যুবকের পরিচয় দেয়া যাক। তার নাম ইমরান। ইমরান হোসেন খান।
ইমরানের রিক্সা ব্যস্ত রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতেই চলছিল। হঠাৎ রিকশাচালক রিক্সার গতি কমিয়ে দিল এবং এক পর্যায়ে রিক্সা থামিয়ে নেমে পড়ল। ইমরান চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল, ‘কী ব্যাপার? রিক্সা থামালেন কেন?’
রিকশাচালক বলল, ‘ইচ্ছা কইরা তো থামাই নাই। চেইন ছিলিপ কাটছে।’
‘চেইন ছিলিপ কাটার আর সময় পেল না।’ বিরক্ত মুখে বলল ইমরান, ‘চেইন ঠিক করেন মিয়া।’
‘ঠিক করতেছি।’ রিক্সাওয়ালা চেইন ঠিক করার চেষ্টা করতে লাগল।
মেয়েদের একটা ভ্যানিটিব্যাগ হাতে নিয়ে ইমরান অস্বস্তিবোধ করতে লাগল। সে সন্তর্পণে চারিদিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করল, কেউ তাকে বিশেষ নজরে দেখছে কি না।
হঠাৎ করেই ইমরানের দৃষ্টি গেল অদূরে—একজন পুলিশ সার্জেন্ট হেঁটে আসছে তার রিক্সার দিকে। ইমরানের মুখের রক্ত সরে গেল। সে দ্বিধায় পড়ে গেল হাতের ব্যাগটি নিয়ে। ব্যাগটি দ্রুত কোথাও লুকাতে পারলে ভাল হত কিন্তু লুকানোর মত কোন কিছু সে খুঁজে পেল না। সে রিক্সাওয়ালাকে বলল, ‘এই মিয়া, চেইন ঠিক করতে এতক্ষণ লাগে?’
‘চেইন তো ঠিক হইছেই।’
‘তাহলে দেরি করছেন কেন? চলেন।’
রিকশাচালক উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘কই যাইবেন কইলেন না তো।’
‘কোথাও যাব না। এমনিই ঘুরব, কোন অসুবিধা আছে?’
রিকশাচালক অবাক চোখে তাকাল। সে হ্যাঁ না কিছু না বলে আবার বসে পড়ে রিক্সার চেইন উলটা দিকে ঘুড়াতে লাগল।
পুলিশ সার্জেন্ট প্রায় চলে এসেছে। ইমরানের কপালে চিকণ ঘাম দেখা দিল। সে মনে মনে দোয়া ইউনুস পড়া শুরু করল। ইমরান মোটামুটি বুঝে গেল সামনে কী ঘটতে যাচ্ছে। সে পরিষ্কার দেখতে পেল পুলিশ সার্জেন্ট তার কাছাকাছি এসে তার হাতের ব্যাগটির দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলছে, ‘এই ব্যাগটা কি আপনার?’
ইমরান শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘জি আমার।’
‘এটাতো দেখি মেয়েদের ব্যাগ।’ সার্জেন্ট কঠিন দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল, ‘আপনার হাতে মেয়েদের ব্যাগ কেন?’
ইমরান সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল, ‘পুরুষের হাতে মেয়েদের ব্যাগ থাকা কি নিষেধ?’
সার্জেন্ট কড়া দৃষ্টিতে বলল, ‘ব্যাগের মধ্যে কি আছে?’
ইমরান চুপ করে রইল।
‘কথা বলছেন না কেন? এই ব্যাগ কার, কী আছে এর ভেতর?’
ইমরান ঘাবড়ে গেল। সে আমতা আমতা করে কিছু বলার চেষ্টা করেও পারল না। শুধু বলল, ‘জি, মানে…’
‘ব্যাগ ছিনতাই করে রিকশা নিয়া পালাইতেছেন?’
সার্জেন্টের কথায় রিক্সাওয়ালা খুব আনন্দ পেল। সে হাসি হাসি মুখ করে তাকাল ইমরানের দিকে। চোখের সামনে ভদ্রবেশী এক ছিনতাইকারীকে দেখে তার আনন্দের সীমা রইল না। রিক্সাওয়ালার হাসি দেখে ইমরানের পিত্তি জ্বলে গেল। এই হারামজাদার কারণে এখন তাকে হেনস্তা হতে হচ্ছে। সে রিক্সাওয়ালার দিকে কটমট করে তাকাল।
‘চেহারা দেখে তো ভদ্রই মনে হয়। দেখি ব্যাগটা খুলেন।’
পুলিশ সার্জেন্টের কথায় ইমরান ঘুরে তাকাল।
ইমরান তার হাতের ভ্যানিটিব্যাগটি ধরে কী করবে বুঝতে পারছে না আর ঠিক তখনই পুলিশ সার্জেন্ট রিক্সার হুডে হাতের রুলার দিয়ে একটা বাড়ি দিয়ে হুংকার দিয়ে বলল, ‘ঐ ব্যাটা ছাগল, রিকশা থামানোর জায়গা পাস না?’
রিকশাওয়ালা বলল, ‘ছার, চেইন ছিলিপ কাটছে।’
‘চেইন ঠিক করতে কতক্ষণ লাগে? চড় দিয়া তোর রিকশা চালানো শিখায় দিব, হারামজাদা। সরা রিকশা এখান থেকে। সাইডে যাইয়া চেইন ঠিক কর, যা।’
পুলিশ সার্জেন্টের হুংকার ইমরানকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো বাস্তবে। সে সম্বিৎ ফিরে পেয়ে বুঝতে পারল সে যা ভাবছিল তার কিছুই আসলে ঘটে নি। ঘাম দিয়ে জ্বর সারল যেন তার। সে একটা বড় স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল।
…
ঢাকার আকাশে সন্ধ্যা নেমে এসেছে।
ধুলোভর্তি আকাশে সন্ধ্যা তারাটা অস্পষ্ট। সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে গাঢ় ছায়া অপসৃয়মাণ।
শাহেদ তার বেডরুমে শুয়ে আছে অসময়ে। তার ঘর অন্ধকার—মুখটাও। সিলিঙের দিকে তাকিয়ে আছে সে। নিষ্পলক দৃষ্টি। অন্যমনস্ক। মাথার মধ্যে কয়েক হাজার ভাবনা ঘুরপাক খাচ্ছে। সে বিছানায় শুয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। তার মনের অস্থিরতা কাটছে না কিছুতেই। কিছুক্ষণ এপাশ-ওপাশ করে উঠে বসল সে। বিছানার পাশ থেকে তার মোবাইল ফোনটা নিয়ে নাতাশার নাম্বার বের করে ফোন করল। ওপাশ থেকে ফোনের রিংটোনের শব্দ ভেসে এলো। ফোন বাজছে কিন্তু নাতাশা ধরছে না। শাহেদ শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ গড়াগড়ি করে সে ফোন করল আবার। না—এবারো উত্তর পাওয়া গেল না। শাহেদ চিন্তিত ভঙ্গিতে একটা টেক্সট মেসেজ লিখল—I’m sorry. Please pick up the phone, I need to talk.
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শাহেদের অস্থিরতাও বাড়ল সমান গতিতে। সোমা কয়েকবার ডেকে গেছে। শাহেদ রাতে কিছু খাবে না জানিয়ে দিয়েছে। কেন যেন মনে হচ্ছে আজ রাতটা অনেক দীর্ঘ হবে। সে দীর্ঘ রজনী পার করার মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেলল।
…
ঢাকার আকাশে সূর্য উদয় হচ্ছে।
একটি নির্ঘুম রাত কাটিয়ে শাহেদ তার রুমের সাথে লাগোয়া বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মাথাটা ধরে আছে এখনো। একটু ঘুমিয়ে নিলে নিশ্চয়ই আবার ঠিক হয়ে যাবে সব কিছু। আড়মোড়া ভেঙে সে তাকাল সামনে। আকাশছোঁয়া সারি সারি অট্টালিকার ফাঁক গলে প্রথম ভোরের এক চিলতে রোদ সবে মাত্র এসে পড়েছে। রোদেলা ভোরের মিষ্টি বাতাস এসে শাহেদের মুখে প্রশান্তির পরশ বুলিয়ে দিল।
…
সকাল ন’টা প্রায়।
সোমা চা নিয়ে ঢুকল শাহেদের রুমে। শাহেদ রাতের না হওয়া ঘুমটা পুষিয়ে নিতে আবার এসে শুয়ে পড়েছে। কিন্তু কিছুতেই ঘুমাতে পারছে না।
সোমা ডেকে বলল, ‘ভাইয়া তোমার চা।’
শাহেদ কিছু বলল না।
সোমা লক্ষ করল শাহেদের চোখ রক্তবর্ণ ধারণ করেছে। ঘুমে ঢুলুঢুলু শাহেদকে কেমন বিধ্বস্ত লাগছে। সোমা শঙ্কিত কণ্ঠে বলল, ‘কী ব্যাপার তোমাকে এত বিধ্বস্ত লাগছে কেন? মনে হয় সারারাত ঘুমাও নি? চোখ দু’টা তো একেবারে রেড রোজ করে রেখেছ। হোয়াট’স গোয়িং অন ভাইয়া?’
‘নাথিং। এখন চা খাব না, নিয়ে যা। আর একটু ঘুমব।’ শাহেদ নির্লিপ্ত কণ্ঠে উত্তর দিল।
‘ঠিক আছে, চা ঢেকে রেখে যাচ্ছি। তুমি পরে খেয়ে নিও।’
শাহেদ হঠাৎ বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘পরে খেয়ে নিব মানে? ঠাণ্ডা চা খাব না কি? তোকে বললাম না আমি আরও একটু ঘুমব। এত কথা কেন বলছিস? যা ভাগ!’
সোমা অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল শাহেদের দিকে। এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে সে ধীরে পায়ে বের হয়ে গেল শাহেদের ঘর থেকে।
…
দুপুর বারোটা।
শাহেদ একটা বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দূর থেকে চারিদিকে একবার তাকিয়ে দেখল। সে মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল মেইন গেটের সামনে। সে ডোরবেলে চাপ দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল।
বেশ কিছুক্ষণ পর একজন দারোয়ান গেট খুলে জিজ্ঞেস করল, ‘কারে চান ভাইজান?’
‘ইয়ে মানে, নাতাশা ম্যাডাম আছে ভেতরে? এটাতো নাতাশাদের বাসা তাই না?’
‘কার কথা কইলেন? নাতশা? এই নামে তো এইখানে কেউ থাকে না!’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শাহেদ বলল, ‘কানাডাতে থাকে… দেশে বেড়াতে এসেছে…’ শাহেদ আবার বাসাটা এবং আশেপাশে তাকিয়ে দেখল। সে নিশ্চিত—এই বাসাটাই। এখান থেকেই সেদিন নাতাশাকে সে তুলে নিয়েছিল।
শাহেদ বলল, ‘এ বাসাটাই তো!’
‘না তো ভাইজান। আপনে মনে হয় ভুল ঠিকানায় আইসা পড়ছেন।’
‘এই বাসা তাহলে কাদের?’
‘এইটা হইল রিমন ভাইদের বাসা।’
‘রিমন?’
‘জে!’
শাহেদ মনে মনে বলল, ‘রিমন! নিশ্চয়ই ওর সেই খালাত ভাই। আর এটি সেই বাসাটাই…’ শাহেদ দারোয়ানকে বলল, ‘রিমন সাহেব বাসায় আছেন?’
‘জে আছেন।’
‘একটু ডেকে দেয়া যাবে?’
‘জে যাবে।’
‘আচ্ছা, যান আপনি তাকে একটু ডেকে দেন তাহলে।’
দারোয়ান গেট আটকিয়ে চলে গেল ভেতরে। শাহেদ চিন্তিতমুখে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘামতে থাকল।
কিছুক্ষণ পর ভেতর থেকে গেট খুলে বেরিয়ে এলো একজন যুবক। ইনিই সম্ভবত রিমন সাহেব। তার পিছে দারোয়ান। রিমন শাহেদকে এক নজর দেখে বলল, ‘আপনি আমায় ডেকেছেন?’
‘জি। আপনার সঙ্গে কি আমি একটু কথা বলতে পারি?’
‘জি বলুন। কী ব্যাপারে?’
শাহেদ ইতস্তত ভঙ্গিতে বলল, ‘ইয়ে মানে, নাতাশা… আই মিন আপনার কাজিন নাতাশা… কানাডা থেকে এসেছেন… উনার ব্যাপারে।’
রিমন বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, ‘আমার কাজিন নাতাশা! আমি আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।’
‘কেন নাতাশা আপনার কাজিন নয়? এটা কি ওদের বাসা না?’
‘কী বলছেন এসব? নাতাশা কে? এ নামের কাউকে আমি চিনি না। আমার মনে হয় আপনার কোথাও কোন ভুল হচ্ছে।’
‘আপনি বলছেন নাতাশা নামে কেউ এখানে থাকে না?’
‘না, থাকে না।’
‘এটা তাহলে ওদের বাসা নয়?’
‘একবার তো বললামই–না।’ রিমনের কণ্ঠে বিরক্তি প্রকাশ পেল।
শাহেদ দ্বিধায় পড়ে গেল। সে বোকার মত তাকাল রিমনের দিকে। বুঝতে পারছে না কী বলবে। সে নিজের মনেই বিড়বিড় করে স্বগতোক্তির মত বলল, ‘তাহলে সেদিন যে আমি ঠিক এই বাসার সামনে থেকেই ওকে নিয়ে গেলাম? তাহলে কি…’ গভীর চিন্তায় পরে গেল শাহেদ। তার দৃশ্যপটে ভেসে উঠল সেদিনের পুরো ঘটনা। এবং মুহূর্তেই সে বুঝে গেল তাকে বোকা বানিয়েছে নাতাশা। সে অস্ফুটে বলল, ‘ও মাই গড!’
…
দুপুর দুটা।
শাহেদ উত্তেজিত ভঙ্গিতে বসে আছে ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে। এজাজ আর জামান শুরুতে শাহেদের অগ্নিমূর্তি দেখে খানিকটা ভড়কে গেলেও নিজেদেরকে যথাসম্ভব সংযত রেখেছে। শাহেদ চোখ বড় করে বলল, ‘আপনারা তার বাসা চেনেন না?’
এজাজ শান্ত কণ্ঠে বলল, ‘না, আমরা তার বাসা চিনি না। তার বাসা চিইন্যা আমরা কি করব? তার বাসা কোথায় সেইটা জানা তো জরুরী না।’
‘বাসা চিনেন না অথচ তাকে নিয়ে দিব্যি ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এটাও বিশ্বাস করতে বলেন?’
‘দেখেন ভাইজান, আপনে অযথা চেঁচামেচি করতেছেন। অযথা চেঁচামেচি কইরা কোন লাভ নাই। চুক্তিমত আমরা সব কাজই করতেছি। দু’একদিনের মধ্যেই ভিসার ডাক পাবেন। এত মাথা গরম করতেছেন ক্যান?’
‘মাথা গরম করছি মানে? নাতাশা কোথায়?’
‘সে এখন কোথায় সেটা আমরা কী কইরা বলব? আমরা তো তার কেয়ারটেকার না।’
শাহেদ শীতল কণ্ঠে বলল, ‘ঠিক আছে, ওকে ফোন করুন।’
‘জি?’ এজাজ তাকাল জামানের দিকে।
শাহেদ আবার বলল, ‘নাতাশাকে ফোন করুন।’
জামান চোখের ইশারায় ইঙ্গিত দিল এজাজকে। এজাজ তার ফোন থেকে একটা নাম্বারে ফোন করল। অপরপ্রান্ত থেকে ফোনের রিংটোন ফিল্টার হয়ে শোনা গেল। তবে কেউ ফোন ধরল না।
এজাজ চোখ পিটপিট করে বলল, ‘রিং তো ভাইজান হয়, কিন্তু ধরতেছে না। বুঝতেছি না কি সমস্যা।’
এরপরে কেউ আর কোন কথা বলল না। সবাই চুপ। এজাজ-জামান মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল। দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে শাহেদ বলল, ‘নাতাশা যে সত্যি কানাডা থেকে এসেছে এবং কানাডার সিটিজেনশীপ আছে—কোন প্রমাণ দেখাতে পারবেন?’
এজাজ বলল, ‘কী যে বলেন ভাইজান, একটা মেয়ে আইসা বলল আমি কানাডার সিটিজেন, ‘পাত্র চাই’ আর আমরা তার কোন কিছু না জাইনাই বিয়ের পাত্র খুঁজা শুরু করব?’
‘তাহলে আমাকে দেখান।’
‘কী দেখাব?’
‘প্রমাণ! প্রমাণ দেখান।’
এজাজ আবার তাকাল জামানের দিকে। জামান এই পুরো সময়টা নীরব ছিল। শাহেদের সব প্রশ্নের উত্তর এজাজ একাই দিয়েছে। এবার সে সামনে এগিয়ে এসে ব্যাখ্যা দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘দেখেন শাহেদ সাহেব, প্রমাণ দেখান তো কোন সমস্যা নয়। নাতশা ম্যাডামের পাসপোর্টের কপি আমাদের কাছে আছে। এমনকি নায়াগ্রা ফলসের সামনে দাঁড়ানো তার ফটোও আছে। কিন্তু, সেটা কোন ফ্যাক্টর না।’
শাহেদ ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘তাহলে ফ্যাক্টরটা কী?’
জামান আবার বলল, ‘আমার কি মনে হয় জানেন? আপনি ব্যাপারটা নিয়ে বিগ ডিল করছেন।’
‘বিগ ডিল করছি মানে? কীভাবে?’ শাহেদের কণ্ঠে উষ্মা প্রকাশ পেল।
‘সামান্য ভুল বুঝাবুঝি—একটু সময় দিন, দেখবেন উনি নিজেই আপনাকে ফোন করবেন। এতটা অস্থির হবার তো কোন দরকার নেই।’
শাহেদ আর কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। সে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। জামান তাকাল এজাজের দিকে। এজাজ ইশারায় বোঝাল, সব ঠিক আছে। শাহেদ হঠাৎ করেই বলল, ‘সে আমাকে ভুল ঠিকানা দিল কেন? যে বাসা তাদের নয়, সেখান থেকে কেন আমাকে তাকে তুলে নিতে বলল?’
জামান ফিরে গেল তার স্বভাবসুলভ হাসিতে। মিষ্টি হেসে বলল, ‘উনি কেন এমন করলেন ঠিক বুঝতে পারছি না। তবে এমনওতো হতে পারে তার বাসা থেকে যাতে কেউ বুঝতে না পারে যে আপনার সাথে যাচ্ছে, সে কারণে উনি আপনাকে আশেপাশের কোন বাসার সামনে থেকে তুলে নিতে বলেছিলেন?’
শাহেদ তাকাল জামানের চোখের দিকে।
‘পারে না? এমনওতো হতে পারে।’
শাহেদের মুখে কোন কথা নেই। সে ভাবনায় পড়ে গেল।
জামান আবার বলল, ‘আমি যতটুকু জানি, ম্যাডামের খালা আর খালাত ভাই সারাক্ষণ উনাকে চোখে চোখে রাখে। আপনার তো জানার কথা, উনি আপনাকে নিশ্চয় বলেছেন। বলেন নাই?’
শাহেদের মনে পড়ল, সে জিজ্ঞেস করেছিল নাতাশাকে তার খালা আর খালাত ভাইকে নিয়ে কীসব ঝামেলার কথা। নাতাশা বলেছিল তার খালা তাকে তার ছেলের সাথে বিয়ে দিতে চায় কানাডা যাওয়ার লোভে। জামানের কথায় মনে হচ্ছে ঘটনা তাহলে ঠিকই। ওদের চোখকে ফাঁকি দিতেই নাতাশা কৌশলে অন্য বাসার সামনে থাকে তাকে তুলে নিতে বলেছিল। শাহেদের দ্বিধা তবু কাটল না।
…
বিকেল পাঁচটা।
রমনা পার্কের একটা পার্কে উদ্ভ্রান্তের মত বসে আছে শাহেদ। তার চারিপাশটা হঠাৎ করেই কেমন শূন্য হয়ে গেছে। দীর্ঘ সময় সে চুপ করে বসে থেকে পার্কের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলা মানুষগুলোকে দেখছে। পার্কের চতুর্দিকে চোখ ঘুরিয়ে দেখল, পার্কের অনেকগুলি চেয়ার আর সবুজ ঘাস জুড়ে বসে আছে ক’জোড়া কপত-কপোতী।
কী যেন ভেবে নিজের অজান্তেই একবার ফোন থেকে নাতাশার নাম্বারে চাপ দিল শাহেদ। ধীরে ধীরে ফোনটা কানে লাগিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল সে। এক রিং, দুই রিং, তিন রিং পরে শব্দ ভেসে এলো—এই মুহূর্তে মোবাইল সংযোগ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না, দয়া করে কিছুক্ষণ পর আবার ডায়াল করুন।
শাহেদের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১২)
with
no comment

