Abinashi-Shabdo-Rashi

অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-৪)

পৃথিবীর বিখ্যাত মায়ামি বিচ সম্পর্কে কিছু কথা বলা যেতে পারে।
মায়ামি বিচ হচ্ছে দক্ষিণ ফ্লোরিডার একটি দ্বীপ শহর। উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের সবুজাভ জলঘেরা তীরই মায়ামি বিচ। দুটো শহরকে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত করেছে একদিকে মায়ামি নদীর ওপর তৈরি হওয়া কলিন্স ব্রিজ আর অন্য দিকে ক্যানেলের ওপরে তৈরি হওয়া ইন্ডিয়ান ক্রিকব্রিজ। বিশাল জলাশয়ের দু’পাশে গড়ে উঠেছে অপূর্ব সুন্দর শহর, যেন সাজানো গোছানো ভিডিও গেমের কোনো শহর। একের পর এক উঁচু দালান, তাদের দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যেও যেন কোনো ছন্দ আছে। স্বচ্ছ কাচে ঘেরা দালানগুলো, তার প্রতিচ্ছবি পানিতে পড়ে এক মুগ্ধতা তৈরি করে। আর ক্যানেল মানেই কোনো এলোপাথাড়ি কিছু নয়। দু’পাশে শান বাঁধানো ঘাট। ঝিরিঝিরি পানির নীরবে বয়ে চলার ঝলক যেন কোনো রমণীর গলার হার। মাঝে মাঝে সাদা প্রাইভেট বোট, রিভার ক্রুজগুলো সৌন্দর্য আরও বাড়িয়ে দেয়।
পর্যটকদের জন্য রয়েছে বিচের দুটো অংশ। উত্তর এবং দক্ষিণ মায়ামি বিচ। দক্ষিণ বিচটাই মূলত বিখ্যাত এবং আকর্ষণীয়। এখানে যেমন জমে ওঠে বিলাসী পর্যটকদের আনাগোনা, তেমন পৃথিবীর সব বিখ্যাত সেলিব্রেটিদের অবসর যাপন থেকে শুরু করে চলে মনোহর সিনেমা জগতের নির্মাণকাজ।
এবার মূল গল্পে ফেরা যাক।
অফিস থেকে শোভন ফোন করল বাসায়। কয়েকবার রিং বাজল। কোন সাড়া না পেয়ে সে ফোন করল নীলিমার মোবাইল ফোনে।
মুগ্ধতায় ঘেরা ফ্লোরিডার বিখ্যাত মায়ামি বিচের তীর ঘেঁষে দাঁড়ানো একটা মনোরম রেস্টুরেন্টের ব্যালকনিতে মুখোমুখি বসে আছে নীলিমা আর মাহমুদ সাজ্জাদ। দুজনেই খাবারের মেনুতে চোখ বুলাচ্ছে। এমন সময় নীলিমার ফোন বেজে উঠল। সে ফোনটা কাছে নিয়ে দেখল শোভনের নাম। উত্তর না দিয়ে ফোন বন্ধ করে রেখে দিল নীলিমা।
মাহমুদ সাহেব উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলেন, ‘কার ফোন ছিল?’
‘শোভনের।’
‘ফোন ধরলে না যে?’
‘ধরে কি বলবো, আমি কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে সমুদ্রের পাড়ে মনোরম একটি রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ করছি?’
‘ওকে তুমি বলে আসনি?’
‘আপনার কি ধারণা, আমি ওকে বললাম—আমি আজ কবি সাহেবের সঙ্গে তার হোটেলে দেখা করতে যাবো, আর ও সানন্দে রাজী হয়ে গেল?’
‘না তুমি বলেছিলে কিনা, ও আসতে চেয়েছিল, শেষ মুহূর্তে মাইন্ড চেঞ্জ করেছে… তাই, ভাবলাম সে হয়তো জানে। আমার অবশ্য বোঝায় ভুলও হতে পারে।’
নীলিমা সে কথার কোন উত্তর না দিয়ে সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে থাকল। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে ব্যালকনিটার ঠিক নিচেই। ভর দুপুরে কি জোয়ার আসে? তাহলে ঢেউগুলো এত বড় কেন? নীলিমার নিজের মধ্যেও এমন উথাল-পাথাল ঢেউ আসে যায় সকাল-দুপুর-সন্ধ্যা-রাত, সেই অশান্ত মনের ঢেউ কেউ কি কখনো দেখে? আকাশের বিশালতা আর সাগরের শত ঢেউ সবাই দেখে—শুধু মানুষের ভিতরের কষ্টের নীল ঢেউটা কেউ দেখেনা।
মাহমুদ সাহেব নীলিমার দিকে কয়েকবার তাকালেন। অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকায় তার মনের অবস্থা কিছু বোঝা যাচ্ছে না। তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অদূরে দাঁড়ানো ওয়েটারকে ডেকে খাবারের অর্ডার দিলেন।
নীলিমার দৃষ্টি অনুসরণ করে মাহমুদ সাহেব তাকালেন সমুদ্র সৈকতে। চোখ ঘুরিয়ে দেখলেন চারিদিকটা। ছোট ছোট বাচ্চারা দৌড়াদৌড়ি করছে। একবার পানিতে যায়, ঢেউ আসলে দৌড়ে পাড়ে চলে আসে। আবার কেউ কেউ বালি দিয়ে উঁচু করে ঢিবির মত কিছু একটা বানাচ্ছে। কেউ বানাচ্ছে ক্যাসল হাউজ। কিছুক্ষণ পর পর ঢেউ এসে সেগুলো ভেঙে দিয়ে যাচ্ছে। বাচ্চাগুলো প্রবল উৎসাহে আবার বালির ঢিবি বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ছে। সার্ফাররা সার্ফিং করছে। কয়েকজন ছেলে-মেয়ে খেলছে বিচ ভলিবল।
একটা লম্বা কাপড়ের বিজ্ঞাপন লেজের সঙ্গে বেধে নিয়ে আকাশে চক্কর দিচ্ছে একটা ছোট্ট প্লেন। কিছুক্ষণ পর পর সে ফিরে আসছে পর্যটক এবং সমুদ্র বিলাসী মানুষগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে।
একটা যুবতী মেয়ে কাঁধে ব্যাগপ্যাক ঝুলিয়ে নিবিষ্ট মনে একটার পর একটা ছবি তুলে যাচ্ছে। একটা করে ঢেউ আসে, ঢেউয়ের সঙ্গে যা উঠে আসছে—স্টার ফিশ, জেলি ফিশ, শামুক-ঝিনুক, সামুদ্রিক লতা-পাতা সব কিছুই ক্যামেরা বন্দি করছে সে। হয়ত কোনো রিসার্চ পেপার তৈরী করতে হবে সে জন্য নাকি অন্য কোনো কারণে কে জানে।
সৈকতে ছেলেদের তুলনায় মেয়েদের সংখ্যাই বোধ হয় বেশী। বেশিরভাগ মেয়েরাই শরীর উন্মুক্ত করে বালির মধ্যে শুয়ে রয়েছে। মাত্র দু’চিলতে কাপড় ছাড়া তাদের শরীরে আর কিছুই নেই। প্রকৃতির খোলা হাওয়ায় সম্পূর্ণরূপে মুক্ত করে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে রৌদ্রস্নান করছে। কেউ নানা রঙের ছাতার নিচে বসে বই পড়ছে। সমুদ্রের গর্জন, মানুষের হৈ-চৈ কোনো কিছুই তাদের ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে না।
এসব দেখতে দেখতে কবি মাহমুদ সাজ্জাদের একটা উপলব্ধি হলো—কি অদ্ভুত সম্মোহনী ক্ষমতা এই সমুদ্রের। এর সৈকত, বালি আর পানি মানুষকে টেনে রাখে বহুক্ষণ৷
দুপুর গড়িয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই। রোদের তেজ নেই। সমুদ্রের বাতাসে শাড়ির আচল আর চুল উড়িয়ে নীলিমা হাঁটছে সৈকতের তীর ঘেঁষে তার প্রিয় কবির পাশে পাশে। আকাশে মেঘ করেছিল—মেঘটা কেটে গেছে। সেই সাথে কেটে গেছে তার মনের মেঘ। এই মুহূর্তে তার জীবনের একটা অন্যরকম ভালোলাগার সময় কাটাচ্ছে তার প্রিয় মানুষের সান্নিধ্যে। বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ হাটার পর নীরবতা ভাঙল নীলিমা। সে ঘাড় ঘুরিয়ে কবির মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কী ভাবছেন?’
‘উম, তেমন কিছু না।’
‘আজ ক’ তারিখ জানেন?’ নীলিমা বলল।
কিছুক্ষণ ভেবে নিয়ে মাহমুদ সাহেব বললেন, ‘৩ তারিখ। ৩রা জুন।’
‘৩রা জুন কবিতাটাও আমার খুব প্রিয়। একটু শোনাবেন?’
মাহমুদ সাহেব আবৃত্তি শুরু করলেন।
‘ওগো সুন্দরী, মনে আছে কাল ৩রা জুন?’
সেকি ভুলে গেছো, তুমিতো দেখছি সাংঘাতিক…’
নীলিমা হেসে দিয়ে পরের দু’লাইন জুড়ে দিল।
‘তুমি যা বলছো স্বীকার করছি, ইয়েস স্যার
বিয়ে আমাদের হয়নি এবং হবেও না…’
কবি: ‘তাতে কি হয়েছে? মনে মনেই তুমি পার্বতী
৩রা জুনের বিকেল থেকেই, সেটাতো ঠিক?’
নীলিমা: ৩রা জুনেই প্রথম উঠল ঘূর্ণিঝড়…
কবি: ৩রা জুনেই প্রথম প্রবল বৃষ্টিপাত…
নীলিমা: আকাশে আতর ছুঁড়ল, প্রথম কদম ফুল…
কবি: একটি রুমালে তোমার হাত ও আমার হাত।
মাহমুদ সাহেব অবাক হয়ে বললেন, ‘আরে তুমিতো ভাল আবৃত্তি করো।’
‘বাড়িয়ে বলার কোন প্রয়োজন নেই। এটাকে ভাল আবৃত্তি বলে না।’ নীলিমা লজ্জা পেয়ে বলল।
‘তাহলে কী বলে?’
নীলিমা হঠাৎ করেই দাঁড়িয়ে পড়ল। তারপর ঘুরে বলল, ‘চলুন ফেরা যাক।’

জামান অনেকক্ষণ থেকে হোটেল গার্ডেন ইনের লবিতে বসে অপেক্ষা করছে মাহমুদ সাহেবের জন্যে। কিন্তু তিনি কখন ফিরবেন কিছু বোঝা যাচ্ছে না। ফ্রন্ট ডেস্ক থেকে নির্দিষ্ট করে কিছুই জানাতে পারল না। মাহমুদ সাহেবের কাছে কোনো মোবাইল ফোন না থাকায় কিছু জানাও সম্ভব হচ্ছে না—তিনি কোথায় গেছেন কার সাথে গেছেন। অথচ জামানের সঙ্গে সকালেই কথা হয়েছে সে সন্ধ্যায় এসে তাকে নিয়ে যাবে রাতের ডিনার করাতে। দেশ থেকে যখন কোনো শিল্পী অথবা কবি-সাহিত্যিক আসেন তারা সাধারণত স্থানীয় সংগঠকদের কিংবা অনুষ্ঠান সংশ্লিষ্ট কাউকে না জানিয়ে অন্য কারো সঙ্গে কোথাও যান না। জামান একটু চিন্তায়ই পড়ে গেল—তাহলে তিনি গেলেন কোথায়?
হোটেল গার্ডেন ইনের সামনে গাড়ি পার্ক করল নীলিমা। মাহমুদ সাহেব বের হয়ে বিদায় নিয়ে চলে যেতে চাইলে নীলিমা বলল, ‘একটু দাঁড়ান, আমিও আসছি।’ সে মনে মনে ভাবল, এতটুকু ভদ্রতা করা যেতেই পারে। অন্তত হোটেলের মেইন গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসাটা সমীচীন হবে। নীলিমা হেঁটে এগিয়ে গেল মাহমুদ সাহেবের সঙ্গে হোটেল লবি পর্যন্ত। এবং সেখানে যেয়েই দেখতে পেল জামান দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ বড় করে জামান দেখল মাহমুদ সাহেবের পাশে হেঁটে আসা নীলিমাকে। তার মাথায় ঢুকছে না, ব্যাপারটা কী হতে পারে। নীলিমার সঙ্গে মাহমুদ সাহেবের সংযোগ কিভাবে হলো। কিংবা সম্পর্কটাই বা-কী? সে চিন্তিত মুখে তাকিয়ে রইল।
নীলিমা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। সে জামানকে দেখেই তাকাল মাহমুদ সাহেবের দিকে। তিনি চোখের ইশারায় অভয় দিলেন নীলিমাকে। নীলিমা ইতস্তত করে বলল, ‘আমি বরং এখন যাই।’
‘চলো, তোমাকে এগিয়ে দিয়ে আসি।’
‘না না তার দরকার হবে না।’
‘ঠিক আছে তাহলে, পরে কথা হবে। ড্রাইভ সেফ।’
নীলিমা আর কথা না বাড়িয়ে দ্রুত চলে গেল তার গাড়ির কাছে। কয়েক মুহূর্তে থমকে দাঁড়িয়ে ভাবল কিছু। তাকাল হোটেল লবির দিকে। কাউকে দেখতে পেল না। সে বিলম্ব না করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বের হয়ে গেল হোটেল পার্কিং থেকে।
নীলিমা চলে যেতেই মাহমুদ সাহেব এগিয়ে গেলেন জামানের সামনে। কিছুটা অবাক হবার ভঙ্গিতে বললেন, ‘আরে জামান সাহেব, আপনি কতক্ষণ?’
‘এইতো মিনিট বিশেক হবে।’ হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে জামান বলল।
‘আজ রাতে আবার কোথায়?’
‘আতিক ভাইয়ের বাসায় বারবিকিউ ডিনার।’
‘যেতেই হবে?’
জামান কী বলবে বুঝতে পারল না। সে বোকার মত হেসে বলল, ‘সবাই অপেক্ষা করছে।’
‘সবার সঙ্গেই তো দেখা হয়েছে কয়েকবার।’ একটু চুপ করে থেকে মাহমুদ সাহেব আবার বললেন, ‘ঠিক আছে, আপনি একটু অপেক্ষা করুন। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।’
মাহমুদ সাহেব হেঁটে গিয়ে এলিভেটরে উঠলেন। এলিভেটরের দরজা বন্ধ হতেই জামান তার হাতের ফোন নিয়ে ফোন করল কমিউনিটির নেতা গোছের কাউকে। অপরপ্রান্ত থেকে ভদ্রলোক ফোন ধরতেই জামান বলল, ‘কে কবির ভাই, গরম খবর আছে।’
‘আরে জামান? খুব এক্সাইটেড মনে হচ্ছে। বলো কী খবর?’ কবির ভাই বললেন।
‘আরে শোনেন কী হয়েছে। আমি আসছি মাহমুদ ভাইকে নিতে তার হোটেলে, ডিনারে নিয়ে যাবো বলে। যা দেখলাম, আমারতো চোখ ছানাবড়া। না দেখলে বিশ্বাস করবেন না।’
‘বুঝলাম না। মানে কী?’
‘মানে তো ফোনে বুঝানো যাবে না। রাত্রে আসতেছি বাসায়। ঘুমায়েন না।’
‘মনে হচ্ছে ইন্টারেস্টিং কিছু। আমি জেগেই থাকব, তুমি এসো কিন্তু।’
লাইন কেটে দিয়ে ফোন হাতে কিছুক্ষণ বসে রইল জামান। একধরনের অস্থিরতা এসে ভর করেছে তার ওপর। সে এবার ফোন করল মুনার স্বামী সাগরকে। অপর প্রান্ত থেকে ফোন ধরতেই জামান বলল, ‘কে সাগর? আচ্ছা, শোভন ছেলেটার ওয়াইফ নীলিমা, মুনার ফ্রেন্ড তাইনা?’
‘হ্যাঁ। কেন জামান ভাই?’ সাগর অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।
‘আছে, ইন্টারেস্টিং একটা ঘটনা আছে… তুমি কিন্তু মুনাকে কিছু বলতে পারবা না, প্রমিজ?’
‘আচ্ছা, ঘটনাটা কী বলেন শুনি?’
জামান ঘটনার বর্ণনা দেয়ার আগে মনে মনে গুছিয়ে নিল কী বলবে আর ঠিক তখনই দেখা গেল এলিভেটর থেকে মাহমুদ সাহেব বের হয়ে আসছেন। জামান ফিস ফিস করে বলল, ‘শোন, আমি তোমাকে পরে কল দিবো। একটু রাত হইতে পারে। ঘুমায়ো না। আরে শহর গরম করা খবর আছে।’
সাগর আর কিছু বলার আগেই জামান ফোন কেটে দিল।
মাহমুদ সাহেব কাছে আসতেই জামান বলল, ‘রেডি?’
‘হ্যাঁ রেডি। চলুন।’
তারা হোটেল থেকে বের হয়ে গেল।

শোভন একটু রাতে করেই বাসায় ফিরল।
নীলিমা বিছানায় শুয়ে ছিল। সে উঠে রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে বিছানা থেকে নেমে কিচেনের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। শোভন বলল, ‘আমি খেয়ে এসেছি।’
নীলিমা একটু দাঁড়াল। কিছু না বলে কিচেনে গেল সে। ডাইনিং টেবিল থেকে তার নিজের জন্যে কিছু খাবার প্লেটে নিয়ে মাইক্রোওভেনে গরম করতে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। প্রতি রাতেই নীলিমা শোভনের জন্যে অপেক্ষা করে অন্তত রাতের খাবারটা যাতে একসাথে খেতে পারে। ওর একা খেতে ভালো লাগে না। কিন্তু দেখা যায় প্রায় রাতেই শোভন বাইরে থেকে খেয়ে আসে।
প্লেট নিয়ে সে টেবিলে বসে চুপচাপ খাচ্ছিল। কাপড় বদলে শোভন এসে একটা চেয়ার টেনে বসল নীলিমার সামনে। নীলিমা ভাবল ও বোধহয় মত বদলে খেতে এসেছে। শোভনের সামনে প্লেট এগিয়ে দিতেই শোভন বলল, ‘একবার তো বলেছি খেয়ে এসেছি।’
নীলিমা আর কিছু বলল না। মনে হচ্ছে কোনো কারণে শোভনের মেজাজ বিগড়ে আছে। তার মেজাজ যদিও ইদানীং প্রায়ই খারাপ থাকে। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়েও ঝামেলা করে।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে শোভন জিজ্ঞেস করল, ‘ফোন ধরো নি কেনো তখন?
নীলিমা কোনো উত্তর দিল না। চুপচাপ খেতে থাকল। শোভন আবারো বলল, ‘বাসার ফোনও ধরলে না, সেল ফোনও ধরলে না, ছিলে কোথায় তুমি?’
নীলিমা এবারো কিছু বলল না।
‘কথা বলছো না কেন?’ শোভন ধমকের স্বরে বলল।
‘একটু বিচের ধারে গিয়েছিলাম।’
‘কেন?’
‘এমনিই। বাসায় একা ভাল লাগছিল না তাই।’
‘তাহলে ফোন ধরে সেটা আমাকে জানালেই হতো। ফোন ছিল না সাথে?’
‘ছিল।’
‘তাহলে ধরো নি কেন?’
‘ধরতে ইচ্ছে করে নি।’
‘নাকি অন্য কোন অসুবিধা ছিল।’
নীলিমা বুঝতে পারছে না শোভন কী বলতে চাইছে। সে ভিতরে ভিতরে একটু শঙ্কিত হলো। তবে কি জামান ভাই কিছু বলেছে শোভনকে? একমাত্র সেই নীলিমাকে দেখেছিল কবি মাহমুদ সাজ্জাদের সঙ্গে হোটেলের লবিতে। তাই যদি হয় তবে শোভন ওর রাতের ঘুম হারাম করে দেবে। নীলিমা মনে মনে তৈরী হয়ে নিল।
‘কথা বলছ না কেন? বলো?’ শোভন এবার বেশ কঠিন স্বরেই জানতে চাইল।
নীলিমা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে। আজকে হার্ডবল প্লে করতে হবে। সে খাওয়া বন্ধ করে হঠাৎ করেই উত্তর দিল, ‘সব কথা তোমাকে বলতে হবে? তুমি বলো? তুমি কি করো, কখন কোথায় যাও, অফিস থেকে ফিরতে কেন দেরী হয়, আমাকে বলো? তাহলে আমার সব কথা তোমাকে বলতে হবে কেন?’
শোভন থতমত খেয়ে গেল। নীলিমার এমন আক্রমণাত্মক উত্তরের জন্যে সে একবারেই প্রস্তুত ছিল না। সম্পূর্ণ অচেনা কণ্ঠ। শোভন অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নীলিমার দিকে, তার চোখ দিয়ে যেন আগুন ঝরছে। সেই অগ্নি চক্ষুকে সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষা করে নীলিমা তার খাওয়া শেষ করে উঠে চলে গেল অন্য রুমে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Abinashi-Shabdo-Rashi

অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-৩)

ডিনার শেষে মাহমুদ সাহেবকে স্থানীয় সংগঠকদের একজন তার হোটেলে পৌঁছে দিয়ে গেছে বেশ কিছুক্ষণ আগেই। তাকে বেশ ক্লান্ত লাগছে। ঢাকা থেকে মায়ামির লম্বা প্লেন জার্নিতে এমনিতেই বেশ ধকল গেছে। তার উপর জেটল্যাগ এখনো কাটেনি। তিনি রুমে ঢুকেই হ্যান্ডপার্সটি বিছানার পাশের টেবিলে রেখে দিলেন। তারপর কাপড় বদলানোর সময় পাঞ্জাবীর পকেট থেকে কিছু কাগজ বের করে টেবিলের উপর রাখলেন। অনেকগুলো বিজনেস কার্ড, ভক্তদের দেয়া ফোন নাম্বারের ছোট ছোট কাগজের টুকরাগুলো ছড়িয়ে রাখলেন। হঠাৎ করেই চোখে পড়ল একটা কাগজ যেখানে মুনা আর নীলিমার ফোন নাম্বার লেখা। সে কাগজটি তুলে ধরলেন একবার চোখের সামনে। তারপর রেখে দিয়ে বাথরুমে ঢুকে হাত মুখ ধুয়ে এসে বাতি নিভিয়ে ঘুমিয়ে পড়লেন।
প্রত্যুষে নীলিমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। পর্দার ফাঁক গলে ভোরের সূর্যের আলো এসে নীলিমার চোখ ছুঁয়ে দিল। অভ্যাস মতো ঘুম চোখ রগড়ানোর জন্যে হাত তুলে চোখের কাছে নিতেই, নীলিমা তার ভেজা গালটা অনুভব করল। কিছুক্ষণ অবাক হয়ে এলোমেলো ভাবতেই মনে পড়ল কাল রাতের কথা। আর সেটা মনে পড়তেই ভোরের সতেজ মনটা মরে সেখানে জায়গা নিলো এক রাজ্যের বিষণ্ণতা। তখন খেয়াল করল সে, সারাটা রাত ঠিক করে শোয়নি পর্যন্ত সে, এককোণে পড়ে আকাশ পাতাল ভাবছিল। কাঁদছিল না, চোখ দিয়ে আপনাতেই জল গড়াচ্ছিল। কখন যে তারমধ্যেই চোখ লেগে গিয়েছিল টের পায়নি সে।
নীলিমা আপ্রাণ চায় শুয়ে পড়া মাত্রই তার দুচোখ জুড়ে ঘুম নেমে আসুক। মুক্তি মিলুক কুঁড়ে কুঁড়ে খাওয়া এই ভাবনার বেড়াজাল থেকে। কিন্তু চাইলেই ভাবনা থেকে মানুষের মুক্তি মেলে? যে কথা কাউকে বলা যায় না, সে কথার তো মনই আধার। ঘুরে ফিরে সে ভাবনা নিজেকেই কুঁড়ে খায়।
প্রতিদিনের রুটিন মাফিক সকালে উঠেই শোভনের জন্যে কফি আর সাথে হালকা নাস্তা তৈরী করে বসে থাকে নীলিমা। শোভন তৈরী হয়ে এসে নাস্তার প্লেট থেকে তড়িঘড়ি করে কিছু একটা মুখে দিয়ে কফির মগ নিয়ে কাজে চলে গেছে। নীলিমার কফি খাওয়ার অভ্যাস নেই। তার পছন্দ চা। সে দেশের মতই চা বানিয়ে নিয়ে বসে রইল চুপচাপ।
সকালে একটু দেরী করেই ঘুম ভাঙ্গল মাহমুদ সাজ্জাদের। শেষ রাতের দিকে তার একবার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ এপাশ ওপাশ করে সে উঠে পড়েছিল। কাগজ কলম নিয়ে একটি কবিতার কয়েকটি লাইন লিখে রেখেছে। রুমের ভিতর কিছুক্ষণ পায়চারী করে ভোরের দিকে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে।
ফোনের শব্দে মাহমুদ সাহেবের ঘুম ভেঙ্গে গেল। বেডসাইড টেবিল থেকে ফোনটা কানে নিয়ে হ্যালো বলতেই অন্য প্রান্ত থেকে জামানের কণ্ঠ শোনা গেল। জামান বলল, ‘মাহমুদ ভাই, উঠেছেন? রেডি হয়ে যান, আমি আপনাকে ঠিক এগারোটায় পিক করবো। মনে আছে তো আপনাকে নিয়ে আজ ডীপ সি ফিশিং-এ যাচ্ছি? তারপর বিকেলে ফিরে এসে বোট রাইড। অনেক এলিগেটর দেখতে পাবেন।’
‘আজ শরীরটা বেশী ভাল না।’ বললেন মাহমুদ সাহেব, ‘আজ থাক, কাল পরশু না হয় যাই?’
জামান একটু ভেবে নিয়ে বলল, ‘তাহলে দুপুরে এসে আমি আপনাকে লাঞ্চে নিয়ে যাবো। ঠিক আছে, আপনি রেস্ট নিন।’
‘না না আমাকে নিয়ে ব্যস্ত হতে হবে না। আমি রুম সার্ভিসে অর্ডার করে কিছু খেয়ে নেবো। আপনি বরং অন্যদেরকে বলে দেবেন, আমি আজ বের হবো না।’
‘আচ্ছা ঠিক আছে। আমি না হয় বিকেলের দিকে একবার খোঁজ নেবো।’
‘ধন্যবাদ।’ বলেই মাহমুদ সাহেব ফোন রেখে দিলেন।
ফোন রেখে দিয়ে বেড সাইড টেবিলে রাখা কাগজের টুকরোগুলো থেকে মাহমুদ সাহেব একটা কাগজ হাতে নিলেন। সেখানে দুটো ফোন নাম্বার লেখা আছে। একটা মুনার আর একটা নীলিমার। সে কলম দিয়ে নীলিমার নাম্বারটাকে বৃত্তাকারে দাগ দিলেন। তারপর ফোনটা নিয়ে কাগজে লেখা নাম্বার দেখে একটা একটা নাম্বার চেপে ঠিক শেষ নাম্বারটাতে এসে থেমে গেলেন। কী ভেবে শেষ নাম্বারটা না চেপে ফোনটা নামিয়ে রাখলেন।
সকাল থেকেই নীলিমা ক্ষণে ক্ষণে ফোনের দিকে তাকাচ্ছে। অন্য কোনো কাজের মধ্যেও সে সজাগ রাখছে নিজেকে। কোনো এক বিচিত্র কারণে তার মনে হচ্ছে, তার কাছে একটা ফোন আসবে। কেউ একজন তাকে ফোন করবে। সে অপেক্ষা করছে। সব কাজের ফাঁকে সেই কাঙ্ক্ষিত ফোনের জন্যে অপেক্ষা করতে তার খারাপ লাগছে না।
সময় গড়িয়ে দুপুর। নীলিমা রান্নার আয়োজন করতে কিচেনে গেল আর তখনই হঠাৎ বাসার ফোন বেজে উঠল। এর আগে সকালে একবার একটা ফোন এসেছিল। সে আগ্রহ নিয়ে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে এক মহিলার কণ্ঠ শোনা গেল। ‘May I speak to Mr. or Ms. Amed, please?’ সে জানতে চাইল।
‘Speaking…’ নীলিমা বলল। যদিও তার শঙ্কা হলো এটা হয়ত কোনো সেলস কল হতে পারে। সকাল থেকেই এমন অনেক উদ্ভট ফোন আসা শুরু হয়। তবুও সে ভদ্রতা করে জানতে চাইল, ‘what is this call about?’
‘Ms. Amed, we have very exciting news for you. You are pre-approved for a home equity loan with the lowest interest rate of…’
‘Sorry, we’re not interested at this time. Thank you.’ মহিলার কথা শেষ হবার আগেই লাইন কেটে দিল নীলিমা। তার বুঝতে বাকী রইল না যে এটা সত্যি একটা সেলস কল। কোনো এক মর্টগেজ কোম্পানি টাকা ধার দিতে চায় কম ইন্টারেস্ট রেটে নতুন বাড়ি কেনার জন্যে অথবা পুরনো বাড়ি মেরামত করার জন্যে। মাঝে মাঝে এভাবে কথা শেষ না করে ফোন কেটে দিতে ওর খারাপ লাগে কিন্তু না দিয়েও উপায় থাকে না। এদের হাত থেকে সহজে নিস্তার পাওয়া যায় না। একটার পর একটা অফার দিতেই থাকে।
ফোন কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল নীলিমা। তারপর কিচেনে ফিরে রান্নার কাজ শুরু করতেই ফোনটা আবার বেজে উঠল। এটা কি সেই কাঙ্ক্ষিত ফোন না কি আবারো সেলস কল। নীলিমা দ্বিধা নিয়ে ফোনটা হাতে নিয়ে বলল, ‘হ্যালো?’
‘বল তো কে ফোন করেছিল আমাকে?’ অপর প্রান্ত থেকে মুনার স্বভাবসুলভ কণ্ঠ ভেসে এলো।
‘কে?’ কিছুটা অবাক হয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘কে আবার? কবি সাহেব!’
‘রিয়েলি? কি বললেন?’ কিছুটা নির্লিপ্ত কণ্ঠে জানতে চাইল নীলিমা।
মুনা হেসে দিয়ে বলল, ‘আমি তোর চেহারাটা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি—মুখটা অন্ধকার করে ফেলেছিস। আই’ম জাস্ট কিডিংরে বাবা। আমাকে উনি ফোন করেন নি। তোকে নিশ্চয়ই করেছেন। এই তোর সাথে কি নিয়ে কথা হলো, বল না?’
‘আমাকে উনি ফোন করেন নি।’ একটু থেমে নীলিমা বলল, ‘তুই কি আমার নাম্বারটা ঠিকমত লিখেছিলি?’
‘কি বলছিস তুই, আমি তোর নাম্বারটা ঠিকমত লিখে দেই নি? এর মানে কি নীলি! তুই আমাকে এই ভাবছিস?’ মুনা রাগ করেই কথা গুলো বলল। ‘Ok then call him up, if you don’t trust me. Hotel Garden Inn, Room #724.’
‘তুই জানলি কিভাবে?’ অবাক হয়ে জানতে চাইল নীলিমা।
‘That’s not important.’ মুনার কণ্ঠে উষ্মা প্রকাশ পেল। সে বলল, ‘মেসেজটা তোকে দেবার জন্যেই ফোন করেছিলাম। I better hang up now.’
‘মুনা শোন, প্লীজ ডোন্ট হ্যাং আপ… আমি কিছু মীন করে বলিনি।’
অপর প্রান্ত থেকে মুনার কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। সে ফোন রেখে দিয়েছে। নীলিমার মনটা খারাপ হয়ে গেল এই ভেবে যে মুনা ওকে আবার ভুল না বোঝে। ফোন রেখে কিচেনে চলে গেল নীলিমা। হঠাৎ তার মনে হলে সে কেনই বা অপেক্ষা করছে। আর তারই বা কি দায় পড়েছে নীলিমাকে ফোন করার। এমন জনপ্রিয় কবি-সাহিত্যিকদের হাজারো ভক্ত তাদেরকে ফোন নাম্বার দেয়, তাই বলে সবার সাথেই কি আর কথা হয়?
এর মধ্যে এক দিন কেটে গেছে। মাহমুদ সাজ্জাদকে নিয়ে ফ্লোরিডার বেশ কিছু জায়গা ঘুরিয়ে দেখিয়েছে জামান আর আতিকুর রহমান। গতকাল রাতে ছিল ডিনার রিসেপশন, ফ্লোরিডার স্বনামধন্য বাঙালি ব‍্যবসায়ী নৌশাদ চৌধুরীর বাসায়। সেখানে উপস্থিত ছিলেন বেশ কয়েকজন সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং কর্মী যারা নিরলসভাবে এই প্রবাসে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির চর্চা করে যাচ্ছেন। মাহমুদ সাহেব তাদের সবার সাথে মত বিনিময় করেছেন। কথা বলেছেন। তাদেরকে উৎসাহ দিয়েছেন। এবং এই ধারাটা যেন অব্যাহত থাকে সেদিকে দৃষ্টি দিতে বলেছেন।
বাংলা সাহিত্যে ভাষার প্রয়োগ, আঞ্চলিক ভাষা, প্রবাসের নতুন প্রজন্মের ভাষা, বাংলাদেশের এফএম ব্যান্ডগুলোর আর জে’দের ভাষার অপব্যবহার—বিকৃত উচ্চারণ, সাহিত্যর নানা বিবর্তন, বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সকলে মতামত তুলে ধরেন। সবার সঙ্গে প্রাণবন্ত একটা সন্ধ্যা কাটান কবি মাহমুদ সাজ্জাদ।
আজ সকাল থেকে সেদিনের অসমাপ্ত কবিতাখানি আবার লেখার চেষ্টা করছেন কবি। কোনো এক বিচিত্র কারণে তার লেখা আসছে না। বেশ কয়েকবার কাগজ কাটাকুটি করে ট্র্যাস বিনে ফেলে দিয়েছেন। এখন জানালার পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে আছেন বাইরে। হঠাৎ তার ভাবনায় ছেদ পড়ল দরজায় টোকার শব্দে। কিছুক্ষণ আগেই তিনি রুম সার্ভিসে অর্ডার করেছেন। এত তাড়াতাড়ি রুম সার্ভিস চলে এলো? তিনি কিছুটা অবাক হয়েই দরজা খুলে দিলেন এবং ততোধিক অবাক হয়ে দেখলেন হাসি হাসি মুখ করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে একটি মেয়ে।
মাহমুদ সাহেব নির্লিপ্ত নয়নে তাকালেন। হালকা সবুজ সুতোর কাজ করা তাঁতের শাড়িতে অপূর্ব লাগছে মেয়েটিকে। আঁচলটা ছেড়ে দেওয়া। কপালে কালো টিপ। দু’হাতে সবুজ আর নীল রংয়ের মিশ্রণে কাঁচের চুড়ির রিনিক ঝিনিক। চুলগুলো খোলাই ছিল। মেয়েটির এলোচুল থেকে মিষ্টি এক সুঘ্রাণ আবিষ্ট করল কবিকে।
মেয়েটিকে দেখে কবি সাহেবের তেমন কোনো ভাবান্তর হলো না। তিনি যে খুব একটা অবাক হয়েছেন তাও মনে হচ্ছে না। দরজায় দাঁড়ানো মেয়েটির মুখের দিকে তাকিয়ে খুব পরিচিত এবং স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, ‘এসো, ভিতরে এসো।’
মেয়েটি ভিতরে ঢুকল। তিনি ঘুরে তাকালেন মেয়েটির দিকে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, ‘কেমন আছো তুমি?’
‘ভালো।’ রুমের ভিতরে সামনে দিকে এগিয়ে গেল মেয়েটি। চারিদিকটা একটু চোখ বুলিয়ে নিল। তারপর খুব স্বচ্ছন্দে বলল, ‘আপনি কি সব মেয়েদেরই তুমি করে বলেন না কি? বয়সে ছোট হলেই কি তুমি বলা যায়?’
‘সব মেয়েদেরকে নয়, যাদেরকে বলা যাবে বলে আমার মনে হয়, শুধু তাদেরকেই বলি। অবশ্য তোমার আপত্তি থাকলে বলবো না।’
‘আপত্তি নেই।’
‘বেশ।’
‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না যে আমাকে দেখে আপনি খুব অবাক হয়েছেন।’
‘কারণটা সহজ, তুমি আসবে সেটা আমি জানতাম।’
‘আপনি জানতেন?’ মেয়েটি অবাক হবার ভঙ্গি করে বলল। ‘আমি তো ভেবেছিলাম আপনি শুধু কবিতাই লিখেন—ভবিষ্যৎও যে দেখতে পান তা তো জানতাম না?’
‘সব সময় দেখতে পাই না, মাঝে মাঝে আমার ইনটুইশন কাজ করে।’
‘তাহলে লবিতে কেন অপেক্ষা করলেন না?’
‘সেটা খুব একটা বিজ্ঞান সম্মত হত না। তাছাড়া, মনের সব খেয়ালকে বেশি প্রশ্রয় দেয়াও ঠিক নয়।’
‘কিসে আপনার মনে হলো যে আমি আসব?’
‘তা জানি না। ঐযে বললাম, ইনটুইশন। সকাল থেকেই মনে হচ্ছিল আজ তোমরা দুজনে আসতে পারো। তুমি একা আসবে সেটা বুঝিনি।’
‘ও আসতে চেয়েছিল, কিন্তু শেষ মুহূর্তে মাইন্ড চেঞ্জ করেছে।’ ঠোঁটের কোণে একটা মৃদু হাসি নিয়ে মেয়েটি বলল।
মাহমুদ সাহেব মৃদু হাসলেন। প্রশ্রয়ের হাসি।
মেয়েটির মনে হলো—তিনি সম্ভবত ওর কথা বিশ্বাস করেননি। প্রসঙ্গ বদলে ও বলল, ‘আমি আসায় আপনি খুশী হয়েছেন?’
‘প্রত্যাশায় প্রাপ্তি এলে, খুশী না হওয়ার কোনো কারণ তো থাকতে পারে না।’
‘আই সি!’ একটা অর্থপূর্ণ হাসি দিয়ে মেয়েটি জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। পর্দা সরিয়ে তাকাল বাইরে।
ফ্লোরিডার নীল আকাশে ঝলমল করছে সোনালী রোদ। মেয়েটি তাকিয়ে আছে আকাশের দিকে। নীল রঙের প্রতি তার দুর্বলতা অস্বাভাবিক রকমের। বাইরে রোদ-ঝলমল নীল আকাশ আর তার চেয়েও বেশি নীল সমুদ্র দু’বেলা হাতছানি দিয়ে ডাকলে কি আর ঘরে বসে থাকা যায়? তাই তো মাঝে মাঝেই সে ছুটে যায় এই নীলের কাছাকাছি। তার ধারণা এই নীলের বাড়াবাড়ির জায়গাটাই হলো ফ্লোরিডা।
সে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল কবির দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, ‘আপনার নির্জন তপস্যায় ব্যাঘাত ঘটালাম না-তো আবার?’
‘আমি অতি সাধারণ একজন মানুষ। আমার আবার তপস্যা কী? তবে হ্যাঁ, মাঝে মাঝে লেখার জন্যে কিছুটা তপস্যার মতো করতে হয় বৈকি।’
‘অতি সাধারণ হওয়াটা তো অনেক কষ্টসাধ্য ব্যাপার—সবাই সাধারণ হতে পারে না। অসাধারণ হওয়াটাই বরং সহজ। যে কেউ হতে পারে।’
‘বাহ! চমৎকার।’ কবি চমৎকৃত হলেন এবং তার মুগ্ধতা প্রকাশে কোনো রকম কার্পণ্য করলেন না। তিনি বললেন, ‘তুমি তো বেশ গুছিয়ে কথা বলো!’
‘সত্যি বলছেন?’
‘হুম!’
‘সত্যি না ছাই।’
মেয়েটির কথার ধরনে মাহমুদ সাহেব হেসে ফেললেন।
‘কোথাও যাননি যে? কেউ নিতে আসেনি আজ?’
‘আসতে চেয়েছিল, না করে দিয়েছি। এখন তুমি এলে। রুম সার্ভিসে অর্ডার দিয়েছি—কিছু খেয়ে তারপর তোমার সাথে না হয় বাইরে ঘুরতে যাবো।’
‘অর্ডার ক্যান্সেল করে দিন। আজ আমি আপনাকে আমার প্রিয় একটা জায়গায় লাঞ্চ করাতে নিয়ে যাবো। আপনি তৈরী হয়ে নিন।’
কিছুক্ষণ ভেবে মাহমুদ সাহেব সম্মতি দিয়ে বললেন, ‘বেশ চলো তাহলে যাওয়া যাক।’

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Abinashi-Shabdo-Rashi

অবিনাশী শব্দরাশি (পর্ব-২)

উত্তর আমেরিকায় বাঙালিদের সাংস্কৃতিক চর্চা নিয়ে কিছু কথা বলা যাক।
আটলান্টিকের পারের এই বাঙালিদের বিনোদনের যেন কোনো শেষ নেই। গান, নাচ, নাটক, কবিতা আবৃত্তি, কাব্য জলসা, বাউল সন্ধ্যা, পুঁথিপাঠ, গুরুগম্ভীর সেমিনার, বইমেলা, পথমেলা—সবই হচ্ছে এখানে। বসন্ত উৎসব, বৈশাখ উদযাপন, ভাষা দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস—সব দিবসই পালিত হয় এখানে। আর সে কারণেই বাংলাদেশ থেকে হাজার মাইল ব্যবধানে নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া, টেক্সাস, ফ্লোরিডা, ভার্জিনিয়া, ওয়াশিংটন ডিসি রাজ্যের ছোট বড় অনেক শহরেও বাঙালির বোধ আর মননে এই বাংলা আর বাংলাদেশ অনেক আদর, ভালোবাসায় নিত্যই আদৃত হয়ে আসছে। এই ‘বাংলাদেশ’ নামক ছোট্ট শব্দটি বাঙালি তাঁর ধমনীতে অনেক আদর আর ভালোবাসায় ঠাঁই দিয়েছে বলেই এই প্রবাসে বাংলা সংস্কৃতির একটা উর্বর ভূমি তৈরি হয়েছে। শক্ত হয়েছে বাংলা ভাষা, বাঙালির সংস্কৃতির শিকড়।
গল্পে ফেরা যাক। শনিবার বিকেলে মায়ামির একটি সেমিনার হলে ‘কাব্য জলসা’ উপলক্ষে স্থানীয় বেশ কিছু বাঙালিদের সমাগম হয়েছে। সবাই যার যার আসন নিয়ে বসেছে। দর্শক সারিতে মুনা এবং তার স্বামী সাগর বসে আছে। মুনা কিছুক্ষণ পর পর দরজার দিকে তাকাচ্ছে। নীলিমা এখনো এসে পৌঁছেনি। আসার আগে সে নীলিমাকে ফোন করেছিল—নীলিমা তাকে জানিয়েছে শোভন যেতে রাজী হয়েছে এবং তাকে সাথে নিয়েই সে অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যাচ্ছে কিন্তু ওদের খবর নেই।
কাব্য জলসার প্রধান সমন্বয়ক, ফ্লোরিডার জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব জনাব আতিকুর রহমান উপস্থিত দর্শকদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করে অনুষ্ঠান শুরু করলেন। আতিকুর রহমান ফ্লোরিডায় আছেন দীর্ঘদিন থেকে। একাধারে একজন আবৃত্তি শিল্পী, অভিনেতা, সংগঠক–অন্যদিকে একজন সফল ব্যবসায়ী। শুরুতে তিনি কবি শামসুর রাহমানের বিখ্যাত কবিতা ‘স্বাধীনতা তুমি’ থেকে কয়েকটি লাইন পাঠ করে শোনালেন। তারপর একে একে স্থানীয় সাহিত্য প্রেমীরা আলোচনা করলেন এবং আবৃত্তি শিল্পীরাও কবিতা আবৃত্তি করলেন।
মুনা আবার ঘুরে তাকাল দরজার দিকে। ঠিক তখনই নীলিমা আর শোভন ঢুকলো। নীলিমা সুন্দর করে সেজেছে। নীল রঙের তাঁতের শাড়ি, কপালে টিপ, মাথায় কোঁকড়ানো চুলে বেলি ফুলের মালা দিয়ে বেণী করা। মায়ামি শহরে বেলি ফুল সে কোথায় পেল কে জানে। নীলিমা শোভনের হাতটা ধরার চেষ্টা করলো কিন্তু শোভন হাত ছাড়িয়ে নিল।
মুনা দূর থেকে ওদেরকে দেখে হাত উঁচু করলো। তারা দুজন গিয়ে বসলো মুনার পাশের আসনে।
অনুষ্ঠানের এই পর্যায়ে উপস্থাপক আমন্ত্রণ জানালেন কাব্য জলসার বিশেষ অতিথি, বাংলাদেশের প্রখ্যাত কবি শ্রদ্ধেয় জনাব মাহমুদ সাজ্জাদকে।
অতিথিদের করতালির মধ্যে কবি মঞ্চে উঠলেন। উপস্থাপককে ধন্যবাদ দিয়ে তিনি তার কথা শুরু করলেন। তিনি বললেন, ‘আমি প্রথমেই আয়োজক এবং কর্মকর্তাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাকে এই কাব্য জলসায় আমন্ত্রণ জানানোর জন্য। আজকে আমার সত্যি খুব ভাল লাগছে এটা দেখে এবং জেনে যে বাংলাদেশের বাইরে এসেও আপনারা বাংলা কবিতা, গান ও সাহিত্যকে এভাবে আঁকড়ে ধরে রেখেছেন। শত ব্যস্ততার মাঝেও এর পরিচর্যা করছেন। এটা অনেক আনন্দের ব্যাপার। অনেক আশার ব্যাপার আমাদের নতুন প্রজন্মের জন্যে, যারা এখানে বেড়ে উঠছে। এই যে শেকড়ের সন্ধান আপনারা তাদেরকে দিচ্ছেন, ‘সুন্দরতম ভূমি বাংলাদেশ’কে বিশদভাবে জানাতে এগিয়ে আসছেন, আমি তার জন্যে বিশেষভাবে সাধুবাদ জানাই। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ।’
আবার করতালি হলো। করতালি থেমে গেলে তিনি বললেন, ‘আমি মূলত কবি, আবৃত্তিকার নই। আমার কাজ লেখা, আবৃত্তি নয়। এটা মনে রাখলে আমার কবিতা পাঠ করা সহজ হবে।’
অতিথিদের মধ্যে সামান্য হাসির শব্দ শোনা গেল।
কবি আবার বললেন, ‘আজ আমি আমার নিজের কোনো কবিতা নয় বরং আমি আমার প্রিয় কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি কবিতা আপনাদেরকে শোনাবো।’ বলেই কবি আবৃত্তি শুরু করলেন।
‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষ পান করে মরে যাবো।
বিষণ্ণ আলোয় এই বাংলাদেশ
নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ
প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-
এ আমারই সাড়ে-তিন হাত ভূমি
যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো
আমি বিষ পান করে মরে যাবো।’
নীলিমা মুগ্ধ নয়নে অপলক তাকিয়ে আছে কবির দিকে। কিছু কিছু মানুষ আছেন যাঁদের সাথে কোনো দিনও সামনাসামনি দেখা হয়নি কিন্তু তাঁদের কাছে কুঁজো হয়ে নতজানু হতে ইচ্ছে হয়। যাঁদের কখনো কখনো গুরু হিসেবে মনেপ্রাণে মেনে নিতে ইচ্ছে জাগে। সেই মানুষের সামনে বসে তার নিজের কণ্ঠে আবৃত্তি শুনতে পারাটা ভাগ্যের ব্যাপার। শ্রদ্ধেয় মাহমুদ সাজ্জাদ নীলিমার কাছে তেমনি একজন মানুষ।
আবৃত্তি করতে করতেই দর্শক সারিতে বসা নীলিমার চোখে কবি সাহেবের দৃষ্টি এসে থমকে গেল মুহূর্তের জন্যে। সে একটু থেমে আবার আবৃত্তি শুরু করলেন। এবং বার কয়েক তাকালেন নীলিমার মুগ্ধ দৃষ্টির দিকে। প্রতিবার দৃষ্টি বিনিময় হতেই নীলিমা মিষ্টি করে একটা হাসি উপহার দিল।
কাব্য জলসা শেষ হতেই উপস্থিত দর্শক আর ভক্তরা ঘিরে ধরল কবি মাহমুদ সাজ্জাদকে। কেউ ছবি তুলছে, কেউ নিচ্ছে অটোগ্রাফ।
নীলিমা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ভক্ত এবং শুভানুধ্যায়ীদের ভিড় একটু কমে আসতেই কবির সামনে গিয়ে দাঁড়াল সে। তারপর নরম সুরে বলল, ‘আমাকে একটা অটোগ্রাফ দেবেন প্লীজ?’
মাহমুদ সাজ্জাদ মুখ তুলে তাকাতেই দেখল সেই মেয়েটি হাসি হাসি মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে।
‘আমি আপনার একজন ভক্ত।’ নীলিমা বলল কবির সহাস্য মুখের দিকে তাকিয়ে।
‘অবশ্যই। দিন।’ বলেই মাহমুদ সাহেব হাত বাড়ালেন।
নীলিমার হাতে একটি বই ছিল। সে বইটা এগিয়ে দিল। কবি মাহমুদ সাজ্জাদের নির্বাচিত কবিতার সংকলন, ‘অবিনাশী শব্দরাশি।’
বইটি হাতে নিয়ে মাহমুদ সাহেব বেশ অবাক হলেন। তিনি বললেন, ‘আরে এই বই আপনি কোথায় পেলেন?’
‘দেশ থেকে নিয়ে এসেছিলাম।’ নীলিমা উত্তর দিল।
‘আপনি কতদিন হলো এসেছেন?’ কবির প্রশ্ন।
‘দু বছর।’
‘হুম।’
‘আপনার কবিতা আমার খুবই ভালো লাগে।’
মাহমুদ সাজ্জাদ বইটির মলাট উল্টিয়ে বললেন, ‘আপনি খুব সুন্দর।’
নীলিমার মুখ আনন্দে উদ্ভাসিত হলো। তার প্রিয় মানুষের মুখে তার সৌন্দর্যের প্রশংসা শুনে আপ্লুত হলো সে। আস্তে করে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ।’
‘কি নাম আপনার?’
‘নীলিমা।’
‘বাহ, বেশ সুন্দর নাম! নীলিমায় নীল।’ বলেই তিনি একটি কবিতার কয়েকটি লাইন আওড়ালেন।
“শ্যামলে শ্যামল তুমি, নীলিমায় নীল।
আমার নিখিল
তোমাতে পেয়েছে তার অন্তরের মিল।
নাহি জানি, কেহ নাহি জানে
তব সুর বাজে মোর গানে;
কবির অন্তরে তুমি কবি,
নও ছবি, নও ছবি, নও শুধু ছবি।”
তারপর থেমে বললেন, ‘বলতে পারবেন কার কবিতা?’
‘বলাকা। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।’ নীলিমা একটু হেসে উত্তর দিলো।
কবি সাহেব বিস্মিত হলেন নিঃসন্দেহে এবং পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন নীলিমার দিকে। একটু হেসে দিয়ে হাতের বইটিতে লিখলেন, ‘নীলিমা, আপনি খুব সুন্দর। আমি অভিভূত। অনেক শুভেচ্ছা।’ তারপর বইটি ফিরিয়ে দিলেন।
নীলিমা খুশিতে আত্মহারা। সে বলল, ‘আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলতে পারি?’
‘অবশ্যই পারেন।’
‘এক মিনিট, আমি ক্যামেরাটা নিয়ে আসছি।’ বলেই নীলিমা দৌড়ে চলে গেল শোভনের খোঁজে।
(পাঠক, বুঝতেই পারছেন—তখন স্মার্ট ফোনের প্রচলন সেভাবে শুরু হয়নি। নাহলে নীলিমা হয়তো কবির সঙ্গে একখানা সেলফি তুলে ফেলত এতক্ষণে। 😊)
নীলিমা চলে যেতেই কর্মকর্তাদের একজনকে দেখা গেল মাহমুদ সাহেবের কাছে এসে তাকে কিছু বলতে। সম্ভবত রাতে কারো বাসায় নৈশভোজের আয়োজন করা হয়েছে এবং সেখানে যেতে হবে—এসব বলতে। এর মধ্যেই আরো কিছু ভক্ত চলে এসেছে। তারা এবার কবির সঙ্গে সাহিত্য নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিলো।
নীলিমা ফিরে এসে দেখল, তার প্রিয় কবির চারিদিকে অনেক লোক। সে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে চলে গেল যেখানে মুনা, সাগর আর শোভন দাঁড়িয়ে অন্যদের সাথে চা-সিঙ্গারা খাচ্ছে আর চুটিয়ে আড্ডা দিচ্ছে।
কথা বলার ফাঁকেই মাহমুদ সাহেব লক্ষ করলেন নীলিমা এসে আবার চলে গেল।
নীলিমা ওদের কাছে যেতেই মুনা আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘কিরে অটোগ্রাফ নিয়েছিস?’
‘হুম।’
শোভন বলল, ‘দেখিতো কি লিখেছেন?’ বলেই হাত বাড়িয়ে বইটি নিতে চাইল।
‘কেনো তোমাকে দেখাবো কেনো?’ দুষ্টুমি করে উত্তর দিলো নীলিমা।
‘কথা বলেছিস?’ মুনা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘বলতে আর পারলাম কই?’
‘তাহলে এতক্ষণ কি করলি। আমার তো মনে হলো সে কি যেন বলছিল তোকে।’ বলেই মুনা তাকাল সাগর আর শোভনের দিকে, ওদের সমর্থন নেবার জন্যে।
‘কবিতা।’
‘তোকে একা কবিতা শোনালো?’
‘প্রসঙ্গক্রমে চলে এলো তাই।’
‘মানে?’
‘মানে কিছু না।’
‘ছবি তুলেছিস?’
‘নারে, তুলতে পারিনি।’
‘চল, ছবি তুলে আসি।’
নীলিমা আর মুনা ঘুরে দাড়িয়েই চমকে গেল। কবি সাহেব ওদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।
মাহমুদ সাহেব নীলিমাকে লক্ষ করে বললেন, ‘এই যে আপনি এখানে। ছবি না তুলে ফিরে এলেন যে, তুলতে চান না?’
‘অবশ্যই চাই। তার আগে পরিচয় করিয়ে দেই… ও হচ্ছে শোভন, আমার হাজব্যান্ড। ও মুনা, ফ্লোরিডায় আমার একমাত্র বান্ধবী, আর ইনি হচ্ছেন…’
নীলিমার মুখ থেকে কেড়ে নিয়ে মুনা বলল, ‘সাগর, আমার একমাত্র হাজব্যান্ড।’
মুনার কথা বলার ঢং এ সবাই একসাথে হেসে উঠল। এরপর তারা সবাই মিলে কবির সঙ্গে ছবি তুলল।
এর মধ্যেই মুনা জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি কোথায় উঠেছেন? কারো বাসায় না হোটেলে?’
‘হোটেলে।’
‘থাকবেন কিছুদিন, নাকি কালই চলে যাচ্ছেন?’
‘এ সপ্তাহটা আছি। আমার এক বন্ধু থাকে অরল্যান্ডোতে, এরমাঝে ওর ওখানে একবার যেতে হবে।’
‘তাহলে তো আপনার সাথে কথা হতে পারে?’ মুনা আবার বলল।
‘হ্যাঁ, তাতো পারেই।’
এরপর মুনা নীলিমার দিকে একবার তাকিয়ে মাহমুদ সাহেবকে বলল, ‘আপনার ফোন নাম্বারটা কি পেতে পারি, অবশ্য আপনার যদি কোন আপত্তি না থাকে।’
‘না না, আপত্তি থাকবে কেন? আপনারা ফোন করলে ভালই লাগবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, আমার নিজেরতো ফোন নেই। আর হোটেলের নাম্বারটাও আমার কাছে নেই।’ একটু ভেবে নিয়ে তিনি আবার বললেন, ‘এক কাজ করলে কেমন হয়, আমাকে বরং আপনাদের ফোন নাম্বারটা দিয়ে দিন, আমিই না হয় ফোন করব।’
মুনা তাড়াতাড়ি একটা কাগজে নীলিমা আর তার নাম্বার লিখে কবির হাতে দিলো। সেটা দেখে সাগর আর শোভন চোখ ঘুরিয়ে একটু মুচকি হাসল। এরমধ্যে আরেক কর্মকর্তা এসে মাহমুদ সাহেবকে নিয়ে গেলেন। কবি বিদায় নিয়ে চলে যেতেই ওরা সবাই সেমিনার হল থেকে বের হয়ে এলো।
নীলিমা চুপচাপ হাঁটছে করিডোর দিয়ে। মুনাও হাঁটছে নীলিমার পাশে পাশে। নীলিমার অন্য পাশে শোভন আর মুনার পাশে সাগর। মুনাকে খুবই খুশি মনে হচ্ছে। বেশ উচ্ছ্বসিত হয়ে নীলিমাকে বলল সে, ‘বলতো কবি সাহেব আগে কাকে ফোন করবেন? তোকে না আমাকে?’
‘তোর কি মনে হয়, উনি ফোন করবেন?’ নীলিমা অনিশ্চিতভাবে বলল।
শোভন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, ‘খেয়ে দেয়ে আর কাজ নেই, আরে উনার কি সে সময় হবে নাকি? এ বাসা ও বাসা দাওয়াত খেতে খেতেই তো সময় চলে যাবে। তারপর সাইট সিয়িং, ফিশিং আরো কত কি। লেখালেখিও নিশ্চয়ই করবেন। হু নোজ!’
সাগর চোখ টিপে যোগ করল, ‘ফ্লোরিডায় এসেছেন–নর্থ বীচ কিংবা সাউথ বীচে যাবেন না? ওখানেই না কবিতার সব উপকরণ।’
‘সাগর?’ মুনা কটাক্ষ করলো সাগরকে।
নীলিমা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, ‘ছিঃ সাগর ভাই, এভাবে বলছেন কেন?’
‘ছিঃ সাগর, এভাবে বলছ কেন?’ নীলিমার কণ্ঠ অনুকরণ করে বলল শোভন।
নীলিমার মুখটা অন্ধকার হয়ে গেলো মুহূর্তেই। প্রিয় কবিকে নিয়ে এমন ফাজলামো তার একেবারেই পছন্দ নয়। সে রেগে বলল, ‘এনাফ! লেটস গো হোম।’ বলেই নীলিমা দ্রুত এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে।
মুনা একবার সাগর আর একবার শোভনের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমরা না!’ বলেই সে সাগরকে বলল, ‘চলো।’
এরপর আর কেউ কোনো কথা বলল না। মুনা আর সাগর অন্যদিকে চলে গেলো।
শোভন দ্রুত পায়ে এগিয়ে গিয়ে গাড়ি খুলে দিলো। নীলিমা উঠে বসতেই গাড়ি ছেড়ে দিলো সে। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই বড় রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
আলো ঝলমল মায়ামির রাস্তা দিয়ে এগিয়ে চলছে ওদের গাড়ি। নীলিমা চুপচাপ তাকিয়ে আছে বাইরের দিকে। সে ভীষণ আহত হয়েছে সাগর আর শোভনের অশোভনীয় আচরণে। সে কিছুতেই বুঝতে পারছে না, কোনো কারণ ছাড়াই কিছু মানুষ আছে যারা কবি-সাহিত্যিক কিংবা গুণীজনদের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাতে জানে না নাকি ইচ্ছে করেই দেখায় না। কে জানে।
নীলিমা মন খারাপ করে বসে রইল। গাড়ি চালাতে চালাতে শোভন দু’একবার তাকাল নীলিমার দিকে, কিন্তু কিছু বলল না।
নীলিমার মন খারাপের আরেকটি কারণ হলো কবি মাহমুদ সাজ্জাদের কাছে একটা ব্যক্তিগত ফোন নেই এই বিষয়টি তাকে অবাক করেছে। সে ভেবেছিল কবির নাম্বারটা নিয়ে এলে তার সঙ্গে একটু কথা বলতে পারত। ওর যে তাকে কিছু জিজ্ঞেস করবার ছিল। বাসায় ফিরে কাপড় বদলাতে বদলাতে নিজের মনেই সে বলল, ‘এত বড় একজন কবি, উনার নিজের একটা সেল ফোন থাকতে পারে না? আশ্চর্য!’
শোভন কাপড় ছেড়ে বিছানায় শুয়ে ছিল। সে তাকাল নীলিমার দিকে। একটু মুচকি হেসে বলল, ‘আরে, উনিতো আর এখানে থাকেন না যে তার একটা সেল ফোন থাকতে হবে। তাছাড়া উনি এসেছেন মাত্র কয়েকদিনের জন্যে। এ ক’দিনের জন্যে একটা সেল ফোনের ব্যবস্থা কে করে দেবে বলো?’
‘কিন্তু বাংলাদেশ থেকে যেসব শিল্পীরা আসেন তাদের তো দেখি সবারই সাথে ফোন থাকে। গানের শিল্পী, নাটকের শিল্পী, সিনেমার নায়ক-নায়িকা সব শিল্পীদেরই তো দেখলাম পারসোনাল ফোন নিয়ে সারাক্ষণ কথা বলছে।’
‘আরে ওদের কথা আলাদা। ওরাতো স্টার। কবি সাহিত্যিকেরা তো আর স্টার নয়। তারা জাস্ট কবি সাহিত্যিক।’
নীলিমা অবাক হয়ে গেলো, কবি-সাহিত্যিকদের প্রতি এমন তুচ্ছ মানসিকতার কথা ভেবে। এর আগেও আতিক ভাইর কাছে এ ব্যাপারে ও শুনেছে সেসব কথা। আতিকুর রহমান ফ্লোরিডার স্থানীয় সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, সংগঠক, নিজেও অসাধারণ কবিতা আবৃত্তি করেন, নীলিমাকে অত্যন্ত স্নেহ করেন। নীলিমার সঙ্গে মাঝে মাঝে সাহিত্য নিয়ে কথা হয়। সেদিন কথায় কথায় নীলিমাকে বলছিলেন আক্ষেপ করে। প্রতি বছর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের বাংলাদেশী সংগঠনগুলির একত্রে ‘ফোবানা’ নামে যে মহাসম্মেলন হয় সেখানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি কিছু কবি-সাহিত্যিক, আবৃত্তি শিল্পীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হলো গানের শিল্পীদের যেভাবে মূল্যায়ন করা কিংবা গুরুত্ব দেয়া হয় তেমনটা কবি-সাহিত্যিকদের ক্ষেত্রে দেখা যায় না। এমনকি তাদেরকে নিয়ে যে কাব্য-জলসা কিংবা সাহিত্য-চর্চার অনুষ্ঠান করা হয়, সেখানেও দর্শকদের উপস্থিতি থাকে শূন্যের কোঠায়। সবাই অপেক্ষায় থাকে কখন বড় বড় শিল্পীরা গান করবেন, মঞ্চ মাতাবেন। ফোবানা’র মূল আকর্ষণই থাকে দেশ থেকে আসা সেই সব গানের শিল্পীরা। কবি-সাহিত্যিকরা থাকেন অবহেলিত, উপেক্ষিত।
নীলিমা প্রসাধনী তুলে, রাতের শোয়ার কাপড় পড়ে বিছানায় এসে দেখলো শোভন চোখ বন্ধ করে আছে। ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। সে আলতো করে একটা হাত রাখলো শোভনের গায়ের উপর।
মাঝে মাঝে শোভনের বুকের সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করে নীলিমার–আদর পেতে ইচ্ছে করে ভীষণ। একটা সময় ছিল, শোভনের কাছে গেলেই সে বুঝতে পারতো। আদর ভালোবাসা দিতে কোন কার্পণ্য ছিল না। এখন তাকে চাইলেও পাওয়া যায় না। ইচ্ছে করছে, ধাক্কা দিয়ে শোভনকে জাগিয়ে দিতে। আবার ভাবল, কী লাভ। সাড়া তো দিবেই না। উপরন্তু, এমন বিরক্তি প্রকাশ করবে, তা নীলিমার জন্য হবে আরো অপমানকর। এসব ব্যাপারে তো কোন জোর চলে না!
নীলিমা যা ভেবেছিল তাই হলো। শোভন বিরক্ত হয়ে নীলিমার হাতখানি সরিয়ে দিয়ে পাশ ফিরে শুলো।
অভিমানে নীলিমার চোখ ভিজে এলো। সে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সিলিং এর দিকে।
শোভনের এমন উপেক্ষা আর অবহেলা ভীষণ কষ্ট দেয় তাকে। তারপরেও সে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে দিন কাটিয়ে দিচ্ছে একই ছাদের নীচে। এই বিদেশ বিভূঁইয়ে কিইবা করার আছে মানিয়ে নেয়া ছাড়া। আর যাবেই বা কোথায় সে। কিন্তু এমন জীবন তো সে কখনই আশা করেনি। প্রায় দু বছর হয়ে গেল নীলিমা এসেছে এই দেশে। প্রথম প্রথম ওদের দিনগুলি বেশ আনন্দে কেটে যেত। কাজ থেকে ফিরে শোভন তাকে যথেষ্ট সময় দিত। মাঝে মাঝে খুনসুটি করতো। সমুদ্রের পাড়ে হেঁটে বেড়াত। সেই শোভন কেমন যেন ধীরে ধীরে নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছে নীলিমার কাছ থেকে। ক্লান্ত হয়ে বাসায় ফিরে। প্রায়ই রাত করে। ছুটির দিনগুলিতেও চলে যায় বাইরে। নীলিমার দিনগুলি কাটে একাই। সে ভীষণ একা। মাঝে মাঝে তার দম বন্ধ হয়ে আসে। তখন সে একাই চলে যায় সমুদ্র পাড়ে। বুক ভরে বাতাস নেয়। তারপর ফিরে আসে তার ছোট্ট এপার্টমেন্টে।
শোভনের এমন পরিবর্তনের কি কারণ আছে সেটা সে এখনো জানে না। কাছের দু’এক জন মানুষের কাছ থেকে কিছু কান কথা তার কানে এসেছে কিন্তু সেসব নিয়ে শোভনের সাথে কোনো ধরনের বাকবিতণ্ডায় সে যায় নি। সময়ের উপর সব কিছু ছেড়ে দিয়ে অপেক্ষা করছে নীলিমা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে জানালার কাছে দাঁড়াল নীলিমা। পর্দা সরিয়ে তাকিয়ে রইল দূর সমুদ্রের দিকে। এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল কবি মাহমুদ সাজ্জাদের কথা। কানে ভেসে এলো তার আবৃত্তি করা কবিতার পঙক্তি, ‘যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো, আমি বিষ পান করে মরে যাবো…’
ধীরে ধীরে নীলিমার বিষণ্ণতা কেটে গেল। মনে পড়ল কবির সাথে তার পরিচয় আর কথোপকথনের কথা। নীলিমা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে কবির কথা। কবি বললেন, ‘আপনি খুব সুন্দর, কি নাম আপনার?’ এটুকু ভাবতেই নীলিমার মন ভাল হয়ে গেল। সে ঘুরে একবার ঘুমন্ত শোভনের দিকে তাকাল। তারপর আবার ফিরে তাকিয়ে রইল দূর সমুদ্রের দিকে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় সমুদ্রের পানি চিক চিক করছে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব