দীর্ঘ বিমান ভ্রমণের সময় একজন ভ্রমণকারী যখন বিভিন্ন টাইম জোন দ্রুত অতিক্রম করে, তার শরীর যে সময় যে অঞ্চলের উপরে যায়, সেইমতো কাজ করতে থাকে। একজন ভ্রমণকারী কতদূর ভ্রমণ করল তার উপর নির্ভর করে কত সময়ে শরীর নতুন অঞ্চলের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারবে। সেই সময়টাতে ভ্রমণকারী বিভিন্ন টাইম জোনের দ্রুত পরিবর্তনজনিত কারণে ক্লান্তিতে ভোগে, মাথা ঝিমঝিম করে ও ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। একধরণের অস্বস্তিকর অনুভূতির এই উপসর্গকে বলে জেটল্যাগ।
বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার সময়ের পার্থক্য কোথাও ১০ ঘণ্টা, কোথাও ১১ ঘণ্টা, কোথাও ১২ ঘণ্টা। শিকাগো শহরটি আমেরিকার মধ্যাঞ্চলে অবস্থান করায় বাংলাদেশের সঙ্গে সময়ের পার্থক্য ঠিক ১২ ঘণ্টা। ডেলাইট সেভিংস এর সময় পার্থক্য হয় ১১ ঘণ্টা।
আজ চারদিন হয়ে গেল, কিন্তু ফাহিমের জেটল্যাগের প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটে নি। প্রতিদিন ভোর তিনটা চারটা অবধি সে জেগে থাকে, ঘুমলেও ঘুম ভেঙে যায়। তারপর চুপচাপ শুয়ে থেকে ভাবনার জগতে ডুবে থাকা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না তার। ভোরের দিকে চোখ ভেঙে আসে আবার একটু পরেই ছোট বোন লীনার ডাকাডাকিতে নাস্তার টেবিলে যেয়ে বসতে হয়। সকালে নাস্তার টেবিল সাজানো হয় হাতে বানানো পরাটা, আটার রুটি, শিম দিয়ে আলু ভাজি অথবা টাটকা সবজির নিরামিষ সাথে ডিম ভাজি, মুরগীর মাংস আর সুজির হালুয়া দিয়ে। বিদেশে বিভূঁইয়ে এসব খাবার চাইলেও পাওয়া যায় না। দেশে এলে ফাহিম তাই সকালের নাস্তাটা খুব আনন্দ নিয়ে খায়।
নাস্তা সেরে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ গরম চা নিয়ে ফাহিম লিখতে বসল সিমিকে। গত দুই দিন সিমির সঙ্গে দেখা হয় নি। দেখা না হবার অবশ্য কারণ আছে। ফাহিম ওর মা, ছোট বোন, আর বোনের স্বামীকে সঙ্গে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য এসেছে ওদের গ্রামের বাড়িতে। ও জানে ফিরে যাওয়ার সময় এলে তাড়াহুড়োতে আর হয়তো আসাই হবে না।
সিমির সঙ্গে ফোনে আর এমএসএর মাধ্যমে কথা হচ্ছে তবুও সিমির কড়া নির্দেশ, সময় বের করে মেইল লিখতে হবে। গতকাল থেকে ফাহিমের মাথায় কুমার বিশ্বজিতের গাওয়া রবীন্দ্র সঙ্গীতের একটা লাইনই শুধু ঘুরছিল। সে কী মনে করে মেইলের সাবজেক্টে সেই লাইনটি লিখল: আমার বেলা যে যায় সাঁজ বেলাতে, তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে…
প্রিয়তমা সিমি,
বলেছ, দেখা হোক বা না হোক, মেইল লেখা যেন বন্ধ না করি। কথা যেহেতু দিয়েছি, কিছু একটা তো লিখতেই হয়। তাই লিখছি। যদিও ঠিক বুঝে উঠতে পারছি না, কী লিখব?
গতকাল প্রায় সারা রাতটাই আমি জেগে ছিলাম। ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত এপাশ ওপাশ করেছি। ঘুমের নিষ্ফল চেষ্টা। আমি কম ঘুমাই ঠিকই তাই বলে একেবারেই নির্ঘুম কাটবে সেটা ভাবি নি। আমি সেই অর্থে ইনসোমনিয়াক নই। তবুও এমন হলো। জেটল্যাগের প্রভাব হয়ত কাটে নি পুরোপুরি। সেটাও একটা কারণ হতে পারে। কারণ যাই হোক, এই দীর্ঘ রাত আমি বিভিন্ন রকমের ভাবনায় ডুবে ছিলাম। কিন্তু তার মধ্যে বিজ্ঞাপন বিরতির মতো প্রতিটি ভাবনার মাঝেই নিয়মিত বিরতি দিয়ে দেখা দিয়েছ তুমি। তোমার কথাই ভেবেছি খণ্ড খণ্ডভাবে। এক পর্যায়ে নিজের সঙ্গেই যুদ্ধ করলাম—কেন আমার মগজে চিন্তা চেতনায় শুধুই তুমি। এ আমি কী করছি? কী হচ্ছে এসব, কেনোইবা হচ্ছে। নিজেকে ঝাঁকি দিয়ে বললাম, ওয়েক আপ ফাহিম! এসব কী? তুমি অবাস্তব স্বপ্নে বিভোর হয়ে আছ। ওয়েক আপ!
হঠাৎ করেই আমি অনুধাবন করলাম, সত্যিই তো তাই। আমাকে বাস্তবে ফিরে আসতে হবে। অনেকভাবে আমি স্থির হলাম। আমি এখন জানি—আমি ঠিক কী চাই। আমাকে কী করতে হবে।
সব সম্পর্কেরই কিছু স্তর থাকে। তার একটি হচ্ছে প্রবল আকর্ষণের স্তর। প্রথম দর্শনেই প্রেম বলো বা বন্ধুত্বের চৌকাঠ পেরিয়ে প্রেমের উঁকিঝুঁকিই বলো—এই স্তরে আকর্ষণের টান থাকে প্রচণ্ড তীব্র। এ সময়টা শুধুই হরমোনের তীব্রতা আর ওঠাপড়ার সময়! তুমি কি বুঝতে পারো?
আমাদের নির্মল বন্ধুত্বের ওপরে আর কোনো সত্যি নেই। এর চেয়ে জরুরীও কিছু নেই। আমি অবশ্যই চাইব আমাদের এই সম্পর্ক চাপ ও চিন্তামুক্ত রাখতে। আমি তোমার কাছে এমন কিছুই চাইব না, যা তোমাকে অস্বস্তিতে ফেলে দেয়। আমি এমন কিছুর জন্য অস্থিরও হতে চাই না। যা আমার প্রাপ্য নয়, তা পাওয়ার অধিকারও আমার নেই।
আমি জানি না, এসব কথা আমি কেন লিখছি তোমাকে? শুধু তোমাকে জানাতে চাই, আমি তো এমন না। তুমি যাকে এখন দেখছ, সে মোটেও আমি নই।
নিজেকে ভালো রেখো। নিজের মধ্যেই থেকো। হাল ছেড়ো না। আমি এবং আমার শুভ কামনা সমসময়ই থাকবে তোমার জন্য।
অফুরান ভালোবাসা।
—ফাহিম
…
অফিসে বসেই ফাহিমের মেইল পেল সিমি এবং কোনো এক ফাঁকে দ্রুত উত্তরও লিখল সে।
ফাহিম,
সুন্দর একটা মেইল পাঠানোর জন্য অনেক ধন্যবাদ।
আমি ঠিক তোমার মেইলের উত্তর লিখতে বসি নি। শুধু তোমাকে জানাতে চাচ্ছি যে আমি ভীষণ খুশি হয়েছি এটা জেনে যে তুমি আমার সেদিনের ব্যবহারে কিছু মনে করো নি। আমার ইমোশনকে কোনো প্রশ্রয় তুমি দাও নি। একদিকে ভালোই করেছ। আমি সত্যিই খুশি হয়েছি এটা জেনে যে তুমি আমার বন্ধু হিসেবেই থাকতে চাও। সেটিই আসলে আমার সবচেয়ে বেশি দরকার। এই মুহূর্তে তোমার মতো একজন ভালো বন্ধুর বড়ই অভাব।
অনেক কিছু লেখার আছে কিন্তু অফিসে বসে দীর্ঘ ইমেইল লেখা যাবে না। আমি বাসায় ফিরে তোমার মেইলের উত্তর লিখব, ততক্ষণ পর্যন্ত…
অনেক অনেক ভালোবাসা তোমার জন্য।
বর্ষা aka সিমি
…
রাতে হাতের সব কাজ সেরে সিমি লিখতে বসল।
ফাহিম, প্রিয় বন্ধু আমার—
তুমি কি জানো, কেন আমি তোমাকে এত পছন্দ করি? কারণ, তোমার মধ্যে একধরণের শক্তি আছে, অথবা সম্মোহনী, যা চুম্বকের মতো অন্যকে আকৃষ্ট করে। আমি ঠিক বলতে পারব না, সে শক্তিটা আসলে কী! আমি এও বলতে পারব না কতটা শক্তিশালী সেই ক্ষমতা, অথবা সেই শক্তি আমার ওপর কীভাবে কাজ করেছে, কিন্তু স্বীকার করতে ভয় নেই যে আমি তোমার প্রতি ভীষণ রকমের আকৃষ্ট হয়েছি। এটা সম্পূর্ণই ভিন্ন ধরণের একটা অনুভূতি। এই অনুভূতির কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। শুধু জানি, আমার ভীষণ ভালো লাগছে। তোমার পাশে কোনো কথা না বলে চুপচাপ বসে থাকাতেও শান্তি।
প্রেমে তো তুমি পড় নি, পড়েছি আমি। আমি সত্যিই প্রেমে পড়েছি। সামনে সমূহ বিপদ আমার। একটু একটু লোভ হচ্ছে, সাধ জাগছে। অভুক্ত আমি কত কিছু পেতে চাই। জানি, কিছু চাওয়া অপূর্ণই থেকে যায়। সব চাওয়া পাওয়া হয় না। কখনোই। তবুও মনের ওপরে তো জোর চলে না। মনকে তার নিজস্ব গতিতেই চলতে দেয়া উচিৎ।
নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করছ কেন তুমি? তুমি এমন কিছুই করো নি। তোমার আগ্রহ কিংবা অস্থিরতা যা দেখা যাচ্ছে, তা আর কিছুই নয়—আমার প্রতি তোমার ভালো লাগার অনুভূতি বা উচ্ছ্বাসের বিস্ফোরণ বলতে পারো। এটা নিয়ে মন্দ লাগা কিংবা নিজেকে অন্যকিছু ভাবার তো দরকার দেখি না। এটাই কি স্বাভাবিক নয়?
সেদিন আমার অনুভূতিকে তুমি প্রশ্রয় দিয়েছ খানিকটা। আমি তোমার অনুভূতিকে। একই দোষে আমিও দোষী—ব্যস, কাটাকাটি। আমি কিছুই মনে করি নি। সত্যি বলছি।
তবে এটা ঠিক, তোমাকে ঘোর ভেঙে বাস্তবে ফিরে আসতে হবে, এই জন্যে যে, তুমি পৃথিবীর একজন অনিন্দ্য সুন্দরী চমৎকার নারীর সঙ্গে বৈবাহিক সূত্রে আবদ্ধ। আর এদিকে আমি একজন স্বামীহীনা বিধবা নারী। শুনতে যত খারাপই লাগুক, সত্যকে তো আর অস্বীকার করা যাবে না।
তুমি ভীষণ কোমল হৃদয়ের একজন মানুষ, ফাহিম। যে কোনো মানুষের কষ্টেই তুমি সমব্যথী হও। তোমার নাচারটাই এমন। আর যেহেতু তুমি আমাকে পছন্দ করো (একটু বেশিই—থ্যাংক ইউ ফর দ্যাট!), সেখানে আমার কষ্ট তোমাকেও যে কষ্ট দেবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তারমানে আমার কষ্ট, অসহায়ত্ব, একাকীত্ব এসবই আমার প্রতি তোমার একধরণের ভালোলাগার সৃষ্টি করেছে। আমার প্রতি যে টানটা তুমি অনুভব করো, সেটা একধরণের মায়া। এটা তো খারাপ কিছু না, ফাহিম। সত্যি বলতে কী, আমার ভাবতে ভালো লাগছে যে, পৃথিবীতে এখনো এমন কিছু মানুষ আছে, যাদের জন্য নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে করে, বেঁচে থাকার অনুপ্রেরণা পাই।
রানা যখন চলে গেল, আমার মনে হয়েছিল আমিও খুব তাড়াতাড়ি চলে যাব। রানাকে হারানোর ক্ষতি আমি সহ্য করতে পারব না। অথচ দেখো, আমি শুধু যে সহ্যই করেছি তা কিন্তু নয়, আমার এই একাকীত্বকে আমি মেনে নিয়েছি, খানিকটা উপভোগও করছি। এটা অস্বাভাবিক নয় কি?
ফাহিম, মাই ফ্রেন্ড, এই পৃথিবীতে কোনো কিছুই কোনো কিছুর জন্য বাঁধা হয়ে থাকে না। থেমেও থাকে না।
আমার মা যখন মারা গেলেন, আমার বাবা এতটাই মূষরে পড়েছিলেন যে দেবদাসের মতো দাড়ি-টাড়ি রেখে একাকার। অথচ, কিছুদিন যেতে না যেতেই, তার কাউকে ভালো লাগা শুরু হয় এবং এক সময় তাকে বিয়েও করে। এটাই জীবন। সাসপেন্স আর অনিশ্চয়তায় ভরপুর জীবনের নাটক। মাঝে মাঝে ভীষণ একঘেয়েমি ও বিরক্তিকরও বটে।
জেনে খুশি হলাম যে তুমি অন্তত আমাদের বন্ধুত্বের মাজেজাটা বুঝতে পেরেছ। এটা আমার জন্য বড়ই স্বস্তিকর। যেমনটা বলেছিলাম, আমার সত্যিকার অর্থেই ভালো কোনো বন্ধু নেই। কাজেই, কোনো অবস্থাতেই তোমাকে আমি হারাতে চাই না। তুমি আমার কষ্ট শুষে নিতে চাও, আমাকে একটু স্বস্তি দিতে চাও, ভালোলাগা দিতে চাও, ভালোবাসায় রাখতে চাও—এটা ভেবেই আমি কতটা ভালো থাকি, কী করে বুঝাই। তোমাকে নিয়ে এটুকু ভাবতেই গর্বে আমার বুক ভরে যায়। আই রিয়েলি অ্যাম প্রাউড অফ ইউ, ফাহিম!
আমি কি একটা অনুরোধ করতে পারি। প্লিজ কোনো অবস্থাতেই নিজেকে বদলে ফেলো না। তুমি না চাইলেও হয়ত আর পারবে না, তবুও বলছি। থাকো না এভাবেই, আমার একজন ভালো বন্ধু হয়ে। তুমি জানো না, তুমি কী, কী তোমার প্রাপ্য আর কতটাই উপযুক্ত একজন মানুষ তুমি। কাজেই কী পেলে আর কী পেলে না, সেটা ভুলে যাও। শুধু জেনো, তুমি সৃষ্টিকর্তার এক অসাধারণ সৃষ্টি—নিজেকে কখনোই ছোট করে দেখো না। নিজের ভেতরেই থেকো। বাকীটা পরিস্থিতি আর প্রকৃতির ওপর ছেড়ে দাও।
এখন যে ‘তুমি’ কে আমি দেখছি, সে তুমি নও। ভিন্ন কেউ। তবে আমি সবচেয়ে বেশি খুশি হতাম, এখন যাকে দেখছি সেই ‘তুমি’ কেই যদি আরো আগে দেখতে পেতাম। আশাকরি বিষয়টা তুমি ধরতে পারবে। এর চেয়ে বেশি কিছু খুলে বলতে পারব না। বুঝলে ভালো—না বুঝলে নাই।
রানার কাছ থেকে আমি শিখেছি, রণে ভঙ্গ না দিয়ে কীভাবে যুদ্ধ করে যেতে হয়। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন? গত দশ বছর যেসকল বাঁধা আর সমস্যার সম্মুখীন হয়েছি, কম তো শিখি নি। এসব নিয়ে আর কিছু বলতে চাই না, শুধু তোমাকে মনে করিয়ে দিতে চাই, টসে হারলেই আফসোস, আহারে কয়েনের অপর পাশটা আমার ছিল।
তুমিও আশাহত হয়ো না। আমার শুভ কামনা তোমার জন্য সবসময়ের জন্য থাকবে একই রকম। আমিও তোমাকে অনেক পছন্দ করি ফাহিম। শুধু কি তাই, আমি তোমাকে ভালোওবাসি অনেক। কিন্তু আমার কীইবা করার আছে। আমি তোমার মতো অস্থির নই। আমি নিজেকে ঝাঁকি দিয়ে বলি না, ওয়েক আপ সিমি! এসব কী?
প্লিজ ফাহিম, নিজেকে বদলে ফেলো না। প্লিজ!
ভালোবাসা।
তোমার বর্ষা।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-১৮)
with
no comment

