Shawpno-Jal

মধ্যবিত্ত পরিবারের সহজ সরল জীবনের আড়ালে কিছু রূঢ় বাস্তবতা

বই পড়ার আগ্রহ যখন হারিয়ে যাচ্ছিলো, তখন হাতে এলো এবারের বই মেলায় প্রকাশিত একটি বই। গল্পকার ফরহাদ হোসেনের নতুন উপন্যাস ‘স্বপ্নজাল’। প্রতিশ্রুতিশীল নবীন লেখকদের মধ্যে ফরহাদ হোসেনের লেখায় তাঁর নিজস্বতা রয়েছে৷ অনলাইনে লেখালেখির প্লাটফর্মগুলোতে আগেই তাঁর লেখা পড়েছি। অনেক অসাধারণ বিষয় তিনি তুলে ধরেন তাঁর লেখায়। আমার পক্ষে তাঁর লেখা গল্পগুলো এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হয় না। গত কয়েকদিন ধরে কাজের ফাঁকে ফাঁকে লেখকের নতুন উপন্যাস ‘স্বপ্নজাল’ পড়ছিলাম। উপন্যাসটিতে মানুষের স্বপ্ন নিয়ে খেলা একটি প্রতারক চক্রের গল্প বলেছেন তিনি। তাঁর গল্প বলার ঢং আমাকে আটকে রেখেছে অসাধারণ মলাটবন্দী বইটির পাতায় পাতায়। কাজের ব্যস্ততায় দৃশ্যত বইটি হাত থেকে নামিয়েছি, কিন্তু মনে মনে অস্থিরতায় ভুগেছি পরেরটুকু পড়ার জন্য।
পড়া শেষ, একটু স্বস্তি একটু অস্বস্তি নিয়ে বইটি সম্পর্কে লিখতে বসলাম। এটাকে ঠিক রিভিউ বলা যায় কিনা জানি না, কারণ বুক রিভিউয়ের নিয়মকানুন আমার জানা নেই। এটা আমার বক্তব্য বলেই ধরে নিতে পারেন।


ফরহাদ হোসেনের উপন্যাসটি মধ্যবিত্ত পরিবারের সহজ সরল জীবনের আড়ালে কিছু রূঢ় বাস্তবতা আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে, যা অনেকেই তাদের জীবনের সাথে মেলাতে পারবেন। মরীচিকার পেছনে ছুটতে থাকা এক বেকার যুবকের সর্বস্বান্ত হওয়ার গল্পের পেছনে যে বিষয়টি আমাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে তা হলো ভালোবাসা৷ উপন্যাসটিতে ভালোবাসার জটিল রসায়ন অসাধারণ ভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন লেখক। প্রতারণা আর প্রেমের গল্প পাশাপাশি ছুটে গেছে সুন্দর একটি পরিণতির দিকে। গল্পের ছলে লেখক একদিকে আমাদের যেমন সাবধান করেছেন, অন্যদিকে শিখিয়েছেন কীভাবে ভালোবাসতে হয়।


অন্যপ্রকাশের বই মানেই চমৎকার কাগজে ছাপানো সুদৃশ্য মলাটের বই- সর্বজন বিদিত এই প্রচলিত কথাটি ‘স্বপ্নজাল’ এর ক্ষেত্রেও ব্যতিক্রম নয়। মাসুম রহমানের করা প্রচ্ছদে বইটি দেখলেই হাতে নিয়ে দেখতে ইচ্ছে করবে, ইচ্ছে করবে নাকে তুলে ঘ্রাণ নেওয়ার। নতুন বইয়ের ঘ্রাণ আমার মত আপনাদেরও ভালো লাগে নিশ্চয়ই।


আমি নিজে কখনও রিভিউ লিখিনি তাই, তাই অন্যের লেখার ত্রুটি বিচ্যুতি বিশ্লেষণ করা আমার কাছে ধৃষ্টতার নামান্তর। আর স্বপ্নজালের মতো উপন্যাসের ক্ষেত্রে কিছু বলার যোগ্যতা আমার আসলেই নেই। তবুও কিছু বিষয় আমাকে বলতে হবে, নইলে স্বস্তি পাবো না।
প্রথমত, দুএকটি জায়গায় শব্দের ব্যবহার আমাকে কিছুটা এভাবে ভাবিয়েছে যে, এই শব্দটা ব্যবহার না করে অন্য শব্দ ব্যবহার করা যেতো। এটা সম্ভবত লেখকের দীর্ঘসময় প্রবাসে থাকার জন্য হয়েছে। দ্বিতীয়ত, শেষার্ধে গল্প খুব দ্রুত শেষ হয়েছে। শুরুর দিকে গল্প বলার যে মুন্সিয়না তিনি দেখিয়েছেন তাতে আরেকটু সময় নিয়ে গল্পটা শেষ করলে আমার মত পাঠকদের অন্তরাত্মা অতৃপ্ত থাকতো না।
পরিশেষে আমি চাই এমন বই প্রচুর আসুক, আমরা মন ভরে পড়বো৷ সেগুলো সম্পর্কে লিখতে লিখতে হয়তো কীভাবে বুক রিভিউ লিখতে হবে তাও শিখে যাবো৷ ধন্যবাদ ফরহাদ হোসেন ও অন্যপ্রকাশকে আমার মনে বই পড়ার আকাঙ্ক্ষাকে জাগিয়ে তোলার জন্য।

লিখেছেন: হাসান মাহমুদ পলাশ

Ebong-ekdin-hothath

এবং একদিন হঠাৎ

বীজগাণিতিক রাশিমালাকে সরলরূপে প্রকাশ করে তার মান নির্ণয়কে সরলীকরণ বলে। স্কুলের পরীক্ষার খাতায় সরল অংক করতে হয়েছে কমবেশি আমাদের সবাইকেই। অনেকেরই হয়তো মনে আছে, একটা দীর্ঘ লাইনের রাশিমালাকে ধাপে ধাপে কিভাবে সমাধানে টেনে আনা হয়। সফলভাবে নির্দিষ্ট মান নির্ণয় করতে পারলেই সরল অংক মিলে যাবার আনন্দ। ফরহাদ হোসেনের উপন্যাসিকা সংকলন “. . . এবং একদিন হঠাৎ” পড়তে গিয়ে সেই অংক স্যারের জালিবেতের সামনে বসে সরল অংক কষার দিনগুলোর কথাই মনে হয়েছে আমার।

প্রথম উপন্যাসিকা অপলার অভিমান। অভিবাসী জীবনের সংগ্রামে জড়িয়ে পড়া একজন হাসান। জীবন ও জীবিকার লড়াইয়ে একসময় একটা যন্ত্রে পরিণত হয় সে। একটা নিশ্চিত আগামীর সন্ধানে ক্রমেই ব্যস্ততার গহ্বরে বিলীন হতে থাকে। বর্তমানকে ছাপিয়ে তার সামনে প্রকট হয়ে দাঁড়ায় আগামীর চিন্তা। কিন্তু স্বপ্নের পেছনে ছুটতে ছুটতে একসময় দিকভ্রান্ত পথিকের মতো বর্তমানকেই হারিয়ে ফেলে হাসান আর অপলার জীবন। আজকের দিনটাকে উপভোগের এই বোধহয় যখন হয় ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। তবু হাল ছাড়ে না হাসান। গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে বরং একটা সুন্দর আগামীর প্রত্যাশায় ভালোবাসার নৈবদ্য সাজিয়ে অসীম ধৈর্য নিয়ে সে অপেক্ষা করতে থাকে। এজন্য তাকে মূল্য দিতে হয় অনেক। কিন্তু পরিশেষে সম্ভবত: এই ভালোবাসা আর ধৈর্যের শক্তিতেই হয়তো সে তার প্রত্যাশিত দিনের সন্ধান পায়। কিন্তু কিভাবে, তা জানতে হলে পড়তে হবে, অপলার অভিমান। গল্পের পরতে পরতে উঠে এসেছে অভিবাসী নারী ও পুরুষের জীবনের জটিলতার নানা দিক। একই সাথে, অনাত্মীয় হয়েও অভিবাসীদের মধ্যে গড়ে ওঠা পরম আত্মিক সম্পর্ক, পরস্পরের জন্য তাদের গভীর মর্মবোধ ও ত্যাগের গল্প। অপলার অভিমান বলে দিয়ে যায়, নিজের অধিকারটা নিজেকেই আদায় করে নিতে হয়। কখনো চাইতে হয়।

দ্বিতীয় উপন্যাসিকা একদিন হঠাৎ। এক অভিবাসী তরুণীর কম বয়সী আবেগে ভুল নৌকায় সওয়ার হওয়া থেকে সে যাত্রার সমুদ্র ঝড়ে তছনছ হয়ে যাওয়া জীবনকে নতুন তটের সন্ধান দিয়েছেন লেখক। প্রেম দ্বিধা বিশ্বাস আর অবিশ্বাসে বারবার দুলে উঠেছে গল্পের নৌকা। লেখকের অনবদ্য বর্ণনায় রাচনা, অর্ণব আর তানিশার হাত ধরে উত্তর আমেরিকার পথে পথে যেন হেঁটে চলেছে পাঠক। এরই মধ্যে দিয়ে উঠে এসেছে অভিবাসী জীবনের নানা জটিল ও কুটিল দিক। এসেছে তরুণ অভিবাসীর জীবনের সংগ্রাম আর দেশে ফেলে যাওয়া মায়ার বাঁধনগুলি। ভুল, শুধরানো আর সম্পর্কের দ্বন্দ্বের শেষে এসে জয়ী হয়েছে ভালোবাসা।

প্রসঙ্গ কথায় লেখক বলেছেন গল্পগুলি জীবন থেকে নেয়া। দীর্ঘ প্রবাসে সেখানকার অভিবাসীদের যাপিত জীবনকে কাছে থেকে প্রত্যক্ষ করেছেন লেখক, আর সেই সব জীবনের জটিল সমীকরণকে সরল অংকের মতোই এক আশ্চর্য সুন্দর সমাপ্তিতে নিয়ে এসে মিলিয়েছেন। এ যেন বীজগাণিতিক জটিল রাশিমালাকে সরলীকরণের মতোই।

অমর একুশে গ্রন্থমেলা ২০২১ উপলক্ষে পেন্সিল পাবলিকেশন্স থেকে প্রকাশিত হয়েছে “. . . এবং একদিন হঠাৎ”। সংকলনের প্রথম উপন্যাসিকাটি একজনকে এবং দ্বিতীয়টি তিনজনকে উৎসর্গ করা হয়েছে। উৎসর্গের এই ধারণাটি অন্যরকম। তৌহিদ হাসানের অনবদ্য প্রচ্ছদের ১১২ পৃষ্ঠার বইটির দাম ২৬০ টাকা।

লিখেছেন: আসাদুল লতিফ

Tritio-Pokkho

তৃতীয় পক্ষের কথা

এ পৃথিবীতে বিভিন্ন মানুষের মাথায় বিভিন্ন ধরনের পাগলামি ভর করে। তেমনি কিছু মানুষের মাথায় এই ধরনের পাগলামিও ভর করে যে তারা বই ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না! সময় সুযোগ পেলেই মজে থাকে গল্পতে। এই তৃতীয় পক্ষ বইটিও তেমনি একটা বই যে বইয়ের গল্পগুলো নেশার মত শুধু টানতে থাকে বইয়ের ভেতর মুখ গুজে বসে থাকার জন্য।
প্রথমেই আমি যখন বই পড়তে শুরু করি যে কোন বইই হোক না কেন সবার আগে বইয়ের ভেতর নাক মুখ গুজে বইয়ের মাতাল করা ঘ্রাণ শুকে নিজের ভেতর অনুভব করার চেষ্টা করি। তারপর ধীরে ধীরে চোখ বুলাই উৎসর্গ পত্রের উপর। কেউ যে উৎসর্গ পত্রের দু’ তিন লাইনের লেখা দিয়ে নিজের সবচেয়ে প্রিয় মানুষদের প্রতি তার সর্বোচ্চ ভালবাসার বহিঃপ্রকাশ এভাবে করতে পারে তা ফরহাদ ভাই এর এই লেখা না দেখলে এর গভীরতা বুঝতামই না!!
এই বইয়ে মোট গল্প আছে ৫ টি। এখন আসি গল্পে। এই এত সুন্দর গল্পগুলোর বিশ্লেষণ এই কয়েক লাইনে করা অসম্ভব, তবুও কিছু চেষ্টা করি।
মেয়েটি এখন কোথায় যাবে: এই গল্পটি আমার সবচেয়ে প্রিয় গল্প গুলোর মধ্যে একটি। বাংলাদেশের ফরিদপুরের মেয়ে সোমার বিয়ে হয় তার বোনের দেবর আমেরিকা প্রবাসী শহিদ এর সাথে। বিয়েটি হয় ফোনে,বিয়ের দুই বছর পর সোমা যখন ভিসা পেয়ে আমেরিকায় আসে এয়ারপোর্টে নেমেই শুরু হয় তার বিপত্তি। শহিদের এয়ারপোর্টে এসে সোমাকে নিয়ে যাবার কথা থাকলেও শহিদ আসেনি তাকে নিতে। অপরিচিত দেশ, অপরিচিত মানুষ, সাহায্যের জন্য হাত বাড়িয়েও সাহায্য না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়ল। হঠাৎই দেখা হল দেশি ভাই ফরিদ সাহেবের সঙ্গে। তারপর যেন আস্তে আস্তে সে ভরসা ফিরে পেতে শুরু করল। ফরিদ সাহেব তাকে নিয়ে শহিদের বাসায় গিয়েও তাকে না পেয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে সোমাকে সামলানোর চেষ্টা করে যেতে লাগলেন। এখানে ফরিদ সাহেব সোমাকে ব্যস্ত রাখতে শিকাগো শহরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখানোর পাশাপাশি “এফ আর খান ” এর সিয়ার্স টাওয়ার, শেখ মুজিব ওয়ে সব কিছুর গল্প করলেন। আর লেখক সাহেব আমাদের ঘুড়িয়ে আনলেন শিকাগো থেকে কল্পনাতে। ফরিদ সাহেব শহিদকে খুঁজে বের করতে তোলপাড় করে ফেললেন সারা শহর। একটু পর পর সোমার কান্না থামানোর চেষ্টায় এটা সেটা বলে হাসানোর চেষ্টা করতেন। তার বাসায় নিয়ে তাকে সহজ করার চেষ্টা করেছেন, সেখানে তাদের কিছু স্মৃতি গড়ে উঠে যেটা সারাজীবনের সুখ স্মৃতি হিসেবে থাকে। সারাটা গল্প জুড়ে শহিদকে নিয়ে উত্তেজনা কাজ করে সে কোথায় গেল এটা নিয়ে। অবশেষে ফিরে পাওয়া গেল তাকে, সে সোমাকে নিতে আসে। তার না আসার কারণ দুর্ঘটনার শিকার সব কিছুই ব্যাখ্যা করে। বিদায় বেলা করুণ সুরে আচ্ছন্ন করে পরিবেশ
হৃদয়ে আগন্তুক: হাসান আর তিথির সুন্দর সংসার তাদের ছোট্ট মেয়ে তিতলিকে নিয়ে। আমেরিকার ব্যস্ত জীবনে দুজনের ব্যস্ত সময়ই কাটছিল। হঠাৎই পরিবর্তন ঘটল তিথির বান্ধবী রুপা যখন আমেরিকায় ট্রেনিংয়ে এসে তাদের বাসায় বেড়াতে আসল। পরিবেশটা ও পাল্টে গেল, ব্যাকইয়ার্ডে বিকালে চায়ের আড্ডায় আর গল্পে জমে উঠত। ছেলে মেয়ের বন্ধুত্বের বিষয় নিয়েও বাক বিতণ্ডা চলত। অবশ্য পরের দিন থেকেই আস্তে আস্তে সব কিছু পাল্টে যেতে শুরু করল, হাসান তার কাপুরুষতার পরিচয় দিল, রুপার জীবনের বেদনাময় ঘটনা বের হয়ে এলো। হঠাৎই দেখা হল আকাশের সাথে। যে আকাশ একদিন অভিমান নিয়ে চলে এসেছিল আমেরিকায়। তিথি রুপাকে ভুল বুঝল আবার সে ভুল বুঝতে পেরে সব কিছু ঠিক করার চেষ্টাও করল। কিন্তু সবকিছু কি এত সহজে ঠিক হয়!! শেষে আকাশের সাথে রুপা চলে গেল, আকাশ প্রস্তুতি নিচ্ছে তার এক বুক ভালবাসার কথা জানাবার জন্য রুপাকে। এ দিকে তিথিও হাসানকে ক্ষমা করবে কি করবে না এই দ্বিধা দ্বন্দ্বে শেষ হল গল্পটি।
অপেক্ষা: চারদিকে অন্ধকার নেমে দমকা বাতাসে যখন ঝমঝম বৃষ্টি শুরু হবে তখনই এই গল্পটির শুরু হয়। শরীফুল আলম আমেরিকার একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার। ২০ বছর ধরে আমেরিকায় বসবাস করছেন। জীবনের ৪৭টি বসন্ত কাটিয়ে তিনি ২৪ বছর বয়সী রুবিনাকে বিয়ে করে আনলেন। যদিও তিনি স্বাভাবিক ভাবেই সংসার করতে চেয়েছিলেন কিন্তু রুবিনা তা চায়নি! সে শুধু নিজের স্বার্থে আর গ্রিন কার্ডের আশায় বিয়ে করে। শরীফুল খুব চাপা স্বভাবের বলেই তার কোন অভিযোগ নেই। অবশ্য এতে রুবিনার ও কোন দোষ নেই, বিয়ের আগেই বলেছিল সে অন্য কাউকে চায় কিন্তু শরীফুল পাত্তা দেয় নি ভেবেছে বিয়ের পর ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু এক সময় রুবিনা শরিফকে টেনশনে রেখে ঠিকই চলে যায় সোহেলের কাছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সোহেলের কাছ থেকেও সে ধোকা পেল। সে কি এখন ফিরবে শরীফ এর কাছে?
কী ঘটেছিল লাস ভেগাসে: শাহেদ আর শায়লার দুই ছেলে মেয়ে নিয়ে সংসার। শাহেদ খুবই সহজ সরল মনের মানুষ। সবাইকে খুব সহজেই বিশ্বাস করে আর সাহায্য করতে চায় এবং করেও। তেমনি মাশুক যখন সবকিছু হারিয়ে রাস্তায় নেমেছিল তখন মাশুককে সাহায্যে করে নিজের বিপদ ডেকে এনেছিল, মাশুককে ওয়ার্ক পার্টনার করেছিল। আর মাশুক ব্যবসায় লস দেখিয়ে দেখিয়ে শাহেদকে ঠকিয়ে যাচ্ছিল প্রতিনিয়ত। তাই তাকে শিক্ষা দিতে শাহেদের স্ত্রী শায়লা বুদ্ধি করে মাশুককে নিয়ে যায় লাস ভেগাসে। আর সেখানে নিয়ে গিয়ে সব তথ্য ফাঁস করে মাশুককে এমন শিক্ষা দেয় শায়লা রুপা আর রুপার বরকে সাথে নিয়ে যে মাশুক পালিয়ে বাঁচে। শাহেদ কাজ ছাড়া কিছু বুঝত না আর টাইম দিত না বলে নায়লার সাহায্যে শাহেদকে ও টাইট দিয়ে দেয়।
একজন আজমল হোসেন: সোমা আর রঞ্জু দম্পতির ঝগড়া দিয়েই গল্পের শুরু।খুনসুটি, ঝগড়া ও ভালবাসার এক মিশ্র অনুভূতি পাওয়া যায় এই গল্পে!! সোমার সাথে ঝগড়া করে রঞ্জু যখন বেরিয়ে যায় তখনই সে একটা গাড়ির সামনে পড়লে সেই গাড়ির আফ্রো আমেরিকান চালক রঞ্জুর দিকে নোংরা ইঙ্গিত দিয়ে চলে গেল। ঘটনার শুরু এখান থেকেই। আজমল হোসেন আমেরিকায় আসেন একটা রিসার্চ অ্যাসিস্টন্টশিপ নিয়ে। স্বপ্নের দেশে পাড়ি জমিয়ে তিনি আর এখান থেকে ফেরত যেতে চান নি। সোনার হরিণ ধরে তবেই ফিরবেন। কিন্তু সবার সব ক্ষেত্রে কি ভাগ্য সহায় হয়! তার ক্ষেত্রেও হল না। ফায়জুল তার গ্রামের ছেলে হয়েও তাকে অনেক বড় বিপদে ফেলে দিল। ফায়জুলের পরামর্শেই তিনি একটি কালো মেয়ের সঙ্গে কন্ট্রাক্ট ম্যারেজ করে ফেললেন। আর সেটাই তার সব থেকে বড় ভুল! এই মেয়েটি তার যা কিছু ছিল সবকিছু হাতিয়ে নিল ভয় দেখিয়ে,আর তার বয়ফ্রেন্ডকে নিয়ে অনেক অনেক অত্যাচার করল আজমল সাহেবের উপর। তিনি কোনমতে জান নিয়ে পালিয়ে এসে পরলেন সোমা আর রঞ্জুর হাতে। সোমার সেবা শুশ্রূষায় সেরে উঠতে লাগলেন আজমল সাহেব। কোন কিছু জিজ্ঞেস করলে রেগে উঠেছেন আজমল সাহেব মাঝে মাঝে, তখন সোমা রাগ দেখিয়েও পরক্ষণেই ভুলে গিয়ে আজমল সাহেবের দেখাশোনায় লেগে গেছে। সোমার এই মাতৃভাব পুরো গল্পটাকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। প্রিয় মানুষটিকে মনে পরে কি না সোমার এই ধরনের প্রশ্নে আজমল সাহেবের ছলছল চোখ, রঞ্জুর সাহায্য দেশে ফেরা সবকিছু মিলিয়ে কেমন অন্য রকম একটা ভাল লাগা তৈরি করে গল্পের ভেতর।
তাই গল্পগুলো বিস্তৃত ভাবে পড়তে তাড়াতাড়ি বইটি পড়তে শুরু করুন, এবং আমি হলফ করে বলতে পারি প্রত্যেকটি গল্প অসাধারণ লাগবে।
এই প্রথম হুমায়ূন আহমেদ ছাড়া অন্য কারো বই আমি গভীর ভাবে গভীর মনোযোগের সহীত পড়েছি।
সবশেষে বলতে চাই এভাবে আরও গল্প উপহার দিয়ে আমাদের মনকে আনন্দে আপ্লুত করুন এই শুভ কামনা। আর কষ্ট করে আমাকে অটোগ্রাফ সহ বইটা পাঠানোর জন্য অসংখ্য ধন্যবাদ ভাই সাহেব। যদিও বইমেলায় আমি যেতে পারিনি কিন্তু যখন বইটি আমি হাতে পাই এই বইয়ের প্যাকেট আমাকে কিছুটা হলেও বইমেলার স্বাদ দিয়েছে!! দোয়া করি আমাদের সবার হৃদয়ে এভাবে সদা হাস্যোজ্জল হয়ে থাকেন সব সময় আর আরও নতুন নতুন বই নিয়ে আসুন খুব শীঘ্রই।

লিখেছেন: ফাইজা চৌধুরী নিশি

Dhushor-Boshonto-Review

হৃদয়গ্রাহী গল্পগ্রন্থ ‘ধূসর বসন্ত’

বসন্তের রং সবুজ হয়। তবে গল্পের নাম ধূসর বসন্ত কেন? বইয়ের এই গল্পটা সবচেয়ে হৃদয়গ্রাহী। ভালোবাসার গল্পে বিষাদের ছোঁয়া দিয়ে অপূর্ব সুন্দর একটা ছোটগল্প। ধূসর বসন্তের নামেই গল্পগ্রন্থের নাম।
বাবা মায়ের বিচ্ছেদে একটা শিশুমনে কীভাবে প্রভাব ফেলে সেই বিষয় উপজীব্য করে লেখা গল্পের নাম ’ছেলেটা’। স্ত্রীর সঙ্গে বিচ্ছেদের পরে সন্তানকে দেখতে যান বাবা অনেক তৃষ্ণা নিয়ে। সেই এক সন্ধ্যার গল্প।
ডোমেস্টিক ভায়োলেন্স নিয়ে লেখা ’ছিন্ন’ গল্পের জন্যে লেখককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই। পুরুষের কলমে নারীর জবানিতে উঠে আসা লেখার সমাপ্তিও চমৎকার ছিল। এই গল্পগুলো উঠে আসা উচিত।
সর্বশেষ যে গল্পটা নিয়ে লিখছি তার নাম `ডিপোর্টেশন’। বিদেশের জীবন মানেই নিশ্চিত জীবনের হাতছানি? আর্থিক সচ্ছলতা আর সুন্দর সব দৃশ্য সম্বলিত ছবি? এর বাইরেও প্রবাসীদের জীবনের যন্ত্রণা আর টানা পোড়েনের আখ্যান উঠে এসেছে এই গল্পে।
বইটিতে নয়টি গল্প আছে।

ধূসর বসন্ত
ধরন: গল্পগ্রন্থ (ছোট গল্প)
প্রচ্ছদশিল্পী: এনায়েত ইসলাম
প্রকাশ: অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০২০
প্রকাশনী: আনন্দম

Farhad-Hossain-Jojon-Jojon-Dhur-Book-Review

‘যোজন যোজন দূর’-এর আদ্যোপান্ত

একটি উপন্যাস যখন স্রেফ গল্পনির্ভর হয়, তা অনেকটা নরোম ভাতের মতো লাগে। সহজ বাংলায় যাকে আমরা জাউ ভাত বলি। কোনোরকমে উদরপূর্তি। কিন্তু গল্পের সাথে সাথে যখন চারপাশের পরিবেশ, প্রকৃতি, ঐতিহ্য, ইতিহাস ইত্যাদি পাওয়া যায়, তা হয় সবজি-ভাতের মতো। খেতেও সুস্বাদু, একই সাথে পুষ্টির যোগানও হয়। লেখক ফরহাদ হোসেন-এর সকল গল্প-উপন্যাসেই ইতিহাসের সাথে পরিচিত হওয়া যায়। তাঁর নতুন প্রকাশিত উপন্যাস ‘যোজন যোজন দূরে’ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান রয়েছে।

গল্পের সাথে সাথে তিনি রিলেটেড সকল স্থানের ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়েছেন। আমেরিকার বিভিন্ন স্থান ও স্থাপনার তথ্যসমৃদ্ধ গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনা রয়েছে।

উপন্যাসটি মূলত আমেরিকায় বসবাসরত বাঙালিদের বিচিত্র জীবনাচার ও সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে রচিত। দূর থেকে বাঙালিদের কাছে আমেরিকা মানেই সুখ ও স্বচ্ছলতার আলো ঝলঝলে জীবন। কিন্তু বাস্তবতা এতোটা সহজ নয়। সেখানে টিকে থাকতে কঠিন যুদ্ধের ভেতর দিয়ে যেতে হয়, এবং ফলস্বরুপ নানান জটিলতা দেখা দেয়। অবৈধ বসবাস, ডিপোর্টেশন, পারিবারিক অশান্তি ইত্যাদি সমস্যায় জর্জরিত আমেরিকার বাঙালিরা। বাঙালিদের এরূপ জটিলতার সাথে সাথে আমেরিকানদের চরিত্রের ক্রস পলিনেশনও লেখক প্রকটভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন। বইটি পড়তে পড়তে মনে হয়েছে, টিভির পর্দায় কোনো বিদেশি প্লটে লেখা নাটক দেখছি। আমরা যারা বিটিভির যুগে জন্মেছি, তারা এই উপন্যাসটি পড়লে স্মৃতিকাতরতায় ভুগবেন। মনে হবে, সেই কিশোর বয়সে দেখা বহুল চরিত্রের নাটক, যেসব নাটকের দৃশ্য বিদেশের চমৎকার ও আকর্ষণীয় স্থানে চিত্রায়িত হতো।

টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের বিখ্যাত শহর ডালাসের বাঙালি কমিউনিটিতে জনপ্রিয় নাম ফরিদ হাসান। তাকেই এ উপন্যাসের মূল চরিত্র করা হয়েছে। মূল চরিত্র বলে নয়, লেখক এ চরিত্রকে যেভাবে উপস্থাপন করেছেন- তাতে করে ফরিদকে উপন্যাসের সবচেয়ে প্রিয় চরিত্র দাবি করতে আমার কোনো কার্পণ্য নেই। ফরিদের চরিত্রের দিকে একটু আলোকপাত করা যাক। সোসাইটির যে কারো সমস্যার সমাধানে ফরিদ সর্বদা তৎপর। অন্যের সমস্যার সমাধান করতে করতে একসময় তার নিজের জীবনই চরম জটিলতার মধ্যে পড়ে যায়। পারিবারিক ভাঙনের কবলে ফরিদের পরিবার- এ দুঃসময়েও সে অন্যের বিপদের ডাকে সাড়া দেয়। ফরিদের চরিত্রের সাথে প্রিয় অভিনেতা হুমায়ূন ফরিদীর খুব সাদৃশ্য পেয়েছি। যেন লেখক তাকে সামনে বসিয়েই চরিত্রটি সাজিয়েছেন। আমার ধারণা- জীবিত থাকলে স্বয়ং হুমায়ূন ফরিদীও দ্বিধান্বিত হতেন, লেখককে প্রশ্ন না করে পারতেন না!

উপন্যাসটিতে লেখক বহুল চরিত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়েছেন। সাবের, স্বপন, রাশেদ, মিতু ইত্যাদি চরিত্রগুলোর বিচিত্র জীবনবৈচিত্রের পাশাপাশি মূল ঘটনার বর্ণনা সুনিপূণভাবে উপস্থাপন করছেন। পারিপ্বার্শিক চরিত্রগুলো আমেরিকার ভিন্ন ভিন্ন জীবনবৈচিত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা দেয়। মিতু চরিত্রটিকে খুবই ভালো লেগেছে। ভেতরে দুঃখ পুষেও সে বাইরে সবসময় চঞ্চল। অন্যদিকে রেশাদ চরিত্রটি একেবারেই উল্টো। সে ভেতরে-বাইরে সবসময়ই অস্থির। সবার থেকে নানান কৌশলে আর্থিক সুবিধা আদায় করাই তার একমাত্র কাজ। আপাতদৃষ্টিতে চরিত্রটি নেগেটিভ হলেও তার কথা-বার্তার ধরনে তাকে খুবই ইন্টারেস্টিং লেগেছে। এখানে লেখকের দক্ষতার প্রশংসা না করলেই নয়। এতো চরিত্রের সমাহার উনি ঘটিয়েছেন, অথচ প্রতিটি চরিত্রই স্পষ্ট এবং কোথাও কোনো অতিকথন নেই। ১৭৪ পৃষ্ঠার মেদহীন, পরিপাটি একটি উপন্যাস। একদিকে ফরিদ-রুমা দম্পতি, অন্যদিকে রিয়া-মুরাদ দম্পতির টানা-পোড়েনে তাদের সন্তানরা মানসিক চাপের মুখোমুখি হয়। পারিবারিক ভাঙন সন্তানদের উপর কী ভয়াবহ বিরূপ প্রতিক্রিয়া ফেলে, এ উপন্যাসে তা স্পষ্ট হয়েছে। গল্পের একপর্যায়ে নাটকীয়ভাবে আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ যুবক ডেভিডের আগমন ঘটে। রিয়ার সাথে তার গভীর বন্ধুত্ব মুরাদকে অস্থির করে তুলে। সে তার লাগামহীন জীবনের আচমকা লাগাম টেনে রিয়ার কাছে ফিরতে চায়। এখানে রিয়া আর মুরাদের রয়াসন চমৎকার। ভালোবাসলে হাজার অপরাধও তুচ্ছ করে ক্ষমা করা যায়। আসলে ভালোবাসা যত্নে বাড়ে। যে যত্নের অভাবে রুমাও দিন দিন কঠিন থেকে কঠিন হয়েছে । এই কাঠিন্য তাকে ফরিদের থেকে এতো দূরে সরিয়ে নিয়ে যায় যে, স্বামী-স্ত্রী হয়েও তারা যেন যোজন যোজন দূরের কেউ!

যারা বৈচিত্রপূর্ণ গল্প পড়তে ভালোবাসেন, তারা নিঃসংশয়ে উপন্যাসটি পড়তে পারেন। এখানে পারিবারিক গল্পের পাশাপাশি পাবেন সহজাত শারীরিক-মানসিক প্রেমের আবেদন এবং আমেরিকায় বাঙালিদের জীবনযাত্রা ও ইতিহাস-ইতিহ্যের সংস্পর্শ।

‘যোজন যোজন দূর’ রকমারিসহ সকল অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাওয়া যাচ্ছে এবং মেলার প্রথমদিন থেকে পাওয়া যাবে অন্যপ্রকাশের প্যাভিলিয়নে।

যোজন যোজন দূর
ধরন: উপন্যাস
লেখক: ফরহাদ হোসেন
প্রকাশনা: অন্যপ্রকাশ
প্রচ্ছদ: ধ্রুব এষ
মুদ্রিত মূল্য: ৪০০ টাকা মাত্র