marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-৫)

ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে বসে আছে অনেকক্ষণ থেকে শাহেদ। কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে না জামান কিংবা এজাজের সঙ্গে। দুজনেই ব্যস্ত—টাকা গণনা আর অ্যাপ্লিকেশন দেখা নিয়ে। আরো বেশ কয়েকজন নতুন প্রার্থীকেও দেখা যাচ্ছে অপেক্ষা করছে। শাহেদ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল। কিন্তু তার মাথায় আসছে না—আরো নতুন প্রার্থীর কাছে থেকে টাকা কেন নেয়া হচ্ছে। নাতাশার কথায় তো মনে হল, শাহেদকে সে পছন্দ করেছে! তাহলে? শাহেদ চিন্তিত মুখে বসে রইল।
জামানের সামনে বসা যুবক সরে যেতেই শাহেদ উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গিয়ে জামানকে লক্ষ করে বলল, ‘আপনারা কি আরও ক্যান্ডিডেট দেখবেন নাকি? আমি তো ভেবেছিলাম—’
শাহেদকে কথা শেষ করতে না দিয়ে এজাজ বলল, ‘জাস্ট ব্যাকআপ। ব্যাকআপ হিসেবে আরও কিছু ক্যান্ডিডেট লিস্ট কইরা রাখতেছি। বলা তো যায় না, তাই না?’
শাহেদ বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘বুঝলাম না। ব্যাকআপ মানে কী?’
‘বুঝায়ে বলতেছি। ব্যাকআপ মানে—এই ধরেন আপনে যদি কোন কারণে টাকার জোগাড় করতে না পারেন, অথবা মাইন্ড চেঞ্জ কইরা ফালান, তখন আমরা কী করব?’
শাহেদ দ্রুত বলল, ‘না- না মাইন্ড চেঞ্জ করব কেন? মাইন্ড চেঞ্জ করার প্রশ্নই আসে না। তাহলে তো আর আসতামই না?’
‘আপনের তো আরও তিনদিন আগে আসার কথা ছিল। কি, ছিল না বলেন?’
শাহেদ ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘তাইলে আপনেই বলেন, আমাদের দোষটা কোথায়?’
শাহেদ ইতস্তত করে বলল, ‘ইয়ে মানে, এতগুলো টাকা জোগাড় করতে একটু সময় লেগে গেল। বুঝতেই তো পারছেন।’
জামান এতক্ষণ এজাজ আর শাহেদের কথা শুনছিল। এবার সে মাথা সামনে এনে বলল, ‘শুনেন শাহেদ সাহেব, কিছু মনে করবেন না। এর আগে দু’বার আমাদের এধরণের সমস্যা হয়েছিল।’
‘কী রকম?’
‘বসুন বলছি।’
শাহেদ বসল। জামান আবার সামনে ঝুঁকে বলল, ‘আমাদের দু’জন ক্লায়েন্ট- একজন আমেরিকান সিটিজেন, একজন ব্রিটিশ—তারা পাত্র পছন্দ করল। পাত্র মহা আনন্দে চলে গেল, কিন্তু আর ফিরে আসল না।’
শাহেদ অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে বলল, ‘বলেন কী? ফিরে আসবে না কেন? এমন সুযোগ কেউ হাত ছাড়া করে?’
জামান তার বিখ্যাত হাসি মুখে এনে বলল, ‘জি! একবার ভেবে দেখেন!’
এবার এজাজ শাহেদের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, সাধেই কি আর ব্যাকআপের চিন্তা করতেছি ভাইজান? অভিজ্ঞতা, বুঝলেন অভিজ্ঞতা। আমরা যা করি সব কিছুর পিছনেই একটা ভ্যালিড রিজন থাকে। ভ্যালিড রিজন ছাড়া আমরা কোন কাজ করিনা।’ বলেই সে জামানের দিকে তাকাল।
জামান তাকে সমর্থন করে বলল, ‘তবে এর একটা অলটারনেটিভ অবশ্য আছে। আপনি যদি জেনুইনলি সিরিয়াস হন, তাহলে আপনাকে বলতে পারি।’
শাহেদ রাগান্বিত স্বরে বলল, ‘আপনাদের কাছে কি আমাকে যথেষ্ট সিরিয়াস মনে হচ্ছে না?’
‘জি হচ্ছে, কেন হবে না?’
‘বলুন আমাকে কী করতে হবে?’
‘সিকিউরিটি ডিপোজিট দিয়ে আপনি এই ডিলটা ক্লোজ করে ফেলতে পারেন। সেক্ষেত্রে নাতাশা ম্যাডামও আর অন্য কোন পাত্র দেখবেন না, পছন্দ কিংবা বিয়ে করা তো দুরের কথা।’
শাহেদের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। সে ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট? কত?’
‘এ ধরণের সিচুয়েশনে আমরা লাখ খানেক নিয়ে থাকি। তবে আপনি পঞ্চাশ হাজার দিলেই চলবে। আফটার অল ম্যাডামের পছন্দের লোক আপনি!’
শাহেদের মাথায় কিছু ঢুকছে না। এসব কথা তাকে আগে কেন বলা হয় নি? এখন আবার এতগুলো টাকা সে জোগাড় করবে কীভাবে? শাহেদ চুপ করে রইল।
এবার এজাজ ব্যাখ্যা করে বলল, ‘আপনে যে ক্যানাডা যাবেন, মত বদলাবেন না এবং নিশি ম্যাডাম সরি নাতাশা ম্যাডামও অন্য কোন পাত্র দেখবেন না—এইটা হইল তার নিশ্চয়তা।’
শাহেদ শূন্য দৃষ্টিতে একবার এজাজ আর একবার জামানের দিকে তাকাল। সে ছোট করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়াল।

শাহেদ ডাইনিং টেবিলে মুখ অন্ধকার করে বসে আছে। আরো কিছু টাকা লাগবে, একথাটা বলার সাহস তার নেই। কিন্তু টাকাটা ছাড়া এত বড় একটা সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যাবে সেটাও সে মেনে নিতে পারবে না। শাহেদ কয়েকবার তার বাবার দিকে তাকাল। আবার টাকা চাইলে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সেটা ভেবেই শাহেদের মুখ আরো অন্ধকার হয়ে গেল।
রাকিবউদ্দিন সাহেব হঠাৎ করেই তাকালেন শাহেদের দিকে। শাহেদ চোখ নামিয়ে নিল সাথে সাথেই।
‘শাহেদ, কিছু বলবে?’ রাকিব সাহেব খাওয়া থামিয়ে বললেন।
‘জি? জি না, কিছু না।’
সোমা শাহেদের অবস্থা দেখে বলল, ‘ভাইয়া, ভয় পাচ্ছ কেন? বলে ফেল? তোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে, তুমি কিছু বলতে চাও। You have something in mind.’
শাহেদ চুপ করে রইল।
‘তা তোমার লাইফ টাইম অপরচুনিটি প্রোজেক্টের কী সিচুয়েশন? তোমার মাকে বলেছ, তোমার না কি আরও কিছু টাকা লাগবে?’
শাহেদ অবাক চোখে তাকাল তার মায়ের দিকে। ম্যারেজ মিডিয়া অফিস থেকে ফিরে সে তার মাকে বলেছিল বাবাকে বলতে, তার আরো কিছু টাকা লাগবে। জাহানারা বেগম সরাসরি বলে দিয়েছে, আমি পারব না। তোমার সমস্যার কথা তুমিই বল। এখন দেখা যাচ্ছে তার মা ঠিকই বলেছে।
শাহেদ বলল, ‘জি।’
‘টাকাটা দিয়ে তুমি কী করছ ডিটেইল না জেনে আর তো কোন টাকা দেয়া যাবে না।’ রাকিবউদ্দিন সাহেব পরিষ্কার জানিয়ে দিলেন।
শাহেদ খানিকটা ইতস্তত কণ্ঠে বলল, ‘বিষয়টা এই মুহূর্তে ডিসক্লোজ করতে চাচ্ছি না, বাবা। কয়েকটা দিন পড়ে বলি?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব বিরক্ত হলেন। তিনি কঠিন স্বরে বললেন, ‘কী এমন সিক্রেট যেটা ফ্যামিলিতে শেয়ার করতে পারছ না? অথচ কয়েকদিন পর পর এসে টাকা চাচ্ছ? তোমার কি ধারণা, আমি টাকার গাছ লাগিয়েছি?’
শাহেদ অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল তার মায়ের দিকে। জাহানারা ছেলের অসহায়ত্ব অনুধাবন করে তার স্বামীকে বললেন, ‘আহা, কয়েকটা দিন না হয় অপেক্ষা কর। এতো অস্থির হচ্ছ কেন?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব আর কোন কথা বললেন না।
সবাই চুপ করে আছে। সবার মনোযোগ খাবার প্লেটে। শাহেদ তার বাবার দিকে একদৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, ‘টাকাটা কি পাচ্ছি?’
রাকিবউদ্দিন সাহেব শীতল গলায় বললেন, ‘তুমি ভাল করেই জান, আমার কাছে এমন কোন টাকা নেই যে চাওয়া মাত্রই পাওয়া যাবে। আমাকে ভেবে দেখতে হবে।’
শাহেদ খাওয়া শেষ না করেই উঠে পড়ল। জাহানারা দ্রুত বললেন, ‘কী হল, খাওয়াটা শেষ করে যা।’
শাহেদের মুখ থমথমে। সে কিছু না বলে চলে গেল তার রুমে।
জাহানারা তাকালেন তার স্বামীর দিকে। রাকিবউদ্দিন স্ত্রীর দৃষ্টি উপেক্ষা করে সোমাকে বললেন, ‘ডালটা এদিকে দে তো মা।’

রাত ১১টা।
শাহেদের মন খারাপ। ভীষণ রকমের মন খারাপ করে সে শুয়ে আছে তার বিছানায়। তাকিয়ে আছে সিলিং এর দিকে। চোখের দৃষ্টিতে শূন্যতা। আরো পঞ্চাশ হাজার টাকা! কিভাবে এত টাকা জোগাড় করবে সে? তার বাবা যদি তাকে সে টাকাটা না দেয় তাহলে সব স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে এখানেই। সে এপাশ ওপাশ করছে, কিছুই ভাল লাগছে না।
শাহেদের ফোন বেজে উঠল। ফোন হাতে নিয়ে দেখল অপরিচিত নাম্বার। সে ফোন রেখে দিল। ফোনটা আবার বাজল। সে আবার কাটল। তৃতীয় বারে সে ফোনটা ধরে বিরক্তি কণ্ঠে বলল, ‘হ্যালো?’
‘বলুন তো আমি কে? বলতে পারলে আপনার জন্যে একটা সারপ্রাইজ গিফট।’
মুহূর্তেই শাহেদের চেহারার রঙ বদলে গেল। তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘আপনি সেই- যার কণ্ঠ শোনার জন্যে প্রতিটি রাত আমি অপেক্ষা করি। আপনি সেই- যাকে আরেকবার দেখার জন্যে আমার চোখ দুটি-’
‘ব্যাস ব্যাস, আর কাব্য করতে হবে না। আবার আপনি আপনি কেন?’
‘তুমিইতো শুরু করলে।’ একটু থেমে শাহেদ আবার বলল, ‘তুমি ফোন নাম্বার চেঞ্জ করেছ না কি? নাম্বারটা চিনতে পারছিলাম না।’
‘আরে না- এটা প্রাইভেট নাম্বার। এটা দিয়ে সবার সঙ্গে কথা বলি না। সিক্রেট নাম্বার বলতে পার।’
শাহেদ কিছুটা সময় নিয়ে গভীর কণ্ঠে বলল, ‘তোমাকে না খুব দেখতে ইচ্ছে করছে। এভাবে শুধু ফোনে কথা বলে মন ভরে না।’
‘তাই নাকি? তা কতখানি দেখতে ইচ্ছে করছে শুনি?’ দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল নাতাশা।
‘অনেক। অনেক খানি। তোমাদের নায়াগ্রা ফলসে যত পানি গড়িয়ে পড়ে, তার চেয়েও বেশি।’
‘বাব্বাহ, তাহলে তো আর দেরী করার উপায় নেই। উমম, একটা কাজ অবশ্য করা যায়। কালকে আমি মোটামুটি ফ্রি। তোমার সময় হবে?’
‘হবে না মানে, কী বল? মিলিয়ন টাইমস হবে।’ শাহেদের কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
‘তাহলে, কাল সকাল দশটায়। না না এগারোটায়—ঠিক এগারোটায় তুমি আমাকে পিক করবে, ওকে? এড্রেস দিচ্ছি লিখে নাও।’
‘কিন্তু আমার যে গাড়ি নেই।’
‘গাড়ি নেই তো কি হয়েছে? আমরা রিক্সায় ঘুরব।’
‘রিক্সায়?’ শাহেদ বিস্মিত কণ্ঠে বলল।
‘হ্যাঁ, রিক্সায়।’
‘তোমার ভয় লাগবে না?’
‘ভয় লাগবে কেন? আমি বুঝি রিক্সায় কোনদিন চড়ি নি? তোমাকে নিয়ে সারাদিন ঘুরব, লাঞ্চ করব, কথা বলব।’
শাহেদ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘Wow, that’s sounds like a date.’
‘It’s a date! তাহলে এড্রেসটা লিখ। কাগজ কলম আছে?’
‘Just a minute…’
শাহেদ বিছানা থেকে নেমে পাশের টেবিল থেকে নোট খাতা আর কলম নিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ বল।’
ঠিকানা লেখা হলে নাতাশা ফোন কেটে দিল। যদিও শাহেদের আরো কিছুক্ষণ কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল। সকালেই তো দেখা হবে, এই সান্ত্বনা নিয়ে সে ঘুমাতে গেল। অনেকক্ষণ শুয়ে থেকেও ঘুমের কোন খবর হল না। এপাশ ওপাশ ফিরছে আর ঘুম নিয়ে ভাবছে কেন ঘুম আসছে না!
কিন্তু শাহেদের মনে এরকম ব্যাকুলতা কেন! কেন ওর এমন অস্থির লাগছে!

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Tags: No tags

Add a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *