‘ছার, চা খাবেন? গরম চা। দেই?’
শাহেদ ফোনটা হাতে ধরে বসে ছিল অন্যমনস্কভাবে। তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। নাতাশাকে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও ফোনে পাওয়া গেল না। শাহেদকে কেন সে এড়িয়ে যাচ্ছে শাহেদের বোধগম্য হচ্ছে না। একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, শাহেদের মনে দ্বিধা-শঙ্কা তৈরি হতেই পারে, সেক্ষেত্রে বরং শাহেদেরই উচিৎ হারিয়ে যাওয়া। দূরে সরে যাওয়া নাতাশা আর তার গ্যাংদের বলয় থেকে যতদূরে যাওয়া যায়। তা না করে নাতাশাই নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। শাহেদের মেজাজ খারাপ হল, খুব। রাগে ক্ষোভে আর দুঃখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে এলো আবার।
‘ছার, চা খাবেন? গরম চা। দেই?’
শাহেদ তাকিয়ে দেখল একটা অল্প বয়সী ছেলে—চায়ের কেতলি আর পানির বালতি হাতে দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে। শাহেদ হ্যাঁ বা না কিছু না বলে আবার তার ভাবনার জগতে ফিরে গেল।
‘দেই ছার? ফেরেস গরম চা।’
শাহেদ বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘এই তোর কাছে চা চেয়েছি? ভাগ এখান থেকে।’
চা বিক্রেতা ছেলেটা আহত চোখে তাকাল শাহেদের দিকে। সারাদিনে সে বহু ধরণের মানুষের দেখা পায় এই পার্কে। সবাই যে তার চা খায় তা না, কিন্তু এভাবে তাড়িয়ে দেয় না। সেও কম যায় না। ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘না খাইলে না খাবেন, এত চ্যাত দেখান ক্যান?’
গজ গজ করতে করতে ছেলেটা চলে গেল অন্যদিকে। শাহেদ শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার চলে চাওয়ার দিকে।
…
‘অনেকদিন থেকে তোমাকে একটা কথা বলব ভাবছিলাম।’
সোমা প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে তাকাল রাজনের দিকে। সে নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল, ‘ভাবা-ভাবির কি আছে। বলে ফেললেই তো হয়। বল।’
‘জানিনা ব্যাপারটাকে তুমি কীভাবে নেবে?’
‘কোন ব্যাপারটা?’
রাজন সোমার প্রশ্নের উত্তর সরাসরি না দিয়ে বলল, ‘ইউ নো হাউ মাচ আই লাভ ইউ…’
‘হেঁয়ালি রাখ তো! এসব প্যাঁচান কথা আমার ভাল লাগে না। যা বলার সরাসরি বলবে।’
‘আমার বাসায় একবার নিয়ে যেতে চাই তোমাকে।’ অনেকক্ষণ ইতস্তত করে রাজন বলে ফেলল। তারপর তাকাল সোমার দিকে, উত্তরের অপেক্ষায়—
সোমা কিছু বলল না। অস্বস্তিকর নীরবতা নেমে এলো। কিছু সময় পার করে সোমা বলল, ‘না। নট পসিবল।’
‘আমি কোথায় থাকি তোমার দেখতে ইচ্ছে করে না?’
‘না।’
‘না?’
‘না। দ্যাটস নট ইম্পরট্যান্ট! তুমি কোথায় থাক তা জেনে আমার কী হবে? তুমি বড়লোকের ছেলে আমি জানি। তোমার গাড়ি আছে, ফ্ল্যাট আছে তাও জানি। কিন্তু রাজন, আমি তো সেগুলো ভেবে তোমার সাথে সম্পর্ক করি নি। তোমার সঙ্গে দেখা হওয়াটা আমার জন্য ইম্পরট্যান্ট আর দেখাত হচ্ছেই—অলমোস্ট এভ্রিডে!’
রাজন আর কিছু বলার মত কথা খুঁজে পেল না। মনে হচ্ছে এ জনমে সোমাকে তার একান্তভাবে আর কখনই পাওয়া হবে না।
রাজন মনে মনে আর কী কী অপশন আছে ভাবতে থাকল।
…
নাতাশার সাথে যোগাযোগের সব চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার কিছুদিন পর শাহেদ আবার গেল ইজি ম্যারেজ মিডিয়া অফিসে। সর্বশেষ চেষ্টা করে দেখবে একবার। নিশ্চয়ই এজাজ কিংবা জামানের মাধ্যমে ফোন করালে নাতাশা ফোন ধরবে। আর তখনই সে তার সাথে কথা বলবে।
শাহেদ হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো ম্যারেজ মিডিয়া অফিসের সামনে। অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে দেখল, কলাপ্সিবল গেটে বড় একটা তালা ঝুলছে। শাহেদ ঘড়ি দেখল—দুপুর সাড়ে বারোটা। সকাল ন’টায়ই তো এই অফিস খোলা পেয়েছে শাহেদ। আজকে কী হল? সে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল—আশে পাশে কাউকে দেখা যাচ্ছে না। সে-কি ভুল জায়গায় এলো না কি? এতদিন যাওয়া-আসা এখানে, এমন ভুলত তার হবার কথা না। সে আবারো চারিদিকে একবার দেখল এবং নিশ্চিত হল।
অজানা আতংকে শাহেদের শরীরে ভয়ের শীতল স্রোত নেমে এলো। তার হার্টবিট বেড়ে গেল। সে কলাপ্সিবল গেটের ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করল—অন্ধকার। হঠাৎ লক্ষ করল একটা ছোট ছেলে ওকে দেখছে—দূর থেকে। শাহেদের মনে হল, এই ছেলেটিকে এই অফিসে সে দেখেছে আগে। দু’একবার চাও এনে দিয়েছে। শাহেদ হাত তুলে ডাকল, ‘এই, এই ছেলে শোন। এদিকে আস।’
ছেলেটির ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল সে এখনই দৌড়ে পালাবে। শাহেদ দ্রুত এগিয়ে গিয়ে ওর হাত ধরে ফেলল। ‘এই, এরা কোথায়? জামান সাহেব, এজাজ সাহেব? অফিসের বাকী সবাই?’ ছেলেটির হাত ধরে রেখেই প্রশ্ন করল শাহেদ।
‘হেরা তো আইজ আসে নাই।’
‘আসে নাই কেন জান?’
‘জানি না। তয় আর আইব বইলাও মনে অয় না।’
‘কেন, আসবে না কেন?’
‘জানি না।’
শাহেদের মনে হল ছেলেটি জানে কিন্তু বলছে না। সে তার হাত ছাড়িয়ে নেবার চেষ্টা করছে। শাহেদ হাত না ছেড়েই বলল আবার, ‘এরা কোথায় থাকে কিছু জান? মানে এদের বাসা কোথায়?’
‘জানি না।’
শাহেদ কিছুক্ষণ ভেবে কী মনে করে ছেলেটির হাত ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি যাও।’
ছেলেটি ভয় মিশ্রিত ভঙ্গিতে কয়েক পা পিছিয়ে ঘুরে এক দৌড়ে পালিয়ে গেল। শাহেদ মাথার চুলে হাত ঢুকিয়ে চুল ছিঁড়ে ফেলার মত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল মূর্তির মত।
…
সুন্দর স্নিগ্ধ বিকেল।
পড়ন্ত বিকেল বেলায় প্রকৃতি সেজেছে নিজের রূপে। আর প্রেমিকের মন রক্ষার্থে প্রেমিকা এসেছে প্রেমিকের গৃহে।
ঢাকা শহরের এক অভিজাত এলাকার সুউচ্চ অ্যাপার্টমেন্ট। লিফট দিয়ে উঠে এলো রাজন আর সোমা। রাজন উত্তেজিত। সোমা নির্লিপ্ত। ম্রিয়মাণ। সোমাকে দেখেই মনে হচ্ছে ইচ্ছের বিরুদ্ধে এবং শুধুমাত্র রাজনের অনুরোধ রক্ষার্থে সে এসেছে। তার স্বভাবসুলভ হাসি কিংবা দুষ্টুমি তার চেহারা থেকে উধাও। লিফট থেকে বের হয়ে তারা এসে দাঁড়াল একটা অ্যাপার্টমেন্টের সামনে। দরজা খুলে রাজন বলল, ‘এস।’
সোমা ইতস্তত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। রাজন তার হাত ধরে আলতো করে টেনে রুমের ভেতরে নিয়ে এলো। সোমার পেছনে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে রুমের সবগুলো লাইট অন করে দিল রাজন। সোমা মুগ্ধ হয়ে গেল রাজনের সুন্দর পরিপাটি অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরের অঙ্গসজ্জা দেখে। ছবির মত করে সাজান সবকিছু। এক নজরে বসার ঘর, সোফা সেট, টিভি সেট, দেয়ালে টানানো পোট্রেট, ফ্রেমে বাধানো ছবি—সব কিছুতেই আভিজাত্যের ছোঁয়া।
সোমার দিকে তাকিয়ে রাজন বলল, ‘কেমন দেখছ?’
সোমা মৃদু হাসল। অস্ফুটে বলল, ‘সুন্দর!’ কিন্তু তার জড়তা কিছুতেই কাটছে না।
রাজন আবার বলল, ‘মেক ইয়োরসেলফ কমফোর্টেবল ইয়াং লেডি। ইট’স ইয়োর হোম টু।’
সোমা কিছু না বলে চারিদিকটা একবার ঘুরে দেখল। তারপর হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল বড় জানালাটার পাশে। পর্দা সরিয়ে উঁকি দিল বাইরে। অন্ধকার নেমে এসেছে। গোধূলি রঙে রাঙান বিকেলটা হঠাৎ কেমন ধূসর হয়ে যাচ্ছে।
‘কফি খাবে? বাসায় ইনস্ট্যান্ট কফি আছে।’
সোমা ফিরে তাকাল রাজনের দিকে। ‘কফি খাব না। শুধু পানি।’ বলেই সে আবার তাকাল বাইরে।
রাজন দু’কাপ কফি, এক গ্লাস পানি আর কিছু স্ন্যাকস একটা ট্রে-তে সাজিয়ে এনে রাখল সোফার সামনের কফি টেবিলে। সোমা এসে বসল সোফাতে। রাজন পানির গ্লাস এগিয়ে দিল সোমার হাতে। সোমা পানি খেয়ে নামিয়ে রাখল গ্লাস। দুজনেই কফি নিয়ে আস্তে করে চুমুক দিল। কিছুটা সময় চুপচাপ পার করে রাজন বলল, ‘টিভি দেখবে? টিভি ছেড়ে দেই?’
সোমা কিছু বলল না। সোমা এখনো সহজ হতে পারছে না।
আবারো নীরবতা। কিঞ্চিৎ অস্বস্তিকর। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাজন বলল, ‘কী ব্যাপার সোমা, একেবারে কোয়াইট হয়ে গেলে যে?’
‘এভাবে আমাকে এখানে নিয়ে আসাটা তোমার ঠিক হয় নি, রাজন। আমার ভাল লাগছে না। চল, চলে যাই।’
‘আহা, এত অস্থির হচ্ছ কেন? বস না, তোমাকে একটু দেখি—এত কাছে থেকে দেখার সুযোগ যদি আর না হয়?’
‘মানে?’
‘তোমার সাথে একান্তে কখনই কথা বলতে পারি না। সারাক্ষণ তোমার বন্ধুরা ঘিরে থাকে। এত রিকোয়েস্ট করে তোমাকে একটা সারপ্রাইজ দেব ভেবে নিয়ে এলাম, আর তুমি শুধু যাই যাই করছ।’
‘আচ্ছা, কী সারপ্রাইজ দেবে দাও, তবে তাড়াতাড়ি। আমাকে বাসায় ফিরতে হবে। এতক্ষণে মা চিন্তায় অস্থির হয়ে যাবে।’
রাজন ঘনিষ্ঠ হয়ে বসল। সোমার হাত থেকে কফির কাপটা নিয়ে রেখে দিল ট্রে-তে। আলতো করে ধরল তার হাত। সোমার হাত নিয়ে রাজন তার আঙুল দিয়ে ধীরে ধীরে স্পর্শ করল। সোমা কিছুই বলল না দেখে রাজন সাহসী হয়ে উঠল। সে অত্যন্ত সন্তর্পণে তার উষ্ণতার হাত দিয়ে সোমার শরীরের কিছু অংশে স্পর্শ করল।
সোমা চোখ বন্ধ করে আছে। রাজন ধীরে অতি ধীরে তার ঠোঁট নামিয়ে এনে স্পর্শ করল সোমার ঠোঁট। সোমা চোখ বন্ধ করেই রইল। রাজন সরে এসে তাকিয়ে রইল সোমার চোখের দিকে। কোন রকম প্রতিক্রিয়া সে দেখতে পেল না। রাজন আবার কাছে এসে ছোঁয়াল ঠোঁট—একে দিল গভীর চুম্বন। সোমার নিশ্বাস ভারী হয়ে এলো। রাজন অনুভব করল সোমার উষ্ণ নিশ্বাস। তার অভিজ্ঞতায় বুঝতে অসুবিধা হল না—সোমাকে সে তৈরী করে ফেলেছে। বাঁধা দেবার মত পরিস্থিতি সোমার নেই এখন। সে কালক্ষেপণ না করে অতি সন্তর্পণে সোমাকে পাঁজা কোলে নিয়ে গেল তার বেডরুমে।
বিছানায় শুইয়ে দিয়ে রাজন জড়িয়ে ধরল সোমাকে—ভালবাসার আলিঙ্গনে। রাজন তার অবাধ্য হাত দুটো চালিয়ে দিল সোমার শরীরের স্পর্শকাতর অংশগুলোতে।
হঠাৎ করেই সোমা উঠে বসল। পরিস্থিতি অনুধাবণ করে নিজেকে সঙ্কুচিত করে ফেলল সে। রাজনকে বাঁধা দিয়ে বলল, ‘প্লিজ, রাজন, এভাবে না।’
রাজন অবাক চোখে বলল, ‘না কেন?’
‘আই’ম নট রেডি ফর দিস।’
‘হোয়াট আর ইউ টকিং অ্যাবাউট?’ রাজন ক্ষেপে গিয়ে বলল, ‘তাহলে এসেছ কেন?’
‘আমি ভেবেছিলাম…’
‘কী ভেবেছিলে?’ রাজনের তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ভয় পেয়ে গেল সোমা। সে কোন উত্তর দিতে পারল না আর।
রাজন ধাক্কা দিয়ে সোমাকে শুইয়ে দিল আবার নরম ভেলভেটের বিছানায়। চড়ে বসল সোমার নরম শরীরের ওপরে। অসহায় সোমা ছটফট করতে থাকল রাজন নামক এক অন্যরকম পুরুষের ভিন্নরকম ভালবাসার পরশে।
…
সারাদিন পার্কে আর রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে উদ্ভ্রান্তের মত ঘরে ফিরে এলো শাহেদ।
মানসিক চাপে ভীষণরকম বিপর্যস্ত সে। তাকে দেখলেই যে কেউ বলে দিতে পারবে, মানসিকভাবে কতটা বিধ্বস্ত সে এখন। শাহেদ ধীর পায়ে তার রুমে ঢুকে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বিছানায় এলিয়ে দিল তার শরীর। তাকিয়ে রইল ঘূর্ণায়মান ফ্যানের দিকে। তার সমস্ত শরীর-মন ঘূর্ণায়মান ফ্যানের পাখার মত ঘুরতে থাকল। সে চোখ বন্ধ করে চুপ করে শুয়ে রইল কিছুক্ষণ এবং আশ্চর্যজনকভাবে মুহূর্তের মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়ল।
…
সন্ধ্যা গাঢ় হয়ে আসছে।
মিসেস জাহানারা চিন্তিত মুখে রান্না ঘরে একটা টুলের উপর বসে আছেন। তিনি কয়েকবার দরজার দিকে তাকালেন। এসময়ে একবার হলেও রান্নাঘরে আসে সোমা। কিন্তু সে আসছে না। ইতিপূর্বে তিনি একবার সোমার ঘরে গিয়ে দেখে এসেছেন, এখনো ফেরে নি কলেজ থেকে। মেয়েটা কেন আসছে না ভেবে অস্থির হয়ে আছেন তিনি। দিনকাল ভাল না। অল্পতেই তার টেনশন এবং প্রেশার বেড়ে যায়। তিনি আপন মনেই বললেন, ‘সোমাটা আজ আবার এত দেরী করছে কেন?’
মিসেস জাহানারা রান্নাঘর থেকে বের হয়ে শাহেদের ঘরে গেলেন। শাহেদ ঘর অন্ধকার করে শুয়ে আছে। তিনি শাহেদের বিছানার কাছে এসে অবাক হয়ে লক্ষ করলেন—শাহেদ গভীর ঘুমে ঘুমিয়ে আছে। এই ভর সন্ধ্যায় কেউ ঘুমায়? তিনি চিন্তিত মুখে বের হয়ে গেলেন শাহেদের ঘর থেকে।
…
জানালার ফাঁক গলে রাস্তার আলো এসে পড়েছে রাজনের শোবার ঘরে।
বিছানায় শুয়ে আছে দুটি শরীর। সোমা আর রাজন। সোমা ফুলে ফুলে কাঁদছে। রাজন লক্ষ করল সোমার কান্না। সে ঘুরে সোমাকে টেনে নিল নিজের কাছে। হাত দিয়ে চোয়াল স্পর্শ করল সোমার। আদুরে গলায় বলল, ‘কাঁদছ কেন, সোমা। কী হয়েছে?’
সোমা কিছু বলতে পারল না। সে নীরবে চোখ মুছে চলল।
রাজন আবার আদর করে সোমাকে টেনে নিল তার বুকে। ‘বলবে না?’
সোমা নাক টেনে বলল, ‘আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, যা আমি বিয়ের রাতে তোমাকে উপহার দিতে চেয়েছিলাম, তা তুমি আগেই নিয়ে নিলে। এটা খুবই অন্যায় হল।’
রাজন খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল, ‘আমার উপহার আমি নিয়েছি। কিছুদিন আগে এই যা, তাতে এত মন খারাপ করার কী আছে? আর আমি তো অন্য কেউ না, আমি সে-ই যাকে তুমি এই উপহারটা দিতে চেয়েছিলে।’
সোমা রাজনের বুক থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে উঠে বসল বিছানায়। চোখ মুছে শীতল কণ্ঠে বলল, ‘রাজন, আমার কিছু কথা আছে।’
রাজন আধশোয়া অবস্থায় হাত ভেঙে হাতের ওপর মাথা রেখে বলল, ‘বল।’
‘না, ওভাবে নয়। উঠে বস।’
রাজন উঠে বসল—মুখোমুখি। ‘বল, কী বলবে?’
‘এভাবে আর কতদিন, রাজন? তুমি তো কিছুই বলছ না।’
‘কী জানতে চাও?’
‘জানতে চাই তোমার কমিটমেন্টের কথা। তোমার প্রতিশ্রুতির কথা। যা একটা মেয়ের সবচেয়ে বড় বিসর্জনকে অহংকারী করে তুলতে পারে।’
রাজন সময় নিল সোমার প্রশ্নের উত্তর দিতে। ‘কি প্রতিশ্রুতি তুমি চাও বল?’ সে ব্যাখ্যা দেবার ভঙ্গিতে বলল, ‘তোমাকে আমি ভালবাসি এর চেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি আর কী হতে পারে, সোমা?’
সোমা স্থির এবং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল। ‘আমি চাই আমাদের ভালবাসার পরিণতির প্রতিশ্রুতি।’
‘বুঝেছি, বিয়ের কথা বলছ?’
‘এভাবে লুকিয়ে ভালবাসা-বাসি খেলতে আমার ভয় হয়।’
‘কিসের ভয়, সোমা? বিয়ে তো আমি তোমাকেই করব। পাত্র হিসেবে আমাকে নিশ্চয়ই তোমার বাবা-মা অপছন্দ করবেন না। আফটার অল বিসিএস কোয়ালিফাইড।’
‘তাহলে আমাদের বাসায় প্রস্তাব পাঠাও। আমাদের এনগেজমেন্টটা হয়ে থাক, তারপর আমার পরীক্ষা শেষ হলে বিয়েটা সেরে ফেলব। আমাকে নিয়ে মা ভীষণ চিন্তা করে, তুমি প্লিজ এ কাজটা কর। বোঝই তো, মেয়ে বড় হলে বাবা-মায়ের চিন্তার শেষ থাকে না।’
‘ঠিক আছে প্রস্তাব পাঠাব। বোকা মেয়ে, বিয়ে হলেই তো সব আনন্দ শেষ, এমন লুকিয়ে প্রেমের মজাটা তখন আর পাওয়া যাবে না।’ বলতে বলতে রাজন সোমাকে আবার কাছে টেনে নেবার জন্য হাত বাড়াল।
সোমা বাঁধা দিয়ে বলল, ‘না, প্লিজ, আমাকে কথা দাও।’
‘আচ্ছা দিলাম, কথা দিলাম। কিন্তু তার আগে তোমাকে একটা প্রমিজ করতে হবে।’
‘কী সেটা?’
‘আমি তোমাকে প্রতিদিন একবার করে দেখতে চাই—এখানে।’
সোমা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল রাজনের মুখের দিকে। চোখে বিস্ময়!
‘এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?’
‘সেটা কী করে সম্ভব?’
‘চাইলেই সম্ভব। এই যেমন, তুমি চেয়েছিলে বলেই আজ সম্ভব হয়েছে।’
‘আমি ভেবেছিলাম অন্যকিছু, কিন্তু তুমি যে—’
সোমাকে কথা শেষ করতে দিল না রাজন। সোমার মুখে হাত চাপা দিয়ে জোর করেই টেনে নিল তার কাছে। রাজনের বাহু বন্ধনে ছটফট করতে থাকল সোমা।
ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১৩)
with
no comment

