নাতাশা লক্ষ করল শাহেদ কোন কথা বলছে না—একেবারেই চুপ করে আছে। আজ কি তার মনটা কোন কারণে খারাপ? কিছু একটা বলতে চাচ্ছে, কিন্তু বলতে যেয়েও বলছে না।
নাতাশা নীরবতা ভেঙে বলল, ‘কী ব্যাপার শাহেদ, কথা বলছ না যে? তুমি ভীষণ অন্যমনস্ক। তোমার মন ভাল নেই? আমাকে বলবে কেন?’
শাহেদ তাকাল শূন্য দৃষ্টিতে। কিছু বলল না।
নাতাশা আবার বলল, ‘Is something wrong? আমার সঙ্গ ভাল লাগছে না?’
শাহেদ বলল, ‘না- না তা হবে কেন? কী বলছ? তোমার সঙ্গ ভাল লাগবে না কেন?’
‘তাহলে?’
একটু চুপ করে থেকে শাহেদ বলল, ‘তোমাকে চলে যেতে হবে তাড়াতাড়ি, তাইনা?
নাতাশা বলল, ‘কোথায়, কানাডায়?’
শাহেদ মাথা নাড়ল।
‘তাতো যেতে হবেই। কেন?’
‘কত দিনের ছুটি নিয়ে এসেছিলে?’ শাহেদ জানতে চাইল।
‘মাত্র দেড় মাসের ছুটি পেয়েছি। তাও তো প্রায় শেষ হয়ে আসছে।’
‘এক্সটেনশন করতে পারবে না?’
নাতাশা একটু ভেবে বলল, ‘করা যাবে না তা নয়। ইমার্জেন্সি হলে তো বাড়ানো যেতেই পারে। কেন বল তো?
‘আমার যে একটু সময় লাগবে।’ শাহেদের কণ্ঠে আকুতি।
নাতাশা কিছু বলল না।
‘হঠাৎ করে বেশ কিছু টাকার জোগাড় করতে হচ্ছে। বুঝতেই তো পারছ।’
‘না বোঝার তো কিছু নেই, অবশ্যই বুঝতে পারছি। আই উইশ, আমি তোমাকে এই সময় হেল্প করতে পারতাম…’
‘না না তোমাকে এ নিয়ে ভাবতে হবে না। ব্যবস্থা একটা হয়ে যাবে। তুমি আমাকে এত বড় একটা সুযোগ দিচ্ছ, এটাই তো কত!’
‘সাম হাউ টাকাটা যদি ম্যানেজ করতে পার, ইভেন লোন করেও যদি হয়… একবার কানাডায় গেলে দু’তিন মাসের মধ্যেই তুমি সব টাকা শোধ করে দিতে পারবে।’
নাতাশার কথা শুনে শাহেদ কিছুটা আশ্বস্ত হল। তার চেহারায় প্রশান্তির ছায়া নেমে আসল।
…
শাহেদ রান্নাঘরে এসে উঁকি দিল।
সোমা আর জাহানারা বেগম রান্নাঘরে ব্যস্ত। সোমা টুকটাক সাহায্য করছে তার মাকে। সাহায্যের চেয়ে কথাই বলছে বেশি। জাহানারা খুব আগ্রহ নিয়ে তার মেয়ের কথা শুনছে।
‘মা মেয়ে কী এত কথা হচ্ছে শুনি?’ শাহেদ রান্নাঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল।
শাহেদকে দেখে জাহানারা হেসে দিয়ে বললেন, ‘তুই নাকি কোন বিদেশী মেয়েকে বিয়ে করতে চাচ্ছিস? মেয়েটার নাকি একবার বিয়ে হয়েছিল? বয়সেও নাকি তোর চেয়ে বড় হবে?’ কৌতুহল দৃষ্টি নিয়ে তাকালেন জাহানারা।
শাহেদ হেসে বলল, ‘কী সমস্যা, এত নাকি নাকি করছ কেন? তিনটা প্রশ্ন করলে, তিনটাই নাকি দিয়ে।’
সোমা হেসে ফেলল। শাহেদ কপট রাগে তাকাল সোমার দিকে। সোমা মনে হচ্ছে কোন কিছুই বাদ রাখেনি তার মাকে জানাতে। শাহেদ আবার তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সিএনএন থেকে তো দেখি সব খবর ইতোমধ্যেই পেয়ে গেছ?’
সোমা ভেংচি কাটল শাহেদের দিকে তাকিয়ে।
শাহেদ বলল, মেয়েটা বিদেশী নয়, বাংলাদেশী। থাকে বিদেশে। মা তোমার সঙ্গে আমার জরুরী কিছু কথা আছে।’ শাহেদ এবার সোমার দিকে ঘুরে বলল, ‘এই যে ক্রিস্টিনা আমানপোর দয়া করে আপনি কি এখান থেকে একটু যাবেন?’
সোমা বলল, ‘যাব কেন? যা বলার তোমাকে আমার সামনেই বলতে হবে। আমি এত বড় একটা স্যাক্রিফাইস করলাম—আমার বিয়ের ফান্ডের টাকা তোমাকে দিলাম আর আমাকেই কিনা বলছ চলে যেতে? হাউ রুড? আই অ্যাম অ্যা পার্ট অফ দিস প্রজেক্ট ভাইয়া, তুমি আমাকে চলে যেতে বলতে পার না।’
‘ঠিক আছে, তোকে যেতে হবে না।’
জাহানারা বললেন, ‘বল কী বলবি।’
একটু ভেবে শাহেদ বলল, ‘দেশে থেকে তো কিছু হচ্ছে না, আর কিছু হবে বলেও মনে হয় না। ঐ মেয়েটাকে বিয়ে করে আমি বিদেশ যেতে চাই।’
‘কিন্তু মেয়েটা সম্পর্কে ভালোমতো জানতে হবে না?’ জাহানারা আশঙ্কা প্রকাশ করে বললেন, ‘ওর বাবা-মাকে আসতে বল কথা বলি।’
‘ওর বাবা-মাকে আমি কোথায় পাব? ওরা থাকে কানাডায়। আর বিয়ে তো আমি ওর বাবা-মাকে করব না। যাকে করব তার সম্পর্কে আমি যতটুকু জেনেছি, তাতে আমি স্যাটিসফায়েড। নাতাশা খুবই ভাল মেয়ে।’
জাহানারা বললেন, ‘ভাল মেয়েই যদি হবে তবে তার ডিভোর্স হল কেন?’
শাহেদ মুখ কালো করে ফেলল।
সোমা শাহেদের পক্ষ নিল। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমার ছোট বোন, মানে আমার ছোট খালা–তারও তো একবার ডিভোর্স হয়েছিল মা, সে কি খারাপ মেয়ে?’
জাহানারা বিরক্ত কণ্ঠে বললেন, ‘তুই কথার মধ্যে কথা বলছিস কেন?’
‘আই অ্যাম অ্যা পার্ট অফ দিস প্রজেক্ট মাম! আমাকে তো কথা বলতেই হবে!’
জাহানারা চূড়ান্ত বিরক্ত হলেন। তিনি ভ্রূ কুঁচকে বললেন, ‘মাম? আমার সঙ্গে ইংরেজি বলবি না।’
শাহেদ বলল, ‘কী শুরু করলে তোমরা? আর এটা কী ধরণের কথা মা? একবার বিয়ে হলেই কেউ খারাপ হয়ে যায় না। আমি ওর সব কথাই জেনেছি মা, খুবই ভাল মেয়ে। ট্রাষ্ট মি!’
সোমা বিদ্রূপাত্মক হাসির রেখা চোখে-মুখে ফুটিয়ে তুলে বলল, ‘বাংলা বল ভাইয়া।’
শাহেদ ওর মায়ের কাছে ঘেঁষে দাঁড়াল। মায়ের ঘাড়ে হাত রেখে আবদারের সুরে বলল, ‘মা শোন, আমার আরও বেশ কিছু টাকা লাগবে। কিছু একটা ব্যবস্থা কর। দরকার হলে বড় মামার কাছ থেকে লোন করে এনে দাও।’
জাহানারা মাথা নেড়ে বললেন, ‘না না, সেটা সম্ভব নয়। আমি কোন লোন-ঠোন চাইতে পারব না।’
‘কেন পারবে না?’
‘এত কিছু তো বলতে পারব না। পারব না, ব্যাস।’
শাহেদের মন খারাপ হল। সে কী করবে বা কী করবে বুঝতে পারল না।
সোমা বলল, ‘আই হ্যাভ অ্যান আইডিয়া।’
জাহানারা কঠিন কণ্ঠে বললেন, ‘তোকে আর আইডিয়া কপচাতে হবে না। তুই যা আমার সামনে থেকে।’
শাহেদ অনুনয় করে বলল, ‘আহা মা, শুনিই না ওর আইডিয়াটা কী?’
জাহানারা চুপ করে রইলেন। শাহেদ সোমাকে ইশারা করল।
সোমা বলল, ‘আমাদের গ্রামের বাড়ির অনেক জমি পড়ে আছে ছোট চাচার দখলে। জমিগুলো ফেরত পাবার কোন আশা নেই। ফসলেরও কোন ভাগ আমরা পাইনা। ওখান থেকে কিছু জমি বিক্রি করে দিলেই হয়। চাচা কিছু বললে তোমরা বলবে শাহেদ বিদেশ যাবে, টাকা দরকার।’
শাহেদ উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘এক্সেলেন্ট! এক্সেলেন্ট আইডিয়া। ইউ আর অ্যা ব্রিলিয়ান্ট সিস্টার। মা তুমি আজ রাতেই বাবার সঙ্গে কথা বলবে। হাতে একদমই সময় নেই। প্লিজ!’ শাহেদের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
জাহানারা বেগম হ্যাঁ না কিছু বললেন না।
সোমা বলল, ‘ভাইয়া তুমি চিন্তা করনা। আব্বুকে আমি বোঝাব। ধরে নাও কাজটা হয়ে গেছে। ডান!’
ওর মাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শাহেদ দ্রুত রান্নাঘর থেকে বের হয়ে গেল।
…
রাত বেশি হয় নি।
জাহানারা শোবার ঘরে ঢুকে দেখলেন রাকিবউদ্দিন সাহেব বিছানায় শুয়ে আছেন। তিনি কপালের দু’পাশে চেপে ধরে আছেন। তার কি মাথা ব্যথা হচ্ছে না কিছু নিয়ে চিন্তা করছেন বোঝা গেল না। জাহানারা স্বামীর পাশে এসে দাঁড়িয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ‘এই তোমার কি শরীর খারাপ? মাথা ব্যথা করছে? মাথা টিপে দিব?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব নির্লিপ্ত কণ্ঠে বললেন, মাথা টিপতে হবে না, যা বলতে চাও সরাসরি বলে ফেল। ভূমিকার দরকার নেই।’
একটু আমতা আমতা করে জাহানারা বললেন, ‘শাহেদের ব্যাপারে একটা আলাপ ছিল…’
‘আলাপ জমবে না। এ ব্যাপারে আমার কোন আগ্রহ নেই।’
জাহানারা অবাক হয়ে বললেন, ‘মানে? আমি কী বলতে চাইছি, তুমি না শুনেই…’
‘শুনেছি, সোমা সব বলেছে আমায়।’
জাহানারা খুব আগ্রহ নিয়ে বললেন, ‘এমন একটা সুযোগ, তোমার কি মনে হয় না আমাদের সায় দেয়া উচিৎ?’
শীতল কণ্ঠে রাকিবউদ্দিন সাহেব বললেন, ‘তোমার মনে হলে তুমি দাও। কিন্তু গ্রামের কোন জমি আমি বিক্রি করব না।’
সোমা এসে দাঁড়াল শোবার ঘরের দরজায়। মাথা ঢুকিয়ে বলল, ‘বাবা, আসব?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব উঠে বসলেন। বললেন, ‘আয়, তবে কোন লাভ হবে না। তোকে যা বলার বলে দিয়েছি।’
সোমা তার বাবার কাছে এসে মোলায়েম সুরে বলল, ‘ওয়ান লাস্ট থট দিয়ে দেখবে নাকি? আই হ্যাভ অ্যানাদার আইডিয়া… বলব?’
‘আই অ্যাম নট ইন্টারেস্টেড।’ রাকিবউদ্দিন সাহেব কোন রকম আগ্রহ দেখালেন না।
‘আহা শোনই না।’ সোমা বলল, ‘আমি বলছিলাম কী, জমি বিক্রি করার দরকার নেই। তুমি ছোট চাচাকে বলবে জমিগুলো বন্ধক রেখে টাকা দিতে, ভাইয়া দু’তিন মাসের মধ্যেই টাকা পাঠিয়ে দিবে, তুমি জমিগুলো তখন আবার ছাড়িয়ে নেবে। ইটস দ্যাট সিম্পল।’
রাকিবউদ্দিন সাহেব তাকালেন সোমার দিকে। তারপর তাকালেন তার স্ত্রীর দিকে।
জাহানারার চেহারায় ব্যাকুলতা ফুটে উঠল।
…
ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিস।
শাহেদ টাকা নিয়ে এসেছে। এজাজ সব টাকা একবার গণনা শেষ করে তাকাল শাহেদের দিকে।
শাহেদ বলল, ‘এজাজ ভাই, সব ঠিক আছে তো? ঠিকমত গুনেছেন?’
এজাজ বলল, ‘কী যে বলেন ভাইজান। জেন্টেলম্যান্স ডিলিং, না গুনলেও অসুবিধা ছিল না, আপনে বারে বারে বলেন দেইখাই গুনাগুনির ঝামেলায় যাই, হে হে হে।’
শাহেদ এবার জামানের দিকে ঘুরে বলল, ‘জামান ভাই, কাগজপত্র কতদূর, প্রসেসিং হচ্ছে তো তাইনা?’
‘সবকিছুই ঠিকমত হচ্ছে।’ জামান মাথা ঝুঁকিয়ে নিচু গলায় বলল, ‘তবে সবচেয়ে জরুরী কাজটা এখন সেরে ফেলা দরকার।’
শাহেদ তাকাল উৎসুক দৃষ্টি নিয়ে।
‘আপনাদের বিয়েটা রেজিস্ট্রি করতে হবে এবং ইমিডিয়েটলি নোটারি করে অ্যাম্বাসিতে জমা দিতে হবে।’
শাহেদ কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল, ‘বিয়েটা কোথায় হবে?’
‘সেটা আপনারা দুজন মিলে যে ডিসিশন নিবেন সেভাবেই হবে। তবে এই মুহূর্তে ব্যাপারটা যত সিক্রেট থাকে তত ভাল। তাছাড়া-’
‘তাছাড়া?’
‘নাতাশা ম্যাডামের পারসোনাল কিছু ঝামেলা আছে…’
শাহেদ বিচলিত হল। সে শঙ্কিত ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কিসের ঝামেলা? কই আমিতো কিছু জানিনা?’
‘আপনি বরং তার সাথেই কথা বলেন।’
‘ঠিক আছে আমি আসি।’
শাহেদ রাজ্যের চিন্তা নিয়ে উঠে দাঁড়াল। সে চলে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই এজাজ ডাকল, ‘ভাইজান-’
শাহেদ তাকাল এজাজের দিকে।
এজাজ বলল, ‘একটু বসেন। আর এক কাপ চা খান।’
শাহেদ বসল না। দাঁড়িয়েই বলল, ‘না না আর চা খাব না। বলেন কী বলবেন?’
এজাজ কাঁচুমাচু ভঙ্গিতে বলল, ‘বিয়ের রেজিস্ট্রি এবং নোটারি করতে কিছু খরচ হবে তাতো বুঝতেই পারতেছেন। হাজার বিশেক টাকা সাথে রাইখেন। এর বেশি হয়তো লাগবে না। আর লাগলে তো একটা ব্যবস্থা হবেই-’
শাহেদের মুখ শুকিয়ে গেল। সে অবিশ্বাস্যভাবে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল এজাজের দিকে।
ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৮)
with
no comment

