্টের কী সিচুয়েশন? তোমার মাকে বলেছ, তোমার না কি আরও কিছু টাকা লাগবে?’
শাহেদ অবাক চোখে তাকাল তার মায়ের দিকে। ম্যারেজ মিডিয়া অফিস থেকে ফিরে সে তার মাকে বলেছিল বাবাকে বলতে, তার আরো কিছু টাকা লাগবে। জাহানারা বেগম সরাসরি বলে দিয়েছে, আমি পারব না। তোমার সমস্যার কথা তুমিই বল। এখন দেখা যাচ্ছে তার মা ঠিকই বলেছে।
শাহেদ বলল, ‘জি।’
‘টাকাটা দিয়ে তুমি কী করছ ডিটেইল না জেনে আর তো কোন টাকা দেয়া যাবে না।’ রাকিবউদ্দিন সাহেব পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন।
শাহেদ খানিকটা ইতস্তত কণ্ঠে বলল, ‘বিষয়টা এই মুহূর্তে ডিসক্লোজ করতে চাচ্ছি না, বাবা। কয়েকটা দিন পড়ে বলি?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব বিরক্ত হলেন। তিনি কঠিন স্বরে বললেন, ‘কী এমন সিক্রেট যেটা ফ্যামিলিতে শেয়ার করতে পারছ না? অথচ কয়েকদিন পর পর এসে টাকা চাচ্ছ? তোমার কি ধারণা, আমি টাকার গাছ লাগিয়েছি?’
শাহেদ অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল তার মায়ের দিকে। জাহানারা ছেলের অসহায়ত্ব অনুধাবন করে তার স্বামীকে বললেন, ‘আহা, কয়েকটা দিন না হয় অপেক্ষা কর। এতো অস্থির হচ্ছ কেন?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব আর কোন কথা বললেন না।
সবাই চুপ করে আছে। সবার মনোযোগ খাবার প্লেটে। শাহেদ তার বাবার দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘টাকাটা কি পাচ্ছি?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব শীতল গলায় বললেন, ‘তুমি ভাল করেই জান, আমার কাছে এমন কোন টাকা নেই যে চাওয়া মাত্রই পাওয়া যাবে। আমাকে ভেবে দেখতে হবে।’
শাহেদ খাওয়া শেষ না করেই উঠে পড়ল। জাহানারা দ্রুত বললেন, ‘কী হল, খাওয়াটা শেষ করে যা।’
শাহেদের মুখ থমথমে। সে কিছু না বলে চলে গেল তার রুমে।
জাহানারা তাকালেন তার স্বামীর দিকে। রাকিবউদ্দিন স্ত্রীর দৃষ্টি উপেক্ষা করে সোমাকে বললেন, ‘ডালটা এদিকে দে তো মা।’

রাত ১১টা।
শাহেদের মন খারাপ। ভীষণ রকমের মন খারাপ করে সে শুয়ে আছে তার বিছানায়। তাকিয়ে আছে সিলিং এর দিকে। চোখের দৃষ্টিতে শূন্যতা। আরো পঞ্চাশ হাজার টাকা! কিভাবে এত টাকা জোগাড় করবে সে? তার বাবা যদি তাকে সে টাকাটা না দেয় তাহলে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে এখানেই। সে এপাশ ওপাশ করছে, কিছুই ভাল লাগছে না।
শাহেদের ফোন বেজে উঠল। ফোন হাতে নিয়ে দেখল অপরিচিত নাম্বার। সে ফোন রেখে দিল। ফোনটা আবার বাজল। সে আবার কাটল। তৃতীয় বারে সে ফোনটা ধরে বিরক্তি কণ্ঠে বলল, ‘হ্যালো?’
‘বলুন তো আমি কে? বলতে পারলে আপনার জন্যে একটা সারপ্রাইজ গিফট।’
মুহূর্তেই শাহেদের চেহারার রঙ বদলে গেল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি সেই- যার কণ্ঠ শোনার জন্যে প্রতিটি রাত আমি অপেক্ষা করি। আপনি সেই- যাকে আরেকবার দেখার জন্যে আমার চোখ দুটি-’
‘ব্যাস ব্যাস, আর কাব্য করতে হবে না। আবার আপনি আপনি কেন?’
‘তুমিইতো শুরু করলে।’ একটু থেমে শাহেদ আবার বলল, ‘তুমি ফোন নাম্বার চেঞ্জ করেছ না কি? নাম্বারটা চিনতে পারছিলাম না।’
‘আরে না- এটা প্রাইভেট নাম্বার। এটা দিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলি না। সিক্রেট নাম্বার বলতে পার।’
শাহেদ কিছুটা সময় নিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল, ‘তোমাকে না খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। এভাবে শুধু ফোনে কথা বলে মন ভরে না।’
‘তাই নাকি? তা কতখানি দেখতে ইচ্ছে করছে শুনি?’ দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল নাতাশা।
‘অনেক। অনেক খানি। তোমাদের নায়াগ্রা ফলসে যত পানি গড়িয়ে পড়ে, তার চেয়েও বেশি।’
‘বাব্বাহ, তাহলে তো আর দেরী করার উপায় নেই। উমম, একটা কাজ অবশ্য করা যায়। কালকে আমি মোটামুটি ফ্রি। তোমার সময় হবে?’
‘হবে না মানে, কী বল? মিলিয়ন টাইমস হবে।’ শাহেদের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
‘তাহলে, কাল সকাল দশটায়। না না এগারোটায়—ঠিক এগারোটায় তুমি আমাকে পিক করবে, ওকে? এড্রেস দিচ্ছি লিখে নাও।’
‘কিন্তু আমার যে গাড়ি নেই।’
‘গাড়ি নেই তো কি হয়েছে? আমরা রিক্সায় ঘুরব।’
‘রিক্সায়?’ শাহেদ বিস্মিত কণ্ঠে বলল।
‘হ্যাঁ, রিক্সায়।’
‘তোমার ভয় লাগবে না?’
‘ভয় লাগবে কেন? আমি বুঝি রিক্সায় কোনদিন চড়ি নি? তোমাকে নিয়ে সারাদিন ঘুরব, লাঞ্চ করব, কথা বলব।’
শাহেদ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘Wow, that’s sounds like a date.’
‘It’s a date! তাহলে এড্রেসটা লিখ। কাগজ কলম আছে?’
‘Just a minute…’
শাহেদ বিছানা থেকে নেমে পাশের টেবিল থেকে নোট খাতা আর কলম নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ বল।’
ঠিকানা লেখা হলে নাতাশা ফোন কেটে দিল। যদিও শাহেদের আরো কিছুক্ষণ কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল। সকালেই তো দেখা হবে, এই সান্ত্বনা নিয়ে সে ঘুমাতে গেল। অনেকক্ষণ শুয়ে থেকেও ঘুমের কোন খবর হল না। এপাশ ওপাশ ফিরছে আর ঘুম নিয়ে ভাবছে কেন ঘুম আসছে না!
কিন্তু শাহেদের মনে এরকম ব্যাকুলতা কেন! কেন ওর এমন অস্থির লাগছে!

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৪)

ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে জামান আর এজাজের সামনে বসে আছে আরো একজন নতুন প্রার্থী। জামান অ্যাপ্লিকেশান ফর্মের ওপর চোখ বুলাচ্ছেন। দেখে মনে হচ্ছে খুব মনোযোগ দিয়ে দেখছে সব কিছু ঠিক ঠাক আছে কি না। এজাজ ব্যস্ত ভঙ্গিতে টাকা গুনছে।
আরেকজন নতুন প্রার্থীর কানাডা দেশটি সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ। সে এজাজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কানাডা দেশটা কেমন ভাই?’
এজাজ টাকা গণনা বন্ধ করে বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকাল তার দিকে। সে রুক্ষ কণ্ঠে বলল, ‘কানাডা দেশটা কেমন সেইটা আমি কেমনে বলব? আমি তো আর কানাডার সিটিজেন না। যিনি সিটিজেন তার সাথে যখন কথা হবে, তাকেই জিজ্ঞেস করবেন।’
প্রার্থী চুপ করে গেল। এজাজ পুনরায় ব্যস্ত হয়ে পড়ল টাকা গণনায়। কিছুক্ষণের নীরবতা। নতুন প্রার্থী ইতস্তত করে আবার বলল, ‘আপনার কি মনে হয়, একবার কানাডায় ঢুকতে পারলে…… ঐখান থিকে আমেরিকায় ঢুকাও সহজ হবে, কি বলেন?’
এজাজ টাকা গণনা বন্ধ করে তাকাল প্রার্থীর দিকে। ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘আগে ক্যানাডায় ঢুকেন, তারপর আমেরিকায় ঢুকার চিন্তা কইরেন। কাঁঠালেরই খবর নাই, আপনে মিয়া তেলের জন্যে ব্যস্ত হইয়া পড়ছেন। আগে ইন্টারভিউ দেন, সিলেকশন পান, তারপর ক্যানাডা না আমেরিকা সে চিন্তা কইরেন।’
এবার জামান অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আপনি একটু ঐখানে গিয়া বসেন। ইন্টারভিউর সময় হলে আপনাকে ডাকা হবে।’
নতুন প্রার্থী বিব্রত ভঙ্গিতে উঠে গিয়ে বসল অন্যান্য অপেক্ষারত প্রার্থীদের সারিতে।

জাহানারা আহমেদ রান্নাঘরে চা বানাচ্ছিলেন।
ইউনিভার্সিটিতে যাওয়ার আগে হন্তদন্ত হয়ে রান্না ঘরে ঢুকল সোমা। সে দ্রুত একগ্লাস পানি খেয়ে তার মায়ের দিকে তাকাল। জাহানারা বললেন, ‘সোমা, তোর বাবাকে এই চা- টা দিয়ে আয় তো।’
সোমা চোখ ঘুরিয়ে বলল, ‘আমি পারব না, মা। আমার ক্লাসের দেরী হয়ে যাচ্ছে। তুমি যাও না?’ সোমা এগিয়ে এসে মায়ের পাশে দাঁড়াল। ‘এক কাজ কর মা। তুমি দু’কাপ চা নিয়ে যাও। বাবাকে এক কাপ দাও, তুমিও এক কাপ তার সাথে বসে খাও। দেখবে তোমারও ভাল লাগবে, বাবাও খুশি হবে।’
জাহানারা কপট রাগ দেখিয়ে বলল, ‘আমার এখন এত কিছুর সময় নেই। রান্না ফেলে আমি এখন তোর বাবার সাথে বসে চা খাই!’
‘আচ্ছা না খেলে নাই। আমি গেলাম।’
‘তুই কিছু খেয়ে গেলি না।’
‘না মা, খাওয়ার সময় নেই।’
‘সেকিরে, তুইও খেলি না, শাহেদও নাস্তা না করেই চলে গেল!’
সোমা কিছু না বলে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। সোমা বেরিয়ে যেতেই জাহানারা নিজের জন্য আরেক কাপ চা ঢেলে, দু’কাপ চা নিয়ে বের হয়ে হয়ে গেল।
শাহেদ যখন ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে পৌঁছল তখন দুপুর গড়িয়ে গেছে।

জামান এবং এজাজ বসে আছে তাঁদের অফিসে। অফিস মোটামুটি ফাঁকা। নতুন কোন পাত্রকে দেখা যাচ্ছে না। শাহেদ ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই এজাজ বলল, ‘কি ভাইজান খালি হাতে আসলেন, মিষ্টি কোথায়?’
শাহেদ বিব্রত ভঙ্গিতে হাসল।
এজাজ আবার বলল, ‘ম্যাডাম আপনারে পছন্দ করছে। উনি অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আপনাকে বিয়ে করে কানাডা নিয়ে যাবেন।’
শাহেদ অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল এজাজ এবং জামানের দিকে। দুজনেই হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে শাহেদের দিকে। শাহেদ ইতস্তত করে বলল, ‘জি, সত্যি বলছেন?’
এজাজ বলল, ‘মিথ্যা বলব ক্যান, মিথ্যা বইলা আমাদের কী লাভ?’
জামান সায় দিয়ে বলল, ‘নাতাশা ম্যাডাম অনেক পাত্র দেখেছেন, কিন্তু আপনাকেই উনার বেশি পছন্দ হয়েছে। শেষ পর্যন্ত লটারিটা আপনিই জিতেছেন।’
এজাজ বলল, ‘আপনার তো ভাই বিরাট ভাগ্য!’
শাহেদের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক দেখা দিল। সে আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘এখন আমাকে কি করতে হবে?’
এজাজ বলল, ‘কি করতে হবে সেইটা বলার জন্যেই তো আপনাকে আসতে বলছি।’
জামান জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার পাসপোর্ট করা আছে?’
‘না।’
জামান এজাজের দিকে তাকাল। তারপর শাহেদের দিকে ঘুরে বলল, ‘অসুবিধা নাই, পাসপোর্ট আমরা তৈরি করে দেব। আমাদের লোক আছে।’ বলেই তাকাল এজাজের দিকে,
এজাজ সায় দিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ আমাদের লোক আছে।’
একটু থেমে জামান বলল, ‘শুনেন শাহেদ সাহেব, আপনাকে তো আগেই বলেছিলাম, কিছু খরচ আছে।
কানাডায় যাবার জন্যে মেডিকেল টেস্ট এবং কনসালটেন্সি ফি জমা দিতে হবে।’
‘কত?’
‘চল্লিশ হাজার। তবে হাজার পঞ্চাশেক সাথে রাইখেন—চা পানি খাওয়ানোর ব্যাপার আছে।’
‘কবে দিতে হবে?’
‘যত তাড়াতাড়ি সম্ভব।’ বলেই জামান তাকাল এজাজের দিকে।
এজাজ সাথে সাথে বলল, ‘পারলে আজকেই নিয়ে আসেন। ম্যাডামের ছুটি প্রায় শেষ, উনাকে ফেরত যেতে হবে না? উনাকে তো আর এইখানে বসে থাকলে চলবে না, তাইনা?’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শাহেদ বলল, ‘আমি কি উনার সাথে একটু দেখা করতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন। আরে আপনার ওয়াইফ আর আপনে. ইয়ে মানে দুইদিন পরে যে আপনের ওয়াইফ হবে তার সাথে দেখা করতে পারবেন না, কি বলেন?’
শাহেদ এজাজের মুখের দিকে তাকাল প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে। এজাজ দ্রুত তাকাল জামানের দিকে।
‘আসলে একটানা অনেকদিন বিভিন্ন ধরনের মানুষজনের সঙ্গে কথা বার্তা বলতে হয়েছে। উনি নিজেও একটু টায়ার্ড, তাই আজ একটু আর্লি বাসায় চলে গেছেন।’ জামান ব্যাখ্যা করল।
এজাজ বলল, ‘আপনে আসার এই কিছুক্ষণ আগেই উনি চলা গেলেন। আপনে তো দেরী করে ফেলছেন। ইশ, আর একটু আগে আসলেই কিন্তু দেখাটা হয়ে যাইত।’
শাহেদ বলল, ‘উনার মোবাইল নাম্বার কিংবা ল্যান্ড ফোন নাম্বারটা যদি…’
জামান বলল শাহেদকে থামিয়ে দিয়ে, ‘কিছু মনে করবেন না, ম্যাডামের ফোন নাম্বার কাউকে দেবার পারমিশন আমাদের নাই। তবে আপনার চিন্তার কারণ নাই, কেননা-’
এজাজ আশ্বস্ত করে বলল, ‘উনি নিজেই আপনাকে ফোন করবেন। সে আপনার ফোন নাম্বার নিয়া গেছেন। আমি নিজেই লেইখা দিছি।’
শাহেদ সন্তুষ্টচিত্তে বলল, ‘ও আচ্ছা, ঠিক আছে তাহলে আমি আসি।’
‘আচ্ছা আচ্ছা ঠিক আছে।’
শাহেদ ইতস্তত করে উঠে দাঁড়াল।

শাহেদদের বাসা। রাতে খাবার টেবিলে বসে সবাই খাচ্ছে। চুপচাপ।
শাহেদের মুখ অন্ধকার। সে অন্যমনস্কভাবে প্লেটে হাত নাড়ছে কিন্তু খাচ্ছে না কিছুই। জাহানারা লক্ষ করলেন। তিনি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বললেন, ‘কিরে শরীর খারাপ করেছে না কি? খাচ্ছিস না যে?’
সবাই তাকাল শাহেদের দিকে। শাহেদ দ্রুত মুখে খাবার তুলে মৃদু কণ্ঠে বলল, ‘কই খাচ্ছি তো।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন শাহেদের দিকে। মুখের খাবার শেষ করে বললেন, ‘তারপর ইয়াংম্যান, এনি নিউজ? অ্যাটলিস্ট শো মি সাম স্পার্ক!’
শাহেদ অনেকক্ষণ থেকেই ভাবছিল টাকার প্রসঙ্গটা তুলবে কিন্তু কিভাবে বলবে ভেবে পাচ্ছিল না। সে দ্রুত বলে ফেলল, ‘বাবা, আমার কিছু টাকা দরকার। দু’একদিনের মধ্যেই। খুবই জরুরী।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপ্র তাকালেন তার স্ত্রীর দিকে। তিনি উৎসুক দৃষ্টিতে বলল, ‘কত টাকা শুনি?’
‘পঞ্চাশ হাজার।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব খাওয়া বন্ধ করলেন। তাকালেন সোমা আর জাহানার দিকে। তারপর শেহেদের দিকে ঘুরে বললেন, ‘তা এত টাকার প্রয়োজন পরল কেন জানতে পারি?’
শাহেদ ইতস্তত করে বলল, ‘সেটা এখনই বলতে চাচ্ছি না।’
জাহানারা ধমকের সুরে বললেন, ‘বলতে চাচ্ছি না মানে কী? এতোগুলো টাকা দিয়ে তুই কি করবি?’
শাহেদ নিরুত্তর। সে খাওয়ার দিকে মনোযোগ দিল।
রাকিবউদ্দিন সাহেব বললেন, ‘এখন বলতে না চাইলে অসুবিধা নেই। তবে কারণ না জেনে তো টাকার ব্যবস্থা করা যাবে না। আমাকে তো বুঝতে হবে।’
শাহেদ বাবার দিকে না তাকিয়েই বলল, ‘একটা কাজের ধান্ধা করছি।’
সোমা এতক্ষণ কোন কথা বলে নি। সে মুচকি হেসে বলল, ‘তুমি করছ কাজের ধান্ধা? ঘুষ টুসের ব্যাপার না কি, ভাইয়া? তুমি তো ঘুষ দিয়ে চাকরি করবে না বলেই জানতাম।’
‘ভাল একটা সুযোগ পেয়েছি। বলতে পারিস লাইফ টাইম অপরচুনিটি। সবাই পায় না, আমি পেয়েছি। সুযোগটা হাতছাড়া করতে চাচ্ছি না। এজন্যে অবশ্য সামান্য কিছু টাকা পয়সা খরচ করতে হবে।’
শাহেদের দিকে তিন জোড়া চোখ তাকিয়ে আছে। সবার দৃষ্টি দেখলেই বোঝ যায়, সবার মনে একই প্রশ্ন—ব্যাপারটা কী?
রাকিবউদ্দিন বললেন, ‘বাংলাদেশে আমাদের মত এখনো অনেক ফ্যামিলি আছে যাদের জন্যে পঞ্চাশ হাজার টাকা অনেক টাকা, সামান্য নয়। এ তথ্যটা নিশ্চয়ই তোমার অজানা নয়?’
শাহেদের মন খারাপ হল। টাকাটা না পেলে এমন একটা সুযোগ পেয়েও হাত ছাড়া হয়ে যাবে। এটা সে মেনে নিতে পারছে না। সে চুপ করে বসে রইল।
‘কোন লেজিটিমেট রিজন যদি দেখাতে পার, তাহলে আমি ভেবে দেখব।’
শাহেদের চেহারায় আনন্দের ঝিলিক দেখা দিল। সে কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে একবার তাকাল তার বাবার দিকে। তারপর সোমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।
সোমা আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘তোমার লাইফ টাইম অপরচুনিটিটা কী বল না ভাইয়া।’
‘বলব বলব, কয়েকটা দিন অপেক্ষা কর। সবই জানতে পারবি।’
সে দ্রুত খাওয়া শেষ করে চলে গেল তার রুমে।

শাহেদ নিবিষ্ট মনে তার ল্যাপটপ খুলে গুগল সার্চ দিয়ে কানাডার প্রসিদ্ধ স্থান এবং স্থাপনাগুলো দেখছে। নায়াগ্রা জলপ্রপাত এবং টরেন্টো শহরের বিখ্যাত সিএন টাওয়ারের ছবি এবং ভিডিও খুঁজে খুঁজে সে মুগ্ধ নয়নে অবলোকন করছে।
পৃথিবীতে এমন অনেক কিছু আছে, যা দেখে আমাদের মনে বিস্ময় জাগে। নায়াগ্রা জলপ্রপাত এদের মধ্যে অন্যতম। পৃথিবীর সর্ববৃহৎ জলপ্রপাত এটি। আমেরিকার নিউইয়র্ক অঙ্গরাজ্য এবং কানাডার অন্টারিও প্রদেশের দু’দিকজুড়ে বিস্তৃত। এই অপরূপ জলপ্রপাতের জলধারা নায়াগ্রা নদীতে গড়িয়ে পড়ে অবিরত। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের তিন ভাগের এক ভাগ আমেরিকায়। এর নাম ‘আমেরিকান ফলস’, অন্য নাম ব্রাইডল ভেইল ফলস। বাকি দুভাগ কানাডায়। এর নাম ‘কানাডিয়ান ফলস’। এটার আকার অনেকটা ঘোড়ার খুরের মতো বাঁকা। তাই একে ‘হর্সসু ফলস’ও বলা হয়। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের উচ্চতা ১৬৭ ফুট। জলপ্রপাত থেকে প্রতি সেকেন্ডে ৬৪ হাজার ৭৫০ ঘনফুট পানি নদীতে আছড়ে পড়ে। উত্তর আমেরিকায় এটি সবচেয়ে জোরালো জলপ্রপাত। শুধু সৌন্দর্যে নয়, এটি জলবিদ্যুৎ উৎপাদনেরও এক বিরাট উৎস।
শাহেদ খুব মনোযোগ সহকারে প্রতিটি তথ্য বের করে পড়ছে। ভিডিও দেখছে। কল্পনায় সে নিজেকে আবিষ্কার করছে কখনো নায়াগ্রার তলদেশে আবার কখনো অবজারভেশন ডেকের উপর—যেখান থেকে
আমেরিকান ও কানাডিয়ান উভয় জলপ্রপাতের মনোহর দৃশ্য অবলোকন করা যায়। নায়াগ্রা জলপ্রপাতের শ্বাসরুদ্ধকর নৈসর্গিক সৌন্দর্য দৃশ্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়ল শাহেদ।
শাহেদের নিশ্ছিদ্র ধ্যানের বিঘ্ন ঘটিয়ে তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। কিঞ্চিত মেজাজ খারাপ করে শাহেদ ফোনের দিকে তাকাল। ফোন সামনে এনে দেখল অপরিচিত নাম্বার। তবুও সে বলল, ‘হ্যালো।’
‘হাই।’ অপরপ্রান্ত থেকে রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে এল।
শাহেদ আবার ফোনের নাম্বার দেখে বলল, ‘হ্যালো, কে?’
‘আমি!’
‘আমি কে?’
‘আমি নাতাশা!’
শাহেদ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে বলল, ‘না-নাতাশা! আই মিন আপনি! আমি স্বপ্ন দেখছি না তো? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।’ বলতে বলতে শাহেদ উত্তেজনায় উঠে দাঁড়াল।
নাতাশা হেসে দিল খিলখিল করে। দুষ্টুমির হাসি। হাসতে হাসতেই বলল, ‘না হবারই কথা। সামনা সামনি হলে অন্তত চিমটি কেটে দেখতে পারতেন। ফোনে তো আর সেটা সম্ভব নয়।’
‘তা অবশ্য ঠিক। তা সামনা সামনি আবার কবে দেখা হবে?’
‘দেখতে ইচ্ছে করছে বুঝি?’ নাতাশার কণ্ঠে দুষ্টুমির হাসি।
‘হুমম।’
‘হবে, খুব শীঘ্রই। আগে ফরমালিটিজ গুলো সেরে ফেলুন।’
‘ফরমালিটিজ? ও হ্যাঁ হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি।’
‘আমি আসলে আপনাকে সরি বলার জন্যে ফোন করেছি।’
‘কেন, সরি কেন?’
‘এই যে আপনি আসবেন জেনেও দেরী না করে বাসায় চলে এসেছি, সে জন্যে। আসলে আমার শরীরটা ভাল লাগছিল না। Hope you didn’t mind.’
নাতাশার সৌজন্যবোধে শাহেদ অত্যন্ত খুশি হল। সে সাথে সাথেই বলল, ‘না- না, আমি কিছু মনে করি নি।’
‘That’s like a real gentleman. এনিওয়ে, আমি এখন রাখছি।’
শাহেদ দ্রুততার সাথে বলল, ‘প্লিজ রাখবেন না, শুনুন।’
‘বলুন।’
শাহেদ সলজ্জ কণ্ঠে বলল, ‘আপনি খুব সুন্দর।’
নাতাশা বালিকার মত হেসে উঠল। সে হাসিতে যেন সমুদ্রের ফেনিল উচ্ছ্বাস! ‘তাই নাকি? ধন্যবাদ।’
শাহেদ আরো কিছু শোনার জন্য অধীরভাবে অপেক্ষা করে রইল কিন্তু নাতাশা চুপ।
‘হ্যালো! শুনছেন? হ্যালো?’ মুহূর্তেই অস্থির হয়ে পড়ল শাহেদ।
‘উঁহু, এখন থেকে আর শুনছেন নয়—শুনছো। শুনুন নয়—শোন। আপনি নয়—তুমি। Ok Mr. Nervous? Now good night and have a sweet dream!’
‘Hello, don’t hang up! শুনুন, শোন!’
অপরপ্রান্ত থেকে কোন সারা এল না। হঠাৎ নীরবতা। শাহেদ ফোন নামিয়ে চোখে সামনে ধরে রইল কিছুক্ষণ। মনে হচ্ছে যেন সে নাতাশাকে দেখতে পাচ্ছে। সে গভীর কণ্ঠে বলল, ‘Good night.’

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৩)

‘এভাবে আর কতদিন চলবে? ডু সামথিং ইয়াংম্যান! শো মি সাম ফায়ার!’ প্রতিদিন খাবার টেবিলে বাবার এই কটাক্ষ শুনতে আর ভাল লাগে না।
শাহেদের কথা বলার ভঙ্গিতে নাতাশা উচ্চস্বরে হেসে ফেলল।
শাহেদ অবাক হয়ে দেখল তারপর আবার বলল, ‘ফায়ার দেখানোর জন্য কোন চেষ্টা আমি করছিনা, তা কিন্তু না। তিন বছর ধরে করছি। কিন্তু আমি হচ্ছি ভেজা কাঠ, আগুন জ্বলে না, শুধু ধোঁয়া বের হয়। আমি কী করব বলুন?’
‘ভেজা কাঠ!’ নাতাশার ভাল লাগল শাহেদের উপমাটি। সে বলল, ‘Interesting! Nice start! Please, go on…’
‘দেশে থেকে কী করব? মাস্টার্স শেষ করে বেকার বসে আছি তিন বছর। শত শত ইন্টারভিউ দিয়েও সম্মানজনক একটা কাজ জোটে নি। আমার কোন চ্যানেলও নেই, মামাও নেই। আর ঘুষ দেবার মত সামর্থ্য এবং মানসিকতা কোনটাই আমার নেই। বিদেশে অন্তত নিজের যোগ্যতায় কাজ করতে পারব, ঘুষ দিয়ে কিংবা পেছনের দরজা দিয়ে নয়।’
‘Well said. Very impressive. I like your motivation.’ নাতাশা প্রশংসার দৃষ্টিতে তাকাল শাহেদের দিকে।
‘Thanks.’
‘মিঃ শাহেদ এবার বলুন, পাত্র হিসাবে কেন আমি আপনাকে পছন্দ করব? এটা ঠিক, আপনি খুব সুন্দর করে কথা বলেন! Besides being a nice talker, what else you have? Convince me.’
‘জি?’
‘আই মিন, অনেকের মধ্যে আপনাকেই কেন আমি বেছে নেব? হোয়াই?’
শাহেদ ঠিক বুঝতে পারল না কী বলবে বা বলা উচিৎ।
নাতাশা আবার বলল, ‘বাইরে দেখেছেন কতজন বসে আছে? ইতোমধ্যেই এই কয়েকদিনে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমি কথা বলেছি। কয়েকশোর ওপরে এখনও অ্যাপ্লিকেশন জমা আছে। হয়ত আরো আসবে। তো এতজনের মধ্যে আমি কী কারণে আপনাকেই বেঁছে নেব।’
‘কারণ আমি ভদ্র, শিক্ষিত এবং সৎ। দেখতে খুব একটা সুন্দর না হলেও আমার সুন্দর একটা মন আছে। আমি মেয়েদেরকে সম্মান করি এবং…’
‘এবং…?’
‘আমি স্বপ্ন দেখতে ভালবাসি!’
‘Wow! That’s great. I think you are definitely a potential candidate, no doubt. আপনার সময় আর নষ্ট করব না। আমিও কিছুটা টায়ার্ড। আমাদের হয়তো আবার দেখা হতে পারে। Until then, do you have any questions for me?’
‘রেজাল্ট কবে পাবো?’
‘সেটা আপনি ওদের কাছ থেকে জেনে নেবেন, ঠিক আছে? ভাল থাকবেন।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল।
নাতাশা হাত বাড়িয়ে আবার হ্যান্ডশেক করল। মৃদু হেসে বলল, ‘উইশ টু সি ইউ সুন।’
শাহেদের ভেতরে একধরণের বিদ্যুৎ তরঙ্গ বয়ে গেল। সে খুশি মনে বের হয়ে গেল। নাতাশা শাহেদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে হাসল। রহস্যময়ী হাসি।

এজাজ এবং জামানের সামনে এক তরুণ বসে আছে। তার অ্যাপ্লিকেশন হাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে জামান জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি বায়োডাটা ও ছবি এনেছেন?’
‘জি জি এনেছি।’ তরুণ তার ফাইল থেকে বায়োডাটা আর ছবি বের করে জামানের দিকে এগিয়ে দিল।
‘ম্যাডাম আপনার প্রোফাইল রিভিউ করবেন। উনি যদি পছন্দ করেন, তাহলে আপনাকে ইন্টারভিউর জন্য ডাকা হবে।’
কথা শেষ করে জামান দেখল নাতাশার রুম থেকে বের হয়ে শাহেদ দাড়িয়ে আছে। জামান দ্রুত একটা হাসি দিয়ে বলল, ‘আসেন শাহেদ ভাই, বসেন। ইন্টারভিউ কেমন দিলেন?’
শাহেদ ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, ‘জি, বুঝতে পারছি না। এ ধরণের ইন্টারভিউ আগে কখনও দেই নি তো। আচ্ছা, রেজাল্ট কবে নাগাদ পাওয়া যাবে?’
‘দেখুন, ম্যাডাম গত প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ইন্টারভিউ নিচ্ছেন। এখনো কাউকে পছন্দ করতে পারেন নাই। উনি আরো কিছু ইন্টারভিউ নিবেন তারপর ভেবে চিন্তে একটা ডিসিশন দেবেন।’
‘ও আচ্ছা!’
এজাজ বলল, ‘আপনার মোবাইল নাম্বার তো ফাইলে আছেই, ফলাফল পরে জানানো হবে।’
জামান বলল, ‘একটা কথা শাহেদ সাহেব। ম্যাডাম যাকেই পছন্দ করুক না কেনো, বিয়েটা উনি তাড়াতাড়িই সেরে ফেলবেন। এবং পাত্রকে সম্ভব হলে তার সাথেই নিয়ে যাবেন। সে ক্ষেত্রে ভিসা প্রসেসিং, মেডিক্যাল হাবিজাবি অনেক খরচ আছে। বিষয়টা মাথায় রাখবেন।’
শাহেদ কিছু বলার আগেই এজাজ বলল, ‘আবার বইলা বসবেন না, এতো টাকা লাগবে ক্যান?’
শাহেদ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘কোন আইডিয়া আছে, কত লাগতে পারে? না, মানে জানা থাকলে ভাল হত আর কি।’
এজাজ বলল, ‘আগে সিলেকশন পান, পরে জানবেন।’
জামান বলল, ‘আসলে আগাম কিছুই বলতে পারছি না। পরিস্থিতি বুঝে ব্যবস্থা নেয়া হবে।’
‘আমি আজ আসি তাহলে।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল। আর ঠিক তখনই সে শুনতে পেল—
‘জামান ভাই, আজ আর আমি কারো সঙ্গে দেখা করব না। বাসায় যাব, ড্রাইভারকে গাড়ি বের করতে বলুন।’
শাহেদ ঘুরে দেখল নাতাশা দরজায় দাঁড়িয়ে। উপস্থিত অন্যান্য ক্যান্ডিডেটরাও ঘুরে তাকাল নাতাশার দিকে। সবার চোখ বড় হয়ে গেল।
নাতাশা সবার দিকে একবার চোখ ঘুরিয়ে এনে স্থির হল শাহেদের দিকে। মুচকি হেসে হাত নাড়ল শাহেদকে লক্ষ করে। তারপর ঢুকে গেল তার রুমে।
শাহেদ নির্বাক তাকিয়ে রইল নাতাশার রুমের দিকে তারপর হালকা পায়ে বের হয়ে গেল ম্যারেজ মিডিয়া অফিস থেকে। নাতাশার সৌন্দর্য তাকে বিমোহিত করেছে। বেইলি রোডের ফুটপাত দিয়ে সে হাঁটতে থাকল আনমনে।

মনোমুগ্ধকর একটি বিকেল!
আকাশের সর্বত্র আজ নীলের ছড়াছড়ি। নীল আকাশের বুকে পেঁজা তুলোর মত শুভ্র মেঘের বাস, অদৃশ্য মৌনতায় ছেয়ে আছে চারিদিক। শরৎ শুরু হয়েছে। শরতের আকাশে মেঘের লুকোচুরি। শরতের আলোছায়ার খেলা চলছে; এই মেঘ, এই বৃষ্টি, তো কিছুক্ষণ পরই রোদ।
ঢাকা শহরের বারিধারাস্থ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসের নিরিবিলি জায়গায় সোমা আর রাজন বসে রয়েছে। ২৭ বছরের সুদর্শন যুবক রাজনের সাথে সোমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
আকাশের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সোমা বলল, ‘মনে হচ্ছে বৃষ্টি নামবে আজ।’
রাজন মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে আছে সোমার মুখের দিকে। যেন শরতের সব স্নিগ্ধতা মেখে আরো বেশি আকর্ষণীয় হয়ে আছে সে। আকাশের দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘তাহলে তো ভালই হয়। দুজনে ভিজব।’
‘ইশ্‌, কত শখ, দুজনে ভিজব? ওসব ভেজা-ভিজি আমাকে দিয়ে হবে না। রাজন, চল ফিরে যাই। অনেকক্ষণ তো হল।’
‘কেন, ভাল লাগছে না তোমার?’
‘লাগছে, কিন্তু কি লাভ? এক সময় তো ফিরতে হবেই।’
‘ফেরার দরকারটা কি? চলনা, দুজন মিলে হারিয়ে যাই?’
সোমা গানের সুর ভাজল, ‘আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাব, হারিয়ে যাব আমি তোমার সাথে। সেই অঙ্গীকারের রাখী পরিয়ে দিতে কিছু সময় রেখ তোমার হাতে।’ দু’লাইন গেয়েই সোমা হেসে ফেলল। হাস্তে হাসতেই বলল, ‘হারিয়ে যাব, তবে আজ নয়। এখন আমাকে যেতে হবে রাজন, ক্লাসের সময় হয়ে গেছে।’
সোমা ঢাকা শহরের বারিধারাস্থ বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। ২৭ বছরের সুদর্শন যুবক রাজনের সাথে সোমার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। রাজন দেখা করতে এলে, ক্যাম্পাসের নিরিবিলি এই জায়গাটায় তারা দুজন এসে বসে।
সোমা উঠে দাঁড়াতেই রাজন বলল, ‘আজ ক্লাসে যেতে হবে না। একটা দিন ক্লাস মিস করলে কি হয়?’
‘অনেক কিছু হয়। তোমার কি? পরীক্ষা শেষ, বিসিএস শেষ, রেজাল্ট পেয়েছ, শুধু জয়েনিং-এর অপেক্ষা। চল, উঠি।’
অগত্যা রাজন উঠে দাঁড়াল। আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘আবার কবে দেখা হবে?’
‘আরে, দেখাতো প্রায় প্রতিদিনই হচ্ছে! চল তো, উঠ।’ বলেই সোমা আবার গানের সুর ভাঁজল, ‘আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয়ত।’
হাঁটতে হাঁটতে রাজন বলল, ‘তোমার এই ব্যাপারটা আমার দারুণ ভাল লাগে।’
‘কোন ব্যাপারটা?’ আয়ত চোখে সোমা জানতে চাইল।
‘এই যে সুযোগ পেলেই গানের সুরে কথা বল। তোমার গলা খারাপ না, গান শিখলেও পারতে।’
‘হ্যাঁ, বলেছে তোমাকে।’
সোমা গানের সুর থামিয়ে দিল। রাজন বলল, ‘আহা, থামলে কেন, গাও না। ভালই তো লাগছিল।’
সোমা আবার গানের সুর ধরল।

শাহেদ বিছানায় শুয়ে আছে। ক্ষণে ক্ষণেই তার নাতাশার কথা মনে পড়ছে। তার চোখ মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। নাতাশার সৌন্দর্য, তার কথা বলা, স্মার্টনেস—সব কিছু তাকে নাতাশার প্রতি আগ্রহী করে তুলল। এমন একটা মেয়েকে জীবন সঙ্গী হিসেবে পেলে আর কী লাগে। তার ভাগ্য ফেরাতে একমাত্র অবলম্বন হতে পারে নাতাশাই। কানাডা দেশটাও খারাপ না। স্ট্যাটাসে আমেরিকার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। আমেরিকার পরেই এখন সবচেয়ে বেশি কানাডার ডিম্যান্ড। সেখানে যেয়ে একটা ভাল কাজ যোগানো কোন ব্যাপারই হবে না। তাছাড়া কানাডার সিটিজেনশিপও সে পেয়ে যাবে তাড়াতাড়ি। শাহেদ গভীর চিন্তায় ডুবে গেল।
শাহেদ মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সে নিরবিচ্ছন্ন ভাবনায় ছেঁদ পড়ল। ফোন ধরে হ্যাল বলতেই অপরপ্রান্ত থেকে জামানের কণ্ঠ শোনা গেল।
‘হ্যালো, শাহেদ সাহেব, আপনার জন্য একটা ভাল খবর আছে।’
শাহেদ উঠে বসল।
জামান বলল, ‘নাতাশা ম্যাডাম আপনার ব্যাপারে ইন্টারেস্টেড, আরও কথা বলতে চান। একবার অফিসে আসতে পারবেন?’
শাহেদ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘অবশ্যই আসতে পারব। কখন আসতে হবে?’
‘দেরী না করাই ভাল। পারলে আজকেই চলে আসেন। বলা তো যায় না।’
শাহেদ সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ঠিক আছে, আমি আজকেই আসব। কোন সমস্যা নেই।’
জামান ফোন কেটে দিল।
শাহেদ অবিশ্বাস্য ভঙ্গিতে তার হাতের ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ফোনটা উপরে ছুঁড়ে দিয়ে আবার ধরেই বলল, ‘ইয়েস!’ সে সুর করে গেয়ে উঠল, ‘ওগো বিদেশিনী!’
এজাজ তাকাল জামানের দিকে। জামানের মুখে রহস্যপূর্ণ হাসি।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-২)

বিজ্ঞাপন দাতাদের একজনের নাম এজাজ খান। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। বেইলি রোডের ফুটপাত দিয়ে দ্রুত হেঁটে যাচ্ছিল সে—গন্তব্য ‘EZ Marrage Media’ অফিস।
এজাজ এবং জামান, দুই বন্ধুর আদ্যক্ষর নিয়ে তাদের এজেন্সির নাম। অফিসে যেতে এখনো বেশ খানিকটা রাস্তা হাঁটতে হবে। এমন সময় তার মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো?’
‘হ্যালো স্লামালিকুম। এটা কি 880171*?’ শাহেদ খুব উত্তেজিত হয়ে ফোন নাম্বারটা বলল।
‘জি, জি, নাম্বার ঠিকই আছে—বলেন।’
‘জি ভাই, আমি পত্রিকায় একটা বিজ্ঞাপন দেখে ফোন করলাম। বিষয়টা একটু জানতে চাই। একটু বিস্তারিত বলবেন?’
এজাজ বলল, ‘মোবাইলে তো ভাই বিস্তারিত বলা যাবে না। যদি ইন্টারেস্টেড হন তাইলে একটা নাম্বার দিতেছি, ঐ নাম্বার কল করে অ্যাপয়েন্টমেন্ট করেন। কাগজ কলম আছে?’
‘জি আছে।’
‘তাইলে লেখেন। আমার পার্টনার, নাম জামান। আর নাম্বার হইতেছে…’ এজাজ নাম্বারগুলো বলল।
শাহেদ নাম আর ফোন নাম্বার লিখে, এজাজ সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে ফোন কেটে দিল।
কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে শাহেদ জামান সাহেবের নাম্বারে ফোন করল। এজাজের পার্টনার জামানও একই বয়সের। মধ্য চল্লিশ। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগেই আছে। ক্লায়েন্টদের সঙ্গে হাসি মুখে কথা বলতে বলতে মুখ হাসি হাসি করে রাখার অভ্যাস হয়ে গেছে। জামান সাহেব অফিসের ডেস্কে বসে কথা বলছিলেন আরেকজন ক্যান্ডিডেটের সঙ্গে। তিনি ফোন ধরে বললেন, ‘হ্যালো? ইজি ম্যারেজ মিডিয়া, কে বলছেন?’
শাহেদ বলল, ‘আমি একটু জামান সাহেবের সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম।’
‘জি বলেন, আমিই জামান।’
শাহেদ আবারো উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘আমার নাম শাহেদ। আপনার বন্ধু এজাজ সাহেবের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। পত্রিকায় আপনাদের একটা বিজ্ঞাপন দেখলাম, আমি ঐ ব্যাপারে একটু জানতে চাচ্ছিলাম। একটা অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে চাই।’
‘অ্যাপয়েন্টমেন্ট তো ভাই করতে চান, কিন্তু এক সপ্তাহের মধ্যে কোন স্পট খালি নাই। আচ্ছা দেখি—একটু হোলড করেন।’
জামান অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যালেন্ডার পরখ করে বলল, ‘শোনেন শাহেদ সাহেব, এ সপ্তাহে অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়া যাবে না, আগামী ২১ তারিখের আগে কোন ডেট ওপেন নাই। ২১ তারিখ বিকাল ৪ টায় একটা স্পট আছে, যদি আসতে চান তো বলেন।’
‘জি জি অবশ্যই আসতে চাই।’ কিছু না ভেবে তাৎক্ষণাৎ অ্যাপয়েন্টমেন্ট করতে রাজী হয়ে গেল শাহেদ।
জামান আবার বলল, ‘ম্যাডাম কানাডার সিটিজেন। কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। উনি নিজেই আপনার ইন্টারভিউ নেবেন, একটু তৈরী হয়ে আসবেন।’
জামান বিস্তারিত বুঝিয়ে বলল। শাহেদ পুরো প্রক্রিয়াটা বুঝে নিয়ে নিয়ে খুশি মনে ফোন কেটে দিল। মনে মনে কয়েকবার উচ্চারণ করল, ২১ তারিখ বিকেল ৪ টা!
ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে এসে শাহেদ পাঁচ হাজার টাকার একটা অফেরতযোগ্য ফরম নিয়েছে। সে লাইন বাই লাইন বুঝে নিয়ে ফরমটা পূরণ করে জামান সাহেবের কাছে দিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল।
অপেক্ষারত শাহেদ অফিসের চারিদিকে চোখ বুলিয়ে দেখল। তার পাশেই বসে রয়েছে বেশ কিছু ক্যান্ডিডেট। সবার বয়স পঁচিশ থেকে ত্রিশ-পঁয়ত্রিশের মধ্যেই হবে। সবার চেহার মধ্যেই এক ধরণের উৎকণ্ঠা পরিলক্ষিত হল। সবাই নিজেদের মধ্যে নিচু গলায় কথা বলছে। কয়েকজন একেবারেই চুপ। এর মধ্যে দুজন ক্যান্ডিডেটের কথাবার্তা কানে ভেসে এল শাহেদের।
প্রথমজন তার পাশের জনকে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কি ফেঞ্চ শিখেছেন?’
দ্বিতীয়জন অবাক হবার ভঙ্গিতে বলল, ‘ফ্রেঞ্চ শিখব কেন? আমি তো আর ফ্রান্সে যাচ্ছি না যে আমাকে ফ্রেঞ্চ শিখতে হবে।’
প্রথমজন একটু ভাবের সাথে বলল, ‘ও আচ্ছা, আপনি বোধহয় জানেন না যে, ইংলিশ এবং ফ্রেঞ্চ দুটোই কানাডার অফিসিয়াল ল্যাঙ্গুয়েজ।’
‘আরে ভাই, ইংরেজিটাই ভাল মত শেখা হয় নাই এখনো, আবার ফ্রেঞ্চ!’
শাহেদের ডাক পড়ল। জামান সাহেব শাহেদের অ্যাপ্লিকেশন ফরমটা একনজর দেখে এজাজের দিকে বাড়িয়ে দিল রিভিউ করার জন্য। তারপর উৎসুক দৃষ্টিতে শাহেদের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘বিদেশ যেতে চান কেনো?’
শাহেদ কিঞ্চিৎ ভেবে বলল, ‘বিদেশ যেতে চাই কেনো? সেটা না হয় আপনাদের ম্যাডামকেই বলি।’
জামান তার স্বভাবসুলভ হাসি দিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে, ম্যাডামকেই বলেন। উনি পাশের রুমেই আছেন।’
এজাজ ফরম দেখা শেষ করে বলল, ‘আপনার জন্যে অপেক্ষা করতেছেন। যান।’
শাহেদ উঠে দাঁড়াল। ম্যাডামের রুম লক্ষ করে চলে যেতে উদ্যতে হতেই এজাজ বলল, ‘ভাইজান, ফিসের টাকাটা…’
শাহেদ লজ্জিত ভঙ্গিত বলল, ‘ও হ্যাঁ। এই নিন পুরো পাঁচ হাজার। গুনে নিন।’
‘না না গুনতে হবে না। জেন্টেলম্যান ডিলিং, আবার গুণাগুণই কিসের। গুনতে হবে না। যান ভিতরে যান। ম্যাডাম ওয়েট করতেছেন।’
শাহেদ ঘুরে দাঁড়াতেই এজাজ টাকা গুনা শুরু করল।
শাহেদ এগিয়ে গেল ম্যাডামের রুমের দিকে। কতগুলো চোখ তাকিয়ে আছে শাহেদের দিকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে তার চুলে একবার হাত চালাল। একটা নিঃশ্বাস ফেলে টোকা দিল দরজায়। ঠক, ঠক।
‘প্লিজ কাম ইন।’ ভেতর থেকে রিনরিনে কণ্ঠে কেউ বলল।
শাহেদ আস্তে করে দরজাটা খুলে প্রবেশ করল ভেতরে। ছোট একটি রুম। আসবাব পত্র বলতে একটা টেবিল, সামনে দুটি চেয়ার আর পাশে একটি সোফা। টেবিলে কিছু বিদেশী ম্যাগাজিন আর পানির বোতল দেখা যাচ্ছে। শাহেদ তাকাল।
জানালার পাশে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে ম্যাডাম। বয়স তিরিশ। লম্বায় ৫ ফুট ৪ কি ৫ ইঞ্চি হবে। সাধারণ বাঙালি মেয়েদের তুলনায় লম্বাই বলা চলে। পড়নে কর্পোরেট এক্সিকিউটিভদের মত স্কার্ট, টপস ওপরে একটা কাল ব্লেজার। লম্বা চুল ছড়িয়ে পড়েছে কাঁধের উপর দিয়ে। চুলের রঙে কালোর সাথে বাদামি স্ট্রাইপ—হাইলাইটস করা সম্ভবত একেই বলে।
ম্যাডাম ঘুরে তাকিয়ে দেখল শাহেদকে। পা থেকে মাথা পর্যন্ত একবার দেখে মিষ্টি করে হাসল।
শাহদের মুখ হাঁ গেল। কোনো মেয়ে এত সুন্দর হতে পারে তা তার ধারণার বাইরে ছিল। সে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইল।
ম্যাডাম এগিয়ে এসে শাহেদের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘হাই, আই’ম নাতাশা! নাইস টু মিট ইউ। ইউ মাস্ট বি…’
শাহেদ সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বলল, ‘শাহেদ। শাহেদ আহমেদ। নাইস টু মিট ইউ টু।’ সে হাত বাড়িয়ে হ্যান্ডশেক করল। কিন্তু হাত ছেঁড়ে দিতে ভুলে গেল।
নাতাশা শাহেদের হাতের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। শাহেদ লজ্জা পেয়ে হাত ছেঁড়ে দিল।
‘প্লিজ হ্যাভ অ্যা সিট। মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল।’ বলতে বলতে নাতাশা সোফার এক কোনায় বসে পড়ে তাকাল শাহেদের দিকে। ইশারায় বসতে বলল।
শাহেদ ইতস্তত করে সোফার অন্য কোনায় বসে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ’।
‘তারপর মিঃ শাহেদ কেমন আছেন, ভাল?’
‘জি? জি ভাল।’
‘আমি আপনার বেশি সময় নেবো না। ইট উড জাস্ট বি অ্যা ফরমাল ইন্ট্রোডাকশন। প্রথমে আমার সম্পর্কে আমি বলব; আমার ব্যাকগ্রাউন্ড এবং সব কথা শুনে যদি আপনার ভাল লাগে, তাহলে আপনার কথা শুনব আমি। তারপর কারো যদি কোন প্রশ্ন থাকে সেটা নিয়ে কথা বলা যাবে। ওকে?’
শাহেদ মাথা নেড়ে জানাল, ওকে।
‘তাহলে শুরু করা যাক, কি বলেন?
শাহেদ আবারো মাথা নাড়ল।
একটু থেমে কী বলবে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়ে নাতাশা শুরু করল কথা বলা। ‘গত সাত বছর ধরে আমি কানাডায় আছি। কম্পিউটার সাইন্সে গ্রাজুয়েশন করে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে কাজ করছি একটা ফার্মে। চার বছর আগে একবার বিয়ে হয়েছিল। একটা ক্যানাডিয়ান সাদা ছেলের সাথে। বিয়েটা বছর খানিক টিকেছিল।’
শাহেদের চোখে প্রশ্নবোধক চিহ্ন। সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল।
‘আপনি নিশ্চয়ই কিউরিয়াস বিয়েটা বেশীদিন কেন টেকে নি, তাইনা?’
শাহেদ মাথা নাড়ল, হ্যাঁ।
‘সেটা না হয় পরেই জানবেন, অবশ্যই যদি আপনার সঙ্গে আবারো দেখা কিংবা কথা হয়। তবে এটুকু বলতে পারি, স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে ভালবাসা একটু কম হলেও ক্ষতি নেই, কিন্তু একে অপরের প্রতি সম্মান এবং বিশ্বাস থাকাটা খুবই জরুরী।’ একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে সে আবার বলল, ‘এক সাথে পড়তে যেয়ে বন্ধুত্ব হল। বন্ধুকে বিয়ে করলাম—অথচ বিয়ের পরে বন্ধুত্বটাই নষ্ট হয়ে গেল। হি ওয়াজ চিটেড অন মি।’
শাহেদ কোন মন্তব্য করল না। চুপচাপ শুনে গেল।
নাতাশা বলে চলল, ‘গত তিন বছরে অনেক প্রস্তাব এসেছে, আমি আর বিয়ে করব না বলেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু আব্বু-আম্মুর কন্টিনিউয়াস রিকোয়েস্টে শেষ পর্যন্ত রাজি হলাম। তাই দেশে আসা, পাত্রের সন্ধানে। যদি ক্লিক করে যায়। ইউ নেভার নো।’
শাহেদ তাকাল।
নাতাশা সাথে সাথেই বলল, ‘আই মিন, যদি কাউকে পছন্দ হয়ে যায়। তবে এই মুহূর্তে বিয়েটা হবে শুধুই… উমম, একচুয়ালি ফরমালিটিজগুলো আপনি এজাজ কিংবা জামান ভাইয়ের কাছ থেকেই জেনে নিতে পারবেন। তারচেয়ে বরং—এবার আপনার কিছু কথা শুনি, কী বলেন?’
শাহেদ নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, ‘জি!’
নাতাশা ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘আর ইউ ওকে? আপনাকে এত নার্ভাস লাগছে কেন? উড ইউ লাইক টু হ্যাভ অ্যা গ্লাস অফ ওয়াটার? পানি খাবেন?’
‘না, না। পানি খেতে হবে না। আই অ্যাম ওকে।’
‘আর ইউ শিওর?’
‘ইইয়েস, আই’ম শিওর।’
‘ওয়েল, দেন লেট’স গেট ব্যাক টু বিজনেস। টেল মি সামথিং অ্যাবাউট ইয়োরসেলফ।’
এবার শাহেদ সত্যি সত্যিই নার্ভাসবোধ করল। সে আমতা আমতা করে বলল, ‘পানি খাব।’
নাতাশা শব্দ করে হেসে ফেলল। শাহেদ অস্বস্তি নিয়ে তাকাল তার দিকে। নাতাশা বোতল থেকে গ্লাসে পানি ঢেলে এগিয়ে দিল শাহেদের দিকে। শাহেদ ঢক ঢক করে পানি খেয়ে গ্লাস নামিয়ে রাখল।
নাতাশা তাকাল শাহেদের দিকে। শাহেদ বলল, ‘থ্যাংকস।’
‘ওয়েলকাম।’ ঠিক আছে, চলুন তাহলে শুরু করা যাক। ‘বলুন।’
শাহেদ অবাক হয়ে তাকাল। যেন সে ভিনগ্রহের কারো সামনে বসে আছে। সে কিছু বুঝতে পারছে না, তার সামনে বসা ভিনগ্রহের মেয়েটি কী বলছে।
নাতাশা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘বিদেশে যেতে চান কেন?’
শাহেদ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Moddhorater-Jarti

মধ্যরাতের যাত্রী (বোনাস পর্ব)

হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ফাহিমের।
পৃথিবীতে আশি শতাংশ মানুষের সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ হচ্ছে সকালে ঘুম থেকে ওঠা। ফাহিম সেই আশি শতাংশ দলেরই একজন। সকালের ঘুমটা অনেক প্রিয় তার, বিশেষ করে ছুটির দিনে। যত ইমারজেন্সিই হোক না কেন, এত সকালে সে কিছুতেই চোখ খুলবে না।
বেহায়া ফোনটা একবার থেমে গিয়ে আবার বেজে উঠল। তার এই একাকী জীবনে মাঝে মাঝে ফোনের রিং-টোন শুনতে খারাপ লাগে না। কিন্তু তাই বলে এত সকালে! অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল—অপরিচিত একটা নাম্বার। যা ভেবেছিল তাই, নির্ঘাত টেলিমার্কেটারদের ফোন—ছুটির একটা সকালেও নিস্তার নেই। ফাহিম ফোন কেটে দিল। প্রয়োজনীয় কল হলে ভয়েস মেসেজ তো রাখবেই। তখন কল-ব্যাক করলেই হবে।
শনিবার সকাল। ছুটির দিনে একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠে ফাহিম। কিন্তু কোনো কারণে একবার ঘুম ভেঙে গেলে সহসাই আর ঘুমিয়ে পড়তে পারে না সে। বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি শেষে অগত্যা উঠে গিয়ে এক কাপ ইনস্ট্যান্ট কফি বানিয়ে নিয়ে এসে দাঁড়াল জানালার পাশে। পর্দা সরিয়ে তাকাল সামনের ছোট পুকুরটির দিকে। ওখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি ফোয়ারা থেকে ঝরনার পানির ওঠা নামা করছে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় ডুবে যায় সে।
কী কারণে হঠাৎ করেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে তার। মনে পড়ে সেদিনের সেই রাতটির কথা। কেমন ঘোরলাগা একটা সময়—অন্যরকম ভালোলাগার কিছু অনুভূতি তাকে গ্রাস করে রাখল
ফাহিম সেদিন লিসার ফোন নাম্বার চায় নি। লিসাও তার নাম্বার রাখে নি। উবার প্রাইভেসির নিয়মে অবশ্য একজন কাস্টমার কিংবা ড্রাইভার তাদের আসল নাম্বার দেখতে পারে না। কাজেই চাইলেও লিসার সঙ্গে আর যোগাযোগ করার উপায় ছিল না। উবার ড্রাইভারদের কত ধরণের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা সে শুনেছে। অনেক ভয়াবহ এবং ভয়ংকর ঘটনাও আছে। সেদিনের রাতের ঘটনাও অনেক ভয়ংকর হতে পারত। কিন্তু হয় নি। বরং একটা সুন্দর অনুভূতি নিয়ে সে ফিরে এসেছিল।
‘বিপ বিপ…’
আবারো ফোনের শব্দে ফাহিমের নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় ছন্দ পতন ঘটল। তার ফোনটি এখনো বিছানায়, বালিশের পাশেই পড়ে আছে। ফাহিম বিছানা থেকে ফোন তুলে দেখল সেই একই নাম্বার। সে ফোনটা হাতে নিয়ে ভ্রূ কুঁচকে একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘হ্যালো?’
অপরপ্রান্ত থেকে রিনরিনে কণ্ঠে একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মে আই স্পিক টু ফাহিম প্লিজ?
‘দিস ইজ ফাহিম। হু ইজ দিস?’
‘ক্যান ইউ গেস?’ অপরপ্রান্তের মেয়েটির মুখে রহস্যপূর্ণ হাসি।
নিমিষেই ফাহিম চিনে ফেলল। কণ্ঠটি তার পরিচিত। আসলে খুবই পরিচিত। সে নিশ্চিত হয়েই বলল, ‘তুমি আমার সেই মধ্যরাতের যাত্রী। তোমাকে ভুলি কী করে?’
মেয়েটি হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কেমন আছ ফাহিম?’ তার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
‘হুম, ভাল। তুমি?’
‘ভাল না।’
‘ভাল না কেন?’
‘জানি না।’
ফাহিম চুপ করে রইল।
‘আজ বিকেলে কী করছ?’ জানতে চাইল মেয়েটি।
‘এখনো কোনো প্ল্যান নেই। কেন বলো তো?’
‘আমি দেখা করতে চাই।’
‘দেখা করতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’
একটু ভেবে ফাহিম জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু কীভাবে? এত দূর থেকে কীভাবে আসবে?’
‘তা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি দেখা করবে কি না বলো?’
ভেতরে ভেতরে ফাহিম উত্তেজিত হয়ে পড়ল। কেউ যেন তার কর্ণগোচরে মধুর বাণী বর্ষণ করল। এমন মধুর কথা সে যেন তার জীবনে আর কখনই শোনে নি। ফাহিম তার উত্তেজনা চেপে বলল, ‘দেখা করব।’
‘তোমার বাসার ঠিকানাটা টেক্সট করে দাও। আর বলো ঠিক কখন আসব?’
‘তা না হয় দিচ্ছি। কিন্তু তুমি আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেলে?’ ফাহিম অবাক হয়ে জানতে চাইল।
সেই রহস্যমাখা হাসি দিয়ে লিসা বলল, ‘ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব মি: ।’
‘হ্যাঁ তা তো দেখতেই পাচ্ছি—তবুও জানতে চাইছি।’
‘বলব না—দেখি তুমি ভেবে বের করতে পার কি না।’
ফাহিম কিছু বলল না। গভীর চিন্তায় পড়ে গেল সে। হঠাৎ করেই সেই রাতের কথা মনে পড়ে গেল আবার। খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়। এর মধ্যে লিসার কথা তার প্রতিদিনই মনে পড়েছে। কিন্তু যোগাযোগের কোনো উপায় যেহেতু ছিল না, তাই সেও আর কিছু চিন্তা করে নি। তবে লিসা যেভাবেই হোক, তার ফোন নাম্বারটা যোগার করে নিয়েছে, এ বিষয়টি তাকে অভিভূত করল। এবং তার বেশ ভালও লাগল। সে মনে মনে মেয়েটির বুদ্ধির তারিফ করল।
‘কই ঠিকানাটা পাঠাও।’ লিসা তাড়া দিল।
‘এখুনি পাঠাচ্ছি।’
‘সি ইউ সুন।’ বলেই লাইন কেটে দিল লিসা।
ফাহিম তার বাসার ঠিকানাটি এসএমএস করে দিল লিসার নাম্বারে। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। কফির কাপে চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখল। কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই। হঠাৎ সে লক্ষ করল, তার বেডরুমের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাপড় চোপড়, একটা প্লেটে আধ খাওয়া এক স্লাইস পিজ্জা। বিছানার চাদরটাও বদলানো দরকার। সে দ্রুত হস্তে রুমটাকে পরিপাটি করে ফেলল। ছুটির দিনে সে সাধারণত শেভ করে না। গোসলের আগে সে শেভ করে নিল। ব্লু-জিন্সের সাথে সাদা একটা টি-শার্ট ছেড়ে দিল গায়ের ওপরে। তার ফেভারিট ভার্সাসে ব্রান্ডের কোলন স্প্রে করে দিল সারা শরীরে। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে তৈরি করে অপেক্ষা করতে লাগল ফাহিম।
ফাহিমের এমন লাগছে কেন কে জানে? লিসার ফোন পাওয়ার পর থেকেই তার ভেতরে একধরণের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। লিসার ফোন করার ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তুলল। ফোনটা কি কাকতালীয়? লিসা কি ফাহিমের মনের আকুতি অনুমান করতে পেরেছিল? কী এক অদ্ভুত কারণে ফাহিম যখন ভাবছিল লিসার কথা আর ঠিক তখনই তার ফোনটা এল। একেই কি বলে টেলিপ্যাথি?
মনের কিছু শক্তি নিশ্চয়ই রয়েছে। মানুষের অজান্তেই সেই শক্তি কাজে লাগিয়ে এমন অদৃশ্য যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে মানুষ। ফলে যিনি মনে মনে যে মানুষকে নিয়ে ভাবছে, অজান্তেই সেই ভাবনা ক্রিয়া করছে সেই মানুষটির মস্তিষ্কে। মানুষের মন যে কতটা শক্তিশালী তা ব্যবহার না করা পর্যন্ত মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। লিসার কাছ থেকে এভাবে ফোন আসাটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? ফাহিম ঘড়ি দেখল। সময় যেন থমকে আছে। ফাহিমের অস্থিরতা কাটছে না কিছুতেই। সে নিজেও বুঝতে পারছে না, এমন অস্থিরইবা কেন লাগছে তার?

সব অপেক্ষার শেষ হয় এক সময়। ফাহিমেরও হল।
ফাহিম দাঁড়িয়ে ছিল তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনেই। বাইরে থেকে কিছু বোঝা না গেলেও ভেতরে ভেতরে তার অস্থিরতা ছিল প্রকট। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি গাড়ি এসে থামল তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনের রাস্তায়। ফাহিম দূর থেকে দেখল এক শ্বেতাঙ্গিনী তরুণী গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ফাহিম সহাস্যে এগিয়ে গেল সামনে এবং অবাক বিস্ময়ে দেখল ছিপছিপে গড়নের এক অপূর্ব সুন্দরী তন্বী তরুণীকে।
ভোরের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে শিউলি ফুলের সুরভি মেখে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেয়েটি এগিয়ে এল। পড়নে সাদা একটি লং স্কার্ট সাথে ব্লু-টপস। কাঁধের দুপাশে ছড়িয়ে আছে সিল্কের মত সোনালী চুল। মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে তার আশেপাশে।
তরুণীর নীল চোখ গাঢ় আনন্দে চিকচিক করছে। একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে, ধীর নিশ্চিত পদক্ষেপে সে এসে দাঁড়াল ফাহিমের সামনে—কোনো রকম জড়তা ছাড়াই জড়িয়ে ধরল তাকে। যেন কতদিনের চেনা কেউ—কত আপনজন।
ফাহিমের শরীরে যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গ ছড়িয়ে গেল মুহূর্তেই। লিসার উষ্ণ আলিঙ্গনে মুহূর্তেই নিজেকে হারিয়ে ফেলল সে। একজনের আলিঙ্গনে কারো শরীর এমন করে ভালোলাগায় শিউরে উঠতে পারে, কারো সামান্য স্পর্শে যে এত ভালোলাগা থাকতে পারে—নতুন করে অনুভব করল সে। এই উষ্ণতার, এই ভালোলাগার কি কোনো নাম আছে?
একটু সময় পার করে লিসা নিজের আলিঙ্গন শিথিল করে সরাসরি তাকাল ফাহিমের মুখের দিকে। তাকিয়েই রইল অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে করে, ওর বুকের মধ্যে থেকে বলল, ‘কেমন আছ তুমি?’
ফাহিমের মনে হল, এত আবেগ নিয়ে এর আগে কেউ কোনোদিন তাকে এভাবে জিজ্ঞেস করে নি। সে বলল, ‘অনেক ভাল আছি—অনেক। তুমি?’
‘আমিও অনেক ভাল আছি—অনেক। কত যে খুশি হয়েছি তোমাকে বোঝাতে পারব না। মাত্র কয়েকদিন হল অথচ আমার কাছে মনে হচ্ছে, কতদিন পরে তোমাকে দেখলাম!’ লিসার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
সাভানার আকাশে কনকনে রোদ। অথচ দুপুরের এই তীব্র রোদের মধ্যেই হঠাৎ আকাশ ভেঙে এক পশলা বৃষ্টি নেমে এল। ভিজে যাবার আগেই ফাহিম লিসার হাত ধরে দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল তার অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে।
রুমে ঢুকে লিসা সব ঘুরে ঘুরে দেখল। দেয়ালে টানানো দুটো পোস্টার—একটা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের আর একটি জাতীয় স্মৃতি সৌধের। দুটো পোস্টারেই বড় বড় অক্ষরে লেখা—বাংলাদেশ। লিসা ঘুরে তাকাল ফাহিমের দিকে। কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে বলল, ‘সো ইউ আর ফ্রম বাংলাদেশ?’
‘ইয়েস। হোয়াই?’
‘আমি ভেবেছিলাম তুমি ইন্ডিয়ান।’
‘অনেকে তাই ভাবে। দেখতে আমরা অনেকটা একই রকম।’
‘এশিয়ানরা খুব দয়াল প্রকৃতির হন। এছাড়াও তারা খুব বিশ্বাসী হয়। জীবনের যে কোনও সময়ে পাশে পাওয়া যায়।’
লিসার কাছে থেকে এশিয়ানদের সম্পর্কে এমন উচ্চধারনা শুনে এবং নিজেকে এশিয়ান গোত্রের একজন হিসেবে বেশ গর্ব অনুভব করল ফাহিম। কিঞ্চিত অবাক হয়েই সে জানতে চাইল, ‘তুমি কী করে জানো?’
‘জেনেছি।’ মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল লিসা। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। বৃষ্টির ঝাপটায় জানালার কাঁচে ফোটা ফোটা জলের বিন্দু ভিড় করছে। জানালার কাঁচের আঁকিবুঁকি ভেদ করে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল সে।
ফাহিম লিসার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেও তাকাল বাইরে। লিসা মাথাটা এলিয়ে দিল ফাহিমের দিকে। ফাহিম হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিল তাকে। দুজনেই বাইরে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য দেখতে লাগল।
লম্বা একটা বিরতি দিয়ে ফাহিম বলল, ‘আমাদের কিন্তু বাইরে লাঞ্চ করার কথা। খিদে পেলে জানাবে।’
‘খিদে পেয়েছে তবে অন্য কিছুর।’ ফাহিমের দিকে না তাকিয়েই লিসা কথাটা বলল এবং মিটিমিটি হাসতে থাকল।
ফাহিম চকিতে তাকাল লিসার মুখের দিকে।
‘বৃষ্টির মধ্যে বাইরে যেতে চাচ্ছি না।’ লিসার মুখে দুষ্টুমির হাসি।
ফাহিমেরও বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। অন্য কোনো সময় হলে এই বৃষ্টির দিনে সে নির্ঘাত তার প্রিয় খাবার নিজেই বানিয়ে নিত। হঠাৎই ফাহিমের মনে হল, আচ্ছা খিচুড়ি রান্না করলে কেমন হয়। সাথে ডিম ভাজি। যেই ভাবা সেই কাজ। ফাহিম বলল, ‘আমি তোমাকে একটা মজার আইটেম রান্না করে করে খাওয়াব। আমার খুবই প্রিয়।’
‘কী সেটা?’
‘খিচুড়ি।’
লিসা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। এমন কোনো খাবারের নাম সে তার জীবদ্দশায় শুনেছে কি না সে মনে করতে পারল না। জ্যাকসনভিলে একবার একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে সে গিয়েছিল ব্র্যাডের সঙ্গে—কিন্তু এমন কোনো নামের ফুড আইটেম তার চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না। ব্র্যাডের কথা মনে হতেই লিসার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ব্র্যাডের ব্যাপারে সে ইতোমধ্যেই হার্ডলাইন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—যতদিন বেঁচে থাকবে, ব্র্যাডের কোনো স্থান তার জীবনে আর কোনোদিনও হবে না—তার ব্যাপারে সে হাত পা ঝেড়ে ফেলেছে। লিসার অফলাইন-অনলাইন সব জীবন থেকেই তাকে ব্লক করা হয়েছে।
‘এ বস্তুর নাম কোনোদিন শুনেছি বলে মনে হয় না।’ বলল লিসা।
ফাহিম মনে মনে দ্রুত খিচুড়ির ইংরেজি কী হবে চিন্তা করতে লাগল, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না। সে বলল, ‘এটাকে ইয়েলো রাইসও বলতে পার। ইটস অ্যা কম্বিনেশন অফ রাইস, লেন্টিল, ওনিয়ন, গার্লিক, গ্রিন চিলি, টারমারিক পাউডার এন্ড সল্ট মিক্সড উইথ মাস্টার্ড অয়েল। সাথে থাকবে ফ্রাইড এগস আর ম্যাঙ্গো চাটনি। খেতে অসাধারণ। তুমি ট্রাই করে দেখতে পার।’
‘সাউন্ডস রিয়েলি ইয়ামি। আমার তো এখনই খেতে ইচ্ছে করছে।’
‘আমরা বাঙালিরা, বৃষ্টি হলেই খিচুড়ির আয়োজন করি। এটা অনেকটা ট্র্যাডিশনাল হয়ে গেছে।’
‘তাই? ইন্টারেস্টিং। কিন্তু বৃষ্টির সাথে খিচুড়ির কী সম্পর্ক?’
বৃষ্টির সাথে খিচুড়ির কী সম্পর্ক সেটা ফাহিম নিজেও জানে না। কখনো ভেবেও দেখে নি। হঠাৎ তার মনে হল, আসলেই তো! কীসের সম্পর্ক? এই সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্ত্বিক বা শরীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা কি? সম্পর্ক যাই হোক—আকাশ কালো মেঘে ঢাকলেই তার মন বলে ওঠে—আজ খিচুড়ি হয়ে যাক। শেষ অবধি হয়তো দেখা গেল যে বৃষ্টিটাই হল না, এদিকে খিচুড়ি খাওয়া শেষ।
ফাহিম মনে মনে হেসে ফেলল। লিসা অবাক হয়ে তাকাল। ফাহিম মাথা ঝাঁকাল, ‘কিছু না।’
লিসা হাসল। তার চোখে মুখে দুষ্টুমি। তাকাল ফাহিমের চোখের দিকে। কিছু বলল না। ফাহিমও অবাক চোখে তাকাল। তাকিয়েই রইল। কারো মুখে কোনো কথা নেই—শুধু চেয়ে থাকা।
মাঝে মাঝে চুপ করে কারো দিকে চেয়ে থাকলে চোখ অনর্গল এত কথা বলে যে, সে সময় মুখে কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। কলম কিংবা মুখের ভাষা কোনোদিনও বোধ হয় চোখের ভাষার সমকক্ষ হতে পারবে না।
‘কী দেখছ অমন করে?’ মিষ্টি হেসে লিসা জানতে চাইল।
‘তোমাকে।’ বলল ফাহিম।
‘কী মনে হচ্ছে?’
‘মনে হচ্ছে, এই মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে যে কোনো ছেলে বছরের পর বছর কাঁটিয়ে দিতে পারবে।’
‘তুমি পারবে?’
‘হুম।’
‘ভেবে বলছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘চল, তোমার বেডরুমটা দেখব।’
‘বেডরুমে কী?’ অবাক চোখে বলল ফাহিম।
লিসা ফাহিমের হাত ধরল। ‘সেটা গেলেই বুঝতে পারবে।’ বলেই সে ফাহিমকে টেনে নিয়ে গেল তার বেডরুমে। বেডরু‌মের এক‌টি বড় অংশ জু‌ড়ে রয়েছে একটি ডাবল সাইজ বেড। সুন্দর পরিপাটি করে পাতা। রুমে ঢুকে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে লিসা বলল, ‘আজ রাতটা যদি তোমার এখানে থেকে যেতে চাই, থাকতে দেবে আমায়?’
‘হ্যাঁ দেব। শুধু আজ কেন, যতদিন ইচ্ছে থাকতে পার।’
হঠাৎ কী হল লিসার কে জানে। সে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। ফাহিমের হাত ছেড়ে দিয়ে সে বিছানার এক কোণায় চুপ করে বসল। ফাহিম দাঁড়িয়ে রইল—চুপচাপ।
‘এই ক’টা দিন আমি ব্র্যাডকে ভুলে ছিলাম তোমার কথা ভেবে। ব্র্যাডের অপমান আমি ভুলে ছিলাম তোমার কথা ভেবে। আমি ঘুমাতে যেতাম তোমার কথা ভেবে। আমার ঘুম ভাঙত তোমার কথা ভেবে। তুমি ছিলে আমার সমস্ত দিনে। সমস্ত সময়ে।’
ফাহিম অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল লিসার মুখের দিকে।
‘অবাক হচ্ছ?’ লিসা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আমার এমন কেন হল বলতে পার?’
ফাহিম কোনো জবাব দিতে পারল না। কী বলবে সে। সে নিজেই বা কী জানে। সে নিজেও লিসাকে মিস করেছে, মনে মনে চাইছে দেখা হোক আবার। একবার হুট করে চলে গিয়ে লিসাকে সারপ্রাইজও দিতে চেয়েছিল সে। এ ক’দিন মেয়েটিকে নিয়ে কল্পনার জাল সে-ই বা কম বুনেছে? আবার, লিসাও তাকে মিস করেছে। এসবের মানে কী? এটা কি ভালোবাসা? প্রেম? এর কী ব্যাখ্যা?
ফাহিম লক্ষ করল লিসার চোখ ভেজা। আশ্চর্য মেয়েটি কাঁদছে কেন? ফাহিম লিসার পাশে গিয়ে বসল—পরম যত্নে ওর একটা হাত টেনে নিল নিজের হাতে।
লিসা তাকাল ফাহিমের দিকে—গাঢ় দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করল কিছু। এক অবরুদ্ধ, অশ্রুরুদ্ধ নারীসুলভ কামনায় ওর সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল।
তারপর হঠাৎ কী হল কে জানে, ফাহিম কে আলত করে বিছানায় ফেলে দিয়ে কী এক উষ্ণতার সঙ্গে তার ঠোঁট ছোঁয়াল ফাহিমের ঠোঁটের সঙ্গে।

দুপুরে ঝটপট খিচুড়ি রান্না করে ফেলল ফাহিম। লিসা আগ্রহ নিয়ে দেখল ফাহিমের রান্না। কী এক অদ্ভুত কারণে মেয়েটি সারাক্ষণ ছটফট করছে। একধরণের ভালোলাগায় বুদ হয়ে আছে তার শরীর মন। এক নাগারে একা একাই কথা বলে যাচ্ছে সে।
‘আমি এভাবে চলে আসায় তুমি নিশ্চয়ই অবাক হয়েছ, তাই না?’
‘অবাক হব না? এভাবে তুমি দেখা করতে আসবে, এটা আমি কল্পনাও করি নি।’
‘না এসে কি উপায় বল? তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না, ব্র্যাডের সঙ্গে ব্রেকআপের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল তুমি চলে আসার পর থেকে।’
ফাহিম অবাক হয়ে তাকাল।
‘এত সহজেই তোমাকে পেয়ে যাব, তা অবশ্য আমার ধারণা ছিল না। তবে আমি জানতাম, কোনো না কোনো ভাবে আমি তোমাকে খুঁজে বের করবই।’
‘তুমি কিন্তু এখনো বললে না।’
‘কী?’
‘আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেলে?’
‘খুবই সহজ। উবারের লস্ট এন্ড ফাউন্ডে দিন-তারিখ-সময় দিয়ে বললাম, ঐদিন মধ্যরাতে আমাকে যে রাইড দিয়েছিল, সে আমার অতি মূল্যবান একটি জিনিস নিয়ে গেছে ভুলে—সেটি আমি ফেরৎ চাই।’
‘কী? তুমি কি কিছু ফেলে গেছ গাড়িতে?’ ফাহিম দ্রুত চিন্তা করে নিল। সে তো এর মধ্যে গাড়ি পরিষ্কার করেছে—কিছু চোখে পড়েছে বলে মনে হল না। সে বলল, ‘কই কিছু দেখি নি তো।’
‘দেখবে কী করে? ওটা তো তোমার গাড়িতে নেই।’
‘তাহলে?’
লিসা উঠে গিয়ে দাঁড়াল ফাহিমের সামনে। ফাহিমের বাম বুকের ওপর তর্জনী দিয়ে টোকা দিয়ে বলল, ‘এখানে আছে। ইউ স্টোল মাই হার্ট।’ লিসা এবার ফাহিমের বুকে নিজের কান লাগিয়ে বলল, ‘আই ক্যান হিয়ার দ্য বিট। ইট’স স্টিল দেয়ার।’
ফাহিম ভাষা হারিয়ে ফেলল। আবেগে তার চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে এল। মাঝে মাঝে অনেক সুস্থ শরীরও কিছু আবেগ সহ্য করার শক্তি হারিয়ে ফেলে।

দেখতে দেখতে শনিবারের বিকেল, সন্ধ্যা, রাত এবং পরেরদিন রবিবারের অর্ধেকটা দিন চোখের নিমিষেই যেন পার হয়ে গেল। এদিকে লিসার ফিরে যাবার সময়ও হয়ে এল। দুপুর পেরিয়েছে অনেকক্ষণ হল—দিনের আলো থাকতে থাকতেই তাকে ফিরে যেতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করছিল লিসা। ওর চুল, ওর চোখ, ওর নাক, ওর কান, ওর দাঁত, ওর হাতের আঙ্গুল, ওর পায়ের পাতা সব কিছুর মধ্যে এমন একটা পরিচ্ছন্ন দীপ্তি যে ফাহিম অপলক চেয়ে রইল লিসার দিকে।
হঠাৎ চোখে তুলে লিসা বলল, ‘কী দেখছ?’
‘তোমাকে!’
‘এখনো দেখা শেষ হয় নি? এখনো কি সন্দেহ আছে? দ্বিধা আছে আরো?’
‘জানি না।’
‘তবে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?’
‘তৃপ্তি মিটছে না—কী করব?’
‘কী করলে তৃপ্তি মিটবে?’
‘জানি না।’
একটুক্ষণ চুপ থেকে লিসা বলল, ‘আমার না একেবারেই যেতে ইচ্ছে করছে না।’
ফাহিম হেসে দিয়ে বলল, ‘থাকো না—কে যেতে বলল তোমাকে?’
লিসা ঘুরে দাঁড়াল। গাঢ় কণ্ঠে বলল, ‘আমি তোমার জীবনের একটা অংশ হয়ে থাকতে চাই—আমায় জায়গা দেবে একটু?’ বলতে বলতে লিসার চোখ ভিজে এল।
ফাহিম ওকে দু’হাতে কাছে টেনে নিল। লিসা ফাহিমের বুকে মুখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। দুজনার মন কী এক আশ্চর্য কী এক অপ্রকাশ্য রোমাঞ্চকর উষ্ণতায় ভরে গেল।
লিসার আর্দ্র চোখে কী দারুণ এক খুশী ঝিলিক দিয়ে উঠল। মুহূর্তেই ওর চেহারার সব বিষাদ সরে গেল। লিসা ফাহিমের চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। ফাহিম ফিরিয়ে দিল এক নির্ভরতার হাসি।

লিসাকে তার গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে হেঁটে এল ফাহিম। লিসা মুখ নিচু করে হেঁটে এল। কিছুই বলল না। গাড়ি পর্যন্ত এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল দুজনেই। কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে ফাহিম বলল, ‘আবার কবে আসবে?’
‘তু্মি যেদিন আসতে বলবে। তবে এমন করে একদিনের জন্যে নয়—অন্তত কয়েকদিনের জন্য আসব।’
‘একেবারেই চলে আস না?’
‘যখন আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবার জন্যে তৈরি হবে—তখনই আসব। একেবারে। রাতে যেসব কথা হয়েছে মনে থাকবে তো, না?’
‘অবশ্যই মনে থাকবে।’
লিসা তাকাল আকাশের দিকে। বিকেলের রোদ পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে বলল, ‘এবার যাই।’
‘এসো।’ অস্ফুটে বলল ফাহিম।
লিসা ফাহিমকে দ্রুত একটা হাগ দিয়ে উঠে পড়ল গাড়িতে। দেরি না করে গাড়িটা ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে বের হয়ে গেল এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স থেকে।
লিসার গাড়িটি দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ফাহিম। লিসার সঙ্গে ফাহিমের অনেকখানি অশরীরী ফাহিমও উধাও হয়ে গেল।

আগের পর্ব