Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-৩)

হাসান দেখল বত্রিশ পাটি দন্ত বিকশিত করে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে—রুবেল।
হাসানের সমস্ত উচ্ছ্বাস উবে গেল নিমিষেই—চূড়ান্ত রকমের মেজাজ খারাপ হলো তার। নিজেকে কোনো রকমে সামলে নিল সে। মুখ কালো করে বলল, ‘ও তুমি। আমিতো ভাবলাম… আচ্ছা, তোমাকে না বললাম আসার দরকার নেই। অপলা যে কোন মুহূর্তে চলে আসবে। তুমি এখন যাও।’
রুবেল বলল, ‘হাসান ভাই, আমি এইখানে আসার একটু আগেই তো দেখলাম কে যেন আপনার বাসার সামনে থেকে চইলা গেল। মনে হয় অনেকক্ষণ দাড়ায় ছিল।’
রুবেলের কথা হাসান ঠিক বুঝতে পারল না। সে প্রশ্নবোধক চিহ্ন নিয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
রুবেল আবার বলল, ‘আপনে তো মিয়া সারাদিন লাগায়ে দিলেন। দরজা খুলতে এতক্ষণ লাগে? ছিলেন কোথায়?’
হাসান কিছু বলার আগেই রুবেল আবার বলল, ‘তারপর কি আয়োজন করতেছেন? এতদিন পর আপনার… হে হে হে’ বলতে বলতে হাসানকে পাশ কাঁটিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ল সে।
হাসান ঘুরে বলল, ‘তুমি কি সত্যি সত্যি কাউকে চলে যেতে দেখেছ?’
‘রিল্যাক্স ম্যান, আই ওয়াজ জাস্ট প্লেয়িং উইথ ইউ!’
‘ধুর মিয়া, দিয়েছিলে তো হার্টের মধ্যে একটা পেরেক ঢুকিয়ে। সব সময় ফাজলামো করা ঠিক না।’ কপালের ঘাম মুছে হাসান বলল, ‘তো কোন মতলবে এখানে হাজির হয়েছ বলো, বিসাইডস টরচারিং মি?’
‘হাসান ভাই, আপনারতো ব্যবসা আর টাকা বানানোর চিন্তা ছাড়া আর কোন ধান্দা নাই—সময়ও নাই। তাই ভাবলাম, আপনার জন্যে কয়েকটা জিনিস নিয়া আসি।’ রুবেল দুষ্টুমির হাসি দিয়ে পকেট থেকে একটা ব্রাউন প্যাকেট বের হাসানের দিকে এগিয়ে দিল।
‘কী জিনিস?’ রুবেলের হাতের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল হাসান।
‘আরে বুঝলেন না? আরে ঐ জিনিস! ইউ নো হোয়াট আই মিন…’
‘নো আই ডোন্ট নো হোয়াট ইউ মিন… তাছাড়া আমার কিছুই লাগবে না। তুমি এখন যাওতো ভাই। পরে এসো।’
‘হাসান ভাই, আপনি বয়সে আমার বড় হইলে কী হবে—এই ব্যাপারে আপনার চেয়ে আমার অভিজ্ঞতা একটু বেশীই আছে। রাইখা দেন কাজে লাগবে। গরীবের একটা কথা, বাসী বানায়ে লাভ কী?’
‘শোন রুবেল, তুমি বেশী কথা বলো। বেশী কথা বলা মানুষ আমার মাঝে মাঝে পছন্দ—তবে সব সময় না। যন্ত্রণা করবে না। এখন যাও, পরে এসো।’
রুবেল নাছোড়বান্দা। সে আবারো প্যাকেটটা এগিয়ে দিয়ে বলল, ‘বিপদের সঙ্গী। সব সময় দু’একটা হাতের কাছে রাখতে হয়। কখন কাজে লাগে বলা যায় না।’ বলেই সে প্যাকেট খুলে বের করতে উদ্যত হতেই হাসান থামিয়ে দিল।
‘থাক খুলতে হবে না। এমনিই দাও, দিয়ে বিদেয় হও। তুমিতো দেখছি নাছোড়বান্দা।’ হাসান প্যাকেটটা রুবেলের হাত থেকে নিয়ে প্রায় জোর করেই ওকে বিদায় জানাল।
রুবেল দরজা পর্যন্ত যেয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু একটা মনে পড়ে যাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘হাসান ভাই…’
হাসান বিরক্ত হয়ে বলল, ‘আবার কী? রুবেল, দয়া করে তুমি এখন যাও। অপলা যে কোনো মুহূর্তে চলে আসবে। প্লিজ তুমি যাও—আমি পরে সব তোমাকে বলব। ওকে?’
‘যা যা ঘটবে সব?’
হাসান চোখ বড় করে বলল, ‘হ্যাঁ হ্যাঁ যা যা ঘটবে সব।’
‘ঠিক আছে যাইতেছি। বাট আই উইল বি ব্যাক সুন।’ বলেই দরজা খুলে বের হয়ে গেল সে।
হাসান যেন হাফ ছেড়ে বাঁচল। সে দরজাটা আটকাতে যাবে, রুবেল দরজা ধরে বলল, ‘আপনি এতো নার্ভাস হয়ে আছেন কেন?’
‘উফ!’ বলেই রুবেলের মুখের উপর সজোরে দরজা বন্ধ করে দিল হাসান।
শিকাগোর হাইওয়ে ধরে অপলার ক্যাব ছুটে চলেছে। উদাস দৃষ্টিতে সে তাকিয়ে আছে বাইরে—স্মৃতির সব কটি জানালা খুলে। এতদিন পর আবার মনে পড়ে যাচ্ছে পেছনের কথাগুলো একটি একটি করে—বিক্ষিপ্ত ভাবে। চোখ বন্ধ করে অনুভব করল নিজের মনের কত অব্যক্ত অনুভূতির কথা। জীবনের ক্যানভাসে এমন কিছু স্মৃতির ছবি আঁকা হয়ে যায়, যা ভোলা যায় না কখনোই।

হাসানের ফিরতে বেশ দেরি হলো।
সে ঘরে ঢুকে দেখল অপলা উল্টো দিকে ফিরে শুয়ে আছে। হাসান আলতো করে অপলার পিঠে হাত রেখে বলল, ‘ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি?’
অপলা কিছুই বলল না। নিঃশব্দে পড়ে আছে সে। ঘুমিয়ে পড়েছে কিনা তাও বোঝা যাচ্ছে না।
হাসান ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল, ‘সরি, আজো একটু দেরী হয়ে গেল।’
অপলা এবারো কিছু বলল না।
‘আই’ম রিয়েলি সরি।’
অপলা যেভাবে ছিল সেভাবেই পড়ে রইল। তারপর ঠাণ্ডা কিন্তু কঠিন স্বরে বলল, ‘আমার টিকিটের ব্যবস্থা করো। আমি বাংলাদেশে যাব।’
‘আর মাত্র কয়েকটা মাস। বিজনেসটা একটু গুছিয়ে নেই, তারপর দেখো আর দেরী হবে না।’
‘সে কথা গত তিন বছর ধরেই শুনছি।’ একটু থেমে অপলা অভিমানী কণ্ঠে বলল, ‘তুমি কি একবারও আমার কথা ভাবো?’ তার গলা ধরে এলো। সে ধীরে ধীরে বলল, ‘বিয়ের পরে তুমি আমাকে কতটুকু সময় দিয়েছ বলো? দেশে গিয়ে বিয়ে করে রেখে এলে। কি অসহ্য যন্ত্রণার মধ্যে এক একটি দিন আমাকে কাটাতে হয়েছে!’
‘এখনতো তুমি চলেই এসেছ।’
অপলা উঠে বসল। ঘুরে মুখোমুখি হলো হাসানের। গলার স্বর উঁচু না করেই বলল, ‘হ্যাঁ, চলে এসেছি, কিন্তু কার কাছে? যার জন্যে এতো অপেক্ষা, তার কাছে এসেও যদি তাকে না পাই, তাহলে এ আসার কী মানে?’
হাসান চুপ করে রইল।
‘আমাকে যদি সময় নাই দেবে তাহলে বিয়ে করে এনেছিলে কেন? শুধু রান্না, ঘর গোছানো, লণ্ড্রী করা আর মাঝে মাঝে তোমার শরীরের ক্ষুধা মেটানোর জন্যে? আমিতো একটা মানুষ, হাসান। এই ঘরটার মধ্যে একা একা আমার দম বন্ধ হয়ে আসে।’
হাসান কী বলবে ভেবে পেল না।
কথা বলতে বলতে অপলা চলে গেল ওদের ছোট্ট কিচেন কাম ডানিং রুমটাতে। ফ্রিজ থেকে খাবার বের করে মাইক্রোওয়েভে গরম করতে করতে সে গজগজ করছে। হাসান তার পেছনে এসে বসল ডাইনিং টেবিলে। অপলা প্লেটে ভাত তুলে এগিয়ে দিল হাসানের দিকে।
হাসান লক্ষ্য করল, এত রাগ ক্ষোভ আর অভিমান নিয়েও অপলা তার জন্য খাবার গরম করে দিচ্ছে ঠিকই—প্লেটেও তুলে দিচ্ছে।
‘জেলখানায় মানুষও এর চেয়ে বেশী ভাল থাকে। অন্তত কথা বলার সঙ্গী পায়। এখানে আমার কে আছে যার সঙ্গে কথা বলে দু’দণ্ড সময় কাটাব?’ অভিমানী কণ্ঠে অপলা বলল।
‘আহা তোমাকে না বললাম, এখানে কত বাঙালি ভাবী আছে—তাদের কারো সঙ্গে পরিচয় করো। বন্ধু বানাও। কথা বলো। সময় কেটে যাবে।’
‘পরিচয়টা হবে কীভাবে? ঘরে বসে থেকে? বাঙালিদের কোন অনুষ্ঠানে তুমি আমাকে নিয়ে যাও, না সে সময় তোমার আছে? তাছাড়া কোন বাঙালি ভাবীর সঙ্গে পরিচয় হয়ে অন্য আরেক ভাবীর সমালোচনা করার কোনো ইচ্ছে আমার নেই। আমার চাই তোমার সময়, অন্য কারো নয়।’
‘তাহলে টিভি দেখো। তোমার জন্যেই তো সব হিন্দি আর বাংলা চ্যানেলগুলো নিলাম।’
অপলা আহত চোখে তাকাল হাসানের দিকে। এসব বিনোদনে সাময়িক সময় কাটে—কিন্তু আসল সমস্যার সমাধান নয়। হাসান এই কথাটা কেন বুঝতে পারছে না।
হাসান এবার বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল, ‘আচ্ছা, তুমি কি চাওনা আমাদের একটা সুন্দর বাড়ি হোক, ভাল গাড়ি থাক। দেখো, তাকিয়ে দেখো আমরা কোথায় থাকি। দু’কামরার ছোট্ট একটা এপার্টমেন্ট। যেখানে একটা গেস্ট আসলে থাকতে দেবার জন্যে আলাদা একটা রুম নেই। এক চিলতে রুমের মধ্যে ঠাসাঠাসি করে সব কিছু ভরা। ডাইনিং টেবিলটা বসাতে হয় কিচেনের মধ্যে। তোমার ইচ্ছে হয় না, আমাদের একটা স্বপ্নের বাড়ি হোক। এগুলো আমি কার জন্যে করছি, অপলা? তোমার জন্যে, আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্যে। সুন্দর একটা ভবিষ্যতের জন্যে।’
‘এখানে আসার পর থেকেই তোমার কাছে একটা বাচ্চা চেয়েছি। সেখানেও তোমার আপত্তি। ঝামেলা বাড়িয়ে লাভ কি, বলে এড়িয়ে গেছো। আর ভবিষ্যতের কথা বলছ? হাহ, আমার তো বর্তমানই নেই, আর ভবিষ্যৎ!’
হাসান মুখ নিচু করে ফেলল। সে কোনো উত্তর দিতে পারল না।
‘তুমি শুধু তোমার স্বপ্নের কথাই ভাবছো, হাসান। অন্য কারো নয়। একদিন তোমার অনেক টাকা হবে। স্বপ্নের বাড়ি হবে, গাড়ি হবে ঠিকই—কিন্তু যার বা যাদের কথা ভেবে এগুলো করছ, তারা হয়ত কেউ থাকবে না তোমার পাশে। একদিন কাজ থেকে ফিরে এসে দেখবে আমি নেই।’
হাসান মুখে হাত দিয়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে শুনছে অপলার কথা।
‘আই ডোন্ট ওয়ান্ট মানি, হাসান। আই ডোন্ট নিড মানি। আই নিড এ লাইফ!’
হাসান বুঝতে পারছে না কী বলবে। অপলাকে কখনোই এতটা উতলা হতে দেখেনি সে এর আগে। হাসানের হঠাৎ একটু একটু খারাপ লাগতে লাগল। আহারে, বিকেল থেকে মেয়েটা সেজে গুজে বসে ছিল—বিয়ে বার্ষিকীর দিনটিতে ওকে তার প্রিয় রেস্টুরেন্টে নিয়ে যাবার কথা ছিল। সেটা বড় কথা নয়—অপেক্ষায় থেকে মেয়েটা অভিমানের পাহাড় জমিয়ে ফেলেছে। রাতে বাইরে খাবে বলে সে হয়ত কিছু রান্নাও করেনি। তাই পুরনো যা ছিল তাই গরম করে সামনে দিয়েছে।
অপলা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল বেডরুমে। এবং কাপড় বদলে শুয়ে পড়ল। তার এখন আর কান্না পাচ্ছে না। সন্ধ্যা পেরিয়ে যাবার পর যখন সে বুঝতে পেরেছে—হাসানের আসতে আজকেও দেরি হবে, তখন থেকেই ক্ষণে ক্ষণে সে কেঁদেছে অনেক।

পেছনের কথাগুলো ভেবে চোখ ভিজে এলো অপলার। সে চোখ মুছে তাকাল বাইরে আর ঠিক তখনই তার ক্যাব হাইওয়ে থেকে বের হয়ে ছবির মত দেখতে একটি আবাসিক এলাকায় ঢুকল। এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই ক্যাব ড্রাইভার ঠিকানা মিলিয়ে হাসানের প্রাসদোপম বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। অপলা ফিরে এলো বাস্তবে।
ক্যাব থেকে নেমে অপলা তাকাল বাড়িটার দিকে। তার বিস্ময়ের সীমা রইল না। সে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর ধীর পায়ে এগিয়ে গেল। দাঁড়াল সদর দরজার সামনে।
হঠাৎ অপলার কী হলো কে জানে। ডোর বেলে চাপ দিতে গিয়েও থেমে গেল সে। একবার রাস্তার দিকে ঘুরে তাকিয়ে দেখল ক্যাব ড্রাইভার তাকিয়ে আছে তার দিকে । কিছুক্ষণ ইতস্তত করে সে ফিরে গেল ক্যাবের কাছে।

পরের পর্ব

আগের পর্ব

Dnner-for-two

ডিনার ফর টু (পর্ব-২)

হাসানের এখনো মনে আছে—যেদিন অপলা শিকাগো শহরের একটা ঘিঞ্জি এলাকার তাদের দু’বেড রুমের ছোট্ট এপার্টমেন্টটি ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাকে ফেলে।
প্রতিদিনের মত সেদিনও কাজ থেকে একটু দেরি করেই বাসায় ফিরল হাসান। দরজা খুলে ঘরে ঢুকে সে ডাকল, ‘অপলা।’
কিন্তু কোনো সাড়া দিল না অপলা। সে বেডরুমে যেয়ে দেখল অপলা নেই।
হাসান আবার ডাকল। এবারো নীরব। এবার সে সব রুম গুলো দেখল—নেই। বাথরুম, কিচেন, পেছনের বারান্দা—কোথাও নেই অপলা।
হাসানের দেরি হলে অনেক সময় টিভি দেখতে দেখতে সোফাতেই ঘুমিয়ে পড়ে অপলা। হাসান লিভিং রুমে এসে দেখল—এখানেও নেই। গেল কোথায় এত রাতে? সে চিন্তিত মনে সোফায় বসে পড়ল।
অভ্যাসবশত টেলিভিশনের রিমোট নিয়ে চালু করতে যেয়েই সে লক্ষ্য করল টেলিভিশনের পর্দার উপরে একটা ভাঁজ করা সাদা কাগজ টেপ দিয়ে লাগানো। হাসান উঠে গিয়ে কাগজটি নিয়ে এসে আবার বসল সোফায়। ভাঁজ খুলে সে দেখল একটা চিঠি। অপলার হাতের লেখা। গোটা গোটা অক্ষরে অপলা লিখেছে–
‘হাসান,
নিজের সঙ্গে অনেক যুদ্ধ করে শেষ পর্যন্ত আমি চলে যাচ্ছি।
প্রতিদিন একদিন একদিন করে তোমার সাথে আমার দূরত্ব বেড়েই চলেছে। আমি আর পারছিলাম না—এভাবে আর কিছুদিন চলতে থাকলে আমার মেন্টাল ব্রেকডাউন হতো। তাতে তোমার ঝামেলা আরো বাড়ত বই কমত না। না পারতে ফেলতে—না পারতে রাখতে।’
হাসান চিঠি পড়া বন্ধ করে কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর আবার পড়া শুরু করল—
‘হাসান, একজন পুরুষ মানুষের জীবনে টাকা এবং নারী দুটোরই প্রয়োজন আছে—অন্তত তাই বলেই জানতাম। কিন্তু তুমি তার ব্যতিক্রম। তোমার দরকার শুধু টাকা। আমাকে তো তোমার প্রয়োজন নেই। আমাকে তুমি হয়ত মিস করবে না—মিস করার মতো কোনো ঘটনাই তো ঘটেনি। আমাদের সাড়ে-পাঁচ বছরের বিবাহিত জীবনে পাঁচটা দিনও তুমি আমাকে সম্পূর্ণ ভাবে দাওনি। আমারা দু’জন দু’জনকে কতটুকুই বা চিনতে পেরেছি।’
এ পর্যায়ে হাসান আবার থামল। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বাকী লেখাটুকু পড়ে শেষ করল।
‘তোমার কাছে তো আমি বেশি কিছু চাইনি হাসান। একটু সময়—আর একটা বাচ্চা। তার কোনোটিই যখন দিতে পারবে না তবে কেন আর থাকা বলো? কিসের প্রয়োজনে? আমার কিছু একটা তো চাই। যেদিন জানব তোমার জীবনে আমার প্রয়োজন আছে—আমি ফিরে আসব। তবে আমার জন্যে তোমার অপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই। ভাল থেকো। নিজের যত্ন নিও।
ইতি—তোমার অপলা।’

রান্না ঘরে চারিদিকে দুনিয়ার জিনিসপত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
ওয়ালমার্টে গিয়ে সামনে যা পেয়েছে তাই শপিং কার্টে তুলেছে হাসান। এখন সব কিছু ছড়িয়ে বসে আছে।
কিচেন কাউন্টারে ছড়ানো জিনিষগুলোর দিকে বোকার মত তাকিয়ে আছে সে। বুঝতে পারছে না কী দিয়ে কী করবে? তার কপালে কিঞ্চিত ঘাম দেখা দিল। সে মনে মনে ভাবল—রান্নার আইডিয়াটা বাদ দিলে কেমন হয়। তারচেয়ে বরং কোনো একটা ফাইন ডাইনিং রেস্টুরেন্টে দুজনের জন্যে রিজার্ভেশন দিয়ে দেয়াটাই উত্তম। অপলার একটা পছন্দের রেস্টুরেন্ট আছে—ওদেরকে কল করে রিজার্ভেশনটা দিয়ে দিলেই হবে।
‘উম… নাহ, অপলার একটা পছন্দের আইটেম, এটা আমাকে করতেই হবে। ওকে বরং সারপ্রাইজ দেয়া যাবে।’ হাসান মনে মনে বলল।
এতদিন পর অপলা আসছে। তাকে ইমপ্রেস করতেই হবে আর সেটা তার নিজের হাতে তৈরী অপলার ফেভারিট ডিস। কিন্তু রেসিপিটা কিছুতেই মনে করতে পারছে না সে। অতঃপর রেসিপি বইটা খুলে কয়েকবার পড়ে পূর্ণ উদ্যমে নেমে পড়ল কাজে। রান্না করার এপ্রোনটা গায়ে জড়িয়ে একটার পর একটা আইটেম এলুমিনিয়ামের ট্রে-তে সাজিয়ে ফেলল। প্রয়োজনীয় মশলা, সস আর চিজ ছড়িয়ে দিয়ে ফয়েল পেপার দিয়ে ঢেকে ওভেনে ঢুকিয়ে টাইমার সেট করে দিল। তারপর ফুড নেটওয়ার্ক চ্যানেলের সেফদের মত কপালের ঘাম মুছে একটা তৃপ্তির হাসি দিয়ে বলল, ‘যাক বাবা, শেষ পর্যন্ত ঠিকঠাক মতো সব কিছু দেয়া হয়েছে। এবার জিনিসটা ঠিক মতো হলেই হয়।’
হাসান খুশিমনে রান্না ঘর থেকে বের হয়ে দ্রুত গোসলটা সেরে নিল।
হাসান ঘড়ি দেখল। প্রায় পঁচিশ মিনিট হয়ে গেছে। সে কিচেনে ঢুকে ওভেন খুলে দেখল সবকিছু ঠিক আছে কিনা। ‘মনে তো হচ্ছে সব কিছু ঠিক মতোই হয়েছে। দেখা যাক শেষ পর্যন্ত কী হয়–আল্লাহ্‌ ভরসা।’ বলেই সে আবারো টাইমার সেট করে দিয়ে লিভিং রুমে এসে বসল। এখন শুধু অপেক্ষা।

দুপুর পেরিয়ে বিকেল ছুঁই ছুঁই করছে।
অপলার প্লেন ল্যান্ড করল শিকাগো ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টে। একটা ছোট্ট ক্যারিং লাগেজ আর হ্যান্ডব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে এয়ারপোর্ট থেকে বের হয়ে এলো অপলা। বাদামি রঙের স্কার্টের সাথে কালো রঙের টপস পরিহিতা অপলাকে লাগছে অপ্সরীর মত। চোখে তার প্রিয় প্রাডা ব্র্যান্ডের সানগ্লাস। ঘাড়ের দুপাশে বাঁকা হয়ে চুল ছড়িয়ে আছে। অন্যরকম একটা ব্যক্তিত্বের দ্যুতি ছড়িয়ে আছে তার চোখে-মুখে।
এদিক ওদিক তাকিয়ে সে হেঁটে গিয়ে দাঁড়াল আউট-বাউন্ড প্যাসেঞ্জার তুলে নেবার নির্দিষ্ট জায়গাটিতে। এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই একটা ইয়েলো ক্যাব এসে থামল তার পাশে।
ক্যাব ড্রাইভার অপলার লাগেজটি ট্রাঙ্কে তুলে দিতেই সে উঠে বসল পেছনের সীটে। তারপর ঠিকানাটা দিয়ে দিল ড্রাইভারকে। গন্তব্য হাসানের বাড়ি।
এয়ারপোর্ট থেকে হাসানের বাসা একঘণ্টার ড্রাইভ। অপলা পেছনের জানালাটা খুলে দিয়ে তাকিয়ে রইল বাইরে। বাতাসে চুল উড়ে এসে পড়ছে তার মুখের উপর। চুল সরিয়ে দিয়ে সে আবার তাকাল বাইরে। শিকাগো ডাউন-টাউন পার হয়ে যখন লেক মিশিগানের তীর ঘেঁষে এগিয়ে যাচ্ছিল ক্যাবটি—লেকের দিকে তাকিয়ে অপলা কেমন অন্যমনস্ক হয়ে গেল। তার তখন মনে পড়ে গেল কিছু পেছনের কথা—কিছু স্মৃতি।

অপলা সুন্দর করে সেজেছে।
চুমকি দেয়া গোলাপি রঙের একটা ডিজাইনার শাড়ি। সুন্দর করে পরিপাটি চুল বাঁধা। কপালে টিপ—হাতে বালা। সে অনেকক্ষণ থেকে সামনের জানালা খুলে তাকিয়ে আছে বাইরে। ঘাড় ঘুরিয়ে একবার দেয়াল ঘড়ি দেখল—বিকেল পাঁচটা বেজে পঁচিশ মিনিট। সে আবারো তাকাল বাইরে।
ঘড়ির টিক্‌ টক্‌ শব্দ! এক একটা সেকেন্ড চলে যাচ্ছে। চারিদিকে সুনসান নীরবতা। অপলা জানালার ধার থেকে ভেতরে এসে দেখল ঘড়িতে ৬টা বাজে। সে অসহিষ্ণু হয়ে ফোন করল—কিন্তু ওপাশ থেকে কেউ ফোন ধরল না। সে কিছুক্ষণ টিভি ছেড়ে দিয়ে রিমোট নিয়ে চ্যানেল বদলাতে থাকল। তার অস্থির লাগছে। ঘড়ির কাঁটায় সাতটা বাজতেই সে আবার ফোন করল।
ওপাশ থেকে এবার ফোন ধরতেই অপলা চাপা ক্ষোভের সঙ্গে বলল, ‘তোমার কি আজকেও দেরী হবে? বছরের এই একটা বিশেষ দিনেও কী তুমি একটু আগে আসতে পারতে না? একটা দিন কী আলাদা হতে পারে না, হাসান?’
হাসান বলল, ‘অপলা, একটা ভীষণ জরুরী কাজে আটকা পড়ে গেছি। তুমি রেডি হয়ে থাকো। আমি আসছি।
‘রেডি তো আমি সেই বিকেল থেকে হয়ে বসে আছি। তোমাকে কতবার বললাম, আজকের দিনটাতে অন্তত একটু তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করো।’
হাসান কোনো উত্তর দিল না।
‘আচ্ছা, ঠিক আছে, তুমি তোমার কাজ করো। কাজ শেষ হলেই ফিরো।’ বলেই অপলা ফোন কেটে দিল।
ফোন কেটে দিয়ে চুপ করে বসে রইল অপলা। মুহূর্তেই তার দু’চোখ ভিজে গেল। কিছুক্ষণ পর সে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে দাঁড়াল—নিজেকে একবার দেখল আয়নায়। এতো সুন্দর করে সে সেজেছিল। আজকে ওদের বিয়ে বার্ষিকী। কিছু কিছু দিন মনের খাতায় লেখা হয়ে যায় আজীবনের জন্য। ঠিক তেমন একটা দিন—বিয়ের দিনটা। বিবাহিত দম্পতিদের ক্যালেন্ডারের পাতায় জ্বলজ্বল করে এই দিন।
হাসান যখন কাজে যায় তখন একবার মনে করিয়ে দিল অপলা। ‘মনে আছে তো না? আজকে কিন্তু একদম দেরি করা চলবে না।’
‘খুব মনে আছে। আমি যথা সময়েই চলে আসব—ডু নট ওরি।’
ডু নট ওরি বলেও সে ঠিকই ভুলে গেছে আজকের এই বিশেষ দিনটির কথা। হাসান বলেছিল কাজ থেকে ফিরেই তারা দু’জন ডিনার করতে যাবে। শিকাগোর বিখ্যাত জন হ্যানকক টাওয়ারের ৯৫ তলায় হাসানের প্রিয় রেস্টুরেন্ট ‘সিগনেচার রুম’-এ রিজার্ভেশন দিয়ে রেখেছে সে। দুপুরে একবার ফোন করে হাসানকে মনে করিয়ে দিল অপলা। হাসান তখনো বলল যে সে আজকে তাড়াতাড়িই ফিরবে—অথচ তার ফেরার কোন নাম নেই।
অভিমানে জমে থাকা পানি টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে অপলার চোখ থেকে। সে একে একে খুলে ফেলল তার সব প্রসাধনী। কপালের টিপ খুলে লাগিয়ে রাখল আয়নার কাঁচে। গলার হার, হাতের চুড়ি খুলে রেখে দিল ড্রেসিং টেবিলের কাউন্টারে। তারপর চুল ছেড়ে দিয়ে মন খারাপ করে শুয়ে রইল বিছানায়।

হাসান রান্নাঘরের চারিদিকে ছড়িয়ে থাকা ময়লাগুলো পরিষ্কার করা শুরু করল।
একটা আইটেম রান্না করতে গিয়ে সে ভাল পরিমাণ ময়লা ছড়িয়েছে। অপলা যে কোনো সময় চলে আসতে পারে। সে দ্রুত সবকিছু গুছিয়ে রাখার চেষ্টা করছে আর ঠিক তখনই ডোর বেল বেজে উঠল।
হাসান একবার বাইরের দিকে তাকাল এবং অবাক হয়ে নিজের মনে প্রশ্ন করল, ‘এখন আবার কে এলো? অপলা? কিন্তু ওতো বলল বিকেলের ফ্লাইটে আসবে। এখন ক’টা বাজে?’
হাসান দ্রুত নিজেকে একটু পরিপাটি করে নিয়ে ছুটল দরজা খুলে দেবার জন্যে। সে উচ্চ কণ্ঠে বলল, ‘হোল্ড অন, আই উইল বি দেয়ার ইন অ্যা সেকেন্ড!’
হাসান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চুলগুলি ঠিক করে নিল। এটা অবশ্য তার একটা অভ্যাস—মাঝে মাঝেই চুলে হাত দিয়ে দেখে নেয় পরিপাটি আছে কিনা। দরজা খোলার মুহূর্তে সে একবার অনেকটা নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল, ‘আমি জানতাম তুমি একদিন ঠিকই ফিরে আসবে। ওয়েলকাম—ওয়েলকাম ব্যাক!’
দরজা খুলে চোখ বড় হয়ে গেল হাসানের—সে অবিশ্বাস্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

পরের পর্ব

আগের পর্ব