Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-১)

গভীর রাতে ফরিদের ঘুম ভেঙে গেল।
অনেকক্ষণ থেকে কে যেন ক্ষীণকণ্ঠে ডেকে যাচ্ছে, ‘বাবা। বাবা।’ কণ্ঠটা খুব পরিচিত। ভিকি ভয় পেলে কিংবা কোনো সমস্যায় পড়লে এভাবে অনবরত ডাকতে থাকে। ভিকি ফরিদের ছেলে। বয়স পাঁচ বছর দশ মাস।
ফরিদ কান খাড়া করে অন্ধকারে তাকিয়ে রইল। কিন্তু কোনো রকম শব্দ শুনতে পেল না আর। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। পাশে তাকিয়ে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে মুখ ঢুকিয়ে জবুথবু হয়ে ঘুমাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত অভ্যাস তার—ঘরের উষ্ণতা যাই থাকুক অথবা প্রকৃতিতে যেই ঋতুই চলুক না কেন, তাতে তার কিছু যায় আসে না। মুখ না ঢেকে সে ঘুমবে না। মাথার উপর একটা ফ্যান ঘুরবে সারা বছর। কাঠফাটা গরমেও ফ্যান ঘুরে—কনকনে শীতেও। ফ্যান ছেড়ে দিয়ে মাথা থেকে পা পর্যন্ত ব্লাঙ্কেটে সারা শরীর মুড়িয়ে ঘুমানো তার অভ্যাস। এবং এ নিয়ে কোনো বিতর্কও করা যাবে না। কী যে এক যন্ত্রণা!
ফরিদ মাঝে মাঝে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘এভাবে মুখ ঢেকে ঘুমাতে তোমার কষ্ট হয় না? নিশ্বাস নাও কীভাবে—দম তো বন্ধ হয়ে যাবার কথা।’
‘কেন আমার দম বন্ধ হয়ে গেলে বুঝি তুমি খুশি হও?’
‘কী মুস্কিল—আমি কি তাই বললাম নাকি?’
‘হয়েছে হয়েছে—মনে মনে তো তাই চাও! তুমি কি ভেবেছ, আমি কিছু বুঝি না?’
‘উফ—তুমি না…’ ফরিদ আর কথা বাড়ায় না। এই মেয়ের মাথায় সমস্যা আছে। ভালো রকম সমস্যা। সহজ ভাবে সে কোনো কথার উত্তর দিতে পারে না।
মাঝে মাঝে ফরিদ দুষ্টুমি করে বলে, ‘সুন্দরী মেয়েদের ঘুমলে আরো বেশি সুন্দর লাগে। এমন সুন্দর মুখখানি ঢেকে রেখে ঘুমলে কেমন হয় বলতো?’
‘আমি সুন্দরী?’
‘অবশ্যই সুন্দরী!’
‘তাহলে তোমাদের বাসার সবাই আমার পেছনে আমাকে পেত্নী বলে কেন—আমি কি ভূত?’
ফরিদ আহত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মিলির মুখের দিকে। সে কী বলবে, কী বলা উচিত, কিছুই বুঝতে পারে না। এটা ঠিক মিলির গায়ের রঙ সেই অর্থে ফর্সা নয়। তাই বলে তাকে কিছুতেই অসুন্দর বলা যাবে না। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশের গড়পড়তা মানুষ—মেয়েদের গায়ের রঙ ফর্সা না হলে তাকে সুন্দরী বলে গণ্য করে না। কোনো মেয়ে দেখতে সুন্দর হওয়ার প্রথম শর্ত হচ্ছে—তার গায়ের রঙ ফর্সা হওয়া চাই।
ফরিদের অবশ্য এ ধরনের কোনো প্রেজুডিস নেই—ছিল না কোনো কালেও। তার চোখে মিলি যথেষ্টই সুন্দরী। গায়ের রঙ সামান্য ময়লা হলেও—দেখতে সে অসাধারণ। হরিণের মতো কাটাকাটা চোখ—কী মায়া লেগে আছে সেই চোখে। হাঁটু পর্যন্ত লম্বা ঘন কালো চুল—যাকে বলে মেঘ বরন কন্যা। অসম্ভব সুন্দর অবয়ব তার। মেদহীন একহারা, আকর্ষণীয় দেহ কাঠামো। কিন্তু সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মিলির ব্যক্তিত্ব—যার প্রেমেই ফরিদ ডুবে ছিল আকণ্ঠ। তাই তো পরিবারের সবার মতামতকে উপেক্ষা করে ফরিদ মিলিকেই বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফরিদের পরিবারের কেউই এই বিয়ে মেনে নেয়নি—তা নিয়ে অবশ্য তার মাথা ব্যথাও নেই। ফরিদের সাফ কথা—গায়ের রঙ দিয়ে কী হবে, যদি মানুষটার মনটাই ভালো না হয়। মিলি অত্যন্ত ভালো মনের একটা মানুষ। শুধু স্বভাবটাই একটু পাগলাটে।
‘বাবা। বাবা।’
ফরিদের নিরবচ্ছিন্ন চিন্তায় ছেদ পড়ল। মিলির কথা ভাবতে ভাবতে সে ভুলেই গিয়েছিল ভিকির কথা। একটা ছোট নিশ্বাস ফেলে সে উঠে বসল বিছানায়। ছেলেটা যে কেন এত ভয় পায়?
রাত কতটা গভীর কে জানে? ভিকির কথা ভেবে ফরিদের মনটা একটু খারাপই হলো। ছেলেটা অল্প কিছুদিন হলো একা একা থাকছে তার নিজের রুমে। মিলি সুন্দর করে ভিকির বেডরুম সাজিয়ে দিয়েছে। চারিদিকে নীলের ছড়াছড়ি। বিছানা-কার্পেট-ওয়াল পেপার সব কিছুতেই নীলের ছোঁয়া। রুমের একপাশে ছোটবেলা থেকে জমানো ভিকির সব খেলনা গাড়ি।
এতদিন ভিকি তার মায়ের রুমেই ঘুমতো। মিলির মাস্টার বেডরুমে কিং সাইজ বেডের প্রায় পুরোটা নিয়েই ছিল তার বিচরণ। মিলি খাটের এক কোনায় চুপচাপ পড়ে থাকে। ভিকির জন্মের পর থেকেই মায়ের বিছানাতে ছেলের জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে ফরিদ ঘুমায় অন্য আরেক রুমে। ভিকি পাঁচ বছরে পড়তেই ফরিদ বলে আসছিল মিলিকে—এখন থেকে ভিকিকে ওর নিজের রুমে থাকতে দেয়া উচিত। এখনই অভ্যাস না করলে পরে সমস্যা হয়ে যাবে। ছেলে একা একা ভয় পাবে—একা থাকতে চাইবে না।
‘তোমার মতলবটা কী? ছেলেকে সরিয়ে ওর জায়গা দখল করতে চাও তুমি?’ ভ্রু কুঁচকে মিলি বলল।
‘কী আশ্চর্য—আমি কী তাই বললাম নাকি?’
‘তো কী বললে?’
‘আমি বললাম…’
‘থাক—আর বোঝাতে হবে না।’ ফরিদকে থামিয়ে দিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি যা ভাবছ তা হবে না। রাতে আমার বিছানায় তুমি ঘুমাতে পারবে না—তোমাকে আলাদাই ঘুমাতে হবে।’
‘ফর হাউ লং?’
‘যতদিন না তোমার প্রেশার কুকার হুইসেল বাজানো বন্ধ হয়।’
ফরিদ তাকিয়ে থাকে অসহায় দৃষ্টিতে। এসব কী বলে মিলি?
‘আচ্ছা তোমাকে না কতদিন বলেছি একজন ডাক্তার দেখাও। তোমার স্লিপ অ্যাপনিয়া আছে—কিন্তু তুমি তো আমার কথা শুনবা না। কী আর করা।’
ফরিদ কিছু একটা বলার আগেই মিলি আবার বলল, ‘ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেই তুমি যদি মনে করে থাকো—আমার বিছানায় পার্মানেন্ট জায়গা হবে তোমার, সেটি হবে মস্ত বড় ভুল। সেটি হচ্ছে না।’
‘তাই বলে…’
‘আমি সব কিছু স্যাক্রিফাইস করতে পারি—কিন্তু আমার ঘুমের সাথে কোনো কম্প্রোমাইজ নেই। আর সেটা তুমি খুব ভালো করেই জানো ফরিদ।’ ফরিদকে আবার থামিয়ে দিয়ে বলল মিলি।
কাজেই ভিকিকে আলাদা রুমে দিলেও ফরিদের কপালের কোনো হেরফের হলো না। সে বহাল তবিয়তেই তার রুমেই স্থায়ী এখনো। তবে সপ্তাহে দু’একদিন এর ব্যতিক্রম হয়। ফরিদের ভাগ্যে তখন মিলির বিছানায় ঘুমানোর সুযোগ হয়। আজকের রাতটাও ছিল তেমনি এক বিশেষ রাত।
ফরিদ ঘুমানোর চেষ্টা করছিল—অনেকক্ষণ থেকে এপাশ-ওপাশ করেও ঘুম আসছিল না। ঠিক তখনই মিলির টেক্সট মেসেজ এলো—কি ঘুম আসছে না? এসো ঘুমের ওষুধ দিয়ে দেই। আসার সময় চেক করে এসো ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
ফরিদ খুব ভালো করেই জানে এটা কীসের ইঙ্গিত। সে সময়ক্ষেপণ না করে দ্রুত মিলির রুমের দিকে ছুটে গেল।
মিলিকে পাতলা নাইটিতে দেবীর মত লাগে। তার শরীরের প্রতিটি ভাঁজ এত স্পষ্ট ভাবে দৃশ্যমান যে সে আকর্ষণকে উপেক্ষা করা একেবারেই অসাধ্য। ফরিদ প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়তে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই মিলি বলল, ‘ভিকির রুম চেক করে এসেছ? ও ঘুমিয়েছে তো?’
‘নিশ্চয়ই ঘুমিয়েছে। এত রাত পর্যন্ত জেগে থাকবে নাকি?’
‘তবু যাও—দেখে আসো।’ নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল মিলি।
এমন পরিস্থিতি কেউ এমন শীতল ব্যবহার করতে পারে ফরিদের জানা ছিল না। তার মেজাজ কিঞ্চিত খারাপ হলো কিন্তু সে জানে তর্ক করে লাভ নেই—অযথা সময় নষ্ট হবে। ফরিদ কথা না বাড়িয়ে দেখতে গেল ভিকি ঘুমিয়েছে কিনা।
মিলির মাস্টার বেডরুম আর ফরিদের রুমের মাঝখানেই ভিকির রুম। সাথে একটা বাথরুম লাগোয়া—যেটা ফরিদ আর ভিকির রুমের ঠিক মাঝে। দু’রুম থেকেই দরজা আছে। দু’পাশ থেকেই ব্যবহার করা যায়। ফরিদ দেখল ভিকি কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমিয়ে আছে। তবুও সে তার বিছানার পাশে গিয়ে একবার দেখল। ভিকির ভারি নিঃশ্বাসের শব্দে ফরিদ নিশ্চিত হয়ে ফিরে গেল মিলির ঘরে।
এসে দেখল মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়েছে। ইতিমধ্যে তার নিশ্বাসও ভারি হয়ে এসেছে। মিলি কি ঘুমিয়ে পড়ল—এত তাড়াতাড়ি? ফরিদ কী করবে? চলে যাবে তার রুমে নাকি মিলির ব্লাঙ্কেটের নিচে ঢুকে পড়বে। ঘুমন্ত মানুষের সাথে কি এসব করা যায়—হোক না সে তার স্ত্রী। ফরিদ দ্বিধা নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
ফরিদের মনে পড়ল একদিনের কথা। ভিকিকে ঘুম পাড়িয়ে মিলি ফরিদের রুমে এসে বলল, ‘কী ব্যস্ত?’
ফরিদ একটা জরুরি রিপোর্ট রেডি করছিল—পরদিন সকালে ওর মিটিংর জন্য। সে মাথা তুলে তাকাল।
মিলি বলল, ‘কাজ শেষ করে এসো। আমি জেগে থাকব।’
‘তুমি জেগে থাকবে?’ একটু মৃদু হেসে অবাক কণ্ঠে বলল ফরিদ।
‘হ্যাঁ থাকব।’
‘আচ্ছা যাও আসছি। ফিফটিন মিনিটস।’
হাতের কাজ শেষ না করেই ঠিক বারো মিনিটের মাথায় ফরিদ মিলির ঘরে যেয়ে দেখল—মিলি ব্লাঙ্কেটের নিচে। যথারীতি নিশ্বাস ভারি। মুখটা দেখা গেলেও বোঝা যেত সে ঘুমিয়েছে কিনা, কিন্তু তারও কোনো উপায় নেই।

পরের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-১)

ক্রিং ক্রিং ক্রিং।
প্রত্যুষে হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল ফোনের শব্দে। সে বিরক্ত হয়ে বেডসাইড টেবিলে রাখা ফোনের দিকে তাকিয়ে আবার ব্লাঙ্কেট দিয়ে মাথা ঢেকে শুয়ে রইল। সে এমনিতেই রাত করে বাসায় ফেরে। তাই সকালে একটু দেরিতেই উঠে—সকালের ঘুমটা তার খুবই প্রিয়। পরিস্থিতি তেমন না হলে খুব সকালে তার ঘুম ভাঙ্গার তেমন কোনো রেকর্ড নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যে বেডসাইড টেবিলের উপরে রাখা ফোনটি আবারো বেজে উঠল।
হাসান অত্যন্ত বিরক্ত হয়ে ব্লাঙ্কেটের ভেতর থেকে মাথা বের করে ঘড়িতে সময় দেখল—সকাল সাতটা। সে ফোনটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ সময় আবার কে ফোন করলো। নিশ্চয়ই কোন টেলিমার্কেটিং এর লোকজন। নাহ, এদের যন্ত্রণায় দেখছি সকালে একটু আরাম করে ঘুমানোও যাবে না। যত্তসব।’
সে আবারো ব্লাঙ্কেটের মধ্যে মাথা ঢুকাল এবং সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল।
এক ঘণ্টা পর হাসানের ফোনটা আরেকবার বাজল। এবার সে মাথা তুলে ফোন হাতে নিয়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠেই বলল, ‘হ্যালো?’
ওপাশ থেকে অসম্ভব মিষ্টি একটা কণ্ঠ ভেসে আসল। রিনরিনে কণ্ঠে সে বলল, ‘হ্যালো, ক্যান আই স্পিক টু হাসান?’
হাসান ভ্রূ কুঁচকে বলল, ‘ইয়েস, স্পিকিং। হু ইজ দিস?’
ওপাশ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। একটু চুপ করে থেকে অসহিষ্ণু কণ্ঠে হাসান জিজ্ঞেস করল, ‘মে আই নো, হু ইজ কলিং?’
এবার নারী কণ্ঠ সাড়া দিল। সে বলল, ‘আমি!’
‘আমি? আমি কে?’ আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইল হাসান।
‘অপলা!’
‘কে?’
‘আমি অপলা।’
কয়েক মুহূর্তের জন্যে থমকে গেল হাসান—কথা আঁটকে গেল তার। সে অবাক হয়ে বলল, ‘অ-অপলা? আই মিন অপলা। তুমি?’ বলতে বলতে হাসান বিছানায় উঠে বসল।
‘হ্যাঁ, আমি।’
হাসানের চোখ-মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল, ‘হোয়াট অ্যা সারপ্রাইজ!’
‘কি খুব অবাক হয়েছ?’
‘অবাক হবো না। আমার তো এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না।’
হাসান দ্রুত স্লিপিং গাউনটা গায়ে জড়িয়ে নিয়ে বিছানা থেকে নেমে পড়ল।
‘তোমার জন্যে আরও সারপ্রাইজ আছে।’
হাসান ফোনটা চোখের সামনে এনে একবার দেখল তারপর আবার কানে লাগিয়ে বলল, ‘আরও সারপ্রাইজ?’
‘আমি আজ বিকালের ফ্লাইটে শিকাগো আসছি।’
‘শিকাগো আসছ? কোথায়? মানে কার কাছে?’
‘কার কাছে আবার? তোমার কাছে!’
‘আমার কাছে? রিয়েলি?’ হাসান যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। সে আবারো ফোনটা চোখের সামনে এনে দেখল তারপর কানে লাগিয়ে অপলার কথা শুনল।
অপলা বলল, ‘কেন বিশ্বাস হচ্ছে না?’
‘না, আই মিন হ্যাঁ। আই মিন…’ হাসান কী বলবে ভেবে পেল না।
‘এনি প্রবলেম?’ অপলা জানতে চাইল।
‘প্রবলেম ? আরে না না কিসের প্রবলেম?’
‘ওকে—তাহলে বিকেলে দেখা হচ্ছে। এখন রাখছি…’ বলেই অপলা ফোনটা কেটে দিল।
হাসান সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘ওয়েট! হ্যালো। অপলা?’
অপরপ্রান্ত থেকে কোনো সারা পাওয়া গেল না। হাসান ফোনটা চোখের সামনে এনে দেখে আবার কানে লাগিয়ে কয়েকবার বলল, হ্যালো। এত তাড়াতাড়ি অপলা ফোনটা কেটে দিবে সে ভাবতেই পারেনি।
হাসান হঠাৎ অনুধাবন করল অপলা আসছে—তার সঙ্গে আবার দেখা হবে। সে নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে দু’হাত ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘ও ইয়েস।’
মুহূর্তের মধ্যেই হাসানের সবকিছু কেমন যেন বদলে গেল। সে কিচেনে ঢুকে কফি মেশিনে কফি বানাতে দিয়ে দরজা খুলে আজকের নিউজ পেপার নিয়ে এলো। তারপর, বড় এক মগ কফি নিয়ে বসল ব্যাকইয়ার্ডের ছাতার নিচে। আয়েশ করে কফিতে চুমুক দিতে দিতে পত্রিকার পাতা ওলটাতে লাগল। যদিও কোনো খবরই তার কাছে তেমন গুরুত্ব পাচ্ছে না। আসলে পত্রিকার কোনো খবরের প্রতি তার কোনো আগ্রহও নেই এই মুহূর্তে—সে সারাক্ষণ ভাবতে থাকল অপলার কথা।
তারপরেও হঠাৎ করেই সে আজকের রাশিফল পাতায় চোখ রাখল এবং কাকতালীয় ভাবে যেটুকু পড়ল তাতে তার ভাল লাগা ছড়িয়ে পড়ল চারিদিকে। রাশিফলে লেখা আছে—অনেকদিন পর আজকের সকালটা আপনার কাছে একটু অন্যরকম লাগবে। বিশেষ কারণ হিসেবে কাজ করতে পারে কারো আগমন বা বা কোনো আকাঙ্ক্ষিত খবর। যার জন্য এতদিনের অপেক্ষা। যে কোনো সময় চলে আসবে আকাঙ্ক্ষার সুখবর। সঙ্গীর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি হবে। কর্মক্ষেত্রে সুবাতাস বইবে। দূর যাত্রায় সাবধানতা অবলম্বন আবশ্যক… এটুকু পড়েই হাসান তাকাল চারিদিকে।
সত্যিই আজকের সকালটা যেন একটু অন্যরকম। বাইরে মিষ্টি রোদের ঝলকানি। কেমন ফুরফুরে, আর ঝরঝরে। সকালটা তো কালও ছিল। তবে এমন ঝলমল সুনীল ছিল কি? হঠাৎ করেই শিকাগোর আকাশ ঝলমলে রোদের ঝলকানিতে চিকচিক করছে।
আজকের সকালটা অন্যরকম একটা ভাল লাগা দিয়ে শুরু হয়েছে হাসানের। সকাল সকাল ঘুম ভাঙ্গার পরে যে বিরক্তি শুরু হয়েছিল সেটি মিলিয়ে গেছে—অপলার ফোন পাওয়ার পর থেকেই। কেমন অদ্ভুত এক মন ভাল করা অনুভূতি হচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।
এই ভাল লাগার পাশাপাশি এক ধরণের অস্থিরতা পেয়ে বসল হাসানকে। অস্থিরতাটা কমছে না কিছুতেই। কারো সঙ্গে কথা বলতে পারলে ভাল হতো। সে নিউজ পেপার বন্ধ করে মোবাইল ফোন থেকে ফোন করল রুবেলকে।
শনিবারের সকাল।
শিকাগোর বিখ্যাত লেক মিশিগানের নর্থ বিচ সংলগ্ন একটা বেঞ্চে বসে রুবেল আর যূঁথী কথা বলছিল। আজ সারাদিন ঘুরাঘুরির প্ল্যান করে বের হয়েছে দুজনে। সপ্তাহে এই একটা মাত্র দিন তাদের দেখা হয়। তাও সব সময় যে হয় তা না। কাজেই সময়টাকে একে অপরের সান্নিধ্যে কাটাবার সর্বাত্মক চেষ্টা করে তাঁরারা।
রুবেলের ফোন বাজতেই সে মোবাইলের স্ক্রিনে দেখল হাসানের নাম্বার। সে যূঁথীকে ইশারা দিয়ে ফোন ধরে বলল, ‘হ্যালো।’
ওপাশ থেকে হাসান বলল, ‘হ্যালো রুবেল? গেস হু জাস্ট কল্ড মি?’
‘হু?’ রুবেল জানতে চাইল।
‘ইট ওয়াজ অপলা।’
‘কোন অপলা?’
হাসান অবাক হয়ে বলল, ‘কোন অপলা মানে? ফাজলামো করো? তুমি বুঝি আর জানো না? ঘটনাটা শোনো…’ একটু থেমে হাসান বলল, ‘তখন সকাল আর কত হবে? এই ধরো সাতটার মতো। হঠাৎ একটা ফোনের শব্দে আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল। আমি তো মহা বিরক্ত। এতো সকালে কে ফোন করল। মনে হয় টেলিমার্কেটিং—আমি তাই ফোন না ধরে ঘুমিয়ে রইলাম। কিছুক্ষণ আবার ফোন এলো। এবার আমি ফোন ধরলাম। ওপাশ থেকে একটা মেয়ের কণ্ঠ। জিজ্ঞেস করলো, ক্যান আই স্পিক টু হাসান? আমি বললাম…’
হাসান বিরতিহীনভাবে বলে চলল। রুবেল কথার মাঝখানে তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, ‘হাসান ভাই, আপনি কি পুরা ফোনের কনভারসেশন এখন আমাকে ফোনেই শোনাবেন নাকি? আমি বরং আপনার ওখানে চলে আসি, তারপর না হয় সব কথা শোনা যাবে?’
‘আরে শোনই না, তারপর কী হলো। হ্যাঁ কোথায় যেন ছিলাম?’
উত্তেজিত কণ্ঠে হাসান আবার শুরু করল, ‘ও হ্যাঁ আমি বললাম, আপনি কে? সে বলল, আমি অপলা। আমি আসছি শিকাগোতে। আমি বললাম কোথায় আসছ, কার কাছে উঠবে। ও বলল, কার কাছে আবার? তোমার কাছে? আমি তো আকাশ থেকে পড়লাম। কিছু বুঝে উঠার আগেই সে বলল, এখন রাখি বলেই ফোন রেখে দিল। কোনো মানে হয় বলো?’
‘এখন কি আপনার খুব খারাপ লাগতেছে?’ দুষ্টুমির সুরে রুবেল বলল।
‘না না খারাপ লাগবে কেন? ও তো আমার এখানেই আসছে।’
‘তাইলে এখন কী করবেন?’
‘অপলার পছন্দের একটা আইটেম রান্না করবো। আই’ম গোয়িং টু মেক এ স্পেশাল ডিশ ফর হার। তারপর দুজনে মিলে ডিনার। এ ক্যাণ্ডেললাইট ডিনার ফর টু—জাস্ট ফর টু অফ আস!’
‘তারপর?’ রুবেলের মুখে দুষ্টুমির হাসি।
‘তারপর আবার কী?’ রুবেলের দুষ্টুমি ধরতে একটু সময় লাগল হাসানের। ইঙ্গিত বুঝতে পেরে সে বলল, ‘ফাজলামো হচ্ছে?’
‘আপনে কি নার্ভাস?’
‘আরে না না, নার্ভাস হতে যাবো কেন? আসলে অনেক দিন পর তো, তাই।’
‘কিন্তু আমার তো মনে হইতেছে আপনি নার্ভাস হয়ে যাইতেছেন।’
‘ইয়ে মানে, আসলে তুমি ঠিকই বলেছ। এখন যেন কেমন একটু নার্ভাস লাগছে।’
কথা বলতে বলতে হাসান ঢুকল ঘরের ভেতর। রান্না ঘরে এসে ফ্রিজ খুলে দেখল—ফ্রিজ খালি। রান্না করার মত তেমন কোনো কিছুই চোখে পড়ল না। সে রুবেলকে বলল, ‘গ্রোসারী করতে হবে। মাই ফ্রিজ ইজ এম্পটি।’ হাসান ঘরের চারিদিকে তাকিয়ে দেখল—সব কিছুই কেমন অগোছালো। সে বলল, ‘এদিকে বাসাটাও একটু ক্লিন করা দরকার।’
রুবেল যূঁথীর দিকে তাকিয়ে দেখল—বিরক্ত হয়ে ভ্রূ কুঁচকে তাকিয়ে আছে সে। কিসের এত কথা? রুবেল আঙুল দিয়ে যূঁথীকে অস্থির না হবার ভঙ্গি করল। তারপর বলল, ‘হাসান ভাই, আপনি চাইলে আমি এসে হেল্প করতে পারি।’
‘না না তোমাকে আসতে হবে না। তুমি এসে আবার সব উলটা পালটা করবে। না তার দরকার নেই। আমি একাই সামলাতে পারব।’
হাসান ঘড়ি দেখল। এবং সঙ্গে সঙ্গে বলল, ‘আমাকে এখন যেতে হচ্ছে। রাখি কেমন? পরে কথা হবে।’ কথা না বাড়িয়ে সে ফোন কেটে দিল।
হাসান ফোন কেটে দিতেই রুবেল যূঁথীর দিকে তাকিয়ে কাঁচুমাচু হয়ে বলল, ‘যূঁথী, আমাকে এখুনি একটু যেতে হবে।’
হাসানের ফোন আসার পর থেকেই যূঁথী লক্ষ্য করছিল রুবেলকে এবং ওর কথাও সে শুনেছে। সে অবাক হয়ে জানতে চাইল, ‘যেতে হবে মানে? কোথায়?’
‘কোথায় আবার? হাসান ভাইয়ের ওখানে।’
‘আমার তো মনে হলো উনি তোমাকে যেতে নিষেধ করলেন।’
‘আরে উনি নিষেধ করলেই হবে? আমার একটা দায়িত্ব আছে না।’
যূঁথী প্রচণ্ড বিরক্ত হলো। সে মুখ ঘুরিয়ে তাকাল লেকের দিকে।
রুবেল একটু ইতস্তত করে বলল, ‘ইয়ে, তুমি এক কাজ করো—তুমি বাস কিংবা ট্রেন ধরে বাসায় চলে যাও, আমি তোমাকে পরে কল করব। ওকে?’
যূঁথী এবার রাগান্বিত কণ্ঠে বলল, ‘দ্যাটস নট ফেয়ার রুবেল। আই থট উই হ্যাভ প্ল্যান—পার্কে যাব, মুভি দেখব আর এখন কিনা তুমি…’ রাগে কথা বন্ধ করে যূঁথী আবারো লেকের দিকে ঘুরে তাকাল।
রুবেল কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আর কোনো কথা না বলেই চলে গেল যূঁথীকে একা ফেলে।
যূঁথী ওর চলে যাওয়ার দিকে অবিশ্বাস্যভাবে তাকিয়ে আবারো বলল, ‘দ্যাটস নট ফেয়ার।’
কাপড় বদলে হাসান পেছনের গাড়ি গ্যারাজে গিয়ে ঢুকল। তার বিএমডব্লিউ এসইউভি গাড়িটি স্টার্ট দিয়ে গ্যারাজ খুলে বের হয়ে গেল ধীরে ধীরে।
সামনে পেছনে প্রায় ১০ হাজার বর্গ ফুটের বিস্তৃত সবুজ প্লটে ৬ হাজার বর্গ ফুটের ভিক্টোরিয়ান স্টাইলের দোতলা প্রাসাদোপম বাড়িটি মাত্র বছর খানেক হলো হাসান তৈরী করেছে শিকাগোর অদূরের একটি উপশহরের অভিজাত আবাসিক এলাকায়। চারিদিকে আভিজাত্যের ছায়া। ইন্টেরিয়র ডিজাইনার দিয়ে ভেতরের সব কিছু ডিজাইন করা। উঁচু সিলিংএর ঘরের মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত উঁচু পর্দা দিয়ে গ্লাসের জানালাগুলো ঢেকে দেয়া। অন্দরের সম্পূর্ণ সজ্জায় আধুনিকতার ছোঁয়া। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিখ্যাত টুরিস্ট স্পট ও স্থাপনার ছবি দিয়ে দেয়ালগুলো সাজানো হয়েছে। ঝাড়বাতি থেকে শুরু করে সবকিছুর ভেতরেই নতুনত্বের ছোঁয়া—দারুণ একটা শৈল্পিক ব্যাপার সব কিছুর মধ্যেই। বাড়ির পেছনে সুইমিং পুল। বাড়ির সামনে সুন্দর করে সাজানো ফুলের বাগান। একেই হয়ত বলে স্বপ্নের বাড়ি—হাসানের স্বপ্নের বাড়ি।
আবাসিক এলাকা পার হয়ে হাইওয়েতে এসে পড়ল হাসানের বিএমডব্লিউ এসইউভি। গাড়ি চালাতে চালাতে হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে গেল সে। তার মনে পড়ল সেদিনটির কথা—
(চলবে…)
(ভূমিকাতে বলতে ভুলে গেছিলাম, এই গল্পটি নিয়ে একটি নাটকও নির্মাণ করেছিলাম। নাটকের নাম ছিল ‘মোমের আলোয় অপলার স্বপ্ন’, কোনো এক ভালোবাসা দিবসে আরটিভিতে নাটকটি প্রচারিত হয়েছিল।

পরের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (শেষ পর্ব)

আজকে পেশেন্টের ভিড় খুব একটা নেই ড. জোনসের অফিসে তবুও বেশ দেরি করেই ডাক পড়ল ফরিদের। ফরিদ ভিতরে ঢুকতেই ড. জোনস প্রাথমিক কুশলাদি সেরে জিজ্ঞেস করলেন, ‘প্রথম কবে আপনার মনে হলো আপনার স্ত্রী মানসিকভাবে অসুস্থ?’
মিলি মানসিকভাবে অসুস্থ! কথাটা শুনতে ফরিদের মোটেও ভালো লাগল না। মিলির মধ্যে সামান্য অস্বাভাবিকতা আছে এটা ঠিক কিন্তু তাই বলে ওকে কি অসুস্থ বলা যাবে? কিন্তু যে অস্বাভাবিকতা ওর মধ্যে আছে কিংবা ঢুকে পড়েছে, তার একটা চিকিৎসা হওয়া দরকার, সেটা ফরিদ বিশ্বাস করে।
ফরিদ চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। কিন্তু একদিনের ঘটনা সে কিছুতেই ভুলতে পারবে না। তার মনে পড়ে গেল সেদিনটির কথা।
গভীর রাতে একদিন হঠাৎ ঘুম ভেঙে ফরিদ দেখল, মিলি বিছানায় নেই। চারিদিকে শুনশান নীরবতা। ফোনের পর্দায় সময় দেখল রাত দুটা বেজে তেইশ মিনিট। নিশ্চয়ই বাথরুমে গেছে, এতরাতে আর যাবেই বা কোথায়। ফরিদ অন্যদিকে ঘুরে ঘুমানোর চেষ্টা করল আবার।
মিলি সাধারণত একবার ঘুমিয়ে পড়লে সকালের আগে ঘুম থেকে উঠে না। বাথরুমে যেতে হবে সেই ভয়ে রাতে সে বেশি পানিও খায় না। প্রায় দশ মিনিট হয়ে গেল মিলির ফিরে আসার নাম নেই। বাথরুমে যদি যেয়েও থাকে, এতক্ষণ সেখানে সে কী করছে? ছোট বড় যেই কাজই হোক, এত সময় তো লাগার কথা না।
ফরিদ ছোট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বিছানা থেকে নেমে পড়ল সে। লক্ষ করল বাথরুমের দরজার ফাঁক গলে আলো দেখা যাচ্ছে। সে এগিয়ে গিয়ে আস্তে করে টোকা দিল দরজায়। মিলি কোনো উত্তর দিল না। কমোডে বসে আবার ঘুমিয়ে পড়ল নাকি। ফরিদ দরজার নব ঘুরাতেই খুলে গেল খানিকটা। আস্তে করে দরজা সরিয়ে মাথা ঢুকিয়ে দেখল, কিন্তু মিলিকে দেখা গেল না। সে আর একটু ঢুকে মাথা ঘোরাতেই তার চোখ চলে গেল বাথটাবের দিকে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই তার সমস্ত শরীরটা প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়ে শক্ত হয়ে গেল। মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল। ফরিদ দেখল, বাথটাব পূর্ণ হয়ে আছে পানিতে—সেই পানিতে উপুড় হয়ে ভাসছে মিলির শরীর—সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায়। মিলি এভাবে কতক্ষণ ধরে মাথা ডুবিয়ে আছে কে জানে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে দ্রুত মিলির শরীরটা ঘুরিয়ে টেনে তুলল ফরিদ। মাথাটা উঁচু করে ধরতেই বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে চোখ মেলে তাকাল মিলি।
ফরিদ ভয়ার্ত দৃষ্টিতে মিলির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মিলি, কী হয়েছে তোমার? তুমি এভাবে…’
ফরিদের কথা শেষ হবার আগেই মিলি বলল, ‘কিছু হয় নি তো! কী হবে আবার?’
চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল ফরিদ। তার মাথায় কিছুই ঢুকছে না।
‘ভয় পেয়েছ?’ মিলি আবার তাকাল ফরিদের দিকে।
ফরিদের মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হলো না। তার এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না, মিলি এভাবে পানি ভর্তি বাথটাবের মধ্যে মাথা ডুবিয়ে ছিল কেন—এসবের মানে কী?
মিলির চেহারায় একটা অপ্রকৃতিস্থ ভাব ফুটে উঠেছে। সে ঘোরলাগা মানুষের কণ্ঠে বলল, ‘একটা এক্সপেরিমেন্ট করছিলাম। টাওয়েলটা দাও তো, শীত লাগছে।’
ফরিদের ইচ্ছে হলো জিজ্ঞেস করতে, কীসের এক্সপেরিমেন্ট? ঠিক তক্ষুণি লক্ষ করল মিলির শরীর কাঁপছে থরথর করে। ফরিদ দ্রুত একটা তোয়ালে দিয়ে মিলিকে পেঁচিয়ে ধরে বিছানায় নিয়ে এলো। ব্লাঙ্কেট দিয়ে শরীর ঢেকে জড়িয়ে ধরে রাখল। ধীরে ধীরে উষ্ণতা ফিরে এলো মিলির দেহে। কিছুক্ষণের মধ্যে কাঁপুনির মাত্রাও কমে এলো এবং এক পর্যায়ে সে ঘুমিয়েও পড়ল।
ফরিদ জেগে রইল বাকি রাত। ঘুমন্ত মিলির পাশে বসে আকাশ-পাতাল ভাবতে লাগল সে।
সব শুনে ড. জোনস গম্ভীর হয়ে গেলেন। কিছুক্ষণ একমনে কী যেন ভাবলেন তিনি। নোটপ্যাডে কিছু লিখলেন আবার কেটেও দিলেন। কিছু একটা মেলানোর চেষ্টা করছেন। তিনি ফরিদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের বাচ্চাটি মারা যাবার কতদিন পরের ঘটনা এটি?’
‘দেড় কি দুমাস পর, সঠিক মনে নেই।’
‘আর কোনো অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা এমন কিছু কী সে করে যা দেখে মনে হতে পারে সে অসুস্থ?’
‘না। তবে মাঝে মাঝে ও খুব আনমনে তাকিয়ে থাকে একদিকে।’
‘এনিথিং এলস?’
একটু ভেবে নিয়ে ফরিদ বলল, ‘বাথটাবে শুয়ে থাকে।’
‘পানি ছেড়ে?’
‘হ্যাঁ।’
ড. জোনসের একবার মনে হলো এটা পোস্ট-পারটাম ডিপ্রেশনের কেস। সন্তান জন্ম দেয়ার পরপরই অনেক মা সন্তান জন্মদান পরবর্তী বিষণ্নতায় আক্রান্ত হয়। কিন্তু পরিবারের নিকটজনেরা অনেকক্ষেত্রেই এই বিষণ্নতাকে চিহ্নিত করতে পারে না। ফলে ঘটে দুঃখজনক পরিণতি।
ড. জোনসের লিলিয়ান নামের এক পেসেন্টের কথা মনে পড়ে গেল। সন্তান জন্মদানের পর ইনসমনিয়াতে আক্রান্ত হয় লিলিয়ান এবং সব মিলিয়ে তাল সামলাতে হিমশিম খেতে থাকে। এই পরিস্থিতিই ধীরে ধীরে মনোরোগ হিসেবে দেখা দেয় এবং ড. জোনসের পরামর্শক্রমে ওষুধ সেবনও শুরু করে সে। তারপরেও একদিন লিলিয়ানের স্বামী বাড়ি ফিরে দেখে তাদের সাত মাসের শিশুটি পানিতে ডুবে মারা গেছে। আর তার স্ত্রীকে পাওয়া যায় শহরের সন্নিকটে একটি লেকের ধারে। পরবর্তীতে জানা যায়, নিজের সন্তানকে পানিতে ডুবিয়ে মারার পর লিলিয়ান নিজেও ডুবে মরতে গিয়েছিল এবং সেখানেই জ্ঞান হারিয়ে পড়ে থাকে।
নিজের সন্তানকে মেরে ফেলার আগে অন্তত আশি ভাগ নারী চিকিৎসকের শরণাপন্ন হয় এবং মাথা ব্যথা, ঘুমহীনতা ও অনিয়মিত পিরিয়ডের ব্যাপারে পরামর্শ নেয়।
মিলির অস্বাভাবিকতাকে হালকাভাবে নেবার কোনো সুযোগ নেই। খতিয়ে দেখতে হবে সেও কোনো রকম ডিপ্রেশনে ভুগছে কি না। শিশুটি মারা যাবার পর থেকেই মিলি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তীব্র অপরাধবোধের কারণে বাথরুমে গেলেই তাঁর মনে হয় শিশুটি তার অবহেলার কারণে মারা গেছে। মিলিকে সুস্থ করতে হলে যেভাবেই হোক ওর মাথার মধ্যে ঢুকিয়ে দিতে হবে যে বিষয়টি ছিল নেহায়েত দুর্ঘটনা।

ফরিদের সঙ্গে কথা শেষ করে ড. জোনস মিলিকে ডাকলেন।
‘আপনার ঘুম কেমন হয়?’ মিলির সঙ্গে কথা বলার সময় ড. জোনস জিজ্ঞেস করলেন।
‘আমার ঘুমে কোনো সমস্যা নেই। ঘুম ভালই হয়।’ মিলির সাবলীল উত্তর।
‘আপনার স্বামী বলছিল আপনি ঘুমের মধ্যে বাথরুমের মধ্যে গিয়ে বসে থাকেন।’
‘ঘুমের মধ্যে যাই না তো! আমি তো জেগেই থাকি।’
‘আপনি মাঝে মাঝেই এটা করেন?’
‘জি।’
‘কেন?’
‘এমনিই—কোনো কারণ নেই।’
‘বিনা কারণে কি কেউ কিছু করে মিস মিলি?’
‘আমি তো নিজের ইচ্ছেয় করি না।’
‘তবে?’
‘অন্য কেউ একজন আমাকে দিয়ে করায়।’
‘কে সে?’
‘তা তো বলতে পারব না।’
‘মিস মিলি—বিষয়টা আমার জানা দরকার!’
মিলি কোনো উত্তর দিল না। সে উঠে গিয়ে চুপ করে তাকিয়ে রইল অন্যদিকে।
ড. জোনস আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। তার যা বোঝার তিনি বুঝে ফেলেছেন। মিলির ব্যাপারে একটা সিদ্ধান্তে আসতে পেরেছেন বলেই তার ধারণা।

মিলির যেটা হয়েছে—মেডিক্যাল টার্মে তাকে বলে অডিটরি হ্যালুসিনেশন। মানসিকভাবে আঘাত প্রাপ্ত অনেকের এরকম হয়। অনেকটা সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের মতো। খুব সম্ভব মেয়েটি সিজোফ্রেনিয়ায় ভুগছে। এটি এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে আছে—যাকে বলে নিউরোসিস। তবে এখনই চিকিৎসা না করালে সাইকোসিস পর্যায়ে চলে যাবে। সে পর্যায়ে গেলে ভয়ংকর সব ঘটনা ঘটতে থাকবে। তাই ব্যবস্থা যা করার এখনই করতে হবে।
ড. জোনস মিলিকে তার নির্বাহী তত্ত্বাবধানে পরিচালিত একটি সাইকিয়াট্রিক ক্লিনিকে ভর্তি করানোর পরামর্শ দিলেন ফরিদকে। কিছু ক্লিনিক্যাল টেস্ট অ‍্যান্ড ট্রায়ালের মাধ্যমে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে চান তিনি।
ফরিদ উৎসুক হয়ে জানতে চাইল, ‘কতদিন লাগতে পারে বলে আপনার ধারণা?’
‘ফরিদ সাহেব, মানসিক রোগ তো কোনো জীবাণুঘটিত রোগ না যে এন্টিবায়োটিক দিয়ে দিলাম—আট ঘণ্টা পর পর একটি করে ক্যাপসুল সাত দিন খেল—ভালো হয়ে গেল। শরীরের রোগ-ব্যাধি ওষুধ দিয়ে সারানো যায়, কিন্তু মনের ব্যাধির তেমন কোনো ওষুধ নেই। কঠিন মানসিক ব্যাধি সারতে সময় লাগে। অনেক সময় সারেও না। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করে যেতে হবে। মনের রোগ তাড়াবার ব্যবস্থা করতে হবে।’
ফরিদ মাথা নেড়ে চুপ করে রইল।
ড. জোনস আবার বললেন, ‘আপনার স্ত্রীর মাথায় অনেক এলোমেলো ব্যাপার আছে—যা আপনি কিংবা ভিকি কেউই বুঝতে পারছেন না। আপাত: দেখতে সবকিছু স্বাভাবিক মনে হলেও মিস মিলি কিন্তু মোটেও স্বাভাবিক নয়। আমার ধারণা মিলি তার মনের অসুখটা লুকিয়ে রাখতে চাইছে। শরীরে যেমন ক্ষত থাকলে মানুষ তা লুকিয়ে রাখতে চায়—মনের ক্ষতও তাই। মনের অসুখও বিষাক্ত ঘায়ের মতো—কেউ দেখাতে চায় না। মিস মিলি এক ধরনের অপরাধবোধে ভুগছে। আমাদের কাজ হবে তাকে সেই অপরাধবোধ থেকে মুক্ত করা। কাজটা সহজ নয়—তবে চেষ্টা করলে সফল হবার সম্ভাবনা আছে বৈ কি।’
এক নাগারে থেমে থেমে কথাগুলো বলে ড. জোনস থামলেন। ফরিদ তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে। অত্যন্ত মনোযোগ দিয়ে কথাগুলো শুনল সে।
একটু বিরতি দিয়ে ড. জোনস আবার বললেন, ‘অসুখের মূল কারণটি বুঝতে পারলেই অসুখ সেরে যায়।’
ফরিদ কী বলবে কিছু ভেবে পেল না। তবে বুঝতে পারল, মিলির চিকিৎসা সম্ভব। ড. জোনসের কথাগুলো তার মনে ধরেছে। সে আশার আলো দেখতে পেল। বেশ খুশি মনেই মিলিকে নিয়ে ফরিদ ড. জোনসের অফিস থেকে বের হয়ে এলো সে।
অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই মিলিকে ড. জোনসের ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে দিল ফরিদ।

মিলির সম্পূর্ণভাবে সুস্থ হয়ে ফিরে আসতে বেশিদিন সময় লাগল না।
একমাসের অল্প কিছু বেশি সময় ধরে মিলির চিকিৎসা চলল ড. জোনসের ক্লিনিকে তার বিশেষ তত্বাবধানে। বিভিন্ন রকম পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং থেরাপির মাধ্যমে মিলিকে সুস্থ করে তুললেন তার অক্লান্ত প্রচেষ্টায়।
ক্লিনিক থেকে যেদিন রিলিজ পেল মিলি, সেদিন সে এক অন্যরকম মিলি।
ফরিদ আর ভিকি মিলিকে নিয়ে যখন বাসায় ফিরল তখন সন্ধ্যা গড়িয়ে রাত নেমেছে চারিদিকে।
বাসায় ফিরে মিলিকে শোবার ঘরে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল ফরিদ।
মিলি বলল, ‘তুমি একটা কাজ করো—তুমি ভিকিকে নিয়ে তোমার রুমে চলে যাও। তোমাদের দেখে মনে হচ্ছে না, কেউ সহসা ঘুমবে। আমি একটা ঘুমের ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ব।’
ফরিদ বলল, ‘আমি তোমার পাশে বসে থাকব। তোমাকে ছেড়ে আমি কোথাও যাচ্ছি না। তুমি হাতটা দাও তো—আমি তোমার হাতটা একটু ধরি।’
মিলি হাত বাড়িয়ে দিল। ফরিদ আলতো করে মিলির হাতখানি ধরল।
ভিকি দৌড়ে এসে মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বলল, ‘ইটস ফ্যামিলি টাইম। ক্যান উই অল স্লিপ টুগেদার লাইক বিফোর—প্লিজ মামি!’
মিলি হেসে দিয়ে বলল, ‘আয় পাগলা, আজ আমরা আগের মতো সবাই এক সঙ্গেই ঘুমাব।’
ভিকির চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। সে ফরিদের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমির ভঙ্গিতে বলল, ‘বাট বাবা, ইউ ক্যাননট স্নোর ওকে?’
ফরিদ হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কই, আমি কি স্নোর করি নাকি? আই ডোন্ট ডু দ্যাট এনিমোর!’
‘ইয়েস ইউ ডু।’ ভিকি দুষ্টুমির হাসি দিয়ে বলল, ‘রিমেম্বার লাস্ট টাইম, আই ভিডিও টেপড ইয়োর স্নোরিং। ইউ ওয়ানা সি?’
ফরিদ আর মিলি একসঙ্গে হেসে দিল। মিলি বলল, ‘ফরিদ, একটা গল্প বলো। গল্প বলে আমার মনটা ভালো করে দাও।’
ইতিমধ্যেই ভিকি বাবা-মায়ের মাঝখানে তার জায়গা করে নিয়ে গুটিসুটি শুয়ে গল্প শোনার জন্যে তৈরি হয়ে গেল।
ফরিদ তার গল্প বলা শুরু করল…
মিলি চোখ বন্ধ করে আছে। বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে গল্প শুনছে ভিকি।
কী আনন্দময় সময়! আহারে!
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-৪)

ফরিদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মিলির মুখের দিকে।
‘চলো আমরা একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাই।’ ফরিদের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল মিলি।
ফরিদের চোখের দৃষ্টি প্রসারিত হলো।
‘আমার ধারণা আমাদের সবকথা শোনার পর নিশ্চয়ই একটা ভালো পরামর্শ পাওয়া যাবে।’ আগ্রহ নিয়ে কথাগুলো বলল মিলি।
মিলিকে একজন ভালো সাইকিয়াট্রিস্ট দেখানো দরকার। অনেকদিন থেকেই ফরিদ বিষয়টা নিয়ে ভাবছিল। কিন্তু নিজ থেকে ওকে সে কথা বলার সাহস পাচ্ছিল না। যদি রিয়‍্যাক্ট করে বসে। আজ মিলি নিজেই বলছে সে কথা—ফরিদ বেশ অবাক হলো। সে খুশি মনে বলল, ‘ভিকিকেও সাথে নিলে কেমন হয়?’
‘ভিকি?’ ভ্রু কুঁচকে বলল মিলি, ‘ওকে কেন?’
‘দেখো না কেমন সব কিছুতেই ভয় পায় ছেলেটা? একা ঘুমাতে ভয় পায়। একা একা ইভেন বাথরুমে যেতেও ভয় পায়।’
‘অতটুকুন বাচ্চা—ও তো ভয় পাবেই। এটাই তো স্বাভাবিক। আর তোমারও কোনো সমস্যা আছে বলে আমার মনে হয় না। যা সমস্যা আমার—চিকিৎসা আমার দরকার। আমি নিজেও সেটা জানি। তুমি বরং ভালো একজন সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ নাও। আমি দেখা করতে চাই।’ অস্থিরকণ্ঠে কথাগুলো বলে মিলি চায়ে চুমুক দিল।
মিলির মুখ থেকে এ কথা শোনার পর যেন ঘাম দিয়ে জ্বর ছাড়ার মতো অবস্থা হলো ফরিদের। মিলি এত সহজেই রাজি হয়ে যাবে—এটা ছিল তার কল্পনার অতীত। দেরি না করে ফরিদ ডিরেক্টরি ঘেঁটে শহরের নামকরা সাইকিয়াট্রিস্টের খোঁজ বের করে ফেলল খুব সহজেই।

প্রফেসর ড. ডরথি জোনস, একজন ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্ট—মনোরোগ চিকিৎসার অন্যতম সেরা চিকিৎসক। তিনি একজন সজ্জন রোগী সেবী। এ পর্যন্ত হাজারো রোগী তার চিকিৎসায় সুস্থ জীবন যাপন করছে। একমাসের আগে ড. জোনসের অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার। ফরিদের ভাগ্য ভালো সে এক সপ্তাহের মধ্যেই অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট পেয়ে গেল।
সাইকিয়াট্রি বা মনোরোগ একটি জটিল চিকিৎসা। ড. ডরথি জোনস হলেন এক্ষেত্রে একজন পাইওনিয়ার। তিনি পর্যাপ্ত সময় নিয়ে রোগী দেখেন। সুন্দর সুললিত কোমল ভাষায় সবার সঙ্গে কথা বলেন। নিবিড়ভাবে সকলের যত্ন নেন।
অ‍্যাপয়েন্টমেন্ট অনুসারে একদিন মিলিকে সাথে করে ড. জোনসের অফিসে গিয়ে উপস্থিত হলো ফরিদ। পেপারওয়ার্ক শেষ করার কিছুক্ষণ পরেই মিলির ডাক পড়ল। মিলিকে সাথে নিয়ে ডাক্তারের রুমে ঢুকল সে। তাদেরকে ভিতরে ঢুকতে দেখে ড. জোনস বললেন, ‘আমি পেশেন্টের সঙ্গে একা কথা বলতে চাই প্রথমে।’
ফরিদ মিলির হাতে একটু মৃদু চাপ দিয়ে তাকে আশ্বস্ত করে বের হয়ে গেল।
মিলি দাঁড়িয়ে রইল একা একা।
ড. জোনস বললেন, ‘প্লিজ হ্যাভ এ সিট।’
কোনো জড়তা ছাড়াই মিলি বসল এবং খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলে গেল।
ড. জোনস খুব আন্তরিকভাবে বললেন, ‘কফি খাবেন?’
‘হ্যাঁ, খেতে পারি।’
কফি মেকার থেকে একটি পেপার কাপে কফি ঢেলে মিলিকে দিলেন ড. জোনস। নিজের জন্যেও এককাপ নিলেন। তারপর বললেন, ‘কফি খেতে খেতে কথা বলা যাক, কী বলেন মিস মিলি?’
মিলি মৃদু হেসে বলল, ‘অলরাইট।’ কফিতে একটা চুমুক দিয়ে মিলি কথা শুরু করল। একে একে সব ঘটনাই বলে গেল সে এবং আশ্চর্যজনকভাবে সবকথা বেশ গুছিয়েই বলল মিলি। ভিকির ঘনঘন ভয় পাওয়া, গত সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনা—সবকিছু খুলে বলল সে। বাথরুমে পানির শব্দ, ভিকির কণ্ঠ শুনতে পাওয়া—কোনো কিছুই বাদ গেল না।
মিলির কাছ থেকে সবকথা খুব মনোযোগ দিয়ে বেশ সময় নিয়ে শুনলেন ড. জোনস। তারপর চুপ করে রইলেন অনেকক্ষণ—আরেক কাপ কফি নিয়ে কফিতে চুপচাপ চুমুক দিতে থাকলেন। তার সামনে কেউ একজন বসে আছে, সে কথাও যেন তিনি ভুলে গেছেন।
ড. জোনস কিছুই বলছেন না দেখে মিলি অসহিষ্ণু হয়ে উঠল। মিলির অস্থিরতা হঠাৎ তার নজরে এলো। তিনি মিলির দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘কেসটা আমি দেখছি। ব্যাকগ্রাউন্ড অ্যান্ড পেপারওয়ার্কগুলো রিভিউ করে আমি জানাব।’
ড. জোনসের কথা মিলিকে খুব একটা আশ্বস্ত করতে পারল না। সে অস্থির হয়ে বলল, ‘আপনি কি আমাদের বাসায় একবার আসবেন?’
‘তার কি কোনো দরকার আছে?’ ভ্রু কুঁচকে বললেন ড. জোনস।
‘আপনার মনে হয় নেই?’
‘না নেই।’
‘নাকি যেতে চাচ্ছেন না।’
‘দেখুন মিস মিলি আমি তো আপনাকে বিনে পয়সায় সার্ভিস দিচ্ছি না। আর আমার কন্সালটিং ফি সম্পর্কে নিশ্চয়ই আপনার ধারণা আছে।’
‘জি আছে। প্রয়োজনে আপনার ফি আমরা অ‍্যাডভান্স পে করব।’ মিলির কথাগুলো বেশ কঠিন শোনাল। তার চোখ মুখ শক্ত হয়ে গেল। সে নিঃশ্বাস ফেলছে ঘনঘন।
ড. জোনস অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন মিলির দিকে এবং তারপর কী ভেবে বললেন, ‘ঠিক আছে, ফ্রন্ট ডেস্কে ঠিকানা রেখে যান। আমার এসিস্ট্যান্ট আপনাকে ফোনে কনফার্ম করবে।’
‘অনেক ধন্যবাদ।’
কথা না বাড়িয়ে মিলি উঠে দাঁড়াল। সে একবারও পেছনে না ফিরে ড. জোনসের অফিস থেকে বের হয়ে এলো।

মিলি চলে যাওয়ার পর আরো বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন ড. জোনস। মিলি হঠাৎ করে এমন উত্তেজিত হয়ে গেল কেন? মেয়েটি সম্ভবত হ্যালুসিনেশনে ভুগছে—বারবার একই স্বপ্ন দেখছে। কারণটা খুঁজে বের করতে হবে। একই স্বপ্ন বারবার দেখার পেছনে একটা রহস্য নিশ্চয়ই আছে। কী সেই রহস্য? মিলি অনেক কিছুই বলেছে তবুও তার ধারণা সে কিছু একটা বিষয় চেপে গেছে। সে বিষয়টা কী? ড. জোনস মিলির বাসায় যেয়ে একবার দেখতে চান। তিনি তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে তক্ষুনি বলে দিলেন মিলির বাসা ভিজিটের ব্যবস্থা করার জন্য।

পরের উইকএন্ডেই ড. জোনস মিলিদের বাসায় এসে হাজির হলেন।
ঘুরে ঘুরে বাসার সব ঘরগুলো তিনি দেখলেন। ফরিদের রুমের লাগোয়া বাথরুম দেখলেন এবং ভিকির রুমে ঢুকে তীক্ষ্ণ চোখে চারিদিকে তাকালেন। প্রথমেই তিনি আবিষ্কার করলেন—ভিকির বিছানা আর দেয়ালের মাঝে বেশ খানিকটা ফাঁকা। বিছানার নিচে, দেয়াল ঘেঁসে অনেকগুলো বালিশ ফেলে রাখা হয়েছে। তার মানে ঘুমের মধ্যে ভিকি নিচে পড়ে গেলে যেন ব্যথা না পায় তাই এই ব্যবস্থা। হয়ত এর আগে ভিকি ঘুমের মধ্যে গড়িয়ে বিছানা থেকে নিচে পড়ে গেছে। এটা অসম্ভব নয়—ভয় পেয়ে ভিকি যখন ফরিদকে ডেকে বলেছে নিচে কেউ আছে, ফরিদ ঝুঁকে দেখার সময়ই ভিকি দেয়ালের দিকে সেঁটে গিয়ে বিছানা থেকে নিচে পড়ে যায়। ভিকিকে একবার বিছানার ওপরে আর পরক্ষণেই আবার মেঝেতে দেখতে পায় ফরিদ। এবং ভয় পেয়ে মুর্ছা যায়।
এই মুহূর্তে এর চেয়ে ভালো ব্যাখ্যা তার মাথায় এলো না। যদিও তার মধ্যে খানিকটা সংশয় থেকেই গেল। সময় আসুক ভেবে দেখা যাবে।
ড. জোনস মিলিকে নিয়ে তাদের বেডরুমে এলেন। সেখানে ঢুকেই চারিদিকে এক নজর দেখলেন। তিনি লক্ষ করলেন বিছানার পাশের টেবিলে ছোট একটা বাচ্চা ছেলের ছবি ফ্রেমবন্দী করা। বয়স এক থেকে দেড় বছর হবে হয়ত। সমুদ্র সৈকতে মিলি বসে রয়েছে আর তার একটু সামনেই বালু নিয়ে খেলছে ছেলেটি। ড. জোনস ছবিটি একবার হাতে নিয়ে দেখে আবার নামিয়ে রাখলেন।
‘আপনাদের বিয়ে হয়েছে কত বছর?’ প্রশ্ন করে মিলির দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন ড. জোনস।
‘আট বছর।’
‘একটাই ছেলে?’
উত্তর না দিয়ে চুপ করে রইল মিলি। ড. জোনস তার দিকে তাকিয়ে রইলেন প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে।
মিলি মৃদু স্বরে বলল, ‘জি।’
‘ভেবে উত্তর দিতে হলো?’
‘আমাদের আরেকটি ছেলে ছিল।’ বলেই বেডসাইড টেবিলে রাখা ছবিটির দিকে তাকাল মিলি। ড. জোনস তা লক্ষ করলেন।
‘ছিল?’
মিলি নিশ্চুপ।
‘এখন নেই?’
‘না।’
ড. জোনস তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মিলির দিকে। কিছু একটা আঁচ করতে পারলেন তিনি—সময় দিলেন মিলিকে স্বাভাবিক হবার।
‘ও মারা গেছে।’ মিলি বলল।
‘কীভাবে?’
‘বাথটাবে। গোসলের সময়।’
‘তার মানে খুব ছোট অবস্থায়। কত বয়স হয়েছিল ছেলেটার?’
‘দেড় বছর।’
‘আপনি কাছে ছিলেন না?’
‘ছিলাম।’
‘তাহলে?’
মিলি চুপ করে রইল।
‘অন্যমনস্ক ছিলেন?’
মিলি চুপ।
‘বাথটাবের পানি বন্ধ করতে ভুলে গেছিলেন?’
মিলি চুপ।
‘বলতে না চাইলে অসুবিধা নেই।’ অসহিষ্ণু কণ্ঠে বললেন ড. জোনস। ‘ঘটনা যাই ঘটুক, যেভাবেই ঘটুক—সত্যটা জানা প্রয়োজন।’ একটু থেমে তিনি আবার বললেন, ‘রিমেমবার, আই’ম হেয়ার টু হেল্প ইউ অ্যান্ড আই নিড টু নো দ্য ট্রুথ।’
কিছু না বলে অন্যদিকে তাকিয়ে রইল মিলি। ড. জোনসের চোখের দিকে তাকাতে তার সাহস হচ্ছে না। তার ধারণা, চোখে চোখ পড়লেই ড. জোনস সব কিছু বুঝে যাবেন।
‘আমার ধারণা বাথটাবে পানি ছেড়ে দিয়ে আপনি জরুরি কোনো কারণে বাথরুমের বাইরে চলে যান। এবং একসময় ভুলে যান ছেলেকে পানিতে বসিয়ে রেখে গেছেন।’
হঠাৎ করে ড. জোনসের এমন কথায় চমকে উঠল মিলি। অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকাল ড. জোনসের দিকে।
ড. জোনস কিঞ্চিত উত্তেজিত হয়ে পড়লেন। তিনি আবার বললেন, ‘একটা পর্যায়ে যখন মনে পড়েছে, তখন দৌড়ে এসে দেখেন শিশুটি পানিতে তলিয়ে গেছে! অ্যাম আই রাইট মিস মিলি?’ অনেকটা কাঠগড়ায় উকিলদের মতো জেরা করার ভঙ্গিতে বললেন ড. জোনস।
মিলি নিরুত্তর। জানালা দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল উদাস দৃষ্টিতে।
‘আপনি আমার অফিসে আসুন আরেকদিন। আপনার স্বামীকেও নিয়ে আসবেন।’
ড. জোনস বিদায় নিয়ে চলে যাওয়ার মুহূর্তে উৎসুক দৃষ্টিতে জানতে চাইলেন, ‘বাই দ্য ওয়ে, আপনার স্বামী আর ছেলে কোথায়? ওদেরকে দেখলাম না।’
মিলি তাকাল ড. জোনসের দিকে। ‘উইকএন্ডে ফরিদ ভিকিকে নিয়ে সকার খেলতে যায়।’ উত্তর দিল মিলি।
‘ও আচ্ছা। হ্যাভ এ গুড ডে মিস মিলি—এঞ্জয় ইয়োর রেস্ট অফ দ্য উইকএন্ডস।’ ড. জোনস হাত নেড়ে বিদায় নিয়ে বের হয়ে গেল মিলিদের বাসা থেকে।

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-৩)

বাথরুমে পানি পড়ার শব্দ হঠাৎ করেই থেমে গেল। সুনসান নীরবতায় ছেয়ে গেল চারিপাশ। মিলির শরীরের ওজন যেন হঠাৎ করেই বেড়ে গেল কয়েকগুণ। সে কিছুতেই শরীর নাড়াতে পারছে না। তবুও ভারী পায়ে ধীরে ধীরে হেঁটে তার বিছানায় ফিরে গেল সে। প্রচণ্ড পানির পিপাসা পেল। কিন্তু বিছানা ছেড়ে যাবার মতো শক্তি অবশিষ্ট রইল না তার।
মিলির বেশ শীত লাগছে—রীতিমত কাঁপুনি শুরু হয়ে গেল তার। সে দ্রুত ব্লাঙ্কেটের মধ্যে ঢুকে মুখ ঢেকে ফেলল। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নিস্তেজ হয়ে গেল তার শরীর। সে কি অজ্ঞান হয়ে গেল না ঘুমিয়ে পড়ল—তা বোঝার কোনো উপায় রইল না।

‘মামি, মামি।’ ক্ষীণভাবে একটি শিশুর ডাক মিলির কানে ভেসে এলো—মনে হলো বহু দূর থেকে একটি বাচ্চা ছেলে তার মাকে ডাকছে। তার মামি-মামি ডাকের সঙ্গে ভেসে এলো বাথটাবে পানি ছাড়ার শব্দ। ধীরে ধীরে পানির শব্দ বাড়ছে আর মামি ডাকের শব্দ ক্রমেই মিলিয়ে যাচ্ছে পানির শব্দের আড়ালে। এক সময় বাথটাবে ছেড়ে দেয়া পানির শব্দ সমুদ্র গর্জনের মতো শোনা যেতে লাগল। মিলির চোখের সামনে ভেসে উঠল ছেলেটি—সমুদ্র সৈকতে বসে বালি দিয়ে খেলছে আর ঢেউ আসার সঙ্গে সঙ্গে উঠে দৌড় দিচ্ছে। হঠাৎ বড় একটা ঢেউয়ের ধাক্কায় চোখের নিমিষে ছেলেটা পড়ে গেল পানিতে। বাচ্চা একটা ছেলে, অনেক চেষ্টা করেও তার সমস্ত শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়াতে পারল না—ভেসে গেল ফিরতি পানির টানে। মিলি উঠে দাঁড়াল—হাত বাড়িয়ে দৌড় দিল ছেলেটিকে ধরার জন্য।
ছেলেটির মামি-মামি ডাক আর শোনা যাচ্ছে না। মিলি দৌড়ে গিয়ে ঢুকল বাথরুমে। সাথে সাথেই স্থির হয়ে গেল তার শরীর। নিজের চোখকে সে বিশ্বাস করতে পারল না। বাথটাব ভরে আছে পানিতে। সেই পানিতে উপুড় হয়ে ফুটফুটে একটি বাচ্চা ছেলে ভাসছে। হঠাৎ সম্বিত ফিরে পেয়ে মিলি এক ঝটকায় তুলে নিল ছেলেটিকে। কিন্তু ততক্ষণে যা ঘটার ঘটে গেছে। মিলির বুক ফেটে কান্না এলো–পাগলের মতো চিৎকার করে কাঁদতে থাকল সে। একসময় তার চিৎকার প্রলাপের মতো শোনা যেতে থাকল। মিলি ক্রমাগত বলতে থাকল, বাবু, আমার শোনা, কথা বল, কথা বল শোনা। ছেলেটির মুখ দিয়ে একটু পানি বের হলো শুধু, কোনো শব্দ বের হলো না। তার নিথর দেহ কোলে নিয়ে উদ্ভ্রান্তের মতো বসে রইল মিলি।
একটি এম্বুলেন্স সাইরেন বাজিয়ে মিলিদের বাড়ির বাইরে এসে দাঁড়াল। সাইরেনের তীব্র শব্দে মিলির ঘুম ভেঙে গেল। সে ধড়মড় করে উঠে বসল বিছানায়। একটু ধাতস্থ হতেই সে বুঝতে পারল—এটি ছিল সেই স্বপ্ন, যেই স্বপ্নটি তাকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে কতদিন থেকে!
জানালা গলে সকালের হলদে আর মিঠে রোদ ঢুকেছে মিলির বেডরুমে। পর্দা দিয়ে জানালা ঢেকে রাখতে পছন্দ করে না মিলি। তাই সকাল হতে না হতেই তার বাসা রোদের আলোতে হীরার মতো চকচক করে।
মিলির মাথাটা কেমন যেন ঝিমঝিম করছে। কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল সে। একটু পরেই আড়মোড়া ভেঙে একটা হাই তুলে নেমে পড়ল বিছানা থেকে।
রান্নাঘর থেকে তুমুল শব্দ ভেসে আসছে। ভিকি আর ফরিদ কথা বলছে। ভিকির কথাই শোনা যাচ্ছে বেশি—সে বেশ শব্দ করেই কথা বলছে। বাবা-ছেলে কী যে এত কথা বলে!
ফরিদ ভিকির জন্যে সকালের নাস্তা বানিয়েছে—ওল্ড ফ্যাশানড প্যানকেক সাথে হুইপড বাটার আর ম্যাপল সিরাপ। ভিকি কথা বলছে আর মজা করে খাচ্ছে। কথা বলতে বলতে ফরিদ দু’কাপ মশলা চা বানিয়ে ফেলল। চায়ে মশলা মেশানোই থাকে—শুধু দুধ-পানি মিশিয়ে জ্বাল করে পরিমাণ মতো চায়ের গুড়া ছেড়ে দিলেই হলো। মিলির খুব পছন্দ এই মশলা চা। এখন ফরিদের নিজেরও অনেক ভালো লাগে। মাঝে মধ্যে মিলির ঘুম থেকে উঠতে দেরি হলে, সে নিজেই চা-টা বানিয়ে ফেলে।
ফরিদ ধোঁয়া ওঠা চায়ে চুমুক দিতে দিতে ভিকির কথার উত্তর দিচ্ছে। ছুটির দিনে ফরিদ ভিকিকে বিভিন্ন জায়গায় নিয়ে যায়—বেশিরভাগই পার্ক কিংবা বাচ্চাদের খেলার জায়গা। এই সামারের লম্বা ছুটিতে ভিকিকে সকার ক্যাম্পে দেবার পরিকল্পনা ফরিদের। কিন্তু মিলি চায় ভিকি পিয়ানো বাজানো শিখুক।
‘গুড মর্নিং।’
ফরিদ আর ভিকি একসাথে ঘুরে তাকিয়ে দেখল মিলি দাঁড়িয়ে আছে। রান্নাঘরে ঢুকেই সে বাবা আর ছেলের কথোপকথন শুনছিল নিঃশব্দে।
ফরিদ বলল, ‘গুড মর্নিং।’
ভিকি কিছু বলল না দেখে মিলি আবার বলল, ‘গুড মর্নিং, ভিকি।’
ভিকি অন্যমনস্কভাবে বলল, ‘গুড মর্নিং মাম্মি।’
ভিকির হাতে আইফোন। প্যানকেক খাওয়া বন্ধ করে সে গেম খেলছে ফোনে। মিলি খুবই বিরক্ত হলো। সে বলল, ‘ভিকি, ফোন রাখো। আগে খাওয়া শেষ করো, পরে খেলবে। দাও, ফোনটা দাও তো।’
অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভিকি ফোন নামিয়ে রাখল টেবিলে। এক টুকরা প্যানকেক মুখে দিয়ে তাকিয়ে রইল ফোনের দিকে।
মিলি সেটা লক্ষ্য করে বলল, ‘ছেলেটা একেবারে এডিক্টেড হয়ে যাচ্ছে—ফোন ছাড়া আর কিচ্ছু বোঝে না।’
ভিকি মুখ গোমড়া করে বসে রইল। এজন্যেই ভিকি বাবাকে বেশি পছন্দ করে—ফোন নিয়ে বাবা তাকে কখনো কিছু বলে না।
ফরিদ কাপে চা ঢেলে এগিয়ে দিল মিলির দিকে। সে একটা চুমুক দিয়ে বলল ‘বাপ-বেটা মিলে কী কথা হচ্ছিল শুনি?’
‘আজকে আমরা কোথায় যাবো সেই প্ল‍্যান করছিলাম।’ ফরিদ বলল।
‘প্ল‍্যান করছিলে ভালো—তাই বলে এত চিৎকার করতে হবে কেন? আমি তো ভাবলাম কী যেন হয়েছে। ছুটির দিনের সকালটা শুরু হয় তোমাদের দু’জনের চিৎকার চেঁচামেচিতে। একটু আস্তে কথা বলতে পারো না?’
ভিকি চোখ বড় করে ঘুরিয়ে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদ একটু মুচকি হাসল। মিলি অবশ্য সেটা লক্ষ্য করল না। সে আবার বলল, ‘ছুটির দিনে সকালে একটু আরাম করে ঘুমাব—তারও উপায় নেই!’
প্রতি উইকএন্ডেই এই একই কথা শুনে শুনে ওরা অভ্যস্ত হয়ে গেছে। কাজেই মিলির কথায় ফরিদ কিংবা ভিকি—দু’জনের কারো মধ্যেই তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা দিল না।
‘তোমার চা-টা বোধ হয় ঠাণ্ডা হয়ে গেছে। দাও গরম করে দেই।’ মিলির দিকে তাকিয়ে বলল ফরিদ।
‘সমস্যা নেই—আমি গরম করে নিচ্ছি।’
মিলি তার চায়ের কাপটা মাইক্রোওয়েভে ঢুকিয়ে এক মিনিট গরম করতে দিয়ে এক স্লাইস মাল্টিগ্রেইন ব্রেড টোস্টারে ঢুকিয়ে দিল।
মিলিদের রান্নাঘরের চারপাশটা বেশ সুন্দর খোলামেলা। জানালা দিয়ে অনেকখানি আকাশ দেখা যায়। প্রতিদিন সকালে এক কাপ চা নিয়ে বাইরের সুন্দর দৃশ্য দেখা মিলির অভ্যাস। সে তার ব্রেডে পিনাট বাটার লাগিয়ে চেয়ার টেনে বসল জানালার পাশে। এক কামড় ব্রেড আর এক চুমুক গরম চা—সাথে নির্মল আলোয় ছেয়ে যাওয়া প্রকৃতি। জানালা দিয়ে বাইরেটা আজ সবুজ মায়াময়। অন্যদিনে মিলির মনটা বেশ ফুরফুরে হয়ে যায়—কিন্তু আজ তাকে এক ধরনের অস্বস্তি আঁকড়ে ধরে আছে।
মিলি চায়ের কাপে ছোট ছোট চুমুক দিচ্ছে। একবারও ফরিদ কিংবা ভিকির দিকে তাকাল না। সকালের এই সময়টুকু তার একান্তই নিজের। সে নিজের মতো করেই কাঁটাতে চায়।
জানালা দিয়ে এক ফালি সোনালী রোদ মিলির মুখের উপরে এসে পড়েছে। ঝট করে ফরিদের চোখ আটকে গেল সেখানে। ফরিদ মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে রইল মিলির দিকে। এত সুন্দর কী করে হয় কেউ? কী সরল—কী মায়াবী। কাঁধের পাশ দিয়ে লম্বা চুল ছড়িয়ে আছে তার কোমর অবধি। চায়ের কাপ হাতে নিয়ে রহস্যময় দুটি চোখে মিলি আনমনে তাকিয়ে আছে বাইরে।
অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে মিলির পাশে এসে দাঁড়াল ফরিদ। মিলি ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেখল তাকে, তারপর আবারো তাকাল বাইরে।
ফরিদও তাকাল মিলির সাথে, সেদিকে তাকিয়েই আস্তে করে ডাকল, ‘মিলি!’
‘উম।’
‘কিছু ভাবছ?’
মিলি কোনো উত্তর দিল না।
‘তোমার শরীর কি খারাপ?’
মিলি মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘না।’ তারপর চায়ের কাপে একটা ছোট চুমুক দিয়ে উদাস ভঙ্গিতে তাকিয়ে রইল।
‘কাল রাতে আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়েছিলাম। একটি অদ্ভুত ঘটনা ঘটেছে।’ বলবে না বলবে না করেও ফরিদ বলে ফেলল কথাটা।
‘তাই—কী ঘটনা?’
‘উইয়ার্ড একটা ব্যাপার, বুঝলা। রাতে ভিকির ডাকাডাকিতে ওর রুমে গেলাম। দেখি জড়সড় হয়ে বিছানার উপরে বসে আছে সে। জানতে চাইলাম কী হয়েছে? ও বলল, কে যেন ওর বিছানার নিচে। আমি ওর ভয় ভাঙানোর জন্য নিচু হয়ে তাকালাম খাটের নিচে—তাকিয়ে আমার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।’ এটুকু বলে ফরিদ থেমে গেল।
মিলি তাকাল উৎসুক দৃষ্টিতে ফরিদের দিকে।
ফরিদ আবার বলল, ‘অন্ধকারে প্রথমে কিছুই বোঝা যাচ্ছিল না। অন্ধকার একটু সয়ে এলেই দেখি ভিকি চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে আছে।’
‘তুমি দেখলে ভিকি বিছানার নিচ থেকে তোমার দিকে তাকিয়ে আছে?’
‘হ্যাঁ। তারপর বলল, ওর বিছানার উপর কেউ বসে আছে।’
মিলি চিন্তিত দৃষ্টিতে তাকাল ফরিদের দিকে।
‘আজব না?’ ফরিদ বলল।
‘তারপর?’
ফরিদ চুপ করে রইল। সে আর কিছু মনে করতে পারছে না। সত্যিই কিছুই মনে পড়ছে না তার। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘জানো আমার না আর কিছুই মনে পড়ছে না—ব্যাপারটা কী স্বপ্নে দেখলাম না সত্যিই ঘটল বুঝতে পারছি না। উইয়ার্ড!’
একটু ভেবে নিয়ে মিলি বলল, ‘তুমি ফ্লোরে ঘুমিয়ে ছিলে কেন?’
‘ফ্লোরে ঘুমিয়ে ছিলাম মানে? কোথায়?’
‘ভিকির রুমে।’
‘কী বলো?’
মিলি কোনো উত্তর দিল না।
‘কই, কিছু মনে পড়ছে না তো!’ ফরিদ কপাল কুঁচকে মনে করার চেষ্টা করল।
‘ঘুম ভাঙার পর কী দেখলে তুমি?’
‘ঘুম ভাঙার পর দেখি ভিকি আমার পাশে ঘুমিয়ে আছে—অথচ আমি মনে করতে পারছি না, আমি কখন ওকে আমার রুমে নিয়ে এসেছি।’
‘ঘুম ভেঙে দেখলে তুমি তোমার বিছানায় শুয়ে আছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভিকি তোমার পাশে?’
‘হ্যাঁ। কেন?’
মিলি আর কিছু বলল না। এই মুহূর্তে তার মাথায় কিছু প্রশ্ন চক্রাকারে ঘুরছে। তার মনে হচ্ছে, সামথিং ইজ রং—সামথিং ইজ ভেরি রং। এক ধরনের অস্থিরতা আঁকড়ে ধরল তাকে। বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘এত ঘনঘন ভয় পায় কেন ছেলেটা?’
একথা ঠিক, ভিকি সব কিছুতেই ভয় পায়। অন্ধকারে ভয় পায়। একা বাথরুমে যেতেও ভয় পায়। এত বড় বাড়ি। এতটুকুন একটা ছেলে, ছয় বছর এখনো হয় নি। ভয় তো একটু পেতেই পারে। ফরিদ মিলির কথার কোনো ব্যাখ্যা না দিয়ে বলল, ‘আমি ভাবছি বাসাটা বদলে ফেললে কেমন হয়। অন্য কোথাও মুভ করি চলো।’
‘বাসা বদলে ফেললেই কি স্বপ্ন দেখা বন্ধ হয়ে যাবে? কিংবা মনের ভয়? মনের ভয় তো যেখানেই যাবে সেখানেই সঙ্গী হয়ে যাবে।’
ফরিদ মনে মনে ভাবল, ‘আসলেই তো তাই। এভাবে তো ভেবে দেখা হয় নি।’ সে আর কিছু না বলে তাকিয়ে রইল বাইরে।
মিলিও চুপ করে আছে। সে একবার ঘুরে তাকাল ভিকির দিকে—ভিকি নিবিষ্ট মনে গেম খেলছে ফোনে। বাইরের সোনালি রোদের ঝলকানি বাড়ছে। মিলি উসখুস করছে কিছু একটা বলার জন্য। তার চোখ-মুখে এক ধরনের অস্থিরতা ফুটে উঠল। হঠাৎ নীরবতা ভেঙে সে বলল, ‘সেই স্বপ্নটা আমি আবারো দেখেছি। আর…’
কথা শেষ না করে মিলি থেমে গেল। ফরিদ অবাক হয়ে তাকাল মিলির দিকে। নিজের অজান্তে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে। মিলির স্বপ্ন দেখার ব্যাপারটা ফরিদ জানে। কিন্তু কথা শেষ না করে মিলি থেমে গেল কেন? ফরিদ উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মিলির দিকে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Anya-Kew

অন্য কেউ (পর্ব-২)

পরদিন সকালে ফরিদ একটু রাগের সাথেই বলল, ‘এটা কী হলো?’
মিলি নির্বিকার ভাবে বলল, ‘কী?’
‘আমাকে আসতে বলে তুমি ঘুমিয়ে পড়লে যে?’
‘তুমি রাত কাভার করে এলে আমি কী করব? সারারাত জেগে থাকব?’
‘আমি ঠিক বারো মিনিট পরেই গিয়ে দেখি তুমি বড় বড় নিশ্বাস ছাড়ছ।’
‘তাতে কি প্রমাণ হয় আমি ঘুমিয়ে পড়েছি?’
ফরিদ অবাক হয়ে তাকাল।
‘আর ঘুমলেই বা কী? ঘুমন্ত মানুষকে বুঝি আদর করা যায় না?’
‘মানে?’
‘না কি ঘুমলে আমাকে পচা লাগে দেখতে?’
‘কী বলছ এসব?’
‘ঠিকই বলছি।’
‘তো মুখ ঢেকে রাখলে বুঝব কী করে—ঘুমলে তোমাকে কেমন লাগে?’
‘তো তোমার হাত দু’টো আছে কী জন্যে? ব্লাঙ্কেটটা সরিয়ে দেখতে—মানুষটা ঘুমিয়ে আছে না জেগে আছে। ঘুমলে তাকে সুন্দর লাগে না ভূতের মতো।’
ফরিদ আর কিছু বলল না। ইদানীং মিলিকে সে ঠিক বুঝতে পারে না। ওর সাথে কথায় পেরে ওঠা দায়।
একটু বাদে মিলিই বলল, ‘তোমাকে একটা বুদ্ধি শিখিয়ে দেই। তোমার যদি সত্যিই আমাকে আদর করতে ইচ্ছে করে—আমার ঘুম কিংবা রাত, সে যত গভীরই হোক না কেন—তুমি আদর করবে। ইটস ইয়োর রাইট—গট ইট? এখন যাও অফিসে দেরি হয়ে যাচ্ছে।’
বাস্তবে ফিরে এলো ফরিদ। সাহস সঞ্চয় করে মিলির মুখ থেকে ব্লাঙ্কেটটা আস্তে করে সরিয়ে রাখল সে। কেমন মায়া ভরা একটা মুখ। কী সুন্দর! ফরিদ তাকিয়ে রইল অপলক। তারপর আলতো করে চুমু খেল মিলির চোখের পাতায়। তারপর চিবুকে। ঠোঁটে। আস্তে আস্তে সমস্ত শরীরে।
মিলি কেঁপে উঠল। কিন্তু তার ঘুম ভাঙল না। নিশ্বাসটা বোধ করি একটু দ্রুত হলো। ফরিদ নিজেকে আর স্থির রাখতে পারল না। সে মিলির ঘুমন্ত শরীর নিয়ে মেতে উঠল আদিম খেলায়।
আজকের এই বিশেষ রাতটাতে মিলিকে জড়িয়ে ধরে আরাম করে ঘুমচ্ছিল ফরিদ। আর এর মধ্যে ছেলেটা ডাকাডাকি শুরু করেছে। এজন্যেই মিলিকে বলেছিল আরো ছোটবেলা থেকেই ওকে একা একা ঘুমের অভ্যাস করতে। তাহলে এমন রাত বিরাতে ডাকাডাকি করত না। প্রথম দিকে ভয় পেত বলে, এর আগেও বেশ কয়েকবার মাঝরাতে ভিকিকে সে তার নিজের রুমে নিয়ে এসেছে ফরিদ।
মিলির ঘুম কুম্ভকর্ণের মতো। আগে ভয় পেলে ভিকি তার মাকেই ডাকত। কিন্তু কোনো সাড়া না পেয়ে এখন সে আর তার মাকে ডাকে না। সে বুঝে গেছে মাকে ডেকে লাভ নেই।
ভিকির রুম থেকে কেমন যেন একটা কুনকুন আওয়াজ আসছে। ফরিদ উঠে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল তার রুমের দিকে।
ফরিদ দূর থেকে দেখল—ভিকি গুটিসুটি মেরে দেয়াল ঘেঁষে বিছানার উপরে বসে আছে।
‘ভিকি, কী হয়েছে বাবা? আবার ভয় পেয়েছ?’
চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছে ভিকি। সে কিছু বলতে পারছে না। ইশারায় দেখাল বিছানার নিচে।
ফরিদ বুঝতে না পেরে এগিয়ে গেল কাছে। আবার বলল, ‘স্বপ্ন দেখেছ?’
ভিকি মাথা নাড়ল—না।
‘তাহলে?’
ভিকি আবারো খাটের নিচে হাত ইশারা দিয়ে দেখাল কিন্তু মুখে কিছু বলতে পারল না। তার মুখের কথা যেন আঁটকে আছে। কিন্তু ভিকির চেহারা দেখে আজ ফরিদের মনে শঙ্কা দেখা দিল। কিছু একটা দেখে ভিকি ভয় পেয়েছে—কিন্তু সেটা কী? ওর চোখ মুখের আচরণ এমন কেন? ফরিদ খানিকটা দ্বিধায় পড়লেও ভিকির কথার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে বলল, ‘ভয়ের কিছু নাই। মিছিমিছি ভয় পাচ্ছ কেন? এভাবে ভয় পেলে তো চলবে না ভিকি। তুমি এখন বড় হয়েছ—তোমাকে একা ঘুমাবার অভ্যাস করতে হবে। এসো শুয়ে পড়।’
ফরিদ ভিকিকে হাত ধরে টেনে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বলল, ‘ঘুমাও, বাবা।’
ভিকি কিছু না বলে শুয়ে পড়ল।
ফরিদ ঘুরে দাঁড়াতেই তার টি-শার্টের এক কোনায় টান পড়ল। ভিকি ওর জামা ধরে রেখেছে। ফরিদ মাথা ঘুরাতেই ভিকি দুর্বল কণ্ঠে বলল, ‘খাটের নিচে কে যেন আছে বাবা। প্লিজ একটু দেখো—’
ফরিদ অবাক কণ্ঠে বলল, ‘খাটের নিচে কে থাকবে? কী সব আজগুবি কথা? তোমার ইউটিউব দেখা বন্ধ করতে হবে। নিশ্চয়ই হরর মুভি দেখা শুরু করেছ তাইনা?’
ভিকি কিছু বলল না। এবার সে ফরিদের হাত ধরল।
ফরিদ তাকাল ভিকির মুখের দিকে। করুণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলেটি—চোখে মুখে অনুনয়।
ভিকিকে আশ্বস্ত করা দরকার। ফরিদ দ্রুত মাথাটা কোনো রকম একটু নিচু করে খাটের নিচে তাকাল—অন্ধকারে কিছুই বোঝা গেল না। ফরিদের ধারণা ভিকির কোনো খেলনা গাড়ি রিমোটে চাপ লেগে খাটের নিচে চলে গেছে এবং মাঝে মাঝে শব্দ করছে। অধিকাংশ সময় ভিকি তার কোনো খেলনারই রিমোট সুইচ বন্ধ করে না। তেমন কিছুই হয়ত হবে। ফরিদ মাথা তুলে বলল, ‘কই কিছুই তো নেই। তুমি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছ।’
ভিকি অসহায় দৃষ্টিতে তাকাল ফরিদের দিকে। ফরিদের কথা তার বিশ্বাস হলো না। সে আবারো ক্ষীণ কণ্ঠে বলল, ‘বাবা প্লিজ!’
ভিকির কণ্ঠে এমন কিছু ছিল যে ফরিদের মনে হলো আচ্ছা ঠিক আছে কী আছে একটু ভালোমতোই না হয় দেখি। ছেলেটার ভয় দূর করা দরকার। ফরিদ আবার মাথা নিচু করল। আর ঠিক তখনই খাটের নিচে থেকে কেমন একটা আওয়াজ হলো।
মেঝেতে উপুড় হয়ে বিছানার ঝুলে থাকা চাদর সরিয়ে কিছু সময় অন্ধকারে তাকিয়ে থাকল ফরিদ। চোখে অন্ধকার কিছুটা সয়ে আসতেই সে লক্ষ্য করল এক জোড়া চোখ তার দিকে ভয়ার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।
ফরিদের মাথা ঝিমঝিম করে উঠল। ভয়ের একটি শীতল স্রোত যেন তার শিরদাঁড়া বেয়ে নিচের দিকে নেমে গেল। গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠল। তার কি হ্যালুসিনেশন হলো? সে তার চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। এটা কী করে সম্ভব। বিছানার নিচে ভয়ার্ত চোখে ফরিদের দিকে তাকিয়ে আছে—ভিকি!
ভিকি? হ্যাঁ, ভিকিই তো। অবিকল ভিকির মতো। ফরিদের হৃৎপিণ্ড বলের মতো লাফিয়ে উঠল। এখানে ভিকি এলো কীভাবে? তাহলে বিছানার উপরে কে?
কাঁপাকাঁপা গলায় ভয়ার্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে ভিকি বলল, ‘কে যেন আমার বিছানার উপর বসে আছে বাবা।’

অন্যরকম এক অনুভূতির পরশ নিয়ে মিলির ঘুম ভেঙে গেল সকাল সাড়ে ছ’টায়।
ঘুম ভেঙে মিলি রুটিন মাফিক প্রথমেই গেল ভিকির রুমে। সকালে ভিকিকে জোর করে ঘুম থেকে তুলে বাথরুমে পাঠাতে হয়। স্কুলের দিনে তাকে ইউনিফর্ম পরিয়ে, নাস্তা খাইয়ে তৈরি করে দিতে হয়। আজ স্কুল নেই—তবুও সে গেল তার রুমে।
ভিকির রুমে ঢুকেই মিলি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখতে পেল। সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ—ঘটনাটা কী বোঝার চেষ্টা করল। যদিও সে বুঝতে পারল না।
ভিকির বিছানার পাশে মেঝেতে শুয়ে ঘুমাচ্ছে ফরিদ। মিলির মাথায় কিছুতেই ঢুকছে না—ফরিদ কেন মেঝেতে শুয়ে ঘুমবে। ঘুমানোর ভঙ্গিটাও অদ্ভুত। মনে হচ্ছে খাটের নিচে মাথা ঝুঁকিয়ে কিছু একটা দেখার চেষ্টা করছে সে।
সম্ভবত রাতে ভয় পেয়ে ভিকি ফরিদকে ডেকেছিল। ভিকির সিঙ্গেল বেডে জায়গা হয় নি তাই হয়ত সে মেঝেতেই শুয়েছিল—পরে সেখানেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তাছাড়া আর কী কারণ হতে পারে। ব্যাপারটা খুবই অদ্ভুত ঠেকল মিলির কাছে।
ভিকি ঘুমিয়ে আছে তার বিছানায়—স্বাভাবিকভাবেই। ভিকিকে ডাকতে গিয়ে হঠাৎ মিলির মনে পড়ল—আজতো স্কুল নেই। পরপর পাঁচ দিন প্রত্যুষে উঠার কারণে অভ্যাসবশত স্কুল ছুটির দিনেও মাঝে মাঝে খুব সকালে ঘুম ভেঙে যায়। ভিকির দিকে তাকিয়ে মিলির কেন যেন মনে হলো রাতে হয়তো ছেলেটির ভালো ঘুম হয় নি।
সে মনে মনে ভাবল, আচ্ছা থাক—আর একটু না হয় ঘুমাক। ছুটির দিনে একটু বেশি ঘুমলে ক্ষতি নেই। ফরিদকে কি ডেকে তুলে পাঠিয়ে দেবে তার ঘরে? কিছুক্ষণ ভেবে মিলি ফরিদের কাঁধে হাত রেখে খুব সাবধানে মৃদু স্বরে ডাকল—যাতে ভিকির আবার ঘুম ভেঙে না যায়। কিন্তু ফরিদের ঘুম ভাঙার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। সে দ্বিতীয় বার আর ডাকল না।
মিলিরও ভালো ঘুম হয় নি। সে হাবিজাবি স্বপ্ন দেখেছে। কে যেন ঘুমের মধ্যে তাকে জড়িয়ে ধরে আদর করছে। তার ক্ষীণ বিশ্বাস সেই কাজটি ফরিদই করেছে। কিন্তু সে নিশ্চিত হতে পারছে না। ঘটনাটা স্বপ্নেই ঘটুক আর বাস্তবে—ভিন্ন এক অনুভূতিতে ছেয়ে আছে তার মন। কেমন অলস অলস লাগছে। মিলি হাই তুলল। কড়া করে এক কাপ মশলা চা খাওয়া দরকার। ঘুম থেকে উঠেই এক কাপ চা না হলে তার চলে না।
মিলি অতি দ্রুত রান্না ঘরের দিকে যাওয়ার জন্যে ঘুরে দাঁড়াতেই কোথা থেকে যেন একটা শব্দ ভেসে এলো। সে স্থির হয়ে শব্দের উৎস খুঁজতে এদিক ওদিকে তাকাল। মিলিকে চমকে দিয়ে বাথরুমের ভেতর থেকে বেসিনে পানি ছাড়ার আওয়াজ ভেসে এলো। বন্ধ বাথরুমের ভেতরে পানির কল ছাড়ল কে? মিলির শরীর হিম হয়ে গেল।
ভিকি আর ফরিদের রুমের মাঝের লাগোয়া বাথরুমের দরজার ফাঁক দিয়ে আলো দেখা যাচ্ছে। ভিকি যেভাবে জোরে বেসিনের পানি ছেড়ে দেয়—সেভাবেই কেউ পানি ছেড়ে দিয়েছে। মিলি ঘুরে তাকিয়ে দেখল ভিকি আর ফরিদ যে যেখানে ছিল সেখানেই আছে। অথচ বাথরুমে কেউ একজন আছে—অন্য কারো উপস্থিতি পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু কে সেই অন্য কেউ?
মিলি দুরুদুরু বক্ষে একটু এগিয়ে বাথরুমের দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। তার বুকের ভিতরটা ভয়ে ঢিপঢিপ করে উঠল। তবুও সে সাহস সঞ্চয় করে জিজ্ঞেস করল, ‘কে? কে ওখানে?’
‘ইট’স মি মামি!’
কণ্ঠ শুনে মিলি কেঁপে উঠল—এত অবিকল ভিকির গলার শব্দ। এর মানে কী? কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে মিলি আবার জিজ্ঞেস করল, ‘কে?’ তার গলা দিয়ে কোনো রকমে একটা শব্দ বের হলো।
‘আমি ভিকি!’
মিলি জমে বরফ হয়ে গেল। ভিকি? তাহলে বিছানায় ঘুমিয়ে আছে—সে কে? সে কি ভুল শুনল। কিন্তু পানির শব্দ? এই তো এখনো হচ্ছে। ভিকি যেভাবে জোরে বেসিনের পানি ছেড়ে দেয়—ঠিক তেমনই পানি ছাড়ার শব্দ হচ্ছে। মিলির ভাবনা এলোমেলো হয়ে গেল। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। মনে হলো অনন্তকাল ধরে সে দাঁড়িয়ে আছে। কতটা সময় পার হয়েছে কে জানে। তার সমস্ত শরীর কাঁটা দিয়ে উঠল। থিরথির করে কাঁপছে তার শরীর। যে কোনো মুহূর্তে সে জ্ঞান হারাবে।
‘ভিকি?’ অস্ফুটে একবার উচ্চারণ করল মিলি। তার চারিদিকে সব কিছু অন্ধকার হয়ে এলো।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (শেষ পর্ব)

অনেকক্ষণ আগেই সূর্য ডুবে গিয়েছে। শান্ত নীল সন্ধ্যা নেমেছে। আকাশটা মেঘে ভরে আছে। মেঘ জমেছে হাসানের মনেও।
শিকাগো ডাউন-টাউনের সারিসারি অট্টালিকা পেছনে ফেলে লেক মিশিগানের তীর ঘেঁষে লেক শোর ড্রাইভ দিয়ে এগিয়ে চলেছে হাসানের বিএমডব্লিউ।
কিছুক্ষণ আগে সে অপলাকে নামিয়ে দিয়ে এসেছে শিকাগো রিভার সংলগ্ন ডাউনটাউনে অবস্থিত বিখ্যাত হোটেল হায়াত রিজেন্সিতে। বিদায় নেবার সময়ও হাসান ভাবতে পারছিল না—অপলা আবার এভাবে দূরে চলে যাবে। কিন্তু বাস্তবতাকে মেনে নিতেই হয় মাঝে মাঝে—সে যত কঠিন আর নির্মম হোক না কেন।
হাসান একবার বলেছিল অপলাকে কনফারেন্স শেষ করে আর কয়েকটা দিন থেকে যেতে। কিন্তু অপলা কোনো উত্তর দেয়নি—চুপ করে থেকেছে। মৌনতা সব সময় সম্মতির লক্ষণ নয়। মৌনতা কখনো কখনো অপরাগতারও লক্ষণ। হাসান বুঝে গেল অপলার নীরবতার অর্থ। তাই ব্যর্থ মনোরথ হয়েই ফিরে যাচ্ছে সে—ভগ্ন হৃদয়ে।
বাসায় ফিরে হাসান দেখল রুবেল দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে হাসান কিছু বলল না। রুবেল এগিয়ে এসে গাড়িতে উঁকি দিল। দেখল, অপলা নেই। সে মাথা ঝাঁকিয়ে জানতে চাইল, ‘ভাবী কই?’
হাসান বোকার মতো তাকিয়ে রইল রুবেলের দিকে। সে কোনো উত্তর দিল না।
রুবেল বলল, ‘ওই মিয়া, ভাবীরে কই রাইখা আসলেন?’
‘ডাউন-টাউন—হায়াত রিজেন্সীতে।’ থমথমে গলায় বলল হাসান।
‘ঐখানে কি?’
‘ওর কনভেনশন আছে কাল-পরশু দুইদিন।’
‘তাইলে আপনি ফিরে আসলেন ক্যান—তার সাথে থাকতেন? আরে ফাইভ স্টার হোটেলে থাইকা রোমাঞ্চ করার চান্সটা মিস করলেন মিয়া। ধুর, আপনারে দিয়া কোনো কাম হইব না।’
হাসানের হঠাৎ মনে হলো, তাই তো, রুবেল তো ঠিকই বলেছে। কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল, অপলাকে বললে সে কি রাজী হতো?
হাসান বলল, ‘আরে না। তাই হয় নাকি। ওর হয়তো অফিস কলিগদের সাথে মিটিং থাকতে পারে। তাছাড়া এসব কনভেনশনে গ্রুপ ডিনার থাকে—আমি থাকলে শুধু ঝামেলাই হতো।’
‘আচ্ছা বাদ দেন। জিনিসটা কাজে লাগাইছিলেন?’
‘কোন জিনিসটা—কিসের কথা বলছ?’ ভ্রূ কুঁচকে হাসান জানতে চাইল।
‘আরে কালকে আপনেরে দিয়ে গেলাম না—প্যাকেট? দুই একটা কাজে লাগাইছেন?’ রুবেল অর্থপূর্ণ দৃষ্টিতে হাসছে।
হাসান কী বলবে ভেবে পেল না। অন্য কোনো সময় হলে রুবেলের উপর বিরক্ত হতো সে। কিন্তু কিছু বলল না। হাসানের কথা বলার মুড নেই—আবার রুবেলকে চলে যেতেও বলছে না।
‘হাসান ভাই, ঐ কনভেনশন না কনফারেন্স—ঐটা শেষ হইলে ভাবীর জন্যে একটা বারবিকিউ পার্টি দিতে হবে বুচ্ছেন। যূঁথীরেও আসতে বলব। ভাবীর সাথে পরিচয়টা হইল—তখন তার কথা বলার একটা সঙ্গী হবে। ঠিক আছে না?’
‘কিন্তু অপলা তো আসছে না। কনফারেন্স শেষ করেই ফিরে যাবে।’
‘মানে? বুঝলাম না—ফিরে যাবে মানে?’ রুবেল এমন ভাবে তাকাল হাসানের দিকে—যেন হাসান হিব্রু কিংবা অন্য কোনো দুর্বোধ্য ভাষায় কথা বলছে। সে মাথা চুলকে কিছু একটা বলতে যাবে আর ঠিক তখনই যূঁথীর ফোন এলো। রুবেল ফোন ধরে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘যূঁথী, তোমারে একটু পরে কল দিতেছি। একটা ঝামেলার মধ্যে আছি।’
‘তুমি এখন কোথায়?’ ফোনের ভেতরে দিয়ে যূঁথীর কণ্ঠ শোনা গেল।
‘কোথায় আবার—হাসান ভাইর এখানে। তোমাকে না বললাম—একটা ঝামেলা মধ্যে আছি।’
‘কিসের ঝামেলা?’
‘আছে, তুমি বুঝবা না। আর সব কথা তোমার শুনতে হবে?’
‘হ্যাঁ হবে।’
‘আমি এখন রাখি—পরে কথা হবে।’
‘এই তুমি ফোন রাখবা না। তুমি এখুনি আসো—তোমার সাথে আমার কথা আছে।’
রুবেল ফোন চাপা দিয়ে তাকাল হাসানের দিকে। হাসান তাকে ইশারায় চলে যেতে বলল। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘ঠিক আছে, আসতেছি—বেশিক্ষণ কিন্তু থাকতে পারব না।’
রুবেল চলে যেতেই হাসান ঘরে ঢুকে বসে রইল চুপচাপ। ক্ষণে ক্ষণেই অপলার কথা মনে হচ্ছে তার। দীর্ঘ সময় পার করে হাসান প্রস্তুতি নিল এক দীর্ঘ রাতের প্রতীক্ষায়। মাঝে মাঝে কোনো কোনো রাত খুব দীর্ঘ মনে হয়। আজ এমনই একটা রাত এবং সে জানে আজ রাতটি তার অস্থিরতায় কাটবে। এতদিন পর অপলা ফিরে এসেছিল, এসে আবার চলেও গেল। দুটো দিন বেশ কেটেছে তার—অপলার সান্নিধ্যে।
রাতে ঘুমানোর আগে অপলা ফোন করল হাসানকে।
হাসানের ক্ষীণ আশা ছিল, অপলা হয়ত একবারের জন্যে হলেও তাকে ফোন করবে। ফোনটা তাই বিছানায় নিয়েই সে ঘুমাতে গেল। অপলার ফোন পেয়ে হাসান উঠে বসল। হাসানের সঙ্গে সময়টা তার ভাল কেটেছে এবং হাসান তাকে সময় দিয়েছে এজন্য সে কৃতজ্ঞ—শুধু এটুকু বলার জন্যেই অপলার ফোন করা। খুব সকালে কনফারেন্সের রেজিস্ট্রেশন আর ব্রেকফাস্ট মিটিং—তাই বেশি কথা বলার সুযোগও হলো না অপলার। সে গুড নাইট বলে ফোন কেটে দিল।
স্বাভাবিক ভাবেই রাতে ভাল ঘুম হলো না হাসানের। এবং কয়েকবার ঘুম ভেঙেও গেল। অনেকটা নির্ঘুম রাত কাঁটিয়ে শেষ রাতের দিকে সে গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল।
খুব সকালে হাসানের ঘুম ভেঙ্গে গেল আচমকা।
অনেকক্ষণ থেকেই তার ফোন বেজে চলেছে। সে ফোনটা নিয়ে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে অপলা বলল, ‘কতক্ষণ থেকে ডোর বেল বাজাচ্ছি—নক করছি, দরজাটা খোলো।’
‘মানে কি?’ হাসান বলল অবাক হয়ে।
‘মানে হচ্ছে আমি তোমার বাসার সামনে দাঁড়িয়ে আছি—দরজাটা খুলো। খুলেই দেখো।’
‘কী? এক মিনিট, আমি আসছি।’ হাসান দ্রুত সিঁড়ি বেঁয়ে নেমে দরজা খুলতেই তার ঘুম ভেঙ্গে গেল।
এটা যে স্বপ্ন ছিল সেটা বুঝতে কিছু সময় লাগল হাসানের। সে সাইড টেবিল থেকে পানির বোতল নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে অন্ধকারের মধ্যে তাকিয়ে রইল শূন্যে।র

অনেকক্ষণ ধরে দরজায় ঠকঠক আওয়াজ করছে কেউ।
এক রাতেই হাসানের হেলুসিনেশনের মতো কিছু হয়ে গেল। কোথাও কোনো শব্দ হলেই তার মনে হচেছ—এই বুঝি অপলা ফিরে এসেছে। ক্লিয়ার সাইন অফ অডিটরি হেলুসিনেশন।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখল—সকাল আটটাও বাজেনি। কাল রাত থেকেই মনটা ভীষণ বিক্ষিপ্ত ছিল হাসানের। স্বপ্নের কথা ভেবেও খানিকটা মন খারাপের মতো হলো।
রাতে একেবারেই ঘুম হয়নি তাই এখন এতো সকালে ঘুম ভেঙ্গে যাওয়ায় মেজাজ খারাপ হলো খুব। তার ধারণা এটা রুবেলের কাজ। সাত সকালে এসে হাজির হয়েছে। এই ছেলেটাকে নিয়ে আর পারা যাচ্ছে না। এত বিরক্ত করতে পারে। এর আক্কেল জ্ঞান যে আর কবে হবে কে জানে।
এবার ডোর বেলের আওয়াজ শোনা গেল। কে আসল এই ভাবতে ভাবতে হাসান নেমে এলো ওপর থেকে। আচ্ছা, সত্যি সত্যি অপলা এলো নাকি? হতেও তো পারে। কে জানে সে হয়ত মাইন্ড চেঞ্জ করেছে—বলা তো যায় না। মানুষের মন বলে কথা। নাহ, তাই বা কী করে হবে—এতক্ষণে ওর কনফারেন্স শুরু হয়ে যাবার কথা। এটা রুবেল না হয়েই যায় না। আজকে এই ছেলের খবর আছে। সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে সে। দিস নিড টু বি স্টপড!
অত্যন্ত বিরক্ত চেহারা নিয়ে দরজা খুলে ভুত দেখার মতো চমকে উঠল হাসান। সত্যি সত্যি অপলা দাঁড়িয়ে আছে দরজার সামনে। কালো ট্রাউজার, কালো ব্লেজার আর অফ হোয়াইট রঙের টপস পড়ে দাঁড়ানো মেয়েটিকে অপলার মতই লাগছে। হাসান দু’হাতে চোখ কচলে দেখল এবং নিশ্চিত হলো যখন অপলা বলল, ‘কি, সাত সকালে ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিলাম?’
হাসানের ঘোর কাটতে সময় লাগল। সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে এখনো তাকিয়ে আছে অপলার দিকে।
‘কি ব্যাপার, ভেতরে ঢুকতে দেবে নাকি দাঁড়িয়েই থাকব এখানে?’
হাসান সরে দাঁড়াতেই অপলা ভেতরে ঢুকে পড়ল। হাসান কোনো কথা না বলে অপলার লাগেজ নিয়ে পেছনে পেছনে ঢুকল।
অপলা ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, ‘সেদিন যা যা বললে তা কি ঠিক?’
হাসানের মুখের হাসি বিস্তৃত হলো। সে বলল, ‘তোমার এখনও সন্দেহ আছে?’
অপলা মাথা নেড়ে জানাল, না।
‘তোমাকে আমার ভীষণ প্রয়োজন, অপলা। এবার যখন পেয়েছি আর হারাতে চাইনা।’
‘আমিও না।’
‘তোমার কনফারেন্স?’ অপলার প্রফেশনাল আউটফিটের দিকে চোখ বুলিয়ে বলল হাসান।
‘ম্যানেজ করে এসেছি।’
‘তোমাকে ফিরে যেতে হবে না?’
‘না।’
সকালে ব্রেকফাস্ট টেবিলে অপলা তার টিম ম্যানেজারকে বলেছে, কাজটা সে আর করতে চায় না। কারণটা পারসোনাল এবং ফ্যামিলি রিলেটেড তাই ডিটেইল বলা যাচ্ছে না বলে সে দুঃখিত। ম্যানেজার বলল, কনফারেন্সটা শেষ করে যাও। ও বলল, কাজটাই তো ছেড়ে দিচ্ছি। শুধু শুধু কনফারেন্সে থেকে আর কী হবে? অপলা দেরি না করে রুম চেক-আউট করে একটা ক্যাব নিয়ে চলে এসেছে হাসানের বাসায়।
হাসানের অবাক দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে অপলা আবার বলল, ‘কাজটা আমি ছেড়ে দিয়েছি।’
‘সিরিয়াসলি!’
‘হ্যাঁ।’
‘সো, দিস ইজ ফর রিয়েল? আই মিন উই আর ফ্যামিলি এগেইন?’
‘কোনো সন্দেহ আছে?’
‘এখন আর নেই।’ বলেই হাসান হাসল। তার মুখটা প্রশস্ত করে দুই ঠোঁটে লেপ্টে এক নিদারুণ ভঙ্গিমায় হাসতে থাকল সে—সম্ভবত পৃথিবীর প্রশস্ত হাসি।
রাতের ডিনার শেষ করে পেছনের ছাওনির নীচে বসে আছে হাসান আর অপলা—হাতে গ্রিন টি।
আজকের সন্ধ্যা-রাতটা অন্যরকম। সন্ধ্যার কিছুক্ষণ পর আকাশে একটি বিরল চাঁদ উকি দিয়েছে। ধীরে ধীরে রক্তিম হয়ে উঠছে। আকাশে কিছুটা কুয়াশা থাকায় সন্ধ্যার পরপরই চাঁদটি দেখা যায়নি।
দুজনের কেউ কোনো কথা বলছে না—শুধুই অনুভব করছে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। শুধু কিছু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছে না।
অনেকক্ষণ থেকেই হাসান উসখুস করছিল—অপলাকে একটা কথা বলতে চায়। নীরবতা ভেঙ্গে সে বলল, ‘অপলা, তুমি কি জানো আমি কতটা খুশি হয়েছি।’
‘জানি।’ একটু থেমে অপলা বলল, ‘তুমি কি জানতে আমি ফিরে আসব?’
‘একবার মনে হয়েছিল। আবার মনে হয়েছিল নাও আসতে পারো।’
‘তার মানে আমি ফিরে না এলেও তুমি কিছু বলতে না?’
হাসান কোনো উত্তর দিতে পারল না।
‘শোনো হাসান, নিজের অধিকারটা নিজেকেই আদায় করে নিতে হয়। মাঝে মাঝে চেয়ে নিতে হয়। তুমি কি ভেবেছ, না চাইতেই সব কিছু পেয়ে যাবে? সব কিছু কি এতো সহজ?’
হাসান চুপ করে রইল।
অপলা আবার বলল, ‘তুমি আমার ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলে—কিন্তু তুমি আমাকে ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে তেমন কোনো আগ্রহ দেখাও নি কোনোদিন—কোনো উদ্যোগও নাও নি, কেন?’
হাসান মিন মিন করে বলল, ‘তুমি যদি না আসতে চাও…’
অপলা হাসানের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলল, ‘না আসতে তো চাইতেই পারি, তাই বলে তুমি বলবে না? নাকি বললে তোমার ইগো তে লাগত—নিজেকে ছোট মনে হতো?’
হাসান উত্তর দিল না।
‘কেন, তুমি জোর করতে পারতে না?’
‘তুমি তো জানই আমি কোন কিছু নিয়ে জোর করাটা পছন্দ করিনা।’
‘জানি। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে জোর খাটাতে হয়। নাহলে অনেক কিছু থেকেই বঞ্চিত হতে হয় জীবনে। ভালবাসার জোর—ভালবাসা দিয়ে ভালবাসা আদায় করতে হয়, এটা কি তুমি বোঝ?’
‘বুঝি তো।’
‘তাহলে?’
অপলার হঠাৎ মনে হলো—ধ্যাত, এই মানুষটার সাথে রাগ করে লাভ নেই। আজকের এই মুহূর্তটাকে কিছুতেই নষ্ট করা যাবে না। সে প্রসঙ্গ বদলে বলল, ‘আচ্ছা, রুবেলের ব্যাপারটা কি বলতো? ও আসলেই তোমাকে খুব পছন্দ করে তাই না?’
‘কেন রুবেল কি করেছে আবার?’
‘কি আর করবে? তুমি যা পারো নি—সেটা সে করেছে।’
‘মানে কি?’
অপলা কিছু বলল না। তার ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটে উঠল।
হাসান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে দেখে সে বলল, ‘রুবেল আর যূঁথী কাল রাতে হোটেলে গিয়েছিল—আমার সঙ্গে দেখা করতে।’
‘কি?’
‘ঠিকই শুনেছ।’
‘কিন্তু কেন?’
‘তোমার হয়ে ওকালতি করতে। আমার বিরহে তুমি পাগল হয়ে আছো সেটা বলতে। আমার ফোন পেয়ে তুমি কেমন অস্থির হয়েছিলে সেটা জানাতে।’
‘তাই বুঝি?’ হাসান লজ্জা পেয়ে হাসল। সে অবাক হয়ে ভাবছে। রুবেলের প্রতি ভেতরে ভেতরে কৃতজ্ঞ বোধ করল। রুবেল যা করেছে তা ছিল তার ভাবনার বাইরে।
অপলা আর কিছু বলল না। মিটি মিটি হাসল শুধু।
এমন সময় অপলার ফোন এলো। ওরিগন থেকে তার বান্ধবী শিল্পীর ফোন। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে দিতেই হাসান জানতে চাইল, ‘কার ফোন ছিল?’
‘শিল্পীর। আমি এখন ফিরে যাচ্ছি না শুনে রাইসা অনেক কান্না কাটি করছে।’ একটু চুপ থেকে অপলা বলল, ‘মেয়েটা আমাকে ভীষণ মিস করবে।’
হাসান বলল, ‘তুমি রাইসাকে মিস করবে না?’
‘অবশ্যই করব বাট আই হ্যাভ এ বেটার আইডিয়া।’
‘রিয়েলি? হোয়াট’স দ্যাট?’
‘হাউ’বাউট উই হ্যাভ আওয়ার অউন রাইসা? তুমি আমাকে আমার নিজের একটি রাইসা এনে দিতে পারো না?’
‘কেনো পারব না?’
‘তাহলে আর দেরী কেন?’ অপলার ঠোটে ইঙ্গিতপূর্ণ হাসি খেলা করল।
হাসান হাত বাড়িয়ে দিল—অপলা ধরল সে হাত। তাঁরা দুজন দুজনের কোমর জড়িয়ে ধরে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর।
একটি রৌদ্রকরোজ্জ্বল শুভ্র সকাল আর রূপালী দুপুর পেরিয়ে হাতছানি দিচ্ছে এক কুয়াশাচ্ছন্ন মায়াবী রাত—আজকের পুরো সময়টা কেবলই ভালবাসার ক্ষণ। আজকের রাতটা হবে অন্যরকম। আজকের রাত শুধুই ভালবাসার রাত—ভালবাসাবাসির রাত।
হাসান আর অপলা ঘরের ভেতর ঢুকে পড়তেই যেন আকাশ ফুঁরে বের হয়ে এলো রুবেল। সে বন্ধ দরজার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যাক এতদিনে দুইজনের অপেক্ষার পালা শেষ হইছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌! এবার ডাইরেক্ট একশন!’ বলেই সে নিশ্চিন্ত মনে তার ভক্সওয়াগন স্টার্ট দিয়ে ভটভট করে চলে গেল হাসানের বাসার পেছনের গলির ভেতর থেকে।
রুবেল গাড়িতে উঠেই উচ্চ কণ্ঠে গেয়ে উঠল, ‘আজ পাশা খেলব রে শ্যাম… ও শ্যামরে তোমার সনে… একেলা পাইয়াছি রে শ্যাম…’
কিছুক্ষণের মধ্যেই রুবেলের গাড়ি হাসানদের আবাসিক এলাকা ছেড়ে হারিয়ে গেল হাইওয়েতে।
(সমাপ্ত)

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৬)

অপলার ফোন বাজতেই হাসান চমকে উঠল। একটু ইতস্তত করে সে তাকাল অপলার দিকে।
অপলা চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল হাসানের মুখ ঠিক তার মুখের সামনে। বেরসিক ফোনটি বেজেই চলেছে।
‘এক্সকিউজ মি’ বলে ফোনটা হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়াল অপলা। কয়েক পা এগিয়ে গিয়ে ফোন কানে লাগিয়ে বলল, ‘Hello?’
ওপাশ থেকে কেউ কিছু বলল। কিছুক্ষণ শুনে অপলা বলল, ‘Oh, I miss you too.’ ওপাশের মানুষটি আবার কিছু বলল। অপলা উত্তর দিল, ‘Okay, I’ll be back in couple of days.’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে বলল, ‘I love you too!’
এ পর্যায়ে হাসান তাকাল অপলার দিকে—চিন্তিত ভঙ্গিতে। অপলার মুখে ‘আই লাভ ইউ টু’ শুনে তার মাথায় নতুন চিন্তা শুরু হলো। কার ফোন—কে হতে পারে, যাকে অপলা বলতে পারে আই লাভ ইউ টু?
অপলা কথা শেষ করে ফোন কেটে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। সে উপলব্ধি করল—এসময়ে ফোনটা না এলে কী হতো!
হঠাৎ করেই একটা অস্বস্তিকর নীরবতায় ছেয়ে গেল ঘরটাতে। হাসান তাকিয়ে আছে অন্যদিকে।
অপলা তাকাল হাসানের দিকে। হাসানের চেহারায় সূক্ষ্ম পরিবর্তন দেখা দিলেও অপলা তা ধরতে পারল না।
অপলা একটু ধাতস্থ হয়ে প্রসঙ্গ বদলে জিজ্ঞেস করল, ‘সো হোয়াট’স আওয়ার প্ল্যান ফর টুমরো?’
‘কাল সারাদিন তোমাকে নিয়ে ঘুরব। বাইরে লাঞ্চ করব, বোট রাইডেও যেতে পারি। তুমিতো মিলেনিয়াম পার্ক দেখনি। নামেই পার্ক, কিন্তু কোন বাগান নেই। হা হা হা…।’ হাসান স্বাভাবিক হয়ে এলো।
‘সাউন্ডস গ্রেট!’ একটু থেমে অপলা হাসানের দিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাল। তারপর একসময় বলল, ‘সময়টা বেশ কাটছিল তাই না?’
‘তাহলে, আরেকটু বসো না।’
অপলা চুপ করে রইল। সে স্থির করতে পারছে না—কী করবে। এক মন চাইছে, আরেকটু থেকে যেতে–কী এমন ক্ষতি। আরেক মন বলছে, এত তাড়াহুড়ো কিসের।
হাসান ইতস্তত করে বলল, ‘তোমাকে এভাবে কাছে পেয়ে আমার যে কী ভাল লাগছে। আমার যদি ক্ষমতা থাকত, তাহলে সারাজীবনের জন্যে তোমাকে কাছে রেখে দিতাম। কোথাও হারিয়ে যেতে দিতাম না।’
‘তাহলে চেষ্টা করছ না কেন?’ একটা দুষ্টুমির হাসি দিয়ে অপলা কয়েক পা হেঁটে দরজার কাছে গেল। ঘুরে তাকাল হাসানের দিকে। তারপর বলল, ‘গুড নাইট হাসান।’
হাসান একটা অপ্রস্তুত হাসি হেসে হাত নেড়ে বলল, ‘গুড নাইট অপলা।’
একটু থেমে অপলা চলে গেল ওপরে—তার রুমে।
হাসান তাকিয়ে রইল অপলার চলে যাওয়ার দিকে। এবং হঠাৎ করেই প্রচণ্ড মন খারাপ হলো তার। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল সারাটা রাত যদি কথা বলা যেত অপলার সাথে। অপলা বলেছিল, কত কথা জমে আছে। তাহলে? হাসানেরও তো কত কথা বলার ছিল। কিছুই তো বলা হলো না। বিষাদে ছেয়ে গেল তার মনটা।
অপলা ড্রেস বদলে স্লিপিং গাউন গায়ে জড়িয়ে নিল। প্রসাধনী তুলে ধীরে ধীরে গা এলিয়ে দিল বিছানায়। দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ শুয়ে এপাশ ওপাশ করল সে। তার মনে হাজারো প্রশ্ন দেখা দিল। হাসানের এমন পরিবর্তন তাকে অবাক করেছে। হাসানের ব্যবহার এবং কেয়ারিং তাকে অভিভূত করল। হাসান কি তাহলে সত্যি সত্যি তার জন্যে অপেক্ষা করছে। বিশ্বাসই হচ্ছে না, অপলার জন্য এতটা ভালবাসা সে লালন করে আছে। যেই মানুষটা টাকা আর কাজ ছাড়া অন্য কিছুই বুঝত না, অপলার দিকে ভাল করে তাকাবার একটু সময় যার হতো না, আজ সেই কিনা… অপলা মনে মনে ভীষণ অবাক হলো।
অপলার রেখে যাওয়া সবকিছু হাসান এই বাসাটাতে এনে গুছিয়ে রেখেছে। বিশাল বড় বেডরুম, বাথরুম সব কিছু কাস্টম ডিজাইন করে বানিয়েছে—তার জন্যে। ভাবতে অন্যরকম লাগছে।
হাসানের জন্যে এখন খুব মায়া হচ্ছে তার। আহা বেচারা, কেমন অসহায় হয়ে গেছে। অপলা এখন কী করবে? ফিরে আসবে? তার কি ফিরে আসা উচিত?
অন্যদিকে হাসান তার রুমে বসে বসে ভাবছে, অপলা কি তাহলে তাকে ক্ষমা করে দিয়েছে? নাকি দেখতে এসেছে হাসান এখনো একা আছি কিনা। অপলাকে কী করে বুঝাবে যে, সে তার হৃদয়ের কত বড় একটা অংশ হয়ে আছে। অপলার চলে যাওয়া হাসানকে নতুন করে ভাবতে শিখিয়েছে—উপলব্ধি করতে শিখিয়েছে। সে এখন এক নতুন মানুষ।
হাসানের খুব ইচ্ছে হচ্ছে অপলাকে জড়িয়ে ধরে সারারাত শুয়ে থাকতে। সে কি যাবে তার কাছে? কিন্তু অপলা যদি আবার অন্য কিছু ভাবে? হাসানের মনে আছে, অপলা কিছু নিয়ে রাগ করলে কিছুতেই তার শরীর ছুঁতে দিত না। সে বলত, তোমার ভালবাসা তো শুধু শরীরেই। আমার মন ভাল না হওয়া পর্যন্ত আমাকে ছোঁবে না তুমি।
রাত গভীর হয়ে এলো। দুজন মানুষ একটা দ্বিধার দেয়ালের দু’পাশে অস্থির হয়ে ছটফট করছে। এভাবেই দুজন একান্ত কাছের মানুষ, একে অপরের আরো কাছে এসেও অস্বস্তিকর দীর্ঘ একটি রাত পার করে দিল শুধু সংকোচ আর দ্বিধার কারণে।
পরের দিন রোববার। শিকাগোর দিনটা শুরু হলো রৌদ্রকরোজ্জল সকাল দিয়ে। সকাল পেরিয়ে দুপুর হবে হবে করছে। সকালে তাদের দুজনেরই ঘুম ভেঙেছে একটু দেরীতে। আগের দিনের পরিকল্পনা মোতাবেক আজ তাদের শিকাগো ডাউন-টাউনে যাওয়ার কথা।
হাসান একটা নীল রঙের জিনস প্যান্ট আর সাদা পোলো টি-শার্ট, মাথায় বেসবল ক্যাপ, চোখে রে-ব্যান সানগ্লাস পড়ে বের হয়ে তার বিএমডব্লিউ এসইউভি স্টার্ট দিল। কিছুক্ষণের মধ্যে অপলা এসে উঠে বসল হাসানের গাড়িতে। কাকতালীয় ভাবে অপলা পড়েছে সাদা রঙের স্কার্ট, নীল টপস, তার চোখে প্রাডা ব্রান্ডের সান-গ্লাস। দুজনকেই অপূর্ব লাগছে।
হাসান গাড়ি ছেড়ে দিতেই কোথা থেকে রুবেল এসে হাজির। হাসানদের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে একটা বিস্তৃত হাসি দিয়ে বলল, ‘কাজ তাহলে ঠিকঠাক মতই আগাইতেছে। আলহামদুলিল্লাহ্‌!’
লেক মিশিগানের তীর ঘেঁষে পথচারীর আর পর্যটকদের হাঁটা চলা চলছে। হাসান আর অপলা পর্যটকদের মতোই ঘুরে বেড়াল কিছুক্ষণ। নীল রঙা লেকের ব্যাকগ্রাউন্ডে তাদের দুজনকে পাশাপাশি মনে হচ্ছে হিন্দি সিনেমার নায়ক নায়িকা কোনো গানের দৃশ্যে অভিনয় করছে।
লেকের পাড়ে আসার আগে হাসান অপলাকে নিয়ে গেল শিকাগোর বিখ্যাত মিলেনিয়াম পার্কে। সেখানে বিভিন্ন আর্ট-গ্যালারির মধ্যে বাংলাদেশের একটি কাজ দেখাল। অপলা অবাক হয়ে দেখল। এবং যারপর নাই অভিভূত হলো। সেখান থেকে দুজনে মিলে বিখ্যাত বাকিংহাম ফাউণ্টেনের কাছে গেল। এই জায়গাটি অপলার খুব প্রিয়। ঝর্ণার পাশে কিছুসময় থেকে তাঁরা গেল নেভি-পিয়ারে। সেখানে লেকের ধারের একটি রেস্টুরেন্টে বসে লাঞ্চ করল। ইতিমধ্যেই দুপুর গড়িয়েছে।
লাঞ্চ শেষ করে হাসান আর অপলা এসে বসল লেকের পাড়ের একটি বেঞ্চে।
পড়ন্ত বিকেল। ঝিরিঝিরি বাতাস ভেসে আসছে লেক থেকে। ওরা দুজন তাকিয়ে আছে সামনে। একটা ট্যুর বোট ভেঁপু বাজিয়ে চলে যাচ্ছে ওদের সামনে দিয়ে। ডেক থেকে সবাই হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানাচ্ছে পারের মানুষগুলোকে। পার থেকে থেকেও সবাই হাত নেড়ে উত্তর দিচ্ছে।
অপলার দিকে ঘুরে হঠাৎ করেই হাসান বলল, ‘অপলা, তোমাকে আমার কিছু কথা বলার ছিল।’
‘বলো।’ অপলা অবাক হয়ে হাসানের দিকে তাকাল।
হাসান ইতস্তত করে বলল, ‘আমরা দু’বছরের কিছু বেশি সময় ধরে আলাদা। ইট’স এ বিগ গ্যাপ। এসময়ের মধ্যে তোমার কিংবা আমার অন্য যে কাউকে ভাল লাগতে পারে—কারো সাথে সম্পর্কও হয়ে যেতে পারে। এটা অস্বাভাবিক কিছু না।
অপলা হেসে দিয়ে বলল, ‘এতো ভূমিকা দেবার দরকার নেই হাসান। সরাসরি বলে ফেলো, যা বলতে চাও।’
‘আমার ধারণা, তুমি কাউকে ভালোবাসো। কারো সাথে তোমার সম্পর্ক হয়েছে।’
অপলা তড়িৎ হাসানের কনফিউশনের ব্যাপারটা ধরে ফেলল। সে দুষ্টুমি করে মুচকি হেসে বলল, ‘তোমার ধারণা ভুল নয়।’
হাসানের চেহারায় খানিকটা অনিশ্চয়তার ছায়া দেখা দিল। সে বলল, ‘But I have to tell you how I feel for you.’
অপলা হাসানের হাঁটুর ওপরে হাত রেখে বলল, ‘I know now how you feel about me.’ একটু থেমে সে আবার বলল, ‘তোমার হয়ত মনে হচ্ছে, আমাকে কিছু বলার এটাই তোমার শেষ সুযোগ, আমি আবার চলে যাবার আগে।’
‘হ্যাঁ তাই।’ বলেই একটু হাসল হাসান—শুষ্ক হাসি। ‘এই সুযোগটা আমি হাতছাড়া করতে চাইনা। তোমার সাথে আর যদি দেখা না হয়, যদি তোমাকে আমার কথা গুলো বলা না হয়, যে তোমাকে আমি…’
‘কত ভালবাসি?’
হাসান চুপ।
‘First of all, I don’t have a boyfriend—আর কারো সাথেও আমার কোনো সম্পর্কও হয়নি।’
‘না? তাহলে কাল রাতে তুমি যে ফোনে বললে, I love you, too?’ হাসান ইতস্তত করে বলল।
‘আমি রাইসার সঙ্গে কথা বলছিলাম।’ অপলা আবারো মিটিমিটি হাসছে।
‘রাইসা?’
‘হ্যাঁ। আমার বান্ধবীর মেয়ে। চার বছর বয়স।’
‘দেখো দেখি কী কাণ্ড, আর আমি কিনা ভাবলাম—’ হাসান নিজের ভুল বুঝতে পেরে বিব্রত বোধ করল।
‘আমার বান্ধবী শিল্পী, যার সাথে আমি থাকি—ওর চার বছরের মেয়ে। রাইসাই আমার একমাত্র ভালবাসা। সম্পর্ক যদি কারো সাথে হয়ে থাকে তা ঐ ছোট্ট মেয়েটির সাথে। অমন একটি মেয়েতো আমারও থাকতে পারত!’ এটুকু বলতে বলতে অপলার গলা ধরে এলো। সে তাকিয়ে থাকল লেকের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে। তার চোখ খানিকটা ভিজে গেল।
অপলার কাঁধে হাত রেখে তাকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল হাসান।
নীরবতায় কেটে গেল আরো কিছুটা সময়।
অপলা নিজেকে স্থির করে বলল, ‘হাসান, আজ রাতে আমাকে চলে যেতে হবে।’
‘চলে যেতে হবে মানে? কোথায় চলে যাবে?’
‘তোমাকে তো বলা হয়নি, আমি আসলে এসেছিলাম আমার কোম্পানির এনুয়াল কনফারেন্সে। কাল পরশু দু’দিন মিটিং হোটেল হায়াত রিজেন্সিতে। পরদিন সকালেই আমার ফ্লাইট।’
হাসান বাকরুদ্ধ হয়ে গেল। সে বুঝতে পারছে না, অপলা কী বলছে এসব। ওতো ধরেই নিয়েছিল অপলা আবার ফিরে এসেছে তার কাছে। তারমানে অপলা শুধু দেখা করতে এসেছে—সম্ভবত নিজের চোখে দেখে গেল সে কেমন আছে। হাসান তাকিয়ে রইল অপলার মুখের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে।
‘যখন জানলাম, শিকাগোতে কনফারেন্স, খুব ইচ্ছে হলো দুটো দিন আগে এসে তোমাকে একটু দেখে যাই। তোমার সঙ্গে একটু সময় কাটাই। তোমাকে মাঝে মাঝে ভীষণ দেখতে ইচ্ছে করে।’
হাসান অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল অপলার চোখের দিকে। কী মায়া নিয়ে কথাগুলো বলল অপলা। হাসান নিজেকে স্থির রাখতে পারল না। সে অপলার হাত চেপে ধরল।
‘কেন তোমাকে ফিরে যেতে হবে? না, অপলা। না, আমি তোমাকে আর যেতে দেব না। For god sake, look at me. I’m a different person now!’
‘আমি জানি।’
‘এটা ঠিক একটা সময় আমি টাকার পিছনে হন্যে হয়ে ঘুরেছি। তখন মনে হতো জীবনে টাকাই সব। তুমি চলে যাবার আগের দিন পর্যন্ত মনে হয়েছিল, জীবনে টাকার চেয়ে ইম্পরট্যান্ট কোন কিছু নেই। Now I know, money can only solve money problem. Nothing else. Money cannot buy happiness. Money can give freedom not life. I don’t want money any more. I want to have a life!’
হাসানের মুখে এমন কথা শুনে অপলা বেশ অবাক হলো। মনে হলো অপলার বলে যাওয়া কথাগুলোই আবার বলল হাসান। অপলা একসময় এই কথাগুলোই হাসানকে বলত।
অপলার হাত ঝাঁকি দিয়ে হাসান আবারো বলল, ‘প্লিজ, তুমি চলে যেও না। চলো, আমরা আবার নতুন করে জীবন শুরু করি।’
অপলা কোনো জবাব দিল না। সে চুপ করে রইল।
হাসান অপলার হাত ধরে অপেক্ষা করছে—তাকিয়ে আছে তার মুখের দিকে।
বেশ কিছুক্ষণ চুপ থেকে অপলা বলল, ‘চলো ফেরা যাক। আমার হোটেল চেক-ইনের সময় পার হয়ে যাচ্ছে।’

শেষ পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৫)

‘Oh shit!’ ৩৫০ ডিগ্রী তাপমাত্রার ওভেনের ভেতর হাত ঢুকিয়ে গরমে ছ্যাঁকা খেয়ে মুখ ফসকে বলে ফেলল হাসান।
ওপাশ থেকে অপলা বলল, ‘কী হলো? Is something wrong?’
অপলার কথা হাসানের কানে গেল না। সে তখনো তাকিয়ে আছে রুবেলের দিকে—অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে। এই ছেলেটার কী কোনো কমনসেন্স নাই?
‘Are you alright?’ অপলা আবার জিজ্ঞেস করল।
‘Yeah, I’m fine.’ কথা বলতে বলতে রুবেলকে হাতের ইশারায় চলে যেতে বলল হাসান। কিন্তু নাছোড়বান্দা রুবেল বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বোঝাল—চালিয়ে যান।
হাসান খুবই বিরক্ত হলো। সে রুবেলকে পুরোপুরি অগ্রাহ্য করে হাতে গ্লাভস পরে এলুমিনিয়াম ফয়েলে মোড়ানো গরম ট্রে-টা বের করে নিয়ে ডাইনিং টেবিলে রাখল। ধীরে ধীরে কাভারটা খুলে বলল, ‘Here you go. Surprise!’
‘Lasagna! My favorite dish! Looks really good.’ অপলা উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলেই তাকাল হাসানের দিকে। ‘মনে রাখার জন্যে অসংখ্য ধন্যবাদ।’
‘My pleasure.’ হাসান ট্রে থেকে বড় এক পিস লাজানিয়া তুলে দিল অপলার প্লেটে।
অপলার দেরি সহ্য হলো না। সে কাটা-চামচ আর ছুঁড়ি নিয়ে কাটাকাটি শুরু করে দিল। তারপর মুখে দিয়ে একটু খেয়ে তাকাল হাসানের দিকে।
হাসান নার্ভাস ভঙ্গিতে বলল, ‘অনেকদিন পর তোমার প্রিয় আইটেমটা করলাম। খেতে পারবে কিনা জানিনা। ভাল না লাগলে বলো—আমরা বাইরে গিয়ে খেয়ে নেব।’
‘Umm, perfect! ভাল হয়েছে, হাসান।’
‘সত্যি বলছ?’
‘হুম। সত্যি।’
অপলা খুব তৃপ্তি করে খাচ্ছে। হাসান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে অপলার দিকে। অপলার সেদিকে কোনো লক্ষ্য নেই। সে খেয়েই চলেছে। মাঝে মাঝে আবার এক সিপ শ্যাম্পেনও মুখে দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর সে তাকাল হাসানের দিকে—দেখল, সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। অপলা একটু লজ্জা পেয়ে গেল।
হাসান হেসে দিয়ে বলল, ‘খুব ভাল্লাগছে তোমাকে দেখে।’
‘তাই? আর আমার খাওয়া দেখে কী মনে হচ্ছে—কতদিন না খেয়ে আছি?’
‘আরে না না তা হতে যাবে কেন?’
শ্যাম্পেনে একটা চুমুক দিয়ে অপলা জিজ্ঞেস করল, ‘তারপর, তুমি কেমন আছো?’
‘এইতো, আছি।’ হাসান মৃদু হেসে বলল।
‘এনি গার্লফ্রেন্ড?’ প্রশ্নটা করে অপলা তাকিয়ে রইল হাসানের দিকে।
‘গার্লফ্রেন্ড? আরে নাহ…’ হাসান অবাক হয়ে বলল।
‘না কেন?’
‘আসলে মেয়েদের ব্যাপারে আমার ভাগ্যটা খুবই খারাপ। অবশ্য সেভাবে চেষ্টা করেও দেখা হয়নি।’
‘তাহলে বিয়ে করছ না কেন? নাকি করবে না বলে ডিসিশন নিয়েছ?’
হাসান ঠিক বুঝতে পারল না, অপলা কেন এধরণের কথা বলছে। সেটা কী কথা পিঠে কথা নাকি ও সত্যি সত্যিই জানতে চায়। হাসান হাসি হাসি মুখ করে বলল, ‘আরে ধুর, এই বয়সে কে আর আমাকে বিয়ে করবে?’
‘কী আর এমন বয়স হয়েছে তোমার? You’re still young, good looking, besides being an established businessman.’ এবার দুষ্টুমি করে যোগ করল অপলা, ‘টাকা পয়সা নিশ্চয়ই ভালই বানিয়েছ! সেই সাথে, বিশালাকার বাড়ি, লেটেস্ট মডেলের গাড়ি, কী নেই তোমার। তোমার জন্যে মেয়ের অভাব? একবার দেশে গিয়েই দেখ না, মেয়ের সঙ্গে মায়েরাও লাইনে দাড়িয়ে যাবে।’
অপলার কথার ভঙ্গিতে উচ্চস্বরে হেসে ফেলল হাসান। ‘তুমি দেখি অনেক মজার কথা বলতে শিখেছ অপলা? তুমি বদলেও গেছ অনেক।’
‘তাই? কী রকম?’
‘এই যেমন, তুমি আগে চুপচাপ থাকতে—কথা বলতে কম। হাসতে না একেবারেই। আর এখন, কেমন যেন একটা চটপটে ভাব এসেছে তোমার মধ্যে। বেশ সাবলীল।’
‘কথা আমি আগেও বলতাম। তবে নিজের সাথে—মনে মনে কত কথা বলতাম। তোমাকে পেতাম না, তাই কথাও হতো না। কথা বলার জন্যে একজন সঙ্গী তো চাই, তাইনা?’
মুহূর্তের মধ্যে হাসানের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
হাসানের এই পরিবর্তনটা অপলার চোখ এড়াল না। একটু থেমে সে বলল, ‘তাছাড়া, দু’বছরতো আর কম সময় না, হাসান। একজন মানুষের বদলে যাবার জন্যে যথেষ্ট।’
এরপরে আর কেউ কোনো কথা বলল না। চুপচাপ খেয়ে চলল দুজনে—শুধু চামচের টুংটাং শব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দই শোনা গেল না।
হাসান লক্ষ্য করল অপলার প্লেট খালি হয়ে এসেছে। সে আগ্রহ নিয়ে বলল, ‘আরেকটু তুলে দেই?’
‘Oh no! I’m full.’
‘ঠিক আছে, তুমি লিভিং রুমে গিয়ে বসো, আমি এগুলো ক্লিন করে আসছি।’
‘এখন ক্লিন করতে হবে না। তুমি এসো অনেক কথা জমে আছে।’ বলেই অপলা উঠে দাঁড়াল। একহাতে শ্যাম্পেন গ্লাস ধরে অন্য হাত বাড়িয়ে দিল হাসানের দিকে।
হাসান হেসে দিয়ে ধরল অপলার হাত। অপলা তাকে প্রায় টেনেই নিয়ে গেল লিভিং রুমে। তারপর বসল সোফাতে। প্রচণ্ড ভাললাগায় বুঁদ হয়ে রইল হাসান—অনেকদিন পর যেন জীবন ফিরে পেয়েছে। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলল, ঠিক এই মুহূর্ত থেকে অপলা যা যা বলবে সে তাই তাই করবে। এখন থেকে জাহাজের ক্যাপ্টেন সেই—সে যেভাবে নেভিগেট করবে, সেভাবেই চলবে।
অপলারও ভাল লাগছে। অনেকদিন পর হাসানের কাছে এসে তার সঙ্গ সে উপভোগ করছে। সে চুপচাপ বসে রইল কিছুক্ষণ। এক ধরণের নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে আছে—তবে ভাললাগার রেশটুকু ছড়িয়ে আছে চারিদিকে।
নীরবতা ভাঙ্গার জন্যেই হাসান বলল, ‘মুভি দেখবে? একটা মুভি ছেড়ে দেই?’
হাসানের লিভিং রুমের দেয়াল জুড়ে সিনেমা দেখার পর্দা লাগানো। উপরে প্রজেক্টর থেকে মুভি দেখতে বেশ ভালই লাগে। কিন্তু মুভি দেখার কোনো আগ্রহ অপলার মধ্যে দেখা গেল না। সে বরং উল্টো বলল, ‘আমি এক হাজার মাইল ফ্লাই করে এসেছি কি এখানে বসে মুভি দেখার জন্যে?’
হাসান হেসে ফেলল। আর কী বলা যায় সে ভেবে পেল না। হঠাৎ তার মনে হলে। অপলাকে একটা ধন্যবাদ তো দিতে পারে—তার এত প্রশংসা করল। হাসান বলল, ‘বাই দ্য ওয়ে, থ্যাঙ্কস ফর দ্য কমপ্লিমেন্ট!’
‘কমপ্লিমেন্ট!’ ভ্রূ কুঁচকে অপলা তাকাল হাসানের দিকে।
‘ঐ যে বললে, আমি এখনও ইয়ং, গুড লুকিং…’ হাসানের মুখে লজ্জার হাসি।
‘শুধু তাই নয়, ইয়্যু আর সো সুইট, ইউ নো দ্যাট রাইট?’
হাসানের মুখের হাসি বিস্তৃত হলো। সে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ!’
অপলা হঠাৎ করেই হাসানের একটি হাত তার হাতের মধ্যে এনে কিছুক্ষণ ধরে রাখল। তারপর বলল, ‘একটা কথা জিজ্ঞেস করি?’
‘করো।’
‘এখন তো তোমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আর ইউ হ্যাপি নাউ?’
হাসান চুপ করে রইল। সে একটু অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার মনে পড়ে গেল অপলার সেই কথা গুলো। অপলা বলেছিল, একদিন তোমার অনেক টাকা হবে। স্বপ্নের বাড়ি হবে, গাড়ি হবে ঠিকই, কিন্তু যার বা যাদের কথা ভেবে এগুলো করছ, তারা হয়ত কেউ থাকবে না তোমার পাশে।
অপলা আবারো জানতে চাইল, ‘কি বললে না?
হাসান অস্ফুটে বলল, ‘কী?’
‘তুমি কি এখন সুখী?’
হাসান সুখী কিনা তার উত্তর না দিয়ে সে বলল, ‘আমি ভীষণ একা, অপলা। আমার ভীষণ কষ্ট।’
‘একা থাকছ কেন? একজন সঙ্গী জোগাড় করে নাও।’
‘আমি আসলে অপেক্ষায় ছিলাম—এখনো আছি।’
‘কিসের অপেক্ষা?’
‘তোমার ফিরে আসার।’ একটু থেমে হাঁসান আবার বলল, ‘ভেবেছিলাম, তুমি ফিরে আসবে। যখন তোমার চিঠি পেলাম, তখন ভীষণ মুষড়ে পড়েছিলাম। খুবই কষ্ট হয়েছিল।’
অপলা চুপ করে রইল। কী বলবে ভেবে পেল না। চারিদিকে নীরবতা—দুজনেই যেন নিবিড় ভাবনায় আচ্ছন্ন।
হঠাৎ করেই দরজায় টোকা পড়ল। ঠক ঠক ঠক। ছেদ পড়ল নিবিড় ভাবনায়।
হাসান দরজার দিকে চিন্তিত ভঙ্গিতে তাকাল। দরজায় টোকা বেজেই চলেছে। হাসান অপলার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এক মিনিট, আমি দেখছি।’
দরজা খুলে হাসানের মাথায় রক্ত উঠে গেল। সবগুলো দাঁত বের করে দাঁড়িয়ে আছে রুবেল। হাসান নিজেকে চেষ্টা করেও স্থির রাখতে পারল না। ‘তুমি এখনো ঘুর ঘুর করছ কেন?’ হাসান তার গলার স্বর যথেষ্ট নিচু করে চাপা কিন্তু রাগান্বিত কণ্ঠে বলল।
‘হাসান ভাই, সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা তার খোঁজ নিতে আসলাম।’
‘সবকিছু ঠিক আছে। তুমি এখন যাও।’
‘আপনেতো মনে হয় এখনো আসল কথাটাই বলতে পারেন নাই। আসল কাজ তো দূরে থাক।’
‘আর কিছু বলবে? নাহলে খোদা হাফেজ।’
‘না বলেছিলাম কি, সারাক্ষণ তো আমার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করেন—আই রিয়েলি লাভ হার, আই ক্যান’ট লিভ উইদাউট হার। আমার সব কিছুই সে, দরকার হলে আমার সারাজীবন অপেক্ষা করব। এইসব কথা কি তাকে বলছেন নাকি এখনো ভাবতেছেন?’
হাসান অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে চেয়ে রইল রুবেলের হাসি হাসি মুখের দিকে—কয়েক মুহূর্ত। ‘গুড নাইট রুবেল।’ বলেই সে দরজা বন্ধ করে দিল।
হাসান ফিরে যেতেই অপলা জিজ্ঞেস করল, ‘কে এসেছিল?’
‘রুবেল। ওর কথাতো তোমাকে বলাই হয়নি। হি ইজ অ্যান ইন্টারেস্টিং ক্যারেক্টার। আমাকে খুবই পছন্দ করে—লাইক হিজ বিগ ব্রাদার। কিন্তু মাঝে মাঝে একটু বেশি…’
এটুকু বলে হাসান থেমে গেল। অপলা ভ্রু কুঁচকে তাকালো?
‘বেশি কী?’
‘না কিছু না। তুমি বুঝবে না। আচ্ছা বাদ দাও ওর কথা।’
রুবেলের ব্যাপারে অপলা আর কোনো আগ্রহ দেখাল না। কিন্তু সে তার আগের প্রশ্নের উত্তর এখনো পায় নি, তাই হাসানকে আবার মনে করিয়ে দিল। ‘তুমি কিন্তু এখনো বলনি।’
‘কি জানতে চেয়েছিলে?’
‘আর ইউ হ্যাপি?’
‘তার কী কোন কারণ আছে?’ একটু চুপ করে থেকে হাসান বলল।
‘অবশ্যই আছে। তুমি যা চেয়েছিলে, তার সব কিছুইতো পেয়েছো। ইউ শুড বি হ্যাপি।’
‘হতাম যদি আমার পাশে তোমাকে পেতাম—সবসময়।’
‘কিন্তু তুমিতো আমাকে চাও নি।’
অসহায় চোখে হাসান তাকাল অপলার দিকে। সে কিছুই বলতে পারল না। তবে তার চোখের ভাষা পড়তে পারলে অপলা নিশ্চয়ই বুঝতে পারত তার মনের কথা। মুখের ভাষা মনের কথা বলে কিনা কে জানে, তবে সত্য-মিথ্যে যাই বলুক তা কানে শোনা যায়, তবে কতটা সত্য তা যাচাই করা মুশকিল। এই সমস্যার কারণেই মানুষের চোখের ভাষা বোঝা দরকার। চোখের ভাষা ভাল ভাবে রপ্ত করতে পারলে মনের কথা বোঝা যেতে পারে।
মানুষের জীবনে এমন কিছু সময় আসে যখন নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়—চাইলেও সঠিক কাজটি করা হয়ে উঠে না কখনোই। সময়ের সাথে মানুষ বদলায়। জীবনে কিছু কিছু প্রশ্ন থাকে যার উত্তর কখনও মেলে না, কিছু কিছু ভুল থাকে যা শোধরানো যায় না, আর কিছু কিছু কষ্ট থাকে যা কাউকে বলা যায় না।
হাসান বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ‘বাদ দাও, আমার কথা। তোমার কথা বলো।’
‘আমার কী কথা শুনতে চাও?’
‘এনি রিলেশনশিপ?’
‘আমিতো তোমাকে ছেড়ে কারো সঙ্গে রিলেশনশিপ করার জন্যে যাইনি, হাসান।’ এটুকু বলে অপলা অল্প সময় চুপ করে রইল। তারপর থেমে থেমে বলল, ‘কোনো ছেলের সঙ্গে যে একেবারেই মিশি নি তা কিন্তু নয়। কাজের সুবাদে অনেকের সাথেই পরিচয় হয়েছে—তবে কোনো সম্পর্ক গড়ে উঠেনি। শুধু জানার জন্যে মেশা। তবে যতটুকু জেনেছি এবং বুঝতে পেরেছি, তাতে বলাই যায়—আসলে সব ছেলেরাই একই রকম। দে জাস্ট ওয়ান্ট টু প্লে।’
‘জেনারাইলাইজড হয়ে গেল না? সব ছেলেরা কি একই রকম?’
‘বেশিরভাগ ছেলেরাই। তুমি অবশ্য ওদের কারো মতই নও। তুমি অনেক আলাদা।’
হাসান উৎসুক দৃষ্টিতে তাকাল অপলার দিকে।
অপলা হাসতে হাসতে বলল, ‘You’re too nice.’
‘You think so?’
‘I know so!’
মনে হচ্ছে শ্যাম্পেনের মাত্রা একটু বেশি হয়ে গেছে। যদিও দুজনেই কথা বলছে অসম্ভব মার্জিত ভাবে এবং এখন পর্যন্ত যত কথা হয়েছে কিছুতেই অন্যরকম কিছু মনে হয়নি। তবে দুজনের সান্নিধ্য দুজনেই উপভোগ করছে সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
হাসান হঠাৎ করেই বলল, ‘Do you still love me?’
অপলা তাকিয়ে রইল নেশার দৃষ্টিতে হাসানের দিকে। তার চাহনিই বলে দেয় হাসানের প্রতি তার অনুরাগের কথা।
অনেকক্ষণ থেকেই তারা দুজন দুজনের হাত ধরে কথা বলছিল। কথার ফাঁকে ফাঁকে হাতের ছোঁয়ায় একে অপরের উষ্ণতার আদান-প্রদান করছে। শ্যাম্পেনের প্রভাবেই হোক আর ভাললাগা থেকেই হোক, তারা দুজন অজান্তেই একে অপরের খুব কাছাকাছি চলে এলো। অপলার চোখ বন্ধ হয়ে এলো আবেশে। হাসান তার ঠোঁট নামিয়ে নিয়ে এলো অপলার ঠোঁটের খুব কাছে। অপলা চোখ বন্ধ করে আছে। অসম্ভব নীরবতায় থমকে গেল কিছু মুহূর্ত। হঠাৎ–
অপলার মোবাইল ফোনটি বেজে উঠল ঝনঝন করে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৪)

‘ম্যাম, ইয়োর লাগেজ?’
অপলা ক্যাবের কাছে ফিরে যেতেই ড্রাইভার অপলার লাগেজ বের করে সামনে এগিয়ে দিল।
‘ও মাই গড! আই’ম সো সরি। থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’ বলেই অপলা পার্স খুলে ক্যাবিকে কিছু এক্সট্রা টিপস দিয়ে দিল। ক্যাবি খুশি মনে চলে যেতেই সে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
হাসানের বাড়ির সামনে এসে অপলা এতটাই আবেগাপ্লুত হয়েছিল যে সে ভুলেই গিয়েছিল তার লাগেজের কথা। অপলা মনে মনে ক্যাব ড্রাইভারকে আবার একটা ধন্যবাদ দিল।
রুবেলকে বিদায় করে দিয়ে হাসান লিভিং রুমটা একটু পরিপাটি করে নিচ্ছিল—শেষ মুহূর্তের পরিচ্ছন্নতার ছোঁয়া যাকে বলে আর ঠিক সেই মুহূর্তে দরজায় নক হলো।
খুবই মৃদু শব্দে। হাসান একটু ভাবল—রুবেল কি এখনো যায় নি তাহলে? এবার ডোর বেল বাজল। সে বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘আশ্চর্য, ছেলেটা পারেও বিরক্ত করতে…’ বলে সে দরজা খুলতে গেল।
হাসান দেখল সত্যিই সত্যিই অপলা দাঁড়িয়ে আছে—দরজার সামনে। একটু থতমত খেয়ে সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইল অপলার মুখের দিকে। অপলার মুখে একটা স্মিত হাসি। হাসান চুপ করে আছে—অপলাও। কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। কিংবা বলতে পারল না।
কিছু সময় পার করে অপলা নীরবতা ভেঙ্গে বলল, ‘হাই, হাসান! ইটস বিন অ্যা হোয়াইল!’
হাসান সম্বিত ফিরে পেয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, অনেকদিনই তো। দু’বছরতো আর কম সময় নয়! দেখতে দেখতে বছর কেটে যায়।’
হাসানের দৃষ্টি সরাসরি নিবদ্ধ অপলার ওপর—সে কিছুক্ষণ অপলক তাকিয়ে থেকে বলল, ‘অপলা, ইউ লুক গ্রেট। অনেক সুন্দর হয়েছ তুমি—ভেরী প্রিটি!’
অপলা হেসে দিয়ে বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ। ইউ লুক ভিনটেজ—এন্ড গ্রেট টু!’
অপলার প্রশংসায় হাসানের হাসি প্রসারিত হলো। সে ধন্যবাদ দিয়ে বলল, ‘এসো, ভেতরে এসো।’
অপলা ভেতরে ঢুকে ব্যাগটা রেখে কয়েক পা এগিয়ে গেল সামনে। চারিদিকে একনজর চোখ বুলিয়ে ঘুরে দাঁড়াল হাসানের দিকে। হাসান হঠাৎ বুঝতে পারল তার হাতের ব্রাউন প্যাকেটের দিকে অপলা তাকিয়ে আছে। সে অপ্রস্তুত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে হাত পেছনে নিয়ে গেল।
অপলা বলল, ‘আর ইউ ওকে?’
‘ইয়েস, ইয়েস আই’ম ফাইন।’ হাসান বোকার মত হেসে বলল।
অপলা মিটি মিটি হাসি দিয়ে বলল, ‘তো এই তোমার সেই ড্রিম হাউজ! যার জন্যে তুমি…’
হাসানের মুখে অপরাধীর হাসি। সে বলল, ‘শুধু আমার একার নয়, তোমারও…’
‘হুম, ওকে। তাহলে চলো, আমাকে ঘুরিয়ে দেখাও।’ অপলা চোখ ঘুরিয়ে তাকাল হাসানের দিকে।
‘অবশ্যই দেখাব। তার আগে তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। তারপর না হয় দেখাব সব। তুমিতো নিশ্চয়ই এখনি চলে যাচ্ছ না। চলো আমি তোমাকে তোমার রুম দেখিয়ে দিচ্ছি।’
‘বেশ, চলো।’
হাসান অপলার ক্যারিং লাগেজটা সিঁড়ি বেঁয়ে ওপরে নিয়ে গেল। অপলা উঠে এলো পিছে পিছে। বেশ পরিপাটি করে সাজানো বড় একটা ঘরে অপলাকে নিয়ে এসে কোথায় কী আছে দেখিয়ে দিল হাসান। বিশাল একটা বাথরুম—বাথটাব, সাথে ওয়াকিং ক্লোজেট। ক্লোজেট ভর্তি অপলার রেখে যাওয়া কাপড়-চোপড়।
অপলা সারা ঘর একবার দেখে নিয়ে এসে দাঁড়াল হাসানের সামনে।
‘ইউ মাস্ট বি টায়ার্ড।’ অপলা সামনে এসে দাঁড়াতেই হাসান জিজ্ঞেস করল।
অপলা মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, ‘হুম, একটু!’
‘তাহলে রেস্ট নাও।’
‘রেস্ট নিতে হবে না—আমি একটু ফ্রেশ হয়েই আসছি।’
‘ঠিক আছে তুমি ফ্রেশ হয়ে নাও। আমি দেখছি, ডিনারের কী অবস্থা।’ বলেই হাসান দ্রুত বের হয়ে গেল।
প্রথমেই বাথটাবে পানি ছেড়ে দিল অপলা। তারপর গরম আর ঠাণ্ডা পানির তাপমাত্রা ঠিক করে কিছুটা লিকুইড সাবান ঢেলে দিল পানির মধ্যে। সাথে সাথে বাথটাব সাবানের ফেনায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। অপলা কাপড় ছেড়ে বাথটাবে গা এলিয়ে দিল। তার শরীর থেকে ভ্রমণের ক্লান্তি দূর হয়ে যেতে থাকল—আবেশে চোখ বন্ধ হয়ে এলো তার।
হাসান ডাইনিং রুমে এসে দেখল সবকিছু ঠিকঠাক আছে কিনা। সে ডাইনিং টেবিলের দু’পাশে দুজনের জন্যে প্লেট, ছুঁড়ি, কাঁটা চামচ, ন্যাপকিন সুন্দর করে সাজাল। একটা শ্যাম্পেনের বোতল ন্যাপকিন দিয়ে পেঁচিয়ে টেবিলের পাশে শ্যাম্পেন স্ট্যান্ডের উপর রাখল। ডাইনিং টেবিলের ঠিক মাঝ বরাবর ঝুলে থাকা ঝালর বাতিটি জ্বালিয়ে আলো কমিয়ে দিল। তারপর অনেকগুলো ক্যান্ডেল জ্বালিয়ে একবার তাকিয়ে দেখল—পরিবেশটা রোমান্টিক হলো কিনা। তার চোখে-মুখে একটা তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল। সে দ্রুত চলে গেল তার রুমে ডিনারের জন্যে ফরমাল ড্রেস পরার জন্যে।
বিছানার উপর কয়েকটি লং ড্রেস ছড়িয়ে অপলা তাকিয়ে আছে—সে ঠিক করতে পারছে না কোন ড্রেসটা পড়বে। যদিও তার পছন্দের পোশাক শাড়ি কিন্তু সে আজ হাসানের পছন্দের একটা আউটফিট পরবে বলে মনস্থির করল। কিছুক্ষণ ভেবে সে তার প্রিয় জর্জিও আরমানির নীল রঙের গাউনটিই তুলে নিয়ে গায়ে চড়াল। নিজেকে পরিপাটি করল সময় নিয়ে। সুন্দর করে সাজল। অনেকটা প্রথম ডেট নাইটের মতোই অনুভূতি হচ্ছে তার। স্লিভলেস লং ড্রেসের সঙ্গে একটি জিরকন ডায়মন্ডের নেকলস পড়ল। হাতে ব্রেসলেট। ড্রেসের সঙ্গে মিলিয়ে হাতের ব্যাগ। দেখে মনে হবে যেন কোনো বিশেষ পার্টিতে যাচ্ছে সে। বেডরুমের লম্বা আয়নায় একবার নিজেকে তাকিয়ে দেখল অপলা—ক্লাসিক ও সেক্সি লুকের মিশ্রণে তাকে দেখতে লাগছে গ্রীক দেবীদের মতো। আয়নায় কিছুটা সময় তাকিয়ে থেকে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে এলো সে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে এদিক ওদিক তাকাল। ঘাড় ঘুড়িয়ে দেখল হাসান দাঁড়িয়ে আছে ডাইনিং টেবিলের পাশে। অপলা জোরে বলল, ‘সো হোয়াটস ফর ডিনার?’
হাসান কয়েক পা এগিয়ে এসে দাঁড়াল। মাথা তুলে দেখল অপলাকে। তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল—বিস্ময়ে। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ সে। অপলাকে দেখতে লাগছে অস্কার অনুষ্ঠানে ঝাঁ চকচকে লাল গালিচার উপর দিয়ে হেঁটে আসা হলিউড সেলেব্রিটিদের মতো। তার রূপ যেন উপচে পড়ছে। হাসান একটা ছোট্ট নিঃশাস ফেলে অস্ফুটে বলল, ‘ওয়াও!’ তারপর এগিয়ে এসে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘লেট’স চেক ইট আউট।’
সৌন্দর্যের দ্যুতি ছড়িয়ে অপলা নেমে এলো নিচে। হাসান মুগ্ধ নয়নে বলল, ‘ইউ লুক বিউটিফুল। মনে হচ্ছে অস্কারে যাচ্ছ এওয়ার্ড নিতে।’
‘তাই?’ বলেই একটু হাসল অপলা। সেই হাসির আড়ালে সামান্য বিষাদ। তাতে কিছু স্মৃতি, কিছু বিস্মৃত সুখ, কিছু আড়াল করে রাখা কষ্ট। কিছু লুকিয়ে রাখা সময়। সব যেন ক্ষণিকের জন্যে ভেসে উঠল একসাথে।
হাসান হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সামান্য ইতস্তত করে হাসানের বাড়িয়ে দেয়া হাত ধরল অপলা।
হাসান তাকে এস্কর্ট করে নিয়ে এলো ডাইনিং টেবিলে।
অপলা দেখল সুন্দর করে সাজানো ডাইনিং টেবিল—দুজনের জন্যে। মনে হচ্ছে কোনো পাঁচ তারকা হোটেলের ফাইন ডাইনিং রেস্টুরেন্ট।
হাসান চেয়ার সরিয়ে অপলাকে বসতে সাহায্য করল। অপলা বসতেই সে প্রফেশনাল ওয়েটারদের মতো ন্যাপকিনটির ভাঁজ খুলে অপলার হাতে দিল। তারপর ফ্রেঞ্চ উচ্চারণে বলল, ‘Would that be “dinner for two” mam?’
অপলা মজা পেল। সে হেসে দিয়ে বলল, ‘Yes! Thank you.’
‘Okay then, may I offer you a glass of champagne?’ একই রকম ফ্রেঞ্চ উচ্চারণে বলল হাসান।
‘Yes you may.’ অপলা আবারো হাসল।
হাসান অনভ্যস্ত হাতে শ্যাম্পেন বোতলের কর্ক খুলতে চেষ্টা করল পেশাদার ওয়েটারদের মত একটা ভাব নিয়ে। কিন্তু অনভ্যস্ত হাতে কর্ক খোলা মাত্রই অতিরিক্ত বুদবুদ তৈরী হয়ে বোতল থেকে উপচে পড়ল শ্যাম্পেন। অপলা হেসে ফেলল।
হাসান অপ্রস্তুত ভাবে হাসল। সে খুব ধীরে একটা গ্লাসে কিছুটা শ্যাম্পেন ঢেলে এগিয়ে দিল অপলার হাতে। তারপর নিজের জন্যে একটা গ্লাসে ঢেলে নিয়ে বসল তার নির্দিষ্ট চেয়ারে। শ্যাম্পেন গ্লাস উঁচু করে ধরে হাসান বলল, ‘চিয়ার্স!’
অপলা তার গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে হাসানের গ্লাসে আলতো করে একটা ছোঁয়া দিয়ে বলল, ‘চিয়ার্স!’
একটা হালকা চুমুক দিয়ে শ্যাম্পেন গ্লাস নামিয়ে রাখল অপলা। তাকাল হাসানের দিকে।
হাসানকে কিছুটা নার্ভাস মনে হলো, কেন কে জানে। সে শব্দ করে কয়েক সিপ শ্যাম্পেন গলায় ঢেলে দিল।
অপলা মৃদু হেসে বলল, ‘Thirsty?’
হাসান খানিকটা অপ্রস্তুতভাবে বলল, ‘একটুতো বটেই।’
‘আমিও।’ হেসে বলল অপলা। এবং বড় করে এক সিপ শ্যাম্পেন মুখে নিল।
হাসান খানিকটা স্বাভাবিক হয়ে এলো। অপলা প্রচণ্ড ক্ষুধা পেয়েছে এমন একটা ভাব নিয়ে বলল, ‘কোথায় তোমার ডিনার? আনো দেখি, আর সহ্য হচ্ছে না। অনেক খিদে পেয়েছে।’
‘এখুনি আনছি।’ বলেই হাসান ঘুরে পাশের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘Waiter, we’d like to have our dinner now.’ ভাবটা এমন যে সেখানে একজন ওয়েটার দাঁড়িয়ে আছে।
হাসানের কাণ্ড দেখে হেসে ফেলল অপলা। সে হাসতে হাসতে বলল, ‘And tell him to get me a huge dish, completely full.’
‘Will do, mam.’ বলেই হাসান উঠে চলে গেল ভেতরে। কিচেন থেকে ডিশটা বের করতে যাবে ঠিক তখনই তার চোখ পড়ল, কিচেনের জানালার ওপাশে রুবেল দাঁড়িয়ে উঁকি ঝুঁকি দিচ্ছে। হাসানের সাথে চোখাচোখি হতেই সবগুলো দাঁত বের করে দিল সে। রুবেলের দিকে চোখ বড় করে তাকিয়ে হাসান অন্যমনস্কভাবে গরম ওভেনে হাত ঢুকিয়ে দিল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব