অফিস থেকে ফিরে রাতে মেইল চেক করল ফাহিম। সিমির কোনো মেইল নেই। কী মনে করে সে ইয়াহু চ্যাট রুমে লগইন করল এবং দেখল, বেশ কয়েকটা এসএমএস লিখে রেখেছে সিমি। ফাহিম খুব মনোযোগ দিয়ে পড়ল।
আমি তোমার মেইল পেয়েছি কিন্তু রিপ্লাই দিতে পারি নি—আমি খুবই দুঃখিত ফাহিম। আসলে কিছু লিখতে ইচ্ছে করছিল না। তোমার মেইল পড়ার পরে আমি অনেক ভেবেছি। সাথে সাথেই ভাবছিলাম কিছু লিখব কিন্তু কেন যেন আর ইচ্ছে করল না উত্তর লিখতে। জানি না আমার কী হয়েছে। মনে হচ্ছে আমি একটা গভীর জঙ্গলে হারিয়ে গেছি। বের হওয়ার কোনো রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না কিছুতেই। আমি যেন আর নিজের মধ্যে নেই। না, এসবের কোনো কিছুর সাথেই তুমি নেই। ইটস জাস্ট ওয়ান অফ দোজ ডে’জ। তেমনই একটা দিন।
তুমি কিন্তু আবার ভেবো না তোমার মেইল পেয়ে আমি আপসেট হয়েছি। আর আপসেট হবোই বা কেন? তুমি বিবাহিত, পৃথিবীর অন্যতম সুন্দরী একজন রূপসী তোমার বউ—একথা তো আমি জানিই। আমি বরং খুশি হয়েছি—দেরিতে হলেও তার কথা লিখেছ নিজ থেকে। তুমি স্বস্তিবোধ করছ—আমিও।
তবে এই মুহূর্তে আমার কারো সাথেই কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। প্লিজ কিছু মনে করো না।
আমাকে ২/৩ দিন সময় দাও। অ্যান্ড ফর গডস সেক—আমাকে নিয়ে ভেবো না। বিভ্রান্ত হয়ো না। আমি ঠিক আছি। তুমি যেখানে আছো, সেখানেই থাকবে, আমার প্রাণের বন্ধু, সত্যিকার অর্থেই অসম্ভব একজন ভালো বন্ধু হয়ে।
আমার একটু সময় চাই—কিছু নির্মম সত্যকে ধারণ করবার জন্য। এ সময়টুকু আমার দরকার। প্লিজ।
আর আমাকে ছেড়ে যেও না কোথাও। তোমার রহস্যময়ী সিমি যে কোনো মুহূর্তে রহস্যের বেড়াজাল ছিঁড়ে বেরিয়ে আসবে। কাজেই, থেকো আশে পাশেই।
আল্লাহ হাফেজ।
…
সিমির মেসেজগুলো পড়ে ভীষণ দ্বিধায় পড়ে গেল ফাহিম। হঠাৎ কী এমন হলো যে তার কোনো কিছুই লিখতে ইচ্ছে করল না। ২/৩ দিন সময় চেয়েছে সিমি। তার মানে এ’কদিন সে যোগাযোগ করবে না। ফাহিমের কোনো কথায় কি সে কষ্ট পেয়েছে? কী জানি হতেও পারে। ফাহিম অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিল।
আচ্ছা এমন কি হতে পারে যে ফাহিম তাঁর স্ত্রী সম্পর্কে যা কিছু লিখেছে তা শোনার জন্য হয়ত প্রস্তুত ছিল না সে। কিন্তু তাইই বা হবে কেন? অবশ্য অনেক সময় সত্যি জেনেও আমরা বাস্তবতাটা ঠিক মেনে নিতে পারি না—মেনে নিতে কষ্ট হয়। মানুষের মন বিচিত্র জিনিস। সমস্ত নক্ষত্র পূঞ্জে যে জটিলতা ও রহস্য আছে, তার থেকেও রহস্যময় মানুষের মন। সিমির মনের মধ্যে কী কাজ করছে একমাত্র সেই জানে।
আরো একদিন পরে হঠাৎ করেই ফাহিম আবিষ্কার করল সিমিকে—চ্যাট রুমে। অনেকক্ষণ চুপ থেকে সে দেখতে চাইল, সিমি ওকে হাই হ্যালো কিছু বলে কিনা। কিন্তু না সে কিছুই বলল না। ফাহিম আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে কিছু না বলে চ্যাট রুম থেকে চলে গেল, কিছুটা হতাশ হয়ে।
মাঝে দুদিন কেটে গেল। ফাহিমের কী যেন নেই, কী যেন নেই টাইপের অনুভূতি হতে লাগল। সেদিন সকালে অফিসে এসেই সে ছোট্ট একটা মেইল লিখল সিমিকে।
এই যে রহস্যময়ী মেয়ে,
আপনার কোনো খোঁজ নেই কেন? ভালো আছেন তো?
কেউ কি জানে, কারো একটা মেইলের জন্য কেউ একজন কত অপেক্ষায় থাকে?
কারো সময় হলে যেন ইমেইল করে।
কেউ যেন ভালো থাকে। খুব ভালো।
কারো মেইলের অপেক্ষায় কেউ।
মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে ফাহিম সকালের টিম মিটিং এ চলে গেল। মিটিং এ কিছুতেই মন বসল না তার। সিমির কথা আজ খুব মনে পড়ছে। কিন্তু এমন চুপ করে গেল কেন মেয়েটা? ফাহিমের একটু অভিমানের মতো হলো। ছেলেরা কি অভিমান করে? হঠাৎ ফাহিম অভিমানের ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল কিছুক্ষণ। অভিমান ভীষণ অন্যরকম একটা জিনিস। সবার উপর অভিমান করা যায় না, শুধু ভালবাসার মানুষগুলোর উপরই অভিমান হয়, তাহলে সিমির প্রতি তাঁর এমন অনুভূতি হচ্ছে কেন?
সিমির তো এখন অফিস থেকে ফিরে আসার কথা। সে কী করছে এখন? ফাহিমের মেইলটি কি সে দেখেছে?
মিটিং শেষ করে এসে ফাহিম চ্যাট রুমে ঢুঁ মারার জন্য এলো কিন্তু তার দেখা মিলল না। তবু সে লিখল, ‘হাই, সিমি, কেমন আছ তুমি? মিসিং ইউ।’
এটুকু লিখে কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবল সে। তারপর লগ অফ করে কাজে ফিরে গেল।
দিন শেষে বাসায় ফিরে যাবার আগে ফাহিম আরেকবার চ্যাট রুমে এলো এবং দেখতে পেল সিমির রিপ্লাই। মাত্র দু’লাইনের একটা মেসেজ। সে লিখেছে—
‘আমি ভালো আছি। খুব ভালো আছি। সত্যি যদি বলতে হয়, তাহলে বলব, এর চেয়ে বেশি ভালো আসলে থাকা যায় না। নিজেকে মনে হচ্ছে একজন প্রিন্সেস!’
ব্যস এটুকুই। আর কিছু না।
ফাহিম আবারো দ্বিধায় পড়ে গেল। দুদিন আগেই না সিমি লিখল সে খুবই খারাপ অবস্থার মধ্যে আছে আর আজকে নিজেকে প্রিন্সেসের মতো লাগছে। এর চেয়ে বেশি ভালো থাকায় যায় না। ওয়াও—হোয়াট অ্যা কন্ট্রাডিকশন! কেমন বৈপরীত্য এবং দ্বন্দ্ব, সম্পূর্ণ অনিশ্চিত—একেবারেই যেন শিকাগোর ওয়েদার! প্রতি মিনিটেই বদলে যায়—কারণে অকারণে। আবহাওয়াবিদদের দেয়া পূর্বাভাস কখনোই ঠিক হয় না এই শহরে। তাদের আর কী দোষ?
সিমির সঙ্গে তাঁর প্রাণের এই শহরের অনেক মিল। সবকিছুই কেমন রহস্যে ঘেরা।
…
এরমধ্যে সিমির একটি রেকর্ড করে পাঠানো গান পেল ফাহিম। সম্পূর্ণ গান নয়, গানের কয়েকটি লাইন। সেই সাথে সে লিখেছে—
তোমার জন্য একটা গান পাঠালাম ফাহিম। জানি না, তোমার ভালো লাগবে কি না, তবুও ইচ্ছে হলো পাঠাতে। শুনে দেখো।
ভালোবাসা জেনো।
~সিমি।
তাহলে কি সিমির মনের মেঘ কিছুটা কমতে শুরু করেছে? হয়ত তাই। নাহলে হুট করে একটা গান পাঠানোর কথা না। ফাহিম গানটি শুনল। এবং যারপর নাই মুগ্ধ হলো। সত্যিই সুন্দর গায় সিমি। হয়ত ছোটবেলায় গান শিখেছে, একসময় চর্চা ছিল বোঝা যায়। কণ্ঠের কারুকাজ বেশ ভালো—মানুষের মনের মধ্যে পৌঁছে যাবার মতোই। ফাহিম আবারো মুগ্ধ হলো।
সুযোগ পেয়ে সে দ্রুত ছোট করে উত্তর লিখল।
সিমি,
তুমি যে কত ভালো গান করো, তা কি তুমি জানো? আমি জানি না, তুমি গানের চর্চাটা চালিয়ে যাও কিনা, তবে চর্চাটা রাখলে ভালো করবে। ছোটবেলায় গান শিখতে কিনা জিজ্ঞেস করি নি, তবে তোমার দু তিনটি গান শুনেই আমি বলে দিতে পারি, ইউ হ্যাভ অ্যা স্ট্রং বেজ।
তোমার আরো গান শোনার অপেক্ষায় রইলাম।
–আমি।
…
ইতোমধ্যে শিকাগোর আবহাওয়া বদলে গেল আরো কয়েকবার। লেক মিশিগানের পানিও গড়াল অনেক। অবশেষে সিমি একটা নাতিদীর্ঘ মেইল লিখল ফাহিমকে।
ফাহিম, প্রাণের বন্ধু আমার—
কেমন আছো তুমি?
যখন এই লেখাটি আমি লিখছি তোমার জন্য, তখন তোমার ঘুমিয়ে থাকার কথা। তুমি হয়তো ঘুমচ্ছো। আমার এখানে এখন সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা। অত্যন্ত দুঃখিত, তোমাকে এভাবে অপেক্ষা করিয়ে রাখার জন্য।
জানি অপেক্ষায় ছিলে। খুব কষ্ট হয়েছে বুঝি? আচ্ছা কথা দিচ্ছি, কেউ যদি খুব বেশি দুঃখিত হয়ে থাকে, তবে কখনও দেখা হলে তাকে সুখিত করে দেয়ার চেষ্টা করা হবে। চলবে?
তোমাকে দেখে কিন্তু কখনও মনে হয় না, যে তোমারও মন খারাপ হতে পারে! আমি প্রায়ই ভাবি, একজন মানুষ সবসময় এমন হাসিখুশি থাকে কী করে? তোমাকে আমার হিংসেই হয়!
কথা দিয়েছিলাম, তাই ফিরে এলাম আমার নতুন মেইল নিয়ে—পাওনা মিটিয়ে দিতে। চিঠির বিনিময়ে চিঠি।
কিন্তু কী লিখি তোমায় বলো তো? মাথাটা সত্যিই কেমন যেন শূন্য হয়ে আছে। অথচ তোমাকে কত কিছু বলার ছিল, বলার আছে, বলতে চাই। কিন্তু কোথায় শুরু করি? এমন ভাষা কি আছে যা দিয়ে এই তিরিশ বছরের জমানো ব্যথা বন্দী করা যায় চিঠির পাতায়? এমন শব্দ কি আছে যা দিয়ে হতভাগ্য এক হৃদয়ের স্পন্দন আঁকা যায়?
জানো ফাহিম, একটা সময় ছিল যখন চাইলেই আমি লিখতে পারতাম—বিরতিহীন। এতটাই স্বতঃস্ফূর্ত ছিলাম তখন যে আমাকে কখনো ভাবতেও হতো না কী লিখব, কী নিয়ে লিখব? কিন্তু সে সময়গুলি এখন শুধুই এক অতীত ইতিহাস।
তবুও চেষ্টা করি কিছু লিখতে। আমার ফেলে আসা সময় থেকে। কথাগুলো কিছুটা ফিলসফিক্যাল, কেন জানি মেমরি ব্যাংক থেকে এগুলোই সামনে আসছে।
আমার মা কখনোই কোনো আগন্তুকের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করতেন না। আমার বাবা আমাদেরকে উৎসাহিত করতেন মানুষদের সঙ্গে কথা বলতে—এমনি কী তারা অপরিচিত হলেও। তারা দুজনেই চাইতেন, আমাদের অনেক বন্ধু হোক, তাঁদের মনোভাব বুঝি এবং পৃথিবীটাকে জানি। মানুষের সঙ্গে মিশলেই চেনা যাবে মানুষ।
আমার মা সবসময় বলতেন, সত্যিকারের বন্ধুরা তোমার জীবন থেকে চলে গেলেও তোমার হৃদয় থেকে কখনোই যাবে না। কাজেই বন্ধু বানাবে। বন্ধু হচ্ছে আল্লাহর আশীর্বাদ। একজন বন্ধু তোমার জীবনে অনেক সুখের সময় এনে দিতে পারে। কাজেই কথা বলবে, তাকে যদি তুমি নাও চেনো। পৃথিবীটাকে নতুন দৃষ্টি দিয়ে দেখার সুযোগ পাবে প্রতিদিন।
আমার মায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস ছিল আমার। আমার এই তিরিশ বছরের জীবনে চলার পথে আমি অনেক বন্ধু বানিয়েছি—অনেক বন্ধু পেয়েছি, বন্ধু হয়েছি। আমি জানি, একমাত্র একজন বন্ধুকেই আমি পাবো যখন আমার দরকার পড়বে কারো কাঁধে মাথা রেখে যেন একটু কাঁদতে পারি।
আমি ছোট বেলায় খুব অল্পতেই মন খারাপ করে ফেলতাম। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন বুঝতে শিখলাম, তখনই আমার মায়ের কথা মনে পড়ত। আমার জীবনে তাঁর প্রভাব—তাঁর ভূমিকা। আমার জীবনের সর্বশেষ্ঠ উপহার হচ্ছে আমার মা। বেঁচে থাকতে যিনি সব সময় আমার চোখের পানি মুছে দিতেন। মহান আল্লাহ’র কাছে আমি কৃতজ্ঞ সেজন্য।
আমার মনে হয় অনেক কথাই লিখে ফেলেছি আজকে। তবুও যা বলতে চেয়েছিলাম তার কিছুই বলা হয় নি। তুমি হয়ত ভ্রূ কুঁচকে ভাবছ, এসব কী?
দৈবক্রমে তোমার সাথে আমার পরিচয়, তাও আবার ইমেলের মাধ্যমে, কিন্তু সেদিন যদি একজন অপরিচিত মানুষের মেইল মনে করে ডিলিট করে দিতাম, তা হয়ত ট্র্যাশ কিংবা রিসাইকেল বিনেই পড়ে থাকত এতদিন অথচ দ্যাখো, তুমি এখন জায়গা করে নিয়েছ সিমির স্পেশাল সিক্রেট লকারে। এখন আমি জানি, আমার একজন কেউ আছে যার কাঁধে মাথা রেখে আমি কাঁদতে পারব!
ভাবতেই পারছি না, অবশেষে তোমার সাথে দেখা হবে আমার। ২২ তারিখ কবে আসবে? আমি তো আর অপেক্ষা করতে পারছি না ফাহিম! আমার ধৈর্য এত কম কেন?
অনেক ভালোবাসা আর শুভ কামনা রইল।
~সিমি
এ এমন পরিচয় (পর্ব-১১)
সিমিকে উত্তর দেবার আগে, শেষ মেইলের পুনশ্চ-তে লেখা সিমির কথাগুলো ফাহিম বেশ কয়েকবার পড়ল। সিমি কেন বলল যে সে ফাহিমের কাছে কোনো মায়া, দয়া, অনুকম্পা, কিংবা সহানুভূতি এসব কিছুই চায় না। শুধু চিঠির এই সম্পর্কটাই থাকুক, ভালোবাসায় সমৃদ্ধ হয়ে। ফাহিমের কোনো কথায় কি সে ভুল বুঝেছে? ফাহিমও তো এমনই চায়।
সিমির মনটা কি তাহলে খারাপ? ফাহিম চাইল এমন কিছু কথা লিখবে যা পড়ে সিমির মনটা ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু অনেক ভেবেও সিমির জন্য কোনো কিছুই লিখতে পারল না সে। হঠাৎ মনে হলো, একটা কবিতা লিখলে কেমন হয়? কলেজ জীবনে মাঝে মাঝেই সে কবিতা লেখার চেষ্টা করেছে। সেসব পাগলামি করার বয়স কি আর এখন আছে? তখন যেকোনোও মেয়েকে দেখলে কবিতা লেখায় রাত পার হয়ে যেতো। সেই কবিতা অবশ্য আর কাউকেই দেয়া হতো না।
সিমির জন্য ফাহিমের মন কেমন কেমন করে। মেয়েটাকে কেন জানি অন্যরকম মনে হয়। খুবই বিশ্বাসের একটা মানুষ, যার কাছে নির্দ্বিধায় সব কথা বলা যায়। এত মায়াময় একটা মেয়ে। সেই মেয়েটিকে কী লিখবে তাই ভাবছিল ফাহিম। আরো কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সে লিখল—
I’m not a poet
capable of writing lovely sonnets.
I’m not a musician
able to compose magnificent symphonies
or a sculptor who could create
a monument
that would endure forever.
I’m just one man…
এই কবিতা পড়ে তোমার মন ভালো হবে কিনা জানি না। তবুও একটু চেষ্টা করে দেখা। তোমার মনের ওপর এর খানিকটা রেশ থেকে গেলেই আমার ভালো লাগবে।
ভালো থেকো। খুব ভালো।
…
কবিতাটি পেয়ে অসম্ভব এক ভালোলাগায় ভরে গেল সিমির সমস্ত মন। হারিয়ে গেল কথামালার ভেতরে। এমন সাধারণ অথচ কত আন্তরিক। সে কালক্ষেপণ না করেই লিখতে বসে গেল।
ফাহিম, প্রিয় বন্ধু আমার—
তোমার কবিতাটা ভালো লেগেছে। ভীষণ। তোমার লেখার মতোই। তোমার লেখা আমি যত মনোযোগ দিয়ে পড়ি, তেমন করে অন্য কারো লেখা আমি কখনও পড়ি নি। মাঝে মাঝে ভাবি, আচ্ছা, মানুষ কি তার লেখার ভেতর দিয়ে প্রকাশ পায় বেশি, নাকি কথার ভেতর দিয়ে? নাকি দু’টোই।
তোমার প্রতিটা লেখাই আমি সেভ করে রাখছি। ইমেইল হওয়াতে অবশ্য একটা সুবিধে হয়েছে—লেখা হারিয়ে যাওয়ার কোনো ফুসরৎ নেই। ফোনের বাটন চেপে না পাবার বেদনা নেই। কণ্ঠ না শুনেও লেখা দেখে কল্পনায় তোমাকে দেখতে পাচ্ছি—বেশ। কিন্তু এই দেখাটা কি সত্যি হতে পারে না?
তুমি কবে আসবে দেশে? কবে দেখা হবে? কথা বলব সামনা সামনি বসে?
আচ্ছা, তোমার কি নদী ভালো লাগে, নাকি নদীর ওপর পালতোলা নৌকা?
নীল আকাশ, নাকি আকাশের ওপর মেঘ?
বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ, নাকি মাঠের ওপর বৃষ্টি?
চাঁদ ভালো লাগে, নাকি জোছনা রাত?
গহীন রাত নাকি সেই রাতে ঝি ঝি পোকার ডাক?
পড়ন্ত বিকেল নাকি সেই বিকেলের চটুল হাওয়া?
খোলা চুল নাকি চুলের ঘ্রাণ?
উত্তরের প্রতীক্ষায় থাকব। অফুরান শুভেচ্ছা তোমার জন্য।
সিমি লেখাটি শেষ করে একটা কবিতা লিখে দিল নিচে।
‘Call me’ by Robert J. Lavery.
If one day you feel like crying…
Call me.
I don’t promise that I will make you laugh,
But I can cry with you.
If one day you want to run away–
Don’t be afraid to call me.
I don’t promise to ask you to stop,
But I can run with you.
If one day you don’t want to listen to anyone…
Call me.
I promise to be there for you.
And I promise to remain quiet.
But if one day you call…
And there is no answer…
Come fast to see me.
Perhaps I need you.
ভালো থেকো সুন্দর মনের মানুষ।
~সিমি।
…
তখন শিকাগোতে সকাল আট’টার একটু বেশি।
সিমি হয়তো ঘুমাচ্ছে। কাল রাতে অনেকক্ষণ কথা হয়েছে তার সাথে—রাত জেগেছে। সিমি বলেছিল সকালে ফোন করে তার ঘুম ভাঙিয়ে দিতে। আজ তো ওর কাজ নেই। থাক না, ঘুমাক না আর একটু।
হঠাৎ করেই ফাহিমের মাথায় একটা খেয়াল চেপে বসল। সিমি ওকে যে কবিতাটা পাঠিয়েছে—সেটির বাংলা অনুবাদ ওকে পাঠালে কেমন হয়? আরো ভালো হয় কবিতাটির আবৃত্তি রেকর্ড করে পাঠাতে পারলে। সিমি যেমন ওকে মাঝে মাঝে ওর গাওয়া গানের কয়েকটি লাইন রেকর্ড করে পাঠায়। সিমির গানের গলাও সুন্দর। কিন্তু ফাহিম তো আবৃত্তিকার নয়, তবুও তার কেন এমন ইচ্ছে হলো কে জানে। মনের কিছু ইচ্ছাকে তাৎক্ষনিক ভাবে প্রাধান্য দেয়া যেতেই পারে—ফাহিম আবৃত্তি করল।
যদি কোনো দিন
অঝোরে কাঁদতে চাও তুমি,
তবে আমায় ডেকো।
আমি কথা দিচ্ছি না
তোমায় হাসিয়ে দেবো,
তবে, তোমার সাথে কাঁদতে তো পারবো।
যদি একদিন দূরে কোথাও
চলে যেতে চাও তুমি,
আমায় ডাকতে ভয় পেও না।
আমি কথা দিচ্ছি না
তোমায় বাঁধা দেবো।
তবে তোমার সাথে যেতে তো পারবো।
যদি একদিন কারো
কথাই শুনতে ইচ্ছে না করে,
তবে আমায় ডেকো।
আমি কথা দিচ্ছি,
নীরবে তোমার কথা শুনবো।
কিন্তু কখনও একদিন
তোমার ডাকে যদি না আসি,
তবে তুমি আমায় দেখতে যেয়ো।
হয়তো সেদিন খুব দরকার
তোমাকেই আমার।
কবিতাটির সঙ্গে ফাহিম আরো লিখল—
সিমি, তোমার পাঠানো কবিতাটির বাংলা ভার্শন পাঠালাম রেকর্ড করে। আমি আবৃত্তি শিল্পী নই তবুও একবার চেষ্টা করলাম। এক কাপ চা হাতে, সকালের মিষ্টি রোদ খানিকটা গায়ে মেখে শুনে দেখো একবার। ভালো না লাগলে ডিলিট করে দিও।
প্রিয় মানুষটির জন্যে ছন্দে আনন্দে সকালের শুভেচ্ছা।
আঁধারের পর সূর্যের আলো,
দিনটা তোমার কাটুক ভালো।
–ফাহিম।
…
সিমি ঘুম থেকে উঠে ফাহিমের কবিতা পেয়ে ভীষণ উচ্ছ্বসিত হয়ে গেল।
আজ অফিস নেই। সারাদিন তেমন কিছু করারও নেই। তবে সে জানে আজ ফাহিমের একটা মেইল আসবে। মেইল না আসা পর্যন্ত সে কবিতাটিই শুনতে থাকল। সিমি চট করে এক কাপ চা বানিয়ে নিয়ে এসে বসল বারান্দায়। গাছের ফাঁক দিয়ে সকালের রোদের অনেকখানিই এসে পড়েছে। সিমি রোদে গা ভিজিয়ে, গরম চা’য়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শুনল কবিতাখানি আবার। বেশ কয়েকবার শুনে তার মনে হলো—বাহ, বেশ তো!
সিমির মনটা এতোটাই ভালো হয়ে যাবে বা যেতে পারে তা সে কল্পনাও করে নি কখনও। কেমন একটা সুখ সুখ অনুভূতি হচ্ছে। ইচ্ছে করছে পাখির মতো আকাশে উড়তে, অঝোর বৃষ্টিতে ভিজতে। সে ফাহিমের সাথে কণ্ঠ মিলিয়ে কবিতাটি আওড়ালো শব্দ করে।
দুপুরের দিকে ফাহিমের ইমেইল পেল সিমি। ফাহিম লিখেছে—
সিমি, প্রিয়তমা বন্ধু আমার—
অনেকদিন থেকেই একটা ব্যাপার নিয়ে খুব অস্বস্তি বোধ করছি। ভাবলাম, আজকে তোমাকে জানাই।
আমি ভীষণ অবাক হয়েছি, তুমি আমার স্ত্রীর কথা বিভিন্ন প্রসঙ্গে এনেছ কিন্তু আর একবারও জানতে চাও নি তার ব্যাপারে। আমি কৌশলে এড়িয়ে গিয়েছি—সেটা নিশ্চয়ই তুমি বুঝতে পেরেছ। তুমি হয়তো ভেবেছ, আমার নীরবতার কোনো কারণ নিশ্চয়ই আছে আর তাই তুমিও নীরবতায় আছে। হয়তো অপেক্ষায় ছিলে কিংবা আছো, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তোমার মনে কৌতূহল যে জন্মেছে সেটা কিন্তু আমি বুঝেছি। কাজটা আমি ইচ্ছে করেই করেছি। আমি দেখতে চাইছিলাম—কতটা ধৈর্য তুমি ধরতে পারো। একধরণের পরীক্ষা বলতে পারো।
তবে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি যে তুমি একজন অসাধারণ ধৈর্যশীল মেয়ে। অন্য কোনো মেয়ে হলে তার কৌতূহল তীব্র হতো—অনেক। তুমি ব্যতিক্রম। তোমার ধৈর্য আর নির্লিপ্ততা আমাকে অভিভূত করেছে।
তবে একেবারেই যে কৌতূহলী ছিলে না, তাই বা বলি কী করে। তুমিই তো তাকে ইন্টারনেট থেকে খুঁজে বের করে বলেছিলে, তোমার বউ কিন্তু হট। তুমি মিথ্যে বলো নি, সে সত্যিকার অর্থেই সুন্দরী—শুধু বাইরে নয়, ভেতরেও। এবং তার সুন্দরের প্রশংসা সে পেয়ে আসছে তার টিনেজ বয়স থেকে। ছোট বেলা থেকেই সে একটু লাজুক ও নরম প্রকৃতির। কথাও বলে কম, যাকে বলে মিতভাষী। সে যখন টিনেজ পার হয়ে কুড়িতে পড়ল তখন আমিই তাকে ইনসিস্ট করেছিলাম মডেলিং ক্যারিয়ার করতে। তোমার মনে আছে কিনা জানি না, তখন আনন্দ বিচিত্রা নামে একটা ম্যাগাজিন ছিল, বেশ জনপ্রিয়। সেখানে ফটোসুন্দরী প্রতিযোগিতা হতো। অনেকটা আমার চাপে, একরকম ইচ্ছার বিরুদ্ধেই সেই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়। এবং প্রথম দশজনের মধ্যে টিকেও যায় সে। কিন্তু ফাইনাল রাউন্ডের আগেই তাকে চলে আসতে হয় আমেরিকায় ইমিগ্রেশন নিয়ে, তার ভাইবোনদের সাথে।
তার সাথে আমার পরিচয়, প্রেম আর বিয়ের ঘটনা নিয়ে লিখলে একটা প্রেমের উপাখ্যান সৃষ্টি হবে বলেই আমার বিশ্বাস। তবে বন্ধু যখন হয়েছ, তার সম্পর্কে প্রতিনিয়তই কিছু না কিছু জানবে কথা প্রসঙ্গে। অবশ্যই যদি তুমি জানতে চাও।
সুন্দরী স্ত্রীদের স্বামীরা সুযোগ পেলেই তাঁদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে থাকে। আমিও তার ব্যতিক্রম নই। তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ, এ কেমন আদিখ্যেতা। স্ত্রীর কথা বলতে যেয়ে শুধু তার সৌন্দর্যের প্রশংসাই করে যাচ্ছি। যে সুন্দর তাকে সুন্দর বলায় কোনো অপরাধ নেই।
তবে সবকিছু ছাড়িয়ে তার প্রেমে আমি পড়েছিলাম শুধুমাত্র তার ব্যক্তিত্ব আর জ্ঞানের সৌন্দর্যে। মানুষের সৌন্দর্য প্রকাশ পায় তার ব্যক্তিত্বে। সৌন্দর্য দৃষ্টি কাড়ে কিন্তু ব্যক্তিত্ব কাড়ে মন। সেটা যে শুধু মেয়েদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, তা কিন্তু নয়। ব্যক্তিত্বহীন কিংবা মনের পরিচর্যা করে না এমন মানুষ আমার দৃষ্টিতে একটু কমই সুন্দর।
যাইহোক, সৌন্দর্য নিয়ে এমন বিশেষজ্ঞের মতামত কিংবা বক্তৃতা দেবার কোনো ইচ্ছেই আমার ছিল না। কেন দিলাম তাও জানি না। আপাতত এই চ্যাপ্টার ক্লোজ।
শেষ করছি একটা গল্প দিয়ে। এই গল্প নিয়েও পরে হয়তো আমাদের কথা হবে। ভালো থেকো সিমি। তুমি ভালো থাকলে আমিও ভালো থাকি। অনেক ভালোবাসা।
…
মেয়েটি একটি চিঠি লিখল, ‘আমি আসছি, বিয়ে করব! বিয়ে করার মতো টাকা আছে তোমার কাছে?’
ছেলেটি সবেমাত্র গ্রাজুয়েশন শেষ করে একটা মাল্টি-ন্যাশনাল কোম্পানিতে জয়েন করেছে, বেতন খুবই কম। এক বছরও হয় নি চাকরি। এরমধ্য বিয়ে করার মতো টাকা! চেক বই’র হিসেব মিলিয়ে তার মনটাই খারাপ হয়ে গেল।
মেয়েটি আরো লিখেছে, ‘আমার ভাই-বোনরা কেউ রাজী না। শুধু ছোট বোন ছাড়া। মা-ও রাজী না। তবে আমার জিদের কাছে হার মেনে আশা ছাড়া দিয়ে বলেছে, তোমার কপাল যদি তুমি পোড়াতে চাও আমাদের আর কী করার আছে। ঐ ছেলেকে যদি বিয়ে করো তবে তোমার নিজ দায়িত্বে একা একা-ই করতে হবে। আমরা কেউ তোমার সাথে থাকব না।’
মেয়েটি স্বপ্নের আমেরিকার নিশ্চিত ভবিষ্যতের কথা না ভেবে একা একাই শুরু করল এক অনিশ্চিত যাত্রা। দেশে ফিরল। ছেলেটির সাথে দেখা করল। তারা সিদ্ধান্ত নিলো বিয়ে করবে। বিয়ে হলো, কাজী অফিসে।
অল্প কিছুদিনের মধ্যেই মেয়েটি বুঝে গেল ভুল একটা হয়ে গেছে। ছোট খাট ভুল না। বেশ বড়। মনে পড়ল মায়ের কথা। কিন্তু ফিরে যাবার আর তো পথ খোলা নেই। ঘটনা যা ঘটার ঘটে গেছে!
মেয়েটি এখন কী করবে?
–ফাহিম।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-১০)
সিমি,
প্রথমেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি, তোমাকে কলব্যাক করতে পারি নি বলে। কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম! গভীর রাতে আমার ফোনটা একবার বেজে উঠল। আমার এখানে তখন ভোররাত ৩:১১! ফোনটা কি তুমি করেছিলে?
তোমার জীবনের গল্প শুনে আমি কিন্তু আর মন খারাপ করে নেই এখন। তবে বেশ কিছুদিন তোমাকে নিয়ে অনেক ভেবেছি তা অস্বীকার করব না। আমারও মনে হয়, জীবনকে জীবনের নিয়মেই চলতে দেয়া উচিৎ। পেছনের কথা ভেবে থেমে থাকলে তো চলবে না। মানুষের জীবনে দুঃখ যেমন থাকে, সুখের স্মৃতিও তো থাকে। জীবনে দুঃখ–কষ্ট, বেদনা–ব্যর্থতা আসবেই। এসব নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে।
তুমি তো খুব সুন্দর করে বললে সিমি; সত্যিই তো সৃষ্টিকর্তাই হচ্ছে চিফ স্ক্রিপ্ট রাইটার এবং কারো সাধ্য নেই সেই স্ক্রিপ্ট পরিবর্তন করার। আর হ্যাঁ, সৃষ্টিকর্তার ওপর আমার পূর্ণ বিশ্বাস এবং আস্থা দুইই আছে।
আমার হৃদয়ের নিলয় থেকে অলিন্দে তোমার জন্যে বেশ খানিকটা জায়গা খালি করেছি। রিজার্ভেশন পাক্কা। তুমি ডিজার্ভ করো তাই অটো রিজার্ভ হয়েছে। তবে , বিনিময়ে ছোট একটা জিনিষ চাইব।
তোমার একটা মিষ্টি হাসি
যদি পাই,
বর্ত্যে যাই,
কিছু আর নাহি চাই।
তোমার সঙ্গে যখন দেখা হবে, এই উপহারটি আমায় দিও। তাতেই আমি খুশি হবো—অনেক।
ভালো থেকো মেয়ে। আমাদের কিন্তু কথা বলার কথা। অপেক্ষায় আছি—
ফাহিম।
………
আজ ফাহিমের মনটা ভীষণ ফুরফুরা। সিমির সাথে তার ফোনে কথা হয়েছে। মেয়েটির কণ্ঠস্বর, কথা বলার ঢং, উচ্চারণ, সারাক্ষণ হেসে হেসে কথা বলা, দুষ্টুমি—সব কিছু মিলিয়ে অন্যরকম একটা ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হলো ফাহিম। আবার একটু কষ্টও হলো, এই ভেবে যে এমন স্বতঃস্ফূর্ত, হাসিখুশি মেয়েটির জীবনে কেন এমন একাকীত্ব!
সিমির সঙ্গে কথা বলার পর ফাহিমের আরো একটা উপলব্ধি হলো। তার মনে হলো মেয়েটির চরিত্রের মধ্যে একধরণের রহস্যময়তা আছে। ঘুমতে যাবার আগে ফাহিমের ইচ্ছে হলো কয়েক লাইন মেইল লিখে পাঠানোর। সে লিখল—
রহস্যময়ী মেয়ে,
I love when you laugh, I like when you laugh. Wish you can laugh like that forever.
সত্যিই তুমি এত সুন্দর করে হাসতে পারো, আমি তো তোমার হাসির প্রেমেই পড়ে গেছি। দুষ্টুমিও বেশ ভালোই জানো দেখছি। যদিও আমি ভালো কথা বলতে পারি না, সুন্দর করে তো নয়ই। অথচ তোমার সঙ্গে কী সাবলীল আর সহজভাবেই না কথা বলে গেলাম। ননস্টপ। এ কি আমি? নিজেই ভীষণ অবাক হয়েছি। অথচ, আমি কথা বলতে পারি না, হাসাতে জানি না, মন ভালো করে দেবার কোনো ক্ষমতা আমার নেই—আরো কত কী শুনি নিজের সম্পর্কে। জানি না, তোমার কাছে কী মনে হয়েছে, অথবা কী ভেবেছ আমার সম্পর্কে—আমি কিন্তু বেশ এনজয় করেছি তোমার সঙ্গ। মনেই হয় নি, একে অপরের কাছ থেকে ১২,৭২২ কিলোমিটার দূরত্বে আমাদের অবস্থান ছিল।
এই প্রথম ফোনে আমাদের কথা হলো অথচ মনে হয়েছে তুমি আমার জন্ম জন্মান্তরের চেনা কেউ। প্রতিদিনই আমাদের দেখা হয়, কথাও হয়। কত আপন। আমার আপনার চেয়ে আপন যে জন, খুঁজি তারে আমি আপনায়…
কেন জানি না, গত বেশ কয়েক দিন ধরে, আমি প্রতি মুহূর্তে কেবল তোমার কথাই ভাবছি। আমি তোমাকে দেখতে পাই, চোখ খোলা থাকুক বা বন্ধ। আমার অদেখা তোমার মুখটি সারাক্ষণ চোখের সামনে ঘুরে।
এটুকু লিখে ফাহিম ভাবতে লাগল। হঠাৎই আর কোনো কথা খুঁজে পেল না সে। অনেকক্ষণ ধরে আতিপাতি করে কথা খুঁজে না পেয়ে তার পছন্দের একটা গানের কিছু লাইন লিখল—জনপ্রিয় আমেরিকান গায়ক রয় অরবিসনের ‘রহস্য মেয়ে।’
In the night of love
Words tangled in her hair
Words soon to disappear
A love so sharp it cut
Like a switchblade to my heart
Words tearing me apart
She tears again my bleeding heart
I want to run, she’s pulling me apart
Fallen angel cries
Then I just melt away
She’s a mystery girl
…
কাজ থেকে ফিরে ফাহিমের মেইল পড়ল সিমি। মনে মনে হাসল। একটু ভাবল এবং উত্তর লিখল প্রায় সাথে সাথেই।
এই ফাহিম,
তুমি কি প্রেমে পড়ে গেলে নাকি? কিন্তু তোমার তো প্রেমে পড়া বারণ। একেবারেই না না। এখন কী হবে তবে? সামনে সমূহ বিপদ তোমার।
আমার ধারণা তুমি প্রেমে পড়েছ, আবার—এমন একটি মেয়ের, যে রহস্য ভালোবাসে, হঠাৎ করেই সে তোমার জীবনে এসেছে রংধনুর সাত রঙে রাঙ্গিয়ে, সূর্যের সব আলো ছড়িয়ে। যদিও সেই রঙ কিংবা আলোর কোনোই প্রয়োজন নেই তোমার জীবনে। আমি কি ঠিক বলেছি?
তোমার বউ যদি জানতে পারে, তোমার কিন্তু খবর আছে বন্ধু। ধরা পড়ে গেলে আমাকে দোষ দিতে পারবে না কিছু। আমি কিন্তু আগেই সাবধান করে দিচ্ছি। 😛
তুমি কয়েক লাইন কবিতা লিখেছ না কি গান, কিছুই বুঝি নি। ব্যাখ্যা করবে? কে এই মিস্ট্রি গার্ল? প্রিটি প্রিটি প্লিজ।
আমি অবশ্যই হাসবো, সত্যিকার উচ্চ শব্দে হাসা যাকে বলে। তুমি যখন দেশে আসবে, দেখবে আমার হাসি। আমি কেমন হাসতে পারি নিজ চোখেই দেখো। তখন কিন্তু শব্দদূষণের জন্য আমাকে দায়ী করতে পারবে না।
আমি আর কিছু লিখতে চাইছি না। আমার অংশটুকু কাল লিখব। সে পর্যন্ত ভালো থেকো।
লটস অফ লাভ।
অ্যা মিস্ট্রি গার্ল।
…
সিমি,
তোমার বুঝি তাই ধারণা যে আমি তোমার প্রেমে পড়েছি? এত দ্রুত? তোমার সঙ্গে আমার এই মেইল চালাচালির সম্পর্ককে কি প্রেম বলা ঠিক হবে?
না বন্ধু, আমাকে নিয়ে ভয় পেও না। সেই অর্থে যাকে প্রেম-ভালোবাসা বলে, তেমন প্রেমে পড়ার কোনোই সম্ভাবনা নেই—অন্তত আমার পক্ষ থেকে। যদিও এটা অস্বীকার করা যাবে না যে, রহস্যময়ী মেয়েটি আমার মনোঃদৃষ্টি আকর্ষণ করেছে খুব ভালোভাবেই। হঠাৎ দেখা দেয়া রঙধনুর মতোই।
মানুষের জীবনটাও কিন্তু রংধনুর রংয়ের মতোই। হঠাৎ করে সুখ দেখা দেয়, কিছু সময় সে সুখ স্থায়ী হয়। আবার চলেও যায়।
ভালোবাসা, এই এক ছোট শব্দে আছে হাজার অনুভূতির মিশ্রণ। ভালোবাসাকে কতভাবেই তো সংজ্ঞায়িত করা যায়। পৃথিবীতে সহস্র ধরণের ভালোবাসা আছে। আমি যদি তোমাকে ভালোবাসিও, তোমার মতো একজন বন্ধু তেমন ভালোবাসা পেতেই পারে। একজন মানুষের বুকে অনেক এবং অনেকের প্রতিই ভালোবাসা থাকতে পারে। থাকাটা অস্বাভাবিক কিছু না।
তোমার প্রেমে যেন না পড়ে যাই, তারজন্যে আমাকে আগেভাগেই সতর্ক করে দেবার জন্য ধন্যবাদ তোমাকে। যদিও, আমাকে সতর্ক করে দেবার অনেক আগে থেকেই আমি জানি—আমার সীমাবদ্ধতার কথা। কাজেই বেশি টেনশন নিও না। বন্ধু যেখন ভেবেছি, সম্পর্কটা সেখানেই লক করা থাকবে—অন্তত আমার কাছ থেকে। তোমাকে ঝামেলায় ফেলবার কোনো অভিসন্ধিই আমার নেই। আমার কোনো আচরণে তুমি যদি অস্বস্তিবোধ করো জানিয়ে দিও। মানুষ বলে কথা। আচরণের তারতম্য হতে পারে।
জনপ্রিয় আমেরিকান গায়ক রয় অরবিসনের ‘রহস্য মেয়ে’ শিরোনামের একটা গানের কিছু লাইন লিখেছিলাম তোমার জন্য। ব্যাখ্যা তো দিতে পারব না। আমি কবিও নই—লেখকও নই। তবে গানটির আরো কয়েকটি লাইন লিখে দিচ্ছি, আমার ধারণা এটুকু বুঝতে কোনো অসুবিধাই হবে না—ব্যাখ্যারও প্রয়োজন পড়বে না।
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
She’s a mystery girl
…
ফাহিম,
তুমি দেখি প্রেমে পড়া বারণ সংক্রান্ত কথাগুলোকে সিরিয়াসলি নিয়েছ। আই ওয়াজ জাস্ট জোকিং বাবা—ট্রায়িং টু পুল ইয়োর লেগস। তোমার সীমাবদ্ধতার কথা কি আর আমি জানি না? তার ওপরে আমি নিজেও তো আমার সীমাবদ্ধতার কথা জানি। আর তুমি না বললেও আমি খুব ভালো করেই জানি যে তুমি তোমার স্ত্রীকে অনেক ভালোবাসো। আমিও ভালোবাসি আমার স্বামীকে। যদিও সে আর আমার কাছে নেই।
আমি তোমার সঙ্গে দুষ্টুমি করেছি মাত্র ফাহিম, প্লিজ আমাকে ভুল বুঝো না। আমি এমনই। আর হ্যাঁ, আমিও তোমাকে অনেক পছন্দ করি।
তুমি কিন্তু বললে না, কেন তুমি আমাকে মিস্ট্রি গার্ল বলেছ… প্লিজ টেল মি না
…
এই ছোট মেইলটা পাঠিয়ে দিয়ে সিমির হঠাৎ মনে হলো, একটা প্রশ্ন ছিল, করা হয় নি। সে আবার লিখল—
তোমাকে জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি, আচ্ছা তার মানে এই কি যে আমি যদি না হাসি, তুমি আমাকে ভালোবাসবে না?
ওকে বাই।
তোমার রহস্য মেয়ে
পুনশ্চ: ফাহিম, আমি তোমার কাছ থেকে মায়া, দয়া, অনুকম্পা, সহানুভূতি কিছুই চাই না। যেমন আছে আমাদের চিঠির সম্পর্ক তেমনি স্নিগ্ধ ভালোবাসার আলোয় উজ্জ্বল থাকুক-এটুকুই আমার কাম্য।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৯)
(গত পর্বের সিমির চিঠির বাকী অংশ…)
কুড়িতে পড়তে না পড়তেই, আমি একজন নিখুঁত মানুষের প্রেমে পড়ে যাই। দুই বছর প্রেম করে আমরা গাঁটছড়া বাঁধি। আমাদের বিয়ের গল্পটা সত্যিই সিরিয়াস কিছু। তোমাকে পরে বলব এক সময়।
একটা দুর্ঘটনার পর থেকে আমার শাশুড়ি বিছানায় পড়ে ছিল প্রায় ৬ মাসেরও বেশি। পুরো বাড়ি এবং সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে আমার কাঁধে। আমার বয়স তখন মাত্র বাইশ বছর। বিয়ের দুই বছর যেতে না যেতেই রানার পাকস্থলীতে একটা সমস্যা দেখা দেয়। বেশ কিছু পরীক্ষানিরীক্ষার পর জানা গেল, মানুষটার জন্মই হয়েছে একটা কিডনি নিয়ে এবং সেটাও ঠিকমতো কাজ করছে না, এক অর্থে বিকল। এ কথা জানার পর, হঠাৎই কেউ যেন আমার চোখ দুটো কালো পর্দায় মুড়ে দিলো। সবকিছু কেমন ঝাপসা হয়ে এলো চারিদিকে। যেদিকে তাকাই, শুধুই অন্ধকার। সবকিছুই কেমন এলোমেলো হয়ে গেলো। তবুও আমি আশা ছাড়ি নি এক মুহূর্তের জন্য। বিশ্বাস করো ফাহিম, আমার মুখ থেকে একবারের জন্যেও হাসি মুছে যায় নি। সত্যি কথা বলতে কী, রানাকে যখন ভর্তি করালাম চেন্নাই’র ভেলর হাসপাতালে, কিডনি বায়োপ্সি করার জন্য—আমার মুখের ঐ হাসিটুকুই ছিল তার জন্য উপহার স্বরূপ।
তারপরে কতদিন চলে গেছে, কত স্মৃতি নিয়ে। আমাদের বিবাহিত জীবনটা ছিল অন্যরকম—এক কথায় ঈর্ষণীয়। কোনো পার্টিতে গেলে সবাই আমাদের দিকে অন্যরকম দৃষ্টিতে তাকাত। আমি রানার দিকে তাকাতাম, নিজে নিজেই গর্বিত হতাম। অহংকারী হতাম। ভাবতাম, আমার হাত ধরে থাকা এই মানুষটি আমার স্বামী। আমার খুব ভালো লাগত। অনেক ভালোবাসতাম সেই অনুভূতি।
পাঁচ বছর পর, রানার কিডনি যখন আর নিতে পারছিল না, তখন ডায়ালাইসিস শুরু করতে হলো। রক্ত পরিশোধনের একটি আধুনিকতম প্রক্রিয়া হচ্ছে ডায়ালাইসিস। কিডনি যখন অতিমাত্রায় বিকল হয়ে পড়ে, তখন এটি করতে হয়। যখন ডায়ালাইসিস করার সিদ্ধান্ত নিতে হয়, তখন রোগীর চিকিৎসার জন্য কিডনি সংস্থাপন ছাড়া আর অন্য কোনো উপায় থাকে না। এ অবস্থায় রোগীকে বাঁচানোর জন্য ডায়ালাইসিস করতে হয়। কাজেই একবার ডায়ালাইসিস শুরু করলে পরবর্তী সময়ে সেটি করা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তখন ডায়ালাইসিস না করা মানে অকালে মৃত্যুর প্রহর গোনা।
শুরু হলো আমার দুঃস্বপ্নের দিন। সেদিনগুলির কথা আমি আর মনে করতে চাই না। আমার জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক আর কষ্টের সময়। তার আগে আমি বুঝতেই পারি নি, ঐ মানুষটাকে আমি কত ভালোবাসতাম। বুঝতে পারি নি, ঐ মানুষটা ছাড়া আমার আর কেউ নেই। অথচ তাকে একটু ভালো রাখবার জন্য কিছুই করতে পারছিলাম না আমি। এতটা অসহায়ত্ব আমি আমার জীবদ্দশায় আর কখনোই অনুভব করি নি। আহ, সেই কষ্টের অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না। কষ্ট মানুষকে কাঁদায় না, নীরব করে রাখে। আমিও নীরবে পাথর হয়ে গেলাম অনেকটাই।
আমি আমার জীবনকে বাজী রাখলাম, যে কোনোভাবেই হোক, আমি রানাকে সুস্থ করে তুলবোই কিন্তু বুঝতে পারি নি, সৃষ্টিকর্তা বাজী ধরা পছন্দ করেন না। তিনি চান নি, রানা আমার জীবনে থাকুক এবং তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে যাওয়ার কোনো ক্ষমতাই আমাদের নেই।
আমার পুরো জীবন যেন উত্তাল সমুদ্রে ডুবে যাওয়া এক কাগজের নৌকা। আমার স্বপ্ন ছিল সমূদ্রের মতো বিশাল, আর বাস্তবতা ছিল কাগজের নৌকার মতো ঠুনকো। আমি তাকে হারালাম। আমার হাজারো চেষ্টা ব্যর্থ করে সে চলে গেল।
শেষ বিকেলের পশ্চিমাকাশে ডিমের কুসুমের মতো সূর্যটা যখন হেলে পড়ে, ধীরে ধীরে হলুদ থেকে লাল হয়ে যাওয়া নির্জীব ও নির্মল সূর্যটা বিদায় নেবার পূর্বে শেষ বারের মতো মেঘের মধ্য থেকে মাথা বের করে তার কুসুম বর্ণ রূপ দেখাবার জন্য আরেকবার উকি দেয়—তারপর আচমকাই দিগন্তে ডুবে যায়। এখন আমি দিগন্তরেখায় এক অস্তগামী সূর্য ছাড়া আর কিছুই নই। আমার জীবনটা ধীরে ধীরে দিগন্তরেখার নীচে ডুবে যাচ্ছে অস্তগামী সূর্যের মতোই।
সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলো, বেলা যে ফুরিয়ে যায়
কখন যেন হঠাৎ করেই চলে যেতে হবে
সময়ের হাতে বুঝি সময় আর বেশি নাই!
আজ আমাকে লেখায় পেয়ে বসেছে। আমি বেশ বুঝতে পারছি এই মেইলটি অনেক বড় হয়ে গেছে। কী জানি এমন দীর্ঘ লেখা পড়তে পড়তে তোমার চোখ জ্বালা করবে কিনা। যদি বোর ফিল করো তার জন্য আগেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। তোমাকে বোর করার কোনো ইচ্ছেই আমার নেই।
আমার ঘুম পাচ্ছে। তোমার সঙ্গে কালকেই চ্যাট করতে চাই। দেখা দেবে তো?
আজ আমার মনটা ভীষণ খারাপ। তুমি আমাকে সুন্দর করে একটা চিঠি দেবে। যে চিঠি পড়ে আমার মন ভালো হয়ে যাবে।
ভালো থেকো হে প্রিয়। ভালোবাসায় থেকো—ভালোবাসায় রেখো! সবসময়।
সিমি।
It’s not what’s happening to you now or what has happened to you in your past that determines who you become. Rather, it’s your decisions about what to focus on, what things mean to you, and what you’re going to do about them that will determine your ultimate destiny. –Anthony Robbins
…………।
প্রিয় সিমি,
তোমার মেইলটি পড়ার পরে আমি একরকম অসাড় হয়ে গেছি। আই লস্ট মাই সেনসিটিভিটি। মনে হচ্ছে কেউ যেন একটা ধারালো বস্তু আমার হার্টে ঠুকে দিয়েছে। আমি ভীষণ মর্মাহত হয়েছি। গভীর অন্তর্বেদনায় ভুগছি। তোমার সঙ্গে ঘটে যাওয়া সবকিছুর জন্যেই সমবেদনা বা সহমর্মিতা প্রকাশ করা ছাড়া আর কীইবা করতে পারি! এর চেয়ে বেশি কিছু লিখতেও যে পারছি না। জীবনে এই প্রথম কারো চিঠির উত্তরে কী লিখব তা ভেবে দিশেহারা হচ্ছি।
কিছু কিছু সময়ে শুধু লিখে বা ফোনে সত্যিকারের আন্তরিকতা বোঝানো যায় না। খুব কাছে এসে মাথাটা বুকের সাথে জড়িয়ে ধরে সমবেদনা জানাতে পারলে মনে হতো কিছুটা কষ্টের ভাগ নিতে পেরেছি। কিন্তু চাইলেই তো আর সেটা সম্ভব না।
মাঝে মাঝে ভেবে অবাক হই, সৃষ্টিকর্তা কেন এত নিষ্ঠুর হয়! কেন এত কষ্ট দেয়। এভাবেই কেন?
আমার ব্যস্ততার কারণে আমি আজকেও একটা দীর্ঘ মেইল লিখতে পারব না জানি। ভীষণ দুঃখিত। তবে আমি চেষ্টা করব লিখতে না পারলেও অন্তত ফোনে তোমার সঙ্গে কথা বলতে। অ্যান্ড দ্যাটস অ্যা প্রমিজ। কথা বলবো কী, আমার তো এখনই ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে তোমার কাছে। ইচ্ছে হয়, শক্ত করে জড়িয়ে ধরি তোমাকে। শুষে নেই তোমার সব কষ্ট!
আমি খুবই ব্যস্ত থাকব কিছুদিন। তবে যত ব্যস্তই থাকি না কেন, আমার মনটা কিন্তু পড়ে থাকবে তোমার কাছেই। তোমার পাশে। ইনভিজিবল হয়ে।
তোমার অনাগত দিনগুলিতে আমাকে পাশে পাবে সবসময়। সে আমি যত দূরেই থাকি না কেন?
তোমাকে তো বলা হয় নি, আমার হার্টটা কিন্তু বেশ বড়। আই মিন লিটারেলি, বিগ। আই হ্যাভ বিন ডায়াগনোজড অ্যাজ কার্ডিয়াক এনলার্জমেন্ট। কাজেই আমার হৃদয়ের কোনো এক কোণে তোমার জন্য একটু জায়গা নিশ্চয়ই হবে।
তোমার হাসি দেখতে ইচ্ছে করে। খুব। কবে দেখব?
যখনই মন খারাপ হবে জানিও, আমি কল দেবো। তোমার যদি কথা বলতে ইচ্ছে হয়, তাহলেও জানিও।
এখন যাই। ভালো থেকো।
অনেক অনেক ভালোবাসা।
ফাহিম।
…………
যথারীতি ঘুম থেকে উঠেই অফিসের যাবার আগে সিমি মেইল চেক করতে বসল। ফাহিমের কোনো মেইল নেই। ফাহিমকে অনলাইনেও দেখা গেল না। একটু মন খারাপ করে সে অফিসে গেল। কাজের ফাঁকে কয়েক দফায় মেইল চেক করল, না নেই।
কাজ থেকে ফিরে সিমি গোসল সেরে, কী মনে করে একটা তাতের শাড়ি পড়ল। সিমি কখনো তেমন একটা সাজগোজ করে না। রাতের খাবার শেষ করে মেইল খুলে বসল সে। ফাহিমের কোনো উত্তর নেই। আবারো হাওয়া হয়ে গেছে মানুষটা। কিছুটা আনমনা হয়ে বসে থেকে আবারো একটা মেইল লিখতে বসল আর ঠিক তখনই ফাহিমের ইমেইল এলো।
সিমি দ্রুত কয়েকবার মেইলটি পড়ল তারপর ধীরেসুস্থে একটা উত্তর লিখল।
সাবজেক্ট লাইনে লিখল, ‘না জানি কেনরে এত দিন পর জাগিয়া উঠিল প্রাণ।’
ফাহিম প্রিয় বন্ধু আমার,
কেন যেন মনে হচ্ছে আমার দীর্ঘ চিঠি পড়ে তোমার মন খারাপের মতো কিছু একটা হয়েছে। আমার কারণে তোমার মন খারাপ হোক, সেটি আমার কাম্য নয়। তুমি জানতে চেয়েছিলে বলেই আমি আমার জীবনের কিছু কথা তোমায় বলেছি। বিশেষ করে আমার দুঃখের স্মৃতিগুলো তোমার সাথে ভাগ করে নিয়েছি। আমার অনেক সুখের স্মৃতিও আছে, যা আমার মাথাকে সোজা এবং উঁচু রাখতে সাহায্য করে। আমি আমার সারা জীবন সেই স্মৃতিগুলো রোমন্থন করেই বেঁচে থাকতে পারব। আমি সত্যিই ভীষণ আনন্দিত, তোমার মতো একজন বন্ধু আছে আমার। আমাকে নিয়ে তোমার ভাবনা আমাকে আপ্লুত করে। আমার ইচ্ছে, আমাদের এই বন্ধুত্ব অটুট থাকুক সারাজীবন। থাকবে ইনশাল্লাহ।
আমার কি মনে হয় জানো ফাহিম, আল্লাহ কখনোই নির্দয় হয় না। আমি জানি না তুমি কতটা আল্লাহর ওপর বিশ্বাসী তবে আমার শতভাগ বিশ্বাস রয়েছে তার ওপর। এবং আমি এও বিশ্বাস করি, তিনি যাই করেন না কেন, তার পেছনে একটা কারণ থাকে। তিনি যা করেন ভালোর জন্যই করেন। আমি আমার ভাগ্যের জন্য আল্লাহকে কখনোই অনুযুক্ত করি না। কী জানি, হয়তো তার কোনো বেটার প্লান আছে আমাকে নিয়ে। তার চেয়ে বড় স্ক্রিপ্ট রাইটার তো আর কেউ নেই। আমার কী সাধ্য, সেই স্ক্রিপ্ট আমি এডিট করি?
আশাকরি তুমি তোমার ফ্যামিলির সাথে সময়টা ভালোই কাটাচ্ছ। তোমার মা কি তোমার সাথে শিকাগোতেই থাকেন? আর তোমার বাবা? তোমার ফ্যামিলি লাইফ সম্পর্কে জানিও। এবং তোমার স্ত্রীর কথাও। দেখেতো মনে হচ্ছে সে খুবই ফ্রেন্ডলি পারসন। আমি জানি না, তোমাকে আগে কখনো বলেছি কিনা, তোমার বৌ কিন্তু ফাটাফাটি সুন্দরী। তোমরা ছেলেরা যাকে বলো হট, সে কিন্তু সেই কিসিমের হট। আর তোমার মেয়ে? তার কথাও জানিও।
তুমি আমাকে নিয়ে এত ভাবো, বিষয়টা ভাবতেও ভালো লাগে। নিজেকে এখন আর একা মনে হয় না। আমি কোনো কিছু নিয়েই আর উতলা হই না। আবগেতাড়িত হয়ে কষ্টও পাই না। দিন শেষে এটা ভেবে ভালো লাগে যে, দূরে হলেও কেউ একজন আছে যার ওপর আমি ভরসা করতে পারি। তোমার ওপর, কেন জানি না, অজানিতেই ভরসা জন্মে গেছে। এই ভরসা আমাকে একটু হলেও কিছু অতিরিক্ত শক্তি জোগায়, সাহস দেয়। জীবনকে এগিয়ে নিতে এই অতিরিক্ত সাহস আর শক্তিটুকুর ভীষণই প্রয়োজন। অনেক ধন্যবাদ ফাহিম। তোমার কাছে অনেক ঋণী হয়ে যাচ্ছি। জানি না এসব ঋণ কী করে শোধ দেব। যদি দেখা হয় কোনোদিন, কী নেবে জানিয়ে দিও আগে ভাগেই।
তোমার হার্টের সমস্যার কথা জেনে ভীষণ উদ্বিগ্ন হয়েছি। আল্লাহর কাছে অনেক প্রার্থনা করছি, তিনি যেন সব সময় তোমাকে সুস্থ রাখেন। তবে আমার অভিজ্ঞতা থেকে এটুকু বলতে পারি, হৃদযন্ত্রের যে কোনো সমস্যাকে হালকাভাবে দেখো না। আবারো বলছি। এটা অনেকটা আমাদের মনের মতোই। যে কোনো মুহূর্তেই বদলে যেতে পারে। রানারও এনলার্জড হার্ট ছিল। যদিও এটা তার জীবনে কোনো সমস্যা সৃষ্টি করে নি তবে তার শেষ নিঃশ্বাস নেবার আগে তার হৃদযন্ত্র বন্ধ হয়ে যায় পুরোপুরিভাবে।
তোমার নিজের ব্যস্ত জীবন এবং তোমার পরিবারের বাইরে আমার জন্য একটু জায়গা আছে এটা জেনে ভীষণ সুখী হলাম। এরজন্য আলাদাভাবে তোমাকে কোনো ধন্যবাদ দিতে চাই না। আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তোমার জীবনে অলিখিত কিংবা অদৃশ্য একটা অধিকার ইতোমধ্যেই তৈরি হয়ে গেছে আমার। সেকথা থাক, হার্টের চিকিৎসা ঠিকঠাক মতো করাও। প্লিজ এটাকে নিয়ে হেলাফেলা করো না। তোমার কিছু হয়ে গেলে সে খবর শোনার মতো মানসিক শক্তি আমার হবে না। আই ক্যান্ট অ্যাফোর্ড টু হিয়ার দ্য নিউজ অফ ইউ সাফারিং ফ্রম এনিথিং! তুমি কি তা বোঝ?
তুমি অবশ্যই আমার হাসি দেখবে। তবে কখন তার সঠিক সময় হয়তো বলতে পারব না এই মুহূর্তে, তবে দেখবে অবশ্যই। তুমি যখন ঢাকা আসবে তখনই দেখবে। অথবা আমি যদি শিকাগোতে যাই। যেতেও তো পারি—কিছু কি বলা যায়?
আজ আর লিখতে ইচ্ছে করছে না। আমি জানি তুমিও আমার মতো দীর্ঘ মেইল পড়তে পছন্দ করো। কি ঠিক বলি নি?
আমি অনলাইনে থাকব কিছুক্ষণ। তোমাকে খুঁজব কিছুক্ষণ। তোমাকে পেলে কথা বলব কিছুক্ষণ। না পেলে মন খারাপ করে থাকব কিছুক্ষণ।
ভালোবাসা তবুও অনেক।
সিমি।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৮)
হ্যালো ফাহিম,
তুমি কি আমার আগের মেইল দুটো পেয়েছিলে? পরপর দুটো মেইল পাঠিয়েছি তোমাকে। দুদিন হয়ে গেল, কোনো উত্তর এলো না। একটু অবাকই হলাম। তুমি ঠিক আছ?
তোমাকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছিলাম। আমাকে কোনো টেক্সটও পাঠাও নি। আমি বলেছিলাম তুমি চ্যাট করতে না পারলে আমাকে টেক্সট করে জানিও। আমি তাহলে আর লগইন করব না। তুমি কিছু জানাও নি, তবুও আমি গত দুদিন অফিসে যাওয়ার আগে তুমি অনলাইনে আছ কিনা দেখার জন্য লগইন করেছি। তুমি ছিলে না। একটা মেসেজও রাখো নি আমার জন্য। ইশ কী নিষ্ঠুর একটা মানুষ তুমি।
তোমার মেইলের অপেক্ষায়, মন খারাপ করে বসে আছি আমি।
হোপ অল ইজ ওয়েল। লাভ ইউ।
সিমি।
…
পরের দিনও কোনো মেইল এলো না। সিমি অফিস থেকে ফিরে আবারো দু’লাইন লিখে পাঠাল ফাহিমের ঠিকানায়।
হোয়াট ফাহিম? নো মেইল ফর মি? মি স্যাড ☹
এটা খুবই অন্যায়। ভীষণ। তুমি জানো একজন মানুষ তোমার মেইলের অপেক্ষায় থাকে। অথচ তার কথা তোমার মনেই পড়ছে না। এটা কোনো কথা? আরে বাবা, দুটো লাইন লিখে তো পাঠাতে পারো। নাহয় টেক্সট মেসেজ দাও। অথবা ইয়াহুতে।
এভাবে চুপ করে থাকলে আমার বুঝি কষ্ট হয় না? কী হয়েছে তোমার? আমি কি এমন কিছু লিখেছি কিংবা আমার কোনো কথায় কি তুমি আহত হয়েছ? কিছু একটা তো বলো।
এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে তোমার সাথে জীবনেও কোনো সম্পর্ক রাখব না। মাইন্ড ইট। আমি মেইল চাই। বড়, অনেক বড় মেইল। ভুল করেও ভুলে যেন যাওয়া না হয়। ওকে?
তোমার বিহনে আমার মন কেমন কেমন করে, তুমি কি তা বোঝ?
আমার মন কেমন করে—কে জানে, কে জানে, কে জানে কাহার তরে!
আশাকরি, বড় কোনো ঝামেলায় তুমি পড় নি।
ভালো থেকো।
সিমি।
…
আরো একদিন গেল। অফিসে বেশ কয়েকবার মেইল চেক করে দেখেছে—কোনো মেইল নেই ফাহিমের। সেদিন ফাহিমের ফোন নাম্বারটা চেয়ে নেয়া উচিৎ ছিল। অন্তত ফোন করে জানা যেত? সিমির মনে হঠাৎ করে আরো একটা আশঙ্কা দেখা দিল। আসলে ফাহিমের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে সে কিছুই জানে না। সিমি জানতে চায় নি তার পরিবারের কথা। আমেরিকাতে সে নিশ্চয়ই একা থাকে না। তার হয়তো একটা ফ্যামিলি আছে। স্ত্রী আছে। ছেলে-মেয়ে আছে। সেটাই স্বাভাবিক। চল্লিশ বছরের একজন পুরুষ নিশ্চয়ই একা নেই।
অবশেষে ফাহিমের মেইল পেল সিমি। ছোট একটা মেইল তবুও সিমির আনন্দের সীমা রইল না। পরপর চারদিন ফাহিমের মেইল না পেয়ে ভীষণ রকমের মুষড়ে পড়েছিল সে। কী যেন নাই নাই অনুভূতি হচ্ছিল তার। আজ ভালো লাগছে। ফাহিম লিখেছে—
সিমি,
আমি আছি, যাই নি কোথাও। তোমার সব মেইলগুলিই পেয়েছি। অফিস থেকে হঠাৎ করেই একটা ক্লায়েন্ট সাইটে যেতে হয়েছিল। ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। পারসোনাল মেইল চেক করার কোনো সুযোগই ছিল না। চারদিন পরে তোমার মেইলের উত্তর লিখতে বসলাম। তবে তোমার সবগুলো মেইলের উত্তর হয়তো দেয়া হবে না একসাথে। শুধু তোমাকে অশ্বত্ব করার জন্য এটুকুই লেখা আপাতত। আজ চ্যাট করতে পারব। আজ তোমার ওখানে শুক্রবার। তোমার নিশ্চয়ই ডে অফ। বাসায়ই তো থাকবে। চাইলে ফোনে কথাও হতে পারে। কথা বলতে চাও?
ফাহিম।
…
সিমি অফিস থেকে এসে মেইলের উত্তর লিখল।
ফাহিম,
উফ হাফ ছেড়ে বাঁচলাম। কী টেনশনেই না পড়েছিলাম। যাক তুমি সুস্থ আছ এটাই বড় কথা। তুমি জানো আমি কতটা অপেক্ষা করে থাকি তোমার মেইলের। তোমার মেইল পাওয়ার চেয়ে ভালো কিছু আর কী হতে পারে? কিন্তু তারচেয়েও বড় কিছু হবে যদি তোমার সাথে সত্যিই কথা বলতে পারি।
অবশ্যই কথা বলতে চাই। আমি ভীষণ খুশি হবো। ইনফ্যাক্ট আমি ইগারলি অপেক্ষা করছি কখন তোমার কণ্ঠস্বর শুনতে পাবো। আমি যতটা না এক্সাইটেড, একই সাথে ঠিক ততটাই নার্ভাস হয়ে আছি। অথচ কেন তা বুঝতে পারছি না। এ যেন নতুন করে কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে আমার জীবনে। ভাবতেই পারছি না—সত্যিই অবশেষে আমাদের কথা হবে।
সে পর্যন্ত ভালো থাকি—তুমিও থেকো।
সিমি।
…
সিমি অপেক্ষা করল, কিন্তু ফাহিমের কোনো সারা পাওয়া গেল না। না ফোন কল, না টেক্সট মেসেজ, না ইমেইল। সে ভীষণরকমের আশাহত হয়ে পড়ল। ফাহিম বলেছিল ফোনে কথা বলবে আজ। কতটা আগ্রহ নিয়ে বসেছিল সে। অথচ… কী হয় ছেলেটার? হুট করেই নাই হয়ে যায়?
ফাহিমকে সে খুব মিস করছে, কিন্তু কেন? যাকে এখনো সামনা সামনি দেখেনি, কখনো ফোনেও কথা হয় নি। শুধুই কয়েকটি মেইলের আদান-প্রদান আর তাতেই তার এমন অবস্থা? তবে ফাহিম কি তাকে মিস করে না? সিমি বুঝতে পারে নি, কখন থেকে, কী করে সে ফাহিমকে এতটা একান্ত কাছের মানুষ ভাবতে শুরু করেছে।
সিমির খুব মন খারাপ হলে তার রানার কথা মনে পড়ে। রানা সামনে চলে আসতেই তার পেছনের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। পেছনের কথা ভাবতে ভাবতেই একটা দীর্ঘ ইমেইল লেখা শুরু করল সিমি। অনেকটা ডায়েরী লেখার মতো।
সাবজেক্ট লাইনে লিখল, আজি এ প্রভাতে রবির কর কেমনে পশিল প্রাণের পর, কেমনে পশিল গুহার আঁধারে প্রভাতপাখির গান!
ফাহিম প্রিয় বন্ধু আমার,
একটা সময় ছিল, যখন আমি সারাদিন লিখতে পারতাম। কতকিছু লিখতাম। আমার দিন কেটে যেত টাইপ করতে করতে। অথচ সেই আমি এখন আর লিখতে পারি না। যখনই আমি কিছু লিখতে শুরু করি, আমার রানার কথা মনে পড়ে। আমার সব লেখাগুলোর প্রথম সমালোচক ছিল সে। সে ছিল আমার শিক্ষক, আমার মেন্টর। আজকের এই আমাকে, যদি তুমি বলো আমি স্মার্ট, তবে সেই স্মার্টনেস আমার মধ্যে এনে দিয়েছে রানা। আমি ইংরেজিতে বরাবরই ছিলাম ভীষণ কাঁচা—রানাই আমাকে ইংরেজি উচ্চারণ শিখিয়েছে। শিখিয়েছে বাচনভঙ্গি, শব্দ চয়ন। কথা বলার সময় আত্মবিশ্বাস, মাথা উঁচু করে কথা বলা—সব কিছুই তার কৃতিত্ব। আমি সব সময় একটু লাজুক প্রকৃতির ছিলাম। মানুষের সামনে কথা বলতে লজ্জা পেতাম। হাতাশাবাদী মানুষ বলতে যা বোঝায় আমি ছিলাম তেমনই একজন। কিন্তু রানাই আমাকে শিখিয়েছে কীভাবে আশাবাদী হতে হয়। লক্ষে না পৌঁছানো পর্যন্ত লেগে থাকতে হয়। সে একবার আমার ডায়েরীতে লিখেছিল, “life at times seems to me like a losing battle, but I never gave up the fight.” সত্যিকার অর্থেই সে ছিল একজন সাহসী যোদ্ধা। বেঁচে থাকার প্রতিটি দিন প্রতিটি মুহূর্ত সে যুদ্ধ করে গেছে—শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত।
আমাদের দিনগুলো ছিল অনেক কষ্টের। এখন যখন সেসব দিনের কথা মনে পড়ে, আমার চোখ ভিজে আসে। আহারে কী দিন গেছে আমাদের! রানার চিকিৎসার জন্য আমাদের হাতে কোনো টাকা ছিল না।
আমরা অনেক স্ট্রাগল করেছি। রানার চিকিৎসার ব্যয় বহন করার জন্য, এক পর্যায়ে একে একে আমাদের গাড়ি, হাই-ফাই মিউজিক সেট, টিভি, ভিসিআর এমন কি বিয়ের গয়নাগুলোও বিক্রি করতে হয়েছিল। কিন্তু আমরা কিছুতেই হাল ছেড়ে দেই নি। কীভাবে আমি ভুলে যাবো সেই দিনগুলি?
আই ফিল প্রাউড টু বি হিজ ওয়াইফ। যদি পুনর্জন্ম বলে কিছু থাকে তবে আমি আল্লাহর কাছে একটিই জিনিষই চাইব, তিনি যেন সেই জীবনেও রানাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্দিষ্ট করে দেন। একজন স্বামী হিসেবে, সে ছিল মহান। একজন বন্ধু হিসেবে—অতুলনীয়। একজন সমালোচক হিসেবে—অপরিসীম। একজন শিক্ষক হিসেবে—অসাধারণ।
রানা নেই। কোনোদিন ফিরেও আসবে না আর। কিন্তু এই সহজ অথচ নিষ্ঠুর সত্যিটাকে আমি মেনে নিতে পারছি না। কষ্ট হচ্ছে। প্রতিদিন। প্রতি মুহূর্ত। আর মেনে না নিয়েই বা কী করব? এটাই আমার জীবন—আমার নিয়তি। যে কষ্ট সে পেয়েছে তা ছিল অসহনীয়। মাঝে মাঝে মনে হয়, সে বেঁচে নেই, এটা একদিকে ভালোই হয়েছে। সহ্যসীমার বাইরের এই কষ্ট থেকে সে মুক্তি পেয়েছে।
রানার কথা বলার জন্য এই মেইলটি আমি লিখতে চাই নি। তার কথা এনেছি শুধু বোঝানোর জন্য, কত শক্ত এবং সাহসিকতা নিয়ে সে এক একটা পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছে। আমি কখনো তাকে নিরাশ হতে দেখি নি। হতাশা শব্দটি তার অভিধানে ছিল না। শত অসুস্থতার মধ্যেও যখনই সে একটু ভালো বোধ করত, সে খুনসুটিতে মেতে উঠত। জোকস বলত। হাসত সবার দিকে তাকিয়ে। সে ছিল একজন সুখী মানুষ। আমি ছিলাম তার অনুসারী।
আমার কি মনে জানো ফাহিম, ‘সুখ’ বিষয়টা হচ্ছে এমন, যে তুমি আগেই সিদ্ধান্ত নিয়ে নাও যে তুমি সুখী হবে কি হবে না। জীবনে যা ঘটে গেছে, সেই সত্যিটাকে তুমি মেনে নাও আর না নাও, তোমার ভবিষ্যৎ কিন্তু তার ওপর নির্ভর করে না। এভাবেই আমি আমার মনকে গুছিয়ে নেই।
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে দিনের শুরুতেই আমি সিদ্ধান্ত নেই। আমার দুটো অপশন: চাইলে আমি সারাদিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে জীবনের সমস্যাগুলো গণনা করতে পারি অথবা আমার একাকীত্ব নিয়ে হা হুতাশ করতে পারি। অথবা বিছানা থেকে নেমে সুন্দর সকালের দিকে তাকিয়ে সৃষ্টিকর্তার প্রতি কৃতজ্ঞবোধ করতে পারি এইজন্যে যে তিনি আমাকে আরেকটি সকাল দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন এই ভেবে।
প্রতিটা দিনই কিন্তু একটা উপহার। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত আমার চোখ খোলা, আমি ফোকাস করব নতুন এই দিনটির প্রতি এবং আমার যত সুখের স্মৃতি জমা হয়েছে সেখানে।
মানুষের বয়স আর জীবন হচ্ছে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের মতো। তুমি যা জমা রাখবে, একসময় তাই তুলতে পারবে। আমি তাই চেষ্টা করি, জীবনের যত সুখ, আনন্দ, ভালোলাগার স্মৃতি, মুহূর্তগুলো এই অ্যাকাউন্টে জমা রাখতে।
তোমার প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং ধন্যবাদ আমার এই মেমরি ব্যাংকের অংশীদার হয়ে কিছু সুখ, কিছু আনন্দ জমা রাখার জন্য। আমি প্রতিদিন কিছু না কিছু জমা রেখে চলেছি।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৭)
জানি আমার বিরহে তুমি কাতর নও—হবার তো তেমন কোনো কারণও নেই। তবুও কিউরিয়াস মাইন্ড ওয়ান্টস টু নো—কার কথা ভেবে ভেবে গানটি গাইছিলে তুমি? লিখেছ, নিঃসঙ্গ নিজেকে সঙ্গ দেবার জন্য, তাই কি?
‘সময় যেন কাটে না’ সামিনা চৌধুরীর এই গানটি আমি জিঙ্গেল হিসেবে প্রথম দেখেছি টিভিতে (অপি করিম মডেল ছিল), সম্পূর্ণ গানটি শোনার সুযোগ হয় নি। গানের লাইনগুলি যখন পড়ছিলাম, আমার চোখে অপির মুখাবয়বটিই ভাসছিল। কিন্তু অপির জায়গায় আমি তোমার ছবিটি দেখতে চাইছিলাম। কিন্তু কিছুতেই তোমাকে কল্পনায় মেলাতে পারছিলাম না। আচ্ছা, তুমি কি কোনো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলে?
ইশ কবে যে তোমাকে দেখতে পাবো? তোমার একটা ছবি কি আমাকে পাঠাতে পারো? না কি তোমাকে দেখার জন্যে বাংলাদেশেই যেতে হবে আমাকে?
আচ্ছা তুমি তো আমার ছবি দেখেছ, তাই না? কিছু তো বললে না।
আমার কেন যেন মনে হয়, আমাকে যত বেশি জানবে হঠাৎ করেই তুমি মন বদলে ফেলবে এক সময়।
তুমি ঠিকই বলেছ, চিঠি কিন্তু কথা বলার চেয়েও ভালো মাধ্যম। তুমি চাইলেই তোমার সব কথা কোনো সংশয় ছাড়াই বলতে পারো। তাহলে আমাদের এই ইলেকট্রনিক চিঠির আদান-প্রদান চলতে থাকুক, কী বলো?
আমার সঙ্গে কথা বলতে তুমি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করো জেনে আশ্বস্ত হলাম। একটা ব্যাপারে আমি তোমাকে নিশ্চিত করতে চাই আর তা হলো, আমার কাছ থেকে তুমি কখনো আঘাত পাবে না। তোমার মতো আমিও বিশ্বাস করি, আমরা একে অপরের ভালো বন্ধু হতে পারব।
তুমি হয়তো এখন গভীর ঘুমে। আমার দিনের শেষ প্রায়। এখনই বাসায় যাবো। তার আগেই ভাবলাম তোমার জন্য একটা মেইল পাঠিয়ে দেই। আমি জানি, কেউ একজন আমার চিঠির অপেক্ষায় থাকে সারাক্ষণ।
তোমাকে বোর করতে চাচ্ছি না। তোমার দিনের শুরুটা অন্য রকম হওয়ার বদলে বিরক্তিকর হতে পারে এই চিঠি পড়ে। মাঝে মাঝে খুব আফসোস হয়, ইশ আমি যদি কবি লেখকদের মতো সুন্দর করে লিখতে পারতাম!
আপাতত এটুকুই। ভালো থেকো।
ফাহিম।
পুনশ্চ: ফাহিম আমার অনেক পছন্দের নাম। আমার নামটি বদলে না দেবার জন্যে অশেষ কৃতজ্ঞতা।
…
ফাহিম, প্রিয়তম বন্ধু আমার—
লক্ষ করলাম, তোমার আগের মেইলটিতে তুমি কোনো সম্বোধন করো নি আমায়! কেন? এর আগে লিখেছো প্রিয় সিমি। আমি কি তাহলে অপ্রিয় হয়ে গেলাম? তাহলে অপ্রিয় সিমিই লিখতে!
তুমি হাসছ আমি জানি।
তোমার চিঠি পেতে আমার খুব ভালো লাগে, এটা আর নতুন কিছু নয়। নতুন করে যেটা যোগ করতে চাচ্ছি আর তা হলো তোমার লেখা আমার শুধু ভালোই লাগে তা নয়, আমি এখন তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষায় থাকি তোমার মেইলের। আজ আমার নতুন কাজের দ্বিতীয় দিন। আমি অলরেডি দশ মিনিট লেট। এখনো বের হতে পারি নি। কিন্তু তোমার মেইল এসেছে কিনা সেটা চেক না করে আমি বের হতেই পারলাম না। এবার বোঝা গেছে ব্যাপারটা?
তুমি ঠিকই বলেছ, সময় যেন কাটে না, গানটি একটেলের একটি বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয়েছে। বিজ্ঞাপনটি দেখার আগে আমিও গানটি শুনি নি। গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই কোনো একটা টিভি চ্যানেলে দেখলাম সামিনা চৌধুরী গানটি গাচ্ছে। এবং সঙ্গে সঙ্গেই ভীষণ ভালো লেগে যায় আমার। বিশেষ করে গানের কথাগুলো। ঠিক যেন আমারই কথা—আমার কথা ভেবেই লেখা হয়েছে।
তুমি আমাকে দেখতে চেয়েছ। খুব শীঘ্রই আমার কিছু ছবি পাঠিয়ে দেবো তোমাকে। এখানকার নেটের যা অবস্থা এই মুহূর্তে ছবি আপলোড করতে গেলে অনেক সময় লেগে যাবে, সেক্ষেত্রে অফিসে যেতে অনেকই দেরী হয়ে যাবে। অফিসের দ্বিতীয় দিনেই দেরীতে যাওয়া মোটেই সমীচীন হবে না।
বরং তুমি তোমার কিছু ছবি পাঠিয়ে দাও আমার জন্য। যদিও আমি ইয়াহুতে তোমার একটা ছবি দেখেছি, সেটা তোমার মুখের একটা সাইড ভিউ শুধু এবং আকারে খুবই ছোট। দেখেতো মনে হচ্ছে তুমি বেশ হ্যান্ডসাম। তবে গায়ের রঙটা কিঞ্চিৎ কালোই হবে হয়তো। আমাদের দেশে যাকে বলে শ্যামলা। তোমরা কী বলো—ব্রাউন? যাইহোক ব্ল্যাক অর ব্রাউন কোনো জরুরী বিষয় নয়। ফ্রেন্ডশিপ ইজ নট অ্যাবাউট লুক, ইটস অল অ্যাবাউট মেন্টালিটি। তাই নয় কি?
আজ তোমাকে অনলাইনে পাবো ভেবেছিলাম। মনে হচ্ছে তুমি ব্যস্ত আছো। সমস্যা নেই, কালকে নাহয় চ্যাট করবো। আমার সকালে, তোমার সন্ধ্যায়—অবশ্যই যদি তুমি ফ্রি থাকো।
দেখেছ, আমাকে কথায় পেয়ে বসেছে। আজকে অফিসে নির্ঘাত দেরী হবে। আমি যাই। তুমি অপেক্ষায় থাকবে তাই তাড়াহুড়ো করে লিখলাম।
তোমার মেইলের আকার যেমনই হোক তাতে কিছু যায় আসে না। এক লাইনের না এক হাজার লাইনের তা মুখ্য নয়। অবশ্য আমি কিন্তু বড় মেইল লিখতে এবং পড়তে পছন্দ করি। আমার ধারণা তুমি ইতোমধ্যেই তা জেনে গেছ।
আবারো লিখব, কাজ থেকে ফিরেই। সুন্দর থেকো। হ্যাভ অ্যা ওয়ান্ডারফুল স্লিপ এন্ড সুইট ড্রিম।
ভালোবাসা জেনো।
অপ্রিয় সিমি।
পুনশ্চ: তুমি ভালো লিখতে পারো না, এ কথাটা মোটেও ঠিক না ফাহিম। তোমার কথার মায়ায় এই আমি কেমন করে আঁটকে যাচ্ছি, একটু একটু করে, দেখেছ? এমন করে এর আগে কোনো ছেলে আমাকে লিখে নি কখনও। কোনো কাব্য নয় বরং তোমার এই সাধারণ সাদামাটা সহজ কথাই আমাকে নেশা ধরিয়ে দেয়। আমি চাই না, আমার এ নেশা কেটে যাক সহসাই।
…
ঘুমতে যাবার আগে সিমি আরো একটা দীর্ঘ মেইল লিখল ফাহিমকে। রাত ১২টা পেরিয়ে ১৪ মিনিট।
প্রিয় ফাহিম,
আমি ঐদিন সন্ধ্যায় বিশেষ কারো জন্যেই অপেক্ষা করছিলাম না। কিছু এলোমেলো ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম। আমার সেই ভাবনার মাঝে তুমিও খানিকটা জায়গা করে নিয়েছিলে। খানিকটা নয়, বেশ খানিকটা। আমি যদি বলি আমি আসলে অপেক্ষা করছিলাম আমার নতুন বন্ধুর চিঠির, ভাবছিলাম তারই কথা।
নাহ, আমি কোনো জানালার ধারে দাঁড়িয়ে ছিলাম না। আমি আর আগের মতো সেই রোম্যান্টিক সিমি নেই। আর তুমি যদি শো-বিজের কোনো তারকার সাথে আমাকে কম্পেয়ার করো বা মিলিয়ে দেখতে চাও—হে প্রিয় বন্ধু আমার, তুমি শুধু হতাশই হবে। কাজেই এখনই সতর্ক হয়ে যাও। পরে কিন্তু আমাকে ব্লেম করতে পারবে না।
টিপিক্যাল বাঙালি মেয়েদের মতোই আমি খুবই সাদামাটা সাধারণ একটা মেয়ে। আমার চেহারার মধ্যে কোনো চমক নেই। তারপরেও, তুমি চাইলে অবশ্যই আমার ছবি তোমাকে পাঠাব। অবশ্য তার আগে ফটো অ্যালবাম থেকে কিছু ছবি নিয়ে স্ক্যান করাতে হবে। আমিও কিন্তু তোমার ছবি দেখার অপেক্ষায় আছি। তোমার ইয়াহু আইডিতে যে থাম্বনেইল ছবিটি আছে, সেটি খুবই ছোট যা থেকে তুমি আসলে দেখতে ঠিক কেমন তা উদ্ধার করা কঠিন। আমার আগের মেইলে কী লিখেছি তা মোটেও ঠিক নয়।
সত্যি কথা যদি বলি, আমার আসলে খুবই ইচ্ছে হচ্ছে তোমাকে দেখতে। সশরীরে। সামনা-সামনি। তুমি এত দূরে থাকো কেন বলতো? আচ্ছা তুমি শেষ কবে দেশে এসেছিলে?
চিঠির মাধ্যমে একে অপরকে বেশ ভালোভাবেই জানা যায়। তবে চ্যাটিং এর কিন্তু একটা আলাদা প্রাণ আছে। একজন জীবন্ত মানুষের সাথে সরাসরি কথা বলার মতোই অনেকটা। তারপরেও চিঠিই কিন্তু পারে দুজন মানুষকে দুজনার খুব কাছে টেনে নিতে।
আচ্ছা শোনো, দীর্ঘ চিঠি লিখে মানুষকে বিরক্ত করতে আমার কিন্তু বেশ লাগে। আমার ধারণা, তুমি ইতোমধ্যেই নিশ্চয়ই তার কিছুটা নমুনা দেখতে পেয়েছ।
তোমার সঙ্গে স্বল্প সময়ের জন্যে হলেও চ্যাট করে খুব ভালো লাগল। মনে হচ্ছিল তোমাকে আমি অনেকদিন থেকেই চিনি। সিরিয়াসলি বলছি। হ্যাঁ এ কথা ঠিক, আমি তোমাকে চিনি না, এবং আমি তোমার সম্পর্কে বেশিকিছু জানতে চাই না, চিনতেও না। আমি ঠিক তোমার সম্পর্কে ততটুকুই জানতে চাই, যতটুকু তুমি জানাতে চাও। কেউ তার ব্যক্তিগত জীবনের কিছু বা অনেক কিছু কাউকে জানাতে চাইতে নাই পারে—এটা তার অধিকার। সেই অধিকার খর্ব করার আমি কে?
তোমার ইতিহাসটা কী আমি জানি না, জানতে চাইও না, শুধু এটুকুই বলব, পেছনের কোনো জটিলতা (যদি থাকে) নিয়ে সাফার করার কোনো মানে হয় না। যা ঘটে গেছে, গেছে। সামনের জীবনটা অন্য রকম হোক—সে চেষ্টাই করা উচিৎ। জীবনটা হওয়া উচিৎ হেমন্তের বিকেলের মতো—শরীর জুড়িয়ে যাবার মতো যথেষ্ট ঠাণ্ডা আবার যথেষ্ট গরম যাতে ঠাণ্ডাটা শরীরে বসে না যায়।
আমার ধারণা, তুমি এখন অফিসে। আজ রাতে আমাদের চ্যাট হবে? মানে তোমার সন্ধ্যা আর আমার ভোর। যদি কথা হয়, শুধু তাহলেই আমি লগইন করব, নাহলে অফিসের যাওয়ার আগে সময় নষ্ট করতে চাই না। এমনিতেই ঢাকার ট্রাফিক জ্যামের অবস্থা ভয়াবহ। অফিসে যেতে একঘণ্টার ওপরে লেগে যায়। নতুন কাজে বারে বারে দেরীতে যাওয়া কোনো ভালো কথা না।
তোমাকে আমার ফোন নাম্বার দিয়েছি কিন্তু, যদি মাইন্ড চেঞ্জ করো, আমাকে টেক্স করে জানিয়ে দিও। আবারো বলছি, তুমি চ্যাট করতে না পারলে আমি লগইন করব না। মনে থাকে যেন!
আমার কথা ভেবে তুমি যে দ্রুত আমার মেইলের উত্তর দাও, এটা জেনে আমি ভীষণ আহ্লাদিত। এতটা গুরুত্ব পাওয়ার যোগ্য কি আমি? আমার প্রতি তোমার এই স্পেশাল অ্যাটেনশন দেয়ার জন্যে কী করে ধন্যবাদ দিব জানি না, তবে এই স্পেশাল অ্যাটেনশন আমি পেতে চাই, একই ভাবে—দীর্ঘদিন!
তুমি কয়েকবার জানতে চেয়েছ, নতুন কাজে আমার প্রথম দিনটি কেমন কেটেছে। ভালো না। একেবারেই। আমার সহকর্মীরা সবাই খুবই ভালো, কেয়ারিং অ্যান্ড হেল্পফুল। অফিসটাও খুব সুন্দর, পরিপাটি করে সাজানো। যেখানে যেটা থাকার সেখানেই সেটা আছে। ঢাকার আবহাওয়াও ছিল আশানুরূপ সুন্দর। নাতিশীতোষ্ণ। সবকিছুই যেমন থাকার কথা তেমনই ছিল। ভালো না লাগার কোনোই কারণ নেই তবুও আমার দিনটি ভালো কাটে নি তার একমাত্র কারণ ছিল—সারাদিনে আমার করার কিছুই ছিল না। হয়তো প্রথম দিন বলেই, কিন্তু তবুও আমি বোর হয়ে যাচ্ছিলাম। কিছুটা ফ্রাস্টেটেডও। আজকের চিত্রটাও একইরকম ছিল। ধারণা করছি, আগামীকাল থেকে হয়তো কিছু কাজ হাতে পাবো, সময়টাও ব্যস্ততার মধ্যে কাটবে।
তোমাকে কি বলেছিলাম আমি দীর্ঘ চিঠি পছন্দ করি? আমি কখনওই বোর হই না। কাজেই, আমাকে যখন লিখবে, দড়ি টেনে ধরবে না, যতক্ষণ ইচ্ছে লিখে যাবে। তোমাকে তো আর পৃষ্ঠা গুনতে হবে না। মেইলিং কস্ট বেড়ে যাবার কোনো ভয়ও নেই। কাজেই লিখবে।
তোমার সম্পর্কে জানিও, যতটুকু জানাতে চাও। আমার অবশ্যই ভালো লাগবে আমি জানি।
ভালোবাসা অফুরান: ফ্রম মি সিমি।
…
পরিশিষ্ট: সিমি মেইলের নিচে *মায়া এঞ্জেলো’র বিখ্যাত কবিতা ‘ফেনোমেনাল ওম্যান’ এর কিছু লাইন লিখে দিয়েছে। কিন্তু কেন দিয়েছে সেই রহস্য উন্মোচন সহসাই করতে পারল না ফাহিম। কবিতাটির সঙ্গে সিমির চরিত্রের কি কোনো মিল আছে? সিমিও কি মায়া এঞ্জেলোর কবিতার মতোই একজন বিস্ময়-রমণী? হয়তো বা। ফাহিমের কাছে অবশ্য পৃথিবীর তাবৎ মেয়েদের বিস্ময়-রমণী মনে হয়। সিমি তো পৃথিবীর বাইরের কেউ নয়।
Phenomenal Woman – Poem by Maya Angelou
Pretty women wonder where my secret lies.
I’m not cute or built to suit a fashion model’s size
But when I start to tell them,
They think I’m telling lies.
I say,
It’s in the reach of my arms,
The span of my hips,
The stride of my step,
The curl of my lips.
I’m a woman
Phenomenally.
Phenomenal woman,
That’s me.
প্রিয়দর্শিনীরা ভেবে পায় না আমার রূপের রহস্য কী!
সুদর্শনা নই আমি কিংবা ফ্যাশন মডেলের মাপে মাপে নয় আমার দেহের গঠন
কিন্তু আমি যখন ওদের বলতে শুরু করি,
ওরা ভাবে, বানিয়ে বলছি,
আমি বলি, রহস্য লুকিয়ে আছে
বাহুদ্বয়ের প্রসারণ ক্ষমতায়,
নিতম্বের বিস্তারে,
ধাপের দৈর্ঘ্যে,
ঠোঁটের বঙ্কিমতায়।
আমি নারী
বাহ্যত।
ধারণাসম্মত রমণী,
সেটাই আমি।
*মায়া এঞ্জেলো ছিলেন একাধারে কবি, নাট্যকার, নৃত্যশিল্পী, কণ্ঠশিল্পী, চলচ্চিত্র পরিচালক, প্রযোজক ও অভিনেত্রী। ১৯৯৩ সালের ২০ শে জানুয়ারী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের অভিষেক অনুষ্ঠানে অ্যাঞ্জেলো তাঁর “অন দ্যা পালস অফ মর্নিং” কবিতাটি আবৃতি করেছিলেন। গায়িকা হিসেবে তার অনেক সাফল্য থাকলেও সঙ্গীতের জন্য তিনি গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হননি। কিন্তু তার নিজের লেখা কবিতা ‘পালস অফ মর্নিং’ আবৃত্তির জন্য লাভ করেন গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড। এর আগে ১৯৬১ সালে প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে ‘দ্য গিফট আউটরাইট’ কবিতার জন্য কবি রবার্ট ফ্রস্ট এই বিশেষ সম্মাননায় ভূষিত হয়েছিলেন। সে হিসেবে রবার্ট ফ্রস্টের পর মায়া এঞ্জেলো একমাত্র কবি যিনি এই পুরস্কারে ভূষিত হন।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৬)
সিমির আগের মেইলটা পেয়ে ফাহিমের মনটা ফুরফুরা ছিল। তার মনের সমস্ত আশঙ্কা মুহূর্তেই কেটে গেছে। সে ফুরফুরে মেজাজ থাকতে থাকতেই আর দেরী না করে উত্তর লিখতে বসে গেল।
সিমি প্রিয় বন্ধু আমার,
তোমার মেইল পেয়ে আমার যে কী ভালো লেগেছে, তখনকার সে অনুভূতি বলে বুঝানো যাবে না। বুকের উপর থেকে যেন বড্ড ভারী একটা পাথর নেমে গেল।
তুমি মেয়েটা সত্যিই অন্যরকম। তোমার মধ্যে কোনো ন্যাকামি নেই। তারচেয়েও বড় কথা কোনোরকম সংকোচ বা দ্বিধাও নেই। এ কদিনে তোমাকে যতটুকু চিনেছি তাতে এটুকু নির্দ্বিধায় বলতে পারি।
এ কথা ঠিক, অনেককে দীর্ঘদিন কাছ থেকে জেনেও জানা হয়ে ওঠে না আবার কারো কারো সঙ্গে স্বল্পকটি চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে এমন একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে যে তা অতি নিবিড়। সম্পর্কের নানা রকম যেমন হয়। জানার ধরণও হয় তেমনি।
তুমি যখন বললে আমার মেইলগুলো তোমাকে শক্তি দেয় কোনো ভাবে, আমি জেনে তৃপ্ত হয়েছি। ভীষণ। তোমাকে নিয়মিত লেখার আগ্রহটা পাকাপোক্ত হলো। অবশ্যই যতদিন তুমি চাইবে, আমি লিখব।
আমার একটা ইয়াহু মেসেঞ্জার আইডি আছে। একটা অনলাইন ম্যাগাজিনে ইন্টারভিউ দেবার জন্য খুলেছিলাম। খুব একটা ব্যবহার করা হয় না। এবার মনে হচ্ছে এটার একটা সুষ্ঠু ব্যবহার হবে।
আগামী এক ঘণ্টার মধ্যে যদি এই মেইল তুমি পড়, তাহলে আমাকে তোমার বাডি লিস্টে অ্যাড করে নিও। তাহলেই এখনই হয়ত তোমার সাথে মেসেঞ্জারে কথা হতে পারে। নাহলে অন্য যে কোনো সময়ে।
আজ এ পর্যন্তই।
ভালো থেকো। খুবই ভালো থেকো সব সময়। তুমি ভালো না থাকলে আমার যে ভালো থাকা হয় না।
ফাহিম।
লাঞ্চব্রেক থেকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরেই সিমিকে মেইলটি পাঠিয়ে দিল ফাহিম।
আজ সারাদিন অনেকগুলো মিটিং ছিল—একটা নতুন প্রজেক্ট শুরু হচ্ছে। মোটামুটি ব্যস্ততায় দিন শেষ করে অফিস থেকে বের হবার ঠিক আগের মুহূর্তে ফাহিম তার পারসোনাল মেইলে লগইন করল এবং যথারীতি দেখতে পেল সিমির মেইল এসে বসে আছে। মুহূর্তেই ফাহিমের চোখমুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সুপ্রিয় ফাহিম,
তোমার মেইলটা পেয়েই উত্তর দিতে বসে গেলাম। একটু তাড়াহুড়োও করছি। আজ একটু আর্লি ঘুমিয়ে পড়তে চাই। কাল সকালে আমার নতুন কাজের জয়েনিং। আমি ভেবে অবাক হচ্ছি, আমার অখণ্ড সময়গুলো কত দ্রুত শেষ হয়ে গেল। কী আর করা!
এখন বলো কেমন আছো তুমি?
আচ্ছা তোমার কি আর কোনো নাম আছে? তোমাকে ফাহিম নামে ডাকতে আমার কোনো সমস্যা অবশ্য নেই, তবে যখনই তোমার নাম ধরে ডাকি, সবসময় শুধুই মনে হয় কেউ আমাকে বলছে ‘জি ভাবী!’ আমার খালাত দেবরের নাম ফাহিম! 😛
আমি তোমাকে দেখতে পেলাম তুমি অনলাইনে আছো, হাই দিলাম, তুমি সারা দিলে না। মনে হয় মেসেঞ্জার অন রেখে চলে গেছো। অসুবিধা নেই, আমি তোমাকে এই ছোট মেইলটি পাঠিয়ে দিয়ে ঘুমাতে যাচ্ছি। তুমি সুযোগ পেলেই উত্তর দেবে। আজকের মতো এটুকুই।
ফাহিম বন্ধু আমার, তোমার মতো সরল, স্বাভাবিক, সুরুচিপূর্ণ মানসিকতার একজন মানুষকে বন্ধু হিসেবে পাওয়াটা ভাগ্যের ব্যাপার। সত্যিই বলছি।
নিজের যত্ন নিও। ভালো থেকো তুমিও। খুবই ভালো থেকো সবসময়। তুমি ভালো না থাকলে আমারও যে ভালো থাকা হয় না। তোমার লাইন চুরি করে লিখে দিলাম। এত সুন্দর কথা কোথায় পাও তুমি?
সিমি।
…
সিমি,
আমার যে কী হয়েছে! যখনই আমি মেইল চেক করি, প্রথমেই খুঁজি তোমার নাম। কিন্তু সমস্যা হলো, যখনই দেখি তোমার নাম নেই, আমি ভীষণ অস্থিরতায় কাতর হয়ে পড়ি। হতাশা গ্রাস করে আমাকে। মনে হয় তুমি বোধহয় আর লিখবে না আমাকে। মনে হয়, তুমি হয়তো মন বদলে ফেলেছ। তারপর মেইল খুলে যখনই তোমার নাম দেখি—কী যে হয় আমার! হাতে যত কাজই থাকুক, সাথে সাথেই মেইল খুলে পড়তে বসে যাই। আমার মনের সব আশঙ্কা দূর হয়ে যায় মুহূর্তেই। অনেক অনেক অনেক ধন্যবাদ।
দুঃখিত আমার অফিস কম্পিউটারে পারসোনাল চ্যাটিং ব্লক করা। সিকিউরিটির কারণেই হয়তো। কাজেই অফিস থেকে তোমার সাথে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ইমেইল। মেসেঞ্জারে চ্যাট করতে হলে বাসায় যেয়ে করতে হবে।
কাল রাতে তোমার সঙ্গে অল্প সময়ের জন্য চ্যাট হলো—উফ, কী যে ভালো লাগল! মনে হচ্ছিল আমাদের বুঝি সামনা সামনিই কথা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল তোমাকে আমি কতদিন থেকে চিনি। তুমি আমার খুব কাছের কেউ।
তুমি কি জানো কী ভীষণ মিষ্টি একটা মেয়ে তুমি?
সরি, আমার তো আর কোনো নাম নেই। তবে তুমি চাইলে তোমার পছন্দের একটা নাম তুমি আমায় দিতে পারো। সেটা আমার জন্য একটা বিশেষ কিছু হবে।
আমি জানি এখন তুমি গভীর ঘুমে। ঘুম থেকে উঠে অফিসে যাবার আগেই যদি তুমি মেইল চেক করো, আশাকরি তোমার ভালো লাগবে।
তোমার নতুন চাকরীর জন্য অভিনন্দন এবং অনেক অনেক শুভ কামনা। খুব শীঘ্রই তোমার সাথে কথা হবে আশাকরি।
ফাহিম (যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি আমায় অন্য কোনো নাম না দিচ্ছ—ততক্ষণ এই নামেই চলুক)।
…
ফাহিম, কেমন আছো? আমি নিশ্চিত তুমি এখন ঘুমাচ্ছ। আমি অফিসে তাই বেশি কিছু লিখতে পারছি না। তবে রাতে বাসায় ফিরেই লম্বা মেইল লিখব। শুধু জেনো, তোমার মেইলটি সত্যিই আমার দিনটাকে অন্যরকম করে দিয়েছে। ভীষণ ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে আছি। ভালো থেকো বন্ধু। সিমি।
…
সিমি, আমি জেগেই ছিলাম—তোমার মেইলের অপেক্ষায়। এখন নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যেতে পারব। তবে নতুন করে অপেক্ষায় থাকব তোমার পরের মেইলটির জন্যে। আশাকরি, তোমার নতুন কাজের সবকিছু ঠিকঠাক যাচ্ছে। বাকী দিনটা ভালো কাটুক। অনেক শুভ কামনা। ফাহিম।
…
সন্ধ্যায় অফিস থেকে ফেরার পর হঠাৎ করেই একাকীত্ব পেয়ে বসল সিমিকে। বাসার বারান্দায় অস্থিরভাবে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করল। তারপর তাকিয়ে রইল আনমনে দূর পানে। নিজেকে ভীষণ নিঃসঙ্গ মানুষ মনে হলো তার। নিঃসঙ্গতা মানুষকে মাঝে মাঝে পেয়ে বসে। এটা কিছুতেই হতে দেয়া যাবে না। সিমি দেখেছে নিঃসঙ্গতা মানুষকে শুধু অসুখীই করে না, মৃত্যুর মুখেও ঠেলে দেয়।
মানুষের জীবনটা বড় অদ্ভুত। কেউ সবার মাঝে থেকেও একা। কেউ সবার থেকে দূরে থেকেও একা। কেউ বা হাজার প্রাপ্তির ভিড়ে একা। দিন শেষে আমরা সবাই একা, তবে কেন এই একাকিত্ব বোধ বা নিঃসঙ্গতা?
নিঃসঙ্গতা মানেই কি একা হয়ে যাওয়া নাকি এটি মনের এমন একটি উপলব্ধি যা আমাদের মনকে বাইরের সমস্ত যোগাযোগ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে দেয়? সিমি এলোমেলো ভাবনার জালে জড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ।
একটা দীর্ঘ সময় পার করে সিমি আগামীকালের অফিসের জন্য সবকিছু গুছিয়ে নিয়ে চিঠি লিখতে বসল ফাহিমকে।
“সময় যেন কাটে না
বড় একা একা লাগে
এই মুখর জনারণ্যে
বিরহী বাতাস বহে
শুধু তোমার জন্যে।”
তুমি কি এই গানটি শুনেছ আগে? সামিনা চৌধুরী গেয়েছেন। অফিস থেকে ফিরে, সন্ধ্যা থেকেই এই গানটি আমি গুনগুন করে গাচ্ছিলাম। আবার ভেবে বসো না তোমার কথা ভেবে কিংবা তোমার বিরহে এই গান গাওয়া। 😛 আমার নিঃসঙ্গ আমিকে সঙ্গ দিচ্ছিলাম বলতে পারো।
তুমি কি জানো, আমিও তোমার মেইলের জন্য কেমন করে অপেক্ষা করি। দিস ইজ ক্রেজি বাট ট্রু। যখনই মেইলবক্স খুলি, আমি জানি, তোমার এক লাইনের একটা মেসেজ হলেও সেখানে অপেক্ষা করছে আমার জন্যে। তোমার দীর্ঘ মেইলটি পড়ে আমার দিনটি সত্যিই অন্যরকম ভালোলাগায় পূর্ণ ছিল। অফিসে কিছুক্ষণ পর পরই মেইল চেক করেছি, দেখলাম ইয়াহুতেও অনলাইনে আছো, কিন্তু সাহস পাই নি তোমাকে একটা হ্যালো পর্যন্ত বলার। তুমি নিশ্চয়ই কিছু মনে করো নি। কথা তো হবেই। অফিসের নিয়মকানুনটা আগে একটু ভালো করে জেনে নেই।
আচ্ছা তুমি এমন কেন বলো তো? মেইল পাঠাতে একটু দেরী হলেই বুঝি ধরে নিতে হবে আমি মন বদলে ফেলেছি? এটা কোনো কথা? আচ্ছা আমি কি কোনো টিনেজ মেয়ে যে হুটহাট আমার মন বদলে যাবে? মেইল লিখতে পারি আর না পারি, তুমি যে আমার ভাবনায় থাকো এটা কি কম?
আমি নিজেও জানি না, আমার অফিস থেকে ইয়াহুতে চ্যাট করতে পারব কিনা। না পারলেও ক্ষতি নেই। আমার কি মনে হয় জানো। এই মেসেঞ্জারে চ্যাটিং ব্যাপারটা ক্ষণস্থায়ী, একটা সময় হারিয়েও যায়। কিন্তু একটা ইমেইলের গুরুত্ব কিন্তু অনেক। একটা হাতে লেখা চিঠির মতোই। দেখো একটা চিঠিতে আমরা কত কথা লিখতে পারি, শেয়ার করতে পারি মনের ভাব। চ্যাটিং এর সময় অনেক হেজিটেশন কাজ করে, কথা বলতে হয় মেপে অথবা ভেবে এবং দ্রুত। ইচ্ছে হলেই অনেক কিছু বলা যায় না। কিন্তু যখন চিঠি লিখতে বসি, কতকিছু লিখতে পারি। আমার কিন্তু মেইল অপশনটাই বেটার মনে হয়। আমি জানি তুমিও আমার সঙ্গে একমত হবে।
গতকাল একটু সময়ের জন্যে তোমার সঙ্গে চ্যাট করে আমারও ভীষণ ভালো লেগেছে। আমি চিন্তাই করি নি, এভাবে তোমাকে পেয়ে যাবো। এ যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টির মতো ছিল ব্যাপারটি। তুমি সত্যিই অমায়িক একটা মানুষ। তোমার সঙ্গে কথা বলতে ভীষণ স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি আমি। যদিও এখনো তোমার সম্পর্কে অনেক কিছুই জানা হয় নি আমার, তবুও মনে হয় তোমার সাথে আমার বন্ধুত্বটা বেশ অনেকদূরই গড়াবে।
তোমাকেও আমার ভীষণ ভালো লাগে ফাহিম।
তোমাকে ডাকার মতো কোনো ছোট নাম না থাকলে সমস্যা নেই। ফাহিম নামটা কিন্তু খারাপ না। আমি তোমাকে এই নামেই ডাকব।
তোমার মেইল এখন আমার জন্যে ডেইলি ডোজ অফ মেডিসিন এর মতো। খুব কাজ করে। আমার টেনশন, ডিপ্রেশন এমনকি নার্ভাসনেসও কেটে যায় আমি যখন তোমার চিঠি পড়ি। তোমার চিঠি আমার নিঃসঙ্গতার সঙ্গ। তোমার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।
তুমি চাইলেই আমাকে ভালো রাখতে পারো। না চাইলে না। কাজেই, লক্ষ রেখো মেডিসিনের ডোজ যেন মিস হয় না কিছুতেই।
অনেক ভালোবাসা।
সিমি।
এ এমন পরিচয় (পর্ব-৩)
রাতে ঘুমানোর আগে ফাহিম মেইলের উত্তর লিখতে বসল। অনেক ভেবে নিয়ে সে লিখল—
‘প্রিয়তমা সিমি,
এটা ঠিক, আমরা একে অপরকে চিনি না। তুমি আমাকে চেনো না, একজন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে কয়েকটি মেইল আদান-প্রদান হয়েছে, শুধু এটুকু পরিচয়ের সূত্র ধরেই কারো সঙ্গে তার একান্ত অনুভূতির কথা ভাগ করে নেয়া হয়ত যায় না—তবুও তুমি বলেছ। তবে একথা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, তোমার কষ্ট আমাকে স্পর্শ করেছে। রাত দশটার দিকে ঘুমাতে যাবার আগে তোমার মেইলটি আমি আবারো পড়লাম এবং সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর লিখতে বসলাম। কিন্তু কী যে হলো, কেন যেন কিছুই লিখতে পারলাম না। রাত বারোটা নাগাদ বিছানায় গিয়ে এপাশ-ওপাশ করে ঘুমানোর চেষ্টা করলাম। ঘুম এলো না। এখন বাজে রাত দু’টোর মতো। তোমার জন্যে কয়েকটি লাইন না লিখে যেন কিছুতেই ঘুম আসছে না। মনে হচ্ছে কিছু একটা মিসিং। অবশেষে বুঝলাম, তোমার জন্য অন্তত একটি লাইন হলেও আমাকে লিখতে হবে।
আমার শুধু তোমাকে একটা কথাই বলার আছে। আমরা যতই একজন আরেকজনকে চিনি আর না চিনি কিন্তু আমার কেবলই মনে হচ্ছে, তুমি আমার অনেকদিনের চেনা—কাছের একজন মানুষ। দূরের কেউ নও। তুমি মুনারও বন্ধু। আর মুনার সঙ্গে আমার বন্ধুত্ব দশ বছরের ওপরে। আমাকে অবিশ্বাস করার কোনোই কারণ নেই। এবং চাইলে ভরসা রাখতেও পারো—নিশ্চিন্তে। অভয় দিয়ে বলছি।
তোমার মনের ভেতরে যত কষ্ট জমে আছে, তা দ্রুত বের হয়ে যাক। আমার প্রতি আস্থা রাখতে পারো। অযাচিতভাবে কাউকে বিরক্ত করার মানুষ আমি নই। ভালো থেকো। শুভেচ্ছা।
ফাহিম।’
রাত দু’টায় মেইল পাঠিয়ে ফাহিম যখন ঘুমাতে গেল, নিজেকে বেশ হালকা লাগছিল তার।
সকালে অফিসে যেয়ে প্রাত্যহিক টিম মিটিং শেষ করে ফাহিম তার বসের সঙ্গে দেখা করতে গেল একটা প্রজেক্টের আপডেট দিতে। ফাহিমের বস জ্যানিস প্যাসিলিও, ষাটোর্ধ আমেরিকান শ্বেতাঙ্গ প্রৌঢ়া। ফাহিমকে সাথে নিয়ে জ্যানিস চলে গেল স্মোকিং এর জন্য নির্ধারিত অফিস বিল্ডিং এর বাইরের জায়গাটাতে। কিছুদিন আগে তার প্রথম ধাপের ফুসফুসের ক্যান্সার ধরা পড়েছে, তারপরেও এই মহিলা সিগারেট ছাড়তে পারছেন না। কী আছে এই সিগারেটে যা ছাড়তে এত অনীহা? সিগারেটে ৬৫ রকমের বেশি ক্যান্সার সৃষ্টিকারী পদার্থ থাকে। নিকোটিন ছাড়াও তিন হাজারেরও বেশি রকম রাসায়নিক পদার্থ ঢুকে যায় ধূমপায়ীর শরীরে। এমন কোন রোগ নেই যার কারণের মধ্যে ধূমপান নেই। আর এই ধূমপানের কারণে সবচেয়ে ভয়াবহ রোগটিই হলো ক্যান্সার।
জ্যানিস বিভিন্ন কথা বলছে কিন্তু ফাহিমের কানে যেন কিছুই ঢুকছে না।
‘কোনো সমস্যা?’ ব্যাপারটা লক্ষ করে জ্যানিস জানতে চাইল।
‘না না কোনো সমস্যা না। তুমি কেমন আছ?’ ফাহিম সপ্রতিভ ভঙ্গিতে জানতে চাইল।
জ্যানিস সিগারেটে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল, ‘আমি ভালো আছি। কিন্তু তোমার কী হয়েছে? মনটা তো এখানে নেই। আমাকে বলতে পারো যদি পারসোনাল ইস্যু না হয়ে থাকে।’
ফাহিম কী বলবে ভেবে পেল না। সকাল থেকে এখন পর্যন্ত সে তার পারসোনাল মেইলগুলো খুলে দেখার সুযোগ পায় নি। অফিসের ইমেইল দেখে আর উত্তর দিতেই সময় চলে যায় অনেক। তারপর টিম মিটিং, এখন বসের সাথে কথা বলতে এসেছে এখানে। ভেতরে ভেতরে যে সে অস্থির হয়ে আছে এবং তার বসের চোখে সেই অস্থিরতা ধরাও পড়ে গেছে। সে দ্রুত উত্তর দিল, ‘না না তেমন কিছু না।’ বলেই সে দ্রুত প্রজেক্টের আপডেট দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
জ্যানিস ওকে পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য কিছু পরামর্শ দিল। কথা শেষ করে চলে যেতে উদ্যত হতেই জ্যানিস ডাকল, ‘ফাহিম!’
জ্যানিসের ডাক শুনে ফাহিম ঘুরে তাকাল।
জ্যানিস বলল, ‘আমি কিছুদিনের জন্যে ছুটি নিচ্ছি—কেমো শুরু হবে। আমি ফিরে না আসা পর্যন্ত যে কোনো দরকারে তুমি মার্গারেটের কাছে যাবে, ওর সঙ্গে কথা বলবে। সব রিপোর্ট তাকেই দেবে। শী উইল বি ইয়োর বস ইন মাই অ্যাবসেন্স।’
ফাহিম মাথা নেড়ে চিন্তিত ভঙ্গিতে তার নিজের রুমে গিয়ে বসল। ঘড়ি দেখল, সকাল দশটা বেজে দশ মিনিট। মাথাটা ধরে আছে মনে হচ্ছে। ফাহিম ব্রেকরুমে গেল কফি আনতে। সকালে অফিসে এসে অনেকের মতোই ফাহিম ব্রেকরুম থেকে এক কাপ কফি নিয়ে ঢুকে তার রুমে। আজকে কফি নেবার সময় হয় নি। সে কফি বানিয়ে নিয়ে এসে বসল তার অফিস কম্পিউটারের সামনে।
কফিতে চুমুক দিতে দিতে পারসোনাল ইমেইলে লগইন করা মাত্রই চোখে পড়ল সিমির মেইল। সকাল ৮টায় এসেছে। তারমানে বাংলাদেশে তখন রাত ৮টা। ফাহিম অবাক হয়ে লক্ষ করল আকারে বেশ বড়ই আজকের মেইলটা। এতদিন যেসব মেইল আদান-প্রদান হয়েছে সেগুলোর তুলনায় যথেষ্ট বড়। সে আগ্রহ নিয়ে পড়া শুরু করল।
‘প্রিয় ফাহিম,
তোমার মেইল পেয়ে আমি অনেকক্ষণ একা একা হেসেছি, কেন জানো? তুমি যা করেছ আমিও ঠিক তাইই করেছি। অস্বস্ত্বিবোধ করছি তবুও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমিও তোমার মেইলের অপেক্ষা করছিলাম। এবং সেটা পেয়েই আমি উত্তর লিখতে শুরু করেছি। তোমার মতোই—যদিও তখনো জানি না, কী লিখব।
আর কিছু লেখার আগে প্রথমেই তোমাকে ধন্যবাদ জানাতে চাই—তোমার সমবেদনা আর সাহস দিয়ে আমাকে লেখার জন্য। আমি কৃতজ্ঞ। আমি ভীষণ খুশি এই ভেবে যে এখন থেকে তোমার মতো একজন সুন্দর হৃদয়ের মানুষকে আমার বন্ধু হিসেবে পাশে পাবো।
তোমাকে ভয় পাবো কেন? আসলে আমি খুব সহজে কাউকে বন্ধু বানাতে পারি না। এমন নয় যে আমি খুঁতখুঁতে। আমি ঠিক পারি না। পারি না সবার সাথে তাল মেলাতে। কিন্তু আমার কেন যেন মনে হচ্ছে, তোমার সাথে আমার যাবে। আমরা হয়ত একে অপরের ভালো বন্ধু হতে পারবো।
তোমার বন্ধু মুনা আর তার প্রেমিক প্রবর অনির্বাণ কদাচিৎ আমাদের বাসায় আসত। তোমাকে কি বলেছি অনির্বাণ ছিল রানার বন্ধু? সেই সুবাদে মুনাকে আমি চিনতাম। শুনেছি ওদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে। যদিও কারণটা আমার অজানা। ব্রেকআপ হয়ে যাবার পর থেকে মুনার সাথে আমার আর কোনো যোগাযোগ নেই। শুধু জানি ও শিকাগোতে ফিরে গেছে এবং সেখানেই আছে কিন্তু কেমন আছে, কী করছে কিছুই জানি না। তোমার সাথে দেখা হলে আমার কথা বলো—আমার শুভেচ্ছা দিও।
আমার জীবনে প্রেম, ভালোবাসা, বন্ধু অথবা গার্জিয়ান বলতে একজনই ছিল আর সে হচ্ছে রানা, মানে আমার স্বামী। রানাই ছিল আমার সব—সব কিছু। বিয়ের আগে প্রায় তিন বছর প্রেম করেছি আমরা। আমাদের বিবাহিত জীবনটাও ছিল অত্যন্ত সুখের এবং চমকপ্রদ। বেশ সুখেই কাটছিল সময়। কিন্তু হঠাৎ করেই ওর চলে যাবার সময় হয়ে গেল। ওর এভাবে চলে যাওয়াটা মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে—খুব। মানিয়ে নিতেও পারছি না। রানা নেই—এই সত্যিটাকে বিশ্বাস করে নিতে ভীষণ সমস্যা হচ্ছে। আমি জানি না, কতদিন লাগবে আমার এই সত্যিটাকে মেনে নিয়ে স্বাভাবিক হতে।
যাইহোক, তোমার মতো একজন বন্ধু যখন পেয়েই গেলাম—মনে হচ্ছে আমাকে বেশিদিন অপেক্ষা করতে হবে না। অনাগত দিনগুলিতে আমার জন্য কী অপেক্ষা করছে জানি না, শুধু এই জানি, রানাই আমার জীবনের সব এবং আমার বাকী জীবনেও তাকে ভুলে যাওয়া হবে না।
আমার মনে হচ্ছে আজকে আমাকে কথায় পেয়ে বসেছে। কত বড় একটা চিঠি লিখে ফেলেছি ইতোমধ্যেই। তুমি বোর হবে জেনেও লিখলাম এত কথা। তুমি তো বলেইছো, আমার সব অনুভূতির কথা তোমাকে জানাতে। এখন বিরক্ত হলেও কিছু করার নেই। তবুও ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি—যদি আমার এই চিঠি তোমাকে কিছুমাত্র বিরক্তের উদ্রেক করে থাকে।
তোমার সাহস জাগানিয়া অসম্ভব সুন্দর চিঠিটির জন্য আরেকবার ধন্যবাদ। আমার খুব ভালো লেগেছে।
আমি অপেক্ষা করবো—তোমার পরের মেইলটির জন্য। তোমার নিজের সম্পর্কেও কিছু জানিও। অন্তত বুঝতে যেন পারি আমার নতুন এই বন্ধুটি কেমন মানুষ!
আজ তবে এই টুকু থাক। বাকী কথা পরে হবে…
শুভেচ্ছা আর শুভ কামনা,
সিমি।’
এ এমন পরিচয় (পর্ব-২)
সাতদিন পর আমেরিকায় ঈদ। ঈদের দিনেও ফাহিম অফিসে গেল। এখানে ঈদের দিন একটা সাধারণ দিনের মতোই। দুপুরের লাঞ্চ ব্রেকে অফিস বসেই কাছের বন্ধু, আত্মীয়, পরিচিত অনেককেই ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে মেসেজ পাঠাল ফাহিম। হঠাৎই কী মনে করে সে ঈদের শুভেচ্ছা জানিয়ে একটা ইমেইল পাঠাল সিমিকে। দুপুর তখন সাড়ে বারোটা, শিকাগোর সময়।
পরেরদিন সকালে সিমির উত্তর এলো। সে লিখেছে, ‘ঈদ মোবারক ফাহিম। মহান আল্লাহতায়ালা তোমার আর তোমার পরিবারের উপর শান্তি বর্ষণ করুন। আমার ধারণা গতকাল তোমাদের ঈদ হয়ে গেছে। আশাকরি ঈদের দিনটি আনন্দেই কেটেছে। আগামীকাল আমাদের ঈদ। অনেক শুভেচ্ছা রইল। সিমি।’
‘তুমি ঠিকই বলেছ। গতকাল আমরা ঈদ পালন করেছি। যদিও দিনের অর্ধেকের বেশি সময় অফিসেই ছিলাম। অফিস শেষে সন্ধ্যাটা কাটিয়েছি আত্মীয় স্বজন আর বন্ধুদের সান্নিধ্যে। তোমাদের ঈদ কি আজকে?’ ফাহিম লিখে পাঠাল।
‘হ্যাঁ, আজ আমাদের ঈদ হচ্ছে। সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। অনেক আনন্দ করছে সবাই। যদিও আমার জন্যে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি।’ এটুকু পড়ে ফাহিম একটু ভাবল। ‘সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি’ এ কথার মানে কী? সে সিমির ইমেইল থেকে বাকী লেখাটুকু পড়ল। ‘আজকের দিনটি বেশ সুন্দর। চারিদিকে রোদের ঝিকিমিকি—একটু গরম অবশ্য পড়েছে, তবে অসহনীয় নয়। যাইহোক, ওয়েদার রিপোর্ট দিয়ে তোমাকে বোর করতে চাচ্ছি না। আশাকরি তুমি ভালো আছ। তাড়াতাড়ি উত্তর দেবার জন্য অনেক ধন্যবাদ। ঈদ মোবারক।’
এরপরে কয়েকদিন আর কোনো ইমেইল লেখা-লেখি হলো না। ফাহিম এরমধ্যে কয়েকবার ভেবেছে—আর একবার কিছু লিখবে কিনা। কাজের ব্যস্ততায় আর কোনো মেসেজ পাঠানো হয় নি ফাহিমের। হঠাৎ করেই সে একদিন এক লাইনের একটা ইমেইল পাঠাল। ‘কাজের ব্যস্ততায় উত্তর দিতে দেরী হলো—দুঃখিত। আশাকরি তোমার ঈদের দিনটি অনেক আনন্দে কেটেছে। শুভেচ্ছা। ফাহিম।’
একটু ভেবে ফাহিম সেন্ড বাটনে চাপ দিল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো, ব্যাপারটা হালকা হয়ে গেল। কাজের ব্যস্ততায় উত্তর দিতে দেরী হলো, এটা কী কথা? ভাবটা এমন যেন ওই প্রান্তে তার ইমেইলের অপেক্ষায় একজন অস্থির হয়ে আছে। কিন্তু এখন আর ভেবে কী হবে। যা হবার তা হয়ে গেছে। ফাহিম অস্বস্তি বোধ করতে লাগল।
ঠিক দশ মিনিটের মধ্যেই সিমির উত্তর এলো। সে ছোট্ট করে লিখেছে, ‘আমার ঈদ মোটেই আনন্দে কাটে নি। শুভেচ্ছা পাঠানোর জন্য ধন্যবাদ।’
ফাহিম বেশ অবাক হলো। সে মনে করতে পারল, আগের ইমেইলে সিমি লিখেছিল সবার সঙ্গে ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। তাহলে এখন এটা কী লিখল সে। দু’দিন আগের ইমেইল খুলে সেসেজটি আবার পড়ল ফাহিম—এবং নিশ্চিত হলো। হ্যাঁ সিমি লিখেছিল, ‘সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই কাটছে দিনটি। অনেক আনন্দ করছে সবাই। যদিও আমার জন্যে সবার সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বেশ কষ্ট হচ্ছে—তবুও চেষ্টা করছি।’ ফাহিম বেশ কয়েকবার পড়ল মেসেজটি। কিন্তু শেষের লাইনটির অর্থ ঠিকমতো বুঝতে পারল না।
একটু ভেবে ফাহিম উত্তরে লিখল, ‘জেনে খারাপ লাগল। কিন্তু ঈদের দিনে তো তোমাকে বেশ প্রফুল্লই মনে হচ্ছিল। তুমি লিখেছিলে, সবার সঙ্গে বেশ ভালোভাবেই দিনটি কাটছে। সবাই আনন্দে করছে। তাহলে কি তুমি যেভাবে চেয়েছিলে—সেভাবে কিছুই হয় নি?’ এটুকু লিখে ফাহিম চুপচাপ বসে রইল। মেসেজটি পাঠানোর আগে আরো কিছুক্ষণ ভাবল। এরপর আর একটি লাইন যোগ করল। ‘বিষয়টি ব্যক্তিগত হলে কিছুই লিখতে হবে না। এমনিই জানতে চাইলাম–তুমি না চাইলে কিছুই জানাতে হবে না। ভালো থেকো।’
দু’দিন কেটে গেল। সিমির কোনো উত্তর এলো না। ফাহিম বেশ আগ্রহ নিয়েই অপেক্ষা করল। তার আগ্রহের কারণটা বোঝা গেল না। কিন্তু তবু সে অপেক্ষা করল—এবং মাঝে মাঝেই ইমেইল খুলে দেখল। তারও একদিন পর সিমির উত্তর এলো। ২৫ মিনিটের ব্যবধানে সিমি দুটো ইমেইল পাঠিয়েছে।
প্রথম মেইলে সে লিখেছে, ‘আসলে সবকিছু ঠিকই ছিল। দিনটিও ছিল সুন্দর। সবাই আনন্দ করছিল—শুধু সবার মাঝে থেকেও নিজেকে একা লাগছিল—ভীষণ একা। আমি জানি না কেন তোমাকে এসব লিখছি। বিষয়টি এমন ব্যক্তিগত নয় যে তোমাকে বলা যাবে না। আসলে মাত্র দু’মাস আগে আমি রানাকে হারিয়েছি। রানা আমার স্বামী। তাকে ছাড়া এটিই ছিল আমার প্রথম ঈদ। স্বাভাবিকভাবেই আমি তাকে মিস করছিলাম। তার অভাবটা কষ্ট দিচ্ছিল খুব—ভীষণ অনুভব করছিলাম। এই আর কী। আমি জানি আমাকে বাস্তবতার মুখোমুখি হতেই হবে একদিন। একসময় হয়তো সব কিছুই মেনে নিতে হবে। যাইহোক, আমি বোধহয় তোমাকে অনেক বিরক্ত করছি এসব বলে। ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। ভালো থেকো। সিমি।’
কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধ থেকে ফাহিম দ্বিতীয় মেইলটিও পড়ল। সিমি লিখেছে, ‘আমার আগের ইমেইলটির জন্যে আমি অত্যন্ত দুঃখিত এবং লজ্জিত। এভাবে আমার ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কথা বলাটা ঠিক হয় নি। তুমি নিশ্চয়ই ভাববে অপরিচিত একজন মানুষকে এত কিছু বলার দরকার কী? তোমাকে বিরক্ত করার জন্যে আবারো দুঃখিত এবং ক্ষমা প্রার্থী।’
দেরী না করে ফাহিম তখনই লিখল, ‘সিমি, আমি তোমার স্বামী হারানোর কথা শুনে যারপর নাই দুঃখিত হয়েছি। এটা অবশ্যই হৃদয়বিদারক একটি বিষয় এবং আমি সমব্যথী। আল্লাহ তোমাকে এই কষ্টের সময়টা পার করতে সাহায্য করবেন নিশ্চয়ই। তিনি তোমাকে এই শোক কাঁটিয়ে উঠবার শক্তি দিক। তুমি কোনোভাবেই আমাকে বিরক্ত করছ না বরং আমি তোমার ইমেইলের অপেক্ষাতেই ছিলাম। নিঃসঙ্কোচে তোমার যা ইচ্ছে লিখতে পারো। তোমাকে দুঃখিত কিংবা লজ্জিত হতে হবে না।’
এটুকু লিখে ফাহিম চুপচাপ বসে রইল। আর কি কিছু লেখা উচিৎ? সে একটু ভাবল। তার খুব জানতে ইচ্ছে করছে, সিমির স্বামীর আসলে কী হয়েছিল। জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে কিনা সে বুঝতে পারছে না। আবার ভাবল, একটা প্রশ্ন করলে সে নিশ্চয়ই উত্তর দিবে—দেরীতে হলেও। কথাবার্তা চালিয়ে যাওয়ার আরেকটা সুযোগ তৈরী হবে। সিমির সঙ্গে কথা বলতে ভালোই লাগছে ফাহিমের। সে লিখল, ‘তোমার স্বামীর কী হয়েছিল জানতে পারি? বলতে না চাইলেও সমস্যা নেই।’ এ পর্যায়ে সে থামল। একটু ভেবে আরো এক লাইন যোগ করল, ‘নিজেকে শক্ত রেখো। আল্লাহ তোমার সহায় হোন। ফাহিম।’
‘প্রিয় ফাহিম,’ সিমি লিখল, ‘আমি তোমার সম্পর্কে কিছুই জানি না। তুমি কে, কোথায় থাকো, কী করো—কিছু না। কিন্তু দেখো, আমি নির্দ্বিধায় তোমাকে আমার জীবনের সবচেয়ে কষ্টের কাহিনীটি বলে যাচ্ছি। অবাক হচ্ছি—কেন? এমন নয় যে আমি আমার কষ্ট বা ব্যথা কারো সঙ্গে ভাগ করে নেবার জন্যে মারা যাচ্ছি। অথচ, কী অবলীলায় আমি বলে যাচ্ছি। আচ্ছা যাইহোক, তুমি জানতে চেয়েছ, তাই বলছি।
গত আট বছর ধরে রানা কিডনি সমস্যায় ভুগছিল। ওর জন্মই হয়েছিল মাত্র একটি কিডনি নিয়ে এবং সেই একমাত্র কিডনিটি গত চার বছর যাবত ঠিকমতো কাজ করছিল না—অকেজো হয়েই ছিল। ২০০৩ সন থেকে তার ডায়ালাইসিস শুরু হয় যা চলছিল তার রেনাল ফেইলিওরের শেষ ধাপ পর্যন্ত। তার শরীরের সব জরুরী অরগ্যানগুলোতেও সমস্যা হচ্ছিল, শেষ পর্যন্ত তার হৃদযন্ত্রও কাজ করা বন্ধ করে দেয়। সে তার শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে ১৭ আগস্ট ২০০৬।
সমবেদনা জানানোর জন্য অশেষ ধন্যবাদ। দ্রুত উত্তর দেবার জন্য ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা রইল। সিমি।’
ফাহিম মেইল পড়ে স্তব্ধ হয়ে রইল দীর্ঘক্ষণ। সে কিছুতেই ভাবতে পারছে না, এমন একটা অবস্থার মুখোমুখি মেয়েটিকে হতে হয়েছে। আরো অবাক হলো এই ভেবে যে, মাত্র আড়াই মাস আগে সিমির হাজবেন্ডের মৃত্যু হয়েছে। আগস্টের ১৭ তারিখে সে মারা গেছে আর আজ অক্টোবর ২৯। ভাবতে ভাবতেই ফাহিমের মন ভারী হয়ে এলো। সিমিকে সহানুভূতি জানিয়ে একটা মেইল পাঠানো দরকার। কিন্তু সে কিছু ভাবতে পারল না। সারাদিন একধরণের বিষণ্ণতায় বুঁদ হয়ে থাকল। অফিসের কাজে মন বসাতে পারল না। একটু তাড়াতাড়িই অফিসের কাজ শেষ করে বাসায় ফিরল ফাহিম।
মধ্যরাতের যাত্রী (বোনাস পর্ব)
হঠাৎ ফোনের শব্দে ঘুম ভেঙে গেল ফাহিমের।
পৃথিবীতে আশি শতাংশ মানুষের সবচেয়ে অপছন্দনীয় কাজ হচ্ছে সকালে ঘুম থেকে ওঠা। ফাহিম সেই আশি শতাংশ দলেরই একজন। সকালের ঘুমটা অনেক প্রিয় তার, বিশেষ করে ছুটির দিনে। যত ইমারজেন্সিই হোক না কেন, এত সকালে সে কিছুতেই চোখ খুলবে না।
বেহায়া ফোনটা একবার থেমে গিয়ে আবার বেজে উঠল। তার এই একাকী জীবনে মাঝে মাঝে ফোনের রিং-টোন শুনতে খারাপ লাগে না। কিন্তু তাই বলে এত সকালে! অনিচ্ছাসত্ত্বেও ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল—অপরিচিত একটা নাম্বার। যা ভেবেছিল তাই, নির্ঘাত টেলিমার্কেটারদের ফোন—ছুটির একটা সকালেও নিস্তার নেই। ফাহিম ফোন কেটে দিল। প্রয়োজনীয় কল হলে ভয়েস মেসেজ তো রাখবেই। তখন কল-ব্যাক করলেই হবে।
শনিবার সকাল। ছুটির দিনে একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠে ফাহিম। কিন্তু কোনো কারণে একবার ঘুম ভেঙে গেলে সহসাই আর ঘুমিয়ে পড়তে পারে না সে। বিছানায় কিছুক্ষণ গড়াগড়ি শেষে অগত্যা উঠে গিয়ে এক কাপ ইনস্ট্যান্ট কফি বানিয়ে নিয়ে এসে দাঁড়াল জানালার পাশে। পর্দা সরিয়ে তাকাল সামনের ছোট পুকুরটির দিকে। ওখানে কৃত্রিমভাবে তৈরি ফোয়ারা থেকে ঝরনার পানির ওঠা নামা করছে। কফিতে চুমুক দিতে দিতে নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় ডুবে যায় সে।
কী কারণে হঠাৎ করেই মেয়েটির কথা মনে পড়ে তার। মনে পড়ে সেদিনের সেই রাতটির কথা। কেমন ঘোরলাগা একটা সময়—অন্যরকম ভালোলাগার কিছু অনুভূতি তাকে গ্রাস করে রাখল
ফাহিম সেদিন লিসার ফোন নাম্বার চায় নি। লিসাও তার নাম্বার রাখে নি। উবার প্রাইভেসির নিয়মে অবশ্য একজন কাস্টমার কিংবা ড্রাইভার তাদের আসল নাম্বার দেখতে পারে না। কাজেই চাইলেও লিসার সঙ্গে আর যোগাযোগ করার উপায় ছিল না। উবার ড্রাইভারদের কত ধরণের বিচিত্র অভিজ্ঞতার কথা সে শুনেছে। অনেক ভয়াবহ এবং ভয়ংকর ঘটনাও আছে। সেদিনের রাতের ঘটনাও অনেক ভয়ংকর হতে পারত। কিন্তু হয় নি। বরং একটা সুন্দর অনুভূতি নিয়ে সে ফিরে এসেছিল।
‘বিপ বিপ…’
আবারো ফোনের শব্দে ফাহিমের নিরবচ্ছিন্ন ভাবনায় ছন্দ পতন ঘটল। তার ফোনটি এখনো বিছানায়, বালিশের পাশেই পড়ে আছে। ফাহিম বিছানা থেকে ফোন তুলে দেখল সেই একই নাম্বার। সে ফোনটা হাতে নিয়ে ভ্রূ কুঁচকে একটু বিরক্ত হয়েই বলল, ‘হ্যালো?’
অপরপ্রান্ত থেকে রিনরিনে কণ্ঠে একটি মেয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘মে আই স্পিক টু ফাহিম প্লিজ?
‘দিস ইজ ফাহিম। হু ইজ দিস?’
‘ক্যান ইউ গেস?’ অপরপ্রান্তের মেয়েটির মুখে রহস্যপূর্ণ হাসি।
নিমিষেই ফাহিম চিনে ফেলল। কণ্ঠটি তার পরিচিত। আসলে খুবই পরিচিত। সে নিশ্চিত হয়েই বলল, ‘তুমি আমার সেই মধ্যরাতের যাত্রী। তোমাকে ভুলি কী করে?’
মেয়েটি হেসে ফেলল। হাসতে হাসতেই বলল, ‘কেমন আছ ফাহিম?’ তার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
‘হুম, ভাল। তুমি?’
‘ভাল না।’
‘ভাল না কেন?’
‘জানি না।’
ফাহিম চুপ করে রইল।
‘আজ বিকেলে কী করছ?’ জানতে চাইল মেয়েটি।
‘এখনো কোনো প্ল্যান নেই। কেন বলো তো?’
‘আমি দেখা করতে চাই।’
‘দেখা করতে চাও?’
‘হ্যাঁ।’
একটু ভেবে ফাহিম জিজ্ঞেস করল, ‘কিন্তু কীভাবে? এত দূর থেকে কীভাবে আসবে?’
‘তা নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না। তুমি দেখা করবে কি না বলো?’
ভেতরে ভেতরে ফাহিম উত্তেজিত হয়ে পড়ল। কেউ যেন তার কর্ণগোচরে মধুর বাণী বর্ষণ করল। এমন মধুর কথা সে যেন তার জীবনে আর কখনই শোনে নি। ফাহিম তার উত্তেজনা চেপে বলল, ‘দেখা করব।’
‘তোমার বাসার ঠিকানাটা টেক্সট করে দাও। আর বলো ঠিক কখন আসব?’
‘তা না হয় দিচ্ছি। কিন্তু তুমি আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেলে?’ ফাহিম অবাক হয়ে জানতে চাইল।
সেই রহস্যমাখা হাসি দিয়ে লিসা বলল, ‘ইচ্ছে থাকলে সবই সম্ভব মি: ।’
‘হ্যাঁ তা তো দেখতেই পাচ্ছি—তবুও জানতে চাইছি।’
‘বলব না—দেখি তুমি ভেবে বের করতে পার কি না।’
ফাহিম কিছু বলল না। গভীর চিন্তায় পড়ে গেল সে। হঠাৎ করেই সেই রাতের কথা মনে পড়ে গেল আবার। খুব বেশিদিন আগের কথা তো নয়। এর মধ্যে লিসার কথা তার প্রতিদিনই মনে পড়েছে। কিন্তু যোগাযোগের কোনো উপায় যেহেতু ছিল না, তাই সেও আর কিছু চিন্তা করে নি। তবে লিসা যেভাবেই হোক, তার ফোন নাম্বারটা যোগার করে নিয়েছে, এ বিষয়টি তাকে অভিভূত করল। এবং তার বেশ ভালও লাগল। সে মনে মনে মেয়েটির বুদ্ধির তারিফ করল।
‘কই ঠিকানাটা পাঠাও।’ লিসা তাড়া দিল।
‘এখুনি পাঠাচ্ছি।’
‘সি ইউ সুন।’ বলেই লাইন কেটে দিল লিসা।
ফাহিম তার বাসার ঠিকানাটি এসএমএস করে দিল লিসার নাম্বারে। তারপর ফোনটা হাতে নিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। কফির কাপে চুমুক দিয়ে নামিয়ে রাখল। কফি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে অনেক আগেই। হঠাৎ সে লক্ষ করল, তার বেডরুমের চারিদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাপড় চোপড়, একটা প্লেটে আধ খাওয়া এক স্লাইস পিজ্জা। বিছানার চাদরটাও বদলানো দরকার। সে দ্রুত হস্তে রুমটাকে পরিপাটি করে ফেলল। ছুটির দিনে সে সাধারণত শেভ করে না। গোসলের আগে সে শেভ করে নিল। ব্লু-জিন্সের সাথে সাদা একটা টি-শার্ট ছেড়ে দিল গায়ের ওপরে। তার ফেভারিট ভার্সাসে ব্রান্ডের কোলন স্প্রে করে দিল সারা শরীরে। অল্প সময়ের মধ্যেই নিজেকে তৈরি করে অপেক্ষা করতে লাগল ফাহিম।
ফাহিমের এমন লাগছে কেন কে জানে? লিসার ফোন পাওয়ার পর থেকেই তার ভেতরে একধরণের উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। লিসার ফোন করার ব্যাপারটা তাকে ভাবিয়ে তুলল। ফোনটা কি কাকতালীয়? লিসা কি ফাহিমের মনের আকুতি অনুমান করতে পেরেছিল? কী এক অদ্ভুত কারণে ফাহিম যখন ভাবছিল লিসার কথা আর ঠিক তখনই তার ফোনটা এল। একেই কি বলে টেলিপ্যাথি?
মনের কিছু শক্তি নিশ্চয়ই রয়েছে। মানুষের অজান্তেই সেই শক্তি কাজে লাগিয়ে এমন অদৃশ্য যোগাযোগ স্থাপন করে থাকে মানুষ। ফলে যিনি মনে মনে যে মানুষকে নিয়ে ভাবছে, অজান্তেই সেই ভাবনা ক্রিয়া করছে সেই মানুষটির মস্তিষ্কে। মানুষের মন যে কতটা শক্তিশালী তা ব্যবহার না করা পর্যন্ত মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না। লিসার কাছ থেকে এভাবে ফোন আসাটাকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়? ফাহিম ঘড়ি দেখল। সময় যেন থমকে আছে। ফাহিমের অস্থিরতা কাটছে না কিছুতেই। সে নিজেও বুঝতে পারছে না, এমন অস্থিরইবা কেন লাগছে তার?
…
সব অপেক্ষার শেষ হয় এক সময়। ফাহিমেরও হল।
ফাহিম দাঁড়িয়ে ছিল তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনেই। বাইরে থেকে কিছু বোঝা না গেলেও ভেতরে ভেতরে তার অস্থিরতা ছিল প্রকট। কিছুক্ষণের মধ্যেই একটি গাড়ি এসে থামল তার অ্যাপার্টমেন্টের সামনের রাস্তায়। ফাহিম দূর থেকে দেখল এক শ্বেতাঙ্গিনী তরুণী গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকাচ্ছে। ফাহিম সহাস্যে এগিয়ে গেল সামনে এবং অবাক বিস্ময়ে দেখল ছিপছিপে গড়নের এক অপূর্ব সুন্দরী তন্বী তরুণীকে।
ভোরের স্নিগ্ধ আলো ছড়িয়ে শিউলি ফুলের সুরভি মেখে সকল প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে মেয়েটি এগিয়ে এল। পড়নে সাদা একটি লং স্কার্ট সাথে ব্লু-টপস। কাঁধের দুপাশে ছড়িয়ে আছে সিল্কের মত সোনালী চুল। মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে তার আশেপাশে।
তরুণীর নীল চোখ গাঢ় আনন্দে চিকচিক করছে। একটুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে, ধীর নিশ্চিত পদক্ষেপে সে এসে দাঁড়াল ফাহিমের সামনে—কোনো রকম জড়তা ছাড়াই জড়িয়ে ধরল তাকে। যেন কতদিনের চেনা কেউ—কত আপনজন।
ফাহিমের শরীরে যেন বিদ্যুৎ তরঙ্গ ছড়িয়ে গেল মুহূর্তেই। লিসার উষ্ণ আলিঙ্গনে মুহূর্তেই নিজেকে হারিয়ে ফেলল সে। একজনের আলিঙ্গনে কারো শরীর এমন করে ভালোলাগায় শিউরে উঠতে পারে, কারো সামান্য স্পর্শে যে এত ভালোলাগা থাকতে পারে—নতুন করে অনুভব করল সে। এই উষ্ণতার, এই ভালোলাগার কি কোনো নাম আছে?
একটু সময় পার করে লিসা নিজের আলিঙ্গন শিথিল করে সরাসরি তাকাল ফাহিমের মুখের দিকে। তাকিয়েই রইল অনেকক্ষণ। তারপর আস্তে করে, ওর বুকের মধ্যে থেকে বলল, ‘কেমন আছ তুমি?’
ফাহিমের মনে হল, এত আবেগ নিয়ে এর আগে কেউ কোনোদিন তাকে এভাবে জিজ্ঞেস করে নি। সে বলল, ‘অনেক ভাল আছি—অনেক। তুমি?’
‘আমিও অনেক ভাল আছি—অনেক। কত যে খুশি হয়েছি তোমাকে বোঝাতে পারব না। মাত্র কয়েকদিন হল অথচ আমার কাছে মনে হচ্ছে, কতদিন পরে তোমাকে দেখলাম!’ লিসার কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঝরে পড়ল।
সাভানার আকাশে কনকনে রোদ। অথচ দুপুরের এই তীব্র রোদের মধ্যেই হঠাৎ আকাশ ভেঙে এক পশলা বৃষ্টি নেমে এল। ভিজে যাবার আগেই ফাহিম লিসার হাত ধরে দৌড়ে গিয়ে ঢুকে পড়ল তার অ্যাপার্টমেন্টের ভেতরে।
রুমে ঢুকে লিসা সব ঘুরে ঘুরে দেখল। দেয়ালে টানানো দুটো পোস্টার—একটা বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের আর একটি জাতীয় স্মৃতি সৌধের। দুটো পোস্টারেই বড় বড় অক্ষরে লেখা—বাংলাদেশ। লিসা ঘুরে তাকাল ফাহিমের দিকে। কৌতূহলী দৃষ্টি নিয়ে বলল, ‘সো ইউ আর ফ্রম বাংলাদেশ?’
‘ইয়েস। হোয়াই?’
‘আমি ভেবেছিলাম তুমি ইন্ডিয়ান।’
‘অনেকে তাই ভাবে। দেখতে আমরা অনেকটা একই রকম।’
‘এশিয়ানরা খুব দয়াল প্রকৃতির হন। এছাড়াও তারা খুব বিশ্বাসী হয়। জীবনের যে কোনও সময়ে পাশে পাওয়া যায়।’
লিসার কাছে থেকে এশিয়ানদের সম্পর্কে এমন উচ্চধারনা শুনে এবং নিজেকে এশিয়ান গোত্রের একজন হিসেবে বেশ গর্ব অনুভব করল ফাহিম। কিঞ্চিত অবাক হয়েই সে জানতে চাইল, ‘তুমি কী করে জানো?’
‘জেনেছি।’ মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল লিসা। বাইরে ঝিরিঝিরি বৃষ্টি ঝরছে। বৃষ্টির ঝাপটায় জানালার কাঁচে ফোটা ফোটা জলের বিন্দু ভিড় করছে। জানালার কাঁচের আঁকিবুঁকি ভেদ করে মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল সে।
ফাহিম লিসার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে সেও তাকাল বাইরে। লিসা মাথাটা এলিয়ে দিল ফাহিমের দিকে। ফাহিম হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিল তাকে। দুজনেই বাইরে বৃষ্টি পড়ার দৃশ্য দেখতে লাগল।
লম্বা একটা বিরতি দিয়ে ফাহিম বলল, ‘আমাদের কিন্তু বাইরে লাঞ্চ করার কথা। খিদে পেলে জানাবে।’
‘খিদে পেয়েছে তবে অন্য কিছুর।’ ফাহিমের দিকে না তাকিয়েই লিসা কথাটা বলল এবং মিটিমিটি হাসতে থাকল।
ফাহিম চকিতে তাকাল লিসার মুখের দিকে।
‘বৃষ্টির মধ্যে বাইরে যেতে চাচ্ছি না।’ লিসার মুখে দুষ্টুমির হাসি।
ফাহিমেরও বাইরে যেতে ইচ্ছে করছে না। অন্য কোনো সময় হলে এই বৃষ্টির দিনে সে নির্ঘাত তার প্রিয় খাবার নিজেই বানিয়ে নিত। হঠাৎই ফাহিমের মনে হল, আচ্ছা খিচুড়ি রান্না করলে কেমন হয়। সাথে ডিম ভাজি। যেই ভাবা সেই কাজ। ফাহিম বলল, ‘আমি তোমাকে একটা মজার আইটেম রান্না করে করে খাওয়াব। আমার খুবই প্রিয়।’
‘কী সেটা?’
‘খিচুড়ি।’
লিসা ভ্রূ কুঁচকে তাকাল। এমন কোনো খাবারের নাম সে তার জীবদ্দশায় শুনেছে কি না সে মনে করতে পারল না। জ্যাকসনভিলে একবার একটা ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে সে গিয়েছিল ব্র্যাডের সঙ্গে—কিন্তু এমন কোনো নামের ফুড আইটেম তার চোখে পড়েছে বলে মনে হয় না। ব্র্যাডের কথা মনে হতেই লিসার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। ব্র্যাডের ব্যাপারে সে ইতোমধ্যেই হার্ডলাইন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছে—যতদিন বেঁচে থাকবে, ব্র্যাডের কোনো স্থান তার জীবনে আর কোনোদিনও হবে না—তার ব্যাপারে সে হাত পা ঝেড়ে ফেলেছে। লিসার অফলাইন-অনলাইন সব জীবন থেকেই তাকে ব্লক করা হয়েছে।
‘এ বস্তুর নাম কোনোদিন শুনেছি বলে মনে হয় না।’ বলল লিসা।
ফাহিম মনে মনে দ্রুত খিচুড়ির ইংরেজি কী হবে চিন্তা করতে লাগল, কিন্তু কিছুতেই মনে করতে পারল না। সে বলল, ‘এটাকে ইয়েলো রাইসও বলতে পার। ইটস অ্যা কম্বিনেশন অফ রাইস, লেন্টিল, ওনিয়ন, গার্লিক, গ্রিন চিলি, টারমারিক পাউডার এন্ড সল্ট মিক্সড উইথ মাস্টার্ড অয়েল। সাথে থাকবে ফ্রাইড এগস আর ম্যাঙ্গো চাটনি। খেতে অসাধারণ। তুমি ট্রাই করে দেখতে পার।’
‘সাউন্ডস রিয়েলি ইয়ামি। আমার তো এখনই খেতে ইচ্ছে করছে।’
‘আমরা বাঙালিরা, বৃষ্টি হলেই খিচুড়ির আয়োজন করি। এটা অনেকটা ট্র্যাডিশনাল হয়ে গেছে।’
‘তাই? ইন্টারেস্টিং। কিন্তু বৃষ্টির সাথে খিচুড়ির কী সম্পর্ক?’
বৃষ্টির সাথে খিচুড়ির কী সম্পর্ক সেটা ফাহিম নিজেও জানে না। কখনো ভেবেও দেখে নি। হঠাৎ তার মনে হল, আসলেই তো! কীসের সম্পর্ক? এই সম্পর্কের বৈজ্ঞানিক, মনস্তাত্ত্বিক বা শরীরবৃত্তীয় ব্যাখ্যা কি? সম্পর্ক যাই হোক—আকাশ কালো মেঘে ঢাকলেই তার মন বলে ওঠে—আজ খিচুড়ি হয়ে যাক। শেষ অবধি হয়তো দেখা গেল যে বৃষ্টিটাই হল না, এদিকে খিচুড়ি খাওয়া শেষ।
ফাহিম মনে মনে হেসে ফেলল। লিসা অবাক হয়ে তাকাল। ফাহিম মাথা ঝাঁকাল, ‘কিছু না।’
লিসা হাসল। তার চোখে মুখে দুষ্টুমি। তাকাল ফাহিমের চোখের দিকে। কিছু বলল না। ফাহিমও অবাক চোখে তাকাল। তাকিয়েই রইল। কারো মুখে কোনো কথা নেই—শুধু চেয়ে থাকা।
মাঝে মাঝে চুপ করে কারো দিকে চেয়ে থাকলে চোখ অনর্গল এত কথা বলে যে, সে সময় মুখে কিছু বলতে ইচ্ছে করে না। কলম কিংবা মুখের ভাষা কোনোদিনও বোধ হয় চোখের ভাষার সমকক্ষ হতে পারবে না।
‘কী দেখছ অমন করে?’ মিষ্টি হেসে লিসা জানতে চাইল।
‘তোমাকে।’ বলল ফাহিম।
‘কী মনে হচ্ছে?’
‘মনে হচ্ছে, এই মেয়েটির চোখের দিকে তাকিয়ে যে কোনো ছেলে বছরের পর বছর কাঁটিয়ে দিতে পারবে।’
‘তুমি পারবে?’
‘হুম।’
‘ভেবে বলছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘চল, তোমার বেডরুমটা দেখব।’
‘বেডরুমে কী?’ অবাক চোখে বলল ফাহিম।
লিসা ফাহিমের হাত ধরল। ‘সেটা গেলেই বুঝতে পারবে।’ বলেই সে ফাহিমকে টেনে নিয়ে গেল তার বেডরুমে। বেডরুমের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে একটি ডাবল সাইজ বেড। সুন্দর পরিপাটি করে পাতা। রুমে ঢুকে চারিদিকে চোখ বুলিয়ে লিসা বলল, ‘আজ রাতটা যদি তোমার এখানে থেকে যেতে চাই, থাকতে দেবে আমায়?’
‘হ্যাঁ দেব। শুধু আজ কেন, যতদিন ইচ্ছে থাকতে পার।’
হঠাৎ কী হল লিসার কে জানে। সে কেমন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। ফাহিমের হাত ছেড়ে দিয়ে সে বিছানার এক কোণায় চুপ করে বসল। ফাহিম দাঁড়িয়ে রইল—চুপচাপ।
‘এই ক’টা দিন আমি ব্র্যাডকে ভুলে ছিলাম তোমার কথা ভেবে। ব্র্যাডের অপমান আমি ভুলে ছিলাম তোমার কথা ভেবে। আমি ঘুমাতে যেতাম তোমার কথা ভেবে। আমার ঘুম ভাঙত তোমার কথা ভেবে। তুমি ছিলে আমার সমস্ত দিনে। সমস্ত সময়ে।’
ফাহিম অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল লিসার মুখের দিকে।
‘অবাক হচ্ছ?’ লিসা আবার জিজ্ঞেস করল, ‘আমার এমন কেন হল বলতে পার?’
ফাহিম কোনো জবাব দিতে পারল না। কী বলবে সে। সে নিজেই বা কী জানে। সে নিজেও লিসাকে মিস করেছে, মনে মনে চাইছে দেখা হোক আবার। একবার হুট করে চলে গিয়ে লিসাকে সারপ্রাইজও দিতে চেয়েছিল সে। এ ক’দিন মেয়েটিকে নিয়ে কল্পনার জাল সে-ই বা কম বুনেছে? আবার, লিসাও তাকে মিস করেছে। এসবের মানে কী? এটা কি ভালোবাসা? প্রেম? এর কী ব্যাখ্যা?
ফাহিম লক্ষ করল লিসার চোখ ভেজা। আশ্চর্য মেয়েটি কাঁদছে কেন? ফাহিম লিসার পাশে গিয়ে বসল—পরম যত্নে ওর একটা হাত টেনে নিল নিজের হাতে।
লিসা তাকাল ফাহিমের দিকে—গাঢ় দৃষ্টিতে বোঝার চেষ্টা করল কিছু। এক অবরুদ্ধ, অশ্রুরুদ্ধ নারীসুলভ কামনায় ওর সমস্ত শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল।
তারপর হঠাৎ কী হল কে জানে, ফাহিম কে আলত করে বিছানায় ফেলে দিয়ে কী এক উষ্ণতার সঙ্গে তার ঠোঁট ছোঁয়াল ফাহিমের ঠোঁটের সঙ্গে।
…
দুপুরে ঝটপট খিচুড়ি রান্না করে ফেলল ফাহিম। লিসা আগ্রহ নিয়ে দেখল ফাহিমের রান্না। কী এক অদ্ভুত কারণে মেয়েটি সারাক্ষণ ছটফট করছে। একধরণের ভালোলাগায় বুদ হয়ে আছে তার শরীর মন। এক নাগারে একা একাই কথা বলে যাচ্ছে সে।
‘আমি এভাবে চলে আসায় তুমি নিশ্চয়ই অবাক হয়েছ, তাই না?’
‘অবাক হব না? এভাবে তুমি দেখা করতে আসবে, এটা আমি কল্পনাও করি নি।’
‘না এসে কি উপায় বল? তুমি বিশ্বাস করবে কি না জানি না, ব্র্যাডের সঙ্গে ব্রেকআপের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল তুমি চলে আসার পর থেকে।’
ফাহিম অবাক হয়ে তাকাল।
‘এত সহজেই তোমাকে পেয়ে যাব, তা অবশ্য আমার ধারণা ছিল না। তবে আমি জানতাম, কোনো না কোনো ভাবে আমি তোমাকে খুঁজে বের করবই।’
‘তুমি কিন্তু এখনো বললে না।’
‘কী?’
‘আমার ফোন নাম্বার কোথায় পেলে?’
‘খুবই সহজ। উবারের লস্ট এন্ড ফাউন্ডে দিন-তারিখ-সময় দিয়ে বললাম, ঐদিন মধ্যরাতে আমাকে যে রাইড দিয়েছিল, সে আমার অতি মূল্যবান একটি জিনিস নিয়ে গেছে ভুলে—সেটি আমি ফেরৎ চাই।’
‘কী? তুমি কি কিছু ফেলে গেছ গাড়িতে?’ ফাহিম দ্রুত চিন্তা করে নিল। সে তো এর মধ্যে গাড়ি পরিষ্কার করেছে—কিছু চোখে পড়েছে বলে মনে হল না। সে বলল, ‘কই কিছু দেখি নি তো।’
‘দেখবে কী করে? ওটা তো তোমার গাড়িতে নেই।’
‘তাহলে?’
লিসা উঠে গিয়ে দাঁড়াল ফাহিমের সামনে। ফাহিমের বাম বুকের ওপর তর্জনী দিয়ে টোকা দিয়ে বলল, ‘এখানে আছে। ইউ স্টোল মাই হার্ট।’ লিসা এবার ফাহিমের বুকে নিজের কান লাগিয়ে বলল, ‘আই ক্যান হিয়ার দ্য বিট। ইট’স স্টিল দেয়ার।’
ফাহিম ভাষা হারিয়ে ফেলল। আবেগে তার চোখ দুটো আর্দ্র হয়ে এল। মাঝে মাঝে অনেক সুস্থ শরীরও কিছু আবেগ সহ্য করার শক্তি হারিয়ে ফেলে।
…
দেখতে দেখতে শনিবারের বিকেল, সন্ধ্যা, রাত এবং পরেরদিন রবিবারের অর্ধেকটা দিন চোখের নিমিষেই যেন পার হয়ে গেল। এদিকে লিসার ফিরে যাবার সময়ও হয়ে এল। দুপুর পেরিয়েছে অনেকক্ষণ হল—দিনের আলো থাকতে থাকতেই তাকে ফিরে যেতে হবে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে পরিপাটি করছিল লিসা। ওর চুল, ওর চোখ, ওর নাক, ওর কান, ওর দাঁত, ওর হাতের আঙ্গুল, ওর পায়ের পাতা সব কিছুর মধ্যে এমন একটা পরিচ্ছন্ন দীপ্তি যে ফাহিম অপলক চেয়ে রইল লিসার দিকে।
হঠাৎ চোখে তুলে লিসা বলল, ‘কী দেখছ?’
‘তোমাকে!’
‘এখনো দেখা শেষ হয় নি? এখনো কি সন্দেহ আছে? দ্বিধা আছে আরো?’
‘জানি না।’
‘তবে এভাবে তাকিয়ে আছ কেন?’
‘তৃপ্তি মিটছে না—কী করব?’
‘কী করলে তৃপ্তি মিটবে?’
‘জানি না।’
একটুক্ষণ চুপ থেকে লিসা বলল, ‘আমার না একেবারেই যেতে ইচ্ছে করছে না।’
ফাহিম হেসে দিয়ে বলল, ‘থাকো না—কে যেতে বলল তোমাকে?’
লিসা ঘুরে দাঁড়াল। গাঢ় কণ্ঠে বলল, ‘আমি তোমার জীবনের একটা অংশ হয়ে থাকতে চাই—আমায় জায়গা দেবে একটু?’ বলতে বলতে লিসার চোখ ভিজে এল।
ফাহিম ওকে দু’হাতে কাছে টেনে নিল। লিসা ফাহিমের বুকে মুখ রেখে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। দুজনার মন কী এক আশ্চর্য কী এক অপ্রকাশ্য রোমাঞ্চকর উষ্ণতায় ভরে গেল।
লিসার আর্দ্র চোখে কী দারুণ এক খুশী ঝিলিক দিয়ে উঠল। মুহূর্তেই ওর চেহারার সব বিষাদ সরে গেল। লিসা ফাহিমের চোখের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি করে হাসল। ফাহিম ফিরিয়ে দিল এক নির্ভরতার হাসি।
…
লিসাকে তার গাড়ি পর্যন্ত এগিয়ে দিতে হেঁটে এল ফাহিম। লিসা মুখ নিচু করে হেঁটে এল। কিছুই বলল না। গাড়ি পর্যন্ত এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল দুজনেই। কোনো কথা খুঁজে না পেয়ে ফাহিম বলল, ‘আবার কবে আসবে?’
‘তু্মি যেদিন আসতে বলবে। তবে এমন করে একদিনের জন্যে নয়—অন্তত কয়েকদিনের জন্য আসব।’
‘একেবারেই চলে আস না?’
‘যখন আমাকে বাংলাদেশে নিয়ে যাবার জন্যে তৈরি হবে—তখনই আসব। একেবারে। রাতে যেসব কথা হয়েছে মনে থাকবে তো, না?’
‘অবশ্যই মনে থাকবে।’
লিসা তাকাল আকাশের দিকে। বিকেলের রোদ পশ্চিমাকাশে হেলে পড়েছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সে বলল, ‘এবার যাই।’
‘এসো।’ অস্ফুটে বলল ফাহিম।
লিসা ফাহিমকে দ্রুত একটা হাগ দিয়ে উঠে পড়ল গাড়িতে। দেরি না করে গাড়িটা ছেড়ে দিয়ে ধীরে ধীরে বের হয়ে গেল এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স থেকে।
লিসার গাড়িটি দৃষ্টির আড়ালে চলে যাওয়ার পরেও অনেকক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল ফাহিম। লিসার সঙ্গে ফাহিমের অনেকখানি অশরীরী ফাহিমও উধাও হয়ে গেল।


