Shawpno-Jal

মধ্যবিত্ত পরিবারের সহজ সরল জীবনের আড়ালে কিছু রূঢ় বাস্তবতা

বই পড়ার আগ্রহ যখন হারিয়ে যাচ্ছিলো, তখন হাতে এলো এবারের বই মেলায় প্রকাশিত একটি বই। গল্পকার ফরহাদ হোসেনের নতুন উপন্যাস ‘স্বপ্নজাল’। প্রতিশ্রুতিশীল নবীন লেখকদের মধ্যে ফরহাদ হোসেনের লেখায় তাঁর নিজস্বতা রয়েছে৷ অনলাইনে লেখালেখির প্লাটফর্মগুলোতে আগেই তাঁর লেখা পড়েছি। অনেক অসাধারণ বিষয় তিনি তুলে ধরেন তাঁর লেখায়। আমার পক্ষে তাঁর লেখা গল্পগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। গত কয়েকদিন ধরে কাজের ফাঁকে ফাঁকে লেখকের নতুন উপন্যাস ‘স্বপ্নজাল’ পড়ছিলাম। উপন্যাসটিতে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে খেলা একটি প্রতারক চক্রের গল্প বলেছেন তিনি। তাঁর গল্প বলার ঢং আমাকে আটকে রেখেছে অসাধারণ মলাটবন্দী বইটির পাতায় পাতায়। কাজের ব্যস্ততায় দৃশ্যত বইটি হাত থেকে নামিয়েছি, কিন্তু মনে মনে অস্থিরতায় ভুগেছি পরেরটুকু পড়ার জন্য।
পড়া শেষ, একটু স্বস্তি একটু অস্বস্তি নিয়ে বইটি সম্পর্কে লিখতে বসলাম। এটাকে ঠিক রিভিউ বলা যায় কিনা জানি না, কারণ বুক রিভিউয়ের নিয়মকানুন আমার জানা নেই। এটা আমার বক্তব্য বলেই ধরে নিতে পারেন।


ফরহাদ হোসেনের উপন্যাসটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সহজ সরল জীবনের আড়ালে কিছু রূঢ় বাস্তবতা আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে, যা অনেকেই তাদের জীবনের সাথে মেলাতে পারবেন। মরীচিকার পেছনে ছুটতে থাকা এক বেকার যুবকের সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্পের পেছনে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে তা হলো ভালোবাসা৷ উপন্যাসটিতে ভালোবাসার জটিল রসায়ন অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। প্রতারণা আর প্রেমের গল্প পাশাপাশি ছুটে গেছে সুন্দর একটি পরিণতির দিকে। গল্পের ছলে লেখক একদিকে আমাদের যেমন সাবধান করেছেন, অন্যদিকে শিখিয়েছেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়।


অন্যপ্রকাশের বই মানেই চমৎকার কাগজে ছাপানো সুদৃশ্য মলাটের বই- সর্বজন বিদিত এই প্রচলিত কথাটি ‘স্বপ্নজাল’ এর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। মাসুম রহমানের করা প্রচ্ছদে বইটি দেখলেই হাতে নিয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে, ইচ্ছে করবে নাকে তুলে ঘ্রাণ নেওয়ার। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আমার মত আপনাদেরও ভালো লাগে নিশ্চয়ই।


আমি নিজে কখনও রিভিউ লিখিনি তাই, তাই অন্যের লেখার ত্রুটি বিচ্যুতি বিশ্লেষণ করা আমার কাছে ধৃষ্টতার নামান্তর। আর স্বপ্নজালের মতো উপন্যাসের ক্ষেত্রে কিছু বলার যোগ্যতা আমার আসলেই নেই। তবুও কিছু বিষয় আমাকে বলতে হবে, নইলে স্বস্তি পাবো না।
প্রথমত, দুএকটি জায়গায় শব্দের ব্যবহার আমাকে কিছুটা এভাবে ভাবিয়েছে যে, এই শব্দটা ব্যবহার না করে অন্য শব্দ ব্যবহার করা যেতো। এটা সম্ভবত লেখকের দীর্ঘসময় প্রবাসে থাকার জন্য হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শেষার্ধে গল্প খুব দ্রুত শেষ হয়েছে। শুরুর দিকে গল্প বলার যে মুন্সিয়না তিনি দেখিয়েছেন তাতে আরেকটু সময় নিয়ে গল্পটা শেষ করলে আমার মত পাঠকদের অন্তরাত্মা অতৃপ্ত থাকতো না।
পরিশেষে আমি চাই এমন বই প্রচুর আসুক, আমরা মন ভরে পড়বো৷ সেগুলো সম্পর্কে লিখতে লিখতে হয়তো কীভাবে বুক রিভিউ লিখতে হবে তাও শিখে যাবো৷ ধন্যবাদ ফরহাদ হোসেন ও অন্যপ্রকাশকে আমার মনে বই পড়ার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলার জন্য।

লিখেছেন: হাসান মাহমুদ পলাশ

Ebong-ekdin-hothath

এবং একদিন হঠাৎ

বীজগাণিতিক রাশিমালাকে সরলরূপে প্রকাশ করে তার মান নির্ণয়কে সরলীকরণ বলে। স্কুলের পরীক্ষার খাতায় সরল অংক করতে হয়েছে কমবেশি আমাদের সবাইকেই। অনেকেরই হয়তো মনে আছে, একটা দীর্ঘ লাইনের রাশিমালাকে ধাপে ধাপে কিভাবে সমাধানে টেনে আনা হয়। সফলভাবে নির্দিষ্ট মান নির্ণয় করতে পারলেই সরল অংক মিলে যাবার আনন্দ। ফরহাদ হোসেনের উপন্যাসিকা সংকলন “. . . এবং একদিন হঠাৎ” পড়তে গিয়ে সেই অংক স্যারের জালিবেতের সামনে বসে সরল অংক কষার দিনগুলোর কথাই মনে হয়েছে আমার।

প্রথম উপন্যাসিকা অপলার অভিমান। অভিবাসী জীবনের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়া একজন হাসান। জীবন ও জীবিকার লড়াইয়ে একসময় একটা যন্ত্রে পরিণত হয় সে। একটা নিশ্চিত আগামীর সন্ধানে ক্রমেই ব্যস্ততার গহ্বরে বিলীন হতে থাকে। বর্তমানকে ছাপিয়ে তার সামনে প্রকট হয়ে দাঁড়ায় আগামীর চিন্তা। কিন্তু স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে একসময় দিকভ্রান্ত পথিকের মতো বর্তমানকেই হারিয়ে ফেলে হাসান আর অপলার জীবন। আজকের দিনটাকে উপভোগের এই বোধহয় যখন হয় ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। তবু হাল ছাড়ে না হাসান। গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে বরং একটা সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় ভালোবাসার নৈবদ্য সাজিয়ে অসীম ধৈর্য নিয়ে সে অপেক্ষা করতে থাকে। এজন্য তাকে মূল্য দিতে হয় অনেক। কিন্তু পরিশেষে সম্ভবত: এই ভালোবাসা আর ধৈর্যের শক্তিতেই হয়তো সে তার প্রত্যাশিত দিনের সন্ধান পায়। কিন্তু কিভাবে, তা জানতে হলে পড়তে হবে, অপলার অভিমান। গল্পের পরতে পরতে উঠে এসেছে অভিবাসী নারী ও পুরুষের জীবনের জটিলতার নানা দিক। একই সাথে, অনাত্মীয় হয়েও অভিবাসীদের মধ্যে গড়ে ওঠা পরম আত্মিক সম্পর্ক, পরস্পরের জন্য তাদের গভীর মর্মবোধ ও ত্যাগের গল্প। অপলার অভিমান বলে দিয়ে যায়, নিজের অধিকারটা নিজেকেই আদায় করে নিতে হয়। কখনো চাইতে হয়।

দ্বিতীয় উপন্যাসিকা একদিন হঠাৎ। এক অভিবাসী তরুণীর কম বয়সী আবেগে ভুল নৌকায় সওয়ার হওয়া থেকে সে যাত্রার সমুদ্র ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনকে নতুন তটের সন্ধান দিয়েছেন লেখক। প্রেম দ্বিধা বিশ্বাস আর অবিশ্বাসে বারবার দুলে উঠেছে গল্পের নৌকা। লেখকের অনবদ্য বর্ণনায় রাচনা, অর্ণব আর তানিশার হাত ধরে উত্তর আমেরিকার পথে পথে যেন হেঁটে চলেছে পাঠক। এরই মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে অভিবাসী জীবনের নানা জটিল ও কুটিল দিক। এসেছে তরুণ অভিবাসীর জীবনের সংগ্রাম আর দেশে ফেলে যাওয়া মায়ার বাঁধনগুলি। ভুল, শুধরানো আর সম্পর্কের দ্বন্দ্বের শেষে এসে জয়ী হয়েছে ভালোবাসা।

প্রসঙ্গ কথায় লেখক বলেছেন গল্পগুলি জীবন থেকে নেয়া। দীর্ঘ প্রবাসে সেখানকার অভিবাসীদের যাপিত জীবনকে কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন লেখক, আর সেই সব জীবনের জটিল সমীকরণকে সরল অংকের মতোই এক আশ্চর্য সুন্দর সমাপ্তিতে নিয়ে এসে মিলিয়েছেন। এ যেন বীজগাণিতিক জটিল রাশিমালাকে সরলীকরণের মতোই।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ উপলক্ষে পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে “. . . এবং একদিন হঠাৎ”। সংকলনের প্রথম উপন্যাসিকাটি একজনকে এবং দ্বিতীয়টি তিনজনকে উৎসর্গ করা হয়েছে। উৎসর্গের এই ধারণাটি অন্যরকম। তৌহিদ হাসানের অনবদ্য প্রচ্ছদের ১১২ পৃষ্ঠার বইটির দাম ২৬০ টাকা।

লিখেছেন: আসাদুল লতিফ

Tritio-Pokkho

তৃতীয় পক্ষের কথা

এ পৃথিবীতে বিভিন্ন মানুষের মাথায় বিভিন্ন ধরনের পাগলামি ভর করে। তেমনি কিছু মানুষের মাথায় এই ধরনের পাগলামিও ভর করে যে তারা বই ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না! সময় সুযোগ পেলেই মজে থাকে গল্পতে। এই তৃতীয় পক্ষ বইটিও তেমনি একটা বই যে বইয়ের গল্পগুলো নেশার মত শুধু টানতে থাকে বইয়ের ভেতর মুখ গুজে বসে থাকার জন্য।
প্রথমেই আমি যখন বই পড়তে শুরু করি যে কোন বইই হোক না কেন সবার আগে বইয়ের ভেতর নাক মুখ গুজে বইয়ের মাতাল করা ঘ্রাণ শুকে নিজের ভেতর অনুভব করার চেষ্টা করি। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুলাই উৎসর্গ পত্রের উপর। কেউ যে উৎসর্গ পত্রের দু’ তিন লাইনের লেখা দিয়ে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের প্রতি তার সর্বোচ্চ ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ এভাবে করতে পারে তা ফরহাদ ভাই এর এই লেখা না দেখলে এর গভীরতা বুঝতামই না!!
এই বইয়ে মোট গল্প আছে ৫ টি। এখন আসি গল্পে। এই এত সুন্দর গল্পগুলোর বিশ্লেষণ এই কয়েক লাইনে করা অসম্ভব, তবুও কিছু চেষ্টা করি।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে: এই গল্পটি আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প গুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশের ফরিদপুরের মেয়ে সোমার বিয়ে হয় তার বোনের দেবর আমেরিকা প্রবাসী শহিদ এর সাথে। বিয়েটি হয় ফোনে,বিয়ের দুই বছর পর সোমা যখন ভিসা পেয়ে আমেরিকায় আসে এয়ারপোর্টে নেমেই শুরু হয় তার বিপত্তি। শহিদের এয়ারপোর্টে এসে সোমাকে নিয়ে যাবার কথা থাকলেও শহিদ আসেনি তাকে নিতে। অপরিচিত দেশ, অপরিচিত মানুষ, সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েও সাহায্য না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। হঠাৎই দেখা হল দেশি ভাই ফরিদ সাহেবের সঙ্গে। তারপর যেন আস্তে আস্তে সে ভরসা ফিরে পেতে শুরু করল। ফরিদ সাহেব তাকে নিয়ে শহিদের বাসায় গিয়েও তাকে না পেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে সোমাকে সামলানোর চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। এখানে ফরিদ সাহেব সোমাকে ব্যস্ত রাখতে শিকাগো শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখানোর পাশাপাশি “এফ আর খান ” এর সিয়ার্স টাওয়ার, শেখ মুজিব ওয়ে সব কিছুর গল্প করলেন। আর লেখক সাহেব আমাদের ঘুড়িয়ে আনলেন শিকাগো থেকে কল্পনাতে। ফরিদ সাহেব শহিদকে খুঁজে বের করতে তোলপাড় করে ফেললেন সারা শহর। একটু পর পর সোমার কান্না থামানোর চেষ্টায় এটা সেটা বলে হাসানোর চেষ্টা করতেন। তার বাসায় নিয়ে তাকে সহজ করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে তাদের কিছু স্মৃতি গড়ে উঠে যেটা সারাজীবনের সুখ স্মৃতি হিসেবে থাকে। সারাটা গল্প জুড়ে শহিদকে নিয়ে উত্তেজনা কাজ করে সে কোথায় গেল এটা নিয়ে। অবশেষে ফিরে পাওয়া গেল তাকে, সে সোমাকে নিতে আসে। তার না আসার কারণ দুর্ঘটনার শিকার সব কিছুই ব্যাখ্যা করে। বিদায় বেলা করুণ সুরে আচ্ছন্ন করে পরিবেশ
হৃদয়ে আগন্তুক: হাসান আর তিথির সুন্দর সংসার তাদের ছোট্ট মেয়ে তিতলিকে নিয়ে। আমেরিকার ব্যস্ত জীবনে দুজনের ব্যস্ত সময়ই কাটছিল। হঠাৎই পরিবর্তন ঘটল তিথির বান্ধবী রুপা যখন আমেরিকায় ট্রেনিংয়ে এসে তাদের বাসায় বেড়াতে আসল। পরিবেশটা ও পাল্টে গেল, ব্যাকইয়ার্ডে বিকালে চায়ের আড্ডায় আর গল্পে জমে উঠত। ছেলে মেয়ের বন্ধুত্বের বিষয় নিয়েও বাক বিতণ্ডা চলত। অবশ্য পরের দিন থেকেই আস্তে আস্তে সব কিছু পাল্টে যেতে শুরু করল, হাসান তার কাপুরুষতার পরিচয় দিল, রুপার জীবনের বেদনাময় ঘটনা বের হয়ে এলো। হঠাৎই দেখা হল আকাশের সাথে। যে আকাশ একদিন অভিমান নিয়ে চলে এসেছিল আমেরিকায়। তিথি রুপাকে ভুল বুঝল আবার সে ভুল বুঝতে পেরে সব কিছু ঠিক করার চেষ্টাও করল। কিন্তু সবকিছু কি এত সহজে ঠিক হয়!! শেষে আকাশের সাথে রুপা চলে গেল, আকাশ প্রস্তুতি নিচ্ছে তার এক বুক ভালবাসার কথা জানাবার জন্য রুপাকে। এ দিকে তিথিও হাসানকে ক্ষমা করবে কি করবে না এই দ্বিধা দ্বন্দ্বে শেষ হল গল্পটি।
অপেক্ষা: চারদিকে অন্ধকার নেমে দমকা বাতাসে যখন ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হবে তখনই এই গল্পটির শুরু হয়। শরীফুল আলম আমেরিকার একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার। ২০ বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করছেন। জীবনের ৪৭টি বসন্ত কাটিয়ে তিনি ২৪ বছর বয়সী রুবিনাকে বিয়ে করে আনলেন। যদিও তিনি স্বাভাবিক ভাবেই সংসার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু রুবিনা তা চায়নি! সে শুধু নিজের স্বার্থে আর গ্রিন কার্ডের আশায় বিয়ে করে। শরীফুল খুব চাপা স্বভাবের বলেই তার কোন অভিযোগ নেই। অবশ্য এতে রুবিনার ও কোন দোষ নেই, বিয়ের আগেই বলেছিল সে অন্য কাউকে চায় কিন্তু শরীফুল পাত্তা দেয় নি ভেবেছে বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এক সময় রুবিনা শরিফকে টেনশনে রেখে ঠিকই চলে যায় সোহেলের কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সোহেলের কাছ থেকেও সে ধোকা পেল। সে কি এখন ফিরবে শরীফ এর কাছে?
কী ঘটেছিল লাস ভেগাসে: শাহেদ আর শায়লার দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার। শাহেদ খুবই সহজ সরল মনের মানুষ। সবাইকে খুব সহজেই বিশ্বাস করে আর সাহায্য করতে চায় এবং করেও। তেমনি মাশুক যখন সবকিছু হারিয়ে রাস্তায় নেমেছিল তখন মাশুককে সাহায্যে করে নিজের বিপদ ডেকে এনেছিল, মাশুককে ওয়ার্ক পার্টনার করেছিল। আর মাশুক ব্যবসায় লস দেখিয়ে দেখিয়ে শাহেদকে ঠকিয়ে যাচ্ছিল প্রতিনিয়ত। তাই তাকে শিক্ষা দিতে শাহেদের স্ত্রী শায়লা বুদ্ধি করে মাশুককে নিয়ে যায় লাস ভেগাসে। আর সেখানে নিয়ে গিয়ে সব তথ্য ফাঁস করে মাশুককে এমন শিক্ষা দেয় শায়লা রুপা আর রুপার বরকে সাথে নিয়ে যে মাশুক পালিয়ে বাঁচে। শাহেদ কাজ ছাড়া কিছু বুঝত না আর টাইম দিত না বলে নায়লার সাহায্যে শাহেদকে ও টাইট দিয়ে দেয়।
একজন আজমল হোসেন: সোমা আর রঞ্জু দম্পতির ঝগড়া দিয়েই গল্পের শুরু।খুনসুটি, ঝগড়া ও ভালবাসার এক মিশ্র অনুভূতি পাওয়া যায় এই গল্পে!! সোমার সাথে ঝগড়া করে রঞ্জু যখন বেরিয়ে যায় তখনই সে একটা গাড়ির সামনে পড়লে সেই গাড়ির আফ্রো আমেরিকান চালক রঞ্জুর দিকে নোংরা ইঙ্গিত দিয়ে চলে গেল। ঘটনার শুরু এখান থেকেই। আজমল হোসেন আমেরিকায় আসেন একটা রিসার্চ অ্যাসিস্টন্টশিপ নিয়ে। স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমিয়ে তিনি আর এখান থেকে ফেরত যেতে চান নি। সোনার হরিণ ধরে তবেই ফিরবেন। কিন্তু সবার সব ক্ষেত্রে কি ভাগ্য সহায় হয়! তার ক্ষেত্রেও হল না। ফায়জুল তার গ্রামের ছেলে হয়েও তাকে অনেক বড় বিপদে ফেলে দিল। ফায়জুলের পরামর্শেই তিনি একটি কালো মেয়ের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করে ফেললেন। আর সেটাই তার সব থেকে বড় ভুল! এই মেয়েটি তার যা কিছু ছিল সবকিছু হাতিয়ে নিল ভয় দেখিয়ে,আর তার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে অনেক অনেক অত্যাচার করল আজমল সাহেবের উপর। তিনি কোনমতে জান নিয়ে পালিয়ে এসে পরলেন সোমা আর রঞ্জুর হাতে। সোমার সেবা শুশ্রূষায় সেরে উঠতে লাগলেন আজমল সাহেব। কোন কিছু জিজ্ঞেস করলে রেগে উঠেছেন আজমল সাহেব মাঝে মাঝে, তখন সোমা রাগ দেখিয়েও পরক্ষণেই ভুলে গিয়ে আজমল সাহেবের দেখাশোনায় লেগে গেছে। সোমার এই মাতৃভাব পুরো গল্পটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রিয় মানুষটিকে মনে পরে কি না সোমার এই ধরনের প্রশ্নে আজমল সাহেবের ছলছল চোখ, রঞ্জুর সাহায্য দেশে ফেরা সবকিছু মিলিয়ে কেমন অন্য রকম একটা ভাল লাগা তৈরি করে গল্পের ভেতর।
তাই গল্পগুলো বিস্তৃত ভাবে পড়তে তাড়াতাড়ি বইটি পড়তে শুরু করুন, এবং আমি হলফ করে বলতে পারি প্রত্যেকটি গল্প অসাধারণ লাগবে।
এই প্রথম হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া অন্য কারো বই আমি গভীর ভাবে গভীর মনোযোগের সহীত পড়েছি।
সবশেষে বলতে চাই এভাবে আরও গল্প উপহার দিয়ে আমাদের মনকে আনন্দে আপ্লুত করুন এই শুভ কামনা। আর কষ্ট করে আমাকে অটোগ্রাফ সহ বইটা পাঠানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই সাহেব। যদিও বইমেলায় আমি যেতে পারিনি কিন্তু যখন বইটি আমি হাতে পাই এই বইয়ের প্যাকেট আমাকে কিছুটা হলেও বইমেলার স্বাদ দিয়েছে!! দোয়া করি আমাদের সবার হৃদয়ে এভাবে সদা হাস্যোজ্জল হয়ে থাকেন সব সময় আর আরও নতুন নতুন বই নিয়ে আসুন খুব শীঘ্রই।

লিখেছেন: ফাইজা চৌধুরী নিশি

Dhushor-Boshonto-Review

হৃদয়গ্রাহী গল্পগ্রন্থ ‘ধূসর বসন্ত’

বসন্তের রং সবুজ হয়। তবে গল্পের নাম ধূসর বসন্ত কেন? বইয়ের এই গল্পটা সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী। ভালোবাসার গল্পে বিষাদের ছোঁয়া দিয়ে অপূর্ব সুন্দর একটা ছোটগল্প। ধূসর বসন্তের নামেই গল্পগ্রন্থের নাম।
বাবা মায়ের বিচ্ছেদে একটা শিশুমনে কীভাবে প্রভাব ফেলে সেই বিষয় উপজীব্য করে লেখা গল্পের নাম ’ছেলেটা’। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে সন্তানকে দেখতে যান বাবা অনেক তৃষ্ণা নিয়ে। সেই এক সন্ধ্যার গল্প।
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে লেখা ’ছিন্ন’ গল্পের জন্যে লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। পুরুষের কলমে নারীর জবানিতে উঠে আসা লেখার সমাপ্তিও চমৎকার ছিল। এই গল্পগুলো উঠে আসা উচিত।
সর্বশেষ যে গল্পটা নিয়ে লিখছি তার নাম `ডিপোর্টেশন’। বিদেশের জীবন মানেই নিশ্চিত জীবনের হাতছানি? আর্থিক সচ্ছলতা আর সুন্দর সব দৃশ্য সম্বলিত ছবি? এর বাইরেও প্রবাসীদের জীবনের যন্ত্রণা আর টানা পোড়েনের আখ্যান উঠে এসেছে এই গল্পে।
বইটিতে নয়টি গল্প আছে।

ধূসর বসন্ত
ধরন: গল্পগ্রন্থ (ছোট গল্প)
প্রচ্ছদশিল্পী: এনায়েত ইসলাম
প্রকাশ: অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০
প্রকাশনী: আনন্দম

Farhad-Hossain-Jojon-Jojon-Dhur-Book-Review

‘যোজন যোজন দূর’-এর আদ্যোপান্ত

একটি উপন্যাস যখন স্রেফ গল্পনির্ভর হয়, তা অনেকটা নরোম ভাতের মতো লাগে। সহজ বাংলায় যাকে আমরা জাউ ভাত বলি। কোনোরকমে উদরপূর্তি। কিন্তু গল্পের সাথে সাথে যখন চারপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ইত্যাদি পাওয়া যায়, তা হয় সবজি-ভাতের মতো। খেতেও সুস্বাদু, একই সাথে পুষ্টির যোগানও হয়। লেখক ফরহাদ হোসেন-এর সকল গল্প-উপন্যাসেই ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। তাঁর নতুন প্রকাশিত উপন্যাস ‘যোজন যোজন দূরে’ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে।

গল্পের সাথে সাথে তিনি রিলেটেড সকল স্থানের ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। আমেরিকার বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনার তথ্যসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে।

উপন্যাসটি মূলত আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিদের বিচিত্র জীবনাচার ও সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে রচিত। দূর থেকে বাঙালিদের কাছে আমেরিকা মানেই সুখ ও স্বচ্ছলতার আলো ঝলঝলে জীবন। কিন্তু বাস্তবতা এতোটা সহজ নয়। সেখানে টিকে থাকতে কঠিন যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, এবং ফলস্বরুপ নানান জটিলতা দেখা দেয়। অবৈধ বসবাস, ডিপোর্টেশন, পারিবারিক অশান্তি ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত আমেরিকার বাঙালিরা। বাঙালিদের এরূপ জটিলতার সাথে সাথে আমেরিকানদের চরিত্রের ক্রস পলিনেশনও লেখক প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, টিভির পর্দায় কোনো বিদেশি প্লটে লেখা নাটক দেখছি। আমরা যারা বিটিভির যুগে জন্মেছি, তারা এই উপন্যাসটি পড়লে স্মৃতিকাতরতায় ভুগবেন। মনে হবে, সেই কিশোর বয়সে দেখা বহুল চরিত্রের নাটক, যেসব নাটকের দৃশ্য বিদেশের চমৎকার ও আকর্ষণীয় স্থানে চিত্রায়িত হতো।

টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত শহর ডালাসের বাঙালি কমিউনিটিতে জনপ্রিয় নাম ফরিদ হাসান। তাকেই এ উপন্যাসের মূল চরিত্র করা হয়েছে। মূল চরিত্র বলে নয়, লেখক এ চরিত্রকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন- তাতে করে ফরিদকে উপন্যাসের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র দাবি করতে আমার কোনো কার্পণ্য নেই। ফরিদের চরিত্রের দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। সোসাইটির যে কারো সমস্যার সমাধানে ফরিদ সর্বদা তৎপর। অন্যের সমস্যার সমাধান করতে করতে একসময় তার নিজের জীবনই চরম জটিলতার মধ্যে পড়ে যায়। পারিবারিক ভাঙনের কবলে ফরিদের পরিবার- এ দুঃসময়েও সে অন্যের বিপদের ডাকে সাড়া দেয়। ফরিদের চরিত্রের সাথে প্রিয় অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীর খুব সাদৃশ্য পেয়েছি। যেন লেখক তাকে সামনে বসিয়েই চরিত্রটি সাজিয়েছেন। আমার ধারণা- জীবিত থাকলে স্বয়ং হুমায়ূন ফরিদীও দ্বিধান্বিত হতেন, লেখককে প্রশ্ন না করে পারতেন না!

উপন্যাসটিতে লেখক বহুল চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। সাবের, স্বপন, রাশেদ, মিতু ইত্যাদি চরিত্রগুলোর বিচিত্র জীবনবৈচিত্রের পাশাপাশি মূল ঘটনার বর্ণনা সুনিপূণভাবে উপস্থাপন করছেন। পারিপ্বার্শিক চরিত্রগুলো আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন জীবনবৈচিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়। মিতু চরিত্রটিকে খুবই ভালো লেগেছে। ভেতরে দুঃখ পুষেও সে বাইরে সবসময় চঞ্চল। অন্যদিকে রেশাদ চরিত্রটি একেবারেই উল্টো। সে ভেতরে-বাইরে সবসময়ই অস্থির। সবার থেকে নানান কৌশলে আর্থিক সুবিধা আদায় করাই তার একমাত্র কাজ। আপাতদৃষ্টিতে চরিত্রটি নেগেটিভ হলেও তার কথা-বার্তার ধরনে তাকে খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এখানে লেখকের দক্ষতার প্রশংসা না করলেই নয়। এতো চরিত্রের সমাহার উনি ঘটিয়েছেন, অথচ প্রতিটি চরিত্রই স্পষ্ট এবং কোথাও কোনো অতিকথন নেই। ১৭৪ পৃষ্ঠার মেদহীন, পরিপাটি একটি উপন্যাস। একদিকে ফরিদ-রুমা দম্পতি, অন্যদিকে রিয়া-মুরাদ দম্পতির টানা-পোড়েনে তাদের সন্তানরা মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়। পারিবারিক ভাঙন সন্তানদের উপর কী ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে, এ উপন্যাসে তা স্পষ্ট হয়েছে। গল্পের একপর্যায়ে নাটকীয়ভাবে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ যুবক ডেভিডের আগমন ঘটে। রিয়ার সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব মুরাদকে অস্থির করে তুলে। সে তার লাগামহীন জীবনের আচমকা লাগাম টেনে রিয়ার কাছে ফিরতে চায়। এখানে রিয়া আর মুরাদের রয়াসন চমৎকার। ভালোবাসলে হাজার অপরাধও তুচ্ছ করে ক্ষমা করা যায়। আসলে ভালোবাসা যত্নে বাড়ে। যে যত্নের অভাবে রুমাও দিন দিন কঠিন থেকে কঠিন হয়েছে । এই কাঠিন্য তাকে ফরিদের থেকে এতো দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় যে, স্বামী-স্ত্রী হয়েও তারা যেন যোজন যোজন দূরের কেউ!

যারা বৈচিত্রপূর্ণ গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তারা নিঃসংশয়ে উপন্যাসটি পড়তে পারেন। এখানে পারিবারিক গল্পের পাশাপাশি পাবেন সহজাত শারীরিক-মানসিক প্রেমের আবেদন এবং আমেরিকায় বাঙালিদের জীবনযাত্রা ও ইতিহাস-ইতিহ্যের সংস্পর্শ।

‘যোজন যোজন দূর’ রকমারিসহ সকল অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে এবং মেলার প্রথমদিন থেকে পাওয়া যাবে অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়নে।

যোজন যোজন দূর
ধরন: উপন্যাস
লেখক: ফরহাদ হোসেন
প্রকাশনা: অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা মাত্র

cheleta

ছেলেটা

প্রায় ছয় মাস হলো আমার স্ত্রীর সংগে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আমি এখনও জানিনা আমাদের সংসার কেন ভেঙ্গে গেল। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রবেশ ঘটেনি। কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাদের সম্পর্ক দিনকে দিন জটিল হয়ে যাচ্ছিল। যদিও আমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ছিল। আমি অবশ্য কোন অভিযোগের বিরুদ্ধে কিছুই বলতে পারিনি। শুধু ভেবেছি, জোড় করে আর যাই হোক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। তারচেয়ে বরং আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো।
যদিও সে এখন আর আমার স্ত্রী নয়, কিন্তু আমার তাকে সাবেক ভাবতে ভাল লাগে না। আমরা দুজনে এখনও সিঙ্গেল, নতুন করে বিয়েও করিনি-কোনো সম্পর্কেও জড়াইনি। তাই প্রাক্তন কিংবা বর্তমান বিষয়টা এখনও আমাদের সম্মোধন বা পরিচয়ের মধ্যে আসেনি।
আমাদের একটি মাত্র ছেলে সন্তান। গত মাসে সে ৫ বছরে পড়ল। সে তার মায়ের কাছেই থাকে।
মাসের প্রথম দিনেই আমি সাধারনত আমার স্ত্রীর হাতে এলিমনির বরাদ্দকৃত টাকাটা দিয়ে আসি। এর ব্যতিক্রম খুব একটা হয় না।
একদিন বিকেলে, কাজ থেকে ফেরার পথে আমি টাকা দেবার জন্যে ওর বাসায় গেলাম। কলিং বেল বাজাতেই আমার ছোট্ট ছেলেটা দৌড়ে এসে দরজার এক পার্ট খুলে লোহার গ্রিল ধরে দাড়াল। আমাকে দেখে যে সে খুব খুশি হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। অফিসের কাজে আমাকে একমাসের ট্যুরে বাইরে যেতে হয়েছিল। এতদিন পরে আমাকে দেখে খুশিতে চিকচিক করে উঠল ছেলেটার দুই চোখ।
বন্ধ দরজার ভেতর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল,‘বাবা তুমি আসছ?’
আমি বললাম, ‘হ্যা বাবা, আমি আসছি। কেমন আছো তুমি?’
সে ছোট ছোট করে বলল, ‘আমি ভালো আছি।’
‘আম্মু আসে নাই এখনও।’
‘না।’ বলেই সে খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল,‘তুমি কি ভিতরে আসবা। চাবি এনে দেই, খুলে ভিতরে আসো।’
‘থাক বাবা, চাবি আনতে হবে না। আমি এখানেই থাকি।’
‘কেন?’
‘ভিতরে আসাটা ঠিক হবে না বাবা।’
‘কেন? কেন ঠিক হবে না?’
‘তোমার আম্মু যে বাসায় নেই।’
আমাকে দেখার পর তার চোখে মুখে যে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিয়েছিল, তা যেন হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেল। আমি ওর গভীর চোখ দুটোতে বিষাদের হাসি দেখতে পেলাম। এমন একটা পরিস্থিতিতে এতটুকু একটা বাচ্চা নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আমি প্রসংগ বদলে দেবার চেষ্টা করলাম যাতে ওর ছোট্ট মনের উপর চাপ না পড়ে। কিছুদিন আগেই ওর জন্মদিন ছিল। অফিসের ট্যুরে শহরের বাইরে থাকায় আমি ওর জন্মদিনে আসতে পারিনি। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা তোমার বার্থডেতে কি কি মজা করলে বলো।’
সে খুব খুশি হয়ে বলল, ‘অনেক মজা করেছি। অনেক মজা।’
‘আমাকে মিস করোনি?’
‘অনেক মিস করেছি। অনেক।’
বন্ধ দরজার গ্রিলের মধ্যে দিয়ে হাত প্রসারিত করে আমরা দুজন দুজনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আমার স্ত্রী বাসায় না থাকা অবস্থায় আমি কখনও যদি আসি, আমরা এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকি। ছেলেটা কয়েকবার ভিতরের দিকে তাকাল। আমি বুঝতে পারলাম সে তার বেবি সিটার দূর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কিনা সেটা লক্ষ্য করছে। আমি আরও কিছুক্ষন খেলাচ্ছলে বিভিন্ন কথা বললাম। তার স্কুল কেমন চলছে, বার্থ-ডে তে কি কি গিফট পেল, সামনের উইকএন্ডে সে আমার সাথে কোথায় যেতে চায় এসব অনেক ধরনের কথাই হলো আমাদের মাঝে। আমি আরও কিছুক্ষন অপেক্ষা করে বললাম, ‘তোমার আম্মুর আসতে বোধ হয় দেরী হবে। আমি তোমার আম্মুর জন্যে কিছু টাকা এনেছি। এগুলো তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। আম্মু এলে বলবে, বাবা এসে দিয়ে গেছে।’ বলেই আমি আমার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা এনভেলপ বের করে ওর হাতে দিলাম।
সে এনভেলপ হাতে নিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে নেড়েচেড়ে বলল, ‘আম্মু তোমার কাছে অনেক টাকা পায়?’
আমি বললাম, ‘না বাবা। অনেক টাকা না। আমি কাজ করে যেই টাকা পাই, তার কিছু অংশ।’
‘ও।’ বলে সে চুপ করে রইল।
সে আদৌ কিছু বুঝেছে কিনা জানি না। তবে সে যেহেতু দেখছে বাবা প্রতিমাসে একটা সময়ে এসে আম্মুর হাতে টাকা দিয়ে যায়, সেহেতু এটাই হয়তো নিয়ম। তবুও আমি একটু বুঝিয়ে বললাম, ‘এই ধরো তোমার স্কুল, তোমার ফেভারিট ফুড, ফেভারিট টয়স কেনার জন্যে, বেড়াতে যাওয়ার জন্যে এই টাকা আমি দেই।’
সে আবার এনভেলপটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু এখানে তো অনেক টাকা! তোমার জন্যে কিছু রেখেছ?’
আমি হেসে দিয়ে বললাম, ‘হ্যা বাবা, আমার জন্যে যতটুকু দরকার, রেখেছি। তাছাড়া আমিতো একা। আমার বেশি টাকা লাগে না। তোমরা তিনজন। তুমি, আম্মু, বেবি সিটার।’
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে সে কিছু একটা ভাবল। তারপর হঠাৎ করেই বলল,‘তুমি একটু দাড়াও বাবা, আমি আসছি।’ বলেই সে এক দৌড়ে ভিতরে চলে গেল। আমি ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ কিছু একটা ভাঙ্গার শব্দ হলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই সে ফিরে এলো। তার ছোট্ট হাত দুটির মুঠি বন্ধ করে সে আমার সামনে এসে দাড়াল। তারপর আমার দিকে তার ছোট্ট হাত দুটি একসাথে এগিয়ে দিয়ে মুঠি মেলে ধরে বলল, ‘নাও।’
আমি তাকিয়ে দেখলাম ওর হাত ভর্তি অনেক গুলো কয়েন। তার ছোট্ট হাত দুটিতে যতখানি সম্ভব ভরে নিয়ে এসেছে।
‘আমার মানিবক্সে যা ছিল, নিয়ে এসেছি। এখানে হয়তো অনেক নেই, কিন্তু তুমি কিছু কিনতে পারবে।’ বলতে বলতেই তার চোখ ভিজে এলো।
আমি গ্রিলের মধ্যে দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরলাম। অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলাম না। কেঁদে ফেললাম।
সেদিনের পর থেকে আমি যেন অন্য এক মানুষ হয়ে গেলাম। আমি মরে গেলাম না আমার পুনর্জন্ম হলো, কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারলাম, জীবনে আমি কিছু একটা ভাল কাজ করেছিলাম যার কারনে মহান করুনাময় আমাকে এমন পুরস্কার দিলেন।
সেই আনন্দ, সেই ভাললাগা, সেই ভালবাসার কথা আমি যতদিন বেঁচে থাকব, আমার মনে থাকবে। অতটুকু ক্ষুদ্র মনের মধ্যে যেই ভালবাসার আধার পরম করুনাময় সৃষ্টি করেছেন,তার মূল্য অপরিসীম।
ছেলেটা আমার অনেক বড় হয়ে গেছে। তার বয়স এখন দশ। এখন সে ভায়োলিন বাজাতে জানে। সকার খেলে। স্কুলেও ভাল রেজাল্ট করছে। মাঝে মাঝে সে আমার সংগে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকার খেলা খেলে। আমি তার চোখের দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারিনা। চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।
সে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার চোখে কি হয়েছে বাবা। কাঁদছ কেন?’
আমি চোখ মুছতে মুছতে বলি, ‘কাঁদি নারে বাপ। কাঁদি না।’
আমার আত্মার একটা অংশ। যেই ভালবাসা আর মহানুভবতা উপরওয়ালা তার হৃদয়ে সৃষ্টি করে দিয়েছেন, আমি তার জন্যে অশেষ কৃতজ্ঞ। ঐ একটা বিকেল আমার জীবনের গতিপথ নতুন করে বদলে দিয়েছে।
ছোট্ট দুটি হাতের মুঠি ভরা কতগুলো কয়েন এখনও আমার জ্যাকেটের পকেটে। আমার মন খারাপের দিনগুলিতে আমি জ্যাকেটের পকেট থেকে কয়েনগুলো বের করে হাতে নিয়ে দেখি। যেই কয়েনগুলো সে তার মানিবক্স খালি করে নিয়ে এসে আমাকে দিয়েছিল, সেই ভালবাসার কয়েনগুলোই আমার জীবনকে এখন পরিপূর্ণ করে দেয়।
আমি নতুন করে বাঁচতে শিখি!

immigration-deportation

ইমিগ্রেশন ডিপোর্টেশন এবং অপেক্ষার গল্প (পর্ব-১)

‘এক্সিউজ মি! তুমি কি বলতে পারবে আমার আম্মু কোথায় বসেছে?’
এয়ার হোস্টেস অবাক হয়ে তাকাল প্রশ্নকারীর দিকে। অল্প বয়সী একটা ছেলে—দৃষ্টিতে উৎকণ্ঠা। চোখে মুখে শঙ্কা আর দুশ্চিন্তার ছায়া সুস্পষ্ট।
মধ্য আকাশে কুয়েত এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইট সবেমাত্র সোজা হয়ে চলতে শুরু করেছে। বিমান তার নির্দিষ্ট উচ্চতায় উঠে যাবার পরপরই বিমানের ক্যাপ্টেন ইতোমধ্যে সিটবেল্ট বাঁধার সংকেত নিভিয়ে দিয়েছেন। মাত্র কিছুক্ষণ হলো বিমানটি নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে কুয়েতের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করেছে। কেবিন ক্রুরা উঠে দাঁড়িয়েছে। তারা একটি ট্রেতে করে উষ্ণ ভেজা টিস্যু পেপার বিতরণ করছে যাত্রীদের মাঝে—হাত মুখ মুছে নেবার জন্যে। খাবার পরিবেশনের প্রস্তুতি চলছে—কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবারের ট্রলি নিয়ে বের হয়ে পড়বে। যাত্রীদের মধ্যে কয়েকজন সিট বেল্ট খুলে বাথরুমের দিকে এগিয়ে গেল। কেউ কেউ চাদর গায়ে পেঁচিয়ে আরাম করে বসেছে। কেউ কেউ সামনের ছোট টিভি স্ক্রিনে সিনেমা ছেড়ে দিয়েছে।
বিমানে উঠার পর থেকেই ছেলেটি অস্থির হয়ে চারিদিকে খুঁজেছে। কিন্তু কোথাও দেখতে পায়নি তাকে। ভেবেছিল প্লেনে ছাড়ার আগে হয়ত সবাই একসাথে হবে ওরা—কিন্তু হয়নি। তাই প্লেন সোজা হতেই সে হেল্প লাইটটি জ্বালিয়ে দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। একজন কেবিন ক্রু দূর থেকে লক্ষ্য করে ছেলেটির কাছে এগিয়ে আসতেই সে উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল তার মায়ের কথা।
এয়ার হোস্টেস খানিকটা দ্বিধা নিয়ে তাকাল ছেলেটির মুখের দিকে। আনুমানিক দশ কিংবা এগার বছর বয়স হবে তার। এয়ার হোস্টেস ছেলেটির সিটের পজিশন দেখল। লক্ষ্য করল তার পাশের সিটে ছোট একটি মেয়ে বসে আছে। সম্ভবত ওর ছোট বোন। মেয়েটির চোখ ফোলা। দীর্ঘ সময় ধরে বিরতিহীন কান্নার কারণে চোখ ফুলে আছে। এয়ার হোস্টেস দেখল জানালার সিটে একজন ভদ্রলোক বসা। বেশভূষায় মনে হলো কুয়েতি কিংবা মধ্যপ্রাচ্যের কোনো দেশের নাগরিক। তার মানে ছেলেটির মা কিংবা বাবা কেউ ওদের সঙ্গে নেই। এয়ার হোস্টেস কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কেন, তোমার আম্মুর কোথায় বসার কথা? তোমাদের সঙ্গে না?’
‘আমরা তো তাই ভেবেছিলাম, কিন্তু সে তো আমাদের সঙ্গে বসেনি।’
এয়ার হোস্টেস ভ্রু কুঁচকে জানতে চাইল, ‘তাহলে কোথায় বসল? তোমারা একসঙ্গে বোর্ডিং করোনি?’
‘না।’
‘সে কি আলাদা বোর্ডিং করেছে?’
‘আমি ঠিক জানি না।’
এবার এয়ার হোস্টেস পুরা মাত্রায় বিভ্রান্ত হয়ে গেল। সে জানতে চাইল, ‘তোমার আব্বু? তিনি কোথায় বসেছেন?’
‘আব্বু তো নিউ ইয়র্কে—আসে নি আমাদের সাথে।’
‘তিনি যাচ্ছেন না?’
‘না।’
‘কিন্তু তোমার আম্মু যাচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘মেয়েটি কি তোমার বোন?’ পাশের ছোট মেয়েটির দিকে তাকিয়ে সে বলল।
‘হ্যাঁ। আমার ছোট বোন।’
একটু ভেবে এয়ার হোস্টেস বলল, ‘আচ্ছা, ঠিক আছে। আমি দেখছি কিছু জানতে পারি কিনা। আচ্ছা তোমার মায়ের নাম কী?’
‘শিরিন খান।’
‘শিরিন খান!’ এয়ার হোস্টেস নামটা উচ্চারণ করল একবার তারপর বলল, ‘আমি ফিরে আসছি একটু পরেই—তুমি একটু শান্ত হয়ে বসো।’
ছেলেটির সিট নাম্বার আরেকবার দেখে নিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে সে হেঁটে চলে গেল ককপিটের দিকে।
ছোট মেয়েটি তার ভাইয়ের হাত ধরে কেঁদে উঠল আবার। ছেলেটি তার বোনকে জড়িয়ে ধরে কান্না থামানোর চেষ্টা করল—কিন্তু কিছুতেই মেয়েটির কান্না থামছে না। তার নিজেরও অনেক কান্না পাচ্ছে—কিন্তু তাকে এখন কাঁদলে চলবে না। শক্ত হতে হবে। পরিস্থিতি যাইহোক, তাকে মোকাবেলা করতে হবে। সে বোনকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে স্থির হয়ে বসে রইল।
বেশ কিছু সময় পার করে এয়ার হোস্টেস ফিরে এলো। সাথে একজন ফ্লাইট অফিসার। কিন্তু যে সংবাদ তাঁরা নিয়ে এলো তা মোটেও সুখকর হলো না। এয়ার হোস্টেস বলল, ‘হানি, শিরিন খান নামে কোনো প্যাসেঞ্জার এই প্লেনে নেই। এই নামের কেউ যাচ্ছেন না।’
মুহূর্তে ছেলেটির মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গেল। কান্নায় ভেঙে পড়ল বাচ্চা মেয়েটি। ছেলেটি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলল, ‘তাহলে? সে তাহলে কোথায় গেল? কী হয়েছে আম্মুর?’
‘আমাদের কাছে এর চেয়ে বেশি কোনো তথ্য নেই। আমরা চেষ্টা করছি খোঁজ বের করার।’
ছেলেটি তার বোনকে জড়িয়ে ধরল আবার।
‘তুমি কি শিওর—এই প্লেনেই তার বুকিং ছিল?’
ছেলেটি নিশ্চিত নয়। সে নিরুত্তর দাঁড়িয়ে রইল। তার বাবা বলেছিল, তোমাদের আম্মুর সঙ্গেই তোমরা একসাথেই যাবে। সেভাবেই সব ব্যবস্থা করা হয়েছে। এয়ারপোর্টেই আম্মুর সঙ্গে দেখা হবে।
ছেলেটি চুপ করে আছে দেখে এয়ার হোস্টেস আবার জানতে চাইল, ‘তিনি কি তোমাদের সাথে এয়ারপোর্টে এসেছিলেন?’
‘না।’
এয়ার হোস্টেস আর কিছু জিজ্ঞেস না করে অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল ফ্লাইট অফিসারের দিকে। সে কিছু বুঝতে পারছে না ঘটনা কী হতে পারে। ফ্লাইট অফিসার এতক্ষণ ছেলেটি আর তার বোনের দিকে তাকিয়ে ভাবছিল সে—ছোট ছোট দুটি বাচ্চা—এদের তো একা একা ফ্লাই করার কথা না। নিশ্চয়ই কোনো বিশেষ ব্যবস্থায় এরা এসেছে। সেটা কী? ফ্লাইট অফিসার মাথা ঝুঁকিয়ে সামনে এসে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা এয়ারপোর্টে কার সঙ্গে এসেছো? কেউ হেল্প করেছে?’
‘আমার আব্বু।’
‘তোমার আম্মু কোথায় ছিল তখন?’
কিছু না বলে ছেলেটি চুপ করে রইল আবার।
ফ্লাইট অফিসার আবার বললেন, ‘তোমার আম্মুর কি অন্য কারো সাথে আসার কথা ছিল? অন্য কোথাও থেকে?’
ছেলেটি এবারও নিরুত্তর রইল। সে ঠিক বুঝতে পারছে না কী বলবে এবং কীভাবে বুঝিয়ে বলবে।
ফ্লাইট অফিসার কিঞ্চিত অধৈর্য হয়ে বললেন, ‘তুমি কি শিওর এই ফ্লাইটেই তোমাদের সঙ্গেই তার যাওয়ার কথা ছিল?’
‘ওরা আব্বুকে তাই বলেছিল—যে আম্মু আমাদের সঙ্গেই যাবে। কিন্তু আমরা বোর্ডিংয়ের সময় তাকে দেখিনি। ভেবেছিলাম প্লেনে এসে দেখা হবে।’
‘এক মিনিট। ওরা মানে? ওরা কারা—কাদের কথা বলছো?’
‘ইমিগ্রেশন পিপল।’ ছেলেটি আস্তে করে এমনভাবে বলল যেন আশেপাশের কেউ শুনতে না পায়। যেন কেউ শুনলে সে লজ্জায় পড়ে যাবে। ইতিমধ্যেই ভয়ে তার মুখ শুকিয়ে গেছে।
‘ওহ গড!’ বলেই ফ্লাইট অফিসার তাকালেন এয়ার হোস্টেসের দিকে। তার আর বুঝতে অসুবিধা হলো না—ঘটনা আসলে কী ঘটেছে বা ঘটে থাকতে পারে। তিনি মোটামুটি নিশ্চিত—শুধু বুঝতে পারছেন না, ভদ্রমহিলা বিমানে উঠেনি কেন?
তিনি ছোট ছোট ভাই-বোন দুটির দিকে তাকিয়ে ভালো মত লক্ষ্য করলেন। এদেরকে এখন কী বলে সান্ত্বনা দেবে সেটাই তিনি বুঝতে পারছেন না। তিনি নরম সুরে বললেন, ‘তোমরা যাচ্ছ কোথায়? কোন দেশে?’
‘বাংলাদেশে।’
ফ্লাইট অফিসার চিন্তায় পড়ে গেলেন। এত অনেক লম্বা ফ্লাইট। তিনি মনে মনে হিসেব করে ফেললেন—নিউ ইয়র্ক থেকে কুয়েত ১২ ঘণ্টা—মাঝে ট্রানজিটে থাকতে হবে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা তারপর শেষ পর্যায়ে কুয়েত থেকে ঢাকা আরো ৫ ঘণ্টা। তার মানে সব মিলিয়ে কম করে হলেও ২১-২২ ঘণ্টা। এতটা সময় বাচ্চা মেয়েটি কী করে পার করবে সেটিই এক চিন্তার বিষয়। হয়ত আরো কান্নাকাটি করবে। তিনি ছেলেটিকে এবার বুঝিয়ে বললেন, ‘তোমাদেরকে একটু ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করতে হবে। আমরা যখন কুয়েতে নামব—তখন খোঁজ নিয়ে জানার চেষ্টা করব। আমরা নিউ ইয়র্কে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করব। তখন নিশ্চয়ই জানতে পারব। আমি বুঝতে পারছি, তোমাদের মন খারাপ। কিন্তু এই মুহূর্তে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই।’ এরপর একটু থেমে তিনি এয়ার হোস্টেসকে বললেন, ‘ওদের দিকে লক্ষ্য রেখো। ওদের যা দরকার—তাই যেন পায়। কোনো সমস্যা যেন না হয়। আমি আবার এসে খোঁজ নিয়ে যাবো।’ বলেই তিনি চলে গেলেন ককপিটের দিকে।
এয়ার হোস্টেস বলল, ‘আমরা কিছুক্ষণের মধ্যেই খাবার পরিবেশন করব। তোমাদের কি অন্য কিছু লাগবে এখন?’
‘না, আমার কিছু লাগবে না।’ ছেলেটি বলল। সে মন খারাপ করে বসে রইল।
এবার মেয়েটির দিকে তাকিয়ে বলল সে, ‘তোমার কিছু লাগবে সোনামণি?’
‘আমি আম্মুকে চাই। আমি আম্মুর কাছে যেতে চাই। আমার আম্মুকে এনে দাও।’ কেঁদে কেঁদে বলল মেয়েটি। এবং কাঁদতেই থাকল।
এয়ার হোস্টেস পড়ে গেল মহা চিন্তায়। কিন্তু এখানে, এই মাটি থেকে পঁয়ত্রিশ হাজার ফিট উপরে সে তার আম্মুকে কোথায় পাবে?

প্রিয় পাঠক, আপনাদের কৌতূহলী মন নিশ্চয়ই জানতে চাইছে ছেলেটির মায়ের কী হলো। সে কোথায়? কেনই বা ওদের সঙ্গে যাচ্ছে না বা যেতে পারল না। এ সমস্ত প্রশ্নের উত্তর সহ ছেলেটি, তার বোন, আর বাবা এবং সর্বপোরি মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেব আগামী পর্বে।
সে পর্যন্ত অপেক্ষা করুন।

পরের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন

Farhad-Hossain

এ এমন পরিচয় (পর্ব-১)

আজ সকাল থেকেই ফাহিমের মধ্যে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে। কেন জানি এক অজানা ভালোলাগা গ্রাস করে রাখল তাকে সারাক্ষণ। সারাদিন ভীষণ উত্তেজনায় কাটল তার।
হঠাৎ করে এই ভালোলাগার কারণ একটা টেক্সট মেসেজ। সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানায় শুয়ে শুয়ে আলসেমি করছিল ফাহিম—মেসেজের নোটিফিকেশন এলো তখন। সে ফোনটা সামনে নিয়ে দেখল সিমির মেসেজ। সে লিখেছে, ‘হাই, তুমি কি ডালাসে আমার একটা কাজের ব্যবস্থা করে দিতে পারবা?’
ফাহিম বেশ কিছুক্ষণ মেসেজটার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে উত্তর দিল, ‘চেষ্টা করে দেখতে পারি। কী ধরণের কাজ তুমি খুঁজছো?’
‘জানি না। যে কোনো কাজ—আমার পক্ষে করা সম্ভব এমন কোনো কাজ।’
‘তুমি ডালাসে আসছ? তোমার না আসার কথা ছিল?’
‘আগামীকালই আসছি। দুপুর সাড়ে বারোটায় আমার অ্যারাইভালো।’
‘তাহলে তো ভালোই হলো। আমাদের কি দেখা হতে পারে?’
‘বুঝতে পারছি না। আমি মাত্র একদিনের জন্যে আসতেছি। পরেরদিনই ফিরে যাচ্ছি।’
‘উফ!’
‘তুমি ফ্রি থাকলে আগামীকাল দেখা হতে পারে। তুমি কখন ফ্রি হবা?’
‘পাঁচটা পর্যন্ত আমার কাজ। তারপরেই ফ্রি।’
‘দেখি পাঁচটার পরে আমি দেখা করতে পারি কিনা। আমি তোমাকে জানাব।’
ওকে লিখে ফাহিম ফোনে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল। অনেকক্ষণ কেটে গেল। কিন্তু সিমি আর কিছু লিখল না। ফাহিম বিছানা ছড়ে উঠে পড়ল। সে বাথরুমের দিকে পা বাড়াতেই ‘টিং’ করে নোটিফিকেশনের শব্দ শুনতে পেল। সে চকিতে ফোন তুলে নিল। সিমি লিখেছে, ‘তুমি কি পরশুদিন দেখা করতে পারবা? আমি তিনটার মধ্যেই ফ্রি হয়ে যাব। রাত আটটায় আমার ফ্লাইট।’
ফাহিম কিছু না ভেবেই তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল, ‘পারব।’
‘আমাকে এয়ারপোর্টে ড্রপ করতে পারবা?’
‘হ্যাঁ পারব।’
সিমি ঠিকানা লিখে পাঠাল। তারপর আর কোনো কথা নেই। অনেকক্ষণ কেটে গেল। ফাহিমের মনে হচ্ছে সিমি আরো কিছু লিখবে। অন্তত একটা সৌজন্যমূলক ধন্যবাদ নিশ্চয়ই দেবে। সে ফোন হাতে দাঁড়িয়ে রইল।
আরো কিছুক্ষণ ফোনের দিকের তাকিয়ে থেকে ফাহিম বাথরুমে ঢুকে পড়ল। প্রাত্যহিক কাজ শেষ করে ফিরে এসে ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল সিমি লিখেছে, ‘থ্যাঙ্ক ইউ ফাহিম। ইট রিয়েলি মিনস এ লট।’
ফাহিম লিখল, ‘আমার যে কী ভালো লাগছে তোমাকে বোঝাতে পারবো না সিমি। কতদিন পর তোমাকে দেখতে পাবো, ভাবতে পারো?’
সিমি কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর সে অফলাইন হয়ে গেল।
সিমির সঙ্গে শেষ কবে দেখা হয়েছিল ফাহিম মনে করার চেষ্টা করল। সম্ভবত ২০০৯ সালের জানুয়ারি কিংবা ফেব্রুয়ারিতে যখন সে দেশে গিয়েছিল। সিমি তখন কাজ করত একটা এয়ারলাইন্সে। সম্ভবত সিঙ্গাপুর এয়ারলাইন্স। ঢাকার গুলশানস্থ সিমির অফিসে দেখা করতে গিয়েছিল ফাহিম। মাত্র কয়েক মিনিটের দেখা। রিসেপশনে বলতেই সিমিকে ডেকে দিল রিসেপশনিস্ট। সিমি এলো—এসে একটা এনভেলপ ধরিয়ে দিল ফাহিমের হাতে। আর কোনো কথা নেই। ফাহিমের সাথে তার এক বন্ধু ছিল। বাংলাদেশের জনপ্রিয় একজন সঙ্গীত শিল্পী। তার সঙ্গে সৌজন্যমূলক পরিচয়টুকুও করাতে পারেনি ফাহিম। সিমি এনভেলপটি ফাহিমের হাতে দিয়েই চলে গিয়েছিল ভিতরে। একবারের জন্যেও ফিরে তাকায় নি। ফাহিম কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে চলে এসেছিল। সেই শেষ দেখা।
ফাহিম গত নয় বছরে অনেকবার ভেবেছে, কী এমন হয়েছিল—বা ঘটেছিল যে সিমি তার সঙ্গে সব ধরণের যোগাযোগ বন্ধ করে দিল? ফাহিম ফোনে চেষ্টা করেছে অনেকবার—সিমি কোনো উত্তর দেয়নি। ফেসবুক—মেসেঞ্জারেও ফাহিমকে ব্লক করে দিয়েছে সিমি। অথচ সিমির অনুরোধেই ফাহিম ফেসবুকে একাউন্ট খুলেছিল। সিমিই তাকে কিভাবে ফেসবুক ব্যবহার করতে হয় শিখিয়েছিল।
যোগাযোগের সব মাধ্যমগুলিই বন্ধ করে দিল সিমি—এমনকি ইমেইলও। অথচ একটা অনাকাঙ্ক্ষিত ইমেইলের কারণেই সিমির সঙ্গে ফাহিমের পরিচয় হয়েছিল। অনেকটা নাটক-সিনেমার কাহিনীর মতো। ভুল থেকে পরিচয় তারপর বন্ধুত্ব তারপর বিচ্ছেদ। সময়টা খুব মনে আছে ফাহিমের। ২০০৬ সনের অক্টোবর মাসের ১৬ কী ১৭ তারিখ।
সিমির সঙ্গে ফাহিমের পরিচয়পর্বটা বেশ অদ্ভুত।
তখন সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের ব্যবহার এখনকার মতো এতটা জনপ্রিয় হয়ে উঠেনি। এখন যেমন যে কোনো মজার ঘটনা, কৌতুক, ছবি ও অন্যান্য তথ্য বন্ধুদের ট্যাগ করে টাইমলাইনে শেয়ার করার প্রচলন—তখন ইমেইলই ছিল অনলাইন যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এবং এ ধরণের মজার বিষয়গুলো শেয়ার করার প্রচলিত মাধ্যম।
তো এমনই একটি মজার ঘটনা, সম্ভবত একটা কৌতুক ফাহিমের ইমেইলে এলো। মজার ঘটনা বা বিষয়টি কী সে কথা ফাহিমের মনে নেই এখন আর তবে যা মনে আছে তা হলো সে আবার সেই কৌতুকটি শেয়ার করল আরেকটি ইমেইল গ্রুপে যেখানে তার অন্যান্য বন্ধুরা আছে।
এবং সেই ইমেইলটির একটি উত্তর এলো ফাহিমের ইনবক্সে—একজনের কাছ থেকে। যে লিখেছে তাকে ফাহিম চিনতে পারল না। এবং সে এই ইমেইল গ্রুপেই বা কী করে এলো তাও ফাহিম মনে করতে পারল না। খুব কড়া ভাষায় সে লিখেছে—ফাহিম না চিনে একজন অপরিচিত মানুষকে এধরণের ইমেইল কেন পাঠিয়েছে। সে যদি ফাহিমের পরিচিত হয়েই থাকে তবে কীভাবে তাকে চেনে? আর ফাহিমের পরিচয়ই বা কী?
‘আপনাকে আমি ঠিক চিনতে পারছি না—ক্ষমা করবেন। আপনি কি বলবেন, আপনি কে?’
ফাহিম কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে মেলানোর চেষ্টা করল, কিন্তু কিছুতেই মেলাতে পারল না। সে তার ইমেইল লিস্টের সব ইমেইলগুলোকে এক এক করে দেখল এবং সব শেষ ইমেইলটি যে পাঠিয়েছে সেই লিস্ট দেখে বুঝতে পারল সে ফাহিমের দীর্ঘদিনের বন্ধু মুনার পরিচিত কেউ।
ফাহিম বিষয়টি ব্যাখ্যা করে লিখে পাঠাল—এটা আসলে অনিচ্ছাকৃত ভুল। ভীষণ দুঃখিত। সে আরো লিখল, ‘আমাকে চেনার অবশ্য কোনো কারণও নেই। আমার নাম ফাহিম। শিকাগোতে থাকি। আপনার ইমেইল লিস্টের মুনা নামের যে মেয়েটি আছে, সে আমারও বন্ধু। আমরা একই শহরে থাকি। আপনার আর কিছু জানার থাকলে দয়া করে বলবেন। অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্যে আবারো দুঃখিত।’
এরপরে এই বিষয় নিয়ে আর কোনো ইমেইল আদান-প্রদান হয় নি। ফাহিম মাঝে মাঝে ইমেইল খুলে দেখেছে—কিন্তু না কোনো উত্তর আর আসে নি। এক সময় বিষয়টা সে ভুলেও গেল।
বেশ কিছুদিনের ব্যবধানে হঠাৎ করেই ফাহিম একটা ইমেইল পেল। সিমি লিখেছে, ‘হ্যালো ফাহিম, কেমন আছো? উত্তর দিতে দেরী হলো বলে দুঃখিত। ব্যক্তিগত কিছু কাজে ব্যস্ত ছিলাম। ইমেইল নিয়ে আর ভাবতে হবে না—এসব ইমেইল পেতে আমার কোনো সমস্যা নেই। ভালো থেকো। সিমি।’
ফাহিমের ভালো লাগল ইমেইলটা পেয়ে। এমন নয় যে সে একটা উত্তরের অপেক্ষায় ছিল। তবুও সিমির এমন সৌজন্যতায় খানিকটা মুগ্ধ হলো সে। এবং একটা ধন্যবাদ দিয়ে দু’লাইন মেসেজ লিখে পাঠাল সে। ‘রিপ্লাই দেবার জন্যে ধন্যবাদ সিমি। আমি আমার ইমেইল লিস্টটি আপডেট করে নিয়েছি। এরপর থেকে তোমার কাছে আর অপ্রয়োজনীয় ইমেইল যাবে না—অন্তত আমার কাছ থেকে না।’ এটুকু লিখে ফাহিম একটু ভাবল। তারপর লিখল, ‘জাস্ট কিউরিয়াস—তুমি কি ইউএসএ তে থাকো না বাংলাদেশে? ভালো থেকো। ফাহিম।’
ফাহিম ইমেইল পাঠিয়ে দিয়ে লগ আউট করে অফিসের কাজে মন দিল।
পরের দিন সকালে লগ-ইন করেই সিমির ইমেইল পেল ফাহিম। সিমি লিখেছে, ‘আমি বাংলাদেশের মেয়ে। ঢাকায় থাকি। মুনা আমার স্বামীর এক বন্ধুর প্রেমিকা (এক্স)। এত তাড়াতাড়ি তোমার উত্তর পেয়ে খুব ভালো লাগল। অনেক ধন্যবাদ। টেক কেয়ার। সিমি।’
ফাহিম রিপ্লাই বাটনে চাপ দিয়ে চুপ করে বসে রইল। সে ভেবে পেল না, কী লিখবে। কী-ই বা লিখা উচিৎ। ফাহিম যা জানতে চেয়েছিল তার উত্তর সিমি দিয়েছে। এখন কী আর কিছু জানতে চেয়ে মেসেজ পাঠাবে নাকি শুধু একটা ধন্যবাদ দিয়ে রিপ্লাই করবে। কিছুক্ষণ ভেবে কোনো উত্তর না দিয়েই ইমেইল বন্ধ করে দিল সে।

পরের পর্ব

marriage-media

ম্যারেজ মিডিয়া (পর্ব-১)

ঢাকা শহরের ব্যস্ততম আবাসিক এলাকার একটি রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাঁড়াল শাহেদ। তার হাতে এক টুকরো কাগজ। সেখানে লেখা সাইনবোর্ডের নাম মিলিয়ে সে ভিতরে প্রবেশ করল।
ভিতরে ঢুকে সে চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিল। তার চোখের দৃষ্টিতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে সে কারো সংগে দেখা করতে এসেছে। সে আরো কয়েক পা এগিয়ে গেল সামনের দিকে আর তখনই তার দৃষ্টি থেমে গেল কোনার দিকের একটি টেবিলে বসা যুবকের দিকে। ঝাঁকরা চুল, একহারা লম্বা গড়ন। শাহেদ এগিয়ে কাছে যেতেই ঝাঁকরা চুল মাথা তুলে তাকিয়ে দেখল তাকে। তারপর আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘শাহেদ?’
শাহেদ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল।
‘আমি ইমরান। ইমরান হোসেন খান। ঐ যে সেদিন…’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝতে পেরেছি।’
‘প্লিজ বসুন।’
শাহেদ বসতেই ইমরান বলল, ‘কী খাবেন বলুন?’
‘না, কিছু খাবো না।’
‘এদের বিফ সমুচাটা খুব ভালো। আমি দুটো খেয়েছি। সাথে এক কাপ চা। খেয়ে দেখুন না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে, সমুচা দিতে বলুন।’
ইমরান একজন ওয়েটার ডেকে আরো চারটা সমুচা আর দু’কাপ চা দিতে বলল।
কিছুক্ষণের নীরবতা ভেঙে শাহেদ জানতে চাইল, ‘আমার নাম্বার কোথায় পেলেন?’
ইমরান একটি পাসপোর্ট সাইজের ছবি বের করে শাহেদের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘এই ছবিটার পেছনে লেখা ছিল।’
শাহেদ ছবিটা হাতে নিয়ে দেখল, এটি তারই ছবি এবং ছবির পেছনে ওর পুরা নাম আর ফোন নাম্বারটা লেখা। সে খানিকটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘বলুন কী ব্যাপারে ডেকেছেন?’
‘সোনিয়ার ব্যাপারে…। ওর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কি, ওকে কিভাবে চেনেন, কিভাবে পরিচয় হলো, এইসব আর কি…’
শাহেদ বোঝার চেষ্টা করল। কিছু বলল না।
ইমরান আবার বলল, ‘বুঝতে পেরেছি, আপনি হয়তো ভাবছেন এটা আপনার ব্যক্তিগত ব্যাপার, আমাকে কেন বলবেন, এইতো?’
শাহেদ সরাসরি তাকাল ইমরানের মুখের দিকে। তার চেহারায় ইতস্তত ভাবটা স্পষ্ট।
ইমরান মরিয়া হয়ে বলল, ‘আই নিড ইয়োর হেল্প শাহেদ, এন্ড আই অ্যাম প্রিটি শিওর, ইউ নিড মাইন। এখন আমাদের উচিত দুজন দুজনকে সাহায্য করা।’
শাহেদ একবার তাকাল বাইরে, আবার তাকাল ইমরানের দিকে। মনে হচ্ছে সে বিষয়টার গুরুত্ব অনুধাবন করতে পেরেছে। তার চোখের দৃষ্টিতে তাই বলে। শাহেদ নিজেও বুঝতে চায়, ইমরানের সম্পৃক্ততাই বা কী?
ইমরান সমুচার প্লেট সামনে এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘নিন খান। খেতে খেতে বলুন।’
শাহেদ অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তার ইতস্তত ভাবটা কাটতে কিছুটা সময় লাগছে। সে তার হাতের ফোনটি নিয়ে টেবিলের উপরে ঘুরাতে লাগল।
কিছুদিন আগের কথা। শাহেদ তার রুমে বসে কয়েকদিনের পুরনো একটি নিউজপেপারে বিজ্ঞাপনের পাতা উল্টিয়ে দেখছিল। হঠাৎ করেই তার চোখ আঁটকে গেল একটি বিজ্ঞাপনের দিকে। মোটা কালিতে হেডলাইনে লেখা, ‘বিয়ে করে বিদেশ যান।’
হেডলাইনের নীচে দু’লাইনের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দিয়ে লেখা হয়েছে, ‘কানাডায় বসবাসরত (সিটিজেন) কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট সুন্দরী পাত্রীর (৩০) জন্যে ভদ্র, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত অনূর্ধ্ব ৩৫ বছরের পাত্র আবশ্যক। পাত্রীর একবার বিয়ে হয়েছিল। শুধুমাত্র নিজ খরচে কানাডায় যেতে ইচ্ছুক পাত্র যোগাযোগ করুন।’
নীচে একটি ফোন নাম্বারও দেয়া আছে। শাহেদ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে কয়েকবার বিজ্ঞাপনটি পড়ল। তারপর কলম দিয়ে বিজ্ঞাপনটির চারিদিকে একটি বৃত্ত একে চিহ্নিত করে রাখল।
‘ভাইয়া খেতে আসো। টেবিলে খাবার দেয়া হয়েছে।’ শাহেদের ছোটো বোন সোমা দরজায় উঁকি দিয়ে বলেই চলে গেল রান্নাঘরে।
রান্নাঘরের দিকে যেতেই দূর থেকে সোমা শুনতে পেল তার বাবার কণ্ঠ, ‘সোমা, মা দেখতো আমার চশমাটা কোথায় রাখলাম? বোধহয় বেডরুমে ফেলে এসেছি।’
‘দেখছি বাবা।’ বলেই সোমা চলে গেল বেডরুমে।
শাহেদ ইতিমধ্যেই খাবার টেবিলে এসে বসেছে। শাহেদ-সোমার বাবা রাকিবউদ্দিন সাহেব শাহেদের দিকে একবার তাকালেন। তারপর ভ্রূ কুঁচকে বিদ্রূপাত্মক স্বরে বললেন, ‘তারপর ইয়াংম্যান, এভাবে আর কতদিন? শো মি সাম ফায়ার!’
শাহেদ চুপ করে রইল। সোমা চশমাটা এনে তার বাবার হাতে দিল। রাকিবউদ্দিন সাহেব চশমা চোখে দিয়ে আবার শাহেদের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ মনে পড়ে যাওয়া ভঙ্গীতে বললেন, ‘বাই দ্য ওয়ে, ব্যাংকে যে ইন্টারভিউটা দিয়েছিলে, তার কী খবর? রেজাল্ট পেয়েছ?’
শাহেদ খানিকটা ইতস্তত করে বলল, ‘চাকরীটা আমার হয়নি বাবা।’
‘হবে না জানতাম।’ সোমা নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল।
‘হলো না কেন?’ রাকিবউদ্দিন সাহেব জানতে চাইলেন।
‘পরীক্ষা দিয়েছিলাম দু’হাজারের বেশি। নিয়েছে মাত্র পাঁচজন। এদের মধ্যে দুজন দুই প্রভাবশালী মন্ত্রীর রিলেটিভ, একজন ব্যাঙ্কের এক বড় অফিসারকে দিয়েছে তিন লাখ টাকা ঘুষ। এই তিনজন আগে থেকেই ঠিক করা ছিল। বাকী দুজন নিয়েছে মেরিটে।’ শাহেদ থেমে থেমে ব্যাখ্যা দিল।
‘হুম, আজকাল প্রায় সব চাকরীর ক্ষেত্রেই এরকম হচ্ছে। দেশটা যে কোথায় যাচ্ছে!’ রাকিবউদ্দিন সাহেব আফসোসের সুরে বললেন।
‘দেশের তো আর হাত পা নেই যে কোথাও যাবে! আমরাই বদলে যাচ্ছি বাবা!’ সোমা বিজ্ঞের মত বলল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রাকিবউদ্দিন সাহেব শাহেদের দিকে তাকিয়ে আবার বললেন, ‘তো এখন কি করবে ভেবেছো কিছু?’
‘ভাবছি বন্ধুদের সঙ্গে শেয়ারে ব্যবসা করবো। অল্প কিছু ক্যাপিটাল হলেই শুরু করা যাবে।’
শাহেদ-সোমার মা জাহানারা বেগম টেবিলে খাবার পরিবেশন করছিলেন। তিনি এতক্ষণ শুনছিলেন বাবা-ছেলে-মেয়ের কথাবার্তা। এবার তিনি কিছুটা বিরক্ত হয়ে শাহেদের দিকে তির্যক দৃষ্টি নিয়ে বললেন, ‘তোকে মাস্টার্স পাশ করিয়েছি কি ব্যবসা বাণিজ্য করার জন্যে? ব্যবসা করবি তো মেট্রিক পাশ করে করলেই পারতি? মাস্টার্স করার কী দরকার ছিল?’
শাহেদ ইতস্তত করে অন্যদিকে তাকাল। কী বলবে ভেবে পেল না।
সোমা শাহেদের দিকে তাকিয়ে তার মনের অবস্থাটা বোঝার চেষ্টা করল। খাবার টেবিলে সব সময় বাবা আর মায়ের আগ্রাসনের স্বীকার হয় শাহেদ। সব সময় তাই অপরাধীর মতো হয়ে থাকে বেচারা। ভাইয়ের জন্যে তার অনেক খারাপ লাগে কিন্তু সে-ই বা কী করবে। সোমা মায়ের কথায় বিরক্ত প্রকাশ করল। শাহেদের পক্ষ নিয়ে সে বলল, ‘এটা কেমন কথা বললে মা? মাস্টার্স করেছে বলে ভাইয়া বিজনেস করতে পারবে না? কী সব সিলি চিন্তা ভাবনা!’
জাহানারা আক্ষেপ করে বললেন, ‘আমাদের কত শখ ছিল তুই একটা বড় চাকরী করবি।’
‘চাকরী না পেলে কী করবো মা? কিছু একটা তো করতে হবে?’ শাহেদের কণ্ঠে অসহায়ত্ব স্পষ্ট।
‘সেই কিছু একটা কী মাই সান?’ রাকিবউদ্দিন প্রশ্ন করে তাকিয়ে রইলেন শাহেদের মুখের দিকে।
শাহেদ অবশ্য কোনো উত্তর দিতে পারল না। খাওয়া বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইল।
শাহেদ তার ঘরে এসে মন খারাপ করে বসে রইল। প্রতিদিন খাবার টেবিলে এই একই বিষয়ে কথা বলতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু ঘুরে ফিরে এই একটি বিষয়েই তাকে কথা বলতে হয়। ‘ইন্টারভিউর কী হলো’, ‘এভাবে আর কতদিন’, ‘শো মি সাম ফায়ার ইয়াংম্যান’ এই জাতীয় প্রশ্নে সে যথেষ্ট বিব্রত হয়। কিন্তু কিছুই করার নেই।
শাহেদ পুরনো পত্রিকাটি কী মনে করে হাতে নিয়ে পাতা উল্টাতে থাকল এবং তার চোখে পড়ল সেই বিজ্ঞাপনটি, যেটিতে সে বৃত্ত একে চিহ্নিত করে রেখেছিল। সে বিড়বিড় করে আবার পড়ল।
-: বিয়ে করে বিদেশ যান :-
‘কানাডায় বসবাসরত (সিটিজেন) কম্পিউটার গ্র্যাজুয়েট সুন্দরী পাত্রীর (৩০) জন্যে ভদ্র, সম্ভ্রান্ত, শিক্ষিত অনূর্ধ্ব ৩৫ বছরের পাত্র আবশ্যক। পাত্রীর একবার বিয়ে হয়েছিল। শুধুমাত্র নিজ খরচে কানাডায় যেতে ইচ্ছুক পাত্র যোগাযোগ করুন।’
বিজ্ঞাপনটি পড়তে পড়তেই শাহেদের চোখ মুখে একধরণের উজ্জ্বলতার আভা দেখা দিল। সে মনস্থির করে ফেলল যে সে বিষয়টি কী যাচাই করে দেখবে। শাহেদ ফোন নাম্বারটি দেখে একটি একটি করে নাম্বার টিপে ফোনটি কানে নিয়ে উত্তেজিত ভাবে অপেক্ষা করতে থাকল।

পরের পর্ব

Moddhorater-Jarti

মধ্যরাতের যাত্রী (পর্ব-১)

সন্ধ্যা থেকেই আকাশের মুখ ভার। ঘন অন্ধকারের চাদরে ঢেকে আছে চারপাশ। বজ্রগর্ভ মেঘের আনাগোনাই বলে দেয়—ভয়াবহ ঝড়-বৃষ্টি হবে—এতে কোনো সন্দেহ নেই।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলের জর্জিয়া অঙ্গরাজ্যের ছোট্ট শহর সাভানা সহ আশেপাশের এলাকায় ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনার কথা গতকালই জানিয়েছিল জর্জিয়া রাজ্যের আবহাওয়া দপ্তর। আটলান্টিক মহাসাগরের উপর যে ঘূর্ণাবর্তটি তৈরি হয়েছিল তা ইতোমধ্যেই নিম্নচাপে পরিণত হয়েছে। পাশের রাজ্য ফ্লোরিডার লাগোয়া এলাকা থেকে জর্জিয়ার মধ্যভাগে রয়েছে নিম্নচাপটি। মৌসুমি অক্ষরেখাও এখন ঐ নিম্নচাপ এলাকা হয়ে আটলান্টিক পর্যন্ত বিস্তৃত রয়েছে।‌
ফাহিম তার স্টুডিও এপার্টমেন্টের জানালার পর্দা সরিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল বাইরে। আজ কাজে বের হবে কি না তাই নিয়ে সে দ্বিধায় আছে। ঘরে একা একা বোরিং বসে থাকার চেয়ে বরং কিছু রাইড পেলে সময়টাও কাজে লাগল, হাতে কিছু টাকাও এল। তড়িৎ সিদ্ধান্ত নিয়ে ফাহিম গাড়িতে গিয়ে বসল।
উবারের ড্রাইভিং অ্যাপটি চালু করে দিয়ে এগিয়ে চলল সাভানা ডাউন-টাউনের দিকে। শনিবারের সন্ধ্যা—বেশ কিছু রাইড মিলবে এই ভরসায় সে এগিয়ে চলল।
ফাহিম শখ করে উবার চালায়। মূলত সময় কাটানোটাই তার প্রথম উদ্দেশ্য। পেশায় সে একজন ইঞ্জিনিয়ার। ভাল বেতনের একটি চাকরী তার আছে। উবার না চালালেও কোনো ক্ষতি নেই, কিন্তু ঘরে বসে টিভি দেখে আর ফেসবুকিং করে আর কত সময় কাটে? তাই সাপ্তাহিক ছুটির দু’দিন উবার চালায় ফাহিম—কয়েক ঘণ্টার জন্য।
রাত সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে বেশকিছু রাইড সে পেল কিন্তু সমস্যা হল রাইডগুলো সব ছোট ছোট। বেশিরভাগই এক নাইটক্লাব-বার থেকে আরেকটাতে, যেগুলোর দূরত্ব ১ থেকে ২ মাইলের মধ্যে। সাভানা ডাউন-টাউন এমনিতেই অনেক ছোট। অনেকগুলো রাইড পেয়েও তার তহবিলে যা জমা হল তা মোটেও সন্তোষজনক না। যদিও তাতে তার মন খারাপ হল না। তার সময়টা ভালই কেটেছে। সে তার এপার্টমেন্টে ফিরে যাবার সিদ্ধান্ত নিল। বাসায় যেয়ে নেটফ্লিক্সে একটা মুভি দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়বে। তাছাড়া আবহাওয়াও খুব একটা ভাল না। এ অঞ্চলে ঘোষণা ছাড়াই উথালিপাথালি ঝড়-বৃষ্টি হয়।
ফেরার পথে যদি কোনো রাইড পাওয়া যায় সেই ভেবে সে উবার অ্যাপটি চালু রেখেই রওয়ানা দিল আর ঠিক তখনই একটা রাইডের কল এল। গাড়ির গতি কমিয়ে রাইডের অবস্থান জেনে নিয়ে ২ মিনিটের মধ্যেই যথাস্থানে গিয়ে হাজির হল।
ফাহিমের গাড়িটি একটি জনারণ্য বারের সামনের রাস্তায় এসে দাড়াতেই ছুটে এল অপরূপ সাজগোজ করা চপলমতি একটি তন্বী শ্বেতাঙ্গিনী তরুণী। প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা যৌবনের উজ্জ্বল একটি শিখা যেন। বয়েস আনুমানিক বাইশ কি তেইশ। পড়নে কালো রঙের স্কার্ট—হাঁটু অবধি নামানো। নিচের অংশে কিছুই নেই। অন্ধকারের মধ্যেও ক্ষিনাঙ্গি ধবধবে সাদা দু’খানি পা জ্বলজ্বল করছে। অপূর্ব তার অঙ্গ লাবণ্য। মোবাইল ফোনে মেয়েটির নাম দেখল ফাহিম—লিসা রজার্স।
দরজা খুলে মেয়েটি চকিতে গাড়ির পেছনের সীটে উঠে বসল। মেয়েটি কোনো কথা বলল না। সাধারণত প্যাসেঞ্জার গাড়িতে উঠে দু’একটি সৌজন্যমূলক কথা বলে। ফাহিম লক্ষ করল, মেয়েটির ফর্সা মুখে কেমন বিশাদের ছায়া। সাধারণত রেস্টুরেন্ট-বারে ফুর্তি করতে আসা ছেলে-মেয়েরা সবসময় উৎফুল্ল থাকে। খই ফুটতে থাকে তাদের মুখে সারাক্ষণ।
ভদ্রতার খাতিরে ফাহিম বলল, ‘লিসা?’
‘ইয়েস।’
‘হাই, দিস ইজ ফাহিম।’
‘হাই।’ মৃদু কণ্ঠে বলল মেয়েটি।
‘আমরা কোথায় যাচ্ছি?’ যদিও উবার অ্যাপেই সব তথ্য দেয়াই ছিল, তবুও ফাহিম জানতে চাইল। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে শুক্রবার আর শনিবার রাতে রেস্টুরেন্ট কিংবা বার থেকে যারা একটু টিপসি হয়ে বের হয়, তারা প্রায়ই ঠিকানা ভুল করে।
‘জ্যাকসনভিল!’ মেয়েটি বলল।
‘জ্যাকসনভিল? আই মিন জ্যাকসনভিল, ফ্লোরিডা?’
‘ইয়েস।’
‘সে তো অনেকদূর!’
ফাহিম মেয়েটির দেয়া গন্তব্যের ঠিকানা নেভিগেটরে এন্ট্রি করে সার্চ দিতেই তার কপালে চিন্তার রেখা দেখা দিল। এই অঞ্চলে সে নতুন বিধায় বিভিন্ন জায়গার দূরত্ব সম্পর্কে তার সম্যক ধারণা ছিল না। বিপত্তিটা ঘটল সেখানেই। সাভানা থেকে জ্যাকসনভিলের দূরত্ব দেখাচ্ছে ১১৫ মাইল। সময় ২ ঘণ্টা ৩ মিনিট।
ফাহিম চিন্তিত কণ্ঠে বলল, ‘এক্সিকিউজ মি, লিসা। আমার আসলে বুঝতে ভুল হয়েছে। আমি তো এতদূর যেতে পারব না। তাছাড়া ওয়েদারও ভাল নয়। তুমি বরং আমার রাইড ক্যান্সেল করে দিয়ে অন্য কাউকে নাও। আমি ভীষণভাবে দুঃখিত।’ হাইওয়েতে ওঠার আগেই রাস্তার পাশে ফাহিম গাড়ি থামিয়ে দিয়ে ভিউ মিররে তাকাল লিসার দিকে। যদিও অন্ধকারে তার প্রতিক্রিয়া তেমন বোঝা গেল না।
‘তোমাকে ভাড়া দ্বিগুণ করে দিব। আমি আসলে অনেক বিপদে পড়েছি। এর আগে চারজন আমার রাইড ক্যান্সেল করেছে। আমাকে রাতেই ফিরতে হবে। প্লিজ আমাকে ফেভার করো। প্লিজ!’
ফাহিম এবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল মেয়েটির দিকে। ভাল মত লক্ষ করে সে জানতে চাইল, ‘তুমি এসেছিলে কীভাবে?’
একটু নীরব থেকে মেয়েটি বলল, ‘আমার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে।’
‘তাহলে একা ফিরে যাচ্ছ যে? তোমার বয়ফ্রেন্ড কোথায়?’
এ কথার কোনো উত্তর না দিয়ে মেয়েটি জানালা দিয়ে তাকাল বাইরের দিকে। হঠাৎ তার চোখ দুটি চিকচিক করে উঠল। সে শব্দ করে কেঁদে ফেলল। কাঁদতে কাঁদতেই তাকাল ফাহিমের মুখের দিকে। কিন্তু কিছুই বলল না। সে হাতের ছোট পার্স থেকে একটা টিস্যু বের করে চোখ মুছে নিল। কিন্তু সেই অঝর ধারার জলপ্রপাত থেকে জল গড়ানো বন্ধ হল না।
ফাহিম গভীর চিন্তায় পড়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না কী করবে। মেয়েটি যেভাবে কাঁদছে—নিশ্চয়ই তার সঙ্গে এমন কিছু ঘটেছে যার ধাক্কা এই তরুণীর আবেগী মন কিছুতেই মানতে পারছে না। তবে এই আবেগ বেশিক্ষণ স্থায়ীও হবে বলে মনে না। বেশিরভাগ সময়েই তরুণী কিংবা যুবতী মেয়েদের হঠাৎ আসা আবেগ হঠাৎ চলে যায়।
ফাহিম তাকাল সামনের দিকে। হঠাৎ হঠাৎ ছুটে চলা দু’একটি গাড়ির হেড লাইটের আলো আর মাঝে মাঝে বিদ্যুৎ চমকের আলো ছাড়া আর কিছুই দৃষ্টি গোচর হচ্ছে না।
ফাহিম অস্থিরতায় ভুগছে। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকবে। মেয়েটা নিজে থেকে না নেমে গেলে তাকে গাড়ি থেকে নেমে যেতেও বলতে পারছে না। তবুও সে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল, ‘দেখ লিসা, তুমি চাইলে আমি একটা উবার ডেকে দেই। আর একটা কথা আমি এই অঞ্চলে একেবারেই নতুন। দেখা যাবে অন্ধকারে রাস্তা হারিয়ে অন্য কোনো বিপদে পড়ব। সেটা কি ভাল হবে?’
মেয়েটি ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলল। কোনো উত্তর দিল না। গাড়ি থেকে নেমে যাবারও কোনো তাগিদ দেখাল না।
‘আমি কি রাইড ক্যান্সেল করে দিব?’
মেয়েটি অনুনয় করে মাথা নাড়িয়ে জানাল—না।
ফাহিম একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘আমি হিসেব করে দেখলাম, তোমার ভাড়া আসবে প্রায় প্রায় ১৪০ ডলারের মত। তুমি আমাকে ডাবল ফেয়ার দিতে চেয়েছ, সেক্ষেত্রে তোমার খরচ হবে ২৮০ ডলার।’
মেয়েটি কান্না বন্ধ করে তাকাল ফাহিমের দিকে।
ফাহিম বলল, ‘তোমাকে বরং আমি একটা হোটেলে নামিয়ে দেই। তুমি রাতটা থেকে সকালে উঠেই বাস ধরে চলে যেও। তাতে তোমার বেশ কিছু টাকা সাশ্রয় হবে। এয়ারপোর্টের কাছে বেশ কিছু হোটেল আছে, তুমি চাইলে ওখানে নিয়ে যাই তোমাকে।’
কোনো কথা না বলে মেয়েটি আবার কান্না শুরু করল।
এবার ফাহিমের মনে অন্য আশংকা দেখা দিল। এমনও হতে পারে, মেয়েটি অভিনয় করছে। দেখা যাবে সে হাইওয়েতে ওঠা মাত্রই একদল গ্যাং তার গাড়ি থামিয়ে সবকিছু ছিনতাই করে নিয়ে যাবে। কিছুই বলা যায় না। ফাহিম আবার তাকাল মেয়েটির দিকে। নাহ, এই মেয়েকে দেখে তেমন মনে হচ্ছে না। মেয়েটি তাহলে সত্যিই কোনো বিপদে পড়েছে। ওর বয়ফ্রেন্ডের সংগেই বড় একটা ঝামেলা হয়েছে, কোনো সন্দেহ নেই।
ফাহিম তার ফোনে ওয়েদার চ্যানেলের অ্যাপ থেকে বাকী রাতের ওয়েদার ফোরকাষ্ট দেখে মেয়েটির দিকে আবার ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল। ‘যে কোনো মুহূর্তে থান্ডারস্টর্ম শুরু হবে। এ অবস্থায় রাস্তায় বের হওয়াটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়। তুমি কি বুঝতে পারছ কেন চার চারজন উবার ড্রাইভার তোমার রাইড ক্যান্সেল করেছে?’
মেয়েটি নিরুত্তর।
‘চল তোমাকে হোটেলে নামিয়ে দেই। আর না হয় তোমার বয়ফ্রেন্ডের কাছে–যেখান থেকে এসেছি সেখানে।’
‘না।’ অনেক কঠিন স্বরে মেয়েটি বলল।
এত ভাল যন্ত্রণায় পড়া গেল। কেন যে এই রাইড রিকোয়েস্ট সে না বুঝেই নিতে রাজি হয়েছিল। আর উবারই বা তাকে কেন চালাতে হবে, তার কি টাকার অভাব আছে? সময় কাটানোর আর কি কোনো উপায় ছিল না? নিজের ওপর প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হল ফাহিমের।
আচ্ছা পুলিশ ডাকলে কি কিছু হবে? না কি উবার সার্ভিসে কল করে একটা পরামর্শ চাইবে? ফাহিম আবার তাকাল মেয়েটির দিকে। মায়া জড়ানো এক জোড়া দীঘল চোখ। সে চোখে উৎকণ্ঠা। হঠাৎ ফাহিমের মধ্যে এক ধরণের পরিবর্তন এল—কী মনে করে সে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, মেয়েটিকে তার নিরাপদ গন্তব্যে সে পৌঁছে দেবে। এই মনোভাব পরিবর্তনের কোনো হেতু অবশ্য বোঝা গেল না।
ফাহিম গাড়ি ছেড়ে দিয়ে হাইওয়েতে ওঠার আগেই একটা গ্যাস স্টেশন থেকে গ্যাস ভরে নিল। কয়েকটি পানির বোতল, কিছু হালকা সয়লাব আর নিজের জন্য একটা কফিও নিল। অতঃপর আল্লাহ ভরসা বলে ইন্টারস্টেট হাইওয়ে আই-৯৫ এ উঠে গতি বাড়িয়ে দিল।
কিছুদূর যেয়েই রিয়ার ভিউ মিররে একবার তাকাল মেয়েটির দিকে ফাহিম। অবাক এবং কৃতজ্ঞতার দৃষ্টিতে মেয়েটি তাকিয়ে আছে তার চোখের দিকে। ফাহিম মৃদু হেসে তাকে আশ্বস্ত করল।
শরীর থেকে সব টেনশন ঝেড়ে ফেলে আবেশে চোখ বন্ধ করল মেয়েটি। এবং অল্প সময়ের মধ্যে ঘুমিয়েও পড়ল। ফাহিম মোটেও অবাক হল না। এটি একটি কমন দৃশ্য—লেট নাইট প্যাসেঞ্জাররা গাড়িতে উঠেই ঘুমিয়ে পড়ে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই—অ্যালকোহলের প্রভাবেই এটা হয়।
হাইওয়েতে তেমন কোনো গাড়ির চলাচল নেই। হঠাৎ হঠাৎ ১৮ চাকার দূরপাল্লার লরী পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। উলটো দিক থেকেও গাড়ির সংখ্যা কম। ভুতুড়ে অন্ধকারে ফাহিমের নিসান আল্টিমা এগিয়ে চলল। ভিউ মিররে পেছনে তাকাল সে, কেমন নিশ্চিন্তে ঘুমাচ্ছে মেয়েটি। বেশ কিছুক্ষণ ড্রাইভ করার পর ফাহিম একবার ওডোমিটার দেখল। মাত্র ৫০ মাইল চালানো হয়েছে। সময়ের হিসেবে প্রায় এক ঘণ্টা চালিয়েছে সে। বাকী পথটুকু যেতে কত সময় লাগবে মনে মনে এমন একটি হিসেব করছিল ফাহিম আর ঠিক তখনই আচমকা শুরু হল মুষলধারে বৃষ্টি সাথে দমকা হাওয়া আর বিদ্যুতের ঝলকানি। জর্জিয়া স্টেটের সাভানা আর ফ্লোরিডা স্টেটের জ্যাকসনভিল—আটলান্টিক মহাসাগরের উপকূলীয় পাশাপাশি দুটি শহর। বৃষ্টির তীব্রতাই বলে দেয় এই বৃষ্টি সামুদ্রিক ঝড়ের সৃষ্টি। ঝড়ো হাওয়া আর বৃষ্টির তীব্রতা এতই বেড়ে গেল যে ফুলস্পিডে উইন্ডশীল্ড ওয়াইপার ছেড়ে দিয়েও গাড়ির সামনের কাঁচ ভেদ করে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। ফাহিম বাধ্য হয়ে গাড়ির গতি আরো কমিয়ে দিল। বাতাসের জোর এতই বেড়ে গেল যেন মনে হচ্ছে গাড়ি যে কোনো মুহূর্তে উড়িয়ে নিয়ে যাবে। ফাহিম হাইওয়ে ইমের্জেন্সী লেনে গাড়ি দাঁড় করাল—ইমের্জেন্সী লাইট জ্বালিয়ে বসে রইল চুপচাপ।
হঠাৎ বজ্রপাতের তীব্র শব্দে লিসার ঘুম ভেঙে গেল। সে চোখ মেলে তাকিয়ে কিছুই বুঝতে পারল না। অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এখানে কেন?’
ফাহিম ঘাড় ঘুরিয়ে একবার তাকাল লিসার দিকে, কিছু না বলে আবার তাকাল সামনে।
‘তুমি কে?’ অনিশ্চিত স্বরে জিজ্ঞেস করল লিসা।
‘আমি কে মানে?’ ফাহিম বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আই’ম ইয়োর ড্রাইভার ম্যাডাম, আপনাকে গন্তব্যে পৌঁছে দেবার মহান দায়িত্ব নিয়ে রাস্তায় নেমেছি। এখন এই দুর্যোগের মধ্যে বসে রয়েছি। দেখতে পাচ্ছেন? বুঝতে পারছেন কিছু?’
লিসা কিছু বুঝতে পারল বলে মনে হল না—সে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে রইল।
(১ম পর্বের সমাপ্তি)
পরিশিষ্ট ১ – ‘এক রহস্যময়ী রাত ও নারীর গল্প’ নামে এই গল্পটি প্রকাশ হয়েছিল নির্বাচিত.কম এর নির্বাচিত বর্ষা সাহিত্য উৎসবে।
পরিশিষ্ট ২ – রহস্য গল্প লিখব বলে শুরু করেছিলাম, লেখা শেষে দেখা গেল এটা হয়েছে একটা প্রেমের গল্প। তাই নাম বদলে দিলাম।

পরের পর্ব