প্রায় ছয় মাস হলো আমার স্ত্রীর সংগে আমার ছাড়াছাড়ি হয়ে গেছে। আমি এখনও জানিনা আমাদের সংসার কেন ভেঙ্গে গেল। আমাদের সম্পর্কের মধ্যে তৃতীয় কোনো ব্যক্তির প্রবেশ ঘটেনি। কিন্তু কোনো এক বিচিত্র কারণে আমাদের সম্পর্ক দিনকে দিন জটিল হয়ে যাচ্ছিল। যদিও আমার বিরুদ্ধে অনেক অভিযোগ ছিল। আমি অবশ্য কোন অভিযোগের বিরুদ্ধে কিছুই বলতে পারিনি। শুধু ভেবেছি, জোড় করে আর যাই হোক সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা যায় না। তারচেয়ে বরং আলাদা হয়ে যাওয়াই ভালো।
যদিও সে এখন আর আমার স্ত্রী নয়, কিন্তু আমার তাকে সাবেক ভাবতে ভাল লাগে না। আমরা দুজনে এখনও সিঙ্গেল, নতুন করে বিয়েও করিনি-কোনো সম্পর্কেও জড়াইনি। তাই প্রাক্তন কিংবা বর্তমান বিষয়টা এখনও আমাদের সম্মোধন বা পরিচয়ের মধ্যে আসেনি।
আমাদের একটি মাত্র ছেলে সন্তান। গত মাসে সে ৫ বছরে পড়ল। সে তার মায়ের কাছেই থাকে।
মাসের প্রথম দিনেই আমি সাধারনত আমার স্ত্রীর হাতে এলিমনির বরাদ্দকৃত টাকাটা দিয়ে আসি। এর ব্যতিক্রম খুব একটা হয় না।
একদিন বিকেলে, কাজ থেকে ফেরার পথে আমি টাকা দেবার জন্যে ওর বাসায় গেলাম। কলিং বেল বাজাতেই আমার ছোট্ট ছেলেটা দৌড়ে এসে দরজার এক পার্ট খুলে লোহার গ্রিল ধরে দাড়াল। আমাকে দেখে যে সে খুব খুশি হয়েছে বোঝাই যাচ্ছে। অফিসের কাজে আমাকে একমাসের ট্যুরে বাইরে যেতে হয়েছিল। এতদিন পরে আমাকে দেখে খুশিতে চিকচিক করে উঠল ছেলেটার দুই চোখ।
বন্ধ দরজার ভেতর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে সে বলল,‘বাবা তুমি আসছ?’
আমি বললাম, ‘হ্যা বাবা, আমি আসছি। কেমন আছো তুমি?’
সে ছোট ছোট করে বলল, ‘আমি ভালো আছি।’
‘আম্মু আসে নাই এখনও।’
‘না।’ বলেই সে খুব আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল,‘তুমি কি ভিতরে আসবা। চাবি এনে দেই, খুলে ভিতরে আসো।’
‘থাক বাবা, চাবি আনতে হবে না। আমি এখানেই থাকি।’
‘কেন?’
‘ভিতরে আসাটা ঠিক হবে না বাবা।’
‘কেন? কেন ঠিক হবে না?’
‘তোমার আম্মু যে বাসায় নেই।’
আমাকে দেখার পর তার চোখে মুখে যে আনন্দের ঝিলিক দেখা দিয়েছিল, তা যেন হঠাৎ করেই মিলিয়ে গেল। আমি ওর গভীর চোখ দুটোতে বিষাদের হাসি দেখতে পেলাম। এমন একটা পরিস্থিতিতে এতটুকু একটা বাচ্চা নিজেকে খাপ খাওয়াতে পারছে না। ওর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে আমি প্রসংগ বদলে দেবার চেষ্টা করলাম যাতে ওর ছোট্ট মনের উপর চাপ না পড়ে। কিছুদিন আগেই ওর জন্মদিন ছিল। অফিসের ট্যুরে শহরের বাইরে থাকায় আমি ওর জন্মদিনে আসতে পারিনি। তাই আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘বাবা তোমার বার্থডেতে কি কি মজা করলে বলো।’
সে খুব খুশি হয়ে বলল, ‘অনেক মজা করেছি। অনেক মজা।’
‘আমাকে মিস করোনি?’
‘অনেক মিস করেছি। অনেক।’
বন্ধ দরজার গ্রিলের মধ্যে দিয়ে হাত প্রসারিত করে আমরা দুজন দুজনের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছি। আমার স্ত্রী বাসায় না থাকা অবস্থায় আমি কখনও যদি আসি, আমরা এভাবেই দাঁড়িয়ে থাকি। ছেলেটা কয়েকবার ভিতরের দিকে তাকাল। আমি বুঝতে পারলাম সে তার বেবি সিটার দূর থেকে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছে কিনা সেটা লক্ষ্য করছে। আমি আরও কিছুক্ষন খেলাচ্ছলে বিভিন্ন কথা বললাম। তার স্কুল কেমন চলছে, বার্থ-ডে তে কি কি গিফট পেল, সামনের উইকএন্ডে সে আমার সাথে কোথায় যেতে চায় এসব অনেক ধরনের কথাই হলো আমাদের মাঝে। আমি আরও কিছুক্ষন অপেক্ষা করে বললাম, ‘তোমার আম্মুর আসতে বোধ হয় দেরী হবে। আমি তোমার আম্মুর জন্যে কিছু টাকা এনেছি। এগুলো তোমার কাছে রেখে যাচ্ছি। আম্মু এলে বলবে, বাবা এসে দিয়ে গেছে।’ বলেই আমি আমার জ্যাকেটের পকেট থেকে একটা এনভেলপ বের করে ওর হাতে দিলাম।
সে এনভেলপ হাতে নিয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে নেড়েচেড়ে বলল, ‘আম্মু তোমার কাছে অনেক টাকা পায়?’
আমি বললাম, ‘না বাবা। অনেক টাকা না। আমি কাজ করে যেই টাকা পাই, তার কিছু অংশ।’
‘ও।’ বলে সে চুপ করে রইল।
সে আদৌ কিছু বুঝেছে কিনা জানি না। তবে সে যেহেতু দেখছে বাবা প্রতিমাসে একটা সময়ে এসে আম্মুর হাতে টাকা দিয়ে যায়, সেহেতু এটাই হয়তো নিয়ম। তবুও আমি একটু বুঝিয়ে বললাম, ‘এই ধরো তোমার স্কুল, তোমার ফেভারিট ফুড, ফেভারিট টয়স কেনার জন্যে, বেড়াতে যাওয়ার জন্যে এই টাকা আমি দেই।’
সে আবার এনভেলপটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কিন্তু এখানে তো অনেক টাকা! তোমার জন্যে কিছু রেখেছ?’
আমি হেসে দিয়ে বললাম, ‘হ্যা বাবা, আমার জন্যে যতটুকু দরকার, রেখেছি। তাছাড়া আমিতো একা। আমার বেশি টাকা লাগে না। তোমরা তিনজন। তুমি, আম্মু, বেবি সিটার।’
কিছুক্ষন চুপ করে থেকে সে কিছু একটা ভাবল। তারপর হঠাৎ করেই বলল,‘তুমি একটু দাড়াও বাবা, আমি আসছি।’ বলেই সে এক দৌড়ে ভিতরে চলে গেল। আমি ওর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ কিছু একটা ভাঙ্গার শব্দ হলো। কিছুক্ষনের মধ্যেই সে ফিরে এলো। তার ছোট্ট হাত দুটির মুঠি বন্ধ করে সে আমার সামনে এসে দাড়াল। তারপর আমার দিকে তার ছোট্ট হাত দুটি একসাথে এগিয়ে দিয়ে মুঠি মেলে ধরে বলল, ‘নাও।’
আমি তাকিয়ে দেখলাম ওর হাত ভর্তি অনেক গুলো কয়েন। তার ছোট্ট হাত দুটিতে যতখানি সম্ভব ভরে নিয়ে এসেছে।
‘আমার মানিবক্সে যা ছিল, নিয়ে এসেছি। এখানে হয়তো অনেক নেই, কিন্তু তুমি কিছু কিনতে পারবে।’ বলতে বলতেই তার চোখ ভিজে এলো।
আমি গ্রিলের মধ্যে দিয়ে হাত বাড়িয়ে আমার ছেলেটাকে জড়িয়ে ধরলাম। অনেক চেষ্টা করেও কিছুতেই নিজেকে আর স্থির রাখতে পারলাম না। কেঁদে ফেললাম।
সেদিনের পর থেকে আমি যেন অন্য এক মানুষ হয়ে গেলাম। আমি মরে গেলাম না আমার পুনর্জন্ম হলো, কিছুই বুঝতে পারলাম না। কিন্তু এটুকু বুঝতে পারলাম, জীবনে আমি কিছু একটা ভাল কাজ করেছিলাম যার কারনে মহান করুনাময় আমাকে এমন পুরস্কার দিলেন।
সেই আনন্দ, সেই ভাললাগা, সেই ভালবাসার কথা আমি যতদিন বেঁচে থাকব, আমার মনে থাকবে। অতটুকু ক্ষুদ্র মনের মধ্যে যেই ভালবাসার আধার পরম করুনাময় সৃষ্টি করেছেন,তার মূল্য অপরিসীম।
ছেলেটা আমার অনেক বড় হয়ে গেছে। তার বয়স এখন দশ। এখন সে ভায়োলিন বাজাতে জানে। সকার খেলে। স্কুলেও ভাল রেজাল্ট করছে। মাঝে মাঝে সে আমার সংগে চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকার খেলা খেলে। আমি তার চোখের দিকে বেশিক্ষন তাকিয়ে থাকতে পারিনা। চোখ ঝাপসা হয়ে যায়।
সে জিজ্ঞেস করে, ‘তোমার চোখে কি হয়েছে বাবা। কাঁদছ কেন?’
আমি চোখ মুছতে মুছতে বলি, ‘কাঁদি নারে বাপ। কাঁদি না।’
আমার আত্মার একটা অংশ। যেই ভালবাসা আর মহানুভবতা উপরওয়ালা তার হৃদয়ে সৃষ্টি করে দিয়েছেন, আমি তার জন্যে অশেষ কৃতজ্ঞ। ঐ একটা বিকেল আমার জীবনের গতিপথ নতুন করে বদলে দিয়েছে।
ছোট্ট দুটি হাতের মুঠি ভরা কতগুলো কয়েন এখনও আমার জ্যাকেটের পকেটে। আমার মন খারাপের দিনগুলিতে আমি জ্যাকেটের পকেট থেকে কয়েনগুলো বের করে হাতে নিয়ে দেখি। যেই কয়েনগুলো সে তার মানিবক্স খালি করে নিয়ে এসে আমাকে দিয়েছিল, সেই ভালবাসার কয়েনগুলোই আমার জীবনকে এখন পরিপূর্ণ করে দেয়।
আমি নতুন করে বাঁচতে শিখি!
অপেক্ষা (পর্ব-১)
সায়াহ্নের আকাশ মেঘাচ্ছন্ন। সূর্যটা ডুবে যাচ্ছে খুব দ্রুত। চারিদিকে অন্ধকার নেমে আসছে। দমকা বাতাস বইতে শুরু করেছে। যে কোনো সময় শুরু হবে ঝমঝম বৃষ্টি।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত শহর শিকাগোর একটি উপশহরের লেক সংলগ্ন দোতলা, বাংলো টাইপের সুন্দর পরিচ্ছন্ন একটি বাড়ির ড্রাইভওয়েতে একটি গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত ভেতরে প্রবেশ করল যে ব্যক্তিটি তার নাম শরীফুল আলম।
শরীফুল আলম আমেরিকায় আছে গত প্রায় বিশ বছর ধরে। পেশায় একজন সফল ইঞ্জিনিয়ার। সময়ের ব্যবধানে ইতিমধ্যেই জীবন থেকে সাতচল্লিশটি বসন্ত চলে গেছে। দীর্ঘদিন একাকীত্বের জীবন কাটিয়ে সে অনুধাবন করে, তার জীবনে এখন একজন সঙ্গী দরকার। অবশেষে দেশে গিয়ে শরীফ বিয়ে করেছে চব্বিশ বছর বয়সের রুবিনাকে।
রুবিনা আমেরিকায় এসেছে মাত্র চার মাস হলো। এখনো সবকিছু নতুন তার কাছে। তবে স্মার্ট মেয়ে রুবিনা অতি দ্রুত সবকিছুর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করছে।
রাত বাড়ার সাথে সাথে বাতাসের বেগ বাড়তে থাকল। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে ঘন ঘন। মাষ্টার বেডরুমের বিছানায় বসে রুবিনা টিভির দিকে তাকিয়ে আছে। টিভিতে ঝড়ের সতর্কবাণী দিচ্ছে। পাশে শুয়ে আছে শরীফ, নির্বিকার। খবরে তার কোন আগ্রহ নেই। রুবিনা তার দিকে ঘুরে ভীত কণ্ঠে বলল, ‘আমার ভয় লাগছে।’
খোলা জানলা দিয়ে হাওয়া ঢুকে পর্দা নাড়িয়ে দিচ্ছিল। শরীফ উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে বাইরের দিকে তাকাল। তারপর জানালা বন্ধ করে এসে আবার শুয়ে পড়ল। রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ভয়ের কিছু নেই। টর্নেডো, টুইস্টার এগুলো কিছুই না। সামান্য বাতাস বইছে আর তাতেই টিভিতে একেবারে সতর্কবাণীর ঝড় বইয়ে দিচ্ছে। সবকিছুতেই এদের বাড়াবাড়ি।’
শরীফ রিমোটটা নিয়ে টিভি বন্ধ করে দিল। তারপর বেডসাইড টেবিলে রাখা এলার্ম ঘড়িতে সকাল ছ’টায় এলার্ম সেট করে রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এসো ঘুমিয়ে পড়ি।’ বলেই শরীফ বেডলাইটের সুইচ বন্ধ করে পাশ ফিরে শুয়ে পড়ল এবং প্রায় সাথে সাথেই ঘুমিয়ে পড়ল।
রুবিনার চোখে ঘুম নেই। সে তাকিয়ে থাকে অন্ধকারে। ডিজিটাল ঘড়িতে সময় জ্বলজ্বল করছে। রাত মাত্র দশটা।
আমেরিকায় আসার পর থেকেই রুবিনার ঘুমের সমস্যা দেখা দিয়েছে। প্রথমে ভেবেছিল রাত দিনের পার্থক্য তাই এমন হচ্ছে। কিন্তু একদিন একদিন করে চার মাস হয়ে গেল, রুবিনা ঘুমাতে পারে না। রাত যখন প্রায় শেষ হতে থাকে তখন তার অবসাদ গ্রন্থ ক্লান্ত শরীর ঘুমে আক্রান্ত হয়, আর ঠিক তখনই ঘড়ির এলার্ম বেজে উঠে। শরীফের অফিসে যাবার সময় হয়ে যায়।
রুবিনা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল রাত এগারটা বেজে পঞ্চাশ মিনিট। গত প্রায় দু’ঘণ্টা ধরে সে বিছানায় বসে রয়েছে। অনেকবার শরীফের দিকে তাকিয়ে দেখেছে, স্বামীর সাইনবোর্ড ধারী মানুষটি কেমন নির্লিপ্ত ভাবে ঘুমাচ্ছে। সে উঠে গিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দিল। বাইরে তাকিয়ে দেখল ঝড়ের তীব্রতা অনেকটা কমে গেছে। তবে বৃষ্টি হচ্ছে মুষলধারে। রুবিনা তাকিয়ে থাকে অকম্পিত দৃষ্টিতে সমুখপানে রাতের প্রহরজুড়ে। জীবনের মোড় কীভাবে ঘুরে যায় তা কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারে না। রুবিনাও পারেনি।
কত সময় পাড় হয়েছে সে নিজেও জানেনা। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল ঘড়ির দিকে। ভোর পাঁচটা। ঝরের তীব্রতা আরো খানিকটা কমে গেছে। বৃষ্টিও থেমে গেছে অনেকক্ষণ হয়। রুবিনা ধীর পায়ে শরীরটাকে প্রায় জোড় করেই টেনে নিয়ে গেল বিছানায়। নরম বিছানায় নিজেকে এলিয়ে দিয়ে আস্তে করে ব্লাঙ্কেটের খানিকটা টেনে নিল শরীফের গা থেকে। তারপর একসময় ক্লান্তিতে শিথিল হয়ে এলো তার শরীর। চোখ দুটি বন্ধ হয়ে এলো ঘুমে।
ঘণ্টার কাঁটা সকাল ছ’টায় স্পর্শ করতেই তীক্ষ্ণ শব্দে এলার্ম বেজে উঠে। শরীফ চোখ না খুলেই ক্ষিপ্রতার সাথে এলার্মে সুইচ বন্ধ করে দেয়। কিছুক্ষণ শুয়ে থেকে অলসতা কাটানোর চেষ্টা করে। তারপর বিছানা ছেড়ে হাই দিতে দিতে দ্রুত ঢুকে পড়ে মাষ্টার বেডরুমে লাগোয়া বাথরুমের ভিতর। ঢুকেই বেসিনের কল ছেড়ে দেয় সে। শব্দ করে মুখ ধোয়। শুকিয়ে যাওয়া কাশি উপরে টেনে নিলে যেমন শব্দ হয়, ঠিক সেইরকম একধরনের অদ্ভুত শব্দ করে শরীফ। শেভ করার সময় রেজার দিয়ে বেসিনে খট খট করে রেজার পরিষ্কার করে। সবশেষে টয়লেটের কাজ শেষ করে ফ্ল্যাশ টেনে শরীফ বাথরুম থেকে বেড় হয়ে দেখে রুবিনা তার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। এই রুটিনেই শুরু হয় প্রতিটা সকাল। আজকেও তার কোনো ব্যতিক্রম হলো না।
বাথরুম থেকে বের হয়ে একটু লজ্জা পেয়ে শরীফ বলল, ‘এইরে দিলাম বুঝি ঘুম ভাঙ্গিয়ে।’
‘সে তো রোজই দাও।’ বলতে বলতে ব্লাঙ্কেট সরিয়ে উঠে বসল রুবিনা।
‘তুমি আবার উঠছ কেন? তোমাকে এখন উঠতে হবে না। সকালে ঘুমটা হচ্ছে মেয়েদের বিউটি স্লিপ। শরীরটা বরং একটু পুরুক।’
রুবিনা কোন উত্তর না দিয়ে চুপচাপ বসে থাকল।
শরীফ অফিসের পোশাক পড়তে পড়তে বলল, ‘শরীরটা একটু চাঙ্গা হওয়া দরকার। দেশে থাকতে কি খাওয়া দাওয়া করতে না নাকি? ডায়েট করে তো শরীরের বারোটা বাজিয়েছ।’
রুবিনা কোন উত্তর না দিয়ে ঢুকে পড়ল বাথরুমে। কিছুক্ষণ আয়নায় দিকে তাকিয়ে নিজেকে দেখল। তারপর সেখান থেকেই উত্তর দেল, ‘আমার শরীরের তুমি খারাপ দেখলে কোথায়?’
‘আরে মেয়েদের শরীর একটু নাদুস-নুদুস না হলে কি ভাল লাগে? একটু হালকা মেদ থাকলে শরীরের সৌন্দর্য অন্যরকম হয়।’
রুবিনা বাথরুম থেকে বেড় হয়ে এসে আবার ব্লাঙ্কেট টেনে শুয়ে পড়ল।
শরীফ বলে চলল, ‘আজকাল বাংলাদেশের মেয়েরা না খেয়ে যে কি সব করে ডায়েট ফায়েট করে। সিস্টেমের বারোটা বাজিয়ে ফেলে। আর এদেশের মেয়েদেরকে দেখ, নিয়মিত জিমে যায়, এক্সারসাইজ করে। না খেয়ে শুকনো কাঠি হয়ে থাকে না। এতে গ্ল্যামার নষ্ট হয়ে যায়।’
রুবিনা চুপচাপ শরীফের বক্তৃতা শুনতে থাকে। শরীফ তার কাজের ব্যাগটা কাঁধে ঝুলিয়ে কথা শেষ করে, ‘এনিওয়ে, আই বেটার গেট গোয়িং। আই নিড টু বিট দ্য ট্রাফিক।’ বলেই সে দ্রুত বেড় হয়ে গেল।
রুবিনা ভাবলেশহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শরীফের গমন পথের দিকে।
ঘুম থেকে একটু দেরী করেই উঠে রুবিনা। সকালের নাস্তা শেষে তেমন কিছু করারও থাকে না তার। বেশীর ভাগ সময় বসে থাকে লিভিং রুমে টিভি সেটের সামনে। শরীফ বলেছে টিভি দেখে ইংরেজি শিখতে। কিন্তু টিভি আর কতক্ষণই বা ভাল লাগে। চ্যানেল ঘুরাতে ঘুরাতে এক সময় টিভি বন্ধ করে দেয় সে।
প্রতিদিন দুপুরে মেইল বক্স খুলে চিঠি আনা রুবিনার প্রিয় কাজের একটি। সারাদিনে এই একটি কাজকেই তার সবচেয়ে বেশী গুরুত্বপূর্ণ মনে হয়। চিঠিগুলো এনে খুব আগ্রহ নিয়ে একটার পর একটা খাম সে খুলে দেখে।
দুপুর ১২টার মধ্যেই সাধারণত মেইলম্যান মেইল ডেলিভারি দিয়ে যায়। তাই লাঞ্চের আগেই রুবিনা গেল বাসার সামনের ড্রাইভওয়ে সংলগ্ন মেইল বক্স থেকে চিঠি আনতে। মেইল বক্স খুলে একগাদা এনভেলাপ বের করে দ্রুত চোখ বুলায় প্রেরকের ঠিকানার দিকে। না নেই। আজো আসেনি তার প্রত্যাশিত সেই চিঠি। মুঠো ভর্তি করে চিঠি গুলো নিয়ে সে ভিতরে আসল। সোফায় বসে আবারো একটি পর একটি ঠিকানা দেখল। তারপর হতাশ হয়ে বসে থাকল।
হঠাৎ করে ফোন বেজে উঠল। ফোনের শব্দে রুবিনা সম্বিত ফিরে পায়। অলস ভঙ্গিতে সাইড টেবিলে রাখা ফোনটার দিকে তাকাল। ধরতে ইচ্ছে করছে না। ফোন বেজেই চলেছে। উঠে গিয়ে কর্ডলেস ফোনটি ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘হ্যালো?’
‘মেইল চেক করেছো?’ ফোনের ভেতর থেকে একটা পুরুষ কণ্ঠ শোনা গেল। কণ্ঠটি রুবিনার চেনা। তবে সেটি শরীফের কণ্ঠ নয়।
‘করেছি। প্রতিদিনই করছি। আজকেও আসেনি। চার মাস হয়ে গেল। কিছু বুঝতে পারছি না।’
‘ইমিগ্রেশন অফিসে কল দিয়ে একটা খোজ নাও না বাবা। অনলাইনেও তো চেক করতে পারো। তোমার তো দেখি কোন আগ্রহই নেই’
‘আগ্রহ নেই মানে? কি বলছো তুমি? একটি রাতও আমি ঘুমতে পারছি না টেনশনে আর তুমি কিনা বলছো আমার কোন আগ্রহ নেই? আশ্চর্য!’ রুবিনার কণ্ঠে রাগ ঝরে পড়ল।
‘আহা, এত রিয়্যাক্ট করছো কেন? এক কাজ করো না প্লীজ, কেস নাম্বারটা নিয়ে একটা ফোন করে দেখো।’
‘দেখি।’ বলেই ফোন কেটে দিল রুবিনা।
শরীফের সাথে রুবিনার কথাবার্তা তেমন একটা হয় না। সামান্য যেটুকু হয় তা ঐ রাতে খাবার টেবিলে। রুবিনার মনটা আজ অস্থির। খেতে ইচ্ছে করছে না। প্লেটে খাবার নিয়ে শুধু নাড়াচাড়া করছে, মুখে দিচ্ছে না।
শরীফ সেটা লক্ষ্য করে বলল, ‘কি ব্যাপার খাচ্ছ না যে?’
‘খেতে ইচ্ছে করছে না।’
‘না খেলে তো চলবে না। তোমার শরীরের যা অবস্থা!’
রুবিনা কিছুটা ইতস্তত করে জানতে চাইল, ‘আচ্ছা, কার্ডটা এখনো আসছে না কেন? চার মাস হয়ে গেল আমি এসেছি। তুমি না বললে এক-দেড় মাসের মধ্যেই চলে আসবে?’
‘এত অস্থির হচ্ছো কেন? চলে আসবে। আজকাল সবকিছুতেই সময় লাগে। যা কড়াকড়ি অবস্থা।’
রুবিনা কোন কথা বলল না। চুপচাপ খাবার প্লেটের দিকে তাকিয়ে থাকল।
শরীফ খেতে খেতেই বলল, ‘তাছাড়া তুমি তো আর জব খুঁজছো না যে কার্ড ছাড়া চলবে না। আর যদি কোন কারণে প্রয়োজন পড়েই, পাসপোর্ট দেখালেই চলবে। পাসপোর্টে এলিয়েন নাম্বার স্ট্যাম্পড করা আছে, কাজেই কোন সমস্যা হবে না।’
এরপর কথাবার্তা আর এগোয় না। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে রুবিনা উঠে গিয়ে বেসিনে প্লেট রেখে আবার ফিরে আসল। শরীফের খাওয়া তখনও শেষ হয়নি।
আবার একটি দীর্ঘ রাতের শুরু।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে, হাতের কিছু কাজ শেষ করে শরীফ বিছানায় এসে শুয়ে পড়ল।
রুবিনা টেবিল থেকে খাবার গুলো ফ্রিজে তুলে রেখে কিচেনে গেল। বেসিনে রাখা প্লেট ধুয়ে, রান্না ঘরটা পরিষ্কার করে সে যখন বিছানায় এলো, শরীফ তখন গভীর ঘুমে।
শরীফের কোন চাহিদা নেই। না শরীরের, না মনের। ওদের মধ্যে কোন ভালবাসার কথা হয় না। কোন ভালবাসাবাসি হয় না। এভাবেই কেটে যায় দিনগুলি। এভাবেই দুটি মানুষ বাস করছে একই ছাদের নীচে। আলাদা ভাবে।
আরেকটি দীর্ঘ রাত কাটাবার জন্যে মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ধীর পায়ে বিছানায় এসে ঘুমন্ত শরীফের পাশে আলতো করে শুয়ে পড়ল রুবিনা। তারপর সেই অসহ্যকর নীরবতা। নির্ঘুম রুবিনা অপলক তাকিয়ে থাকে শূন্যে, অন্ধকারে।
আরেকটা দিন চলে গেল জীবন থেকে। আরেকটা অপেক্ষার প্রহর নামছে।
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-১)
[ভূমিকা: ‘অবিনাশী শব্দরাশি’ মূলত একটি কবিতার সংকলন। বারো তেরো বছর আগে ফিতার ক্যাসেটে আবৃত্তির আকারে বের হয়েছিল। আমি কবিতার মানুষ নই। তবুও কবিতাগুলি তখন ভালো লেগেছিল। এরপর ফুয়াদের কম্পোজিশনে নওরীন একটা গান করেছিল যার শিরোনাম ছিল ‘অবিনাশী শব্দরাশি’। এভাবেই নামটি এক সময় মাথায় গেঁথে যায়। নামটি সেখান থেকেই ধার করা।
নতুন গল্প শুরু করলেও শেষ করতে পারছি না। নিজের উপরেই বিরক্ত লাগছে। কী আর করা—আপাতত পুরনো গল্প দিয়েই চালিয়ে দেই। অনেকেই হয়ত গল্পটি আগে পড়েছেন তবে এই গ্রুপে প্রথম!
এবার ডালাস নয় বরং হাযির হলাম আমেরিকার সানসাইন স্টেট নামে পরিচিত রৌদ্রকরোজ্জ্বল ফ্লোরিডার গল্প নিয়ে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। সবাইকে আগাম ধন্যবাদ।]
নতুন গল্প শুরু করলেও শেষ করতে পারছি না। নিজের উপরেই বিরক্ত লাগছে। কী আর করা—আপাতত পুরনো গল্প দিয়েই চালিয়ে দেই। অনেকেই হয়ত গল্পটি আগে পড়েছেন তবে এই গ্রুপে প্রথম!
এবার ডালাস নয় বরং হাযির হলাম আমেরিকার সানসাইন স্টেট নামে পরিচিত রৌদ্রকরোজ্জ্বল ফ্লোরিডার গল্প নিয়ে। আশা করি আপনাদের ভালো লাগবে। সবাইকে আগাম ধন্যবাদ।]
‘এই শোন, আজ কিন্তু তুমি আমাকে বাইরে নিয়ে যাবে। কফিটা খেয়ে রেডি হয়ে নাও।’ কফির কাপটা শোভনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল নীলিমা।
ছুটির দিনে সকালে ঘুম ভাঙ্গার পর বিছানায় শুয়ে গড়াগড়ি করা শোভনের স্বভাব। শোভন উঠে বসে কফির কাপ হাতে নিয়ে একটা চুমুক দিয়ে বলল, ‘আমি যেতে পারবো না। আমার কাজ আছে।’
‘তোমার তো সব সময়ই কাজ থাকে।’ একটু কপট রাগ করে নীলিমা বলল, ‘ঠিক আছে না গেলে, গ্রোসারিটা অন্তত করে নিয়ে আসি চলো।’
‘বললাম তো যেতে পারবো না। আমার অন্য কাজ আছে। তুমি একাই যাও। তাছাড়া তোমার ঐ বাংলাদেশী মাছ তরকারি কিনে আনা কিংবা খাওয়া কোনোটার ইচ্ছেই আমার নেই।’
শোভনের এমন কথায় নীলিমার মনটা বিষণ্ণ হলো। কিন্তু সে কিছু বলল না।
‘কী যে রান্না করো না, সারা এপার্টমেন্ট গন্ধ হয়ে যায়। বাইরে বেরুলে সবাই এমন ভাবে তাকায় যেন মনে হয় আমরা অন্য কোন গ্রহ থেকে এসেছি।’ শোভন কটাক্ষ করে বলল।
নীলিমা আহত দৃষ্টিতে তাকাল শোভনের দিকে। তার মুখ লাল হয়ে গেল।
‘ওসব স্পাইস এন্ড স্মেলি ফুড রান্না না করলে কি হয় না? প্যাকেট ফুড মাইক্রোওয়েভে গরম করে খেয়ে নিলেই তো হয়। রান্নার ঝামেলা নেই, ক্লিনিং এর ঝামেলা নেই। গন্ধও ছড়ায় না। আমেরিকায় এসেছো, একটু আমেরিকান হও।’
‘দেখো শোভন, তোমার মত সবাই তো আর আমেরিকান হয়ে যায়নি যে শুধু প্যাকেট ফুড খেতে হবে। আর তাছাড়া স্পাইসি ফুড শুধু আমি একাই রান্না করি না—অন্য বাঙালিরাও করে। ইন্ডিয়ান, পাকিস্তানী, মেক্সিকানরাও করে। আর ক্লিনিংতো তুমি করো না—ঘর গোছানো, রান্না করা, লন্ড্রি করা কোনো কিছুতেই তুমি হেল্প করো না। তাহলে এত কথা কেন বলছো!’ নীলিমা তীব্র প্রতিবাদ করে ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
শোভন ভ্রূ কুঁচকে তাকাল নীলিমার চলে যাওয়ার দিকে।
দরজার সামনে গিয়ে ঘুরে দাঁড়াল নীলিমা। শীতল কণ্ঠে বলল, ‘তুমি না যাবে না যাও, অত ফালতু কথা বলার দরকার কি।’
শোভন নীলিমার কথায় কোনো ভ্রুক্ষেপ না করে কফিতে চুমুক দিল।
কিছুক্ষণ পর বাইরে যাওয়ার জন্যে তৈরী হয়ে নীলিমা আবার আসল বেডরুমে। ড্রেসিং টেবিলের উপর থেকে তার পার্সটা নিয়ে বেরিয়ে যাবার সময় শোভনকে বলল, ‘ঠিক আছে আমি যাচ্ছি। টেবিলে ব্রেকফাস্ট দেয়া আছে, ইচ্ছে হলে খেয়ে নিও।’
শোভন তাকাল নীলিমার দিকে। দেখল নীলিমা গ্রোসারী করতে যাচ্ছে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ পড়ে। সে কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘এটা কী পড়ে যাচ্ছ?’
‘দেখতেই তো পাচ্ছ!’ নীলিমা ইচ্ছে করেই বাঁকা উত্তর দিলো।
‘তোমাকে না বলেছি এ ধরনের ড্রেস পরে বাইরে যাবে না। আমেরিকায় এসেছো, অথচ গেয়ো স্বভাবটা এখনো গেলো না। একটু স্মার্ট হবার চেষ্টা করো।’
নীলিমা শীতল দৃষ্টিতে তাকাল শোভনের দিকে। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল, ‘তো তোমার কি ধারণা যারা সালোয়ার কামিজ কিংবা শাড়ি পড়ে তারা স্মার্ট নয়? সরি, তোমার এই কথাটা মেনে নিতে পারছি না।’ একটু থেমে সে আবার বলল, ‘আচ্ছা আমার শাশুড়ি আম্মা, আই মিন তোমার মা, যখন এই দেশে আসবেন, তাকে তুমি কি পরতে বলবে শোভন, জিন্স আর টি-শার্ট?’
শোভন কোনো উত্তর দিলো না। কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে কফিতে চুমুক দিলো। নীলিমা এক দৃষ্টিতে শোভনের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বের হয়ে গেল ঘর থেকে।
শোভন কফিতে শেষ চুমুক দিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল। হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল জানালার সামনে। পর্দা সরিয়ে তাকাল নীচে। তাকিয়ে থাকল নীলিমার গাড়ি বের হয়ে যাওয়া পর্যন্ত। নীলিমার গাড়ি আড়াল হতেই সে হাতে ফোন নিল তারপর ডায়াল করল একটা নাম্বারে।
…
নীলিমা আর শোভন দম্পতি বসবাস করে সূর্যের আলোয় আলোকিত শহর যুক্তরাষ্ট্রের সানশাইন স্টেট নামে খ্যাত ফ্লোরিডা রাজ্যের আলো ঝলমল মায়ামি শহরের প্রাণকেন্দ্রে। আটলান্টিক মহাসাগরের সবুজাভ জলঘেরা তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে সারি সারি এপার্টমেন্ট। তারই একটিতে তাদের বসবাস।
নীলিমার ঘরটি সুন্দর করে সাজানো। পরিপাটি বিছানা। ছিমছাম আসবাবপত্র। রুচি ও ঐতিহ্য দু’য়েরই পরিচয় পাওয়া যায়। আধুনিকতার ছোঁয়া মানানসই। সবকিছুতেই শিল্পের ছোঁয়া স্পষ্ট। ঘরের দক্ষিণে উন্মুক্ত জানালা। বাতাসের ঝাপটায় মাঝে মাঝে পর্দাগুলো উড়ে উড়ে খেলা করে। জানালাটি নীলিমার খুব প্রিয়। কারণে, অকারণে খুব বেশি মন খারাপ হলে, বা সময় কাটানোর জন্য ঐ জানালাটায় গিয়ে দাঁড়ায় সে। বাইরের ফুরফুরে বাতাস উদাস করে দেয় তার মনকে। ঐ জানালাটায় দাঁড়ালে দূরের সমুদ্র দেখা যায়।
গাড়ি চালাতে চালাতে আনমনা হয়ে যায় নীলিমা। শোভনের কিছু কথা কিছু ব্যবহার তাকে ভীষণ আহত করে। সে জানালার কাচ নামিয়ে দিল। একবার ভাবল গ্রোসারী বাদ দিয়ে কাছের কোন বিচে গিয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকবে। সমুদ্রের কাছাকাছি থাকার এই একটা সুবিধা। যখন তখন চলে যাওয়া যায়।
নীলিমার খুব পছন্দের শহর মায়ামি। মায়ামি নামের মধ্যেই কেমন যেন একটা রোমান্টিক আবেশ মাখানো রয়েছে। দেশ থেকে এসেই সে এই শহরটিকে ভালোবেসে ফেলে। ছোটবেলা থেকেই সমুদ্র দেখার খুব শখ ছিল নীলিমার। ইচ্ছে ছিল কক্সবাজার যাবে। কিন্তু যাওয়া হয়নি। সব সময় ভাবত বিয়ের পর তার স্বামীকে নিয়ে প্রথমেই চলে যাবে সমুদ্র সৈকতে। লোনা পানিতে পা ভেজাবে। বেলাভূমিতে হাত ধরাধরি করে হাঁটবে। সূর্যাস্ত দেখবে। এক সঙ্গে পাশাপাশি বসে জ্যোৎস্নার আলো দেখবে।
নীলিমার ভালো লাগে শাড়ি পরতে। সমুদ্র সৈকতে বালিতে হাঁটতে। আকাশের নীল তার পছন্দের রঙ। জ্যোৎস্নার আলোতে তার মন উচাটন হয়। সে কবিতা ভালোবাসে, একা একা মাঝে আবৃত্তিও করে। ভালো বাসে বাংলা গান। প্রবাসে থেকেও সে হৃদয়ে ধারণ করে এক টুকরো বাংলাদেশ।
অন্যদিকে শোভন, পুরোপুরিই আমেরিকান জীবন ধারা। কোনো বাঙালি অনুষ্ঠানে সে যায় না। বাংলাদেশীদের সাথে মেলামেশাও করে না। তার একটা জগত আছে। সম্পূর্ণই আলাদা।
ফ্লোরিডায় প্রায় ২০ হাজারের মত বাংলাদেশীর বসবাস। মায়ামিতে আছে ৫ থেকে ৬ হাজার। মায়ামি তথা ফ্লোরিডার আবহাওয়া পুরোটাই বাংলাদেশের মত। গরম, আর্দ্রতা বাংলাদেশের মতই। আবার শীতকালে তাপমাত্রা ১৫-২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এর মধ্যেই থাকে। শুধু আবহাওয়া নয়, গাছপালাগুলাও দেশের মতই পরিচিত।
গ্রোসারী শেষ করে, পছন্দের কিছু মাছ কিনে নিয়ে এসে রান্নার কাজটা শেষ করল নীলিমা। রান্না শেষ করেই শুরু হলো পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা অভিযান। প্রথমেই ধরল লিভিং রুমের কার্পেট। ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে ক্লিনিং শুরু করতেই বেজে উঠল ফোন। কিন্তু ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের শব্দে ফোন রিং এর শব্দ নীলিমার কানে পৌঁছল না। ক্লিনিং শেষ করে ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের সুইচ বন্ধ করতেই ফোনের শব্দ শুনতে পেল সে।
নীলিমা এগিয়ে গিয়ে ফোন ধরতেই অপর প্রান্ত থেকে রিনরিনে কণ্ঠ ভেসে এলো, ‘তোর ব্যাপারটা কি বলতো? ইদানীং যে কল করা একেবারে ছেড়েই দিয়েছিস? কী করিস সারাদিন? কল করে ম্যাসেজ রাখলেও তো তুই কল ব্যাক করিস না। আজব।’
নীলিমা হেসে ফেলল। অপর প্রান্তের রিনরিনে কণ্ঠের মেয়েটির নাম মুনা। নীলিমা প্রিয় বান্ধবী। খুব চটপটে আর ছটফটে স্বভাবের মেয়ে মুনা। তার চোখে মুখে দুষ্টুমি খেলা করে সারাক্ষণ।
মুনা বলল, ‘হাসছিস যে?’
‘মুনা, তোর এই ব্যাপারটা না আমার খুব ভালো লাগে, তাই হাসছি।’
‘কোন ব্যাপারটা?’
‘এইযে, হাই হ্যালো না বলে হঠাৎ করে মাঝখান থেকে কথা বলা শুরু করে দিস।’
‘হ্যাঁ হয়েছে, আর বলতে হবে না। কি করছিলি?’
‘এইতো, কার্পেট ভ্যাকুয়াম করছিলাম। যা ধুলা জমে।’
‘তুই এত পিকি কেন রে? সারাক্ষণ শুধু ক্লিনিং আর পলিসিং, পারিসও বাবা।’
নীলিমা আবারো হাসলো। মুনা বলল, ‘এই শোন, যে জন্য তোকে ফোন করেছি—এই শনিবার বিকেলে তোদের কোন প্লান আছে?’
একটু ভেবে নিয়ে নীলিমা বলল, ‘এই শনিবার? আমারতো নেই। তবে শোভনের কথা জানিনা, ও-তো আমাকে কিছু বলে না। কেনরে?’
‘তোর জন্য একটা দারুণ খবর আছে?’
‘কি খবর?’ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘তোর প্রিয় কবি মাহমুদ সাজ্জাদ ফ্লোরিডায় আসছেন।’
‘সত্যি বলছিস? কোথায়? কখন?’
‘ইয়েস মাই ক্লিনিং লেডী, সত্যি বলছি। জামান ভাই ফোন করেছিলেন। উনারা প্রতি মাসে যে কাব্য জলসা করেন, এ মাসে কবি সাহেব স্পেশাল গেস্ট হয়ে আসছেন। নিজে কবিতা আবৃত্তি করবেন, ভক্তদের অটোগ্রাফ দেবেন। যাবি নাকি?’
‘যাবো না মানে? কি বলছিস তুই? অফকোর্স যাবো।’ নীলিমার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
‘শোভন ভাই তো যাবে বলে মনে হয় না—উনি তো আবার বাঙ্গালিদের কোনো অনুষ্ঠানে যান না। না গেলে বলিস, আ’উইল পিক ইউ আপ অন দ্য ওয়ে।’
‘আমি শোভনকে নিয়েই যাবো। যেতে না চাইলেও জোর করে নিয়ে যাবো।’
‘তাহলে তো ভালোই। কল করিস, জাস্ট ইন কেস, ইউ নিড মি।’
‘থ্যাঙ্ক ইউ বন্ধু!’
‘থ্যাঙ্ক ইউ দিতে হবে না। আমাকে জানাস কিন্তু।’
‘হ্যাঁ জানাবো।’
মুনা ফোন কেটে দিল।
নীলিমা ফোন হাতে খুশী মনে ফোনের দিকে তাকিয়ে রইল আনমনে।
কবি মাহমুদ সাজ্জাদের নাম শুনেই নীলিমার মনটা কেমন জানি আনচান করতে থাকে। কখন হবে সেই কাব্য জলসা?
রাতে খাবার টেবিলে নীলিমা আর শোভনের মধ্যে সাধারণত প্রয়োজনের বাইরে কোনো কথা হয় না। শোভন যেহেতু দেশী খাবার খুব একটা পছন্দ করে না, তাই সে সাধারণত নীলিমার রান্নার তেমন কোনো প্রশংসাও করে না। খেতে কেমন হয়েছে সে ব্যাপারে তার তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায় না। নীলিমা মাঝে মাঝে আগ্রহ নিয়ে রান্না কেমন হয়েছে জিজ্ঞেস করলে সে ‘হয়েছে’, ‘ভালোই’ জাতীয় উত্তর দেয়। তাই নীলিমাও খুব একটা আগ্রহ নিয়ে আর জিজ্ঞেস করে না।
শোভন চুপচাপ খেয়ে যাচ্ছে। নীলিমা কয়েকবার তাকাল তার দিকে। শোভন অবশ্য লক্ষ করল না। সে তার মত করে খেয়ে চলেছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমা আস্তে করে জিজ্ঞেস করল, ‘এই শনিবার বিকেলে তোমার কি কোন প্লান আছে?’
‘কেন?’
‘বাংলাদেশ থেকে কবি মাহমুদ সাজ্জাদ আসছেন এখানকার একটা সেমিনার এ গেস্ট হয়ে।’
‘মাহমুদ সাজ্জাদ? এটা আবার কে? এই নামের কোন কবি সাহিত্যিকের নাম তো শুনি নাই।’
‘আশ্চর্য! তুমি তাঁকে চেনো না?’ নীলিমা অবিশ্বাস্য চোখে তাকাল শোভনের দিকে।
‘এমন ভাবে তাকাচ্ছ যেন তাকে না চিনে আমি মস্ত বড় অপরাধ করে ফেলেছি।’
নীলিমার ইচ্ছে হলো বলে একজন বাঙালি হয়ে কবি মাহমুদ সাজ্জাদকে চিনতে না পারাটা অপরাধেরই শামিল। কিন্তু সেসব কিছু না বলে, একটু ভেবে নিয়ে নীলিমা বলল, ‘আমরা যাচ্ছি কিন্তু।’ নীলিমার কণ্ঠে একধরনের উত্তেজনা স্পষ্ট।
‘আমরা যাচ্ছি মানে? তুমি কি আমাকে নিতে চাইছো? ওসব আঁতেলদের আঁতলামি দেখতে যাওয়ার ইচ্ছে বা সময় কোনোটাই আমার নেই। তোমার ইচ্ছে হয় তুমি যাও।’
শোভনের এমন করে বলায় নীলিমা একটু আহতই হলো। সে মন খারাপ করে বলল, ‘বাংলাদেশের কোন অনুষ্ঠানে তুমি যাওনা বলে আমারও যাওয়া হয় না। আর একা যেতে আমার ভাল লাগে না তা তুমি জানো।’
‘ভালো না লাগলে যেও না।’ নির্লিপ্ত উত্তর শোভনের।
‘তাই বলে কোন অনুষ্ঠানেই আমার যাওয়া হবে না?’ নীলিমার কণ্ঠ ধরে এলো। সে অভিমানী গলায় আবার বলল, ‘ঠিক আছে তোমার যেতে হবে না, আমি একাই যাবো।’ বলেই সে খাবার শেষ না করেই উঠে চলে গেলো।
শোভন তার চলে যাওয়ার দিকে একবার তাকিয়ে আবার খেতে শুরু করল।
নীলিমা কিছুতেই নিজেকে সংযত রাখতে পারছে না। বাচ্চা মেয়েদের মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না আসছে। সে এখন বাথরুমের দরজা বন্ধ করে নিঃশব্দে কিছুক্ষণ কাঁদবে। নীলিমা বাথরুমে গিয়ে ঢুকল। বেসিনের কল ছেড়ে দিল। সে চায়না শোভন তার কান্নার শব্দ শুনুক। যার কাছে সামান্য আবেগের মূল্য নেই, তাকে তার কান্না শুনিয়ে নিজেকে ছোট করার কোনো মানে হয় না।
অপেক্ষা (বোনাস পর্ব)
মাঝ রাতে অকস্মাৎ ঘুম ভেঙ্গে গেল শরীফের। কোনো কারণ ছাড়াই সে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। কেন যেন অস্থির লাগছে। তার পানি পিপাসা লেগেছে। সে পাশের টেবিলে রাখা পানির বোতল থেকে পানি খেয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকল। সে মনে করতে পারল না সে কী কোনো স্বপ্ন দেখেছে? তাহলে এমন লাগছে কেন?
কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে সে আবার যখন শুয়ে পড়তে যাবে তখন হঠাৎ কি মনে করে পাশের টেবিল থেকে তার মোবাইল ফোনটা হাতে নিল। শরীফ একবার ঘুমাতে গেলে কখনোই ফোন খুলে দেখে না। রাত-বিরাতে কেউ যে তাকে ফোন করে তাও না—তবু সে ফোন বন্ধ করে ঘুমায়।
ফোনটা হাতে নিতেই স্ক্রিনের লাইট জ্বলে উঠল। সে দেখল একটা টেক্সট মেসেজ। শরীফের মনে হলো তার জীবনে এত সুন্দর মেসেজ সে আর কোনদিনই দেখেনি। খুশীতে তার চোখ ছল ছল করে উঠল। সে মেসেজটা আবার দেখল। রুবিনা লিখেছে, প্লিজ কল মি!
শরীফ ঘড়ি দেখল। রাত তিনটা বেজে তের মিনিট। এত রাতে কি ফোন করা ঠিক হবে? কিন্তু, রুবিনা নিশ্চয়ই কোনো বিপদে পড়েছে—না হলে ফোন করতেই বা বলবে কেন? রুবিনা ওকে ছেড়ে চলে গেছে দু’সপ্তাহ হয়ে গেল। এর মাঝে কখনোই সে শরীফকে ফোন করতে বলেনি। রুবিনা নিজে থেকেই দু’একবার ফোন করেছে—ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা বলেছে, যেন তাকে সে তাড়াতাড়ি ডিভোর্স দিয়ে দেয়। রুবিনার পক্ষে আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকারও কোনো দরকার নেই। শরীফ অবশ্য কিছুই বলেনি তাকে। কোনো অনুনয় বিনয় বা অনুরোধ কিছুই করেনি।
শরীফ টেক্সট মেসেজের সময় দেখল। রুবিনা মেসেজটি পাঠিয়েছে রাত বারোটা বেজে বিশ মিনিটে। তার মানে মাত্র তিন ঘণ্টা আগে। এত রাতেই বা সে কোথায়? অনেক ভেবে শরীফ সিদ্ধান্ত নিল—ফোন করবে রুবিনাকে। কিন্তু যদি সে ঘুমিয়ে থাকে? যেখানেই থাকুক এত রাতে নিশ্চয়ই সে জেগে নেই। ফোন করে ঘুম নষ্ট না করে বরং টেক্সট মেসেজে রিপ্লাই দিয়ে দেখলে কেমন হয়? ও যদি জেগে থাকে কিংবা সত্যিই কোনো বিপদে পরে তাহলে নিশ্চয়ই সে উত্তর দিবে। শরীফ রিপ্লাই বাটনে চাপ দিয়ে লিখল, ‘আর ইউ আপ?’
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শরীফের ফোনে উত্তর এলো, ‘ইয়েস।’
শরীফ ফোনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। এবং ঠিক সে সময় আরো একটি মেসেজ এলো। রুবিনা লিখেছে, ‘ক্যান উই টক?’
রুবিনা কথা বলতে চাইছে। কিন্তু সে বলেনি এখনি না অন্য যে কোনো এক সময়। বলেছে, ক্যান উই টক? বলেনি, ক্যান উই টক নাও? শরীফ কিছুটা দ্বিধায় পড়ে গেল। তার কি এখনি কল করা উচিৎ এই এত রাতে নাকি সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করবে। সে আবার ঘড়ি দেখল, রাত তিনটা সতের। শরীফ চুপ করে বসে রইল।
শরীফের চিন্তার ব্যাঘাত ঘটিয়ে হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠল। রুবিনার ফোন। শরীফ ফোন ধরে উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বলল, ‘হ্যালো!’
রুবিনা কোনো কথা বলল না। চুপ করে রইল। তার নিঃশ্বাসের শব্দ শোনা যাচ্ছে—ভারী নিঃশ্বাস।
শরীফ আবার বলল, ‘রুবি!’
রুবিনা এবারো নিশ্চুপ। সে নিজেকে স্থির করার চেষ্টা করছে। প্রচণ্ড অভিমান আর অপমানে তার বুক ভারী হয়ে আছে। তার চোখ ভিজে যাচ্ছে।
‘তুমি কোথায়? কী হয়েছে?’ উৎকণ্ঠা নিয়ে শরীফ জানতে চাইল।
‘এয়ারপোর্টে।’ ভাঙা কণ্ঠে বলল রুবিনা।
‘কোন এয়ারপোর্টে?’
‘লাগোর্ডিয়া।’
‘এত রাতে? কোথায় যাচ্ছ?’
‘জানিনা।’
‘মানে কী?’ শরীফ ঠিক বুঝতে পারল না। সে আবার জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি ঠিক আছো তো? ইজ এভ্রিথিং অলরাইট?’
‘নো।’ আস্তে করে ভারী কণ্ঠে কোনো রকমে ছোট এক শব্দে উত্তর দিল রুবিনা।
‘কী হয়েছে? আমাকে বলা যাবে?’
রুবিনা চুপ করে গেল আবার। নীরবতা কাঁটিয়ে একসময় সে অস্ফুটে বলল, ‘আমি চলে এসেছি।’
শরীফ বুঝতে পারল না কী বলবে। তার কি খুশি হওয়া উচিৎ? ক্ষীণভাবে একটা সূক্ষ্ম জয়ের আনন্দ কি সে অনুভব করছে? শরীফের সব সময়ে মনে হয়েছে, রুবিনা একদিন ফিরে আসবে। এমন একটা ফোন কল তার আসবে—বলবে, আমি চলে এসেছি। যদি সত্যিই তাই হয়, তখন সে কী করবে? গ্রহন করবে রুবিনা কে? সম্পর্কটা কি আগের মতো আর হবে? রুবিনার যা ব্যক্তিত্ব, তাতে মনে হয় না সে কখনও নিজ থেকে বলবে, আমার ভুল হয়েছিল। আমি আমার ভুল বুঝতে পেরেছি। শরীফ যথাসম্ভব তার উত্তেজনাকে সংযত রেখে বলল, ‘চলে এসেছি মানে কী? কী হয়েছে তোমার?’
সে কথার উত্তর না দিয়ে হু হু করে কেঁদে ফেলল রুবিনা। দু’হাতে মুখ চেপে কাঁদতে লাগল। কেন কাঁদছে সে নিজেও জানেনা। অনেক চেষ্টা করেও সে তার কান্নার বাঁধ সংবরণ করতে পারল না। রাত বাড়ার সাথে সাথে সিটি নেভার স্লিপস—নিউ ইয়র্কের ব্যস্ততম এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা কমে এসেছে অনেকটাই। আর মাত্র ঘণ্টা খানিক পরেই শুরু হয়ে যাবে এয়ারপোর্টের ব্যস্ততা। শেষ রাতের এই থমথমে আওয়াজের সাথে রুবিনার কান্নার আওয়াজ মিশে গেল।
শরীফ আর কিছু না বলে চুপ করে রইল। ওকে কাঁদতে দিল। কিছু সময় পরে রুবিনার কান্নার বেগ কমে এলো। একটু সময় নিয়ে শরীফ বলল, ‘আমাকে কি বলবে, কী হয়েছে?’
‘তুমি শুনে কী করবে শরীফ?’ হঠাৎ ঝাঁঝাল কণ্ঠে বলে উঠল রুবিনা। ‘তোমার মতো একজন নির্জীব, অনুভূতিহীন মানুষের পক্ষে কি কিছু করা সম্ভব?’
শরীফ কোনো কথা খুঁজে পেল না। কী বলবে? রুবিনা ইচ্ছে করেই তাকে একটা খোঁচা দিয়েছে—শরীফ অপ্রস্তুত হয়ে বসে রইল।
অপরপ্রান্তে রুবিনা কেঁদেই চলেছে। সবকিছু সহ্য করা যায় কিন্তু একটা মেয়ের কান্না সহ্য করা যায় না। শরীফের কেমন যেন মায়া লাগতে লাগল মেয়েটির জন্য। যদিও সে জানে রুবিনা একটা ভুল করেছে, বেশ বড় ধরণের ভুল—তাই বলে কি সারাজীবন তাকে সাফার করতে হবে? শরীফের বিশ্বাস রুবিনা একদিন তার ভুল বুঝতে পারবে। এমন একটা ফোনের অপেক্ষায় কি সে থাকেনি? সত্যি বলতে কী—সে অপেক্ষাতেই ছিল। তাহলে কি রুবিনা সত্যি সত্যিই তার ভুল বুঝতে পেরেছে? সে জন্যেই কি সে চলে এসেছে? নাকি অন্য কিছু? কোনো বিপদও তো হতে পারে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রুবিনা কিছুই বলছে না।
‘আমি অনলাইনে টিকেট কেটে দিচ্ছি—তুমি নেক্সট ফ্লাইট ধরে চলে এসো।’ রুবিনাকে আশ্বস্ত করে বলল শরীফ।
‘না।’
‘না, কেনো?’
‘সেটা তুমি ভালো করেই জানো। আমার পক্ষে তো আর ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।’
‘তুমি না বললে তুমি চলে এসেছে? তাহলে কোথায় যাবে, কী করবে তুমি?’
‘জানি না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শরীফ বলল, ‘তুমি ফিরে এসো রুবি। আমরা আবার নতুন করে শুরু করি সব কিছু।’
‘করুণা?’
‘মোটেই না।’ একটু থেমে শরীফ আবার বলল, ‘দায়িত্ব। ভালোবাসা।’
এরপর রুবিনা কোনো কিছু আর বলতে পারল না। অঝরে কাঁদতে থাকল।
নিঃশব্দের কান্না কিন্তু কান্নার গভীরতা বুঝতে শরীফের কষ্ট হলো না। তার ইচ্ছে হলো এখুনি গিয়ে রুবিনা যেখানে আছে সেখান থেকে তাকে নিয়ে আসতে। রুবিনার নিঃশব্দ কান্নার শব্দ তার কর্ণ কুহরে প্রবেশ করে এখন হৃদয় ক্ষরণ শুরু করে দিয়েছে। সে কালক্ষেপণ না করে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল—তাকে যেতে হবে এবং এখুনি। শরীফ বলল, ‘তুমি যেখানে আছো—সেখানেই থাকো। কোথাও যাবে না। আমি আসছি।’
‘তোমাকে আসতে হবে না।’
‘শোনো রুবি, আমি তোমাকে ফিরিয়ে আনার জন্য আমি আসছি না। তুমি না চাইলে আসবে না—কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তোমার একটা ব্যবস্থা তো হওয়া দরকার। নিউ ইয়র্কে কি তোমার পরিচিত কেউ আছে? তুমি কি সব কিছু চেন? নতুন একটা জায়গায় সেটেল হতেও সময় লাগে। আমি শুধু তোমার একটা ব্যবস্থা করে দিয়েই আবার চলে আসব।’
‘আমি একটা খারাপ মেয়ে—আমার জন্য কেন তুমি কষ্ট করবে?’
‘ভালো-খারাপ বিবেচনার সময় এখন না রুবি। আর তুমি ভালো না খারাপ সে বিচার করারও আমি কেউ নই। তুমি যা করেছ, সেটা তুমি তোমার ভালোবাসার মানুষের জন্য করেছ। এটা নিয়ে আমার জন্য কোনো আক্ষেপ নেই। তবে হ্যাঁ ব্যাপারটার একটা সমাধান অন্য ভাবেও করা যেত। কিন্তু আমরা কি সব সময় সঠিক কাজটি করি? ভুল করি বলেই আমরা মানুষ—নাহলে অন্য কেউ হতাম।’
রুবিনা মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলল। সে কিছু একটা বলতে চাইল কিন্তু কোনো শব্দ বের হলো না। শরীফ বুঝতে পেরে তাকে আশ্বস্ত করল এবং তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল। তাঁর নিজেরও একটা ব্রেক দরকার। রুবিনা দেশ থেকে আসার পর ওকে নিয়েও কোথাও যাওয়া হয়নি। সেই অর্থে মেয়েটিকে সময়ও দেয়া হয়নি। সে-ই বা ওকে কতটুকু চিনেছে। শরীফের মনের মধ্যে এক ধরণের খচখচানি শুরু হলো। সে দ্রুত একটা ব্যাগ গুছিয়ে নিল। কিছু কাপড়, সেভিং কীটস, টুথ পেস্ট-ব্রাশ, মেডিসিন, ল্যাপটপ, ফোন চার্জার আর টুকিটাকি কিছু জিনিস ব্যাগে ভরে নিয়ে বের হয়ে পড়ল। গন্তব্য এয়ারপোর্ট।
ভোরের আলো তখনো ফোটেনি ভালভাবে। আধো আলো আধো অন্ধকার। পূবের আকাশে কমলা আভা। শিকাগোর রাস্তা একদমই ফাঁকা। অল্প কিছু গাড়ি চলাচল করছে। এয়ারপোর্টে পৌঁছতে বেশি দেরি হলো না শরীফের। এয়ারপোর্টে পৌঁছে নিউ ইয়র্কের ফ্লাইট কাউন্টারে দিয়ে দাঁড়াল সে। খোঁজ নিয়ে দেখল কোনো স্ট্যান্ডবাই টিকেট পাওয়া যাবে কিনা। শরীফের ভাগ্য সহায় হলো। শেষ মুহূর্তে একটা ক্যানসেলেশনের কারণে সে শিকাগো-নিউ ইয়র্কের প্রথম ফ্লাইটের একটা সীট পেয়ে গেল।
সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে শরীফের ফ্লাইট নিউ ইয়র্কের লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। দুরুদুরু বক্ষে সে বের হয়ে এলো প্লেন থেকে। সে জানে রুবিনা এয়ারপোর্ট লাউঞ্জের কোথাও বসে আছে—কিন্তু এত বড় এয়ারপোর্টে অবস্থান না জেনে খুঁজে বের করা কিছুতেই সম্ভব হবে না। শরীফ ফোন করল রুবিনাকে। রুবিনা ঘুম জড়ানো কণ্ঠে হ্যালো বলতেই শরীফ উত্তেজিত হয়ে বলল, কোথায় তুমি? রুবিনা চারিদিকে তাকিয়ে তার অবস্থান জানাল শরীফকে। রুবিনা কোথায় আছে সেটা জেনে নিয়ে শরীফ এগিয়ে গেল।
সাউথওয়েষ্ট এয়ারলাইন্সের লাউঞ্জে এসে একবার চারিদিকে দেখেই দূর থেকে শরীফ দেখতে পেল রুবিনাকে—লাউঞ্জের একটি কর্নারে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কেমন জবুথবু হয়ে বসে রয়েছে মেয়েটি। জানালার কাঁচ ভেদ করে আসা রোদের আলোতে আরো মায়াবী দেখাচ্ছে তার ছিপছিপে শরীরটাকে। দেখেই ভীষণ মায়া লাগল তার। শরীফ রুবিনাকে দেখতে পেলেও প্যাসেঞ্জারদের ভীরে রুবিনা শরীফকে দেখতে পেল না। শরীফ খুব দ্রুতই পৌঁছে গেল রুবিনার কাছে।
শরীফ রুবিনার পেছনে গিয়ে দাঁড়াতেই রুবিনার ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় যেন বুঝতে পারল কিছু। সে তড়িৎ গতিতে ঘুরে দাঁড়িয়েই দেখল শরীফকে। দাঁড়িয়ে আছে ঠিক তার চোখের সামনে—মুখে এক প্রশস্ত নির্ভরতার হাসি। ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা টেনে বলল, ‘দেখলে, ঠিকই চলে এসেছি।’
রুবিনার চোখ দুটি ছলছল করে উঠল। পারিপার্শ্বিকতা সব ভুলে আবেগে সে জড়িয়ে ধরল শরীফকে। আহা বেচারি, কেমন ফুলে ফুলে কাঁদছে।
শরীফও নিবিড় করে জড়িয়ে ধরল রুবিনাকে। ওর মতো আবেগহীন মানুষের কাছ থেকে এরকম উষ্ণ আলিঙ্গন ভাবাই যায় না।
রুবিনার গাল বেয়ে নেমে এলো উষ্ণ চোখের জল। তির তির করে কেঁপে উঠতে লাগল তার সমস্ত হৃদয়। শরীফের আলিঙ্গনে সে নিজেকে আবিষ্কার করল সম্পূর্ণ এক অন্য রুবিনাকে।
অপ্রাপ্ত ভালোবাসার দুজন মানুষ আওয়াজহীন ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে রইল।
(সমাপ্ত)
পরিশিষ্ট: এই পর্বটি অনুরোধের ঢেঁকি গেলা জাতীয় লেখা। দুবছর আগে যখন মূল গল্পটি ক্যানভাস এবং পেন্সিলে পোষ্ট করেছিলাম, তখন এই পর্বের কোনো অস্তিত্বই ছিল না এবং কখনো লিখতে হবে সেটাও ভাবি নি। তবে গল্পের ওপেন এন্ডিং এর বিষয়টি অনেকে সহজে নিতে পারেন নি—তারা চেয়েছিলেন হ্যাপি এন্ডিং। কিছুদিন আগে অন্যপ্রকাশে গল্পটি পূণঃপ্রকাশ করার পরে সেই একই ধরণের মন্তব্য এবং অনুরোধ আসতে থাকে। এই পর্যায়ে এসে পাঠকদের ইচ্ছাটাকেই প্রাধান্য দিতে চাইলাম।
কিছু কিছু গল্প থাকে, লেখক তাঁর নিজের খুশি মতন লিখে যায়। বাস্তবে আসলে কী ঘটে সে তাঁর ধাঁর ধাঁরে না। মূল গল্পে রুবিনা, সোহেলের বাসা থেকে বের হয়ে নিউ ইয়র্কের রাস্তায় হারিয়ে যায়। সেখানেই আমাদের গল্পটি শেষ হয়েছিল। তারপর রুবিনা কী করল? আসলে আদৌ কি সে এয়ারপোর্টে গিয়ে বসে ছিল? সে কি সত্যি সত্যিই শরীফকে মেসেজ পাঠিয়েছিল? শরীফ কি সত্যি সত্যিই এসেছিল রুবিনার কাছে? বাস্তবে এসব কিছু ঘটেছে কি না আমরা জানি না, তবে এভাবে ভাবতে ভালো লেগেছে বিধায় এই পর্বটি এভাবে লেখা হয়েছে। লেখকের স্বাধীনতা বলে কথা।
যারা চেয়েছিলেন শরীফ আর রুবিনার মিল হোক, এই পর্বটি তাদের জন্য। বাকীদের জন্য আগের শেষটাই শেষ।
সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা।
অপেক্ষা (শেষ পর্ব)
আহমেদ মামা নিউইয়র্ক থেকে প্রকাশিত বাংলা পত্রিকা ‘সাপ্তাহিক ঠিকানা’র পুরনো কয়েকটা সংখ্যা সাথে করে নিয়ে এসেছেন। তিনি পত্রিকা থেকে গ্রীনকার্ড সংক্রান্ত কিছু খবর বের করে শরীফকে দেখিয়ে বললেন, ‘স্বামীর স্পন্সর নিয়ে আমেরিকায় এসে গ্রীনকার্ড হাতে পেয়ে স্ত্রীর চলে যাবার ব্যাপারে এখানে বেশ কয়েকটা প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে। এখান থেকে একটির কিছু অংশ আমি তোমাকে পড়ে শোনাচ্ছি। ইন্টারেস্টিং ইনফরমেশন। আই থিংক, ইউ উইল ফাইন্ড ইয়োর আনসার।’
মামা পড়া শুরু করলেন–
‘দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে দেশে গিয়ে একেবারেই অপরিচিত কাউকে বিয়ে করা, বয়সে অনেক কম মেয়েকে বিয়ে করা, ছেলের চেয়ে মেয়ের শিক্ষাগত যোগ্যতা বেশি হওয়া, বিশেষ করে বাংলাদেশ থেকে আসার আগে স্বামীর জীবন-যাপন সম্পর্কে যে ধরনের ধারনা থাকে বাস্তবে তার মিল খুঁজে না পাওয়া ইত্যাদি অনেক কারণে ইমিগ্রান্ট হয়ে আমেরিকায় আসার পর পরই স্ত্রীর চোখ-কান খুলে যায় কিংবা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রাখা পুরুষের জন্যে হৃদয়টা আকুলি বিকুলি করে।’
মামা একটা বিরতি নিয়ে কফির কাপে চুমুক দিলেন। শরীফ কিছুটা বিরক্ত আবার কিছুটা আগ্রহ নিয়েই মামার পড়া শুনতে থাকল। মামা আবার শুরু করলেন, ‘আবার উল্টোটাও ঘটেছে। বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতেও যায়নি, কিংবা কালচার সম্পর্কে প্রকৃত শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারেনি—এমন নিউলি ম্যারেড হঠাৎ করে আমেরিকান কালচারে এসে নিজেকে কন্ট্রোল করতে পারে না। আমেরিকানদের মত হতে চায়। এ কারণেও স্বামীর সাথে মনোমালিন্য সৃষ্টি হয়। স্বামীর বন্ধুর প্রতি দৃষ্টি পড়ে। এমন পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্যে দেশে গিয়ে হুট করে বিয়ে করা কিংবা টেলিফোনে বিয়ে করার মনোভাব পরিবর্তন করা উচিত।’
আরেক দফা পড়া থামিয়ে মামা কফির কাপে আরেকটা চুমুক দিয়ে শরীফের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কিছু বুঝলে?’
শরীফ বোঝার চেষ্টা করল। অন্তত দুটো কারণে রুবিনা ওকে ছেড়ে চলে যেয়ে থাকতে পারে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে অন্যমনস্ক ভাবে সে নিজের মনেই জিজ্ঞেস করল, ‘আমি এখন কি করব?’
মামা যেন ওর মনের কথা বুঝতে পেরেই বলল, ‘অপেক্ষা।’
‘জি?’
‘এখন তোমার অপেক্ষা করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।’
শরীফ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকাল মামার দিকে।
মামা ব্যাখ্যা করে বললেন, ‘রুবিনা যদি ফিরে আসে, তাহলে সে আর কোনোদিনও তোমাকে ছেড়ে যাবে না। হান্ড্রেড পার্সেন্ট। আর যদি ফিরে না আসে, তবে তোমাকে তোমার ভাগ্যকেই মেনে নিতে হবে।’
এরপরে মামা আরো অনেক কথা বললেন। যুক্তি দিয়ে বোঝালেন। আহমেদ মামা অনেক ভালো যুক্তি দিয়ে বোঝাতে পারেন। অভিজ্ঞতারও একটা ব্যাপার আছে। উনি যুক্তি দিয়ে একপর্যায়ে শরীফকে প্রায় বুঝিয়ে ফেলেছিলেন যে রুবিনাকে ওর ডিভোর্স করাই উচিত।
‘আমার কথা গুলো ভেবে দেখো।’ যাবার সময় শরীফকে মনে করিয়ে দিলেন।
‘জি মামা, ভেবে দেখব। অবশ্যই ভেবে দেখবে। আপনার একটা কথাও ফেলে দেবার মত না।’
মামা খুশী হয়ে বললেন, ‘এনি হেল্প, জাস্ট লেট মি নো। ডোন্ট হেজিটেট টু কল মি।’
‘আমি অবশ্যই কল করব। আপনি ভাববেন না।’
মামাকে বিদায় দিয়ে ফিরে এসে শরীফ আবার ব্যাকইয়ার্ডের ছাতার নিচে এসে বসল। হঠাৎ লক্ষ্য করল পত্রিকাগুলো মামা নিয়ে যেতে ভুলে গেছেন। নিশ্চয়ই এগুলো ফেরত নিতে উনি আরেকবার আসবেন। হয়ত ইচ্ছে করেই ফেলে গেছেন। ভাবতে ভাবতেই শরীফ একটি পত্রিকা খুলে মামার পড়ে শোনানো প্রতিবেদনগুলো খুঁজে খুঁজে আবার পড়ল।
রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে শরীফ অনেক কিছুই ভাবল। রুবিনাকে একবার ফোনও করল। রুবিনা অবশ্য ফোন ধরে নাই।
নিজের সংগে অনেক বোঝা পড়া করেও শেষ পর্যন্ত কোন সিদ্ধান্তে আসতে পারল না সে। একবার ভাবল, ঠিক আছে আমি অপেক্ষাই করব। দেখি সে ফিরে আসে কিনা। আবার পরক্ষণেই ভাবল, যে চলে গেছে তাকে নিয়ে আর ভেবে কি লাভ।
শরীফ আপন মনেই ভেবে চলল, ‘আমি জানি তুমি ভালো থাকতে পারবে না। আমি যদি তোমাকে ক্ষমা করেও দেই, আমার প্রতিটা দীর্ঘশ্বাস তোমাকে কখনোই ক্ষমা করবে না রুবিনা। এটা কোনো অভিশাপ না, এটাই প্রকৃতির হিসাব। কাউকে কষ্ট দিয়ে কেউ ভালো থাকতে পারে না। তুমিও পারবে না।’
তারপরেই সে ভাবল, ‘রুবিনা তো আমাকে ভালোবাসে না। ওর ভালোবাসার মানুষ আছে। কে জানে এখন হয়ত সে তার ভালোবাসার মানুষটির বাহু বন্ধনেই ঘুমিয়ে আছে। তবে কেন শুধু শুধু অপেক্ষা? শুধু শুধু তার কথা ভেবে নিজেকে কেন কষ্ট দেয়া। ওহ গড, গিভ মি সাম ষ্ট্রেংথ!’
শরীফ আর কিছুই ভাবতে পারে না। তার কষ্টগুলো নীরবে গুমরে কাঁদে।
…
সোহেল আজ দিনের শিফটে ক্যাব চালাচ্ছে। দুপুরের দিকে সে একজন প্যাসেঞ্জার নিয়ে লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্ট অভিমুখে যাচ্ছিল, তখন রুবিনার ফোন এলো। সে ফোন ধরতেই রুবিনা বলল, ‘এই শোন, আমার রান্না প্রায় শেষ। তুমি কিন্তু তাড়াতাড়ি চলে এসো। একসাথে খাবো। আজ তুমি আমাকে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি দেখাতে নিয়ে যাবে বলেছিলে। মনে আছে?’
‘হ্যাঁ মনে আছে। আমি তাড়াতাড়ি চলে আসব।’
‘কতক্ষণ লাগবে?’
‘এই তো সব মিলিয়ে ঘণ্টা খানেক।’
‘ফেরার পথে আবার কোনো প্যাসেঞ্জার তুলো না কিন্তু।’
সোহেল হেসে দিয়ে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে।’
লাগোর্ডিয়া এয়ারপোর্টে প্যাসেঞ্জার নামিয়ে দিয়ে সোহেল তার ক্যাবের উইণ্ডশিল্ডে ‘নট ফর হায়ার’ সাইনটি লাগিয়ে দিল। এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে সে যখন বাসার দিকে ফিরে আসছিল ঠিক তখনই আরেকটা ক্যাব সোহেলের এপার্টমেন্টের সামনে এসে থামল। ক্যাব থেকে নেমে আসল একজন হিস্প্যানিক শ্বেতাংগিনী। ছোট্ট একটা ট্রাভেল ব্যাগ নিয়ে সে ঢুকে পড়ল এপার্টমেন্ট বিল্ডিং এর সদর দরজা দিয়ে।
সোহেলের আসতে যেহেতু ঘণ্টা খানেক দেরী আছে, এই ফাঁকে রুবিনা গোসলটা সেরে নিল যাতে সে তৈরী হয়ে থাকতে পারে। কাপড় বদলে বাইরে যাবার জন্যে তৈরী হয়ে রুবিনা যখন বেডরুম থেকে বের হয়ে আসবে ঠিক তখনই সে শুনতে পেল দরজা খোলার শব্দ। সে অবাক হয়ে ভাবল সোহেল এত তাড়াতাড়ি চলে এলো? এখনও তো আধ ঘণ্টাও হয়নি। সে খুশি মনে রুমের বাইরে এসে দেখল সুন্দর মুখের একটি অপরিচিত মেয়ে লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে আছে।
‘কে আপনি? এখানে কিভাবে এলেন?’ কিছুটা থতমত খেয়ে রুবিনা জিজ্ঞেস করল।
‘Excuse me!’ অপরিচিত মেয়ে না বোঝার দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে।
রুবিনা বুঝতে পারল যার সংগে সে কথা বলছে সে হয়ত বাংলা বুঝে না। সে বাঙালি নয়। চেহারা এবং বেশভূষায় আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের মতই দেখতে। তাই সে এবার ইংরেজিতে জানতে চাইল, ‘Who are you? How did you get in here?’
‘I’m Gabie. Gabriela.’
‘So, Gabie- let me ask you again, how did you get in here?’
‘With my key!’
‘With your key? You’ve a key of this apartment?’
‘It’s my apartment.’
‘What?’
‘I live here. I share this apartment.’
‘What are you talking about?’
রুবিনা আর কোন কথা বলতে পারল না। আকাশ পাতাল চিন্তা তার মাথায় ভেঙ্গে পড়ল। কিছুতেই সে মেলাতে পারছে না। কি হচ্ছে এসব?
‘You didn’t tell me your name. Who are you?’
গ্যাব্রিয়েলার প্রশ্ন শুনে রুবিনা তার দিকে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,
‘I’m nobody!’
এক ধরনের অস্বাভাবিক চিন্তা রুবিনাকে গ্রাস করল। আকাশ-পাতাল ভাবছে সে। গ্যাব্রিয়েলার সাথে কিসের সম্পর্ক সোহেলের। সম্পর্ক যাই হোক, সোহেল কেন তাকে কিছুই জানায়নি। গ্যাব্রিয়েলা বলছে সে এপার্টমেন্ট শেয়ার করে, এ কথার মানে কি?
রুবিনা তো তার কোন কথা কখনোই লুকায়নি। তাহলে সোহেল কেন বলল না?
এরপর একটা দীর্ঘ সময় কেটে গেল এক ধরনের অস্বস্তিকর নীরবতায়।
ইতোমধ্যেই সোহেল ফিরে এলো। সে রুমে ঢুকেই দেখল, গ্যাব্রিয়েলা দাঁড়িয়ে আছে।
রুবিনা সোহেলের দিকে তাকাল অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে।
গ্যাব্রিয়েলা ছুটে এসে সোহেলকে জড়িয়ে ধরে গভীরভাবে চুম্বন দিল। ‘I missed you honey. I missed you so much!’
উচ্ছ্বসিত গ্যাব্রিয়েলা রুবিনার উপস্থিতিকে পাত্তা না দিয়ে আবারো সোহেল কে কয়েকবার চুমু দিল।
সোহেল অপ্রস্তুত ভাবে গ্যাব্রিয়েলাকে ছাড়িয়ে নিল। তারপর অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে।
রুবিনা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারল না। সে বুঝতেও পারল না কিছু। তার হৃদপিণ্ডের কম্পন বেড়ে গেল। মুহূর্তেই দুনিয়াটা যেন তার অন্ধকারে ঢেকে গেল।
কিচ্ছুক্ষণ চিন্তা করার পর রুবিনা সিদ্ধান্ত নিল যা করার তাকে এখনই করতে হবে। সে দ্রুত বেডরুমের ভেতরে ঢুকে গেল।
সোহেল রুবিনার পিছে পিছে যেতে চাইলে গ্যাব্রিয়েলা তাকে জড়িয়ে ধরেই জিজ্ঞেস করল, ‘Is that your cousin sister you told me about? She seems upset. Where’s her husband?’
সোহেল কিছু বলার আগেই রুবিনা তার সুটকেস নিয়ে বের হয়ে আসল।
সোহেল অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘Where are you going?’
রুবিনা সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে এপার্টমেন্টের দরজা খুলে বের হয়ে গেল।
সমস্ত ঘটনা এত দ্রুত ঘটল যে কিছু বুঝে উঠার আগেই সোহেল দেখল রুবিনা নেই। সে দৌড়ে নিচে নেমে গেল রুবিনাকে থামানোর জন্যে।
রুবিনা নিচে নেমেই দেখল একটা ক্যাব দাঁড়িয়ে আছে। সম্ভবত গ্যাব্রিয়েলা যে ক্যাব নিয়ে এসেছিল–চালক তাকে নামিয়ে দিয়ে পরের প্যাসেঞ্জার ধরার জন্যে অপেক্ষা করছিল।
রুবিনা এগিয়ে যেতেই সোহেল তার পথ আগলে দাঁড়িয়ে বলল, ‘রুবিনা, প্লিজ গিভ মি এ চান্স টু এক্সপ্লেইন।’
‘এক্সপ্লেইন? কি এক্সপ্লেইন করবে তুমি সোহেল? তোমাকে আর কিছুই এক্সপ্লেইন করতে হবে না।’
‘এটা খুবই স্বাভাবিক। তুমি বুঝতে ভুল করছ।’
‘আমি আর কিছুই বুঝতে চাই না। আমার যা দেখার দেখেছি, যা বোঝার বুঝেছি, এবং যা শোনার শুনেছি। নিজের চোখকে তো আর অবিশ্বাস করতে পারব না।’
সোহেল রুবিনার হাত ধরার চেষ্টা করল।
রুবিনা তাকে কঠিন কণ্ঠে বলল, ‘ইয়্যু আর এ লায়ার। আমার ভাবতে কষ্ট হচ্ছে।’ তারপর হতাশ কণ্ঠে বলল, ‘আমি তোমাকে বিশ্বাস করেছিলাম, সোহেল!’ বলেই রুবিনা দ্রুত অপেক্ষারত ক্যাবে চড়ে বসল।
রুবিনার কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে সোহেল আর কিছুই বলতে পারল না। সে অসহায় দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
ক্যাব চালক ঠিকানা চাইলে রুবিনা কিছু বলতে পারল না। তার দুচোখ ছল ছল করছে। নিউইয়র্কের ক্যাব চালকরা এমন দৃশ্যের সাথে খুবই পরিচিত। চালক কোনো কথা না বলে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল বড় রাস্তার দিকে। তারপর হারিয়ে গেল ব্যস্ত নগরীর ব্যস্ত রাস্তার ভীরে।
হঠাৎ করেই আকাশে মেঘ করেছে। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। নিজের দু’চোখে হালকা জ্বালা অনুভব করছে রুবিনা। বাঁধ ভাঙ্গা এক বুক কষ্ট যেন বের হয়ে আসতে চাইছে তার বুকের ভিতর থেকে। চিৎকার করে সেই জ্বালা মিটাতে ইচ্ছে করছে। দু’চোখ বেয়ে নেমে আসল নোনা জলের ধারা।
নিউ ইয়র্কের আকাশে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আজ জমাট বাঁধা সব কষ্ট যেন আকাশের কান্না হয়ে ঝরে পরছে। অঝোর ধারায়, নোনাজলের ধারা হারিয়ে যাচ্ছে জলে জলে মিতালি করে। সেই সাথে ধুয়ে নিয়ে যাচ্ছে রুবিনার অন্তরে লুকিয়ে থাকা সকল নোংরা-আবর্জনা।
কিছু স্বপ্ন হারিয়ে যায়, এভাবেই!
কিছু অপেক্ষার অনন্ত প্রহর কখনই শেষ হয় না।
(শেষ হলো অপেক্ষা’র গল্প)
(আপনাদের সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করার জন্যে। আপনাদের সুন্দর সুন্দর মন্তব্য আমাকে অনুপ্রাণিত করে সব সময়। সামনে আবার কোনো গল্প নিয়ে দেখা হবে অচিরেই। সবার জন্যে শুভেচ্ছা। অনেক অনেক ধন্যবাদ। আবারো কৃতজ্ঞতা!)
(গল্পটি একুশের বইমেলা ২০২০এ অন্যপ্রকাশ থেকে প্রকাশিত আমার প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘তৃতীয় পক্ষ’তে সংকলিত হয়েছে! এখন রকমারি আর দারাজ এও পাওয়া যাচ্ছে!)
অপেক্ষা (পর্ব-৪)
‘আজ আমরা কোথায় যাচ্ছি?’
ঘর থেকে বের হয়ে রুবিনা জিজ্ঞেস করল সোহেলকে।
‘প্রথমেই যাবো গ্রাউন্ড জিরোতে। সেখান থেকে ম্যাডিসন স্কয়ার গার্ডেন। তারপর নিউইয়র্ক পাবলিক লাইব্রেরী। রাতে জ্যাকসন হাইটসের কোনো বাংলাদেশী রেস্টুরেন্টে দেশী খাবার, তারপর বাসা।’
‘তারপর?’ রুবিনার হাসিতে দুষ্টুমি।
‘তারপর…’ সোহেল আর কিছু না বলে একটা অর্থপূর্ণ হাসি ফিরিয়ে দিল রুবিনার দিকে।
একদিনে যতটুকু সম্ভব রুবিনাকে নিউইয়র্ক শহরটা ঘুরিয়ে দেখাল সোহেল।
‘কি আশ্চর্য। কি ভয়ঙ্কর! ওয়াও! ইশ, এখানে না এলে কত কিছু অদেখাই থেকে যেত।’ সারাক্ষণই উচ্ছ্বাস প্রকাশ করল সে। যা দেখে তাতেই মুগ্ধ হয় রুবিনা।
ম্যানহাটনে এসে কেমন যেন অন্যমনস্ক হয়ে গেল সোহেল। নিজের মনেই আক্ষেপ করতে থাকে। ‘মাঝে মাঝে ভাবি, এদেশে না এলেই বোধ হয় ভাল হতো। দেশে থেকে নিশ্চয়ই কিছু না কিছু করতে পারতাম। দেশে আমার সব বন্ধুরাই আজ দাঁড়িয়ে গেছে।’
‘তুমিই না অস্থির হয়ে গেলে? আর কিছুদিন অপেক্ষা করে দেখতে, চাকরী নিশ্চয়ই একটা পেয়ে যেতে।’
‘সত্যিই, তোমার জীবনটাও তাহলে এমন প্যাঁচের মধ্যে পড়ত না। আর আমারও এ অবস্থা হতো না। হাজার হাজার ডলারের লোনে প্রায় ডুবে গেছি আমি। কত টাকা খরচ করেছি। একটা সবুজ কাগজের অভাবে কিছুই করতে পারলাম না।’ সোহেলের কণ্ঠে হতাশা ঝরে পড়ল।
রুবিনা এগিয়ে এসে সোহেলের হাত ধরল। তারপর গাঢ় স্বরে বলল, ‘এখন আর এসব কথা ভেবে কষ্ট বাড়িয়ে লাভ কি? এতদিন হয়নি তো কি হয়েছে, এখন হবে। তুমিই তো বললে, কত মানুষ দশ বছর এমনকি বিশ বছরও অপেক্ষা করে একটা গ্রীনকার্ডের জন্যে।’
সোহেল সামান্য হাসল। রুবিনা তাকে সাহস দিয়ে বলল, ‘আমরা একটা নতুন জীবন শুরু করব সোহেল। আমি জানি আমাকে সবাই খারাপ বলবে। বলুক। আমি আমার ভালবাসার মানুষের সাথে জীবন কাটাতে চাই। তারজন্যে যে কোনো অপবাদ আমি মেনে নেব। জীবনটা আমার, আমি আমার মত করে বাঁচতে চাই। আর সেই অধিকার নিশ্চয়ই আমার আছে?’ বলতে বলতে রুবিনার কণ্ঠ ভারী হয়ে গেল।
সোহেল নীরবে রুবিনার কথা শুনতে থাকে। রুবিনা আবার বলল, ‘আমিই বা কি করব। দুজন মানুষের সাথে যদি কোনো কেমিষ্ট্রিই না কাজ করে, তাদের একসাথে থাকার কি মানে? যার সাথে শরীর-মন কোনো কিছুরই মিল নেই, তার সাথে সারাটা জীবন কাটানোর কথা আমি ভাবতেও পারি না। কোন মানুষ এভাবে তার সারাটা জীবন কাটাতে পারে না।’
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে রুবিনা আবারও বলল, ‘মানুষের জীবনে একটা ভুল সিদ্ধান্তে অকালে নষ্ট হয় তার জীবন। ঠিক তার বললে ভুল হবে, সাথে জড়িয়ে থাকে আরও কয়েকটি জীবন। কষ্ট পেতে হয় সারাটা জীবন।’
দিনের আলো কমে আসছে। ধীরে ধীরে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নামছে নিউইয়র্কের আকাশে।
অনেকক্ষণ থেকেই দুরের স্ট্যাচু অফ লিবার্টির দিকে মোহাবিষ্ট হয়ে তাকিয়ে আছে রুবিনা।
রুবিনার খুব কাছে এসে দাঁড়াল সোহেল। আজ সকাল থেকেই সে ভাবছিল রুবিনাকে একটা কথা বলা দরকার। অনেকবার বলতে চেয়েও বলা হয়নি। এখন না বললে দেরী হয়ে যাবে। অথচ বলা হচ্ছে না। কিছুটা দ্বিধা কাঁটিয়ে সোহেল রুবিনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘রুবি, তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল।’
রুবিনা চোখ না ফিরিয়েই বলল, ‘আমি ওখানে যেতে চাই, আজকেই।’ রুবিনা সোহেলের কোনো কথা শুনেছে বলে মনে হলো না।
‘লাস্ট ফেরীটা তো ছেড়ে চলে গেছে। দিনের আলোয়ে না গেলে ভাল লাগবে না। আমরা বরং আরেকদিন যাবো।’
রুবিনা কিছু বলল না। সোহেল কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলল, ‘রুবি, তোমার সাথে আমার কিছু কথা আছে। ইটস ইম্পরট্যান্ট।’
‘বাসায় যেয়ে শুনব।’ বলেই রুবিনা আফসোসের সুরে বলল, ’ইশ, কেন যে আগে বললাম না। লাস্ট ফেরীটা কখন ছেড়ে গেছে?’
‘বিকেল পাঁচটায় সম্ভবত।’
‘ও।’
এরপর সোহেল আর কোন কথা বলতে পারল না।
রুবিনা মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল লিবার্টি আইল্যান্ডের দিকে।
ফেরার পথে সোহেল রুবিনাকে নিয়ে গেল বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকা জ্যাকসন হাইটসে। জ্যাকসন হাইটসের ৭৩ থেকে ৭৪ স্ট্রীটে অবস্থিত বাংলাদেশী দোকানগুলি নিউইয়র্ককে বাংলাদেশীদের কাছে একটা বিশেষ মহিমা দিয়েছে। ৭৪ স্ট্রীটে ঢুকলে দেখা যাবে যে অদৃশ্য স্টারগেইট জাতীয় কোন গেইট পার হয়ে আমেরিকার নিউইয়র্ক থেকে হঠাৎ ঢাকার ফার্মগেটে পৌঁছে গেছে। লোকেরা জটলা করে বাংলায় আড্ডা দিচ্ছে। রাস্তা ঘাট বাংলাদেশের মতই সঙ্কীর্ণ আর নোংরা। দোকান পাট বাংলায় নামকরণ করা। এমনকি একটা রাস্তার নাম দেয়া হয়েছে বাঙ্গালীর নামে। আমেরিকার ব্যস্ততম শহরে হঠাৎ বাংলাদেশ। রুবিনা কৌতূহলী দৃষ্টিতে চারিদিকে দেখল আর অবাক হলো।
একটা দেশী রেস্টুরেন্টে ঢুকে পড়ে ওরা রাতের খাবার অর্ডার দিল। রুবিনা অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, দেশের যাবতীয় খাবারের আয়োজন এখানে আছে। একেবারেই বাংলাদেশী কায়দায়। অনেকদিন পর খুব মজা করে দেশের খাবার খেতে পেরে তার মনটা প্রফুল্ল হয়ে গেল। সে ক্ষণে ক্ষণে বলল, দারুণ। দারুণ। খাওয়া শেষ করে বের হয়ে সোহেল একটা পানের দোকান থেকে দুটো মিষ্টি পান কিনে রুবিনার হাতে দিল। রুবিনা হাসতে হাসতে একটা পান মুখে নিয়ে বলল, ওয়াও! অসম্ভব সুন্দর একটা দিনের শেষ করে যখন ওরা বাসায় ফিরল তখন অনেক রাত।
শরীফ অফিসে বসে আছে, অন্যমনস্ক ভাবে। কাজে মন দিতে পারছে না। কিছুই ভাল লাগছে না তার। অবশেষে হাতের কিছু কাজ গুছিয়ে বাসায় চলে আসল। মনটার সাথে ধীরে ধীরে শরীরটাও কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে।
শরীফ অনুভব করল–মনের সাথে শরীরের অদ্ভুত এক সম্পর্ক রয়েছে। মন ভাল অবস্থায় শরীর খারাপ থাকলেও তা ভাল হতে সময় লাগে না। আবার মন খারাপ থাকলে শরীর ভাল থাকলেও তা খারাপ হতে সময় লাগে না। মনই সব, শরীর কিছু নয়।
ঘরে ঢুকে শরীফের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। মেয়েটা সবকিছু কি সুন্দর পরিপাটি করে সাজিয়ে রাখত। সোফায় হেলান দিয়ে শরীফ ভাবতে থাকে রুবিনার কথা। পেছনের কথা ভাবতে ভাবতে তার একদিনের কথা মনে পড়ল। খাবার টেবিলে রুবিনা তাকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা, একটা কথা তোমার কাছে অনেকবার জানতে চেয়েছি। তুমি এড়িয়ে গেছ। আই’ম জাস্ট কিউরিয়াস।’
‘কি কথা?’ হাসতে হাসতে শরীফ চোখ তুলে তাকাল রুবিনার দিকে।
‘তুমি সময় থাকতে বিয়ে করলে না কেন? আই মিন একজন পুরুষ সাধারণত যে বয়সে বিয়ে করে। বিয়েরও তো একটা বয়স আছে, তাই না?’
শরীফ কোনো কিছু না বলে চুপচাপ খেতে থাকে।
‘বুঝেছি, বলবে না।’
‘কি বলব? প্রয়োজন হয়নি, তাই।’
‘নাকি প্রয়োজনটা মিটে যেতে অন্য কোনো উপায়ে।’
‘হোয়াট ডু ইউ মিন?’ শরীফের হাসিটা নিমিষে মিলিয়ে গেল।
‘নাথিং।’ বলে চুপ করে গেল রুবিনা। তারপর আবার বলল, ‘অবশ্য প্রয়োজনের বাইরে কোন কাজটাই বা তুমি করো?’
শরীফ কিছুটা অস্বস্তি বোধ করলে কিছু বলল না। কিন্তু রুবিনা বলে চলল, ‘প্রয়োজন মনে করনি বলে গত বিশ বছরের মধ্যে একবারও দেশে যাবার সময় বের করতে পারোনি। দেশে যাওয়া মানেই তো একগাদা অর্থের অপচয়। যথেষ্ট উপার্জন তোমার, টাকা পয়সার অভাব নেই, সিটিজেনশীপও আছে। তাহলে?’
শরীফ বুঝতে পারল না কি বলবে, কি বলা উচিত। আর রুবিনাই বা হঠাৎ করে এধরনের কথা জিজ্ঞেস করছে কেন? মেয়েটা কেমন ফুঁসে ফুঁসে কথা বলছে। ওর এমন রাগের ভঙ্গি সে আগে কখনও দেখেনি। চিৎকার করছে না, কিন্তু রাগটা ঠিকই বোঝা যাচ্ছে।
‘তা হঠাৎ তোমার বিয়ের প্রয়োজন পড়ল কেন? বয়স হয়ে যাচ্ছে, দেখাশোনার জন্যে একজন মানুষ তো চাই, তাইনা?’
শরীফ না বোঝার দৃষ্টিতে তাকাল রুবিনার দিকে। রুবিনা বলল, ‘তবু ভাল, সাদা চামড়ায় যত রুচিই থাক না কেন, বিয়ে করতে হবে একশত ভাগ খাটি বাঙ্গালী। তাই বিশ বছর পর দেশে গিয়ে নিজের অর্ধেক বয়সের একটা মেয়েকে বিয়ে করে আনলে। অথচ, মেয়েটার কথা একবারও ভেবে দেখার প্রয়োজন বোধ করলে না।’
ফোনের শব্দে শরীফের ভাবনায় ছেদ পড়ল। ফোন ধরতে ইচ্ছে করছে না। কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। তবুও কি মনে করে সে ফোনটা ধরল। রুবিনা হতে পারে। নাকি অফিসের কেউ? সে দ্বিধা হাতে ফোন নিয়ে বলল, ‘হ্যালো?’
‘কেমন আছ শরীফ?’ ফোনের ওপাশে আহমেদ মামার কণ্ঠ শোনা গেল।
‘জি মামা, আছি। বুঝতেই তো পারছেন।’
আহমেদ মামা শিকাগোর কমন মামা। বাঙ্গালী কমিউনিটির মধ্যে সবচেয়ে পুরনোদের একজন। তিরিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে উনি আছেন এই শহরে। কমিউনিটির সকলে তাই তাকে মুরুব্বী হিসেবে সম্মান করে। তিনিও বুদ্ধি পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করেন। জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী, ঈদ পূনর্মিলনী, বনভোজন, বিজয় দিবস, স্বাধীনতা দিবস—সব দিবসেই তাকে দেখা যায়। শহরে অবাঞ্ছনীয় কিছু ঘটলেই মামার কর্ণ গোচরে সবার আগেই সেটা চলে যায়। তিনি তখন নিজ দায়িত্বে সেটার একটা সমাধান না হওয়া পর্যন্ত লেগে থাকেন।
মামা বললেন, ‘শোনো, আমার খোঁজে একজন ভাল ল’ইয়ার আছে। বেটা জিউইস, কিন্তু আমার সাথে খুব ভাল সম্পর্ক। তুমি চাইলে আমি কথা বলে দেখতে পারি।’
‘না না মামা, আমি এমুহূর্তে এসব কিছুই ভাবছি না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি এই উইকএন্ডে তোমার বাসায় আসব। কিছু কথা বলা দরকার। কমিউনিটির ব্যাপার তো বুঝতেই পারো। লোকজন বলাবলি করছে।’
শরীফ বুঝতে পারল না লোকজন বলাবলি করছে কিসের ভিত্তিতে। রুবিনা তো সত্যি সত্যিই বেড়াতে যেতে পারে। তা সে নিউইয়র্কেই যাক আর ডালাসেই যাক। সেটা নিয়ে মানুষের এত মাথা ব্যথা কেন? আর এই খবরটাই বা এত তাড়াতাড়ি কানাকানি হয়ে গেল কি করে? সে কিছুতেই মেলাতে পারল না ব্যাপারটা।
রুবিনার এভাবে চলে যাওয়াটা যতটা না ওকে ব্যথিত করেছে, তার চেয়েও বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে এখানকার বাঙ্গালী কমিউনিটি। ইতিমধ্যে তার স্বল্প পরিচিত কয়েকজনের মাধ্যমে সে জানতে পারল, রুবিনা যে তার প্রেমিকের হাত ধরে পালিয়ে গেছে এই ব্যাপারটা এখন সবাই জানে। আশ্চর্য!
অনেক বছর ধরে শিকাগোতে থাকলেও শরীফের পরিচিত তেমন কেউ নেই এখানে। সোসাইটির কোন কার্যক্রম বা অনুষ্ঠানেও সে খুব একটা যায় না। তবে রুবিনা দেশ থেকে আসার পর বেশ কিছু ইভেন্টে সে গিয়েছে তাকে নিয়ে। দু’চারজন বাঙ্গালী ভাবীদের সাথে হয়ত পরিচয় হয়েছে রুবিনার। কিন্তু সে নিশ্চয়ই কাউকে কিছু বলেনি। তারপরেও কিভাবে যে ব্যাপারটার হাত-পা গজিয়ে হাঁটাহাঁটি শুরু করে দিল শরীফ কিছুতেই বুঝতে পারল না। সেদিনও আহমেদ মামা ওকে ফোন করে এসব কথাই জানতে চেয়েছেন। আজ আবার ফোন করলেন।
শনিবার সকালে মামা এসে হাজির।
বসন্তের সকাল। চার ঋতুর দেশ আমেরিকার প্রকৃতিতে এখন বসন্ত চলছে। শীতের শেষে গরমের আগে আসে গরমের মতই ক্ষণিকের বসন্ত। ফুরফুরে একটা হাওয়া বইছে চারিদিকে। নানা রঙের পাতার ফাঁকে ফাঁকে রোদের কিরণ উঁকি দিচ্ছে। রোদ ঝলমলে একটা দিনের শুরু।
শরীফ দরজা খুলে দিতেই মামা ভিতরে ঢুকে চলে গেলেন ব্যাকইয়ার্ডে। ছাতার নিচে চেয়ার থেকে কুশনটা ঝেড়ে নিয়ে বসলেন আয়েস করে। তার হাতে কিছু পুরনো বাংলা পত্রিকা। সেগুলোর একটা ভাজ খুলে চোখের সামনে মেলে ধরলেন।
শরীফ কিচেন থেকে দু কাপ কফি নিয়ে এসে বসল মামার পাশে। মামা তার কফিতে একটা চুমুক দিয়ে কথা শুরু করলেন, ‘আচ্ছা, ব্যাপারটা আমাকে খুলে বলতো? পুরো ঘটনাটা বলবে। কিছুই বাদ দেবে না, দেখি, তোমাকে কোনোভাবে হেল্প করতে পারি কিনা।’
শরীফ কিছু না বলে অন্যমনস্ক ভাবে তাকিয়ে থাকে ওক গাছের ঝাঁকের মধ্যে দিয়ে পিছনের লেকের দিকে।
মামা অবশ্য শরীফের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে বলে চললেন ‘আরে আমরা আছি কেন তাহলে? এক কমিউনিটিতে থাকব আর কেউ কাউকে হেল্প করব না, তা কি হয় নাকি? এটি আমাকে দিয়ে হবে না। এদেশে আমাদের আর আছেই বা কে বলো? একে অপরের বিপদে যদি এগিয়ে না আসি, তাহলে চলবে কি করে? তুমি একেবারেই ভাববে না। বলো।’
মামা তাকিয়ে রইলেন শরীফের মুখের দিকে।
শরীফের সব কথাই মামা জানেন। তবুও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘আপনি তো মোটামুটি সবই জানেন। দীর্ঘদিন পর দেশে গিয়ে পারিবারিক পছন্দে বিয়ে করি। স্ত্রী উচ্চ শিক্ষিত, দেখতেও মোটামুটি সুন্দরী বলে বিয়েতে আপত্তি করিনি। বরং খুশীই হয়েছিলাম।’
আহমেদ মামা এখানে আপত্তি করলেন। তিনি বললেন, ‘তোমার বউ মোটামুটি নয়, যথেষ্ট সুন্দরী। আর তুমি আপত্তি করবে কেন? তুমি যেই বয়সে বিয়ে করেছ, রুবিনার মত একটা মেয়ে তোমাকে বিয়ে করতে রাজী হয়েছিল সেটাই তো যথেষ্ট।’
শরীফ মনে মনে বলল, ‘আরে এ তো দেখি বেশি কথা বলে। আপনি তো এসেছেন কথা শুনতে, বলতে নয়!’ কিন্তু সে মামার কথায় সহমত জানিয়ে বলল, ‘জি মামা, বয়সের ঐ গ্যাপটাই যা একটু বেশী। কিন্তু ওকে আমি খুবই পছন্দ করি। অনেক ভালোওবাসি।’
‘সে কথা কি তোমার বউ জানে?’
‘জানবে না কেন? না জানার কি আছে?’
‘আছে, না জানার অনেক কিছুই আছে। তাকে সেটা জানাতে হবে। বোঝাতে হবে। না হলে সে জানব কি করে?’
শরীফ না বোঝার দৃষ্টি নিয়ে মামার দিকে তাকিয়ে রইল। মামা বললেন, ‘বাদ দাও। আচ্ছা বলত, রুবিনা কি তোমাকে ভালবাসে?’
শরীফ চুপ করে রইল। এ প্রশ্নের কোনো উত্তর তার কাছে নেই। সে নিজেও জানে না রুবিনা তাকে ভালবাসে কিনা।
‘শোন শরীফ, তোমাকে একটা কথা বলি। তিরিশ বছরের বেশী হলো এদেশে এসেছি। চোখের সামনে অনেক কিছু দেখেছি। মনে কিছু করো না। আমার ধারনা রুবিনার অন্য কারো সাথে এফেয়ার হয়েছে। তা না হলে এভাবে চলে যাবার তো কোনো কারণ থাকতে পারে না।’
শরীফ আপত্তি জানিয়ে বলল, ‘কিন্তু সেটা কি করে সম্ভব। মাত্র চার মাস হলো রুবিনা আমেরিকায় এসেছে। তাছাড়া, কারো সাথে তো ওর জানাশোনাও হয়নি এখনও।’
‘জানাশোনা হয়ত আগেই ছিল। তুমি জানতে না।’
শরীফ অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মামার দিকে। তারপর দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে তাকিয়ে থাকল দুরের লেকের দিকে, যত দূর দৃষ্টি যায়। ভাবনাগুলো আবার এলোমেলো হয়ে গেল।
অপেক্ষা (পর্ব-৩)
একটু ধাতস্থ হয়ে শরীফ ফোন করল সাউথওয়েষ্ট এইয়ারলাইন্সের কাস্টমার সার্ভিসে। সেখানে খোঁজ নিয়ে যা জানতে পারল তাতে তার মাথা আরও এলোমেলো হয়ে গেল। গতকালের ওই নির্দিষ্ট ফ্লাইটে রুবিনা আলম নামে কোনো যাত্রী ডালাসে যায়নি। এয়ারলাইন্সের সিকিউরিটি এবং প্রাইভেসি রুলসের কারণে কাস্টমার সার্ভিস থেকে এর চেয়ে বেশী আর কিছু সে জানতে পারল না। রুবিনা তাহলে গেল কোথায়?
রুবিনার খালা খাবার আয়োজন করছিলেন হঠাৎ বাসার ফোন বেজে উঠল। সে ফোনটা ধরতেই রুবিনার কণ্ঠ শুনতে পেলেন। তিনি উৎকণ্ঠা নিয়ে জানতে চাইলেন, ‘রুবিনা! কেমন আছিস মা? তুই কোথায়?’
‘আমি ভাল। তোমরা কেমন আছো? খালুর শরীর কেমন?’
‘কেমন আর থাকব। তোর চিন্তায় তো আমাদের ঘুম হারাম হয়ে গেছে। এমনিতেই আমার ব্লাডপ্রেসার হাই। তোর না আসার কথা এখানে?’
‘কথা তেমনি ছিল খালা। একটা ঝামেলা হয়েছে। পরে সব বলব। আমাকে নিয়ে তোমরা কোন চিন্তা করো না। আমি ভাল আছি।’
‘আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। এমনিতেই আমার প্রেশারের সমস্যা। তুই তোর খালুর সাথে কথা বল। আমি ডেকে দিচ্ছি।’
‘খালুকে ডাকতে হবে না। আমি এখন কথা বলতে পারব না খালা। সময় হলে তোমরা সবই জানতে পারবে। আমি রাখছি।’
‘না না রাখিস না। একটু ধর… এই শুনছ?’ বলেই সে উঁচু গলায় ডাকল রুবিনার খালুকে।
রুবিনার খালু এগিয়ে এসে ফোন হাতে নিয়ে দেখলেন অপর প্রান্তে কোনো রিং টোন নেই। সে চিন্তিত মুখে রুবিনার খালার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘লাইনটা বোধ হয় কেটে দিছে।’
রুবিনার হারিয়ে যাওয়ার শোকে শরীফ যখন চিন্তিত এবং মানসিকভাবে বিপর্যস্ত—রুবিনা তখন নিউইয়র্কের একটা এপার্টমেন্টের লিভিং রুমের সোফায় বসে ডিভিডিতে হিন্দি সিনেমা দেখছে। ঐদিন শরীফ যদি এয়ারপোর্টের ভিতরে যেত তাহলে সে দেখতে পেত—রুবিনা আসলে ডালাসে নয়, সাউথওয়েষ্ট এয়ারলাইন্সের কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নিউ ইয়র্ক ফ্লাইটের বোর্ডিং নিচ্ছে।
কিচেন কাউন্টার থেকে দু’কাপ ইনস্ট্যান্ট কফি আর কিছু স্ন্যাকস নিয়ে রুবিনার পাশে এসে বসল সোহেল।
সোহেলের সংগে রুবিনার যোগাযোগ ছিল প্রথম থেকেই। সোহেলই নিউইয়র্কের টিকেট কেটে ইলেকট্রনিক কোড নাম্বারটি রুবিনাকে দিয়ে ছিল।
সোহেল বাংলাদেশ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে কিছুদিন চাকরী খুঁজেছে। তারপর আরও কিছুদিন বেকার ঘুরাঘুরি করে সে নিউ ইয়র্ক থেকে প্রায় চারশত মাইল দুরের একটি ছোট্ট শহর বাফেলোতে মাস্টার্স করার জন্যে চলে আসে দুই বছর আগে। ভেবেছিল হায়ার ডিগ্রী নিয়ে দেশে ফিরে গিয়ে ভাল একটা চাকরী পেয়ে যাবে সহজেই। রুবিনাকে বিয়ে করে সুখের সংসার করাটা সময়ের ব্যাপার মাত্র। কিন্তু মাস্টার্সটা আর করা হয়ে উঠেনি তার। দেশ থেকে নিয়ে আসা কিছু টাকা আর প্রথম ছয় মাস একটি গ্যাস ষ্টেশনে রাতের শিফটে কাজ করে যা রোজগার করেছিল তা দিয়ে দুটি সেমিস্টার ফি দিতে পারলেও বেশিদূর আর এগুতে পারেনি। সেমিস্টার গ্যাপ পড়ায় স্টুডেন্ট স্ট্যাটাস হারাতে হয়। অতঃপর হতাশ হয়ে চলে এসেছে ব্যস্ত নগরী নিউইয়র্কে। এখানে তার ভালই কাটছে দিনকাল। ক্যাব চালিয়ে রোজগারও খারাপ না। কিন্তু তারপরেও হতাশা তাকে তাড়িয়ে বেড়ায় প্রতিনিয়ত। একটাই আফসোস, ইস, একটা গ্রীনকার্ড যদি থাকত!
রুবিনার হাতে কফির কাপ দিয়ে সোহেল আক্ষেপ করে বলল, ‘বুঝলা রুবি, এই দেশে শালা সবকিছুই তাড়াতাড়ি হয়। মোটামুটি বিদ্যুৎ গতিতে বলতে পারো। হয় না শুধু ঐ কাগজটাই।’
সোহেল রুবিনাকে রুবি বলে ডাকে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে সোহেল বলতে থাকে, ‘বছর লেগে যায়। যুগ পার হয়। কেন হচ্ছে না, কবে হবে তাও জানার উপায় নাই। ফোন করলে কেউ ধরে না। ঘণ্টা পার হয়, সেখানে একজন লোক থাকার কথা। এটা তার চাকরী, কিন্তু কেউ নেই। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই মেশিনে রেকর্ড বাজতে থাকে। যাতে একসময় ধৈর্য হারিয়ে তুমি ফোন রেখে দাও। আর কেউ যদি হঠাৎ ফোনটা ধরে, তার কাছেও কোন উত্তর নেই। আমেরিকার ফেডারেল এমপ্লয়ীজরা অনেকটা আমাদের দেশের সরকারী কর্মচারীর মতই।’
‘তো এতদিনেও তোমার একটা গ্রীনকার্ড হলো না?’ রুবিনার সরল প্রশ্ন।
‘পাগল। মানুষ দশ-বারো এমন কি বিশ বছর অপেক্ষা করেও কিছু করতে পারে না, আরতো আমি…।’
‘থাক। এখন আর তোমাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে হবে না। আমি খুব তাড়াতাড়ি ডিভোর্সটা নিয়ে নেব। সোনার হরিণ তো এখন আমার হাতের মুঠোয়…’ উচ্ছ্বসিত রুবিনা সোহেলকে আশ্বস্ত করল।
‘তার আগে তুমি তোমার হাজব্যান্ডকে একটা ফোন করো। তাকে এভাবে টেনশনে রাখাটা তোমার মোটেই ঠিক হচ্ছে না।’
‘করব। আজ রাতেই ফোন করব।’
শরীফ কিছুতেই বুঝতে পারছে না রুবিনা কেন এমন করল? তাহলে কি সে সুখী নয়? তাই কি সারাক্ষণ তার মুখটা বিষণ্ণতায় ভরা থাকে? শরীফের অস্থিরতা বেড়ে গেল।
সন্ধ্যা থেকে সে ঘরময় পায়চারী করল। কিছুই ভাল লাগছে না। অস্থিরতা আর অজানা আশংকায় বুক ধড়ফড় করতে লাগল। কিছুক্ষণ কাটল স্তব্ধতার মধ্যে। শরীফের চিন্তাচ্ছেদ হলো ফোনের শব্দে। সে দ্রুত ফোনটা ধরেই বলল, ‘হ্যালো।’
‘আমি।’ ফোনের ওপাশে রুবিনার শান্ত কণ্ঠ শোনা গেল।
‘রুবিনা! তুমি কোথায়?’ উত্তেজিত হয়ে শরীফ জানতে চাইল।
রুবিনা উত্তর দেবার আগেই শরীফ আবার বলল, ‘এসবের মানে কী? তুমি খালার বাসায় বেড়াতে যাবার কথা বলে চলে গেলে, অথচ সেখানে তুমি যাওনি। তাহলে তুমি কোথায় গেছ?’ শরীফ উত্তেজনায় কাঁপতে থাকল।
‘কোথায় গেছি সেটা তো কোন ইম্পরট্যান্ট বিষয় নয়।’
‘কী বলছ এসব? তাহলে ইম্পরট্যান্ট বিষয়টা কী রুবিনা?’ শরীফের উত্তেজনা আরও একধাপ বেড়ে গেল।
‘উত্তেজিত হচ্ছ কেন? শান্ত হও, আমি বলছি সবকিছু।’
শরীফ আর কিছু না বলে চুপ করে রইল।
রুবিনা বলল, ‘প্লীজ রিয়্যাক্ট করো না। একটা কথা বলছি বোঝার চেষ্টা করো।’ একটু চুপ করে থেকে আবার বলল সে, ‘দেখো, আমরা দুজন দু’প্রান্তের মানুষ। তোমার চিন্তাধারা একরকম, আমার একরকম। তুমি মানুষটা নিঃসঙ্গ আমি জানি। আর নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্য তোমার চাই শুধুই একজন সঙ্গী, জাস্ট এ কোম্পানি। বাট আই নিড মোর দ্যান দ্যাট।’
‘সেটা কী আমাকে বলো। তাছাড়া, কী নেই আমার আর কী দেইনি আমি তোমাকে?’
‘আমার যা চাই তা তোমার কাছে নেই এবং তুমি তা দিতেও পারবে না।’
‘তাহলে এতদিন কেন বলনি?’
‘বলেছি। অনেকবার বলেছি। তুমি বোঝার চেষ্টা করনি। অথবা বুঝেও কেয়ার করনি। মনে করে দেখো।’
শরীফের মনে আছে দেশে যাবার পর, রুবিনার সংগে বিয়ের কথা যখন ঠিক হচ্ছিল তখনই রুবিনা তার সংগে দেখা করে বলেছিল এ বিয়েতে সে রাজী নয়। শুধু বাবা-মাকে কষ্ট দিতে পারবে না বলে না করতে পারছে না। তাই সবচেয়ে ভাল হয় শরীফ যদি রুবিনাকে বিয়ে না করে অন্য কোনো মেয়েকে বিয়ে করে। রুবিনা এও বলেছিল সে একজনকে ভালবাসে এবং তাকেই বিয়ে করতে চায়। তার জন্যে যতদিন অপেক্ষা করতে হয় করবে। কিন্তু শরীফ রুবিনার সে সব কথার কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ভেবেছিল বিয়ের পরে সব ঠিক হয়ে যাবে। তাছাড়া একবার আমেরিকা নিয়ে গেলে পেছনের কোনো কথা তখন আর মনে থাকবে না।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শরীফ জানতে চাইল, ‘তাহলে দেশ থেকে এসেছিলে কেন? না এলেই পারতে।’
‘আমিতো আসতে চাইনি। তুমিই ইনসিস্ট করেছিলে।’
‘হ্যাঁ আমিই করেছিলাম। ভুলটা আমারই। আমার বোঝার ভুল হয়েছিল। আমি ভেবেছিলাম…’
শরীফের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে রুবিনা বলল, ‘কি ভেবেছিলে, আমেরিকায় গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে?’
শরীফ কোনো উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘আরো আগেই তো চলে যেতে পারতে। এত নাটকের কী দরকার ছিল? কিসের অপেক্ষায় ছিলে তুমি?’
‘কিসের অপেক্ষায় ছিলাম তা এখন নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ।’
‘আমার ভাবতে ঘৃণা হচ্ছে, ছিঃ! তুমি শেষ পর্যন্ত…। আচ্ছা, মানুষ কী ভাববে বলত? নিজেকে ছোট করতে তোমার খারাপ লাগছে না?’
‘মানুষের কাজই হচ্ছে অন্যের ব্যাপারে মাথা ঘামানো। মানুষ নিজে যেমনই হোক সবসময় অন্যকে নিয়ে বলতে ভালোবাসে। মানুষ কী ভাববে, লোকে কী বলবে—এসব নিয়ে ভাবলে তো আমার চলবে না। আর তা নিয়ে আমার মাথা ব্যথাও নেই। শরীফ শোনো, তুমি আজ অনেক উত্তেজিত। মাথা গরম করে কোনো কিছুর সমাধান হবে না। আমি বরং এখন রাখি। এ ব্যাপারে পরে কথা বলব।’ রুবিনা শরীফকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই লাইনটা কেটে দিল।
সোহেলের এপার্টমেন্টে মোটামুটি স্বাচ্ছন্দ্যেই সময় কাটছে রুবিনার। রান্না করছে, ঘর গোছাচ্ছে। সব খানেই একটা প্রাণের ছোঁয়া। সোহেলের ছোট্ট এক বেডরুমের এপার্টমেন্ট এ ক’দিনেই বেশ সুন্দর পরিচ্ছন্ন করে সাজিয়ে ফেলেছে সে।
সোহেল রাতের শিফটে ক্যাব চালায় আর দিনের বেশীর ভাগ সময় ঘুমিয়ে কাঁটায়। তবে রুবিনা আসাতে তার রুটিনের কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে। এখন সে দুপুরের আগেই ঘুম থেকে উঠে পরে রুবিনার হাতের মজাদার রান্না খাবে বলে।
দুপুরে খাবার টেবিলে বসে রুবিনা আক্ষেপ করে বলল, ‘তবে যাই বলো সোহেল, তোমার মাস্টার্স ডিগ্রী শেষ না করাটা কিন্তু আমি মোটেও মেনে নিতে পারছি না। কত ঝামেলা করে এদেশে এলে, অথচ…’
‘কীভাবে করব বলো? টিউশন ফি জোগাড় করব, না ক্লাস করব? সারারাত কাজ করার পর দিনের বেলা ক্লাসে যেয়ে চোখে অন্ধকার দেখতাম। প্রচণ্ড মাইগ্রেন হতো। তারপরেও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম, কিন্তু বেশিদিন টিকতে পারিনি। এভাবে তো আর পড়াশুনা হয় না। এটা শুধু আমার একার সমস্যা না। আমার মত আরও অনেকেরই এই অবস্থা।’
সোহেল মন খারাপ করে তার আফসোসের কথা বলতে থাকল, ‘একটা সেমিস্টার মিস করলেই আউট অফ স্ট্যাটাস। সেখানে আমি একটার পর একটা সেমিস্টার মিস করেছি, কোনো ক্লাসই নিতে পারিনি। তোমাকে তো সবকিছুই জানিয়েছি।’
‘জানতাম বলেই তো, শরীফের সংগে শেষ পর্যন্ত বিয়েতে রাজী হয়েছিলাম। অবশ্য তুমি না বললে আমি কখনোই রাজী হতাম না। মরে গেলেও না।’
‘ভাগ্যিস রাজী হয়েছিলে।’
‘শুধু তোমার জন্যে কত বড় মিথ্যের আশ্রয় আমাকে নিতে হলো, ভেবে দেখেছ? এটাতো একধরনের প্রতারণা তাই না?’
‘এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন ওয়ার এন্ড লাভ।’
‘কিন্তু আমার খুব খারাপ লাগছে মানুষটার জন্যে। ওর তো কোনো দোষ নেই।’
‘তবে কার দোষ?’
‘জানিনা।’
হঠাৎই চুপ হয়ে যায় রুবিনা। সোহেলও আর কিছু বলতে পারে না। একটি অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে গেল ঘরের ভিতর।
এর মধ্যে শরীফ আরও বেশ কয়েকবার চেষ্টা করল রুবিনার সংগে যোগাযোগ করার। রুবিনা কলার আইডি দেখে ফোন ধরেনি। ব্যাপারটা বুঝতে পেরে শরীফ একটা অপরিচিত নাম্বার থেকে ফোন করল রুবিনাকে।
ফোন ধরার পর রুবিনা যখন বুঝতে পারল এটা শরীফের কল তখন সে বলেছে, ‘এখন কথা বলতে পারব না। তোমাকে রাতে কল দিব।’ বলেই লাইনটা কেটে দিয়েছে সে। এর পর থেকে আর কারো কোনো ফোনই ধরে নি রুবিনা।
সোহেলে রাতের শিফটে কাজে চলে যাবার পর শরীফকে ফোন করল রুবিনা।
‘একটা কথা আমার মাথায় ঢুকছে না কিছুতেই। তুমি হঠাৎ করেই এমন একটা ডিসিশন কেন নিলে?’ কথা না পেঁচিয়ে শরীফ সরাসরি জিজ্ঞেস করল রুবিনাকে।
‘ডিসিশন তো আমি হঠাৎ করে নেয়নি, শরীফ। আমি আগে থেকেই জানতাম আমি এমনই কিছু একটা করব। কিছুদিন আগে বা পরে। মনে করে দেখো, আমেরিকায় আসার আগেও আমি বলেছিলাম—আমি যাচ্ছি ঠিকই, কিন্তু আমাকে বেশিদিন ধরে রাখতে পারবে না।’
‘তারপরেও, এভাবে চলে যাওয়াটা কি তোমার ঠিক হয়েছে বলো? আমাকে খুলে বললে আমি নিশ্চয়ই তোমাকে জোড় করে আটকে রাখতাম না। প্রয়োজনে আমরা মিউচুয়ালি সেপারেশন নিতাম।’
‘এখন তো জানলে! এখন তাহলে ডিভোর্স লেটারটা পাঠিয়ে দাও।’
এ কথা শুনে সহসাই শরীফ উত্তেজিত হয়ে পড়ল। সে তার রাগ চেপে রাখার কোনো রকম চেষ্টা না করেই বলল, ‘ডিভোর্স! ডিভোর্স তো আমি তোমাকে দিব না। তুমি চাইলে আমার এগেইনস্টে এলিগেশন এনে কোর্টে গিয়ে কেস করো। ডিভোর্স নিয়ে নাও। কিন্তু আমি তোমাকে ডিভোর্স দিব না।’
‘আমাকে তো তোমার ঘৃণা করা উচিত।’ রুবিনা নিজেকে শান্ত রেখেই বলল।
‘তুমি যা করলে, এটার জন্যে তোমাকে একদিন রিগ্রেট করতে হবে রুবিনা। রিমেমবার ইট!’
‘সেটাই যদি হয় আমার ডেসটিনেশন, তাহলে করব। কপালের উপর তো কারো হাত নেই।’
‘ইউ শুড বী গ্রেটফুল টু মি!’ শরীফ ইচ্ছে করেই রুবিনাকে কথাটা মনে করিয়ে দিল।
‘অফকোর্স আই’ম গ্রেটফুল টু ইউ, শরীফ। তুমি আমাকে এদেশে এনেছো। তোমার জন্যে আমার গ্রীনকার্ড হয়েছে। আমার স্বপ্ন পূরণ হতে এখন আর কোন বাঁধা নেই। আমি অবশ্যই কৃতজ্ঞ। আমাকে তোমার অকৃতজ্ঞ মনে হতে পারে। কিন্তু আমি যা করেছি আমাদের দুজনের ভালোর জন্যেই করেছি। তোমার সংগে থাকলে তোমাকে ঠকানোই হতো শুধু। তুমি ভাল মানুষ—তোমাকে ঠকানোটা হতো অন্যায়। তাই চলে এসেছি।’ রুবিনা উত্তেজিত হয়ে একনাগাড়ে কথা গুলো বলে চুপ করে গেল।
এরপর দীর্ঘ নীরবতা। কেউ কোনো কথা বলল না। একসময় নীরবতা ভেঙ্গে শরীফ বলল, ‘ঠিক আছে রাখি তাহলে।’ রাখি বললেও শরীফ ফোন ছাড়ল না—ধরে থাকল। রুবিনাও চুপ করে থাকল। দুজনের নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া আর কোথাও কোনো শব্দ নেই। এভাবে আরও কিছুক্ষণ চলল চুপচাপ নিঃশ্বাসের আদান-প্রদান। তারপর একসময় ফোন রেখে দিল শরীফ।
অপরপ্রান্তে ফোন হাতে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে রইল রুবিনা।
অপেক্ষা (পর্ব-২)
শরীফের এই পরিবর্তন অবশ্য একদিনেই হয়নি। সে প্রথম দিকে স্বাভাবিক নিয়মেই স্বামী-স্ত্রীর শারীরিক মিলনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু রুবিনার কাছ থেকে সাড়া মেলেনি। যদিও শরীফ তাকে কাছে ডাকলে সে বাধাঁও দেয়নি কখনও। নির্জীব জড় পদার্থের মত পড়ে থেকেছে শুধু।
শরীফ জানতে চেয়েছে, ‘তুমি কি আমাকে বিয়ে করে সুখী হওনি?’
শরীফের এই প্রশ্নের কোনো উত্তর রুবিনা দিতে পারেনি। শুধু চুপ করে থেকেছে। এরপর থেকে শরীফও নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে। প্রাকৃতিক রিপুর তাড়নায় সে যে কখনো তাড়িত হয়নি তা নয়, তবে তার ব্যক্তিত্বের সাথে যায় না বলেই সে নিজেকে সংযত রেখেছে। রুবিনার সাথে শারীরিক সম্পর্ক তৈরী করার চেষ্টা করেনি আর। ভেবেছিল সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক হয়ে যাবে। সে সেই সময়ের অপেক্ষায় আছে।
প্রতিদিনের মতো আজকেও রুবিনা দুপুরে মেইল বক্স থেকে একগাদা মেইল বের করে দেখতে থাকে একটির পর একটি। বেশীর ভাগই বিভিন্ন কোম্পানির বিজ্ঞাপন আর সেল কুপন। অপ্রয়োজনীয় জাঙ্ক মেইলে ভর্তি হয়ে থাকে মেইল বক্স। রুবিনা মাঝে মাঝে ভাবে, দেশে হলে এত কাগজ অন্তত কেজি হিসেবেও বিক্রি করা যেত।
রুবিনা মেইল নিয়ে এসে লিভিং রুমে বসল। তারপর আরও একবার খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল। না নেই। আজকেও আসেনি। চিঠিটা কি তাহলে হারিয়ে গেল? নিশ্চয়ই কোথাও কোন গোলমাল হয়েছে।
রুবিনা ফাইল কেবিনেট থেকে আইএনএস-এর কনফার্মেশন লেটারটি নিয়ে নাম্বার দেখে ফোন করল। কয়েকবার রিং হবার পর অপরপ্রান্ত থেকে মেশিনে রেকর্ডকৃত শব্দ শুনতে পেল, ‘প্লীজ এন্টার ইয়োর থার্টিন ডিজিট রিসিপ্ট নাম্বার।’
রুবিনা ফোনের বাটনে কেস নাম্বার দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল। কিছুক্ষণ পর সে শুনতে পেল তার রেসিডেন্ট এলিয়েন কার্ড ইতিমধ্যেই ফাইলে থাকা তার ঠিকানায় পাঠানো হয়েছে। রুবিনা লম্বা একটা দম নিয়ে উঠে দাঁড়াল। তারমত খুশী এ মুহূর্তে আর কেউ নেই। তার চেহারায় খুশির ঝিলিক দেখা দিল। সে দেরী না করে ফোন করল একজনকে।
প্রায় সাথে সাথেই অপর প্রান্ত থেকে একটি পুরুষ কণ্ঠে ভেসে আসল, ‘কি, কোন খবর হলো?’
উচ্ছ্বসিত রুবিনার উত্তর, ‘ইয়েস স্যার। দ্যা গোল্ডেন ডিয়ার ইজ অন ইটস ওয়ে… চলে আসবে দু’একদিনের মধ্যেই।’
‘ফাইনালি! থ্যাংকস গড!’ অপরপ্রান্তে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফোনের ভিতরেও বোঝা গেল, স্পষ্ট।
রুবিনার অপেক্ষার দিন শেষ হলো। মেইল বক্সে আজ অল্প কয়েকটি চিঠি। এর মধ্যে অতি আকাঙ্ক্ষিত এনভেলপটি চিনতে তার মোটেও অসুবিধা হলো না। দেরী না করে প্রায় সাথে সাথেই খুলে দেখল একটি লেটার সাইজ কাগজে তার ছবি সম্বলিত একটি ছোট্ট আয়তাকৃতি অতি উন্নত মানের সাদা রঙের প্লাস্টিক কার্ড। এটাই তাহলে সেই সোনার হরিণ? সে উলটে পালটে দেখল। পেলব হাতে স্পর্শ করে মনে মনে ভাবল, নাম গ্রীনকার্ড অথচ রঙ সবুজ না হয়ে সাদা? এর কারণ কি? শরীফকে জিজ্ঞেস করতে হবে।
রুবিনা এক দৌড়ে ঢুকে পড়ল বাসার ভিতরে। প্রথমেই ফোন করল শরীফকে তার অফিসে। খবরটা এখুনি জানানো দরকার। শরীফ ফোন ধরতেই রুবিনা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘এসেছে!’
‘কি এসেছে?’ শরীফ অবাক হয়ে জানতে চাইল।
‘সেই চিঠিটা। যার জন্যে এতদিন ধরে অপেক্ষা করছি।’
‘আহা হেঁয়ালি করো না তো।’
‘আশ্চর্য, তুমি বুঝতে পারছো না? আমার গ্রীনকার্ড এসেছে।’
‘রিয়েলি? দ্যাটস গ্রেট নিউজ। তাহলে তো সেলিব্রেট করতে হয়। আজ রাতে চলো আমরা একটা ফাইন ডাইনিং এ ডিনার করি। তুমি রেডি হয়ে থেকো।’
কথা না বাড়িয়ে শরীফ ফোন রেখে দিলো। মানুষটা কি প্রয়োজনের বাইরে একটা কথাও বলতে পারে না! রুবিনা অবাক হয়। এমন একটা খুশির খবরে সে একটা কথা বলেই রেখে দিল? কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে রুবিনা আবার ফোন করল একটি বিশেষ নাম্বারে।
ডিনার শেষে বাসায় ফিরে নিয়ম মাফিক অন্য কাজ গুলো সেরে শরীফ বিছানায় শুয়ে টিভি ছেড়ে দিল।
নিয়মের ব্যতিক্রম করল রুবিনা। সে সাধারণত ঘরের কাজ শেষ না করে ঘুমাতে যায় না। কিন্তু আজ কোনো কিছু না করেই তাড়াতাড়ি ছুটে গেল বিছানায়।
শরীফ পাশ ফিরে শুয়ে আছে। রুবিনা বিছানায় উঠে বসল। আস্তে করে শরীফের গায়ে হাত রেখে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছ?’
‘অলমোষ্ট। কিছু বলবে?’
‘ভাবছি, একবার ডালাসে যাবো। খালা-খালুকে একবার দেখে আসি। উনারা অনেকদিন থেকেই বলছেন।’
শরীফ মাথা ঘুড়িয়ে রুবিনার দিকে তাকাল। তারপর বলল, ‘তা যাও না। অসুবিধা কি? কবে যেতে চাও?’
রুবিনা খুশি চেপে রেখে বলল, ‘সম্ভব হলে এই উইকএন্ডেই।’
‘এই উইকএন্ডে না গিয়ে পরের উইকএন্ডে যাও। তাহলে আমিও যেতে পারব তোমার সাথে।’
‘তোমার না কাজে অনেক চাপ? কি সব ঝামেলা যাচ্ছে! তুমি বরং পরে যেয়ে আমাকে নিয়ে এসো।’
‘একা যেতে ভয় লাগবে না?’
‘ভয় লাগবে কেন? বাংলাদেশ থেকে তো একাই এলাম। আর শিকাগো থেকে ডালাস একা যেতে পারব না?’
শরীফ কৌতূহলী দৃষ্টিতে রুবিনার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, যাও।’
সকাল অফিসে যাওয়ার সময় শরীফ ফ্রিজ খুলে ভি-এইট জুসের একটা ক্যান বের করে একটা ঝাঁকি দিয়ে ঢক ঢক করে বেশ খানিকটা জুস গলায় চালান করে দিল। তারপর কফি মেকার থেকে কফি ঢেলে একটা চুমুক দিতেই রুবিনা সুটকেস নিয়ে নীচে নেমে এলো তাড়াতাড়ি। তার মধ্যে একধরনের অস্থিরতা স্পষ্ট। নীল জিন্স আর সাদা টি-শার্টে ওকে বেশ অন্যরকম লাগছে। ঘরে সাধারণত দেশ থেকে নিয়ে আসা সালোয়ার-কামিজ আর মাঝে মাঝে সুতি শাড়ি পরে রুবিনা। হঠাৎ তাই জিন্স-টিশার্ট পরিহিতা রুবিনার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকল শরীফ।
‘কি দেখছ অমন হাঁ করে?’ কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইল রুবিনা।
‘ইয়্যু লুক ফ্যাবুলাস! বুঝতে পারছি না, কোন ড্রেসে তোমাকে সবচেয়ে বেশি মানায়?’
‘ভাল লাগছে?’
‘খুউব!’
রুবিনা কি বলবে ভেবে পেল না। অন্তত একটা ধন্যবাদ দেয়া যেতেই পারে। তাই সে বলল, ‘থ্যাংকস!’
শরিফুল হেসে দিয়ে বলল, ‘নাস্তা করে নাও। হাতে এখনও সময় আছে। এত তাড়া কিসের?’
‘তোমার অফিসে দেরী হয়ে যাবে না?’ বলতে বলতে ফ্রিজ খুলে এক গ্লাস অরেঞ্জ জুস খেয়ে নিল রুবিনা।
‘একদিন দেরী হলে কিছু হবে না।’
কথা বলতে বলতে কিচেন কাউন্টারে রাখা ব্রেড টোস্টারে একটা বেগল টোষ্ট করে তাতে অনেক খানি ক্রিম চিজ লাগিয়ে রুবিনার হাতে দিল শরীফ, ‘নাও, এটা খাও।’
‘আমি তো এত সকালে কিছু খেতে পারি না।’
‘ঠিক আছে, তাহলে সাথে নিয়ে নাও। পরে খেও।’
একটা র্যাপিং পেপারে বেগলটা মুড়িয়ে রুবিনার হাতে দিয়ে বলল, ‘প্লেনে একগ্লাস পানি অথবা জুস ছাড়া আর কিছুই খেতে দেয় না। আজকাল এয়ারলাইন্স গুলো অনেক চিপ হয়ে গেছে। কিছুদিন আগেও অন্তত এক প্যাকেট বাদাম দিত, এখন তাও দেয় না।’
ঘর থেকে বের হয়ে আসল তারা দুজন। শরীফ রুবিনার সুটকেস গাড়ীর ট্র্যাঙ্কে তুলে দিয়ে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসল। রুবিনা পাশের সিটে উঠে এসে বসা মাত্রই শরীফ গাড়ি স্টার্ট দিয়ে রাস্তায় বের হয়ে গেল।
রাস্তায় তেমন কোনো কথাই হলো না ওদের দুজনের মধ্যে। শরীফের বাসা থেকে এয়ারপোর্ট প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিটের ড্রাইভ। লেক মিশিগানের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় রুবিনা মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে জানালা দিয়ে। অবলোকন করতে থাকে শিকাগোর মনোরম দৃশ্যাবলী।
দেশ থেকে আসার পরের উইকএন্ডেই শরীফ ওকে নিয়ে এসেছিল শিকাগো ডাউনটাউন দেখাতে। বাংলাদেশের গর্ব এফ আর খানের ডিজাইনকৃত সিয়ার্স টাওয়ার আর জন হ্যানকক টাওয়ার দেখে মুগ্ধ হয়েছিল রুবিনা। সেই সাথে নেভী পিয়ার, বাকিংহ্যাম ফাউনটেইন, সায়েন্স মিউজিয়াম, এডলার প্লানেটারিয়াম সবই ঘুরিয়ে দেখিয়েছে ওকে। রুবিনা অবাক হয়ে দেখেছে আর ভেবেছে সব কিছুর ব্যাপকতা নিয়ে। এদেশটা কত বড়? ডাউনটাউন আর লেক মিশিগানের মাঝ দিয়ে ওদের গাড়ি লেক শোর ড্রাইভ দিয়ে এগিয়ে যাবার সময় রুবিনা বার বার অন্যমনস্ক হয়ে গেল।
শিকাগো মিডওয়ে এয়ারপোর্টের ডিপারচার কার্ব সাইডে শরীফের গাড়ি এসে থামল। গাড়ি থেকে নেমে এলো রুবিনা। ট্রাঙ্ক থেকে সুটকেস নামিয়ে শরীফ এসে দাঁড়াল রুবিনার পাশে। তারপর বলল, ‘প্লেন থেকে নেমেই কিন্তু তুমি আমাকে ফোন করবে।’
‘করব।’
হঠাৎ করেই শরীফ রুবিনাকে বুকে টেনে নিল। রুবিনার চোখ ছলছল করে উঠল। বুকের মধ্যে কেমন যেন লাগছে। সে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তাকাল শরীফের মুখের দিকে।
‘কিছু বলবে?’ শরীফ জানতে চাইল।
‘না কিছু না।’
‘ঠিক আছে। যাও তাহলে। চেক-ইনে অনেক ঝামেলা করে। হাতে সময় নিয়ে যাওয়াই ভাল।’
রুবিনার গলা ধরে এলো। সে বাষ্পরুদ্ব কণ্ঠে বলল, ‘তুমি ভাল থেকো। ঠিকমত খাওয়া দাওয়া করো আর শরীরের যত্ন নিও।’
‘তুমি এমন ভাবে বলছ যেন তোমার সাথে আমার আর দেখা হবে না সহসা। আরে মাত্র তো এক সপ্তাহের ব্যাপার।’ বলতে বলতেই শরীফ রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখল একজন ট্রাফিক পুলিশ এগিয়ে আসছে ওর গাড়ির দিকে।
‘এইরে পুলিশ বুঝি এখনই টিকেট দিয়ে দিবে। এখানে আর দাঁড়ানো যাবে না। গাড়ি সরাতে হবে।’
‘আচ্ছা, তুমি যাও। আমিও যাচ্ছি।’
‘না, তুমি আগে যাও।’
রুবিনা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত টার্মিনালের ভিতরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
দুপুরের পর থেকেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে বেশ কয়েকবার ফোনের দিকে তাকাল শরীফ। রুবিনার একটা কলের অপেক্ষায় আছে সে। এতক্ষণ তো লাগার কথা না। মাত্র দুই ঘণ্টার ফ্লাইট। সকাল এগারটার মধ্যেই তো পৌঁছে যাবার কথা। এখন সাড়ে বারোটা।
শরীফ আবার কাজের ব্যস্ততায় ডুবে গেল, ঠিক তখনই তার মোবাইল ফোনটা বেজে উঠল। সে তাকিয়ে দেখল রুবিনার ফোন। অবশেষে তার মুখে হাসি দেখা দিল। সে ফোন ধরেই বলল, ‘পৌঁছে গেছ?’
‘হ্যাঁ।’ ফোনের ওপাশ থেকে রুবিনার কণ্ঠ শোনা যায়।
‘হাউ ওয়াজ দ্য ফ্লাইট?’
‘ভাল না।’
‘কেন?’
‘বাম্পিং। ওয়েদার খারাপ ছিল।’
‘ভয় পেয়েছিলে?’
‘হ্যাঁ।’
কথা বলার মাঝেই শরীফের অফিস ফোন বেজে উঠে। সে ফোনটা অন-হোল্ডে রেখে রুবিনাকে বলল, ‘এই শোন, আমি এখন রাখছি। একটু পরে আবার কল দিচ্ছি। নাহলে রাতে কথা হবে।’
‘তোমাকে এত অস্থির হতে হবে না। সময় মত আমিই কল দিব।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে।’ একটু চুপ করে থেকে শরীফ বলল, ‘রুবিনা!’
‘বলো।’
‘আই উইল মিস ইউ।’
রুবিনা চুপ করে থাকে। ওর নিঃশ্বাসের শব্দ ছাড়া শরীফ আর কিছুই শুনতে পেল না। শরীফ ফোন কেটে দিয়ে অফিসের ফোন ধরল।
রাতে অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর শরীফ রুবিনাকে ফোন করল। কিন্তু কোনো উত্তর পেল না। রুবিনার মোবাইল ফোন বন্ধ। ফোনে কি চার্জ নেই? আচ্ছা, চার্জার নিতে ভুলে যায়নি তো? শরীফ বুঝতে পারল না রুবিনা ফোন কেন ধরছে না। সে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করল, কিন্তু প্রতিবারই কল ভয়েজ মেসেজে চলে গেল। হয়তো টায়ার্ড সে জন্যে ঘুমিয়ে পরেছে অথবা কাজিনদের সাথে গল্প করছে। কতদিন পর দেখা। তারপরেও একটা ভয়েজ মেসেজ দিয়ে রাখল শরীফ। তারপর কিছুটা চিন্তিত মনেই ঘুমতে গেল।
সকালে অফিসে গিয়ে শরীফ ব্যস্ত হয়ে পড়ল কাজে। ব্যস্ততার মধ্যেও সে কয়েকবার ফোন করল রুবিনার মোবাইল ফোনে। কিন্তু প্রতিবারই কল চলে গেল ভয়েস মেসেজে। শরীফ অবাক হয়ে ভাবল, ‘আশ্চর্য, ফোন ধরছে না কেন?’
শরীফ আরেকবার ফোন করল এবং যথারীতি কল চলে ভয়েস মেসেজে। শরীফ আবারও একটা মেসেজ রাখল, ‘কি ব্যাপার রুবিনা, ফোন ধরছ না কেন? ইজ এভ্রিথিং অলরাইট? রাতে ফোন ধরলে না, সকালেও না। কোনো খবর নেই। খালার বাসায় গিয়ে দেখি একেবারে ভুলেই গেলে? এখানে কেউ একজন যে চিন্তায় অস্থির সেদিকে খেয়াল আছে? এনিওয়ে, কল মি। মিসিং ইয়্যু!’
রাতে বিভিন্ন কাগজ পত্র ঘাটাঘাটি করে শরীফ রুবিনার খালার বাসার নাম্বার খুঁজে পেল। দেরী না করে সে সাথে সাথে ফোন দিল সেই নাম্বারে। অপরপ্রান্তে রুবিনার খালা ফোন ধরল, ‘হ্যালো।’
‘স্লামালিকুম। খালা আমি শরীফ। কেমন আছেন?’
আগ্রহ ভরা কণ্ঠে খালা বললেন, ‘ভাল আছি বাবা। তোমরা কেমন আছ? রুবিনা কেমন আছে? ওতো অনেকদিন কল-ঠল করে না।’
শরীফ বুঝতে পারছে না খালা কি বলছেন! অনিশ্চিত ভাবে সে শুনে গেল তার কথা। তিনি আরো বললেন, ‘মাঝে মাঝে কথা বললে ভাল লাগে। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কথা বলার একজন মানুষ পাইনা। সবাই ব্যস্ত। রুবিনা প্রথম দিকে প্রায়ই কল দিত। অনেকদিন হল সেও কল করে না। ওর শরীর ভাল তো?’
শরীফের শিরদাঁড়া বেয়ে একটি শীতল স্রোত নেমে গেল নিচের দিকে। সে ভীত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, ‘খালা কি বলছেন এসব? আমিতো আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না। রুবিনা তো গতকালই আপনাদের ওখানে গেল। এয়ারপোর্টে পৌঁছে সে আমাকে ফোনও করেছে।’
‘কই আমরা তো কিছুই জানি না। তুমি এসব কি বলছ, আমার মাথায় তো কিছুই ঢুকছে না। একটু ধরো তো বাবা। এই শুনছ, এদিকে আসো। শরীফ ফোন করেছে…’ খালা চিৎকার করে তার স্বামীকে ডাকল।
শরীফের মুখ থেকে অস্ফুটে শুধু একটা শব্দই বের হলো, ‘ও মাই গড!’ তারপর তার হাত থেকে ফোনটা পড়ে গেল বিছানায়।
ফোনের অপর প্রান্ত থেকে রুবিনার খালুর কথা শোনা গেল, ‘শরীফ, কি হয়েছে বাবা? শরীফ। ঘটানাটা কি আমরা তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আমাদেরকে বলো, কি হয়েছে? শরীফ। হ্যালো? হ্যালো?’
শরীফ বুঝতে পারছে না সে এখন কি করবে, কি বলবে। মাথাটা কেমন যেন এলো মেলো ঠেকছে। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে।
অবিনাশী শব্দরাশি (শেষ পর্ব)
মাহমুদ সাজ্জাদ বললেন, ‘কী খাবে বলো।’
নীলিমা অনেকক্ষণ চুপ করে বসে আছে মাহমুদ সাহেবের সামনে। সে বলল, ‘কিছু খাবো না। খিদে নেই। আপনি খেয়ে নিন।’
‘তাহলে থাক, আমারো তেমন একটা খিদে নেই।’
‘না না, আপনি খেয়ে নিন, আমি বসছি।’
‘চলো, সমুদ্রের বাতাস গায়ে লাগিয়ে খিদেটা একটু বাড়িয়ে নিয়ে আসি। তারপর না হয় একসঙ্গে বসে খাওয়া যাবে।’
নীলিমা কিছু বলল না। উঠে দাঁড়িয়ে হেঁটে গেল বাইরের দিকে। মাহমুদ সাহেব বের হয়ে এলেন তার পিছে।
আতিকুর রহমানের স্টোর থেকে ফিরে আসার সময় হোটেল গার্ডেন ইনের সামনে থেকে মাহমুদ সাহেবকে তুলে নিয়ে এসেছে নীলিমা। তার মনটা বিষণ্নতায় ভারী হয়ে আছে। তার অনেক কথা সে কবিকে বলতে চায়। কবির মুখ থেকে শুনতে চায়। কিন্তু কোনো কথাই তার বলা হচ্ছে না। এখানে আসার পর থেকেই চুপ করে আছে সে।
বেলাভূমিতে হাঁটতে হাঁটতে মাহমুদ সাজ্জাদ তাকালেন নীলিমার দিকে। দেখলেন মাথা নিচু করে অন্যমনস্ক ভাবে হাঁটছে মেয়েটি। ওর মধ্যেকার সেই স্বাভাবিক চঞ্চলতাটুকু নেই। তিনি একসময়ে হালকাভাবে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কী ব্যাপার, নীলিমার মন ভালো নেই আজ? সূর্যস্নাত এমন দিনে নীলিমার মন থাকবে রোদের মত ঝলমলে। সেখানে যেন মেঘের ঘনঘটা। উহু, মোটেও ভালো কথা নয়। কি হয়েছে, আমাকে বলা যায়?’
‘বললে কি হবে? মন ভালো করে দেবেন?’
‘সে গ্যারান্টি তো দিতে পারব না। তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি।’
‘তাহলে দিন—আমার মন ভাল করে দিন। আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ।’
‘একটা কবিতা শুনবে?’
‘কবিতা শুনতে ইচ্ছে করছে না। কবিতা ছাড়া আর কিছু জানেন না?’
‘হা হা হা।’ মাহমুদ সাহেব নীলিমার কথার ভঙ্গিতে হেসে ফেললেন। ‘কবিতাটাই একটু জানি, তাও ভালো মতো না। কবিতা ছাড়া আর কী শোনাই তোমাকে? উম, তাহলে… তাহলে…’
‘আমি আপনার হাতটা কিছুক্ষণ ধরে থাকতে চাই… ’ কবিকে কথা শেষ করতে না দিয়ে হঠাৎ করেই বলল নীলিমা। ‘দেবেন, আপনার হাতটা ধরতে?’
নীলিমার এমন অদ্ভুত অনুরোধে মাহমুদ সাহেব আস্তে করে দাঁড়ালেন। তিনি খুব অবাক হলেন কি না তা বোঝা গেল না। কিন্তু খুব স্বাভাবিক ভাবে তিনি তার হাত দু’খানি বাড়িয়ে দিলেন নীলিমার দিকে।
নীলিমা কাঁপা কাঁপা হাতে তার প্রিয় মানুষের হাত দুটি ধরে দাঁড়িয়ে রইল।
…
আতিকুর রহমান খুবই বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘না না, জামান, কাজটা তুমি ঠিক করো নি। এভাবে না জেনে শুনে কারো নামে কিছু বলাটা তোমার একেবারেই উচিৎ হয় নি।’
নীলিমা চলে যাবার পর পরই আতিকুর রহমান জরুরী ভিত্তিতে ফোন করে জামানকে ডেকে নিয়ে এসেছেন তার স্টোরে। জামান বসে আছে তার অফিস রুমে মাথা নিচু করে।
আতিকুর রহমান প্রচণ্ড রকমের রেগে আছেন। তিনি আবার বললেন, ‘আমেরিকার মতো এত বড় একটা দেশে থেকেও মনটাকে বড় করতে পারলে না। আফসোস! এ কাজটা না করলেই কি হতো না। নীলিমা তো তোমার কোনো ক্ষতি করেনি। না কি করেছে?’
জামান মিন মিন করে বলল, ‘না করে নি।’
‘তাহলে? আর মাহমুদ ভাই-ই বা কী মনে করবেন? আমাদের সম্পর্কে ওনার ধারণাটা কী হবে বলো?’
‘আই’ম সরি আতিক ভাই।’
‘সরি আমাকে না বলে বরং যাকে বলার তাকেই বলো।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘আর সরি বললেই বা কী? এক সরিতেই কি আর সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? বাঙালি কমিউনিটিতে যে কোনো কথা বাতাসের আগে ছুটে, না জানি কে কী বলা শুরু করেছে।’
‘আমার ভুল হয়েছে আতিক ভাই। আমি স্বীকার করছি—কাজটি ঠিক হয় নি। বাট আই প্রমিজ, আই উইল ফিক্স ইট। জাস্ট গিভ মি ফিউ ডেজ।’ কথা শেষ করে জামান একটু অন্যভাবে তাকাল।
আতিকুর রহমান ঠিক বুঝতে পারছে না, জামান কী ফিক্স করবে আর কীভাবেই বা করবে? সে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল জামানের দিকে।
জামান আবারো বলল, ‘আই’ম সরি এগেইন।’ সে উঠে দাঁড়াল এবং দ্রুত পায়ে বের হয়ে গেল।
…
কথা বলতে বলতে নীলিমার দু চোখ ভিজে এল। সে আস্তে করে বলল, ‘আপনি তো আমার সব কথাই শুনলেন, এখন আমি কি করব বলতে পারেন? আমার কী করা উচিৎ?’
মাহমুদ সাজ্জাদ কী বলবে ভেবে পেলেন না। নীলিমাকে সে কী বলবে? কীইবা বলা উচিৎ? তিনি কি বলবেন, শোভনকে ছেড়ে তুমি চলে যাও? যে তোমাকে ভালোবাসে না, সম্মান করে না, তোমার ইচ্ছা অনিচ্ছার কোন মূল্য নেই যার কাছে, তার কাছে তুমি কেন থাকবে? তুমি চলে যাও। কিন্তু তিনি কিছুই বলতে পারলেন না। মাত্র কয়েকদিনের পরিচয়ে কাউকে তার জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা সিদ্ধান্তের ব্যাপারে প্ররোচিত করা কি ঠিক হবে? তিনি চুপ করে রইলেন।
জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে গিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগতে ভুগতে দিশেহারা হয়ে পড়ে অধিকাংশ মানুষ। হতাশা, ব্যর্থতা, গ্লানির তিক্ত অনুভূতিগুলো যখন ঘিরে ধরে তখন ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সম্বল হয় একটু আশা, একটুখানি সম্ভাবনার হাতছানি। জীবনের কঠিন সময়ে মনোবল ধরে রাখতে হৃদয়ে অনুপ্রেরণা পাওয়াটা জরুরী। একজন প্রিয় মানুষের কাছ থেকে সেই অনুপ্রেরণা কি কেউ পেতে পারে না?
‘কি আমার জন্যে কোন কথাই কি আপনার নেই? একটা ছোট্ট পরামর্শও কি আপনি দিতে পারেন না।’
কবি তবু নীরব। উদাস নয়নে তাকিয়ে রইলেন সামনের দিকে।
নীলিমা আবার বলল, ‘জানি, কিছু বলতে পারবেন না। সে সাহস আপনার নেই। আপনাদের মতো কবি লেখকদের যত সাহস শুধু ঐ কলমেই—মুখে নয়।’
মাহমুদ সাজ্জাদ মৃদু হাসলেন শুধু। কিছু বললেন না। নীলিমার কথাই কি তাহলে ঠিক? হয়ত তাই। তিনিতো চাইলেও ওকে বলতে পারছে না, যে তোমাকে আমার কত ভালো লেগেছে। তোমার জন্যে আমার খারাপ লাগছে। খারাপ লাগবে। সব কথা কি বলা যায়?
নীলিমা এক দৃষ্টিতে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল কবির মুখের দিকে। তারপর বলল, ‘আপনি কি ভাবছেন আমি জানি। আপনাকে কিছুই বলতে হবে না। আমি জানি আমাকে কী করতে হবে।’ কথা বলতে বলতে অভিমান আর কষ্ট মিশ্রণের বাষ্পে চোখ ভরে উঠল তার।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমা বলল, ‘এনিওয়ে, আমাকে সময় দেবার জন্যে ধন্যবাদ। চলুন ফেরা যাক।’
মাহমুদ সাজ্জাদ চুপ করেই থাকলেন আরো কিছুক্ষণ। তারপর নীলিমার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললেন, ‘চলো।’
কিছুটা হেঁটে কবি থেমে দাঁড়ালেন। ঘুরে তাকালেন নীলিমার দিকে। বললেন, ‘শোনো নীলিমা, বুঝতে পারছি তুমি হতাশ হয়েছো আমি কিছু না বলাতে। আমি যদি বলি, তুমি শোভনকে ছেড়ে চলে যাও, তোমার চলে যাওয়াই উচিৎ—কিন্তু সে কথা বলার অধিকার কি আমি রাখি? জীবনটা তোমার, সিদ্ধান্তটা তোমাকেই নিতে হবে। কিন্তু কারো কথায় প্রভাবিত হয়ে নয়।’ তিনি থেমে থেমে বললেন, ‘তুমি যথেষ্ট স্মার্ট একটা মেয়ে। তোমার মতো একজন বুদ্ধিমতী মেয়ে কেন মেনে নেবে—যে জীবন তার প্রাপ্য নয়?’
নীলিমা চুপ করে শুনছে তার কথা।
এবার কবি ভাবলেন, মেয়েটার মন ভাল করে দেয়া দরকার। এটুকু অন্তত সে করতে পারে। তিনি সমুদ্রের দিকে একবার তাকালেন। সেদিকে তাকিয়েই বললেন, ‘নীলিমা, তুমি কি জানো, তোমার মতো মেয়েরা আছে বলেই, আজো কবিতা লেখা হয়। তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে একজন সাধারণ মানুষও কবি হয়ে যেতে পারে।’
‘থাক, আমাকে আর মন ভোলানো কথা না বললেও চলবে। আমি কোনো টিনেজ মেয়ে নই।’
নীলিমা ঘুরে হাঁটা শুরু করল। একটু হেসে কবিও তাকে অনুসরণ করল।
তারা দুজনে হেঁটে চলল। পাশাপাশি। চুপচাপ। অদ্ভুত এক নীরবতায় ছেয়ে আছে চারিদিক। সূর্য তখন ডিমের কুসুম হয়ে ঢলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে। রাঙা পশ্চিমাকাশ আর সমুদ্রের পানি মাখামাখি হয়ে আছে। ক্রমেই পশ্চিমাকাশের সূর্যটা একটা লাল টকটকে থালার মতো হয়ে উঠল। চোখের পলকেই ডুব দিল ধূসর মেঘের কোলে, সন্ধেটা একরকম চুরি করেই ঝুপ করে নামল।
…
বেশ কিছুদিন পরের ঘটনা।
দুপুরের পরে শোভন বেশ কয়েকবার ফোন করল মার্শাকে, কিন্তু মার্শা তার ফোন ধরল না। এক পর্যায়ে সে মরিয়া হয়ে গেল এবং একবার ভয়েস মেসেজ রাখল। মার্শার কাছ থেকে কোনো সাড়া না পেয়ে শোভন সিদ্ধান্ত নিল ওর বাসায় গিয়ে দেখবে বিষয়টা কি? এমন তো হবার কথা না। সে অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
গাড়ি চালিয়ে ১৫ মিনিটের মধ্যে শোভন চলে এলো মার্শার এপার্টমেন্টের সামনের পার্কিং লটে। গাড়ি থেকে নেমে দ্রুত চলে গেল এপার্টমেন্টের মেইন গেটে। সিকিউরিটি কোড চাপল কিন্তু গেট খুলল না। ভাবল ভুল ডিজিট চেপেছে। সে আবারো সিকিউরিটি কোড চাপল কিন্তু এবারো গেট খুলল না। প্রতিবার স্ক্রিনে দেখাচ্ছে, রং নাম্বার, ট্রাই এগেইন। কিন্তু শোভন জানে সে কোনো ভুল করছে না। পৃথিবীর অন্য অনেক কিছুতেই ভুল হতে পারে, কিন্তু এই নাম্বার তার ভুল হবার কথা না। হতেই পারে না। তবে কি মার্শা সিকিউরিটি কোড বদলে ফেলেছে? মাঝে মাঝেই কম্পিউটারের পাসওয়ার্ড বদলের মতো সিকিউরিটি কোড হয়তো বদলাতে হয় কিন্তু সেটা তো তাকে জানাবে মার্শা। ভুলটা তাহলে কোথায় হচ্ছে?
শোভন আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে আবার ফোন করল মার্শাকে। কোনো সাড়া নেই। সে চিন্তিত মনে ফিরে যাবার জন্যে ঘুরে দাঁড়াল। ঠিক সে সময়ে ঐ এপার্টমেন্টের আরেক জন বাসিন্দা সিকিউরিটি কোড চেপে গেটে খুলে ঢুকে পড়তেই শোভন অতি দ্রুত তার পিছে ঢুকে পড়ল মেইন গেট বন্ধ হয়ে যাবার আগেই।
এলিভেটর থেকে বের হয়ে উল্কার মতো ছুটে হলওয়ে পার হয়ে দাঁড়াল মার্শার দরজার সামনে। কয়েকবার টোকা দিতেই মার্শা দরজা খুলে দিল। এবং দেখল শোভন দাঁড়িয়ে আছে। শোভনকে দেখে সে ভ্রূ কুচকে তাকাল এবং বিরক্তিকর ভঙ্গিতে বলল, ‘What do you want? And how did you get in here?’
শোভন অবাক হয়ে গেল। এ কী ধরণের কথা বলছে মার্শা? সে বলল, ‘What do you mean by what do I want?’
দীর্ঘকায় এক শ্বেতাঙ্গ যুবক এসে দাঁড়াল মার্শার পেছনে। শোভন চোখ বড় করে তার দিকে তাকাল একবার এবং তার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জানতে চাইল, ‘Who is he?’
‘That’s none of your business.’ মার্শা বলল।
মার্শা এবার কৈফিয়তের সুরে বলল, ‘Why didn’t you tell me that you are married? You have a wife? I can’t believe this! You liar!’
শোভন দ্রুত ভাবতে থাকল মার্শা কী করে জানল সে কথা। কে তার সাথে যোগাযোগ করল আর কীভাবেই বা হলো। নীলিমা? নাকি অন্য কেউ? কে হতে পারে? কিন্তু এসব নিয়ে এখন ভাবার সময় নেই। তাকে দ্রুত এখন বর্তমান পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। এই লম্বুটাই বা কে? মার্শার এক্স বয়ফ্রেন্ড?
দীর্ঘকায় এই শ্বেতাঙ্গ যুবকের নাম এরিক। প্রায় সাড়ে ৬ ফুট লম্বা সুঠাম দেহের অধিকারী এরিক হচ্ছে মার্শার প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ড। শোভনের ধারণাই ঠিক।
শোভন আবার জিজ্ঞেস করল, ‘Who is he? You just can’t do this to me. Why are you doing this to me, Marsha?’
‘Why am I doing this? মার্শার কণ্ঠে হতাশা আর বিরক্তি স্পষ্ট, ‘Because you are a cheater Shovan and you know what, once is a cheater, always is a cheater!’
এবারে শোভন সত্যি সত্যিই রেগে গেল। সে তেড়ে গেল মার্শার দিকে আর ঠিক তখনই এরিক সামনে এগিয়ে এলো। সে মার্শাকে পেছনে রেখে শোভনের সামনে এসে ধমকের সুরে বলল, ‘You better knock off you bloody fool. I don’t want any trouble here.’
এ ধরণের প্রতি-আক্রমণের জন্যে মোটেই প্রস্তুত ছিল না শোভন। সে আড় চোখে তাকালো এরিকের মাংসপেশির দিকে তারপর তাকালো তার চোখের দিকে। এবং হঠাৎ করেই ফুটো বেলুনের মতো চুপসে গেল শোভন। কেমন একটা ভয় ধরিয়ে দেবার মতো চেহারা নিয়ে তাকিয়ে আছে এরিক।
শোভন এরিকের ঘাড়ের পাশ দিয়ে অবিশ্বাস্য দৃষ্টি নিয়ে তাকাল মার্শার দিকে।
এবার মার্শা এগিয়ে এলো সামনে। সে খানিকটা নরম স্বরে বলল, ‘Since I did not know much, I started learning about Bangladesh! I wanted to go to Bangladesh you know.’ তার কণ্ঠস্বরে আক্রমণের তেজ নেই, উলটা কেমন যেন ভারী হয়ে আছে।
হঠাৎ একটা অস্বস্তিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হলো। বলে কী এই মেয়ে? শোভন অপরাধীর মত তাকালো মার্শার দিকে।
মার্শা অত্যন্ত কঠিন এবং শীতল কণ্ঠের মিশ্রণে আবারো বলল, ‘You only talked about the bad part of Bangladsh, it’s people and culture; you never talked about the sweet part of it. You don’t even know how rich your culture is! Try to learn your own culture! You’re a Bangladeshi first, and then an American. Remember it!’ কথাগুলো বলে অগ্নিদৃষ্টিতে শোভনের দিকে তাকিয়ে রইল মার্শা।
শোভন মার্শার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না। সে চোখ ফিরিয়ে নিল।
মার্শার চোখ ভিজে এলো। সে তার আবেগকে সংবরণ করতে পারল না।
এই পর্যায়ে এরিক এগিয়ে এসে মার্শার ঘাড়ে একটি হাত দিয়ে ধরে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। তারপর শোভনের কাছে এগিয়ে এসে ইশারায় দরজা দেখিয়ে দিল।
বিপর্যস্ত শোভন পরাজিত সৈনিকের মতো ঘুরে দাঁড়িয়ে ধীরে ধীরে মার্শার ঘর থেকে বের হয়ে গেল।
…
শোভন কস্মিনকালেও ভাবেনি আরো একটি সারপ্রাইজ তার জন্যে অপেক্ষা করছে। সে বাসার সামনে গাড়ি থেকে নামতেই দেখল নীলিমা একটা বড় সুটকেস পাশে নিয়ে ড্রাইভওয়েতে দাঁড়িয়ে আছে তার গাড়ির পাশে। শোভন বুঝতে পারল না এটা আবার কিসের আলামত। নীলিমা হঠাৎ করে কোথায় যেতে চায়? ওর তো কোনো রিলেটিভও নেই আমেরিকার কোথাও। আর মুনার বাসায় যেতে হলে এত বড় সুটকেস কেন? সে গাড়ি থেকে নেমে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘নীলি, কোথায় যাচ্ছো তুমি? Where are you going?’
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
শোভনের বুঝতে বাকি রইল না কী ঘটতে যাচ্ছে? সে দু’য়ে দু’য়ে চার মিলিয়ে নিল। কিন্তু এখনো বুঝতে পারছে না, কলকাঠিটি কে নাড়ল কোথা থেকে। সে অস্থির হয়ে বলল, ‘You can’t go like this. Oh, come on!’
‘It’s too late Shovon! অনেক দেরী হয়ে গেছে…’ নীলিমা শীতল কণ্ঠে বলল।
শোভন অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল নীলিমার দিকে। তার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা সরল না।
নীলিমা বলল, ‘Can you do me a favor, সুটকেসটা ট্রাঙ্কে একটু তুলে দিবে?’
শোভনের কানে কোন কথা ঢুকছে না। সে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর নীলিমা নিজেই সুটকেসটি টেনে তোলার চেষ্টা করতেই শোভন সম্বিত ফিরে পেল। সে সুটকেসটি তুলে দিল পেছনের ট্রাঙ্কে।
‘থ্যাঙ্ক ইউ।’ বলল নীলিমা। সে গাড়িতে উঠে বসল। স্টার্ট দিয়ে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। শোভন রোবটের মত এগিয়ে গিয়ে দাঁড়াল জানালার পাশে।
নীলিমা তাকাল শোভনের দিকে। তারপর বলল, ‘দু’সপ্তাহের খাবার রান্না করা আছে ফ্রিজে। জানি তোমার পছন্দ নয়, তবুও রেখে গেলাম। ভালো থেকো।’
শোভনের ভঙ্গুর চেহারা থেকে মুখ ঘুরিয়ে সামনের দিকে তাকালো নীলিমা। তারপর বলল। ‘Enjoy your life the way you always wanted. You’re a free man! Have a nice life!’
নীলিমা আর কালক্ষেপণ না করে দ্রুত গাড়ি নিয়ে বের হয়ে গেল বাসার সামনের ড্রাইভওয়ে থেকে।
শোভন শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে থাকল নীলিমার চলে যাওয়ার দিকে। সে তাকিয়েই থাকল। কতক্ষণ এভাবে তাকিয়ে আছে সে নিজেও জানে না। হঠাৎ চোখ জ্বালা করতেই সে বুঝতে পারল তার চোখ ভিজে আছে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, কয়েক ফোটা তপ্ত অশ্রু টপ টপ করে ঝরে পড়ল তার চোখ থেকে।
(সমাপ্ত)
অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-৫)
পরেরদিন বিকেলে মুনা এলো নীলিমার সঙ্গে দেখা করতে। দরজা খুলে দিতেই মুনা ভিতরে ঢুকল এবং সাথে সাথেই বলল, ‘কিরে এরই মধ্যে দেখি সিএনএন-এর হেডলাইনে চলে এসেছিস। তলে তলে এতদূর?’
‘দ্যাখ মুনা, সবসময় ভণিতা করবি না। ব্যাপারটা কী সেটা বল?’ ভ্রূ কুঁচকে নীলিমা বলল।
‘খবরের জন্ম দিয়েছিস আর নিজেই জানিস না?’
‘আহা, বাবা বল না, ব্যাপারটা কী?’
‘তোকে নাকি কবি সাহেবের হোটেল রুম থেকে বের হতে দেখেছে কেউ কেউ এবং খুবই আপত্তিকর অবস্থায়?’
‘কেউ কেউ এবং খুবই আপত্তিকর অবস্থায়!’ হতবাক হয়ে নীলিমা নিজেকেই বলল। তারপর মুনার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘হুম, ইন্টারেস্টিং। এ তো দেখছি তিলকে তাল নয়, রীতিমত কুমড়ো বানিয়ে ফেলেছে।’
‘শোভন ভাইয়ের কানে কথাটা গেলে উনিতো যুদ্ধ বাঁধিয়ে ফেলবেন। এখন কী করবি?’
‘আমি শোভনকে নিয়ে ভাবছি না। ভাবছি যাকে জড়িয়ে কথাটা রটানো হলো, উনি কী ভাববেন?’
নীলিমা জানালার কাছে গিয়ে বাইরে তাকাল। দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ চুপ করে। এই মুহূর্তে তার মনের ভিতরে একটা ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সে মেলাতে পারছে না—এভাবেও কথা ছড়াতে পারে। তার প্রচণ্ড মেজাজ খারাপ হলো এই কমিউনিটির মানুষজনের উপরে। সেই সাথে অভিমানও হলো। মুনার দিকে তাকিয়ে সে বলল, ‘কথাটা যেহেতু এভাবে রটেছে, তাহলে ব্যাপারটাকে জাস্টিফায়েড করা উচিৎ কি বলিস?’
নীলিমার কথা মুনা কিছুই বুঝতে পারল না। সে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তাকিয়ে থাকল নীলিমার মুখের দিকে।
মুনার প্রশ্নবোধক চোখের দিকে তাকিয়ে নীলিমা বলল, ‘ভাবছি সত্যি সত্যি আপত্তিকর কিছু একটা করলে কেমন হয়।’
‘আর ইউ আউট অফ ইয়োর মাইন্ড?’ মুনা তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া জানাল। সে বুঝতে পারছে না নীলিমা কী বলছে এসব?
‘চোখ কান খোলা রাখ। দেখ, সিএনএন হেডলাইনে আর কি কি নিউজ আসে। তুই আর কিছু বলবি?’
‘আমার কথায় রাগ করিস না। I’m your best friend, Neeli. I do care for you.’
‘I know dear. Don’t worry, I’ll handle it.’ নীলিমা হঠাৎ করেই খুব ইমোশনাল হয়ে পড়ল। সে আর কোনো কথা বলতে পারল না। উদাস নয়নে তাকিয়ে থাকল বাইরে।
মুনার খুব খারাপ লাগতে লাগল। সে চায়নি বিষয়টা নিয়ে কথা বলতে কিন্তু নীলিমাকে সাবধান করার জন্যেই সে এসেছিল। নীলিমা ওর একমাত্র ভালো বন্ধু এখানে। তাকে নিয়ে মানুষ কথা বলে বেড়াবে তা কি করে হয়। নীলিমাকে ওর চেয়ে ভালো আর কেউ চিনে বলে মনে হয় না। এমনকি শোভনও নয়। মুনা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়াল। তারপর কোনো কিছু আর না বলে প্রায় নিঃশব্দেই চলে গেল সে। পেছন থেকে দরজা বন্ধ হবার শব্দ পেয়ে ঘুরে তাকাল নীলিমা। ততক্ষণে মুনা চলে গেছে।
…
অফিসে ভীষণ ব্যস্ততায় কাটছে শোভনের সময়। লাঞ্চের পরেই তার বস ক্যাথলিনের সঙ্গে মিটিং ছিল। প্রায় একঘণ্টার মিটিং শেষ করে তার ডেস্কে ফিরে এলো সে। এবং এসেই তার মোবাইল ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল ৫টা মিসকল। কেউ একজন তাকে ৫বার ফোন করেছে!
ফোনটা হাতে নিয়ে ভাবতে ভাবতেই শোভনের অফিস ফোন বেজে উঠল। সে ফোন তুলে কলার আইডি দেখে বলল, ‘Hi sweetie!’
অপর প্রান্ত থেকে রিনরিনে কণ্ঠে কেউ একজন বলল, ‘Aren’t you supposed to see me today?’
‘I’ve been really busy today, but I’ll be coming in an hour, ok haan?’
‘One hour?’
‘Ok, 30 minutes, how’bout that?’
‘Ok!’
শোভন ফোন কেটে দিয়ে কিছু একটা ভাবল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ফোন করল নীলিমাকে।
নীলিমা তখনও দাঁড়িয়ে ছিল জানালার পাশে। তার মনটা ভারী হয়ে আছে। অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনটা ধরল সে।
ওপাশ থেকে শোভন বলল, ‘এই শোনো, আমার ফিরতে একটু দেরী হবে। অফিসের কাজে ভীষণ ব্যস্ত আজকে। কাজের শেষে আবার যেতে হবে এক ক্লায়েন্টের সাথে দেখা করতে। বেশি রাত হলে তুমি খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ো। আমার জন্যে বসে থেকো না।’
নীলিমা চুপ করে শুনল। শোভন আবার বলল, ‘কী যে করো না, বাংলাদেশের মায়েদের মতো না খেয়ে বসে থাকা। এসব কী বাজে অভ্যাস। এটা আমেরিকা—এখানে কেউ কারো জন্যে না খেয়ে বসে থাকে না। তোমার যখন খিদে পাবে খেয়ে নিবে। ব্যাস।’
নীলিমা কিছুই বলল না। একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে চুপ করে রইল।
শোভন বলল হ্যালো। কোনো সাড়া না পেয়ে ফোন রেখে দিলো সে।
নীলিমা অনেকক্ষণ ফোন হাতে দাঁড়িয়ে রইল। সে জানে শোভন দেরী করে ফেরার যে অজুহাত দিলো সেটা মিথ্যা। শোভনের যে কাজ সেখানে অফিসের নির্দিষ্ট সময়ের বাইরে ক্লায়েন্টের সঙ্গে দেখা করতে হয় না। ইদানীং সে প্রায় এই অজুহাতটি দেয়। নীলিমার স্বভাবের বাইরে বলেই সে এ বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলে না।
হঠাৎ করেই নীলিমা খুব অসহায় বোধ করতে লাগল। তার মায়ের কথা মনে পড়ল। ইচ্ছে হচ্ছে তার মা-কে জড়িয়ে ধরে বলে, এই দেখো মা আমি কেমন আছি—কত সুখে আছি? বলেছিলে না, তুই অনেক সুখে থাকবি? স্বপ্নের আমেরিকায় আমি কেমন সুখে আছি একবার দেখে যাও মা। ভাবতে ভাবতেই নীলিমার চোখ ভিজে উঠল।
দীর্ঘ সময় পাড় হলো। কিন্তু মনের অস্থিরতাটা কিছুতেই কাটছে না নীলিমার। এই মুহূর্তে তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে তার প্রিয় কবির সংগে কিছুক্ষণ কথা বলতে। তার সাথে কথা বললে কি অস্থিরতাটা একটু কমবে? নীলিমা তার হাতের ফোনের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। কী ভেবে ফোন করল হোটেল গার্ডেন ইনে।
ফ্রন্ট ডেস্কের রিসেপশনিস্ট ফোন ধরতেই নীলিমা বলল, ‘Can I get transferred to room 724 please?’
‘Just a moment please.’ বলেই রিসেপশনিস্ট লাইন বদলি করে দিল ৭২৪ নাম্বার রুমে।
কয়েকবার রিং বাঁজার পর মাহমুদ সাহেব ফোন ধরলেন।
‘আপনার কি অনেক ব্যস্ততা আজকে? কোথাও যাচ্ছেন?’ অপরপ্রান্তে মাহমুদ সাহেব ফোন ধরা মাত্রই অস্থির হয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘কেন বলতো?’
‘আপনার সঙ্গে আমার কিছু কথা ছিল।’
‘দেখা করতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে চলে এসো। আমি তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি।’
‘আমি না আসা পর্যন্ত আপনি কোত্থাও যাবেন না।’
মাহমুদ সাজ্জাদ হেসে ফেললেন। মেয়েটি এমন ভাবে অধিকার নিয়ে কথা বলে যে মায়াই লাগে। তিনি বললেন, ‘তুমি না আসা পর্যন্ত আমি কোত্থাও যাবো না।’
ফোন রেখে দিয়ে নীলিমা বাথরুমের বেসিনে ঠাণ্ডা পানির ট্যাপ ছেড়ে দিল। বেশ কিছুক্ষণ ঠাণ্ডা পানির ঝাপটা দিল মুখে। তারপর ঝটপট তৈরী হয়ে বের হয়ে গেল বাসা থেকে।
গাড়ি চালাতে চালাতে নীলিমা ঠিক করল আতিক ভাইর সঙ্গে দেখা করে যাবে। সে আজ একবার ফোন করেছিলেন, বলল জরুরী কথা আছে সময় করে কলব্যাক করতে। তাকে কলব্যাক করা হয়নি। যেতে পথেই তার কনভিনিয়েন্ট স্টোরটা পড়বে। বরং সামনাসামনিই শোনা যাক কী কথা। দশ মিনিটের মাথায় নীলিমা পৌঁছে গেল আতিকুর রহমানের গ্যাস স্টেশন কাম কনভিনিয়েন্ট স্টোরের সামনে। গাড়ি পার্ক করে ভিতরে ঢুকতেই নীলিমা দেখল আতিক সাহেব কথা বলছেন একজন কাস্টমারের সঙ্গে। কথা শেষ হতেই নীলিমা এগিয়ে গিয়ে বলল, ‘আতিক ভাই, স্লামালাইকুম।’
মাথা না তুলেই তিনি সালামের উত্তর দিলেন, ‘ওয়ালাইকুমস্লাম।’ তারপর তাকিয়ে দেখলেন নীলিমা দাঁড়িয়ে সামনে। তিনি হেসে দিয়ে বললেন, ‘আরে নীলিমা, এসো।’
‘কি ব্যাপার জরুরী তলব?’
‘বলছি। জাস্ট এ মিনিট। চলো, অফিস রুমে বসে কথা বলি। কফি খাবে?’
‘আজকে না। আরেকদিন খাবো। আজ একটু তাড়া আছে।’
‘ঠিক আছে। এসো।’
আতিকুর রহমান তার অফিস রুমে গিয়ে ঢুকলেন। নীলিমা হেঁটে এলো পিছনে। আতিক সাহেব বললেন, ‘বসো।’
নীলিমা বসতেই তিনি বললেন, ‘তারপর বলো, কেমন আছো?’
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। বসে রইল চুপ করে। আতিকুর রহমান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে নীরবতা ভাঙলেন। তিনি বললেন, ‘এসব কী শুনছি নীলিমা?’
নীলিমা মাথা তুলে তাকাল আতিকুর রহমানের দিকে। তারপর অসহিষ্ণু ভাবে বলল, ‘তাহলে এ জন্যেই ডেকেছেন? আমি বুঝতে পারছিনা হোয়াই দিস হ্যাজ বিকাম সাচ অ্যা বিগ ডিল? আচ্ছা আতিক ভাই, আপনি তো মাঝে মাঝে আমার বাসায় যান আমার খোঁজখবর নেবার জন্যে। শোভন হয়তো বাসায়ও থাকে না অনেক সময়—তারমানে কি আপনার সাথে আমার সম্পর্ক? কেউ কারো সাথে দেখা করলে, খোঁজখবর নিলেই কি কিছু হয়ে যায়? ব্যাপারটা কি এতই সহজ?’
আতিকুর রহমান থতমত খেয়ে তাকিয়ে রইলেন নীলিমার মুখের দিকে। তিনি বুঝতে পারেন নি নীলিমা এভাবে রিয়্যাক্ট করবে। তার চোখে-মুখে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। নীলিমা আবারো বলল, ‘আমি ভাবতে পারছিনা মানুষের মন এতো নোংরা হয় কী করে? আবার এরাই কিনা করছে সুস্থ সংস্কৃতির চর্চা। সুস্থ সংস্কৃতি—হাহ! পরচর্চা করে যাদের এত আনন্দ, তারা কাব্য জলসা না করে পরনিন্দা জলসা করলেই তো পারে। দর্শকের অভাব হবে না, হল ভরে যাবে দর্শকে।’
‘এত উত্তেজিত হলে তো চলবে না। মাথা ঠাণ্ডা করে আমাকে ব্যাপারটা খুলে বলো।’
দীর্ঘ সময় চুপ করে থাকল নীলিমা। তারপর ধীরে ধীরে সব ঘটনা খুলে বলল।
…
শোভন অনেকক্ষণ থেকে বসে বসে ভাবছে কী করে কাজ থেকে কয়েক ঘণ্টা আগে বের হওয়া যায়। ইতোমধ্যেই সে বেশ কয়েকবার বিভিন্ন রকমের কারণ দেখিয়ে কাজ থেকে ছুটি নিয়েছে। আজকে কী বলবে সে ভেবে পাচ্ছে না। কিছুক্ষণ চিন্তা করে সে গেল তার ম্যানেজারের রুমে।
ক্যাথলিন ফোনে কথা বলছিল। হাত ইশারায় শোভনকে বসতে বলল। কথা শেষ করে ক্যাথি শোভনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘What’s up?’
‘My wife is sick. She’s not feeling good. I’m taking rest of the day off.’ চেহারার মধ্যে যথাসম্ভব করুণ একটা ভাব ফুটিয়ে কথাগুলো বলল শোভন।
শোভনের এভাবে প্রায়ই হুট-হাট করে চলে যাওয়াটা ক্যাথির পছন্দ না। তাছাড়া ওর কাজের গতিও আগের মতো নেই। কেন যেন সময় মতো কোনো এসাইনমেন্ট শেষ করতে পারছে না। ক্যাথি এর আগে একবার জিজ্ঞেস করেছিল, সমস্যাটা কী? কিন্তু শোভন কোনো গ্রহণযোগ্য উত্তর দিতে পারেনি। শুধু বলেছে এরপর থেকে অফিসের কাজে আরো মনোযোগী হবে সে। কিন্তু তেমন অগ্রগতি ক্যাথির চোখে পড়ছে না। ক্যাথি কিছুটা বিরক্তি নিয়েই বলল, ‘Don’t you already owe me a bunch of hours?
‘Yes, I know. Don’t worry Kathy, I’ll make my time up.’
স্ত্রীর অসুস্থতার অজুহাতে কোনো স্বামী মিথ্যে বলবে, কোনো বসই হয়তো সেটা ভাববে না। শোভন সে সুযোগটাই নিল। ক্যাথি বলল, ‘Ok, go home. Make sure you take good care of her.’
‘Of course, I will.’ শোভন বের হয়ে এলো ক্যাথির রুম থেকে। রুমের বাইরে এসে বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। তারপর দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে গেল।
…
সেদিন হোটেলের লবিতে নীলিমা এবং কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে জামানের দেখা হয়েছিল সে বিষয়টি পরিষ্কার করে বুঝিয়ে বলল নীলিমা আতিকুর রহমানকে। সব কথা শুনে তিনি বললেন, ‘ঠিক আছে, ব্যাপারটা আমি দেখছি। তুমি এ নিয়ে একটুও ভাববে না।’
নীলিমার শঙ্কা তবু কাটল না। সে বলল, ‘শোভন ব্যাপারটা জানলে কী যে করবে… জানেনই তো ওর মেজাজ কেমন?’
‘আমি ভেবে অবাক হই, শোভনকে এখনো তুমি যেভাবে কেয়ার করো, প্রিভিলেজ দাও, অথচ সে যদি একবারও তোমার কথা ভাবতো। একটা ট্যালেন্টেড মেয়ে কীভাবে হারিয়ে যাচ্ছে।’ আতিকুর রহমান আফসোস করে বললেন।
নীলিমা কিছু বলল না। আতিক সাহেব আবার বললেন, ‘একটা কথা তোমাকে বলা দরকার। জানিনা কথাটা তুমি কীভাবে নেবে।’
‘আতিক ভাই, আমি জানি আপনি কী বলতে চান—তবুও শুনি, বলুন।’
একটু ইতস্তত করে আতিকুর রহমান বললেন, ‘একটা কিউবান মেয়ে কি যেন নাম, মার্সা। হ্যাঁ ঐ মেয়েটির সঙ্গে শোভনের সম্পর্কের ব্যাপারটা কমিউনিটির অনেকেই বলাবলি করে, শুনতে খারাপ লাগে। ওদের দুজনকে নাকি একসাথে ঘুরতেও দেখেছে অনেকে। কিছু মনে করো না, তোমাকে পছন্দ করি বলেই বলছি। তুমি ওকে একটু বোঝাও।’
‘সে চেষ্টা কি আর করিনি। But, he does not find me attractive anymore! আমার প্রয়োজন হয়ত ফুরিয়ে গেছে ওর কাছে। অবশ্য প্রয়োজন ছিলই বা কবে? আমিতো গেঁয়ো। গায়ে দেশের গন্ধ। এতদিনেও আমেরিকান হতে পারিনি। আসলে সাদা চামড়ার মোহে ও এখন আচ্ছন্ন হয়ে আছে। অন্ধ হয়ে গেছে।’
আতিকুর রহমান আর কিছু বললেন না। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে তারও ভালো লাগছে না। সে অস্বস্তি নিয়ে অন্য দিকে তাকালেন।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে নীলিমা বলল, ‘আমি এখন আসি আতিক ভাই।’
আতিকুর রহমান ঘুরে তাকাল।
নীলিমা উঠে দাঁড়াল এবং আতিকুর রহমান কিছু বলার আগেই দ্রুত বের হয়ে গেল তার ষ্টোর থেকে।
…
শোভন অফিস থেকে বের হয়েই সোজা চলে গেল মার্সার এপার্টমেন্টে। মায়ামি ডাউনটাউনের ওর অফিস থেকে মাত্র বিশ মিনিট দূরেই একটা স্টুডিও এপার্টমেন্টে একা থাকে মার্সা। মার্সার জন্ম ও বেড়ে ওঠা মায়ামি শহরেই। ওর বাবা-মা কিউবান অভিবাসী—মায়ামিতে এসেছেন প্রায় ২৫ বছর আগে।
২২ বছর বয়সী মার্সা কলেজ ড্রপ আউট। নিজের পরিবারের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজের মতো থাকছে। কাজ করে মায়ামি বিচ সংলগ্ন একটা রেস্টুরেন্টে ওয়েট্রেস হিসেবে। সাত-আট মাস আগে মার্সার সঙ্গে পরিচয় ঘটে শোভনের। একদিন দুপুরে অফিস কলিগদের সঙ্গে লাঞ্চ খেতে এসে দেখা হয় মার্সার সঙ্গে। রেস্টুরেন্ট ওয়েট্রেস মার্সা শোভনদের টেবিলে অর্ডার সার্ভ করতে এসে পানির গ্লাস ফেলে দেয়। মুহূর্তেই মার্সার চেহারা বদলে যায়। সে তাৎক্ষণিক ক্ষমা প্রার্থনা করে। লজ্জা আর ক্ষমার মিশ্রণের এক চিলতে হাসি দিয়ে মার্সা দ্রুত পরিস্থিতি সামলে নেয়। এরপর থেকে শোভন প্রায়ই এই রেস্টুরেন্টে খেতে আসত মার্সার সঙ্গে যাতে দেখা হয়। বিষয়টি মার্সার দৃষ্টি এড়ায় না। ঐ সময়ে মার্শার বয়-ফ্রেন্ডের সঙ্গে ব্রেক-আপ সেইসাথে চলছিল টাকা-পয়সার টানাটানি। চতুর শোভন বুঝতে পেরে সেই সুযোগটাই কাজে লাগায়। নিজেকে সিঙ্গেল হিসেবে পরিচয় দিয়ে মার্শার সাথে সম্পর্ক তৈরী করে। সেই সম্পর্ক ধাপে ধাপে এমন এক পর্যায়ে চলে এসেছে সেখান থেকে বের হয়ে যাওয়া সহজ সাধ্য নয়।
শোভনের কাছে মার্শার এপার্টমেন্টের সিকিউরিটি কোড আছে। সে কোড টিপে ঢুকে পড়ল মেইন গেট দিয়ে। এলিভেটর দিয়ে উপরে উঠে হলওয়ে দিয়ে কিছুদূর এগিয়ে চলে এলো মার্শার রুমের সামনে। দরজায় টোকা দিতেই হাসি হাসি মুখ করে দরজা খুলে দিল মার্শা।
শোভন ভিতরে ঢুকেই মার্শাকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘Marsha, my sweet heart!’ বলেই তার ঠোঁটে গভীর চুম্বন দিলো।
মার্শা শোভনকে ছাড়িয়ে নিয়ে কপট রাগ করে বলল, ‘What made you so late, I’ve been waiting for… since who knows how long, since morning.’
‘I know honey. Been busy at work, you know?’
‘You must be thirsty; can I get you something to drink? How bout a cold beer or gin and tonic?’
‘I’m thirsty and hungry. Bring me a super cold beer and a super hot Marsha. I’m heading to bedroom.’ চোখ টিপে কিছু একটা ইঙ্গিত দিয়ে শোভন বেডরুমে দিকে হেঁটে গেল।
মার্শা হেসে দিয়ে চলে গেল কিচেনে। ফ্রিজ থেকে একটা বরফ শীতল বিয়ারের ক্যান নিয়ে ঢুকল বেডরুমে।



